Wednesday, June 18, 2025

ইরানে হস্তক্ষেপ: সম্মান হারানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা নিতে বললেন শি জিংপিং

ইরানে হস্তক্ষেপ সহজভাবে নিচ্ছে না চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে সেটি বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে। এবার প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং-ও যুক্তরাষ্ট্রের হম্বিতম্বির বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছেন। সম্মান হারানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা নিতে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৭ জুন) এক এক্স-বার্তায় শি অতীতের পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের ধ্বংস স্মরণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে তিনি লিখেন, ‘বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াই এগিয়ে যেতে পারে।’

ইতিহাসের রেফারেন্স টেনে শি লিখেন, ১০০ বছর আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশ্ব বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। বিশ্বের ২০% এরও বেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। অনেকে বিশ্বাস করতেন এর সূর্য কখনো অস্ত যাবে না।

২০০ বছর আগে ফ্রান্স ইউরোপের মঞ্চে প্রভাব বিস্তার করেছিল। এর সেনাবাহিনী ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছিল। এর সংস্কৃতি ঈর্ষার বিষয় ছিল। নেপোলিয়ন নিজেকে অমর ঘোষণা করেছিলেন।

৪০০ বছর আগে স্প্যানিশ রাজত্ব ম্যানিলা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত শাসন করেছিল। এর ধনরাশি বহনকারী জাহাজগুলো রুপো ও রেশমে ভরা ছিল। রাজারা ভেবেছিলেন তাদের গৌরব চিরস্থায়ী হবে।

প্রতিটি সাম্রাজ্য নিজেকে অপরিহার্য বলে ঘোষণা করেছিল। প্রতিটিই শেষ পর্যন্ত ম্লান হয়ে গেছে।

শি আরও লিখেন, ‘ক্ষমতা হ্রাস পায়। প্রভাব স্থানান্তরিত হয়। বৈধতা মুহূর্তেই মরে যায় যখন এটি অর্জনের পরিবর্তে ধারণা করে নেওয়া হয়। প্রতিটি পতনশীল সাম্রাজ্য অতীত থেকে শিখতে দেরি করেছে। আমেরিকা যদি বিশ্বে সম্মান হারায় তবে তারাও সেই দেরিতেই শিখবে। বিশ্ব এগিয়ে যায়; সবসময়।’

অন্য পোস্টে শি লিখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও পুলিশি কার্যক্রমে আট ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। হাজার হাজার আমেরিকান সৈন্য মারা গেছে বা গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। অন্য পক্ষে লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া (মার্কিনদের) সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত ছিল।’

শি জিংপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
শি জিংপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

ইসরাইলি হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থেমে যায়নি, থামেনি পারমাণবিক বোমার আশঙ্কাও by এমা গ্রাহাম-হ্যারিসন

মাত্র কয়েক দিনের যুদ্ধে ইসরাইল ইরানের এক ডজনেরও বেশি শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে, দেশের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক নেতৃত্বের অনেক অংশ ধ্বংস করেছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে। এটি ইসরাইলি সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তির একটি শক্তিশালী প্রদর্শন। কিন্তু তাতেও ইরানের বিস্তৃত ও নিরাপদভাবে ছড়িয়ে থাকা পারমাণবিক কর্মসূচি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি— এমনটাই বলছেন ইসরাইলি সামরিক কমান্ডার এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞরা। বরং, অনেকের আশঙ্কা— এই সহিংসতা যদি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না করে শেষ হয়, অথবা যদি একটি কঠোর পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং অবাধ নিয়ন্ত্রণসহ কোনো চুক্তি না হয়, তাহলে ইরান হয়তো বোমা তৈরির পথেই আরও দ্রুত অগ্রসর হবে।

একজন ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, এই আঘাত ইরানের ‘ব্রেকআউট’— অর্থাৎ একটি কার্যকর পারমাণবিক বোমা তৈরির সময়সীমা কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়েছে। তবে, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, ইরান এখনও তিন বছর দূরে বোমা ডেলিভারির সক্ষমতা অর্জনের। তারা বিশ্বাস করেন, ইরান এখনই সক্রিয়ভাবে বোমা তৈরির চেষ্টায় নেই— সিএনএন মঙ্গলবার জানিয়েছে। সেক্ষেত্রে এই কয়েক মাসের বিলম্ব বড় কিছু নয়।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল বলেই তিনি এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তাও যদি সত্যি হয়, এই হামলাগুলো খুব বেশি সময় কেড়ে নেয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া ইসরাইলের পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করা সম্ভব নয়। এই হামলার সবচেয়ে বড় ফলাফল— ইরানি নেতৃত্বের মনে আতঙ্ক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ। যারা নিজের দেশের সরকারকে ঘৃণা করে, তারাও ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুদের ঘরে ঢুকে পড়া ক্ষেপণাস্ত্রের বিভীষিকা ভুলতে পারেনি। পুরো এলাকা খালি করে দেওয়ার আদেশ গাজা যুদ্ধের বিভীষিকাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

ইসরাইল নিজে কখনও প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, তার একটি গোপন পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে— যা প্রতিরোধমূলক হিসেবে তৈরি। অনেক ইরানিই মনে করেন, তাদেরও একই অস্ত্র থাকা দরকার। এই যুদ্ধ হয়তো সেই জনসমর্থন আরও বাড়িয়েছে। গত এক বছরে ইরানের আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বকারী বাহিনীগুলো একের পর এক পতনের পর, দেশটির অভ্যন্তরে পারমাণবিক কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে— বলেন সিমা শাইন। তিনি মোসাদের গবেষণা শাখার সাবেক প্রধান।

তিনি বলেন, গত দেড় বছরে আমি যতটা পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা দেখেছি, এমনটা আগে কখনও দেখিনি। যদিও বেশিরভাগ আলোচনা ছিল— ‘ইরান বোমা বানাবে কি না’ নিয়ে, ‘বানাতে পারে কি না’ নিয়ে নয়— তবুও এই সিদ্ধান্ত বদলানো খুবই সহজ। তিনি আরও বলেন, যদি যুদ্ধ পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস না করেই শেষ হয় এবং ইরান ‘ব্রেকআউট’ করতে পারে, তাহলে তারা তা করবেই।

এ অঞ্চল নিয়ে অভিজ্ঞ এক পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তাও একমত— ইসরাইলের হামলাগুলো যতটা না প্রতিরোধমূলক, তার চেয়েও বেশি হতে পারে পারমাণবিক বিস্তার ত্বরান্বিতকারী হিসেবে। ‘আমার মতে, যদি এই হামলার পর তাদের সক্ষমতা অক্ষত থাকে, তাহলে তারা যত দ্রুত সম্ভব বোমা বানাবে।’
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ধ্বংসে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ফোর্দো স্থাপনাটি। এটি ক্বোম শহরের কাছে একটি পাহাড়ের নিচে গভীরে স্থাপিত। ইসরাইলের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমাগুলোরও সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এখানেই সংরক্ষিত রয়েছে ইরানের অধিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও সেন্ট্রিফিউজ। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাংকার-ধ্বংসকারী বোমাগুলোই হয়তো এটি ধ্বংস করতে পারে।

প্রাথমিক হামলার সাফল্যে যখন ইসরাইল উল্লসিত, তখন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তজাচি হানেগবি সতর্ক করেছেন, ইসরাইল একা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে পারবে না। তিনি ইসরাইলি গণমাধ্যমকে বলেন, এটি কেবল সামরিক উপায়ে করা সম্ভব নয়। বরং, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘমেয়াদী একটি চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতেই সেনাবাহিনী ভূমিকা রাখতে পারে। নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে মার্কিন সামরিক সহযোগিতা বেশি পছন্দ করেন। ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসার জন্য চাপ দিয়ে বলেছেন, আমি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বুঝি, কিন্তু ‘আমেরিকা মৃত’ বুঝি না”— এ কথা তিনি বলেন এবিসি-টিভির এক সাক্ষাৎকারে। ইসরাইলি নেতার স্বপ্ন কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস নয়, বরং তেহরানে সরকার পরিবর্তনও। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র যেটি সাধারণ মানুষের ঘরে আঘাত হানে, তা ইরানি জনগণের কাছে নেতানিয়াহুর আহ্বানকে আরও শূন্য করে তোলে।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, আমরা গাজা যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে অবমূল্যায়ন করছি—  যারা ইরান সরকারকে ঘৃণা করে, তাদের মধ্যেও। তিনি আরও বলেন, গাজার সরকারও এক নির্মম কর্তৃত্ববাদী শাসন, যার বিরুদ্ধে হামলার যৌক্তিকতা দেখানো হয়। কিন্তু ইসরাইল যেভাবে বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে, তা সন্ত্রাস।

ইসরাইলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট এই ধরনের অভিযানে যুদ্ধাপরাধের উপাদান দেখেছেন। পশ্চিমাদের মৌন সমর্থন এই হামলাগুলোকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। নাসর বলেন, একসময় বিশ্বাস ছিল— আন্তর্জাতিক উদার গণতান্ত্রিক বিশ্ব শৃঙ্খলা ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, ইউরোপ ও আমেরিকা ইসরাইলকে বেপরোয়া হতে দেবে না। গাজার ধ্বংসস্তূপে সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে। যদি ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে না টানেন, এবং ইরান যদি তাড়াতাড়ি একটি পরমাণু নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে না আসে, তাহলে ইসরাইল ফোর্দো’তে আরও বড় হামলার চিন্তা করতে পারে।

আইডিএফ-এর গোয়েন্দা গবেষণা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক আলেক্স গ্রিনবার্গ বলেন, ইসরাইল ও বিশ্ব অনেক দিন ধরেই পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা মারার চিন্তা করছে। এমনকি ফোর্দোকে বোমায় ধ্বংস করা না গেলেও, বিকল্প পদ্ধতিও রয়েছে। ইসরাইল যেহেতু ইরানের পারমাণবিক আর্কাইভের একটি বড় অংশ দখল করেছে, তারা ফোর্দোর ভিতরের অনেক পরিকল্পনা জানে। ফলে হয়তো তাদের জন্য ভবন ব্যবস্থাপনা ভেঙে দেওয়া, প্রবেশপথ বন্ধ করা, এমনকি স্পেশাল ফোর্স দিয়ে স্থল অভিযান করাও সম্ভব।

ইতিমধ্যে নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহে আঘাত হানে ইসরাইল, যার ফলে সেন্ট্রিফিউজগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। গত বছরও ইসরাইল স্পেশাল ফোর্স দিয়ে সিরিয়ার এক ভূগর্ভস্থ হিজবুল্লাহ ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস করেছে। নেতানিয়াহু যতই সামরিক হামলা চান না কেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা সংস্থার প্রেসিডেন্ট ডেভিড আলব্রাইট বলেন, একটি কঠোর পরিদর্শনভিত্তিক চুক্তিই হয়তো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে সবচেয়ে কার্যকর হবে। তিনি বলেন, ইসরাইলের কৌশলের সমস্যা হলো— যদি তারা বোমা মারা বন্ধ করে, তাহলে ইরান আবার সবকিছু গড়ে তুলতে পারে। তখন আবার নতুন করে বোমা ফেলতে হবে।
(অনলাইন গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ) 

‘এটা আপনার জন্য নয়’: ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় আশ্রয়কেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের ঢুকতে বাধা

সামার আল-রাশেদের বয়স ২৯ বছর। পাঁচ বছরের মেয়েকে একাই বড় করছেন তিনি। থাকেন ইসরায়েলের একর এলাকার কাছে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে। তাঁর প্রতিবেশীদের অধিকাংশই ইহুদি।

গত শুক্রবার ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা হিসেবে যখন তীব্র শব্দে সাইরেন বাজছিল, তখন বাড়িতেই ছিলেন সামার ও তাঁর মেয়ে জিহান।

সাইরেন বাজা শুরু হলে আতঙ্কিত সামার মেয়ের হাত ধরে ভবনের আশ্রয়কেন্দ্রের (বাংকার) দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। অন্য বাসিন্দারাও সেদিকে ছুটছিলেন তখন।

ওই সময়ের কথা মনে করে সামার বলেন, ‘আমি কিছু গুছিয়ে নেওয়ার সময় পাইনি। শুধু পানি, আমাদের ফোন ও মেয়ের হাত ধরে ছুটতে থাকি।’

আতঙ্কিত সামার নিজের ভয় লুকিয়ে রেখে মেয়েকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন। নরম গলায় আরবি ভাষায় মেয়েকে ধৈর্য ধরতে বলছিলেন, যেন তাঁরা একসঙ্গে দ্রুতপায়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে এগোতে পারেন—ঠিক যেভাবে প্রতিবেশীরাও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল।

কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রের দরজার সামনে সেখানকার এক ইসরায়েলি বাসিন্দা এই মা-মেয়ের পথ আটকে দাঁড়ান। সামার বলেন, ওই ব্যক্তি তাঁকে আরবিতে কথা বলতে শুনে ফেলেছিলেন। আশ্রয়কেন্দ্রের দরজা দিয়ে ঢোকার আগেই ওই ব্যক্তি তাঁদের পথ আটকান এবং মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন।

ঘটনার আকস্মিকতায় সে মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সামার। বলেন, ‘আমি হিব্রু খুব ভালো বলতে পারি। তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তিনি ঘৃণাভরে আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন, “এটা আপনার জন্য নয়।”’

সামার বললেন, ঠিক তখনই ইসরায়েলি সমাজের গভীর বিভাজনরেখাগুলো যেন উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল।

গভীর হতাশা নিয়ে মেয়ের হাত ধরে সামার নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে আকাশে বিস্ফোরণের আলো দেখতে পেলেন—দূরে ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যাচ্ছে, কখনো আকাশেই বিস্ফোরিত হচ্ছে, দু–একটা মাটিতে আছড়ে পড়ছে। এ দৃশ্য যেমন তাঁকে আতঙ্কিত করছিল, তেমন প্রতিবেশীদের আচরণও ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল।

আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি

ইসরায়েলজুড়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় এখন প্রচণ্ড ভিড়। সেখানে পুরোনো বাড়িগুলোয় কোনো বাংকার নেই। ফলে পুরোনো বাড়ির বাসিন্দারা এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় আশ্রয় নেন।

তেল আবিব ও পশ্চিম জেরুজালেমে ভবনের সিঁড়িঘরগুলো এখন বাসিন্দাদের অস্থায়ী শোবারঘরে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিম জেরুজালেমের অবসরপ্রাপ্ত সমাজকর্মী ইয়াকোভ শেমেশ বলেন, ইরানের হামলা শুরুর পর থেকে তাঁর স্ত্রী তাঁদের অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের সিঁড়িঘরেই ঘুমাচ্ছেন।

শেমেশের বয়স ৭৪ বছর। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভবনে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। রোববার রাতে আমি ছাদে গিয়েছিলাম কী হচ্ছে দেখতে। আকাশে আলোর ঝলকানি দেখলাম, তারপরই বিস্ফোরণের শব্দ। কিন্তু খবরে এ নিয়ে কোনো তথ্য পেলাম না। হয়তো তারা (রাষ্ট্র) আমাদের জানাতে চায় না এটা কতটা কাছাকাছি এসেছিল।’

ইসরায়েলের আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবের আকাশেই ধ্বংস করছে। আকাশজুড়ে সেসব বিস্ফোরণের আলোক ঝলকানি
ইসরায়েলের আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবের আকাশেই ধ্বংস করছে। আকাশজুড়ে সেসব বিস্ফোরণের আলোক ঝলকানি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসলামিক বিপ্লবের প্রতিশোধ, নাকি পারমাণবিক অস্ত্রের লড়াই? by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

২০২৫ সালে এসে আমরা যেন আবার ১৯৭৯-এর ছায়ায় ফিরে যাচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে গোলা-বারুদের ধোঁয়া, তেহরান-ইসরাইলে সাইরেনের শব্দ, ইসরাইলের আকাশে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কার্যত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। খামেনিও পাল্টা হুমকি দিয়েছেন। তিনিও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ‘যুদ্ধ শুরু’র ঘোষণা দিয়েছেন। বৃটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান উড়িয়ে আনা হচ্ছে। ভূমধ্যসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ নিমিটজ। জি-৭ সম্মেলন থেকে তড়িঘড়ি করে ট্রাম্প দেশে ফিরেছেন। জরুরি সভা করছেন। হোয়াইট হাউস অস্বস্তিকর নীরবতায়। ইরানের ফোর্দোতে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনার দিকে চোখ তাদের।

এই স্থাপনা একটি বিশাল পাহাড়ের নিচে, ভূগর্ভের অনেক গভীরে। সেটা ধ্বংস করতে হলে কমপক্ষে ১৩,৬০০ কিলোগ্রাম ওজনের বোমা প্রয়োজন। এই বোমা বহন করতে পারে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ যুদ্ধবিমান। এক্ষেত্রে ইসরাইলকে সফল হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা লাগবেই। কিন্তু ট্রাম্প কি তার দেশের কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন? এ নিয়ে আছে বিস্তর বিতর্ক। যদি তিনি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তবে এই যুদ্ধ কি কেবল আধুনিক পারমাণবিক শঙ্কার প্রতিফলন ঘটাবে? নাকি এটি সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত প্রতিশোধ হবে? মনে আছে সেই ১৯৭৯ সালের কথা। তখন মার্কিনপন্থি ইরানের শাসক রেজা শাহ পাহলভিকে উৎখাত করে ইরানের ইসলামিক বিপ্লব।

এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুলুল্লাহ খামেনি। ওই আন্দোলনে শাহ শাসনের অবসানে রাজধানী তেহরানে অবস্থিত তখনকার মার্কিন দূতাবাসে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্বমোড়ল হওয়ার পরও ইরানে তাদের সেই গ্লানি আজও বহন করে বেড়াতে হচ্ছে। ওই সময় থেকে ইরানে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারাই ইসলামি বিপ্লবের উত্তরাধিকারী। এই শাসনযন্ত্র  আজও যুক্তরাষ্ট্রের গলায় কাঁটা হয়ে আছে? পারমাণবিক ইস্যুতে যতটা না, তার চেয়ে বেশি এই অপমানের প্রতিশোধ নেয়া। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে সেই সুযোগ খুঁজছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা কোথা থেকে শুরু?
আরও গভীরে গিয়ে বলা যায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ১৯৫৩ সাল থেকেই উত্তাল। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন যৌথভাবে এক ‘সিআইএ-পৃষ্ঠপোষক’ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে সরিয়ে দেয়। কারণ? মোসাদ্দেক ইরানের তেল জাতীয়করণ করেছিলেন। এটা ছিল পশ্চিমা শক্তির জন্য অর্থনৈতিক আঘাত। এ জন্য তারা ইরানের তেল সম্পদকে লুটেপুটে খেতে পারছিল না। এরপর যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজত্বে ইরান পশ্চিমঘেঁষা এক শাসনব্যবস্থায় পরিণত হয়। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লব সেই রাজনীতি উল্টে দেয়। আয়াতুল্লাহ রুহুলুল্লাহ খোমেনি নেতৃত্বে একটি ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে ঘোষণা করে ‘শয়তানের রাষ্ট্র’। এরপর থেকেই দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক কখনওই স্বাভাবিক হয়নি।

ইসলামিক বিপ্লবের প্রতিশোধের রাজনীতি
ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব— বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি— বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তারা শুধুই একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি ‘বিপ্লবী আদর্শ’। সেই আদর্শ যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধিতা ও জায়নিস্টদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানেই প্রশ্ন উঠে: আজকের যুদ্ধ কি আসলে সেই ১৯৭৯ সালের প্রতিক্রিয়া? খামেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বার্তাগুলো দিচ্ছেন (যুদ্ধ শুরু হয়েছে, জায়নিস্টদের কোনও দয়া করা হবে না)— তা শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি বিপ্লবী চেতনার ধারাবাহিক প্রতিফলন। তাদের চোখে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সেই ‘সাম্রাজ্যবাদী দানব’। তারা মুসলিম বিশ্বের শোষণকারী। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও সামরিক পদক্ষেপকে দেখা হয় ‘ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে, যা ইরানকে আদর্শিকভাবে আরও প্রতিরোধী করে তোলে।

পারমাণবিক অস্ত্র: বাস্তব হুমকি, না কৌশলগত গুজব?
২০০০-এর দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে। যুক্তরাষ্ট্র বহুবার দাবি করেছে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। ইরান অবশ্য বলে আসছে, তাদের প্রকল্প শুধু শান্তিপূর্ণ ও গবেষণাভিত্তিক। ২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্লানক অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তিতে ইরান আন্তর্জাতিক তদারকির বিনিময়ে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখতে রাজি হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির শর্ত ভাঙতে থাকে, যা আবারও উদ্বেগ তৈরি করে। ২০২৫ সালে এসে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে— ইরান সম্ভবত ‘নিউক্লিয়ার ব্রেকআউট ক্যাপাবিলিটিতে’ পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ তারা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক হস্তক্ষেপের একটি ন্যায্যতা দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি: শুধু ইসরাইল বনাম ইরান নয়
২০২৫ সালের মে-জুন মাসে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় শুরু হয়। একদিকে ইসরাইল দাবি করছে তারা ইরানের একটি গোপন ইউরেনিয়াম স্থাপনা ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে ইরান বলছে তারা ‘ফাত্তাহ’ নামের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরাইলকে প্রত্যাঘাত করেছে। তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দিয়েছে। তেলক্ষেত্রে আঘাত করেছে। মাটির সঙ্গে মিশে গেছে তেল আবিবের বহু স্থাপনা। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, আমরা জানি ‘সুপ্রিম লিডার’ কোথায় আছেন। আমরা চাইলে তাঁকে এখনই সরাতে পারি। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বৃটেনের লেকেনহিথ ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছে। এটা যুদ্ধ প্রস্তুতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— যুক্তরাষ্ট্র কি শুধু ইসরাইলের পক্ষ নিচ্ছে, না কি নিজেই একটি সামরিক সংঘাতে প্রবেশ করছে?

কংগ্রেস বনাম হোয়াইট হাউস: আইনি দ্বন্দ্ব
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা করার অধিকার কেবল কংগ্রেসের। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হলেন সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সীমিত সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। ট্রাম্প অতীতে সিরিয়ায় এমন হামলা চালিয়েছিলেন। বর্তমানে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্য থমাস ম্যাসি বলেছেন— এটা আমাদের যুদ্ধ নয়। হলেও কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে সামরিক প্রস্তুতি ও ট্রাম্পের ঘন ঘন হুমকি এটাই বলে দেয় যে, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতি ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
যুদ্ধের আরেকটি বড় দিক হলো অর্থনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের দোহাই দিয়ে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কৌশল কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে চুক্তিতে ফিরতে পারেনি। তুরস্ক, চীন, রাশিয়া— সবাই এখন ইরানের পাশে কোনো না কোনোভাবে অবস্থান নিয়েছে। ফলে ইরানকে কূটনৈতিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখানে উল্লেখ্য, এ কয়েকদিনে চীন কূটনৈতিক ভাষায় প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবার সরাসরি মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের বিরোধিতা করি।  

ইসলাম বনাম পশ্চিম: আদর্শিক সংঘর্ষের পুনর্জাগরণ?
এই যুদ্ধকে শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ভুল হবে। খামেনি ও তাঁর অনুসারীরা একে ‘ইসলামের পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘পশ্চিমা শয়তানি জোট’ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। এই বার্তাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বহু তরুণের মধ্যে সহানুভূতির সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। ফলে এই যুদ্ধ কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং মুসলিম বিশ্ব বনাম পশ্চিমাদের মধ্যকার একটি আদর্শিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। এই যুদ্ধ কোথায় নিয়ে যেতে পারে?

এই যুদ্ধ আসলে একইসাথে তিনটি মাত্রা বহন করছে।
১. ইতিহাসের প্রতিশোধ: ১৯৭৯-এর বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া ও সিআইএ-সমর্থিত অতীতের অভ্যুত্থানের ক্ষোভ
২. পারমাণবিক আতঙ্ক: নিরাপত্তা ও সামরিক প্রভাব বজায় রাখতে চাওয়া দুই পক্ষের ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতা
৩. আদর্শিক দ্বন্দ্ব: ইসলাম বনাম পশ্চিমের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ

এই সংঘাতের ভয়াবহতা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে যদি পারমাণবিক হামলার ঝুঁকি থেকে থাকে, অন্যদিকে রয়েছে কোটি মানুষের বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের বেদনার স্পর্শ। যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ছারখার হয়ে যেতে পারে। এর উত্তাপ আরও ছড়িয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ববাসী তিল তিল করে গড়ে তুলেছে আজকের বিশ্ব। তখনকার সময় থেকে এখন পৃথিবী রয়েছে ‘ই-যুগে’। বুর্জ খলিফা, মালয়েশিয়ার টুইন টাওয়ার, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার সহ অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন সমৃদ্ধির সাক্ষ্য বহন করে। এখন যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়, তাহলে তা পৃথিবীকে আবার নিয়ে যাবে সেই অন্ধকার অতীতে। তাই এখন সময় ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার, যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার। নয়তো, ২০২৫-এর এই যুদ্ধ হতে পারে এমন এক আগুন, যা গোটা মানবসভ্যতাকে ঝলসে দিতে পারে।

mzamin

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তালা বিএনপিকে ভোগাবে by সালেহ উদ্দিন আহমদ

লন্ডনে অধ্যাপক ইউনূস ও তারেক রহমানের আলোচনা নিয়ে কার হার হলো আর কার হলো জিত, তা নিয়ে আলোচনা চলছেই। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন এত দিন ইউনূস-ভক্ত, তাঁরা এখন তাঁর সমালোচনায় নেমেছেন। বিএনপি ইউনূসের বিরুদ্ধে নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে অনেক হইচই করেছে, এখন তাদের ভূমিকাও পাল্টে গেছে। বিচিত্র সেলুকাস কী আজব আমাদের রাজনীতি, এক দিনেই সব পাল্টে গেল!

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক রায় দিয়েছেন যে লন্ডন বৈঠকে বিএনপির বিজয় হয়েছে। বিষয়টা অন্যভাবেও দেখা যায়। অধ্যাপক ইউনূস চেয়েছিলেন নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে হবে। তিনি দুই মাস নির্বাচন এগিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। তারেক রহমান চাচ্ছিলেন এ বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচন। তিনি ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারি মেনে নিয়েছেন। সুতরাং দুই পক্ষই দুই মাস করে ছাড় দিয়েছে।

নির্বাচন নিয়ে যাঁরা তাঁর অঙ্গীকারে সন্দিহান ছিলেন এবং নির্বাচনের তারিখ নিয়ে যাঁরা ষড়যন্ত্র দেখছিলেন, অধ্যাপক ইউনূস তাঁদের থেকে কিছুটা চাপমুক্ত হলেন। এটাকে অধ্যাপক ইউনূসের একটা অর্জন হিসেবে দেখা যায়। অন্যদিকে তারেক রহমানেরও একটা বড় অর্জন আছে। জনগণ এই প্রথমবারের মতো বিএনপির দলীয় ভিডিও স্ক্রিনের বাইরে বৃহত্তর এবং হাই প্রোফাইল মঞ্চে তাঁকে ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখতে পেল। সবকিছু হিসাব করলে এই বৈঠকে লোকসান কারও হয়নি এবং লাভ দুই পক্ষেরই সমান সমান।

এখন কোনো কোনো রাজনৈতিক দল মনে করছে, বিএনপি ও তারেক রহমানের প্রোফাইল বাড়িয়ে অধ্যাপক ইউনূস তাদের লোকসান করে নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করেছেন। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ যেসব রাজনৈতিক দল এত দিন নির্বাচনের তারিখ ও সংস্কার নিয়ে অধ্যাপক ইউনূসকে সমর্থন দিয়েছিল, তারা বেশ নিরাশ হয়েছে। কারণ, লন্ডনে এত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং বিএনপির অনুরোধে নির্বাচনের তারিখ এগিয়ে এনে, অধ্যাপক ইউনূস বিএনপিকে বেশ উজ্জীবিত করেছেন। বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, এটা একটা ‘টার্নিং পয়েন্ট’।

অধ্যাপক ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে সাক্ষাৎ ও সমঝোতার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে হাওয়া লেগেছে। নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করছে দলগুলো।

জামায়াতে ইসলামী ২৯৪ আসনে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কেউ নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তবে হেফাজতের নেতারা সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নির্বাচন করতে পারবেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনো দল গোছানোতে ব্যস্ত। তারা দলকে নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত করার আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে তারা তাদের প্রতীক মুষ্টিবদ্ধ হাত বা শাপলা—এ দুটির একটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। তাদের বড় নেতারা সময় করে তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

বিএনপি বড় দল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতে তারাই একমাত্র সংগঠিত জাতীয় দল, যারা আগেও সরকার গঠন করেছিল বেশ কয়েকবার। এটা ধরে নেওয়া যায় যে বিএনপি নেতা তারেক রহমান এককভাবে বিএনপির নির্বাচনী কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা দেবেন। তিনি দেশে আসার আগে সম্ভবত তা নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন কিছু জানা যাবে না। যদিও ভেতরে ভেতরে কাজ চলছে। তিনি কবে দেশে আসবেন? স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, তাঁর দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই। মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ‘শিগগির আসবেন।’

বিএনপি ঘরানার ছোট দলগুলো বিএনপির দিকেই চেয়ে আছে তাদের নির্বাচনী পালে হাওয়া ধরাতে। বিএনপির সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্না একটি দৈনিককে বলেছেন, তারেক রহমান প্রস্তাব করেছিলেন যে জাতীয় সরকার গঠন করবেন।

রাজনৈতিক দল গণফোরাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, তারাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোস্তফা মোহসীন মন্টু ছিলেন গণফোরামের চেয়ারম্যান। দুঃখের খবর হলো, তিনি ১৫ জুন হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন।

বিএনপি নেতা তারেক রহমান বেশ আগেই ঘোষণা করেছেন, ছোট দলগুলো যারা আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির শরিক ছিল, তাদের নেতাদের জন্য ছয়টি আসন ছেড়ে দেবেন। তার একটি আসন হলো পটুয়াখালীতে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের জন্য। কিন্তু তারেক রহমানের এই বদান্যতা গ্রহণ করা যে ছোট দলগুলোর নেতাদের জন্য খুব সহজ হবে না, তা প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। কারণ, সেসব আসনে যাঁরা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী, তাঁরা ছোট দলের নেতাদের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।

১২ জুন নুরুল হক যখন পটুয়াখালীতে নিজ উপজেলায় দলীয় সভা করতে যান, তখন তিনি বিএনপির লোকজনের হাতে অবরুদ্ধ হন এবং তাঁকে উদ্ধারে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে যেতে হয়েছিল। অন্য দলের নেতারাও যে নিজ এলাকায় বিএনপির কাছ থেকে খুব ভালো সংবর্ধনা পাবেন না, তা সম্ভবত ধরে নেওয়া যায়। নুরুল হক ঘোষণা করেছেন, বিএনপির সঙ্গে বড় সমঝোতা না হলে, তাঁর গণ অধিকার ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবে।

মনে করা হয়েছিল, ইউনূস-তারেক বৈঠকের পর এ রকম সব সংকটের অবসান হবে। যেমন ঢাকা দক্ষিণের মানুষের দুর্ভোগ কমবে। কিন্তু তা হওয়ার নয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তালা লাগানোর এক মাস পার হয়ে দুই মাসে পড়েছে। বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ পড়ানোকে কেন্দ্র করে সংকট চলছেই। এর মধ্যে নগর ভবনে সভা করেছেন ইশরাক। সেখানে ব্যানারে তাঁর নামের আগে ‘মাননীয় মেয়র’ লেখা হয়েছে।

বিএনপি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ে যা করেছে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে সম্ভবত পস্তাবে। তারা যেভাবে হাসিনা আমলের একটা ‘অবৈধ’ নির্বাচনকে ‘বৈধতা’ দিল, তা সত্যি আশ্চর্যজনক। বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, অন্যরাও যখন কাজে-অকাজে সরকারি ভবনে তালা দেবে, রাস্তাঘাট অবরোধ করবে, তখন বিএনপি কী করবে?

অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, ইশরাক হোসেন কেন পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন না? অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, ইশরাক হোসেন মেয়রের শপথ নিলে কয় দিনের জন্য মেয়র হবেন বা আদৌ কি দায়িত্ব পাবেন? এক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হয়েছিল নির্বাচন এবং ওই নির্বাচনের মেয়রের মেয়াদ এ বছরের ১৫ মে শেষ হয়েছে। তবু তিনি কেন মেয়র পদে যেতে চান?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্ভবত অনেকেই বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে তাকাবেন। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হওয়ার অভিলাষ বিএনপির মধ্যে অনেকের। বেগম জিয়ার প্রথম মেয়াদে মির্জা আব্বাস ছিলেন মেয়র। পরবর্তী মেয়াদে ইশরাকের বাবা সাদেক হোসেন খোকাকেই বেগম খালেদা জিয়া সুযোগ দেন মেয়র হতে। ঢাকা শহর বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে আব্বাস ও খোকার দ্বন্দ্ব তখন আলোচনার বিষয় ছিল। মির্জা আব্বাস এত বছর পর মেয়র পদে আবার ফিরে যেতে চান কি না, তা জানা যায়নি। তবে ইশরাকের আন্দোলন থেকে তিনি দূরেই ছিলেন।

দ্বিতীয় প্রজন্মেও আছেন আরও দাবিদার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্রের পুত্রবধূ ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরীও ঢাকা দক্ষিণের নেতা। তিনি বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে কর্মী ও নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানোর চেয়ে ইশরাক হোসেন এখনই মেয়রের চেয়ারের ওপর তাঁর দাবিটা প্রতিষ্ঠিত করে নিতে চান।

মেয়রের আন্দোলন অনেকটা ইশরাকের একক প্রজেক্ট। যদিও দু-একজন বিএনপি নেতা মাঝেমধ্যে তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। ইশরাক কখনো বলেছেন, তিনি নিজে নিজেই শপথ নেবেন। আবার কখনো বলেছেন, নগর ভবনের কাজ চলবে তাঁরই তত্ত্বাবধানে। তাঁর আন্দোলন ‘আমরা ঢাকাবাসী’র ব্যানারে।

উল্লেখ্য, একই নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচনে পরাজিত হন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল। তিনি ঢাকা উত্তরের মেয়র পদ দখল নিয়ে কোনো রকম পদক্ষেপ নেননি। অবশ্য তিনি এর মধ্যেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি আবার মেয়র পদে আসতে চাইবেন কি না, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

প্রথম আলোর এক খবরে প্রকাশ, শপথের মাধ্যমে দায়িত্ব বুঝে না পেলেও আজও নগর ভবনের একটি মিলনায়তনে সংস্থাটির প্রায় ৭০টি ওয়ার্ডের সচিবদের নিয়ে বৈঠকে বসেছেন ইশরাক হোসেন। বেলা ১টার দিকে বৈঠকটি শুরু হয়। এর আগে গতকাল ৭০ জনের বেশি পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শককে নিয়ে বৈঠক করেছিলেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনুস সরকার যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন এবং বিএনপিও তার সঙ্গে আইনের শাসন নিয়ে একমত, সেই সময়টায় দেশের অন্যতম বৃহৎ সিটি করপোরেশনে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তা দুই পক্ষের ওপরই জনগণের আস্থায় টান পড়বে। সরকারের উচিত ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়রের পূর্ব নির্বাচনের মেয়াদের সময় আর আছে কিনা তা পরিষ্কার করা। না থাকলে সিটি করপোরেশানের কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া। আর মেয়াদ যদি এখনো থাকে, তাহলে ইশরাকের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া।

বিএনপিকেও ঢাকা শহরের বৃহত্তর রাজনীতির প্রেক্ষাপট চিন্তা করে এর সমাধান খুঁজতে হবে অনতিবিলম্বে। সামনেই ভোট। বিএনপির চোখ থাকবে মূলত বৃহত্তর ঢাকার বিশটা সংসদীয় আসনের দিকে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়ে এবং নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে ভোটে যাওয়া খুব ভালো দেখাবে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মূল গেটে মূল গেটে তালা এখনো ঝুলছে। ভবিষ্যতে এই তালা বিএনপিকে অনেকভাবে ভোগাবে।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

২৫০০ বছরের পুরোনো দুশমনি: ইসরায়েল কি ‘মরদখাই’? ইরান কি ‘হামান’? by সারফুদ্দিন আহমেদ

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেন। তাঁর মাথায় কিপ্পা (ইহুদিদের ধর্মীয়ভাবে মাথায় পরার ছোট গোলাকার টুপি)।

কাঁধে তালিত (ইহুদিদের ধর্মীয় স্কার্ফ, যেটি ধর্মীয় দায়িত্ব ও ঈশ্বরের আদেশ পালনের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়)। প্রাচীন দেয়ালটাতে হাত রেখে তিনি খানিকক্ষণ চুপচাপ প্রার্থনা করলেন।

দেয়ালের একটি ফোকরে একখণ্ড কাগজ পুরে দিলেন। এরপর সেখান থেকে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন।

এটি গত বৃহস্পতিবার (১২ জুন) ভোরের ঘটনা। সূর্যাস্তের পর, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নেতানিয়াহু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘কয়েক মুহূর্ত আগে ইসরায়েল অপারেশন রাইজিং লায়ন শুরু করেছে।’

পরদিন শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সেই চিরকুটটির (যেটি নেতানিয়াহু আগের দিন দেয়ালের ফোকরে গুঁজে এসেছিলেন) একটি ছবি প্রকাশ করল।

ছবিতে দেখা গেল, কাগজে নেতানিয়াহুর নিজের হাতে হিব্রু ভাষায় লেখা: ‘হেন আম কে-লাবি ইয়াকুম’। বাংলায় এর অর্থ ‘এই জাতি সিংহের মতো জেগে উঠবে।’

এর নিচে হিব্রুতে বেনিয়ামিনের নিজের স্বাক্ষর।

‘হেন আম কে-লাবি ইয়াকুম’ একটি বাক্যাংশ। এটি নেওয়া হয়েছে ওল্ড টেস্টামেন্টের বুক অব নাম্বার্স-এর ২৩: ২৪ আয়াত থেকে।

পুরো আয়াতটির অর্থ: ‘দেখো, এই জাতি সিংহের মতো জেগে উঠবে এবং এক তাগড়া সিংহের মতো নিজেকে তুলে ধরবে যে শিকার ধরে তার রক্ত আকণ্ঠ পান না করা পর্যন্ত বিশ্রামে গা এলিয়ে দেবে না।’

‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ই ইসরায়েলের একমাত্র সামরিক অভিযান নয়, যার নাম ইহুদি বাইবেল থেকে নেওয়া। ইসরায়েল প্রায়ই তার অভিযানগুলোর নামকরণ করে ইহুদি বাইবেল কিংবা ধর্মীয় অনুপ্রেরণা থেকে।

ধর্মীয় শব্দ, প্রতীক ও ভাষ্য কেন সামনে আনা হয়?

তেল আবিবের উপকণ্ঠের রামাত গান এলাকায় অবস্থিত ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম একাডেমিক প্রতিষ্ঠান বার ইলান ইউনিভার্সিটির (যেখানে ইহুদি ঐতিহ্য ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষাদান করা হয়) গবেষক দালিয়া গাভরিয়েলি-নুরির ভাষ্যমতে, ইসরায়েল তার ৭৫ বছরের ইতিহাসে যতগুলো সামরিক অভিযান চালিয়েছে, তার অর্ধেকের নাম ইহুদি বাইবেল থেকে নেওয়া।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে বাশার আল–আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর উদ্দেশে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সিরিয়ায় ‘অপারেশন অ্যারো অব বাশান’ নামের একটি অভিযান চালিয়েছিল।

‘বাশান’ শব্দটি ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখ করা একটি অঞ্চলের নাম। এটি সিরিয়ার দক্ষিণ ও জর্ডান নদীর পূর্ব দিকের ভূমিকে বোঝায়। প্রাচীনকালে ইহুদিরা বাশান রাজাকে পরাজিত করে এই অঞ্চল দখল নিয়েছিল।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করতে ইসরায়েল যেসব অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেসব অভিযানে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে, সেগুলোতে তারা বিভিন্ন বিবলিক্যাল নাম ও প্রতীক ব্যবহার করছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এর মধ্য দিয়ে তারা ফিলিস্তিনের ভূমির ওপর ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার’ দাবি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের যুদ্ধগুলোকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

আমালেক কারা? নেতানিয়াহু কেন আমালেক নিশ্চিহ্ন করতে চান?

গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের অভিযান চালানোর নির্দেশ দিতে গিয়ে নেতানিয়াহু এ পর্যন্ত অন্তত তিনবার হিব্রু বাইবেলে উল্লেখ করা আমালেকের কাহিনি সেনাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন।

২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু হিব্রু বাইবেলের তোরাহ অংশের ২৫: ১৭ আয়াত থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন।

এই আয়াতে বলা আছে: ‘স্মরণ করো, আমালেক তোমার সঙ্গে কী করেছিল।’ নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘আমরা মনে রাখি এবং যুদ্ধ করি।’ নেতানিয়াহুর এই কথার মধ্যে হিব্রু বাইবেলের আরেকটি আয়াতের সংযোগ আছে বলে অনেক বিশ্লেষক তখন বলেছিলেন।

সেই আয়াতটি হলো: ‘যাও, আমালেকদের ওপর আঘাত হানো এবং যা কিছু তাদের আছে সব সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দাও; তাদের কাউকে ছেড়ে দেবে না—পুরুষ, নারী, শিশু, স্তন্যপানকারী নবজাতক, গরু, ভেড়া, উট এবং গাধা—সবকিছু মেরে ফেলো।’ (১ শমূয়েল ১৫:৩)

নেতানিয়াহুর বিবৃতিতে ‘আমালেক’-এর উল্লেখ কতটা ভয়ংকর এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করতে কতটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তা বুঝতে ইহুদিধর্মীয় ভাষ্যের দিকে নজর বোলাতে হবে।

আমালেক ছিল একটি প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী। ফেরাউনের কবল থেকে মুসা নবী (মোজেস) বনি ইসরাইল বা ইসরায়েলিদের মুক্ত করে মিসর থেকে তাঁদের পূর্বপুরুষের (ইয়াকুব নবী, যাঁর আরেক নাম ‘ইসরাইল’) ভূমির দিকে, অর্থাৎ কিনান বা আজকের ফিলিস্তিনের দিকে যখন রওনা হয়েছিলেন (যূথবদ্ধ নির্গমন বা এক্সুডাস), তখন আমালেক সম্প্রদায় তাদের ওপর মরুভূমিতে আক্রমণ করেছিল।

এই আক্রমণকে ইহুদি ধর্মে এক নির্মম ও কাপুরুষোচিত কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইহুদিধর্মীয় গ্রন্থের ভাষ্যমতে, পরবর্তী সময়ে ঈশ্বর আদেশ দেন, আমালেকের নাম পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। তোরাহ-এর ২৫: ১৭ আয়াতে বলা হয়েছে: ‘তুমি আকাশের নিচ থেকে আমালেকের চিহ্ন মুছে ফেলবে।’

ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিদের কাছে আমালেক কেবল একটি জাতি নয়, বরং চরম শত্রুতা, ঈশ্বরবিরোধিতা ও নিপীড়নের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ইসলামের ভাষ্যেও আমালেকের উল্লেখ পাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনে আমালেক নামটির সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে কিছু ইসলামি ঐতিহাসিক সূত্রে, আমালেকদের প্রাচীন মিসর বা আরব অঞ্চলের আদি অত্যাচারী গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ইবনে কাসির, তাফসির কুরতুবি, তাফসির আল-জালালাইন প্রভৃতি প্রাচীন তাফসিরে বলা হয়েছে, এই শত্রুবাহিনী ছিল জালিম ও অত্যাচারী এক জাতি, যারা ‘আদ’ জাতির ধ্বংসপ্রাপ্ত লোকদের উত্তরসূরি হতে পারে।

আমালেকরা ফিলিস্তিন, মিসর ও হেজাজ অঞ্চলে বসবাস করত বলে মুসলিম ঐতিহাসিকেরা ধারণা দেন। তাঁদের ‘জাব্বারিন’ বা অত্যাচারী হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই আমালেক ইহুদি ইতিহাসে একমাত্র জাতি, যাদের পুরোপুরি নির্মূলের আদেশ দেওয়া হয়। তাদের স্মৃতি ও নাম নিশ্চিহ্ন করার আদেশ আজও তোরাহ পাঠের সময় বা ধর্মীয় বক্তৃতায় স্মরণ করা হয়।

নেতানিয়াহুর চোখে আজকের আমালেক কারা?

আজকের দুনিয়ায় আমালেক জাতিগোষ্ঠী অবশিষ্ট নেই। তবে ইহুদিদের ধর্মীয় ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্রজন্মে ‘আমালেক’ নতুন রূপ নিয়ে ফিরে আসতে পারে বলে বিবেচিত হয়।

মূলত রাজনৈতিক বা ধর্মীয় শত্রুকে ইহুদিরা প্রতীকীভাবে ‘আমালেক’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। ইহুদিদের ধর্মীয় নেতা বা রাবাইরা এবং ইহুদিধর্মগ্রন্থ ‘তানাখ’-এর পণ্ডিতদের বেশির ভাগই মনে করেন, ইরানিরা, ফিলিস্তিনিরা তথা মূলত মুসলমানেরাই হলো আজকের দিনের ‘আমালেক’।

ফলে নেতানিয়াহু যখন গাজায় সেনা পাঠানোর সময় সেনাদের তোরাহ-এর ২৫: ১৭ আয়াত উল্লেখ করে ‘আমালেকদের’ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার কথা মনে করিয়ে দেন, তখন সেটিকে গাজার নারী-পুরুষ-বৃদ্ধসহ সব ফিলিস্তিনিকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার নীতি হিসেবে দেখা হয়। নেতানিয়াহু বলতে চান, এই আদেশ তাঁর নয়, বরং এটি ঈশ্বরের আদেশ।

ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় রাবাই বা ধর্মগুরুরাও এই ‘ফতোয়া’ দিয়েছেন যে, অ–ইহুদি শত্রুদের সবাই এ সময়কার ‘আমালেক’। সে কারণে তাদের নারী–শিশু–বৃদ্ধ সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াই ঈশ্বরের আদেশ।

সিংহ যেমন শিকার ধরে তার রক্ত পান করে পরিতৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেয় না, তেমনি ইহুদিদেরও ‘আমালেকদের’ সমূলে বিনাশ না করা পর্যন্ত বিশ্রাম নেওয়ার অনুমতি নেই।

নতুন আতঙ্কের নাম ‘কিং'স তোরাহ’

ইৎসহাক শাপিরা এবং ইয়োসেফ এলিৎসুর নামের দুজন রাবাইয়ের লেখা ‘তোরাত হামে‌লেখ’ (ইংরেজিতে যার শিরোনাম ‘কিং'স তোরাহ’ এবং বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে ‘রাজাধিরাজের তোরাহ’) একটি ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থ বা হালাখার প্রথম খণ্ড ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

বিবিসির ‘কিংস তোরাহ স্প্লিটস ইসরায়েল'স রিলিজিয়াস অ্যান্ড সেক্যুলার জ্যুস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বইয়ে মূলত এমন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ইহুদি ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে অ–ইহুদিদের (অর্থাৎ ইহুদি নয় এমন মানুষ) হত্যা করা বৈধ হতে পারে। এই দাবি করা হয়েছে নির্দিষ্ট ইহুদি ধর্মগ্রন্থের নির্বাচিত উদ্ধৃতির দোহাই দিয়ে।

বইটির প্রথম খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে—শান্তিকাল ও যুদ্ধকাল, উভয় সময়েই অ–ইহুদিদের হত্যা সংক্রান্ত বিধান। সেখানে বলা হয়েছে, অ–ইহুদিরা যদি ‘নূহের সাতটি বিধান’ না মানে, তাহলে যুদ্ধের সময় ছাড়াও তাদের হত্যা করা বৈধ হতে পারে।

২০১৬ সালের শেষে বইটির দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। সেখানে আলোচনা করা হয়েছে শাসনব্যবস্থা ও শাসকের ক্ষমতা নিয়ে।

এই অংশে একটি সরকার গঠন করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, একজন নাগরিকের সেই সরকারের প্রতি কতটা আনুগত্য থাকা উচিত এবং সরকার চাইলে কোনো ব্যক্তিকে কেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে পারে—তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।

বইটির পঞ্চম অধ্যায়ের শিরোনাম হলো ‘যুদ্ধের সময় অইহুদিদের হত্যা’। এই অধ্যায়ে বলা হয়েছে: ‘ইহুদিদের জীবন রক্ষা করার জন্য, এমন অইহুদিদেরও হত্যা করা যেতে পারে যারা সরাসরি হত্যা সমর্থন করছে না বা তাতে উৎসাহও দিচ্ছে না।’

প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর থেকেই বইটি ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। ইসরায়েলের বাম ও প্রগতিশীল গোষ্ঠী বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি করলেও নেতানিয়াহু সরকার তা করেনি। ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট বইটির লেখকদের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘লেখকদের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ নেই।’

তবে ইসরায়েলের আরবা ও হেবরনের সাবেক প্রধান রাবাই ডোভ লিয়র এবং নেতানিয়াহুর দলের নীতি নির্ধারন পরিষদের সদস্য রাবাই ইয়াকব ইউসেফের মতো প্রভাবশালী ধর্মগুরুরা বইটিকে অনুমোদন দিয়েছেন।

এ কারণেই মূলত ইসরায়েলের সেনারা ফিলিস্তিনি শিশু বা নারী বা বৃদ্ধদের হত্যা করার পর সাধারণত কোনো ধরনের অনুশোচনা বা বিবেক তাড়নায় আক্রান্ত হন না। কারণ, তাঁদের মাথায় থাকে, ইসরায়েলের যারা শত্রু, তারা হলো সেই ‘আমালেক’, যাদের চিহ্ন ঈশ্বর তোরাহ-এর ২৫: ১৭ আয়াতে ‘আকাশের নিচ থেকে’ পুরোপুরি ‘মুছে’ ফেলতে আদেশ দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু বহুবার ইরানকে ‘আমালেক’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি চলতি বছরের ১৪ মার্চ বেইত শেমেশে অবস্থিত ন্যাশনাল পুলিশ একাডেমিতে পুরিম উপলক্ষে ‘এস্থারের পুস্তক’ পাঠে অংশ নেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন: ‘আড়াই হাজার বছর পর সেই ভূমিতেই (পারস্য, আজকের ইরান) আবার এক শত্রু ইহুদিদের ধ্বংস করতে উঠে এসেছে। সেও চায় ইহুদি জাতিকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে। কিন্তু তোমাদের মতো বীর উঠে এসেছে—আমাদের জাতির বীরেরা। আমরা বুদ্ধিমত্তা, বীরত্ব ও সাহসিকতায় পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছি। আমরা পারস্য অক্ষকে ভেঙে দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা ইতিহাসের সেই পুরোনো যুদ্ধেই আছি; পারস্য (আজকের ইরান) বনাম ইসরায়েল—হামান বনাম মরদখাই।’

মরদখাই মানে ইসরায়েল? হামান মানে ইরান?

বিবলিক্যাল, কোরআনিক ও ঐতিহাসিক ভাষ্যমতে, ব্যাবিলন তথা আজকের ইরাকের বাদশাহ বখতেনাসর (সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার) বাইতুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেমে অভিযান চালিয়ে ব্যাপকভাবে বনি ইসরাইল বা ইসরায়েলের বংশধরদের (ইহুদিদের) হত্যা করেছিলেন। বাকিদের বন্দী করে ক্রীতদাস হিসেবে ইরাকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

এরপর পারস্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সাইরাস দ্য গ্রেট (শাসনকাল: খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৯-৫৩০) (সাইরাস দ্য গ্রেট এবং কুরআনে উল্লিখিত জুলকারনাইন—এই দুই ব্যক্তিকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিক ও তাফসিরমূলক বিতর্ক রয়েছে।

অনেক মুসলিম পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক মনে করেন, সাইরাস দ্য গ্রেটই জুলকারনাইন; অবশ্য এটি সর্বসম্মত মত নয়।) ব্যাবিলন আক্রমণ করে ইহুদিদের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেন। বখতেনাসর যে সুলাইমানি মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, সেটি সাইরাস দ্য গ্রেট পুনর্নির্মাণের অনুমোদন দেন।

অধিকাংশ ইহুদি ফিলিস্তিনে ফিরে এলেও তাদের একটি অংশ ওই সময় পারস্যে বা আজকের ইরানে চলে আসে।

ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ এস্থার গ্রন্থের (বুক অব এস্থার) ভাষ্য অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে (আনুমানিক ৪৮০-৪৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) পারস্য সম্রাট আহাশভেরোশের (আহাশভেরোশ হলেন পারস্য সম্রাট প্রথম জারক্সিস) রাজদরবারে মরদখাই নামের একজন ইহুদি ব্যক্তি চাকরি করতেন। তিনি এস্থার নামে এক তরুণীর দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

এস্থারও ইহুদি ছিলেন, কিন্তু তিনি নিজের পরিচয় গোপন করেছিলেন। পরে তিনি সম্রাটের প্রিয়ভাজন হন এবং সম্রাট তাঁকে বিয়ে করেন। এস্থার সম্রাটের প্রিয় রানি হন।

সম্রাট আহাশভেরোশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হামান (নোট: মিসরের ফেরাউন বা ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের মন্ত্রীর নামও ছিল হামান) নামের এক ব্যক্তি।

হামান চেয়েছিলেন সবাই যেন তাঁর সামনে মাথা নত করে। কিন্তু মরদখাই মাথা নত করেননি, কারণ তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদী ইহুদি এবং শুধু ঈশ্বরের সামনে তিনি মাথা নত করতেন।

মরদখাই মাথা নত না করায় হামান ক্ষিপ্ত হয়ে পুরো ইহুদি জাতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করেন। হামান সম্রাটকে বুঝিয়ে পুর (ডিস্ক বা চাকতির মতো জিনিস) দিয়ে লটারির মতো দৈবচয়নে একটি দিন নির্ধারণ করেন এবং একটি রাজ-আদেশ জারি করেন, যেদিন সব ইহুদিকে হত্যা করা হবে।

এরপর রানি এস্থার নিজের ইহুদি পরিচয় সম্রাটের কাছে প্রকাশ করে হামানের ষড়যন্ত্র ফাঁস করেন। সম্রাট খেপে গিয়ে হামানকে ইহুদিদের ফাঁসি দেওয়ার জন্য তাঁর নিজেরই বানানো ফাঁসিতে ঝোলানোর নির্দেশ দেন।

এর মাধ্যমে পারস্যে থাকা ইহুদি জাতি রক্ষা পায়। এই কাহিনিকে ইহুদি ধর্মে ‘অস্তিত্বের সংগ্রাম’ হিসেবে দেখা হয়।

এই কাহিনি ইহুদিদের কাছে ন্যায় ও বিশ্বাসের বিজয় এবং অন্যায়ের পতনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। মরদখাইকে ন্যায়, ধৈর্য ও বিশ্বাস এবং হামানকে অহংকার ও শয়তানির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

‘পুর’ বা চাকতিসংক্রান্ত এ ঘটনার স্মরণে প্রাচীনকাল থেকে প্রতিবছর ইহুদিরা ‘পুরিম’ নামের একটি উৎসব পালন করে।

পুরিম উৎসব প্রতিবছর ইহুদি ক্যালেন্ডারের আদার (Adar) মাসের ১৪ তারিখে পালিত হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এটি সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পড়ে।

কারবালার ঘটনা স্মরণ করে আশুরার দিনে আমাদের দেশে যেভাবে এক সময় পুঁথিপাঠের মতো করে মীর মশাররফ হোসেনের লেখা ‘বিষাদ সিন্ধু’ থেকে পাঠ করা হতো, অনেকটা সেভাবে পুরিম উৎসবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা এস্থারের কাহিনি স্মরণ করে ‘বুক অব এস্থার’ থেকে পাঠ করেন।

এই দিনে ইহুদিরা হামানের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। শিশুরা মুখোশ পরে এবং নানা রকম নাটক মঞ্চস্থ হয়।

আধুনিক ইসরায়েলি রাজনীতি, বিশেষ করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইরানকে হামানের উত্তরসূরি হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং নিজেকে বা ইসরায়েলকে মরদখাই ও এস্থারের জায়গায় দাঁড় করান।

এর মাধ্যমে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মীয়-ঐতিহাসিক ন্যায়সংগত প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরেন।

আমালেক নিশ্চিহ্ন করাই নেতানিয়াহুর আসল লক্ষ্য?

নেতানিয়াহু এর আগে একাধিকবার ইরানকে ‘আমালেক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর গাজার ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার আহ্বান জানিয়ে নেতানিয়াহু বলেন: ‘প্রতিটি প্রজন্মের প্রতিটি হামান, যে কিনা ইহুদি জাতিকে বিলুপ্ত করতে চায়, আমরা তাকে প্রতিহত করব।’

২০২৩ সালের ৩ নভেম্বর আইডিএফ-এর জেনারেলদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে নেতানিয়াহু বলেন: ‘আপনারা জানেন, আমাদের হোলি বাইবেল আমাদের বলে—“আমালেক কী করেছে, তা মনে রেখো। ” আমরা মনে রেখেছি, তাই আমরা লড়ছি।’

২০১২ সালের ৭ মার্চ ওয়াশিংটন সফরের সময় নেতানিয়াহু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বুক অব এস্থার গ্রন্থটি উপহার দিয়েছিলেন।

ওই সময় ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ আমেরিকান-ইসরায়েলি পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে (আইপ্যাক)দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ‘হামান ছিল পারস্যের ইহুদিবিদ্বেষী যে ইহুদি জাতিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছিল।’ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, প্রাচীন পারস্যের উত্তরসূরি ইরান এই মুহূর্তে পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

২০১৭ সালের ১০ মার্চ পুরিম উৎসবের সময় নেতানিয়াহু মস্কো সফর করছিলেন। এ সময় তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে উপহার হিসেবে ‘বুক অব এস্থার’ দেন। উপহারটি দেওয়ার সময় তিনি পুতিনকে বলেছিলেন: ‘আমালেকের বংশধর পারস্যের নেতা হামান আজও ইহুদিদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে; আর আমরাও মরদখাই হয়ে হামানের বিরুদ্ধে লড়ছি।’

২০২৪ সালের ২৩ মার্চ ইসরায়েলের মিলিটারি পুলিশের উদ্দেশে দেওয়া বক্তৃতায় নেতানিয়াহু বলেন: ‘২ হাজার বছর আগে প্রাচীন পারস্যে ইহুদিবিদ্বেষী হামান ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল৷ আজ আধুনিক পারস্যের ইরানি শাসন একইভাবে ইসরায়েল ধ্বংস করতে চাচ্ছে।’ তিনি আরও যোগ করেন: ‘আমরা হামানকে ধ্বংস করেছি; আমরা সিনওয়ারকেও (হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার যাঁকে ওই বছরেরই ১৬ অক্টোবর ইসরায়েল হত্যা করে ) ধ্বংস করব।’

নেতানিয়াহু তাঁর যাবতীয় রাজনৈতিক, সামরিক তথা সার্বিক কাজকর্মের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে চান, তিনি ইহুদিধর্মগ্রন্থে ইহুদি জাতিকে প্রতিষ্ঠার যে নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটিই তিনি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন।

ইহুদি ধর্মতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বিশ্বাস করে, নবী মুসাকে (মোজেস) ঈশ্বরের দেওয়া ১০ প্রত্যাদেশের (টেন কমান্ডমেন্টস) ফলক যে সুলাইমানি সিন্দুকে (আর্ক অব দ্য কনভেন্ট) সংরক্ষিত ছিল, তা প্রথম সলোমনের মন্দিরে [মুসলমানরা এটিকে সুলাইমান (আ.)-এর মসজিদ বলে, ইসলামি ভাষ্যমতে, এই মসজিদ সুলাইমান (আ.)-এর আদেশে জিনেরা নির্মাণ করেছিল] রাখা ছিল।

ব্যাবিলনের সম্রাট বখতেনাসর মন্দিরটি (পুনশ্চ: মুসলমানদের কাছে এটি মসজিদ) ধ্বংস করার পর সিন্দুকটি নিখোঁজ হয়ে যায়।

পবিত্র কোরআনে এই সিন্দুকের উল্লেখ আছে: ‘আর তাদের নবী তাদের বলেছিলেন, তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট তাবুত আসবে, যাতে তোমাদের রব-এর নিকট হতে প্রশান্তি এবং মুসা ও হারুন বংশীয়গণ যা পরিত্যাগ করেছে, তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতারা তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও, তবে নিশ্চয় তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৪৮)

আল আকসার নিচে নেতানিয়াহুর মন্ত্রীসভার বৈঠক

এই ‘তাবুত’ই হলো সেই সিন্দুক। ইসলামি ভাষ্যমতে, সিন্দুকটিতে নবী মূসা (আ.)-এর লাঠি, পোশাক ইত্যাদি ও তাওরাতের কিছু অংশসহ কিছু বরকতময় চিহ্ন আছে। এটি এখনো অজ্ঞাত স্থানে সুরক্ষিত আছে।

ইহুদিধর্মতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বিশ্বাস করে, সিন্দুকটি টেম্পল মাউন্টের (আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্স) নিচে রয়েছে।

এই বিশ্বাস থেকে ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল সরকার মসজিদটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সিন্দুকটি খুঁজে চলেছে। সেখানে তারা রীতিমতো ভূগর্ভস্থ ঘর তৈরি করেছে।

২০২৩ সালের ২১ মে নেতানিয়াহু নিজে আল–আকসার নিচে ভূগর্ভস্থ ঘরে মন্ত্রিসভা নিয়ে বৈঠক করেছেন। পরদিন ২২ মে মিডল ইস্ট মনিটর ‘ইসরায়েল: ক্যাবিনেট হোল্ডস মিটিং বিনিথ আল-আকসা মস্ক’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করে।

তাতে বলা হয়, দখল করা জেরুজালেম এবং এখানকার পবিত্র স্থানগুলোর ওপর ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রদর্শনের অংশ হিসেবে আল-আকসা মসজিদের নিচে একটি সুড়ঙ্গে ইসরায়েলের দখলদার সরকার মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছে।

মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে ছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এএফপির এক খবরে বলা হয়, সেখানে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ‘কয়েক দিন আগে, আবু মাজেন (ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ডাকনাম আবু মাজেন) বলেছিলেন, জেরুজালেম এবং আল-হারামের (হারাম আল শরিফ) সঙ্গে ইহুদি জনগণের সম্পর্ক নেই। তাই আমি তাঁকে বলছি, আপনি দেখুন, আমরা আজ জেরুজালেম ও আল-হারামের পেটের ভেতরে বসে আমাদের সভা করছি।’

ইসরায়েলি দৈনিক ‘মারিভ’-এর বরাত দিয়ে মিডলইস্ট মনিটর জানায়, ওই বৈঠকের সময় ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের একটি বড় বাজেট এবং জেরুজালেমের জন্য বেশ কয়েকটি ‘জুডাইজেশন প্রকল্প’ অনুমোদন করে।

এই বাজেট এবং প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য আল-আকসা মসজিদের নিচে আরও টানেল খনন করতে উৎসাহিত করা, যা অনিবার্যভাবে মসজিদের প্রাচীন কাঠামোকে দুর্বল করে দেবে।

সুড়ঙ্গটি শুরু হয়েছে আল-আকসার সেই প্রাচীরের নিচে, যার ফোকরে নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার ইরানে চালানো অভিযানের নামের ইঙ্গিত দেওয়া চিরকুটটি ফেলে এসেছিলেন।

অথচ এই প্রাচীরের সঙ্গেও ইসরায়েলের আজকের ঘোর শত্রু ইরান তথা পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

সংক্ষিপ্ততম ইতিহাস হলো: খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে বাদশাহ সুলাইমান (কিং সলোমন) প্রথম উপাসনালয়টি বানান। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ সালে বখতেনাসর এটি ধ্বংস করেন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ সালে পারস্যের, অর্থাৎ আজকের ইরানের সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট এটি আবার বানানোর অনুমতি দেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫১৬ সালে পারস্য সম্রাট দারিউস প্রথম-এর সময় এটির পুনর্গঠন শেষ হয়।

৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট টাইটাস ইহুদি বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে জেরুজালেম দখল করেন। সে সময় রোমান বাহিনী দ্বিতীয়বার এটি ধ্বংস করে।

ইহুদিদের বিশ্বাস, পারস্য সম্রাট দারিউস প্রথম-এর পুনর্নির্মিত মন্দিরের (ইহুদিরা যেটিকে বলে ‘সেকেন্ড টেম্পল’) সর্বশেষ ধ্বংসাবশেষ হিসেবে দেয়ালটি টিকে আছে। আজকের আল-আকসা মসজিদের (‘টেম্পল মাউন্ট’) পশ্চিমে অবস্থিত এই দেয়ালটির নাম ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’।

এই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে প্রাচীনকাল থেকে ইহুদিরা সেকেন্ড টেম্পল ধ্বংসের শোকে কাঁদেন। সে কারণে এই দেয়ালকে ‘ওয়েইলিং ওয়াল’ বা ‘কান্নার দেয়াল’ বলে। ইহুদিরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরুর আগে এখানে এসে প্রার্থনা করেন।

নেতানিয়াহুও যেকোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এখানে আসেন। প্রার্থনা করেন।
গত বৃহস্পতিবার এখানে এসে তিনি নিজেকে ‘মরদখাই’ আর ইরানকে ‘হামান’ ও ‘আমালেক’ সাব্যস্ত করে হামলা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু ইরানের এক শাসকই একদিন ইহুদিদের ইরাকের এক শাসকের কবল থেকে মুক্ত করে যে মন্দির ফের বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেই মন্দিরেরই শেষ অবশিষ্টাংশে হাত রেখে যে তিনি হামলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তা হয়তো তাঁর মনে ছিল না।

* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
* ই–মেইল-sarfuddin2003@gmail.com

সুড়ঙ্গ কেটে আল আকসা মসজিদের নিচে বানানো ভূগর্ভস্থ ঘরে ২০২৩ সালের ২১ মে নেতানিয়াহুর মন্ত্রীসভা বৈঠক করে।
সুড়ঙ্গ কেটে আল আকসা মসজিদের নিচে বানানো ভূগর্ভস্থ ঘরে ২০২৩ সালের ২১ মে নেতানিয়াহুর মন্ত্রীসভা বৈঠক করে। ছবি: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে নেওয়া

ইরানে হামলা ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনবে by ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস

১৩ জুন ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নতুন যুদ্ধ শুরু করার মধ্য দিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূচনা করেছে। এ যুদ্ধে কেউই লাভবান হবে না, এমনকি ইসরায়েলের সরকারও। কিন্তু বহু মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসবে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি আক্রমণে এরই মধ্যে বহু হতাহত হয়েছেন।

দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যে আগে এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যে ব্যর্থ হয়েছে, সেই শিক্ষা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন এ যুদ্ধকে পূর্বপ্রতিরোধমূলক (সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে আগে থেকেই আক্রমণ করা) যুদ্ধ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করেছেন। তেহরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করতে না পারে, সেটা ঠেকাতেই এ হামলা। এটা করার মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু আবার সেই একই কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি করলেন, যা এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার করেছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে বেড়াচ্ছে এবং ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও নেতাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলের এই আক্রমণ সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকে আরও বিপজ্জনক জায়গায় পরিণত করল।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ইরাক আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি। ইরানে ইসরায়েলের উসকানিমূলক হামলাটি এরই মধ্যে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তাঁর আক্রমণের উদ্দেশ্য হলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া। এ পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় ইরানের নাতানজ, ইস্পাহান ও ফরদো পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে নানা মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এ হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকৃতপক্ষে থেমে যাবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সেটা ভালো করেই জানেন।

ইরান খুব জেনেবুঝেই তাদের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনাটি মাটির অনেক গভীরে নির্মাণ করেছে। কেবল শক্তিশালী বাংকার-বিধ্বংসী বোমা ছাড়া সেটা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ইসরায়েলের সেই সক্ষমতা নেই। এ ধরনের বোমা উৎপাদনের সক্ষমতা আছে যুক্তরাষ্ট্রের।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলকে এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন, যারা বরাবরই ইসরায়েলি নেতাদের ও কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে, তেল আবিবকে তারা ষ্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, এ অস্ত্র সরবরাহ করা হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয় যে ওয়াশিংটন এ হামলার বিষয়ে আগে থেকে কতটা জানত। প্রথম দিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ হামলাকে ইসরায়েলের ‘একতরফা’ অভিযান বলে উল্লেখ করে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখে। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি এ হামলার ব্যাপারে পুরোপুরি জানতেন।

এ হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ও অনুমোদনের ব্যাপারটি এখনো একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। তবে এটা নিশ্চিত, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি নতুন চুক্তির যে ক্ষীণ আশাবাদ জন্ম হয়েছিল, এ হামলার মধ্য দিয়ে সেটা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল। এটা স্বল্প মেয়াদে নেতানিয়াহুর জন্য একটি বিজয়।

কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাটি অনেকটাই নির্ভর করছে এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা টেনে আনা যাচ্ছে, তার ওপর। এটি তেল আবিবের জন্য একটি বড় জুয়া খেলা। কারণ, ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের শীর্ষস্থানীয় অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক নীতির সমালোচক। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক নীতি থেকে সরে আসাকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ইসরায়েলের এ হামলা ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের অন্যান্য স্বার্থের ক্ষতি করছে। এর কারণ হলো বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বড় ধরনের অবনতি হতে পারে। তার কারণ হলো, এ সংঘাত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ।

আবার যদি দেখা যায়, ইসরায়েল বিজয়ের পথে এগোচ্ছে, তাহলে ট্রাম্প নিঃসন্দেহে এটিকে নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করবেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর কৌশল যদি ক্রমশ এমন দিকে এগোয়, যেখানে তিনি ওয়াশিংটনকে আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে টেনে আনতে চান, তাহলে ট্রাম্প অবশ্যই নেতানিয়াহুর প্রতি ব্যাপক ক্ষুব্ধ হবেন।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার যে বর্তমান পরিস্থিতি, তাতে ইসরায়েল যদি আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইরানে আর কোনো কৌশলগত অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়।

নেতানিয়াহুর ঘোষিত দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাত করা। সেটাও নাগালের বাইরে বলে মনে হচ্ছে।

ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইরানি জনগণকে তারা খোলাখুলিভাবে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের একতরফা আগ্রাসন তেল আবিবের প্রতি ইরানিদের ক্ষোভ বাড়াবে।

আঞ্চলিক অন্য দেশগুলো, যেখানে তেহরানের প্রভাব ক্রমে কমে যাচ্ছিল, সেখানে নেতানিয়াহুর এ পদক্ষেপ আবারও ইরানের পুরোনো জোটগুলোকে নতুন প্রাণ দান করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

ইরানে শাসকেরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইসরায়েলের আগ্রাসন ঠেকাতে পারমাণবিক বোমা প্রয়োজন। বর্তমান বাস্তবতায় ইরানে পারমাণবিক বোমা তৈরির ব্যাপারে যাদের মধ্যে সন্দেহ ছিল, সেটা এখন আর থাকবে না। মধ্যপ্রচ্যের অন্য দেশগুলো, যেখানে তেহরানের স্বার্থ ও প্রভাব ক্রমশও কমে যাচ্ছিল, নেতানিয়াহুর এই আগ্রাসন সেসব জায়গায় ইরানি মিত্রদের মধ্যে নতুন প্রাণের জোয়ার তৈরি করবে।

তেহরানের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে ইসরায়েল যদি সফলও হয়, তাতেও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর যা ঘটেছিল, তা থেকেই শিক্ষা নিতে হবে। এ ঘটনার পর সেখানে চরমপন্থার ব্যাপক উত্থান ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০-এর দশকে ইসলামিক স্টেটের (আইএসআইএল বা আইএসআইএস) উত্থান ঘটে, যারা গোটা অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাস চালায়।

তেহরানে একটি অনুগত সরকারকে মসৃণভাবে ক্ষমতায় আনার কোনো সুযোগ ইসরায়েলের সামনে নেই। দেশ দুটির মধ্যে সরাসরি সীমানা না থাকায় ইরান দখল করে সেই চেষ্টা করা একেবারেই অসম্ভব। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও এমন কোনো প্রচেষ্টাকে সমর্থন দেওয়া কল্পনা করাও কঠিন। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।

অন্যভাবে বলা যায়, নেতানিয়াহুর এই হামলাগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিলম্বিত করা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির আলোচনার পথ রুদ্ধ করার মতো কিছু স্বল্প মেয়াদি কিছু কৌশলগত সাফল্য এনে দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস, ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একজন ফেলো
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স

ইরানে ইসরায়েলের হামলায় ফিরে আসছে অপারেশন ব্যাবিলনের স্মৃতি by আসজাদুল কিবরিয়া

কয়েক বছর ধরে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়েছে ইসরায়েল। বিভিন্ন সময় হামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এবার ইসরায়েল তা বাস্তবে রূপ দিল। ইরানে ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগসূত্র খুঁজেছেন আসজাদুল কিবরিয়া।

মিলটা সামান্য হলেও কাকতালীয় না পরিকল্পিত, তা বলা কঠিন। তবে এটা অনুমান করা যায়, সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনশাম বেগিনের নির্দেশে ৪৪ বছর আগে প্রায় কাছাকাছি দিন-তারিখে চালানো অভিযানের সাফল্য ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কিছুটা অনুপ্রাণিত করেছে।

সেটা ছিল ১৯৮১ সালের ৭ জুন, রোববার। চিন্তা করেই বেছে নেওয়া হয়েছিল দিনটা। দুপুরের পরপরই কয়েকটি ইসরায়েলি সিএইচ-৫৩ হেলিকপ্টারে চেপে বসেন দেশটির বিমান পাইলট উদ্ধারকারী দলের কয়েকজন সদস্য।

বেলা তিনটার দিকে জর্ডান সীমান্তের পশ্চিম দিকে ১০০ ফুট ওপরে হেলিকপ্টারগুলো শূন্যে ভাসতে থাকে। তখনো এর আরোহীরা জানেন না যে ঠিক কী হতে যাচ্ছে। তবে একটা নির্দেশ স্পষ্ট, খানিক পরেই যে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো উড়ে যাবে, সেগুলোর কোনোটি বিধ্বস্ত হলে বা অন্য কোনো কারণে পাইলট ভূপতিত হলে তাঁকে উদ্ধার করার জন্য অন্য যেকোনো দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করতে হবে।

ঠিক বিকেল চারটার দিকে সিনাই মরুভূমির (১৯৭৯ সালে মিসরের সঙ্গে শান্তিচুক্তি হলেও তখনো ইসরায়েল পুরো সিনাই উপত্যকার দখল ত্যাগ করেনি) এৎজায়ন বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আটটি এ-১৬ যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন শুরু করল।

প্রতিটিই দুটি করে এমকে ৮৪ বোমা, দুটি করে এআইএম-৯এল সাইডউইনডার মিসাইল, একটি করে ৩০০ গ্যালন ফুয়েল ট্যাংক এবং ডানার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ৩৭০ গ্যালন করে দুটি বাড়তি ফুয়েল ট্যাংক বহন করছিল। বিমানগুলোর গন্তব্য ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল-তুয়াতিয়াহ। আর এ যুদ্ধবিমানগুলোকে পথ দেখানো ও পাহারা দেওয়ার জন্য আরও কয়েকটি এফ-১৫ বিমান যোগ দেয়।

----- ২.

ইসরায়েলের সীমান্ত পেরিয়ে জর্ডানের আকাশসীমা প্রবেশকালে আকাবা উপসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এটা চোখে পড়ে বাদশাহ হোসেনের। তিনি তখন তাঁর ইয়টে অবকাশ যাপন করছিলেন। একজন অভিজ্ঞ যুদ্ধবৈমানিক হিসেবে হোসেন মুহূর্তেই আঁচ করে ফেলেন, কী হতে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত ইরাকে একটি সতর্কতামূলক বার্তা পাঠান। তবে অজ্ঞাত কারণে তা আর পৌঁছায়নি।

উত্তর দিকে জর্ডানের ও দক্ষিণ দিকে সৌদি আরবের রাডার ফাঁকি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানগুলো মরুভূমির সমতল থেকে মাত্র ১৫০ ফুট ওপর দিয়ে ও এলোমেলোভাবে দ্রুত এগোতে থাকে। জর্ডান ও ইরাকের জঙ্গি বিমান তাদের বাধা দেবে, এটা ধরে নিয়েই অগ্রসর হচ্ছিল ইসরায়েলি বিমানগুলো। কিন্তু বিনা বাধায় তারা ইরাকের আকাশসীমায় প্রবেশ করে।

দজলা (ইউফ্রেতিস) নদী অতিক্রম করার পর ইরাকি জঙ্গি বিমানের বাধা আসবে বলে যে ধারণা করা হয়েছিল, সেটাও ভুল প্রমাণিত হলো। ফোরাত (তাইগ্রিস) নদী অতিক্রমের সময় ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানগুলোর দৃষ্টিসীমায় চলে এল আল-তুয়াতিয়াহতে নির্মাণাধীন ওসিরাক পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্রের গোলাকার গম্বুজ। এখানেই ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ফরাসি সহায়তায় পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ চালাচ্ছিলেন।

এফ-১৫ বিমানগুলো ততক্ষণে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে গেছে। মূল কাজটা করবে এফ-১৬ বিমানগুলো, যেখান থেকে তখন ছাড়া হলো শিখা ও তুষ। উদ্দেশ্য মিসাইল ও রাডারকে বিভ্রান্ত করে ফাঁকি দেওয়া। লক্ষ্যবস্তুর চার মাইল দূরে থাকতে এফ-১৬ জঙ্গি বিমানগুলো পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতায় খাড়া উঠে গেল। আর তারপরই দ্রুতগতিতে ধেয়ে এল ওসিরাকের রিঅ্যাক্টরের দিকে। একের পর এক মোট ১৪টি বোমা বর্ষিত হলো গোলাকার গম্বুজের ওপর। আর দুটি বোমা পরল লক্ষ্যবস্তুর বাইরে। মাত্র ৮০ সেকেন্ডে কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে গেল সাদ্দাম হোসেনের পারমাণবিক বোমা তৈরির সব প্রয়াস।

এদিকে ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানের হামলায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে দ্রুত ছুটে এলেন ওসিরাকের চারপাশে মোতায়েন করা বিমানবিধ্বংসী কামানের চালকেরা। তাঁরা তখন ক্যাফেটেরিয়ায় খাচ্ছিলেন। কামান থেকে যখন গোলা ছোড়া হলো, তখন ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানগুলো দ্রুত সরে যাচ্ছে। রাডার–ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় তা চালু না করে এলোমেলোভাবে ছোড়া গোলা কোনো ক্ষতিই করতে পারেনি এসব বিমানের। কোনো রকম বাধাবিঘ্ন ছাড়া আবার সৌদি আরব ও জর্ডানের আকাশসীমা অতিক্রম করে নিরাপদে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে এল বিমানগুলো। মোট ৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট আকাশে উড্ডয়ন করতে হয়েছিল তাদের।

------ ৩.

এই বিমান হামলায় একজন ফরাসি কারিগর নিহত হন। খ্রিষ্টান হওয়ার কারণে ফরাসি ও ইতালির বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কারিগরেরা রোববার সাপ্তাহিক ছুটি পালন করবে বিবেচনায় বেগিন এদিন হামলার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, যেন তাঁদের কোনো ক্ষতি না হয়। তবে ইরাকের প্রচলিত সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারেই তাঁদের ছুটি পালন করতেন, যা ইসরায়েলিদের জানা ছিল না। অবশ্য যখন হামলা হয়, তার আগে প্রায় সবাই কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করেছিলেন।

ক্ষিপ্ত-রাগান্বিত সাদ্দাম হোসেন আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত কমান্ডার ও তাঁর অধীনস্থ মেজর পদের ওপরের সব কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আরও ২৩ জন কর্মকর্তা ও পাইলটকে কারাগারে পাঠানো হয়।

ইরাকে হামলার ঘটনাটি পরদিন প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে বেশ হইচই পড়ে যায়। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে একে ‘অমার্জনীয় ও অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইসরায়েলে এফ-১৬ সরবরাহ বন্ধ করে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডাহেইম একে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেন। নিরাপত্তা পরিষদ কঠোর ভাষায় এ হামলার নিন্দা জানায়।

------- ৪.

ওই হামলার ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বেগিন রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পান। জুন মাসেই ছিল ইসরায়েলের নির্বাচন, যেখানে তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন লেবার পার্টির নেতা শিমন পেরেজ। নির্বাচনে লিকুদ পার্টির বেগিন জয়লাভ করেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী এজার ওয়াইজম্যান এ রকম কোনো অভিযানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে বেগিন সমর্থন পান তাঁর মন্ত্রিসভার কৃষিমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন (যিনি পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন), পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইজ্যাক শামির, সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাফায়েল এইটান এবং বিমানবাহিনীর প্রধান ডেভিড আইভরি। ওয়াইজম্যান পদত্যাগ করলে বেগিন নিজে কিছুদিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে শ্যারনের হাতে এর ভার ছেড়ে দেন।

মূলত ১৯৭৮ সাল থেকেই ওসিরাকে হামলা চালানোর পরিকল্পনা শুরু করেন বেগিন। ১৯৮০ সালের অক্টোবরে গোপনে মন্ত্রিসভায় এ হামলা পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। তার আগে জুলাই মাস থেকে জনপরিসরে ইরাকের পারমাণবিক বোমা তৈরির বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়। এটাও বলা হতে থাকে যে ইসরায়েল প্রয়োজনে এই হুমকি মোকাবিলায় হামলা চালাবে। শেষ পর্যন্ত তা–ই হয়েছে; ‘অপারেশন অপেরা’ সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে এই অভিযান সম্পন্ন করা হয়, যা ‘অপারেশন ব্যাবিলন’ নামেও পরিচিত।

-------- ৫.

৪৪ বছর পর বেগিনের মতোই কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ১৩ জুন ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। ২০০টি জঙ্গি বিমান দুই দফা হামলা করে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কারখানাগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং নাতানজ ও ফরদৌতে পারমাণবিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।

এ ছাড়া ইরানের হামলায় দেশটির সেনাপ্রধান ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধানসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার নিহত হন। ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ছয়জন পরমাণুবিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন। এরপর অবশ্য ইরান পাল্টা আঘাত হেনেছে ইসরায়েলে ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে। পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে, যাতে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি।

কয়েক বছর ধরে এ হামলা চালানোর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময় হামলা করার হুমকি তো দেওয়া হয়। এবার ইসরায়েল তা বাস্তবে রূপ দিল।

------- ৬.

অপারেশন ব্যাবিলনের ২৬ বছর পর ২০০৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল একই রকম হামলা চালিয়ে সিরিয়ার আণবিক কর্মসূচি স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়। তবে সিরিয়ার সরকার কখনোই স্বীকার করেনি যে কোনো ধরনের পারমাণবিক কর্মসূচি তারা নিয়েছিল। তবে ইসরায়েলি হামলায় সামরিক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছিল। ইসরায়েল ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়ায় এই হামলার কথা স্বীকার করে তা বিস্তারিত প্রকাশ করে।

আবার ইরাকের ওসিরাকে ইসরায়েলি হামলার বছরখানেক আগে ইরান ছোটখাটো হামলা চালিয়ে কিছু ক্ষতিসাধন করেছিল। বড়সড় হামলা চালালে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে, আশঙ্কায় ওসিরাক রিঅ্যাক্টরে আঘাত করেনি ইরানি জঙ্গি বিমান। কাজটা পরে সম্পন্ন করে ইসরায়েল। আর ১৯৯১ সালে অপারেশন ‘ডেজার্ট স্ট্রর্ম’–এর সময় মার্কিন বাহিনী ওসিরাকে হামলা চালিয়ে ওখানে যা অবশিষ্ট ছিল, তা গুঁড়িয়ে দেয়।

ইসরায়েলের ইরাক অভিযানে সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত হয়েছিল ভারত। পাকিস্তানের কাহুতায় অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনায় একই কায়দায় আঘাত হানার চিন্তা শুরু হয়। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার গড়ে তোলার প্রয়াসে ভারতের চেয়ে ইসরায়েলই বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে লেখা চিঠিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাঁর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, পাকিস্তান ও লিবিয়া মিলে আণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে।

অপারেশন ব্যাবিলনের সাফল্য ইসরায়েলকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সে ভারতকে পাকিস্তানে হামলার জন্য সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ভারত-ইসরায়েল যৌথভাবে এ হামলা করবে বলে ঠিক হয়। গুজরাটের জামনগর বিমানঘাঁটিকে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয় অভিযানের জন্য জঙ্গি বিমান ওড়াতে। আর উদমাহপুর ঘাঁটিকে নির্ধারণ করা হয় জ্বালানি পুনর্ভরণের জন্য।

১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে ইন্দিরা এ বিষয়ে সম্মতি দেন; তার আগে অবশ্য বাতাসে কথা ছড়িয়ে পড়ে যে পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করতে যাচ্ছে ভারত। সে সময় অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাকিস্তানের একজন পরমাণুবিজ্ঞানী ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের প্রধান রাজা রামান্নাকে এই বলে সতর্ক করেন যে ভারত কাহুতায় হামলা করলে পাকিস্তান ট্রমবেতে ভারতীয় পারমাণবিক কেন্দ্রে পাল্টা আঘাত হানবে। তারপরও ভারত সরকার তাদের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে থাকে। হঠাৎ হামলা চালিয়ে যথাসম্ভব ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ধ্বংস করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। সে কারণে ইসরায়েলের সহযোগিতায় গোপনে প্রস্তুতি চলতে থাকে।

কিন্তু এ ধরনের খবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ভারতকে সতর্ক করেন হামলা–পরবর্তী পরিণতির জন্য। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গোপনে পাকিস্তানকে ভারতের পরিকল্পনা সম্পর্কে আভাস দেয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি টেলিভিশনে প্রচারিত এক খবরে কাহুতায় ভারতীয় হামলার পরিকল্পনার কথা ফাঁস করা হয়। পরিস্থিতি গুরুতর আঁচ করতে পেরে পাকিস্তান কাহুতার আশপাশে সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া এফ-১৬ দিয়ে ভারতে পাল্টা হামলা চালাবে বলে জানান দেয়।

এমতাবস্থায় ইন্দিরা গান্ধী কাহুতা অভিযানের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেন। এর কিছুদিন পর তিনি দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ভারতীয়দের কেউ কেউ বিশেষত বিজেপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা মনে করেন, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা মারাত্মক ভুল করেছেন। তাঁরা এটাও মনে করেন যে মোদির উচিত হবে ইসরায়েলি সহযোগিতায় পাকিস্তানের আণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো। ইসরায়েল গত শুক্রবার থেকে ইরানে হামলা চালানো শুরু করার পর তাঁদের মধ্যে এ দাবি ও উত্তেজনা জোরদার হয়েছে।

লক্ষণীয় হলো, ১৯৮৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় এক চুক্তিতে উপনীত হয়; যার মূলকথা হলো, এক দেশ অন্য দেশের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করবে না। এই চুক্তির অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রতিবছর ১ জানুয়ারি ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লি নিজ নিজ দেশের পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করে আসছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত–পাকিস্তানের এ রকম ‘সমঝোতা’ কত দিন বহাল থাকবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়েছে।

(তথ্যসূত্র: এয়ারফোর্স ম্যাগাজিন, এপ্রিল ২০১২; দ্য ওয়ারফেয়ার হিস্ট্রি নেটওয়ার্ক, দ্য ইকোনমিক টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া)
* আসজাদুল কিবরিয়া, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবনে উদ্ধারকাজ করছেন ইরানি রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবনে উদ্ধারকাজ করছেন ইরানি রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা। ছবি: এএফপি

ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্নমত

ইসরায়েল গত সপ্তাহে ইরানে নজিরবিহীন হামলা শুরুর সময় দাবি করেছিল, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে। যেকোনো সময় এ অস্ত্র তৈরি করে ফেলবে তারা। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেকাতেই দেশটিতে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল।

তবে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। মার্কিন গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো অবস্থায় নেই। শুধু তাই নয়, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে তেহরানের অন্তত তিন বছর লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এসব তথ্য দিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ট্রাম্প প্রশাসনের চারজন কর্মকর্তা।

ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অবশ্য এ বিষয়ে বলেন, ইরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার ঠিক আগের ধাপে রয়েছে। যদি তারা একটি (পারমাণবিক অস্ত্র) তৈরি করতে চায়, তাহলে এর জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই তাদের কাছে রয়েছে।

সেই চার কর্মকর্তার একজনের মতে, ইরানে টানা পাঁচ দিন ধরে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর মার্কিন গোয়েন্দারা এখন ধারণা করছেন, ইসরায়েল সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতাকে মাত্র কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে দিতে পেরেছে।

অপর এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে হয়। এ জন্য দরকার পড়ে সেন্ট্রিফিউজের। ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় সেই সেন্ট্রিফিউজ আছে। ইসরায়েলের হামলায় নাতাঞ্জের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু দেশটির সুরক্ষিত আরেকটি পারমাণবিক স্থাপনা ফরদো এখনো অক্ষত।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় অস্ত্র না দিলে ও আকাশপথে হামলা চালাতে সহায়তা না করলে ফরদোর ক্ষতি করার মতো সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই।

ট্রাম্প ও বাইডেন প্রশাসনে মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন করা একজন সাবেক শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক ব্রেট ম্যাকগার্ক বলেন, ইসরায়েল (ইরানের) এসব পারমাণবিক স্থাপনায় নজরদারি চালানো বা অকার্যকর করে দিতে পারে। কিন্তু এগুলো ধ্বংস করতে হলে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা করতে হবে নয়তো এ নিয়ে চুক্তি করতে হবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের কথাতেও একই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা এ বিষয়ে সিএনএনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব নয়। ভূগর্ভস্থ এসব স্থাপনা ধ্বংস করার মতো বোমা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান বি-২-এর পক্ষেই এসব বোমা দিয়ে হামলা চালানো যায়, যেটা ইসরায়েলের কাছে নেই।

ইরান ‘চাইলেই সম্ভব’, তবে...

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এই কমান্ডের অবস্থান ভিন্ন। এক সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা শুরুর পর ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড। তারা বলেছে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়ে তৎপরতা বাড়ায়, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যেই তারা সেটা করতে পারবে।

গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান তুলসি গ্যাবার্ড মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে বলেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। এ ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অনুমোদন দেননি। ২০০৩ সালে খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন।

এদিকে জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি–বিষয়ক সংস্থা আইএইএ গত সপ্তাহে বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা দরকার তার কাছাকাছি সমৃদ্ধ ইউরোনিয়াম মজুত করেছে, যা দিয়ে নয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।

তবে ইরানের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো দুটি। প্রথমটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি চায় তাহলে কয়েক মাসের মধ্যে তারা এটা তৈরি করতে পারবে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো পারমাণবিক অস্ত্র ছোড়ার জন্য যে অস্ত্রব্যবস্থার প্রয়োজন, সেটা তৈরি করতে হলে আরও অনেক সময় প্রয়োজন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ইসরায়েলের হামলার পর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, আকস্মিক এ হামলা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির করার পথে ঠেলে দিতে পারে।

ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র
ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র। ছবি: এএফপি

আশঙ্কা, ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে

ট্রাম্পের তেহরান খালি করে দেয়ার বার্তায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই। বিশেষ করে তেহরানে স্রোতের মতো মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছেন। এতে করে সড়কে অকল্পনীয় যানজট সৃষ্টি হয়। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের খবর রাখেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন ট্রাম্পের বার্তা নিছক কোনো বার্তা নয়। এতে ভয়ঙ্কর কিছুর ইঙ্গিত রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার এক রকম হুমকি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে কি এবার তেহরানে হামলা করে সবকিছু উড়িয়ে দেয়ার ছক সাজানো হয়েছে! এমন ভয়ে মানুষের শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে হিম অনুভূতি। ইরানও নমনীয় হচ্ছে না। তাদের অবস্থান ‘ডু অর ডাই’। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব জুড়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। ওদিকে  বিস্ফোরণে কেঁপে কেঁপে উঠছে তেহরান। মিসাইলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত তেল আবিব। পঞ্চম দিনের প্রাণঘাতী হামলায় বাতাসে বারুদের গন্ধ। জীবন বাঁচাতে তেহরানের সাধারণ নাগরিকরা শহর ছেড়ে যাচ্ছেন। ইসরাইলিরা আশ্রয় নিয়েছে বাংকারে। দেশও ছাড়তে শুরু করেছেন কেউ কেউ। এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যাচেষ্টার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, হাইপারসনিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। সোমবার সন্ধ্যায় ইরানের রাজধানী তেহরানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সমপ্রচার চলাকালে তাতে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে দু’জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। হামলা চালানো হয়েছে ইরানের একাধিক হাসপাতালে। সেখানে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। রক্তে ভেসে গেছে হাসপাতাল চত্বর। অন্য হাসপাতালগুলোতে আহতদের ঢল নেমেছে। এর একটি ইমাম খোমেনি হাসপাতাল।  ইমার্জেন্সি ইউনিটে রোগীদের চাপ বেড়েছে ভয়াবহ। একজন চিকিৎসক একে রক্তস্নান বলে অভিহিত করেছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের যুদ্ধকালীন চিফ অব স্টাফ আলি সাদমানিকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া ইস্পাহানে আরও তিনজনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে কখন তাদের মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইরানি গণমাধ্যম বলছে- ইসরাইলি ভূখণ্ডে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় ও তীব্র’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি চলছে। এ রিপোর্ট লেখার সময় এসব তথ্য রীতিমতো বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ইসরাইল যেভাবে ইরানে হামলা করছে তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। তারা সেখানকার শীর্ষ সামরিক, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বহু পারমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে। পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। হামলা হয়েছে তেলের ডিপোতে। টেলিভিশন স্টেশন আইআরআইবি’তে এবং হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে। এসবই বলে দেয় ইরান পুরোদমে যুদ্ধ করছে। ইরানকে ধ্বংস করে দিতে চায় তারা। একই সঙ্গে টিভি স্টেশন ও হাসপাতালে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তারপরও ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ বলছেন, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পরিণতি হবে ইরাকের প্রয়াত নেতা সাদ্দাম হোসেনের মতো। ইরানে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে চায় ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্ব। তবে জোর করে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের চেষ্টা হবে কৌশলগত ভুল- এমন মন্তব্য করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সহ তার টিম তড়িঘড়ি করে কানাডার জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন থেকে দেশে ফিরেছেন। তা নিয়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা। কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিতে পারে। তারই প্রস্তুতি নেয়ার জন্য ট্রাম্প তাড়াহুড়ো করেছেন। এ জন্যই ভূমধ্যসাগরে তিনি মোতায়েন করেছেন যুদ্ধজাহাজ নিমিটজ। অন্যরা বলছেন, তিনি যুদ্ধ থামানোর জন্য তড়িঘড়ি করে ফিরে গেছেন। অবশ্য এ কাজে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ব্যবহার করতে পারেন। তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, সংঘাতের বাস্তব সমাপ্তি চান, শুধু অস্ত্রবিরতি নয়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেহরানের বাসিন্দাদের শহর ছেড়ে পালাতে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছেন, ইরানকে তিনি কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে দেবেন না। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হলে তা সংঘাত বাড়াবে না, বরং সংঘাতের ইতি টানবে।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। কোনো পক্ষই পিছপা হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ইসরাইলের ক্রমাগত হুমকির বিরুদ্ধে আরও জোরালো হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির  রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরাইলের ওপর নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের ঢেউ আছড়ে পড়বে। এটা খুব দ্রুত হবে বলে জানান তিনি। গত কয়েকদিনের তুলনায় সোমবার দিবাগত রাতে ইরানের হামলা বেশ জোরালো ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই হামলায় ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। আইআরজিসি বলেছে, মঙ্গলবার ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তর ও মোসাদের অপারেশনাল সেন্টারে আঘাত করেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তাসনিম নিউজ একাধিক ছবি প্রকাশ করেছে যাতে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদর দপ্তরে আগুন জ্বলছে বলে দেখা গেছে। তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইসরাইল এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তারা যেভাবেই হোক ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে চাইছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সুর তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে এই যুদ্ধের সত্যিকার ইতি চান তিনি। এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরাইলের হামলার মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের অধিকার। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে আসার কথা জানানোর পর যেন নড়েচড়ে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিজেদের জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো ইউরোপে পাঠাচ্ছে তারা। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থানগুলোতে সামরিক সেনা ও সরঞ্জাম বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওদিকে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা করতে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ অথবা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে পাঠাতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমনটি জানিয়েছেন তিনি। সিবিএস নিউজের এক্সের এক পোস্টে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সত্যিকার ইতি চান ট্রাম্প। তবে এটা পারমাণবিক ইস্যু নিষ্পত্তি করার মাধ্যমে হতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর অর্থ হচ্ছে ইরানকে সম্পূর্ণরূপে পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে।

এদিকে ইসরাইলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল আলবারেস। তিনি বলেছেন, বিশ্বের মধ্যে আমরা ইসরাইলের বড় বাণিজ্য অংশীদার। যার মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরও বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ চলতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত ইউরোপীয় অংশীদারদের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। আর এ সময়ের মধ্যে ইসরাইলকে অস্ত্র দেয়া যাবে না। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পুনরায় সংলাপ শুরু করার আহ্বানও জানিয়েছেন আলবারেস। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রায় আক্রমণের পর শান্তি অর্জনের জন্য ইইউ যেভাবে কাজ করেছিল, সেভাবেই ইরান-ইসরাইল নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের বিরোধিতা করার কথা জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, কাজাখস্তানের আসতানায় উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভের সঙ্গে এক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের আগ্রাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল সামরিক অভিযান শুরু করায় মধ্যপ্রাচ্যে হঠাৎ করে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে চীন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি আরও বলেন, আমরা এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করি, যা অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে লঙ্ঘন করে।

mzamin

তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করল ইসরায়েল by বায়েজিদ আহমেদ

এক–দুজন নয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এটির অবস্থান ইরানের রাজধানী তেহরানের আলবোরজ পর্বতমালার পাদদেশে। হত্যাকাণ্ডের শিকার ওই পাঁচ অধ্যাপক দেশটির পরমাণু গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত ছিলেন।

পরমাণু গবেষণায় ওই পাঁচ নক্ষত্রকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। এমনটাই জানিয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত একমাত্র বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মো. নাকিব হাসান। তিনি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত আন্তর্জাতিক হোস্টেলে থাকছেন। তাঁর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের। তেহরান থেকে টেলিফোনে তিনি জানান, একসঙ্গে এতজন অধ্যাপককে হারিয়ে শোকে মুষড়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা–কর্মচারীরা। এককথায় শোকে স্তব্ধ পরমাণু গবেষণার জন্য বিশেষায়িত ইরানের শীর্ষস্থানীয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়টি এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শোক জানিয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

নাকিব জানান, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা রাহিনীর ক্রমাগত হামলার কারণে তাঁরা একধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। বাংলাদেশ থেকে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন, কখন যেন কী হয় এ ভাবনায়! সারাক্ষণ বাংলাদেশ থেকে স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও শুভান্যুধায়ীদের ফোনে একধরনের ট্রমা তৈরি হয়েছে নাকিবের মনে। কারণ, জীবনে তিনি কোনো দিন এমন দুঃসহ ও ভয়ার্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি।

নাকিব বলেন, ১৩ জুন ভোরে আবাসিক এলাকায় টার্গেট করে তাঁদের এই পাঁচ শিক্ষককে হত্যা করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। যদিও ওই শিক্ষকদের কেউ তাঁর বিভাগের নন, তারপরও তাঁরা তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ছিলেন। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর বেহেস্তি ইউনিভার্সিটি কখনো এমন নৃশংস ঘটনার শিকার হয়নি। একসঙ্গে এতজন অধ্যাপককে তাদের হারাতে হয়নি।

এ বছরের জানুয়ারিতে বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাকিব হাসান তেহরানের শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। তিনি জানান, নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। তাঁরা সবাই ছিলেন পরমাণুবিজ্ঞানী।

বাংলাদেশের শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার সন্তান নাকিব হাসান জানান, গত শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক এলাকায় ঘুমন্ত অবস্থায় ইসরায়েলি হামলায় ওই বিজ্ঞানীরা নিহত হন। রোমহর্ষ সে খবর তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে জানতে পারেন। এ ছাড়া শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা মিডিয়া গ্রুপে হত্যাকাণ্ডের শিকার ওই পাঁচ অধ্যাপকের ছবি দেওয়া হয়েছে।

নিহত ওই পরমাণুবিজ্ঞানীদের মধ্যে ড. আহমাদরেজা জোলফাগারি, ড. ফেরেদুন আব্বাসি ও ড. আবদলহামিদ মিনুচেহর শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বাকি দুজন পরমাণুবিজ্ঞানী ড. আমির হোসেন ফাকেহি ও ড. মোহাম্মাদ মেহদি তেহরানচি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করতেন।

শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক প্রথিতযশা পরমাণুবিজ্ঞানী ছিলেন ড. মাজিদ শাহরিয়ারি, যাঁকে ২০১০ সালে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ গাড়ি বোমা হামলায় হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের আরও চার পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। তাঁরা হলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ আকবর মোতালেবি জাদেহ, মেকানিকসের বিশেষজ্ঞ আলী বাখোরি কাতিরিমি, পদার্থবিদ্যার বিশেষজ্ঞ মনসুর আসগারি ও ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ সাইদ বার্জি।

আইডিএফ দাবি করেছে, নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীরা ইরানের পরমাণু গবেষণার জনক মোহসেন ফাখরিজাদেহর উত্তরসূরি। ২০২০ সালে ইসরায়েল তাঁকেও হত্যা করে।

নাকিব জানান, চার দিন ধরে তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন প্রদেশের সামরিক স্থাপনাগুলোয় ইসরায়েল ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে। অন্যান্য বেসামরিক এলাকায় খুব একটা হামলা চালাচ্ছে না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে কেউ বের হচ্ছেন না। ইরানি নাগরিক থেকে শুরু করে দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভীষণ ভয়ের মধ্যে আছেন।

নাকিব হাসান জানান, তাঁর জানামতে, ইরানজুড়ে ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলায় দেশটির অনেক শীর্ষ স্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা মারা গেলেও বাংলাদেশি কোনো নাগরিক হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। রোববার তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন।

নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীদের এই ছবি প্রকাশ করেছে তেহরানের শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ
নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীদের এই ছবি প্রকাশ করেছে তেহরানের শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

তেহরানে ধবধবে খেলনা রাজহাঁস ও শিশুর হাতে রক্তের দাগ by সুজন সুপান্থ

শিশুদের মন কত দূর পৌঁছাতে পারে? এই মন কি পৌঁছাতে পারে তেরো নদী সাত সমুদ্দুর? এসব চেনে? এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে বলা যেতে পারে—তেরো নদী সাত সমুদ্দুরের জল নয় বরং শিশুরা যে জল চেনে, তাতে বড়জোড় কাগজের নৌকা ভাসানো যায়। আর সেই নৌকায় যাত্রী বলতে শুধুই শিশুর কল্পনা। পানিতে ঢেউ দিলে দুলে দুলের নৌকা চলে যাবে দূরে।

কিন্তু শিশুদের কি কেবল এই-ই নিয়তি? না। নিয়তি তাদের একদিন ছোট থাকতেই শিশুজীবন থেকে বের করে নিয়ে আসে। পুতুলের জন্য মালা গাঁথবে বলে বসে ছিল যে শিশু, তাকে একদিন ছোট বয়সেই বড়দের মতো ভার নিতে হয়। ছোট্ট জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভার নিতে হয় তার সব খেলনার। কারণ, খেলনার সঙ্গে তো তার হৃদয়ের সম্পর্ক। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দিনে সব ছেড়ে তুলতুলে কোমল হাতে কোলে তুলে নিতে হয় প্রিয় খেলনা। যে করেই হোক গুলি বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে বাঁচাতে হবে তাকে।

যেমনটা করেছে তেহরানের ছোট্ট এ মেয়েটি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সামনে ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়ে রক্তাক্ত ইরানি একজন নারী। আর তাঁর পেছনে ছোট্ট শিশুটি ডান হাতে জড়িয়ে আছে প্রিয় খেলনা রাজহাঁস। রাজহাঁসটির গায়ে রক্ত বা কোনো কিছুর দাগ নেই। একদম পরিষ্কার। আর শিশুটির বাম হাতে রক্তের দাগ।

বার্তা সংস্থা এএফপি এই ছবিটি প্রকাশ করেছে। গত ১৫ জুন তেহরানের কেন্দ্রস্থল কেশাভার্জ বুলেভার্ডে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক ভবন। নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য এই নারী ও ছোট্ট মেয়েটি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে। কিন্তু শুধু নিজে বাঁচলে হবে! খেলনাগুলোর কী হবে—এই ভাবনায় হয়তো ছোট্ট শিশুটি আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছে খেলনাগুলো। হাতের কাছে এই রাজহাঁসটি পেয়ে বুকে জড়িয়ে নেমে পড়েছে অনিশ্চিত পথে। এই পথে হয়তো আবারও তাদের মুখোমুখি হতে হবে বুলেট-গুলির।

শিশুদের হৃদয়ে কী মায়া দেখুন, ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া ঘর থেকে জীবনের ঝুঁকি যেন কোনো রকমে সে বের করে এনেছে খেলনা রাজহাঁসটিকে। নিজে কোথায় আশ্রয় নেবে, সেই ভাবনা হয়তো তার নেই। তবু গুলি থেকে বাঁচিয়ে এনে খেলনা রাজহাঁস বুকে আগলে সে তাকে দিচ্ছে শুশ্রূষা। সে কী অদ্ভুত মায়া! কী আশ্চর্য একটা আদর!

আর মানুষ, যারা বড়! মানুষের দ্বন্দ্বময় মন। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে মানুষ ছুড়ছে গুলি, ছুড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র। গুলির আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে আর সব মানুষের ঘরবাড়ি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে শিশুসহ বড়রাও। কী হিংস্র, কী ভয়ংকর সেই সব দৃশ্য! মানুষ হত্যা করছে মানুষকে, শিশুকে।

যে শিশুটি এত দিন জেনে এসেছে এ পৃথিবী নয়নাভিরাম, যে শিশুটি খেলনা কোলে আড়াল করে শোক। ইচ্ছা করে ডাক দিয়ে বলি—মাতৃমনা পরির সঙ্গে তোমার লুকিয়ে দেখা হোক।

ইরান ইসরায়েল সংঘাতে ১৫ জুন তেহরানের কেন্দ্রস্থল কেশাভার্জ বুলেভার্ডে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক ভবন। নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য এই মা ও মেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে
ইরান ইসরায়েল সংঘাতে ১৫ জুন তেহরানের কেন্দ্রস্থল কেশাভার্জ বুলেভার্ডে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক ভবন। নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য এই মা ও মেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে। ছবি: এএফপি