Friday, March 14, 2025

আফ্রিকার তিনটি দেশে ফিলিস্তিনিদের পাঠাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা পুনর্গঠনের জন্য ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসন করতে পূর্ব আফ্রিকার তিনটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

শুক্রবার (১৪ মার্চ) মার্কিন বার্তাসংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসন নিয়ে সুদান, সোমালিয়া এবং সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই প্রস্তাবের পর সুদান তা তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দিয়েছে। সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাদের সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বা ফিলিস্তিন সম্পর্কিত কোনো প্রস্তাব নিয়ে যোগাযোগ করা হয়নি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে, সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ডের তথ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফোন করা হলেও কোনো উত্তর মেলেনি।

উল্লেখ্য, গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজার ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে তাদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেন, যার মাধ্যমে তারা জর্ডান, মিসর এবং অন্যান্য আরব দেশে পুনর্বাসিত হবে। এই সময় ট্রাম্প গাজাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ বানানোর পরিকল্পনাও পেশ করেন।

ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা গাজার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ এতে তাদের গাজা থেকে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের ভয় স্পষ্ট হয়েছে। তবে, ইসরায়েল ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশ এবং বিশেষত আরব রাষ্ট্রগুলি এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে।

অপরদিকে, মিসর গাজা পুনর্গঠনে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। চলতি মাসে আরব লীগের সম্মেলনে কায়রোর প্রস্তাবটি আরব নেতাদের সমর্থন লাভ করেছে। ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রকল্পের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা নেই, যা গাজার স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।

মার্কিন এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গোপন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সুদান, সোমালিয়া এবং সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে, কতটা অগ্রগতি হয়েছে বা আলোচনা কোথায় চলছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল এই আলোচনা পরিচালনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র এই দেশগুলোকে আর্থিক, কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন প্রণোদনা প্রস্তাব করতে পারে। পাঁচ বছর আগে ট্রাম্প আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরায়েল এবং চারটি আরব দেশের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, যা এখন একটি সফল কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

হোয়াইট হাউস এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। রন ডারমার, যিনি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা সদস্য এবং নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, তিনিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

এদিকে, ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বেচ্ছায়’ ফিলিস্তিনিদের দেশত্যাগের পক্ষেই ছিলেন, এ সপ্তাহে বলেছেন যে, ইসরায়েল বিভিন্ন দেশ খুঁজছে যাতে ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করা হয়। তিনি আরও জানিয়েছেন, ইসরায়েল তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘বিশাল অভিবাসন বিভাগ’ প্রস্তুত করছে।

প্রসঙ্গত, সুদান উত্তর আফ্রিকার দেশটি ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য সম্মত হয়েছিল। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্র সুদানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে তার তালিকা থেকে বাদ দেয় এবং দেশটি আন্তর্জাতিক ঋণ এবং বৈশ্বিক বৈধতা লাভ করে।

কিন্তু, সুদান তখন থেকে গৃহযুদ্ধে প্রবাহিত হয় এবং সরকারী বাহিনী ও আরএসএফ প্যারামিলিটারির মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই সংঘর্ষে জাতিগতভাবে উদ্বেগজনক হত্যাকাণ্ড এবং ধর্ষণের কথা জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু করেছে। তৎকালীন বাইডেন প্রশাসন জানায় যে, আরএসএফ এবং এর পৃষ্ঠপোষকরা গণহত্যা করছে।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের উচ্ছেদ অভিযানের মুখে উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের উচ্ছেদ অভিযানের মুখে উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত



পুতিন কি ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবেন

তিন বছরের বেশি সময় স্থায়ী যুদ্ধের বিরতিতে ইউক্রেন সম্মতি দেওয়ার পর কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে রাশিয়া। অবশ্য যুদ্ধে রাশিয়া এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কি যুদ্ধবিরতিতে সায় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ কাজে লাগাবেন, নাকি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবেন।

সৌদি আরবের জেদ্দায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ৩০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে ইউক্রেন। এরপর রাশিয়াকেও একই প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে জানিয়েছেন, শিগগিরই রাশিয়া-ইউক্রেনকে ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেওয়া হবে।

এরই মধ্যে ইউক্রেন এই প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে উল্লেখ করে রুবিও বলেন, রাশিয়াও শান্তির হাত বাড়িয়ে দিলে এত দিনের চলমান যুদ্ধ বন্ধ হতে খুব বেশি দেরি নেই। কিন্তু রাশিয়া যদি এ প্রস্তাব মেনে না নেয়, তাহলে শান্তি আলোচনায় অনিশ্চয়তা দেখা দেবে বলে মত দেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতিতে রাশিয়ার রাজি হওয়া না-হওয়া বহুমুখী হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি অবধি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাফ জানিয়ে এসেছেন, কোনো ধরনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার আগ্রহ তাঁর নেই। যদি শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করতেই হয়, সেটি হতে হবে স্থায়ী সমাধান।

বর্তমানে যুদ্ধে অনেকটাই কোণঠাসা ইউক্রেন, রাশিয়ার সেনারা ভালো অবস্থানে রয়েছেন। তা ছাড়া পুতিন বারবার বলেছেন, সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পাবেন। এই পরিস্তিতিতে পুতিন কি ট্রাম্পের মন রাখবেন, নাকি যুদ্ধ চালিয়ে ইউক্রেনে জয়ের পথেই হাঁটবেন, তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।

মূলত গত ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারি পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের একান্ত ফোনালাপ এবং এরপর দফায় দফায় রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিনিদের বৈঠকই চলমান যুদ্ধের আশু সুরাহার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করেন কূটনীতিকেরা।

তবে কূটনীতিকেরা মনে করেন, রাশিয়ার পদক্ষেপ এখনো স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না। সৌদি আরবে বৈঠকের পর বেশ কৌশলী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্রেমলিন। ক্রেমলিনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত না জেনে কোনো মন্তব্য জানানো হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না বলেই রাশিয়া এমন কৌশলী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

রুশ-মার্কিনদের সাপে-নেউলে সম্পর্কের বাইরে গিয়ে ট্রাম্প-পুতিন সখ্য কিন্তু বিশ্বপাড়ায় মোটেও অজানা নয়। তবে এ সখ্যই সব নয়, এর বাইরে আছে ইউক্রেনের খনিজের প্রতি ট্রাম্পের চোখ আর কিয়েভের ভূমির ওপর পুতিনের লোভ।

শেষ কয়েক দিনের যুদ্ধে ভালোই এগিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর কুরস্কের বেশির ভাগ এলাকা এখন রাশিয়ার দখলে। দর–কষাকষিতে কুরস্ককে নিজেদের হাতে রাখতে চান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তবে দিন দিন তা কঠিন হয়ে উঠছে তাঁর সেনাবাহিনীর জন্য।

আবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নজিরবিহীন বাগ্‌বিতণ্ডা এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অসম্মান করার অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের মতো ঘটনা এত দিন জেলেনস্কিকে ভালোই ভুগিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, শান্তিচুক্তির প্রতি যত দিন না আগ্রহ দেখাবে ইউক্রেন, তত দিন বন্ধ থাকবে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিতে হচ্ছে জেলেনস্কিকে।

কিন্তু পুতিন কেন আপস করবেন? বাইডেন প্রশাসনের সময় হাজারখানেক নিষেধাজ্ঞার ভারেও নতজানু না হওয়া পুতিন কেন এত সহজে রাজি হবেন যুদ্ধবিরতিতে?

এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি এস পেশকভের সাক্ষাৎকারে। পেশকভ জানিয়েছেন, জেদ্দার আলোচনার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ও পর্যবেক্ষণ করছে মস্কো। এখনই হলফ করে কিছু বলা না গেলেও কয়েক দিনের মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের আরেক দফা টেলিফোন আলাপের পর রাশিয়া নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে পারবে।

প্রথমবার ট্রাম্প-পুতিন টেলিফোন আলাপে রাশিয়ার ইতিমধ্যে দখল করা ইউক্রেনের ভূমি নিয়ে ফয়সালা, কোনোভাবেই ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগদান করতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং পূর্ব-মধ্য ইউরোপে ন্যাটোর হম্বিতম্বি কমিয়ে আনার ব্যাপারে পুতিন জোরালো দাবি তুলেছেন বলে জানা যায়।

চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আবারও পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলবেন তিনি। বার্তা সংস্থা এপির নিশ্চিত করা এ তথ্য থেকেই চূড়ান্ত দর–কষাকষির আভাস পাচ্ছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকেরা।

এর আগে ট্রাম্প বেশ কয়েকবার তাঁর বক্তব্যে আভাস দিয়েছেন, এই চুক্তিতে ইউক্রেনকে ছাড় দিতে হবে। এত দিন ইউক্রেন ছাড় দিতে রাজি না থাকলেও এবার বাধ্য হয়েই আপসের পথে হাঁটতে হতে পারে দেশটিকে।

এ প্রসঙ্গে রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিয়া গ্রাশ্চিনেকভ বলেন, ‘সাদা চোখে এই চুক্তিতে কারও বিজয় হয়নি মনে হলেও রাশিয়া কৌশলগত বিজয় নিশ্চিত করেই চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মতি দেবে।’

রাশিয়া কৌশলগত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এমন কথা উঠে এসেছে মস্কোর সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও। বলা হয়েছে, রুশ প্রতিনিধিরা জেদ্দায় না থাকলেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ রুশ প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

এ ছাড়া ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ গত মাসেও রাশিয়ায় পুতিনের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছেন। ভবিষ্যতেও তাঁর রাশিয়া সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, এই পুরো আলোচনায় ইউরোপকে তোয়াক্কাই করছে না ট্রাম্প প্রশাসন।

ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের ঘটনায় ইতিমধ্যে দুই ভূখণ্ডের সম্পর্ক অনেকটাই শীতল। ন্যাটো নিয়েও ট্রাম্প খুশি নন; শপথ নিয়েই দাবি জানিয়েছেন ন্যাটোর বাজেট বাড়ানোর। আবার ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও তাঁর উপদেষ্টা ইলন মাস্কও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়া উচিত।

ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড আদায়ের চেষ্টার ইস্যুতেও ইউরোপের সঙ্গে কয়েক দফা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন–কষাকষি হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে ভেঙে রাশিয়ামুখী হওয়াকে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কংগ্রেস সদস্য ভালো চোখে দেখছেন না। তারপরও এটাই এখন বাস্তব।

এই বাস্তবতার ভিতকে পুঁজি করেই রুশ কূটনৈতিক বিশ্লেষক স্যামুয়েল শ্যারাপ বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে মস্কোর বর্তমান সম্পর্ক যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো। ট্রাম্প-পুতিনের মধ্যকার উষ্ণতার বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতির যে আলোচনা চলছে, তা মস্কো মেনে নিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

শুরুতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি দিয়ে যুদ্ধ বন্ধের পথ রচিত হলেও পরবর্তী সময়ে হয়তো এই ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতিই স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের সূচনা করবে এবং তিন বছর ধরে চলা এই সংঘাতের অবসান হবে বলে মত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের।
ভ্লাদিমির পুতিন ও ভলোদিমির জেলেনস্কি
ভ্লাদিমির পুতিন ও ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি: রয়টার্স

ভারতীয় নারীরা গড়ে দিনে ৭ ঘণ্টার বেশি সময় ঘরের কাজ করে

ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বলিউডের সিনেমা ‘মিসেস’ এর রিচাকে ভারতে ঘরে ঘরে দেখতে পাওয়া যায়। সম্প্রতি দেশটিতে সরকারি এক জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, ভারতীয় নারীরা গড়ে দিনে সাত ঘণ্টার বেশি সময় ঘরের কাজ এবং পরিবারের সদস্যদের সেবাযত্নে ব্যয় করেন। এ জন্য তাঁদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। গৃহস্থালি কাজে একজন নারীর তুলনায় একজন পুরুষের অবদান অর্ধেকেরও কম।

মিসেস সিনেমার রিচার ঘরের কাজ করতে করতে নাজেহাল অবস্থা হয়। ব্লেন্ডারে চাটনি করলে হবে না, শিলপাটাতে বেটেই করতে হবে। রুটি আগে ভেজে রাখলে হবে না, চাই চুলা থেকে গরম-গরম নামানো ফুলকো রুটি। আজ রান্নার এই ভুল, কাল কাজের ওই ভুল। আর এসব করতে করতে নাচকে ঘিরে রিচার স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয় না।

ওই জরিপে যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে সেখানে দেখা গেছে, একজন নারী দৈনিক গড়ে ২৮৯ মিনিট বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজে ব্যয় করেন এবং ১৩৭ মিনিট বিনা পারিশ্রমিকে পরিবারের সদস্যদের সেবাদান কাজে ব্যয় করেন। সেখানে পুরুষ ৮৮ মিনিট ঘরের কাজে আর ৭৫ মিনিট সেবা দানে ব্যয় করেন।

ছয় বছর আগে ভারতে এ ধরনের একটি জরিপ হয়েছিল এবং সেখানেও একই ধরনের ফলাফল দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। অথচ নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ভারত সরকার থেকে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই জরিপ বলেছে, ওই সব উদ্যোগ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি।

ইন্ডিয়াস টাইম ইউস সার্ভের জরিপকারীরা সারা দেশে ৬ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীদের আগের দিন তাঁরা কী কাজ করেছেন, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। গত সপ্তাহে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রথম জরিপটি হয়েছিল ২০১৯ সালে।

আগেরবারের সঙ্গে এবারের ফলাফলে দুটি মূল পার্থক্য হলো আগের বারের চেয়ে এবার ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীরা বিনা মজুরিতে গৃহস্থালি কাজে ১০ মিনিট সময় কম ব্যয় করেছেন। আর মজুরিসহ কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ ৩ শতাংশের সামান্য বেশি বেড়েছে।

ওই জরিপের সারসংক্ষেপে এ বিষয় দুটির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নারীদের ‘বিনা মজুরির কাজ থেকে মজুরি দেওয়া হয়—এমন কাজের দিকে অগ্রসর হওয়া’ একটি ইতিবাচক লক্ষণ। তাঁরা এখনে গৃহস্থালি কাজে কম সময় দিয়ে মজুরি দেওয়া হয়—এমন কাজে বেশি সময় দিচ্ছেন।  

যদিও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এটা আসলে প্রকৃত সত্য নয়। এমনকি যদি গৃহস্থালি কাজে নারীর অবদান সামান্য কমেও তার অর্থ এই নয় যে নারীদের সংগ্রাম কমে গেছে। তাঁদের এখনো পুরুষদের তুলনায় চাকরি এবং সংসারের কাজ নিয়ে অধিক হিমশিম খেতে হয়।

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অশ্বিনী দেশপান্ডে বলেছেন, নারীরা কীভাবে তাঁদের সময় কাটান, সেটা গভীরভাবে বুঝতে হলে টিইউএস জরিপের তথ্য পাশাপাশি ভারতের ফিমেল লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট (এফএলএফপিআর) পর্যালোচনা করা উচিত। এফএলএফপিআর ১৫ বা তার বেশি বয়সের নারীদের শ্রম বাজারে অংশগ্রহণের হিসাব করে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এফএলএফপিআর ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ সালে ৩৭ শতাংশ হয়েছে।

অধ্যাপক অশ্বিনী বলেন, কাজের সুযোগ বেড়েছে শুধু এই কারণে ভারতের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়েনি। বরং অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণেও চাপে পড়ে নারীরা অর্থ উপার্জনের জন্য বাইরে কাজ করতে যাচ্ছেন।

অর্থনীতির এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘নারীরা একটি চাকরি করার জন্য গৃহস্থালি কাজে তাঁদের সময় কম ব্যয় করার অপেক্ষা করছেন না। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পারিবারিক আয় বাড়াতে আর্থিক মূল্য আছে—এমন কাজ করতে চাইছেন। এর ফলে তাদের দ্বিগুণ কাজ করতে হচ্ছে, বাইরে অর্থের বিনিময়ে কাজ এবং ঘরে বিনা পারিশ্রমিকের কাজ।’

শুধু ভারতীয় নারীদের এ অবস্থা নয় বরং পুরো বিশ্বের বাস্তবতা এটাই। বিশ্বে গড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় তিন ঘণ্টা বেশি সময় গৃহস্থালি ও সেবাদান কাজ করেন।

ভারতীয় নারীদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান প্রায় ৪ ঘণ্টা।

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ভারত সরকার থেকে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু জরিপ বলেছে, ওই সব উদ্যোগ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ভারত সরকার থেকে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু জরিপ বলেছে, ওই সব উদ্যোগ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করলেন প্রধান উপদেষ্টা ও জাতিসংঘ মহাসচিব

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আজ শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থীশিবিরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে ইফতার করেছেন।

চার দিনের সফরে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে যাওয়ার আগে আজ দুপুরে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

ওই বৈঠকে আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে তিনি রমজান মাসে বাংলাদেশে এসেছেন।

বৈঠকে কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে বসবাসরত ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য মানবিক সহায়তা হ্রাস নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে এতটা বৈষম্যের শিকার অন্য কোনো জনগোষ্ঠী আমি দেখিনি।’

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের ভুলতে বসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানবিক সহায়তা কমানো একটি অপরাধ। পশ্চিমা দেশগুলো এখন প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় দ্বিগুণ করছে, কিন্তু তখন আবার বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের ‘অপরিসীম কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেন গুতেরেস। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি অত্যন্ত উদারতা দেখিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আমার জন্য একটি বিশেষ বিষয়।’

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং তাদের জন্য সহায়তা সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেবেন।

এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও প্রধান উপদেষ্টা
এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও প্রধান উপদেষ্টা। ছবি : সংগৃহীত

খোঁয়াড়ের মতো নোংরা এক বাসায় কেটেছে ম্যারাডোনার শেষ দিনগুলো

ডিয়েগো ম্যারাডোনার শেষ দিনগুলোয় তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন যে আটজন, তাঁদের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে বিচার চলছে বুয়েনস এইরেসের সান ইসিদ্রো আদালতে। গতকাল শুনানি কার্যক্রম চলার পর আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত বিচারকার্যে বিরতি ঘোষণা করা হয়। শুনানিতে ম্যারাডোনার দুই কন্যা দালমা ও জিয়ানিন্নার পক্ষের আইনজীবী ফের্নান্দো বার্লান্দো জানিয়েছেন, সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে কতটা অযত্নে শেষ দিনগুলো কাটাতে হয়েছে।

আদালতে বার্লান্দো অভিযোগ করেন, ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত যে বাসায় ১৯৮৬ বিশ্বকাপের নায়কের শেষ দিনগুলো কেটেছে, তা কোনো রোগীর থাকার জন্য উপযোগী ছিল না। বার্লান্দোর ভাষায়, ‘বাসাটা ছিল শূকরের খোঁয়াড়ের মতো, এতটা নোংরা খুব কমই দেখা যায়।’

মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের সপ্তাহ দুয়েক পর ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ম্যারাডোনা। বুয়েনস এইরেসের এক অভিজাত এলাকায় ভাড়া করা বাড়িতে জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে তাঁর।

সর্বকালের অন্যতম সেরা এ ফুটবলার যে বাড়িতে থাকতেন, আদালতের সামনে বার্লান্দো সেই বাসার একটি মডেল উপস্থাপন করেন। বাসার ভেতরের অবস্থা, কী কী সুবিধা-অসুবিধা ছিল, আদালতকে তা বোঝাতে মডেলটি উপস্থাপন করা হয়। বার্লান্দোর ভাষায়, ‘বাসাটি ঘরোয়া হাসপাতালের উপযোগী ছিল না।’ বাথরুম নিয়ে বার্লান্দো বলেন, ‘এক মিটারেরও কম প্রশস্ত’, যা কঠিন ছিল ‘ডিয়েগোর চলাফেরার জন্য।’

বার্লান্দো সেই বাসার কক্ষগুলোর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুনানিতে। ম্যারাডোনার দেখাশোনার জন্য নার্সরা অবস্থান করেছেন বাসায়। কিন্তু তাঁরা যে কক্ষে থাকতেন, সেখান থেকে ম্যারাডোনার কক্ষের বেশ দূরত্ব ছিল। অর্থাৎ ম্যারাডোনা কোনো দরকারে তাঁদের ডাকলে নিজেদের কক্ষ থেকে সেই ডাক শোনা অসম্ভব ছিল নার্সদের জন্য।

আগামী মঙ্গলবার বিচারকার্যে সাক্ষ্য দেবেন পুলিশ কর্মকর্তা লুকাস গ্যাব্রিয়েল, দুই কমিশনার রদ্রিগো বোর্হে ও হাভিয়ের লিওনার্দো মেন্দোজা। ম্যারাডোনার মৃত্যুর দিন তাঁরা সবার আগে সেই বাসায় প্রবেশ করেছিলেন। সপ্তাহে দুই দিন (মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার) এই বিচারকার্যে চিকিৎসকসহ অন্তত ১০০ জন সাক্ষ্য দেবেন, যা জুলাই পর্যন্ত চলতে পারে।

এদিকে আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে দেশটির সাংবাদিক ভিভিয়ানা কানোসার অনুষ্ঠান ‘ভিভিয়ানা এন ভিভো’য় উপস্থিত হয়ে বার্লান্দো ম্যারাডোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ‘৮ থেকে ২৫ বছরের কারাবাস’ দাবি করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ‘গুন্ডাদের দল’ অভিহিত করে বার্লান্দো বলেছেন, ‘তাঁরা ম্যারাডোনাকে পুরোপুরি অনুপযুক্ত পরিবেশে থাকার জন্য পাঠিয়েছিলেন। ঠিকমতো দেখাশোনা না করে তাঁর পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন কিংবা দেখাশোনার নামে আসলে হত্যা করছিলেন।’

মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন একজন নিউরোসার্জন, একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ, একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন মেডিকেল কো-অর্ডিনেটর, একজন নার্স কো-অর্ডিনেটর, একজন চিকিৎসক এবং রাতের পালার নার্স। দিনের বেলায় ম্যারাডোনাকে দেখভাল করতেন যে নার্স, তাঁর বিচার করা হবে আলাদাভাবে।

বুয়েনস এইরেসে ম্যারাডোনার একটি দেয়ালচিত্র। কিংবদন্তিকে এখনো খুব ভালোবাসেন আর্জেন্টাইনরা
বুয়েনস এইরেসে ম্যারাডোনার একটি দেয়ালচিত্র। কিংবদন্তিকে এখনো খুব ভালোবাসেন আর্জেন্টাইনরা। এএফপি

বিজেপির হিন্দি, হিন্দু ও হিন্দুস্তান নীতির ‘বিপদ’ by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

পরপর তিন মেয়াদে ভারতে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হলেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন বড় দুটি সমস্যার মুখোমুখি। এটা নিয়ে দুই পর্বে বিশ্লেষণ করেছেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব

তৃতীয় দফার শাসনকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চোখ রাঙাতে শুরু করেছে দুটি সমস্যা। একটি তাঁর সরকারের তৈরি ত্রিভাষা নীতি, যার মধ্য দিয়ে তিনি তামিলনাড়ুসহ অহিন্দিভাষী রাজ্যগুলোয় হিন্দি ভাষাশিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে চান। অপরটি সংসদীয় কেন্দ্রগুলোর সীমানা পুনর্বিন্যাস ও লোকসভার বহর বাড়ানো।

দুটি সমস্যাই প্রাচীন। বহু উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশজুড়ে ত্রিভাষা নীতি আজও রূপায়িত হয়নি। হিন্দিকে সর্বত্র গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়নি, ‘রাষ্ট্রভাষার’ মর্যাদাও পায়নি, সরকারি বা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তা–ও একা নয়, ইংরেজি ‘দোসর’। অন্য সমস্যাটি, অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের আইনসভার বহর বাড়ানোর বিষয়টি, অর্ধশতাব্দী ধরে ধামাচাপা দেওয়া রয়েছে।

আগামী বছর সরকারকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রবল গোলমাল তা নিয়েও। তামিলনাড়ু দাবি জানিয়েছে, আরও ৩০ বছর সংসদের বহর অপরিবর্তিত থাকুক। এই দাবিতে তারা দাক্ষিণাত্যকে জোটবদ্ধ করতে চাইছে। সমর্থন পাওয়া স্রেফ সময়ের ব্যাপার।

বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টায় মোগলদের কালঘাম ছুটে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা রণে ভঙ্গ দিয়েছিল। নরেন্দ্র মোদির বিজেপিকেও তেমনই অলঙ্ঘনীয় বাধার মোকাবিলা করতে হবে যদি তিনি জবরদস্তি এই দুই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন। প্রতিরোধের জন্য দাক্ষিণাত্য কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ত্রিভাষা নীতি, হিন্দির আগ্রাসন ও দাক্ষিণাত্য

হিন্দি ভাষাকে ভারতে সর্বজনীন করে তোলার প্রচেষ্টা বহুকালের। স্বাধীনতার আগে থেকেই সেই প্রচেষ্টা নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্ক হয়েছে। অহিন্দিভাষী রাজ্য আপত্তি জানিয়েছে। প্রতিবাদী হয়েছে দক্ষিণের রাজ্যগুলো। সবচেয়ে বেশি সক্রিয় প্রতিরোধে শামিল হয়েছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি।

১৯৩৭ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে সরকারি স্কুলে হিন্দি ভাষাশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরু হয়েছিল তীব্র আন্দোলন, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইরোড ভেঙ্কটাপ্পা রামাস্বামী ‘পেরিয়ার’। তিনি মনে করতেন, গান্ধী, নেহরু ও কংগ্রেসের হিন্দিপ্রেম তামিল ভাষা ও সংস্কৃতির অবসান ঘটাবে। দক্ষিণ হয়ে যাবে উত্তরের দাস।

পেরিয়ারের সেই আন্দোলন জন্ম দিয়েছিল দ্রাবিড় জাত্যভিমানের—যা আজও প্রবল। তিন বছর পর ১৯৪০ সালে শান্তি ফিরেছিল সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে।

স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নের সময় হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করা যায় কি না, সেই বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়, হিন্দি হবে সরকারি ভাষা। কিন্তু হিন্দির পাশাপাশি সরকারি ভাষা হিসেবে গণ্য হবে ইংরেজিও। তার মেয়াদ থাকবে পরবর্তী ১৫ বছর—১৯৬৫ সাল পর্যন্ত।

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মাদ্রাজে নতুনভাবে শুরু হয় তীব্র হিন্দিবিরোধী আন্দোলন। শঙ্কা ছিল, মেয়াদ শেষে হিন্দিই হবে একমাত্র সরকারি ভাষা। হিন্দি আগ্রাসন রুখতে ঘটে যায় প্রভূত রক্তপাত ও প্রাণহানি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী জানিয়ে দেন, অহিন্দিভাষী রাজ্য যত দিন চাইবে, তত দিন পর্যন্ত হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজিও থাকবে সরকারি বা দাপ্তরিক ভাষা। সেই ঘোষণায় শান্তি ফিরেছিল।

সংবিধানপ্রণেতারা শিক্ষাকে রেখেছিলেন রাজ্যতালিকায়। ১৯৭৫ সালে তা নিয়ে আসা হয় যুগ্ম তালিকায়। দেশ যত এগোতে থাকে, ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও তত অনুভূত হয়।

সরকারি স্কুলে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান হলেও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষার চল বাড়ে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের আকর্ষণও বাড়তে থাকে সত্তরের দশক থেকে।

নব্বইয়ের দশকে বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ সেই প্রবণতায় গতি আনে। রাজ্যে রাজ্যে ঢল নামে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের। মাতৃভাষার পাশাপাশি হু হু করে বেড়ে যায় ইংরেজি শিক্ষার কদর।

ভারতে ত্রিভাষা নীতি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। তাতে হিন্দিভাষী রাজ্যে হিন্দি ও ইংরেজির সঙ্গে অন্য কোনো ভারতীয় ভাষা শেখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। অহিন্দিভাষী রাজ্যে আঞ্চলিক ভাষা ও ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি চিহ্নিত হয় তৃতীয় ভাষা হিসেবে। নীতি গৃহীত হলেও তার বাস্তবায়ন ছিল কঠিন। বিতর্কও দেখা দেয় রাজ্যে রাজ্যে।

কার্যত দেখা যায়, নীতি মানার চেষ্টা শুধু সরকারি ও সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলোতেই। বেসরকারি ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল চলতে থাকে নিজস্ব সুবিধামতো। দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোয় স্থানীয় ভাষার সঙ্গে ইংরেজিই প্রাধান্য পেতে থাকে। হিন্দি থাকে প্রায় অচ্ছুত। এতটাই যে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থানুকূল্যে নবোদয় বিদ্যালয় খুলতেও তৎকালীন মাদ্রাজ (অধুনা তামিলনাড়ু) সরকার অস্বীকার করেছিল।

নতুন শিক্ষানীতি ও শিক্ষামন্ত্রীর হুমকি

অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও উত্তেজনা সৃষ্টিতে বিজেপি বরাবর অপ্রতিদ্বন্দ্বী। নোট বাতিলের মতো ‘হারাকিরি’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন করেছিলেন, সেই রহস্য আজও অনুদ্‌ঘাটিত। সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলে মধ্যরাত্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কেনই–বা তিনি তড়িঘড়ি জিএসটি রূপায়ণ করেছিলেন, তা–ও অজানা। এই দুই সিদ্ধান্তে কার কতটা লাভ হয়েছে, সেই অনুসন্ধান আজও অব্যাহত।

নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন (সিএএ) কিংবা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) দেশের কোন উপকারে এসেছে বা আসবে, তা কেউ জানে না। এসব সিদ্ধান্ত মানুষকে ভীত করে তুলেছে। অশান্তি সৃষ্টি করেছে রাজ্যে রাজ্যে। সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। একশ্রেণির নাগরিকদের মনে ক্রোধের সঞ্চার করেছে। এই অর্থহীন মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সাম্প্রতিক মন্তব্যে, যা নতুন করে উসকে দিয়েছে তামিল জাত্যভিমান।

মোদি সরকার ২০২০ সালে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষণা করে। সেই নীতিতে দেশের সব রাজ্যের সরকারি স্কুলে ত্রিভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের বারানসিতে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তামিলনাড়ুকে দেশের সংবিধান মানতে হবে। রাজ্যে ত্রিভাষা শিক্ষা চালু করতেই হবে। না করলে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পের’ প্রাপ্য টাকা তাদের দেওয়া হবে না।

ওই প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৬০ শতাংশ, বাকি ৪০ শতাংশ রাজ্যের। তামিলনাড়ু সরকারের অভিযোগ, সেই বরাদ্দের প্রাপ্য ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা কেন্দ্র দিচ্ছে না।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের মন্তব্যের ভিডিও ট্যাগ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন অভিযোগ করেন, ‘হিন্দির প্রসারে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী তামিলনাড়ুকে ব্ল্যাকমেল করছেন। কিন্তু হুমকির কাছে তামিলনাড়ু মাথা নোয়াবে না।’

শুরু হয়েছে নতুন ভাষাযুদ্ধ। তামিল অস্মিতা রক্ষায় বিজেপির নেতৃত্ব ছেড়েছেন রঞ্জনা নাচিয়ার। ভাষাযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণের অন্য রাজ্যেও।

কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায়ও দাবি উঠেছে ত্রিভাষা নয়, দ্বিভাষা শিক্ষার। স্ট্যালিন তুলে ধরেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের উদাহরণ। রাশিয়ার ভাষা আগ্রাসন কীভাবে সোভিয়েতের পতন ঘটিয়েছে, সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়েছেন বিজেপিকে। হুমকিটা প্রচ্ছন্ন, কিন্তু স্পষ্ট।

বিজেপি ও তার হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান নীতি

মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও কংগ্রেসও হিন্দির প্রসারে উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু অহিন্দিভাষীদের স্পর্শকাতরতা উপেক্ষা করেননি। চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি থেকে নানা সময় পিছিয়ে এসেছেন। ভাষার বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য রক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ও সংঘ পরিবারের হিন্দি আধিপত্যবাদের কাছে অহিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর স্পর্শকাতরতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই সন্দেহ জাগছে। নতুন শিক্ষানীতির ত্রিভাষা চরিত্র ও শিক্ষামন্ত্রীর হুমকি তারই প্রমাণ।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) ও জনসংঘের কাছে শুরু থেকেই হিন্দুস্তান, হিন্দু ও হিন্দি ছিল সমার্থক। যে হিন্দু সেই হিন্দুস্তানি এবং সে হিন্দিভাষী—এটাই ছিল তাদের পরিচয়। ক্রমেই ‘হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান’ স্লোগান জনপ্রিয় হয়।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির উত্থান তাদের বেপরোয়া করে তোলে। ক্ষমতায় এসেই সরকারি নির্দেশে ফরমান জারি করা হয়, সব কেন্দ্রীয় ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং করপোরেশনের কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হয় হিন্দি, নয়তো হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজিতে ব্যবহার করতে হবে।

তামিলনাড়ুসহ বহু অহিন্দিভাষী রাজ্য তখনো বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা কেন্দ্রকে হুঁশিয়ার করে জানিয়েছিলেন, রাজ্যে রাজ্যে আগুন জ্বললে তার দায় বিজেপিকেই নিতে হবে। সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছিল কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলও। বলেছিল, ওই নির্দেশ অপ্রয়োজনীয়ই শুধু নয়, তা সরকারি ভাষা আইনেরও পরিপন্থী।

বিজেপি অবশ্য চেষ্টায় রাশ টানেনি। গত ১০ বছরে হিন্দির ব্যবহার ও বিকাশের জন্য নানাভাবে সচেষ্ট। ১০ বছরে যত আইন তারা পাস করেছে, প্রতিটির পরিচিতি দেওয়া হয়েছে হিন্দিতে।

ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের নতুন নাম ‘ভারতীয় ন্যায়সংহিতা’। দেশের নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা ‘ইন্ডিয়া’র পরিবর্তে ‘ভারত’কে প্রাধান্য দিতে চেয়েছে। নতুন সংসদ ভবনের অভ্যন্তরের যাবতীয় নির্দেশিকা হিন্দি ও সংস্কৃতভিত্তিক। বোঝা যায়, ভাষা হিসেবে হিন্দি ও সংস্কৃতের প্রভুত্ব স্বীকারে দেশবাসীকে তারা বাধ্য করতে চায়।

হিন্দিভাষী রাজ্য ও ত্রিভাষা নীতির উপেক্ষা

অথচ বাস্তবে ত্রিভাষা নীতি সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোয়। কিংবা বলা যায়, হিন্দিভাষী রাজ্যে ত্রিভাষা নীতি রূপায়ণে কেন্দ্র যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ তাদের অহিন্দিভাষী রাজ্য নিয়ে। বিশেষ করে তামিলনাড়ু, যেখানে সক্রিয় প্রতিরোধে রাজ্যবাসী সদা প্রস্তুত।

উদাহরণ হিসেবে রয়েছে উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড, উত্তরাখন্ড, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়। এসব রাজ্যের সরকারি স্কুলে ত্রিভাষা তো দূরের কথা, দুটি ভাষাও সেভাবে পড়ানো হয় না। ভাষা একটাই—হিন্দি।

এসব রাজ্যের সরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষাও শেখে না। কারণ, শিক্ষকের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ইংরেজি শিক্ষা যতটুকু তা বেসরকারি বিদ্যালয়ে।

পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মতো রাজ্যে হিন্দি আবার তৃতীয় ভাষা। এতে পড়ুয়াদের সুবিধা অনেক। খাটনি কম, নম্বর মেলে বেশি।

কংগ্রেসের তামিল নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদাম্বরম এ কারণেই পরামর্শ দিয়েছেন, অযথা হিন্দির প্রসারে ত্রিভাষা নীতি রূপায়ণে একবগ্গা না হয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বরং দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি শেখানোর ওপর জোর দিক। তাতে আখেরে দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মই উপকৃত হবে।

কারও জাত্যভিমানে আঘাত না দিয়ে আসমুদ্রহিমাচলে হিন্দির বাধাহীন প্রসার ঘটিয়ে চলেছে হিন্দি সিনেমা ও তার গান। দেশব্যাপী হিন্দির বিকাশে আজও তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অবিতর্কিতও।

এই সার সত্যটুকু না বুঝে অনর্থক জবরদস্তি তামিলনাড়ুতে বিজেপির দরজা আরও বহুদিনের জন্য বন্ধ করে দেবে। তামিলনাড়ুর শুরু করা ভাষাযুদ্ধের ‘দোসর’ হয়েছে সংসদের আসন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত, যা রুখতে কোমর বাঁধতে শুরু করেছে দাক্ষিণাত্য। জোড়া ‘টাইম বোমা’র টিকটিক বিপদঘণ্টি নরেন্দ্র মোদি কি শুনতে পাচ্ছেন?

* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

বিজেপির হিন্দি, হিন্দু ও হিন্দুস্তান নীতির ‘বিপদ’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পরিচয়

চার দিনের সফরে ঢাকায় পৌঁছেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) বিকেল ৫টায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি।

এ সময় বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে জাতিসংঘ মহাসচিব সরাসরি হোটেলে যাবেন।

জানা গেছে, আগামীকাল শুক্রবার (১৪ মার্চ) সকাল ৯টায় মহাসচিবের অবস্থানরত হোটেলে প্রথমে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর প্রধান উপদেষ্টার অফিসে যাবেন গুতেরেস। সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠক শেষে বাণিজ্যিক একটি ফ্লাইটে কক্সবাজারে যাবেন তিনি। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা তার সফরসঙ্গী হবেন। কক্সবাজারে তাদের স্বাগত জানাবেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম।

আন্তোনিও গুতেরেস ১৯৪৯ সালে ৩০ এপ্রিল পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই তার শৈশবকাল অতিবাহিত হয়। তার বাবা ভার্জিলিও ডায়াস গুতেরেস ও মাতা ইল্দা কান্ডিডা দে অলিভেইরা।

তিনি স্বনামধন্য লিসিও দে ক্যামোসে (বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়) পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতকধারী হন। দেশের সেরা ছাত্র হিসেবে প্রিমিও ন্যাশিওনাল দোস লিসেয়াস পদক জয় করেন। এরপর পদার্থবিজ্ঞান, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ইনস্টিউটো সুপেরিয়র টেকনিকোতে অধ্যয়ন করেন। ১৯৭১ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর সিস্টেম তত্ত্ব এবং টেলিযোগাযোগ সংকেত বিষয়ে সহকারী অধ্যাপকরূপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মময় জীবন শুরু করেন।

১৯৭৪ সালে সমাজতান্ত্রিক পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে গুতেরেসের। অল্পকিছুদিন পরই তিনি অধ্যাপনা পেশা পরিত্যাগ করেন। এরপর তিনি পূর্ণাঙ্গকালীন রাজনীতিবিদে পরিণত হন। ১৯৭৪ সালের ২৫ এপ্রিল সংঘটিত কার্নেশন বিপ্লবের মাধ্যমে কাইতানোর একনায়কতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটে। এরফলে গুতেরেস সোশ্যালিস্ট পার্টির লিসবন অংশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন। দলীয় নেতৃত্বের অন্যতম হিসেবে গুতেরেস ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে শিল্পসচিব, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত লিসবন ডেপুটি ও পরবর্তীতে কাস্তেলো ব্রাঙ্কো পৌর এলাকা থেকে পর্তুগিজ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। এ সময় অনেকগুলো সংসদীয় কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে জর্জ স্যাম্পাইয়ো’র স্থলাভিষিক্ত হয়ে সমাজতান্ত্রিক পার্টির দলীয় নেতৃত্বে ছিলেন।

১৯৯২ সালে তিনি সমাজতান্ত্রিক পার্টির মহাসচিব নিযুক্ত হন এবং আনিবাল কাভাকো সিলভা সরকারের প্রতিপক্ষীয় নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সেপ্টেম্বর, ১৯৯২ সালে সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সহসভাপতি হিসেবে মনোনীত হন।

১৯৯৫ সালে কাভাকো সিলভা মন্ত্রিসভার সময়কাল শেষ হবার পর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট পার্টি জয়লাভ করে ও তিনি পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী হন। তার পূর্বসূরীর তুলনায় পৃথক থেকে সমাজের সকলস্তরের মানুষের সঙ্গে সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সরকার পরিচালনায় অগ্রসর হন। এরফলে তিনি তার সরকারের প্রথম বছরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। পর্তুগালে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে অর্থনৈতিক কল্যাণের দিকে ধাবিত হয় ও নতুন শর্তারোপে নগদ অর্থ স্থানান্তরের কার্যক্রম গ্রহণ করে। এ ছাড়াও লিসবনে এক্সপো ’৯৮-এর আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয় যা পর্তুগালকে বিশ্বের কাছে আরও উন্মোচিত করে।

১৯৯৯ সালে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০০ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতিত্ব করেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে তার সরকার তেমন সফলতা পায়নি। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা ও হিঞ্জ রাইবেইরো সেতু দুর্যোগের ফলে তার কর্তৃত্ব ও জনপ্রিয়তা বহুলাংশে খর্ব হয়। ডিসেম্বর, ২০০১ সালে স্থানীয় নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট পার্টির বিপর্যয়কর ফলাফলের প্রেক্ষিতে গুতেরেস পদত্যাগ করেন।

তিনি বলেন যে, ‘আমি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে নিপতিত দেশকে রক্ষার স্বার্থে পদত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছি।’ রাষ্ট্রপতি জর্জ স্যাম্পাইয়ো সংসদ ভেঙ্গে দেন ও নির্বাচন আহ্বান করেন। তৎকালীন সামাজিক নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী এডুয়ার্ডো ফেরো রড্রিগুয়েজ সোশ্যালিস্ট পার্টির দলীয় নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু, ২০০২ সালের সাধারণ নির্বাচনে হোসে ম্যানুয়েল ডুরাও বারোসো’র সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টির কাছে পরাজিত হয়। পর্তুগিজ রাজনীতি থেকে গুতেরেস অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

২০০৫ সালের মে মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ থেকে গুতেরেসকে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার নির্বাচিত করা হয়। হাইকমিশনার হিসেবে তিনি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃত্ব দেন ও মেয়াদকাল শেষ হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের ১২৬ দেশে কর্মরত ১০,০০০ কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করেন। পাশাপাশি ৬০ মিলিয়ন শরণার্থী, প্রত্যাবর্তনকারী, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত লোক ও রাষ্ট্রবিহীন ব্যক্তিকে সহায়তায় এগিয়ে আসেন।

২০০৭ সালে এনপিআরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেন, ইরাকি শরণার্থীদের দুর্দশার বিষয়টি ১৯৪৮ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাধিক শরণার্থী সঙ্কট ছিল। দুর্বলভাবে শরণার্থী সঙ্কটের বিষয়ে প্রচার করা হলেও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রেও কম সমস্যার সৃষ্টি করেনি। হাইকমিশনার হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদকালে তিনি সিরীয় গৃহযুদ্ধের শিকার শরণার্থীদের কাছে আন্তর্জাতিক সাহায্যের বিষয়টি নিশ্চয়তার বিধান করেন। লেবানন ও জর্ডানের ন্যায় দেশগুলোয় শরণার্থী সঙ্কট অস্তিত্বের প্রশ্ন ছিল। তাদের বেঁচে থাকার বিষয়ে অতিরিক্ত সাহায্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ২০০৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ পর্যন্ত জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্বপালন করেন তিনি। অক্টোবর, ২০১৬ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তাকে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে ঘোষণা করে। তিনি বান কি মুনের স্থলাভিষিক্ত হন। 

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ছবি : সংগৃহীত
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ছবি : সংগৃহীত

সাড়ে চার শ বছর আগের এক অনন্য মসজিদ by মোহাম্মাদ মোরশেদ হোসেন

ছাউনিসমৃদ্ধ শানবাঁধানো পুকুরঘাটে বসে কথা বলছিলেন স্থানীয় লোকজন। নামাজের আগে-পরে সেখানে সময় কাটান তাঁরা। ওই ঘাট থেকে হেঁটে ৫০ ফুট পশ্চিমে গেলে একটি চওড়া ফটক। ওই ফটকের বাঁ পাশ দিয়ে সিঁড়ির মতো কাঠামো। একসময় আজান দেওয়া হতো সেই স্থান থেকে। ফটকের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতেই সুন্দর টাইলসসমৃদ্ধ উঠান আর লাল রঙের গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ চোখে পড়ে। মসজিদের চারপাশে সুপরিসর জায়গা। নান্দনিক স্থাপত্যে গড়া সুলতানি আমলের এই মসজিদের নাম বখশি হামিদ মসজিদ। আজ থেকে সাড়ে চার শ বছর আগে এটি নির্মাণ করা হয়। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মধ্য ইলশা গ্রামে এই মসজিদ অবস্থিত।

মসজিদে প্রবেশের তিনটি দরজার মধ্যে মাঝখানের প্রধান দরজার ওপরে আরবিতে লেখা তিন লাইনের একটি শিলালিপি রয়েছে। ওই শিলালিপিতে লেখা আছে, ‘এই পবিত্র মসজিদ জাতি এবং ধর্মের খুঁটি। সুলতান সম্রাট সোলাইমান খান কররানীর আমলে নির্মিত এই মসজিদ। আল্লাহ তাঁকে সব আপদ বিপদ থেকে নিরাপদ রাখুন।’

শিলালিপির বক্তব্যমতে, এই মসজিদ সুলতান সোলাইমান খান কররানির (শাসনকাল: ১৫৬৫-১৫৭২) আমলে তৈরি। তবে লোকমুখে বখশি হামিদ মসজিদ বলে পরিচিতি পেয়েছে এটি।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি এবং ইতিহাসবিদেরা জানান, বখশি হামিদের পুরো নাম মুহাম্মদ আবদুল হামিদ। বখশি ছিল তাঁর উপাধি। বখশি ফারসি শব্দ। আর এর অর্থ কালেক্টর বা করগ্রহীতা। তৎকালীন সময়ে আবদুল হামিদ এ অঞ্চলের কালেক্টর বা প্রশাসক ছিলেন। তিনি এলাকার শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। তিনিই এ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা।

বখশি হামিদ মসজিদ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ইট, পাথর ও সুরকি। মসজিদের পূর্ব পাশে শানবাঁধানো ঘাট ও বড় পুকুর রয়েছে। ওই পুকুরের ঘাটেও নির্মাণ করা হয় মসজিদ নির্মাণের সময়। তবে ওই ঘাট সংস্কার করায় পুরোনো ইটের ওপর টাইলস শোভা পাচ্ছে। মসজিদের পশ্চিমে কবরস্থান, পূর্বে–উত্তরে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ইসলামি কমপ্লেক্স।

জানা গেছে, ১৯৭০ সালে সরকার বখশি মসজিদকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। প্রত্ন বিভাগের তালিকায় তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদকে মোগল স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে এটি সংরক্ষিত (প্রটেক্টেড মনুমেন্ট অ্যান্ড মৌন্ডস) তালিকায় স্থান পাওয়ায় কিছু সংস্কার হয়েছিল। মোগল স্থাপত্যকৌশলে নির্মিত এ মসজিদ তিন গম্বুজবিশিষ্ট, মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং ছোট গম্বুজ দুটি ধনুকের মতো করে ছাদের সঙ্গে যুক্ত। মসজিদটি ৩৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৩ ফুট প্রস্থ।

সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের ভেতর থেকে ওপরের দিকে তাকালে বড়–ছোট মিলিয়ে তিনটি গম্বুজ। গম্বুজের ভেতরে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রকমের অলংকরণ। মসজিদের সামনে দিঘির পাড়ে বখশি হামিদের সমাধি। সমাধির পাশে বটগাছ। মসজিদের সামনে সরকারের জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাইনবোর্ড দেখা গেছে। সাইনবোর্ডে এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, মাঝখানে একবার মসজিদের মূল নকশা পরিবর্তন করে রং করায় আপত্তি জানিয়েছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এরপর মসজিদে শেওলা জমে গেলেও স্থানীয়রা আর সংস্কারে হাত দেননি। বর্তমানে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির অর্থসচিব শহীদুল ইসলাম বলেন, মসজিদে ইমাম মুয়াজ্জিনের বেতন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে ২০ হাজার টাকার ওপর খরচ হয়। মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া অর্থ ও স্থানীয়দের সহায়তায় এসব খরচ মেটানো হয়।

শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, বর্তমানে সপ্তাহের শুক্রবার ও শনিবার বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এ মসজিদ দেখতে আসেন। ওই দুই দিন মুসল্লিও বেশি হয় মসজিদে।

বাঁশখালী উপজেলার গুনাগরী গ্রামের বাসিন্দা ও গবেষক আলমগীর মোহাম্মদ বলেন, ‘সাড়ে চার শ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ মোগল স্থাপত্যরীতির এক অনন্য নিদর্শন। তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শিগগিরই বখশি হামিদ মসজিদের সৌন্দর্য ক্ষয়ে পড়তে পারে। আমরা আশা করব সরকার এই নান্দনিক মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে। এর পরিচর্যায় দ্রুত লোকবল নিয়োগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

যেভাবে যাওয়া যায়: শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে যেকোনো পরিবহনে পিএবি সড়ক (পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী) দিয়ে বাঁশখালী উপজেলার গুনাগরী খাসমহল এলাকায় নামতে হবে। সেখান থেকে পশ্চিমে মোশারফ আলী সড়ক হয়ে দুই কিলোমিটার গেলে মধ্য ইলশা গ্রামে ছায়াসুনিবিড় গ্রামে বখশি হামিদ মসজিদটির দেখা মিলবে।

সুলতানি আমলে নির্মিত এই মসজিত সাড়ে চার শ বছরের পুরোনো। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মধ্য ইলশা গ্রামে
সুলতানি আমলে নির্মিত এই মসজিত সাড়ে চার শ বছরের পুরোনো। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মধ্য ইলশা গ্রামে। প্রথম আলো

তালেবানের জোড়াতালির সরকার পতনের দিকে যাচ্ছে? by মোহাম্মদ বুরহান

২০২১ সালে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর থেকে আফগানিস্তানের তালেবান তাদের সহিংস আন্দোলনকে একটি কার্যকর সরকারব্যবস্থায় রূপান্তর করার জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করে চলেছে। তালেবান সরকারের মধ্যে ঐক্যের একটি বাহ্যিক প্রদর্শন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এর আড়ালে কট্টরপন্থী তালেবান সরকার গভীর উপদলীয় কোন্দল, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও জন–অসন্তোষে ডুবতে বসেছে।

বিশ্লেষক মাবিন বাইক তাঁর ‘তালেবান’স ইন্টারনাল পাওয়ার স্ট্রাগল: আ রেজিম অন দ্য ব্রিক’ শিরোনামের প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় অস্তিত্বগত হুমকি কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ নয়, বরং গোষ্ঠীটির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি।

এ বিভক্তিকে যদি সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে সেটা বাড়তেই থাকবে এবং তালেবান সরকারের পতন ডেকে আনবে এবং আফগানিস্তানকে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্যে ফেলে দেবে।

তালেবান সরকারকে এখন সবচেয়ে বড় যে ইস্যুটি সামাল দিতে হচ্ছে, সেটা হচ্ছে, বিভিন্ন উপদলগুলোর মধ্যে সংহতি ধরে রাখা। মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বে তালেবান আন্দোলন নুরজাই গোত্রকে কেন্দ্র করে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এ গোত্রের পছন্দ-অপছন্দের কাছে অন্য গুরুত্বপূর্ণ তালেবান নেতারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।

সংগঠনটির প্রয়াত নেতা মোল্লা ওমর নেতৃত্ব সবার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। আখুন্দজাদাকে সেই স্তরের কর্তৃত্ব অর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তাঁর অনমনীয় ধরনের নেতৃত্ব তালেবানের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে পরিচয়কেন্দ্রিক বিভাজন গভীর করছে।

মোল্লা ইয়াকুব ও মোল্লা বারাদারের মতো মূল নেতারা তালেবানের মধ্যে নিজস্ব ক্ষমতার ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। ফলে তালেবানের মধ্যে বেশ কিছু প্রভাবকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

দোহা সংলাপের (যার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়েছিল) সময় তালেবান আন্দোলন যে ঐক্য দেখাতে পেরেছিল, সেটা অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে তালেবানের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে ক্ষমতার ব্যাপক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

আফগানিস্তানের দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নেতৃত্বের এ লড়াইকে তীব্র করেছে। আফগানিস্তানের অর্থনীতি আগে থেকেই ভঙ্গুর ছিল। তালেবান ক্ষমতা দখলের আগে বিদেশি সহায়তা ও প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের ওপর দেশটি ব্যাপকভাবে নির্ভর করত।

এখন বৈধ অর্থায়নের উৎস সীমিত হয়ে গেছে। ফলে তালেবান সরকারকে হাজি বশির নুরজাইয়ের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত খনি পরিচালনার আয় এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর আরোপ করা ব্যাপক করের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ফলে আফগান এলিটদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে বিশাল একটা ব্যবধান তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি মাসে স্থানীয় আফগান মুদ্রার মান অবনমনের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। আবার ইউএসএআইডির সহযোগিতা বন্ধের কারণে খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

পুঁজি পাচার নিয়ন্ত্রণে জানুয়ারি মাসে তালেবান সরকার অদক্ষ একটা পদক্ষেপ নেয়। বিমানবন্দর দিয়ে ৫ হাজার ডলার এবং স্থলবন্দর দিয়ে ৫০০ ডলারের বেশি স্থানান্তর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসে বিতর্কিত স্থাপনা নির্মাণ বিতর্কে পাকিস্তানের সঙ্গে তোর্কহাম সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্য সরবরাহে বাধা তৈরি হয়। প্রায় পাঁচ হাজার ট্রাক সীমান্তে আটকে যায়।

একই সঙ্গে তালেবানের কট্টর নীতি, বিশেষ করে নারী অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে স্তিমিত করে দিয়েছে। পশ্চিমা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতারা সেই ধরনের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে শঙ্কিত থাকে, যারা তাদের অবস্থানের ক্ষেত্রে অনড়। ফলে ইতিমধ্যেই ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলে দেয়।

তালেবান সরকারের অস্থিতিশীলতার আরেকটি বড় কারণ হলো, কঠোর সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে তারা একেবারেই রাজি নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর অব্যাহত আহ্বানের পরও তালেবান নাগরিক স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নারীদের শিক্ষার ওপর বিধিনিষেধ কঠোর করেছে।

এই পদক্ষেপগুলো বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এটি কূটনৈতিক স্বীকৃতি কিংবা বাইরে থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সমর্থন পাওয়া অসম্ভব করে তুলেছে।

তালেবানের অতিরিক্ত দমনমূলক নীতির কারণে সৌদি আরব ও অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে কম আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এমনকি যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে তালেবানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, সেসব দেশও এখন ন্যূনতম সহযোগিতার বাইরে বাড়তি কিছু দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। কেননা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি প্রতিক্রিয়া দেয়, সে জন্য তারা উদ্বিগ্ন।

ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পালাবদলের পর ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়টি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। রিপাবলিকান সিনেটর টিম শেডি ‘কোনো করদাতা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করতে পারে না’ শীর্ষক যে বিলটি এনেছেন, তার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মার্কিন ফেডারেল সহযোগিতা যাতে আফগানিস্তানে না পৌঁছায়।

মার্কিন আইনপ্রণেতারা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন করদাতাদের অর্থ চরমপন্থী উপাদানগুলোতে কার্যকরভাবে বা কার্যত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ইন্ধন জোগাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্টনি ব্লিঙ্কেন স্বীকার করেছেন, কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকার আধুনিক অস্ত্র তালেবানের কাছে গেছে। এসব ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করার মতো সিদ্বান্ত নিতে পারে।

একই সঙ্গে ঘরের এবং বাইরে নির্বাসিত বিরোধী গোষ্ঠীগুলো তালেবানের বিরুদ্ধে জমে ওঠা পাহাড়সম অসন্তোষের মধ্যে নিজেদের ভিত্তি গাড়ার জন্য উর্বর ভূমি খুঁজে পাচ্ছে। চরমপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী যেমন ইসলামিক স্টেট, তারা প্রভাব বিস্তার করছে।

প্রতিবেশীরা আফগানিস্তানের এই পরিস্থিতির প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গোপনে তারা বিকল্প শক্তিগুলোকে সমর্থন দিতে পারে।

* মোহাম্মদ বুরহান, পাকিস্তানের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ অ্যানালিস্ট
    এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

তালেবান সরকারকে এখন সবচেয়ে বড় যে ইস্যুটি সামাল দিতে হচ্ছে, সেটা হচ্ছে, বিভিন্ন উপদলগুলোর মধ্যে সংহতি ধরে রাখা।
তালেবান সরকারকে এখন সবচেয়ে বড় যে ইস্যুটি সামাল দিতে হচ্ছে, সেটা হচ্ছে, বিভিন্ন উপদলগুলোর মধ্যে সংহতি ধরে রাখা। ফাইল ছবি

৫০ দিনে যেভাবে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিলেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। ১১ মার্চ তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের ৫০ দিন পূর্ণ হলো। এ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে গত মঙ্গলবার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ডেভিড ই স্যাংগার একটি নিবন্ধ লিখেছেন। পাঠকের জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৫০ দিনে এমন অনেক কাজ করেছেন, যা দেশটির আধুনিক ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্ট করেননি। তাঁর এসব কাজ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি খোলনলচে বদলে দিচ্ছে। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের পর খুব কষ্টে ওয়াশিংটনই এসব ভিত্তি তৈরি করেছিল।

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বিকল্প কৌশলগত রূপরেখা ঘোষণা না করেই ট্রাম্প কিয়েভকে ছুড়ে ফেলছেন। রাশিয়ার হামলার নিন্দা জানিয়ে সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়াকে আগ্রাসনকারী দেশ উল্লেখ করে একটি প্রস্তাব এনেছিল ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা। এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোটদানের নির্দেশ দিতে দ্বিধা করেননি ট্রাম্প।

শুধু তা–ই নয়, একই দিন সাধারণ পরিষদে ইউক্রেন নিয়ে একটি বিকল্প প্রস্তাব এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে রাশিয়ার হামলার নিন্দা জানানো হয়নি। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে।

ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পানামা খাল, গ্রিনল্যান্ড, গাজা এমনকি কানাডাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর এসব বক্তব্য লুণ্ঠনকারীর হুমকির মতো মনে হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তকে ‘কৃত্রিম বিভাজক রেখা’ বলে মন্তব্য করেছেন রিপাবলিকান পার্টির এই প্রেসিডেন্ট।

ওয়াশিংটনে ওভাল অফিসে ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর ইউক্রেনে অস্ত্র ও মার্কিন বাণিজ্যিক উপগ্রহ চিত্র তথা গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ আংশিক বন্ধ করেছিলেন ট্রাম্প। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার পর কিয়েভের ওপর থেকে গতকাল এই দুই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির রক্তচোষা তকমা দিয়ে তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। ন্যাটো মিত্রদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করতে না পেরে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। পোল্যান্ড পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চিন্তাভাবনা করছে। দেশ দুটি নিজেদের রক্ষার ক্ষেত্রে শেষ আশ্রয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আর ভরসা রাখতে পারছে না।

বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দিতে ট্রাম্প কতটা সফল হবেন, তা কেউ জানেন না। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে এই ব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান (১৯৪৫-৫৩)। এর পর থেকে পরবর্তী সব প্রেসিডেন্ট এই ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে অবদান রেখেছেন। নতুন বিশ্বব্যবস্থার যে ভিত্তি ট্রুম্যান গড়েছিলেন, সেটার মর্মকথা তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন অ্যাকেস নিজের স্মৃতিকথা ‘প্রেজেন্ট অ্যাট দ্য ক্রিয়েশন’ নামের বইয়ে তুলে ধরেছেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যা শুরু করেছে, তাতে আজকাল ওয়াশিংটনে থাকাটা অস্বস্তিকর হয়ে পড়েছে।

সফট পাওয়ারের প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ এস নাই জুনিয়র ট্রাম্পের সম্পর্কে সম্প্রতি বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দাতব্য কর্মকাণ্ডের সমস্যা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছেন। কিন্তু বেলা শেষে তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পক্ষেই যায়।

পুরোনো ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে চাইলেও নিজে কী গড়তে চাইছেন, তা নিয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না। তবে তাঁর কাজ দেখে মনে হচ্ছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর বৃহৎ শক্তির রাজনীতির জগৎই তাঁর পছন্দ। তাই তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে নানা বিষয়ে দর-কষাকষি করছেন। অন্যদিকে ছোট শক্তিগুলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ: জবাব দিতে সময় চেয়েছে বেশির ভাগ দল by কিরণ শেখ

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে মতামত দিতে বিএনপি ও জামায়াতসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল সময় চেয়েছে। সাতটি দল কমিশনে মতামত জমা দিয়েছে। সময় চেয়ে চিঠি দিয়েছে বা যোগাযোগ করেছে ১৬টি দল। বাকি দলগুলো গতকাল পর্যন্ত কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এই তথ্য জানিয়েছে। বিএনপি, জামায়াতসহ সমমনা দলগুলো মতামত দেয়ার জন্য কয়েকদিন সময় চেয়েছে। এসব দল কমিশনের পাঠানো নির্ধারিত ফরমে টিক চিহ্নে জবাব দিতে চাইছেন না। তারা বিস্তারিত মতামত দেয়ার জন্য সময় চেয়েছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তারা মতামত জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন।

এ ছাড়া গণতন্ত্র মঞ্চও কয়েকদিন সময় চেয়ে বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছে। মঞ্চও টিক চিহ্ন দেয়ার বিরোধিতা করেছে। বলছে, শুধুমাত্র টিক চিহ্ন চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবমাননা করা হয়েছে।  

গত ১০ই মার্চ মতামত চেয়ে ৩৭টি রাজনৈতিক দলের কাছে ‘স্প্রেড শিট’ পাঠিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই সুপারিশের বিষয়ে ১৩ই মার্চের মধ্যে রাজনৈতিক দল ও জোটকে মতামত জানাতে বলা হয়েছিল। এরমধ্যে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সঙ্গে ফোনে কথা বলে কয়েকদিন সময় চেয়েছে। জামায়াতও সময় চেয়েছে। ওদিকে গণতন্ত্র মঞ্চ কয়েকদিন সময় চেয়ে গতকাল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। এই মতামত পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা শুরু করবে কমিশন।

গতকাল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সাতটি রাজনৈতিক দল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মতামত দিয়েছে। ১৬টি রাজনৈতিক দল পূর্ণাঙ্গ মতামত দিতে আরও কয়েকদিন সময় চেয়েছে। বাকি ১৪টি দলের সঙ্গে কমিশন আবার যোগাযোগ করছে। গতকাল বিকাল ৪টার মধ্যে মতামত দেয়া সাতটি দল হলো-লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, জাকের পার্টি, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম ও ‘আমজনতার দল’।

এ দলগুলোকে নিয়ে আগামী মঙ্গল ও বুধবার নাগাদ আলোচনা শুরু করা হতে পারে উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবনে দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করা হবে।

দলীয় সূত্র জানায়, সংবিধানসহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে ছয়টি কমিশন করেছে, তার আলোকে ছায়া কমিটি করেছে বিএনপিও। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেসব সুপারিশ চেয়েছে, সেসব নিয়ে এই ছয় কমিশন কাজ করছে। পূর্ণাঙ্গ মতামত তৈরি হতে আরও কিছু সময় লাগবে। রিপোর্ট তৈরি হওয়ার পর দলটি যুগপৎ আন্দোলনের দল ও জোটের সঙ্গে কথা বলবে। এরপরে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে রিপোর্ট জমা দেবে। আর টিক চিহ্ন বিষয়ে দলটি অনীহা প্রকাশ করেছে। এটাকে দলটি সংক্ষিপ্ত মনে করছে। কারণ দলটি সংবিধানের সংস্কারের জন্য যে প্রস্তাব তৈরি করেছে তার ইতিমধ্যে ১ হাজার পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে। তারা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেবে।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করার জন্য আমরা কাজ করছি। রিপোর্ট তৈরি হওয়ার পর যুগপৎ আন্দোলনের দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রিপোর্ট চূড়ান্ত হওয়ার পরে আমরা জমা দেবো।    
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ মানবজমিনকে বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে মতামত দেয়ার জন্য আমরা সময় বাড়িয়ে নিয়েছি। আমরা পূর্ণাঙ্গ মতামত দেবো। তবে যেসব বিষয়ে একমত, সেখানে টিক চিহ্ন দেবো।

ওদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো চিঠির সঙ্গে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর সারসংক্ষেপ স্প্রেডশিটে ছক আকারে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি সুপারিশের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। এরমধ্যে প্রথমটি হলো, সংশ্লিষ্ট সুপারিশের বিষয়ে একমত কি না। এতে তিনটি বিকল্প রাখা হয়েছে, সেগুলো হলো-একমত, একমত নই এবং আংশিকভাবে একমত। এরমধ্যে যেকোনো একটিতে টিক চিহ্ন দিয়ে মতামত জানাতে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তটি হলো, প্রতিটি সুপারিশের বিষয়ে সংস্কারের সময়কাল ও বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। এজন্য ছয়টি ঘর রয়েছে, সেগুলো হলো: সংস্কারের সময়কাল ও বাস্তবায়ন- নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশের মাধ্যমে, নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে, নির্বাচনের সময় গণভোটের মাধ্যমে, ‘গণপরিষদের মাধ্যমে’ ‘নির্বাচনের পরে সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে’ এবং গণপরিষদ ও আইনসভা হিসেবে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে। এসব ঘরের যেকোনো একটিতে টিক চিহ্ন দিয়ে মতামত দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি সুপারিশের পাশে দলগুলোর মন্তব্য দেয়ার একটি জায়গা রাখা হয়েছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মানবজমিনকে বলেন, আমরা এখনো মতামত দেইনি। বৃহস্পতিবার সময় চেয়ে চিঠি দিয়েছি। আর টিক চিহ্ন চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবমাননা করা হয়েছে। আমরা বিস্তারিত মতামত দেবো। আর যেখানে আমাদের মতামতের সঙ্গে মিল রয়েছে, সেখানে টিক চিহ্ন দেবো।  

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আমরা কমিশনের কাছে সময় চেয়েছি। এখন রমজান মাস বিভিন্ন জায়গায় আমাদের ইফতার মাহফিল থাকে। অনেকে ওমরাহ’য় গিয়েছেন, কেউ কেউ গ্রামে রয়েছেন। যার কারণে আমরা সবাই একসঙ্গে বসতে পারছি না। এজন্য সময় চেয়েছি কমিশনের কাছে। ঈদের পর দিতে পারলে আমাদের জন্য ভালো হতো।

mzamin

জেলে রাত কাটালেন দুতের্তে পাচ্ছেন যে সুবিধা

এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রড্রিগো দুতের্তে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) অধীনে জেল খেটেছেন একরাত। এই রিপোর্ট যখন শুক্রবার পাঠকের হাতে যাবে, তখন এই জেল খাটার মেয়াদ হয়তো দু’দিন হয়ে যাবে। সেখানেই তাকে বন্দিশিবিরে এ মাসে ৮০তম জন্মদিন পালন করতে হবে। হেগে অবস্থিত ওই জেলখানা এক সময় ছিল নাৎসিদের জেলখানা। সেখানে যাদেরকে আটক রাখা হয়, তারা সবাই একটি করে প্রাইভেট সেল, কমপিউটার, একটি লাইব্রেরি এবং খেলাধুলার সুযোগ পান। জেল কর্তৃপক্ষের দেয়া খাবার যদি পছন্দ না হয়, তাহলে জেলখানার কেন্দ্রীয় কিচেন থেকে শপিং লিস্ট ধরে জিনিস নিয়ে তিনি নিজেই নিজের খাবার রান্না করে খেতে পারবেন। হেগে বন্দি অবস্থায় তিনি চিকিৎসা সুবিধা, আইনজীবী এবং ভিজিটরদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন। দুতের্তেকে গ্রেপ্তারের পর বুধবারই তাকে নিয়ে বিমান আকাশে ওড়ে নেদারল্যান্ডসের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছার পর দুতের্তেকে রাখা হয় জেলে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তাতে প্রাথমিকভাবে আদালতে হাজির করার কথা। সেখানে তিনি নিজের পরিচয় নিশ্চিত করবেন। আদালতে কোন ভাষায় বিচারকার্যক্রম অনুসরণ করতে চান, তা বাছাই করবেন। এবং তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে যুক্তি-তর্ক তুলে ধরবেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। বুধবার ফিলিপাইনের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতের্তেকে আইসিসির বন্দিশিবিরে নিয়ে গেলে সেখানে তার বেশ কিছু সমর্থক সমবেত হন। তারা জাতীয় পতাকা দুলিয়ে চিৎকার করতে থাকেন- ‘তাকে ছেড়ে দাও’। কিন্তু তাকে বহনকারী গাড়ি দ্রুতগতিতে লোহার গেট অতিক্রম করে  ভেতরে প্রবেশ করে। ৭৯ বছর বয়সী দুতের্তে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে যে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করেছেন, তার জন্য তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। তিনি ক্ষমা চাননি। তাকে নিয়ে বিমান নেদারল্যান্ডসে পৌঁছার পরপরই আইসিসি বলেছে, হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে তার বিরুদ্ধে যৌক্তিক তথ্যপ্রমাণ আছে। তিনি প্রথমে ডাভাও-এর মেয়র ছিলেন। পরে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কিন্তু এই দুই সময়েই তিনি মাদকের ডিলার, ব্যবহারকারী ও মাদকের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেন। সরকারি হিসাবে এভাবে হত্যা করা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার মানুষকে। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা হাজার হাজার হতে পারে। এর স্বপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন দুতের্তে। তিনি বলেছেন, দেশের রাস্তাগুলোকে অপরাধমুক্ত রাখতে মাদকের ডিলারদের বিরুদ্ধে ছিল তার অভিযান। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো তার যুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছে। তারা বলেছে, দুতের্তের অভিযানের সময় পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। শহুরে গরিব যুবকদের টার্গেট করেছে তারা।

উল্লেখ্য, আইসিসিতে প্রথম কোনো এশিয়ান সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে যাচ্ছেন দুতের্তে। তিন বছরের মধ্যে সন্দেহজনকভাবে তাকেই প্রথম দ্য হেগে উড়িয়ে নেয়া হয়েছে। সোমবার হংকং থেকে রাজধানী ম্যানিলা বিমানবন্দরে অবতরণ করলেই গ্রেপ্তার করা হয় দুতের্তেকে। তার সমর্থকদের অভিযোগ, দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মারকোসের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে আইসিসি। সবচেয়ে শক্তিধর যেসব ব্যক্তিকে জবাবদিহিতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না কোনো দেশের আদালতে বা তারা সেটা করার সক্ষমতা রাখে না অথবা করার ইচ্ছাও করে না, তাদের জন্য শেষ আশ্রয়স্থল হলো আইসিসি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে হলে ওই দেশের সহযোগিতা লাগে। তাদের অনুমোদন লাগে। অনেক দেশই মাঝে মাঝে এমন গ্রেপ্তার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। দুতের্তের ক্ষেত্রে আইসিসি যে বিচার করছে তা ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি যেসব কাজ করেছেন তার ভিত্তিতে। ২০২২ সালের নির্বাচনে রড্রিগো দুতের্তের মেয়ে সারা দুতের্তেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হবে এমন শর্তে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মারকোসের সঙ্গে পার্লামেন্ট নির্বাচনে শক্তিশালী জোট গঠন করে। ফলে কয়েক মাস আগেও আইসিসিকে সহযোগিতা করার ধারণাকে বাতিল করে দেন মারকোস। কিন্তু দুতের্তেকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রত্যর্পণ করা হয়েছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়ে গেছে। ওদিকে ম্যানিলা থেকে হেগে পৌঁছার পুরো পথে তার ওপর পাখির চোখ ছিল বিশ্ব মিডিয়ার। রড্রিগো দুতের্তের মেয়ে কিত্তি এবং দুতের্তে নিজে তার সহযোগীর মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদর্শন করেছেন। ফ্লাইট রাডারে সব থেকে বেশি চোখ ছিল তাকে বহনকারী বিমানে। ফেসবুকে পোস্ট করা এক ভিডিওতে তিনি বলেন, আমি সেই ব্যক্তি- যে দেশের আইনপ্রয়োগকারী ও সামরিক বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছি। আমি কথা দিচ্ছি আপনাদেরকে সুরক্ষিত রাখবো। এসব কিছুর দায় আমি নিচ্ছি। দুতের্তেকে গ্রেপ্তারের এই ঘটনা শক্তিশালী একটি বার্তা দেয় যে, শক্তিধর ব্যক্তিদেরকেও তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। তবে জাতীয় সার্বভৌত্বের সঙ্গে আইসিসির ভূমিকা নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের মতো আইসিসির সদস্য নয় এমন কিছু রাষ্ট্র এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ওদিকে দুটি হাইপ্রোফাইল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখনো কার্যকর করতে পারেনি আইসিসি। তার একটি হলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অন্যজন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

mzamin

আছিয়া, আমাদের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি by রিয়াদ ইসলাম

মাগুরায় অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর চিকিৎসাধীন সেই শিশু আছিয়া আর নেই। আমরা যারা এক সপ্তাহ ধরে প্রার্থনা করেছি, প্রতিবাদ করেছি, বিচার চেয়েছি—তারা আজ শূন্য হাতে ফিরে এসেছি। কিন্তু শুধু আমরা না, পুরো বাংলাদেশ আজ এক অদৃশ্য কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ব্যর্থতা আছিয়ার নিথর শরীরে লেখা রয়ে গেছে।

আমাদের দেশ এগোচ্ছে—উন্নয়নের স্রোতে, গগনচুম্বী অট্টালিকায়, অর্থনীতির পরিসংখ্যানে। কিন্তু উন্নয়ন কি আদৌ আছিয়ার দুঃসহ আর্তনাদ শুনতে পায়? এই সমাজ কি একবারের জন্য নিজেকে প্রশ্ন করেছে, কেন বারবার শিশুরা এমন পাশবিকতার শিকার হচ্ছে?

এটা শুধু আছিয়ার গল্প নয়, এটা পুরো বাংলাদেশের গল্প। প্রতিদিন কোনো না কোনো শহরে, কোনো না কোনো গ্রামে একেকটা আছিয়া আমাদের চোখের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধু খবরে দেখি, ফেসবুকে পোস্ট দিই, রাস্তায় মিছিল করি—তারপর? কয়েকদিন পর সব ভুলে যাই। অপরাধীর বিচারের দাবি তোলার পাশাপাশি কি আমরা নিজেদের বিচার করতে রাজি আছি?

আমাদের চারপাশটা আজ যেন এক অন্ধকার গহ্বরে পরিণত হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয়, ক্ষমতার দম্ভ আর নৈতিকতার সংকট একেকটা আছিয়ার জন্ম দিচ্ছে। আমরা মুখে বলি, "শিশুরা ফুলের মতো পবিত্র," অথচ সেই ফুলের পাপড়িগুলো আমরা নিজ হাতে ছিঁড়ে ফেলি।

আমাদের চোখের সামনে ধর্ষণের শিকার হয় মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত, নিখোঁজ হয় একের পর এক শিশু, পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিক্ষার্থী আবরারকে। আর আমরা? আমরা একেকবার মোমবাতি জ্বালাই, প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়াই, তারপর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের ক্রোধ—সবই ক্ষণস্থায়ী।

আছিয়া চলে গেছে, কিন্তু সে আমাদের একটা আয়না দেখিয়ে গেছে—একটা ভাঙা, রক্তমাখা আয়না। যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে আমাদের সমাজের পশুত্ব, আমাদের বিবেকহীনতা। আমরা কি সেই আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে বদলানোর শক্তি রাখি? নাকি আরও একদিন পর আরেকটা শিশুর মৃত্যু দেখে আবার কিছুদিন শোক পালন করব?

উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। যদি সত্যিই আমরা আরেকটি আছিয়ার মৃত্যু দেখতে না চাই, তবে আমাদের সমাজকে, বিচারব্যবস্থাকে, শিক্ষাকে—সবকিছুকে বদলাতে হবে। কারণ, প্রতিটি শিশু বাঁচার অধিকার নিয়ে জন্মায়, মৃত্যুর জন্য নয়।

লেখক: সাংবাদিক
তারিখ: ১৩/০৩/২০২৫ খ্রিঃ,।

mzamin

দেশে ৩ কোটি ৮০ লাখ লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত

বাংলাদেশে কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তথ্য মতে, প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। গতকাল কিডনি দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে নানা কর্মসূচিতে তারা এই তথ্য জানান। যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্ব কিডনি দিবস-২০২৫ উদ্‌যাপন করেছে শীর্ষস্থানীয় কিডনি বিষয়ক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস)। দিবসটি উদ্‌যাপন উপলক্ষে সংস্থাটি বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করে। কর্মসূচিসমূহের মধ্যে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়, ঢাকাস্থ মোহাম্মদপুর-এর নবোদয় আবাসিক এলাকায় বর্ণাঢ্য র‌্যালি, পথচারীদের মধ্যে টি-শার্ট বিতরণ, পরবর্তীতে শাহবাগ মোড়ে বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশনের সঙ্গে ও ধানমণ্ডি আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যৌথ র‌্যালির আয়োজন করে। এ ছাড়াও ক্যাম্পস-এর শাখা অফিসগুলোতেও বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও কিডনি বিষয়ক সচেতনতামূলক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশ্ব কিডনি দিবস-২০২৫ এর প্রতিপাদ্যের আলোকেই ক্যাম্পস তার এ বছরের সমস্ত আয়োজন সাজিয়েছে। গ্যালি শেষে ক্যাম্পস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ)-এর তথ্য অনুযায়ী, কিডনি রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কিডনি রোগের প্রকোপ বাড়ছে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্থূলতার মতো অসংক্রামক রোগের কারণে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ শুধু দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই সংখ্যা ডায়াবেটিস রোগীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীদের চেয়ে প্রায় বিশ গুণ। মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগ ১৯৯০ সালে ছিল ১৯তম স্থানে, বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭ম স্থানে, এভাবে চলতে থাকলে  ২০৪০ সালে দখল করে নেবে ৫ম স্থান। আবার উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে কিডনি রোগের হার সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, বাংলাদেশেও কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক। তথ্য মতে, প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের উপর নির্ভরশীল হয়। শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমানভাবে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আরও ২৪ থেকে ৩০ হাজার রোগী হঠাৎ কিডনি বিকল হয়ে সাময়িক ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। এই রোগ আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা।

পক্ষান্তরে, সবাই যদি কিডনি রোগের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা, পরিণতি ও কারণ সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করে তা হলে ৬০-৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এই মরণঘাতী কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিডনি রোগের সাধারণ কারণগুলো হলো- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, নেফ্রাইটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ব্যথানাশক ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহার, জন্মগত ও বংশগত কিডনি রোগ, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ ও পাথুরে রোগী। আমরা একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবো যে, প্রায় সবগুলো কারণই আমাদের অস্বাস্থ্যকর জীবন ধারার সঙ্গে জড়িত, একটু সচেতন হলে প্রতিরোধ যোগ্য। তাছাড়া যারা ঝুঁকিতে আছেন যেমন যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বেশি, বংশে কিডনি রোগ আছে, যারা ধূমপায়ী, যারা তীব্র মাত্রার ব্যথার ওষুধ খেয়েছেন, যাদের পূর্বে কোনো কিডনি রোগের ঝুঁকি আছে তাদের বছরে অন্তত ২বার প্রস্রাব ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করে নেয়া উচিত। কেননা, প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, কিডনি বিকলের চিকিৎসা সর্বাধিক ব্যয়বহুল। ফলে চিকিৎসা করতে গিয়ে পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। তাই ক্যাম্পস এর স্লোগান ‘‘কিডনি রোগ জীবননাশা-প্রতিরোধই বাঁচার আশা’’- ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। অর্থাৎ কিডনি রোগ  প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করে চিকিৎসার মাধ্যমে মরণব্যাধি কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা। কিডনি রোগের সুলভে চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ক্যাম্পস ইতিমধ্যে ঢাকার পাশাপাশি টাঙ্গাইল, চাঁদপুর, মাদারীপুর, সখিপুর, নবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও ঘাটাইল শহরে কিডনি সেবা ও ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্রসমূহের পক্ষ থেকেও নিজ নিজ জেলা ও থানা শহরে বিশ্ব কিডনি দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে র‌্যালি ও বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

mzamin

ভারতের মন্তব্য অযাচিত

বাংলাদেশের নির্বাচন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘু সমপ্রদায় নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের করা মন্তব্য অযাচিত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল বলে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এই মন্তব্য করেন।

রণধীর জয়সোয়ালের করা মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও সংখ্যালঘু সম্পর্কিত বিষয়সমূহ নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে, এ বিষয়সমূহ একান্তই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এ ধরনের মন্তব্য অযাচিত ও অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপের শামিল। এ ধরনের মন্তব্য বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতার ভুল প্রতিফলন। বাংলাদেশ সব দেশের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা আশা করি যে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ধরনের মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

সীমান্তে হত্যা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের বিজিবি-বিএসএফ’র মহাপরিচালক পর্যায়ের  বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক যতগুলো এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে জোরালোভাবে প্রতিবাদ করেছে। আমরা প্রতিবাদ করছি, আলোচনা করছি। আমাদের হাতে যা আছে তার সবগুলো ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি যাতে এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে চালানো অপপ্রচারের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতীয় অপপ্রচার যা দেখছি সেগুলোর বেশির ভাগ হচ্ছে বেসরকারিভাবে। বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ তাদের নিজেদের মতো করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই ধরনের অপপ্রচার সঠিকভাবে মোকাবিলা করা খুব একটা সহজ ব্যাপার না। কিন্তু এই বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবেচনার মধ্যে আছে। কীভাবে ভালোভাবে রেসপন্স করা যায় সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত আলোচনা করছে।

চলতি মাসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগের মহাপরিচালক বলেন, ২৬শে মার্চ প্রধান উপদেষ্টার চীনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কথা। ২৭শে মার্চ তিনি বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার কনফারেন্সে উদ্বোধনের ব্যানারে অংশ নিবেন বলে আমরা জেনেছি। বিকালে চীনের স্টেট কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে। এরপরের দিন চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ২৯শে মার্চ সকালে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। এদিন রাতেই তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন।

সমপ্রতি প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্য দেশের জন্য বিপজ্জনক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য দেয়ার পর আমাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকে না। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে ভারত বাংলাদেশের কূটনৈতিক পত্রের জবাব দিয়েছে কি না এবং না দিয়ে থাকলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে রফিকুল আলম বলেন, এটার বিষয়েও প্রধান উপদেষ্টা সমপ্রতি একটি সাক্ষাৎকারে জবাব দিয়েছেন। তারপরও আমরা বলছি, আমরা ভারতের কাছ থেকে কোনো জবাব পাইনি। পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা পাবলিকলি একটা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

সমপ্রতি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক নিয়ে মোহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, গত ৬-৭ই মার্চ কলকাতায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে গঙ্গার পানিবণ্টনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কারিগরি পর্যায়ের সভায় মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্যার পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, সীমান্ত নদীগুলোকে কেন্দ্র করে দুই দেশের পরিকল্পনার বিষয়টি এবং আরও অনেক বিষয়। তিনি বলেন, কিছু বিষয়ের আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্তে না আসতে পারার কারণে বৈঠকের পর কোনো মিনিটসে সই করা হয়নি। তবে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোনো সভায় দু’পক্ষ এক বা একাধিক বিষয়ে একমত না হলে মিনিটস স্বাক্ষর নাও হতে পারে। অতীতেও বিভিন্ন সভায় এ রকম ঘটনা ঘটেছে। দু’পক্ষ পরে কূটনৈতিক মাধ্যমে মতৈক্যের ভিত্তিতে এটি স্বাক্ষর করার প্রচেষ্টা নেবে।

mzamin

তাৎপর্যপূর্ণ সফরে ঢাকায় জাতিসংঘ মহাসচিব

চারদিনের সফরে ঢাকায় পৌঁছেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরাঁ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফর করছেন তিনি। গুতারাঁর এ সফরে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। বৃহস্পতিবার বিকালে গুতেরাঁকে বহনকারী এমিরেটসের এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট (ইকে-৫৮৬) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বিমানবন্দর থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে যান। এর আগে সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব তার রমজান মাসের সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সফর করছেন। এই সফরকালে রোহিঙ্গা সংকট এবং এর সমাধানে বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের সহযোগিতা, সেই সঙ্গে অন্যান্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। শুক্রবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং রোহিঙ্গা ইস্যু ও অগ্রাধিকার বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান সকাল ৯টায় হোটেলে গুতেরাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। পরে জাতিসংঘ মহাসচিব সকাল ১০টায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বৈঠকের পর গুতেরাঁ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের জন্য কক্সবাজার যাবেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক কক্সবাজার বিমানবন্দরে গুতেরাঁকে অভ্যর্থনা জানাবেন। কক্সবাজারে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও আন্তনিও গুতেরাঁ প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতারে যোগ দেবেন। দুই নেতা অনুষ্ঠান চলাকালীন রোহিঙ্গা, ইমাম এবং বিভিন্ন সমপ্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইফতারের আগে, মহাসচিব ক্যাম্পের বেশ কয়েকটি সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করবেন, যার মধ্যে রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার, লার্নিং সেন্টার, মাল্টি-পারপাস সার্ভিস সেন্টার এবং একটি পাট উৎপাদন স্থাপনা। তার রোহিঙ্গা যুবক ও শিশুদের সঙ্গেও আলাপ করার সম্ভাবনা রয়েছে। গুতেরাঁ একই দিন সন্ধ্যায় ঢাকায় ফিরে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থান করবেন। শনিবার জাতিসংঘ মহাসচিব ঢাকায় জাতিসংঘের কার্যালয় পরিদর্শন করবেন। সেখানে তিনি জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলন করবেন, বাংলাদেশ-জাতিসংঘ সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী পর্যবেক্ষণ করবেন এবং জাতিসংঘের কর্মীদের সঙ্গে একটি সভায় যোগ দেবেন। বিকালে তিনি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর একটি গোলটেবিল আলোচনায় যোগ দেবেন। তিনি যুব সমাজের সঙ্গে একটি সংলাপে অংশ নেবেন এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পরে গুতেরাঁ হোটেলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে যৌথ মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ভাষণ দেবেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস একই দিনে জাতিসংঘ প্রধানের সম্মানে ইফতার এবং নৈশভোজের আয়োজন করবেন। রোববার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে গুতেরাঁ এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করবেন। বিমানবন্দরে ড. খলিলুর রহমান তাকে বিদায় জানাবেন। সফরকালে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রোহিঙ্গা সমস্যার মতো দেশটি যে সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তা তুলে ধরা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইউনূসকে লেখা সামপ্রতিক এক চিঠিতে গুতেরাঁ আশা প্রকাশ করেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর আসন্ন উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করবে এবং তাদের দুর্দশার জন্য সমাধান বের করতে সহায়তা করবে। গুতেরাঁ বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সমর্থন করার জন্য জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে সংগঠিত করার প্রয়াস চালিয়ে যাবে। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, তিনি তার ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকদের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে জাতিসংঘের স্থানীয় টিমগুলোকে রাখাইনে মানবিক সহায়তা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য কীভাবে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করা যায় সে বিষয়ে নির্দেশনা প্রদানের জন্য অনুরোধ করেছেন।
mzamin

দুঃখ ভারাক্রান্ত বাংলাদেশ

দেশবাসীকে লজ্জায় ভাসিয়ে না ফেরার দেশে মাগুরায় ধর্ষণের শিকার শিশু আছিয়া। পুরো দেশের মানুষের প্রার্থনা আর ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টাকে ব্যর্থ করে ছোট্ট আছিয়া হার মেনেছে ভয়ানক পাশবিকতার  কাছে। গতকাল বেলা ১টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মাগুরায় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার আছিয়ার ওপর ঘটে যাওয়া নির্মম পাশবিক ঘটনার প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে শহর থেকে গ্রামে। রাজপথ উত্তপ্ত হয়েছে মিছিল আর স্লোগানে। একই সঙ্গে তার ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা ছিল প্রতিটি মানুষের। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর সিএমএইচ থেকে আসা দুঃসংবাদে স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা দেশ। শোক আর ক্ষোভে একাকার মানুষ ধিক্কার জানাচ্ছে মানুষরূপী কুলাঙ্গারদের। সব শ্রেণি- পেশার মানুষ দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন। ওদিকে গতকালই মাগুরার গ্রামের বাড়িতে নামাজে জানাজার পর আছিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। ওদিকে আছিয়ার ওপর চালানো পাশবিকতার ঘটনার দ্রুত বিচার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় ছাত্র-জনতা।

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) শিশু বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) চিকিৎসাধীন আছিয়াকে গতকাল বেলা ১টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। হাপাতালটির পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের প্রফেসর কর্নেল নাজমুল হামিদ এই তথ্য নিশ্চিত করেন। এদিনও সকালবেলা দুই দফায় শিশুটির ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হয়। সিপিআর দেয়ার পর তার হৃৎস্পন্দন ফিরে এসেছিল। কিন্তু দুপুর ১২টায় তার আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। এই দফায় সিপিআর দেয়ার পরও তার হৃৎস্পন্দন ফেরেনি। বেলা ১টায় তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আগের দিনও আছিয়ার চারবার ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হয়। আছিয়ার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে সিএমএইচে। শোকে বিহ্বল তার মা দাবি করেছেন, কন্যা হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীদের ফাঁসি। আছিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেন সরকারপ্রধান। আছিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে সেনাবাহিনী। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার আগামী সাত দিনের মধ্যে শুরু হবে। শিশুটির মামলার তদন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন আইজিপি বাহারুল আলম।
আছিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন তিনি।

জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান পৃথক বিবৃতিতে আছিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

এদিকে এই মৃত্যুর ঘটনায় গতকালও প্রতিবাদমুখর ছিল দেশ। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় শিশুর প্রতি নিপীড়নের প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে। ধর্ষণবিরোধী মঞ্চের উদ্যোগে আছিয়ার গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শাহবাগে গায়েবানা জানাজা হয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে। শোক প্রকাশ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন। দুপুরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে, মাগুরায় নির্যাতনের শিকার শিশুটি বেলা ১টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। সিএমএইচের সর্বাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োগ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শিশুটির সকালে তিনবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। দু’বার স্থিতিশীল করা গেলেও তৃতীয়বার আর হৃৎস্পন্দন ফিরে আসেনি। এতে আরও বলা হয়, ৮ই মার্চ শিশুটিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। শিশুটির বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শিশুটির শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। যেকোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে সেনাবাহিনী।

এর আগে ৫ই মার্চ মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রাতে ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয় আট বছরের শিশুটি। বোনের শ্বশুর তাকে ধর্ষণ করেছে বলে জানায় শিশুটি। ধর্ষণের ঘটনায় সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার বোনের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরও তাকে চিকিৎসার জন্য না নিয়ে উল্টো ঘরের ভেতরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরদিন ৬ই মার্চ সকালে প্রতিবেশী এক নারী তাদের ঘরে এলে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যায়। এরপর শিশুটিকে মাগুরা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। ততক্ষণে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়ে। হাসপাতালে গিয়ে বোনের শাশুড়ি চিকিৎসকদের জানান শিশুটিকে জ্বিনে ধরেছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বিষয়টি টের পেয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায় বোনের শাশুড়ি। ৬ই মার্চ দুপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ওইদিন রাতেই পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দুইদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ৮ই মার্চ শনিবার তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে সিএমএইচে চিকিৎসা নিচ্ছিল শিশুটি। সিএমএইচ সার্জারি বিভাগের প্রধানকে প্রধান করে আছিয়ার জন্য ৮ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। কিন্তু দিন দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। সোমবার চোখের পাতা নাড়ে শিশুটি।

চিকিৎসকরা যখন তাকে বাঁচানোর আশা করছিল তখন ফের অবনতি হতে থাকে তার শারীরিক অবস্থা। এদিকে ধর্ষণের ঘটনায় মাগুরা সদর থানায় মামলা করেছেন শিশুটির মা। এতে শিশুটির বোনের শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাশুর ও ভগ্নিপতিকে আসামি করা হয়েছে। তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। আইন উপদেষ্টা গতকাল বলেন, আছিয়া দুপুর ১টার দিকে সিএমএইচে মারা গেছে। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা শোক জানিয়েছেন। আমরা সবাই শোকার্ত, এর মধ্যে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন নেয়ার ব্যবস্থা করেছি। আছিয়ার মরদেহ দাফনের জন্য মাগুরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে হেলিকপ্টার যোগে। আছিয়ার মরদেহ এবং তার পরিবারের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার উপস্থিত থাকবেন। তিনি সেখানে দাফন পর্যন্ত থাকবেন। ‘ডিএনএ স্যাম্পল কালেকশন করা হয়ে গেছে, আশা করি আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে রিপোর্ট পেয়ে যাবো। এরই মধ্যে ১২-১৩ জনের ১৬১ ধারায় স্টেটমেন্ট নেয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী সাত দিনের মধ্যে বিচারকাজ শুরু হবে। আইন উপদেষ্টা বলেন, আমরা যদি সাতদিনের মধ্যে বিচারকাজ শুরু করতে পারি, আমাদের বিচারকরা সর্বোচ্চ দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে বিচার করতে পারবেন। কারণ এখানে পারিপার্শ্বিক এত সাক্ষ্য রয়েছে, ডিএনএ টেস্ট পাওয়া যাবে, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়া যাবে- ফলে আমরা আশা করছি খুব দ্রুত সময়ে এই মামলার বিচার হবে। ইনশাআল্লাহ দোষী সাব্যস্ত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে। এদিকে মাগুরায় ধর্ষণের শিকার শিশুটির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে ‘নরপশুদের’ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক শোক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মাগুরার কয়েকটা নরপশুর নিষ্ঠুরতা তার মতো এক শিশুর ওপর দিয়ে গিয়েছিল। ক্ষতচিহ্ন নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় সংগ্রাম করে শিশুটি জগতের মায়া ছেড়ে আমাদের কতোটা লজ্জা দিয়ে ও কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

জানাজায় মানুষের ঢল
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, গতকাল আছিয়ার মরদেহ ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে বিকাল সাড়ে ৫টার পর মাগুরা স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। শহরের নোমানী ময়দানে সন্ধ্যা ৭টায় শিশু আছিয়ার জানাজায় অংশ নেন হাজার হাজার মাগুরাবাসী। জানাজা পরিচালনা করেন মাগুরা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুফতি হাবিবুর রহমান। জানাজা শেষে আছিয়ার লাশ দাফনের জন্য তার নিজ বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের জারিয়া গ্রামে নেয়া হয়।

এ সময় বিচার চেয়ে শহরে বিক্ষোভ করে ছাত্র-জনতা। বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ভায়না এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে।

শিশু আছিয়ার মৃত্যুর খবর নিজ বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের জারিয়া গ্রামে পৌঁছালে সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়ে তার স্বজনরা। বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসে আছিয়াদের বাড়িতে। পুরো এলাকা হয়ে পড়ে শোকাচ্ছন্ন।

স্থানীয় বাসিন্দা হামিদুর রহমান বলেন, আজ আছিয়া আমাদের মাঝ থেকে চলে গেল। তাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না। আমরা চাই ধর্ষকের ফাঁসি। আজ একজন মা হারালো তার সন্তানকে। সন্তান হারানোর বেদনা খুবই কষ্টের। আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে আছি।

এলাকার প্রতিবেশী কৃষ্ণ বালা বলেন, আছিয়ার মৃত্যুর খবরে আমি খুবই ব্যথিত হয়েছি। আমি ২ সন্তানের জননী। যে শিশু আজ মারা গেল সে আমাদেরই সন্তান। আমরা আমাদের সন্তানকে যারা পৃথিবী ছাড়া করলো তাদের সবার বিচাই চাই। 

mzamin

গৃহপরিচারিকা থেকে সিইও, এক মায়ের সফল জীবন সংগ্রামের কাহিনী

মারিয়া পাজ বানাগ-মার্কেজ এমন একজন মা যার শক্তি, আত্মত্যাগ তার সন্তানদের সঙ্গে অটুট বন্ধন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ৫৮বছর বয়সে এসে ফিলিপিন্সের বাসিন্দা মারিয়া পাজ কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, অটুট অধ্যবসায়ের অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণও বটে। তিন সন্তানকে একা বড় করা থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত জুড়ে সাতটি সফল প্যাস্ট্রি শপের গর্বিত মালিক হওয়া পর্যন্ত তার যাত্রা ভালোবাসা এবং সংকল্পের শক্তিতে ভরপুর। কুইজন প্রদেশের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণকারী মারিয়া পাজের জীবন স্বাভাবিকভাবেই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে কেটেছে। একটি সাধারণ পরিবারে ১২ ভাইবোনের সঙ্গে বেড়ে ওঠা, যেখানে তার বাবা ছিলেন একজন কৃষক এবং মা একজন গৃহিণী। মারিয়া পাজ প্রথম দিকে শিখেছিলেন যে বেঁচে থাকার জন্য কঠোর পরিশ্রম এবং ত্যাগের প্রয়োজন। কিন্তু তার জীবন যাত্রা সত্যিকার অর্থে শুরু হয়েছিল যখন তিনি কন্যা সন্তান জামাইকার মা হয়েছিলেন। জন্ম থেকেই  প্রতিবন্ধী জামাইকা বছরের পর বছর চিকিৎসাজনিত নানা জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে।

একজন মায়ের প্রতিবন্ধী শিশুকে বড় করে তোলার লড়াই

মারিয়া পাজ যখন জামাইকার জন্ম দেন, তখন তার মেয়ের জন্মগত ত্রুটি ধরা পড়ে। মেয়েকে বড় করে তোলার জন্য বছরের পর বছর ধরে একাধিক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। পাঁচ বছর বয়সে জামাইকার মুখের ভেতরের অংশ মেরামত করার জন্য প্রথম অস্ত্রোপচার হয়েছিল। ১২বছর বয়সে তার চোখের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল এবং পরে তার হার্টের একটি ছিদ্র মেরামত করতে একটি হার্ট সার্জারির প্রয়োজন হয়।

মারিয়া পাজ নিদারুণ সমস্যার মধ্যে পড়ে যান। তার নিজের শহরে গড়ে তোলা ছোট বেকারি শপটি মেয়ের চিকিৎসার প্রয়োজনগুলো পূরণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। মারিয়া পাজ সেদিনের কথা মনে করে বলছেন, ‘মেয়ের হার্ট অপারেশনের জন্য আমার কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না এবং সেটি আমার হৃদয়কে চুরমার করে দিচ্ছিলো। আমি আমার মেয়ের কষ্ট দেখতে চাইনি, তাই আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। আমাকে কাজের জন্য বিদেশে যেতে হয়েছিল।’

২০০৫  সালে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মারিয়া পাজ তার সন্তানদের পেছনে ফেলে সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকার কাজ করার জন্য চলে যান। মারিয়া বলছেন, ‘আমি জামাইকার অপারেশনের জন্য অর্থ সঞ্চয় করতে দুই বছর সৌদি আরবে কাজ করেছি। প্রতিদিন, আমি আমার বাচ্চাদের কথা ভাবতাম, বিশেষ করে জামাইকার কথা, কারণ সন্তানেরাই আমার সবকিছু ছিল।’

ভালোবাসা ও সংকল্পের যাত্রা

মারিয়া পাজ ফিলিপিন্সে ফিরে আসেন, কিন্তু তার মেয়েকে সুস্থ করে তোলার লড়াই তখনো শেষ হয়নি। ২০০৮ সালে, তিনি দুবাইতে চলে যান, যেখানে তিনি উম্মে সুকিমে এক ফরাসি দম্পতির বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজে নিযুক্ত হন। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে মারিয়া পাজ তার সন্তানদের বড় করার জন্য ফিলিপিন্সে অর্থ পাঠিয়ে গেছেন। সেইসঙ্গে পরিবারের সঙ্গেও তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন গড়ে উঠেছে। তার বড় মেয়ে প্যাট্রিস মেরি নেদারল্যান্ডে যাওয়ার আগে সাত বছর দুবাইতে কা/জ করেছিলেন। তার ছোট ছেলে জন প্যাট্রিক ম্যানিলায় স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। কিন্তু মারিয়া পাজের জীবনে চালিকা শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে জামাইকা।  

মারিয়ার কথায়, সে সবসময় আমার মনে ছিল। আমি তাকে সুস্থভাবে বড় করে তুলতে দিনরাত পরিশ্রম করেছি। যখন আমার নিয়োগকর্তা ২০২১ সালে তার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে এটাই জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। আমার বেকিংয়ের প্রতি একটা আবেগ ছিল এবং আমি জানতাম যে এটি আমাদের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ।

একজন গৃহকর্মী থেকে একজন বেকারির মালিক

২০২১ সালে তার নিয়োগকর্তা চলে যাওয়ার পরে মারিয়া পাজ দুবাইয়ের সাতোয়া এলাকায় মারিয়া পাজ পেস্ট্রি নামে কটি ছোট বেকারি খোলার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। সেদিনের কথা মনে করে মারিয়া বলেন, ‘আমার কোনও পুঁজি ছিল না, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ছিল না। আমার কাছে যা ছিল তা ছিল আমার বেকিং দক্ষতা। কলেজ চলাকালীন একটি বেকারিতে পার্টটাইম  কাজ করার সময় তিনি এই কাজটি শিখেছিলেন। ফিলিপিন্সে একটি ছোট বেকারি পরিচালনা করেছিলেন। তার তৈরি চিজকেকগুলো, বিশেষ করে টিকটক এবং ফেসবুকে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র ফিলিপিনোদের মধ্যেই নয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যেও খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মারিয়া পাজ বলছেন, ‘এই বেকারি শপটি পরিচালনা করার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানুষদের কাছে আমার বাড়িতে তৈরি করা পেস্ট্রির রেসিপিগুলো ভাগ করে নিতে পারি। এটি খাবারের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আমার ভালোবাসার বন্ধন গড়ার একটি প্রয়াস।’

মারিয়া পাজ তার আত্মীয়দের সঙ্গে অংশীদারিত্বর মাধ্যমে দোকান চালানোর অর্থ জোগাড় করেছিলেন। আর্থিক সংস্থাগুলো থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন। মারিয়া বলছেন, আমার এক বছরের জন্য কোনও বেতন ছিল না। আমরা শুধুমাত্র আমাদের করা সামান্য লাভের ওপর বেঁচে ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম যে আমার পরিবারকে সমর্থন করার জন্য আমাকে এ চেষ্টা  চালিয়ে যেতে হবে। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বেকিংয়ে প্রতি অধ্যবসায় এবং ভালোবাসা আমার ঋণ পরিশোধ করতে সাহায্য করেছে।’

ধীরে ধীরে দুবাইতে জনপ্রিয় হতে থাকে মারিয়ার বেকারিটি। তার বাড়িতে তৈরি চিজকেক এবং পেস্ট্রির প্রতি অনেকেই আকৃষ্ট হতে শুরু করেন। মাত্র চার বছরে মারিয়া পাজ একজন গৃহপরিচারিকা থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি প্যাস্ট্রি দোকানের মালিক হয়ে ওঠেন। তিনি তার দোকানে ৭০ জনেরও  বেশি কর্মী নিয়োগ করেছিলেন, বেশিরভাগই ফিলিপিনো। তবে এই সাফল্য একদিনে আসেনি। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং তার সন্তানদের জন্য একটি ভাল ভবিষ্যৎ প্রদানের আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে এই সংগ্রামের নেপথ্যে।  

মায়ের জয়: অসুস্থ কন্যাকে সুস্থ করা, একটি স্বপ্ন পূরণ

অবশেষে জামাইকার সার্জারির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন মারিয়া। তিনি অশ্রুসজল গলায় বলে চলেন, ২৩ বছর পর আমি অবশেষে আমার মেয়ের অবস্থা ঠিক করতে পেরেছি। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়। প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি চ্যালেঞ্জ আমাকে এই মুহূর্তের দিকে নিয়ে গেছে।

মারিয়া পাজ জামাইকার অস্ত্রোপচারের জন্য এক মিলিয়ন পেসো খরচ করেছেন, যার সবটাই এসেছে তার বেকারি থেকে। ‘আমার বেকারি না থাকলে এর কিছুই সম্ভব হতো না’- আবেগসিক্ত গলায় বলে চলেন এই লড়াকু মা।  

আশা ও অধ্যবসায়ের বার্তা

আজ মারিয়া পাজ শুধু একজন সফল উদ্যোক্তা নন; তাদের জন্য তিনি আশার আলো যারা জীবনে একাধিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়েছেন। তার গল্প প্রমাণ করে-আপনি যেখান থেকেই শুরু করুন না কেন, দৃঢ় সংকল্প, ভালোবাসা এবং জেদের দ্বারা সবকিছুই করা সম্ভব। মারিয়া পাজের কথায়, হাল ছেড়ে দিও না। কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাও। একদিন স্বপ্ন সত্যি হবেই।

গরিব মানুষ কি রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেল by জাভেদ হুসেন

মানুষ অনেক কিছু করে বেঁচে থাকলে। মানুষ গান গায়, দর্শন–ইতিহাস চর্চা করে। ছবি আঁকে। বিভিন্ন মতের মধ্যে তর্ক–মারামারি হয় কার মত ভুল আর কারটা ঠিক তাই নিয়ে। তর্কে অবশ্য তার সুরাহা হয় না। আরও তর্ক হয়। তর্ক মারামারিতে গিয়ে গড়ায়। তবে একটা বিষয় নিয়ে তর্কের কোনো অবকাশ নেই। আর তা হলো দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি...এই সবই করে জীবিত মানুষ। মৃত মানুষ কোনো দর্শন চর্চা করে না, ইতিহাস লেখে না। এসব করার জন্য আগে আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে। 

কিন্তু এই বেঁচে থাকার ব্যাপারটাই আমাদের রাজনীতির আলাপ থেকে ক্রমে উধাও হয়ে যাচ্ছে কেন? কিছুদিন আগেও যেকোনো বক্তৃতা, রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা আর আলাপ শুরু হতো শ্রমিক–কৃষকের কথা দিয়ে। মানে, যে মানুষগুলো সমাজে সংখ্যায় বেশি, যারা আসলে কেবল টিকে থাকে, যারা বেঁচে থাকে না, সেই মানুষগুলোর কথা দিয়ে। সেসব মানুষ এখন অদৃশ্য আর নেই হয়ে গেছেন আমাদের রাজনীতির আলাপ থেকে। তারা পত্রিকার পাতায় আসেন কদাচিৎ। কখনো আসেন কৃষিপণ্যের দাম কমে যাওয়ার সূত্র ধরে। কখনো শ্রমিক বেতন না পেয়ে রাস্তা অবরোধ করলে যানজটের খবরের প্রসঙ্গক্রমে।

দুনিয়াজুড়ে এই ঘটনা ঘটছে। মানুষ হারিয়ে গিয়ে রাজনীতির বিষয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মতাদর্শ। গরিব মানুষ এখন আর রাজনীতির বিষয় নয়। তারা বড়জোর ভোটের সময় দিন কয়েকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তা–ও যদি সত্যি সত্যি তাঁরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।

নিখোঁজ হয়ে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে মুছে যাচ্ছে মানুষ। একসময় রাজনীতিতে বাস্তব মানুষের প্রতিফলন পাওয়া যেত। ক্ষমতায় যাওয়াই এখনো বহাল রাজনীতির মূল কথা। কিন্তু তা হয়ে গেছে এক বিমূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায়। বাস্তব মানুষ ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে পড়েছে। তাদের জায়গা নিয়েছে ‘সংস্কৃতি’, ‘পরিচয়’ এবং ‘প্রতিনিধিত্ব’-এর মতো বিমূর্ত ধারণা।

এ ব্যাপারটা ঘটার একটা অন্যতম সূত্র হলো পশ্চিমের কালচারাল স্টাডিজ। কালচারাল স্টাডিজের উৎপত্তি মূলত ১৯৬০-এর দশকে ব্রিটেনের বার্মিংহাম স্কুল থেকে। রিচার্ড হগার্ট, স্টুয়ার্ট হল এবং তাঁদের সহকর্মীরা দেখাতে চেয়েছিলেন যে সাংস্কৃতিক চর্চা কেবল উঁচুতলার বিষয় নয়, বরং সাধারণ মানুষও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তোলে এবং তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দিকে, এটি একটি বিপ্লবী ধারণা ছিল। প্রচলিত একাডেমিক কাঠামোতে শ্রমজীবী শ্রেণির সাংস্কৃতিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে থাকে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে কালচারাল স্টাডিজ শ্রমজীবী শ্রেণির বাস্তব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিবর্তে ‘পরিচয়ের রাজনীতি’কে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। শ্রমিকদের মজুরি, জীবনমান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মতো বাস্তব ইস্যুগুলোকে পাশ কাটিয়ে গবেষণা ঘুরে যায় লিঙ্গ, জাতিসত্তা, যৌন পরিচয়, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ইত্যাদির দিকে।
এই পরিবর্তন কাকতালীয় ছিল না। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে ধীরে ধীরে একাডেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে একটি নতুন ধারা প্রচলিত করতে শুরু করে। বাস্তব মানুষের জীবন আর সমস্যা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ‘ভাষা’, ‘সংস্কৃতি’, ও ‘প্রতিনিধিত্ব’ রাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠল।

এখন তো দুনিয়াজোড়াই আমজনতার প্রকৃত সংকট—আর্থিক বৈষম্য, কাজ উপার্জনের নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া—এসব ইস্যু রাজনীতির মূলধারায় গুরুত্ব হারিয়েছে। মানুষের কথা বলবে এমন কোনো প্রক্রিয়া এখন আর শক্তিশালী নয়। এখন রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সাংস্কৃতিক প্রশ্নের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।  

কোনোমতে টিকে থাকা মানুষগুলো সব সময় খাপ খাইয়ে নেয়। ভোটের সময় কিছুদিনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাছে আসে, প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু নির্বাচনের পর তারা আবার বিস্মৃত হয়। পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি মূলধারার আলোচনায় উঠে আসে।

মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো যখন অন্য কোনো রাজনীতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়, তখন কার লাভ হয়? কোনো একটা মূল সমস্যা যে সমাধান না হয়ে টিকে থাকে, তা তো বোঝা যায়। নইলে আমাদেরকে কেন বারবার মুক্ত হওয়ার জন্য, স্বাধীন হওয়ার জন্য লড়তে হয়, মরতে হয়। সে কোন জিনিস, যা বদলাচ্ছে না বলে এতবার যুদ্ধে নামতে হয়?

ওয়াল ই নামে একটা অ্যানিমেশন ছবি আছে। মানুষের হাতে পড়েই পৃথিবী আর বাসযোগ্য নেই। মানুষ তাই বিশাল এক মহাকাশযানে করে চলে গেছে মহাশূন্যে। সেই যান চালায় এক কম্পিউটার। একজন ক্যাপ্টেনও আছেন।

কম্পিউটারের কাছে তথ্য আছে যে পৃথিবী মানুষের বাসের যোগ্য নয়, সেখানে যাওয়া যাবে না। এমন সময় খবর পাওয়া গেল, পৃথিবী আবার বাসযোগ্য হয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাইলে কম্পিউটার বলল, সেখানে গেলে টিকে থাকা যাবে না। ক্যাপ্টেন জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি টিকে থাকতে চাই না। আমি বাঁচতে চাই।’  

টিকে থেকে আর কত দিন? আমরা বাঁচতে চাই।

* জাভেদ হুসেন, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

গরিব মানুষ কি রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেল