Monday, October 6, 2025

হামাস-ইসরাইল শান্তি আলোচনা আজ, ট্রাম্পের তাগাদা

আজ সোমবার হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে মিশরে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা শুরু হচ্ছে। এতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এরই মধ্যে ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছেন। তার মধ্যে কিছু অংশে রাজি হয়েছে হামাস। তারা ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তি ও গাজা শাসনভার ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের হাতে হস্তান্তরের বিষয়ে রাজি হয়েছে। তবে দলটি অন্যান্য ইস্যুতে আরও আলোচনার দাবি জানিয়েছে। তাদেরকে নিরস্ত্রীকরণ এবং ভবিষ্যতে গাজা শাসনের বিষয়ে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে শুরু হচ্ছে এই আলোচনা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, এ পর্যন্ত আলোচনা খুব সফল হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে প্রথম ধাপ এই সপ্তাহেই সম্পন্ন হবে এবং আমি সবাইকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সময় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- নইলে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটবে। এর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করছেন খুব শিগগিরই জিম্মিদের মুক্ত করা শুরু হবে। নিজের প্রস্তাবে নমনীয়তা থাকবে কি না- এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, নমনীয়তার প্রয়োজন নেই। কারণ সবাই মূলত একমত হয়েছে। তবে কিছু পরিবর্তন অবশ্যই আসবে। তিনি বলেন, এটি ইসরাইলের জন্য দারুণ একটি চুক্তি। একইসাথে পুরো আরব ও মুসলিম বিশ্বের জন্যও। আমরা এ নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। এদিকে, হামাসের প্রস্তাবে সাড়া দেওয়ার পরও গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার ইসরাইলকে ‘অবিলম্বে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে’ নির্দেশ দেন ট্রাম্প।

তা সত্ত্বেও তারা অব্যাহতভাবে বোমা হামলা করে গাজাবাসীকে হত্যা করছে। ইসরাইলি সরকারের মুখপাত্র শোশ বেদরোশিয়ান রোববার বলেন, গাজার ভেতরে কিছু বোমাবর্ষণ বন্ধ হলেও এখনো কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্দেশ দিয়েছেন ‘যদি আত্মরক্ষার প্রয়োজন হয়, সেনারা প্রতিরোধমূলক হামলা চালাবে।’

গাজা থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলি বিমান ও ট্যাংকের গোলাবর্ষণে শনিবার রাত থেকে রবিবার পর্যন্ত গাজার বহু আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদক রোববার ইসরাইল সীমান্তের কিবুত্ৎস বেয়েরির কাছে অবস্থানকালে গাজা থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখেছেন। হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় আরও ৬৫ জন নিহত হয়েছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিবিএস নিউজকে বলেন, জিম্মিদের মুক্তি ঘটাতে হলে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে হবে। বোমা পড়ার মধ্যে মুক্তি সম্ভব নয়। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব জিম্মিদের মুক্ত করা হোক। ২০ দফা পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতি ও ৪৮ জন জিম্মির মুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ২০ জনের জীবিত থাকার সম্ভাবনা আছে। তাদের মুক্তির বিনিময়ে শত শত আটক ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেয়া হবে। শনিবার টেলিভিশন ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যেই জিম্মিদের মুক্তির ঘোষণা দিতে পারব।

সরকারি মুখপাত্র বেদরোশিয়ান আরও জানান, নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এই আলোচনার মেয়াদ কয়েক দিনের মধ্যেই সীমিত থাকবে। নেতানিয়াহু সোমবার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য ইসরাইলি প্রতিনিধি দলকে মিশরে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, হামাসের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আছেন প্রধান আলোচক খালিল আল-হাইয়া। তিনি রোববার রাতে কায়রো পৌঁছেছেন। গত মাসে দোহায় ইসরাইলি হত্যাচেষ্টার টার্গেট ছিলেন তিনিও। এ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল-থানি উপস্থিত থাকবেন বলে বলা হয়েছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/183361_Abul-4.webp

কঠোর অভিযানের মধ্যে কৌশলে পাথর ‘লুট’ by সুমনকুমার দাশ

নদীতে বড় বড় নৌযান সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা, যা ‘বাল্কহেড’ নামে পরিচিত। শত শত শ্রমিক নদীর পাড়ে জমা করে রাখা পাথর টুকরিতে ভরে সেই সব নৌযানে ওঠাচ্ছেন। কাছেই নদীতে চলছে খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর), যা দিয়ে পানির নিচ থেকে পাথর ওঠানো হচ্ছে।

সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় পাথর লুটকারীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যেও এই দৃশ্য দেখা গেল কানাইঘাট উপজেলার লোভা নদীতে। লোভা নদী সীমান্তের ওপার থেকে এসে সুরমায় মিশেছে। এই নদীতেও পানির স্রোতের সঙ্গে ওপার থেকে পাথর আসে।

লোভা নদীর বাংলাদেশ অংশের শুরুতে একটি পাথর কোয়ারি (যেখানে পাথর উত্তোলন করা হয়) রয়েছে। সেই কোয়ারিতে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করা যেত। তারপর সরকার আর কোয়ারি ইজারা দেয়নি, মানে হলো পাথর তোলা নিষিদ্ধ। তবে নিলামে বিক্রি করা পাথর স্থানান্তরের নামে এখন সেখানে লুট চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁরা বলছেন, পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা, যাঁরা বিএনপির কোনো কোনো নেতার সঙ্গে মিলে কাজটি করছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে নিলামে পাথর কেনা ঠিকাদারের যোগসাজশ রয়েছে।

লোভা নদী সিলেট শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। কানাইঘাট উপজেলা শহর থেকে এর দূরত্ব আট কিলোমিটারের মতো। গতকাল রোববার বেলা একটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত নৌপথে সুরমা নদী হয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী লোভা নদীর জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, সুরমা নদীর কানাইঘাট বাজারের বিপরীত অংশ স্টেশন এলাকায় একটি বাল্কহেডে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক পাথর তুলছিলেন। আশপাশের অন্তত আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাথরের এমন স্তূপ দেখা গেছে। পাশে ক্রাশার মেশিনে (পাথর ভাঙার কল) পাথর ভাঙার কাজও করছিলেন শ্রমিকেরা।

সুরমা নদী পেরিয়ে সংযুক্ত লোভা নদীতে ঢোকার পরপরই নদীর দুই পাড়ে কয়েক শ পাথরের স্তূপ চোখে পড়ে। নদীর দুই পাশের চিন্তারবাজার, মেছারচর, বাগিচাবাজার, নয়াবাজার, মুলাগুল, সাউদগ্রাম, বড়গ্রাম এবং লোভাছড়া ছাব্বিশের পিলারের পাশের ভালুকমারা ও ডাউকেরগুল গ্রামের পাশে অন্তত ১০০ বাল্কহেড ভেড়ানো আছে। সেসব বাল্কহেডে পাথর ওঠানো হচ্ছিল। সব মিলিয়ে অন্তত ৫০টি খননযন্ত্র দেখা যায়, যা দিয়ে পাথর নৌযানে ওঠানো হচ্ছিল। ৩০ থেকে ৩৫টি ক্রাশার মেশিনে পাথর ভেঙে টুকরা করতে দেখা যায়।

পাথর তুলতে দেখা গেছে তিনটি জায়গায়। সেখানেও খননযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল। কিছু মানুষকে নদীর নিচে থাকা পাথর হাত দিয়ে তুলে নৌকায় রাখতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, লোভাছড়া এলাকাটি দুর্গম। এখানে প্রশাসনের লোকজন আসেন না। এ কারণে পাথর লুটে কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, রাতের বেলা পাথর সরানো হয়। তখন কেউ দেখে না।

যে কৌশলে সরানো হয় পাথর

স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে কোয়ারি ইজারা বন্ধের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত নদীর দুই পাড় এবং আশপাশে থাকা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করেন। এর মধ্যে ৪৪ লাখ ঘনফুট পাথর ওই বছরই নিলামে তোলা হয়। যদিও তখন মামলার কারণে বিক্রি সম্ভব হয়নি। পরে আইনি জটিলতা শেষে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) ৪৪ লাখ ঘনফুট পাথর নিলামে বিক্রি করে। মেসার্স পিয়াস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সাড়ে ২১ কোটি টাকায় পাথরগুলো কিনেছিল। শর্ত ছিল, কার্যাদেশে উল্লিখিত ৪৫ দিনের মধ্যে নিজ খরচ ও উদ্যোগে নিলামে কেনা পাথর কেবল দিনের বেলা অপসারণ করতে হবে। নতুন করে পাথর উত্তোলন ও সংরক্ষণ করে নিলামে কেনা পাথরের সঙ্গে মেশানো যাবে না।

সূত্র জানায়, ঠিকাদার গত ৭ মে পাথর অপসারণে কাজ শুরু করেন। ইতিমধ্যে নির্ধারিত ৪৫ দিন শেষ হয়ে যায়। তখন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে তাঁরা সময় আরও ৩০ দিন বাড়িয়ে নেন। বাড়তি সময়ও গত ২৩ জুলাই শেষ হয়েছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পাথর অপসারণে সময় বাড়ানোর দাবিতে দ্বিতীয় দফায় আবেদন করেছিল। কিন্তু জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সময় বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে আবেদনটি নথিজাতপূর্বক নিষ্পত্তি করে।’

সময় শেষ হওয়ার পরও পাথর স্থানান্তর কেন করা হচ্ছে, জানতে চাইলে ঠিকাদার মেসার্স পিয়াস এন্টারপ্রাইজের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী দাবি করেন, তিনি অন্যায্যভাবে কোনো পাথর অপসারণ করছেন না। তাঁর ভাষ্য, তাঁকে বিপুলসংখ্যক পাথর সরানোর জন্য সময় দেওয়া হয় মাত্র ৪৫ দিন। এ সময়ে এত পাথর সরানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, নিলামে কেনা পাথরের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ স্থানান্তর সম্ভব হয়েছে। তাই আবার তিন মাস সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। সময় বাড়ানো হয়নি। তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। আদালত তাঁকে তিন মাস সময় দিয়েছেন। তিনি শুনেছেন, সরকার পক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে। তবে স্থগিতাদেশ আসেনি। তাই পাথর স্থানান্তরে বাধা নেই।

রাতে পাথর কে সরায় জানতে চাইলে কামরুল হাসান চৌধুরী বলেন, সেটা তিনি জানেন না।

সিলেটের পরিবেশবাদীরা বলছেন, ৪৫ দিনের পর ঠিকাদার বাড়তি ৩০ দিন সময় পেয়েছেন। কিন্তু তারপরও সময় বাড়ানোর আবেদনের উদ্দেশ্য ভিন্ন।

সামনে বিএনপি নেতারা, নেপথ্যে আ.লীগ

স্থানীয় সূত্র বলছে, নিলামে পাথর কেনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী একসময় সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সক্রিয় নেতা ছিলেন। তাঁকে সামনে রেখে ২০ থেকে ৩০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী পাথর লুটে জড়িত। কয়েকজন বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।

যাঁদের বিরুদ্ধে পাথর লুট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক তমিজ উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ সদস্য কামাল উদ্দিন, আওয়ামী লীগ কর্মী মঈনুল (অন্য মামলায় ১২ আগস্ট গ্রেপ্তার), লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, সহসভাপতি বিলাল আহমদ, কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আলমাস উদ্দিন।

নাম আসা তিনজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। তাঁরা হলেন তমিজ উদ্দিন, বিলাল আহমদ ও আলমাস উদ্দিন। তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি এসবে জড়িত নই। যিনি নিলাম পেয়েছেন, তিনি কি অভিযোগ করেছেন? যদি তিনি না করেন, তাহলে কেন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ? লোভাছড়ার দুই পাড়ে নিলামের বাইরে কোনো পাথর নেই।’

আলমাস উদ্দিন বলেন, ‘আমরার থুরাথুরি (সামান্য) মাল (পাথর) আছিল। সরকার নিয়া গেছে। এখন নিলাম যারা পাইছে, তারা নিতাছে। আমরা কিছুত জড়িত নাই।’

অবশ্য কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেন, নিলাম পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও বিএনপির দু-একজন কর্মী মিলে পাথর এখন সরাচ্ছেন। নিলামের পাথর অপসারণের সময় শেষ হলেও পাথর নেওয়া থামছে না। এ ছাড়া নতুন করে পাথর তোলায় এলাকার পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে।

নিলামের কাগজ ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে

সিলেটের বিভিন্ন জায়গা থেকে এক বছর ধরে পাথর লুট করা হয়। সর্বশেষ লুট করা হয় ভোলাগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র থেকে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার বৃহস্পতিবার থেকে জোরালো অভিযান শুরু করেছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, গতকাল পঞ্চম দিনের মতো লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে যৌথ বাহিনী ও টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় টাস্কফোর্সের অভিযানে প্রায় ৩৯ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সদর উপজেলার সালুটিকর এলাকা থেকে দুজনকে আটক করা হয়।

অভিযানের মধ্যে যখন পাথর স্থানান্তর কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন লোভা নদী থেকে নিলামের কাগজ ব্যবহার করে পাথর সরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়কারী শাহ সাহেদা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামের বৈধ কাগজটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি চক্র কোয়ারি ও আশপাশের এলাকায় নির্বিচার লুটপাট চালাচ্ছে।’

পাথর লুট চলছেই। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া থেকে খননযন্ত্র দিয়ে অবাধে পাথর তোলা হচ্ছে। পাথর ভাঙার পর তোলা হচ্ছে নৌযানে। গতকাল দুপুরে
পাথর লুট চলছেই। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া থেকে খননযন্ত্র দিয়ে অবাধে পাথর তোলা হচ্ছে। পাথর ভাঙার পর তোলা হচ্ছে নৌযানে। গত ১৮ আগস্ট ২০২৫, দুপুরে ছবি: আনিস মাহমুদ

ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব কি ঔপনিবেশিকতার প্রত্যাবর্তন by হাসান ফেরদৌস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড  ট্রাম্প গাজা প্রশ্নে ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে গাজাবাসীর যেমন কোনো মতামত জানতে চাওয়া হয়নি, তেমনি অনাগত ভবিষ্যতেও তাদের কেউ এই তথাকথিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনে স্থান পাবে না।  ট্রাম্পের এই শান্তি প্রস্তাব গাজায় ঔপনিবেশিক শাসন চালুর নতুন পরিকল্পনা কি না, তা নিয়ে লিখেছেন হাসান ফেরদৌস

১৯১৯ সাল। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ, হার হয়েছে তুরস্কের। এত দিন সমগ্র ফিলিস্তিন ছিল তুরস্কের নিয়ন্ত্রণাধীন। যুদ্ধের পর অন্যতম বিজয়ী শক্তি ব্রিটিশ সরকার আবদার করল এই অঞ্চলের দায়িত্বভার তার হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

ফিলিস্তিনের মানুষ কী চায়, সে প্রশ্ন বিবেচনা না করেই ভার্সাইয়ের হল অব মিররসে বসে দিন কয়েক কাগজ-কলমে কাটাকুটি করে ঠিক করা হলো, যত দিন না এই অঞ্চলের মানুষ ‘নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে’, তত দিন তা শাসন করার দায়িত্ব থাকবে যুক্তরাজ্যের ওপর।

 ১০০ বছর পর সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। এবারও হাতে গোনা কয়েকজন ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে শলাপরামর্শের পর ঠিক করলেন; যত দিন না পরিস্থিতি অনুকূলে আসছে, তত দিন গাজা, যা ফিলিস্তিনের একটুকরা ভূমি, তা শাসনের দায়িত্বে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তী প্রশাসন।

এর নেতৃত্বে থাকবেন সেই যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। সঙ্গে পরিচালনা পর্যদ বা বোর্ডের প্রধান হিসেবে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলা বাহুল্য, গাজাবাসী কী ভাবেন বা কী চান, তা বিবেচনায় আনার কোনো প্রশ্নই উঠল না।

২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশে নিয়ে সাড়ম্বরে গাজার জন্য এই শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে। তাঁর কথায়, এ হলো শতাব্দীর সেরা ব্যবস্থা বা ‘ডিল’।

গাজা প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন, তা আগাগোড়া ক্ল্যাসিক ঔপনিবেশিক শাসন চালুর সর্বশেষ উদাহরণ। একদল মানুষ, যাদের ওই ভূখণ্ডের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, শুধু গায়ের জোরে (পড়ুন বোমার জোরে) ২২-২৩ লাখ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করছে, ‘হয় মেনে নাও, না মানলে গুলি খাও!’

-----২

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড  ট্রাম্প গাজা প্রশ্নে যে ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে এই ভূখণ্ডের ভবিষ্যতের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গাজাবাসীর যেমন কোনো মতামত জানতে চাওয়া হয়নি, তেমনি অনাগত ভবিষ্যতেও তাদের কেউ এই তথাকথিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনে স্থান পাবে না।

গাজা যেন ২২ লাখ মানুষের একটি ভূখণ্ড নয়, একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, যার মালিকানায় থাকবে একটি নির্বাহী বোর্ড!

প্রশাসনিক কাজে সাহায্যের জন্য বেছে বেছে অরাজনৈতিক ‘টেকনোক্র্যাটিক’ ফিলিস্তিনিদের খুঁজে আনা হবে। নিরাপত্তার জন্য আশপাশের দেশ থেকে ভাড়া করে আনা হবে পুলিশ ও সৈন্য।

বিখ্যাত ব্রিটিশ-ইসরাইয়েলি ঐতিহাসিক ড্যানিয়েল-লেভি মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প গাজার জন্য যে পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন, তা পড়ে মনে হয় এটি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো নথি। লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য জড়িত না থাকলে একে এক সেরা ‘কমেডি’ বলা যেত।

-----৩

পরিকল্পনাটির মুখ্য শর্ত, গাজার কোনো কাজে হামাসকে রাখা যাবে না। তাদের শুধু নিরস্ত্র করতে হবে তা–ই নয়, ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে তাদের রাখা যাবে না। শান্তি প্রশ্নে তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনাও হবে না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, হামাসকে হয় এই প্রস্তাব মেনে নিতে হবে, না হয় তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। তাদের কীভাবে খতম করতে হয়, নেতানিয়াহু তা খুব ভালো করেই জানেন।

হামাসের ব্যাপারে প্রতিবেশী আরবদের মধ্যে কমবেশি মতৈক্য রয়েছে। মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ গাজা থেকে হামাসের বহিষ্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। আরব লীগও হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে। জাতিসংঘে গৃহীত এক প্রস্তাবেও হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে সায় দেওয়া হয়েছে।

দুই বছরের টানা যুদ্ধের পর হামাসের তেমন কোন সামরিক শক্তি নেই যে তারা এই প্রশ্নে বাগ্‌বিতণ্ডা করবে। ফলে অনুমান করি, কিছুটা বিলম্বে হলেও হামাস অস্ত্র ত্যাগ ও ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার দাবি মেনে নেবে।

 কিন্তু তারচেয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নিয়ে। ফিলিস্তিন সমস্যার কেন্দ্রেই রয়েছে এই জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের স্বীকৃতি ও বাস্তবায়ন।

ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনায়, অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের এক ধারা রাখা হয়েছে যাতে স্বাধীন ফিলিস্তিনকে তার ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে; কিন্তু তার বাস্তবায়নের কোনো পথরেখা চিহ্নিত হয়নি।

পরিহাসের বিষয় হলো, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের যে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করা হয়, তাতে একই সঙ্গে একটি ইহুদি ও একটি আরব (ফিলিস্তিনি) রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল।

ইহুদি রাষ্ট্রটি অনেক আগেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; কিন্তু প্রায় ৮০ বছর পরেও স্বাধীন ফিলিস্তিন সেখানকার জনগণের ‘আকাঙ্ক্ষাই’ রয়ে গেছে।

নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন তিনি কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে দেবেন না। কোনো কোনো আরব রাষ্ট্র, যেমন সৌদি আরব বলেছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া কোন শান্তি পরিকল্পনায় তাদের সমর্থন নেই। সে কথা মাথায় রেখে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় স্বাধীন ফিলিস্তিনের দাবিটি একদম উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

এতে যে সম্ভাব্য স্বাধীন ফিলিস্তিনের কথা বলা হয়েছে, কবে সে ‘আকাঙ্ক্ষা’ বাস্তবায়িত হবে তার কোনো সময়সীমা নেই। এতে শর্ত দেওয়া হয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে পশ্চিম তীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে ঢেলে সাজাতে হবে।

ঢেলে সাজানো হয়েছে কি না, তার সনদপত্র আসবে এই নতুন ট্রাম্প-ব্লেয়ার বোর্ডের কাছ থেকে। ইসরায়েল ‘হ্যাঁ’ না বলা পর্যন্ত তারা যে এই প্রশ্নে নড়েচড়ে বসবে না তা বলাই বাহুল্য।

-----৪

বিভিন্ন বেসরকারি আরব ভাষ্যকার ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। যে বোর্ডকে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘের নয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মিল রয়েছে, এ কথা বলেছেন আল কুদস আল-আরাবি পত্রিকার এক ভাষ্যকার।

 লেবাননের সাংবাদিক রাশিদা দেরঘাম বলেন, ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে ট্রাম্প গাজাকে কোনো দেউলিয়াপ্রাপ্ত করপোরেশন ঠাউরে এখন তার দেখভালের ব্যবস্থা করছেন।

জর্দানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারওয়ান মুয়াশের আলী বলেন, এটা কোনো শান্তি পরিকল্পনা নয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের সব রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার করে তাদের ‘ম্যানেজ’ করার বন্দোবস্ত।

গাজাবাসী ও ফিলিস্তিনিদের ঝুড়ি শূন্য থাকলেও ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর দাবির প্রায় সব কটিই আদায় করে নিয়েছেন। এত দিন তিনি বলে এসেছেন হামাসের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তিনি হামলা বন্ধ করবেন না। এই পরিকল্পনায় কার্যত তাঁর সেই শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছে।

নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে গাজার ব্যাপারে কোনো ভূমিকা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন, এই পরিকল্পনায় সে দাবিও মেনে নেওয়া হয়েছে। গাজায় অনির্দিষ্টকাল ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন থাকবে, তাঁর এ দাবিও মেনে নেওয়া হয়েছে।

সোজাকথায়, নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায়, নেতানিয়াহু যা যা দাবি করেছেন, তার সবই এই পরিকল্পনায় নিশ্চিত করা হয়েছে। এ কথা ঠিক, তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিনের বিরোধিতা করেছেন। এই পরিকল্পনায় যে স্বাধীন ফিলিস্তিনের কথা বলা হয়েছে, টাইমসের ভাষায়, তা বড়জোর এক সুখকল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। কিছুটা পরিহাসের সুরেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি টাইমস লিখেছে, ‘ড্রিম  অন’, অর্থাৎ স্বপ্ন দেখতে থাকো।

এসব সত্বেও গাজায় জাতিহত্যা বন্ধ হবে, শুধু এ কারণেই প্রস্তাবটিকে কেউ কেউ স্বাগত জানিয়েছেন। মিসর ও আরব আমিরাতসহ আটটি আরব দেশ প্রস্তাবটি চূড়ান্তকরণে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সতর্ক সমর্থন জানিয়েছে পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া।

ইতিপূর্বে ট্রাম্প বলেছিলেন, সব গাজাবাসীকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে তিনি অত্যাধুনিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলবেন। এই পরিকল্পনায় সেই দাবি বাদ গেছে, বলা হয়েছে গাজাবাসীকে কোথাও যেতে হবে না। কেউ যদি চলে গিয়েও থাকে, তারা চাইলে ফিরে আসতে পারবে।

-----৫

মানতে হবে, গাজায় গণহত্যা বন্ধে কোনো আরব বা ইউরোপীয় দেশ এ পর্যন্ত অর্থপূর্ণ কিছুই করেনি। সেই তুলনায় ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবে গাজাবাসী কিছুটা হলেও আলোর আভাস পেয়েছেন।

এ কথা ভাবার কারণ রয়েছে যে ট্রাম্পের চাপের কারণেই নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনা মেনে নিয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে দোহায় হামাসের এক বৈঠকে বোমা বর্ষণের জন্য কাতারের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। সেটিও সম্ভব হয়েছে ট্রাম্পের চাপাচাপিতে।

আমরা জানি, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পুরস্কার হিসেবে ট্রাম্প নিজের জন্য নোবেল পুরস্কার দাবি করেছেন। সত্যি সত্যি যদি গাজায় গণহত্যা থামে, সেখানে শান্তি আসে, হোক না তা কবরের শান্তি, সে জন্য ট্রাম্প যদি সেই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন, তাতে কি আপত্তি করার কেউ থাকবেন?

* হাসান ফেরদৌস,  সাংবাদিক ও লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

দুর্লভ খনিজের কূটনীতি : চীনের আধিপত্য রুখে দিচ্ছে ভারত? by মানিশ বৈদ্য

দুর্লভ খনিজে চীনের আধিপত্য (বৈদ্যুতিক যান, ইলেকট্রনিক পণ্য, টারবাইন ও প্রতিরক্ষার সরঞ্জাম তৈরির জন্য অপরিহার্য উপাদান) দীর্ঘদিন ধরে ভারতের জন্য একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু এখন নয়াদিল্লি এখন সেই দুর্বলতাকে কৌশলগত সুবিধায় রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর ভারত সফরে বেইজিং ভারতের বিরল খনিজের চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ ঘোষণা এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা সম্মেলনে (৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর) ঠিক আগে, আর এ বছরের শেষ দিকে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনের প্রাক্কালে।

বিশ্বের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের সঙ্গে এ কূটনৈতিক তৎপরতা দেখায় যে ভারত কীভাবে দ্বৈত মঞ্চ ব্যবহার করে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে আপস না করেই সরবরাহশৃঙ্খলের ক্ষেত্রে তাদের ঝুঁকি মোকাবিলা করছে। এটি যতটা ভারতের কূটনৈতিক উদ্যোগ, ঠিক ততটাই এসসিও সম্মেলনের আগে চীনের দিক থেকে উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল। চীনের দিক থেকে এটি মোটেই কাঠামোগত বিষয় নয়; বরং তাৎক্ষণিক কৌশলগত হিসাব।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে চীন সাত ধরনের বিরল খনিজ রপ্তানি লাইসেন্সের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ চালু করে। এতে ভারতের শিল্পমহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির শিল্পমালিকের সতর্ক করে দেন যে, এতে করে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। সব মিলিয়ে চীনের বিধিনিষেধে ভারতের শিল্প বিকাশ ও সবুজ প্রযুক্তির আকাঙক্ষা বাস্তবায়নে বিরল খনিজের গুরুত্ব যে সীমাহীন সেটা স্পষ্ট।

বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসে ভারত দর–কষাকষির জায়গা তৈরি করে নেয় এবং চীনকে কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য করে। যদিও পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, এসব প্রতিশ্রুতি তখনই কার্যকর হবে, যখন রপ্তানি লাইসেন্স লাইসেন্সের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য আসবে।

এদিকে ভারত বিরল খনিজে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। জুন মাসে দেশটির ভারী শিল্প মন্ত্রণালয় স্থানীয়ভাবে বিরল খনিজ উৎপাদনে আর্থিক সহায়তা ও মজুত গড়ে তোলার জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করে। এর উদ্দশ্য হলো চীন থেকে আমদানি করা বিরল খনিজের মূল্যের ব্যবধান কমানো। অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওডিশায় নতুন বিরল খনিজ অনুসন্ধান প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে।

বিশ্বের প্রধান দুটি কৌশলগত জোটে সদস্যপদ থাকার কারণে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত নিয়ে গঠিত কোয়াড জোটে যুক্ত হয়ে নয়াদিল্লি সরবরাহশৃঙ্খলের নিরাপত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। গত জুলাইয়ে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

এর বিপরীতে এসসিও সম্মেলনে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের উপস্থিতি দেশ দুটির সঙ্গে ভারতের টেকসই সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আনে। তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ভারত যে বাস্তব সমস্যা সমাধানে বহুপক্ষীয় চ্যানেল ব্যবহার করতে আগ্রহী, সে ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে।

এসসিও জোটের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও কোয়াডের মাধ্যমে প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করা—এই দুইয়ের মধ্য দিয়ে ভারত একটি বাস্তবসম্মত কূটনীতি পরিচালিত করছে। বিশ্বের খুব কম মধ্যম শক্তিই এ বাস্তবসম্মত পথ অনুসরণ করতে পেরেছে।

এই দ্বৈতপথ কোনো বিরোধপূর্ণ অবস্থান নয়; বরং এটি পরিকল্পিত। ভারত কোয়াডের মাধ্যমে চীনের সরবরাহশৃঙ্খলের বিকল্প পথ খুঁজছে আর দেখায়, আবার এসসিওর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা আদায় করছে।

বিরল খনিজের সরবরাহশৃঙ্খলে যদি আরও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, ভারত আরও বেশি করে কোয়াড অংশীদার হবে এবং দেশি সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। অন্যদিকে যদি কোয়াডের কার্যক্রম স্থবিরতা নেমে আসে, তাহলে এসসিও জোটের কাছ থেকে সুবিধা নিতে পারবে। তবে সন্দেহবাদীরা সতর্ক করেছেন, চীন যদি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে এবং কোয়াড অংশীদারেরা যদি তাদের কাজ বাস্তবায়নে ধীর হয়ে যায়, তাহলে ভারতের কূটনীতি অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়বে। তবে একাধিক বিকল্প রেখে ঝুঁকি কমানোর কৌশল ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পথেরই অনুসরণ।

ভারত সম্ভাব্য সংকটকে কূটনৈতিক সুবিধায় পরিণত করেছে। এসসিও জোটে যাওয়া, দেশি উৎপাদন এবং কোয়াডের মাধ্যমে ভারত তার বিরল খনিজের দুর্বলতা মোকাবিলা করতে চায়।

এটি শুধু নীতি পরিবর্তন নয়, ভারতের ভূরাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রমাণ। ভারত চায় চীন কিংবা পশ্চিমাদের ওপর নির্ভর না করে শিল্প ভবিষ্যৎ নিজস্ব শর্তে নির্ধারণ করতে। তবে ভারতের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষা হচ্ছে, দেশি বিরল খনিজের ইকোসিস্টেমটা দ্রুত গড়ে তোলা, যাতে চীনের সদিচ্ছার ওপর দেশটির নির্ভরতা কমানো যায়।

* মানিশ বৈদ্য, ভারতের অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনে জুনিয়র ফেলো
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

চীনের দুর্লভ খনিজের খনি
চীনের দুর্লভ খনিজের খনি। ছবি : রয়টার্স

গাজা যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ, লন্ডনে ৫০০ গ্রেপ্তার

গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ও যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে ইউরোপজুড়ে বড় বড় শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ–মিছিল করেছেন। যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

স্পেনের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর বার্সেলোনা ও রাজধানী মাদ্রিদে গতকাল শনিবার যে বিক্ষোভ হয়েছে তার ডাক দেওয়া হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। তবে ইতালির রোম ও পর্তুগালের লিসবনে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয় গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’কে ইসরায়েল আটক করার পর।

ইসরায়েলি বাহিনী ভূমধ্যসাগরে থাকতেই নৌবহরটি আটক করেছে। ইসরায়েলের নৃশংস হামলা ও দুর্ভিক্ষে বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টা হিসেবে এ নৌবহর বার্সেলোনা থেকে রওনা দিয়েছিল।

নৌবহর থেকে আটক ৪৫০ মানবাধিকারকর্মী ও অন্যদের মধ্যে ৪০ জনের বেশি স্পেনের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে বার্সেলোনার একজন সাবেক মেয়রও রয়েছেন।

এদিকে গাজার জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে গত শুক্রবার ইতালিতে এক দিনের সাধারণ ধর্মঘটে ২০ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন।

গত কয়েক সপ্তাহে স্পেনে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সরকার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চরম দক্ষিণপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করছে।

গত মাসে একটি সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ইসরায়েলি একটি দল স্পেনে গিয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা সেখানে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। এতে প্রতিযোগিতার আয়োজন ব্যাহত হয়।

ওই সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গাজায় চলমান যুদ্ধকে ‘জাতিহত্যা’ বলে আখ্যা দেন এবং আন্তর্জাতিক সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলি দলের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।

ইউরোপজুড়ে যখন এই বিক্ষোভ–সমাবেশ চলছিল সে সময়ে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস বলেছে, তারা গাজা যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব আংশিকভাবে মেনে নিতে রাজি আছে। গাজায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে ৬৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে উপত্যকাটি।

বার্সেলোনার টাউন হল কর্তৃপক্ষ বলেছে, সেখানে শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা পুলিশের।

বিক্ষোভে অংশ নিতে অন্য একটি শহর থেকে এক ঘণ্টা যাত্রা করে বার্সেলোনা এসেছেন ৬৩ বছর বয়সী মারিয়া জেসুস পাররা। বিক্ষোভ–মিছিলে তিনি ফিলিস্তিনের পতাকা উঁচু করে ধরে ছিলেন। মারিয়া বলেন, তিনি চান, তিনি টেলিভিশনে প্রতিদিন গাজায় নৃশংসতার যে ভয়াবহ চিত্র দেখেন তার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

মারিয়া বলেন, ‘১৯৪০–এর দশকে (ইউরোপে যেমন) দেখেছিলাম, তেমন একটি জাতিহত্যা এবার আমরা চোখের সামনে ঘটতে দেখছি, এও কীভাবে সম্ভব? এখন আর কেউ এটা বলতে পারবে না যে, সেখানে কী ঘটছে, তারা সেটা জানতেন না।’

লন্ডনে গ্রেপ্তার

ম্যানচেস্টারে একটি সিনাগগে প্রাণঘাতী হামলার পর পুলিশ লন্ডনে গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ স্থগিত করার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু অনুরোধ উপেক্ষা করে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সমর্থনে লন্ডনে গতকাল একটি বিক্ষোভ–মিছিল বের হয়। পুলিশ মিছিল থেকে অন্তত ৪৪২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। দ্য গার্ডিয়ান তার প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৫০০ বলে জানিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার ম্যানচেস্টারের ওই সিনাগগে হামলায় দুজন নিহত হন। পরে পুলিশ হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে। হামলাকারী একজন সিরীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন।

হামলার পর পুলিশ লন্ডনে সিনাগগ ও মসজিদ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। পুলিশ বলেছে, শনিবারের বিক্ষোভ তাদের এ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে।

বিক্ষোভের আয়োজকেরা পুলিশ ও সরকারের বিক্ষোভ স্থগিত করার অনুরোধ অগ্রাহ্য করে। তাঁদের যুক্তি, বৃহস্পতিবার সিনাগগে হামলার আগে এ বিক্ষোভ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ জানাতে এ বিক্ষোভ ডাকা হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-05%2Fzj5e3f2t%2FBarcelona.webp?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
স্পেনের বার্সেলোনায় ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ–মিছিল। ৪ অক্টোবর, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স