Thursday, August 15, 2024

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারত কি তার দক্ষিণ এশিয়ার মিত্রদের হারাচ্ছে? -সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের নিবন্ধ

ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ নতুন দিল্লির ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর জেরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির ওপর চীনের প্রভাব বাড়তে পারে। ওয়াশিংটনের ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের অ্যাডজান্ট ফেলো নীলান্তি সমরানায়েক বলেছেন, হাসিনার পদত্যাগ দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলির সাথে ভারতের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে।

সমরানায়েক মনে করেন, তিনি (হাসিনার) সমস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে দিল্লির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং ভারতের সাথে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক ছিল। হাসিনার দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া আঞ্চলিক সম্পর্ককে আরো খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ এখন একটি সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে যথেষ্ট সময় লাগবে, তাই অন্তর্বর্তী সরকারের ভারতের সমর্থনের প্রয়োজন হবে।

ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ বিদেশ নীতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে শুরু করেছিলেন, যার লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক দেশগুলির সাথে সম্পর্ক জোরদার করা। বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও জামায়াতে ইসলামী ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের পরিবর্তে চীন ও পাকিস্তানের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বিশেষভাবে শক্তিশালী। মে মাসে পিপলস লিবারেশন আর্মি বলেছিল যে তারা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সাথে একটি যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করবে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের পরে বাংলাদেশ চীনা অস্ত্র রপ্তানির দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাপক ছিল, যা প্রায় ১১ শতাংশ।

বাংলাদেশের পরিস্থিতির জেরে ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতি একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছে। ২০২২সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কটে সহায়তা করার পরে, ভারত একটি চীনা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্প অবরুদ্ধ করে এবং নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে শ্রীলংকায় নোঙর করা চীনা গবেষণা জাহাজে আপত্তি জানায়। তবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে যখন মোদি ভারতের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের আগে কাচাথিভু দ্বীপের উপর অধিকার দাবি করে একটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। যা ভারতের কংগ্রেস পার্টি ১৯৭৪ সালে শ্রীলঙ্কার কাছে হস্তান্তর করেছিল। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহামেদ মুইজ্জু যিনি ভারত-বিরোধী প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমেই ভারতীয় সৈন্যদের দেশ থেকে বহিষ্কার করেন। চীনের সাথে আরও শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করেন।

নেপালের কে.পি. শর্মা অলি, যাকে চীনপন্থি বলে মনে করা হয় এবং আগে আঞ্চলিক বিরোধ নিয়ে ভারতের সাথে যাঁর দ্বন্দ্ব ছিল, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে এসেছেন। ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে আফগানিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্কও উত্তেজনাপূর্ণ।

সমরানায়েক বলেন, এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ছোট দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব একটা খারাপ নয়। ভুটান ভারতের সাথে সবচেয়ে বেশি জোটবদ্ধ। যদিও অনেকে মালদ্বীপের বিদেশি সামরিক উপস্থিতি বন্ধ করার এবং প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের জন্য তার অভ্যন্তরীণ নীতির সমালোচনা করেছে, তবুও নতুন সরকার একটি সংশোধিত আকাশ নিরাপত্তা সহযোগিতা কর্মসূচিতে ভারতের বেসামরিক উপস্থিতি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিল।

সমরানায়েক উল্লেখ করেছেন যে, শ্রীলঙ্কা অন্যান্য ছোট দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মতো ভারতের সাথে অসম ক্ষমতার মুখোমুখি হয়েছিল এবং প্রায়শই ভারতের সামনে নিজেকে দুর্বল বলে মনে করতো । উদাহরণ দিতে গিয়ে সমরানায়েক বলেন, শ্রীলঙ্কার বন্দরে যে পরিমাণ জাহাজ নোঙর করার এবং রাজস্ব সংগ্রহের সুযোগ ছিল, শুধুমাত্র চীনা জাহাজ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণে সেই কার্যক্রম ১২মাসের জন্য স্থগিত রাখতে হয়। সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিতে আরো কিছুটা ধাক্কা দিতে পারে । কারণ বামপন্থী এনপিপি (ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার অ্যালায়েন্স) এর সম্ভাব্য বিজয় ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শ্রীলংকার বৈদেশিক নীতির অভিমুখকে যথেষ্ট অনিশ্চয়তার মুখে ফেলবে।

সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউট দ্বারা প্রকাশিত স্টেট অফ সাউথইস্ট এশিয়া ২০২৪ সমীক্ষা অনুসারে, ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে সবচেয়ে কম কৌশলগতভাবে প্রাসঙ্গিক অংশীদারদের মধ্যে একটি, যখন চীনকে এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কৌশলগত শক্তি হিসাবে দেখা হয়। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জরিপে অংশ নেওয়া ১০টি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশের ১৯৯৪ জন উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ০.৬ শতাংশ বলেছেন যে ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি, যেখানে চীনের দিকে রয়েছে ৫৯.৫ শতাংশ।

নাতাশা আগরওয়াল, ভারতের একজন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক যুক্তি দিয়েছিলেন যে, চীনের মতো ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক শক্তির সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে তার প্রতিবেশীদের প্রতি দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিতে স্থান পেয়েছে ‘অহংকার’। নাতাশার পরামর্শ, এই অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি ঠেকাতে গেলে ভারতকে তার প্রতিবেশী প্রথম নীতিতে সামঞ্জস্য আনতে হবে । স্বাধীন এবং সম্মিলিতভাবে ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে, সম্ভবত ভারতের জন্য তার প্রতিবেশী প্রথম নীতিকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার সময় এসেছে।

উইন-উইন পার্টনারশিপ

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে ভারতের প্রতিবেশী নীতি কিছুটা টালমাটাল হলেও সময়ের সাথে সাথে সেটি পরিবর্তিত এবং উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। বলছেন, জিন্দাল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত। এই অঞ্চলে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে তার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য দিল্লিকে অনুরোধ করেছেন শ্রীরাধা। তিনি বলছেন, ভারতকে প্রতিবেশী প্রথম নীতি থেকে বিচ্যুত হলে চলবে না। যেকোনো পরিস্থিতিতেই সেই নীতি মেনে চলতে হবে। এমনকি কঠিন পরিস্থিতিতেও ভারতকে দেখতে হবে প্রতিবেশীদের সাথে কতটা ভালো কাজ করা যায়। এমনকি ভালো সময়েও চীনের দিক থেকে যে চ্যালেঞ্জগুলি আসতে পারে সে বিষয়ে ভারতকে সচেতন থাকতে হবে।

প্রাক্তন কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াত বলেন, 'প্রতিবেশী প্রথম নীতির বিষয়বস্তু এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ভারতের এই নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিবেশীদের বৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং সক্ষমতা তৈরি করা। ভারত বিশ্বাস করে যে, নিজেদের স্বার্থেই প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা উচিত । যাতে সীমান্ত অঞ্চলগুলি জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের মতো ভারতবিরোধী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত না হয়। এটি একটি উইন-উইন পার্টনারশিপ। ত্রিগুনায়াত, যিনি এর আগে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রথম সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান এবং সম্ভবত পরবর্তী নেতৃত্বের মধ্যে পূর্বপরিকল্পিত কিছু ধারণার কারণে ভারতের প্রতি স্বল্প সময়ের জন্য নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। তবে ঢাকার সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উভয় দেশের জনগণের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক সংযোগের ওপর ভিত্তি করে। তাই যেকোনো মন কষাকষি দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে না। '

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্কট লুকাস জোর দিয়েছিলেন যে 'ভারতের আঞ্চলিক অবস্থান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার নিজস্ব স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতির উপর। তাই আঞ্চলিক পরিবর্তন সত্ত্বেও, যদি ভারতে একটি স্থিতিশীল সরকার থাকে এবং দেশ রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্রমাগত উন্নতি করতে থাকে, তাহলে আপনার সামনে সেরা সুযোগগুলি আবারো ফিরে আসবে।

'উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তার কারণে আঞ্চলিক দেশগুলি এখনও ভারতের সাথে কাজ করতে আগ্রহী।

কুগেলম্যান মনে করেন , আপনি যদি এই অঞ্চলের চারপাশে তাকান, এমনকি চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং উপস্থিতি সত্ত্বেও, তাহলে দেখতে পাবেন এখনও এমন অনেক দেশের সরকার রয়েছে যারা চীন এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে আগ্রহী এবং অনেক ক্ষেত্রে ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় তারা।

মালদ্বীপের প্রসঙ্গ তুলে কুগেলম্যান বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে দিল্লির উদ্বেগের প্রতি আরও সহনশীল অবস্থান গ্রহণ করেছে দেশটি এবং সপ্তাহান্তে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘গভীর’ করার জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সফরকে স্বাগত জানিয়েছে।

একইসঙ্গে কুগেলম্যান মনে করেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করতে পারে। তবে বাণিজ্য এবং পানি বণ্টনের মতো ব্যবহারিক বিষয়গুলি উভয়ের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক পরিচালনার মাধ্যম হতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও জনপ্রত্যাশা : একটি বিশ্লেষণ by ড. মো. সফিকুল ইসলাম

গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যূত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে যেটা বাংলাদেশের আপামর জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। ঐ দিন সকল বয়সের ও সকল স্তরের নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস প্রকাশ দেখে মনে হয়েছে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। দীর্ঘদিন পর মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ভয়াবহ নিপীড়নমূলক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, আক্রমণাত্মক বক্তব্য, মিথ্যা, প্রতারণা ও অপকৌশলের একটি রাষ্ট্রীয় রূপ দান করেছে যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থক এবং বিরোধী মতের লোকদেরকে গুম, খুন ও নির্যাতনের সকল সীমা অতিক্রম করেছিল। মানবাধিকার, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার লেশমাত্র ছিল না।

এমতাবস্থায় অকুতোভয় ছাত্রদের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের অবসান হয়। এজন্য প্রায় চার শতাধিক ছাত্র-জনতাকে জীবন দিতে হয়েছে যা দেশে-বিদেশে জুলাই ম্যাচাকার নামে পরিচিত। আমি মনে করি, এ গণ-অভ্যুত্থানে মূল চেতনা হচ্ছে বৈষম্যহীন, দুনীতিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ যেখানে সকল মানুষ রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে মুক্ত থাকবে; সকল সমাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারসমূহ সমানভাবে ভোগ করবে। ভোটাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে পাবে। এ প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার মতামতের ভিত্তিতে নোবেল বিজয়ী জননন্দিত ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে।
এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। এ প্রত্যাশা পূরণে সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু; স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সকল স্বায়ত্তশাসিত, সাংবিধানিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কার ও পুনর্গঠন প্রয়োজন। বিশেষ করে; পুলিশ প্রশাসন, জন প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সংস্কার অতীব জরুরি। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে পুলিশ বাহিনী দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দল ও বিরোধী মতকে দমন ও নিপীড়ন তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের গুম, খুন ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। তারা আওয়ামী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মত আচরণ করতেন। কথায় কথায় বিরোধী দলের মিছিল ও সমাবেশে গুলি ও ধরে নিয়ে নেতা-কর্মীদের নির্যাতন ও রিমান্ডে নেওয়া তাদের দৈনন্দিন প্যাকটিজ হয়ে গিয়েছিল। সর্বশেষ ছাত্র জনতার আন্দোলনকে দমন করার জন্য প্রায় চার শতাধিক ছাত্র-জনতা এবং বিরোধী দলীয় কর্মী-সমর্থককে গুলি করে হত্যা করেছে। প্রায় বার হাজার ছাত্র ও বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এ অবস্থায় পুলিশ প্রশাসনের যেসব সদস্য আইনের অপব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত তাদের তদন্ত করে অতি দ্রুত বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।

যেসব মেধাবী ও যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যগণ এতদিন ও.এস.ডি. ও কম গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিল তাদেরকে দিয়ে পুলিশ প্রশাসন পুনর্গঠন করা অতি জরুরি। পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে জনবান্ধব সংস্কৃতি তৈরির লক্ষ্যে তাদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দরকার। বিজিবি এর মত তাদের পোশাক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবর্তন করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা যেতে পারে।
জন প্রশাসনেরও সংস্কার প্রয়োজন। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর জন প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ দলীয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছে। বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে নির্বাচনের সময় দলীয় বক্তব্য দিয়েছে। আওয়ামী লীগের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাল জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করণে সহায়তা ও ভোট কাস্টিং এর হার বাড়িয়ে দেখিয়ে নির্বাচনকে আইনগত বৈধতা দান করেছে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও অবর্ণনীয় নিপীড়নের সহযোগী হিসেবে করেছে তাদের বরখাস্ত করে যারা এতদিন উপেক্ষিত ছিল এবং দক্ষ ও যোগ্য তাদেরকে দিয়ে জন প্রশাসন পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু, বিচার বিভাগ বিগত আওয়ামী সরকারের দুঃশাসনকে বৈধতাদানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০১১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কের বিধানকে অবৈধ ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ও তিনটি জাল-জালাতিপূর্ণ নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় শাস্তি দিয়ে কারারুদ্ধ করেছে। বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী ও বিরোধী মতের লোকদেরকে, বিশেষ করে, সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদেরকে হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলায় ডিমান্ড দিয়ে পুলিশকে নির্যাতনের সুযোগ করে দিয়েছে। অসংখ্য বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও বিরোধী মতের লোকদেরকে কারারুদ্ধ করেছে। বিচার বিভাগ থেকে এসব বিচারকদের সরিয়ে বিচার বিভাগ পুনর্গঠন করতে হবে। বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ নিরপেক্ষকরণ এবং উচ্চ আদালতে যোগ্য ও নিরপেক্ষ বিচারপতি নিয়োগের আইন করতে হবে। তাছাড়া, দুর্নীতি দমলো কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সরকারি, স্বায়তশাসিত, রাষ্ট্রত্ব প্রতিষ্ঠান থেকে দলীয় কর্মকর্তাদেরকে সরিয়ে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

এছাড়া অন্তর্বর্তীকালনি সরকারের প্রধান কাজ হবে গণতন্ত্র পুনঃ:প্রতিষ্ঠা, বিশেষ করে, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে নির্বাচন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে। তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়। বিগত তিনটি নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে, তরুণ ভোটারগণ ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ব্যবস্থা জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনসহ পুরো নির্বাচনীয় ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। বাংলাদেশে ইতিহাসে সবচেয়ে জালিয়াতিপূর্ণ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ নির্বাচন যেসব কমিশন পরিচালনা করেছেন তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। এ সরকারের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি না হলেও তাদের প্রতি ব্যাপক জন সমর্থন রয়েছে। আশা করি এ সরকার প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য কতটা: ভারতের প্রধান বিচারপতি

ভারতের প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় বলেছেন- বাংলাদেশ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য কতটা। ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শেষে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা দিবস আমাদেরকে দেশের জনগণের একে অপরের প্রতি দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতিকে সংবিধানের সব মূল্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় আরও বলেন, বাংলাদেশে এখন যেটা ঘটছে তা স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান তা পরিষ্কারভাবে আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বাধীন হওয়া বা স্বাধীনতা মঞ্জুর হওয়া সহজ। কিন্তু এই বিষয়গুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা অনুধাবনের জন্য আমাদের অতীতের কাহিনীগুলো স্মরণ করা উচিত। অর্থাৎ অতীতে কার কি অবদান সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি। বার্তা সংস্থা পিটিআইকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন আউটলুক ইন্ডিয়া। উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রজনতার প্রতিবাদ বিক্ষোভে ৫ই আগস্ট পদত্যাগ করে পালিয়ে ভারতে চলে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটের দিকে ইঙ্গিত করেন প্রধান বিচারপতি। স্বাধীনতা দিবসে সাংবাদিকদের উদ্দেশে ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় বলেন, এদিন উপলক্ষ্যে আমি আপনাদের সবাইকে, আমাদের সাংবাদিক সমাজের কেন্দ্রীয় সদস্যদের স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে, বিশেষ করে যারা আইনের সঙ্গে যুক্ত তাদেরকেও স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। এটা এমন একটা দিবস যেদিন আমাদেরকে একে অন্যের প্রতি দায়িত্ব পালনের কথা, দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, ভারতের সাধারণ মানুষদের দৈনন্দিন জীবনের কঠিন সময়গুলোর সংগ্রামের বিষয়ে কাজ করাই আদালতের বৈশিষ্ট্য। পতাকা উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। তিনি বলেন, সবার ওপরে সংবিধান। যদি এটা আইনসভা, নির্বাহী ও বিচারবিভাগ সমুন্নত রাখে তাহলে ভারত হবে একটি উন্নত দেশ। সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এবং সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিবাল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহার লাল নেহরুর বক্তব্যকে স্মরণ করেন। তাহলো দেশ স্বাধীনতাকে লালন করছে।

ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়

প্রথম আলোঃ বরেণ্য চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের রাজশাহীর পৈতৃক বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে পাশে থাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রকর্মীরা বলছেন, বাড়ি ভাঙার ফুটেজ যাতে না দেখা যায়, এ কারণে কলেজে থাকা সিসিটিভি বন্ধ করে রাখা হয়। এ ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, সিসিটিভি তারা বন্ধ করেনি।

এর আগে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর পেয়ে গতকাল বুধবার দুপুরে জড়ো হন রাজশাহীর চলচ্চিত্রকর্মীরা। এ সময় কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চলচ্চিত্রকর্মীদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে ঠিকাদার দাবি করেছেন। তবে কলেজের অধ্যক্ষ বলছেন, তাঁদের সাবেক শিক্ষার্থীরা এটা ভেঙে ফেলেছেন।

স্থানীয় সূত্র ও চলচ্চিত্রকর্মীরা বলেন, গতকাল ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি ভাঙার খবর পেয়ে তাঁরা নগরের মিয়াপাড়া এলাকায় জড়ো হন। সেখান থেকে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে তাঁরা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে যান।

সেখানে দেখতে পান, গত ৬ আগস্ট দুপুর ১২টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত কলেজের সিসিটিভি চলছিল। এর পর থেকে সিসিটিভি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো ফুটেজ ধারণ হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, এই ভাঙচুরে কলেজ প্রশাসন রয়েছে।

সিসিটিভি বন্ধ হওয়ার বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ আনিসুর রহমান বলেন, ‘এর আগেও সিসিটিভি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা নতুন কিছু না। এটা আমরা বন্ধ করিনি। আমি এটা খুব বেশি বুঝিও না। ওই দিন থেকে বাইরের সাইটের তিনটি ক্যামেরা মিসিং আছে। ওই দিন যাঁরা (সাবেক শিক্ষার্থী) এসেছিলেন, তাঁরা এটা করেছেন কি না, তা–ও বলতে পারছি না।’

এদিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ গতকালই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. মহিনুল হাসানকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। তিনি আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন। সিসিটিভি ফুটেজ তিনিও ওই দিন পর্যন্তই পেয়েছেন। তিনি আজ ঋত্বিক ঘটকের বাড়িতে এসে চলচ্চিত্রকর্মী ও কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাড়ি পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, তিনি খুব দ্রুত এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন। এই কাজ করেছে যারা, সেই দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। খুব দ্রুতই এখানে সবাইকে নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের নামে দৃশ্যমান কিছু করবে জেলা প্রশাসন।

আজকেও ঋত্বিক ঘটকের বাড়িতে এসেছিলেন চলচ্চিত্রনির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম সাইক। তিনি বলেন, আগামী ৪ নভেম্বর ঋত্বিক ঘটকের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এখানে উৎসব করা হবে। সে ক্ষেত্রে এখানে দ্রুতই একটি উন্মুক্ত মঞ্চ, অফিস কাম লাইব্রেরি করে দেবে জেলা প্রশাসন। পরে এখানে ঋত্বিক ঘটক কমপ্লেক্স করা হবে। তাঁরা আজকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আশ্বাস পেয়েছেন। সিসিটিভি বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ হয়। উনি কিছু না করলে এটা কী করে সম্ভব যে বন্ধ হয়ে যাবে।’

ঋত্বিক ঘটক জীবনের শুরুর সময়টা কাটিয়েছেন পৈতৃক বাড়ি রাজশাহীতে। এই বাড়িতে থাকার সময় তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে পড়েছেন। রাজশাহী কলেজ ও মিয়াপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার মাঠে প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে নাট্যচর্চা করেছেন। ওই সময় ‘অভিধারা’ নামে সাহিত্যের কাগজ সম্পাদনা করেছেন ঋত্বিক। তাঁকে ঘিরেই তখন রাজশাহীতে সাহিত্য ও নাট্য আন্দোলন বেগবান হয়। এই বাড়িতে থেকেছেন ঋত্বিক ঘটকের ভাইঝি বরেণ্য কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী।

এই বাড়ির পুরো ৩৪ শতাংশ জমি ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকার রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজকে ইজারা দেয়। কলেজটি বাড়ি ঘেঁষেই পশ্চিম পাশে রয়েছে। ২০১৯ সালে বাড়িটির একাংশ ভেঙে সাইকেল গ্যারেজ তৈরির অভিযোগ উঠেছিল কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। তখন রাজশাহীসহ সারা দেশে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। পরে ২০২০ সালে বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় রাজশাহী জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন থেকে পরে ভূমি মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ঋত্বিক ঘটকের বাড়িটি ইজারা থেকে অবমুক্ত করে ঋত্বিক ঘটকের নামে দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল।

‘রেজিস্ট্যান্স উইক’ ‘প্রতিবিপ্লব করার চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকবে না’

আওয়ামী লীগ যদি প্রতিবিপ্লব করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। তাই দেশ নিয়ে ছেলে খেলা না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ অন্যরা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের রাজপথে নামার প্রয়োজন ছিল না উল্লেখ করে সারজিস আলম বলেন, কিন্তু ওই কুচক্রী মহল ও ফ্যাসিজমের দোসররা এখনো চক্রান্ত করছে। তারা দেশের এবং দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন জনের সাথে মিলে বিভিন্ন অপকর্ম করছে। তারা বিভিন্ন অপচেষ্টা করে যে ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে, সেটি প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্র-জনতাকে আবার রাস্তায় নেমে আসতে হয়েছে। আমরা চাই না আমাদের রাস্তায় নামার মাধ্যমে আমাদের একজন ভাই-বোনের চলাফেরায় বিন্দুমাত্র অসুবিধা হোক। কিন্তু দেশ যখন সংকটে পড়ে যায়, তখন আমাদের কষ্ট করে হলেও রাস্তায় নামতে হয়। কারণ দেশ যদি দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। সে জায়গা থেকে আমরা ছাত্র-জনতা আজকে আবার রাস্তায় নেমে এসেছি।

তিনি বলেন, আমরা শুনছি বিভিন্ন মহল থেকে আজকের ১৫ই আগস্টকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ থেকে শুরু করে স্বৈরাচারের যারা দোসর ছিল তারা আবার একটি পাল্টা গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, ছাত্র-জনতা গত ৫ই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়েছে, তারা যদি আবার দেশে একটি পাল্টা গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর বিন্দু মাত্র চেষ্টা করে, তাহলে তাদের আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না। এজন্য তাদের আমরা ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে হুঁশিয়ার এবং সাবধান করে দিতে চাই, এদেশ নিয়ে আর কোন ছেলেখেলা করার চেষ্টা করবেন না।

তিনি আরও বলেন, এ দেশটা ছাত্র জনতা মিলে একসাথে যেদিকে যাওয়া প্রয়োজন সেদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা করা প্রয়োজন আমরা তাই করব। কেউ যদি আমাদের এই দেশ নিয়ে বিন্দুমাত্র কোন অপচেষ্টা করে ছাত্র-জনতা যে কোন মুহূর্তে রাস্তায় নেমে তাদের প্রতিহত করবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চার দফার প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, আমরা এই ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’ দিয়েছি এই জায়গা থেকে যে, বিভিন্ন মহল থেকে আমাদের কাছে খবর আসছে কিছু দোসর শয়তানকে নিয়ে তারা (আওয়ামী লীগ) এই সপ্তাহে একটি পাল্টা গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে চায়। সেই জায়গা থেকে আমাদের ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’ দেয়া। তারা যদি তাদের জায়গা থেকে কোনো নোংরা পরিকল্পনা করে, এগুলোকে প্রতিহত করার জন্য আমরা ছাত্র-জনতা এই ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’ কর্মসূচি দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রয়েছে আমরা বিশ্বাস করি সেটি ছাত্র জনতার সরকার। আমরা আমাদের দাবির বিষয়ে তাদেরকে প্রশ্ন করবো, চাপে রাখবো। আমরা এটাও বিশ্বাস করি, তাদের সদিচ্ছা রয়েছে। তারা আমাদের দাবিগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে মেনে নিবে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে যে দাবিগুলো জানিয়েছি, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে, তাদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা শুরু হয়েছে। আমাদের এই সরকারের ওপর আস্থা আছে। আমরা বিশ্বাস করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেগুলো করবে। কিন্তু তাদের মধ্য যদি আমরা কোন দীর্ঘসূত্রিতা দেখি, আমরা বলে দিচ্ছি, আমরা তাদেরকে যেমন ওই গদিতে বসাতে পারি, তাদেরকে আমরা নামাতেও পারি। আমরা তাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছি, আমরা জানি কোন কাজটা করতে কতটুকু সময় লাগে। ততটুকু সময়ের মধ্যে এই কাজটি অবশ্যই হতে হবে। তা না হলে ছাত্র-জনতা এই শাহবাগের মঞ্চ থেকে পুরো বাংলাদেশে আবার তাদের বিরুদ্ধেও কথা বলবে।

দুপুর সাড়ে ১২টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শাহবাগের জাদুঘরের সামনে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’ কর্মসূচি চলছে। অন্যদিকে শাহবাগের ফুলের দোকানে সামনে সাংস্কৃতিক সমাবেশ করছে বৈষম্যবিরোধী সাংস্কৃতিক জোট।

‘ভাবছে বাংলাদেশে একটা ঘটনা ঘটেছে, সেটা টেনে এনে যদি ক্ষমতা দখল করতে পারি’ by সেবন্তী ভট্টচার্য্য

আরজিকর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনকাণ্ডে যখন তদন্ত শুরু করল সিবিআই। তখন বিরোধীদের নিশানা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টানলেন বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। বললেন, ‘ভাবছে বাংলাদেশে একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে সেটা টেনে এনে যদি ক্ষমতা দখল করতে পারি। আমি বলি, আমি ক্ষমতার মায়া করি না। আমি বলি-যতদিন বাঁচব, মানুষের সেবা করে যাব। মানুষকে ন্যায়বিচার দিয়ে যাব। যার জন্য আমি ফাঁসির দাবি করেছিলাম, পুলিশকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়েছিলাম'।

আরজিকর কাণ্ড নিয়ে প্রথম থেকেই সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আশ্বাস দিয়েছেন নিরপেক্ষ তদন্তের। রোববারের মধ্যে তদন্তে অগ্রগতি না হলে, সিবিআই’র হাতে তদন্তভার তুলে দেবেন বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

তবে তার আগেই কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে মঙ্গলবারই সিবিআই’র হাতে আরজিকর কাণ্ডের তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়। মমতা প্রশ্ন তোলেন, ‘বলুন, কোন অ্যাকশনটা আমরা নিইনি? ১২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ ১৬৪ জনকে কাজে লাগিয়েছিল। একমাসের সিসি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়েছে। রোববার পর্যন্ত সময় দিয়েছিলাম। তার আগেই সিবিআইয়ের হাতে মামলা তুলে দেওয়া হল। রোববারের মধ্যে মামলার কিনারা হোক। আমরা ফাঁসি চাই।’

কী প্রতিক্রিয়া বিরোধী শিবিরে? বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা বলেন, ‘রাজ্যে যদি একটা ঘটনা ঘটত, তাহলে দুর্ঘটনাবশত ঘটে গিয়েছে এটা বোঝা যেত। সবচেয়ে বড় বিষয়, তিনি একজন নারী মুখ্যমন্ত্রী, তার রাজ্যতে সবচেয়ে বেশি নারী অপমানের শিকার হচ্ছেন। এত নারীর অপমান হয়েছে এবং প্রতিক্ষেত্রে উনি বলে দিচ্ছেন, ওই নারীর  চরিত্র খারাপ ছিল। ওই মহিলার দোষ ছিল। একটা কেস কেউ বলতে পারবে, যেখানে উনি নির্যাতিতার পাশে দাঁড়িয়েছেন । প্রত্যেকবার ধর্ষণকারী কিংবা খুনি তার পাশে উনি দাঁড়িয়েছেন। এটাই দুর্ভাগ্য।’

গোটা আফ্রিকায় এমপক্সের প্রাদুর্ভাব, বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা জারি

আফ্রিকার কিছু অংশে এমপক্সের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক। আগে এটি মাঙ্কিপক্স নামে পরিচিত ছিল। আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে এমপক্সের প্রাদুর্ভাবের সময় কমপক্ষে ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে বৈশ্বিকভাবে উদ্বেগ বেড়েছে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে রোগটি পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিজ্ঞানীরা এই রোগের একটি নতুন রূপ শনাক্ত করেছে যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে উদ্বিগ্ন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইসাস বলেছেন, আফ্রিকা এবং তার বাইরে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে যা খুবই উদ্বেগজনক। ভয়াবহ সংক্রমনকারী এই রোগটির প্রাদুর্ভাব বন্ধ করতে এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। এমপক্স পাশাপাশি অবস্থানের ফলে এক মানুষের শরীর থেকে দ্রুত অন্যদের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষ করে লিঙ্গ, ত্বক থেকে ত্বকের যোগাযোগ এবং কথা বলা বা অন্য ব্যক্তির কাছাকাছি শ্বাস নেওয়া থেকেও রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শরীরে প্রথমে ফ্লুর মতো উপসর্গ দেখা দেয় পরে তা ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি করে যা ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম। এই রোগে আক্রান্ত প্রতি ১০০ জনে ৪ জনের মৃত্যু হয়। এমপক্সের দুটি প্রকার রয়েছে। যা ক্লেড-১ এবং ক্লেড-২ নামে চিহ্নিত করেছে বিজ্ঞানীরা। কঙ্গোতে এ বছর মোট ১৩ হাজার ৭০০টির বেশি রোগীর শরীরে এমপক্স শনাক্ত করা হয়েছে যাদের কমপক্ষে ৪৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালে এমপক্সের কারণে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। সেসময় তুলনামুলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ ক্লেড-২ শ্রেণীর এমপক্স শনাক্ত করেছিল বিজ্ঞানীরা। তখন রোগটি শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পরেছিল। এতে প্রায় ৮৭ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল যাদের মধ্যে ১৪০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
সূত্র: অনলাইন বিবিসি।

ভারতীয় গোয়েন্দারা বঙ্গবন্ধুকে দুবার সতর্ক করেছিলেন

রমেশ্বর নাথ কাও
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে চলতে থাকা ষড়যন্ত্রের কথা জানত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের আগে অন্তত দুবার রয়ের পক্ষ থেকে ষড়যন্ত্রের কথা বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেসব বিশ্বাস করেননি।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান রমেশ্বর নাথ কাও বা আর এন কাও নিজেই এ তথ্য জানিয়েছিলেন। তিনি ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত র’এর দায়িত্বে ছিলেন। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর উপদেষ্টা ছিলেন।

১৯৮৯ সালে ভারতের ইংরেজি সাপ্তাহিক সানডের ২৯ এপ্রিল সংখ্যায় র’এর ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে আর এন কাও এর কিছু অংশের প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সেখানেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা এবং তাঁদের পক্ষ থেকে সতর্ক করে দেওয়ার কথা তিনি জানান। এমনিতে আর এন কাও খুব একটা মুখ খুলতেন না। কিন্তু সংবাদ প্রকাশিত হলে এর ব্যাখ্যা বা প্রতিবাদ হিসেবে তিনি কিছু কথা বলেছিলেন।

আর এন কাও তাঁর প্রতিক্রিয়ায় লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অসন্তুষ্ট অংশ যে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে, সে তথ্য র আগেই পেয়েছিল। আমি এ নিয়ে সে সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলি। তাঁকে জানাই যে এ তথ্য আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র থেকে পেয়েছি এবং এই সূত্রের নাম যেকোনো মূল্যে গোপন রাখতে হবে।’

আর এন কাও এ বিষয়ে আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে আমি ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা যাই। এই সফরকালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার সময় আমি তাঁকে পায়চারি করতে করতে বঙ্গভবনের বাগানে যেতে অনুরোধ করি। সবার অগোচরে নিয়ে গিয়ে আমি আমার তথ্য তাঁকে জানাই যে তাঁর জীবন হুমকির মধ্যে রয়েছে। তিনি সে সময় আনন্দপূর্ণ একটি পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, “ওরা সবাই আমার নিজের ছেলে। আমাকে আঘাত করবে না।” আমি কোনো ধরনের তর্কের মধ্যে না গিয়ে কেবল বললাম, আমাদের তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং এই ষড়যন্ত্রের যেসব তথ্য পেয়েছি, তা বিস্তারিত পাঠাতে পারব।’

আর এন কাও এরপর লেখেন, ‘এই আলোচনার অংশ হিসেবেই ১৯৭৫ সালের মার্চে আমি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঢাকায় পাঠাই। তিনি ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে যেসব তথ্য আমাদের কাছে আছে, সে অনুযায়ী তাঁকে জানান যে সেনাবাহিনীর দুটি ইউনিট, বিশেষ করে গোলন্দাজ (আর্টিলারি) ও অশ্বারোহী বাহিনী (ক্যাভালরি) তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু দুঃখজনক যে শেখ মুজিব আমাদের সব সতর্কতাই উপেক্ষা করেছিলেন।’

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এই বার্তা তিনি নানাভাবেই পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই বিশ্বাস করতে পারেননি কোনো বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে।

(প্রথম আলো থেকে প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০০৭)

বহু বাধা পেরিয়ে ৩৪ বছর পর হত্যার বিচার

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অরডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন।

১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর খুনিদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।

১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ নানা কারণে আটবার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। অন্যদিকে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় প্রদান করে। বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বজায় রাখেন। কিন্তু অপর বিচারক এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পরে হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচার কাজ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামিকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন।

২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর- ২৯ দিনের শুনানির পর চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওইদিন (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর করে জাতিকে দায়মুক্ত করা হয়।

খন্দকার মোশতাকের উত্থান-পতন by এমরান হোসাইন শেখ

খন্দকার মোশতাক আহমেদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতক হিসেবে যে নামটি সবার আগে আসে, তা হলো খন্দকার মোশতাক আহমদ। দেশের আপামর জনগণের কাছে একজন নিন্দিত ও ঘৃণিত ব্যক্তি। বন্ধু হিসেবে বুকে টেনে নেওয়া জাতির পিতার হত্যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন এই বিশ্বাসঘাতক। জাতির পিতাকে হত্যার পরপরই নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও।

১৯১৯ সালে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির দশপাড়া গ্রামে জন্ম মোশতাক আহমদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনকারী এই ঘাতকের শুরুর জীবন এতটা কালিমালিপ্ত দেখা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। ছাত্র রাজনীতিতে তার বিচরণ ছিল। মুসলিম লীগের ছাত্র শাখার নেতৃত্ব পালন করেন। পরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। এ সময় উদীয়মান তরুণ এবং ক্যারিশমেটিক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নজরে আসেন মোশতাক। তখন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিল তার পদচারণা।

মোশতাক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অতি ভক্ত। আওয়ামী লীগের ভেতর তিনি ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দলে বামপন্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়লে মোশতাক আওয়ামী লীগে আরও ‘গুরুত্বপূর্ণ‘ হয়ে ওঠেন। অতি বিনয়ী ভদ্রতার মুখোশ পরা হাসিতে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতেন।

খন্দকার মোশতাক ১৯৪২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হলে ১৯৫৪ সালে তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৫৫ সালে তিনি মুক্ত হয়ে আবারও সংসদে যুক্তফ্রন্টের চিফ হুইপ হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করার পর তিনি আবারও বন্দি হন। তিনবার জেল খেটে বঙ্গবন্ধুর আরও কাছে আসেন। ৬ দফা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গ্রেফতারও হন। দেশের আটটি রাজনৈতিক দল ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করলে তাতে খন্দকার মোশতাক আহমদ পশ্চিম পাকিস্তান অংশের সমন্বয়ক ছিলেন। ১৯৬৯ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খানের ডাকা গোলটেবিল বৈঠকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মোশতাক অন্যদের মতো ভারতে পাড়ি জমান এবং মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করলে সেখানেও বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয় মোশতাককে। ১৯৭৫ সালে মন্ত্রণালয় পরিবর্তন করে তাকে করা হয় বাণিজ্যমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভারত নীতিতে মোশতাকের সমর্থন ছিল না। তবুও বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবজাত মহানুভবতায় তাকে নবগঠিত বাকশালে ঠাঁই দেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য ও আসামির জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, পচাঁত্তরের মাঝামাঝি মোশতাকের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তিনি নিজে ও আত্মীয়দের মাধ্যমে সেনা সদস্যদের নিয়ে জাতির পিতাকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এ সময় গাজীপুর, কুমিল্লাসহ ঢাকায় সহযোগীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামি তাহের উদ্দিন ঠাকুর জবাববন্দিতে বলেন, ‘‘১৯৭৫ সালের মে বা জুনের প্রথম দিকে গাজীপুরের সালনা হাইস্কুলে ঢাকা বিভাগীয় স্বনির্ভর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সালনাতে মোশতাক সাহেব সেনা অফিসারদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাদের আন্দোলনের অবস্থা কী?’ জবাবে তারা জানান যে, ‘বস সবকিছুর ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমরা তার প্রতিনিধি।’ ১৯৭৫ সালের জুনে দাউদকান্দি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সেনা অফিসারদের মধ্যে মেজর রশীদ, মেজর বজলুল হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর ফারুক যোগদান করেন।

১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সচিবালয়ে গেলে খন্দকার মোশতাক বলেন, ‘এ সপ্তাহে ব্রিগেডিয়ার জিয়া দুইবার এসেছিলেন। তিনি এবং তার লোকেরা তাড়াতাড়ি কিছু একটা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।’ আমি জিজ্ঞাসা করায় খন্দকার মোশতাক জানান, ‘বলপূর্বক মত বদলাইতে চায়, প্রয়োজনবোধে যেকোনও কাজ করতে প্রস্তুত।’ খন্দকার মোশতাককে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানান যে, তিনি তার মতামত দিয়েছেন। কারণ, এছাড়া অন্য আর কাজ কিছু নাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল অনুমান ৬টার সময় খাদ্যমন্ত্রী টেলিফোনে আমার কাছে জানতে চান যে, ‘গুলির আওয়াজ শুনেছি কিনা।’ আমি না বলে জানাই। পরে আমাকে পুনরায় টেলিফোনে রেডিও শুনতে বলেন। রেডিওতে শুনি মেজর ডালিমের ঘোষণা, ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’ বুঝলাম, তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’’

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুর হত্যার মূল পরিকল্পনায় যে মোশতাক ছিলেন, তা স্পষ্ট হয় ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পরপরই। ওইদিনই মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সূর্যসন্তান বলে আখ্যায়িত করেন। ক্ষমতায় বসে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মোশতাক ইমডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান চালু করেন। তার শাসনামলেই চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মো. মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কারাবন্দি করা হয় আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীকে। অবশ্য এত কিছুর পরও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি মোশতাক। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর খালেদ মোশারফের পাল্টা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তাকে বন্দি করা হয়। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর মোশতাক প্রথমে বন্দি থাকলেও ১৯৭৬ সালে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্ত হয়ে ডেমোক্রেটিক লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে গিয়ে ব্যর্থ হন। পরে সামরিক শাসককে অপসারণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। আদালত তাকে পাঁচ বছরের শাস্তি প্রদান করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। তবে রাজনীতিতে আর সফলতা পাননি। হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী আ.ফ.ম. মুহিতুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু এর আগেই ওই বছরের ৫ মার্চ মোশতাক মৃত্যুবরণ করেন। ফলে হত্যার দায় থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি।

মৃত্যুর পর পুলিশ পাহারায় দাউদকান্দির দশপাড়ায় তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে সীমানা প্রাচীর ঘেরা তার বাড়িতে দোতলা একটি ভবন রয়েছে। এছাড়া, সেখানে একটি মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান আছে। মোশতাকের ছেলেমেয়েরা বিদেশে বসবাস করেন। প্রথমদিকে তারা মাঝে মধ্যে দেশে এলেও জনরোষের ভয়ে গত কয়েক বছর ধরে তারা দেশে ফেরেননি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে মোশতাক আহমেদের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন,‘‘খন্দকার মোশতাককে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সূক্ষ্ম কূটচাল চালতে দেখেছেন। দেশে যখন পুরোদমে যুদ্ধ চলছিল, মোশতাক বলাবলি করতেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে জীবিত পেতে চাইলে দেশ স্বাধীন হবে না।’ তবে আমরা কৌশল করে তার জবাবে বলতাম— দুটোই চাই। ষড়যন্ত্রের কারণে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় মোশতাককে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। তখন অলিখিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় কাজ করতেন আব্দুস সামাদ আজাদ। ওই সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা জোরদার করেন মোশতাক। তার এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি প্রমাণিত হয় ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে।’’

‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে মোশতাককে নিয়ে বঙ্গবন্ধু
মোশতাকের গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে বেশ কয়েকবার খন্দকার মোশতাক আহমদের নাম এসেছে। বইয়ের নির্ঘণ্টে দেখা গেছে, ৮টি পৃষ্ঠায় তার নাম বা প্রসঙ্গ এসেছে। দেখা গেছে, কোনও কোনও পৃষ্ঠায় একাধিকবার তার নাম এসেছে। বইয়ে উল্লিখিত সময়ে খন্দকার মোশতাক নিজেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জেলে ছিলেন। কখনও একই জেলখানায় কখনও ভিন্ন স্থানে। বঙ্গবন্ধু তাঁর বর্ণনায় কখনও কখনও মোশতাকের শারীরিক অসুস্থতা বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন।

রোজনামচা বইয়ে বঙ্গবন্ধু ও খন্দকার মোশতাক জেলে থাকতে কোনও এক বাংলা নববর্ষে (১৫ এপ্রিল) পরস্পরকে ফুল পাঠিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া, এক কোরবানির ঈদে একসঙ্গে নামাজ পড়ার কথাও রয়েছে। মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধু তাকে বন্ধু বলে সম্বোধন করেছেন। কখনও বা নাম উল্লেখ করেছেন। মোশতাক অন্য জেলে থাকলে বিভিন্ন মাধ্যমে তার খবর নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

জেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোশতাক সম্পর্কে বইয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার জায়গা থেকে আমি দেখলাম, মোশতাক হাসপাতালের বারান্দায় চেয়ারে বসে রয়েছে। চেনাই কষ্টকর। বেচারাকে কী কষ্টই না দিয়েছে! একবার পাবনা, একবার রাজশাহী একবার ঢাকা জেল।’

আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘খন্দকার মোশতাক আহমদ ও আবদুল মোমিন সাহেব হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মোশতাক সাহেবের শরীর খুবই খারাপ। ওজন অনেক কম হয়ে গেছে। মোমিন সাহেব এখন ভালো। তাদের সাথে দেখা হয়েছিল হাসপাতালের দরজায়। তারা সব দলের ঐক্য চায়। তবে পূর্ব বাংলার দাবি ছেড়ে নয়, ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছে।’

৬ দফা আন্দোলনের সময় একসঙ্গে জেলে যাওয়ার পর অন্যান্য নেতার পাশাপাশি মোশতাক সম্পর্কেও বর্ণনা করেছেন জাতির পিতা। তিনি লিখেছেন, ‘মোশতাক সাহেব তো পুরনো পাপী। অত্যন্ত সহ্য শক্তি, আদর্শে অটল। এবার জেল তাকে বেশি কষ্ট দিয়েছে— একবার পাবনা জেলে, একবার রাজশাহী জেলে, আবার ঢাকা জেলে নিয়ে। কিন্তু সেই অতি পরিচিত হাসিখুশি মুখ।’

২৩-২৭ এপ্রিল ১৯৬৭ সময়ের একটি বর্ণনায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন, বিশিষ্ট নেতা খোন্দকার মোশতাক আহমেদ জেলে আছি। আমরা ছয় দফা দাবির জন্য জেলে এসেছি।’

কারাগারের রোজনামচা বইয়ে জাতির পিতা যেসব রাজনীতিক বা ব্যক্তির বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন, বইটির শেষাংশে তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। এসব ব্যক্তিত্বের মধ্যে খোন্দকার মোশতাক আহমেদও রয়েছেন। বইটিতে তার জীবনী সম্পর্কে যা তুলে ধরা হয়েছে তা হলো— ‘খোন্দকার মোশতাক আহমদ (১৯১৯-১৯৯৬): বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী অংশের নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নানা সন্দেহজনক ও বিতর্কিত কাজে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারের (১৯৭১-৭৫) বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্মান্তিক ও ষড়যন্ত্রমূলক হত্যায় তার (মোশতাক) গোপন সমর্থন ও সহায়তা ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৯৭৫-এ দেশদ্রোহী স্বাধীনতাবিরোধী কতিপয় সেনা সদস্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর তাকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসায়। ক্ষমতায় বসেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের কতক মৌলিক রাষ্ট্রীয় আদর্শের পাশ্চাৎমুখী পরিবর্তন ঘটান। তিনি বাংলাদেশের একজন নিন্দিত রাজনীতিবিদ।

>>>তথ্য সূত্র: বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার একাধিক আসামি ও সাক্ষীর সাক্ষ্য, কারাগারের রোজনামচাসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একাধিক বই এবং গণমাধ্যমে দেওয়া আমির হোসেন আমুর একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ।

সেই মহামৃত্যুঞ্জয় by আনিসুজ্জামান

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ট্রাইব্যুনালে
জেলখানা থেকে নিয়ে যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান, ১৯৬৯। ছবি: সংগৃহীত
একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে কী করে তিনি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থপতি হলেন? মুজিব বা মুজিব ভাই থেকে কেমনভাবে হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু? এ তাঁর একাগ্রতার গুণে, স্থির লক্ষ্যের জোরে।

কৈশোরে যে-পরিবেশে লালিত হয়েছিলেন, সেখানে সম্প্রদায়ভেদ ও ছোঁয়াছুঁয়ির বাধানিষেধের একটা জায়গা ছিল। তাতে আহত বোধও করেছেন। মুসলিম লীগের রাজনীতি যে তাঁকে টেনেছিল, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তারই মধ্যে কলকাতায় ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার সময়ে, ইসলামিয়া কলেজের অর্থনীতির শিক্ষক ভবতোষ দত্তকে কয়েকজন ছাত্র মিলে মুসলমান এলাকা পার করে হিন্দু অঞ্চলের সীমান্তে পৌঁছে দিয়েছেন, আবার পরদিন সেখান থেকে নিয়ে এসেছেন। অনেক দিন পরে স্মৃতিকথায় ভবতোষ দত্ত লিখেছেন, ওই ছেলেদের দলপতি ছিল শেখ মুজিবুর রহমান। মুসলিম লীগ কর্মী যে-মানবিকতা জলাঞ্জলি দেননি, এ তারই প্রমাণ।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় যত আনন্দ পেয়েছিলেন, বঙ্গ-বিভাগে ততটা বেদনা অনুভব করেছিলেন। পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের কর্মধারায় দুঃখিত হয়েছিলেন ততোধিক। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের এক নেতা তিনি, গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাস করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যত দিন না ছাত্রদের সমঝোতা হয়, চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

তারপর তো জেলযাত্রা হয়ে গেল নিয়মিত। তাঁকে পাকিস্তান-আন্দোলনের সৈনিক বলে জানত, এমন এক অবাঙালি কারারক্ষীর তাঁকে কারাগারে দেখে বিস্ময় লেগেছিল—এমন লোকও কারারুদ্ধ হয়!

কিন্তু কারাগারই তাঁর বাসস্থান, তাঁর শিক্ষায়তন হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষা নিয়েছিলেন অনেকটা সেখান থেকেই। পূর্ব বাংলায় নতুন বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মকর্তা নির্বাচিত হন কারাগারে থাকতেই। বিয়ে করেছেন, সন্তানও হয়েছে, কিন্তু রুজি-রোজগারের সন্ধান করেননি।রাজনীতিই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। সে-রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি অতটা নয়, যতটা বাঙালির অধিকার আদায়ের রাজনীতি।

প্রাদেশিক মন্ত্রী হয়েছিলেন। একবার তো কয়েক দিন পরে আবার কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন, আরেকবার মন্ত্রিত্ব ছাড়েন নিজের রাজনৈতিক দলের কাজ করবেন বলে। সাংগঠনিক প্রতিভা ছিল, মানুষকে মনে রাখতে পারতেন। ছুটে বেড়াতে পারতেন প্রদেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। তাঁর রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দীর মতো কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে উৎসাহ ছিল না তাঁর, বরঞ্চ যাঁর সমালোচনা করতেন, যাঁর সঙ্গে পাতিয়েছিলেন নানা-নাতির সম্পর্ক, সেই এ কে ফজলুল হকের মতো প্রাদেশিক রাজনীতিই ছিল তাঁর সব।

আওয়ামী মুসলিম লীগ আওয়ামী লীগ হয়েছে, তার পেছনে কাজ করেছে তাঁর উৎসাহ। পূর্ব বাংলার নাম পূর্ব পাকিস্তান হয়েছে, তাতে তাঁর আপত্তি—বলেছেন, তাহলে তো বঙ্গোপসাগর ছাড়া বঙ্গের নাম কোথাও থাকল না। পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হলো, এতেও তাঁর আপত্তি—বলেছেন, এ দেশ তো সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য।

সব সম্প্রদায়ের মানুষও তাঁকে নিজের বলে মনে করতে শুরু করে। প্রবীণ নেতা ছিলেন দেশে আরও—ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী। যখন তিনি ছয় দফা কর্মসূচি দিলেন বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে, তখন আর প্রথমোক্ত দুজন বেঁচে নেই। দেখা গেল, বাঙালিরা তাঁকেই মানছে নিজেদের নেতা হিসেবে, বাঙালির স্বার্থরক্ষক হিসেবে। যখন তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি, দেশের মানুষ নিজের জীবন তুচ্ছ করে, আইন অমান্য করে, দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছে; জেলের তালা খুলে তাঁকে মুক্ত করে এনেছে।

এ-ঋণ তিনিও অপরিশোধ্য বিবেচনা করেছিলেন। পাকিস্তানের একমাত্র সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বারবার বলেছেন, দেশবাসীর কাছে যে-ওয়াদা করেছেন, তার খেলাফ করবেন না। করেনওনি। ক্ষমতাও হাতে আসেনি তাঁর। তিনি ডেকেছেন অসহযোগ আন্দোলন, পূর্ব বাংলার মানুষ এক হয়ে তাতে যোগ দিয়েছে। তিনি ডাক দিয়েছেন মুক্তিসংগ্রামের, তিনি ডাক দিয়েছেন স্বাধীনতা-সংগ্রামের। স্বল্পসংখ্যক দেশদ্রোহী ছাড়া সবাই সাড়া দিয়েছে তাতে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি অনুপস্থিত—কিন্তু তাঁরই নামে পরিচালিত হয়েছে সে-যুদ্ধ, তাঁরই নামে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ।

বিজয়ীর বেশে তিনি ফিরে এসেছেন পাকিস্তানের কারাগার থেকে। হাতে তুলে নিয়েছেন দেশের শাসনভার। ভুলচুক হয়নি, তা হয়তো নয়, কিন্তু দেশকে দিয়েছেন যথেষ্ট। বিপ্লবের নেতাদের নাকি গ্রাস করে নেয় বিপ্লব, নয়তো প্রতিবিপ্লব। এ ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।

...সংশয়ে তাকে আমরা অস্বীকার করেছি,
ক্রোধে তাকে আমরা হনন করেছি,
প্রেমে এখন আমরা তাকে বরণ করব—
কেননা, মৃত্যুর দ্বারা সে আমাদের সকলের
                       জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত,
সেই মহামৃত্যুঞ্জয়।
—রবীন্দ্রনাথ, ‘শিশুতীর্থ’ (১৩৩৮)

বিশ্বনেতাদের চোখে বঙ্গবন্ধু by শরিফুজ্জামান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
কেউবা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন, কেউবা মুগ্ধ তাঁর ব্যক্তিত্বের কথা জেনে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি দেখে, তাঁর সাদাসিধে জীবনযাপনের কথা জেনে কেউ কেউ রীতিমতো বিস্মিত। অনেকেই আবার বলেছেন, তিনি শুধু বাংলাদেশের নেতাই ছিলেন না, ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাঁকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত নেতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন কেউ কেউ।

বঙ্গবন্ধুকে এভাবে যাঁরা স্বীকৃতি দিয়েছেন, সম্মান দেখিয়েছেন বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, তাঁদের কেউই এ দেশের নাগরিক নন। তাঁরা বিশ্বনেতা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান অথবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বাংলাদেশ সফরে এসে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর দেখার পর তাঁরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নিজের হাতে মন্তব্য লিখেছেন। এসব মন্তব্য হয়ে উঠেছে জাদুঘরের মূল্যবান সম্পদ।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া জানা বা বোঝার সুযোগ থাকলেও বিশ্বনেতা বা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মন্তব্য দেখার সহজ সুযোগ নেই। এসব মন্তব্য সযত্নে তুলে রাখা হয়।

প্রণব ও মোদির চোখে বঙ্গবন্ধু
প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মনে করেন, এই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন তাঁর জন্য বড় সম্মান ও বিরল সুযোগ। বঙ্গবন্ধুকে বড় মাপের নেতা আখ্যা দিয়ে ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে ২০১৫ সালের ৬ জুন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন তিনি। মোদির মূল্যায়ন হচ্ছে, একজন বড় মানবতাবাদী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সব মানুষের সমতা ও সুযোগের পক্ষে ছিলেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চির অটুট বন্ধনে বঙ্গবন্ধুর যে লক্ষ্য ছিল, তা উপলব্ধি করার প্রতিশ্রুতি দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বঙ্গবন্ধুকে সাহসী নেতা আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, ‘আই স্যালুট দ্য ব্রেভ লিডার অব অল টাইমস।’ একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মদাতাকে এভাবে হত্যা করায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। প্রণব লিখেছেন, এই বাড়ি থেকে শেখ মুজিব বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে নেতৃত্ব দেন এবং এই বাড়িতেই তাঁকে হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি জাদুঘর পরিদর্শন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দেশটির অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল গুরবক্স সিং সিহোটা মন্তব্য খাতায় লিখেছেন, ‘আমরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতীয় যোদ্ধা। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যুদ্ধে আমাদের ভূমিকা এ দেশের মানুষের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে।’ ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন করেন।

গত বছরের ১৫ জুলাই ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং মন্তব্য করেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে স্মরণ করা হবে।

কেবল বঙ্গবন্ধু নও, ভুটানেরও বন্ধু
মন্তব্য বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে চিঠি লিখেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। এ বছরের ১২ এপ্রিল জাদুঘর পরিদর্শনের পর তিনি লিখেন, ‘প্রিয় শেখ মুজিব, মানুষ বলে তুমি মৃত। কিন্তু আমি অনুভব করি তুমি আজও আমাদের চারপাশে। আমি খুশির সঙ্গে জানাতে চাই যে তোমার স্বপ্ন আজ তোমার মেয়ে শেখ হাসিনার দ্বারা পূরণ হয়েছে। তুমি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছ। তুমি কেবল বঙ্গবন্ধু নও, ভুটানেরও বন্ধু।’

জাদুঘর পরিদর্শনের পর ভুটানের কুইন মাদার বা রাজমাতা শেরিং পেম ওয়াংচুক মন্তব্য করেন, খুবই চমৎকার। একজন মহান ও দূরদর্শী নেতাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি। ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভুটানের সাবেক রাজা জিগমে সিংহে ওয়াংচুকের তৃতীয় স্ত্রী শেরিং পেম ওয়াংচুক এখানে আসেন।

শ্রীলঙ্কা গর্বিত
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা বঙ্গবন্ধুকে এই অঞ্চলের মহান নেতা আখ্যা দিয়ে বলেন, তাঁর ত্যাগ বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করে যাবে। এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য পূরণের অংশীদার হতে পেরে শ্রীলঙ্কা গর্বিত। ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন তিনি।

চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর ঘুরে দেখে তিনি লিখে গেছেন, এ এক গভীর মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা। এমন একজন মহৎ মানুষকে নিছক বুলেটবিদ্ধ করে হত্যা করা হলো। তবে তাঁর অর্জনের স্মৃতি এ দেশে বেঁচে থাকবে। তাঁর অনুসারী এবং কন্যা যেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উচ্চতায় বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন, এমন প্রত্যাশা রেখে গেছেন চন্দ্রিকা।

শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংসদের স্পিকার কারু জয়সুরিয়া এসেছিলেন ২০১৬ সালের ৪ জুন। জাতির জনকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি লিখেছেন, পরবর্তী প্রজন্ম চিরতরে তাঁর নাম স্মরণ করবে।

নানা ভাষায় শ্রদ্ধা
বিশ্বনেতাদের অনেকেই নিজের ভাষায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। জাপানি, চীনা, আরবি, হিন্দি, উর্দুসহ নানা ভাষায় তাঁরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লিখেছেন।

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো তারো জাপানি ভাষায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে গেছেন। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট, কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী, মিসরের শিক্ষামন্ত্রী, নাইজেরিয়ার শিক্ষামন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তাঁদের অনুভূতির কথা লিখে গেছেন।
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের কিউরেটর এবং সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি বিভিন্ন ভাষায় লেখা বিশ্বনেতাদের মন্তব্য বাংলায় অনুবাদ করার চিন্তা করছে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। এ ছাড়া এগুলোর একটি সংকলন প্রকাশ করা হবে।

তিন ধরনের মন্তব্য খাতা
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে তিন ধরনের মন্তব্য খাতা রাখা হয়। একটি ভিভিআইপিদের জন্য, বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, বিশিষ্ট নাগরিক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের জন্য এই খাতা সংরক্ষিত থাকে। আরেকটি খাতা আছে দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য, যেটি ভিআইপি খাতা নামে পরিচিত। আর সাধারণ মানুষের জন্য রয়েছে আরেক ধরনের মন্তব্য খাতা। কয়েক দিন পরপর এই খাতার শত শত পৃষ্ঠা ভরে যায়।

এ প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বঙ্গবন্ধু যে সাধারণ মানুষের নেতা ছিলেন, তা জাদুঘর পরিদর্শনকারীর সংখ্যা এবং মন্তব্য খাতায় লেখা অতিসাধারণ মানুষের বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়।

অনুপ্রেরণার বাতিঘর
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের দেয়ালে বুলেটের চিহ্ন এবং বঙ্গবন্ধু যে সিঁড়িতে গুলির আঘাতে পড়ে গিয়েছিলেন, সেই স্থান দেখে বিশ্বনেতাদের অনেকেই মর্মাহত হয়েছেন। ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাদুঘর পরিদর্শন করে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ কারণেই মৃত্যুর ৪০ বছরের বেশি সময় পরও শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা করা হয়।

গত বছরের জানুয়ারিতে এসে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো মন্তব্য বইয়ে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানবজাতির জন্য ছিলেন অনুপ্রেরণার বাতিঘর।

সাধারণ জীবনযাপনে মুগ্ধ
সৌদি আরবের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়নবিষয়ক উপমন্ত্রী খালেদ আল ওতাইবি বঙ্গবন্ধুর সাদাসিধে জীবনযাপনের বিষয়টি জেনে মুগ্ধ হন। ২০১৭ সালের আগস্টে এসে খালেদ লিখেছেন, ‘জাতির পিতা ছিলেন একজন দুর্দান্ত অনুপ্রাণিত মানুষ, যিনি তাঁর জনগণের সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর পরিবারকে দেখলাম এবং তাঁদের জীবনযাপনের পদ্ধতি আমাকে এই ধারণা দিল যে তাঁরা সাধারণ জীবন যাপন করতেন।’

বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সহকারী কিউরেটর কাজী আফরিন জাহান জানান, প্রায় সবাই একই প্রশ্ন করেন, কেন এমন অরক্ষিত স্থানে বা সাধারণ বাড়িতে একজন প্রধানমন্ত্রী বসবাস করতেন। বিশ্বনেতারা যখন বঙ্গবন্ধুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থান দেখেন, শিশু রাসেলকে হত্যার বর্ণনা শোনেন, তখন শিউরে ওঠেন।

৩২ নম্বর বাড়ি, রাজনীতির বাতিঘর
বাংলাদেশের মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পরিচয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি। সেই বাড়ি বাঙালির তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবার এই বাড়িতে নিহত হন।

১৯৯৪ সালের ১১ এপ্রিল বাড়িটিকে ট্রাস্টের অধীনে দেওয়া হয়, এরপর বাড়িটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

জাদুঘরের ভিভিআইপি খাতায় বাংলায় লেখা একটিমাত্র মন্তব্য, আর তা লিখেছেন বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ২০১৬ সালের ১৯ আগস্ট জাদুঘর পরিদর্শন করে আবদুল হামিদ লিখেছেন, ‘মুক্তিসংগ্রামে যেমন এ বাড়িটি বাঙালির দিকনির্দেশনার উৎস ছিল, তেমনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।’

মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ, একটি “ইসলামিক” রাষ্ট্রের “অনৈসলামিক” জাতির পিতা! by তাজবীর তন্ময়

ভারত উপমহাদেশের শেষ গভর্নর লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে নিজ বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মাদ আলি জিন্নাহ। দুপুরে খাবারের টেবিলে বসে রীতিমত অবাকই হন লর্ড মাউন্টব্যাটেনসহ উপস্থিত অন্যান্য আমন্ত্রিতবর্গ। দিনটা ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট, আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চলছে রমজান মাস, মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করেই খাওয়ার আয়োজন করা হবে ভেবেছিলেন তাঁরা। কিন্তু কিসের রোজা? কিসের পবিত্রতা! শূকরের মাংস আর শরাব জিন্নাহর খুব পছন্দ তা জানতেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। সেদিন তাঁর চাক্ষুষ প্রমাণ দেখলেন।
এইভাবেই চলমান রোজার মাসে শূকরের মাংস দিয়ে প্রস্তুত করা বিভিন্ন আইটেম আর নিজের পছন্দের শরাব ‘স্কচ’ দিয়ে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’ অর্জনের আনন্দ উৎযাপন করলেন মুসলিম রাষ্ট্রের স্থপতি কায়েদে আজম মোহাম্মাদ আলি জিন্নাহ
উপরের বিবরণটি পড়েই একে সত্য ঘটনা ভেবে নিবেন না। এটি লেখকের কল্পনাপ্রসূত একটি দৃশ্যমাত্র। তবে জিন্নাহ যে মদ, শূকরের মাংসের বেশ বড় ভক্ত ছিলেন, সকালের নাশতায় বেকন খেতেন এবং দিনে অন্তত ৩০-৪০টির মত সিগারেট টানতেন- এসব তথ্য উঠে এসেছে একাধিক ইতিহাসবিদের বয়ানে। সে হিসাবে উপরের কাল্পনিক ঘটনাটি একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।
মিঠিবাঈ ঝিনা আর পুঞ্জা ঝিনার সন্তান মুহাম্মাদালির জন্ম করাচীতে হলেও তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন গুজরাটের অধিবাসী। মজার ব্যাপার হল, মুহাম্মাদালির বংশপদবী ছিল ঝিনাভাই এবং শুধু মুসলমান নয়, গুজরাটের হিন্দুদের মধ্যেও এই বংশপদবী ছিল, এখনও আছে। অন্নদা শঙ্কর রায় লিখছেন, “গুজরাটি প্রথা অনুযায়ী পুত্রের নামে পিতার নাম যোগ করে তারপর যোগ করতে হয় বংশের পদবী। যেমন গান্ধী বংশের করমচাঁদের পুত্র মোহনদাস গান্ধী, তাতা বংশের নাসরবানজির পুত্র জামশেটজি, খোজানি বংশের ঝিনাভাইয়ের পুত্র মুহাম্মাদালি ইত্যাদি”। 
১৮৯৪ সালে বিলেতে লেখাপড়া করার সময় আধুনিক হওয়ার জন্য মুহাম্মাদালি তাঁর নামকে দুই ভাগ করে রাখেন মোহাম্মাদ আলি। পিতার নামকেও দুই ভাগ করে প্রথম অংশটুকু রেখে বর্জন করেন বাকিটুকু, ফলে বদলে যায় বংশ পদবীও। বিলেতি কায়দায় ‘ঝিনা’ উচ্চারণ হতে থাকে ‘জিনা’। সেই ‘জিনা’ই ভারতীয়দের মুখে উচ্চারিত হতো ‘জিন্না’ নামে, আলেমওলামারা আরবি টানে বলতেন ‘জিন্নাহ’।
হাস্যকর শোনালেও সত্য, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত উপমহাদেশকে বিভক্ত করে ফেললেও সে নীতির প্রতিফলন ছিল না জিন্নাহর নিজের ঘরেই। ১৯১৮ সালের ১৯ই এপ্রিল তার মক্কেল বিত্তবান পার্শি স্যার দীনশা পেটিটের কন্যা রতনবাই তথা রত্তিকে বিয়ে করেন। স্যার দীনশা এই বিয়ের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং জীবনদশায় কখনই মেয়েকে ক্ষমা করেননি। সুখী হয়নি এই পরিবার, ১৯১৯ সালে মেয়ে ‘দিনা ওয়াদিয়া’র জন্মের কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যান রতনবাই। এবং বড় হয়ে মেয়ে দিনাও বেছে নেয় পার্শি সম্প্রদায়ের খ্রিস্টান ছেলে নেভিল ওয়াদিয়াকে।
হিন্দু-মুসলমান আলাদা দুইটা জাতি- এটাই ছিল জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের মূলকথা। কিন্তু জিন্নাহর বোঝায় ভুল ছিল। জাতীয়তা শুধু ধর্মের ভিত্তিতে বানানো যায় না, জাতীয়তা নির্ধারিত হয় অনেক হিসেব নিকেশের পরে। ধর্ম দিয়ে যদি জাতীয়তা নির্ধারণ হত, তবে মধ্যপ্রাচ্যে কেবল একটি রাষ্ট্রই থাকতো, তারা আলাদা আলাদা ১৮-১৯ টা স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হত না। কেউ সৌদি, কেউ কুয়েতি, কেউ লেবানিজ, কেউ ফিলিস্তিনি পরিচয় দিত না।
এবং এই ব্যাপারটা জিন্নাহ বুঝতে পেরেছেন ৪৭ এর দেশভাগের পর। পাকিস্তান সৃষ্টির পর দেখা গেলো জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব আর রাষ্ট্রের কাঠামো নির্মাণ করতে কাজে দিচ্ছে না। জাতি গড়া যে কঠিন কাজ জিন্নাহ সেটা ততদিনে বুঝে গেছে। নেশন-স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র? না স্টেট-নেশন বা রাষ্ট্র-জাতি? এই গ্যাড়াকলেই আটকে পড়েন গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ।
মূলত জিন্নাহ সাহেব একটি মুসলিম রাষ্ট্র পেয়েছিলেন কিন্তু জাতি গঠন করতে পারেন নাই। যে কোনো দেশের ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যাবে স্বাধীনতার নায়করা আগে জাতি গঠন করেছেন, তারপর রাষ্ট্র অর্জনের সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তান জাতি-রাষ্ট্র হয় নাই, হয়েছে রাষ্ট্র-জাতি। দেশভাগের পর দেখা গেল কেউ দাবি করে আমি বেলুচ, কেউ বলে আমি বাঙালি, কেউ দাবি করে আমি পাঞ্জাবি, আবার কেউ বলে আমি পাঠান কিন্তু কেউ বলে না আমি পাকিস্তানী কিংবা মুসলমান। সবাই শুধু নিজের জাতিসত্ত্বার কথাটাই আগে দাবি করে।
পাকিস্তানে জিন্নাহর বিশ্বাস ছিল না, বাজির উপরেই পেয়ে গেছেন। অবশ্য এতে কংগ্রেসের হাত ছিল না এ কথা বললে ভুল হবে। কংগ্রেস চেয়েছিল পূর্ব পাঞ্জাব আর পশ্চিমবঙ্গ। চেয়েছিল দিল্লির একাধিপত্য, সংবিধানী সভায় স্বতন্ত্র নির্বাচন পদ্ধতি তথা ওয়েটেজ প্রথার বিলুপ্তি। মুসলিম লীগকে দেশের তথা প্রদেশের একাংশ প্রদান না করলে এ ব্যাপারগুলো অর্জন সম্ভব হতো না। অর্থাৎ ইংরেজরা ভাগ করে দিয়ে গেল এ কথা খুব একটা সত্য নয়, বলা যায় কংগ্রেস ভাগ করে নিলো।
“পূর্বপুরুষে হিন্দু, ধর্মে কাফির, কর্মে ইংরেজ চর, দর্শনে হিন্দু বন্ধু” ছিলেন তথাকথিত মুসলিম রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ। উপমহাদেশে অনেকগুলো স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের পরিবর্তে পাকিস্তান নামক একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রের জন্য দায়ী জিন্নাহ নামক মানুষটার ক্ষমতার লোভ। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তান নামে কোন শব্দ ছিল না। কিন্তু ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ অনৈতিকভাবে লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে মুসলমানদের জন্য পৃথক পৃথক রাষ্ট্রের বদলে “পাকিস্তান” নামে একটা রাষ্ট্র দাবি করেন। যদিও লাহোর প্রস্তাবে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ ছিল। জিন্নাহ অনৈতিকভাবে লাহোর প্রস্তাবের স্টেটস শব্দের ‘এস’ কেটে দিয়ে স্টেট লিখে বাঙালির সাথে বেইমানি করে শুরুতেই। তা না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হয় ৪৭ সালেই।
আসলে পাকিস্তান আজও এক অদ্ভুত রাষ্ট্র। জিন্নাহ ছিলেন সেক্যুলার, বিয়ে করেছিলেন অন্য ধর্মের এক মেয়েকে, ৫ ওয়াক্ত নামাজ না পড়লেও মদ পান করতেন, শূকরের মাংস ছিল তার প্রিয়। কিন্তু তিনি ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের জাতির জনক। এর চেয়ে হাস্যকর কিছু আর হতে পারে না।
এরপরও কিছু মুসলমান নামধারী ধর্মান্ধ আসবে জিন্নাহ সম্পর্কে গুনগান গাইতে। লেখককে গালাগালি দিয়ে, খোদার কসম কেটে, দাবী করবে জিন্নাহই মুসলমানদের বন্ধু, পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশের জন্ম হত না… ইত্যাদি! তাদের উদ্দেশে এই গল্পটি-
১৯২৪ সালের ঘটনা। দিল্লিতে এক আলোচনা সভায় খোশ মেজাজে জিন্নাহ পাশে বসা সার তেজবাহাদুর সপ্রুকে বলেন,
*“আমার মনে হয় আমি হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা সমস্যার একটি সমাধান বাতলে দিতে পারি। আপনারা আপনাদের গোঁড়া পুরোহিত শ্রেণীকে উৎসাহ প্রদান করেন আর আমরাও আমাদের মোল্লা সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে ফেলি। তাহলেই সাম্প্রদায়িক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে”(সমগ্রন, পৃষ্ঠা-১২৬)

ওদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে শঙ্কা: সরজমিন পঙ্গু হাসপাতাল by ফাহিমা আক্তার সুমি

বাইশ বছর বয়সী মুস্তাকিম। রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি ইএক্স-২ এ চিকিৎসাধীন। গুলিবিদ্ধ মুস্তাকিমের ডান পায়ের হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। মুস্তাকিম মানবজমিনকে বলেন, ১৯শে জুলাই বিকাল চারটার দিকে মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হই। পরে পপুলার হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে দুইদিন রাখার পর পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। মঙ্গলবার অপারেশন করা হয়। ডান পায়ের হাঁটু পর্যন্ত কাঁটতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ভাড়ায় প্রাইভেটকার চালাতাম। ডিউিটি শেষে বাসায় ফেরার পথে পুলিশের গুলিতে আহত হই। আমার পা-টা এভাবে হারিয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। জীবনের তো এখনো অনেক সময় বাকি। এখন তো তেমন কিছু করতে পারবো না। পুরোপুরি সুস্থ হলে কিছু একটা করতে হবে। চিকিৎসার জন্য ধার-দেনা করে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। ভবিষতে কীভাবে জীবন চলবে বুঝতে পারছি না।

শুধু মুস্তাকিম নয়, ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতালে)। আহতদের মধ্যে কেউ ছাত্র, কেউ সাধারণ মানুষ। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় আছেন অনেকে। ১৫ই জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ৬৩৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন এখানে। এদের মধ্যে ৩৮৬ জনই গুলিবিদ্ধ। মারা গেছেন দু’জন। পা কাটা পড়েছে ৮ জনের। জুলাই-আগস্টে আন্দোলন করতে গিয়ে আহত ১৩০ জন এখনো এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

গুলিবিদ্ধ আতিকুলের মা আমেনা বলেন, আমার সন্তানের ডান হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। উত্তরা রাজলক্ষ্মী মার্কেটে চাকরি করতো। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছি। আন্দোলনের শুরু থেকে সে যুক্ত ছিল। ৫ই জুলাই উত্তরাতে গুলিবিদ্ধ হয়। একটা গুলি আমার ছেলের হাতে লেগে আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘটনার দিন হৃদরোগ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে ৭ তারিখে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ভর্তির একদিন পর হাত কাটে চিকিৎসকরা। আমার ৩ ছেলে ৩ মেয়ে। এই ছেলে সবার ছোট। ওর বাবা আলাল উদ্দিন পুরনো ফার্নিচার বিক্রি করেন। আমার ছেলে ঘর ভাড়ার টাকা দিয়ে ওর বাবাকে সাহায্য করতো। ছেলেটার জীবন তো মাত্র শুরু। ডান হাতটাই কাটা পড়েছে। কী করবে ও, কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। শুধু আমার সন্তানের হাত না এইরকম শত শত সন্তানের হাত-পা গেছে। কারও মায়ের বুক খালি হয়েছে। তাদের যেন সরকার ব্যবস্থা করে দেয় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার। আমার সন্তানের হাত চলে গেছে তবুও আমি খুশি এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম। বরিশালে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তামিম বড়। ঢাকাতে নানির বাসায় বেড়াতে এসেছিল। এর আগে মাদ্রাসায় ঢাকাতে পড়াশোনা করেছে। ঘটনার দিন মিরপুর-২ নম্বর এলাকায় তার পায়ে গুলি লাগে। তামিমের মামা তানভীর বলেন, ৫ই জুলাই আন্দোলনের সময় মিছিল দেখে তামিমও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। মিছিল মিরপুর দশ নম্বর থেকে দুই নম্বর পর্যন্ত পৌঁছালে ১৫-২০ জন পুলিশ গুলি ছোড়া শুরু করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি গলির মধ্যে দৌড়ে যায় তামিম। এরপর তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে সন্ধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে দেখি। প্রথমে দুইটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে পঙ্গু হাসপাতালে আনা হয়। তামিমের পা প্রথমে ভালো ছিল কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে ওর পায়ে পচন ধরে যায়। পরে মঙ্গলবার হাঁটুর উপর পর্যন্ত পা কাটতে হয়। তামিম ওর মায়ের একমাত্র ছেলে। ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তার মায়ের। সারাজীবনের জন্য আমার ভাগ্নেটা পঙ্গু হয়ে গেল।

মো. মাসুদ কোটা সংস্কার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি পেশায় একজন ভ্যানচালক। মাসুদ বলেন, ১৮ই জুলাই গুলি লাগে আমার পায়ে। আমি ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে প্রতিদিনের মতো ওইদিনও যাই। রাত সাড়ে আটটার দিকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে পুলিশ। পাশে থাকা লোকজন আমাকে উদ্ধার করে বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ভালো না বুঝে পঙ্গুতে পাঠিয়ে দেয়। পরের দিন আমার অপারেশন হয়। আমি দ্রুত সুস্থ হতে চাই। আমার পরিবারের আর কেউ নেই স্ত্রী ও তিন সন্তান ছাড়া। আমার ছোট ছোট তিন সন্তানের ভবিষ্যত কী হবে? ওদেরকে কীভাবে বড় করে তুলবো। মেরুল বাড্ডায় পরিবার নিয়ে থাকি। চিকিৎসক বলেছেন জীবনে আর কোনোদিন ভারী কাজ করতে পারবো না। সামনের দিনগুলোতে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পারছি না। পায়ে গুলি লেগে হাড় গুঁড়া হয়ে বাইরে বেরিয়েছে। আমার ১৩ বছরের মেয়েটি চিকিৎসা খরচ চালানোর জন্য গার্মেন্টেসে কাজ শুরু করেছে।

ক্যাজুয়ালিটি জি-৩৯ ভর্তি আসলাম। তিনি ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। গাজীপুরের কালিয়াকৈর তাদের বাড়ি। আসলাম বলেন, ৫ই জুলাই আন্দোলনের জন্য রাস্তায় বের হই। বিকাল চারটার দিকে আমরা কয়েকজন মিলে আনসারদের সঙ্গে কথা বলে আমরা রাজপথে বের হই। এরপর সামনের দিকে যেতে থাকি। যখনই আমরা সামনের দিকে যাই একের পর এক গুলি করা শুরু করে। তখন আমরা বাঁচার জন্য যে যার মতো পালানোর চেষ্টা করি। তবে আটকে পড়ার কারণে কয়েকজনের গুলি লাগে। আনসার সদস্যরা তখন হাতে যখন যেটা পায় সেটি দিয়ে  পেটাতে থাকে। আমাকে  পেটানোর পরে মাটিতে পড়ে যাই এ সময় আমার বাম হাত পা দিয়ে চেপে ধরে হাতে গুলি করে। ওই অবস্থায় আমি উঠে রাস্তায় দৌড়াতে থাকি। তখন কিছু অপরিচিত লোকের মাধ্যমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে যাই। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি মার্কেটিংয়ে চাকরি করতাম। ৭ তারিখে পঙ্গু হাসপাতালে আসার পর আমার তিনটা অপারেশন হয়। আমার বাবা একটি গার্মেন্টেসে কাজ করেন। আমি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাই।

সাতক্ষীরায় গুলিবিদ্ধ হয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলী হাসান। ৫ই আগস্ট আন্দোলনে যায় সে। আলী হাসানের মামা সাব্বির হোসেন বলেন, আমার ভাগ্নের ডান পায়ে ছয়টা গুলি লাগে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সাব্বির বড়। ওর বাবা শ্রমিকের কাজ করে। অপারেশন তিনটা করা হয়েছে। আজ আরেকটি করবে। ওর পা কাটা লাগবে। ঘটনার দিন ওর সামনে তিনজন মারা যায়। ভাগ্নেটার সামনে কী হবে বুঝতে পারছি না। তার পা ভালো হোক এটাই চাই।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজজামান বলেন, ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধদের হাড়ও ভেঙেছে, সঙ্গে ওপরের চামড়া-মাংসও থেতলে গেছে। যাদের অঙ্গহানি হয়েছে বা যারা প্রতিবন্ধিতার দিকে যাবেন তাদের চিকিৎসার প্রক্রিয়ায় আগামী দুই থেকে তিন মাসের জন্য রেকর্ড রাখা হচ্ছে। তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতার জন্য আমাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

জুলাই গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

জুলাই গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, গণহত্যা ও গুলি বর্ষণের ঘটনায় বিচারের জন্য ইতোমধ্যে কিছু মামলা হয়েছে। আমরা নিজেরা, রাজপথে থাকা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন, জনগণের বিভিন্ন গোষ্ঠী দাবি করেছেন যে, এটাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার করার সুযোগ আছে কি না। আমরা সেটা খতিয়ে দেখেছি।

তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন আছে, সেটা পরে ২০০৯ ও ২০১৩ সালে সংশোধনী হয়েছে। সেই আইনে আমরা জুলাই গণহত্যা, আগস্টের প্রথম পাঁচদিনের গণহত্যাও বোঝাচ্ছি। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য ইতোমধ্যে ছোটখাটো গবেষণা করেছি। আমরা দেখেছি, এই আইনের অধীনে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ও যারা আদেশ দিয়েছেন এবং যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব।

আসিফ নজরুল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি ইনভেস্টিগেশন টিম আছে, প্রসিকিউশন টিম আছে। এগুলোকে আমরা রিঅর্গানাইজড করার চেষ্টা করছি, আদালতটা একটু পরে করব। ইনভেস্টিগেশন আমরা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে করার চেষ্টা করছি। জাতিসংঘ থেকে বারবার আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

বিচারের সত্যিকারের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের সর্বাত্মক তত্ত্বাবধানে আমাদের ইনভেস্টিগেশন টিম কাজ করবে। সেটার লক্ষ্যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করব।

আইন উপদেষ্টা বলেন, ঢাকায় জাতিসংঘের আসাবিক প্রতিনিধির সঙ্গে মিটিং করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। সহযোগিতা চাইবো। এছাড়া, আমাদের আরও উচ্চ পর্যায় থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সংস্থা আছে, উনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। আশা করছি, দ্রুত এটা শুরু করতে পারব। তিনি বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিচার করব। হত্যাকাণ্ডে জড়িত বিদায়ী সরকারের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেকোনো অপরাধের বিচার করার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য আমাদের আছে। আমাদের দেশের ব্যাংক ও সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে যাবে, এটা তো আমার-আপনার টাকা। সাবেক সরকারের মন্ত্রীদের টাকা না। জনগণের টাকা যারা নিয়ে গেছেন, তাদের অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করা ও বিচারের সম্মুখীন করার জন্য যতটুকু করা দরকার, অবশ্যই আমরা করব।

আইন উপদেষ্টা বলেন, সাইবার সিকিউরিটি আইনসহ যেসব নিবর্তনমূলক আইন আছে, সেগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। এসব আইন বাতিল অথবা সংশোধন করা হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে উদ্বেগের মধ্যেই ইসরাইলকে ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দেয়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরসাইলের কাছে নতুন করে ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির মধ্যে বেশ কয়েকটি ফাইটার জেট এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের কথা রয়েছে। মঙ্গলবার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে অবহিত করা হয়েছে। এবারের চালানে ৫০টির বেশি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান সহ উন্নত মাঝারি রেঞ্জের এয়ার টু এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র, ১২০ মিমি ট্যাঙ্ক গোলাবারুদ এবং ভারী বিস্ফোরক মর্টার রয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে এমন সময়ে ইসরাইলকে অস্ত্র দেওয়ার অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

তবে আপাতত স্বস্তির খবর হচ্ছে খুব শিঘ্রই এই অস্ত্র হাতে পাচ্ছে না ইসরাইল। এই চুক্তি বাস্তবায়ন হতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ইসরাইলকে দীর্ঘমেয়াদে তার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এই অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে ওয়াশিংটন। ২০২৬ সাল নাগাদ এসব অস্ত্র ইসরাইল হাতে পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

কারণ মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সমুন্নত করতে ইসরাইলকে সহায়তা করা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে দেশটি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে এই অস্ত্র চুক্তি বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

যদিও সম্প্রতি গাজায় হাজার হাজার বেসামরিকদের নিহতের ঘটনায় ক্ষুদ্ধ মার্কিন নাগরিকরা। তারা ইসরাইলের সাথে বাইডেন প্রশাসনের যে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে তার সমালোচনা করেছে। এ বিষয় সামাল দিতে কংগ্রেসের আইন প্রণেতা এবং মার্কিন জনগণে ক্রমবর্ধমান চাপ ঠেকাতে ভারসাম্য রক্ষা করছে বাইডেন প্রশাসন। এর আগে গাজা ইস্যুকে সামনে এনে বড় একটি অস্ত্রের চালান বন্ধ করে দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে সম্প্রতি ইরানের হুঁশিয়ার পর ইসরাইলের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছে পেন্টাগন। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাউবো: বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে ৩ কর্মকর্তা by ফারুক আহমেদ চৌধুরী

নিয়মানুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে তিন বছরের অধিক সময় থাকতে পারবেন না। সরকারের এমন নিয়ম থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁপাইনবাবগঞ্জ কার্যালয়ের ৩ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে। বিধি ভেঙে একই কর্মস্থলে দু’জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) ৭ বছর ও একজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) ১০ বছর ধরে আছেন। তারা হলেন, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) মো. মাহবুব আলম (৭ বছর), উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল শরীফ (১০ বছর) ও  মো. আব্দুর রহমান (৭ বছর)। তবে তাদের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ রাখলে তাদের কিছুই করার নেই। কর্তৃপক্ষ বদলি করলে তারা চলে যাবেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকায় তারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। জড়িয়ে পড়েছেন নানা অনিয়মে। এতে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তারা কীভাবে একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর থাকছেন বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাউবো’র চাঁপাইনবাবগঞ্জ কার্যালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মানবজমিন’র পক্ষ থেকে যোগাযোগ করার পর নিজেরাই বদলির জন্য তোড়জোড় করেছেন। তাদের অনিয়মের অপরাধ সামনে আসার আগেই চলে যেতে চাইছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সর্বগ্রাসী পদ্মা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। নদীভাঙন এ জেলার প্রধান সমস্যা। ভাঙন রোধে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প চলমান। এসব প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। তারা সাত-দশ বছর ধরে একই কর্মস্থলে রয়েছেন। প্রকল্প তদারকির নামে ফাঁকিবাজি, ঠিকাদারদের সঙ্গে সিন্ডিকেট, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনে সহযোগিতার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। এদিকে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে চাকরি করার কারণে তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। সেইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম নিয়েও। পদ্মার ভাঙন থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ও শাহজাহানপুর এলাকা রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি মেগা প্রকল্প চলমান। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের জুনে। পরে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। সংশোধিত প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়। শুরুতে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৬৬ কোটি টাকা। সংশোধনের পর প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৭ কোটি বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৩ কোটি টাকায়।

সংশিষ্ট সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের অধীন ৬.১০ কিলোমিটার নতুন নদীতীর সংরক্ষণ কাজ ২৯টি প্যাকেজে, ৪ কিলোমিটার আগের বাস্তবায়ন হওয়া নদীতীর রক্ষা কাজের পুনর্বাসনের কাজ চারটি প্যাকেজে এবং ৮ কিলোমিটার আগের নির্মিত বাঁধের পুনরাকৃতিকরণ কাজ একটি প্যাকেজে বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই তিন কর্মকর্তা চলমান এই প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযুক্ত প্রকৌশলীরা নিয়মিত তদারকি করছেন না। ফলে কাজের মান নিয়ে ফাঁকিবাজিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) মো. মাহবুব আলম বলেন, আমি ৭ বছর থেকে এখানে আছি। উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেছিলাম। কিন্তু এক বছর আগে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি। বদলি না করলে আমার কী করার আছে? পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি আমাকে একই জায়গায় দীর্ঘদিন রাখে তাহলে তো আমি সেখানেই থাকবো। আর আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা।

১০ বছর ধরে একই কর্মস্থলে থাকার কথা স্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল শরীফ বলেন, বোর্ড রেখেছে তাই আছি। তাছাড়া আমি একটু অসুস্থ। বদলি তো আমার হাতে নেই। নামপ্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতি বছরই কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদকাল সম্পর্কিত তথ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে পাঠানো হয়। এরপরের দায়িত্ব তাদের। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মুহাম্মদ আমিরুল হক ভূঞা বলেন, মাহবুব আলম নামে একজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীকে এরই মধ্যে বদলি করা হয়েছে। বাকি দু’জনের বিষয়েও খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জিহাদের ছবি নিয়ে কেঁদেই চলেছেন মা

কোটা বিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত জিহাদ হোসেন (২৫)কে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার মা শাহিনুর বেগম। ছেলের ছবি বুকে চেপে কেঁদেই চলছেন তিনি। কান্না যেন থামছেই না তার। জিহাদের কথা বলতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা নুরুল আমীম। ছোট ভাইকে হারিয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন বড় ভাই জিন্নাত মোল্লা ও দুই বোন জান্নাতুল ও জয়নব। জিহাদ পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা সদরের মোল্লাপট্টি এলাকার নুরুল আমিন মোল্লা ও শাহিনুর বেগমের ছেলে।

দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জিহাদ ছিলেন সবার ছোট। তাই পরিবারের সবার কাছে সে ছিল আদরের। ঢাকার যাত্রাবাড়ী কোনাপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে সরকারি কবি নজরুল কলেজে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তরে অধ্যায়নরত ছিলেন জিহাদ। তার মা শাহিনুর বেগম আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। সন্তানের ছবি শাড়ির আঁচলে মুছে বার বার বুকে জড়িয়ে অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বিলাপ করছেন।

সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। তার এমন অকাল মৃত্যুতে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে পরিবারটির। জিহাদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯শে জুলাই শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় দনিয়া কলেজ ও কাজলা ফুটওভার ব্রিজের মাঝামাঝি রাস্তায় বুকের ডান পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হন জিহাদ। গুরুতর আহত অবস্থায় সহপাঠী ও বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে ওই এলাকার সালমান হাসপাতালে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জিহাদকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ভর্তির কিছুক্ষণ পর বিকালে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ঢামেক হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পরের দিন শনিবার (২০শে জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার লাশ বহনকারী এম্বুলেন্সযোগে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় আবৃত কফিনে জিহাদের মরদেহ দশমিনা উপজেলা সদরের মোল্লাপট্টি এলাকায় নিজ বাসভবনের সামনে এসে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

পরে ২১শে জুলাই রোববার ভোরে দশমিনা সদর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় চত্বরে জিহাদের জানাজার নামাজ শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জিহাদ দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় স্যার সলিমুল্লাহ কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করে সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন এবং একই কলেজে ওই বিষয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন।
জিহাদের বাবা নুরুল আমিন মোল্লা বলেন, আমার ছেলে মেধাবী ছিল। আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে আমি তাদের বিচার দাবি করছি।

বড় বোন জান্নাতুল বলেন, দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের তথা দেশবাসীর অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমার ছোট ভাই জীবন উৎসর্গ করেছে। বড় ভাই জিন্নাত হোসেন বলেন, আমার ভাই জিহাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে। দেশে বিদ্যমান স্বৈরসরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, আন্দোলন করেছে। আগামীর বাংলাদেশ যেন সুন্দর হয়, দুর্নীতিমুক্ত হয়। যুগ যুগ ধরে আগামী প্রজন্ম যেন আমার ভাইয়ের এ অবদান মনে রাখে। শেখ হাসিনা সরকার স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিল অন্য কোনো দল ভবিষ্যতে এ ধরনের  কোনো চেষ্টা যেন না করে। তাহলেই আমার ভাই ভালো থাকবে। আমার ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষমতাসীন দল-বিরোধীদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল

দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল হয়েছে বুধবার। ফার্স্টলেডি কিম কিওন হি’র স্টক জালিয়াতির একটি অভিযোগে একজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাবের শুনানিতে পার্লামেন্টারি কমিটিতে এ ঘটনা ঘটে। সিউল নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটর অফিসের সিনিয়র প্রসিকিউটর কিম ইয়ং-চোল, অন্য প্রত্যক্ষদর্শী, ফার্স্টলেডি এদিন শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন না। এই শুনানি থেকে রাজনৈতিক সুফল পাওয়ার চেষ্টা করছে প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি (ডিপি) এমন সমালোচনা করেছে ক্ষমতাসীন পিপল পাওয়ার পার্টি (পিপিপি)। বার্তা সংস্থা ইয়োনহোপের রিপোর্টে আরও বলা হয়, পিপিপি’র প্রতিনিধি সং সিউওগ-জুন বলেছেন, অভিশংসন ছাড়া কি প্রসিকিউটরকে শাস্তি দেয়ার আর কোনো উপায় নেই? আমাদের তো অ্যাক্ট অন ডিসিপ্লিনারি অব প্রসিকিউটরস আছে। এই আইনের অধীনে একজন প্রসিকিউটরকে বরখাস্ত করা সহ নানাবিধ ব্যবস্থা নেয়া যায়। তিনি আরও বলেন, এই শুনানি করে এবং অভিশংসন প্রস্তাব সামনে এনে সময়ক্ষেপণ করে লেজিসলেশন এবং বিচারবিভাগ সময় নষ্ট কেন করছে তা বুঝতে পারছি না। পার্লামেন্টারি কমিটির চেয়ারম্যান চুং জুং-রাই জোর দিয়ে বলেন- জাতীয় পরিষদ আইন অনুযায়ী এটা একটা মানসম্মত প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে তিনি ফার্স্টলেডি এবং যেসব ব্যক্তি এই শুনানিতে উপস্থিত হননি তাদের সবার বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ ফাইল করার প্রতিশ্রুতি  দেন। শুনানিতে ২০ জন সদস্যকে তলব করা হয়েছিল।

তার মধ্যে শুধু লিম ইউন-জিওং, যিনি ডাইজিওন ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটরস অফিসের সিনিয়র প্রসিকিউটর, তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে যে, যেহেতু অভিযোগের সঙ্গে ফার্স্টলেডির যোগসূত্র আছে, তিনি ডয়েচ মটর্স এনকরপোরেশন ইনকরপোরেশনে ম্যানিপুলেট করেছেন- তাই যথাযথ তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন কিম।
কিম এবং অন্য তিনজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করেছে ডিপি। দলটির সাবেক নেতা লি জায়ে-মিউংসহ অনেকের বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতির অভিযোগ আছে। ওই প্রস্তাবের ফলে এসব দুর্নীতি তদন্ত শুরু হয়। এ ছাড়া আছে বেআইনিভাবে উত্তর কোরিয়াকে আন্ডারওয়্যার প্রস্তুতকারক কোম্পানি সসাঙ্গবাঙ্গউল গ্রুপের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর অভিযোগ আছে। সম্প্রতি এন্টি করাপশন অ্যান্ড সিভিল রাইটস কমিশনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা মারা যান। তা নিয়েও দুই দল প্রচণ্ড হট্টগোল করে।


কলকাতায় ডাক্তার ধর্ষণ: হত্যা মামলা সিবিআইতে

কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে ৩১ বছর বয়সী একজন নারী ডাক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তোলপাড় চলছে ভারত জুড়ে। পিতামাতা এমন সব লক্ষণ পেয়েছেন যাতে মনে করা হচ্ছে তাকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্য ডাক্তার ও স্টাফরা ধর্মঘট করছেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে ধর্ষিতার পিতামাতা বলেছেন, নিহতের শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া গেছে। এর পরিমাণ প্রায় ১৫০ মিলিগ্রাম। এ থেকে তারা ধারণা করছেন, তাকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। এই মামলাটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। তার মধ্যেই ধর্ষিতার পিতামাতা এই দাবি করেন। তারা পিটিশনে বলেছেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, মৃত্যুর কারণ ছিল গলা টিপে ধরা। এটাই যৌন নির্যাতনের পরিষ্কার লক্ষণ। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে ভয়াবহ তথ্য দেয়া হয়েছে। নিহতের মাথায় ক্ষত থাকার বিষয়ে বেশ কিছু পিটিশন দেয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তার দুই কানেই ক্ষত আছে। এতে বোঝা যায় প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। নিহতের ঠোঁটে ক্ষত আছে। এতে ইঙ্গিত মেলে যে, হামলার সময় তার কণ্ঠরোধ করার বা মুখের ভেতর কাপড় গুঁজে দেয়া হতে পারে। তার কাঁধে কামড়ের দাগ আছে। পিটিশনে আরও বলা হয়েছে, অটোপসি রিপোর্টে নিহতের শরীরের ভেতরে প্রায় ১৫০ মিলিগ্রাম শুক্রাণু পাওয়া গেছে। এই পরিমাণ এটাই বলে দেয় যে, ধর্ষণে একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিল। এ থেকে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় যে, তাকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। তারা আরও বলেছেন, বিশ্বাসযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, তাদের কন্যাকে হত্যার মিশনে জড়িত ছিল কমপক্ষে তিনজন।

মামলাটি সিবিআইয়ে স্থানান্তরের আগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশ সঞ্জয় রায় নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সে একজন স্বেচ্ছাসেবক। ঘন ঘন তাকে ওই হাসপাতালে দেখা যেতো। নিহতের পিতামাতা পিটিশনে বলেছেন, অন্য অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোনোই পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অন্যদিকে পরিষ্কার তথ্যপ্রমাণ মিলেছে যে, তাদের কন্যাকে গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। এই অপরাধ একজনের পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয়। তারা পিটিশনে আরও জোর দিয়ে বলেছেন যে, আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তখনকার অধ্যক্ষ ও অন্য অংশীদারদের এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। হাসপাতালে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব ছিল তাদের। মামলাটি সিবিআইয়ে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট হাসপাতাল প্রশাসন, বিশেষ করে সাবেক অধ্যক্ষ ড. সন্দ্বীপ ঘোষের কড়া সমালোচনা করেছে। আদালত প্রশ্ন রেখেছে, একজন ডাক্তারকে মৃত অবস্থায় পাওয়ার পর পুলিশে কেন অভিযোগ দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পর আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধানের পদ ত্যাগ করেন ড. ঘোষ। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে অন্য একটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ করে রাজ্য সরকার। নিহত ডাক্তারের পিতামাতা অভিযোগ করেছেন তাদের মেয়ের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে তড়িঘড়ি করে।

 এই হত্যায় অন্যদের জড়িত থাকাকে আড়াল করতে মিথ্যা ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। হাইকোর্টে মঙ্গলবার রাজ্য সরকারের আইনজীবী বলেছেন, একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং দু’জন নারী ডাক্তারের উপস্থিতিতে নিহতের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তাতে স্বাক্ষর করেছেন নিহতের মা। রাজ্য পুলিশও দাবি করছে যে, তারা নিহতের পরিবারের সঙ্গে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট শেয়ার করেছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ময়নাতদন্ত করে তা ভিডিওগ্রাফিও করা হয়েছে, যাতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না ওঠে। এই ভিডিও নিহতের পরিবারকে পাঠানো হয়েছে।  মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্ট মামলা সিবিআইতে স্থানান্তর করার পর এখন তা সিবিআইয়ের হাতে। অভিযুক্ত সঞ্জয় রায় এখন কেন্দ্রীয় এজেন্সির হেফাজতে রয়েছে। সিবিআইয়ের টিম এই মামলা তদন্তে তিনটি গ্রুপ করেছে। একটি গ্রুপ সেমিনার হল পরিদর্শন করবে, যেখানে ওই ডাক্তারের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। অন্যদল অভিযুক্তকে আদালতে তুলবে। এবং তার রিমান্ড চাইবে।
তৃতীয় দলটি কলকাতা পুলিশের সঙ্গে মামলার তদন্তে সমন্বয় করবে।

শাহবাগে সম্প্রীতির শপথ শিক্ষার্থীদের

দেশে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছেন শিক্ষার্থী-শিক্ষক-সাংবাদিকসহ নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন ও ‘একতার বাংলাদেশ’ এর সম্প্রীতি সমাবেশে এই শপথ নেয়া হয়। বুধবার রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে বিকাল ৪টায় ‘একতার বাংলাদেশ’ এর মুখপাত্র তাহমীদ আল মুদাসসির এর সভাপতিত্বে এ সভা শুরু হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু সায়েম, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক শাফী মোহাম্মদ, ফাদার তপন ডি রোজারিও এবং ‘কালবেলা’ পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশও সম্প্রীতির আয়োজনে যুক্ত হয়।

সম্প্রীতি কামনা করে শপথ পাঠ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি প্লাবন তারিক। শপথ বাক্যে বলা হয়,‘আমি শপথ করছি যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমার প্রতিটি পদচিহ্ন হবে ন্যায়বিচারকে সমুন্নত রাখার একেকটি প্রতিরূপ। সাম্য এবং মানবিক মর্যাদা হবে আমার রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগের সেতুবন্ধন। আমার কাছে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার যথাযথ বাস্তবায়নই হবে ব্যক্তিগত স্বার্থকে সমুন্নত রাখার একমাত্র রক্ষাকবজ। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমার কার্যক্রম এবং চিন্তার পরিসর জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে সবসময় ক্ষমতায়িত করবে।

আরও বলা হয়, আমি জীবনের যেকোনো পর্যায়ে বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করবো না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠে বা হয়ে উঠতে চায় তার বিপরীতে দাঁড়ানো হবে আমার একান্ত দায়িত্ব। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে সব ধরনের বিভাজনের পথ রুদ্ধ করে বাংলাদেশ হবে সব মানুষের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিতকরণের উর্বর ভূমি। সমাবেশে বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব সাহিত্য বিষয়ক অধ্যাপক ড. সাদিক মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা কোনো বৈষম্যের বাংলাদেশ চাই না। সবার ধর্ম পালনের অধিকার চাই। কোনো ভেদাভেদ চাই না। সাম্যের বাংলাদেশ চাই।’

অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘যতদিন দেশ থেকে কুচক্রী মহল বিতাড়িত না হবে, ততদিন আমাদের পাহারায় থাকতে হবে। কোনো ভাবেই কুচক্রী মহলকে ছাড় দেয়া যাবে না। দিল্লিতে পরিত্যক্ত স্বৈরাচার আছেন, অথচ তার ছেলে জয় বলেন, তার মা পদত্যাগ করেনি। সেখান থেকে তারা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। সতর্ক থাকতে হবে। অবশ্যই ভেতরের ষড়যন্ত্র আঁচ করতে হবে।’

তিনি বলেন, আমি জীবনের যেকোনো পর্যায়ে বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করবো না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠে বা হয়ে উঠতে চায় তার বিপরীতে দাঁড়ানো হবে আমার একান্ত দায়িত্ব। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, সকল ধরনের বিভাজনের পথ রুদ্ধ করে বাংলাদেশ হবে সকল মানুষের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিতকরণের উর্বর ভূমি।

এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘রেজিস্ট্যান্স উইক’র কর্মসূচি শাহবাগে জমায়েত হওয়ার কর্মসূচি ছিল। বিকালে রাজধানী শাহবাগে আসতে থাকেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে তাদের স্লোগান দিতে দেখা যায়। পরে তারাও এসে এই ‘একতার বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে যোগ দেন।
এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আপনারা লক্ষ মানুষের সমাবেশ দেখেছেন, এরপর যদি মানুষের ওপর চোখ তুলে তাকানোর চেষ্টা করো তাহলে কোটি মানুষের সমাগমে পিষে ফেলবো। বাংলাদেশের মানুষ ষোলো বছর পরে নতুন করে স্বাধীনতার মুখ দেখেছে, সেই দিকে কেউ যদি নজর দেয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তার জায়গা বাংলাদেশে হবে না।

তিনি বলেন, এই যে স্বৈরাচারের দোসররা একদিনে অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালায়নি। লুকিয়ে আছে আমাদের আশপাশে। যে পথেই নৌকার মাঝিরা হাঁটুক না কেন, তাদেরকে নৌকাসহ ডুবিয়ে দেয়া হবে। আমরা আমাদের একটি ধাপ পার করেছি মাত্র। যতদিন না জনগণের সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করতে পারি, ততদিন রাজপথে নামার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যে গর্ত থেকে ফ্যাসিস্টরা বের হওয়ার চেষ্টা করবে সে গর্তে তাদের ঢুকিয়ে তালা লাগিয়ে দিতে হবে।

আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, অধিকার আদায়ে আমরা সবসময় রাজপথে থাকবো। ঢাকার সব ছাত্র ও জনতা এক হলে আমরা শহীদদের স্মরণে শাহবাগ থেকে রাপা প্লাজা অভিমুখে পদযাত্রা, মোমবাতি প্রজ্জালন ও নিহত হওয়ার ঘটনাস্থলে এক মিনিট নীরবতা পালন করে দোয়া করবো। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ। পরে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি এবং শহীদদের স্মরণে শাহবাগ থেকে ধানমণ্ডির রাপা প্লাজা অভিমুখে পদযাত্রা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ‘একতার বাংলাদেশ’।

লাপাত্তা জনপ্রতিনিধিরা, সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি by মারুফ কিবরিয়া

৫ই আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে যান বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানের সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যানসহ বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি লাপাত্তা। এসব জনপ্রতিনিধি অনুপস্থিত থাকায় দপ্তরগুলোর কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা। ফলে জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ, ট্রেডলাইসেন্সসহ নানা সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ পড়েছেন ভোগান্তিতে। গত আট দিনে জেলা-উপজেলার অনেক জায়গায় কর্মস্থলে হাজির হননি জনপ্রতিনিধিরা।

সূত্রমতে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরে মুহূর্তেই এলাকা ত্যাগ করেন তারা। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও আগুন দেয়। ফলে আতঙ্কে এলাকা ছাড়া হয়ে কেউই দাপ্তরিক কার্যক্রমে অংশ নেননি। যদিও অনেক এলাকায় সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইতিমধ্যেই।  
শেখ হাসিনা পালানোর আগেই দেশত্যাগ করেন ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। গত ৩রা আগস্ট সপরিবারে সিঙ্গাপুর চলে যান। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের পরপর এই সিটির ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও লাপাত্তা। সংশ্লিষ্ট এলাকায় এসব কাউন্সিলরদের না পেয়ে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। একই অবস্থা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেরও। ঘটনার পর থেকে প্রকাশ্যে আসেননি এই সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম। সিটির আওতাধীন ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অনেকেই লাপাত্তা। ৩৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ সেলিম। ৫ই আগস্ট থেকে উত্তর বাড্ডা সাতারকুল রোড এলাকায় তার দপ্তরটি বন্ধ রয়েছে।

শেখ হাসিনা পদত্যাগের পরপরই আত্মগোপনে চলে গেছেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) মেয়র তাহসিন বাহার সূচনা ও কাউন্সিলররা। ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কুসিক এলাকার নাগরিক সেবা কার্যক্রম। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কার্যালয়গুলো রয়েছে তালাবন্ধ। কোনো ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় খোলা পাওয়া যায়নি। ওইদিন পালিয়ে যান কুমিল্লার প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার।

৫ই আগস্ট সন্ধ্যায় কুসিক মেয়রের বাসভবন পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। লুট করে নিয়েছে ভবনের জিনিসপত্র। অনেক কাউন্সিলরের বাসভবন এবং কার্যালয় পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসে কাজ করার মতো অবস্থাও নেই। লুটপাট হওয়া কম্পিউটার, চেয়ার, টেবিলসহ কিছু জিনিসপত্র দুর্বৃত্তরা নিয়ে গেছে। এদিকে, সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের প্রায় সবক’টিই বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশন এলাকায় নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুরুদ্দিন আহমেদ বলেন, ৭ই আগস্ট জরুরি একটি কাজে কাউন্সিলর অফিসে গিয়েছিলাম। দেখি তালাবদ্ধ। কুমিল্লা সিটি ছাড়াও জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরাও ৫ই আগস্ট থেকে লাপাত্তা বলে জানা গেছে।
গত ৫ই আগস্ট থেকে গা-ঢাকা দিয়েছেন  ফেনী পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা পালানোর পরপর তাকে আর এলাকায় দেখা যায়নি। পৌরসভার কাউন্সিলররাও নেই। গত ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রমে নেই তারা। একই পরিস্থিতি ইউনিয়ন পরিষদেও। জেলার ৮ নং জয়লস্কর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশিদ মিলন ৫ই আগস্ট থেকে পলাতক। তার সঙ্গে পালিয়েছেন বিভিন্ন ওয়ার্ডের মেম্বাররাও।

এদিকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার পর থেকে সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে আসেননি সিলেটের মেয়র মো. আনোয়ারুজ্জামান। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলররাও গা-ঢাকা দিয়েছেন। টানা দু’দিন সিটি করপোরেশনের অচলাবস্থার পর সাবেক মেয়র আরিফুল হক সব কাউন্সিলরকে কাজ করার আহ্বান জানান। এ সময় বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত নির্বাচিত কাউন্সিলররা কাজে যোগ দেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিরা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

শেখ হাসিনার পতনের পর আত্মগোপনে চলে গেছেন রাজশাহী জেলার জনপ্রতিনিধিরা। ৯০ শতাংশেরও বেশি জনপ্রতিনিধি ফেরেননি কর্মস্থলে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা কার্যক্রম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র ও কাউন্সিলররা আত্মগোপনে চলে গেছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে তারা সবাই পলাতক থাকায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কার্যক্রম। একই অবস্থা জেলার গোদাগাড়ী, তানোর, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, পবা, মোহনপুর, বাঘা, চারঘাট ও বাঘমারা উপজেলা পৌরসভার। এসব উপজেলা ও পৌরসভার মেয়র-চেয়ারম্যানদের বেশির ভাগই আত্মগোপনে আছেন।

আত্মগোপনে রয়েছেন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। পুরো সিটিতে কোনো কাউন্সিলরই এখন প্রকাশ্যে নেই। বেশ কয়েকদিন সিটির অচলাবস্থার পর ১২ই আগস্ট প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লস্কর তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বৈঠক হয়। সেখানে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা জেলার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধীনে অন্য সব জনপ্রতিনিধিরা এলাকা ছাড়া। কেউ প্রকাশ্যে নেই। ফলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর আত্মগোপনে চলে যান পাবনার ঈশ্বরদীর বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি। কার্যালয় ছাড়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাদের অনেকেই এখনো কার্যালয়ে ফেরেননি।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরপর ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটুসহ সব ওয়ার্ড কাউন্সিলররা গা-ঢাকা দিয়েছেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাগেরহাটে আওয়ামী লীগ দলীয় শতাধিক জনপ্রতিধি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে থাকায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সেবাবঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বাগেরহাট জেলার ৩টি পৌরসভা, ৯টি উপজেলা ও ৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়র ও চেয়ারম্যানরা সবাই আওয়ামী লীগ দলীয়। এরমধ্যে গণঅভ্যুত্থানের পর শরণখোলা উপজেলা চেয়ারম্যান রায়হান উদ্দিন শান্ত, সদ্য সাবেক এমপি শেখ হেলাল উদ্দিনের প্রার্থীকে হারিয়ে বিদ্রোহী হিসেবে বিজয়ী ফকিরহাট উপজেলা চেয়ারম্যান অহিদুজ্জামান বাবু ও চিতলমারী উপজেলায় চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন সিদ্দিকী এলাকায় থেকে অফিস করলেও অন্যরা জনরোষের ভয়ে এখনো পলাতক রয়েছেন।

‘মারা গেলে আমার লাশ ফেলে যাইস না’

পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক পারভেজ হাওলাদার। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। পরিবারের আদরের ছেলেটির স্বপ্ন ছিল বিদেশ যাবে। তারপর একটা সুন্দর বাড়ি করবে।      

সেই বাড়িতে মাকে নিয়ে থাকবে। তবে বাড়ি করতে না পারলেও পারভেজের নামে একটি সড়কের নামকরণ করেছে এলাকাবাসী। কারণ বাড়ি করার স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে একটি বুলেট। নিভে গেছে পারভেজের জীবন প্রদীপ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়া পারভেজ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে মাথায় বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এরআগে সকালে ফেসবুকে সে তার আইডি থেকে শেষ স্ট্যাটাস দেয় ‘আল্লাহ তুমি ভালো পরিকল্পনাকারী, আল্লাহ তুমি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের খেয়াল রাইখো। দেশের জন্য দশের জন্য যেইটা ভালো হয় তাই কইরো আল্লাহ। আজকে যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। আমিন’। আর আন্দোলনের মাঠে বন্ধুদের বলেছিল, ‘আমি মারা গেলে আমার লাশ ফেলে যাইস না, পরিবারের কাছে লাশ পৌঁছে দিস, বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে যেন আমার দাফন না হয়’।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাকাইশারী বাজার এলাকায় জনৈক রমজানদের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতো পারভেজ। কথা হয় পারভেজের পরিবার ও তার বন্ধুদের সঙ্গে।
তাদের দেয়া তথ্যমতে, সানারপাড় শেখ মোরতোজা আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসপি পাশ করার পর আর্থিক সংকটের কারণে লেখা-পড়া আর করতে পারেনি পারভেজ। তারপরও শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন তাকে ঘরে থাকতে দেয়নি। পরিবারের সকল বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনে যোগ দেয় সে। ৩ বোন ২ ভাইয়ের মধ্যে সে ছোট। তার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয় তার বড় বোন সেলিনা আক্তার, মেঝ বোন রোকসানা আক্তার ও ভাগ্নি সিদ্বেশ্বরী ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী মাহমুদা আক্তার। ৪ঠা আগস্ট একের পর এক নিহতের ঘটনায় পারভেজ বোন আর ভাগ্নিকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু বাইরে নাস্তা খেতে যাই বলে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের মার্চ টু ঢাকা ঘোষিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে ৫ই আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় ঘর থেকে বেরিয়ে যায় পারভেজ। মহসিন, শাকিলসহ অনেকের সঙ্গে মৌচাক থেকে পায়ে হেঁটে রওনা হয় তারা। প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ হেটে কাজলা এলাকায় পুলিশের বাঁধায় পড়ে তারা। সেখানে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার সঙ্গে বিক্ষোভ করে পারভেজরা। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে টোল প্লাজার সামনে একটি গুলি এসে পারভেজের বাম চোয়াল ভেদ করে পিছনে ঘাড় দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়ে সে। মোহসিন ও শাকিল সহ কয়েকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পাশে সালমান হসপিটালে নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎক পারভেকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে তার লাশ বাসায় নিয়ে আসা হয়। ওইদিনই আছরের নামাজের পর বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে নামাজের জানাজা শেষে শুকুরসী কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। পরদিন এলাকাবাসী পারভেজের নামে নিমাকাশারী বাজার রোডের নাম করণ করেন‘ শহীদ পারভেজ রোড’।

পারভেজের বড় বোন সেলিনা আক্তার বলেন, আমি আমার বোন রোকসানা ও আমার মেয়ে মাহমুদা আক্তার কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাইনবোর্ড এলাকায় কয়েকদিন গিয়েছি। যখন একের পর নিহত হচ্ছিল ছাত্ররা। তখন পারভেজ বলে, তোমরা বাসায় থাকো। গুলি খেয়ে মরে গেলে তো এক কথা। আর না মরলে পঙ্গু হয়ে গেলে তো তোমার মেয়ের বিয়ে দিতে পারবা না। তার ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাবে। তখন তাকে বলি ঠিক আছে আমরা যখন আন্দোলনে যাবো না তাহলে তুমিও যেতে পারবে না। সে বলে আচ্ছা। কিন্তু সকালে নাস্তা খেতে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে যায়। সকাল ১০টার দিকে ফোন দিলে বলে ঠিক আছি কোন চিন্তা করো না। বলি সাবধানে থাকিস। বলে কোন সমস্যা নাই। আবার ১১টার দিকে ফোন দিলে বলে, ঠিক আছি। সাড়ে ১১টায় বন্ধু মহসিনকে বলে‘ ‘আমি মারা গেলে আমার লাশ ফেলে যাইস না, পরিবারের কাছে লাশ পৌছে দিস, বেওয়ারিশ ভাবে যেন আমার দাফন না হয়’। ১২টার পর শাকিল ফোন করে বলে পারভেজ মারা গেছে।

কান্নাজড়িত কন্ঠে সেলিনা আক্তার বলেন, পারভেজ বলতো আমি ছাত্র ছিলাম। এখন ছাত্রদের আন্দোলনে কি ঘরে বসে থাকা যায়। জীবন দিয়ে হলেও তাদের সঙ্গে আছি। আর্থিক সংকটের কারণে বেশিদূর পড়তে পারেনি সে। এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে কাজ করে সংসারে কিছুটা সহায়তা করতো। আর বলতো আমাকে বিদেশ পাঠিয়ে দাও। বিদেশ গিয়ে এই নিমাইকাশারীতে একটা বাড়ি করবো। সবাইকে নিয়ে সেই বাড়িতে থাকবো। বলতাম এতো টাকা কই পাবো। ধৈর্য ধরো, টাকা যোগাড় হলে বিদেশ পাঠাবোনে। সে বলতো ‘স্বপ্ন দেখতে সমস্যা নাই। স্বপ্ন পুরন করবো আল্লাহ’। কিন্তু ভাইয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো।
পারভেজের মা হাসি বেগম বলেন, গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি দিঘীরপাড় এলাকায় নদী ভাঙ্গায় সব শেষ হয়ে গেছে। ৩৫-৪০ বছল আগে গ্রাম থেকে চলে আসি। স্বামী মজিবুর রহমান ঢাকার সদরঘাটে ফেরি করে। কালিগঞ্জের চরে আশ্রয় নেই। এরপর পারভেজের বয়স যখন ৬ বছর তখন নিমাইকাশারী এলাকায় ভাড়ায় বাসায় উঠি। গ্রামে কিছুই নাই। তাই এখানেই ভোটার হই। ১৪ মাস আগে পারভেজের বাবা মারা যায়। সবার ছোট পারভেজ অনেক আদরের সন্তান ছিল আমার। মাঝে মাঝেই আমার হাতে খেত। ৪ আগস্ট রাতেই নিজ হাতে খাওয়াইছি। আজ আমার বাবা (পারভেজ) নাই। কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসি বেগম। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার কিছু চাওয়ার নাই। আমার ছেলেকে যেন মানুষ ভুলে না যায়। সে দেশের মানুষের জন্য শহীদ হয়েছে। সরকার যেন তার নাম শহীদ হিসেবে লিখে রাখে।