Thursday, January 7, 2016

উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে পরমাণু সাবমেরিন, বি-৫২ মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের!

উত্তর কোরিয়া হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা করার পর কোরিয় উপদ্বীপে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন, বি-৫২ বোমারু বিমান এবং এফ-২২ স্টিলথ জঙ্গিবিমান মোতায়েন করবে আমেরিকা। এ নিয়ে আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল লি সান-জিন এবং কোরিয়ায় মার্কিন সেনা কমান্ডার জেনারেল কার্টিস স্ক্যাপ্যারোটি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা ইয়োনহ্যাপ এ খবর দিয়েছে।
আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৫ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া, দেশটিতে প্রায় ৬০ বছর ধরে রয়েছে মার্কিন সেনা ঘাঁটি।
সূত্র : রেডিও তেহরান

প্রশ্নটি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছেই! by মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

কয়েকদিন আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বলেছেন, তিনি বের হলে চারদিকের রাস্তাঘাট বন্ধ করে মানুষজনকে আটকে রাখায় তার ভীষণ কষ্ট হয়। রাষ্ট্রপতির এ উপলব্ধিকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কারণ রাজধানী ঢাকার রাস্তায় কোনো ভিআইপি বের হলেই বেশ কিছুক্ষণ আগ থেকেই রাস্তাঘাট ফাঁকা করার জন্য পথচারীসহ সব ধরনের যানবাহন আটকে রাখা হয়। ফলে জনসাধারণকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। তবে গত ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যা ঘটেছে তা বোধহয় এ যাবতকালের রেকর্ড। সেদিন রাজপথের বেশ কিছু এলাকার প্রতি ইঞ্চি জায়গা দখল করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে রাজধানীকে সম্পূর্ণরূপে অচল করে দেয়া হয়েছিল। ওই দিন বায়তুল মোকাররমের পার্কিং থেকে বের হয়ে হাউস বিল্ডিংয়ের সামনের বড় রাস্তায় আসতেই চল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেল। মনে হয়েছিল বড় রাস্তায় এসে পড়ায় এখন যেতে পারব। কিন্তু হা-হতোস্মি! সেখানে একেবারে স্থির হয়ে থাকতে হল। গাড়ির চাকা এক ইঞ্চি সচল করা গেল না। এক ভদ্রমহিলা তো গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে যেতে যেতে সরকারকে গালমন্দ করতে থাকলেন। আমার প্রোস্টেট সমস্যার কারণে আমাকে দুই আড়াই ঘণ্টা পরপর টয়লেটে যেতেই হয়। এখানে রাস্তায় গাড়ির ভেতরে বন্দি অবস্থায় প্রায় দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নেমে তোপখানা সিগনালে অবস্থানরত পুলিশ ভাইদের কাছে গেলাম। সার্জেন্টকে বললাম, এখানে আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বন্দি অবস্থায় আছি। তিনি বললেন, কিছু করার নেই। সবদিকের রাস্তাঘাট বন্ধ। জবাবে বললাম, ২০-২৫ গজ দূরেই আমার গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত সামনের কয়টা গাড়ি যেতে দিলে আমি ডান দিক দিয়ে চলে যেতে পারতাম। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সামনে ডানে সব রাস্তা ব্লক। এ অবস্থায় রাস্তায় কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর দেখলাম, বিজয় নগরের দিকে কিছু গাড়ি যাওয়ার মতো ফাঁকা হয়েছে। আমি সিগনালে দাঁড়ানো একজন অফিসারকে বিষয়টি জানালে তিনি সার্জেন্টকে নির্দেশ দিয়ে কিছু গাড়ি ছেড়ে দিতে বলায় আমি সে স্থান থেকে বের হয়ে সোজা অফিসার্স ক্লাবে গিয়ে ঢুকলাম এবং প্রায় দৌড়ে গিয়ে টয়লেট ব্যবহার করলাম। রাস্তায় বন্দি অবস্থায় থেকে টয়লেট ব্যবহার করে যে আরাম পেলাম তা চিরদিন মনে থাকবে। এ আরাম এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার গোপাল ভাঁড়ের সেই গল্প মনে পড়ে গেল। গল্পটি বলে ফেলি : রাজা পুত্রসন্তান লাভ করায় প্রাসাদে বিরাট খানাপিনা এবং আমোদ আহলাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরই এক ফাঁকে মহারাজ গোপালকে ডেকে বললেন, ‘আমি পুত্রসন্তান লাভ করায় তুমি কতটা আনন্দিত গোপাল?’ গোপাল এক মুহূর্ত ভেবেই জবাব দিলেন, ‘মহারাজ বাহ্য ত্যাগের পর আমি যে সুখ-আনন্দ পাই তেমন আনন্দই পেয়েছি’। একথা শুনে মহারাজ ক্ষিপ্ত হয়ে গোপাল ভাঁড়কে বন্দি করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেন। অতঃপর শূলে চড়ার আগে গোপালের অন্তিম কোনো খায়েশ আছে কিনা জানতে চাইলে গোপাল বললেন, মহারাজ মরেই যখন যাব, তার আগে আমি আপনার সঙ্গে নৌ-ভ্রমণে যেতে চাই। মহারাজও তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে রাজি হলেন এবং দু’জন নৌ-ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। গোপাল নিজেই নৌকা চালাতে থাকলেন এবং চালাতে চালাতে একদম মধ্য নদীতে চলে গেলেন। হঠাৎ এ সময় মহারাজের পেটে মোচড় দিতে লাগায় তিনি গোপালকে তাড়াতাড়ি নৌকা কূলে নিতে বললেন। আদেশ পেয়ে গোপাল নৌকা কূলের দিকে ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকলেন। এ অবস্থায় রাজা গোপালকে আরও জোরে বৈঠা চালাতে বললেন। এভাবে নৌকা কূলে ভিড়তেই রাজা নেমে দৌড়ে গিয়ে বাহ্য ত্যাগ শেষে গোপালের কাছে ফিরে এসে বললেন, ‘কী সুখ আর তৃপ্তি যে পেলাম তা বলে বোঝাতে পারব না, যাও তোমার মৃত্যুদণ্ড আমি রহিত করে দিলাম।’ গোপাল আজ্ঞে হুজুর বলে প্রাসাদ ত্যাগ করলেন।
এখন প্রশ্ন হল গোপাল ভাঁড় না হয় রোজ রাজপ্রাসাদে যেতেন এবং রাজার সঙ্গে কথা বলে সবকিছু বোঝাতে পারতেন; কিন্তু আমাদের দেশের রাজন্যবর্গকে কীভাবে কে বোঝাবেন? এ দেশে হাজার হাজার মানুষ রাস্তাঘাটে মিটিং-মিছিল ইত্যাদির কারণে বিড়ম্বনায় পড়েন, সেসবের অবসান হবে কবে? আমি না হয় সেদিন পল্টনের মোড়ে দাঁড়ানো সেই পুলিশ সাহেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লেখাটি শেষ করলাম। কিন্তু ৪ জানুয়ারির মতো আর কতদিন জনসাধারণকে আটকে রেখে মিটিং-মিছিল করা হবে সে প্রশ্ন তো থেকেই গেল। আর মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছেই প্রশ্নটি জোরেশোরে উপস্থাপন করলাম।
লেখক-মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্টমুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : রাজনীতিবিদ, কলাম লেখক

কেন আটকে আছে শিক্ষকদের পে-স্কেল? by মো. আবুসালেহ সেকেন্দার

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, শিক্ষকরা না বুঝে আন্দোলন করছেন। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেননি শিক্ষকরা পে-স্কেলের কোন বিষয়গুলো বোঝেননি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে তা ঘোষিত অষ্টম পে-স্কেলে অনুপস্থিত রয়েছে। যে বিষয়গুলো পে-স্কেলে নেই সেই বিষয়গুলো কীভাবে শিক্ষকরা বুঝবেন সেই বিষয়টি বুঝিয়ে বলার জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি। তিনি যদি প্রমাণ করতে পারেন, শিক্ষকরা যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছেন এবং যা যৌক্তিক বিবেচনায় মন্ত্রিপরিষদের অনেক সদস্য বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পে-স্কেলে রয়েছে তাহলে আমাদের শিক্ষক নেতাদের অজ্ঞতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা জাতির কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন সেই প্রতিশ্র“তি প্রদান করছি। আর যদি তিনি প্রমাণে ব্যর্থ হন তাহলে আমরা এ সাবেক আমলাকে আর এক মুহূর্তের জন্যও অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই না। এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ‘জ্ঞানের অভাব রয়েছে’ এমন অভিযোগ উত্থাপন করে পরে ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যমে পার পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার কোনো ক্ষমা প্রার্থনা নয়, পে-স্কেল নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়ে অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান করায় অনতিবিলম্বে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি।
অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা সরকারের কাছে দয়া-ভিক্ষা করছেন! অবশ্যই প্রথম থেকে শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষক ফেডারেশনের শীর্ষ নেতাদের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র আন্দোলনই এর জন্য দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছেন এবং তারা আমলা বা অন্য কারোর সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে চান না। তাদের একমাত্র চাওয়া সরকার প্রতিশ্র“ত স্বতন্ত্র পে-স্কেল বাস্তবায়ন। কিন্তু প্রথম থেকেই দেখেছি, শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের আন্দোলন ও বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে এক ধরনের গোঁজামিল রয়েছে। তারা একদিকে বলছেন, আমরা আমলা বা অন্য কারোর সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে চাই না, অন্যদিকে আবার তারা স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবি উত্থাপনের ক্ষেত্রে ‘ঝেড়ে কাশতে’ পারেননি। ফলে সরকার শিক্ষক নেতাদের এ অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েছে। সরকার আমলাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের তুলনা করেই অষ্টম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতা-বিবৃতিতেও সেই তুলনা এখনও লক্ষ করা যাচ্ছে।
তাই একজন তরুণ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের কাছে বিনীতভাবে বলতে চাই, অষ্টম পে-স্কেলে কী বৈষম্য আছে তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবি উত্থাপন করুন। অন্যথায় অষ্টম পে-স্কেলের ছকে বন্দি থেকে কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত রাখা সম্ভব হবে না। আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবি নতুন কোনো বিষয় নয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারই একাধিকবার এমন প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে। ‘সংকটমোচন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আওয়ামী লীগের রূপকল্প-২০২১ সাল কেমন বাংলাদেশ দেখতে চাই’ শীর্ষক প্রবন্ধে ‘শিক্ষা’ উপশিরোনামে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে-স্কেল প্রণয়নের বিষয়টি বলা হয়েছে। প্রবন্ধটিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে : ২০১৪ সালে নিরক্ষরতা সম্পূর্ণ দূর, শিক্ষার মানোন্নয়নে, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং শিক্ষকদের উচ্চতর বেতন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে’ (‘ভিশন ২০২১’, ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা : ২০০৯, পৃ. ৫১)। ২০০৮ ও ’১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ও জাতীয় শিক্ষানীতিতেও ওই ধরনের প্রতিশ্র“তি রয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে স্থায়ী পে-কমিশন, শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্বতন্ত্র কমিশন গঠন ও সম্মানজনক সম্মানী প্রদানের কথা বলা হয়। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতেও বলা হয়েছে : ‘আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সব স্তরের শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে’ (পৃ. ৫৮)। শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের এখন উচিত হবে সবকিছু ভুলে জাতির সামনে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময়ে দেয়া প্রতিশ্র“তি তুলে ধরা এবং সেই প্রতিশ্র“তির বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্দোলন করা।
অবশ্য শিক্ষক নেতারা কতটুকু তা পারবেন তা নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে! কারণ সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নের জন্য শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হতে পারে। কিন্তু দলীয় রাজনীতির শিকলে বন্দি শিক্ষক নেতাদের পক্ষে কি আদৌও তা সম্ভব হবে!
দুই.
বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আর একটি প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোরালোভাবে উত্থাপিত হচ্ছে : এর আগে যে অর্থমন্ত্রী তার অশালীন বক্তৃতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, সেই অর্থমন্ত্রী আবারও কী করে শিক্ষকদের হেয় প্রতিপন্ন করে বক্তব্য প্রদান করেন? অবশ্যই গত কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতায় পাতায় ঘোরাঘুরি করা একটি ছবির মধ্যেই এ প্রশ্নের উত্তর রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক ফেডারেশনের নেতাদের সেলফি উৎসবই সেই সাহসের প্রধান উৎস।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের সেলফির ছবিটি পোস্ট করে সালেহ হাসান নকিব নামে এক শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একটি মারাত্মক জিনিস। কে দাস আর কে প্রভু তা সুস্পষ্ট। আবুল মালের বেপরোয়া বক্তব্যের উৎসটি এখানেই। পরোয়া করে না, কারণ পরোয়া করবার প্রয়োজন নেই।’ নকিব কি সত্যি ভুল লিখেছেন? সেদিন যদি শিক্ষক নেতারা সেলফি উৎসবে না মেতে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতে পারতেন তাহলে হয়তো অর্থমন্ত্রী তার প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করা এবং নতুন করে শিক্ষকদের প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য প্রদানে সাহস করতেন না। আমরা চাইব আগামী দিনে আমাদের শিক্ষক নেতারা আর সেলফি উৎসবে না মেতে দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে দাবি আদায় করেই তবে ঘরে ফিরবেন।
তিন.
আন্দোলনের ধীরগতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ করছেন, শিক্ষক ফেডারেশনের নেতারা সাধারণ শিক্ষকদের স্বার্থের চেয়ে নিজের আগামী দিনের ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিচ্ছেন বলেই আন্দোলনের এমন ধীরগতি। অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষক রাজনীতি করেন তাদের শেষ জীবনে স্বপ্ন থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হবেন। তাই কোনো শিক্ষক নেতাই চাইবেন না তার নেতৃত্বে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক যাতে তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমরা শিক্ষক নেতাদের এ চাওয়াকে ধূলিসাৎ করতে চাই না। অথবা আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে কেউ নতুন কোনো সংকটের সৃষ্টি করুক সেটিও চাই না। কিন্তু প্রশ্ন রাখতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়াই কি শিক্ষক জীবনের সার্থকতা? একবার কি ভেবে দেখবেন ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ২৭ ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদ অলংকৃত করেছেন, কয়জনকে এ দেশের মানুষ মনে রেখেছে? এমনকি ঢাবির ছাত্ররাই বা কয়জনের নাম জানে? অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম। শিক্ষক নেতাদের এ বিষয়টি ভাবার জন্যও অনুরোধ করছি।
পরিশেষে, শিক্ষক নেতাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, দয়া করে সময় থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করুন। আর সাধারণ শিক্ষকদের মান-অভিমান ভুলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেডারেশন ঘোষিত কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান করছি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কঠোর অবস্থানই বলে দিচ্ছে যে, শিক্ষকদের দাবি আদায় খুব সহজে হবে না। তাই সব শিক্ষকের মনে রাখা উচিত- বিভেদ নয়, দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প নেই।
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
salah.sakender@gmail.com

আস্থার সম্পর্ক আদৌ তৈরি হবে কি? by তারেক শামসুর রেহমান

বহুল আলোচিত পৌর নির্বাচন শেষ হয়ে যাওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এই নির্বাচন কি দুটি বড় দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) মাঝে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে আদৌ সহায়ক হবে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মাঝে যদি সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে গণতন্ত্রকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কিংবা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে নানা ‘প্রশ্ন’ থাকলেও পৌর নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণে একটা সম্ভাবনার জন্ম হয়েছিল যে, এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর দুই বড় দলের মধ্যে একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হবে! এখন সে সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, সংঘাত-সহিংসতার মধ্য দিয়ে যে নির্বাচনটি শেষ হল, তা রেখে গেছে অনেক প্রশ্ন। এবং একটি ‘সমঝোতাকে’ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
বিএনপি এরই মধ্যে এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে। সংবাদপত্রগুলো গত ৩১ ডিসেম্বর বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রের যে ছবি ছেপেছে, তা একটি শুদ্ধ নির্বাচনের ধারণাকে সমর্থন করে না। কিন্তু তারপরও এ নির্বাচন অনেকগুলো ‘সাফল্য’ দাবি করতে পারে। প্রথমত, এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকেছে। মিডিয়ার কারণে দুপুরের আগেই কোথাও কোথাও সহিংসতা, জাল ভোট প্রদান, ভোট কেন্দ্র দখলের খবর এলেও বিএনপি নির্বাচন বর্জনের কথা বলেনি। বরং দু’দুবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তাদের ‘প্রতিবাদ’ লিপিবদ্ধ করেছে। এর মধ্য দিয়ে ‘সব দলের অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত করে নির্বাচন কমিশন একটি বাহবা নিতেই পারে। দ্বিতীয়ত, নারীরা সেদিন সকালেই প্রায় প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। এটা নিঃসন্দেহে একটা প্লাস পয়েন্ট। তৃতীয়ত, এবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কোনো খবর আমরা পাইনি, অথচ আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, অতীতে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর লোকদের ওপর হামলা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এবার তেমনটি হয়নি। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট। চতুর্থত, বেসরকারি নির্বাচন-পর্যবেক্ষকদের প্রায় কেউই পৌর নির্বাচনকে শতকরা একশ’ ভাগ শুদ্ধ বলেননি। তবে বলেছেন, তুলনামূলক বিচারে ভালো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, শতকরা ৭৩ ভাগ ভোট পড়েছে। এটা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু ছোট ছোট ‘ঘটনা’ যেমনি বড় অর্জনকে ম্লান করে দেয়, ঠিক তেমনি পৌর নির্বাচন সম্পন্ন করতে সফলতার চেয়ে ইসির সীমাবদ্ধতাই বেশি ফুটে উঠেছে।
এ নির্বাচনের পর যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনে এ দেশে আগামীতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি-না? ৫ জানুয়ারির (২০১৪) জাতীয় সংসদ (দশম) নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন (শেষের তিনটি) এবং সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচন প্রমাণ করল নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৪) ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেটা ছিল সংসদীয় রাজনীতির একটা ‘কালো অধ্যায়’। এখন এর সঙ্গে যোগ হল ৭ জন মেয়রের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার খবর। এটা কোনো ভালো খবর নয়। ইসি এ ব্যাপারে আদৌ তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ ঘটনা ইসির ভূমিকাকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করল। প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতির এখতিয়ার বলে নিজ স্বাক্ষরে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি আমলারা। এক্ষেত্রে সরকারি দলের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের ওপর যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ‘চাপ’ ছিল, তা কি অস্বীকার করা যাবে?
পৌর নির্বাচন নিয়ে যা ‘ঘটল’, মিডিয়ায় যা প্রকাশিত হয়েছে, কিংবা চ্যানেলগুলোতে যা সম্প্রচারিত হয়েছে, তা সরকার কতটুকু গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু সরকারের শরিক দল জাতীয় পার্টি যখন অনিয়ম ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করে, ইসি ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করে, তখন সরকারের গুরুত্ব দেয়া উচিত। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। আমাদের সংবিধানের ১১নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ আমরা বারবার সাংবিধানিক প্রাধান্যের কথা বলি। সেক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই ১১নং অনুচ্ছেদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন একটি প্রশ্ন থাকবেই, পৌর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংবিধানের ১১নং ধারার মূল স্পিরিটটি কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে? আমরা যতই বলি ইসি স্বাধীন এবং যতই সংবিধানের দোহাই দিই না কেন (১১৮-৪), বাস্তবতাই বলে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন নয়। আমরা যে অর্থে ভারতের নির্বাচন কমিশনকে তাদের ‘অধিকার’ চর্চা করতে দেখি, আমাদের এখানে এটা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। ইসিকে অর্থের জন্য সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে এক ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়। ইসি নিজে কোনো ‘বাজেট’ প্রণয়ন করতে পারে না। ইসির নিজের কোনো ‘ক্যাডার কর্মকাণ্ড’ নেই, যারা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিজেরা পরিচালনা করতে পারে। পৌর নির্বাচনে প্রায় ৭০ লাখ ভোটার ছিল। জড়িত ছিল কয়েক কোটি মানুষ। এটা একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ। সরকারের সহযোগিতা তাদের প্রয়োজন ছিল। আর নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত হয়ে গেলে তা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কারণ আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে ‘দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা’ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমলাদের অনেকে ভালো পোস্টিং, সুযোগ-সুবিধা নেয়ার আশায় অনেকটা জ্ঞাতসারেই সরকারি দলের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেন। এ প্রবণতা খারাপ। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রবণতা অনেক বেশি বেড়েছে। মাঠ পর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এ ‘প্রবণতা’ বড় ধরনের প্রতিবন্ধক।
এখন যে বিষয়টির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে, একটি ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচন আয়োজন করা কীভাবে সম্ভব? সংবিধানের ১১৮-৪ ধারা আমাদের ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। সংবিধানের ৫৮ ধারায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান ছিল। এখন যা অতীত। বিদেশী পর্যবেক্ষক, বিশেষ করে জাতিসংঘ কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব। যেমনটি করেছে নেপাল। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে। নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘বিদেশীদের’ ডেকে আনা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। উপরন্তু জাতিসংঘ তখনই নির্বাচন-পর্যবেক্ষক পাঠাবে অথবা নির্বাচনের আয়োজন করবে (যেমন- নেপাল, কম্বোডিয়া) যখন বিবদমান ‘পক্ষ’ জাতিসংঘকে অনুরোধ করবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এরকম কোনো সম্ভাবনা নেই।
তাহলে কি এ রকম চলতেই থাকবে? নির্বাচন মানেই জাল ভোট, ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র দখল, কিংবা সহিংসতা! এই বৃত্ত আমাদের ভাঙা দরকার। কিন্তু কীভাবে? দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দলীয় সরকারের (ওই সময় সরকার থাকে নির্বাচনকালীন সরকার। তাদের কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে না) অধীনে নির্বাচন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতি একটু ভিন্ন। বুদ্ধিজীবীরা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারতেন। আমি দুঃখজনকভাবে অনেক তথাকথিত সুশীলকে দেখছি টক-শোতে, যারা কিছুদিন আগেও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলতেন, পত্রিকায় কলাম লিখতেন; আজ দেখি তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাচ্ছেন। আমি অবাক হয়ে দেখি, যারা সাংবিধানিক পদে আছেন, শপথ নিয়েছেন, তারা টক-শোতে দলীয় রাজনৈতিক বক্তব্য রাখছেন। অতীতে কখনোই এমনটি হয়নি। অতীতেও রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ভিসিরা ছিলেন, মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানরা ছিলেন। তারা সাধারণ ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ এড়িয়ে চলতেন। আজ পাল্টে গেছে সব। আর এভাবেই আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পাল্টে দিয়েছি। পাল্টে দিয়েছি নির্বাচনের সংস্কৃতি।
আজ যখন সংবাদপত্রগুলো বলে ‘প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন’, ‘শতাধিক পৌরসভায় হামলা, সংঘাত, গুলি, ব্যালট ছিনতাই’, ‘বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা’; কিংবা যখন বহিরাগতদের ভোট কেন্দ্রে ঢুকে জাল ভোট প্রদানের দৃশ্য প্রথম পাতায় ছাপা হয়, কিংবা ভাঙা ব্যালট বাক্স জঙ্গলে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়ার ছবি ছাপা হয়, তখন আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়। এই যে সংস্কৃতি, এই সংস্কৃতি সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার জন্য সহায়ক নয়। এই সংস্কৃতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ ও দূরত্ব আরও বৃদ্ধি করবে। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে হয়ে পড়বে একদলীয়। লংঘিত হবে মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সুস্থ চিন্তার চর্চা।
বিএনপি মাত্র ২৩টি আসনে, আর আওয়ামী লীগ ১৭০+৭ আসনে বিজয়ী হল। এই পরিসংখ্যান সত্য হলে বলতে হবে বিএনপি তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে(?)। সেটা কি বর্তমানে এমন পর্যায়ে এসেছে (২৩ আসন)? প্রশ্ন এখানেও। সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস বলে, অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এমনকি ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির ভোট প্রাপ্তির হার ছিল শতকরা ৩৩ ভাগের ওপরে। সেই পরিসংখ্যানের সঙ্গে ‘২৩ আসনের’ হিসাব মেলে না।
একটি নির্বাচন হয়েছে। এটাকে ভালো নির্বাচন বলা যাবে না। এ নির্বাচন এই অভিমতকে আরও শক্তিশালী করবে যে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। আর ইসিও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। তারপরও সব ‘ত্র“টি’কে ফেলে দিয়ে দুই বড় দলের মাঝে যদি একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়, তাহলে তা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tsrahmanbd@yahoo.com

সন্ত্রাস বিঘ্নিত পাক-ভারত সম্পর্ক by সৈয়দ রশীদ মুনির

বিদায়ী বছরটি শেষ হয়েছে পাক-ভারত পরিস্থিতির ক্ষেত্রে একটি তুলনামূলক ইতিবাচক ঘটনার মধ্য দিয়ে। দু’দেশের পররাষ্ট্র সচিব ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরাজমান কাশ্মীর ও অন্যান্য সমস্যা নিরসনে আলোচনা শুরু করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। উন্নয়নের আনন্দে অবগাহন করে পাকিস্তান ও ভারতের সরকার ভবিষ্যতের বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছে এবং কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাকিস্তান সফর শান্তির ভবিষ্যৎ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রটি পরিবর্তনশীল, যেখানে কয়েক বছরের অগ্রগতি কয়েক ঘণ্টায় অপূর্ণতায় পর্যবসিত হতে পারে। প্রতিটি পদক্ষেপ সঠিক পথে নেয়ার পরও আমরা উল্টো পথে বহু পদক্ষেপ পিছিয়ে যেতে পারি। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে অত্যন্ত ধীরগতির শান্তি প্রক্রিয়া- যা তার অনিশ্চয়তা ও ভঙ্গুরতার জন্য কুখ্যাত- সামনের দিনগুলোতে আরও একবার পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এবং তা হবে এমনসব ঘটনার আলোকে, যেখানে শান্তিপ্রত্যাশীরা অসন্তোষ এবং যুদ্ধবাজরা উল্লাস প্রকাশ করছে।
এ মুহূর্তে উদ্বেগের কারণ হল ভারতীয় সীমান্তের ওপারে হামলা, যে জন্য রাষ্ট্রবহির্ভূত অনুঘটক ও জঙ্গিদের দায়ী করা হচ্ছে। এসব ঘটনার প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করা কঠিন। তবে এখন পর্যন্ত যেসব রিপোর্টকে বিশ্বাস করতে হচ্ছে সেগুলো বলছে, পাক-ভারত সীমান্তের কাছে পাঠানকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ঘাঁটির ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে জঙ্গি হামলাটি চালানো হয়েছে। হামলার ঘটনার পর এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এ হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জৈশ-এ-মোহাম্মদ। এ দাবি যদি সত্য হয় তাহলে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কোনো শান্তির প্রত্যাশাকে নিশ্চিতভাবেই বিদায় জানাতে হবে।
পরিস্থিতির এমন হতাশাজনক মূল্যায়নের দুটি কারণ রয়েছে। যদি ওই হামলায় উল্লিখিত জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সত্য হয়, তাহলে ভারত সরকারের উদ্বেগের কারণটি হবে প্রথমত. পাকিস্তানের নিজ ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে জঙ্গিবাদী অবকাঠামো ভেঙে দিতে দেশটির রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যরে প্রশ্নে। দ্বিতীয়ত. এবং সম্ভবত যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক তা হল, এ হামলা পাকিস্তানের নিরাপত্তা ইস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্পর্কের বিষয়ে ভারত সরকারের অবিশ্বাস আরও বাড়াবে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের নিরাপত্তা ইস্টাবলিশমেন্ট জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে কিছু বিষয়ে সহমত পোষণ করে বলে মনে করা হয়।
এ ধরনের পরিবেশে হামলার প্রকৃত উৎস ও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো খুব বেশি উদ্যোগ নেবে না। পাশাপাশি আফগানিস্তানে ভারতীয় কনস্যুলেটে হামলার ঘটনাও দু’দেশের মধ্যে বিদ্বেষ ও বৈরিতা বৃদ্ধির আশংকা বাড়িয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় প্রতিরক্ষা স্থাপনায় হামলা পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর স্বার্থের একটি বড় চালিকাশক্তি- অতীতে বিভিন্ন যুদ্ধ এবং অন্য নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে যার প্রকাশ ঘটেছে। এ বাস্তবতায় সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতা ছিল না- পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষে ভারতীয়দের এটা বোঝানো বেশ কঠিন হবে।
আস্থা ও সহযোগিতার পথই একটি আপসরফায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য উপায়। কিন্তু যখন অতীত বর্তমানকে তাড়া করে ফেরে, তখন পাকিস্তান ও ভারত তাদের দীর্ঘদিনের পুরনো সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবে, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অতীতের বহু ঘটনার মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও পাক-ভারত শান্তি প্রক্রিয়াকে সিঁকেয় তুলে রাখবে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শুধু রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কারণে নয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির অক্ষমতার কারণেও যে বৈরিতার উপস্থিতি থেকে যাবে, তাতে শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়ার আশা অতি সামান্যই।
ফলে দু’দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের প্রকৃত উদ্যোগও ব্যর্থ হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে হামলা চালিয়েছে একটি পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন- এ দাবির সত্যতা যদিওবা নিরূপণ করা যায় তবুও এ হামলা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। শান্তি প্রক্রিয়া ব্যর্থতার কিনারে পৌঁছে গেছে এটিই এখন বাস্তবতা। পাঠানকোটে যারাই হামলা চালিয়ে থাকুক না কেন, তাদের পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে আলোচনাকে লাইনচ্যুত করার উদ্দেশ্যটি সফল হয়েছে। দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্প্রতি যে নমনীয়তা লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তার আর কোনো মূল্য নেই।
অবশ্যই শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর আসা আঘাত এবং পারস্পরিক বৈরী মনোভাব উপেক্ষা করার খুবই ক্ষীণ একটি সুযোগ দুই দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রয়েছে। তবে ইতিহাসকে বিশ্বাস করলে প্রভাবশালীদের মনে এ ধরনের ইচ্ছা জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে পাকিস্তানের বেসামরিক-সামরিক ইস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে যে মতভিন্নতা রয়েছে, মনে হয় আগামীতে তা আরও স্পষ্ট হবে।
একইভাবে এ হামলার পর পাকিস্তানের প্রতি নরেন্দ্র মোদির প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এখন পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আইনসভা ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা তার সরকারের পক্ষে কঠিন হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের লড়াই একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ অবস্থায় যখন কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগের লক্ষ্য হয় সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা, তখন একটি অবিশ্বস্ত প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাক- এটা নিশ্চিতভাবেই পাঠানকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের কাছে একটি কাঙ্ক্ষিত বিষয়।
পাক-ভারত শান্তি প্রক্রিয়ার ভাগ্যে এমনটিই ঘটে থাকে। আত্মস্বার্থ, শঠতা এবং একটি সাধারণ অনাস্থার বোধ সিদ্ধান্ত-প্রণয়নকারী শক্তির ব্যক্তিবর্গের মধ্যে পরিব্যাপ্ত। যখনই কিছু অগ্রগতির বিষয়ে আশা জেগেছে, তখনই আতংক আমাদের আচ্ছন্ন করেছে এবং পরিস্থিতি অচলাবস্থার চেয়েও বেশি খারাপ হয়েছে। একটি বৈরী পরিস্থিতিতে একমাত্র সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিল্পীসুলভ আচরণ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং নমনীয় (সফট) কূটনীতির অন্যান্য পন্থাই দু’দেশের মধ্যে মতভিন্নতা নিরসনে সহায়ক হতে পারে। পরিশেষে, আমরা সাধারণ নাগরিক ভিন্ন ভিন্ন ট্রেনের দুর্ভাগা যাত্রী হিসেবে ভুলভ্রান্তি কাটিয়ে বিপদ থেকে উত্তরণের প্রত্যাশা করি, আমাদের গন্তব্য অভিন্ন- শান্তি।
পাকিস্তানের ডেইলি টাইমস পত্রিকা থেকে ভাষান্তরিত
সৈয়দ রশীদ মুনির : পাকিস্তানি কলাম লেখক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

মত প্রকাশের প্রক্রিয়া বিপর্যস্ত হলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথচলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় by মাহফুজ উল্লাহ

বিদায়ী বছরে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। জীবনযাপনের এ উৎসাহী মানসিকতা মানুষ অনেকদিন থেকেই লালন করে আসছে। ভবিষ্যৎদ্রষ্টা না হয়েও মানুষ কল্পনা করে নতুন বছরটি তার জীবনে বয়ে আনবে প্রত্যাশিত সুখ ও শান্তি। সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ না হলেও বাংলাদেশের শহুরে মানুষদের কাছে ধীরে ধীরে বাড়ছে ইংরেজি নববর্ষ উদ্যাপনের প্রয়োজনীয়তা। এ জন্য সরকারকেও হতে হচ্ছে সক্রিয় ও কঠোর। সরকারের এ কঠোরতা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও কার্যকর হলে নাগরিকরা আশ্বস্ত হতে পারতেন। অথচ বিদায়ী বছরের শেষের আগের দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলীয় পরিচয়ে পৌরসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে।
টেলিভিশন পরিচিতির কারণে বছরের শেষদিনে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, নির্বাচন কেমন হল? জবাবটা তৈরি ছিল। সেটাও সংবাদপত্রের কল্যাণেই। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর একটি ইংরেজি দৈনিকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় যে খবরটি ছাপা হয়েছে তার বাংলা অনুবাদ মোটামুটি এ রকম : ফেনী জেলার দাগনভূঞার একটি ভোট কেন্দ্রে একজন মহিলা চারটি ভোট দিয়ে আসার পর সরকারদলীয় একজন তাকে অনুরোধ করেন আরেকটি ভোট দেয়ার জন্য। মহিলা রাজি হচ্ছিলেন না, বলছিলেন পুলিশ ধরলে জেলে যেতে হবে। অনেক পীড়াপীড়িতে তিনি রাজি হলেন এ শর্তে যে, পুলিশ ধরলে সরকারি দলের লোকজন নিরাপত্তা দেবেন।
এ ঘটনা সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনের একটি ছবি। এরকম আরও অসংখ্য ছবি আছে। নাগরিক সমাজের অনেকের কাছেই সংখ্যার হিসাবে এসব অনিয়ম তুচ্ছ। তাদের অনেকে বলেন, তেমন ভায়োলেন্স হয়নি, মাত্র একজন মারা গেছেন। অবস্থাটা এমন যে, আরও অনেক লোকের মৃত্যু হওয়া উচিত ছিল। এ তর্কে জড়িয়ে না পড়েও যে কথাটি জোর গলায় বলা প্রয়োজন তা হচ্ছে, এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক উদ্যোগ, বঞ্চিত হয়েছে অসংখ্য মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে, একটি সুন্দর নতুন বছরের প্রত্যাশা ঢেকে গেছে অন্ধকারে।
গণতন্ত্রকে অনেকভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায় এবং সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছেও। ইতিহাসে পরদেশ আক্রমণ বা দখল করে নেয়ার সংস্কৃতিও স্বদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থারই অংশ। কিন্তু যেভাবেই দেখা হোক না কেন, গণতন্ত্রের সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক অনেক গভীর, সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রকে দিতে পারে মর্যাদা। গণতন্ত্র হচ্ছে মত প্রকাশের এবং নেতা বাছাইয়ের স্বাধীনতা। জনগণ তাদের নেতা হিসেবে কাকে বাছাই করবেন সেটি তাদের ব্যাপার। তাদের ওপর যদি নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে তারা সেটা গ্রহণ করতে চান না। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশেই রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব এমনভাবে গড়ে উঠেছে যাতে তারা জনগণের ওপর তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনেকদিন ধরে চাপিয়ে রাখতে পারেন। এ ব্যাপারে একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ জিম্বাবুয়ে, যেখানে রবার্ট মুগাবে বিরোধী দলের উপস্থিতি সত্ত্বেও নিজেকে কয়েক দশক ধরে জনগণের ওপর চাপিয়ে রেখেছেন। গণতন্ত্রের চর্চায় সাম্প্রতিক সময়ে আরও যে বিষয়টি যুক্ত হয়েছে তা হচ্ছে বংশলতিকা। এ বংশলতিকা ব্যবহার করে দলের ও সরকারের নেতৃত্ব ভ্রমণ করছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মন্তরে।
এই বিরাজমান বাস্তবতার পরও নিজের ও রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে মানুষের আকাঙ্ক্ষার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এর কারণ পৃথিবীতে সবসময় সুচিন্তার ওপর বিকৃত চিন্তা বিজিত হয়েছে, অন্ধকার থেকে মানুষের উত্তরণ ঘটেছে আলোয়। এ কারণেই আজ থেকে ৬৭ বছর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক ঘোষণার ২১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে : স্বাধীনভাবে পছন্দকৃত প্রতিনিধির মাধ্যমে সরকার পরিচালনায় প্রত্যেকের অধিকার আছে। জনগণের ইচ্ছাই হবে সরকারের কর্তৃত্বের ভিত্তি এবং এ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে গোপন ও সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে। এ ঘোষণার প্রতি পুনরায় ২০০৫ সালের শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। কিন্তু এ অঙ্গীকার থেকে বাংলাদেশ কত দূরে দাঁড়িয়ে আছে?
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি অন্যতম উপাদান ছিল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ তাদের মতামত যেভাবে প্রকাশ করেছিল তার অস্বীকৃতিই পাকিস্তান সম্পর্কে তাদের মোহভঙ্গের কারণ হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনী ফলাফলের পর প্রায় অনুরূপ ঘটনা ঘটলেও মানুষ ভেবেছিল এটি হবে সাময়িক সংকট। কিন্তু সংকট আরও তীব্র হয়েছে এবং পাকিস্তানিরা উপলব্ধিও করতে পারেনি গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারহীনতা পূর্ব বাংলার মানুষের মনোজগতে কী পরিবর্তন এনেছে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই ক্ষমতাসীনরা জনগণের মনোজগতের এ পরিবর্তনকে পূর্বাহ্নে উপলব্ধি করতে পারে না। দু-একটি উদাহরণই যথেষ্ট। যা ঘটেছিল জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষেত্রে।
মোহিনী চরিত্রের অধিকারী এই দুই নেতা জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাকে হিমালয়সম উচ্চতায় নিয়ে গেলেও রাজনীতিতে শেষ রক্ষা করতে পারেননি। মানুষের মনোজগতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের ফলে এ দু’জন তাদের রাজনৈতিক দলকে বর্তমান সময়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছেন।
বাংলাদেশে ঘটনাগুলো ঘটেছে অন্যভাবে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া নির্বাচনের মাধ্যমে যে জনইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতে পারত তা হয়নি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোনো নির্বাচনই দীর্ঘস্থায়ী সমালোচনামুক্ত হয়নি। সমালোচনা সত্ত্বেও ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভব হয়েছিল দেশের একমাত্র রংধনু পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার। সংখ্যার হিসাবে নয়, মতাদর্শের ভিত্তিতে সমাজের প্রায় সব পেশা ও শ্রেণীর মানুষ ওই সংসদে মত প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিল।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াইটি কষ্টকর ও দীর্ঘস্থায়ী। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী অনিয়ম যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা অবিশ্বাস্য। মার্কিন সমাজ সে সমস্যা কাটিয়ে উঠলেও ২০০৪ সালের নির্বাচনে মার্কিন গণতন্ত্র পুনরায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল।
নির্বাচনের সময় সীমিত সময়ের জন্য হলেও জনগণ ক্ষমতাসীন হয়ে ওঠে। তখন নেতাদের ছুটতে হয় ভোটারদের কাছে, করতে হয় মনোরঞ্জন। কিন্তু রাজনীতিকরা যেহেতু অনেক বুদ্ধিমান তাই মনোরঞ্জনে ব্যর্থ হয়ে তারা বেছে নেন জনগণের ভোট চুরির পথ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা সহজেই ভোট চুরি করে সরকারের মালিক বনে যেতে পারেন। আবার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার সুযোগে এ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন দুর্বৃত্তের শাসন, যা ঘটেছে ১৯৩০-এর দশকে হিটলারের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
গণতন্ত্র হচ্ছে উদারনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার ভিত্তি হচ্ছে স্বাধীনতা। মানুষকে ভয় দেখানো, ভোট ডাকাতি করা, নির্বাচনের আগেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা, নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেয়া এবং সর্বোপরি ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নির্বাচনী মাঠ শূন্য করে নিজে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া গণতন্ত্র নয়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া মানেই ভোটারদের ওপর ভীতির চাদর বিছিয়ে দেয়া, যাতে কেউ প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস না পায়। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছিলেন, মানুষ যখন ভোট দিতে যায় তখন শুধু তাদের নেতাই নির্বাচন করে না, একই সঙ্গে নিজের রাষ্ট্রের জন্য লক্ষ্যও ঠিক করে দেয়। এ অভিমত প্রকাশের প্রক্রিয়াটি বিপর্যস্ত হলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথচলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা একদিকে মানুষের মনোবেদনার কারণ হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এ বিষয়টি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে চাইবেন না। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ যে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে দুটি বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা না গেলে জাতীয় অগ্রগতি ও প্রগতি ব্যাহত হবে।
তিন বছর আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দ্য গ্লোবাল কমিশন রিপোর্ট অব ইলেকশন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করার ব্যাপারে পাঁচটি শর্তের কথা বলেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে- আইনের শাসনকে শক্তিশালী করা যাতে ভোটার ও প্রার্থীর স্বার্থ সংরক্ষিত হয়; এমন একটি নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা যারা স্বাধীন, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন পরিচালনায় সক্ষম; এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে বহুদলীয় শাসন ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন করবে না; সর্বজনীন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অর্থের ব্যবহারকে নিয়ম-কানুনের মধ্যে নিয়ে আসা।
বর্তমান সময় থেকে শুরু করে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের পবিত্রতা রক্ষা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এখনই রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসতে হবে। আর সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব হবে ভোটারের একই নির্বাচনে পরপর পাঁচবার ভোট দেয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় প্রগতি ও অর্থনীতি, সংকটাপন্ন হবে জাতীয় নিরাপত্তা।
মাহফুজ উল্লাহ : সাংবাদিক

‘শিশুদের এসএসসি’ পরীক্ষার নেপথ্যে যারা byতানজীবা চৌধুরী ও রিফাত আফরোজ

২০০৯ সালে শুরু হওয়ার পর অনেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাকে আখ্যায়িত করেন শিশুদের এসএসসি পরীক্ষা হিসেবে। এই পরীক্ষার প্রভাব কেবল যে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের ওপরই পড়ছে তা নয়, বরং তা সমভাবে প্রভাব ফেলছে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তার সংলগ্ন শিক্ষা অফিসগুলোতেও। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে গিয়ে শিক্ষকদের ব্যস্ততা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাপনীর জন্য উপযুক্ত শিক্ষার্থী বাছাই করা শুরু হয় মূলত চতুর্থ শ্রেণী থেকেই। পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং সমাপনী পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থীর সংখ্যায় যেন পার্থক্য না থাকে সে জন্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শ্রেণীতেই পুনরাবৃত্তি করতে হয়। বছরের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রস্তুতির জন্য বিদ্যালয়ের নিয়মিত সময়ের বাইরে কোচিং ও অতিরিক্ত ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। আদতে কোচিং হলেও সরকারি নিষেধ থাকায় স্কুলগুলোর এই উদ্যোগকে অতিরিক্ত ক্লাস হিসেবেই অভিহিত করা হয়। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার পর থেকে বিশেষ কোচিং ক্লাস শুরু হয়। এসব ক্লাসে মূলত ইংরেজি আর গণিতের ওপর জোর দেয়া হয় বেশি, পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গাইড বই বেশি অনুসরণ করা হয়। সাধারণত এই কোচিং বাধ্যতামূলক, সবাইকে এর জন্য ফি দিতে হয়। স্কুল ছুটির সময়েও (যেমন গ্রীষ্মকালীন/রোজার ছুটি) কোচিং করানো হয়। এই কোচিংয়ের জন্যও ফি নির্ধারিত করা থাকে।
ভালো ও দুর্বল সব ধরনের শিক্ষার্থীর চাহিদার কথা মাথায় রেখেই যেগুলো বেশি প্রয়োজনীয়, কোচিংয়ে সেগুলোই পড়ানো ও যাচাই করা হয়। সমাপনীর প্রশ্নের আদলে প্রশ্ন তৈরি করে পরীক্ষা নেয়া হয়। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো জেনে পরীক্ষার উপযোগী করে তোলার জন্য তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হয়, যদি শিক্ষার্থী না পারে, সে ক্ষেত্রে তাকে সাজেশন দেয়া হয়। যদি এতেও কাজ না হয় তবে শেষ চেষ্টা হিসেবে পরীক্ষার সময় ভালো ছাত্রের পাশে দুর্বল ছাত্রকে বসানো হয়। একজন প্রধান শিক্ষকের ভাষায়- ‘প্রশ্নগুলো এমনই, একটা ভালো ছাত্র যদি পাশে থাকে তাহলে একটা গাধা ছাত্রও পাস করে যাবে, তবে আমরা তাকে বলে দিই ভালো ছাত্রটিকে বেশি ডাকাডাকি না করতে, তাহলে আবার তাকে পাস করাতে গিয়ে
A+ কমে যাবে।’
বিদ্যালয়ের দক্ষ শিক্ষকরাই কোচিং ক্লাস নিয়ে থাকেন। একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘যেসব স্কুল ভালো করেছে সবগুলো কোচিং করেই ভালো করেছে, কারণ ৩৫ মিনিটের ক্লাসে সব ধরে ধরে শেখানো যায় না। আর স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় এটি অতিরিক্ত চাপ হয়ে যাচ্ছে। উপর থেকে চাপ দেয়া হয়, শিক্ষার্থীদের ভালো করে প্রস্তুত করতে হবে, বাধ্য হয়ে তাই কোচিং করাতেই হয়।’
অভিভাবকরা বলেন, শিক্ষকরা পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করে কার সন্তানের কী অবস্থা তা জানিয়ে দেন। অনেক অভিভাবক নিজে থেকে আসেন, আবার অনেককেই খবর দিয়ে আনতে হয়। সন্তানের পড়াশোনার উন্নতি কিভাবে করা যায় তা নিয়ে তারা আলোচনা করেন এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন। সামর্থ্য থাকলে বাসায় শিক্ষক রাখতে বলেন এবং কাকে শিক্ষক হিসেবে নিলে বেশি উপকার পাবেন সে ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
সমাপনীর ফলে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা বাড়ছে বলেও জানা যায়। শিক্ষকরা সাক্ষাৎকারে জানান, কোনো শিক্ষার্থী যদি ফেল করে তবে শিক্ষা অফিস থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ আসে। একজন প্রধান শিক্ষক জানান, ইতিপূর্বে তাদের স্কুলে শিক্ষার্থী ফেল করায় লিখিতভাবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর তাদের কারণ দর্শাতে হয় এবং ভবিষ্যতে তাদের আরও ভালো যত্ন নেয়ার অঙ্গীকার করতে হয়। এখন কোনো শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে যেমন ওই বিদ্যালয়ের প্রধানকে জবাব দিতে হয়, তেমনি কোনো শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পরপর দুইবার অকৃতকার্য হলেও তাকে জবাবদিহি করতে হয়। শুধু বিদ্যালয় নয়, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলেও একজন শিক্ষা অফিসার উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, বর্তমানে স্কুলগুলো অনেক সচেতন। যেহেতু জিপিএ ৫ থেকে স্কুলের মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, তাই স্কুল প্রধানরা শিক্ষা অফিসের সুনজরে আসার জন্য শিক্ষার্থীদের বেশি যত্ন নিয়ে থাকেন। তবে একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রশাসন চায় শতভাগ ছাত্র পাস করবে, তাই তারা বেশি দুর্বল ছাত্রকে আরেক বছর পঞ্চম শ্রেণীতে রেখে দেন। আবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কিছু নির্দেশও তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর। যেমন- একবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর এসে বলেন, তারা কোয়ান্টিটি চান না, কোয়ালিটি চান। কিন্তু শতভাগ ছাত্রকে একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা যায় না বলে তিনি মনে করেন।
পঞ্চম শ্রেণীর জন্য বিস্তৃত প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অন্যান্য ক্লাসে মাঝে মধ্যে সমস্যা দেখা দেয়। শিক্ষক স্বল্পতা থাকায় ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর ক্লাস মাঝে মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে শিক্ষকরা জানান। শিক্ষক কম থাকলে একজন শিক্ষকই একসঙ্গে দুইটি ক্লাস নেন, এক ক্লাসে কিছু লিখতে দিয়ে এসে তিনি আরেক ক্লাসে পড়ান। এভাবে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হলেও কেউ অকৃতকার্য হলে বাড়তি প্রশাসনিক ঝামেলা এড়ানোর জন্য অন্য শ্রেণীর কার্যক্রম বন্ধ রেখে হলেও পঞ্চম শ্রেণীর সব কাজ চালিয়ে নেয়া হয়। এছাড়া যারা দক্ষ শিক্ষক তারাই মূলত সমাপনী পরীক্ষায় পরিদর্শন, খাতা মূল্যায়নসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, আবার ওই সময়ই স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার শেষ প্রস্তুতি চলতে থাকে। ফলে ১ম থেকে ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা তাদের দক্ষ শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হয়।
এই পরীক্ষাকে সামনে রেখে কোনো কোনো উপজেলায় বছরে তিনটি মডেল টেস্টও নেয়া হয়ে থাকে, কোনোটিতে শিক্ষা অফিস থেকে প্রশ্ন দেয়া হয় আর শিক্ষার্থীরা খাতা নিয়ে আসে। আবার কোনোটিতে সমাপনীর মডেলে কেন্দ্রীয়ভাবে ফাইনাল মডেল টেস্ট নেয়া হয় যেখানে অন্য একটি কেন্দ্র ঠিক করা হয়, খাতা সরবরাহ করা হয় এবং এই পরীক্ষার জন্যও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি নেয়া হয়।
শিক্ষা অফিসগুলোয় জানুয়ারি মাস থেকেই বিভিন্ন রকম কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়ে স্কুল কমিটিগুলোর সঙ্গে মিটিং, শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা, শিক্ষকদের নিয়ে বিষয়ভিত্তিক ট্রেনিং, দুর্বল ছাত্রদের অতিরিক্ত সময় দেয়ার নির্দেশনা ইত্যাদি। তবে জুন/জুলাই মাস থেকে কাজের চাপ বেশি থাকে। পাশাপাশি সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক সব শিক্ষার্থীর নামের তালিকা নেয়া হয়। এ সময়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা নিজেদের ক্লাস্টারের মধ্যে বিদ্যালয়গুলোতে পরিদর্শনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। একজন শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার মূল কাজটা করে থাকে শিক্ষক ও অভিভাবক। আমাদের কাজ হল তার তদারকি করা।’ এ লক্ষ্যে তিনি শিক্ষকদের মধ্যে একটি গার্ডিয়ানশিপ তৈরি করে দেন, প্রতিটি ক্লাসে ১০-১২ জন করে শিক্ষার্থী নিয়ে কয়েকটি গ্রুপ করে গ্রুপ প্রতি একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল করানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। সহকারী শিক্ষা অফিসার বলেন, তারা শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে তৈরি, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং মডেল টেস্টের ফলাফল মূল্যায়নের ভিত্তিতে আরও ভালোভাবে পরিচর্যা করতে বলেন। তবে এসব ক্লাসের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হয় এমন অভিযোগ তারা পাননি। অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য অভিভাবকরা যদি গোপনে টাকা দেন এবং অভিযোগ না করেন তবে এ প্রসঙ্গে শিক্ষা অফিসের কোনো করণীয় নেই বলে তিনি জানান।
সমাপনী পরীক্ষার কেন্দ্র নির্বাচন, কর্মকর্তা ও পরিদর্শক নিয়োগ এবং আসন ব্যবস্থা শিক্ষা অফিসের তত্ত্বাবধানে করা হয়। এছাড়া পরীক্ষা শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে নেপ থেকে উপজেলায় প্রশ্ন আসে যা উপজেলা শিক্ষা অফিসের লকারে বা থানায় রাখা হয় এবং পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট আগে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়া হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য মূল্যায়নকারী নিয়োগ ও তাদের মূল্যায়নের ওপর বিশেষ ট্রেনিং- ‘মার্কার ট্রেনিং’ দেয়া, এক উপজেলার খাতা আরেক উপজেলায় পৌঁছে দেয়া এবং তার আগে খাতা কোডিং ও কাটিংয়ের দীর্ঘ কাজ তাদেরই করতে হয়। এখানেও কর্মীস্বল্পতা লক্ষণীয়। যেমন- একজন শিক্ষা অফিসার জানান, তাদের উপজেলায় সহকারী শিক্ষা অফিসার থাকার কথা ৬ জন, কিন্তু বর্তমানে আছেন দু’জন। নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে তাদের অন্যান্য অনেক কাজ করতে হয় যা তাদের করার কথা নয় এবং এর ফলে মূল দায়িত্ব পালন করতে অসুবিধা হয়। যেমন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর না থাকায় তাদেরই ডিআর ফরমের ডাটা এন্ট্রি করতে হয়। অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেটের বিকল্প হিসেবে তাদের পরীক্ষা হলেও থাকতে হয়।
অনেকেই মনে করেন, শিক্ষার্থী আগের চেয়ে বেশি শিখছে, শিক্ষককেও বেশ পরিশ্রম করতে হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত স্কুল মনিটরিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন রকমের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি স্কুলের নিজস্ব পরীক্ষা যেমন- ৪র্থ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব দেয়া, অভিভাবকদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার মিটিং করা, সর্বোপরি শিক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এই কর্মদক্ষতাকে মাথায় রেখে সাত বছরব্যাপী যে ব্যবস্থা চলমান রয়েছে তার মূল লক্ষ্য পরীক্ষা না করে শ্রেণীকক্ষে যথাযথ পাঠদান করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাক্রমকে কাটছাঁট করে সিলেবাস কমিয়ে সাজেশনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর আরোপিত অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ যেমন কমবে, তেমনি শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা অফিস তথা সমগ্র স্টেকহোল্ডাররা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে বলে ধারণা করা যায়।
তানজীবা চৌধুরী ও রিফাত আফরোজ : শিক্ষা গবেষক

উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য চাই মানবসম্পদের উন্নয়ন by সালমা ইসলাম

নিকট-ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সুসংবাদ না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও খ্যাতিমান বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনার দিকগুলো উঠে এসেছে। গত কয়েক বছরের বিশ্বমন্দার কথা বিবেচনায় রেখে বলা যায়, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সব বাধা কাটিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ আমূল বদলে যাবে বিশ্ব অর্থনীতির চিত্র। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, আগামী দিনগুলোতে অনেক দেশে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ যে কয়েকটি দেশে মোটামুটি উচ্চ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে তার একটি বাংলাদেশ। উচ্চ হারের প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হলে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি যেসব কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা সৃষ্টির আশংকা তৈরি হয় সেসব বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের বিকল্প নেই। আমাদের এখন ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করার বিষয়েই গুরুত্ব দিতে হবে। যেখানে আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন দেশে বৈশ্বিক গড় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখাই অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, সেখানে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কাজটি কত কঠিন তা সহজেই অনুমান করা যায়। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গত শতকে এমন উচ্চ প্রবৃদ্ধি কেবল জাপানই অর্জন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করুণ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে দীর্ঘসময় উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখার কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে জাপান। আমাদের দেশে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে না পারলে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। উন্নয়নের দৌড়ে প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এগিয়ে থাকতে হলে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য এমন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব থাকলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে না এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম বাধা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ। ঋণের সুদের হার না কমলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। একজন শিল্পোদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে কোনো কারখানা প্রতিষ্ঠা করলে যাতে উৎপাদন শুরু করতে কোনোরকম বাধার সম্মুখীন না হন, সেটা নিশ্চিত করা অতি জরুরি। কোনো বাধা তৈরি হলে কেবল উদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, একই সঙ্গে অনেক কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি অন্যান্য বিনিয়োগকারীকেও হতাশ করবে।
রেমিটেন্স ও তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; এ দুই খাতে আরও জোর দেয়া দরকার। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের টেকসই উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে এ দু’খাতে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নেই আমাদের বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, দেশের দ্রুত অগ্রগতির জন্য শুধু শ্রমনির্ভর শিল্প-কারখানার ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প-কারখানার বিকাশের দিকেও জোর দেয়া উচিত। উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প-কারখানায় কাজ করার যোগ্যতাসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরি করতে সক্ষম না হলে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প-কারখানা বিকাশের গতি বেগবান হবে না। কারণ এ ধরনের শিল্প-কারখানায় বিদেশী কর্মীর চেয়ে দেশী কর্মীর ওপরই বেশি নির্ভর করতে হবে। বিদেশী কর্মীর ওপর নির্ভর করে যে কোনো খাতের শিল্প-কারখানার বিকাশে স্থবিরতা দেখা দেয়ার আশংকা থাকে বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে দীর্ঘসময় উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকার নেপথ্যে যেসব বিষয় কাজ করেছে তার অন্যতম হল উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। আমরা যদি উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হই, এ উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হাত ধরেই দেশে উচ্চতর গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আগামী দিনগুলোতে সর্বক্ষেত্রে উচ্চতর গবেষণায় নেতৃত্বে থাকতে না পারলেও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
২.
বর্তমান বাস্তবতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আমদানিনির্ভরতা কী করে কমানো যায়- সেদিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি আমদানি করে উৎপাদনের পরিধি বাড়াতে হবে। উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা দরকার। বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানির পরিবর্তে দেশে উৎপাদনের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। উচ্চ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার পাশাপাশি কুটির শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের বাজারজাতকরণের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। দেশের যেসব প্রান্তিক মানুষ একমাত্র কুটির শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাদের উৎপাদিত পণ্যেও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব।
যেসব ব্যক্তি কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত কিংবা প্রান্তিক চাষী, তাদের সন্তানরা যাতে উচ্চ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কল-কারখানায় দক্ষ কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দিতে হবে যুগোপযোগী শিক্ষা বিস্তারে।
শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের দেশের অনেক মানুষের ভুল ধারণা রয়েছে। তারা মনে করেন, তাদের সন্তানের উচ্চশিক্ষা জরুরি। সন্তানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অনেকে নিজের শেষ জমিটুকুও বিক্রি করে দেন। দরিদ্র পরিবারের কোনো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর কাক্সিক্ষত চাকরি না পেলে ওই পরিবারের সদস্যরা হতাশ হন। ওই ধরনের পরিবারের শিক্ষার্থীরা যাতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
বিশ্বায়নের এ যুগে আমাদের সব ধরনের শিক্ষা বিশ্বমানের হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থী যাতে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিজের মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়, তাদের তেমনভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীর মূল্যায়নে তাদের সৃজনশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ও পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কোনো কোনো আলোচক মনে করেন, পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা কমালে এ খাতে অনেক অর্থের সাশ্রয় হবে। যারা পরীক্ষার সংখ্যা কমানোর কথা বলেন তাদের মনে রাখা দরকার, পরীক্ষার সংখ্যা কমালে তা শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের প্রাথমিক বা প্রস্তুতি পর্বেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একসময় কারও কারও ধারণা ছিল, প্রাথমিক সমাপনীর মতো পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিশুরা হয়তো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। বাস্তবে আমরা লক্ষ করি, শিশুরা আনন্দের সঙ্গে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে শিশুরা যেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে এতেই স্পষ্ট হয় তারা আনন্দের সঙ্গেই বিষয়টি মেনে নিয়েছে। বারবার পরীক্ষার মুখোমুখি হলে অন্তর্মুখী শিশুরাও নিজেকে প্রকাশের চেষ্টা করে। এতে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে জানার কৌতূহল বাড়ে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সংখ্যা কমলে শিশুদের কৌতূহল বৃদ্ধির সুযোগ সংকুচিত হবে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই যেসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে সফল হতে হিমশিম খায়। প্রাথমিকের কোনো শিক্ষার্থীই ঝরে পড়বে না- এটা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে দেশের টেকসই উন্নয়নে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সময় একজন শিক্ষার্থীর মানবিক গুণাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যক্তির মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ করায় কী ধরনের ভূমিকা রাখবে এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হাজার বছরের মানবিক সংস্কৃতিকে ধারণ করার পক্ষে নিজের অবস্থান অটুট রাখে, এ বোধ তাদের ভেতর জাগ্রত করতে হবে। আবহমান কালের রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত না হলে একজন শিক্ষার্থী বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করলেও তার ভেতর অনেক অপূর্ণতা থেকে যাবে। আমাদের কোনো শিক্ষার্থীর ভেতর যাতে এ অপূর্ণতা না থাকে এদিকে সংশ্লিষ্ট সবার সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ শুরু না হলে শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় না। কী করে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে অধ্যয়নে যুক্ত থাকবে তা গবেষণা করে বের করতে হবে। কেবল অনুকরণ করে শিক্ষার কোনো ক্ষেত্রেই প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়। আমাদের শিশুদের মন ও মননের বিকাশে সহায়ক পাঠ্যপুস্তক রচিত না হলে শিক্ষাক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অনিশ্চিত থেকে যাবে। অনুকরণনির্ভর অধ্যয়ন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্গত মর্মবাণীর প্রতি শিশুদের যাতে আগ্রহ বাড়ে, এমন পুস্তকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। হাজার বছর ধরে প্রচলিত আমাদের সংস্কৃতির মানবিক দিকগুলোর সঙ্গে শিশুদের পরিচয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী যাতে শুধু প্রযুক্তি বা শুধু মানব বিদ্যায় পারদর্শী হয় তাহলে তার মধ্যে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। এটা দূর করার জন্য যাতে সে উভয় বিষয়ে পারদর্শী হতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। একজন শিক্ষার্থী আজীবন কী করে সর্বোচ্চ মানবিকতার চর্চায় উদ্বুদ্ধ হবে- এ বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ বলতে কী বোঝায়- এ বিষয়টিও গভীরভাবে ভাবতে হবে।
৩.
বহুমুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার পরও চলমান বিশ্বমন্দার প্রভাব থেকে উন্নত দেশগুলোর বেরিয়ে আসতে না পারার বিষয়টি বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশ্লেষকরা পেছনে ফেলে আসা ঘটনার বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন কেন বিশ্বমন্দা এত দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে কী ধরনের নীতি অবলম্বন করলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে মন্দার কবল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব- এটাই এখন বিশ্ববাসীর অন্যতম চিন্তার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধির হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক দেশেই প্রবৃদ্ধি অর্জনে এক ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প-কারখানা বিকশিত হওয়ার পরও যেসব দেশের প্রবৃদ্ধিতে স্থরিবতা সৃষ্টি হয়েছে- সেসব দেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছার কাজটি অত্যন্ত কঠিন। কোনো কোনো দেশের প্রবৃদ্ধি দুই অংক থেকে ৪ শতাংশ, এমনকি ২ শতাংশ হওয়ার বিষয়টিও বিশ্ববাসীকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলবে। এসব বিষয়ে বিশ্লেষকরা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবেন এটাই স্বাভাবিক। সাধারণভাবে বলা যায়, রফতানি কিংবা উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে একক পণ্যের ওপর নির্ভর করলে ঝুঁকি থাকে বেশি। উৎপাদিত পণ্য কিংবা রফতানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। রফতানির ক্ষেত্রে মাত্র কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভর করলেও উচ্চমাত্রার ঝুঁকি থেকেই যায়।
পারমাণবিক চুল্লিতে দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাপানের মতো উন্নত দেশকেও হিমশিম খেতে হয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা জরুরি।
সম্প্রতি ইবোলা ভাইরাসের আতংক বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর আমরা লক্ষ করেছি, এ বিষয়ক ডাক্তার ও নার্সের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এ ধরনের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদেশী ডাক্তার ও নার্সদের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে নিজ দেশের ডাক্তার ও নার্সদের ওপর নির্ভর করলে দ্রুত সুফল পাওয়া যায়। ইবোলা আতংকের মতো যে কোনো পরিস্থিতি জনবলের অভাবে মোকাবেলা করতে দেরি হলে দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ না থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় বহুমুখী সংকটের সৃষ্টি হয়।
যেহেতু বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সামনে অনেক বিকল্প থাকে, তাই তাদের বিনিয়োগে উৎসাহী করার জন্য নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহীদের স্বল্পসময়ে শিল্প-কারখানা চালু করার ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মতো দেশী বিনিয়োগকারীরাও যাতে সমান সুযোগ পান সে জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া দরকার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কোনো উদ্যোক্তার বিনিয়োগে উৎসাহ কমে গেলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০৫০ সালের বিশ্ব অর্থনীতি সম্পর্কে যে পূর্বাভাস দিয়েছে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বাংলাদেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে দেশটি ২০৫০ সালে অর্থনীতির আকারের দিক থেকে নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানটি যেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন দেশের অগ্রগতির পূর্বাভাস দিয়েছে তার অন্যতম হল প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ। এ দুই ক্ষেত্রে কোনো দেশ পিছিয়ে থাকলে অন্য অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত অগ্রগতিতে বহুমাত্রিক অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।
৪.
বিশ্বমন্দা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার প্রেক্ষাপটে মন্দা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে দেশে দেশে শ্রম সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে আমাদের দেশের কর্মীরা গতানুগতিক দক্ষতা নিয়ে বিদেশে গিয়ে তেমন সুবিধা করতে পারবে না। কেবল বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীই নয়; দেশের শিল্প-কারখানায় কাজ করতে আগ্রহীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি সম্প্রতি জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, সেসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে আমাদেরও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে শ্রমঘন শিল্প-কারখানার পাশাপাশি উচ্চ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিল্প-কারখানা দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। আমাদের প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে উচ্চ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিল্প-কারখানার বিকাশে মনোযোগ বাড়াতে হবে। আগামী দিনগুলোতে বিশ্বব্যাপী উচ্চ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিল্প-কারখানায় দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা বাড়বে। এ ধরনের মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আমরা সক্ষম না হলে আগামী দিনগুলোতে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশংকা দেখা দেবে।
কোনো একটি দেশ প্রতিবেশী দেশের তুলনায় একবার পিছিয়ে পড়লে সেদেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কত ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়, তা গ্রিসের অর্থনীতির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। গ্রিসকে ইইউভুক্ত দেশগুলো উদারভাবে সহায়তা করেছে। এমন সহায়তা না থাকলে পিছিয়ে পড়া কোনো দেশের অর্থনীতিতে কী ভয়াবহ অস্থিরতার সৃষ্টি হবে, এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আগে থেকে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে পিছিয়ে থাকলে যে কোনো অস্থির পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কত কঠিন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের ইতিবাচক ধারা যাতে অব্যাহত থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : প্রকাশক, যুগান্তর

পৌর নির্বাচন ২০১৫- ৭৪ শতাংশ ভোটকে স্বাভাবিক বলা যাবে না by এম সাখাওয়াত হোসেন

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচন। পৌরসভার বাদবাকি কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে না হলেও অনুমেয় যে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সমর্থিত ব্যক্তিরাই প্রার্থী হয়েছিলেন। এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে যেভাবে নির্বাচনী প্রচার এবং আচরণবিধি পালিত হয়েছে, তা পূর্বাভাস দিচ্ছিল নির্বাচনটি কেমন হবে। নির্বাচনের তিনটি ধাপের প্রথম ধাপ প্রাক-নির্বাচন নিয়ে বহু মতামত এবং লেখাজোখা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ভোট গ্রহণ।
নির্বাচনের তফসিলের পরে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ছিল ২৩৪টি পৌরসভা, যার মধ্যে সাতটি পৌরসভা নির্বাচন করতে হয়নি। কারণ মেয়র পদসহ বেশ কিছু কাউন্সিলর পদও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ভোট গ্রহণ হয়নি। এটাও বাংলাদেশের পৌর নির্বাচন-২০১৫-এর বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকবে। ওই সাতটি বাদ দিলে ফল পাওয়া গেছে ২০৭টিতে এবং ২০টি পৌরসভার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ স্থগিত করায় বাকি ১৯টিতে আংশিক ফলাফল পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ ফলাফল হয়নি বিধায় স্থগিত রয়েছে।
এ ভোটের মেয়রভিত্তিক দলওয়ারি ফলাফল উল্লেখ করার তেমন প্রয়োজন না থাকলেও পরিসংখ্যানের ছোট বিশ্লেষণ উল্লেখ করছি। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক সরকারি দল আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১৬৮টি, অন্যতম বৃহত্তম দল বিএনপি ২২; বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাপা একটি এবং অন্যান্য পেয়েছিল ২৬টি, যার মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত তথাকথিত বিদ্রোহীরা। এই বিদ্রোহী জয়ী প্রার্থী এবং স্থগিত ২০ পৌরসভার বিজয়ীরা স্বীয় দলে ফিরে গেলে এবং স্থগিত পৌরসভাগুলোর নির্বাচন শেষ হলে সরকারি দলের সংখ্যা আরও বাড়বে।
যা-ই হোক, বিএনপি প্রায় সাত বছর পর স্বীয় দলীয় প্রতীক নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ছিল, এটা ওই দলের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে। তবে ওই দলের এমনভাবে হেরে যাওয়ার কারণগুলো কী, তা দলটির বিচার-বিশ্লেষণে বের হবে। এই নির্বাচনে জাতীয় সংসদের জন্য নিবন্ধিত ৪০টি দলের ২০টি দল অংশগ্রহণ করলেও তাদের দলের অবস্থান তৃণমূলে কোন পর্যায়ে রয়েছে, তার প্রমাণ এই নির্বাচন। এমনকি জাতীয় পার্টিও তার ভোটব্যাংকের সমর্থন পায়নি, যেমন পায়নি বিএনপি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অবস্থান খুবই নাজুক থাকলেও তাদের ভোটের শতাংশ ছিল ৩২ দশমিক ৪৯ এবং প্রাসঙ্গিক পর্যায়ে আসন ছিল ২৯টি। অপরদিকে আওয়ামী লীগের আসন ছিল ২৩০টি এবং প্রাপ্ত ভোটের গড় ছিল ৪৮ দশমিক ১৩, প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।
এবারের পৌরসভা নির্বাচন কেমন হয়েছে, এমনটাই প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনের পরপরই। কারণ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গণমাধ্যমে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে এ নির্বাচনও ২০১৪ সাল থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে যে নেতিবাচক সংস্কৃতির মাত্রা দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে তেমন উন্নত হয়েছে বলে মনে হয় না। সরকারের এই মেয়াদকালে নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় যে নিম্নমুখিতা প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে, ভবিষ্যতে তার উন্নতির লক্ষণ দেখা যাবে বলে মনে হয় না। ২০০৮ সালের পরে ২০১৩ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ওই মেয়াদের কোনো নির্বাচন নিয়ে তেমন বড় কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যৌক্তিকতা ওই সময়ের জাতীয় সংসদে একাধিকবার রেফারেন্স হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল। তবে বিদ্যমান সংসদে এমন দাবি আর উচ্চারিত হয়নি।
আগেই বলেছি যে শুধু প্রতীক ছাড়া ২০১১ সালের নির্বাচনেও দলের সদস্যরাই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের নির্বাচনের সঙ্গে এ নির্বাচনের সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি। এ তুলনার জন্য ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক প্রাপ্ত ২০৭টি পৌরসভার গড় ভোটের ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশ (৭৪%)।
এবং উল্লেখিত পত্রিকার তথ্যমতে মেয়র পদে এই পরিসংখ্যানে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে ৭৪টি পৌরসভায় এবং ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে ৬৩টি পৌরসভায়। তার মানে ২০৭টি পৌরসভার মেয়র পদের মধ্যে ১৩৭টিতে ৭৫ শতাংশের ওপরে ভোট পড়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পৌরসভায় গড়ে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে। নলডাঙ্গার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট পড়েছে শতভাগ, যেমন ছিল যশোরের এমএম কলেজের কেন্দ্রটিতে। দৈবক্রমে ধরা পড়েছিল যশোরের ওই কেন্দ্র। কারণ, তিনটার সময় সেখানে ভোট গণনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
লক্ষণীয়, এসব জায়গায় গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শুধু মেয়র পদে গড়ে ৭৪ শতাংশ এবং ৭৫ থেকে ১০০ ভাগ ভোট পড়া অবাক কাণ্ড। কারণ, নিকট অতীতে কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ হারে ভোট পড়ার উদাহরণ নেই এবং সোজা অঙ্কে তেমনটা সম্ভব নয়। ২০১১ সালের পৌর নির্বাচন যদি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তবে ওই সময়ে নির্বাচন হয়েছিল পাঁচ ধাপে, জানুয়ারি ১২, ১৩, ১৭, ১৮ ও ২৭। ২৫৪টি পৌরসভায়। ওই নির্বাচনে ৫৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছিল এবং আওয়ামী লীগ ১১৬টি মেয়র এবং বিএনপি ১০৬টি পেয়েছিল। ওই নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি একটি আসন পেয়েছিল। ২০১১ সালে ভোটের শতাংশ নিরীক্ষণ করলে প্রতীয়মান হবে যে প্রায় ৫৭ শতাংশ গড় ভোট মানে ৬০ শতাংশের ওপরে তেমন ভোট পড়েনি। ওই সময়ে প্রায় সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গড়পড়তা ভোটের শতাংশ প্রায় কাছাকাছি ছিল।
আমাদের দেশের সব স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত একাধিক ব্যালটে ভোট হয়ে থাকে। মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের জন্য একটি করে ব্যালট পেপার ভোটারকে দেওয়া হয়। আমাদের ভোট প্রদানের জন্য ব্যালট-ব্যবস্থা এখনো যান্ত্রিক বা বৈদ্যুতিক নয়, তাই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, ভোটার নিশ্চিত করা থেকে ব্যালট বাক্সে তিনটি ব্যালট পেপার প্রবেশ করানো পর্যন্ত সর্বনিম্ন দুই থেকে পাঁচ মিনিট সময় প্রয়োজন হয়। বয়স্ক এবং নারী ভোটারদের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিন থেকে পাঁচ মিনিট সময়ের প্রয়োজন হয়।
ভোট সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটায় শেষ করতে প্রতি বুথে ৩৫০ থেকে ৪০০ ভোটারের ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। এই বিভাজনে কেন্দ্রের মোট ভোটারের ভিত্তিতে বুথ বা ভোটকক্ষ তৈরি করা হয়। কাজেই ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০টি এবং সর্বনিম্ন ১২ থেকে ১৫টি ভোট হতে পারে। ৩০টি ভোটের হিসাবেও ধরলে সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত আট ঘণ্টায় ২৪০টি ভোট হতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলে যে একটি বুথে এক ঘণ্টায় ২০ থেকে ২৫টি ভোট পড়তে পারে। অবশ্য বৈদ্যুতিক ভোটিং মেশিন হলে এর অধিকসংখ্যক ভোট নেওয়া সম্ভব।
অভিজ্ঞতার আলোকে এটি পর্যবেক্ষণমাত্র, তবে পত্রপত্রিকার তথ্যে বহু জায়গায় সকালে ভোটার সমাগম বেশি ছিল, সে ক্ষেত্রেও ভোট গ্রহণের গতি ২০ থেকে ৩০টির বেশি হওয়ার কথা নয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও বৈদ্যুতিন মিডিয়ার তথ্য মোতাবেক দুপুর ১২টার পর থেকে ভোটার সমাগম একেবারেই কম ছিল। অবশ্য ওই সময়ে ভোট পড়েছে অস্বাভাবিক গতি ও সংখ্যায়। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী প্রদত্ত ব্যালট পেপারের গণনা এবং ভোটের ফলাফলে ব্যবহৃত ফরম পর্যালোচনা করলে কোনো গরমিল থাকলে তা সহজেই ধরা পড়বে।
আলোচিত ফরম দুটির সরল ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি, যাতে পাঠকদের বোধগম্য হয়। বিধিমোতাবেক ভোটের আগে প্রাপ্ত ব্যালট পেপারের মোট সংখ্যার বিপরীতে ব্যবহৃত মোট পেপারের সংখ্যা উল্লেখ করতে হয়, যার মধ্যে ব্যালট বাক্স থেকে প্রাপ্ত ব্যালট টেন্ডারকৃত, আপত্তিকৃত, হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হওয়া ইত্যাদির যোগফল প্রাপ্ত ব্যালটের সমান হতে হবে। অন্যথায় বিধির ব্যত্যয় হবে, যা আইনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায়। পৌরসভার ক্ষেত্রে মেয়র এবং কাউন্সিলরদের ব্যালটের হিসাব আলাদাভাবে দিতে হবে। বাক্স থেকে প্রাপ্ত ব্যালট পেপারের সংখ্যা মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদের সমান হতে হবে। কাজেই কোনো কেন্দ্রে ৩০০টি ব্যালট পেপার ব্যবহৃত হলে তা সব পদের জন্যই সমান হতে হবে। কোনো পদের হারে তারতম্য হলে সে ক্ষেত্রে কারচুপি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর এবং এজেন্টদের প্রতিস্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই গণনার কপি ব্যাগে এবং এক কপি নির্বাচন কমিশনে অবশ্যই প্রেরণ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে প্রাপ্ত ফলাফলের ফরমের সঙ্গে ব্যালট পেপারের পরিসংখ্যান এবং বৈধ ভোট খতিয়ে দেখতে পারে। অপর দিকে একজন ভোটারের তিনটি ব্যালট গ্রহণ করার আগে প্রতিটির মুড়িতে স্বাক্ষর এবং টিপসই প্রদান বাধ্যতামূলক। মুড়িতে টিপসই না থাকলে তা বৈধ ব্যালট বলে গণ্য করা যায় না। তবে মুড়ি কেন্দ্র থেকে সিলগালা করা অবস্থায় রিটার্নিং অফিসে আনা হয়, যা পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য মামলার আলামত হিসেবে রক্ষিত থাকে; অবশ্য যদি কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের আশ্রয় নেন।
যা-ই হোক, পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণে প্রায় ৭৪ শতাংশ ভোট এবং তদূর্ধ্ব বৈধ ভোট প্রাপ্তিকে স্বাভাবিক বলা যায় না। দৃশ্যত, বেশির ভাগ শান্ত পরিবেশ থাকলেও তথ্যে প্রকাশ যে ব্যালট স্টাফিং হয়েছে কক্ষের বা বুথের ভেতরে। ওপরে বর্ণিত হিসাবের আঙ্গিকে মেলালে হয়তো তা সহজে ধরা যায়, তবে সে ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশন ও আদালতের ভূমিকা হবে মুখ্য। সেসবের ভিত্তিতে মনে করা স্বাভাবিক যে ২০১৪ সালের পর থেকে নির্বাচন সংস্কৃতির নিম্নগামী চলনে তেমন পার্থক্য দেখা যায়নি।
পরিশেষে বলতে হয়, বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশেই যে ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ নির্বাচন হয়, তা নয়। উন্নত বিশ্বের নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে শতভাগ শুদ্ধ হয় না আর উঠতি অথবা নতুন গণতান্ত্রিক দেশে ব্যবস্থাপনা নয়, কারচুপির কারণে নির্বাচন বিতর্কিত হয়। আর দুটো একত্র হলে তাকে সুষ্ঠু বা প্রায় সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায় কি না, তা ভেবে দেখার বিষয়। নির্বাচন কতখানি গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তার সঠিক বিচার করতে পারেন অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ও অংশগ্রহণকারী ভোটাররা।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ড- আজ মধ্যরাতেই তিন খুনির ফাঁসি কার্যকর by আ.ফ.ম নুরুল কাদের

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদসহ ৫ জাসদ নেতা হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামীর ফাঁসির রায় আজ রাতেই কার্যকর হচ্ছে। যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামী আনোয়ার হোসেন, রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু ও হাবিবুর রহমান হাবি যশোর কারাগারে কনডেম সেলে বন্দী রয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আজ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আসামীদের ফাঁসি কার্যকর হবে বলে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, তিনিসহ জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন কারা কর্তৃপক্ষের চিঠি পেয়েছেন। ফাঁসির রায় কার্যকর নির্বিঘ্নে করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ জানান, তিনজনের ফাঁসি কার্যকরের সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এক আসামীর পরিবার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শুক্রবার সকাল ৮টায় জেল গেটে উপস্থিত হয়ে মরদেহ গ্রহণ করতে বলেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এদিকে ফাঁসি কার্যকর হবে এমন সংবাদে খুশি নিহতের পরিবার ও জাসদের নেতাকর্মীরা।
১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের কালিদাসপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সন্ত্রাসবিরোধী এক জনসভায় জাসদ কেন্দ্রীয় সভাপতি জাতীয় নেতা কাজী আরেফ আহমেদ, জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদ নেতা ইসরাইল হোসেন ও শমসের মন্ডল একদল সন্ত্রাসীর গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ঘটনার দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি পরদিন সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের সাড়ে পাঁচ বছর পর ২০০৪ সালের ৩০ আগষ্ট কুষ্টিয়ার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ১০ আসামীর ফাঁসি ও ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় দেন। রায়ের বিরুদ্ধে আসামীপক্ষ আপিল করলে ২০০৮ সালের ৫ আগষ্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নিম্ন আদালতের মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামীর মধ্যে ৯ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন। অপর আসামী এলাজ উদ্দিন হাইকোর্টে মামলা চলাকালে মৃত্যুবরণ করেন। একই সাথে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামীর সাজা মওকুফ করে মহামান্য হাইকোর্ট। এরপর হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ফাঁসির তিন আসামী রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু, আনোয়ার হোসেন ও হাবিবুর রহমান হাবি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। ২০১১ সালের ৭ আগস্ট প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে শুনানি শেষে আপিলকারী ফাঁসির ৩ আসামীসহ ৯ জনের সাজা বহাল রাখেন।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হাবিবুর রহমান হাবির বাড়ি মিরপুর উপজেলার মালিহাদ ইউনিয়নের রাজপুর রাজনগর গ্রামে। তার পিতার নাম ইসমাইল হোসেন। হাবিবুর রহমান হাবির ছোট ভাই হাসিবুর রহমান জানান, যশোর জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের দেখা করার জন্য চিঠি দিয়েছিল। চিঠি পেলেও আমাদের পরিবারের কেউ দেখা করতে যায়নি। মিরপুর থানা পুলিশের একটি টিম তাদের বাড়িতে এসে আগামী শুক্রবার (৮ জানুয়ারী) সকালে তার ভাইয়ের লাশ গ্রহণ করতে বলেছে। ওই দিন সকালেই আমরা যশোর যাব লাশ আনতে। হাবিবুর রহমানের স্ত্রী জাহানারা জানান, ফাঁসির খবর তারা পেয়েছেন। লাশ এনে এলাকায় দাফন করা হবে। অন্য দুই আসামী আনোয়ার হোসেনের বাড়ি কুর্শা ইউনিয়নের কুর্শা গ্রামে। আর রাশেদুল ইসলাম ঝন্টুর বাড়ি একই ইউনিয়নের কুলপাড়া মল্লিকপুরে।
মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামী পলাতক রয়েছে। তারা হলেন, মান্নান মোল্ল্যা, জালাল ওরফে বাশার, রওশন আলী, বাকের আলী ও জাহান আলী। হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ৫ জন গা ঢাকা দেন। এর মধ্যে মান্নান মোল্লা, জাহান ও জালাল ভারতে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
রায় কার্যকর হচ্ছে এমন সংবাদে নিহতের পরিবার ও জেলার বিভিন্ন মহল নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। নিহত জাসদ নেতা এয়াকুব আলীর ছেলে ইউসুফ আলী রুশো জানান, আমার পিতাসহ যারা সেদিন নির্মমভাবে হত্যা হয়েছিলো তাদের খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হবে জানতে পেরেছি। এ খবরে আমরা খুব খুশি। ফাঁসি কার্যকরের মধ্যদিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে বলে আশা করছি। তবে এ রায় আরো আগে কার্যকর হওয়া উচিৎ ছিলো। কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন জানান, একজন নিঃস্বার্থ প্রচার বিমুখ নেতা ছিলেন কাজী আরেফ। সন্ত্রাস ও সম্প্রদায়িকতামুক্ত দেশ গড়ায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল তাঁর। তাকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিরুদ্ধে মহামান্য আদালত কর্তৃক ঘোষিত রায়ে মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকরের মাধ্যমে সমগ্র দেশবাসী তথা কুষ্টিয়াবাসীরও কলঙ্কের দায়মুক্তি হবে।
কাজী আরেফসহ নিহত ৫ জাসদ নেতা
হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
জাতীয় নেতা কাজী আরেফসহ ৫ জাসদ নেতা খুনের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িতরা বিচারের আওতায় আসলেও ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীরা আজও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাদের চিহ্নিত করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা। জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন বলেন, কাজী আরেফ হত্যাকান্ড কোন সাধারণ হত্যাকান্ড ছিল না। গভীর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাকে হত্যা করা হয়। কাজী আরেফ একজন দুরদর্শী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাকে হত্যার মধ্যদিয়ে একটি চেতনাকে ধবংস করা হয়। তাই এ ঘটনার পিছনে থেকে যারা কলকাঠি নেড়েছেন, অর্থ দিয়ে সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক এটা আমাদের চাওয়া। পরিকল্পনাকারী ও অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে তৎকালিন বিএনপি নেতা হাবলু মোল্লার নাম এসেছিল। পরবর্তিতে বিএনপি জোট সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়। এদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জোর দাবি জানানান তিনি।
সে দিন যা ঘটেছিল
সেদিন ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী। জনসভা পরিচালনাকারী হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী আমলা সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি কারশেদ আলম স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখন বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টা। আরেফ ভাই বক্তব্য শুরু করেন। বক্তব্য দুই থেকে তিন মিনিট দেয়ার পর হামলা শুরু হয়। জনসভা মঞ্চের পূর্ব পাশ থেকে এসে গুলি চালানো হয়। হামলায় ৯ জন অংশ নেয়। সবার হাতে ছিল ভারী অস্ত্র। তৎকালিন কুষ্টিয়া জেলা জাসদ সভাপতি লোকমান হোসেনকে উদ্দেশ্য করে প্রথম গুলি চালায় তারা। পরে জেলা জাসদের সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলীও গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় কাজী আরেফ আহমেদ সন্ত্রাসীদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। সন্ত্রাসীরা ওই সময় কাজী আরেফকে মঞ্চ থেকে নেমে আসার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। এক পর্যায়ে কাজী আরেফকে প্রচন্ড গালমন্দ করেন তারা। কাজী আরেফ খুনিদের অনুরাধ করে বলেন, তোমরা আমাকে মার। কোথায় যেতে হবে বল আমি যাচ্ছি। কিন্তু অন্যদের মেরো না। পরে সন্ত্রাসীরা কাজী আরেফকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। তিনটি বুলেট লাগে তার শরীরে। মঞ্চের ওপর পড়ে যান তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে এ মামলার অন্যতম স্বাক্ষী হন কারশেদ আলম। রায় কার্যকর হতে যাচ্ছে জেনে তিনিও আনন্দিত। তিনি বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় কার্যকর হচ্ছে জেনে ভাল লাগছে। বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলাম এ রকম একটি দিনের জন্য। আমি দেখেছি কি নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিলো তাদের। এই হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন ঘটতে কাজী আরেফ আহমেদ তার জীবদ্দশায় শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত যে লড়াই করে গেছেন। মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সেই একই আদর্শ ও চেতনা লালন করতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েও এতটুকু বিচ্যুত হননি পরিবারের সদস্যরা। যে আদর্শিক চেতনায় তিনি একটা সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখার অপরাধে সন্ত্রাসীদের নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন। সর্বশেষ এই রায় কার্যকরের মধ্যদিয়ে সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাবে এমনই প্রত্যাশা পরিবারের।
মুক্তিযুদ্ধে কাজী আরেফের অবদান
কাজী আরেফ আহমেদ মূলত একজন জনদরদী, আত্মমর্যাদাশীল, নির্লোভ মানুষ। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের প্রশ্নে তিনি ছিলেন একরোখা ও জেদি। আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনই কাজী আরেফ আহমেদকে রাজনৈতিক কর্মী করে গড়ে তোলে। ১৯৬২ এর নভেম্বর এ সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ বাংলাদেশে স্বাধীন করার সিদ্ধান্তে এক মতে পৌঁছান। এটাই ৬২ এর নিউক্লিয়াস নামে পরিচিত। যার নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে যুদ্ধের লক্ষ্যে একটি গোপন সংগঠন গড়ে উঠেছিলো। সারা দেশব্যাপী এ সংগঠনের তৎপরতা ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হলে, ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি হিসেবে কাজী আরেফ আহমেদ প্রথম সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেন। বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ১৯৭০ সালে গঠিত ‘জয় বাংলা বাহিনীর’ অন্যতম সংগঠকও ছিলেন তিনি। কাজী আরেফ আহমেদ স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় পতাকার অন্যতম রূপকার। দীর্ঘদিন ধরে লালিত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নসাধ ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার সূচনালগ্নে কাজী আরেফ আহমেদ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট’র অন্যতম নেতার ভূমিকা পালন করেন। এই বাহিনীর নেতা হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম রণাঙ্গনের (বৃহত্তর পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনা ও বরিশাল ) নেতৃত্ব দেন।

ভারতকে সহায়তা দেবে পাকিস্তান

নরেন্দ্র মোদি ও নওয়াজ শরিফ
ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে হামলার তদন্তে ভারতকে পাকিস্তান পূর্ণ সহযোগিতা করবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ গতকাল মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করে এ আশ্বাস দিয়েছেন। মোদিকে শরিফ বলেন, তদন্তে যদি পাকিস্তানের যোগসাজশের কোনো তথ্য পাওয়া যায়, তা হলে তাঁর সরকার সত্য উদ্ঘাটনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। তিনি এ কথাও বলেন, কীভাবে কারা এই হামলার ছক কষে তা কার্যকর করল, সেই তদন্তেও তাঁর সরকার সাহায্য করবে। রাষ্ট্রীয় সফরে শ্রীলঙ্কায় থাকা নওয়াজ শরিফ কলম্বো থেকে গতকাল বিকেলে মোদিকে ফোন করেন। মোদি তাঁকে বলেন, পাঠানকোটে যারা হামলা করেছে, তারা পাকিস্তানের নাগরিক। এ বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ ভারতের হাতে রয়েছে এবং সেই তথ্যপ্রমাণ গত সোমবারই পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছে। ভারত চায়, পাকিস্তান অতি দ্রুত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক। শরিফের ফোনের আগে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নাসির খান জানজুয়ার সঙ্গে কথা বলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। সরকারি সূত্রের খবর, জঙ্গিরা যে পাকিস্তানের লোক এবং পাঠানকোটে বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা চালানোর আগে তারা যে পাকিস্তানে কারও কারও সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলেছে, সেই কথা জানজুয়াকে দোভাল জানান। দুই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার আলাপের কিছু পরেই মোদিকে ফোন করেন শরিফ। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী বলেন,
পাকিস্তানে যোগাযোগের তথ্যপ্রমাণ পেলে তাঁরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। তদন্তে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শরিফ বলেন, সন্ত্রাস দমনে ভারতের লড়াইয়ের পাশে পাকিস্তানও রয়েছে। পাকিস্তানও সন্ত্রাসের শিকার। পাকিস্তানকে দ্রুত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আরজি জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জন কারবি সোমবার বলেন, পাকিস্তান দৃঢ়ভাবে এই হামলা নিয়ে কথা বলেছে। তাঁরা মনে করছেন, যে ভঙ্গিতে তারা এ ঘটনার নিন্দা করেছে, সেভাবেই এর বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নেবে। অতীতে কোনো জঙ্গি হামলার পরপরই পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী তদন্তের সাহায্যে ভারতকে এভাবে আশ্বস্ত করেননি। আবার এ কথাও ঠিক, মুম্বাইয়ে ২৬/১১ হামলার অকাট্য প্রমাণ দেওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত পাকিস্তান অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সোমবারই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতিতে পাঠানকোটে হামলার নিন্দা করা হয়েছিল। তারপর শরিফের ফোনের ফলে এখন মনে করা হচ্ছে, চলতি মাসের মাঝামাঝি পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের আলোচনা স্থগিত রাখার জন্য মোদির ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তা কিছুটা লাঘব হবে। পাঠানকোটে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান সোমবারই শেষ হয়েছিল। পাঁচ জঙ্গির লাশ পাওয়া গেছে, একজনের পুড়ে যাওয়া শরীরও উদ্ধার হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, সেটি ষষ্ঠ জঙ্গির।

ট্রাম্পের প্রথম টিভি বিজ্ঞাপনেও মুসলিম বিরোধিতা

ডোনাল্ড ট্রাম্প
টেলিভিশনের নির্বাচনী বিজ্ঞাপনেও মুসলিমবিরোধী অবস্থান থেকে সরলেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রিপাবলিকান দলের এ মনোনয়নপ্রত্যাশীর প্রথম টিভি বিজ্ঞাপনেও ‘যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার’ আহ্বান প্রকট। আবার এতে ‘মিথ্যা ছবি’ ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। খবর বিবিসির। ট্রাম্পের ৩০ সেকেন্ডের প্রথম টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটন, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, স্যান বার্নার্দিনোর হামলাকারী ও কথিত আইএস জঙ্গির আলোকচিত্র, মার্কিন যুদ্ধজাহাজের গোলাবর্ষণ, ভবনে বিস্ফোরণ এবং সীমান্ত অতিক্রমের ফুটেজ দেখানো হয়। ভারী পুরুষ কণ্ঠে এতে বলতে শোনা যায়, রাজনীতিকেরা অন্য কিছু বলে ভান করলেও শুধু ট্রাম্পই একে উগ্র মুসলিম সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এর সমাধান খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম প্রবেশের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেন তিনি। এ ছাড়া অভিবাসীদের মার্কিন সীমান্ত পার হওয়ার ফুটেজ দেখিয়ে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কিছু সীমান্তে দেয়াল তৈরি করবে, এর অর্থ আদায় করা হবে প্রতিবেশী মেক্সিকো থেকে। বিজ্ঞাপনটি শেষ হয় ট্রাম্পের ‘ট্রেডমার্ক বক্তব্য’ ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ দিয়ে। বিজ্ঞাপনটির বিষয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ধনকুবের ট্রাম্প বলেছেন, টিভি বিজ্ঞাপন তাঁর জন্য জরুরি কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও কোনো ঝুঁকি চান না বলেই এটি তৈরি করা হয়েছে। তাঁর প্রচারণার ব্যয় ‘বাজেটের নিচে’ রয়েছে বলেও দাবি করেন এই রিপাবলিকান নেতা। এদিকে তথ্যের সত্যতা যাচাইকারী ওয়েবসাইট পলি ফ্যাক্টস বলছে, ট্রাম্পের টিভি বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত সীমান্তের ভিডিওটি আসলে আফ্রিকার মরক্কোর।

আইএসের হুমকিদাতা সিদ্ধার্থ ধর?

সিদ্ধার্থ ধর
ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রকাশ করা পাঁচ ব্যক্তিকে হত্যার দৃশ্যসংবলিত সর্বশেষ ভিডিও চিত্রের হুমকিদাতা ব্যক্তিকে সিদ্ধার্থ ধর নামের একজন ব্রিটিশ নাগরিক বলে মনে করা হচ্ছে। হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়া সিদ্ধার্থ ধরের এক বোন বলেছেন, হুমকি দেওয়া লোকটির কণ্ঠ শুনে সেটিকে তাঁর ভাইয়ের কণ্ঠ বলেই মনে হয়েছে। তবে ওই লোকটিই যে তাঁর ভাই সিদ্ধার্থ ধর, সে বিষয়ে এখনো তিনি নিশ্চিত নন। ভিডিও চিত্রটি সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, এটি পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়া আইএসের ‘মরিয়া’ প্রোপাগান্ডা ছাড়া কিছুই নয়। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে উদ্দেশ করে ভিডিওটি পাঠায় আইএস। এতে যে পাঁচজনকে হত্যা করতে দেখা গেছে তারা যুক্তরাজ্যের হয়ে আইএসের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করছিল বলে দাবি জঙ্গিদের। ১০ মিনিটের ভিডিওতে পাঁচ হত্যাকারী ছাড়াও অন্য যে দুজনকে দেখা যায়, একজন অল্পবয়সী। প্রাপ্তবয়স্ক অপরজন মুখোশ পরিহিত ছিলেন। এই দুজন ব্রিটিশ ইংরেজি উচ্চারণে যুক্তরাজ্যে হামলার হুমকি দেয়। বিবিসির খবরে বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিটিকে ব্রিটিশ নাগরিক সিদ্ধার্থ ধর বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। একটি দাপ্তরিক সূত্র বলেছে, সিদ্ধার্থই এখন ভিডিও-সংশ্লিষ্ট তদন্তের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। ওই সূত্রের ভাষ্য, ‘বহু মানুষ মনে করছে, এটা সে-ই।
’ব্রিটিশ হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া সিদ্ধার্থ ধর পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা ছিলেন। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি আবু রুমাইশাহ নাম গ্রহণ করেন। সন্ত্রাসবাদ উৎসাহিত করার অভিযোগে যুক্তরাজ্যে তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। তবে ২০১৪ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সিরিয়ায় চলে যান। সেখান থেকে ইন্টারনেটে নিজের ছবিও প্রকাশ করেন, যাতে তাঁকে কাঁধে অস্ত্র ও এক হাতে নিজের শিশুসন্তানকে ধরে রাখতে দেখা যায়। সিদ্ধার্থের বোন কণিকা ধর ভিডিওটির অডিও ক্লিপিং প্রথমে শুনে বলেন, এটি তাঁর ভাইয়ের কণ্ঠ বলেই মনে হচ্ছে। তবে একটি ক্লিপ দেখার পর কণিকা বলেন, তিনি এখন নিশ্চিত হতে পারছেন না। এদিকে চ্যানেল ফোর নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ভিডিওটিতে থাকা অল্পবয়সী ছেলেটিকে নিজের নাতি বলে শনাক্ত করেছেন দক্ষিণ লন্ডনের এক ব্যক্তি। সানডে ডেয়ার নামে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি বলেছেন, এটি তাঁর নাতি ইসা ডেয়ার, যাকে সিরিয়ায় নিয়ে গেছেন তাঁর মেয়ে গ্র্যাসে ডেয়ার। ব্রিটিশ-নাইজেরীয় বংশোদ্ভূত গ্র্যাসে ডেয়ার ধর্মান্তরিত হয়ে খাদিজা নাম নিয়েছেন। ২০০৯ সালে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর ২০১৩ সালে ২২ বছর বয়সে তিনি সিরিয়ায় যান।

পরমাণু বোমার কাছে হাইড্রোজেন বোমা ‘দানব’!! সফল পরীক্ষা করেছে উত্তর কোরিয়া

পরমাণু বোমার নাম শুনলেই আমাদের পিলে চমকে যায়। বুক ধড়ফড় করে। কিন্তু, হাইড্রোজেন বোমা তার চেয়েও অনেক অনেক গুণ শক্তিশালী। তার তাণ্ডব সৃষ্টির ক্ষমতা অনেক বেশি ভয়াবহ।
আজ থেকে সত্তর বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ অগস্টে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ‘লিটল বয়’ আর ‘ফ্যাট ম্যান’ নামে দু’টি পরমাণু বোমা ফেলেছিল আমেরিকা। যে প্রকল্পে ওই পরমাণু বোমার জন্ম হয়েছিল, তার নাম ছিল ‘ম্যানহাটন প্রোজেক্ট।’ যার নেতৃত্বে ছিলেন বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার। সেই পরমাণু বোমার জেরে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এখনও বংশানুক্রমে অন্ধত্ব, বধিরতা ও পঙ্গুত্বের মতো নানা ধরনের জটিল অসুখ হয়ে চলেছে।
হাইড্রোজেন বোমা তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। একটা বিস্ফোরণে একটা ছোট হাইড্রোজেন বোমা একটা বড় শহরকে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একেবারে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করতে পারে। করে দিতে পারে ধু ধু মরুভূমি।
পরমাণু বোমা আর হাইড্রোজেন বোমা- এই দু’টি শক্তিশালী বোমা বানানো হয় একেবারেই আলাদা দু’টি উপায়ে।
একটির নাম- ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’। যে উপায়ে বানানো হয় তুলনায় কম শক্তিশালী পরমাণু বোমা। এই পদ্ধতিতে একটা ক্ষুদ্র পরমাণুকে দুই বা ততোধিক ক্ষুদ্রতর ও হাল্কা পরমাণুতে ভাঙা হয়। তার ফলে বেরিয়ে আসে প্রচুর পরিমাণে শক্তি।
আরেকটি পদ্ধতির নাম- ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’। যে উপায়ে বানানো হয় অনেক বেশি শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা। এই পদ্ধতিতে দুই বা ততোধিক ক্ষুদ্র পরমাণুকে জুড়ে অনেক বড় ও ভারী পরমাণু বানানো হয়। এতে বেরিয়ে আসে আরও অনেক বেশি শক্তি। তাই হাইড্রোজেন বোমা হয় অনেক বেশি শক্তিশালী। যে হেতু এই পদ্ধতিতে দুই বা ততোধিক হাইড্রোজেন পরমাণুকে জোড়া হয়, তাই এর নাম- ‘হাইড্রোজেন বোমা’।
কোনটা বানানো বেশি কঠিন- পরমাণু বোমা নাকি হাইড্রোজেন বোমা?
এর উত্তরটা হল- হাইড্রোজেন বোমা। কেন কঠিন? কারণ, ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’-এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণ তাপমাত্রা। দশ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। গবেষণাগারেও চট করে যে তাপমাত্রায় পৌঁছতে পারা যায় না। কঠিন জিনিসই তো বেশি কাজের হয়!
তবে ‘ফিশন’ ছাড়া ‘ফিউশন’ হয় না। এর মানে, ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’ পদ্ধতিতে হাইড্রোজেন বোমা বানানোর জন্য যে বিপুল তাপমাত্রার প্রয়োজন, তা ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’-এর মাধ্যমে পরমাণু বোমা বানিয়েই জোগাড় করা হয়।
আবার খুব ছোট্ট হাইড্রোজেন বোমাও বানানো যায় বলে হাইড্রোজেন বোমাকে ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যেও পুরে ফেলা যায়। এর ফলে, কোনো এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েও হাইড্রোজেন বোমা সেখানে ফেলে দেয়া যায়। এখন পর্যন্ত কোনো দেশই যুদ্ধে হাইড্রোজেন বোমা ব্যবহার করেনি। হিরোশিমা, নাগাসাকি দেখেছিল অনেক কম ভয়াবহতা, পরমাণু বোমা পড়ার ফলে।
হাইড্রোজেন বোমার সফল পরীক্ষা করেছে উত্তর কোরিয়া
উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে তারা সফলভাবে প্রথমবারের মতো হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এর আগে দেশটির প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছাকাছি ‘কৃত্রিম ভূমিকম্প’ সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া।
আজ বুধবার দেশটি আবারো পরমাণু বোমার পরীক্ষা করেছে বলে যখন ধারণা করা হচ্ছিল তখন এ ঘোষণা দিলো পিয়ংইয়ং।
রাষ্ট্র পরিচালিত কোরিয়ান সেন্ট্রাল টেলিভিশন'এর বিশেষ ঘোষণায় বলা হয়, উত্তর কোরিয়া হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা করেছে। সংবাদে আরো বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন বৈরী নীতির কারণে পরমাণু অস্ত্র মজুদ করতে বাধ্য হয়েছে পিয়ংইয়ং।
এ ছাড়া, ঘোষণায় আরো বলা হয়, উত্তর কোরিয়া দায়িত্বশীল রাষ্ট্র তাই এ প্রযুক্তি অন্যকে হস্তান্তর করবে না বা আক্রান্ত না হলে এটি ব্যবহার করবে না।
অবশ্য উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষার ঘোষণা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে অনেকেই। থার্মোনিউক্লিয়ার বোমার পরীক্ষা চালালে যে ব্যাপক মাত্রার ভূমিকম্প হয় আজকের ভূমিকম্প সে রকম ছিল না।
বরং অতীতে দেশটি যে তিনটি পরমাণু বোমার পরীক্ষা করেছে তার মতই ছিল এটি। এর আগে ২০০৬, ২০০৯ এবং ২০১৩ পরমাণু বোমার পরীক্ষা করেছে দেশটি।
উ. কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা জাপানের জন্যে ‘মারাত্মক হুমকি’
জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার নিন্দা জানিয়ে একে জাপানের জন্য ‘মারাত্মক হুমকি’ এবং পরমাণু বিস্তার রোধ প্রচেষ্টার জন্য ‘বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আজ বুধবার সফলভাবে এ পরীক্ষা চালানোর দাবি করেছে উত্তর কোরিয়া।
অ্যাবে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া যে পরমাণু পরীক্ষাটি চালিয়েছে তা আমাদের দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি এবং আমরা কিছুতেই তা বরদাস্ত করব না।’
তিনি আরো বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার এই পরীক্ষা ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু বিস্তার রোধ প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।’
উ. কোরিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অবরোধের আহ্বান দ. কোরিয়ার
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গুয়েন-হাই উত্তর কোরিয়ার পরমাণু পরীক্ষার কড়া সমালোচনা করে একে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ‘বড় ধরনের উস্কানি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ আন্তর্জাতিক অবরোধের আহ্বান জানিয়েছেন।
আজ বুধবার এ পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া।
পার্ক জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার এ পরমাণু পরীক্ষাটি শুধু আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই হুমকি নয়, বরং এটি আমাদের ভবিষ্যত এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’