Monday, August 26, 2013

উচ্চশিক্ষার ফেরিওয়ালাদের রুখবে কে? by ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীদের তুলনায় দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন সংখ্যা যে অনেক কম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ অবস্থা অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এবং দেশে মানসম্মত শিক্ষার সম্প্রসারণে ১৯৯২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ সালে আগের আইনের স্থলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ প্রণয়ন করা হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশে বর্তমানে রয়েছে ৭১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও সরকার অনুমোদিত ৭১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও রয়েছে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসসহ অনুমোদনহীন ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন। এর পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর জন্য দেশে রয়েছে অসংখ্য স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি ফার্ম, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়তই প্রতারিত হচ্ছেন। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে? আর বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে লাগামহীন প্রতারণার মাধ্যমে বাণিজ্য করে যাওয়া স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি ফার্মগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কি কেউ নেই?
দেশের ৭১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর শর্ত পূরণ না করেই চলছে। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই স্থায়ীভাবে নিযুক্ত ভিসি, প্রোভিসি, রেজিস্ট্রার ও কোষাধ্যক্ষ। তাছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেই রয়েছে শিক্ষার মান বজায় না রাখা, নিয়মিত সিন্ডিকেট সভা আহ্বান না করা, স্থায়ী বা নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকা বা নিজস্ব ক্যাম্পাসের জমি না থাকা, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা সংক্রান্ত শর্ত ভঙ্গসহ নানা অভিযোগ। আবার ব্যাঙের ছাতার মতো দেশের যত্রতত্র ক্যাম্পাস স্থাপনকারী একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগ। বস্তুত এসব ক্যাম্পাসের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার ফেরিওয়ালারা ভুয়া সার্টিফিকেটের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, দেশের প্রথম সারির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে জঙ্গিসংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগসহ মালিকানা নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব। মূলত দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই বিভিন্ন সময়ে দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনাসহ বিশেষ ক্ষমতার জোরে অনুমোদন পাওয়ায় সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার করুণ দশা বিরাজ করছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ঢাকার বারিধারার নর্দ্দার ক্যাম্পাস ছাড়া অবৈধভাবে পরিচালিত বাকি ক্যাম্পাসগুলো এবং রাজশাহীর বাগমারায় অবস্থিত অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ ও উচ্ছেদ করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। তাছাড়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নর্দান ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটিসহ ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্ছেদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইউজিসি কর্তৃক দ্রুত চিঠি দেয়ার কথা রয়েছে। এগুলো ছাড়াও গত জানুয়ারি মাসে আরও ছয়টি অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস উচ্ছেদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়।
একশ্রেণীর অসাধু লোক উচ্চশিক্ষা নিয়ে ফেরিওয়ালার মতো দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য করে চলেছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সরকার বা ইউজিসির অনুমোদন না নিয়েই এবং কোনো রকম নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো শাখা ক্যাম্পাস খুলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে টাকার বিনিময়ে সরাসরি সার্টিফিকেট বাণিজ্যসহ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। অথচ সরকার এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর ৩৮ ধারায় সরকার কর্তৃক একটি জাতীয়, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠনের কথা স্পষ্টভাবে বলা থাকলেও দীর্ঘদিনেও তা গঠন করা হয়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভালো-মন্দ সব ধরনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান যে প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আবার উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে দেশের ভেতরে অবস্থিত প্রায় পাঁচশ স্টুডেন্টস কনসালটেন্সি ফার্ম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লাগামহীনভাবে প্রতারণা করে চলেছে। অথচ দেখার যেন কেউ নেই। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে যাওয়ার নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি ভালোভাবে জানা না থাকায় এবং বিদেশী একটি ডিগ্রি আর নিজের ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর আশায় ভিটেমাটি ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব স্টুডেন্টস কনসালটেন্সি ফার্মের দ্বারস্থ হয়। এগুলোর বেশির ভাগই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। আর শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ভাগ্যে জুটছে প্রতারণা। পুলিশের এক হিসাবে দেখা গেছে, গত বছর পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী এভাবে স্টুডেন্টস কনসালটেন্সি ফার্মগুলোর মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এসব স্টুডেন্টস কনসালটেন্সি ফার্ম কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। এরা শুধু একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার এসব ফেরিওয়ালা তথা এসব প্রতারকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দেশে স্পষ্ট তথা সুনির্দিষ্ট কোনো আইনও নেই। তাই প্রতারিত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়ার তেমন কোনো জায়গা থাকে না। অনেক সময় এসব প্রতারককে ধরা গেলেও এক্ষেত্রে আইন না থাকায় প্রতারণার বাইরে পুলিশ বা ভুক্তভোগী তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা করতে পারেন না।
শিক্ষাকে বলা হয়ে থাকে জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু দেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই যদি প্রকৃত অবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে তো সেই মেরুদণ্ড দিয়ে ভালোভাবে দাঁড়ানোই সম্ভব হবে না। সেই শিক্ষা দিয়ে কিভাবে একটি দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব? বিষয়টি সরকারসহ সবারই ভালোভাবে অনুধাবন করা উচিত। দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই সরকারের উচিত হবে, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততা, সার্টিফিকেট বাণিজ্য করা, লেখাপড়ার মান সঠিকভাবে বজায় না রাখাসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। অন্যথায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আর বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে স্টুডেন্টস কনসালটেন্সি ফার্মগুলোর লাগামহীন প্রতারণা ও বাণিজ্য বন্ধে প্রয়োজন কঠোর আইন প্রণয়ন করে তার যথাযথ বাস্তবায়ন। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দেশ-বিদেশে ভর্তিসহ সামগ্রিক বিষয়ে দ্রুত ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই) শীর্ষক একটি বিধিমালা প্রণয়নও অপরিহার্য।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ইউআইটিএস; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

নির্বাচনী ফলাফলে যেসব বিষয় প্রভাব ফেলবে by ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশের যেসব নির্বাচন স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত সেগুলো হল- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন। আমরা সচরাচর স্থানীয় শাসনকে স্থানীয় সরকার বলে থাকি। সংবিধানের ৪র্থ ভাগের ৩য় পরিচ্ছেদে ‘স্থানীয় শাসন’ শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার ইংরেজি অর্থ করা হয়েছে Local Government. Local Government শব্দটির শাব্দিক অর্থ ‘স্থানীয় সরকার’ বিধায় সাধারণ মানুষের কাছে ‘স্থানীয় শাসনে’র স্থলে ‘স্থানীয় সরকার’ শব্দ দুটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এমনকি স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা সংশ্লেষে যেসব আইন ও বিধি প্রণীত হয়েছে সেসব আইন ও বিধিতে স্থানীয় সরকার শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯; স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০; স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ, ২০০৮; স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা, ২০০৮; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) আইন, ২০১০; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০। সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে। সে নিরিখে সর্বত্র ‘স্থানীয় সরকারে’র পরিবর্তে ‘স্থানীয় শাসন’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার যুক্তিসঙ্গত হয়।
আমাদের দেশে বর্তমানে জাতীয় নির্বাচন বলতে শুধু সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনকে বোঝায়। সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে প্রতি ৫ বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হতেন। তখন রাষ্ট্রপতির নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচন হিসেবে বিবেচনার অবকাশ ছিল। বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি প্রত্যক্ষভাবে জনগণের ভোটের পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। নির্বাচন কমিশনকে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে যেসব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রপতি পদের এবং সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ।
স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা অথবা সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের যেসব দায়িত্ব পালন করে থাকে, সেসব দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের অধীনে প্রদান করা হয়েছে। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১০; উপজেলা পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০০৮; পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১০ এবং সিটি কর্পোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১০Ñ এ চারটির প্রতিটিতে পৃথকভাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিজ ছবি ও প্রতীক ব্যতীত কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বা প্রতীক বা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম বা ছবি ছাপাতে কিংবা ব্যবহার করতে পারবেন না, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা দেখি স্থানীয় সরকারের এ চারটি নির্বাচনে ব্যানার, পোস্টার, লিফলেট ও দেয়াল লিখনে প্রার্থীর নাম ও প্রতীকের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক এবং নেতৃবৃন্দের নাম উল্লেখ না থাকলেও সরকারের পদধারী নন এমন অনেক নেতা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করে প্রার্থীর প্রতি দলীয় সমর্থন যে রয়েছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে প্রার্থীর পক্ষে দলের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ না থাকলেও গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলের সমর্থনহীন নির্বাচনের সংখ্যা নগণ্য। আরও পরিতাপের বিষয়, বিধিমালা অনুযায়ী স্থানীয় শাসন বা সরকারের যে কোনো নির্বাচনকে রাজনৈতিক রূপ দিলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এ অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে মর্মে বিধিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত আমাদের কোনো নির্বাচন কমিশন এসব নির্বাচন রাজনৈতিক দলের পরিচিতি পাওয়া সত্ত্বেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেনÑ এমনটি দেখার সুযোগ দেশবাসীর হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রধান চারটি রাজনৈতিক দল- আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী আচরণবিধির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়কে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এসব নির্বাচনকে অরাজনৈতিক বলার সুযোগ কোথায়? আর যদি অরাজনৈতিক বলার সুযোগ না থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে আচরণবিধিতে পরিবর্তন এনে এসব নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ে অনুষ্ঠিত হওয়াই যথার্থ হবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যে দলীয় ভিত্তিতে হয়েছে, সে বিষয়ে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত এ ৫টি নির্বাচনের জয়-পরাজয়কে আগামী জাতীয় নির্বাচনের জয় বা পরাজয়ের মাপকাঠি বিবেচনায় দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল এবং উভয়ের স্ব স্ব জোট নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে মরিয়া হয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। উপরোক্ত ৫টি নির্বাচনের প্রথমোক্ত ৪টি একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এ ৪টি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য ভোটের ব্যবধানে পরাজয় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে তাদের নেতৃস্থানীয় অনেককেই শংকিত করে তোলে। সে শংকার বিষয়টি মাথায় রেখে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জনসমর্থন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর অনুকূলে আনার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের পরও যখন দেখা গেল তাদের প্রার্থী উপরোক্ত ৪টি নির্বাচনের চেয়েও অনেক বেশি ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন, তখন তারা নতুন করে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ শুরু করেছেন।
আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন একাধিক ব্যক্তির কেউ বা এ পরাজয়ের জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পদে বহাল থাকাকালীন দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন, কেউ বা দলীয় সভানেত্রীর সরকারি পদের সঙ্গে সঙ্গতিহীন ও অসৌজন্যমূলক কথাবার্তাকে দায়ী করেছেন, কেউবা জাতীয় নেতাদের সঙ্গে কর্মীদের দূরত্বকে দায়ী করেছেন, কেউ বা উফশী (হাইব্রিড) মন্ত্রী ও নেতাদের অতিকথনকে দায়ী করেছেন, কেউ বা শেয়ারবাজার, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পদ্মা সেতু, রেলের কালো বিড়াল, হলমার্ক, ডেসটিনি প্রভৃতি দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। কেউ বা নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নকে দায়ী করেছেন, কেউ বা প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগসহ সরকারের সব পর্যায়ের দলীয়করণকে দায়ী করেছেন, কেউ বা স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার অধীন নির্বাচিত প্রার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের বিরোধকে দায়ী করেছেন, কেউ বা আওয়ামী লীগের ক্রমনিমজ্জিত ভাবমূর্তিকে দায়ী করছেন, কেউ বা আওয়ামী লীগের ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন, কেউ বা দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আপসকামিতাকে দায়ী করছেন, কেউ বা দলীয় কোন্দলকে দায়ী করছেন, কেউ বা দলের ত্যাগী ও জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করছেন, কেউ বা নিকৃষ্টদের পদ-পদবি দিয়ে পুরস্কৃত করে উৎকৃষ্টদের বঞ্চিত করাকে দায়ী করছেন, আবার কেউ বা আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতাদের বদলে বামদের মূল্যায়ন করাকে দায়ী করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, উপরোক্ত কারণগুলোর যে কোনো একটি পরাজয়ের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে দায়ী নয়। বরং পরাজয়ের পেছনে সব কারণেরই কমবেশি ভূমিকা রয়েছে। অনেকের অভিমত, এ পাঁচটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নয়, আওয়ামী লীগেরই পরাজয় ঘটেছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে পরাজয়ের দায় নিরূপণে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন আমাদের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা নেই। উভয় দলে সভানেত্রী ও চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্ত দলীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃত। তাই দলের সাফল্য ও ব্যর্থতার কৃতিত্ব ও দায় বহুলাংশে স্ব স্ব দলের সভানেত্রী ও চেয়ারপারসনের ওপর বর্তায়।
৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয়ের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আক্ষেপ করে বলতে শোনা গেছে, তার সরকারের উন্নয়ন এবং প্রার্থীদের সততা ও যোগ্যতাকে কেন জনগণ মূল্যায়ন করে দেখল না, তা অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ অনুসন্ধানের উদ্যোগ পরাজয়ে ব্যথিত না হয়ে বরং আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে জয়ের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য হলেও তার অবশ্যই বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, পরাজয়ের কারণ হিসেবে যেসব বক্তব্য উচ্চারিত হয়েছে তার বিহিত করা ছাড়াও বিচার বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগে জ্যেষ্ঠ, দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবীদের অবদমিত করে যেভাবে কনিষ্ঠ, অদক্ষ, অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্তদের তথাকথিত দলীয় বিবেচনায় মূল্যায়িত করে লোভনীয় পদ দেয়া হয়েছে, তা ভোটের বাজারে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রধানমন্ত্রী অন্তত সেটুকু বিবেচনায় নিয়ে যদি ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হন, তাহলে বোধকরি ডুবন্ত তরী বহুকষ্টে তীরে পৌঁছে সম্মানহানি থেকে দলকে কিছুটা হলেও রেহাই দেবে। আমাদের রাজনীতিতে দেশের সংখ্যালঘুদের আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বাস্তবতা হল, এ ভোটব্যাংক যে কোনো নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের পক্ষে যতটা না অবদান রাখছে তার চেয়ে বেশি অবদান রাখছে সম্মিলিতভাবে জামায়াত, হেফাজত ও গ্রামীণ ভোটব্যাংক আওয়ামীবিরোধী শিবিরের বিজয়ের ক্ষেত্রে। আগামী সংসদ নির্বাচনে এ সম্মিলিত ভোটব্যাংক যে জয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেবে, সে বিষয়ে নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই।
আমাদের দেশসহ পৃথিবীর সব দেশের জনগণ প্রতিষ্ঠান বিমুখ। আর এ প্রতিষ্ঠান বিমুখতা বড় হয়ে দেখা দেয় একটি দল একবার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর দ্বিতীয়বার ভোটারদের সম্মুখীন হলে, যখন তারা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান খুঁজে দেখার চেষ্টা করে। এ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান ব্যাপক হলে জয়ের আশা যে তিরহিত হয়, তা ইতিপূর্বে একাধিকবার উপলব্ধি করা গেছে। যারা ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে আসছিলেন, নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভাবনীয় বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বাম ঘরানার মন্ত্রী, উফশী মন্ত্রী ও নেতা এবং অনির্বাচিত মন্ত্রীদের দৌরাত্ম্য তারা সবাই কোণঠাসা, অবমূল্যায়িত, উপেক্ষিত ও নিষ্পেষিত। এভাবে পরীক্ষিত ও ত্যাগীরা যদি অবহেলিত ও উপেক্ষিত হন, তা যে কোনো দলের জয় নয়, বরং পরাজয়কেই নিশ্চিত করে তোলে। ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে অন্তত ৪টির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা সার্বিক বিচারে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলেও কেন তারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, সে হিসাব-নিকাশ করার সময় বোধকরি অত্যাসন্ন। এ হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে স্ব স্ব জোটের ভোটব্যাংকের বাইরে সর্বাগ্রে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন স্যুয়িং ভোট (দোদুল্যমান ভোট)। এসব ভোটার নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিদায়ী সরকারের শাসনকালের কার্যক্রম পর্যালোচনাপূর্বক ভোটদান বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। আমাদের বড় দুটি রাজনৈতিক জোটের সমর্থকের বাইরে যে স্যুয়িং ভোট রয়েছে তা শতাংশের হিসাবে তাদের সমর্থিত ভোটের চেয়ে বেশি। তাই এ স্যুয়িং ভোট যে দল বা জোটের দিকে যাবে তারাই হবে নির্বাচনে বিজয়ী। এ বাস্তবতায় আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে ফলাফল কী হবে, ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল তারই পূর্বাভাস- এমনটি ভাবা অমূলক নয়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

বিভাজনের রাজনীতির অবসান জরুরি by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

একটি পারিবারিক গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই। একজন মা তার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যথাযথ মূল্যবোধ সহকারে প্রাপ্তবয়স্ক লোক হিসেবে এসব শিশুর দেখাশোনার চেয়ে অন্য আর কিছু শ্রেয় হতে পারে না। রাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা ভীত হয়ে পড়ল। মা তাদের কাছে টেনে নিলেন। শিশুরা বলল, ‘যতক্ষণ তুমি আমাদের সঙ্গে আছ, ততক্ষণ আমরা কোনো কিছুকেই ভয় পাই না।’ পরদিন মা তাদের সঙ্গে নিয়ে একটি পাহাড়ে উঠলেন। তিনি শিশুদের উৎসাহ দিচ্ছিলেন, ‘ধৈর্য সহকারে আর সামান্য একটু চেষ্টা করলে আমরা ওপরে উঠে যাব।’ শিশুরা বলল, ‘মা তুমি না থাকলে আমরা শিখরে উঠতে পারতাম না।’ সে রাতে মা তারকারাজির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার সন্তানরা জীবনে বিপর্যয় মোকাবেলা করতে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছে।’ পরদিন এক ঝড় এলো, মা তার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেঘের বিপরীত দিকে তাকাও এবং উজ্জ্বল সূর্যরশ্মি দেখ।’ সন্তানরা ওপরের দিকে অন্ধকারের অপর দিক দেখতে পেল। সে রাতে মা প্রার্থনা করল, ‘আজকের দিনের চেয়ে শ্রেয় কিছু হতে পারে না। কারণ অন্ধকারের অপর দিক দেখার ক্ষমতা আমি আমার সন্তানদের দিতে পেরেছি।’ বছর চলতে থাকল। তার সন্তানরা দীর্ঘদেহী ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠল এবং তাদের চরিত্র ও সাহসিকতা উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশ পেল। অবশেষে যখন মায়ের ইহজগৎ ত্যাগ করার সময় হয়ে এলো, মা বললেন, ‘‘আমি আমার ভ্রমণের শেষপ্রান্তে পৌঁছেছি। এখন আমি বুঝতে পারছি ‘প্রারম্ভের চেয়ে শেষ শ্রেয়’, কারণ আমার সন্তানরা একাই পথ চলতে পারে এবং তোমাদের পর তাদের সন্তানরাও একাই চলতে পারবে।’’
বিএনপি-আওয়ামী লীগের যৌথ আন্দোলনে ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি পক্ষপাতহীন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ-বিএনপিই দেশ শাসন করে আসছে। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া- দুজনেই দুবার করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। তাদের নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীল আচরণেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিদের মুখে এটা প্রকাশ পাচ্ছে; বিশ্ব মিডিয়ায়ও আলোচিত হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার একটা সুফল বাংলাদেশ পাচ্ছে। দেশে শিল্পোৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। রফতানি আয় বেড়েছে ঈর্ষনীয়ভাবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে প্রায় ১ কোটি মানুষের, যা কল্পনাতীত। কয়েক হাজার কোটি ডলার বিদেশ থেকে আসছে রেমিটেন্স ও রফতানি আয় থেকে। যারা মানুষ নিয়ে ভাবেন, রাজনীতি করেন বা নেতৃত্ব দেন- এখান থেকে তাদের অনেক কিছু শেখার আছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রফতানি আয় নিয়ে কয়েকদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, রফতানি আয়ের দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের পরে স্থান হবে বাংলাদেশের। এর জন্য তিনি শিক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন।
দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার হার বাড়ছে চোখে পড়ার মতো। এ প্রসঙ্গে ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রগতি ভারতের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তাছাড়া এনজিওর কর্মকাণ্ড ব্যাপক প্রসারিত হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। এতে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে উল্লেখ করার মতো। এসব অত্যন্ত জটিল ও কঠিন কাজ; যারা সমাজ ও মানুষ নিয়ে কাজ করেন- কেবল তারা ছাড়া অন্যদের এটা উপলব্ধিতে আসার কথা নয়। সামরিক বা অন্য কোনো শক্তির হাতে রাজনীতি বন্দি থাকলে মানুষ এতকিছুর মুখ দেখত কি-না সন্দেহ। রাজনীতি তৃণমূলে পৌঁছেছে বলেই সব ক্ষেত্রে মানুষ পরিবর্তন অনুভব করছে। এ ব্যাপারে পুরোপুরি বুঝতে হলে মইন-ফখরুদ্দীনের দু’বছরের জরুরি শাসন উপলব্ধিতে আনা প্রয়োজন। কারণ এটি সমসাময়িক একটি ঘটনা। বিভিন্ন কারণে প্রথম অবস্থায় মইন-ফখরুদ্দীনের জরুরি শাসনের প্রতি জনগণের সমর্থন ছিল। কিছুদিন যাওয়ার পর জরুরি শাসন আর গণতান্ত্রিক শাসনের তুলনামূলক দিক মানুষ যখন বুঝতে অনুভব করল, তখন জরুরি শাসন একপর্যায়ে মুখ থুবড়ে পড়ল। জরুরি শাসনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল জনগণের বিরুদ্ধে। দু’বছরের ওই শাসনে মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। অনেকের রুটি-রুজির ওপর আঘাত এসেছে দানবের মতো। সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় মুক্তির প্রহর গুনেছে। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। মানুষ উপলব্ধি করেছে, জরুরি শাসনে বাংলাদেশ ক্রমেই পেছনে পড়ে যাচ্ছে। ফলে বন্দি শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তাদের সসম্মানে মুক্তি দিয়ে দেশে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় জরুরি সরকার।
বলতে দ্বিধা নেই, গণতন্ত্রের জন্য একটি সংকটময় সময় এখন বাংলাদেশ অতিক্রম করছে। এই সংকট এখন প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছে। দেশে এক অশান্ত ও বেদনাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে বড় দুই দলের মধ্যে ঐক্যের বিকল্প নেই, বিশেষ করে দুই নেত্রীর মধ্যে ঐক্য জরুরি বলে মানুষ মনে করছে। কারণ, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে দেশ ও জনগণ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগের দুই যুগের শাসনে ধর্মীয় মোড়কে দেশে একটি বিপজ্জনক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই শক্তি দেশের জন্য হুমকি, গণতন্ত্রের জন্য হুমকি; সর্বোপরি উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্যও হুমকি। কাজেই এই শক্তিকে কৌশলে দমাতে দুই নেত্রীর মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। ধর্মীয় উগ্রতার কারণে আমাদের চোখের সামনে ধ্বংস হচ্ছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও মিসরসহ আরও অনেক সম্ভাবনাময় দেশ। এ অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে, যা চূড়ান্তভাবে দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। জাতীয় জীবনের এই বিভক্তি কমিয়ে আনতে রাজনৈতিক ঐক্যের বিকল্প নেই। রাজনীতিতে অশুভ শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করা বাঞ্ছনীয় নয়। খোদ রাজনীতিকদের জন্যই তা ক্ষতিকর হবে। রাজনীতিতে যদি পরমতসহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে কোনোভাবেই দেশে শান্তি বিরাজ করবে না। রাজনৈতিক সংকট দূর করতে তথা সামনের নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার নিয়ে অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বিরোধী জোট মেনে নেবে না, এটি এক রকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। একতরফা কোনো নির্বাচনের দিকে পা বাড়ালে দেশে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। এই সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও সর্বস্তরের মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে বিপদ ডেকে আনবে। এমনটি হলে মাথায় হাত দেয়া ছাড়া রাজনীতিকদের সামনে আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না। কাজেই অপশক্তির হাতকে প্রশস্ত করা রাজনীতিকদের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। অনৈক্য ও বিভাজনের রাজনীতি কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনে না। অনৈক্যের রাজনীতি অর্থনীতির জন্য মারাত্মক অন্তরায়। বিভাজনের রাজনীতির কারণে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম মন্দাভাব বিরাজ করছে, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠছে না, দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে। কাজেই দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে বিভক্তির রাজনীতির অবসান জরুরি। অন্যসব দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিরোধী দলের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি নিরেট গণতান্ত্রিক একটি দাবি। এ দাবির সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষের একাÍতা রয়েছে। মানুষ চায় সব দলের অংশগ্রহণে আগামীতে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু দেখতে দেখতে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে পার্লামেন্টেরও। কিন্তু মানুষের আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মানুষের শংকা দূর হচ্ছে না। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে রাজনীতি ঘোর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে আশার কথা হল, বিরোধী দল সরকারের এই শেষ সময়েও তাদের ন্যায্য দাবির ব্যাপারে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের এই দায়িত্বশীলতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। পরিশেষে বলতে চাই, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া চাইলে দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অবশ্যই হতে পারে। এটা তাদের একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার মাত্র। মানুষ দুই নেত্রীকে অনেক কিছু দিয়েছে। গত ২০ বছরে ঘুরেফিরে তারাই দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। মানুষকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে তারা এক হয়ে কাজ করবেন, এটিই কাম্য। এর ব্যত্যয় ঘটানো কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। দুই শীর্ষ নেত্রীর মধ্যে ঐক্য তৈরি হলে রাজনীতিতে সৃষ্টি হতে পারে ইতিহাস, তারা স্থান করে নিতে পারেন ইতিহাসের সোনালি পাতায়।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মার্টিন লুথার কিংয়ের স্বপ্ন ও আজকের যুক্তরাষ্ট্র by তারেক শামসুর রেহমান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে যারা অতীতে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে শীর্ষে ছিলেন মার্টিন লুথার কিং। আজ ২৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র তাকে আবার স্মরণ করবে। ১৯৬৩ সালের ২৬ আগস্ট ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়াল প্রাঙ্গণে মার্টিন লুথার কিং তার সেই বিখ্যাত ভাষণটি দিয়েছিলেনÑ ‘ও যধাব ধ ফৎবধস’, আমার একটি স্বপ্ন। তার সেই ভাষণের ৫০ বছর পালন করবে যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে দেয়া মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই ভাষণের কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? মার্টিন লুথার কিং যেন একজন কবি! কবিতার ভাষায় বলছেন তার স্বপ্নের কথা। বলছেন, একদিন কৃষ্ণাঙ্গরা, যারা দাস হিসেবে এ দেশে এসেছিলেন, তাদের সন্তানরা এবং শ্বেতাঙ্গরা সবাই মিলে এ দেশকে গড়ে তুলবে। হাতে হাত রেখে একসঙ্গে বেড়ে উঠবে। এই একটি ভাষণের জন্য মার্টিন লুথার কিং ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন। তার নাম আজ একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় জর্জ ওয়াশিংটন, জেফারসন কিংবা লিংকনের সঙ্গে। সেই বিখ্যাত ভাষণের ৫০ বছর পর টাইম ম্যাগাজিন তাকে নিয়ে প্রচ্ছদ করেছে (আগস্ট ২৬, ২০১৩)। তাকে বলা হচ্ছে ‘একুশ শতকের রূপকার’। তাকে নিয়ে লিখেছেন অনেকেইÑ জেসি জ্যাকসন, কলিন পাওয়েল থেকে শুরু করে মালালা ইউসুফজাই পর্যন্ত। মালালা লিখেছে, কীভাবে মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত উক্তি তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অহিংস পথে লুথার কিং কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায় করতে চেয়েছিলেন। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা মার্টিন লুথার কিং ১৯৫৯ সালে ভারতেও এসেছিলেন গান্ধীর অহিংস নীতি সম্পর্কে ধারণা নিতে। অহিংস পন্থায় অধিকার আদায়ে তার এই সংগ্রামের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাকে শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। শুধু তাই নয়, ১৯৭৭ সালে তাকে মরণোত্তর ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল ফর ফ্রিডম’ এবং ২০০৪ সালে ‘কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল’ দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য মার্কিন জাতিরÑ যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ আর শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না, সবাই একসঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রকে গড়ে তুলবে, তাকেই কিনা শ্বেতাঙ্গ জেমস আর্ল রয়ের গুলিতে প্রাণ দিতে হয় ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল।
মার্টিন লুথর কিং জীবদ্দশায় বৈষম্য কমিয়ে আনার সংগ্রাম করলেও এবং জীবন দিলেও মার্কিন সমাজে বৈষম্য কি কমেছে? ১৯৬৩ সালের বিখ্যাত ‘মার্চ অন ওয়াশিংটনে’র পর ৫০ বছর পার হতে চলেছে। কিন্তু বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়েছে, এটা বলা যাবে না। তবে নিঃসন্দেহে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। ১৯৬০ সালে মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ যেখানে ছিল শতকরা ১১ ভাগ, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৪ ভাগ। ১৯৬০ সালে প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ছিল ১৭.০৫ মিলিয়ন। এখন ২৫১ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ৪৫ মিলিয়ন। তারা সবচেয়ে বড় এথনিক গ্র“প নয়। বর্তমানে মার্কিন জনগোষ্ঠীর বড় অংশ হচ্ছে লাতিনো অথবা হিসপানিক, ৫৪ মিলিয়ন। শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা গেছে ১৯৬৭ সালে স্কুল ত্যাগকারী কৃষ্ণাঙ্গদের হার যেখানে ছিল শতকরা ২৯ ভাগ, ২০১১ সালে তা কমে এসে দাঁড়ায় ৭ ভাগে। অথচ একই সময় শ্বেতাঙ্গদের স্কুল ত্যাগের হার ছিল ১৫ ভাগ (১৯৬৭), আর এখন ৫ ভাগ। ১৯৬০ সালে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ব্যাচেলর ডিগ্রি গ্রহণকারীদের হার ছিল ৪ ভাগ (শ্বেতাঙ্গ ৮ ভাগ), ২০১২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২১ ভাগ, আর শ্বেতাঙ্গদের এ হার ৩৫ ভাগ। তবে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতার হার বেশি। পরিসংখ্যান বলে, কারাগারে অবস্থানকারী কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর হার ৩৭ ভাগ, এর মধ্যে ৪২ ভাগ আবার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। কিশোর অপরাধীর হার (কৃষ্ণাঙ্গ) শতকরা ৩২ ভাগ। পরিসংখ্যান বলে, কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার কমেছে। ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল শতকরা ৪১ ভাগ, সেখানে বর্তমানে এই হার ২১ ভাগ। অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে মেইন-এ কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে বেকারত্বের হার বেশি, শতকরা ২১ ভাগ, আর দারিদ্র্যের হারও বেশি ৪৬ ভাগ। মিসিসিপি যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্রতম রাজ্য। অথচ সেখানে শতকরা ৫৭ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। নিউইয়র্কে সবচেয়ে বেশি কৃষ্ণাঙ্গ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, এ সংখ্যা ২,০৪০৩২। আয়ের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের গড় আয় যেখানে বছরে ২১ হাজার ডলার, সেখানে শ্বেতাঙ্গদের আয় ২৭ হাজার ডলার। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গরা এখনও পিছিয়ে আছে। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যেখানে শতকরা ৭ জন শ্বেতাঙ্গ বেকার, সেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে এ হার শতকরা ১৫ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু পুরুষদের জন্য। কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের মধ্যে বেকারত্বের হার শতকরা ১৩ ভাগ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৩ ভাগ। আর ৬০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গের মধ্যে বেকারত্বের হার মাত্র ৯ ভাগ। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা গেছে শতকরা মাত্র ৭ ভাগ ব্যবসা রয়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণে (২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী)। যদিও ১৯৬১ সালের হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা তিনগুণ বেশি। তবে নিজস্ব বাড়ি নেই অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানের। পরিসংখ্যান বলছে, শতকরা ৭০ ভাগ শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান যেখানে নিজস্ব বাড়ির মালিক, সেখানে শতকরা মাত্র ৪৫ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। ১৯৬০ সালে একজন কৃষ্ণাঙ্গ বেঁচে থাকতেন গড়ে ৫০ বছর। এখন বাঁচেন ৭২ বছর। তুলনামূলকভাবে শ্বেতাঙ্গদের বেঁচে থাকার গড় ৭৭ বছর (১৯৬০ সালে ৬৮)। তবে শ্বেতাঙ্গ মহিলারা বাঁচেন বেশি দিন, ৮১ বছর (কৃষ্ণাঙ্গ মহিলারা ৭৮ বছর)। স্বাস্থ্য সচেতনতার দিক থেকে কৃষ্ণাঙ্গরা যে কতটা পিছিয়ে আছে, তা জানা যায় আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে। প্রতি এক লাখ আমেরিকানের মধ্যে ২৩৩ জন কৃষ্ণাঙ্গ যেখানে মারা যায় হƒদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, সেখানে শ্বেতাঙ্গ মারা যায় ১৮২ জন। ডায়াবেটিস, ব্রেস্ট ক্যান্সার, আÍহত্যার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৪০, ১৮ ও ৫ জন (কৃষ্ণাঙ্গ) এবং ১৯, ১২ ও ১৩ জন (শ্বেতাঙ্গ)। এখানে শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে আÍহত্যার প্রবণতা বেশি। প্রশাসনে ও রাজনীতিতেও বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। ১৯৬৩ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে (মোট সদস্য ৪৩৫ জন) মাত্র ৫ জন সদস্য ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। একজনও সিনেটর ছিলেন না (মোট সদস্য ১০০ জন)। ৫০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্য থেকে ৪৩ জন হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্য পেয়েছে, একজন সিনেটর পেয়েছে, একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে। যদিও বারাক ওবামাকে পুরোপুরি কৃষ্ণাঙ্গ বলা যাবে না। ওবামার মা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ, আর বাবা আফ্রো-আমেরিকান (কেনিয়ান)।
এই পরিসংখ্যান কতটুকু আশার কথা বলে? মাটির্ন লুথার কিংয়ের স্বপ্ন কতটুকু পূরণ হয়েছে? মার্কিন সমাজে এখন কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যে বৈষম্য নেই, তা বলা যাবে না। দৃষ্টিভঙ্গিগতভাবেও পার্থক্য রয়েছে। আগস্টের প্রথম দিকে সিমারম্যান নামে এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনায় (নিউইয়র্ক) অভিযুক্ত একজন শ্বেতাঙ্গ নাগরিককে অভিযুক্ত করেনি জুরি বোর্ড। অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে গুলি করে মেরেছিল কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে। তারপরও তাকে অভিযুক্ত করা হয়নি। এ ঘটনায় মার্কিন সমাজে বৈষম্যের বিষয়টি আবার সামনে চলে এসেছে। টাইম ম্যাগাজিন একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। তাতেও কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৫ জন কৃষ্ণাঙ্গ উত্তরদাতা সিমারম্যানের বিচারের ঘটনায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। অথচ শতকরা ৪৯ জন শ্বেতাঙ্গ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা সন্তুষ্ট। প্রশ্ন করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। শতকরা ৬৮ জন কৃষ্ণাঙ্গ উত্তরদাতা মনে করেন, বিচার বিভাগ কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপারে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’। শতকরা ২৫ জন শ্বেতাঙ্গ তা মনে করেন না। ৫৩ জন কৃষ্ণাঙ্গ মনে করেন, জনসাধারণের অধিকার সংক্রান্ত আইনে আরও পরিবর্তন দরকার, যাতে বৈষম্য কমানো যায়। ১৭ ভাগ শ্বেতাঙ্গ অবশ্য তা মনে করেন না।
সুতরাং যে ‘স্বপ্নের’ কথা মার্টিন লুথার কিং শুনিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে, তা বলা যাবে না। অগ্রগতি কিছুটা হয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এখনও যেতে হবে অনেক দূর। একদিন যে ‘কালো মানুষ’রা এ দেশে দাস হিসেবে এসেছিল, তারা, তাদের পরবর্তী প্রজš§ এখনও মূলধারায় পুরোপুরিভাবে মিশে যেতে পারেনি। ইতিহাস বলে ১৬২০ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে ২১ হাজার কৃষ্ণাঙ্গকে ক্রীতদাস হিসেবে আফ্রিকা থেকে মার্কিন মুল্লুকে আনা হয়েছিল। ভার্জিনিয়ার জেমসটাউনে হল্যান্ডের দাস ব্যবসায়ীরা প্রথম ১৯ জন দাসকে এনেছিল তামাক ক্ষেতে কাজ করানোর জন্য। সময়টা ১৬১৯। সেই থেকে শুরু। তারপর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দাস ব্যবস্থা বন্ধের উদ্যোগ নেন। আর ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাস ব্যবস্থা নিষিদ্ধ হয়। তবে এটা তো ঠিক, ১৭৭৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে দাস ব্যবস্থা স্বীকৃত ছিল। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রায় ৪০ লাখ মানুষ আফ্রিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল, যাদের দাস হিসেবে ‘বিক্রি’ করা হয়েছিল। ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা এই দাস পরিবারেরই সন্তান। মার্কিন লুথার কিং ‘আধুনিক কালের দাসদের’ মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন কালো মানুষদের স্বীকৃতি। চেয়েছিলেন কালো মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তা। চেয়েছিলেন সাদা আর কালো মানুষদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। সবাই সমান, সবাই এক- যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে এই সমতা আর ভ্রাতৃত্ববোধের কথাই বলা হয়েছে। তবে ‘একতা আর অধিকারে’র যে আহ্বান মার্টিন লুথার কিং ১৯৬৩ সালে জানিয়েছিলেন, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন আজও হয়নি। তাই অধিকার আন্দোলনের অপর নেতা জেসি জ্যাকসনের ভাষায় বলতেই হয়, ‘ডব’াব মড়ঃ ঃড় শববঢ় সধৎপযরহম’। আন্দোলন চলবেই।
হাইল্যান্ড ভিলেজ, ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কোন পথে খালেদা by সাজেদুল হক

শেখ হাসিনার অচেনা পথ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে অনেক। কিন্তু খালেদা জিয়াও যে নতুন পথে হাঁটছেন তা হয়তো খেয়ালই করছেন না অনেকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। ভিনদেশী মিডিয়ায় তাদের পরিচয় ব্যাটলিং বেগমস।

পুলিশ দম্পতি খুনের জবানি

পুলিশ দম্পতির নির্মম খুনের বর্ণনা উঠে এসেছে তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের জবানিতে। আদালতে রেকর্ড করা ৩০ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে খুনের ঘটনার আদ্যোপান্ত খুলে বলেছে সে। জানিয়েছে, পিতা-মাতাকে খুন করার আগে মাতাল ছিল সে।

গত কুড়ি বছরের প্রতিটি দিন আমি নিজ দেশে ফেরার চেষ্টা করেছি- তসলিমা নাসরিন

গতকাল ছিল আলোচিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন। ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাস থেকে তিনি নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। জন্মদিন উপলক্ষে চ্যানেল আইতে গতকাল সমপ্রচার হয় তার সাক্ষাৎকার।

সিরিয়াকে ঘিরে যুদ্ধের ঘনঘটা হামলা হলে পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বলবে

রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে আরেকটি যুদ্ধের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে। বলা যায়, চারদিক থেকে যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে সিরিয়াকে ঘিরে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।

‘ড. ইউনূস রাষ্ট্রদ্রোহী’

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, ড. ইউনূস একজন রাষ্ট্রদ্রোহী। কারণ তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেছেন। এর জন্য তার বিচার হওয়া উচিত।

মেয়েদেরও স্বপ্নদোষ হয়?

স্বপ্নদোষ হলো একজন পুরুষের ঘুমের মধ্যে বীর্যপাতের অভিজ্ঞতা। এটাকে ‘ভেজাস্বপ্ন’ও বলা হয়। ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলেদের এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার প্রাথমিক বছরগুলোতে স্বপ্নদোষ খুব সাধারণ। তবে বয়ঃসন্ধিকালের পরে যেকোনো সময় স্বপ্নদোষ হতে পারে।

ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি

সিরিয়ার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে রাশিয়া। এ ধরনের অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া ব্যাহত করবে এবং এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর ভয়ানক প্রভাব ফেলবে বলেও সতর্কবার্তা দিয়েছে দেশটি।

গাদ্দাফির যৌনাচার!

লিবিয়ার সাবেক নেতা কর্নেল মোয়াম্মার গাদ্দাফি স্কুলছাত্রীদের অপহরণ করে এনে যৌনদাসী হিসেবে নিজের আস্তানায় রাখতেন বলে তার ওপর প্রকাশিত একটি বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।