Tuesday, September 8, 2020

রোয়ান্ডা গণহত্যা: ১০০ দিনে যেভাবে ৮ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়

১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে রোয়ান্ডায় ৮ লাখ মানুষ হত্যা করেছিল হুতু চরমপন্থিরা। তাদের শিকার ছিল সংখ্যালঘু টুটসি সম্প্রদায়ের মানুষজন, যারা ছিল তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও।
কীভাবে ওই গণহত্যা শুরু হয়েছিল?
রোয়ান্ডার বাসিন্দাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই হুতু, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে টুটসিরা দেশটির শাসন ক্ষমতায় ছিল।
১৯৫৯ সালে টুটসি রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে হুতুরা। তখন হাজার হাজার টুটসি প্রতিবেশী যেসব দেশে পালিয়ে যায়, তার মধ্যে রয়েছে উগান্ডাও।নির্বাসিত টুটসির একটি দল বিদ্রোহী একটি বাহিনী গঠন করে যার নাম দেয়া হয় রোয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ)। ওই বাহিনী ১৯৯০ সালে রোয়ান্ডায় অভিযান শুরু করে এবং ১৯৯৩ সালে শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলতে থাকে।
১৯৯৪ সালের ৮ এপ্রিল রাতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানা এবং বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট সাইপ্রিয়েন নটারিয়ামিনা, যাদের দুজনেই হুতু সম্প্রদায়ের, বহনকারী বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। ওই বিমানে থাকা সব যাত্রী মারা যান।
এই ঘটনার জন্য আরপিএফকে দায়ী করে হুতু চরমপন্থিরা এবং খুব তাড়াতাড়ি মানব হত্যার একটি সুপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ শুরু করে।
আরপিএফের দাবি ছিল, ওই বিমানটিকে গুলি করেছে হুতুরাই, যাতে তারা গণহত্যার একটি অজুহাত তৈরি করতে পারে। কীভাবে গণহত্যা করা হয়েছে?
অতি সতর্কতার সঙ্গে বিরোধী পক্ষের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকা মিলিশিয়াদের হাতে তুলে দেয়া হয়, এবং তারা গিয়ে তাদের সবাইকে পরিবারের সদস্যদের সহ হত্যা করে।
তখন প্রতিবেশীরা প্রতিবেশীদের হত্যা করেছে। এমনকি অনেক হুতু স্বামী তাদের টুটসি স্ত্রীদের হত্যা করেছে, কারণ তাদের দাবি, না হলে তাদের হত্যা করা হতো।
সেই সময় প্রত্যেকের পরিচয় পত্রে গোত্রের নাম উল্লেখ থাকতো। ফলে মিলিশিয়ারা রোড ব্লক বসিয়ে পরিচয় পত্র যাচাই করতো এবং টুটসিদের হত্যা করতো।
বেশিরভাগ সময় এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে ধারালো ম্যাচেটি (ধারালো ছুরির মতো) দিয়ে, রোয়ান্ডায় যা প্রায় সবার ঘরেই থাকে।
হাজার হাজার টুটসি নারীকে আটক করে যৌন দাসী করা হয়। কেন এটা এত পাশবিক হয়ে উঠেছিল?
রোয়ান্ডার সমাজ সবসময়েই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, যার প্রশাসনিক কাঠামোকে অনেকটা পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে সরকারের উঁচু মহল থেকে প্রতিটি জেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হয়।
তখনকার সরকারি দল, এমআরএনডির একটি যুব শাখা ছিল - যাদের বলা হয় ইন্টেরাহামায়ি - যারা পরবর্তীতে মিলিশিয়ায় রূপ নেয় এবং যারা বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। স্থানীয় গ্রুপগুলোর হাতে অস্ত্র এবং হিট-লিস্ট তুলে দেয়া হয়, যারা ভালোভাবে জানতো যে এসব মানুষকে কোথায় পাওয়া যাবে।
হুতু চরমপন্থিরা একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপন করে, যার নাম ছিল আরটিএলএম। ওই বেতার কেন্দ্র এবং পত্রিকার মাধ্যমে বিদ্বেষ মূলক প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হতো, মানুষজনকে 'তেলাপোকা' হত্যা করার জন্য বলা হতো, যার মানে টুটসিদের হত্যা করা বোঝানো হতো।
যেসব নামী ব্যক্তিদের হত্যা করা হবে, তাদের নাম ওই রেডিওতে পড়ে শোনানো হতো।
এমনকি চার্চের যাজক এবং নানদের বিরুদ্ধেও হত্যাকাণ্ডের জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে, যাদের শিকার অনেক মানুষ সেসব চার্চে আশ্রয়ের জন্য গিয়েছিলেন।
১০০ দিনের হত্যাযজ্ঞে আট লাখ টুটসি আর প্রগতিশীল হুতুদের হত্যা করা হয়। কেউ কি ওই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল?
রোয়ান্ডায় জাতিসংঘ এবং বেলজিয়ামের সৈন্য ছিল, কিন্তু গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘ মিশনকে কোন দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
একবছর আগেই সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা নিহত হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আর কোন আফ্রিকান জাতির লড়াইয়ের মধ্যে ঢুকতে রাজী ছিল না।
দশজন বেলজিয়ান সৈনিক নিহত হওয়ার পর বেলজিয়ামের সব সৈন্য এবং জাতিসংঘের বেশিরভাগ সৈনিককে রোয়ান্ডা থেকে সরিয়ে আনা হয়। হুতু সরকারের বন্ধু ফরাসিরা তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার জন্য একটি বিশেষ সেনাদল পাঠায়। তারা পরবর্তীতে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করলেও অভিযোগ রয়েছে যে, ওই এলাকায় গণহত্যা বন্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।
রোয়ান্ডার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল কাগামে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে, তারা গণ হত্যাকারীদের মদদ দিয়েছে, যদিও প্যারিস ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কীভাবে এর শেষ হয়েছিল?
সুসংগঠিত বাহিনী আরপিএফ উগান্ডার সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্রমেই রোয়ান্ডার বেশিরভাগ এলাকা দখল করে নেয়। ১৯৯৪ সালের ৪ঠা জুলাই এই বাহিনী রাজধানী কিগালির উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করে।
তখন প্রতিহিংসার ভয়ে প্রায় ২০ লাখ হুতু-যাদের মধ্যে বেসামরিক লোকজন এবং গণহত্যার সঙ্গে জড়িতরাও ছিল- সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় আশ্রয় নেয়। তখন দেশটির নাম ছিল জায়ার। অনেকে প্রতিবেশী তানজানিয়া এবং বুরুন্ডিতে আশ্রয় নেয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর আরপিএফ যোদ্ধারা হাজার হাজার বেসামরিক হুতু বাসিন্দাকে হত্যা করেছে। পরবর্তীতে কঙ্গোয় মিলিশিয়াদের ধরতে অভিযান চালানোর সময় আরো অনেক মানুষকে হত্যা করে। তবে আরপিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কঙ্গোয় যারা আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। সাহায্য সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তাদের সহায়তার বেশিরভাগই হুতু মিলিশিয়াদের হাতে পড়েছে। কঙ্গোর ক্ষেত্রে কী হয়েছিল?
কঙ্গোর সেনাবাহিনী আর হুতু মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে যে বাহিনীগুলো যুদ্ধ করছিল, তাদের সহায়তা করতে শুরু করে রোয়ান্ডার বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আরপিএফ।
রোয়ান্ডার সহায়তা পুষ্ট বিদ্রোহীরা কঙ্গোর রাজধানী কিনসাসায় অভিযান শুরু করে এবং মোবুতু সেসে সেকো সরকারকে উৎখাত করে লরেন্ট কাবিলাকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ক্ষমতায় বসানো হয়।
কিন্তু নতুন প্রেসিডেন্ট হুতু মিলিশিয়াদের দমনে ঢিলেমি করায় নতুন আরেকটি যুদ্ধের শুরু হয়, যাতে জড়িয়ে পড়ে ছয়টি দেশ। বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী খনিজ সম্পদ পূর্ণ দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য লড়াই শুরু করে।
২০০৩ সাল পর্যন্ত চলা ওই লড়াইয়ে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মারা গেছে বলে ধারণা করা হয়। এখনো রোয়ান্ডা সীমান্তবর্তী এলাকায় বেশ কয়েকটি সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। কারো কি বিচার হয়েছে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ২০০২ সালে, যার অনেক আগে রোয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফলে এজন্য দায়ীদের বিচার করতে পারবে না এই আদালত।
তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ওই হত্যাযজ্ঞের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিচারের জন্য তানজানিয়ার শহর আরুশায় একটি আদালত স্থাপন করে যার নাম 'রোয়ান্ডার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত'।
লম্বা এবং ব্যয়বহুল বিচারের পর গণহত্যার জন্য এ পর্যন্ত ৯৩জনের বিচার হয়েছে, যাদের অনেকেই ছিলেন হুতু সরকারের আমলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাদের সবাই হুতু সম্প্রদায়ের। গণহত্যায় অভিযুক্ত লক্ষাধিক ব্যক্তির বিচার দ্রুত করার জন্য রোয়ান্ডা সামাজিক আদালত তৈরি করে, যার নাম গাসাসা।
সংবাদদাতারা বলছেন, বিচার শুরু হওয়ার আগেই অন্তত ১০ হাজার অভিযুক্ত কারাগারে মারা গেছে।
২০১২ সাল পর্যন্ত ১২ হাজার গাসাসা আদালত বসেছে। সাধারণত বাজার বা কোন গাছের নীচে এসব আদালত বসে, যারা প্রায় ১২ লাখ মামলার বিচার করার চেষ্টা করছে।
তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্য বের করা, বিচার এবং পুনর্মিলন ঘটানো। রোয়ান্ডান ভাষায় গাসাসা মানে হচ্ছে একত্রে বাসা এবং আলোচনা করা। রোয়ান্ডার বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?
ছোট্ট ও বিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠনের জন্য অভিনন্দন পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট কাগামে। তার নীতির কারণে দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। তিনি রোয়ান্ডাকে একটি প্রযুক্তিগত কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজেও টুইটারে সক্রিয়।
তবে তার সমালোচকরা বলেন, তিনি বিরোধিতা সহ্য করতে পারেন না। দেশে বিদেশে তার বেশ কয়েকজন বিরোধী অপ্রত্যাশিতভাবে মারা গেছেন।
গণহত্যার বিষয়টি এখনো রোয়ান্ডায় খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয় এবং জাতি বা গোত্র নিয়ে কথা বলা বেআইনি। সরকার বলছে, বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা ছড়ানো বন্ধ করা এবং রক্তপাত বন্ধ করাই এর উদ্দেশ্য, যদিও অনেকে বলেন এর ফলে আসলে সঠিক পুনর্মিলন হচ্ছে না।
মি. কাগামের বেশ কয়েকজন সমালোচকের বিরুদ্ধে গোত্রগত বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, তাদের কোণঠাসা করার জন্যই এসব অভিযোগ।
২০১৭ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যে নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ৯৮.৬৩ শতাংশ ভোট।
সূত্রঃ বিবিসি

ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল স্থল ও বিমানবাহিনীর ১০০ জন সেপাই by হাজিমে ইশিই

একটি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছিল ঢাকা। আতঙ্ক ছড়িয়েছিল জাপানেও। ঘটনা ঘটিয়েছিল জাপানি লাল ফৌজ। যাকে বলা হয় রেড আর্মি। জাপানের উগ্রপন্থি একটি গোষ্ঠী। ১৯৭৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর। ১৩৭ জন যাত্রী ও ১৪ জন ক্রু নিয়ে জাপান এয়ারলাইনসের একটি বিমান জঙ্গিরা ছিনতাই করে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করে। চারদিকে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি।

ঘটনার নেপথ্যে ছিল রেড আর্মির ৯ সদস্যের মুক্তি ও ৬০ লাখ মার্কিন ডলার আদায়।
ঘটনা সুরাহায় ঢাকায় এসেছিলেন সে সময়ের জাপান সরকারের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাজিমে ইশিই। তাঁর নেতৃত্বে সমঝোতা বৈঠকের সময়ই বাংলাদেশের বিমানবহিনীতে ঘটে নাটকীয় এক অভূত্থান।

হাজিমে ইশিই খুব কাছ থেকে সেই অভূত্থানের নানা ঘটনা অবলোকন করেছেন। মানবজমিন অনলাইন থেকে পাঠকদের জন্য সামরিক অভূত্থানের অজানা কাহিনী তুলে ধরা হলো হাজিমে ইশিই’র বয়ানে-

স্থলবাহিনীসহ নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে সকাল আটটা নাগাদ। ৮টা বেজে ১০ মিনিটে নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা মূল ভবনে ঢুকে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড লড়াই শুরু হয়ে যায়। ভারি মেশিনগানের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে বিমানবন্দরজুড়ে। মাঝেমধ্যে লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেট উড়ে এসে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের পাশে কংক্রিটের দেয়ালে বিকট আওয়াজ করে বিদ্ধ হয়ে যায়।

‘মি. ইশিই, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে পালিয়ে যান! এখানে থাকা একেবারে নিরাপদ নয়!’ কেউ চিৎকার করে আমাকে সাবধান করে দিল। হ্যাঁ, তাই তো। নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার অন্যান্য ভবনের চেয়ে উঁচু বলে এটা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সুতরাং দুই পক্ষই মরিয়া হয়ে এটা দখল করার চেষ্টা করবে। তা সত্ত্বেও আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যদি বিমান ছিনতাইকারীরা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়, তখন আমি এখানে উপস্থিত না থাকলে কী হবে? সামরিক অভ্যুত্থানের চেয়ে বিমানে থাকা সব জিম্মিকে উদ্ধার করাটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গুলির আওয়াজের প্রচন্ডতা আরও বেড়ে গেল। টাওয়ারের ভেতরে থাকলে উড়ে আসা গুলিতে ভেঙে যাওয়া কাচের টুকরোর আঘাতে আহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া জিম্মিদের উদ্ধার না করে মারা যাওয়ার কোনো মানে হয় না। আমরা ঠিক করলাম, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের বাইরের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নেব। গুলি এড়ানোর জন্য ভবনের পেছনে গা লুকিয়ে বারান্দার মেঝেতে পুরোনো খবরের কাগজ বিছিয়ে তার ওপর বসে পড়লাম। মাথা রক্ষা করার জন্য হাত দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করলাম। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে মাঝেমধ্যে লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেট উড়ে যাচ্ছিল।

সকাল সাড়ে আটটার দিকে নিয়মিত বাহিনী বিদ্রোহীদের কোণঠাসা করে ফেলতে শুরু করে। বিমানবন্দরে নিয়মিত বাহিনীর আগমনের পর থেকে মূল ভবনের একতলা থেকে তাদের গতিবিধি লক্ষ করছিলেন পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মি. তেশিগাওয়ারা। তখনকার ঘটনাবলি তাঁর পরিষ্কার মনে আছে: ‘বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারের পাশে লোহার হেলমেট পরা সামরিক বাহিনীর সেনারা পজিশন নিয়েছে। যেসব বিদ্রোহী সৈন্য আত্মসমর্পণ করে মূল থেকে বেরিয়ে আসছে, সামরিক বাহিনীর সেনারা তাদের অস্ত্রমুক্ত করছে।

‘তবে লড়াই তখনো অব্যাহত ছিল। মূল ভবনকে মাঝখানে রেখে বিমানবন্দরের এক পাশে চলা লড়াই এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। তবে এরপর উলটো দিক থেকে গুলির আওয়াজ আবারও শোনা গিয়েছিল। সামরিক বাহিনী ধীরে ধীরে বিদ্রোহীদের পরাভূত করতে শুরু করে। একসময় মূল ভবনে তারা ঢুকে পড়ে। চাকাওয়ালা ভারি মেশিনগান আমাদের সামনে দিয়ে টেনে নিয়ে তারা ছুটে গিয়েছিল। বিদ্রোহী সেনারা ক্যানভাসের জুতা পরলেও নিয়মিত বাহিনীর সৈন্যদের পায়ে ছিল সামরিক জুতা। ভবনের ভেতর দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় তাদের জুতা কংক্রিটের মেঝেতে পড়লে খটখট আওয়াজ বেজে ওঠে।

‘মূল ভবনের ভেতর থেকে আবার কানফাটা গুলির আওয়াজ শোনা গেল। দুই পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় পুণরায় শুরু হয়ে গেছে। আমরা সবাই মেঝেতে শুয়ে পড়লাম। অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর কত ঘণ্টা সময় চলে গেছে বুঝতে পারছিলাম না। মনে হয় যেন বেশ কয়েক দিন ধরে এমনটা চলছে। তারা কথা দিয়েছিল বিদেশিদের ক্ষতি করবে না, কিন্তু যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেট চলে আসে, তখন কী হবে? গুলি বিনিময় দ্রুত শেষ হোক, প্রাণপণে সেই কামনা করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।

‘জাইকা ও জাপান এয়ারলাইনসের কর্মীরা এরপর একসময় সুখবর নিয়ে হাজির হলেন। সামরিক বাহিনীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানের ইতি টানা হয়েছে। বিমানবন্দরের ভবনে থাকা জাপানিরা সবাই অক্ষত অবস্থায় আছেন। একতলায় আমরা যারা ছিলাম, সবাই এক জায়গায় জড়ো হলাম।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মি. উয়েদা সেদিনের কথা স্মরণ করে বললেন: ‘সকাল ৮টা ২০ মিনিটের দিকে দেখলাম, টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের উত্তরের দিক দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা থেকে পথচারীরা হঠাৎ সরে যাচ্ছে। ক্যামোফ্ল্যাজ নকশার সামরিক পোশাক পরা স্থলবাহিনীর সৈন্যরা রাস্তায় জড়ো হয়ে সেখান থেকে বিমানবন্দরের দিকে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু করে। আমরা সবাই প্রাণ বাঁচাতে সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে শুরু পড়লাম। আমি তিনতলায় ছিলাম। সেখান থেকে দেখলাম আমাদের ঘরের ঠিক নিচে ভবনের দেয়ালে কয়েকজন বিদ্রোহী সৈন্যকে দাঁড় করিয়ে নিয়মিত বাহিনীর সেনারা একযোগে গুলি চালাল। আমি শিউরে উঠলাম। দৃশ্যটা ছিল সত্যিই ভয়াবহ।

‘সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আমাদের ঘরে এসে আমাদের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। আমরা সবাই বিদেশি জেনে তারা কোনো হিংসাত্মক আচরণ না করে সেখান থেকে চলে যায়।

‘৮টা ৪০ মিনিটের দিকে লক্ষ করলাম, নিয়মিত বাহিনী গোটা বিমানবন্দর এলাকায় তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এদিক-সেদিকে গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে আছে। বিশেষ প্রতিনিধিলের নেতা মি. ইশিইর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমাকে তিনতলা ও নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের মধ্যে আসা-যাওয়া করতে হয়েছিল। সেই আসা-যাওয়ার মধ্যে কয়েকটি মৃতদেহ দেখতে হয়েছিল। সবার মুখে সুন্দর গোঁফ, বাঙালিসুলভ সুদর্শন চেহারা। এই সামরিক অফিসারদের কেন এখানে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল, তা নিয়ে ভাবার মতো মানসিকতা তখন আমার ছিল না।

‘আমরা জাপানি প্রতিনিধিরা ছিনতাই করা বিমানে থেকে যাওয়া সব জিম্মিকে অক্ষত অবস্থায় করার জন্য ধৈর্যের সঙ্গে জঙ্গিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। অন্যদিকে নির্মম হত্যাযজ্ঞের বলি হয়ে এ দেশের সামরিক ব্যক্তিরা কারও নজরে না পড়ে এভাবে মাটিতে পড়ে রয়েছে! মানুষের জীবনের মূল্য কি কখনো এক হয় না? আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল। কোনো কিছু ঠিকমতো বিবেচনা করতে পারছিলাম না। মৃতদের মধ্যে এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদের সহযোগী গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার চৌধুরীও ছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করে জিম্মি উদ্ধারের আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তাঁকে কেন এভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে, আদৌ বুঝতে পারলাম না।’

‘আর কোনো চিন্তা করতে হবে না। আমরা আপনাদের রক্ষা করতে এসেছি’, কথাটা বললেন সামরিক বাহিনীর একজন অফিসার, যিনি কমবেশি ১০ জন সৈন্যের সমন্বয়ে একটি ইউনিটের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। অল্পবয়সী ও নিম্নপদস্থ অফিসার হলেও তাঁর মনোভাব দেখে বুঝতে বাকি রইল না যে তিনি এই ইউনিটের প্রধান। তিনি এগিয়ে এসে আমাকে স্যালুট করেন। তারপর আমার সঙ্গে করমর্দন করেন। বিদ্রোহীদের দমন করে নিয়মিত বাহিনী শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। অফিসার ও সেনা সবাই ক্যামোফ্লেজ নকশার সামরিক পোশাক পরিধান করছিল। সেনাদের হাতে ছিল বেশ বড় মেশিনগান। তারা মূল ভবনের ছাদের চার কোণায় ভারি মেশিনগান বসিয়েছে। মেশিনগানগুলোকে বিমানবন্দর ও ঢাকা শহরের দিকে মুখ করে রাখা হয়েছে। ছাদে প্রায় ১৫ জন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের চারপাশে স্থলবাহিনীর সশস্ত্র সৈন্যরা পজিশন নিয়েছে।

এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল স্থল ও বিমানবাহিনীর প্রায় ১০০ জন সেপাই। এতে বিমানবাহিনীর একজন অফিসারসহ ২১ জন অফিসার ও সেনা নিহত হন। বিদ্রোহী সেনা মিলে মোট ২০০ জনের বেশি এই ঘটনায় প্রাণ হারান বলে জানা গেছে।

এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ঠেকাতে না পারার অভিযোগে এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি প্রায় পদচ্যুত হতে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সহায়তায় তিনি তাঁর পদে বহাল থাকতে পারলেও সামরিক বাহিনীর মধ্যে তাঁর প্রভাব ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদের ভাগ্য নিয়ে এই অনিশ্চয়তার কারণে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার অবসানের পর বাংলাদেশকে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য বিশেষ দূত প্রেরণের ব্যাপারে জাপান সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

৬ই অক্টোবর রাতে জাপানের অন্যত প্রধান দৈনিক মাইনিচি শিম্বুন পত্রিকা টেলিফোনে এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে।
মাহমুদ: আমি ভালোই আছি। জাপানের জনগণ আমার ভাগ্য নিয়ে চিন্তিত ছিলেন জেনে খুশি হলাম। তাঁদের জন্য আমার শুভেচ্ছা রইল।

মাইনিচি শিম্বুন: সামরিক অভ্যুত্থানের কথা আপনি কখন জানতে পারলেন?
মাহমুদ: আমি প্রায় না ঘুমিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে দর-কষাকষি চালাচ্ছিলাম। ছিনতাই করা বিমানের যাত্রীসহ আমরা সবাই, এমনকি জঙ্গিরাও, চরম ক্লান্তির মধ্যে ছিলাম। আমার হাতে আর সময় ছিল না। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার সমাধান করার জন্য আমি প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি জঙ্গিদের কাছে সর্বশেষ দাবি জানিয়ে বললাম, ঢাকাতেই সব জিম্মিকে ছেড়ে দিতে হবে।

মাইনিচি শিম্বুন: তার মানে বিদ্রোহীরা যখন নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারে ঢুকে পড়েছিল, আপনি তখন সেখানেই ছিলেন?
মাহমুদ: না। আমি ছিনতাইকারীদের বললাম, আমার প্রস্তাব ভেবে দেখুন। এ জন্য আপনাদের ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হবে। এ কথা বলে আমি নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের নিচে আমার অফিসে গেলাম। সেখানে চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। কয়েক দিন ঘুমানোর সুযোগ হয়নি বলে ঘুম পাচ্ছিল। ঘুমের ঘোর আমাকে কাবু করতে যাচ্ছিল। এমন সময় আমাকে বিদ্রোহীদের হামলার মুখোমুখি হতে হলো। আমি সেখানে থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। সঠিকভাবে বললে আমার অধীনরাই আমাকে উদ্ধার করেছিলেন। আমি তাড়াহুড়ো করে বিমানবন্দর ত্যাগ করলাম। তার পরের ঘটনা...তার পরের ঘটনা সম্বন্ধে বলতে গেলে বেশি লম্বা সময়ের প্রয়োজন হবে। তাই এখন না-ই বা বললাম। তার চেয়ে বরং ছিনতাইকারীদের সঙ্গে আলোচনার কথাই বলি।

আলোচনা ছিল অত্যন্ত জটিল। আমি সবকিছুর আগে চেষ্টা করেছি আমার ওপর তারা যেন আস্থা না থাকলে আলোচনা কখনো এগোয় না। তারা কোনোক্রমেই আপসরফায় আসতে রাজি ছিল না। অন্যদিকে ঢাকায় সব জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য মি. ইশিইর কাছ থেকে প্রচন্ড চাপ আসছিল। জঙ্গি এবং জাপান সরকার উভয় পক্ষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে ভালোভাবে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলাম। সে জন্য আমার সহিষ্ণুতার দরকার ছিল। আমি নাজুক অবস্থান ছিলাম। সুতরাং, সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা আমার প্রয়োজন ছিল। এক পর্যায়ে আমি জঙ্গিদের প্রস্তাব করলাম, আমি ছিনতাই করা বিমানে গিয়ে তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলব। তবে তারা এতে রাজি হয়নি।