Friday, March 6, 2026

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাত কত দিন টেনে নিতে পারবে ইসরায়েল

আল জাজিরার বিশ্লেষণ: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বেশ জোর দিয়েই বলছে, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের সামরিক বাহিনীর রয়েছে। তবে ইসরায়েলের জন্য চিত্রটা ভিন্ন। গাজায় চলমান জাতিগত নিধন, লেবানন ও সিরিয়ায় যুদ্ধ বা আক্রমণ এবং ইরানের সঙ্গে আগে এক দফা সংঘাত—সব মিলিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী ইতিমধ্যেই ক্লান্ত। ফলে একটি দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে।

গত শনিবার ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েলকে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি, স্কুল বন্ধ এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সেনাকে তলব করতে হয়েছে।

হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো টানা হামলার মুখে পড়েছে। জরুরি পরিষেবা হিমশিম খাচ্ছে। যে মাত্রার যুদ্ধ ইসরায়েলি সরকার অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়, সেই মাত্রার যুদ্ধের সঙ্গে সে দেশের সাধারণ জনগণ অভ্যস্ত নয়। তাদের বোমা থেকে বাঁচতে বাংকার বা শেল্টারে আসা–যাওয়ার মধ্যেই সময় কাটছে।

আপাতত যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলি জনগণের উৎসাহ বেশি দেখা যাচ্ছে। বড় বড় শহরে ইসরায়েলিদের সঙ্গে কথা বললে দেখা যায়, তারা এমন এক শত্রুর মোকাবিলা করতে মরিয়া, যাদের সম্পর্কে তাদের কয়েক দশক ধরে বলা হয়েছে, তারা ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। কট্টর বামপন্থীরা ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই সরকারের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েলে সামরিক উন্মাদনার জোয়ার বয়ে গেছে।

ইসরায়েলের রাজনীতি নিয়ে খবর রাখা শির হেভার আরও বলেন, এবারের যুদ্ধ ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাতের মতো নয়। তখন মূলত ইসরায়েলিদের মনে আতঙ্ক ও অস্তিত্ব রক্ষার ভয় ছিল। তাঁদের ভয় ছিল, ইরান হয়তো ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেবে। এখন এই যুদ্ধ একরোখা সামরিক উন্মাদনা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।

শির হেভার বলেন, এমনকি যুদ্ধের গুটিকয় সমালোচকও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যুদ্ধটি ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিষয়টি যেন এমন, ইসরায়েল চাইলেই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, সেটা ঠিক করতে পারবে।’

যুদ্ধের প্রতি এই সমর্থনকে অনেকেই ইসরায়েলি সমাজের চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার অংশ হিসেবে দেখছেন। আগে যাঁরা প্রান্তিক পর্যায়ের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিবিদ ছিলেন, তাঁরা এখন সরকারের কেন্দ্রে চলে এসেছেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চাপে তরুণ ও মেধাবীরা দ্রুত দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

ইসরায়েলিদের যাঁরা দেশে রয়েছেন, তাঁরা আগে থেকেই ইরানকে তাঁদের দেশের প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। দিনের পর দিন যুদ্ধ চললেও এই সমাজ আরও বেশি সামরিকীকরণ বা যুদ্ধমুখী হয়ে উঠতে পারে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ওপর নাৎসি জার্মানির বিমান হামলার মতো। তখন ব্রিটিশরা সেই বোমাবর্ষণ মেনে নিয়েছিল। কারণ, তারা চরম অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে বলে মনে করত।

বার–তাল বলেন, ‘ইসরায়েলিদের অনুভূতিও এখন একই রকম। আমাদের প্রায় জন্ম থেকেই শেখানো হয়, ইরান অশুভ। কিন্ডারগার্টেন, হাইস্কুল ও সেনাবাহিনী—সব জায়গাতেই এ ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়।’

বার-তালের মতে, কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে ইসরায়েলি সমাজ কোন দিকে মোড় নেবে, তা আন্দাজ করা কঠিন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ (বিপর্যয়) বা সাম্প্রতিক গাজায় জাতিগত নিধনের সময়ও দেশটির শাসকগোষ্ঠীর নৃশংসতা মানুষের মনে আঁচড় ফেলতে পারেনি।

বার–তাল বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন এমন এক প্রজন্ম আছে, যারা আগের চেয়ে বেশি যুদ্ধবাজ ও ডানপন্থী। নেতানিয়াহু আমাদের বলছেন, আমাদের এখন তলোয়ারের ওপর ভর করেই বাঁচতে হবে। এটি প্রমাণ করে, টিকে থাকার জন্য ইসরায়েলের শত্রুর প্রয়োজন।’

বোমা ও বন্দুক

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সামাজিক প্রভাবের বাইরেও ইসরায়েলকে সামরিক হিসাব-নিকাশ মাথায় রাখতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে, ইরানের মতো বিশাল আয়তন ও সামরিক শক্তিধর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইসরায়েল বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ কত দিন চালিয়ে নিতে পারবে, তা ঠিক করে নিতে হবে।

প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক হামজে আত্তার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো মিত্রদের সমর্থনের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। ইরানের ভান্ডার ফুরানোর আগেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিঃশেষ হয়ে যায় কি না, তার ওপর।

হামজে আত্তার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ইসরায়েলের দিকে ২০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য বলা যায়, এর আগে ১২ দিনের সংঘাতে ইরান প্রায় ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। প্রতিবারই একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ইসরায়েলকে একটি ইন্টারসেপ্টর রকেট ছুড়তে হয়েছে। এটি সম্ভবত ইসরায়েলের একার পক্ষে সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া তারা হয়তো এত দিনে তাদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।’

ইসরায়েলের আলাদা তিনটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে—স্বল্পপাল্লার রকেট ঠেকাতে ‘আয়রন ডোম’, মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ‘অ্যারো-২’ ও ‘অ্যারো-৩’।

ইসরায়েলের ভান্ডারে কত ইন্টারসেপ্টর রকেট আছে, সেটা তারা গোপন রাখে। তবে ১২ দিনের সংঘাতের সময় তাদের মজুত কমে আসছিল। এতে বোঝা যায়, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উচ্চ মাত্রার প্রতিরক্ষা বজায় রাখা কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারে তাদের কৃচ্ছ্রসাধন করতে হতে পারে। তখন শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার দিকে নজর দিতে হতে পারে। এতে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

আত্তার বলছেন, ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্রমতে, জুনে সংঘাতের পর থেকে ইরান প্রতি মাসে ১০০টি করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর অর্থ, তেহরান ইতিমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের বড় মজুত গড়ে তুলেছে।

তবে আত্তার মনে করিয়ে দেন, ইরানের হুমকি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার ওপর নয়; বরং তাদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের ধরনের ওপরও নির্ভর করছে।

আত্তার ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ইরানের দীর্ঘপাল্লার (যা গ্রিস ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে), মাঝারি পাল্লার (যার নিশানা ইসরায়েল পর্যন্ত) এবং স্বল্পপাল্লার (যার নিশানা হতে পারে উপসাগরীয় দেশ) রয়েছে।

হামজে আত্তার আরও যোগ করেন, ‘আমরা জানি না, ১২ দিনের সংঘাতের আগে ইরানের কাছে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, কতগুলো ধ্বংস হয়েছে বা তাদের কাছে কতগুলো লঞ্চার (ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যন্ত্র) আছে। যদি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যন্ত্র না থাকে, তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র যা–ই থাকুক, তা কোনো কাজে আসবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যন্ত্রকে নিশানা করে হামলা চালাচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিবেচনা

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় চলা নির্বিচার হামলা ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। গোলাবারুদের খরচ এবং কয়েক লাখ রিজার্ভ সৈন্যকে দীর্ঘ সময় মোতায়েন রাখা ইসরায়েলি রাজকোষের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পনাকারীরা শুরুতে এমন পরিস্থিতির কথা ভাবেননি।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে লেবানন ও গাজায় নির্বিচার হামলায় ইসরায়েলের ব্যয় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। এই ব্যয় দেশটিকে কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাজেটঘাটতির মুখে ফেলেছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে ব্যয় ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে ঠেকেছে।

অর্থনীতির ওপর এই চাপের কারণে ২০২৪ সালে বিশ্বের তিনটি প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে।

শির হেভার বলেন, ইসরায়েল এখন ঋণসংকট, জ্বালানিসংকট, পরিবহনসংকট এবং স্বাস্থ্যসেবাসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এগুলোর কোনোটিই একা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ, এটি অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, এটি প্রযুক্তির প্রশ্ন।

শির হেভার আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে, যা নিজেই লোড হতে পারে, নিজেই লক্ষ্য স্থির করতে পারে এবং দূর থেকে হামলা চালাতে পারে, তাহলে আমি মনে করি না, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ইসরায়েলের এই আগ্রাসন থামানোর জন্য যথেষ্ট হবে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-02%2Frvlpbre0%2FSaudi3.jpg?rect=0%2C0%2C773%2C515&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা পর কালো ধোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি। ছবি: রয়টার্স

শুল্ক বাতিল: আদালত কি ট্রাম্প ও তাঁর দলকে বাঁচিয়ে দিলেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গত শুক্রবার সম্ভবত তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রেসিডেন্টের নিয়োগ দেওয়া দুজনসহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা তাঁর বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আদালতের এ রায় ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিছু রিপাবলিকান প্রকাশ্যেই এই রায়ের প্রশংসা করছেন। পর্দার আড়ালে আরও অনেকেই এতে খুশি হয়েছেন।

আদালতের সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পের এজেন্ডার জন্য বড় ধাক্কা হলেও এটি তাঁর হাত থেকে এমন কিছু হাতিয়ার কেড়ে নিয়েছে, যা দেশের জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই সঙ্গে ট্রাম্পের দলের জন্যও তা স্পষ্ট রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হচ্ছিল।

শুল্ক নিয়ে এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প দ্রুতই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি ভিন্ন একটি ক্ষমতার অধীনে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছেন। এমনকি শুক্রবার তিনি দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে তাঁর ক্ষমতা আরও ‘শক্তিশালী’ হয়েছে; কিন্তু বিষয়টি আসলে সত্য নয়। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।

সংবিধানে কংগ্রেসকে দেওয়া ক্ষমতাগুলো যখন ট্রাম্প নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তখনো রিপাবলিকানরা তাঁকে তা করতে দিয়ে খুশিই ছিলেন। তবে আদালতের রায়ের ধাক্কাটি রিপাবলিকান শিবিরে একটি আত্মোপলব্ধির জন্ম দিতে পারে। তারা ট্রাম্পের বাণিজ্যিক চালগুলো আর মেনে নেবে কি না, সে প্রশ্ন উঠতে পারে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার আগে ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ২০১৬ সালের পর ২০২৫ সালটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন খারাপ বছরে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরটি গত কয়েক দশকের মধ্যে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও অন্যতম দুর্বল বছর ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি। সহজ কথায়, পুঁজিবাজারের হিসাব বাদ দিলে মার্কিন অর্থনীতি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।

এই স্থবিরতার পেছনে সুনির্দিষ্টভাবে শুল্কের দায় কতটুকু, তা পরিষ্কার নয়। তবে শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং এর ফলে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত খরচ স্পষ্টতই অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যে অর্থনীতি আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল। এই শুল্ক আমেরিকানদের কাছে অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য ট্রাম্পকে সরাসরি অভিযুক্ত করার একটি সুযোগ করে দিয়েছে।

ট্রাম্পকে মূল্য দিতে হচ্ছে

ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের শুল্ক নিয়ে বাড়াবাড়ির মূল্য তাঁদের দিতেও হয়েছে। গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প বৈশ্বিক শুল্কের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে নেট সিলভারের গড় সমীক্ষায় অর্থনীতিতে তাঁর জনপ্রিয়তার রেটিং ‘প্লাস-৬’ থেকে ‘মাইনাস-১২’-তে নেমে এসেছে। গত মাসে সিএনএনের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ আমেরিকান শুল্কনীতিতে ট্রাম্পের ওপর অসন্তুষ্ট, বিপরীতে সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩৭ শতাংশ। এমনকি রিপাবলিকানপন্থী ভোটারদেরও ২৫ শতাংশ এটি পছন্দ করেননি।

রিপাবলিকানদের দিকে চোখ

যেসব রিপাবলিকান সমর্থক শুল্কনীতি নিয়ে সন্দিহান হওয়া সত্ত্বেও এত দিন চুপ ছিলেন এবং এখন এই অধ্যায়ের ইতি টানতে চান, তাঁদের দিকে এখন চোখ থাকবে। এক বছর ধরে অনেক রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিষয়টি অনেকটা ‘নাক ও মুখ বুজে’ সহ্য করেছেন। কারণ, এই শুল্কনীতি রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মুক্ত বাণিজ্যের আদর্শের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ছিল।

কিন্তু ট্রাম্পের এই ‘একলা চলো’ নীতির জন্য আদালতের রায়টি একটি বড় ধাক্কা, যা তাঁর অন্যান্য প্রচেষ্টাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিচারপতি নিল গোরসাচ তাঁর সহমত পোষণকারী বক্তব্যে অনেকটা অনুরোধের সুরেই কংগ্রেসকে বলেন, যেন তাঁরা এই বিষয়গুলো এখন থেকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা শুরু করেন।

এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই শুল্কনীতির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রথম দফার শুল্ক বাতিল করার আগেই ট্রাম্পের এই এজেন্ডার প্রতি অনেকের ধৈর্যচ্যুতির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। এই রিপাবলিকানদের কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, তাঁরা ট্রাম্পকে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সময় এসেছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

প্রকৃতপক্ষে শুক্রবার ট্রাম্পের মতো খুব কম রিপাবলিকানকেই আদালতের সমালোচনা করতে দেখা গেছে। এর মানে এই নয় যে তাঁরা হঠাৎ করেই এ ইস্যুতে দলবদ্ধভাবে ট্রাম্পের সঙ্গ ত্যাগ করবেন। আর ট্রাম্পও সুপ্রিম কোর্ট বা নিজের দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন—এমনটা দেখাতে চাইবেন না। তবে ট্রাম্প যদি বড় আকারে শুল্ক আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যান, তবে তিনি সম্ভবত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করবেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবার ইরানি যুদ্ধজাহাজ তাক করে টর্পেডো ছুড়ল যুক্তরাষ্ট্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে কোনো যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হলো। শ্রীলঙ্কার কাছে ভারত মহাসাগরে গত বুধবার মার্কিন হামলায় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ তলিয়ে গেছে।

পেন্টাগন এখন পর্যন্ত হামলাকারী সাবমেরিনটির নাম প্রকাশ করেনি। ওই দিন সকালে প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় ইরানের যুদ্ধজাহাজটির পেছনের অংশে একটি টর্পেডো আঘাত হানছে এবং বিশাল জলরাশি আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। হামলায় যুদ্ধজাহাজটির মূল কাঠামো দ্বিখণ্ডিত হতে দেখা যায়।

পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ ঘটনাকে ‘নীরব মৃত্যু’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বিষয়টিকে পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন, টর্পেডোটি ‘তাৎক্ষণিক প্রভাব’ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা ৩২ জন ইরানি নাবিককে উদ্ধার করেছেন। জাহাজটিতে ১৮০ জন ক্রু ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউএস নেভি হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ কমান্ডের তথ্যমতে, সর্বশেষ ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট মার্কিন সাবমেরিন ‘ইউএসএস টর্স্ক’ থেকে শত্রুপক্ষের জাহাজে টর্পেডো ছোড়া হয়েছিল। তখন জাপানের একটি ৭৫০ টনের জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল সেটি।

এরপর থেকে স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মার্কিন সাবমেরিনগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং সংবেদনশীল গোয়েন্দা মিশনে নিয়োজিত থাকলেও কোনো জাহাজ ডোবানোর কাজে টর্পেডো ব্যবহার করেনি। তবে ১৯৯১ সালের ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং গত জুনে ইরানের ইস্পাহানে পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলায় সাবমেরিন থেকে নিয়মিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বা টমাহক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে।

জেনারেল কেইন জানান, ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডোবাতে ‘মার্ক-৪৮’ হেভিওয়েট টর্পেডো ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই টর্পেডোটি সময়ের সঙ্গে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রায় ৩,৮০০ পাউন্ড ওজনের এই টর্পেডো সোনার ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে এবং জাহাজের নিচে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণে সৃষ্ট গ্যাসের বুদ্বুদ জাহাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, ফলে জাহাজটি দ্রুত দুই টুকরো হয়ে ডুবে যায়।

প্রতিরক্ষা দপ্তরের শেয়ার করা একটি ছবিতে দেখা যায়, পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে যুদ্ধজাহাজটির সামনের অংশটি খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে আছে।

টর্পেডো
টর্পেডো। প্রতীকী ছবি

চট্টগ্রামের নামী বেকারি-রেস্তোরাঁয় কী খাচ্ছে মানুষ by ফাহিম আল সামাদ

প্রকাশ ০৬ মার্চ ২০২৬ঃ বেকারির সামনে ফুটপাতের ওপর টেবিলে সাজিয়ে রাখা নানা পদের ইফতারি। মুখরোচক সব খাবার কিনতে ব্যস্ত ক্রেতারা। তবে বেকারির ভেতরের যেতেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বেকারির রান্নাঘরের দেয়ালজুড়ে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। এর পাশেই তৈরি করা হচ্ছিল মুখরোচক এসব ইফতারি। স্যাঁতসেঁতে রান্নাঘরে খাদ্য তৈরিতে নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই।

গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় হারুন বেকারিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখতে পান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোট একটা বেকারি; দেখলে মনে হয় তেলাপোকার ফ্যাক্টরি। আমরা রান্নাঘরে ঢুকেই রীতিমতো অবাক হয়েছি। দেয়ালজুড়ে তেলাপোকার বিচরণ। রান্নাঘরে সেগুলো ঘোরাঘুরি করছিল।’

শুধু হারুন বেকারি নয়, গত ১০ দিনে চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৫টি খাদ্য তৈরি বেকারি ও রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেয়েছেন নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বারকোড সুইটস, মেরিডিয়ান রেস্তোরাঁর মতো নামী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তেলাপোকা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও জীবাণু বহন করে, যা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, আমাশয়, ফুড পয়জনিংসহ নানা রোগের কারণ হতে পারে।

যেখানে যা দেখলেন কর্মকর্তারা

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নগরের চকবাজার এলাকায় নামী রেস্তোরাঁ কাচ্চি ডাইনে পরিদর্শনে যান জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসন। প্রতিষ্ঠানটির রান্নাঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে তেলাপোকা ও ইঁদুরের বিচরণ। ১ মার্চ মুরাদপুর এলাকায় বারকোড সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারির রান্নাঘরে গিয়েও তাঁরা তেলাপোকা-ছারপোকার বিচরণ ও বিড়ালের উপস্থিতি দেখতে পান।

গত বুধবার কালুরঘাট এলাকার বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড ও গতকাল বৃহস্পতিবার গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং এলাকায় হোম রেসিপি ফুড বেকারি গিয়েও তেলাপোকা পাওয়া গেছে রান্নাঘরে। চারটি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরই স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন বলে জানিয়েছেন নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানকে আগে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও সতর্ক করলেও আবার একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায় বলে কর্মকর্তার জানিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান জরিমানা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহার

নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার করা হচ্ছে অবাধে। খাদ্যপণ্যে ব্যবহারযোগ্য নয়—এমন রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে ইফতারের খাদ্যপণ্য তৈরিতে। জিলাপি তৈরিতে দেদার ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোজ বা সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড।

গতকাল বৃহস্পতিবার নগরের চকবাজার এলাকায় সাতকানিয়া ভাতঘর নামের প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। এ সময় সেখানে জিলাপি তৈরিতে হাইড্রোজের ব্যবহার করতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত মাত্রায় এর সংস্পর্শে এলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক সময় মেধাশক্তি দুর্বলও করে দেয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, হাইড্রোজ যে ড্রামে আনা হয়, এর ওপরেই লেখা আছে, এটি ব্যবহারের সময় খাওয়া বা পান করা যাবে না। কারণ, এটি বাতাসের ক্ষতিকর কণা ছড়ায়। এটি ব্যবহার করা হয় পোশাক খাতে। আর সেটি ব্যবহার হচ্ছে খাবার তৈরিতে। গোপালজল, কেওড়াজলও খাবারে ব্যবহার নিষিদ্ধ, তবু ব্যবহার করা হচ্ছে।

এসব প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়ার মতো শাস্তি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জরিমানা করে এসব প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়ার কারণে তারা একই ভুল আবার করে। যেহেতু সিলগালা করে দেওয়ার বিধান আছে, তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠিন শাস্তি দিলে বাকিরা সতর্ক থাকবে।

নগরের জিইসি মোড়ের হারুন বেকারিতে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। গতকাল তোলা
নগরের জিইসি মোড়ের হারুন বেকারিতে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। গতকাল তোলাছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনের হামলায় ডুবে যাওয়ার আগে ভারতে মহড়ায় অংশ নিয়েছিল ইরানের যুদ্ধজাহাজ

শ্রীলঙ্কার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনের আঘাতে ডুবে যাওয়া ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ভারতে আয়োজিত নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছিল বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। সেটি ইরানে ফেরার সময় ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশের পর হামলার শিকার হয়।

যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার এ ঘটনা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিধি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ ঘটনায় ভারতেও ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে, বিশেষ করে যেখানে ভারত মহাসাগরে নয়াদিল্লির শক্তিশালী নৌ উপস্থিতি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জলসীমায় বুধবার ডুবে যাওয়া ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দিনা’ থেকে ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী। এ ছাড়া ওই জাহাজ থেকে ৩২ জন ইরানি নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছুড়ে কোনো যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনা বিরল।
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের যুদ্ধজাহাজটি থেকে একটি বিপৎসংকেত পেয়েছিল। তবে তারা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, সেখানে জাহাজের কোনো চিহ্ন ছিল না। সমুদ্রের পানিতে কেবল তেলের আস্তরণ ও ভাসমান নাবিকদের দেখতে পায় তারা। উদ্ধার হওয়া নাবিকদের শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের গলে শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, এ জাহাজডুবির ঘটনা দেখিয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে তাঁদের সামরিক অভিযান এখন দেশটির সীমান্তের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি আইআরআইএস দিনাকে একটি ‘মূল্যবান শিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নৌবাহিনীকে পুরোপুরি নির্মূল করাই এ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে ইরানের জাহাজটিতে টর্পেডো হামলার মুহূর্তটি দেখা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পানির নিচে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ হয়। এতে জাহাজটি ভেঙে যায়। এ সময় বিশাল জলরাশি ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন নৌবাহিনীর এ পদক্ষেপকে ‘সমুদ্রে একটি নৃশংসতা’ আখ্যা দিয়েছেন। এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেছেন, এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অচিরেই ‘চরম অনুশোচনা’ করতে হবে। জাহাজটিতে ইরানের প্রায় ১৩০ জন নাবিক ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ভারতীয় নৌবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আক্রান্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ভারতের বিশাখাপত্তম বন্দরে গত ১৫ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ’ ও বহুজাতিক নৌ মহড়া ‘এমআইএলএএন ২০২৬’-এ অংশ নিয়েছিল। ভারতীয় নৌবাহিনী আয়োজিত এ আয়োজনে ৭৪টি দেশ যোগ দিয়েছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এক্সে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। সেখানে মহড়া চলার সময় ইরানি যুদ্ধজাহাজটিকে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় দেখা যায়। অন্য একটি ছবিতে জাহাজের ডেকের ওপর ইরানের জাতীয় পতাকাকে পেছনে রেখে বেশ কয়েকজন নাবিককে ছবি তোলার জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এ যুদ্ধজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘অতিথি’ হিসেবে দেশটিতে অবস্থান করছিল। তবে এ জাহাজে হামলার বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

জাহাজডুবি নিয়ে ভারতে নানা প্রশ্ন

ভারত মহাসাগরকে দীর্ঘকাল ধরে নিজের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে নয়াদিল্লি। বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান সমুদ্রপথগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারতীয় নৌবাহিনী নিয়মিত টহল এবং বহুজাতিক মহড়া পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার ক্ষেত্রে ভারত ঐতিহাসিকভাবেই একটি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে।

এ ঘটনার বিষয়ে সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের বিরোধীদলীয় নেতারা। তাঁদের মতে, ভারতের সামুদ্রিক অঞ্চলের এত কাছাকাছি একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া জরুরি ছিল।

ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের ‘নীরবতার’ তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বিষয়টিকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বক্তব্যের দাবি জানিয়েছে।

ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘাত আমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কিছুই বলছেন না।’

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার জন্য ভারত রাজনৈতিক বা সামরিক—কোনোভাবেই দায়ী নয়। তিনি আরও বলেন, ভারতের কাছে যেসব বিষয় সংবেদনশীল, সেগুলোকে উপেক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের আমন্ত্রণেই জাহাজটি এ জলসীমায় অবস্থান করছিল।

মাঝসমুদ্রে ইরানি যুদ্ধজাহাজে বিস্ফোরণ। গত বুধবার ভারত মহাসাগরে
মাঝসমুদ্রে ইরানি যুদ্ধজাহাজে বিস্ফোরণ। গত বুধবার ভারত মহাসাগরে। ছবি: রয়টার্স

ভারত মহাসাগরের ‘অভিভাবক’ মোদির অতিথি ইরানি জাহাজকে ডুবিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী বার্তা দিল

গত অক্টোবরের শেষ দিকের কথা। নৌবাহিনীর নীল ইউনিফর্ম আর চোখে রোদচশমা লাগিয়ে ভারতীয় নৌসেনাদের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি সেদিন বলেছিলেন, এই মহাসাগর দিয়ে বিশ্বের বিশাল পরিমাণ বাণিজ্য ও জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়।

উপস্থিত অতিথি ও শ্রোতাদের ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানের মধ্যে মোদি গর্বের সঙ্গে সেদিন ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভারতীয় নৌবাহিনী হলো ভারত মহাসাগরের অভিভাবক।’

মোদির সেই ঘোষণার পাঁচ মাস পার হতে না হতেই দেখা গেল, ভারত মহাসাগরের সেই ‘অভিভাবক’ নিজের এক অতিথিকেই রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

গত বুধবার ভারতের আমন্ত্রণে নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়ে দেশে ফিরছিল ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চল থেকে মাত্র ৪৪ নটিক্যাল মাইল (৮১ কিলোমিটার) দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় জাহাজটি তলিয়ে যায়।

এই মহড়া চলাকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু নিজে যুদ্ধজাহাজটির নাবিকদের সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন। অথচ জাহাজটি আক্রান্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক দিনের বেশি সময় লেগেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও সম্প্রসারিত করতে প্রস্তুত। এই হামলা তারই প্রমাণ।

গত বুধবার পেন্টাগনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানি যুদ্ধজাহাজটিকে ডুবিয়ে দিয়েছে। তারা হয়তো ভেবেছিল, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তারা হয়তো নিরাপদ থাকবে।’

নিজ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নিজেদের যুদ্ধজাহাজের ওপর এমন অতর্কিত হামলায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে তেহরান। ইরান বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘আইআরআইএস ডেনা’ ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর আমন্ত্রিত ‘অতিথি’। নয়াদিল্লির ডাকে মহড়া শেষ করে ফেরার পথেই যুদ্ধজাহাজটি আক্রান্ত হয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘ইরানের উপকূল থেকে ২ হাজার মাইল (৩,২১৮ কিলোমিটার) দূরে সমুদ্রের বুকে ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য তাদের একদিন পস্তাতে হবে। আমার কথা মিলিয়ে নেবেন।’

আইআরআইএস ডেনা এখন ভারত মহাসাগরের নিচে। যুদ্ধজাহাজে থাকা ৮০ জনের বেশি ইরানি নাবিক নিহত হয়েছেন। তাঁরা ওই যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছিলেন এবং ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেলফিও তুলেছিলেন।

ভারতের অবসরপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, শুধু যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং ভারত মহাসাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী হিসেবে ভারতের যে ভাবমূর্তি ছিল, তা–ও তলিয়ে গেছে। ডেনার ওপর এই অতর্কিত হামলা ভারতের নিজস্ব আঙিনায় তার শক্তি ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকেই যেন নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে।

ভারতের দোরগোড়ায় যুদ্ধ

নৌ-মহড়া ‘মিলন’ শেষে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিশাখাপত্তনম ত্যাগ করে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডেনা। ৪ মার্চ ভোরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশের পরপরই এটি ভয়াবহ হামলার শিকার হয়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী এখন পর্যন্ত ৩২ জন নাবিককে জীবিত ও ৮০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। শতাধিক নাবিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

বিশাখাপত্তনমের সেই মহড়ায় অংশ নিয়েছিলেন ভারতের সাবেক নৌ-কর্মকর্তা ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি সেই নাবিকদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, তাঁদের খুব ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আসা সেই নাবিকদের কুচকাওয়াজটি ছিল সত্যিই দেখার মতো।’

শেখর সিনহা বলেন, ‘একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া সব সময়ই অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে আবেগের কোনো স্থান নেই। আসলে যুদ্ধে নৈতিকতা বলে কিছু থাকে না।’

দীর্ঘ চার দশক ভারতীয় নৌবাহিনীতে কাজ করা এই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, ‘ভারত মহাসাগরকে আগে নিরাপদ অঞ্চল মনে করা হতো। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি, পরিস্থিতি বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের এই যুদ্ধ এখন ভারতের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। ভারত মহাসাগরে আমরা এতকাল যে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করতাম, তা স্পষ্টতই সংকুচিত হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য অবশ্যই চরম উদ্বেগের।’

ভারতের উভয়সংকট

যুদ্ধজাহাজটি আক্রান্ত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতীয় নৌবাহিনী একটি বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, বিপদসংকেত পাওয়ার পর তারা সাহায্যের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে শ্রীলঙ্কা উদ্ধারকাজ শুরু করে দেয়।

নয়াদিল্লি বা তাদের নৌবাহিনী—কেউ–ই যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ন্যূনতম সমালোচনাও করেনি। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক বিশ্লেষকেরা বড় একটি প্রশ্ন তুলছেন, ভারত কি এই হামলার বিষয়ে আগে থেকে জানত, নাকি তারা পুরোপুরি অন্ধকারে ছিল?

সাবেক নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ভারত যদি এই হামলার বিষয়ে আগে থেকে না জানে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির তথাকথিত কৌশলগত অংশীদারত্বের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আর ভারত যদি সব জেনে থাকে, তবে ধরে নিতে হবে—তারা কৌশলে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছে।’

অবসরপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা ও নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ’-এর পরিচালক সি উদয় ভাস্কর এই ঘটনাকে ভারতের জন্য একটি ‘কৌশলগত অস্বস্তি’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সরকারের এই রহস্যময় নীরবতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের নৈতিক অবস্থানকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

‘আগ্রাসীদের পক্ষে ভারত’

দীর্ঘদিন ভারত ‘জোট নিরপেক্ষ’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও বর্তমান সরকারের অধীন দিল্লি স্পষ্টতই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকেছে। ইরানে হামলার ঠিক দুদিন আগে মোদি ইসরায়েল সফর করেন ও নেতানিয়াহুকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন।

অথচ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক শোক পর্যন্ত জানায়নি। যেখানে শোকবইয়ে সই করতে মন্ত্রী পর্যায়ের কেউ যাওয়ার কথা, সেখানে পাঠানো হয়েছে পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিকে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক শ্রীনাথ রাঘবনের মতে, ভারত এখন পরোক্ষভাবে আগ্রাসীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভারত কেবল ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করছে, কিন্তু এর পেছনের কারণগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, মোদি সরকার চরম অবিবেচকের মতো ‘ভারতের কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থকে’ বিসর্জন দিয়েছে। সরকারের এই নীরবতা ‘ভারতের মূল জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করছে এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পররাষ্ট্রনীতিকে ধ্বংস করছে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-05%2Fb0n1zhu1%2Firan-fridget.avif?rect=56%2C0%2C848%2C565&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গত বুধবার ভারত মহাসাগরে ইরানের যুদ্ধজাহাজে সাবমেরিন থেকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: রয়টার্স

কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কার্যক্রম স্থগিত

কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর।

এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন কর্মী হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে প্রবাসে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে পররাষ্ট্র দপ্তর।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘নিরাপদে সম্ভব হলে কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকেরা বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো উপায়ে দ্রুত দেশ (কুয়েত) ত্যাগ করুন। যারা দেশ (কুয়েত) ত্যাগ করতে পারছেন না, তাদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

সূত্র: বিবিসি

কুয়েতের বয়ান এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের আশপাশে হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে। রয়টার্সের সংগ্রহ করা ভিডিও থেকে নেওয়া স্থিরচিত্র। ২ মার্চ, ২০২৬
কুয়েতের বয়ান এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের আশপাশে হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে। রয়টার্সের সংগ্রহ করা ভিডিও থেকে নেওয়া স্থিরচিত্র। ২ মার্চ, ২০২৬