Saturday, May 30, 2015

‘মানবপাচার করে গণহত্যা একুশ শতকের ভয়াবহতম অপরাধ’

জাতীয় প্রেসক্লাবে মানব পাচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
এতে পাচারের শিকার বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং
পাচারকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়। ছবি: প্রথম আলো
মানব পাচারের প্রতিবাদে আজ রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের
সামনে ১৯টি বেসরকারি সংস্থা মানববন্ধন করে। ছবি: প্রথম আলো
সমুদ্রপথে মানবপাচার এবং পাচারের শিকার মানুষদের গণহারে হত্যা করাকে একবিংশ শতাব্দীর ভয়াবহতম অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে দেশের ১৯টি বেসরকারি সংস্থার নেতারা। তাঁরা পাচারের শিকার বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পাচারকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তিরও দাবি জানান। আজ শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। পাচারের শিকার দুই ব্যক্তি এবং আরও দুজনের স্বজনও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি ওয়াজেদ আলী খান বলেন, পাচারের শিকার লোকজনকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করতে হবে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে অভিবাসনবিষয়ক বেসরকারি সংস্থাগুলোর জোট কারাম এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়ক হারুন আল রশিদ বলেন, ‘এই আধুনিক যুগে এভাবে মানবপাচার এবং হত্যা ভয়াবহতম অপরাধ। সারা বিশ্ব আজ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। থাইল্যান্ড পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করছে। যারা পালিয়ে আছে তাদের বলেছে আত্মসমর্পণ করতে, নয়তো তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশ পাচারকারীদের বেশির ভাগকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আর প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বললেন পাচারের শিকার লোকজনেরও বিচার হবে, সেটিও মানবিক নয়। কারণ সমুদ্রপথে যাঁরা পাচারের শিকার তাঁদের প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা অপহরণ করা হয়েছে।’
বেসরকারি সংস্থা ওয়্যারবী ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, ‘একসময় সরকার বিদেশে গিয়ে এক-দুই বিলিয়ন ঋণ চাইত। কিন্তু আজ প্রবাসীরা প্রতি মাসেই বিলিয়ন ডলার পাঠাচ্ছে। কিন্তু তাঁদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না।’
সংবাদ সম্মেলনে পাচারের শিকার ধীরাজ কুমার বিশ্বাস ও আবদুর রহমান ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, চোখের সামনে মানুষকে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। আর যাঁরা বেঁচে তীরে পৌঁছে তাঁরাও বেঁচে থাকে নিষ্ঠুর যন্ত্রণায়।
বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান লিলি জাহান বলেন, ‘আমাদের সবার পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অওয়াজ তোলা উচিত। আর এ ক্ষেত্রে যাঁদের ব্যর্থতা আছে তাঁদেরও জবাবদিহি করতে হবে।’
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) নির্বাহী পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, হাজার হাজার মানুষকে যখন সাগরপথ দিয়ে নেওয়া হচ্ছিল তখন দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোথায় ছিল?
সংবাদ সম্মেলনের আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ‘সাগরে ভাসছে মানবতা’, ‘মানবপাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, ‘মানবপাচার করে যারা, সমাজের শত্রু তারা’ প্রভৃতি লেখা স্লোগান প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আওয়াজ ফাউন্ডেশন, বমসা, বিসিডব্লিউএস, বিলস, বিএলএফ, বিজিআইডব্লিউএফ, বোয়েফ, বিগফ, বিডব্লিউডব্লিউআইসি, আহছানিয়া মিশন, ইনাফি বাংলাদেশ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ন্যাশনাল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, ওকাপ, সলিডারিটি সেন্টার, ওয়্যারবি ও রামরু যৌথভাবে এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

এই চেহারায় ছাত্রলীগকে দেখতে চাই না: ওবায়দুল কাদের

ওবায়দুল কাদের
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এই চেহারায় ছাত্রলীগকে দেখতে চাই না। এটা শেখ হাসিনার ডিজিটাল ছাত্রলীগের চেহারা না। এই ছবি-চেহারা পরিবর্তন করতে হবে।’
আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন। ওবায়দুল কাদেরের বক্তৃতার সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পদপ্রত্যাশী অনেক নেতার নামে স্লোগান দিচ্ছিলেন। মঞ্চ থেকে বারবার স্লোগান বন্ধ করার কথা বললেও তাঁরা থামছিলেন না। পরে ওবায়দুল কাদের এ মন্তব্য করেন।
ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ করে বলেন, রাজনীতি করতে চাইলে রাজনীতির কিছু নিয়ম-নীতি আছে। দল করতে হলে দলের কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। বড় নেতা হতে হলে ছোট নেতা থেকেই শৃঙ্খলার শিক্ষা নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি শেখার জন্য কিছু দরকার নেই, শুধু বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়। এই আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধুর শৈশব থেকে বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত যে বিবর্তন তা পড়ে নিজের জীবনকে সুন্দর করো। রাজনীতিকে শেখার জন্য যদি আমাদের জীবিত কারও প্রয়োজন হয়; তিনি স্বয়ং আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর কাছ থেকে আমরা রাজনীতির শিক্ষা নেব।’
ওবায়দুল কাদের বলেন, পোস্টারে-ছবিতে এখন অনেক নেতা। বিলবোর্ডে নেতার কোনো শেষ নেই। সিকি-আধুলি নেতা। অসংখ্য নেতা এখন। তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে নয়াদিল্লি থেকে আগ্রা পর্যন্ত রাস্তার কোথাও কারও, কোনো রাজনৈতিক নেতার ছবি সংবলিত একটা বিলবোর্ডও দেখিনি। একটা পোস্টার, একটা ব্যানার দেখিনি।’ পড়াশোনা ছাড়া, মেধা ছাড়া ছাত্রনেতার কোনো প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বিলবোর্ড অপসারণে নেতা-কর্মীদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি অপ্রয়োজনীয় বিলবোর্ড অপসারণের। এই বিষয়ে সহযোগিতা চাইছি। ঢাকার দুই মেয়র ও আমি সড়ক মন্ত্রী আপনাদের সহযোগিতা চাইছি। এই বিলবোর্ডের জন্য আমরা আকাশ, আকাশের চাঁদ দেখি না। এই বিলবোর্ড থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। সৌজন্য ব্যানার-পোস্টার সবই আছে, শুধু সৌজন্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। কাজেই রাজনীতিতে ছাত্রলীগ সৌজন্যবোধ ফিরিয়ে আনবে সেটাই আমি প্রত্যাশা করব।’
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বৃহত্তর ঐক্যের জন্য আমরা যে কারও সঙ্গে বসতে রাজি আছি, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ন রেখে। পেট্রলবোমা, ককটেল সন্ত্রাসের মধ্যে গোটা জাতি যখন পুড়ে মরছে তখন সীমান্তচুক্তির কূটনীতি চলছিল। তখন কার সঙ্গে বসব আমরা? তখন কি পেট্রলবোমা বন্ধ করব? আপনারা কি বন্ধ করতে চেয়েছিলেন? আজকে বলছেন, অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে এ দেশের অনেকের সঙ্গে বসার দরকার আছে।’
ওবায়দুল কাদের বলেন, তিস্তা নদীর পানি এখন সময়ের ব্যাপার। কিছু দিন হয়তো সময় লাগবে। কিন্তু এখন আর ভারতের কোনো নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে যতটুকু এটার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের পার্লামেন্টে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন অনুমোদন করেছে। তেমনি তিস্তা নদীর পানির অনুমোদনও সবার সমর্থনে বাংলাদেশ ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। তাঁর দাবি, ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। এই অংশীদারত্ব জনগণের স্বার্থে নতুন নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে। সব কিছু সময় দিয়ে হয় না।
ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর দ‌ক্ষিণের সভাপতি আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সাংসদ সানজিদা খানম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী, ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক সভাপতি মিরাজ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবির প্রমুখ। সম্মেলন পরিচালনা করেন দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শেখ আনিস-উজ-জামান।

নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন বুহারি

সাবেক সেনাশাসক মুহাম্মদ বুহারি নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। শুক্রবার শপথ গ্রহণ করেন তিনি। ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয় বুহারির দল। নাইজেরিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের বিদায় ঘণ্টা বাজালেন বুহারি (৭২)।
নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায় স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত। অনুষ্ঠানে বুহারি ঐতিহ্যবাহী মুলসমান পোশাক পরে হাজির হন। তার হাতে ছিল ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আফ্রিকার ৩০টি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড ও ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট ফ্যাবিয়াস উপস্থিত ছিলেন। দুর্নীতিমুক্তির ঘোষণা দিয়েই ভোটারদের মনজয় সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

পৃথিবী নয়, মানুষের জন্ম অন্য কোনো গ্রহে

পৃথিবী নয়, মানুষের জন্ম মহাশূন্যের অন্য কোনো গ্রহে। শূন্য থেকে আসা একটি বেলুন পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীদের অধিকাংশই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এ বেলুনটির গায়ে মহাশূন্যের অনেক আনুবীক্ষণিক জীবের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর এ ঘটনা মানুষের প্রকৃত উৎপত্তি নিয়ে বিতর্কের পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মঙ্গলেই প্রথম প্রাণের উৎপত্তি হয়, যেহেতু মঙ্গলে খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে।
মার্কিন পরিবেশবিদ ড. এলিস সিলভারও তার লেখা বই ‘হিউম্যানস আর নট ফ্রম আর্থ : অ্যা সায়েন্টিফিক ইভালিউশন অব দ্য এভিডেন্স’ এ দাবি করেছেন, মানুষ আসলে এ পৃথিবীর আদিবাসী নয়। তারা অন্য কোথাও থেকে এখানে এসেছে। তার দাবি, মানুষ একা একা পৃথিবীর অন্য প্রাণীদের সঙ্গে বেড়ে ?ওঠেনি, বরং ১০ হাজার বছর আগে পৃথিবীর বাইরের কোনো প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের পৃথিবীতে আগমন ঘটে। মানুষ এবং অন্য প্রাণীদের পার্থক্যের তুলনা করে নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন তিনি। ইয়াহু নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, একটি প্রজাতি হিসেবে পৃথিবী আমাদের চাহিদা পূরণ করছে ঠিকই কিন্তু যারা মানুষকে পৃথিবীতে নিয়ে আসছে তাদের মতো পারছে না। এলিসের মতে, মানুষ যে ভিন্ন কোনো গ্রহ থেকেই আসছে তার প্রমাণ হচ্ছে অধিকাংশ মানুষই তার পিঠ ও কোমর ব্যথায় ভোগে।
এ থেকে এটাই প্রমাণ করছে, কম মাধ্যাকর্ষণ শক্তিবিশিষ্ট কোনো গ্রহেই মানুষের জন্ম। তাই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না তারা। এছাড়া মানুষ যেভাবে সন্তান জন্ম দেয় সেটাও পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে নেই। জন্মের সময় মানব শিশুর মাথা অনেক বড় থাকে, যে কারণে সন্তান জন্ম দিতে মায়েদের অনেক কষ্ট হয়। পৃথিবীতে বসবাসকারী অন্য কোনো প্রাণীই এভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারে না। আবার মানুষের শরীরে এমন ২২৩ রকমের জিন পাওয়া যায়, যা পাওয়া যায় না পৃথিবীর অন্য কোনো প্রজাতির শরীরে। এলিস তার বইতে বলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে, শতভাগ ফিট। তার শরীরের ভেতরে বা বাইরে কোনো ধরনের সমস্যা নেই। এমন মানুষ পাওয়া গেলে আমি বিস্মিতই হব এবং এটাও প্রমাণ করে, মানুষ আসলে এ পৃথিবীর প্রাণী নয়। ডেইলি মেইল।

পাকিস্তানে এক লাখ নাগরিকত্ব বাতিল

বহিরাগত সন্দেহে ১ লাখ লোকের নাগরিকত্ব বাতিল করছে পাকিস্তান। ইতিমধ্যে ভিনদেশী সন্দেহে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র স্থগিত করেছে। শুক্রবার ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় পাকিস্তানের জাতীয় ডাটাবেস ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল ডাটাবেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথরিটি (এনএডি আরএ) তাদের পরিচয়পত্র স্থগিত করেছে। যে কারণে এই ১ লাখ লোক অবৈধ হয়ে গেছে।
এদের মধ্যে কারও কম্পিউটারাইসড জাতীয় পরিচয়পত্র (সিএনআইসি) স্থগিত এবং বাকিদের নবায়ন করা হয়নি। সম্প্রতি সিএনআইসিধারীদের মধ্য থেকে বহিরাগত চিহ্নিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে এনএডিআরএ কর্তৃপক্ষ। এনএডিআরএ মুখপাত্র ফাইক আলি ছাছার বলেন, ‘সন্দেহভাজন সব সিএনআইসিধারীদের নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করছে এনএডিআরএ। এ পর্যন্ত এক লাখ নাগরিকের পরিচয়পত্র স্থগিত করে দেয়া হয়েছে যাদের বেশিরভাগই আফগান।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু আমাদের একটি সুনিপুণ পদ্ধতি রয়েছে সেহেতু বহিরাগতরা ধরা পড়বেই। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রতিটি প্রদেশে একটি করে যৌথ ভেরিফিকেশন কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা প্রতিটি সিএনআইসি যাচাই করে দেখছে।’ তবে বহিরাগতরা কিভাবে সিএনআইসি পেয়েছে এ বিষয়ে ছাছার অথবা এনএডিআরএ চেয়ারম্যান কেউই কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাকিস্তানি হিসেবে যাদের কোনো পরিচয় নেই তাদের নামে কিভাবে পরিচয়পত্র ইস্যু করেছে এনএডিআরএ?
ইতিমধ্যে এনএডিআরএ কার্যক্রমে অনেক আসল পাকিস্তানি নাগরিক বিড়ম্বনায় পড়েছেন। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সব প্রমাণাদি জমা দেয়ার পরেও এনএডিআরএ কিভাবে তাদের পরিচয়পত্র স্থগিত ঘোষণা করেছে? চাকওয়াল জেলার বাসিন্দা শোয়া সাইদান শাহ বলেন, ‘আমার পরিবার ১৭১৮ সাল থেকে পাঞ্জাব প্রদেশে বসবাস করে আসছে। আমি আমার জন্ম সনদ জমা দিয়েছি। এছাড়া আমার আত্মীয়-স্বজনদের পরিচয়পত্রও জমা দিয়েছি তারপরও এনএডিআরএ কর্তৃপক্ষ বলছে আমি নাকি বহিরাগত!’ পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান থেকে হাজার হাজার লোক তাদের দেশে এসে অবৈধভাবে বসবাস করছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। এদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে। নাডরা তাদের শনাক্ত করেছে। ফলে তাদের পরিচয়পত্র স্থগিত করা হয়েছে। এই অবস্থায় অবৈধ হয়ে পড়া লোকদের পরিণতি কী হবে, তা এখনও পরিষ্কার করা হয়নি।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান ব্লাটারের

দুর্নীতির অভিযোগে ফিফার সাত শীর্ষ কর্মকর্তা গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় টালমাটাল ফুটবলবিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে দুই যুগ ধরে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা। ফিফার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন সময়ে ১৫ কোটি ডলারেরও বেশি ঘুষ নিয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। ফিফার এই ঘুষ, দুর্নীতি ও বহুমাত্রিক কেলেংকারি ফুটবলের গণ্ডি ছড়িয়ে ছুঁয়ে গেছে গোটা বিশ্বকে। লেগে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে। এমনকি জাতিসংঘও বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যেই কাল জুরিখে ফিফার সদর দফতরে সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় জুরিখসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক নাটকই মঞ্চায়িত হয়েছে।
ফিফা কংগ্রেসে হামলা
শুক্রবার সভাপতি সেপ ব্লাটারের উদ্বোধনী ভাষণের ঠিক আগে আচমকা ফিফা কংগ্রেসে হামলা চালায় ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষুব্ধ জনতা। ফিফার প্রতিনিধিদের লাল কার্ড দেখিয়ে তারা স্লোগান দিতে থাকে- ‘ফুটবলকে মুক্ত করো, ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো।’ বিক্ষোভকারীরা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে লাঞ্ছিত না করলেও এ ঘটনায় হতভম্ব সেপ ব্লাটার দ্রুত নিরাপত্তারক্ষীদের ডেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেন। এর আগে ফিফা থেকে ইসরাইলকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছিল ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশন।
ব্লাটারের আহ্বান
দুর্নীতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্লাটারের পদত্যাগ ও সভাপতি পদে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার দাবি করেছিলেন। কিন্তু ব্লাটার নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এখনও দুর্নীতিতে ব্লাটারের সম্পৃক্ততার কোনো খবর পাওয়া না গেলেও সংস্থার প্রধান হিসেবে দায় এড়াতে পারেন না তিনি। মজার ব্যাপার হল, যার বিরুদ্ধে সবার অভিযোগ, সেই ব্লাটারই কাল সবাইকে একজোট হয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানালেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রীতিমতো বিদ্রোহ ঘোষণা করে ব্লাটার বলেছেন, ‘ফিফার সম্মান ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে প্রয়োজন দলীয় চেতনা। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ফিফাকে কক্ষপথে ফেরাতে এখনই কাজ শুরু করতে হবে। যে বা যারাই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়া হবে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করে যাব।’ এর আগে আরও খারাপ খবরের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন ব্লাটার।
শুদ্ধি অভিযান
দুর্নীতির অভিযোগে বুধবার সুইস পুলিশের হাতে আটক হওয়া অধিকাংশ ফিফা কর্মকর্তাই উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার। টিভি স্বত্ব, বিপণন, বাণিজ্যিক অংশীদার, টুর্নামেন্ট বরাদ্দসহ আরও যেসব খাতে দুর্নীতি হয়েছে তার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক ব্যবসায়ীও জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে কাল শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র। কনকাকাফ থেকে অভিযুক্ত সবাইকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের দেয়া ১৪ দুর্নীতিবাজের তালিকায় থাকা তিন আর্জেন্টাইন ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন আর্জেন্টিনার একজন বিচারক। ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি হোসে মারিয়া মারিনসহ অভিযুক্ত বাকিদের বিরুদ্ধে আলাদা করে তদন্ত শুরু করেছে ব্রাজিলের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়।
২০১৮ বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডে!
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক হতে রাশিয়া ও কাতার কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে কিনা, সেটা তদন্ত করছে সুইস পুলিশ। ফিফার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ রাশিয়া আর কাতারেই হবে।’ কিন্তু দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে শেষ মুহূর্তে অন্য কোনো দেশে বিশ্বকাপ সরিয়ে ফেলা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০১৮ বিশ্বকাপ আয়োজনে নাকি প্রস্তুত আছে ইংল্যান্ড। ওয়েবসাইট।

ঈদ ধারাবাহিকে সজল ও সুমাইয়া শিমু

ঈদ এলেই টিভি চ্যানেলে ধারাবাহিক নাটকের আধিক্য দেখা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় আসছে ঈদ উপলক্ষে একুশে টিভিতে প্রচারের লক্ষ্যে মিনহাজুল ইসলাম অভি নির্মাণ করেছেন ছয়পর্বের ঈদের বিশেষ ধারাবাহিক নাটক ‘শেষ অধ্যায়’। এটি রচনা করেছেন রেজাউর রহমান রিজভী। এ ধারাবাহিক নাটকে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন সজল ও সুমাইয়া শিমু।
এর আগে সজল-শিমু বিভিন্ন একক এবং ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করলেও এবারই প্রথম ঈদের বিশেষ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছেন তারা দুজন। ‘শেষ অধ্যায়’ নাটকটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে সজল বলেন, ‘এ নাটকের গল্প বেশ ভালো। শিমু এমন একজন অভিনেত্রী যার সঙ্গে কাজ করতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ নিয়ে কাজ করা যায়। আমার বিশ্বাস নাটকটি দর্শকের ভালো লাগবে।’ সুমাইয়া শিমু বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আসছে ঈদ উপলক্ষে একটি ধারাবাহিকেই অভিনয় করছি। দর্শকের কাছে বিশেষ অনুরোধ থাকবে ধারাবাহিক এ নাটকটি দেখার জন্য।’ প্রসঙ্গত, আসছে ঈদ উপলক্ষে সজল একের পর এক বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করলেও শিমু খুব বেছে বেছে কাজ করছেন।

২৮ এপ্রিলের ভোট মডেল by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, আমরা জিয়াউর রহমান ও এরশাদের অসুস্থ নির্বাচনী সংস্কৃতি পেছনে ফেলে ক্রমে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এগোচ্ছিলাম। ১৯৭৩-এর আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী অনিয়মও আমরা ভুলে যেতে চাই। ’৯০-এর পরে বেশ কিছু ভালো নির্বাচনের দৃষ্টান্ত আমরা ইতিমধ্যে স্থাপন করেছি। ২০০৮ সালের সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা সবাই স্মরণ করেন। শুধু স্মরণ করতে চান না তখন কোনো দলীয় সরকার ক্ষমতায় ছিল না। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে। সেই অবস্থা এখন আর নেই।
‘সুষ্ঠু ভোট’ ও ‘ভোটাধিকার’ বলে শুধু বক্তৃতা দিলে কাজ হবে না। সুষ্ঠু ভোট ও সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর কোনো কৌশলের কথা এখন থেকে ভাবতে হবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে, এরপর উপজেলা নির্বাচনের শেষ দিকের কয়েকটি পর্বে, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রহসনের পর সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পর্কে কি আর আশাবাদী হওয়ার সুযোগ আছে? নেই। কারণ, এই তিন সিটি নির্বাচন কোনো সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন ছিল না। তিন সিটিতেই যদি বিএনপি জয়লাভ করত, তাহলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের তেমন ক্ষতি হতো না। আমাদের ধারণা, একটি মেয়র পদেও বিএনপিকে জিততে না দেওয়ার কারণ নৈতিক পরাজয়ের ঝুঁকি। তখন পেট্রলবোমার কার্ডটি সরকার আর আরাম করে খেলতে পারত না। কাজেই ভোট-সন্ত্রাস ছাড়া সরকারের বিকল্প ছিল না।
সরকার নিজের মুখ রক্ষা করতে গিয়ে সুষ্ঠু ভোট সংস্কৃতি, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, জনগণের ভোটাধিকার ইত্যাদির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। তাতে অবশ্য সরকারের কোনো ক্ষতি হয়নি। বর্তমান সরকার মিডিয়াকে পাত্তা দেয় না, জাতিসংঘকে পাত্তা দেয় না, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় কাউকেই পাত্তা দেয় না। কারণ কী? এই সরকার পাঁচ বছরের জন্য ‘নির্বাচিত’ বলে একটি সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে। এটাই সরকারের একমাত্র শক্তি। বলা বাহুল্য, এই শক্তিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের ধারণা, বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়াই একটি দলের প্রধান শক্তি। আর কোনো কিছু তার প্রয়োজন নেই। একবার সরকার গঠন করতে পারলে বাকি সব সরকারি প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, কিছু মিডিয়া ও কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি সরকারের কাছে অবনত হয়ে থাকে। এটাই আমাদের ঐতিহ্য ও বাস্তবতা। এসব সত্ত্বেও অনেক দেশপ্রেমিক ব্যক্তি, সংগঠন, মিডিয়া সরকারের নানা সমালোচনা করবে। এতে সরকারের কিছুই যায় আসে না। জাতিসংঘ, আমেরিকা, অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনা গায়ে না মাখলেই হলো। কথায় বলে, ‘যার দু’কান কাটা তার লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই’। বর্তমান সরকার সে রকম একটা মডেল উপহার দিয়েছে। ভবিষ্যতে অন্য দলের সরকারও তা ব্যবহার করতে পারবে।
সিটি করপোরেশনের মতো নির্বাচনেও সরকার, সরকারি দল, অঙ্গ দল কী সন্ত্রাস করতে পারে, তা সবাই দেখেছেন। নির্বাচন কমিশনকেও দেখেছেন। এখন ভাবুন, ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তনের যে নির্বাচন হবে, তা কেমন হবে?
এ দেশের নির্বাচন ইস্যুতে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। সরকারি দলের সমর্থকেরা বারবার বলেছেন, ‘অতীতে বিএনপি আমলেও (২০০১) ভোট-সন্ত্রাস হয়েছে।’ কে অস্বীকার করছে? কিন্তু আমরা তো ২০০১-এর কালো অধ্যায় পেরিয়ে ২০০৮-এ সুষ্ঠু নির্বাচন করেছি। ২০১৪-তে তো ২০০৮-এর চেয়েও উন্নত মানের নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০০৮-এর চেয়েও কড়া নির্বাচন কমিশন দেখার কথা। তা কি হয়েছে?
সবাই আশা করেছিল ২৮ এপ্রিল একটি সুন্দর ভোট হবে। কিন্তু সবার চোখের সামনে, মিডিয়ার সামনে, কিছু টিভি চ্যানেলের লাইভ কভারেজের সামনে এমন সব ঘটনা ঘটে গেল, যা শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, অকল্পনীয়ও বটে। মনে হলো, আমরা জিয়া, এরশাদ জমানায় আবার ফিরে যাচ্ছি। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বাতিলে আওয়ামী লীগের এত উৎসাহ কেন, তা আরও স্পষ্ট হলো জনগণের সামনে। ‘নির্বাচন কমিশন’ যদি আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন হয়, তাহলে এ রকম নির্বাচন করেও যে জয়ী হওয়া কোনো বাধা নয়, এটা সরকার জানে। তা ছাড়া, এই সরকার তো বেশি বিদেশি, জাতিসংঘ কারও সমালোচনাই তোয়াক্কা করে না। দু’কান কাটা হলে যা হয়।
২৮ এপ্রিলের ভোট মডেলটি বিরোধী দলের জন্য খুব ভয়ংকর। নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী কর্মকর্তা, আনসার, পুলিশ সবার সহযোগিতায় (ব্যতিক্রম ছাড়া) এ রকম ভোট-সন্ত্রাস হলে সেখানে তারা কী করতে পারে? সিটি নির্বাচনের মতো স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনেই যদি সরকারি দল এ রকম ভোট–সন্ত্রাস করে, তাহলে সরকার পরিবর্তনের নির্বাচনে সরকার, সরকারি দল ও অন্যরা কী করতে পারে, তা এখন থেকে বিরোধী দলকে ভাবতে হবে। ভোটের আগের দিন পর্যন্ত সবকিছু সুন্দর, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক পরিবেশেই হয়তো হবে। যেমন ২৮ এপ্রিলের ভোটে হয়েছে। কিন্তু ভোটের দিন কী হবে, তা আগাম কেউ ভাবতে পারেনি। তবে এবার ভাবতে পারবে। যত ভোট–সন্ত্রাসই হোক না কেন, নির্বাচন কমিশন যদি তা আমলে না নেয় (যেমন এবার হয়েছে) তাহলে বিরোধী দলের কিছুই করার থাকবে না। যত বেশি ভোট–সন্ত্রাস হবে, তত দ্রুত ফলাফলের গেজেট ছাপা হবে। কারণ, সরকারি দলের দরকার ওই গেজেট। বাকি সব বাকির খাতায়। ‘নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল’ নামে একটি স্তর আছে বটে, তবে তা দিয়ে কোনো দল বা প্রার্থী অতীতে সুবিচার পেয়েছেন বলে শোনা যায়নি। কাজেই সরকারি দল ভোট-সন্ত্রাস করলে বিরোধী দলের জেতার কোনো সুযোগই নেই। বিরোধী দল পাল্টা ভোট-সন্ত্রাস করতে চাইলেও সুবিধা করতে পারবে না। এ রকম অবস্থায় শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ ভোটার (যার এক বড় অংশ নারী) আর ভোট দিতে যাবে না। জাল ভোটের বাক্স ভর্তি করার সুযোগ এতে আরও বেড়ে যাবে। যেমনটি ২৮ এপ্রিল হয়েছে।
কাজেই আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে বিরোধী দলকে ২৮ এপ্রিলের ভোট অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের নীতি ও কৌশল ঠিক করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংসদ নির্বাচন ক্ষমতা বদলের নির্বাচন। বর্তমান সরকার তাদের আমলে যা যা করেছে, তাতে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তারা কোনোভাবেই নিতে পারবে না। কাজেই বর্তমান সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত (পরোক্ষভাবে) আগামী সংসদ নির্বাচন ২৮ এপ্রিলের ভোট প্রহসনের চেয়ে আরও ভয়ংকর কিছু হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। প্রত্যেক ভোটার যেন তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। জনগণ চায় একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। যারা প্রত্যেক দল বা প্রার্থীর প্রতি একই আচরণ করবে। কিন্তু গত কয়েকটি নির্বাচনে আমরা তা পাচ্ছি না। যথারীতি ভোটের অনুষ্ঠান হচ্ছে। কিন্তু একে ভোট বলা চলে না। অথচ এই দেশেই ২০০৮ সালে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। তাহলে ২০১৫ সালে আমরা তা পারছি না কেন?
জনগণ সবচেয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠী। এখন জনগণকে ভাবতে হবে কী পদক্ষেপ নিলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রকৃত ভোটের ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। ২৮ এপ্রিলের ভোট ‘সাফল্য’ আওয়ামী লীগ সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। এই মডেল তারা ভবিষ্যতেও প্রয়োগ করতে পারে। কাজেই বিরোধী দল, সাধারণ ভোটার ও মিডিয়া—সবাইকে এখন থেকে ভাবতে হবে কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে সরকার, সরকারি দল এ রকম ভোট-সন্ত্রাস করতে সাহস করবে না। মনে রাখতে হবে, আগামী সংসদ নির্বাচন বর্তমান সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই নির্বাচনে তারা যেকোনো মূল্যে জিততে চাইবে। কাজেই ‘সুষ্ঠু ভোট’ ও ‘ভোটাধিকার’ বলে শুধু বক্তৃতা দিলে কাজ হবে না। সুষ্ঠু ভোট ও সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর কোনো কৌশলের কথা এখন থেকে ভাবতে হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

খোয়াব by মোজাফ্ফর হোসেন

একদিন ভোরে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলে ছুটে গেলাম বাবার কাছে। মায়ের চেয়ে বাবার সঙ্গে আমার সখ্য বরাবরই বেশি। কাজেই আমার কোথাও কিছু ঘটলে বাবার কানেই পৌঁছায় সবার আগে। সেদিনের ওই স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নটার কথা বাবাকে না বললেই নয়। স্বপ্নের হয়েছে এই এক জ্বালা—চোখ জোড়া মেলতে না মেলতেই অর্ধেকটা গায়েব; মনে হয়, যেন ঘটেও ঘটেনি। বাবা তখন কেবলই খবরের কাগজে মনটা চুবিয়েছেন। এত ভোরে কাগজ আসে না। আসলেও বাবা তোয়াক্কা করেন না, তাঁর অভ্যাস খবর বাসি করে তারপর পড়তে বসা। আমার দাদাবাড়ি ছিল গ্রামে, সে সময় গ্রামে খবরের কাগজ পৌঁছাত এক দিন পর। ফলে এখন শহরে বাস করলেও এখনো এভাবেই পেপার পড়ে অভ্যস্ত আমার বাবা। আমি যে তাঁর শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়েছি, সেটা তিনি দেখেও না দেখার ভান করলেন। এত সকালে যে নিজ থেকে উঠি না, সেটা ভালো করেই জানেন তিনি। কাজেই ভেবেছেন, আমি দৃষ্টিভ্রম, এমনিতেই চলে যাব।
‘বাবা, একটু শুনবে? শুনতে তোমাকে হবেই।’ এমন স্বরে কথাটি তাঁকে বললাম যেন যে মানুষটি আমার সামনে বসে আছেন তিনি আমার বাবা নন, আমিই তাঁর বাবা।
‘না শুনে যখন উপায় নেই, তখন বলে যা।’ আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন বাবা।
‘আমি খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছি।’
‘হুম।’ কাগজের ভেতর থেকে বাবা বললেন। বুঝলাম, আমার স্বপ্নের বৃত্তান্ত শোনার অত তাড়া নেই তাঁর। কথা আর না বাড়িয়ে চলে আসতে পারলেই ভালো লাগত, কিন্তু সেই ভালো লাগা বেশিক্ষণ টেকসই হবে না ভেবে আগ বাড়িয়ে বলতে হলো আমাকেই।
‘শোনো, স্বপ্নে দেখলাম দাদি উঠোনের মাঝখানে কুয়ো খুঁড়ছে। আমরা সবাই কত বারণ করছি, কিন্তু কে শোনে কার কথা! তুমি তো রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়েই গেলে। মাও খুব রাগ করল। তবে দাদির কাণ্ড দেখে আমিই খুব মজা পাচ্ছিলাম। তারপর দেখি কি—বালতিতে করে কুয়ো থেকে আমি পানি তুলছি দাদি গোসল করবেন বলে। বালতিটা সে কী ভারী! উঠতেই চায় না, আমারও জেদ চপে গেল। তুলে দেখি, বালতির ভেতরে জড়সড় হয়ে বসা দাদি। মৃত। আমি চেঁচিয়ে উঠেছি আর অমনি ঘুম ভেঙে গেল।’
‘হুম। যা, আর ঘুমানোর দরকার নেই। হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বস গে। তোর মাকে বল আমাকে এক কাপ চা দিতে।’ খবরের কাগজের ভেতর শেয়ারের পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে বললেন বাবা। শেয়ার বাজারে বাবার কোনো লেনদেন নেই। তাঁর ঢাকায় এক বন্ধু আছে—আজিজ অাঙ্কেল। শেয়ারের কারবার করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেছেন তিনি। রীতিমতো আঙুল ফুলে কলাগাছ! একবার আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছিলেন, বাবাকে হাতে-কলমে বুঝিয়েছেন শেয়ার ব্যবসা, তারপর থেকেই এই পাতাটা বাবা বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। একবার কিছু টাকা গুছিয়েও ছিলেন, কিন্তু তা দিয়ে আমার ছোট ভাইয়ের আকিকার জন্য মা এক জোড়া ছাগল কিনে ফেলেছেন। কত দিন থেকে আকিকা আকিকা শুনছি, এবার ফাইনালি হচ্ছে।
‘এটা খুব বাজে স্বপ্ন না, বলো? দাদি মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে, তাকে কি একটু সাবধানে থাকতে বলবা? তুমি বললে শুনবে।’
‘স্বপ্ন কোনো দিন সত্যি হয় না। শোন, তোর দাদিকে কিছু বলার দরকার নেই। কুয়ো খোঁড়ার আইডিয়াটা তাঁর মনে ধরে যেতে পারে।’
স্বপ্ন যে সত্যি হয় না, সে তো আমিও জানি। হলে কবেই আমি কলেজ পাস করে এত দিনে চাকরিতে লেগে যেতাম! ডাক্তার হতাম, ইঞ্জিনিয়ারও হতাম। কারণ, বাবার স্বপ্ন আমি ইঞ্জিনিয়ার হই, মায়ের ডাক্তার। তাঁদের এই চাওয়ার পেছনে অবশ্য সামান্য হেতু আছে। বাবার বাবা চেয়েছিলেন তাঁর বড় ছেলে, মানে আমার বাবা, বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে, সেই আমলে দাদার মাথায় ইঞ্জিনিয়ারের আইডিয়াটা কীভাবে এল, সেটি অবশ্য ভাবার বিষয়।
বাবা শেষপর্যন্ত হলেন মানুষ গড়ার ইঞ্জিনিয়ার—স্কুলমাস্টার। আর মায়ের কেসটা ভীষণ মর্মস্পর্শী। ভুল চিকিৎসার কারণে কঠিন একটা রোগ হয়েছিল আমার নানির। কী রোগ, আমি তা ঠিকমতো না জানলেও মায়ের মুখে সব সময় ‘আকড়’ ‘আকড়’ শুনে এসেছি, ব্যাকরণ ঘেঁটে পরে জেনেছি তার অর্থ—‘কঠিন’। নানি মারা যাওয়ার আগে সব সময় নাকি বলতেন, ‘ভালো ডাক্তার পেলে আমি মরতাম না’, যদিও তখনো তিনি মরেননি। মা পণ করেছিলেন সেই সময়ই, ছেলে হলে ডাক্তার আর মেয়ে হলে তাঁর জন্য আনবেন ডাক্তার জামাই।
বাবার সঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম আমি। স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি এমন সময় বাবা এবং দাদির বেধে গেল তুমুল আকারে। সামনেই দাদার মৃত্যুবার্ষিকী। দাদি চান মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি গ্রামের বাড়িতে হোক, তবে বাবার ইচ্ছে উল্টোটা। তাঁদের ছোট মানুষের মতো ঝগড়া করতে দেখে বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। হাসতে হাসতে চলে গেলাম স্কুলে। ততক্ষণে সকালের স্বপ্নের কথা মন থেকে ক্লিন বোল্ড, মনে করতে চাইলেও ঠিক ঠিক আর মনে করতে পারব না।
টিফিন শেষ করে সবে ক্লাসে ঢুকেছি, খবরটা গেল এমন সময়—শহরে আমাদের সঙ্গে যে বাড়িতে থাকেন দাদি, সেখানে বাথরুমে পড়ে বড় রকম আঘাত পেয়েছেন তিনি। হেড স্যারকে বলে বাড়ি চলে এলাম আমি। এসে দেখি, কান্নাকাটির তুমুল হিড়িক পড়ে গেছে। দাদি নেই। এরপর আর বহুদিন স্বপ্ন দেখিনি। দেখলেও ঘুমের ঘোর কাটতে না-কাটতেই কেটে গেছে তার রেশ।
তো, সেদিন একটু দেরিতেই ঘুমিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙলও দেরিতে। শুক্রবার, স্কুল ছুটি, কাজেই আমাকে কেউ ডাকার প্রয়োজন বোধ করেনি। হয়তো ঘুমাতাম আরও কিছুক্ষণ যদি ওই আজব স্বপ্নটা না দেখতাম।
যথারীতি ছুটে এলাম বাবার কাছে। বাবাও যথারীতি অন্যান্য দিনের মতো বাসি খবর গিলছিলেন গোগ্রাসে ।
‘বাবা?’ একবার ডেকে কোনো সাড়া পেলাম না। ‘বাবা?’ আবার ডাকলাম। ‘শুনছি তো! বল।’  খুব আজব একটা স্বপ্ন দেখলাম।’ বাবা জানেন আমি না বলে যাব না, তাই বললেন, ‘বলে যা। শুনছি।’ ‘দেখলাম, বিকেলে আমি আর তুমি বাজার করতে বেরিয়েছি। চারদিক কেমন ঘোলা ঘোলা। বাড়িঘরগুলো খুব ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। গাছপালা সব কেমন বিবর্ণ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব রং কে বা কারা যেন ধুয়ে দিয়েছে। একবার দেখি, রিকশা চালাচ্ছে একটা কঙ্কাল, আবার দেখি একটা রোবট। তুমি কোনো কথা বলছ না। আমি তোমাকে চিৎকার দিয়ে ডাকছি, তুমি গা-ই করছ না! একবার দেখি, কেমন শকুন হয়ে গেছে সব মানুষ। আবার দেখি, চারদিকে কুকুর আর কুকুর, মানুষ কোথায়! কুকুরগুলো কেমন জিব বের করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে—যেন অনেক দিন কিছু খায়নি, এখনই আমাদের গিলে খাবে। তুমি যে কী করে কিছু হয়নি এমন একটা ভাব নিয়ে বসে ছিলে, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি। তোমার নীরবতা ভয়ংকর একটা শব্দের মতো আমাকে আঘাত করে চলেছিল বিরতিহীন। ভীষণ ভয় পেয়ে আমি যেই ধরেছি তোমার হাত, অমনি আস্তে আস্তে গলে যেতে লাগল তোমার শরীর। আর সেই সময়ই তো ঘুমটা ভেঙে গেল আমার।’
বাবা কোনো কথা বললেন না।
‘কিছু বলছ না যে!’
‘কাল খেলায় পাকিস্তান কেমন হারল দেখলি। তুই বললি বাংলাদেশ পারবে না। দেখলি তো?’
‘বাবা, আমি তোমাকে একটা স্বপ্নের কথা বলছিলাম! আর বাংলাদেশ পারবে না, সে কথা তো আমি বলিনি; বলেছি, খেলাটা খুব জমবে।’
‘হুম।’
‘আমার স্বপ্নটা?’
‘স্বপ্ন কোনো দিন সত্যি হয় না। যাহ্। এখন থেকে চিত হয়ে শুবি না। দেখবি, স্বপ্ন দেখা কমে গেছে। আর দাঁত মেজে শুবি, তাহলে এমন পাগলাটে স্বপ্ন দেখবি না।’ হতাশ হয়ে চলে এলাম আমি। স্বপ্নের কথা যাতে বেমালুম ভুলে না যায়, এ জন্য ডায়েরিতে লিখে রাখলাম দু-তিন লাইনে। আমি আসলে দেখতে চাচ্ছিলাম দিনটাতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসে কি না।
দিনের বেলাটা রোজকার মতোই গেল। পড়ন্ত দুপুরে ঘুরতে বের হলাম হাফিজুল চাচার সাঙ্গে। পুরো নাম হাফিজুল হলেও লোকটিকে আমি ডাকি হাফি চাচা বলে। হাফি চাচা আমাদের বাড়ির মালিক। দোতলায় থাকেন। একাই থাকেন। একটা মেয়ে এসে রান্না করে দিয়ে যায় তাঁকে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আর বিয়ে করেননি। কোনো ছেলেমেয়ে নেই। লোকে বলে, হাফি চাচার নাকি শারীরিক সমস্যা ছিল তাই বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। মায়ের মুখেও শুনেছি একই কথা। লোকটা যে ভালো, এ নিয়ে এলাকায় কেউ দ্বিমত করবে না। বাবা ঘুরতে বেরোন কম, তাই হাফি চাচা মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিয়ে যান আমাকে। বাইরে থেকে তাঁকে গম্ভীর মনে হলেও তিনি কিন্তু বেশ রসিক মানুষ, আমাদের ঘোরাঘুরিটা এ জন্য বেশ জমে। সেদিন আমরা বাড়ির কাছেই এক পার্কে গিয়ে বসলাম। হাফি চাচা মন দিয়ে তাঁর ছেলেবেলার গল্প করছিলেন, মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম আমিও। এরই এক ফাঁকে আমাদের স্যান্ডেল জোড়া উধাও। হাফি চাচা হাসতে হাসতে বললেন, ‘অতি মনোযোগী হলে হিতে বিপরীতও হতে পারে।’ দূরত্ব পায়ে হাঁটার হলেও স্যান্ডেল না থাকায় রিকশাই চেপে বাড়ি ফিরলাম আমরা। ভাড়া নিয়ে রিকশাচালকের সঙ্গে চাচার বাধল মহা ক্যাচাল। হাফি চাচা দশ টাকার এক টাকাও বেশি দেবেন না। আর রিকশাচালক গোঁ ধরে আছে, বিশ টাকা নিয়েই ছাড়বে। তার মেয়ের নাকি বিয়ে, জামাই বিশ হাজার টাকা নেবে, তাই সে কিছু টাকা ধরে চাচ্ছে। ‘এত্তগুলান ট্যায়া জোগাড় করতি হবি। তাই স্যার এ কয় মাস রেকশা থেকি নামিনি।’ রিকশাচালক অতি বিনয়ের সঙ্গে বলে। আমার আবার সবকিছুতে আগ্রহ বেশি, হাফি চাচা না রিকশাচালক—শেষ পর্যন্ত কে জেতে না দেখে সরছি না।  ‘তুই যেটা দিবি, সেটা যৌতুক, বুঝলি? এটা অন্যায় কাজ, আর আমি জেনেশুনে দিল দরিয়া সেজে তোর সেই অন্যায়ে সায় দিতে পারব না। অন্য কারণ নিয়ে আসিস।’ রিকশার ছিটের ওপর দশ টাকার নোটখানা রেখে হাঁটা ধরলেন চাচা। আমিও হাঁটা দিলাম পিছু পিছু। আমি আর বাবা বসেছিলাম সন্ধ্যায়। বাবা চা খাচ্ছিলেন আর আমি মুড়ি চিবোচ্ছিলাম। ‘এই শুনেছ?’ এমন সময় মায়ের প্রাত্যহিক হাঁক। শুনেছি তো অনেক কিছু, আবার অনেক কিছুই শুনিনি! তুমি কোনটার কথা বলছ?’ বাবার চিরচেনা উত্তর। ‘তিন মাস আগে পাগলি মেয়ের বিয়ে দিল না—ছয়মন নাম, আমি তখনই বলেছিলাম, পাগলি মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে, দেখো কোনো কাহিনি আছে। জানা গেল, ছয়মন গেছে হাসপাতালে, পেট ফেলতে! ফলল তো আমার কথা?’
‘ও, এটা আমি জানতাম না। দুপুরে যে মফা মাস্টারের মেয়েকে বখাটেরা অ্যাসিড মেরেছে, সেটা শুনলাম। বাদ দাও এসব। আজ রাতে তোমার স্পেশাল খিচুড়ি আর ভুনা গরুর মাংস করো না, আয়েশ করে খাই।’ বাবা খুব সুন্দর করে একটা কথার মধ্য আরেকটা কথা ঢুকিয়ে দেন। মূল প্রসঙ্গটা খুব সহজেই ছিটকে যায়। এটা তিনি ইচ্ছে করে করেন, না স্বভাবদোষে—ধরা যায় না। রাতে আমরা বেশ আয়েশ করে ভুনা মাংস আর খিচুড়ি খেলাম। দিনটা আর পাঁচটা দিনের মতো করে চলে গেল খুব সাধারণভাবেই। গত রাতের স্বপ্নের সঙ্গে কোনোভাবেই মিলল না। স্বপ্ন যে সত্যি হয় না, সে তো আগে থেকেই জানতাম।
বছর খানেক পরের কথা। সেদিন কী জন্য যেন স্কুল বন্ধ ছিল। দুপুরে খেয়েদেয়ে কেবল ঘুমিয়েছি আমি, চোখের পাতা বুজে আসতেই দেখলাম, আমি কালো অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর তলিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় একটা অচেনা কণ্ঠস্বর। সে বলল, ফিরে আয়। তোর বাবা চাপা পড়ে মারা গেছে। তারপর গুহার ভেতরে ঘুরে-ফিরে কে যেন বলতেই থাকল—চাপা পড়ে মারা গেছে! ধড়ফড় করে উঠে পড়লাম আমি। বাবা ব্যস্ত ছিলেন স্কুলের খাতা দেখায়। কাছে যেতেই বললেন, ‘বিরক্ত করিস না। মাথার ওপর অনেক চাপ।’
‘এই তো, এই কথায় তো বলতে এসেছি। খুব বাজে স্বপ্ন বাবা। তোমাকে বলা ঠিক হবে কি না...কিন্তু না বলে থাকতেও পারব না যে!’
‘অত ঢং না করে বলে ফেল। হাতে অনেক কাজ। বহুবার বলেছি, স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না। তা-ও বল শুনি, না শুনিয়ে ছাড়বি না যখন।’ বাবা আমাকে একবার দেখে নিয়ে বললেন। অমনি তাঁকে আমি জানালাম স্বপ্নের কথা। শোনামাত্রই মুখটা শুকিয়ে খটখটে এঁটেল মাটির মতো হয়ে গেল বাবার। হাতের কলম আর নড়ছে না।
‘বেশ। ভাগ এখন।’ তিনি যে স্বপ্নটিকে আমলে নেননি সেটা বোঝানোর চেষ্টা করলেন অস্থিরভাবে হাঁটাহাঁটি করে।
‘বাবা, স্বপ্ন কখনোই সত্যি হয় না। তোমার কোনো স্বপ্ন আজ অবধি সত্যি হয়েছে, ফলেছে, বলো?’ বাবা আমাকে বারবার বলছিলেন এ কথা। ওদিকে তাঁকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম আমিও। এবার হাতের কাজ বন্ধ করে ওপরের দিকে একবার তাকালেন তিনি। আমাদের বাসাটা ছিল অনেক দিনের পুরোনো, হাফি চাচার দাদার হাতে তোলা। এক দিক চুন-সুরকি গাঁথুনি, অন্য দিকটা মাটির। ছাদে স্থানে স্থানে ফাটল ধরেছে। শুনেছি মাকে নিয়ে বাবা এ বাড়িতে এসেছেন বিয়ের পরপর। এখানেই আমার ও আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম। জন্মানোর পর থেকে দেখছি বাড়িটা টালমাটাল-কার্নিশের উত্তর কোনার কয়েকটি ইট খসে গেছে। প্রতিটা ঘরেরই কিছু অংশ লোনা ধরা। বাবা কী যেন ভেবে কিছুক্ষণের মধ্যে বের হয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। যাওয়ার আগে বললেন, ‘মাকে বলিস, ফিরতে রাত হবে’। সমস্ত বিকেল মাথায় এই পড়ে সেই পড়ে ভেবে ভেবে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে মধ্য রাতে ফিরলেন বাসায়।
শেষ রাতের দিকে ঘটল দুর্ঘটনাটা। একটা চক্কর, এরপর সহসা পিলে চমকানো শব্দ। ভূমিকম্প ভূমিকম্প বলে চিৎকার দিয়ে আমরা সবাই বের হয়ে এলাম বাইরে। সবার আগে আগে এলেন বাবা। হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়লেন বুক ধরে।
ওই রাতেই ছাদ চাপা পড়ে মারা পড়লেন হাফিজুল—আমার হাফি চাচা।

সাগরে হারিয়ে যাওয়া সাব্বির ইন্দোনেশিয়ার আশ্রয় শিবিরে! by উৎপল রায়

২০১৪ সালের ১৪ই এপ্রিল। বাংলা বর্ষবরণের জন্য প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন গিয়েছিলেন ঢাকার আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী সাব্বির আহমেদ (২৪)। সঙ্গে ছিলেন তার আরও কজন বন্ধু। সবার মধ্যে ছিল তারুণ্যের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই বর্ষবরণ উদযাপন ছিল তাদের জন্য বিভীষিকাময়। বর্ষবরণের দিন সবাই নেমেছিলেন সাগরে। তাদের উচ্ছ্বাস যেন বাঁধ মানছিল না। একসময় সাগরে সাঁতার কাটতে নেমে একে একে হারিয়ে যান সাব্বিরসহ বেশ কজন। এর মধ্যে চারজনের লাশ স্থানীয় কোস্টগার্ড ও জেলেদের সহায়তায় উদ্ধার করা হলেও হারিয়ে যান সাব্বির ও উদয় নামে দুজন। এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। সাব্বির ফিরে আসেননি বাবা-মায়ের বুকে। কিন্তু একটি ছবি আবারও আশার আলো জ্বালিয়েছে সাব্বিরের বাবা মো. হাসানুর রহমান ও মা সেলিনা বেগমের বুকে। গত ১১ই মে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে মাতাং রায়া গ্রামের একটি আশ্রয় শিবিরে আচেহ উপকূল থেকে উদ্ধার করা বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের একটি ছবি ছাপা হয়। ছবির তথ্য অনুযায়ী ১০ই মে ভোরে আচেহ উপকূলে দুটি নৌকায় আটকে পড়া ৪৬৯ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাকে এ আশ্রয়কেন্দ্রে এনে রাখা হয়। ছবিতে দেখা যায়, লুঙ্গি পরা, খালি গায়ে হাত দুটি বুকের ওপর গুটিয়ে চটে শুয়ে আছেন আনুমানিক ২৫ বছরের এক যুবক। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে। চোখ দুটি ঢুকে গেছে কোঠরে। বেরিয়ে আছে কণ্ঠার হার। পা দুটিও শীর্ণকায়। গায়ের রং হয়ে গেছে মিশমিশে কালো। যুবকটি কত দিনের অভুক্ত ও অসুস্থ তা তার শরীর দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। ১১ই মে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ছবিটি দেখেই আঁতকে ওঠেন সাব্বিরের বাবা হাসানুর রহমান ও মা সেলিনা হোসেন। পাগলপ্রায় হয়ে পড়েন তারা। ছুটে যান সংশ্লিষ্ট পত্রিকা অফিসে। জানান তাদের অব্যক্ত কথা। এ ছেলেই যে তাদের হারিয়ে যাওয়া সাব্বির তা নিশ্চিত করেন তারা। পত্রিকা অফিস থেকে জানানো হয় এটি এএফপির তোলা ছবি। তাদের নিজস্ব ছবি নয়। হাসানুর রহমান এরপর ছুটে যান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। যোগাযোগ করেন এএফপির সঙ্গে। ছবির মানুষটি যে সাব্বির সে বিষয়েও তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। কর্মকর্তাদের পরামর্শে এ বিষয়ে আবেদন করেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতনরা বলেছেন, তারা এ বিষয়ে খোঁজ নিতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু আবেদন দাখিলের দুই সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে পরিবারকে কিছুই জানানো হয়নি। তবে আশা ছাড়ছেন না পুত্রশোকে কাতর হওয়া হাসানুর রহমান। সংশ্লিষ্ট সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন ছেলেকে ফিরে পেতে যে কোন কিছু বিসর্জন দিতে রাজি আছেন তিনি। কিছুই চান না, শুধু তার সাব্বিরকে ফিরে পেতে চান। ছবিটি দেখার পর সাব্বিরের বাবা-মা বলছেন, এ আমাদের সন্তান সাব্বির। কোন মা-বাবাই তার সন্তানকে চিনতে ভুল করেন না। আমরাও করছি না। সাব্বিরকে দেখে আমরা শতভাগ নিশ্চিত হয়েছি। অভুক্ত থাকায় তার শরীর শুকিয়ে গেছে। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটির ২ নম্বর সড়কের ১৫১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায়, হাসানুর রহমান ও সেলিনা হোসেন ছেলে সাব্বিরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। কখন তাদের আদরের সাব্বির তাদের কোলে ফিরে আসবে। এক বছরের বেশি সময় ধরে পুত্র হারানোর কি দুঃসহ যন্ত্রণা তাদের ভোগ করতে হচ্ছে, তাও বলছেন তারা চোখের জলে। তাদের বিশ্বাস, পত্রিকায় এএফপির তোলা এ ছবিটিই তাদের প্রিয় সন্তানের। সাব্বিরের বাবা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বর্তমানে অবসরে) জানান, ১১ই মে অন্তত তিনটি জাতীয় দৈনিকে এ ছবিটি ছাপা হয়। তখনই তাকে সাব্বির বলে আমরা শনাক্ত করি। এর মধ্যে কোন ভুল নেই। নিজের সন্তানকে চিনতে পারে না পৃথিবীতে এমন বাবা-মা নেই। আমরা শতভাগ নিশ্চিত, এটিই আমাদের সাগরে হারিয়ে যাওয়া সাব্বির। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় গিয়েছি। ইন্দোনেশিয়ান অ্যাম্বেসির সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও ধরনা দিচ্ছি। কিন্তু কেউ আমাকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। বাংলাদেশে অবস্থানরত এএফপি সাংবাদিকরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সরকারের সংশ্লিষ্টরা যদি একটু আন্তরিক হন তাহলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে আমরা ফিরে পেতে পারি। এজন্য সরকার, ইন্দোনেশিয়ার সরকার ও বিশেষ করে যারা এ ছবিটি তুলেছিলেন তাদের সহযোগিতা চাই আমরা। মা সেলিনা হোসেন বলেন, প্রতিদিনই শুনছি সাগরে কতজনই ভেসে বেড়াচ্ছেন। কতজনকে উদ্বার করা হচ্ছে। এদের অনেকেই সাগরে হারিয়েছিলেন। পরে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে। আমার ছেলেও তো সাগরে হারিয়েছিল। হয়তো জলদস্যুদের খপ্পরে পড়েছিল। নয়তো কেউ তাকে অপহরণ করেছিল। অথবা জেলেরা তাকে উদ্ধার করে উপকূলের কোথাও নামিয়ে দিয়েছে। এমনটি হতে পারে না? আমি বিশ্বাস করি এ ছেলেটিই আমার হারিয়ে যাওয়া সাব্বির। আমি আবারও আমার বুকের মানিককে বুকে টেনে নিতে চাই। তিনি বলেন, যে মা তার সন্তানকে আল্লাহর হাতে সপে দেয়, সেই সন্তানকে আল্লাহতাআলা মায়ের বুক থেকে কেড়ে নেন না। সেলিনা হোসেন আরও বলেন, একমাত্র মা-ই বোঝেন সন্তান হারানোর কি যন্ত্রণা! এক বছরের বেশি সময় ধরে আমি চোখের পাতা এক করতে পারি না। সারাক্ষণ ছেলের স্মৃতি হাতড়াই। আল্লাহতাআলা হয়তো আমার দিকে মুখ ফিরিয়েছেন। এখন আমি ছেলেকে ফিরে পেতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার সন্তান আমার কোলে ফিরে আসবে।

তৃতীয় দেশকে সুবিধা দিতে ভারতের অনীহা by কাজী জেবেল

নৌ ট্রানজিট প্রটোকল সংশোধনীর খসড়ায় ভারত আপত্তি তুলে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। খসড়া প্রস্তাবটি বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ভারত এই আপত্তি তুলল। নতুন প্রস্তাবে ভারত নদীপথে ট্রানজিটের আওতায় তৃতীয় দেশে পণ্য চলাচলের বিধানটি বাতিলের সুপারিশ করেছে। এছাড়া অপারেশনাল মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ বাড়ানোর বিধানও বাদ দিয়ে ভারত নতুন খসড়া পাঠিয়েছে।
ভারত নৌ ট্রানজিট প্রটোকলের খসড়া নতুন করে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদী বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তিনি এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সই হবে। সফরকালেই আমরা বাণিজ্য চুক্তির আওতায় নৌ ট্রানজিট প্রটোকল সই করব। বাণিজ্য চুক্তির ভূমিকায় তৃতীয় দেশে পণ্য পরিবহনের কথা রয়েছে। ফলে নৌ ট্রানজিট প্রটোকলের ভূমিকাতেও আমরা সেটা উল্লেখ করেছি। বাণিজ্য চুক্তি থেকে নৌ ট্রানজিট প্রটোকলকে আলাদা করার সুযোগ নেই।’
ভারতের প্রস্তাব সম্পর্কে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, নৌ প্রটোকল ট্রানজিটে নতুনত্ব ছিল তৃতীয় দেশে পণ্য পরিবহনের সুবিধা দেয়ার বিষয়টি। এতে নৌপথের নাব্য সাপেক্ষে নেপাল ও ভুটান থেকে পাথর, কাঠসহ বিভিন্ন পণ্য কম খরচে পরিবহনের সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ভারতের ওই প্রস্তাব মেনে নিলে আমরা এসব সুবিধা পাব না। তিনি বলেন, সরকারের উচিত হবে রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি উপস্থাপন করা।
আগামী ৬ ও ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করবেন। এই সফরকালে নদীপথে ট্রানজিট প্রটোকলের সংশোধিত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা আছে। এ উপলক্ষে নৌপথে ট্রানজিট সংক্রান্ত প্রটোকলের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর ভারত তাদের আপত্তির কথা জানায়, যা নিয়ে সরকার বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। ভারতের নতুন প্রস্তাব গ্রহণ করতে হলে খসড়াটি আবার যাচাই-বাছাই (ভেটিং) এবং নতুন করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রয়োজন হবে বলে এ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যা সময়সাপেক্ষ বিষয়। ভারতের এই প্রস্তাব পাওয়ার পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দিয়েছে।
১৮ মে মন্ত্রিসভায় খসড়া প্রটোকল অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সংস্কার ও সমন্বয়) মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে বলেন, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনকে টার্গেট করে তৃতীয় দেশে পণ্য পরিবহনের বিষয়টি ট্রানজিট প্রটোকলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, এতে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চুক্তি, কনভেনশন কিংবা চর্চা প্রয়োগ করা এবং পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ট্রানজিট গ্যারন্টি দেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ভারতের দেয়া নতুন খসড়ায় পুরো এ বিষয়টি মুছে দিয়ে তাতে যে দেশের পণ্য পরিবহন করা হবে, তা ওই দেশের আইনে পণ্য চলাচলের বিধান প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। খসড়ায় বাংলাদেশের নদীপথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভারত বাংলাদেশকে বছরে ১০ কোটি টাকা দেয়ার বিধান রয়েছে। এই চার্জ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি সাপেক্ষে বাড়ানোর কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু ভারতের নতুন পরিবর্তিত খসড়ায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধির কথা মুছে ফেলা হয়েছে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন এসব পরিবর্তন সংবলিত নতুন খসড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে বিষয়টিতে বাংলাদেশের সম্মতি চেয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশন বলেছে, ভারতের মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের আগেই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মতামত পাওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে খসড়া অনুমোদনের পর তা পরিবর্তন করা সময়সাপেক্ষ। এছাড়া উভয় দেশ কর্তৃক চূড়ান্তকৃত বাণিজ্য চুক্তির (ট্রেড এগ্রিমেন্ট) সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই বিষয়টি ভারতকে জানিয়ে দেয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সোমবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নৌ ট্রানজিট প্রটোকলে কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব ভারত করেছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত প্রটোকলের খসড়ায় তৃতীয় দেশের অন্তর্ভুক্তির যে কথা বলা হয়েছে সেটা অবশ্যই প্রত্যাশিত। কেননা এতে করে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথে ট্রানজিট ও বাণিজ্য প্রটোকলের অধীনে ১৯৭২ সাল থেকেই ভারত ট্রানজিট সুবিধা ভোগ করছে। তিন বছর পরপর বাণিজ্য চুক্তি নবায়নের পাশাপাশি নদীপথে ট্রানজিট প্রটোকলও নবায়ন করতে হয়। এবার ওই প্রটোকলে সংশোধনীতে প্রতি চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পর কোনো পক্ষ আপত্তি না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই চুক্তি নবায়ন হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গাড়ি থামলেই মদের অফার by তোহুর আহমদ

মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে পাঁচটা। রাজধানীর বনানী বাজারের ফুলের দোকানগুলো ঘেঁষে একটি গাড়ি দাঁড়াতেই গাড়িটি ঘিরে ধরল কয়েকজন যুবক। গাড়ির কাচ নামতেই চালক ও পেছনের আরোহীর দিকে লেমিনেটিং করা একটি কাগজ বাড়িয়ে দিলেন তারা। কিন্তু ওই যুবকদের অনুমান ছিল ভুল। চালক ও আরোহী গাড়ি থেকে নেমে এসে উত্তেজিত ভঙ্গিতে যুবকদের বকাঝকা করতে শুরু করলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে অলিগলি দিয়ে মুহূর্তেই চম্পট দিল ওই যুবকরা।
বনানী বাজারের ব্যবসায়ীরা জানালেন, ওই ভদ্রলোক তার স্ত্রীকে নিয়ে এখানে বাজার করতে এসেছেন। কিন্তু এখানকার মদ ব্যবসায়ীরা তার কাছে মদ বিক্রির অফার দেয়। এ কারণে তিনি বিব্রত হয়ে চিৎকার করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, বনানীর প্রায় পুরো এলাকা মদ ব্যবসায়ীদের দখলে। এখানে অন্তত ৮০-৯০ জন হকার ভ্রাম্যমাণ মদের ব্যবসা করছে।
বান্ধবীদের চাহিদা দামী উপহার সামগ্রী। কিন্তু পড়ুয়া প্রেমিকরা তার জন্য অর্থসংস্থান করবে কোথায়? তাই বান্ধবীদের জন্য উপহার সামগ্রী কিনতে মদের বোতল পাচারের কাজে নেমে গ্রেফতার হয়েছে দুই তরুণ। এমনই ঘটনা ঘটেছে ভারতের উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে। আবগারী দফতরের পুলিশ স্যাটেলাইট বাস স্টেশন থেকে গতকাল মদের বোতল সহ গ্রেফতার করল দ্বাদশ শ্রেণীর দুই ছাত্রকে। গ্রেফতারকৃতদের নাম প্রজাপতি (২০) এবং রীতেশ (২০)। তারা হারু নাগলার বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, হরিয়ানা থেকে মদের বোতল এনে বেরিলিতে পাচার করত তারা। জেরায় দুই ছাত্র পুলিশকে জানিয়েছে, বান্ধবীদের দামী উপহার দিতেই তারা এই কাজ বেছে নিয়েছে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে আবগারী দফতরে আধিকারিকরা স্যাটেলাইট বাস স্টেশনে ফাঁদ পেতে ভারতে প্রস্তুত বিদেশী মদের ৩০ টি বোতল সহ তাদের হাতেনাতে পাকড়াও করেন। গ্রেফতার হওয়া দুই ছাত্র জানিয়েছে, আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে তারা এই পাচারের কাজ চালায়। বাকি দুই ছাত্রের খোঁজ করছে পুলিশ। তারা পার্শ্ববর্তী হরিয়ানা ও উত্তরাখণ্ড থেকে বেআইনি মদের বোতল এনে বেরিলিতে বিক্রি করে। উত্তরপ্রদেশে মদের ওপর আবগারী শুল্ক বেশি হওয়ায় পাশের দুই রাজ্য থেকে পাচার করে ভাল মুনাফা হত তাদের। গত এক বছর ধরে তারা এই কাজ করছে বলে জেরায় জানিয়েছে দুই ছাত্র। সূত্র: এবিপি আনন্দ

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর মদ ব্যবসার গডফাদার কবির ওরফে কবির দালাল বনানী এলাকায় একচেটিয়াভাবে মদের ব্যবসা করছে দীর্ঘদিন ধরে। তার সেকেন্ড ইন কমান্ডের নাম সেলিম ওরফে বাঞ্ছারাম। এই সিন্ডিকেটের উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হল- সুলতান, মোজাম্মেল, নান্নু, ফরিদ, আলম, দুলাল, বেলাল, ফারুক, মিজান, মোতাহার ও শাহেদ।
সূত্র জানায়, বনানীবাজার, ফুল মার্কেট, বনানী ১১ নম্বর রোড ও কামাল আতাতুর্ক এভিনিউসহ আশপাশের পুরো এলাকায় তারা ফেরি করে বিদেশী মদ ও বিয়ার বিক্রি করে। বিশেষ করে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই মদ সিন্ডিকেটের প্রধান টার্গেট। জানা গেছে, কবির ও বাঞ্ছারাম সিন্ডিকেটের অন্তত ২০ জন হকার কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মদ সাপ্লাই দেয়। সরবরাহ সুবিধার জন্য এ এলাকার কয়েকটি গলিতে চায়ের দোকানের আড়ালে তারা মদের গোডাউনও খুলেছে। জানা যায়, এই সিন্ডিকেট মূলত মোবাইল ফোনেই মদ-বিয়ারের বেচাকেনা করে বেশি। ফোন করার সঙ্গে সঙ্গেই চাহিদামতো মদের জোগান চলে যাসে।
বিষয়টি যাচাই করার জন্য বৃহস্পতিবার ৩ বোতল বিদেশী মদের চাহিদা জানিয়ে ফোন করা হয় সিন্ডিকেটের গডফাদার কবিরের মোবাইল ফোনে। তার সঙ্গে কথোপকথন অনেকটা এ রকম ছিল-
যুগান্তর প্রতিবেদক : কবির ভাই বলছেন?
কবির : কে?
যুগান্তর প্রতিবেদক : কবির ভাই, খিলক্ষেত থেকে মিজান (ছদ্মনাম) বলছি। বড় ভাই, তিনটা বোতল লাগত যে। গাড়ি কখন পাঠাব?
কবির : ও মিজান ভাই, চিনছি। অনেকদিন পর ফোন দিলেন যে, মাল কি অন্য জায়গা থাইক্যা নিতাছেন নাকি।
যুগান্তর প্রতিবেদক : নারে ভাই, আসলে দেশে আছিলাম না। এই তো কদিন হয় ফিরছি। এখন কন, গাড়ি কখন পাঠামু।
কবির : সন্ধ্যা সাতটার পর পাঠায়েন। ড্রাইভারকে আমার নাম্বার দিয়া কইয়া দেন বনানীবাজারে আইস্যা যেন একটা ফোন দেয়। আমার লোক গাড়িতে মাল তুইল্লা দিব।
যুগান্তর প্রতিবেদক : টাকা কত পাঠাব?
কবির : মাল কী কী নিবেন?
যুগান্তর প্রতিবেদক : এই ধরেন একটা ব্ল্যাক লেবেল হুইসকি, একটা রেড ওয়াইন আর কিছু বিদেশী বিয়ার দিয়েন।
কবির : ব্ল্যাক লেবেলের দাম পড়বে ৮ হাজার। রেড ওয়াইন ৫ হাজার টাকা। বিয়ারের দাম ৩৫০ কইর‌্যা দিয়েন।
এভাবেই মোবাইল ফোনে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বিদেশী মদ-বিয়ার বিক্রি করছে এই চক্র। ফলে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব থেকে।
তবে বনানী পুলিশের একটি সূত্র এই মদ সিন্ডিকেটের বিষয়ে আরও ভয়াবহ তথ্য দিয়েছে। বনানী থানার এক উপপরিদর্শক যুগান্তরকে বলেন, মদের বড় চালানসহ কবিরের লোকজনকে ধরা কঠিন। কারণ বড় চালান তারা মিয়ানমার দূতাবাসের গাড়িতে করে বহন করে। মদ পাচারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে মিয়ানমার দূতাবাসের দুটি গাড়িকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। এ দুটি গাড়ির নম্বর হল দ-৬৭-০২১ ও দ-৬৭-০১৯। এর একটি সবুজ লুসিডা ব্র্যান্ডের গাড়ি। অন্যটি সোনালি রংয়ের হানড্রেড কার। বনানী থানার ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দিনে অন্তত ১০ বার এ দুটি গাড়িতে মদ চোরাচালান হয়। কিন্তু দূতাবাসের গাড়ি হওয়ার কারণে পুলিশ এই দুটি গাড়িতে তল্লাশি চালাতে পারে না।
বনানী থানার আরেক পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, শুধু গাড়ি নয় কবির সিন্ডিকেটের মদ লুকিয়ে রাখার প্রধান জায়গা হচ্ছে বনানীতে অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাসের কর্মচারী আবাসিক এলাকা। বিশেষ করে ১, ৭ ও ৯ নম্বর রোডে বসবাসকারী অনেক মিয়ানমার নাগরিকের আবাসিক ফ্ল্যাটকে মদ রাখার গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদেশী নাগরিকদের বাড়িতে অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকার সুযোগে এই কৌশলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কবির সিন্ডিকেট।
সূত্র জানায়, ভোলা থেকে এসে প্রথমে রাজধানীতে রিকশা চালাতেন কবির। বনানী এলাকায় রিকশা চালানোর সময় তিনি এই মদ ব্যবসার সঙ্গে পরিচিত হন। একপর্যায়ে তিনি নিজেই এ এলাকায় মদ ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। কবিরের এই মদ ব্যবসা চলছে অন্তত ১৫ বছর ধরে। এই অবৈধ মদ ব্যবসা করেই কবির এখন কোটিপতি। এখন ঢাকায় তিনি বিলাসবহুল একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। হাল ফ্যাশনের দামি ব্র্যান্ডের গাড়িতে তিনি চলাফেরা করেন। মদ ব্যবসার সুবাদে সমাজের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলেও তার ওঠাবসা।
সূত্র জানায়, বর্তমানে কবিরের হয়ে এই ব্যবসার পুরোটাই দেখভাল করছে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড সেলিম ওরফে বাঞ্ছারাম। সে নিজেকে র‌্যাবের সোর্স বলে পরিচয় দেয়।
সম্প্রতি গুলশান থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার সহায়তায় গুলশান-২ এলাকার একটি হোটেলে যুগান্তরের এই প্রতিবেদক পরিচয় গোপন করে বাঞ্ছারামের সঙ্গে তার মদ ব্যবসার বিষয়ে কথা বলতে সক্ষম হয়। তার সঙ্গে আলোচনা ছিল অনেকটা এ রকম :
যুগান্তর প্রতিবেদক : আপনার ব্যবসা কেমন চলছে। ঝামেলা-টামেলা হয় না?
বাঞ্ছারাম : ঝামেলা তো আছেই। তবে টাকা দিলে সব ঠিক।
যুগান্তর প্রতিবেদক : প্রতি মাসে কত টাকা দিতে হয়।
বাঞ্ছারাম : ঠিক নাই। এই ধরেন কোনো মাসে ৩ লাখ দিই। আবার কোনো মাসে ৪ লাখও লাগে।
যুগান্তর প্রতিবেদক : এত টাকা? কারা এত টাকা নেয়?
বাঞ্ছারাম : টাকা নেয় অনেকেই। পুলিশ নেয়, র‌্যাব নেয়, নারকোটিক্সের লোকজন তো টাকা না পেলে পাগল হয়ে যায়। একেক ইন্সপেক্টর একেকবার আসে। সিপাই পাঠায়। টাকা না দিলে গ্রেফতারের ভয় দেখায়। বলে ব্যবসা বন্ধ কইর‌্যা দিব।
যুগান্তর প্রতিবেদক : কাকে কত দেন?
বাঞ্ছারাম : এই ধরেন, নারকোটিক্সের ইন্সপেক্টরকে দিই প্রতি মাসে ৭০ হাজার। বনানী থানায় দিতে হয় এক লাখ। সিআইডির এক এএসপি স্যারের ড্রাইভার প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। ডিবির টাকা তোলে এসআই এস কবির (সোলায়মান কবির) স্যার। তবে কবির স্যারের টাকার ঠিক নাই। টাকার দরকার হইলেই ফোন দেয়। তখন আমি ডিবিতে টাকা পৌঁছে দিয়ে আসি। এসবিতেও কিছু টাকা দিতে হয়।
যুগান্তর প্রতিবেদক : এভাবে ঘুষ দেয়ার পরও আপনাদের লাভ থাকে?
বাঞ্ছারাম : তেমন একটা লাভ থাকে না। এই ধরেন খায়াপইরা বাইচ্যা থাকা আর কী।
যুগান্তর প্রতিবেদক : মাসে বেচাকেনা এখন কেমন?
বাঞ্ছারাম : ভাই, আগে ব্যবসাটা ভালো ছিল। এই ধরেন সারাদিনে ২০ লাখ টাকারও বেচাকেনা হইছে। কিন্তু এখন ১০ লাখও নাই। আবার নানা লোকজন ঝামেলা করে। পুলিশের ভয় দেখায়।
যুগান্তর প্রতিবেদক : আপনারা কোথা থেকে মদ আনেন।
বাঞ্ছারাম : যেখানে সুবিধা পাই সেখান থেকেই আনি। তবে গুলশানের এসটিএল (এসটিএল ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস) ও গুলশান ১০৮ নম্বরের ইডিএস (ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সাভির্সেস) ওয়্যারহাউস থেকে মাল আনি বেশি।
বাঞ্ছারাম বলেন, মোট ১১টি সংস্থার লোকজনকে মাসোয়ারা দিতে হয়। এই মাসোয়ারা দিয়েই তারা ব্যবসা করে আসছেন। মাঝে মাঝে তাদের কিছুদিনের জন্য ব্যবসা বন্ধ রাখতে বলা হয়। তখন কিছুদিন তারা মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকেন। তখন ব্যবসা বন্ধ থাকে।

নারী লাঞ্ছনা- রাষ্ট্রের জবাবদিহি by সালমা খান

ঘরে-বাইরে কোথাও নারী নিরাপদ নয়। একের পর এক নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের ধরতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দ্বারাও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে নারী নিগ্রহ নিয়ে লিখেছেন নারী নেত্রী সালমা খান
পয়লা বৈশাখে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, যেখানে তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে প্রকাশ্যে নারী নিগ্রহের ঘটনাকে ধিক্কার দিয়ে অনেক সমালোচনার টেবিল মুখর হয়েছে, দেশব্যাপী নারী সংগঠনগুলো অব্যাহত প্রতিবাদ মিছিল ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধনের মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে দেশের বৃহত্তর সমাজে এর তেমন প্রভাব পড়ছে না। পুরুষশাসিত সমাজ যে এখেনা যৌন হয়রানি ও নারীর শ্লীলতাহানিকে ‘ছোট্ট একটু দুষ্টামি’ মনে করে তা আবার প্রমাণিত হলো যখন দেখি তথাকথিত কিছু পুরুষ পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাজধানীর জনবহুল এলাকা থেকে সন্ধ্যারাতে (রাত নয়টা) একজন তরুণীকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করতে দ্বিধা করে না। মাত্র দিন দশেক আগে নারায়ণগঞ্জে এক নারী পোশাককর্মী কাজের পর বাড়ি ফিরতে বাসে উঠে ক্লান্তিবশত একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হন। এর আগেও ময়মনসিংহ, সাভার ও মানিকগঞ্জে এ ধরনের ঘটনা ঘটে (সূত্র: প্রথম আলো)। সাধারণ নারীর নিরাপত্তাই যেখানে উদ্বেগের বিষয়, সে ক্ষেত্রে কর্মজীবী নারী, যাঁদের কাজ শেষে গণপরিবহন ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প নেই, তঁাদের জন্য রাষ্ট্র কি সুরক্ষা দেবে? উপর্যুপরি এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, অপরাধী ধরা না পড়ায় অথবা বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে অপরাধীরা কতখানি বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
পৃথিবীর সব সভ্য দেশে ট্যাক্সিসহ সব গণপরিবহনে ড্রাইভারের সিটের পেছনে গাড়ির নম্বর ও ড্রাইভারের ছবিসহ আইডি ঝুলিয়ে রাখার নিয়ম আছে, যাতে করে যাত্রী চালক ও পরিবহনটিকে শনাক্ত করতে পারে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির কাজ এটি এবং অবিলম্বে সব সরকারি, বেসরকারি বাস, সিএনজি ইত্যাদিতে এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া আইনত চালু করা হোক। এ ছাড়া প্রতি বাসস্ট্যান্ড ও সড়কসমূহের যেখানে কারখানা, দোকান ইত্যাদি অবস্থিত, সেখানে আলো জোরদারকরণ ও মধ্যরাত পর্যন্ত পুলিশি টহলের ব্যবস্থা করা হোক।
বিগত চার দশকে মানব উন্নয়ন সূচকে আমাদের অভাবনীয় উন্নতি যা একদিকে আমাদের দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং বাংলাদেশকে সহস্রাব্দ লক্ষ্যে পৌঁছাতেও সহায়ক হয়েছে, তার মূল চালিকা শক্তি এ দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নারীর উচ্চহারে অংশগ্রহণ। এই অর্জনের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে উজ্জ্বল উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয়।
বিবিএসের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের কলকারখানায় পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিক বেশি, বর্তমানে দেশে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫৭ জন, আর নারী শ্রমিকের সংখ্যা ২১ লাখ ১২ হাজার ৮৩০ জন। তা সত্ত্বেও শ্রমজীবী নারী ন্যূনতম নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। ঘরে–বাইরে কোথাও নারী নির্যাতনের সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। নারীর প্রতি সহিংসতা–সংক্রান্ত বিবিএস কর্তৃক প্রথম জাতীয় জরিপে (২০১৪) দেখা যায়, ৮৭ শতাংশ নারী নিজ গৃহে স্বামী দ্বারা মানসিক-শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তাই বলা যায় এ দেশের পুরুষেরা নারী নির্যাতনের প্রথম শিক্ষাটা পায় পারিবারিক প্রথা থেকে, যেটা পরবর্তী জীবনে সে ধারণ করে সামাজিক ও গণজীবনে।
সব দেশেই রকমভেদে নারী নির্যাতনের শিকার হয়, কিন্তু উন্নত বিশ্বে পরিবারে লিঙ্গ-সমতার সংস্কৃতি থাকায় বৃহত্তর জীবনে শিক্ষার মাধ্যমে পরিশীলিত একটি লিঙ্গসম্পর্ক নারী পুরুষের মধ্যে বিরাজ করে, যা নারী নির্যাতন হ্রাসে সহায়ক হয়। নারী নির্যাতন তখন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় পরিণত হয়। উপরন্তু আইন সেখানে প্রকৃতই নিজের গতিতে চলে—দল-মত-ব্যক্তিনির্বিশেষে অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে কর্তৃপক্ষ তৎপর থাকে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে আমাদের অচিরেই নারী নির্যাতন নিরসনের সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি উদারমনস্ক প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি হলো পরিশীলিত সমমর্যাদাভিত্তিক লিঙ্গসম্পর্ক। আমাদের পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতিচর্চা ও আইনি কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে প্রতি ক্ষেত্রে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
দেরিতে হলেও সম্প্রতি নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছুটা তৎপর হয়েছে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তির আওতায় আনতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী লাঞ্ছনার বিচার হয়েছে, পয়লা বৈশাখের ঘটনার কিছু অপরাধী শনাক্তকরণ হয়েছে, নারায়ণগঞ্জে বাসে পোশাককর্মীকে ধর্ষণকারী একজন গ্রেপ্তার হয়েছে।
আমরা আশা করব, পুলিশি তৎপরতায় মাইক্রোবাসে তরুণী ধর্ষণকারীদেরও অচিরে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। নারীর চলাফেরার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে ক্ষেত্রে আসুন, সব নারী-পুরুষ মিলে আমরা অব্যাহত গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করি এবং সমাজের প্রতি স্তরে নারীর মর্যাদা ও লিঙ্গ–সমতার সংস্কৃতি চালু করি।
সালমা খান: অর্থনীতিবিদ, নারী নেত্রী।

এক বাড়িতেই ছয় মায়ের আহাজারি by রোকনুজ্জামান পিয়াস ও ইসরাইল হোসেন বাবু

তাদের কত হাত-পায়ে পড়লাম। বললাম ছেলেকে ফেরত এনে দিতে। টাকা চাইলো তাও দিলাম। কিন্তু ছেলেকে ফেরত দিলো না। বলে তোর ছেলে কুমিরের পেটে। কুমিরের কাছে যা। নাহলে কোর্টে যা। কোর্টে মামলা করেছিস ছেলেকে ফেরত পেতে এখন আমার কাছে কি? এর বেশি বলতে পারলেন না নিখোঁজ আমিনুলের মা। শুধু কাঁদলেন, চোখের পানিতে ভাসালেন বুক। ১৭ বছরের আমিনুল সিরাজগঞ্জ উপজেলার বেলকুচি থানার আজুগড়া জামতৈল গ্রামের বৃদ্ধ আজিজুল হকের একমাত্র ছেলে। মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে আমিনুল ২০১৩ সালের ১লা নভেম্বর থেকে নিখোঁজ। তার সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছে আমিনুলের আরও ৫ পড়শী- ইসমাইল, হালিম, খোকন, আবদুল হাবিব, রশিদ। জামতৈল গ্রামের একই বাড়িতে সন্তানের জন্য আহাজারি করছে ৬ মা। শুধু তারা নয় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে একইপথ ধরে নিখোঁজ রয়েছেন ৩ শতাধিক মানুষ। তাদের কারও মা শয্যাশায়ী হয়েছেন। কারও স্ত্রী মুর্ছা যাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৪ হাজার মানুষ পাচার হয়েছে। যাদের মধ্যে প্রায় ৩শ’ নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নিখোজ রয়েছেন জেলার বেলকুচি ও এনায়েতপুর এলাকায়। গতকাল সরজমিনে বেলকুচি উপজেলা ও এনায়েতপুর থানার বেশ কয়েকটি গ্রামে গেলে চোখে পড়ে নিখোঁজদের পরিবারের করুণ চিত্র। প্রায় প্রত্যেক গ্রাম থেকেই কেউ না কেউ নিখোঁজ রয়েছেন।
আজুগড়া জামতৈল গ্রামের আজিজুল হকের ৬ সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে আমিনুল। ছেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই ঘর থেকে ছেলের ছবি এনে আমিনুলের মা চোখের পানি ফেলতে থাকেন। বলেন, কাউকে দেখলেই মনে হয় আমার আমিনুল। কেঁদে ওঠেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসের ১ তারিখে নিখোঁজ হয় সে। ৪ তারিখে ট্রলারে ওঠার পর ফোন করে। এ খবর শোনার পর এলাকার চিহ্নিত দালাল রেজাউলের কাছে গিয়ে জানতে চান। রেজাইল স্বীকার করে বলে তাকে ছাড়াতে টাকা লাগবে। তারা বিক্রি হয়ে গেছে। টাকাও দিয়েছেন কিন্তু ফেরত দেয়নি। এ সময় আমিনুলের বাড়িতে হাজির হন তার সঙ্গে সাগরে নিখোঁজ হওয়া আমিনুলের পাশের বাড়ির ইসমাইল, হালিম, আবদুল হাবিব, রশিদের মা-বাবা আর খোকনের মা-ভাই। সেখানে কান্নার রোল পড়ে। একসময় আশে-পাশের মানুষজন জড়ো হয়। তারা অঝোরে ছেড়ে দেয় চোখের পানি।  পুত্রশোকে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন আগে মারা গেছেন খোকনের বাবা হযরত। খোকনের ভাই জানান, যেদিন বাবা মারা যান সেদিনও দালালরা টাকা নিতে এসেছিল।  তারা জানান, আলী পরিচয় দিয়ে টেকনাফের এক দালাল ৬০ হাজার টাকাও নিয়েছে। আরও টাকা দাবি করেছিল। খোকনের ভাই আরও জানান,  যেদিন তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয় সেদিন সে বলেছিলে- আমরা এমন এক জায়গায় আছি যেখান থেকে পৃথিবীর কেউই তাদের ফিরিয়ে নিতে পারবে না। একই গ্রামের সাবেক মেম্বার করিম, তার ছেলে রেজাউল, আবদুল লতিফ ও রাজু জড়িত। সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসের স্ত্রী দৌলতপুর ইউপি চেয়ারম্যান আশানুর বিশ্বাসের কাছে অভিযোগ কোন ফল পাওয়া যায়নি। উপরন্তু কোর্টে মামলা করায় দালাল রেজাউল তাদের বলেছে, তোদের ছেলে এখন কুমিরের পেটে। তারা এও বলেছে কোর্টে কেস করেছিল। তোদের ছেলেকে কোর্টেই আছে। গিয়ে নিয়ে আয়।
উল্লেখ্য, দালাল রেজাউল পুলিশের অভিযানে আটক হলেও এক রাত থানায় রেখে ছেড়ে দেয়। নিখোঁজ ওই ৬ জনের পরিবার জানায়, পাশ্ববর্তী আজুগড়া গ্রামের সোবহানের ছেলে আবুল কালাম, আজমতের ছেলে ভাষা ও মান্নান দোকানির ছেলে জাকারিয়া একই সঙ্গে ট্রলারে উঠে নিখোঁজ হয়। এরমধ্যে পুত্র শোকে ঘটনার ১৯ দিনের ব্যবধানে মারা যান সোবহান। একই উপজেলার চরনিশিবয়ড়া গ্রামের নিখোঁজ হয়েছেন তাঁত শ্রমিক আবদুল করিম। তার স্ত্রী মিনা পারভীন বর্তমানে সন্তান সম্ভবা। মিনার বাবা জালাল উদ্দিন, কোরবানি ঈদের ৭ দিন পর নিখোঁজ হন তার মেয়ের স্বামী। এরপর থেকে প্রায়ই মেয়ে জ্ঞান হারান। তিনি আরও বলেন, জামাইয়ের সঙ্গে নাগগাতি গ্রামের একজন ও গাড়ামাসি গ্রামের দু’জন মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ট্রলারের উঠেছিল। বর্তমানে তারা থাইল্যান্ডের জেলে থাকলেও তার জামাইয়ের কোন খোঁজ নেই। উপরন্তু আদাচাকি গ্রামের সহোদর আলতাফ ও আজম দালাল ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছিল।
সরজমিনে দালাল আলতাফ হোসেনের গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ওই গ্রাম থেকেও ৪ জন নিখোঁজ হয়েছিল। যারা বর্তমানে থাইল্যান্ডের জেলে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এর মধ্যে তার আপন ভাইপো ডিনারও রয়েছে। নিখোঁজ অন্যরা হলেন, ওই গ্রামের আবু হেলাল, আবদুল আলিম ও আবদুল কাদের। জেলে থাকা অবস্থায় পরিবারের সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছে। এজন্য টেকনাফের একটি মোবাইল নম্বরে প্রতিবার ৫শ’ টাকা বিকাশ করতে হয় তাদের।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কড্ডা গ্রামের ইলিয়াছ হোসেন  দালালের খপ্পরে পড়ে একই পথে পা বাড়ায় ৭ মাস আগে। তার বাবা ফল ব্যবসায়ী তারা সেখ জানান, বেলকুচির চালা গ্রামের সানোয়ার দালালের মাধ্যমে তার ছেলে এ পথে গিয়েছে। ওই সময় ছেলের বউ অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। সম্প্রতি তিনি একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছেন। কিন্ত স্বামী ফিরে না আসায় মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। তারা আরও জানান, ইলিয়াসের মা ছেলের শোকে মাঝে-মধ্যে মাঝরাতে উঠে ছেলের খোঁজে ঘর থেকে বের হয়ে দৌড় মারেন। বিভিন্ন জায়গায় ছেলেকে খোঁজ করে বেড়ান। এ অবস্থায় তিনি এখন মৃত্যু শয্যায়।
এদিকে, বেলকুচি থানার চালাগ্রামে ব্যবসায়ী শরীফ উদ্দিন ও সিরাজগঞ্জ সদরের সারটিয়া গ্রামের আনোয়ারসহ আরও ১৪ জন সম্প্রতি মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য দালালদের সঙ্গে বের হয়। কিন্তু দালালরা তাদের ইন্দোনেশিয়ায় একটি জঙ্গলে তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ধরনের আরও কয়েকটি গ্রামে গিয়ে মিলেছে একই চিত্র। তবে এসব ঘটনায় বেলকুচিতে মাত্র ৩টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ২টিতে চার্জশিট হয়েছে। একটি রয়েছে তদন্তাধীন। এছাড়া কোর্টে মামলা হয়েছে আরও ২টি। অপরদিকে, পার্শ্ববর্তী এনায়েতপুর থানায় মামলাটি। যার মধ্যে ২টি চার্জশিট হয়েছে। বাকি ২টি পুলিশ ও একটি সিআইডি তদন্ত করছে।

ভোটকেন্দ্রে কথা বলতে পারবেন না সাংবাদিকরা -ইসির নির্দেশনা by সিরাজুস সালেকিন

পুলিশের বাধার পর এবার ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক প্রবেশে নানা শর্ত দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মাগুরার উপ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বুধবার রিটার্নিং অফিসারদের চিঠির মাধ্যমে সাংবাদিকদের প্রবেশের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের কথা বন্ধ ও কোন কিছু স্পর্শ না করাসহ ৯টি বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইসির জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক আরাফাত আরা স্বাক্ষরিত চিঠিতে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে সাংবাদিকদের এসব নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও এ নির্বাচনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে রিটার্নিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া প্রিজাইডিং অফিসারকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
ইসির চিঠিতে রিটার্নিং অফিসারের কাছে ৯টি শর্ত দিয়ে বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের পূর্বে প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া কোন ভোটকক্ষে প্রবেশ করা যাবে না, এক সঙ্গে ৫ জনের বেশি সাংবাদিক প্রবেশ করতে পারবেন না, ১০ মিনিটের বেশি কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারবেন না, ভোটকক্ষে নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ কারো  সঙ্গে আলাপ করতে পারবেন না, সাংবাদিকগণ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না, কোন প্রকার নির্বাচনী উপকরণ স্পর্শ বা অপসারণ করা থেকে বিরত থাকবেন,  প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন ধরনের কর্মকাণ্ড হতে বিরত থাকবেন; সংবিধান, নির্বাচনী আইন ও বিধিবিধান মেনে চলবেন, এবং সাংবাদিক পরিচয়পত্রের উল্টো পিঠের সকল নির্দেশনা মেনে চলবেন। এ নির্দেশনা জারির পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পত্রে বলা হয়েছে, রিটার্নিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া ভোটকেন্দ্রে কোন প্রিজাইডিং অফিসার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। এতে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচন কমিশন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় চাইলে অনেক কিছুই বলতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকদের নির্দেশনা দেয়া যুক্তিসঙ্গত হবে কি-না এটা চিন্তার বিষয়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের কাছে সহযোগিতা চাইতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে দেয়াটা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। তবে সাংবাদিকদের সুবিধার্থেই এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন  নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাংবাদিকদের সুবিধার্থেই একটি গাইড লাইন তৈরি করা হয়েছে। এটা কোন নীতিমালা বা নির্দেশনা নয়। বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো পুলিশ যাতে সাংবাদিকদের সমস্যা না করে সেই জন্য মাগুরা উপ-নির্বাচনে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা জানান, গত এপ্রিলে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অধিকাংশ কেন্দ্রে অনুমোদিত সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়া ও নাজেহালের ঘটনা ঘটে। সেসময় বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রে বাধা এসেছিল পুলিশের পক্ষ থেকে। প্রকৃত বিষয় উদঘাটনে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ইসি কর্মকর্তার সমন্বয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। উক্ত কমিটি প্রকৃত ঘটনা ও সুপারিশসহ ইসিতে প্রতিবেদন দেয়ার কথা রয়েছে। সিটি নির্বাচনে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা ও নাজেহালের ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটনের আগেই স্বয়ং নির্বাচন কমিশনই ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশে এ কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করলো। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের কাজটিকে আরো জটিল করলো ইসি। আগামী ৩০শে মে মাগুরা-১ উপ-নির্বাচনেই নতুন এ নির্দেশনা চালু করা হচ্ছে। সিটি নির্বাচনে নানা ধরনের অনিয়মে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সাংবাদিকদের ওপরই এমন তৎপরতা দেখাচ্ছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। আর এ তৎপরতায় ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ভোটাররা  অনুৎসাহিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বলেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বলা হতে পারে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসার প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশন নিজেরাই একটা ফল তৈরি করে ঘোষণা দিতে পারে।  এরকম কিছু হলে আমরা অবাক হব না।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা দৃশ্যমান রাখতে সাংবাদিকদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। সাংবাদিকরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং কেন্দ্রে তাদের প্রবেশে কোন বাধা দেওা যাবে না। প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহের স্বার্থে তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন।

২৫শে মার্চেই ইন্দিরা সীমান্ত খোলার নির্দেশ দেন by প্রণব মুখার্জি

সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’-এর অবিকল তরজমা...
(পঞ্চম কিস্তি)
জেনারেল ইয়াহিয়া খান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসন এবং প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলির নির্বাচন ঘোষণা করলেন। জনসংখ্যার আঞ্চলিক অনুপাতে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬২ আসন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের। বাকি ১৩৮ আসন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করলো। তারা প্রাদেশিক নির্বাচনেও ভাল করলো, পূর্ব পাকিস্তানের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পেল।
সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের শর্ত পূরণ করতে হলে মুজিবুরকেই সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে হয়। কিন্তু ওই যুক্তি বাস্তবে কঠোর বিরোধিতার সম্মুখীন হলো। ইয়াহিয়া খান যদিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করবেন। পাকিস্তানি রাজনীতির গতিপ্রকৃতি, সেনাবাহিনীর সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ এবং দৃঢ় কায়েমি স্বার্থ (সেনাবাহিনী, শিল্পপতি এবং উচ্চপর্যায়ের আমলাতন্ত্রের) রক্ষার কারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে দেয়া হয়নি। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি পশ্চিম পাকিস্তানের ৮০ ভাগের বেশি আসন লাভ করেছেন, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ও পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভকারী বৃহত্তম দলের মধ্যে প্যারিটি বা সমতা চাইলেন। আর এভাবেই গণতন্ত্রের পয়লা শর্ত অগ্রাহ্য হলো। ১৯৭১ সালের ২৭শে জানুয়ারি ভুট্টো এই প্রস্তাব নিয়ে ঢাকায় এলেন। এবং মুজিবের সঙ্গে পরবর্তী তিন ধরে এক আলোচনায় বসলেন। আলোচনা ব্যর্থ হলো। ভুট্টো তখন দাবি করলেন যে, পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট উভয় অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে পৃথকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। তার মানে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানে পিপিপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। মুজিবুর রহমান এই প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলে বাতিল করে দিলেন। ইয়াহিয়া খান ভুট্টো এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বাঙালিবিরোধী শক্তিশালী লবির চাপে ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দিলেন।  এবং ওই অধিবেশন স্থগিত করতে না করতেই পূর্ব পাকিস্তান প্রতিবাদে ফেটে পড়ল।
৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য আবেদন জানালেন: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রাম।... তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর। আমরা অনেক রক্ত দিয়েছি এবং আরো দেব। আমরা স্বাধীন হব ইনশাআল্লাহ।’
 ৭ই মার্চ থেকে মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সরকারের সঙ্গে পূর্ণ অসহযোগিতার ডাক দিল। ৭ থেকে ২৫শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত দুটি সরকার ছিল। আইনগতভাবে একটি ‘ডি জুরে’ সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াহিয়া খান। আর ডি ফ্যাক্টো বা কার্যত সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন মুজিবুর রহমান। এবারে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর মতোই অচলাবস্থা নিরসনে মুজিবুর রহমানর সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকা সফরে গেলেন। কিন্তু সামরিক জান্তা, যারা পাকিস্তানি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র, মুজিবুর রহমানের দাবি মেনে  নিতে তাদের কোন ইচ্ছাই ছিল না। আলোচনার নামে ১৬ থেকে ২৪শে মার্চ সময়ের মধ্যে তারা সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও গোলাবারুদ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনার কাজে ব্যয় করল।
জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ ঘোষণা দিলেন যে, মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। ওই রাত নয়টা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর হামলা চালালো। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তর এবং রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তরে আক্রমণ করল। মুজিবুর রহমান তার আসন্ন গ্রেপ্তার আঁচ করতে পেরে একই রাতে ঘোষণা দিলেন যে:
‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাই, আপনারা যে যেখানেই থাকুন সর্বশক্তি শক্তি দিয়ে দখলদার বাহিনীকে প্রতিহত করুন। বাংলাদেশের মাটি থেকে দখলদার সেনাবাহিনীর শেষ সৈনিককে বহিষ্কার এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনারা যুদ্ধ চালিয়ে নেবেন।’
এই ঘোষণা বেতার, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে দেয়া হলো। ২৫-২৬ মার্চের রাত দেড়টায় মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলো এবং তাকে ঢাকার সেনা সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে তাকে নিয়ে যাওয়ার আগের তিনদিন তাকে সেখানেই অন্তরীণ রাখা হয়। ইয়াহিয়া খান ২৬শে মার্চে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মুজিবের নিন্দা করেন।
১০ই এপ্রিলে মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে (অনুপস্থিতিতে) একটি প্রবাসী সরকার ঘোষণা করা হলো। এবং পূর্ব পাকিস্তানের কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (পরে এটি মুজিবনগর হিসেবে পরিচিত হয়) ১৭ই এপ্রিল বিপ্লবী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হলো। ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
পরবর্তী মাসগুলোতে রক্তপিপাসুদের নৃশংসতা, গণহত্যা, নির্বিচারে ধর্ষণ চলল, যার পরিণতিতে প্রথমে এক কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেন এবং তারা সংলগ্ন ভারতীয় ভূখণ্ডে আশ্রয় নিলেন এবং পরে তা একটি বীরোচিত, একটি সফল, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে রূপ নিল। পাক-ভারত ১৩ দিনের যুদ্ধের পরে পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজি ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ৯১ হাজারের বেশি কর্মকর্তা ও সৈন্যসহ ভারত-বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।
আমাদের অনেকেই তখনকার ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। লক্ষ লক্ষ গৃহহীন মানুষ প্রতিবেশী ভারতের রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিতে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন, আর তাদের অসহায়ত্ব এবং বহুমুখী দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার শিকার হওয়া আমাদের জনগণের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে।
পূর্ববঙ্গের পরিস্থিতিতে  ভারতের প্রতিক্রিয়া হওয়ার বহুবিধ বিষয় ছিল, যার মধ্যে কেবল ১৯৭১ সালের মার্চের সাধারণ নির্বাচনে ‘ইন্দিরা ঢেউ’ এর কারণে ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত আলোচিত বিজয় ছিল না।
 ‘নেহরুর আমল থেকে দলের অভ্যন্তরে এবং বিরোধী দলের অবাধ্য ব্যক্তিদের মোকাবিলা করতে এরকম একজন শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী আর দেখা যায়নি এবং ক্ষমতার বলয় বিশেষ করে ১৯৭১ সালের আঞ্চলিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে বিদেশ নীতিতে করণীয় নির্ধারণে মিসেস গান্ধী তার পিতার মতোই একজন সুদক্ষ এবং খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম নেতার পরিচয় দেন’ ( রিচার্ড সিসন ও লি রোজ, ওয়ার এন্ড সেসেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া এন্ড দি ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, নিউ দিল্লি, ১৯৯০)।
উপরন্তু মানবাধিকার রক্ষায় পাশে দাঁড়াতে ভারতের ইতিহাস ছিল। ১৯৪৯ সালের গোড়াতেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরু ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘যেখানে স্বাধীনতা বিপন্ন কিংবা বিচার হুমকির মুখে কিংবা যেখানে আগ্রাসন জায়গা করে নিয়েছে, সেখানে আমরা নিরপেক্ষ থাকতে পারি না এবং পারব না।’ ইন্দিরা গান্ধী সেই পথ অনুসরণ করলেন এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভারতের সমর্থনের হস্ত প্রসারিত করার মধ্য দিয়ে তিনি বিনা দ্বিধায় পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরুর দর্শনকে বাস্তবে রূপায়ণ করলেন।
অন্য যে কারণটি বেশি জরুরি ছিল তা হল পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুর আশ্রয় গ্রহণ করা।
‘ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হিসেব নিকেশে  অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখাটা বড় হয়ে উঠল। ... উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে লাখ লাখ মানুষের আশ্রয় দান তাদের শিবিরগুলো নির্মাণ ও তার রক্ষণাবেক্ষণের সরকারি প্রাক্কলন ভারতের সম্পদের তুলনায় ছিল অতি বৃহৎ। কারণ তা উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দে এবং দেশের কষ্টার্জিত উদ্বৃত্ত গমের প্রতি তা একটা বিরাট হুমকি সৃষ্টি করেছিল।’ (রিচার্ড সিসন ও লি রোজ, ওয়ার এন্ড সেসেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া এন্ড দি ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, নিউ দিল্লি, ১৯৯০)
তবে অর্থনৈতিক ফ্যাক্টর ভারতের একমাত্র উদ্বেগের কারণ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে ভারত সরকারের জন্য ভিন্ন ধরনের একটি সমস্যার উদ্ভব ঘটিয়েছিল। উভয় রাজ্যে বিশেষ করে ত্রিপুরায় আকস্মিকভাবে বিশ থেকে ত্রিশ লাখ উদ্বাস্তু প্রবেশ করার ফলে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ জটিল উপজাতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার  স্থিতি হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ এর ফলে উপজাতি ও অ-উপজাতীয় যে জনসংখ্যা রাজ্যে ছিল, তা এখন উপজাতিদের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। আর এটাই তুলনামূলক শান্ত এলাকায় নতুন ইস্যু ও সমস্যার উদ্ভব ঘটার শংকা তৈরি করে। (রিচার্ড সিসন ও লি রোজ, প্রাগুক্ত)
ইন্দিরা গান্ধী আগ্রহের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ২৫শে মার্চে তিনি এক আদেশ জারি করেন যে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত খুলে রাখতে হবে, যাতে উদ্বাস্তুরা নিরাপদে ভারতে প্রবেশ করতে পারেন। কেবল তাই নয়, তিনি আরও গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের ভারতে বরণ করা হবে এবং তাদের নিরাপত্তা দেয়া হবে। ৩০শে মার্চে ইন্দিরা গান্ধী উভয় কক্ষে পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতির উপর একটি রেজুলেশন উত্থাপন করেন এবং সেখানে তিনি ভারত সরকারের ভূমিকা কি হবে সে বিষয়ে একটি রূপরেখা দেন।
(সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’ এর অবিকল তরজমা)

‘ইকো ফিশ’ প্রকল্প- ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুন

মৎস্য অধিদপ্তরের নেওয়া ‘ইকো ফিশ’ নামের প্রকল্পটি সুবিবেচনাপ্রসূত, দূরদর্শী ও আশাব্যঞ্জক। তবে আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো, অনেক ভালো উদ্যোগ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয় না। সুষ্ঠু বাস্তবায়নের অভাবে সরকারের অনেক ভালো প্রকল্প স্রেফ অর্থ অপচয়ের কারণ ঘটায়—এমন উদাহরণ অনেক রয়েছে। ‘ইকো ফিশ’ প্রকল্পের পরিণতি যেন সে রকম না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই প্রথম কাজ।
প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে দেশের উপকূলীয় আটটি জেলার নদনদীতে ইলিশ মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ইলিশের বংশবিস্তার ও প্রজননকাল নির্ধারণসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের নানা দিক নিয়ে গবেষণা করা হবে। একই সঙ্গে জাটকা ধরার নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে ব্যয় করা হবে ৯০ কোটি টাকা, যা দেবে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি)। এই অর্থ যেন সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়, যেন কেউ নয়ছয় করার সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ইলিশের পোনা ও অন্যান্য মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। বছরের আট মাস দীর্ঘ সময়; এটা যুক্তিপূর্ণ কি না, সে ব্যাপারে এ পর্যন্ত গবেষণা হয়নি। গবেষণা করে দেখা উচিত এই সময় কমানোর সুযোগ রয়েছে কি না।
নিষেধাজ্ঞার এই দীর্ঘ সময়জুড়ে দরিদ্র জেলেদের আয়-রোজগারের কী ব্যবস্থা হবে, তা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দারিদ্র্যের কারণেই জেলেরা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জাটকা ধরেন; এটা বন্ধ করতে হলে তাঁদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে হবে, শুধু চার মাস প্রতি জেলে পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া যথেষ্ট নয়। জেলেদের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ-সহায়তার খবর নিঃসন্দেহে ভালো প্রস্তাব। তবে জেলেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে আরও কিছু করণীয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমরা এই প্রকল্পের সাফল্য কামনা করি।
ইলিশ রক্ষায় উপকূলে নতুন প্রকল্প ‘ইকো ফিশ’ by এম জসীম উদ্দীন
আপডেট: মে ২৬, ২০১৫ # উপকূলের নদ-নদীতে ইলিশ মাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দেশের আট জেলায় ‘ইকো ফিশ’ নামে এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। এর আওতায় দেশে প্রথমবারের মতো ইলিশের বংশবিস্তার ও প্রজননকাল নির্ধারণসহ নানা দিক নিয়ে গবেষণা করা হবে। পাশাপাশি জাটকা ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আটটি জেলা হলো বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর। মোট ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ১ মার্চ। এতে মৎস্য অধিদপ্তরকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ফিশ’। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় এলাকায় মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে নানামুখী কাজ করছে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গবেষক ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়েরএকদল বিশেষজ্ঞ ২১ দিনের একটি প্রশিক্ষণ দেবেন।
সংশ্লিষ্ট জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তদারকিতে মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কার্যক্রম চলবে। প্রতিটি জেলায় ওয়ার্ল্ড ফিশের একজন বিজ্ঞানী ও তিনজন সহযোগী বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে একটি দল প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করবেন। ইতিমধ্যে আট জেলায় জেলেদের জরিপকাজ শুরু হয়েছে। বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বঙ্কিম চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ইকো ফিশ প্রকল্পের আওতায় জেলে অধ্যুষিত বিভিন্ন গ্রাম ভাগ করে সেগুলোতে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মূল প্রকল্পের কাজ শুরু হতে আরও কয়েক মাস  লাগবে।
ওয়ার্ল্ড ফিশের গবেষকেরা জানান, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশের বংশবিস্তার ও প্রজনন সময়কাল নিয়ে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো গবেষণা হয়নি। এই প্রকল্পের আওতায় ইলিশের জীবনপ্রণালি ও অন্য বিষয় নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ ছাড়া নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার রোধে কী কী করণীয়, তা-ও চিহ্নিত করা হবে। কারণ উপকূলে চিংড়ি ও অন্য মাছ ধরার জন্য যেসব ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহৃত হয়, তাতে ইলিশের পাশাপাশি অন্য মাছ, শুশুক, বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী ও জলজ উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ প্রকল্প উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদীতে ইলিশের পাশাপাশি অন্য জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকাসহ অন্য ছোট মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই সময়ে সরকার চার মাস পর পর জেলেদের প্রতি পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি চাল সহায়তা দেয়। কিন্তু অর্ধেকেরও কম জেলে এই সহায়তা পান। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় সহায়তা পাওয়া জেলেরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটান। এসব বিবেচনায় নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তর জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে সংশিষ্ট জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দেবে।
প্রকল্পসংশিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, জেলে ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ২৫ সদস্যের দল গঠন করে তাঁদের ক্ষুদ্র পেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। খাঁচায় মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি-গবাদি পশু পালন, সবজি চাষ, কুটিরশিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা থাকবে প্রকল্পের আওতায়।
‘ইকো ফিশ’ প্রকল্পের কেন্দ্রীয় দলনেতা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন আবদুল ওহাব গত রোববার বলেন, ‘এই প্রকল্পের আওতায় উপকূলের ইলিশ মাছ অতিমাত্রায় আহরণ থেকে রক্ষা পাবে এবং বড় হওয়ার সুযোগ পাবে। ইলিশ মাছের পাশাপাশি অন্য মাছ ও জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। পাশাপাশি জেলেদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখাও এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

মাইরুনা আইএসে যোগ দিতে তুরস্ক গিয়েছিল by দীন ইসলাম

মাইরুনা ফারহিন। ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশী তরুণী। বাবা ডা. শামসুদ্দিন মোহাম্মদ ইসহাক ও মা তিনা ফারজানার সঙ্গে বাস করে রাজধানীর ধানমন্ডিতে। গত ৪ঠা মে বাবা-মাকে না জানিয়ে হঠাৎ করেই তুরস্কের উদ্দেশে টার্কিশ এয়ারলাইনস যোগে ঢাকা ত্যাগ করে এ তরুণী। তুরস্কের পার্শ্ববর্তী দেশ সিরিয়া বা ইরাকে ইসলামিক স্টেটে (আইএস)  যোগ দিতেই তুরস্ক যায় সে। মেয়ের এমন মনোভাব সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা ছিল বাবা-মায়ের। তাই ওই তরুণী নিখোঁজ হওয়ার পরপরই তুরস্কের বাংলাদেশ দূতাবাসের সাহায্য চান তারা। এরপর বাংলাদেশ দূতাবাস অতি জরুরি ভিত্তিতে একটি কূটনৈতিক নোট ভারবালের মাধ্যমে বিষয়টি তুরস্ক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়। সঙ্গে ওই তরুণীর পাসপোর্টের কপি ও একটি ছবি যুক্ত করে দেয়া হয়। তুরস্কের ন্যাশনাল পুলিশের ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট মাইরুনা ফারহিনকে দ্রুত শনাক্ত করে তাকে তুরস্কে প্রবেশের অনুমতি দানে বিরত থাকে। কামাল আতাতুর্ক বিমানবন্দর থেকেই ৫ই মে’র ফিরতি ফ্লাইটে তাকে ফেরত পাঠানো হয় ঢাকায়।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মনজুরুল করিম খান চৌধুরী এ বিষয়ে মুঠোফোনে মানবজমিনকে জানান, ওই তরুণী হয়তো কোন চরমপন্থি গ্রুপে যোগ দিতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল তুরস্ক কর্তৃপক্ষ। এ কারণে তাকে পরবর্তী ফ্লাইটে ফেরত পাঠিয়েছেন তারা। পরিবারকে না জানিয়ে তুরস্কে আসার কারণেই তার বিষয়ে চিঠি দেয়া হয়। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তুরস্ক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কনস্যুলার শাখার মহাপরিচালক, সাউথ এশিয়া বিভাগের উপ-মহাপরিচালক ও আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন বরাবরে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘এটা খুবই আতঙ্কের বিষয় যে, ওই তরুণী তুরস্কের প্রতিবেশী কোন দেশের চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে যোগ দিতে সেখানে গিয়েছে।’ এতে বলা হয়, বাংলাদেশী টিএনএজার তরুণী মাইরুনা ফারহিন (বাংলাদেশী পাসপোর্ট নং- এএফ ৮৮০০০৩৬০) ৪ঠা মে, সোমবার টার্কিশ এয়ারলাইন্সযোগে ঢাকা থেকে তুরস্কের পথে রওনা দিয়েছে। সে তার পরিবারকে কিছু না জানিয়েই তুরস্কের উদ্দেশে রওনা দেয়। তার পাসপোর্টের কপি ও একটি রঙিন ছবি এর সঙ্গে যোগ করে দেয়া হলো। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এয়ারপোর্ট থেকে ওই তরুণীকে আটকের পর পরবর্তী ফ্লাইটে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভাল হয়। এ বিষয়ে ইস্তাম্বুলে কনসাল জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তার নাম ও ফোন নম্বর উল্লেখ করে দেয়া হয়। ওই তরুণীর পাসপোর্টের কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার জন্ম ১৯৯৬ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি। ২০১৩ সালের ২৯শে জুলাই পাসপোর্টটি নিয়েছে। জরুরি যোগাযোগের জায়গায় তরুণীর পিতার নাম লেখা রয়েছে। সঙ্গে একটি মোবাইল ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে। ওই নম্বরে বারবার যোগাযোগ করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।