Tuesday, August 27, 2024

শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সমস্যা সহজে কাটছে না by আহমেদ হুসাঈন

বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনার সরকারকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে গেছে ভারত। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার, অপশাসন, খুন-গুমের মতো নানা অপরাধ-অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও ভারত তার অবস্থান বদল করেনি। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারতে চলে যাওয়ার পর নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বিচারের জন্য হাসিনাকে বাংলাদেশ ফেরত চাইলে তারা কী অবস্থান নেবে, সেটাও অস্পষ্ট। তাঁর লাল পাসপোর্ট বাতিল হওয়ার পর তাঁকে ভারত কীভাবে আশ্রয় দেবে, সেটা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এসব নিয়ে আজ ২৫ আগস্ট ভারতের দ্য ওয়্যার-এ লিখেছেন বাংলাদেশি লেখক ও সাংবাদিক আহমেদ হুসাঈন

শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনকে দেড় দশক ধরে অন্ধভাবে সমর্থন জুগিয়ে গেছে ভারত। ছাত্র–জনতার টানা আন্দোলনের মুখে শেষমেশ ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে সামরিক কার্গো উড়োজাহাজে করে সেই ভারতেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। এর আগে মাত্র ২০ দিনে ৫৪২ জনের প্রাণহানি (এখন পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ৭৫৭) হয়েছে।

বছরের পর বছর ‘সাউথ ব্লক’ হাসিনার রাজনৈতিকভাবে দুর্নীতিপরায়ণ সরকারের ব্যাপারে অন্ধ হয়ে থেকেছে। এটি তার (ভারতের) ঘনিষ্ঠ মিত্র এই সরকারকে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করতে সহায়তা করেছে, যা আনুমানিক ১৫০ বিলিয়ন (১৫ হাজার কোটি) ডলার বা ১৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি (১ ডলার=১১৮ টাকা হিসাবে) টাকা। এই অর্থ বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের দ্বিগুণ।

বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে নিয়ে নিজ অবস্থান বদলাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে ভারত, বিশেষ করে গত কয়েক বছরে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে নরেন্দ্র মোদির সরকার কখনোই বাংলাদেশ বা এর জনগণকে বন্ধু বানানোর চেষ্টা করেনি। এর পরিবর্তে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের জন্য ভারত তার সুনাম ও উজ্জ্বল জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে ঝুঁকি নিতে তৈরি থেকেছে।

হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যাতে হাসিনাকে স্বস্তি পাওয়ার কিছুটা জায়গা করে দেয়, সে জন্য ভারতের লবি ওয়াশিংটনের কাছে তদবির করে। ওই সময় দিল্লি ওয়াশিংটনকে বলেছিল, ‘আমাদের মধ্যে (ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র) কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে কোনো না কোনো ঐকমত্য না হলে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) আমাদের (ভারত) কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পাবে না।’

গত ১৯ জুলাই বাংলাদেশে ৭৫ জন নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগের মৃত্যু হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এ ঘটনাকে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে আখ্যায়িত করেন। গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনকে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেন। অথচ এ ঘটনার এক দিন পর পার্লামেন্টে জয়শঙ্কর তাঁর দেওয়া বক্তৃতায় দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঘনিষ্ঠতম এই মিত্রের (হাসিনা) বিরুদ্ধে কেন নিকটতম প্রতিবেশী দেশটির জনগণ ফুঁসে উঠলেন, তা তুলে ধরতে ব্যর্থ হন।

এদিকে হাসিনার পতনের নেপথ্যে থাকা ঘটনা অনুসন্ধান না করে ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যম এর পেছনে পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার দিকে সন্দেহের তির ছোড়ে। এটা নিশ্চিতভাবেই হাস্যকর যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও উভয় দেশ ছোট্ট বাংলাদেশের মিত্র বলে পরিচিত। আবার হাসিনা সরকারের পতনে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার কথাও হাস্যকর। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপিতে পাকিস্তান ও ভারত—দুই দেশকেই ছাড়িয়ে যায়।

এমনকি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে হাসিনাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা নিয়েও অতিরঞ্জিত কথাবার্তা ছড়ায় ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম।

ওই সব গণমাধ্যমের মতো ভারতের ক্ষমতাসীনেরাও হাসিনাকে দিল্লিতে থাকতে দেওয়া কেন বোঝাস্বরূপ, সেটি বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ক্ষমতাচ্যুত এই স্বৈরশাসক এখন বেশ কিছু অভিযোগের মুখোমুখি। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের হিসাবে, কোটা সংস্কারকে ঘিরে সৃষ্ট বিক্ষোভে ৩২ শিশু নিহত হয়েছে। সবচেয়ে ছোট যে শিশুটি প্রাণ হারিয়েছে, তার বয়স পাঁচ বছরও হয়নি। এই শিশুদের একজন রিয়া গোপ। বাড়ির ছাদে খেলার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় শিশুটি। এমন সব অমানবিক ঘটনার জন্য যে ব্যক্তির নির্দেশনা দায়ী থাকার বিষয়টি অনস্বীকার্য, তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন করা বা তাঁকে আশ্রয় দেওয়া অসম্ভব।

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দৃশ্যত ভালো নয়। বছরের পর বছর হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে আসায় এখন আওয়ামী লীগ থেকে ভারতকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য কঠিন। উদাহরণ হিসেবে হাসিনার পতনের কয়েক ঘণ্টা পর ঢাকায় ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা উল্লেখ করা যায়।

হাসিনাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতে থাকতে দেওয়া হলে তা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে আরও বাধার সৃষ্টি করতে পারে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি যখন চূড়ান্ত, তখন তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানাতে পারে বাংলাদেশের নতুন সরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। হাসিনাকে তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় বিচারের সম্মুখীন করতে বাংলাদেশ চুক্তির আওতায় ফেরত চাইতে পারে। মামলাগুলোর ৫৬টি হত্যা মামলা। আবার বাংলাদেশ সরকারের তরফে হাসিনার পাসপোর্ট বাতিল করার বিষয়টি পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। ভারতে পালানোর সময় এ পাসপোর্টই ব্যবহার করেন তিনি। এটি হাসিনার দিল্লিতে অবস্থানকে জটিলতর করেছে।

হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিলে বাংলাদেশের তরুণদের কাছে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির ঝুঁকিও রয়েছে। তাতে লাখ লাখ তরুণ চীনের দিকে ঝুঁকবেন। এ বিশৃঙ্খলা স্পষ্টত ভারতের অদক্ষ ও নিষ্ক্রিয় আমলাতন্ত্র নিজের ঘাড়ে চাপিয়েছে।

এ থেকে উত্তরণে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণকে মেনে নেওয়া। বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ করার এখনই উপযুক্ত সময়। একই সঙ্গে ভারতকে তার পুরোনো মিত্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বাছাই করতে হবে বাংলাদেশে নতুন মিত্রকে। এ–ও উপলব্ধি করতে হবে যে বাংলাদেশ নিয়ে তার (ভারতের) পুরোনো নীতি ব্যর্থ হয়েছে এবং পুরোনো মিত্র জনগণের কাছে এখন মূল্যহীন।

বাংলাদেশকে ভারত যেভাবে দেখে থাকে, তাতেও বদল আনা দরকার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা করা দুই দেশের ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ৫৩ বছর আগের এ সহায়তা বাংলাদেশকে চিরঋণী মনে করার জন্য যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অর্ধেককে স্বাধীন করেছে। তাই বলে ইউরোপ দেশটির কোনো উপনিবেশ নয়। আবার ফ্রান্স, ইতালি বা জার্মানির গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টাও চালায় না ওয়াশিংটন। ভারত যদি আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে চায়, তবে এর পররাষ্ট্রনীতির নির্ধারকদের এক ব্যক্তির মতো কাজ করতে হবে।

সবশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ভারতের শত্রু নয়। সমস্যা ভারতের নেতাদের।

ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ পাল্টাপাল্টি হামলা: এখন কী হতে পারে

প্রথম আলোঃ ইসরায়েলে বড় পরিসরে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। ইসরায়েলের দাবি, এমন তথ্য পেয়েই গত রোববার ভোররাতে আগেভাগে তারা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর অবস্থানে হামলা চালায়।

লেবাননে ইসরায়েলের এই হামলার পর জবাব দিতে সময় নেয়নি হিজবুল্লাহ। তারা রোববার সকালে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনা নিশানা করে তিন শতাধিক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।

হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, গত জুলাইয়ের শেষ দিকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা চালিয়ে তাঁর সংগঠনের কমান্ডার ফুয়াদ শোকরকে হত্যা করে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল সীমা অতিক্রম করেছে। শোকর হত্যার বদলা নিতে ইসরায়েলে হামলার আদেশ দেওয়া হয়।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস। জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী।

৮ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

হিজবুল্লাহ বলেছে, গাজা যুদ্ধ থেকে ইসরায়েল সরে না আসা পর্যন্ত তাদের এমন হামলা বন্ধ হবে না।

এর মধ্যে গত রোববার দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল।

বিষয়টি নিয়ে আল-জাজিরার পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। উত্তরগুলো জেনে নেওয়া যাক।

হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডার ধ্বংসের দাবি

ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডারে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ রকেট থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

গত অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা নিশানা করে প্রায় ৮ হাজার রকেট ছুড়েছে হিজবুল্লাহ।

ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর হাজারো রকেট ধ্বংস করে দিয়েছে।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, ইসরায়েলের ১১টি সামরিক ঘাঁটি নিশানা করে তারা প্রায় ৩৪০টি কাতিউশা রকেট ছুড়েছে।

হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, ইসরায়েল দাবি করে, এ অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আছে। কিন্তু ইসরায়েলের দাবি মিথ্যা। হিজবুল্লাহর হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের দুর্বলতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে গেছে।

বৈরুতের লেবানিজ-আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইমাদ সালামি বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ইসরায়েলের দাবি অতিরঞ্জন হতে পারে। কেননা, ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের উল্লেখযোগ্যভাবে হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, তবে এত এত রকেট ধ্বংসের দাবি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডার দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিষয়টি হিজবুল্লাহর দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের সক্ষমতাকে সীমিত করে দিতে পারে।

এটা কি সর্বাত্মক যুদ্ধ

না। এটা ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ নয়।

গত ৮ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৯৭ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা অন্তত ৫৬৬। এর মধ্যে ১৩৩ জন বেসামরিক মানুষ।

গত রোববার ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ৩০টি গ্রাম ও শহরে হামলা চালিয়েছে। গত অক্টোবরের পর লেবাননে এটাই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বিমান হামলার ঘটনা।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইসরায়েলে তারা শুধু সামরিক স্থাপনা নিশানা করে হামলা চালিয়েছে। তারা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো এড়িয়েছে।

গত ৩০ জুলাই হিজবুল্লাহ কমান্ডার শোকরকে হত্যা করা হয়। মূলত তারপর থেকেই ইসরায়েল ও তার মিত্ররা হিজবুল্লাহর দিক থেকে প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কায় দিন গুনছিল।

হিজবুল্লাহ বিবৃতি দিয়ে বলেছে, শোকর হত্যার বদলা নিতেই তারা গত রোববার ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে। প্রতিশোধমূলক এই হামলার ‘প্রথম পর্যায়’ তারা সফলভাবে শেষ করেছে। হামলার প্রভাব পর্যালোচনা করে তারা পদক্ষেপ নেবে।

বৈরুতের সেন্ট জোসেফ ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক করিম এমিলি বিতার আল-জাজিরাকে বলেন, এই দফার লড়াই আপাতত শেষ হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে আগামী সপ্তাহগুলোতে আর হামলার ঘটনা ঘটবে না।

হানিয়া-শোকর হত্যার বদলা?

হিজবুল্লাহ প্রকাশ্যেই বলেছে, সংগঠনের কমান্ডার শোকরকে হত্যার বদলা নিতেই তারা ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে।

শোকর হত্যার পরদিন ইরানের রাজধানী তেহরানে গুপ্ত হামলায় নিহত হন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে হামাস ও ইরান।

হানিয়া হত্যার বদলা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে তেহরান। তবে হানিয়ার হত্যার বদলার বিষয়ে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।

হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন, আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে হিজবুল্লাহ।

ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে হামাস আছে। আছে ইরাকের ইসলামিক রেজিসট্যান্সের মতো সশস্ত্র সংগঠন।

হাসান নাসরুল্লাহ আরও বলেন, তাঁরা স্বতন্ত্রভাবে জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত বেছে নিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব দেখতে পাওয়া যাবে।

তবে কমান্ডার শোকর হত্যাকাণ্ডের বদলা এত পরে কেন? হাসান নাসরুল্লাহর ভাষ্য, বদলার বিষয়টি নিয়ে তাঁরা মিত্রদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। এককভাবে হামলা চালানো হবে, নাকি সবাই মিলে একযোগে হামলা চালাবে—বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সময় লেগে গেছে।

হিজবুল্লাহর হামলার অন্যতম নিশানা ছিল তেল আবিবের কাছের গ্লিলোট ঘাঁটি। সেখানে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরের একটি ইউনিটের অবস্থান রয়েছে। হাসান নাসরুল্লাহর ভাষ্যে, এই ইউনিটটি গুপ্তহত্যার অভিযান পরিচালনা করে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এএফপিকে বলেন, এই ঘাঁটিতে হামলা হয়নি।

অধ্যাপক ইমাদ সালামি বলেন, হিজবুল্লাহ সম্প্রতি যেসব ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তা মূলত সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার শোকর হত্যার বদলা হিসেবে। হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান হানিয়া হত্যার বদলার সঙ্গে এই হামলার সরাসরি যোগসূত্র নেই।

ইমাদ সালামি আরও বলেন, হিজবুল্লাহ ইঙ্গিত দিয়েছে, তাদের প্রতিশোধমূলক হামলা কোনো একক বিষয় নয়, বরং এটা বিস্তৃত কৌশলের অংশ।

যুদ্ধবিরতি আলোচনায় প্রভাব ফেলবে?

হ্যাঁ। বড় পরিসরে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

ইমাদ সালামি বলেন, এই ঘটনাগুলো মিসরের কায়রোয় চলমান শান্তি আলোচনায় তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

গত রোববার সন্ধ্যায় হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, এটা এখন স্পষ্ট যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আলোচনায় নতুন শর্ত দিতে যাচ্ছেন। তাই আর অপেক্ষা করার কোনো কারণ নেই।

হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাসেম কাসির বলেন, রোববারের হামলা ছিল হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে সংগঠনটির কমান্ডার শোকর হত্যার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। একই সঙ্গে তা কায়রোয় থাকা ফিলিস্তিনি আলোচকদের প্রতি হিজবুল্লাহর সমর্থনেরও বার্তা। এই বিষয়গুলোর সঙ্গে আলোচনার ফলাফলের পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়ার যোগসূত্র থাকতে পারে।

এখন কী ঘটতে পারে

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। কোনো পক্ষই চাইছে না, উত্তেজনা আরও বাড়ুক।

তাই এখন উত্তেজনা কিছুটা কমবে বলে মনে হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাল্টাপাল্টি হামলায় উভয় পক্ষের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হয় না।

অন্যদিকে দুই পক্ষ এখনো নিজ নিজ সামরিক অবস্থানে অটল থাকায় পরবর্তী সময়ে কী হয়, তা দেখার জন্য বেসামরিক নাগরিকদের অপেক্ষায় থাকতে হবে।

অধ্যাপক করিম এমিলি বিতার বলেন, লেবানন অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। দেশটির বেশির ভাগ নাগরিক, এমনকি হিজবুল্লাহর বহু সমর্থকও বড় পরিসরের যুদ্ধের পক্ষে নন।

আল জাজিরা

দীপু মনির ঘুষের সাম্রাজ্য by পিয়াস সরকার

তিনি ছিলেন শেখ হাসিনা সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী। দায়িত্ব পালন করছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও। ডা. দীপু মনির চলনে ও পোশাকে ছিল না আভিজাত্যের ছাপ। কথা বলেন গুছিয়ে, মুখে লেগে থাকতো হাসি। কিন্তু এর আড়ালে গড়ে তুলেছিলেন ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের সাম্রাজ্য। ২০১৮ সালে দেশের প্রথম নারী শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। চেয়ারে বসেই রীতিমতো শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠেন। গড়ে তোলেন ঘুষ-দুর্নীতির হাট। অবৈধভাবে ব্যাগে পুরেছেন কোটি কোটি টাকা। দুর্নীতির জাল বিছিয়ে ছিলেন শিক্ষার প্রতিটি স্তরে। দুর্নীতির সম্রাজ্য চালাতেন নিজ এলাকায়।

দীপু মনি বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী। ২০০৮ সাল থেকে তিনি চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। এরপর গ্রেপ্তারের পর দু’দফা রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে। আইনত নোট-গাইড বিক্রি বন্ধ ছিল। কিন্তু আইনের ফাঁক গলিয়ে সহযোগী বই হিসেবে প্রচলিত ছিল গাইড বই। নোট-গাইডের বিপক্ষে ব্যাপক কথা বললেও তিনি নিজেই বখরা নিতেন এসব সংগঠন থেকে। এই সংগঠনের এক নেতা বলেন, আমাদের বাৎসরিক চুক্তি ছিল ১০০ কোটি টাকা। বছরে চারবার ২৫ কোটি করে দিতে হতো। এ ছাড়াও বিভিন্ন উপলক্ষের দিনেও পাঠাতে হতো টাকা।
টাকা তিনি শুধু যে গাইড বই প্রকাশনী থেকে নিতেন তা নয়। ঘুষ নিতেন কোচিং সেন্টারগুলো থেকেও। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও আইনত বৈধ নয়। কিন্তু স্যাডো এডুকেশনের আওতায় চলতো এসব প্রতিষ্ঠান। এসব থেকে চাঁদার পরিমাণ নির্দিষ্ট না থাকলেও বছরে কয়েক কোটি করে টাকা নিতেন। ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারের মালিক বলেন, আমাদের ব্যবসাটা একটু অন্য রকম। আমরা বৈধ আবার বৈধ না। এজন্য সংগঠনের মাধ্যমে একটি চাঁদা তোলা হতো। সময় ভেদে নিরূপণ করে এই টাকা উত্তোলন করা হতো। ভার্সিটি ভর্তি কোচিংয়ের সময় দিতে হতো প্রায় কোটি টাকা। অন্য সময় দিতে হতো অর্ধ কোটি টাকা। এসব টাকা একত্র করে দেয়া হতো শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিকে। তবে তিনি টাকা নিজে গ্রহণ করতেন না। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো দীপু মনির ঘনিষ্ঠ লোকরা।

শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন ডা. দীপু মনি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) নিয়োগও দিয়েছেন নিজের পছন্দ মাফিক লোকজন। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বাধ্যতামূলক পাঁচ শতাংশ যেতো তার পকেটে। এ ছাড়াও প্রকল্প ভেদে এই অর্থের হেরফের হতো। আওয়ামী লীগের আমলে বিশেষ করে ডা. দীপু মনির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বই নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। কয়েক বছর ধরে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই চলে আসলেও তার আমলে তিনি দিতে ব্যর্থ হন। বরাবরই বইয়ের পাণ্ডুলিপির কারণে এই দেরি হতো। এই দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থাকলেও ডা. দীপু মনি নিজে পড়ে দেখার জন্য নিতেন এবং দীর্ঘদিন নিজের কাছে আটকে রাখতেন। এর জন্য বরাবরই বই ছাপাতে দেরি হতো। প্রতি বছর প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপানো হতো। অজানা এক কারণে বারংবার একই চক্র পেতো বই ছাপানোর কাজ। কাজগুলো বাগিয়ে নিতো সেগুলো একই মালিকের প্রতিষ্ঠান। দুটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে অস্বাভাবিক কাজ দেয়া, নির্ধারিত সময়ে বই না দেয়ার পরও জরিমানা হতো না। সক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কাজ দেয়া হতো অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস এবং কচুয়া প্রেসকে। যারা ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বই ছাপানোর কাজ বাগিয়ে নেয়। এমনকি এই দুটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বই সরবরাহ করে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৪ থেকে ৫ মাস দেরিতে বই দেয়ার পরও এনসিটিবি সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের বই ডিসেম্বরে ডেলিভারি দেখানো হয়েছে। পুরো জালিয়াতির সঙ্গে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান-উৎপাদন নিয়ন্ত্রক জড়িত ছিল। এমনকি সেই সময়ে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিযোগ জানালেও নেয়া হয়নি ব্যবস্থা। আবার বিনামূল্যে বই ছাপার কাগজ কেনায় বড় ধরনের দুর্নীতি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একটি চক্র। ২০২১ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানোর কাজে ব্যবহৃত কাগজ বাজারদরের চেয়ে গড়ে টনপ্রতি ২০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে কেনা হয়েছে। বাড়তি দামে কেনা হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ আর্টকার্ডও। ফলে সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

বিশেষ করে নতুন কারিকুলাম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় তাকে নিয়ে। করোনাকালীন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ৫৪৪ দিন বন্ধ থাকার পর খোলা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ এই সময় বন্ধ থাকার কারণে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েন। করোনার কারণে স্থগিত হয় ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষা। এই শিক্ষার্থীদের অটোপাস দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে গঠন করা হয়েছিল এনটিআরসিএ। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল দুর্নীতির আখড়া। গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশে কালক্ষেপণ, ভুয়া সনদ, আলাদা আবেদন নিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায় ছিল এই প্রতিষ্ঠানের কাজ। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েও লাভ হয়নি চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের। এমনকি এনটিআরসিএ হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। এনটিআরসিএ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়াসহ সমস্যা নিরসনে উদ্যোগ না নিয়ে বরং জিইয়ে রেখেছিলেন। নতুন কারিকুলাম চালু করা হয় ২০২৩ সালে। এই পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছিল শুরু থেকেই। এই কারিকুলাম বাস্তবায়নে এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দিতেন না। কারিকুলাম নিয়ে সমালোচনা করায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাতজনের নাম উল্লেখ করে ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। যাদের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি করায় অনেক অভিভাবক পালিয়ে থাকতেও বাধ্য হন। আবার চাকরি হারানোর ভয়ে অনেক শিক্ষক চুপ থাকতে বাধ্য হন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একক আধিপত্য বিস্তারে কাজ করছিলেন ডা. দীপু মনি। কুক্ষিগত করেছিলেন পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্টি বোর্ড পরিবর্তন করে দখল নেন। এ ছাড়া অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে দখল করেন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়। বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান করা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলামকে। তার সঙ্গে আরও ১৩ জন রয়েছেন। জামায়াত সমর্থিত হিসেবে পরিচিতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান ছিলেন প্রফেসর মো. আবদুল্লাহ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান। তিনিও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও দখল নেন। অভিযোগ রয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির সঙ্গে জড়িত থাকায় দেননি সমাবর্তনের অনুমতি। ২০১২ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা  হলেও ২০২৩ সালে এসে প্রথম সমাবর্তনের অনুমতি পায়। এরপর তিনি এতে যোগ দেননি।

এসব ঘুষ-দুর্নীতির পরিচালনা করা হতো ভাই জেআর ওয়াদুদ টিপু ও চাঁদপুর পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদারের মাধ্যমে। নিয়ম বহির্ভূতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করে রতন কুমার মজুমদারকে একাধিকবার অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেন। এই দু’জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য দেখতেন। এমনকি ঢাকার কলাবাগানে ছিল দীপু মনির অঘোষিত লিয়াজোঁ দপ্তর। আর বনানীতে ছিল ‘রাজনৈতিক স্বজন’ ভবন। তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগের রেট ছিল এক থেকে তিন কোটি এবং অধ্যক্ষ নিয়োগ হতো ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকায়। বদলির রেট ছিল পদভেদে ২ থেকে ৩০ লাখ টাকা। এই সময়ে নিয়োগ পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত চার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগে লেনদেন হয়েছে।
নিজ জেলায় চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শুধু জমি অধিগ্রহণে ৩৫৯ কোটি টাকা দুর্নীতির পাঁয়তারা করেন দীপু মনি। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের আগেই সেখানকার সাড়ে ৬২ একর জমি মৌজা দরের চেয়ে ২০ গুণ বেশি দাম দেখিয়ে দলিল করে নেন তার আত্মীয়রা। এমন একাধিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিস। এর প্রতিবাদ জানানোর কারণে ৪৮ ঘণ্টা পর তাকে নেত্রকোনায় বদলি করা হয়। চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনায় বালু উত্তোলন করতেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সেলিম খান এই বালুর ব্যবসা দেখতেন। তিনি এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বালু তোলার সমালোচনা করায় পদ হারান। দীপু মনির নির্বাচনী এলাকা হাইমচর-নীলকমল ইউনিয়নের বাহেরচরে বিপুল পরিমাণ খাসজমি নিজের কব্জায় নিয়ে দীপু মনির ভাই গড়ে তোলেন ‘টিপু নগর’। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দুর্বৃত্তদের হামলায় প্রাণ হারান সেলিম।
এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ৪১ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির এই তালিকায় রয়েছে ডা. দীপু মনিরও নাম।

বাংলাদেশ ব্যাংক: অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে by এমএম মাসুদ

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার একটি তালিকা নবনিযুক্ত গভর্নর আহসান এইচ মুনসুরের দপ্তরে দেয়া হয়েছে এবং অনৈতিক কাজে জড়িত এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করে শাস্তি চাওয়া হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢাকা, চট্টগ্রাম শাখা ও খুলনা শাখাসহ বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের লুটপাটের ফিরিস্তি উঠে এসেছে। এতে কিছু কর্মকর্তার ভয়াবহ লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা আর জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারে ছত্রছায়ায় লুটপাটের সিন্ডিকেট গড়েছেন বেশকিছু কর্মকর্তা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতির এই মূল হোতারা বেপরোয়া হয়ে দেশের সম্পদ লুটেরাদের কাছে দিতে সহযোগিতা করছে। ফলে সীমাহীন লুটপাট, দেশের বাইরের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারসহ নানা কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়েছে। পরিণত হয়েছে নখ-দন্তহীন প্রতিষ্ঠানে।
বিপর্যস্ত আর্থিক খাতের করুণ পরিণতির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্দেশ্য হলো দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনিয়ম আর দুর্নীতি বের করে শাস্তির আওতায় আনা। কিন্তু খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই লুটপাটের চিত্র বেড়িয়ে এসেছে। অনেকটা রক্ষকই ভক্ষক হয়েছে।

এ বিষয়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে ফোন দেয়া হলে তিনি ফোন ধরেননি। তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে সাজানোকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমরা যেটাই করি না কেন, যারা দোষী, তাদের ধরা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা দায়ী থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাও দায়ী থাকলে দেখা হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএফআইইউসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, বিগত সময়ে আর্থিক খাতে যারা লুটপাট ও অর্থ পাচার করেছেন, যারা দুর্নীতি করেছেন; তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বলেন, অর্থ পাচার নিয়ে বিএফআইইউ কাজ করছে, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টলিজেন্স সেল (সিআইসি) কাজ করছে।

প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ কর্মকতাদের আমলনামা। তালিকায় আছেন যারা:
বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক কামাল হোসাইন: আওয়ামী লীগ সরকার আসার পরপরই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ইচ্ছাতে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কামাল হোসাইন বিএফআইইউতে পদায়ন পেয়েছেন এবং একটানা ১৫ বছর সেখানেই ছিলেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে সরকারের আস্থাভাজন এবং প্রবল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেন। তিনি কখনই বদলি হন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকের ঘটনায় তিনি তৎকালীন গভর্নরকে মিসগাইড করেছেন এবং অর্থ উদ্ধারকে জটিল করে দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয় থেকে যে কর্মকর্তাগণ এস আলমের ছেলের বিয়েতে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি চার্টার্ড প্লেনে করে ওই বিয়েতে অংশগ্রহণ করেন। তার ওই বিয়েতে অংশগ্রহণের ছবি ও ভিডিও ইউটিউবে এখনো রয়ে গেছে। সকল গভর্নরের সময়েই এস আলম গ্রুপের পিএস আকিজ উদ্দিন তাকের গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে গ্রুপটির বাংলাদেশ ব্যাংকের এজেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন।
অতিরিক্ত পরিচালক মাসুদ রানা: ২০০৬ সালের মার্চ থেকে একটানা ১৯ বছর ধরে বিএফআইইউতে রয়েছেন মাসুদ রানা। তিনিও কখনো বদলি হন না। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে সেখান থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের তালিকা থেকে বাদ দিতেন। তাছাড়া দেশের মানি লন্ডারিংয়ের সব চক্রের তিনি প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী। প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
যুগ্ম পরিচালক সেউলি শাহা: বিএফআইইউ’র বিভিন্ন কর্মকর্তার তথ্য সংগ্রহ করেন এবং প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংস্থাটির এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। সকল কর্মকর্তা বদলি হলেও তিনিও বদলি হন নাই।

যুগ্ম পরিচালক মো. আশরাফুল আলম: মহাদুর্নীতিবাজ এই আশরাফুল সাবেক দুই ডেপুটি গভর্নরের (ডিজি) পক্ষে সকল ব্যাংকে ‘ফান্ড কালেক্টর’-এর ভূমিকা পালন করেছেন। সকল ব্যাংকের বিভিন্ন ছুতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়ে পত্র প্রেরণ করেন এবং তারপর একেক ক্ষেত্রে একেক হারে অর্থ বিনিময়ে তা সমাধান করে দিতেন তিনি।
যুগ্ম পরিচালক আসাদুজ্জামান খান ও মো. শাহনেওয়াজ মুরাদ: এরা দু’জন হলুদ ও নীল দলের দুইজন আইকনিক নেতা। এরা ইউনিটে কোনো কাজ করেন না। স্ব স্ব দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে থাকেন। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং দুষ্টচক্রের নিকট তথ্য পাচার করে থাকেন।
যুগ্ম পরিচালক সৈকত কুমার সরকার: সৈকত প্রশ্নফাঁস জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার অধ্যয়নকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি’র অনুমোদন নেই। তিনি বিএফআইইউ’র বিগত দুই ডিজির পক্ষ হতে বিভিন্ন ব্যাংকে লবিংয়ে ব্যস্ত থাকতেন।
যুগ্ম পরিচালক ইবনে আহসান কবীর ও মো. মুশফিকুল ইসলাম: মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত এই দুই কর্মকর্তা খেলাধুলা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে থাকেন এবং তথ্য পাচার করে আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ সমাধানের ব্যবস্থা করে থাকেন।
নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান: এস আলমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এস আলমের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ঢাকতেন এবং রিপোর্টে সন্নিবেশন ঠেকাতে তিনি নিজ আজ্ঞাবহ পরিদর্শন দল পাঠাতেন। তিনি চার্টার্ড বিমানে করে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এস আলমের ছেলের বিয়েতে সপরিবারে অংশগ্রহণ করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের যেসব কর্মকর্তা তার চাহিদামাফিক পরিদর্শন প্রতিবেদন করেননি তাদেরকে শাস্তিমূলক পোস্টিং ও পিএমএস খারাপ দিতে বাধ্য করেছেন। তার ছেলেকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। তার পিএ আব্দুল আহাদ তার সকল অপকর্মের দোসর। তাকে সে সর্বদা সঙ্গে রাখতেন। এস আলম গ্রুপের সহায়তায় সে তার সর্বময় ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। প্রধান কার্যালয়ে পরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় এস আলমের ঋণ মওকুফে জড়িত ছিল।

যে কৌশলে বাংলাদেশের কাছে ঘেঁষতে চায় ভারত

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত স্বার্থ সব সময়ই বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। গত ১৫ বছরে হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব পৌঁছেছিল এক অন্য জায়গায়। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জন্য যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতাগুলোকে উন্মোচিত করেছে এবং তাদের কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও হাসিনা সরকারের পতন এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে ভারত কিছুটা বিস্মিত। এই পরিস্থিতিতে ভারত কীভাবে বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের সঙ্গে নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন করবে সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশটির জাতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান।

এতে বলা হয়েছে, সদ্য ক্ষমতা হারানো শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক শোষণে বাংলাদেশের জনগণের যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে ভারত। দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের বিবৃতি অনুযায়ী বাংলাদেশি জনগণের মধ্যে ভারতে বিরোধিতা প্রকট হওয়ার কারণ হচ্ছে হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনে ভারতের অন্ধ সমর্থন। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়েছে যা ভারতের উদ্বেগের কারণই বটে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে আগামীতে যে সরকার আসবে তারা ভারতের নিরাপত্তার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি হতে পারে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে দেশটির বৃহৎ ইসলামী দলের জোট এবং ভারত বিরোধিতার ইতিহাস রয়েছে।

ভারতের পূর্ব সীমান্তে অস্থিতিশীল করার জন্য পাকিস্তানের মতো বহিরাগতরা একটি অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে বলে উল্লেখ করেছে দ্য স্টেটসম্যান। গণমাধ্যমটি আরও বলেছে, বাংলাদেশে চীনা প্রভাব বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সামরিক ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা আরও জোরালো করতে পারে দুই দেশ। বাংলাদেশে চীনের দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্য ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যকে কৌশলগতভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাছাড়া, বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ভাগ্য ভারতের জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়। যদিও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো নিপীড়ন হয়নি।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অবশ্যই ভারতের জন্য একটি অগ্রাধিকার হতে হবে, কারণ সহিংসতার যেকোনো বৃদ্ধি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ভারতের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তার স্বার্থ রক্ষার জন্য, ভারতকে দ্রুত এবং সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করতে হবে। আসন্ন বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত হতে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি জনগণের কাছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্যাকেজ এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ভারত বিরোধিতা নিরসনের নতুন প্রচেষ্টার সঙ্গে বিশ্বাস পুনর্গঠনে সহযোগী হতে পারে। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অগ্রণী ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে সামরিক সহযোগিতাও বাড়াতে হবে। ভারতকে অবশ্যই প্রতিবেশী দেশের জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা মাথায় রেখে আরও সূক্ষ্মদর্শী হতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে এমন মতাদর্শগত চিন্তা পরিহার করতে হবে। ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং আধিপত্যবাদী চিন্তা-চেতনা থেকে বিরত থাকতে হবে। যদিও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন অর্জন করা কঠিন হবে। তবে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতি ভারতের জন্য যেমন হতাশার তেমন সম্ভাবনার। কূটনীতি, আর্থিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত ধৈর্য ব্যবহার করে, ভারতকে আঞ্চলিক নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পথ প্রশস্ত করতে হবে।

জামায়াত আমিরের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানও

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এর প্রতিষ্ঠাতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার এ প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার কথা শুধু নিজ দল বা ধর্মের লোকদের। কিন্তু সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিত্র ভিন্ন। তার এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাও। জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠানে সব ধর্মের এমন সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব? তা সরেজমিনে গিয়ে দেখেছেন কালবেলা প্রতিবেদক। সিলেট থেকে মিঠু দাস জয়ের পাঠানো প্রতিবেদনে তার প্রকৃত দৃশ্য উঠে এসেছে।

সালটা ২০২১ এপ্রিল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মকবুল আহমেদের মৃত্যুর পর থেকে দলের হাল ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। নিজ এলাকার সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাসের পর চিকিৎসাসেবায় আত্মনিয়োগ করেন তিনি। জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি হাসপাতালও। সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নামের এ প্রতিষ্ঠান যেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর আমিরের হাসপাতালে কাজ করছেন অন্যান্য ধর্মের মানুষও। চিকিৎসক থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী- সব স্তরেই আছেন তারা।

প্রতিষ্ঠানটিতে আয়া হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন হেলেন রানী দাস। তিনি জানান কতটা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করছেন হাসপাতালটিতে। তথ্য বলছে, জামায়াত নেতার হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে ১ হাজার ৪৫০ জন। যার মধ্যে ভিন্ন ধর্মের রয়েছেন আড়াই শতাধিক। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন তারা।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিকিউরিটি চিফ প্রজেশ দাস কালবেলাকে বলেন, আমি হিন্দু ধর্মের একজন মানুষ হিসেবে শতভাগ বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি এ হাসপাতালে কোনো ধরনের বৈষম্য নেই। বেতন-ভাতা, চলাফেরা- এসব বৈষম্য কোনো কিছু এখানে নেই। এখানে সবাই সমান। এখানকার ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে আমাদের সুন্দর সম্পর্ক রয়েছে। এ হাসপাতালে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই কাজ করছি। আমাদের পরিচালক স্যারদের থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে আমাদের একটি সুন্দর সম্পর্ক আছে, তা এই সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা বিরল দৃষ্টান্ত।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি ও শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তুলিকা দেবি কালবেলাকে বলেন, আমি এখানে কোনো ধরনের বৈষম্যের স্বীকার হইনি। কোনো দিন ধর্ম নিয়ে হেনস্তাও হইনি। এখানকার নিয়োগ স্বচ্ছভাবে হয়। এখানে টাকা দিয়ে কোনো নিয়োগ হয় না। আমি এই মেডিকেলে চাকরি করতে পেরে গর্ববোধ করছি।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিওতে কর্মরত নার্স সুমি রানী দে কালবেলাকে বলেন, আমি এক বছর হলো এ হাসপাতালে চাকরি করছি৷ এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য নেই। আমরা সবাই মিলেমিশে কাজ করছি। আমাদের বেতন-ভাতা নিয়মিত দেওয়া হয়। এখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া খুব স্বচ্ছ। এখানকার পরিচালক স্যার থেকে শুরু করে সবার সহযোগিতা পাই। এখানে কাজ করে ভালো লাগছে। আশা করি ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করব।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যাকাউন্টেট কর্মরত সুস্মিতা দাস কালবেলাকে বলেন, অনেক দিন ধরে এ হাসপাতালে কাজ করছি। আমরা সবাই মিলে সুন্দরভাবে কাজ করছি। আমার কাছে মনে হয়- আমরা সবাই একই পরিবারের। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কোনো ভেদাভেদ নেই৷ এখানে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে যারা উত্তীর্ণ হয় তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এখানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রে মিলেমিশে কাজ করে যাচ্ছি।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইলেকট্রিক বিভাগে কর্মরত হিমেল দাস কালবেলাকে বলেন, আমি হাসপাতালে ইলেকট্রনিক বিভাগে চাকরি করছি৷ এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য নেই। ধর্ম নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। এখানে চাকরি পেতে কোনো টাকা-পয়সা লাগে না। ইন্টারভিউর মাধ্যমে চাকরি পেয়েছি। এখানে কোনো ধরনের দলীয় সমস্যা নেই।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিকিউরিটি গার্ড অপু দাস কালবেলাকে বলেন, আমি ৫ বছর ধরে এখানে চাকরি করছি। এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য নেই। পত্রিকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে সিভি জমা দিয়েছিলাম। আমি আগে থেকে জানতাম এটা জামায়াতের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ইন্টারভিউর মাধ্যমে চাকরি পেতে কোনো সমস্যা হয়নি৷এখন সুন্দরভাবে চাকরি করছি।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ তলার এ ব্লকের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আয়া হেলন রানী দাস কালবেলাকে বলেন, আমি ১৫ বছর ধরে কর্মচারী হিসেবে এখানে স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি করছি। এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য নেই৷ নার্স, ব্রাদার সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে ডাক্তারের সঙ্গে ডিউটি করছি।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭ম তলার এ ব্লকের শিশু বিভাগে কর্মরত নার্স শুভ চন্দ শীল কালবেলাকে বলেন, আমি উইমেন্স নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম৷ যোগ্যতার ভিত্তিতে পরীক্ষা দিয়ে এ হাসপাতালে চাকরি পেয়েছি। আমি আগে থেকে জানতাম এটি জামায়াতের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছি। কোনো টাকা দিয়ে এখানে চাকরি দেওয়া হয় বলে কখনো শুনিনি। আর আশাকরি এখানে এরকম হবে না কোনো দিন। এখানে ধর্ম, বর্ণ কোনো বৈষম্য নেই।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার হুমায়ূন রশিদ সানি কালবেলাকে বলেন, আমি প্রায় ২ বছর ধরে এখানে চাকরি করছি। এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই মিলেমিশে চাকরি করছি। এখানে স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে চাকরি হয়ে থাকে। হাসপাতালে কোনো রাজনৈতিক দলীয় সমস্যা নেই।

সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও কমিউনিটি মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাফহীম আহমদ রিফাত কালবেলাকে বলেন, এ হাসপাতাল ও কলেজে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছেন। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কখনো এমন কোনো অভিযোগ পাইনি যে, কাউকে ধর্ম, বর্ণ নিয়ে হেনস্তা, অপমান বা অভিযোগ করা হয়েছে। এ হাসপাতাল ও কলেজে ১ হাজার ৪৫০ স্টাফ আছে, তার মধ্যে ২৭০ স্টাফ ব্যতীত বাকি সবাই অন্য ধর্মাবলম্বী। এখানে ডাক্তার, লেকচারারসহ ৩২০ জনের মধ্যে ৭০ জন, নার্স ২৮৩ জনের মধ্যে ৯০ জন, আয়া ১৩৬ জনের মধ্যে ২৬ জন, ওয়ার্ড বয় ১২০ জনের মধ্যে ১৬ জন, সিকিউরিটি ৯০ জনের মধ্যে ২০ জন আছেন অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।

তিনি বলেন, এখানে ধর্ম, বর্ণ কোনো কিছুর ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় না। এখানে স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, এখানে টাকা দিয়ে কোনো নিয়োগ হয় না। এখানে শতভাগ স্বতন্ত্র কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ কমিটির প্রধান হিসেবে সিলেটের স্বনামধন্য শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এনাম উদ্দিনকে প্রধান করে ৮ সদস্যের কমিটি গঠন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মিলে এ হাসপাতাল ও কলেজকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর।

সম্প্রতি এক বক্তব্যে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করা হাসপাতাল প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আগামীর দায়িত্ব পালন করবে এ দেশের তরুণ সমাজ। এখানেও আমরা কোনো ধরনের ব্যবধান বরদাশত করব না। আমি সরকারের কোনো দায়িত্বে কখনো ছিলাম না। কিন্তু আমার নিজের গড়া কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। একটা মেডিকেল কলেজ আছে। সেখানে সাড়ে সাতশ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে। আমার এই মেডিকেল কলেজে যেমন মুসলমান আছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হিন্দু ও খ্রিস্টান ভাইবোনেরা আছে। দু-একটি জায়গায় বৌদ্ধ ভাইবোনেরাও আছে। আমরা এখানে কোনো বেশকম করিনি। আমরা দেখেছি কার যোগ্যতা আছে আমার এ জায়গাটিকে সার্ভিস দেওয়ার- তাকেই বেছে নিয়েছি।

তিনি বলেন, আমি জামায়াতে ইসলামীর আমির। অনেকে বলে আপনার প্রতিষ্ঠানে আসলেই কি এ রকম। আমি বলি, গিয়ে একটু দেখে আসুন। আমার মুখের কথা আপনার বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। আপনি ওখানে যান। ওখানে গিয়ে আপনি দেখে আসুন। বাস্তবে কী আছে? এর মাধ্যমে আমি আমার মেডিকেল কলেজটাকে একটা ছোট বাংলাদেশ বানানোর চেষ্টা করেছি। এ রকম হবে বাংলাদেশ।

কী ঘটেছিল সচিবালয়ে

রোববার দিনভর দেশবাসীর চোখ ছিল সচিবালয়ে। আনসার সদস্যদের অবস্থানে অবরুদ্ধ ছিল প্রশাসনের কেন্দ্র সচিবালয়। অনেকটা দাবি মেনে নেয়ার পরও রাত অবধি গড়ায় আনসারদের কর্মসূচি। তারা অবস্থান না ছাড়ায় তৈরি হয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সচিবালয়ের শ’ শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে আটকা পড়েন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা। আনসারের মহাপরিচালকও অবরুদ্ধ ছিলেন সচিবালয়ে। রাতে শিক্ষার্থীদের শক্ত প্রতিরোধে আনসাররা সচিবালয় এলাকা ছাড়েন। তার আগে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আনসারদের পিটুনির শিকার হন প্রতিবাদী ছাত্র-জনতা। প্রতিরোধের মুখে পালিয়ে যাওয়া আনসারদের কেউ কেউ জীবন রক্ষায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সচিবালয়ে। আবার পালানোর পথে কেউ কেউ আটক হন পুলিশের হাতে। এমন ৩৯০ জন আনসার সদস্যকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। মামলা হয়েছে ৪০০০ জনের বিরুদ্ধে।

চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে রোববার সকাল ৭টার পর থেকেই সচিবালয়ের চারপাশ ঘিরে অবস্থান নেন কয়েক হাজার আনসার সদস্য। জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ আশপাশের এলাকায় তারা অবস্থান নেন। নিজেদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয়া আনসার সদস্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন। তারা সবাই বাহিনীর পোশাক পরে নিজেদের আইডি কার্ড ঝুলিয়ে কর্মসূচিতে যোগ দেন। অনেকে ব্যাগে করে অতিরিক্ত কাপড়, খাবারও নিয়ে এসেছিলেন।
আনসারদের অবস্থানের মধ্যেই সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা-সচিব এবং কর্মকর্তা কর্মচারীরা ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় সচিবালয়ের ৫টি প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ জোরদার করেন আনসার সদস্যরা। দুপুরের পর সচিবালয়ে কাউকে প্রবেশ করতে বা বের হতে দিচ্ছিলেন না আনসার সদস্যরা। দুপুরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর দপ্তরে আনসারের ডিজিসহ আনসার প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। বৈঠকে ৩ মাসের রেস্ট প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া দাবি দাওয়া পূরণের বিষয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে অংশ নেয়া আনসার সদস্যরা গণমাধ্যমের সামনে দাবি পূরণের আশ্বাস পাওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে কর্মসূচি প্রত্যাহার করার কথা বলেন। কিন্তু বাইরে থাকা আনসার সদস্যরা জাতীয়করণের দাবিতে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনঢ় থাকেন। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। আনসার সদস্যরা অবস্থানে অনঢ়। রাত ৮টায় পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিতীয় দফায় ৫ উপদেষ্টাকে নিয়ে ফের বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।  

দিনের শুরুতেই সচিবালয়ে এসেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম। রাতেও আনসার সদস্যরা অবস্থান না ছাড়ায় তারা ফেসবুকে বিষয়টি জানিয়ে সাধারণ ছাত্রদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের ঢল নামে টিএসসিতে। রাত ৯টার দিকে কিছু শিক্ষার্থী সচিবালয়ের দিকে গেলে তাদের উপর আনসার সদস্যরা হামলে পড়ে। লাঠি, ইট, বেল্ট দিয়ে তাদের মারধর করা হয়। এতে আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহকে পিটিয়ে আহত করেন আনসার সদস্যরা। এখবর টিএসসিতে পৌঁছলে সেখান থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী লাঠিসোটা নিয়ে সচিবালয়ের দিকে আসেন। তখন আনসার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তৎপর হন। তারা দুই পক্ষকে সরিয়ে দিতে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরাও আনসার সদস্যদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালান। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আনসার সদস্যরা প্রেস ক্লাব ও জিরো পয়েন্ট এলাকা দিয়ে পালাতে শুরু করেন। এ সময় কেউ কেউ মারধরেরও শিকার হন। এ সময় জীবন শঙ্কায় অনেক আনসার সদস্য সচিবালয়ে ঢুকে পড়েন। শিক্ষার্থীরাও কিছু আনসার সদস্যকে আটকে ঘিরে রাখেন। আনসার সদস্যদের পালানোর সময় পুরো সচিবালয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা। তারা নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। সেনা সদস্যরা সচিবালয়ের ফটকে অবস্থান নিয়ে ভেতরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ করে দেন। রাতে সচিবালয়ে আটকে থাকা আনসার সদস্যদের নাম তালিকা করে থানা পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা হয়।

হঠাৎ করে আনসার সদস্যদের এই কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দাবি মানার পরও তারা কেন এভাবে সচিবালয় অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। বলা হচ্ছে আনসারের সাবেক ডিজি বা কর্মকর্তাদের ইন্ধন থাকতে পারে এই আন্দোলনে। এ ছাড়া যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তাদের অনেকে বিদায়ী সরকারের সময়ে দলীয় পরিচয়ে চাকরি নিয়েছিলেন বলে আলোচনা আছে। সূত্রের দাবি বিগত ১৫ বছরে প্রায় ৪২ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই দলীয় সুবিধায় নিয়োগ পান।
চার থানায় মামলা, আসামি ১০ হাজার, গ্রেপ্তার ৩৯০
ওদিকে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলন করা সাধারণ আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) চার থানায় চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই চার থানায় প্রায় ১০ হাজার আনসার সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এরমধ্যে এজাহারনামীয় আসামি ৪২৬ জন। ঢাকা মহানগর পুলিশের শাহবাগ, পল্টন, বিমানবন্দর ও রমনা থানায় এসব মামলা করা হয়েছে। চার মামলায় এখন পর্যন্ত ৩৯০ জন আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের গতকাল আদালতে তুলে থানা পুলিশ। পরে আদালত তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শাহবাগ থানা সূত্রে জানা যায়, সচিবালয়ে হামলা ভাঙচুরের ঘটনায় আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ২০৮ জন ও অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে ৩ হাজার আনসার সদস্যকে। এ ছাড়া শাহবাগ থানায় ১৯১ জন আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পল্টন থানা সূত্রে জানা গেছে, পল্টন থানার মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ১১৪ জন। এ ছাড়া মামলায় ৪ হাজার আনসার সদস্যকে অজ্ঞাত হিসেবে আসামি করা হয়েছে। রোববার রাত থেকে ৯৫ জন আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রমনা থানা সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় রমনা থানার মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ৯৮ জন ও অজ্ঞাত আসামি ৩ হাজার। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯৮ জনকে।

এদিকে চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে সচিবালয় অবরুদ্ধ করে ভাঙচুর ও হামলা-মামলায় ৪ থানায় গ্রেপ্তার ৩৯০ জন আনসার সদস্যকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের পৃথক কয়েকটি আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালতের নিবন্ধন শাখা সূত্রে জানা যায়, এদিন শাহবাগ থানার মামলায় গ্রেপ্তার ১৯১ জন, রমনা থানার মামলায় ৯৮ জন, পল্টন থানার মামলায় ৯৫ জন ও বিমানবন্দর থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ৬ জন আনসার সদস্যকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এ চার থানার মামলায় অন্তত ৪২৬ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত তিন হাজার অজ্ঞাতনামা আনসার সদস্যদের আসামি করা হয়েছে।

সচিবালয় পরিস্থিতি জাগ্রত ছাত্রসমাজ মোকাবিলা করেছে

জাগ্রত ছাত্রসমাজ যারা স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে তাদের অপরিসীম ত্যাগের ভূমিকা সচিবালয় এলাকার পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। সচিবালয়ে যারা আনসারদের ছত্রছায়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে তাদের ষড়যন্ত্র সফল হবে না। প্রচলিত আইনেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। হামলায় আহত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহসহ আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান আইন উপদেষ্টা। সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন তারা। ড. আসিফ নজরুল বলেন, আনসার সদস্যের দাবি ছিল- এখনই রাত ১০টার সময় প্রজ্ঞাপন জারি করে তাদের জাতীয়করণ করতে হবে। তারা এমন এক অসম্ভব দাবি তুলেছিল গণ্ডগোল করার জন্য। সচিবালয়ে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারতো।

জাগ্রত ছাত্রসমাজ যারা স্বৈরাচরের পতন ঘটিয়েছে, তাদের অপরিসীম ত্যাগের ভূমিকায় পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। যেই ছাত্ররা স্বৈরাচরের পতন ঘটিয়েছে যারা আমাদের স্বপ্ন এবং যাদের ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হিসেবে দেখি তাদেরকে রাস্তায় ফেলে কীভাবে নির্মমভাবে মেরেছে। আপনারা তাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখেছেন। তিনি বলেন, আমাদের ছাত্রদের ওপর, সমন্বয়কদের ওপর, বিশেষ করে হাসনাতের ওপর যে বর্বর হামলা হয়েছে তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসেছি। সাধারণ মানুষকেও গুরুতরভাবে আহত করা হয়েছে। দু’জনকে অপারেশন করার প্রয়োজন হবে। হাসনাতের অবস্থা এখন মোটামুটি ভালো আছে। আইন উপদেষ্টা বলেন, আমরা মনে করি কাল আনসার বাহিনীর ছদ্মবেশে যারা এসেছিল কোনো দাবি আদায় তাদের এজেন্ডা ছিল না। দাবি আদায় হয় আলাপ-আলোচনার মধ্যদিয়ে। তারা বারবার আলাপ-আলোচনা করে সম্মত হয়ে ফিরে গেছে এবং বারবার আমাদের ঘিরে ফেলেছে। লাঠি তাদের স্টকে ছিল- আপনারা দেখছেন তারা মারমুখীভাবে ছাত্রদের ওপর নির্যাতন করেছেন। তিনি বলেন, এর আগেও আন্দোলনের সময় যারা আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ চোখে আঘাত পেয়েছেন। এমনকি একজনের একটি চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা আমাদের নেই। এ সময় তিনি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেলে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তি চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে ৮০০ জনকে ভর্তি দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে হাসপাতালে ১০০ জন গুলিবিদ্ধ আহতসহ চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ছাড়া নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ৯ জন রয়েছেন। আইসিইউতে যারা রয়েছেন তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হাসপাতালে যারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি করা হবে। অনেক ওষুধ সরকারিভাবে সাপ্লাই হয় না। সেগুলোও আমরা তাদের দিয়ে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেছি। ঢামেক হাসপাতালে আহতরা যেন সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা পায় সেজন্য তাদের ডেডিকেটেড আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছে।

যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নির্বাচন চাই

যৌক্তিক সময়ের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী জাফর আহমদের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এ দাবি জানান।

তিনি বলেন, আমাদেরকে এখন অত্যন্ত ধৈর্য ধরে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা বাড়াতে হবে। এই সরকার এসেছে, এই সরকার অবশ্যই কাজ করার জন্য এসেছে। সেই কাজ করার সুযোগ তাদেরকে দিতে হবে। এই কথা আমরা বার বার বলছি, যৌক্তিক সময় অবশ্যই তাদেরকে দিতে চাই। নির্বাচন ছাড়া তো সম্ভব নয়, নির্বাচন হতেই হবে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, সবাই যেন ভোট দিতে পারে এবং এই নির্বাচনের ফলে এমন একটা অবস্থা তৈরি না হয় যে, আবার সেই আগের অবস্থা ফিরে আসে তাহলে সেটা কখনই জনগণ মেনে নেবে না। সেজন্য ধৈর্য ধরে আমরা অপেক্ষা করছি, জনগণ অপেক্ষা করছে। কিন্তু সেটা অবশ্যই একটা যৌক্তিক সময় পর্যন্ত হতে হবে। আমি বিশ্বাস করি যে, সেই যৌক্তিক সময়ের মধ্যে অবশ্যই একটা নির্বাচন হবে, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যে আশাবাদী হলেও নির্বাচনের রোডম্যাপ না থাকায় নিজের অভিমত ব্যক্ত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা আশা করেছিলাম যে, প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় তিনি একটা রোডম্যাপ দেবেন, সেই রোডম্যাপ আমরা কিন্তু ফর ট্রানজিসেন টু ডেমোক্রেসি এটা আমরা কিন্তু উনার বক্তব্যের মধ্যে পাইনি।

সংস্কারের কথা বলেছেন, সেই সংস্কারগুলো কোন কোন বিষয়, সেটারও কিছু কিছু তিনি আভাস দিয়েছেন, আমি জানি- সেগুলো এই অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব না। তবে সেটা সম্পর্কে একটা ধারণা থাকলে আরও বেশি করে ধারণা করতে পারতাম যে, ঘটনা আসলে ভালোর দিকে যাচ্ছে। যাই হোক আমাদের প্রত্যাশা ভালোর দিকে যায়, এটা জনগণের প্রত্যাশা।

কবে নির্বাচন হবে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত- প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, উনি সঠিক বলেছেন। অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে। এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তো রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমি আশা করবো, আমাদের প্রধান উপদেষ্টা সেই প্রক্রিয়াটির দিকে যাবেন, খুব দ্রুত যাবেন এবং তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলবেন।
তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, পুলিশ স্টেট যাতে কেউ না বানাতে পারে- সেই অবস্থা তৈরি করবেন। অত্যন্ত ভালো কথা। আমরা এটাই চাচ্ছি, সব সময় যে আমরা পুলিশ স্টেটে পরিণত হতে চাই না, পুলিশ আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবে, পুলিশ প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে বলে দেবে যে, এটা করা যাবে, এটা করা যাবে না অথবা আমাদেরকে মিথ্যা মামলা দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে আমাদের থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে আমাদের সর্বনাশ করবে, আমাদের ছেলেদেরকে গুলি করবে, এটা আমরা আর দেখতে চাই না। এটা যদি উনারা করে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা তাদের প্রতি থাকবে।
ফখরুল ইসলাম বলেন, আজকে এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমাদের প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে, গায়েবি মামলা হয়েছে, সেগুলোকে অবিলম্বে তুলে ফেলতে হবে। আমরা পত্রিকায় দেখলাম যে, প্রধান উপদেষ্টার মামলা চলে গেছে, উঠানো হয়েছে, আরেকজন উপদেষ্টার মামলা উঠানো হয়েছে, সাজা ছিল- সেই সাজা বাতিল করা হয়েছে। আমাদের একজন মানুষও নাই, বিএনপি বলেন, জামায়াত বলেন, এখানে আমরা যারা বসে আছি- যাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা নাই। আমাদের আশা এই মামলাগুলো ১ লাখ ৪৫ হাজার মামলা অবিলম্বে তুলে দিতে হবে।
পুলিশ রিফর্মের বিষয় প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য সমর্থন করে তিনি বলেন, আমরাও এটি চাই। সেদিন আইজিপি বলেছেন, পুলিশকে জনগণের পুলিশ তৈরি করা হবে, এটাকে আদর্শ পুলিশ তৈরি করা হবে। আমরা এটা চাই, খুব দ্রুত চাই।”

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রোববার যে ঘটনা ঘটেছে সচিবালয় ঘেরাও করে আনসার এবং কিছু লোকজন, পোশাকধারী লোক তারা গোলযোগ সৃষ্টি করে সেখানে সমস্যা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ছাত্ররা সেটাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। এটা কিন্তু অশনিসংকেত, এটা ভালো লক্ষণ নয়। অর্থাৎ যারা পরাজিত তারা এখন আবার বিভিন্নভাবে চক্রান্ত করছে এ বিজয়কে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য। তাই জনগণকে আহ্বান জানাবো, আপনারা সবাই সতর্ক থাকবেন, এই বিষয়গুলোকে কখনো কোনো প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।

তিনি বলেন, আমরা এখনো প্রশাসনে সেই সমস্ত ব্যক্তিদের দেখতে পাচ্ছি, যারা এই ফ্যাসিবাদী সরকারকে মদত দিয়েছে, তাদের সাহায্য করেছে এবং বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত। তাদের চেহারা আমরা দেখতে চাই না। আবারো বলছি, দয়া করে অতি দ্রুত এদের অপসারিত করে যারা দেশপ্রেমিক, যারা কাজ করতে চায়, যাদের বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের নিয়ে এসে সেই প্রশাসন চালানোর ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় এটার জন্য জাতি আপনাদের ক্ষমা করবে না।
জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম মহাসচিব এএসএম শামীমের সঞ্চালনায় সভায় ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, জাতীয় পার্টির মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকন, প্রেসিডিয়াম সদস্য নবাব আলী আব্বাস খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

গ্রামে গ্রামে খাবারের অপেক্ষা by মারুফ কিবরিয়া

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা। ফেনীর মহিপালে একটি বড় ত্রাণবাহী মিনি ট্রাক এসে থামলো। স্থানীয় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক ট্রাকটি ঘিরে ধরলেন। তাদের দাবি, ফেনী সদর উপজেলায় অনেক মানুষ খাবার পাচ্ছে না। বন্যাকবলিত মানুষগুলোর জন্য খাবার লাগবে। কিন্তু ট্রাকের দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবক জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর দেয়া হবে। হতাশা নিয়ে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক সাইদুজ্জামান বলেন, ফেনীতে যে বন্যা হয়েছে সেটা ইতিহাসে কখনো হয়নি। আমরা কয়েকজন বিভিন্ন জায়গা থেকে তহবিল সংগ্রহ করে মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত না। ফেনীর ফাজিলপুর, রামপুরসহ বেশ কয়েক জায়গায় মানুষ খাবার পায়নি। আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি। তাই তাদের খাবারের ব্যবস্থা স্থানীয়রাই  করে যাচ্ছে। কিন্তু ফেনীর বাইরে থেকে অঢেল ত্রাণসামগ্রী এলেও সেটা আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়া কোথাও দেয়া হচ্ছে না।

আরেক স্বেচ্ছাসেবক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ত্রাণসামগ্রী আসছে অনেক। কিন্তু বাসাবাড়িতে অনেক মানুষ সেটা পাচ্ছেন না। মানুষ খাবারের কষ্ট করছে অনেক। আর বেশি পানি যেখানে সেখানে সেনাবাহিনী ও সরকারি সংস্থা ছাড়া কেউ যেতে পারছে না।
সরজমিন ফেনীর মাস্টারপাড়া, চাঁড়িপুর বিরিঞ্চি এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব সড়কে পানি বেশি থাকায় অনেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। দোতলায় অবস্থান করছেন অনেকে। তবে কমবেশি সবাই বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটে ভুগছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার নিয়ে দুই একবার এলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
বিরিঞ্চি এলাকার বাসিন্দা মো. ওমর ফারুক বলেন, শুনছি সারা দেশ থেকে খাবার আসছে। কিন্তু আমাদের লোকাল ভাইয়েরা যতটুকু পারছে করছে। এটা দিয়ে হয়না।

বন্যা পরিস্থিতি এখন যেমন: ফেনী শহর ও আশপাশের অনেক এলাকায় বানের পানি রয়ে গেছে। কমলেও তা ধীরগতি। অনেক স্থানেই বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় কেউ কারওর খোঁজ নিতে পারছেন না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নৌকা, স্পিডবোট নিয়ে এলেও প্রবল স্রোত ও রাস্তাঘাট চেনাজানা না থাকায় উদ্ধার কাজ চলছে ধীরগতিতে। তবে সেনাবাহিনী, বিজিবি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার অব্যাহত রেখেছে।
গতকাল সকালে দেখা যায়, শহরের এসএসকে সড়ক, ট্রাংক রোড, মিজান রোড থেকে পানি নেমে গেছে। পুরাতন জেল রোড, কলেজ রোড, ক্যাডেট কলেজ রোড, ডাক্তারপাড়া, মাস্টারপাড়া, রামপুর, পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার, শাহীন একাডেমি এলাকা, চাঁড়িপুর, বিরিঞ্চি, বনানীপাড়াসহ প্রায় সব এলাকা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। সদরের ১২ ইউনিয়নের ১০৮টি ওয়ার্ডের সব এলাকা পুরোপুরি বন্যাকবলিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী উপজেলায় পানি কমলেও রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা ডুবে গেছে। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও লাখ লাখ মানুষ স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা বা উঁচু ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, সীমান্তবর্তী পরশুরাম পৌরসভার সীমান্ত এলাকা বাউরপাথর, সলিয়া, অনন্তপুর, চিথলিয়া ইউনিয়নের চিথলিয়া, অলকা, নোয়াপুর, ধনিকুণ্ডা, দুর্গাপুর, মির্জানগর ইউনিয়নের কাউতলী, চম্পকনগর, বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের সাতকুচিয়া গ্রামে জলাবদ্ধতার পর থেকে খাবার পাচ্ছেন না বাসিন্দারা।

একইভাবে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, বাঘাইয়া, সাতসতি, ইজ্জতপুর, মোটবী, গঙ্গানগর, ফাজিলপুর ইউনিয়নের শিবপুর, বটতলি এলাকায় কোনো ধরনের খাবার পৌঁছেনি।
জেলা প্রশাসক মোছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, কিছু এলাকায় পানি নামতে শুরু করলেও সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এরইমধ্যে এক হাজার ৬০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ফেনীতে সাড়ে ৫০০ টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণের অপেক্ষা: ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জয়লস্কর ইউনিয়নের জয়লস্কর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে মাঠ প্লাবিত। স্কুলটির নিচতলায়ও পানি ঢুকে গেছে। সরজমিন গতকাল গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েকশ’ পরিবার। বানের জলে বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন স্কুলে। তবে সবারই অপেক্ষা ত্রাণের গাড়ির। গাড়ি আসা মাত্রই স্কুলে আশ্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিরা হাজির হচ্ছেন। আশ্রয় নেয়া রোকসানা বেগম মানবজমিনকে বলেন, অনেকেই খাবার ব্যবস্থা করছে। বিজিবি’র গাড়ি থেকে দেয়া হয়। আবার ঢাকা থেকেও অনেকে এসে খাবার দিচ্ছে। কিন্তু বাথরুমের অসুবিধা বেশি হচ্ছে। মহিলাদের জন্য ব্যবস্থা থাকলেও অনেক মানুষ একসঙ্গে হওয়ায় কষ্ট বেশি হচ্ছে।
আশ্রয় নেয়া কুতুব উদ্দিন মোল্লা বলেন, আমাদের এখানে খাবার আসে। কিন্তু আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষ বাড়ি থেকে আসেনি। তারা খাবারের কষ্ট করতেছে। আমাদের এখানে হাইওয়ের পাশে হওয়ায় মানুষ বেশি ত্রাণ দিচ্ছে।
জয়লস্কর থেকে এক কিলোমিটার দূরে সিলোনীয়া হাইস্কুল। এখানেও আশপাশের গ্রাম থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েকশ’ পরিবার। আশ্রয় নেয়া কয়েকজন জানান, ত্রাণসামগ্রী এলেও পানি ও ওষুধের সংকট আছে। সবাই খাবার দিচ্ছে কিন্তু সে অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি দেয়া হচ্ছে না।
সরজমিন দাগনভূঞার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ঘুরে দেখা যায় গতকাল বিকাল পর্যন্ত এসব এলাকায় বন্যার পানি বাড়ছিল। ফলে এসব এলাকার বাড়িঘরে অবস্থান করা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। উপজেলার নয়নপুর এলাকার ৫০ বছর বয়সী মোজাম্মেল হক বলেন, এত বন্যা এদিকে কখনো হয় নাই। গতকাল থেকে পানি বাড়তেছে। আমরা এখনো বাড়িতে আছি। ঘরের সামনে দুই ফুট পানি।

সেকান্দারপুর এলাকার বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, বাড়ির ভেতরে পানি আছে। আজ রাতে মনে হয় ঘরে ঢুকবে। বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তায় আছি।
উপজেলার প্রতাপপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকার সব রাস্তাঘাট বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। সেখানে প্রতাপপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনটি ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছেন ১৮০টি পরিবার। বিকাল ৫টার দিকে দাগনভূঞা উপজেলার আতাতুর্ক স্কুলের ১৯৯৬ সালের এসএসসি ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থীরা রান্না করা খাবার ও পানি বিতরণ করেন। সেখানে ৮০০ মানুষের জন্য খাবার দেয়া হয়। এ সময় আজমল হক সুমন বলেন, আমরা দাগনভূঞার বিভিন্ন স্থানে গত কয়েকদিন ধরে খাবার বিতরণ করছি। ব্যাচভিত্তিক বন্ধুরে উদ্যোগে এই কাজটির মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি।
এ ছাড়াও দাগনভূঞার পাশাগ্রুপ, ব্রিকফিল মালিক সমিতিসহ অনেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
বন্যার সার্বিক অবস্থা প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিবেদিতা চাকমা মানবজমিনকে বলেন, প্রায় সত্তর হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানো হচ্ছে। তবে বিক্ষিপ্তভাবে অনেকে বাসাবাড়িতে থাকায় তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়ে ওঠে না।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঢাকার সড়কে চলছে রিকশা। অলিগলি ছাপিয়ে মূল সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন চাকার এই যান। কিছু ভিআইপি সড়কেও চলতে দেখা যাচ্ছে রিকশা। প্যাডেল ছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়েও চালকরা মহাসড়কে উঠছেন। কোথাও কোথাও উল্টোপথেও চলছে রিকশা। শুধু ঢাকার রিকশাই নয়, ঢাকার বাইরে থেকেই বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ঢুকে পড়েছে রাজধানীতে। এতে সড়কের গতিরোধ, বিশৃঙ্খলা ও যানজট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া ভারী মোটরযানের পাশাপাশি তিন চাকার এই হালকা যান চলার কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

ঢাকায় রিকশা নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ গত মে মাসে হাসিনা সরকারের আমলে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধের কথা জানান তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে রিকশাচালকদের আন্দোলনের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা হয়।

এরপর থেকেই ঢাকায় রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে থাকে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো। ঢাকায় কী পরিমাণ রিকশা রয়েছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে বর্তমানে ঢাকায় ১২ লাখের বেশি রিকশা চলাচল করছে। এরমধ্যে শুধু দক্ষিণ সিটিতেই চলছে সাত লক্ষাধিক। যদিও এসব রিকশার বড় একটি অংশ অবৈধ। ঢাকায় দুই সিটি মিলিয়ে লাইসেন্স রয়েছে এমন রিকশার সংখ্যা ২ লাখের কিছুটা বেশি। সম্প্রতি গণপরিবহন সংকটকালীন সময় ঢাকার বাইরে থেকেও ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা ঢুকে পড়েছে রাজধানীতে। এসব রিকশাও এখন দেদারছে চলছে মূল সড়কে।

একটি প্যাডেলচালিত রিকশা বানাতে মাত্র ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। আর ব্যাটারিচালিত রিকশা বানাতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। সরকারিভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন নেই। বিআরটিএ’র তথ্যানুযায়ী, গত বছর ৭ হাজার ৮৩৭টি যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অটোরিকশা ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও ব্যাটারিচালিত রিকশা ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।

বর্তমানে ঢাকার সড়কে তীব্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে একইসঙ্গে যানজট বাড়ছে। এরমধ্যে মহাসড়কে রিকশা চলাচল করাকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সড়কে বের হলেই যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় রিকশা। সড়কের একপাশ জুড়ে থাকে রিকশার সারি। একটি রিকশার গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০-৩০ কিলোমিটার হয়ে থাকে। তাই রিকশার কারণে ভারী মোটরযানের গতিও শ্লথ হয়ে যায়। এতে সৃষ্টি হয় যানজটের। ভারী যানচালকরা জানিয়েছেন, মহাসড়কের জন্য রিকশা চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। যেখানে-সেখানে তারা রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে রাস্তা সরু হয়ে মহাসড়কের গতি কমিয়ে ফেলে। জহির নামের এক রাইদা বাসচালক বলেন, মহাসড়কে রিকশা চলার কারণে গাড়ি চালাতে অসুবিধা হয়। কোনো রিকশার পেছনে গাড়ি থাকলে গতি উঠানো যায় না, ধীরে চালাতে হয়। এখন তো ঢাকার সব জায়গায় রিকশা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতেও এখন রিকশা চলে। এমএম লাভলী পরিবহনের এক চালক বলেন, ফার্মগেট-কাওরান বাজার এলাকায় আগে রিকশা চলতো না। কিন্তু এখন এই সড়ক দিয়েই রিকশা চলছে। অটোরিকশাগুলো খুব জোরে চলে। এগুলোর কারণে ঝুঁকি বাড়ে। মেহেদী হাসান নামের এক মোটরসাইকেলচালক বলেন, রিকশার কোনো লুকিং গ্লাস নেই। তারা হঠাৎ হঠাৎ পিছনে না দেখে ডানে-বামে চাপে। এতে পেছনে থাকা দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে।
জানা গেছে, একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় ব্যাটারি থাকে ৩ থেকে ৪টি। প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় দিনে ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। ফলে অবৈধ এই পরিবহনে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ খরচ হয়। এদিকে গতকাল শাহবাগে দুই ঘণ্টা বিক্ষোভ করেন প্যাডেলচালিত রিকশাচালকরা। বিক্ষোভে তারা বলেছেন, ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলার অনুমতি না থাকলেও দেদারছে চলছে এটি। প্যাডেলচালিত রিকশার বৈধতা আছে, নাম্বার আছে। এর জন্য প্রতি বছর ৩০০ টাকা ফি দিতে হয় তাদের। গত মে মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর অনুমতি দেয়ায় তা সড়কে বেপরোয়া চলাচল করছে বলেও অভিযোগ করছেন প্যাডেলচালিত রিকশাচালকরা। রিকশাচালকদের দাবি, ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মতো উত্তরেও রিকশার নতুন লাইসেন্স দিতে হবে, পুরনো লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। তারা বলেছেন, সরকারের রাজস্ব বাড়ানো ও বৈধ লাইসেন্সধারী রিকশা পেশাজীবীদের স্বার্থে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে চালকদের লাইসেন্স দিতে হবে। এছাড়া অসুস্থ চালকদের জন্য ফ্রি ফ্রাইডে মেডিকেল চিকিৎসা সেবাসহ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স পাওয়া রিকশা পেশাজীবীদের ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার দাবি করেছেন চালকরা।

বর্তমানে ঢাকার আশেপাশের ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো সব ঢাকায় ঢুকেছে। এটার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এখন মূল সড়ক সব ধরনের রিকশা চলাচল দ্রুত বন্ধ করতে হবে। শাখা সড়কে চললেও সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা দরকার। এখন যানজট মূল সড়ক থেকে শাখা সড়কেও চলে যাচ্ছে। তাই শাখা সড়কেও ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। তাই রিকশা কোথায় পার্কিং হবে, সার্কুলেশন কীভাবে হবে এসব পরিকল্পনা লাগবে।

এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, আমাদের কারখানাগুলোতে তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। মোটরগুলো আমদানি হচ্ছে এগুলো বন্ধ করতে হবে। প্রশাসনকে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতিদ্রুত একটা নীতিমালা তৈরি করা দরকার। বিগত সরকারের সময়েও এই নীতিমালার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো কাগজে-কলমে কাজ হয়, আলোর মুখ দেখে না। মূল সড়কে চলবে গণপরিবহন। আমাদের সড়কে এই ছোট ছোট যানবাহন দিয়ে চাহিদা পূরণ হবে না।

মৌলভীবাজারে অসহায় মানুষ -তৃতীয় দফায় বন্যা by ইমাদ উদ দীন

ধীরগতিতে কমছে বানের পানি। জেলার নদীগুলোর পানি এখন বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর কমতে শুরু করেছে নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়া গ্রামগুলোর উজান এলাকায় বানের পানি। তবে নদী ও হাওরের ভাটি এলাকায় এখনো ঘরবাড়িতে হাঁটু ও কোমর পানি। সময় যত যাচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্র, অন্যত্র আশ্রয় নেয়া ও নিজ বসতভিটায় ঝুঁকি নিয়ে থাকা বন্যার্তরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটসহ স্যানিটেশন আর পানিবাহিত নানা রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। জেলার ৭টি উপজেলার নদী ও হাওর তীরের প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত। এর আগে কখনো এমন আগ্রাসী ও রাক্ষুসে বন্যা দেখেননি কেউ। মাত্র ঘণ্টা দুয়েক এর ব্যবধানে কিছু সামাল দেয়ার আগেই আকস্মিক এ বন্যায় চোখের নিমিশে সবই শেষ। কোনো রকম প্রাণ রক্ষা করতে পারলেও সব হারিয়ে এখন তারা নিঃস্ব।

বানভাসিরা বন্যার প্রথমদিনের ভয়াবহতার ভয় আর দুঃসহ স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। স্বপ্নের রোপা আমন ধান ও সবজি ক্ষেত বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা এখন দ্বিগুণ হচ্ছে। এমনটি জানালেন জেলার মনু, ধলাই, ফানাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকার বন্যায় দূর্ভোগগ্রস্তরা। জানা যায়, জেলা জুড়ে এখন ৩য় দফা বন্যা চলমান। এখন বৃষ্টি থামলেও ধীরগতিতে নামছে পানি। জেলার নদী তীরের বাসিন্দারা নতুন করে প্রথমবারের মতো বন্যা আক্রান্ত হলেও হাওর তীরের বাসিন্দারা এনিয়ে ৩য় দফায় বন্যা আক্রান্ত হলেন। আগের দু’দফা বন্যার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারো বন্যা আক্রান্ত হলেন। জেলার নদী ও হাওর তীরের গ্রামগুলোর বন্যাকবলিত অনেক মানুষই তাদের গবাদিপশুসহ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। অনেকেই নানা কষ্টে ঘরে মাচাং বেঁধে চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।

তারা জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পেলেও গ্রাম এলাকায় ত্রাণ সহায়তা মিলছে কম। এমন দুর্দিনে তারা এখনো সরকারি ত্রাণ সহায়তা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা পাননি। ব্যক্তি, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনসহ বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ হলেও তা শৃঙ্খলিত না হওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন দুর্ভোগগ্রস্তরা। আশ্রয়কেন্দ্র বা যোগাযোগ ব্যবস্থা যে এলাকায় ভালো সেখানে ত্রাণ যাচ্ছে বেশি। বন্যাকবলিত অনেক গ্রামেই দীর্ঘ অপেক্ষার পরও অসহায় বন্যার্তরা পাচ্ছেন না ত্রাণ সহায়তা। তারা জানান, এই সময়ে ক্ষেত কৃষি না থাকায় নেই আয় রোজগারও। বন্যায় সর্বস্বান্ত কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের হতদরিদ্র মানুষ পড়েছেন মহাবিপাকে। তারা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সমস্যায় ভুগছেন। তারা অভিযোগ করে বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে হাওর ও নদী তীরের অধিকাংশ বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিচতলায় শৌচাগার ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা থাকায় তা বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অনুরূপ বাড়িতে, সড়কে বা উঁচু স্থানে অন্যত্র আশ্রয় নেয়া বন্যাকবলিত লোকজনও এই সমস্যায় ভুগছেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলার ৭টি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৬৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে প্রায় ১১ হাজার বন্যার্ত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ৬৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে ৮২৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। জেলার অসহায় হতদরিদ্র বানভাসি দুর্ভোগগ্রস্ত মানুষ সরকার, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও রাজনৈতিক সংগঠন, বিভিন্ন সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠনসহ দেশ ও প্রবাসের বিত্তবানদের কাছে অতীতের মতো তাদের চলমান এই কঠিন দুর্যোগে সার্বিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন জানাচ্ছেন।

গাজীর কারখানায় আগুন -লুট করতে গিয়ে নিখোঁজ ১৭৬ by জয়নাল আবেদীন জয়

নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের এমপি, সাবেক মন্ত্রী ও গাজী গ্রুপের মালিক গোলাম দস্তগীর গাজীর টায়ার কারখানায় দ্বিতীয়বারের মতো আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। রূপগঞ্জের রূপসী এলাকার ওই কারখানাতে গত রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সোমবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট টানা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আগুন দেয়া পর্যন্ত চলে লুটপাট। লুটপাট করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ১৭৬ জন নিখোঁজ বলে ফায়ার সার্ভিসের কাছে দাবি করেছেন নিখোঁজদের স্বজনরা। ইতিমধ্যে স্বজনরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের কাছে নিখোঁজদের নাম ঠিকানা দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা, গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দস্তগীরসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারীরা গা ঢাকা দেয়। সেদিন বিকাল থেকেই গোলাম দস্তগীরের মালিকানাধীন রূপসী এলাকায় গাজী টায়ার কারখানা ও কর্ণগোপ এলাকায় গাজী পাইপ এবং ট্যাংক পাম্প কারখানাসহ তার মালিকানাধীন জি পার্ক, বসতবাড়ি ও পূর্বাচলের বাড়িতে লুটপাটের পর আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে গত ২৪শে আগস্ট গোলাম দস্তগীর গাজীকে ঢাকার শান্তিনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২৫শে আগস্ট এ খবর রূপগঞ্জে ছড়িয়ে পড়লে লোকজন আবারো রূপসী গাজী টায়ার কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু করেন।

স্থানীয় বেশকিছু বিএনপি নেতাকর্মীরা এসে ভাঙচুর ও লুটপাটে বাধা দিলে তা না মেনে ভাঙচুর ও লুটপাট চলতেই থাকে। একপর্যায়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে কারখানার ভেতরের ৬ তলা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন কয়েক শতাধিক লোকজন। ওই ভবনে কেমিক্যাল ও টায়ার তৈরির কাঁচামাল ছিল। ভবনের ভেতরে লুটপাট নিয়ে দুটি পক্ষের মাঝে হাতাহাতি ও মারপিটের ঘটনা ঘটে। এ সময় একটি পক্ষ ভবন ত্যাগ করলে ভবনের প্রবেশ গেট বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে পুরো ভবনে আগুন লেগে যায়। এ সময় আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আগুনের লেলিহান শিখা ৬০ থেকে ৮০ ফুট উঁচুতে উঠে পড়ে। ভবনের ভেতরে আটকা পড়া অনেকেই স্বজনদের ফোন করে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানায়। খবর পেয়ে ঢাকার ফুলবাড়ীয়া ফায়ার সার্ভিস, ডেমড়া ফায়ার সার্ভিস, কাঞ্চন ফায়ার সার্ভিস, আড়াইহাজার ফায়ার সার্ভিস, আদমজী ফায়ার সার্ভিস, সিদ্দিকবাজার ফায়ার সার্ভিসসহ ১২টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে ব্যবহার করেন টিটিএ। সন্ধ্যা ৬টা অবধি এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। এদিকে, ভবনে প্রবেশ করে নিখোঁজ হয়েছেন এমন ব্যক্তির খোঁজে গাজী টায়ার কারখানায় ভিড় করছেন স্বজনরা। এখন পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের কাছে ১৭৬ জন নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা দিয়েছেন স্বজনরা। বেশির ভাগ নিখোঁজদের বাড়ি উপজেলার মৈকুলী, রূপসী কাজিপাড়া, ছাতিয়ান, মুগরাকুল, কাহিনা, বরপা, মাসাবো, তারাবো, বরাবো, চনপাড়া,  মুড়াপাড়াসহ আশপাশের এলাকায়।

ভয়াবহ এই আগুনে কারখানার আশপাশের মার্কেট, হাটবাজার, শিল্প কলকারখানা এবং এলাকাবাসী চরম আতঙ্কে রয়েছেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিএনপি নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশিক্ষক) রেজাউল করিম বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নিখোঁজদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আগুন নেভানোর পর নিখোঁজদের ব্যাপারে বলা যাবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বজনরা আমাদের কাছে ১৭৬ জন নিখোঁজের তালিকা দিয়েছেন।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মনিরুজ্জামান মনির বলেন, দলীয় নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে সাংগঠনিকভাবে দল থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গাজী সাহেব অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার করা হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের রুটি-রোজগারের জায়গা এই কারখানা। কারখানা ধ্বংস করলে এখানে কর্মরত ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মচারী কোথায় যাবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান মাহমুদ রাসেল বলেন, কেউ কোনো প্রকার অরাজকতা, লুটপাট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবে। প্রচলিত আইনে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বন্যায় বাড়ছে উদ্বেগ, উত্তেজনার পারদ চড়ছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে

বাংলাদেশের জনগণের একটি বৃহৎ অংশের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে প্রবলভাবে বেড়েছে ভারতবিরোধী মনোভাব। তাঁদের ধারণা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে যেন তেন প্রকারে ক্ষমতা ধরে রাখতে মদত জুগিয়ে গেছেন। ২১শে আগস্ট উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বন্যায় বাংলাদেশ বিধস্ত হবার পর, আবারো বাংলাদেশিদের কাছে ভিলেন হিসেবে আবির্ভূত হয় ভারত। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে অবহিত না করেই ত্রিপুরার একটি বাঁধ থেকে পানি ছাড়ার জন্য ভারতকে দোষারোপ করা হচ্ছে, ছাত্ররা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভারত বিরোধী স্লোগান তুলে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে।

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দুই ছাত্র প্রতিনিধির একজন নাহিদ ইসলাম ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, “সতর্কতা ছাড়াই বাঁধ খুলে দিয়ে ভারত অমানবিকতা প্রদর্শন করেছে।” একটি ফেসবুক পোস্টে, তিনি লিখেছেন: “যে প্রজন্ম ভারতকে আমাদের শত্রু হিসাবে দেখে তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।” বাংলাদেশের কিংবদন্তি রাজনীতিবিদদের মধ্যে একজন, প্রয়াত মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যিনি অভিযোগ তুলেছিলেন, ভারত বাংলাদেশকে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলির পানি থেকে বঞ্চিত করছে, এটি তাঁরই একটি উদ্ধৃতি।

ভারত এবং বাংলাদেশ গঙ্গা (পদ্মা), তিস্তা এবং ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) সহ ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগ করে। ইউনূস প্রশাসনের ছাত্র প্রতিনিধি নাহিদ ইসলাম, এমনকি একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ভারতকে “পানি সন্ত্রাস” এর দায়ে অভিযুক্ত করেছে। অন্য একটি পোস্টে নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, “আমরা তিস্তা প্রকল্প চীনকে দিলে ভারত জব্দ হবে।” তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতার কারণে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব গ্রহণে ভারতের সিদ্ধান্তহীনতাকে কাজে লাগাতে চাইছে চীন। নাহিদ ইসলামের মন্তব্যের ভার রয়েছে, কারণ তিনি ছাত্র বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন। যে বিক্ষোভ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকে উৎখাত করেছিল। নাহিদ বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রধান।

বৃহস্পতিবার, পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক একটি বিবৃতি জারি করে বন্যার কারণ ব্যাখ্যা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রক বলেছে-'আমরা বাংলাদেশকে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখেছি যে, ত্রিপুরার গোমতী নদীর উজানে দুম্বুর বাঁধ খুলে দেওয়ায় নাকি বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তের জেলাগুলিতে বন্যার বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এটি সঠিক নয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গোমতী নদীর ক্যাচমেন্ট এলাকায় গত কয়েকদিনে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং বাংলাদেশে বন্যাটি মূলত বাঁধের নিচের দিকের এই বৃহৎ ক্যাচমেন্টের পানির কারণে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে দুম্বুর বাঁধটি বাংলাদেশের ১২০কিলোমিটার উজানে অবস্থিত এবং এটি একটি কম উচ্চতার বাঁধ, প্রায় ৩০ মিটার লম্বা। প্রবল প্রবাহের ক্ষেত্রে, পানি  স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্গত হয়। ভারত বিকাল ৩টা পর্যন্ত পানির স্তর বৃদ্ধির প্রবণতা সম্পর্কে বাংলাদেশকে অবহিত করতে থাকে। ২১ আগস্ট, সন্ধ্যা ৬ টার দিকে বন্যার কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভারতের বিবৃতিতে পানি বন্টনের সহযোগিতাকে  দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। জোর দেওয়া হয়েছে যে ভারত  দ্বিপাক্ষিক পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে পানি  সম্পদ এবং নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত  পারস্পরিক উদ্বেগগুলি সমাধান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সন্ধ্যায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেন। ভারতের কিছু নেতৃস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে যে ভার্মাকে তলব করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া এটিকে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে জানিয়েছে। ঘটনার সাথে পরিচিত ঢাকার লোকেদের মতে, ভার্মা ভুল তথ্যের দ্বারা সৃষ্ট জটিলতাগুলির সমাধানে ইউনূসের সাথে দেখা করেছিলেন। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের নিরাপত্তার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা মোতাবেক, বৈঠকে ইউনূস বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথভাবে বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। ইউনূস আশাপ্রকাশ  করেছিলেন যে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধের  শীঘ্রই সমাধান করা হবে।

জটিল সমস্যা

যদিও বিবাদের সমাধান করা সহজ বিষয় নয়। কারণ একাধিক নদীর পানি নিয়ে বিরোধ রয়েছে, তবে গঙ্গা ও তিস্তা প্রধান। রাজনীতিবিদ ভাসানীর শেষ প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচী ছিল ১৯৭৬ সালের মে মাসে 'ফারাক্কা লং মার্চ'। ৯৬ বছর বয়সী ভাসানী ১৯৭৫ সালে গঙ্গা নদীর উপর ভারত যে ফারাক্কা ব্যারেজ স্থাপন করেছিল তা ভেঙে ফেলার দাবিতে ঐতিহাসিক পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে এই ব্যারেজ বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানির অংশ থেকে বঞ্চিত করবে। ভারত ১৯৯৬ সালে (১৯৭৭ এবং ১৯৮৮সালের মধ্যে অ্যাড-হক ব্যবস্থা অনুসরণ করে) বাংলাদেশের সাথে একটি পানি বন্টন চুক্তি সম্পন্ন করে। যার প্রেক্ষিতে ভাসানীর লং মার্চকে আজও বাংলাদেশ স্মরণ করে। গত কয়েক বছরে ফারাক্কা লং মার্চ স্মরণ দিবসের তাৎপর্য দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে, মার্চের ৪৮ তম বছর স্মরণে ঢাকায় একাধিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। বেশিরভাগ ইভেন্টের আয়োজকরা দাবি করেছিলেন যে বাংলাদেশের ৫৪ টি আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য অংশের জন্য লড়াই করা উচিত।

এই ধরনের আবেগ গত দুই থেকে তিন বছরে বেড়েছে, কারণ বাংলাদেশ ২০১৯ সালে ভারতকে ফেনী নদী থেকে পানি উত্তোলনের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ২১শে আগস্টের বন্যার পর, ছাত্র কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে ফারাক্কা ব্যারেজ বন্ধ করার জন্য ভাসানীর দাবির পুনরাবৃত্তি করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভারতীয় রাজনীতিবিদ বলেছেন- এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় অপ্রস্তুত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভারতকে বলির পাঁঠায় পরিণত করতে চাইছে। ভারত-বাংলাদেশ পানি-বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০২৬ সালে চুক্তির পুনর্নবীকরণের জন্য ভারতের সাথে আলোচনার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশের নতুন সরকার অন্যান্য বিকল্পগুলিও বিবেচনা করছে।

অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকার একজন বুদ্ধিজীবী আনু মুহম্মদ ভারতকে উজানে বাঁধ দিয়ে আন্তঃসীমান্ত নদীতে পানি প্রবাহে বাধা, বর্ষা মৌসুমে  হঠাৎ করে পানি ছেড়ে দেওয়া এবং পানি বণ্টনে একতরফা পদক্ষেপের জন্য অভিযুক্ত করেছেন। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের মতে, ১৯৯৬সালের পানি-বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে ঠিকই তবে সামগ্রিকভাবে ফারাক্কা ব্যারেজ বাংলাদেশকে দারুণ যন্ত্রণা দিয়েছে। ওই অধ্যাপক দাবি তুলেছেন- “এটাই সময়, বাংলাদেশের উচিত ভারতের কাছে ফারাক্কা ব্যারেজ বাতিল করার দাবি জানানো। এটা অযৌক্তিক দাবি হবে না। অতীতে, ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ফারাক্কা ব্যারাজের সমালোচনা করেছিলেন এবং এটি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।"

তিস্তার পানিবণ্টন সংকট সমাধানও সহজ হবে না। ভারতের কাছে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় দাবি কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছেন এই অভিযোগ করে যে তার রাজ্য পানি থেকে বঞ্চিত হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুক্তি হলো, সিকিম জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধের মাধ্যমে তিস্তার পানিকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। তিস্তার পানি উজানের প্রবাহকে মুক্ত না করে বাংলাদেশের সাথে ভাগ করা হলে পশ্চিমবঙ্গর উত্তরাংশ শুষ্ক হয়ে যাবে। যেহেতু জলবিদ্যুৎ বাঁধগুলি সিকিমের আয়ের প্রধান উত্সগুলির মধ্যে একটি, তাই ভারত সরকারের পক্ষে সিকিমকে তিস্তাকে অবাধে প্রবাহিত করতে দিতে রাজি করানোর কাজটি সহজ হবে না।

জলবায়ু উদ্বেগ

আন্তঃসীমান্ত নদী সম্পর্কিত সমস্যাগুলির পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বে জলবায়ু পরিবর্তন বৃষ্টির ধরণকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। ভারতের চারটি রাজ্যের নদীর পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই রাজ্যগুলি হল পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা এবং মেঘালয়। মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা এবং  পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে  বড় বন্যা সাধারণত বাংলাদেশের নিম্নধারার এলাকাকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র, 'প্রথম আলোর' একটি কলামে, আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল ভারতের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন যে, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের ফেনী ও কুমিল্লা জেলা এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে তিন দিনে যে বৃষ্টিপাত হয়েছে তা পুরো আগস্ট মাসের গড় বৃষ্টিপাতের সমান। এই রেকর্ড বৃষ্টির কারণে এই নজিরবিহীন বন্যা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিতে বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদদের ব্যর্থতা এবং বাঁধের গেট খোলার বিষয়ে অবগত করতে ভারতের অক্ষমতাকেও দায়ী করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের সাম্প্রতিক প্রবণতা অনুসারে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খরা এবং বন্যা উভয়ের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়তে পারে। সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের হ্রাস এবং একই সময়ে চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনাগুলি বেড়েছে। তিস্তার গড় পানি  নিষ্কাশনও ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের নিম্নধারার এলাকায় পানির প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে। নতুন আবহাওয়ার ধরণটি নির্দেশ করে যে দীর্ঘ শুষ্ক অঞ্চলগুলি সংক্ষিপ্ত ভারী বৃষ্টিপাতেই  ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। যদি উত্তর-পূর্ব ভারত বন্যা ও খরার ঘটনা প্রত্যক্ষ করে, তবে বাংলাদেশের নিম্নধারার অঞ্চলগুলিকে এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

সূত্রঃ দ্য ডিপ্লোম্যাট