Monday, February 29, 2016

ফোর ইন ওয়ান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ by শাহদীন মালিক

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকের ঘটনা। খোঁজাখুঁজি করলে প্রথম আলোসহ অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সঠিক দিন, হেডলাইনের ভাষা ইত্যাদি পাওয়া যাবে। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বৃত্তান্ত এখানে ততটা গুরুত্বপূর্ণ না, মূল কথাটাই মুখ্য।
কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহ নামের এক শিশু অপহৃত হয়েছিল। অপহরণকারীরা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। লাখ দুয়েক টাকা (যত দূর মনে পড়ে) মুক্তিপণ দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ ফিরে আসেনি। দিন পাঁচেক পর তার গলিতপ্রায় লাশ পাওয়া গিয়েছিল। মুক্তিপণ আদায় ও ঘটনাবলির অন্যান্য পরম্পরার সূত্র ধরে দুই আসামি গ্রেপ্তার হলো। মূল আসামি হিসেবে শনাক্ত হলো জনৈক মোতাহার। র্যা ব গ্রেপ্তার করল মোতাহারকে। ‘ক্রসফায়ারে দিল’। মোতাহার নিহত হলো।
বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে নিহত আবদুল্লাহর বাবা-মায়ের বক্তব্য শুনলাম। তাঁরা সন্তুষ্ট। তাঁদের ছেলের হত্যার সঠিক বিচার হয়েছে। খুনির শাস্তি (ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া) হয়েছে। টেলিভিশন আরও দেখাল—এলাকাবাসীও ভীষণ সন্তুষ্ট। এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে।
র্যা ব তার সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। দু-চারজনের মনে না-ও থাকতে পারে, তাই পুরোনো খবরের পুনরাবৃত্তি করছি। ২০০৪ সালের দিকে, যত দূর মনে পড়ে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। আজকাল কালেভদ্রে পত্রপত্রিকায় তাঁর ছবি দেখা যায় (হাতকড়া পরানো, প্রিজন ভ্যান থেকে হয় নামছেন বা উঠছেন) আর সম্ভবত তারেক রহমানের ছবি দেখা বা কথা শোনা যায় না, কারণ হাইকোর্ট পলাতক আসামির খবর প্রকাশ/প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। অনেকটা তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় সৃষ্ট র্যা ব তখন যা করত, আজও প্রায় তা-ই করছে। ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ চলছেই। ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে মোতাহারের পর শিশু হত্যাসংক্রান্ত ২৬ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার খবরের শিরোনাম: ‘বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন নিহত...’। অবশ্য শিরোনামে আরও ছিল ‘...বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা’।
হবিগঞ্জের বাহুবলের চার শিশু হত্যার মূল সন্দেহভাজন আসামি বাচ্চু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ২৫ তারিখে, অর্থাৎ আগের দিন। সেই খবর। বিচার তো হয়েই গেল, আবার শঙ্কা-টঙ্কা কী?

দশক চারেক আগে, কিছু কমও হতে পারে, ‘টু ইন ওয়ান’ প্রথম বাজারে এসেছিল। টেপ বা ক্যাসেট প্লেয়ার, আর সঙ্গে রেডিও। তাই টু ইন ওয়ান। তারপর থ্রি ইন ওয়ান। অর্থাৎ ক্যাসেট আর সিডি প্লেয়ার, আর সেই সঙ্গে রেডিও। এখন যুগ ‘ফোর ইন ওয়ান’-এর।

বিচার-আচার দেশ থেকে উঠে গেছে—এটা তো বলা যাবে না। তবে ‘রূপ’ নিশ্চয়ই পাল্টেছে। আমরা সবাই একেবারে গোড়ার কথায় গিয়ে ঠেকেছি। এবং সেটা খোদ প্রধান বিচারপতির কথার জের ধরে। বিচারপতিরা রায় কখন লিখবেন, মামলার শুনানির পর? নিয়ম মেনে সময়মতো রায় যে লেখা হয় না, তা তো না। রায় লেখা হতো, হচ্ছে। প্রশ্নটা এখন সময় নিয়ে। তবে অন্য কিছু প্রশ্নও উঠে এসেছে কারণ, খোদ প্রধান বিচারপতিই তো কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ কে খান আইন অনুষদ ভবন’ উদ্বোধন করার বক্তৃতায় বলেছিলেন যে টেলিফোনে নির্দেশনা পেয়ে রায় আর লেখা হয় না।
শুনানি শেষের পরে যদি রায় লেখা হয় তবে, প্রশ্ন হলো কত পরে? এক বছর, দুই বছর, তিন বছর? অবসর হয়ে যাওয়ার পর কত বছর তক? রায় লেখা অবশ্য অতি দুরূহ ব্যাপার। বিশেষ করে উচ্চ আদালতের। এখানে সিদ্ধান্ত বা ‘ডিসিশন’-এর সঙ্গে আইনের ব্যাখ্যার প্রশ্নও জড়িত।
আগে হাইকোর্টের নিয়ম ছিল পুরো রায়টা—অর্থাৎ এ ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে বাদীর আইনজীবী তাঁর পক্ষে এই এই তথ্য ও যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। পক্ষান্তরে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী বাদীর বক্তব্য এই এইভাবে খণ্ডন করেন। নিজের পক্ষে এই সেই তথ্য, যুক্তি প্রদান করেছেন। রায়ে এসব কথা বলে রায় প্রদানকারী বিচারপতি উভয় পক্ষের তথ্য ও আইনি যুক্তির মূল্যায়ন করে আস্তে আস্তে কোন পক্ষের আইনগত অবস্থা সঠিক, সেদিকে এগিয়ে যেতেন। দুই-তিন-চার ঘণ্টা ধরে বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মৌখিক বক্তব্যের পর একেবারে শেষে গিয়ে বলেন, মামলাভেদে—রুল ইজ মেড অ্যাবসলিউট। অর্থাৎ বাদী জিতেছে। অথবা বিপরীত সিদ্ধান্তে উপনীত হলে ‘রুল ইজ ডিসচার্জড’।
মাননীয় বিচারপতির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনে আমরা বুঝতে পারতাম, রায়টা কেন আমার মক্কেলের পক্ষে/বিপক্ষে গেল। মাননীয় বিচারপতির ডিকটেশনটা বেঞ্চ অফিসার শর্টহ্যান্ডে লিপিবদ্ধ করেন। পরে টাইপ করে বিচারপতিদের দেন। তাঁরা পড়ে, কারেকশন করে চূড়ান্ত করেন এবং অবশেষে তিন/চার মাস পর আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় পাই। গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলো বিভিন্ন ল রিপোর্টে ছাপা হয়।
তবে আজকাল কোনো কোনো বিচারপতি কিছু কিছু মামলায় এক লাইনে শেষের কথা—অর্থাৎ ‘আপিল অ্যালাউড’ (আপিলকারী জিতেছে) বা ‘রুল ডিসচার্জড’ বলে শেষ করে দেন। ফলে পুরো রায়টা দু-তিন বছরেও পাওয়া যায় না। বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তির অন্ত থাকে না।
‘স্যার, রায় কখন পাব’ প্রশ্নের জ্বালায় মক্কেলের ফোন ধরি না।
তাই হয়তো প্রধান বিচারপতি রায় কত দিনে লিখবেন, প্রশ্নটা সামনে নিয়ে এসেছেন। তবে কোনো সুরাহা আজতক হয়েছে বলে শুনিনি। আমরা সমস্যা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করতে পারদর্শী। কিন্তু সমাধান খুঁজে পাই না।
কোনো কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য যে আয়োজন-সরঞ্জাম-কর্মকর্তা ইত্যাদি প্রয়োজন, তার প্রায় কিছুই আমাদের আদালত ব্যবস্থায় নেই। এসবের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে না। ফলে অবস্থার পরিবর্তনের আশা খুবই অল্প। কিন্তু আদালতে যন্ত্রপাতি (কম্পিউটার ইত্যাদি) সাজ-সরঞ্জাম, দক্ষ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংস্কার অত্যাবশ্যক। সংস্কার যত দেরিতে হবে, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি তত বাড়বে আর বিচারব্যবস্থার ওপর কমবে আস্থা।

সমস্যা আরও আছে, আজকাল আইন-মামলা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ধারণাগুলো হয়ে উঠছে অত্যন্ত গোলমেলে।
পুরোনো এবং অনেকেরই জানা চুটকি। মক্কেল গেছে ভালো উকিলের কাছে। উকিল সাহেব মক্কেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে, কাগজপত্র দেখে বলে দিলেন যে তার মামলা চলবে না।
মক্কেল উত্তেজিত—আপনি না বড় উকিল, মামলা চালাতে পারবেন না, এটা কী কথা? ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মক্কেল চলে গেল, পরদিন অন্য উকিল তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে মামলা দায়ের করে দিল। মামলা চলল বছর পাঁচেক। মক্কেলের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ গেল উকিলের পেছনে, উকিলের সেরেস্তায়। শেষ পর্যন্ত মামলা খারিজ। এ জন্যই প্রথম উকিল মামলা ফেরত দিয়েছিল। কিন্তু মামলা ঠিকই চলেছিল পাঁচ বছর।
মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা চলা শুরু হয়েছে। মামলা সংখ্যা ৭৮–এ পৌঁছেছে বলে জেনেছি। অনেককে বলতে শুনেছি, এগুলো তো দেওয়ানি মামলা। ক্ষতিপূরণ চেয়েছে সে, যে মামলা করেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ।
জানলাম প্রথম যে ফৌজদারি কোর্টে আজকাল দেওয়ানি মামলা চলছে ডজন ডজন, সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে। দেওয়ানি মামলায় অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট হচ্ছে। আর এতকাল জানতাম, আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা করতে হলে ‘কোর্ট’ ফি দিতে হয়। কোটি টাকা বা তার বেশি ক্ষতিপূরণ চাইতে হলে আদালতে ‘ফি’ দিতে হয় হাজার পঞ্চাশেক টাকা।
পুলকিত হয়ে দেখছি ‘কোর্ট’ ফি ছাড়াই মামলা চলছে।
যে ‘ডিফেমড’ অর্থাৎ যার মানহানি হয়েছে, মানহানির মামলা করবে সে স্বয়ং, আইনে এর তিনটি ব্যতিক্রম দেওয়া আছে। যার মানহানি করা হয়েছে সেই ব্যক্তি যদি মৃত হয়, অথবা উন্মাদ হয় অথবা ‘পর্দানশিন’ মহিলা হয়, তা হলে তার পক্ষে অন্য ব্যক্তি মানহানির ফৌজদারি মামলা করতে পারবে। অন্যথায় মামলা চলবে না। অথচ মামলা চলছে। সেই দ্বিতীয় উকিলের মতো—মামলা চলবে না মানে! চালালেই চলবে।
আরেক নীতিনির্ধারক বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীতে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে বিধান করা হয়েছে। সেহেতু এক-এগারোর ক্ষমতা দখলকারীদের বিরুদ্ধে পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী অবৈধ/অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলের মামলা করা হবে। ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭-এ। পঞ্চদশ সংশোধনী হয়েছিল ২০১১-তে। ঘটনার পর আইন পরিবর্তন করে নতুন আইনের অধীনে পুরোনো ঘটনার বিচার করা যায় না। এ ব্যাপারে ২০০৯-এর বিডিআর বিদ্রোহের পর খোদ রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আপিল বিভাগ উত্তর দিয়েছিলেন, না, ঘটনার পর আইন পরিবর্তন করে আগের ঘটনার বিচার করা যাবে না। সংবিধানের ৩৫ (১) অনুচ্ছেদেও এ কথাই বলা আছে।
তাতে কী। এ দেশে এখন মামলা চালাতে চাইলেই চলে।

এখন ফোর ইন ওয়ানের যুগ। অভিযোগ গ্রহণ করে র্যা ব। তদন্ত করে র্যা ব। দোষ-নির্দোষ সিদ্ধান্ত নেয় র্যা ব। শাস্তি কার্যকর করে র্যা ব। ফোর ইন ওয়ান। যেসব ব্যাপার বা ঘটনায় র্যা বের কোনো ইন্টারেস্ট নেই, সেসব ঘটনায় আমরা আদালতে মামলা চালাই।
এই অধম নিশ্চিত, ২০৪১ সাল পর্যন্ত এ দেশের জনগণকে অপেক্ষা করতে হবে না। তার অনেক আগেই আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে যোগ দেব। তবে আইনের শাসন বাদ দিয়ে। চলবে র্যা বের শাসন, পুলিশের শাসন, রিমান্ডের শাসন এবং আরও নতুন নতুন শাসন। জাদুঘরে ঢুকবে আইনের শাসন।
ড. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট।

চতুর্দিকে সর্বনাশের ঘণ্টাধ্বনি! by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

দেশ, রাষ্ট্র, জনগণ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি সব কিছু আজ ফ্যাসিবাদের যূপকাষ্ঠে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। একটি বিকাশমান অর্থনীতি ক্রমেই পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি আজ লুটেরাদের হাতে বন্দী। ঘুষ-দুর্নীতি প্রবেশ করেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সাধারণ মানুষ আজ অনিরাপদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন এক আতঙ্কের নাম। বিপদে সাহায্যের জন্য পুলিশের কাছে ঘেঁষতেও ভয় পেতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। কাগজে কাগজে শিরোনাম হয়েছে- ‘ফুয়েল না দিলে ফাইল নড়ে না’। কোথাও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মতো স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সর্বত্র এমন সব লোককে নিয়োগ বা দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যারা কেবলই ‘জো-হুকুম’ টাইপের মোসাহেব। কোথাও কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় লাগামছাড়া হয়ে গেছে দুর্নীতি। ব্যাংকগুলো লুট হয়ে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত এই লুটেরাদের কাছে বড় বেশি অসহায়। তিনি বলছেন, দলীয় লোকদের চাপের কারণে লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। ‘রাজনৈতিক বিবেচনা’য় দেয়া হয়েছে ব্যাংকের লাইসেন্স। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো কথায় পাত্তা দিচ্ছে না। সেখানেও ইতোমধ্যে জাঁকিয়ে বসেছে দুর্নীতি আর অনিয়ম। বেসিক ব্যাংক লুটে খেলেন যে শেখ বাচ্চু, তার নাম পর্যন্ত যেন কেউ নিতে সাহস পাচ্ছিল না। কিন্তু কী শক্তি এই লুটেরার? কোন খুঁটির জোরে তিনি আছেন বহালতবিয়তে, তার কোনো হদিস মিলছে না। অবশেষে অর্থমন্ত্রী সংসদে বললেন, বেসিক ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সাথে জড়িত আছেন ওই শেখ বাচ্চু, আজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের জবার দেয়ার মতো কেউ নেই। এমনকি অর্থমন্ত্রীও না।
থানায় গেলে আরো মরণ। একটি জিডি করতেও ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগে। থানার চেয়ার-টেবিলও ঘুষ খায়। এর মধ্যে আছে আবার পুলিশের সোর্স। তারা পুলিশকে চিনিয়ে দেয়, কাকে আটক করলে মুক্তিপণ আদায় করা যাবে। প্রতিদিন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে পুলিশের প্রধান পুলিশের অত্যাচার-নির্যাতনকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে বিচ্ছিন্ন ঘটনার পাহাড় জমে গেছে। পুলিশের এই অপরাধের আজব এক সাজার নাম হয়েছে ‘ক্লোজড করা’ বা ‘প্রত্যাহার করা’। এর মাধ্যমে পুলিশ যেন বাঙালকে হাইকোর্ট দেখায়। আমরা প্রতিদিন হাইকোর্ট দেখছি। এ ক্ষেত্রেও দলীয়করণ বা আঞ্চলিককরণের কুপ্রভাব আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছি। কনস্টেবল যদি গোপালগঞ্জের হয়, তাহলে সে ওসিকেও মানতে চায় না। পুলিশের চেইন অব কমান্ড রসাতলে গেছে। প্রতিদিন পুলিশ অপরাধ করছে। প্রতিদিন ক্লোজড বা প্রত্যাহার হচ্ছে। তাতে তাদের অপরাধ কমছে না। কারণ সে জানে, তাকে শায়েস্তা করার কেউ নেই। আর সে কারণেই পুলিশ অহঙ্কার করে বলতে পেরেছেÑ ‘মাছের রাজা ইলিশ আর দেশের রাজা পুলিশ।’ সরকার তার বিরোধীদের দমনে নির্বিচারে যথেচ্ছ পুলিশকে ব্যবহার করছে। ফলে তার নিজেকেই দেশের রাজা মনে হচ্ছে।
এ দিকে সংদদে আবার প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, জামায়াত-শিবিরসহ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদযুক্ত ব্যক্তিরা যেন কোনোভাবেই পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিয়োগ না পেতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, আগুনসন্ত্রাসীরা যেন শৃঙ্খলিত একটি বাহিনীতে ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারে পুলিশকেই সজাগ থাকতে হবে। আমরা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চাই না, তবে আশা করি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। তিনি বলেন, পুলিশ নিয়োগে যাতে জঙ্গি সন্ত্রাসী ও জামায়াত-শিবির না ঢুকতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে তার হাজারবার বলা মানুষ পুড়িয়ে মারার কাহিনী পুনরুল্লেখ করে বলেন, এমনকি পুলিশ সদস্যরাও বিএনপি-জামায়াতের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। তারা ১৮-১৯ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে। পুলিশবাহিনী যখন জনবল গ্রহণ করে, তখন এর দায়িত্বে থাকেন পুলিশবাহিনীর অফিসারেরা। তাই তাদের এ কথাগুলো মনে রাখা উচিত। এমপিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের নিজ নিজ এলাকায় এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল তারা কেউ যদি পুলিশ বাহিনীতে ঢুকে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই এসব তথ্য গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে দেবেন এবং তারা সেটা নিশ্চয়ই যাচাই-বাছাই করে দেখে ব্যবস্থা নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একসাথে অনেক মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। প্রথমত, কেউ জামায়াত-শিবির বা বিএনপি করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে চাকরি দেয়া যাবে না, সংবিধান তার এ বক্তব্য সমর্থন করবে না। তাহলে এই বাহিনীতে যা কিছু চাকরির সৃষ্টি হবে, তার সবই দিতে হবে আওয়ামী বা সরকার দলের সমর্থকদের। এটা সংবিধানের স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। চাকরির ক্ষেত্রে এ দেশের সব নাগরিকের অধিকার সমান। শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কাউকে চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। আসলে সব চাকরি দিতে হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে। কারণ, এ দেশকে কেউ আওয়ামী লীগের কাছে ইজারা দেয়নি। এখানে সব নাগরিকের অধিকার সমান। এ দিকে তার কথায় আবার ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া পুলিশবাহিনী নতুন করে বিরোধী দল দমনের একটি লাইসেন্স পেল। এখন তারা বিরোধী দলের সদস্যদের গ্রেফতারবাণিজ্যে আরো মহা উৎসাহে লেগে যেতে পারে। আবার এমপিদের উদ্দেশে তিনি যে বললেন, তারা যেন খোঁজ নেন, তার এলাকায় জামায়াত বা বিএনপির কেউ পুলিশবাহিনীতে ঢুকেছে কি না। ঢুকে থাকলে এমপিরা যেন তা গোয়েন্দা বাহিনীকে জানান, যাতে তারা ব্যবস্থা নিতে পারে।
পুলিশে চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে এমপিদের এমনিতেই কোনো সুনাম নেই। তার ওপর যদি তারা এই বাণিজ্য শুরু করেন, তবে পরিস্থিতি কী ভয়াবহ রূপ নিতে পারে তা সহজেই ধারণা করা যায়। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপিরা পুলিশকে এই ভয় দেখিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে যে বাধ্য করবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য সবার চাকরির অধিকার হরণ করে নিলে সমাজের ভেতরে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে, পুলিশ বা আওয়ামী মাস্তান দিয়ে তার সমাধান করা কোনোমতেই সম্ভব হবে না। এতে সমাজে সহিংসতা বাড়তে বাধ্য। সে সহিংসতা হানাহানির পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেই। তাতে বর্তমান ফ্যাসিবাদী শাসকদের তখত মজবুত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ধারণা করি, সরকার এ ধরনের পরিস্থিতিতে গেলে দেশে এক চরম অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
কোনো ফ্যাসিবাদী সরকার কখনোই স্বাধীন সংবাদপত্রকে সহ্য করে না। বর্তমান সরকারও তা করছে না। তারা ইতোমধ্যেই দৈনিক আমার দেশ, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যান্য টিভি চ্যানেলও সরকারের নিয়ন্ত্রণে ও মালিকানায়। ভিন্নমতের সংবাদপত্র যা এখনো প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোও হুমকির মুখে। অনেক সংবাদপত্রে সরকারি চাপে করপোরেট হাউজ বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দিতে পারছে না। এর মধ্যে সরকারি চাপের মধ্যে পড়েছে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো। এ দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ওলটপালট করে দেয়ার ক্ষেত্রে এ দু’টি পত্রিকা নিন্দনীয় ভূমিকা পালন করেছে, সন্দেহ নেই। তারা গণতান্ত্রিক সরকারের বদলে মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ১/১১’র অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় এনে গর্বের সাথে তা ঘোষণাও করেছে। ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সম্প্রতি উপলব্ধি করেছেন, ওই অগণতান্ত্রিক সরকারের সময় রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহকৃত খবর কোনো রকম যাচাই-বাছাই না করে প্রকাশ করা ছিল তার সাংবাদিক জীবনের বড় ভুল। তাদের সে ভুলে জাতি এখন ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে এবং জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
সরকারও মওকা পেয়ে এখন তাদের বিরুদ্ধে এক হাত নিয়েছে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগাররা মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে প্রায় ৮০টি মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করেছে। সরকার যখন আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক ৭০টি মামলা দায়ের করল, তখন তারা দায়সারা গোছের কিছু কথা বলেছিলেন বটে। তখন মাহফুজ আনামরা বোধকরি কল্পনাও করেননি, এক সময় তাদেরও একই ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। তবে এ বিষয়ে আমরা দায়সারা গোছের কোনো কথা বলতে চাই না। আমরা বলতে চাই, মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সরকারের যে বিষোদগার, তার প্রতিবাদ আমরা করি। অন্তত সত্যোপলব্ধি তো তার হয়েছে। তাকে বিচারের মুখোমুখি করার ঘোষণায় আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ, তাদের তৎপরতার ফলে মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীন সাময়িকভাবে ক্ষমতায় এলেও চূড়ান্ত বিচারে লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ। তারা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম আবদুল জলিলের ভাষায় মইন-ফখরের সাথে ‘আঁতাতের নির্বাচন’ করে এখন ক্ষমতায় আসীন আছেন। আর মাহফুজ আনামরা যেমন গর্ব করে বলেছিলেন, তারাই ওই রাষ্ট্রঘাতী সরকারকে ক্ষমতায় এনেছেন, একইভাবে শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, ওই সরকার ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল। আর ওই সরকার যা কিছু ব্যবস্থা বিএনপির বিরুদ্ধে নিক, তিনি তার বৈধতা দেবেন। দিয়েছেনও। তাহলে মাহফুজ আনাম একা কেন দোষী হবেন? এর দায়ভার তো শেখ হাসিনাকেও নিতে হয়। এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার কাতারে যারা ছিলেন, তাদের প্রায় সবাই এখন শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা অলঙ্কৃত করছেন। বিচার হলে তো তাদেরও হওয়া উচিত।
এই দ্বিচারিতা আওয়ামী লীগকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তাদের পায়ের নিচের ঝুরঝুরে মাটির নিচে দাবিয়ে দিতে খুব বেশি সময় নেবে বলে মনে হয় না।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

আততায়ী, কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রকে খুঁজছি by ফারুক ওয়াসিফ

দেশে অনেক শিশু হত্যার শিকার হচ্ছে এবং অনেক বন্দুকযুদ্ধও হচ্ছে। হত্যাকারীরা খালি হাতে বা লাঠি বা দা দিয়ে শিশুদের হত্যা করে লুকিয়ে রাখে। যেমন ঘটেছিল ঢাকার কেরানীগঞ্জে ও সিলেটের বাহুবলে। তারপর সেই সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের কেউ কেউ পালাতে গিয়ে র্যা বের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারাও পড়ে। যেমনটা ঘটেছে কেরানীগঞ্জ ও বাহুবলের শিশুহত্যার সন্দেহভাজনদের বেলায়। সর্বশেষ, বাহুবলের চার শিশু হত্যার আসামিদের একজন বাচ্চু মিয়া (৩৩) র্যা বের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।
যা-ই হোক, খবরগুলো পড়ার পর থেকে নারায়ণগঞ্জের নিহত কিশোর ত্বকী ও তার বাবার কথা ভাবছি। ত্বকীকে নিষ্ঠুর কায়দায় হত্যা করে নারায়ণগঞ্জেরই শীতলক্ষ্যা নদীর সোঁতায় ফেলে রাখা হয়েছিল। সেই থেকে ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। রাফিউর রাব্বী সেই শহরের একজন ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিচিত নেতা। তাঁর কিংবা ত্বকীর মায়ের শোকের পরিমাপ করা সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। কিন্তু এই তিন বছরে কখনো তাঁদের বলতে শুনিনি, তাঁরা প্রিয়তম পুত্রের হত্যাকারীদের ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু চান। তাঁরা বরং বিচার চেয়ে এসেছেন। বিচার বলতে বুঝিয়েছেন আদালতের সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে আইনিভাবে খুনি অথবা খুনিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। বিচারের মাধ্যমে শাস্তি আর বন্দুকযুদ্ধে হত্যার মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রতিটি বিচারের ঘটনায় সমাজে আইনের শাসন শক্তিশালী হয়, আততায়ীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র সজাগ—এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, জনগণের মধ্যে নিরাপত্তার ভরসা নবায়িত হয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষের শক্তি নিজেদের জোরদার করার সুযোগ পায়।
গত বছরের আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম ছিল শিশু রাজন ও সামিউলকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। শিশু দুটির পরিবারও বিচার চেয়েছিল এবং আদালতের মাধ্যমে সেই বিচার নিশ্চিত করা হয়েছিল। তা দেখে অনেকের মতো আমরাও আশাবাদী হয়েছিলাম যে পুলিশ সঠিক তদন্ত করলে, ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বাধা না দিলে অল্প সময়ের মধ্যে ন্যায্য বিচার করা সম্ভব। এই দুটি ঘটনায় দেশজোড়া আলোড়নের চাপে পুলিশ ও কর্তৃপক্ষ যা করা উচিত, সেটাই করেছিল। আসামিদের একজনকে সৌদি আরব থেকে ধরে এনে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল। ত্বকীর খুনের ঘটনায় কেন এ ধননের তৎপরতা দেখা গেল না?
শিশুহত্যার ঘটনায় আমরা তিন ধরনের ‘বিচার’ দেখতে পেলাম: আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার (সামিউল ও রাজনের বেলায়), বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ‘বিচার’ (সাম্প্রতিক কেরানীগঞ্জ ও বাহুবলের শিশু হত্যার বেলায়) এবং করব করব করেও বিচার না করার অবিচার (ত্বকী হত্যার মতো ঘটনায়)!
কারও বেলায় অতিবিচার হয় আর কারও বেলায় হয় এর উল্টো। ২০০৪ সালে নাটোরের বিএনপি নেতা গামা হত্যাকারীদের ২০ জনই ফাঁসির দণ্ডাদেশ থেকে ২০১০ সালে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পান। ২০১১ সালে নাটোরেরই বড়াইগ্রাম উপজেলার চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সানাউল্লাহ নূর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ১১ আসামির সবাই জামিনে মুক্তি পেয়ে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। সরকার ও পুলিশ যখন এ রকম এক চোখে দুরবিন আর আরেক চোখে ঠুলি পরে থাকে, তখন সমাজে নৈরাজ্য উপস্থিত হয়। নৈরাজ্য মানে নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা যখন নাজুক, যখন যা হওয়ার কথা নয়, তা-ই হয় এবং যা হওয়া খুবই প্রয়োজন, তা হয় না। শিশুহত্যার এমন ব্যাপকতা কোনোভাবেই হওয়া উচিত ছিল না। কিন্তু হচ্ছে। পুলিশ ওয়েবসাইটের হিসাব দেখায়, ২০১৫ সালে থানায় নথিবদ্ধ হওয়া খুনের সংখ্যা ৪ হাজার ১৫। শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে ২৯২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ওই বছর বাংলাদেশে ১৮৩ জন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এই সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ৫৫ জন বেশি। বাস্তবত, সব ঘটনা থানায় নথিবদ্ধ হয় না, সব খবর পত্রিকা পর্যন্ত আসে না। তারপরও এ পরিসংখ্যান অকাট্যভাবে প্রমাণ করে, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অপরাধমূলক হত্যা একসঙ্গেই বাড়ছে বাংলাদেশে।
আমাদের প্রশ্নটা বরং অন্য জায়গায়। একটা দেশে কেন ও কখন এত হত্যা-প্রতিহিংসা বেড়ে যায়? দেশ মানে সমাজ। আমরা ইংরেজ আমল থেকে কেবলই রাষ্ট্র রাষ্ট্র করছি। রাষ্ট্রকে কার্যকর করা, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রকে মানবিক করার কথা আমরা বলে থাকি। কিন্তু সমাজের কী হবে? সিরিয়াল কিলার ও ধর্ষক রসু খাঁ তৈরি হয় সমাজে, মা-বাবাকে হত্যাকারী ঐশীও বেড়ে ওঠে সমাজে-পরিবারে। শিশুর ঘাতকেরাও এই সমাজেরই আরও কারও বাবা-স্বামী-ভাই হয়েই আছে। ঐশীর বেলায় আদালত দৃশ্যত খুনের বিচার করেছে, কিন্তু যে পরিবেশ খুনি বানিয়ে তোলে, সেটাকে শায়েস্তা করা হবে কোন কায়দায়? সব দায়ের বিচার তো ফৌজদারি বিধিতে হওয়ার কথাও নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান বার্নার্দিনোতে নির্বিচার গুলিতে ১৪ জন নিহত হওয়ার পরে সিএনএন শিরোনাম দিয়েছিল ‘সোশ্যাল কিলিং!’ সামাজিক ক্রসফায়ারই বলি আর বলি সোশ্যাল কিলিং, এগুলোর কি প্রতিকার নেই? সরাসরি যে খুনি, তার শাস্তি দিলেই এসব ঘটনা ঘটা বন্ধ হয় না। বিভিন্ন জায়গায় নোটিশ টাঙানো থাকে, কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। এসব ক্ষেত্রে কি কর্তৃপক্ষের দায় নেই? সাধারণ মানুষের দ্বারা সাধারণ মানুষের খুন, বড়দের ওপর রাগের জন্য নিরীহ নিষ্পাপ ছোটদের হত্যা করা আসল অসুখ নয়, এগুলো রোগলক্ষণ বা সিম্পটম। আমাদের সমাজ যে ভয়ানকভাবে হিংসাত্মক হয়ে উঠছে, এগুলো তারই প্রকাশ।
অপরাধের ঘটনায় দারোগা খুঁজবে অপরাধীকে, রাজনীতিবিদেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় দায় এড়াবেন, অথবা প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর ফন্দি করবেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীকে খুঁজতে হবে সমাজের গভীর অসুখের কারণ। কোনো সমাজে বড়সংখ্যক মানুষের মনে কেন নিষ্ঠুরতা ও হিংসা-প্রতিহিংসা দানা বাঁধে, তার কার্যকারণ জানতে না পারলে এই সামাজিক বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। সারানো সম্ভব হবে না সমাজের এই ব্যাধি।
ইংরেজ আমল থেকে আমরা মোটামুটি তিনটি রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। রাষ্ট্র বদলেছে, সমাজও বদলেছে। কিন্তু সমাজকে সবার জন্য নিরাপদ করার বা সংস্কারের ডাক কি কখনো জোরেশোরে দেওয়া হয়েছে? বড় রাজনীতিবিদদের কথা বলে লাভ নেই। বিদ্যাচর্চায় জড়িত ব্যক্তি কিংবা অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাছে কি আসলেই কোনো ব্যাখ্যা বা সমাধান আছে?
ছোটবেলায় পত্রিকার পাতায় মাঝেমধ্যেই ‘আততায়ীর হাতে নিহত’, ‘কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছু জানে না’ কিংবা ‘রাষ্ট্র নির্বিকার’ কথাগুলো পড়ে ভাবতাম, আততায়ী, কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্র বোধ হয় কোনো ব্যক্তির নাম। ভয়ে ভয়ে আততায়ী নামক খারাপ লোকটাকে খুঁজতাম, কর্তৃপক্ষ নামক মানুষটা কেন এত চুপ, সেটা ভাবতাম আর রাষ্ট্র কোথায় থাকে, সেই প্রশ্নে পেরেশান হয়ে যেতাম। আজকের করুণ, কঠিন বাস্তবতার সামনে সে রকমই পেরেশান লাগে, যখন ‘আততায়ী’র সঠিক বিচার হয় না বা তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না এবং ‘কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়’ মনোভাব নিয়ে চলে এবং রাষ্ট্রকে পাষাণের মতো নির্বিকার থাকতে দেখি।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

‘পিপি বলার কে?’

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের আগে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দুই আইন বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, সাংবাদিকেরা থাকতে পারবে, না পারবে না, তা নিয়ে বলার কোনো অধিকার রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির (পিপি) নেই। এক আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছেন, এ নিয়ে ‘পিপি বলার কে’?
আজ সোমবার প্রথম আলোর কাছে এমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক।
শফিক আহমেদ বলেন, এটা খুব অদ্ভুত ঘটনা। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় সাংবাদিকেরা থাকবেন এবং দায়িত্বপালন করবেন—এটাই স্বাভাবিক। সাংবাদিকেরা থাকতে পারবেন না—এ ধরনের কোনো নির্দেশনা দেওয়ার অধিকার পিপির নেই। এটা সম্পূর্ণ অনধিকার চর্চা বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে বিচারক বিশেষ কোনো কারণ বা যুক্তিতে এটা বলতে পারেন।
একই মন্তব্য করেন আইনজীবী শাহদীন মালিক। তিনি পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘পিপি বলার কে?’ তিনি বলেন, পিপি কেন এ ধরনের কথা বললেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ ধরনের মামলায় সাংবাদিকদের দায়িত্বপালনে কোনো বাধা নেই। বিচারক কোনো যুক্তি থেকে এটা বলতে পারেন।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় কারাগারে থাকা ২৩ আসামিকে আজ আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের উপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগে এজলাসকক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হয়।
আদালতে বিচারক আসন গ্রহণের কিছু আগে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) আইনজীবী ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম চলাকালে বাদী, আসামি ও আইনজীবী ছাড়া আর কেউ এজলাসকক্ষে থাকতে পারবেন না বলে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে।
প্রধান আসামি নূর হোসেনের আইনজীবী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহাও একই কথা বলেন।
এরপর গণমাধ্যমকর্মীদের আদালতের এজলাসকক্ষ থেকে বের করে দেয় পুলিশ। সাংবাদিকেরা আদালতের এজলাসকক্ষের বাইরে অবস্থান করেন।
সাক্ষ্যগ্রহণকে সামনে রেখে সকাল নয়টার দিকে আদালতে প্রধান আসামি সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‍্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানাসহ ২৩ জন আসামিকে হাজির করা হয়। প্রথমে তাঁদের আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে সকাল সোয়া ১০টার দিকে সেখান থেকে আসামিদের আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণের তিন দিন পর তাঁদের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগী হত্যার ঘটনায় একটি এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় আরেকটি মামলা ফতুল্লা মডেল থানায় করা হয়। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে নূর হোসেন ও র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ।
৮ ফেব্রুয়ারি এসব মামলায় নূর হোসেন ও র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৩ আসামির উপস্থিতিতে আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন। র‍্যাবের আট সদস্যসহ ১২ আসামি এখনো পলাতক। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই বিচার শুরু হয়েছে।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেই পারে: হানিফ

মাহবুব উল আলম হানিফ
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে আমাদের কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। এটা হতেই পারে। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত সাত বছরে দেশে যে পরিমাণ উন্নয়ন করেছে, তাতে মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে।’
আজ রোববার দুপুরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ইউপির দ্বিতীয় ধাপের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হানিফ এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে দ্বিতীয় ধাপের ৬৭২টি ইউপির দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া আগামী ৮ মার্চের মধ্যে সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে তৃতীয় ধাপের প্রার্থীদের তালিকা পাঠাতে তৃণমূল কমিটিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘অনেকেই এখন শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানিয়ে অন্য দল থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে চলে আসছেন বা সরকারি দলে যোগদান করতে চাচ্ছেন। স্থানীয় উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করে অন্য কোনো প্রার্থী যদি না আসে, সে ক্ষেত্রে কি আমাদের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ আছে?’
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ২৫টি ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গেছেন। অন্য ২৫টিতে জয়ের পথে।
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন তুলে ধরে হানিফ আরও বলেন, মানুষ চায় দেশ এগিয়ে যাবে, গ্রামীণ অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে প্রত্যেকেই তাদের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করতে পারবে। যেটা শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে তারা পাচ্ছে। সেই আস্থা থেকেই মানুষ পাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি দল-বিরোধী দল বলে কিছু আছে? বিরোধী পক্ষ না থাকলে ইউপি কার্যকর হবে না—এমন কোনো বিধান আছে কি না—আমার জানা নেই। আপনাদের জানা থাকলে বলতে পারেন। জাতীয় সংসদে বিধান আছে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দল থাকবে। বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া। ইউপিতে এ রকম কোনো সিস্টেম নেই। ইউপিতে বিরোধী থাকল না থাকল—সেটার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
হানিফ বলেন, বিএনপির অবস্থান সব সময় জনগণের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের উন্নয়ন বিএনপির পছন্দ নয়। পছন্দ নয় বলেই সব সময় সরকারের বিরুদ্ধে, জনগণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে—এটাই স্বাভাবিক। জনগণও তাদের সেই আন্দোলনকে কীভাবে শিক্ষা দিতে হয়, সেটা অতীতেও দিয়েছে এবং বিএনপি যদি আবারও ভবিষ্যতে সেই চিন্তা করে, জনগণ তাদের সেই শিক্ষা দেবে। তিনি বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করা ছাড়া বিএনপির আর কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। এটা নালিশের পার্টি হিসেবে পরিচিত হয়েছে জনগণের কাছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, বীর বাহাদুর, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, কেন্দ্রীয় সদস্য আমিনুল ইসলাম, এস এম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ।

সাংবাদিকদের বের করে দিয়ে সাক্ষ্য শুরু

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলায় কারাগারে থাকা ২৩ আসামিকে আজ সোমবার আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাঁদের উপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগে এজলাসকক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে আজ সাত খুনের দুটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল।
সাক্ষ্যগ্রহণ সামনে রেখে সকাল নয়টার দিকে আদালতে প্রধান আসামি সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‍্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানাসহ ২৩ জন আসামিকে হাজির করা হয়। প্রথমে তাঁদের আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। সকাল সোয়া ১০টার দিকে সেখান থেকে আসামিদের আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।
আদালতে বিচারক আসন গ্রহণের কিছু আগে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) আইনজীবী ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম চলাকালে বাদী, আসামি ও আইনজীবী ছাড়া আর কেউ এজলাসকক্ষে থাকতে পারবেন না বলে আদালতের নির্দেশনা আছে।
প্রধান আসামি নূর হোসেনের আইনজীবী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহাও একই কথা বলেন।
এরপর গণমাধ্যমকর্মীদের আদালতের এজলাসকক্ষ থেকে বের করে দেয় পুলিশ। সাংবাদিকেরা এখন আদালতের এজলাসকক্ষের বাইরে অবস্থান করছেন।
এ ব্যাপারে জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মজিবুল হক বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য মামলার শুনানিতে সাংবাদিকদের উপস্থিতি কাম্য। কিন্তু আজ যা হলো, তা নজিরবিহীন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, এই মামলায় একই আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের নির্ধারিত তারিখ ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন নূর হোসেন, আরিফ হোসেন ও এম এম রানাসহ ২২ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। আসামি তারেক সাঈদকে আদালতে হাজির করা হয়নি। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন আদালত। একই সঙ্গে সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ পিছিয়ে ২৯ ফেব্রুয়ারি ধার্য করা হয়।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণের তিন দিন পর তাঁদের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগী হত্যার ঘটনায় একটি এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় আরেকটি মামলা ফতুল্লা মডেল থানায় করা হয়। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে নূর হোসেন ও র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ।
৮ ফেব্রুয়ারি এসব মামলায় নূর হোসেন ও র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৩ আসামির উপস্থিতিতে আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন। তবে র‍্যাবের আট সদস্যসহ ১২ আসামি এখনো পলাতক। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই বিচার শুরু হয়েছে।

চূড়ান্ত পরীক্ষায় ভারতের নতুন পারমাণবিক ডুবোজাহাজ অরিহন্ত

নিজ দেশে তৈরি পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত প্রথম ডুবোজাহাজ (সাবমেরিন) আইএনএস অরিহন্তের চূড়ান্ত পরীক্ষা চালাচ্ছে ভারতীয় নৌবাহিনী। এর মধ্য দিয়ে পানির নিচ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম জাহাজের অধিকারী ষষ্ঠ দেশে পরিণত হলো ভারত।
ডুবোজাহাজটি মোতায়েন করা হলে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের সক্ষমতার ষোলোকলা পূর্ণ হবে। তখন স্থল, জল ও আকাশ—তিন অবস্থান থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা অর্জন করবে দেশটি।
আইএনএস অরিহন্ত কী?
১১০ মিটার লম্বা ছয় হাজার টনের আইএনএস ‘অরিহন্ত’ (সংস্কৃত নামটির অর্থ শত্রু হত্যাকারী) সরকারের একটি গোপন কর্মসূচির আওতায় গত তিন দশক ধরে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের যাত্রা শুরু সত্তরের দশকে। অনুমোদন পায় ১৯৮৪ সালে। এরপর কাজ শুরু হয় ১৯৯৮ সালে।
বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে ডুবোজাহাজটির। একজন কর্মকর্তা দ্য ইকোনমিক টাইমসকে বলেছেন, গত পাঁচ মাসে গভীর সাগরে বেশ কয়েকটি মহড়া ও অস্ত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এটি।
পারমাণবিক শক্তিচালিত এই ডুবোজাহাজটিকে ১২টি স্বল্পপাল্লার কে-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র বা চারটি কে-৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত করা যাবে। একই ধরনের আরও দুটি ডুবোজাহাজ তৈরির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। আর ২০১০ সালের মধ্যে এমন চারটি ডুবোজাহাজ বানাতে চায় ভারত।
বিশ্বে এই ডুবোজাহাজ কী প্রভাব ফেলতে পারে?
ভারত পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত এই ডুবোজাহাজ মোতায়েন করলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নৌ অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। বিশেষ করে পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াকে একই ধরনের প্রযুক্তি গড়ে তুলতে চীন সহায়তা করতে পারে। এ বিশ্লেষণ ব্লুমবার্গের।
ভারত ও চীন উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ‘প্রথম ব্যবহার নয়’ নীতি মেনে চলে। তারা পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ডুবোজাহাজগুলোকে দেখে থাকে মূলত প্রতিরোধক হিসেবে, যার লক্ষ্য যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো।
ভারতের কাছে স্থল ও আকাশে ব্যবহারযোগ্য যেসব পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তার তুলনায় অরিহন্তকে শনাক্ত করা শত্রুর জন্য অনেক কঠিন হবে। ফলে এর ‘দ্বিতীয় দফায় আঘাত’ হানার সক্ষমতা রয়েছে। সুতরাং শত্রুপক্ষের কেউ প্রথম আঘাতে ভারতের অন্যান্য পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম হলে, দেশটি অরিহন্ত দিয়ে পাল্টা আঘাত হানতে পারবে।
অবশ্য ভারত ও চীন উভয়ের বর্তমান পারমাণবিক ডুবোজাহাজগুলোই শব্দ করে চলাচল করে এবং তা শনাক্ত করা সহজ। ফলে এগুলোকে ‘দ্বিতীয় দফায় আঘাত’ হানার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোয়ারি ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি তাদের এক প্রতিবেদনে তেমনটিই বলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন ও ভারত তাদের ডুবোজাহাজগুলোতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করায় অস্থিরতার একটা দীর্ঘ পর্যায় শুরু হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে সামুদ্রিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।
এমন ডুবোজাহাজ আর কার কার আছে?
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন এরই মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ডুবোজাহাজ তৈরি করেছে। এর মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পূর্ণমাত্রায় স্থল, জল ও আকাশ—তিন স্থান থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা আছে বলে মনে করা হয়।

ইরানে পরিবর্তনের হাওয়া

হাসান রুহানি
ইরানের ‘একঘরে’ অবস্থার হয়তো পরিবর্তন হতে চলেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন কোণঠাসা ছিল দেশটি। সম্প্রতি মূলত পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে করা পরমাণুবিষয়ক চুক্তির আওতায় দেশটি বেশির ভাগ নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, এই ‘মুক্তি’র কতটুকু সুফল ইরান ঘরে তুলতে পারবে তার অনেকখানি নির্ভর করছে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলের ওপর। এই ফলের ওপর নির্ভর করছে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির সম্পর্কোন্নয়ন এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজের ভাবমূর্তি শক্তপোক্ত করা।
নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ যে তথ্য দিয়েছে, তাতে এটা মোটামুটি স্পষ্ট যে দেশটিতে রক্ষণশীলদের চেয়ে সংস্কারপন্থী ও উদার-রক্ষণশীলদের জোট বেশি আসন পাবে। তবে কোনো পক্ষই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। বর্তমানে পার্লামেন্টে রক্ষণশীলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ক্ষমতাসীন উদারপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি স্বাধীনভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। পার্লামেন্টে সংস্কারপন্থীদের হাতে বেশি আসন এসে গেলেই তিনি অনেক স্বচ্ছন্দ হবেন।
সরাসরি কিছু না বললেও রুহানি গতকালই বলেছেন, জনগণ তাঁদের শক্তিমত্তা দেখিয়েছে এবং এই সরকারের নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা ইরানের এই নির্বাচনকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন এই কারণে যে এবার ৬০ শতাংশের বেশি ভোটারের বয়স ৩০ বছরের নিচে। সংস্কারপন্থীদের জয়ের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হবে যে তরুণেরা পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চান। বিশ্ব থেকে তাঁরা আর বিচ্ছিন্ন থাকতে চান না।
তেহরান থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক জোনাহ হাল অবশ্য বলেছেন, তেহরানে সংস্কারপন্থীদের বড় বিজয় হলেও সারা দেশে একই চিত্র দেখা যাবে এমন কথা কেউ ভাবছে না। তিনি মনে করেন, গ্রামাঞ্চলে রক্ষণশীলেরাই প্রাধান্য বজায় রাখবে।
মূলত কট্টর রক্ষণশীলতার জোরালো ভিত্তি গড়েছিলেন প্রেসিডেন্ট রুহানির পূর্বসূরি মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তাঁর ক্ষমতার দুই মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। আহমাদিনেজাদের সরকার দেশেও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের গবেষণা পরিচালক রেজা মারাশি বলেছেন, নির্বাচনের এই ফল স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, ভোটাররা পরিবর্তন চান। তিনি বলেন, ইরানিরা রাজনৈতিক অভিজাত গোষ্ঠীর কাছে জোরালোভাবে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষ যে রাজনৈতিক ও সামাজিক আশা-আকাঙ্ক্ষা লালন করে এসেছে তা তারা পূরণ করতে পারেনি। এ কারণেই তারা পরিবর্তন চায়।
তবে ইরানের রক্ষণশীল ঘরানার কৈহান পত্রিকার সাংবাদিক ঘানবার নাদেরি নির্বাচনের আগে আল-জাজিরাকে বলেছিলেন, যদি সংস্কারপন্থীদের জয় হয়, তাহলেও ইরানের অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হবে বলে তাঁর মনে হয় না। সব দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিষয়ে ঘানবার নাদেরি বলেন, সময় এসেছে তরুণদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার। কিন্তু রাজনীতিকেরা পদ আঁকড়ে থাকছেন। তরুণদের জায়গা দিতে চাচ্ছেন না। যত দিন এটা না হবে তত দিন ইরানের রাজনৈতিক অবস্থা বদলাবে না।
প্রেসিডেন্ট রুহানি একই সঙ্গে একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম ও সমঝোতাপন্থী বিদগ্ধ কূটনীতিক। এ কারণে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘ডিপ্লোম্যাট শেখ’ হিসেবে পরিচিত। রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতার মুখেও রুহানি পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করেন।

সৃজনশীল প্রশ্ন: তত্ত্ব ও প্রয়োগ by গোলাম ফারুক

এ দেশে সাধারণভাবে মনে করা হয়, যে ব্যক্তি লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তিনি জীবন-জগতের বাস্তবতার বেশি কিছু বোঝেন না। এই সমস্যা দূর করার জন্য শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা থেকে মুক্ত করার আশায় চালু হয়েছে ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি। কিন্তু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কিছু নিবন্ধ বা শিক্ষক-অভিভাবকদের ক্ষোভ বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে, সমস্যাটা দূর হয়নি, বরং হয়তো আরও গভীর হয়েছে।
তাহলে ‘সৃজনশীল’ চালু করা কি ভুল হয়েছে?
না, ভুল হয়নি। শিক্ষা–বিষয়ক মনোবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ব্লুম যে ছয়টি চিন্তাস্তর চিহ্নিত করেছিলেন, আমাদের আগের পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীরা কেবল তাদের সর্বনিম্ন (জ্ঞান) এবং তার পরের স্তরটির (অনুধাবন) কিছুটা চর্চা করত। বর্তমান পদ্ধতিতে তাদের এর ওপরের আরও চারটি স্তরে চিন্তা করার সুযোগ পাওয়ার কথা। কিন্তু আমার ধারণা, তারা তা যথাযথভাবে পাচ্ছে না। উপরন্তু, আগের মতো, অন্যের (সু)লিখিত বড় বড় নোট মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে আসার সুযোগটাও আর নেই। সম্ভবত এই একূল-ওকূল দুকূল হারানোর বেদনাই জনমনে উদ্ভূত ক্ষোভের কারণ।
‘সৃজনশীল’ হোঁচট খাচ্ছে একে সৃজনশীলভাবে ব্যবহার না করার কারণে। ‘সৃজনশীল’-এর ব্যর্থতা নিশ্চয়ই এর তাত্ত্বিক কাঠামোতে নেই, থাকলে তা দুনিয়াজুড়ে গৃহীত হতো না। আমরা জানি, এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে ব্লুম চিহ্নিত ছয়টি চিন্তাস্তর এবং তাদের কাঠামো। ১৯৫৬ সালে ব্লুম যে হাতবইটি প্রকাশ করেন, সে অনুযায়ী নিম্নতর চিন্তার তিনটি স্তর হচ্ছে ‘জ্ঞান’, ‘অনুধাবন’ ও ‘প্রয়োগ’। আর উচ্চতর চিন্তার তিনটি স্তর হচ্ছে ‘বিশ্লেষণ’, ‘সংশ্লেষণ’ ও ‘মূল্যায়ন’। চিন্তার এই কাঠামো শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যখন ২০০১ সালে ব্লুমের ছাত্র লরিন এন্ডারসনের নেতৃত্বে একদল বিশেষজ্ঞ একে ঢেলে সাজান। তাঁরা চিন্তার স্তরগুলোর নামবাচক নামগুলোকে ক্রিয়াবাচক করে দেন। ব্লুম যেটাকে ‘জ্ঞান’ বলেছেন, তাঁরা সেটাকে ‘মনে করা’ বলে আখ্যায়িত করেন। ‘অনুধাবন’ হয় ‘বুঝতে পারা’, ‘প্রয়োগ’ হয়ে যায় ‘প্রয়োগ করা’, ‘বিশ্লেষণ’ হয় ‘বিশ্লেষণ করা’, ‘সংশ্লেষণের’ জায়গায় আসে ‘মূল্যায়ন করা’ আর ‘মূল্যায়নের’ জায়গায় তাঁরা প্রায় নতুন একটি ক্রিয়াপদ বসান—‘সৃষ্টি করা’।
ভাবনার এই ছয়টি প্রক্রিয়া আবার পরস্পর-বিচ্ছিন্ন নয়। এদের একটির ওপর আরেকটি পিরামিড বা সিঁড়ির মতো করে সাজিয়ে কল্পনা করা যেতে পারে। পিরামিডের মতো সাজানোর অর্থ হচ্ছে এটা বোঝানো যে সব সময় নিচের স্তরটি তার ওপরের স্তরের চেয়ে আকারে বড় হয়। যেমন: আমরা যত তথ্য মনে রাখতে পারি, তার সবটুকু বুঝি না, আবার যতটুকু বুঝি, তার সবটুকু প্রয়োগ করতে পারি না। একইভাবে, যা প্রয়োগ করি, তার সব বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমাদের থাকে না। আবার যতটুকু বিশ্লেষণ করি, তার পুরো মূল্যায়ন করতে পারি না, আর সৃষ্টি করার ক্ষমতা তো তার চেয়েও কম। অন্যদিকে, চিন্তাস্তরগুলোকে কখনো সিঁড়ির মতো কল্পনা করা হয় এ কারণে যে প্রথম ধাপটি না পেরোলে দ্বিতীয় ধাপটিতে পা রাখা যায় না। একইভাবে, দ্বিতীয় ধাপে উঠতে পারলেই কেবল তৃতীয়টিতে উত্তরণ সম্ভব। অর্থাৎ, সর্বশেষ ধাপে পৌঁছাতে হলে আগের সব কটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
ব্লুম ও এন্ডারসনে ছয়টি স্তর থাকলেও আমাদের ‘সৃজনশীল পদ্ধতিতে’ চারটি স্তর আছে। নিচ থেকে ওপরের সেগুলো হচ্ছে ‘জ্ঞান’, ‘অনুধাবন’, ‘প্রয়োগ’ ও ‘উচ্চতর দক্ষতা’। এটা স্পষ্ট, এই পদ্ধতির সর্বনিম্ন তিনটি স্তর ব্লুমের ট্যাক্সোনমি থেকে নেওয়া। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এন্ডারসনদের নামগুলো আরও জুতসই হতো। ব্লুমের অনুকরণে সৃজনশীল প্রশ্নে যাকে ‘জ্ঞান’ নাম দেওয়া হয়েছে, তা আসলে ছাত্রছাত্রীর জ্ঞান যাচাই করে না, বরং পাঠ্যবইয়ের কী কী সে মনে করতে পারে, তা পরীক্ষা করে। আমরা যেভাবে ‘মুখস্থ’ শব্দটা ব্যবহার করি, সেই অর্থে মুখস্থ না করেও কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা পাঠ্যবইয়ের অনেক বিষয় মনে রেখে সৃজনশীল পরীক্ষার ‘জ্ঞান’-বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। এন্ডারসন বলেছেন, মানুষ নানাভাবে ‘মনে করে’। যেমন দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিভান্ডার থেকে কোনো কিছু তুলে আনে, সেখানকার কোনো কিছু আবার নতুন করে দেখতে পেয়ে তাকে চিনতে পারে বা অনেক সময় অবচেতন মনে ঘুমিয়ে থাকা অনেক পুরোনো বিষয় নতুন অভিজ্ঞতার সংস্পর্শে এসে জেগে ওঠে। এভাবে প্রতিটি স্তর কীভাবে কাজ করে, এন্ডারসন সেই ব্যাপারে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।
যা-ই হোক, আসল মুশকিলটা হয় ‘উচ্চতর দক্ষতা’ নিয়ে। এটা স্পষ্ট যে এটা দিয়ে ওপরের তিনটি চিন্তাস্তরকে বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো ব্লুমের, না এন্ডারসনের? এখানে কি তিনটির সব কটি অন্তর্ভুক্ত, নাকি দুটি, না কেবল একটি? বিষয়টি প্রশ্নকর্তা, শিক্ষক, পরীক্ষক, ছাত্রছাত্রী, কারও কাছেই পরিষ্কার নয়। উপরন্তু, এই ‘উচ্চতর দক্ষতা’ এবং ‘প্রয়োগের’ জন্য যে উদ্দীপক ব্যবহার করা হয়, বাংলাদেশে সেই উদ্দীপক তৈরিতে সক্ষম প্রশ্নকর্তার সংখ্যা খুব কম।
‘উচ্চতর দক্ষতা’ সম্পর্কে ধারণার অভাব, ধারণা থাকলেও একই প্রশ্নের মধ্যে চিন্তার সর্বোচ্চ তিনটি স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করার দুরূহতা শেখা, শেখানো, প্রশ্ন তৈরি ও মূল্যায়নকে কঠিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভব করে তোলে। অন্যদিকে, যথাযথ প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার অভাবের কারণে অধিকাংশ শিক্ষকের কাছে ‘উদ্দীপক’ তৈরি করা একটি আতঙ্ক। অনেকে খেটেখুটে যাও–বা তৈরি করেন, তা প্রায়ই উদ্ভট, অপ্রাসঙ্গিক, কিংবা নোট বা পাঠ্যবইয়ের অনুকরণ হয়ে যায়।
সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিকে সফল করে তুলতে হলে এই দুই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তিনটি উচ্চতর চিন্তাস্তরের জন্য একটির বদলে তিনটি প্রশ্ন করা যায়, যাদের নাম হতে পারে¦ ‘বিশ্লেষণ’, ‘মূল্যায়ন’ ও ‘সৃজন’। তাতে শিক্ষকেরা বুঝবেন কী পড়াতে হবে, প্রশ্নকর্তারা পরিষ্কার ধারণা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন, শিক্ষার্থীরা জানবে উত্তরে কী লিখতে হবে আর পরীক্ষকেরাও সঠিকভাবে তা মূল্যায়ন করতে পারবেন।
এবার আসা যাক উদ্দীপকের কথায়। উদ্দীপক লেখার ক্ষেত্রে প্রশ্নকর্তাকে স্বাধীনতা দিলে এই সমস্যার কিঞ্চিৎ সমাধান হতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় প্রশ্নকর্তা যদি উদ্দীপক রাখা বা না রাখার স্বাধীনতা পান। ছাত্রছাত্রীর চিন্তাস্তর পরীক্ষার জন্য সব সময় যে উদ্দীপক ব্যবহার করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এন্ডারসন ও আরও অনেকে কোন ধরনের চিন্তাস্তরের জন্য কী প্রশ্ন করতে হবে এবং সেখানে কী ধরনের ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা যায়, তার সুনির্দিষ্ট নমুনা তৈরি করে দিয়েছেন। সেখানে কোথাও উদ্দীপকের কথা বলা হয়নি।
নিজেরা একটু বুদ্ধি খাটালে এন্ডারসনদেরও দরকার হয় না। আমাদের পুরোনো পদ্ধতির প্রশ্ন দিয়েও ছাত্রছাত্রীদের চিন্তাক্ষমতা যাচাই করা যায়। যেমন পুরোনো একটি প্রশ্ন¦ ‘হৈমন্তীর চরিত্র বিশ্লেষণ করো’¦ অনায়াসে ছাত্রছাত্রীদের বিশ্লেষণ স্তরের চিন্তা যাচাই করতে পারে। কিন্তু আমরা জানি, এ ধরনের প্রশ্ন বারবার আসায় পরীক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থে আর বিশ্লেষণ করে না, কোনো তৈরি নোট মুখস্থ করে নেয়। এই পুনরাবৃত্তি এড়াতে প্রশ্নটি একটু ঘুরিয়ে অনেকভাবে করা যায়। যেমন: ‘হৈমন্তীর সঙ্গে তোমার দেখা ওই বয়সী কোনো নারীর মিল-অমিল আলোচনা করো’, কিংবা ‘হৈমন্তীর জায়গায় এই যুগের কোনো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারী থাকলে কী করত বলে তোমার ধারণা। আলোচনা করো’। তাহলে ছাত্রছাত্রীরা আর মুখস্থ করার দিকে ঝুঁকবে না। বরং বেশি লেখার সুযোগ পেয়ে নিজেদের সৃজনশীলতার প্রমাণ দিতে পারবে, যা তারা উদ্দীপকভিত্তিক প্রশ্নের কারণে পাচ্ছে না। উদ্দীপকবিহীন প্রশ্ন প্রণয়নে প্রশ্নকর্তারা এবং উত্তর পরীক্ষণে পরীক্ষকেরা অনেক সহজ বোধ করবেন। উদ্ভট উদ্দীপক লিখে কিংবা নোটবইয়ের প্রশ্ন নকল করে বা বেশি বেশি নম্বর দিয়ে আর দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে না।
অজ্ঞানতাপ্রসূত প্রশংসাও ‘সৃজনশীল’কে দুর্বল করে দেয়। এই পদ্ধতি যে খুব ভালো, তার প্রমাণ দিতে গিয়ে আমরা বলি যে এখানে মুখস্থবিদ্যাকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওপরের পিরামিডগুলো লক্ষ করলে দেখা যাবে নিচের ‘জ্ঞান’-এর স্তরটিই সবচেয়ে বড়। আমাদের প্রশ্নকাঠামোতেও এই স্তরের জন্য সবচেয়ে বেশি নম্বর বরাদ্দ থাকে। যদিও ১০ নম্বরের একটি প্রশ্নে আপাতদৃষ্টিতে ‘জ্ঞানে’ ১, ‘অনুধাবনে’ ২, ‘প্রয়োগে’ ৩ এবং ‘উচ্চতর দক্ষতায়’ ৪ থাকে; ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে, এখানে আসলে ‘জ্ঞানে’ ৪, ‘অনুধাবনে’ ৩, ‘প্রয়োগে’ ২ এবং ‘উচ্চতর দক্ষতায়’ ১ আছে। কারণ, আমরা আগেই আলোচনা করেছি, প্রতিটি স্তরে তার নিচের স্তরগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন: ‘প্রয়োগে-৩-এর ভেতর ১ হলো ‘জ্ঞান’ এবং ১ ‘অনুধাবন’-এর জন্য। তার মানে ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য মুখস্থ করে বা যেভাবেই হোক পাঠ্যবইয়ের তথ্যগুলো খুব ভালোভােব মনে রাখতে হবে।
যা-ই হোক, ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি কোথায় কোথায় হোঁচট খাবে, শুরুতে তা জানা না থাকলেও এখন তো তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। পথের এই বন্ধুরতাকে বিবেচনায় নিলে পদ্ধতিটি অনেক সাবলীলভাবে এগিয়ে যাবে, ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে, শঙ্কিত নাগরিকেরাও দুশ্চিন্তামুক্ত হবেন।
গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।
faruk.golam@yahoo.com

এবিএম মূসা: কালের আয়নায় by সোহরাব হাসান

নিকট অতীতে যে কজন পুরোধা পুরুষ বাংলাদেশের সংবাদপত্রজগৎকে আলোকিত ও আলোড়িত করেছেন, এবিএম মূসা তাঁদের অন্যতম। দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় তিনি এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আমরা কখনো তাঁকে পেয়েছি চৌকস রিপোর্টার হিসেবে, কখনো ধীমান বার্তা সম্পাদকরূপে, আবার কখনো নন্দিত কলাম লেখক হিসেবে। সাংবাদিকতার বাইরেও নানা ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন। যুক্ত ছিলেন নানা সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে তাঁর সাংবাদিক সত্তাই বড় হয়ে উঠেছিল।
এবিএম মূসার জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১; বর্তমান ফেনী জেলার দক্ষিণ ধর্মপুরে। মৃত্যু ৯ এপ্রিল ২০১৪, ঢাকায়। বাবার চাকরিসূত্রে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের বেশির ভাগ সময় কেটেছে চট্টগ্রামে। এরপর কুমিল্লা হয়ে ঢাকায়। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করার পরই এবিএম মূসা সাংবাদিকতা শুরু করেন তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার-এ। প্রথমে ক্রীড়া প্রতিবেদক, পরে বার্তা সম্পাদক। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুস সালাম। পাকিস্তান আমলে পত্রিকাটির বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনা পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এবিএম মূসা লন্ডন হয়ে কলকাতা যান। বিবিসি, সানডে টাইমস ও লন্ডন টাইমস-এর সংবাদদাতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ও বিজয়ের বার্তা পরিবেশন করেন। সে সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন: অদ্ভুত এক সহমর্মিতা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রতিটি বিদেশি সাংবাদিকের। ব্যক্তিগত সমর্থন ছিল মুক্তিযুদ্ধে। তাই বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীর দুর্দশার বিবরণ পাঠিয়ে, তথা নিজেদের পত্রিকা ও বেতার সংস্থার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার বিবরণ পাঠাতেন। [আমার বেলা যে যায়, পৃষ্ঠা ২০৫]
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় এবিএম মূসা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক হন, সেখান থেকে সরকারি পত্রিকা মর্নিং নিউজ-এর সম্পাদক। কিন্তু সেখানেও তাঁর বেশি দিন থাকা হয়নি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ফেনী থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘শেখ সাহেবের দোহাই দিয়ে নৌকায় চড়ে সাংসদ হলাম। তবে হওয়াটাই সার, সংসদীয় কাজকর্ম কিছুই বুঝি না। অথচ এমপি হয়েই মহাফ্যাসাদে পড়ে গেলাম। মনে হলো এলাকাবাসী রাস্তা আর পুল চায় না। তারা যা চায়, তা অনেকটাই অদ্ভুত মনে হতো। ছেলের চাকরি, মেয়ের বিয়ের খরচ, বউ তালাকের সালিস আর আকাম-কুকামের জন্য জেলে যাওয়া কর্মীর জামিন।’ (আমার বেলা যে যায়, পৃষ্ঠা ২২৬)
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপালিত একদল ঘাতকের হাতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে ক্ষমতায় আসে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। এবিএম মূসা লন্ডনে ফিরে গিয়ে ফের সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর ব্যাংককে ইউনেপ-এর তথ্য কর্মকর্তা পদে যোগ দেন। সেখানেই পরিচয় হয় সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। আলাপ প্রসঙ্গে জিয়া তাঁকে বলেন, ‘বিদেশে পড়ে আছেন কেন? দেশে আপনাদের মতো মানুষের প্রয়োজন আছে।’ এরপর দেশে ফিরে এবিএম মূসা বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের প্রধান সম্পাদক হয়েছিলেন। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সচেষ্ট থেকেছেন। তিনি নিজেকে মুজিবের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। বলতেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ করি না, মুজিব লীগ করি।’
তরুণ বয়সে এবিএম মূসা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন। এ জন্য তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছিল। তিনি যুক্ত হয়েছিলেন রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে; আরও পরে যোগ দেন গণতান্ত্রিক যুবলীগে। দুটোতেই বামপন্থী তরুণদের সমাবেশ ঘটেছিল। পরবর্তীকালে এবিএম মূসা যে বামপন্থার বিরোধী ছিলেন, সেটি স্পষ্ট হয় তাঁর লেখা ও কথায়। তাঁর ভাষা আন্দোলনে যোগদান নিছক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এ কারণেই তাঁকে দেখি পরবর্তীকালে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনে অগ্রণী ভূমিকায়। তাঁর ভাষায়, ‘সরকারিভাবে প্রথম বাংলা চালু হয়েছে গাড়ির নম্বর প্লেটে। এই চালু হওয়ারও একটি ইতিহাস আছে। ১৯৬০ সালে আমরা তিনজন—সাঁতারু ব্রজেন দাস, অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও ক্রীড়াঙ্গনে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব এফ কাসিম ও আমি একসঙ্গে অথবা আগে-পরে গাড়ি কিনলাম। ...তিনজনই বাংলায় লেখা নম্বর প্লেট লাগালাম। এই তিনটি গাড়ি রাস্তায় নামার পর কয়েক জায়গায় ট্রাফিক পুলিশ ধরল। তারপর পাঁচ আইনে। এই ধরাধরির খবর নিয়ে পত্রপত্রিকায় উঠল শোরগোল, চারদিকে বিবৃতির ছড়াছড়ি। প্রাদেশিক সরকার ভড়কে গেল। পরিষদ সেক্টর আইনানুগ অ্যাক্ট সংশোধন করে বাংলায় নম্বর প্লেট লেখা শুধু বৈধ নয়, বাধ্য করা হলো।’ (আমার বেলা যে যায়)
এবিএম মূসার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি দলমত-নির্বিশেষে সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন। তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে রাজনীতি তথা সব মত ও পথের ঊর্ধ্বে স্থান দিতেন। সাংবাদিক ইউনিয়ন ভাগ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের টেবিলগুলোও ভাগ হয়ে যায়। এবিএম মূসা একটি ফোরামের নেতৃত্ব দিলেও সবার সঙ্গে সদ্ভাব রাখতেন। বয়সের দাবিতে অনেককে হুকুমও করতেন, স্নেহ-ভালোবাসা মিশ্রিত সেই হুকুম কেউ উপেক্ষা করতে পারতেন না।
বিশিষ্ট সাংবাদিক এবিএম মূসার ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে স্মরণসভায় (ডান থেকে) এবিএম মূসার সহধর্মিণী সেতারা মূসা, সাংবাদিক কলামিস্ট কামাল লোহানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ
এবিএম মূসা সহজেই মানুষকে কাছে টানতে পারতেন। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এত সব বিচিত্র কাহিনি ও ঘটনা, যা শ্রোতামণ্ডলীকে মুগ্ধ করত। তিনি গল্প করতে ভালোবাসতেন। জাতীয় প্রেসক্লাবকে তিনি মনে করতেন তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। তিনি বলেছেন, ‘শুধু সাংবাদিকদের বিনোদন নয়, এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও আমাদের ক্লাবটার একটি ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। এ দেশের ইতিহাসে অনেক অধ্যায় এ ক্লাবেই লিখিত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা এ ক্লাব থেকে সভা করে মিছিল নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা রুখে দিয়েছেন। বাষট্টিতে নয় নেতার বিখ্যাত বিবৃতিটির খসড়া করেছিলেন, তাঁরা এই ক্লাবের দোতলায় বসে এক গোপন সভায় মিলিত হয়ে। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনাও এই প্রেসক্লাব থেকেই। সেই সময় প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এই ক্লাবের মিলনায়তনেই প্রথম মিলিত হয়েছিলেন।’ [আমার বেলা যে যায়]
প্রয়াত অগ্রজের প্রতি জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

এবিএম মূসা ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানের মতো

বিশিষ্ট সাংবাদিক এবিএম মূসার ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে
স্মরণসভায় (ডান থেকে) এবিএম মূসার সহধর্মিণী সেতারা মূসা,
সাংবাদিক কলামিস্ট কামাল লোহানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
সাবেক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান, জাতীয় প্রেসক্লাবের
সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা এবিএম মূসার অভাব অনুভব করে। তাঁর নীতি-নৈতিকতা ও সাহসিকতার জন্য তাঁকে স্মরণ করবে সবাই। বিশিষ্ট সাংবাদিক এবিএম মূসার ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে স্মরণসভা ও মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এমন মন্তব্য করেছেন।
আজ রোববার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এ স্মরণসভার আয়োজন করে এবিএম মূসা-সেতারা মূসা ফাউন্ডেশন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের সভাপতিত্বে এ আলোচনায় বক্তারা প্রথিতযশা এ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, শুধু সাংবাদিকতাই নয় রাজনীতি, ক্রীড়াঙ্গনসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানের মতো ছিলেন এবিএম মূসা। দেশের উন্নয়ন, প্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য তাঁর মতো মানুষ আরও প্রয়োজন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, আজ গণমাধ্যমের জন্য কষ্টকর সময়। এখন গণমাধ্যম দুঃসময় অতিক্রম করছে। আমরা ভয়ে ভীত, ভয়ে মিইয়ে গিয়েছি, কাবু হয়ে গিয়েছি। এ সময় এবিএম মূসার মতো সাহসী ও প্রতিবাদী মানুষের অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল।
গণমাধ্যমের দুঃসময়ের প্রসঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, এবিএম মূসারা যে দুঃসময় মোকাবিলা করেছেন সেটা স্বৈরশাসনের সময়ে। ‘এখন নিজেদের সুবিধাবাদী চরিত্রের জন্য এ দুঃসময় তৈরি হয়েছে’ মন্তব্য করে ইকবাল সোবহান চৌধুরী আরও বলেন, এ দুঃসময় আমরা নিজেরা তৈরি করেছি। কখনো অসাংবিধানিক শক্তিকে স্বাগত জানিয়ে, কখনো নিজেদের সুবিধার জন্য স্বৈরাচারকে সহযোগিতা করে, জরুরি আইনকে স্বাগত জানিয়ে এ অবস্থা তৈরি করেছি।
সাংবাদিক কলামিস্ট কামাল লোহানী এবিএম মূসার জীবনের নানামাত্রিক দিক তুলে ধরেন। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধে স্বৈরশাসকদের ভূমিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান, সাংবাদিকদের ঐক্যসহ নানা ক্ষেত্রে এবিএম মূসার বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে এবিএম মূসার মেয়ে সাংবাদিক পারভীন সুলতানা মূসা জানান, আগামী মাসে এবিএম মূসা স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হবে। ইতিমধ্যে ১০০ জনের লেখা পাওয়া গেছে। স্মারক গ্রন্থের সম্পাদনা করবেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
অনুষ্ঠানে এবিএম মূসার সহধর্মিণী সেতারা মূসা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় আরও অংশ নেন ফেনী-১ আসনের সাংসদ শিরীন আখতার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবদুর রহিম, এরশাদ মজুমদার, সৈয়দ তোশারফ আলী, শামসুদ্দিন আহম্মেদ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী, সাংবাদিক মাহমুদ হোসেন খান, ফরিদা ইয়াসমীন, দিল মনোয়ারা প্রমুখ।

পাঞ্জাবে নারীবাদী আইন সংবিধান ও শরীয়ত পরিপন্থি

পাকিস্তানের পাঞ্জাবে নারীর অনুকূলে পাস হওয়া আইনকে সংবিধান ও শরীয়তের পরিপন্থি বলে আখ্যায়িত করেছেন জমিয়তে উলেমা ইসলাম (ফজল) প্রধান ফজলুর রহমান। এমন আইনের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। শনিবার তিনি হায়দরাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি এ আইনকে এনজিও পরিচালিত আইন বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এনজিওরা এসব পথ অনুসরণ করছে। তিনি বলেন, এ আইনের মাধ্যমে প্রতিজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হবে। এতে পাকিস্তানে যে শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন আছে তা ভেঙেচুরে যাবে। এমন বন্ধন পশ্চিমা দেশগুলোতে নেই। তিনি বলেন, পশ্চিমারা স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ককে পার্টনার হিসেবে বিবেচনা করে। তবে এ ঘটনা পাকিস্তানে ঘটতে পারে না। নতুন আইনে যে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে তা পাকিস্তানে বিদ্যামান আইনেই আছে। তিনি বলেন, ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা দিয়েছে বিশ্বের অন্য কোন আইন তা নিশ্চিত করে নি। নতুন যে আইন করা হয়েছে তা একজন পুরুষকে অনিরাপদ করবে। এ সময় তিনি মনে করিয়ে দেন, এটা সেই পিএমএল-এন যারা বিগত পারভেজ মোশাররফ সরকারের সময় নারীর অনুকূলে যায় এমন একটি প্রস্তাবনায় স্বাক্ষর করে নি। কিন্তু এখন তারাই বিতর্কিত আইন বাস্তবায়নে তার থেকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা কেমন পাকিস্তান বানাতে চায়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এর মধ্য দিয়ে কি পাকিস্তানকে আবার কলোনি বানানোর চেষ্টা চলছে।

জার্মানির পাসপোর্ট সবচেয়ে শক্তিশালী

জার্মানির পাসপোর্ট হলো বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী। আর সবচেয়ে কম আফগানিস্তানের পাসপোর্ট। ভিসা মুক্ত সফরের ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের নাগরিকদের রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। এ কারণে সেখানকার পাসপোর্টের কদর কম। টোলো নিউজ শুক্রবার এক রিপোর্টে এ কথা বলেছে। এতে যে সূচক প্রকাশ করা হয়েছে তাতে একটানা তৃতীয় বছর শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে জার্মানির পাসপোর্ট। তবে তার নিচে অবস্থান করছে ইউরোপীয় অন্য কয়েকটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও কানাডা।  অন্যদিকে দক্ষিণ সুদান ও ফিলিস্তিনের নিচে এসে সবচেয়ে কম শক্তিশালী পাসপোর্ট বিবেচিত হচ্ছে আফগানিস্তানের। পাসপোর্টের অধিকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিসা মুক্ত চলাচলে বিশ্ব যে অবস্থান নিয়েছে তার ভিত্তিতে পাসপোর্টের এই শক্তির সূচক নির্ধারণ করেছে লন্ডনভিত্তিক হেনলি অ্যান্ড পার্টনারস। উল্লেখ্য, যেসব আফগান নাগরিক দুবাইয়ে ব্যবসা বা পর্যটনে যেতেন তাদের ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিধিনিধেষ আরোপ করেছে। এর ফলে আফগানিস্তানের পাসপোর্টের অধিকারী হয়েও নাগরিকরা মুক্তভাবে যেখানে ইচ্ছে সফর করতে পারছেন না।