Tuesday, March 25, 2014

ক্ষমতাকেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থার
ওপর জনগণের আস্থা হ্রাস পেল
আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনেক দৃশ্যমান আশাজাগানিয়া অগ্রগতি হয়েছিল। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, ব্যাপক কারচুপি—এগুলো আমরা পার হয়ে এসেছি বলে সাধারণ মানুষ ভেবেছিল। কিন্তু এবার চার দফায় উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠান, বিশেষত চতুর্থ দফার ভোট গ্রহণকালে সহিংসতা, কারচুপি ইত্যাদি দেখে মনে হচ্ছে আমরা সেই অবস্থা থেকে সরে আসা নয়, আরও পেছনের দিকে যাচ্ছি। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। যদিও শুধু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়, কিন্তু নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটা মূল অংশ। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বিষয় আমি লক্ষ করি; সেটা যেন এ রকম যে—আগের তুলনায় খারাপ করতে হবে, প্রতিপক্ষের তুলনায় খারাপ করতে হবে। এ রকম একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতার দৃষ্টান্ত এই উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো। জাতীয় রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে ক্ষমতায় যেতে হবে এবং ক্ষমতায় থাকতে হবে। উপজেলা নির্বাচন যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় ভিত্তিতে হয় না, তা সত্ত্বেও এই নির্বাচনে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে একদম পরিষ্কারভাবে নিয়ে যাওয়া হলো। এর ফলে শুধু প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই নয়, যাঁরা স্থানীয়ভাবে নিজেদের যোগ্য মনে করেছেন, তাঁদের মধ্যেও ক্ষমতার একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতার প্রতিফলন আমরা দেখলাম। ব্যাপক সহিংসতা ও বহুমুখী অনিয়মের মধ্য দিয়ে সেটাই ফুটে উঠল।
এ ধরনের সহিংসতা, কারচুপি ও অনিয়ম প্রতিহত করার দায়িত্ব যাঁদের রয়েছে, তাঁরা পরিষ্কারভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি। তাঁরা যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন শুধু তাই নয়, তাঁরা যে তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটাও অস্বীকার করেছেন। এবং এই অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে তাঁরা এগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাচনের ভোট গ্রহণের চারটি পর্যায়ে সেটা ক্রমান্বয়ে আরও বেশি করে স্পষ্ট হয়েছে; চতুর্থ দফায় পরিষ্কার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে, তাদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার; বস্তুত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তারাই প্রধান কুশীলব। উপজেলা নির্বাচন রাজনৈতিক দলভিত্তিক না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীরা এবং তাদের কর্মী-সমর্থকেরাই পুরো প্রক্রিয়াটির প্রধান কুশীলব। সে কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাকে আমি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকারও আগে স্থান দিতে চাই। সেখানে সব রাজনৈতিক দল এবং দলের বাইরে থেকে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের সবারই কম-বেশি ভূমিকা ছিল। তবে গণমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ক্ষমতাসীন দলের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সেটার কারণে অনেক সময় প্রতিপক্ষ বা অন্য পক্ষগুলো বেপরোয়া হয়েছে, সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে; যারা যেখানে পেরেছে নিজেরাও কারচুপি ও বলপ্রয়োগের চেষ্টা করেছে এবং দোষটা ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এখানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে ক্ষমতাসীন দল এবং সেটার সুযোগ নিয়ে আবার অন্য পক্ষগুলো একই ধরনের সহিংসতা ও কারচুপিতে জড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত আসে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা।
বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন কিন্তু একটা সুপ্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি হিসেবে আগের তুলনায় অনেক সবল হয়েছিল বলে আমাদের ধারণা ছিল। এর নেতৃত্বের মধ্যেও একধরনের দৃঢ়তা, প্রভাবমুক্ত হয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে কাজ করার যোগ্যতা দেখা গিয়েছিল। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর আগের নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে যে ধারাটি সৃষ্টি হয়েছিল, বর্তমান নির্বাচন কমিশন কিন্তু সেই ধারাটি বজায় রাখতে পারেনি। উপজেলা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই তারা ব্যর্থতা দেখিয়েছে। এমনকি নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যও তারা কর্তন করার চেষ্টা করেছে। সেগুলো ব্যাপক আলোচনার বিষয়, এখন সেদিকে যাব না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাধারণ নাগরিক হিসেবে এমন প্রত্যাশা ছিল যে প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা ব্যর্থতা হয়তো থাকবে, কিন্তু সেই ব্যর্থতা যে এত ব্যাপক মাত্রায় হবে, এটা কিন্তু যেকোনো সাধারণ নাগরিকের কাছে হতবাক হওয়ার মতো একটা ব্যাপার। নির্বাচন কমিশনের কাছে কিন্তু যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকে, যা কাজে লাগিয়ে এ ধরনের সহিংসতা ও অনিয়ম প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। অন্তত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা যায়। কিন্তু সেটার ওপর ভিত্তি করে তারা কোনো চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা করেছে কি না বা স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, সেটার কোনো সুনির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত এই চারটি দফায় আমরা দেখতে পাইনি। এ ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, এমনকি সেনাবাহিনীও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে আমরা দেখতে পাইনি। তা যদি করা হতো, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে যে সহিংসতা, কারচুপি ও অন্যান্য অনিয়ম হয়েছে, তা হতে পারত না। অন্তত এত ব্যাপক মাত্রায় হতে পারত না। এই যে নির্বাচন কমিশন সহিংসতা ও কারচুপি প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেটাকে তারা কোনো পর্যায়েই আমলে নেয়নি। বরং প্রতিটি পর্যায়ের নির্বাচন শেষে বলে এসেছে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে; তারা একধরনের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। এমনকি এমন ধরনের বক্তব্য তারা দিয়েছে, যেটাকে এই সব সহিংসতা, কারচুপি ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ার নামান্তর বলা যায়। যারা এসব করেছে, নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে আগেরবারের দৃষ্টান্ত দেখে পরেরবার আরও বেশি মাত্রায় সহিংসতা ও কারচুপি করতে লোকজন উৎসাহিত হয়েছে। সে কারণেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রতিটি পর্যায়ে সহিংসতা ও কারচুপির মাত্রা বেড়েই চলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবারই প্রথম একাধারে কয়েকটি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমি মনে করি, এ সিদ্ধান্ত বেশ ভালো। সারা দেশে এতগুলো নির্বাচন একসঙ্গে করার চেয়ে পর্যায়ক্রমে করাই উত্তম, যেমনটি ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হয়ে থাকে। প্রথম দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ভুলভ্রান্তিগুলো বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ধাপে সেগুলো শোধরানোর চেষ্টা করা যেত। কিন্তু এই পদ্ধতির ইতিবাচক ব্যবহার করা হলো না।
বরং এমন একটা ধারণা বা জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হলো যে প্রথম পর্যায়ের ফল দেখে দ্বিতীয় পর্যায়ে নিজেরা কী ধরনের ভূমিকা নির্ধারণ করবেন, সেই চিন্তা কাজ করেছে কি না। অর্থাৎ, এটা ক্ষমতাসীনদের নিজেদের পক্ষে ফল অর্জনের একটা কৌশল কি না—এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে। নির্বাচন কমিশন কিন্তু আরেকটি কাজ করতে পারত, প্রতিটি পর্যায়ের ভোট গ্রহণের পর ফল প্রকাশ না করে সব দফার নির্বাচন শেষে একসঙ্গে ফল প্রকাশ করতে পারত। তাহলে হয়তো এতটা সহিংসতা হতো না। এই উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা হ্রাস পেল। এটি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথে পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষণ। এর দায় নিতে হবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে, কারণ তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান শক্তি। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, সে দায়িত্ব মূলত প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের। কীভাবে তা ফিরে আসতে পারে, এই চিন্তাটাও তাদের নিজেদেরই করতে হবে। কারণ, রাজনৈতিক অঙ্গনে এ ধরনের ব্যর্থতার কারণেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে; সুস্থ রাজনীতির বিপরীত শক্তি, অগণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ ঘটছে। কিন্তু গণতন্ত্রের বিকল্প তো কিছু নেই; গণতন্ত্রের একমাত্র বিকল্প হলো উন্নত স্তরের গণতন্ত্র। সেই উন্নত স্তরের গণতন্ত্রের দিকে যেতে হলে এই আচরণগত দিকগুলো পরিবর্তন করতে হবে। সে জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে; তারপর নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সামর্থ্য বাড়াতে হবে, তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে পুরো ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসে।

সু চি কি পারবেন?

অং সান সু চি
সহযোগীদের নিয়ে দৃপ্ত পায়ে রেঙ্গুনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিলেন এক দলনেত্রী। কিছুক্ষণ আগে তিনি শহরের উপকণ্ঠে এক সমাবেশে বক্তৃতা করছিলেন। গ্রীষ্মের গরমের রেশ তখনো কাটেনি। বাড়িতে ফেরার জন্য দ্রুত তাঁরা পা ফেলছিলেন। শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছিল। হঠাৎ একটি সামরিক যান তাঁদের সামনে এসে থামল। ঝটপট কয়েকজন সেনাসদস্য যান থেকে নেমে তাঁদের দিকে রাইফেল তাক করলেন। সেনাদলের ক্যাপ্টেন, তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াও। নইলে গুলি করব।’ দলনেত্রী চুপচাপই ছিলেন। সহযাত্রীদের পেছনে রেখে ক্যাপ্টেনের সামনে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমরা রাস্তার পাশ দিয়ে যাচ্ছি। তাতে তো তোমাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।’ জবাবে ক্যাপ্টেন বললেন, ‘না, রাস্তার পাশ দিয়েও তোমরা হাঁটতে পারবে না। আমাদের কথা যদি অমান্য করো, গুলি করব।’ দলনেত্রী জানতেন, সেনাবাহিনী তাঁদের ঘৃণার চোখে দেখে। দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের ক্রোধও কম নয়। তিনি শান্ত স্বরে সহযাত্রীদের রাস্তা থেকে সরে যেতে বললেন। এরপর ক্যাপ্টেনকে সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিলেন, ‘আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবই। পারলে আমাকে গুলি করো।’ তখনো সেনারা তাঁর দিকে রাইফেল উঁচিয়ে ছিল। যেকোনো মুহূর্তে গুলি ছুড়তে পারে। ইতিমধ্যে দলনেত্রী মনস্থির করে ফেলেছেন। সেনারা তাঁকে হত্যা করতে চাইলে নিবৃত্ত করা যাবে না। তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে সামরিক যান থেকে নেমে এলেন মেজর পদমর্যাদার এক সেনা কর্মকর্তা। তিনি অধীনদের রাইফেল নামিয়ে নিতে বললেন। আর সহযাত্রীদের নিয়ে দলনেত্রী পা বাড়ালেন বাড়ির উদ্দেশে। এই দলনেত্রী অং সান সু চি। ত্যাগে, সংগ্রামে, ধৈর্যে ও দৃঢ়তায় তাঁর তুলনা মেলা ভার। তাঁকে বলা হয় এশিয়ার নেলসন ম্যান্ডেলা। বর্তমানে সু চি মিয়ানমারের বিরোধী দলের নেতা। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরের নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে এনএলডিই জয়ী হবে। কিন্তু সামরিক বাহিনী তাঁকে ক্ষমতায় আসতে দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। ১৯৯০ সালেও সু চির দল ৮১ শতাংশ আসনে জিতেছিল।
২. ১৯৮৮ সালে অং সান সু চি দেশে ফিরেছিলেন অসুস্থ মাকে দেখতে। ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার বইয়ের ভূমিকায় তাঁর স্বামী মাইকেল এরিস লিখেছেন, ‘সেটা ছিল অক্সফোর্ডের শান্তসন্ধ্যা। মার্কের অন্যান্য দিনের সঙ্গে সেদিনের সন্ধ্যার কোনো পার্থক্য ছিল না। টেলিফোন যখন বাজল দুই ছেলে তখন বিছানায় শুয়ে ছিল এবং আমরা পড়ছিলাম। সু রিসিভার তুলে খবর পেল তার মা গুরুতর অসুস্থ। স্ট্রোক করেছেন। ফোন রেখেই সু চি ব্যাগ গোছাতে শুরু করলেন। তখনই আমার আশঙ্কা হয়েছিল, আমাদের জীবন বোধ হয় চিরতরে বদলে গেল।’ ২৬ আগস্ট রেঙ্গুনের গ্রেট শোয়েডন প্যাগোডার পশ্চিম পাশের ময়দানে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে অং সান সু চি যে ভাষণ দেন, তা এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে নিজেকে শামিল করেছি বাবার ঐতিহ্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনগণকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটি অত্যন্ত পরিষ্কার এবং খোলাখুলি ব্যাপার। আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হলে কিছুই অর্জন করতে পারব না। যদি দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ হতেই না পারে, তাহলে কোনো আদর্শ বা পদ্ধতির সরকারই দেশের জন্য বড় কল্যাণ বয়ে আনতে পারবে না।’ ১৯৯৯ সালে অং সান সু চির স্বামী ক্যানসারে মারা যান লন্ডনে। সামরিক সরকার গৃহবন্দী সু চিকে স্বামীর লাশ দেখতে লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি দিলেও তিনি তা নাকচ করে দেন এই ভেবে যে একবার দেশের বাইরে গেলে তারা আর দেশে ফিরতে দেবে না। ত্যাগে ও সংগ্রামে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় হতে পারেন দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা; যিনি একনাগাড়ে ২৭ বছর শ্বেতাঙ্গ সরকারের কারাগারে ছিলেন। আর সু চি প্রায় ২১ বছর অন্তরীণ ছিলেন। ১৯৫৬ সালে সু চির বয়স যখন ১১ বছর, ইয়াঙ্গুনের মেথোডিস্ট ইংলিশ হাইস্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে মিয়ানমারের অভিজাত পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়ত—যাদের মধ্যে বার্মিজ, চীনা, ভারতীয়; খ্রিষ্টান, হিন্দু ও মুসলমানও ছিল। বর্মি মুসলমানদের সঙ্গে সু চি ও তাঁর বাবা অং সানের পরিবারের রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১২ মার্চ ইয়াঙ্গুনে সুইডিস সাংবাদিক বার্টিল লিটনারের সঙ্গে আলোচনা হয় মিয়ানমারের রাজনীতি নিয়ে। আলোচনায় আরও ছিলেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান ও সাংবাদিক শ্যামল দত্ত।
লিটনার রোহিঙ্গা সমস্যা ও মিয়ানমার নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। মিয়ানমারের মুসলমান নেতারা কীভাবে দেশটির স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন, তারও ব্যাখ্যা দিলেন তিনি। বললেন, তাঁরা ছিলেন সবাই জাতীয়তাবাদী নেতা। সেদিন লিটনার আমাদের যে গল্পটি শোনান, তা কৌতূহলোদ্দীপক। ১৯৮৮ সালে অং সান সু চি রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ছিলেন না। ভেবেছিলেন মাকে দেখে লন্ডনে ফিরে যাবেন। কিন্তু বাবার তিন বন্ধু উ উইন থিন, উ মই থু এবং মং থো কা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই মং থো কা একজন মুসলিম লেখক ও রাজনীতিক। লিটনার আমাদের যে ছবিটি দেখালেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৮৮ সালের ২৪ আগস্ট ইয়াঙ্গুন জেনারেল হাসপাতালের অস্থায়ী মঞ্চে সু চি যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, তাঁর পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন মং থো কা, যার আসল নাম নূর মোহাম্মদ। আন্দোলনের একপর্যায়ে আরও অনেকের সঙ্গে মং থো কাও গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৯১ সালের ১১ জুন কারাগারেই মারা যান এবং ইয়াঙ্গুনের সুন্নি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মিয়ানমারের মুসলমানরা এখনো অং সান সু চিকে তাঁদের শেষ ভরসা মনে করেন। তাঁদের ধারণা, গণতন্ত্রের আন্দোলনকে সু চি যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, রোহিঙ্গাদের রক্ষায়ও তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। অং সান সু চি সরাসরি রোহিঙ্গাদের পক্ষ না নিলেও ২০১২ সালে জাতিগত দাঙ্গার পর একে বড় ধরনের ‘আন্তর্জাতিক ট্র্যাজেডি’ বলে অভিহিত করেন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত থাকতে বলেন। তবে সু চি এও স্বীকার করেন যে তিনি যে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটি বৌদ্ধ সংখ্যাগুরুদের দল। তাঁকে ভোটের কথা ভাবতে হয়। সে কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, সু চি নির্বাচিত হলে কি মিয়ানমারের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোয় পরিবর্তন আসবে? তিনি কি জাতিগত বিদ্বেষ ও বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে সব নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করতে পারবেন? না জাতিগত সোভিনিজম এই শান্তিবাদী নেত্রীকেও আচ্ছন্ন করে রাখবে? (শেষ) সংশোধনী: গতকাল বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্যের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেটি হবে ডলার নয়, টাকার অঙ্কে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

মুরসির ৫২৯ সমর্থকের মৃত্যুদণ্ড

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ও মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসির ৫২৯ জন সমর্থকের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন একটি আদালত। বিচার শুরুর তিন দিনের মাথায় গতকাল সোমবার মাত্র দুই সেশন শুনানির পর আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। মামলার শুনানি চলাকালে দণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের পক্ষে কাউকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, দণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ব্রাদারহুডের প্রধান নেতা মোহাম্মদ বাদিও রয়েছেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা এবং জনগণ ও তাদের সম্পদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। তবে দণ্ড পাওয়া ব্যক্তিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন। এ ছাড়া রায় অনুমোদনের জন্য দণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের কাগজপত্রসহ রায়ের নথি মিসরের গ্রান্ড মুফতির কাছে পাঠানো হবে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মিসরের রাজধানী কায়রোর দক্ষিণে মিনার একটি আদালতের বিচারক ৫২৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে রায় দেন। মিসরের ইতিহাসে এক রায়ে এত ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। রায়ে ১৬ জনকে খালাস দেওয়া হয়। আসামিদের মধ্যে ১৪৭ জনকে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়।
অন্য আসামিরা কেউ জামিনে, কেউবা পালিয়ে আছেন। আসামিদের পক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, তাঁদের কাউকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাঁরা বিচারের এই প্রক্রিয়াকে ‘সব ধরনের আইনি মূল্যবোধকে’ পাশ কাটানো বলেও উল্লেখ করেন। অভিযুক্ত এক ব্যক্তির আইনজীবী ইয়াসির জিদান অভিযোগ করেন, শুনানি ও রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে ঢোকার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে বাধা দেন। তাঁর মতো বেশ কয়েকজনের সঙ্গেই এমন আচরণ করা হয়েছে। দণ্ড পাওয়া এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গত শনিবার বিচার শুরু হয়। ওই দিনই নিরপেক্ষ বিচারক প্যানেল নিয়োগের জন্য আদালতে আবেদন জানান অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনজীবীরা। কিন্তু আইনজীবীদের সেই আবেদন নাকচ করা হয়। দণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আগামী ২৮ এপ্রিলের আগে চূড়ান্ত বিচারের জন্য আদালত বসছেন না। এই সময়ের মধ্যে দণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের আপিল করতে হবে। তার আগে এই রায়ের নথি মিসরের গ্রান্ড মুফতির কাছে পাঠানো হবে। রায়ের নথির সঙ্গে দণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের পক্ষের কাগজপত্রও পাঠানো হবে। মিসরের আইন অনুযায়ী গ্রান্ড মুফতিই যেকোনো মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। লন্ডনে ব্রাদারহুডের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল-হাদাদ বলেন, মিসরের আদালতের এই রায় প্রমাণ করে, দেশটিতে একনায়কতন্ত্র চলছে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে, আপিলের পর রায় পরিবর্তনও হতে পারে। তবে এটা স্পষ্ট, ফিল্ড মার্শাল আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি মিসরে পুরোপুরি একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন।
কায়রোর একটি মানবাধিকার সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ জারি বলেন, ‘এই রায় অগ্রহণযোগ্য। মিসরের বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’ বর্তমানে মিসরে নিষিদ্ধ সংগঠন ব্রাদারহুডের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাসহ মুরসিপন্থী অন্তত এক হাজার ২০০ জনের বিচার করছে সেনা-সমর্থিত সরকার। তাঁদের মধ্যে গতকাল ৫৪৫ জনের বিচারের রায় ঘোষণা করা হলো। গত শনিবার তাঁদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। আজ মঙ্গলবার আরও অন্তত ৭০০ ব্যক্তির বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, এই ৭০০ ব্যক্তির মধ্যে মোহাম্মদ বাদিও থাকবেন। গত বছরের ৩ জুলাই মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট ও ব্রাদারহুড নেতা মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। প্রতিবাদে রাজপথে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে ব্রাদারহুড। একপর্যায়ে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। ১৪ আগস্ট মিনায় ব্রাদারহুড-সমর্থকদের বিক্ষোভ শিবির থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই ওই সহিংসতার সময় গ্রেপ্তার হন। তারপর দেশের বিভিন্ন স্থানে চলা সহিংসতায় কয়েক শ মানুষ নিহত হয়। পরে ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করে মিসর সরকার। ক্ষমতাচ্যুত মুরসিও কারাগারে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে ক্ষমতায় থাকার সময় প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভকারীদের হত্যায় উসকানি দেওয়ার মামলায় মুরসির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। বিবিসি, আল-জাজিরা ও ওয়াশিংটন পোস্ট।

জি-৭ সম্মেলনে যোগ দিতে ওবামা নেদারল্যান্ডসে

বারাক ওবামা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গ্রুপ অব সেভেনের (জি-৭) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গতকাল সোমবার নেদারল্যান্ডসে পৌঁছেছেন। দেশটির দ্য হেগ শহরে ওবামার আহ্বানে জি সেভেনের বর্তমান জরুরি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ক্রিমিয়া অঞ্চলের দখল নেওয়ার পর রাশিয়াকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া যায়, তা নিয়ে ছয়টি দেশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন ওবামা। এ ছাড়া জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া নিয়েও সম্মেলনে আলোচনা হতে পারে। ক্রিমিয়া পরিস্থিতির কারণে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে পশ্চিমা নেতাদের। এএফপি।

তীব্র লড়াইয়ের মুখে তারকারা

নির্বাচনী সভায় তৃণমূলের প্রার্থী অভিনেত্রী
শতাব্দী রায়। সৌজন্যে পিটিআই
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে এবার নির্বাচনী ময়দানে নেমেছেন একঝাঁক তারকা। তারকা প্রার্থীর তালিকায় এবার এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই দল থেকে অন্তত ১০ জন তারকাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বিজেপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন চারজন তারকা। অবশ্য কংগ্রেস বা বাম দল থেকে কোনো তারকা এবার মনোনয়ন পাননি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ও বিজেপির তারকা প্রার্থীরা ইতিমধ্যে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন। চষে বেড়াচ্ছেন নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা। জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী সবাই।
কিন্তু বিভিন্ন এলাকার ভোটের হিসাব বলছে, তারকা প্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পেতে পারেন। তবে তাঁরা যে এবার কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ছেন, সে ব্যাপারে তৃণমূল ও বিজেপির নেতারা জানেন। তৃণমূলের এই তারকা প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন টালিউড তারকা দেব, সন্ধ্যা রায়, মুনমুন সেন, তাপস পাল, শতাব্দী রায়, ভূমি ব্যান্ডের সৌমিত্র রায়, নাট্যকর্মী অর্পিতা ঘোষ, সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেন, ফুটবলার ভাইচুং ভুটিয়া, ইতিহাসবিদ নেতাজির নাতি অধ্যাপক সুগত বসু প্রমুখ। বিজেপির তারকা প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী বাপ্পী লাহিড়ী ও বাবুল সুপ্রিয়, টালিউড তারকা জর্জ বেকার, জাদুকর পি সি সরকার (জুনিয়র) প্রমুখ। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে জিতেছিলেন দুই চলচ্চিত্র তারকা তাপস পাল ও শতাব্দী রায়। এবারও তাঁরা মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে এবার তাঁদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হতে পারে। রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দিয়ে এসব তারকাকে প্রার্থী করায় অনেক এলাকায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই লড়বেন যশোবন্ত

যশোবন্ত সিং
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা যশোবন্ত সিং রাজস্থানের বারমার আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গতকাল সোমবার মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ওই আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন তিনি। তবে দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেননি তিনি। বিভিন্ন সময় ভারতের পররাষ্ট্র, অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা যশোবন্ত সিং বারমারে বিজেপির প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা সোনারাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। গতকাল দল থেকে পদত্যাগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে যশোবন্ত বলেন, 
আমি দল থেকে পদত্যাগ করছি না। কিন্তু সমর্থকদের চাপে প্রার্থী হয়েছি।’ সমর্থকদের কাছ থেকে নায়কোচিত সংবর্ধনা পাচ্ছেন যশোবন্ত। বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেছেন তিনি। যশোবন্তের সমর্থক রাম সিং বলেন, যশোবন্ত সিংকে বিভিন্ন স্থানে ফুলেল সংবর্ধনা জানানো হচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

ভোটের লড়াইয়ে নয় গরমে ভয় মুনমুনের!

মুনমুন সেন
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুরা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে প্রার্থী হয়েছেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের মেয়ে মুনমুন সেন। গত রোববার প্রথম তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকায় যান। ভোটের লড়াইকে ভয় পান না বলে ওই দিন সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন অভিনেত্রী মুনমুন। তবে তিনি যে গরমকে বেশ ভয় পাচ্ছেন, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
রোববার বাঁকুরা স্টেডিয়ামে জনসভায় মুনমুন বলেন, ‘নির্বাচনের মাঠে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কী মুনমুন ভীত হয়ে পড়েছেন? জবাব হচ্ছে, মোটেই নয়।’ তবে মুনমুন বাঁকুরায় গিয়ে গরমে ভীত ছিলেন, এটা স্পষ্ট। তিনি বিকেলের পর বাঁকুরা শহরে পৌঁছেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হোটেলকক্ষে অবস্থান নেন। নিজের স্বামীর সঙ্গেই তিনি ওই কক্ষে বেশি সময় কাটান। পরে মুনমুনকে সভাস্থলে নিতে খোলা জিপ অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তিনি উঠেন বিলাসবহুল এসইউভি গাড়িতে।

শ্লীলতাহানির শিকার অভিনেত্রী নাগমা

নাগমা
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসদলীয় প্রার্থী অভিনেত্রী নাগমা গতকাল রোববার নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন। সাধারণ মানুষ নয়, নিজের দলের একজন বিধায়ক তাঁর শ্লীলতাহানির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উত্তর প্রদেশের মিরাট আসনের কংগ্রেসপ্রার্থী নাগমা নির্বাচনের প্রচারণা চালাতে এবং স্থানীয় গুরুদুয়ারায় সম্মান জানাতে মিরাট আসনের হাপুর এলাকায় যান। সেখানে একটি দলীয় কার্যালয়ও উদ্বোধনের কথা ছিল। এ সময় নাগমার সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক গজরাজ শর্মা। অভিযোগ ওঠে, জনসমক্ষে নাগমার গায়ে হাত দেন গজরাজ শর্মা।
বিষয়টি বুঝতে পারেন তিনি। বিরক্তিসহকারে তিনি তাঁর শরীর থেকে গজরাজের হাত সরিয়ে দেন। এরপর আবারও গজরাজ একই কাজ করতে থাকলে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে সমর্থকদের সঙ্গে কথা না বলেই সেখান থেকে চলে যান এই বলিউড অভিনেত্রী। এমএলএ গজরাজ শর্মার এই আচরণে নারী আন্দোলনের কয়েকজন কর্মী নিন্দা প্রকাশ করেন এবং এ ঘটনায় বিধায়কের প্রতি ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানান। তবে গজরাজ অভিযোগ অস্বীকার করেন। জি নিউজ।

কঠিন সঙ্কটে ফের তাতার মুসলমানরা

শেষ পর্যন্ত ক্রিমিয়া রাশিয়ার অঙ্গরাজ্য হয়ে গেলো। ইউক্রেন ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার ও রাশিয়ায় যোগ দেয়ার পক্ষে রেফারেন্ডসে রায় দিলেন ৯৬ শতাংশ ক্রিমিয়ান। এর পরপরই একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দিলেন, ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হলো। বিপাকে পড়েছেন ক্রিমিয়ার মুসলিম তাতাররা। অঞ্চলটি ইউক্রেনের অঙ্গীভূত থাকাকালে যে স্বাধীনতা তারা ভোগ করেছেন, রুশ কর্তৃত্বে ক্রিমিয়া চলে যাবার পর সে স্বাধীনতা তাদের হারাতে হবে ভেবে তাতাররা উদ্বিগ্ন। রুশ শাসনের তিক্ত ও বেদনাদায়ক স্মৃতি তাদের মন থেকে আজও মুছে যায়নি। ১৯৪৪ সালে তাতারদের গণহারে নির্বাসনে পাঠানো ও হত্যার ইতিহাস তাতার মুসলিমরা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না।
ক্রাইমিয়ান তাতারদের এক আঞ্চলিক নেতা মুস্তাফা আসাবা গত মঙ্গলবার রয়টার্সকে বলতে লাগলেন, আমাদের দমন-পীড়ন রুশরা আবার চালাতে চাইলে আমরা প্রতিরোধ গড়বো। জানি আমাদের ওপর মোকদ্দমা চলবে, আমাদের জেলে পাঠানো হবে- তবুও আমরা দমবো না। আড়াই লাখের বেশি তাতার মুসলিম বর্তমানে ক্রিমিয়ার বাসিন্দা। অঞ্চলের মোট ২০ লাখ জনসংখ্যার তারা প্রায় ১৩ শতাংশ।
১৯৪৪ সালে স্ট্যালিন ছিলেন সোভিয়েতের অধিনায়ক। তার হুকুমে তাতার মুসলিমদের সমস্ত ঘরবাড়ি তখন কেড়ে নেয়া হয়। মসজিদগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং পরিণত করা হয় গুদামে। নিরশ্বেরবাদী যাদুঘরে পরিণত করা হয় একটি মসজিদকে। বেলগর্স্ক-এর এক দোকান মালিক নাইয়ারা বললেন, তার একটি মাত্র শিশু সন্তানকে নিয়ে কি হবে ভেবে তিনি ভয় পাচ্ছেন।
বেলগর্স্কের আতঙ্কগ্রস্ত সংখ্যালঘুরা সামনে দুর্দিনের আশঙ্কায় খাদ্য জমা করতে শুরু করেছেন এবং এলাকার বাইরে থেকে প্রবেশ ঠেকাতে নিরস্ত্র পাহারার আয়োজনে নেমেছেন।
আসাবা বলতে লাগলেন, তাতার মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ ও উত্তেজনা ক্রমে বাড়তে থাকলেও জন্মভূমি ছেড়ে যেতে তারা রাজি নন। যে কোনো অবস্থায় ক্রিমিয়ায় থেকে যেতে প্রস্তুত ৯৫ শতাংশ তাতার মুসলিম। তাতার মুসলমানরা কয়েকশ’ বছর ধরে ক্রিমিয়ার বাসিন্দা। নাৎসী বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে স্ট্যালিন ১৯৪৪ সালে তাদের দেশ ছাড়তে ও নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছিলেন। দুর্গম যাত্রাপথে বহু মুসলমান শাহাদৎ বরণ করেন। সে সময় তাতার মুসলমানরা সংখ্যায় ছিলেন ২ লাখের বেশি। ১৯৮০ দশকের শেষদিকে সোভিয়েতে পেরেস্ত্রইকা চালু হয়। তারপর মুসলমানরা অনুমতি পান জন্মভূমিতে ফেরার। তাদের ফেরার প্রক্রিয়া চলতে থাকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত বিলুপ্ত হওয়ার এবং ইউক্রেন স্বাধীন ঘোষিত হওয়ার সময় পর্যন্ত। হারানো জমি ও জায়গার ওপর নিজেদের স্বত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নানা আইনি বাধা-বিপত্তির মুখে পড়তে হয় তাতার মুসলিমদের। তাদের যাবতীয় জমি ও সম্পত্তি তাদের অনুপস্থিতিতে জবরদখলে নিয়েছিল জাতিগত রুশরা।
অরাজক পরিস্থিতি বর্তমানে বিরাজ করছে ক্রিমিয়ায়।
ক্রিমিয়া রাশিয়ায় যুক্ত হওয়ার পর পরই শত শত তাতার মুসলমানকে নিহত এক তাতার আন্দোলন কর্মীর জানাযায় শরিক হতে দেখা যায়।
তাতার আন্দোলনকর্মী রেশাত আমেতফের আকস্মিক গায়েব ও খুন হওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে ক্রিমিয়ায় পেছনের সপ্তাহ থেকে কেমন অরাজক আবহাওয়া চলতে শুরু করেছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীর ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি ডিরেক্টর ব্যাশেল ডেনবার-এর অন ইসলামের হস্তগত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, এই গুম ও হত্যাকা-ের আগাগোড়া তদন্ত চালিয়ে দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়া হচ্ছে ক্রিমিয়ান কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব তারা এড়িয়ে যেতে পারে না।
দু’সপ্তাহ আগে তাদের একটি প্রতিবাদ মিছিল থেকে মুসলিম আন্দোলনকর্মী রেশাত আমেতফকে ফৌজি জ্যাকেট পরা কিছু লোক তুলে নিয়ে যায় এবং তখন থেকে তিনি লাপাত্তা। রোববার তার লাশ পাওয়া যায়। নির্যাতনের স্বাক্ষরসহ তার লাশটি ফেলে রাখা হয় কাছের একটি জঙ্গলে।
তিন সন্তানের বাবা ও পেশায় নির্মাণকর্মী ৩৯ বছর বয়সী আমেতফ ক্রিমিয়ার ইউক্রেন থেকে বেরিয়ে পড়ার ও রাশিয়ার অঙ্গীভূত হওয়ার ছিলেন বিরোধী।
আমেতফের অস্বাভাবিক বিদায়ে জানাযায় ক্রন্দনরত তার এক আত্মীয় ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘সত্যের পক্ষে লড়াই ছিল আমেতফের। তার দাদাও আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন বিশ্বযুদ্ধের সময়। আত্মীয় বলতে লাগলেন, আমেতফের প্রাপ্য ছিল সম্মানসূচক পদক। বদমাশদের হাতে তার এভাবে খুন হওয়ার কথা ছিল না।’
আমেতফের গুম হওয়ার ও পরে খুন হওয়ার ঘটনায় রুশ নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ায় নিজেদের ভবিষ্যৎ দুর্দিন নিয়ে আবার শঙ্কায় দিন কাটাতে শুরু করেছেন তাতার মুসলমানরা। রুশ নিয়ন্ত্রণে তাদের বিঘিœত ভবিষ্যতের আভাস তারা খুঁজে পাচ্ছেন আমেতফের ঘটনায়।
ক্রিমিয়ার মুসলমানরা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে একটি সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন।
রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযুক্তির উল্টো পরিণাম রাশিয়াকে ভবিষ্যতে ভুগতে হবেÑ এই বলে পুতিনকে সতর্ক করেন আসাবা।
ক্রিমিয়া নিয়ে ইউক্রেনকে আজ যে পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, সেই অভিন্ন পরিস্থিতির মুখে রাশিয়াকে পড়তে হবে আর মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই। আসাবার মতে, মাত্র এক বছর আগেও কেউ ভাবতে পারেনি যে, ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হবেন। কিন্তু তা ঘটেছে। অন-ইসলাম।