Sunday, January 25, 2026

আমি স্বতন্ত্র হই আর যা-ই হই, এই দুর্দশা মেনে নেব না: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘আমি বাংলাদেশের সব বিভাগেই গেছি। সেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া দেখছি। তাহলে আমার সরাইল-আশুগঞ্জের এই অবস্থা কেন? কেন এই দুর্দশা? আমি স্বতন্ত্র হই আর যা-ই হই, এই দুর্দশা মেনে নেব না। আপনারা দৃশ্যমান একটা পরিবর্তন লক্ষ করবেন।’

শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম পরমানন্দপুরে নির্বাচনী জনসভায় এসব কথা বলেন রুমিন ফারহানা।

রুমিন ফারহানা ‘হাঁস’ প্রতীক পাওয়ার পর আজ শুক্রবার সরাইল উপজেলার পরমানন্দপুর গ্রামে প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন। সেখানে জনসভায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যদি আমাকে আপনাদের উসিলায় এমপি করেন, যে-ই সরকারে আসুক না কেন, আমি একজন স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে সরকারকে বাধ্য করব এই এলাকার উন্নয়ন করার জন্য। স্কুল–কলেজ–মাদ্রাসা, মন্দির–মসজিদের উন্নয়নের জন্য কেবল সরকারি বরাদ্দ নয়, আমি আমার নিজস্ব উদ্যোগে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন এই অবহেলিত জনপদের উন্নয়ন হয়।’

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আজকে এই পাঁচ গাঁও (পরমানন্দপুর, বরইচারা, ফতেহপুর, হরিপুর ও ষাটবাড়িয়া) থেকে আমার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হচ্ছে। আমরা জানি, সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলা দুটো বাংলাদেশের মধ্যে সবচাইতে অবহেলিত উপজেলা। আমি বলেছি, এই দুই উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত এলাকা কোনটি। আমাকে বলা হলো—এই পাঁচ গাঁও। আমি আজকে দেড়–দুই ঘণ্টা গাড়িতে যাত্রা করছি, ২০ মিনিট নৌকায় যাত্রা করছি। তারপর ৪৫ মিনিট থেকে প্রায় এক ঘণ্টা অটোরিকশায় যাত্রা করছি, তা–ও আবার বালুর রাস্তা। সমাবেশে আইসা আমি বলি, মা-বইনেরা যেমন ভর্তা বানায়, আমি সে রকম ভর্তা হইয়া গেছি। তাইলে আমার মা-বোন-ভাইয়েরা, তারা কী করে চলাচল করে?’

এলাকার উন্নয়নের অঙ্গীকার করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি আজকে আমার প্রথম নির্বাচনী জনসভা থেকে ওয়াদা করছি, ভূইশ্বর থেকে পরমানন্দপুর সড়কে একটা ব্রিজ করে দেওয়া আমার নির্বাচনী ওয়াদা। শুধু ব্রিজ নয়, আমাদের পাকা রাস্তাও হইতে হবে। এই এলাকাটা যদি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এলাকা হয়, তাহলে মানুষ কীভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে? মানুষ কী করে আধুনিক জীবনযাত্রার ছোঁয়া পাবে? আমি আমার প্রথম নির্বাচনী জনসভা থেকে আশ্বস্ত করছি, এখানে (পাঁচ গ্রামে) সেতু ও পাকা রাস্তার ব্যবস্থা করব।’

ভোটারদের উদ্দেশে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘হাঁস হইল সমৃদ্ধির প্রতীক, হাঁস হইল ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতীক, হাঁস হইল নতুন শান্তির প্রতীক। সুতরাং এইবারের ভোটটা হাঁস মার্কায় হবে। আপনারা একটিবার সুযোগ দিন। এইবারে ভোটটা আমার হাঁস মার্কায় চাই।’

নির্বাচনী জনসভায় সভাপতিত্ব করেন পাকশিমুল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড শাখা বিএনপির সভাপতি সিরাজ খান। উপস্থিত ছিলেন সরাইল উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আইয়ুব হোসেন সরদার, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হোসেন মিয়া, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক উসমান খাঁন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল বারেক প্রমুখ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামের মসজিদসংলগ্ন মাঠে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামের মসজিদসংলগ্ন মাঠে। ছবি: প্রথম আলো

যারা অন্যায় করেনি, তাদের শাস্তি হতে দেব না: আওয়ামী লীগের কর্মীদের উদ্দেশে ফখরুল

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গত ১৫ বছর আপনারা ভোট দিতে পেরেছিলেন? ভোট দিতে পারেননি। সে সময় আগের রাতেই ভোট হয়ে গেছে। এখন একটা সুযোগ এসেছে।’

শুক্রবার বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শোল্টিহরি বাজারে নির্বাচনী গণসংযোগের সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম এ কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন ভালো করেছেন। এলাকার সমর্থক–কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি আপনাদের পাশে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের শাস্তি হবে। যারা অন্যায় করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না।’

দুপুরে মির্জা ফখরুল নির্বাচনী গণসংযোগ ও পথসভার উদ্দেশে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন। বিকেলে তিনি সদর উপজেলার দেবীপুর ইউনিয়নের শোল্টিহরি বাজারে গণসংযোগের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এ ছাড়া ১১ মাইল, বৈরাগীহাট, পয়সাফেলা ও মুন্সিরহাট এলাকায় গণসংযোগ করেন। তিনি ভোটারদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করে ধানের শীষে ভোট চান।

শোল্টিহরি বাজারে এলাকাবাসীর উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি কিন্তু আপনাদেরই ছেলে, আপনাদেরই ভাই। এই এলাকা থেকে নির্বাচন করে আমি কখনো জিতেছি, কখনো হেরেছি। যখন হেরেছি, তখন কিন্তু আপনাদের ছেড়ে যাইনি। আমার বয়স ৭৮ হয়ে গেছে। কিন্তু মনের দিক থেকে এখনো তরুণ আছি। আমি বিশ্বাস করি, এখনো অনেক কাজ করতে পারব। সুযোগ পেলে এলাকার সমস্যার সমাধান করতে পারব।’

ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা মুসলমান–হিন্দু ভাইবোনদের অনুরোধ করব, আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে এলাকার উন্নয়নে কাজ করি। এই উন্নয়ন কেবল ধানের শীষ করতে পারবে, আর কেউ করতে পারবে না। আজ কিছু লোক আমাদের ভাগ করতে চায়। আমরা কি বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান আলাদা আলাদা বাস করি? এলাকাতে একসঙ্গে হিন্দু-মুসলমানরা থাকেন। একসঙ্গে চলাফেরা করেন। আমাদের পরবে হিন্দুরা আসেন, হিন্দুদের পূজায় আমরা যাই। আমরা এই অবস্থাটা ধরে রাখতে চাই। আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই একসঙ্গে দেশটাকে গড়ে তুলতে চাই। সবাইকে সমান নিরাপত্তা দিতে চাই।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এখন একটা দল আসছে, নাম কী? জামায়াত। তারা কি এর আগে ক্ষমতায় এসেছিল? কারও জন্য কোনো কাজ করেছে? আমরাই কাজ করেছি। বিএনপিই পরীক্ষিত দল। আরও কাজ করতে চাই। নতুন স্কুল, রাস্তাঘাট করতে চাই, হাসপাতাল করতে চাই। ছেলেমেয়েদের চাকরির ব্যবস্থা করতে চাই।’

নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দেবীপুর ইউনিয়নের শোল্টিহরি বাজারে
নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দেবীপুর ইউনিয়নের শোল্টিহরি বাজারে। ছবি: প্রথম আলো

তিস্তা প্রকল্পে সমঝোতার ইঙ্গিত সমীক্ষা চালাচ্ছে চীন by মিজানুর রহমান

তিস্তা নদীর পানির হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে গেছে হাসিনা আমলেই। তবে ওই নদীকে বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে সরকারের তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগে আগে থেকেই আগ্রহী ছিল চীন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বেইজিং এতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। কিন্তু তখন প্রস্তাবটি বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। কারণ দিল্লি ছিল সক্রিয়। তারা তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের কৌশলী প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিল। যা অগ্রাহ্য করার মতো অবস্থানে ছিলেন না শেখ হাসিনা। কিন্তু ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে। হাসিনা সরকারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির প্রভাবও কমেছে। তিস্তায় বহুমাত্রিক প্রকল্প গ্রহণে একতরফাভাবেই চীনের দিকে অগ্রসর হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় উৎসাহী হয়েছে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে কাজ করছে। যদিও এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন অন্ধকারে।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বেইজিংয়ের সঙ্গে। আলোচনার ফোকাল পয়েন্টে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালে একাধিকবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে মন্ত্রণালয় এবং চীনা দূতাবাসের মধ্যে। প্রকল্পটির কারিগরি দিক খতিয়ে দেখেছেন চীনা বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে চুক্তি বা সমেঝাতার জন্য একের পর এক সম্ভাব্য তারিখও হয়েছে। যদিও তা আর চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চীনের তরফে প্রকল্পটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এই সমীক্ষা শেষ হলে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হবে। আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই চুক্তির সম্ভাবনা নেই। তবে সমীক্ষা শেষ হলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো অবস্থায় রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এ বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মানবজমিনকে বলেন, তিস্তা চুক্তি ১২ই ফেব্রুয়ারির আগে হবে না, তবে হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা আমাদের কাগজপত্র সব জমা দিয়েছি। এখন তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এটা একটা জটিল প্রকল্প। আমরা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এটা হচ্ছে না কারণ তাদের সমীক্ষা শেষ করার পর যদি সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে তারপরও এক মাস লাগবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি, দুই দেশ থেকে কারা যাবে, কোথায় সাইন হবে এমন নানা বিষয় আছে। এখনো যেহেতু সমীক্ষার ওপরে ওরা কনক্লুসিভ হয় নাই। ব্যাংকের রিভিউ, টেকনিক্যাল সাইডের রিভিউও চলছে। চায়না ফুললি কমিটেড। আবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে মনে হয় বিষয়টি আছে। তারাও আশাবাদী যে চুক্তিটা হয়ে যাবে। তারা কমিটেড আর আমরা আমাদের কাজ করে দিয়েছি।

ওদিকে গত ১৯শে জানুয়ারি তিস্তা নদী এলাকা পরিদর্শন করেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গাজীর ঘাট এলাকা পরিদর্শনকালে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে ছিলেন। তিস্তা নদী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপদেষ্টা। বলেন, আমরা আজ এখানে এসেছি মূলত কাজের অগ্রগতি দেখতে ও আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে। রাষ্ট্রদূত মহোদয় নিজেই এসেছেন, যা প্রমাণ করে চীন এই প্রকল্প নিয়ে কতোটা আন্তরিক। তারা প্রকল্প যাচাই-বাছাই করছে। আমরা কোনো তড়িঘড়ি করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। বরং একটি টেকসই সমাধান খুঁজছি। আশা করি, শিগগিরই আমরা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবো। পানি সম্পদ উপদেষ্টা বলেন, প্রকল্পটা করার ব্যাপারে চীন ও বাংলাদেশ সরকার উভয়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রকল্পটা অনেক বেশি জটিল হওয়ায় তিনটা জিনিস আমাদের দেখতে হচ্ছে- বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ ও একইসঙ্গে সেচ। ফলে এগুলো সঠিকভাবে যাচাই করার জন্য চীন একটু সময় নিচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে হতাশা না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমি আবারো আপনাদের বলছি, হতাশা ছড়িয়েন না। হতাশা ছড়িয়ে লাভ নেই তো কোনো। বরং আশার কথা, একজন রাষ্ট্রদূত এসেছেন, আমি এসেছি। নিশ্চয়ই এখানে আশার বড় বেশি জায়গা আছে বলেই আমরা এসেছি। আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই নদী খনন ও পাড় বাঁধার কাজটা করতে চাই, যাতে আপনাদের আর ঘরবাড়ি হারাতে না হয়। পরিদর্শনকালে বন, পরিবেশ ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথমে তিস্তা সড়ক সেতুতে যান।

সেখানে তাকে প্রকল্পের নকশা দেখান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে তিনি, চীনের রাষ্ট্রদূতসহ তিস্তা রেলসেতুর কাছে নৌকায় ঘোরেন। পরে কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়নে গাজীর ঘাটে নদীভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। উল্লেখ্য, প্রতিনিধিদলের প্রাক্কলন মতে, ১০ বছর মেয়াদে ওই প্রকল্পে ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ৫ বছরে সেচ, ভাঙন রোধ, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ গুরুত্ব পাবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার একটি খসড়া চীন সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। রিভারাইন পিপলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর তিস্তার ভাঙন ও প্লাবণে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন উত্তরের ৫ জেলার বাসিন্দা। এ ছাড়াও বাস্তুভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরুর আশা করেছিল চীনের ডিরেক্টর অব দ্য পলিটিক্যাল সেকশন জং জিং। তার নেতৃত্বে চীনা প্রতিনিধিদল বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনসহ নদীপাড়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি আরও কমে যায়, ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আর বর্ষাকালে তিস্তায় প্রবাহিত হয় তিন থেকে চার লাখ ঘনফুট পানি। সব কপাট খুলে দেয়া হয়। দ্রুত বেগে নেমে আসা তিস্তার পানিতে উত্তরের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। ভাঙনের পাশাপাশি ব্যাপক ফসলি জমি ক্ষতির মুখে পড়ে। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানির মতে, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে অববাহিকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছি।

বিগত আওয়ামী সরকার তিস্তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছিল, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাতে তিস্তাপাড়ের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে তিস্তা নদীকে ঘিরে চীনের প্রস্তাবিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের আগে এ অঞ্চলের নদী ও প্রকৃতিকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন পরিবেশ ও নদী রক্ষা আন্দোলনের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চড়া সুদের বিদেশি ঋণে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে নদী শাসনের যে কারিগরি নকশা করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে নদী আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাপা’র সহ-সভাপতি ও জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণা বিভাগের সাবেক প্রধান নজরুল ইসলামের মতে, তিস্তা উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী এবং সারা দেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী। এই নদী আজ সংকটাপন্ন। এই সংকটের মূল কারণ দু’টি। একটি হচ্ছে ভারত এই নদীর পানি সরিয়ে নিচ্ছে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে বাংলাদেশে আর তেমন পানি আসে না। বিগত সরকার তিস্তা নিয়ে বহু আশা দেখিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে এই বুঝি একটা চুক্তি হলো। চুক্তি হলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। ওটা ছিল একটা মরীচিকা।

কারণ আমরা জানি ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নিয়ে চুক্তি হয়েছে ১৯৯৬ সালে। কিন্তু তাতে এই শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের গঙ্গা অথবা পদ্মায় সামান্যতম পানি বৃদ্ধিও ঘটেনি। চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, সেখানে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত। এই প্রকল্পে বলা হচ্ছে যে তিস্তা নদীকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংকুচিত করবে। এই রকম মারাত্মকভাবে সংকুচিত করলে শীতকালের প্রবাহ না হয় ধরা যাবে। কিন্তু বর্ষাকালে যে বিশাল প্রবাহ আসে অথবা হরকা বন্যা বা যে প্রবাহ আসে, সেটা কীভাবে এই নদী ধারণ করবে? তার উত্তর কি?’ যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের মতে নদীভাঙনের সমাধান হচ্ছে, ভাঙনের কারণ কী, এটা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ হচ্ছে বর্ষাকালে অধিক পানি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভারত আমাদের দিকে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘ নদী প্রবাহ আইনে বাংলাদেশকে সই করতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) এই বৈশ্বিক সমন্বয়ক বলেন, এ আইনে সই করে নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। দরকার হলে আমাদের যে উন্নয়ন সহযোগী, অর্থাৎ যারা ভারতেও কাজ করে বাংলাদেশেও কাজ করে যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ হতে পারে। এ রকম সংগঠনের সহযোগিতায় ও মধ্যস্থতায় আমাদের এই পানির সমস্যার সমাধানটা করতে হবে।

mzamin

জেন-জিদের কাছে মিথ্যুক পরিচয় ঘুচবে তো! by হেলাল মহিউদ্দীন

বাংলাদেশে এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের যথাযথ পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশ্লেষণের কাঠামোও দুর্বল। তাই আমরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যক্তি গুণাবলি এবং তাঁদের শাসনকাজের মূল্যায়নকে গুলিয়ে ফেলি। এই গুলিয়ে ফেলা বাংলাদেশে অবিরাম উদ্দেশ্যহীন বিতর্ক-বাহাস তৈরি করে। বিভাজন আরও জোরদার হয়।

শাসক ও শাসনের রাজনীতি বিশ্লেষণের পদ্ধতি আসলে আলাদা। একটি দিয়ে ব্যক্তি হিসেবে শাসক বা নেতার মূল্যায়ন করতে হয়। অন্যটি শাসনকালের রাজনৈতিক সাফল্য-ব্যর্থতাকে মূল্যায়ন করতে হয়। দুটি একাকার করে পাঠ করলে ইতিহাস বিকৃত হয়।

২.

একজন মানুষ ভালো হলে তিনি কি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভালো শাসক? আবার একজন শাসক ব্যর্থ হলে তিনি কি ব্যক্তি হিসেবে পুরোপুরিই অশ্রদ্ধেয় হয়ে যান?

অসামান্য ব্যক্তিত্বধারী রাজনীতিকদের অসফলতার ইতিহাসও অনেক। যুক্তরাষ্ট্রের জিমি কার্টার অত্যন্ত সৎ ও মানবিক মানুষ হিসেবে বিশ্বস্বীকৃত; কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনেকটাই দুর্বল। উরুগুয়ের হোসে মুহিকার ব্যক্তিগত জীবনে নৈতিকতার প্রতীক। অথচ তাঁর শাসননীতি নিয়ে বিতর্ক আছে। তানজানিয়ার জুলিয়াস ন্যয়েরে ব্যক্তিগত সততায় প্রশ্নহীন, কিন্তু তাঁর অর্থনৈতিক নীতি দেশকে সংকটে ফেলেছিল। ভারতের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধেয়, কিন্তু শাসনকাল সংক্ষিপ্ত। মনমোহন সিং ভদ্র ও শালীন মানুষ হিসেবে সমাদৃত, কিন্তু তাঁর সরকারের দুর্বলতা সর্বজনবিদিত।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে ‘পারসন অ্যাডমায়ার্ড, গভর্নমেন্ট ডিবেটেড’ বলে একটি ধারণা আছে। ব্যক্তি ভালো; কিন্তু শাসনকাল বিতর্কমুক্ত নয়, এটিই সারকথা। এই তালিকা দীর্ঘ। উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দুই প্রেসিডে হার্বার্ট হুভার ও জেরাল্ড ফোর্ড। নেলসন ম্যান্ডেলা আইকনিক চরিত্র। শত্রু-মিত্রসহ সবাই তাঁকে শেষ দিন পর্যন্ত ভালোবাসলেও শাসনকালে তিনি জনপ্রত্যাশা পুরোপুরি মেটাতে পারেননি।

তৃতীয় বিশ্বে সৎ ও ভালো মানুষ শাসক তেমন মেলে না কথাটিও অসত্য। সেনেগালের লিওপোল্ড সেদার সাঁগোর, বুরকিনা ফাসোর টমাস সাংকারা, ফিলিপাইনের কোরাজন অ্যাকুইনো, চেক রিপাবলিকের ভাকলাভ হ্যাভেল, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা ভালো মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সম্মান ঠিকই পেয়েছেন; কিন্তু তাই বলে তাঁদের রাষ্ট্রনীতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে যায়নি। সেগুলোর বিশ্লেষণ নিয়ে এখনো বিতর্ক চলমান।

৩.

ফরাসি দার্শনিক আলব্যের কামু লিখেছিলেন, রাজনীতি আর নৈতিকতা এক নয়। আগেই রাজনৈতিক সাহিত্যের দর্শনগুরু জর্জ অরওয়েল লিখে রেখেছিলেন আরও স্পষ্ট ভাষ্য, ‘রাজনীতির ভাষায় মিথ্যাকে শোনাতে পারে সত্যের মতো, হত্যাকে করে তুলতে পারে পূজনীয়!’

বাংলাদেশের বিশ্লেষকেরা রাজনীতিতাত্ত্বিক মাইকেল ওয়ালজের ‘ডার্টি হ্যান্ডস’ ধারণাটি মনে রাখতে পারেন। ওয়ালজ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘পলিটিক্যাল অ্যাকশন: দ্য প্রবলেম অব ডার্টি হ্যান্ডস’-এ লেখেন, ‘রাজনৈতিকভাবে “সঠিক” কাজ করতে গিয়ে একজন নেতাকে অনেক সময় নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বেলায় হাত সব সময় পরিষ্কার রাখা যায় না, এটিই বাস্তবতা।’

ওয়ালজ বাস্তবতাটি তুলে ধরেছেন মাত্র। রাষ্ট্রনায়কদের অপকর্মের বৈধতা দেননি; বরং বলেছেন, ব্যক্তি শাসক নীতিনৈতিকতাবিবর্জিত হলে ‘ডার্টি হ্যান্ডস’ মহা নোংরা হয়। ব্যক্তিশাসক উচ্চ নৈতিকতাধারী মানুষ হলে হাত অনেকটাই কম নোংরা হয়। সহনীয় বা পরিষ্কার করে নেওয়ার সুযোগ থাকে। পার্থক্য এখানেই।

৪.

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যক্তি রাজনীতিকের চরিত্র চিত্রণ ও শাসনকাজ বিশ্লেষণ গুলিয়ে ফেলার সমস্যা আমাদের মতো প্রকট নয়। নাগরিকেরা অন্ধভাবে দল-মতের পূজারি বা বিরোধী নন বলেই সমস্যাটি কম। তাঁদের সমর্থন ও মতাদর্শিক দুর্বলতাও সময়ে সময়ে বদলে যেতে পারে। তাঁরা ইতিহাসকে অত্যন্ত নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে দেখতে চান। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা দেশ চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে ইতিহাস লিখতে ও লেখাতে বসে যাবেন—এসব পছন্দ করেন না। মসনদে বসেই নেতার ভাস্কর্য-ম্যুরাল আর প্রশস্তি-বন্দনার কল্পকাহিনি লেখালেখির দোকান খুলে বসার তীব্র বিরোধিতা করেন, প্রতিবাদ জানান।

লেখালেখির সুবাদে প্রায়ই বিভিন্ন রকম মেসেজ ও ই-মেইল পাই। সম্প্রতি একজন তরুণ এক দীর্ঘ লেখায় জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের শিশুকাল থেকেই শুনে এসেছেন, পাঠ করেছেন এবং গভীরভাবে বিশ্বাস করে এসেছেন যে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া ক্ষতি ছাড়া দেশের উপকারে তাঁরা কিছুই করেননি। তাই তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল অনেকটাই এই দুই চরিত্র এবং তাঁদের সমর্থক মানুষদের প্রতি বিরূপ মনোভাব নিয়ে।

তরুণ আরও জানান, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় স্কুলজীবনের শেষ দিক থেকে সঠিক সত্য জানতে উদ্‌গ্রীব হলেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত ইতিহাসের সত্যকে খুঁড়ে দেখার চেষ্টাও করেননি। তবে জুলাই বিপ্লব তাঁকে সত্যান্বেষণে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ও তাঁর জানাজায় জনতার বিপুল উপস্থিতি। এরপর খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ও তাঁর জানাজায় দেখা জনসমুদ্র তাঁকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে। লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা নিজেকে এবং বঙ্গবন্ধুকেই বাংলাদেশের সর্বেসর্বা বন্দনাচরিত্র দেখাতে গিয়ে ১৫টি বছরে জাতির মন ও মননের একটি চিরস্থায়ী ক্ষতি করে গেছেন। সেই ক্ষতির উপশমও সহজ নয়। তবু তিনি এবং তাঁর প্রজন্মের অসংখ্যজন সত্য জানার পথ খুঁজছেন।

জেন-জি তরুণটি সরাসরি ‘মিথ্যুক’ বিশেষণে অভিযুক্ত করেছেন জেনারেশন এক্স বা আমাদের প্রজন্মকে। নিন্দা জানিয়েছেন তাঁদের এবং মিলেনিয়ালদের (জেন–ওয়াই) কাছে মিথ্যা ছড়ানোর। আবার জানতেও চেয়েছিলেন কীভাবে বাংলাদেশের নির্মোহ ইতিহাস পাঠ করবেন।

উত্তরে পরামর্শ দিলাম, ‘ব্যক্তি শাসকের চরিত্র এবং শাসনপদ্ধতিকে আলাদা রেখে পাঠ করবেন। শাসনকাজে দায় একজন ব্যক্তির থাকে না। অসংখ্য জনের দায়িত্ব ও শ্রমবিভাজনের পরিণাম শাসনকাজের সাফল্য–ব্যর্থতা’। ভাবলাম, এ বিষয়ে আলোকপাত হয়তো অন্যদেরও কাজে লাগতে পারে। এই লেখাও সে কারণেই লেখা।

তরুণের অভিযোগটি আমাকে দীর্ঘ সময় ভাবিয়েছে। মনে পড়েছে কীভাবে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে হাজার হাজার কোটি টাকা তছরূপ হয়েছে ইতিহাস শেখানো এবং বঙ্গবন্ধু–বন্দনার নামে একদল লুটেরার হাতে। অগণিত, অসংখ্য বানোয়াট, অসত্য, অপাঠ্য ও নিম্নমানের বইপত্র লিখে ও প্রকাশ করে একদল দুর্বৃত্ত কোটিপতি হয়েছে।

স্কুলে স্কুলে লাইব্রেরির জন্য বরাদ্দের সিংহভাগ খরচ করে এসব বইপত্র কিনতে বাধ্য ছিল স্কুলগুলো। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক দান-অনুদান বরাদ্দও ছিল শর্তযুক্ত। ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতাধর নেতারা হতেন অনুষ্ঠানগুলোর শিরোমণি। গানে-নাটকে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলক থাকত তাঁদের তুষ্ট করা দলীয় বয়ান ও ব্যক্তি-স্তুতি। পত্রপত্রিকায় সত্য বলতে চাওয়া মানুষদের টুঁটি চিপে ধরার তথ্যপ্রযুক্তি আইন ছিল ‘জ্ঞান পুলিশের’ ভূমিকায়।

তরুণটিকে দেওয়া উত্তরে স্বীকার করেছিলাম, ‘ব্যক্তি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সততা, দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা ও অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব মূল্যায়নে আমজনতা অনেক প্রাজ্ঞ বিশ্লেষকের চাইতেও এগিয়ে। প্রমাণ তাঁদের জানাজার জনসমুদ্র। দুজনেরই দেশ শাসনের ভালো-মন্দ বিশ্লেষণের বিতর্কও বজায় থাকতে হবে ইতিহাসের নির্মোহ সত্যানুসন্ধানের দরকারে। শুধু তাঁরাই নন, যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতা নেবেন—কেউই যেন ছাড় না পান।

তরুণটি জানতে না চাইলেও নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে—জেন-জিদের কাছে আমাদের মিথ্যুক পরিচয়টি ঘুচবে তো!

* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জেন-জিদের কাছে মিথ্যুক পরিচয় ঘুচবে তো!

আফগানিস্তানে তুষারপাত ও ভারী বৃষ্টিতে নিহত অন্তত ৬১

আফগানিস্তানে গত তিন দিনে তুষারপাত ও ভারী বৃষ্টির কারণে অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন। আজ শনিবার দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (অ্যান্ডমা) এ তথ্য জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এক পোস্টে জানিয়েছে, গত তিন দিনের তুষারপাত ও বৃষ্টিতে ৬১ জন নিহত, ১১০ জন আহত এবং ৪৫৮টি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হতাহতের এ ঘটনাগুলো গত বুধবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে মূলত দেশটির মধ্য ও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ঘটেছে।

একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মোট ৩৬০টি পরিবার এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক ভিডিও বার্তায় তিনি জনগণকে তুষারাবৃত রাস্তায় অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার অনুরোধ করেছেন।

ওই মুখপাত্র এএফপিকে আরও জানান, হতাহতের অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে ছাদ ও তুষারধসের কারণে। এ ছাড়া হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় অতিরিক্ত ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়েও অনেকের মৃত্যু হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশের জরুরি বিভাগ জানিয়েছে, বুধবার প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে ঘরের ছাদ ধসে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্য জেলাগুলোতেও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কাবুলের উত্তরে পারওয়ান প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আফগানিস্তানের অন্যতম প্রধান সড়ক সালাং মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কটি আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। এ ছাড়া রাজধানীর পশ্চিমে অবস্থিত বামিয়ান প্রদেশের মধ্যবর্তী পাহাড়ি গিরিপথে আটকা পড়েছেন অনেক পর্যটক। তবে তাঁদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার উজবেকিস্তান থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের একটি সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে প্রায় ১২টি প্রদেশের বাসিন্দারা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন।

আফগানিস্তানের জাতীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ড্যাবসের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘আমাদের কারিগরি দল প্রস্তুত রয়েছে, কিন্তু সালাং পাস বন্ধ থাকায় তারা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছে না।’

ভারী তুষারপাত ও বৃষ্টিতে গ্রামপ্রধান দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে দোকানপাট ধ্বংস হয়েছে এবং গবাদিপশু মারা গেছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক সাহায্য ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় আফগানিস্তানের চার কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষের এ বছর মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে। ভূমিকম্প ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সেখানে টিকে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে।

আফগানিস্তানের পাঞ্জশির প্রদেশের দারা জেলায় তুষারে ঢাকা একটি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আফগান পুরুষেরা। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
আফগানিস্তানের পাঞ্জশির প্রদেশের দারা জেলায় তুষারে ঢাকা একটি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আফগান পুরুষেরা। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬। ছবি: এএফপি

ট্রাম্প ঝড়ে কাঁপছে দুনিয়া! by আহসান হাবিব বরুন

বিশ্ব রাজনীতির আকাশে আবারও ঘন কালো মেঘ। একদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি। এই অস্থিরতার কেন্দ্রে যে নামটি ঘুরে ফিরে আসছে, তা হলো ডনাল্ড ট্রাম্প। এক সময় যাঁকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের “ব্যতিক্রমী” প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেছিলেন, আজ তিনি বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক অনিবার্য ঝড়ের প্রতীক। তাঁর বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও হুমকির রাজনীতি শুধু আমেরিকার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া—সর্বত্রই এই ঝড়ের আঁচ অনুভূত হচ্ছে।

এই লেখায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মপদ্ধতির আলোকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের দীর্ঘ ইতিহাস, ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক উদাহরণ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বরাবরই “স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের রক্ষক” হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই দাবির আড়ালে রয়েছে শক্তি ও দম্ভের রাজনীতি। বিশ শতকের শুরু থেকেই লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের নজির অসংখ্য। গুয়াতেমালা, চিলি, নিকারাগুয়া, পানামা—একটির পর একটি দেশে সরকার পরিবর্তন, সামরিক হস্তক্ষেপ কিংবা অর্থনৈতিক চাপে নতিস্বীকার করানোর ইতিহাস আছে।
শীতল যুদ্ধের (কোল্ড ওয়ার)সময় “কমিউনিজম ঠেকানোর” অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ তার সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান অভিযান কিংবা লিবিয়ায় ন্যাটো হস্তক্ষেপ—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক শক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। ফলাফল হিসেবে কোথাও স্থিতিশীলতা আসেনি। বরং যুদ্ধ, উদ্বাস্তু সংকট ও রাষ্ট্রের ভাঙন ত্বরান্বিত করেছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসই ট্রাম্প যুগের রাজনীতিকে বোঝার ভিত্তি তৈরি করে। কারণ ট্রাম্প নতুন কিছু আবিষ্কার করেননি। তিনি বরং পুরোনো আগ্রাসী ধারাকেই আরও প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মক ভাষায় সামনে এনেছেন।
ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্লোগান ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। কথাটি শুনতে দেশপ্রেমিক মনে হলেও বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়ায়—যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে যেকোনো দেশকে চাপ দেওয়া, প্রয়োজনে হুমকি দেওয়া কিংবা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত করা। ট্রাম্প কূটনীতির চেয়ে ব্যবসায়ীর মতো দরকষাকষিতে বিশ্বাসী। তাঁর কাছে আন্তর্জাতিক চুক্তি মানে লাভ-ক্ষতির হিসাব। লাভ না হলে চুক্তি ভাঙতে দ্বিধা নেই।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা, ইরান পরমাণু চুক্তি বাতিল করা কিংবা ন্যাটো মিত্রদের প্রকাশ্যে তিরস্কার—এসবই ট্রাম্পের একতরফা নীতির উদাহরণ। এই নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হলেও বিশ্ব ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। বহুপাক্ষিকতার জায়গায় এসেছে অনিশ্চয়তা।

ভেনেজুয়েলা ট্রাম্প যুগের আগ্রাসী নীতির একটি জীবন্ত উদাহরণ। তেলসমৃদ্ধ এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। কিন্তু সংকটের বড় অংশই তৈরি হয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার সরকারকে “অবৈধ” আখ্যা দিয়ে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তেলের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ খাদ্য ও ওষুধ সংকটে পড়ে।
গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞা সাধারণ জনগণকেই বেশি ভুগিয়েছে। সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। এটি শুধু ভেনেজুয়েলার গল্প নয়। এটি গোটা বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, অর্থনৈতিক অস্ত্র কীভাবে আধুনিক আগ্রাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

লাতিন আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই নিজের প্রভাববলয় হিসেবে দেখে এসেছে। ট্রাম্প আমলে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও কঠোর হয়েছে। কিউবার ওপর নিষেধাজ্ঞা কড়া করা হয়েছে। নিকারাগুয়া ও বলিভিয়ার মতো দেশগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। অভিবাসন ইস্যুতে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোকে হুমকি দিয়ে সীমান্ত রক্ষার দায় চাপানো হয়েছে।
এই অঞ্চলের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের ঐতিহাসিক অনাস্থা রয়েছে। ট্রাম্পের ভাষা ও আচরণ সেই অনাস্থাকে আরও গভীর করেছে। ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তি সেখানে প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।

ট্রাম্পের আগ্রাসী ভাষা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য নয়। ইউরোপীয় মিত্ররাও তাঁর সমালোচনার শিকার হয়েছে। ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইউরোপ যথেষ্ট খরচ করছে না। বাণিজ্য ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশ্নে ইউরোপ যখন নেতৃত্ব দিতে চেয়েছে, তখন ট্রাম্প সেই প্রচেষ্টাকে তুচ্ছ করেছেন।
এর ফলে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে। ইউরোপ নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে আরও স্বনির্ভর হওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছে। এটি বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে আমি মনে করি।

মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির প্রধান ক্ষেত্র। ট্রাম্প যুগে ইরান এই আগ্রাসনের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ইরান পরমাণু চুক্তি বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তেলের রপ্তানি সীমিত করা হয় এবং প্রকাশ্যে  সামরিক হামলার হুমকিও দেওয়া হয়।
এই নীতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। হরমুজ প্রণালীতে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান-ইসরাইল শত্রুতা আরও প্রকাশ্য হয়েছে। পুরো অঞ্চল এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অথচ এই চাপেও ইরান নীতিগতভাবে নতি স্বীকার করেনি। বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য আরও জটিল হয়েছে।

এশিয়ায় ট্রাম্পের আগ্রাসনের প্রধান অস্ত্র বাণিজ্য যুদ্ধ। চীনের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধ শুরু করে তিনি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেন। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার চাপ দেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কখনো হুমকি, কখনো বৈঠক—এই দ্বৈত নীতিও এশিয়াকে অনিশ্চিত করেছে।
এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কৌশল চীনকে আরও সংগঠিত করেছে। আঞ্চলিক দেশগুলো এখন দুই শক্তির মাঝে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে।

ট্রাম্পের নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক ব্যবস্থায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল—জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক চুক্তি—সেগুলোর ওপর আস্থা কমেছে। একক শক্তির সিদ্ধান্তই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
এর ফলে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা জানে না, আগামীকাল কোন নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বিশ্ব রাজনীতি যেন নিয়মের বদলে শক্তির উপর দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরাসরি এই আগ্রাসনের লক্ষ্য না হলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এড়াতে পারে না। বাণিজ্য, রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও খাদ্য বাজার—সবকিছুই বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানির দাম বাড়ে। বাণিজ্য যুদ্ধ হলে রপ্তানি বাজারে চাপ পড়ে।
তাই বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য প্রয়োজন সতর্ক কূটনীতি। বহুপাক্ষিকতার পক্ষে থাকা। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি জোরালোভাবে তুলে ধরা।

শেষ কথা:
ট্রাম্প ঝড়ে কাঁপছে দুনিয়া—এই কথাটি শুধু একটি শিরোনাম নয়। এটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ইতিহাস দীর্ঘ। ট্রাম্প সেই ইতিহাসকে আরও উন্মুক্ত ও আক্রমণাত্মক করেছেন। ভেনেজুয়েলা থেকে ইরান, লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়া—সবখানেই এই ঝড়ের ছাপ।
আমি মনে করি,আগ্রাসন কখনো চিরস্থায়ী সমাধান দেয় না। শক্তির রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘাত জন্ম দেয়। তাই প্রয়োজন সংলাপ, সমঝোতা ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা। সুতরাং ঝড় নয়, মানবসভ্যতাকে এগিয়ে এগিয়ে নেয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে শান্তি ও সৌহার্দ্য।

* আহসান হাবিব বরুন, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।

mzamin

ইরানে বিক্ষোভের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ভিন্ন উদ্দেশ্য by হামিদ দাবাশি

ইরানে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই বিবিসি ফারসি যেন যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বিক্ষোভের মাত্রা অতিরঞ্জিত করার এক বিশেষ মিশনে নেমেছে। তারা ইরানের সেই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করছে, যারা রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও ইসরায়েল বা তার প্রকাশ্য দালাল রেজা পাহলভির ইশারায় রাজনীতি করতে রাজি নয়।

এটি ইসরায়েলের স্বার্থে যুক্তরাজ্যের সফট পাওয়ার ব্যবহারের আরেকটি নজির। ইরান নিয়ে বিবিসি ফারসির এই একদেশদর্শী প্রচার একদিকে যেমন প্রবল, অন্যদিকে ঠিক ততটাই ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের চলমান গণহত্যা নিয়ে তাদের নীরবতা দেখা গেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রকাশ্যে দেশে বিক্ষোভ হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষোভ রয়েছে, আর যারা সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে সরকার উৎখাত বা ইরানের ভাঙন ঘটাতে চাইছে—এ দুই পক্ষের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। এই দ্বিতীয় লক্ষ্যটিই মূলত ইসরায়েলের প্রকল্প।

ইরানের এই বিক্ষোভের পেছনে যে দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাজ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে এই সংকটের পেছনে মূলত দুটি পরস্পরসম্পূরক কারণ রয়েছে। একদিকে এর পেছনে আছে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অদক্ষতা, অন্যদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরোপিত বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর সাম্প্রতিক একটি শিরোনাম বিষয়টি যথার্থভাবে ধরেছে: ‘অর্থনীতি তলানিতে ঠেকায় ইরানের মুদ্রা ছাই হয়ে যাচ্ছে’।

একই সঙ্গে এটাও সত্য, এই বিশেষ সংকট অনেকটাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এক বিভ্রান্তিমূলক নাটক। তারা লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন বা ভেনেজুয়েলার মতো আরও একটি অকার্যকর রাষ্ট্রকে নিশানা বানিয়েছে, যাতে তারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে এবং গাজায় চলমান গণহত্যা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পারে।

ইরানিদের তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। কারণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। শ্রমজীবী মানুষ অকল্পনীয় দারিদ্র্যের ভারে ভেঙে পড়ছে।

আজ ইরানের দিকে ইসরায়েলের অতিরিক্ত মনোযোগের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথম ও প্রধান কারণ—এটি একটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশল। এর উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ইসরায়েলি গণহত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবশিষ্ট ভূমি লুটের বিষয়টি আড়াল করা।

তেল আবিবের ধারণা, যত বেশি আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে, তত দ্রুত বিশ্ব গাজার গণহত্যা ভুলে যাবে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেটি হলো ইরানকে ভেঙে ছোট ছোট জাতিগত রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেমন পরিকল্পনা তারা লেবানন ও সিরিয়ার ক্ষেত্রেও করেছে। ইসরায়েল পুরো অঞ্চলকে নিজের প্রতিচ্ছবিতে গড়ে তুলতে চায়। তথাকথিত ‘সোমালিল্যান্ড’-কে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনেও এ নকশাই কাজ করছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নটি এখানে মূলত একটি ধোঁয়াশা। ওবামা প্রশাসনের সময়ে ইরান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে তাদের পঞ্চম বাহিনী এআইপিএকের মাধ্যমে ইসরায়েল শুরু থেকেই এ চুক্তির বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুপক্ষেরই স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই সেই চুক্তি ধ্বংস করেন। ফলে আজ ইরান ও বাইরের বিশ্বের মধ্যে কোনো পারমাণবিক সমঝোতা না থাকার দায় মূলত ইসরায়েলেরই।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের শাসকগোষ্ঠী ও সাধারণ দরিদ্র জনগণের ওপর সমানভাবে বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা চাপানোর জন্য প্রধানত দায়ী। এ নিষেধাজ্ঞার পেছনে দুটি যুক্তি দেখানো হয়। একটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বানানো উদ্বেগ, আরেকটি হলো ইরানকে কম আক্রমণাত্মক ও আরও বেশি ইসরায়েলপন্থী অবস্থান নিতে বাধ্য করা।

এ বিশ্লেষণে যে মৌলিক সত্য পুরোপুরি অনুপস্থিত, তা হলো—ইসরায়েল নিজেই একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। তারা একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাচ্ছে; বিশেষ করে তারা অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে।

পূর্ববর্তী বিক্ষোভগুলোর তুলনায় বর্তমান আন্দোলন এখনো ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ অভ্যুত্থানের মতো ব্যাপকতা, তাৎপর্য বা স্বতঃস্ফূর্ততায় পৌঁছায়নি। সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান নিয়ে এখনো একাডেমিক আলোচনার ঢেউ চলছে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই—নারীদের নেতৃত্বে সংঘটিত হওয়ায় সেটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।

বর্তমান বিক্ষোভ অত্যন্ত সহিংস এবং এটি কোনোভাবেই নারী নেতৃত্বাধীন নয়। মাসা আমিনি-পরবর্তী আন্দোলনই সম্ভবত আধুনিক ইরানের শেষ সত্যিকারের দেশজ, স্বতঃস্ফূর্ত ও বিশ্বব্যাপী তাৎপর্যপূর্ণ গণ-আন্দোলন। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ মসজিদে আগুন দেওয়ার মতো উসকানিমূলক ঘটনার মাধ্যমে মোসাদের এজেন্টদের দ্বারা অপবিত্র হয়েছে। এখানে জে কে রাউলিংয়ের মতো ব্যক্তিরা ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন।

এ আন্দোলন ভুয়া খবরেও কলুষিত হয়েছে। ভুয়া খবর প্রচারের এই কৌশল ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি রাষ্ট্র ভাঙতে ব্যবহার করছে। হারেত্জ, দ্য মার্কার ও সিটিজেন ল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে পাহলভি রাজতন্ত্রের বিকারগ্রস্ত উত্তরসূরি রেজা পাহলভির পক্ষে কৃত্রিম সমর্থন তৈরি করছে; যদিও এই উসকানি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট করছে।

ইরানি রাষ্ট্র এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। তবে একের পর এক সংকট সামলানো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ডিএনএতেই রয়েছে।

গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু আক্রান্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রটি এ বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করবে—এতে কোনো দ্বিধা থাকবে না। প্রয়োজনে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটি কিংবা সরাসরি ইসরায়েলেও পাল্টা আঘাত হানবে। প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ই পুরো পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দেবে।

মির হোসেইন মুসাভি, জাহরা রাহনাভার্দ, মোহাম্মদ খাতামি, মোস্তফা তাজজাদেহ বা আবোলফজল কাদিয়ানি—এ ধরনের শান্তিপূর্ণ ও বৈধ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে জায়গা করে নিচ্ছে অবৈধ ও সুযোগসন্ধানী পাহলভিপন্থী রাজতন্ত্রী এবং মুজাহিদিন-ই-খালক, যাঁদের ইরানের ভেতরে কোনো প্রকৃত জনভিত্তি নেই।

বিবিসি কিংবা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো পশ্চিমা গণমাধ্যম যখন জায়নবাদী দালাল পাহলভির জন্য কৃত্রিম জনসমর্থন তৈরি করতে ব্যস্ত, তখন ইরানি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল, কিংবা উভয়ের আক্রমণের আশঙ্কা করছে।

বিক্ষোভ অন্তত আংশিকভাবে ভেতর থেকে শুরু হলেও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রকাশ্যে বলেছেন, মোসাদের এজেন্টরা এতে জড়িত। এটি সত্য নাকি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল, তা স্পষ্ট নয়। তবে যা–ই হোক, এতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে।

মূলত এটি কোনো বিপ্লব নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাঁচা হাতে সাজানো এক ভ্রান্ত তথ্যভিত্তিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা। এর আদল ১৯৫৩ সালে সিআইএ ও এমআই-সিক্সের যৌথ ষড়যন্ত্রে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে উৎখাত করার ঘটনার মতো। আমেরিকা দেবে সামরিক শক্তি, আর ব্রিটেন বিবিসি ফারসির মতো মাধ্যমে দেবে ভুয়া সংবাদ।

এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বাস্তব ও ন্যায্য কারণে। কিন্তু ইসরায়েল সেটিকে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছে। এর ফলে তারা একটি জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কল্যাণ থেকে জন্ম নেওয়া ন্যায্য প্রতিবাদকে সম্পূর্ণভাবে অবিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

* হামিদ দাবাশি, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-15%2Fx9mw79ei%2Firanprotesterafp.jpg?rect=119%2C0%2C1014%2C676&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানের পতাকা হাতে সরকারপন্থীদের বিক্ষোভ। রয়টার্স

অবসরে গেলেন মার্কিন মহাকাশচারী সুনিতা

নাসার অভিজ্ঞ মহাকাশচারী সুনিতা উইলিয়ামস অবসরে গেছেন। দীর্ঘ ২৭ বছরের কর্মজীবন শেষে এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। তবে জীবনের বাকিটা সময় পার করতে তাকে অর্থ-কড়ি নিয়ে ভাবতে হবে না। মোটা অংকের পেনশন পেতে যাচ্ছেন সুনিতা।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর থেকে তার অবসর কার্যকর হয়েছে। তিনি মহাকাশে ৬০৮ দিন কাটিয়েছেন। যা নাসার মহাকাশচারীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে তিনটি অভিযান, একাধিক মানব মহাকাশ ভ্রমণের রেকর্ড তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সুনিতা ৯টি স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেছেন। এর মাধ্যমে মহাকাশযানের বাইরে তিনি মোট ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিট সময় কাটিয়েছেন। এটি যেকোনো নারী মহাকাশচারীর জন্য সর্বোচ্চ এবং নাসার ইতিহাসে সামগ্রিকভাবে চতুর্থ সর্বোচ্চ।

এদিকে সুনিতার পেনশনের পরিমাণ নিয়ে জল্পনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, মোটা অংকের অর্থ পেতে যাচ্ছেন তিনি। অবশ্য মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক অঙ্কটি প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি বার্ষিক প্রায় ৪৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার ফেডারেল সরকার থেকে পেনশন পেতে পারেন। নাসায় তার ২৭ বছরের কর্মজীবনের সঙ্গে ইউএস নেভি ক্যাপ্টেন হিসেবে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতাও যুক্ত করা হয়েছে। সে হিসেবেও তার পেনশনের পরিমাণ বাড়বে। 

ছবি : সংগৃহীত
সুনিতা উইলিয়ামস

ভয়াবহ তুষারঝড়ের কবলে যুক্তরাষ্ট্র, ৮ হাজার ফ্লাইট বাতিল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ কোটি মানুষ এক ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর শীতকালীন ঝড়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। শুক্রবার শুরু হওয়া এই ঝড়ে দেশটির বিশাল এলাকাজুড়ে ভারী তুষারপাত ও হিমশীতল বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (এনডব্লিউএস) জানিয়েছে, রকি পর্বতমালা থেকে পূর্ব দিকে ধেয়ে আসা এই ঝড় ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ পরিস্থিতি তৈরি করছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, টেক্সাস থেকে নর্থ ক্যারোলাইনা পর্যন্ত বিস্তৃত এই দুর্যোগে তুষারপাত ও জীবনঘাতী বরফের স্তরে ঢেকে যেতে পারে বিশাল জনপদ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্ধারিত আট হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়্যার’-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ৩ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল হয়েছে। রোববারের জন্য বাতিল করা হয়েছে আরও পাঁচ হাজার ফ্লাইট।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বরফ জমে যে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা কোনো শক্তিশালী হারিকেনের চেয়ে কম নয়।

মেরিল্যান্ডের ইউএস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের আবহাওয়াবিদ জ্যাকব অ্যাশারম্যান রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ঝড়।’ তীব্রতা এবং ব্যাপ্তির দিক থেকে এটিকে চলতি মৌসুমের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। ডাকোটা এবং মিনেসোটায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে গেছে। এই কনকনে ঠান্ডায় বাইরে বের হওয়া প্রাণঘাতী হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

লুইজিয়ানা, মিসিসিপি এবং টেনেসি অঙ্গরাজ্যগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে গাছের ডালপালা ও বিদ্যুতের লাইনের ওপর অন্তত এক ইঞ্চি পুরু বরফের স্তর জমে থাকতে পারে।

দেশটির কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ইতিমধ্যে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা (ফেমা) সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র জোহরান মামদানির জন্য এই ঝড়েই প্রথম বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। তিনি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভারী তুষারপাত মোকাবিলায় নিউইয়র্কের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি শক্তিশালী ‘তুষার-যোদ্ধা’ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

পুরু বরফের স্তর পরিস্কার করছেন এক ব্যক্তি। ওকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র
পুরু বরফের স্তর পরিস্কার করছেন এক ব্যক্তি। ওকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: রয়টার্স

আফগানিস্তানে ন্যাটো সেনাদের নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অপমানজনক’ বললেন স্টারমার

আফগান যুদ্ধে ন্যাটো সদস্যদেশগুলোর সেনারা সম্মুখসমরে না থেকে ‘পেছনে নিরাপদ দূরত্বে’ ছিল বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে ‘অপমানজনক ও ভয়ানক’ বলে কড়া সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। গতকাল শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, আফগান যুদ্ধে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো খুব একটা সাহসী ভূমিকা রাখেনি। তিনি বলেন, ‘তারা বলবে যে তারা আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছিল। পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা সম্মুখসমর থেকে কিছুটা দূরে নিরাপদ অবস্থানে থাকত।’

ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিপদে পড়লে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো হয়তো এগিয়ে আসবে না।

ট্রাম্পের এসব মন্তব্যে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিহত ব্রিটিশ সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘আফগানিস্তানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর ৪৫৭ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আরও অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।’

স্টারমার বলেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য শুধু অপমানজনক নয়, বরং অত্যন্ত নিন্দনীয়। যাঁরা তাঁদের স্বজনদের হারিয়েছেন, তাঁদের মনে ট্রাম্পের এই বক্তব্য গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তিনি নিজে এমন ভুল তথ্য দিলে অবশ্যই ক্ষমা চাইতেন।

তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স এএফপিকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদম সঠিক কথা বলেছেন। ন্যাটো জোটের অন্য সব দেশ সম্মিলিতভাবে যা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একাই তার চেয়ে বেশি করেছে।’

যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ব্রিটিশ সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। আফগানিস্তানে প্রাণ হারানো ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনার মধ্যে ৪০৫ জনই সরাসরি শত্রুসেনার হামলায় নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।

ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, তাঁরা ছিলেন বীর। তাঁরা জাতির সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নস আফগানিস্তানে পাঁচটি মিশনে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। তিনি ট্রাম্পের দাবিকে ‘পুরোপুরি হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনক ট্রাম্পের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটি ন্যাটো জোটকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে দলের নেতা ও ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত নাইজেল ফারাজ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ভুল বলছেন। ২০ বছর ধরে ব্রিটিশ সেনারা মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে।’

আফগান যুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নেওয়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারিও এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে বন্ধু বানিয়েছি ও অনেক বন্ধুকে হারিয়েছি। হাজার হাজার মানুষের জীবন চিরতরে বদলে গেছে। মা–বাবারা তাঁদের সন্তানদের দাফন করেছেন। অনেক শিশু এতিম হয়েছে। পরিবারগুলো এখনো সেই ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছে। সেই আত্মত্যাগ নিয়ে সত্য ও সম্মানের সঙ্গে কথা বলা উচিত।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-15%2Fgq5wkw63%2FUntitled-3.png?rect=0%2C0%2C640%2C427&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ফাইল ছবি: রয়টার্স