Wednesday, April 22, 2026

এন্ড্রু কিশোরের জন্মদিনে কনকচাঁপার আবেগভরা শ্রদ্ধা

বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য নাম এন্ড্রু কিশোর। পেশাদার জীবনে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন ১৫ হাজারেরও বেশি গানে—এর মধ্যে অসংখ্য গান আজও কালজয়ী। এ জন্য শ্রোতারা ভালোবেসে তাঁকে ডেকেছেন ‘প্লেব্যাক–সম্রাট’ বলে। চলচ্চিত্রের গানে এন্ড্রু কিশোরের অন্যতম সহশিল্পী ছিলেন জনপ্রিয় গায়িকা কনকচাঁপা। তাঁরা জুটি বেঁধে উপহার দিয়েছেন অগণিত জনপ্রিয় গান। কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিনে ফেসবুকে এক আবেগমাখা পোস্টে তাঁকে স্মরণ করেছেন কনকচাঁপা।

কনকচাঁপা লিখেছেন, ‘শুভ জন্মদিন, হে তরল সোনা মাখানো কণ্ঠের রাজা এন্ড্রু কিশোর দাদা! আমরা গর্বিত, আমাদের এন্ড্রু কিশোর আছেন! আছেন বলছি, কারণ তিনি এখনো আমাদের জীবনের অংশ—আরও বেশি আপন ও প্রয়োজনীয়।’ ফেসবুক পোস্টে কনকচাঁপা আরও লেখেন, ‘একজন এন্ড্রু কিশোর—একটি কণ্ঠ, একটি গলিত সোনার নদী। সিনেমা হলে তাঁর গান বাজলেই পুরো হল ভরে যেত আবেগে। তাঁর কণ্ঠে ছিল জাদু—যা মানুষকে ভাসাতে, কাঁদাতে, ভালোবাসতে শেখাত। যখন গাইতেন “ডাক দিয়াছে দয়াল আমারে”, তখন মনে হতো—এই পৃথিবীর প্রতি আমাদের অভিমান যেন একসঙ্গে ঝরে পড়ছে। আর যখন গাইতেন “তুমি আমার জীবন”, তখন প্রতিটি মানুষ ভাবত, এভাবেই তো প্রিয়াকে বলতে চেয়েছি আমি!’

কনকচাঁপা জানান, এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে ৩৪ বছর ধরে গান গেয়েছেন। গান গাইবার সময়টা মনে করে লিখেছেন, ‘তিনি (এন্ড্রু কিশোর) আজ নেই, অথচ তাঁর কণ্ঠের প্রতি আমার বিস্ময় কাটে না। মঞ্চে যখন গাই, শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যাই—ভাবি, কত সম্মান যে আল্লাহ আমাকে বিনা কারণে দিয়েছেন!’

জন্মদিনের দিনে কনকচাঁপা ফেসবুকে পোস্ট করেছেন মতিন রহমান পরিচালিত সালমান শাহ–শাবনূর অভিনীত ‘তোমাকে চাই’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘আমার নাকেরই ফুল বলেরে তুমি যে আমার’–এর রেকর্ডিং সময়ের একটি স্থিরচিত্র। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘এই ছবিটি “তোমাকে চাই” সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ে, সিম্ফনি স্টুডিওতে। এন্ড্রু কিশোর–কনকচাঁপা নামের জুটি যে মহাশিল্পী নিজের ভালোবাসার তুলিতে এঁকেছেন, সেই জাতশিল্পী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইকেও শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁরা দুজনেই আজ আমাদের মাঝে নেই—তবু তাঁদের সুরে, তাঁদের ভালোবাসায় আমরা এখনো বেঁচে আছি।’

১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন এন্ড্রু কিশোর কুমার বাড়ৈ। তাঁর মা ছিলেন সংগীতানুরাগী ও কিংবদন্তি কিশোর কুমারের ভক্ত। তাই ছেলের নাম রাখেন ‘কিশোর’। মায়ের সেই ভালোবাসা থেকেই সংগীতে তাঁর পথচলা। ১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গান শুরু করেন এন্ড্রু কিশোর। তবে জনপ্রিয়তা পান ১৯৭৯ সালের ‘প্রতিজ্ঞা’ ছবির ‘এক চোর যায় চলে’ গানটির মাধ্যমে। এর পর থেকে শুরু হয় ইতিহাস। তাঁর গাওয়া অগণিত কালজয়ী গানের মধ্যে রয়েছে, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমার ছোঁয়াতে খুঁজে পেয়েছি’, ‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’, ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘তুমি আমার কত চেনা’, ‘ও সাথিরে’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘তুমি চাঁদের জোছনা নও’ ইত্যাদি।

২০২০ সালের ৬ জুলাই এন্ড্রু কিশোর পরপারে পাড়ি জমান। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, তাঁর গান এখনো জীবন্ত—শ্রোতাদের হৃদয়ে, স্মৃতিতে, আবেগে। শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে তিনি আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার এবং মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কারসহ বহু সম্মান অর্জন করেন।

এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে রেকর্ডিংয়ে কনকচাঁপা
‘তোমাকে চাই’ সিনেমার ‘আমার নাকেরই ফুল বলেরে তুমি যে আমার’ গানের রেকর্ডিংয়ে কনকচাঁপা ও এন্ড্রু কিশোর। ছবি : কনকচাঁপার ফেসবুক থেকে

ফুড কার্ট দিয়ে যাত্রা শুরু, এখন দেশের জনপ্রিয় বার্গারের ঠিকানা চিলক্স by মৃণাল সাহা

ফাস্ট ফুড ভাবতেই প্রথম যে কয়টি নাম মাথায় ঘুরপাক খায়, তার মধ্যে অন্যতম বার্গার। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সালের দিকে দুই পিস বান আর তার ভেতর প্যাটি দিয়ে যাত্রা শুরু হয় বার্গারের। প্রায় দেড় শ বছর পর এসে বার্গার এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড। আর বাংলাদেশে বার্গারের জন্য জনপ্রিয় যে কয়টি রেস্তোরাঁ, তার মধ্যে শুরুর দিকে থাকবে চিলক্সের নাম।

আড্ডার জায়গা খোঁজা

গত দশকেও বাংলাদেশে ফাস্ট ফুড মানেই বিদেশি কয়েকটি চেইন শপের নাম আসত। পিৎজা, বার্গারের মতো খাবার খেতে চাইলে তরুণদের কাছে সেসবের বাইরে বিশেষ কোনো জায়গাও ছিল না। এমন একটা সময় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের (পুরোনো ক্যাম্পাস, মহাখালী–গুলশান রোড) উল্টো পাশে ফুড কার্ট নিয়ে হাজির হয় ‘চিলক্স’। ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবসে ছোট্ট একটি ফুড কার্ট নিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। সেই যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ পড়া তিন বন্ধু। মারুফ, প্রান্ত ও ফাইজ—এই তিনজন মিলে নতুন কিছু একটা শুরু করতে গিয়েই চালু করেছিলেন ‘চিলক্স।’

ফুড কার্ট থেকে রেস্তোরাঁ

ফুড কার্ট চালু করার আইডিয়া এসেছিল প্রান্তর মাথা থেকে। এরপর তিনি সেই ভাবনা শেয়ার করলেন বন্ধু মারুফের কাছে। স্কুলজীবন থেকে একসঙ্গে পড়ালেখা করছেন এই দুজন। ফাইজের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠার পর। প্রান্ত ও মারুফ মিলে শুরু করেন চিলক্সের যাত্রা; পরবর্তী সময়ে যোগ দেন ফাইজ। ফাইজ জানান, ‘শুরুতে এত বড় কিছু করার পরিকল্পনা ছিল না। নিজেদের সময়টা কাজে লাগাতে চেয়েছিলাম। অফিস শেষে বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা দিতে পারবে এমন একটা জায়গা হিসেবেই শুরু হয়েছিল চিলক্সের।’

‘টাইম পাস’ ভেবে শুরু করা চিলক্স এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় চেইন রেস্তোরাঁ। ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করলে ফাইজ ও মারুফ পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে চিলক্স ছেড়ে দেন প্রান্তর হাতে। বর্তমানে প্রান্ত একাই আগের মতোই ভালোবাসা ও নিষ্ঠা দিয়ে চিলক্স ব্র্যান্ডটিকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

চিলক্সের বার্গারে বিশেষ কী

শুরুতে খাবারের পদ ছিল একেবারেই সামান্য। বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর বিভিন্ন ধরনের শেক। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ছিলেন মূল ক্রেতা। অফিস শেষ করে বাসায় ফেরার পথে সামান্য সময় কাটানো আর টুকটাক খাওয়া। এখান থেকেই দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে থাকে ‘চিলক্স’। শিক্ষার্থীরা যখন কম দামে ভালো কিছু খুঁজছিলেন, তখন চিলক্স ফুড কার্ট যেন বিশেষ বন্ধু হয়ে তাঁদের পাশে থেকেছে। আর এভাবেই একটা বিশেষ ধরনের ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি হয় চিলক্সের।

তবে চিলক্সের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ার আরেকটি কারণ ছিল সস। সাধারণত আমেরিকান ঘরনায় বানানো বার্গারে সস থাকে সামান্য। সস যত কম থাকে, খেতে গিয়ে মুখ তত দ্রুত শুকিয়ে আসে। সেই চিন্তাধারায় ধাক্কা দিল চিলক্স। মার্কিন স্টাইলের শুকনা বার্গার নয়, বরং চিলক্সের বার্গারে থাকত সসের সমাহার। এটাই চিলক্সকে জনপ্রিয়তা এনে দেয় বলে মনে করেন ক্রেতা থেকে বিক্রেতা সবাই।

কার্ট থেকে দোকান

২০১৬ সালের শুরুতে যাত্রার পর শেষ দিকে এসেই আবার ফুড কার্টটি বন্ধ করে দিতে হয় তাঁদের। তবে বেশি দিন ক্রেতাদের অপেক্ষায় রাখেননি। নতুন বছরে বাংলা নববর্ষে মহাখালীতে চিলক্সের প্রথম ব্র্যাঞ্চের উদ্বোধন হয়। মারুফ জানান, ‘আমরা যখন কার্ট বন্ধ করে দোকান খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকে পেজে নক করে খোঁজ নিতেন। এই আগ্রহই আমাদের সাহায্য করেছে নতুন করে জায়গা খুঁজে আউটলেট দিতে।’ সেখান থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

কয়েক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ব্র্যাঞ্চ শুরু করেন ধানমন্ডিতে। চিলক্সের লক্ষ্যই ছিল ছাত্রছাত্রীদের কাছে যত কম দামে ভালো ফাস্ট ফুড পৌঁছে দেওয়া। ৯ বছর পরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে তারা।

ঢাকা ছাড়িয়ে

বর্তমানে চিলক্সের মোট ২২টি আউটলেট। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও বগুড়ায় চিলক্স তাদের শাখা খুলেছে। ইচ্ছা বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে চিলক্সের নাম পৌঁছে দেওয়া। শুধু বার্গার-ফ্রাইস বা শেক নয়, গত ৯ বছরে তাদের মেনুতেও এসেছে বৈচিত্র্য।

এখন তো ফিস টটস আর নাগা ড্রামসও চিলক্সের খুবই জনপ্রিয় খাবার।  এ ছাড়াও রাইস বোল, ডেজার্ট ও মুরগির নানা পদ পাওয়া যায় চিলক্সের প্রতিটি শাখায়। সঙ্গে থাকে আইকনিক সস। এ ছাড়াও সামনে ক্রেতাদের জন্য নতুন কিছু চমক নিয়ে আসছে চিলক্স।
মহাখালীর সেই ছোট্ট ফুড কার্ট থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে চিলক্সের নাম। বিখ্যাত লাল লোগো আর হানি মাস্টার্ড সসের আইকনিক চিলক্স মুগ্ধ করে যাচ্ছে সব বয়সী ভোজনরসিকদের।

বাংলাদেশে বার্গারের জন্য জনপ্রিয় যে কয়টি রেস্তোরাঁ, তার মধ্যে শুরুর দিকে থাকবে চিলক্সের নাম
বাংলাদেশে বার্গারের জন্য জনপ্রিয় যে কয়টি রেস্তোরাঁ, তার মধ্যে শুরুর দিকে থাকবে চিলক্সের নাম। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন