Friday, February 10, 2012

বিদ্যুতের দাম ও পল্লী বিদ্যুৎ-নিশ্চিত হোক উৎপাদন ও সরবরাহ

অনেক সমস্যার ভিড়ে বাংলাদেশে এখনো অন্যতম সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ সংকট থেকে কোনোভাবেই মুক্তি মিলছে না। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বিদ্যুৎ। মাঝখানে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল বিদ্যুৎ সংযোগ। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই নেওয়া হয়েছিল এ ব্যবস্থা। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। লোডশেডিং এখনো আছে।

বাকসংযমই কাম্য-অহিংস আন্দোলনের ঘোষণা ইতিবাচক

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যে যেন জন-আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটেছে। গত বুধবারের গণ-অনশনে তিনি ঘোষণা করেছেন, 'আর জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর-ধ্বংসের রাজনীতি নয়, হরতাল নয়।' জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করার কথা বলেছেন তিনি।

স্মরণ-নির্ভীক সাংবাদিক শহীদ শামছুর রহমান by সেলিনা আক্তার লাকি

সাংবাদিক জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন শহীদ শামছুর রহমান। নির্ভীক সাংবাদিক শামছুর রহমান দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী আর গডফাদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে শহীদ হয়েছেন ২০০০ সালের এই দিনে। ১৯৫৭ সালের ৫ মে যশোরের শার্শা থানার শলকোনা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সোহরাব উদ্দিন এবং মা খয়রুন্নেছা।

পবিত্র কোরআনের আলো-ঈসা মাসীহ (আ)-এর জন্মের পর ইহুদি বংশে আর কোনো নবী আসেননি

১৯। ইয়া আহ্লাল কিতাবি ক্বাদ জাআকুম রাসূলুনা ইউবাইয়্যিনু লাকুম 'আলা ফাত্রাতিম মিনার রুসুলি আন তাক্বূলূ মা জাআনা মিম বাশীরিউঁ ওয়ালা নাযীর; ফাক্বাদ জাআকুম বাশীরুঁ ওয়া নাযীর; ওয়াল্লাহু 'আলা কুলি্ল শাইয়্যিন ক্বাদীর।
২০। ওয়া ইয ক্বালা মূসা লিক্বাওমিহী ইয়া ক্বাওমিয্কুরূ নি'মাতাল্লাহি 'আলাইকুম ইয জা'আলা ফীকুম আম্বিইয়াআ ওয়া জা'আলাকুম মুলূকা; ওয়া আতাকুম মা লাম ইউ'তি আহাদাম মিনাল 'আলামীন।

সদরে অন্দরে-এত শিক্ষার্থীর মৃত্যুতেও কাঁদে না যে শিক্ষকের মন! by মোস্তফা হোসেইন

শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছিল সারা দেশ। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকার পাশেই উত্তোলিত হয়েছিল কালো পতাকা। শোকাবহ সেই পরিবেশ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মচারী-কর্মকর্তারা বুকে ধারণ করেছিলেন শোকের প্রতীক কালোব্যাজ।

ইতিউতি-কিশোর শিক্ষার্থীদের নিরাপদে যাতায়াতের জন্য by আতাউস সামাদ

এক. বাংলাদেশের একটা অংশ এখন শোকে পাথর। আর সে জন্য সারা দেশ দুঃখভারাক্রান্ত। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মায়ানী ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামে চলছে কান্নার রোল। গত সোমবার ওই গ্রামগুলোর ৪৮ কিশোর মারা গেল একটা উল্টে যাওয়া মিনিট্রাক আর পথের পাশের জলাশয়ের পানির মধ্যে বন্দি হয়ে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসে সহিংসতা কাম্য নয়

আবারও অশান্ত হয়ে উঠল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীর রক্ত ঝরল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের দুই কর্মীর মধ্যকার সামান্য কথা কাটাকাটির জের ধরে বেড়ে ওঠা সংঘাতে নিহত হলেন দুই শিক্ষার্থী। নিহত দু'ছাত্রই ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রশিবিরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত।

নতুন নির্বাচন কমিশন-গুরুদায়িত্ব, কঠিন কাজ

নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে শপথ গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার প্রথম প্রতিক্রিয়ায় কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ বলেছেন, 'সংবিধান রক্ষার শপথ নিলাম, এটা কঠিন কাজ এবং গুরুদায়িত্ব। তবে আমরা প্রস্তুত।' প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই দিন বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় থাকাকালে এত উদারভাবে নির্বাচন কমিশন আগে গঠিত হয়নি।

সত্যনিষ্ঠ আলেম শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) by মুফতি এনায়েতুল্লাহ

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) সম্পর্কে মুসলমান সমাজ কমবেশি অবগত। তিনি সদর সাহেব হুজুর নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশের কোরআন-সুন্নাহ ও আধুনিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ যে ক'জন ক্ষণজন্মা মনীষী জন্ম নিয়ে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে মানুষের হেদায়েতের প্রেরণারূপে গণ্য হতেন তাদের মধ্যে হজরত সদর সাহেব ছিলেন অন্যতম।

মদিনা সনদ :সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দলিল by আ ফ ম খালিদ হোসেন

এই সনদের ফলে, বহুধা বিভক্ত মদিনাবাসীর গৃহযুদ্ধ বন্ধ হয়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদি নাগরিকের সমান অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও কর্তব্যের সীমারেখা নির্ধারিত হয় ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ইহুদিদের মধ্যে সামাজিক ঐক্য ও রাজনৈতিক সমীকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মাধ্যমে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক চুক্তি সম্পাদন করেন,

বাঙালি সমগ্র জাদুঘর by তারিক রহমান সৌরভ

১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে বাঙালি সমগ্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১২ সালে নবম বর্ষে পদার্পণ করল এই জাদুঘর। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারাকে সমৃদ্ধ করতে যেসব কীর্তিমান বাঙালি বিশেষ অবদান রেখেছেন তাদের সৃষ্টি ও কর্ম সংগ্রহ, স্থায়ী সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের লক্ষ্যে এই জাদুঘর যাত্রারম্ভ করে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশে সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

সুবিধাবাদী ছাত্র নেতৃত্ব চাই না-ছাত্ররাজনীতি by মোঃ আবু সালেহ সেকেন্দার

শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলো এরকম যোগ্য নেতৃত্বের কারণে বারবার অস্থিতিশীল হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। ছাত্রলীগের রাজনীতি যদি ছাত্রদের কল্যাণের রাজনীতি হয়ে ওঠে, তবে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির চেহারাটাই বদলে যাবে। কারণ বৃহৎ এই ছাত্র সংগঠনের প্রভাবে অন্য সংগঠনও বদলে যেতে বাধ্য হবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে।

একুশ আমাদের কাছে যা চায়-ধর নির্ভয় গান by আলী যাকের

আমাদের সংকীর্ণমনা হলে চলবে না। আমাদের সংকীর্ণতা ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে হবে আরও অনেক দূরে এবং আমি মনে করি, আমাদের সকলের জন্য এ ধরনের একটি প্রত্যয়, একটি বিশ্বাস আমরা অর্জন করতে পারি, যাতে করে এসব জাতীয় দিবসে আমাদের যে ঋণ আমাদের মাতৃভূমির প্রতি সেই ঋণ পরিশোধ করার জন্য বৃহত্তর, মহত্তর কর্মকাণ্ডে ব্যাপৃত হওয়ার একটি অঙ্গীকার আমরা গ্রহণ করব।

চাকরি ছাড়লেন ক্যাপেলো!

অভিযোগ একই সঙ্গে গুরুতর, আবার নয়ও। গুরুতর এই অর্থে—বর্ণবাদ বিষয়টি সব সময়ই স্পর্শকাতর। আবার গুরুতর নয়, কারণ শাস্তি হলেও সেটি হবে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ পাউন্ডের জরিমানা। টাকার অঙ্কের দিক দিয়ে একেবারেই নগণ্য। তার পরও এই ছোট অঙ্কের সম্ভাব্য শাস্তির ঘটনা কেন্দ্র করে যা ঘটল, সেটা ইংলিশ ফুটবলকেই নাড়িয়ে দিল।

‘হাতিদের’ মাহুত গেরভিনহো

গেরভিনহো-জাদুতে ফাইনালে উঠে গেল আইভরি কোস্ট। পরশু আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আর্সেনাল স্ট্রাইকারের দেওয়া একমাত্র গোলেই মালিকে হারিয়েছে ‘হাতিরা’। গ্যাবনের রাজধানী লিব্রেভিলেতে প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে প্রায় একক নৈপুণ্যেই গোলটি করেছেন গেরভিনহো।

ওয়ানডে সিরিজ-ধবলধোলাই জিম্বাবুয়ে

নিউজিল্যান্ডের কাছে ওয়ানডে সিরিজে ধবলধোলাই হলো জিম্বাবুয়ে। তবে সিরিজের তিন ম্যাচেই জিম্বাবুয়ে যেভাবে বিধ্বস্ত হলো, সেটাকে ধবলধোলাই শব্দটি ঠিক বোঝাতে পারছে না। কাল নেপিয়ারে শেষ ওয়ানডেতে ২০২ রানে হেরেছে সফরকারীরা। এর আগের দুই ম্যাচে ব্যবধানটা ছিল ১৪১ ও ৯০ রানের।

ছয় দলের সাতকাহন by আরিফুল ইসলাম

ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হলেও বিপিএলে আদতে ক্রিকেট কতটা থাকবে, সংশয় আছে যথেষ্ট। সংশয় দূর হবে নাকি আরও বাড়বে, প্রমাণ মিলতে থাকবে আজ থেকেই। ক্রিকেট মাঠে গড়াবে আজ। মাঠের ক্রিকেট শুরুর আগে ছয় দলের শক্তি-দুর্বলতা ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেছেন আরিফুল ইসলাম ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস কাগজে-কলমে অন্যতম সেরা দল।

ব্যাংকার্স বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক-মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামানো বড় চ্যালেঞ্জ

মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একে প্রাধান্য দিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে। তাতে মুদ্রা সরবরাহের রাশ টেনে ধরতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এর ফলে ব্যাংক খাতে তারল্যপ্রবাহ কমে গেছে।

বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের যন্ত্রপাতি প্রদর্শনী শুরু-শ্রমিকদের যথাযথ সুবিধা দিতে অর্থমন্ত্রীর আহ্বান

দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প খাতের শ্রমিকদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, গত তিন দশকে দেশের সামগ্রিক বস্ত্র খাত এমন একটা পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যা নিয়ে জাতি গর্বিত। এ জন্য উদ্যোক্তা ও শ্রমিক—উভয়েরই বড় ধরনের অবদান আছে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুরস্কার দেবে সিটি ফাউন্ডেশন-বাংলাদেশ এখন প্রবৃদ্ধি নিয়ে টানাপোড়েনে আছে: ওয়াহিদ

বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীল। এর বড় কারণ হলো, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রবৃদ্ধি বেশি। তাই অর্থনৈতিক মন্দায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেখানে অর্থনীতি নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে আছে, সেখানে বাংলাদেশ আছে প্রবৃদ্ধির টানাপোড়েনে।

স্ত্রী ও দুই মেয়ে শ্রীলঙ্কা পালিয়েছেন-মালদ্বীপে নাশিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

মালদ্বীপের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের বিরুদ্ধে গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ে শ্রীলঙ্কায় পালিয়ে গেছেন। নাশিদের সমর্থকেরা দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস বিক্ষোভ করছে। থানা ও সরকারি অনেক ভবন জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আদ্দু সিটিতে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

মার্কিন ‘দখলদারদের’ বিদায় উৎসব পালন করল সদরের সমর্থকেরা

ইরাকে শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় নেতা মোকতাদা আল-সদরের সমর্থকেরা গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন ‘দখলদার বাহিনীর’ বিদায় উদ্যাপন করেছে। ইরাকে মোকতাদার অনুসারীরা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসছিল। শেষে মার্কিন সেনারা প্রায় নয় বছর পর গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইরাক ত্যাগ করে।

সুপ্রিম কোর্টে শুনানি-‘সুইস কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখা উচিত ছিল গিলানির

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির অবশ্যই উচিত ছিল, প্রেসিডেন্ট জারদারির বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার কার্যক্রম নতুন করে শুরু করার জন্য সুইস কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখা।
অদালত অবমাননার দায়ে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি অভিযুক্ত হতে পারেন কি না, এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হয়েছে।

নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের ভাষ্য-দক্ষিণ এশিয়ার জিহাদে আগ্রহ হারাচ্ছে বিদেশি জঙ্গিরা

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে আল-কায়েদা ও তালেবানের জিহাদে যোগ দিতে বিদেশি জঙ্গিরা আগ্রহ হারাচ্ছে। পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা এ কথা বলছেন। কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশি জঙ্গিদের এ অঞ্চলের জিহাদে বিমুখ হওয়ার কারণগুলো হলো: আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়া, সংগঠনটির তহবিল-সংকট ও মার্কিন চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন থেকে অব্যাহত হামলা।

দানিয়ুব নদীতে বরফ জমে নৌ-চলাচল বন্ধ by সরাফ আহমেদ

টানা দুই সপ্তাহের তীব্র শীতে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ১০টি দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ইউরোপের বৃহত্তম নদী দানিয়ুবের পানি জমে বরফ হয়ে গেছে। দুই হাজার ৮৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর ৯০ শতাংশ পানি জমে যাওয়ায় বিপদে পড়েছে তীরবর্তী দেশগুলো। এসব দেশের সমুদ্রবন্দর নেই। নৌপথে পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করার ক্ষেত্রে দানিয়ুবের জলপরিবহন ব্যবস্থাই তাদের ভরসা।

সোনারগাঁয়ে কমিটি বাতিলের প্রতিবাদ-যুবদলের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের কমিটি বাতিলের প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে ঝাড়ুমিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেছেন নেতা-কর্মীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার সামনে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে সড়ক অবরোধ করে রাখেন তাঁরা। এতে সেতুর দুই প্রান্তে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। দুর্ভোগে পড়ে হাজারো যাত্রী।

শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে দাবি মানলেন মালিকপক্ষ

রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা গতকাল বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক আদায়ের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। মোজাক নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানার শ্রমিকেরা এ বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভের মুখে কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মানতে বাধ্য হয়।

বউমেলা, শুধুই নারীদের জন্য

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার পোড়াদহে বুধবার জামাইমেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে ছিল পুরুষদের প্রাধান্য। গতকাল বৃহস্পতিবার হয়ে গেল বউমেলা, যেখানে প্রাধান্য ছিল পাড়াগাঁওয়ের বউ-ঝিদের। বউমেলায় পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ। ১৫ জন নারী মেলার বাইরে পাহারায় থাকেন। জামাইমেলায় মাছ-মিষ্টির ছড়াছড়ি। আর বউমেলায় গৃহস্থালি ও প্রসাধনসামগ্রী থাকে বেশি।

মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রশ্ন ফাঁস-শুভেচ্ছা কোচিংয়ের মালিকসহ দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র by গোলাম মর্তুজা

মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শুভেচ্ছা কোচিং সেন্টারের মালিক এম এ মান্নানসহ দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক লুৎফর রহমান ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে এ অভিযোগপত্র জমা দেন।

নগরে গৃহবধূসহ দুজন খুন

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে পৃথক ঘটনায় এক গৃহবধূসহ দুজন খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন গৃহবধূ মৌসুমী আক্তার (২০) ও চা-দোকানি রাজীব ঢালী (২৮)। পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কামরাঙ্গীরচর থানার মমিনবাগে শ্বশুরের বাসা থেকে গৃহবধূ মৌসুমী আক্তারের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁর স্বামী পারভেজ খান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ঘটনার পর থেকে পারভেজ ও তাঁর বাড়ির লোকজন পলাতক।

বিজ্ঞান মেলা ২০১২-তরুণ বিজ্ঞানীরা দেশ বদলে দেবে

তরুণ বিজ্ঞানীদের বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবনী চিন্তাই পারে দেশকে বদলাতে। ভবিষ্যতে এটা গুণগত পরিবর্তন আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, দেশের সন্তানদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতেই ‘প্রথম আলো-ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ বিজ্ঞান মেলা ২০১২’-এর আয়োজন করা হয়েছে।

বেড়া দিয়ে মাছ শিকার-পদ্মায় বিপুল বাঁশ বেড়া ও জাল ধ্বংস

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বেড়া দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করতে গতকাল বৃহস্পতিবার অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাঁরা মাছ চাষের বিপুল পরিমাণ বেড়া, বাঁশ ও নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে সেগুলো ধ্বংস করেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে ২ মার্চ পর্যন্ত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৬ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ২ মার্চ আবাসিক ছাত্রাবাস খুলে দেওয়া হবে। ৩ মার্চ ক্লাস শুরু হবে। সিন্ডিকেটের সভায় গতকাল বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম।

শপথ গ্রহণের পর সিইসি-নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যা করতে হয় তা-ই করব

দেশের নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ বললেন, ‘নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যা যা করতে হয়, আমরা তা-ই করব।’ শপথ গ্রহণের পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ।

শিল্পীর ভুবন-প্রাচ্যের ক্যাকটাস by সিলভিয়া নাজনীন

‘ঘটনাগুলো সব আগে থেকেই ঘটে আছে, আমরা তার ভেতর দিয়ে পরিভ্রমণ করি’—এমন দার্শনিকসুলভ চিন্তা একজন শিল্পীকে সহজেই মানিয়ে যায়; শিল্পী নাসরীন বেগমের এমন উক্তিকে স্বাভাবিক ধরে নিয়েই কথোপকথন চলছিল তাঁর স্টুডিওতে। কিছুক্ষণ আলাপচারিতায় বোঝা গেল তিনি অন্য শিল্পীদের থেকে নানা কারণেই আলাদা।

বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে-নিশ্চিত করতে হবে স্বাস্থ্যসেবা

চিকিৎসাসেবাপ্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দারিদ্র্যপীড়িত এ দেশে স্বাস্থ্যসেবার যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়টি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকরা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে অভাগাদের তালিকাতেই রয়েছে। ১৬ জুলাই সহযোগী একটি দৈনিকে 'স্বাস্থ্যসেবায় ঝুঁকিপূর্ণ ৩২ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ'

পবিত্র শবেবরাত-সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত হোক

আজ পবিত্র শবেবরাত। মহিমান্বিত ভাগ্যরজনী, পরম সৌভাগ্যের রাত। আজকের রাতটি মুসলমানদের জীবনে সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পরিচিত। এ রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআন মজিদে বলা হয়েছে, পরবর্তী বছরের হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত, আমল ইত্যাদির আদেশ-নিষেধ এ রাতেই ফয়সালা করা হয়। এ রাতে ইবাদত ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে

পবিত্র কোরআনের আলো-ইহুদিরা নিজেদের পিতৃভূমি ফিরে পেতে সাময়িকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল

২২। ক্বালূ ইয়া মূসা ইন্না ফীহা ক্বাওমান জাব্বারীনা; ওয়া ইন্না লান্নাদ্খুলাহা হাত্তা ইয়াখ্রুজূ মিন্হা; ফা-ইঁ ইয়্যাখ্রুজূ মিন্হা ফা-ইন্না দাখিলূন। ২৩। ক্বালা রাজুলানি মিনাল্লাযিনা ইয়াখাফূনা আন্'য়ামাল্লাহু 'আলাইহিমাদ্খুলূ 'আলাইহিমুল বাব; ফা-ইযা দাখাল্তুমূহু ফা-ইন্নাকুম গালিবূন। ওয়া 'আলাল্লাহি ফাতাওয়াক্কালূ ইন কুন্তুম মুমিনীন।

রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশিত উচ্চশিক্ষা by মিল্টন বিশ্বাস

উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং বেশির ভাগ পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. জিল্লুর রহমানের একটি প্রত্যাশিত বক্তব্য গত ৫ জুলাই সব জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি শিক্ষার মান সম্পর্কে কথা বলেছেন।

শবেবরাতের তাৎপর্য by মাসুদা বেগম

১৪ শাবানের দিবাগত রাত লাইলাতুল বারাত বা শবেবরাত নামে অভিহিত। এই পবিত্র রাতে নিহিত রয়েছে মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ, তেমনি রয়েছে বহু তাৎপর্য, ফজিলত ও বরকত। তাই এ রাতকে বলা হয়েছে লাইলাতুল বারাত বা মুক্তির রাত। অন্যদিকে পবিত্র মাহে রমজানের আগের মাস হওয়ায় শাবানকে বলা হয়েছে রমজান শরিফের প্রস্তুতির মাস।

পবিত্র লাইলাতুল বারাত-কল্যাণময় রজনী by সৈয়দ গোলাম মোরশেদ

শবেবরাত। মুসলমানদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক রজনী। মুসলমানদের বিশ্বাস, এ মোবারক রজনীতে আল্লাহপাক পরবর্তী এক বছরের জন্য তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত ইত্যাদি বিষয় নির্ধারণ করে থাকেন। অর্থাৎ বলা যায়, তকদিরের বাজেট পেশ করে থাকেন।

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস-আইনের শাসন চাই by তামান্না ইসলাম অলি

খুব সাদা চোখে যেকোনো অপরাধই মানবতাবিরোধী। আবার মানবতাবিরোধী যেকোনো ক্রিয়াই অপরাধের আওতায় পড়ে। তবে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠার পর নতুন মাত্রা পেয়েছে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' শব্দবন্ধটি; বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে। এই আদালতের সহায়তায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ভয়ংকর সব যুদ্ধাপরাধ করেছিল,

রঙ্গব্যঙ্গ-ভূরিভোজ by মোস্তফা কামাল

আবদুর রশিদ খুবই ভোজনবিলাসী মানুষ। খেতে খুব পছন্দ করেন। খাবার দেখলে আর সহ্য করতে পারেন না। পেটে ক্ষুধা না থাকলেও খাবার দেখলেই তাঁর ক্ষুধা বেড়ে যায়। তিনি ভরা পেটেও বেশ খেতে পারেন। কারো খাবারের অফার তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন, এমন নজির নেই। খাবার নিয়ে তিনি খুব একটা বাছবিচারও করেন না।

চারুশিল্প-বাস্তবতা, শিল্পী ও স্বপ্ন by জাফরিন গুলশান

এ কথা সত্য যে আজকের শিল্পকলা অন্য যেকোনো সময়ের শিল্পকলার চেয়ে ভিন্নতর। বিজ্ঞান ও কারিগরির ক্রম-অগ্রসরমাণ চেতনা, পরিচিত জগতের বাইরে মানুষের বিচরণ, রহস্যময় অন্তর্জগতের ক্রমউন্মোচন, ভার্চুয়াল সামাজিক সম্পর্ক, সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির বিশ্বজনীন সংকট—সব মিলিত হয়ে এই যুগের মানুষের জীবনযাত্রা অন্য সব সময়ের চেয়ে আলাদা। এখনকার শিল্পও তাই অনেক বেশি বিশ্লেষণাত্মকভাবে অধিকারপ্রবণ এবং বহুচরিত্র অবলম্বনকারী।

একুশে বইমেলা ২০১২-লেখকের মুখোমুখি

এবারের বইমেলায় তিন লেখকের উল্লেখযোগ্য তিন বই মুনতাসীর মামুন এবারের বইমেলায় আমার বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হচ্ছে। এর বেশির ভাগই মুক্তিযুদ্ধ, ঢাকা এবং উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গ বিষয়ে। এর মধ্যে আছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে শান্তি কমিটি ১৯৭১, ঢাকার স্মৃতি-১২, সুবর্ণ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ১৩নং সেক্টর, অন্যরকম;

একুশের চাওয়া একুশের পাওয়া-বিদেশে বাংলা চর্চা by বিশ্বজিৎ ঘোষ

উনিশ শ বায়ান্ন সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে দেশে-বিদেশে বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বায়ান্ন-পূর্ব কালখণ্ডে, ঔপনিবেশিক আমলে বেশ কয়েকজন বিদেশি পণ্ডিত-গবেষক-লেখক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে লেখালেখি করে খ্যাতি অর্জন করেন। এঁদের মধ্যে উইলিয়াম কেরি, হ্যানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স, লেবেদেফ, হ্যালহেড, গ্রিয়ারসন, ম্যাক্সমুলার, ম্যানুয়েল, ডিরোজিও, দুশান জাভিতেল প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়।

সময়ের প্রেক্ষিত-বাংলাদেশ-জাপান: চার দশকের মৈত্রী by মনজুরুল হক

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে জাপান স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, আমাদের দেশ শত্রুর রাহুকবল থেকে মুক্ত হওয়ার মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে। ওই সময়ের আগে পর্যন্ত ভারত ও ভুটানের বাইরে পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত বলয়ভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ ছাড়া অন্য আর কোনো দেশ আমাদের স্বাধীন অস্তিত্ব মেনে নেয়নি।

ভারতে লোকপাল নিয়োগের বিতর্ক এবং বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত by এ এম এম শওকত আলী

লোকপাল মানে অমবুডসম্যান (Ombudsman)। এ প্রতিষ্ঠানটির উৎস স্ক্যান্ডিনেভিয়ান (Scandinavian) দেশে। ওই সব দেশেই অমবুডসম্যান শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অমবুডসম্যান দুর্নীতিসহ অন্যান্য অনিয়মতান্ত্রিক কার্যকলাপ প্রতিরোধের দায়িত্বে নিযুক্তি লাভ করে।


স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে অমবুডসম্যান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারীদের দুর্নীতি, অনাচার ও অনিয়ম রোধে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানে অমবুডসম্যান শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৮০ সালের দিকে এ-সংক্রান্ত একটি আইন প্রণীত হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই অমবুডসম্যান নিযুক্তির বিষয়ে কোনো আগ্রহ প্রদর্শন করেনি। রাষ্ট্রবহির্ভূত কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে মাঝেমধ্যে কিছু গুরুত্ব আরোপ করলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধরদের যথেষ্ট প্রভাবিত করতে পারেনি।
এ ক্ষেত্রে ভারতের চিত্র অনেকটা এক রকম হলেও সাম্প্রতিককালে কিছু ব্যক্তি ও তাঁদের সমর্থকরা ক্ষমতাসীন সরকারকে বহুলাংশে প্রভাবিত করার বিষয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন। আন্না হাজারে নামীয় গান্ধীবাদী এক ব্যক্তি লোকপাল নিয়োগের জন্য চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এর ফলে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারসহ কংগ্রেস ভীত হয়ে হাজারের সঙ্গে সংলাপও করে। হাজারের দাবি ছিল, এ-সংক্রান্ত খসড়া বিল নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিতর্কের একপর্যায়ে জানা যায় যে দুই বিবদমান পক্ষের মধ্যে খসড়া বিলের বিষয়ে বিরোধের অনেকটা নিষ্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
হাজারে প্রথমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠান। সময় ছিল ১০ মার্চ ২০১১। এতে হাজারে বলেন, 'আমি আমরণ অনশন করব, যদি না খসড়া প্রণয়ন সংক্রান্ত কমিটিতে ৫০ শতাংশ সদস্য নাগরিক সমাজ থেকে অন্তর্ভুক্ত হয়।' তিনি ৫ এপ্রিলের এক চিঠিতে এ বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি খসড়া বিলে জনলোকপাল শব্দটি ব্যবহার করেন। হাজারের আগে যোগগুরু রামদেব দুর্নীতি নির্মূলের লক্ষ্যে সোচ্চার হয়েছিলেন। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তাঁর অন্যতম দাবি ছিল, বিদেশে গচ্ছিত কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশের মতো ভারতেও কালো টাকার পরিমাণের বিষয়টি অনেকটা অস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফিনামিয়াল ইন্টিগ্রিটি নামীয় প্রতিষ্ঠানের মতে, ১৯৪৮-২০০৮ সময়কালে বিদেশে গচ্ছিত কালো টাকার পরিমাণ ভারতের ক্ষেত্রে ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের টাকার পরিমাণের বিষয়টি বিতর্কিত। তবে এ বিতর্কে দেশের অভ্যন্তরে কালো টাকার পরিমাণের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে। যোগগুরু রামদেবকে শেষ পর্যন্ত দিলি্ল পুলিশ শহর থেকে রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়। এরপর রামদেবের সম্পদ ও নগদ অর্থের পরিমাণও মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়।
হাজারের অনুসারী কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির বিষয়েও কিছু অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করা হয়। বলা হয় যে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁর ছেলে উত্তর প্রদেশের (ইউপি) মুখ্যমন্ত্রীর সহায়তায় বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়েছেন। ওই ব্যক্তি মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে একটি দুর্নীতির মামলা যাতে ব্যর্থ হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করেন। অর্থাৎ তিনি অন্যায়ভাবে পুরস্কৃত হন। এটাই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে মিডিয়ায় অভিযোগ। এ ঘটনা উল্লেখ করে কিছু ভারতীয় সংবাদপত্র যে মন্তব্য করে তা ছিল, কংগ্রেস এ বিষয়ে গোপনে যথেষ্ট অনুশীলন করেছে।
ভারতে লোকপাল নিয়োগ সংক্রান্ত আইনি খসড়ার ইতিহাস অত্যন্ত পুরনো। ১৯৬৬ সাল থেকেই এ প্রচেষ্টার সূত্রপাত। ওই সময় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন লোকপাল নিয়োগের সুপারিশ করে। এরপর সংবিধান পর্যালোচনা কমিশন (২০০২) এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন (২০০৭) একই ধরনের সুপারিশ করে। প্রথম লোকপাল বিল ১৯৬৮ সালে প্রণীত হয়। লোকসভায় এ বিলটি পাস করা হয়। কিন্তু রাজ্যসভা বিলটি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর ১৯৭১, ১৯৭৭, ১৯৮৫, ১৯৮৯, ১৯৯৬, ১৯৯৮, ২০০১, ২০০৫ ও ২০০৮ সালে বিলটি সংসদে উত্থাপিত হয়। তবে সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। রাজ্য পর্যায়ে লোকযুক্ত পদ সৃষ্টি এবং নিযুক্তি করা হয় মোট ১৮টি রাজ্যে। তবে নাগরিক লোকযুক্ত সম্পর্কে নাগরিক সমাজের ধারণা নেতিবাচক। তাদের মতে, এ ব্যবস্থা ফলপ্রসূ হয়নি। লোকপাল বিল আইনে রূপান্তরিত না হওয়ার কারণ হিসেবে নাগরিক সমাজ একটি বিষয় চিহ্নিত করে। তাদের মতে, রাজনীতিবিদরা কোনো সময়ই তাঁদের ওপর নজরদারি হোক তা চান না। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের আধিকারিক, যেমন_প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিচারপতিদের ওপর লোকপালের নজরদারি রইবে কি না, সে বিষয়টিও বিতর্কিত। এ সম্পর্কে একটি মতবাদ হলো, সবার জন্য লোকপালের নজরদারি আবশ্যক। অন্যটি হলো, অন্তত প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের নজরদারির বাইরে থাকবেন। পর্যায়ক্রমে দুটি সংবিধান পর্যালোচনা কমিশনের এ বিষয়ে সুপারিশ ছিল_প্রধানমন্ত্রীকে লোকপালের আওতাবহির্ভূত করা প্রয়োজন।
কমিশনের প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে যুক্তিও দেওয়া হয়েছিল। বলা হয় যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করলে তিনি স্বীয় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন। হাজারের বর্তমান দাবির মধ্যে এ বিষয়টি সরকার ও তাঁর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে। হাজারে প্রধানমন্ত্রীকেও লোকপালের অধিক্ষেত্রভুক্ত করতে আগ্রহী। জানা যায়, সরকার শেষ পর্যন্ত নমনীয় হয়ে প্রস্তাব করে যে প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার সময় তদন্ত হতে পারে। হাজারে তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। লোকপালের নিয়োগের দাবি এমন এক সময় হয়েছে, যখন ২জি-সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় ক্ষমতাসীন জোটের টেলিকমমন্ত্রী ও একজন মহিলা সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। পক্ষান্তরে এ কথাও বলা যায় যে এদের গ্রেপ্তার ও পরবর্তী সময়ে বিচারকাজ শুরু হয় এমন এক সময়, যখন লোকপালের অস্তিত্ব ছিল না। এ সত্ত্বেও নাগরিক সমাজের দাবি যে প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই লোকপালের আওতার মধ্যে থাকবেন।
ভারতসহ বিদেশের কিছু সাংবাদিক ও কলামিস্ট হাজারের দাবি সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। প্রশ্নটি হলো, লোকপাল নিয়োগের মাধ্যমেই কি দুর্নীতি হ্রাস করা সম্ভব? এ প্রসঙ্গে আরো যুক্তি প্রদান করা হয়েছে যে হাজারের মতে, লোকপাল নিয়োগের মাধ্যমে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দুর্নীতি হ্রাস পাওয়ার দাবি নিতান্তই বায়বীয়। এসব সমালোচকের অভিমত হলো, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় ঘুষ আদান-প্রদানের প্রবণতা অপরিবর্তিত থাকবে। এ ছাড়া দুর্নীতির শাস্তি যত কঠোর হবে, দুর্নীতি-সংক্রান্ত ঘুষের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশে মোটামুটিভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তবে এ প্রতিষ্ঠানের নজরদারির কোনো কাঠামো নেই। নাগরিক সমাজ আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা প্রদানে আগ্রহী। এর ফলে এখনো সরকার অথবা সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে মতভেদ অত্যন্ত দৃশ্যমান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে একটি সংসদীয় কমিটি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মধ্যে এ নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধ লক্ষ করা গেছে। এ ক্ষেত্রেও যে বিষয়টি মুখ্য তা হলো, নির্বাহী বিভাগ দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করছে কি না? এ প্রসঙ্গে কমিশনের চেয়ারম্যানের প্রকাশ্য উক্তি ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, নির্বাহী বিভাগ থেকে তাঁর ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ হয় না। এ সত্ত্বেও নাগরিক সমাজ স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার। এ বিষয়ে সর্বশেষ উত্তেজনার বিষয় হলো, সরকারি কর্মকর্তাদের সুরক্ষা। সম্প্রতি কমিশন-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের বিষয়ে এ প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। সংশোধিত খসড়া আইনে নির্বাহী বিভাগ কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার আগে সরকারের পূর্বানুমতির বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে নাগরিক সমাজ ও কমিশন সমস্বরে বলেছে, এর ফলে কমিশনের তদন্ত করার অধিকার বাধাগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে বিদ্যমান ফৌজদারি কার্যবিধিমালায় এ ধরনের কোনো বাধা স্থায়ীভাবে না রাখারও বিধান রয়েছে। বিধানটি হলো, অনধিক ৬০ দিনের মধ্যে সরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হলে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করার জন্য কোনো বাধা নেই। এ বিষয় নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরেও কিছু মতভেদ রয়েছে। একজন প্রবীণ মন্ত্রী পূর্বানুমতি-সংক্রান্ত বিধান না রাখার পক্ষে। তবে এটা তাঁর ব্যক্তিগত মত। মূল বিষয়বস্তু লোকপাল নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত থেকে মুক্ত নন। বাস্তবে দেখা গেছে যে তদন্ত শুরু হয় সরকার পরিবর্তনের অব্যবহিত পর।
বাংলাদেশে লোকপাল বা 'অমবুডসম্যান' নিয়োগের কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। এ বিষয়ে একজন প্রবীণ মন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছেন, নেতিবাচক রাজনৈতিক ধারার কারণেই এটা হয়নি। যে বিষয়টি তিনি ঊহ্য রেখেছেন তা হলো, নির্বাচিত কর্মকর্তারা এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে তাঁদের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ করুন_এটা চান না। এটা তাঁদের কাম্য নয়। বিদ্যমান আইনটি তিন দশক আগের। এ আইনটি আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। আইনটি প্রয়োজনীয় সংশোধনের সময় এর প্রভাব দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর পড়বে কি না সে বিষয়টি মুখ্য। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের মডেলটি পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। কারণ সে দেশে 'অমবুডসম্যান'সহ দুর্নীতি প্রতিরোধবিষয়ক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

রক্তাক্ত বিশ্ববিদ্যালয়-বন্ধ হোক এ প্রাণঘাতী তাণ্ডব

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের রেশ এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে রক্তাক্ত হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিবদমান দুই ছাত্র সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হলো। আহত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও।


বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। যে ঘটনা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত, তা খুবই সামান্য। শ্রেণীকক্ষে সহপাঠীদের কথা কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের এমন প্রাণঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া নিতান্তই দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ ও পুলিশ প্রশাসন উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীদের মারমুখী অবস্থানের কারণে কোনো সমঝোতায় পেঁৗছানো সম্ভব হয়নি। অনিবার্য ফল হিসেবেই প্রাণহানির ঘটনাটি ঘটে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবারই রক্তক্ষয় হয়েছে। প্রাণ দিতে হয়েছে অনেক শিক্ষার্থীকে। এমনিতেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে অনেক গল্প আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন ছাত্রশিবিরের দুর্গ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। প্রায় দুই যুগ ধরে এখানে আধিপত্য বিস্তার করে আছে ছাত্র শিবির। একসময় ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করত। বিগত বিভিন্ন সরকারের আমলে সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করে। সেই আধিপত্যের জের ধরে রাখতেই এ সংঘর্ষ ঘটেছে কি না, সেটা তদন্তসাপেক্ষে জানা যাবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু কখনো কাম্য হতে পারে না। রাজনীতি এভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে না।
'ছাত্রানং অধ্যয়নং তপঃ'- পাঠ্য বইতে এমন কথা পড়ানো হয় ছোটবেলাতেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা পড়তে যান, তাঁরা জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যাওয়া এই ছাত্ররা যখন সামান্য ব্যাপার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, তখন তাঁদের ওপর থেকে সব ভরসা উঠে যায়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, উচ্চশিক্ষার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও যখন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপারেও প্রশ্ন দেখা দেয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনা থেকে নতুন আরেকটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সরকার অপসারণের একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়ার খবরও জানা গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংঘর্ষের নেপথ্যে সুদূরপ্রসারী কোনো ষড়যন্ত্র নেই তো? অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র সংঘর্ষের পর অনেককিছু ঘটেছে দেশের রাজনীতিতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংঘর্ষের নেপথ্যে অন্য কোনো শক্তির হাত রয়েছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রাণঘাতী তাণ্ডব বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক ও সজাগ থাকবে, এমনটিই আশা করি আমরা।

সীমান্তে গুলি বন্ধ করবে না ভারত!-বাংলাদেশের কঠোর অবস্থান নিতে হবে

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অবন্ধুসুলভ আচরণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কূটনৈতিক অঙ্গনে হাসিনা-মনমোহন অথবা দীপু মনি-এসএম কৃষ্ণা যতই উষ্ণ সম্পর্কের পরিচয় দিন না কেন, মাঠপর্যায়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত একটি ভয়ানক এলাকায় পরিণত হয়েছে।


সর্বশেষ ৯ ফেব্রুয়ারি একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে চুয়াডাঙ্গা জীবননগর সীমান্ত থেকে গরু আনার জন্য অবৈধভাবে সীমানা পার হওয়ার চেষ্টার সময় বিএসএফ ছয় বাংলাদেশি কিশোরকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের সীমান্ত বিএসএফের ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ধৃত এক কিশোর মুমূর্ষু অবস্থায় অতি কৌশলে পালিয়ে এলে তাকে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের খোঁজ এ সম্পাদকীয় শেখার সময় পর্যন্ত মেলেনি। সাম্প্রতিককালে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলি করে হত্যা এবং ধরে নিয়ে যাওয়ার বা নির্যাতন করার ঘটনা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এমনই পরিস্থিতিতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান ইউ কে বনশল বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশের সীমান্তে বিএসএফের গুলি চালানো বন্ধ হবে না। সীমান্তে গুলি চালানো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এরই প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জানিয়েছেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কোনোক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। বিএসএফের অস্ত্র প্রয়োগ বন্ধে প্রয়োজনে আমরা জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে নালিশ জানাব।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যাদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেহাত পেটের দায়ে গরু চোরাচালান বা পণ্য চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। সেটা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অজানা নয়। এই চোরাচালান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় চলে আসছে। এ অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে শুধু বাংলাদেশিরাই যে জড়িয়ে আছে, তা নয়- সমান হারে ভারতীয় চোরাকারবারিরাও জড়িত। শুধুু তাই নয়, আমরা এটাও জানি যে, বিএসএফের অনেক সদস্য এ চোরাকারবারের ভাগও পেয়ে থাকেন। এসব অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে বা চোরাকারবারির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারত দুটি দেশেই প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। যারা চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের সম্মুখীন করাই একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব, তাদের গুলি করে হত্যা করা নয়- বিশেষ করে রাষ্ট্র দুটির মধ্যে যখন উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করে। এ অঞ্চলে যারা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিল, তাদের বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সমূলে উৎপাটন করে ভারতের নিরাপত্তাকে অনেকটা সুনিশ্চিত করে দিয়েছে। বিএসএফ কি তারই পুরস্কার হিসেবে তুচ্ছ অপরাধীদের ওপর গুলি চালিয়ে বাংলাদেশকে মরদেহ উপহার দিচ্ছে? পৃথিবীর বহু দেশের সীমান্তে চোরাকারবার রয়েছে। একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার মাদক চোরাকারবারিদের ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশের সীমান্তে এভাবে পণ্য চোরাকারবারিদের গুলি করে হত্যা করা হয় না। বিএসএফের প্রধান গুলি বন্ধ না হওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা শুধু অমানবিক আচরণের অংশই নয়, মধ্যযুগীয় মানসিকতারও প্রতিফলন। আমরা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণের অনুরোধ জানাই। সেই সঙ্গে ভারতকে খতিয়ে দেখতে হবে এ ধরনের আচরণের পেছনে কোনো অশুভ নেপথ্য শক্তির হাত রয়েছে কি না, যারা দুই দেশের সম্পর্ক ভালো চোখে দেখে না।

চরাচর-একুশের মাস আমাদের আন্দোলিত করুক

আবার বসন্ত। আবার ফিরে এলো একুশে ফেব্রুয়ারির অবিস্মরণীয় দিন, ৬০ বছরের স্মৃতিগন্ধ নিয়ে। বছরের হিসাবে বড় কম নয়, অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গিয়ে দিনটি আমাদের কাছে বসন্তের সমার্থক হয়ে গেছে। কবি অনেক দিন আগে বসন্তকে ভুবনবিজয়ী বলে গেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি তাঁর দেওয়া অভিধাকে সার্থক ও সুপ্রযুক্ত করেছে।


আমরা সবাই এ দিনটির ইতিহাস জানি। সারা বিশ্বে মধ্যে ভাষা ব্যবহারকারী মানুষদের হিসাবে পঞ্চম স্থানে রয়েছে যে বাংলা ভাষা, সেই ভাষা মাতৃভাষা যাদের, তারাই বাঙালি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৩৫৮ সালের ৮ ফাল্গুন বাঙালি জাতির একাংশ সে দিনকার পূর্ব পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা জবরদস্তি উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিয়ে মাতৃভাষার অপমৃত্যু ঘটানোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঢাকার রাস্তায় রক্ত ঝরিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
এক দশক অতিক্রম করার আগেই ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভারতের পূর্ব প্রান্তের সীমায় অবস্থিত বরাক ভূখণ্ডের শিলচরে পুনরাবৃত্তি ঘটল সেই অভাবনীয় ঘটনার। সেখানে মাতৃভাষা বাংলার অস্তিত্ব রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিলেন ১১ জন শহীদ। একুশে ফেব্রুয়ারির বিশ্বজননীতার সেই তো শুরু। একুশে ফেব্রুয়ারির পাশে এসে দাঁড়াল ১৯ মে, মোটামুটি একই ভৌগোলিক পরিমণ্ডল। নদীমাতৃক দেশ আমাদের। এক নদীর পানি মিশে যায় অন্য নদীর পানিতে। এভাবে মিলেমিশে একই স্রোত চলে যায় মোহনার দিকে। মানুষেরও একই স্বভাব। আর সমভাষী হলে তো কথাই নেই। বাঙালি জাতিসত্তার বাঙ্ময় প্রকাশ- অমর একুশের বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসে রূপান্তরিত হওয়ার পেছনে যেসব ঘটনা বা উদ্যোগ ছিল, সংক্ষেপে সেই সূত্রগুলো জানা আমাদের সবার প্রয়োজন সত্য জানার অধিকারে। তথ্যে প্রকাশ, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি অন্যতম শহীদ আবদুল জব্বরের জন্মস্থান গফরগাঁও থেকে 'গফরগাঁও থিয়েটার'-এর তরফে সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের ২৫ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে এই মর্মে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার জনৈক এনামুল হক। দিন কয়েক পর কসোভোর বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষাপ্রেমী গ্রুপ মহাসচিবের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ঘোষণার প্রস্তাব করে এবং প্রস্তাবের উত্তরে জাতিসংঘের মহাসচিবের দপ্তর থেকে বিষয়টি প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক কর্ম পরিচালনা কেন্দ্র ইউনেসকোর গোচরে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। কানাডাভিত্তিক মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামের সংগঠনের বাংলাভাষী সদস্য রফিকুল ইসলাম ও আবদুুস সালাম এ বিষয়ে ইউনেসকোর দপ্তরে যোগাযোগ করলে তাঁদের জানানো হয় যে প্রস্তাবটি আসতে হবে সেই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। এটাই নিয়ম। এটা জেনে যাওয়ার পর কানাডাপ্রবাসী রফিকুল ইসলাম ১৯৯৯ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি লিখে পাঠান। চিঠি পেয়ে শিক্ষামন্ত্রী
 

আলোকের এই ঝরনাধারায় (পর্ব-৬২)-পঁচিশে মার্চের রাত by আলী যাকের

আমরা তিন বন্ধু- মাহমুদুর রহমান বেণু, কমলদা (মাসরুরুল হক সিদ্দিকী), যত দূর মনে পড়ে, লুৎফর রহমান খোকা, ওয়াহিদ ভাই এবং আমি রংপুরের উদ্দেশে রওনা হলাম। মনে আছে, রাস্তাঘাট সুনসান ছিল। ফলে আরিচা থেকে নগরবাড়ী পর্যন্ত ফেরি থাকা সত্ত্বেও নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাওয়া গেল। সেখানে সন্‌জীদা আপা এক তরুণ দম্পতির সঙ্গে একটি কোয়ার্টারে একসঙ্গে থাকতেন। তাঁকে প্রস্তুত হতে বলে আমরা সবাই দিনাজপুরের পথে রওনা হলাম। বুদ্ধিটা ওয়াহিদ ভাইয়েরই ছিল।


এত দূর যখন এসেছি, দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির আর রামসাগর- এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দুটি দেখে যাওয়া যাক।
এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয়। আমরা দিনাজপুরের পথে চা খাওয়ার জন্য পথের ধারের একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে গাড়ি থামালাম। তখন সন্ধ্যা। মোটা কাচের চশমা পরা এক বৃদ্ধ একা বসে চা খাচ্ছিলেন। আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন কি না। আমাদের এই প্রশ্ন শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তাঁর নিজস্ব রংপুরের ভাষায় বললেন, 'দিয়েছি বৈকি।' আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কাকে ভোট দিয়েছেন? তিনি বললেন, 'কেন? শেখের ব্যাটাকে।' একটু দুষ্টুমি করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, কেন শেখকে ভোট দিলেন? তিনি বললেন, "তাহলে শুনুন, শেখ যাবে এখান দিয়ে, আমরা সবাই রাস্তার দুই ধারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, শেখের গাড়ির বহর আসছে। শেখের গাড়ি এসে ঠিক আমার সামনে থেমে গেল। গাড়ি থেকে নামল শেখ মুজিব। আর কোনো দিকে না তাকিয়ে আমার কাছে এসে আমার দুই হাত ধরে বলল, 'বাবা, আমাকে একটু দেখবেন।' তারপর ভোটের দিন আমি দশ গ্রামের মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে এসে শেখের পক্ষে ভোট দিয়েছি।" তাঁর এই সহজ-সরল কথায় আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি সম্পর্কে আবারও একবার নিশ্চিত হলাম। সাধারণ মানুষের নাড়ির সঙ্গে ছিল তাঁর যোগ। এমন নেতা কখনোই বিফল হতে পারেন না। দেখতে দেখতে সেই অমোঘ ২৫শে মার্চ একেবারে দোরগোড়ায় চলে এলো।
২৫শে মার্চও সন্ধ্যা থেকে ভাষা শহীদ মিনারে দেশাত্মবোধক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। হঠাৎ সাড়ে ৯টার দিকে ওই অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে লক্ষ করিনি, কিন্তু পরে দেখলাম যে চারদিকে কেমন যেন একধরনের ভৌতিক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলাম, শহীদ মিনার অন্ধকার, কোথাও কেউ নেই। ওই ভবনের ক্যাফেটারিয়ার মালিক বলাই আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, 'মনে হয় অবস্থা খুব ভালো না। আপনারা বাড়ি চইলা যান।' আমরা পাঁচ বন্ধু, প্রায় পঞ্চপাণ্ডবের মতো, আমার গাড়িতে চড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলাম। পরে শুনেছি, সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত এবং তাঁর বন্ধুরাও সেই সময় বলাইয়ের ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিতেন। তাঁরা প্রায় সন্ধ্যায়ই আমাদের গাড়িটা ওই ভবনে যাওয়া-আসা করতে দেখতেন এবং ভাবতেন যে গাড়িটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুপ্তচরদের। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে এই কদিন আগে আমার কথা শুনে প্রথমবারের মতো তাঁর ভুল ভাঙল। যা হোক, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আসলে কী ঘটছে জানার জন্য আমরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে, বঙ্গবন্ধু ভবনে যাব। গাড়ি করে যখন রোকেয়া হলের সামনে এসেছি, তখন দেখতে পেলাম, রোকেয়া হলের সামনে সদ্য ফেলে রাখা একটি বিশাল শিরীষ বৃক্ষ কেটে সাফ করা হচ্ছে। এই বৃক্ষটি ওখানে রাখা হয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যাত্রাপথে ব্যারিকেড দেওয়ার জন্য। এবং গাছটি কাটছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরই কয়েকজন সদস্য। ডানে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেখানে দুই ট্রাক ভর্তি অস্ত্রসজ্জিত সেনা সদস্য উপস্থিত। আমরা একটু অবাকই হলাম। কেননা ১ মার্চ থেকে পাকিস্তানি আর্মি ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে কখনো শহরে প্রবেশ করেনি। ৩২ নম্বরে যখন পৌঁছলাম, তখন চারদিক সুনসান। গেটে কেবল একজন দ্বাররক্ষী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন যে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় সব নেতা কিছুক্ষণ আগেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলে গেছেন তাঁদের গন্তব্যে। পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ বিফল হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তিনি এও বললেন, 'আপনারা যাঁর যাঁর বাড়িতে চলে যান। কেননা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার রাস্তায় নামবে।' আমরা গাড়ি করে তড়িঘড়ি মগবাজারে এলাম। কেননা সেখানেই আমাদের পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে চারজনের গন্তব্য ছিল। তাদের সেখানে নামিয়ে দিলাম। তারপর আমি একা গাড়ি চালিয়ে রাজারবাগে আমাদের বাসস্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। সেই বাড়িতে আমি থাকতাম আমার বড় ভাই এবং ভাবির সঙ্গে। রাত তখন পৌনে ১১টা হবে। হাত-মুখ ধুয়ে কেবল খেতে বসেছি, এমন সময় সামনের রাস্তা থেকে একটা হৈচৈয়ের শব্দ পেলাম। আমি খাওয়া ছেড়ে উঠে দ্রুত হাত ধুয়ে দৌড়ে গেলাম রাজারবাগের সামনের সদর রাস্তায়, যেটি আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ছিল। গিয়ে দেখি, সেখানে পাড়ার সব লোক জড়ো হয়েছে। তারা সবাই উত্তেজিত। কেউ কেউ 'জয় বাংলা' বলে স্লোগান দিচ্ছে। রাজারবাগে যেসব পুলিশ ভাই থাকতেন, তাঁরা রাইফেল হাতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন এবং সবাইকে বোঝাচ্ছেন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে। কেননা নিরস্ত্র মানুষ রাস্তায় থাকলে পাকিস্তানিরা তাদের মেরে ফেলবে, আর তাতে পুলিশের পক্ষে প্রতিরোধবূ্যহ রচনা করা প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়বে। তাঁরা এও বললেন যে শেষ বুলেটটি থাকা পর্যন্ত এবং তাঁদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ে যাবেন। আমরা যার যার বাসায় ফিরে এলাম।

(চলবে)
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

শেকড়ের ডাক-ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য by ফরহাদ মাহমুদ

প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের মূল্য যে আমরা বুঝি না, তা নয়। কিছুদিন আগে বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের সময় আমাদের তরুণ সমাজ যেভাবে ভোট সংগ্রহের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল, তা আমাদের মুগ্ধ করেছে। এর পেছনে কাজ করেছে আমাদের এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাদের ভালোবাসা, তাদের আবেগ-অনুভূতি।


কিন্তু সেই অনুভূতি যদি আরো 'ডিপ রুটেড' বা গভীরে প্রোথিত হতো, তাহলে আরো ভালো হতো। কারণ এই আবেগের অধিকাংশটাই খুব ভাসা ভাসা, যার ফলে আমরা কখনো সমস্যা উপলব্ধি করার, সমস্যার গভীরে যাওয়ার কিংবা সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করি না। গত ৭ ফেব্রুয়ারি একটি টিভি চ্যানেলে অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেছিলেন, সুন্দরবন থেকে প্রতিবছর চোরাশিকারিরা ১০ থেকে ১২ হাজার হরিণ শিকার করে। ১০ বছরে বাঘ মারা পড়েছে অর্ধশতাধিক। দেদার পাচার হচ্ছে নানা রকম গাছ। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের গর্বের, ভালোবাসার সুন্দরবন কত দিন টিকে থাকবে?
একটি দেশের নানা রকম ঐতিহ্য থাকে। এর অন্যতম হচ্ছে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং অবকাঠামোগত ঐতিহ্য। এর মধ্যে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপরই নির্ভর করে সভ্যতার বিকাশ, মানুষের জীবনযাত্রা, এমনকি সুস্থতাও। আর এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য গঠিত হয় একটি দেশের নদীনালা, হাওর-বাঁওড়, জলাশয় থেকে শুরু করে বন, বৃক্ষলতা, পশুপাখি, মৎস্যসম্পদ থেকে কীটপতঙ্গ পর্যন্ত প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদজগৎ নিয়ে। আমরা ইতিমধ্যে অনেক প্রাকৃতিক ঐতিহ্যই ধ্বংস করে ফেলেছি। শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ প্রায় নাই হয়ে গেছে। চিতা, গণ্ডার, গয়াল, বুনো মোষসহ অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী হারিয়ে গেছে। জংলি কুকুর, হাতি, মেছো কুমির, লজ্জাবতী বানর, ভালুকসহ অনেক প্রজাতির প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার পথে। অতীত রেকর্ডে পাওয়া যায়, আমাদের সাত শতাধিক প্রজাতির পাখি ছিল, এখন তিন থেকে চার শ প্রজাতির পাখি দেখা যায়, তাও যথেষ্ট সংখ্যায় নয়। আমাদের ছয় শতাধিক প্রজাতির মাছ ছিল, এখন পাওয়া যায় মাত্র দুই শ প্রজাতির মতো। প্রজাপতি, ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি এখন কমই দেখা যায়। আর এর সব কিছু মিলে প্রকৃতিতে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, সেই ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বন ধ্বংস, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, অর্থনৈতিক মূল্যহীন উদ্ভিদের টিকে থাকার মতো সুযোগ না থাকা, নদীগুলো ভরাট হতে হতে শুকিয়ে যাওয়া, অবশিষ্ট নদীগুলোতেও অব্যাহত পানিদূষণ, জলাশয়-জলাভূমি ভরাট বা নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। কোনো কোনো প্রজাতির প্রজাপতি বা মথ একটিমাত্র প্রজাতির গাছকে কেন্দ্র করেই বেঁচে থাকে। সেই গাছটি না থাকলে ওই প্রজাপতিও থাকবে না। আমাদের দেশে ১৮ প্রজাতির পেঁচা ছিল বলে নিকট-অতীতের রেকর্ডেও জানা যায়। এখন মাঝেমধ্যে পাঁচ-সাতটি প্রজাতির পেঁচা দেখা যায়। একইভাবে ধনেশ, ময়না, জংলি শালিক, কাঠঠোকরা, টিয়াসহ অনেক কোটরবাসী প্রজাতির পাখির সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। কারণ তারা বাসা বানাতে পারছে না, প্রজনন করতে পারছে না। কোটরসম্পন্ন গাছই এখন দুর্লভ হয়ে পড়েছে। অর্থকরী কাঠের গাছগুলোয় সাধারণত কোটর হয় না, তদুপরি পরিণত হওয়ার আগেই সেসব গাছ বিক্রি করে দেওয়া হয়।
বিদেশি দাতা সংস্থা বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনের কারণে এর আগে সরকার কিছু বনকে নামে মাত্র সংরক্ষিত বন ঘোষণা করেছে। এটি বরং হিতে বিপরীত হয়েছে। এর ফলে সেই বনগুলো আরো দ্রুত ধ্বংস হয়েছে। আগে বন বিভাগের অধীনে থাকা সেই বনগুলো থেকে কিছু রাজস্ব পাওয়া যেত। তখন বন বিভাগ সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যায় কিছুটা হলেও সচেষ্ট থাকত। সংরক্ষিত বনাঞ্চল করার ফলে সেখান থেকে গাছ কাটা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রাজস্ব আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে তদারকি-পরিচর্যাও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। সেই সুযোগে কিছু অসাধু কমকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে চোররা বনগুলোর গাছ কেটে সাবাড় করে দিয়েছে। টেকনাফ গেম রিজার্ভে ১৯৮০ সালের দিকেও যেখানে শতভাগ বন ছিল, ২০০৫ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেখানে প্রাকৃতিক বনের পরিমাণ ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ভাওয়াল গড়ের যেভাবে দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং যেভাবে বনের জমি দখলের প্রক্রিয়া চলছে, তাতে দু-এক দশক পর একটি প্রদর্শনী এলাকা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। মধুপুর সংরক্ষিত বনাঞ্চলেরও একই অবস্থা। চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নামমাত্র অস্তিত্ব আছে। সামাজিক বনায়নের নামে একাশিয়া নামক বিদেশি প্রজাতির ক্ষতিকর গাছ লাগানো হচ্ছে, যা আমাদের বন্য প্রাণীদের আবাসযোগ্যতা নষ্ট করছে। তদুপরি আইন অনুযায়ী বনাঞ্চলের সীমানার তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটখোলা থাকতে পারবে না। কিন্তু কেবল টেকনাফ ও চুনতি বনাঞ্চলের সীমানা ঘেঁষেই রয়েছে ১৮টি ইটখোলা। এদের ইট পোড়ানোর প্রধান জ্বালানি হচ্ছে এসব বনের কাঠ। এসব নিয়ে পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসন নিয়মিত এসব ইটখোলার লাইসেন্স নবায়ন করে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বিশেষ কারণে ছাড়পত্র দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি ছোট্ট দেশ, অথচ এর রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা। এই জনসংখ্যা আবার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলেছে। তাই ছোটখাটো গ্রামীণ বন অনেক আগে থেকেই উজাড় হতে শুরু করেছে। বর্তমানে গ্রামীণ বনের খুব একটা অবশিষ্ট নেই। অথচ এসব গ্রামীণ বন ছিল বহু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। জনসংখ্যার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মালিকানাধীন এসব বন রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। তাই গ্রামীণ বনাঞ্চলের সেসব প্রাণী ও উদ্ভিদ রক্ষা করাটাও সম্ভব হবে না। এ কারণে সরকারিভাবে সম্ভব হলে প্রতিটি উপজেলায়, তা না হলে কমপক্ষে প্রতিটি জেলায় গ্রামীণ বনের আদলে একটি সংরক্ষিত গ্রামীণ জঙ্গল স্থাপন করা যেতে পারে। এর জন্য খুব বেশি জমিরও প্রয়োজন নেই, ১০-২০ একর জমিই যথেষ্ট। উপজেলা প্রশাসনই এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারে। একইভাবে শীতের অতিথি পাখিদের, বিশেষ করে হাঁসজাতীয় জলচর পাখিদের জন্যও সারা দেশে অন্তত ১০-২০টি জলাশয় হলেও চিহ্নিত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাখিগুলো এখন যেখানে যায়, সেখানেই শিকারিদের উৎপাতের শিকার হয়। তখন শিকারিদের উৎপাত হলে এবং কাছাকাছি কোনো সংরক্ষিত জলাশয় থাকলে সেগুলোয় গিয়ে সাময়িক আশ্রয় নিতে পারবে।
অনেককেই বলতে শোনা যায়, আগে মানুষের সমস্যার সমাধান হোক, পরে প্রাণী ও উদ্ভিদের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা যাবে। এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কিছু হতে পারে না। উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ তথা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে মানুষও টিকে থাকতে পারবে না, সেই সত্যটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। মানুষের সব সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান কোনো দিনই হবে না। আর প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়েও আনা যাবে না। কাজেই এটি আলাদাভাবে না দেখে দ্রুত দেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আমাদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সুন্দরবন নিয়ে তরুণ সমাজের মধ্যে যে রকম উৎসাহ আমরা দেখেছিলাম, দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের একইভাবে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। শুধু সুন্দরবন নয়, আমাদের সব সংরক্ষিত বনাঞ্চলকেই উপযুক্তভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। আর তা করা গেলে বিশ্বে আমাদের সম্মান অনেক বেড়ে যাবে।
fmahmud53@yahoo.com

চৈতন্যের মুক্ত বাতায়ন-বেঁচে থাকতে হলে আশাবাদী হতেই হবে by যতীন সরকার

অপরিমেয় রক্ত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাকিস্তানের শৃঙ্খল ছিন্ন করে যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, সেই বাংলাদেশেই যখন পাকিস্তানের ভূতের আছর হয়, এবং 'এর চেয়ে পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলাম'-এর মতো কথা বাংলাদেশের মানুষই যখন বলে ফেলে, বিশেষ করে পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশকে যখন বারবার সেনাশাসনে নিষ্পিষ্ট হতে দেখি, তখন এক অসহনীয় বেদনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি। সেই বেদনা থেকে কি কোনো দিন আমাদের মুক্তি ঘটবে না?


পাকিস্তানের ভূতের আছর থেকে কি কোনো দিনই আমরা মুক্ত হতে পারব না? এ রকম প্রশ্নে যে সময় প্রতিনিয়তই বিদ্ধ হচ্ছিলাম, সে সময়ই হাতে আসে 'পূর্বাপর ১৯৭১' নামের একটি বই। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত বইটির লেখক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমান। বইটির পরিচিতি প্রসঙ্গে এর মলাটে যা লেখা হয়েছে তার শেষ দুটি বাক্য- 'কেবল সামরিক ইতিহাস বিবেচনায় নয়, পাকিস্তান-যুগ এবং তৎকালীন সামরিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক উপাদান মিলবে এই গ্রন্থে। ইতিহাস নিয়ে যাঁরা চিন্তাভাবনা করেন, সমরশক্তির গঠন ও মনস্তত্ত্ব যাঁদের বিবেচ্য, তাঁদের বারবার ফিরতে হবে এই গ্রন্থের কাছে।'
কথাগুলো যে পুরোপুরি সত্য, বইটির পাঠ সমাপনের পর সে বিষয়ে আমি নিঃসংশয়। বইটি সম্পর্কে আগে আমি অন্যত্র যা লিখেছি, সে কথাগুলোই আজ আবার কালের কণ্ঠের পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করছি।
'বেঙ্গল রেজিমেন্টের পথিকৃৎ' মেজর খলিল ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম চলাকালেও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পালাতে পারেননি। এরপর তিনি আটক হন বন্দিশিবিরে। সেসব অভিজ্ঞতা নিয়েই রচিত তাঁর বই 'পূর্বাপর ১৯৭১'। বইটির উপশিরোনাম 'পাকিস্তানি সেনা-গহ্বর থেকে দেখা'। এই উপশিরোনামটিই বইয়ের বর্ণনীয় বিষয়কে স্পষ্ট করে তুলেছে, 'সেনা-গহ্বর' কথাটি হয়েছে খুবই তাৎপর্যবহ। যে স্থানে তিনি কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছেন, সে স্থানটিকে 'গহ্বর' ছাড়া আর কিছুই বলা যেতে পারে না। এই গহ্বরে যাঁরা তাঁর সহবাসী ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশকেই বলা যায় 'কূপমণ্ডূক' বা কুয়ার ব্যাঙ।
এই কুয়ার ব্যাঙদের পরিচয় তিনি তুলে ধরেছেন বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে, 'পাকিস্তানিদের সীমাহীন অজ্ঞতা' শিরোনামে। ব্রিগেডিয়ার তোজাম্মেল, ক্যাপ্টেন জিলানি, মেজর মাহমুদ আতাউল্লাহ, অনারারি ক্যাপ্টেন সৈয়দ আসকার হুসেন, কর্নেল শিনারি- এ রকম বিভিন্ন পদমর্যাদার সেনানায়করা যে একেকজন ছিলেন অজ্ঞতার ডিপো, সে কথা মেজর জেনারেল খলিলের বইয়ে না পড়ে অন্য কারো মুখে শুনলে আমি বিশ্বাসই করতে পারতাম না। বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে ওদের অজ্ঞতা ও অজ্ঞতাজাত অবজ্ঞা যে ছিল সীমাহীন, তাঁর বইয়ে সেসবের বহু দৃষ্টান্ত তিনি উপস্থাপন করেছেন। তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মানুষ যে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়েই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে- এই জ্ঞানটুকুও ওখানকার সেনাপতিদের ছিল না। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে ওরা মনে করত পাকিস্তানে দুশমন ভারতীয়দের সৃষ্ট 'গণ্ডগোল' মাত্র।
শুধু সেনানায়করা নয়, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সব শ্রেণী-পেশার মানুষই বাঙাল মুলুক সম্পর্কে ছিল একই রকম অজ্ঞতা ও অবজ্ঞা। কিছু 'উচ্চশিক্ষিত ও পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি, যাঁরা পূর্বাঞ্চলে পশ্চিমের শোষণ-শাসন সম্পর্কে তাঁদের লেখায় ও কথায় প্রতিবাদ করতেন' তাঁরা ছিলেন একেবারেই 'মুষ্টিমেয় সংখ্যক'। আর সেখানকার 'অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত জনগণ, যারা পুরো জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ' তাদের মতামত সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলেই খলিল মনে করেন না। কারণ 'এই উপমহাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানই একমাত্র দেশ, যেখানে সামন্ততন্ত্র বিদ্যমান এবং তা অত্যন্ত রূঢ় ও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই সামন্ততন্ত্রে জমির মালিকানার ক্ষেত্রে প্রজাদের কোনো অধিকার নেই। এরা যখন তখন মালিকের খামখেয়ালির ওপর সর্বতোভাবে নির্ভরশীল। সামন্তপ্রভু তাদের যা জানাবে তা-ই তারা জানবে, যা শেখাবে তা-ই তারা শিখবে, যাকে ভোট দিতে বলবে তাকেই তারা ভোট দেবে।'
এদের সঙ্গে প্রতিতুলনায় বাংলাদেশের 'অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত জনগণ' যে অনেক বেশি অগ্রসর, সে কথা ভেবে খুবই আত্মপ্রসন্ন হতে পারি বৈকি। আমাদের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে তো গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। তবু ওই বুদ্ধিজীবীদের ভেতরকার গাদ্দার ও মেরুদণ্ডহীনদের সংখ্যাটিও একেবারে ক্ষীণ নয়। এ রকম কিছুসংখ্যক বাঙালির প্রসঙ্গও খলিলের বইয়ে উঠে এসেছে। এদের মধ্যেই আছে শহীদ মুনীর চৌধুরীর ভাই কর্নেল কাইয়ুম চৌধুরীর নাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার সুযোগ পেয়েও কাইয়ুম চৌধুরী পালিয়ে তো আসেনইনি, বরং সে সময় রেডিও পাকিস্তানে প্রচারিত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে 'গাদ্দার' সম্বোধন করে বলেন, 'মুজিব তুমি জানো না তোমার মতো কুলাঙ্গার এই সোনার দেশটির কী ক্ষতি করেছে ও করছে।' একাত্তরের চৌদ্দই ডিসেম্বরে তাঁর ভাই মুনীর চৌধুরীর শহীদ হওয়ার খবর পেয়েও তিনি বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেই ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মুক্তিযোদ্ধারাই মুনীর চৌধুরীকে হত্যা করেছে।
তবু, এর পরও, কর্নেল কাইয়ুম চৌধুরীর জন্য আমার মনের গভীরে কিছুটা হলেও শ্রদ্ধার উপস্থিতি অনুভব করি। কারণ তিনি পাকিস্তানকেই তাঁর স্বদেশ বলে গ্রহণ করেছেন, সেই স্বদেশের প্রতি প্রীতিতে তাঁর একটুও খাদ নেই, পাকিস্তানের সেবাদাসত্ব করেছেন মনপ্রাণ দিয়ে, এখনো তা-ই করে যাচ্ছেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ফিরে এসে নানা ধানাইপানাই করে নিজেকে ধোয়া তুলসীপাতা প্রমাণের চেষ্টা করেননি। নিজের বিশ্বাসে তিনি সৎ, তাঁর এই সততা অবশ্যই প্রশংসনীয়।
কিন্তু সামান্য প্রশংসা কি প্রাপ্য পাকিস্তানপ্রেমী বাঙালি কূটনীতিক রিয়াজ রহমানের? দখলদার পাকিস্তানি সেনানায়কের আদেশে বিদেশে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারকারী বিদ্বান কাজী দীন মুহম্মদের? একই রকম অপকর্মে নিয়োজিত মেরুদণ্ডহীন অথচ ব্যক্তিগত স্বার্থসচেতন বিচারপতি নূরুল ইসলামের?
দিলি্ল দূতাবাসে পাকিস্তান কর্তৃক নিযুক্ত বাঙালি দ্বিতীয় সচিব রিয়াজ রহমান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে যোগ না দিয়ে একাত্তরের জুন-জুলাইয়ের দিকে চলে যান করাচিতে। দীর্ঘকাল একান্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে পাকিস্তানি প্রভুদের মনোরঞ্জন করে ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং অধিষ্ঠিত হন এ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে- একসময় রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র সচিবের পদও লাভ করেন। বিচারপতি নূরুল ইসলামও শেখ মুজিব সরকারের পতনের পর 'রাজনীতিতে জড়িত হয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গেই একাত্ম' হন। তেমনই স্বাধীনতার সক্রিয় বিরোধিতকারী ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদও স্বাধীন দেশে মর্যাদাপূর্ণ জীবনই যাপন করে গেলেন। অথচ এদেরই বিপরীতে অবস্থান নিয়ে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতাসংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন যাঁরা, তাঁদের অনেককেই স্বাধীন দেশে চূড়ান্ত মর্যাদাহীন জীবন কাটাতে হয়েছে। এসব দেখেশুনেই মেজর জেনারেল খলিল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন-
'মুক্তিযুদ্ধকে যদি একটি বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করা যায় তাহলে এটাও প্রকাশ পাবে যে বিপ্লবের চিরাচরিত নীতি অনুযায়ী বিপ্লব-পরবর্তী ইতিহাসের অধ্যায় বিপ্লবের সন্তানরাই প্রথম কোরবানি হয় এবং যারা বিপ্লবের বিরোধিতা করে কিংবা যারা বিপ্লব থেকে নিজেদের সযত্নে দূরে রাখে, তারাই বিপ্লবের ফল ভোগ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।'
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ তথা জাতীয় বিপ্লবকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য তদানীন্তন পাকিস্তানি শাসকরা যেসব কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছিল, সেসবেরই একটি হলো শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। ঊনসত্তরের 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' ও তার পরিণতির কথা আমরা সবাই জানি; কিন্তু একাত্তরে বন্দি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে পাকিস্তান যে বিচারের প্রহসন করেছিল, সে সম্পর্কে সামান্য ভাসা ভাসা কথা ছাড়া তেমন কিছু আমাদের জানা নেই। এই প্রায়-অজানা বিষয়টি খলিল তাঁর বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে বিবৃত করেছেন। এটি পড়ে জানা যায় যে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ঊনসত্তরের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতোই দাঁড় করানো হয়েছিল 'জয়দেবপুর ষড়যন্ত্র মামলা'। খলিলের বর্ণনায়-
'তথাকথিত ষড়যন্ত্রটি হয়েছিল জয়দেবপুর রাজপ্রাসাদে, ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে। সেখানে তখন মোতায়েন ছিল দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তার অধিনায়ক ছিলেন কর্নেল মাসুদ। ষড়যন্ত্রটিতে জেনারেল ওসমানী, মজুমদারসহ সব বাঙালি সিনিয়র অফিসার জড়িত ছিলেন। ষড়যন্ত্রের কথিত সিদ্ধান্ত ছিল যে সব বাঙালি সৈনিক অতর্কিতে পাকিস্তান সেনাছাউনিতে পাঞ্জাবি সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণ করবে এবং তাদের অস্ত্রাগার দখল করে নেবে। এরপর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় থাকবে না, অতএব পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যাবে।'
সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট এই 'ষড়যন্ত্র মামলা'র বিচারের জন্য লায়ালপুরে কোর্ট মার্শাল গোছের একটি বিশেষ আদালত স্থাপন করে তার প্রেসিডেন্ট বানানো হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার রহিমউদ্দিনকে। আর এই প্রহসনের বিচারে পূর্ব পাকিস্তানে থেকে কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিকে দিয়ে সাক্ষ্য দেয়ানো হলেও আসল সাক্ষী ছিলেন তিনজন বাঙালি সেনা অফিসার- ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার, লেফটেনেন্ট কর্নেল মুহম্মদ ইয়াসিন ও লেফটেনেন্ট কর্নেল মাসুদুল হুসেন খান। তাঁদের কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, খলিলের বইয়ে তার বিবরণ পড়ে রক্ত হিম হয়ে যায়, দম বন্ধ হয়ে আসে, ঘৃণায় সব শরীর কুঞ্চিত হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি বর্বর সেনাদের প্রতিই নয় শুধু, এ কে ব্রোহীর মতো বিদ্বান বুদ্ধিজীবীর আচরণেও গা শিরশির করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যদিও পাকিস্তানি সেনা শাসকদের প্রহসনের আদালতকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেননি বা কোনো আইনজীবী নিয়োগে রাজি হননি, তবু দুনিয়ার সামনে বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক সরকার সিন্ধুর প্রখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহীকে ডিফেন্স কাউন্সিলর নিযুক্ত করে। কিন্তু ব্রোহী কেবল সাক্ষীগোপাল হয়েই থাকলেন, ডিফেন্স কাউন্সিলর হিসেবে কোনো দায়িত্বই তিনি পালন করলেন না, পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের অবৈধ বিচারপ্রক্রিয়া বৈধতা প্রদানের কাজটিই বিশ্বস্ততার সঙ্গে করে গেলেন। প্রহসনের বিচারে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হলো।
তবু এতসব ষড়যন্ত্র আর অমানবিক আচরণ ও পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয়কে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না, বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করল, বঙ্গবন্ধুও পাকিস্তানের বর্বর শাসকদের ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। অনেক দিন পাকিস্তানের বন্দিশিবিরে বাস করে, অনেক অভিজ্ঞতার ঝুলি কাঁধে নিয়ে মেজর জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমানও ফিরে এলেন স্বাধীন স্বদেশেই- ১৯৭৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর।
বইয়ের এক স্থানে লেখক পাকিস্তানের দুজন একান্ত সংবেদনশীল ও দূরদর্শী মানুষের স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে দুটি 'ভবিষ্যদ্বাণী'র উল্লেখ করেছেন। একটি পাকিস্তানের একজন সুশিক্ষিত উচ্চমানসম্পন্ন ও চরিত্রবান সেনানায়ক জেনারেল শওকত রেজার, অন্যটি 'সীমান্ত গান্ধী' খান আবদুল গাফ্ফার খানের। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে- এই খবরটি শুনে শওকত রেজা লেখককে বলেছিলেন, 'বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। ওখানে কোনো প্রতিরক্ষার সমস্যা নেই বলে তেমন কোনো বৃহৎ প্রতিরক্ষা বাহিনীর কিংবা প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত খরচের প্রয়োজনও নেই। অতএব, অতি শিগগির তোমরা অর্থনৈতিক উন্নতির দিক দিয়ে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাবে।'
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফ্ফার খান ছিলেন কাবুলে স্বেচ্ছানির্বাসিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, 'এই উপমহাদেশে একমাত্র বাংলাদেশেই নিখুঁত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে ও কার্যকর থাকবে।'
বাংলাদেশ সম্পর্কে জেনারেল শওকত রেজা ও সীমান্ত গান্ধীর বলিষ্ঠ আশাবাদের কথা স্মরণ করে খলিল লিখেছেন-
'প্রতিভাবান ও প্রজ্ঞাবান এই দুই ব্যক্তির ভবিষ্যদ্বাণী এখনো প্রায় প্রতিদিন আমার মনে পড়ে। তাঁদের কথা আংশিকভাবে সত্য হয়নি, এ কথা বলতে পারব না। তবে পুরোপুরি সত্য হওয়ার জন্য এখনো এই তিন যুগ পরও অপেক্ষা করে আছি। আমার বিশ্বাস, দুজনেরই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হবে। তবে কত দিন লাগবে জানি না।'
আমরা কেউই জানি না। কিন্তু এই দুজন ধীমানের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হবে বলে যদি না মানি, তাহলে আমাদের কারোরই বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই। বেঁচে থাকতে হলে আশাবাদী হতেই হবে। তবে সেই সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিত : আশাবাদকে সার্থক করতে হলে প্রতি মুহূর্তেই সতর্ক ও সক্রিয় হতে হয়, অসতর্ক ও নিষ্ক্রিয় আশাবাদ বুদ্ধুদের মতোই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আর মহৎ মানুষ কখনো ফলিত জ্যোতিষীর মতো ভবিষ্যদ্বাণী করেন না; তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী কতকগুলো সম্ভাবনার প্রতিই অঙ্গুলি নির্দেশ করে মাত্র, সংশ্লিষ্ট মানুষজনকে কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তব করে তুলতে হয় এবং তখনই ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়ে ওঠে। শওকত রেজা ও গাফ্ফার খানের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।
মেজর জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমানের বইয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার বিবরণ পড়তে পড়তে উনিশ শতকের একজন প্রায় অখ্যাত লেখক সেখ আবদুল লতিফের (ইনি সেই প্রখ্যাত নবাব আবদুল লতিফ নন) কথা আমার বারবার মনে পড়ছিল। সেখ আবদুল লতিফ মনে করতেন যে 'সৈনিক বৃত্তি অবলম্বন করে মানুষ তার মহৎ শক্তির অপব্যবহার করে।' ১৮৭৮ সালে ইনি 'মানব সংস্কারক' নামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। সে বইয়ে 'সৈন্য' শীর্ষক প্রবন্ধটিকে তিনি লিখেছিলেন-
'আহা! কতদিনে সংসারে ধর্মের রাজত্ব হইবে, যুদ্ধের মূল উচ্ছেদ হইবে, সৈনিক কর্ম অদৃশ্য হইবে। একবার ভাব পৃথিবীতে কত সৈন্য আছে, তাহারা কত অর্থ অপব্যবহার করিতেছে, কত পরিশ্রমে নষ্ট করিতেছে; তাহারা কত কর্মসাধন করিতে পারিত, সমাজের কত উপকার করিতে পারিত। এক দেশে সৈন্য থাকিলে অন্য দেশীয়রা ভয় করিতে পারে, কোন দেশে না থাকে কিছু সন্দেহ উপস্থিত হইতে পারে না। আহা! কতদিনে সেই দিনের উদয় হইবে।'
যত দিনই লাগুক 'সেই দিনের উদয় হইবেই' এবং সেদিনই আমাদের মুক্তির সংগ্রাম প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়ে উঠবে- আমার মনের গভীরে আমি এ রকম গভীর বিশ্বাসই লালন করি।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ধর্ম-ইসলাম মানবপ্রেমের কথা বলে by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলামে মানুষের হূদয়বৃত্তির ব্যাপক একটি ভুবনের কথা বলা হয়েছে। ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষ স্বভাবতই নিজেকে ভালোবাসে। এ কারণে সে তার সৃষ্টিকর্তাকেও ভালোবাসে। মূলত ভালোবাসা দুটি পর্যায়ে বিভক্ত, একটি হলো স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির প্রেম আর অপরটি হলো সৃষ্টির সঙ্গে সৃষ্টির প্রেম।


নিজের প্রতি ভালোবাসার মূলসূত্র ধরেই মানুষ তার বাবা-মা, ভাইবোন, সন্তানসন্ততি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এমনকি উপকারীকেও ভালোবাসে। আর এ ভালোবাসা পেতেই সে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রয়াসে লিপ্ত হয়। স্রষ্টা নিজেও তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসেন এবং ভালোবাসার পাত্রের জন্য পৃথিবীকে সুশোভিত করে সাজিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসে।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত-৫৪)
মানুষকে সৃষ্টিগত দাবি অনুসারেই সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসতে হবে এবং তিনি যে পথ অনুসরণ করতে বলেছেন, তা অনুসরণ করতে হবে। স্রষ্টাপ্রেম হবে সব ভালোবাসার ঊর্ধ্বে এবং সে পথ হবে সব পথের ঊর্ধ্বে। তাহলেই হবে সৃষ্টির সার্থকতা এবং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সুসম্পর্ক। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা স্রষ্টাপ্রদত্ত একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য বিষয়; তাই এটি মানব মন ও দৈনন্দিন জীবনে ঈমানের দাবি। প্রাকৃতিক পরিবেশের অপরূপ সৌন্দর্য তথা গাছপালা, ফুল-পাখি, নদী-সমুদ্র, আকাশ এবং নানা মনোহারিণী বিষয়কে না ভালোবাসলে নিজের সন্তানকেও ভালোবাসা যায় না। তেমনি সৃষ্টিজগৎকে না ভালোবাসলে স্রষ্টাকেও ভালোবাসা যায় না। ফলে কোনো রকম প্রত্যাশা ছাড়াই মানুষ প্রকৃতিপ্রেমে নিমগ্ন হয়, অনেকে আপনজনহীন হয়েও একদল অনাত্মীয়ের ভীড়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। কেউ অসহায় কোনো মানুষ, শিশু বা জীবজন্তুর প্রতিও নিঃস্বার্থে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং তাকে কেন্দ্র করে নিজের জীবন চলার পথ বদলে ফেলে। মানবপ্রেম সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি (আল্লাহ) তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আর-রূম, আয়াত-২১)
জাগতিক সব কাজকর্ম ও নেক আমল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা সুদৃঢ় করার উপলক্ষ মাত্র। সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি লাভই ধর্মপ্রাণ মানুষের সর্বোচ্চ মর্যাদার সম্বল। স্রষ্টাপ্রেম অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে তাঁর প্রতি গভীর ধ্যানমগ্নতা, আত্মসমর্পণ ও মনোনিবেশ করা। সমগ্র সৃষ্টি তার স্রষ্টাকে ভালোবাসে, আর স্রষ্টা নিজে তাঁর সর্বোত্তম সৃষ্টি ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ভালোবাসেন। মানবীয় গুণাবলির বিকাশ সাধন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরপারে পরিত্রাণ লাভ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ বাস্তবায়ন ও তাঁর ভালোবাসা অন্তরে স্থান দেওয়া ব্যতীত কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে দিকনির্দেশনা প্রদান করে ঘোষিত হয়েছে, ‘বলো, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৩১)
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবশ্রেণীতে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠতম পাত্র হচ্ছেন বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত নবীকুল শিরোমণি হজরত মুহাম্মদ (সা.)। কারণ, উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও অবদান সবচেয়ে বেশি। নবী করিম (সা.) তাঁর উম্মতকে দুটি কারণে ভালোবাসেন। ১. যারা তাঁর আনীত বিধিবিধান তথা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালিত করবে। ২. তাঁকে ভালোবেসে যাঁরা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং তাঁর ভালোবাসার পাত্র হয়েছিলেন। ইসলামি শরিয়তে নবী করিম (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা একটি অপরিহার্য কর্তব্য, যার অবর্তমানে ঈমানই পরিশুদ্ধ হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তানসন্ততি এবং সমগ্র বিশ্ববাসী অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় না হব।’ (বুখারি ও মুসলিম) তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা ঈমান না আনা পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আবার পরস্পরকে ভালোবাসতে না পারা পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না।’ (মুসলিম)
মানুষ যে উৎসের পরিপ্রেক্ষিতে একে অন্যকে ভালোবাসে, এ সম্পর্কে গভীরভাবে বিবেচনা করলে নির্দ্বিধায় বলতে বাধ্য হবে—আমার প্রেম-ভালোবাসা, জীবন-মৃত্যু, আমার সর্বস্ব সেই মহান সত্তার জন্য নিবেদিত, যিনি আমার সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা; যেমনিভাবে বলেছিলেন মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ—সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, যিনি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত-১৬২) তাই মুমিন মুসলমান হতে হলে অবশ্যই প্রত্যেক মানুষকে তার জীবন, সম্পদ, সন্তানসন্ততি—সবকিছুর চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সর্বাধিক ভালোবাসতে হবে। তাঁর হুকুম-আহকাম বা বিধিবিধানগুলো শুধু জাহান্নামের ভয়েই নয়, বরং স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার জন্য পালন করতে হবে।
সৃষ্টিকর্তা মানুষের স্বভাব-চরিত্রে যে প্রেমবোধ দিয়েছেন, তা শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সর্বব্যাপী। তাই মানুষ আপনজনের গণ্ডি ছাড়িয়ে তার ভালোবাসা আশপাশের সুবিস্তৃত পরিবেশমণ্ডলীতে ছড়িয়ে দেয়। ফলে দয়া-মায়া, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা এবং হূদয়ের টান একজন মানুষের পক্ষ থেকে অন্য মানুষ অবশ্যই পেতে পারে। একজন মানবের ভালোবাসা একজন মানবীও পেতে পারেন। তবে সে ভালোবাসা হতে হবে বৈধ ও অনুমোদিত। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা কেবল শরিয়তের অনুমোদনের গণ্ডিতেই আবদ্ধ নয়; বরং তা বহুবিধ পুণ্যময় কাজ। ভালোবাসা পোষণ ও প্রকাশের বৈধ কোনো সম্পর্ক ছাড়া ইসলামে একজন মানব-মানবীর মধ্যে হূদয়ের কোনো টান থাকা এবং প্রেমকে আরও গভীর করার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে একজনের প্রতি অন্যের ভালোবাসা হতে হবে ‘ফিল্লাহ’ বা আল্লাহর ওয়াস্তে। অর্থাৎ, আমি তাকে ভালোবাসব এ জন্য যে তার প্রতি আমার ভালোবাসা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত। কেননা যারা মুমিন, তারা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
তবে প্রেম-ভালোবাসা প্রকাশের প্রতিযোগিতায় জঘন্য পাপাচার, ব্যভিচার ও অশ্লীলতায় নিমজ্জিত হওয়ার চেয়ে মনকে প্রকৃত অর্থে মানবপ্রেমের উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা একান্ত কর্তব্য হওয়া উচিত। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবকিছুর ঊর্ধ্বে সঠিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে প্রাণাধিক ভালোবাসার তাওফিক দান করুন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড দাওয়াহ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

গ্যাসসম্পদ-গ্যাজপ্রমের সঙ্গে পেট্রোবাংলার চুক্তি কী দেবে? by মুশফিকুর রহমান

পেট্রোবাংলার অধীন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড ও বাপেক্সের সঙ্গে গত ২০ জানুয়ারি গ্যাজপ্রম ২০ মাসে মোট ১০টি গ্যাসকূপ খননের চুক্তি অনুস্বাক্ষর করেছে। সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে এ চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছে।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাশিয়ায় আন্তর্জাতিক বাঘসংক্রান্ত সম্মেলনে গেলে দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে জ্বালানি খাতসহ বহুমুখী সহযোগিতার আলোচনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তেল-গ্যাস উত্তোলন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম বাংলাদেশে পেট্রোবাংলার সঙ্গে কাজের আগ্রহ দেখায়। স্মর্তব্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নে রাশিয়ার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কামতা ও বেগমগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে রুশ সহযোগিতায়।
অনুস্বাক্ষর করা চুক্তির আইনগত ভেটিং শেষে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর (আশা করা হচ্ছে, এই ফেব্রুয়ারি মাসে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হবে) গ্যাজপ্রম কারিগরি জনবলসহ দুটি ড্রিলিং রিগ আমদানি করে তিতাস (চারটি), রশীদপুর (একটি), সেমুতাং (একটি), বেগমগঞ্জ (একটি), শ্রীকাইল (একটি) ও শাহবাজপুরে (দুটি) গ্যাসকূপ খনন করবে। গড়ে প্রায় তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ মিটার গভীরতার ১০টি গ্যাসকূপ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলে পেট্রোবাংলা গ্যাজপ্রমকে পর্যায়ক্রমে ১৯৩.৩২ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করবে। চুক্তি অনুযায়ী, গ্যাজপ্রমকে কূপ খননের পাশাপাশি সম্ভাব্য ব্লো-আউট বা বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। তা ছাড়া কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঠিকাদার হিসেবে গ্যাজপ্রম আন্তর্জাতিক ইনসু্যুরেন্সের অধীনে ক্ষতিপূরণ দিতে দায়বদ্ধ। বিশেষভাবে এ বিষয়টি তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসকূপ খননের বিপদমাত্রা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
পেট্রোবাংলা আশা করছে ১০টি গ্যাসকূপ খনন সম্পন্ন করে সেগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন করা গেলে ২০১৩ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। পেট্রোবাংলা ১৫ বছরের বিভিন্ন গ্যাসকূপ খননের (বাপেক্স ও এ দেশে বহুজাতিক কোম্পানির কূপ খনন ব্যয়সহ) ব্যয় পর্যালোচনায় গ্যাজপ্রমের সঙ্গে সম্মত হওয়া ব্যয় সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচনা করছে। তা ছাড়া নতুন গ্যাসকূপ খননের পর তা গ্যাস উৎপাদন শুরু করলে বিনিয়োজিত অর্থ দ্রুতই উঠে আসবে।
সম্প্রতি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেছেন, ২০১৫ পর্যন্ত জ্বালানি গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে, সংস্থাটির পক্ষের সে চাহিদার গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয়। জ্বালানি গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির বিভিন্ন খবর প্রচারমাধ্যমে নিয়মিতই প্রকাশিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের গ্যাসসংকট নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর চট্টগ্রামের রাউজান ও শিকলবাহা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র গত নভেম্বর থেকে গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করেছে। কিন্তু রাউজান বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দেওয়া গেলে সেখানকার দুই ইউনিট থেকে ৩৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারত। এ জন্য দরকার হতো দৈনিক ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট পরিমাণ গ্যাস। একইভাবে কর্ণফুলী পাড়ের শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬০ মেগাওয়াট ও ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার দুটি ইউনিট চালাতে দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার প্রায় ৬৭ শতাংশ এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। দেশে শিল্প, বাণিজ্য ও গৃহস্থালির চাহিদা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে নতুন উৎপাদন যোগ করা সত্ত্ব্বেও প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি এখন স্পষ্ট। গ্যাসের নতুন সংযোগ পেতে আগ্রহী গ্রাহকের চাহিদা হিসাবে নিলে প্রাক্কলিত ঘাটতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
গ্যাস উৎপাদনে পেট্রোবাংলার সঙ্গে অংশীদারি চুক্তির অধীনে বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও পটুয়াখালীর কাজল এলাকার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে কূপ খনন করে গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের পরিকল্পনা বড় রকমের হোঁচট খেয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্প গভীরের সমুদ্রবক্ষে সাংগু গ্যাসক্ষেত্রও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এক দশক আগেও যে সাংগু গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হতো, এখন সেখান থেকে দৈনিক মাত্র সাত-আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদন অংশীদারি চুক্তির অধীনে বহুজাতিক কোম্পানি সান্তোস সম্প্রতি সাংগুতে তিনটি কূপ খনন করেছে কিন্তু সেগুলোতে প্রত্যাশার গ্যাস মেলেনি। সেই প্রেক্ষাপটে পেট্রোবাংলার অধীন কোম্পানি বাপেক্সের গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন দ্রুততর করা এবং উৎপাদনক্ষম গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে আরও বেশি উৎপাদন কূপ খনন করা এখন জরুরি।
বাপেক্স এখন অন্য সময়ের তুলনায় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননকাজে খুবই ব্যস্ত সময় পার করছে। ইতিমধ্যে ত্রিমাত্রিক ও দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপে বাপেক্স নতুন কূপ খননের জায়গা চিহ্নিত করছে। ২০১৫ সালের মধ্যে বাপেক্সের বিদ্যমান পাঁচটি ড্রিলিং রিগ ও কারিগরি জনবল দিয়ে দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে ন্যূনতম ২৪টি গ্যাসকূপ খনন করার কথা। বাপেক্সের বিদ্যমান সামর্থ্য দিয়ে একের পর এক গ্যাসকূপ খনন অব্যাহত রাখলেও দেশের স্থলভাগে কাজের পরিমাণ বিবেচনায় তা অপর্যাপ্ত। ফলে পেট্রোবাংলাকে কনট্রাক্টর ড্রিলিং কোম্পানির সন্ধান করতে হয়েছে।
আমাদের দেশে বিশেষায়িত ঠিকাদার নির্বাচন বেশ সময়সাপেক্ষ কিন্তু পেট্রোবাংলার ওপর গ্যাস সরবরাহ দ্রুততর করার চাপ প্রবল। ২০১০ সালের নভেম্বরে পেট্রোবাংলা বৃহত্তর চট্টগ্রামের পটিয়া, জলদি, কাসালং ও সীতাপাহাড়ের সম্ভাবনাময় গ্যাসসমৃদ্ধ ভূগঠনে অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য রাশিয়া, চীন, কোরিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারতের আগ্রহী আটটি রাষ্ট্রীয় মালিকানার কোম্পানির কাছ থেকে যৌথ অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব আহ্বান করে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম, চীনের সিনোপেক, সিনুক, থাইল্যান্ডের পিটিটিইপি, ভারতের ওএনজিসি-বিদেশ আগ্রহ দেখালেও পরবর্তী সময়ে কাজের সীমিত পরিমাণের কারণে গ্যাজপ্রম পিছিয়ে যায়। চীনের সিনোপেকের সঙ্গে ওই চারটি ভূগঠনে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ আংশীদারির চুক্তি নিয়ে আলোচনা অনেকটুকু এগিয়েছে। বাপেক্স আশা করছে সিনোপেকের সঙ্গে এ চুক্তি নিয়ে সমঝোতা হবে।
ইতিপূর্বে দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্র তিতাস, রশীদপুরে পাঁচটি গ্যাস উন্নয়নকূপ খননের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের চেষ্টায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত পোল্যান্ডের ক্রাকভের সঙ্গে আলোচনা শেষপর্যায়ে এসে ভেঙে যায়। ২০০৫ থেকে একটানা তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস উদগিরণ ক্রাকভকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। এরই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার গ্যাজপ্রমের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি পেট্রোবাংলার জন্য স্বস্তির সুযোগ এনে দিয়েছে।
যদি বর্তমানের গ্যাসের চাহিদা (দৈনিক প্রায় দুই হাজার ৫২০ মিলিয়ন ঘনফুট) অনড় থাকত এবং পেট্রোবাংলার প্রত্যাশা অনুযায়ী পেট্রোবাংলার পরিকল্পিত গ্যাসকূপগুলোর খনন সময়মতো সফলভাবে সম্পন্ন হতো; তাহলে দেশের গ্যাস সরবরাহের বর্তমান ঘাটতি প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারত। কিন্তু উৎপাদন কূপগুলোর কোনো কোনোটির গ্যাস ফুরিয়ে আসছে; অন্যদিকে উৎপাদনের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস সঞ্চালনের অবকাঠামো ঘাটতি বাধা হিসেবে বিদ্যমান। সেই সঙ্গে বাড়ছে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান সে কারণেই সম্ভবত বলছেন, তাঁর সংস্থার একক প্রচেষ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি গ্যাস চাহিদার সবটুকু জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য প্রাথমিক জ্বালানির বহুমুখী সরবরাহ উৎস নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ড. মুশফিকুর রহমান: পরিবেশবিষয়ক লেখক।

ভাষার রাজনীতি-মাতৃভাষা নিয়ে কেন অহংবোধ থাকবে না? by মোহীত উল আলম

ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আমরা সচেতন হই যখন পাকিস্তানের স্রষ্টা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রথমবার তিনি এ ঘোষণা দেন ২১ মার্চ রেসকোর্সের একটি জনসভায়, সেখানে তিনি প্রতিবাদের সম্মুখীন হন।


২৪ মার্চ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে একই বক্তব্য দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ভাষা নিয়ে পাকিস্তানে রাজনীতি শুরু হয়। আমাদের ভাষা স্বাতন্ত্র্যবোধ ক্রমে ক্রমে রাজনৈতিক স্বাজাত্যবোধে পরিণত হয়। কিন্তু এখনো আমরা কবি আবদুল হাকিমের সেই অনন্য পঙিক্তঋদ্ধ অনুশোচনার বাইরে আসতে পারিনি: ‘যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।’
আমার আজকের আলোচনায় বাংলা ভাষার বিপরীতে ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের একটি তুলনামূলক প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেখাতে চাইব যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উন্নতির জন্য এবং বাংলাদেশকে স্বয়ম্ভর একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোতে দাঁড় করানোর জন্য সর্বস্তরে মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষার কার্যকর প্রচলন ছাড়া উপায় নেই।
তবে ভাষার রাজনৈতিক পরিচয় বোঝার জন্য নিম্নোক্ত সরস আখ্যানটি উপভোগ্য হতে পারে। গল্পটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে। একবার তাঁর গৃহে অতিথি এলে তাঁকে আপ্যায়নের জন্য তিনি ভৃত্যকে ডাকছিলেন। কয়েকবার ডাকার পরও ভৃত্য সাড়া না দেওয়াতে তিনি যখন বিরক্ত হয়ে উঠছিলেন, তখন ভৃত্যের উদয় হয়। গামছা দিয়ে তখন সে হাত-মুখ মুছছিল। বিদ্যাসাগর বললেন, ‘কী রে, এতক্ষণ কোথায় ছিলি, ডেকে সাড়া পাচ্ছি না’। ভৃত্য বলল, ‘আজ্ঞে, আমি আহার করছিলুম’। বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, ‘ব্যাটা, তুই আহার করছিলি না, তুই গিলছিলি, আহার করেন বাবুরা’।
‘আহার করা’ আর ‘গেলা’র পার্থক্যের মধ্যে পৃথিবীর যত শ্রেণীগত রাজনীতির কথা, যত শোষণের গল্প লুকিয়ে আছে। প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ডেভিড ক্রিস্টালের একটি চটি বই আছে ইংলিশ: দ্য গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ, ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত। বইটিতে ইংরেজি কীভাবে বিশ্বভাষায় পরিণত হলো তার একটি নিটোল বর্ণনা আছে। ভারতে ইংরেজির ক্রম-অধিষ্ঠান বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি একটি কৌশল অবলম্বন করলেন। ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব সম্পর্কে তিনি স্রেফ নীরব রইলেন। যেন এ দুটো ঘটনা ঘটেইনি। ব্যাপারটা তাতে এমন দাঁড়াল যে ইংরেজি ভাষা যেন ভারতে কোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই বিকাশ লাভ করেছিল। এখানে ইংরেজি ভাষার ইতিহাস নিয়ে তাঁর রাজনীতিটা হলো বিশ্বদরবারে প্রমাণ করা যে ইংরেজি যেন কখনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাষা ছিল না, এটা যেন তার আপন মহিমাগুণে বিশ্বভাষায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, ইংরেজি ভাষার বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা লাভের পেছনে যে কামানের গোলা কাজ করেছিল, সেটি ক্রিস্টাল সচেতনভাবে এড়িয়ে গেলেন। ইংরেজি তাঁর মাতৃভাষা। সে জন্য ইংরেজির মাহাত্ম্য প্রচার করাই তাঁর উদ্দেশ্য।
১৭১৯ সালে প্রকাশিত ড্যানিয়েল ডিফোর জনপ্রিয় উপন্যাস রবিনসন ক্রুসোতে নায়ক ক্রুসোর সঙ্গে জনৈক দ্বীপবাসীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার কাহিনি আছে। লোকটি কৃষ্ণকায়। কিন্তু ক্রুসো প্রথমে যে কাজটি করেন, সেটি ঔপনিবেশিক রাজনীতির সাফল্যের সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগের সূচনাপর্ব বটে। লোকটির নাম দিলেন তিনি, ম্যান ফ্রাইডে। কারণ, লোকটিকে যেদিন নরখাদকদের হাত থেকে তিনি উদ্ধার করেন সেদিন ছিল শুক্রবার। (বলা বাহুল্য, পরবর্তীকালে ঐতিহাসিকেরা দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলসংলগ্ন দ্বীপাঞ্চলগুলোতে কোনো নরখাদক বা ক্যানিবল জনগোষ্ঠীর খোঁজ পাননি। এটি ছিল নিছক ডিফোর কল্পনা।) ম্যান ফ্রাইডেকে ইংরেজি ভাষা শেখানো হয় এবং ইংল্যান্ডেও নিয়ে আসা হয়। যেন এর আগে ফ্রাইডের নিজস্ব কোনো ভাষা ছিল না, সে ছিল বোবা।
ঔপনিবেশিক রাজনীতির এই সূত্রের প্রয়োগে অনেক দিন কলকাতা হয়ে পড়েছিল ‘ক্যালকাট্টা’, আর ঢাকা হয়ে পড়েছিল ‘ডাক্কা’। তবে, এ পর্ব হয়তো আমরা শুধু পার হয়ে এসেছি, কিন্তু এর প্রকোপ থেকে মুক্তি পেয়েছি বলা যাবে না। ভাষা নিয়ে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে এটিকে অপরকে বা শাসিতকে পরাভূত করে রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। ইংরেজ লর্ড ম্যাকলের কথা নিশ্চয় সবার মনে পড়ছে। পণ্ডিত লোক ছিলেন। ভারতীয়দের কোনো নিজস্ব জবান আছে সেটা বিশ্বাস করতে পারেননি, কেননা তাঁর ধারণায়, পুরো ভারতীয় আর পার্সি সাহিত্য অর্থাৎ পুরো প্রাচ্যের সাহিত্য যে ইউরোপের যেকোনো গ্রন্থাগারের দুই তাক বা র‌্যাক ভর্তি হয়েই শেষ হয়ে যাবে। তাই বললেন, ভারতীয়দের মুখে বুলি দিতে হবে। ১৮৩৫ সালে তাঁর বিখ্যাত শিক্ষানীতি পাস করিয়ে নিলেন, যাতে বলা হলো যে ভারতীয়দের মধ্যে বাছাইকৃত শিক্ষিত অংশ শুধু চামড়ায় থাকবে ভারতীয় কিন্তু বুলি তাদের হবে ইংরেজি। ম্যাকলের আমরা দুয়োরানির নাতিপুতি। আমরা তাই স্বাধীন বাংলাদেশে চড়বড়িয়ে বলে বেড়াচ্ছি যে ইংরেজি ছাড়া আমাদের চলবে না, ইংরেজি হচ্ছে জীবন, ইংলিশ ইজ লাইফ, চিকিৎসার ভাষায় যেটাকে বলা হবে কোরামিন। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ মানসিকতার সমালোচনা করতে গিয়ে টিভির একটি চ্যানেলে তাঁর স্বভাবসুলভ ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলেছেন, তা হলে জাপান, চীন, কোরিয়া, ব্রাজিল, রাশিয়া এমনকি মালয়েশিয়া পর্যন্ত ইংরেজি ছাড়া এত ওপরে উঠল কীভাবে!
ইংরেজি সভ্যতার সকল প্রকার মৌলিক চিন্তার উৎসযুগ ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের রেনেসাঁর সময়ে শেক্সপিয়ার ১৬১১ সালে তাঁর দ্য টেম্পেস্ট নাটকে ক্রুসোর পূর্বসূরি প্রসপেরোকে দিয়ে তাঁর ভৃত্য ক্যালিবানকে ঔপনিবেশিক ভাষা শেখানোর প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। ব্যাপারটার মধ্যে যে অস্বাভাবিকতা আছে, যেটা ম্যাকলে আন্দাজ করতে পারেননি, কিন্তু যেটা শেক্সপিয়ারের দূরদৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারেনি সেটার জায়গা দিতে গিয়ে শেক্সপিয়ার ক্যালিবানের মুখে সে বিখ্যাত অভিসম্পাতের ভাষা জুগিয়ে দিলেন: ‘ইয়ু টট মি ল্যাঙ্গুয়েজ; অ্যান্ড মাই প্রফিট অন ইট / ইজ আই নো হাউ টু কার্স’ (তুমি আমাকে ভাষা শিখিয়েছ, আর এতে আমার লাভ হলো, আমি জানি কীভাবে গালাগাল করতে হয়।)
১৬১১ সালে ইংল্যান্ডে ধর্মের জগতে আরেকটি বড় বিপ্লব ঘটে যায়। রাজা প্রথম জেইমসের উদ্যোগে ইংল্যান্ডের নির্বাচিত মনীষীরা মিলে পাঁচ বছরের অপরিসীম পরিশ্রমের পর পবিত্র বাইবেলের ইংরেজি ভাষান্তর প্রকাশ করেন, যেটি দ্য কিং জেইমস বাইবেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এটার ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডিসেম্বর ২০১১ সংখ্যার সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধটির লেখক অ্যাডাম নিকলসন জানাচ্ছেন, এ চারশ বছর পরও রাজা জেইমসের বাইবেলের ইংরেজি ভাষা যেমন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বিখ্যাত সংগীতকার বব মার্লের অনুসারী রাস্তাফারিয়ানদের অনুপ্রাণিত করছে, তেমনি করছে নিউ মেক্সিকো স্টেটের নাভাজো রিজারভেশনের ইন্ডিয়ান অশ্বারোহী রোম ওয়েজারকে। এরও প্রায় ৮৫ বছর আগে আরেক ইংরেজ সন্তান উইলিয়াম টিনডেল ১৫২৬ সালে বাইবেলকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। তখনো মুদ্রণশিল্প ইংল্যান্ডে প্রবেশ করেনি। টিনডেল তাঁর অনুবাদটি ছাপিয়েছিলেন জেনেভা থেকে। বাইবেলকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে তিনি এ জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন যে ল্যাটিন ভাষায় রচিত বাইবেল সাধারণ ইংরেজদের অধিগম্য ছিল না এবং তার ফলে ক্যাথলিক ধর্মযাজকেরা ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছিল। টিনডেল তাঁর এ কর্মের জন্য ঈশ্বরদ্রোহিতার অভিযোগে ১৫৩৬ সালে শিরশ্ছেদকৃত হলেও, রাজা জেইমসের লক্ষ্য ছিল কিন্তু ভিন্ন। তাঁর উদ্যোগে অনূদিত বাইবেলের একটি অতি পরিচিত শব্দগুচ্ছ হচ্ছে ‘দ্য পাওয়ারস দ্যাট বি’ (অর্থাৎ ঈশ্বরের শক্তির মতোই রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা পায়)। অর্থাৎ ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা হবে সাধারণ ইংরেজদের মনের কোঠায়, বাইবেল ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে নেওয়ার পেছনে এ ছিল তাঁর রাজনৈতিক অভীপ্সা। বাইবেলকে স্বচ্ছন্দ ইংরেজি ভাষায় অনূদিত করে রাজার মহিমা তিনি স্থায়ী করলেন, এটি হলো ভাষা নিয়ে তাঁর রাজনীতি। কিন্তু অনুবাদের ইংরেজি ভাষাটি এত চমৎকার হয়েছে যে বলা হয় ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য এত প্রবল এবং ইংল্যান্ডের পরাশক্তিসম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশ হয়ে ওঠার পেছনে এ অনূদিত বাইবেলের ভূমিকা অত্যন্ত প্রত্যক্ষ।
ইংরেজদের মাতৃভাষার মাধ্যমে ফুঁড়ে ওঠার সংগ্রামী ইতিহাস কম দীর্ঘ নয়। ১৫৮৬ সালে উইলিয়াম বুলোকার রচিত প্রথম ইংরেজি ব্যাকরণ লিখিত হয় প্যাম্ফলেট অব গ্রামার। তার পরও দেড় শ বছর পর্যন্ত, ১৭৫৫ সালে, স্যামুয়েল জনসনের অভিধান আ ডিকশনারি অব দ্য ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ বের না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষিত ইংরেজমাত্রই ইংরেজি ভাষার ব্যাকরণকে ম্লেচ্ছ বা অচ্ছুৎ মনে করতেন। বুলোকারের সময়কালীন ল্যাটিন এবং ফরাসি ভাষার প্রতিপত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত অন্যান্য ইংরেজ মনীষী ছিলেন টমাস এলিয়ট, রজার আসকাম (রানি এলিজাবেথের শিক্ষক), উইলসন, জর্জ পুটেনহাম এবং রিচার্ড ম্যালকেস্টর (মার্টিন টেইলর স্কুলের প্রধান শিক্ষক)। শেষোক্তজন বিদেশি ভাষার দাসত্ব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে লিখলেন: ‘আমাদের ভাষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের স্বাধীনচিত্ততার কথা, আর ল্যাটিন ভাষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের পায়ে বিদেশি ভাষার রজ্জুর কথা, পরাধীনতার কথা। আমি রোমকে ভালোবাসি, কিন্তু লন্ডনকে আরও ভালোবাসি। আমি ইতালিকে পছন্দ করি, কিন্তু ইংল্যান্ডকে আরও বেশি ভালোবাসি। আমি ল্যাটিন ভাষাকে সম্মান করি, কিন্তু ইংরেজি ভাষাকে পূজা করি।’ (সূত্র: এ সি ব: আ হিস্ট্রি অব দ্য ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ)
উপরিউক্ত আলোচনার সূত্রে আমরা বলতে পারি, আমাদেরও বাংলা ভাষা নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। এ কথা বুঝতে হবে যে মাতৃভাষার চর্চার মাধ্যমে বেশির ভাগ লোক যখন বোধগম্য জগতে বিচরণ করতে থাকে, তাদের যখন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বোধগম্যতা বাড়ে, তখন জাতি কখনো পিছিয়ে থাকতে পারবে না।
পাঁচ লাখ লোক বেশি মাত্রায় শিক্ষিত হওয়া অবশ্যই একটি জরুরি ব্যাপার এবং তার মধ্যে দুই লাখ লোক ইংরেজিতে সুশিক্ষিত হওয়া আরও জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো নিতান্তপক্ষে ১০ কোটি লোক আপন মাতৃভাষায় শিক্ষিত হওয়া জীবন, সমাজ, বিজ্ঞান, ধর্ম, রাজনীতি, উৎপাদন এবং সভ্যতায়। জাতি হিসেবে উন্নত হোন, তখন দেখবেন ইংরেজ আর সৌদিরা এসে হাত কুর্নিশ করে দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে।
পাদটীকা হিসেবে বলছি, মাতৃভাষা হচ্ছে গর্ব করার বস্তু। ভারতীয় ইংরেজি ভাষার লেখিকা অরুন্ধতী রায় যখন তাঁর বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংস লিখে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন, তখন টাইম সাময়িকীতে উপন্যাসটির ওপর একটি আলোচনায় লেখা হলো, অরুন্ধতী রায়ের ইংরেজির ওপর এত দখল যে তাঁর ভাষার দক্ষতা অনুযায়ী উপন্যাসটি উতরোতে পারেনি। খোঁচাটা এখানে যে, অ-ইংরেজি ভাষাভাষী হয়ে কেন অরুন্ধতী এতটা ইংরেজি জানবেন! আমাদের মাতৃভাষা নিয়ে কেন আমাদের এ রকম অহংবোধ থাকবে না?
মোহীত উল আলম: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মানববিদ্যা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস।

শিক্ষাঙ্গনে হত্যা-সন্ত্রাস কি সরকারকে বিচলিত করে না?-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই খুন

সাম্প্রতিক ছাত্রহত্যার সারিতে এবার যোগ দিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে নিহত দুজন ছাত্রই ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী। নিহত ছাত্রদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কলঙ্কিত হলো।


সংঘাতের কারণটি তুচ্ছ ব্যক্তিগত রেষারেষি। দুজন সহপাঠীর একজন ছাত্রলীগের সদস্য, অন্যজন ছাত্রশিবিরের। একপর্যায়ে গত বুধবার উভয় ছাত্রই বিষয়টাকে দলীয় চেহারা দিতে সক্ষম হন এবং ডেকে আনেন যাঁর যাঁর দলের সহযোদ্ধাদের। আগুনে ঘি পড়লে যেমন হয়, সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনের সার্বিক যুদ্ধে পরিণত হয়। বন্দুক, চাপাতি, রামদা ব্যবহূত হয়—প্রক্টরসহ আহত হন ৪০ জন। সংঘাতের অন্তিমে দেখা গেল, গুলিবিদ্ধ দুটি দেহ পড়ে রয়েছে—হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা গেল তাঁরা মৃত। সবই ঘটেছে পুলিশ প্রশাসনের চোখের সামনে। এ নিয়ে গত ২৪ বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত ছাত্রের সংখ্যা দাঁড়াল ১৭।
ছাত্রলীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আদর্শের দাবিদার সংগঠন। ছাত্রশিবির মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন। আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় উভয়ের ঘোষিত প্রতিপক্ষ। কিন্তু খেয়াল করার বিষয়, এ দুটি সংগঠনের রক্তপাত এবং হত্যা-বদলাহত্যার ইতিহাসে আদর্শের কারণে যতটা না, তার চেয়ে বেশি প্রাণ ঝরেছে ক্যাম্পাসের দখলদারি প্রতিষ্ঠার জন্য। বলা দরকার, শিক্ষাঙ্গনে দখলদারির চর্চায় ছাত্রশিবিরই পথপ্রদর্শক। তবে আদর্শ যা-ই হোক না কেন, কার্যত সন্ত্রাস-হত্যার রেকর্ডের দিক থেকে উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কম।
সাধারণ শিক্ষার্থীর ক্যাডারে পরিণত হওয়া, ক্যাডারদের কারও কারও খুন হয়ে যাওয়া আর কারও কারও খুনি হয়ে ওঠার মাধ্যমে কেবল নতুন খুনের সম্ভাবনাই তৈরি হয় না, নষ্ট হয় শিক্ষার পরিবেশ, জিম্মি হয় অজস্র শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। এসব বন্ধের দায় যেমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, তেমনই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা সরকারেরও। হত্যা হত্যাই; হত্যাকারী মাত্রই অপরাধী—এর বাইরে অন্য কোনো বিবেচনা তাই থাকতে পারে না। পাশাপাশি, প্রধান তিনটি ছাত্রসংগঠন যেভাবে খুন-সন্ত্রাসের সমার্থক হয়ে উঠছে, যেভাবে কখনো নিজ দলের, কখনো প্রতিপক্ষ দলের কর্মীদের হত্যা করে চলেছে, সেভাবে এর বিচার কিন্তু হয় না। শিক্ষাঙ্গনে খুনের বিচার আদালতের মাধ্যমেই হতে হবে, কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী তাণ্ডবের অবসান ঘটাতে হবে রাজনীতিবিদদেরই। শিক্ষাঙ্গনে অব্যাহত সন্ত্রাস আর হত্যাকাণ্ড জনগণকে যতটা বিচলিত করে, সরকারকে কি ততটা বিচলিত করে?

কাজ না দেখেই বিরোধিতা কেন?-নতুন নির্বাচন কমিশন

সাবেক সচিব কাজী রকিব উদ্দিন আহমদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া চার কমিশনার পদে নিয়োগ পেয়েছেন যথাক্রমে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু হাফিজ, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোবারক, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল মোহাম্মদ জাভিদ আলী এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ।


নতুন নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, তাতে এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, তারা আগেই ঠিক করে রেখেছিল, যিনি বা যাঁরাই কমিশনে নিযুক্ত হোন না কেন, তারা মানবে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তাঁরা কমিশন গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রত্যাখ্যান করছেন। এই কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনে বিরোধী দলের এই নেতিবাচক মনোভাব কাম্য নয়। বিতর্ক এড়ানোর জন্য যেখানে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে কমিশন গঠন করা হলো, সেখানে বিরোধী দলের প্রত্যাখ্যান দুর্ভাগ্যজনক। অনুসন্ধান কমিটি গঠনে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলে বিএনপি সংশোধনের প্রস্তাব দিতে পারত, কমিটির কাছে নাম পাঠিয়ে পরখ করে দেখতে পারত সত্যি সত্যি তারা আমলে নেয় কি না। কিন্তু সেসব না করে নতুন নির্বাচন কমিশন প্রত্যাখ্যান করে তারা রাজনীতিকে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল।
বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে যে আন্দোলন করছে, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন তার সঙ্গে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়। জাতীয় নির্বাচনকালে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয়তা বিরোধী দল কী করে অস্বীকার করবে? যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই, তাদের দাবি অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, তারপর নির্বাচনটি কে করবে? সরকারের দায়িত্ব নির্বাচন করা নয়। এ কাজটি কিন্তু নির্বাচন কমিশনকেই করতে হবে।
নতুন নির্বাচন কমিশনে যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। তাঁরা দলীয় না নিরপেক্ষ, সেটি প্রমাণের জন্যও তো কিছুটা সময় দিতে হবে। নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, তিনি এই দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। আমরাও মনে করি, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার কাজটি সহজ নয়। বিশেষ করে, রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা না পেলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এই গুরুদায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অতএব, রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার উচিত হবে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা। আগামী জাতীয় নির্বাচনের এখনো প্রায় দুই বছর বাকি। আমরা বিরোধী দলকে বলব, আগে তাদের কাজকর্ম দেখুন, বিচার-বিশ্লেষণ করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন। কাজ শুরুর আগেই বিরোধিতা কেন?

ফুকুশিমা বিপর্যয়ের এক বছর-জাপানের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব by রাহীদ এজাজ

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাপানকে নির্ভর করতে হচ্ছে তেল-গ্যাস আমদানির ওপর। পূর্ব জাপানে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। দেশের অর্থনীতির এ সংকট কাটাতে বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি বেশ কিছু উদারমুখী নীতি গ্রহণ করাটা জরুরি।
ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্রে বিস্ফোরণের পর জাপানের অর্থনীতির বর্তমান চালচিত্র আর ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা জানাতে গিয়ে এ অভিমত দেন টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অধ্যয়ন কেন্দ্রের অধ্যাপক শুজিরো উরাতা।
গতকাল বৃহস্পতিবার অধ্যাপক উরাতা টোকিওর বিদেশি প্রেস সেন্টারে জাপান সফররত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ভূমিকম্প-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি যে ক্ষতি হবে, তার পুরোটার ধকল সইতে হবে অর্থনীতিকে। আগামী গ্রীষ্মে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে জ্বালানির জন্য আরও তেল-গ্যাস আমদানি করতে হবে। এ ছাড়া বর্তমানে ৫৪টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি সচল আছে, জনগণের বিরোধিতার মুখে সরকারকে সেগুলোও বন্ধ করে দিতে হবে। এমন অবস্থায় ইয়েনের ফের অবমূল্যায়ন ঠেকানো, ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ভারসাম্য আনা—সব মিলিয়ে সরকারকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাপানে উদার অর্থনীতির প্রবক্তাদের অন্যতম শুজিরো উরাতা মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারকে বেশ কিছু উদারমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মন্দাভাব, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস, সঞ্চয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা ও সরকারের ঋণের হার বাড়তে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত করের হার বাড়াটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংস্থা আসিয়ানের শিল্প ও বাণিজ্যনীতি প্রণয়নে যুক্ত শুজিরো উরাতা মনে করেন, জাপানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ায় শিল্পোৎপাদনের হার কমেছে। কাজেই উৎপাদন বাড়াতে শ্রমবাজার বিদেশিদের জন্য খুলে দেওয়ার কথা বিবেচনায় নিতে হবে। তবে বহির্গমন নীতিতে কতটা পরিবর্তন আনা হবে, এ নিয়ে তিনি সন্দিহান। সরকার এ ব্যাপারে কতটা উদারতা দেখাবে, তা নিয়ে তাঁর সংশয় আছে।
শুজিরো উরাতার মতে, জাপানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বাজার উন্মুক্ত করা দরকার। তবে বিষয়টি খুব সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সই। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা শেষ করার পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ওপর জোর দিতে হবে। এ লক্ষ্যে কৃষিসহ বিভিন্ন খাত উন্মুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৩০৯ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। সিরাজুল হক, বীর প্রতীক এক মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বকথা রাতের অন্ধকারে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল অবস্থান নিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের চারদিকে। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলে আছেন সিরাজুল হক।


সকাল থেকেই তাঁদের ওপর শুরু হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বোমাবর্ষণ। বিরামহীনভাবে সারা দিন ধরে চলল। সিরাজুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা দমে গেলেন না। সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি আক্রমণ মোকাবিলা করলেন। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা পালানোর চেষ্টা করতে থাকল। কিন্তু সে পথ রুদ্ধ। তখন ভেঙে পড়ল পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ। এ ঘটনা পরশুরামে। ১৯৭১ সালের ৮-১১ নভেম্বর।
পরশুরাম ফেনী জেলার অন্তর্গত। এর অবস্থান বিলোনিয়া পকেটে। ফেনীর উত্তরে ভারত সীমান্তে বিলোনিয়া। বিলোনিয়া উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬ মাইল লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ছয় মাইল বিস্তৃত। এর তিন দিকেই ভারত। ১৯৭১ সালে বিলোনিয়া পকেটের বিভিন্ন স্থানে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান।
নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া পকেটে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের অবরোধ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ৯ নভেম্বর থেকে পাকিস্তানি সেনারা বোমাবর্ষণ শুরু করে। সারা দিন তাদের বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকে। দুপুরের পর পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি আক্রমণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি আক্রমণ সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিহত করেন। এ সময় পরশুরামে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে সিরাজুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁদের বীরত্বে পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। এরপর পাকিস্তানি সেনারা পরশুরাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন।
পরদিন ১০ নভেম্বর যুদ্ধ থেমে থেমে চলতে থাকে। রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরশুরাম ঘাঁটির ওপর মুক্তিযোদ্ধারা প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। এ আক্রমণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য নিহত হয়। বাকিরা আত্মসমর্পণ করে। সকাল হওয়ার পর সেখানে দেখা যায়, চারদিকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে পাকিস্তানি সেনাদের লাশ। ধানখেত, বাংকার, খাল—কোথাও ফাঁকা নেই।
সিরাজুল হক চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান)। ১৯৭১ সালের মার্চে ছুটিতে বাড়িতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধ-যুদ্ধ শেষে যুদ্ধ করেন ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাবসেক্টরে।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য সিরাজুল হককে বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৯৫। গেজেটে নাম সিরাজ। প্রকৃত নাম সিরাজুল হক।
সিরাজুল হক ১৯৯৭ সালে মারা যান। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেই চাকরি করেন। ১৯৯৩ সালে অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ফেনীর সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের শিলুয়া গ্রামে। বাবার নাম আফজালুর রহমান। মা বদরের নেছা। স্ত্রী জরিনা আক্তার বেগম। তাঁর এক ছেলে ও তিন মেয়ে।
সূত্র: প্রথম আলো ফেনীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবু তাহের এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ২।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

হাসিনার সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের মতবিনিময়-চট্টগ্রাম নগর আ.লীগে নেতাদের বিভেদ আছে

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে নেতাদের মধ্যে বিভেদের কথা জানালেন তৃণমূলের নেতারা। তবে তাঁরা বলেছেন, কর্মীদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। নেতারা দলাদলি করছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে মতবিনিময় সভায় দলের চট্টগ্রাম মহানগরের তৃণমূলের নেতারা এসব কথা জানান।


গণভবনে এই সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দেন।
সভায় চট্টগ্রাম মহানগরের প্রতি থানার সভাপতি এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহুরুল আলম দোভাষ ও গিয়াসউদ্দিন বক্তব্য দেন। সাংগঠনিক প্রতিবেদন পেশ করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনামুল হক দানু। সভায় নগর আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সব নেতাই উপস্থিত ছিলেন। এক পক্ষে রয়েছেন চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও মহানগরের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। অন্য পক্ষে রয়েছেন সহসভাপতি সাংসদ নুরুল ইসলাম বিএসসি এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন।
সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম চট্টগ্রামের নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরীকে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। আতাউর রহমান খান কায়সারের মৃত্যুতে সভাপতিমণ্ডলীর একটি পদ এত দিন খালি ছিল। সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন।
সভাসূত্র জানায়, সভায় বিভিন্ন থানার সভাপতিরা বলেন, নেতাদের মধ্যে বিভেদ ও মনোমালিন্য থাকলেও কর্মী পর্যায়ে দলাদলি নেই। তাঁরা দলীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার নেতৃত্বে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। আপনি কমিটি করে দেন। কোনো বিভেদ থাকবে না।’ সভায় কেউ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ করেননি। এ আচরণে মুগ্ধ সৈয়দ আশরাফ সমাপনী বক্তৃতায় বলেন, চট্টগ্রামের নেতাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সংস্কৃতি যে কত উচ্চপর্যায়ের, তা আজকের সভায় প্রমাণিত হয়েছে।
সভায় প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি সবার কাছ থেকে তালিকা নিচ্ছেন। আলোচনা, পর্যালোচনা করছেন। খুব কম সময়ের মধ্যেই কমিটি করে দেওয়া হবে। এর আগে সভার উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাঁরা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাস করেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করেন এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাঁদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত প্রতিহত করতে হবে। যারা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চায়, তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করি। আমরা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় যাওয়ায় বিশ্বাস করি না। জনগণই আমাদের মূল শক্তি।’ তিনি বিএনপি সরকারের সময়ে ভোট চুরি ও ভোট ডাকাতির বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, আসলে এই দলটি গণতন্ত্রে ও জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাস করে না। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে দলটি ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণ মেনে নেয়নি। মাত্র দেড় মাসের মাথায় জনগণ খালেদা জিয়াকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়ন করেছে।

যশোরে ১৩ মাসে ১১০ হত্যা by মনিরুল ইসলাম

যশোরে খুনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। গত ১৩ মাসে ১১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে গত বছর (২০১১) ৯৭ জন ও গত জানুয়ারি মাসে ১৩ জন খুন হন, যা গত ছয় বছরের মধ্যে বেশি। যশোর পুলিশ ও কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ খুনের সঙ্গে কিশোরেরা জড়িত।

বইয়ের মেলা প্রাণের মেলা-মেলায় একুশের আবহ by আশীষ-উর-রহমান

বিকেল থেকে মেলার মঞ্চে আলোচনা হলো শহীদ মুনীর চৌধুরী নিয়ে। সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হলো তাঁর লেখা কবর নাটক। অভিনয়ে-আলোচনায় সৃষ্টি হয়েছিল অমর একুশের আবহ। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে খুব বেশি লোকসমাগম ছিল না মেলায়। ফলে যাঁরা বই কেনার জন্যই এসেছিলেন, তাঁরা স্টলগুলোর সামনে বেশ রয়েসয়ে যাচাই-বাছাই করে পছন্দের বইটি কিনতে পেরেছেন।

রস, কষ, শিঙাড়া, বুলবুলি, মস্তক by হুমায়ূন আহমেদ

গল্প লেখার পেছনের গল্প: বিশ্বসাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের গ্র্যান্ড মাস্টার আমেরিকান লেখক আইজ্যাক অ্যাসিমভ। ভূতের গল্পের আরেক গ্র্যান্ড মাস্টার হলেন স্টিফান কিং। ইনিও আমেরিকান। এই দুই লেখকই গল্প লেখার গল্প লিখতে পছন্দ করেন। আইজ্যাক অ্যাসিমভ আবার স্টিফান কিংয়ের এক কাঠি এগিয়ে। তিনি গল্পটি লিখে কত টাকা পেয়েছিলেন, কত পাওয়া উচিত ছিল, তাও লিখেন।

এই কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়—খালেদা জিয়া

বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, নতুন নির্বাচন কমিশনকে তাঁরা মানবেন না। এই কমিশনের অধীনে তাঁরা কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এর বিরুদ্ধে তাঁর দল আন্দোলন করবে। খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, এই নির্বাচন কমিশন (ইসি) সরকারের আজ্ঞাবহ। সরকার তাদের পছন্দের লোকদের বসিয়েছে।

জনপ্রশাসন মাথাভারী ও ভারসাম্যহীন by অরুণ কর্মকার ও মোশতাক আহমেদ

জনপ্রশাসন মাথাভারী ও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না মানা, পদোন্নতির বিধিমালা লঙ্ঘন এবং অনুগত ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়াতে পদের চেয়ে পদোন্নতি বেশি হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি করছে।

শু ক্র বা রে র বিশেষ প্রতিবেদন-হূদয়ের ‘চকলেট পাঠশালা’ by সুমন মোল্লা

গণ্ডগ্রামটির অধিকাংশ মানুষই জুতার কারিগর! পড়াশোনার চল এখানে নেই বললেই চলে। প্রাথমিকের পাট চুকিয়ে মাধ্যমিকে গেছে এমন লোক এখানে খুঁজে পাওয়া কঠিন। যে বয়সে শিশুদের হাতেখড়ি ওঠে, সে বয়সি শিশুদের জুতার কারিগর বানাতে হাতে তুলে দেওয়া হয় ভোমর (জুতা সেলাইয়ের সুঁইবিশেষ)।

গণতন্ত্র বিশ্বাস করলে নির্বাচনে যেতে হবে —শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী বলছেন, তিনি এই নির্বাচন কমিশন মানেন না, নির্বাচনে যাবেন না। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও এ রকম বলে পরে তিনি তা মেনেছেন। কুমিল্লার মতোই তিনি নির্বাচনে যাবেন, সবই করবেন। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে নির্বাচন করতে হবে।

হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকি

'ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে'_ বাংলার এ প্রবাদ বাক্যটি বহুকাল ধরে প্রচলিত হয়ে এলেও এখন আর ঢেঁকি ধান ভানে না। অথচ এক সময় গ্রামবাংলায় ধান ভানার প্রধান যন্ত্র ছিল ঢেঁকি। চাল ভানাসহ অন্যান্য কাজে এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। ঢেঁকি প্রধানত ধানের তুষ ছাড়িয়ে চাল বানানো কাঠের তৈরি কলবিশেষ।

দর্শকদের টানতেই পারল না বিপিএল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

তুলনাটা ঘুরেফিরে আসছে। বলা ভালো, কর্তাব্যক্তিরাই নিয়ে আসছেন তা। ২০১১ বিশ্বকাপ আয়োজনে সফলতার তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগও (বিপিএল) তেমন 'ফাটানো' কিছু হবে, তাঁদের বিশ্বাস। কিন্তু সকালের সূর্য যদি দিনের পূর্বাভাস দেয়, তাহলে সর্বনাশ! কাল বিপিএলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ইঙ্গিত দিচ্ছে নিজেরাই 'ফেটে' যাওয়ার। ক্রিকেটের মোড়কে নানা মসলার জগাখিচুড়ির ফ্লপ শোর!

পদ্মা সেতু নিয়ে উভয় সংকট by আনোয়ার হোসেন

পদ্মা সেতু নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে সরকার। মালয়েশিয়ার অর্থায়নে সেতু করতে হলে বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করতে হবে। তাতে সম্পর্কের আরও বেশি টানাপোড়েন তৈরি হবে। আবার মালয়েশিয়া সেতু তৈরি করে দিলে এর সেবার ব্যয় হবে অত্যধিক বেশি। অন্যদিকে দাতাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিলে দুর্নীতির অভিযোগও মানতে হবে।