Monday, March 25, 2019

এক কিংবদন্তির নীরব প্রস্থান

বাংলাদেশি সংগীতের যেদিকটায় তাকান, খুঁজে পাওয়া যাবে একজন শাহনাজ রহমতউল্লাহকে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গানে গানে সুবাস ছড়িয়েছেন তিনি। প্রতিনিয়ত গান পিপাসুদের আত্মার খোরাক জুগিয়েছেন। সব বয়সী শ্রোতারাই কিংবদন্তি এই শিল্পীর গান-সুরে অবগাহন করেন। দেশাত্মবোধক গান, গজল, প্রেমের গান, বিরহের গান, উর্দু —সব ধরনের গানে তিনি অনন্য। দেশের সংগীতের কিংবদন্তি এই গায়িকা কিশোরী বয়সেই জানান দিয়েছিলেন তাঁর সংগীত প্রতিভার। কিংবদন্তি এই শিল্পীর স্বামী মেজর (অব.) আবুল বাশার রহমতউল্লাহর ভাষায়, গান গেয়ে মানুষকে কাঁদানোর ক্ষমতাও ছিল শাহনাজের, যা খুব কম শিল্পীরই থাকে। দেশের সংগীতাঙ্গনে পাঁচ দশকের রাজত্ব শেষে কিংবদন্তি শিল্পীর প্রস্থানটা একেবারেই নীরবে হয়েছে।
শনিবার মধ্যরাতে শাহনাজ রহমতউল্লাহর মৃত্যু খবরটা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে পরিবারের পক্ষ থেকেও তাড়া ছিল দ্রুত সমাহিত করার। কানাডা আর যুক্তরাজ্যে থাকা ছেলে-মেয়েকে তাঁদের মায়ের মৃত্যুর খবর রাতেই জানিয়ে দেওয়া হয়। সন্তানদের দেশে ফিরতে অনেকটা সময় লেগে যাবে, তাই দেরি করেনি। পুরো বিষয়গুলো হয়েছে শাহনাজ রহমতউল্লাহর একান্ত চাওয়ার কারণে। তিনি কখনোই চাননি মৃত্যুর পর মরদেহ যেন বেশি সময় ধরে পড়ে না থাকে। স্ত্রীর কথা স্বামী ও পরিবারের অন্যরা অক্ষরে অক্ষরে পালনের চেষ্টা করে গেছেন।
পরিচিতিজনদের অনেকেই বলতে চেয়েছিলেন, একজন শাহনাজ রহমতউল্লাহ এ দেশের সম্পদ। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া উচিত, শহীদ মিনারে নেওয়া উচিত। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা উচিত। কিন্তু মৃত্যুর পর যেটা এই কিংবদন্তি মোটেও চাননি, তা পরিবারের কেউ করতে যাননি। এমনকি বনানীর সামরিক কবরস্থানে সমাহিত করার পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাইলেও পরিবার সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
কণ্ঠের স্বকীয়তায় বাংলাদেশি শিল্পীদের মধ্যে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। ৫০ বছরের গানের জগতে দাপুটে বিচরণ করা এই শিল্পী হঠাৎ করেই গানের জীবন থেকে নিজেকে আড়াল করে নেন। ২০০৮ সালের পর একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। বারিধারার পার্ক রোডের বাড়ির ছাড়ে শখের বাগানে সময় কেটে যেত তাঁর। তবে খুব কাছের সহশিল্পী ও শুভাকাঙক্ষীদের বাসায় মাঝে মধ্যে কিছু ঘরোয়া আয়োজনে তাঁর উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল।
কথায় কথায় একবার কিংবদন্তি এই শিল্পী বলেছিলেন, ৫-৬ বছর বয়সেই নাকি তিনি গুণগুণ করে গান গাইতেন। বিষয়টি বাবা এম ফজলুল হকের নজরে এসেছিল। নয় বছর বয়সে বড় বোনকে গানের তালিম দিতে বাসায় ওস্তাদ মুনীর হোসেন আসতেন। শাহনাজ রহমতউল্লাহর ভাষায়, ভিকারুন্নিসা স্কুলের শিক্ষার্থী তাঁর এই বড় বোন তুখোড় মেধাবী সংগীতশিল্পী ছিলেন। বোন তালিম নেওয়ার সময় পাশে বসে থাকতেন তিনি। এই বোনটি ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শাহনাজ রহমতউল্লাহ সেই ছোট্ট বয়সে বেতারেও গাইতেন। খেলাঘরেও গান শিখেছেন। ওই সময়টায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন দেশের আরেক বরেণ্য গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন। তাঁরা নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। ছোট্ট বয়সে পরিণত কণ্ঠের কারণে ওস্তাদের পাশাপাশি অন্য অনেকের প্রিয় শিক্ষার্থী হয়ে ওঠেন তিনি।
শাহনাজ রহমতউল্লাহ ১৯৬২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘নতুন সুর’ সিনেমার গানে কণ্ঠ দেন। তাঁর বাবা ছিলেন আইনজীবী। তাঁর মতে, বাবাই মনে করেছিলেন, গান গাইলে তিনি বেশ ভালো করতে পারবেন। তাই তো বাবা এম ফজলুল হকের উৎসাহে মা আসিয়া হক তাকে ওস্তাদ রেখে গান শেখানো শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে জন্ম নেওয়া এ শিল্পী গজল সম্রাট মেহদী হাসানের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের মাধ্যমে তিনি উপমহাদেশের কিংবদন্তি এই গজল সম্রাটের সাহচর্য পান।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে দেশাত্মবোধক গানে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক কণ্ঠস্বর হিসেবে দর্শকের কাছে প্রতিষ্ঠিত করে তোলেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। শুধু শ্রোতা নয়, পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মাঝেও তাঁর গাওয়া গানগুলো আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এই শিল্পীর আসল নাম শাহনাজ বেগম হলেও পরবর্তীতে শাহনাজ রহমতউল্লাহ হিসেবেই জনপ্রিয়তা পান। বরেণ্য এ শিল্পী শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে। এর বাইরেও শহীদ আলতাফ মাহমুদের কাছেও গানে তালিম নেন।
৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কণ্ঠে শোনা গেছে অসংখ্য কালজয়ী গান। দেশের গান এবং চলচ্চিত্রের গানে তার জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়ে’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে‌ এবার বল’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গান গেয়েছেন কিংবদন্তি এই শিল্পী। বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০ টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতউল্লাহর গাওয়া চারটি গান জায়গা করে নেয়। শাহনাজ রহমতউল্লাহর গাওয়া অসংখ্য রোমান্টিক গানের মধ্যে ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘হারানো দিনের মতো হারিয়ে গেছ তুমি’ ইত্যাদি আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরে।
দীর্ঘ সংগীতজীবনের এই সময়ে শাহনাজ রহমতউল্লাহর চারটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। প্রথমটি ছিল প্রণব ঘোষের সুরে ‘বারটি বছর পরে’, তারপর প্রকাশিত হয় আলাউদ্দীন আলীর সুরে ‘শুধু কি আমার ভুল’। গানের জীবনে ৫০ বছর পূর্তির পর থেকে পেশাদারভাবে গান গাওয়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৩ সালে শাহনাজ রহমতউল্লাহ সেনা কর্মকর্তা আবুল বাশার রহমতউল্লাহকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির এক কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। মেয়ে নাহিদ রহমতুল্লাহ থাকেন লন্ডনে। আর ছেলে এ কে এম সায়েফ রহমতুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে এখন কানাডায় থাকেন। অসংখ্য-অগণিত শ্রোতা-ভক্তদের অমোঘ ভালোবাসা ছাড়াও তার প্রাপ্ত পুরস্কার-সম্মাননার তালিকাটাও বেশ লম্বা। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯২ সালে রাষ্ট্র তাঁকে সম্মানিত করেছে একুশে পদকে ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯০ সালে ‘ছুটির ফাঁদে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শাহনাজ রহমতুল্লাহ। এ ছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই সংগীতশিল্পী।
সংগীতশিল্পী কনক চাঁপা বলেন, ‘কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ মরে গিয়ে জানিয়ে দিলেন উনি ছিলেন, উনি আছেন, উনি থাকবেন। সত্যিই আমরা ভাগ্যবান যে শাহনাজ রহমতউল্লাহ একান্তই আমাদের ছিলেন। সুরসম্রাট আলাউদ্দিন আলী এবং শাহনাজ রহমতউল্লাহ মিলে যে অনবদ্য সৃষ্টির যৌথ অধ্যায় ছিল, তা সত্যি সত্যিই ভীষণ মৌলিক। তাঁর গানের প্রক্ষেপণ, উপস্থাপন, তাঁর কণ্ঠের ট্রিমেলো, রেজোন্যান্স, শব্দচয়ন, সর্বোপরি তাঁর বিশেষায়িত অন্যরকম কণ্ঠ তাঁর প্রতিটি গানকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। বেশির ভাগ গান কবিতা থেকে গান হয়ে ওঠে। কিন্তু আমার গবেষণা বলে ওনার গান প্রথমে গান হয়ে জন্ম নিয়ে তারপর কবিতা হয়ে উড়ে উড়ে সাহিত্যে ছড়িয়ে যায়। যেমন “সেই চেনা মুখ কত দিন দেখিনি” এই লাইনটি দিয়ে তার সুরের মাধুরীর ওপর ভিত্তি করে একজন ঔপন্যাসিক একটি উপন্যাস লেখার প্লট পেয়ে যাবেন।’
বাংলা গানের কিংবদন্তি গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ দেশাত্মবোধক এই গানটি ১৯৭০ সালের মার্চে লেখেন তিনি। তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চনা-দুর্দশা আর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষাকে ছন্দময় করে গানটি তৈরি করে বাঙালির হৃদয়ে জাগরণ তুলেছিলেন তিনি। আর এই গানে কণ্ঠ দেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। প্রিয় শিল্পীর শেষ বিদায়ের আগে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শাহনাজ রহমতউল্লাহর বারিধারার বাসায় এসেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তখন কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘একজন বড় মাপের শিল্পী শুভেচ্ছাদূতের ভূমিকা পালন করেন। আজকে যদি ভারতের দিকে তাকাই দেখবেন, লতা মুঙ্গেশকরের নাম বললেই সারা বিশ্ব তাঁকে একনামে চেনেন। পাকিস্তানের নুরজাহানের নাম বললে সারা পৃথিবী একনামে তাঁকে চেনে। তেমনি বাংলাদেশের কিছু শিল্পী আছেন যাদের নাম বললে সারা পৃথিবীর মানুষ চিনবে। শাহনাজ রহমতউল্লাহ তাঁদেরই একজন। সংগীত জগতে বাংলা গানের দূত ছিলেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। তিনি বাংলা গানের প্রথম সারির প্রতিনিধি। শিল্পীরা তৃপ্তির জন্য কাজ করেন, খ্যাতির জন্য নয়। শাহনাজ রহমতউল্লাহকে যতটুকু জেনেছি, তিনিও তৃপ্তির জন্য গান করেছেন, খ্যাতির জন্য নয়।’
শাহনাজ রহমতউল্লাহর বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন বাংলাদেশের গুণী সুরকার, সংগীত পরিচালক, সংগীতজ্ঞ ও শব্দসৈনিক। বিবিসির জরিপে যে ২০টি বাংলা গান সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি পেয়েছে এর মধ্যে তিনটি গান “জয় বাংলা বাংলার জয়”, “একবার যেতে দে না” এবং “একতারা তুই দেশের কথা” তাঁর সুর করা। আর ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে অনেক জনপ্রিয় ছিল৷ সংগীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে। আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের সুদর্শন নায়ক ও সংগীতশিল্পী। তিনি চিরসবুজ নায়ক হিসেবে পরিচিত। আশির দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

বড় বাজার লাতিন আমেরিকা by ফখরুল ইসলাম

• গত অর্থবছরে মারকোসারের সদস্যভুক্ত চার দেশে রপ্তানি হয় প্রায় ২১ কোটি ডলারের পণ্য।
• আমদানি হয়েছে ২৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য।
• রপ্তানির ৮৫ শতাংশই হয় ব্রাজিলে।

বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাব্য বড় রপ্তানি গন্তব্যস্থল হিসেবে অনুচ্চারিত এক মহাদেশের নাম লাতিন আমেরিকা। সংগত কারণেই এ তালিকায় মহাদেশটির নাম কারও মুখে আসে না। কারণ, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি হয় সামান্যই। উল্লেখ করার মতো যে দেশে রপ্তানি কিছুটা হয়, তার নাম হচ্ছে ব্রাজিল। যদিও ব্রাজিলে রপ্তানির তুলনায় দেশটি থেকে বাংলাদেশের আমদানি আট গুণ বেশি।
অথচ লাতিন আমেরিকার প্রায় সব দেশই হতে পারে বাংলাদেশি পণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বড় বাজার। বিশেষজ্ঞ ও রপ্তানিকারকেরা বলছেন, লাতিন আমেরিকাকে বড় বাজার বা রপ্তানি গন্তব্যস্থল করতে গেলে কয়েকটি পক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। পক্ষগুলো হচ্ছে রপ্তানিকারক; বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশি মিশন; লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সরকার এবং ওই সব দেশের আমদানিকারকেরা।
একটি উদ্যোগ অবশ্য শুরু করেছেন ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. জুলফিকার রহমান। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক চিঠি দিয়ে জানান যে মারকোসারের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পেয়েছেন। মারকোসারের সঙ্গে এফটিএর আলোচনা শুরু করতে তিনি আগ্রহপত্র পাঠানোর অনুরোধ করেন।
মারকোসার হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার এক বাণিজ্য জোট, যে জোটের গুরুত্বপূর্ণ চার সদস্য আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ জোটে বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, গায়ানা, পেরু ও সুরিনাম হচ্ছে সহযোগী সদস্য।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য ওই চিঠি পাওয়ার পর থেকে সজাগ হয়েছে এবং ট্যারিফ কমিশনকে দিয়ে একটি সমীক্ষাও করিয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে ব্যবসায়ী নেতাসহ আন্তমন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠকও করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠকে উপস্থিত প্রায় সবারই একই মত। আর সেটা হচ্ছে, রপ্তানি পণ্যে বহুমুখিতা যেমন দরকার, আবার রপ্তানি পণ্যের নতুন বাজারও খোঁজা দরকার। এই সময়ে সম্ভাব্য বড় বাজার হতে পারে দক্ষিণ আমেরিকা এবং আপাতত পছন্দের দেশ হতে পারে মারকোসারের গুরুত্বপূর্ণ চার সদস্য।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, মারকোসারের চার দেশের জনসংখ্যা ৩০ কোটি, গড় মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারের বেশি এবং মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এফটিএ করা গেলে উভয় পক্ষেরই বাণিজ্য বাড়বে, তবে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে এফটিএর ব্যাপারটিই তো দ্বিপক্ষীয়। আমরা যেমন সুবিধা নিতে চাইব, অপর পক্ষকেও সুবিধা দিতে হবে। সুতরাং দর-কষাকষি করার সময় খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের প্রধান পণ্য যেন ওই পক্ষের নেতিবাচক তালিকায় না ঢুকে পড়ে।’
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘এখনকার এফটিএ আলোচনায় বাণিজ্যের সঙ্গে বিনিয়োগের বিষয়ও আসে। মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ আলোচনার অগ্রগতি হলে আশা করি বিনিয়োগ আলোচনাও বাদ পড়বে না।’
মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ করার ব্যাপারে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, মারকোসারের একটি বিশাল বাণিজ্য অঞ্চল এবং এই অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা অনুযায়ী রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। কম হওয়ারও কারণ আছে। দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্য ঢুকতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা আছে। উচ্চ শুল্কের কারণে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি এখন বন্ধ। পাট রপ্তানিও বন্ধের পথে। তবে এফটিএ করে শুল্ক কমানো গেলে বা শূন্য করা গেলে দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার অনেক বড় হবে।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ মারকোসারের সদস্য চার দেশে ২০ কোটি ৮০ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ব্রাজিলেই রপ্তানি হয় ৮৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। একই সময়ে দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ ২৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বাংলাদেশ আমদানি করে চিনি, ভোজ্যতেল, ভুট্টা, গম ও পশুখাদ্য ইত্যাদি। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওষুধ, তামাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং তৈরি পোশাক। এফটিএ হলে উভয় পক্ষের বাণিজ্য বাড়বে ২০ গুণ।
জানা গেছে, বাংলাদেশে এ দেশগুলোর বিনিয়োগের তথ্য ট্যারিফ কমিশন বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়—কেউই জোগাড় করতে পারেনি। তবে উচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ হয়েও তাদের দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে কোনো শুল্কমুক্ত বা কোটামুক্ত সুবিধা পাওয়া যায় না। দেশগুলোর সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক কোনো বাণিজ্য চুক্তিও নেই বাংলাদেশের। মারকোসারের দেশগুলো তৈরি পোশাক, জুতা, মাছ ইত্যাদি পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘মারকোসারের সদস্যরা বিশেষ করে ব্রাজিল আমাদের পণ্য রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। সব খরচ মিলিয়ে ব্যয় ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ হওয়া খুবই দরকার। কারণ, ব্রাজিল, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে মিলিয়ে বাজারটা আসলেই অনেক বড়।
শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় লাতিন আমেরিকার মধ্যে চিলিতে রপ্তানি বাড়ছে জানিয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে পোশাকশিল্প মালিক টিপু মুনশি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা এ আশা করতেই পারি যে দক্ষিণ আমেরিকাও হবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম বড় রপ্তানি গন্তব্যস্থল।’
মারকোসারের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন রয়েছে, সেসব দেশের রাষ্ট্রদূত ও কমার্শিয়াল কাউন্সিলররা দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে কী করেছেন এবং ভবিষ্যতে কী করবেন—এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন মোহাম্মদ হাতেম।
এ বিষয়ে অবশ্য বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে যোগাযোগ করলে বাণিজ্যসচিব মো. মফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মারকোসারের সঙ্গে এফটিএ করতে আমরা আগ্রহী। ঢাকায় ব্রাজিল দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। একটি দলকে মারকোসারের সদস্যদেশগুলোতে পাঠানোর চিন্তা চলছে।’

একের পর এক অগ্নিকাণ্ড আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না পুরান ঢাকার মানুষের by রুদ্র মিজান

পুরান ঢাকায় একের পর এক ঘটছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্ক বেড়েছে। এরমধ্যেই ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের আরেক ঘটনা। শনিবার দিবগাত রাতে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে প্রায় ২৫টি  দোকান, কারখানা। জেএন সাহা রোডের ওই ছয় নম্বর গলির মার্কেটের পাশেই বাসা-বাড়ি। গলির আরেক পাশে  স্কুল। বিভিন্ন দোকান। ভয়াবহ আগুনে দোকান, কারখানা পুড়ে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গতকাল ওই মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে, সানরাইজ ইন্টারন্যাশনাল প্রি ক্যাডেট স্কুলের গেটে, দু’ তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শিশুরা। তাদের চোখে-মুখে আতঙ্ক। রাস্তার ওপারে ভস্মীভূত মার্কেটের দিকে তাকিয়ে আছে তারা। মার্কেটের গেট বন্ধ। গেটের সামনে কৌতূহলী মানুষ। ভেতরে কি হয়েছে জানার ইচ্ছে তাদের। এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন জানতে চাইলে এক বৃদ্ধা বলেন, আগুন সব শেষ করে দেয়। এই আগুন কতজনকে শেষ করছে কে জানে। দেখতে আসছি, আগুনে কি ক্ষতি হয়েছে।
আগুনের ভয়াবহ বর্ণনা অনেকের মুখে মুখে। তাদেরই একজন শিক্ষিকা রেহানা। তার বাসার সামনেই মার্কেট। বাসা থেকে মার্কেট হয়েই যেতে হয় প্রধান সড়কে। মেয়েকে রিকশায় তুলে দিতে বাসা থেকে বের হন তিনি। ঘড়িতে তখন রাত ৯টা ৩৪ মিনিট। এরমধ্যেই দেখতে পান আগুনের শিখা। বিকট কয়েক শব্দ হলো। তারপর আগুন ছড়িয়ে গেল পুরো মার্কেটে। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ দৌড়াতে থাকলো। চারদিকে তখন ‘আগুন আগুন’ চিৎকার। কান্নার শব্দ। দ্রুত সবাইকে বাসা থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে যেতে বলেন রেহানা।
নিজেদের জান-মাল রক্ষার জন্য এগিয়ে যান আশপাশের লোকজন। তারা পানি ছিটাতে থাকেন। খবর পেয়ে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট সেখানে উপস্থিত হয়ে ৪০ মিনিট চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে।
ওই গলির আরেক বাসিন্দা নুরুজ্জামান জানান, তিনি গলিতে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এরমধ্যেই দেখতে পান আগুন। শুরুতে আগুনের তীব্রতা কম ছিলো। এ সময় অনেকেই দোকান থেকে কিছু জিনিস সরাতে পেরেছেন। এমনকি গ্যারেজে রাখা একটি সিএনজি অটোরিকশাও সরানো সম্ভব হয়েছে। পাঁচ-সাত মিনিট পরেই তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
এ সময় বিকট শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটছে। তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের লোকজন পানি ঢেলে আগুন নেভাতে চেষ্টা করে বলে জানান তিনি।
গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, গলির পিচঢালা রাস্তাটি তখনও পানিতে ভিজে আছে। বাতাসে পুড়া গন্ধ। গেটের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় আগুনে পুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন পণ্য, কাঠ, টিন, ছুরি, ক্যাবল, আসবাবপত্র। পুড়েছে তিনটি সিএনজি অটোরিকশাও। সেমিপাকা এই মার্কেটে ওয়ালটনের শো রুম, ইলেকট্রনিকস, ওয়ার্কশপ, সেলুন, ভাঙাড়ি, কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন ধরনের দোকান ছিলো ১২টি। টিভির ট্রলি, শেভিং ব্রাশ, ছুরি তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের কারখানা ছিলো সাতটি। এ ছাড়াও অন্যান্য দোকান মিলিয়ে প্রায় ২৫টি দোকান। প্রতিটি দোকানই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে পুড়ে বাদামি হয়ে পড়ে আছে তিনটি সিএনজি অটোরিকশা। ছুরির কারখানায় পড়ে আছে সিলিন্ডার। জানা গেছে, অন্তত পাঁচটি সিলিন্ডার ছিল মার্কেটে। এ ছাড়াও তিনটি সিএনজি অটোরিকশায় ছিল আরো তিনটি সিলিন্ডার।
ওই মার্কেটের মালিক আতাউর রহমান বাবু। তার ছোটভাই ব্যবসায়ী মাহমুদুর রহমান সেলিম জানান, মার্কেটে কেমিক্যাল গোডাউন ছিল না বলেই আগুন আধা ঘণ্টার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে কয়েক সিলিন্ডার ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সিলিন্ডারগুলো ছুরি জোড়া দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো। এগুলো তেমন ভয়াবহ ছিল না। সেলিম জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এড়াতেই তারা কম টাকায় দোকানগুলো ভাড়া দেন। এই ঘরগুলো কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিলে কয়েক গুন বেশি টাকা পাওয়া যেত। তারপরও এই অগ্নিকাণ্ডে অনেক ক্ষতি হয়েছে। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি তিনি। তবে তার ধারণা শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের উৎপত্তি।
সেলিম জানান, রাতে মার্কেটে কম লোকজনই থাকে। কাজ শেষে রাত ৯টার পরে তারা বাইরে বেড়াতে যায়। এরমধ্যেই আগুনের ঘটনা ঘটে। যে কারণে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহামেদ খান জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় চল্লিশ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। তবে আগুনের সূত্রপাত এখনো জানা যায়নি বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত ২০শে ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মসজিদের সামনে বিস্ফোরণ থেকে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই  আগুনে নারী-শিশুসহ ঘটনাস্থলেই কমপক্ষে ৬৭ জন নিহত হন। চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউন, বডি স্প্রে, স্যান্ডেল ও প্লাস্টিকের বেশ কয়েক কারখানা ছিল। তারপর থেকেই পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আগুন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

নীতিমালা ভেঙে ডাক্তার গড়ার কারবার by শিশির মোড়ল

*অধিকাংশ মেডিকেল কলেজ শর্ত না মেনেও অনুমোদন পাচ্ছে।
*নজরদারি কম, দুর্নীতির অভিযোগ।

দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের প্রায় সব কটি চলছে কমবেশি শর্ত অমান্য করে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনের কাজে যুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তেমনটাই বলছেন।
কলেজগুলোর শর্তমাফিক অবকাঠামো নেই, কারও হয়তো নিজস্ব জমি নেই, অনেকেরই শিক্ষার্থীদের হাতে–কলমে শেখানোর জন্য উপযুক্ত হাসপাতাল বা পর্যাপ্ত রোগী নেই। শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অথচ কলেজের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
আওয়ামী লীগের গত দুই আমলে বছরে গড়ে তিনটি করে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশে এখন বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৬৯। মোট ৩৬টির মালিকানা বা পরিচালনায় আছে সরকারি দলের নেতা অথবা দলসমর্থিত চিকিৎসক বা ব্যবসায়ী। অতীতেও ক্ষমতাসীন দলসমর্থিত উদ্যোগ প্রাধান্য পেয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, শরীয়তপুর, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর জেলার ছয়টি কলেজ ঘুরে দেখেছেন। ১৩টি কলেজের সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদন হাতে এসেছে। অনুসন্ধান আরও বলছে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ওপর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কম। তথ্য চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, নেই।
রাজশাহী শহরের খড়খড়ি এলাকায় শাহ মখদুম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ৭ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টা। একটি ঘরে জনা কুড়ি ছাত্রছাত্রী বাদে ক্যাম্পাস মোটামুটি ফাঁকা। হাসপাতালের নির্মাণাধীন বহির্বিভাগটি সুনসান। শয্যাগুলো খালি। কলেজটি চালু হয়েছে পাঁচ বছর আগে, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে। অধ্যক্ষ নেই, ভারপ্রাপ্ত হয়ে কলেজ চালাচ্ছেন উপাধ্যক্ষ।
ঘণ্টাখানেক পর প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিবেদক বহির্বিভাগে শ্বাসকষ্টে ভোগা একজন রোগীর দেখা পান। তাঁর সঙ্গী বলেন, অনেকক্ষণ এসেছেন, ডাক্তার পাননি।
গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি পরিদর্শক দল এ কলেজ দেখতে গিয়েছিল। ওই দলের একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, কলেজটিতে অনুমোদিত শিক্ষার্থী সংখ্যার অনুপাতে হাসপাতালের শয্যা বা রোগী নেই। সেই অনুপাতে শিক্ষকও কম।
এসবই বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালার বরখেলাপ। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতিমালার চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান শর্ত মানছে না। ইতিমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। ভবিষ্যতে আমরা আরও কঠোর হব।’
সব বেসরকারি কলেজ যে শিক্ষার্থী পায়, এমন না। রাজশাহীর কলেজটির কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন তাদের মোট ২০০ শিক্ষার্থী আছেন। এই প্রথম ছয়জন শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছেন। এযাবৎ কোনো বছরই অনুমোদিত ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হননি। এবার ঢুকেছেন মাত্র ১৮ জন। তবে লাভের হাতছানি বড়।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মোট আসন ৬ হাজার ২৩১। এ বছর বিদেশি ভর্তি হয়েছেন প্রায় এক হাজার। সরকার-নির্ধারিত ভর্তি ফি ১৮ লাখ টাকা। বেতন ও অন্যান্য নিয়মিত খরচও নির্ধারিত। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে একজন শিক্ষার্থী কলেজকে দেবেন ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিদেশি শিক্ষার্থীরা এর জন্য দেবেন ৩৬ লাখ টাকা। এর বাইরে আছে পরীক্ষার ফি ও হোস্টেল খরচ, যা প্রতিষ্ঠান ঠিক করবে।
চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসরকারি কলেজগুলো এই আয়কে গুরুত্ব দেয়, চিকিৎসা শিক্ষাকে নয়।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব। তাঁর কথা, ‘কিছু মেডিকেল কলেজের অবস্থা খুবই খারাপ। সম্প্রতি আমরা সদস্যদের বলেছি, সকলকেই নীতিমালার সব শর্ত মানতে হবে। মান উন্নত করতে হবে। দু-একটি প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো খাতের বদনাম হচ্ছে।’
শর্তের বরখেলাপ
নীতিমালা অনুযায়ী, ৫০ আসনের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে অন্তত ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল থাকতে হবে। শিক্ষার্থী ভর্তির দুই বছর আগে থেকে হাসপাতালটি চালু থাকতে হবে। ৭০ শতাংশ শয্যায় নিয়মিত রোগী ভর্তি থাকবে। হাসপাতাল ও কলেজ হবে একই ক্যাম্পাসে। এগুলোর আয়তনও নির্দিষ্ট করা আছে। কলেজের আসন বরাদ্দ বাড়লে সেই অনুপাতে হাসপাতাল বড় করতে হবে।
রাজশাহীতে দেখা কলেজটির হাসপাতালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক দল ২৫০ শয্যার চেয়ে কম পেয়েছে। ৭ মার্চ দুপুরে প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিবেদক সেখানে শয্যায় কোনো রোগী দেখেননি। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেছিলেন, ভর্তি সাতজন রোগী বিদ্যুৎ না থাকায় বাইরে গেছেন। প্রতিবেদক পরে সন্ধ্যায় গিয়ে চারজন রোগীকে দেখতে পান।
হাসপাতালে রোগী না থাকা আর শিক্ষকস্বল্পতা একটি সাধারণ সমস্যা। পরিদর্শন কর্তৃপক্ষের সূত্র বলছে, অনেক হাসপাতাল আদতে বিশেষজ্ঞ ক্লিনিকের মতো, যেখানে বিকেলে রোগী দেখার ভিড় হয়। আরেক সমস্যা, ভবনের কাঙ্ক্ষিত আয়তনসহ অবকাঠামো এবং কলেজ ও হাসপাতালের অভিন্ন ক্যাম্পাস না থাকা।
২০১২ সালে চালু হওয়া খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এক কিলোমিটার দূরত্বে ছড়িয়ে আছে। ময়লাপোতার মোড়ে ১৮ তলা যে ভবনটি আছে, সেটি হাসপাতাল ভবন। ৫ মার্চ এই ভবনে ঘুরে কোনো শিক্ষার্থী চোখে পড়েনি।
অভ্যর্থনাকারীর কাছে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি পাঁচতলায় পাঠান। সেখানে এক কর্মচারী বলেন অপেক্ষা করতে। আধা ঘণ্টা পরে তিনি বলেন, অধ্যক্ষ চলে গেছেন। জানা যায়, কলেজ ভবনটি রয়েল হোটেলের কাছে। পরদিন তাঁর নাগাল পেলে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক পরিতোষ পাল বলেন, তিনি নতুন এসেছেন, প্রতিষ্ঠানের খুঁটিনাটি তথ্য জানা নেই।
হাসপাতাল দূরে হলে বা সেখানে পর্যাপ্ত রোগী না থাকলে শিক্ষার্থীদের অনুশীলনের সমস্যা হয়। নীতিমালায় বিষয় ও শিক্ষার্থীর মাথা গুনে শিক্ষকের সংখ্যা বেঁধে দেওয়া আছে। শিখন ভালো হওয়ার জন্য ৫০ আসনের একটি কলেজে কমপক্ষে ১৭৭ জন শিক্ষক দরকার।
দেশের প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজটি রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায়। নাম বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজের সুনাম আছে। এর হাসপাতাল নিজস্ব ভবনে। তবে ৩৪ বছর ধরে কলেজ চলছে ভাড়া বাড়িতেই।
অধিদপ্তরের পরিদর্শন কর্মকর্তাদের বিবেচনায়, ৬৯টি কলেজের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজসহ ১৬টি মানসম্পন্ন। ১০টিই ঢাকার বাইরে। এগুলোর হাসপাতালে রোগী থাকে এবং শিক্ষকের সংখ্যাও মোটামুটি ভালো।
তবে ভালো কলেজগুলোরও জমি-ভবনের আয়তন অথবা ভাড়া বাড়ির সমস্যা আছে। অধিদপ্তরের কাছ থেকে যে ১৩টি মেডিকেল কলেজের পরিদর্শন প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, সেগুলোর ১১টিই এমন।
পেছনে প্রভাবশালীরা
গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে পশ্চিমে ইটাহাটায় ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের বাঁ পাশে সিটি মেডিকেল কলেজের ভাড়া করা পাঁচতলা ভবন। আশপাশের দোকানিরা বলছেন, ভবনটি তৈরি হয়েছিল পোশাক কারখানার জন্য।
প্রতি তলায় সরু বারান্দার দুপাশে ছোট ছোট ঘর। এসব ঘরে শিক্ষকেরা বসেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকেরা ক্লাসও করেন। কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী মণ্ডল কলেজটি ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললেন, প্রতিষ্ঠানটি মানসম্পন্ন।
কলেজের হাসপাতাল বেশ দূরে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল হামিদ বলেন, ওই দিন রোগী ভর্তি ছিল ১৮ জন। নীতিমালার শর্ত মোতাবেক সেখানে কমপক্ষে ১৭৫ জন রোগী থাকার কথা। কিন্তু অত শয্যা ফেলার জায়গা নেই।
প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সাংসদ মহীউদ্দীন খান আলমগীর। হাসপাতালে তাঁর অফিস ঘরের বাইরে নামফলক ঝুলছে। কলেজটি তিনি কিনে নিয়েছেন। একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ‘গার্মেন্টস বিক্রি হলে মেডিকেল কলেজ বিক্রি হবে না কেন? দুটোই এখন ব্যবসা।’
সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, ২০১০ সাল থেকে কলেজটি তিনবার ক্যাম্পাস বদলিয়েছে। নিজস্ব জমি নেই। পরিদর্শনের দিন হাসপাতালে মোট ৫১ জন রোগী ছিল, যাদের সেদিনই অথবা তার আগের দিন ভর্তি করা হয়। অধিকাংশ রোগীর সমস্যা ছিল মাথা, কোমর বা পেটে ব্যথা, যার জন্য ভর্তি নিষ্প্রয়োজন। কলেজের আসনসংখ্যা ৮০। মোট শিক্ষক ১০৫, ওই দিন ছিলেন ১৬ জন।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে আছে, প্রায় সব শর্ত অমান্য করায় এ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন স্থগিত করা হয়েছিল। ফের পরিদর্শনের জন্য ওপরতলার চাপ আসে। বিশেষ পরিদর্শন কমিটি গঠিত হয়। প্রতিবেদনটি তাদের।
রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে মেডিকেল কলেজের মালিকানা বা পৃষ্ঠপোষক বদলের নজির আছে। ৩৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের উদ্যোক্তা ক্ষমতাসীন সরকারপন্থী। তাঁদের মধ্যে একজন মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী ও দুজন সাবেক মন্ত্রী আছেন। আছেন একাধিক সাংসদ, চিকিৎসক নেতা ও ব্যবসায়ী।
বিএনপিপন্থী এবং জামায়াতে ইসলামীপন্থী চিকিৎসক বা ব্যবসায়ীরা ছয়টি করে মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। জাতীয় পার্টির নেতারা চালাচ্ছেন দুটি মেডিকেল কলেজ। বাদবাকি ১৯টি মেডিকেল কলেজের পরিচালকেরা সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত না।
নজরদারি ও দুর্নীতি
কলেজগুলো নজরদারির মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়নবিষয়ক পরিচালকের দপ্তরের। এখানকার একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানের সূচনায় দপ্তরটির পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক এম এ রশিদ। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সম্প্রতি তিনি বদলি হয়েছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেছিলেন, তাঁদের পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নতুন কলেজের অনুমোদনসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি। কমিটির সভাপতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সদস্যদের মধ্যে আছেন চিকিৎসক নেতারা।
কলেজ স্থাপন, আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, নবায়ন বা কোর্স অনুমোদন-সংক্রান্ত একাধিক সভার কার্যবিবরণীতে (২০১২-২০১৩) দেখা যায়, মন্ত্রণালয় শর্ত না মানা কলেজগুলোও অনুমোদন দিয়েছিল।
২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদক তথ্য অধিকার আইনে সব কটি কলেজের পরিদর্শন প্রতিবেদন চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ৯০ দিন পর চিঠিতে লেখেন, ‘বেসরকারি মেডিকেল কলেজ–সংক্রান্ত পরিদর্শন প্রতিবেদন অত্র বিভাগে সংরক্ষিত নেই।’
অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্যও ছিলেন। তাঁর সাফ কথা, ‘এভাবে চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত না।’ তিনি বলছেন, সরকারকে খারাপ মেডিকেল কলেজগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সাহায্য করতে হবে। আর বেশি দুরবস্থার কলেজগুলোকে অন্য কলেজের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ)

নারী যাত্রীদের অপহরণ করে যৌন নির্যাতন করতো ওরা

কাগজপত্রবিহীন বাস সংগ্রহ করে তারা বিভিন্ন রুটে চালায়। চালকেরও কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। বিভিন্ন স্টপেজে গ্রাম থেকে আসা অপেক্ষমাণ একা নারী যাত্রীদের টার্গেট করতো। কৌশলে বাসের অন্য যাত্রীদের সঙ্গে ওই নারীদের বাসে তুলতো। একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছার পর বিভিন্ন অজুহাতে অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দিতো। আর টার্গেটকৃত নারীদের গন্তব্য পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসিয়ে রাখতো। অন্য যাত্রীরা বাস থেকে নেমে গেলে ওই নারীদের  সঙ্গে অশোভন আচরণ করত। শরীরে হাত দিয়ে নানাভাবে যৌন নির্যাতন ও হেনস্থা করত।
আবার কোনো কোনো নারীকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করত।
সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিত। আর লুটে নিত নারীদের সঙ্গে থাকা টাকাপয়সা, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য সামগ্রী। এরপর নির্জন কোনো স্থানে ভুক্তভোগীকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেত। দিনের পর দিন এভাবেই অসহায় নারীদের সঙ্গে তারা এমন আচরণ করত। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (রাব-১) হাতে এই চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য বের হয়ে এসেছে। গতকাল কাওরান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম এসব কথা জানান।
র‌্যাবের এই অধিনায়ক বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে বাসের নারী যাত্রীদের অপহরণ ও শ্লীলতাহানি করা হচ্ছে এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের গোয়েন্দা টিম মাঠে নামে। শনিবার আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আরেক নারীকে অপহরণ চেষ্টাকালে হাতেনাতে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন, ব্রাহ্মবাড়িয়ার নাসিরনগরের মনির মিয়ার ছেলে মো. খলিল মিয়া (৩৩),  চাঁদপুরের শামসুল হকের ছেলে মেহেদি হাসান বাবু (২২) ও ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার সায়েদ আলীর ছেলে মো. রাকিব হোসেন (১৯)। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে খলিল মিয়া পেশায় একজন চালক।
সে এক বছর ধরে আশুলিয়া ক্লাসিক বাসের চালক হিসাবে কাজ করছে। তার কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। সে যে বাস চালায় সেটারও কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। এর আগে সে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাত। ২০১৬ সালে ঢাকায় এসে চালকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে। পরে চালক হয়। মেহেদি হাসান বাবু ছয় বছর ধরে আশুলিয়া ক্লাসিক বাসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছে। এর আগে চার বছর সে আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া রুটে লেগুনা চালাত। চালকের সহকারী ইশারা দিয়ে টার্গেটকৃত নারী দেখালে সে ওই নারীর কাছ থেকে কোনো ভাড়া নিত না। পরে ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে গল্প গুজব করে সময় কাটাতো। যাতে সে কোন রুটে যাচ্ছে তা যেন না বুঝে। আর চালকের সহকারী হিসেবে কর্মরত রাকিব এক বছর ধরে আশুলিয়া ক্লাসিক বাসে কাজ করছে। এর আগে সে বিভিন্ন চায়ের দোকানে কাজ করেছে। রাকিব মূলত কম বয়সী নারীদের টার্গেট করত। বাসে ওঠার সময় চালক ও সুপারভাইজারকে ইশারা করে বিষয়টি জানিয়ে দিত।
যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়
র‌্যাব-১ অধিনায়ক সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, ভুক্তভোগী এক নারী দুই মাস আগে ঢাকায় এসেছে। তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁ। ঘটনার দিন সে বাইপাইল থেকে নবীনগর যাওয়ার উদ্দেশ্য বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিল। এসময় আশুলিয়া ক্লাসিক নামের বাসের চালকের সহকারী রাকিব বাস থামিয়ে কোথায় যাবে জিজ্ঞাসা করে। এসময় ওই নারী জানায়, সে নবীনগর যাবে। পরে রাকিব তাকে ওই বাসে তুলে নেয়। ঢাকায় নতুন আসার কারণে রাস্তাঘাট না চেনায় ওই নারীও বাসে উঠে। পরে সে তার ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলিয়ে দেয় বাসের সুপারভাইজর মেহেদির সঙ্গে। কিন্তু তার ভাই মেহেদিকে নবীনগর নামিয়ে দেয়ার কথা বললেও কৌশলে তারা বাস আব্দুল্লাহপুরের দিকে নিয়ে যায়। আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে বাসের কাগজপত্রে সমস্যা আছে বলে অন্যান্য যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। আর ওই নারীকে গন্তব্যে পৌছে দেয়ার কথা বলে নামতে দেয়নি। পরে বাসটি আবার রওনা হলে মেহেদি ও রাকিব ওই নারীর পাশে বসে খারাপ আচরণ করতে থাকে। খারাপ কাজ করার ইঙ্গিত দিয়ে তাকে ঝাপটে ধরে। তখন ওই নারী বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকরা করতে থাকে। তার চিৎকারে আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে তারা বাস থামায়। এসময় তড়িঘড়ি করে ওই নারী নেমে যায়। কিন্তু তারা আবার ওই নারীকে জোর করে গাড়িতে তুলে। র‌্যাব সদস্যরা এই দৃশ্য দেখে আসামিদের গ্রেপ্তার করে।
র‌্যাব অধিনায়ক আরো বলেন, এর আগেও এই আসামিরা অনেক নারী যাত্রীকে যৌন নির্যাতন করেছে। গ্রাম থেকে আসা কম বয়সী নারীদের ধর্ষণ করে তার ভিডিও ধারণ করে ভয়ভীতি দেখাতো। লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা এসব ঘটনা কাউকে জানাতো না। এছাড়া তারা অনেক বাসের যাত্রীদের একা পেয়ে জোরপূর্বক টাকা-পয়সা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিত।

এরশাদ নাটক

নাটক! নাটক!! নাটক!!! জমে উঠেছে দেশের সুবিধাবাদী রাজনীতির রূপকার এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টিতে নাটক। এইচ এম এরশাদ পরিচালিত, রওশন এরশাদ নির্দেশিত, রুহুল আমিন হাওলাদার প্রযোজিত, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ রচিত এই নাটকে সর্বশেষ বলি জিএম কাদের। সম্পত্তি লিখে দেয়ার মতোই ‘উইল’-এর মাধ্যমে জাতীয় পার্টির মালিকানা পাওয়া জিএম কাদের হঠাৎ সবকিছু খোয়ালেন! কো-চেয়ারম্যান ও সংসদ উপনেতা দুই পদ থেকেই তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিরোধী দলের উপনেতা পদে রওশনকে নেয়া হয়েছে; এখন রুহুল আমিন হাওলাদারকে ‘কো-চেয়ারম্যান’ নাকি মশিউর রহমান রাঙাকে সরিয়ে দিয়ে ‘মহাসচিব’ পদে পুনরায় বসানো হয় দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন দলের নেতাকর্মীরা। জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপার এক নেতা বলেন, স্যার (এরশাদ) এসব করেই নিজেকে মিডিয়ার খবরে রাখার চেষ্টা করছেন। ফুয়েল পেলেই উনি বদলে যান। কখন কোন রূপ ধারণ করেন বলা মুশকিল।
এরশাদকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টিতে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট দু’ধারি ছুরির মতো। দল থেকে কেউ বাদ গেলে এদের লাভ, নতুন যোগ দিলেও লাভ। কেন্দ্র থেকে শুরু করে পদ বেচাবিক্রি, তৃর্ণমূলের কমিটি, নির্বাচনে মনোনয়ন, এরশাদের নাম করে প্রশাসনে বিভিন্ন কাজ বাগিয়ে নেয়া, প্রশাসনে নিয়োগ বদলি বাণিজ্য সবকিছুই এরা নিয়ন্ত্রণ করেন। এদের তোয়াজ করেই দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে হয়। যা রুহুল আমিন হাওলাদার করেন। কিন্তু জিএম কাদের এই কৌশল পাত্তাই দেন না। এতে কাদেরের সঙ্গে নেতাদের দূরত্বের সৃষ্টি হয়। দেশের রাজনীতিতে নেতাকর্মীদের পিলে চমকানো এই ‘এরশাদ নাটক’ কখন কে উপরে উঠেন, আর কে নিচে নামেন কেউ জানেন না। সবকিছুই নির্ভর করে পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০/১-ক ধারা ক্ষমতার ওপর। সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদ কখন কার মাথায় ছাতা ধরবেন, কার মাথা কেটে ফেলবেন, কাকে কড়া রৌদ্রে দাঁড় করে রাখবেন আর কাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন তা তিনিও জানেন না। ঠিক করে দেয় সিন্ডিকেট। তবে আজ যাকে ছুঁড়ে ফেলছেন তিনিই কালই তাকে প্রমোশন দিয়ে পার্টিতে ফিরে আনতেও পারেন। জাপার নেতারা বলছেন, নির্বাচনের সময় তিনি ‘এই নাটক’ বেশি করেন। তখন টাকার ছড়াছড়ি থাকে। অন্যসময় টাকা-পয়সার গন্ধ পেলেও করেন। এক সময় লেদারের গন্ধ পেলেই এসব করতেন। এখন টাকার গন্ধ পেলেই বহিষ্কার-তিরস্কার-পদায়ন-বর্জন এসব করেন।
এরশাদ এখন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। কোথাও গেলে হুইল চেয়ার তার সঙ্গী হয়। দলের মহাসচিব এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে ‘ভুল চিকিৎসার’ কারণে তার এই পরিণতি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় ‘অসুস্থতার নাটক’ করেছেন। এবারের নির্বাচনের সময় সত্যিকারের অসুস্থ হন। ২০ মার্চ ৯০তম জন্মদিন পালন করেন এরশাদ। তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘হয়তো এটাই আমার জীবদ্দশায় শেষ বক্তৃতা’। এর পরের দিন বৃহস্পতিবার ২১ মার্চ ছোট ভাই জিএম কাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের ফ্লাটে দেখা করতে গেলে তাকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, ‘তুমি দলকে ভালো চালাচ্ছো। তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে ভুল করিনি’। পরের দিনই ব্যর্থতার অভিযোগে পার্টির কো-চেয়ারম্যানে পদ থেকে কাদেরকে অব্যাহতি দেন। সাংগঠনিক নির্দেশে এরশাদ বলেন, ব্যর্থতার কারণে জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। তবে ওই বার্তায় তিনি বলেন, সংসদের বিরোধী দলের উপনেতার দায়িত্বে জিএম কাদের থাকবে কিনা তা পার্লামেন্টারী পার্টির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু পার্লামেন্টারী পার্টির বৈঠক পর্যন্ত অপেক্ষা না করে পরের দিনই সংসদের বিরোধী দলের উপনেতা পদ থেকেও কাদেরকে সরিয়ে দেন। সে পদে বসান স্ত্রী রওশন এরশাদকে। তিনি দশম সংসদে এরশাদকে ল্যাং মেরে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদে গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পালন করেন। দলের নেতারা জানান, সংরক্ষিত নারী আসনে যে চারজন এমপি হয়েছেন তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান অর্থের লেনদেন হয়েছে। আবার সিংগাপুরে সিকিৎসার জন্য যাওয়ার আগে প্রথম দফা যে চারজনের নাম ঘোষণা করেন তাদের কাছ থেকেও ‘লেনদেন’ হয়।
সূত্র জানায়, জিএম কাদেরকে পদচ্যুতই শেষ নয়; দলের নেতাকর্মীদের জন্য সামনে আরো নাটক অপেক্ষা করছে। এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে কো-চেয়ারমান পদে অথবা আবার মহাসচিব পদে আনা হতে পারে। ২০ মার্চ এরশাদের জন্মদিনে রুহুল আমিন হাওলাদার ও ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ যাননি। আগের রাতে হাওলাদার বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায় গিয়ে এরশাদকে প্রচুর উপঢৌকন দেন। যা নতুন মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙা কখনোই করেননি। আর দলের সর্বমহলে নতুন মহাসচিবের গ্রহণযোগ্যতা গড়ে ওঠেনি। আনপ্রেডিক্টেবল এরশাদ ছোটভাই জিএম কাদেরকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান করেন ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি। এই ঘোষণা দেয়ার পর বেঁকে বসেন স্ত্রী রওশন। গৃহবিবাদ ঠেকাতে স্ত্রী রওশন এরশাদকে এক ধাপ উপরে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দলের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে জাতীয় পার্টিকে জিএম কাদেরের নামে ‘উইল’ করে দেন। তার অবর্তমানে জিএম কাদের দল চালাবেন এ নির্দেশনা দেন। কিন্তু জিএম কাদের দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি। বড় ভাই চেয়ারম্যান এই তাঁর পুঁজি। তবে ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হওয়ায় সিন্ডিকেট নেতাদের সঙ্গে তার এমনিতেই দূরত্ব ঘোচেনি।
এরশাদ চার বছর বছর আগে রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে জাপার মহাসচিব করেন। কিছুদিন পর বাবলুকে সরিয়ে আবার ওই পদে হাওলাদারকে নিয়ে আসেন। ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে এরশাদ নিজের ভাগ্নি মেহেজেবুন নেসা রহমানের বিয়ে দেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগে আকস্মিকভাবে রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে মহাসচিব করা হয় দূর সম্পর্কের ভাগ্নে মশিউর রহমান রাঙ্গাকে। কিন্তু ক’দিন পর ‘চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী’ পদ সৃষ্টি করে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে সে পদে বসানো হয় রুহুল আমিন হাওলাদারকে। এরশাদের একের পর এক নাটকে জাতীয় পার্টি সাংগঠনিকভাবে কার্যত ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। নিবেদিতপ্রাণ ও পরীক্ষিত নেতারা মান মর্যাদা নিয়ে আগেই কেটে পড়েছেন। যারা এখনো রয়েছেন সম্মান রক্ষার্থে তারাও দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। তবে সুবিধাবাদী সিÐিকেট চক্র এখনো এরশাদ নাম ভাঙ্গিয়ে আয়-রোজগার করায় এরশাদকে একের পর এক নাটকে উৎসাহিত করছেন। এজন্যই তৃর্ণমূলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। সংসদ নির্বাচনে ১৭০ জন লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী করেন; ভোটের আগে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে সরকারের সঙ্গে মাত্র ২৬ জন প্রার্থী নিয়ে সমঝোতার ঘটনা কেউ মেনে নিতে পারেননি। নিজের আসন ধরে রাখার চেষ্টায় ২০ আসন ছেড়ে দেয়ার প্রকল্পে হাওলাদার নিজেই গর্তে পড়ে এমপি হতে পারেননি। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দলের এমন অবস্থা যে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এবারের উপজেলা নির্বাচনে জাপার দু’জন উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
জাপার একাধিক নেতা মনে করেন এরশাদ গণবিরোধী অবস্থান এবং সব সময় জনগণের মতামতের বিপক্ষ্যে ক্ষমতাসীনদের তোয়াজ নীতির কৌশল করায় এই দশা হয়েছে। তাঁর কর্মময় জীবনে দেখা যায় ১৯৫২ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে শিয়ালকোটে ৫৪ ব্রিগেডের মেজর হন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-১৯৭০ সালে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ও ১৯৭১-১৯৭২ সালে ৭ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তিনি ছুটিতে রংপুর ছিলেন। কালুর ঘাট বেতারে ঘোষণা শুনে সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও তিনি পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের সঙ্গে ১৯৭৩ সালে দেশে আসেন। তিনি ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন। ৯ বছর ক্ষমতায় থেকে নানা ক্যারিকেচা করে ১৯৯০ সালে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন।
’৯০ এ ক্ষমতা হারানোর পর ২২ মামলায় এরশাদ কারাগারে থাকার সময় জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব দেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজান চৌধুরীর কারণে জাপা নুতন করে প্রাণ ফিরে পায়। জাতীয় পার্টি গণমুখী রাজনীতি শুরু করলে পঞ্চম ও ৬ষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদ ৫টি করে আসনে বিজয়ী হন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে কারাগার থেকে বের হয়েই আবার জাতীয় পার্টিকে ‘সুবিধাবাদী’ দলে পরিণত করেন। জনমত ও জনশ্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে হয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব, নয়তো নিজেকে ‘নিরাপদ’ রাখার চেষ্টা করেন। এ জন্যই মিজানুর রহমান চৌধুরী, ব্যারিষ্টার মওদুদ, কাজী জাফর আহমদ, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের মতো বটবৃক্ষরা এরশাদকে ত্যাগ করেন। এরশাদ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে তার ভেল্কিবাজী ইতিহাসে যায়গা করে দিয়েছে। জাপার নেতাদের মতে এরশাদ দলের নেতাকর্মীদের কাছে গিরগিটির মতোই। কখন তিনি কোন রুপ ধারণ করেন বলা মুশকিল।
জিএম কাদেরকে ব্যর্থতার অভিযোগে কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া প্রসঙ্গে জেএম কাদের গত শুক্রবার রাতে বলেন, আমার কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। কারণ বৃহস্পতিবার রাতে আমাকে এরশাদ সাহেব বলেছিলন, তুমি (জি এম কাদের) খুব ভালো করছো। আমি (এরশাদ) তো আর বেশি দিন বাচঁবো না, তুমি দলটাকে বাচিঁয়ে রেখো। আমি জানি তুমি পারবে। তবে শনিবার বিকালে উপনেতার পদ থেকে অব্যাহতির বিষয়ে জানতে জিএম কাদেরকে একাধিক ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
২২ মার্চ শুক্রবার জিএম কাদেরের অব্যহতির ‘সাংগঠনিক নির্দেশে’ এরশাদ স্বাক্ষর করেন। শনিবার প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে অবস্থান করেন জিএম কাদের। তাকে এরশাদ ‘চিন্তা করো না আমি দেখবো’ অভয় দেন। আর মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাকে বলেন, এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। কাজী ফিরোজ রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, দলের কে কোন পদে থাকবে সেটা এরশাদ সাহেব ভালো বলতে পারবেন। কেন তাকে সরিয়ে দেয়া হলো সেটা এরশাদ সাহেবই ভালো জানেন। তবে জি এম কাদের কোনো রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব নয়। পার্টির কোনো নেতার সঙ্গে দেখা করবেন না কথা বলবেন না তাহলে রাজনীতি কিভাবে হয়? নির্বাচনের আগে বা পড়ে একবারও নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা বলেন, এরশাদের নাটক কেবল শুরু; এই নাটক কোথায় গিয়ে ঠেকে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

যেভাবে হত্যা করা হয় ওয়াসিমকে by ওয়েছ খছরু

আউশকান্দির টোলপ্লাজা থেকে উদার পরিবহনের বাসে উঠেন নিহত ওয়াসিম আব্বাস ও তার ১০ সহপাঠী। তারা সবাই বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে সিলেটে ফিরছিলেন। বাসে ওঠার পর হেলপার মাসুক তাদের প্রত্যেকের কাছে ১০০ টাকা ভাড়া চায়। এতে আপত্তি তোলেন ওয়াসিম। ভাড়া তো এত নয়, বেশি চাচ্ছেন কেনো- এ প্রশ্ন করেন ওয়াসিম। এ নিয়ে বাসের হেলপারের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। এরই মধ্যে উদার পরিবহনের ওই বাস শেরপুর পৌঁছে যায়। ভাড়া নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ায় বাস থেকে নেমে যান ওয়াসিম ও তার সহপাঠীরা।
সবার শেষে নামেন ওয়াসিম ও তার বন্ধু রাকিব হাসান। এমন সময় হেলপার ওয়াসিম ও তার বন্ধুদের নিয়ে কটূক্তি করে। বলে- ‘বাসে ওঠার  যোগ্যতা নেই, কম ভাড়া দেয়।’ এ কথা শুনেই শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে দাঁড়ানো বাসে উঠেন ওয়াসিম ও তার বন্ধু রাকিব। তারা উঠতেই চালক জুয়েল মিয়া বাসের স্পিড বাড়িয়ে দেয়। কটূক্তি কেনো করা হলো- এ নিয়ে ফের তর্ক বাধলে ওই সময় হেলপার মাসুক ধাক্কা দেয় ওয়াসিম ও তার বন্ধুকে। হেলপারের ধাক্কায় রাকিব ছিটকে রাস্তার উপর পড়ে। আর ওয়াসিম পড়ে যাওয়ার আগেই বাসের হাতল ধরে ফেলে। এ সময় হেলপার দরোজা বন্ধ করে দিলে অসহায় হয়ে পড়েন ওয়াসিম।
দ্রুতগতির বাসের ঝাঁকুনিতে এক সময় সে চাকার নিচে পিষ্ট হয়। এতেই গুরুতর আহত হয়ে পড়ে। তার দুই পায়ের উপর দিয়ে প্রথমে বাসের সামনের চাকা এবং পরে পেছনের চাকা উঠে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার পথেই মৃত্যু হয় ওয়াসিমের। এমন ঘটনা এখনো ভুলতে পারছেন না ওয়াসিমের সঙ্গে থাকা সহপাঠীরা। চোখের সামনেই তারা ওয়াসিমের মৃত্যু দেখেছেন। আর এই মৃত্যু নিছক কোনো দুর্ঘটনা ছিল না বলে দাবি করেন তারা। ওয়াসিমের সঙ্গে আহত হওয়া রাকিব হাসান দুর্ঘটনার সময়ের কথা স্মরণ হলেই আঁতকে উঠেন। বলেন- হেলপার আমাকে ও ওয়াসিমকে ধাক্কা দেয়। আমি ছিটকে রাস্তায় পড়ে গেলেও ওয়াসিম হাতলে আটকে যায়। পরে সেখান থেকে চাকার নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়। রাকিব জানান, ‘আমরা মোট ১১ জন ছিলাম। সবাই বাস থেকে নেমে যাওয়ার পর ওয়াসিম নামে। পেছন থেকে কটূক্তি করে বাসের হেলপার ও সুপারভাইজার। এই কটূক্তি শুনেই আমরা বাসে উঠি।
এরপর বাসের স্পিড বাড়িয়ে দিলে এই দুর্ঘটনা ঘটে।’ রাকিব বলেন, ‘আমি ভাগ্যের  জোরে বেঁচে গেছি। আর ওয়াসিম নিহত হলো। আমি যখন পড়ে যাই এর একটু পরেই দেখি ওয়াসিম চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছে।’ ওয়াসিমের সঙ্গে থাকা আরেক প্রত্যক্ষদর্শী রঞ্জন ঘোষ জানিয়েছেন, প্রতিবাদ করতে বাসের গেটে ওঠার পরই চালক বলে ‘এদেরকে বাঁধ’। এ কথা বলার পর বাসের গতিও আস্তে আস্তে বাড়াতে থাকে। এরপর ভেতর থেকে আমাদের ধাক্কা দেয়া হয়। দু’জনকে আলাদাভাবে ধাক্কা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন- ‘পড়ে যাওয়ার পরও ওয়াসিম বাঁচতে চেষ্টা করে। কিন্তু বাস স্পিড বাড়িয়ে টার্ন নেয়ার কারণে বাসের  পেছনের চাকার নিচে পড়ে সে।’ এদিকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) ছাত্র ওয়াসিম আব্বাসকে বাসচাপায় হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন উদার পরিবহনের চালক ও হেলপার। শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উদার পরিবহনের বাসচালক জুয়েল আহমদ ও রাত ২টার দিকে হেলপার মাসুককে পৃথক স্থান থেকে আটক করে  মৌলভীবাজার মডেল থানা পুলিশ। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনা স্বীকার করেছেন।
মৌলভীবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ারুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিকালে নবীগঞ্জের  টোলপ্লাজা থেকে সিলেট যাওয়ার উদ্দেশে উদার পরিবহনের বাসে ওঠেন সিকৃবির কয়েকজন ছাত্র। এ সময় হেলপার মাসুক মিয়া তাদের কাছে ১০০ টাকা ভাড়া দাবি করে। এতে ওয়াসিম ও তার বন্ধুরা ছাত্র পরিচয় দিয়ে ভাড়া কম দেয়ার কথা জানান। এতে হেলপার ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। এক পর্যায়ে তারা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নেমে যান। নামার সময় পেছন থেকে হেলপার তাদের গালি  দেন। এতে ওয়াসিম বাসের সিঁড়িতে উঠে হাতল ধরে কেন গালি দিলেন তা জিজ্ঞেস করতেই চালক গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। ঠিক তখনই হেলপার মাসুক মিয়া ওয়াসিমকে ধাক্কা দিয়ে নিচে  ফেলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বাসের পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে ওয়াসিম গুরুতর আহত হন।

চাকার নিচে পিষ্ট দেবপাড়ার স্বপ্ন

কত স্বপ্ন ছিল তার চোখে। একদিন বড় হবে। পিএইচডি করবে। রাজনীতিবিদ হয়ে মন্ত্রী হবে। এরপর মানুষের সেবা করবে।- এমন স্বপ্নাতুর তরুণ ওয়াসিম আব্বাসের সেই স্বপ্ন ঘাতক চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে গেল। বুঝ ধরাতে পারছেন না স্বজনরা। কান্নার রোল পড়েছে নবীগঞ্জের গাছঘেরা শ্যামল গা দেবপাড়ার রুদ্র গ্রামে। কাঁদছে গোটা দেবপাড়ার মানুষ।
নবীগঞ্জও কাঁদছে। শোকে কাতর সবাই। একটি স্বপ্নের এমন মৃত্যু কাঙ্ক্ষিত ছিল না কারো জন্য। এলাকার মানুষের কাছে প্রিয়জন ছিল ওয়াসিম। ছুটি পেলেই ছুটে আসতো দেবপাড়া। গ্রামের হাটবাজার, খেলার মাঠ মাতিয়ে রাখতো সে। এলাকার মানুষকে স্বপ্ন দেখাতো সব সময়। বদলে যাওয়া দেবপাড়ার নতুন সারথী হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। এ কারণে গতকাল ওয়াসিমের জানাজায় ছিল মানুষের ঢল। সবার চোখে ছিল শোকের জল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা যখন ওয়াসিমকে দেবপাড়ার রুদ্রগ্রামে শেষ বিদায় জানিয়ে আসে তখন বারবার পিছনে ফিরে তাকা‘য় ওয়াসিমের জন্য। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তারা ওয়াসিমকে নিয়ে রুদ্রগ্রামে আড্ডায় মেতে উঠেছিল।
নিজের বাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে এসে গোটা গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছে। দেবপাড়ায় বসে আড্ডা দিয়েছে। সেই ওয়াসিমকে আজ নিজ হাতেই চির বিদায় জানিয়ে এলেন বন্ধুরা। ওয়াসিমের সহপাঠী ও রুমমেট সোহান অঝোরে কাঁদছিলেন বন্ধুদের জন্য। গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ভাতিজার বিয়েতে অংশ নিতে কয়েক দিন আগেই ওয়াসিম চলে যায় রুদ্রগ্রামের বাড়িতে। যাওয়ার সময় সে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে যায়। তার দাওয়াত পেয়ে আমরা ১০ বন্ধু মিলে শুক্রবার জুমার নামাজের আগে দেবপাড়ার রুদ্রগ্রামে গিয়ে পৌঁছাই। বিশাল আয়োজন। বিয়েতে ওয়াসিম সহ আমরা সবাই মিলে হুই-হুল্লোড় করি। অনেক মজা করি। বিয়ে পর্ব শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। এরপর আমরা সবাই এক সঙ্গে রুদ্রদের বাড়িতে থেকে যাই। রাতেও আমরা দেবপাড়ায় এক সঙ্গে আড্ডা দেই। পরদিন ওয়াসিমের বাড়ি থেকেই আমরা ফিরছিলাম। আর ঘাতক বাস কেড়ে নিল ওয়াসিমকে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুস সামাদ হলের ৩০৭ নম্বর কক্ষের বাসিন্দা ওয়াসিম আব্বাস। এই কক্ষে তার সঙ্গে বসবাস করেন সোহান। ওয়াসিমকে ছাড়া কক্ষে বাস করবেন কেমনে- প্রশ্ন করে সোহানের।
এই রুমে মশিউর নামে তাদের আরেক বন্ধু বসবাস করেন। সহপাঠীরা জানিয়েছেন- কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ো টেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ২০১৪ সালের শেষের দিকে সে ভর্তি হয়। এরপর সে হলের বাসিন্দা হয়। পড়ালেখায় মেধাবী ছিল বলে সব খানেই ছিল ফার্স্ট ক্লাস। অনার্স শেষ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায়ও শেষ হয়েছে। এখন কেবল প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা বাকি ছিল। আগামী এক মাসের মধ্যে স্নাতকপর্ব শেষ হয়ে যেত। বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ছাত্র সমিতির ভিপি ছিলেন ওয়াসিম আব্বাস। গত নভেম্বরের দিকে সে ওই বিভাগের ভিপি নির্বাচিত হয়। এর বাইরে একাধিক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণচূড়া সামাজিক সংগঠনের কর্মী ছিল। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিল। সব সময় হাসিখুশিতে থাকতো ওয়াসিম। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়ন রঞ্জন ঘুষ শুভ জানিয়েছেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের সবখানেই তার বিচরণ ছিল। খেলার মাঠে ওয়াসিম ছিল সবার চেয়ে এগিয়ে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ হওয়া ফুটসাল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দল নেতা ওয়াসিমের টিম। ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার সহ সব আড্ডায় ওয়াসিম ছিল মধ্যমণি। সব সময় হাসিমুখে কথা বলতো।
কখনো তার আচরণে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হতেন না। এই নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে ওয়াসিম ক্যাম্পাসে সবার পরিচিত ছিল। তিনি জানান- ওয়াসিমের মৃত্যুতে গোটা ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কাঁদছেন সবাই। ওয়াসিমের আরেক রুমমেট মশিউর রহমান আজাদ জানিয়েছেন- ওয়াসিম পিএইচডি করতে চেয়েছিল। এরপর রাজনীতি করে মন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। মানুষের সেবা করার জন্যই সে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তিনি বলেন- ওয়াসিমকে আমরা কখনো কটু কথা বললে সে কিছু মনে করতো না। বরং আমাদের যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেদিকে তার খেয়াল ছিল। নবীগঞ্জের দেবপাড়ার রুদ্র গ্রামের মো. আবু জাহেদ মাহবুব ও ডা. মীনা পারভিন দম্পতির ছোট ছেলে।
মাহবুব আগে পল্লী বিদ্যুতের ইন্সপেক্টর ছিলেন। এখন দেবপাড়া বাজারে ব্যবসা করেন। আর মা ডা. মীনা পারভিন হেলথের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ওয়াসিমের বড় বোন পেশায় নার্স। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী সহ বসবাস করেন ঢাকাতে। বাড়িতে পিতা-মাতা একাই থাকেন। এ কারণে সময় হলেই ওয়াসিম পিতা-মাতার সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি যেতেন। ওয়াসিমের বন্ধু সোহান জানিয়েছেন- তার পিতার ইচ্ছা ছিল ছেলে ও মেয়েকে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। কিন্তু মেয়েকে পারেননি। এ কারণে ওয়াসিমকে নিয়েই তাদের সব স্বপ্ন ছিল। আর ওয়াসিমও পিতা-মাতার স্বপ্ন পূরণে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করছিল। ওয়াসিমের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ইফতিজা তাবাস্‌সুম ইসলাম ও আশরাফি আশা জানিয়েছেন- ওয়াসিম ক্যাম্পাসের সবার কাছে পরিচিত ছিল। সে কখনো কাউকে আঘাত করেনি। বরং তাকে যারাই আঘাত দিয়েছে তাদের ভালোবেসেছে। পড়ালেখায় মেধাবী হওয়ার কারণে তাদের ডিপার্টমেন্টে ভিপি ছিল। তার মৃত্যু গোটা ক্যাম্পাসের শূন্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান তারা।

জেদ্দা থেকে স্বর্ণ আনার চুক্তি হয় মিন্টুর সঙ্গে -রিমান্ডে বিমানবালা by শাহনেওয়াজ বাবলু

সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে বাংলাদেশ। দূরত্ব ৪,৫৮৪ কি.মি.। বিমানে আসতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টার মতো। এই সময়ে কিছু মাল বহন করার বিনিময়ে পাবেন বিপুল অঙ্কের টাকা। এই লোভ সামলাতে পারেন নি সৌদি এয়ারলাইন্সের দুই বিমানবালা সায়মা আক্তার ও ফারজানা আফরোজ। দু’জনে প্যান্টির নিচে করে জেদ্দা থেকে বাংলাদেশে ৩৬ পিস স্বর্ণ আনার চুক্তি করেন মিন্টু নামের এক লোকের সঙ্গে। বাংলাদেশে এই স্বর্ণ রিসিভ করার কথা ছিল রাকিব নামের একজনের। যার বাড়ি কুমিল্লা।
কিন্তু গত সোমবার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছার পর ওই দুই বিমানবালাকে স্বর্ণসহ এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের সহযোগিতায় আটক করে কাস্টম কর্তৃপক্ষ। পরদিন দু’জনকে আদালতে হাজির করা হয়। ফারজানা বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে রয়েছেন। আর সায়মা আক্তারকে দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সায়মা এসব তথ্য দেন। গতকাল ফের তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
তবে, দুজনের পরিবারেরই দাবি, তারা কখনো এই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাদের ফাঁসানো হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, তারা একটি বড় চক্রের সঙ্গে জড়িত। আগেও এই দু’জন এমন কাজ করেছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই সফিকুল ইসলাম গতকাল মানবজমিনকে বলেন, রিমান্ড শেষে আমরা রোববার তাকে কোর্টে নিয়ে এসেছি। সায়মার কাছ থেকে কিছু তথ্য পেয়েছি। আশা করছি, ফারজানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরো তথ্য পাওয়া যাবে।    
বিমানবালা সায়মা আক্তারের স্বামী তানভীর আহমেদ। আড়াই বছর হয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন দু’জন। তারা রাজধানীর কলাবাগানের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। তানভীর আগে একটি বিয়ে করেছেন। ওই স্ত্রীর সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়ে গেছে। আগের সংসারে একটি ছেলে আছে। তার বয়স ১৭ বছর। সে একটি ইংলিশ মিডিয়ামে ও লেবেলে পড়ে। সায়মা ৮ বছর ধরে সৌদি এয়ারলাইন্সে বিমানবালা হিসেবে কর্মরত। সায়মার স্বামী তানভীর মানবজমিনকে বলেন, আমাদের বিয়ে হয়েছে আড়াই বছর হলো। সে আগে কখনো এই কাজ করেছে বলে আমার মনে হয় না। আর যদি করেও থাকে আমি জানতাম না। যখন এই খবর শুনেছি আমি খুবই আশ্চর্য হয়েছি। এখন আইনি প্রক্রিয়ায় আমার স্ত্রীকে মুক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার স্ত্রী যেহেতু এই কাজের জন্য আটক হয়েছে, এর জন্য আমি খুবই অনুতপ্ত।    
এদিকে ফারজানা আফরোজের বিয়ে হয়েছে দুই বছর হলো। তার স্বামী আরিফুল হক। তিনি নাসা কোম্পানির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। তিনি স্বামীর সঙ্গে গুলশানে একটি বাসায় থাকেন। ফারজানার বাবার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। তবে সে ছোটবেলা থেকে তার পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় থাকেন। ফারজানার শ্বশুর অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার দিন আমার ছেলে বৌমাকে আনতে বিমানবন্দরে গিয়েছিল। এই ঘটনা শোনার পরে সেখান থেকে সে চলে আসে। ওই দিন রাতে আর আমাদের কিছু জানায়নি। পরদিন সকালে ছেলের কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে পারি। আমরা কখনোই বিশ্বাস করতে পারছি না যে, আমার পুত্রবধূ এই কাজ করতে পারে। আর এর আগে এমন কোনো লক্ষণও আমরা তার মধ্যে দেখতে পাইনি। যেহেতু ঘটনা ঘটে গেছে এখন আমরা তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করার চেষ্টা করছি। 
গত সোমবার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টম কর্তৃপক্ষ ও এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ জানতে পারে দুই বিমানবালার স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়টি। স্বর্ণ রয়েছে সৌদি আরব থেকে আসা সৌদি ফ্লাইট এসভি-৮০২ এর দুই নারী কেবিন ক্রু সায়মা ও ফারজানার কাছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেন তারা। রাত ২টার দিকে ওই ফ্লাইট হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেন তারা। নিজেদের রক্ষা করতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তারা স্বর্ণ থাকার বিষয়টি স্বীকার করে। এসময় বিমানবালা সায়মার প্যান্টির ভেতর থেকে ২৬ পিস এবং ফারজানা আফরোজের প্যান্টির ভেতর থেকে ১০ পিস মোট ৩৬ পিস স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়।

২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবসের বৈশ্বিক স্বীকৃতি চায় ঢাকা

গণহত্যা বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অ্যাদামা দিয়েং মনে করেন- যেকোনো স্থানে গণহত্যা সংঘটিত হওয়া বা তার আশঙ্কায় জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তা না হলে এর বীভৎস রূপ দেখতে  হয় বিশ্বকে। ঘটনার ব্যাপকতায় তখন আর কিছুই করার থাকে না! মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে গণহত্যা চলছে বিশেষ করে ২০১৭ সালের আগস্টে ভয়াবহতা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। তার বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে একদিন না একদিন হবেই- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, সেখানে এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছিল। অ্যালার্ম বেজে ছিল, কিন্তু সেই সময়ে বিশ্ব সম্প্রদায় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণহত্যা থেকে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ব্যক্তিদের রাখাইনে ফেরাতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে। ৫ দিনের সফরে ঢাকায় আসা জাতিসংঘ দূত রোববার দুপুরে  রাজধানীর ইস্কাটনস্থ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে গণহত্যা: ১৯৭১’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে বিস।
পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আলোচ্য বিষয়ের ওপর বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য মফিদুল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিস মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম আব্দুর রহমান এনডিসি পিএসসি। সমাপ্তি ভাষণ দেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েজ আহমদ।
সেমিনারে জাতিসংঘের বিশেষ দূত বলেন, রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দেশটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে মিয়ানমারে যথাযথ পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নিরাপদে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হবে। আর্মেনিয়া, বাংলাদেশ, রুয়ান্ডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণহত্যার কথা উল্লেখ করে অ্যাদামা দিয়েং বলেন, গণহত্যা আচমকা ঘটে না। এর জন্য দীর্ঘ পরিকল্পনা থাকে। এর পেছনে অনেক সময়ও নেয়া হয়। সে কারণে গণহত্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে শুরুতেই এর প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ দূত বলেন, একাত্তরে পাকবাহিনী এখানে যে গণহত্যা চালিয়েছে সে বিষয়টি বাংলাদেশ জাতিসংঘের ফোরামে তুলে ধরতে পারে।
বাংলাদেশে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে তিনি কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন কি-না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার এখতিয়ারের মধ্যে নয়। গণহত্যা প্রতিরোধের লক্ষ্যেই তিনি কাজ করেন। সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে নৃশংস গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই গণহত্যার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের নিয়ে বিএনপি রাজনীতি করেছে। গণহত্যায় জড়িত দু’জন মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে বিএনপি মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছে। তাদের গাড়িতে পতাকা তুলে দেয়া হয়েছে। এখনো গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে বিএনপি রাজনীতি করছে।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মফিদুল হক বলেন, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। এই গণহত্যায় ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছেন। গণহত্যার বিচারও বাংলাদেশ শুরু করেছে। এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য বাংলাদেশ কাজ করছে বলেও তিনি জানান। সেমিনারের উন্মুক্ত আলোচনায় প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম বলেন, ২৫শে মার্চের কালোরাত্রিতে বাংলাদেশে গণহত্যার সূচনা হয়েছে। এই দিনকে সামনে রেখে জাতিসংঘের গণহত্যা বিষয়ক দূতের ঢাকা সফর এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি বড় অর্জন। সফরের জন্য তিনি জাতিসংঘ দূতের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, আমি পররাষ্ট্র সচিব বা সাবেক আমলা হিসাবে এখানে কথা বলছি না। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গণহত্যার সাক্ষী হিসাবে এখানে কথা বলছি।
যুদ্ধকালীন গণহত্যার বিভিন্ন ঘটনার জলজ্যান্ত প্রমাণ ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি আশা করি একদিন বাংলাদেশের গণহত্যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারি তার বক্তৃতায় মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিচারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, রাজনীতি নয়, আমরা দায়মুক্তির জন্য ওই বিচার চেয়েছি। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। এ সময় ফাঁসি এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া জামায়াত নেতাদের নামগুলো উল্লেখ করে বলেন, তাদের বিচারে আমরা খুশি।
প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘ দূত যা বললেন-  এদিকে বাসস জানিয়েছে, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের চালানো গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরবে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রিভেনশন অব জেনোসাইড বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা অ্যাদামা ডিয়েং রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে একথা বলেন। তিনি বলেন, যদিও কিছু কিছু দেশ এর বিরোধিতা করবে, তবু আমরা মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে চালানো পাকিস্তানের গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করবো। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এদেশে যে গণহত্যা শুরু করে তা স্মরণ করে বলেন, ‘পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা প্রায় ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা এবং দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট করে।’ এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রমহারা এসব মা-বোনকে পুনর্বাসিত করেন। প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ দূত রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও আলাপ করেন। মিস্টার দিয়েং এ সময় রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো মিয়ানমারের বর্বরতাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের দৃঢ় সহযোহিতার কথা পুনরুল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘গণহত্যা চালানো সেইসব নৃশংসতাকারীকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে’। জাতিসংঘ দূত এসময় বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিতে দেশটির ওপর চাপ জোরদারের জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান একা করতে পারবে না। তাই এই সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে চাপ আরো বাড়াতে হবে। জাতিসংঘ চায় রোহিঙ্গারা তাদের নিজ রাজ্য রাখাইনে পুনর্বাসিত হোক এবং সেখানে শান্তিপূর্ণ ও বৃহত্তর সমাজ গড়ে উঠুক।’ ১০ লাখেরও অধিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গারা সংখ্যায় কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণকেও ছাড়িয়ে গেছে। যে কারণে স্থানীয় জনগণকে খুবই ভোগান্তির স্বীকার হতে হচ্ছে।’
রোহিঙ্গাদের কল্যাণে তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার তাদের অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য ভাসানচর নামে একটি দ্বীপের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা বিষয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ায় আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে ধন্যবাদ জানান। সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ ইস্যুতে তিনি বলেন, দেশে দু-একটি এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও সরকার শক্ত হাতে এসব মোকাবিলা করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন যাতে করে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের মত এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে ওঠে। প্রেস সচিব জানান, অ্যাদামা ডিয়েং এ সময় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তিনজন নারী নেতৃত্বের নাম উল্লেখ করেন। এরা হচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরডেন।
প্রেস সচিব জানান, জাতিসংঘ দূত প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক। তিনি  আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) এর মতই সফলভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সক্ষম হবে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে সফররত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায়। এ সময় তারা উভয়েই ঘটনার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী গৃহীত পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান এবং সেইভ এন্ড সার্ভ ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টা সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এমপি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান এবং সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

দৃষ্টিসীমার বাইরে শাহনাজ রহমতুল্লাহ

যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়, যে ছিল হৃদয়ের আঙ্গিনায়, সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়- নিজের কালজয়ী এই গানের মতো করেই চিরতরে হারিয়ে গেলেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। অগণিত ভক্তকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিদায় নিলেন বাংলা সংগীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র। শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় বারিধারায় নিজ বাসায় শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় শাহনাজ রহমতুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৬৫ বছর। গতকাল বাদ জোহর বারিধারায় পার্ক মসজিদে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বনানীর সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। খ্যাতিমান এ শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শাহনাজ রহমতুল্লাহর বিদায়ে সংগীত তথা পুরো সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পরিণত হয় শোকের বইয়ে।
মৃত্যুর পর পরই শাহনাজ রহমতুল্লাহর বাসায় তার সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তরা ভিড় করতে থাকেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে নৃত্যশিল্পী ডলি ইকবাল জানান, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তার স্বামী মেজর (অব.) আবুল বাশার রহমতুল্লাহ একজন ব্যবসায়ী। মেয়ে নাহিদ রহমতুল্লাহ থাকেন লন্ডনে আর ছেলে এ কে এম সায়েফ রহমতুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্র থেকে এমবিএ করে এখন কানাডায় থাকেন। একুশে পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন বরেণ্য শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। ১৯৯২ সালে তাকে একুশে পদক দেয়া হয়। ১৯৯০ সালে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবিতে গান গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ আয়োজনে আজীবন সম্মাননা, ২০১৩ সালে সিটি ব্যাংক থেকে গুণীজন সংবর্ধনা দেয়া হয় তাকে। বাংলাদেশের সংগীতে যে কজন শিল্পী নিজের গানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন তাদের মধ্যে শাহনাজ রহমতুল্লাহ অন্যতম। তার জন্ম ১৯৫৩ সালের ২রা জানুয়ারি ঢাকায়। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই গান শুরু করেন। অবাক করার বিষয় হলো প্রায় সেই বয়স থেকেই তিনি গান করেন চলচ্চিত্র, টেলিভিশন আর বেতারে। খেলাঘর থেকে শুরু করা এ শিল্পীর কণ্ঠ সে সময়ই ছিল পরিণত। গজল সম্রাট মেহেদি হাসানের শিষ্য হয়েছিলেন তিনি। তার কাছেই তার গানের তালিম নেয়া। ধীরে ধীরে শাহনাজ রহমতুল্লাহর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অল্প বয়সেই তারকাখ্যাতি পান তিনি। বাংলাদেশের দেশাত্মবোধক গানের দিকটা ধরতে গেলে সবার আগেই চলে আসে শাহনাজ রহমতউল্লাহর নাম। তাছাড়া চলচ্চিত্রের গানেও ব্যাপক সফলতা লাভ করেন তিনি। ১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু হয় তার।
এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে অনেক চলচ্চিত্রে তার গাওয়া গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘আমার দেশের মাটির গন্ধে’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’, ‘যে ছিলো দৃষ্টির সীমানায়’, ‘আমায় যদি প্রশ্ন করে’, ‘কে যেন সোনার কাঠি’, ‘মানিক সে তো মানিক নয়’, ‘যদি চোখের দৃষ্টি’, ‘সাগরের তীর থেকে’, ‘খোলা জানালা’, ‘পারি না ভুলে যেতে’, ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’সহ আরো অনেক গান। বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহর গাওয়া গানই চারটি। এগুলো হলো ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিতে খান আতাউর রহমানের কথা ও সুরে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথা ও আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ ও ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে? এবার বল’। শাহনাজ রহমতুল্লাহর ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার, আর আরেক ভাই চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল। তিনিও গান করতেন। গানের ক্ষেত্রে তাদের মায়ের অনুপ্রেরণাই ছিল বেশি। ক্যারিয়ারের ৫০ বছর পূর্তির পর গান থেকে বিদায় নেন খ্যাতিমান এ শিল্পী। এর অন্যতম কারণ ছিল ধর্মেকর্মে মনোযোগী হওয়া। গান ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি তখন বলেছিলেন, ওমরাহ করে আসার পর আর গান করতে ইচ্ছা করেনি। আমি নামাজ পড়া শুরু করেছি। নামাজ পড়েই সময় কাটছে। ৫০ বছরের ওপরে গান গেয়েছি, মানুষের কাছ থেকে অপরিমেয় ভালোবাসা পেয়েছি। আমেরিকাতেই গান করতে গিয়েছি ২০ বার। আর কত গাইব? গান ছাড়ার পর এ মাধ্যমটি থেকে দূরে থাকলেও অনুজদের সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন এ শিল্পী।

বিক্ষোভে উত্তাল সিলেট

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ওয়াসিমকে বাসচাপা দিয়ে ‘হত্যার’ ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল সিলেট। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে চৌহাট্টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। রাস্তায় হাজারো শিক্ষার্থীর বিক্ষোভের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে করে দিনভর চরম দুর্ভোগে ছিলেন  সিলেটবাসী। দুপুরের পর শিক্ষার্থীরা তিন দিনের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে রাস্তা থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, ‘ওয়াসিমকে ক্লিয়ারলি খুন করা হয়েছে। এটা হত্যাকাণ্ড।’ এদিকে- ছাত্র বিক্ষোভের মুখে শনিবার রাতেই সিলেটের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে ঘাতক উদার পরিবহনের বাস চালক জুয়েল ও গতকাল দুপুরে ছাতকের সিংচাপইড় এলাকা থেকে হেল্পার মাসুককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শিক্ষার্থী ওয়াসিম আব্বাসকে বাস চাপায় নিহতের ঘটনায় গতকাল সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠে সিলেট নগরী।
রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ, রাস্তায় অগ্নিসংযোগের পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরে যায়। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বেলা ১১টার দিকে অবস্থান নেয় সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন চৌহাট্টা এলাকায়। সেখানে তারা রাস্তায় বসে ওয়াসিম আব্বাস নিহতের ঘটনায় বিক্ষোভ করতে থাকে।
দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিলসহ হাজারো শিক্ষার্থী আম্বরখানা হয়ে চৌহাট্টায় আসে। তারা চৌহাট্টা চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে করে জিন্দাবাজার থেকে আম্বরখানা এবং নয়াসড়ক থেকে রিকাবীবাজার পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে পড়ে। ওই সব সড়কে কয়েক শ যানবাহন আটকা পড়ে। বিক্ষোভকালে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সিলেটের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। দুপুর ১২টার দিকে চৌহাট্টা এলাকা দিয়ে আবু সিনা ছাত্রাবাসে যাওয়ার সময় ছাত্র বিক্ষোভের মুখে পড়েন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। শিক্ষার্থীরা তার গাড়িও আটকে দেয়। পরে মুহিত সহ আওয়ামী লীগ নেতারা এসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এ সময় বক্তব্য রাখেন আবুল মাল আবদুল মুহিত ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী। আবুল মাল আবদুল মুহিত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, ওয়াসিমকে খুন করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে দায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের এভাবে রাস্তা দখল না করে আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বলেন- মানুষকে কষ্ট দেয়া উচিত নয়। পরে অবশ্য শিক্ষার্থীরা আবুল মাল আবদুল মুহিতের গাড়ি ছেড়ে দেয়। এদিকে- দুপুর দেড়টার পর শিক্ষার্থীরা তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে চৌহাট্টা এলাকা ত্যাগ করেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন- ওয়াসিমের খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূক শাস্তির দাবিতে তারা আগামী তিন দিন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করবে। এই সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে তারা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে। এদিকে- ওয়াসিম আব্বাসকে বাস থেকে ফেলে হত্যার ঘটনায় শনিবার রাতে সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় চালক জুয়েল মিয়াকে। গতকাল সকালে জুয়েলকে মৌলভীবাজার সদর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জেদান আল মুছা। তিনি জানিয়েছেন- জুয়েলের বিরুদ্ধে মামলা হলে পুলিশ পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে। জুয়েল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থানার বাড়াউরা গ্রামের মৃত আজিদ মিয়ার পুত্র।
ওদিকে গতকাল সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সিংচাপইড় গ্রামের শ্বশুর বাড়ি থেকে মাসুক আলী নামের ওই হেলপারকে আটক করা হয়। মাসুক আলী সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া এলাকার দৌলত আলীর ছেলে। তাকেও মৌলভীবাজার থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর থানার ওসি সুহেল মিয়া জানিয়েছেন- এ ঘটনায় মামলা হলে চালক ও হেল্পারকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। এদিকে- নিহত শিক্ষার্থী ওয়াসিমের মরদেহ গতকাল সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গ্রামের বাড়ি নবীগঞ্জের দেবপাড়ার রুদ্র গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাদ জোহর জানাজা শেষে লাশ দাফন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সহকর্মীরা।
সিকৃবিতে শোক: বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ৪র্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্র ওয়াসিম আব্বাসের মৃত্যুতে সিকৃবিতে রোববার শোক দিবস পালন করা হয়েছে। এ কারণে গতকাল সিকৃবিতে কোনো ক্লাস, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। এ ছাড়াও পূর্বনির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী একাডেমিক কাউন্সিলের সভাও স্থগিত করা হয়। দুপুরে ওয়াসিম আব্বাস এর স্মরণে শোক সভা, মানববন্ধন ও আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়ার আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞা’র সভাপতিত্বে ও সাধারন সম্পাদক প্রফেসর ড. জীতেন্দ্র নাথ অধীকারীর সঞ্চালনায় শোক সভায় বক্তব্য রাখেন- সিকৃবির ভিসি প্রফেসর ড. মো. মতিয়ার রহমান হাওলাদার, ডিন কাউন্সিলের আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মো. আবুল কাশেম, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. বদরুল ইসলাম শোয়েব, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক  প্রফেসর ড. সৈয়দ সায়েম উদ্দিন আহম্মদ, পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. নজরুল ইসলাম, অফিসার পরিষদের সভাপতি কৃষিবিদ মো. সাজিদুল ইসলাম, গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. মিটু চৌধুরী, সাদা দলের সভাপতি প্রফেসর ড. এম. রাশেদ হাসনাত, লেপস্‌ এর সভাপতি সরকার মো. ইব্রাহিম খলিল, সহকারী প্রফেসর মো. নাজমুল হোসাইন, কর্মচারী সমিতির সভাপতি শাহ্‌ আলম সুরুক প্রমুখ। শোক সভায় বক্তারা ওয়াসিম আব্বাস এর আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়ার আয়োজন করা হয়।

আরেক টাইটানিক আতঙ্ক!

এমভি ভাইকিং স্কাই জাহাজের ভিতর তখন বেশির ভাগ মানুষ মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত। ঠিক তখনই প্রচণ্ড ভাবে এদিক ওদিক দুলতে থাকে প্রকাণ্ড সেই জাহাজ। ১০ মিটারেরও বেশি উচ্চতার উত্তাল ঢেউয়ের নিচে বার বার যেন হারিয়ে যাচ্ছিল তা। কয়েক তলা বিশিষ্ট ওই জাহাজের জানালার কাচ ভেঙে ভিতরে আছড়ে পড়তে থাকে লোনা পানি। ঐতিহাসিক টাইটানিক ডুবে যাওয়ার আগে যখন দিখন্ডিত হয়ে যায়, দু’খণ্ড যখন খাড়া হয়ে ডুবে যেতে থাকে এবং মানুষগুলো, আসবাবপত্রগুলো যেভাবে মেঝেও ওপর এপাশ ওপাশ গড়িয়ে যেতে থাকে- ঠিক তেমনি এই জাহাজের ভিতরকার অবস্থা দাঁড়ায়। প্রকাশিত ভিডিওতে এ দৃশ্য ফুটে উঠেছে। এমন এক বিপদসঙ্কুল অবস্থায় জাহাজের ইঞ্জিন যায় বিকল হয়ে। প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কায় একবার এদিক, আবার ওদিক ঘুরে যেতে থাকে এমভি ভাইকিং স্কাই।
আর ভিতরে তখন বাঁচার করুণ আকুতি।
দিশাহারা হয়ে পড়েন নাবিক ও যাত্রীরা। কেউ প্রার্থনা শুরু করে দেন। কেউ আর্তচিৎকারে শূন্য সমুদ্রের বাতাস ভারি করে তোলেন। মৃত্যুর এক ভয়ঙ্কর বিভীষিকা যেন তাদের সামনে হানা দেয়। ঠিক এমন অবস্থায় বিপদ সংকেত পাঠানো হয়। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। উদ্ধার অভিযানে নামে ৫টি হেলিকপ্টার। কয়েকটি জাহাজ। এর মধ্যে আবার উদ্ধারকাজে নামানো দুটি ফ্রেইটার জাহাজের ইঞ্জিন যায় বিকল হয়ে। প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হতে থাকে। দুটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের গতিপথ বাধ্য হয়ে পরিবর্তন করে দেয়া হয়।
শনিবার ভয়াবহ এ অবস্থার সৃষ্টি হয় নরওয়ের পশ্চিম উপকূলে। এ সময় চারদিকে ভয়াবহ এক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। আরেকটি টাইটানিক দৃশ্য চোখের ওপর ভাসতে থাকে সবার। এমন অবস্থায় নরওয়ের মোরে ওগ রোমসডাল কাউন্টির পুলিশ বলেছে, এমভি ভাইকিং স্কাই জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল। এতে তখন ১৩০০ এর মতো মানুষ ছিলেন। ক্যাপ্টেন বিপদ সঙ্কেত পাঠানোর পর উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এতে থাকা লোকজনকে উদ্ধার কাজ চলছিল বলে জানানো হয়েছে। উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া একটি ফ্রেইট- হ্যাগল্যান্ড ক্যাপ্টেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। প্রচণ্ড বাতাস আর উত্তাল ঢেউয়ের কারণে এমনটা ঘটেছে। একই কারণে এমভি ভাইকিং স্কাইয়ের যাত্রীদের উদ্ধারে নামানো দুটি হেলিকপ্টারকে তাৎক্ষণিকভাবে হ্যাগল্যান্ড ক্যাপ্টেনের নাবিকদের উদ্ধারে গতিপথ পাল্টে দেয়া হয়। নরওয়ের স্থানীয় সময় বিকাল ২টার দিকে এমভি ভাইকিং স্কাই থেকে বিপদ সঙ্কেত পাঠানো হয়। বলা হয়, এর ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে। এতে জাহাজটি বিক্ষিপ্তভাবে ঢেউয়ের ওপর দুলছিল কলার খোসার মতো। সৌভাগ্য যাত্রীদের এবং জাহাজটির যে, এ সময় তা ডুবে যায়নি। তাহলে সত্যি সত্যি আরেকটি টাইটানিক ট্র্যাজেডির সৃষ্টি হতো নরওয়ের পশ্চিম উপকূলে।
অনেকটা পরে এমভি ভাইকিং স্কাইয়ের একটি ইঞ্জিন সচল হয়। ফলে তা খুব ধীর গতিতে উপকূলের কিছুটা কাছাকাছি আসতে সক্ষম হয়। সেখানে উদ্ধার কাজ চলছিল। ওই জাহাজে ছিলেন জন কারি নামে একজন ব্যক্তি। তাকে হেলিকপ্টারে উদ্ধারের পর এনআরকে টেলিভিশনকে তিনি বলেছেন, তখন আমরা মধ্যাহ্নভোজে ছিলাম। অকস্মাৎ দুলতে শুরু করলো জাহাজ। জানালার কাচ ভেঙে গেল। তার ভিতর দিকে প্রচণ্ড বাতাসের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রবেশ করতে শুরু করলো পানি। আর চারদিকে তখন এক ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। মানুষ জীবনের মায়ায় চারদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। ভয়ে বুক শুকিয়ে যায় সবার। চোখে মুখ শুকিয়ে পাথরের রূপ ধারণ করে। যেন বিস্ফারিত হয়ে কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে চোখ।
হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছে জ্যানেট জ্যাকব নামে একজনকে। তিনি বলেছেন, আমার জীবনে এত ভয়াবহতার মুখোমুখি কখনো হইনি। আমি তো প্রার্থনা শুরু করেছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম জাহাজে থাকা প্রতিজন মানুষের নিরাপত্তার জন্য। এর মধ্যে হেলিকপ্টার এলো উদ্ধার করতে। তাতে যখন তোলা হলো সেই ট্রিপও ছিল ভয়াবহ।
এমভি ভাইকিং স্কাই যখন এমন বিপদে পড়ে তখন এর কাছেই ছিল মাছধরা বোট। জান এরিক নামে একজন জেলে তার বোট নিয়ে প্রথম উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তিনি আফটেনপোস্টেন পত্রিকাকে বলেছেন, সৌভাগ্য সবার। ভয়াবহ এক পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়েছেন জাহাজের মানুষগুলো। যদি ইঞ্জিন সচল না হতো তাহলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা পাথরের ওপর আছড়ে পড়তো। আর তাতে ঘটে যেত সেই টাইটানিকের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা।
স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪০ মিনিট নাগাদ জাহাজটি থেকে ১৫৫ জনকে উদ্ধার করে তীরে আনা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন আহত হয়েছেন। তার মধ্যে তিন জনের অবস্থা গুরুতর। এনআরকে-র মতে, জাহাজটির যাত্রীদের বেশির ভাগই বৃটিশ ও আমেরিকান। সমুদ্র উদ্ধার বিষয়ক সার্ভিসগুলো বলেছে, জাহাজটি বিপদমুক্ত আছে এবং উদ্ধার অভিযান চলছিল।
নরওয়ের আবহাওয়া বিষয়ক ইনস্টিটিউট বলেছে, ১০ মিটারের চেয়েও উঁচু ঢেউ ঘটনার সময় ওই সমুদ্রে উত্তাল মৃত্যুকূপ তৈরি করে।

এই গাড়িও ঢাকায় চলে!

গাড়ি রাস্তায় চলছে ঠিকই। কিন্তু একটি গাড়িরও নেই কোনো সঠিক কাঠামো। কোনটির দরজা নেই। কোনটির জানালা নেই। কোনটির ছাদ ঢাকা হালকা টিন দিয়ে। এমনই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর গুলিস্তান থেকে ছেড়ে যাওয়া বেশির ভাগ টেম্পু ও লেগুনার। তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব গাড়িতে যাতায়াত করছেন কেরানীগঞ্জ এলাকার অধিকাংশ মানুষ। গুলিস্তান ফ্লাইওভারের নিচে এই লেগুনা এবং টেম্পুগুলোর স্টেশন।
এই স্টেশনের আওতাধীন রয়েছে ৫৭টি লেগুনা ও ৬০টি টেম্পু। গুলিস্তান থেকে লেগুনাগুলো যায় কেরানীগঞ্জের নিমতলীতে। আর টেম্পুগুলোর গন্তব্য রোহিতপুর। একটি টেম্পুতে ১৮ জন যাত্রীকে বসানো হয় গাদাগাদি করে। প্রতিজন ৩০ টাকা করে ভাড়া দেন। স্ট্যান্ডে প্রতিদিন একটি লেগুনা ৬০০ ও একটি টেম্পু ৫১০ টাকা চাঁদা দেয়। এই চাঁদা স্থানীয় নেতারা পান বলে চালক ও সহকারীরা জানিয়েছেন।
লেগুনা চালক বাবু মিয়া মানবজমিনকে বলেন, ১২ বছর ধরে আমি এই লেগুনার সঙ্গে জড়িত। প্রথম পাঁচ বছর হেলপার হিসেবে ছিলাম। গত ৭ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছি। প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা ইনকাম করি। এটা দিয়ে আমার পরিবার চলে। ড্রাইভার এবং গাড়ির লাইসেন্স বা কাগজ ঠিক আছে কিনা জানতে চাইলে বাবু মিয়া বলেন, আমার গাড়ির কোনো লাইসেন্স নেই। আর নিজেরও নেই। এখানকার অনেক গাড়িরই লাইসেন্স নেই। সবাই এভাবেই গাড়ি চালায়। লাইসেন্স না থাকায় প্রায় সময় পুলিশ আমাদের বিভিন্ন জায়গায় আটকায়। পরে মালিক সমিতির নেতারা দেন-দরবার করে আমাদের উদ্ধার করে।
গুলিস্তান এলাকায় টেম্পু চালান মোবারক হোসেন। বাড়ি চকবাজারে। তিনি বলেন, পাঁচ বছর ধরে এই এলাকায় টেম্পু চালাই। প্রথমে নিজের গাড়ি ছিল। গত বছর সেটা বিক্রি করে দিয়েছি। লাইসেন্স আছে কিনা জানতে চাইলে মোবারক বলেন, শুধু আমার না এখানকার কোনো গাড়ি এবং ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই। এভাবেই সবাই গাড়ি চালায়। আবু বকর। বাড়ি নিমতলী। গুলিস্তান এলাকায় ১০ বছর ধরে হার্ডওয়্যার ব্যবসা করেন তিনি। প্রতিদিনই যাতায়াত করেন লেগুনা দিয়ে। আবু বকর মানবজমিনকে বলেন, আমি ১০ বছর ধরে লেগুনা দিয়েই যাতায়াত করি। এই রোডে বাস দিয়ে যাতয়াতেরও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। আমার বাড়ি যাওয়ার জন্য লেগুনাই সবচেয়ে ভালো মাধ্যম।
লেগুনাগুলোর ফিটনেস নেই বললেই চলে। তবে রাতের বেলা যাতায়াতের সময় কিছুটা ভয় করে। বিশেষ করে বর্ষাকালে। এই সময় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। গুলিস্তান এক চায়ের দোকানে কথা হয় লেগুনা মালিক খায়রুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি নিজেই লেগুনা চালান। খায়রুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, টেম্পু দিয়ে পরিবহন সেক্টরে আমি এসেছি। সিএনজি চালিয়েছি। বাস চালিয়েছি। এখন নিজেই কয়েকটি লেগুনা কিনে ব্যবসা করছি। মাঝে মাঝে নিজেই লেগুনা চালাই। আমার বেশির ভাগ গাড়ি কিস্তিতে কেনা। লেগুনার যাত্রী ঢাকায় অনেক। যেসব রাস্তায় বাস চলে না সেসব রাস্তার জন্য লেগুনা বন্ধুর মতো।
লেগুনা যদি না থাকে তাহলে যাত্রীদের ১০ টাকার ভাড়া ৮০ টাকা রিকশা ভাড়া দিতে হবে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ডিসি এম মুরাদ জানান, এগুলো বেশ কয়েকদিন বন্ধ ছিল। পরে এটা মনিটরিং করে সেন্ট্রালি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যেসব স্থানে হালকা যানের প্রয়োজন আছে সেসব স্থানে লেগুনা এবং টেম্পু চলে। আমার রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাদের চলাচল করতে দিচ্ছি না। কোথায় কোথায় লেগুনা চলবে, আর কোথায় চলবে না, তার পর্যালোচনা চলছে। আমরা হালকা যানটির রুটগুলোকে পুনর্বিন্যাসের কাজ করছি। আর যেগুলোর কোনো কাগজপত্র নেই আমরা সেগুলোর আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। অনেক লেগুনা চালকের বয়স ১৫ থেকে ২০ বছর। তাদের হাতে যানবাহন কতটুকু নিরাপদ জানতে চাইলে এম মুরাদ বলেন, আসলে আগে লেগুনা বা টেম্পু চালকরা খুব কম বয়সী ছিল। কিন্তু পরে আমরা সেসব চালকদের আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। অনেককে আটকও করা হয়েছে। এখন কম বয়সী চালক তেমন একটা দেখা যায় না। তবে যদি থেকেও থাকে আমরা এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো।

ইসরাইল ‘ডাকাতদের রাষ্ট্র’: মাহাথির মুহাম্মাদ

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মাদ বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইল হচ্ছে ‘ডাকাতদের রাষ্ট্র’। একমাত্র ইসরাইল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে তার দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
মাহাথির মুহাম্মাদ বলেন, “আমরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে নই তবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করার জন্য আমরা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে পারি না।”
গতকাল (শনিবার) ‘পাকিস্তান ডে’ উপলক্ষে রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত প্যারেড অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। পাকিস্তান ডে উপলক্ষে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে পৌঁছান।
ইসরাইলি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে মাহাথির মুহাম্মাদ বলেন, “রাষ্ট্র গঠনের জন্য আপনারা অন্যের ভূমি দখল করতে পারেন না। এটা একটা ডাকাতদের রষ্ট্র হয়েছে।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সিরিয়ার গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের অংশ বলে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলছেন তখন মাহাথির মুহাম্মাদ এসব কথা বললেন। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় গোলান মালভূমি দখল করে নেয় ইসরাইল। তবে বিশ্বের কোনো দেশ এখনো পর্যন্ত গোলানকে ইসরাইলের অংশ বলে স্বীকৃতি দেয় নি।

‘মন্ত্রিপরিষদে অভ্যুত্থান পরিকল্পনা’, তেরেসা মের বিপদসঙ্কেত!

নিজ দলেই বিদ্রোহের শিকার বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে তার ওপর প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। তাকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা চলছে পর্দার আড়ালে। রাজপথে শনিবার প্রায় ১০ লাখ মানুষ ব্রেক্সিট ইস্যুতে দ্বিতীয় গণভোটের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। ফলে তেরেসা মে এখন কোনপথে হাঁটবেন! তাকে নিজ দল কনজার্ভেটিভ পার্টির অনেক সিনিয়র নেতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগের প্রতিশ্রুতি দিলেই তার ব্রেক্সিট ইস্যুতে সমর্থন দেবেন তারা।
এমন অবস্থায় তার বিরুদ্ধে মন্ত্রীপরিষদের কিছু সদস্য যে প্রচেষ্টা নিয়েছেন তাকে মন্ত্রপরিষদের অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যায়িত করছে বৃটিশ বিভিন্ন গণমাধ্যম। বলা হচ্ছে, এমন অভ্যুত্থান বা পরিকল্পনার কারণে তেরেসা মের জন্য ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের দিন ফুরিয়ে এসেছে। হয়তো আর কয়েকটা দিন তিনি সেখানে থাকতে পারেন। অর্থাৎ এর মধ্যেই তাকে পদ থেকে সরে যেতে হবে।
তাহলে কে তার হাল ধরবেন! হ্যাঁ, এমন ব্যক্তিও বাছাই করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তেরেসা মে’কে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে সে পদে বসানো হবে ডেভিড লিডিংটন অথবা মাইকেল গভ’কে। এমন খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ।
খবরে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিট ইস্যুতে সরকারের ভিতরেই অস্বাভাবিক উত্তেজনাকর অবস্থা বিরাজ করছে। এমন ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’কে ক্ষমতাচ্যুত করা হতে পারে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। দ্য সানডে টাইমসকে মন্ত্রিপরিষদের ১১ জন মন্ত্রী বলেছেন, তারা চান প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আর তাতে তার পদে নতুন কাউকে বসানোর পথ তৈরি হোক।
যদি তেরেসা মে পদ ছেড়ে দেন তাহলে অন্তর্বর্তী তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নাম করা হয়েছে তেরেসা মে’র ডেপুটি ডেভিড লিডিংটনের। তবে বেশ কিছু সদস্য এক্ষেত্রে মাইকেল গভ-এর প্রতি তাদের সমর্থন দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
তেরেসা মে’র নীতি বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা জর্জ ফ্রিম্যান এরই মধ্যে টুইট করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সারাদেশে আপনি দেখতে পাবেন তার প্রতি শুধুই ক্ষোভ। সবাই মনে করছে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। সরকার অচল হয়ে আছে। গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ধসে পড়েছে। এই অবস্থা চলতে পারে না। আমাদের এ অবস্থায় একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন, যিনি (ব্রেক্সিট ইস্যুতে) কাজ করতে পারবেন।
দ্য সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকাকে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নিকি মরগান বলেছেন, তেরেসা মে’কে মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের বলা উচিত যে, তার সময় শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে স্টিভ বেকার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে চাওয়া নেতাদের এখনই কর্মকান্ড শুরু করা উচিত।
কনজার্ভেটিভ দলের ব্যাকবেঞ্চার হিসেবে পরিচিত এমপি অ্যান-মেরি ট্রেভেলিয়ান লিখেছেন, আমাদের এখন এমন একজন নেতা প্রয়োজন, যিনি আমাদের দেশের ওপর আস্থা রাখেন এবং তেরেসা মের বাকি কাজ এগিয়ে নিতে চান।
বাজফিড অনুযায়ী, এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’কে তারই কয়েকজন হুইপ বৈঠককালে জানিয়ে দিয়েছেন তার পদ ছেড়ে দেয়া উচিত। তবে তেরেসা মে তার পদে অনড় থাকতেই পছন্দ করছেন। ওদিকে শনিবার প্রায় ১০ লাখ মানুষ লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ করেছেন। তাদের দাবি ‘পিপলস ভোট’। তারা দ্বিতীয় গণভোটের দাবিতে এমন বিক্ষোভ করেন। ব্রেক্সিটপন্থি বিক্ষোভকারীরা উত্তর-পূর্ব লন্ডন থেকে রাজধানীমুখী বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন। শনিবারের বিক্ষোভে সাবেক ইউকিপ নেতা নাইজেল ফারাজে বক্তব্য রেখেছেন বেশ কিছু স্থানে। এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজেনও।