Saturday, March 15, 2014

ভারতের গণতন্ত্রের ‘প্রদর্শনী’ by শশী থারুর

ভারতের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন আগামী সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। বিশ্বের একক বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার চর্চার এ কার্যক্রম চলবে আগামী ৭ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ দিন ধরে, নয়টি পর্বে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণের তারিখের মধ্যে থাকবে এক সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবধান। ৮১ কোটি ৪০ লাখ ভোটার একটি নতুন (এবারেরটি ষোড়শ) পার্লামেন্ট তথা সরকার নির্বাচিত করবেন। দেশজুড়ে নয় লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ৫০০টির বেশি রাজনৈতিক দলের ১৫ হাজার প্রার্থী থেকে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেবেন ভারতের ভোটাররা। গণতন্ত্র নিঃসন্দেহে একটি প্রক্রিয়া, এটি কোনো একক ঘটনা নয়। কিন্তু ভারতে নির্বাচন প্রকৃতই ঘটনার সমাহার, যা প্রতিবারই প্রশংসা কুড়ায়। এ দেশের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের চালচিত্রই এর কারণ। ভারতে নির্বাচন মানেই সুবিশাল উপকরণ ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ আর অসংখ্য বিচিত্র ভাষার সংশ্লিষ্টতা। অক্ষরজ্ঞানহীন ভোটারদের সুবিধার জন্য এখানে প্রার্থীরা শুধু নামে নন, প্রতীক দিয়েও চিহ্নিত হন।

সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার খোঁজে by সোহরাব হাসান

পৃথিবীর সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত ও রাজনৈতিক ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ অঞ্চলের নাম দক্ষিণ এশিয়া। এখানে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ আছে। আছে মেধাবী ও কর্মক্ষম এক বিশাল তরুণসমাজ। কিন্তু সেই তরুণদের কাজে লাগানোর জন্য যে সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা, পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার, রাষ্ট্রনেতাদের চিন্তা ও কর্মে তার লক্ষণ দেখা যায় না। বরং তাঁরা ঐতিহাসিক ভ্রান্তির বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

নদীর জন্য আমরা কী করেছি? by তুহিন ওয়াদুদ

আমরা সেই জাতি যে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা করতে জানি না। তার প্রকৃত দৃষ্টান্ত হচ্ছে নদীর পরিচর্যা না করা। হাজার বছর আগে আমাদের নদী ছিল সহস্রাধিক। বর্তমানে ছোট-বড় মিলে নদ-নদীর সংখ্যা সাত শতাধিক বলা হলেও কার্যত নদীর সংখ্যা ২৩০। মূলত অযত্নেই বিলীন হয়েছে এ নদীগুলো। দেশের বুক চিরে বয়ে চলা নদীগুলো আমাদের জন্য আশীর্বাদ ছিল। আমরা এ নদীগুলোর পরিচর্যা করিনি। সর্বোচ্চ যতখানি অবহেলা প্রদর্শন করা যায়, আমরা তা-ই করেছি। নদীকে যদি আমরা শত্রু হিসেবে গণ্য করতাম, তাহলেও সাবধান হতাম। প্রতিদিন যেন আমরা নদীর টুঁটি টিপে হত্যা করি। নির্মম সেই হত্যাকাণ্ড। আমাদের চোখের সামনে প্রবহমান নদীগুলোয় এখন আর কোনো প্রবাহ নেই। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেও আমরা অনেক নদীর প্রবাহ বন্ধ করেছি।

ন্যায়বিচার- পাকেচক্রে পুলিশি তদন্ত by মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

ফৌজদারি মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অনিবার্যভাবে সম্পৃক্ত পুলিশের ভূমিকা। পুলিশি তদন্ত ও সাক্ষ্য সুবিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য, যা মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সম্পৃক্ত। মামলা দায়েরের পর ঘটনা উদ্ঘাটন, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, অনুসন্ধান, পটভূমি অবলোকন, অপরাধ ব্যাখ্যা, ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন পুলিশি তদন্তের ভিত্তি। মূলত যেকোনো মামলার সত্য-মিথ্যা পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে। এ কার্যক্রমে যত বেশি থাকবে স্বচ্ছতা, তত বেশি নিশ্চিত হবে মামলার বিচার-প্রক্রিয়ায় সফলতা। এ সফলতাই সমাজে হ্রাস করতে পারে অপরাধপ্রবণতা।

আপনি কি আগের মতোই বউ পেটান? by আনিসুল হক

আপনি কি আগের মতোই বউ পেটান? যে প্রশ্নের উত্তর ‘না’ দিয়ে করা যায় না, তার উদাহরণ হিসেবে এই বাক্যটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আপনি যদি বলেন, ‘হ্যাঁ’, তাহলে তো জানাই গেল ব্যাপারটা। কিন্তু যদি বলেন, না, তাহলে কিন্তু আপনার হাত পরিষ্কার হয় না। মানেটা দাঁড়ায়, এখন পেটান না বটে, তবে আগে পেটাতেন। বা আগে বেশ জোরেশোরে পেটাতেন, এখন অতটা জোর নেই, বা আগের পদ্ধতির চেয়ে এখনকার পদ্ধতিটা খানিক বদলে ফেলেছেন। না, আমি কখনোই স্ত্রী নির্যাতন করিনি, শুধু ‘না’ দিয়ে এই প্রশ্নের সেই উত্তর দেওয়া যায় না।

তৃণমূলকে সমর্থনের কথা কখনো বলিনি: আন্না

আন্না হাজারে
ভারতের প্রবীণ গান্ধীবাদী নেতা আন্না হাজারে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ করলেও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসকে নির্বাচনে সমর্থন করার কথা তিনি কখনো বলেননি। একই সঙ্গে আন্না এ কথাও বললেন, দেশের কোনো রাজনীতিকই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য নন। এই পদে এমন একজনের বসা উচিত, যিনি অরাজনৈতিক ব্যক্তি। গত বুধবার দিল্লির রামলীলা ময়দানের জনসভায় মমতার সঙ্গে আন্নারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মমতা জনসভায় গেলেও আন্না যাননি।
গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে এর কারণ ব্যাখ্যা করেন তিনি। আন্না বলেন, ‘আমাকে ঠকানো হয়েছে। আমায় বলা হয়েছিল, এটা মমতার ডাকা জনসভা, আবার মমতাকে বলা হয়েছে ওটা ছিল আমার জনসভা। বেলা ১১টা থেকে আমি অপেক্ষা করেছি। কিন্তু দুইটার সময় দেখলাম, মাত্র চার হাজারের মতো লোক সভায় এসেছে। এত সামান্য মানুষের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চাইনি।’ ঠকানোর কথা বললেও আন্না যে মমতার পাশ থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন, গতকাল নিজেই তা যথেষ্ট স্পষ্ট করে দেন। তিনি বলেন, ‘মমতার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। তাঁকে সমর্থনের কথা আমি আগে জানিয়েছিলাম। কিন্তু কখনো বলিনি তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসকে নির্বাচনে সমর্থন করব।’

হতাশ জাকারবার্গ ফোন করলেন ওবামাকে

মার্ক জাকারবার্গ
ফেসবুকের ওপর মার্কিন গোয়েন্দাদের আড়ি পাতার খবরে হতাশ এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। হতাশার কথা জানাতে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে টেলিফোন করেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন জাকারবার্গ। গোয়েন্দা নজরদারি সম্পর্কে ফেসবুকে নিজের ব্লগ স্পটে ওই পোস্টে জাকারবার্গ লিখেছেন, ‘আমি হতাশ ও বিভ্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইন্টারনেটে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, হুমকি নয়। তাঁদের (এনএসএ) কর্মকাণ্ডের বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার, তা না হলে জনগণ তাঁদের বিশ্বাস করবে না।’ টেলিফোনে ওবামা-জাকারবার্গের কথোপকথনের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কেইতলিন হেইডেন। বিবিসি।

লেবার পার্টির প্রবীণ নেতা টনি বেনের মৃত্যু

টনি বেন
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির প্রবীণ নেতা টনি বেন (৮৮) আর নেই। ব্রিটিশ রাজনীতিতে বামধারার এই রাজনীতিবিদ গতকাল শুক্রবার সকালে নিজ বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়েছে।
গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে লেবার পার্টির মন্ত্রী ছিলেন টনি বেন। এক বিবৃতিতে তাঁর চার সন্তান—স্টিফেন, হিলারি, মেলিসা ও জোসুয়া বাবার মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ করেন। তাঁরা বাসায় ও হাসপাতালে তাঁদের বাবার সেবা করার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন টনি বেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এএফপি, বিবিসি।

বিদ্যুৎও চাই, অযথা বেশি দামও নয় by আনু মুহাম্মদ

কয়েক বছরে ষষ্ঠবারের মতো বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রস্তাব নিয়ে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ৪ থেকে ৬ মার্চ গণশুনানি করেছে। দাম বাড়ার বিষয়ে পিডিবি যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রস্তাবে যাঁরা কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন (৪০০ ইউনিট পর্যস্ত) তাঁদের প্রতি ইউনিট প্রায় দেড় টাকা ও যাঁরা বেশি ব্যবহার করেন (৬০০ ইউনিটের বেশি) তাঁদের দুই পয়সা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

মঙ্গলযাত্রা!-অচিরেই মঙ্গল গ্রহে আবাস গড়তে যাচ্ছে মানুষ। পুরোদমে চলছে সে প্রস্তুতি। মঙ্গলযাত্রায় সঙ্গী হতে পারেন এক বাংলাদেশিও

‘ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক দিয়ে দিন শুরু হলো মঙ্গল গ্রহের চার বাসিন্দার। হাতে অনেক কাজ। মার্স স্যুট (মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, এমন পরিধেয় কাপড়) গায়ে চাপিয়ে প্রস্তুত হলেন তাঁরা। রোভারের (একধরনের রোবটিক গাড়ি) সাহায্যে আশপাশটা ঘুরে দেখতে হবে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আপডেট জানাতে হবে, আগামী দিনগুলোর জন্য খাবারের বন্দোবস্ত রাখাও জরুরি। চারদিকে ধু ধু প্রান্তর। মাঝে জনমানব বলতে কেবল তাঁরা চারজন। দূরে, আড়ালে বসে কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী তাঁদের ওপর নজর রাখছে কি না, কে জানে!’

কেমন হবে তৃতীয় ধাপের ভোট গ্রহণ

শ্রীপুরে ভোট নিয়ে সশস্ত্র সংঘাত
আজ তৃতীয় পর্যায়ে ৮১টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শ্রীপুর উপজেলার নির্বাচন নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে সহিংসতার কারণে নির্বাচন কমিশন স্থগিত করেছে। তৃতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে মোট এক হাজার ৫৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বলে তথ্যে প্রকাশ। তাঁদের মধ্যে সিংহভাগ দুই প্রধান দলের সমর্থিত প্রার্থী। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মার্কায় এবং কাগজে-কলমে এই নির্বাচন দলভিত্তিক না হলেও অতীতের তুলনায় এবারই প্রথম প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। অপরদিকে এমনও তথ্য রয়েছে যে আচরণবিধির তোয়াক্কা না করে বেশির ভাগ মন্ত্রী ও সমপর্যায়ের ব্যক্তিরা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচনে জড়িয়ে পড়েছেন। অনেকে বিভিন্ন উপায়ে নির্বাচনকে অনুকূলে আনার প্রয়াসে লিপ্ত। মাঠপর্যায়ের নির্বাচনে জড়িত বেশ কিছু সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাদে এ নির্বাচন নিয়ে তাঁদের অসহায়ত্বের কথা নানাবিধ উপায়ে বলার চেষ্টাও করেছেন। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ত ভূমিকা তাঁদের জন্য কতখানি অস্বস্তিকর, তেমন কথা জানাতেও কুণ্ঠিত বোধ করেননি।
উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্ব অনেকটা শান্তিপূর্ণ হলেও দ্বিতীয় ধাপকে সেই তুলনায় শান্তিপূর্ণ বলার উপায় নেই। বহু উপজেলায় সহিংস পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ব্যালট বাক্স ছিনতাই থেকে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদানের সচিত্র সংবাদ শুধু পত্রপত্রিকাতেই নয়, টেলিভিশনের পর্দায়ও সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন। বেশির ভাগ উপজেলায় সহিংসতার খবর তেমন না পাওয়া গেলেও অল্পসংখ্যক স্থানের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অনেককে ২০০৮ সালের আগের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর বিশৃঙ্খল ব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেসব ভোটার ও জনসাধারণ যাঁরা ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের সব ধরনের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁদের হোঁচট খাওয়ারই কথা। বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটারদের মনে পুরোনো আতঙ্ক নতুনভাবে অনুভব হতে পারে। তৃতীয় পর্যায়ের প্রাক্-নির্বাচনে বিশেষ কিছু জায়গায় যে ধরনের অশান্ত পরিবেশ, আচরণবিধির নির্বিচারে লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গেছে, তাতে সাধারণ ভোটাররা আলোচিত ধাপের নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কিত। এমন তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
দুই তৃতীয় দফায় নির্বাচনে বহু জায়গায় আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হলেও নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান নয়। সবচেয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে রাজধানীর অদূরে শ্রীপুর উপজেলায়। এই উপজেলায় আওয়ামী লীগের সমর্থিত ও অসমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার আগ পর্যন্ত যে সহিংসতা হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে একজন কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এ মৃত্যু ঘটে প্রাক্-নির্বাচনী সহিংসতায় নির্বাচনের দিনের সপ্তাহ খানেক আগে, যখন পুরো পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। কার্যত তেমন দেখা যায়নি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচনী এলাকার সব ব্যবস্থাপনা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে থাকার কথা। কাজেই যেকোনো বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়দায়িত্ব যেমন নির্বাচন কমিশনের, তেমনি এর ব্যত্যয় বা বিচ্যুতিও নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায়। এখানে সরকারের বা প্রশাসনের ভূমিকা গৌণ থাকে। বরং সরকার বা প্রশাসনের যেকোনো সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের সম্মতি ব্যতিরেকে সম্পাদন করার কথা নয়। এমনটাই আইনের বিধান। শ্রীপুরে পরিস্থিতির অবনতির সূত্রপাতের ঘটনাটির প্রেক্ষাপটের যে তথ্যচিত্র পাওয়া যায়, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ঘটনাটি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। শ্রীপুরে ইতিপূর্বের নির্বাচনগুলো, বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুধু ২০০৮-এর পৌরসভা ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া বাকি নির্বাচনগুলো দলীয় সরকারের সময় হলেও ওই অঞ্চলের নির্বাচন নিয়ে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনে কোনো বড় ধরনের অভিযোগও উত্থাপিত হয়নি। শ্রীপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের ফটোসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের ইতিহাস জড়িত। শ্রীপুর পৌরসভাতেই পাইলট প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে যুগান্তকারী ভোটার তালিকা প্রণীত হয়। সেই শ্রীপুরে অবশেষে নির্বাচন স্থগিত করতে হয়েছে, যা সাধারণ ভোটারদের মর্মাহত করেছে। শ্রীপুরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উদ্ভব হয় আওয়ামী লীগের কথিত বিদ্রোহী প্রার্থীকে কেন্দ্র করে। একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন কোনো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হলেও তা নির্বাচনের আচরণবিধি ও আইন লঙ্ঘিত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে এবং এর প্রতিকারের প্রাথমিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কোনো প্রার্থীকে গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার বা জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলেও তা নির্বাচন কমিশনের পূর্বানুমতি অথবা সম্মতি ব্যতিরেকে করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে হস্তক্ষেপের শামিল বলে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি বা পূর্বানুমতি নিয়ে একজন বৈধ প্রার্থীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়েছিল কি না, তার ব্যাখ্যা কোনো পক্ষ থেকেই পাওয়া যায়নি।
ওই ঘটনার জের ধরে নির্বাচনী এলাকায় কয়েক দিন যাবৎ তথাকথিত বিদ্রোহী ও সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে একজনের মৃত্যু হয়। পত্রপত্রিকায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে এক প্রার্থীর কথিত দেহরক্ষীকে গুলি ছোড়ার ভঙ্গিমা প্রকাশিত হওয়ার পর প্রকাশের এবং প্রচারের প্রেক্ষাপটে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যা এবং বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার আগে নির্বাচন কমিশন কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা জানা যায়নি। শ্রীপুরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে যে ঘটনা ঘটেছে এবং একজনের প্রাণহানি হয়েছে, তাতে নির্বাচনী পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে। নির্বাচনে এ ধরনের সহিংসতা এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টির পেছনে যত পরোক্ষভাবেই হোক, ওই সব প্রার্থীর বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। রয়েছে প্রার্থিতা বাতিলের মতো আইন। এ ক্ষেত্রে শুধু স্থগিত করাই যথেষ্ট নয় বলে আমি মনে করি। এ পরিবেশ সৃষ্টি করার পেছনে যারা দায়ী, নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এর জের অন্যান্য স্থানেও পড়বে। আজকের নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন বিভিন্ন জায়গার ভোটাররা। তাঁদের আশ্বস্ত করতে নির্বাচন কমিশনের যে ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন, তেমনটা দৃশ্যমান নয়। আগেই বলেছি, বিভিন্ন তথ্য ও সূত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা অতীতের দুঃস্বপ্নের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তথ্যে প্রকাশ, ফরিদপুরের এক উপজেলায় একজন প্রার্থী যিনি একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের আত্মীয় বলে কথিত, অনেকগুলো অ্যাম্বুলেন্সসহকারে শোভাযাত্রা করেছেন, যার সচিত্র প্রতিবেদন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনভাবে আচরণবিধি ভাঙার মহোৎসবের পরও তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি। প্রায়ই প্রতিপক্ষের সমাবেশে হামলা, নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ইত্যাদির তথ্য প্রকাশিত হলেও প্রতিকার অত্যন্ত ধীরগতিতে অথবা না নেওয়ার কারণে সম্পূর্ণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা। এসব আলামত নির্বাচনী সংস্কৃতিকে পুনরায় অন্ধকারাচ্ছন্ন করবে, তাতে সন্দেহ নেই। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন নির্বিকার থাকতে পারে না। উচিত হবে নিজস্ব উপায়ে এসব পরিবেশ নষ্টকারী ও আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায় সম্পূর্ণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, বিশেষ করে নির্বাচনের দিনে হানাহানি ঠেকাতে হলে কমিশনকে এখনই শক্ত হাতে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখনো তেমন অভিপ্রায় লক্ষ করা যাচ্ছে না।
তিন স্থানীয় সরকারের এই পর্যায়ের নির্বাচন এবার যেভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার মধ্যেই অন্তর্নিহিত রয়েছে এ ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির উপাদান। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুরো দেশের উপজেলা নির্বাচনকে দুই বৃহৎ দলের জনপ্রিয়তার শক্তি প্রদর্শন করার ক্ষেত্র হিসেবেই নেওয়া হয়েছে। আর এ কারণেই দুই দলই বিদ্যমান আইনের তোয়াক্কা না করে প্রার্থী মনোনয়ন ও সমর্থনের যে ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে স্থানীয় পর্যায়ে কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অধিক জনপ্রিয় ব্যক্তি স্থানীয় প্রভাবশালীদের কারণে সমর্থন না পেয়েও নির্বাচন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়ায় দলগুলো বিপাকে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শাসক দল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন তৃণমূলের নির্বাচন। এখানে প্রার্থীর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতি প্রাধান্য পায়। কাজেই দলের মনোনীত ব্যক্তি গ্রহণযোগ্য বা জনপ্রিয় না হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন পর্যন্ত স্থানীয় বিষয়; দলীয় ব্যানার ব্যবহার করলেও এর পরিবর্তন হওয়ার নয়। জনপ্রিয় নয় এমন ব্যক্তির দলের আনুগত্য ও প্রভাবের কারণে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তার উদাহরণ শ্রীপুর। ১২ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত তথ্যে প্রকাশ যে, শ্রীপুরে এখন আওয়ামী লীগ পূর্বতন প্রার্থীর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে কথিত বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। এতেই প্রতীয়মান যে স্থানীয় সরকার দলভিত্তিক নির্বাচন হলে তা কেমন হবে।
চার পরিশেষে যে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই তা হলো, এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ কেন ধাপে ধাপে করতে হলো, বিশেষ করে একই জেলায় একাধিক ধাপে নির্বাচনের পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের সহায়ক হয়নি। এমন পরিকল্পনা কেন নিতে হলো, তার সংগত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। একাধিক ধাপে একই জেলা তথা পুরো দেশে উপজেলা নির্বাচন, বিশেষ করে দশম জাতীয় সংসদের বিতর্কিত নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে কতখানি ফলপ্রসূ হবে, তার বিশ্লেষণের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। অতীতে উপজেলা নির্বাচন একই দিনে হওয়ায় হানাহানি ছিল না বললেই চলে। চতুর্থ পর্যায়ের উপজেলা নির্বাচনের সমাপ্তির আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দেড় মাস ছুটি গ্রহণ এবং অনুপস্থিতি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। অতীতে এমন নজির নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এ সময় অনুপস্থিতি নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে বেশ জটিলতার সৃষ্টি করবে। কারণ, তাঁর অনুপস্থিতিতে একজন জ্যেষ্ঠ কমিশনার রুটিন কাজ করতে পারেন মাত্র। এখানেও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন আইন ও বিধিতে সমস্যা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেন ছুটিতে বিদেশে গেলেন, তার ব্যাখ্যা তিনিই দিতে পারেন। তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে বাকি ধাপের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে, তেমন আলামত দৃশ্যমান নয়।
এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

উপজেলা নির্বাচন- কেমন হবে তৃতীয় ধাপের ভোট গ্রহণ by এম সাখাওয়াত হোসেন

আজ তৃতীয় পর্যায়ে ৮১টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শ্রীপুর উপজেলার নির্বাচন নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে সহিংসতার কারণে নির্বাচন কমিশন স্থগিত করেছে। তৃতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে মোট এক হাজার ৫৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বলে তথ্যে প্রকাশ। তাঁদের মধ্যে সিংহভাগ দুই প্রধান দলের সমর্থিত প্রার্থী।

গারদখানা by আল-আমিন

‘পাশাপাশি তিনটি গারদখানা। বাইরে কড়া রোদ- অথচ ভেতরে লাইট জ্বলছে। অসহ্য গরম। তিনটি গারদখানার একটি মাত্র বাথরুম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা। ভেতরে ঠাসাঠাসি অবস্থায় হাজতিরা।’ এ হলো রাজধানীর পল্টন থানার গারদখানার চিত্র। শুধু পল্টন নয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি)’র প্রায় প্রতিটি থানার গারদের একই অবস্থা। অনেক সুস্থ হাজতি গারদের এ অবস্থায় থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এই চিত্র আদালতের হাজতেও। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য কোন অপরাধ বা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে শাস্তি হয়।

মরেননি, সমাধি দশায় আছেন, মর্তে ফিরে আসবেন

ভারতের অধ্যাত্মিক গুরু আশুতোষ মহারাজার (৭০) মৃতদেহকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। গুরুর মরদেহ প্রায় ৬ সপ্তাহ ধরে তার আশ্রমে ডিপ ফ্রিজে রেখেছেন ভক্তরা। তার ভক্তদের ধারণা গুরুজী মারা যাননি, উচ্চতর পর্যায়ের ধ্যানে লিপ্ত রয়েছেন। ধ্যান ভাঙার পর তিনি আবার জেগে উঠবেন এবং তাদের মাঝে জীবিত হয়ে ফিরে আসবেন। ২৯ জানুয়ারি পাঞ্জাব প্রদেশের ছোট্ট শহর নূরমহলে নিজের আশ্রমে দেহত্যাগ করেন গুরুজী আশুতোষ মহারাজ। কিন্তু তার মৃত্যু মেনে নিতে নারাজ তার ভক্তের দল। তারা গুরুজীর মৃতদেহ সৎকার করার বদলে ফ্রিজে রেখে দিয়েছেন। তাদের ধারণা, তিনি আবার মর্তে ফিরে আসবেন।
আধ্যাত্মিক নেতা আশুতোষ মহারাজ ছিলেন দিব্যজ্যোতি জাগ্রত সংস্থান মিশনের প্রধান। এই মিশনের মুখপাত্র স্বামী বিশালানন্দ দাবি করেন, গুরুজীর মৃত্যু হয়নি তিনি সমাধি দশায় আছেন, মর্ত্যে ফিরে আসবেন। তিনি ধ্যানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছেন এবং তার জ্ঞান আছে। বিশালানন্দ সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, গুরুজীর ভক্তরা এখন তার ধ্যানভঙ্গের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন। তার ধ্যান না ভাঙা পর্যন্ত আশ্রম খোলা থাকবে এবং ভক্তরা এখানে তাদের ধ্যানসহ অন্যান্য ধর্মকর্ম চালিয়ে যাবেন। গুরুজী তার ভক্তদের মাধ্যমে এখনও তাদের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছেন বলেও এ সপ্তাহের গোড়ার দিকে দাবি করেছিলেন বিশালানন্দ। লখিন্দর সিং নামক অন্য এক ভক্ত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাকে বলেছেন, ‘আমরা চোখ বন্ধ করলেই মহারাজের সঙ্গে কথা বলতে পারছি। তিনি আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন বলে আমাদের নিশ্চিত করেছেন।’

পুতিনকে মূল্য দিতে হবে : ওবামা

ইউক্রেনের উপদ্বীপ ক্রিমিয়াকে কেন্দ্র করে কিয়েভের সঙ্গে মস্কোর দ্বন্দ্বে ওয়াশিংটন দৃঢ়ভাবে কিয়েভের পক্ষ নিয়েছে। এর ফলে পূর্ব-পশ্চিম জোটের মধ্যে সৃষ্ট সংকট আরও ঘনীভূত হল। খবর এফপির। ওবামা বুধবার ইউক্রেনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী আরসেনি ইয়াতসেনিউককে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান। উভয় নেতা রাশিয়ার প্রতি কড়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করে জানান, ইউক্রেন তার সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেবে না। ক্রিমিয়া থেকে রুশ সৈন্য প্রত্যাহার না করলে প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনকে চড়া ‘মূল্য’ দিতে হবে বলে ওবামা পুনর্ব্যক্ত করেন। ক্রিমিয়ার গণভোটকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি একে ‘বেপরোয়া’ আচরণ বলে উল্লেখ করেন। ওবামা হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই সংকট সমাধানে আরেকটি পথ খোলা রয়েছে। আমরা আশা করছি প্রেসিডেন্ট পুতিন সেই পথটি বেছে নিতেই আগ্রহী হবেন।’ ওবামা বলেন, ‘তবে যদি তিনি পথটি বেছে না নেন, তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইউক্রেন সরকারের পাশে এসে দাঁড়াবে।’ এ সময় ইয়াতসেনিউক তার পাশে ছিলেন। এর আগে ওভাল অফিসে তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। ক্রিয়েভের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইয়াতসেনিউক বলেন, ‘আমরা আমাদের মুক্তির জন্য, আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি। আমার আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াই করছি। আমরা আÍসমর্পণ করব না।’ ওয়াশিংটনে বেশ কয়েকটি বৈঠকের পর জাতিসংঘে বৈঠকের জন্য বৃহস্পতিবার ইয়াতসেনিউকের নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, রাশিয়ার এক ঊর্ধ্বতন আইনপ্রণেতা বলেছেন, কিয়েভের সম্ভাব্য সশস্ত্র হামলা মোকাবেলায় ক্রিমিয়ায় সামরিক ইউনিটগুলো অবস্থান গ্রহণ করছে। এর মাধ্যমে মস্কো ইউক্রেনের এ অঞ্চলে সামরিক অভিযানের কথা এই প্রথম বারের মতো স্বীকার করল। প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন এর আগে জোর দিয়ে বলেছিলেন, ক্রিমিয়ায় প্রকাশ্যে সামরিক পোশাক পরে যারা যানবাহন ও অস্ত্র সজ্জিত হয়ে টহল দিচ্ছেন তারা স্থানীয় আত্ম-প্রতিরক্ষা ব্রিগেডের সদস্য এবং তারা কোনো দোকান থেকে পোশাকগুলো কিনে থাকতে পারেন। সাবেক সোভিয়েত আমলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গঠিত রাশিয়ার স্টেট ডুমাস কমিটির প্রধান লিওনিদ স্লাতস্কি বুধবার রাতে ইকো অব মস্কো রেডিওকে বলেন, ‘কিয়েভের সশস্ত্র আগ্রাসন ও সশস্ত্র অভিযান ঠেকাতে ক্রিমিয়ায় কয়েকটি সামরিক ইউনিট অবস্থান গ্রহণ করছে।’ তবে এ সামরিক অবস্থান ব্যাপক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি পার্লামেন্টে প্রায়ই ইউক্রেন নিয়ে বক্তৃতা করেন। ওদিকে, ইউক্রেন সীমান্তে স্থলবাহিনীর প্রশিক্ষণ তৎপরতা বাড়িয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী তিনটি এলাকায় প্রশিক্ষণ তৎপরতা চলছে। সেখানে ট্যাংক ও কামান ইউনিটসহ রুশ পদাতিক বাহিনী অংশ নিচ্ছে। একইসঙ্গে রুসতোফ এলাকায় রাশিয়ার প্যারাট্রুপারদের এক মহড়া শুরু হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রোস্তফ, বেলগুরুদ ও কুর্সক এলাকা ছাড়াও আরো কিছু স্থানে সামরিক প্রশিক্ষণ চলছে। অচেনা এলাকায় সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা যাচাই এবং দক্ষতা বাড়াতে এসব প্রশিক্ষণ চলছে। চলতি মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত এসব প্রশিক্ষণ চলবে। এছাড়া রোস্তফ এলাকায় চার হাজার প্যারাট্র–পারের অংশগ্রহণে এক মহড়া চলছে। আগামীকাল পর্যন্ত ওই মহড়া চলবে বলে জানা গেছে।

ফেসবুকে নতুন সঙ্গীর খোঁজে মমতা

শেষটা মোটেও ভালো হল না আন্না-মমতা জুটির। বুধবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে আন্না হাজারের অনুপস্থিতি ও মমতার জনসভা চরম ফ্লপ হওয়ায় উভয় নেতার মধ্যে ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। গান্ধীবাদী নেতা বলে পরিচিত আন্না হাজারের সঙ্গে যৌথ সমাবেশ করে লোকসভা ভোটের আগে অন্য আঞ্চলিক দলগুলোর থেকে অনেকটাই এগিয়ে যাবেন ভেবেছিলেন তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু মাঝপথেই হাল ছেড়ে দিলেন আন্না।
ক্ষোভে-অভিমানে ফেসবুকে নয়া জোট সঙ্গীর খোঁজ শুরু করে দিয়েছেন মমতা। বুধবার মমতা তার ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমরা ভালো মানুষদের পাশে চাই। যারা এগিয়ে এসে বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আঁতাত ভেঙে শুধু দেশবাসীর স্বার্থে ভোটে লড়বেন। তৃণমূল ছোট দল। আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা জানি। তবু আমরা লড়ে যাব। দরকার হলে একলা।’ পাশাপাশি দিল্লির ময়দানে ঝড় তুলতে না পারার দোষ মমতা চাপিয়েছেন কংগ্রেস-বিজেপির ওপর। মমতার দাবি, এই দুই দল সিন্ডিকেট করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। দেশের মানুষের কোনো খেয়ালই রাখে না তারা। দেশের মানুষের কাছে তাই তৃণমূল নেত্রী এগিয়ে আসতে এবং দেশের চিরাচরিত রাজনীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে আহ্বান জানিয়েছেন।

দেবযানীর ভিসা কারচুপি মামলা খারিজ

পরিচারিকার ভিসা কারচুপি মামলায় অভিযোগ থেকে অবশেষে অব্যাহতি পেলেন ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে। তার বিরুদ্ধে ওঠা ভিসা প্রতারণার অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন মার্কিন আদালত। তবে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ না থাকার যে অভিযোগ তুলেছেন দেবযানী, তা অবশ্য মানতে চাননি মার্কিন আদালত। ১৪ পাতার রায়ে বিচারপতি জানিয়েছেন, ৯ জানুয়ারি ভারতে ফিরে যাওয়ার আগপর্যন্ত তার কূটনৈতিক রক্ষাকবচ বহাল ছিল।
২০১২ অক্টোবর থেকে ২০১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কনসুুলেট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন দেবযানী খোবরাগাড়ে। ভিয়েনা কনভেনশন মেনেই তার কূটনৈতিক রক্ষাকবচ ছিল। পরিচারিকা সঙ্গীতা রিচার্ডের বেতন নিয়ে ভিসায় ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগে, গত বছর ১২ ডিসেম্বর দেবযানী খোবরাগাড়েকে গ্রেফতার করা হয়। দেহতল্লাশিসহ একাধিক অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাকে। দেবযানীকে কেন্দ্র করে ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কে এক তিক্ততার সৃষ্টি হয়।

আপনি কি আগের মতোই বউ পেটান?

আপনি কি আগের মতোই বউ পেটান? যে প্রশ্নের উত্তর ‘না’ দিয়ে করা যায় না, তার উদাহরণ হিসেবে এই বাক্যটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আপনি যদি বলেন, ‘হ্যাঁ’, তাহলে তো জানাই গেল ব্যাপারটা। কিন্তু যদি বলেন, না, তাহলে কিন্তু আপনার হাত পরিষ্কার হয় না। মানেটা দাঁড়ায়, এখন পেটান না বটে, তবে আগে পেটাতেন। বা আগে বেশ জোরেশোরে পেটাতেন, এখন অতটা জোর নেই, বা আগের পদ্ধতির চেয়ে এখনকার পদ্ধতিটা খানিক বদলে ফেলেছেন। না, আমি কখনোই স্ত্রী নির্যাতন করিনি, শুধু ‘না’ দিয়ে এই প্রশ্নের সেই উত্তর দেওয়া যায় না। এই শিরোনামটার জন্যও আমাকে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিতে হবে। আমাদের ভাষা তো আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারারই প্রতিচ্ছবি। বউ পেটানো কথাটার মধ্যে তাচ্ছিল্যের ভাব আছে, তুচ্ছতার ভাব আছে। যেন স্বীকার করেই নেওয়া হচ্ছে, স্ত্রীকে মারধর করাটা বেশ একটা চল। বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘ঢোল ও মেয়েমানুষ মাইরের ওপরেই রাখতে হয়!’ যেহেতু আমরা বাংলাদেশের পুরুষেরা বেশির ভাগই ঘরের মধ্যেই নারী-নির্যাতন করে থাকি, তাই আমাদের ভাষায় এ ধরনের বাগ্ধারা প্রচলিত হতে পেরেছে। প্রথম আলোয় খবরটি বেরিয়েছিল ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি। ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উমেন ২০১১’ শিরোনামে জরিপ পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৮৭ ভাগ নারী স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনোভাবে কোনো না কোনো দিন নির্যাতিত হয়েছেন। পরিসংখ্যানটা বেশ উদ্বেগজনক।
তার মানে, আমরা যদি ১০ জন বিবাহিত পুরুষকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে দাঁড় করাই, এর নয়জনই কোনো না কোনোভাবে স্ত্রী নির্যাতন করেছেন। বিবাহিত জীবনে নারী-পুরুষের ঝগড়াঝাঁটি-মনোমালিন্য হবে না, সে কথা কেউই বলবে না। কিন্তু নারীদের যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নিশ্চয় এই ৮৭ ভাগ নারীর মনে এই বেদনা ছিল যে তাঁদের স্বামীর আচরণটা নির্যাতনের পর্যায়েই পড়ে, তাই তাঁরা এটা বলেছেন। এই ৮৭ ভাগের মধ্যে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতন আছে। আচ্ছা, তাহলে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন কতজন? সেই সংখ্যাটাও বেশ ভীতিকর। প্রায় ৬৫ ভাগ নারী বলেছেন, তাঁরা স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার মানে, আপনি যদি এলোপাতাড়িভাবে তিনজন পুরুষকে দাঁড় করান, তাঁদের দুজন স্ত্রীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন। এখানে আসে এই রচনার শিরোনামটা: আপনি কি আগের মতোই বউ পেটান? তিন ভাগের দুই ভাগ পুরুষকে বলতে হবে, ‘হ্যাঁ।’ শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে ৪৫ ভাগ নারী স্বামীর চড় বা ঘুষিতে আহত হয়েছেন, ১৫ শতাংশ লাথি বা মারধরের শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যাটিও ভয়াবহ উদ্বেগজনক। পৃথিবীর অনেক দেশেই স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। প্রথম আলোর ২৩ জানুয়ারির মানসুরা হোসাইনের আলোচ্য প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ইউরোপে চারজন নারীর মধ্যে একজন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। ভারতের একই জরিপে বলা হয়েছে, ৪৪ ভাগ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার।
বাংলাদেশের পরিসংখ্যানটা বেশ ভয়াবহ। এবং লজ্জাজনক। অথচ আমরা মানবোন্নয়ন সূচকে নানা দিক থেকে ভালো করছি। শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছি। আমাদের নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্নতি বিস্ময়কর। নারীর ক্ষমতায়নে নানা দিক থেকে আমরা বেশ উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করছি। হয়তো আমাদের জরিপে যে এত বেশিসংখ্যক নারী সত্য উচ্চারণে এগিয়ে এসেছেন, সেটা সেই অগ্রগতিরই একটা লক্ষণ। নারীরা মুখ খুলছেন। কিন্তু একজন পুরুষ হিসেবে গোটা পরিসংখ্যানটা আমার জন্য চরম লজ্জার। আমিই হলাম এ ক্ষেত্রে অপরাধী। দশজন পুরুষের নয়জনই যখন নির্যাতন করেন, তাঁদের মধ্যে আমিও আছি। পারিবারিক নির্যাতন এবং তা প্রতিরোধের আর্থিক হিসাব ও করণীয় সম্পর্কে সিপিডির একটা গবেষণাপত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, যা প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। সেই আলোচনায় বক্তারা খুব জোর দিয়েছেন এই বিষয়টির ওপরে যে আমাদের সমাজে পারিবারিক নির্যাতনকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। একজন আলোচক এ-ও বলেছেন, সরকারি কোনো কমিটিতে পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কথা উঠলে এমনকি নারী সদস্যদেরও কেউ কেউ বলে থাকেন যে এটা তেমন কোনো সমস্যাই নয়। এ আর এমন কী! এই হলো সমাজের মনোভাব। প্রথম আলোয় ৮ মার্চ ২০১৪ প্রকাশিত আরেকটা প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে আইসিডিডিআরবির গবেষণার ফল: দেশের ৮৯ ভাগ পুরুষ মনে করে, স্ত্রী অন্যায় করলে মার দেওয়া যায়! কাজেই, পারিবারিক নির্যাতন যদি প্রতিরোধ করতে হয়, এটাকে একটা সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সবাই মিলে একযোগে আওয়াজ তুলতে হবে যে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়। সেটা করতে হবে সমাজের সর্বস্তরে।
যেমন গণমাধ্যমকে জনমত গড়ে তুলতে হবে, শিল্পে-সাহিত্যে-নাটকে-সংগীতে নারী নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে, তেমনি সরকারকে, তেমনি সিভিল সমাজকে এই নিয়ে সরব, সোচ্চার, সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে। সত্যি কথা বলতে কি, এখন পর্যন্ত বিষয়টা মনে হয় যেন দাতাদের মাথাব্যথার ব্যাপার। আমরা বউ পেটাই, তাঁর নীরব বা উচ্চ স্বরের কান্না যেন একমাত্র শুনতে পায় দাতারা, উন্নয়ন-সহযোগীরা, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলো, এনজিওরা। যেন এটা আমাদের ইস্যুই নয়। এই মনোভাবটার পরিবর্তন করা দরকার সবার আগে। অবশ্য নিশ্চয়ই বলতে পারি, সবকিছুর জন্য দায়ী পিতৃতন্ত্র। ছোটবেলা থেকেই একটা ছেলে পুরুষ হয়ে ওঠে, আর সমাজ নারীকে নারী করে তোলে। সমাজের মনোভঙ্গির ভেতরেই থাকা নারী হলো ইতরতর, দুর্বল, সুতরাং নির্যাতনের যোগ্য। কাজেই পিতৃতন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে। কথাটা বলা সোজা, করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র এখনো একজন নারী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারেনি। তারা নারীদের ভোটাধিকারই দিয়েছে মাত্র সেদিন। সমাজের আগাগোড়া মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো দরকার। নারী ও পুরুষ যে সব দিক থেকে সমান, নারীর প্রতি এই সম্মানবোধটা সর্বক্ষেত্রে জাগিয়ে তোলা দরকার। সে কারণেই হয়তো এখন খুব করে বলা হচ্ছে নারীর অর্থনৈতিক অবদানের কথা। বলা হচ্ছে, যে নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করেন, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আমাদের গার্মেন্টস-কর্মীরা, তাঁদের অবদান তো আছেই, কিন্তু আছে অনেক অস্বীকৃত অবদান। ঘরের মধ্যে নারী যে অবদান রাখছেন, তার কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি নেই। আমাদের কৃষক পরিবারগুলোয় নারীরা অনেক ক্ষেত্রে কাজ করেন, অনেক ক্ষেত্রে ধানমাড়াই থেকে শুরু করে ধান সেদ্ধ করা, শুকানো, বীজ সংরক্ষণ ইত্যাদি নানা কাজে সরাসরি অংশ নিলেও সেসবের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।
এই স্বীকৃতি না থাকা থেকেও নারীকে অধস্তন বলে ভাবনাটা চলে আসে। ৮ মার্চে প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় পরিসংখ্যান ব্যুরোর আরেকটা গবেষণাপত্রের সূত্র ধরে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে নারীদের গৃহস্থালির কাজের অর্থমূল্য হিসাব করা হয় না। এটা করা গেলে অর্থনীতিতে নারীর অবদান আড়ালে থেকে যেত না।’ কাজেই, আজ যে আওয়াজ উঠেছে, নারীকে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাতে হবে, ঘরে-বাইরে তাঁর অপরিসীম অবদানের জন্য, আর তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, তাঁকে বলতে হবে, স্যরি, দুঃখিত। কারণ, তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতি দিইনি আমরা এত দিন, সেই আওয়াজে আমাদের সব পুরুষকেই কণ্ঠ মেলাতে হবে। নারীর সামনে নতজানু হয়ে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা দেখার পর নিজেদের অপরাধী ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। রাষ্ট্রের নিশ্চয় করণীয় আছে, আইনশৃঙ্খলার সঙ্গেও এসবের সম্পর্ক আছে, দৃষ্টান্তমূলক সাজাও অপরাধ কমিয়ে আনে। সব ঠিক, কিন্তু আমার নিজের ঘরে যদি নারী আমার দ্বারা নির্যাতিত হন, তাহলে তার দায় তো আমারই। আমি জানি না, ক্ষমা চাইলেই সেই অপরাধের দায় থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারব কি না। এই পরিসংখ্যানের আরেকটা দিক খুবই উদ্বেগজনক। ইচ্ছার বিরুদ্ধে নারীরা ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সে ৪১ দশমিক ৮ ভাগ যৌনতার শিকার হয়, ১৫ থেকে ১৯ বছরে হয় আরও ৩৪ দশমিক ৩ ভাগ। তাহলে ৭৬ ভাগ নারী ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যেই যৌন নির্যাতনের শিকার হন। কী ভয়াবহ তথ্য! কাজেই, এই রচনাটার শিরোনামটিই আবার বলতে হয়। আপনি কি আগের মতোই নারী নির্যাতন করেন? আপনি কি আগের মতোই অনিচ্ছুক নারীর ওপরে বল প্রয়োগ করেন? এই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয়। হয়তো আপনি বলবেন, 
না, আমি করি না, কখনোই করিনি।’ কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার পাশে দাঁড়ানো আর নয়জন এই কাজ করেছেন। নারীর ওপরে যৌন নির্যাতন যদি ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে, তার পেছনে নিশ্চয়ই ৮০ ভাগ পুরুষ জড়িত। কাজেই বলা যাবে, আপনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচজন পুরুষের মধ্যে চারজনই এই কাজ করেছেন। কী বলব। লজ্জাই পাই শুধু। সত্যি সত্যি, পারিবারিক নির্যাতনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা একটা বড় বাধা। পুরুষবাদী মানসিকতা তো আছেই। আমাদের এই গ্রহণযোগ্যতার বিরুদ্ধে সরব হতে হবে, বলতে হবে, ঘরের মধ্যে নারী নির্যাতন চলতে পারে না। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা সবাই মিলে আওয়াজ তুলে বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রে অনেক উন্নতিই তো ঘটাতে পেরেছি। এ ক্ষেত্রে না পারার কোনো কারণ দেখি না। একই কথা বলব বাল্যবিবাহ বা কৈশোরবিবাহের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে ৬৭ ভাগ মেয়েরই আইনি বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। এর পেছনেও নিশ্চয়ই সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাবও কিন্তু কম দায়ী নয়। আমরা সবাই মিলে আওয়াজ তুললে এই অপরিণত বয়সের বিয়েও আমরা রোধ করতে পারব। বাল্যবিবাহও কিন্তু পারিবারিক নির্যাতনের অন্যতম কারণ।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

নদীর জন্য আমরা কী করেছি?

আমরা সেই জাতি যে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা করতে জানি না। তার প্রকৃত দৃষ্টান্ত হচ্ছে নদীর পরিচর্যা না করা। হাজার বছর আগে আমাদের নদী ছিল সহস্রাধিক। বর্তমানে ছোট-বড় মিলে নদ-নদীর সংখ্যা সাত শতাধিক বলা হলেও কার্যত নদীর সংখ্যা ২৩০। মূলত অযত্নেই বিলীন হয়েছে এ নদীগুলো। দেশের বুক চিরে বয়ে চলা নদীগুলো আমাদের জন্য আশীর্বাদ ছিল। আমরা এ নদীগুলোর পরিচর্যা করিনি। সর্বোচ্চ যতখানি অবহেলা প্রদর্শন করা যায়, আমরা তা-ই করেছি। নদীকে যদি আমরা শত্রু হিসেবে গণ্য করতাম, তাহলেও সাবধান হতাম। প্রতিদিন যেন আমরা নদীর টুঁটি টিপে হত্যা করি। নির্মম সেই হত্যাকাণ্ড। আমাদের চোখের সামনে প্রবহমান নদীগুলোয় এখন আর কোনো প্রবাহ নেই। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেও আমরা অনেক নদীর প্রবাহ বন্ধ করেছি। আমাদের দেশের নদীগুলো হতে পারত যোগাযোগের অন্যতম পথ। আমরা সে কাজ করিনি। অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে দেশের অভ্যন্তরে মালামাল পরিবহন করা যেত। দেশে রেলপথ তৈরি করার সময়ে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল ব্রিজ-কালভার্ট তৈরি করা। রেলপথের পাশাপাশি যখন আমাদের সড়কপথ সম্প্রসারিত হয়েছে, তখন অসংখ্য ব্রিজ-কালভার্ট করতে হয়েছে। আমরা জলপথের পরিবর্তে রেল ও সড়কপথ বেছে নিয়েছি। ব্রিজ-কালভার্টগুলোর মুখে থাকে জলের গভীরতা। সেই গভীরতার চারদিক দিয়ে প্রথমত বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ ধরা চলতে থাকে। আস্তে আস্তে সেই ব্রিজের মুখে গভীর জলাশয় ঘিরে আল দিয়ে পুকুর তৈরি করা হয়েছে। এভাবে হাজার হাজার ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ করে মাছ চাষ হচ্ছে। ফলে শুধু পানিপ্রবাহই বন্ধ হয়নি, অল্প বৃষ্টিতেই ছোট্ট ছোট্ট স্থানগুলোয় বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। জলের অসংখ্য ক্ষীণধারা একখানে মিলিত হয়ে জলের বিশাল প্রবাহ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু সেই ক্ষীণ প্রবাহগুলো বন্ধ হওয়ায় মূল নদী তার যৌবন হারাতে বসেছে। আমাদের দেশে অনেক নদী শুধু খননের অভাবে প্রাণ হারিয়েছে এবং হারাচ্ছে। বর্ষাকালে নদী যখন দুই পাড় ভাঙে, তখন ভেঙে যাওয়া মাটিগুলো দিয়ে নদী ভরাট হয়। ভরাট হওয়া স্থানগুলো খননের মাধ্যমে গভীর করা প্রয়োজন। খনন করা হয় না বলে পরবর্তী বছরে যখন বর্ষা মৌসুমে নদী ভরে যায়, তখন গভীরতা না থাকার কারণে নদীর দুই পাড় ভাঙতে থাকে। যেহেতু গভীরতা কম, তাই পাড় ভেঙে ভেঙে নদী তার স্থান তৈরি করে নেয়। এতে নদী বাঁক পরিবর্তন করে এবং নতুন নতুন এলাকা নদীতে বিলীন হয়। নদীগুলো যদি খনন করা হতো এবং একই সঙ্গে পাড় বেঁধে দেওয়া হতো, তাহলে নদীর পাড় ভাঙত না। আমাদের দেশে যখন বন্যা দেখা দেয়, তখন শুরু হয় তৎপরতা। বন্যার মৌসুম শেষ হলে আমরা আবার ভুলে যাই নদীর কথা। দেশীয় তত্ত্বাবধানে অনেক নদীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। আবার অনেক নদী আছে, যেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নিজস্ব তত্ত্বাবধান ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র-ধরলাসহ অনেক নদ-নদী রয়েছে, যেগুলো বাঁচাতে পাশের দেশেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। তিস্তা নদী বর্তমানে আলোচনার শীর্ষে। তিস্তার উজানে ভারত। এই নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ভারতের সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। তিস্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই তিস্তায় বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে যে সামান্য পরিমাণ পানিপ্রবাহ আসে, এতে সম্ভব নয়। বর্ষা আসতে এখনো দুই মাস বাকি। এরই মধ্যে তিস্তার পানিপ্রবাহ একেবারেই নেমে এসেছে। তিস্তা সেচ প্রকল্পের কাছে এখন পানির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কিউসেক। এর নিচে পানির পরিমাণ কখনোই নেমে আসেনি। এই পানি দিয়ে সেচ প্রকল্প চলবে না। দ
বিতীয় পর্যায়ে যে তিস্তা সেচ প্রকল্প শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেটা সম্ভব হবে না এমনকি প্রথম পর্যায়ের যে প্রকল্পটি চলছে, তা-ও বন্ধ হবে। কয়েক বছর ধরেই তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার শেষ নেই। এই আলোচনার ফল এখন পর্যন্ত শূন্য। আলোচনার যে ধরন, তাতে মনে হচ্ছে, এ আলোচনা শেষ পর্যন্ত প্রহসনই থেকে যাবে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে হলে আসলে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ও ভারতে উভয় দেশেই সুশীল সমাজ, মানবাধিকারকর্মী, নদী সংগঠনের সংগঠক, সাংবাদিকসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমত যে নদী-তীরবর্তী মানুষের অধিকার নদীতে, সেটার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তা ছাড়া তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি প্রায় অসম্ভব। কেন্দ্রীয় সরকার সম্মত হলেও অনেক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজি হচ্ছে না। এভাবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি বিলম্ব করার সুযোগ নেই। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া প্রয়োজন। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি না হলে মানুষের জীবন ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাংলাদেশের পানির প্রধান উৎস। যত দূর শোনা যাচ্ছে, চীন উজানে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথই বদলে দেবে। যদি তা-ই হয়, তাহলে তিস্তার পানি না পেলে ভয়াবহতা সৃষ্টি হবে। ব্রহ্মপুত্রের পানি না পেলে দেশব্যাপী পানি-সংকটে ভুগতে হবে। আমাদের সব ব্রিজ-কালভার্টের সামনে থেকে পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। আমাদের বড় ও ছোট নদীগুলো খনন করতে হবে এবং পাড় বেঁধে দিতে হবে। নদী আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক নদীগুলো রক্ষায় বক্তব্যসর্বস্বতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশের দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, নদী নিয়ে চুক্তির ব্যাপারে পানিসম্পদমন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট করা হয় না। সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী বিশ্ব নদী দিবস সম্পর্কে জানতেনই না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নদীবিষয়ক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল রিভার্স ব্রাজিলে এক সম্মেলনে ১৯৯৭ সালে নদীকৃত্য দিবস চালু করে। বিশ্বের অনেক দেশেই দিবসটি উদ্যাপিত হয়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয় না এ দিবসটি উদ্যাপনের। নদীর জন্য আমাদের রাষ্ট্র বিশেষ কিছু করে না। রাষ্ট্র নদীর জন্য কাজ করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। শুধু আইন পাস করা নয়, নদীর পরিচর্যা আমাদের প্রয়োজন।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও সিনেটর, রিভারাইন পিপল।
wadudtuhin@gmail.com