Friday, October 17, 2025

অপ্রতিরোধ্য জোহরান মামদানি: নিউইয়র্ক টাইমস

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জোহরান মামদানির উত্থানকে ‘ঐতিহাসিক এবং অপ্রতিরোধ্য’ বলে খবর প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। তাতে বলা হয়েছে, মাত্র ৩৩ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট সিটি মেয়র প্রার্থী আগে নিউইয়র্ক সিটিতে তেমন পরিচিত ছিলেন না। তবে এখন চিত্র ভিন্ন। নির্বাচনে সাবেক গভর্নর এবং সিটির অন্যতম বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে জয়লাভের পথে রয়েছেন মামদানি।
জুনের প্রাথমিক নির্বাচনে মামদানি শুধু প্রতিকূলতাকেই হারাননি বরং ১২.৮ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। এই জয় দেশের রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিক নির্বাচনের পর তিনি শহরের ক্ষমতাধর ব্যক্তি, ব্যবসায়ীক, শিল্প ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং সংশয়ী স্থানীয় ডেমোক্রেটদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে সমর্থন আদায়ের জন্য অপ্রতিরোধ্যভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

এসব সাক্ষাতে মামদানি নিজেকে এক নতুন ধরনের বামপন্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। যিনি শোনেন, নিজের দুর্বলতা বোঝেন এবং পরিবর্তন বিশ্বাস করেন। তিনি পার্টনারশিপ ফর নিউ ইয়র্ক সিটি-এর মতো বড় ব্যবসায়িক কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং রবার্ট উলফের মতো ডেমোক্রেটিক পার্টির গুরুত্বপূর্ণ অর্থ সংগ্রহকারীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। মামদানি তার পূর্বের কিছু অবস্থানের বিষয়ে এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছেন। তিনি ভাড়াটেদের সমর্থন করতে চান। তবে বাড়িওয়ালাদের শাস্তি দিতে চান না। তিনি ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে থাকলেও ইহুদিবাদ-বিরোধী নন বলে স্পষ্ট করেছেন। পুলিশের বিষয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিয়েছেন, এমনকি তিনি তার মিলিয়নেয়ার ট্যাক্স প্রস্তাব নিয়ে আপস করতেও রাজি। এই পরিবর্তনকে ‘মামদানি ২.০’ বলা হচ্ছে।

মামদানি তার নির্বাচনের মূল ভিত্তি হিসেবে সাশ্রয়ী মূল্যের এজেন্ডাকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো হলো- সকলের জন্য বিনা খরচে সর্বজনীন শিশুযত্ন সুবিধা দেয়া। সকলের জন্য ফ্রি বাস পরিষেবা। শহরের ভাড়া-স্থিতিশীল অ্যাপার্টমেন্টগুলির জন্য চার বছরের ভাড়া স্থগিত রাখা। তিনি বলেছেন, সঠিক হওয়াটাই নিজের জন্য অর্থহীন যদি না তারা জয়ী হতে পারে এবং জনগণের কাছে ডেলিভার করতে পারে।

মামদানির ব্যক্তিগত জীবন এবং পটভূমি তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তার শিকড় ভারত এবং উগান্ডায়। তিনি একজন মুসলিম। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র। তার মা বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার এবং বাবা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি। তিনি হাই স্কুল থেকেই ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সোচ্চার। তার এই বৈচিত্র্যময় পরিচয় এবং ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান অভিবাসী-সমৃদ্ধ নিউ ইয়র্ক সিটির ভোটারদের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলেছে। তার প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক প্যাটরিক গ্যাসপার্ডের মতে গাজার ইস্যুটি সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার মতো অন্যান্য বিষয়ে কথা বলার জন্য একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করেছে।

নির্বাচনী প্রচারে মামদানিকে অনেক আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জোহরানকে মামদানি দ্য কমি বলে অভিহিত করেছেন এবং ভিত্তিহীনভাবে বলেছেন যে মামদানি অবৈধভাবে দেশে আছেন এবং তিনি নির্বাচিত হলে নিউ ইয়র্ককে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে বঞ্চিত করা হবে। জর্জ ফ্লয়েডের বিক্ষোভের সময় তিনি পুলিশকে তহবিল বন্ধ করো বলে যে টুইট করেছিলেন, তা থেকে তিনি এখন সরে এসেছেন এবং প্রয়োজনে পুলিশ বিভাগের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথাও বলেছেন। তিনি বর্তমান পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশকে তার প্রশাসনে রেখে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করছেন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তারের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা তার কিছু মিত্র এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের কাছে অবাস্তব বলে মনে হয়েছে। তবে তিনি তার এই অবস্থানে অনড়।
mzamin

জিম্মিদের মরদেহ ফেরতে বিলম্বকে চুক্তি লঙ্ঘন বলছেন নেতানিয়াহু, একমত নয় যুক্তরাষ্ট্র

সিএনএন ও আল–জাজিরাঃ ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরুর মাত্র ছয় দিনের মাথায় উপত্যকাটিতে আবার হামলা শুরুর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তি না মানলে ইসরায়েল এ হামলা চালাবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। যদিও যুদ্ধবিরতির পর গাজায় ২৪ জনকে হত্যা করে ইসরায়েলই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ হামাসের।

আজ বৃহস্পতিবার ছিল ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি’ পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় যুদ্ধবিরতির সপ্তম দিন। আগের দিন বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার দেন ট্রাম্প। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করা হয়, তাঁর প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাস যদি ভবিষ্যতে অস্ত্রসমর্পণ করতে রাজি না হয়, তাহলে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন?

জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি এটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। তিনি বলার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েল গাজার রাস্তাগুলোয় ফিরে যাবে। আর ইসরায়েল যদি আবার গাজায় প্রবেশ করে, তখন হামাসের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেবে। ফলে হামাস অস্ত্রসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। গাজায় নতুন হামলা থেকে তিনিই এখন ইসরায়েলকে বিরত রেখেছেন।

ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ষষ্ঠ দফায় রয়েছে হামাসের অস্ত্রসমর্পণের বিষয়টি। পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অনুযায়ী বর্তমান যুদ্ধবিরতি চলছে। যুদ্ধবিরতির এই ধাপে ইসরায়েলি জিম্মিদের ফেরত দেওয়া হবে। পরবর্তী ধাপে অস্ত্রসমর্পণ করবেন হামাস সদস্যরা। এর বিনিময়ে তাঁদের ‘ক্ষমা’ করা হবে। যদিও পরের ধাপের অস্ত্রসমপর্ণসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনো সমঝোতা হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে গাজায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা এলাকাগুলোয় হামাস সদস্যদের অস্ত্র হাতে টহল দিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়েছেন তাঁরা। এ বিষয়ে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘সহিংস গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করছে হামাস।’ গত সপ্তাহেও তিনি বলেছিলেন, গাজায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য হামাসকে সাময়িক সময়ের জন্য অস্ত্র ধরার অনুমতি দিয়েছেন তিনি।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে একমত নয় যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী গাজায় বন্দী থাকা জীবিত ২০ ইসরায়েলি জিম্মিকে ফেরত দিয়েছে হামাস। মৃত ২৮ জিম্মির মধ্যে ১০ জনের মরদেহও ইসরায়েলকে ফেরত দিয়েছে তারা। এই মরদেহগুলোই শুধু তাদের কাছে ছিল বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য, দুই বছর ধরে ইসরায়েলের হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় বাকি মরদেহ খুঁজে বের করতে সময় লাগবে।

তবে এ কথা মানতে নারাজ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর মতে, যুদ্ধবিরতি শুরুর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জীবিত ও মৃত—সব জিম্মিকে ফেরত না দিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে হামাস। গতকাল জেরুজালেমে নেতানিয়াহু বলেন, সব জিম্মি ফেরত আনতে বদ্ধপরিকর তাঁরা। ইসরায়েলের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। ইসরায়েলে হস্তক্ষেপ করলে চড়া মূল্য দিতে হবে।

মরদেহ ফেরতে বিলম্বকে নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা মনে করে না বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন দেশটির দুজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তাঁরা বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হামাস এই নিশ্চয়তা দিয়েছে যে বাকি জিম্মিদের মরদেহ খুঁজে বের করতে এবং ফেরত দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রও এ কাজে সহায়তা করছে।

জিম্মিদের মরদেহ খুঁজে বের করার জটিলতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ট্রাম্পও। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ কাজ। তারা (হামাস) খোঁড়াখুঁড়ি করছে। অনেক মরদেহ খুঁজে পাচ্ছে। এরপর মরদেহগুলো আলাদা করতে হচ্ছে। আপনারা এটি বিশ্বাস করতে পারবেন না। অনেক মরদেহ বহু আগে থেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে ছিল। ধ্বংসস্তূপ সরাতে হচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন শুরু

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংঘাত–পরবর্তী গাজার নিরাপত্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করা হবে। এই বাহিনী গঠনের কাজ শুরু হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ দুজন কর্মকর্তা। এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য ইসরায়েলে ২০০ সেনা পাঠানোর বিষয়ে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওই মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, এই বাহিনীতে যোগ দেওয়া নিয়ে ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, কাতার, আজারবাইজানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্র। বাহিনীটিকে সহায়তা করবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজন সেনা।

আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী গঠনের কাজটি করতে চাইছে বলে জানান ওই দুই কর্মকর্তা। তাঁরা এ–ও বলেন, সংঘাত–পরবর্তী গাজায় কোনো বাসিন্দাকে জোর করে উপত্যকাটি থেকে বিতাড়িত করা হবে না। আর যেসব ফিলিস্তিনি হামাসকে হুমকি বলে মনে করবেন, তাঁদের জন্য গাজায় একটি নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলা হবে।

২৪ ফিলিস্তিনিকে হত্যা

১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৪ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দখলদার ইসরায়েলি শক্তি দিনরাত যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করছে। চুক্তি লঙ্ঘনের এই ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। সেগুলো যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যস্থতাকারীদের কাছে পাঠানো হবে।

এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশ করতে দেওয়ার কথা ইসরায়েলের। তবে সে পরিমাণ ত্রাণ পাচ্ছেন না গাজাবাসী। যেমন আজ স্থানীয় সময় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ১০০ ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করে। ট্রাকগুলোর চালকেরা বলেন, গাজায় প্রবেশের আগে ট্রাকগুলো নিরীক্ষা করতে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। এতে মূলত বিলম্ব হচ্ছে।

এরই মধ্যে আজও গাজার দক্ষিণে মিসর–নিয়ন্ত্রিত রাফা সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাঁদের ভাষ্য, গাজায় ত্রাণ যাবে শুধু ইসরায়েল–নিয়ন্ত্রিত কেরেম শালোম দিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, গাজায় আগের চেয়ে বেশি ত্রাণ প্রবেশ করছে এটা ঠিক। তবে তা প্রয়োজনের কাছাকাছিও নয়।

এই স্বল্প পরিমাণে ত্রাণ পেয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে গাজাবাসীর মধ্যে। পরিচয় প্রকাশ না করে উপত্যকাটির এক ফিলিস্তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আল্লাহর দয়ায় আমরা অবশেষে ত্রাণ পাওয়া শুরু করেছি। আমার সন্তানেরা খাবার পাচ্ছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। দোয়া করি, সামনের দিনগুলো যেন আমাদের ভালো কাটে।’

ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। এই ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেক ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ চাপা পড়ে আছে বলে দাবি হামাসের। বৃহস্পতিবার গাজা নগরীতে
ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। এই ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেক ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ চাপা পড়ে আছে বলে দাবি হামাসের। বৃহস্পতিবার গাজা নগরীতে। ছবি: রয়টার্স।

কিছু রাজনৈতিক দল ঐকমত্যের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে কাগজে সই করছে: নাহিদ ইসলাম

কিছু রাজনৈতিক দল জাতীয় ঐকমত্যের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে একটি কাগজে সই করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইস্কাটনে এনসিপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম এই মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকগুলো কমিশন হয়েছে। শ্রম কমিশন হয়েছে। কিন্তু এই কমিশন নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। স্বাস্থ্য কমিশন নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। মানুষের জীবনের সঙ্গে যে যে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান জড়িত, যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জড়িত, তার সংস্কার নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক ছয়টি সংস্কার কমিশন নিয়ে ঐকমত্য কমিশন গঠন হয়েছে।

সেখানেও গণতন্ত্রের জন্য সবার ভালো ইন্টেনশন (উদ্দেশ্য) দেখতে পাননি তাঁরা।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ফলে তাঁরা মনে করেন, বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লড়াই শুরু করেছেন, এর পাশাপাশি তাঁদের যে অর্থনৈতিক রূপান্তরের লড়াই, যেটাকে তাঁরা বলছেন বৈষম্যবিরোধী সমাজব্যবস্থা, ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থার জন্য তাঁরা লড়াই করবেন। ছাত্র-শ্রমিকসহ পেশাজীবী সব মানুষ একত্রিত হয়ে এই লড়াই করবেন।

বাংলাদেশের সব উন্নয়নের কেন্দ্রে মানবিক মর্যাদা থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, তাঁরা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে উন্নয়নের গালগল্প শোনানো হয়েছে, যেই প্রবৃদ্ধির গল্প গল্প শোনানো হয়েছে, সেই কাঠামো থেকে দেশকে বের করতে হবে। বাংলাদেশের সব উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানবিক মর্যাদা, একটি মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা। এই মর্যাদাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান ও একটি দায়-দরদের সমাজ প্রতিষ্ঠাই তাঁদের লক্ষ্য।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় শ্রমিক শক্তি আজ আত্মপ্রকাশ করছে। রাজপথে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। অন্যদিকে, এই দিনে কিছু রাজনৈতিক দল জাতীয় ঐকমত্যের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে একটি কাগজে সই করছে।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমরা সব সময় জানি, রাজপথের শক্তি জয়ী হয়। ইনশা আল্লাহ, জাতীয় শ্রমিক শক্তিও জয়ী হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি শ্রমিকদের পক্ষে রাজনীতি করবে। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের রাজনীতি করবে।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে এখনো শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরির জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। গার্মেন্টসে আগুন লাগছে। বস্তিতে আগুন লাগছে। কলকারখানায় আগুন লাগছে। শ্রমিক মারা গেলে দুই লাখ, তিন লাখ টাকায় জীবনের দাম নির্ধারণ করা হয়। শ্রমিকের জীবনের কোনো মূল্য হয় না। শ্রমিকের শ্রমকে কেবল অর্থনীতি শোষণের কেন্দ্রে ভাবলে চলবে না। বাংলাদেশে যে লুটপাট হয়েছে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেখান থেকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে যেতে হবে।

ফ্যাসিবাদী আমলে যেসব রাঘব ছিল, মাফিয়া অলিগার্ক ছিল, তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি বলে মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, এই রাঘব, মাফিয়া অলিগার্কদের ব্যবসা এখনো রক্ষা করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে সেই মাফিয়াদের, যারা শ্রমিকদের এতকাল ধরে শোষণ করেছে। তাই তাঁরা সেই অলিগার্কি ব্যবস্থার পরিবর্তন চান।

অনুষ্ঠানে নতুন সংগঠনের নেতাদের নাম ঘোষণা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাজহারুল ইসলাম ফকির। সদস্যসচিব শ্রমিকনেতা রিয়াজ মোর্শেদ। মুখ্য সংগঠক শ্রমিক নেতা আরমান হোসেন।

‘আমাদের অন্তর্ভুক্ত না করে কীভাবে এই সনদে স্বাক্ষর করবে তারা’
'আমাদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। আমাদের অন্তর্ভুক্ত না করে কীভাবে এই সনদে (জুলাই সনদ) স্বাক্ষর করবে তারা। আমাদের আগেও শান্তি ছিল না, এখনো নাই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। '

আজ শুক্রবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে অবস্থান নিয়ে এসব কথা বলেন ইমরান মিয়া। তিনি নিজেকে জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভের পর সকালে ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধা’ ব্যানারে শতাধিক মানুষ সংসদ ভবন এলাকার ১২ নম্বর গেটের সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দেন।  একপর্যায়ে তাঁরা সংসদ ভবন এলাকার ১২ নম্বর গেট টপকে ভেতরে ঢোকেন। মঞ্চের সামনে অতিথিদের চেয়ারে বসে স্লোগান দিতে থাকেন।

বেলা ১১টার দিকে দেখা যায়, অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে অতিথিদের জন্য সাজিয়ে রাখা চেয়ারে তাঁরা বসে আছেন। অনুষ্ঠানমঞ্চ ও অতিথিদের জন্য রাখা এই চেয়ারের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আন্দোলনকারীদের দাবি, জুলাই আন্দোলনে তাদের অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আইনি সুরক্ষা, পুনর্বাসন  বাস্তবায়ন করতে হবে।

নিজেকে জুলাই যোদ্ধা বলে পরিচয় দেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘এ জুলাই সনদ মানি না। এই সনদে জুলাই যোদ্ধাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা আন্দোলন করতে গিয়ে পা হারিয়েছি, হাত হারিয়েছি, চোখ হারিয়েছি। অথচ আমাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। আমাদের অনেকে  হাসপাতালে এখনো চিকিৎসা নিচ্ছে। তাই আমাদের দাবি অবিলম্বে জুলাই সনদের সংশোধন করতে হবে।’  

যাদের রক্তের ওপর জুলাই অভ্যুত্থান তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। ক্রাচে ভর দিয়ে আসা জিহাদ ইসলাম জানান তিনি  জুলাই যোদ্ধা। তিনি বলেন, 'আমাদের এত জোরাজুরি করে ঢুকতে হবে কেন। আমাদের কি ইনভাইট করা উচিত ছিল না? ১৫/২০ হাজার চেয়ার দিতে পারত না?'

জুলাই সনদের সংশোধন বা পরিবর্তন না হলে অবস্থান চালিয়ে যাবেন বলেন জিহাদ ইসলাম।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, বিক্ষোভকারীদের সরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা তাঁদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত যাবেন না বলে জানিয়েছেন।  জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিনিধিরা এখানে আসছেন। তাঁদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের আলোচনা হবে। আলোচনার পর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে অবস্থান নিয়েছেন ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধা’ ব্যানারে শতাধিক মানুষ
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে অবস্থান নিয়েছেন ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধা’ ব্যানারে শতাধিক মানুষ। ছবি: প্রথম আলো

বাবা যেসব কাজ করলে সন্তান পরীক্ষায় ভালো ফল করে by সুমন মাহমুদ

আপনার শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে? তাহলে তার ভালো ফলের ক্ষেত্রে বাবা হিসেবে আপনার ভূমিকা অপরিসীম। আপনি যদি আপনার সন্তানের পড়া কিংবা আঁকার সময় সাহায্য করেন, সেটা আপনার সন্তানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আবার ধরুন সন্তানের খেলার সঙ্গী হলেন আপনি, সেটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

ভাবছেন, কাজের ব্যস্ততায় সেই সময় আপনি পাচ্ছেন কই? সন্তানের ভালোর জন্য সময় আপনাকে বের করতেই হবে। কারণ, সম্প্রতি ইংল্যান্ডের লিডস ইউনিভার্সিটি একটি গবেষণা চালিয়ে দেখেছে, বাবারা যদি নিয়মিতভাবে সন্তানদের সঙ্গে পড়া, খেলা, গল্প বলা, আঁকা কিংবা গান গাওয়ার মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলেন, তাহলে তাঁদের সন্তানেরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভালো ফল করে।

গবেষণায় যা জানা গেছে

মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্য পায়, এমন ৫ হাজার পরিবারের ৫–৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করেছিল ‘মিলেনিয়াম কোহর্ট স্টাডি’। এটি যুক্তরাজ্যে শিশুদের নিয়ে গবেষণার জন্য সুপরিচিত গবেষণা প্রকল্প। আর তাদের এই গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের জন্ম ছিল ২০০০ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, বাবারা যদি ৩ বছর বয়সী সন্তানের সঙ্গে আঁকা, খেলা ও পড়ার মতো কাজ করেন, তাহলে সন্তান ৫ বছর বয়সে স্কুলে ভালো করে। আবার ৫ বছর বয়সে বাবাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে ৭ বছর বয়সী শিশুদের ‘কি স্টেজ অ্যাসেসমেন্ট’-এ ফল ভালো হয়।

গবেষণার প্রধান লিডস ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের রিসার্চ ফেলো ড. হেলেন নরম্যান বলেন, ‘এখনো বেশির ভাগ শিশুর যত্ন মূলত মায়েরাই নেন। তবে বাবারা যদি সক্রিয়ভাবে শিশুর যত্নে অংশ নেন, তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের ভালো ফলের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।’

গবেষণা অনুসারে, বাবাদের অংশগ্রহণ শিশুদের স্কুলের সাফল্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা শিশুর লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, শিক্ষাবর্ষে বয়স বা পরিবারের আয় যা-ই হোক না কেন।

মা ও বাবা একই কার্যক্রমে অংশ নিলে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব দেখা যায়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মায়েরা শিশুদের আবেগগত ও সামাজিক আচরণে বেশি প্রভাব ফেলেন, যেখানে বাবাদের প্রভাব শিক্ষাগত সাফল্যে বেশি।

গবেষকেরা পরামর্শ দেন, বাবারা যেন প্রতি সপ্তাহে যতটা সম্ভব সন্তানদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সময় কাটান। ব্যস্ত কর্মজীবী বাবারা দিনে মাত্র ১০ মিনিট সময় দিলেও সন্তানেরা শিক্ষাগত সুফল পেতে পারে।

গবেষকদের সুপারিশ

সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গবেষকেরা কিছু সুপারিশ করেছেন। তার একটি হলো, স্কুল ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁরা প্রতিটি শিশুর মা-বাবার যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করবেন (যদি সম্ভব হয়)। পাশাপাশি শিশুর কার্যক্রমে বাবাদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে কৌশল তৈরি করবেন।

গবেষকেরা এ–ও বলেছেন, দ্য অফিস ফর দ্য স্ট্যান্ডার্ডস ইন এডুকেশনের (যুক্তরাজ্যের শিক্ষার মানদণ্ড দপ্তর) পক্ষ থেকে যখন স্কুল পরিদর্শনে যাওয়া হবে, তখন প্রতিষ্ঠানটি যেন বাবাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনা করে।

গবেষণার সহ-লেখক ছিলেন ফাদারহুড ইনস্টিটিউটের ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনসের প্রধান ড. জেরেমি ডেভিস। ফাদারহুড ইনস্টিটিউট যুক্তরাজ্যের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। এটি এমন একটি সমাজ গঠনে কাজ করছে, যেখানে পুরুষদের সক্রিয় বাবা ও পরিচর্যাকারী হিসেবে মূল্যায়ন, তৈরি ও সহায়তা করা হয়।

জেরেমি ডেভিস যা বলেছেন তার সারমর্ম হলো, বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, বাবারা তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও সরাসরি প্রভাব ফেলেন। তাই মায়েদের মতো বাবারাও যেন সন্তানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মেশেন বা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেন, তার জন্য উপায় খুঁজে বের করে সহায়তা করতে হবে।

লিডস ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের রিসার্চ ফেলো ড. হেলেন নরম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি অর্থায়ন করেছে ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (ইএসআরসি)। গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি লিডস ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

সূত্র: লিডস ডট এসি ডট ইউকে

বাবারা যদি সক্রিয়ভাবে শিশুর যত্নে অংশ নেন, তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের ভালো ফলের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে
বাবারা যদি সক্রিয়ভাবে শিশুর যত্নে অংশ নেন, তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের ভালো ফলের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। ছবি: প্রথম আলো

গাজায় যেভাবে ইসরায়েলের পরাজয় আর ফিলিস্তিনের পুনর্জন্ম হলো by রামজি বারুদ

ইসরায়েল গাজায় তার কোনো কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। গাজায় ইসরায়েলের পরাজয় এবং ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণের পুনর্জন্ম নিয়ে লিখেছেন রামজি বারুদ

শেষ পর্যন্ত আমরা যদি গাজায় ফিলিস্তিনি বিজয়ের কথা বলি, তবে এটি ফিলিস্তিনি জনগণের, তাঁদের অবিনাশী মনোবল এবং দল, মতাদর্শ ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা গভীর শিকড়যুক্ত প্রতিরোধের এক গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য।

দশকের পর দশক ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি দখলদারির ‘সমাধান’ কেবল একটি সুশৃঙ্খল আলোচনানির্ভর প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব। ‘শুধু সংলাপই শান্তি আনতে পারে’—এই বাক্য রাজনৈতিক অঙ্গন, একাডেমিক প্ল্যাটফর্ম, গণমাধ্যম এবং অনুরূপ সব জায়গায় অবিরাম প্রচারিত হয়েছে।

এ ধারণাকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল শিল্পগোষ্ঠীর জন্ম হয়, যা নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত হয় ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এবং ইসরায়েল সরকারের মধ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ও তার পরবর্তী বছরগুলোতে।

‘শান্তি’র অবসান

সমস্যা কখনোই ‘সংলাপ’, ‘শান্তি’ এমনকি ‘বেদনাদায়ক আপস’-এর মৌলিক ধারণার সঙ্গে ছিল না, যা ১৯৯৩ থেকে ২০০০-এর দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত ‘শান্তিপ্রক্রিয়া’র সময়টিতে নিরন্তর প্রচার করা হয়; বরং পুরো সংঘাতের রূপ নির্ধারিত হয়েছে এই শব্দগুলো এবং অনুরূপ অন্যান্য পরিভাষার সংজ্ঞা ও বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘শান্তি’ মানে ছিল এমন এক আনুগত্যশীল ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব, যারা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্য থেকে আলোচনা করতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতার বাইরে কাজ করতে রাজি থাকবে।

একইভাবে ‘সংলাপ’ও কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য ছিল, যখন ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব সশস্ত্র প্রতিরোধ পরিত্যাগ করবে, নিরস্ত্র হবে, ইসরায়েলের কথিত ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ‘অস্তিত্বের অধিকার’ স্বীকার করবে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত ভাষা মেনে চলবে।

আসলে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব যখন সশস্ত্র প্রতিরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করে এবং জাতিসংঘের নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাবের সীমিত ব্যাখ্যা মেনে নেওয়ার পর, তখনই কেবল ওয়াশিংটন আরাফাতের সঙ্গে ‘সংলাপে’ রাজি হয়। এই নিম্নস্তরের আলোচনাগুলো তিউনিসিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে অংশ নেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিকটপ্রাচ্যবিষয়ক সহকারী সচিব রবার্ট পেলেট্রু।

ইসরায়েল কখনোই কঠোর শর্ত ছাড়া ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ‘সংলাপে’ বসেনি। ফলে আরাফাত তাঁর জনগণের ক্ষতির বিনিময়ে একের পর এক একতরফা ছাড় দিতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত অসলো চুক্তি ফিলিস্তিনিদের কোনো মৌলিক সুফল এনে দেয়নি; ইসরায়েল কেবল স্বীকৃতি দিয়েছিল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ), সমগ্র ফিলিস্তিন বা ফিলিস্তিনের জনগণকে নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পিএ দুর্নীতির আশ্রয়স্থলে পরিণত হয় এবং এর অস্তিত্ব ইসরায়েলি দখলের অস্তিত্বের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে ইসরায়েল কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে অভিযান চালিয়েছে, নির্বিচার গণহত্যা করেছে, গাজায় বিধ্বংসী অবরোধ আরোপ করেছে, কর্মীদের হত্যা করেছে এবং নারী ও শিশুদেরসহ অসংখ্য ফিলিস্তিনিকে বন্দি করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ‘সংলাপ’, ‘শান্তি’ ও ‘বেদনাদায়ক আপস’-এর যুগে ১৯৬৭ সালের দখলের পর থেকে ফিলিস্তিনি ভূমির সর্ববৃহৎ সম্প্রসারণ ও কার্যত সংযুক্তকরণ সংঘটিত হয়েছে।

গাজা কেন ব্যতিক্রম

এই সময়কালে একটি ব্যাপক ঐকমত্য গড়ে ওঠে যে ‘সহিংসতা’—অর্থাৎ ইসরায়েলি সহিংসতার জবাবে ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। পিএর নেতা মাহমুদ আব্বাস ২০০৮ সালে এটিকে ‘নিরর্থক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে পিএর নিরাপত্তা বাহিনীর বড় অংশকেই ইসরায়েলের প্রতি যেকোনো ধরনের প্রতিরোধ, সশস্ত্র বা নিরস্ত্র দমন করতে কাজে লাগান।

যদিও জেনিন, তুলকারেম, নাবলুস ও পশ্চিম তীরের অন্যান্য অঞ্চল ও শরণার্থীশিবিরগুলো কোনোভাবে প্রতিরোধের কিছু সীমিত ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়, ইসরায়েল ও পিএর যৌথ প্রচেষ্টা প্রায়ই এসব উদ্যোগকে ধ্বংস করে দেয় বা অন্তত উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে ফেলে।

তবে গাজা সব সময়ই ছিল ব্যতিক্রম। এই উপত্যকার সশস্ত্র আন্দোলন ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকেই অব্যাহত আছে—প্রথমে ফেদায়িন আন্দোলন, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক ও ইসলামি প্রতিরোধগোষ্ঠীর মাধ্যমে। এই অঞ্চল সব সময়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকেছে, প্রথমে ইসরায়েলের পরে পিএরও।

২০০৭ সালে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে স্বল্প কিন্তু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আব্বাসপন্থীরা পরাজিত হওয়ার পর গাজা অবিসংবাদিতভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

এ ঘটনা ঘটে ইসরায়েলি সেনাদের ২০০৫ সালে গাজার জনবসতি অঞ্চল থেকে তথাকথিত ‘পুনর্বিন্যাস’-এর দুই বছর পর। তখন তারা গাজার ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের অংশে সামরিক বাফার জোন গড়ে তোলে, যা আজকের এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতির সূচনা করে।

২০০৬ সালে হামাস ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে, এটি একটি অপ্রত্যাশিত ফলাফল; যা ওয়াশিংটন, তেল আবিব, রামাল্লাসহ পশ্চিমা ও আরব মিত্রদের ক্রুদ্ধ করে তোলে। তাদের ভয় ছিল, যদি ইসরায়েলের পিএমিত্ররা গাজা ও পশ্চিম তীরে প্রতিরোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, তাহলে দখল করা অঞ্চলে এক ব্যাপক গণ–অভ্যুত্থান শুরু হবে।

ফলে ইসরায়েল গাজার ওপর দমবন্ধ করা অবরোধ আরও জোরদার করে, যা ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করলেও অঞ্চলটি আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

২০০৮ সাল থেকে ইসরায়েল নতুন কৌশল নেয়—গাজার প্রতিরোধকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক বাহিনী হিসেবে গণ্য করা এবং তার বিরুদ্ধে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু করা। এর ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে—এদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক।

এই বড় সংঘাতগুলোর মধ্যে ছিল ২০০৮–০৯ সালের ডিসেম্বর–জানুয়ারির যুদ্ধ, ২০১২ সালের নভেম্বর, ২০১৪ সালের জুলাই–আগস্ট, ২০২১ সালের মে এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া গণহত্যামূলক যুদ্ধ।

অবিশ্বাস্য ধ্বংসযজ্ঞ, অবরোধ, আন্তর্জাতিক ও আরব বিশ্বের বহুমুখী চাপ ও নিঃসঙ্গতার মধ্যেও গাজা টিকে থেকেছে এবং নিজেকে পুনর্গঠিত করেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি ধ্বংসাবশেষের ইট-পাথর দিয়ে পুনর্নির্মিত হয়েছে আর প্রতিরোধের অস্ত্রাগারও পুনরায় ভরে উঠেছে ইসরায়েলের অবিস্ফোরিত গোলা থেকে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার করে।

৭ অক্টোবর: ইসরায়েলের ‘বিপর্যয়’

৭ অক্টোবর হামাসের অভিযান যা ‘আল-আকসা’ ফ্লাড নামে পরিচিত—দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা স্থিতাবস্থার এক বড় ধরনের ছেদ সৃষ্টি হয়। ফিলিস্তিনিদের কাছে এটি তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের পরিণত রূপ; এমন এক চূড়ান্ত ধাপ যা ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে শুরু হয়েছিল এবং বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে।

এটি ইসরায়েলকে কঠোরভাবে জানিয়ে দেয় যে লড়াইয়ের নিয়ম একেবারেই বদলে গেছে এবং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা তথাকথিত চিরস্থায়ী ভুক্তভোগীর ভূমিকায় থাকতে অস্বীকৃতি জানায়। ইসরায়েলের জন্য এই ঘটনাটি ছিল ভূমিকম্পস্বরূপ। এটি দেশটির আত্মপ্রচারিত সামরিক ও গোয়েন্দা দক্ষতার গভীর ত্রুটি উন্মোচন করে এবং ফিলিস্তিনিদের সামর্থ্য সম্পর্কে ইসরায়েলি নেতৃত্বের মূল্যায়ন কতটা ভুল ছিল, তা স্পষ্ট করে দেয়।

এই ব্যর্থতা আসে এমন এক সময়ের পর, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকালে কিছু অনুগত আরব ও মুসলিম দেশকে সঙ্গে নিয়ে স্বাভাবিকীকরণ অভিযানে সাময়িক সাফল্য লাভ করেছিল। তখন মনে হচ্ছিল, ফিলিস্তিন ও তাদের সংগ্রাম মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতায় একেবারে প্রান্তিক হয়ে গেছে।

পশ্চিম তীরে অধীন ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এবং গাজায় অবরুদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলনকে দেখে মনে হচ্ছিল, ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে ফিলিস্তিন আর কোনো সিদ্ধান্তমূলক বিষয় নয়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দু তথা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত সাফল্যের স্বপ্ন—হঠাৎ ভেঙে পড়ে। ক্রুদ্ধ বা বিভ্রান্ত হলেও নিজের অর্জিত সব সুবিধা পুনরুদ্ধারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতানিয়াহু এক ভয়াবহ সামরিক অভিযানে নেমে পড়েন, যা দুই বছরের ব্যবধানে মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যায় পরিণত হয়।

ফিলিস্তিনিদের পদ্ধতিগতভাবে নির্মূল করা এবং জীবিতদের গাজা থেকে জাতিগতভাবে উৎখাত করার প্রকাশ্য ইচ্ছা ইসরায়েল ও তার জায়নবাদী মতাদর্শের সহিংস চরিত্রকে উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করেছে। এর ফলে বিশ্ব, বিশেষত পশ্চিমা সমাজ প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছে ইসরায়েল আসলে কী এবং সব সময় কী ছিল।

গাজার প্রতিরোধ ও সহিষ্ণুতা এবং ইসরায়েলের পরাজয়

তবে যে ভয়টি ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু আরব দেশকে একত্র করে রেখেছে, তা হলো ফিলিস্তিনে এবং তা থেকে ছড়িয়ে পড়া গোটা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ—বিশেষত সশস্ত্র প্রতিরোধ পুনরায় উত্থিত হতে পারে, এমন আশঙ্কা; যা সব স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

এই ভয় আরও গভীর হয় যখন হিজবুল্লাহ (লেবানন) ও আনসারাল্লাহর (ইয়েমেন) মতো অরাজনৈতিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো গাজার প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে মিলে এমন এক শক্তিশালী জোট গঠন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে বাধ্য করে।

তবুও ইসরায়েল গাজায় তার কোনো কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। একদিকে ফিলিস্তিনি জনগণের কিংবদন্তিতুল্য সহিষ্ণুতার কারণে। অন্যদিকে প্রতিরোধ বাহিনীর সামরিক সক্ষমতার কারণে, যারা দুই হাজারের বেশি ইসরায়েলি সামরিক যান—যার মধ্যে শত শত মেরকাভা ট্যাংকও ছিল—ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।

প্রায় আট দশকের অস্তিত্বজুড়ে কোনো আরব সেনাবাহিনীই ইসরায়েলকে এ ধরনের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারেনি। যদিও ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যরা—কিছু আরব দেশ ও পিএসহ—এখনো প্রতিরোধ বাহিনীকে নিরস্ত্র করার দাবি জানাচ্ছে, বাস্তবতার বিচারে তা কার্যত অসম্ভব।

গত দুই বছরে ইসরায়েল গাজায় দুই লাখ টনের বেশি বিস্ফোরক বর্ষণ করেছে কেবল এই একটিমাত্র লক্ষ্য পূরণের জন্য এবং ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ দিয়েও তারা এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে, এমন কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

ইসরায়েল কেবল গাজায় ব্যর্থ হয়নি; বরং অনেক ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার ভাষায় গাজায় চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছে।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। প্রতিরোধের সব রূপের বৈধতাসহ, যা এখন ইসরায়েলি উপনিবেশবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক কার্যকর কৌশলে পরিণত হয়েছে। এই কারণেই ইসরায়েলের পরাজয় গোটা অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে দিতে পারে—এই ভয় সবাইকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা ও আরব মিত্ররা আলোচনার মাধ্যমে ৯০ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস এবং তাঁর অসলো ধারাকে আবারও একমাত্র বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে, তবু যুদ্ধের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করবে—যেখানে অসলো ও তার দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিনিধিদের চিরতরে ইতিহাসের আস্তকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত করা হবে।

শেষ পর্যন্ত আমরা যদি গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিজয়ের কথা বলি, তবে এটি ফিলিস্তিনি জনগণের, তাদের অবিনাশী মনোবল এবং দল, মতাদর্শ ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা গভীর শিকড়যুক্ত প্রতিরোধের এক গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য।

সবকিছু বিবেচনায় রেখে এটিও স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, গাজার বর্তমান যুদ্ধবিরতি কোনোভাবেই ‘শান্তিচুক্তি’ হিসেবে দেখা যাবে না; এটি কেবল গণহত্যার এক স্বল্প বিরতি। কারণ, নিশ্চিতভাবেই সামনে আরও এক দফা সংঘাত আসছে—যার প্রকৃতি নির্ভর করবে আগামী মাস ও বছরগুলোতে পশ্চিম তীর এবং গোটা অঞ্চলে কী ঘটে তার ওপর।

* রামজি বারুদ, দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকল-এর সম্পাদক। তিনি পাঁচটি বইয়ের লেখক। তাঁর সর্বশেষ বই দিস চেইনস উইল বি ব্রোকেন: প্যালেস্টিনিয়ান স্টোরিজ অব স্ট্রাগল অ্যান্ড ডিফায়েন্স ইন ইসরায়েলি প্রিজনস। বারুদ সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স এবং আফ্রো–মিডল ইস্ট সেন্টারের একজন নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র রিসার্চ ফেলো।
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনজুরুল ইসলাম

যুদ্ধবিরতি শুরুর পর উত্তর গাজায় নিজ ঠিকানায় ফিরছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি
যুদ্ধবিরতি শুরুর পর উত্তর গাজায় নিজ ঠিকানায় ফিরছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। ছবি: রয়টার্স

মৌলভীবাজারের যে বাড়ি পাখিদের ‘আপন ঠিকানা’ by আকমল হোসেন

সকালটা রোদে ঝলমল করছে। গ্রামীণ পাকা সড়কের দুই পাশে আমনের রোপণ করা চারার ফাঁকে জলের মধ্যে পড়ছে রোদ। ঢেউ খেলছে হালকা-গাঢ় সবুজ পাতা। খেতের কোথাও ১০-২০টি, কোথাও ১-২টি করে সাদা বক দাঁড়িয়ে থেকে শিকার খুঁজছে।

মৌলভীবাজারের মোকামবাজার-অফিসের বাজার সড়ক ধরে যাওয়ার পথে তখন এ রকমই সকালের পরিবেশ। একঝলকে খানিকটা দূরে ধানখেতের এক প্রান্তে চোখে পড়ে, একটি বাড়ির গাছে গাছে যেন সাদা কাঠগোলাপের মতো থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। হাওয়ায় সেই ফুলের পাপড়ি দুলছে।

এরপরই কাছে যাওয়া, এসব ফুলের সঙ্গে পরিচয়। তবে ওই বাড়ির গাছে গাছে সাদা কোনো ফুল ফোটেনি, ফুল হয়ে ফুটে আছে সাদা বক। এখানে বক পাখি সংসার পেতেছে। সঙ্গে আছে কালো পানকৌড়ির দল, শালিকসহ নানা রকমের পাখিও।

সকালবেলা মাত্র ঘুম থেকে উঠছেন বাড়ির লোকজন। পাখিরা সমবেত ডাকে সরগরম করে রেখেছে সারা বাড়ি। বাড়ির লোকজন অনেকটা বছর ধরে এসব পাখির সঙ্গে আছেন, পাখিরা তাঁদের সঙ্গে আছে। ওই ডাককে তাঁরা আর আলাদা করতে পারেন না। পাখি, পাখির ডাক—সবকিছুই এখন তাঁদের বাড়ির অংশ হয়ে গেছে, সংসারযাপনের অংশ হয়ে গেছে।

এটি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু গ্রামের একটি বাড়ি। বাড়ির তিন দিকেই ফসলের খোলা মাঠ। পূর্ব দিকে মাঠ শেষে আছে খাইঞ্জার হাওর।

বাড়ির কর্তা মো. এরশাদ মিয়া বলেন, ‘অনেক বছর ধরি পাখিরে রাখছি। পাখিরে পাহারা দিই। রাইতে ডাক শুনলে জানের দিকে চাই না, ঘর থাকি বাইর অই যাই। অনেকে শিকার করতো চায়। দিনের বেলায়ও কেউ কেউ আয়। কেউরে পাখি মারতে দিই না। আরও তো বাগান আছে। তারা যায় না। এখানে আশ্রয় পাইছে বলে আইছে। তারারে যত্ন করি রাখি।’

সম্প্রতি সকালে দূর থেকে যে রকমটা দেখা গেছে, গাছে গাছে সাদা সাদা ফুল হয়ে আছে পাখি। কাছে গেলে তার পরিমাণ যেন আরও বেড়ে যায়। এরশাদ মিয়ার বাড়ির পশ্চিম দিকের একটি পুকুরের পাড় ঘেঁষে আম, তেঁতুল, সুপারিসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ আছে। প্রায় সব কটি গাছেই বসে আছে ছোট-বড় অসংখ্য বক।

কাছেপিঠে আছে পানকৌড়ি। সাদার ফাঁকে ফাঁকে সবুজের সঙ্গে মিশে থাকা কালো রঙের পাখি। পানকৌড়ি নড়লে-চড়লেই ভালো করে চোখে পড়ে। মানুষ, বক ও পানকৌড়ি ওই বাড়িতে ‘মিলেমিশে আত্মীয় যেন’।

প্রায় গাছেই আছে পাখির বাসা। কোনোটিতে এখনো পাখির ছানা বসে আছে। কাছেই মা-বাবার মধ্যে কোনো না কোনোটি পাহারায়। দূর থেকে মা অথবা বাবা আধার নিয়ে আসছে, ছানার হাঁ করা মুখের ভেতর খাবার ঠেলে দিচ্ছে। সন্তান বাৎসল্যে ভরপুর বাড়ির সব কটি গাছ। বাড়ির পশ্চিম দিকটাতে চলার উপায় নেই। পাখির বিষ্ঠায় সাদা সাদা হয়ে আছে গাছতলা।

ওই গ্রামেরই মাদ্রাসাছাত্র মো. তারেক জানিয়েছে, সে প্রায়ই পাখি দেখতে ওই বাড়িতে যায়। বাড়ির লোকজন যেমন, প্রতিবেশীরাও তেমন পাখির প্রতি নজর রাখেন। প্রতিবেশীরা মনে করেন, এই পাখি তাঁদের সবার। কেউ পাখিকে বিরক্ত করেন না।

বাড়ির লোকজন ও স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ৮ থেকে ১০ বছর ধরে ওই বাড়িতে পাখি আশ্রয় নিয়েছে। কমবেশি সারা বছরই বাড়িতে পাখি থাকে। তবে কার্তিক মাসে পাখির সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তখন অসংখ্য পাখিতে সব কটি গাছ সাদা হয়ে ওঠে। ভোরের দিকে পাখিরা জেগে যায়, তারপর ডাকতে শুরু করে। ডাকতে ডাকতে বাসা ছেড়ে মাঠের দিকে, কিংবা হাওরের দিকে উড়াল দেয়। সারা দিন বাইরে থাকে। বিকেল হলে আবার বাড়িতে ফিরতে শুরু করে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-27%2Fddwvosze%2FMoulavibazarDH053720250816bok-shalik-4moulvibazar.JPG?rect=0%2C0%2C2000%2C1333&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ঝাঁক বেঁধে পাখি নীড়ে ফিরছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু গ্রামের একটি বাড়িতে। ছবি: প্রথম আলো