Thursday, August 8, 2013
খোলাবাজারে ফরমালিন বিক্রি নিষিদ্ধ করা জরুরি by আ ব ম ফারুক
আমরা ২০০৫ ও ২০০৬ সালে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছও পরীক্ষা করে দেখেছি যে, অধিকাংশ মাছের স্যাম্পলেই ফরমালিন দেয়া রয়েছে। ছোট মাছ তো আর বিদেশ থেকে আসে না। তাই এগুলোতে ফরমালিন নিশ্চয়ই আমদানিকারক পর্যায়ে মেশানো হয় না। ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উদ্-দৌলা যে কাজটি শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে ফরমালিনযুক্ত মাছ ব্যাপকহারে ধরে শাস্তি প্রদানের পর এখন বাজারে ফরমালিনের উৎপাত কিছুটা হলেও কমেছে বলে মনে হয়। ফরমালিন রাসায়নিকটি আগে লাশ বা প্রাণীদেহের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। এছাড়া বিভিন্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, স্টুডিও, ট্যানারি শিল্প, প্লাস্টিক কারখানায় এটি ব্যবহৃত হয়। বিদেশ থেকে তারা এটি আমদানি করে। তাদের হাত থেকে এই ফরমালিন খোলাবাজারে চলে আসছে এবং বাংলাদেশে এখন শুধু মাছই নয়, এমনকি দুধ ও বিভিন্ন ফলমূল সংরক্ষণের জন্যও ফরমালিন লুকিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বিশ্বের কোনো দেশেই ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ফরমালিন মেশায় না। খাদ্যসামগ্রীতে এর ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবেই নিষিদ্ধ। ফলে ক্রেতারা এসব খাদ্যসামগ্রী কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একটু সতর্ক হলে কেনার আগে ক্রেতা বুঝতে পারবেন মাছে ফরমালিন দেয়া আছে কি-না। ফরমালিন দেয়া মাছের গায়ে পিচ্ছিলভাব থাকবে না, মাছের গা খস্খসে হবে, চোখের মণি উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ না হয়ে ঘোলা আর মলিন দেখাবে, কান্খা লালের বদলে হালকা বাদামি হবে (অবশ্য অনেক বিক্রেতা ফরমালিন দেয়ার পর এটি লাল দেখানোর জন্য অন্য মাছের রক্ত কিংবা লাল রং লাগিয়ে রাখে)। রান্নার পর এই মাছে স্বাভাবিক স্বাদ পাওয়া যাবে না, বিশেষ করে মাথা ও পেটের অংশ অত্যন্ত বিস্বাদ ও রাসায়নিক গন্ধযুক্ত হবে।
একইভাবে ফরমালিন দেয়া দুধের তৈরি মিষ্টিতে দুধের স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া যাবে না। তার বদলে রাসায়নিক গন্ধ ও স্বাদ পাওয়া যাবে। ফরমালিন দেয়া আঙ্গুরের গায়ে মৌমাছি বসবে না, আঙ্গুরের মিষ্টি সুগন্ধ পাওয়া যাবে না। আপেল-নাশপাতির বেলাতেও এই সুগন্ধ থাকবে না। আগে দোকানে আঙ্গুর ঝুলিয়ে রাখলে একদিন পরই আঙ্গুর একটা-দুটা খসে পড়ত। এখন ফরমালিন দেয়ার কারণে পচে না ও খসে পড়ে না। আপেল-নাশপাতিও দিনের পর দিন এ কারণেই পচে না। কোনো মাছের বা ফলের দোকানে ক্রেতার চোখ বা নাকে ঝাঁঝ লাগলে বুঝতে হবে সেখানে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়।
ফরমালিন অত্যন্ত বিষাক্ত বলে নিয়মিত ফরমালিনযুক্ত খাবার খেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যান্সার হওয়ার আশংকা থাকে। এছাড়া ফরমালিন খাদ্য পরিপাকে বাধা দেয়, পাকস্থলীর ক্ষতি করে, লিভারের এনজাইমগুলোকে নষ্ট করে এবং কিডনির কোষ নেফ্রনগুলোকে ধ্বংস করে। ফলে গ্যাস্ট্রিক আলসার বাড়ে, লিভার ও কিডনির নানা রকম জটিল ও দুরারোগ্য রোগ দেখা দেয়। মহিলাদের শরীরে ফরমালিন প্রবেশ করলে মাসিক ঋতুস্রাবে সমস্যা দেখা দেয়। গর্ভবতী মায়েদের জন্য ফরমালিন আরও ক্ষতিকর, অন্যান্য সমস্যা ছাড়াও এর কারণে গর্ভস্থ শিশু বিকলাঙ্গ হয়। ১৯৯৪ সালে আমেরিকার এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সি বলেছে, ফরমালিন ফুসফুস ও গলবিল এলাকায় ক্যান্সার সৃষ্টি করে। এর আগে ১৯৮৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার বলেছে, ফরমালিন মানবদেহের বিভিন্ন অংশের ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। ১৯৯২ ও ১৯৯৬ সালে আমেরিকার স্টেট অব ক্যালিফোর্নিয়াও ক্যান্সার সৃষ্টি করে বলে ফরমালিনকে কার্সিনোজেন বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বলে চিহ্নিত করে। ২০০৪ সালের ১ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গলবিল এলাকায় ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য ফরমালিনকে দায়ী করে (সংস্থার প্রেস বিজ্ঞপ্তি নং ১৫৩)। ২০০৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা পোস্ট পত্রিকায় ফরমালিনযুক্ত মাছ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় মাছ ও শুঁটকি ব্যবসায় ব্যাপক মন্দার কথা জানা যায়।
মাছ, দুধ বা ফলে যে অসৎ ব্যবসায়ী ফরমালিন মেশায়, তার জন্যও দুঃসংবাদ রয়েছে। ফরমালিন অত্যন্ত ঝাঁঝালো এবং মেশানোর সময় এর বাষ্প চোখের সংস্পর্শে এসে চোখের কর্নিয়ার ক্ষতি করে, কর্নিয়া তার স্বচ্ছতা হারিয়ে ঘোলা হয়ে যায়। এর পরিণামে ব্যবসায়ী চোখে ঝাপসা দেখে, ছানি তৈরি হয়। ফরমালিনের বাষ্প শ্বাস নেয়ার ফলে বমিভাব, মাথাব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট, হাঁপানি এবং ফুসফুস ও গলবিলে ক্যান্সার দেখা দেয়। তাছাড়া ফরমালিন পানিতে মিশিয়ে ব্যবহারের ফলে হাতের ত্বকে ঘা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারে সে ঘা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে, কোনো ওষুধেই সারে না। অর্থাৎ ফরমালিনের কারণে শুধু যে ক্রেতারই ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, ব্যবসায়ীও আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা তাই ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করব ক্রেতার ও নিজেদের মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ক্ষতির কথা ভেবে ফরমালিনের ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য। সেই সঙ্গে সরকারের প্রতিও আমরা আবেদন জানাই খোলাবাজারে ফরমালিনের বিক্রি বন্ধে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য। অবশ্য আমরা শিল্প-কারখানায় যেখানে সত্যিই প্রয়োজন সেখানে ফরমালিনের ব্যবহার বন্ধ করার কথা বলছি না। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিগুলোতে স্যাম্পল সংরক্ষণের জন্য যতটুকু ফরমালিন প্রয়োজন, তা তাদের না দেয়ার কথা বলছি না। মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে ব্যবহার্য ফরমালিনও বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু খোলাবাজারে খুচরা আকারে অবাধে ফরমালিন বিক্রির কোনোই দরকার নেই। অন্য কোথাও এর কোনো ব্যবহার নেই।
ফরমালিন এ দেশে তৈরি হয় না বা চোরাচালান হয়ে ভারত থেকেও আসে না। ফরমালিন আমদানি লাইসেন্স ব্যবহার করে বিদেশ থেকে আনা হয়। তাই কোন শিল্প-কারখানা কতটুকু ফরমালিন আমদানি করল, তা সরকারের জানা আছে। এখন প্রয়োজন কতটুকু ফরমালিন ওই প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেছে এবং কতটুকু উদ্বৃত্ত আছে তার হিসাব নেয়া। এভাবে হিসাব নিলে খোলাবাজারে ফরমালিন বিক্রি বন্ধ করা যাবে। তাছাড়া মোবাইল কোর্টগুলো মাছের বাজারে অভিযান চালানোর সময় বাজারের ওষুধের ও হার্ডওয়্যারের দোকানগুলোতে ফরমালিন বিক্রি হয় কি-না তা খুঁজে দেখতে পারে। মিটফোর্ড মার্কেটসহ সব রাসায়নিক পদার্থ বিক্রির দোকানে ফরমালিনের বিক্রি অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। আমদানি লাইসেন্স ও ব্যবহারের হিসাব ছাড়া ফরমালিনের মজুদ, বিক্রি, এমনকি বহনও নিষিদ্ধ করা হলে এবং অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে ফরমালিনের ব্যাপক ব্যবহার বন্ধ হতে পারে বলে আমরা মনে করি। আশা করি, জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে সরকার এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
আ ব ম ফারুক : অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শেখ মুজিবের চোখে তার স্ত্রী by ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শেখ মুজিবের জন্ম ১৯২০ সালে। আত্মজীবনীতে সে সময় থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সময়ের কথা তিনি বর্ণনা করেছেন। স্ত্রীকে শুধু তিনি বই লেখার প্রেরণাদায়িনী হিসেবে তুলে আনেননি, তাকে তুলে ধরেছেন একজন স্বামী অন্তপ্রাণ স্ত্রী হিসেবে, একজন স্নেহময়ী মা হিসেবে, একজন স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদ-দেবরের প্রতি নিবেদিত ও শ্রদ্ধাবান গৃহবধূ হিসেবে, একজন কষ্ট-সহিষ্ণু, সর্বংসহা সংবেদনশীল নারী হিসেবে। আত্মজীবনীতে মুজিব লিখেছেন, ‘আমার স্ত্রীর ডাক নাম রেণু।’ অবশ্য তার পোশাকি ফজিলাতুন্নেছা নামটি বইয়ের কোথাও উল্লেখ নেই। হিসাব করে দেখা যায়, মুজিব ও তার স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান প্রায় ১০ বছর। তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স তের বছর হতে পারে।’ এই বাল্যবিবাহের কারণ হিসেবে তিন বছর বয়সে রেণু’র পিতৃবিয়োগ ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের কথা এসেছে। শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘রেণুর দাদা আমার দাদার চাচাত ভাই। রেণুর বাবা মানে আমার শ্বশুর ও চাচা তার বাবার সামনেই মারা যান। মুসলিম আইন অনুয়ায়ী রেণু তার সম্পত্তি পায় না। রেণুর কোনো চাচা না থাকায় তার দাদা (শেখ কাশেম) নাতনি ফজিলাতুন্নেছা ও তার বোন জিন্নাতুন্নেছার নামে সব সম্পত্তি লিখে দিয়ে যান। ‘রেণুর বাবা মারা যাওয়ার পর ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সঙ্গে আমার এই নাতনির বিবাহ দিতে হবে।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা; মুরব্বির হুকুম মানার জন্য রেণুর সঙ্গে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হল। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। রেণু তখন কিছু বুঝত না, কেননা তার বয়স তখন বোধ হয় তিন বছর হবে।’ রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তার মা মারা যান আর দাদা মারা যান ৭ বছর বয়সে। তারপর রেণু শেখ মুজিবের মা’র কাছে চলে আসেন এবং তার ননদ, দেবরদের সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ির অপাত্য স্নেহে বড় হতে থাকেন। তিনি ছোটবেলায় বাবা বাবা বলে কান্নাকাটি করলে শাশুড়ি জবাব দিতেন এবং পরবর্তীকালে রেণু শাশুড়িকে বাবা বলে ডাকতেন বলে শোনা যায়। ১৯৩৩ সালে তাদের বিয়ে হলেও শেখ মুজিবের লেখা থেকে জানা যায়, তাদের ফুলসজ্জা হয়েছিল ১৯৪২ সালে।
আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু তার লেখাপড়া, রাজনীতি ও কলকাতা-ঢাকার জীবনের কথা লিখেছেন। তিনি পড়াশুনার জন্য আব্বা-মা উভয়ের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিতেন। তদুপরি তিনি পড়াশুনা ও রাজনীতির আংশিক খরচ এমনকি সিগারেট খাওয়ার টাকাও স্ত্রীর কাছ থেকে নিতেন। এই টাকা নেয়ার কথাটা আত্মজীবনীতে এবং বিশেষত রেণু প্রসঙ্গে বেশ কয়েকবার এসেছে। তিনি লিখেছেন, ‘আব্বা-আম্মা ছাড়াও সময় সময় রেণুও আমাকে কিছু টাকা দিতে পারত। রেণু যা কিছু জোগাড় করত বাড়ি গেলে এবং দরকার হলেই আমাকে দিত। কোনোদিন আপত্তি করে নাই, নিজে মোটেই খরচ করত না। গ্রামের বাড়িতে থাকত, আমার জন্য রাখত।’
টাকা প্রসঙ্গে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আব্বা, মা, ভাই-বোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেণুর ঘরে এলাম বিদায় নিতে। দেখি কিছু টাকা হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘অমঙ্গল অশ্র“জল’ বোধ হয় অনেক কষ্টে বন্ধ রেখেছে। তবে এবারে একটু অনুযোগের স্বরে বললেন, ‘একবার কলকাতা গেলে আর আসতে চাও না, এবার কলেজ ছুটি হলে বাড়ি এসো।’ টাকা-পয়সার কথা বইয়ের আরও একাধিক জায়গায় এসেছে। বাঙালি জীবনে বাবা-মা, বড় ভাই-বোনদের কাছ থেকে পড়াশুনা করার জন্য অর্থ নেয়াটি তেমন বিরল ঘটনা নয়। বিরল ঘটনা হচ্ছে স্ত্রীর অর্থে পড়াশুনা ও রাজনীতির জন্য টাকা নেয়ার বিষয়টা। আরও বিরল ঘটনা হল তা অকপটে, অসংকোচে ছাপার অক্ষরে প্রকাশ। শেখ মুজিব বলে কথা, তাই এমন দ্বিধাহীনভাবে তিনি তা প্রকাশ করেছেন। টাকা-পয়সাই নয়, সশরীরে বিএ পরীক্ষার সময় উপস্থিত হয়ে তিনি স্বামীকে প্রণোদনা দিয়েছেন। শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘রেণু কলকাতায় এসে হাজির, কেননা রেণুর ধারণা পরীক্ষার সময় সে আমার কাছে থাকলে আমি নিশ্চয়ই পাস করব, বিএ পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম।’
মুজিব ছিলেন মনে-প্রাণে রাজনীতিবিদ। সেকালে রাজনীতিকে তেমন ভালো চোখে দেখা হতো না বলে স্বামীর রাজনীতিকে স্ত্রীরা কেউই সহজভাবে মেনে নিতেন না। জেলে যাওয়াটা ছিল আরও অগ্রহণযোগ্য বিষয়। শেখ মুজিব বঙ্গশার্দুল বা বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার আগে বেশ কয়েকবার জেলে গেছেন। কিন্তু তার পতœী তাকে কখনও রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে বলেননি। তিনি বলতেন, রাজনীতি কর আপত্তি নেই, কিন্তু পড়াশুনাটি করবে। তারপরও যখন রাজনীতির কারণে সঠিকার্থে বাংলা ভাষার স্বপক্ষে আমরণ অনশন করছিলেন তখন রেণু বললেন, ‘জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ।’ পৃথিবীতে যে নারীর কেউ নেই, ছোটবেলায় মা-বাবা-দাদা মারা গেছেন, তার পক্ষে স্বামীকে কণ্টক রাজনীতির ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া কঠিন ছিল। সে কঠিন কাজটি করেছিলেন একজন অবলা, অনাথ, স্বল্পশিক্ষিত, স্বশিক্ষিত, গ্রামীণ মহিলা। এখানে তার দূরদর্শিতার পরিচয়ও মেলে। স্বামীকে এভাবে সামনে ঠেলে না দিলে তিনি তার স্বামীই থাকতেন; শেখ হাসিনা, জামাল, কামাল, রেহানা, রাসেলের পিতা থাকতেন, বঙ্গপিতা হতেন না। আত্মজীবনীতে উল্লেখ আছে, শেখ মুজিব কলকাতা থেকে ঢাকা এসে ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তার ল’পড়া হল না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরজীবনের জন্য বহিষ্কৃত হলেন। তার পিতা ঠিকই বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানালেন। তিনি টাকা-পয়সা দিতে চান না। ‘কিন্তু রেণু কিছুই বলে না। নীরবে কষ্ট সহ্য করে চলেছে।’ এই কষ্ট সহ্য করাটা যেন বিধির বিধান। শিশুবেলা থেকেই কষ্ট সহনে অভ্যস্ত রেণু আমৃত্যু সর্বংসহাই ছিলেন।
শেখ মুজিব তার আত্মজীবনীতে আরও অনেক কথাই বলেছেন, যা এই প্রজন্মর কাছে কেন আমাদের মতো প্রজন্মর কাছেও অজানা। এমন একটি অজানা কথা এসেছে তার প্রথমবার মন্ত্রিত্ব গ্রহণের কালে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে খবরটি গভীর রাতের আগে স্ত্রীকে জানাতে পারেননি, কেননা তিনি ছিলেন বাঙালি-বিহারি দাঙা দমনে ব্যাপৃত। তিনি লিখেছেন, ‘রাত চার ঘটিকায় বাড়িতে পৌঁছলাম, শপথ নেয়ার পরে পাঁচ মিনিটের জন্য বাড়িতে আসতে পারি নাই। আর দিনভর কিছু পেটেও পড়েনি। দেখি রেণু চুপটি করে না খেয়ে বসে আছে, আমার জন্য।’ আজকালকার দিনে কোনো মন্ত্রী দানাপানি পেটে না পেলে ২৪ ঘণ্টা কাজ করবেন আর তার স্ত্রী বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনে নিবেন, তা দুর্লভ না হলেও সুলভ নয়।
রেণুর এই শিক্ষাই হয়তো তাকে আরও বহু কিছু শিখিয়েছে, কোনো কালে কি কেউ শুনেছেন যে, মন্ত্রীর পত্নী নিজের সংসারের ব্যয়ভার বহনের জন্য বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে এসেছেন কিংবা কোনো মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পর তার স্ত্রী ভাড়া বাড়ির খোঁজে রাস্তায় নামছেন। শেখ মুজিবের পতœী রেণু এসব নির্দ্বিধায় ও বিনা বাক্যব্যয়ে করেছেন।
১৯৫৪ সালে শেখ মুজিব প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হন, তবে তার মন্ত্রিত্বের আয়ু ছিল ক্ষণস্থায়ী। ৯২(ক) ধারা জারি হলে তিনি লিখেছেন, ‘বাসায় এসে দেখলাম, রেণু এখনও ভালো করে সংসার পাততে পারে নাই। তাকে বললাম, ‘আর বোধহয় দরকার হবে না। কারণ মন্ত্রিসভা ভেঙে দিবে, আর আমাকেও গ্রেফতার করবে। ঢাকায় কোথায় থাকবা, বোধহয় বাড়িই চলে যেতে হবে। আমার কাছে থাকবা বলে এসেছিলা, ঢাকায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ হবে, তা বোধহয় হল না। নিজের হাতের টাকা পয়সাগুলোও খরচ করে ফেলেছ।’
তারপর বাড়িতে পুলিশ এসেছে। পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে মন্ত্রী রিকশায় চড়ে বাসায় ডুকেছেন। এর পরে অবার জেলের প্রস্তুতি। আমরা জানি যে, রেণু তার স্বামীর কাপড়-চোপড় আমৃত্যু সুন্দর করে গুছিয়ে দিতেন। শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘রেণু আমাকে খেতে বলল। রেণু আমার সবকিছু ঠিকঠাক করে দিল এবং কাঁদতে লাগল। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। রেণুকে বললাম তোমাকে কি বলে যাব, যা ভালো বোঝ কর।’ নিজের স্ত্রীর সক্ষমতা ও কর্ম কৌশলতার প্রতি কতটা দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে সব দায়িত্ব তার কাঁধে চাপিয়ে হাসিমুখে জেলে যেতে পারতেন শেখ মুজিব।
স্বামী-সন্তানের প্রতি যেমন, তেমনি শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতিও রেণুর ছিল অনন্ত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। তাদের অসুখ-বিসুখে কাছে থাকা ছিল তার রুটিন কাজ। সেদিনের একটি ঘটনা শেখ মুজিবের লেখায় এসেছে। তিনি তখন জেলে, তার বাবা অসুস্থ। শ্বশুরের অসুস্থতার খবর টেলিগ্রাম মারফত পেয়ে রেণু বাড়িতে ছোটেন। তবে যাওয়ার কালে টেলিগ্রামের কপিটি সংযুক্ত করে শেখ মুজিবের মুক্তির আবেদন করে যান। যার ভিত্তিতে শেখ মুজিবকে মুক্তিও দেয়া হল। রেণু যে শুধু তার প্রতি বা তার নিকটজনের প্রতি সংবেদনশীল ও মানবিক ছিলেন তা নয়, তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতিও অতিশয় সংবেদনশীল ছিলেন, তার প্রমাণও নেতার লেখায় মেলে। তিনি মাদারীপুর বোনের বাড়ি যাচ্ছিলেন- দু’জন শুভাকাক্সক্ষী সহযাত্রী সঙ্গে ছিলেন। শীতের রাতে তাদের কোনো চাদর না থাকায় কষ্টের অন্ত ছিল না। রেণু তার নিজের গায়ের চাদর খুলে তাদের দিয়েছিলেন।
এসবই ১৯৫৫ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলীর অংশবিশেষ। তারপর ১৯৫৫ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত মুজিব জীবনের ঘটনাপুঞ্জি চমকপ্রদ। সেখানে তার পত্নীর অবস্থান, কিন্তু তার বয়ানে শোনার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। তবে লোকমুখে শুনে, অল্প-স্বল্প লেখালেখি পড়ে জানতে পারি, ‘বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যের উপেক্ষিত উর্মিলা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব শিশু বয়সে বঙ্গবন্ধু মুজিবের ঘরণী হয়ে আসেন। এই অবুঝ, অবলা, অনাথ মেয়েটিই কালে মহাকাব্যের মূলনায়ক মুজিবের প্রধান চালিকারূপে আবির্ভূত হন। নীরবে, নিভৃতে এই মহিলা স্বামীসেবা, সন্তান লালন, পিতৃতুল্য শ্বশুর, দেবর-ননদ সবারই পরিচর্যা করেছেন। তদুপরি ফজিলাতুন্নেছা মুজির গৃহাভ্যন্তরে এমন একটি পরিবেশ উপহার দিয়েছিলেন, যার ফলে নেতা মুজিব দুর্গমগিরি, দুস্তর পারাবার পাড়ি দিতে পেরেছিলেন। নিশ্চিন্তে তার সংগঠন ও জনগণের সেবায় নিজের মূল্যবান জীবনও বিসর্জন দিতে পেরেছিলেন। তীক্ষè বুদ্ধি ও দক্ষতার অধিকারী এই মহিলা পরিণত বয়সে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ও তথ্যের আধার ছিলেন। স্বামীর সুষ্ঠু সিদ্ধান্তে মনস্তাত্ত্বিক সহযোগিতা ছাড়াও তার দেয়া তথ্য নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে সহায়ক হয়েছে। অসামান্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই মহাপ্রয়াণ মহিলা ছিলেন রীতিমতো চুম্বকের মতো। একই সঙ্গে ছিলেন শেখ মুজিবের পত্নী, প্রধানমন্ত্রীর বেগম, রাষ্ট্রপতির মহীয়সী ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার ব্যাপারে শ্যেন দৃষ্টি সম্পন্না এক মহিলা, নেতা মুজিবের defacto friend, philosopher and guide.
অচিরেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা ও ডায়েরির কাজ শেষ হলে আমরা এ সম্পর্কে আরও বহু কিছু জানতে পারব। আমরা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারব যে, তার দাম্পত্য জীবনে বেগম ফজিলাতুন্নেছার ন্যায় এমন ধীরস্থির প্রাজ্ঞ, সর্বংসহা বুদ্ধিদীপ্ত, দূরদর্শী ও স্বামী অন্তপ্রাণ মহিলার আর্বিভাব না হলে শেখ মুজিব বঙ্গশার্দুল, বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা বা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হতেন না কিংবা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌমের জš§ হতো না।
ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী : শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদের সভাপতি
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ নেতিবাচক রাজনীতি by মোঃ মাহমুদুর রহমান

মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের সীমা যাতে ২৬ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম না করে সে ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছে। সরকারের ঋণসীমার বিষয়ে কঠোরতা প্রদর্শন সব মহলে প্রশংসিত হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ সংকোচনের নীতিমালা সমালোচিত হয়েছে। গত বছর ব্যাংকিং সেক্টর থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.৩ শতাংশ, এবার তা ১৫.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্সসহ অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠন ও অর্থনীতিবিদরা ঘোষিত মুদ্রানীতির বেসরকারি খাতের ঋণ সংকোচনের নীতিমালার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এর ফলে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। তাত্ত্বিকভাবে তাদের বক্তব্য সঠিক হলেও বাস্তবতা ঘোষিত মুদ্রানীতিকে সমর্থন করে। বিগত মে মাসে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৩ শতাংশ, যেখানে মুদ্রানীতিতে তা বাড়িয়ে ডিসেম্বরে ১৫.৫ শতাংশ এবং আগামী জুন-২০১৪ সালে ১৬.৫ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কম হলেও এ বছরের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলে ঋণ সংকোচন নয়, বরং বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বর্তমান বছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজমান থাকায় প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। ফলে চলতি বছরের মে মাসে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশ ছিল। আগামী ৬ মাসে রাজনৈতিক অবস্থা বিগত দিনের চেয়ে আরও খারাপ হওয়ার আশংকা রয়েছে বিধায় মুদ্রানীতিতে উল্লিখিত লক্ষ্যমাত্রা বেশি যৌক্তিক। প্রকৃত ব্যবসায়ী বা শিল্পোদ্যোক্তারা এ মুহূর্তে রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী নন। এখন যদি ব্যাংক অতিরিক্ত ঋণ দিতে যায়, তাহলে তা ভুল মানুষের হাতে পড়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ না হয়ে ভিন্ন খাতে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যেমন কষ্টকর হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে তা খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকবে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো অবস্থায়ই তার অধীনস্থ ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে না বিধায় ঘোষিত মুদ্রানীতি বেশি যৌক্তিক।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই যৌক্তিকতা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা কি অর্জিত হবে? প্রথমেই বলতে হয়, যে ভিত্তি বছরগুলো হিসাবে নিয়ে মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয়, তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণত কোনো স্থিতিশীল অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরা হয়। এক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। ১৯৯৫-৯৬ সাল ছিল ওই সময়ের সরকারের শেষ বছর, একইভাবে ২০০৫-০৬ সালও ছিল একটি সরকারের শেষ বছর এবং আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী তা দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় অস্থিতিশীলই ছিল। এই মৌলিক দুর্বলতাকে অগ্রাহ্য করলেও বিভিন্ন কারণে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। প্রথমত, নির্বাচনের বছর আমাদের দেশে অর্থের প্রবাহ বেশি থাকে। উচ্চবিত্তের হাত থেকে টাকা প্রবাহিত হয় প্রান্তিক আয়ের মানুষের দিকে, যা আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির একটি নেতিবাচক দিক। প্রান্তিক আয়ের মানুষের সঞ্চয়ের সুযোগ না থাকায় সব টাকাই সাধারণ ভোগ ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা কোনো অবস্থায়ই সম্ভব হয় না। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী মাসে বিশ্বে কৃষিজ খাদ্যশস্যের বাম্পার ফলনের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পূর্বাভাসও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে প্রভাবিত করেছে। ফলে জুন মাসের ৭.৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি থেকে ডিসেম্বরে শতাংশে নামিয়ে আনার চিন্তা করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো কিছুর দাম বাড়লে দেশীয় বাজারে এর প্রভাব পড়ে দ্রুততার সঙ্গে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হ্রাস পেলে সেটা আর দেশীয় বাজারে সমন্বয় করা হয় না বললেই চলে। তাই এই পূর্বাভাস আমাদের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না। সরকারি-বেসরকারি খাতে সম্ভাব্য বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কারণে চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্তরের ওপর চাপ, হরতাল-অবরোধের কারণে পণ্য সরবরাহে বিঘœজনিত কৃত্রিম মূল্যস্তর বৃদ্ধি এবং আবহাওয়াজনিত কারণে কৃষি উৎপাদনের তারতম্যের বিষয়গুলো মুদ্রানীতি প্রণয়নে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী বছরে টাকার প্রবাহ বিবেচনা না করা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাম্পার ফলনের ওপর ভরসা করাই হচ্ছে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় দুর্বলতা। তবে সাধারণ মানুষ, যাদের প্রতিদিন বাজারে যেতে হয়, তাদের কাছে মূল্যস্তর নামিয়ে আনার পরিসংখ্যানকে গল্প মনে হয়। বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল তারা খুঁজে পায় না। জীবনযাত্রার ব্যয়ের বোঝা দিন দিন তাদের কাছে ভারি মনে হচ্ছে।
আমাদের সংগ্রামী মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা প্রবৃদ্ধির হারকে ৬-এর কাছাকাছি রাখতে সহযোগিতা করছে। সরকারি খাতের ভূমিকা এক্ষেত্রে খুবই কম। উল্টো আমাদের নেতিবাচক রাজনীতি বেশিরভাগ সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করে। রাজনীতিকদের আচরণ মানুষকে শংকিত করে তুলেছে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচন নিয়ে অচলাবস্থা এবং সংঘাতময় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আগাম বার্তা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করতে বাধ্য করেছে। এর ফলেই আজ বৈদেশিক মুদ্রার মাত্রাতিরিক্ত রিজার্ভ। তিন মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে যথেষ্ট, সেখানে বর্তমানে সাড়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধের মতো মজুদ বর্তমান। অব্যবহৃত মুদ্রার মজুদ অর্থনৈতিক স্থবিরতাই নির্দেশ করে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বিরাজ করছে। কারণ কোনো উদ্যোক্তা এই অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না। আর বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা প্রায়ই অতিরিক্ত সুদের কথা বলেন। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি সুদ দিতে হয় ঋণের বিপরীতে। কিন্তু কেন সুদ হার বেশি, তা বলা হয় না। ব্যাংকের ঋণযোগ্য তহবিলের পেছনে ব্যয় যখন বেশি হয়, তখন ঋণের বিপরীতে সুদ বেশি নিতে হয়। সোজা কথা, বেশি দামে জিনিস কিনলে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। আমানত সংগ্রহে অতিরিক্ত সুদ দিতে হয় মূলত অর্থনীতির আকারের চেয়ে বেশি ব্যাংক দেশে ক্রিয়াশীল থাকায় অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে। একই কারণে অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেশি হয়। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের কারণে সুদের হার বেশি নির্ধারণ করতে ব্যাংক বাধ্য হয়। আর ঋণ শ্রেণীকৃত হয় বা খেলাপি হয় ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিবেচনাবোধ সরকার ও ক্ষমতাশালীদের অবৈধ প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হলে। সাম্প্রতিক হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্র“পের কেলেংকারি বিষয়টিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন হবে।
মুদ্রানীতি প্রণয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাংক নির্বাচনী বাজারে টাকার ছড়াছড়ি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে না। দেশে অর্থনীতির আকার অনুযায়ী কয়টি ব্যাংক থাকবে সেটিও তারা ঠিক করে দিতে পারে না। ব্যাংক থেকে ঋণের নামে রাজনৈতিক লুটপাট বন্ধ করার ক্ষমতাও বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমিত। তাই ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে অতিরিক্ত ব্যয় বজায় রেখে ঋণের সুদ হার বিচ্ছিন্নভাবে কমানো বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ ছাড়া সংঘাতময় রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগকারীদের আস্থাশীল করাও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ নয়। এসব আমাদের রাজনীতিকদের কাজ। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সরকারি নীতি ও নেতিবাচক দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় রাজনীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, তা মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ঈদ বাজারের অর্থনীতি by ড. আর এম দেবনাথ

গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম দেশের বাড়িতে। দেখলাম যেখানেই বাস স্টপেজ, সেখানেই একটা বাজার। ফলমূলের দোকান আছে, চা-বিস্কুটের দোকান আছে। জামাকাপড়, জুতা, শাকসবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের দোকান। চারদিকে শুধু দোকান আর দোকান। কটিয়াদী কিশোরগঞ্জের একটা বড় বাজার। এটি পাটের বাজারের জন্য বিখ্যাত। দেখলাম শুধু দোকান আর দোকান। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এসব দোকানে বিক্রি কী রকম? ও বলল, কী বলেন, একদরের দোকানও আছে! কোনো দোকানে বাজারের দিনে ঢোকার ব্যবস্থা নেই। আর এখন তো রোজার মাস, সামনে ঈদ। দোকানে দোকানে শুধু পণ্য আর পণ্য। চারদিক থেকে ট্রাক আসছে, লরি আসছে। ঢাকা থেকে, ভৈরব থেকে, ময়মনসিংহ থেকে পণ্য আসছে। ক্রেতার কোনো অভাব নেই। ঢাকার মতো এখানেও জৌলুসপূর্ণ বাড়ি আছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আছে। এসব শুনি আর শুনি- মাথায় গরিব মানুষের কথা। তাদের অবস্থা কী? তারা কি এই বাজারের অংশীদার? মনে হয় না। তাতে কী, যারা পারে তারা বাজার করবে না কেন? এসব ভাবি আর ভাবি, আর মনে প্রশ্ন জাগে, রোজার ঈদ উপলক্ষে দেশে মোট কত টাকার বিকিকিনি হয়? কেমন হয় অর্থনীতি ও ব্যবসার অবস্থা?
প্রকৃতপক্ষে রোজার ঈদে কত টাকার বেচাকেনা হয় এবং তা কোন কোন খাতে, তার হিসাব করা খুবই কঠিন। আমি তো নস্যি, বড় বড় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীও এর হিসাব দিতে পারবেন না। পারবে না কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানও। তবে একটা আলোচনা হতে পারে। রোজার ঈদে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় জামাকাপড়ের। শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, প্যান্ট, শার্ট, জুতা, স্যান্ডেল ইত্যাদিই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এই ঈদে। অলঙ্কার, কসমেটিকস, খাবার জিনিসপত্র ইত্যাদির বেচাকেনাও কম হয় না। এ উপলক্ষে শহরে যেমন বেচাকেনা হয়, তেমনি আজকাল সমানতালে গ্রামেও বেচাকেনা বেড়ে যায়। কী করে এসবের হিসাব করা যায়? আমার কাছে কোনো পদ্ধতি নেই। তবে খবরের কাগজে বাবুরহাটের একটা খবর দেখলাম। এটি ঢাকার কাছে, নরসিংদীর আরও কাছে। পুরনো বিখ্যাত বাজার। শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, থান কাপড়, পর্দা ও সোফার অঢেল সরবরাহ এই বাজারে। বস্তুত বাংলাদেশের অন্যতম বড় কাপড়ের বাজার। সারাদেশের লোক, বাজারিরা এখানে আসে প্রতি সপ্তাহে। সপ্তাহের তিন দিন হাট হয়- শুক্র, শনি ও রোববার। এখন অবশ্য তিন দিন নয়, এখন বাজার সাত দিনই। দিন-রাত। এ জায়গাটি এখন বাসে-গাড়িতে ক্রস করা এক অসম্ভব ব্যাপার। এই বাজারে এখন সপ্তাহে কত টাকার পণ্য বিক্রি হয়? কাগজের খবর থেকে বুঝলাম, সপ্তাহে এখন এখানে কমপক্ষে তিন-চার হাজার কোটি টাকার শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদি বিক্রি হয়। ভাবা যায়?
উত্তরবঙ্গের পাবনার দিকেও আরেকটি শাড়ি-লুঙ্গির বাজার আছে। আমার ধারণা, ওই বাজারের লেনদেন এত বেশি হবে না। তারপরও অনুমান করা যায়, সেখানেও সপ্তাহে হাজার দুয়েক কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। দুই বাজার মিলে সপ্তাহে যদি পাঁচ হাজার কোটি টাকারও কম হয়, তাহলে রোজার মাসে কম করে হলেও হাজার দশেক কোটি টাকার শুধু শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রি হয়। কী বিশাল বাণিজ্য ভাবা যায়! বলা দরকার, এই দুটি বাজার গ্রামাঞ্চলের লোকদের জন্য। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর জন্য। শহরবাসীর- ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী নগরীর লোকদের চাহিদা ওই বাজার দুটি মেটায় না। শহুরে মধ্যবিত্তের বাজার চাহিদা ভিন্ন এবং তাদের জামাকাপড় ভিন্ন ধরনের। তাদের ক্রয় তালিকাও ভিন্ন ধরনের। অবশ্যই এগুলো ‘হাই ভ্যালু গুডস’। যদিও এক্ষেত্রে গ্রামবাসীর তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা কম, কিন্তু বাজার মূল্যে এদের জন্য ক্রয়-বিক্রয় হবে অনেক অনেক বেশি। কত তা অনুমান করা কঠিন। জামাকাপড়, জুতা, শাড়ি-লুঙ্গি, শার্ট, কসমেটিকস, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, সেলফোন ইত্যাদি ছাড়াও ঈদের বাজারে অন্য অনেক পণ্য আছে। অবশ্যই এই মাসে বিশাল বাণিজ্য হয় ভোগ্যপণ্যের। তেল, সয়াবিন, চিনি, ছোলা, পিঁয়াজ, রসুন, মসলা ইত্যাদির বেচাকেনা এ মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে দ্বিগুণ। এই মাসে সবাই একটু ভালো খেতে চায়, যে পারে না সেও চেষ্টা করে। ধনীরা তো করেই। রোজার মাসে ভোগের মাত্রা অনেক বেশি। সরবরাহ ঠিক রাখা যায় না বলেই কিন্তু জিনিসপত্রের দাম এ মাসে বাড়ে। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের অনেক ক্ষেত্রেই মিসম্যাচ হয়। আবার রয়েছে দোকানদারদের কারসাজি। এই মাসে ফলের চাহিদা, শাকসবজির চাহিদাও বাড়ে। মাছ-মাংসের চাহিদাও বেশি। অর্থাৎ রোজার মাস ও ঈদ উপলক্ষে কাঁচাবাজার, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম, তেল, মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, ছোলা, খেজুর ইত্যাদি ভোগ্যপণ্যের বেচাকেনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয়, এ মাসের বেচাকেনাতেই ব্যবসায়ীরা যা করার তা করে ফেলেন। প্রকৃতপক্ষে বছরের ব্যবসা এ মাসেই হয়। বাকি ১১ মাস দোকানদাররা অল্প-স্বল্প লাভ করে, দোকানের দৈনন্দিন খরচা, কর্মচারীর খরচা তোলে। এটা রোজার মাসে ঈদ উপলক্ষে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক দেখেও বোঝা যায়। শত শত কোটি টাকা এ মাসে উত্তোলন করা হয়। ব্যাংকের আমানত কমে যায়। অনেক ব্যাংক এ সময়ে ‘ক্যাশ’ ঘাটতিতে পড়ে।
ঈদ উপলক্ষে একটা বড় ব্যাপার ঘটে অর্থনীতিতে, ব্যবস্থাতে। প্রচুর ‘ক্যাশ’ যায় গ্রামাঞ্চলে। এমনিতেই আজকাল গ্রামাঞ্চলে অনেক ‘ক্যাশ’ যায়। ব্যাংকিং খাতের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ‘ক্যাশ’ ঢাকায়। ব্যাংক-আমানতেরও তাই। ঢাকায় আগে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ফরিদপুরের লোকই ছিল বেশিÑ বিশেষ করে দোকানদার, রিকশাওয়ালা ও চাকরিজীবীদের মধ্যে। এখন এই অবস্থা নেই। ঢাকায় এখন উত্তরবঙ্গের প্রচুর কর্মজীবী ও রিকশাওয়ালা আছে। রিকশাওয়ালা, কাজের বুয়া এখন বৃহত্তর ময়মনসিংহেরও আছে। এটা আগে ছিল না। এ কারণে সারা বছরই গ্রামে ঢাকা থেকে ‘রেমিট্যান্স’ যায়। এর পরিমাণ অনেক। এর ফলও গ্রামে এখন অনুভূত হয়। এখন একজন স্বাস্থ্যবান রিকশাওয়ালাও গ্রামে গিয়ে সুদের ব্যবসা করে। জমি বন্ধক দেয়। গ্রামের চিত্র এভাবে বদলাচ্ছে। ‘রেমিট্যান্স’ বা নগদ টাকা শুধু ঢাকা থেকে নয়, আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। এই মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণও বেড়ে যায়। কত এর পরিমাণ? ২০১২-১৩ অর্থবছরের সাত মাসে সারাদেশে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসে ৭০,৭৮৪ কোটি টাকা। সাত মাসের হিসাবের ভিত্তিতে হিসাব করলে মাসে হয় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এটা সরকারি হিসাবে। আমরা জানি, অবৈধ পথে প্রায় সমপরিমাণ টাকা দেশে আসে। অর্থাৎ মাসে আসে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। যদি এর পরিমাণ কাটছাঁট করে ১৫ হাজার কোটি টাকাও ধরে নিই, তাহলেও ঈদ ও রোজার মাস উপলক্ষে দেশে আসবে আরও বেশি টাকা। কারণ এ মাসে সবাই বাবা-মা, ভাইবোন, চাচা-ভাতিজা, শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য বেশি টাকা দেশে পাঠায়। তাহলে ভাবুন, এই মাসে গ্রামাঞ্চলে কত টাকা ‘ক্যাশ’ হিসাবে প্রবাহিত হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে একটা কথা আছে। যে টাকা আসে, তার একটা অংশ যায় ঋণ পরিশোধে। কিছু যায় জমি ক্রয়ে। বাকি টাকা অবশ্যই ভোগে। যেভাবেই যাক না কেন, গ্রামাঞ্চলে রোজার মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাশ’ প্রবাহিত হয়। তারপর রয়েছে আরেক উৎস। ঈদ উপলক্ষে লাখ লাখ ঢাকাবাসী, মূলত মধ্যবিত্ত ঢাকাবাসী গ্রামমুখী হয়। তারা সাধারণত বছরে একবারই গ্রামে যায়। তারাও প্রচুর ক্যাশের উৎস। এ মাসে পরিবহন ও পর্যটন ব্যবসাও জমজমাট হয়। সব মিলিয়ে এ এক বিশাল বাণিজ্য। সারাদেশের সার্বিক অর্থনীতির একটা বড় ‘ইভেন্টে’ পরিণত হয়েছে রোজার মাস ও ঈদ। এছাড়া রয়েছে ধনাঢ্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধিদের দানমূলক কর্মকাণ্ড। রয়েছে সরকারের দান কর্মকাণ্ড। বলা যায়, সারা বছরের লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বেচাকেনা হয় এ মাসেই। অতএব এ ধরনের উৎসব যত বেশি হবে, তত টাকা যাবে গ্রামে।
ড. আর এম দেবনাথ : সাবেক প্রফেসর, বিআইবিএম
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1266)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ▼ 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...