Saturday, January 24, 2026

আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন কীভাবে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে? by আবুল কালাম আজাদ

বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়াই চলছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি।

২০১৪ সাল থেকে একাধারে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর আবারো সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আসন্ন নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পর পর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যে ২০১৪ আর ২০২৪ সালে বিএনপি ও জামায়াত অংশ না নেয়ায় একতরফা নির্বাচন হয়েছে।

আর আঠারো সালের নির্বাচনকে সমালোচকেরা বলে থাকেন রাতের ভোট। আসন্ন নির্বাচনও সব দলের অংশগ্রহণে হচ্ছে না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেনা ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের শরিক মিত্র দলগুলোর কয়েকটি।

এই নির্বাচনে মূলত অংশ নিচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি বিশেষ করে ২০১৪ এবং ২৪ সালের ভোটে অংশ না নেয়া আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত।

ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও বাতিল করে দিয়েছে।

এ অবস্থায় দলটি ভোটে অংশ নিতে না পারলেও বিতর্কের কিছু নেই বলে মনে করে আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের দৃষ্টিতে এই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক হবে।

দুই জোটের অবস্থান

ছাব্বিশের নির্বাচনটিও ভবিষ্যতে কারো কারো কাছে একতরফা হিসেবে মূল্যায়ন হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা দুই জোটের নেতারা মনে করেন, সর্বস্তরের ভোটার, বৈধ দল ও প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, ভোটার উপস্থিতির মাধ্যমেই আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা বুঝি ভোটারদের অংশগ্রহণ। পার্টিকুলার কোনো দলের নয়।

"নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হয় একটা আইনের ভিত্তিতে। দেশে ইলেকশন কমিশন আছে, একটা নির্বাচনী আইন আছে সাংবিধানিক একটা বিধি আছে। আপনারা দেখবেন সেই আইনের ভিত্তিতে যারা যারা যোগ্য হবেন, আইনের মধ্যে যারা থাকবেন- তারা ইলেকশন করবেন, দ্যাট ইজ কল পার্টিসিপেটরি, দ্যাট ইজ কল ইনক্লুসিভ।

"নির্বাচনে যোগ্য লোকদেরকে নির্বাচন করতে না দিলেই সেটা হবে অংশগ্রহনহীন ইলেকশন" বলেন জামায়াত নেতা মি. পরওয়ার।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এবার অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রশ্নে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।

তার যুক্তি, বর্তমানে দেশের নিবন্ধিত সব দলই ভোটে অংশ নিচ্ছে, তাই এটি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন।

"ইনক্লুসিভ ইলেকশন মানেই হচ্ছে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন। বিকজ আওয়ামী লীগ কোনো পলিটিক্যাল পার্টি না। তারা একটা মাফিয়া গোষ্ঠী, তারা রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়েছে, তারা এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে, জনরায় হয়েছে।

"গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে তারা এদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চায় না। ইনক্লুসিভ মানে যারা এখন রাজনীতিতে রেজিস্ট্রার্ড আছে, ইলেকশন কমিশনের সাথে নিবন্ধন আছে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে"।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলছেন, "যদি দুএকটা ছোট খাট দল ইলেকশনে অংশগ্রহণ না করে থাকে, সেটা সবসময় হয়ে থাকে তাতে কিছু যায় আসে না। নির্বাচনের ইনক্লুসিভ চরিত্র থাকবে গ্রহণযোগ্য হবে বিশ্বাসযোগ্য হবে।"

জাতীয় পার্টির ভিন্ন অবস্থান

বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রধান জোট আসন্ন নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছে। আওয়ামী লীগ না থাকায় এই দুই জোটের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

দুই জোট মনে করছে, ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। তবে তাদের এই প্রত্যাশা পূরণ হবে কিনা- সেটি নিয়ে সন্দেহ এবং আশঙ্কার কথা শোনা যায় জাতীয় পার্টির অবস্থান থেকে ।

দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আনকন্ট্রোলড আনচেকড একটা ইলেকশনের দিকে বাংলাদেশ যাচ্ছে এবং ভোটের দিনে এখানে স্থানীয় মব, স্থানীয় শক্তি, স্থানীয়ভাবে যারা হোল্ড রাখে, তারা যা চাইবে তাই হবে।

"বাধা দেয়ার মতো কোনো শক্তি এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পারছি না। এই যে বল্গাহীন, বাধা না দেয়ার ক্ষমতা ছাড়া একটা ভোট হচ্ছে সেটারতো বিকল্প আরো অনেক কিছু হওয়া উচিত ছিল। জাতীয় পাটি জামাতের নিষিদ্ধের সময় প্রতিবাদ করেছিল, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সময়ও প্রতিবাদ করেছে" বলেন মি.পাটোয়ারী।

অতীতে আওয়ামী লীগের জোটের সঙ্গে থাকা জাতীয় পার্টি এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা আওয়ামী লীগকে কোনো পলিটিক্যাল সলিউশন দেয়নি। আবার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ঘটনাও কিন্তু বিএনপি- জামায়াতকে কোনো পলিটিক্যাল সলিউশন দিল না।

"ইনক্লুসিভ ভোট ছাড়া ফুল ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন হবে না। পরের ভোটে গিয়ে হয়তো আমরা একটা ফুল ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের দিকে যেতে পারি। সেদিকে যেতে গেলে আগেতো একটা সেমি ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন লাগবে। আমি মনে করি সেদিক থেকে এবারের ভোটে অনেক সমস্যার সমাধান হবে" বলেন মি. পাটোয়ারী।

মি. পাটোয়ারীর কথায়, ভোট না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

"এই ইলেকশনটা কিন্তু একটা ট্রানজিশন, একটা সেমি ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন। আওয়ামী লীগেরও কিন্তু একটা ট্রানজিশন প্রয়োজন। সকলেরই কিন্তু একটা শিফট প্রয়োজন। ভোট না হলে বর্তমান সরাকার দেশ চালাতে পারবে না।"

অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনী রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রকৃত অংশগ্রহনমূলক যেটাকে আমরা বুঝি যে সকল রাজনৈতিক দল মত সবার অংশগ্রহন সেটা এবার আসলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

"সামনে এটা হয়তো পরের নির্বাচনে হলেও হতে পারে যদি আওয়ামী লীগ তার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করে পর্যালোচনা করে এবং বিচারগুলো যদি হয়ে যায়, তারপরে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই একভাবে আসতে পারে।

"এখন ওই আংশিকভাবেই নির্বাচন করতে হবে। তারপরেও নির্বাচন কতটা ঠিকঠাক হয় সেটাও এখন উদ্বেগের বিষয়" বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব

অতীতে নির্বাচনগুলোর বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এই দুই দলেরই ভোটার সবচেয়ে বেশি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও দলটির সমর্থক ভোটাররা রয়েছেন; তাদের ভোট জয় পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের কর্মী সমর্থকদের ভোটদানে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। সেটি ভোটার উপস্থিতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে, সেটি নিয়ে দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।

বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটার উপস্থিতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না।

"এদেশের মানুষ এবং নতুন প্রজন্ম যারা নতুন ভোটার হয়েছে, যাদের বয়স আঠারো থেকে ত্রিশ পঁয়ত্রিশের মধ্যে তারা স্বাধীনভাবে মুক্ত পরিবেশে ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, উদগ্রীব হয়ে আছে, এই ভোটারকে কেউ থামাতে পারবে না।

"আর এখানে একটা ক্ষুদ্র অংশ যদি নিজেরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না চায় বা ভোট দিতে না চায়, সেই স্বাধীনতাতো তাদের আছে। তবে আমি মনে করি না যে, তাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি হবে" বলেন বিএনপি নেতা মি.আহমদ।

জামায়াত জোটের পক্ষ থেকেও মনে করা হয় যে, ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।

তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলছেন, আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, সেটি ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে।

"যদি আওয়ামী লীগ অলটুগেদার ভোট বর্জন করে, তাহলে কিন্তু কাস্টিংটা অবৈধভাবে করতে হবে। এবং সেটাকে কেউ লুকাতে পারবে না। বাংলাদেশে ৪২ হাজার সেন্টারে ভোট হবে, সেখানে অবৈধ কাস্টিংগুলো একসময় ন্যাকেড হয়ে যাবে এবং ভোটটা তখন প্রশ্নবিদ্ধ হবে"।

শামীম পাটোয়ারি এ-ও বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসুক, এটা আমরা সবাই চাচ্ছি এবং কী করলে আসবে- সেটা সবাইকে একটা সমঝোতাও করতে হবে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এবার ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পড়লে প্রশ্ন উঠতে পারে।

আনু মুহাম্মদের ভাষায়, "ফিফটি পার্সেন্টের বেশি ভোট না হলেতো সেটা গ্রহণযোগ্য হয় না। আর এতদিন পরে নির্বাচন হচ্ছে এটাতো আরো বেশি হবার কথা। সেটা যদি না হয় সেটা একটা ব্যর্থতা হবে।

"এখন এটা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশন কতটা আস্থার অবস্থা তৈরি করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার কতটা আন্তরিকতার সাথে নির্বাচনে যায়। এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে এটা স্পষ্ট করতে হবে যে, তারা কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও এটা একটা পরীক্ষা" বলেন আনু মুহাম্মদ।

আসন্ন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে- এমন বিশ্লেষণ আছে। প্রথমত ভোটার উপস্থিতি, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তা ও ভোটের পরিবেশ, যা শান্তিপূর্ণ অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে। এখানেও দুশ্চিন্তা দিক রয়েছে বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ।

"জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু যারা তাদের মধ্যে আগের বিভিন্ন নির্বাচনে আমরা দেখছি যে, তাদের মধ্যে একটা আতঙ্কের অবস্থা তৈরি করা হয়, যাতে নির্বাচনে তারা ভোট দিতে না যায়।

"তাদের নির্বাচনে যাওয়া এবং না যাওয়া- দুই দিক থেকে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সেই জায়গাটাতো নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা আসে কারণ তারা একটা বড় অংশ।"

সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের মধ্যেও আতঙ্ক আছে বলে বলছেন আনু মুহাম্মদ

"এখন মাজার আক্রান্ত হচ্ছে, বাউলরা আক্রান্ত হচ্ছে- এদের সাথেতো বিশাল জনগোষ্ঠী। এখন তারা যদি দেখে যে, আমরা একটা সহিংসতার মধ্যে পড়বো বা যারা এখানে নির্বাচন করছে বা দাপটের সাথে চলাফেরা করছে তারা আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে, তাহলেও ভোটসংখ্যা অনেক কমে যাবে।"

গণঅভ্যুত্থানে পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের
গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের

রুবিও, ব্লেয়ার, কুশনারের নাম ঘোষণা: ট্রাম্পের গঠন করা শান্তি পর্ষদ কি কোনো ‘ঔপনিবেশিক কাঠামো’

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে অন্তর্ভুক্ত করে গাজা তদারকি পর্ষদের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছে হোয়াইট হাউস। তবে অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের গঠন করা কথিত এ ‘শান্তি পর্ষদ’কে (বোর্ড অব পিস) ঔপনিবেশিক কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী গঠিত বোর্ড অব পিস ফিলিস্তিনের গাজার অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা তদারকি করবে। গত অক্টোবর মাস থেকে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা চলছে।

গতকাল শুক্রবার পর্ষদের সদস্যদের নাম জানানো হয়। এতে ব্লেয়ার ও কুশনার ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। গত বছরের শেষের দিকে ট্রাম্পের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি নিজেই এ পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে থাকছেন।

অক্টোবরে বিবদমান দুই পক্ষ ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট বডি বা বিশেষজ্ঞ দল থাকবে। আর এ দলের কর্মকাণ্ড তদারকি করবে আন্তর্জাতিক শান্তি পর্ষদ বা ‘বোর্ড অব পিস’। এ ব্যবস্থা একটি অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য কার্যকর থাকবে।

হোয়াইট হাউস জানায়, পর্ষদে আরও রয়েছেন প্রাইভেট ইকুইটি এক্সিকিউটিভ ও ধনকুবের মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা ও ট্রাম্পের উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল। এ ছাড়া জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ গাজায় হাই-রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে সদস্যদের কার কী সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব হবে, তা হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি।

তবে অনেক অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞ ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিদেশের ভূখণ্ড তদারকির এ ব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। অন্যদিকে ইরাক যুদ্ধে ভূমিকার কারণে গত বছর থেকেই পর্ষদে টনি ব্লেয়ারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমালোচনা চলছে।

এ পর্ষদের অধীন গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রথমে গাজাবাসীর জন্য জরুরি ত্রাণের ব্যবস্থা করবে বলে জানান প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রধান আলী শায়াথ। ওয়েস্ট ব্যাংক রেডিও স্টেশন নামের একটি সম্প্রচারমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, গাজা পুনর্গঠনে তিন বছরের বেশি লাগবে না। যদিও জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপত্যকাটিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোগুলো নতুন করে গড়ে তুলতে অন্তত ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।

হোয়াইট হাউস আরও বলেছে, সাবেক মার্কিন স্পেশাল অপারেশন কমান্ডার মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফার্সকে গাজায় ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’-এর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত নভেম্বরের মাঝামাঝি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত এক প্রস্তাবে ইসরায়েলি আগ্রাসনে বিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে এই বাহিনী গঠনের জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হয়।

এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েল ও হামাস একে অপরকে দোষারোপ করছে। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১০০ শিশুসহ ৪৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি এবং ৩ ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি তাণ্ডবে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষ-শিশু নিহত হয়েছে। দেখা দিয়েছে চরম খাদ্যসংকট। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে গাজার পুরো জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘের তদন্ত কমিটিসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইসরায়েলের দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫০ জনের বেশি জিম্মি হওয়ার ঘটনার পর তারা আত্মরক্ষার্থেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-17%2Fhtkf4077%2FTrump-3.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। পেছনে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দৃশ্য দেখা যায়। মার-আ-লাগো ক্লাব, পাম বিচ, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি রিপোর্ট বেশ চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবার ‘ইউ.এস. সিকস টু বি ‘ফ্রেন্ডস’ উইথ বাংলাদেশ’স ওয়ান্স-ব্যান্ড ইসলামিস্ট পার্টি’ শিরোনামে এক দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী এই গণমাধ্যম। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জনের পথে রয়েছে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল। এই পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পরিকল্পনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা। এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড হাতে পেয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে জামায়াত শরিয়া আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা এবং নারীদের সন্তান লালন পালনে সহায়তার জন্য তাদের কর্মঘণ্টা কমানোর পক্ষে কথা বলেছে। তবে দলটি সম্প্রতি জনসমক্ষে নিজেদের ভাবমূর্তি নরম করার এবং জনসমর্থনের ভিত্তি বৃদ্ধির চেষ্টা হিসেবে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দুর্নীতি নির্মূলের বিষয়টি উপস্থাপন করছে।

পরিবর্তিত এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামপন্থি এই দলটির সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকরা। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা অডিও রেকর্ড অনুযায়ী, গত ১লা ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, দেশটিতে এখন ইসলামী ভাবধারা বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফলাফল করবে বলেও মনে করেন ওই কূটনীতিক।

অডিও রেকর্ডে ওই কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই। এ সময় তিনি কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, তারা তাদের টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে দলটির প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানাতে আগ্রহী কিনা। তিনি প্রশ্ন করেন, আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের টকশো-তে যাবে?

নিরাপত্তার কথা জানিয়ে ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী শরিয়া আইন চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে- এমন আশঙ্কাকে মার্কিন কূটনীতিক খুব একটা গুরুত্ব দেননি। তিনি জানান, ওয়াশিংটনের হাতে এমন কিছু প্রভাব খাটানোর হাতিয়ার রয়েছে যা তারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। ওই কূটনীতিক বলেন, আমি বিশ্বাস করি না যে, জামায়াত শরিয়া আইন চাপিয়ে দিতে পারবে। তিনি উল্লেখ করেন, দলটির নেতারা যদি উদ্বেগজনক কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর শতভাগ ট্যারিফ বা বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করবে।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনাটি ছিল মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে একটি রুটিনমাফিক অফ-দ্য-রেকর্ড বৈঠক। তিনি আরও যোগ করেন, বৈঠকে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না। বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারকেই নির্বাচিত করবে, যুক্তরাষ্ট্রের তাদের সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ওই বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি জামায়েতের যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান। তিনি জানান, ব্যক্তিগত কোনো কূটনৈতিক বৈঠকে করা মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে আমাদের তরফে কোনো মন্তব্য করার সিদ্ধান্ত নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কূটনীতিকরা বাংলাদেশের সংকটকালীন ও রূপান্তরকালীন এই সময়ে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন- সে বিষয়টি এতদিন অপ্রকাশিত থাকা এসব মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট। হাসিনার পতনের পর দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে এসেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া অভ্যুত্থানের পর দেশে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তা কয়েক দশকের অস্থিরতার পর বাংলাদেশের জন্য একটি চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

এদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাত নিয়ে মতবিরোধ এবং রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি, ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্য চুক্তি ঝুলে থাকার ফলে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক এমনিতেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই আবহে জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই সখ্য ভারতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি বলেন, জামায়েত বহু বছর ধরেই বাংলাদেশে ভারতের উদ্বেগের বিষয়। দলটিকে দিল্লি পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে। এ ছাড়া ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে। যদিও মনিকা শাই জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

মূলধারার রাজনীতিতে জামায়াতের প্রবেশ:
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করা বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল এক চরম অস্থিরতার মধ্যদিয়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েক দশকে ঢাকাকে বহু সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র এবং সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর উত্তাল বেসামরিক শাসন প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। দেশটিকে তার বৃহৎ প্রতিবেশী- ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়েছে। এরমধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে প্রায় ২৫০০ মাইল। বর্তমানে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে। ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল হাসিনা। গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে বর্তমানে তিনি দিল্লির অজ্ঞাত স্থানে আশ্রয়ে আছেন। গত নভেম্বরে তাকে অভ্যুত্থানে ১৪০০ মানুষ হত্যায় আদেশ দেয়ার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। অন্তর্বর্তী সরকারে তরফে বারবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হলেও তাতে এখনো সাড়া দেয়নি ভারত সরকার।
ডিসেম্বরের সেই বৈঠকে জনৈক মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন, হাসিনার দণ্ডাদেশ ছিল একটি রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার বহিঃপ্রকাশ। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ট্রাইব্যুনাল অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না, কিন্তু তিনি দোষী এবং তারা সেটি প্রমাণ করেছে। নিজেদের এখতিয়ারের মধ্য থেকেই তারা এটি করেছে, যা বেশ চিত্তাকর্ষক।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশকে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের (ট্রানজিশন) জন্য প্রস্তুত করতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে সরকার গঠনের পর ড. ইউনূস বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি পরিবার। আমাদের এটিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আসন্ন নির্বাচন অবাধ হবে এবং তা সঠিক সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। তিনি উল্লেখ করেন, কে কী বললো তাতে কিছু যায় আসে না, নির্বাচন ১২ই ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবেÑ একদিন আগেও নয়, একদিন পরেও নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বেশ শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। হাসিনা সরকারের আমলে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হওয়ার পর, নির্বাচনী প্রচারণায় দলটি নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং বাংলাদেশের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মুবাশার হাসানের মতে, জামায়াত এখন একটি মূলধারার রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক জামায়াতের মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান জানান, তার দল দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন- এই চার মূলনীতিকে সামনে রেখে প্রচারণা চালাচ্ছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও যোগ করেন, জামায়েতের শরিয়া আইন কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
আসন্ন এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলো বিএনপি। লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যদি তার দল নির্বাচনে জয়লাভ করে তবে তিনিই হতে পারেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি’র কৌশল সম্পর্কে অবগত এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির মতে, তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলাফল করবে। তবে দলটির সঙ্গে বিএনপি’র জোট করার কোনো পরিকল্পনা তার নেই।
জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তিনি বিএনপি’র সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। গত জানুয়ারি মাসে রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে আমরা একসঙ্গেই সরকার পরিচালনা করবো। উল্লেখ্য, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ছিল জামায়াত।

ওয়াশিংটন পোস্টকে জামায়াতের ওই মুখপাত্র জানান, ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চারটি এবং ঢাকায় বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে জামায়াত। এ ছাড়া, গত শুক্রবার দলটির শীর্ষ নেতা মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গেও একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকেও অংশ নেন।

ওয়াশিংটনের বৈঠকগুলো নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হওয়া বৈঠকগুলোকে তারা নিয়মিত কূটনৈতিক কাজের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে, ইউএসটিআর (মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর) এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
মোহাম্মদ রহমান ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, গত আগস্টে জামায়াত আমীরের ওপেন হার্ট সার্জারি পরবর্তী সময় ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ঢাকার বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে আয়োজিত এক সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি ভবিষ্যতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও দূতাবাসের কর্মকর্তারা যোগাযোগ শুরু করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক আরও বলেন, আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই, যাতে আমরা যেকোনো প্রয়োজনে ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলতে পারিÑ আপনারা এইমাত্র যা বললেন, তার সম্ভাব্য পরিণতি কিন্তু এমন হতে যাচ্ছে।
ওই কূটনীতিক জোর দিয়ে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী যদি ক্ষমতায় আসে এবং এমন কোনো নীতি বাস্তবায়ন করে যা ওয়াশিংটনের কাছে চরমভাবে অগ্রহণযোগ্য বা সাংঘর্ষিক, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিশাল পোশাক শিল্পের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ওই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া মোট রপ্তানির ২০ শতাংশই মূলত সামাজিক ও উদারপন্থি বিভিন্ন পোশাক বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভরশীল। যদি বাংলাদেশ নারীদের মাত্র পাঁচ ঘণ্টা কাজ করার নিয়ম বেঁধে দেয়, অথবা তাদের কর্মক্ষেত্র থেকে বের করে দেয় অথবা শরিয়া আইন জারি করে, তাহলে দেশটিতে আর কোনো নতুন ক্রয়াদেশ (অর্ডার) আসবে না। আর যদি নতুন কোনো ক্রয়াদেশ না আসে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তবে জামায়াত এমন কিছু করবে না। কারণ দলটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা শিক্ষিত ও বিচক্ষণ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। যদি তারা কোনো ভুল পথে যায় তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তা আমরা তাদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরবো।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে নয়াদিল্লির উদ্বেগ প্রশমিত করার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারত ২০১৯ সালে নিজেদের অধীনে থাকা জম্মু-কাশ্মীরে জামায়াতে ইসলামীর শাখাকে ‘বেআইনি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ২০২৪ সালে আবারো সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে।
কুগেলম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক যদি আরও ভালো অবস্থায় থাকতো, তবে হয়তো নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ভারতের উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকানরা আরও বেশি আগ্রহী হতো। কিন্তু বর্তমানে এই অংশীদারিত্বে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা বিরাজ করায় কুগেলম্যান মনে করেন না যে, মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতীয় উদ্বেগের প্রতি খুব একটা মনোযোগী বা সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন।

mzamin

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনকে এক সুতায় বাঁধল কে by সাইমন টিসডাল

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—ভৌগোলিকভাবে একে অপরের থেকে বহুদূরের এই তিন অঞ্চল আজ একটি অদ্ভুত মিলের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই মিলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর লাগাতার মিথ্যাচার, নৈতিক শূন্যতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আর তার বিপরীতে ইউরোপীয় নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও দ্বিধা—এই তিন সংকটকে এক সুতায় বেঁধে ফেলেছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি’ করেছিলেন। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ২১টি মিথ্যা তিনি বলেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই অভ্যাসে কোনো ছেদ পড়েনি। প্রতিদিনই তিনি মার্কিন জনগণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে সত্য বিকৃত করছেন। মিনিয়াপোলিসে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার পর তাঁর ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এই অবজ্ঞা শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, গভীরভাবে অনৈতিক এবং বিপজ্জনক।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মতোই বিশ্বের বহু নেতা ট্রাম্পের এই দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এই মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার, চুপ করে থাকার বা এর বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা একটি সাধারণ, উত্তেজনা বাড়ানো উপাদান হিসেবে কাজ করছে।

গ্রিনল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ নাকি গ্রিনল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে আছে আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া দরকার। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় সেই জাহাজ? তিনি তো নিজেই ওই স্বশাসিত দ্বীপে গেছেন। গ্রিনল্যান্ডবাসী ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সরাসরি আজগুবি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

ডেনমার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, তারা গ্রিনল্যান্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং সেখানে চীনা বিনিয়োগের ‘স্রোত’ যাচ্ছে বলে ট্রাম্প যেসব কথা বলছেন, তা তাঁর বানানো গল্প। জনমত জরিপ বলছে, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ট্রাম্পের কাছে দ্বীপ বিক্রি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধী। তারা চায় স্বাধীনতা। যুক্তরাষ্ট্র রাজা তৃতীয় জর্জকে তাড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল। তারা এখন স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্‌যাপন করছে। ফলে তাদের তো বিষয়টি বোঝার কথা। ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান। বাস্তবে তিনি চান এর খনিজ সম্পদ এবং আমেরিকাকে আবার বড় করতে।

ভেনেজুয়েলায় পরিস্থিতি আরও রক্তাক্ত। গত সপ্তাহান্তের অভ্যুত্থানের আগে মিথ্যার এক ভয়াবহ স্রোত বয়ে যায়। ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দেশটির নেতা নিকোলা মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। এই অভিযোগ তুলে ট্রাম্পের প্রশাসন মাদক পাচারের সন্দেহে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ১০০ জনের বেশি মানুষকে নৌকায় হত্যা করে কোনো যাচাই–বাছাই ছাড়াই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধে আছে’ বলে ঘোষণা দেন এবং এর মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করেন।

আসলে, ২০১৮ সালে মাদুরো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা চলছে। ট্রাম্প এখন স্বীকারও করেছেন, এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য গণতন্ত্র ফেরানো নয়; যদিও দেরিতে হলেও তিনি বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা নয়, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই, নির্মমভাবে দেশটি লুট করছেন। সঙ্গে সঙ্গে মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকেও হুমকি দিচ্ছেন।

এবার ইউক্রেন। আরেকটি অচলাবস্থার মুখে পড়া ভূমি। এখানে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে না পারার অক্ষমতা ভয়াবহ ক্ষতি করছে। তিনি মিছেমিছি বলেছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার হুমকি দেন। আর পুতিন (আরেকজন পেশাদার মিথ্যাবাদী) ট্রাম্পকে সামান্য তোষামোদ করে আবার বোমাবর্ষণ শুরু করেন। প্রতিবারই ট্রাম্প পিছু হটেন, আর প্রায়ই দোষ চাপান ইউক্রেনের নির্দোষ নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যাচার ছাড়াও আরেকটি বিষয় স্পষ্ট। সেটি হলো ইউরোপীয় নেতাদের ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্বলতা ও বিভক্তি। এখন অন্তত ইউরোপের বোঝা উচিত—এই প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করা যায় না, তাঁর ওপর নির্ভর করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে ব্রেক্সিট আর শুধু ভুল সিদ্ধান্ত মনে হয় না; এটি প্রায় আত্মঘাতী বলে মনে হয়।

মার্ক টোয়েনের কথাকে একটু বদলে বললে বলা যায়, ‘মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, মারাত্মক মিথ্যা আর ডোনাল্ড ট্রাম্প।’

সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ান-এর পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-01%2F7ffc292e-3088-4db4-8c3b-3113f675422c%2FUkraine.jpg?rect=51%2C0%2C5298%2C3532&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। ফাইল ছবি: এএফপি

প্রচারের শুরুতেই উত্তাপ, বিএনপি-জামায়াত মুখোমুখি by সেলিম জাহিদ

প্রায় ১৭ বছর পর দেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ এক পরিবেশে এই ভোট যাত্রা শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। কিন্তু প্রচারের প্রথম দিন থেকেই প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পর আক্রণাত্মক বক্তব্য শুরু করেছে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে।

নির্বাচনী প্রচার শুরুর মাত্র দুদিন হলো। গতকাল শুক্রবার ও আগের দিন বৃহস্পতিবার—এ দুই দিনে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে যে স্পষ্টত ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো সামনের দিনগুলোতে পরস্পর আক্রমণের ধার আরও বাড়তে পরে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগেই আঁচ করা যাচ্ছিল যে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরবিরোধী শক্ত অবস্থানের দিকে যাবে। এখন পরিস্থিতি সেদিকেই গড়াচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপির দিক থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা, ধর্মের অপব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ ষড়যন্ত্র করার অভিযোগগুলো সামনে আনা হচ্ছে।

পাল্টাপাল্টি আক্রমণ

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত দুই দিনে রাজধানী ঢাকার ভাষানটেকসহ সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার মিলে আটটি জনসভায় বক্তৃতা করেন। আর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ঢাকার মিরপুরসহ উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও রংপুরে পাঁচটি জনসভায় বক্তব্য দেন। দুই নেতার বক্তব্যগুলো তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়।

তারেক রহমান জামায়াতের নাম উল্লেখ না করে ১৯৭১ সালে তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার সমালোচনা করেন এবং ধর্মকে ব্যবহার করে ‘বেহেশতের টিকিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে ‘শিরক’ ও ‘কুফরি’ বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, প্রতিপক্ষ দল সৎ মানুষের শাসনের কথা বলে নিজেরাই অসৎ কাজ করছে এবং ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে মানুষকে ঠকাচ্ছে। তিনি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পোস্টাল ব্যালট ছিনতাই এবং এনআইডি ও মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহের মাধ্যমে ভোট চুরির ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেন।

গতকাল শুক্রবার এই বাগ্‌যুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। খুলনায় নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনকে আখ্যা দেন ‘দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ’ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘আগে যুদ্ধ হতো তরবারি, তির-ধনুক ও কামান দিয়ে। এখন যুদ্ধ হচ্ছে ব্যালট দিয়ে।’ তারেক রহমানের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘কোনো মুসলমান আরেক মুসলমানকে কাফের বলতে পারেন না…তিনি এটা বড় অপরাধ করেছেন।’ আরও বলেন, ‘উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন…বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের।’

বিপরীতে জামায়াতের দিক থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে দলটির নেতাদের অতীত দুর্নীতি, নেতা–কর্মীদের অতীত–সাম্প্রতিক দখল–চাঁদাবাজি এবং তাঁদের ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’ হয়ে ওঠার অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।

এর সঙ্গে দুই পক্ষ থেকেই একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বসহকারে সামনে আনা হচ্ছে, সেটি হলো ‘বিদেশি আধিপত্য’। বিএনপির দিক থেকে জামায়াতকে লক্ষ্য করে পিন্ডি, অর্থাৎ পাকিস্তান। আর জামায়াতের দিক থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে দিল্লির আধিপত্যবাদ চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার ভোটের মাঠে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি নতুন এক মুখোমুখি লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ, বিদেশি আধিপত্য, ধর্মের ব্যবহার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’—এই কয়েকটি ইস্যু ঘিরে ভোটের মাঠে শুরু হয়েছে দুই পক্ষের বাগ্‌যুদ্ধ।

এটাকে দল দুটির ‘রাজনৈতিক বা আদর্শগত অবস্থান’ বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিজেদের মধ্যে ভিন্নতা দেখাতে হলে তো এগুলোকে তারা সামনে আনবেই। এখন উদ্বেগের জায়গাটা হচ্ছে, এগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়ে যায় কি না। সেটা যতক্ষণ পর্যন্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া ভালো।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘দেশের জন্য সলিউশনটা হচ্ছে নির্বাচনটা হওয়া এবং সেটা শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক গতিতে হওয়া। রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক, পারস্পরিক সমালোচনা এগুলো থাকবে—এটা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়।’

বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে শুরু করে হবিগঞ্জসহ সাত জেলায় জনসভা করে বিএনপির চেয়ারম্যান সরাসরি জামায়াত ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডিও নয়, নয় অন্য কোনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, কেউ দিল্লিতে পালায়, কেউ পিন্ডিতে পালায়, কিন্তু বিএনপি দেশের মানুষের পাশেই থাকে।

তারেক রহমান প্রতিটি বক্তৃতার শুরুর দিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের গুম, খুন, নির্যাতন, ভোটাধিকার হরণ এবং দেশের টাকা পাচারের সমালোচনা করেন। এই সমালোচনা খুব তীব্র ছিল, কিন্তু তিনি এতে খুব বেশি সময় ব্যয় না করে দ্রুতই বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিপক্ষের বর্তমান ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তারেক রহমান তাঁর সাতটি জনসভায় জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি প্রতিটি জেলার স্থানীয় সমস্যাগুলো নিয়েও কথা বলেছেন।

বক্তৃতায় তারেক রহমান উন্নয়নের অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ ও খাল খনন, বেকারদের প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোতে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিটি জনসভায় উপস্থিত জনতার সমর্থন চেয়েছেন।

গত দুদিনে তারেক রহমানের নির্বাচনী জনসভায় একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয়। সেটি হচ্ছে মঞ্চ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সরাসরি তাঁর কথোপকথন। গতকাল ভাষানটেকের জনসভায় এই কথোপকথন ছিল বেশ চমকপ্রদ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এটি বেশ অভিনব এবং নাটকীয়। এর মধ্য দিয়ে কার্যত জনসভাকে জীবন্ত করে তোলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটা সম্পর্ক জোরদারের প্রয়াস রয়েছে, যা ভোটের মাঠে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিপরীতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতিকে ‘খয়রাতি’ অনুদান বলে কটাক্ষ করেন এবং এটি চাঁদাবাজি ও লুটপাটের উৎস হতে পারে বলে বৃহস্পতিবার মিরপুরের জনসভায় ইঙ্গিত দেন।

এ প্রসঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দুই হাজার টাকার অনুদানের উল্লেখ করে জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে বলেন, ‘তাদের হাতে খয়রাতি কোনো অনুদান আমরা তুলে দিয়ে তাদের অপমান করতে চাই না।’

অবশ্য গতকাল পঞ্চগড়ের জনসভায় শফিকুর রহমান বিএনপির প্রতিশ্রুত আটটি সামাজিক উন্নয়ন কার্ডের পরিকল্পনার বিপরীতে ভিন্ন চিন্তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ভাই, আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। আপনারা সবাই ভাইবোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড চাই।’

জামায়াতের আমির নির্বাচনকে সরাসরি ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজি নির্মূলের ওপর জোর দেন। নারীর সম্মানের ক্ষেত্রে তারেক রহমান অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করার কথা বলেন। আর শফিকুর রহমান তাঁদের নিরাপত্তা ও ইজ্জত রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। তারেক রহমান পররাষ্ট্রনীতিতে ‘দিল্লি, পিন্ডি বা অন্য কোনো দেশের’ নির্ভরতার সমালোচনা করলেও শফিকুর রহমান ‘আধিপত্যবাদ’-এর বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেন।

গত দুদিনে শফিকুর রহমানের পাঁচটি জনসভার বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাঁর বক্তব্যে জাতীয় রাজনীতি বা স্থানীয় সমস্যাগুলো বেশ বলিষ্ঠ ও স্পষ্টভাবে এসেছে। মিরপুরে তিনি এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং গ্যাস–সংকট নিয়ে সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো তুলে ধরে এর সমাধানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। আর গতকাল পঞ্চগড়ের জনসভায় জামায়াতের আমির উত্তরবঙ্গকে ‘কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী’ বানানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে থেকেই বিএনপির দিক থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে দলটির মহিলা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের বিভ্রান্ত করছেন। তাঁরা এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করছেন, মোবাইল ফোন নম্বর নিচ্ছেন। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের নারী কর্মীদের অবরুদ্ধ করা, কোথাও কোথাও হামলার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগের দিন বুধবার মিরপুরে জামায়াত আমিরের নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের একটি অভিযোগে দলের কয়েকজন নারী কর্মীকে আটক করা হয়। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সারা দেশে এ বিষয়টিতে জামায়াত যে কতটা ক্ষুব্ধ, তার প্রকাশ ঘটে জামায়াত আমিরের মিরপুরের বক্তব্যে। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা কিছু বন্ধুদের বলতে চাই, মেহেরবানি করে মায়েদের ইজ্জত নিয়ে কখনো টান দেবেন না, তাহলে আগুন জ্বলবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যান ও জামায়াত আমিরের গত দুদিনের নির্বাচনী জনসভার বক্তব্যে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ধরা পড়ে। সেটি হলো, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রশ্নে। জামায়াতের আমির ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রসঙ্গে বলেন, যাঁরা গত ৫৪ বছরের পচে যাওয়া রাজনীতি চান না, রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন চান, তাঁরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন বলে আশা করছেন। অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

প্রচারের প্রথম দুই দিনেই যে চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মূল লড়াই এখন দুই বিরোধী শিবিরে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে। আর জামায়াত, এনসপিসহ ১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ধর্মীয় ভাষ্য, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও ‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ যাত্রার কথা বলে সেই নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।

অবশ্য দুই দলের পাল্টাপাল্টি আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে এ দেশের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য বলে মন্তব্য করেন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনীতির বৈশিষ্ট্যই হলো ভিন্নমত বা প্রতিপক্ষের প্রতি বিষোদ্‌গার। নির্বাচনের সময় এলে এটা বেড়ে যায়। অনেক সময় শোভনীয়তার মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়।’

মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা ও ধর্মের ব্যবহারের অভিযোগ বিষয়ে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আগে জামায়াত সম্পর্কে এ কথাগুলো আওয়ামী লীগ বলত, তখন জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির পার্টনারশিপ ছিল। এখন আওয়ামী লীগ নেই, এখন বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কাজেই জামায়াতকে ওইভাবে আইডেনটিফাই করা হচ্ছে, এটা আগেও করা হয়েছে। এটা বিএনপি করে নাই, যেহেতু বিএনপি এর আগে ওইভাবে জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এবার যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বী, তারা এ প্রশ্নগুলো তুলছে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-24%2Few3cli74%2FCombo.jpg?rect=0%2C0%2C915%2C610&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমান (বাঁয়ে) ও শফিকুর রহমান (ডানে) ছবি: কোলাজ

যেকোনো হামলাকে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখবে ইরান, কড়া হুঁশিয়ারি

যেকোনো ধরনের হামলাকে নিজেদের ওপর ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখবে ইরান। দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার এ কথা বলেন। এর ‘সবচেয়ে কঠিন জবাব দেওয়ার’ হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরির একটি বিশাল বহর পারস্য উপসাগরের দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্পের এমন ঘোষণা দেওয়ার পর তেহরান এমন হুঁশিয়ারি দিল।

ইরানের ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আশা করছি, এ সামরিকায়ন সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর জন্য নয়। তবে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত আছে। আর এ কারণে ইরানে সবকিছুকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।’

ইরানের ওই সরকারি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এবার যেকোনো ধরনের হামলাকে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) সীমিত, সীমাহীন, সার্জিক্যাল ও গতিশীল যে নামই দিক না কেন, আমরা সেটিকে আমাদের ওপর সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করব।’ তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরানের পক্ষ থেকে সবচেয়ে কঠিন জবাব দেওয়া হবে।

গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প অবশ্য এ–ও বলেছেন, মার্কিন রণতরির বহর ব্যবহার করার দরকার পড়বে না। বিক্ষোভকারীদের হত্যা কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি ইরানকে আবারও হুঁশিয়ারি দেন।

জবাবে ইরানের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে আমরা অবশ্যই জবাব দেব।’ তবে ইরানের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা স্পষ্ট করতে চাননি ওই কর্মকর্তা।

অতীতেও বিভিন্ন সময় মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে উত্তেজনার সময় অঞ্চলটিতে বাড়তি বাহিনী পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে সেগুলো প্রায়ই প্রতিরক্ষামূলক ছিল। গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার আগেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বড় পরিসরে বাড়ানো হয়েছিল।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-24%2Fgji49as0%2Flong-tussle.jpg?rect=11%2C0%2C603%2C402&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

মাচাদোকে পরিকল্পনা করেই নির্বাসনে পাঠিয়েছেন ট্রাম্প! by পিওতর এইচ কোসিকি

‘স্বাধীনতার সেই ঘণ্টা বেজে উঠেছে’—৩ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমন ঘোষণাই দিয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ঠিক সেই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরে নিয়ে নিউইয়র্কের পথে ছিল মার্কিন বাহিনী। তবে মাচাদোর সেই উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে যায়। কারণ, কিছু পরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলার শাসনক্ষমতা গণতান্ত্রিক শক্তির হাতে দেওয়া হবে না; বরং তাঁর প্রশাসনই দেশটি চালাবে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার ভেতরে এবং প্রবাসী ভেনেজুয়েলানদের মধ্যে আনন্দের জায়গায় নেয় আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে মাচাদোর বৈঠকও সেই ধোঁয়াশা কাটাতে পারেনি। এখন প্রশ্ন একটাই—ভেনেজুয়েলার মানুষের বহুদিনের স্বাধীনতার স্বপ্নের কী হবে? যে গণতান্ত্রিক অধিকার ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী এদমুন্দো গোনসালেসের কাছ থেকে মাদুরো কেড়ে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কি তা ফিরিয়ে দেবে?

মাচাদো এ মাসের শুরুতে আমেরিকানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমাদের একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আছেন। জনগণ যে দায়িত্ব আমাদের দিয়েছে, তা পালনে আমরা প্রস্তুত।’ কয়েক দিনের মধ্যেই ভ্যাটিকানও তার সমর্থনের বার্তা দেয়। পোপ লিও চতুর্দশের সঙ্গে মাচাদোর একটি পূর্বঘোষণাহীন ব্যক্তিগত সাক্ষাতের ছবি তখন প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু কারাকাসে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রায় দুই সপ্তাহ পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকে পাশে সরিয়ে রেখে ‘শাসন-ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গোনসালেসকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল ভেনেজুয়েলার মানুষ। তবু ট্রাম্প সেই গণরায় উপেক্ষা করতেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কারও ট্রাম্পকে তাঁর বৈধতা মানতে রাজি করাতে পারেনি। বরং সেটিকে তিনি ব্যক্তিগত অপমান হিসেবেই দেখেছেন বলে মনে হয়।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ‘তিনি (মাচাদো) যদি পুরস্কারটি ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে আমি এটি নিতে পারি না’, তাহলে আজ তিনিই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হতেন।’ এই মন্তব্য ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই মাচাদোকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছে, যাতে মাদুরোকে অপসারণের পথে তিনি কোনো জটিলতা তৈরি করতে না পারেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই তিনি দেশ ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী চাভেজপন্থী নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার বিরোধীরা টিকে থাকতে পারবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও–ও একই সুরে বলেছেন—মাচাদো ‘অসাধারণ’ হলেও বাস্তবতা হলো, ‘বিরোধীদের বড় অংশ এখন আর ভেনেজুয়েলার ভেতরে নেই।’ তাঁর ভাষায়, এখন প্রশাসনের দৃষ্টি ‘স্বল্পমেয়াদি জরুরি বিষয়’-এর দিকে।

রুবিওর তিন ধাপের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো ‘স্থিতিশীলতা’, যার মেয়াদ কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস। এই সময়ে দেশটি শাসন করবেন মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোনো অঙ্গীকার তিনি করেননি। উপরন্তু মাদুরোর গোপন পুলিশপ্রধান দিয়োসদাদো কাবেয়ো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেসের ক্ষমতার ছায়ায় তাঁর নিজেরই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ট্রাম্পের ‘পুতুল’ হিসেবে তাঁর অবস্থানও স্বভাবতই ভঙ্গুর।

এই পরিস্থিতিকে কারাকাস ক্রনিকলস যথার্থই ‘স্থবির উত্তরণ’ বলে অভিহিত করেছে। মাচাদো যদিও বলেছেন, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ‘খুব ভালো’ হয়েছে, তবু বাস্তব চিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।

ট্রাম্পকে তুষ্ট করতে গিয়ে ১৫ জানুয়ারির সেই বৈঠকে তিনি তাঁকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারও উপহার দেন। ট্রাম্প খুব আগ্রহভরে তা গ্রহণও করেন। তবে যদিও নোবেল কমিটি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—এই পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু তোষামোদ দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। ট্রাম্প মাচাদোকে সমর্থন করেন না, কারণ তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী; ট্রাম্পের তেলকেন্দ্রিক পরিকল্পনায় নয়।

ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের এখন আর ট্রাম্পের অহংকারী মাথায় হাত বুলিয়ে চলার সুযোগ নেই। গত দুই বছরে দেশ-বিদেশের ভেনেজুয়েলানদের সংগঠিত করেই মাচাদো নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। রাজনৈতিক উত্তরণে নিজেদের কণ্ঠস্বর টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁকে সেই পথেই আবার ফিরতে হবে। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, সারা দেশে প্রতিবাদ সংগঠিত করার ক্ষমতাই মাচাদোর হাতে থাকা ‘একমাত্র অস্ত্র’।

মাচাদো একজন ধর্মভীরু রোমান ক্যাথলিক। তিনি জানেন, ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছে মূলত খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রের নৈতিকতা ও সংগঠনী শক্তির ওপর। মাচাদো ও ট্রাম্পের মূল্যবোধ (নৈতিক হোক বা রাজনৈতিক) কখনোই এক পথে আসবে না। তাই ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রীকে ফিরতে হবে সেই কৌশলে, যেটি তাঁকে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছিল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর সামনে এখন শেষ সুযোগ—নিজেদের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করা।

* পিওতর এইচ কোসিকি, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড-এর ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ছবি: রয়টার্স

গণ–অভ‍্যুত্থান–পরবর্তী নির্বাচনে নারীরা কোথায় by সেলিম জাহান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও প্রক্রিয়া এখনো ব‍্যাপকভাবে পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চায় না যে নারীরা এ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় অংশগ্রহণ করুন। তাই রাজনৈতিক দলের সব স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব কম। আসন্ন নির্বাচনে নারীরা কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সেলিম জাহান

২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ‍্যুত্থানের পরবর্তী একটা সময়ে প্রশ্ন উঠেছিল, ‘জুলাইয়ের নারী যোদ্ধারা কোথায়?’

উত্থাপিত প্রশ্নটির একটি পরিপ্রেক্ষিত ছিল। জুলাই অভ‍্যুত্থানে মেয়েরা ছিলেন সংগ্রামের প্রথম সারিতে—নেতৃত্বে, দাবিতে, দৃশ‍্যমানতায়। কোনো সন্দেহ নেই যে জুলাই আন্দোলন সফল হওয়ার পেছনে মেয়েদের অংশগ্রহণ একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।

কিন্তু বছর ঘুরতেই তাঁরা যেন হারিয়ে গেলেন। তাঁদের আর দেখা গেল না নানা সংস্কার বিষয়ের প্রতিনিধিত্বে, দেশের রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার অংশগ্রহণে, দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। মেয়েরা যেন উবে গেলেন।

সংগতভাবেই প্রশ্ন উঠল, ‘জুলাইয়ের নারীরা কোথায় হারালেন?’

২.

আমাদের দেশে ব‍্যাপারটি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের কথাই ধরা যাক। সে সংগ্রামে বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন—প্রত‍্যক্ষভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে এবং পরোক্ষভাবে সারা দেশে।

কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে না তাঁদের বীরত্বগাথা তেমনভাবে উঠে এসেছে, না মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকার যথাযথ মূল‍্যায়ন হয়েছে।

বহু ক্ষেত্রে সেই নারীদের চিত্রায়িত করা হয়েছে শুধু মুক্তিযুদ্ধের বলি হিসেবে, কিন্তু যুদ্ধে যোদ্ধা হিসেবে তাঁদের যথাযথ মূল‍্যায়ন হয়নি। তাই স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে দেশ পুনর্গঠনের নানা কর্মকাণ্ডে মেয়েরা উপেক্ষিতই থেকে গেলেন। তাঁদের কথা কেউ ভাবল না এবং তাঁদের কাজে লাগানোর বিষয়টিও কেউ চিন্তা করল না।

জুলাই গণ–অভ‍্যুত্থানের দেড় বছর পর বাংলাদেশ আজ গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় একটি সুষ্ঠু জন–অংশগ্রহণমূলক নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জুলাই আন্দোলনের একটি প্রধান ভিত্তিভূমি ছিল বৈষম‍্যবিহীন একটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা এবং একটি সমতাসম্পন্ন সমাজ গঠন। সে উদ্দেশ‍্যে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের লক্ষ‍্যে বাংলাদেশ এখন একটি অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববর্তী সময়ের মতো আজ আবারও প্রশ্ন উঠছে, ‘দেশের নির্বাচনে মেয়েরা আজ কোথায়?’

প্রশ্নটি ওঠার একটি সংগত কারণ আছে। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুসারে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের জন্য মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ১০৯ জন, অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

 মোট নারী প্রার্থীর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ৭২ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩৭ জন। তার মানে হচ্ছে, প্রতি ৩ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ১ জন কোনো দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেননি।

দলগত দিক থেকে বাংলাদেশের ৫০টি রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। তার মধ্যে ৩০টি দলেরই কোনো নারী প্রার্থী নেই, অর্থাৎ দেশের তিন-পঞ্চমাংশ রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। সে অবস্থায় এই ৩০টি দল সারা দেশে একজনও যোগ্য নারীও পেলেন না প্রার্থী হিসেবে—এটা দুর্ভাগ্যজনক।

৩.

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, নারীদের প্রতি বৈরিতা ও তাঁদের বিরুদ্ধে একধরনের বৈষম্য কি এখানে কোনোভাবে কাজ করেছে?

যেসব রাজনৈতিক দল নারী প্রার্থী দিয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ১০ জন নারী প্রার্থী নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও মার্ক্সবাদী বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নারী প্রার্থীর তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

বিএনপির মতো একটি প্রধান শক্তিশালী তৃণমূলপ্রোথিত রাজনৈতিক দল তার ৩২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০ জনের (মাত্র ৩ শতাংশ) বেশি নারী প্রার্থী দিল না বা দিতে পারল না, এটা চরম দুঃখজনক।

দেশের ৯টি রাজনৈতিক দল মাত্র ১ জন করে নারী প্রার্থী দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ‍্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ৪৪ প্রার্থীর মধ্যে শুধু ৩ জন নারী প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে। অথচ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দলটির জন্ম।

উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর ২৭৯ প্রার্থীর মধ্যে ১ জনও নারী প্রার্থী নেই। কোন বার্তা দিতে চাইছে দেশের এই অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলটি?

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একাধিক নারীনেত্রী জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি জোট বাঁধায় দলত‍্যাগ করেছেন।

অনেকেই বলছেন, নারী বিষয়ে জামায়াতের নানা নীতি ও অবস্থানের কারণে এই নারীনেত্রীরা জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি।

কথা আরও আছে। নির্বাচন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য পোষণ করেছিল, নির্বাচনে প্রতিটি দলের প্রার্থীদের মধ্যে ন‍্যূনতম ৫ শতাংশ প্রার্থী হবেন নারী। এই লক্ষ‍্যে দলগুলো অঙ্গীকারবদ্ধও হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।

দ্বিতীয়ত, দেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর ২০২০ সালের মধ্যে তাদের সব স্তরের ও পর্যায়ের পর্ষদগুলোতে ন‍্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রাখার কথা ছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সে শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে সে ব্যাপারে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করা হয়েছে। হাতের কাছে উপাত্ত নেই, কিন্তু মনে হয় না যে সে লক্ষ‍্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে।

৪.

এই অনভিপ্রেত চালচিত্রের কারণ কী?

এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও প্রক্রিয়া এখনো ব‍্যাপকভাবে পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চায় না যে নারীরা এ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় অংশগ্রহণ করুন। তাই রাজনৈতিক দলের সব স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব কম।

এককথায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের উপস্থিতি কম এবং বাংলাদেশে রাজনীতি করেন, এমন নারীর সংখ্যাও সীমিত।

এর পরিপ্রেক্ষিতে নারীরা কম সংখ্যায় নির্বাচনে প্রার্থী হন, নির্বাচনী সমাবেশ কিংবা প্রচারণা করেন না। সমাজও নারীদের এই ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত নয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচনে সনাতনভাবে পেশিশক্তির প্রয়োগও নারীদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করে না।

নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচনী অভিযান চালানোর জন্য জনশক্তি জোগাড় করাও মেয়েদের জন্য দুরূহ। সেই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রার্থী হলেও মেয়েরা দলের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য ও সাংগঠনিক সহায়তা পান না।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে ‘মবতন্ত্রের’ বিস্তারও নির্বাচন প্রার্থী হতে মেয়েদের নিরুৎসাহিত করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বহু সময়েই নারীরা তাঁদের জন্য সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হতেই আগ্রহী থাকেন। কিন্তু এটা একটি সংরক্ষিত ব্যবস্থা এবং এটি নারীর প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক সক্ষমতার পরিপন্থী।

অথচ উপর্যুক্ত চালচিত্রের প্রেক্ষাপটে রয়েছে এই সত‍্য যে তিন দশক ধরে বাংলাদেশের দুটি প্রধানতম দলের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন নারী এবং এই সময়কালে তাঁরা দুজনেই অদলবদল করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ছিলেন।

কিন্তু বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর শীর্ষেই রয়ে গেছে এবং এটা রাজনীতির তৃণমূল ও মধ‍্যপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বা প্রতিনিধিত্বের চালচিত্রের বাস্তবতায় যে খুব বড় একটা পরিবর্তন এনেছে, এমন নয়।

সেই সঙ্গে তাঁদের নেতৃত্ব কিংবা প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে তাঁরা নিজেরা যে এ ব্যাপারে বিস্তৃত প্রত্যক্ষ প্রণোদনামূলক কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন, এমনটাও নয়।

সুতরাং রাজনৈতিক কাঠামোর সামষ্টিক পর্যায়ের শীর্ষে নারী থাকলেও ব্যষ্টিক পর্যায়ে সেটা আপামর নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যাপারে খুব একটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয় না।

৫.

ঐতিহাসিকভাবেও বাংলাদেশে নির্বাচনকালে কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশ কিংবা প্রচারণায় বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণও খুব একটা দেখা যায় না।

নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভালো চোখে দেখে না। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে নারীরা ভোট দেন, কিন্তু তাঁদের অনেকেই স্বাধীনভাবে ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, এমনটা বলা বোধ হয় সঠিক হবে না।

কারণ, কোন প্রার্থীকে কিংবা কোন প্রতীকে তাঁরা ভোট দেবেন, তা তাঁরা নির্ধারণ করেন না, বাড়ির পুরুষেরাই ঠিক করে দেন। সেখানে মেয়েদের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি খাটিয়ে তাঁদের ভোটাধিকার ব‍্যবহার করার সুযোগ বড় কম।

বাড়ির পুরুষদের পছন্দের প্রার্থীকে মেয়েরা ভোট দেন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া-আসার ব‍্যাপারেও গ্রামবাংলার নারীদের স্বাধীনতা নিতান্ত সীমিত।

সুতরাং বাংলাদেশের নির্বাচনে নারীরা কোথায়, এ প্রশ্নের সবচেয়ে সদুত্তর হচ্ছে, এ দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁদের নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় যেখানে রেখে দিতে চায় এবং রেখে দিয়েছেন, বাংলাদেশের নারীরা সেই বৃত্তের মাঝেই আছে।

এ বৃত্ত ভাঙতে না পারলে নির্বাচন আসবে, নির্বাচন যাবে, কিন্তু এ দেশের নারীরা পুরুষ–নির্দেশিত স্থানেই থাকবেন। এ বৃত্ত ভাঙার দায়িত্বটি কিন্তু শুধু নারীদের নয়, আমাদের সবার।

* সেলিম জাহান, সাবেক পরিচালক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-18%2Fq9sy47b2%2F18012026-cm-5.jpg?rect=0%2C2%2C2323%2C1549&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ‍্যুত্থানের পরবর্তী একটা সময়ে প্রশ্ন উঠেছিল, ‘জুলাইয়ের নারী যোদ্ধারা কোথায়?’

গত বছর ট্রেন্ডিংয়ে ছিল স্ট্রিট শপিং

প্রকাশ ০২ জানুয়ারি ২০২৬ঃ গত বছর বাজেটের মধ্যে কেনাকাটার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। জনপ্রিয়তা পেয়েছিল স্ট্রিট শপিং। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো সারা বছরই দিয়ে গেছে বিশেষ ছাড়।

বছরজুড়েই ছিল বাজেটের মধ্যে কেনাকাটার প্রবণতা। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ব্র্যান্ডের দোকান থেকে সরে এসেছেন বেশির ভাগ ক্রেতা। ক্রেতাদের ধরে রাখতে এ কারণে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো সারা বছরই বিশেষ ছাড় দিয়ে গেছে। গজ কাপড় কিনে পোশাক বানানোতে আবার আগ্রহ দেখা গেছে।

ভ্যানে করে ঘুরতে ঘুরতে ক্রেতাদের বাড়িতে ঢুকে গেছে ক্রোকারিজ, পর্দার কাপড়, বিছানার চাদর, বাঁশ–পাট–বেতের ঝুড়ি। ফুটপাতের নানা ধরনের পোশাক ও পসরায়ও ক্রেতাদের সমাগম দেখা গেছে।

পোশাকের বাইরে বাড়ির নানা অনুষঙ্গ কিনতে শহরের নানা প্রান্তের সস্তার বাজারে ছুটে গেছেন গ্রাহকেরা। হাজারীবাগ, সিদ্দিকবাজার, আলুবাজার, বংশাল, মালিটোলা, মোগলটুলীসহ ধানমন্ডির পুরোনো ১৫ নম্বর রোড, মিরপুর ১০, ১১, ১২, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, পান্থপথ, মৌচাক মার্কেটের নিকটবর্তী সিদ্ধেশ্বরী রোড, টিকাটুলি কালীমন্দিরের পাশেসহ ঢাকার অনেক জায়গাতেই কারিগরের হাতে বানানো চামড়ার জুতার চাহিদা দেখা গেছে এ বছর।

সুপারশপের পাশাপাশি কাঁচাবাজার থেকে কেনাকাটা করার প্রবণতাও বেড়েছে। করোনার সময় অনলাইনে কেনাকাটার যে তোড় শুরু হয়েছিল, এ বছরও সেটা জোরে সঙ্গেই চলেছে। কম আসায় বাইরের পণ্য দেখা গেছে কম। 

দোকানে গিয়ে ফরমায়েশ দিয়ে নিজের পছন্দমতো জুতা বানিয়েছেন ক্রেতারা
দোকানে গিয়ে ফরমায়েশ দিয়ে নিজের পছন্দমতো জুতা বানিয়েছেন ক্রেতারা। ছবি: কবির হোসেন

গ্রিনল্যান্ড কার হাতে যাবে, তা রাশিয়ার বিষয় নয় : পুতিন

গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে চলমান বিতর্কে রাশিয়ার কোনো উদ্বেগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ কার হাতে থাকবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে নেওয়ার বিষয়।

বুধবার রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কথা বলেন পুতিন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কী ঘটছে বা ঘটছে না, তা মস্কোর মাথাব্যথার কারণ নয়। তবে একই সঙ্গে দ্বীপটির প্রতি ডেনমার্কের অতীত আচরণের কড়া সমালোচনা করেন তিনি। খবর রয়টার্সের।

পুতিনের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও মস্কো বিষয়টি কিছুটা আগ্রহের সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার শক্ত অবস্থানের কারণে এই ইস্যুর ভূরাজনৈতিক প্রভাব তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতাকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেও, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে না। ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, ডেনমার্কের এই আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নিয়ে চলমান বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে মেটানো সম্ভব।

রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ডেনমার্ক ঐতিহাসিকভাবে গ্রিনল্যান্ডকে একটি উপনিবেশ হিসেবে দেখেছে এবং সেখানকার জনগণের প্রতি কঠোর আচরণ করেছে। যদিও তিনি উল্লেখ করেন, এটি আলাদা প্রসঙ্গ এবং বর্তমান বাস্তবতায় এ নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ খুব বেশি নেই।

পুতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে রাশিয়ার কোনো আপত্তি নেই। বরং তিনি মনে করেন, ইতিহাসে এ ধরনের ভূখণ্ড কেনাবেচার নজির রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা কেনা এবং ১৯১৭ সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে ভার্জিন আইল্যান্ডস কেনার কথা উল্লেখ করেন।

আলাস্কার সেই সময়কার মূল্য বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি, গ্রিনল্যান্ডের বিশাল আয়তন এবং স্বর্ণের দামের পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করে পুতিন বলেন, গ্রিনল্যান্ড কিনতে ডেনমার্ককে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার দিতে হতে পারে। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের সেই অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য রয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত
ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত


ইসরায়েলি বোমা থেকে বাঁচলেও অজানা ভাইরাসে মরছে গাজার মানুষ

ফ্লুয়ের উপসর্গ নিয়ে মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন মারওয়া কালুব। তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত তাঁর মেয়ে মরিয়ম আর বাড়িতে ফিরবে না। মেয়ের মৃতদেহ নিয়ে তাঁকে হাসপাতাল ছাড়তে হবে।

৩৮ বছর বয়সী এই মায়ের বিশ্বাস ছিল, মেয়ের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আর জ্বর-সর্দির সাধারণ ওষুধেই মরিয়ম সুস্থ হয়ে উঠবে, কিন্তু যা হয়েছে তা ছিল অপ্রত্যাশিত।

প্রায় দুই বছর ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলছে। গত বছর অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সেখানে ইসরায়েলের হামলা থামেনি। ইসরায়েল গাজায় এখনো ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

ফলে গাজার বাসিন্দাদের মাসের পর মাস তীব্র অনাহারে কাটাতে হচ্ছে। এতে তাদের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, সাধারণ অসুস্থতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

মরিয়মের খালা ইমান কালুব মিডলইস্ট আইকে বলেন, ‘মরিয়মের আগে কোনো শারীরিক জটিলতা বা অসুস্থতা ছিল না। মারা যাওয়ার আগে ওর প্রচণ্ড কাশি, বমি ভাব এবং অনেক জ্বর হয়েছিল। সে খাবার খাওয়াদাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল।’

এই নারী আরও বলেন, ‘গাজায় অনেক মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো তার সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা কখনো কল্পনাও করিনি, সে এভাবে শেষ হয়ে যাবে।’

কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি রূপান্তরিত (মিউটেড) ভাইরাস গাজাজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

সেখানকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখনো ভাইরাসটি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেনি। এ জন্য তারা পরীক্ষার সীমিত সুযোগ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের গুরুতর ঘাটতির কথা বলেছেন। স্থানীয়রা ভাইরাসের অপ্রত্যাশিত প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছেন।

৮ বছর বয়সী মরিয়মকে ১১ জানুয়ারি রানতিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই হাসপাতাল একসময় গাজায় কিডনির রোগ ও ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র ছিল।

ইসরায়েলি বাহিনী গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বারবার আঘাত হেনে এটিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বর্তমানে রানতিসি হাসপাতালটি শ্বাসনালি ও অন্ত্রসংক্রান্ত সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটি মেরামত এবং পরিষেবা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও হাসপাতালটিকে ব্যাপক চাপ সামলাতে হচ্ছে।

প্রচণ্ড কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত মরিয়মের শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করলে তার মা তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন।

ইমান কালুব বলেন, হাসপাতালে আসা অসুস্থ শিশুর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে তাকে একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানোর জন্য কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন, মরিয়মের ফুসফুসের অবস্থা খুবই গুরুতর। তাকে চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

ইমান কালুব আরও বলেন, ‘তাঁরা শুধু তাকে অক্সিজেন দিতে পেরেছিল। তাকে এমনকি স্যালাইন পর্যন্ত দিতে পারেনি। হয়তো তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, তাকে আর বাঁচানো যাবে না।’

পরিবারটি অনেক আশা নিয়ে অক্টোবরের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছিল। তারা একটি বাড়ি মেরামত করছিল এবং মরিয়ম স্কুলে যেতে শুরু করেছিল।

মাসের পর মাস বোমাবর্ষণের ভেতর বেঁচে থাকা একটি শিশু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরে গেল, যা পরিবারটি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

ইমান বলেন, দুই বছরের যুদ্ধ তাকে হত্যা করতে পারেনি। একটি ছোট ভাইরাস সেটা করল।

‘প্রতিরোধ করা যেত’

দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই রোগের কারণে গাজাজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে পরিবারগুলোকে শিশুদের বাড়ির ভেতরে রাখার এবং সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা বা সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসকেরা এখনো এই রোগের কারণ শনাক্ত করতে বা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। দুই বছর ধরে ইসরায়েলি জাতি হত্যায় গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।

গাজা নগরের আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজা নজিরবিহীন মানবিক ও স্বাস্থ্যসংকটের মুখোমুখি। এখানে এমন কোনো বাড়ি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে এ রোগে কেউ আক্রান্ত হয়নি।

এই কর্মকর্তার ধারণা, ভাইরাসটি ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি রূপান্তরিত ধরন হতে পারে বা এমনকি কোভিড-১৯ ভাইরাসও হতে পারে।

আবু সালমিয়া বলেন, জরুরি রোগী ভর্তি প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ রোগী শ্বাসনালিতে সংক্রমণ, প্রচণ্ড জ্বর, ওজন অনেক কমে যাওয়া এবং জয়েন্টের ব্যথায় ভুগছেন।

গুরুতর নিউমোনিয়া নিয়ে কয়েক হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, কিছু রোগীকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গাজার অধিকাংশ চিকিৎসাকেন্দ্র পূর্ণ সেবা দিতে সক্ষম নয়। হেলথ ক্লাস্টার ওই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৫ শতাংশ জরুরি ওষুধের সরবরাহ নেই। মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুত ৭১ শতাংশ খালি হয়ে গেছে।

আবু সালমিয়া আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে ওষুধ এবং পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম নেই, যার কারণে রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে গেছে। রোগীর সংখ্যা হঠাৎ অনেক বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে শয্যার ব্যবহার ১৫০ থেকে ২০০ শতাংশে পৌঁছেছে।’

বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে অতিরিক্ত ভিড়, ছেঁড়া তাঁবু, দূষিত পানি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ বলে মনে করেন তিনি।

এই কর্মকর্তা বলেন, শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন। দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টি সংক্রমণ প্রতিরোধক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে, ফলে কিডনির রোগ, ক্যানসার এবং হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জটিলতা বাড়ছে, তাঁরা মারা যাচ্ছেন। শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেও রোগ দ্রুত ছড়াচ্ছে।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলো গত মাসে জানিয়েছে, গাজায় ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ৭৭ শতাংশ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছেন।

অনাহারে থাকা মানুষগুলো রোগাক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। অথচ এই ঝুঁকি কমানো যেত, মৃত্যু আটকানো যেত।

আবু সালমিয়া বলেন, ‘স্বল্প সম্পদ নিয়ে জীবন রক্ষায় কাজ করা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠা সত্ত্বেও আমাদের গভীর দুঃখের সঙ্গে বহু মৃত্যু দেখতে হচ্ছে, যেগুলো আটকানো যেত।’

প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তিন মাস বয়সী শাথা মারা গেছে। সন্তান হারানো মা হিবা আবু জারাদ যমজ মেয়ে নাদাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন। ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, গাজা নগর
প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তিন মাস বয়সী শাথা মারা গেছে। সন্তান হারানো মা হিবা আবু জারাদ যমজ মেয়ে নাদাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন। ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, গাজা নগর। ছবি: এএফপি

ভোটের পুরোনো হিসাব–নিকাশ এবার বদলে যাবে: আসিফ মাহমুদ

গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে ভোটের পুরোনো হিসাব–নিকাশও বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।

আসিফ মাহমুদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে যে ইকুয়েশন ৫০-৫৫ বছর ধরে চলে আসছিল, সেই প্রতিটি ইকুয়েশন এবারের নির্বাচনে ভেঙে গেছে। ইতিমধ্যে আপনারা যদি রাস্তায় যান, বাজার করতে গেলে যে সবজিওয়ালা আছে, রিকশায় উঠলে যে রিকশাওয়ালা মামা আছেন, শিক্ষক-ছাত্র থেকে সব শ্রেণি, পেশা ও কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, তখন আমরা সেই পলিটিক্যাল ডেমোগ্রাফি যে পরিবর্তন হয়েছে, সেটা উপলব্ধি করতে পারি। সুতরাং আগের গতানুগতিক হিসাব–নিকাশ যে অমুক দলের ৩০ শতাংশ-অমুক দলের ৪০ শতাংশ—সেই হিসাব–নিকাশ এবার বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকারের মধ্য দিয়ে বদলে দেবে।’

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০–দলীয় ঐক্যের অংশীদার এনসিপির নেতা আসিফ মাহমুদ। ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট ও হাজারীবাগ থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ সংসদীয় আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. জসীম উদ্দীন সরকারের সমর্থনে ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৬’ শীর্ষক এই সমাবেশ হয়।

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল এনসিপি জামায়াতসহ বিভিন্ন ইসলামি দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এই নির্বাচনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে।

আসিফ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচন নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ বিগত ৫০ বছর যেভাবে চলেছে, আগামী দিনে সেভাবে চলবে কি না? বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশের জনগণ যে কালো অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে, আগামী দিন সে রকম হবে কি হবে না? আমরা যে অপশাসন, গুম-খুন, মুখ চেপে ধরে রাখা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির রাজনীতি দেখে আসছি, সেটা সামনের বাংলাদেশে দেখব কি না?

গত ১৭ বছরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এখন ক্ষমতায় আসার কনফিডেন্স বিল্ড করা একটা দলের মধ্যে সেই ১৭ বছরের কার্যক্রমেরই একধরনের পুনরাবৃত্তি গত দেড় বছরে দেখা গেছে, বলেন আসিফ মাহমুদ।

নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একদিকে হেলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন আসিফ মাহমুদ। ভোটে অনিয়ম হলে জুলাইয়ের মতো প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। আগের বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজনে যুক্ত নির্বাচন কমিশনারদের পরিণতি বর্তমান কমিশনকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আপনারা পড়ুন, সেটা আমরা চাই না।’

১০–দলীয় ঐক্য শুধু আসন ভাগাভাগির জন্য নয়, বরং সংস্কারসহ কিছু নীতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে জানিয়ে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, তাঁরা বিজয়ী হলে ঐকমত্য কমিশনের সংস্কারের যে বিষয়গুলো এই গণভোটে আছে, তার থেকে আরও বেশি সংস্কারের উদ্যোগ নেবেন।

অন্তর্বর্তী সরকার থেকে পদত্যাগ করার সময় আলোচনা ছিল যে আসিফ মাহমুদ ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নেন।

এই আসনের ভোটারদের জামায়াত ও ১০-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী জসীম উদ্দীন সরকারকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘ঢাকা-১০ আসনের জনগণের সঙ্গে আমার যতটুকুই যোগাযোগ হয়েছে, তারা পরিবর্তন চান। কোনো চাঁদাবাজ, স্বীকৃত সন্ত্রাসী ও খুনিরা এই আসনে বিজয়ী হয়ে আসুক এবং আবার ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করুক, তা জনগণ চান না।’

জামায়াত আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য নুর নবী মানিক। ঢাকা-১০ আসনে দলের প্রার্থী জসীম উদ্দীন সরকার ভোট চেয়ে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে ইসলামি সংগীত পরিবেশন করা হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-23%2Fmsenq8ju%2Fasif-mahmud-dhaka-10.jpg?rect=0%2C0%2C722%2C481&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে ঢাকা-১০ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. জসীম উদ্দীন সরকারের সমর্থনে ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৬’ শীর্ষক সমাবেশে। ছবি: ভিডিও থেকে