১১ কনটেইনার রাসায়নিক ভুয়া ছাড়পত্র বানিয়ে গায়েব! by মাসুদ মিলাদ

জাল ছাড়পত্র বানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১১টি কনটেইনার-ভর্তি রাসায়নিক দ্রব্য সরিয়ে নিয়ে গেছেন একজন আমদানিকারকের প্রতিনিধি। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার সময় বন্দরের সিসিটি-১ গেট দিয়ে এসব কনটেইনার বের করা হয়। কাস্টম হাউসে এত বড় জালিয়াতির ঘটনা এর আগে ঘটেনি বলে জানা গেছে।


নথিপত্রে দেখা যায়, প্রায় এক কোটি ১১ লাখ টাকা মূল্যের আমদানি করা এসব পণ্যের শুল্ক-কর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৭ লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৭ টাকা। কিন্তু কাস্টম হাউসের হিসাবে এই টাকা পরিশোধের জাল কাগজ বানিয়ে শিপিং এজেন্ট ও বন্দর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আমদানিকারকের প্রতিনিধি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ (গতকাল রোববার) সকালে বিষয়টি জানার পর যাচাই করে সত্যতা পেয়েছি। পণ্য খালাসকারী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আমদানিকারকের ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের শনাক্তকরণ নম্বর লক (বন্ধ) করা হয়েছে।’
কাস্টম হাউসের নথিপত্র অনুযায়ী, ঢাকার ২ মৌলভীবাজারে অবস্থিত মেসার্স নিউ সেভেন স্টার কেমিক্যাল ভারত থেকে ১১ কনটেইনারে ২৬৪ টন সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (কস্টিক সোডা, সলিড কস্টিক সোডা ফ্লেকস) নামে এক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করে। এম ভি দরিয়ান জাহাজ থেকে এসব কনটেইনার গত মাসে বন্দরে খালাস হয়। আমদানিকারক এসব পণ্য খালাসের দায়িত্ব দেন চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে খান বিল্ডিংয়ের দোতলায় অবস্থিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এ অ্যান্ড এস এজেন্সিকে। গত ১২ ডিসেম্বর কাস্টম হাউসের শুল্কায়ন শাখা-দুই থেকে এসব পণ্যের শুল্ক হার নির্ধারণ অর্থাৎ শুল্কায়নও করা হয়। শুল্ক হার নির্ধারণ করা হয় ৬৭ লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৭ টাকা।
নিয়মানুযায়ী, এই টাকা কাস্টম হাউসে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের কাস্টমসের হিসাবে জমা দিয়ে ব্যাংক থেকে একটি নম্বর নেওয়া হয়। সেই নম্বর দেখিয়ে কাস্টম হাউসের ‘ট্রেজারি স্পিড’ শাখা থেকে পণ্য খালাসের অনুমতি বা ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
কাস্টম হাউসের সূত্র জানায়, আমদানিকারকের প্রতিনিধি এ অ্যান্ড এস এজেন্সি শুল্ক কর জমা দেওয়ার জাল ছাড়পত্র তৈরি করে। গত বৃহস্পতিবার এই ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে বলে জাল কাগজে দেখানো হয়। এই জাল ছাড়পত্র দেখিয়ে শিপিং এজেন্ট ও বন্দর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। একই দিন অতি দ্রুততায় সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সন্ধ্যার সময় বন্দরের সিসিটি-১ গেট দিয়ে কনটেইনার বের করে নেওয়া হয়।
কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, গতকাল সকালে এই জালিয়াতির ঘটনার খবর পান অতিরিক্ত কমিশনার মো. মতিউর রহমান। খবর পেয়ে তিনি যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ মুশফিকুর রহমানকে দায়িত্ব দেন। এর পরই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে।
এ প্রসঙ্গে কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মতিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাস্টম হাউসে যাতে কোনো অনিয়ম হতে না পারে সে জন্য পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কারণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি পুরোপুরি চালু করা গেলে এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটত না।’
কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, নিয়মানুযায়ী গেট দিয়ে মালামাল নেওয়ার সময় অনলাইনে ছাড়পত্র নম্বর দিয়ে শুল্ক কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না—তা যাচাই করা হয়। কিন্তু সিসিটি-১ গেটে অনলাইন পদ্ধতি অচল থাকায় বিষয়টি শনাক্ত করতে পারেননি কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
জাল কাগজপত্রে দেখা যায়, ছাড়পত্রের নম্বর দেওয়া হয়েছে ৯১৭৮। ব্যাংকে টাকা পরিশোধের নম্বর দেওয়া হয়েছে ১৫০৩। এই দুটি নম্বরই ভুয়া বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা শনাক্ত করেন। এই নম্বরে কোনো টাকা জমা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স এ অ্যান্ড এস এজেন্সিজের কার্যালয়ে ফোন করা হলে মো. রিপন নামের এক ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের মালিক আমাকে বসিয়ে রেখে বাইরে চলে গেছেন।’ বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এরপর দফায় দফায় যোগাযোগ করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
কাস্টম হাউসের নথিতে দেখা যায়, মেসার্স এ অ্যান্ড এজেন্সি কাস্টম হাউস থেকে ১৯৯৬ সালে পণ্য খালাসের লাইসেন্স পায়।
কাস্টম হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, এই প্রতিষ্ঠানের গত ছয় মাসের পণ্য খালাসের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এই প্রতিষ্ঠান খালাস করবে এমন কোনো পণ্য বন্দরে আছে কি না, তাও যাচাই করা হচ্ছে।

No comments

Powered by Blogger.