Monday, January 19, 2026

দুবাইয়ের ব্লু ভিসা বনাম গোল্ডেন ভিসা: ১০ বছরের ভবিষ্যতে দুটি ভিন্ন পথ

বিশ্বজুড়ে মেধা, পুঁজি ও উদ্ভাবনী শক্তি আকর্ষণে দেশগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দুবাই নিয়েছে এক ভিন্নধর্মী দ্বিমুখী কৌশল। করমুক্ত সুবিধার গণ্ডি পেরিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন দীর্ঘমেয়াদি আবাসনের জন্য দুটি স্বতন্ত্র ভিসা চালু করেছে- দুবাই ব্লু ভিসা ও দুবাই গোল্ডেন ভিসা। একটি পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের রূপকারদের জন্য, অন্যটি বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্য। এ খবর দিয়েছে গাল্ফ নিউজ।

এতে বলা হয়, এ দুটি ভিসাই ১০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য এবং দুবাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ গঠনে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতীক। একদিকে পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতি ও উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত মানবসম্পদকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দুবাই কেবল ক্ষণস্থায়ী সম্পদ নয়, বরং টেকসই মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চায়।

গোল্ডেন ভিসা তুলনামূলকভাবে পুরোনো ও বিস্তৃত কর্মসূচি। এটি দুবাইয়ের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ পরিকল্পনার মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ, স্টার্টআপ গঠন ও আন্তর্জাতিক করপোরেট সদর দপ্তর স্থানান্তরের মাধ্যমে এর সাফল্য পরিমাপ করা হয়।

অন্যদিকে, সম্প্রতি ঘোষিত ব্লু ভিসা একটি আরও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘নেট জিরো বাই ২০৫০’ কৌশল এবং সবুজ অর্থনীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জনের লক্ষ্যকে সরাসরি সহায়তা করে। পরিবেশবিজ্ঞানী, সবুজ উদ্যোক্তা ও জলবায়ু কর্মীদের ১০ বছরের স্থিতিশীলতা দিয়ে দুবাই নিজস্ব টেকসই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পরিবেশ আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

ব্লু ভিসা: এখানে মূল মানদণ্ড হলো টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংক্রান্ত অবদান। যোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন পরিবেশবান্ধব স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতা, পরিবেশবিজ্ঞানে পিএইচডিধারী গবেষক, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের মতো আন্তর্জাতিক এনজিওর কর্মকর্তা, জায়েদ সাসটেইনেবিলিটি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বড় প্রতিষ্ঠানে কার্বন নিঃসরণ কমানোর নেতৃত্বদানকারী নির্বাহীরা। নির্দিষ্ট বেতন বা বিনিয়োগের শর্ত নেই, এখানে মূল ‘মুদ্রা’ হলো প্রমাণিত প্রভাব।

গোল্ডেন ভিসা: এর পরিসর অনেক বিস্তৃত। এর আওতায় রয়েছেন- রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী। যারা নূন্যতম ২০ লাখ দিরহাম মূল্যের সম্পত্তির মালিক। সরকারি অনুমোদিত পরিকল্পনা বা অ্যাক্সিলারেটরের সহায়তাপ্রাপ্ত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও শীর্ষ নির্বাহী, যাদের মাসিক বেতন কমপক্ষে ৩০ হাজার দিরহাম। শিল্পী, ক্রীড়াবিদ ও গবেষকেরাও এই ভিসা পাবেন। এছাড়া মেধাবী শিক্ষার্থী- যারা উচ্চ একাডেমিক অর্জনকারী।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্লু ভিসা বৈশ্বিক অভিবাসন নীতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যেখানে জলবায়ু লক্ষ্যকে সরাসরি ভিসা নীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। গোল্ডেন ও ব্লু- এই দুই ভিসার মাধ্যমে দুবাই স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, ভবিষ্যৎ গড়তে তারা একই সঙ্গে অর্থনীতি ও পরিবেশ- দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।

mzamin

ইরান আন্দোলন ২০২৬: কেন আলাদা ও ব্যাপক? by এস এম জারিফ

ইরান এখন যে পথে হাঁটছে, সেই পথে এর আগেও অনেকবার হেঁটেছে দেশটি। প্রায় ৪০ বছর ধরে দেশটির রাজপথগুলো মানুষের ক্ষোভ, আর্তচিৎকার আর হঠাৎ নেমে আসা নীরবতার সাক্ষী হয়ে আছে। এখানকার নাগরিকদের কাছে আন্দোলন তাই নতুন কিছু নয়।

এর আগে ইরানে শিক্ষার্থীরা তাঁদের অধিকারের জন্য, ভোটাররা তাঁদের চুরি হয়ে যাওয়া ভোটাধিকার ফিরে পেতে, কখনো বা সাধারণ পরিবারগুলো দ্রব্যমূল্যের চাপ সইতে না পেরে পথে নেমে এসেছে। যুগের পর যুগ যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
২০০৯ কি ’২২ কি ’২৬—প্রতিবার গল্পটা আগে থেকেই লেখা ছিল বলে মনে হয়েছে। বিক্ষুব্ধ মানুষেরা রাজপথে নামেন, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পুরোনো ভাষায় কথা বলেন এবং অবধারিতভাবে বহিঃশত্রুর ওপর দোষ চাপান। অতঃপর আন্দোলনরত মানুষেরা বিক্ষোভের কড়া জবাব পান। শেষমেশ শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থার জয় হয়। আবার ফিরে আসে নীরবতা।

তবে যা-ই বলা হোক না কেন, এবারের বাতাসটা অন্য রকম। ইরানের শাসনব্যবস্থার গভীরে এবার কিছু একটা নড়ে উঠেছে।

ইরানে চলমান এই আন্দোলন কোনো একক রাষ্ট্রীয় নীতি বা ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া নয়। বরং দিনের পর দিন বয়ে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, চূড়ান্ত পর্যায়ের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি জমে জমে এ অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

বিভিন্ন সমীক্ষা, প্রবাসে বসবাসরত ইরানি নাগরিকদের বয়ান ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ইরানের নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরাজমান সম্পর্ক বিপর্যয়কর এক অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। এর ভেতর নতুন প্রজন্মের তরুণদের অংশগ্রহণ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এটুকু পরিষ্কার যে তরুণেরা রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের আদর্শিক ভিত্তির (যাকে ভিলায়াতে ফকীয় বা ইসলামি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধান বলা হয়ে থাকে) খুব একটা ভক্ত নয়।

রাজনৈতিক ইসলামের দুর্দিন

প্যারিস ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ ফারিদ ভাহিদ ‘লে মোঁদ’ পত্রিকায় যুক্তি দেখিয়েছেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ বা মৃত্যুশয্যায় পৌঁছে গেছে। তাঁর মতে, একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য ‘মস্তিষ্ক’ ও একটি ‘হৃদয়’ প্রয়োজন। ভাহিদের দাবি, ইরান এর দুটিই হারিয়েছে। কেননা ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের কাছে মুদ্রাস্ফীতি বা সামাজিক হতাশার কোনো সমাধান নেই। তারা কেবল সামরিক দমন-পীড়নের মাধ্যমে পেশিশক্তি দেখিয়েই সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এটিকে সব ধ্বংসের সূচনা ধরা যায়। ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সামনে নাগরিকদের বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা চালানোর ব্যাপক সক্ষমতা থাকলেও পুরো বিষয়টি আর ‘সজীব’ রাজনৈতিক সত্তার প্রতিনিধিত্ব করছে না।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (চ্যাথাম হাউস) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সানাম ভাকিলের ‘ইরানস লুমিং লিডারশিপ ক্রাইসিস’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, ইরানিরা রাজনৈতিক ইসলামের ধারণাকে বাতিল করেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও নাগরিকের আদর্শিক লড়াইয়ে নাগরিকেরা ইতিমধ্যে জয়ী হয়েছেন। তাঁরা এখন ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ চাইছেন। জনগণ এমন একটি রাষ্ট্র চাইছে যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকবে আর বাকি বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে।

এর অর্থ হলো, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন শুধু আর একটি বিক্ষোভের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। তারা এমন এক সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যে সমাজ ইতিমধ্যে মানসিকভাবে ভবিষ্যতে বসবাস শুরু করে দিয়েছে। আর সেই ভবিষ্যতে এই ধর্মকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার কোনো স্থান নেই।

ধুঁকছে ইরানের গ্র্যান্ড বাজার, হুমকির মুখে অর্থনীতি

ইরানের গ্র্যান্ড বাজারের বণিকশ্রেণি কাজার রাজবংশের আমল থেকে শুরু করে পাহলভি শাসন, এমনকি ইসলামি প্রজাতন্ত্র পর্যন্ত প্রতিটি শাসনব্যবস্থাতেই ইরানের অর্থনৈতিক স্নায়ুকেন্দ্রের ভূমিকা পালন করেছে। ইরানের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এখানকার বাজারিরা (ইরানের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ী ও বণিকশ্রেণিকে বোঝানো হয়) শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয় বরং রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় বাজারিরা ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ছাত্রদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শাহ সরকারের অর্থনৈতিক শিরা কেটে দিয়েছিলেন। পণ্যসরবরাহ বন্ধ করা ও ধর্মঘটের মাধ্যমে তাঁরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বাজারকে শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে। করছাড়, ধর্মীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে বাজারিদের আনুগত্য নিশ্চিত করা হয়।

তবে গত ডিসেম্বরের শেষে রিয়ালের দর ডলারের বিপরীতে ১৪ লাখ ৮০ হাজারে নেমে আসে। ৫০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যের চাপে এ আন্দোলন আর নাগরিকদের স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এমন অবস্থায় গ্র্যান্ড বাজার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আমদানি–নির্ভর বাজারে ডলার ছাড়া ব্যবসা অসম্ভব। রিয়ালের মানের পতনের কারণে আমদানি করা পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতা দেখা চরমে পৌঁছায়। কাপড়, যন্ত্রাংশ, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস–সহ সবকিছুর দাম কয়েক দিনের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে এর সবচেয়ে প্রকট প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের বাজারে ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট চলছে। আমিষের প্রধান চাহিদা হিসেবে পরিচিত মুরগির মাংসের দাম এতটাই বেড়েছে যে তা খাদ্যতালিকায় রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোটখাটো অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খরচ চালাতে না পেরে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাজারি ও অর্থনৈতিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের ঐক্য স্থাপিত হয়েছে। ‘বেঁচে থাকার লড়াই’ বা ‘রায়ট ফর সারভাইভাল’ নামে তাদের এ জোটবদ্ধ আন্দোলন শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ৩১ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

যখন মানুষ তাদের নিজ পরিবারকে খাওয়াতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবাহিনীর প্রতি তাদের ভয় কমতে থাকে। এ কারণে এই ক্ষুধার অর্থনীতির মধ্যে ইরানের জনগণকে রুখে দেওয়া ২০২২ সালের হিজাব আন্দোলনের চেয়ে কঠিন হবে।

ইরানের নিরাপত্তাবাহিনীও এই সংকটের বাইরে নয়। ইরানের মুদ্রার মানের পতনের কারণে বাসিজ ও আধা সামরিক বাহিনীর জন্য তাদের বেতন কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিরাপত্তাবাহিনীকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে না পারলে শাসনব্যবস্থায় ফাটল ধরতে বাধ্য।

ইরানের নেতৃত্বের সংকট

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বয়স ৮৬। তিনি প্রায় ৩৫ ধরে ক্ষমতায় আছেন। সবশেষ ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তাঁর অনুপস্থিতি ইরানকে রাজনৈতিক নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগিয়েছে। এই যুদ্ধে খামেনির শীর্ষস্থানীয় অনেক কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনা তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো এখন খামেনির মৃত্যুর মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

সাধারণ জনগণের কাছে এসব বিষয় অজানা নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান এখন পদ্ধতিগত এক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। তাঁদের ধারণা, এমন পরিস্থিতিতে উলামা–শাসিত ইসলামি শাসনব্যবস্থা থেকে কট্টর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে দেশটি। এ ধরনের রাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রণ থাকবে মূলত নিরাপত্তা কাঠামোর হাতে।

ইরান ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে ক্রমেই জাতীয়তাবাদী সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আলি আলফনেহ ‘ইরান আনভেইলড: হাউ দ্য রেভোল্যুশনারি গার্ডস ইজ ট্রান্সফর্মিং ইরান ফ্রম থিওক্রেসি টু মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ’ গ্রন্থে বিষয়টি ব্যাখা করেছেন। তাঁর মতে, আইআরজিসি বর্তমানে দেশের অর্ধেক অর্থনীতির অধিকর্তা। ফলে সংসদ ও প্রশাসনিক পদগুলোয় তাদের প্রভাব বাড়ছে। ক্ষমতার এমন বিশেষ কাঠামোকে বিশেষজ্ঞরা ‘সিকিরিউটারাইজড স্টেট’ বা সামরিকীকৃত রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেন।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউটমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো করিম সাজ্জাদপুরের ‘অটাম অব দ্য আয়াতুল্লাহ্‌জ’ শীর্ষক প্রবন্ধ অনুযায়ী, খামেনির পর ইরানে আর কোনো প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা নেই। এ শূন্যতার সুযোগে আইআরজিসি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এমন অবস্থায় তারা সরাসরি ক্ষমতায় না বসে কোনো দুর্বল নেতাকে ক্ষমতায় বসিয়ে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়তে পারে। খামেনিও ইরানের প্রিটোরিয়ান স্টেট বা সামরিক রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনার পক্ষে মত দিয়েছেন। খামেনির পরবর্তী শাসকেরা ধর্মীয় কড়াকড়ির চেয়ে পারস্য জাতীয়বাদকে বেশি গুরুত্ব দেবেন বলে মনে করেন তিনি।

নারী, জীবন ও স্বাধীনতা

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের নীতি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর ২২ বছর বয়সী মাসা আমিনির মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে ইরানে ব্যাপক সামাজিক রূপান্তরেরও সূত্রপাত ঘটে।

প্রথম দিকে নারী অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য হলেও দ্রুত তা ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জাতীয় ন্যায্যতার আন্দোলনে রূপ নেয়। সব বয়স ও শ্রেণির মানুষেরা নারীদের সঙ্গে যুক্ত হন। তেহরান থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দেয়। বাইডেন প্রশাসন ইন্টারনেট পরিষেবা প্রসারিত করার উদ্যোগ নেয়। কংগ্রেসে মাসা আমিনি হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাকাউন্টিবিলিটি অ্যাক্ট পাস করা হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ও সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সরকারি দমন–পীড়নের জবাবদিহি স্থাপনের স্বার্থে এ আইন পাস করা হয়। এ আইনের মাধ্যমে পরবর্তীকালে ইরানের কিছু নেতার বিরুদ্ধে ভিসা ও সম্পত্তিসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

জাতিসংঘের তদন্ত অনুযায়ী ইরানের নিরাপত্তাবাহিনী দমন–পীড়নের সময় পাঁচ শতাধিক মানুষকে হত্যা করে এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষকে আটক করা হয়। শেষ পর্যন্ত মাসব্যাপী চলা সহিংসতা, ভীতি ও ক্লান্তির মাধ্যমে এ বিক্ষোভকে দমন করা হয়।

ট্রাম্পের হুমকি ও ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন চালানো হলে ওয়াশিংটন দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে বারবার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন সূত্রের খবর, কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির কিছু কর্মীকে সন্ধ্যার মধ্যে ঘাঁটি ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা এবং এর জবাবে দেশটির পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহের মতে, ট্রাম্প এমন সংক্ষিপ্ত ও ক্ষিপ্র অভিযান পছন্দ করেন, যেখানে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে থাকে।

গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘তথাকথিত “সর্বোচ্চ নেতা” কোথায় লুকিয়ে আছেন, তা আমরা ঠিকঠাক জানি।’
৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে বন্দী করার ঘটনার পর তেহরানের নীতিনির্ধারকেরাও এই আশঙ্কায় ভুগছেন যে ইরানেরও এমন অভিযান চালানো হতে পারে। তবে অধ্যাপক আকবরজাদেহ মনে করেন, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানে অভিযান চালানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কঠিন হবে। কেননা এমন অভিযান চালাতে হলে মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোকে অনেক বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে।

এ ছাড়া ইরানে স্থল অভিযানের সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি ব্যয়বহুলও বটে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসের আল-জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে শিক্ষা নিয়ে ট্রাম্প নেশন বিল্ডিং বা দেশ গঠনের মতো প্রকল্প থেকে সরে এসেছেন। তিনি এখন ইরানি শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সরিয়ে দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর লক্ষ্য হবে, নতুন একটি পক্ষকে ইরানের ক্ষমতায় বসানো যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে।

ভালি নাসের মনে করেন, ট্রাম্প এমনভাবে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান যেন পারমাণবিক অস্ত্রের ইস্যুতে ওয়াশিংটনের দেওয়া কঠোর বার্তা বা শর্ত ইরান মেনে নেয়।

অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ

সামরিক এসব বিকল্পের পাশাপাশি ট্রাম্পের হাতে অর্থনৈতিক অস্ত্রেরও মজুত রয়েছে। বর্তমানে ইরান দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করলেও ট্রাম্প প্রশাসন একে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে মনোযোগী হয়েছে। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা যেকোনো দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

অর্থনৈতিক তথ্যভান্ডার ট্রেডিং ইকোনমিকস জানিয়েছে, ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলো হলো চীন, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক।

এ ছাড়া মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শক্তিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে ইরানের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা কাটাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইরানের চলমান আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগবে।

আর্তেশ বনাম আইআরজিসি

ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। একটি হলো আর্তেশ বা নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং অন্যটি হলো আইআরজিসি বা রেভোল্যুশোরি গার্ড। সেনাবাহিনী দেশের সীমান্ত রক্ষা এবং আইআরজিসি ইসলামি শাসন ও আদর্শ রক্ষায় কাজ করে।

এর আগে ইরানের সেনাবাহিনী মূলত দেশের সীমান্ত রক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খুব একটা জড়াত না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাও সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে তারা স্পষ্ট করেছে যে কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলাকে তারা অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছে এবং এ কারণেই মাঠে নেমেছে।

ইরানে অভ্যন্তরীণ দমনের প্রধান হাতিয়ার হলো আইআরজিসির অধীনস্থ বাসিজ মিলিশিয়া। গত জুনের ইসরায়েলি হামলায় বাসিজের বেশ কিছু সদর দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বিক্ষোভ দমনে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে গণ্য হওয়া বাসিজ এখন বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিলেও মুদ্রাস্ফীতির কারণে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের বেতনও এখন আর সংসার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। এ পরিস্থিতিতে আর্তেশ শুধু সীমান্ত রক্ষা করবে নাকি আইআরজিসির মতো বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাবে? এই অমীমাংসিত প্রশ্ন এখন ইরানের ক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

ইরানের সামনে কোন পথ খোলা

ইরানে বিক্ষোভের সময় সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। বিক্ষোভের মাত্রা কিছুটা কমে এসেছে। গত মঙ্গলবার এরফান সোলতানি নামের এক তরুণ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আরব স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো আলি আলফনেহ আল-জাজিরাকে বলেছেন, এমন অবস্থায় তেহরানের সামনে দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, ভেনেজুয়েলার মতো সমঝোতা করা। অর্থাৎ ট্রাম্পের সঙ্গে এমন এক দফারফায় আসা যেন মূল নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটে কিন্তু শাসনের মূল কাঠামোগুলো ঠিক থাকে। দ্বিতীয়ত, চূড়ান্ত পতন। অর্থাৎ সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক ধস, গণবিক্ষোভ ও নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যে ভাঙনের ফলে পুরো শাসনব্যবস্থার পতন।

ইরানের এবারের বিক্ষোভের ফল হিসেবে অতি দ্রুত শাসনব্যবস্থার পতন না–ও ঘটতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে এটুকু বলা যায়, শীর্ষ নেতৃত্বের বার্ধক্য, অভিজাত শ্রেণির মতবিরোধ, দীর্ঘস্থায়ী শাসন ও দমননীতি থেকে উদ্ভূত সামাজিক ক্লান্তি, তরুণ প্রজন্মের কাছে ইসলামের রাজনীতিকরণসংক্রান্ত মতাদর্শের বৈধতা খোয়া যাওয়া এবং অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ইরানকে আজ এ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, সিএনএন, লে মোঁদ, টাইম, নিউইয়র্ক টাইমস
* এস এম জারিফ, প্রথম আলোর সহসম্পাদক

এবারের আন্দোলনে ইরানের শাসনব্যবস্থার গভীরে কিছু একটা নড়ে উঠেছে।
এবারের আন্দোলনে ইরানের শাসনব্যবস্থার গভীরে কিছু একটা নড়ে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স

হাততালির রাজনীতিতে ভালো কথার জায়গা নেই by মহিউদ্দিন আহমদ

‘দশে মিলি করি কাজ/ হারি জিতি নাহি লাজ।’ সম্ভবত এটি খনার বচন। কথা হলো, কেউ হারতে চায় না। হেরে যাওয়ার জন্য কেউ কি একসঙ্গে জোট বাঁধে? একা যেটি সম্ভব নয়, জোট বেঁধে কয়েকটি পক্ষ শক্তি বাড়াতে পারে। নির্বাচনের রাজনীতিতে এই শক্তির প্রদর্শন ও ব্যবহার খুবই জরুরি।

আমাদের দেশে জোটের রাজনীতির শুরু সেই ১৯৫৪ সালে। ক্ষমতায় তখন পাকিস্তান মুসলিম লীগ। এটিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে। তার বিরুদ্ধে একজোট হয় তিনটি দল—পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফতে রব্বানী পার্টি। তারা গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। নেপথ্যে থেকে সমর্থন দেয় কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ। এ দলের কয়েকজন যুক্তফ্রন্টের টিকিটে প্রার্থী হন।

দেশে ছিল পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা। কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতা সংখ্যালঘুদের জন্য বরাদ্দ আসনেও প্রার্থী হন। এ ছাড়া মাঠে ছিল পাকিস্তান কংগ্রেস ও তফসিলি ফেডারেশন। তাদের প্রার্থীরা সবাই ধর্মীয় সংখ্যালঘু। তাঁরাও ‘অমুসলিম’ আসনে দাঁড়ান। তাঁদের ভোট দেন ‘অমুসলিম’ ভোটাররা।

যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগ ছিল সবচেয়ে বড় দল। এর বাইরে কিছু দলের নেতাদের সঙ্গে তাদের সমঝোতা ছিল, নির্বাচনে জিতলে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করবে। আওয়ামী লীগ এই সমঝোতা বাস্তবায়ন করে এক বছর পর, ১৯৫৫ সালে। দল থেকে তারা ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দেয়।

 এ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ভূমিধস বিজয় হয়। ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা ২২৮টি আসনে জয়ী হন। প্রদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, তা-ও আবার দলীয় সরকারের অধীনে, এ ছিল অভাবিত। ক্ষমতাসীনেরা কোনো কারচুপির চেষ্টা করেনি। ক্ষমতাসীন দলের প্রধান নেতা মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন হেরে যান তরুণ ছাত্রলীগ নেতা খালেক নেওয়াজ খানের কাছে।

দলীয় সরকারের অধীনেও যে ভালো নির্বাচন হতে পারে, তার একটি উদাহরণ হলো ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন। তবে এটিই প্রথম, এটিই শেষ। দলীয় সরকারের অধীনে পরবর্তীকালে কোনো নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। স্থূল ক্ষমতালিপ্সা, নিম্নরুচির রাজনীতি আর গুন্ডামি দিয়ে ক্ষমতাসীনেরা বরাবরই নির্বাচনকে প্রভাবিত করে জয় ছিনতাই করেছে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলের জয়ের প্রধান নিয়ামক ছিল তাদের জোটবদ্ধ হওয়া। এই জোটে যারা ছিল, তাদের মধ্যে আদর্শের মিল ছিল না বললেই চলে। একটা ব্যাপারে তারা একমত হয়, ক্ষমতাসীনদের হারাতে হবে। আদর্শিক মিল ও সংহতি না থাকার কারণে যুক্তফ্রন্টের আয়ু ফুরিয়ে যায়। বছর না পেরোতেই এটি মুখ থুবড়ে পড়ে এবং মারা পড়ে। তারপর দেখা যায় দলীয় রাজনীতির এক বীভৎস রূপ। পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার, গালাগাল, এমনকি মারামারির এক নির্লজ্জ নজির তৈরি হয়। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা তাঁদের স্পিকার শাহেদ আলীকে দৈহিক আঘাত করে মেরে ফেলেন। এ কলঙ্ক মুছবার নয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমরা দেখছি জোটের রাজনীতি। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রথমে দুটি জোটের দেখা মেলে—আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫-দলীয় জোট আর বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট। পরে ১৫-দলীয় জোট ভেঙে একটি ৮-দলীয় এবং একটি ৫-দলীয় জোট হয়। জোটের মধ্যে অনেক দলই ছিল বিপরীত মেরুর। তারা এককাট্টা হয়েছিল একটি ইস্যু নিয়ে, এরশাদকে হটাতে হবে। তো এরশাদ হটে গেলেন। নির্বাচনের গন্ধ নাকে এসে লাগল। ৫-দলীয় জোট কিছুদিন জাতীয় সরকারের দাবিতে হইচই করল।

আওয়ামী লীগ আর বিএনপি—দুটিই চায় একা একা ক্ষমতায় যেতে। ফলে কোনো নির্বাচনী জোট হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের মিত্রদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছিল। এই সমঝোতার ফল নগদ পেয়ে যায় বিএনপি। লাভের একটা বড় বখরা জোটে তার মিত্র জামায়াতে ইসলামীর ভাগ্যে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতসহ তিনটি দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করে মাঠে নামে। জয় পেয়ে তৈরি হয় জোট সরকার। ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার দেশে জোট সরকারের দেখা মেলে।

একটা বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট। বিএনপি আর জামায়াত যে কটি নির্বাচনে জোট করে বা জোট বেঁধে নির্বাচন করেছে, প্রতিবার তারা জয় পেয়েছে। যেবার তাদের জোট ছিল না, তারা হেরেছে। এটা দেখেই জোটের শক্তি ও মূল্য আন্দাজ করা যায়।

২০০৮ সাল থেকে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪-দলীয় জোট। কিন্তু নির্বাচনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার কারণে এগুলো গ্রহণযোগ্য হয়নি। এটি প্রথাগত জোটও ছিল না। জোটের ছোট শরিকেরা সবাই আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা আওয়ামী লীগ কবজা করে নিয়েছিল। নির্বাচনে তারা কোনো বিরোধী পক্ষকে দাঁড়াতেই দেয়নি।

এ বছর আরেকটি সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সময় আছে সাকল্যে চার সপ্তাহ। এখন পর্যন্ত মাঠে দেখা যাচ্ছে দুটি জোট। একদিকে বিএনপি জুলাই আন্দোলনের কতিপয় সহযোগীর সঙ্গে আসন সমঝোতা করে প্রার্থিতা ঠিক করেছে। সেখানে অন্যরা দল হিসেবে গৌণ। হাতে গোনা তাদের কয়েকজন নেতাকে বিএনপি আসন ‘ছেড়ে’ দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কয়েকটি দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আসনবিন্যাস চূড়ান্ত করেছে। বলতে গেলে, এটিই প্রথাগত জোট।

দুই জোটের অনেক শরিকের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। আদর্শিকভাবে তারা কেউ কেউ বিপরীত মেরুর। এটাও স্বাভাবিক। কারণ, জোট বা আসন সমঝোতা হয়েছে নির্বাচনে জিততে। নির্বাচন হয়ে গেলে এই সমঝোতা কত দিন টিকবে, বলা মুশকিল। যে পক্ষ জিতবে, তারা সরকার গঠন করে সরকারি পদ ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বিলিয়ে ‘মিত্রদের’ ধরে রাখবে। যে পক্ষ হেরে যাবে, তাদের সংহতিতে চিড় ধরতে পারে।

বিএনপির নেতৃত্বে যে জোট, সেটি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, এ জোটে বিএনপির অবস্থান পাহাড়সম। অন্যেরা খুব ছোট ও দুর্বল। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে তারা জোট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবে না। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াতের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য থাকলেও অন্যেরা মোটেও হেলাফেলার পাত্র নয়। এই জোটে নেতা বেশি। ফলে ঝামেলাও বেশি।

যে জোটই বিরোধী দলে যাক, তারা সরকারি দলকে সুস্থির থাকতে দেবে না। আমাদের দেশে ‘এজিটেশনাল পলিটিকস’-এর যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তাতে কোনো সরকারের পক্ষে শান্তিতে মেয়াদ পূরণ করা খুব কঠিন। সবাই রাজনীতিটাকে সংসদ ভবনের দেয়ালের ভেতরে না রেখে রাস্তায় নিয়ে এসেছে। সবাই চায় সব ফয়সালা রাস্তায় হোক। ‘রাজপথ ছাড়ি নাই’, এ জমানার একটা বুলন্দ স্লোগান। রাস্তা আটকে মিছিল করা বা বসে পড়া, যখন-তখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো অফিস ঘেরাও করা, এসব তো অনেক দিন ধরেই মহিমান্বিত করা হয়েছে। বক্তৃতা দেওয়ার সময় ছোট-বড় সব নেতা কথা শুরু করেন ‘সংগ্রামী ভাইয়েরা’ বলে। সংগ্রাম ছাড়া কোনো কথা নেই। যিনি যত গরম কথা যত চড়া স্বরে বলতে পারেন, তিনিই তত বড় সংগ্রামী নেতা।

অনেক অনিশ্চয়তা ডিঙিয়ে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তারপরও শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ১২ ফেব্রুয়ারির দিনটা পেরোলে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারব, দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে। আমার মনে হয়, সমস্যা শুরু হবে তার পর থেকে।

রাজনীতিটা এখন আর ভদ্র-সজ্জনদের আওতায় নেই। এটি চলে গেছে চাঁদাবাজ-গালিবাজদের হাতে। যে যত বেশি গাল দিতে পারে, সে তত বেশি হাততালি পায়। হাততালির রাজনীতিতে সুবচনের জায়গা নেই।

* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

হাততালির রাজনীতিতে ভালো কথার জায়গা নেই

ইরানে আন্দোলন নিয়ে বামপন্থীরা নীরব কেন by ইয়াশা মাউঙ্ক

অনেকে আশঙ্কা করছেন, ইরানে চলমান আন্দোলন খুবই খারাপ পরিণতির দিকে যেতে পারে। নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর সিদ্ধান্তে কয়েক হাজার মানুষ পর্যন্ত নিহত হতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ক্ষমতা অসুস্থ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হাত থেকে বিপ্লবী গার্ডের হাতে চলে যেতে পারে।

এতে হয়তো নারীদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল হবে, কিন্তু জনগণের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে। এমনকি গণতন্ত্রে রূপান্তর ঘটলেও তার ফল দীর্ঘস্থায়ী না–ও হতে পারে। মিসর থেকে তিউনিসিয়া পর্যন্ত ব্যর্থ গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতাগুলো তেমনই বলে।

তবু যাঁরা স্বাধীনতা, সাম্য ও নারীর মৌলিক অধিকারে বিশ্বাস করেন, তাঁদের সহানুভূতি থাকা উচিত ইরানের কোটি কোটি সাহসী মানুষের প্রতি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে এই ঐতিহাসিক আন্দোলন নিয়ে একধরনের নীরবতা দেখা গেছে। এই নীরবতা স্পষ্ট ছিল মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে।

ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন থেকে ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠানই এ মুহূর্তের গুরুত্ব বুঝতে অস্বাভাবিক রকম ঢিলেমি করেছে। আরও খারাপ বিষয় হলো, যখন তারা ঘটনাগুলো কাভার করেছে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবাদের গুরুত্ব খাটো করে দেখিয়েছে। কিছু ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে এমন মনোভাবও দেখা গেছে, যেন তারা দেশের নির্মম শাসনব্যবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল।

প্রতিবাদের শুরুর দিকেই দ্য গার্ডিয়ান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির একটি মতামতধর্মী লেখা প্রকাশ করেছিল। বিশ্বের বামপন্থী সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলোতে এই নীরবতা আরও বেশি চোখে পড়েছে। শনিবার সকালে আমি যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী ধারার প্রধান প্রকাশনাগুলোতে ইরান বিষয়ে কিছু উল্লেখ আছে কি না, খুঁজে দেখেছি। দ্য নেশন, দ্য নিউ রিপাবলিক, জ্যাকোবিন, স্লেট, এমনকি ডিসেন্টের ওয়েবসাইটেও কিছুই ছিল না।

অন্য অনেক বিষয় কেন বেশি মনোযোগ পাচ্ছে, তার কিছু সরল ব্যাখ্যা আছে। ভেনেজুয়েলায় কী ঘটছে, মিনেসোটায় কী হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে হোয়াইট হাউস থেকে প্রতিদিন যে নানা ধরনের অগ্রহণযোগ্য ঘটনা ঘটছে, সেগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের মনোযোগ দেওয়া যুক্তিসংগত। পাশাপাশি এমন একটি দেশ নিয়ে প্রতিবেদন করা সত্যিই কঠিন, যেখানে বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয় এবং যেখানে সারা দেশেই এখন ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি এত কঠিন ছিল কোনো স্টাফ লেখক দিয়ে ইরানে কী ঘটছে তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখা? কিংবা প্রবাসে থাকা কোনো ইরানির কাছ থেকে তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মতামতধর্মী লেখা সংগ্রহ করা?

এই নীরবতা মোটেও কাকতালীয় নয়। এটি একটি সচেতন বা অচেতন সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি না এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সচেতনভাবে নেওয়া হয়েছে। তবু এর শিকড় গিয়ে মেলে একেবারে সহজ একটি হিসাবের কাছে, যা জর্জ অরওয়েলের সময় থেকেই বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পিছু ছাড়েনি।

অনেকসংখ্যক প্রগতিশীল ও বামপন্থীর কাছে তাদের মূল অঙ্গীকার কোনো নীতি বা পৃথিবীকে বদলানোর স্বপ্ন নয়, বরং তাদের বিশ্বাস হলো, নিজেদের দেশ ও সমাজই গভীর অকল্যাণের মূল উৎস। এতে তাদের মনে একধরনের সহজ শত্রু-মিত্রের ধারণা তৈরি হয়। অরওয়েল তাঁর সময়ের কিছু বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে যেমন বলেছিলেন, ‘তাদের প্রকৃত কিন্তু অস্বীকৃত প্রেরণা ছিল পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা ও স্বৈরতন্ত্রের প্রতি মোহ।’

গত এক সপ্তাহে এমন কিছু উদ্ভট বামপন্থীকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল না, যারা ইরানের প্রতিবাদকারীদের সাম্রাজ্যবাদের অসহায় হাতিয়ার বলে আখ্যা দেয়। এদের কেউ কেউ আবার নিকোলা মাদুরো যে স্বৈরশাসক, সেটা স্বীকার করতে চায় না। তারা খামেনি বা মাদুরোর প্রশংসা না করলেও তাদের শাসনব্যবস্থার পতনও চায় না।

আমি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়ার পর থেকেই নিজেকে বামপন্থী মনে করি। ১৩ বছর বয়সে আমি জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দিয়েছিলাম। তখন যেসব আদর্শে বিশ্বাস করতাম, আজও তার অনেকগুলোতেই বিশ্বাস করি।

আন্তর্জাতিক সংহতিতে বিশ্বাস করি, উদার কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করি, বর্ণবিদ্বেষ, জাতিগত নিধন ও যুদ্ধকে সর্বোচ্চ অশুভ বলে মনে করি। আমি আবারও এমন একটি গণ-আন্দোলনের অংশ হতে চাই, যা নীতিনিষ্ঠভাবে এই মূল্যবোধগুলোর পক্ষে দাঁড়ায়। কিন্তু যে বামপন্থা তেহরান ও ইরানের অন্যান্য শহরের রাস্তায় নামা সাহসী নারী ও পুরুষদের প্রতি সমর্থন জানাতে অক্ষম, তার সঙ্গে আমার মিল খুবই কম।

* ইয়াশা মাউঙ্ক, ইংরেজি সাময়িকী পারসুয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
- পারসুয়েশন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তারে অনূদিত

ইরানে বিক্ষোভ
ইরানে বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

খাদের কিনারায় ইরান, ঘুরবে নাকি পতন: বিক্ষোভে নিহত ৫ হাজার

ইরানে রিয়ালের দরপতন ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হওয়ার পর ব্যাপক সহিংসতা ও রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটেছে। ২২ দিনের এ বিক্ষোভ দমনে নির্বিচারে গুলি, ইন্টারনেট বন্ধ ও গণগ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। এ আন্দোলনে এ পর্যন্ত ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারি সূত্র বলছে। যদিও কানাডাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল পোস্ট বলছে, এ সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি। এ হত্যাযজ্ঞের জন্য ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে খামেনি শাসনের পরিবর্তন চেয়ে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার আহ্বান জানান। একদিকে দেশে আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানি, বিক্ষোভকারীদের প্রবল বিরোধিতা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের চাপ—এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইরান খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি?

ন্যাশনাল পোস্টের এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদন বলা হয়েছে, দমন-পীড়নের মুখে বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে এসেছে। এ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘট ও নিরাপত্তা বাহিনীতে ভাঙন বা বিরোধ জরুরি। আপাতত সেসব লক্ষণ স্পষ্ট নয়। কিন্তু এত প্রাণহানির শোক ও তরুণদের ক্ষোভ সহজে যাবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ক্ষোভ ও ব্যাপক প্রাণহানি সত্ত্বেও ইরানের প্রশাসন টিকে গেলেও এটা শাসকের জন্য বড় ধাক্কা। এ সংকটের সত্যিকার সমাধান না করলে বা প্রশাসন এর গভীরতা না বুঝলে সামনে আরও বিপদ বাড়বে।

ইরানি রিয়ালের দরপতন ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে বিক্ষোভ শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। পরে এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ অংশ নেয়। একপর্যায়ে এটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। এতে প্রকাশ্য সমর্থন দেয় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। সে সময়ে বিক্ষোভ দমনে কঠোর হয় প্রশাসন। বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধ নেবে বলে হুমকি দেন ট্রাম্প। বিষয়টি নিয়ে পাল্টাপাল্টি হুমকি চলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে। তবে শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের সহায়তা না করায় ট্রাম্প বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আন্দোলনকারীরা। এনডিটিভি বলছে, বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, তিনি (ট্রাম্প) আমাদের বোকা বানিয়েছেন, আমাদের প্রতারিত করেছেন।

এর আগের দিন খামেনি বলেন, হাজারো হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দায়ী। হাজারো মৃত্যুর কথা ‘স্বীকার’ করে ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে খামেনি সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ‘হতাহতের ঘটনা, ক্ষয়ক্ষতি ও অপপ্রচারের’ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। তবে জবাব দিতে দেরি করেননি ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে তিনি বলেন, ‘ইরানে বর্তমান শাসনকাঠামো ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় এসে গেছে। এখন নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে।’ 

ছবি : সংগৃহীত

পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক যেসব ঝুঁকি তৈরি করছে by মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। তবে সম্প্রতি একটি ভাইরাল ভিডিও নতুন এই ব্যবস্থাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। প্রথম আলো (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) জানায়, বাহরাইনের ঠিকানাসংবলিত বহু পোস্টাল ব্যালট এক বাসায় গণনা করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ফেসবুকে না ছড়ানোর অনুরোধও শোনা যায়।

এরপর লন্ডনভিত্তিক আল–জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আরও দুটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে দেখা যায়, সৌদি আরব ও কুয়েতেও একই ধরনের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে; কিছু ব্যালট অন্যের কাছে পাওয়া নিয়ে প্রবাসী শ্রমিকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, এসব ভিডিওও ফেক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নয়।

ঘটনাটি নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে এবং তদন্ত চলছে। তবে বাস্তবতা হলো, ভোট শুধু গণনার প্রক্রিয়া নয়; ভোট একই সঙ্গে জন–আস্থার প্রতীক। তাই বাহরাইনের ঘটনাটি একক ভিডিও হয়ে শুরু হলেও দ্রুতই এটি প্রবাসী ভোটব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

প্রবাসী ভোটিং আসলে কীভাবে হচ্ছে?

অনেকেই মনে করেন, প্রবাসীরা দূতাবাসে গিয়ে ভোট দেন এবং দূতাবাস তা দেশে পাঠায়। বাস্তবে বাংলাদেশে প্রবাসী ভোটদান বর্তমানে দূতাবাসভিত্তিক শারীরিক ভোট নয়; এটি ডাকযোগে ভোটদান পদ্ধতি।

নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপটি মূলত নিবন্ধন ও ব্যালট ট্র্যাকিংয়ের জন্য। অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি মূলত এমন: প্রবাসী ভোটার অ্যাপে নিবন্ধন/এনরোলমেন্ট করলে ডাকযোগে ব্যালট ভোটারের বিদেশি ঠিকানায় যায়। ভোটার ব্যালটে ভোট দিয়ে সেটি আবার ডাকযোগে বাংলাদেশে ফেরত পাঠান।

এই প্রক্রিয়ায় দূতাবাস বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতাকারী—এমন নির্দেশনা কমিশনের নথিতে নেই; বরং পুরো ব্যবস্থার নির্ভরতা ডাকব্যবস্থা ও ঠিকানার নির্ভুলতার ওপর।

ঠিকানার বাস্তবতা

ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোকে আমাদের সংবেদনশীলভাবে বিচার করতে হবে। শ্রমঘন দেশগুলোয় বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, অনেক শ্রমিক একই বাসা, ফ্ল্যাট বা ক্যাম্পে বসবাস করেন। ফলে একই ঠিকানা একাধিক মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

আবার মালয়েশিয়ার মতো দেশে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক অনিয়মিত অবস্থায় থাকায় স্থায়ী ঠিকানা, বৈধ ভাড়া চুক্তি বা নিয়মিত পোস্টাল–সুবিধা অনেক সময়ই তাঁদের থাকে না। সে কারণে কারও সহকর্মী বা পরিচিত ব্যক্তির ঠিকানা ‘কমন অ্যাড্রেস’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঘটনাও দেখা যায়।

নির্বাচন কমিশন অ্যাপে ঠিকানা পূরণের ক্ষেত্রে সতর্ক করেছে; বর্তমানে অবস্থানরত ঠিকানা দিতে হবে, রাস্তা-বিল্ডিং-ব্লক/এলাকা স্পষ্টভাবে লিখতে হবে এবং পোস্টাল/জিপ কোড নির্ভুল রাখতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে অনেক অভিবাসী শ্রমিক স্বল্পশিক্ষিত হওয়ায় ইংরেজিতে ঠিকানা লেখা, পোস্টাল কোড বোঝা কিংবা কোন ঠিকানাটি ব্যবহার করা উচিত—এসব বিষয়ে বিভ্রান্ত হন। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগে দেশে কিছু অনানুষ্ঠানিক ‘সেন্টার’ বা ‘তৃতীয় পক্ষ’ গড়ে ওঠে, যারা শ্রমিকদের হয়ে অনলাইনে আবেদন বা অ্যাপ ফিলআপ (পূরণ) করে দেয়।

এতে কিছু সুবিধা মিললেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়; ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা এবং ভোটসংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়া অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়তে পারে। তখন প্রশ্ন ওঠে, এই ব্যবস্থায় যে অনৈতিক প্রভাব পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?

এই পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব, কুয়েত ও বাহরাইনের ঘটনায় প্রথমেই খতিয়ে দেখতে হবে; একটি বাসায় অনেক পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার পেছনে ঠিকানা-সংক্রান্ত বাস্তবতা কাজ করেছে, নাকি অন্য কোনো অনিয়ম রয়েছে?

তবে ঠিকানার যুক্তি দেখিয়ে বিষয়টি পাশ কাটানোও ঠিক হবে না। কারণ, একই জায়গায় ব্যালট পাঠানো স্বাভাবিক হলেও একটি ব্যক্তিগত বাসায় এতগুলো ব্যালট একসঙ্গে জমা হওয়া বা গণনা হওয়া অস্বাভাবিক।

এখানেই তদন্তের মূল বিষয় এবং এখান থেকেই আস্থার সংকট তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভোট ডাকযোগে দেশে পৌঁছানোর পর স্থানীয় পোস্ট অফিসসহ মধ্যবর্তী পর্যায়ে অনিয়ম হবে না—এই নিশ্চয়তাও জনমনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভোট নিয়ে আমাদের সমাজ-মনস্তত্ত্ব

বাংলাদেশি সমাজ ভোটের প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ভোটের অধিকার এখানে মানুষ কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, ব্যক্তিগত সম্মান হিসেবেও দেখে। তাই ভোটসংক্রান্ত সন্দেহ মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়ায়। এই সন্দেহপ্রবণতা কোনো ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি বহু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা একটি জাতীয় মনস্তত্ত্ব।

এখানে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথাও মনে রাখতে হবে। সেই আন্দোলনের পেছনে অন্যতম বড় বাস্তবতা ছিল, জনগণের ভোটাধিকার দীর্ঘদিন কার্যকরভাবে সীমিত হয়ে পড়া এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ফলে ভোট নিয়ে মানুষের আবেগ আরও তীব্র হয়েছে এবং ভোট–সম্পর্কিত যেকোনো ঘটনা এখন সহজেই বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি বইতে বলেছেন, রাষ্ট্র টিকে থাকে বৈধতার ওপর; বৈধতা দুর্বল হলে শাসন ও প্রতিষ্ঠান প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অতএব, ভোটপ্রক্রিয়ায় সন্দেহ তৈরি হলে সেই বৈধতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এ কারণেই একটি ভিডিও এত বড় রাজনৈতিক আলোড়ন তৈরি করতে পারে।

অন্যান্য দেশের ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়—প্রবাসী ভোটিং কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়; সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ভোটের গোপনীয়তা ও ‘চেইন অব কাস্টডি’ (ভোট কাগজটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কার কার হাতে গেল) কীভাবে সুরক্ষিত করা হচ্ছে।

ফিলিপাইন

ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা দেখায়—প্রবাসীদের ভোট কেবল একটি নির্বাচনপ্রক্রিয়া নয়; এটি প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির একটি শক্ত কাঠামো। এ উদ্দেশ্যে ফিলিপাইন ২০০৩ সালে ‘বিদেশে অবস্থানরত ভোটার আইন’ বা রিপাবলিক অ্যাক্ট ৯১৮৯ প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোটদানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে এই কাঠামো আরও দৃঢ় হয়, কারণ রিপাবলিক অ্যাক্ট ৯১৮৯ সংশোধন করে ২০১৩ সালে রিপাবলিক অ্যাক্ট ১০৫৯০ প্রণয়ন করা হয়, যা ওভারসিস ভোটিং ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করে। (সূত্র: সিনেট ইলেকটোরাল ট্রাইব্যুনাল ও জুডিশিয়ারি ই-লাইব্রেরি, ফিলিপাইনস)

এই আইনের অধীনে বিদেশে থাকা ফিলিপাইন নাগরিকেরা নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রবাসী ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করতে পারেন এবং সাধারণভাবে ভোট প্রদান হয় সংশ্লিষ্ট দূতাবাস/কনস্যুলেট পরিচালিত ওভারসিস ভোটিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। (সূত্র: ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স, ফিলিপাইনস)

ফিলিপাইনের প্রবাসী ভোটব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো ভোটার উপস্থিতি (টার্নআউট) কম। সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল/ইন্টারনেটভিত্তিক ভোটের দিকে অগ্রসর হওয়ায় প্রবাসী ভোটিং আরও সহজ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভোট জালিয়াতি’ জাতীয় অভিযোগ ও সন্দেহও বেড়েছে। (সূত্র: এএফপি ফ্যাক্টচেক, ৪ মে ২০২৫)

ফিলিপাইন নির্বাচন কমিশন (কমেলেক) বিভিন্ন সময় ‘অনলাইন ভোটে কারচুপি’ জাতীয় অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও বাস্তবতা হলো ডিজিটাল ভোটিং নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হওয়ামাত্রই নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে (সূত্র: ফিলিপাইন ডেইলি ইনকোয়ারার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৫)

মেক্সিকো

মেক্সিকোতে প্রবাসী ভোটিংকে জাতীয় বৈধতা ও নাগরিকত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হয়; রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শুধু ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে চায় না। মেক্সিকোর উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তারা প্রবাসী ভোটকে একক পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ধাপে ধাপে বহু মাধ্যমভিত্তিক (ডাকযোগে, দূরবর্তী পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দূতাবাস/কনস্যুলেট) ভোটিং ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়েছে।

বিদেশে থাকা মেক্সিকানদের ভোটার নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা করে দেশটির ন্যাশনাল ইলেকটোরাল ইনস্টিটিউট (আইএনই) এবং নির্দিষ্ট নির্বাচনে প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। (সূত্র: সেক্রেতারিয়া দে রেলাসিওনেস এক্সতেরিওরেস, মেক্সিকো)

তবে এসিই ইলেকটোরাল নলেজ নেটওয়ার্ক/প্রজেক্ট ২০২৫ রিপোর্ট এবং ইউএনএএম-এর নর্থ আমেরিকা গবেষণা কেন্দ্রের (সিসান) ২০২৫ বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয়, মেক্সিকোর প্রবাসী ভোট চালুর প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন বিতর্কের মধ্য দিয়ে গেছে এবং শুরুতে ডাকযোগে ভোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছিল।

ডাকযোগে ব্যালট পৌঁছানো–ফেরত পাঠানো, ঠিকানা ও ডেলিভারি জটিলতা এবং কিছু কড়াকড়ি শর্ত প্রবাসীদের অংশগ্রহণকে সীমিত করেছে। ফলে ভোটাধিকার থাকলেও বাস্তবে ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।

শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। দেশটি এখনো প্রবাসী ভোটাধিকার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, তারা শুধু প্রযুক্তিগত বা আইনগত দিক নয়, এই সিদ্ধান্ত সমাজে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াবে কি না এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ওপর জন–আস্থা কীভাবে প্রভাবিত হবে—এসব বিষয়ও গভীরভাবে বিবেচনা করছে। ফলে প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও শ্রীলঙ্কা তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং প্রবাসী ভোটিং চালুর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে।

শেষ কথা

ফিলিপাইন, মেক্সিকো বা শ্রীলঙ্কা অভিজ্ঞতা বলে, প্রবাসী ভোটব্যবস্থা প্রযুক্তি দিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে টিকে থাকে। বাংলাদেশে এটি নতুন উদ্যোগ। কিন্তু ভোট নিয়ে আমাদের সমাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল; শুরুতেই যদি প্রবাসী ভোট কারচুপির সন্দেহে আক্রান্ত হয়, তবে এ ব্যবস্থাটি প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এটি শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এর বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি আছে। রেমিট্যান্স ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্বল হবে। ভোট নিয়ে সন্দেহে বিদেশে শ্রমিকদের পারস্পরিক বন্ধন ভেঙে গেলে সংঘাত বাড়বে আর নিয়োগদাতা দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়া নিয়েও নতুন করে ভাবতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং প্রবাসী নেতৃত্ব—সবার দায়িত্ব হলো এই ব্যবস্থাকে কারচুপি-অনিয়ম থেকে রক্ষা করা।

* মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার, শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক যেসব ঝুঁকি তৈরি করছে

প্রতীকী সাফল্যের গল্প দিয়ে নয়, বরং টেকসই জাতীয় উন্নয়ন দরকার: জাইমা রহমান

‘নিরাপত্তা, সুরক্ষা, পরিবহন ক্ষেত্র—সবকিছুই মূলত পুরুষদের নিরাপদ রাখা ও সফল হওয়ার জন্যই নকশা করা হয়েছে। নারীরা এর মধ্যে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। এই পৃথিবী শুধু পুরুষদের সফল হওয়ার জন্য নয়, এটি নারীদের জন্যও। তাই আমাদের সামনে এগিয়ে আসতে হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন বিএনপির সদ্য নিযুক্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। আজ রোববার বিকেলে এক নীতিনির্ধারণী সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি এ কথাগুলো বলেন। তিনি নিজেই জানালেন, এটাই কোনো নীতি সংলাপে তাঁর প্রথম অংশগ্রহণ।

তারেক রহমানের সঙ্গে গত ১৭ বছর লন্ডনে ছিলেন মেয়ে জাইমাও। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাবা–মায়ের সঙ্গে তিনিও দেশে ফেরেন। ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন: পলিসি, পসিবিলিটি অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ’ (নারীর হাতে জাতির নির্মাণ: নীতি, সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ) শীর্ষক ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে এই নীতি সংলাপের আয়োজন করে ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভ। আলোচনায় অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এই সংলাপে প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা আবেদ। তরুণেরা অংশ নেন মুক্ত আলোচনায়। জাইমা রহমানের প্রতি তাঁদের প্রশ্ন ছিল জলবায়ু পরির্বতনজনিত ক্ষেত্রে নারীর ঝুঁকি, অনলাইনে হয়রানি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি প্রসঙ্গে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক কাজী জেসিন।

প্রথমে লিখিত বক্তব্য ও পরে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন জাইমা রহমান। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমাকে আজ সুযোগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের নীতিগত বিষয়ে কথা বলার জন্য। আমি এমন কেউ নই, যার কাছে সব সমস্যার সব উত্তর আছে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সবার মধ্যেই সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করার অন্তর্নিহিত শক্তি আছে।’

জাইমা রহমান বলেন, ‘আজকের এই সংলাপ নারীরা কীভাবে জাতি গঠন করছে, সে বিষয়ে। কিন্তু ভবিষ্যৎ গঠনের কথা বলার আগে আমাদের সৎভাবে বাংলাদেশের নারীদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে কথা বলতে হবে, যে বাস্তবতা তাদের জীবনকে গড়ে দিচ্ছে। সমাজে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা এসেছে আমার পরিবার থেকে, যেমনটা আমাদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই হয়। নীতি, আইন বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানার অনেক আগেই আমাদের ঘরই ছিল আমাদের প্রথম শ্রেণিকক্ষ।’

এ সময় জাইমা রহমান নারীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দাদা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে দাদি খালেদা জিয়া যেভাবে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি চালুসহ বিভিন্ন ভূমিকা নিয়েছিলেন, চিকিৎসক মায়ের পেশাগত দায়িত্ব পালন, নানির সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড, নারীর ক্ষমতায়নে বাবার ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

জাইমা রহমান বলেন, ‘আমার দাদা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বুঝতেন যে নারীদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। দাদুর একটি গল্পের কথা মনে পড়ে। দাদু যখন লন্ডনে আমাদের সঙ্গে ছিলেন, একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, নাইজেরিয়ার একজন নার্স তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন এবং বলেছিলেন তাঁর দেশ মেয়েদের শিক্ষায় খালেদা জিয়ার মডেল অনুসরণ করে উপকৃত হয়েছে।’

নারীর সমতায় পুরুষের ভূমিকা পালনের ওপর জোর দিয়ে জাইমা রহমান বলেন, ‘আমাদের মধ্যে যেসব পুরুষ আছেন—আমাদের বাবা, ভাই, ছেলে, স্বামী, সহকর্মী ও বন্ধুরা—নারীর অধিকারের প্রতি আপনাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের সাফল্যকে উদ্‌যাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমতা কেবল কথার ওপর টিকে থাকতে পারে না। যদি ব্যবস্থা ও প্রত্যাশা স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে নারীদের ত্যাগের ওপরই নির্ভর করে চলে, তবে বৈষম্য অবিরামভাবে চলতেই থাকবে। বিশেষ করে বাবাদের এই চক্র ভাঙার ক্ষেত্রে একটি অনন্য ভূমিকা আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি একমাত্র সন্তান এবং আমার মা–বাবা কখনোই আমাকে এমন অনুভূতি দেননি যে তাঁরা মেয়ের বদলে ছেলে চাইতেন। একবার কেউ এমন প্রশ্ন করায় আমার বাবা তাকে বকেও দিয়েছিলেন।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘তিনি (বাবা) বুঝতেন যে ঘরে আমি সম্মান ও যত্নে বড় হলেও বাইরের পৃথিবী সব সময় একই রকম হবে না। তাই তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, আমি যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই পৃথিবীর মুখোমুখি হতে পারি।’

জাইমা রহমান বলেন, ‘যখন নারীদের প্রান্তে ঠেলে না দিয়ে স্বাগত জানানো হয়, তখন তারা শুধু নিজেদের জীবনই বদলায় না, তারা বদলে দেয় তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং জাতির ভবিষ্যৎও। বাংলাদেশ যদি প্রকৃত অগ্রগতি চায়, তাহলে প্রতীকী সাফল্যের গল্প দিয়ে নয়, বরং টেকসই জাতীয় উন্নয়ন দরকার। ক্ষমতায়ন শুধু শ্রেণিকক্ষ, শুধু অফিস বা শুধু নীতিনির্ধারণে থেমে থাকতে পারে না। এটি পৌঁছাতে হবে আমাদের ঘরে, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং আমাদের মানসিকতায়। এর দায়িত্ব আমাদের সবার।’

প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে জাইমা রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানচ্যুতির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন নারীরা। পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ৭৮ শতাংশ নারী অনলাইনে হয়রানির শিকার হন। বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে। এটি একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। আইনি সুরক্ষা যথেষ্ট নয়, অভিযোগ করার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সুরক্ষা নেই। নিরাপত্তা, সুরক্ষা, পরিবহন ক্ষেত্র—সবকিছুই মূলত পুরুষদের নিরাপদ রাখা ও সফল হওয়ার জন্যই নকশা করা হয়েছে। এগুলো আসলে নারীদের জন্য তৈরি নয়। নারীদের এসবের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। নারীদের জন্য প্রবেশগম্যতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। অনেক নারী খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন তাঁরা পদোন্নতির কাছাকাছি পৌঁছে যান, তখন পারিবারিক দায়িত্ব, শিশু লালন–পালন ইত্যাদির কারণে কর্মজীবন ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ‘কিছু বিষয় পুনর্নকশা করা যেতে পারে, যাতে সমাজে নারীরা আরও ভালোভাবে সফল হতে পারে। এই পৃথিবী শুধু পুরুষদের সফল হওয়ার জন্য নয়, এটি নারীদের জন্যও। তাই আমাদের সামনে এগিয়ে আসতে হবে।’

‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন: পলিসি, পসিবিলিটি অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বক্তব্য দেন জাইমা রহমান। আজ রোববার বিকেলে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে
‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন: পলিসি, পসিবিলিটি অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বক্তব্য দেন জাইমা রহমান। আজ রোববার বিকেলে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে। ছবি: মীর হোসেন

যে কারণে নতুন বন্ধু খুঁজছেন জার্মান চ্যান্সেলর by সরাফ আহমেদ

তুষারময় শীতকে পেছনে ফেলে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস দুই দিনের সফরে ভারতে গেছেন। সফর শুরুর দিনেই তিনি জানিয়েছেন, জার্মানি ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। দুই দেশের লক্ষ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও শক্তিশালী করা। তবে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ও একমুখী পররাষ্ট্রনীতিই কি তার পুরোনো মিত্রদের নতুন বন্ধু খুঁজতে বাধ্য করছে?

জার্মানির গণমাধ্যমগুলো এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে জার্মানি যখন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় জার্মান চ্যান্সেলরের ভারত সফর স্পষ্টতই গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে।

এই সফরের কয়েক দিন আগেই, ৮ জানুয়ারি, জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার বার্লিনে তাঁর ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ব যেন ‘লুটেরাদের আড্ডায়’ পরিণত না হয়। বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ভাঙনের দিকে নীরব দর্শক হয়ে না থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশগুলোকে বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসতে রাজি করাতে হবে।

জার্মানির প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের সুর ধরেই ভারত সফররত চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, ভারত যেন কৌশলগত ক্ষেত্রে কেবল রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, জার্মানি ভারতের সঙ্গে সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।

জার্মানি সরকারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই সফরকে বার্লিন বিশেষ সম্মানের নিদর্শন হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে ভারত সরকারও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে চ্যান্সেলর তাঁর প্রথম এশিয়া সফরে চীনকে অগ্রাধিকার না দিয়ে আগে ভারতে এসেছেন। যদিও আগামী ফেব্রুয়ারিতে তাঁর চীন সফরের কথা রয়েছে, তবু ভারত সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য দিল্লির কাছে পরিষ্কার বলে মনে করা হচ্ছে।

সফরের শুরুতে চ্যান্সেলর সরাসরি রাজধানী নয়াদিল্লিতে না গিয়ে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটে। মোদির আমন্ত্রণে সেখানে তিনি একটি ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেন এবং ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা মহাত্মা গান্ধীর একটি স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন। রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী কর্মসূচিকে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রকাশের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভারতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ টোবিয়াস শলৎসের মতে, চ্যান্সেলরের এই সফরের সময়টি কৌশলগতভাবে অনুকূল। তাঁর ভাষায়, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন জোট ও অংশীদারত্ব গঠনের প্রয়োজন তৈরি করেছে, আর সেই প্রেক্ষাপটেই জার্মান সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ভারত ও জার্মানির মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে এই জায়গায় যে তারা এমন এক বিশ্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে চীন একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে সরে যাচ্ছে এবং রাশিয়া ক্রমেই আরও বেশি সমস্যাপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে ভারতের সঙ্গে জার্মানির মতভেদও রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। ভারত এখনো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রাশিয়া থেকে আমদানি করে। কিন্তু টোবিয়াস শলৎসের মতে, রাশিয়া ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদার নয়।

জার্মানির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল এআরডি বলছে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জার্মানি মনে করছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের জন্যও জার্মানি ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট অর্থনীতি, গবেষণা এবং বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ। চ্যান্সেলর মের্ৎস ভারতে অস্ত্রশিল্পে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে চান এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বুন্দেসটাগে জার্মানি-ভারত সংসদীয় দলের দীর্ঘদিনের সদস্য ডির্ক ভিসে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা ক্রমে নানা সমস্যায় পড়ছেন, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে হঠাৎ করে ভিসা বাতিলের ঘটনা বাড়ছে। তাঁর মতে, এসব শিক্ষার্থীকে আরও বেশি করে জার্মানির দিকে আকৃষ্ট করা উচিত। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জার্মানি ও ভারতের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৬০ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থী রয়েছেন। এই সফরের সময় স্বাস্থ্যসেবা খাতে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সফরের দ্বিতীয় দিনে চ্যান্সেলর মের্ৎস জার্মানির শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বেঙ্গালুরুতে শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করবেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি এবং কাঁচামাল খাতে ভারত জার্মানির কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

দুই দিনের এই সফরে ভারত ও জার্মানি একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে ভারতে দুই হাজারেরও বেশি জার্মান কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিগুণ হয়ে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও চীনের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য এখনো এর পাঁচ গুণ, তবু ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক দ্রুত, এবং সেই প্রবৃদ্ধিতে অংশ নিতে চায় জার্মানি।

চ্যান্সেলর মের্ৎস ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবেও ভারতে এসেছেন। দীর্ঘ কয়েক বছর আলোচনার পর জানুয়ারির শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জার্মানির পত্রিকা ডি সাইট লিখেছে, এই সফর ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নতুন বন্ধু খোঁজার’ অংশ। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ এবং শীতল যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জার্মানির সরকার এই নির্ভরতা কমাতে চায়। একই সঙ্গে ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা এবং সেই বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাও বার্লিনের কৌশলের অংশ।

সময়টি উভয় দেশের জন্যই অনুকূল বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে, যা জার্মানির ক্ষেত্রেও বিভিন্নভাবে প্রযোজ্য। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে নির্বিঘ্নে তেল কিনছে। মাত্র এক মাস আগে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি যেভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, প্রায় একই উষ্ণতায় স্বাগত জানানো হয়েছে জার্মান চ্যান্সেলর মের্ৎসকেও।

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক থেকে জার্মানির সরকার ঠিক কী অর্জন করতে চায়, আর ভারত সত্যিই রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। তবে নতুন বিশ্বব্যবস্থায় জার্মানি যে নতুন মিত্র খুঁজছে, তা এই সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

* সরাফ আহমেদ, প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি। ই–মেইল: sharaf.ahmed@gmx.net
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ফাইল
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ফাইল ছবি: রয়টার্স

সুন্দরবনে ১০০ কেজি হরিণের মাংস ও ৪ হাজার মিটার ফাঁদ জব্দ

প্রকাশ ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ঃ সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে ১০০ কেজি হরিণের মাংস ও প্রায় ৪ হাজার মিটার হরিণ শিকারের ফাঁদ জব্দ করেছে কোস্টগার্ড। গতকাল সোমবার খুলনার কয়রা উপজেলার আওতাধীন সুন্দরবনের ঘোলের খাল–সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব মাংস ও ফাঁদ জব্দ করা হয়।

কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল বিকেল চারটার দিকে কোস্টগার্ডের একটি দল কয়রায় সুন্দরবনের কাগাদোবেকি টহল ফাঁড়ির ঘোলের খাল–সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় ওই এলাকা থেকে ১০০ কেজি হরিণের মাংস এবং প্রায় ৪ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে শিকারিরা বনের ভেতরে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

উদ্ধার করা হরিণের মাংস ও শিকারের ফাঁদ পরবর্তী আইনি ব্যবস্থার জন্য বন বিভাগের কাগাদোবেকি টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন বলেন, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গত এক বছরে সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে ৮২৪ কেজি হরিণের মাংসসহ ২৯ জন শিকারিকে আটক করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৭ ডিসেম্বর সুন্দরবনের মুচির দোয়ানি এলাকা থেকে ২১ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই শিকারিকে আটক করা হয়। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধে কোস্টগার্ডের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নদী তীরে হরিণের পাল।‌ সুন্দরবনের নীলকমল এলাকায়
নদী তীরে হরিণের পাল।‌ সুন্দরবনের নীলকমল এলাকায়। ফাইল ছবি