বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে লাখ লাখ মুসলি্লর মোনাজাত-মঙ্গল চাই শান্তি চাই

লাখ লাখ মুসলি্ল দু'হাত তুলে আল্লাহর কাছে শান্তি কামনা করলেন মুসলিম উম্মাহর। দেশ, মানুষের কল্যাণ, বিশ্বশান্তির জন্য করজোড়ে প্রার্থনা জানালেন মহান রাব্বুল আল আমিনের কাছে। তুরাগ তীর থেকে সারাদেশ প্রকম্পিত হলো 'আমিন, আমিন' ধ্বনিতে। দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে শুরু হয়ে ২০ মিনিটের আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ১২টা ৫৪ মিনিটে শেষ হলো হজের পর মুসলিম জাহানের বৃহত্তম সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব।


লাখো মুমিন মুসলমানের সঙ্গে এ আখেরি মোনাজাতে শামিল হন রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। আগামী ২০
জানুয়ারি থেকে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাত হবে ২২ জানুয়ারি।
রাষ্ট্রপতি ইজতেমা ময়দানের মূল প্যান্ডেলে তার জন্য নির্মিত বিশেষ আসনে বসে মোনাজাতে অংশ নেন। তার পাশে বসে মোনাজাতে অংশ নেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও মহাজোট নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। রাষ্ট্রপতি ইজতেমা ময়দানে তার নির্ধারিত আসন গ্রহণ করেন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে। একই মঞ্চে ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনৈতিক মিশনের সদস্য ও পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা।
আখেরি মোনাজাতে অংশ নেওয়ার জন্য ইজতেমা ময়দানে আসতে ধর্মপ্রাণ মানুষের যেন কষ্ট না হয়, সে বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার বিশ্ব ইজতেমা প্রাঙ্গণে আসেননি। গণভবন থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তিনি মোনাজাতে অংশ নেন।
বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার জন্য মঞ্চ তৈরি করা হয় ইজতেমা ময়দানের পাশের অ্যাটলাস কারখানার ছাদে। বিরোধীদলীয় নেতা দুপুর ১২টা ১৪ মিনিটে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আ স ম হান্নান শাহ, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, এমএ মান্নান, ফজলুল হক মিলনসহ বিএনপির স্থানীয় নেতারা।
তুরাগতীর অভিমুখে জনস্রোত : শীতের ভোরে হালকা কুয়াশার মাঝে ব্যস্ত রাজপথে লক্ষ্য করা যায় জনস্রোত। যতদূর চোখ যায় মানুষ আর মানুষ। লাখো মানুষের অভূতপূর্ব মিছিল টঙ্গীর তুরাগতীর অভিমুখে। সব পথের বাঁক মিশে যাচ্ছে তুরাগের মোহনায় বিস্তৃত ইজতেমা ময়দানে। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে জনসমাগম বাড়তে থাকে। রাজপথে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বনানী ও কুড়িল থেকে মূল সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষ হেঁটেই যেতে থাকেন ইজতেমা ময়দানের দিকে। মাঝে মধ্যে দু'একটি প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও রিকশা দেখা গেছে। তবে এয়ারপোর্ট ক্রসিংয়ের সামনে থেকে এসব যানবাহন চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সকাল ১০টার মধ্যে টঙ্গী এলাকার সব ভবনের ছাদ, বারান্দা, প্রধান সড়ক, শাখা সড়ক, ফুটপাত_ সর্বত্র মানুষ বসে পড়ে প্রস্তুতি নেন আখেরি মোনাজাতের। প্রধান সড়কের একপাশ পুলিশ বিশেষভাবে ফাঁকা রাখে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের আসার জন্য। শুধু টঙ্গী এলাকা নয়, ইজতেমা ময়দান থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে পর্যন্ত বিস্তৃত হয় জনতার ঢল। অন্যদিকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে বসে পড়েন মানুষ। আর টঙ্গীর তুরাগতীরে ইজতেমা ময়দানের মূল প্যান্ডেলে জায়গা না পেয়ে প্যান্ডেলের বাইরে পলিথিন শিট, হোগলার চাটাই, পাটি, জায়নামাজ, পত্রিকা বিছিয়ে ও কাপড়ের শামিয়ানা টানিয়ে হাজারো মানুষ অবস্থান নেন।
ইজতেমার মুরবি্বরা জানান, দেশের লাখো মানুষের পাশাপাশি এবারের ইজতেমায় প্রায় ৯০টি দেশের ১৭ হাজার বিদেশি অংশ নেন। এ যাবৎকালে এবারই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিদেশি ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন বলে তারা জানান।
শেষ বয়ান ও আখেরি মোনাজাত : সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় ইজতেমার প্রথম পর্বের শেষ বয়ান বা হেদায়েতি বয়ান। দিলি্লর মাওলানা জুবায়রুল হাসান বয়ান করেন। তার দেশের মুরবি্বরা তার বয়ানের তর্জমা করেন। বয়ানে বলা হয়, মানুষের ইমানি শক্তি দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে সামান্য বিপদ-আপদে এমনকি গাছের পাতা নড়লেই মানুষ দিশাহারা হয়ে যাচ্ছে। আল্লার প্রতি ইমান মজবুত হলে বড় বড় তুফানের মতো বিপদ এলেও মানুষ তা সহজেই মোকাবেলা করতে পারবে। প্রতিটি কাজে আল্লাহকে স্মরণ করাই ইমানি শক্তিকে দৃঢ় করার মূলমন্ত্র। বয়ান চলে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে শুরু হয় আখেরি মোনাজাত। মোনাজাত পরিচালনা করেন দিলি্লর মাওলানা জুবায়রুল হাসান। হিন্দি ভাষায় মোনাজাত পরিচালনা করেন তিনি। মুহূর্তে তুরাগতীরের লাখো মানুষের হাত ওঠে আল্লাহর দরবারে। 'আল্লাহুম্মা আমিন' ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় আসমান-জমিন। টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল মাঠে নির্ধারিত ছাউনির নিচে নারীরাও মোনাজাতে অংশ নেন। এখানে সমবেত হয়েছিলেন বিভিন্ন বয়সের কয়েক হাজার নারী।
টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে দেশের সব প্রান্তের কোটি কোটি মানুষ একই সময় আখেরি মোনাজাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
১২ মুসলি্লর মৃত্যু : রোববার আরও দুই মুসলি্লর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে রোববার পর্যন্ত ১২ মুসলি্লর মৃত্যু হয় বলে ইজতেমার মুরবি্বরা জানিয়েছেন। তারা হলেন_ কেরামত উল্লাহ (৭৫), আবদুল আজিজ (৭৫), বরিশালের আবদুল মজিদ (৬০), কুষ্টিয়ার আলীমুদ্দিন (৬০) ও শামসুল হক (৫৫), চট্টগ্রামের পাহাড়তলির মোঃ সফিউল্লাহ (৬০), সিরাজগঞ্জের বেলকুচির মোঃ হাবিবুর রহমান (৭০), চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ধর্মপুর গ্রামের মোঃ মাবুদ (৬০), কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বহির নদী গ্রামের আলিমুদ্দিন সর্দার (৬৬), ফেনী সদরের সলুয়াপুর গ্রামের মোঃ মোস্তফা (৬৫), চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার নজিবুল্লাহ (৬০) ও মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরকমলাপুর গ্রামের মোঃ রতন সর্দার (৮৮)। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বালিয়াকান্দি গ্রামের শুক্কুর মিয়ার ছেলে আবদুল জলিল (৫৫) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
কঠোর নিরাপত্তা : ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ১২ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। র‌্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয়। তুরাগ নদীতে বোট আর আকাশে র‌্যাব সদস্যদের নিয়ে টহল দেয় হেলিকপ্টার। এ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দু'একটি মোবাইল চুরি ছাড়া বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি। তবে আখেরি মোনাজাত শেষে ইজতেমা মাঠের চারপাশের প্রতিটি সড়কে পুলিশের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার গিয়াসউদ্দিন সমকালকে জানান, র‌্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ১২ হাজার সদস্য গতকাল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা ছাড়াও মেডিকেল সেন্টার, জরুরি উদ্ধার এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করেন পুলিশ সদস্যরা।
র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং প্রধান কমান্ডার এম সোহায়েল জানান, প্রথম দফার তিন দিন ইজতেমা ময়দানকে পাঁচটি সেক্টরে ভাগ করে প্রায় ১ হাজার র‌্যাব সদস্যকে ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত রাখা হয়। মাঠের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অবজারভেশন পোস্ট বসিয়ে দুরবিনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি ছাড়াও দুটি কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে গোটা এলাকা ছিল সিসি ক্যামেরার আওতায়। নারীদের প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য নারী র‌্যাব সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন।
রোববার পর্ষন্ত ইজতেমা ময়দান এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন অপরাধে ৩০টি মামলা দায়ের ও ৮০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছেন। খাদ্যে ভেজাল ও অবৈধ দোকানসহ চুরি, ছিনতাই, পকেটমার, অজ্ঞান পার্টির সদস্যসহ ১৫০ জনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া গতকাল রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর বেড়িবাঁধ সড়ক এবং এয়ারপোর্ট ক্রসিংয়ের সামনে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় দু'জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হন।