Friday, February 20, 2026

‘শহীদের শোকসভা’ ঘিরে ইরান আবারও সংকটের মুখে by জেসন বার্ক

ইরানের সামনে এক সংকটময় মুহূর্ত দাঁড়িয়ে আছে। আর মধ্যপ্রাচ্যও আছে অনিশ্চয়তার মুখে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে ইসলামপন্থী শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিষ্কার যে ছিল, তেহরানে বড় কোনো অস্থিরতা হলে তার প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ে।

ওমানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তাঁর দল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় বসেছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দুই পক্ষের অবস্থানের ফারাক এতটাই বেশি যে তা সহজে মেটানো সম্ভব নয়, বরং সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরানে শাসন পরিবর্তনই হতে পারে সবচেয়ে ভালো ঘটনা। ফলে উত্তেজনা ও ঝুঁকি—দুটিই বাড়ছে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের নিয়ন্ত্রণ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানের শাসন পরিবর্তন বলেই মনে হচ্ছে। অনেকের মতে, সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, আশির দশকের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের ঢেউ ইরানে ছড়িয়ে পড়ে। মাশহাদ থেকে আবাদান পর্যন্ত লাখো মানুষ রাস্তায় নামে।

এ দৃশ্য অনেককে ইরানের শাহর শেষ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। অতীত ও বর্তমানের মধ্যে কিছু স্পষ্ট মিল আছে, যা ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় মিল অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। প্রায় ৫০ বছর আগেও একই ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৭৭ সালে নিত্যপণ্যের দাম ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তখনো জীবিকা হুমকির মুখে পড়ায় তেহরানের বাজারের দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

আরেকটি মিল দেখা যাচ্ছে দমন–পীড়ন, শোক এবং প্রতিবাদের এক পুনরাবৃত্ত চক্রে, যা শেষ পর্যন্ত শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। ১৯৭৮ সালে একটি রক্ষণশীল পত্রিকায় আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনিকে নিয়ে কটূক্তিপূর্ণ লেখা ছাপা হয়। এতে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।

কুম শহরে শত শত মাদ্রাসাশিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে। তারা শাহর শাসনের প্রতীক এবং তাঁর আরোপিত আধুনিকায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে ছয়জন নিহত হয়। এরপর তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এই বিক্ষোভ হয়তো থেমে যেত, যদি না শিয়া মুসলমানদের মধ্যে ৪০ দিনের শোক পালনের ঐতিহ্য থাকত। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এই শোকসভাগুলোই পরবর্তী বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়।

পোলিশ সাংবাদিক রিশার্ড কাপুশচিনস্কি তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন, স্বাভাবিক মৃত্যু হলে শোকসভার পর একধরনের শান্ত, মেনে নেওয়ার মনোভাব তৈরি হয়। কিন্তু সহিংস মৃত্যুর ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়।

১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে কুমের ঘটনার ঠিক ৪০ দিন পর নতুন বিক্ষোভ শুরু হয়, নতুন করে হত্যাকাণ্ড ঘটে, আবার শোক পালিত হয় এবং তা আবার বিক্ষোভে রূপ নেয়। এই চক্র ক্রমে তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ দেশ ছেড়ে চলে যান, আর ফিরে আসেননি।

এই চক্র আবারও ফিরে আসতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা সারা দেশের ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়েছেন জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নিহতদের মৃত্যুর পর ৪০ দিনের শোকের শেষে আবার রাস্তায় নামতে। তাঁদের লক্ষ্য নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতি ধরে রাখা এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।

এটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসবিদ আলী আনসারির মতে, ১৯৭৮ সালে শাহবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। আর কেউ কেউ মনে করেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে শুধু জানুয়ারিতেই নিহত মানুষের সংখ্যা ৩০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। এর মানে, সামনে আরও বহু শোকসভা এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভ।

১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকেরা সরাসরি ঘটনাস্থলে ছিলেন। কিন্তু এখন তেমন উপস্থিতি নেই। সরকার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে ঠিক কারা আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু বোঝা যায়, ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি গভীর এবং বাস্তব।

১৯৭৮ সালের আন্দোলনে ছিল একটি বিস্তৃত জোট। এতে খোমেনির অনুসারী ধর্মীয় গোষ্ঠীর পাশাপাশি ছিল উদারপন্থী, জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রী, নারীবাদী, মধ্যপন্থী আলেম, এমনকি কিছু কমিউনিস্টও। বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও এতে যুক্ত ছিল। এই বৈচিত্র্যে যেমন শক্তি ছিল, তেমনি দুর্বলতাও। কারণ, সবাই শাহকে সরাতে চাইলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে সবার ধারণা ছিল ভিন্ন।

আজও সেই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বর্তমান শাসন যদি পতনও হয়, ভবিষ্যৎ পথ তৎক্ষণাৎ স্পষ্ট না–ও হতে পারে। খোমেনিও দেশে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ ক্ষমতা পাননি। কয়েক বছরের মধ্যে ইরান–ইরাক যুদ্ধ, নতুন সংবিধান, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে তাঁর শাসন শক্তিশালী হয়। এই প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য সব প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে দমন করা হয়।

আজ যাঁরা ইরানে পরিবর্তন চান, তাঁদের জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। সফল হতে হলে ব্যাপক জনসমর্থন এবং একটি বিস্তৃত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু সেই ঐক্যের ভেতরেই থাকবে নানা মত ও ভবিষ্যৎ কল্পনা। অতীতে এই বৈচিত্র্যই একসময় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছিল, যার সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

তাই শাসন পতন হলেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ৪৭ বছর আগের মতোই এখনো বলা কঠিন, সামনে কী অপেক্ষা করছে। জনগণ হয়তো বিজয়ী হবে। কিন্তু তখনই শুরু হবে আসল লড়াই—স্বাধীনতা, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য।

* জেসন বার্ক, দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সাংবাদিক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে শুধু জানুয়ারিতেই নিহত মানুষের সংখ্যা ৩০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে
ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে শুধু জানুয়ারিতেই নিহত মানুষের সংখ্যা ৩০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। ছবি: এএফপি

গাজা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জুয়া খেলা by রনি পি সাসমিতা

গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আর সেই সমীকরণে অপ্রত্যাশিতভাবে নাম লেখাতে চাইছে ইন্দোনেশিয়া। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সরকার ১০ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে গাজায় গঠিত হতে যাওয়া বহুজাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে সর্বোচ্চ ৮ হাজার সেনা পাঠাতে তারা প্রস্তুত।

এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক নয়, এটি কূটনৈতিক অবস্থানেও বড় বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বহু দশক ধরে গড়ে ওঠা ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির ভঙ্গিমা থেকে এটি দৃশ্যমান সরে আসা। প্রশ্ন উঠছে, জাকার্তা কি সত্যিই নিজের জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি বাইরের এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রভাবে নিজের পথ বদলাচ্ছে?

ভূরাজনীতি কখনো ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার প্রদর্শনী নয়। এটি ঠান্ডা মাথায় জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম মর্যাদার হিসাব। কিন্তু বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অনেকের চোখে সুপরিকল্পিত কৌশলগত পদক্ষেপের চেয়ে তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া বলেই মনে হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার আন্তর্জাতিক প্রভাব এত দিন দাঁড়িয়ে ছিল ভারসাম্যের ওপর—কোনো বিতর্কিত নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ওপর নয়। অথচ যে উদ্যোগে তারা যোগ দিতে চলেছে, তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্য উপেক্ষার জন্য পরিচিত।

ফলে বিষয়টি শুধু মধ্যপ্রাচ্য শান্তি উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব কূটনীতিতে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীন, স্থিতিশীল ভাবমূর্তি কি এতে আঘাত পাবে?

যদি বোর্ড অব পিসের অধীনে সত্যিই সেনা পাঠানো হয়, ঝুঁকি আরও বাড়বে। গাজা কোনো প্রচলিত শান্তিরক্ষা এলাকা নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত সংঘাতক্ষেত্রগুলোর একটি। এখানে মানবিক দায়বদ্ধতা ও কঠোর নিরাপত্তা বাস্তবতা প্রায়ই মুখোমুখি দাঁড়ায়।

এমন জায়গায় অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় ম্যান্ডেট ছাড়া হাজার হাজার সেনা পাঠানো মানে এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া, যেখানে নিরপেক্ষ থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—ইন্দোনেশিয়ার বহুদিনের ‘স্বাধীন ও সক্রিয়’ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি কি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে? বান্দুং সম্মেলন এবং জুয়ান্ডা ঘোষণার সময় থেকে এই নীতিই তাদের কূটনীতির মেরুদণ্ড।

ইন্দোনেশিয়া ঐতিহাসিকভাবে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, কারও ব্যক্তিগত কূটনৈতিক এজেন্ডার অনুসারী হিসেবে নয়। কিন্তু ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া মানে এমন একপক্ষীয় পন্থাকে বৈধতা দেওয়া, যা আন্তর্জাতিক–স্বীকৃত নিয়মের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক।

‘স্বাধীন’ মানে বাইরের চাপমুক্ত অবস্থান। ‘সক্রিয়’ মানে জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অংশগ্রহণ। যদি তা বদলে যায়, তবে ইন্দোনেশিয়া কেবল যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নীতির প্রতীকী সমর্থকে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি নেবে।

এতে চীন, রাশিয়া বা আসিয়ান অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্ব এত দিন নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে হয়েছে। কিন্তু বোর্ড অব পিস বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বাইরে। ফলে দেশটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী থেকে রাজনৈতিক নিরাপত্তা কাঠামোর সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হতে পারে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক, এটি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। যদি অর্থনৈতিক বা কৌশলগত প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি আলোচনাযোগ্য হয়ে ওঠে, তবে কূটনৈতিক পরিচয়ের সামঞ্জস্যই ভেঙে পড়তে পারে। অথচ বৈশ্বিক শান্তি ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে তাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার টিকিয়ে রাখতে হলে নীতিগত স্বাধীনতা জরুরি।

এখানেই তৈরি হচ্ছে ‘ফিলিস্তিন প্যারাডক্স’। ইন্দোনেশিয়ার সংবিধান সব ধরনের উপনিবেশবাদ প্রত্যাখ্যান করে এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়ের ওপর জোর দেয়। অথচ এমন এক উদ্যোগে যোগ দেওয়া, যার উদ্যোক্তা অতীতে ইসরায়েলের পক্ষে ঝুঁকে থাকা নীতির স্থপতি—তা সহজে মিলিয়ে নেওয়া কঠিন।

ট্রাম্পের জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরানোর সিদ্ধান্ত বহু দশকের কূটনৈতিক ঐকমত্য ভেঙেছিল এবং মুসলিম বিশ্বে তীব্র সমালোচনা কুড়িয়েছিল। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক সমর্থক হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার কাছে এই অংশগ্রহণ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

যদি বোর্ড অব পিস ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা ছাড়াই আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণ এগিয়ে নেয়, তবে ইন্দোনেশিয়া এমন একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে, যা দেশ-বিদেশে চাপিয়ে দেওয়া উদ্যোগ হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা বা জাতিসংঘের মতো মঞ্চে তাদের নৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হবে।

গাজা সংঘাত শুধু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে সীমাবদ্ধ নয়। তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’সহ বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এখানে সক্রিয়। ইন্দোনেশীয় বাহিনীকে যদি পশ্চিমা নিরাপত্তাবলয়ের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তবে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। শান্তিরক্ষীরাই হয়ে উঠতে পারেন সংঘাতের সক্রিয় লক্ষ্য।

৮ হাজার সেনা পাঠানো ছোটখাটো পদক্ষেপ নয়,এটি একটি পূর্ণ ব্রিগেড। এমন সময়ে, যখন নর্থ নাটুনা সাগরে উত্তেজনা বাড়ছে এবং ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, তখন আট হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া দেশের মূল প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারকে দুর্বল করতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও সিদ্ধান্তটি ভারী। ধ্বংসস্তূপে পরিণত, উচ্চ সামরিকীকৃত এলাকায় হাজার হাজার সেনা টিকিয়ে রাখতে বিশাল লজিস্টিক অবকাঠামো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও গোপন ব্যয় শেষ পর্যন্ত জাতীয় বাজেটেই চাপ ফেলবে।

দেশের অর্থনীতি যখন চাঙা করার প্রয়োজন এবং প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ যখন অপরিহার্য, তখন অনিশ্চিত কৌশলগত ফলের আশায় বিপুল সম্পদ বরাদ্দ করা সংসদীয় পর্যালোচনা দাবি করে। স্পষ্ট নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক লাভ না থাকলে এটি ব্যয়বহুল ভূরাজনৈতিক জুয়া হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কোনো উদ্যোগে অংশ নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি ভাবমূর্তির ঝুঁকি তৈরি করে। মার্কিন রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত। ভবিষ্যৎ প্রশাসন যদি ট্রাম্পযুগের উদ্যোগ থেকে সরে আসে, তবে অকারণেই ইন্দোনেশিয়া কূটনৈতিক বিপাকে পড়তে পারে।

ব্যক্তিনির্ভর কূটনৈতিক কাঠামো সাধারণত অস্থির হয়। ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্য বরাবরই জাতিসংঘ ও আসিয়ানের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে। কারণ, এগুলো কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে বাঁধা নয়, তাই টেকসই।

দ্রুত বদলে যাওয়া বহু মেরু বিশ্বে প্রভাব বাড়াতে ইন্দোনেশিয়ার শর্টকাটের প্রয়োজন নেই। তাদের শক্তি ছিল স্বাধীনতা, ভারসাম্য ও নীতিনিষ্ঠ কূটনীতি।

প্রশ্ন একটাই, জাকার্তা সেই ঐতিহ্য রক্ষা করবে নাকি দৃশ্যমান ভূরাজনৈতিক উপস্থিতির মোহে নিজস্ব অবস্থানকে আপসের মুখে ঠেলে দেবে?

* রনি পি সাসমিতা, ইন্দোনেশিয়া স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিকস অ্যাকশন ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

গাজায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে ফিলিস্তিনি কিশোরেরা। গাজা নগরীর আল-শাতি শরণার্থীশিবিরের পাশে। ৮ নভেম্বর ২০২৫
গাজায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে ফিলিস্তিনি কিশোরেরা। গাজা নগরীর আল-শাতি শরণার্থীশিবিরের পাশে। ৮ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জমি কেনা সহজ করতে ইসরায়েলের বিতর্কিত পদক্ষেপ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা এবং সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জন্য ফিলিস্তিনের অধিকৃত জমি কেনা সহজ করার লক্ষ্যে নতুন কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে ইসরায়েল। গতকাল রোববার ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় পদক্ষেপগুলো অনুমোদন করা হয়। ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের এ পদক্ষেপকে ‘কার্যত একীভূতকরণ’ বলে উল্লেখ করেছে।

পশ্চিম তীর সেই অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। অঞ্চলটির বড় অংশই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় পশ্চিমা সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সীমিত আকারে শাসনকাজ পরিচালনা করে।

ইসরায়েলের উগ্রপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচনা করেন।

চলতি বছরের শেষ দিকে নেতানিয়াহুকে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। ইসরায়েলি বসতি এলাকায় তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। জোটের অনেক সদস্যই পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার পক্ষে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করা এই ভূমির সঙ্গে কথিত বাইবেলীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা দাবি করে থাকে ইসরায়েল।

গতকাল ইসরায়েলের মন্ত্রিপরিষদ পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম এ বিতর্কিত প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে ইসরায়েল। এর এক সপ্তাহ আগেও পশ্চিম তীরে বেশ কিছু পদক্ষেপ অনুমোদন করেছিল ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা। ওই পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেন, ‘আমরা বসতি স্থাপনের বিপ্লব চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের ভূমির প্রতিটি অংশে আমাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করছি।’

জমি নিবন্ধনের নতুন পদক্ষেপটিকে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে পরিচালিত ‘অবৈধ জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার যথাযথ জবাব’ বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, জমি নিবন্ধন একটি অত্যাবশ্যক নিরাপত্তাব্যবস্থা।

ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই পদক্ষেপ স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে এবং জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়ক হবে।

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তারা মনে করে, এ পদক্ষেপটি আসলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিকে ধীরে ধীরে ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা। তাদের মতে, অবৈধ বসতি স্থাপনের মাধ্যমে দখল আরও স্থায়ী করতে ইসরায়েলের নেওয়া পরিকল্পনার সূচনাপর্ব এটি।

ইসরায়েলি বসতি–বিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা পিস নাউ বলেছে, ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের কারণে পশ্চিম তীরের প্রায় অর্ধেক এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিরা জমি হারাতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার বিরোধিতা করেছেন। তবে তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের দ্রুত বসতি নির্মাণ ঠেকাতে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ২০২৪ সালে এক পরামর্শমূলক মতামতে বলেছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখল ও বসতি আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী এবং যত দ্রুত সম্ভব তা বন্ধ করা উচিত। তবে ইসরায়েল এই মত মেনে নেয়নি।

ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে রামাল্লাহর কাছে শুকবা শহরের কাছে নতুন বসতি স্থাপন। ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে রামাল্লাহর কাছে শুকবা শহরের কাছে নতুন বসতি স্থাপন। ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

১০ দিনের মধ্যে চুক্তি না করলে ইরানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুততার সঙ্গে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, এই প্রস্তুতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চাইলে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই ইরানে হামলা চালাতে পারে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেহরানকে ১০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যে চুক্তি না হলে ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যদি হামলা চালানো হয়, তাহলে তা কীভাবে চালানো হবে, সে ইঙ্গিত দেননি প্রেসিডেন্ট  ট্রাম্প। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলতি সপ্তাহে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়ানো হয়েছে, তাতে চাইলে তাঁরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র–সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেণপকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাতে পারবেন।

ট্রাম্পের মূল মাথাব্যথা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে। তিনি বারবার বলেছেন, তেহরানকে পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে, ইউরেনিয়ামও সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে অগ্রগতির কথা জানিয়েছিল দুই পক্ষ। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে মার্কিন কর্মকর্তাদের।

পরে বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে গাজা বোর্ড অব পিসের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, গত বছর ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা না চালালে, তেহরানের হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত করত। যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো এখন আরও এক ধাপ এগোতে হবে। না–ও হতে পারে। হয়তো একটি চুক্তি হবে। আগামী ১০ দিনের মধ্যেই সম্ভবত তা জানা যাবে।

পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় ইরান। তেহরান তা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে গত বছরের জুনে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত শুরু হলে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময়েই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

বিমানবাহী রণতরি, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান সমাবেশ

মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার ও ক্রুজার যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং ৫০টির বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। এ ছাড়া দ্রুততার সঙ্গে সেখানে আরও কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহের ট্যাংকার পাঠিয়েছে মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে।

এসব ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করা রয়েছেন। মূলত এসব ঘাঁটির কারণেই ট্রাম্পের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গত জানুয়ারিতে ইরানের বিক্ষোভের সময় দেশটিতে হামলা চালাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, তখন ঘাঁটিগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল ছিল। সে সময় ইরানের পাল্টা হামলা চালালে ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা ছিল।

তবে গত মাসে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোতে মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে পারে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো সাময়িক সময়ের জন্য ইরানের হাত থেকে ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষা দেবে। দীর্ঘ মেয়াদে সংঘাত বাধলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের এফ–৩৫, এফ–২২ ও এফ–১৬–এর মতো যুদ্ধবিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যের পথে ছিল। বড় পরিসরে হামলা চালানোর জন্য সেখানে জ্বালানি সরবরাহের উড়োজাহাজও নেওয়া হয়েছে। গত বছর ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের বি–২ বোমারু বিমানগুলোকেও উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে হামলার প্রস্তুতির জন্য আরও সময় পাবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে প্রতিশোধমূলক হামলার পরিকল্পনা সাজিয়ে নিতে পারবে তেহরান। আর শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তার জন্য ওয়াশিংটনকে যে মূল্য দিতে হবে, তা বিবেচনায় রাখতে হবে ট্রাম্পকে।

যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলও

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে তৎপর হয়েছে ইসরায়েলও। তেহরান ও ওয়াশিংটনের চলমান বৈঠকের মধ্যেই সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি চান ইসরায়েলের ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা কমাতে পদক্ষেপ নিক যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তাতেও অংশ নিতে পারে ইসরায়েল।

বিষয়টি নিয়ে জানাশোনা আছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত এমন দুই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে তা আগামী রোববার পর্যন্ত পেছানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের ওই দুই কর্মকর্তা। তাঁদের ভাষ্যমতে, ইসরায়েল কিছু পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কয়েক দিনের মধ্যে তীব্র হামলা চালিয়ে ইরানকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। যেন দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনায় ছাড় দিতে রাজি হয়।

আরব সাগরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন
আরব সাগরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ছবি: রয়টার্স

ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে কী ঘটতে পারে

দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা ও বিশিষ্ট লেখক জেসন বার্ক ইরানের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের ঐতিহাসিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, তখনকার মতো আজও একটি বৃহৎ মোর্চা গঠনই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। তবে ‘দ্য রেভোল্যুশনিস্টস: দ্য স্টোরি অব দ্য এক্সট্রিমিস্টস হু হাইজ্যাক্ট দ্য নাইনটিন সেভেন্টিজ’ বইয়ের এই লেখক সতর্ক করেছেন, এবারের পরিবর্তনকামীদের অতীতের মতো ভুল করা যাবে না। তাঁদের সতর্ক থাকতে হবে।

ইরানে একটি সংকটময় মুহূর্ত আসন্ন বলে মনে হচ্ছে। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পড়তে পারে। তেহরানে কোনো বিপ্লব বা সরকার পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিণতি কেমন হতে পারে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লব থেকে তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই বিপ্লবের মধ্যে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছিলেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও তাঁর দল ওমানে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা শুরু করেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দুই পক্ষের মধ্যে ফাঁক এত বড় যে তা পূরণ করা কঠিন এবং সংঘাত অনিবার্য।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে একাধিকবার ইরানে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। গত সপ্তাহান্তে তিনি আবার বলেছেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনই ‘সবচেয়ে ভালো ঘটনা হতে পারে’। পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হচ্ছে এবং ঝুঁকি বাড়ছে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যারা ক্ষমতায় এসেছে, এখন ইরানের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিতে। সরকার পরিবর্তনই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে। বাস্তবে এটি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে থাকতে পারে।

ইরানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে, যা দেশটিতে ১৯৮০-এর দশকের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। এবারের বিক্ষোভে দেশটির মাশহাদ থেকে আবাদান পর্যন্ত নানা শহরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন।

এমন দৃশ্য অনেককে ইরানের শাহর শেষ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তখন লাখ লাখ মানুষ সড়কে নেমে এসেছিলেন। আমরা যখন চলতি ঘটনাগুলোর সাক্ষী হচ্ছি, তখন বর্তমান ও অতীতের পরিস্থিতির মধ্যে তীব্র সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের ভবিষ্যতে কী হতে পারে এবং আশা-ভয় নিয়ে আলোচনা করতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।

একটি স্পষ্ট মিল হলো, উভয় বিক্ষোভে অর্থনীতি কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। সাম্প্রতিক প্রতিবাদের মূল বিষয় ছিল ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি। প্রায় ৫০ বছর আগে পরিস্থিতি আজকের মতো প্রায় একই ছিল। ১৯৭৭ সালে নিত্যপণ্যের দাম ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল।

এবারের মতো তখনো তেহরানের বাজারের দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাই প্রথমে বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। কারণ, এবারের মতো তখনো তাঁদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছিল।

দ্বিতীয় একটি মিল ধীরে ধীরে সামনে আসছে। তা হলো নিপীড়ন, শোক ও প্রতিবাদ চক্রের মধ্যকার মিল। এই চক্রই শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। ১৯৭৮ সালে ইরানের রক্ষণশীল একটি সংবাদপত্রে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিকে নিয়ে একটি কুৎসামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে বিক্ষোভ শুরু হয়। খোমেনির অনুগামীরা ব্যাপকভাবে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।

পবিত্র শহর কোমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁরা শাহর চাপিয়ে দেওয়া আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরাসরি গুলি চালান এবং ছয়জন শিক্ষার্থী নিহত হন। এতে রাজধানী তেহরান আরও অশান্ত হয়ে ওঠে।

এসব প্রতিবাদ হয়তো দ্রুত থেমে যেত, কিন্তু তা হয়নি। কারণ হিসেবে ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত একটি রীতির কথা বলা হয়ে থাকে। শিয়া মুসলিমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে চূড়ান্তভাবে স্মরণ করার আগে সাধারণত ৪০ দিনের শোক পালন করেন।

প্রয়াত প্রখ্যাত পোলিশ সাংবাদিক রিশার্ড কাপুশিনস্কি ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পূর্ববর্তী সহিংসতার গভীর বর্ণনা দিয়েছেন। ইরানে মৃত ব্যক্তির বাড়ির দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, প্রয়াত ব্যক্তির ঘরে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, প্রতিবেশী এবং পরিচিতদের পাশাপাশি ‘পুরো রাস্তা, পুরো গ্রাম এবং মানুষের ভিড়’ জমে যায়।

কাপুশিনস্কি লিখেছেন, ‘কারও মৃত্যু যদি স্বাভাবিক হয়...তবে এই জমায়েত প্রথমে কয়েক ঘণ্টার তীব্র আবেগ ও করুণ আর্তনাদের মধ্য দিয়ে কাটে। এরপর ধীরে ধীরে মানুষের মন একধরনের নিস্তেজ, বিষণ্ন ও শান্ত অবস্থায় চলে যায়।’ কিন্তু ‘কোনো ব্যক্তির মৃত্যু যদি সহিংস উপায়ে হয়, তাহলে মানুষের মনে প্রতিশোধের নেশা চেপে বসে। তখন তাঁরা যাকে তাঁদের এ শোকের মূল হোতা বলে মনে করেন, সেই খুনির নাম উচ্চারণ করেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেই খুনি যদি অনেক দূরেও থাকে, তারপরও মানুষের এই নাম উচ্চারণের মুহূর্তে সে শিউরে উঠবে। কারণ তার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে।’

১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে কোম শহরে বিক্ষোভের ঠিক ৪০ দিন পর নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। এতে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। এর ফলে শোকসভা ও শোকমিছিলের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, তা অনিবার্যভাবে নতুন গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল।

জবাবে সরকার আরও বেশি প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালাতে থাকে। শোক আর প্রতিবাদের চক্রটি ক্রমে তীব্রতর হতে থাকে। অবশেষে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে জনগণের ‘সব শোকের হোতা’ সেই শাহ ইরান ছেড়ে পালিয়ে যান। বলা হয়েছিল, তিনি ছুটিতে যাচ্ছেন, কিন্তু এরপর তিনি আর কোনো দিন ফিরে আসেননি।

প্রতিবাদের সেই চক্র আবারও ফিরে আসতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে ৪০ দিনের শোক পালন শেষে দেশজুড়ে তাঁদের সহকর্মীদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাজারকর্মীদের একটি বাণিজ্য সংগঠনের টেলিগ্রাম চ্যানেলের বরাতে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘একই সঙ্গে সব শহরে নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতি অম্লান রাখা এবং জাতীয় গণ-অভ্যুত্থান অব্যাহত রাখা’ এই বিক্ষোভের লক্ষ্য। দেশটির ‘সমসাময়িক রাজপথে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়াই’ তাদের বিক্ষোভের উদ্দেশ্য।

আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার হুমকির চেয়েও এই পরিস্থিতি (ব্যাপক বিক্ষোভের শঙ্কা) বর্তমান শাসকদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। ইরানের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আলী আনসারি মতে, ১৯৭৮ সালে শাহবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ২ হাজার ৮০০ জন নিহত হয়েছিলেন।

অথচ অনেকের ধারণা, কেবল গত জানুয়ারিতেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এর অর্থ হলো, সামনের সপ্তাহগুলোতে শোকাতুর মানুষের বিশাল জমায়েত এবং একের পর এক ‘চল্লিশা’ বা ৪০ দিনের শোক পালনের দীর্ঘ মিছিল দেখা যাবে।

১৯৭৮ সালে রিশার্ড কাপুশিনস্কিসহ কয়েক শ আন্তর্জাতিক সংবাদকর্মী ও আলোকচিত্রী ইরানে সশরীর উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো উপস্থিতি নেই। উপরন্তু দেশটির সরকার ইন্টারনেটের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত রেখেছে। ফলে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানের রাজপথে ঠিক কারা নেমেছিলেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে অস্থিরতা যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তা যে গভীর ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধের এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ছিল, তা স্পষ্ট। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিহতের যে বিয়োগান্ত জীবনকাহিনি উঠে এসেছে, তা থেকে স্বাধীনতার জন্য জীবন বা অঙ্গহানির ঝুঁকি নেওয়া সেই ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয়ের মাত্র একটি খণ্ডিতচিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

আমরা জানি, ইরানের ১৯৭৮ সালের বিপ্লবী আন্দোলনটি একটি বৃহৎ মোর্চা আকারে হয়েছিল। এতে খোমেনির অনুসারী ইসলামপন্থীরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন লাখ লাখ দরিদ্র ও স্বল্পশিক্ষিত ইরানি, যাঁরা নির্বাসিত আয়াতুল্লাহকে (কখনো কখনো আক্ষরিক অর্থেই) তাঁদের যাবতীয় প্রার্থনার জবাব বলে ধরে নিয়েছিলেন।

তবে ওই আন্দোলনে আরও অনেকে ছিলেন, যাঁরা শাহর পতন নিশ্চিত করার লড়াইয়ে সমপরিমাণ কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন এবং চরম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।

১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে ইরানের রাজপথে সম্ভাব্য সব আদর্শের উদারপন্থী ও জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ও নারীবাদী, মধ্যপন্থী আলেম ও তাঁদের শিক্ষার্থী—এমনকি পুরোনো ঘরানার কিছু কমিউনিস্ট শাহবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। দেশটির জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিরাও এ আন্দোলনে শামিল ছিলেন। এই বৈচিত্র্যের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও ছিল। কাপুশিনস্কি যেমনটি লিখেছিলেন, ‘প্রত্যেকে শাহর বিরোধিতা করেছিলেন এবং তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যেকের কল্পনা ছিল ভিন্ন ভিন্ন।’

বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন হলে নতুন দিকনির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না–ও হতে পারে। কারণ, মনে রাখা প্রয়োজন, খোমেনি দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা দখল করেননি। ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ, নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন সংবিধান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও বাসিজের মতো নতুন নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে তাঁর শাসনকে পুরোপুরি সুরক্ষিত করতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল।

ইরানের প্রতিটি সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করতে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে এই বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনেও এই বাহিনীগুলো ছিল শাসকদের প্রধান অস্ত্র।

আজকের ইরানে যাঁরা তাঁদের শাসকদের পতন চাইছেন, সেই সব সাহসী নারী-পুরুষের জন্য এখানে একটি শিক্ষা রয়েছে। তখনকার মতো এখনো তাঁদের বিজয় কেবল কোটি মানুষের গণ–অভ্যুত্থান এবং একটি বৃহৎ মোর্চা গঠনের মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে।

তবে সবার লক্ষ্য এক হলেও ১৯৭৯ সালে শাহর পতন ঘটানো সেই আন্দোলনকারীদের মতো আজও ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একেকজনের স্বপ্ন একেক রকম হবে। সে সময় জনগণের এই চরম বৈচিত্র্যই শেষ পর্যন্ত দুর্বলতায় পরিণত হয়েছিল। যার সুযোগ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অন্যদের ওপর নিজেদের একনায়কতন্ত্র ও কট্টরপন্থী আদর্শ চাপিয়ে দিয়েছিল।

তাই বলতে হয়, বর্তমান শাসনের পতন হতে পারে ঠিকই; কিন্তু তেমনটা ঘটলে এর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ৪৭ বছর আগের সেই টালমাটাল সময়ের মতো অনিশ্চিত। জনগণ হয়তো জয়ী হবে; কিন্তু তখন তারা দেখবে, মুক্তি, সমৃদ্ধি আর নিরাপত্তার আসল লড়াইটা আসলে কেবল শুরু হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-16%2Ftp9rwjvy%2FPeople-gather-near.png?rect=0%2C0%2C1161%2C774&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রদর্শনীতে রাখা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পাশে সাধারণ মানুষের ভিড়। ইরানের রাজধানী তেহরানে, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

কৃত্রিম অক্সিজেনের অভাবে বায়ুথলি দুটি ওভারটাইম খেটে নিস্তেজ না হয়ে গেলেই হলো

২০–২৫ ধাপ চড়াই উঠি আর অপেক্ষা করি। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা। ওই ক্ষণটুকুতে মনে হয় আমার ফুসফুস, শ্বাসনালি আর নাকের দুটি ফুটো ছাড়া আর জগতে কিছুর অস্তিত্ব নেই। হাড়ে হাড়ে টের পাই, বুক ভরে বাতাস নেওয়ার মতো আনন্দের আর কিছুই নেই। কিন্তু জানি, পরের কুড়ি কিংবা পঁচিশ পা ফেলেই আবার থামতে হবে। আর এই কাজ চালিয়ে যেতে হবে চূড়ায় পৌঁছা অবধি। কৃত্রিম অক্সিজেনের অভাবে বায়ুথলি দুটি ওভারটাইম খেটে নিস্তেজ না হয়ে গেলেই হলো! মাঝেমধ্যে জমাট অন্ধকার ভেদ করে হেডল্যাম্পের আলো ফেলে চারপাশ দেখি! ভ্রম হয়, এ কোথায় এলাম!

শুভ্র বরফের প্রাণহীন এই রাজ্যে আসার জন্যই কি তবে এত কষ্ট, এত আয়োজন? বদ্বীপে আমার যাপিত জীবনের সঙ্গে যে এর কোনো মিল নেই! ফের মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ খেলে যায়। একঘেয়েমির দিনগুলোর কথা কে ভাবতে চায়? প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণের ভাষায়, ছাদের আলসের চৌরস একখানা টালি হয়ে অনড় অবস্থায় জীবন কাটাতে তো চাইনি। আমাকে বাঁচিয়ে রাখে তো আকাশে পেরেকের মতো ঝুলে থাকা এই সুবিশাল পর্বতগুলোর স্বপ্ন। ওদের শুভ্র গাত্রই আমাকে এই গহনলোকে পা বাড়াতে বারবার প্রলুব্ধ করে। সেই কবে বান্দরবান গিয়ে অনেক উঁচু থেকে বাকি দুনিয়া দেখেই উচ্চতার প্রেমে পড়া। সেদিন থেকেই যেন চারপাশের দুনিয়া পালটে গেল একটু একটু করে। আর উচ্চতার এই সংস্রব তো খারাপ না। এরা বিপথগামী করে না; ধীরে ধীরে নিয়ে যায় আরও উঁচু কিংবা বৃহৎ কিছুর দিকে।

বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মানাসলুর (৮ হাজার ১৬৩ মিটার) গা ধরে আরোহণ করছি। অতি উচ্চতা আর নিম্ন তাপমাত্রার সঙ্গে শরীরকে খাপ খাইয়ে নিতে এই পর্বতের অন্দর-কন্দর বেয়ে আসা-যাওয়া করেছি গত কিছুদিন। এবার মূল পরীক্ষা। এবারের আরোহণটা সংগত কারণেই আমার কাছে কিছুটা হলেও আলাদা। দুনিয়াতে আট হাজার মিটারের (৮ হাজার ১৬৩ মিটার) অধিক উচ্চতার পর্বত আছে সাকল্যে ১৪টি। ইতিমধ্যে এর তিনটি আরোহণ করলেও কৃত্রিম অক্সিজেনবিহীন আরোহণ এই প্রথম। পাতলা বাতাসের এই রাজ্যে পর্বতারোহীদের পরম সঙ্গী কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া আমার শরীর কেমন করে সেটা জানতে উন্মুখ হয়ে আছি।

শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছাতে পারব তো?

২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৪০ নাগাদ ধড়াচূড়া পরে বেরিয়ে পড়েছি। কথাটা যত সহজে বলা গেল, কাজটা ততটাই কঠিন। এই উচ্চতায় জুতার ফিতা বাঁধা কিংবা ব্যাকপ্যাক থেকে পানি বের করে খাওয়ার মতো মামুলি কাজও কঠিন পরীক্ষায় ফেলে। হিমজব্দ আঙুলে এসব কাজ সারা রীতিমতো বিভীষিকা! অন্যদের চেয়ে আমি মিনিট দশেক আগে বেরোলাম। দলের অন্য সবার সঙ্গেই কৃত্রিম অক্সিজেন আছে। আমার দীর্ঘদিনের পর্বত-সাথি বীরে তামাংয়ের সঙ্গেও তা-ই। কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহচর্য না নেওয়ায় আমার গতি অন্যদের চেয়ে কম থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে খুব বেশি পিছিয়ে যাতে না পড়ি, সেদিকে আমার পূর্ণ মনোযোগ। হেডল্যাম্পের বৃত্তাকার আলো পথ দেখাচ্ছে। সামনে যেন বরফের বুনো সাগর। প্রথম দিকের ঢাল খুব বেশি নয়। শক্ত বরফকে ক্র্যাম্পনের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত করে চলা। অবশ্য নতুন পড়া তুষার এসব ক্ষতকে সারিয়ে তোলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই আমার আরেক সঙ্গী তানভীর (আহমেদ) ভাই নাগাল পেয়ে গেল। খানিক পরে বীরেও। তানভীর ভাইয়ের গতি আজ ভালো হওয়ায় উনি এগিয়ে গেলেন। আমি চলছি বীরের সঙ্গে। ক্রিস আর গেসমেনকে দেখা যাচ্ছে অনেক পেছনে। তাদের পেছনে চার নম্বর ক্যাম্পে রীতিমতো কবরের নিস্তব্ধতা।

মিনিট ত্রিশেক এগোতেই ঢাল আরও খাঁড়া হয়ে উঠল। শ্বাসপ্রশ্বাসের মাত্রা বাড়ল আরও। আমার গতি যথেষ্ট ভালো জেনেও মনের মধ্যে সন্দেহ, পর্বতের শীর্ষবিন্দুতে ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারব তো? নাকি পাতলা বাতাসের রাজ্যে দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা অক্সিজেন কণারা পালিয়ে পালিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দেবে? নিজের শঙ্কা আর সন্দেহকে সঙ্গী করেই চড়াই ভাঙা; সাদা বরফের এই জঙ্গলে পথ করে নেওয়া। তবে আশার ব্যাপার হলো, আজকে রাতের আবহাওয়া বেশ ভালো। হাওয়ার কামড়টা অনুপস্থিত। তা সত্ত্বেও শরীরে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে; অক্সিজেনের অভাবেই মূলত। অক্সিজেন যে এই উচ্চতায় উষ্ণতারও জোগানদার।

শরীরের প্রতিটা কোষেরই লাগে তিনটি প্রয়োজনীয় উপাদান—গ্লুকোজ, পানি আর অক্সিজেন। সত্যি বলতে সামিট পুশের দিন প্রথম দুটোর দিকে নজর দেওয়ার সময় থাকে না খুব একটা। অতি ভালো থার্মোসের পানিও জমে যায় পর্বতের অতীব নিম্ন তাপমাত্রায়। এবার সঙ্গে তৃতীয় লাইফলাইন অক্সিজেনও নেই! বদলে আছে অপরিসীম উৎসাহ, পরিশ্রম করার ক্ষমতা আর গত কয়েক মাসের প্রস্তুতি।

কিছুই ঠাহর করা যায় না

একটা প্রাণান্তকর ঢাল বেয়ে উঠছি। ছন্দপতন হওয়ার শঙ্কায় খুব বেশি থামছিও না। পাহাড়ের কাঁধের মতো অংশ দেখা যাচ্ছে একটা। মাথায় আপাতত ওটাকেই গন্তব্য ঠিক করে রেখেছি। ওখানে গিয়েই জিরিয়ে নেব। সময় বয়ে যাচ্ছে। টানা চড়াই ভেঙে হাঁপ ধরা বুকে পাহাড়ের কাঁধে উঠে আবিষ্কার করলাম চূড়ার একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। গলায় পানি ঢালতেই খানিকটা দূর থেকে তানভীর ভাইয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘আই ডিড ইট, বাবর!’ নিজে চূড়ার এত কাছে জেনেও আনন্দটুকু তানভীর ভাইয়ের জন্যই বেশি হলো। আত্মার শিখর নামেও পরিচিত মানাসলু তাঁর প্রথম আট হাজার মিটার পর্বত চূড়ায় আরোহণ। বোহিমিয়ান আমার তুলনায় তানভীর ভাই পুরোদস্তুর সংসারী মানুষ! করপোরেট জগতের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও নিজের স্বপ্নের অভিযানের আগে দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নিয়েছেন। আলিঙ্গনে বাঁধলাম তাঁকে। চূড়া এখান থেকে আর মিনিট দশেকের পথ। তবে জায়গাটা বিপৎসংকুল। অল্প এই পথটুকুর আকৃতি-প্রকৃতি বোঝা মুশকিল। এই জায়গায় সর্বদা থাকতে হয় সাবধানী আর উৎকর্ণ। মুহূর্তের অসাবধানতা ডেকে আনতে পারে সমূহ বিপদ।

অতীব সাবধানতার সঙ্গে বাকি পথটুকু পাড়ি দিয়ে চূড়ায় উঠে এলাম। একঝটকায় এতক্ষণ মনের মধ্যে দানা বেঁধে থাকা শঙ্কা, সন্দেহ দূর হয়ে গেল! ঘড়িতে তখন ভোর ৪টা ৩৫ মিনিট। চরাচর আঁধারে ঢাকা। হেডল্যাম্পের আলোর বাইরে কিছুই ঠাহর করা যায় না! দ্রুত ব্যাকপ্যাক থেকে জাতীয় পতাকা বের করলাম। লাল-সবুজ পতাকাটা হাতে নেওয়ার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে আর কোনো কিছুর তুলনা হয় না। শৃঙ্গে কিছু ছবি তুলেই বেজক্যাম্পের পথ ধরলাম।

মানাসলু অভিযানে বাবর আলী
মানাসলু অভিযানে বাবর আলী। ছবি: ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সৌজন্যে

উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব!

প্রকাশ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ উত্তর কোরিয়ায় পারিবারিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, কিম জং উন তার মাত্র ১৩ বছর বয়সী কন্যা কিম জু’কে উত্তর কোরিয়ার পরবর্তী নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়ার পথে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কিম জু’কে তার প্রভাবশালী ফুপু কিম ইয়ো জং-এর মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে। এ দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) গত সপ্তাহে আইনপ্রণেতাদের জানায় যে, প্রায় ১৩ বছর বয়সী কিম জু এ’কে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ মাসের শেষদিকে উত্তর কোরিয়া তাদের বৃহত্তম রাজনৈতিক সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে কিম জং উন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রদ্ধদ্বার বৈঠকে এনআইএস কর্মকর্তারা বলেন, আসন্ন ওয়ার্কার্স পার্টি কংগ্রেসে হাজারো প্রতিনিধির সামনে কিম জু এ তার পিতার সঙ্গে উপস্থিত হন কিনা, তা তারা পর্যবেক্ষণ করছেন।

কিম জু এ প্রথম জনসমক্ষে আসেন ২০২২ সালের নভেম্বরে একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময়। এরপর থেকে তিনি অস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক কুচকাওয়াজ, কারখানা পরিদর্শনসহ নানা অনুষ্ঠানে পিতার সঙ্গে উপস্থিত হন। গত সেপ্টেম্বরে তিনি চীনের নেতার সঙ্গে বৈঠকের জন্য পিতার সঙ্গে বেইজিংয়েও যান।

আগে সিউলের কর্মকর্তারা সন্দেহ করেন, একটি মেয়েকে উত্তর কোরিয়ার নেতা হিসেবে বেছে নেয়া হতে পারে কি না। কারণ দেশটির নেতৃত্ব কাঠামো রক্ষণশীল ও পুরুষপ্রধান। তবে কিম জু এ’র ঘনঘন উপস্থিতি তাদের সেই ধারণা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে। এনআইএস-এর পূর্ববর্তী মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, চীনে তাকে নিয়ে যাওয়া উত্তরসূরি হিসেবে তার ভাবমূর্তি গড়ে তোলার অংশ হতে পারে।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার হতে পারেন কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং। তার বয়স ৩৮ বছর। তাকে উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় এবং তার শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন রয়েছে। তিনি বর্তমানে কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন এবং তার ভাইয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক এক জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রাহ জং ইল সতর্ক করে বলেন, ক্ষমতার লড়াই ‘সম্ভাব্য’। যদি কিম ইয়ো জং মনে করেন তার সুযোগ আছে, তবে তিনি শীর্ষ পদে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। তার মতে, নিজের রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নে তাকে থামানোর কোনো কারণ নেই।

রাহ দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, সবকিছু সময়ের ওপর নির্ভর করে। তবে আমি বিশ্বাস করি, যদি কিম ইয়ো জং মনে করেন যে তিনি শীর্ষ নেতা হতে পারেন, তাহলে তিনি তা করবেন। তার জন্য নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকার কোনো কারণ নেই। কিম ইয়ো জং উত্তর কোরিয়ার ভেতরে ও বাইরে কড়া বক্তব্য দেয়ার জন্য পরিচিত। ২০২২ সালে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ‘অবিবেচক ও নিকৃষ্ট ব্যক্তি’ বলে অভিহিত করেন এবং সতর্ক করেন যে সিউল ‘পূর্ণ ধ্বংস ও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।’

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, একজন অবিবেচক ব্যক্তি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগাম হামলার কথা বলার দুঃসাহস দেখিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া গুরুতর হুমকির মুখে পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ এড়াতে চাইলে দক্ষিণ কোরিয়ার উচিত নিজেকে সংযত রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের ওয়েবসাইট ‘৩৮ নর্থ’-এ প্রকাশিত ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিম জং উন হঠাৎ মারা গেলে বা গুরুতর অসুস্থ হলে ‘অস্থিরতা’ দেখা দিতে পারে। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে, স্বল্পমেয়াদে কিম ইয়ো জং-এর মতো রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই ক্ষমতা গ্রহণে এগিয়ে থাকবেন। অন্যদিকে কিম জু এ ও তার দুই ভাই- যারা এখনও অল্পবয়সী ও আগামী ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বাস্তবসম্মত উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো অবস্থানে নেই।

উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব!

বিএনপির শপথ না নেওয়া গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা by শরীফ ভূঁইয়া

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপির প্রতিনিধিদের শপথ না নেওয়ার ফলে দলটির ও দেশের জন্য নতুন সূচনা যথার্থ হলো না। এই শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি দুভাবে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করল। প্রথমত, গণভোটে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নাগরিক ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। গণভোটে অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে এটিও ছিল যে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর প্রতি তাদের সম্মতি জ্ঞাপন করছে কি না? যেহেতু ‘হ্যাঁ’ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, সেহেতু সংবিধান সংস্কার আদেশ জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এর কার্যাবলি সংবিধান সংস্কার আদেশের উল্লেখযোগ্য বিষয়। এমনকি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়টিও এই আদেশে অন্তর্ভুক্ত আছে। পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের ফরমও এই আদেশে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যেহেতু আদেশটি গণভোটে জনগণের সম্মতি লাভ করেছে, তাই এসব বিষয়ও জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত। কাজেই বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়াটা গণভোটে জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করা।

দ্বিতীয়ত, যে কারণে দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে বিএনপি জনরায়কে উপেক্ষা করছে, তা হলো নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুস্পষ্টভাবে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন ১২ তারিখে দয়া করে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেবেন। বিএনপির অন্যান্য প্রতিশ্রুতি যেমন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড ইত্যাদির মতো গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থানও দলটির একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। তাই এই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় যে বিএনপি যদি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান না নিয়ে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিত, তাহলে নির্বাচনে তারা যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা করতে পারত কি না? ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিলে এমনও হতে পারত যে বিএনপি নির্বাচনে খারাপ ফল করত। কিন্তু এই শপথ না নেওয়ার ফলে কার্যত গণভোটের রায় ‘না’ হলে যে অবস্থা দাঁড়াত, জাতি এখন সেই অবস্থার মুখোমুখি। কাজেই বিএনপি দুভাবে অর্থাৎ গণভোটের ফলাফলকে উপেক্ষা করে এবং তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে জনরায়কে উপেক্ষা করেছে।

এর ফলে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের যে প্রক্রিয়া চিন্তা করা হয়েছিল, তা একটা প্রাথমিক বাধার সম্মুখীন হলো। এই প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপ ছিল সংবিধান সংস্কার আদেশ জারি, দ্বিতীয় ধাপ ছিল গণভোট এবং তৃতীয় ধাপ ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ। প্রথম দুটি ধাপ অনুসরণ করা গেলেও তৃতীয় ধাপে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনপ্রক্রিয়া বাধার সম্মুখীন হলো। তবে এখনো আশা করি বিএনপির প্রতিনিধিরা শপথ নেবেন। এতে বিএনপির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কাও নেই। যেহেতু সংস্কার পরিষদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে।

আর যদি সংস্কার পরিষদ গঠন করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করার দুর্বলতা হলো, এই অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা সীমিত এবং এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিষয় পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন অতীতে আদালত কর্তৃক অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে। যেমন, হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ-সংক্রান্ত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা-সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী। বলা বাহুল্য, আদালত কর্তৃক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করার ফলেই দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। এ কারণে জুলাই সনদে বর্ণিত ব্যাপক ও মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত প্রক্রিয়া টেকসই না-ও হতে পারে। বিএনপির পক্ষে এখনো শপথ নেওয়া সম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে পুরো বিষয়ের একটি সুন্দর সমাধান হতে পারে।

* ড. শরীফ ভূঁইয়া, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।

শরীফ ভূঁইয়া
শরীফ ভূঁইয়া। ফাইল ছবি