Wednesday, February 5, 2025

ক্যানসার কেন এত বেশি হচ্ছে by অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম মোস্তফা

ক্যানসার কী?

অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন দ্বারা সৃষ্ট একটি রোগ হলো ক্যানসার। এই কোষগুলো শরীরের স্বাভাবিক টিস্যুতে অনুপ্রবেশ করে ক্ষতি করতে থাকে। ইদানীং নানাবিধ রাসায়নিক, দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে ক্যানসারের মতো জটিল রোগ বেড়ে চলছে। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন ক্যানসার। তবে স্ক্রিনিং, সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ কৌশলের অগ্রগতি অনেক ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার হারকে উন্নত করেছে।

ক্যানসার হলো জেনেটিক মিউটেশনের ফল যা কোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতা পরিবর্তন করে। এই মিউটেশনগুলো দ্রুত কোষ বিভাজন ও বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে। যার ফলে সৃষ্টি হয় টিউমার। এই টিউমার নিরীহ বা বিনাইন এবং ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসারাস হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারগুলোর কাছাকাছি টিস্যুকে আক্রমণ করার এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রয়েছে, একে বলে মেটাস্ট্যাসিস।

ক্যানসারের লক্ষণ কী

রোগের ধরন এবং অবস্থানের ওপর নির্ভর করে ক্যানসারের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ক্লান্তি বা অবসাদ, কোথাও কোনো পিণ্ড বা গোটা, ওজন হ্রাস, ত্বকের পরিবর্তন, জন্ডিস, নতুন তিল বা বিদ্যমান মোলের পরিবর্তন, মল বা মূত্র ত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্ট, গিলতে অসুবিধা বা গলায় কিছু আটকে যাওয়ার অনুভূতি। বদহজম, খাওয়ার পরে অস্বস্তি বা ব্যথা, পেশি বা জয়েন্টে ব্যথা, অকারণে তীব্র ব্যথা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বর এবং রাতে ঘাম, শরীরের কোথাও অস্বাভাবিক রক্তপাত বা রক্ত জমাট বাঁধা ইত্যাদি।

যদি এই উপসর্গগুলো দেখা যায়, তবে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।

প্রাথমিক শনাক্তকরণ

কোনো উপসর্গ না থাকা সত্ত্বেও ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে উপযুক্ত স্ক্রিনিং করা যায়। জানা যাক ঝুঁকিগুলো কী।

বয়স: বয়সের সঙ্গে ক্যানসার হওয়ার আশংকা বাড়ে। যদিও যেকোনো বয়সে যে কাউকে ক্যানসার আক্রমণ করতে পারে, তবে বেশির ভাগ ক্যানসার ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়।

জীবনধারা: ধূমপান, মদ্যপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং কায়িক শ্রমহীনতা ও স্থূলতা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

জেনেটিক ফ্যাক্টর: কিছু ক্যানসারে পারিবারিক পূর্ব ইতিহাস থাকে। জেনেটিক পরীক্ষা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত মিউটেশন শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী রোগ: আলসারেটিভ কোলাইটিস, হেপাটাইটিস, খাদ্যনালির প্রদাহ ইত্যাদি নির্দিষ্ট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পরিবেশগত উপাদান: পরিবেশে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উপস্থিতি, দূষণকারী ও বিষাক্ত পদার্থ ও দূষণ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পরোক্ষ ধোঁয়া এবং পেশাগত ঝুঁকি।

ক্যানসারের জটিলতা

ক্যানসার রোগ এবং এর চিকিৎসা উভয় থেকেই দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা।

ব্যথা: ক্যানসারের কারণে বা চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হতে পারে ব্যথা।

ক্লান্তি: ক্যানসার রোগীদের একটি সাধারণ সমস্যা ব্যথা। কেমোথেরাপির মতো চিকিৎসার কারণে প্রায়ই এটা বাড়তে পারে।

শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা: ক্যানসার বা চিকিৎসার প্রভাবে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

বমি বমি ভাব: ক্যানসারের চিকিৎসার আরেকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বমি বমি ভাব।

অন্ত্রের সমস্যা: ক্যানসার এবং চিকিৎসার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া হতে পারে।

ওজন হ্রাস: ক্যানসার পুষ্টির শোষণকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে রুচি কমে ওজন হ্রাস করতে পারে।

স্নায়ুজনিত সমস্যা: স্নায়ুতে প্রদাহ, ব্যথা ও বৈকল্য হতে পারে। অন্যদিকে মস্তিষ্কের ক্যানসার মাথাব্যথা বা স্নায়বিক ঘাটতির কারণ হতে পারে।

চিকিৎসা

চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে—

১. সার্জারি: টিউমার ও পার্শ্ববর্তী টিস্যু অপসারণের জন্য সার্জারির প্রয়োজন হয়।

২. রেডিয়েশন: উচ্চশক্তির তেজস্ক্রিয় তরঙ্গ ক্যানসারের কোষ মেরে ফেলতে বা টিউমার সংকুচিত করতে ব্যবহৃত হয়।

৩. কেমোথেরাপি: ক্যানসার কোষসহ দ্রুত বিভাজক কোষকে ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয় এই ওষুধ।

৪. ইমিউনোথেরাপি: ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগায় এই পদ্ধতি।

৫. টার্গেটেড থেরাপি: সুনির্দিষ্টভাবে ক্যানসার কোষের মিউটেশনকে লক্ষ্য করে প্রয়োগ করা হয় এই ওষুধ।

৬.হরমোনাল থেরাপি: হরমোন দ্বারা প্রভাবিত কিছু ক্যানসার যেমন স্তন এবং প্রোস্টেট ক্যানসারে এই থেরাপি ব্যবহৃত হয়।

প্রতিরোধ

ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে জীবনধারা পরিবর্তন জরুরি। ধূমপান ত্যাগ করুন। তামাক এড়িয়ে চললে একাধিক ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। সরাসরি সূর্যের আলোর সংস্পর্শ সীমিত করুন। সানস্ক্রিন ব্যবহার, সুরক্ষামূলক পোশাক পরার মাধ্যমে ক্ষতিকারক অতি বেগুনি রশ্মি থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। স্বাস্থ্যকর ডায়েট যেমন ফল, সবজি, গোটা শস্য এবং চর্বিহীন প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য আপনার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে শক্তিশালী করবে। নিয়মিত ব্যায়াম করে সঠিক ওজন বজায় রাখতে পারলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমবে। সপ্তাহের বেশির ভাগ দিন কমপক্ষে ৩০ মিনিটের শারীরিক ব্যায়াম দরকার। নিয়মিত স্ক্রিনিং ক্যানসার শনাক্তে সাহায্য করে। কিছু টিকা ক্যানসার ভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত। ভ্যাকসিন এই ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম মোস্তফা, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ একাডেমি অব প্যাথলজি ও চিফ কনসালট্যান্ট (প্যাথলজি) আনোয়ারা মেডিকেল সার্ভিসেস, ধানমন্ডি, ঢাকা

ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নিতে হয়
ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নিতে হয়। ছবি: পেক্সেলস

গাজাকে দখলে নেওয়ার ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কী আছে: নেতানিয়াহুর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন

যুক্তরাষ্ট্র সফররত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা নিয়ে তিনি কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী ট্রাম্প গাজাকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় নিতে চান। একই সঙ্গে চান ফিলিস্তিনিদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে স্থায়ীভাবে পাঠিয়ে উপত্যকাটির আবার উন্নয়ন এবং সেখানে ‘বিশ্ববাসী’র দখল প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর এ বিস্ময়কর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হলো—

ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজার ‘নিয়ন্ত্রণ নেবে’ এবং এর ওপর তার ‘মালিকানা’ প্রতিষ্ঠা করবে। সব ফিলিস্তিনিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পর এ ভূখণ্ডের ওপর তিনি তাঁর দেশের ‘দীর্ঘমেয়াদি’ মালিকানা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তবে কীভাবে ও কোন কর্তৃত্ববলে যুক্তরাষ্ট্র গাজার দখল নিতে পারে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা গাজা উপত্যকার দখল নেব এবং সেখান থেকে সব বিপজ্জনক অবিস্ফোরিত বোমা ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস করার দায়দায়িত্ব নেব।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ উপত্যকার বিধ্বস্ত ভবনগুলো ‘সমান’ করবে, সেখানে ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নকাজ চালাবে, সীমাহীন চাকরির ব্যবস্থা করবে এবং বিশ্ববাসীর জন্য বাড়ি তৈরি করবে।’

গাজাকে ‘মৃত্যু ও ধ্বংসের প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গাজার বাসিন্দাদের অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলেই তাঁরা সেখানে ফিরতে চান, এমনটা দাবি করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘মানবিক হৃদয়’ ও ‘ধনসম্পদ’ নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে গাজায় বসবাসকারী ১৮ লাখ ফিলিস্তিনির চলে যাওয়া উচিত।

এর আগে জর্ডান, মিসর ও অন্যান্য আরব দেশকে ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করার আহ্বান জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, তাঁদের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।

গাজাবাসীকে জোর করে উচ্ছেদ করা হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে এবং শুধু এ অঞ্চলের দেশগুলোই নয়, বরং ওয়াশিংটনের পশ্চিমা মিত্ররাও এর জোর বিরোধিতা করবে। কিছু মানবাধিকার সংস্থা ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে জাতিগত নিধনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, গাজাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসৈকত’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে ‘বিশ্বের লোকজন’ থাকতে পারবেন। ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারের কথার মিল আছে। কুশনার বলেছিলেন, ‘সাগরপাড়ের সম্পত্তি’ গাজার মূল্য অনেক বেশি।

ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান সমর্থন করেন কি না। এ প্রশ্নে তিনি অস্পষ্ট জবাব দেন। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র সরে যাওয়া উচিত—এ বক্তব্য তাঁর দ্বিরাষ্ট্রীয় নীতির বিরোধিতার ইঙ্গিত কি না, যা দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতির বিরোধী, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন—‘না’।

এ প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘এটি দ্বিরাষ্ট্র বা এক রাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্র গঠন, এমন কিছুই বোঝায় না। এর অর্থ, আমরা এটি চাই (গাজার নিয়ন্ত্রণ)। আমরা লোকজনকে বাঁচার একটা সুযোগ দিতে চাই। গাজা উপত্যকা একটা নরকের গর্ত হয়ে থাকায় সেখানে কখনোই তাঁদের বাঁচার সুযোগ ছিল না। এটি ছিল আতঙ্কের জায়গা।’

ট্রাম্পের দাবি, তিনি যা বলেছেন, তার প্রতি অজ্ঞাত নেতাদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘এ সিদ্ধান্ত হালকাভাবে নেওয়া হয়নি।’ তাঁর আরও দাবি, ‘এ ভূখণ্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়ে আমার দেওয়া বক্তব্যকে সবাই পছন্দ করেন।’ ট্রাম্পের মত, ‘এটি হলে মধ্যপ্রাচ্যের এ অংশে দারুণ স্থিতিশীলতা বয়ে আসবে।’

গাজায় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাও নাকচ করে দেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘গাজা সম্পর্কে বলতে হয়, সেখানে যা করার প্রয়োজন, আমরা তা-ই করব। যদি এটির (সেনা পাঠানো) প্রয়োজন হয়, তবে আমরা তা-ও করব।’

গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ধারণাকে সমর্থন জানিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) গাজা নিয়ে আলাদা রকমের ভবিষ্যৎ দেখেন। আমি মনে করি, এটি এমন কিছু, যা ইতিহাস বদলে দিতে পারে।’

পশ্চিম তীর নিয়ে বক্তব্য আগামী মাসে

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে নিজের অবস্থান সম্পর্কে আগামী মাসে তিনি বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা এ বিষয়ে এখনো অবস্থান গ্রহণ করিনি।’ সংবাদ সম্মেলনে গাজা উপত্যকা, ইসরায়েল ও সৌদি আরব সফরের পরিকল্পনার কথাও জানান ট্রাম্প।

এদিকে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। হোয়াইট হাউসে বসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্পকেই ইসরায়েলের এযাবৎকালের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গাজায় আমাদের কাজ শেষ করতে হবে। জেতার মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধের সমাপ্তি টানবে ইসরায়েল।’ প্রচলিত চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে ভাবার জন্য ট্রাম্পের প্রশংসা করেন তিনি।

ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা প্রত্যাখ্যান সৌদি আরবের

নিজ ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো চেষ্টাকে জোরালোভাবে নাকচ করে সৌদি আরব এক বিবৃতিতে বলেছে, একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করবে না।

ইতিমধ্যে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার ট্রাম্পের আহ্বানকে ‘তাঁদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। আর জাতিসংঘে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি দূত বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের গাজায় বসবাসের আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের সম্মান করা উচিত।

ইসরায়েলের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত গাজার একাংশ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে গতকাল এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ উপত্যকা তাঁর দেশের মালিকানায় নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন

কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’-এ ব্যবসায়ীদের হাহাকার, হোটেল-রেঁস্তোরা বন্ধ

মধ্য কলকাতার মারকুইজ স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, কিড স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড, নিউ মার্কেট ও আশেপাশের এক বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের পরিচিতি ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে। প্রায় সারা বছরেই বাংলাদেশিদের আনাগোনায় সরগরম থাকতো গোটা এলাকা। বাংলাদেশি খাবার থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশিদের জন্যই গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলের হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতে এক সময় ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই অবস্থা ছিল। শীতকালে ও ঈদের সময় বাংলাদেশিদের ভিড়ে হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়তো। বিভিন্ন দোকান ও মলগুলোতে উপচে পড়তো ভিড়।

কোথায় সেই ভিড়? গোটা এলাকা থেকে বাংলাদেশিরা যেন উবে গিয়েছেন। চারিদিক এখন শুনশান। স্থানীয় মানুষ ও মেডিকেল ভিসায় আসা নামমাত্র কিছু বাংলাদেশির আনাগোনা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের ধাক্কায় কলকাতার মিনি বাংলাদেশে এখন শুধুই হাহাকার। চারিদিকে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে, বলছিলেন এক ব্যবসায়ী।

জুলাই থেকেই বাংলাদেশিদের আসা কমছিল। তবে গত ছয় মাসে তা কমতে কমতে এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, হোটেল মালিকরাসহ সব ব্যবসায়ীরাই মাছি তাড়াচ্ছেন। অনেক হোটেল বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বন্ধ হয়েছে অনেক রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সির অফিস ও মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রও।
বিশিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ী ও মার্কুইজ স্ট্রিট-ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ওয়েলফেয়ার সোসাইটি'র সহ সম্পাদক মনতোষ সরকার এই প্রতিবেদককে জানান, এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সবই বাংলাদেশিদের উপর নির্ভর করে ব্যাপক আকার নিয়েছিল। গত ছয়-সাত মাসে বাংলাদেশিদের আসা কমতে কমতে প্রায় শূণ্যে নেমে আসায় এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা  সবাই অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত। হোটেলগুলোতে আবাসিক নেই বললেই চলে। বিশাল খরচের বোঝা সকলের কাঁধে। একই কথা জানান, সম্রাট হোটেলের ম্যানেজার প্রেম ঘোষ। তিনি বলেন, একসময় আমরা বাংলাদেশি আবাসিকদের জায়গা দিতে পারতাম না। এখন দু’চার জন ছাড়া কোনও আবাসিক নেই।

এক রেঁস্তোরার মালিক জানালেন, আর বলবেন না। রেস্তোরাঁ খুলে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে বাংলাদেশি পর্যটকদের বসার জায়গার জন্য অপেক্ষা করতে হতো এখন সেখানে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া কোনো কাজ নেই। তিনিই জানালেন, ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। ক্রেতার অভাবে অনেকে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। নিউমার্কেটের সামনে দেখা সিরাজগঞ্জের মহম্মদ সিরাজের সঙ্গে। পিতাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তিনি কথায় কথায় বলেন, চারিদিক এমন শুনশান চেহারা আগে কখনো দেখিনি। ফুটপাতের সস্তার খাবারের দোকানগুলোর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। কাপড়ের দোকান, পোষাকের দোকানগুলোতে তেমন কোনও ক্রেতা নেই। তিনি জানান, যে হোটেলে তিনি রয়েছেন সেখানে বাংলাদেশি পর্যটক মাত্র দুই জন। তার কথায়, এমন দৃশ্য কোনোদিন দেখব বলে ভাবিনি।

নিউমার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলছিলেন, বাংলাদেশিদের উপরই আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম। ফলে তাদের অনুপস্থিতিতে সব কাপড়ের দোকানে কর্মী কমিয়ে দিতে হয়েছে। অনেক আর্থিক ঋণের বোঝা চেপে রয়েছে। কী হবে তা নিয়ে তিনি ও তার মতো সব ব্যবসায়ীরাই চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ঈদ আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি যা চলছে তাতে কোনও আশা দেখতে পাচ্ছি না। ফলে ঈদের জন্য আগে থেকে যে সব অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাস সেগুলো বাতিল করতে হচ্ছে।

পার্ক স্ট্রিটের বিলাসবহুল শাড়ি ও শেরওয়ানির দোকানগুলোরও এখন করুণ অবস্থা্। স্থানীয়রা ছাড়া আর কোনও পর্যটকের দেখা মিলছে না। বাংলাদেশিরাই ছিলেন এসব দোকানের বড় বড় ক্রেতা, জানান এক দোকানের কর্মচারী।

মিনি বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পরিবহন ব্যবসায়ী শ্যামলী যাত্রি পরিবহনের মালিক অবনী কুমার ঘোষ বলেন, এক কথায় ভয়াবহ।পরিস্থিতি যেভাবে চলছে তাতে খুব শিগগিরই কোনও আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। তিনি বলেন, সৌহার্দে্র বন্ধন হিসেবে দুই বাংলার মধ্যে যে যাতায়াতের সেতু বন্ধন গড়ে উঠেছিল তা এক প্রকার ভেঙে পড়েছে। দুই বাংলার মধ্যে যাতায়াতের জন্য অসংখ্য পরিবহনের বাস চলতো সেগুলো সবই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

তিনি জানান, এখন তাদের সৌহার্দ বাস প্রতিদিনের বদলে চলে সপ্তাহে একটি বা দুটি। সেগুলোতেও আট দশ জনের বেশি যাত্রী থাকে না। ফলে ঘোর সঙ্কটে রয়েছেন তিনিও। আর বাংলাদেশিদের উপর নির্ভর করে যে অসংখ্য পরিবহন সংস্থা গড়ে উঠেছিল সেগুলোর অনেকেই পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়েছে।
বণিকসভার এক কর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে পর্যটক আসা ভিসা ও অন্যান্য কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। হাসপাতালের ব্যবসা মার খাচ্ছে। নিউ মার্কেট থেকে ই এম বাইপাসে তৈরি বহু হোটেল বাংলাদেশি রোগী ও তাদের পরিবারের উপরে নির্ভরশীল। সেখানে কলকাতা ও রাজ্যের ছেলেমেয়েরা কাজ করেন। বাংলাদেশিরা না আসায়  হোটেলের ব্যবসাও মার খেয়েছে। ফলে অনেকেই রুটিরুজি হারিয়েছেন। বিভিন্ন দোকানের কর্মচারীদেরও ছাঁটাই করা হচ্ছে।

শুধু নিউমার্কেট অঞ্চল নয়, গড়িয়াহাট, হাতিবাগানের মতো এলাকাগুলোর ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশিদের উপর নির্ভর করতেন। তারা এখন হা হুতাশ করছেন। একই চিত্র বড় বাজারের বড় বড় শাড়ির আড়ৎগুলোতেও। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণ শাড়ি ও পোষাক কিনে বাংলাদেশে পাঠাতেন সে সব এখন এক প্রকার বন্ধ।

mzamin


ট্রাম্পের সাহায্য স্থগিত, বাংলাদেশে মার্কিন কর্মসূচি পুনর্গঠনের সুযোগ by জন ড্যানিলোভিজ

ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যখন ২০ জানুয়ারি সমস্ত মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়, তখন বহিষ্কৃত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করা বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলো তা শুনে আনন্দিত হয়েছিল। নয়া দিল্লির নির্দেশে কাজ করা ভারতীয় ডানপন্থী মিডিয়া ভাষ্যকারদের এই নেটওয়ার্কটি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি নতুন ট্রাম্প সরকারের অসন্তুষ্টির চিহ্ন হিসেবে এই পদক্ষেপকে চিহ্নিত করতে শুরু করে। কিন্তু শিগগিরই তারা বুঝতে পারে যে, বাংলাদেশই একমাত্র নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত ‘মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা শিল্প’ থেকে বাদ পড়েছে। ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহায়তা পেত এবং দেশটির এনজিওগুলোর জন্যও এই সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে।

আমি যখন এক্স -এ বিষয়টি তুলে ধরি, তখন ভারতের অতি-জাতীয়তাবাদী ভাষ্যকাররা কয়েকদিন ধরে একে ‘ভুয়া খবর’ বলে তীব্র উপহাস করতে থাকে। এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি সংকটময় মুহূর্ত। বাংলাদেশে উন্নয়ন সহায়তা বন্ধের বাস্তব প্রভাবকে খাটো করে দেখলে চলবে না। সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর এর প্রভাব পড়বে। যদিও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছিল, তবে অন্যান্য কর্মসূচি যেমন স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন এবং শিক্ষা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) দ্বারা অর্থায়ন করা হয়েছিল, এখন আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে একটি স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থার ১,০০০-এর বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, কারণ তারা ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন।

বিশ্বব্যাপী সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে নতুন মার্কিন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেয়া হয়নি। বরং নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকে এ নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছিল। মাইক্রো লেভেলে এর প্রভাব সবথেকে বেশি। তবে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধুমাত্র সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ভাবলে ভুল হবে। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি, আমেরিকায় বসবাসকারী নাগরিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স এবং বিশ্বব্যাংকের মতো মার্কিন-প্রভাবিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেয়া ঋণ—এসবই দেশের অর্থনীতির জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য ও অভিবাসন সংক্রান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের আসন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো সহায়তা বন্ধের চেয়ে ওয়াশিংটন-ঢাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর সম্ভাব্যভাবে বেশি প্রভাব ফেলবে।  যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কতটা প্রতিযোগিতামূলক থাকবে। কারণ এটি শুল্ক ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অভিবাসন সীমিত করা এবং অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো হলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে পারে। এর ওপর যদি যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের পাঠানো অর্থের ওপর কর বসানো হয়, তাহলে রেমিট্যান্স আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সাহায্যে বন্ধের ৯০-দিন বিরতির পরে কী হবে তা যে কারও অনুমানযোগ্য, এমনকি একটি স্বাধীন সংস্থা হিসাবে USAID-এর ভবিষ্যত এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বৈদেশিক সহায়তা নীতির সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়, ট্রাম্প প্রশাসনের মার্কিন মিত্রদের সাথেও আলোচনা করা উচিত। বিশেষ করে কোয়াড জোটের দেশ— ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে এই আলোচনা জরুরি। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশ অবস্থিত হওয়ায়,  চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে কোয়াড সদস্যদের উচিত ঢাকার জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা আরও বাড়ানো। বিশেষ করে জাপানের এগিয়ে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সহায়তার ঘাটতি পূরণেও সহায়ক হতে পারে।

অনেক বিশ্লেষক যখন ঢাকা-ওয়াশিংটনের সহায়তা স্থগিত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তখন দুই দেশের সম্প্রসারিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক তাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। একটি মার্কিন কোম্পানি ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের সাথে একটি নতুন তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দ্বিতীয়ত, একজন ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারী, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসকে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিলো তা দেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন। তবে বিনিয়োগের প্রতি সাম্প্রতিক আগ্রহ দেখে বোঝা যায় যে,  বাংলাদেশে ব্যবসা ও রাজনীতির পরিবেশ ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাণিজ্য বাড়ানো ও মার্কিন বিনিয়োগ আনতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। গত মাসে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো মঞ্চে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে আলাপচারিতা করেন।  অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সহায়তার চেয়ে বাণিজ্যই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সাধন করে। তাই বিদেশি সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা সঠিক পথ নয় এবং এটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। সহায়তা স্থগিতের ৯০ দিনের ধোঁয়াশা কেটে গেলে বাংলাদেশের জন্য মার্কিন বিনিয়োগ কোন খাতে আসবে তা সামগ্রিক নগদ ডলারের পরিমাণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সহায়তা কর্মসূচি সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের পর্যালোচনা করা উচিত।

গণতন্ত্রের জন্য অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিন

উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে সমর্থন করার জন্য প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেয়ার এটি একটি সুযোগ। যা এই সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের মানুষের চাহিদাকে আরও ভালোভাবে পূরণ করবে। একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের জেনারেল জেডের সাথে জড়িত থাকার উপর আরও বেশি ফোকাস করা সম্ভবত বিনিয়োগে একটি বড় রিটার্ন প্রদান করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষার্থীরা হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন এবং সারা দেশে ছড়িয়ে দেন তাদের মধ্যে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্কতা ছিল। এটি  বাংলাদেশের তরুণদের ক্ষমতাকে  কাজে লাগানোর গুরুত্ব তুলে ধরে। তাদের প্রয়োজন বুঝে  কর্মসূচি তৈরি করা উচিত, যাতে তারা বাংলাদেশ, এশিয়া তথা বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে । সেইসঙ্গে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথপ্রদর্শক হতে পারে।

সূত্র : বেনার নিউজ

লেখক জন ড্যানিলোভিজ হলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সিনিয়র ফরেন সার্ভিস অফিসার যার দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে  ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার কূটনৈতিক কর্মজীবনে তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

mzamin

বাংলাদেশের ওপর ভারতের আঞ্চলিক দাপট কি চীনের সঙ্গে নৈকট্য বাড়ার কারণ

চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। তাই ঢাকা এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বিস্তার করার পরিকল্পনা ধাক্কা খেতে পারে। গত বছর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বেশ কয়েকটি আলোচনা চালিয়েছে চীন। এদিকে হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব উপভোগ করে আসলেও বর্তমানে  এ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ায় আগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। দিল্লিতে হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া, ঢাকার কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হস্তান্তর না করা এবং ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধির একের পর এক প্রতিবেদন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও খারাপ দিকে নিয়ে গেছে।

লন্ডন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের একজন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো চিতিগজ বাজপেয়ী বলেছেন, যেসব দেশের সাথে ভারতের ঐতিহাসিকভাবে বৈরি সম্পর্ক রয়েছে- শুধুমাত্র চীন নয়, এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও, তাদের প্রতি বাংলাদেশের   অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সহানুভূতিশীল।

গত মাসে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বেইজিংয়ে তার চীনা সমকক্ষ ওয়াং ইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। ডেকান হেরাল্ডের একটি প্রতিবেদন অনুসারে ওয়াং তৌহিদ হোসেনকে বলেছেন- চীন তার সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশকে সমর্থন করে। দেশের অবস্থার সঙ্গে মানানসই একটি উন্নয়ন পথ অন্বেষণ করে। চীন বাংলাদেশি জনগণের পছন্দকে সম্মান করে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক।

থিঙ্ক ট্যাঙ্ক তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের চীন বিষয়ক বিশ্লেষক রক্ষিত শেঠি বলেছেন- ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে সবুজ রপ্তানি বাড়াতে চীনের সোলার প্যানেল কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের প্রস্তাব করেছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র ফেলো জোশুয়া কুরলান্টজিক বলেছেন, ইউনূস ঢাকার জন্য আরও সাহায্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে শিগগিরই বেইজিং সফর করবেন। কুরলান্টজিক বলেন, ইউনূস নতুন চীনা  বিনিয়োগ আনতে  আগ্রহী। তিনি চীনের কাছ থেকে ঋণ মাফ এবং বাংলাদেশে নতুন চীনা প্রকল্পে সুদের হার কমানোরও চেষ্টা করছেন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে কয়েকশ চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সেতু  প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

চীনের উন্নয়ন মডেল এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান সারিবদ্ধতা দিল্লির দর কষাকষির ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে বলে মনে করেন রক্ষিত শেঠি। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৩ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য মোট ১৬৮.৪ বিলিয়ন ইউয়ান (২৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ) ছিল, যার বেশিরভাগই বাংলাদেশে চীনা রপ্তানি ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা ফ্রন্টেও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হয়েছে। পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা এবং চীনা J-10C ফাইটার জেট অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ তার বিমান বাহিনীকে উন্নত করতে চাইছে বলে জানা গেছে। শেঠি মনে করেন , চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তা কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে , বিশেষ করে তার পূর্ব সীমান্তে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার চিহ্ন হিসেবে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)  চুক্তি লঙ্ঘনের উল্লেখ করে তার বাংলাদেশী প্রতিপক্ষদের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। ইউনূসের প্রশাসনের দ্বারা জেলে বন্দী ‘ইসলামপন্থীদের’ সাম্প্রতিক মুক্তি ভারতে নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে, ভারতের চির প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সামরিক ব্যস্ততাও দিল্লিতে শঙ্কা জাগিয়েছে। গত মাসে, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর একজন সিনিয়র অফিসার এস এম কামরুল হাসান পাকিস্তানে গিয়ে  দেশটির প্রতিরক্ষা সচিব মোহাম্মদ আলী এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করেন। একই মাসে পাকিস্তানের একটি সামরিক প্রতিনিধি দল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সংবেদনশীল এলাকাও পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় সৈন্যদের সমর্থনে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। বাজপেয়ী বলেন, হাসিনার পতনের পর দিল্লির তোয়াক্কা না করেই ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে ঢাকা দ্বিধাবোধ করেনি। তিনি আরও বলেন, ঢাকার সাম্প্রতিক পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য ভিসার নিয়ম শিথিল করা এবং নভেম্বরে বাংলাদেশের বন্দরে একটি পাকিস্তানি পণ্যবাহী জাহাজের ডকিং এর প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব হ্রাস দক্ষিণ এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কুরলান্টজিক  বলছেন , কর্তৃত্ববাদী  হাসিনা সরকার হোক বা ইউনূসের সরকার- উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেই চীন বাস্তবতা দেখিয়েছে।  অন্যদিকে, ভারত এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা এতদিন  হাসিনা এবং তার দলকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। বাজপেয়ী মনে করেন , পাকিস্তানের পাশাপাশি, নয়াদিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে সম্পর্কের  টানাপোড়েনের মাঝে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নৈকট্য ভারতের পূর্বমুখী সম্পর্ককে জটিল করে তুলবে। কারণ নয়াদিল্লির ‘অ্যাক্ট ইস্ট’নীতিতে বাংলাদেশ একটি মূল ফ্যাক্টর।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

mzamin

আওয়ামী লীগের কার্যালয়: ভুতুড়ে পরিবেশ, নাক চেপেও সামনে দিয়ে হাঁটা দায় by মোহাম্মদ মোস্তফা

সুসজ্জিত ভবনটি এখন অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভেতরের সব আসবাব লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। পোড়া এই ভবনের নিচতলা শৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছয় মাস ধরে মলমূত্র জমে থাকার কারণে উৎকট গন্ধ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ জন্য ভবনের সামনের সড়কে নাক চেপেও হাঁটা দায়।

রাজধানীর গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বর্তমান চিত্র এটি। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভবনটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আগস্ট মাসজুড়ে চলে লুটপাট। কেবল এই ভবনই নয়, রাজধানীর তেঁজগাওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়েও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকেও মালামাল লুট করে নেওয়া হয়। তখন থেকে এই তিন ভবন অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

গত মঙ্গলবার এ তিনটি কার্যালয় সরেজমিনে ঘুরে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। তাতে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দেখা গেছে গুলিস্তান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

ভবঘুরে লোকদের ঠিকানা

মঙ্গলবার বেলা দুইটার দিকে গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির নিচতলা লোকজন গণশৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করছেন। উৎকট গন্ধের কারণে নাক চেপে মানুষ এই ভবনের সামনের অংশ পার হচ্ছেন। এ সময় বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে ভবনের নিচতলায় গিয়ে প্রস্রাব করতে দেখা যায়। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের শৌচাগার হিসেবেও এই ভবনের নিচতলা ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভবনটির ভেতরে প্রবেশের পর দেখা যায়, নিচতলায় দুটি কক্ষে নোংরা পানি জমে আছে। পুরো ফ্লোরে ময়লা–আবর্জনার স্তূপ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখা গেল বাথরুম থেকে শুরু করে সব কক্ষের মালামাল লুট করার পর এসব কক্ষ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসবের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। প্রতিটি কক্ষের দরজাও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দরজা খুলতে গিয়ে ভবনের দেয়াল ভাঙতে হয়েছিল। সেখানে ইটের খোয়া ও কাচের টুকরা পড়ে আছে। ছয়তলায় গিয়ে দেখা গেল, সেখানে কয়েকজন মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাঁদের ছিন্নমূল মানুষ মনে হয়েছে। কত দিন ধরে থাকছেন জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে তাঁরা এই ভবনে আছেন। রাতে আরও অনেক লোক ভবনে আসেন বলে জানান তাঁরা।

ভবন থেকে বেরিয়ে কথা হয় এই কার্যালয়ের সামনের এক ভ্রাম্যমাণ দোকানির সঙ্গে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার এই বাসিন্দা জানান, ৪০ বছর ধরে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যবসা করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এই দশা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। কেবল বললেন, ‘ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়, এটা সকলের বোঝা উচিত।’ পাশের আরেক দোকানির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় হকার থেকে শুরু করে পথচারীরাও ভবনটিকে শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজনকে এখানে শৌচকাজ সারতে তাঁরা দেখেছেন। আরও কয়েকজন দোকানির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁরা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

গুলিস্তানে ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ১০ তলাবিশিষ্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি ২০১৮ সালের ২৩ জুন উদ্বোধন করেছিলেন দলের সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল।

পাহারা দিচ্ছেন বিএনপির নেতা

তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের চিত্রও অনেকটা একই রকম। এই কার্যালয়েও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর মালামাল লুট করা হয়েছিল। পরিত্যক্ত এই ভবন এখন দেখে রাখছেন স্থানীয় বিএনপির এক নেতা। রফিক মাতব্বর নামের এই নেতা নিজেকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার ৪ নম্বর ইউনিট বিএনপির সভাপতি পরিচয় দিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিনিয়ত ছিন্নমূল লোকজন এসে অবশিষ্ট মালামাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছেন। এসব ঠেকাতে তিনি কার্যালয়ের একটি ফটকে তালা দিয়েছেন। আরেকটি ফটক খুলে নেওয়ার পর সেখানে বিভিন্ন জিনিস রেখে প্রবেশপথ বন্ধ করেছেন, যাতে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

এই কার্যালয় ঘুরে দেখা যায়, আগুনের পোড়া চিহ্ন এখনো ভবনটিতে রয়েছে। প্রতিটি কক্ষ ভাঙচুরের পর সেখানে ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। এই ভবনে কাচের ব্যবহার বেশি করা হয়েছিল। ভবনটির নিচতলা ও দোতলায় অসংখ্য কাচের টুকরা পড়ে আছে। নিচতলায় নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শেখ হাসিনার পুরোনো কিছু ছবি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এই কার্যালয় স্টিলের অবকাঠামো দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। স্টিল ছাড়া এখানকার বাকি সবই লুট করা হয়েছে।

বিএনপির এই নেতার পাশাপাশি এই কার্যালয়ের পাহারায় একজন নিরাপত্তা প্রহরীও রয়েছেন। অহিদুল হক নামের ওই নিরাপত্তাকর্মী প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর তিনি সেখানে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। বেক্সিমকো গ্রুপ থেকে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত এক টাকাও বেতন পাননি।

২০২৩ সালের ৩ জুন এই কার্যালয়ের উদ্বোধন করা হয়েছিল। আশপাশের লোকজন জানান, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের নেতা–কর্মীদের এই কার্যালয়ের আশপাশেও ঘোরাঘুরি করতে দেখেননি।

ভুতুড়ে দশা

ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ভেতরের সব কক্ষই ভাঙচুর করা হয়েছিল। সেখানে মঙ্গলবার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে কাঠের বেড়া দিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না। কার্যালয়ের সামনে ২৪ বছর ধরে চা বিক্রি করেন এক ব্যক্তি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পরও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা কার্যালয়ের সামনে আসতেন। ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার পর থেকে আর কেউ আসেন না। পুলিশ মুঠোফোন তল্লাশি করার কারণে কার্যালয়ে আসা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বিকেলে বিএনপির লোকজন কার্যালয়ের সামনে আড্ডা দেন।

আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার পর ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন মো. কাউছার নামের এক ব্যক্তি। মঙ্গলবার ওই কার্যালয়ের সামনে পাওয়া গেল তাঁকে। ধানমন্ডি এলাকায় ১৫ বছর ধরে রিকশা চালান জানিয়ে পঞ্চগড় জেলার এই বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, ভেতরে কিছু নেই। সব নিয়ে গেছে। ভাঙচুরও করা হয়েছে। আগে কার্যালয়ের ভেতর ও সামনের রাস্তায় মানুষ গিজগিজ করত। এখন ভেতরে ভুতুড়ে পরিবেশ আর বাইরে জনশূন্য অবস্থা।

রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এখন চরম দুর্দশা। আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর লুটপাট চালানো হয় ভবনটিতে। এখন নিচতলায় প্রস্রাব করেন পথচলতি মানুষ। ওপরের তলাগুলোতে থাকেন ভবঘুরে অনেকে। মঙ্গলবারের চিত্র
রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এখন চরম দুর্দশা। আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর লুটপাট চালানো হয় ভবনটিতে। এখন নিচতলায় প্রস্রাব করেন পথচলতি মানুষ। ওপরের তলাগুলোতে থাকেন ভবঘুরে অনেকে। মঙ্গলবারের চিত্র। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবনের প্রতিটি তলায় রয়েছে এমন ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। মঙ্গলবারের চিত্র
গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবনের প্রতিটি তলায় রয়েছে এমন ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। মঙ্গলবারের চিত্র। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

পোড়া আর ভাঙচুরের ক্ষত নিয়ে পড়ে আছে তেজগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়। মঙ্গলবারের চিত্র
পোড়া আর ভাঙচুরের ক্ষত নিয়ে পড়ে আছে তেজগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়। মঙ্গলবারের চিত্র। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

 

বাংলাদেশি রোগী নেই: কলকাতার হাসপাতালে ত্রাহি অবস্থা

দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুরের আর এন টেগোর হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম গত বছরের এই সময়ের ছবিটি। চারদিকে শুধুই বাংলাদেশির ভিড়। হাসপাতালের বাইরের দোকানগুলোসহ গেস্ট হাউসগুলো থাকতো বাংলাদেশিতে ঠাসা। কিন্তু মঙ্গলবার হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে যে ছবিটি উঠে এসেছে তাতে চারদিক সুনশান। হাসপাতালের লবিও এখন গিজগিজ করছে না বাংলাদেশি রোগীদের ভিড়ে। মধ্য কলকাতা থেকে ই এম বাইপাসের ধারের হাসপাতালগুলোর সামনে এখন সেই রমরমা ভিড়ের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালের বেশির ভাগ নির্ভরশীল বাংলাদেশি রোগীদের উপর। ফলে বাংলাদেশি রোগীদের অনুপস্থিতিতে কলকাতার হাসপাতালগুলোর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সংগঠন এসোসিয়েশন অব হসপিটালস্‌ অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি রূপক বড়ুয়া জানান, কলকাতার হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশের রোগীদের থেকে মাসে প্রায় ২০-২৫ কোটি রুপির মতো আয় হতো। জুলাইয়ে যা ২০ শতাংশের মতো কমেছে। আগস্টের পর থেকে তা কমতে কমতে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল ও অশান্তির জেরে এবং ভারতীয় ভিসার নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা বাংলাদেশির সংখ্যা কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্যে এসে দাঁড়িয়েছে। চূড়ান্ত গুরুতর ও আপৎকালীন অসুস্থতা ছাড়া মেডিকেল ভিসাও ভারত সরকার ইস্যু করছে না। ফলে আগস্টের পরবর্তী দু’-তিন মাস পুরনো মেডিকেল ভিসায় কিছু রোগী এলেও নতুন করে মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ির কারণে এখন তাও বন্ধ। অনেকে নিরাপত্তাজনিত কারণেও আসছেন না।

ভাষাগত সাযুজ্য, সুবিধাজনক থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা খরচের স্বল্পতার জন্য লাখ লাখ বাংলাদেশির স্বাভাবিক পছন্দ ছিল কলকাতা। হার্টের অসুখ থেকে শুরু করে নিউরোসার্জারি, ক্যান্সার, পেডিয়াট্রিক সার্জারি, ইউরোলজিক্যাল সমস্যা, অর্থোপেডিক রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি কিংবা বন্ধ্যত্ব, সবকিছুর চিকিৎসাতেই বাংলাদেশিরা ঢাকার চেয়ে কলকাতাকে ভরসা করতেন বেশি। ভারতে বিদেশ থেকে চিকিৎসা করাতে রোগীদের মধ্যে ৬৯ শতাংশই এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। এর বেশির ভাগই বেছে নিয়েছিলেন কলকাতাকে।

কলকাতায় ১০-১২টি বেসরকারি হাসপাতালেই থাকতো বাংলাদেশি রোগীদের যাতায়াত। কলকাতায় মণিপাল গোষ্ঠীর অধীন চারটি হাসপাতালে গত সাত দিন ধরে বহির্বিভাগে নতুন বাংলাদেশি রোগী নেই বললেই চলে। সূত্রের খবর, আগে মাসে ২৩০০-২৪০০ রোগী বাংলাদেশ থেকে আসতেন। কিন্তু এখন বাংলাদেশের কোনো রোগী নেই ইনডোর বিভাগেও। কর্তৃপক্ষ মনে করেন, এই অবস্থা আরও কিছুদিন চলবে। বাংলাদেশের রোগীরা মূলত নগদে চিকিৎসার খরচ মেটাতেন। ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে হাসপাতালকে।

রুবি জেনারেলের সিজিএম-অপারেশনস শুভাশিস দত্ত বলেন, আগে পড়শি দেশ থেকে দিনে ৩০-৩৫ জন রোগী আসতেন। গত ১ তারিখ থেকে নতুন রোগী ভর্তিও হননি। তার কথায়, আর্থিক ক্ষতি তো হচ্ছেই। আর এন টেগোর হাসপাতাল সূত্রের খবর, বহির্বিভাগে দিনে ১৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি রোগী আসতেন। সেখানে শেষ কয়েকদিনে তা কমে শূন্যে দাঁড়িয়েছে।

বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়াও বাংলাদেশি রোগীর অভাবে কলকাতা ও শহরতলির ছোট-মাঝারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা খুবই সংকটজনক। এই সব হাসপাতাল ও নার্সিং হোমের ব্যবসার বড় অংশ আসতো বাংলাদেশের রোগীদের চিকিৎসা থেকে। ফলে নগদের অভাবে ভুগছে তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিউরোসার্জন জানান, বাংলাদেশের রোগীরা মূলত চিকিৎসা করান নগদে। তাদের সংখ্যা কমতে কমতে শূন্যে নেমে আসায় প্রভাব পড়েছে চিকিৎসকদের উপরেও। অস্ত্রোপচারও বন্ধ। এখন ভরসা ভারতের রোগীরা।

পিয়ারলেস হাসপাতালের সিইও সুদীপ্ত মিত্রের মতে, বাংলাদেশের যে রোগীরা চিকিৎসা করাবেন বলে স্থির করেছিলেন, তারা আসবেনই। ফলে এটা লাভ-ক্ষতির বিষয় নয়। এখন হয়তো রোগী পাচ্ছি না। আগামী দিনে তা পাবো।

কয়েকটি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তারা ইতিমধ্যেই চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করা বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ই-চিকিৎসা ব্যবস্থা দিচ্ছেন।অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ‘চিকিৎসা পর্যটকদের’ সংখ্যা কমায় কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। কারণ, কলকাতার বিভিন্ন বড় হাসপাতাল থেকে হোটেল, রেস্তরাঁ ব্যবসা চিকিৎসার কারণে আসা বাংলাদেশিদের উপরে নির্ভরশীল। দিল্লির আর্থিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনস’র সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের চিকিৎসা পর্যটন শিল্পে সব থেকে বড় অংশীদার বাংলাদেশ। গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা গদিচ্যুত হওয়ার পরে ভারতের চিকিৎসা পর্যটন ক্ষেত্র ধাক্কা খেয়েছে। চিকিৎসা পর্যটক কমেছে। ফলে হাসপাতাল ও তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সব থেকে বেশি প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। কারণ, এই সব অঞ্চলেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা পর্যটক আসেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে দশটি দেশ থেকে সব থেকে বেশি মানুষ ভারতে চিকিৎসা করাতে আসেন, তার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। ২০২২ সালে যে ৪ লাখ ৭৪ হাজার বিদেশি ভারতে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন, তার ৬৮.৯ শতাংশ এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে। এর বাইরে বহু মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে সীমান্তবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা করিয়ে যান।

বাংলাদেশের উপর নির্ভরতা কমাতে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনস বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। তাতে অন্যান্য দেশ থেকেও চিকিৎসা পর্যটন টানতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

mzamin

নাহিদ-আসিফরা পদত্যাগ করলেও সরকারে থাকতে পারেন ছাত্র প্রতিনিধি

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর থেকে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিষয়টি সামনে এসেছে। ছাত্র আন্দোলনের নেতারা নতুন দল গঠন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন। জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হলেও রাজনৈতিক দল হবে ভিন্ন। যেখানে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা নেতৃত্বে থাকবেন। এ ছাড়া সরকারে থাকা ছাত্রদের প্রতিনিধিরাও থাকতে পারেন। দলের নেতৃত্বে আসার আগেই সরকার থেকে পদত্যাগ করবেন ছাত্র প্রতিনিধিরা। তাদের একজন ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসতে পারেন।

বর্তমানে সরকারে রয়েছেন ছাত্রদের তিন উপদেষ্টা । তারা হলেন- তথ্য ও সম্প্রচার এবং আইসিটি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। এ তিনজন ধাপে ধাপে সরকার থেকে পদত্যাগ করে দলে যোগ দিলে সরকারে ছাত্রদের অংশীদারিত্ব কীভাবে থাকবে সে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। ছাত্ররাও বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। এক্ষেত্রে তিন উপদেষ্টা পদত্যাগ করলেও সরকারে ছাত্রদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে চান তারা। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অভ্যন্তরে আলোচনা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ছাত্ররা চাইছেন সরকারে তাদের অংশীদারিত্ব একেবারে শেষ না হোক। সে ক্ষেত্রে কীভাবে সরকারের সঙ্গে ছাত্ররা কাজ করতে পারে সে বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে সংগঠন দু’টির অভ্যন্তরে। যেটি নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে সরকারের উচ্চমহলেও।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব মানবজমিনকে বলেন, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হতে সরকারে থাকা ছাত্রদের প্রতিনিধিদের মধ্যে এক-দুই জন উপদেষ্টা পদত্যাগও করতে পারেন। এক সঙ্গে দুই জন না তিন জন পদত্যাগ করবেন- সেটি চূড়ান্ত হয়নি। হলে বলা যাবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। একজন নতুন করে উপদেষ্টা পরিষদে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আশা করি একজন উপদেষ্টা পরিষদে আসবেন। তবে এখনো পর্যন্ত তারা (সরকারে থাকা বর্তমান তিন উপদেষ্টা) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। জানালে বলা যাবে।
সুত্র মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদে রদবদল আসছে। নতুন কয়েকটি মুখ যোগ হতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় নাগরিক কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, তিন উপদেষ্টা ধাপে ধাপে পদত্যাগের করলে সরকারে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে থাকবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা চাচ্ছি আমাদের কোনো প্রতিনিধি সেখানে থাকুক। যিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন না বা হবেন না। যাই করা হোক সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সেটি নির্ধারণ করা হবে। অভ্যুত্থানের কোনো অংশীজনের সঙ্গে বিরোধ যেন সৃষ্টি না হয় সে বিষয়েও সজাগ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।

জানা গেছে, দল ঘোষণার আগ মুহূর্তে পদত্যাগ করতে পারেন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। যিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসবেন। এরপর দ্বিতীয় ধাপে পদত্যাগ করবেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আর উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সবার শেষে পদত্যাগ করতে পারেন।
এদিকে সংস্কার কমিশনসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রদের প্রতিনিধি রয়েছে। যারা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সরকারে ভূমিকা রাখছেন। রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে তারা নিজেকে যুক্ত করছেন বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায়। অন্যদিকে দল গঠনের প্রক্রিয়াও অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ঘোষিত হতে পারে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল। শুরুতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবেন তারা। ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফরম জাতীয় নাগরিক কমিটি এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে। যদিও নাগরিক কমিটি সরাসরি রাজনৈতিক শক্তি হবে না। তারা প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে।

দল গঠনের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সারা দেশে আড়াই শতাধিক কমিটি দিয়েছে নাগরিক কমিটি। দল ঘোষণা আসার আগে সেটিকে চার শতাধিকে উন্নীত করতে চায় সংগঠনটি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও জেলায় জেলায় কমিটি দিচ্ছে। এ ছাড়া নতুন দলের নাম ও দলীয় প্রতীক নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষেরও মতামত নেবে নাগরিক কমিটি। যে কেউ অনলাইন অফলাইনে তাদের মতামত দিতে পারবেন। এ ছাড়াও ছাত্ররা দল গঠনের আগে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন। উদ্দেশ্য, তাদের নতুন দলে ভেড়ানো।

mzamin

ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি পাচ্ছেন নারী ফুটবলার সুমাইয়া

নারী দলের হেড কোচ পিটার বাটলারের প্রতি অনাস্থা এনে অনুশীলন থেকে বিরত আছেন ১৮ ফুটবলার। বাটলারকে অপসারণ না করলে অনুশীলনে ফিরবেন না এমনটা জানিয়ে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের কাছে চিঠিও দিয়েছেন আন্দোলনকারী ফুটবলাররা। ইংরেজিতে লেখা এই চিঠি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। অনেকের ধারণা বাফুফের সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি সাবিনাদের হয়ে এই চিঠি লিখে দিয়েছেন। এ নিয়ে তদন্ত কমিটির জেরার মুখেও পড়তে হয়েছে ফুটবলারদের। তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হয়ে সতীর্থদের হয়ে চিঠি লেখার কথা জানিয়েছেন মাতসুশিমা সুমাইয়া। এরপরেও অনেকে বিষয়টি বিশ্বাস করতে চাইছেন না। এই বিষয়টি অনেক পীড়া দিচ্ছে জাপানে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলারকে। পাশাপাশি  বেশ কয়েকদিন ধরে অগণিত প্রাণহানি ও ধর্ষণের হুমকি পাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পঙেছেন সুমাইয়া।

এনিয়ে আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ স্ট্যাট্যাসে সুমাইয়া লেখেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। আমার নাম মাতসুশিমা সুমাইয়া। আমি বাংলাদেশ মহিলা জাতীয় ফুটবল দলের একজন খেলোয়াড়। ইন্টার স্কুলে ইংলিশ মিডিয়াম স্টুডেন্ট হয়ে খেলা থেকে শুরু করে মালদ্বীপে লীগ জেতা এবং বাংলাদেশের হয়ে সাফ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৪ জেতা, এই যাত্রাটা আমার কাছে দারুণ ছিল। যখন থেকে আমি এই পথটি বেছে নিয়েছি, আমার স্বপ্ন ছিল সেই তরুণ শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা। যাদের বাবা-মা চায় তারা শুধু পড়াশোনার ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করুক। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে আবেগ এবং উৎসাহ বাধা ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু আজ, আমি আফসোস নিয়ে বসে থাকি আক্ষেপ নিয়ে আমার শিক্ষা, আমার পরিবার, ঈদ, সব বিসর্জন দিয়ে এমন একটি দেশের সেবা করার জন্য যে আমাদের সংগ্রামের তারিফ করতে জানে না।

আমি আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম ফুটবল খেলার জন্য, বিশ্বাস করেছিলাম যে আমার দেশ আমার পাশে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একজন ক্রীড়াবিদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কেউ সত্যিই চিন্তা করে না। আমার এবং দলের সহকর্মীদের জন্য আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে গিয়েছি তা নিয়ে ইংরেজিতে চিঠি লেখার সর্বনিম্ন ক্ষমতা আমার আছে। গত কয়েকদিন ধরে, আমি অগণিত প্রাণহানি ও ধর্ষণের হুমকি পেয়েছি, শব্দগুলো আমাকে এমনভাবে ধ্বংস করেছে যা আমি কল্পনাও করিনি। আমি জানি না এই আঘাত থেকে সারতে আমার কতো সময় লাগবে, কিন্তু আমি জানি যে কাউকে তাদের স্বপ্ন অনুসরণ করার জন্য এর মধ্যদিয়ে যেতে হবে না।

mzamin

মোহাম্মদপুর থেকে নিখোঁজ সেই কিশোরীর সন্ধান মিলেছে

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আদাবর এলাকা থেকে ‘নিখোঁজ’ ১১ বছরের সেই শিশু আরাবি ইসলাম সুবার সন্ধান মিলেছে। স্বেচ্ছায় এক কিশোরের সঙ্গে ‘পালিয়ে যাওয়া’ সুবা বর্তমানে ওই কিশোরের পরিবারের হেফাজতেই রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মঙ্গলবার দুপুরে আদাবর থানার ওসি এস এম জাকারিয়া বলেন, ‘সুবা স্বেচ্ছায়ই এক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। যেটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছিল। এখন সে ওই ছেলের বাড়িতেই রয়েছে।’

এর আগে সুবার সন্ধান চেয়ে সোমবার সন্ধ্যায় আদাবর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা ইমরান রাজিব।

উল্লেখ্য, রোববার সন্ধ্যায় ফুফাত ভাইয়ের সঙ্গে বাইরে বের হয় সুবা। রাস্তা পার হওয়ার সময় ফুফাত ভাই কিছুটা আগে চলে যায়। পরে সে পেছনে ফিরে দেখে সুবা নেই। শিশুটির ছবিসহ নিখোঁজের খবর ফেইবুকেও ছড়িয়ে পড়ে। আরাবি বরিশালের একটি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ক্যানসারের চিকিৎসায় তার মা ঢাকায় এসেছিলেন। মায়ের সঙ্গে সুবাও এসেছিলেন।

mzamin