Wednesday, May 29, 2013

সংঘাতের রাজনীতি

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে তা আজ স্বীকৃত একটি বিষয়। বাংলাদেশ সফরে এসে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারিও আবার সে কথাই স্বীকার করে গেলেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা এই সম্ভাবনাকে নিজ গতিতে চলতে দিচ্ছে না। এটা আজ সত্যিই এক আক্ষেপের বিষয় যে এসব পরিহার করতে পারলে বাংলাদেশ আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াত! মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি আর শারমেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হয়েই দেশটির সম্ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, নারীশিক্ষায় অগ্রগতি, দ্বিতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উঠে আসাসহ বিভিন্ন সাফল্যের কথা উল্লেখ করে এ দেশের গতিশীল গণতন্ত্রেরও প্রশংসা করেছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশে এসেই হরতালের মুখে পড়তে হয়েছে শারমেনকে। যে দেশটি সামনের দিকে এগোচ্ছে, রয়েছে সম্ভাবনা, সে দেশটিতে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা সংগত কারণেই তাঁকে হতাশ করেছে। বলেছেন, অসংখ্য বাংলাদেশির মতো আমি আর আমার সহকর্মীরা নিরাশার সঙ্গে একের পর এক হরতাল, রাজপথে সহিংসতার পর সহিংসতা অবলোকন করেছি। হরতাল কর্মসূচির কারণে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেছেন মার্কিন সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি। কূটনৈতিক সূত্রে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর এই সফরের সময় হরতাল না দেওয়ার জন্য মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল। এ ধরনের অনুরোধ রক্ষা করা শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে, কিন্তু দলটি তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। হরতালের কারণে ‘বিরক্ত’ হয়ে যদি তিনি বৈঠকটি বাতিল করে থাকেন, তবে বিএনপির হরতাল ডাকার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকভাবে ভুল হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
শারমেন বাংলাদেশের যে সম্ভাবনার কথা বলেছেন আর যে বিষয়গুলো নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন, তা নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের জনগণও নিজেদের এই সমস্যা আর সম্ভাবনা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। বাংলাদেশের আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের বিদ্যমান ধারার রাজনীতি। দেশের বাইরে থেকে এসে কেউ তা শুধরে দিতে পারবে না, যতক্ষণ না দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজ থেকেই তা শোধরানোর উদ্যোগ নেয়।
দেশের বর্তমান সংঘাত ও সহিংসতার মূলে রয়েছে আগামী নির্বাচন। শারমেনের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেছেন যে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেবে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান দেশবাসীরও চাওয়া। এ নিয়ে বর্তমানে যে অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা দূর করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। আমরা আশা করব, বিরোধী দল হরতালের মতো কর্মসূচি ও সহিংসতা পরিহার করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথ বেছে নেবে। তা না হলে সম্ভাবনাময় এই দেশটির সম্ভাবনাকে নষ্ট করার দায় তাদের নিতে হবে।

সভা-সমাবেশ বন্ধ করা যায়, কিন্তু হরতাল? by আলী ইমাম মজুমদার

যে তিমিরে ছিলাম, সেখানেই রইলাম। আবার হরতাল ডাকা হলো। একটু পেছনে তাকালে স্মরণে আসবে এর প্রেক্ষাপট। অতিসম্প্রতি প্রধান বিরোধী দল তাদের অফিসের সামনে একটি সমাবেশ করার জন্য দু-দুটি দিন ধার্য করেও ঢাকা মহানগর পুলিশের অনুমতি পায়নি। প্রতিবাদে তারা একটি হরতাল ডেকেছিল। তখন উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল ঘূর্ণিঝড় মহাসেন। হরতাল আহ্বানকারীরা তখনকার মতো তা প্রত্যাহার করলেন। বন্যার কিছু উপকারিতা সম্পর্কে জানা যায়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের কোনো উপকারিতার কথা এত দিন জানা ছিল না। এযাত্রায় অন্তত দেখা গেল, মহাসেনের হুংকারে জাতি অন্তত একটি আসন্ন হরতালের হাত থেকে রেহাই পেল। এক দিনের হরতাল কোনো না কোনো অজুহাতে একাধিক দিনের হয়ে যায়, এমনটিও অনেকবার দেখা গেছে। তবে তখনকার মতো প্রত্যাহার করা হলেও ২৪ মে ঘোষণা দিয়ে ২৬ মে আবার তারা হরতাল ডাকল। কারণ বলা হলো একটাই, নিয়মতান্ত্রিক সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে এ হরতাল।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হয়ে জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। জনশৃঙ্খলার স্বার্থে সে বাধানিষেধ আরোপের ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও মহানগর পুলিশ আইনসমূহে রয়েছে। সময়ে সময়ে তার প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগও হয়। বাধানিষেধের অপপ্রয়োগ যদি জনজীবনে অধিক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তার দায়িত্ব আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেউ নেয় না। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষ দিতে থাকে। আর বারবার এ ধরনের পরিস্থিতি ঘটে চলেছে। এর মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এটা দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করা যায় যে হরতাল দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছে একটি অগ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও যখন যাঁরা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা সময়ে সময়ে হরতাল ডাকেন; কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে। এতে ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। তবে বরাবর সব সরকারই নির্বিকার থাকে। আর বিরোধী দলও তাদের সিদ্ধান্তে রয়ে যায় অবিচল। এখন উভয় পক্ষের মধ্যে আগামী নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে একটি সংলাপের প্রচেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় হরতালটি সে উদ্যোগে প্রতিকূলতা সৃষ্টিতেই ভূমিকা রাখার কথা। আর হরতাল ডাকার যত যুক্তিই থাক; বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেগুলো অগ্রহণযোগ্য। তবে বিস্ময়করভাবে এখানে প্ররোচনা দিয়ে চলেছে সরকারের এ-জাতীয় সিদ্ধান্ত। ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া হবে—এটাই বিজ্ঞানের সূত্র। সমাজবিজ্ঞানও প্রায় ক্ষেত্রেই সে সূত্র অনুসরণ করছে। এমনটাই আমরা দেখছি।
এসব সমাবেশ ক্ষেত্রবিশেষে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় গড়ায়। অবনতি ঘটায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। তবে বিষয়টি কিন্তু অভিনব নয়। এখন যাঁরা সরকারি দলে আছেন, তাঁরাও বিরোধী দলে ছিলেন। তখনো কি সভা-সমাবেশে একই উপসর্গ দেখা দিত না? অবশ্য তখনো এগুলোতে বাধাদানের ঘটনা ঘটেছে হরহামেশাই। এসবই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। বেদনাদায়ক হলেও বিষয়টি সত্য।
তবে এবার একটা নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। সরকার ঢাকায় সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দিয়েছে। ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকের ২০ মে ২০১৩-এর প্রধান শিরোনাম ছিল ‘ব্যান অর নো ব্যান?’ এতে চারজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নৈরাজ্য ঠেকাতে ঢাকায় সভা-সমাবেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী যিনি ক্ষমতাসীন দলটির মহাসচিবও বটে, তিনি বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় মহাসেন-পরবর্তী ত্রাণতৎপরতা সুচারুভাবে পরিচালনা করতে সারা দেশে এক মাসের জন্য রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রসচিব বললেন, এ বিষয়ে কোনো সরকারি পরিপত্র জারি হয়নি। আবার পুলিশের মহাপরিদর্শক জানালেন, তিনি এসবের কিছুই জানেন না। বিষয়টি নিয়ে একটি গোলকধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে। এটা কোন আইনের ভিত্তিতে কীভাবে করা হলো, তা দেশবাসীর কাছে অস্পষ্ট। তা স্পষ্ট করার উদ্যোগও কেউ নেয়নি। তবে কার্যত দেখা গেল, রাজধানী ঢাকায় কোনো সভা-সমাবেশ হতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি রাজনৈতিক দলের মিলাদ মাহফিলেও পুলিশ বাধা দিচ্ছে। কোনো বৈধ রাজনৈতিক দলের সমাবেশ করার অধিকার বন্ধ করতে যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে। এমনিতেই যখন যাঁরা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা সুযোগ পেলেই হরতাল-অবরোধ ডেকে বসেন। আর সভা-সমাবেশ বন্ধ করার সিদ্ধান্তটি নিয়ে তাঁদের হরতাল ডাকার অজুহাত সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে। হরতালেও সহিংসতা ও নৈরাজ্যের আশঙ্কা সমাবেশ-শোভাযাত্রার চেয়ে কিছু অংশে কম নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। আর হরতালটি ডাকা হয়েছে দেশজুড়ে। এমনিতেই গত নভেম্বর থেকে হরতাল অনেকটা প্রাত্যহিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অন্য সব কাজ উপেক্ষা করে হরতালের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দায় পড়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর। আর সেটা শুধু হরতালের দিনই নয়। এর আগের দিন থেকে হরতাল শেষ হওয়ার পরও কয়েক ঘণ্টা। এভাবে দিনের পর দিন চাপের মুখে থাকলে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যাঁরা সরকারে থাকেন তাঁরা প্রায়ই বলতে চান, হরতাল চলাকালে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক আছে আর অর্থনীতির চাকাও সঠিকভাবে ঘুরছে। সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগে পিকেটিং সমাবেশ হয়তো বন্ধ করা যায়। কিন্তু অন্য সব উপসর্গ? এটি সত্যি কথা, ঘন ঘন হরতালে অতিষ্ঠ জনগণ এখন সুযোগ পেলেই হরতালকে উপেক্ষা করে। কিন্তু কতটুকু করা যায়? ঢাকা শহরে সরকারি-বেসরকারি কিছু বাস ছাড়াও জীবিকার তাগিদে ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ইত্যাদি চলে। তবে বড় বিপণিবিতানগুলো খোলে বেলা দুইটার পর। কেননা, খুলে বসে থাকলেই তো হবে না; ক্রেতাও তো আসতে হবে। ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগের ভয়ে প্রাইভেট কার বের করার ঝুঁকি নেন খুব কম লোক। আর মহাসড়কগুলো কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। ফলে পণ্য পরিবহনব্যবস্থা অচল হয়ে অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এমনটাই দাবি করছেন দেশের সব দলমতের শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে নেতাদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিতে শুরু করেছেন। কিন্তু বিষয়টি সুরাহা না হয়ে বরং আবার উল্টো পথেই যাত্রা করল।
সভা-শোভাযাত্রার নামে যারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করে, তাদের বিরুদ্ধে তো হামেশাই মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাস করতে হচ্ছে অনেককেই। রিমান্ডের প্রয়োগ আর ডান্ডাবেড়ির ব্যবহারও তো আমরা দেখলাম। অবশ্য এখানে উল্লেখ করা যথার্থ হবে যে, রাজনৈতিক নেতাদের রিমান্ডে নেওয়া ও নির্যাতনের সংস্কৃতি চালু হয় গত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে। এগুলো আদৌ ঠিক হয়নি, এমনটা কি এখন তাঁরা ভাবেন? ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে এসব কোনো অবস্থাতেই করা হবে না—এমন আলাপ-আলোচনাও কি তাঁদের মাঝে হয়? এ ধরনের শুভবুদ্ধির উদয় সহজে ঘটবে—এমনটা ভাবতে ইচ্ছা করে কিন্তু ভরসা হয় না। মনে হয়, প্রত্যেকেই মারমুখী হয়ে আছেন। আর যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরাও তো চিরদিন সেখানে থাকবেন না। কেউ থাকেননি। তখন একই সংস্কৃতি চালু থাকলে তাঁদেরও এরূপ হেনস্তা হতে হবে, এটা ভেবেও তো প্রতিপক্ষের প্রতি কিছুটা সহনশীল হতে পারেন। জরাজীর্ণ অতীতকে ভুলে তাঁরাও তো নতুনভাবে পথ চলতে শুরু করতে পারেন। সৃষ্টি করতে পারেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মানবোধ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে। মূল সমস্যাটা এখানেই। অথচ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কথা বলেন তাঁরাই। আর সেটা চাইলে যা করার দরকার, করছেন তার উল্টোটা। বারবার আমাদের বিশ্বাসের ভিতে তাঁরা ফাটল সৃষ্টি করে চলেছেন। এক-দুটি সভা-সমাবেশে কিছু নৈরাজ্য হলে ক্ষতি হয় বটে। তবে সে ক্ষতি যাতে যথেষ্ট কম হয়, তার সক্ষমতা তো আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর রয়েছে। অন্তত ঢাকা মহানগরে তা আছে পর্যাপ্ত মাত্রায়। কিন্তু দেশব্যাপী একটি হরতালে যে ক্ষতি হয়, জনজীবনে যে দুর্ভোগ নেমে আসে, তা বন্ধ করার সুযোগ কিন্তু তেমন নেই। আদেশ দিয়ে সভা-সমাবেশ ঠিকই বন্ধ করা হয়েছে, কিন্তু হরতাল বন্ধ করা যায়নি। যাবেও না। তাহলে ভুক্তভোগী জনগণ প্রশ্ন রাখতে পারে—ক্ষতি কোনটাতে বেশি হলো? অবশ্য আমাদের দেশটিতে একটি সুবিধা আছে। তা হলো এ ধরনের সিদ্ধান্তের পরিণামের দায়দায়িত্ব কখনো কাউকে নিতে হয়নি।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

লিমনের অন্তহীন সংগ্রাম

যে পৃথিবীতে পা হারানো মানুষও এভারেস্ট জয় করছে, সেই পৃথিবীর এক দুর্ভাগা তরুণ লিমনকে বাকি এক পায়ে লড়াই করতে হয় প্রতাপশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। র‌্যাবের গুলিতে হারানো পা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না; কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় তিনি ফিরে পেতে চেয়েছিলেন ভয়হীন একটা জীবন। দুই বছর পার হলেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হুমকি এখনো তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। পা হারানো লিমন আমাদের পঙ্গু মানবাধিকারের এক মর্মান্তিক প্রতীক। যে কথিত সন্ত্রাসী মোরশেদ জমাদ্দারের লোক বলে র‌্যাব লিমনকে ফাঁসাতে চাইছে, পরিহাস হচ্ছে ঘটনার দুই বছর পরও সেই সন্ত্রাসীকে বা তাদের বাহিনীর কাউকে র‌্যাব গ্রেপ্তার দেখাতে পারেনি। অথচ গুলিতে পা চলে গেল সে সময়ের ১৬ বছর বয়সী কিশোর লিমনের। লিমনের মায়ের করা মামলার অপমৃত্যুর ব্যবস্থা করেছে পুলিশ। ঘটনার পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা লিমনকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দেন। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, লিমন ও তাঁর বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই সন্ত্রাসী। লিমনদের মতো দরিদ্র অসহায় নিরীহ পরিবারটি যদি সন্ত্রাসী হয়, তাহলে বাংলাদেশের সব মানুষকেই সন্ত্রাসী বলতে হবে। একটি অপরাধ ঢাকতে এভাবে সমগ্র রাষ্ট্রশক্তি লিমনের বিরুদ্ধে, ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে, আইন ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে ‘অপরাধ’ করে চলছে। পঙ্গু লিমন ও তাঁর পরিবারকে মামলার পর মামলায় নাজেহাল করা হচ্ছে, আবার সেই পঙ্গু দেহ নিয়েই লিমন চালিয়ে যাচ্ছেন পড়ালেখার সংগ্রাম। প্রতি মাসে ২০ মাইল দূরে ঝালকাঠি আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হয় লিমনকে। পাশাপাশি সামলাতে হচ্ছে র‌্যাবের সোর্স ও মাস্তানদের হুমকি। গত ঈদের আগে র‌্যাবের ‘সোর্সদের’ হামলায় তাঁর একটি কানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরীক্ষার আগে আগে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় ২০১১ সালে এইএসএসসি পরীক্ষা আর দিতে পারেননি। এবারে তিনি পরীক্ষা দিয়েও বিপন্ন।
লিমন যেন এক সংশপ্তক, যিনি অঙ্গহারা হয়েও এক পায়েই চালাচ্ছেন জীবন ও অধিকারের সংগ্রাম। লিমনের এই সংগ্রাম এক পায়ে এভারেস্ট জয়ের থেকেও কঠিন। র‌্যাব-পুলিশের মামলা চলছে তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে রাষ্ট্র-প্রশাসন। লিমন যেন বিপন্ন বাংলাদেশের মুমূর্ষু মানবতা। লিমন জিতলে মানবতা জিতবে, লিমন হারলে হারবে বাংলাদেশ।

অরণ্যের পুত্র হয়ে by দেবী শর্মা

ষাটের দশকে বরিশালে আমাদের বাড়ির সামনের খোলা বারান্দাটির এক পাশ সবুজ রঙের নেটে ঘিরে দ্বিজেন শর্মা (বাড়ির জামাই) চমৎকার একটি পড়ার ঘর বানিয়ে ফেলল। কিন্তু না, কিসের যেন অভাব। বাইরের দিক থেকে নেটের লাগোয়া বড়সড় একটি পাখির বাসা তৈরি করে মুনিয়া, লাভ বার্ডস—এমন কয়েক জোড়া পাখি পুরতেই যেন একটা সামঞ্জস্য এল। নারকেলগাছের ছায়ায় পাখির বাসার ওপরের কোনায় ছোট এক বোতল কার্বোলিক অ্যাসিড ঝুলিয়ে সাপখোপের হাত থেকে পাখিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা হলো। প্রাকৃতিক পরিবেশে এবার লেখার সব আয়োজন পূর্ণ।
শ্রাবণ মাস, ঝেঁপে বৃষ্টি এল। নারকেলগাছ চুইয়ে জল গড়াচ্ছে, বৃষ্টির ছাটে পাখিদের ডানা ঝাপটানি। বাড়ির সামনের মোটামুটি বড়সড় লনটিকে সে জীবনের প্রথম গার্ডেন ডিজাইনের লক্ষ্য স্থির করল। কুরচি, নীল জবা, মাধবী, মালতী, অশোক। চাঁড়িতে নীল শাপলা, সবুজ লন—একটু একটু করে যেন অপরূপা হয়ে ওঠা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় গাছের প্রায় নাভিশ্বাস, আজ এখানে তো কাল ওখানে। আমার আইনজীবী বাবা সন্ধ্যায় কোর্ট থেকে ফিরে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, ‘সে কী করে, গাছগুলো এখনো এখানে?’
হয়তো তার মানসে তখন পাহাড়ি প্রকৃতির উজ্জ্বল, ঋজু, ধ্যানমগ্ন পৌরুষময় রূপের সঙ্গে নদীনালা-সমৃদ্ধ সমতলের উচ্ছল, নমনীয় নারী প্রকৃতির সংশ্লেষের প্রক্রিয়া চলছে। আমার ধারণায় মানুষটি পাহাড়ে অরণ্যের বেপরোয়া শৈশব, কৈশোরের অপার সম্ভারে জীবনের প্রারম্ভেই অলৌকিক সৌন্দর্যবোধে দীক্ষিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সমস্ত জীবনের কঠোর সাধনায় সেই রহস্যময়ীর নৈকট্য লাভে ধন্য হয়েছে। ঝকঝকে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া সেই লনে বন্ধুবান্ধবসমেত আমরা বাঁধভাঙা আনন্দে ভাসতাম। কখনো লক্ষ্মীপূজা, দোল পূর্ণিমায় এর পরিধি আরও বাড়িয়ে তুলত। ইউসুফ ভাই, দুলু, গফুর ভাই, বীণা, নিখিলদা, নূরজাহান, রানীদি, সিদ্দিক ভাই, মা—সব মিলিয়ে যেন চাঁদের হাট।
দিন যায়, ষাটের দশকের শেষে এই ভূখণ্ডে অস্তিত্বের লড়াইয়ের চরম পর্যায়ে ছত্রখান হয়ে একদিন সব ভেঙে পড়ে। আমরা দুজন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। অস্তিত্ব রক্ষা ও জীবনধারণ প্রাথমিক পর্যায়ে নেমে আসে। ঘৃণার লক্ষ্য এড়িয়ে পশুর জীবন হিঁচড়ে স্বাধীনতার দ্বারে পৌঁছালাম। আবার পরিবার একত্র হলাম, তবে নয় মাসের যন্ত্রণায় দ্বিজেন শর্মাও ঝলসে গেছে।
বছর তিনেক পরে বিদেশের এক অভাবিত ডাক এল, সোভিয়েত ইউনিয়নে, অনুবাদের কাজে। এই গরম থেকে প্রচণ্ড শীতের দেশে গিয়ে পড়লাম। টুপি, ওভারকোট, হাতমোজা, বুটজুতা—মানুষ চেনা দায়। তার ওপর হাঁটুসমান বরফে ধুপধাপ আছাড় খাওয়া। হাত ধরাধরি করে এলাকা চষে বেড়াই, একসময় সবই স্বাভাবিক হয়ে আসে; প্রকৃতি, কুকুর, মানুষ এবার নতুন মাত্রায় মন-মানসে যুক্ত হতে থাকে। শীতের রাতের তুষারবৃষ্টির পর শুদ্ধ, শুভ্র প্রকৃতি, পত্রহীন ন্যাড়া গাছগুলো রাতারাতি বরফে সজ্জিত রূপকথার মতো মনভোলানো। শীতের প্রথম বরফ মানেই মহোৎসব, বাচ্চারা বরফে খেলছে, বৃদ্ধারা ঠেলছেন, স্কি, স্কেটিং কী না, একমাত্র ফারগাছই তার দেহসৌষ্ঠব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, বরফ তার খাঁজে খাঁজে। বসন্তের শুরুতেই মুখিয়ে থাকা ঘাস, গাছপালা তরতরিয়ে মাথা তুললে রাতারাতি সবুজে ভরে যায় প্রকৃতি। এবার দ্বিজেন নিচে বাড়ির লাগোয়া বড়সড় ত্রিকোণ জায়গাটুকুতে বাগান করতে প্রস্তুত। এবারও সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা—পপলার, বার্চ, সিরিন, লাইলাক, ভেতরে ছোট্ট একটি লন, বর্ডারে পপি কসমস। রুশি বৃদ্ধারা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গ্রীষ্মের দীর্ঘ সন্ধ্যায় আমাদের অষ্টম তলার ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের টেবিলে বিভিন্ন সালাদ, মাংসের রোল, পানীয়, বন্ধুবান্ধব নিয়ে জমাট আসর। নিশ্চিন্ত জীবন। এর মধ্যে দ্বিজেন বন্ধুবান্ধব পেলেই নটর ডেম কলেজ ও সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজের নারীদের কাছে নতুন গাছের বীজ পাঠাত। গাছ হোক না হোক, বীজ পাঠাতে সে ক্ষান্ত হয়নি কখনো।
বন্ধু বিশুদা তাঁর পাঁচ-ছয় বছরের মা-মরা ছেলে ইয়ানকে অপারগ হয়ে রেখে যেতেন আমাদের বাড়ি। ছেলে, মেয়ে, আমি বাইরে, দ্বিজেন জেঠুই সব। অনুবাদের ফাঁকে ফাঁকে অনেক সময় ছোট কাচের বয়াম দিয়ে পোকা ধরতে তাকে বাগানে পাঠানো হতো। পোকামাকড়-পাগল ইয়ান বেশ কতগুলো বয়ামে পুরত। একবার পর পর দুটি রঙিন পোকা পাওয়ায় একটা মুখে পুরে ও দুটোকেই জেঠুর জন্য নিয়ে আসে, যাক কিছু হয়নি। আর ধবধবে সুন্দর ইয়ান যখন তার প্রিয় কালো কুচকুচে কুকুরটাকে জড়িয়ে লাল কার্পেটে শুয়ে থাকত— যেন পটে আঁকা ছবি।
গ্রীষ্মে মস্কোর বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়ানো ছিল আমাদের বার্ষিক প্রোগ্রামের অংশ আর তার পাশেই প্রদর্শনী কেন্দ্র ‘ভেদেনখা’ একটি প্যাভিলিয়নে ছিল শিল্পসম্মত ছোট ছোট বাগানের অপূর্ব নমুনা। রাশিয়ার বাইরে প্যারিস, বার্লিন, লন্ডন, হেলসিংকি—সর্বত্রই ফুল, প্রকৃতি, বাগানে অসাধারণ উৎকর্ষে মুগ্ধ মানুষটির দেশের জন্য খেদোক্তি উঠে আসত। লিভারপুলে একবারের ‘টুকরো বাগানের প্রদর্শনী’ তাকে প্রচণ্ড আলোড়িত করে।
ফরাসি গার্ডেন, জাপানি গার্ডেন, মোগল গার্ডেন—টুকরো একেকটি শিল্পকর্ম যেন। গ্রীষ্মকালীন গ্রামের বাড়ির একটি নমুনা মনে পড়ে: খড়ের ঘরের পাশ দিয়ে নুড়ির একটি নালা, কুলকুল শব্দে স্বচ্ছ জল গড়াচ্ছে, উঠানের মতো বাগান, লতাপাতার ঝাঁকা—প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক টুকরো ল্যান্ডস্কেপ। শতবর্ষের ঐতিহ্য, বৈশিষ্ট্য, ঋতুর রং পরিবর্তন—সব যেন শিল্পীর মনোভূমির রংতুলিতে রূপ নেয় এমন একেকটি শিল্পকর্মের।
মগ্নময়ী দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র দ্বিজেন ওরফে খোকার আজ ৮৪তম দেশ-বিদেশ উজাড় করে অপার সম্ভার নিয়ে তরি ভিড়িয়েছে, এখন তৈরি হবে সেই আশ্চর্য বাগান, যেখানে নিকষ কালো আঁধারে নগরের শৃঙ্খলিত কিশোর কেঁদে উঠবে না: ‘হারিয়ে গেছি আমি’; যেখানে উজ্জীবিত, মন্ত্রমুগ্ধ প্রজন্ম বেঁচে থাকবে অরণ্যের পুত্র হয়ে।
দেবী শর্মা: দ্বিজেন শর্মার জীবনসঙ্গিনী।

তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের পরিণতি by শাহাদুজ্জামান

বিশেষ সামরিক আদালতে কর্নেলতাহেরের মৃত্যুদণ্ডের রায় চ্যালেঞ্জ করে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাটি ফের আলোচনায় এসেছে। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের লেখায় এই ঘটনার প্রধান দুই কুশীলব আবু তাহের ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার ওপর আলো ফেলা হয়েছে। সম্প্রতি তাহেরের ফাঁসিকে একটি হত্যাকাণ্ড এবং তাঁর পেছনে জেনারেল জিয়ার সংশ্লিষ্টতার ঘোষণা দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের প্রেক্ষাপটটি বর্ণনা করেছি। আজ সেই সম্পর্কের পরিণতির ওপর আলোকপাত করতে চাই। আগেই উল্লেখ করেছি, স্বাধীনতা-উত্তরকালের মুজিব সরকারের প্রকাশ্যে বিরোধিতাকারী শক্তিশালী বামধারার রাজনৈতিক দল জাসদের নানা তৎপরতার ব্যাপারে জিয়া অবহিত হতেন তাহেরের মাধ্যমে, অন্যদিকে গোপনে মুজিব সরকারকে উৎখাতে মোশতাক চক্রের ডানপন্থী ধারার ষড়যন্ত্রের খবর তিনি পেতেন ফারুক, রশীদের মাধ্যমে। সরকারবিরোধী দুটি শক্তিই সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেনাবাহিনীর কৌশলগত সহায়তা পেতে অসন্তুষ্ট উপসামরিক প্রধান জিয়াকে তাদের সম্ভাব্য মিত্র বলে বিবেচনা করেছিল। জিয়া দুটি তুরুপের তাসই নিজের হাতে রেখেছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির অস্ট্রেলীয় গবেষক ডেনিস রাইটকে উদ্ধৃত করে গতকাল লিখেছিলাম, যখন ফলাফল অস্পষ্ট, তখন খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সব রকম পথ খোলা রাখা জিয়ার স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য। (হাবীব জাফারুল্লাহ সম্পাদিত দ্য জিয়া এপিসোড ইন বাংলাদেশ পলিটিকস, সাউথ এশিয়ান পাবলিশার, ১৯৯৬)। বলা বাহুল্য, ফলাফল স্পষ্ট হয় ১৯৭৫ সালের আগস্টে যখন মোশতাক চক্রের ডানপন্থী ষড়যন্ত্রমূলক শক্তিটি শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে সরকার উৎখাতে সফল হয়। তুরুপের দুটি তাস হাতে রাখার সুফলও পান জিয়া। নতুন সরকারপ্রধান মোশতাক বিদ্যমান সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে সরিয়ে সেনাপ্রধান করেন জিয়াকে। বাংলাদেশের ইতিহাস এরপর এক গভীর নাটকীয়তার দিকে ধাবিত হয়। জুনিয়র অফিসারদের হাতে সংঘটিত এই রক্তাক্ত অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে খালেদ মোশাররফ ২ নভেম্বর মাঝরাতে আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থান করেন এবং জিয়াকে গৃহবন্দী করেন। এই সময় আওয়ামী লীগের ব্যানার নিয়ে খালেদ মোশারফের ভাই ও মায়ের মিছিল, ভারতীয় রেডিও-টিভিতে খালেদের ক্ষমতা দখল নিয়ে উচ্ছ্বসিত সংবাদ ভুলভাবে এই অভ্যুত্থানের পেছনে ভারতীয় মদদ এবং আওয়ামী লীগের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা তৈরি করে। আওয়ামী সরকারের পুনরুত্থানের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে মোশতাক চক্র গোপনে এ সময় জেলে আওয়ামী লীগের প্রধান চারজন নেতাকে হত্যা করে।    পরিস্থিতির জটিলতায় বন্দী জিয়া এ সময় নিজেকে পুরো দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে নিজের বেতন-ভাতা ইত্যাদির জন্য আবেদন করেন। কিন্তু জিয়া এও টের পান যে সেই রক্তাক্ত কাল পর্বে বন্দী অবস্থায় তাঁর জীবনও মোটেই নিরাপদ নয়। তাই শেষরক্ষা হিসেবে তিনি এ সময় তাঁর তুরুপের দ্বিতীয় তাসটি ব্যবহার করেন। তিনি টেলিফোনের মাধ্যমে গোপনে তাঁর জীবন বাঁচানোর জন্য অনুরোধ করেন তাহেরকে।
আগেই উল্লেখ করেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডারদের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে তাহেরের সঙ্গে জিয়ার যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ঘটে, তা অব্যাহত ছিল স্বাধীনতার পরও। জিয়াকে যারা সেনাপ্রধান করেছে সেই মোশতাক চক্র সেই মুহূর্তে খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিজেদের জীবন রক্ষায় ব্যস্ত। ফলে তাদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, জিয়া তা জানতেন। জিয়া এও জানতেন যে সে সময়ের বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ধারা জাসদ এবং ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের গোপন শক্তি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে আছেন তাহের। নিরবলম্ব জিয়া তাই টের পেয়েছিলেন, সেই মৃত্যুকূপ থেকে তাঁকে রক্ষা করার একমাত্র চাবিটি তখন রয়েছে তাহেরের হাতে। সেই ভরসাতেই তাহেরের কাছে জীবন বাঁচানোর আকুতি করেছিলেন তিনি। এবং বাস্তবিক বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমেই ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাহের জিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। কেন তাহের তা করলেন, সংক্ষেপে ইতিহাসের সেই মুহূর্তটিকে বুঝে নেওয়া যেতে পারে। 
সে মুহূর্তে ক্যান্টনমেন্টে বিরাজ করছিল চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। কারণ, খালেদের অনুগত, ফারুক, রশীদের অনুগত এবং জিয়ার অনুগত সেনারা তখন পরস্পরের মুখোমুখি। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সিপাহিরা জেনারেলদের ক্ষমতায় লড়াইয়ের গুটি হিসেবে আর ব্যবহূত হতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা তাদের নেতা তাহেরকে অবিলম্বে একটি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেয়, নইলে তারা নিজেরাই রুখে দাঁড়াবে বলে ঘোষণা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৫ নভেম্বর রাতে জাসদের নেতারা জরুরি বৈঠকে বসেন। জাসদের প্রধান নেতারাসহ হাজার হাজার কর্মী তখন জেলে। ফলে একটা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে দ্বিধান্বিত ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই আগ্নেয় পরিস্থিতি থেকে ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। একটা ঐতিহাসিক চাপের মুখে তাঁরা তাঁদের বিপ্লব পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করেন এবং জাসদের গণবাহিনীসহ বেসামরিক শক্তি ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সামরিক শক্তির সমন্বয়ে ৭ নভেম্বর একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় বাংলাদেশের রাজনীতি চালিত হচ্ছিল ক্যান্টনমেন্ট থেকে। অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে আপাতত ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের সাংগঠনিকভাবে সংহত করার একটা অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা করেন তাহের।
আগেই উল্লেখ করেছি, তাহের খুব ভালোভাবেই জানতেন যে জিয়া মোটেও তাঁদের আদর্শিক সঙ্গী নন। কিন্তু যে মানুষ বন্দী অবস্থায় আছেন, যিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেছেন, যিনি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য আবেদন জানিয়েছেন, তেমন একজন নাজুক ব্যক্তিকে মুক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবেন বলেই ভেবেছিলেন তাহের। বিপ্লবী পরিস্থিতিতে বিপরীত মেরুর মানুষের সঙ্গে কৌশলগত আঁতাত তৈরির বহু নজির পৃথিবীতে আছে। একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ কিউবার বিপ্লব। কিউবার বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটানোর পরও সেই বিপ্লবের কিংবদন্তি নেতা কাস্ত্রো বা চে গুয়েভারা কেউই সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নেননি। গেরিলা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সদ্য আসা কাস্ত্রো এবং চে নিজেদের গুছিয়ে নিতে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান করেছিলেন মধ্যপন্থী আইনজীবী মানুয়েল আরুটিয়াকে। সেই আরুটিয়া ক্ষমতা পেয়ে প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কাস্ত্রো তাঁকে উৎখাত করতে সক্ষম হন।
কাস্ত্রো পারলেও তাহের তাঁর আপাতমিত্রের প্রতিবিপ্লবী তৎপরতাকে উৎখাত করতে পারেননি। লক্ষণীয়, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের দুটি মাত্রা ছিল। একটি সামরিক, অন্যটি বেসামরিক। তাহেরের নেতৃত্বে সামরিক মাত্রাটি সফল হলেও, জনতাকে সংগঠিত করার বেসামরিক মাত্রাটি ব্যর্থ হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান প্রমুখ। ফলে অভ্যুত্থানের ভরকেন্দ্রটি জনতার ভেতর না এসে রয়ে যায় ক্যান্টনমেন্টে। কথা ছিল বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে জিয়া ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এসে তাহেরের সঙ্গে যৌথভাবে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসবেন। কিন্তু জিয়া তাঁর জীবন রক্ষার জন্য তাহেরকে ধন্যবাদ জানালেও প্রতিশ্রুত সাক্ষাতের জন্য ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আসেননি বরং অন্যান্য সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে অতিদ্রুত পুরো পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে খালেদ মোশাররফসহ আরও কয়েকজন সেনাকর্তা সৈনিকদের হাতে নিহত হন। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দ্বিতীয় জীবন পেয়ে জিয়া দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ক্যান্টনমেন্টে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে তিনি একে একে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তার হন তাহেরও এবং একপর্যায়ে গোপন সেই অবৈধ বিচারের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করেন। তাহের বিচারের সময় তাঁর জবানবন্দিতে জিয়াকে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের এই পরিণতিকে আমাদের বুঝতে হবে সে সময়ের বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে। তখন  পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের জোর ঠান্ডা লড়াইয়ের কাল। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ দেশে প্রথমবারের মতো একটি সমাজতান্ত্রিক ধারার শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার অত্যন্ত নিকটবর্তী হয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন তাহের। দেশের ভেতর ক্রিয়াশীল মার্কিনপন্থী, পাকিস্তানপন্থী, ধর্মীয় মৌলবাদী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যাবতীয় সামরিক, বেসামরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল যেকোনো মূল্যে এই সমাজতান্ত্রিক স্রোতটিকে ঠেকানো। তারা সামনে পেয়েছিল অনিশ্চিত সাঁতারু কিন্তু ক্ষমতায় আগ্রহী জিয়াকে। এই পুরো শক্তিটি তাই জিয়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিবিপ্লবী এই শক্তি বিপ্লবী শক্তির মূলকেন্দ্র তাহেরকে হত্যা করে তাই সমাজতন্ত্রের ধারাটিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। জিয়া কর্তৃক তাহেরের ফাঁসির এই আয়োজনকে তাই নেহাত ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয় ভাবার কারণ নেই। এটি দুটি বিপরীতমুখী আদর্শ ও শক্তির সংঘাতের অনিবার্য পরিণতি। জিয়া ও তাহের ছিলেন দুটি ভিন্ন শক্তির প্রতিভূ, যাঁরা পরস্পরকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাসের বিশেষ মুহূর্তের ভুলভ্রান্তির মিথস্ক্রিয়ায় পরাজয় ঘটেছিল তাহেরের, জয়ী হয়েছিলেন জিয়া। ফলে স্বভাবতই আমরা তাহেরের প্রত্যাশিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত সমাজতান্ত্রিক ধারার কোনো বাংলাদেশকে পাইনি বরং জিয়ার হাত ধরে পরবর্তীকালে এখানে বিকশিত হতে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের, ধর্মীয় মৌলবাদীদের এবং মুক্তবাজারের লুটেরা পুঁজির ধারকদের। কিন্তু ইতিহাসের গতি পাল্টায়, তাহের নিশ্চিহ্ন হননি, ফিরে এসেছেন। এখন দেখার বিষয় তাহেরের আদর্শটি ফিরে আসে কি না। (শেষ)
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com

বেসিসের প্রতি by মো. আরিফুর রহমান

শুরুতেই ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসকে (বেসিস)। কারণ, তারা আউটসোর্সিংয়ে কাজের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১০০টি পুরস্কার দিয়েছেন। এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। কারণ, আমাদের দেশের জন্য আউটসোর্সিং হচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় খাত। যেকোনো পর্যায়ের মানুষ এই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত পর্যায়ের উন্নতি সাধন করতে পারেন। আউটসোর্সিংয়ে অপার ও সীমাহীন সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে যেকোনো ব্যক্তি তাঁর ভাগ্যকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে এবং অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিতে পারে এই আউটসোর্সিং। বেসিসের কাছে আমার বিশেষ আবেদন, এ দেশে আউটসোর্সিং যাতে দ্রুত প্রসারিত হতে পারে, সে জন্য তারা বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। এ দেশের মানুষের মধ্যে আউটসোর্সিংয়ের ধারণা পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের সেমিনার ও ট্রেনিংয়ের আয়োজন করতে হবে। এসব সেমিনার ও ট্রেনিং শুধু শহরকেন্দ্রিক না করে গ্রামপর্যায়েও আয়োজন করা যেতে পারে।
আউটসোর্সিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় বা সময়ে করতে হয় না। এর ফলে এটা শহর কিংবা গ্রাম—সব জায়গায় করা যাবে। প্রয়োজন শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও ব্যক্তির আউটসোর্সিং সম্পর্কে ধারণা ও আগ্রহ।
গ্রামাঞ্চলে নারী-পুরুষকে আউটসোর্সিংয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলতে গ্রাম এলাকায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তাদের প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে সমর্থন জুগিয়ে যেতে হবে। কারণ, তারা শহর এলাকার মতো সুযোগ-সুবিধা পায় না। বাংলাদেশের সব এলাকায় যেসব ব্যক্তি আউটসোর্সিং সম্পর্কে আগ্রহী, তাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের আগ্রহে যাতে কোনোক্রমেই অনাগ্রহের সৃষ্টি না হয়, সে জন্য অত্যন্ত সহজ কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। মোট কথা, বাংলাদেশে আউটসোর্সিংয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করতে বেসিস কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস। এই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একদিন এ দেশের প্রতিটি ঘর একেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান হবে—এই প্রত্যাশায় বেসিসকে এগিয়ে আসতে হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হবে, এ আশা আমরা করতেই পারি।
মো. আরিফুর রহমান
ঢাকা।

ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন by মীর মাহফুজুর রহমান

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন বিল, ২০১৩’ পাস হয়েছে। ফলে ‘জনবহুল’ বা ‘প্রকাশ্যে’ ধূমপানের জন্য ৩০০ টাকার জরিমানার বিধান করা হলেও এতে রয়েছে বড় ধরনের ফাঁকি। এতে ‘জনবহুল স্থান’ বা ‘পাবলিক প্লেস’ বলতে অনেক কিছুর উল্লেখ করা হলেও এর সংজ্ঞায় সুকৌশলে ফুটপাত, পার্কসহ কোনো উন্মুক্ত স্থান অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিন্তু আমরা জানি, বর্তমানে বাংলাদেশের সব শহরের রাজপথ বা ফুটপাত জনবহুল। এসব রাজপথ বা ফুটপাতে সাধারণত অনেকটা ঠেলাঠেলি বা ধাক্কাধাক্কি করে চলাফেরা করতে হয় এবং প্রায়ই লক্ষ করা যায়, এতে বয়স্ক লোক ছাড়াও অল্প বয়সী তরুণেরা চলমান অবস্থায় অবজ্ঞাভরে বা তোয়াক্কা না করে ধূমপান করে ধোঁয়া ছাড়ছেন। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সতর্কবাণী লিপিবদ্ধকরণ নতুন কোনো কিছু নয়। নতুন সংশোধিত আইন প্রণয়নে আমাদের মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করতেই হয়!
সংশোধিত আইনে ধূমপানের জন্য ৩০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হলেও যখন আমরা দেখি যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য প্রকাশ্যে ধূমপান করছেন, তখন এরূপ একটি ত্রুটিযুক্ত ‘সংশোধিত’ আইনের আদৌ বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহই জাগে। তা ছাড়া যেসব আবদ্ধ স্থান বা প্রতিষ্ঠানে ধূমপান নিষিদ্ধ হয়েছে, সেসব আবদ্ধ স্থান বা প্রতিষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কমই গিয়ে থাকেন।
মীর মাহফুজুর রহমান
কাঁঠালবাগান, ঢাকা।