Tuesday, July 1, 2025
হত্যায় মেতেছে ইসরাইল: গাজায় ক্যাফে, স্কুল ও ত্রাণকেন্দ্রে হামলায় নিহত ৯৫
প্রত্যক্ষদর্শী ইয়াহিয়া শরীফ বলেন, আমরা ছিন্নভিন্ন লাশ খুঁজে পেয়েছি। এই জায়গার কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক সংযোগ ছিল না। এটি ছিল শিশু-সহ বহু মানুষের একটি মিলনস্থল। আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ বলেন, বহু উদ্বাস্তুর জন্য এটি ছিল ওই অঞ্চলে কিছুটা আশ্রয়ের মতো, তপ্ত তাঁবু থেকে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার জায়গা। হামলায় বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে রক্তের দাগ মাটিতে লেগে আছে।
সোমবারই ইসরাইলি বাহিনী গাজা সিটির ‘ইয়াফা স্কুল’-এ বিমান হামলা চালায়। সেখানে শত শত উদ্বাস্তু আশ্রয় নিয়েছিলেন। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার আল-আকসা হাসপাতালের প্রাঙ্গণেও হামলা চালানো হয়। সেখানে হাজারো পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। আল জাজিরার তারেক আবু আযম বলেন, হাসপাতাল লক্ষ্য করে চালানো এই বিশাল বিস্ফোরণের আগে কোনো সতর্কবার্তাও দেয়া হয়নি। মাত্র ১০ মিটার দূরেই আমরা সম্প্রচার করছিলাম। এই হাসপাতালে এটি ১০তম হামলা। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস এক বিবৃতিতে এই হামলাকে সিস্টেমেটিক অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং বলেছে, আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের ভেতরে একটি তাঁবুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন অনেকে এবং বহু রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং জাতিসংঘ-সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধ্বংস করার জন্য ইসরাইলকে অভিযুক্ত করেছেন। গাজার দক্ষিণের খান ইউনিসে খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষমাণ ১৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন ইসরাইলি বিমান হামলায়। আহত হন আরও ৫০ জন। এই কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সমর্থিত বিতর্কিত সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)। তারা মে মাসের শেষ থেকে সীমিত পরিসরে ত্রাণ সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছে। জিএইচএফের তত্ত্বাবধানে থাকা এসব স্থানে প্রতিদিনের হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে, এই স্থানে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ঘটনাগুলো পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।
তবে ইসরাইলি দৈনিক হারেৎস জানায়, সেনাদেরকে বেসামরিক জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেনা সদস্য জানায়, যারা কোনো হুমকি না তা সত্ত্বেও, তাদের দিকেও মারাত্মক গুলি চালানো হয়।
গাজায় আবারও স্থল হামলার আশঙ্কা
ইসরাইলি বাহিনী খান ইউনিসে বাড়িঘর ধ্বংস করে দেয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে। একে নতুন একটি স্থল অভিযান শুরুর ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উত্তর গাজার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে নতুন করে আবারও ‘জবরদস্তিমুলকভাবে সরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেয়া হয়েছে। সেখানে আগেই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ৬০ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের পিতা সালাহ বলেন, টানা বিস্ফোরণ চলেছে। ঘরবাড়ি, স্কুল- সব কিছু উড়িয়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। মিডিয়ায় আমরা যুদ্ধবিরতির কথা শুনি, কিন্তু বাস্তবে দেখি কেবল মৃত্যু। জয়তুন অঞ্চলে ইসরাইলি ট্যাঙ্ক ঢুকে পড়ে এবং অন্তত চারটি স্কুলে বিমান হামলা চালানো হয়। সেখানে শত শত পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার ৮০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে ইসরাইলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে অথবা উচ্ছেদের হুমকির আওতায়। এই ভয়াবহ হামলাগুলোর মধ্যেই ইসরাইলি কৌশল বিষয়ক মন্ত্রী রন ডারমার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে একটি নতুন যুদ্ধবিরতির আলোচনা চালাতে। কাতার বলেছে, যুদ্ধবিরতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন সিরিয়াস, কিন্তু জটিলতা রয়ে গেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, মানবিক ক্ষয়ক্ষতি যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা আর সহ্য করার মতো নয়। গাজার মানবিক ও সামরিক বিষয়গুলোকে এক সূত্রে বেঁধে ফেলা অগ্রহণযোগ্য।
হামাস ও মধ্যস্থতাকারীদের অবস্থান
হামাস নেতা ওসামা হামদান সোমবার বলেন, ইসরাইল থেকে ৪ সপ্তাহ ধরে যুদ্ধবিরতি বিষয়ে কোনো খবর নেই। আমরা যুদ্ধবিরতি চাই, যাতে আমাদের জনগণকে রক্ষা করা যায়। মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি যাতে সীমান্তগুলো খোলা যায়। কাতার বলেছে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে এখন নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কাতারের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, আজ বা কালই কোনো বড় অগ্রগতি হবে না, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি আলোচনার পথ খুলেছে।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
হারেৎস পত্রিকার কলাম: আব্রাহাম চুক্তি সম্প্রসারণে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা থেমে যাচ্ছে জটিল বাধার মুখে! by জিভ বার'এল
লেবানন: হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণে কঠিন সমীকরণ
আগামী দিনগুলোতে লেবাননের সরকার আসবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে। মার্কিন দূত টম ব্যারাক গত সপ্তাহে বৈরুতে গিয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তার মূল কথা হলো- হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে হবে। লেবাননের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম ইতিমধ্যেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। লেবানন সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে লিটানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিগুলোর ৮০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে দাবি প্রেসিডেন্ট আউনের। এমনকি প্যালেস্টাইন শরণার্থী শিবিরগুলোতেও অস্ত্র নিষিদ্ধে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সম্মতি মিলেছে। তবু আউন বলছেন, যেকোনো নিরস্ত্রীকরণ হতে হবে সংলাপের মাধ্যমে, যাতে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি না থাকে। কিন্তু ওয়াশিংটন সংলাপের সময় দিতে চায় না। ব্যারাকের মতে, যদি সংলাপ হয়ও, তা এখনই শুরু করতে হবে এবং হিজবুল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে এতে রাজি হতে হবে।
আউন পাল্টা শর্ত দিয়েছেন- ইসরাইলকে কিছু এলাকা ছাড়তে হবে। কাজেই এই চুক্তি বাস্তবায়নের শর্ত হলো- প্রথমে ইসরাইল ৫টি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে কিছুটা পিছু হটবে। পরে পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের বিনিময়ে পুরোপুরি সরে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি লেবানন রাজি না হয়, তারা শান্তিচুক্তি পর্যবেক্ষণ কমিটি থেকে বেরিয়ে আসবে, জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআইএফআইএলের সেনা তুলে নেয়া হবে এবং দেশটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
ইরান কি কৌশল বদলাবে?
হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ ইরানের জন্য বিশাল বিষয়। এই সিদ্ধান্তে বোঝা যাবে, ইরান তার প্রভাব বলয়ের ভবিষ্যৎ কৌশল কীভাবে নির্ধারণ করছে। তারা কি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র গঠন করবে, না কি সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়বে অস্ত্রের হুমকি ছাড়াই? উল্লেখ্য, ইরাকে ইতিমধ্যে ইরান শিয়া মিলিশিয়াদের জাতীয় বাহিনীতে একীভূত করতে রাজি হয়েছে। কিন্তু লেবানন হলো ইরানের ভূ-রাজনৈতিক হীরক খণ্ড, যেখান থেকে তাদের প্রভাব ছড়িয়েছে সিরিয়া, গাজা এবং ইয়েমেনেও।
সিরিয়া: আব্রাহাম চুক্তিতে সম্ভাবনা ও গোলান সংকট
সিরিয়ায় চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। নতুন প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারাআ ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব রোধে সফল হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাত চান না এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত হতে পারেন। এই অবস্থানের পুরস্কারস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ট্রাম্পের উষ্ণ স্বাগত, সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। কিন্তু মূল বাধা রয়ে গেছে গোলান মালভূমি। ট্রাম্প নিজেই এর ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দিয়েছেন। ফলে আলোচনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডেওন সা’র বলেছেন, দামেস্ক যদি গোলান ছাড়তে রাজি হয়, তাহলে চুক্তি সম্ভব। অথচ কিছুদিন আগেও আল-শারাআকে একজন ‘জিহাদি নেতা’ হিসেবেই বিবেচনা করা হতো।
সৌদি আরব: কূটনৈতিক ‘বড় পুরস্কার’ কিন্তু শর্ত আছে
গাজা যুদ্ধের ঠিক আগমুহূর্তে ইসরাইলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল সৌদি আরব। তখন তাদের শর্ত ছিল- ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। কিন্তু যুদ্ধের পর তারা বলছে- দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের স্বীকৃতি ও বাস্তব পদক্ষেপ ছাড়া কোনো সম্পর্ক নয়। তবে সৌদি আরব ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে। কারণ তারা এক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকায়। যদিও এই বিনিয়োগ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, কিন্তু কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট।
চূড়ান্ত প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে: ট্রাম্প কি পারবেন?
তিনি এখনো নেতানিয়াহুকে গাজা যুদ্ধ থামাতে রাজি করাতে পারেননি। তাহলে সৌদি আরবকে কীভাবে বোঝাবেন যে মানবিক ত্রাণই যথেষ্ট, রাষ্ট্র না হলেও চলবে? ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী নেতৃত্বের কাছে নোবেল শান্তি পুরস্কার কিংবা ট্রাম্পের কূটনৈতিক বিজয় কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় যদি তারা গাজা ফিরে পেতে চায়। আব্রাহাম চুক্তির ‘সুবাসিত ফলাফল’ এখনো বহু দূর, আর পথে রয়েছে বিস্ফোরক বাস্তবতা।
(হারেৎস পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে অনুবাদ)

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ইরানের ‘সরিয়ে ফেলা’ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে
পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার আগে ইরান কি সেগুলো গোপনে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলেছে, নাকি সবই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে?
গত সপ্তাহান্তে ইরানের বড় তিন পারমাণবিক স্থাপনা—ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র বাংকার–বিধ্বংসী বোমার ব্যবহার করেছে, বিশেষ করে পার্বত্য এলাকায় ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে অবস্থিত ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে এ বোমা ব্যবহার করা হয়।
হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের আঘাতে ইরানের ওই সব স্থাপনা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।
কিন্তু ট্রাম্পের এ দাবির সঙ্গে একমত হতে পারছে না আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।
জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থাটি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নজরদারি করে। সংস্থাটি বলেছে, ফর্দোতে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত এ স্থাপনা ইরানের সবচেয়ে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র।
রোববার আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, হামলায় ফর্দোর ভেতরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সংবেদনশীল সেন্ট্রিফিউজগুলো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। তবে ইরানের ৯ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম—যার মধ্যে ৪০০ কেজির বেশি পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি মাত্রায় সমৃদ্ধ, তা ধ্বংস হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তেমন কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই।
পশ্চিমা দেশগুলো এখন মরিয়া হয়ে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামগুলো কোথায় গেল, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে জড়িত বর্তমান ও সাবেক এক ডজনের বেশি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বলেছেন, এ বোমাবর্ষণ ইরানের জন্য হয়তো তাদের ইউরেনিয়াম মজুত গোপন করে ফেলার একটি আদর্শ সুযোগ তৈরি করেছে। এখন এ বিষয়ে আইএইএর যেকোনো তদন্ত সম্ভবত আরও সময়ক্ষেপণকারী ও জটিল হয়ে যাবে।
২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আইএইএর প্রধান পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অলি হেইনোনেন বলেন, এ অনুসন্ধানে সম্ভবত ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো থেকে উপাদান উদ্ধার, ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও পরিবেশগত নমুনা সংগ্রহের মতো জটিল প্রক্রিয়া জড়িত থাকবে, যা অনেক সময়সাপেক্ষ।
হেইনোনেন আরও বলেন, ধ্বংসস্তূপের এমন জায়গায় উপাদান থাকতে পারে, যেখানে পৌঁছানো কঠিন কিংবা সেগুলো হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচে ছড়িয়ে পড়েছে অথবা বোমাবর্ষণের সময় হারিয়ে গেছে।
আইএইএর দায়িত্ব পালনের সময় অলি হেইনোনেন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ওয়াশিংটনে স্টিমসন সেন্টার থিঙ্কট্যাংকে কর্মরত।
আইএইএর নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, ইরানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মাত্রায় সমৃদ্ধ ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা অস্ত্র তৈরি মানের খুব কাছাকাছি। অস্ত্র তৈরির জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়। ইরানের ওই মজুত নয়টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট।
এ মজুতের সামান্য একটি অংশের হিসাব না পাওয়া গেলে সেটাও গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হবে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য। যারা মনে করে, ইরান এখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করলেও এ অস্ত্র তৈরির পথ অন্তত খোলা রাখতে চাইছে।
হামলার আগেই ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয়তো অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আইএইএর প্রধান গ্রোসি বলেন, ১৩ জুন ইসরায়েলের প্রথম হামলার দিন ইরান তাঁকে জানিয়েছিল, তারা তাদের পারমাণবিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ রক্ষায় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
এ বিষয়ে ইরান বিস্তারিত আর কিছু জানায়নি জানিয়ে গ্রোসি আরও বলেন, এতেই মনে হচ্ছে, হয়তো ইরান উপকরণগুলো সরিয়ে নিয়েছে।
এ বিষয়ে সম্পৃক্ত এক পশ্চিমা কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফর্দোতে থাকা অধিকাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হামলার কয়েক দিন আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে, যেন তারা আগেভাগেই জানত যে হামলা হতে চলেছে।
কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, স্যাটেলাইটের ছবিতে হামলার আগে ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনার বাইরে ট্রাকসহ বেশ কয়েকটি যানবাহনের একটি সারি দেখা গেছে। এ থেকে ইঙ্গিত মিলছে, হয়তো সেখানে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, এ–সংক্রান্ত কোনো গোয়েন্দা তথ্য তাঁর জানা নেই। ট্রাম্পও ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে ফেলা নিয়ে উদ্বেগ পুরো উড়িয়ে দিয়েছেন।
ফক্স নিউজ চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরানিরা কিছুই সরাতে পারেনি। এটা করা খুবই বিপজ্জনক। এটা খুব ভারী; খুব, খুবই ভারী। এ কাজ করা খুব কঠিন। তার ওপর আমরা খুব একটা আগেভাগে তাদের (সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে) জানাইনি। তারা জানত না যে আমরা আসছি, ঠিক তখন, তখনই জানতে পেরেছিল।’
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর রয়টার্সকে ট্রাম্পের সর্বসাধারণের সামনে দেওয়া বক্তব্য দেখতে বলেছে।
আরেক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ইউরেনিয়াম মজুত কী অবস্থায় আছে, তা যাচাই করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি আইএইএ ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের কথা উল্লেখ করেন। যার মধ্যে রয়েছে ইরানের পক্ষ থেকে অবৈধ স্থানে পাওয়া ইউরেনিয়ামের নিদর্শনগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হওয়া।
ওই কূটনীতিক বলেন, এটা চোর-পুলিশ খেলা হতে চলেছে।
ইরানের দাবি, পরিদর্শক সংস্থা তাদের ওপর যত শর্ত আরোপ করেছিল, তার সবই তারা মেনে চলছিল।
এখন সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে গেছে
ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েল দেশটিতে হামলা শুরু করার আগে আইএইএ নিয়মিতভাবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় প্রবেশাধিকার পেত এবং ২৪ ঘণ্টা সেখানে থেকে নজরদারি করতে পারত।
পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার প্রতিরোধে গৃহীত আন্তর্জাতিক অস্ত্রবিস্তার চুক্তির (এনপিটি) অংশ হিসেবে আইএইএ এটা করত। ১৯১টি দেশ এ চুক্তিতে সই করেছে, যাদের মধ্যে ইরান রয়েছে।
এখন ধ্বংসস্তূপ আর ছাইয়ের নিচে এসব চাপা পড়ে গেছে।
তার ওপর ইরান তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিতের হুমকি দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টে এ–সংক্রান্ত বিষয়ে ভোট হয়েছে। অনেক দেশ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে অবৈধ মনে করে।
ইরান বারবার বলেছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের লক্ষ্য বেসামরিক, অস্ত্র তৈরি নয়।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যও বলেছে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ তাদের হাতে নেই। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার আগে নিজেদের গোয়েন্দা তথ্য সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে গেছেন।
এনপিটির সদস্য হিসেবে ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের হিসাব দিতে হয়। এরপর আইএইএর দায়িত্ব সেই হিসাব যাচাই করা, যার মধ্যে পরিদর্শনও অন্তর্ভুক্ত।
তবে সংস্থাটির ক্ষমতা সীমিত। তারা ইরানের ঘোষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় পরিদর্শন করতে পারে; কিন্তু অঘোষিত স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন চালাতে পারে না।
আইএইএ জানিয়েছে, ইরানের কাছে কতসংখ্যক অতিরিক্ত সেন্ট্রিফিউজার রয়েছে, তা তাদের অজানা এবং এগুলো কোথায় সংরক্ষিত আছে, সে সম্পর্কেও জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থাটির কোনো ধারণা নেই। এসব সেন্ট্রিফিউজার ব্যবহার করে ইরান নতুন বা গোপন সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে।
এ কারণে এমন উপাদান খুঁজে বের করাটা অতিমাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এগুলো দিয়ে আরও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করা সম্ভব, বিশেষ করে যেগুলো অস্ত্র তৈরির পর্যায়ের খুব কাছাকাছি হতে পারে।
আইএইএ যেসব দেশের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারে বা পায়, তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও রয়েছে। তবে সংস্থাটি বলেছে, তারা কোনো তথ্যই সরাসরি গ্রহণ করে না, প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করে দেখে।
কর্মকর্তারা বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের ইউরেনিয়াম সংরক্ষণের স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এখন এ দুই দেশই সবার আগে ইরানের বিরুদ্ধে ইউরেনিয়াম মজুত গোপন রাখা বা আবার সমৃদ্ধকরণ শুরুর অভিযোগ আনতে পারে।
ছায়ার পিছু ধাওয়া
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিশাল মজুত আছে—এমন অভিযোগ করে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ওই হামলার আগে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিশাল মজুতের খোঁজ পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা।
ওই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছিল, যখন নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে না, তখন কোনো বিদেশি শক্তির গোপন মজুত সম্পর্কে দাবির সত্যতা যাচাই করা কতটা কঠিন হতে পারে।
ইরাকের মতো এখানেও পরিদর্শকদের শেষমেশ ছায়ার পিছু ধাওয়া করতে হতে পারে।
তৃতীয় আরেক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেছেন, যদি ইরান তাদের ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পর্কে তথ্য দিতে স্বচ্ছতা দেখায়, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু যদি না দেখায়, সে ক্ষেত্রে কেউ–ই কোনো দিন নিশ্চিত হতে পারবে না, আসলে সেগুলোর কী হয়েছে।
আইএইএকে তাদের ১৮০ সদস্যরাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তারা নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারছে না। তারা যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ, এটা বলতে পারছে না। আবার তাদের হাতে ইরানের সমন্বিত অস্ত্র কর্মসূচির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণও নেই।
এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র আইএইএর যাচাই-বাছাই ও নজরদারি কার্যক্রমকে সমর্থন জানিয়ে তেহরানকে অনুরোধ করেছে, দেশের মধ্যে যেন তাদের পরিদর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
আইএইএর মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হিসাব রাখা সত্যিই কঠিন। এ জন্য দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে।
আইএইএ বলেছে, ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক ক্ষেত্রটির ওপরের অংশ (যুক্তরাষ্ট্রের) হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। নাতাঞ্জে দুটি পারমাণবিক স্থাপনায় ৬০ শতাংশের ওপরে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন ও মজুত করা হতো। ভূপৃষ্ঠের ওপরের স্থাপনাটি অপেক্ষাকৃত ছোট। এটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অর্থ, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ছোট একটি অংশ হয়তো ধ্বংস হয়ে গেছে।
ফর্দো মাটির গভীরে স্থাপিত ইরানে সবচেয়ে গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। এখানেই ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ উৎপাদিত হতো। গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে হামলা চালায়। হামলায় ব্যবহার করা হয় বাংকার–বিধ্বংসী শক্তিশালী বোমা। হামলায় ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটির কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ যে এলাকায় বোমাবর্ষণ করা হয়েছে, সেখানে ইরানের সবচেয়ে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ রাখা ছিল। এতে ওই এলাকায় প্রবেশের টানেলের মুখগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে আইএইএ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনে যেতে পারেনি। ফলে বাইরের বিশ্বের সামনে প্রশ্নের সংখ্যা অসংখ্য, যার সামান্য উত্তরই জানা আছে।
গত বুধবার গ্রোসি বলেন, বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর অবস্থা আইএইএর পরিদর্শকদের কাজ কঠিন করে তুলবে। কারণ, সেখানে ধ্বংসস্তূপ আছে, অবিস্ফোরিত গোলাবারুদও থাকতে পারে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এতে সময় লাগবে।
আইএইএর সাবেক প্রধান পরিদর্শক হেইনোনেন বলেন, সংস্থাটির পরিদর্শকেরা স্বাধীনভাবে কী যাচাই করতে পেরেছেন, সে বিষয়ে যথাসময়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে তথ্য প্রকাশ করতে পারা আইএইএর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারে, সেখানে তারা কোনো কিছু নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না কিংবা যা এখনো তাদের অজানা রয়ে গেছে—সবই তাদের স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে।
তবেই কেবল সদস্যরাষ্ট্রগুলো নিজেরা ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারবে বলে মনে করেন হেইনোনেন।
![]() |
| ইরানি সেন্ট্রিফিউজ পরিদর্শনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তেহরান, ১১ জুন ২০২৩ ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ভারতের রাজনীতিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলতে থাকবে by সালেহ উদ্দিন আহমদ
জয়শঙ্কর এক বক্তব্যে বলেন, ‘পাকিস্তানে “সন্ত্রাসী অবকাঠামোয়” হামলার আগে তাদের অবহিত করা হয়েছিল।’ এমন বক্তব্য প্রকাশ পাওয়ার পর কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো থেকে মোদি সরকারের তুমুল সমালোচনা শুরু হয়।
প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘হামলার আগে পাকিস্তানকে সবকিছু জানিয়ে দিয়ে ভারতের নিরাপত্তা ও সেনাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে।’ আম আদমি পার্টির নেতা ও রাজ্যসভার এমপি সঞ্জয় সিং বলেন, ‘পাকিস্তানকে আগে জানানো দেশদ্রোহের শামিল। এটি ক্ষমার অযোগ্য ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে ভারতীয় টিভি ও সংবাদমাধ্যমগুলোয় যুদ্ধের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র কর্নেল সোফিয়া কোরেশি ও উইং কমান্ডার ভয়মিকা সিং। তাঁরা দুজনই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র হিসেবে যুদ্ধে অগ্রগতি ও সাফল্যের বিবরণ দিতেন। বলা বাহুল্য, কর্নেল সোফিয়া কোরেশি একজন মুসলমান।
কর্নেল কোরেশির ধর্ম ও মোদির যুদ্ধের ‘সাফল্য’ নিয়ে তীক্ষ্ণ কটাক্ষ করেন মধ্যপ্রদেশের এক মন্ত্রী—কুওয়ার শাহ। বলা যায়, এক ঢিলে দুই পাখি। তিনি বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুরে মোদি পাকিস্তানেরই এক বোনকে দিয়ে পাকিস্তানকে হারিয়েছেন।’
শাহ এখানে যুদ্ধের সময় কর্নেল কোরেশির জোরালোভাবে ভারতীয় ‘সাফল্য’ নিয়ে উপস্থাপনাকে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। মন্ত্রীর এ মন্তব্য নিয়ে ভারতের বিচার বিভাগকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। মন্ত্রীর মন্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে মোদির জয় যুদ্ধে নয়, প্রচারে। তবে এটাও সত্য, ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত যত না যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের লড়াই, তার চেয়েও বেশি প্রচারের মাধ্যমে বিজয়ের স্নায়বিক লড়াই।
মধ্যপ্রদেশের মন্ত্রীর এই বিতর্ক থামতে না থামতেই ভারতের প্রথম স্থানীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান টাইমস প্রথম পাতায় প্রতিবেদন করে যে মোদির দল শিগগির বিজেপির ১১ বছর শাসনক্ষমতার উদ্যাপন উৎসব শুরু করবে। তাতে কর্নেল কোরেশি ও উইং কমান্ডার এক বড় ভূমিকা পালন করবেন। সরকারের জোরালো অস্বীকৃতির মুখে ইন্ডিয়ান টাইমসকে এ খবর প্রত্যাহার করতে হয়েছে।
কিন্তু তাঁদের দুজনকে নিয়ে প্রচারণা চলছেই; বিশেষ করে কর্নেল কোরেশিকে নিয়ে। বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার প্রেসিডেন্ট জামাল সিদ্দিকি বলেছেন, কর্নেল কোরেশি মুসলমান নারী ভোটারদের মধ্যে বিজেপির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করবেন। হিন্দুস্থান টাইমসের এক খবরে বলা হয়, কর্নেল সোফিয়া কোরেশির মা–বাবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে গুজরাটে এক রাজনৈতিক পথসভায় অংশগ্রহণ করেছেন।
পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে ভারতের অপারেশন সিঁদুর কতটুকু সফল হয়েছে, তা নিয়ে ভারতের ভেতরে ও বাইরে যথেষ্ট তর্কবিতর্ক আছে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতীয় বিরোধী দলগুলো লোকসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকে যুদ্ধের ফলাফল ও কেন যুদ্ধ হঠাৎ বন্ধ করা হয়েছে, তা নিয়ে আলাপ–আলোচনা করতে লোকসভার বৈঠক ডাকতে বলেছিল। কিন্তু মোদি সরকার তাদের অনুরোধ বাতিল করে দিয়েছে।
সরকার অবশ্য অপারেশন সিঁদুরের কৃতিত্ব নিয়ে তাদের জয়বাদ্য অব্যাহত রেখেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মোদি সরকার খুব শিগগির ভারতীয় নারীদের মধ্যে উপহার হিসেবে সিঁদুরের কৌটা বিলির পরিকল্পনা করবে।
আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচন। গত দুটি নির্বাচনে মোদির দল বিজেপি অনেক চেষ্টা করেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। এবার তাদের সুযোগ, অপারেশন সিঁদুরের ‘সাফল্য’ দিয়ে যদি পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মন জয় করা যায়। তাই প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় অপারেশন সিঁদুরের রণক্ষেত্র পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তরিত হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র মোদিবিরোধী। তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধের নামকরণ ‘সিঁদুর’ রাখায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, অপারেশনের নাম ‘সিঁদুর’ করা হয়েছে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে। মমতা বলেছেন, ‘এই নামকরণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রচার দেশে বিভাজন তৈরি করছে। নির্বাচন উপলক্ষে সেনা অভিযানের নাম নিয়ে রাজনীতির হোলি খেলছেন তিনি।’
ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক গুরুতর মন্তব্য প্রকাশ পায়। তিনি মোদিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘আমরা সিঁদুরকে সম্মান করি। আপনি সব ভারতীয় নারীর স্বামী নন যে তাঁদের সিঁদুর বিলাতে পারেন। আপনি তো নিজের স্ত্রীকেও সিঁদুর পরান না। এটি অত্যন্ত অসম্মানজনক।’
এখানে উল্লেখ করা যায়, মোদি যদিও তাঁর মা-বাবার অনুরোধে ১৯৬৮ সালে ১৮ বয়স বয়সে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রী যশোদা বেন মোদির সঙ্গে এক দিনের জন্যও সংসার করেননি। শ্রীমতী যশোদা বেন গুজরাটের একটা ছোট্ট গ্রামে ভাইয়ের সংসারে থাকেন এবং স্থানীয় স্কুলে মাস্টারি করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে এ ঘটনাকে স্মরণ করে এই কথাগুলো বলেন।
পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য অন্য প্রসঙ্গে মমতার সমালোচনা করলেও নিজের স্ত্রীকে সিঁদুর পরানো নিয়ে কিছু বলেননি। তিনি বলেন, ‘সিঁদুর খেলার পবিত্র ভূমি থেকে আমি বলছি যে আমরা এখন অপারেশন সিঁদুর নিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে নতুন সংকল্প ঘোষণা করছি।’ সিঁদুর খেলা বলতে তিনি পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার সময় সিঁদুর-রঙের হোলি খেলা হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
মোদির পরই ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় আসেন। সিঁদুর নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেসব সমালোচনা করেন, তার উত্তরে শাহ এক জনসভায় বলেন, ‘সিঁদুরের অপমান করার মানে কী, আগামী নির্বাচনে বুঝিয়ে দিন মমতাকে!’ শাহ আরও বলেন, ‘আমি বাংলার মাতৃশক্তির কাছে অনুরোধ করছি, আগামী নির্বাচনে অপারেশন সিঁদুরের ওপর প্রশ্ন তোলা মমতাজিকে সিঁদুরের দাম বুঝিয়ে দিন। মা-বোনেরা বুঝিয়ে দিন, সিঁদুরের অপমান করার অর্থ কী!’
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার ও ব্লুমবার্গস প্রকাশ করেছে, ভারতীয় যৌথ বাহিনীর প্রধান অনিল চৌহান সিঙ্গাপুরে এক সাক্ষাৎকারে ভারতীয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান খোয়ানোর কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রথম দিকে ৭ মে আমাদের যুদ্ধবিমান হারাই। কয়টা হারিয়েছি, সেটা জরুরি নয়। গুরুতর ব্যাপার হলো, কেন হারিয়েছি?’ তার এই বক্তব্যে ভারতের বিজেপিপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো জেনারেল চৌহানের ওপর দারুণভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে। তিনি কেন বিদেশের মাটিতে এ নিয়ে কথা বলতে গেলেন, তা নিয়ে বিজেপি মহলে দারুণ সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
সামনেই কয়েক মাসের মধ্যে বিহারের বিধানসভার নির্বাচন, তারপর রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের। বিজেপি চাইছে অপারেশন সিঁদুরের সাফল্যের বাজনা বাজিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলো পার করতে। কিন্তু তা বোধ হয় মোদির জন্য কঠিন হবে। কারণ, যুদ্ধের দুর্বলতাগুলো ধীরে ধীরে সামনে চলে আসছে। সেনাবাহিনীর ক্যামোফ্লাজ পোশাকে প্রধানমন্ত্রী মোদি যেভাবে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তা–ও বিরোধী মহলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, মোদি নিজের রাজনৈতিক কাজে এই যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন।
ভারতীয় জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে ফ্রন্টলাইনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘মোদি জেনারেল নন। তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তিনি কেন যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিচ্ছায়া নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রচারণা করছেন? যুদ্ধ ও ভোট এবং সৈনিক ও সরকারপ্রধানের মধ্যে ব্যবধান যদি মুছে যায়, তা হবে দেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।’
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পরই নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর শেষ হয়নি, অপারেশন চলমান।’ এখন মনে হচ্ছে, তিনি ঠিকই বলেছিলেন। তবে তিনি যে অপারেশন সিঁদুরকে চলমান রেখে ভারতীয় রাজনীতির মাঠে টেনে আনবেন, তখন তা কেউ ধারণা করেনি।
এখন মনে হচ্ছে, অন্তত বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলবে। হয়তো বা তা পরবর্তীকালে অন্য রাজ্যগুলোর নির্বাচনেও গড়াবে।
* সালেহ উদ্দিন আহমদ: সাবেক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
![]() |
| অপারেশন সিঁদুরের সাফল্যে বিজয় উদ্যাপন করছেন বিজেপির কর্মী–সমর্থকেরা। অমৃতসর, ১৭ মে। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: কোথায় ব্যর্থ, কোথায় সফল by জাহেদ উর রহমান
একটা বড় প্রাপ্তি দিয়ে শুরু করা যাক। এটা হচ্ছে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনকে বিপ্লব বলে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া। এমনকি যাঁরা এই চেষ্টা করেছেন, তাঁরাও সরে এসেছেন এই চেষ্টা থেকে; তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোকেও এখন ‘গণ-অভ্যুত্থান’ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখছি। এমনকি স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা শুরুর দিকে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে ‘বিপ্লব’ শব্দটি ব্যবহার করলেও পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করেছেন ‘গণ-অভ্যুত্থান’ শব্দটি। শেখ হাসিনার পতনের জন্য আমরা যা করেছি, সেটা বিপ্লব নাকি গণ-অভ্যুত্থান, এটা আমাদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলানোর জন্য খুবই জরুরি। সেই প্রসঙ্গে আসব শেষের দিকে।
দীর্ঘ এক বছর চলে গেলেও আমরা আজও এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাতে পারিনি, শেখ হাসিনার পতন আমরা কেন চেয়েছিলাম এবং পতন–পরবর্তী সময়ে আমাদের উদ্দেশ্য কী ছিল। কেউ কেউ অবশ্য ঝটপট উত্তর দিয়ে দেবেন ৩ আগস্ট ২০২৪ শহীদ মিনারে ছাত্ররা তো শেখ হাসিনার পতনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যবস্থা ফিরে আসা প্রতিরোধ করার জন্য নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির ঘোষণা করেছিলেন।
ঘটনাচক্রে একটা স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে চলে আসা কিছু ছাত্রনেতা যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা কি দেশের সব শ্রেণির মানুষের মনের চাওয়া ছিল? এক দফার মধ্যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির কথাটা বাদ দিয়ে শুধু শেখ হাসিনার পতনের কথা বললে আন্দোলনরত জনগণ রাস্তা থেকে ফিরে যেত ওই দিন? ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ফিরে আসা প্রতিরোধ করার জন্য নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও এই প্রশ্ন করা কি অমূলক হবে যে এই লক্ষ্যটি কি আসলে ‘চাপিয়ে দেওয়া’ নয়?
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির প্রসঙ্গেই গত এক বছরে ‘সংস্কার’ একটি বহুলশ্রুত শব্দে পরিণত হয়েছে। সত্যি বলতে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলানোর ক্ষেত্রে সংস্কারই সম্ভবত এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। যাঁরা খুবই গভীর, বিস্তৃত সংস্কারের পক্ষে খুব কঠোরভাবে অবস্থান নিয়েছেন, তাঁরা প্রায়ই বলেন, ‘জনগণ সংস্কার চায়।’ নিজের চাওয়াকে জনগণের নামে বলার প্রবণতা এই মাটিতে অনেক পুরোনো। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য রয়েছে। তবে বিভেদ রয়েছে সংস্কারের ব্যাপ্তি ও ধরন নিয়ে। সেটারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। বলা বাহুল্য, এটা দেখেই অনেকে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছেন।
সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কমিশনগুলোর যেসব সংস্কার প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশনে আসেনি, সেগুলো এবং কমিশনের আলোচনায় প্রাথমিকভাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিষয়গুলো সরকার দ্রুত শেষ করতে আন্তরিকতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ওদিকে সরকার কর্তৃক গঠিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কিছুদিন আগে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নেও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘদিন একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করার পর অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। ধারণা করি, সরকার মোটাদাগে মানুষকে হতাশ করেছে। শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, এটা মেনে নিয়েও বলতে চাই, অনেক অসাধারণ কিছু করা দূরেই থাকুক, একটা সরকারের খুবই সাধারণ রুটিন কাজের ক্ষেত্রেও সরকারের ব্যর্থতা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা একেবারে নজিরবিহীন। পুলিশ বাহিনী অন্তর্গতভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়ে সামরিক বাহিনীর মাঠে উপস্থিতির পরও এমন ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য।
শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশ আদতে কোনো রাষ্ট্র ছিল না, ছিল ‘মগের মুল্লুক’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই আলাপ এখন অনেকেই তুলছেন এই সরকারের সময়ে দেশ ‘মবের মুল্লুকে’ পরিণত হয়েছে কি না। বিশেষ করে ধর্মের নামে তৈরি হওয়া মব নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছুই করতে পারেনি কিংবা পরিকল্পিতভাবেই করেনি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে নিউইয়র্ক টাইমস–এর মতো পত্রিকা বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ডানপন্থী উগ্রবাদীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খানিকটা সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে, এমন শিরোনামে রিপোর্ট করেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি না বাড়ার মতো অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য আছে সরকারের। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতি বাস্তবায়নের চেয়ে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণে চাহিদা হ্রাস পাওয়ার বড় প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া এই সরকারের ক্যাবিনেটকে মোটাদাগে দুর্নীতিমুক্ত বলেই মনে করা হয়, যদিও সরকারি অফিসে দুর্নীতি দমনে সরকার কিছুই করতে পারেনি। এমনকি পারেনি বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, দখলদারির মতো ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।
একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে তাদের চিন্তা এবং আদর্শগত মতপার্থক্য বা ভিন্নতা থাকবেই কিন্তু প্রত্যাশিত ছিল শেখ হাসিনা–পরবর্তী সময়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা অনেক ভালো থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি খুব খারাপ পর্যায়ে চলে না গেলেও দলগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ করছে। দীর্ঘকাল একটা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মধ্যে থেকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মিথস্ক্রিয়া থেকে অনেক দূরে ছিল দীর্ঘকাল। তাই এমন সংকট হয়তো অভাবনীয় নয়। কিন্তু এটাকেও আমরা বেশ খানিকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতাম যদি গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পরবর্তী মুহূর্ত থেকেই এর কৃতিত্ব দাবি করে অন্যদের অবদানকে তুচ্ছ করার প্রবণতাকে আমরা রোধ করতে পারতাম। একই সঙ্গে সরকারের দিক থেকে একটি দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করাও রাজনীতিতে অবিশ্বাস তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।
শেখ হাসিনার পতন–পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি হতাশা তৈরি করেছে সম্ভবত গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী এবং সামনের সারিতে থাকা ছাত্রদের কেউ কেউ নানা রকম অনিয়ম–দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছেন বলে সাধারণের মধ্যে ধারণা তৈরি হওয়া। জুলাইয়ের নামে নতুন ‘চেতনা ব্যবসা’ চালু করছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ উমামা ফাতেমা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ সংগঠনটি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিয়ে যে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, সেটা দীর্ঘদিন থেকে সমাজে প্রচলিত ধারণাকেই শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
যাঁরা চেয়েছিলেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘটা স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানটিকে বিপ্লব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে বিপ্লবী সরকার গঠনের মাধ্যমে সংবিধান স্থগিত করে, ছাত্রদের দিয়ে মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে, রাষ্ট্রক্ষমতা দীর্ঘকালের জন্য কুক্ষিগত করবেন, তাঁরা হতাশ হয়েছেন। যাঁরা চেয়েছেন অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারটিকে যতটা সম্ভব (নিদেনপক্ষে পাঁচ বছর) টেনে নিয়ে গিয়ে নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব উপভোগ করা, হতাশা আছে তাঁদেরও; কারণ দেশ নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। হতাশ হয়েছেন তাঁরাও, যাঁরা চেয়েছেন এবারই এই বাংলাদেশের সব ধরনের সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কার করে আমাদের গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করে তুলবেন। তাঁদের এ ধরনের চিন্তার সদিচ্ছাকে প্রশ্ন না করেও বলা যায়, এটা শিশুতোষ অতি আশাবাদ। এখন পর্যন্ত সংস্কার নিয়ে যেভাবে আলাপ–আলোচনা হয়েছে এবং যতটুকু মতৈক্য হয়েছে, সেটা খুবই আশাব্যঞ্জক।
এই অভ্যুত্থানের সুফল আমরা যতটা পেলাম, শেষ পর্যন্ত সেটা খুব সন্তোষজনক নয় বটেই। যদি শুরুতেই এ গণ-অভ্যুত্থানটাকে বিপ্লব বলে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা না করতাম এবং একটা দক্ষ সরকার পেতাম, তাহলে এর সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া সম্ভব ছিল। একটা বিপ্লবের কাছে একটা জাতি এবং রাষ্ট্র যা চাইতে পারে, একটা গণ-অভ্যুত্থানের কাছে কোনোভাবেই সেটা চাইতে পারে না। বাস্তবতার জমিনে দাঁড়িয়ে যদি আমরা আমাদের গণ-অভ্যুত্থানটাকে এবং এর ধরনটাকে সঠিকভাবে আত্মস্থ করতে পারতাম, তাহলে আমরা অনেক বেশি বাস্তব স্বপ্ন দেখতে পারতাম, বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য ঠিক করতে পারতাম।
সবকিছুর পরও আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার প্রধান বাধা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে পালিয়ে যেতে বাধ্য করতে পেরেছি আমরা। এবং এর পরবর্তী সময়ে বিপ্লবের নামে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ করতে পেরেছি আমরা, এগুলো আমাদের খুব বড় অর্জন। ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে হাঁটতে, আলোচনা-বিতর্ক (মাঝেমধ্যে ঝগড়াঝঁটি) করতে করতে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় বাকি ইস্যুগুলোর সমাধান করতে পারব।
● জাহেদ উর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
জুলাইয়ের পর প্রত্যেকে যার যার এজেন্ডায় চলে গেছে, -সাক্ষাৎকারে মো. নাহিদ ইসলাম by আসিফ হাওলাদার
প্রথম আলো: জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। ওই সময়ের এমন কোনো ঘটনার কথা বলবেন কি, যা এখনো প্রকাশ করেননি?
নাহিদ ইসলাম: কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণ–অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী এক বছর—এই পুরো সময়টাই বাংলাদেশের জন্য ঘটনাবহুল। সব ঘটনা এখনো বলার সময় আসেনি।
জুলাইয়ের আন্দোলন কীভাবে সংঘটিত হয়েছে, তার পেছনের প্রেক্ষাপট কী—এর ভেতরের অনেক কিছুই সামনে আসেনি। আমরা এখন নানা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতরে থাকায় সেই সুযোগটা হচ্ছে না। যেকোনো বড় ঘটনার পর তার ইতিহাস পুনরুদ্ধারের জন্য সময় লাগে।
প্রথম আলো: যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান হয়েছিল, গত এক বছরে সেটা কতটা পূরণ হলো?
নাহিদ ইসলাম: জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাটা কী, সেটা আগে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থান একেকজনের কাছে একেক রকম।
প্রথম আলো: আপনারা যেভাবে দেখেন, তা–ই বলুন।
নাহিদ ইসলাম: আমাদের কাছে আকাঙ্ক্ষাটা ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে, কিন্তু ব্যবস্থার পতন বা বিলোপ ঘটেনি। সেই ব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে। সেই ব্যবস্থার রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরে গেছে, আরেকটা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। কিন্তু আমাদের লড়াইটা সেই ব্যবস্থার সঙ্গে। পুরোনো ব্যবস্থাকে ভাঙতে বা পরিবর্তন করতে হবে। সেই জায়গায় আসলে অর্জন হয়নি এখনো। বৈপ্লবিক দায়িত্বটা পালন হয়েছে, কিন্তু গঠনটা আমরা এখনো করতে পারিনি।
অনেকে জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল সরকার পতনের একটা ঘটনা হিসেবে দেখেন। তাঁদের কাছে তো আওয়ামী লীগের পতনটাই অর্জন বা এখানেই জুলাই শেষ। আমাদের কাছে জুলাই এখান থেকে শুরু আসলে। সেই জায়গায় আমাদের অবশ্যই অপ্রাপ্তি আছে। কিন্তু এই সংগ্রাম বা আকাঙ্ক্ষার জন্য যাত্রাটা চলমান।
প্রথম আলো: আপনি যে অপ্রাপ্তির কথা বলছেন, তার কারণ কী বলে মনে করেন?
নাহিদ ইসলাম: অভ্যুত্থানের সময় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। আমাদের নেতৃত্বের অনেক ধরনের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম ছিল না। ৫ আগস্টের পর যখন এটাকে সংগঠিত করতে চাওয়া হয়েছে, তখন নানা দিক থেকে বাধা এসেছে। ফলে সঠিকভাবে সংগঠিত করা যায়নি। শিক্ষার্থীদের সঠিক কর্মসূচি দিয়ে মাঠে রাখা যায়নি।
একই সঙ্গে সরকার ও রাজপথে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। সরকারের জায়গা থেকে ক্ষমতার ওপর যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন ছিল, সেটা তারা করতে পারেনি। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী, সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল ও সরকার বা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে যে ঐক্য বা অঘোষিত–অলিখিত চুক্তিটা হয়েছিল, সেই চুক্তিটা ভঙ্গ হয়েছে, সেখানে অনৈক্য হয়েছে। জুলাইয়ের পরে প্রত্যেকে যার যার এজেন্ডায় চলে গেছে। সবাই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এজেন্ডায় এক জায়গায় আসতে পারেনি। শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত সবাই এক জায়গায় থাকলেও পরে আর সবাই এক জায়গায় থাকেনি। এর ফলে অনেক কিছু করার যে সুযোগ আমাদের ছিল, সেটা করা যায়নি।
আরেকটা কারণ হলো সেই আমলাতন্ত্র, সেই সেনাবাহিনী, সেই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আর অলিগার্করা রয়ে গেছে।
প্রথম আলো: এই সরকারের জন্য উদ্বেগের প্রধান দুটি বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ‘মব’ (দলবদ্ধ সহিংসতা)। এ বিষয়ে আপনাদের কোনো পর্যবেক্ষণ আছে?
নাহিদ ইসলাম: আমি জানি না এখানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী রকম। তারা মাঠে থেকে চেষ্টা করছে, তারপরও কেন পুলিশকে আরও সক্রিয় করা গেল না...। পুলিশকে আরও অনেক বেশি সক্রিয় করা সম্ভব হতো যদি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি মাঠে রাখা যেত, ব্যবহার করা যেত। ৫ আগস্টের পরে শিক্ষার্থীরাই থানাগুলাকে সক্রিয় করেছিল। নতুন পুলিশ নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবু আইনশৃঙ্খলার অনেকখানি উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এই আইনশৃঙ্খলা বা এই পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে আমরা নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারব কি না, সেটা নিয়ে সংশয় আছে।
‘মব’ বলে যেভাবে হেয় করা হচ্ছে, তার সঙ্গে আমরা একমত নই। যাদের ‘মব’ বলা হচ্ছে, এরা বিক্ষুব্ধ জনগণ। সঠিক কর্মসূচি ও নেতৃত্ব না থাকার কারণে এদের নানাজন নানাভাবে ব্যবহার করেছে, ডাইভার্ট করেছে, নিজেদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা বা গোষ্ঠী এজেন্ডায় তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। এটা আমাদেরও সীমাবদ্ধতা। জনগণকে একটা দিকে ধাবিত করার মতো কর্মসূচি সরকারের দিক থেকেও অনুপস্থিত ছিল।
মানুষ কর্মসূচি চেয়েছে, দেশ গঠনের জন্য কাজ করতে চেয়েছে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। দেখা গেছে পুরোনো তর্ক, নানা ধরনের গোষ্ঠীগত স্বার্থের রাজনীতির ভিত্তিতে অভ্যুত্থানকারী বিভিন্ন অংশ নিজেদের মতাদর্শগতভাবে ভাগ করেছে। তাদের এখন ‘মব’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয় যেটাকে ‘মব’ বলা হচ্ছে, এটা শুধু পুলিশি বা আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটা আরও বহু বছর বাংলাদেশে থাকবে। কারণ, এরা অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা।
প্রথম আলো: কিন্তু অভ্যুত্থান–পরবর্তী একটা সরকারের শাসনামলে আইন হাতে তুলে নেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য?
নাহিদ ইসলাম: সরকার নিজে ‘প্রো–অ্যাকটিভ’ না হলে তখনই তারা এই সুযোগটা পায়। অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতাকে যতক্ষণ না একত্র করা যাচ্ছে, সঠিক নেতৃত্ব ও কর্মসূচি দেওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ এই পরিস্থিতি থাকবে। সেটার জন্যই আমরা রাজনৈতিক দল করেছি। কারণ, আমরা মনে করেছি যে এই অভ্যুত্থান যারা করেছে, বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ধারণ করতে পারবে না।
প্রথম আলো: এক বছরেও অভ্যুত্থানের শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা হলো না। শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিরা নানা অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন সময়ে।
নাহিদ ইসলাম: আমরা মনে করি, সরকারের পক্ষ থেকে যাঁরা তালিকা করেছেন, তাঁদের এ বিষয়টা পরিষ্কার করে ঘোষণা দেওয়া উচিত যে আর তালিকা নেই। নিখোঁজ থাকলে নিখোঁজ। কোন প্রক্রিয়ায় কীভাবে তালিকা করা হচ্ছে, তা উন্মুক্ত করে দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
আর পুনর্বাসনের জন্য সরকার অনেক ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন আর্থিক সুবিধা বা বাজেট বরাদ্দ ইতিমধ্যে হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার কারণে সুযোগ-সুবিধাগুলো তাঁদের হাতে সঠিক সময়ে পৌঁছাচ্ছে না। তবে জুলাইয়ের ইতিহাস সংরক্ষণে সরকারের আরও ভূমিকা রাখা উচিত।
প্রথম আলো: জুলাই অভ্যুত্থানে, বিশেষ করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনসহ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের ঐক্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি ভেঙে গেল। অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধেরও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো এর জন্য মূলত আপনাদের দায়ী করছে।
নাহিদ ইসলাম: ক্ষমতা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকে মনে করেন আমরা উপদেষ্টা হতে পেরেছি, তাঁরা হতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, এখন যেভাবে দেখা হয়, আন্দোলনের সময় কিন্তু আমরা এত ছাত্রসংগঠন দেখিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য প্ল্যাটফর্ম ছিল না।
ফ্যাসিবাদবিরোধী সব দল ও ছাত্রসংগঠন অভ্যুত্থানে ছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সবার এক থাকতে না পারার দায় এককভাবে কারও নয়। তবে আমি মনে করি, জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময়ে যাতে একসঙ্গে হতে পারি, সেই সম্পর্ক ও যোগাযোগটা অভ্যুত্থানের সব পক্ষের মধ্যে থাকা উচিত।
প্রথম আলো: আপনি এনসিপির দায়িত্ব নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। সামগ্রিকভাবে সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে বলা হলে ১০–এ কত দেবেন?
নাহিদ ইসলাম: নম্বর দিতে চাই না। এই সরকারের যে রাজনৈতিক সমর্থন দরকার ছিল, সেটা শুধু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তারা পেয়েছে, অন্য কোনো দলের কাছ থেকে পায়নি। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত ছিল না, হতেও দেওয়া হয়নি। সেনাবাহিনী থেকেও সেই সমর্থন আসেনি। সরকার কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কাজগুলো করবে?
প্রথম আলো: জুলাই সনদ হতে যাচ্ছে। কিন্তু আপনাদের দাবি করা জুলাই ঘোষণাপত্র অভ্যুত্থানের এক বছরেও হলো না। এ বিষয়ে আপনাদের কোনো চিন্তা আছে?
নাহিদ ইসলাম: দুই দফায় প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে পারল না। কেন দিতে পারল না, সেটাও স্পষ্ট করল না। এখন আমরা আর সরকারের কাছ থেকে এটা আশাও করি না। অভ্যুত্থানে যারা অংশগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে যারা যারা আসবে, তাদের নিয়েই আমরা নিজেরাই ঘোষণাপত্র দেব। আগামী ৫ আগস্টের মধ্যেই এটা হবে।
প্রথম আলো: অভ্যুত্থানের পর থেকে সমন্বয়ক পরিচয়ে নানা অপকর্মের অভিযোগ সামনে এসেছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকে এবং সমন্বয়কদের ঘনিষ্ঠ অনেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এগুলো কি জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী নয়?
নাহিদ ইসলাম: শুরুর দিকে দুর্নীতি ছিল না। কিছুদিন পরে মাঝের স্তর থেকে আবার দুর্নীতি শুরু হয়েছে। ছাত্রদের একটা অংশ যে নানাভাবে এর সঙ্গে জড়িয়েছে, এটাও আমরা স্বীকার করি। আগের যে ব্যবস্থা, সেটা কিন্তু বহাল ছিল। আগের লোকেরা যখনই একটু সুযোগ পেয়েছে, আগের নিয়মকানুন চালু করেছে। ছাত্রদের একটা অংশকে তারা এর সঙ্গে যুক্ত করেছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের অনেকেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিচয় ব্যবহার করে এসব কাজে যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু যা ঘটেছে, তার চেয়ে অপপ্রচার বেশি হয়েছে। এটা পরিকল্পিত ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতিপরায়ণ হিসেবে চিত্রিত করে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ভিত্তি নষ্ট করে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া। ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনেকখানি অন্যায্য আচরণ হয়েছে।
প্রথম আলো: আপনারা একটা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে এই দল গঠনের আগে কী আশা করেছিলেন আর দল গঠনের পর মাঠপর্যায়ে গিয়ে কী মনে হচ্ছে?
নাহিদ ইসলাম: হ্যাঁ, আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমাদের নিজেদের পারফরম্যান্সে হয়তো অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষ চাইছে আমরা তাদের কাছে গিয়ে কথা বলি, আমাদের রাজনীতিটা স্পষ্ট করি। কিন্তু আমরা নানা জটিলতায় তাদের কাছে যেতে পারছি না। সার্বিকভাবে আমি বলব, মানুষের জায়গা থেকে সাড়া আছে, আমাদের নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।
প্রথম আলো: কেউ কেউ একটি ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে আপনাদের বিশেষ সম্পর্কের বিষয়ে অভিযোগ করে থাকেন। এ ব্যাপারে কিছু বলতে চান?
নাহিদ ইসলাম: এটা খুবই দুঃখজনক। আওয়ামী লীগের সময়ে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করেছি, তখনো আমাদের এই ‘ট্যাগ’ দেওয়া হয়েছে। এখনো করা হচ্ছে। এনসিপি মধ্যমপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে চায়। একাত্তর, ইসলাম, নারী ইত্যাদি বিষয়ে আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি।
আমি মনে করি, এখানে হয়তো যোগাযোগের একটা ঘাটতি আছে। এ ছাড়া আমাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপপ্রচারও আছে।
আমরা হয়তো নিজেদের রাজনীতি বা আদর্শ স্পষ্ট করতে পারছি না। আবার ছাত্ররা কী চায়, সেটা বোঝার আগ্রহও অনেকের মধ্যে দেখা যায় না। কিছু বদ্ধমূল ধারণা বা পুরোনো ছকে অনেকে দেখার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগের ফ্রেমিং থেকে দেখা থেকে উচিত নয়।
একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সুশীল সমাজ এই গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়নি। যদিও তাদের অনেকের অংশগ্রহণ ছিল। সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটতে সহায়তা করেছে। গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে সাধারণ ছাত্র-জনতার মাধ্যমে। আমরা তাঁদের কাছে নিজেদের রাজনীতি স্পষ্ট করতে চাই।
প্রথম আলো: আপনাদের নেতাদের বক্তব্যে বিএনপির সমালোচনা দেখা যায়। এটা কি আগামী নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো মেরুকরণের ইঙ্গিত?
নাহিদ ইসলাম: আমরা কোনো দলের বিরুদ্ধে বা পক্ষে—বিষয়টা এমন নয়। আমরা পুরোনো বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে। বিএনপি এই বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। তারা শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চাইছে। এখন বিএনপি বা যেকোনো দল যদি পুরোনো বন্দোবস্তকে রক্ষা করতে চায় বা আওয়ামী লীগের জায়গায় পুনঃস্থাপিত হতে চায়, তাহলে অবশ্যই তাকে নতুন আওয়ামী লীগ হিসেবে দেখা হবে। বিএনপি তার রাজনীতি স্পষ্ট করেনি। নতুন রাজনীতির জন্য নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। জামায়াতের বিরুদ্ধে একাত্তরের গণহত্যা–সম্পর্কিত যে অভিযোগ আছে, তারাও সে বিষয়টি পরিষ্কার করেনি। সেই জায়গা থেকে পুরোনো রেটোরিক বা পুরোনো ধাঁচের রাজনীতি আবার ফেরত আসছে।
প্রথম আলো: একজন নারীর সঙ্গে আপনাদের একজন নেতার কথোপকথনের ফাঁস হওয়া অডিও নিয়ে নানা আলোচনা দেখা গেল। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
নাহিদ ইসলাম: যেকোনো ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে রাজনৈতিকভাবে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। একটা ঘটনা ঘটেছে। আমরা একটা ব্যবস্থা নিয়েছি, সেটা প্রক্রিয়াধীন আছে। কিন্তু যে প্রচারণাটা হয়েছে, সেটা পরিকল্পিত ছিল। অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেত্রীদেরও চরিত্রহননের চেষ্টা করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন দলের লোকজন এনসিপির নেত্রীদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালিয়েছেন, তখন আমরা কাউকে এগিয়ে এসে সহযোগিতা করতে দেখিনি।
গণ–অভ্যুত্থানের একটা প্রধান নৈতিক শক্তি ছিল নারীরা। তাই নারীদের রাজপথ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে এবং এখনো আছে।
প্রথম আলো: আগামী নির্বাচনে আপনারা কোনো জোট বা সমঝোতায় যাবেন, নাকি এককভাবেই নির্বাচন করবেন?
নাহিদ ইসলাম: জোট করা বা আসন সমঝোতা—এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। সম্প্রতি আমরা নিবন্ধনের আবেদন করেছি। নির্বাচন বিষয়ে আমরা ভাবব ৫ আগস্টের পরে। এর মধ্যে যদি জুলাই সনদ হয়ে যায়, এটা আমাদের একটা বড় অর্জন হবে। সংস্কারের ধাপটা কিছুটা এগোবে। তারপর আমরা নির্বাচন নিয়ে এগোব।
জোটের বিষয়েও আমরা এখন পর্যন্ত ভাবিনি। আমরা আগে সংগঠনটা তৈরি করতে চাই। এনসিপি এককভাবে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে চায়। ফলে নির্বাচন বিষয়ে আমরা কী সিদ্ধান্ত নেব, এটা এখনই বলা মুশকিল।
তবে যদি জোট করার সম্ভাবনা তৈরি হয়, আদর্শিক মিল থাকলে সেটি হতে পারে। যেসব দলের সঙ্গে আদর্শিক মিল দেখি, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। সংস্কার প্রশ্নে কোন দল কী ভূমিকা রাখে, সেটাও আমরা বিবেচনায় রাখছি।
প্রথম আলো: অনেকে অভিযোগ করেন, ছাত্র উপদেষ্টারা বাংলো, গাড়ি ইত্যাদি সরকারি সুবিধা নিয়ে পুরোনো বন্দোবস্তে ঢুকে গেছেন। আপনি কী বলবেন?
নাহিদ ইসলাম: আমাদের পুরোনো বন্দোবস্তে ঢোকানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। এখনো সেই চেষ্টা আছে। অনেকে চাইছে আমরা পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় আসন ভাগাভাগি, সমঝোতা ইত্যাদির মাধ্যমে আপস করি। কিন্তু আমরা সেটা করছি না। এ কারণে ছাত্রদের প্রতি ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি।
সরকারি পদে থেকে ছাত্র উপদেষ্টারা কোনো অন্যায্য সুবিধা নেননি। আমি উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়ার পর নিজের ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে শুরু করে সম্পত্তির তথ্য প্রকাশ করেছি। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় একটা বিদেশ সফরও করিনি, প্রয়োজনীয় সফরেও যাইনি। ফলে অনেকগুলো সুযোগ-সুবিধা আমরা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিইনি।
প্রথম আলো: আপনারা শুরু থেকে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে এসেছেন। বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে সেই বন্দোবস্ত আদৌ অর্জিত হবে বলে মনে করেন?
নাহিদ ইসলাম: নতুন বন্দোবস্ত অর্জিত হতেই হবে, তা না হলে গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে। নতুন বন্দোবস্ত না হলে আওয়ামী লীগের পতন করে কী লাভ হলো, যদি আরেকটা আওয়ামী লীগই আসে?
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
নাহিদ ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
মামদানির উত্থান, মার্কিন রাজনীতিতে নয়া মেরূকরণ
সম্প্রতি ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে মামদানিকে ‘শতভাগ কমিউনিস্ট উন্মাদ’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। এর পেছনে কারণও আছে। ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে মামদানি বলেন, আমি ডনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন- একজন প্রগতিশীল মুসলিম অভিবাসী, যে সত্যিকারের বিশ্বাস থেকে লড়াই করে। মামদানির এমন বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, তার প্রার্থিতা ট্রাম্পের রাজনীতির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ, যা গত কয়েক বছরে জাতীয় ও নগর রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। জিও নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, জোহরান মামদানির বয়স মাত্র ৩৩ বছর। তিনি একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তাকে সমাজতান্ত্রিকমনা ভাবা হয়। অনেকেরই এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে, তার মতো একজন মুসলিম নিউ ইয়র্কের মেয়র পদে ডেমোক্রেট দলের হয়ে লড়াই করবেন। দলীয় প্রাইমারি নির্বাচনে বাজিমাত করেছেন মামদানি। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নিউ ইয়র্ক সিটির সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোর মতো রাজনীতিবিদ তার কাছে পরাজিত হয়েছেন। এ বিষয়টি আমেরিকার ইতিহাসে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। বিজয় উদ্যাপনকালে নেলসন ম্যান্ডেলাকে উদ্ধৃত করে মামদানি তার সমর্থকদের বলেন, কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত তা অসম্ভব বলে মনে হয়। তবে এটা এখন সম্ভব, আমার বন্ধুরা।
এখন প্রশ্ন হলোÑ ট্রাম্পের জমানায় কীভাবে এটা সম্ভব করলেন মামদানি। তাহলে জনপ্রিয়তার জোয়ার কি ডানপন্থিদের বিরুদ্ধে বইতে শুরু করেছে? অন্যদিকে তার উত্থান ডেমোক্রেটিকদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, মামদানির উত্থান ডেমোক্রেটদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে। বেশ কয়েক বছর ধরে নিউ ইয়র্কের স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে রয়েছেন এই মামদানি। তার প্রচারণার মূল মটো ‘যে শহর আমরা সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসতে পারি’। এই প্রেক্ষাপটে সাশ্রয়ী মূল্যে বাড়ি, বিনামূল্যে বাস ও শিশু যত্নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তার স্লোগান হলোÑ ‘স্বপ্নটাকে সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসা’। এর পাশাপাশি তিনি একজন ফিলিস্তিনপন্থি। গাজায় ইসরাইলের হামলার বিরোধিতা করে কড়া সমালোচনা করেন তিনি। জনসম্মুখে মামদানি বলেছেন, মেয়র নির্বাচিত হলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্কে প্রবেশ করলে তাকে গ্রেপ্তার করবেন তিনি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর এমন কথা বলেছিলেন মামদানি। একজন মুসলিম সমাজতন্ত্রী হয়ে নিউ ইয়র্কের মতো একটি শহরের মেয়র হওয়ার চিন্তা করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। কেননা, ওই শহরের মূল জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইহুদি। এ বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে মেয়র নির্বাচন। এর আগে হয়তো একটি তিক্ত ও বিতর্কিত প্রচারণার মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। মার্কিন রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী মামদানির মতো এমন একজন ডেমোক্রেট প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা খুব বেশি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তার পক্ষে কিছু ইহুদি থাকলেও ডেমোক্রেটিক দলের বেশির ভাগ ইহুদি তাদের নিজস্ব আগ্রহের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ইহুদিরা নিউ ইয়র্ক সিটি বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি একটি তথ্য অত্যন্ত উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সেটা হলো বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার হলেন মামদানির মা। যা দক্ষিণ এশিয়ায় তাকে জনপ্রিয় করে তুলছে। এ ছাড়া উর্দু, হিন্দি এবং বাংলায় প্রচারণা করেও বেশ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে মামদানি। যেগুলো দক্ষিণ এশিয়ার মেজর ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এতে বোধহয় স্বস্তিতে নেই ট্রাম্প।
ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে তিনি বলেন, জোহরান মামদানি হলেন শতভাগ সমাজতান্ত্রিক উন্মাদ। যিনি প্রাইমারি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন এবং মেয়র হওয়ার পথে আছেন। তিনি আরও লেখেন, এর আগেও আমাদের কট্টরপন্থি- বামপন্থি ছিল, তবে বর্তমানেরটা বেশ হাস্যকর। তিনি (মামদানি) দেখতেই কেমন ভয়ঙ্কর। এ ছাড়া মামদানি তেমন স্মার্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকায় প্রগতিশীল রাজনীতির একটি পরীক্ষামূলক উদাহরণ তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই, সাধারণ নির্বাচনী প্রচারণায় এই বিষয় এবং আরও বেশ কিছু বিষয়ের উপর জাতীয়ভাবে জোর দেয়া হবে। রিপাবলিকানরা নিশ্চিতভাবেই ডেমোক্রেটিক পার্টির বামপন্থি মনোভাবকে তুলে ধরবেন। প্রগতিশীল রাজনীতিতে ইহুদিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রগতিশীল ইহুদিরা মামদানি কর্তৃক ইসরাইলি সমালোচনার সঙ্গে একমত হতে পারেন। কেননা, গাজা যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের অবস্থান নড়বড়ে অবস্থায় পতিত হয়েছে।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1265)
-
▼
2025
(3280)
-
▼
July
(186)
-
▼
Jul 01
(7)
- হত্যায় মেতেছে ইসরাইল: গাজায় ক্যাফে, স্কুল ও ত্রাণক...
- হারেৎস পত্রিকার কলাম: আব্রাহাম চুক্তি সম্প্রসারণে ...
- ইরানের ‘সরিয়ে ফেলা’ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কি আর খুঁজে প...
- ভারতের রাজনীতিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলতে থাকবে by সা...
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: কোথায় ব্যর্থ, কোথায় সফল by জা...
- জুলাইয়ের পর প্রত্যেকে যার যার এজেন্ডায় চলে গেছে, ...
- মামদানির উত্থান, মার্কিন রাজনীতিতে নয়া মেরূকরণ
-
▼
Jul 01
(7)
-
▼
July
(186)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

