Tuesday, February 25, 2014

রোবট হবে মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান?

কম্পিউটারচালিত রোবট ২০২৯ সালের মধ্যেই সব কাজে আমাদের চেয়ে করিতকর্মা হয়ে উঠবে। তারা মানুষের সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশা ও কৌতুক করতে পারবে এবং অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে শিখে নিতে পারবে। প্রযুক্তিবিষয়ক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান গুগলের প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক রে কারজওয়েইল বলেন, এমন দিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন রোবটেরা নানাবিধ দক্ষতায় সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষটিকেও ছাড়িয়ে যাবে।  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ ৬৬ বছর বয়সী কারজওয়েইল ইতিমধ্যে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কয়েকবার নির্ভুল অনুমান করে সুনাম কুড়িয়েছেন। দাবা খেলায় কম্পিউটার ১৯৯৮ সালের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হবে বলে তিনি ১৯৯০ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। আইবিএমের ডিপ ব্লু নামের কম্পিউটারটি ১৯৯৭ সালে গ্যারি ক্যাসপারভকে দাবায় হারিয়ে কারজওয়েইলের সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে সার্থক করে।
আর ইন্টারনেটের ব্যবহার সীমিত আকারে শুরুর পর কারজওয়েইল বলেছিলেন, একদিন এই প্রযুক্তি সারা বিশ্বকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলবে শিগগিরই।  সেই কারজওয়েইল এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি বলেন, ১৫ বছরের মধ্যেই রোবটেরা মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক বিকাশের ফলে তিনি এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। জোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত হলিউড চলচ্চিত্র হার ইতিমধ্যে এআইয়ের সর্বাধুনিক প্রয়োগ দেখিয়েছে। আর এসব বিষয়ে আজকাল বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রতি জনসাধারণও যথেষ্ট আস্থা দেখাচ্ছে।  অ্যাপল কম্পিউটারে ব্যবহার করা হয় কণ্ঠস্বর শনাক্তকারী প্রযুক্তি সিরি। এর মাধ্যমে কম্পিউটারের সঙ্গে রীতিমতো কথা বলা যায়। আর গুগল ইতিমধ্যে তৈরি করেছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত মোটরগাড়ি। তাই কারজওয়েইল মনে করেন, তাঁর এবারের ভবিষ্যদ্বাণীটি মোটেও আকাশকুসুম ব্যাপার নয়। দ্য ইনডিপেনডেন্ট।

ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে পরোয়ানা

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ইয়ানুকোভিচবিরোধী বিক্ষোভের
সময় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারের কাছে
গতকাল সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় মোমবাতি। তার পাশ দিয়ে
এক ধর্মগুরুকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেনের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। শান্তিকামী জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে গতকাল সোমবার তাঁর বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারি করা হয়। ইউক্রেনের সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কিয়েভে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে রাশিয়া। এদিকে আজ মঙ্গলবারের মধ্যে ইউক্রেনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা রয়েছে। এ লক্ষ্যে বিরোধী নেতা ভিতালি ক্লিৎচকো অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছেন। ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর্সেন আভাকোভ। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আভাকোভ বলেন, ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে শান্তিকামী জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর একটি মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইয়ানুকোভিচসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ইয়ানুকোভিচকে সর্বশেষ গত রোববার বালাকালাভা এলাকায় দেখা গেছে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনী প্রত্যাহার হওয়ার পর তিনি ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগীর সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে অজ্ঞাতস্থানে চলে গেছেন। কানাল টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আভাকোভ বলেন, ‘এই সময় কারও অতিরিক্ত আবেগ না দেখানো উচিত।
এখন ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়, সেখানে কর্তৃপক্ষ শান্তিকামী জনগণের বিরুদ্ধে গিয়েছিল।’ রাশিয়াপন্থী হিসেবে পরিচিত ইয়ানুকোভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে ভোট দেওয়ায় ইউক্রেনের পার্লামেন্টের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মস্কো। কিয়েভ থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিজের মনোভাবের প্রকাশও ঘটিয়েছে দেশটি। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, কিয়েভে বিরোধীরা ক্ষমতা দখল করেছে। অস্ত্র ছাড়ার আহ্বান উপেক্ষা করে সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। তবে ইউক্রেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকা ওলেকসান্দার তারচিনভ বলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার সঙ্গে ‘সমতার ভিত্তিতে ও ভালো প্রতিবেশীর’ সম্পর্ক গড়ে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস গত রোববার বলেন, রাশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই ইউক্রেনে চলমান অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটাতে হবে। এনবিসি টেলিভিশনের টক শো ‘মিট দ্য প্রেস’-এ অংশ নিয়ে তিনি আরও বলেন, ইউক্রেনের সহিংসতা বা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়া রাশিয়া, ইউক্রেন, ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—কারও জন্যই ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। রাশিয়াপন্থী বলে পরিচিত ইয়ানুকোভিচ ইউক্রেনের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ইইউর সহায়তা প্যাকেজে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে সহায়তা নেওয়ায় বিক্ষোভে নামে ইইউপন্থীরা। বিবিসি ও এএফপি।

পিলখানা ট্র্যাজেডি- আর হারাতে চাই না! by মো. ইমামুল হক

বাংলাদেশের ইতিহাস কখনোই ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া বিডিআর বিদ্রোহ নামের সেই ভয়াবহ ঘটনাটির কথাটি ভুলতে পারবে না, যেখানে দেশমাতৃকার সেবায় অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ দিতে হয়েছিল ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে।

একটি ঘটনায় মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে এত অধিকসংখ্যক উচ্চ প্রশিক্ষিত মেধাবী সেনা কর্মকর্তার হত্যার ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে আর একটিও নেই। আইন তার নিজের গতিতেই চলেছে। আদালত অভিযুক্ত ৮০০ জনের মধ্যে ১৫০ জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। যদিও এই বিচার অনেক শহীদ পরিবারকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ, সেই বীভৎস ঘটনার প্রকৃত কারণ
এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। তবু এই বিচার হয়তো বা কিছু শহীদ পরিবারের সদস্যদের মনের কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা হিসেবে কাজ করবে।
এর পরও যাঁরা একসঙ্গে এত বিশালসংখ্যক দক্ষ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার হত্যার বিষয়টি কোনোভাবেই মন থেকে মেনে নিতে পারেন না, তাঁদের সবার কাছে সব সময় একটা বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, কেন এই ঘটনা ঘটল? তাঁরা নেপথ্যের কারণগুলো জানতে চান। আদালতের রায় ঘোষণার পরও সেই সব প্রশ্ন থেমে থাকেনি। এই বিদ্রোহের অনেক কিছুই দেশবাসীর কাছে অজানা। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এর প্রকৃত কারণ এবং নেপথ্য ব্যক্তিদের সত্যের আলোয় আনতে হবে। আমাদের আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে, একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে সামাজিক নৈতিকতার প্রতি আমাদের বাধ্যবাধকতাও আছে। আমরা যদি আইনের শাসন ও সামাজিক নৈতিকতা থেকে দূরে থাকি, তার মানে হবে আমরা আমাদের মাতৃভূমির নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করছি।
এত বড় একটি বিদ্রোহ কি কেবল বিডিআরের কয়েকজন ডিএডি সমমানের কর্মকর্তার পরিকল্পনা হতে পারে? তাঁরা কি বাইরের কোনো শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হননি? সরকারকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে এবং সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।
চলে যাওয়ার সময় আমাদের শহীদ ভাইয়েরা আমাদের বিহ্বল মানসিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করে গেছেন। সময়মতো তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় কাজটুকু আমরা করতে পারিনি। জীবদ্দশায় নানা উপলক্ষে দেশে-বিদেশে তাঁরা আমাদের দেশকে গর্বিত করে গেছেন, তাঁরা তাঁদের বিক্রম দেখিয়েছেন, মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন, সহকর্মীদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের প্রয়োজনের সময় আমরা তাঁদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। কেন এই দুঃখজনক ঘটনাগুলো ঘটল, কেন আমরা সময়মতো তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারলাম না, সেগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। ভুল থেকে, দুঃখজনক সেই ঘটনা থেকে আমরা কী শিক্ষাটাই নিতে পেরেছি, সেটাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে।
এসব বীর শহীদের অনেক বন্ধু, সহকর্মী এবং পরিবারের সদস্যরা শোক আর ক্ষোভকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চান। এ রকম একটি উদ্যোগই গ্রহণ করেছে কর্নেল মুজিব ট্রাস্ট, যার মূল উদ্দেশ্য হলো কর্নেল মুজিবসহ সব শহীদ ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা। ২০০৯ সালে ভয়ানক সেই ঘটনার পরপরই ঘটনার অন্যতম শহীদ কর্নেল মুজিবুল হকের নামে শহীদ কর্নেল মুজিব ট্রাস্ট গঠিত হয়।
কর্নেল মুজিব ট্রাস্টের পক্ষ থেকে প্রতিবছর ২৫ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে আমরা যে শান্তিপূর্ণ মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করি, তা আমাদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করতে, জাতিকে গৌরবোজ্জ্বল করতে ওই শহীদদের জীবন উৎসর্গের প্রতীকী রূপকে উপস্থাপন করে। একটি মোমবাতি নিজেকে পুড়িয়ে আমাদের আলো দেয়, একইভাবে শহীদ ভাইয়েরা আমাদের আলোকিত করার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। ওই সব স্বর্গীয় আত্মার স্বপ্ন ছিল সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের, যেখানে আমরা সবাই মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করব।
আমাদের মহান দায়িত্ব আজ তাঁদের সেই স্বপ্ন পূরণে কাজ করা। তাঁদের পরিকল্পনা ও স্বপ্ন পূরণ এবং মূল্যবোধ ধারণে আমাদের অবশ্যই অঙ্গীকার করতে হবে। সেই সঙ্গে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, বীরত্ব এবং দায়িত্ববোধ আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায় আমাদের। ২৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ সেনা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে কর্নেল মুজিব ট্রাস্ট আমাদের শহীদ ভাইদের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় কাজটি করতে চায়।
জাতি হিসেবে আমরা এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারি না যে আমরা শুধু এই মূল্যবান জীবনগুলোকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি তা নয়, বরং দেশের জন্য এই বীরদের মূল্যবান অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে পারিনি। যে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাঁরা আত্মত্যাগ করলেন, সেই প্রতিষ্ঠানটিও যেন আজ দ্বিধান্বিত, নয়তো কেন আজও ২৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালিত হয় না। এই জাতির ইতিহাস আত্মত্যাগের ইতিহাস। এ জাতি জানে কীভাবে শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মান দিতে হয়। আজ শহীদ সেনা দিবসের পঞ্চম বার্ষিকী পালন কালে আসুন আমরা যথোপযুক্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে আমাদের বীরদের স্মরণ করি।


মো. ইমামুল হক: জাতিসংঘের একজন সাবেক কর্মকর্তা ও শহীদ কর্নেল মুজিবুল হকের ভাই
Emamul.haque@gmail.com

পিলখানা ট্র্যাজেডি- আর হারাতে চাই না! by মো. ইমামুল হক

বাংলাদেশের ইতিহাস কখনোই ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া বিডিআর বিদ্রোহ নামের সেই ভয়াবহ ঘটনাটির কথাটি ভুলতে পারবে না, যেখানে দেশমাতৃকার সেবায় অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ দিতে হয়েছিল ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে।

পাকিস্তানের তালেবান নেতা গুলিতে নিহত

আসমতুল্লাহ শাহীন
পাকিস্তানে গতকাল সোমবার অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীদের গুলিতে তেহরিক-ই-তালেবানের (টিটিপি) শীর্ষস্থানীয় নেতা আসমতুল্লাহ শাহীন ভুটানিসহ অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। উত্তর ওয়াজিরিস্তানের ঘুলাম খান তেহসিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘুলাম খান তেহসিলের দারগা মান্দি এলাকার কাছে অজ্ঞাতনামা একদল বন্দুকধারী অতর্কিতে একটি গাড়িতে হামলা চালায়। এতে আসমতুল্লাহ, গাড়িচালক ও দুজন দেহরক্ষী ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
আসমতুল্লাহর পরিবারের একজন সদস্য বার্তা সংস্থাকে খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে টিটিপির পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। গতকাল নিরাপত্তা সূত্রও আসমতুল্লাহ নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রায় এক মাস আগে আসমতুল্লাহ নিহত হয়েছিলেন বলে একবার গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর তালিকায় শীর্ষ ২০ জন তালেবান কমান্ডারের তালিকায় ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ শুরা সদস্য আসমতুল্লাহ। ২০০৯ সালে তাঁর মাথার জন্য এক লাখ ২০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ডন।

অজ্ঞাত স্থানে ইংলাক!

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা রাজধানী ব্যাংকক ছেড়েছেন। বর্তমানে তিনি রাজধানী থেকে ৯০ মাইল দূরে অবস্থান করছেন বলে তাঁর দপ্তর থেকে গতকাল সোমবার জানানো হলেও ঠিক কোথায় আছেন, তা জানানো হয়নি। এদিকে ব্যাংককে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। মধ্য ব্যাংককের একটি বিপণিবিতান এলাকায় গত রোববার বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে চলমান সংকট নিরসনে অভ্যুত্থানের আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন থাইল্যান্ডের সেনাপ্রধান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সহিংসতা এভাবে চলতে থাকলে দেশ ভেঙে পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী ইংলাককে ক্ষমতা থেকে উৎখাত এবং থাই রাজনীতিকে তাঁর ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার প্রভাবমুক্ত করতে বর্তমানের বিক্ষোভ চলছে। ২০০৬ সালে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত স্বেচ্ছানির্বাসনে বিদেশে থাকা থাকসিনই পেছনে থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছেন বলে ধারণা করা হয়। ইংলাকের দপ্তর থেকে গতকাল সাংবাদিকদের জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী ব্যাংককে নেই। বর্তমানে তিনি ব্যাংককের বাইরে অবস্থান নিয়ে ‘দাপ্তরিক কাজকর্ম চালাচ্ছেন’। তবে ইংলাক কত দিন ধরে রাজধানীর বাইরে থেকে কাজ করছেন বা তাঁর নির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। অবশ্য ইংলাককে সর্বশেষ প্রায় এক সপ্তাহ আগে (গত মঙ্গলবার) ব্যাংককে দেখা গেছে। আগামী বৃহস্পতিবার রাজধানীতে তাঁর একটি দুর্নীতির মামলার শুনানিতে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুরাপোং তোভিচাকচাইকুল জানান, ‘ইংলাক আজ মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন। আমরা ব্যাংককের বাইরে বৈঠক করব, সেই সম্ভাবনাই বেশি। আর প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আমি অবগত নই।’ থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক সংকটের একপক্ষে রয়েছে ব্যাংককের মধ্যবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণী এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের সমর্থকেরা। আরেক পক্ষে রয়েছে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, যারা থাকসিন পরিবারের সমর্থক। অবস্থাদৃষ্টে এই সংকট নিরসনের আশু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ১৯৩২ সালে থাইল্যান্ডে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটির সেনাবাহিনী ১৮ বার অভ্যুত্থান বা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছে। সর্বশেষ ২০০৬ সালে তারা থাকসিনকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তবে চলমান সংকটে তারা নাক গলাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। সেনাপ্রধান প্রাইয়ুথ চান-ওচা এক বিরল টেলিভিশন ভাষণে বলেন, ‘কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতেই হবে। তার মানে এই নয়, সেনারা (আইনের) কাঠামোর আওতায় কাজ না করে হস্তক্ষেপ করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কে নিশ্চিত করে বলতে পারে, আমরা সেনাদের ব্যবহার করলেই পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যাবে?’ এদিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা বর্তমানে থাকসিন পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। গতকাল তারা একটি টেলিভিশন কেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়, যেটি পরিচালনা করেন থাকসিনের ছেলে। এ ছাড়া পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রালয়ের দিকেও রওনা হয় বিক্ষোভকারীরা। গত রোববার মধ্য ব্যাংককের ব্যস্ততম একটি বিপণিবিতান এলাকায় বোমা বিস্ফোরণে অন্তত একজন নারী ও চার বছরের একটি ছেলেশিশু নিহত হয়। ওই ঘটনায় শিশুটির আহত ছয় বছরের বোনও গতকাল মারা গেছে। ওই বোমা হামলায় কারা জড়িত, তা এখনো স্পষ্ট নয়। রয়টার্স ও এএফপি।

ফেরিওয়ালার ১৬ ডিগ্রি

যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতো ছোটবেলায় রাস্তার আলোয় পড়াশোনা করতেন অশোক কুমার ভাটি। তবে লিংকনের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বা প্রেসিডেন্ট হওয়ার কোনো সংকল্প নেই তাঁর। কেবল জ্ঞানের অন্বেষায় ছুটেছেন ৫৮ বছরের অশোক। এই চেষ্টার ফসল ১৬টি ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা! একটি মানুষের এতগুলো ডিগ্রি অর্জন যদি কেউ বিস্ময়কর কিছু মনে না করেন, তাঁদের জ্ঞাতার্থে আরেকটি দেওয়া যেতে পারে। অশোক একজন ফেরিওয়ালা। ভারতের রাজস্থানের লুনি রেলস্টেশনে ফেরি করে খাবার বিক্রি করতেন তিনি। রাজধানী জয়পুর থেকে পালি জেলার এই এলাকাটি ৩৫০ কিলোমিটার দূরে। একাই চালিয়ে গেছেন স্টেশনের পারিবারিক এই ব্যবসা। আর ফেরি করার সঙ্গে সঙ্গে অর্জন করেছেন নানা ডিগ্রি। খাবারের দোকানে অশোক মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করতেন।
আর নিজের জ্ঞানের ক্ষুধা মেটাতেন বই পড়ে। ২০০৯ সালে রেলওয়ের কোনো ফেরিওয়ালার নয় ডিগ্রি/ডিপ্লোমা অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের ‘লিমকা বুক অব রেকর্ডসে’ স্থান করে নেন। বর্তমানে তিনি ১৬টি ডিগ্রি/ডিপ্লোমাধারী। অশোকের এই জ্ঞান অন্বেষার স্বীকৃতি দিয়েছে ভারতের রাজস্থানের কোটার বর্ধমান মহাবীর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ও। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম সমাবর্তনে তাঁকে ‘বিশেষ পুরস্কার’ দেওয়া হয়। অশোকের পাওয়া ডিগ্রিগুলোর ১১টি এসেছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সমাবর্তনে বিশ্ববিদালয়ের উপাচার্য বিনয় কুমার ‘অসাধারণ’ ব্যক্তি হিসেবে অশোককে উল্লেখ করেন। অশোক এম কম ডিগ্রি পেয়েছেন, তিনি আইন ও সাংবাদিকতায় স্নাতক, সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। জ্ঞানার্জনের দৌড় এখনো থামেনি তাঁর, বিশ্ববিদ্যালয়ের গান্ধী চর্চা কেন্দ্রে এখন ডিপ্লোমা করছেন তিনি। হিন্দুস্তান টাইমস।

যেভাবে সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। সকাল ৯টা ৫ মিনিট। ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল দরবার হলে প্রবেশ করেন। তার কাছে ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবুল হক প্যারেড হস্তান্তর করেন।
এরপর ডিজি ও ডিডিজি মঞ্চে নির্দিষ্ট আসনে বসেন। বিডিআরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম সিদ্দিকুর রহমান পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বিডিআরের নৃশংসতা মেনে নিতে পারেননি পেশ ইমাম। বিদ্রোহের কিছুদিন পর মার্চের প্রথম সপ্তাহে তিনি হৃদরোগে মারা যান। কোরআন তেলাওয়াতের পর দরবারের সবাইকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বক্তৃতা করেন মেজর জেনারেল শাকিল। তিনি আগের দিনের প্যারেডের প্রশংসা করেন। এরপর তিনি 'অপারেশন ডাল-ভাত' কার্যক্রম প্রসঙ্গ তোলেন। জেনারেল শাকিল জানতে চান, ডাল-ভাতের দৈনিক ভাতা সৈনিকরা ঠিকভাবে পেয়েছে কি-না। কিন্তু সৈনিকদের জবাব জোরালো ছিল না। দরবারে সাধারণত সৈনিকদের যে ধরনের তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত ইতিবাচক প্রত্যুত্তর থাকে, এ ক্ষেত্রে তা ছিল না। ডিজি ডাল-ভাতের কিছু হিসাব, সৈনিকদের ডিএ প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, '২০০৮ সালে আপনাদের শৃঙ্খলা ভালো ছিল না। অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।' ডিজির এ বক্তব্য সৈনিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তাদের চোখ-মুখের ভাষা ছিল কিছুটা ভিন্ন। এভাবেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ বদলে গেল সবকিছু। ঘড়ির কাঁটায় আনুমানিক তখন সকাল সাড়ে ৯টা। ডিজি তখনো বক্তৃতা করছিলেন। হঠাৎ ১৩ ব্যাটালিয়নের সিপাহি মাঈন আকস্মিকভাবে অস্ত্র হাতে মঞ্চে উঠেই ডিজির দিকে অস্ত্র তাক করে। সঙ্গে সঙ্গে দরবার হলে হট্টগোল শুরু হয়। ওই সময় ডিজি শাকিল পূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকান। ডিজির চোখের দিকে তাকিয়ে সৈনিক মাঈন মঞ্চে অজ্ঞানের মতো হয়ে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ডিডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী ও কর্নেল আনিস ওই সৈনিককে ধরে ফেলেন। প্রায় একই সময় ৪৪ ব্যাটালিয়নের আরেক সিপাহি কাজল মঞ্চে উঠে আসে। কিন্তু মাঈনকে পড়ে যেতে দেখে কাজল হঠাৎ কোথাও না থেমে মঞ্চের দক্ষিণ পাশে চলে যায়। কিন্তু বেরুনোর পথ না থাকায় জানালার কাচ ভেঙে ফেলে কাজল। লাফ দিয়ে বাইরে চলে যায়। তখনই শোনা যায় একটি গুলির শব্দ। মূলত এটাই ছিল প্রথম গুলির শব্দ।

কি থেকে কি হয়ে গেল। দরবার হল মুহূর্তে ফাঁকা। প্রায় তিন হাজার সৈনিক এবং জেসিও মুহূর্তের মধ্যে যে যেভাবে পেরেছে জানালা বা দরজা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যান। অনেক কর্মকর্তাও ওই সময় বেরিয়ে যান। ডিজি, ডিডিজি, সব সেক্টর কমান্ডার ও পরিচালক, তিনজন মহিলা ডাক্তার, সাত-আটজন লে. কর্নেল, ১৫-১৬ জন মেজর, দুজন ক্যাপ্টেন, কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর, আরপি জেসিও, এনএসএ, ডিএডি ফসিউদ্দীন, বিডিআর মসজিদের দুই ইমাম, তিন-চার সিপাহিসহ ৪৫-৫০ জন দরবার হলে থেকে যান। অফিসাররা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মত্ত হন। অন্যদিকে সিপাহিরা বাইরে গিয়ে নিজেদের সংগঠিত করে এবং নানারকম গুজব ছড়িয়ে দেয়। তারা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি গ্রুপ কাজ শুরু করে।

ঘটনা সামনের দিকে যেতে থাকে। ১৫-২০ মিনিট পর দরবার হলের পূর্ব-দক্ষিণ কোণ থেকে গুলির আওয়াজ আসতে থাকে। একই সঙ্গে 'ধর, ধর' শব্দ শোনা যায়। ওই সময় দরবার হলের ভেতর সামনের লোকজন দৌড়াদৌড়ি করে বের হয়ে যায়। এদিকে সিপাহি মাঈনকে কয়েকজন কর্মকর্তা তাদের জুতার ফিতা দিয়ে বেঁধে ফেলেন। মাঈন মঞ্চের উপর অজ্ঞানের মতো পড়ে থাকে। ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল কর্মকর্তাদের বলেন, সবাইকে যেন আবার দরবার হলের ভেতর ডেকে আনা হয়, দরবার আবার শুরু হবে। ডিজি চেয়েছিলেন সবকিছু স্বাভাবিক করতে। তার লক্ষ্য ছিল ক্ষুব্ধ সৈনিকদের শান্ত করে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত, যা সেখানে অবস্থানকারী অফিসাররা তখনো পুরোপুরি অাঁচ করতে পারেননি।

৯টা ৪০ মিনিটের দিকে দরবার হলের বাইরে গুলির শব্দ বাড়তে থাকে। ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল একজন অফিসারকে বললেন, 'কে ফায়ার ওপেন করেছে? তাদের ফায়ার করতে নিষেধ কর। সিচুয়েশন ট্যাকল হয়েছে।' এর মধ্যে দেখা গেল লাল-সবুজ রঙের কাপড় দিয়ে নাক-মুখ বাঁধা বিডিআরের একদল সৈনিক দরবার হল ঘিরে কিছুক্ষণ পর গুলি করছে। তখন দরবার হলের জানালা খুলে কর্নেল গুলজার, কর্নেল এমদাদ, লে. কর্নেল এরশাদ এবং লে. কর্নেল কামরুজ্জামান চিৎকার করে বলেন, 'তোমরা ফায়ার কর না, তোমরা ফেরত যাও।' এ সময় ভেতরে অবস্থানকারী অফিসাররা দেখেন, ফাঁকা গুলিবর্ষণকারী সৈনিকদের আরেক দল গুলি সরবরাহ করছে। সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের একটি পিকআপ রাস্তা দিয়ে দরবার হলের পাশের মাঠে এসে দাঁড়ায়। ততক্ষণে কাচ ভেঙে গুলি দরবার হলের ভেতর ঢুকছিল। কর্মকর্তারা আত্দরক্ষার্থে কেউ দেয়াল ঘেঁষে, কেউ পিলারের আড়ালে আশ্রয় নেন। দরবার হলের দিকে গুলি হচ্ছে দেখে মেজর মো. মাকসুদুল হক ক্রলিং করে দরবার হলের পূর্ব দিকে গাড়ি থামার বারান্দার নিচে পেঁৗছে যান। সেখানে ৮-১০ সৈনিক ও ধর্মীয় শিক্ষক গুলি থেকে বাঁচতে শুয়েছিলেন। আর আনুমানিক ৫০ গজ দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে, অর্থাৎ ৫ নম্বর ফটকের দিক থেকে মাথায় লাল কাপড় বাঁধা একজন সিপাহি গাড়ি থামার বারান্দার দিকে গুলি করতে থাকে। ধর্মীয় শিক্ষকের সঙ্গে শুয়ে থাকা সৈনিকদের একজন তখন 'আমরা সিপাহি' বলে চিৎকার করে। জবাবে গুলিবর্ষণকারী চিৎকার করে বলে, 'সিপাহিরা, সব মাথার উপর হাত তুলে দৌড়ে এলাকা ত্যাগ কর।' তখন এসব সিপাহির সঙ্গে মেজর মাকসুদও মাথার উপর হাত তুলে দৌড় দেন এবং সামনের আবাসিক কোয়ার্টারের পেছনের দেয়াল টপকে বাইরে চলে যান। মেজর মাকসুদই প্রথম অফিসার, যিনি এভাবে পালাতে পেরেছেন। বলা যায়, ভাগ্যই তাকে সহায়তা করেছে। সিপাহিদের সঙ্গে তিনি পালাতে পেরেছেন।

ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল তখনো সমাধানের পথ খুঁজছেন। চেষ্টা করছেন কীভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়। এক পর্যায়ে তিনি কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর (এসএম) নুরুল ইসলামকে বলেন, 'সৈনিকদের এ রকম ক্ষোভ আছে আপনি তো কোনো দিন একবারও বলেননি!' তখন কেউ একজন ডিজিকে বললেন, 'স্যার, গাড়ি লাগানো আছে, আপনি চলে যান।' ডিজি বলেন, 'আমি কোথায় যাব এবং কেন যাব?' সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢাকা সেক্টর কমান্ডার এবং ঢাকার অধিনায়কদের উদ্দেশে বললেন, 'ইউ অল রাশ টু দ্য ইউনিট অ্যান্ড গেট ব্যাক ইউর পিপল এবং সবার সঙ্গে কথা বলো অ্যান্ড ট্রাই টু মটিভেট দেম।' এরপর ঢাকা সেক্টর কমান্ডার ও অধিনায়করা দরবার হল থেকে নিজ নিজ ইউনিটের উদ্দেশে রওনা হন। ডিজি মাইকে ঢাকা সেক্টর কমান্ডার ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক এবং সুবেদার মেজরদের নিজ নিজ ব্যাটালিয়নে কোতের (অস্ত্রাগার) নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের শান্ত করার নির্দেশ দেন। এ সময় ঢাকার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিব, ৩৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এনায়েত ও ১৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল বদরুল নিজ নিজ ইউনিটের দিকে রওনা দেন। এর মধ্যে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা চারদিক থেকে দরবার হলের দিকে গুলি করতে থাকে। তখন দরবার হল থেকে কিছু কর্মকর্তা ও বিডিআর সদস্য বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি করে বের হতে থাকেন।

তদন্ত আদালতকে কামরুজ্জামান জানান, এর আগে ডিজি কথা বলেছেন সেনাপ্রধান ও র্যাবের ডিজির সঙ্গে। সবাই জানিয়েছেন, কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনী ও র্যাব চলে আসবে। লে. কর্নেল ইয়াসমীনও লক্ষ্য করেন, তখন ডিজি বিভিন্ন জায়গায় মোবাইল ফোনে সাহায্যের জন্য সেনাবাহিনী পাঠাতে অনুরোধ করছিলেন।

ওই সময় লে. কর্নেল সৈয়দ কামরুজ্জামানের মোবাইল সেটে ফোন করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়া (পরিচালক, মিলিটারি অপারেশন) জানতে চান, ভেতরে কী অবস্থা। উত্তরে অবস্থা খারাপ শুনে তিনি বলেন, 'চিন্তা কর না, ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড থেকে দুটি ব্যাটালিয়ন মুভ করেছে।' তখন পাশ থেকে ডিওটি কর্নেল আনিস ফোন নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন।

এক পর্যায়ে দরবার হলে আটকেপড়া রেজিমেন্টাল পুলিশ (আরপি) জেসিও আস্তে আস্তে ওয়াকিটকি শুনছিলেন। লে. কর্নেল কামরুজ্জামান ওয়াকিটকির সাউন্ড বাড়িয়ে দিতে বললে তাতে শোনা যায়, অপর পাশ থেকে বলা হচ্ছে, 'অফিসার মেসে অফিসারদের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। বিডিআরের সব গেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিদ্রোহীরা। তারা কোত (অস্ত্রাগার) ভেঙে অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে যাচ্ছে।' এর মধ্যে দেখা যায় এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহার কেঁদে কেঁদে কারও সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। তাকে একজন অফিসার জিজ্ঞেস করাতে জবাবে বললেন, 'রাইফেল ভবনে বিদ্রোহী বিডিআররা ঢুকেছে। হাউস গার্ড অনেক আগে চলে গেছে। ম্যাডাম বলছেন, দরজা ধাক্কা দিচ্ছে।' ডিজি শাকিল সব শুনলেন। এক পর্যায়ে তিনি মাজহারকে বললেন, 'ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে থাকতে বল।' সকাল ১০টার দিকে দক্ষিণ দিকের টয়লেটে লুকিয়ে থাকা মেজর মাকসুম স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানতে পারেন যে বিদ্রোহীরা তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মেজর মাকসুমের পাশে বসা মেজর মনিরও তা জানতে পারেন।

দরবার হলে অবস্থানকারী কর্মকর্তারা শুনতে পান গুলির শব্দ অনেক কাছে এগিয়ে আসছে। তখন মঞ্চের সব আলো নিভিয়ে ফেলতে বলেন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল। কর্নেল আনিস একটি লম্বা কাঠ দিয়ে সব বাল্ব ভেঙে ফেলেন। ডিজি মাইকে সবাইকে শান্ত হতে বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, 'তোমরা গুলি থামাও। তোমাদের সব দাবি মেনে নেওয়া হবে।' এ সময় একজন সৈনিক দৌড়ে পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ওর হাতে বা কাঁধে গুলি লেগেছিল। ভেতরে থাকা একজন ধর্মীয় শিক্ষক তার পাগড়ির কাপড় দিয়ে ওই সৈনিকের ক্ষতস্থান বেঁধে দেন। এ সময় সিপাহি সেলিম, কাজল, হাবিব, আতাউর, ওবায়েদসহ আরও কয়েকজন বিডিআর সদস্য গুলি করতে করতে দরবার হলে প্রবেশ করে। তারা হুকুমের স্বরে পর্দার পেছনে লুকিয়ে থাকা কর্মকর্তাদের বের হয়ে আসতে বলে।

কর্মকর্তারা তখন কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজরকে (এসএম) বলেন, 'আপনি ওদের থামতে বলেন'। সুবেদার মেজর পর্দার বাইরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলতে যান। সঙ্গে মেজর জায়েদীও যান। দুজনকেই সৈনিকরা ধরে ফেলে। তখন কয়েকটি গুলি করা হয়। তারা মাটিতে শুয়ে যান। দুজন সৈনিক মেজর জায়েদীকে তুলে বলে, 'আমাদের সঙ্গে চল।' দরবার হলের বাইরে নিয়ে তারা জায়েদীকে রড দিয়ে মারধর করে। তখনো কেন্দ্রীয় এসএম তার সঙ্গে ছিলেন, তার হাত থেকে রক্ত ঝরছিল। এরপর দুই সৈনিক মেজর জায়েদীকে ২৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সুবেদার মেজর গোফরান মলি্লকের বাসায় নিয়ে যায়।

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা ২০ মিনিট। সিপাহি সেলিম মাইকে কর্মকর্তাদের বেরিয়ে আসতে বলে। সেলিম বলে, 'কাম, ওয়ান বাই ওয়ান'। এ সময় কর্মকর্তাদের রাজি করাতে কিছু সময় লাগে। ডিজিসহ কয়েকজন কর্মকর্তা মঞ্চের পর্দার ভেতর উত্তর দিকে ছিলেন। ডিজিকে কোণায় একটি চেয়ারে বসানো হলো। অন্যরা সবাই ডিজির গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। ডিজি শাকিল বললেন, 'তোমরা মৃত্যুকে কেন ভয় পাচ্ছ? মরতে তো একদিন হবেই।' কর্মকর্তারা বললেন, 'স্যার, আপনার সেফটির দরকার আছে।' ডিজি তখন বললেন, 'র্যাব বা সেনাবাহিনী কেউ এখনো আসলো না!'

ওই সময় কর্নেল মশিউর ডান দিকের উইং থেকে দৌড়ে বাঁ-দিকের উইংয়ে চলে এলেন। বাঁ-উইংয়ের সিঁড়িতে ডিডিজি ব্রিগেডিয়ার বারী ছিলেন। কর্নেল মশিউর দুটি সাউন্ড বঙ্ ওখানকার পেছনের দরজার সামনে একটার ওপর একটা রাখেন। তখন ব্রিগেডিয়ার বারী বলেন, সাউন্ড বঙ্ গুলি ঠেকাতে পারবে না।

সকাল সাড়ে ১০টা। বিদ্রোহী সৈনিকরা চিৎকার করে কর্মকর্তাদের মঞ্চের ভেতর থেকে বের হতে বলে। তখন মঞ্চের নিচে ১৫-১৬ জন বিদ্রোহী কাপড়ে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে ছিল। ১০টা ৩১ মিনিটের পরপরই মঞ্চের পর্দার আড়ালে দক্ষিণ পাশে থাকা তিনজন নারী কর্মকর্তাসহ ২০-২৫ জন কর্মকর্তা হাত উঁচু করে পর্দার বাইরে বের হয়ে আসেন। ১০টা ৩১ মিনিটে মেজর রুখসানা তার স্বামীকে মোবাইল ফোনে বিদ্রোহীদের দরবার হলে ঢুকে পড়ার কথা জানান। তিনি পরে স্বামীর মোবাইল সেট থেকে সময় নিশ্চিত করেন।

উত্তর পাশে থাকা ডিজিসহ অন্য কর্মকর্তারা তখনো বের হননি। বিদ্রোহীরা প্রথমেই কর্মকর্তাদের সবার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। সবাইকে তারা মাটিতে শুয়ে পড়তে এবং র্যাঙ্ক খুলে ফেলতে বলে। কর্মকর্তারা দরবার হলের মেঝেতে শুয়ে পড়েন। তখন তাদের ওপর দরবার হলের ভেতরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো মুখে কাপড় বাঁধা একজন বিডিআর সৈনিক তিন-চার রাউন্ড গুলি চালায়। লে. কর্নেল কায়সার ও অপর দুজন কর্মকর্তা এতে গুলিবিদ্ধ হন। গুলি খেয়ে লে. কর্নেল কায়সার উপুড় অবস্থা থেকে চিৎ হয়ে যান।

লে. কর্নেল কায়সার গুলি খাওয়ার পর দরবার হলের ভেতর মহিলা-কর্মকর্তাদের দিকে এক জওয়ান দৌড়ে এসে বলে, 'ম্যাডামদের মারিসনে, ওনারা ডাক্তার।' তখন অন্য একজন সৈনিক তাদের নিয়ে দরবার হলের পশ্চিম ফটকের দিকে যায়। তাদের পেছন পেছন অন্য কর্মকর্তারাও আসতে থাকেন।

দরবার হলের মঞ্চের পর্দার আড়ালে উত্তর দিকের উইংয়ে ডিজি, ডিডিজি, কর্নেল আনিস, কর্নেল মশিউর, কর্নেল এমদাদ, কর্নেল জাহিদ, লে. কর্নেল সৈয়দ কামরুজ্জামান, লে. কর্নেল এরশাদ, লে. কর্নেল আজম, মেজর খালিদ, মেজর সালেহ, এডিসি ক্যাপ্টেন তানভীর, ডিএডি ফসিউদ্দিন, সঙ্গে এনএসও এবং আরপি জেসিও ছিলেন। লে. কর্নেল সৈয়দ কামরুজ্জামান তদন্ত আদালতকে বলেন, দক্ষিণ দিকের উইংয়ে আশ্রয় নেওয়া কর্মকর্তারা হাত উপরে তুলে পর্দার বাইরে যাচ্ছেন দেখে ডিওটি কর্নেল আনিস ডিজিকে বললেন, 'স্যার, ওই দিকে অবস্থান নেওয়া সব অফিসার সারেন্ডার করেছেন। আমাদের জন্য কী অর্ডার?' ডিজি কী বললেন তা কামরুজ্জামান ভালোভাবে শুনতে পাননি।

বিদ্রোহীরা হ্যান্ডমাইকে বলছিল, 'ভেতরে কেউ থাকলে বাইরে বের হয়ে আসেন।' একই সঙ্গে তারা মঞ্চের দিকে গুলি ছোড়ে। হঠাৎ মুখে কাপড় বাঁধা একজন সৈনিক অস্ত্র-হাতে পর্দা সরিয়ে মঞ্চে ঢুকে চিৎকার করে বলে, 'ভেতরে কেউ আছেন? সবাই বের হন।' একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের দিকে তাকিয়ে দুটি গুলি করে সে। গুলি কারও গায়ে লাগেনি। এরপর ডিজিসহ একে একে অন্য কর্মকর্তারা পর্দা সরিয়ে বাইরে আসেন। সবার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে নেয় বিদ্রোহীরা। মঞ্চের নিচে নেমেই কর্মকর্তারা ডিজি শাকিলকে মধ্যে রেখে গোল হয়ে দাঁড়ান। একজন সৈনিক চিৎকার করে বলে, 'শুয়োরের বাচ্চারা, সারা জীবন আমাদের সিঙ্গেল লাইন করে হাঁটিয়েছিস, নিজেরা গোল করে দাঁড়িয়েছিস!' আবার হুঙ্কার দিয়ে সে বলে, 'সবাই সিঙ্গেল লাইন করে দাঁড়া।' লাইনে ডিজি সবার সামনে দাঁড়ালেন। তারপর কিছুটা জ্যেষ্ঠতা মানার মতো সবাই লাইনে দাঁড়ালেন। নির্মম, নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তারা। এরপর বিশ্ববাসী দেখল এক নিষ্ঠুর বর্বর অধ্যায়। সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

যেভাবে সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। সকাল ৯টা ৫ মিনিট। ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল দরবার হলে প্রবেশ করেন। তার কাছে ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবুল হক প্যারেড হস্তান্তর করেন।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র- মুসলমানদের সামনে দুই পথ, দেশত্যাগ অথবা মৃত্যু

কারনোট: মধ্য আফ্রিকান প্রজতন্ত্রের খ্রিস্টান জঙ্গিরা দেশটির একটি গির্জায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলমানদের দেশত্যাগ অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

উগ্র খ্রিস্টানদের গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারনোটের একটি ক্যাথলিক গির্জায় প্রায় ৮০০ মুসলমান আশ্রয় নিয়েছেন। চলতি মাসের গোড়ার দিকে নিকটবর্তী গুয়েন গ্রামে এক গণহত্যায় অন্তত ৭০ জন মুসলমান নিহত হওয়ার পর তারা গির্জাটিতে আশ্রয় নেন।

এখন খ্রিস্টানরা বলছে, মুসলমানরা গির্জাটি থেকে বেরিয়ে দেশত্যাগ না করলে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেবে তারা।

গত ডিসেম্বর খ্রিস্টান জঙ্গিরা সুসংগঠিতভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা শুরু করে। প্রধানত মুসলমানদের নিয়ে গঠিত সেলেকা গেরিলারা ২০১৩ সালের মার্চ মাসে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। ডিসেম্বরে সেলেকা সরকার পদত্যাগ করার পরপরই মুসলমানদের ওপর গণহত্যা অভিযান শুরু হয়।

হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে এরইমধ্যে প্রায় ১০ লাখ মুসলমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। উগ্র খ্রিস্টানদের হাতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১,০০০ মানুষ। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে ডিসেম্বরেই ফ্রান্স দেশটিতে ১,৬০০ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করলেও তারা দাঙ্গা বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে হীরকসহ আরো বেশ কিছু মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ফ্রান্স এসব সম্পদের লোভে দেশটিতে সেনা পাঠিয়েছে; মুসলমানদেরকে দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে নয়। সূত্র: আইআরআইবি

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র- মুসলমানদের সামনে দুই পথ, দেশত্যাগ অথবা মৃত্যু

কারনোট: মধ্য আফ্রিকান প্রজতন্ত্রের খ্রিস্টান জঙ্গিরা দেশটির একটি গির্জায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলমানদের দেশত্যাগ অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

সহজিয়া কড়চা- অঙ্গীকার জরুরি—উচ্ছ্বাস নয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

‘মোদের গরব মোদের আশা—আ-মরি বাংলা ভাষা’ পঙিক্তটি যখন মধ্যযুগের কবি লিখেছিলেন, তখন তিনি ঠিকই লিখেছিলেন। বাংলা ভাষা তখন ছিল বাঙালির গর্বের ধন এবং তার আশা-ভারসার স্থল।
এই পঙিক্ত লেখার বহু বছর পরে বাংলার কবি—বাংলা ভাষার কবি নোবেল পুরস্কার পান। বাংলা ভাষা বিশ্বসাহিত্যে স্থান পায়। তারও ৫৮ বছর পরে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ তাদের একটি স্বশাসিত ভূখণ্ড পায়। সুতরাং বাংলা ভাষা বাঙালির গর্বের ভাষা এবং তার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আশা-ভরসার স্থল—তাতে সন্দেহ কী?

সাড়ে আট বছর সংগ্রামের পর ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতর রাষ্ট্রভাষা বা সরকারি ভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলে বাংলা ভাষার প্রশ্নে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। একাত্তরে পাকিস্তানকে বিদায় জানানোর পর নিজেদের রাষ্ট্রে বাংলাই সর্বেসর্বা: বাংলার আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না। কোনো প্রতিপক্ষ রইল না। সুতরাং ভাষা নিয়ে আর লড়াই করার মতো কিছু থাকল না। তবে একেবারে কিছুই থাকল না, তাও নয়। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটির ঘটনাবলি নিয়ে স্মৃতিচারণা শুরু হলো। এই স্মৃতিরোমন্থন চলবে বহুকাল বংশানুক্রমে: পুত্র বা কন্যা বলবেন তাঁদের পিতার ভূমিকা সম্পর্কে, তারপর নাতি-নাতনিরা দাদা-নানার অবদান তুলে ধরবেন মিডিয়ায় ফেব্রুয়ারি এলেই। একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ফুলের মধ্যে পলাশ ও শিমুলের কী সম্পর্ক তা বোধগম্য নয়, কিন্তু এই ফুলের দুটি প্রজাতি বাংলার মাটি থেকে বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হলেও ফেব্রুয়ারি এলেই এগুলোর উল্লেখ অনিবার্য হয়ে পড়ছে। সম্ভবত ওগুলো রক্তের মতো লাল বলে।
যেখানে কোনো ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হয় না, শুধু কথা দিয়েই কিস্তিমাত করা সম্ভব, সেখানে বাঙালি তুলনাহীন এবং মালকোঁচা মেরে নেমে পড়ে। যেখানে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, অসামান্য ত্যাগ, বিপুল উদ্যম এবং নিরেট যুক্তিবাদিতা— সেখানে বাঙালি অতি দুর্বল। সে রকম কোনো বিরাট ও মহৎ আয়োজনে তাকে ধরে-বেঁধেও আনা সম্ভব নয়।
কোনো রকম ভাষা আন্দোলন ছাড়াই, মিটিং-মিছিল ছাড়াই পৃথিবীর বহু দেশে সেখানকার প্রধান ভাষা জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে স্থান করে নিয়েছে। সরকারের একটি অগণতান্ত্রিক ও অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একদিন রাজপথে নেমে জীবন দিলেন রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুস সালাম, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান, অহিউল্লাহ, আবদুল আওয়াল এবং এক নাম না-জানা কিশোর। একজন বাংলাভাষী মানুষও যত দিন এ দেশে থাকবে, তত দিন তাদের স্মৃতি থাকবে অম্লান। একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটি নয়—রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহীদেরাই অমর। তাঁদের মৃত্যু নেই।
পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশপ্রেম প্রকাশের ধরনও বদলায়। প্রতি পাঁচ-দশ বছর পর পর আমাদের দেশপ্রেমের পারদও ওঠানামা করে। এক সরকারের সময় যদি শহীদ দিবসে ঘরে শুয়ে টানা ঘুম দিই বা শালীকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাই, তো আরেক সরকারের সময় ভোর না হতেই সেজেগুজে শহীদ মিনারে রওনা দিই। বাঙালির কোনো কিছুর বেগ একবার শুরু হলে তা রোধ করতে পারে না। তা ছাড়া দেশাত্মবোধের হুজুগে অংশগ্রহণ না করা দেশদ্রোহের শামিল।
কোনটা উৎসব আর কোনটা শোক পালন—তা যদি আমরা পার্থক্য করতে না পারি, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর হতে পারে না। আমরা বাংলা নববর্ষ বা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস যে আমেজে উদ্যাপন করব, সেই রকম ধুমধাম করে আনন্দ প্রকাশ একুশের শহীদ দিবসে করতে পারি না। উদ্যাপন করা আর পালন করা এক কথা নয়। ১৯৫৩ থেকে ’৭১ পর্যন্ত শহীদ দিবস পালনের অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে আশির দশক থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনে নতুন নতুনতর মাত্রা যোগ হচ্ছে। উৎসবমুখর পরিবেশে পালন নয়, উদ্যাপিত হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারি।
কেউ ছোট বাচ্চা কাঁধে নিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় বেরিয়েছেন। ছোট বাচ্চা ও সুন্দরী যুবতীদের গালে অ আ ক খ লিখে ভাষার প্রতি প্রবল প্রেম প্রকাশ পৃথিবীর সবার কাছে প্রশংসাযোগ্য মনে হলেও আমার কাছে অসমর্থনযোগ্য। চ্যানেলগুলোতে সরাসরি দেখেছি এবং সংবাদপত্রেও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মেয়েদের মাথায় ফুলের মালা জড়ানো অথবা ফুলের মুকুট—গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মেয়েরা যেমন যায়। টিভির সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কেউ খুব জোর দিয়ে বলছেন, বাংলা আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা না? বাংলা ভাষাকে আমরা ভালোবাসি, একুশ আমাদের মায়ের ভাষাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় একুশের রক্তপাত না হলে আমরা বাংলাকে ভালোবাসতাম না। ধারণা করি, আলাওল, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, তাঁদের মায়ের ভাষাকে খুব বেশি ভালোবাসেননি। কারণ, তাঁরা কোনো উপলক্ষ থেকে নিজের ভাষাকে ভালোবাসার শিক্ষা পাননি।
চর্যাপদের সময় থেকে বাংলা ভাষায় লেখালেখি হচ্ছে। বাংলা পৃথিবীর ১০-১১টি শ্রেষ্ঠ ভাষার একটি। বিপুল ও সমৃদ্ধ তার সাহিত্যসম্পদ। অগণিত সৃষ্টিশীল ও মননশীল প্রতিভা জন্ম দিয়েছে এই ভাষা। অতীতে কোনো শাসক আমাদের বাংলা বর্ণমালাকে মুছে দেওয়ার স্পর্ধা দেখাননি। দু-একজন নির্বোধ ও নষ্ট মানুষ আরবি বা রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন মাত্র। বাংলা ভাষা বিলুপ্তির ষড়যন্ত্র কেউই করেনি, কিন্তু আজ আমরা বাংলা বর্ণ নিয়েই হাহাকার করছি। ব্যানারগুলো ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছে ফেব্রুয়ারিজুড়ে। এই বর্ণমালা যে সত্যি সত্যি দুঃখিনী, তাতেই বা সন্দেহ কী? এক সমীক্ষা করতে গিয়ে গতবার ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় ৪২ জন লেখককে জিজ্ঞেস করেছিলাম বাংলা স্বরবর্ণ কয়টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা কত। সঠিক উত্তর কেউ দেননি, মাথা চুলকিয়েছেন অথবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন।
একুশে ফেব্রুয়ারিতে তোবড়ানো গালে নয়, আপেলের মতো গালে যতই বাংলা হরফ আঁকা হোক, বাংলা ভাষা আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শত্রুকবলিত। গাড়িতে বসে যখন রেডিওতে একটি নিউ সং প্লে হতে দেখি এবং সাম ইয়ং ফ্রেন্ডদের রিকোয়েস্টে যখন একটি ভাটিয়ালি সং ওয়ান উইকের মধ্যে সেকেন্ড টাইম রিপিট করতে দেখি, তখন তো বলতে ইচ্ছাই হয়: হায় বাংলা ভাষা! স্বাধীনতার পর থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারে যে অরাজকতা চলছে, স্বাধীনতার আগের ইসলামীকরণের গোত্রবিশেষের অপচেষ্টা তার কাছে কিছুই নয়।
জাতি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সৌভাগ্য যে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলে। বাংলা ছাড়া অন্যান্য ভাষা যাদের মাতৃভাষা, তারাও বাংলা বলতে পারে। অথচ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই বহু ভাষাভাষী, সেখানে প্রধান ভাষা একাধিক। সেসব দেশে ভাষানীতি আছে। সেসব দেশে কোনো ভাষা আন্দোলন হয়নি, ভাষা সংস্কার নিয়ে কাজ হয়েছে। সর্বস্তরে জাতীয় ভাষা বা সরকারি ভাষা প্রয়োগে অবিচল আনুগত্য দেখায় জনগণ। খেয়াল-খুশির কোনো জায়গা নেই, তা সরকার বরদাশতও করে না। ভাষার অবমাননা বা বিকৃতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বহু ভাষাভাষী থাইল্যান্ডে ভাষা আন্দোলনের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু সে দেশে থাই ভাষা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ব্যবহূত। মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রভাষা নিয়ে রক্তপাত ঘটেনি। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা মালয় ভাষাই সরকারি ভাষা। কঠোর তার প্রয়োগ। ৩৩ শতাংশ চৈনিক ভাষাভাষী মানুষ তাতে আপত্তি করেনি। যদিও চীনা ভাষাও প্রচলিত। তামিল, হিন্দিও চলে। ইন্দোনেশিয়া হাজারো দ্বীপের দেশ। জনগণ কথা বলে এক হাজার ১০০ ভাষায়। অনেক পরিবারে দু-তিনটি ভাষা প্রচলিত। সেখানে ভাষা ইন্দোনেশীয় বা মালয় সরকারি ভাষা। জাভানিজ ও অন্যান্য ভাষাও বহুল প্রচলিত, কিন্তু সংঘর্ষ নেই। মালয়েশীয় মালয় ও ইন্দোনেশীয় মালয় ভাষায় সমতা আনতে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। চুক্তিটি হলো: দুই দেশের মালয় ভাষার শব্দের বানান হবে এক, অর্থ হবে এক, উচ্চারণ হবে এক। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় শিক্ষার মাধ্যম সরকারি ভাষা মালয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিও চালু আছে। ওসব দেশে ভাষার প্রশ্নে কিছুমাত্র উচ্ছ্বাস নেই। একটুখানি দেশ সিঙ্গাপুর। সেখানে চৈনিক, মালয়, তামিল ও ইংরেজি— চারটিই সরকারি ভাষা। কেউ নিজেরটাই শ্রেষ্ঠ বলে হুংকার দেয় না, কেউ কারও মাথা ফাটায় না।
যেসব দেশের জনসংখ্যা খুব কম সেসবেও তাদের সরকারি ভাষা জীবনের সব ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রয়োগ না করে উপায় নেই। যেমন ডেনমার্কে ডেনিশ, নরওয়েতে নরওয়েজিয়ান, সুইডেনে সুইডিশ ও ফিনিশ, ফিনল্যান্ডে ফিনিশ। ফিনল্যান্ডে মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ মানুষ সুইডিশ ভাষাভাষী। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে সেটাও স্বীকৃত সরকারি ভাষা। তুরস্কে তুর্কি সরকারি ভাষা, কিন্তু কুর্দিশও চলে। প্রতিটি জাতীয়তাবাদী দেশেই সরকারি ভাষা রাষ্ট্রীয় কাজে ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কঠোরভাবে প্রয়োগের বিধান রয়েছে।
শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার দাবি বহুদিনের; পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই। ষাটের দশকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইংরেজির সঙ্গে বাংলাও অনুমোদিত হয়। উঁচু শ্রেণীতে বাংলা বইয়ের অভাব। সে অভাব অনুবাদের মাধ্যমে দূর করা খুব সহজ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সে উদ্যোগ নিতে পারত। নিয়েছে কি?
ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে চেতনাটাই আসল, উচ্ছ্বাস নয়। ভারতে সরকারি ভাষা হিন্দি হলেও, অতি বড় দেশ বলে ইংরেজির সেখানে প্রাধান্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি রাজ্যের মানুষ দৈনন্দিন জীবনে নিজেদের ভাষা ব্যবহার করছে—হিন্দি নয়। তামিলনাড়ুতে তামিল, গুজরাটে গুজরাটি, কেরালায় মালয়ালম, অন্ধ্র প্রদেশে তেলেগু ও উর্দু, কর্ণাটকে কানাড়া, মহারাষ্ট্রে মারাঠি, পাঞ্জাবে পাঞ্জাবি, রাজস্থানে রাজস্থানি ভাষা যেভাবে ব্যবহূত, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সেভাবে নয় এবং বাংলাদেশেও বাংলার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যবহূত হয় না।
ভাষা নিয়ে একবার হয়েছে রক্তপাত, এখন হচ্ছে মামলা-মোকদ্দমা। ভাষাদূষণে উচ্চ আদালতের নির্দেশে কমিশনও গঠিত হয়েছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু দেশের ৫০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যই পড়ানো হয় না। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি কোনো দায়িত্ব নেই? আমাদের এনজিওগুলো দেশের মারাত্মক উন্নয়ন চায়। তাদের প্রায় সব গবেষণাপত্রই ইংরেজিতে রচিত হয়। কারণ, ওগুলোর পাঠক দাতারা— দেশের মানুষ নয়।
বক্তৃতাবাজি, স্মৃতিচারণা ও অতীতের বীরদের হরবছর সংবর্ধনা দিয়ে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন সম্ভব হবে না। জাতিকে গড়ে তুলতে হয়। সে জন্য সরকারি আনুকূল্যের প্রয়োজন রয়েছে, যেমন দিয়েছিলেন হোসেনশাহি রাজত্বে আলাউদ্দিন হুসেন শাহরা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দরকার শিক্ষিত শ্রেণীর ভাষার অনাচার রোধে ও উন্নতি সাধনে সুদৃঢ় অঙ্গীকার।

সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সহজিয়া কড়চা- অঙ্গীকার জরুরি—উচ্ছ্বাস নয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

‘মোদের গরব মোদের আশা—আ-মরি বাংলা ভাষা’ পঙিক্তটি যখন মধ্যযুগের কবি লিখেছিলেন, তখন তিনি ঠিকই লিখেছিলেন। বাংলা ভাষা তখন ছিল বাঙালির গর্বের ধন এবং তার আশা-ভারসার স্থল।

আমি মারা যাচ্ছি

ওলিসিয়া জুকোভস্কা
গলায় গুলি লাগার পর প্রবল বেগে রক্ত পড়ছিল ক্ষতস্থান থেকে। সেই সময় ‘আমি মারা যাচ্ছি’ লিখে খুদে ব্লগ লেখার ওয়েবসাইট টুইটারে বার্তা দিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবী ওলিসিয়া জুকোভস্কা। মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ছবি দেখে অনেকেই ধারণা করেন, ওলিসিয়া আর নেই। তবে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছেন ২১ বছরের এই তরুণী। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার যে সহিংসতা চলে, তার প্রতীক ওলিসিয়ার ওই ছবি। ওই দুদিন সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জন নিহত হন। ওলিসিয়াও যোগ দিয়েছিলেন বিক্ষোভে।
বিক্ষোভে কেউ অসুস্থ হলে তাঁদের সেবা দিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার বিক্ষোভের একপর্যায়ে তাঁর গলায় গুলি লাগে। কিয়েভের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বার্তা সংস্থাকে ওলিসিয়া বলেন, ‘আমি সামাজিক ও বাক্স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তার জন্য বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলাম। আমি রাজনীতি করি না। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। শুধু জনগণের সঙ্গে একাত্ম হতেই ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে গিয়েছি।’ টুইটারে বার্তা দেওয়া প্রসঙ্গে ওলিসিয়া বলেন, ‘আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর নিজের ফোন খুঁজছিলাম। দুই হাত রক্তে ভেসে গেছে। ফোন হাতে নিয়ে “আমি মারা যাচ্ছি” লিখে ছবিসহ পোস্ট করেছি। চিকিৎসক তা দেখে আমার কাছ থেকে ফোন সরিয়ে নেন।’ এপি।

দূরদেশ- ইউক্রেনে ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন? by আলী রীয়াজ

ইউক্রেনের গণ-আন্দোলন ও সহিংসতা এবং তাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, তা কি ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন?
নাকি তা বৃহৎ শক্তিশালী দেশের ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর অনিবার্য পরিণতি? ইউক্রেন কি প্রক্সি লড়াইয়ের রণক্ষেত্র, যার একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর অন্যদিকে রাশিয়া? নাকি গণতন্ত্রায়ণের অসম্পূর্ণতার কারণে ভঙ্গুর গণতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী শাসনে রূপান্তরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের উদাহরণ? ইউক্রেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটিই কি দেশটির ভবিতব্য ছিল? রাজধানী কিয়েভে নভেম্বর থেকে সরকারবিরোধীদের অব্যাহত বিক্ষোভের ফলে অবশেষে প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ রাজধানী থেকে পালিয়েছেন, পার্লামেন্ট তাঁকে পদচ্যুত করে স্পিকার আলেকসান্দর তুর্চিনোভকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে, আগামী ২৫ মে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং কারাগারে আটক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেনকো মুক্তিলাভ করেছেন।

গত নভেম্বরে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের সিদ্ধান্তের কারণে, কিন্তু তা পরে আর সেখানে স্থির হয়ে থাকেনি। কেননা, বিক্ষোভের সেটা ছিল উপলক্ষমাত্র। এই আন্দোলন ক্রমেই রূপান্তরিত হয়েছে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে। তা পরিণত হয়েছে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার কাঠামো বদলের দাবিতে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের সফল লড়াইয়ে। এ সবই অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু ইউক্রেনের এই ঘটনাপ্রবাহে গোড়া থেকেই যুক্ত হয়েছে বাইরের শক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ যে ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে দিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছেন, মস্কোতে গিয়ে চুক্তি করেছেন, তাতেই বোঝা যায় যে বাইরের শক্তি এই ঘটনাপ্রবাহের বাইরে নেই, আগেও ছিল না। এ প্রসঙ্গে আরেকটু পরে আসি। তার আগে এখনকার অবস্থা ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন কি না, সেই প্রশ্নের একটা উত্তর খোঁজা দরকার।
১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু দেশটির মধ্যে ইতিহাসের একটা বড় দাগ থেকে গেছে। তা হলো দেশটির পূর্বাঞ্চল রুশভাষী এবং শিল্পোন্নত; অন্যদিকে পশ্চিমে আছে ক্রিমিয়া, তুলনামূলকভাবে অধিকতর জাতীয়তাবাদী। একসময় ক্রিমিয়া ছিল পোল্যান্ড ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরির অংশ। ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তির আওতায় স্তালিন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশে পরিণত করেন। ক্রিমিয়ার জনগণের কোনো রকম ভূমিকা তাতে ছিল না। ক্রিমিয়ার স্থানীয় মানুষেরা ইউক্রেনে রুশভাষী কিংবা রাশিয়া-প্রভাবিত ক্ষমতাসীনদের মধ্যে স্তালিনের ছায়া দেখতে পান। কিন্তু রাশিয়া ১৯২১ সালের পর থেকে অভিবাসন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রুশভাষীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করে তুলতে পেরেছে। সাংবিধানিকভাবে ক্রিমিয়া স্বশাসিত রিপাবলিক, যা ইউক্রেনের অংশ। কিন্তু সেখানে রয়েছে রাশিয়ার নৌবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অচলাবস্থার নিরসন না ঘটলে ক্রিমিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা একেবারে কল্পনা নয়। অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে রাজধানী কিয়েভ ত্যাগ করে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ দেশের পূর্বাঞ্চলেই আশ্রয় নিয়েছেন। ইতিহাসের এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায় নতুন করে সবার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে কি না, সেটা যেমন একটা প্রশ্ন, তেমনি প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে সে পথেই ইউক্রেন এগোবে কি না।
আমরা যদি ইতিহাসের এই প্রত্যাবর্তন নিয়ে সন্দিহানও থাকি, এ নিয়ে আমাদের সন্দিহান হওয়ার অবকাশ নেই যে ইউক্রেনে আমরা এক অর্থে গত শতকের সত্তর বা আশির দশকের স্নায়ুযুদ্ধের অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যদিও বলেছেন যে এটা শীতল যুদ্ধের সময়কার দাবা খেলা নয়, যেখানে আমরা রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি কিন্তু রাশিয়া এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের গত কয়েক বছরের নীতি ও কৌশলের আলোকে এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে রাশিয়া সেভাবেই বিবেচনা করে। সে কারণে ইউক্রেনকে রাশিয়ার অনুকূলে রাখার জন্য পুতিন ইউক্রেনের ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের দায় গ্রহণে পিছপা হননি। কম মূল্যে তেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কাস্টমস ইউনিয়নে ইউক্রেনকে যোগ দিতে চাপ দেওয়ার কারণ আর কী থাকতে পারে?
দেশের ভৌগোলিক অবস্থানও একটা অন্যতম কারণ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সাবেক সোভিয়েত-প্রভাবিত দেশগুলো একে একে পশ্চিমের প্রভাবাধীন হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবান্বিত দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার দেয়াল একার্থে ইউক্রেন। ফলে রাশিয়া চাইছে যে ইউক্রেন তার প্রভাবের মধ্যেই থাকুক। তার জন্য প্রয়োজনে রক্তপাতে তার দ্বিধা নেই, যে অর্থে পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে যে এই দফায় রাশিয়াকে তারা আটকাতে না পারলে ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে আর কখনোই রাশিয়ার প্রভাবমুক্ত করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে দুই পক্ষই ২০০৮ সালে জর্জিয়ার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখেছে। তখন জর্জিয়া ন্যাটোর সদস্য হওয়ার চেষ্টা করলে রাশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ ওসেতিয়া ও আবখাজিয়া নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এখন ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে আবারও এ ধরনের একটা সংকটের সূচনা হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এগুলো হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি ও সামরিক কৌশলের হিসাব। কিন্তু দেশের ভেতরের পরিস্থিতি আমাদের আরও বেশি গভীরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। এক বিবেচনায় এই সংকটের উৎস ২০০৪ সালেই। তখন সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেন; কিন্তু তখনকার প্রেসিডেন্ট লিওনিদ কুচমা বিক্ষোভকারীদের ওপরে বল প্রয়োগে অস্বীকার করেন। এতে করে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু সে সময় রাশিয়া যে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল, তা অনেকেরই জানা। ওই নির্বাচনের আগে ভিক্তর ইউশচেনকোকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টার ঘটনাও ঘটে। কিন্তু বিজয়ী ইউশচেনকো ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেনকো জড়িয়ে পড়েন ক্ষমতার বিবাদে। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট বিবাদে জড়িয়ে পড়লে প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। ২০১০ সালের নির্বাচনে ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলে ক্রমাগতভাবেই পার্লামেন্টের ক্ষমতা সংকুচিত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেন। নিয়মিত নির্বাচন ও পার্লামেন্টে ক্ষমতার হাতবদল সত্ত্বেও ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ ও ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ। ফলে ২০০৭ সালে দেখেছিলাম ইয়ানুকোভিচের সমর্থকদের বিক্ষোভ ও তাঁর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। এখন তাঁর বিরোধীরা ২০০৪ সালের মতো আবারও রাজপথের লড়াইয়ে সাফল্য লাভ করেছে।
কিন্তু এসবের মধ্যে যা ক্রমেই সুদূরপরাহত হয়েছে তা হলো প্রকৃত গণতন্ত্রায়ণ, স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ও বিকাশ। ইউক্রেন একার্থে ব্যতিক্রম নয়। অনেক দেশেই গণতন্ত্রের বদলে একধরনের ‘সংকর শাসন’ বা হাইব্রিড রেজিম তৈরি হয়েছে। সেসব দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফেরার আশঙ্কাই বেশি। সেটাই ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের শাসনে আমরা দেখতে পাই। ইউক্রেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ভঙ্গুর গণতন্ত্রের সমস্যা আরও জটিল আকার নিয়েছে। শক্তিশালী বড় দেশের ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশে যখন গণতন্ত্র ভঙ্গুর হয় তখন শক্তিশালী বড় দেশের জন্য তা অবশ্যই অনুকূল অবস্থার সূচনা করে এবং সে তার সুবিধা নিতে মোটেই পিছপা হবে না। হওয়ার কথাও নয়। যদি কেউ এ কথা বলেন যে বড় দেশ চাইবে তার প্রতিবেশীর গণতন্ত্র দুর্বল হোক, তার সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ কম। আন্তর্জাতিকভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনের গ্রহণযোগ্যতা এখন কম বলে সে ধরনের শাসনের ভরসা হন অন্য কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা। রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্পর্ককে সেই বিবেচনার বাইরে রাখা যাবে না।
ফলে ইউক্রেনের বর্তমান রাজনীতি কেবল সে দেশের জন্যই নয়, কেবল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যই নয়, গণতন্ত্রায়ণের বিষয়ে উৎসাহী সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

দূরদেশ- ইউক্রেনে ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন? by আলী রীয়াজ

ইউক্রেনের গণ-আন্দোলন ও সহিংসতা এবং তাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, তা কি ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন?

ইউক্রেনে ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন?

প্রেসিডেন্ট পালিয়েছেন: কিয়েভে বিক্ষোভকারীদের উল্লাস
ইউক্রেনের গণ-আন্দোলন ও সহিংসতা এবং তাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, তা কি ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন? নাকি তা বৃহৎ শক্তিশালী দেশের ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর অনিবার্য পরিণতি? ইউক্রেন কি প্রক্সি লড়াইয়ের রণক্ষেত্র, যার একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর অন্যদিকে রাশিয়া? নাকি গণতন্ত্রায়ণের অসম্পূর্ণতার কারণে ভঙ্গুর গণতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী শাসনে রূপান্তরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের উদাহরণ? ইউক্রেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটিই কি দেশটির ভবিতব্য ছিল? রাজধানী কিয়েভে নভেম্বর থেকে সরকারবিরোধীদের অব্যাহত বিক্ষোভের ফলে অবশেষে প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ রাজধানী থেকে পালিয়েছেন, পার্লামেন্ট তাঁকে পদচ্যুত করে স্পিকার আলেকসান্দর তুর্চিনোভকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে, আগামী ২৫ মে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং কারাগারে আটক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেনকো মুক্তিলাভ করেছেন। গত নভেম্বরে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের সিদ্ধান্তের কারণে, কিন্তু তা পরে আর সেখানে স্থির হয়ে থাকেনি। কেননা, বিক্ষোভের সেটা ছিল উপলক্ষমাত্র। এই আন্দোলন ক্রমেই রূপান্তরিত হয়েছে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে। তা পরিণত হয়েছে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার কাঠামো বদলের দাবিতে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের সফল লড়াইয়ে। এ সবই অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু ইউক্রেনের এই ঘটনাপ্রবাহে গোড়া থেকেই যুক্ত হয়েছে বাইরের শক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ যে ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে দিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছেন, মস্কোতে গিয়ে চুক্তি করেছেন,
তাতেই বোঝা যায় যে বাইরের শক্তি এই ঘটনাপ্রবাহের বাইরে নেই, আগেও ছিল না। এ প্রসঙ্গে আরেকটু পরে আসি। তার আগে এখনকার অবস্থা ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন কি না, সেই প্রশ্নের একটা উত্তর খোঁজা দরকার। ১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু দেশটির মধ্যে ইতিহাসের একটা বড় দাগ থেকে গেছে। তা হলো দেশটির পূর্বাঞ্চল রুশভাষী এবং শিল্পোন্নত; অন্যদিকে পশ্চিমে আছে ক্রিমিয়া, তুলনামূলকভাবে অধিকতর জাতীয়তাবাদী। একসময় ক্রিমিয়া ছিল পোল্যান্ড ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরির অংশ। ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তির আওতায় স্তালিন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশে পরিণত করেন। ক্রিমিয়ার জনগণের কোনো রকম ভূমিকা তাতে ছিল না। ক্রিমিয়ার স্থানীয় মানুষেরা ইউক্রেনে রুশভাষী কিংবা রাশিয়া-প্রভাবিত ক্ষমতাসীনদের মধ্যে স্তালিনের ছায়া দেখতে পান। কিন্তু রাশিয়া ১৯২১ সালের পর থেকে অভিবাসন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রুশভাষীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করে তুলতে পেরেছে। সাংবিধানিকভাবে ক্রিমিয়া স্বশাসিত রিপাবলিক, যা ইউক্রেনের অংশ। কিন্তু সেখানে রয়েছে রাশিয়ার নৌবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অচলাবস্থার নিরসন না ঘটলে ক্রিমিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা একেবারে কল্পনা নয়। অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে রাজধানী কিয়েভ ত্যাগ করে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ দেশের পূর্বাঞ্চলেই আশ্রয় নিয়েছেন। ইতিহাসের এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায় নতুন করে সবার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে কি না, সেটা যেমন একটা প্রশ্ন,
তেমনি প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে সে পথেই ইউক্রেন এগোবে কি না। আমরা যদি ইতিহাসের এই প্রত্যাবর্তন নিয়ে সন্দিহানও থাকি, এ নিয়ে আমাদের সন্দিহান হওয়ার অবকাশ নেই যে ইউক্রেনে আমরা এক অর্থে গত শতকের সত্তর বা আশির দশকের স্নায়ুযুদ্ধের অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যদিও বলেছেন যে এটা শীতল যুদ্ধের সময়কার দাবা খেলা নয়, যেখানে আমরা রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি কিন্তু রাশিয়া এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের গত কয়েক বছরের নীতি ও কৌশলের আলোকে এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে রাশিয়া সেভাবেই বিবেচনা করে। সে কারণে ইউক্রেনকে রাশিয়ার অনুকূলে রাখার জন্য পুতিন ইউক্রেনের ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের দায় গ্রহণে পিছপা হননি। কম মূল্যে তেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কাস্টমস ইউনিয়নে ইউক্রেনকে যোগ দিতে চাপ দেওয়ার কারণ আর কী থাকতে পারে? দেশের ভৌগোলিক অবস্থানও একটা অন্যতম কারণ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সাবেক সোভিয়েত-প্রভাবিত দেশগুলো একে একে পশ্চিমের প্রভাবাধীন হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবান্বিত দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার দেয়াল একার্থে ইউক্রেন। ফলে রাশিয়া চাইছে যে ইউক্রেন তার প্রভাবের মধ্যেই থাকুক। তার জন্য প্রয়োজনে রক্তপাতে তার দ্বিধা নেই, যে অর্থে পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে যে এই দফায় রাশিয়াকে তারা আটকাতে না পারলে ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে আর কখনোই রাশিয়ার প্রভাবমুক্ত করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে দুই পক্ষই ২০০৮ সালে জর্জিয়ার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখেছে।
তখন জর্জিয়া ন্যাটোর সদস্য হওয়ার চেষ্টা করলে রাশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ ওসেতিয়া ও আবখাজিয়া নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এখন ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে আবারও এ ধরনের একটা সংকটের সূচনা হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এগুলো হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি ও সামরিক কৌশলের হিসাব। কিন্তু দেশের ভেতরের পরিস্থিতি আমাদের আরও বেশি গভীরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। এক বিবেচনায় এই সংকটের উৎস ২০০৪ সালেই। তখন সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেন; কিন্তু তখনকার প্রেসিডেন্ট লিওনিদ কুচমা বিক্ষোভকারীদের ওপরে বল প্রয়োগে অস্বীকার করেন। এতে করে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু সে সময় রাশিয়া যে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল, তা অনেকেরই জানা। ওই নির্বাচনের আগে ভিক্তর ইউশচেনকোকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টার ঘটনাও ঘটে। কিন্তু বিজয়ী ইউশচেনকো ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেনকো জড়িয়ে পড়েন ক্ষমতার বিবাদে। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট বিবাদে জড়িয়ে পড়লে প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। ২০১০ সালের নির্বাচনে ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলে ক্রমাগতভাবেই পার্লামেন্টের ক্ষমতা সংকুচিত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেন। নিয়মিত নির্বাচন ও পার্লামেন্টে ক্ষমতার হাতবদল সত্ত্বেও ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ ও ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ। ফলে ২০০৭ সালে দেখেছিলাম ইয়ানুকোভিচের সমর্থকদের বিক্ষোভ ও তাঁর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন।
এখন তাঁর বিরোধীরা ২০০৪ সালের মতো আবারও রাজপথের লড়াইয়ে সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু এসবের মধ্যে যা ক্রমেই সুদূরপরাহত হয়েছে তা হলো প্রকৃত গণতন্ত্রায়ণ, স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ও বিকাশ। ইউক্রেন একার্থে ব্যতিক্রম নয়। অনেক দেশেই গণতন্ত্রের বদলে একধরনের ‘সংকর শাসন’ বা হাইব্রিড রেজিম তৈরি হয়েছে। সেসব দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফেরার আশঙ্কাই বেশি। সেটাই ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের শাসনে আমরা দেখতে পাই। ইউক্রেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ভঙ্গুর গণতন্ত্রের সমস্যা আরও জটিল আকার নিয়েছে। শক্তিশালী বড় দেশের ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশে যখন গণতন্ত্র ভঙ্গুর হয় তখন শক্তিশালী বড় দেশের জন্য তা অবশ্যই অনুকূল অবস্থার সূচনা করে এবং সে তার সুবিধা নিতে মোটেই পিছপা হবে না। হওয়ার কথাও নয়। যদি কেউ এ কথা বলেন যে বড় দেশ চাইবে তার প্রতিবেশীর গণতন্ত্র দুর্বল হোক, তার সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ কম। আন্তর্জাতিকভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনের গ্রহণযোগ্যতা এখন কম বলে সে ধরনের শাসনের ভরসা হন অন্য কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা। রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্পর্ককে সেই বিবেচনার বাইরে রাখা যাবে না। ফলে ইউক্রেনের বর্তমান রাজনীতি কেবল সে দেশের জন্যই নয়, কেবল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যই নয়, গণতন্ত্রায়ণের বিষয়ে উৎসাহী সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

অঙ্গীকার জরুরি—উচ্ছ্বাস নয়

একুশে ফেব্রুয়ারি
‘মোদের গরব মোদের আশা—আ-মরি বাংলা ভাষা’ পঙিক্তটি যখন মধ্যযুগের কবি লিখেছিলেন, তখন তিনি ঠিকই লিখেছিলেন। বাংলা ভাষা তখন ছিল বাঙালির গর্বের ধন এবং তার আশা-ভারসার স্থল। এই পঙিক্ত লেখার বহু বছর পরে বাংলার কবি—বাংলা ভাষার কবি নোবেল পুরস্কার পান। বাংলা ভাষা বিশ্বসাহিত্যে স্থান পায়। তারও ৫৮ বছর পরে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ তাদের একটি স্বশাসিত ভূখণ্ড পায়। সুতরাং বাংলা ভাষা বাঙালির গর্বের ভাষা এবং তার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আশা-ভরসার স্থল—তাতে সন্দেহ কী?
সাড়ে আট বছর সংগ্রামের পর ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতর রাষ্ট্রভাষা বা সরকারি ভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলে বাংলা ভাষার প্রশ্নে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। একাত্তরে পাকিস্তানকে বিদায় জানানোর পর নিজেদের রাষ্ট্রে বাংলাই সর্বেসর্বা: বাংলার আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না। কোনো প্রতিপক্ষ রইল না। সুতরাং ভাষা নিয়ে আর লড়াই করার মতো কিছু থাকল না। তবে একেবারে কিছুই থাকল না, তাও নয়। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটির ঘটনাবলি নিয়ে স্মৃতিচারণা শুরু হলো। এই স্মৃতিরোমন্থন চলবে বহুকাল বংশানুক্রমে: পুত্র বা কন্যা বলবেন তাঁদের পিতার ভূমিকা সম্পর্কে, তারপর নাতি-নাতনিরা দাদা-নানার অবদান তুলে ধরবেন মিডিয়ায় ফেব্রুয়ারি এলেই। একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ফুলের মধ্যে পলাশ ও শিমুলের কী সম্পর্ক তা বোধগম্য নয়, কিন্তু এই ফুলের দুটি প্রজাতি বাংলার মাটি থেকে বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হলেও ফেব্রুয়ারি এলেই এগুলোর উল্লেখ অনিবার্য হয়ে পড়ছে। সম্ভবত ওগুলো রক্তের মতো লাল বলে। যেখানে কোনো ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হয় না, শুধু কথা দিয়েই কিস্তিমাত করা সম্ভব, সেখানে বাঙালি তুলনাহীন এবং মালকোঁচা মেরে নেমে পড়ে। যেখানে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, অসামান্য ত্যাগ, বিপুল উদ্যম এবং নিরেট যুক্তিবাদিতা— সেখানে বাঙালি অতি দুর্বল। সে রকম কোনো বিরাট ও মহৎ আয়োজনে তাকে ধরে-বেঁধেও আনা সম্ভব নয়।
কোনো রকম ভাষা আন্দোলন ছাড়াই, মিটিং-মিছিল ছাড়াই পৃথিবীর বহু দেশে সেখানকার প্রধান ভাষা জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে স্থান করে নিয়েছে। সরকারের একটি অগণতান্ত্রিক ও অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একদিন রাজপথে নেমে জীবন দিলেন রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুস সালাম, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান, অহিউল্লাহ, আবদুল আওয়াল এবং এক নাম না-জানা কিশোর। একজন বাংলাভাষী মানুষও যত দিন এ দেশে থাকবে, তত দিন তাদের স্মৃতি থাকবে অম্লান। একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটি নয়—রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহীদেরাই অমর। তাঁদের মৃত্যু নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশপ্রেম প্রকাশের ধরনও বদলায়। প্রতি পাঁচ-দশ বছর পর পর আমাদের দেশপ্রেমের পারদও ওঠানামা করে। এক সরকারের সময় যদি শহীদ দিবসে ঘরে শুয়ে টানা ঘুম দিই বা শালীকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাই, তো আরেক সরকারের সময় ভোর না হতেই সেজেগুজে শহীদ মিনারে রওনা দিই। বাঙালির কোনো কিছুর বেগ একবার শুরু হলে তা রোধ করতে পারে না। তা ছাড়া দেশাত্মবোধের হুজুগে অংশগ্রহণ না করা দেশদ্রোহের শামিল। কোনটা উৎসব আর কোনটা শোক পালন—তা যদি আমরা পার্থক্য করতে না পারি, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর হতে পারে না। আমরা বাংলা নববর্ষ বা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস যে আমেজে উদ্যাপন করব, সেই রকম ধুমধাম করে আনন্দ প্রকাশ একুশের শহীদ দিবসে করতে পারি না। উদ্যাপন করা আর পালন করা এক কথা নয়। ১৯৫৩ থেকে ’৭১ পর্যন্ত শহীদ দিবস পালনের অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে আশির দশক থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনে নতুন নতুনতর মাত্রা যোগ হচ্ছে।
উৎসবমুখর পরিবেশে পালন নয়, উদ্যাপিত হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারি। কেউ ছোট বাচ্চা কাঁধে নিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় বেরিয়েছেন। ছোট বাচ্চা ও সুন্দরী যুবতীদের গালে অ আ ক খ লিখে ভাষার প্রতি প্রবল প্রেম প্রকাশ পৃথিবীর সবার কাছে প্রশংসাযোগ্য মনে হলেও আমার কাছে অসমর্থনযোগ্য। চ্যানেলগুলোতে সরাসরি দেখেছি এবং সংবাদপত্রেও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মেয়েদের মাথায় ফুলের মালা জড়ানো অথবা ফুলের মুকুট—গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মেয়েরা যেমন যায়। টিভির সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কেউ খুব জোর দিয়ে বলছেন, বাংলা আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা না? বাংলা ভাষাকে আমরা ভালোবাসি, একুশ আমাদের মায়ের ভাষাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় একুশের রক্তপাত না হলে আমরা বাংলাকে ভালোবাসতাম না। ধারণা করি, আলাওল, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, তাঁদের মায়ের ভাষাকে খুব বেশি ভালোবাসেননি। কারণ, তাঁরা কোনো উপলক্ষ থেকে নিজের ভাষাকে ভালোবাসার শিক্ষা পাননি। চর্যাপদের সময় থেকে বাংলা ভাষায় লেখালেখি হচ্ছে। বাংলা পৃথিবীর ১০-১১টি শ্রেষ্ঠ ভাষার একটি। বিপুল ও সমৃদ্ধ তার সাহিত্যসম্পদ। অগণিত সৃষ্টিশীল ও মননশীল প্রতিভা জন্ম দিয়েছে এই ভাষা। অতীতে কোনো শাসক আমাদের বাংলা বর্ণমালাকে মুছে দেওয়ার স্পর্ধা দেখাননি। দু-একজন নির্বোধ ও নষ্ট মানুষ আরবি বা রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন মাত্র।
বাংলা ভাষা বিলুপ্তির ষড়যন্ত্র কেউই করেনি, কিন্তু আজ আমরা বাংলা বর্ণ নিয়েই হাহাকার করছি। ব্যানারগুলো ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছে ফেব্রুয়ারিজুড়ে। এই বর্ণমালা যে সত্যি সত্যি দুঃখিনী, তাতেই বা সন্দেহ কী? এক সমীক্ষা করতে গিয়ে গতবার ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় ৪২ জন লেখককে জিজ্ঞেস করেছিলাম বাংলা স্বরবর্ণ কয়টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা কত। সঠিক উত্তর কেউ দেননি, মাথা চুলকিয়েছেন অথবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারিতে তোবড়ানো গালে নয়, আপেলের মতো গালে যতই বাংলা হরফ আঁকা হোক, বাংলা ভাষা আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শত্রুকবলিত। গাড়িতে বসে যখন রেডিওতে একটি নিউ সং প্লে হতে দেখি এবং সাম ইয়ং ফ্রেন্ডদের রিকোয়েস্টে যখন একটি ভাটিয়ালি সং ওয়ান উইকের মধ্যে সেকেন্ড টাইম রিপিট করতে দেখি, তখন তো বলতে ইচ্ছাই হয়: হায় বাংলা ভাষা! স্বাধীনতার পর থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারে যে অরাজকতা চলছে, স্বাধীনতার আগের ইসলামীকরণের গোত্রবিশেষের অপচেষ্টা তার কাছে কিছুই নয়। জাতি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সৌভাগ্য যে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলে। বাংলা ছাড়া অন্যান্য ভাষা যাদের মাতৃভাষা, তারাও বাংলা বলতে পারে। অথচ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই বহু ভাষাভাষী, সেখানে প্রধান ভাষা একাধিক। সেসব দেশে ভাষানীতি আছে। সেসব দেশে কোনো ভাষা আন্দোলন হয়নি, ভাষা সংস্কার নিয়ে কাজ হয়েছে। সর্বস্তরে জাতীয় ভাষা বা সরকারি ভাষা প্রয়োগে অবিচল আনুগত্য দেখায় জনগণ। খেয়াল-খুশির কোনো জায়গা নেই, তা সরকার বরদাশতও করে না। ভাষার অবমাননা বা বিকৃতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বহু ভাষাভাষী থাইল্যান্ডে ভাষা আন্দোলনের প্রয়োজন হয়নি।
কিন্তু সে দেশে থাই ভাষা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ব্যবহূত। মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রভাষা নিয়ে রক্তপাত ঘটেনি। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা মালয় ভাষাই সরকারি ভাষা। কঠোর তার প্রয়োগ। ৩৩ শতাংশ চৈনিক ভাষাভাষী মানুষ তাতে আপত্তি করেনি। যদিও চীনা ভাষাও প্রচলিত। তামিল, হিন্দিও চলে। ইন্দোনেশিয়া হাজারো দ্বীপের দেশ। জনগণ কথা বলে এক হাজার ১০০ ভাষায়। অনেক পরিবারে দু-তিনটি ভাষা প্রচলিত। সেখানে ভাষা ইন্দোনেশীয় বা মালয় সরকারি ভাষা। জাভানিজ ও অন্যান্য ভাষাও বহুল প্রচলিত, কিন্তু সংঘর্ষ নেই। মালয়েশীয় মালয় ও ইন্দোনেশীয় মালয় ভাষায় সমতা আনতে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। চুক্তিটি হলো: দুই দেশের মালয় ভাষার শব্দের বানান হবে এক, অর্থ হবে এক, উচ্চারণ হবে এক। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় শিক্ষার মাধ্যম সরকারি ভাষা মালয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিও চালু আছে। ওসব দেশে ভাষার প্রশ্নে কিছুমাত্র উচ্ছ্বাস নেই। একটুখানি দেশ সিঙ্গাপুর। সেখানে চৈনিক, মালয়, তামিল ও ইংরেজি— চারটিই সরকারি ভাষা। কেউ নিজেরটাই শ্রেষ্ঠ বলে হুংকার দেয় না, কেউ কারও মাথা ফাটায় না। যেসব দেশের জনসংখ্যা খুব কম সেসবেও তাদের সরকারি ভাষা জীবনের সব ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রয়োগ না করে উপায় নেই। যেমন ডেনমার্কে ডেনিশ, নরওয়েতে নরওয়েজিয়ান, সুইডেনে সুইডিশ ও ফিনিশ, ফিনল্যান্ডে ফিনিশ। ফিনল্যান্ডে মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ মানুষ সুইডিশ ভাষাভাষী। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে সেটাও স্বীকৃত সরকারি ভাষা। তুরস্কে তুর্কি সরকারি ভাষা, কিন্তু কুর্দিশও চলে। প্রতিটি জাতীয়তাবাদী দেশেই সরকারি ভাষা রাষ্ট্রীয় কাজে ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কঠোরভাবে প্রয়োগের বিধান রয়েছে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার দাবি বহুদিনের; পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই।
ষাটের দশকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইংরেজির সঙ্গে বাংলাও অনুমোদিত হয়। উঁচু শ্রেণীতে বাংলা বইয়ের অভাব। সে অভাব অনুবাদের মাধ্যমে দূর করা খুব সহজ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সে উদ্যোগ নিতে পারত। নিয়েছে কি? ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে চেতনাটাই আসল, উচ্ছ্বাস নয়। ভারতে সরকারি ভাষা হিন্দি হলেও, অতি বড় দেশ বলে ইংরেজির সেখানে প্রাধান্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি রাজ্যের মানুষ দৈনন্দিন জীবনে নিজেদের ভাষা ব্যবহার করছে—হিন্দি নয়। তামিলনাড়ুতে তামিল, গুজরাটে গুজরাটি, কেরালায় মালয়ালম, অন্ধ্র প্রদেশে তেলেগু ও উর্দু, কর্ণাটকে কানাড়া, মহারাষ্ট্রে মারাঠি, পাঞ্জাবে পাঞ্জাবি, রাজস্থানে রাজস্থানি ভাষা যেভাবে ব্যবহূত, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সেভাবে নয় এবং বাংলাদেশেও বাংলার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যবহূত হয় না। ভাষা নিয়ে একবার হয়েছে রক্তপাত, এখন হচ্ছে মামলা-মোকদ্দমা। ভাষাদূষণে উচ্চ আদালতের নির্দেশে কমিশনও গঠিত হয়েছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু দেশের ৫০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যই পড়ানো হয় না। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি কোনো দায়িত্ব নেই? আমাদের এনজিওগুলো দেশের মারাত্মক উন্নয়ন চায়। তাদের প্রায় সব গবেষণাপত্রই ইংরেজিতে রচিত হয়। কারণ, ওগুলোর পাঠক দাতারা— দেশের মানুষ নয়। বক্তৃতাবাজি, স্মৃতিচারণা ও অতীতের বীরদের হরবছর সংবর্ধনা দিয়ে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন সম্ভব হবে না। জাতিকে গড়ে তুলতে হয়। সে জন্য সরকারি আনুকূল্যের প্রয়োজন রয়েছে, যেমন দিয়েছিলেন হোসেনশাহি রাজত্বে আলাউদ্দিন হুসেন শাহরা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দরকার শিক্ষিত শ্রেণীর ভাষার অনাচার রোধে ও উন্নতি সাধনে সুদৃঢ় অঙ্গীকার।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।