Thursday, April 22, 2021
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আট দিন by পরিতোষ পাল

হাজার হাজার বছর আগে এই আন্দামানে এসেছিল একদল মানুষ। প্রথমে ভাবা গিয়েছিল এরা এসেছিল দক্ষিণ এশিয়া থেকে। কিন্তু পরে জানা যায় আসলে এদের অধিকাংশ এসেছিল আফ্রিকা থেকে। তাই আদিবাসী এই মানুষগুলোর মধ্যে নিগ্রো প্রভাব স্পষ্ট। তবে একাংশের মধ্যে রয়েছে মঙ্গোলয়েড প্রভাব। আন্দামানের এই আদিবাসিন্দারাই পৃথিবীর আদিমতম অধিবাসী। জারোয়া, ওঙ্গি, সেন্টিনেলিজ, শম্পেন, গ্রেট আন্দামানিজ ও নিকোবরিজ, এই কটি উপজাতির বাস এই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। সভ্যতা থেকে যোজন দূরে গভীর জঙ্গলে এদের বাস। আজো এরা নগ্ন থাকে। এদের ভাষা এবং সংস্কৃতি একান্তই নিজস্ব। সভ্য সমাজের মানুষকে এরা দেখতে পারে না। মধ্য ও দক্ষিণ আন্দামান ও আরো কয়েকটি দ্বীপে নির্জনতায় এদের বসবাস। এক সময় সংখ্যায় এরা কয়েক হাজার থাকলেও আজ সব মিলিয়ে সংখ্যায় এরা হাজারেরও কম। এদের মধ্যে আবার গ্রেট আন্দানিজদের সংখ্যা নেমে এসেছে ৪৫ জনের কাছাকাছি। আদিমতম এই মানুষগুলোকে রক্ষা করাই এখন প্রধান কাজ হয়ে উঠেছে।
আদিবাসীন্দারা ছাড়াও আন্দামানে এখন বাঙালি, তামিল ও অন্যান্য আরো অনেক জাতির মানুষ বসবাস করেন। আসলে এক সময় ব্রিটিশরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেবার অপরাধে যাদের দ্বীপান্তর দিয়ে পাঠিয়েছিল আন্দামানে তাদের বংশধররা রয়ে গিয়েছেন এই দ্বীপে। আর পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ভারত সরকার পুনর্বাসন দিয়ে পাঠিয়েছিল এখানকার নানা দ্বীপে। তারাই সংখ্যায় এখন বেশি। আন্দামানের নানা প্রান্তে এখন ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোরের মানুষের বসবাস। কয়েকটি জায়গায় তো ৯০ শতাংশের বেশিই বাংলাদেশি। সরকার এদের সকলকে ৩০ বিঘা করে উর্বর জমি দিয়েছিল চাষের জন্য। সেই জমি থেকে উৎপাদিত পণ্যে শুধু দিনই চলে যায় তা নয়। উদ্বৃত্ত ফসল বিক্রি করে আয়ও হয় যথেষ্ট। এছাড়া সকলেই নানা ব্যবসায় জড়িত। দক্ষিণ আন্দামানের প্রান্তে দিগলিপুরে ফরিদপুরের দীপকদের হীরা হোটেলে বাঙালি খাবার খেতে পর্যটকদের ভিড় সারা বছরেই লেগে থাকে। তেমনি পোর্ট ব্লেয়ারের উপকন্ঠে জলিবয় জেটিতে যশোরের হরির শ্রীহরি হোটেলেও বাঙালি পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই রয়েছে।
আন্দামানের রঙ্গতে আমকুঞ্জ সমুদ্র সৈকতেই আলাপ বন বিভাগের পদস্থ অফিসার অজয় কুমার দাসের সঙ্গে। তিনি সৈকতের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজের তদারকি করছিলেন। এগিয়ে গিয়ে কথা শুরু করার আগেই উনি নিজেই পূর্ববঙ্গীয় বাংলায় স্বাগত জানিয়ে বললেন, বেড়াতে এসেছেন বুঝি ! জানালেন, বাংলাদেশের খুলনায় ছিল তাদের বাড়ি। তবে ১৯৬৫ সালে ক্লাস ফাইভে পড়তে পড়তেই ভিটে ছেড়ে এসেছিলেন কলকাতায়। পরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দিগলিপুরে। আন্দামানের নানা প্রান্তেই এই বাংলাদেশিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়া যায়। রঙ্গতের হীরেন বিশ্বাসের কাছেই জেনেছিলাম, আন্দামানে চিকিৎসার জন্য এক পয়সা খরচ করতে হয় না। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দিনরাত খোলা। গেলে বিনা পয়সায় ওষুধও মেলে। তেমনি পড়াশোনাও বিনা খরচে। এমনকি কলেজে পড়তে রাজধানিতে গেলে সেখানে থাকা খাওয়াও বিনা খরচে। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ সুবিধা। এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যেতে যেখানে স্থানীয়দের ৫০ রুপি দিলেই চলে সেখানে পর্যটকদের দিতে হয় ১৯৫ রুপি। প্রবীণদের জন্য রয়েছে আরো নানা সুযোগ সুবিধা। তাই তারা এখন বেশ সুখে স্বচ্ছন্দেই রয়েছেন সেখানে।

অপার কৌতূহল নিয়েই পা দিয়েছিলাম ৫৭২ দ্বীপ সমন্বয়ে গঠিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। অবশ্য মাত্র ৩৮টিতেই বসতি রয়েছে। আর এর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দ্বীপেই পর্যটকদের যাওয়া আসা অনুমোদিত। সমুদ্র আর জঙ্গলের সহাবস্থান এই আন্দামানে। বারাটাংয়ের ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট দেখবার মত। রয়েছে ছোট খাটো পাহাড়। আর আগ্নেয়গিরি। জীবন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে ব্যারেন দ্বীপে। অন্যদিকে দিগলিপুরের অদূরে রয়েছে কাদার আগ্নেয়গিরি। আবার বারাটাং দ্বীপের আশ্চর্য্য লাইম স্টোন কেভ দেখার অনুভূতিটাই আলাদা। ম্যানগোভ অরণ্যকে পাশে রেখে সমুদ্রের মাঝ থেকে হঠাৎ খাড়িতে প্রবেশ করতে হয়। আর সেখান থেকে আড়াই কিলোমিটার পায়ে হেঁটে তবেই দেখা পাওয়া যায় এই কেভের। তবে রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারে পৌঁছেই গিয়েছিলাম অবশ্য দ্রষ্টব্য সেলুলার জেলে। কয়েক বছর আগেই এটিকে জাতীয় স্মারক হিসেবে ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। এই সেই জেল যেখানে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাঠিয়েছিল দ্বীপান্তরে। ৬৯৩টি সেল বিশিষ্ট এই জেলের মাঝখানে টাওয়ার। আর চারদিকে ছড়ানো সাতটি বাহু এখন মাত্র কয়েকটি অংশ টিকে রয়েছে । তিনতলার এই জেল ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ে যায় বিপ্লবীদের কথা, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ দিয়েছিলেন। বহু শহীদের রক্তে রাঙা এই জেলের প্রাঙ্গণে বসে সন্ধ্যায় লাইট এন্ড সাউন্ডে জেনেছিলাম সেলুলার জেল আর বিপ্লবীদের সংগ্রামের কাহিনী। বেরিয়ে আসার পথে সকলেই শিহরিত হয়েছিলেন সেদিনের কথা ভেবে। পোর্ট ব্লেয়ারে কয়েকটি মিউজিয়ামও রয়েছে। আর পোর্ট ব্লেয়ারের অদূরে রয়েছে এশিয়ার প্রাচীনতম চাথাম শ’ মিল।
পোর্টব্লেয়ার থেকে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম নানা দ্বীপের উদ্দেশ্যে। সমুদ্র আমাদের সব সময়ের সঙ্গী ছিল। এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যেতে হয়েছে ছোট ছোট জাহাজে করে। আর এই জাহাজে করে যাবার পথে সমুদ্রের সৌন্দর্যকে নানাভাবে আবিষ্কার করেছি। সমুদ্রের জলের রঙের পরিবর্তন দেখে অবাক হয়েছি। কখনো জলের রঙ ঘন নীল হতে হতে প্রায় কালো। কোথাও একেবারেই নীল। কোথাও সবুজ। আবার তীরের দিকে হাল্কা নীল। আন্দামানের হ্যাভলক দ্বীপের সৌন্দর্যের কথা আগেই জেনেছিলাম। সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মত দ্বীপ। সমুদ্রের ধারে কটেজে কয়েকদিনের অবস্থান মনে রাখার মত। তেমনি ১৫ বর্গ মাইলের ছোট্ট নীল দ্বীপে পৌঁছেও অবাক হয়েছি এর সৌন্দর্য দেখে। এই ছোট্ট নীল দ্বীপকে বলা হয় ভেজিটেবল বোল অব আন্দামান। নানা ধরনের সবজি উৎপাদন হয় প্রচুর পরিমাণে। আর এই দ্বীপের ৯৯ শতাংশই বাঙালি। চারদিকে মোট ৫টি সৈকত। আন্দামানের বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরে দেখার মত এক ডজনেরও বেশি সমুদ্র সৈকত রয়েছে। প্রতিটি সৈকতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দিগলিপুরের কাছে রস এন্ড স্মীথ দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে সাঁতার কেটে আর স্নান করে মন তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। এখানে সমুদ্রের গর্জন নেই, কিন্তু আমেজ রয়েছে। একই রকম সমুদ্র স্নানের আনন্দ পেয়েছিলাম রাধানগর সমুদ্র সৈকতে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দর সৈকত হিসেবে চিহ্নিত রাধানগর-এ গর্জনও রয়েছে সমুদ্রে উদ্দামতা। আর পোর্ট ব্লেয়ারের অদূরে জলিবয় দ্বীপে সমুদ্র স্নানের মজাটাই আলাদা। অনেকটা হেঁটে চলে যাওয়া যায় সমুদ্রের গভীরে।
আন্দামোনের আরেকটি বড় আকর্ষণ হল কোরাল। সামুদ্রিক এই উদ্ভিদটির বৈশিষ্ট্যই আলাদা। মরে গিয়ে এগুলোই শক্ত পাথরের আকার নেয়। আন্দামানকে কোরাল সা¤্রাজ্য বলা যায়। বিভিন্ন দ্বীপের উপকূলে প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে এই বিস্ময়কর কোরাল। তবে ১৫ বছর আগের সুনামি এদের উপর বিপর্যয়ের ছাপ রেখে গিয়েছে। বহু জায়গাতেই কোরালের অপমৃত্যু ঘটেছে। অবশ্য মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যায় না। আবার নতুন নতুন কোরোলের জন্ম হচ্ছে। তবে কোরালকে রক্ষা করার জন্য আন্দামান প্রশাসন যথেষ্ট তৎপর। তাই কোরাল সংগ্রহ করে স্মৃতি হিসেবেও নিয়ে যাওয়া চলে না। আন্দামানের অনেক জায়গাতেই সমুদ্রের নিচের এই কোরাল দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। হ্যাভলক দ্বীপের এলিফ্যান্ট বিচে, ভরতপুর বিচে এবং জলিবয় বিচে কোরাল দেখানো হয় দু’ভাবে। কোরাল দেখানোর জন্য রয়েছে গ্লাস বোট। ছোটো ছোটো এই বোটের নিচটা ফাইবার গ্লাস দিয়ে তৈরি। বোটের নিচের কাঁচের স্বচ্ছতা আমাদের চোখকে সহজেই পৌঁছে দিয়েছিল সমুদ্রের তলদেশে। তাকিয়ে দেখি কত ধরনের কোরাল। নানা রঙের, নানা আয়তনের। কোনটি হলুদ, কোনটি লাল, কোনটি বেগুনি। আর এই কোরালের সম্রাজ্যে দেখা যায় নানা জাতের, নানা রঙের মাছ। মন ভরে যাওয়ার মত দৃশ্য। ঠিক যেন বিশাল একটি প্রাকৃতিক অ্যাকোরিয়াম। মনে মনে শুধুই ভাবি, সমুদ্রের নিচে কত যে সম্পদ তার কতটুকুই বা জানি। তবে সমুদ্রে নেমে কোরাল ও মাছের জগতে প্রবেশেরও সুযোগ রয়েছে। তবে সকলেই এর সুযোগ নিতে পারে না। জল-চশমা পড়ে আর লাইফ রিং হাতের নিচে চেপে ধরে রওনা দিয়েছিলাম সমুদ্রের গভীরে। একে স্নোরকেলিং বলে। গাইড সঙ্গী হাত ধরে নিয়ে গেল যেখানে রয়েছে কোরালের বেশি বেশি উপস্থিতি সেখানে। জলের নিচে মাথা ডুবিয়ে দেখি এক বিস্ময়কর জগত। রঙের কি বাহার। মৃত কোরালের মাঝে জীবন্ত কোরালগুলিকে চেনা যাচ্ছিল সহজেই। আমাদের চারিদিকে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা রঙের মাছ। মনে হয় যেন চুমু খাবে এসে। দেখতে পেলাম একটি স্টার ফিশকেও। রঙের এমন বিস্ফোরণ ও বিচ্ছুরণ আগে কখনো দেখিনি। দেখতে দেখতে আধঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে সহজেই। মনে হচ্ছে আরো দেখি। আশ আর মিটছে না। শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতেই হয়েছে। জলিবয় দ্বীপের সমুদ্র সৈকতেও মেতে উঠেছিলাম স্নোরকেলিং-এ। অনেক সৈকতেই স্কুবা ডাইভের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যবস্থা রয়েছে আরও অনেক রকম অ্যাডভেঞ্চার জলক্রীড়ার। কিন্তু খরচ ও সময়ের কথা বিবেচনা করে সেগুলো আর পরখ করা হয় নি।
তবে রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারের ২৭ কিলোমিটার দূরের মাউন্ট হ্যারিয়েটে যেতে গিয়ে সুনামি বিধ্বস্ত অঞ্চল দেখে মনটা খারাপই হয়ে গিয়েছে। সুনামি আন্দামানের বহু অঞ্চলেই ছোবলের চিহ্ন রেখে গিয়েছে। সেগুলো এখনো পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় নি। তবে মাউন্ট হ্যারিয়েটের শীর্ষে উঠে চারিদিকের দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতাটাও মনে রাখার মত। তেমনি মনে রাখার মত পোর্ট ব্লেয়ারের নিকটবর্তী রস দ্বীপটিকেও। ব্রিটিশরা পোর্ট ব্লেয়ারে রাজধানী করার আগে রস দ্বীপেই তৈরি করেছিল রাজধানী। এখন সেই দ্বীপটি নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এখনও সেখানে রয়েছে ব্রিটিশদের ঘরবাড়ি, ছাপাখানা, জলশোধন কেন্দ্র, বেকারি, মেস ও কবরস্থানের নানা চিহ্ন। দ্বীপে পর্যটকদের যেতে অবশ্য বাধা নেই।
আন্দামানে আটদিন কিভাবে যে কেটে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারিনি। দেখার আনন্দে কোন ক্লান্তিকেই ক্লান্তি মনে হয়নি। বরং ফিরে আসার দিনে বারে বারে ভেবেছি সকলে মালদ্বীপ বা মরিশাসে ছোটেন সমুদ্র সৈকতের আনন্দ পেতে। তারা একবার ঘুরে যান আন্দামান। ফেরার বিমানে উঠে একটিই কথা মনে হয়েছে, আবার আসিব ফিরে এই দ্বীপটির তীরে।
জরুরি তথ্য : আন্দামান ভ্রমণে কোনও বাধা নেই। তবে সব দ্বীপে যাওয়া যায় না। নিকোবরের একটা বড় অংশেই যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। বিদেশিরা পোর্ট ব্লেয়ারে বীর সাভারকার বিমান বন্দরে নেমেই আন্দামানে প্রবেশের অনুমতি সংগ্রহ করে নিতে পারবেন। তবে আন্দামানে ঘুরতে হলে আগে থেকেই একটি ট্যুর অপারেটর সংস্থার সাহায্য নিতে হবে। তারাই বিভিন্ন দ্বীপে যাওয়া এবং থাকার অগ্রিম ব্যবস্থা করে রাখবে। কলকাতা থেকে প্রতিদিন দুটি বিমান যাতায়াত করে। জাহাজেও কলকাতা, বিশাখাপত্তম ও চেন্নাই থেকে যাওয়া যায়। তবে প্রতিমাসে মাত্র কয়েক দিনই জাহাজ যায় আন্দামানে। প্রায় আড়াই দিন লাগে যেতে বা আসতে। তবে অনেক আগে থেকে না কাটলে টিকিট পাবার সমস্যা রয়েছে।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, April 21, 2021
নাইজেরিয়ার যেখানে টাকা দিয়ে বউ কেনা যায়
![]() |
| নাইজেরিয়ার একটি সম্প্রদায়ে দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের শিশুদের বিয়ের নামে কিনে নেয় প্রভাবশালীরা। |
![]() |
| মানি ম্যারেজে কম বয়সী মেয়েদের বিক্রি করে দেয়ায় তারা তাদের স্বামীর পরিবারের সম্পত্তিতে পরিণত হয়। |
![]() |
| দুর্ভাগ্যবশত বেশেরের বেশিরভাগ গ্রাম প্রধানকেই মানি ওয়াইফ রাখতে দেখা যায়। |
![]() |
| মানি ওয়াইফ রাখা সামাজিক মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়ানোয় আর এই প্রথা বিলুপ্তির কোন আভাস দেখা যাচ্ছেনা। |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শিশুর রিকেটস by ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

ভিটামিন-ডি’র কাজ হলো দেহের ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসকে তাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে সাহায্য করা। এ কারণে ভিটামিন-ডি’র অভাব হলে দাঁত ও হাড়ে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অবক্ষেপণ হতে পারে না। ফলে দাঁত ও হাড়ে এদের পরিমাণ বেশ কমে যায়। ভিটামিন-ডি’র সাহায্যে ক্ষুদ্রান্ত্র খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসকে শোষণ করে থাকে। এই ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস লবণের আকারে হাড়ে জমা হয়। এদের কারণে হাড় হয় সুস্থ, সবল এবং মজবুত। এদের অভাব হলে দাঁত এবং হাড়ের স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অবক্ষেপণ এবং দাঁত-হাড়ে অবস্থান নির্ভর করে ভিটামিন-ডি’র ওপর।
আগেই উল্লেখ করেছি, ভিটামিন-ডি’র অভাবে রিকেটস হয়ে থাকে। রিকেটস শিশুদের ছয় মাস বয়স থেকে দুই বছরের মধ্যে বেশি হতে দেখা যায়। রিকেটসের মূল কারণগুলো হলো-
১. অপর্যাপ্ত সূর্যালোক।
২. অপর্যাপ্ত ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার।
৩. ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস- এ দুটো খনিজ লবণের অভাব।
৪. দেহে স্নেহ পদার্থের অভাব- কেননা স্নেহ পদার্থেই ভিটামিন-ডি দ্রবীভূত হয়। স্নেহ পদার্থের অভাবে ভিটামিন-ডি পর্যাপ্ত পরিমাণে শোষিত হতে পারে না এবং দেহের কাজে লাগে না।
**এ ছাড়া যকৃত ও কিডনির রোগ এবং খিঁচুনি নিরোধক ওষুধের কারণেও দেহে ভিটামিন-ডি’র অভাব দেখা দিতে পারে।
আমাদের দেশে অনেক মা-ই জানেন না যে, সূর্যালোকই হচ্ছে ভিটামিন-ডি’র প্রধান উৎস। অনেক মা শিশুর গায়ে রোদ লাগাতে দেন না। এটি মোটেও ঠিক নয়। শিশুকে প্রতিদিন অন্তত ঘণ্টাখানেকের জন্য রোদে রাখা দরকার। এতে শিশু তার দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন-ডি সূর্যের আলো থেকেই সংগ্রহ করতে পারবে। শীতপ্রধান দেশে বছরের বেশির ভাগ সময় সূর্যালোক প্রায় দেখাই যায় না। সে সব দেশে শিশুকে রোদে রাখার প্রশ্নই আসে না। এসব দেশে শিশুকে দেহের চাহিদা অনুযায়ী ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানো হয়। ভিটামিন ডি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় মাছের তেলে। এ কারণে শিশুর ভিটামিন-ডি’র অভাব পূরণের জন্য কডলিভার ওয়েল খাওয়ানো হয়। মাছের তেল ছাড়াও ভিটামিন-ডি পাওয়া যায় দুধ, মাখন, ডিম এবং যকৃতে।
আক্রান্ত শিশুরা প্রচুর ঘামে, বিশেষ করে কপালে এদের ঘাম বেশি দেখা যায়। শিশু ফনটানেল সঠিক সময়ে বন্ধ হয় না। শিশুর করোটির হাড়ের গঠন এবং মিলন ঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না।
শিশুর দেহের সব ভর পায়ের ওপর পড়ে বলে পা এবং হাঁটুর মাঝখানের হাড় ধনুকের মতো বেঁকে যায়। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘নক নী’ বা বো-লেগস।
রিকেটস আক্রান্ত শিশুদের পাঁজরের হাড়গুলো হয় দুর্বল, অপুষ্ট এবং চাকা। ফলে এদের বক্ষদেশ হয় সরু। এরকম অবস্থাকে বলা হয় পিজিয়ন চেস্ট। পেট স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বড় দেখা যায়।
রিকেটস আক্রান্ত শিশুদের কপাল ও বুকের হাড় উঁচু দেখা যায়। বুকের হাড় সরু, নরম ও উঁচু দেখা যায় বলে অনেকটা মোরগির বুকের মতো দেখায়। দাঁতের হাড়ে খনিজ লবণের (ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস) অবক্ষেপণ হয় না বলে দাঁত বিলম্বে ওঠে কিংবা কখনোই ওঠে না। শিশুর কব্জি, হাঁটু এবং অন্য জয়েন্টগুলো মোটা থাকে এবং ফোলা দেখা যায়।
রিকেটস আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা না হলে এক সময় মেরুদণ্ডের হাড়গুলো এঁকেবেঁকে যায়। এ অবস্থাকে বলা হয় কাইফোসিস। শিশুর হাড়ের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় বলে দেহের বৃদ্ধিও কমে যায়। ফলে শিশু বামন বা ক্ষুদ্রাকৃতির হয়। রিকেটস থেকে আপনার শিশুকে রক্ষা করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে গায়ে ভালো করে তেল মেখে শিশুকে অন্তত ঘণ্টাখানেকের জন্য রোদে রাখা। শিশুদের বয়স পাঁচ মাস পূর্ণ হওয়ার পর তাকে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতে দিতে হবে। এ ছাড়া শিশুকে দিতে হবে পরিমিত স্নেহ এবং খনিজ পদার্থ (বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস) সমৃদ্ধ খাবার।
শিশুর শরীরে রিকেটস রোগের লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে শিশু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক আপনার শিশুকে পরীক্ষা করে দেবেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ।
ফোন: ০১৭২২৯১৬৪৭৯ (সঞ্জয়)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Sunday, April 18, 2021
আখের রসের যত গুণ

ক্লান্তি দূর করে
আখের অন্দরে থাকা কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, আয়রন, পটাশিয়াম এবং অন্যান্য উপকারি উপাদান শরীরে প্রবেশ করার পর আপনি হয়ে উঠবেন চাঙ্গা।
লিভার সুস্থ রাখতে
মনে আছে জন্ডিস হলে আখের রস খেতে বলতো চিকিৎসকরা। সহজপাচ্য এই পানীয় আপনার যকৃতকে সহজে হজম করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি শরীরের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে আখের রস।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে
গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে একেবারে নিচের দিকে রয়েছে আখের নাম। আখ থেকে উৎপাদিত চিনি ক্ষতিকর হলেও আখ আপনার শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তবে শুধু ডায়বেটিস না থেকে পাশাপাশি অন্য সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে আখ খেতে পারেন।
>>>সূত্র: বোল্ডস্কাই হেলথ।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Thursday, April 15, 2021
গল্প- অন্ধ চীনা সিপাহীদের কথা by টাইকো হিরাবায়সি

১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ। গুমা জেলার পরিষ্কার আকাশে উত্তরীয় হাওয়ায় উড়ে আসে একটি এরোপ্লেন। কাকতালীয়ভাবে ঐ দিনে বিরাট রকমের বিমান হামলা হয়ে যায়। আমি—বুদ্ধিজীবি থেকে রূপান্তরিত হওয়া এক কৃষক, এদিনে নাসিকি থেকে সড়ক ধরে তুষারে আচ্ছাদিত আকাগি পর্বতের কাছাকাছি চলে আসি। তারপর কাকিকামবারা থেকে আশিনো রেলপথের ট্রেইন ধরে কাইরু পর্যন্ত এসে, রয়োজ রেললাইনে ট্র্যান্সফার হয়ে তাকাসাকিতে নামি। আমাকে আজ আবার সিংগে রেললাইন ধরে উয়েনের দিকে যেতে হবে।
বেলা যদিও অপরাহ্ন, চারটা তিরিশের কাছাকাছি, তবু কলকারখানাময় এ শহরের ধূলি ধূসরিত ছাদগুলোর ওপরে আকাশ এখনো আলোয় উজ্জ্বল। কিন্তু এখানে সেখানে চিরসবুজ গাছপালার পত্রালির ফাঁকে শূন্যসমূহ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। প্ল্যাটফর্মের ওয়েটিং রুমটি অন্ধকারই, তবে বিস্তর লোকজনে ঠাসা। এদের কেউ কেউ শাকসবজিতে পরিপূর্ণ বৃহৎ সব বাঁশের ঝুড়ি বাঁকে বা কাঁধে ঝুলিয়ে কিংবা মেঝেতে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। এসব কিছু থেকে সমস্ত আবহে প্রতিধ্বনিত হয় এক ধরণের কোলাহল ও চঞ্চলতা।
আমি দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটির দিকে এক নজর তাকিয়ে ওয়েটিং রুম ছেড়ে যাওয়ার উদ্যোগ নি। ঠিক সে সময় উর্দিপরা পুলিশের একটি ছোট্ট দল স্টেশনের ওভারব্রীজ পার হয়ে প্ল্যাটফর্মে নামে। এদের মধ্যে আছেন পুলিশের চিফ ও ডেপুটি, দু’জনেই হাতে সাদা দস্তানা ও মাথায় লোহার হেলমেট পরে আছেন। ডেপুটি পুলিশ অফিসার স্টেশন মাস্টারের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটেন। পুলিশ চিফ তাদের সহসা থামিয়ে দিয়ে বোধকরি বিষয়টি নিজ হাতে তুলে নেন। স্টেশন মাস্টার দ্রুত টিকিটঘরে ফিরে গিয়ে একখণ্ড সাদা চক হাতে ফিরে আসেন। এসেই তিনি মানুষজনকে ঠেলে সরিয়ে চক দিয়ে প্ল্যাটফর্মে সাদা দাগ কাটতে শুরু করেন।
আমি প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির সামনে এক পা বাঁকিয়ে দাঁড়াই। দিন কয়েক আগে ভিড়ে ঠাসা রয়োজ রেলপথে চলাচলের সময় কেউ একজন পেরেকের একটি বস্তা ফেলে দিলে আমার পা আহত হয়েছিলো। স্টেশন মাস্টার আমার কাছে এসে আমাকে জোরে ঠেলে ধাক্কিয়ে, চক দিয়ে সাদা দাগটিকে আরো বিস্তৃত করেন। ঐ সময়ে রেলপথে যা নিত্যদিনের ঘটনা অর্থাৎ ট্রেইনটি আসতে বিস্তর বিলম্ব হয়। যাত্রীরা স্টেশন মাস্টারের উদ্ধত আচরণে মোটামুটি অভ্যস্থ বলে কোনরূপ প্রতিবাদ ছাড়াই সরে দাঁড়িয়ে কী ঘটছে কৌতূহল নিয়ে তা দেখে।
কিছুক্ষণের মধ্যে অপরিচ্ছন্ন, বরফে ছাদ ছাওয়া একটি ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসে। আমি কিছু লক্ষ্য করার আগেই পুলিশের দলটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়। আমি যে বগিতে ওঠার কথা ভাবছি, তারা তার দু’টি দরোজার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। ঠিক এখানেই প্ল্যাটফর্মে চক দিয়ে সাদা দাগ কাটা হয়েছে।
বগিটি মনে হলো মোটামুটি খালিই, কিন্তু আমি তাতে ওঠার চেষ্টা করতেই পুলিশ রূঢ়ভাবে আমাকে থামিয়ে দেয়। তখন সহসা আমি দেখতে পাই—কামরাটির মাঝামাঝি সুদর্শন তরুণ একজন উচ্চপদস্থ অফিসার তার ডেপুটিকে সাথে নিয়ে বসে আছেন। আমি তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নাসিকার দিকে তাকিয়ে ততক্ষণাৎ তাকে রাজকুমার তাকামাতসু বলে চিনতে পারি।
কুমার তাকামাতসুকে আমি চর্মচক্ষে দেখবো, তা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। এতদিন যাকে কল্পলোকের চরিত্র হিসাবে ভাবতাম, তাকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে আমার মনে এক ধরনের তীব্র আবেগজনিত আলোড়নের সৃষ্টি হয়। আমি সুদর্শন কুমারের দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করি। ভাবি, চিৎকার করে উঠে সবাইকে বলবো, ‘দ্যাখো হে, রাজকুমার সত্যি সত্যিই এখানে এসেছেন।’ কিন্তু আমি কিংবা অন্য যাত্রীদের এখন আবেগ প্রকাশের সময় নয়। আমরা যদি ভীড়ে ঠাসা কোন না কোন বগিতে জান বাজী রেখে উঠতে না পারি, তাহলে আমাদের পরবর্তী ট্রেনের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, তা কেউ বলতে পারবে না।
আমি ততক্ষণাৎ ট্রেনের মাঝামাঝি একটি বগির দিকে দৌড়াই। কিন্তু সহসা জলজ্যান্ত রাজকুমারকে চাক্ষুষ করার উত্তেজনা আমার গতিকে শ্লথ করে দেয়। আমি ট্রেনে পড়িমরি করে ওঠার জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সারির শেষে দাঁড়িয়ে ভাবি, এ কামরায় কি আজ কোনমতে উঠতে পারবো?
অবশেষে এক পর্যায়ে কোনক্রমে কামরাটির কাছে চলে আসি। বগিটি মারাত্মক রকমের অপরিচ্ছন্ন। জানালার কাচ ভাঙা, দরজায় কাচের বদলে একটি তক্তা পেরেক দিয়ে আটকানো। এক বৃদ্ধা যাত্রী তার মালামালের গাট্টির উপর ঠায় বসে আছেন। তার পাশে ক্রন্দনরত একটি শিশু। এদিকে-ওদিকে অগোছালোভাবে ছড়ানো ফুরোসিকি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা একটি দেরাজ ও বাঁধন খুলে যাওয়া কয়েকটি ঝাড়ু। এসব বিভ্রান্তির মাঝে আমার চোখে কেবলই ভাসে, একটু আগে এক পলকের জন্য দেখা নীলাভ কুশন দিয়ে সাজানো রাজকুমারের কামরাটি। একজন পুলিশ অফিসার এসে চিৎকার করে সবাইকে আরো সরে জায়গা করে দিতে নির্দেশ দেন। কেউ তার কথা না শুনে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।
অবশেষে আমি এখানে ওঠার আশা ছেড়ে দিয়ে সর্বশেষ বগিটির দিকে দৌড়াই। কামরাটিতে কোন যাত্রী দাঁড়িয়ে নেই। একজন সৈনিক, সম্ভবত নিচু র্যাংকের কোন অফিসার হবেন; কামরা থেকে নীরবে বেরিয়ে আসা সাদা পোষাকের সৈন্যদের মাথা গুনছেন। সৈন্যদের শরীর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাদের সকলের কাঁধে আড়াআড়ি করে রাখা কম্বল। ভালো করে তাকিয়ে আমি তাদের গায়ে ময়লার পুরু স্তর দেখতে পাই। আমি বগিটির দরোজার দিকে তাকিয়ে সৈন্যদের এরকম বেহাল অবস্থা কেন, তা ভাবি! একটু ভালো করে নজর করতেই তীব্র ভয় ও বিভ্রান্তিতে আমার পা দু’টি কাঁপতে শুরু করে।
আমি পরিষ্কার দেখতে পাই, এই সৈনিকদের সকলেই অন্ধ! তারা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে অন্য সৈনিকদের পেছন দিক স্পর্শ করে কায়-ক্লেশে হাঁটছে। তাদের সকলকে প্রচণ্ড রকমের ক্লান্ত ও ফ্যাকাশে দেখায়। অনেক দিন ধরে না ছাঁটার কারণে তাদের চুল দীর্ঘ হয়েছে। তাদের মির-মির করা চক্ষুকোটর থেকে ক্রমশ অশ্রু ঝরছে। বলা মুশকিল—এ সিপাহীদের বয়স ঠিক কত? আমি আন্দাজ করি, পয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের মাঝামাঝি। আরেকটু সাবধানে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারি—প্রতি পাঁচজন অন্ধ সেনার পেছনে একজন করে স্বাভাবিক দৃষ্টিওয়ালা সিপাহী। ছড়ি হাতে স্বাভাবিক সিপাহীটির পরনে প্রথাগত জাপানি সৈনিকদের থেকে কিছুটা ভিন্ন রঙের ইউনিফর্ম। তারা যেভাবে অন্ধ সিপাহীদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এতে মনে হয়—তারা এদের থেকে উঁচু র্যাঙ্কের।
একজন সৈনিক, ‘কোয়াই কোয়াইডে, কোয়াই কোয়াইডে’, বা ‘জলদি হাঁটো, জলদি হাঁটো’, রব তুলে সামনের অন্ধ সিপাহীকে ছড়ি দিয়ে খোঁচা দেয়। সহসা আমি বুঝতে পারি, এই অন্ধ সিপাহীদের দলটি জাতীয়তায় চৈনিক। এখন আর বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না, তাদের কেন এত অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর ও আজব দেখাচ্ছে।
ট্রেন থেকে নেমে অন্ধ চীনা সিপাহীরা সকলে প্ল্যাটফর্মে দলবেঁধে জমায়েত হয়। তাদের সংখ্যা পাঁচ শতের কাছাকাছি। আমি যেন নিজের চোখকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, তাই আবার গভীর মনঃসংযোগ করে সাবধানে তাকাই। সিপাহীগুলো তাদের ক্ষত-বিক্ষত চোখ আধবোজা করে রেখেছে, বোধ করি আলোর তীব্রতা সইতে না পেরে। প্রতিটি দৃষ্টিহীন চক্ষুকোটর থেকে ক্রমশ গড়িয়ে নামছে অশ্রুজলের ধারা। এদের প্রত্যেকেই যে সম্পূর্ণরূপে অন্ধ, এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ থাকে না। তলোয়ার ঝোলানো একজন উচ্চপদস্থ জাপানি অফিসার অন্ধ সিপাহীদের জমায়েতের কাছাকাছি হঠাৎ করে চলে আসলে, গুটি কয়েক দৃষ্টিওলা ব্যবস্থাপক গোছের সেনা তাকে স্যালুট দেয়। তিনি জানতে চান, ‘অন্যদের আসার কী হলো?’ ‘তারা পরের ট্রেনে আসছে স্যার’, বলে অন্ধ সিপাহীদের মাথা গুনতি থামিয়ে জবাব দেয় নিচু র্যাঙ্কের এক জাপানি অফিসার।
এসব ধুন্দুমারের মাঝে বিভ্রান্ত এক যাত্রী অন্ধ চীনা সিপাহীদের দিকে তাকিয়ে, ‘এ দুনিয়াতে কী হতে চললো?’ বলে আক্ষেপ করে। একজন মধ্যবয়সী মহিলা-যাত্রী চোখে রুমাল দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। এ বিষয়টা যাত্রী সকলের কাছে পরিষ্কার হয় যে, জাপানি কমান্ডার ও অন্যান্য অফিসাররা চীনা অন্ধ সিপাহীদের সাধারণ যাত্রীদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে চান। কিন্তু তাদের সংখ্যা এতো বৃহৎ ও গতি এতো শ্লথ যে, এদের লুকিয়ে রাখার কোন উপায়ই থাকে না। তাদের চারপাশে কৌতূহলী যাত্রীদের ভীড় কেবলই বাড়তে থাকে।
অবশেষে ট্রেন ছেড়ে দিলে আমরা সাধারন যাত্রীরা পড়িমড়ি করে বগির দিকে দৌড়াই। আমি চলমান কামরার পাদানীতে দাঁড়িয়ে ভেতরের দিকে তাকাই। পুলিশ দলটির যারা প্ল্যাটফর্মে অন্ধ চীনা সিপাহীদের পাহারা দিচ্ছিলো, তারাও লাফিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা পরস্পরের সাথে কানাকানি করে। তাদের একজন বলে, ‘আমার মনে হয় এদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে কোনো পরীক্ষা নিরিক্ষা চালানো হয়েছে’। ‘এরা হয়তো কোন রকমের বিস্ফোরণের শিকার’ মন্তব্য করে হেলমেট পরা এক পুলিশ। ‘কিন্তু বিষাক্ত গ্যাস নিয়ে সত্যিই পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার কোন কী প্রয়োজন ছিল?’ পাল্টা মন্তব্য ছুড়ে দেয় তার সঙ্গীটি। আমি তাদের আলাপচারিতার রেশ ধরে কাছে দাঁড়ানো মাঝবয়সী এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করি, ‘অন্ধ সিপাহীরা কোথা থেকে ট্রেনে চেপেছে?’ মহিলা একটু ভেবে নিরাসক্ত গলায় জবাব দেন, ‘মনে হয় সিনোনই এলাকা থেকে’। ‘তাহলে এরা নিশ্চয়ই নগোয়া অঞ্চল থেকে আসছে’। আমি স্বগোক্তি করি। কামরার যাত্রীরা দ্রুত বিষয়টি ভুলে গিয়ে গালগল্পে মেতে ওঠে। মাঝবয়সী মহিলা, যার সাথে আমার একটু আগে কথা হয়েছে, আলগোছে জানায়, ‘আমি ইচিগো থেকে আসছি, আমার মেয়েকে নিয়ে চিবাতে যেতে হচ্ছে’। মহিলাটি আরো বলেন যে, তার মেয়ে স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক, গলায় বিচ্ছিরি রকমের ফোঁড়া হওয়ার কারণে সে ডিউটিতে সময়মতো যোগ দিতে পারেনি। প্রায় সপ্তাহখানেক দেরিতে কাজে যোগ দিতে যাচ্ছে। কিন্তু চিবাতে যাওয়ার সরাসরি ট্রেন পায়নি, তাই এ ট্রেনে করে যতদূর যাওয়া যায়, তারপর কোন স্টেশনে নেমে অপেক্ষা করবে, যদি সরাসরি যাওয়ার কোন ব্যবস্থা করা যায়। মহিলাটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বারবার এই ট্রেন যাত্রার ক্লান্তি ও ক্লেশের কথা বলে। একটু আগে মহিলাটি যে রকম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চীনা সিপাহীদের বিষয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন, তাতে আমি মনে মনে আহত হয়েছিলাম। এখন আমি তার নিস্পৃহতার কারণ বুঝতে পারি। জাপানিরা তাদের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে এমনই মেতে আছে যে, তাদের অন্য বিষয়ে ভাবার কোন অবকাশই নেই।
ট্রেনটি একটি স্টেশনে এসে থামে। আমি বসার জায়গা খুঁজে পাওয়ার জন্য যে কামরাটিতে অন্ধ চীনা সিপাহীরা বসে ছিল তাতে এসে উঠি। কামরাটি খালি, কিন্তু দুর্গন্ধের জন্য বেশীক্ষণ টেকা যায় না। আমি আবার আগের কামরায় ফিরে আসি। ট্রেনের কন্ডাকটার,‘পরবর্তী স্টেশন জিম্বেবারা’, হাঁকতে হাঁকতে যাত্রীদের মধ্য দিয়ে চলে যায়। এতক্ষণে কামরার পশ্চিমদিকে জানালাগুলো অস্তগামী সূর্যরশ্মির প্রতিসরণে জ্বলে যাচ্ছে। প্রকাণ্ড রক্তিম সূর্য যেন ধীরগামী ট্রেনের সাথে তাল মিলিয়ে দিগন্ত জুড়ে আস্তে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে।
ট্রেনের সিজিলে কিঞ্চিত পরিবর্তন হয়, আমি বুঝতে পারি যে, অন্ধ চীনা সিপাহীদের বয়ে আনা বগিগুলো কেটে রাখা হয়েছে, তাতে আমার কামরাটি হয়ে পড়েছে ট্রেনের সর্বশেষ বগি। আর হ্যাঁ, আমার মনে পড়ে, রাজকুমার এখনো বসে আছেন আমার কামরাটির খানিক আগের একটি কম্পার্টমেন্টে। এতবড় ঘটনাটি সহযাত্রী কাউকে বলতে আমার ইচ্ছা হয় না, ভীষণ ক্লান্ত লাগে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে পর আমি তাকাসাকি স্টেশনের সামনের দোকানদারদের জিজ্ঞেস করি যে, তারা অন্ধ চীনা সিপাহীদের আর কখনো ট্রেনে উঠতে দেখেছে কি? দোকানীরা সকলে আমাকে জানায়, এরকম কোন ঘটনা কখনো তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। আমি ভাবি, মনে হয়, তারা এখান থেকে কখনো ফিরে যায়নি।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- নিদারুণ সময়ের বিহ্বলতায় by রুমা মোদক

উৎসব শেষ হয়ে যাবার পর যে আবশ্যিক নীরবতা নামে, তাতে লেগে থাকে কাঙ্খিত বিষণ্ণতা। ভাদ্রের ঘামঝরা উত্তাপের মতো যে আয়োজনের উন্মাদনা, তার শেষে কার্তিকের হিম নামার আগে আশ্বিনের ঝিমমারা বাতাস। সাথে আবশ্যিক কিছুটা ক্লান্তি। আয়োজনের সাফল্যের উত্তাপের সাথে শেষ হয়ে যাওয়ার শীতলতা। ঘরময় সব রয়েছে। উজ্জ্বল আলো, ঝুলে থাকা রঙিন বেলুন। কিন্তু উৎসব শুরুর আগের ঔজ্জ্বল্যটুকু কেমন উৎসব শেষের পর যাদুর মতো উধাও! আমন্ত্রিত অতিথিরা সব বিদায় নিয়েছে একে একে। তাদের রেখে যাওয়া উচ্ছ্বিস্ট প্লেটের মতোই উজ্জ্বল আলোর নিচেও থ মারা উচ্ছিষ্ট নীরবতা!
সাজ পোশাক পাল্টাতে পাল্টাতে নূরুল হাবীব সামনে অপেক্ষা করে থাকা বাকি রাতটার কথা ভাবে। বিয়ের একযুগে রুমেলার গায়ে থলথলে চর্বি। আকর্ষণহীন বুক পেট প্রায় সমান। এক যুগ আগেও যখন কলেজে যাবার জন্য রিক্সায় চড়তো, তার শরীরের বাঁকে যে ঢেউ খেলতো, পাড়ার মোড়ে হোন্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নুরুল হাবীবের মনে হতো—সে ঢেউয়ে সাঁতার না কাটলে জীবনই বৃথা। রুমেলার পলক ফেলা চোখের ইশারায়, নির্দিষ্ট মাপের বুক থেকে নেমে যাওয়া পেট, কূল থেকে নদীতে নেমে যাওয়ার আহ্বান রাতে ঘুমাতে দিতো না নূরুল হাবীবকে। এখন তার আকর্ষণহীন বুক পেটের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে নুরুল হাবীব অতীতের নূরুল হাবীবকে খোঁজে। বারো বছর আগে এই মেয়ের জন্য দেয়াল টপকে জানালার ফাঁক গলিয়ে একটু দেখা, একটু স্পর্শের জন্য পাগল হয়ে যেতো। ধরা পড়ে তার ভাইদের হাতে মার খেতো। আকর্ষণটি কোথায় ছিলো ঠিক? ঐ বুক-পেটে, নিপুন সাজিয়ে রাখা চোখজোড়ায়, নাকি এখন কলাগাছের গোড়ার মতো স্ফীত হয়ে উঠা বাহুদ্বয়ে, যেখানে প্রথম সে ঠোঁট ছুঁয়েছিলো, সে জানালার শিক গলে!
এখন কপোলে জমে উঠা মেছতার ছোপ, পান খেয়ে রক্তখেকো ড্রাকুলার মতো বীভৎস লাল হয়ে ওঠা জিহ্বা, দাঁত, স্ফীত তলপেট দেখে সে নিজেকে খুঁজে পায়না যে, আসলে ঠিক কিসের জন্য এমন উন্মাদ হয়েছিলো সে!
এস.আই নূরুল হাবীব বিয়ের যুগপূর্তি উপলক্ষে স্ত্রী রুমেলাকে কোটি টাকার ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছে। আনন্দে আর অহংকারে ডগমগ করেছে রুমেলা। সকাল থেকেই শুরু হয়েছে ন্যাকা ন্যাকা গলায় ফোন। কুশলাদি জিজ্ঞাসার অভিনয়ের ফাঁকে ফ্ল্যাটের বিস্তারিত জানানো...ফিটিংস সব বাইরের ভাবি, ইন্টিরিয়র পুরো সেগুন কাঠের আপা, সন্ধ্যায় মিস কইরেন না ভাবি।
সব ভালো করে শোনেও না নূরুল হাবীব। শোনার আগ্রহও বোধ করে না। তার এ ফ্ল্যাট কেনা যতোটা না স্ত্রী রুমেলাকে খুশি করার জন্য তার চেয়ে অধিক স্ট্যাটাস সিম্বল। সহকর্মী সবাইকে একহাত দেখিয়ে দেয়া। আর দেখানোর জন্যই এই বিশেষ দিনটাকে বেছে নেয়া, এক ঢিলে দুই পাখি মারা। সহকর্মী সবাই অনেক আগেই ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছে, সেদিক থেকে পরে কিনে সর্বাধুনিক ফ্ল্যাটটাই নিয়ে সবার থেকে এগিয়েই গেছে সে। এ নিয়ে এতকাল রুমেলার যে খোঁচা-টিপ্পনি-অশান্তি ছিলো, আজ পার্টিতে সবার চোখ টাটানো দেখে সব তীব্র অহংকারের বাষ্প হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেছে। অতিথি আপ্যায়নে গলায় আহ্লাদের সুর আর ধরছিলো না তার। আজ রাতটা স্বামীকে উজাড় করে দেবে সে, দুপুরে ব্যস্ততার ফাঁকে নুরুল হাবীবের গায়ের উপর ঢলে পড়ে বেখাপ্পা কিশোরী গলায় কথা দিয়েছে রুমেলা। কিন্তু এটা ভাবতেই সুখের বদলে একটা বাড়তি চাপ যুক্ত হয়েছে নূরুল হাবীবের মাথায়। এই আকর্ষণহীন মাংসপিণ্ডে কী করে উপগত হবে সে?
শারীরিকভাবে গত একবছর ধরে খুব ফুরফুরে আছে নূরুল হাবীব। মেঘ না চাইতে জলের মতো এক অতি আকর্ষনীয় নারী উদয় হয়েছে তার জীবনে। আহা! শরীর যেখানে যে মাপের থাকার কথা কোথাও কম বা বেশি নেই এক ইঞ্চি। কেমন পাকা আমের মতো গায়ের রং দেখলেই ছিলে খেতে ইচ্ছে করে। বেশ জড়িয়ে গেছে সে মেয়েটার সাথে। একটু অদ্ভুত, কিন্তু নূরুল হাবীবের জন্য তার দরজা সবসময় খোলা। তাই বলে নূরুল হাবীব যখন তখন হানা দিয়ে নিজের ওজন কমায় না মোটেই। পোস্টের একটা ইমেজের ব্যাপার আছে। শহরের শেষ মাথায় মেয়েটার ঠিকানা—ঠিক শহরতলী যাকে বলে। যখন তখন গেলেও কারো নজরে পড়ার কথা নয়। বাণিজ্যিক নার্সারির পর নার্সারি, ঘন গাছের ঝোপ লালিত-পালিত সব গাছের ঝাড় বিক্রির জন্য তৈরি। সে সবের ফাঁকে মেয়েটার ঘরটা বাইরে থেকে ঠিক চোখেও পড়েনা সহজে। হয়তো আড়াল করার জন্যই এভাবে এখানে বানানো। হয়তো পেশার খাতিরেই...। যদিও মেয়েটার চেহারা-ছবি পেশাটার সাথে একদমই যায় না। কিন্তু নূরুল হাবীব এসব কিছু ঘাটায় না, তাছাড়া কোন কমপ্লেন না এলে ঘাটিয়েই বা তার কী দরকার। তার উপরেই নিজেই এসে জুটেছে যখন!
সেও এক আজব ঘটনা। এক লোকের শার্টের কলার ধরে টানতে টানতে একদিন সন্ধ্যায় মেয়েটি থানায় এসে হাজির। সরাসরি তার রুমে। সাজ-পোশাক চেহারা দেখে বাইরে কনস্টেবলদের হৈ চৈ থামিয়ে মেয়েটিকে ভেতরে এসে বসতে বলতে বাধ্য হয় নূরুল হাবীব। মেয়েটি লোকটির শার্টের কলার ছেড়ে হাঁফায় দু’-এক মিনিট। নূরুল হাবীবের সামনের চেয়ারে বসে। একেবারে নূরুল হাবীবের মুখের উপর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, একে হাজতে ঢোকান, ঢোকান প্লিজ। কিন্তু অভিযোগ কী? ডায়েরি করতে হবে। অভিযোগকারী হিসেবে আপনার নাম ঠিকানা লাগবে। নূরুল হাবীবের জেরার প্রাথমিক ধাক্কায় মেয়েটা একটু থমকে যায়, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড। তারপর কেমন স্বভাবসুলভ স্মার্টনেসে সব থমকানো ফু মেরে উড়িয়ে দিয়ে গড়বড় করে বলতে থাকে, লোকটা ধর্ষক। ধর্ষক!
কোথায় কাকে ধর্ষণ করেছে? ভিকটিম কে, ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছে? সার্টিফিকেট আছে? আবারো একসাথে অনেকগুলো জেরায় মেয়েটা উত্তর দিতে মূহুর্তমাত্র ভাবে। বলে, ধর্ষণ করবে। মেয়েটার উত্তরে লোকটিসহ পুরো কক্ষে এবড়ো থেবড়ো দাঁড়ানো দুয়েকজনসহ নূরুল হাবীব নিজেও হো হো করে হেসে ওঠে। সম্মিলিত হাসিতে মেয়েটি বিব্রত হবার বদলে নতজানু হয়, প্লিজ প্লিজ…আকুতিতে গলে পড়ে মেয়েটি। পারলে সব স্মার্টনেসের দ্বিধা ঝেড়ে পায়ে ধরে। সে সুযোগ দেয়না নূরুল হাবীব। মেয়েটার আকুতির পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে সে জানায় লোকটিকে সে নিশ্চয়ই হাজতে পুরবে। নূরুল হাবীবের আশ্বাসে এমন কোনো ফাঁকই থাকে না যে, মেয়েটি অবিশ্বাস করে। তারপর কৃতজ্ঞতা স্বরূপই কিনা কে জানে নিজের ফোন নম্বর আর সাথে অমোঘ এক ইশারা ছুঁড়ে দিয়ে চলে যায় মেয়েটি...।
মূলত লোকটিকে হাজতে ঢোকানোর কোনোই আইনগত ভিত্তিই নেই। কোথায় কীভাবে মেয়েটি তাকে পাকড়াও করেছে লোকটির মুখে শুনে নূরুল হাবীব হাসবে, না কাঁদবে ঠিক করতে পারে না। বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে একটা সূক্ষ্ম প্রশ্নবোধক চিহ্ন মাথা তুলে রাখে। মেয়েটিকে সে টিজও করেনি। দিব্যি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলো। হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হয়ে মেয়েটি, তাকে কলার ধরে টানতে টানতে এই থানায় নিয়ে এসেছে। লোকটিকে হাজতে ঢোকানোর কোন যৌক্তিক কারণ থাকে না বলে নূরুল হাবীব লোকটিকে ছেড়ে দেয়।
তারপর ঘটনার দুয়েকদিন পর যতোটা না মেয়েটির আচরণের কৌতূহলে তারচেয়েও বেশি মেয়েটির আকর্ষণে শহর পেরিয়ে মেয়েটির ঠিকানায় দিকে হাঁটে হাবীব। নারীদের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ঘরে, বাইরে, ডিপার্টমেন্টে সর্বজনবিদিত। অভূতপূর্ব একটা রাত কাটে তার—হাস্যে-লাস্যে-পরিতৃপ্তিতে। ব্যাপারটা তেমন সমস্যা নয়। কোন অভিযোগ না এলেই হলো। বহুগামী চরিত্রে নারীসঙ্গ কম হয়নি জীবনে। তবে এই মেয়েটির সঙ্গে আর কারো তুলনা চলে। পরপর দুয়েকটা সুখস্মৃতি নিয়ে মেয়েটিকে সে অনায়াসেই ভুলে যেতে পারতো। প্রায়ই সে যা করে। কিন্তু প্রথমত অমোঘ আকর্ষণীয় শরীরের কারণে মেয়েটিকে সে ভুলতে পারেনা। আর দ্বিতীয়ত পরবর্তী ঘটনার পরম্পরা মেয়েটিকে তার কাছে আরো জীবন্ত এবং অনিবার্য করে তোলে।
ফুলবিক্রেতা রিজভী মিয়ার দশ বছরের মেয়েটি নিখোঁজ। থানায় ডায়েরি করার তিনদিন পর মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু জীবিত নয়, মৃত— একটা নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে। রোদে ততক্ষণে লাশ ফুলে উঠে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, গায়ে পিঁপড়ার সারি। ডাক্তারি পরীক্ষার সার্টিফিকেটে স্পষ্ট উল্লেখ : হত্যার আগে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
সদর আসনের এম.পি যে গাঁয়ের, সে গাঁয়েই স্থায়ী ঠিকানা রিজভী মিয়ার। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে খেয়ে না খেয়ে ক্যানভাস করেছে সে। ফলে এম.পি স্বয়ং বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে নেন এবং একশনে যান। কিন্তু তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে দিন সাতেক পর ধর্ষক হিসেবে যখন ধরা পড়ে সেই লোকটি, যাকে মেয়েটি থানায় ধরে এনেছিলো তখন নূরুল হাবীব প্রথমে ‘থ’ মেরে যায়। ঘটনার কাকতালীয়তা কিংবা আকস্মিকতায় তার চাকুরি জীবনের সব অভিজ্ঞতা ম্লান হয়ে যায়। লোকটি ধর্ষক। ফলবিক্রেতা রিজভী মিয়ার মেয়েটি নিখোঁজের ডায়েরি হবার তিনদিন পর উদ্ধার হয়েছে মৃতদেহ আর তার সাতদিন পর ধরা পড়েছে ধর্ষক লোকটি। সবমিলিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে ১০ দিন। কিন্তু মেয়েটি লোকটিকে ধরে এনেছিল প্রায় একমাস আগে। সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যায় নূরুল হাবীবের। যাবতীয় আইনী প্রক্রিয়া শেষ করে লোকটিকে কোর্টে চালান দিতে যে কয়দিন লাগে, ভেতরে ভেতরে এক অস্থির উত্তাপ তাড়া করে তাকে। ঘোরগ্রস্ত লাগে মাতালের মতো...।
সেদিন সন্ধ্যায় মেয়েটির ঠিকানার উদ্দেশ্যে যেতে যেতে নূরুল হাবীব আকাঙ্খিত শরীরের মোহ নাকি ঘটনার বিস্ময় কিসে যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শহর থেকে বের হয়ে আসার পর পুরো রাস্তা কেউ দেখেছে কিনা, কখন তার রিক্সা ঠিকানাটির সামনে দাঁড়িয়েছে সে টেরই পায় না। রিক্সাচালকের ডাকে তার হুশ ফেরে। মেয়েটিকে ঘটনার রহস্য জিজ্ঞেস করার সকল প্রস্তুতি ছিলো তার, গত কয়েকদিন সব ব্যস্ততার ভীড়ে ভেতরে ভেতরে জেরার প্রশ্ন তৈরি করেছে সে। মেয়েটার শারিরীক সান্নিধ্যে যাবার অজুহাত যতোটা, তার চেয়েও বেশি বিস্ময়ের কৌতুহল। কিন্তু ঘরে ঢুকেই সব পূর্বপ্রস্তুতি ঝুরঝুরিয়ে ভেঙে পড়ে। মেয়েটার অলঙ্ঘনীয় আকর্ষণে সব গুড়ো হয়ে সোহাগে-আদরে-আহ্লাদে মিশে বিলীন হয়ে যায়। কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয় না।
হয়তো আর জিজ্ঞাসা করার দরকারও পড়তো না। মেয়েটার দুর্দমনীয় আকর্ষণে সে বারবার ছুটে ছুটে যেতো। পরিতৃপ্ত হয়ে নাক ডেকে ঘুমাতো বেঢপ রুমেলার পাশে।
এদিকে আইনও তার নিজস্ব গতিতেই চলছিল। ধৃত ধর্ষকের জামিনের আবেদন বারবার নাকচ হচ্ছিলো।
কিন্তু দ্বিতীয়বার ঘটনাটা ঘটলো। সেদিন মেয়েটি কখন কীভাবে তাকে ভুলিয়ে পাশের উপজেলায় নিয়ে গেলো সে টেরই পেলো না। আচ্ছা তার হয়েছেটা কী? নিজেকেই নিজে চিমটি কাটে নূরুল হাবীব। গত রাতটা সে মেয়েটির ঘরে কাটিয়েছে, এটুকু তার মনে আছে। রুমেলা জানে, কিংবা জানার ভান করে, নানা অপারেশানের কাজে তার প্রায়ই এমন বাইরে রাত কাটাতে হয়। কোন সন্দেহ-আপত্তি-উচ্চবাচ্য করে না। কিন্তু রাতের পর সকালবেলা এই পাশের উপজেলা পর্যন্ত আসার ঘটনাটা কিছুতেই মনে করতে পারে না সে। মেয়েটি তাকে নিয়ে দাঁড়ায় যে লোকটির সামনে, রাস্তার মোড়ে বসে পান-সুপারি বিক্রি করছে সে। হাঁটুর উপর তোলা লুঙ্গি, গায়ে ময়লা চিটচিটে স্যান্ডো গেঞ্জি। গেঞ্জি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা কলসির তলার মতো ভুঁড়ি, কুতকুতে চোখের কোনায় সাদা বর্জ্য। মেয়েটির আবদার তাকে এক্ষুনি গ্রেফতার করতে হবে। সেই পুরোনো অভিযোগ—লোকটি ধর্ষক। আরে কবে কোথায় কখন কাকে ধর্ষণ করেছে সে? এবারও কিছুই বলতে পারেনা মেয়েটি। আরে পাগল নাকি! যখন পরিপূর্ণ হুঁশ ফেরে নূরুল হাবীবের, দ্রুত রিক্সায় উঠে বসে সে। এই মেয়েটিকে না চেনার কথা নয় কারো, তার সাথে প্রকাশ্য দিনের আলোতে পুলিশ অফিসার নূরুল হাবীবকে দেখা গেছে। বলা যায়না কাল স্থানীয় পত্রিকায় খবর হয়ে যেতে পারে। আর মফস্বলের পত্রিকাতো এসব খবরের জন্য তীর্থের কাকের মতো ওৎ পেতে থাকে।
‘আরে পাগল নাকি’ বলে মেয়েটিকে উপেক্ষা করে চলে এলেও নূরুল হাবীব আগের ঘটনাটা ভোলেনি। বরং পুনরায় সেই আকস্মিক কাকতাল ঘটে কিনা সে ভাবনায় অফিসে ঠিকঠাক মন:সংযোগ করতে পারে না। এবং যথারীতি দিন তিনেক পর পদ্মবিলের পাড় থেকে ধর্ষিত-রক্তাক্ত মেহেরুন্নেছা নামের মেয়েটির মৃতদেহ উদ্ধার হলে, সে আর প্রমাণের অপেক্ষা না করে তৎক্ষনাৎ সেই উপজেলার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করে সেই পানওয়ালার গ্রেফতার নিশ্চিত করে।
গ্রেফতারের পর সব তথ্য-প্রমাণে এই পানওয়ালাই ধর্ষক প্রমাণিত হলে সবাই দ্রুত আসামী ধরার কৃতিত্বের মূল রহস্যটা ভুলে যায়। নূরুল হাবীব কী করে ঘটনা জানলো আর আসামী ধরতে সহায়তা করলো কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনা, কিংবা তুলতে ভুলে যায়। ভুলতে পারেনা শুধু নূরুল হাবীব। সে যথারীতি মেয়েটির কাছে যায়। মেয়েটি কোন প্রসঙ্গ ওঠায় না। বারবার তার কৌতুহল নিবৃত্তির সকল প্রস্তুতি ভেস্তে যায়। কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয় না।
কিন্তু আজ! আজ এতো রাতে মেয়েটি এস.পি স্যার পর্যন্ত কেনো? উত্তরটা এস.পি স্যার নিজেই দেয়। বলে শোনেন, মহিলার অভিযোগ: এর আগে আরো দু’জন ধর্ষককে আপনার কাছে নিয়ে গিয়েছিলো আপনি গুরুত্ব দেন নি। এবার তাই সে সরাসরি আমার কাছে এসেছে। স্যার...স্যার...উদভ্রান্তের মতো কিছুটা আদব ভুলে এস.পি স্যারকে থামায় সে। মেয়েটি যে তার সাথে রাত কাটানোর জন্য অভিযোগ নিয়ে আসে নি, বিষয়টি তাকে যতোটা নির্ভার করে তৃতীয়বারের মতো মেয়েটির অদ্ভুত অভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আসার ঘটনায় সে বিভ্রান্ত বোধ করে। সে হড়বড় করে পূর্বের ঘটনাগুলো বলতে থাকে এস.পি স্যারকে, বলতে বলতে ঘামতে থাকে নূরুল হাবীব। দরদর করে সে ঘাম ঘরের এসির ঠান্ডা বাতাসকে অগ্রাহ্য করে ইউনিফর্ম গলে পা বেয়ে কার্পেটে শুষে যেতে থাকে।
এস.পি নিজেও কিছুটা ঘেমে যায় বৃত্তান্ত শুনে। ঠিক এরকমই একটা অভিযোগ নিয়েই এসেছে মেয়েটি। নূরুল হাবীবতো এখনো শোনেইনি সেটা, কিন্তু মিলে গেছে বর্তমান অভিযোগটির সাথে। এবার একেবারে শহরের সম্ভ্রান্ত এক ঘরের ভেতরে। কী করে বিনা অভিযোগ, বিনা ঘটনায় সেই বাড়িতে প্রবেশ করে তারা। অথচ পূর্বের দুই দুইটি ঘটনা প্রমাণ দিচ্ছে, এমন ঘটনা অবাস্তব নয়।
দুশ্চিন্তায় পড়ে যান এস.পি সাহেব। নানা ধাপের চাকুরি জীবনে নানা বৈচিত্র্যময় বীভৎস ভয়াবহ ক্রাইম মোকাবেলা করেছেন তিনি। কিন্তু এমন অদ্ভুত সমস্যায় পড়েননি কখনো। নূরুল হাবীবকে চোখ-কান খোলা রাখতে আদেশ দেন সে রাতে। আর ঠিক দুদিনের মাথায় সেই সম্ভ্রান্ত বাড়িতে বারো বছরের মেয়েটিকে ধর্ষিত রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার ঘণ্টা পার না হতেই মেয়েটির গৃহশিক্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ।
ডায়েরি, কোর্টে চালান দেয়া ইত্যাদির দায়িত্ব অন্য অফিসারের হাতে দিয়ে এবার নূরুল হাবীব লক্ষ্য নির্দিষ্ট ও দৃঢ় করে ছোটে সেই রহস্যময়ী মেয়েটির সন্ধানে। এস.পি স্যারের রুম থেকে বের হওয়ার পর থেকে আর মেয়েটিকে খুঁজে পায়নি সে। শহরতলীর নার্সারির পেছনের ঘরটি তালাবদ্ধ। নার্সারির মালিককে জিজ্ঞেস করে উত্তর পায়, এতো শহর ছেড়ে চলে যাওয়া ডাঃ হাফিজউদ্দিনের চেম্বার। এখানে বসে রোগী দেখতেন তিনি। চলে যাবার পরতো এ ঘর আর খোলা হয়নি।
খটকা লাগে নুরুল হাবীবের। সে সব খুলে বলতেও পারেনা। বলতে না পারার অস্বস্তি, আর নার্সারির মালিকের দেয়া তথ্যের আকস্মিকতা তাকে অস্থির করে। তার দমবন্ধ লাগে। গত একবছরে রাতের পর রাত কাটিয়েছে সে এ ঘরে। কেমনে এ কথা সে এই আম পাব্লিককে বলে! মেয়েটিই বা কোথায় উধাও হলো! ঘুমের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে লাফিয়ে উঠে সে এক অজানা আতঙ্কে। না, এর রহস্য তাকে জানতেই হবে।
পুলিশী দায়িত্বের সব ভাবভঙ্গ, কাঁটাতার গুটিয়ে সে একান্তে চা সিগারেট খেয়ে ভাব জমায় নার্সারির মালিকের সাথে। একথা সেকথায় নানা প্রসঙ্গে ডাঃ হাফিজ উদ্দিনের প্রসঙ্গ উঠায়। কিন্তু নার্সারির মালিক চতুর লোক, কিছুতেই মুখ খুলে না। সপ্তাহ খানেক চেষ্টা করার পর, অর্ধেক বাড়ি ডাঃ হাফিজউদ্দিন বিক্রি করতে পারেন নি আর তিনি এখন ঢাকায় ছেলের কাছে থাকেন ছাড়া আর কোন খবরই উদ্ধার করতে পারে না নূরুল হাবীব।
হাল ছেড়ে দেবে যখন, তখন একদিন পুলিশ ধর্ষণ প্রবণ এলাকা হিসেবে গত পাঁচ বছরে ডায়েরিকৃত ধর্ষণ মামলার হিসেব চেয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে জরুরি মেইল পাঠায় তিন কর্মদিবসের সময় দিয়ে। দ্রুত উত্তর তৈরি করতে তথ্য উপাত্তের সন্ধানে পুরনো ফাইল ঘাটতে গিয়ে বছর পাঁচেক আগের এক এজহার হঠাৎ হাতে আসে তার। ডাঃ হাফিজউদ্দিনের করা মামলা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েটি তার শহরতলীর বাড়িতে ফেরার সময় রাস্তায় ধর্ষিত হয়েছে। সেখানেই সে আবিষ্কার করে ডাঃ হাফিজউদ্দিনের মোবাইল নম্বর। তৎক্ষণাৎ সাত রাজার ধন প্রাপ্তির মতো অভূতপূর্ব আনন্দ অনুভব করে নূরুল হাবীব।
দেরি করে না নূরুল হাবীব। সাথে সাথে নম্বরটাতে ফোন দেয়। রোগী হিসেবে পরিচয় দেয় নিজেকে। পুলিশ শুনলে ডাঃ হাফিজউদ্দিন দেখা করতে নাও রাজি হতে পারেন। সাবধানের মার নেই। ফোনেই ঠিকানা জেনে পরদিনই রওয়ানা হয় ঢাকার উদ্দেশ্যে। পরদিন তিনি যখন মোহাম্মদপুর শাহজাহান রোডে ডাঃ হাফিজউদ্দিনের সাইনবোর্ড খুঁজে পায় তখন সন্ধ্যা প্রায় অতিক্রান্ত। চেম্বারেই পাওয়া যায় তাকে। টিমটিমে আলোয় পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন ডাঃ হাফিজউদ্দিন, গলায় একটা স্টেথো। সামনে-পাশে গোটাকয় চেয়ার থাকলেও মানুষ বা রোগী কেউ নেই। নূরুল হাবীব ভনিতা না করে নিজের আসল পরিচয়টা দেয়। কিন্তু একটা মিথ্যে তাকে বলতে হয়, পাঁচ বছর আগের ধর্ষণ মামলাটি পুনঃতদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে সে। শোনে ডাঃ হাফিজউদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, বলেন, আমিতো কোন পুনঃতদন্ত চাইনি কে আপনাকে আবার দায়িত্ব দিলো, কেনো দিলো! নূরুল হাবীব মিথ্যে বলতে পারে অনায়াসে। কিন্তু এবার একটু আটকে আটকে যায়। বুকের ভেতরে কোন অচেনা আতঙ্ক হাতুড়ি পেটায়। পুলিশের চাকরিতে কত গলা কাটা, মাথা কাটা, নাড়িভুড়ি বের করা মৃতদেহ হাতিয়েছে সে, ঘাবড়ায়নি কখনো। আজ একটা সামান্য ধর্ষণ ঘটনার কেসে এক নড়বড়ে বৃদ্ধের কাছে ঘাবড়ে যেতে থাকে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু বুঝতে দেয় না। কণ্ঠে যথাসাধ্য আত্মবিশ্বাস সংহত করে বলে, আপনি চান না ধর্ষকের বিচার হোক, আর কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার না হোক? ধর্ষনের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স, আপনি জানেন বোধহয়, এবার আপনার মেয়ের ধর্ষকের শাস্তি হবেই হবে, নিশ্চিত থাকুন।
এই উত্তেজিত ভাষণ স্থিতধী ডাঃ হাফিজউদ্দিনকে মোটেই বিচলিত করে না। তিনি নির্বিকার। নির্মোহ কণ্ঠে বলেন, শোনেন আমার মেয়েটা নেই। কাজেই আর কোন মেয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আপনি আসুন।
নেই মানে! হাফিজউদ্দিন পুনরায় পত্রিকাটা চোখের সামনে খুলে ঠাণ্ডা গলায় বলে, নেই মানে নেই। আত্মহত্যা করেছে। কেন যারা পুনতদন্তের নির্দেশ দিয়েছে তারা জানায়নি আপনাকে? আমার মেয়েটা আমার চেম্বারের কড়িকাঠে ঝুলে গলায় দড়ি দিয়েছে!
নূরুল হাবীব চমকে উঠে দাঁড়ায়। চেম্বারের কড়িকাঠে ঝুলে, নার্সারির মালিক জানিয়েছিল ডাঃ হাফিজউদ্দিন শহর ছেড়ে যাবার পর ঐ চেম্বারের দরজা আর খোলা হয়নি।
হাঁটুকাঁপা আতঙ্ক নিয়ে নুরুল হাবীব জানতে চায়, আমি আপনার মেয়ের একটা ছবি দেখতে পারি। ফ্যানের বাতাসে উড়তে থাকা পত্রিকাটিকে এক হাতে চেপে ধরে অন্য হাতে টেবিলের ড্রয়ার খুলে ডাঃ হাফিজউদ্দিন। ড্রয়ারের ভেতরে রাখা খয়েরি রং এর ডায়েরি থেকে একটা লেমিনেট করার ফটোগ্রাফ এগিয়ে দেয় নূরুল হাবীবের দিকে। নূরুল হাবীবের মনে হয় তার পায়ের নীচে মাটি প্রচণ্ড ভূমিকম্পে দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে আর সে তলিয়ে যাচ্ছে ঠিকানাহীন অতল গহীনে...
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- একটি দিন by হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

উত্তর বাবাকে আর দিতে হয় না— মা ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, 'খাবি আবার কী? মেয়ের জ্বর তা যেন বোঝেন না৷ হাড়মাস আমার জ্বালিয়ে খেলে৷'
রামরতনবাবু মৃদুস্বরে বলেন, 'আহা ছেলেমানুষ ওকে অমন করে বকছ কেন? ওরে রমা এবার তোর জ্বর ছেড়ে যাবে রে৷ তার পর তোকে ভাত দেব৷ এই দেখ না আর কটা দিন৷'
বাবার আশ্বাসবাণী শুনে রমার মুখে হাসি দেখা দেয়— বিছানার ওপরে উঠে বসে বলে, 'হ্যাঁ বাবা তাড়াতাড়ি আমার জ্বর সেরে দাও না, তার পর—'
রমা তার কথা শেষ করতে পারে না৷ কথার মাঝেই মা বলেন, 'হ্যাঁ গো, আজকে একটা ডাক্তার ডাকবে তো? আর তো পারা যায় না মেয়েটাকে নিয়ে৷ রোগে ভুগে ভুগে দেখ না মা আমার আধখানা হয়ে গেছে৷'
রামরতনবাবু কোনও উত্তর দেন না৷ ওদিক থেকে বড় মেয়ে রানী ডাকে, 'মা উনুন জ্বলে যাচ্ছে শিগগির এস— চায়ের জল হয়ে গেছে৷' সুরমার আর কথা বলা হয় না৷ মেয়ের ডাকে চলে যেতে হয়৷
রানী চা এনে দেয়৷ রামরতনবাবু তাঁর হোমিওপাথি চিকিৎসার বই এবং বাক্স নিয়ে বসেন৷ সুতোবাঁধা চশমাটা চোখে লাগিয়ে বইটাতে গভীর মনোনিবেশ করেন৷ খানিকটা পড়ে মুখে তুলে জিজ্ঞাসা করেন, হ্যাঁ রে, তোর গায়ে-হাতে ব্যথা আছে?'
রমা মাথা নেড়ে জবাব দেয়, হ্যাঁ বাবা, খু-উ-ব৷'
'কই গো, এখনও যে বাজারে গেলে না?' বলতে বলতে সুরমা এসে পড়ে৷ রামরতনবাবু যেন একটু থতমত খেয়ে গেছেন বলে মনে হয়৷ একদৃষ্টে কয়েক সেকেন্ড রামরতনবাবুর দিকে তাকিয়ে থেকে সুরমা বলে 'কী নুড়োর চিকিচ্ছে হচ্ছে তোমার? এই একটু আগে কথা হল ডাক্তার আনবার জন্যে তা সব বুঝি গুলে খেয়ে ফেললে? আচ্ছা তুমি কি মেয়েটাকে মেরে ফেলতে চাও? তোমার ওই ছাই-এর চিনি খেয়ে কি ওই অসুখ সারে? এত সস্তায় যদি অসুখ-বিসুখ সারত, তা হলে পয়সা খরচ করে আর কেউ ডাক্তারি পড়ত না৷ তোমার ওই মুন্ডুর চিকিচ্ছে শিকেয় তুলে রাখ৷ যদি মেয়েটাকে বাঁচাতে চাও তো ডাক্তার ডাক৷' শেষের দিকে গলা ভারী হয়ে আসে৷ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে সুরমা সশব্দে পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়৷
রামরতনবাবুর মনটা খারাপ হয়ে যায়৷ ডাক্তার ডাকতে তাঁর অসাধ, না সত্যই তিনি মেয়েটাকে মারতে চান? মাসের শেষ— এখন টাকা হাতে নেই৷ শুধু তো ডাক্তার ডাকলেই হল না, তার সঙ্গে দামি দামি ওষুধের দাম জোগাবেন কোথা থেকে? এ-মাসে আবার বাড়ির ট্যাক্স, ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম সব পড়ল এক সঙ্গে৷ রানীর বিয়ের জন্য তিনি ইনসিওর করেছেন৷ রানীর বয়স এখন বারো৷ বাংলাদেশে মেয়ের বিয়ে তো দিতেই হবে৷ সেই জন্য তিনি আগেই কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন৷ ভেতরে ভেতরে তিনি আবার নাকি পাত্রের চেষ্টাও করেন৷ যদি মেয়েটাকে কোনওক্রমে বাগদত্তা করে রাখা যায় তা হলে অনেকটা নিশ্চিত৷ এখন কেবল ভাবনা ছোট মেয়েটাকে নিয়ে৷ বারো মাসের মধ্যে ছ'মাস মেয়েটির অসুখ লেগেই আছে৷ একে তো দেখতে তেমন ভাল নয়, তার ওপর রোগে রোগে মেয়েটির শ্রী দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ কী যে করবেন এটিকে নিয়ে— রামরতনবাবু আর ভেবে কূল কিনারা পান না৷ অগত্যা চটের থলিটা নিয়ে বাজারে চলে যান৷
ঠিক অফিস যাওয়ার সময়টিতে বৃষ্টি নামে৷ এই টিপটিপুনি কেরানি-ভেজানো বৃষ্টি লোককে একেবারে জ্বালাতন করে মারে৷ এ যেন নিয়ম করে আসে৷ অফিস যাওয়ার সময়টাতে বৃষ্টি, তার পরেই ধরে যায়৷
রামরতনবাবু কী আর করেন৷ অফিস তো যেতেই হবে৷ ছাতাটাকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করেন৷ হঠাৎ সুরমা বলে ওঠেন, 'ডালিম আর কমলালেবু আনতে ভুলো না যেন৷ এবারে বড় মাগ্গি৷ ফলওলাগুলো যেন সব গলা কাটে৷ সেদিন ওই চাটুজ্যেরা কিনলে চার পয়সা জোড়া নেবু৷ তুমি তো পয়সা পয়সা বেশ নেবু আনো৷ ভুলো না যেন৷'
রামরতনবাবু দ্বিতীয়বার রাস্তায় পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে রানী বলে, 'আজ আমার রিবন আনতে ভুলো না যেন৷ লাল রঙের আনবে, বুঝলে বাবা? আর যদি লাল না-পাও তো আসমানি৷ দাঁড়াও বাবা লিখে দিচ্ছি, নয় তো তুমি আবার ভুলে যাবে৷'
একটুকরো সাদা কাগজে 'লাল কিংবা আসমানি রিবন' কথা কয়টি লিখে বাবাকে কাগজটা দেওয়ার জন্য বাইরে এসে রানী দেখে বাবা চলে গেছেন৷ রানীর মুখ গম্ভীর হয়ে যায়৷ পরক্ষণে চৌকিটার দিকে চেয়ে রানী চিৎকার করে ওঠে, 'মা বাবা খাবারের ডিবেটা ফেলে গেছে৷'
সুরমা মাছ রান্না ফেলে তাড়াতাড়ি উঠে এসে বলেন, 'যা, যা, দৌড়ে যা, এখনও বোধহয় মোড় পেরোয়নি, যা শিগগির যা৷ হ্যাঁ, শোন পেছনে ডাকিস না যেন৷'
এক হাতে খাবারের ডিবে আর এক হাতে কাগজের টুকরোটা নিয়ে রানী দৌড়তে থাকে৷ রামরতনবাবুর একটু আস্তে চলা অভ্যেস৷ রানী গিয়ে একেবারে সামনে হাজির হয়৷ খাবারের ডিবেটা হাতে দিয়ে বলে, 'বাবা তুমি খাবার ফেলে এসেছিলে কেন?' ডিবেটা হাতে নিয়ে রামরতনবাবু বলেন, 'যা, যা, বাড়ি যা, বৃষ্টিতে ভিজিসনি, অসুখ করবে৷'
রানী ফিরে যায়৷ বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই সুরমা বলে, 'বৃষ্টিতে ভিজলি তো? তোরা আমার হাড়মাস জ্বালিয়ে খেয়ে তবে ছাড়বি৷ কেন, ছাতাটা নিয়ে যেতে কী হয়েছিল৷ ছাতা ছাতা করে তো প্রাণ অস্থির করে তুলছিল তখন৷ নতুন ছাতাটাকে তো এক বার মাথায় দিতে দেখলাম না এ পর্যন্ত৷'
রানী মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে তাকে৷ তার যে কী দোষ হল, তা বুঝতে পারে না৷ ছাতা নেওয়ার সময়ই বা তখন কোথায়? দেরি হয়ে যাবে যে?
মাছের কড়াটা কলতলায় রাখার সময় সুরমার দৃষ্টি পড়ে মেয়ের হাতের দিকে— জিজ্ঞাসা করেন, 'হাতে ওটা কী দেখি?'
রানী হাতের দিকে চেয়ে দেখে— ওই যা! সেই কাগজটাই দেওয়া হয়নি বাবাকে৷ বাবা নিশ্চয়ই ভুলে যাবেন রিবন আনতে— হয়ত বা নীল রঙের এনে হাজির করবেন৷ রানীর চোখের কোণে জল দেখা দেয়৷ কাগজটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে কাঁদতে থাকে৷
কাগজের টুকরোর লেখা কয়টি পড়ে মা বললেন, 'আজ না-হয় কাল হবে তাতে কাঁদিস কেন? একটুতেই মেয়ের আলগা চোখের পানি বেরিয়ে আসে৷'
অফিস থেকে ফিরতে আজ রামরতনবাবুর একটু দেরি হয়৷ রানী বাবার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকে৷ রমা বাবার প্রতীক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়ে৷ রানী বলে, 'মা, বাবার আসতে আজ দেরি হচ্ছে কেন?' সুরমা ছেঁড়া সেমিজটা সেলাই করতে করতে বলেন, 'জানিনে বাপু৷' কার যেন জুতোর শব্দ শোনা যায়৷ অবশেষে রামরতনবাবু এসে পড়েন৷ হাতে তাঁর ফল তো নাই, রিবনও না৷ আছে কেবল একতাড়া কাগজ৷ রানী ছুটে আসে, 'কই বাবা, আমার রিবন?'
বিরক্ত হয়ে রামরতনবাবু উত্তর দেন, 'যা, যা, জ্বালাতন করিসনে বাপু৷ আমার কি মরবার সময় আছে? অফিসের কী কাজই না পড়েছে৷ নাকে দড়ি দিয়ে খাটিয়ে নিচ্ছে৷ আজ সাহেব কী বকুনি না দিলে৷ বাড়িতে কাজ এনে করতে হবে, এখন এত কাজ৷'
সুরমা আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা করে না৷ মুখ গম্ভীর করে থাকে৷ রামরতনবাবু ততক্ষণে কাগজের তাড়াটা আলমারির মাথায় রেখে হাত-পা ধুয়ে আসেন৷ সুরমা একটা রেকাবিতে করে একটা সন্দেশ, এক গ্লাস জল এনে হাতে দেয়৷ কোনও কথা বলে না৷ রামরতনবাবু জিজ্ঞাসা করেন, 'আজ সমস্ত দিন রমা কেমন ছিল?' বারুদে আগুন পড়লে যেমন হয়, সুরমা জ্বলে উঠে বলে, 'তার সঙ্গে তোমার কী দরকার? তোমার কাছে তো তার বাঁচা-মরা দুই-ই সমান৷ মেয়েটির চিকিচ্ছে করাবে না, পথ্য দেবে না, ওকে তুমি মেরেই ফেলবে বলে ভেবেছ৷ আহা, মেয়েটা এত ফল ভালবাসে, তা একরত্তি ফল আনতে প্রবৃত্তি হল না?'
রামরতনবাবুর মেজাজও আজ তেমন ভাল থাকে না৷ অফিসে সাহেবের বকুনি খেয়ে অবধি তাঁর মন খরাপ৷ সুতরাং এক পশলা হয়ে যায়৷ অবশেষে সুরমা কেঁদে ফেলে৷ রামরতনবাবু আর বেশিদূর অগ্রসর হন না৷ আলমারির মাথা থেকে কাগজের তাড়াটা নিয়ে অফিসের কাজে বসে যান৷
রানী বলে, 'মা ভাত দাও না গো, বড় খিদে পেয়েছে৷' মা চিৎকার করে ওঠে, 'আমায় খাবি রাক্ষসী৷ তোদের সব নুন গিলিয়ে মারতে হয়৷ সন্তান পেটে ধরা যে কত জন্মের পাপ— এমন কেউ যেন না-করে, তোদের জন্যই না আমার আজ এই দশা৷ বেরিয়ে যা আমার সামনে থেকে৷'
রানী অবাক হয়ে যায়৷ এমন সময় ঝি এসে বলে, 'দিদিমণি, কড়াটা বার করে দাও না, ততক্ষণে মাজি৷' কী জানি কেন রানীও রেগে ওঠে৷ ঝাঁঝের সুরে উত্তর দেয়, 'যা, আমি পারব না, আমি তোর চাকর নই৷'
অগত্যা সুরমাকেই উঠতে হয়৷ ঝি গজগজ করতে করতে কড়া মাজে৷ ভাত বেড়ে সুরমা রানীকে বলে, 'যা বলগে যা, ভাত বাড়া হয়েছে৷' রানীকে আর বলতে হয় না৷ রামরতনবাবু উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ যাচ্ছি৷'
খেতে খেতে রামরতনবাবু বলেন, 'বাঃ, চিংড়ির ডালনাটা তো বেশ হয়েছে৷' অমনি সুরমা বলে ওঠে, 'আর একটু দেব হ্যাঁ গা৷'
রামরতনবাবু বলেন, 'না না তোমাদের কম পড়বে৷' সুরমা বলে, 'না গো না৷ খাবার মধ্যে কেবল আমি, নাও না আর একটু৷'
কিছুক্ষণ নীরব থেকে রামরতনবাবু বলেন, 'হ্যাঁ ভাল কথা, আজ সলিলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল৷' সুরমা উৎসাহের সুরে বলে, 'কী বলে সে? পাস-টাস দিতে পারবে না? তোমার চেহারা দিনকে দিন যা হচ্ছে তা আর চোখে দেখা যায় না, মেয়েটারও অসুখ৷ চল না গো এই সামনের পুজোর ছুটিতে মধুপুরে ঘুরে আসি? তুমি কী বল?'
রামরতনবাবু বলেন, হ্যাঁ, সে তো রেলের পাস দেবে বলেছে৷ কিন্তু, শুধু পাস দিলেই তো আর যাওয়া হয় না৷ চেঞ্জে যেতে কত খরচ৷'
সুরমা জিজ্ঞাসা করে, 'কত খরচ হিসেব করে দেখ না৷ আজ রাত্তিরেই হিসেব কর কেমন!'
রামরতনবাবু ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন৷
সুরমা বলে, 'আমি এক্ষুনি খেয়ে আসছি, তুমি ততক্ষণ কাগজ-পেন্সিল নিয়ে বস না?'
এতে রানীরও উৎসাহ দেখা দেয়, বলে, 'হ্যাঁ বাবা চল না বেড়াতে অন্য কোথাও, কলকাতা যেন পুরনো হয়ে গেছে৷ হ্যাঁ মা, চল না?'
'কত দিন যে রেলে চড়িনি!'
খাওয়াদাওয়া সেরে সুরমা ঘরে গিয়ে দেখে রামরতনবাবু অঘোরে ঘুমোচ্ছেন৷
রানী বলে, 'মা, দেখলে মা, বাবা আর হিসেব করলে না৷'
সুরমা বলে, 'চুপ চুপ, চেঁচাসনি৷ সারাদিনের খাটুনির পর মানুষটাকে তোরা একটু ঘুমোতেও দিবি নে? যা গোলমাল করিসনি, শুয়ে পড়৷'
>>>২৪ এপ্রিল ১৯৮৮ আজকাল রবিবাসর-এ প্রকাশিত৷ (প্রথম প্রকাশ তিরিশ বছর আগে 'দেশ' পত্রিকায়৷)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, April 14, 2021
চুলের অকালে পেকে যাওয়া রোধ করবেন যেভাবে

মুঠোভর্তি কারি পাতা ১ কাপ নারকেল তেলে ফুটিয়ে নিন। ৬ থেকে ৮ মিনিট ফুটান। ঠাণ্ডা হলে চুলের গোড়ায় ম্যাসাজ করুন নিয়মিত। এটি চুলের অকালে পেকে যাওয়া রোধ করবে।
পেঁয়াজ ও লেবুর রস
সমপরিমাণ পেঁয়াজের রস ও লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে চুলের গোড়ায় ম্যাসাজ করুন। আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
ডিম ও মেহেদি
২ টেবিল চামচ মেহেদি গুঁড়ার সঙ্গে ১টি ডিম ফেটিয়ে মিশিয়ে নিন। ১ টেবিল চামচ টক দই মেশান। মিশ্রণটি চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগিয়ে রাখুন। ৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
কালোজিরার তেল
কালোজিরার তেল সামান্য গরম করে চুলের গোড়ায় ম্যাসাজ করুন। সারারাত রেখে পরদিন ধুয়ে ফেলুন মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে। সপ্তাহে একবার ব্যবহার করলে ফল পাবেন দ্রুত।
সরিষার তেল
রাতে ঘুমানোর আগে সরিষার তেল ম্যাসাজ করুন চুলে। পরদিন সকালে ভেষজ শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
তথ্য: ফেমিনা
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, April 12, 2021
মাথা ব্যথায় কী করবেন

দুশ্চিন্তা (টেনশন) থেকে সৃষ্ট মাথা ব্যথা ও মাইগ্রেন প্রাথমিক পর্যায়ের বা সাধারণ মাত্রার মাথা ব্যথা। ৯০ শতাংশ মাথা ব্যথার কারণ হিসেবে কাজ করে দুশ্চিন্তা। মানসিক চাপ, চোখের অস্বস্তি, ঘুমের অভাব, ক্ষুধা, অস্বস্তিকর ঘুমের ভঙ্গি, ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা, পেশির খিঁচুনি, শিরায় রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, অতিমাত্রায় অ্যালকোহল ও ধূমপান, পানিশূন্যতা, জেনেটিক অবস্থা ইত্যাদি কারণেও এ মাথা ব্যথা হয়। মাইগ্রেন অন্য মাথা ব্যথার চেয়ে মারাত্মক ও তীব্র। ক্রনিক নিউরোলজিক্যাল ডিস-অর্ডার এবং আলোয় সংবেদনশীলতা, বমি ভাব ও অবসাদগ্রস্ততা মাইগ্রেনের ব্যথার সঙ্গে দেখা দেয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ের মাথা ব্যথার উৎস হিসেবে গলার পেছন দিকটা, মাথা ও মানসিক অবস্থার কথা বলা হয়। এটা প্রায়ই মারাত্মক মাথা ব্যথা হিসেবে দেখা দেয়। ক্ষেত্রবিশেষে তা প্রাণনাশীও হতে পারে। এ ব্যথা হঠাৎ কয়েক মিনিটের মধ্যে তীব্রতা পায় এবং দ্রুতই কমে যেতে পারে। অনেক সময় ঘুম থেকে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে জাগতে হয়। তখন দৃষ্টিশক্তি হয় অস্বাভাবিক। ঘাড় নড়ানো যায় না, ব্যথার সঙ্গে জ্বরও আসতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ের মাথা ব্যথার কারণ হিসেবে বাড ক্লটস, মস্তিষ্কে টিউমার, অ্যানিউরিজমস (ধমনির দেয়ালের দুর্বলতার কারণে ধমনি স্ফীত হয়ে ওঠা), মিনিয়েচার স্ট্রোক এবং কার্বন মনোক্সাইড বা বিষাক্ত উপাদানের প্রভাবের কথা বলা হয়।
করণীয়
প্রাথমিক পর্যায়ের মাথা ব্যথার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা প্রচুর পানি পান এবং বাদাম, শাক, শিমের বিচি, ডার্ক চকোলেটের মতো ম্যাগনেসিয়ামপূর্ণ খাবার খেতে বলেন। পর্যাপ্ত ঘুমও মাথা ব্যথা থেকে বাঁচার উপায়। পনির, গাজন প্রক্রিয়ায় বানানো খাবার, অ্যালকোহল ইত্যাদিতে হিস্টামিন নামের উপাদান থাকে, যা মাথা ব্যথা সৃষ্টি করে। কাজেই যাদের মাথা ব্যথা হয় এবং যারা এ ধরনের খাবারে অভ্যস্ত তাদের সাবধান হতে হবে। সাধারণ মাথা ব্যথায় ক্যাফেইন গ্রহণ করা যেতে পারে। আর মাথা ব্যথা কমাতে অবশ্যই একটু খোলা বাতাসে হাঁটাহাঁটি করুন। কারো এসব উপায়ে ব্যথা না গেলে প্রচলিত ওষুধগুলো খাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের মাথা ব্যথা নিরাময়ে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ এ ব্যথা জটিল কোনো কারণে ঘটে থাকে।
অর্গানিক ফ্যাক্টস অবলম্বনে সাকিব সিকান্দার
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, April 5, 2021
আলু থেকে জন্ম নেবে গোলাপ গাছ
প্রথমে গোলাপ গাছের একটি ডাল নিন। যেটা কিছুদিন বেঁচে থাকবে। এরপর গোল আলু, প্লাস্টিকের বোতল, মাটি, ছুরি এবং ছোট একটি পাত্র বা টব নিন। এরপর শুরু হয়ে যাক আপনার গোলাপ চাষের কার্যক্রম।

ছুরি দিয়ে কাণ্ডের বাড়তি পাতাগুলো সাবধানে কেটে ফেলুন। যাতে মূল কাণ্ডের কোনও ক্ষতি না হয়। এরপর আলুর মাঝ বরাবর একটি ছোট্ট ছিদ্র করুন। সেই গর্তে গোলাপের ডালটি বসিয়ে দিন। খেয়াল রাখবেন ডালটি যেন আলুর মধ্যে শক্তভাবে আটকে থাকে। যাতে কাণ্ড বেঁকে বা ভেঙে না যায়।
মাটিতে গর্ত করে সেখানে গোলাপের ডালসহ আলুটি রেখে মাটি দিয়ে ঢেকে দিন। অথবা টব সাজিয়ে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে পাত্রের এক চতুর্থাংশ মাটি দিয়ে ভরে নিন। প্রয়োজনে খুরপি দিয়ে ভালোভাবে মাটি ভরুন। এবার আলুটিকে পাত্রের মধ্যে বসিয়ে দিন। আরও কিছু মাটি আলুর ওপরে দিয়ে পাত্রটি ভরিয়ে ফেলুন।

রোপণের জন্য খোলা জায়গা না পেলে সেক্ষেত্রে বোতলটিকে কেটে দু’ভাগ করে নিন। এখন কাটা বোতলের নিচের অংশকে ব্যবহার করতে পারেন। এরপর ডালটির উপরের দিকে বোতলের উপরের অংশ দিয়ে ঢেকে দিন। খেয়াল রাখবেন যেন বোতলের মুখ খোলা থাকে।
রোপণের পর থেকে এক সপ্তাহ অপেক্ষা করুন। দেখবেন আপনার গোলাপ গাছটি দ্রুত বড় হচ্ছে। এভাবে ঘরোয়া পদ্ধতিতেই নিজের গোলাপের কাণ্ডে নতুন গোলাপ ফোটাতে পারেন।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1266)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ▼ 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)



