Saturday, October 26, 2013

কী হবে? কী হতে পারে?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজপথে রণসাজে পুলিশ
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্ন এখন ‘কেমন আছেন?’ অথবা ‘কী করছেন’-জাতীয় ব্যক্তিগত খোঁজখবর নয়, এখন একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে প্রথমেই এই জিজ্ঞাসা—‘কী হবে?’ আরেকটু বিস্তৃত করে বললে, ‘২৫ অক্টোবরের পর কী হবে?’ প্রশ্নটি সবার মুখে, কারণ উত্তরটি কারও জানা নেই, অথচ এই উত্তরের ওপর নির্ভর করছে দেশের স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এবং উন্নয়ন, একুশ শতকের পথে এগিয়ে চলা অর্থাৎ দেশটির ভবিষ্যৎ। পুরাকালে মানুষজন এ রকম উত্তর-অসাধ্য প্রশ্নের সামনে পড়লে ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাদের কাছে দৌড়াত। স্কুলে পড়েছি গ্রিসের ডেলফির সেই বিখ্যাত ওরাকলের কথা, মিসরের স্ফিংসের কথা। অথবা গাছের পাতায় অথবা ক্রিস্টাল-গোলকে ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়া পরা-মানুষদের কথা। পুরাকাল সেই কবেই গত হয়েছে, এখন রকেট-বিজ্ঞান আর ন্যানো প্রযুক্তির যুগ। ওরাকল এখন কম্পিউটারের সফটওয়্যার। কিন্তু ২৫ অক্টোবরের পর বাংলাদেশে কী হতে পারে, তা বলে দেওয়ার সাধ্য সবচেয়ে উন্নত কম্পিউটারেরও যে নেই! পুরাকালের কথা উল্লেখ করেছি—যতই দিন যাচ্ছে আমাদের মনে হচ্ছে, আমরা ভূতের মতো ক্রমাগত পেছনে যাচ্ছি, সেই পুরাকালের দিকেই।
তা না হলে কুড়ি-বাইশ বছরের গণতন্ত্রচর্চার পর একটা বৈধ নির্বাচন সময়মতো অথবা আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে জাতীয়ভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পীড়িত হতে হবে কেন? আগামী দু-এক দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিশ্চিত করেই বলে দেবে, কী হবে অথবা কী হতে পারে। দেশের মানুষ প্রশ্ন দুটি করছে বটে, কিন্তু প্রশ্ন করার পেছনে প্রথমে যে কৌতূহল, তারপর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল—এখনো আছে—সেসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রোধ। মানুষ সব সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। মানুষ সংঘাত চায় না, হানাহানি চায় না, হরতাল চায় না, জ্বালাও-পোড়াও, রক্তারক্তি, খুন-জখম চায় না। মানুষ চায় একটা সুন্দর নির্বাচন হোক, ভোটের দিন উৎসব হোক, জয়ী-পরাজিতরা করমর্দন করুক, নির্বাচিত সরকার প্রথম দিন থেকেই দেশটাকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করুক। বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশেই সে রকম চাওয়া থাকে মানুষের এবং চাওয়া অনুপাতে পাওয়াও তাদের জুটে যায়। আমরাই শুধু চেয়ে যাই, পাই না। অথচ এ দেশের মানুষের এ রকম পাওয়ার প্রস্তুতি, যোগ্যতা এবং অধিকার রয়েছে। ২৫ অক্টোবর সকালে বসে এই লেখা লিখছি। বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ক্রিকেট খেলা চলছে। আসলে খেলছে তিনটি দল। তৃতীয় দলটি বৃষ্টি।
আজ খেলাটা সেই দলের অধিকারে চলে গেছে। ফলে কোনো দলের জয়ের সম্ভাবনা আর নেই। আমাদের দেশেও রাজনীতির খেলা হয় তিন দলে—সরকারি দল বা জোট, বিরোধী দল বা জোট এবং আমাদের তিক্ত, ক্লিষ্ট, পথভ্রষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এই তৃতীয় দলের জন্য আমরা কিছুতেই জিততে পারি না, শুধু হারি। এই সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য নিয়মগুলো হচ্ছে আলোচনার পরিবর্তে সংঘাত, সৌজন্যের পরিবর্তে শত্রুতা, যুক্তির পরিবর্তে গলাবাজি। নিয়মের মধ্যে আরও আছে একে অপরের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করা, কটু কথা এবং গালিগালাজের (এবং সময় সময় অশ্লীল কথাবার্তা) অকাতর প্রয়োগ। এই সংস্কৃতি তৈরি করে বিভাজন। ফলে এখন পেশাজীবীরা, বুদ্ধিজীবীরা, বিদ্যাজীবীরা সবাই দল/জোটের বিভাজন রেখা ধরে বিরোধী দুই শিবিরে ঢুকে পড়েছেন। দুর্নীতি এই সংস্কৃতির এক বড় চালিকাশক্তি। এখন দুর্নীতিবাজদের সমীহর চোখে দেখা হয়। তারা দলগুলোর অর্থায়নের বড় উৎস। তাদের সমীহ না করলে দল চলবে কেমন করে? কিন্তু এই পেছনে নিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির তো অবসান চাই। তা না হলে দেশটা পড়বে এক বিশাল খাদে, যেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো হবে প্রায় অসম্ভব। মনে রাখতে হবে, এ দেশে দুই-চার কোটি নয়, ষোলো-সতেরো কোটি মানুষের বাস। মিয়ানমার আয়তনে আমাদের আট গুণ, জনসংখ্যা আমাদের চার ভাগের এক ভাগ।
দেশটি যেভাবে উঠে দাঁড়াচ্ছে, তাতে আরও দশ বছর পর আমাদের ধনাঢ্যরা ইয়াঙ্গুনে বাজার-ভ্রমণে যাবেন; অথবা অবকাশযাপনে। ষোলো-সতেরো কোটি মানুষের দেশে বিরাট কোনো বিপর্যয় নামলে দিনের পর দিন বিশ্ব মিডিয়ায় আমরা শুধু খারাপ সংবাদ হয়েই থাকব, রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর যেমন ছিলাম। আমরা খারাপ সংবাদের শিরোনাম হতে চাই না। বৃহস্পতিবার মিরপুর স্টেডিয়ামে যখন মোমিনুল নামের ছোটখাটো ছেলেটি অনিন্দ্যসুন্দর খেলা খেলে শতরান করল, আমি তখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনের কাছে ছিলাম। শিক্ষার্থীদের চিৎকারে সারা দালান বুঝি ভেঙে পড়ছিল। সেই সময় কেউ যদি টেলিভিশনের চ্যানেল বদল করে মির্জা ফখরুল অথবা সৈয়দ আশরাফ ২৫ অক্টোবর নিয়ে কী বলছেন, তা দেখতে ও শুনতে চাইত, তাকে নির্ঘাত সেখান থেকে বের করে দেওয়া হতো। এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার চেয়ে আমাদের ক্রোধটাই বেশি। দেশটাকে নিয়ে এভাবে ছেলেখেলা কেন করা হচ্ছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের রশি ধরে বসে আছেন, মাননীয় বিরোধী নেত্রী বসে আছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রশি হাতে। প্রধানমন্ত্রী বেতার-টিভিতে বক্তৃতা দিলেন। একটুখানি সরে এলেন তাঁর ‘একচুলও নড়ব না’ অবস্থান থেকে।
কিন্তু বিশদ করে বললেন না, নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান কে হতে পারেন। তিনি প্রধান থাকলে তো বিরোধীরা নির্বাচনে যাবে না, এমনকি তাঁর জোটে আজ-আছি-কাল-নেই সেই জাতীয় পার্টিও। তার পরও এটি ছিল প্রস্তাব হিসেবে মন্দের ভালো, অন্তত একটা আলোচনা চলতে পারত। কিন্তু এর পরপরই বেগম জিয়া দিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ফর্মুলা। এই ফর্মুলায় যাঁদের থেকে উপদেষ্টা নেওয়ার কথা, তাঁদের কেউ কেউ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন, কেউ কেউ তাঁদের অপারগতা জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করা হয়নি। বেগম জিয়া তাঁর হাত থেকে তত্ত্বাবধায়কের রশিটা একটুখানি আলগা করেননি। যদি তিনি হালনাগাদ একটা চিন্তা উপহার দিতেন, একটা মন্দের ভালো প্রস্তাবও দিতেন, একটা আলোচনা হতো। জাতীয় সংসদে যখন বিরোধী দল গেল, তাদের ওপর সরকারদলীয়রা চড়াও হলেন। যেখানে একটু বাতাস দিলেই চাল উড়ে যায়, সেখানে ছোটখাটো একটা ঝড়ের দেখা পেলেন বিরোধী সাংসদেরা। তাঁরা মনের আনন্দে বাইরের দরজার দিকে হাঁটা দিলেন। ‘বিধি মোতাবেক প্রস্তাব তুলুন’—এ রকম তাঁদের বললেন সরকারদলীয়রা। কিন্তু যাঁরা বললেন, তাঁরা কটা বিধি মানেন, আর যাঁদের উদ্দেশে তা বলা হলো, তাঁরাই বা কটা মানেন, বলুন? বিধি তো সেই একটাই—আমাদের কপালের লিখন। সেই বিধি চিরদিনই যেন বাম।
ফলে অবস্থার কোনো ইতরবিশেষ হলো না। আজ কাগজে দেখলাম, বেগম জিয়া বলেছেন, এই সরকার অবৈধ। এরপর সরকার নিশ্চয় চাইবে তার বৈধতা কী এবং কত প্রকার তা দেখাতে। ফলে ‘কী হতে পারে’ প্রশ্নটির একটি ভীতিকর উত্তরের আশঙ্কাই দেখা যাচ্ছে। তবে আমি আশাবাদী। আশাবাদী না হয়ে তো উপায় নেই। আমি প্রতিদিন কাটাই তরুণদের সান্নিধ্যে, তারাই আমাকে আশাবাদী করে। এদের পরিবর্তে যদি আমার দিন কাটত মতলববাজ আর দুর্নীতিবাজ লোক, উগ্রবাদী এবং জঙ্গিদের সঙ্গে, তাহলে আমিও হতাশায় ভুগতাম। একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে, সরকারের ‘সভা করতে দেব না’ থেকে ‘শর্ত সাপেক্ষে সভা করা যাবে’ অবস্থান পরিবর্তনের মধ্যে। জঙ্গিরা যদি জুমার নামাজের পর বোমা-ককটেল নিয়ে রাস্তায় না নামে, জাতীয়তাবাদীরা যদি দা-কুড়াল-বল্লম নিয়ে অথবা আওয়ামী-সমর্থকেরা যদি লগি-বইঠা নিয়ে রাস্তায় না বেরোয়, তাহলে হয়তো রক্তপাত ইত্যাদি এড়ানো যাবে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের সত্যিকার উদ্যোগ না নিলে হরতাল-জ্বালাও-পোড়াও দেশ অচল করার কর্মসূচি ঠেকানো যাবে না। মানুষ ক্রোধ নিয়েই এখন কথা বলছে এবং মানুষের কথা দুই জোটকে শুনতে হবে। মানুষ নেতিবাচক, ধ্বংসাত্মক রাজনীতি দেখে দেখে ক্লান্ত। মানুষ চায় শান্তি। ফলে এখন দুই জোটকে সংলাপে বসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী যে টেলিফোন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বিরোধী নেত্রীকে, দু-এক দিনের মধ্যে তিনি যেন তা করেন এবং সেই টেলিফোন পেয়ে বিরোধী নেত্রী যেন বলেন, কথাবার্তা শুরু করা যাক। পৃথিবীতে আর কোনো দেশ নেই, যেখানে জনগণ ক্রমাগত নিজেদের জীবন উন্নত করার সংগ্রাম করে যাচ্ছে আর রাজনীতিবিদেরা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের পথে। পৃথিবীতে আর কোনো দেশ নেই, যেখানে কুড়ি বছর মোটামুটি নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্র চললেও প্রধান দুই দলের নেতার মধ্যে কোনো কথাবার্তা অথবা সৌজন্য বিনিময় হয় না। একটি দেশেই—এই হতভাগা দেশেই—আছে এমন অচর্চা। এর থেকে বেরোতে হবে। ‘কী হবে?’ এর উত্তরে আমি বলব, তিতিবিরক্ত মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠবে। ‘কী হতে পারে’র উত্তরে বলব, আমাদের অপরাজনীতির চর্চা, উগ্রবাদ, মধ্য যুগে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা—এসবকে মানুষ রুখে দেবে। দেবে যে আমি নিশ্চিত—আগামী কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহে যা-ই ঘটুক না কেন, অথবা দুই জোট সেসব ঘটানোর জন্য যত প্রাণপাত পরিশ্রমই করুক না কেন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এবার খালেদা জিয়ার এক দফা

গত মাসে একটি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ভারতে গিয়েছিলাম। সেখানে নির্ধারিত অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম ছিল ভারতের পার্লামেন্ট ভবন পরিদর্শন এবং পার্লামেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিং ব্যুরোর উপদেষ্টা ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান রাশিদ আলভির সঙ্গে মতবিনিময়। তিনি পার্লামেন্ট ভবনের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখানোর পাশাপাশি ভারতীয় পার্লামেন্ট কীভাবে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করেন। ভারতীয় পার্লামেন্টে একই সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী ও মোরারজি দেশাইয়ের ছবি শোভা পাচ্ছে। আছে গান্ধী-নেহরুর সঙ্গে নেতাজি সুভাষ বসুর ভাস্কর্যও। কিন্তু বাংলাদেশে পরস্পরবিরোধী মতের নেতাদের ছবি ও ভাস্কর্য একসঙ্গে স্থাপনের নজির নেই। বরং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা থেকে নামফলক ও ছবি নামানো-ওঠানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আমাদের রাজনীতিকেরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও মনেপ্রাণে তা বিশ্বাস করেন না। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাশিদ আলভি বলেন, গত ৬৭ বছরে দেশটি নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে পার হয়ে এসেছে। কিন্তু এক দিনের জন্যও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয়নি। এটাই ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি ও সৌন্দর্য।
সবশেষে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি বললেন তা হলো, একটি দেশে গণতন্ত্র আছে কি না, তার প্রধান মাপকাঠি হলো শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর। তাঁর এই কথায় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক-বন্ধুরা পরস্পরের দিকে তাকান এবং নিজেদের প্রশ্ন করেন, তাহলে কি বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই? সেনাবাহিনী বুটের জোরে বাংলাদেশে দুবার ক্ষমতা নিয়েছে, সে কথা আমরা জোর গলায় বলি। ২০০৭ সালে তারা ক্ষমতা দখল করলেও মঞ্চের আড়ালে ছিল। কিন্তু সেনাশাসনের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা বাদ দিলেও আমাদের বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ পর্যন্ত একটিবারের জন্যও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই দাবি করেন, ২০০১ সালে তাঁর সরকারই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। কার কাছে? লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে। কিন্তু সেই হস্তান্তরও পুরো শান্তিপূর্ণ ছিল না। ১৫ জুলাইতে বঙ্গভবনে আয়োজিত ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে কি তৎকালীন বিরোধী দলের নেতারা গিয়েছিলেন? যাননি। কেন যাননি? বঙ্গভবনে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল দুপুরে। সে অনুযায়ী সবাইকে আমন্ত্রণপত্রও পাঠানো হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোঁ ধরলেন, বিকেলে প্যারেড গ্রাউন্ডে জনসভা করেই তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, তার আগে নয়। এরপর বঙ্গভবন সময়সূচি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
এই সিদ্ধান্তে বিএনপি ক্ষুব্ধ হয়ে সন্ধ্যার ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে যায়নি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাত্যাগী ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দল দুটির নেতা-কর্মীরা মারামারিতে লিপ্ত হলেন। পাল্টাপাল্টি হামলা চলল। এই হলো আমাদের একমাত্র ‘শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের’ নমুনা। আর ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ, ২০০৬ সালের ৩০ অক্টোবর, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় দেশে কী ঘটেছিল, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। এখন আমরা আরেক অক্টোবরের মুখোমুখি। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল লগি-বইঠার আন্দোলন। এবার দা-কুড়াল-বল্লমের রণধ্বনি শুনতে পেলাম। সারা দেশে টান টান উত্তেজনা। গতকাল ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় সরকারের মাথার ওপর আকাশ ভেঙে না পড়লেও বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ককটেল-বোমা ফাটছে। আটক-গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। গুলি-সংঘর্ষে কয়েকজন মারা গেছে। বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া ২৭ অক্টোবর থেকে টানা ৬০ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করেছেন। এটা নাকি তাঁর প্রাথমিক কর্মসূচি। সামনে আরও কঠোর কর্মসূচি আসছে। তাহলে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, জনগণের জীবন-জীবিকার কী হবে? ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা-পরীক্ষা? গোটা জাতি জিম্মি হয়ে পড়ল একটি নির্বাচনের জন্য। সরকার ও বিরোধী দল যে যার অবস্থানে অনড়।
কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাইছে না। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা এক দফার আন্দোলন করেছিলেন—খালেদার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। এখন খালেদা জিয়া আবার এক দফার আন্দোলন করছেন—শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। গত বৃহস্পতিবার শিক্ষক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, সংবিধানের ভেতরেও সমাধান সম্ভব। কীভাবে? যদি প্রধানমন্ত্রী তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং বাকি ৩৪৪ সাংসদের মধ্য থেকে আরেকজন সেই দায়িত্ব নেন। সেই ত্যাগস্বীকারে কি শেখ হাসিনা রাজি আছেন? ১৯৯৫-৯৬ সালে খালেদা জিয়া রাজি ছিলেন না বলে ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা ও একদলীয় নির্বাচন হয়েছে। বাকশাল কেবল আওয়ামী লীগই করেনি, যত কম দিনের জন্য হোক না কেন, খালেদা জিয়াও একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন। এখন কী হবে? যদি শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে আস্থায় এনে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে পারেন, দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষা পাবে। আর যদি না পারেন কিংবা বিরোধী দল কোনো শর্তেই রাজি না হয়, তাহলে কী হবে? চারদিকে অন্ধকার দেখছি। বিরোধী দলের নেতা খালেদা
জিয়া ইতিমধ্যে দেশবাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনার সরকার ২৪ অক্টোবর (গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া ভাষণে বলেছেন ২৭ অক্টোবর) থেকে অবৈধ এবং তিনি অবৈধ সরকারের পতন ঘটাতে দলীয় নেতা-কর্মী ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীরা বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীদের যেখানেই পাওয়া যাবে, তাদের প্রতিরোধ করা হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে ন্যস্ত করা হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের হুঁশিয়ারি, বিরোধী দল সমাবেশের নামে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে আওয়ামী লীগ তা শক্ত হাতে প্রতিহত করবে। অপর যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক জামায়াত-শিবিরের নাশকতা সম্পর্কে তাঁর কাছে খবর আছে, এই তথ্য জানিয়ে দলীয় কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ‘জুমার পর দেশকে যেন তারা রক্তাক্ত আফগানিস্তানে পরিণত করতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।’ দলীয় নেতা-কর্মীরা কতটা সজাগ ছিলেন, জানি না। তবে জনগণ ভয়ে আছে, আতঙ্কে আছে। নেতারা পাঁচ বছর পর একটি নির্বাচন করবেন এবং জনগণকে ভয়ভীতি ও শঙ্কার মুখে রাখবেন। এটাই জনগণের প্রতি নেতাদের বড় উপহার। আজ আওয়ামী লীগের ও বিএনপির নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতির সঙ্গে ২০০৬ সালের বক্তৃতা-বিবৃতি মিলিয়ে দেখুন।
সে সময়ে বিএনপির নেতারা যেভাবে সংবিধান সমুন্নত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করতেন, আজ আওয়ামী লীগের নেতারাও তা-ই করছেন। আবার সে সময়ে আওয়ামী লীগের নেতারা জনগণের নামে যা যা বলতেন, এখন বিএনপির নেতারা ঠিক তা-ই বলছেন। নাটকের কুশীলব বদলায়নি, ভূমিকা বদলেছে মাত্র। আক্ষেপ হলো, ক্ষমতাসীন দলটি বিরোধী দলের কথিত নাশকতা ঠেকাতে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ভরসা করতে পারছে না। তারা দলীয় কর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছে। দেশের জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে। আর অন্য পক্ষ আগে থেকেই মাঠে আছে। যদি এভাবে দুই পক্ষই মাঠে শক্তির পরীক্ষায় লিপ্ত হয়, তাহলে নির্বাচনের প্রয়োজনটা কী? এত অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করে প্রচারণারও দরকার নেই। বলে দিন, পাঁচ বছর পর পর মাঠের শক্তিপরীক্ষায় যে জয়ী হবে, সে-ই ক্ষমতায় যাবে। মধ্যযুগে মল্লযুদ্ধ হতো। ৪২ বছর ধরে আমাদের দেশেও ক্ষমতা নিয়ে একধরনের মল্লযুদ্ধ চলছে। মাঠে শক্তিপরীক্ষা ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে না। আমাদের প্রধান দুটি দল নির্বাচনের মূল যে নায়ক, সেই জনগণের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না বলেই মাঠে শক্তি প্রদর্শন করে চলেছে প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে। অনেক নাটকীয়তার পর শুক্রবার ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ কয়েকটি স্থানে বিরোধী দলকে জনসভা করার অনুমতি দিয়েছে সরকার।
বগুড়া, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, পঞ্চগড়সহ অন্তত ১০টি স্থানে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। আবার কয়েকটি স্থানে বিরোধী দল সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে। এই যে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান, এতে জনগণের কোনো দাবি নেই, তাদের নিরাপত্তার কথা নেই এবং দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির পরিকল্পনা নেই। সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েও বিতর্ক নেই। কেবলই মাঠ দখল। কেবলই জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। এই যে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই পক্ষ—সবকিছুই করছে গণতন্ত্রের নামে। এক পক্ষ তাদের ভাষায় স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের দাবি মানা না হলে দেশ অচল করে দেওয়া হবে। সড়ক, রেল ও নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া হবে (কিন্তু নেতা-নেত্রীদের গাড়ি চলবে কি না, সে কথা স্পষ্ট করে বলেননি)। অন্য পক্ষ জনগণ ও গণতন্ত্র রক্ষায় বিরোধী দলের সব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত মোকাবিলায় প্রস্তুত। তারা বলছে, এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু দুই পক্ষের ক্লান্তিহীন লড়াইয়ে জনগণ যে জিম্মি হচ্ছে, দেশ যে পিছিয়ে যাচ্ছে,
সেসব নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। সরকারি দল বলছে, আগে স্বাধীনতার শত্রুদের পরাস্ত করুন। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আবার বিরোধী দলের দাবি, শেখ হাসিনার সরকারকে হটালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দেশ ও গণতন্ত্র বাঁচবে। অর্থাৎ, সবকিছুই ঘটছে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকার জন্য। সেখানে নির্বাচন উপলক্ষ হলেও গণতন্ত্র লক্ষ্য হতে পারেনি। এর নাম সত্যিকার গণতন্ত্র নয়। বলপ্রয়োগের গণতন্ত্র। শক্তি প্রদর্শনের গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র মনে স্বস্তি আনে না, ভীতি জাগায়। এই ভয়ংকর ও সর্বনাশা গণতন্ত্র থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারেন রাজনীতিকেরাই, অন্য কোনো শক্তি নয়। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। আপনারা আলোচনায় বসুন। ফোন ও চিঠির মুলো না ঝুলিয়ে এখনই আলোচনায় বসুন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করুন। দুজনের বা যেকোনো একজনের একগুঁয়েমি দেশকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

নিয়তির হাতে ছেড়ে দেওয়া নয়

গত ২০ অক্টোবর প্রথম আলো পত্রিকায় ‘সংখ্যালঘু নিপীড়নের প্রতিকার নেই!’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পড়লাম। লেখাটির জন্য পত্রিকার ‘বিশেষ প্রতিনিধি’কে আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই প্রথম আলো সম্পাদককেও। কারণ, বহুল পঠিত এই পত্রিকা প্রায় নিয়মিতভাবে দেশের দুর্বল জনগোষ্ঠীর দুর্ভাগ্যের তথ্যাদি এবং তাদের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করে থাকে। উদ্দেশ্য, জাতির বিবেককে জাগ্রত করা। কিন্তু সুশীল সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষের হূদয় নিংড়ানো আর্তিগুলো আজ ‘অরণ্যে রোদনে’ পর্যবসিত। দেশের সিংহভাগ মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থের বাইরে আর ভাবে না। প্রতিবেদকের মতো আমরাও বিশ্বাস করি, অন্যায়-নিপীড়নের প্রতিকারের প্রত্যাশা নিপীড়িত মানুষ আর করতে সাহস পান না: ‘এ ধরনের হামলা, নির্যাতন তাঁরা নিয়তি হিসেবেই ধরে নিয়েছেন।’ (প্রথম আলো, পৃ. ৩) এ দেশের সংখ্যালঘুদের অপরাধ কী? বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিসেবে জন্মগ্রহণই কি তাদের অপরাধ?
নাকি আওয়ামী লীগে তারা ভোট দেয় বলে দোষী? যদি দ্বিতীয়টিই কারণ হয়, তবে আমার বক্তব্য এই যে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের কাছে ‘মন্দের ভালো’। উপায় নেই, তাই আওয়ামী লীগকে তারা ভোট দেয়। কারণ, পরিষ্কার—এই দল ছাড়া অন্য কোনো দল সংখ্যালঘুর স্বার্থ নিয়ে ভাবে না। এমনকি তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রেও সংখ্যালঘুদের প্রবেশের সুযোগ খুব একটা নেই—যদি কেউ শুধু তার ব্যক্তিস্বার্থের কথা না ভাবে। আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা তা ভালো করেই বোঝেন, তাই দলীয় আদর্শ তাঁদের মনে-আচরণে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পায় না। তাই রক্ষক ক্ষেত্রবিশেষে ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়—অসহায় সংখ্যালঘু মানুষগুলো অবাক বিস্ময়ে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। সাধারণ মানুষ তো দলের নীতিনির্ধারকদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পায় না। তাই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর থেকে ৩৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ থেকে এ দেশে হিন্দুর সংখ্যা কমে ৮ দশমিক শূন্য ২-এ এসে দাঁড়িয়েছে। যে দেশে মোট জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে, সে দেশে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা না বেড়ে কমে যাওয়ার কারণ কী? এ প্রসঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলের জনৈক সাংসদের রসাত্মক ব্যাখ্যা আমরা প্রথম আলোতে দেখেছি। তিনি বলেছিলেন, ‘হিন্দুদের প্রজননক্ষমতা কম।’
আশা করি, প্রথম আলোর পাঠকদেরও কাণ্ডজ্ঞানহীন ওই ব্যাখ্যার কথা মনে আছে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে এ দেশের সংসদ অধিবেশন চলাকালে আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ কণ্ঠের প্রতিবাদ ও তার উত্তরে এক দুর্ভাগ্যজনক উক্তি আজ প্রসঙ্গত আমাদের মনে পড়ে। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না, ছিল বিরোধী দল হিসেবে। ভারতে বাবরি মসজিদ ধর্মান্ধ হিন্দুদের দ্বারা ধ্বংস হওয়ায় এ দেশে ভোলা জেলায় হিন্দুদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে এবং একাধিক হিন্দু নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে গর্ভ ধারণ করেন। এই অমানবিক ঘটনার পর যখন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সাংসদ তোফায়েল আহমেদ প্রতিবাদ জানান, তার উত্তরে তদানীন্তন সরকারি দলের জনৈক সাংসদ রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘তাহলে বলতে হবে, হিন্দু নারীদের গর্ভ খুব উর্বর।’ বেশ কটি কাগজে মানুষ ওই খবর পড়েছে। তোফায়েল আহমেদের দেওয়া তথ্যটির পেছনে কোনো সত্যতা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখারও প্রয়োজন বোধ করেনি তদানীন্তন সরকার। তখন কাগজে পড়েছি, ওই পাশবিক ঘটনার পর ভোলা থেকে নৌপথে বেশ কিছুসংখ্যক হিন্দু ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর হিন্দুর ওপর নির্যাতন শুরু হয়। অতঃপর ২০০১ সালে, ২০১১ ও ২০১২ সালে প্রশাসনের নাকের ডগায় চট্টগ্রাম মহানগর, হাটহাজারী, সাতক্ষীরা, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, রাঙামাটি, কক্সবাজারের রামু ও উখিয়ায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে (প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর, পৃ. ৩)।
তা ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত ১৬৮টি মন্দির ধ্বংস করা হয় এবং শত শত হিন্দু পরিবার হিংসাত্মক আক্রমণে সর্বস্বান্ত হয়। সরকার ও প্রশাসনকে এ ব্যাপারে অনেকটাই নিরুদ্বেগ ও অসহায় বলে মনে হয়। পরিশেষে আমার বক্তব্য এই যে, নিয়তির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ, এ দেশের সংখ্যালঘুদের আর কোথাও যাওয়ার স্থান নেই। দুটো বিকল্প তাদের জন্য এখনো খোলা আছে: (১) বিশ্বে অনেক আন্তর্জাতিক বিচারালয় আছে—সংখ্যালঘুদের উচিত এসব আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। (২) নির্বাচনের আগে সেকশনাল রিপ্রেজেন্টেশনের দাবি উত্থাপন ও বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন শুরু করা। উল্লেখ্য, যুগপৎ উভয় বিকল্প নিয়েই ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ’ এগিয়ে যেতে পারে। সংসদে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের দাবি জাতীয় ঐক্যের অনুকূলে নয়, এ কথা সত্য। তবে ঐক্য নষ্ট হয় তখনই,
যখন কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ একটি ধর্মকে রাষ্ট্রধর্মরূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গণতন্ত্র জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের সম-অধিকার নিশ্চিত করে। তাই বলা হয়: ডেমোক্রেসি ইজ অ্যান ইগালিটারিয়ান কনসেপ্ট। অতএব, একাধিক ধর্মের মানুষ যে দেশে বসবাস করে, সে দেশে শুধু একটি রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি কেবল ধর্মনিরপেক্ষতা আদর্শটির পরিপন্থীই নয়, তা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থীও বটে। এরূপ ক্ষেত্রে সংসদে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব একটি প্রতিষেধক মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জন ক্যালহাউনের মতে, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানুষ বহুধা বিভক্ত, সে দেশে সংসদে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিত্বের বিকল্প নেই। সুইডেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে এরূপ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে। বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা উপরিউক্ত বিকল্প দুটির কোনটি অনুসরণ করবেন, তা তাঁদেরই বিবেচনার বিষয়।
ড. জিতেন্দ্র নাথ সরকার: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ by মোঃ মাহমুদুর রহমান

দেশকে ওরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে একদম সচেতন সাধারণ মানুষ সবার একই প্রশ্ন। কিন্তু এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর কারও জানা নেই। শেষ গন্তব্য কোথায় তা কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। তবে যাত্রার গতি প্রকৃতি দেখে সবাই একমত যে, দেশ ঐক্য, সংহতি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে এগোচ্ছে না। দেশের যাত্রা পথ অবিশ্বাস, ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিভেদ, সংঘাত, সংঘর্ষ ও অন্ধকারের দিকে। কিন্তু কেন? যে জাতি লাখ লাখ মানুষের আত্মাহুতির মাধ্যমে দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম দিল গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, তাদের কাছে অর্থনৈতিক মুক্তি আজ সুদূরপরাহত, গণতন্ত্র মৃতপ্রায়। এতদিন শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। ভবিষ্যতে তাও আর থাকবে কিনা তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে। কারণ প্রধান বিরোধী দলবিহীন ছোট ছোট কয়েকটি দল নিয়ে অনেকটা একদলীয় নির্বাচন করা আর নির্বাচন না করে ক্ষমতায় থাকা অনেকটা সমার্থক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল।
রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও জনগণের সেবা করা। অন্যান্য পেশায় দেশ এবং জনগণের সেবার বিষয়টি রাজনীতির মতো প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়। যেমন একজন আইনজীবী আইন পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন, সঙ্গে সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশকে সহযোগিতা করে থাকেন। একজন ব্যাংকার অর্থ উপার্জনের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সহায়তা করে থাকেন। কিন্তু রাজনীতিকদের দেশ এবং জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকতে হয়, যার বিপরীতে কোনো অর্থ উপার্জনের সুযোগ নেই। নিজস্ব সম্পদ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য আলাদা আয়ের উৎস না থাকলে সার্বক্ষণিক রাজনীতি করা কষ্টকর। কারণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিপরীতে একজন রাজনীতিক জনগণের কাছ থেকে শুধু সম্মান, সুনাম ও সুখ্যাতির অধিকারী হন, অর্থ-বিত্তের নয়। রাজনীতিকরা সবচেয়ে বেশি সম্মান পাওয়ার যোগ্য। কারণ, অন্যরা যেখানে নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত, সেখানে তারা তাদের মেধা, শ্রম ও সময় ব্যয় করছেন দেশ ও জনগণের জন্য।
এরকম একজন ত্যাগী রাজনীতিকের কাছে নির্বাচন তার জনসেবার পরীক্ষা। জনগণ যদি তার সেবায় তুষ্ট হয়, তাহলে তাকে নির্বাচিত করে দেশ শাসনের ভার দিয়ে তার উপর আরও গুরুদায়িত্ব¡ অর্পণ করতে পারে। গণতন্ত্রে ভোট না পেলে জনগণের সঙ্গে শত্র“তা কিংবা ভোট পেলে জনগণের ওপর প্রভুত্ব¡ করার সুযোগ নেই। সর্বাবস্থায়ই জনসেবায় নিয়োজিত থাকতে হয় যার যার ক্ষমতা অনুযায়ী। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। আমাদের মতো সমস্যাজর্জরিত দেশে যারা নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসনের সুযোগ পান তাদের রাত-দিন পরিশ্রম করতে হয়, চিন্তামগ্ন থাকতে হয়। কারণ সীমিত সম্পদ দিয়ে জনগণের হাজারও সমস্যা সমাধান করা সত্যিই কষ্টকর। তাই জনমতের বিপরীতে সংবিধান সংশোধন করে, বিভিন্ন রকম ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার কিংবা যেনতেন ভাবে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে তাই হচ্ছে।
কেন এমন হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায় রাজনীতির মতো মহৎ কাজটি বেশির ভাগ নেতাকর্মী জনসেবার মানসিকতা নিয়ে করেন না, অর্থবিত্ত অর্জন ও ক্ষমতার জন্য করে থাকেন। ফলে ত্যাগের পরিবর্তে ভোগের মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করা হয়। এ ভোগ কিংবা অর্থ উপার্জন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া পরিপূর্ণতা পায় না। এ জন্য কেউ ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। অন্যভাবে বলা যায়, কেউ ক্ষমতার বাইরে থাকতে চায় না। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর পরই শুরু হয় ক্ষমতাসীন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের অবৈধ উপার্জনের মহোৎসব। এ জন্য ক্ষমতার শেষ দিকে তাদের দুই ধরনের ভয় পেয়ে বসে। একটি হচ্ছে অবাধ অর্থবিত্ত উপার্জনের সুযোগ হাত ছাড়া হওয়ার ভয়। অন্যটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট এবং অন্যান্য অপকর্মের কারণে জনরোষ ও পরবর্তী সরকারের দ্বারা আইনের আওতায় আসার ভয়। তাই তারা ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। অপর পক্ষে বিরোধী দলও অপেক্ষায় থাকে ভোগের পেয়ালা কখন হাতে পাবে। তাই ক্ষমতাসীনদের সরানোর জন্য যে কোনো পথ অবলম্বন করতে দ্বিধা করে না, তাতে জনগণের যত কষ্টই হোক। বাংলাদেশের আজকের রাজনৈতিক সমস্যা যাকে আমরা সাংবিধানিক সমস্যায় রূপান্তরিত করেছি তার মূল ভিত্তি হচ্ছে আমাদের এ ভোগের নেশায় মত্ত রাজনীতি। আর লুটপাট ও ভোগের রাজত্ব স্থায়ী করার জন্য প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা। তাই বিরোধী দলকে নির্যাতন-নিপীড়ন করতে হয়। মিটিং মিছিল ও জনসভা করার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করতে হয়। প্রতিপক্ষকে হত্যার চেষ্টা করতে হয়। নিজে অথবা নিজের পছন্দের মানুষের অধীনে নির্বাচন করে আবারও ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করতে হয়। দেশের সব মানুষকে বোকা ভেবে সরকারি দল সব সময় সংবিধানের জন্য মায়া কান্না প্রদর্শন করতে থাকে। যদিও তারা প্রত্যেকেই নিজেদের প্রয়োজনে সংবিধানের গায়ে ছুরি চালাতে দ্বিধা করেননি। এ যেন ‘মুখে শেখ ফরিদ- বগলমে ইট’।
আরও মজার বিষয় হচ্ছে, আমাদের নেতা-নেত্রীদের বক্তব্যে রয়েছে স্ববিরোধিতা। ক্ষমতায় থাকতে যে কথা বলেন, বিরোধী দলে গেলে ঠিক তার বিপরীত কথা বলেন। ক্ষমতায় থাকলে নির্দলীয় সরকার কারও ভালো লাগে না। বিরোধী দলে থাকলে এর প্রয়োজনীয়তা হাড়ে হাড়ে টের পান। ফলে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়ের সরকার প্রধানের বক্তব্য, আজকের বক্তব্যের ঠিক বিপরীত। একইভাবে তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা যিনি আজকের প্রধানমন্ত্রী তার তখনকার বক্তব্য, আর আজকের বক্তব্য পুরোপুরি বিপরীত। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে গিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত আন্দোলনে অনেক জীবন ও সম্পদ ক্ষয় হয়েছে। অথচ তারই নেতৃত্বে¡ আদালতের রায়ের অজুহাতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থাকে হত্যা করা হল। এটা যেন মায়ের হাতে নিজ সন্তান হত্যার মতো ঘটনা। জনগণ এটাকে ভালো চোখে দেখেনি বলে পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও সাম্প্রতিক জরিপে তারা সরকারকে ‘না’ বলেছে।
রাজনীতি জনসেবার পরিবর্তে রাজ-ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে আমাদের দেশ স্থায়ী সমস্যায় নিপতিত হয়েছে। এ থেকে সহজ মুক্তি নেই, পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ব্যতীত। তবে বর্তমান সংকট থেকে মুক্তি দিতে পারেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজেকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানের পদটি ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিলেই সমঝোতা হতে পারে। সব দলকে নিয়ে একটি নির্বাচন হলে জাতি আপাত সংঘাত-সংঘর্ষ থেকে মুক্তি পাবে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা কেটে যাবে। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখনও এ ঘোষণা দেননি। সহজে দেবেন বলেও মনে হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এ ঘোষণা আদায়ের জন্য বিরোধী দল চূড়ান্ত আন্দোলনে যাচ্ছে। সরকারি দল, পুলিশ ও বিরোধী দলের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হতে পারে। কে জিতবে, কে হারবে বলা না গেলেও এ ধরনের সংঘর্ষের কারণে দেশ ও দেশের জনগণই হারে। সরকার এরই মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অনেকটা জরুরি অবস্থার মতো। এভাবে হয়তো বিরোধী দলের আন্দোলন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। আর সমস্যাটা প্রলম্বিত হবে এ জন্যই।
সরকার হয়তো আশা করছে, কোনোভাবে একদলীয় একটা নির্বাচন করতে পারলেই হল। এ জন্য তারা বৈধ-অবৈধ সব শক্তি নিয়োগ করছে। কিন্তু বিরোধী দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আন্দোলন চালিয়ে যায় তাহলে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে না। তারা ধীরে ধীরে আইন অমান্যের দিকে চলে যাচ্ছে। আজকে তাদের পক্ষ থেকে একজন দার্শনিকের ভাষায় বলা হয়েছে, ‘হোয়েন অর্ডার ব্রিংস ইনজাস্টিস, ডিসঅর্ডার ইজ দি বিগিনিং অব জাস্টিস।’ এভাবে দেশের কিছু মানুষ যদি আইন-শৃংখলা অমান্য করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আশায় আর বেশির ভাগ মানুষ তা সমর্থন করে তা হলে দেশ কতদিন চালানো সম্ভব হবে সরকারের পক্ষে তা বিবেচনা করা দরকার বলে অনেকেই মনে করেন। এছাড়া বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেছেন, এ সরকার ২৪ অক্টোবরের পর অবৈধ, তাই জনগণকে আহ্বান করেছেন সরকারকে ক্ষমতা থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে হটানোর জন্য। তার আহ্বানটি থমাস পেইনের মতো, ‘ইট ইজ দি ডিউটি অব দি পেট্রিয়ট টু প্রটেক্ট হিজ কান্ট্রি ফ্রম ইটস গভর্নমেন্ট’। থমাস পেইন আজ আর বেঁচে নেই, থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, তার এ উক্তি কি বর্তমানে আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য?
সমস্যা হচ্ছে আমাদের অর্থনীতিকে নিয়ে। রাজনীতির মতো পুলিশ, র‌্যাব ও লাঠিয়াল দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অর্থনীতি এখনও চলে ক্ল্যাসিকাল, নিও ক্ল্যাসিকাল ও কিনসিয়ান তত্ত্ব অনুযায়ী। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ পরিবেশ বিঘ্নিত করবে। ফলে আমাদের যাত্রা হবে অন্ধকারের দিকে, যদি অলৌকিক কিছু না ঘটে।
মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আমলাতন্ত্রের ভূমিকা by ধীরাজ কুমার নাথ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা জাতীয় সরকার- যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এ ধরনের সরকারের সময়কালে আমলাতন্ত্রই সরকার পরিচালনায় অন্যতম ভূমিকা পালন করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের লক্ষ্যই হচ্ছে পরবর্তী জাতীয় সংসদের নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ করে জনগণের অভিপ্রায়কে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় দায়িত্ব পালন করবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। যদিও বর্তমান সরকারের মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হয়নি, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ১২৩ ধারা অনুসারে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। তাই বর্তমানে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। এ ছাড়াও সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে কখন প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হবে। এই যে ৯০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকার, তার প্রধান কাজ হচ্ছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করা। এ লক্ষ্যে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সমতল ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সব দল ও জনগণের দাবি এবং এ প্রশ্নেই বিভিন্ন দলের মধ্যে মতবিরোধ লক্ষণীয়। উল্লেখ্য, এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সাহায্য-সহায়তায় সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পাদন করবে। এরূপ কার্যাবলি সম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছাড়া তারা কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনমুখী এবং কোনো ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে সংবিধান ও প্রচলিত বিধি-বিধানবিরোধী। এমনকি নির্বাচন প্রচার কাজে নিয়োজিত থাকা সরকারের কোনো মন্ত্রী নির্বাচনের জন্য সরকারি যানবাহনও ব্যবহার করতে পারেন না। নিজস্ব নির্বাচনী প্রচারে সরকারি হেলিকপ্টার ব্যবহারের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে জবাবদিহি করতে হয়েছিল এবং তার একান্ত সচিব, যিনি ভারতীয় প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা, তাকে এজন্য শাস্তি পেতে হয়েছিল। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এটাই যে, তারা রাজনীতিকদের আইনের বিধান স্মরণ করিয়ে দেবেন। এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা হলে তাদের শাস্তি পেতে হবে। বাংলাদেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তদারকিতে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং দেশবাসী তার ফলাফল গ্রহণ করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বহুলাংশে বেড়ে যায়। প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে নিরপেক্ষতার নিদর্শন স্থাপন ও তা দৃশ্যমান করা এবং একই সঙ্গে সমান সুযোগের পরিবেশ সৃষ্টি করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সব দল ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করা। নির্বাচন কমিশনের কর্মীবাহিনীর এ কাজ প্রাথমিক দায়িত্ব হলেও অন্য সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসক (রিটার্নিং অফিসার), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসনের প্রায় সব স্তরের কর্মী বাহিনী, শিক্ষক ও অন্য প্রায় সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা এবং কমিশনের নির্দেশনা প্রতিপালনে নিয়োজিত থাকে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে- তা এক বড় প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ। তাদের ভূমিকা এমন হওয়া উচিত যা গণতন্ত্রের প্রেরণাকে সমুন্নত রাখতে সহায়ক হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাবমূর্তিকে বিকশিত করে প্রশাসনকে জনগণের কাছে সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সহায়তা করার লক্ষ্যে আমলাতন্ত্রের কর্তব্য হচ্ছে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা, সুশাসনের মাধ্যমে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সব ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করা।
অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সব জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কমকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়, উদাহরণস্বরূপ যিনি রাজশাহী বিভাগে আছেন তাকে চট্টগ্রাম বিভাগে এবং যিনি সিলেট বিভাগে কর্মরত তাকে খুলনা বিভাগে বদলি করা হয়, যাতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংসদ সদস্য অনেক দিনের পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তবে নিজের জেলায় বা পার্শ্ববর্তী জেলায় বদলি করা যাবে না। একই সঙ্গে সব পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বদলি করা হয়। এমন নীতি অনুসরণ করা হয়েছে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে (যদিও ২০০৬ সালে নির্বাচন হয়নি)। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদেরও অনুরূপভাবে বদলি করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন প্রজাতন্ত্রের অধীন যে কোনো কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে বদলি, প্রত্যাহার বা দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারে এবং নতুন করে দায়িত্ব অর্পণ করতে পারে।
এ ছাড়াও নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ বা সংক্ষিপ্তভাবে অবহিতকরণের লক্ষ্যে প্রদর্শনীমূলক ভোট কেন্দ্রের আয়োজন করে ভোটারদের প্রশিক্ষিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ একটি অন্যতম দায়িত্ব। এ কাজে নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহায়তা দেবে প্রশাসন। ভোটারদের অবহিত করা এবং ভোটদান পদ্ধতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করাও আমলাতন্ত্রের দায়িত্ব।
নির্বাচনে আইন-শৃংখলার সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃংখলা রক্ষার মাঝেই জনপ্রশাসনের ভূমিকা অধিকতর দৃশ্যমান হয়ে থাকে। সঠিকভাবে আইন-শৃংখলা রক্ষা হচ্ছে সত্যিকার নিরপেক্ষতা ও আমলাতন্ত্রের দক্ষতার প্রতীক। কারণ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত মারামারি-হানাহানি ছাড়াও জাল ভোট প্রদান, ভোটের বাক্স ছিনতাই, ভোট গণনায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলভ্রান্তি করা, ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতিতে বাধাদানসহ সব ধরনের ঘটনা প্রবাহ, যার বিরুদ্ধে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ আকারে মামলা হতে পারে। অনেক সময় নির্বাচন-পরবর্তীকালে বা ফলাফল ঘোষণার পরও অনেক হানাহানি হতে পারে, যার প্রতি দৃষ্টি রাখা আমলাতন্ত্রের দায়িত্ব।
২০০১ সালে বরিশালের আগৈলঝরা ও রামশীল এলাকায় নির্বাচন-পরবর্তী যেসব ঘটনা দেশবাসী অবলোকন করেছে এবং জাতির বিবেককে যা অদ্যাবধি দংশন করছে, তার দায়দায়িত্ব তৎকালীন প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত আমলাতন্ত্র উপেক্ষা করতে পারে না। আগামী দিনগুলোতেও অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরই এর দায় বহন করতে হবে।
মিরপুর ও মাগুরার উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং এ ব্যাপারে দায়দায়িত্ব সেখানকার মাঠপর্যায়ের আমলাতন্ত্র বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উপেক্ষা করবে কীভাবে? বর্তমানে গণমাধ্যম জনগণের কাছে তুলে ধরছে জনপ্রশাসনের দুর্বলতা বা অতিরিক্ত উৎসাহের চিত্র অথবা পক্ষপাতিত্বের পরিচয় বহনকারী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। তাই আমলাতন্ত্রের জন্য দিনের পর দিন চ্যালেঞ্জ বাড়ছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের দায়দায়িত্ব ও অভিযোগ অধিকতর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের এ ব্যাপারে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে এবং সততার পরিচয় দিতে হবে পদে পদে।
বিশ্বের যেসব দেশে গণতন্ত্র অন্যতম গ্রহণযোগ্য সরকার পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনায় একমাত্র রীতি হিসেবে জনগণের মনে স্থায়ী আসন লাভ করেছে- সেসব দেশে লক্ষণীয় যে, আমলাতন্ত্র গণতন্ত্র রক্ষায় অমূল্য অবদান রাখতে পেরেছে এবং তার ফলেই গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বহাল রাখার স্বার্থে আমলাতন্ত্রকেই অধিকতর অবদান রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা অধিক নিরাপদ এবং আইনের প্রয়োগ ও নীতিমালা প্রণয়নে অনেক সুযোগ পেয়ে থাকে। তাই প্রয়োজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা, যা নির্বাচনকালেই দৃশ্যমান করা সম্ভব। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী জনগণ প্রত্যাশা করে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো বিশেষ দলের তল্পিবাহক হবে না। তারা নিরপেক্ষতা, সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত দেশ ও জনগণের সেবক।
জনগণ আশা করে, আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে জাতির সামনে সুবিচার ও সুশাসনের উদাহরণ সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে তারা দেশবাসীকে টেকসই ও সত্যিকারের গণতন্ত্র উপহার দিতে সক্ষম হবে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা দেশের সবার, কোনো দলের নয়। আমলাতন্ত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে, নিজেদের সুবিধা প্রাপ্তির প্রয়োজনে নয়। পদোন্নতি সাময়িক, অপবাদ চিরকালের।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব

খালেদা জিয়ার রাজনীতি, এখন... by ফরহাদ মজহার

শেষাবধি ২৫ অক্টোবর...
এই লেখা লিখছি বহু প্রতীক্ষার ২৫ অক্টোবর, শুক্রবারে। বাংলাদেশের রাজনীতি কোনদিকে যেতে চাইছে তার কিছুটা আন্দাজ আমরা আজ সন্ধ্যার মধ্যে করতে পারব। যেহেতু গতকাল অবধি দুই পক্ষের মধ্যে তথাকথিত ‘সমঝোতা’ বা ‘আপস’ হয়নি অতএব রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মীমাংসা বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়েই সম্ভবত নিষ্পন্ন হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা আইন-আদালত, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিসহ রাষ্ট্রের সব শক্তি প্রয়োগের প্রতিষ্ঠানকে বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কৌশল ও প্রতিরোধের প্রস্তুতি কেমন সেটা আমরা সম্ভবত দেখতে শুরু করব আরও স্পষ্টভাবে। বলাবাহুল্য, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগের ক্ষমতাই রাজনীতিতে নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে। তবে এর পরিণতি নির্ভর করবে সমাজে রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার মাত্রার ওপর। এ মুহূর্তে খালেদা জিয়া সামগ্রিক রাজনীতিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তার মূল্যায়নের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে কী ধরনের নীতি ও কৌশল এই প্রতিরোধ-পর্বে তিনি গ্রহণ করবেন। এখানে ভুল করলে বিশাল খাদে তিনি পড়ে যেতে পারেন। সেখান থেকে তার পক্ষে উঠে আসা খুবই কঠিন হবে।
এটা ২০০৭ সাল নয়, ২০১৩ সাল। এক-এগারোর নায়কেরা একটি সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক দল ছিল না। তারা সুশীলদের সুবিধাবাদী রাজনীতির ধারক হলেও আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের মতো কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে ঐক্যবদ্ধ ছিল না। ক্ষমতাসীন মহাজোটের রাজনৈতিক মতাদর্শ হচ্ছে ইসলাম-বিদ্বেষ, ফ্যাসিবাদ ও বাংলাদেশকে দিল্লির অধীনস্থ করা। জনগণের সঙ্গে তাদের বিরোধের মূল জায়গাগুলো এখানে। একে জনগণ সমাজের নানান স্তর থেকে মোকাবেলা করছে। কেউ ঈমান-আকিদার জায়গা থেকে, কেউ জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই হিসেবে, আবার কেউ বাংলাদেশের জনগণের ইতিহাস ও সংস্কৃতি হিসেবে। একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল হিসেবে ইসলাম প্রশ্নে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি আসলে কী সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। তাদের মধ্যে কেউ শাহবাগের সমর্থক, আবার কেউ শাপলা চত্বরের। অনেকে মাঝখানে পেন্ডুলামের মতো একবার বামদিকে একবার ডানদিকে হেলছে। এ ধরনের দল নিয়ে বড় কোনো নীতিগত আন্দোলন করা যায় না। রাজনৈতিক উদারবাদও না। কিন্তু নানান কারণে বাংলাদেশের জনগণের বিশাল একটি অংশ খালেদা জিয়ার ওপর নতুন করে ভরসা করছে। এই ভরসা কতটুকু বাহ্যিক অথবা সারবস্তু সম্পন্ন সেটা আমরা এখন দেখতে থাকব। আসলে নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেয়া আর আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ওপর ভরসা করার মধ্যে পার্থক্য আছে। আওয়ামী লীগ বিএনপির শত্র“, ইসলামপন্থীদেরও বটে। কিন্তু শত্র“র শত্র“ আমার মিত্র, এই কৌশল যথেষ্ট নয়। সুনির্দিষ্ট নীতি ও সঙ্গতিপূর্ণ কৌশল দরকার।
দ্বিতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তর ছাড়া বাংলাদেশে ন্যূনতম লিবারেল বা উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনও এখন অসম্ভব- সেটা শুধু বিএনপি ও তার জোটের শরিকদের নয়, ফ্যাসিবাদবিরোধী সব নাগরিককেই বুঝতে হবে। আর খালেদা জিয়াকে বুঝতে হবে, আন্দোলনের যে কোনো পর্যায়ে আপস করে তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে পারবেন, কিন্তু ফ্যাসিবাদের মতাদর্শিক, রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক খুঁটি উপড়ে ফেলতে না পারলে তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন না। মিসরের ঘটনাবলী থেকে তিনি কিছুটা শিক্ষা নিতে পারেন।
তৃতীয়ত রয়েছে দিল্লিকে মোকাবেলার প্রশ্ন। সেটা নিছকই দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক নয়, নতুনভাবে একটি জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। মহাজোট সরকার গত পাঁচ বছরে সেটা ধ্বংস করে দিয়েছে। তার জোটের শরিকদের মধ্যে এ ধরনের উপলব্ধি যেন না হয় যে তিনি তার রাজনৈতিক স্বার্থে জোটের শরিকদের ব্যবহার করছেন, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষার প্রশ্নে সবার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট নীতি ও কৌশল গড়ে তোলা তার অনেক আগেই জরুরি ছিল। শুধু বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। লড়াই সুস্পষ্টভাবে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম হিসেবে হাজির হতে থাকবে। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার রাজনীতি তিনি কিভাবে হাজির করেন, তার ওপর তার নেতৃত্বের নিশ্চয়তা নির্ভর করছে।
এ সরকার অবৈধ
খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারের বৈধতার সীমা ২৪ অক্টোবর বেঁধে দিয়েছিলেন। অপরিসীম দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও উস্কানির মুখেও তিনি নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির বাইরে যাননি। এই কৌশলের একটা তাৎপর্যপূর্ণ ফল হচ্ছে সাধারণ মানুষ ২৪ অক্টোবরের পর এই সরকারকে অবৈধ সরকার হিসেবে গণ্য করছে। বৃহস্পতিবার শিক্ষক-কর্মচারীদের সভায় খালেদা জিয়া স্পষ্টভাবেই আবার বললেন, এই সরকার বৈধ সরকার নয়, অতএব একে হটানো জনগণের কর্তব্য, নাগরিকদের দায়। এর মানে হচ্ছে, এই সরকারকে মানতে জনগণ যেমন বাধ্য নয়, ঠিক তেমনি প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব বা সেনাবাহিনীও মানতে বাধ্য নয়।
ক্ষমতাসীনদের পক্ষে বলা হচ্ছে, এটা ঠিক না। শেখ হাসিনা ‘বৈধ’ সরকার। তারা আসলে বৈধতা (legitimacy) এবং আইনি দাবির (legality) মধ্যে গোলমাল করে ফেলেছেন। শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তিনি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান বদলিয়ে ফেলেছেন। তিনি নিজে আইন করে এখন বলছেন, আমাদের তা মানতে হবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে তিনি নাগরিক ও মৌলিক অধিকার হরণ করে নিয়েছেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন প্রণয়ন করলেই সেটা বৈধ হয়ে যায় না। গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের ধরন। সেই রাষ্ট্রে নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত ও বলবৎ করা না গেলে সে রাষ্ট্র আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থাকে না। সেটা তখন অবৈধ রাষ্ট্র, তার সংবিধানও অবৈধ। এর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক জনগণের বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু যেহেতু গায়ের জোরে আইন করা হয়েছে, অতএব সেই কালো আইনের জোরে তাকে ‘আইনি’ বলা যায়, কিন্তু সে আইন আসলে জংলি আইন। জংলি আইন বৈধ আইন তো নয়ই। কোনো আইনই নয়। এ ধরনের রাষ্ট্র ও সরকার কোনো নৈতিক বা দর্শনগত বৈধতার জোরে টিকে থাকে না। টিকে থাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জোরে, নগ্নভাবে বল প্রয়োগের মাধ্যমে। এর কোনো নৈতিক বা আদর্শগত ভিত্তি নাই। একে বল প্রয়োগের মাধ্যমেই মোকাবেলা করতে হয়, ইতিহাসে তার ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। এ ধরনের রাষ্ট্র বা সরকারের সঙ্গে সমরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সামরিক শাসনের কোনো প্রভেদ নাই। তুলনায় সামরিক আইনের চেয়েও ফ্যাসিবাদ ভয়ংকর। সামরিক একনায়কতন্ত্রের কোনো জনসমর্থন থাকে না, কিন্তু ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্রের পক্ষে বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যম ও সমাজের উগ্র একটি অংশের সমর্থন থাকে।
খালেদা জিয়া এই সরকারকে ‘অবৈধ’ বলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
আমরা এখন বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের পর্যালোচনা করব।
পরাশক্তির মুখাপেক্ষী হওয়া বিপজ্জনক
গত ২১ অক্টোবর বেগম খালেদা জিয়া হোটেল ওয়েস্টিনের সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বক্তব্য পেশ করেছেন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হতে পারে তার একটা প্রস্তাবও দিয়েছেন। বাংলাদেশের ক্রান্তিকালীন রাজনৈতিক মুহূর্তের কারণে তার বক্তব্য ও প্রস্তাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে তার প্রশংসা করেছেন। প্রশংসার ধরন অনেকটা এরকম- ক্ষমতাসীনরা খেলার বোর্ড যেভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে তার বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেতা একটা ‘চাল’ চেলেছেন। কথাটা কেউ সরাসরি বলেছেন, কেউ বলেছেন প্রচ্ছন্নভাবে। বাংলাদেশের বর্তমান অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে তার বক্তব্যের এই মূল্যায়নটা প্রশংসাসূচক হলেও ইতিবাচক নয়। অর্থাৎ রাজনীতির বর্তমান মুহূর্তে বিরোধীদলীয় নেতার কাছ থেকে জনগণ রাজনৈতিক ‘চাল’ চাইছে না, সুনির্দিষ্ট নীতি ও দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করে। প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণও চাল ছাড়া কিছুই ছিল না। বাংলাদেশের এখনকার রাজনৈতিক মুহূর্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে জনগণের চোখে দুই নেত্রীর বক্তব্য, বিশেষ করে বিরোধী দলের নেত্রীর বক্তব্য যদি ‘চাল’ কিংবা রাজনৈতিক চালাকি বলে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সেটা খুবই বিপজ্জনক। তার নিজের জন্য যেমন, বাংলাদেশের জনগণের জন্যও তেমনি।
আবারও বলছি, বাংলাদেশের জনগণ দেশের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে রাজনৈতিক নির্দেশনা চেয়ে আসছে। অর্থাৎ তিনি বাংলাদেশের জনগণকে কী দিতে পারেন বা কী দেবেন সেটা এখনকার সংকট তৈরি হওয়ার অনেক আগেই স্পষ্ট করে বলা দরকার ছিল। তিনি বলেননি। ইতিমধ্যে খুবই দেরি হয়ে গেছে। এখন তিনি নির্বাচনের সময় সরকারের ধরন নিয়ে যে প্রস্তাব করেছেন, সেটা অনেকের মতো আমার কাছেও ‘অবাস্তব’ মনে হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম না ধরে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠনের জন্য বাংলাদেশে তিনি পুরনো লোক ছাড়া নতুন কাউকে খুঁজে পেলেন না। কৌশলগত হলেও সেটাও ঠিক মনে হয়নি। তার রাজনৈতিক প্রভাব সমাজে পড়ে। যেমন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তৈরির সময় এই ধারণা দেশের মানুষকে দেয়া হয়েছিল যে একমাত্র বিচারকরাই বাংলাদেশে ফেরেশতা, তাদেরই প্রধান উপদেষ্টা বানাতে হবে। এর ফল বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ হয়েছে। এ প্রস্তাবের একটা ব্যাখ্যা হচ্ছে, ১৬ কোটির এই দেশে মাত্র বিশজন লোকই আছেন, মরা কিংবা জীবিত, যারা নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারেন। আর ইতিবাচকভাবে বিচার করলে তিনি বলতে চেয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি আমলে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়েছে, অন্যটায় বিএনপি নির্বাচিত হয়েছে, কাজেই এদের ব্যাপারে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। এই ভেবে তিনি সহজ অবস্থান নিতে গিয়ে এ বিষয়টাকে খামাখা আরও জটিল করে ফেলেছেন। এখন সবাই অংক মেলাচ্ছেন, কতজন বেঁচে আছেন, কতজন অসুস্থ, কতজন রাজি হবেন, ইত্যাদি করতে গিয়ে শেষতক লোম বাছতে কম্বল উজাড় হচ্ছে। বাংলাদেশের সুশীল নাগরিক সমাজ কিছুটা ক্ষুব্ধ হতে পারে, কারণ নির্দলীয় নিরপেক্ষ মুহূর্তগুলোর দিকে তারা তাকিয়ে থাকে। এর চেয়ে ভালো কোনো প্রস্তাব দিলেও যে তা শেখ হাসিনার কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতো এমন কোনো গ্যারান্টি নাই। আসলে শেখ হাসিনার প্রস্তাবের বিপরীতে তিনি কোনো প্রস্তাব দিচ্ছেন না কেন বলে যারা তার সমালোচনা করছিল ও চাপ দিচ্ছিল, তিনি তাদের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।
২১ অক্টোবরের প্রেস কনফারেন্সকে তিনি আন্দোলন আরও শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ হিসেবে নিতে পারতেন। গ্রামেগঞ্জে চায়ের দোকানে রেডিও-টেলিভিশনে তার বক্তব্য শোনার জন্য লোকের ভিড় ছিল, যদি কোনো আন্দোলনের ঘোষণা আসে এই আশায়। তারা হতাশ হয়েছে এবং তার দোদুল্যমানতাকে পছন্দ করেনি। সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে মনে হয়েছে তিনি দেশের জনগণকে নয়, বরং পরাশক্তিগুলোকে সন্তুষ্ট করার দিকেই অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে ফেলেছেন। ফলে মনে হয়েছে, সময় ও সুযোগের উপযুক্ত ব্যবহার তিনি করেননি।
যে দিকটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় সেটা হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ সম্পর্কে যতটুকু বলা দরকার, অতি উৎসাহী হয়ে তিনি তার চেয়েও অনেক বেশি বলেছেন। তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্থানীয় বরকন্দাজ হতে চান, যে যুদ্ধ মূলত পরিচালিত হচ্ছে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে, তিনি সেই যুদ্ধে পাশ্চাত্য শক্তির অংশীদার হতে চান, তাদের হাত মজবুত করতে চান। পাশ্চাত্যের হয়ে তিনি এদেশের জনগণের বিরুদ্ধে লড়তে চান। যে র‌্যাবকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ‘ঘাতক বাহিনী’ আখ্যা দিয়েছে, তিনি তার জন্য গর্বিত। এর আগেও তিনি এ ধরনের ভুল গর্বে গর্বিত হয়েছেন। নাগরিক ও মানবাধিকার লংঘনের দায় তার ওপর কালো ছায়ার মতো ঝুলছে। আজ যখন জনগণ মানবিক ও নাগরিক অধিকার অর্জনের জন্য লড়ছে, তখন তার চরম মানবাধিকারবিরোধী অবস্থান নেয়া ঠিক হয়নি। এই অবস্থান তার রাজনৈতিক শক্তি ও সমর্থনের ভিত্তিকে দুর্বল করবে।
তাছাড়া বেগম জিয়া ভুলে যাচ্ছেন, তিনি যতই চেষ্টা করেন না কেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের সেনাপতি শেখ হাসিনা। তিনি শত চেষ্টা করেও শেখ হাসিনার চেয়ে বেশি ফ্যাসিস্ট হতে পারবেন না। এবং ফ্যাসিস্টরাই পরাশক্তির পছন্দ। শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র এটা নয়। বরং ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইটাই তার জায়গা। সেই জায়গা তিনি অলংকৃত করতে না চাইলে তা খালি থাকবে না। আমি বারবারই বলে আসছি, তাকে ঘিরে আছে এমন কিছু শক্তি যারা তাকে পরাশক্তির ইচ্ছামতো পরিচালিত করতে চায়। এতে তাদের নিজেদেরও লাভ আছে। তারা তাকে সারাক্ষণই বিভ্রান্ত করছে ও ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে বাংলাদেশের জনগণের বিপরীতে দাঁড় করাচ্ছে। কিন্তু তিনি যদি সত্যিই দেশনেত্রী হতে চান তাহলে তাকে এদের জাল ছিন্ন করে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। তিনি শেখ হাসিনাকে টালবাহানা বন্ধ করার কথা বলেছেন, এক্ষেত্রে তাকেও টালবাহানা বন্ধ করতে হবে।
তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইছিলেন। তার দিক থেকে এই দাবির যুক্তি আছে। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভালো হোক কী মন্দ হোক, বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতির ভিত্তিতেই সংবিধানে যুক্ত। দ্বিতীয়ত, প্রতিকূল পরিস্থিতি মাথায় নিয়ে তিনি নির্বাচনে যেতে চান না। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তার দলের ক্ষমতায় যাওয়ার দাবি। এই দাবি জনগণের কাছে কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তি নয়। কিংবা বাংলাদেশের বর্তমান অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার বা রূপান্তর ঘটিয়ে নতুনভাবে বাংলাদেশ গঠন করার কর্মসূচিও নয়। বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে তিনি কিভাবে গড়ে তুলতে চান- সেই কর্মসূচি কই? নিদেনপক্ষে একটি সহনশীল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ন্যূনতম নীতিমালা কী হতে পারে, সে বিষয়েও তার কাছ থেকে জনগণ কোনো নির্দেশনা পায়নি।
বিএনপি কোনো বিপ্লবী দল নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ধরনের দল উদার রাজনৈতিক (ষরনবৎধষ) দল বলে পরিচিত। তারপরও সীমিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এ দলটি অনেক কিছুই করতে পারে। করার আছে। যেমন নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা, বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার স্বীকার করা এবং কারখানায় তাদের প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্তে হত্যা বন্ধ করা, প্রাণ ও পরিবেশের ক্ষতি না করা, দুর্নীতি না করা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করা, দিল্লির আগ্রাসন থেকে রক্ষা, অবাধ বাজারের নামে সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন বন্ধ করা ইত্যাদি। বিএনপি এই ন্যূনতম কাজগুলো করবে জনগণ সেই প্রতিশ্র“তি তার কাছ থেকে চায়। এখন আওয়ামী লীগ যদি হঠাৎ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে বসে তাহলে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও এই প্রতিশ্র“তি দেয়ার সময় পাবে না। কিন্তু তিনি এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্র“তি দেননি। মনে রাখা দরকার, আমরা অবাস্তব নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি ও প্রোপাগান্ডামূলক কর্মসূচির কথা বলছি না। বলছি এমন কিছু নীতিগত সংস্কারের কথা যা জনগণকে আশার বাণী শোনায় এবং যার বাস্তবায়ন তার দল বা ১৮ দলীয় জোটের পক্ষে করা সম্ভব। যেমন পঞ্চদশ সংশোধনীর পর যে অগণতান্ত্রিক, নাগরিক ও মানবাধিকারবিরোধী সংবিধান আমাদের ঘাড়ের ওপর বাঘের হিংস্র নখের মতো বসে রয়েছে আর আমাদের ক্রমাগত রক্তক্ষরণ ঘটছে, তিনি কিভাবে তার সংস্কার করবেন। কিংবা আদৌ করবেন কিনা আমরা এখনও জানি না। গণমাধ্যমের ওপর যে নিপীড়ন চলছে সেই নিপীড়নের বিবিধ কালো আইন তিনি বাতিল করবেন কিনা। তিনি মাহমুদুর রহমান, আদিলুর রহমান খানের ওপর দমন-নিপীড়নের কথা বলেছেন, অবশ্যই। কিন্তু এই নিপীড়ন বন্ধ করতে হলে তাকে তো বিচারব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে, দুষ্ট বিচারকদের হাত থেকে নাগরিকদের মুক্তি দিতে হবে, পুলিশ ও প্রশাসনের ট্রিগার হ্যাপি সন্ত্রাসীদের শাস্তি দিতে হবে ইত্যাদি। তিনি এসব সুনির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে কিছুই বলেননি। তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন না বলেছেন, সেটা খুবই ভালো নীতি। একথা তার বারবার বলা দরকার। কিন্তু যারা গণহত্যা করেছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে, মানুষ গুম করেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, আলেম-ওলামাদের আলো নিভিয়ে নির্বিচারে হত্যা করেছে, নিজেরা কোরআন শরিফ পুড়িয়ে আলেম-ওলামাদের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষমা করে দেয়ার অধিকার তো জনগণ তাকে দেয়নি। প্রতিহিংসা অবশ্যই নয়, কিন্তু ন্যায়সঙ্গত বিচার থেকে কাউকে রেহাই দেয়ার অধিকার তার নেই। কারোরই নেই। এই প্রত্যাশাগুলোকেই তিনি লম্বা দাবিনামা বা অনর্থক বিশাল তালিকা না বানিয়ে সহজে বলতে পারেন যে একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা। তিনি ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের সেই ঘোষণাই বাস্তবায়িত করবেন। আসলেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করতে চাইছি। জয় শাহবাগ!
এটা সত্য যে, তিনি ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র কথা বলেছেন এবং বিমূর্ত হলেও তার কিছু রূপরেখা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ওর মধ্যে আবেগ ও আশা আছে, কিন্তু নতুন ভবিষ্যৎ তৈরির কোনো সুচিন্তিত সূত্র নেই। তবু তিনি যখন নিজের ভুলত্র“টি অকপটে স্বীকার করেন, তখন তাকে প্রশংসা না করে পারা যায় না। তিনি বলেছেন, ‘প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ, মানুষ ভুল-ত্র“টির ঊর্ধ্বে নয়। এবং একথা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে, অতীতে আমাদেরও ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে আমি বলতে চাই যে, আমরা ওই সব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আগামীতে একটি উজ্জ্বল, অধিক স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে আমরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি সেই প্রবচনের সঙ্গে একমত যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাই আমরা অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করব না।’ একথাগুলো আমাদের সোনার অক্ষরে খোদাই করে রাখা দরকার। কারণ একথার ওপর দাঁড়িয়েই আগামী দিনে জনগণ তাকে মূল্যায়ন করবে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে, বিদেশীদের সন্তুষ্ট রাখার ভুল ও হীনমন্য নীতি তিনি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। স্বীকার করি, পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাকে কৌশলী হতে হবে। কিন্তু সেটা দেশ ও জনগণের স্বার্থের বিনিময়ে নয়।
তিনি এতদিন শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়ে আসছেন। আমি অনেকবারই তার সমালোচনা করেছি। তিনি ক্ষমতার রাজনীতি করেন, ক্ষমতায় যেতে চান, এতে কোনো অসুবিধা নেই। সেটা অন্যায়ও নয়। আমরা অনেকেই বারবার তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি, বিএনপি কোনো বিপ্লবী দল নয়, ফলে এতটুকুই বিএনপির কাছে আশা করা ন্যায্য যে তারা অতীতের দুর্নীতিপরায়ণ চরিত্র ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা থেকে যথাসম্ভব নিজেদের সংশোধন করে একটা উদার কিন্তু গণতান্ত্রিক নীতির চর্চা করবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটাও কঠিন কাজ। এর অর্থ হচ্ছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর পর সংবিধানের যে দুর্দশা ঘটেছে সেই সংবিধান বহাল রেখে গণতন্ত্র কায়েম ও চর্চা রীতিমতো অসম্ভব। এই সত্য মাথায় রেখেই তাকে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হবে। গণঅভ্যুত্থান ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের সামনে আর কোনো পথ ক্ষমতাসীনরা রাখেনি। তিনি চান বা না চান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেদিকে যাওয়ারই সমূহ সম্ভাবনা। বুর্জোয়া দল হিসেবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকলেও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে তিনি নিজেকে গৌণ শক্তিতে পরিণত করবেন। ষাট ও সত্তর দশকে শেখ মুজিবুর রহমান আইনি পরিমণ্ডলে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিই করেছিলেন। কিন্তু তা আইন ও নিয়মতান্ত্রিকতার সীমা অতিক্রম করে গণঅভ্যুত্থান ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো যায় না ঠিক, কিন্তু ফল পেকে গেলে সেটা পাড়তে না পারলে সেই ফল বাদুড়ের খাদ্য হয়।
বাংলাদেশের মানুষ এখন বেগম জিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি কী বলবেন না বলবেন সেটা তাকে অনেক সাবধানে ও বহু কিছু বিবেচনা করে বলতে হবে। পরাশক্তি তাকে ক্ষমতায় আনবে না, জনগণই আনবে। যদি তারা চায়। পরাশক্তি যদি কাউকে আনে, তবে তারা হচ্ছে তথাকথিত ‘তৃতীয় শক্তি’। তিনি নন। যারা এলে এবার দুই বছর নয়, আরও দীর্ঘকাল থাকবে। আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে তথাকথিত তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা সব সময়ই থাকবে। অতএব ঢাকার কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে সৌহার্দ্য থাকুক, কিন্তু তাদের হাত ধরে চলার নীতি বেগম জিয়াকে ত্যাগ করতে হবে। বিশেষত তিনি যদি বলেন যে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্যায়, সহিংস ও মানবতাবিরোধী যুদ্ধে তিনি বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে লড়বেন, তাহলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের জনগণ তার পেছনে দাঁড়াবে কেন? শেখ হাসিনা এই নীতি নিয়েছেন বলেই জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করছে। আর যারা এই নীতির সমর্থক তারাই বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। এই সরল কাণ্ডজ্ঞান আমরা যেন না হারাই।

খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত ক্ষুদে প্রিন্স : নিয়ম ভাঙল রাজপরিবারের

জন্মের আগেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল উইলিয়াম-কেটের অনাগত সন্তান। জন্মের পরই সেই এক রত্তি জর্জকে নিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছিল সারা ব্রিটেন তথা সারা দেশ। খবর ডেইলি মেইল। এবার সিংহাসনের সেই ক্ষুদে উত্তরাধিকারীর খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পালা। তা নিয়েই আরও একবার হুজুগে মেতেছে দেশ। আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবেরির পৌরোহিত্যে বুধবার অনুষ্ঠিত হল এই ধর্মগ্রহণ অনুষ্ঠান। সাধারণত বাকিংহাম প্যালেসের মিউজিক রুমেই এই ধরনের অনুষ্ঠান করা হয়। কিন্তু এবার সেই প্রথা ভেঙে মধ্য লন্ডনের সেন্ট জেমস প্যালেসকে বেছে নেয়া হয় অনুষ্ঠানের জন্য। মূলত রাজকুমার উইলিয়ামের ইচ্ছেতেই এই পরিবর্তন। ডায়ানাকে মৃত্যুর পরে সমাহিত করা হয়েছিল এই সেন্ট জেমস প্যালেসেই।
উইলিয়াম চেয়েছিলেন, তার মায়ের স্মৃতি জড়ানো সেই জায়গাতেই জর্জের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের অনুষ্ঠানটি হোক। আগের দিন থেকেই মধ্য লন্ডনের সেন্ট জেমস প্যালেসের বাইরে ভিড় জমাতে শুরু করেন আত্মীয়-পরিজন। সংবাদমাধ্যমের দল তো রীতিমতো তাঁবু খাটিয়ে আস্তানা গেড়ে ফেলেন সেখানে। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি কিছুই। রাজপরিবারের এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানটি আগাগোড়া বাঁধা ছিল অত্যন্ত নিচু তারে। সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার তো দূরের কথা, খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয়-বন্ধু ছাড়া কেউই নিমন্ত্রিত হননি অনুষ্ঠানে। সর্বসাকুল্যে ২২টি পরিবারের উপস্থিতিতেই সেরে ফেলা হল অনুষ্ঠান। ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, এদিন ছোট্ট জর্জ সেজেছিল লেসের কাজ করা দুধ সাদা সাটিনের জামায়। ১৮৪১ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার বড় মেয়েকে ‘প্রিন্সেস রয়্যাল’ উপাধি দেয়ার সময়ে যে পোশাক পরানো হয়েছিল, সেই পোশাকটির আদলেই তৈরি হয় জর্জের পোশাকটি।