Thursday, June 18, 2026

হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুবিধা ও ঝুঁকিগুলো জেনে রাখুন by অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেন

হাঁটুতে দীর্ঘদিনের ব্যথা, ফোলা ও চলাফেরায় কষ্টের কারণ সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাড়ের বিকৃতি বা কোনো দুর্ঘটনাজনিত আঘাত। প্রাথমিকভাবে ওষুধ, ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপিতে উপকার না হলে হাঁটু প্রতিস্থাপনে অস্ত্রোপচার (সার্জারি) প্রয়োজন হতে পারে।

হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হাঁটুর অংশ অপসারণ করে সেখানে কৃত্রিম সংযোগ বা ইমপ্ল্যান্ট বসানো হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সফল ও বহুল প্রচলিত একটি অস্ত্রোপচার।

কখন অস্ত্রোপচার দরকার হতে পারে

● হাঁটুতে তীব্র ব্যথা ও ফুলে গেলে। হাঁটা, বসা বা সিঁড়ি ওঠা–নামায় সমস্যা হলে।

● ওষুধ বা ফিজিওথেরাপিতে উপকার না পেলে। অথবা হাঁটু বেঁকে বা শক্ত হয়ে গেলে।

হাঁটু প্রতিস্থাপনে সুবিধা

ব্যথা অনেক কমে যায়। স্বাভাবিক চলাফেরা সহজ হয়। দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়ে। অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনে ফিরে যেতে পারেন।

কত দিন ভালো থাকা যায়

আধুনিক হাঁটু প্রতিস্থাপনের ইমপ্ল্যান্ট সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছরের বেশি সময় কার্যকর থাকে। হাঁটু প্রতিস্থাপন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম সফল অস্ত্রোপচার হিসেবে বিবেচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫-৯৮ শতাংশ রোগী অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘদিন ব্যথামুক্ত ও স্বাভাবিক চলাফেরায় সক্ষম হন। হাঁটু প্রতিস্থাপনের এক দিন পরেই রোগী সম্পূর্ণ ভর দিয়ে হাঁটাচলা শুরু করেন। বাংলাদেশে এখন সফলতার সঙ্গে হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।

সম্ভাব্য কিছু ঝুঁকি

যেকোনো অস্ত্রোপচার–পদ্ধতির মতো হাঁটু প্রতিস্থাপনেও কিছু ঝুঁকি আছে। যেমন—

● অ্যানেসথেসিয়ার সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি: গভীর শিরা–রক্তনালিতে বা পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা। কখনো কখনো এই জমাট রক্তগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে ফুসফুসে যেতে পারে। এর ফলে একটি মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়, যার নাম ‘পালমোনারি এম্বোলিজম’।

● অস্ত্রোপচারের জায়গায় বা জয়েন্টের মধ্যে সংক্রমণ: ইমপ্লান্টের চারপাশের হাড়ে ফ্র্যাকচার (ফাটল) হতে পারে। হাঁটুর ক্যাপের স্থানচ্যুতি ঘটতে পারে অথবা কাছাকাছি থাকা লিগামেন্ট (অস্থিবন্ধনী), স্নায়ু ইত্যাদির কিছু ক্ষতি হতে পারে।

* অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেন, চিফ কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থোপেডিক, আর্থ্রোপ্লাস্টি, আর্থোস্কোপিক এবং ট্রমা সার্জারি বিভাগ, ল্যাবএইড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা

হাঁটুতে দীর্ঘদিনের ব্যথা, ফোলা ও চলাফেরায় কষ্টের কারণ সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাড়ের বিকৃতি বা কোনো দুর্ঘটনাজনিত আঘাত
হাঁটুতে দীর্ঘদিনের ব্যথা, ফোলা ও চলাফেরায় কষ্টের কারণ সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাড়ের বিকৃতি বা কোনো দুর্ঘটনাজনিত আঘাত। ছবি: পেক্সেলস

কিডনি সুস্থ রাখতে কী খাবেন by ফারজানা ওয়াহাব

কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ওপর রেনাল লোড বা কিডনির ওপর চাপ নির্ভর করে। তাই কিডনি সুস্থ রাখতে পুষ্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।

রেনাল লোড কী

আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে শরীরে বিভিন্ন বর্জ্য তৈরি হয়—যেমন ইউরিয়া, সোডিয়াম, পটাশিয়াম। এগুলো ছাঁকতে (ফিল্টার) কিডনিকে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়। এই কাজের চাপকেই বলা হয় রেনাল লোড। প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রোটিন, লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এই রেনাল লোড বাড়ায়, যে কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিডনি সুস্থ রাখার ১০টি টিপস

পর্যাপ্ত পানি পান: প্রতিদিন ৬-৮ গ্লাস (শরীর ও আবহাওয়া অনুযায়ী পানির পরিমাণ বাড়তে পারে)। প্রস্রাব হালকা স্বচ্ছ রঙের থাকলে বুঝবেন পানির পরিমাণ ঠিক আছে।

লবণ কম খাওয়া: দিনে ১ চা–চামচ বা তার কম, শুধু রান্নায় লবণ ব্যবহার করুন। কাঁচা বা ভাজা লবণ পরিহার করুন। অতিরিক্ত লবণ কিডনি ও উচ্চ রক্তচাপের জন্য ক্ষতিকর।

প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ান: চিপস, ফাস্ট ফুড, ক্যানজাত খাবার বাদ দিন। এগুলোয় লবণ ও রাসায়নিক উপাদান বেশি থাকে।

সুষম খাবার: শাকসবজি, ফল, দেহের ওজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত প্রোটিন (বিশেষ করে লাল মাংস) যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।

নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।

ডায়াবেটিস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: এগুলো কিডনির রোগের প্রধান কারণ। নিয়মিত চেকআপ করুন।

ব্যথার ওষুধ: অকারণে বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না।

ধূমপান অ্যালকোহল: এসব এড়িয়ে চলুন। এগুলো কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ওজন কিডনির ওপর চাপ ফেলে।

নিয়মিত পরীক্ষা: নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়ে।

কীভাবে বুঝবেন কিডনি আক্রান্ত

অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ থাকে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

● শরীর ফুলে যাওয়া (পা/মুখ)।

● প্রস্রাবে সমস্যা, প্রস্রাবে ফেনা বা রক্তপাত।

● দুর্বলতা

● ক্ষুধামান্দ্য

মনে রাখতে হবে, কিডনির রোগ হঠাৎ করে হয় না—এটি ধীরে ধীরে বাড়ে। তাই সচেতন হলে বড় জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
কিডনি রোগের ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকুন
কিডনি রোগের ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকুন। প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো

শিশুদের বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে by মৃণাল সাহা

শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো পরিশ্রমের সময়, এখানে অবসাদ স্থায়ী হওয়ার কোনো সুযোগই নেই; বরং তাকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেন অনেকে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার চাপই ডেকে আনতে পারে অবসাদ, প্রভাব ফেলতে পারে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।

বার্নআউট’ শব্দটা সম্ভবত সবচেয়ে খাপ খায় করপোরেট চাকরিজীবীদের সঙ্গে। কাজের চাপে পিষ্ট হয়ে অবিরাম ডেডলাইনের চাপে মানসিক চাপ ছাড়িয়ে যায় সহ্যের সীমা। তখনই ভেঙে পড়ে শরীর ও মন। সাধারণ কাজকর্ম করতেও তখন বিরক্ত লাগে, মানসিক অবসাদ মিলিয়ে শরীর আর চলতে চায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই বার্নআউট।

অনেকেরই ধারণা, এ ধরনের বার্নআউট শুধু মাঝবয়সী চাকরিজীবীদেরই হতে পারে। কিন্তু তা নয়, বার্নআউট হানা দিতে পারে যেকোনো বয়সে। মূলত মানুষের মস্তিষ্ক যখন প্রতিদিনের কাজের চাপ একত্রে আর নিতে পারে না, তখনই চেপে বসে মানসিক অবসাদ। আর সেই অবসাদ থেকে শরীর ও মন দুটিই হাল ছেড়ে দেয়। এই অবসাদ যে শুধু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জমা হয়, তা নয়; বরং শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ।

শিশুদের বার্নআউট কেন হয়?

শিশুরা বার্নআউট হতে পারে বিভিন্ন কারণে। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা, পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে শুরু করে পরিবারের মানুষের চাপ। অনেক সময় একটা পরীক্ষার ফল ভালো না হওয়ার প্রভাবও পড়তে পারে অনেক বড় আকারে। তাই মানসিক চাপ ভালোভাবে মনে গেঁথে বসার আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ঠিক এই জায়গায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মা–বাবার ভূমিকা। কারণ, একটি শিশুকে খুব কাছ থেকে দেখেন তার মা-বাবা। সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন আর লক্ষণ দেখে সহজেই ধারণা করতে পারবেন, আপনার সন্তান বার্নআউট হয়ে যাচ্ছে কি না এবং তখন থেকেই দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে এই অবসাদ মনে আজীবনের মতো চেপে না বসে।

বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে?

হঠাৎ করেই গড়িমসি করা

আগে হয়তো আপনার সন্তান স্কুল থেকে ফিরেই নিজে থেকে পড়তে বসে যেত, কিন্তু এখন তাকে পড়তে বসার কথা বারবার মনে করাতে হচ্ছে। বাসার পড়া তো পড়ছেই না, বইপত্রের মুখোমুখিই হতে চাচ্ছে না। নানা অজুহাতে পড়তে বসা পিছিয়ে দিচ্ছে। পড়াশোনার প্রতি অবসাদ, বার্নআউট থেকে এমনটা হতে পারে।

উদাসীন ভাব

হঠাৎ করেই সন্তানের মধ্যে সবকিছুর প্রতি একধরনের অনীহা বা উদাসীনতা দেখা দিতে পারে। আগে স্কুল থেকে ফিরেই প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, কথা বলত; কিন্তু হঠাৎ করেই এমন কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে সে। জিজ্ঞেস করলেও দুই এক শব্দের মধ্যেই কথা শেষ করতে চায়। হুট করে আগ্রহ কমে যেতে পারে বার্নআউট থেকে।

প্রিয় কাজে অনীহা

পড়াশোনার পাশাপাশি আগে যেসব কাজ করার জন্য উৎসুক ছিল, যেমন কোনো শখের কাজ বা খেলাধুলায় যেতে ভীষণ অনীহা দেখানো, নতুন নতুন বাহানা তৈরি করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

শিশুরা সাধারণত দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু হুট করেই যদি দেখেন তার মনোযোগ কমে গেছে, আগে টানা ২০-৩০ মিনিট মনোযোগ দিতে পারত, সে এখন ১০ মিনিটও স্থির থাকতে পারছে না; তাহলে সেটিও হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং শারীরিক ক্লান্তি থেকে মনোযোগ অনেক সময় কমে যায়।

খিটখিটে মেজাজ

বার্নআউটের অন্যতম লক্ষণ খিটখিটে মেজাজ। হুট করেন শিশুর হাসিখুশি চেহারা উবে যায়, আর মনমেজাজ হয় তিরিক্ষি। ছোটখাটো বিষয়ে রিঅ্যাক্ট করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

সাহায্য করবেন কীভাবে?

সন্তানকে জানুন

প্রতিটি শিশুর আচরণ, স্বভাব, মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা আলাদা। সময়ের সঙ্গে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এসব গড়ে ওঠে। কোন বিষয়গুলো আপনার সন্তানকে আনন্দ দিচ্ছে, কোন বিষয়গুলো তার মনে বিরক্তির উদ্রেক করছে—এসব বোঝার চেষ্টা করুন। সময় দিয়ে তাকে বিভিন্ন কাজে আগ্রহী করে তুলুন।

সন্তানকে পথ দেখান

সন্তান সুন্দর একটা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাক, তা কে না চান! কিন্তু সেই চাওয়া-পাওয়া সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এমন চাপ থেকেও মানসিক অবসাদ আসে। সন্তানের ওপর আপনার চাওয়া-পাওয়া যে বাড়তি চাপ নয়, সেটি তার ছোট্ট মনে গেঁথে দিন।

সন্তানের কথা শুনুন

বেশির ভাগ সময়েই মা-বাবা সন্তানের কথার তেমন মূল্য দেন না; বরং নিজের কথাকেই বড় মনে করেন। তবে এই সময়ে শিশুদের মানসিক স্বস্তির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সে–ও যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানো।

বিশ্রাম দিন

বেশির ভাগ বার্নআউটের পেছনে কারণ থাকে টানা কাজ করে যাওয়া। ক্লান্ত মন ও শরীরকে নতুন করে সতেজ করতে সবারই পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন। পড়াশোনা দূরে রেখে তাকে একটু নিজের মতো সময় কাটাতে দিন। তার শরীর ও মনকে একটু আরাম করতে দিন।

স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করুন

ডিভাইস বা ফোনের স্ক্রিনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা শিশুদের মস্তিষ্ককে শান্ত করে না, উল্টো বার্নআউটের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডিভাইসের সামনে না বসিয়ে অফলাইন বা মাঠে খেলতে নিয়ে যান। এতে তারা যেমন শারীরিকভাবে অ্যাকটিভ হবে, তেমনই মানসিক চাপও অনেকটা ঝেড়ে ফেলতে পারবে।

চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখান

মানসিক চাপ বা কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে বুদ্ধি দিয়ে সামলাতে হয়, তা সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই একটু একটু শেখান। পরীক্ষার সময়ের চাপ, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আবেগকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে কথা বলুন। মন খারাপ হলে বা চাপ অনুভব করলে তা নিয়ে কথা বলা, ডায়েরি লেখা বা খেলাধুলার অভ্যাস দারুণ উপকারে আসে।

সূত্র: চাইল্ড ফোকাস
শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ
শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ। ছবি: প্রথম আলো
 

গ্রামের অনেক মানুষের কাছে কু-পাখির ডাক ভীষণ অমঙ্গলের সংকেত, চেনেন কি এই কু-পাখি by সরওয়ার পাঠান

ছোট–বড় নানা জাতের গাছ আর ঝোপজঙ্গলে ঘেরা ছিল আমাদের বাড়ি। মাঝেমধ্যেই সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতে ঘন পাতার আড়াল থেকে ভেসে আসত অদ্ভুত রহস্যময় এক ডাক। মা তখন উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠতেন, ‘কু-পইখ ডাকতাছে, তাড়াতাড়ি চুলার ভিতরে শিক পোড়া দে।’

গ্রামের লোকজন বিশ্বাস করত, কু-পাখির ডাক আসলে ভীষণ অমঙ্গলের সংকেত, নিশ্চয়ই কেউ মারা যাবে অথবা অশুভ কিছু ঘটবে। আর তাকে তাড়ানোর কৌশল ছিল, জ্বলন্ত চুলার ভেতর লোহার ছেনি বা লোহার শিক ঢুকিয়ে গরম করা। লোহার শিক গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কু-পাখির শরীরও গরম হয়ে উঠবে। লোহাটি যখন টকটকে লাল হয়ে উঠবে, তখন কু-পাখির শরীরে আগুন ধরে যাবে, তখনই সে বাড়ির সীমানা ছেড়ে উড়ে পালাবে; এ–ই ছিল সবার বিশ্বাস।

পরে একসময় বাবার কাছ থেকে জানতে পারলাম, সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতে কু-কু-কু শব্দে যে পাখিটি ডাকাডাকি করে, সে হচ্ছে একধরনের প্যাঁচা। কৈশোরের শুরুতে শব্দের উৎস লক্ষ করে বেশ কয়েকবার টর্চ মেরে কু–পাখি দেখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। কারণ, ঝাঁকড়া পাতার গভীরে সে বসে থাকত, ইচ্ছা করলেও সহজে তার দেখা পাওয়া যেত না।

অবশেষে নিকষ কালো এক রাতে তার দেখা মিলল। বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ঝাঁকড়া আমগাছের মাথা থেকে ভেসে আসছিল কু-পাখির ডাক। তারার আলোয় আবছা দেখতে পাচ্ছিলাম, তির তির করে কাঁপছে গাছের পাতা। এই গাছ লক্ষ্য করে আগেও টর্চ ধরেছি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, আজকেও সে ঝোপালো পাতার আড়ালেই ছিল। হঠাৎ তার ডাক থেমে গেল। আমিও থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আমার খুব কাছেই আবার শোনা গেল সেই শিহরণ জাগানো ডাক, কু–কু–কু। একমুহূর্ত দেরি না করে টর্চের সুইচে চাপ দিলাম। আমার কাছ থেকে একটু দূরে বিদ্যুতের তারে সে বসে আছে। অসাধারণ সুন্দর একটা পাখি। দেখতে ঠিক প্যাঁচার মতো না, যেন ছোটখাটো এক বাজপাখি। তখনো সে ডাকছিল, ডাকের তালে তালে ফুলে উঠছিল তার গলা, সেখানে সাদা আর ধূসর রং দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। তবে চোখেমুখে আলো পড়ায় কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক বন্ধ হয়ে গেল। তখন আমার জানা ছিল না তীব্র আলো নিশাচর প্যাঁচার জন্য খুবই ক্ষতিকর, বেশিক্ষণ চোখে আলো ধরে রাখলে এমনকি জন্মের মতো অন্ধ হয়ে যেতে পারে। কোটরে কিংবা ভুতুম প্যাঁচার চোখে লাইট ধরলে ওরা মানুষের সঙ্গে রীতিমতো ঘাড় ঘুরিয়ে খেলা শুরু করে। কিন্তু এই প্যাঁচা দ্রুতই ডানা মেলে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যতটুকু দেখলাম, তাতে মনে হলো সে মাঝারি আকৃতির বাদামি রঙের একটি পাখি, বুকের দিকটা সাদাটে বাদামি দাগ। লম্বাটে লেজের নিচের দিকটা সাদাটে, চোখের চারপাশে হলুদ বলয়; অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বসে থাকার সময় তার ডানার দুপাশ খয়েরি দেখাচ্ছিল।

সেই রাতেই জেনেছিলাম, কু-পাখি আসলে এক জাতের প্যাঁচা। অনেকের কাছে কালপ্যাঁচা, কেউ বলে খয়েরি শিকড়ে প্যাঁচা। ইংরেজিতে এদের নাম ব্রাউন বুবুক, অনেকের কাছে ব্রাউন হক আউল। আসলে তার ডাকটা হচ্ছে, বুবুক...বুবুক...বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের ভাষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুনেছে কু-হ, কু-হ কিংবা কু...কু...কু...মানে খারাপ কিছু, তাই পাখির ডাক হয়ে গেল মানুষ মরার সংকেত।

গ্রামবাংলার হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে আরও এক জাতের কু-পাখি। আজও সন্ধ্যায় কিংবা রাতে তার ডাক শুনে হিম হয়ে আসে অনেকের রক্ত। অনেকের কাছে সে শুধু অশুভই নয়; বরং এক অতি রহস্যময় পাখি। শিকারিজীবনে আমি প্রথম তার দেখা পেয়েছিলাম এক বাঁশঝাড়ের গহিনে। শুকনা বাঁশ আর পাতার সঙ্গে যেভাবে সে মিশে ছিল, অনেকের পক্ষে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। আকারে খুব বেশি বড় না, তবে চেহারাটা সত্যিই ভুতুড়ে, মাথায় আবার দুটো পালকের শিং। ওদের ধীরলয়ের কু-হ, কু-হ ডাকে আজও বিষণ্ন হয়ে ওঠে গ্রামের সন্ধ্যা। মানুষ আঁতকে ওঠে, জ্বলন্ত চুলায় শিক ঢুকিয়ে দেয় কেউ, কেউ আবার অমঙ্গলের আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। আসলেই কি সে অশুভ পাখি? মোটেও না, এ হচ্ছে প্রকৃতির এক আদরের সন্তান কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা। ইংরেজিতে যাদের বলা হয় কলার্ড স্কোপস–আউল।

কালপ্যাঁচা আর কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা, দুটোকেই কু–পাখি হিসেবে জানে মানুষ। অনেকের কাছে দুটোর ডাক আবার একরকম। আসলে কিন্তু তা না, কালপ্যাঁচা একনাগাড়ে আট–নয়টা ডাক দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেয়, তারপর আবার ডাকতে শুরু করে। অন্যদিকে কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা স্বল্প সময়ের বিরতিতে একনাগাড়ে ডেকে চলে দীর্ঘক্ষণ।

এই যে পাখিরা শুধু ডাকের জন্য মানুষের কাছে অশুভ হয়ে গেল। আসলে কেন ওরা ডাকে? নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য আমরা যেমন কথা বলি, ওরা অনেকটা সেই কারণেই ডাকাডাকি করে। কখনো কখনো নিজের সীমানা নির্ধারণের জন্যও ওরা ডেকে থাকে। প্রজনন ঋতুতে ডাকাডাকিটা বেড়ে যায়। কিন্তু এতে মানুষের ক্ষতি হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। হাস্যকর একটা বিষয় যেন দৃঢ় সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগের পর যুগ। আর মানুষ যাদের কু–পাখি মনে করে, এরা কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে মানুষের উপকার করে থাকে। কালপ্যাঁচা কিংবা কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা—দুটোই ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে। আর কালপ্যাঁচা বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে ইঁদুর শিকার করে থাকে। তাই এর মতো বন্ধু আর দ্বিতীয়টি নেই।

তাই শুধু বিশেষ পাখির ডাকে নয়, যেকোনো বিচিত্র শব্দে যেন আমরা আতঙ্কিত না হয়ে আসল সত্যটি জানার চেষ্টা করি।
কু-পাখি, কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা; চেহারাখানা সত্যি রহস্যময়
কু-পাখি, কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা; চেহারাখানা সত্যি রহস্যময়। ছবি: শুভব্রত সরকার

কী আছে পিতা–মাতার ভরণপোষণ আইনে by মিতি সানজানা

বাবা–মা বার্ধক্যে পৌঁছালে তাঁদের সেবাযত্ন ও দেখভাল করা প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বৃদ্ধ বয়সে অনেক মা–বাবাই কষ্টে জীবনযাপন করেন। অবহেলার শিকার হয়েও সন্তানদের সুখের কথা ভেবে তাঁরা সবকিছু মেনে নেন। তবে তাঁরা কিছু না বললেও আমাদের দেশে বৃদ্ধ মা–বাবার ভরণপোষণ দেওয়ায় রয়েছে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩’ নামে একটি আইন করা হয়েছে। আইনটি সম্পর্কে অনেকেরই কোনো ধারণা নেই।

কী আছে আইনে

মা–বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের সঙ্গে সন্তানের বসবাস বাধ্যতামূলক করার বিধান রেখে সরকার এই আইন করে। মা–বাবার ভরণপোষণ আইন ২০১৩-এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং একাধিক সন্তান থাকলে প্রত্যেককে আলাপ–আলোচনার ভিত্তিতে ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে।’

আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো সন্তান তাঁর মা–বাবাকে অথবা উভয়কে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। সন্তানেরা তাঁদের মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন।

শুধু তা–ই নয়, মা–বাবাকে নিয়মিত সঙ্গ প্রদান করার কথাও আইনে বলা আছে। কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেন, তাহলে তাঁরাও একই অপরাধে অপরাধী হবেন। তাঁদেরও এই আইনের অধীন শাস্তির আওতায় আনা যাবে।

মা–বাবার ভরণপোষণ আইনের ৩(৭) ধারা অনুযায়ী, কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে আলাদাভাবে বসবাস করলে, ওই পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তার প্রতিদিনের আয়রোজগার, মাসিক আয় বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমতে দুজনকেই নিয়মিত প্রদান করবে।

আইন না মানলে

কোনো ব্যক্তি মা–বাবার ভরণপোষণ আইন অমান্য করলে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচার করা হবে। কোনো আদালত এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ বাবা বা মায়ের লিখিত অভিযোগ ছাড়া আমলে নেবেন না। আইনে আপস-নিষ্পত্তির ধারাও সংযুক্ত করা হয়েছে।
পিতা–মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩-এর ৫ (১) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো প্রবীণ তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনেন এবং সে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের ১ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এই আইনের ব্যবহার আমাদের দেশে এখনো খুবই কম।

যদি সন্তান বেঁচে না থাকেন

২০১৩ সালে করা ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’–এর নির্দেশনা অনুসারে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিধিমালা ২০২৩’ তৈরি করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে বাবা-মায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সন্তান যাতে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন, তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেন এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠান, তা এই বিধিমালায় কঠোরভাবে বলা হয়েছে।

কোনো সন্তান যদি কোনোভাবেই মা-বাবাকে নিজের কাছে রেখে ভরণপোষণ করতে না পারেন, তবে বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি বা বেসরকারি পরিচালিত ‘পরিচর্যাকেন্দ্রে’ রেখে তাঁদের পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মা-বাবার কোনো সন্তান জীবিত না থাকলে বা ভরণপোষণের মতো কেউ না থাকলে, পিতা-মাতা ভরণপোষণ কমিটি তাঁদের পরিচর্যাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বিধিমালায় অসহায় মা–বাবার সহায়তার জন্য সরকারি অনুদান এবং দেশি-বিদেশি সহায়তায় একটি ‘ভরণপোষণ তহবিল’ গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
* মিতি সানজানা, ব্যারিস্টার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
দেশে বৃদ্ধ মা–বাবার ভরণপোষণ দেওয়ায় রয়েছে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা
দেশে বৃদ্ধ মা–বাবার ভরণপোষণ দেওয়ায় রয়েছে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। ছবি: এআই/প্রথম আলো

ভারতে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে কীভাবে এআইকে হাতিয়ার বানিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা

ভিডিওটি প্রথম দেখেই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সামরিন আইয়ুব। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এই ফ্রিল্যান্স মডেল গত বছর মোবাইলে স্ক্রল করছিলেন। এ সময় তাঁর এক বন্ধু ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পাঠান।

ভিডিওটিতে নয়াদিল্লিতে তাঁর জীবনকাহিনি তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। এতে বর্ণনাকারীর কণ্ঠস্বর, চলমান ক্যাপশন এবং টেলিভিশনের সংবাদ প্রতিবেদনের মতো শিরোনাম ছিল। কিন্তু পুরো ভিডিওটি ছিল মনগড়া।

২৪ বছর বয়সী আইয়ুব বলেন, ‘এটা একেবারে অনুসরণ করে তথ্য জোগাড় করার মতো ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম সেমিস্টার থেকে শেষ সেমিস্টার পর্যন্ত জীবনের খুঁটিনাটি তারা অনুসরণ করেছে।’

ভিডিওটিতে নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ের বিভিন্ন ছবি জোড়া লাগানো হয়েছিল। গ্রুপ প্রজেক্ট, বিদায় অনুষ্ঠান ও সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সেলফির মতো ক্যাম্পাসজীবনের সাধারণ মুহূর্তের ছবি এতে ব্যবহার করা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভয়েসওভারে মিথ্যা তথ্য তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, তিনি একজন মুসলিম নারী, যিনি হিন্দু পুরুষদের কাছে ‘নিজের শরীর বিক্রি’ করেন। ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়ও ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের ভাইকে তাঁর ‘দালাল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইয়ুব বলেন, ‘ভিডিওটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে আমার মা–বাবাও যদি এটি দেখতেন, তাহলে সেটিকে তাঁরা সত্যি বলে মনে করতেন।’

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইয়ুব এমন কয়েকজন মুসলিম নারীর একজন, যাঁরা ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠা একটি প্রবণতার শিকার হয়েছেন। এ প্রবণতায় এআই ব্যবহার করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি ও অপপ্রচারমূলক কনটেন্ট তৈরির ঝোঁক দেখা যাচ্ছে।

আল–জাজিরা এ ধরনের হামলার শিকার কয়েকজন মুসলিম নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে তাঁরা লজ্জা ও পুরোনো মানসিক অভিঘাত আবারও ফিরে আসার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।

যৌন কল্পনাকে ছবিতে রূপান্তর

মুসলিম নারীদের ছবি ও ভিডিওকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণভাবে উপস্থাপনের এই প্রবণতা এমন এক সময়ে সামনে আসছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় ভারতের অংশগ্রহণ বাড়ছে। চলতি বছরের শুরুতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে’ উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রককাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ) ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি উন্মুক্ত অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৩২৬টি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখেছে।

এসব ভিডিওতে গবেষকেরা দেখতে পান, মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ উপস্থাপন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সাড়া লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব কনটেন্টে ৬৭ লাখের বেশি প্রতিক্রিয়া ও সম্পৃক্ততা (এনগেজমেন্ট) দেখা গেছে।

গবেষণার সহলেখক ও সিএসওএইচের ডিজিটাল গবেষণাবিশ্লেষক জেনিথ খান বলেন, জেনারেটিভ এআই যৌন কল্পনাকে দ্রুত ও বিনা খরচে দৃশ্যমান ছবিতে রূপ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ইমেজ জেনারেটর ও ডিপফেক প্রযুক্তি খুব কম কারিগরি দক্ষতা দিয়ে বিদ্বেষমূলক বয়ানকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃশ্য উপাদানে রূপান্তর করতে সাহায্য করছে।

নতুন এই প্রবণতার দিকে শুধু গবেষকেরা নন, অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও নজর রাখছেন।

মুম্বাইভিত্তিক রাটি ফাউন্ডেশন পরিচালিত অনলাইন নিরাপত্তা সহায়তাকেন্দ্র মেরি ট্রাস্টলাইনও মনে করে, এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। সংস্থাটির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক একটি চিত্র উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে সাধারণত তারকা বা রাজনীতিকদের নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও জনপরিসরে পরিচিত নন, এমন নারীরাও এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি–ভিডিওর শিকার হচ্ছেন। এসব ছবি কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও তা বাস্তব জীবনে গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সহায়তাকেন্দ্রটির সামনের সারির পরামর্শদাতাদের একজন সালমান মুজাওয়ার। তিনি জানান, তাঁরা এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ নথিভুক্ত করেছেন। বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংস্থাটি বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০২২ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে মেরি ট্রাস্টলাইন ৪৮২টির বেশি মামলা নিয়ে কাজ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ঘটনায় ডিজিটালি বিকৃত বা পরিবর্তিত উপকরণ সম্পৃক্ত ছিল। এআই–ভিত্তিক সরঞ্জামের ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ হার বাড়ছে।

মুজাওয়ার বলেন, ‘লজ্জা, ভয় ও মানসিক আঘাতের কারণে এসব (অধিকার) লঙ্ঘনের ঘটনা প্রায় সময় চাপা পড়ে যায়। বৃহত্তর জনপরিসরে আলোচনায় আসা তো দূরের কথা, পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের কাছেও অনেক সময় এসব ঘটনা বলা হয় না।’

‘রাজনীতির পর্নোগ্রাফিকরণ’

আইয়ুবকে নিয়ে তৈরি ভিডিওটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তাঁকে ঘিরে শুরু হয় আপত্তিকর মন্তব্য, হুমকিমূলক ফোনকল এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে নানা অভিযোগ।

আইয়ুব বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, ডিজিটাল মাধ্যমে আমাকে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে। একটি নয়, এক ডজনের বেশি অ্যাকাউন্ট সব জায়গায় (প্ল্যাটফর্মে) ভিডিওটি পোস্ট করছিল। আর শত শত মানুষ তা আবার শেয়ার করছিল।’

সিএসওএইচের সংগৃহীত তথ্যভান্ডারে এমন অনেক এআই-নির্মিত মিম রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় পোশাক পরা মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেখানো হয়েছে। সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের লক্ষ্য করে ভুয়া পর্নোগ্রাফিক ছবিও তৈরি করা হয়েছে।

এসব ছবির অনেকগুলোতে গবেষকেরা একটি ধারা লক্ষ করেছেন। তা হলো—‘মুসলিম পরিচয়ের নারী’ এবং একজন ‘হিন্দু পরিচয়ের পুরুষ’–কে পাশাপাশি উপস্থাপন করা।

জেনিথ খান বলেন, এসব বর্ণনায় মুসলিম পুরুষদের প্রায় সময় সহিংস বা নৈতিকভাবে অধঃপতিত হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে মুসলিম নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তাঁরা বশ্যতাস্বীকারকারী অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পুরুষদের মাধ্যমে ‘মুক্তি’ পেয়েছেন।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের চিত্রায়ণ রাজনৈতিক আলোচনার বাইরের কিছু নয়; বরং এটি রাজনৈতিক সংলাপের একটি অংশ।

জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদমাধ্যম নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা এই প্রবণতাকে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ‘রাজনীতির পর্নোগ্রাফিকরণ’–এর অংশ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, ডানপন্থী ডিজিটাল সংস্কৃতিতে রসিকতা, মিম ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি ব্যবহার করে অপব্যবহারকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়।

উদুপা বলেন, ‘এই অভ্যাসগুলো একটি বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) গড়ে তোলে।...এগুলো যৌথ উদ্‌যাপন ও সম্মিলিত আগ্রাসনের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে।’

গবেষকদের মতে, এই প্রবণতার শিকড় শুধু নারীবিদ্বেষে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আরও গভীর আদর্শিক ভিত্তি রয়েছে। সাউথ এশিয়া মাল্টিডিসিপ্লিনারি একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষক সোমা বসু বলেন, এখানে মূলত যৌনতাকেই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে।

মুসলিম নারীদের শরীর সাম্প্রদায়িক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল ‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’ বিতর্ক। এসব ভুয়া অনলাইন নিলাম প্ল্যাটফর্মে ভারতে মুসলিম নারীদের নিশানা করা হয়েছিল। সোমা বসুর মতে, এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন হিন্দত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু নেতার আনুষ্ঠানিক সমর্থন এবং দলটির ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবকদের অনানুষ্ঠানিক সমর্থন ছিল।

ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জেনিথ খানের গবেষণাও একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক স্থানের সংস্কৃতিতে নারীদের পরিবারের সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই মুসলিম নারীদের দৃশ্যগতভাবে আক্রমণ করা মুসলিমদের হীন বা নিম্নতর হিসেবে উপস্থাপনের একটি কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন মুসলিম নারী ও গবেষক হিসেবে এই প্রবণতা নিজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে জেনিথ খান বলেন, ‘মাথায় ওড়না পরা এক নারীকে যখন পর্নোগ্রাফির চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই ছবি দেখে আমি সত্যি আতঙ্কিত হয়েছিলাম। একজন নারী হিসেবে আপনাকে প্রতিদিন নারীবিদ্বেষী আচরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’

এসব উদ্বেগের বিষয়ে বিজেপির রাজনীতিক আতিফ রশিদ বলেন, এআই ভালো ও খারাপ—উভয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর অপব্যবহার ঠেকাতে তিনি আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান। ডিপফেক বা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডি এবং যৌন উসকানিমূলক কনটেন্টকে তিনি ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেন। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তবে বিষয়টিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিরোধিতা করেন আতিফ। তাঁর ভাষ্যমতে, বিজেপি ‘সব ধর্মের নারীদের সম্মান করে’ এবং ‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করা হয়েছে।

পরিচিত প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এআই

‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’-এর ঘটনা ঘটেছিল ২০২১ ও ২০২২ সালে। সেসব ক্ষেত্রে সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই দুই ঘটনা ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

‘সুল্লি ডিলস’ অ্যাকাউন্ট তৈরির অভিযোগে অমকারেশ্বর ঠাকুর এবং ‘বুল্লি বাই’-এর স্রষ্টা হিসেবে শনাক্ত নিরাজ বিষ্ণয়কে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করে। তবে দুই মাস পর নয়াদিল্লির একটি আদালত ‘মানবিক কারণে’ তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন।

গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআইয়ের বিস্তার মুসলিম নারীদের অনলাইনে হয়রানির পরিসর ও গতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন নতুন অ্যাপ বা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ছবি আপলোড করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি তৈরি করতে পারেন। এসব সরঞ্জাম অনলাইনে সহজে, অনেক ক্ষেত্রেই বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। এগুলো ব্যবহারের জন্য বিশেষ কোনো কারিগরি দক্ষতারও প্রয়োজন হয় না।

সিএসওএইচের গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততা বিভাগের পরিচালক ইভিয়ান লেইডিগ বলেন, নারীদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীদের নিশানা করে প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়রানি চালানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু নতুন বিষয় হলো—এআই সরঞ্জামের কারণে (অধিকার) লঙ্ঘনের মাত্রা ও ক্ষতির পরিসর বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির মধ্যে জীবন যাপন করছেন, তাঁদের জন্য এআই দিয়ে ছবি তৈরির সুযোগ ভয়ের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

২৭ বছর বয়সী গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা ২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা সিএএ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার পর থেকে অনলাইনে নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছেন। সুল্লি ডিলসে যাঁদের ছবি আপলোড করে তথাকথিত ‘নিলামে’ তোলা হয়েছিল, তিনি তাঁদের একজন।

জাতিসংঘের মতে, ভারতের সিএএ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’। আইনটির মাধ্যমে ২০২৫ সালের আগে প্রতিবেশী মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে ভারতে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সুল্লি ডিলস বিতর্কের চার বছর পরও অনলাইনে নিপীড়ন খুব একটা কমেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি সীমিত হলেও সাধারণত হিন্দু নাম ব্যবহার করা বেনামি অ্যাকাউন্টগুলো এখনো তাঁকে খুঁজে বের করে আপত্তিকর বার্তা, ধর্ষণের হুমকি ও হয়রানি চালিয়ে যাচ্ছে। এ সবকিছু তাঁর কাজের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

আফরিন ফাতিমা বলেন, ‘কয়েক দিন পরপর কোনো না কোনো বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে ধর্ষণ বা হত্যার হুমকি আসে।’

এআই দিয়ে তৈরি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবির আশঙ্কা তাঁর সেই ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এসব ছবি সম্পর্কে যখন পড়ি, তখন বিষয়টি খুব ব্যক্তিগত মনে হয়। এগুলো মানুষের মধ্যে ভয়ের মানসিকতা তৈরি করছে।’

অনলাইনের বিদ্বেষ তাঁর বাস্তব জীবনের চলাফেরাতেও প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে ফাতিমা বলেন, ‘একা ভ্রমণ করতে অস্বস্তি লাগে। মুসলিম নারীদের নিয়ে এ ধরনের কল্পনা যখন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তে দেখি, তখন মনে প্রশ্ন জাগে—বাস্তব জীবনেও কেউ কি আমাকে আক্রমণ করতে পারে?’

‘আমি আর নিরাপদ বোধ করি না’

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর আইয়ুবের পেশাগত সুযোগ একে একে কমতে শুরু করে।

এই ফ্রিল্যান্স মডেল বলেন, ‘একজন মডেল হিসেবে আপনার কাছে সুনাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার প্রোফাইলে নেতিবাচক মন্তব্য দেখা গেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ড আপনার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে চায় না।’

চার থেকে পাঁচ মাস ধরে বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর প্রোফাইলে বিপুল পরিমাণে আপত্তিকর মন্তব্য করা হচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য গ্রাহকেরা দূরে সরে যেতে থাকেন। এই হয়রানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও বদলে দেয়।

আইয়ুব বলেন, ‘ইনস্টাগ্রাম একসময় আমার জন্য নিরাপদ জায়গা ছিল। এখন সেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে করি না। কী পোস্ট করব, কীভাবে পোস্ট করব—সেটাও কমিয়ে দিয়েছি।’

ঘটনার পর আইয়ুব নয়াদিল্লি পুলিশের সাইবার অপরাধ ইউনিটে লিখিত অভিযোগ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিছুই হয়নি।’

আইয়ুবের মতে, তাঁর বন্ধুরা একযোগে ওই অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। শুধু এ কারণে বেশির ভাগ আপত্তিকর কনটেন্ট সরানো সম্ভব হয়েছিল।

আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের সঙ্গে তাল মেলাতে ভারতের বিদ্যমান আইনগুলো পেরে উঠছে না।

আইনজীবী ও ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অপার গুপ্ত বলেন, ‘কোনো ছবি মনগড়া হলেও এর ফলে যে ক্ষতি হয়, তা কিন্তু বাস্তব।’

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ‘৬৬ই ধারায়’ কারও সম্মতি ছাড়া তাঁর প্রাইভেট এরিয়া বা স্পর্শকাতর অঙ্গের ছবি ধারণ বা প্রকাশ করলে ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শরীরের কোনো বাস্তব ছবি ধারণই না করে যদি ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে ওই ধারা প্রযোজ্য না–ও হতে পারে।

অপার গুপ্ত বলেন, ‘ছবিটি ভুয়া হলেও এটি একজন নারীর জীবনে স্থায়ী কলঙ্কের দাগ তৈরি করে দিতে পারে।’

অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে সেফ হারবার বা আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়। অর্থাৎ, অবৈধ কনটেন্ট সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তা সরিয়ে ফেললে তারা আইনি দায় থেকে সুরক্ষা পায়। তবে অপার গুপ্তের মতে, অনেক ভুক্তভোগীর জন্য অভিযোগ জানানো পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এই আইনজীবী বলেন, ‘প্ল্যাটফর্মগুলো এমন ব্যবস্থা রাখেনি, যাতে করে সহজে বলা যায়—এটি আমার ছবি, এটি একটি ডিপফেক, এটি সরিয়ে ফেলতে হবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা, অ্যালগরিদমভিত্তিক অগ্রাধিকার ও আইনি কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না এলে আইনি ব্যবস্থা এআই–কেন্দ্রিক অপব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারবে না। কারণ, এআইয়ের বিকাশ ও এর দ্বারা তৈরি কনটেন্ট দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে।

এমন এক পরিস্থিতিতে ভারতে নিশানায় পরিণত হওয়া মুসলিম নারীদের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন পর্যন্ত অধরাই থেকে যাচ্ছে।

আইয়ুব বলেন, ‘ওই অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনের মানুষদের খুঁজে বের করা—এ বিষয়টি আমি খুব করে চেয়েছিলাম। তারা আমাকে চিনতও না। অথচ তারাই আমার সুনাম ধ্বংস করে দিয়েছে।’

ভারতের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে স্লোগান দিচ্ছেন গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা
ভারতের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে স্লোগান দিচ্ছেন গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা। ফাইল ছবি: আফরিন ফাতিমার ফেসবুক থেকে

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বড় প্রতিশ্রুতি ইরানকে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশের পর এর শর্তগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের ছাড়ের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও ইরানের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি তুলনামূলক কম।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কঠিন আলোচনার পরও ইরানকে অতীতে যেসব সুবিধা দাবি করে এসেছে, তার অনেক কিছুই এই সমঝোতায় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইরান মূলত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিনিময়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে বলে সমালোচকদের দাবি।

চুক্তির কাঠামো: দুটি ধাপে বাস্তবায়ন

সমঝোতা স্মারকটি কার্যত দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে স্বাক্ষরের পরপরই কিছু বিষয় কার্যকর হওয়ার কথা। দ্বিতীয় ধাপে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন ছাড়

চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরান সমুদ্রপথে বাধা সৃষ্টি করে এমন ব্যবস্থা সরিয়ে নেবে, যাতে ৩০ দিনের মধ্যে আগের মতো বাণিজ্যিক চলাচল ফিরে আসে।

তবে সমালোচকদের মতে, এর পরেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় ছাড় শুরু হয়।

চুক্তির একটি ধারা অনুযায়ী, স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইরান বছরে ৬০ থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।

ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ের বিষয়

সমঝোতার আরেকটি ধারা অনুযায়ী, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ও অর্থ উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত কি না, তা নিয়ে ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, ৬০ দিনের আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান?

চুক্তিতে ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা নতুন নয়।

আগের পরমাণু চুক্তি জেসিপিওএতেও ইরান একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তবে বর্তমান সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক উপকরণ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও দীর্ঘমেয়াদি পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে বিস্তারিত বাধ্যবাধকতা চূড়ান্ত চুক্তির জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল

সমঝোতায় ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ৬০ দিনের মধ্যে এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে, যা চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হতে পারে।

সমালোচকদের মতে, এর অর্থ হলো ইরান বড় ধরনের ছাড় পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়েই পরবর্তী আলোচনায় বসবে।

সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্ন

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি।

এর মধ্যে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিষয়ক পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, এই ছাড় শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে দেওয়া হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থানের তুলনায় অনেক বড় পরিবর্তন হবে।

তারা আরও অভিযোগ করেন, ইরানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, মানবাধিকার পরিস্থিতি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিষয়ে চুক্তিতে স্পষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি

সমঝোতায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ অবসানের কথা বলা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা না থাকলে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই অনেক কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার ছেড়ে দিয়েছে। ফলে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে বর্তমান শান্তি উদ্যোগ কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সূত্র: সিএনএন

ইরান-মার্কিন সমঝোতার পর হরমুজ প্রণালি পারি দিল ১১ ইরানি জাহাজ
মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের ১১টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শান্তি সমঝোতার খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজগুলোর মধ্যে আটটি পণ্যবাহী জাহাজ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি হয়ে ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করে।

যুদ্ধে ইরান কেন বিশাল বিজয় দাবি করছে, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র কী শিক্ষা পেল by মো. আবু হুরাইরাহ্‌

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের আগ্রাসন রুখে দিয়েছে ইরান। তিন মাসের যুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হারিয়েও তেহরান ভাঙেনি; বরং ট্রাম্পকে নিজের শর্তে আলোচনার টেবিলে এনেছে। ইরানের দুঃসাহসিক প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে, বলপ্রয়োগে কোনো পরাশক্তি দেশটিকে দমাতে পারবে না। এদিকে, দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি সইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনা উপলক্ষে আগামীকাল শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আয়োজিত হচ্ছে এক বিশেষ অনুষ্ঠান।

১৫ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আকস্মিকভাবে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের ঘোষণা দিলেন, তখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তেহরানের এক বিশাল কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি আবার বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া তেহরান পাবে বিরাট আর্থিক সুবিধা, সঙ্গে ছাড় করা হবে তার জব্দকৃত সম্পদ।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আগামীকাল শুক্রবার (১৯ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে এ সমঝোতা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে একদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চুক্তিতে সই করেছেন। ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্মরণীয় করে রাখতে আগামীকাল সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সরাসরি সংঘাতের অবসান ঘটবে।

কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ চুক্তির পর বিশ্বরাজনীতিতেও এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, দেশের শীর্ষ কূটনীতিক এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি এ চুক্তিকে কোনো সাধারণ আপস হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা এটিকে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘদিনের ‘ঐতিহাসিক প্রতিরোধের একটি বড় জয়’ হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চুলচেরা বিশ্লেষণের আলোকে এই প্রতিবেদনে দেখা যাক, কীভাবে তেহরান নিজের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক শক্তি বজায় রেখে এই চুক্তিতে পৌঁছাল এবং এর পেছনে তাদের বাস্তব অর্জনগুলো কী

তিন মাসের যুদ্ধ

ইরানের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধের মুখে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আগ্রাসন ও রক্তক্ষয়ী এ সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত বিধ্বংসী উপায়ে। যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি রিসার্চ ব্রিফিং’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটন এ অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (মহাকাব্যিক তাণ্ডব)। এর মূল লক্ষ্য ছিল, ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং তাদের প্রতিরক্ষামূলক পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা। যুদ্ধের এই প্রাথমিক ধাক্কা তেহরানের জন্য কঠিন ছিল।

প্রথম দফার হামলাতেই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পাশাপাশি নিহত হন দেশটির শীর্ষস্থানীয় আরও কয়েকজন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা।

তবে এ চরম সংকটের মুহূর্তেও ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনিকে দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত করে ইরানিরা জাতি হিসেবে দৃঢ় ঐক্য প্রদর্শন করেন।

মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরান যে পাল্টা আঘাত গড়ে তোলে, তা পশ্চিমাদের হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেয়। ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, এমন কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি ছিল, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

ইরান সফলভাবে এ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।

বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যে প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, তা ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শত শত জাহাজ সাগরে আটকে পড়ে। বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি হয় তীব্র সংকট। ওয়াশিংটন বুঝতে পারে যে সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দমন করা অসম্ভব।

এরপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। ইরান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের শর্তে অটল থেকে দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে এই সমঝোতা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে।

২৫ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার ও পারমাণবিক সক্ষমতা রক্ষা

ইরানের বিজয়ের দাবির পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি রয়েছে। এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ তুলে নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন মার্কিন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের ২৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের জব্দকৃত তহবিল অবিলম্বে অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।

দীর্ঘদিনের অন্যায় নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানের অর্থনীতির জন্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এক বিশাল বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘স্টিমসন সেন্টার’ তাদের জুনের মূল্যায়নে জানিয়েছে, এ চুক্তির ফলে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধোত্তর দেশ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে আরও ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলার পাওয়ার পথ তৈরি করেছে। এটি তেহরানের একটি বিশাল কৌশলগত জয়।

আবার ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার শর্তও এ চুক্তিতে রয়েছে। চুক্তির অনুলিপি অনুযায়ী, ইরান এখন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাধীনভাবে তেল বিক্রি করে সরাসরি রাজস্ব আদায় করতে পারবে। সেই অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করবে।

পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ইরান তার মূল নীতি ধরে রাখতে পারছে। ইরান আরও ৬০ দিনের আলোচনার মেয়াদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান স্তর বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।

কিন্তু ইরানের সবচেয়ে বড় বিজয়—তার মাটির নিচে সুরক্ষিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের শক্তিশালী মজুত ধ্বংস বা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো শর্ত এ পর্যন্ত তেহরানের ওপর চাপাতে পারেনি।

বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী নিউজউইক একটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্যও দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, গত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শত চেষ্টা এবং বিমান হামলার পরও ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির মূল সক্ষমতা (মাটির নিচের সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত) সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ রয়েছে; অর্থাৎ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির চেষ্টা করেও মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি স্পর্শ করতে পারেনি।

তেহরানের কূটনৈতিক সাফল্য ও জাতীয় সংহতির জয়

সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও গণমাধ্যম একে প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি এসেছে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির কাছ থেকে। তিনি ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইরান এ চুক্তিকে নিজেদের বড় বিজয় হিসেবে দেখছে।’

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের ১৪ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘারিবাবাদি আরও স্পষ্ট করেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া জোরাল প্রতিরোধ ও পাল্টা সামরিক জবাবই মূলত মার্কিন প্রশাসনকে আলোচনার টেবিলে আসতে এবং তেহরানের দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য করেছে।

একই সুর শোনা গেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সমান্তরাল বিবৃতিতে। ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক দাবি করেছেন, ‘ইরানি জাতি শুধু সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধেই নয়, কৌশলগত নানা ক্ষেত্রেও এমন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।’

সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ঘোষণা করেছে, চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বন্ধ হবে। এটি মূলত ইরানের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, কোনো বিদেশি শক্তির চাপে নেওয়া পদক্ষেপ নয়।

উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘারিবাবাদি আরও বলেন, ‘এ অর্জন শুধু সামরিক শক্তির নয়; বরং এটি ইরানিদের জাতীয় সংহতি, স্থিতিস্থাপকতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণেরই ফসল।’

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ চুক্তিকে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সফল প্রতিরক্ষামূলক জয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফক্স নিউজ ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানায়, তেহরানের রাস্তাঘাটে বড় বড় প্রচারপত্র বা বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। সেখানে লেখা: ‘হরমুজ প্রণালি চিরকাল ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে’ এবং ‘ট্রাম্প আসলে ইরানের কোনো ক্ষতি করতে পারেননি।’

ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ এ অবস্থানকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে বড় শক্তির আস্ফালন দেখালেও, যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানি বীরদের অসীম সাহসের কারণেই তাদের কাছ থেকে নিজেদের অনুকূলে চুক্তি আদায় করা সম্ভব হয়েছে; অর্থাৎ, ইরান কোনো চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করেনি, বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।

ওয়াশিংটনের প্রচার বনাম বাস্তব চিত্র

স্বভাবতই, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতে এই চুক্তিকে ভিন্নভাবে রং দেওয়ার চেষ্টা করছে। হোয়াইট হাউসের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন দাবি করছে, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করেছে তারা।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় মুহূর্ত হিসেবে দাবি করেন। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরাও স্বীকার করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি মূলত একটি রাজনৈতিক অপপ্রচার।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত ‘ফার্স নিউজ এজেন্সি’ স্পষ্ট করে দিয়েছে, নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পর ইরান নিজস্ব নিয়ম ও সার্বভৌম ক্ষমতায় শুল্ক আদায়ের মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালি পরিচালনা করবে। যুক্তরাষ্ট্র এখানে কোনো শর্ত চাপাতে পারেনি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে প্রচণ্ড নিষেধাজ্ঞা এবং বোমাবর্ষণের মুখেও ইরানের সমাজ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করেছে যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে।

পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ লিসা দফতরি ফক্স নিউজে গভীর হতাশার সঙ্গে স্বীকার করেছেন, ইরান প্রকৃতপক্ষে এ চুক্তিকে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তারা তাদের কোনো মৌলিক সক্ষমতাই ত্যাগ করেনি।

অন্যদিকে পশ্চিমা মদদপুষ্ট কিছু নির্বাসিত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠীও ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছে, এ চুক্তির মাধ্যমে ইসলামিক রিপাবলিক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের উদয়

সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সমঝোতা চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের এক বিশাল কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। বিশ্বের পরাশক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামরিক জোটের যৌথ আক্রমণ সহ্য করেও ইরান তার পারমাণবিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে সচল করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল পুনরুদ্ধার করছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

তাই এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়তো একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। গত তিন মাসের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানকে বাদ দিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে কোনো সমীকরণ মেলানো সম্ভব নয়।

দৃঢ়তা, সঠিক কৌশল ও ঐক্যবদ্ধ জাতিতে ভর করে একটি দেশ যেকোনো পরাশক্তির চাপ মোকাবিলা করেও তার অধিকার আদায় করে নিতে সক্ষম—এটিও প্রমাণ করেছে তেহরান।

{তথ্যসূত্র: বিবিসি, ফক্স নিউজ, আল–জাজিরা, এবিসি নিউজ, আউটলুক ইন্ডিয়া, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস ও অ্যাক্সিওস}

ইতিহাসে দেখা গেছে, এই পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা মানে সমুদ্রশক্তিতে আধিপত্য বিস্তার করা।
ইতিহাসে দেখা গেছে, এই পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা মানে সমুদ্রশক্তিতে আধিপত্য বিস্তার করা। ছবি: এআই জেনারেটেড

চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ করল যুক্তরাষ্ট্র, তেহরান-ওয়াশিংটনের কে বেশি সুবিধা পেল

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) নথি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ১৪ দফার এই নথি পড়ে শোনান।

সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আলোচনার সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হবে বলে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়েছে এতে।

এর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’। জনসমক্ষে চুক্তি প্রকাশ না করা নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র এটি প্রকাশ করল।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি মূলত এমন একটি চুক্তি, যেটা আমাদের অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি ইরানিদের পারমাণবিক বর্জ্য ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি থাকছে। এরপর আমাদের হাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকছে। ইরান যদি ভালো আচরণ করে, তবে আমরাও ইতিবাচক সাড়া দেব। তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, যাতে তারা আরও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সদিচ্ছার ভিত্তিতে যৌথভাবে নিচের বিষয়গুলোতে সম্মত হয়েছে:

১. যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা এই এমওইউতে স্বাক্ষর করছে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ ঘোষণা করতে। এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। পাশাপাশি তারা লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তিতে নিশ্চিত করা হবে। এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধানও সেখানে নিশ্চিত করা হবে।

২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভোগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানাবে। তারা একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে।

৩. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এ সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

৪. এই এমওইউ সই হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নিতে শুরু করবে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে থাকা যেকোনো বাধা বা বিপত্তিও দূর করা শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেবে। এ সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ–পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে ইরান। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেবে।

৫. এই এমওইউ সই হওয়ার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বিনা মাশুলে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করবে। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীত দিক থেকে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করার জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে এটি শুধু ৬০ দিনের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং কারিগরি ও সামরিক বাধা অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ইরান ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণ করবে। আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় দেশগুলোর সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি কীভাবে পরিচালনা করা হবে এবং সেখানে নৌ পরিষেবা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গেও তারা কথা বলবে।

৬. যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে অন্তত ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও উভয় পক্ষের সম্মতিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে ৬০ দিনের মধ্যে এবং সেটা করা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড় ও অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

৭. চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে দুই পক্ষের মতৈক্যের সময়সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ও আইএইএ বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে দেওয়া সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত গুরুত্ব স্বীকার করে। এ বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে এসব সমস্যা সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

৮. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আবার নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্পরিক সম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নিষ্পত্তির বিষয়ে একমত হয়েছে। তা করা হবে ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে। আইএইএর তত্ত্বাবধানে ন্যূনতম পদ্ধতি ব্যবহার করে এগুলো নির্ধারিত স্থানেই নিষ্ক্রিয় (ডাউন ব্লেন্ড) করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে সম্মত হওয়া একটি সন্তোষজনক কাঠামোর ভিত্তিতে দুই পক্ষ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় নিয়েও তারা আলোচনা করবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের বিধানগুলো নিশ্চিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উল্লিখিত পারমাণবিক বিষয়গুলোর চূড়ান্ত গুরুত্ব স্বীকার করছে। পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে এসব ইস্যু সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান পরিস্থিতি (স্ট্যাটাস কো) বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ধরে রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। এ ছাড়া তারা এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করবে না।

১০. যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে এই এমওইউ সই হওয়ার পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে ছাড় দেবে। এই ছাড়পত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর আওতায় ব্যাংকিং লেনদেন, বিমা, পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক সব সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

১১. এই এমওইউ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জব্দ থাকা বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেবে। চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে সমঝোতা আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্পরিকভাবে এই তহবিল ছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছাবে। এই তহবিলগুলো মূল অ্যাকাউন্টে ফিরিয়ে দেওয়া বা অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর যেটাই করা হোক না কেন, সেগুলো ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো সুবিধাভোগীকে দিতে পারবে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

১২. এই এমওইউর সফল বাস্তবায়ন এবং চূড়ান্ত চুক্তির ভবিষ্যৎ শর্তাবলি মানার বিষয়টি তদারকির জন্য একটি নির্বাহী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।

১৩. এই এমওইউ সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই সমঝোতা স্মারকের ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু করা এবং তা অব্যাহত রাখতে বাধ্য থাকবে। সেই সঙ্গে দুই পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে, যা এই এমওইউর অন্য অনুচ্ছেদগুলোর ওপর ভিত্তি করেই হবে।

১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।

‘ধন্যবাদ ইরান’ লেখা একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি বিজয়সূচক চিহ্ন দেখাচ্ছেন। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি, লেবানন। ১৫ জুন ২০২৬
‘ধন্যবাদ ইরান’ লেখা একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি বিজয়সূচক চিহ্ন দেখাচ্ছেন। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি, লেবানন। ১৫ জুন ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

দেড় বছরে চীনের কার্বন নিঃসরণ কখনো কমেছে, কখনো স্থিতিশীল: বিশ্লেষণ

চীনে ১৮ মাস ধরে কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণের হার কখনো স্থিতিশীল অবস্থায়, আবার কখনো কমতির দিকে থেকেছে। এক বিশ্লেষণে এমনটাই দেখা গেছে। এর মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে বৃহত্তম দূষণকারী এ দেশটি প্রতিশ্রুত সময়সীমার অনেক আগে তার কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পেরেছে।

চলতি বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসে চীনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ৪৬ শতাংশ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দেশটির জ্বালানি খাতে কার্বন নিঃসরণের হার স্থিতিশীল থেকেছে। এমনকি বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও কার্বন নিঃসরণ বাড়েনি।

চীন চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২৪০ গিগাওয়াট এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৬১ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে আরও একটি রেকর্ড গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। গত বছর দেশটি ৩৩৩ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল, যা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি।

বিজ্ঞান ও জলবায়ুনীতিবিষয়ক ওয়েবসাইট কার্বন ব্রিফের জন্য বিশ্লেষণটি করেছে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ)। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণের হার আগের বছরের তুলনায় অপরিবর্তিত ছিল। যাতায়াত, সিমেন্ট ও ইস্পাতশিল্পে নিঃসরণের হার কমে যাওয়াটা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চীনের কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ নিয়ে এমন সময়ে বিশ্লেষণটি প্রকাশ পেল যখন কি না, বৈশ্বিক নেতারা ব্রাজিলে কপ–৩০ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলার তাগিদ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সম্মেলনটি হতে যাচ্ছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ব্রাজিলে চলমান জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেননি। তবে চীনা প্রতিনিধিদল আলোচনায় অংশগ্রহণ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এতে যোগ দেননি। তিনি আলোচনার জন্য কোনো প্রতিনিধিদলও পাঠায়নি।

গত ১০ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার ব্রাজিলীয় কূটনীতিক এবং কপ৩০-এর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে কোরেয়া দো লাগো সবুজ প্রযুক্তিতে অগ্রগতি করায় চীনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘চীন এমন সমাধান উদ্ভাবন করছে, যা সবার জন্য, শুধু চীনের জন্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ধনী দেশগুলো জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আগ্রহ হারিয়েছে।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে চীনের দুটি লক্ষ্যমাত্রা আছে। এর একটি হলো ২০৩০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের হার কমতে শুরু করবে এবং ২০৬০ সাল নাগাদ তারা নিট কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করবে। গত সেপ্টেম্বরে চীন তার সর্বশেষ জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের দেশটি তাদের সামগ্রিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের হার সর্বোচ্চ হারের তুলনায় ৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে আনবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই লক্ষ্যগুলো বৈশ্বিক বিপর্যয় এড়াতে যথেষ্ট নয়। তাঁরা মনে করেন, বৈশ্বিক বিপর্যয় এড়াতে কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমাতে হবে।

গত বছর চীন ৩৩৩ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল, যা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি
গত বছর চীন ৩৩৩ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল, যা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

ইসরায়েলকে যেভাবে বোকা বানায় ইরান

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে গোপন অভিযানের জাল বুনে আসছিল। নীরবে কাজ চলছিল- দেশটির অভ্যন্তরে ড্রোন ঘাঁটি স্থাপন, গোপনে অস্ত্র ব্যবস্থাসহ কমান্ডো পাচার। এক কথায় এক বিশাল পরিকল্পনা নিয়েই ওঁৎ পেতে বসেছিল ইসরায়েল।

কিন্তু ২০২৫ জুন মাসে ইরানের উপর করা সেই অতর্কিত হামলার একেবারে কড়া জবাব দিয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনির দেশ প্রমাণ করে দিল, তারাও আগে থেকে পাল্টা আঘাত হানতে প্রস্তুত ছিল।

লোহার দুর্গ বলে পরিচিত আয়রন ডোমকে বোকা বানিয়ে ইসরায়েলি সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ইরান। ইসরায়েল নিজের তৈরি ফাঁদে শিকার ধরতে গিয়ে উল্টো ইরানের পটকা ফাঁদে ধরা পড়েছিল।

এই কৌশলকে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় ডিকয় ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল প্রতারণা। এই কৌশলকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেই সময় মুহূর্তের মধ্যে দুর্বল হয়ে যায়। ফলে নেতানিয়াহুর সামরিক বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়, যা খোদ মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করেছিল।

এটি আসল ক্ষেপণাস্ত্রের মতো দেখতে এবং একইরকম আচরণ করে। কিন্তু এটি মূলত শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়, এটি আসলে একটি ভুয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ফাঁদ।

কৌশলটি ছিল এমন, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার সময় আসলটির সঙ্গে ধাতব পটকা নিক্ষেপ করা হয়, যা থেকে তীব্র আগুন বের হতে থাকে। ইসরায়েলের আয়রন ডোমের মতো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো এই ধাতব পটকা শনাক্ত করে সেটিকে আসল ক্ষেপণাস্ত্র মনে করে।

আসল ক্ষেপণাস্ত্র মনে করায়, সেটিকে বিধ্বস্ত করতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হয়। এভাবে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র যখন ধাতব পটকার দিকে যেতে থাকে বা সেটিকে বিস্ফোরণ ঘটায়, তখন আয়রন ডোমের অস্ত্রাগার খালি হতে শুরু করে। এই সুযোগে দ্রুতগতিতে আসল ক্ষেপণাস্ত্রটি তার লক্ষ্যে আঘাত করে।

মজার ব্যাপার হলো ইসরায়েলের আয়রন ডোম থেকে একবার প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বের হয়ে গেলে, সেটি নতুন করে লোড করতে প্রায় ১০ থেকে ১১ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র আয়রন ডোমে শনাক্ত হওয়ার মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যেই ইসরায়েলের ভূমিতে আঘাত হানতে পারে, আর এখানেই ধরা খায় ইসরায়েল।

ইসরায়েলকে ধরাশায়ী করতে পারলেও ইরান এখন আরও বেশি সতর্ক এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অবিচল। দেশটি সম্প্রতি সব নিয়ম-নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঘোষণা দিয়েছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে এবং এর পাল্লা কোনোভাবেই সীমিত করা হবে না। 

ছবি : সংগৃহীত