Monday, October 28, 2013

সময়চিত্র- দুই নেত্রীর নিয়ত by আসিফ নজরুল

প্রধানমন্ত্রী ফোন করেছেন বিরোধী দলের নেত্রীকে। নৈশভোজে আমন্ত্রণ করেছেন। হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন।

রাজনীতি- পথের শেষ কোথায়, খালেদা জিয়া কি জানেন? by ফারুক ওয়াসিফ

খালেদা জিয়া আবার পথে নেমেছেন। কিন্তু পথের শেষে কী আছে, তিনি কি তা জানেন? মসনদের পথ খাদের দিকেও আগায়। তাঁর হাতের মুঠিতে বড় ঝড়ের লাগাম।

গল্প- তান্নিরা তিন বোন by মীম নোশিন নাওয়াল খান

মিতুর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। পরশু রাত থেকে জ্বর। ছাপরা ঘরে ছেঁড়া কাঁথা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে ও। বাবা আসতে এখনো অনেক দেরি। তিনি চায়ের দোকানে দোকানদারি করেন।

ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি লেখকদের তিনটি বই প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সেলিনা হোসেনের দুটি বই ‘আদান-প্রদানের পথ প্রসারিত হওয়া দরকার’ সাক্ষাৎকার : পারভেজ হোসেন

ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের তিনটি বই প্রকাশ করেছে।

গ ল্প:- ছেলে আর মেয়ে by অ্যালিস মানরো অনুবাদ: শিবব্রত বর্মন

আমার বাবা শিয়ালখামারি। খোপরায় মেটে শিয়াল পালেন তিনি। হেমন্তে বা শীতের শুরুতে যখন এদের লোম পুরু হয়ে যায়, তিনি সেগুলোকে মেরে চামড়া ছাড়িয়ে হাডসনস বে কোম্পানি বা মন্ট্রিল ফার ট্রেডার্সের কাছে বিক্রি করেন।

গল্প- একটি সাধারণ সংবাদ by শাহনাজ মুন্নী

‘মাত্র কিছুক্ষণ আগে মারাত্মক রোমহর্ষক একটা খুন হয়েছে শহরে।’ ‘আবার খুন? মানে আবার একটা অর্থহীন রক্তপাত, কারও অনিচ্ছুক চলে যাওয়া কিংবা সময়ের আগেই কাউকে চলে যেতে বাধ্য করা।

এসেছে নবান্ন আজ by অরুণ কুমার বিশ্বাস

হে ম ন্ত>> এ সংখ্যায় ছাপা হলো পাঠক ফিচার হেমন্ত। হেমন্ত ঋতু নিয়ে অনেকেই অনেক লেখা পাঠিয়েছেন। বিদেশে বসেও দেশের এই ঋতু নিয়েস্মৃতিচারণা করেছেন।

গল্প- উষ্টা by হরিশংকর জলদাস

চোখ পাকিয়ে বললাম, ‘ছাড় ছাড়, পা ছাড়।’ তারপর ডান হাত বাড়িয়ে ডাবটি নিলাম। স্ট্র-এ একটা জোর টান দিয়ে আবার কঠিন গলায় বললাম, ‘এই ছাড়লি না! দিব একটা উষ্টা।’

রম্য গল্প- এক দল এক দফা by আহসান হাবীব

অবশেষে সাইদুল সাহেব একটা রাজনৈতিক দল খুলবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। দলের নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে সব কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

চারু শিল্প- বিশ্ব-পরিমণ্ডলে শিল্পাচার্য by আশীষ-উর-রহমান

বাংলাদেশের আধুনিক চারুশিল্প আন্দোলনের পথিকৃৎ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্ম শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে চলছে বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি।

সাহিত্যে নোবেল ২০১৩ অ্যালিস মানরো- সরলতার ধোঁকা by মাসরুর আরেফিন

এ বছরের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে যখন অ্যালিস মানরোর নাম ঘোষণা করা হলো, তখন ইংরেজিভাষী লেখক-পাঠকের এই বিশাল পৃথিবী একটা ঘোর লাগা অবিশ্বাসের মধ্যে পড়ে গেল যেন।

শাহবাগিরা লাপাত্তা! : এখন আর আসে না ‘প্রতিরোধের’ ঘোষণা by শিশির আবদুল্লাহ

মুক্তিযুদ্ধের কথিত চেতনা ফেরি করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির হাতকে শক্ত করতে মাঠে নামা শাহবাগি কুশীলবরা হঠাত্ উধাও হয়ে গেছে দৃশ্যপট থেকে!

শামসুর রাহমানের অগ্রন্থিত অনুবাদ কবিতা

কবি শামসুর রাহমানের ৮৪তম জন্মদিন পার হলো। কবির করা হো চি মিনের ১২টি কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হলো তাঁর স্মরণে...

সহিংসতা পরিহার করে শান্তি বজায় রাখুন- ব্যাপক প্রাণহানি ও সহিংসতা

টানা ৬০ ঘণ্টার হরতালকে কেন্দ্র করে গত দুই দিনে প্রায় ১৩ জনের প্রাণহানি একটি গুরুতর অশনিসংকেত।

পথের শেষ কোথায়, খালেদা জিয়া কি জানেন?

খালেদা জিয়া আবার পথে নেমেছেন। কিন্তু পথের শেষে কী আছে, তিনি কি তা জানেন? মসনদের পথ খাদের দিকেও আগায়। তাঁর হাতের মুঠিতে বড় ঝড়ের লাগাম। লাগাম ছেড়ে দিলেই তুফান বয়ে যাবে; তা সামলিয়ে তিনিও দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন তো? ঝড়ের লাগাম কখনো ছাড়তে নেই। আলোচনার মায়ার খেলা অচিরেই ফুরাবে; তখনই সামনে আসবে আপস অথবা বলপ্রয়োগের প্রশ্ন। আপসের পথেসংবিধান, ফর্মুলা ইত্যাদির অজুহাত দিলে পুরান ঢাকার ঘোড়াগুলোও হাসবে। আপসে দুই পক্ষই জেতে, দুই পক্ষই হারে। সে রকম ভারসাম্যপূর্ণ আপস না হলে বলপ্রয়োগই ভরসা। সরকার তার সব বাহিনী, প্রতিষ্ঠান আর কলকবজা বিরোধীদের দমনে লাগাবে। বিরোধীদলও জ্বালাও-পোড়াও পথে সরকারকে অকার্যকর করতে চাইবে। দুটোই জনগণকে রাজনীতির মাঠ থেকে খেদিয়ে রাখার কৌশল। জনহীন রাজপথে জননিরাপত্তার নামে বলপ্রয়োগের সুযোগ হাতছাড়া করবে না সরকার। বিরোধীদলীয় নেত্রী কি সেই সুযোগটাই সরকারের হাতে সেধে তুলে দিতে চান? নাকি চান অন্য কোনো শক্তির বলপ্রয়োগ? ক্ষমতা চালানো ও ক্ষমতা বদলের সব শান্তিপূর্ণ আয়োজন যখন নস্যাৎ হয়, তখনই বলপ্রয়োগের মৌসুম আসে। হরতাল-নাশকতা, দমন-পীড়ন জরুরি অবস্থা তখন অনিবার্য। বিরোধী দলের কর্মসূচির ফলে যদি তেমন অকাল আসে, তাহলে সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা মুক্ত হয়ে নেমে পড়বে একদলীয় নির্বাচনে। গণতন্ত্র রক্ষার নামেই হোক আর নিয়মতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার কথা বলেই হোক, সহিংস পরিস্থিতি ক্ষমতাসীনদেরই পক্ষে যেতে পারে। খালেদা জিয়া সেটাই চান?
ঘোলা পানিতে প্রতিবিম্ব পড়ে না। পানি বেশি ঘোলা করে ফেলে বলে গাধা কখনো নিজের মুখ দেখতে পারে না। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে দুই জোট-মহাজোট এতই ঘোলা করে ফেলেছে, এই জল এখন চতুর শিকারিদের আদর্শ ক্ষেত্র। তার পরও সবারই নিজেদের মুখ দেখে নেওয়া উচিত। রাজনৈতিক সমাজ দুই শিবিরে ভাগ হয়ে সত্য ও যুক্তি বিসর্জন দিয়ে পরস্পরকে দোষাচ্ছে। পরস্পরের প্রতি এতই ঘৃণা তাদের, পারলে তারা বিদেশি ঠাকুরের খেদমত করবে কিন্তু দেশি ভাইকে ‘কুকুরের’ মতো দূর দূর করে। আমি যদি আপনাকে ঘৃণায় অন্ধ হই, তাহলেআপনাকে আমি আর জানতে পারব না। নিজেকেও না। এই দোষাদুষির কুস্তি যত চলবে, ততই বিভাজন বাড়বে, বাংলাদেশ বলে আর কিছু থাকবে না। থাকবে শুধু লীগ আর দলে বিভক্ত ছারখার বাস্তবতা। গুণ নয় দোষই সংক্রামক। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র এক দেড় লাখ মানুষ দলকানা ও ঘৃণার পূজারি। অথচ রাজনীতির জলবায়ু এঁরাই নিয়ন্ত্রণ করছেন। পাড়া-গ্রামে দুই দলের ভোটাররা প্রতিবেশীর মতোই বাস করেন। এক পরিবারেই পাওয়া যাবে দুই ভিন্ন দলের নেতা-কর্মী। সেচের পানি বিএনপিপন্থীর জমির ওপর দিয়েই লীগপন্থীর জমিতে যায়। ব্যবসায়ীরা মুনাফার খাতিরে সম্পূর্ণদলনিরপেক্ষ বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। রাজনীতিবিদেরাই কেবল বারেবারেঅযোগ্যতার প্রমাণরাখছেন। তাঁদের ইন্ধন দিতে মুখিয়েআছে কিছু কুদুলে বুদ্ধিজীবী আর আলুপোড়া খেতে আগ্রহী কিছু সুযোগসন্ধানী। আমাদের রাজনীতির চেহারাটা গ্রিক উপকথার প্রাণী সেন্টরের মতো অর্ধেকটা মানবিক অর্ধেকটা পাশবিক। রাজনীতির ওপরের চেহারাটায় যতই মুক্তিযুদ্ধ, ইসলাম, জাতীয়তাবাদ, উন্নয়নের বুলি থাকুক, নিচের দিকে তা পরিবারতন্ত্র, দুর্নীতি, বলপ্রয়োগ ও গণবৈরিতার চতুষ্পদে প্রতিষ্ঠিত। এই পরিবারতন্ত্র দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিত্ত দিয়ে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা বানায়। দলের লোকদের দুর্নীতির ভাগ, মধ্যবিত্তকে আদর্শের লজেঞ্চুস আর বৃহত্তর জনতাকে ধোঁকা দিয়েএই রাজনীতি চলে। বাধ্য না হলে এই রাজনীতি কাউকে ছাড় দেয় না। ক্ষমতার বণ্টন, সম্পদের বণ্টন এই রাজনীতি জানে না। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করাই যেকোনো রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য হওয়ার কথা। নিজের পক্ষে বেশির ভাগ মানুষকে নিয়ে আসাই নেতার ক্যারিশমা। অথচ বাংলাদেশের দুটি বড় দলের আদর্শ ও কর্মসূচির লক্ষ্যহলো ভাগ করো, শাসন করো। দুই উগ্র জাতীয়তাবাদ দেশের কাজে না এলেও, বিপুলসংখ্যক মানুষের চেতনানাশে ওস্তাদ। মেয়াদ ফুরানো ওষুধের মতো এসব আজ বিপজ্জনক। তার পরও বিকল্পেরঅভাবে এই রাজনীতি ও এর সমর্থন আরও কিছুদিন থাকবে। রাজনীতি থাকলে তাদের সমর্থকও থাকবে দেশে। অথচ নেতা-নেত্রীরা যেভাবে পরস্পরকে আক্রমণ করেন, তাতে মনে হয় এক পক্ষের কাছে অন্য পক্ষ হারাম। দুই দলের পক্ষে থাকা কোটি কোটি মানুষকে তাঁরা কী করবেন? বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়েদেবেন?
যুদ্ধাপরাধের বিচার আর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অধিকাংশ মানুষের সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু দুই দল দুই ইস্যুকেই বিতর্কিত করে দেশকে বিভক্ত করতে কামিয়াব হয়েছে। এর দায় দুই পক্ষেরই। সমঝোতা চাইলে উভয় পক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে: বিচারও চলবে, নিরপেক্ষ নির্বাচনও হবে। আর দুই দল যদি সমঝোতায় আসে, কারও সাধ্য নেই ‘তৃতীয়’কাউকে ক্ষমতায় আনে। মীমাংসা চাইলে এই মুহূর্তে সহিংসতা আর ঘৃণার প্রকাশ থামাতে হবে। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের আদেশ কি সরকার-সমর্থকদের ওপর খাটে না? হরতাল যদি উসকানি হয়, হরতাল ঠেকানোর কর্মসূচি কি বরযাত্রা? উভয় পক্ষকেই ঘোড়া সামলাতে হবে। দেশবাসীর সমর্থন চাইলে খালেদা জিয়াকেও বিকল্প পথ বের করতে হবে। মানুষের কাছে যাওয়ার পথ সব সময়ই খোলা। লগি-বইঠা-দা-কুড়াল হাতে করে সেটা হয় না। এগুলো প্রতিবাদের অস্ত্র নয়, সন্ত্রাসের অস্ত্র। এর বাইরে ব্যাপক গণ-অসহযোগ কিংবা গণজাগরণের জন্য তিনি আর কী করতে পারেন, তা তাঁকেই ভাবতে হবে। গণজাগরণ চাইলে যেতে হবে মানুষের কাছে, তরুণ-তরুণীদের কাছে। তাদের কাছে নিজেকে দেশের সম্ভাবনার জিম্মাদার প্রমাণ করতে হবে। তা না করে যতই পাল্টা বলপ্রয়োগের পথে যাবেন, ততই তাঁকে নির্ভর করতে হবে সন্ত্রাসী শক্তির ওপর। বিপরীতে সরকার নির্ভর করবে পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাব ও লীগের ক্যাডারদের ওপর। সরকারের সুবিধাই এখানে বেশি। সরকারপক্ষ পাবে আইনের আশ্রয়, বিরোধী পক্ষের তেমন আশ্রয় নেই। থাকত, যদি বিএনপি গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর সামর্থ্যরাখত। কিন্তু শেখ হাসিনা মিসরের মোবারক নন, খালেদা জিয়াও নন ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু দিন যাচ্ছে আর পথ আটকে যাচ্ছে। কুড়িগ্রামের ভূমিহীন মাজেদ আলী ঢাকায় রিকশা চালান দুই বছর ধরে। বয়স ৭৫। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, এক ছেলে হাইস্কুলে, আরেক ছেলে কলেজে পড়ে। স্ত্রী জরায়ু ক্যানসারে ধুঁকছেন। বাঁচবে না জেনেও চিকিৎসা চালাচ্ছেন, ছেলেদের কামাই খাওয়ার আগেই আয়ু ফুরাবে জেনেও দুই ছেলেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা খরচ দেন। বস্তির ঘরভাড়া দেন, নিজে খান, বউকে খাওয়ান। কারও কাছে তাঁর কোনো আশা নেই। তাঁর রিকশায় বসে পেছন থেকে দেখি, সাদা টুপি, সাদা পাঞ্জাবি, ঘাড়ের ওপর ফেলে রাখা নামাজি উড়নি,
বাতাসে ওড়া পাতলা দাড়িতে সোডিয়াম আলোয় তাঁকে দেবদূতের মতো লাগে। বয়স আর মেহনত তাঁর পিঠ বাঁকিয়ে দিয়েছে। কত দুর্বলমানুষ, অথচ মধ্যরাতে আমার সমর্থনে ঘুষখোর পুলিশের সঙ্গে তর্ক করেন। তারপর আমি বাড়ি ফিরি,  তিনি আবার নামেন রাস্তায়। না নেমে উপায়নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও বৃদ্ধ মাজেদ আলীর থামার উপায়নেই। এক দিনের কামাই নষ্ট হওয়া মানে ছেলেদের পড়ালেখা বন্ধ থাকা, মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রীকে অনাহারি রাখা। জীবনে সুন্দর মনের মানুষ একেবারে কম দেখিনি। মাজেদ আলী তাঁদের একজন। এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, রিকশার হাতলে দুই মুঠি শক্ত করে ঘাড়-পিঠ উবু করে তিনি পথ চলছেন। বাতাসে উড়ছে তাঁর উড়নি। যে আত্মমর্যাদা আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন, সেটুকু দায়িত্বশীলতা আপনারা দেখাবেন কি? আপনারা যা-ই করেন, মনে রাখবেন বাংলাদেশও সমস্যার ভারে নুয়েআসা ওই বৃদ্ধের মতো। আমাদেরও থামবার সুযোগ নেই, আমাদেরও ভরসা করার বন্ধু নেই পৃথিবীতে। প্রতিটি হরতাল, প্রতিটি পুলিশি অ্যাকশনে, আমি দেখতে পাই মাজেদ আলীর পিঠে বাড়ি পড়ছে। মাটির দিকে আরও নুয়েযাচ্ছে তাঁর পিঠ; তবু লোকটা থামতে পারছেন না। বউয়ের চিকিৎসা, ছেলেদের পড়ালেখা চালানো আর জীবনের বাকি কটা দিন ভিক্ষা না করার অসীম জেদের কারণেই মাজেদ আলী থামবেন না। বাংলাদেশের কোটি কোটি মাজেদ আলী দেশের মাটিতে বা বিদেশবিভুঁইয়ে দেশটাকে পিঠে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মাননীয়গণ, আপনাদের অনেক উপায় আছে, মাজেদ আলীদের নেই। ওরা থামবে না, দয়া করে আপনারাই থামুন।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

শিল্পবর্জ্যে মৃতপ্রায় বংশী by পার্থ শঙ্কর সাহা

সাভারের নয়ারহাট থেকে বংশী নদী ধরে স্রোতের বিপরীতে উত্তরের দিকে গেলে ইঞ্জিনচালিত নৌকার ধীরগতিতে স্রোতের বেগ ঠিকই টের পাওয়া যায়।

কই আছে ঢাকার শতবর্ষী বৃক্ষরা

রাজধানী ঢাকার বয়স কত? ইতিহাসবিদদের মতে প্রায় ৪০০ বছর। কিন্তু এই শহরে ৪০০ বছরের পুরোনো কয়টি নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে? যদি ৩০০ বছরের কথা বলি, তা-ও মনে হয় খুব একটা কিছু পাওয়া যাবে না। স্থাপত্য নিদর্শনের কথা বাদ দিয়ে যদি আমরা ৪০০ বছরের পুরোনো কোনো বৃক্ষ বা উদ্যানের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করি, তাহলেও হতাশ না হয়ে উপায় নেই। এমনকি রাজধানী ঢাকায় সঠিকভাবে ৩০০ বছরের পুরোনো কোনো গাছ বা উদ্যানেরও খোঁজ পাওয়া যায় না। শুধু তা-ই নয়, এই শহরের কোথায় কোনো গাছ বা উদ্যান ছিল, তার কোনো তথ্য-প্রমাণও কোথাও সংরক্ষিত নেই। এমন নেই-নেই অবস্থার ভেতর ঢাকার শতবর্ষী বা শতোর্ধ্ববর্ষী গাছগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করছি কয়েক বছর ধরে। মুশকিল হচ্ছে, এখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বয়স নির্ধারণ করার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক গবেষণাগারও নেই। সর্বোপরি, এখানে তথ্যঘাটতির পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতারও বড়ই সংকট। বছর কয়েক আগে ধানমন্ডির দুটি সড়কের উল্লেখযোগ্য কিছু গাছ নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য সিটি করপোরেশনের শরণাপন্ন হই।
এই বিভাগ-সেই বিভাগ ঘুরে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে অনেকটা সময় লেগে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো তথ্যই তিনি জানাতে পারেননি। কারণ, সিটি করপোরেশন সাধারণত ঢাকার বিভিন্ন পথপাশে রোপণ করা গাছের তথ্য সংরক্ষণ করে না। অবশেষ তারা একটি খোঁড়া যুক্তিও উপস্থাপন করে এই বলে যে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কিছু বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সুতরাং খোঁজখবর কিছু ওরাই জানাতে পারে। বৃথা চেষ্টা। যেখানে সিটি করপোরেশন নিজেই কিছু জানে না, সেখানে বেসরকারি সংস্থার তো কোনো দায় পড়েনি। অগত্যা স্থানীয় বয়স্কজনদের সাহায্য নিই। তাঁদের স্মৃতির ঝাঁপি থেকে কিছুটা তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়। ঢাকার গাছ সম্পর্কে এটাই নগর কর্তৃপক্ষের বাস্তব চিত্র। ঢাকার শতবর্ষী বা শতোর্ধ্ববর্ষী গাছ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়েও একই ঝামেলায় পড়তে হয়। কোথাও কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকি ঢাকার গাছ নিয়ে এযাবৎ কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্যশুমারিও হয়নি।
ফলে ঢাকায় এখন থেকে ৪০০ বছর আগে কোথায় কোন ধরনের গাছ ছিল, বা পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় কী কী ছিল, সে সম্পর্কেও কিছু জানা যায় না। তবে এ ক্ষেত্রে মাত্র ১০০ বছর আগের বিক্ষিপ্ত কিছু সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়, যা বলধা গার্ডেন বা লন্ডনের কিউ উদ্যানের কর্মী রবার্ট লুইস প্রাউডলকের রমনা নিসর্গ পত্তনের সমসাময়িক। কারণ, ‘রমনাগ্রিন’ ও বলধা গার্ডেন নির্মাণের কাজ শুরু হয় এক বছর আগে-পরে ১৯০৮ ও ১৯০৯ সালের দিকে। এখানে প্রাউডলকের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আবশ্যক। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে উদ্যাননগরের আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মকাণ্ডে রবার্ট লুইস প্রাউডলক ছিলেন বৃক্ষশোভিত সরণি ও উদ্যান নির্মাণের দায়িত্বে। তিনি ছিলেন লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের অন্যতম কর্মী। অখিল বাবু তাঁর সহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পঞ্চাশের দশকের আগেকার রমনা ও সংলগ্ন এলাকার বৃক্ষসজ্জার সবটুকুই তখনকার সৃষ্টি।
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায় ঢাকায় রাজধানী নির্মাণের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয় এবং সম্ভবত প্রাউডলক পূর্ণাঙ্গ উদ্যান নির্মাণের অবকাশ পাননি। প্রাউডলকই মূলত এই জঞ্জালের নগরে আমাদের ফুসফুস সচল রাখার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনার হাত ধরেই আমাদের বৃক্ষশোভা বর্ণিল হয়ে ওঠে। এ কারণে রমনার অধিকাংশ সুউচ্চ শতবর্ষী গাছগুলো প্রাউডলকের পরিকল্পনার অংশ বলে ধারণা করা হয়। পুরান ঢাকায় এখন আর তেমন কোনো আদিবৃক্ষ বেঁচে না থাকলেও, বলধা গার্ডেনে কিছু শতবর্ষী গাছ এখনো বেঁচে আছে। আনুষ্ঠানিক উদ্যানের বাইরে পুরোনো ‘রমনাগ্রিন’ এলাকার কিছু গাছকেও ১০০ বছরের পুরোনো হিসেবেই শনাক্ত করা যায়। অবশ্য এসব গাছের বয়স ১০০ বছরের সামান্য কম বা বেশিও হতে পারে। এমনকি আমাদের অজান্তে ঢাকায় এমন বয়সী আরও কিছু গাছও থাকতে পারে। সম্প্রতি ৪০০ বছর উদ্যাপন করেছে ঢাকা শহর। মানববসতি ও ইতিহাস-সংস্কৃতির দিক থেকে ৪০০ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। দীর্ঘ পরাধীনতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসচেতনতা ও মাত্রাতিরিক্ত লালসার অপতৎপরতায় এখানকার অনেক ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাচীন বৃক্ষসম্পদও হারিয়ে গেছে।
এ কারণে আমরা সন্ধান করেছি মাত্র শতবর্ষী বা শতোর্ধ্ববর্ষী গাছগুলোর। এমন গাছের সংখ্যা মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি। যদিও এসব গাছ রোপণের সঠিক কোনো সাল-তারিখ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, তবু বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র, জনশ্রুতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকেই এই গাছগুলোকে শতবর্ষী হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচিত গাছগুলো হচ্ছে রমনার মহুয়া, রমনার কুসুম, রমনার দেশি গাব, হেয়ার রোডের পাদাউক, বেইলি রোডের ব্ল্যাকবিন, ফুলার রোডের তেঁতুল, বাংলা একাডেমি, মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ আরও কয়েকটি স্থানের বট, চামেরি হাউসের ছাতিম, বাংলা একাডেমির বহেড়া, তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজের জংলিবাদাম ইত্যাদি। তবে এ বিষয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন। আমাদের অজান্তে আরও কিছু শতবর্ষী গাছ থাকতেও পারে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ সবার প্রতি অনুরোধ, চিহ্নিত এই গাছগুলো যেন অতিসত্বর যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাজটি সরকারি বা বেসরকারিভাবেও হতে পারে। কোনো একটি বেসরকারি সংস্থাও এ দায়িত্বটুকু পালন করতে পারে। আমরা শুধু চাই শত বছরের পুরোনো এই গাছগুলো যেন কালের সাক্ষী হয়ে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের অংশী হয়ে আরও সহস্র বছর বেঁচে থাকে।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।
tarupallab@gmail.com

নদী দূষণকারীর শাস্তি নেই

শিল্প, গৃহস্থালী, পয়ঃবর্জ্যে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর দূষণ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। নদী রক্ষায় পরিকল্পনা, প্রতিবেদনের কমতি নেই।

দুই নেত্রীর নিয়ত

প্রধানমন্ত্রী ফোন করেছেন বিরোধী দলের নেত্রীকে। নৈশভোজে আমন্ত্রণ করেছেন। হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন। টিভি স্ক্রলে এসব দেখে আমারও আশাবাদী হতে ইচ্ছে করে। আমি ভাবি, এমন হয় যদি একটু পর টিভি স্ক্রলে দেখি, বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীরা হরতাল প্রত্যাহার করেছে (বা অন্তত ২৮ তারিখে নৈশভোজের আমন্ত্রণের সম্মানে সেদিনের হরতাল প্রত্যাহার করেছে) এবং বলেছে, নৈশভোজের আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হলেই কেবল তারা আন্দোলনের পথে যাবে। আমাদের রাজনৈতিক প্রত্যাশা কম ক্ষেত্রে পূরণ হয় এ দেশে। এবারও তা হলো না। বিএনপি হরতাল প্রত্যাহার করেনি এবং বলেছে, হরতাল শেষ হলে কেবল তারা আলোচনায় বসবে। বিএনপির যুক্তি হচ্ছে, তার জোটের নেতারা পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে হরতাল প্রত্যাহার করার সুযোগ নেই বলে হরতাল চলবে। আমি আবারও ভাবি, ‘বিএনপি কি এটি বলতে পারত না যে ঠিক আছে, হরতাল প্রত্যাহার করব, যদি সংলাপে বসার আগ পর্যন্ত কোনো রকম পুলিশি হয়রানি না হয়, আন্দোলনকালে গ্রেপ্তার হওয়া নেতা-কর্মীরা মুক্তি পান এবং গত কয়েক দিনে পুলিশি হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো তদন্ত করা হয়।’ বিএনপি এটি বললে প্রধানমন্ত্রী কি তা প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন?
প্রত্যাখ্যান করা হলে বা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পরও পুলিশি অভিযান অব্যাহত থাকলে বিএনপির আন্দোলন কি আরও বেশি মানুষের কাছে তখন গ্রহণযোগ্য হতো না? রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে বেশি বোঝেন, একে অপরকে অনেক বেশি ভালো করে চেনেন। তাই হয়তো বিএনপি অনমনীয় রয়ে গেল। নৈশভোজ বা সংলাপ হলে হয়তো আওয়ামী লীগও অনমনীয় থাকবে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধানের পদ থেকে শেখ হাসিনার সরে যাওয়ার প্রশ্নে। তাহলে সমাধান হবে কীভাবে? এর সম্ভাবনাই বা কতটুকু? আমাদের দুই নেত্রীর রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকারপ্রধান হিসেবে শুভবুদ্ধিজনিত সমাধানের লক্ষ্যে বড় ছাড় দেওয়ার কোনো ঘটনা আমরা দেখিনি। অতীতে আমরা বিএনপিকে বিরোধী দলগুলোর দাবি এবং বিএনপি-নিয়ন্ত্রিত ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা মেনে নিতে দেখেছি কেবল বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়লে। এবার কি আওয়ামী লীগ সরকার রাজপথের তীব্র আন্দোলনের চাপে বাধ্য না হলে নিজে থেকে বড় ধরনের কোনো ছাড় দেবে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে? এত হতাশার হয়তো কারণ নেই।
প্রধান দুটি দল ইতিমধ্যে কিছুটা ছাড় দিয়েছে তাদের আগের অনমনীয় অবস্থান থেকে। আওয়ামী লীগ ‘দলীয় সরকার’ থেকে সরে এসে ‘সর্বদলীয় সরকারের’ প্রস্তাব দিয়েছে। বিরোধী দল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ থেকে সরে এসে ‘নির্দলীয় সরকারের’ কথা বলছে, নির্দলীয় ব্যক্তিদের নির্বাচিত করিয়ে আনার কথা বলে প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রী বর্ণিত সংবিধান কাঠামোর মধ্যে সমাধানে রাজি থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। দুই প্রস্তাবকে সমন্বিত করে আওয়ামী লীগের প্রস্তাব অনুযায়ী বর্তমান সাংসদ এবং বিএনপির প্রস্তাব অনুযায়ী ‘নিরপেক্ষ, নির্দলীয়’ সাংসদদের সমন্বয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, এ নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো দুষ্কর নয়। কিন্তু তাতে কি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন এবং নির্বাচন নিয়ে আরও বহু গুণে গুরুতর সংকট বা অনিশ্চয়তাটি কেটে যাবে? দুই দলের নিয়ত ঠিক থাকলে এই সংকটের সমাধানও সম্ভব। আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হবেন অবশ্যই শেখ হাসিনা। বিএনপি বলছে, কোনোভাবেই এ পদে শেখ হাসিনা থাকতে পারবেন না, থাকতে হবে নিরপেক্ষ কাউকে।
শেখ হাসিনাই থাকলে তা হবে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের বিজয়; বিএনপির পছন্দসই নিরপেক্ষ কেউ থাকলে তা হবে নির্বাচনের আগেই বিএনপির বিজয়। মাঝামাঝি পথ তাহলে কোনটি? সাদামাটাভাবে দেখলে মাঝামাঝি সমাধান হতে পারে, শেখ হাসিনার বদলে আওয়ামী লীগের কোনো সাংসদকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বা তোফায়েল আহমেদের মতো কাউকে কি সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নেবে বিএনপি, এমনকি আওয়ামী লীগ? ২০০৬ সালে বিচারপতি কে এম হাসানের বদলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান পদে আওয়ামী লীগের পছন্দ ছিল বিচারপতি মাহমুদূল আমীন চৌধুরী। বিকল্প হিসেবে এখন কি ঠিক তাঁকেই নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত আছে আওয়ামী লীগ এবং একই সঙ্গে বিএনপি?
যাঁদের কথা বললাম, তাঁদের কেউ নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হলে নির্বাচনের আগে একতরফা বিজয় মিছিল বের করার সুযোগ নেই বড় দুটো দলের কারোর। এমন সমাধান কি আসলেই সম্ভব? আমি বিশ্বাস করি, নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, এমন একটি সমাধানের সত্যিকারের নিয়ত থাকলে তা করা সম্ভব। এই নিয়ত প্রধানত থাকতে হবে ক্ষমতাসীন দলকে। বিরোধী দল যা চাইছে (নির্দলীয় প্রধান), তাতে আওয়ামী লীগের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট হওয়ার বড় কোনো আশঙ্কা নেই। কিন্তু সরকার যা চাইছে (শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল), তাতে বিরোধী দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট হওয়ার অবশ্যই যৌক্তিক আশঙ্কা রয়েছে। আবার নির্বাচনকালীন সরকারকাঠামো বাস্তবায়িত করার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে কেবল সরকারের, বিরোধী দলের নয়। এসব বিবেচনা করে বলা যায় যে সমঝোতার দায়দায়িত্ব সবার, কিন্তু এটি প্রধানত হচ্ছে সরকারের। প্রশ্ন হলো, সরকারের কি আসলেই নিয়ত রয়েছে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের? সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যদি বিরোধী দল জিতে আসে,
অন্য দলটির যথেচ্ছ ক্ষমতা প্রয়োগের অবসান ঘটে এবং তারা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় নতুন সরকারের। এই আশঙ্কা এবারের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও রয়েছে। এটি জেনেশুনেও সত্যিই কি গণতন্ত্রের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে আন্তরিক রয়েছে এবারের সরকারি দলটি? আমি দুঃখিত, আমার মনে হয় না এতটা গণতান্ত্রিক চেতনা রয়েছে বর্তমান সরকারের (এমন চেতনা অতীতে ছিল না বিএনপি সরকারেরও)। যদি তা থাকে, তাহলে সংবিধান বা আদালতের রায় কোনো সমাধানের পথে বাধা হতে পারে না। যদি তা থাকে, তাহলেই কেবল শান্তিপূর্ণ একটি রাজনৈতিক সমাধান দেখব আমরা। অন্যদিকে এমন চেতনা না থাকলে রাজপথের সংঘাতের মধ্য দিয়ে একটি রক্তক্ষয়ী মীমাংসা দেখতে পাব আমরা। এই সংঘাতে বিএনপি জিতলে একটি অংশগ্রহণমূলক কিন্তু তিক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, আওয়ামী লীগ জিতলে একটি একতরফা নির্বাচন হবে, আর কেউই না জিতলে এবং দীর্ঘদিন অচলাবস্থা বিরাজ করলে অরাজনৈতিক শক্তির উত্থান অবধারিত হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান। আমাদের দুই নেত্রী কি সত্যিই বুঝতে পারছেন তা বা বুঝতে চাইছেন?
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শৃঙ্খলিত গণতন্ত্র by কাজী জেসিন

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা প্রবল ঝড়ের সম্ভাবনার আগে মধ্য-শ্রাবণের আকাশের মতো। সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় নেই পরর্মুহুর্তে কি ঘটবে।

সমঝোতা আর কত দূর by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে এক মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে। এ কারণে সবাই দারুণ শঙ্কিত। ২৪শে অক্টোবর সিলেটের গোলাপগঞ্জে গিয়েছিলাম বিকল্প ধারার এক জনসভায়।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দুই নেত্রীর ফোনালাপ

দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণের লক্ষ্যে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে  র টেলিফোন করার খবরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পরিবেশন করেছে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম।

‘এবার বাধা এলে উপড়ে ফেলবো’ by কাজী সুমন

যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন, ২৫শে অক্টোবরের পর রাজপথে থাকবে বিএনপি।

হরতালে সহিংসতা, নিহত ৫

ব্যাপক সংঘর্ষ, পুলিশি অ্যাকশন, ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে সারা দেশে পালিত হয়েছে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ১৮ দলের ডাকা ৬০ ঘণ্টা হরতালের প্রথম দিন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উত্তর-দক্ষিণ পারস্পরিক দৃষ্টিপাত by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

২০১৩ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ চলছে, জাতি ও সমাজ উৎকণ্ঠিত। এরূপ উৎকণ্ঠা প্রসঙ্গেই এই নাতিদীর্ঘ কলাম। প্রথমেই একটি অপ্রিয় বক্তব্য এবং সেটি হল এই যে, অতীতেও অনেকবার বাংলাদেশের মানুষ এবং সমাজ এরূপ উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং এর জন্য যারা দায়ী, তারা কোনো দিনই এ প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন না। অতীতের কিছু আলোচনা করলে আজ বুকের ওপর চেপে থাকা ভার একটু হালকা মনে হতেও পারে। 
প্রথম অস্থিরতা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫
১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের কথা উল্লেখ করছি। মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে সময় কাটিয়েছিল। কেন? ১৯৭২-এর জানুয়ারির ১০ তারিখ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফেরত এসেছিলেন। সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সরকারি দল ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবিচল ও একনিষ্ঠ ছিল। এতদসত্ত্বেও ১৯৭২-এর অক্টোবরে বিরোধী দল হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিল জাসদ। জাসদ সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামে। ১৯৭২ সালে সব ধরনের শিল্প জাতীয়করণ করা হয় এবং সেই জাতীয়করণ করা শিল্পগুলো লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস হয়। কারণ, জাতীয়করণকৃত শিল্পগুলো পরিচালনার জন্য আন্তরিকতা ও অভিজ্ঞতার ভীষণ অভাব ছিল। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে বাইরে ও ভেতরে চোরাচালান মহামারী রূপ নেয়। চোরাচালান রোধ করার জন্য সরকারি হুকুমে সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু সেনা কর্মকর্তা তখনকার সরকারি দলের নেতাদের রোষানলে পড়েন এবং অনেকেই চাকরি হারান। জাতীয় অঙ্গনে দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক অসহযোগিতার কারণে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয় এবং অগণিত মানুষ মারা যায়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সংবিধানে মারাত্মক রকমের সংশোধনী আনা হয় অর্থাৎ বহুদলীয় গণতন্ত্রের বদলে একদলীয় গণতন্ত্র কায়েম করা হয়। সামরিক বাহিনীসহ সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের একমাত্র রাজনৈতিক দলের সদস্য বানিয়ে পুরো সমাজকে একদলীয় রাজনীতিকরণ করা হয়। আইন-শৃংখলা রক্ষার নিমিত্তে জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামক একটি নতুন বাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছিল, যারা যে কোনো কারণেই হোক না কেন, জনমনে আতংকের কারণ হয়, নিপীড়নকারী হিসেবে পরিচিত হয়। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত ভৌত কাঠামো, দুর্বল অর্থনীতি ইত্যাদি বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দুর্নীতি এবং আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক অসহযোগিতা। ফলে বঙ্গবন্ধু শত আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও সাফল্যের সঙ্গে দেশ শাসন করতে পারেননি। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ আওয়ামী লীগের কতিপয় জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার মদদে সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ঘটায়। ওই ঘটনায় বঙ্গবন্ধু নিহত হন। আড়াই মাস পর, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে সেনাবাহিনীর আরেকটি অংশ ১৫ আগস্টের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আরেকটি বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ঘটায়। ৩ নভেম্বরের বিদ্রোহীরা জেনারেল জিয়াকে গ্রেফতার করেছিলেন। এরূপ ঘন ঘন বিদ্রোহ বা প্রতি-বিদ্রোহের কারণে সেনাবাহিনী তো বটেই, দেশের জনগণও সাংঘাতিক উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেই ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে সৈনিকরা একটি বিপ্লব সাধন করে এবং জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে। জেনারেল জিয়ার চেষ্টা ও সাহসিকতায় ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
জিয়া হত্যার আগে ও পরে অস্থিরতা ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হন। তিনি তার আমলে সংবিধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ সংশোধনী আনেন। ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে হারিয়ে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র আবার বহাল করেন। নিজে নতুন দল সৃষ্টি করেন। পুরনো দলগুলো পুনরুজ্জীবিত করেন, যার মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগও পুনরুজ্জীবিত হয়। তিনি লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সেনাবাহিনীপ্রধান বানান। ১৯৮০ সাল থেকে সেনাবাহিনীপ্রধান ইশারা-ইঙ্গিতে তার রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ করতে থাকেন, তথা ওই সময়ের ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে তার সমালোচনা প্রকাশ করতে থাকেন। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা বা পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল। জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের সরকারে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সংশ্লেষের কারণে তার সমালোচনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এরূপ প্রেক্ষাপটে ৩০ মে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীরউত্তমের নেতৃত্বে একদল সেনা অফিসার এবং তাদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ডিভিশনের একটি অংশ বিদ্রোহ বা ক্যু সাধন করে। জেনারেল মঞ্জুর মনে করতেন, দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা অফিসার হিসেবে তারই সেনাপ্রধান হওয়া উচিত এবং অন্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের অধিকতর মূল্যায়ন হওয়া উচিত। সেই বিদ্রোহের প্রক্রিয়ায় জেনারেল জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন। বিদ্রোহকারীদের বিচার হয়। অনেকের ফাঁসি হয়, অনেকের জেল হয়। জিয়া হত্যার পরও সাংবিধানিকভাবেই বিএনপি সরকার চালাতে থাকে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা চলে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকার অদক্ষ, দেশ বিপদে আছে ইত্যাদি অভিযোগে ২৪ মার্চ ১৯৮৪ তারিখে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়াকে পরোক্ষভাবে স্বাগত জানিয়েছিল।
এরশাদ আমলের আগমন, প্রস্থান এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক শাসক লে. জেনারেল এরশাদ নিজেকে এবং তার শাসনকে রাজনৈতিক শাসনে পরিণত করতে প্রচেষ্টা নেন। জাতীয় পার্টি সৃষ্টি করেন। সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল। এই সব কিছুই তিনি করান। তৎকালীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি একমত হয়েছিল যে, তারা কেউই এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনে যাবে না। কারণ, নির্বাচনে গেলেই জাতীয় পার্টি এবং এরশাদের সামরিক সরকার বৈধতা পাবে। ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনটি ঐতিহাসিক ছিল। কারণ, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকারকে বৈধতা দেয়। এরশাদ আমলে অনেক ভালো কাজ হয়েছিল; বিশেষত প্রশাসনিক সংস্কার ও উন্নয়ন খাতে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি এরশাদ রাজনৈতিক অঙ্গনের মন জয় করতে পারেননি। অতএব, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তার বিরুদ্ধে লেগেছিল। ১৮ অক্টোবর ১৯৯০ থেকে এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। হরতাল, ধর্মঘট, আন্তঃনগর বা আন্তঃজেলা যাতায়াত ইত্যাদি ভীষণভাবে বিঘ্নিত হতে থাকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বে নিয়োজিত, যথা সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক বা ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স। ১৮ অক্টোবর ১৯৯০ থেকে ক্রমান্বয়ে অবনতিশীল আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিতে এবং রাষ্ট্রপতিকে সহায়তার নিমিত্তে সেনাবাহিনী ক্রমান্বয়ে নিয়োজিত হচ্ছিল। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি স্থানে সেনা সদস্যরা জনগণের আক্রমণের শিকার হয়। জনগণ কর্তৃক সেনা সদস্যকে আক্রমণের কারণ ছিল অনেকটা এরকম- ‘তোমরা কেন স্বৈরশাসক এরশাদকে সমর্থন দিয়ে এখনও টিকিয়ে রাখছ?’ এরূপ পরিস্থিতিতে নভেম্বর ১৯৯০-এর একেবারে শেষদিকে ডাক্তার মিলন নিহত হওয়ার কারণে ঢাকা মহানগরে হঠাৎ করেই আন্দোলন তীব্রতা পায়। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। কার্ফ্যু বা সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি এরশাদকে আর ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা সমীচীন কি-না, সেনাবাহিনীর মধ্যে এ প্রশ্ন দেখা দেয়। সেনা কর্তৃপক্ষ নীরব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, সেনাবাহিনী নিজেদের বিতর্কিত ও জনবিরোধী করবে না। ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং সামরিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বহুলাংশে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি হিসেবে আমি আমার মূল্যায়ন আমার লেখা সর্বশেষ বই ‘মিশ্র কথন’-এ লিপিবদ্ধ করেছি ইতিহাসের স্বার্থে। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার স্বার্থে ওই আমলের সেনাবাহিনী পরবর্তী তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে এবং বাংলাদেশে আবার নির্বাচিত সরকার ফিরে আসে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সরকার গঠন করে বিএনপি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে আওয়ামী আন্দোলন ১৯৯৪ সালের শেষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। ১৯৯৫ সালে দাবি জোরালো হয়। আন্দোলন কঠোর হয়। ১৯৯৬ সালের শুরুটা জ্বলন্ত ছিল। আন্দোলনকারীরা ছিল আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী। আন্দোলনের তীব্রতার ফল হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে মোট ১৭৩ দিন হরতাল হয়েছিল, ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং চট্টগ্রাম বন্দর সাময়িকভাবে অচল হয়ে গিয়েছিল। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৯৫ থেকে মেজর জেনারেল র‌্যাংকে আমি যশোর অঞ্চলের জিওসি ছিলাম। অতএব, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির সঙ্গে পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলাম অন্য জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের মতোই। সরকারে ছিল বিএনপি। ১৫ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৬ নতুন করে বিএনপি সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর বিএনপি মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে সংবিধান সংশোধন করে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটায়। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে বিএনপি ক্ষমতা ছেড়ে দেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু একটি অঘটন ঘটে। ১৯৯৬ সালের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বীর বিক্রমের মধ্যে ঘোরতর মতপার্থক্য দেখা দেয়। এই মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস এবং সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল নাসিম সেনাবাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব বহাল বা অব্যাহত রাখতে নিবিড় চেষ্টা করেন। কিন্তু সেনাবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ এমন কিছু কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে যেগুলোকে বিদ্রোহমূলক বা সরকার উৎখাতমূলক বলা যায়। সেনাবাহিনীর বৃহদাংশ সেনাপ্রধানের হুকুম মানতে অস্বীকার করায় সেনাবাহিনী আনুগত্য ও শৃংখলার আঙ্গিকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এরূপ উত্তপ্ত ও বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর দুটি অংশ প্রায় পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। যা হোক, বহুমাত্রিক চেষ্টার ফলে বিদ্রোহী অংশ শান্ত হয় এবং সেনাবাহিনী ও দেশে শান্তি ফিরে আসে। ১০ জুন ১৯৯৬ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান পায়। তারা সরকার গঠন করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বাধীন ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এর সেনা বিদ্রোহের মতো লে. জেনারেল নাসিম বীর বিক্রমের নেতৃত্বাধীন ২০ মে ১৯৯৬-এর ঘটনাবলীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের একটি অংশ মনে করে।
অক্টোবর ২০০৬-এর রাজনৈতিক সাইক্লোন ২০০১ থেকে অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতা ছাড়ার আগে থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবে এই নিয়ে প্রচণ্ড মতবিরোধ চলছিল। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ ঢাকার রাজপথ রাজনৈতিক রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই কর্মীদের লগি-বৈঠা হাতে নিয়ে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছিল। ২৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগরে যে রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখন পর্যন্ত বিশেষ কেউই ভোলেনি। তার দায়-দায়িত্ব একাধিক রাজনৈতিক দলের ওপর পড়ে। তিন মাস পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান লে. জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী কর্তৃক তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উৎখাত করা হয় এবং নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সৃষ্টি করা হয়। ২০০৭ সালের প্রথম মাসের ১১তম দিনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এই ঘটনাটিকে ওয়ান-ইলেভেন বলা হয়। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থদের দ্বারা বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এটা দ্বিতীয় ঘটনা। প্রচুর সংখ্যক সেনা অফিসার জরুরি অবস্থা বাস্তবায়ন এবং একাধিক সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে জড়িত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক অঙ্গন তথা রাজনৈতিক নেতাদের ওপর মারাত্মক অত্যাচার নেমে এসেছিল। তুলনামূলকভাবে বিএনপি ও বিএনপিপন্থীরা চাপ ও অত্যাচারের শিকার হয়েছিল বেশি। তারপরও বলতে হয়, মধ্যম ও কনিষ্ঠ পর্যায়ের সেনা অফিসাররা প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন জাতীয় স্বার্থে। প্রথমদিকে তারা জনগণের প্রচুর প্রশংসা পান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রশংসা কমে আসতে থাকে। সাধারণভাবে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহল ১/১১-কে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিল। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তাদের আন্দোলনের ফসল ১/১১-এর সরকার।
১/১১-এর দুই বছর
১/১১ সম্পর্কে জেনারেল মইন ইউ আহমেদের লেখা নিজের বইয়ে যে বিবরণ আছে, সেটাকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়। সাক্ষ্যটা সম্পূর্ণ সত্য নাও হতে পারে। ক্রমান্বয়ে আরও সাক্ষ্য উপস্থাপিত হতেই থাকবে। ২৪ মার্চ ১৯৮২ জেনারেল এরশাদের মার্শাল ল’-এর মাধ্যমে অপসারিত হয়েছিল একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার। দলের নাম ছিল বিএনপি এবং রাষ্ট্রপতির নাম ছিল বিচারপতি আবদুস সাত্তার। ১১ জানুয়ারি ২০০৭ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়নি, কিন্তু সদ্য সাবেক রাজনৈতিক সরকার তথা বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উৎখাত করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা (অর্থাৎ ১/১১) বিএনপির বিরুদ্ধেই বিপ্লব ছিল। ২৪ মার্চ ১৯৮২-এর পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি থেকে কোনো সহযোগিতা আশা করেননি। তাই কৌশলে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে সহযোগিতা নিয়ে ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচন করিয়েছিলেন।
উৎকণ্ঠিত কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ
এখন অক্টোবর ২০১৩। অক্টোবর ২০০৬-এর কথা উপরের অনুচ্ছেদেই বললাম। এ মুহূর্তে আমাদের চিন্তা ও দুশ্চিন্তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে। সাংবিধানিক সংকট নিয়ে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলছেন, তিনি বর্তমান সংবিধানের বাইরে যাবেন না এবং সংবিধানের ভেতরে থেকেই আগামী নির্বাচন করবেন বা করাবেন। অপরপক্ষে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের বক্তব্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নিজস্ব সুবিধার জন্যই অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে যেন জিততে পারে সেই অন্তর্নিহিত লক্ষ্য সামনে রেখে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। বিরোধী দলের মতে, নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনকালে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। অতএব, বিরোধী দল কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। এ মুহূর্তের সংকট কঠিন। সংকটের উৎপত্তি ২০১১ সালের জুন মাসে সংসদ কর্তৃক পঞ্চদশ সংশোধনী আনার মাধ্যমে। সংকট সৃষ্টিতে বর্তমান বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কোনো ভূমিকা নেই। তারপরও বিরোধী শিবির যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে, তাদের দাবি ন্যায্য এবং তা বাস্তবায়ন করা হোক। বিরোধী শিবিরের দাবিটা এমনই একটা দাবি যেটা মূলত ১৯৯৪-৯৬ সময়ে বর্তমান সরকারি দলেরই দাবি ছিল। এ প্রেক্ষাপটে মানুষ যখন উৎকণ্ঠিত, আতংকিত, তখন ১৮ অক্টোবর ২০১৩ প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং একটি প্রস্তাব দেন। ২১ অক্টোবর ২০১৩ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া একটি প্রস্তাব দিয়েছেন; তথা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা দিয়েছেন। উভয় নেত্রীর প্রস্তাবের বিবরণ বা মূল্যায়ন আমি এখানে স্থানাভাবে করছি না। বিজ্ঞ পাঠক নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন কোন প্রস্তাবটি ভালো বা কোন প্রস্তাবটি মন্দ। পূর্ণাঙ্গ না হলেও আংশিকভাবে। অথবা দুটি প্রস্তাবের ভালো অংশ নিয়ে একটি তৃতীয় ভালো প্রস্তাব প্রস্তুত করা যায় কি-না সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।
উপসংহার
সবশেষে আমি এই কলামের শিরোনাম নিয়ে একটু কথা বলি। শিরোনামের শেষাংশ হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ পারস্পরিক দৃষ্টিপাত। উত্তর বলতে আমি ঢাকা মহানগরের উত্তর অংশকে বুঝিয়েছি। দক্ষিণ বলতে সেনানিবাস ছাড়া অবশিষ্ট ঢাকা মহানগরকে বুঝিয়েছি। প্রতীকী অর্থে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের বা জনসমষ্টির মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক সম্পর্কের কথা, সহযোগিতার কথা, অসহযোগিতার কথা সবকিছুকেই বুঝিয়েছি। ১/১১-এর একদিন আগে, ১০ জানুয়ারি ২০০৭-এ প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার অষ্টম কলামে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এতে ১০ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তার পক্ষ থেকে দেশের বিদগ্ধ রাজনৈতিক সমাজের প্রতি একটি আবেদন ছিল। এ মুহূর্তে অবসরপ্রাপ্তরা কী চিন্তা করছেন জানি না, কিন্তু সমাজের সবাই যে উদ্বিগ্ন এটুকু জানি।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

রাষ্ট্রকে বিপন্ন করা চলবে না by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

১৮ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে এক ভাষণ দেন। তার এ ভাষণ বিটিভিসহ দেশের সব স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ও রেডিওতে একযোগে সম্প্রচারিত হয়। চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সমগ্র জাতি তাকিয়ে ছিল প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের দিকে। জাতি প্রত্যাশা করেছিল প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে। কিন্তু মানুষের সেই আশায় গুড়েবালি, যতটা আশা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে মানুষ করেছিল; ততটা নিরাশ হয়েছে। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সিপিবি, বিকল্পধারা, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ আরও অন্য রাজনৈতিক দল প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে ১৯ অক্টোবর মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট বলে অভিহিত করেছে। এ সংবাদ সম্মেলনের পর জাতীয় পার্টির জন্য খুলে যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের দ্বার। জাতীয় পার্টির ডাক পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ২০ অক্টোবর রাতে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে রাজকীয় মেজাজে এরশাদ সাহেব পা রাখেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। শুধু বৈঠকই নয়, নৈশভোজও সারেন এরশাদ সাহেব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে; কিন্তু তার রাজনীতির প্রাপ্তির খাতা শূন্য, তিনি যে কিছুই পাননি উপরন্তু খুইয়েছেন, সেটি বুঝতে পারেন বৈঠক ও নৈশভোজ-পরবর্তী মিডিয়ার সামনে সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য শুনে। অতঃপর তড়িঘড়ি করে ২০ অক্টোবর দুপুরে এক আকস্মিক সংবাদ সম্মেলন করেন এরশাদ সাহেব। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি আশরাফ সাহেবের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। এমনকি তার বক্তব্যকে অসত্য ও বানোয়াট বলে অভিহিত করেন এবং বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাতে বদলে যায় রাজনৈতিক দৃশ্যপট। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশরাফ সাহেব তার বক্তব্য প্রত্যাহারও করেননি এবং এরশাদ সাহেবের অভিযোগের কোনো ব্যাখ্যাও দেননি।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ঠিক এক দিন পর ডিএমপি ঢাকায় সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধের এলান জারি করে। তাতে বলা হয়, ২০ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে ঢাকায় কোনো সভ-সমাবেশ, মানববন্ধন ও মিছিল করা যাবে না, এমনকি ঘরোয়া সমাবেশও পর্যন্ত নিষিদ্ধ থাকবে। এ আদেশ শুনে সবার মাথায় হাত, সামনের দিনগুলো যে সুখকর হবে না এবং অনিশ্চয়তার অন্ধকার যে সহসা কাটছে না- এটি ঝুঝতে কারও বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না। এরই মধ্যে ২১ অক্টোবর গোধূলি বেলায় বিরোধী দলের নেতা হাজির হলেন গণমাধ্যমের সামনে, জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এক যুগান্তকারী, সময়োপযোগী, দূরদর্শী ও রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তব্য রাখলেন তিনি; প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে দিলেন নির্বাচনকালীন বিকল্প এক সরকারের প্রস্তাব। দ্রুত বদলে গেল রাজনীতি। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এবং ব্রিটেন, কানাডাসহ অন্যান্য রাষ্ট্র। স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘও।
২২ অক্টোবরের সূর্যটা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য আশীর্বাদের বরপুত্র হয়ে উদয় হয়। বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের ওপর আলোচনার চিঠি নিয়ে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল সবাইকে চমকে দিয়ে আকস্মিক হাজির হন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মিন্টো রোডের সরকারি বাসায়। আশরাফ সাহেব যথারীতি চিঠি গ্রহণ করে আচমকা ফোন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। কথা হয় দু’জনের মধ্যে কয়েক মিনিট। এ সময়টা বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির জন্য টার্নিং-পয়েন্ট হয়ে দেখা দেয়। সৈয়দ আশরাফ ও ফখরুল সাহেবের ফোনালাপ মিডিয়ায় দেখতে পেয়ে মানুষের আতংকিত চেহারা মুহূর্তের মধ্যেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে নাটকীয়ভাবে খবর আসে মির্জা ফখরুলকে ফোন করেছেন জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট কথা হয় তাদের মধ্যে। রাতে গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা। বৈঠক শেষে তিনি মিডিয়ার সামনে বলেন, দুই দলের মধ্যে সংলাপের দ্বার উন্মুক্ত হল। নাটকীয়তার এখানেই শেষ নয়, পরের দিন অর্থাৎ ২৩ অক্টোবর সবাইকে বিস্মিত করে ড্যান মজিনা সরাসরি চলে যান ভারতের রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরনের বাসায়। তাদের মধ্যে কী কথা হল এবং কেনইবা তিনি পঙ্কজ শরনের বাসায় ছুটে গেলেন- এটার হিসাব রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মিলাতে পারছে না। তবে সামনের দিলগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্যই এটি দৃশ্যমান হবে। বিস্ময় এখানেই শেষ নয়, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নিয়ে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার মাগরিবের নামাজের পর হাজির হন জাতীয় সংসদে। তিনি খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব তুলে ধরেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। এর মাধ্যমে বল এখন আনুষ্ঠানিকভাবে চলে গেল সরকারি দলের কোর্টে। এখন দেখার বিষয় এ বল নিয়ে কেমন খেলা খেলে ক্ষমতাসীন দল।
প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক আছে। এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি নতুন প্রস্তাব। এ সরকারের রূপরেখা কী হবে, সংসদ ভেঙে দিয়ে, না রেখে হবে, এ সরকারের প্রধান কে হবেন, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়- যেমন স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও তথ্য মন্ত্রণালয়ে কোন দলের মন্ত্রী থাকবে ইত্যাদি প্রশ্ন থেকেই যায়। আর বাংলাদেশের সংবিধানে সর্বদলীয় সরকার বলতে কোনো দিকনির্দেশনাও নেই। এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। বিরোধী দল মনে করে, সর্বদলীয় সরকারের নামে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে চান। তাই তাদের দাবি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে কিছুতেই প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। কারণ তাকে নির্দলীয় সরকারের প্রধান রেখে পক্ষপাতহীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায় না। দৃশ্যত সর্বদলীয় সরকারের নামে একটা নোংরা রাজনৈতিক খেলা চলবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকার চাইবে সর্বদলীয় সরকারের নামে কিছু অস্তিত্বহীন দলকে দিয়ে ও অনুগত কিছু মিডিয়ার সাহায্যে বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচনের একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করতে। আসলে কোনো দুরভিসন্ধিমূলক চিন্তা নিয়ে সংকটের সমাধান করা যায় না, বরং সংকট আরও বাড়ে। তাতে দেশ সংকটে পড়ে। এমনিতেই দেশ চরম সংকটে নিপতিত। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কারও কাছেই স্পষ্ট নয়। অনেকে বলছেন, দেশে একটি গৃহযৃদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠছে। এমনটি হলে ধ্বংস হবে মানুষের সব স্বপ্ন, ধ্বংস হবে সম্ভাবনা।
শান্তিতে নেই ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করছেন একটা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যা ধ্বংস করবে অর্থনীতি; ব্যবসা-বাণিজ্য হয়ে পড়বে স্থবির, উৎপাদন কমে যাবে, রফতানি বাণিজ্য নিয়ে দেখা দেবে অনিশ্চয়তা। আমদানি-রফতানি ব্যাহত হবে। বন্ধ হবে কল-কারখানা। কর্ম হারিয়ে বেকার হবে হাজার হাজার শ্রমিক। দেখা দেবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ হবে রুদ্ধ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এর ফলে জাতীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হবে, জিডিপি নিচের দিকে নামবে, সর্বোপরি মধ্য আয়ের দেশের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হবে। কাজেই বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি হওয়া উজ্জ্বল ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এ নির্মোহ সত্যটি শাসক দল যত তাড়াতাড়ি উপলদ্ধি করবে, ততই তাদের জন্য এবং দেশের জন্য মঙ্গল হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের পর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হয়েছে। ব্রিটেন, কানাডা ও জাতিসংঘসহ সুশীল সমাজ, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সর্বস্তরের মানুষ বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে; এখন সরকার এটাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করলে সমাধান দোরগোড়ায়। আর মানুষ চায় সংকটের সমাধান, চায় সংলাপ; চায় পক্ষপাতহীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন, এর জন্য এগিয়ে আসতে হবে সর্বপ্রথম সরকারকেই।
খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসলেই সমাধান বেরিয়ে আসবে বলে মানুষ মনে করে। কারণ খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে কোনো পক্ষপাতিত্বের লেশ মাত্র নেই। তাই এ প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। দুই দল বসে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন এটি ঠিক করতে পারলে অন্যান্য বিষয় সহজেই সমাধানযোগ্য বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নাকি পেছনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব; প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে বলছি, বর্তমান ক্রান্তি সময়ে যত পেছনে তাকাবেন ততই সামনে তাকাতে পারবেন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় গত কয়েক মাসে অনেক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই জাতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে একটি নির্বাচন নিয়ে এমন আÍঘাতী ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্ষমতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে জেনেশুনে কৌশলে জাতিকে ভয়ানক বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে; যাতে এ জাতি বিপন্ন জাতিতে পরিণত হয়, একটা বাইরের অপশক্তির হস্তক্ষেপ যাতে অনিবার্য হয়। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রকে বিপন্ন করে কোনো রাজনীতি হতে পারে না। রাজনীতি করতে গিয়ে রাষ্ট্রই যদি বিপন্ন হল, তাহলে রাজনীতি কার স্বার্থে? কাজেই রাজনৈতিক সহিংসতায় আর যাতে কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, আর যাতে কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সংলাপ ও সংঘাত পাশাপাশি চলে না সংলাপে আসতেই হবে by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্রটা এখন কী? দেশ কি সংলাপের দিকে এগোচ্ছে, না সংঘাতের দিকে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে যাওয়ার আগে বর্তমান পরিস্থিতি একটু বিবেচনা করা যাক। শনিবার (২৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নিজে এবং তার এডিসির মাধ্যমে বহুবার চেষ্টা করে বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে পেরেছেন। জানা যায়, সাঁইত্রিশ মিনিট কথা হয়েছে। সংলাপ হয়েছে, সংঘাত বন্ধ করা হয়নি। রাজশাহীতে রক্ত ঝরেছে। খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনা টেলিফোন-আলাপে তিন দিনের হরতালের ডাক প্রত্যাহার করে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। খালেদা জিয়া রাজি হননি। বলেছেন, তার জোটের আঠারো দল মিলে হরতালের ডাক দিয়ে ফেলেছে, এখন আর কিছু করার নেই। ২৯ তারিখে সন্ধ্যায় হরতাল শেষ হলে আলোচনায় বসা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তাকে গণভবনে দাওয়াত করেছেন। বলেছেন, তিনি যাকে খুশি এবং যতজন তিনি চান সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারেন। তবে আগে তাদের সংখ্যার কথা জানিয়ে দিতে হবে। যাতে সবার জন্য খাবারের আয়োজন করা যায়।
এই আমন্ত্রণ খালেদা জিয়া গ্রহণ করেছেন, না ঝুলিয়ে রেখেছেন তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। আমার ধারণা, খালেদা জিয়া আমন্ত্রণটি ঝুলিয়ে রেখেছেন। যুদ্ধরত দুই পক্ষ শান্তি আলোচনায় বসতে চাইলে আগে একটি যুদ্ধবিরতি ঘটায়। আলোচনা সফল না হলে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও যতবার দুই পক্ষ শান্তি আলোচনায় বসেছে, যুদ্ধবিরতি ঘটানো হয়েছে। বিশ্বের সর্বত্রই শান্তি আলোচনার সময় এটা ঘটে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তো যুদ্ধরত দুটি শত্র“পক্ষ নয়; একই দেশের দুটো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধ মেটানোর জন্য আপস আলোচনায় বসলে দু’পক্ষকেই তো আগে সংঘাত বর্জন করতে হবে, রাজপথের লড়াই স্থগিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সংঘাত বর্জন করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর জন্য তার বেতার ও টেলিভিশনে একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজে একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছেন।
অর্থাৎ আলোচনার একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনার প্রস্তাব অথবা খালেদা জিয়ার পাল্টা প্রস্তাব কোনোটাই রাজনীতিতে শেষ কথা নয়। প্রস্তাব দেয়াই হয় এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংলাপ আলোচনা শুরু করার জন্য। খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে এক ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন, আবার সংসদে গিয়ে সেই প্রস্তাব পাল্টেছেন। তথাপি এই প্রস্তাবকে ভিত্তি করেও আলাপ-আলোচনায় এগোনো যেত।
বিএনপি তা করেনি। প্রস্তাব দিয়েই আলোচনায় বসার সুযোগ গ্রহণের আগেই আন্দোলনের হুমকি দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই হুমকি কার্যকর করে। জামায়াত-শিবিরকে নামিয়ে দেয়া হয় মাঠে। তারা ভাংচুর শুরু করে এবং তাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানি এবং রক্তপাতও ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির ঢাকায় ২৫ অক্টোবরের মহাসমাবেশ প্রথমে নিষিদ্ধ করেছিল। তাতে আমারও মনে হয়েছিল, গণতান্ত্রিক রীতি বিরোধী এই ব্যবস্থা গ্রহণ হাসিনা সরকারের জন্য ঠিক হয়নি। পরে মনে হয়েছে, ৫ মে ঢাকায় শাপলা চত্বরে হেফাজতিদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ঘটানোর প্রতিশ্র“তিতে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের সমাবেশ করার অনুমতি দিয়ে সরকার যে বিরাট ভুল করেছিল, সেই ভুল ২৫ অক্টোবরের বিএনপির সমাবেশের বেলায় তারা করতে চাননি।
২৫ অক্টোবরের সমাবেশে খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তাদের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচি অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত হরতাল ঘোষিত হয়। কিন্তু ২৭ অক্টোবরের আগেই শুরু হয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানি অর্থাৎ বিএনপির ২৫ অক্টোবরের মহাসমাবেশ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সরকারের আশংকা যে একেবারেই অমূলক ছিল না, সমাবেশ-পরবর্তী সহিংস ঘটনা তা প্রমাণ করে। এই সমাবেশ উপলক্ষে সরকার জননিরাপত্তার ব্যবস্থামূলক কঠোর পুলিশি উপস্থিতির ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ৫ মে’র শাপলা চত্বরের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারত। আমাদের দেশের কপট গণতন্ত্র-প্রেমিকেরা যাই বলুক, গণতন্ত্রের ন্যূনতম নিয়ম-কানুন যারা মানে না, তাদের সঙ্গে গণতান্ত্রিক আচরণ করা খুবই বিপজ্জনক।
বিদেশী (ব্রিটিশ) শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও মহাত্মা গান্ধী বলতেন, করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গ (ফড় ড়ৎ ফরব) অর্থাৎ হয় দাবি আদায় করব নয় মরব। বাংলাদেশে দেশী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে বিএনপির নেতানেত্রীরা প্রথমেই বলেন, ‘হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব’, ‘আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করব’, ‘হাসিনাকে তার পিতার পরিণতি বরণ করতে হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনকি ড. ইউনূসের মতো শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীও এখন সরকারের হাত গুঁড়িয়ে দেয়ার হুংকার দিয়ে দেশে অশান্তি ছড়াচ্ছেন। এগুলো কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা? আর এই ভাষায় যারা কথা বলেন এবং সঙ্গে হিংসাত্মক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাদের সঙ্গে গণতান্ত্রিক আচরণ করা গণতন্ত্র রক্ষার জন্যই বা কতটা নিশ্চয়তামূলক?
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে খালেদা জিয়া কি সংলাপে যাবেন? এই ব্যাপারে তার আন্তরিকতা থাকলে তিনি ২৭ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত ঘোষিত হরতাল স্থগিত রাখতেন। হরতাল শুরু হওয়ার আগেই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানি ঘটেছে। মূলত জামায়াত-শিবির মাঠে হিংস্রভাবে নেমেছে। এই অবস্থার মধ্যে খালেদা জিয়া গণভবনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে যদি সংলাপে বসেনও তাতে সংলাপ সফল করার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যাবে কি?
বিএনপি নেত্রীর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জেনেছি, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে তার আগ্রহ আছে। প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে গণভবনে যাওয়ার ব্যাপারেও তার মধ্যে আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু মুশকিল হয়েছে তিনি এখন আর নিজের ইচ্ছা চালিত হতে পারছেন না। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাকে সিঙ্গাপুরে যেতে হয়। সেখানে পুত্র তারেক রহমানের এবং অন্য বিদেশী মিত্রদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
পুত্র তারেক রহমান বিদেশে বাস করেন এবং জামায়াতের গাঁটছড়াবন্দি। তার মতে, ‘জামায়াত এবং বিএনপি অভিন্ন পরিবার।’ আবার জামায়াতের পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের কুখ্যাত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এই ত্রিভুজ বন্ধন থেকে খালেদা জিয়ার নিজেকে মুক্ত করতে পারা সহজ নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন একটা ভাঁওতামাত্র। আসল দাবি ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি বাতিল করা। জামায়াতের জনসমর্থন নেই। তাই বিএনপির জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করে দলটিকে সামনে রেখে মাঠে নেমেছে। জনসমর্থন নেই; তাই ভাংচুর, সন্ত্রাস চালাচ্ছে।
কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা দিন দুই হয় বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি চাঞ্চল্যকর খবর ছেপেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা জিইয়ে রাখা এবং আন্দোলনের নামে বর্তমান সন্ত্রাস সৃষ্টির পেছনে যে আইএসআই সক্রিয় এবং জামায়াত ও তারেক রহমানের মাধ্যমে বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে।
এই খবরকে কেউ কেউ বলতে পারেন ভারতীয় পত্রিকার অপপ্রচার। যদি তাও হয় বাস্তবে কী দেখা যাচ্ছে? খালেদা জিয়ার প্রতিটি জনসমাবেশে এখন জামায়াত-শিবিরই অর্ধেকের বেশি মাঠ দখল করে থাকে। ছাত্রদলকে পিটিয়ে ছাত্রশিবির সভা ও সমাবেশের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়। হরতালের কর্মসূচি পালনেও জামায়াত ও শিবির ক্যাডারদেরই প্রাধান্য। বেগম জিয়া মুখে বলছেন, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান; কিন্তু কাজে প্রকাশ্যেই এই বিচারের ব্যাপারে বিতর্ক সৃষ্টি করছেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি চাইছেন। ঢাকায় শুক্রবারের জনসভাতেও তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সব রাজবন্দিকে মুক্তি দেবে।’ এই রাজবন্দি বলতে যে তিনি বন্দি এবং ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তিদানের কথা বলেছেন, তা একজন বালকের পক্ষেও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
শুক্রবার বেগম জিয়ার সভায় প্রথম বক্তাই ছিল ছাত্রশিবিরের এক নেতা। স্বয়ং বিএনপি-নেত্রী তার ভাষণে ছাত্রশিবিরের গ্রেফতারকৃত সভাপতির মুক্তি দাবি করে বলেছেন, এই শিবির-সভাপতি অত্যন্ত ভালো লোক। সরকার তাকে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালাচ্ছে। বিএনপির এক প্রবীণ ও পুরনো নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার কাছে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বেগম জিয়া গণভবনে দাওয়াত খেতে গেলেও সংলাপ সফল হবে কিনা সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। বিএনপি এখন আর আগের বিএনপি নেই। সম্পূর্ণভাবে জামায়াতের গ্রাসে চলে গেছে। দলনেত্রী সব ব্যাপারেই দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশের পরামর্শ শোনেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন তারেক রহমান ও জামায়াতের সঙ্গে পরামর্শ করে। আজকাল তার বক্তৃতা-বিবৃতি শুনলে মনে হয়, তিনি গোলাম আযমের অনুপস্থিতিতে জামায়াতের অঘোষিত আমির।’
এই আক্ষেপ বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মনেই। কিন্তু তারা মুখ ফুটে তা বলার সাহস পান না। বেগম জিয়া যখন কোনো জনসভায় বক্তৃতা দেন তখন সভাস্থল জামায়াত ও শিবিরের লোক দ্বারা ভর্তি এবং চারদিকে শুধু জামায়াত ও শিবিরের ফেস্টুন, পোস্টার ও ব্যানার দেখে নিজেকে কোন দলের নেতা ভাবেন তা জানতে আমার খুব ইচ্ছা হয়। সরকারের এক নেতা বলেছেন, ‘তারা গণভবনে বেগম খালেদা জিয়া তথা বিএনপিকে শুধু আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।’ অনেকের মতো আমারও প্রশ্ন, বিএনপির বর্তমানে যা অবস্থান, তাতে জামায়াতকে আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানানোর দরকার আছে কি?
২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত হরতালে কি ঘটবে তা ২৭ তারিখের ঢাকার অবস্থা দেখেই বোঝা যায়। ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ভয়ে অনেকেই গাড়ি বের করেননি বা দোকানপাট খোলেননি। কিন্তু আর সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। অর্থাৎ শিথিল হরতাল। যথারীতি জামায়াত-শিবির কিছু ভাংচুর করছে। যেসব জেলায় জামায়াত শক্তিশালী, সেসব জেলায় উপদ্রব বাড়তে পারে। রক্তপাতও হতে পারে। এর বেশি কিছু নয়। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও কোনো কোনো নেতার বাড়িতে ককটেল ছোড়া হয়েছে। কিন্তু পটকা ফুটিয়ে যে ‘বিপ্লব’ করা যায় না, এই শিক্ষাটা বিএনপি-জামায়াত এখনও নেয়নি।
যত কিছুই হোক, বেগম জিয়াকে শেষ পর্যন্ত সংলাপে যেতে হবে বলে আমার ধারণা। গণভবনের আমন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের আগেও তিনি শেখ হাসিনার টেলিফোন ধরার ব্যাপারে যেমন গড়িমসি করেছেন, তেমন গড়িমসি করবেন, নানা শর্ত জুড়বেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আলাপ-আলোচনায় বসতে হবে। কারণ সংঘাতে গিয়ে যে কোনো লাভ নেই এবং গণআন্দোলন করার মতো শক্তি ও জনসমর্থন তার জোটের নেই, এটা দেশের পরিস্থিতিই তাকে বুঝিয়ে দেবে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তাকে আলোচনায় আসতে হবে।
বিএনপি হয়তো এখনও আশা করে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়াও ভারত ও আমেরিকার চাপে হাসিনা সরকার হয়তো তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে। এ জন্য বাজারে তারা নানা গুজবও সৃষ্টি করেছিল। এই গুজবের পালে হাওয়া লাগিয়েছিল ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনা সাহেবের দিল্লিতে ছুটে যাওয়ার খবরটি। এখন তো ভারতের কাগজেই খবর বেরিয়েছে, দিল্লিতে মার্কিন দূতকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের দেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়; বাংলাদেশেও তা হলে দিল্লির আপত্তি নেই। মজিনা সাহেব ভারতের সঙ্গে ঐকমত্য ঘোষণা করে তবে দিল্লি ছেড়েছেন। তাতে হাসিনা সরকারের মনোবল আরও বেড়েছে। শেখ হাসিনা নিজে খালেদা জিয়াকে সরাসরি গণভবনে আমন্ত্রণ জানাতে দ্বিধা করছেন না। দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে সবল অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছেন বলেই শেখ হাসিনা এটা করতে পারছেন।
আমি বর্তমান সরকারের ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রশংসা করি। আন্দোলনের নামে বিরোধী দলের তাণ্ডবের মুখে তারা প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ করছেন বটে, কিন্তু তা সীমিত। প্রয়োজনের বেশি শক্তি প্রয়োগ করছেন না। বাংলাদেশের পুলিশ মার খেয়ে এবং চরম উস্কানির মুখেও ধৈর্য ও সংযম দেখাতে পারে, এই সরকারের আমলে তার প্রমাণ পাওয়া গেল। দেখা যাক, তিন দিনের ‘পটকা-বিপ্লবের’ পর বিএনপি-জামায়াত পরবর্তী ধাপে কি করে? আরও কঠোর কর্মসূচি দিয়ে জনজীবনের বিরক্তিকর উপদ্রব তারা বাড়াতে পারবেন; কিন্তু ‘শিথিল হরতাল’ চাঙা করতে পারবেন না, সরকারকে নতিস্বীকার করানো দূরের কথা। ইতিমধ্যে ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে ৫ মের মতো হয়তো দেখা যাবে ময়দান ফাঁকা, কোথাও পাগড়ির দেখা মিলছে না।
বিএনপির আরও সহযোগী শক্তি আছে। যেমন ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীদের তৃতীয় শিবির। তাদের প্রচেষ্টা এখন অনেকটা কুঁজোর চিৎ হয়ে শুয়ে চাঁদ দেখার স্বপ্নের মতো। সুশীল সমাজের মাথা ড. ইউনূস এখনও নভোচারী, দেশের কথা ভাবেন, কিন্তু দেশের মাটিতে পা রাখেন না। জঙ্গের ময়দানে সময় এলে এদের দেখা যাবে সে আশায় গুড়েবালি।
সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ- সিরাতুল মুসতাকীম হল আঁচল থেকে সব পটকা, বোমা, বারুদ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় নির্বাচন-সংক্রান্ত সব মতভেদ যথাসম্ভব কমানো এবং একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো। আমার বিশ্বাস, বিএনপি-নেত্রীকে সেই পথেই শেষ পর্যন্ত আগাতে হবে। আমি আশাবাদী।

ভারতে বছরে ৩০০ রেলকর্মী প্রাণ হারান

ভারতে রেললাইন নিরাপদ রাখতে গিয়ে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ রেলকর্মীকে প্রাণ দিতে হয়। এসব কর্মী রেললাইন পরীক্ষা করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে প্রাণ হারান। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হল, রেল চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত এসব কর্মীর বেশিরভাগই ট্রেনে কাটা পড়ে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। পরিসংখ্যানের দিক থেকে ভারতের রেলওয়ের এ জাতীয় চাকরি দেশটির মাওবাদী গেরিলা অধ্যুষিত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চাকরির চেয়ে বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত হয়েছে। গত বছর দেশটিতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৮৫ রেলকর্মী। অন্যদিকে, একই সময়ে মাওবাদী গেরিলাদের হামলায় নিহত হয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনী সিআরপিএফের ৩৭ সদস্য। অর্থাৎ যুদ্ধ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যত সিআরপিএফ সদস্য নিহত হয়েছেন তার চেয়ে ৮ গুণ বেশি রেলকর্মী নিহত হয়েছেন বেসামরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে।
দেশটিতে গত চার থেকে পাঁচ বছর ধরে গড়ে এ হারে রেলকর্মীরা নিহত হচ্ছেন বলে স্বীকার করেছেন ভারতের রেলওয়ে বোর্ডের সদস্য (প্রকৌশলী) এসকে জৈন। এছাড়া ভারতের এক লাখ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ নিরাপদ রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত বছর আহত হয়েছেন আরাও ৮০০ রেলকর্মী। অবশ্য, কোনও কোনও বছর নিহতের সংখ্যা ৫০০ পর্যন্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া রেলওয়েমেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শিব গোপাল মিশ্র। দিনরাত বা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কখনোই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান না ভারতের রেলকর্মীরা। রাতের অন্ধকার টর্চ জ্বেলে তাদের পরীক্ষা করতে হয় রেললাইন। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ট্রেনে চাপা পড়ার ঘটনা ঘটে। অবশ্য, আগে প্রতি বছর ৪০০ রেলকর্মী নিহত হলেও এর সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমানো গেছে। এ সম্পর্কে এসকে জৈন বলেন, বর্তমান সংখ্যাটিও গ্রহণযোগ্য নয় এবং রেললাইন পরীক্ষার একটি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা দরকার।ম এদিকে ভারতের রেল কর্তৃপক্ষ লোকবল ব্যবহার করে রেললাইন পরীক্ষা করার পুরনো পদ্ধতির বদলে ‘রেলসোনিক’ নামের আধুনিক একটি পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। এ পদ্ধতিতে রেললাইনের মাধ্যমে আলট্রসোনিক ওয়েব বা অতিশব্দের তরঙ্গ পাঠানো হবে। এ শব্দতরঙ্গ বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে ধারণ করলে বোঝা যাবে, লাইনের কোথাও ফাটল বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছে কি-না। উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার নৌবাহিনীর কাছ থেকে এ পদ্ধতি কিনেছে ভারত। তথ্যসূত্র : দ্য হিন্দু।