Sunday, October 4, 2015

কোনিও হত্যা তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার আগ্রহ, জাপানের উদ্বেগ

রংপুরে হোসি কোনিও হত্যার সাথে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের (ইসলামিক স্টেট) জড়িত থাকার দাবিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জাপান। বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের হত্যায় আইএস জড়িত কি-না তা তদন্তে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বাংলাদেশে বিদেশি হত্যার সাথে আইএসের জড়িত থাকার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়া। আর সিঙ্গাপুর তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশে উচ্চ মাত্রায় সতকর্তা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ঢাকা ও রংপুরে বিদেশি নাগরিক হত্যায় নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
আজ রোববার ফেসবুকে জাপান দূতাবাসের পাতায় দেয়া বৈদেশিক নিরাপত্তা তথ্যে হোসি কোনিও হত্যার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এতে রংপুরে গুলি করে জাপানি নাগরিক হত্যার ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, আইএস এই ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। তারা ইসলামি দেশগুলোতে বিদেশিদের ওপর আরো আক্রমনের হুমকি দিয়েছে।
বার্তায় সিরিয়াতে জাপানের দুজন নাগরিক ইউকাওয়া হারুকানা এবং কিনজি গোটোকে গলা কেটে হত্যা এবং তার ভিডিও আইএস কর্তৃক প্রকাশের ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, এ কারণে বাংলাদেশে জাপানি নাগরিক হত্যার সাথে আইএসের জড়িত থাকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সর্বশেষ নিরাপত্তা তথ্য নিয়ে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈদেশিক নিরাপত্তা তথ্য ও প্রতিবেদন দেবার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে জাপানের নাগরিকদের যথাযথ নিরাপত্তা পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
এদিকে সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের সতর্ক করে দেয়া বার্তা বলা হয়েছে, বিদেশিদের ওপর সম্ভাব্য হামলাজনিত নিরাপত্তা ঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ভ্রমণ বা অবস্থানরত সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের উচ্চ মাত্রায় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রতি সজাগ থেকে স্থানীয় সংবাদের ওপর গভীরভাবে নজর রাখা এবং জনসমাগম বা জনাকীর্ন স্থান পরিহার করে চলা উচিত।
ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়া আজ তাদের নাগরিকদের আগের দেয়া সতর্কবার্তা হালনাগাদ করে রংপুরে জাপানের নাগরিক হত্যা ও এর দায় আইএসের স্বীকার করার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেছে।
প্রসঙ্গত, শনিবার গভীর রাতে আইএস তাদের আনুষ্ঠানিক টুইট বার্তায় হোসি কোনিও হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়েটার্স। এর পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঙ্গি পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টালিজেন্ট গ্রুপ’ আইএসের দাবিটি প্রচার করেছে। এর আগে গুলশানে ইটালির নাগরিক হত্যার দায়ও আইএস স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছিল সাইট ইন্টালিজেন্ট গ্রুপ। তবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই ধরনের কোনো দাবির কথা অস্বীকার করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার আগ্রহ
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি পরপর দুই বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ হত্যাকাণ্ডগুলোর সাথে আইএস জড়িত কি-না তা নিশ্চিতের জন্য তদন্তে বাংলাদেশ সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং যৌথভাবে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আজ চট্টগ্রামে বাংলাদেশ নৌঘাঁটি ঈসা খাঁ’য় আয়োজিত কো-অপারেশন অ্যাফ্লোট রেডিনেস অ্যান্ড ট্রেইনিং (কারাত)- ২০১৫ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। নিরাপত্তা ও অন্যান্য কূটনৈতিক বিষয়ের সাথে এই বিষয়টিও আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। যে সব বিদেশি নাগরিক এ দেশে আছেন তাদের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল বাংলাদেশে না আসার সাথে এসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না।
ইইউ’র নিন্দা
ইইউ’র ঢাকা দূতাবাস এক বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশিদের নৃশংসভাবে হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনতে পারবে বলে ইইউ আস্থাশীল।

সিরিয়ায় হামলা নিয়ে পেন্টাগন-ক্রেমলিন যুদ্ধ

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় বৃহস্পতিবারও লাগাতার বিমানহানা চালাল রাশিয়া। সেইসঙ্গে সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে রাশিয়া-আমেরিকার মতপার্থক্যে ফের ঠান্ডা লড়াইয়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন কূটনীতিকেরা। আসাদ সরকারের হয়ে লড়তে সিরিয়ায় এসেছে কয়েক হাজার ইরানি সেনাও।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সমর্থনে বুধবার সিরিয়ার ময়দানে নেমেই রাশিয়া দাবি করেছিল, এক বছর ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মোকাবিলায় মার্কিন যৌথবাহিনী অভিযান চালালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে, ওবামা সরকারকে এক প্রকার কোণঠাসা করেই আমেরিকার ‘শত্রু’ আসাদের পাশে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। আর তাতেই রাতারাতি বদলাতে শুরু করেছে পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ। আজ সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যেই পারদ চড়েছে ক্রেমলিন-পেন্টাগনের মধ্যে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে আজকের হামলার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি, মন্ত্রকের টুইটার অ্যাকাউন্টে আপলোড করা হয়েছে বোমাবর্ষণের ছবি। তৈরি হয়েছে #সিরিয়াদিসনাইট নামে নতুন হ্যাশট্যাগ। সিরিয়া প্রশ্নে কোনো মতেই রণে ভঙ্গে দেবেন না বলে ইতিমধ্যেই বার্তা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
সিরিয়া-সঙ্কট প্রশ্নে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ সভার অধিবেশনে আমেরিকার নীতি এবং পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যৌথবাহিনীর প্রসঙ্গে সুর চড়িয়েছিলেন পুতিন। আইএস-কে রোখা নিয়ে একমত হলেও ওবামা-পুতিনের মতপার্থক্য প্রকট হয় আসাদের প্রশ্নে। আমেরিকা মনে করে, আসাদকে না হটালে সিরিয়ার সঙ্কটের সমাধান খোঁজা অসম্ভব। কিন্তু পুতিনের মতে, আইএসের মোকাবিলা করতে হলে আসাদকে পাশে নিয়েই চলতে হবে।
এ দিকে, রাশিয়াকে জমি ছাড়তে নারাজ আমেরিকা আজ সিরিয়ায় বিমানহানার ‘আসল উদ্দেশ্য’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাশিয়ার মূল লক্ষ্য আইএস নয়, বরং আসাদ-বিরোধী বিদ্রোহীদের উপর হামলা করতেই পুতিন সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পেন্টাগন। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের একাংশও একই অভিযোগ তুলেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব, অ্যাশটন কার্টারের কথায়, ‘‘যে এলাকায় রাশিয়া হামলা চালাচ্ছে, সেখানে আইএসের অস্তিত্বই নেই। এটাই আসল সমস্যা।’’ একদিকে আসাদকে সমর্থন, আর অন্য দিকে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই— দুটোই একসঙ্গে চলতে পারে না বলে রাশিয়াকে কটাক্ষ করে তিনি জানান, আইএস-কে ঠেকাতে হলে সিরিয়ায় রাজনৈতিক বদল প্রয়োজন। তা না করেই জঙ্গিনিধনের চেষ্টা করলে আদতে সিরিয়ার আগুনে ঘি ঢালা হবে। ওয়াশিংটনের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়ে কার্টার বলেন, ‘‘জঙ্গিনিধন এবং সিরিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বদল— এই দু’টি বিষয়কেই গুরুত্ব দেয় আমেরিকা।’’ লক্ষ্যপূরণে তাই আলাদা ভাবে নয়, বরং একসঙ্গে এগোলেই সাফল্য মিলবে বলে রাশিয়াকে বার্তাও দিয়েছেন কার্টার।
মার্কিন তোপের মুখে আজ সুর চড়াতে ছাড়েনি রাশিয়াও। আজ পুতিনের এক মুখপাত্র জানান, আইএস তো বটেই, সঙ্গে অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেও হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। ভুল তথ্য দিয়ে আমেরিকা বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলেও অভিযোগ রাশিয়ার। এ দিকে, মার্কিন যৌথবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং জঙ্গিযুদ্ধে হেরে যাওয়ার পরেই রাশিয়া মাঠে নেমেছে বলে
দাবি করেছেন ফ্রান্সে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ওরলভ। তাঁর কথায়, ‘‘সিরিয়ায় এক বছর ধরে রয়েছে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বাহিনী। হাজার পাঁচেক হামলাও চলেছে। কিন্তু আইএস বহাল তবিয়তেই রয়েছে।’’ সিরিয়া পরিস্থিতিতে পুতিনের হস্তক্ষেপ নিয়ে তার ভবিষ্যদ্বাণী, ‘‘এক বছরের মধ্যেই সিরিয়ায় স্বাধীন ভাবে নির্বাচন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাবে।’’

সরকারি আনুমতির অপেক্ষায় ঝুলে আছে বিচার

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির হত্যা মামলায় সরকারি চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি আনুমতির অপেক্ষায় বিচারিক কাজ শুরু ঝুলে আছে। রোববার এ মামলার চার্জশিট গ্রহণের শুনানির জন্য দিন ধার্য থাকলেও সরকারি মঞ্জুরি আদেশ না আসায় আবার তা পিছিয়েছে। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সিরাজ জিন্নাত পুনরায় চার্জশিট গ্রহণের শুনানির জন্য আগামী ৮ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন।   গত ১৮ আগস্টও সরকারি মঞ্জুরি আদেশ না থাকায় চা্র্জশিট গ্রহণের শুনানি হতে পারেনি। যে চার কর্মকর্তার জন্য চার্জশিট গ্রহণের শুনানি পিছাল তারা হলেন, পরিদর্শক প্রকৌশল মো. ইউসুফ আলী,  পরিদর্শক প্রকৌশল মো. শহিদুল ইসলাম, ইমারত পরিদর্শক মো. আওলাদ হোসেন, উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. জামশেদুর রহমান। হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের দুই মামলা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর গত ১ জুন রানা, রানার বাবা-মাসহ ৪২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন । গত ৮ জুলাই ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করে আদালত। কিন্তু হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত চার সরকারি কর্মকর্তার বিষয়ে মঞ্জুরি আদেশ না থাকায় পেছানো হয় মামলার চার্জশিট আমলে নেয়ার শুনানি। হত্যা মামলায় সোহেল রানাসহ ৪১ জন আসামি।  ইমারত নির্মাণ আইনে রানাসহ আসামি ১৮ জন। এ হিসাবে দুই মামলার আসামি ৫৯ জন। কিন্তু তাদের মধ্যে ১৭ জনের নাম উভয় মামলার চার্জশিটে থাকায় ব্যক্তি হিসেবে আসামি ৪২ জন। দুই মামলায় মোট সাক্ষী ৭৫০ জন। আসামির তালিকায় রয়েছেন ১২ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাভার পৌরসভার মেয়র, রানার অনুগত বাহিনীর সদস্য এবং তাকে পালাতে সহায়তাকারীরা। মামলা দুটির আসামিদের মধ্যে রানাসহ চারজন ছাড়া সব আসামি জামিন নিয়ে জেলহাজতের বাইরে রয়েছেন। মামলায় ২৬ জন আসামি পলাতক। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ভবন ধসে ১ হাজার ১১৭ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যায়।  সে হিসাবে নিহত হয় ১ হাজার ১৩৬ জন। অন্যদিকে আহত হয় ১ হাজার ১৭০ জন। আসামিরা হলেন, ভবন মালিক সোহেল রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, সাভার পৌর মেয়র আলহাজ রেফাত উল্লাহ, কাউন্সিলর মোহাম্মাদ আলী খান, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, নিউওয়েব বাটন লিমিেিটডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইতার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম, সাইট ইঞ্জিানয়ার মো, সারোয়ার কামাল, আবু বক্কর সিদ্দিক, মো. মধু, অনিল দাস, মো. শাহ আলম ওরফে মিঠু, মো. আবুল হাসান, সাভার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কমকর্তা উত্তম কুমার রায়, সোহেল রানার মা মর্জিনা বেগম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সাবেক উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. আব্দুস সামাদ, উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. জামশেদুর রহমান, উপ-প্রধান পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, পরিদর্শক প্রকৌশল মো. ইউসুফ আলী,  পরিদর্শক প্রকৌশল মো. শহিদুল ইসলাম, ইমারত পরিদর্শক মো. আওলাদ হোসেন, ইতার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, মো. শফিকুল ইসলাম ভূইয়া, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, মো. আতাউর রহমান, মো. আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ মিয়া, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম জনি, রেজাউল ইসলাম, নান্টু কন্টাকটার, মো. আব্দুল হামিদ, আব্দুল মজিদ, মো. আমিনুল ইসলাম, নয়ন মিয়া, মো. ইউসুফ আলী, তসলিম ও মাহবুল আলম। উক্ত আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা, আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, মর্জিনা বেগম, রেফাত উল্লাহ, মোহাম্মাদ আলী খান, রফিকুল ইসলাম, রাকিবুল হাসান রাসেল, বজলুস সামাদ আদনান, মাহমুদুর রহমান তাপস, আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম, মো, সারোয়ার কামাল, উত্তম কুমার রায়, মাহবুবুর রহমান, ফারজানা ইসলাম, রেজাউল ইসলাম ও নান্টু কন্টাকটার উভয় মামলার আসামি। আসামিদের মধ্যে প্রথম ১৬  গ্রেপ্তার হয়েছিলে। পরে এদের মধ্যে আবদুল খালেক, রেফাতউল্লাহ, অনিল দাস, শাহ আলম ও আবুল হাসান, মোহাম্মদ আলী খান ও রাকিবুল হাসান জামিন পান। অপর ২৬ জন পলাতক।

আইএস সন্দেহে আটক ৩ জন রিমান্ডে

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা থেকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পক্ষে প্রচারপত্র (লিফলেট) সাঁটানোর সময় আটক স্কুলছাত্র মোহাম্মদ ফাহিম আল ফয়সাল ইবনে মূসা বিন জুলকার নাইনসহ তিনজনের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। আজ রোববার দুপুরে ময়মনসিংহ বিচারিক আদালতের হাকিম ছাব্বির ইয়াসির আহসান চৌধুরী এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অন্য দুজন হলেন, মিজানুর রহমান ও বদিউল হাসান। গত শুক্র ও শনিবার আইএস জঙ্গিদের পক্ষে প্রচারপত্র বিলি করায় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা থেকে পুলিশ মোট ৯ জনকে আটক করে। আদালত ও ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র বলছে, আটক ৯ জনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা করে। আজ তাঁদের আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করলে বিচারক ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শুক্রবার বিকেলে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সোহাগী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দেয়ালে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ডাক’ শিরোনামে প্রচারপত্র সাঁটানোর সময় ফাহিম আল ফয়সাল ইবনে মূসা বিন জুলকার নাইনকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আটক করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন শনিবার আরও ৮ জনকে আটক করা হয়। পরে সবাইকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জুলকার নাইন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা আঠারোবাড়ি এমসি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমারত হোসেন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনজনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। বাকিদের জেলা গোয়েন্দা কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ

চৌগাছা উপজেলায় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল নেতাদের নেতৃত্বে এক স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোববার দুপুরে উপজেলা সদরের একটি স্কুলের মাঠ থেকে ওই স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল গিয়ে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে এবং ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের তিন নেতাকর্মীকে আটক করে। আটক নেতা-কর্মীরা হলেন চৌগাছা পৌর ছাত্রলীগের সহসাধারণ সম্পাদক পারভেজ সানি, ছাত্রলীগ কর্মী শিমুল ও পৌর ছাত্রদলের সাত নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি উজ্জ্বল। পারভেজ সানির বাবা চৌগাছা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চৌগাছা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরীফ হোসেন জানান, এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। স্কুলছাত্রীর বাবা হাসপাতালে চিকিৎসার কাজে ব্যস্ত থাকায় এখনো মামলা হয়নি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে। ঘটনার খবর পেয়ে জেলা সহকারী পুলিশ সুপার ভাস্কর সাহা হাসপাতালে স্কুলছাত্রীকে দেখতে যান। স্থানীয় লোকজনের বরাত দিয়ে এসআই শরীফ জানান, দুপুরে ওই স্কুলছাত্রী তার এক বন্ধুর সঙ্গে চৌগাছা বাজারের একটি স্কুলের মাঠে বসে গল্প করছিল। এ সময় ছাত্রলীগ নেতা পারভেজ সানি ও ছাত্রদল নেতা উজ্জ্বল তাদের জোর করে তুলে পাশের ডাকবাংলোপাড়ার মাদক ব্যবসায়ী আলামিনের ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে তারা ছেলেটিকে মারধর করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে তাড়িয়ে দেন। পরে পারভেজ সানি, উজ্জ্বল, শিমুল, আলামিনসহ বেশ কয়েকজন কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। একপর্যায়ে কিশোরীটির চিৎকারে এলাকাবাসী ঘটনাটি টের পেয়ে চৌগাছা থানায় খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে পারভেজ সানি, উজ্জ্বল ও শিমুলকে আটক করে। এ সময় অন্যরা পালিয়ে যায়। পুলিশ স্কুলছাত্রীকে উদ্ধার করে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক কাজল মল্লিক ‘রেপ ভিকটিম’ হিসেবে নথিভুক্ত করে কিশোরীকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সোমবার কিশোরীটির ডাক্তারি পরীক্ষা করা হবে বলে চিকিৎসক জানান।

সরকার, দল ও জোটে অস্বস্তি

ইতালির নাগরিকের পর এবার দুর্বৃত্তদের গুলিতে
নিহত হলেন জাপানের এক নাগরিক হোসি কোনিও
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন দল ও জোট যখন সংবর্ধনার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখন রংপুরে জাপানি নাগরিককে হত্যার ঘটনায় অবাক হয়েছেন নেতা-কর্মীরা। সরকার, সরকারের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলে এ ঘটনায় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনা যে পরিকল্পিত তা নিয়ে সংশয় না থাকলেও এর নেপথ্য কারণ নিয়ে নানামুখী জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে। বিশেষ করে দুই যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসির সময় কাছে আসায় দেশ অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে সরকারের একটি বড় অংশের মত।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকায় ইতালীয় নাগরিককে হত্যার চার দিন পর রংপুরে একই কায়দায় জাপানি নাগরিক হত্যার ঘটনায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয়টি নিয়ে সরকারের ভেতর দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি।
দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও বিশিষ্ট নাগরিককে বলেছেন, তাঁর সঙ্গে যে কজন বিশ্বনেতার বৈঠক হয়েছে, তাঁরা দেশের শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন। এই সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে তিনি যখন সর্বশক্তি নিয়োগ করছেন, তখন এ ধরনের চক্রান্তে তা নস্যাৎ হতে দেওয়া হবে না।
একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এ সময় বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও শান্ত। ঠিক এ সময় দুজন বিদেশিকে হত্যা করা হয়েছে সরকারকে বিব্রত করার জন্য। এটা সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং গভীর ষড়যন্ত্র।
বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ১৪ দলের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের না আসা, দুই বিদেশিকে হত্যা ও বিভিন্ন দেশের ভ্রমণবিষয়ক সতর্কবার্তা জারির পর যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো, বাংলাদেশ কি এতই অনিরাপদ যে মানুষ এখানে আসতে পারবে না? হয়তো এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে আমাদের সবার সামনে।’
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন আরও বলেন, ‘ইতালীয় ও জাপানি নাগরিকের হত্যার পর ঘটনা দুটোকে যুক্ত করে দেখলে বোঝা যায়, আবার দুটি ফাঁসির রায় হবে এবং আরও কিছু ঘটনাবলি হয়তো আমাদের সামনে রয়েছে।’
সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একাধিক শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতা একবাক্যে বলছেন, দুটি ঘটনাই পূর্বপরিকল্পিত। কিন্তু উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর বাতিল করায় ক্রিকেটে যে ধারাবাহিক ও ঈর্ষণীয় অর্জন তা ম্লান করার অপচেষ্টা লক্ষ করছেন তাঁরা। তবে দুই বিদেশিকে হত্যার পর সরকারদলীয় নেতাদের ধারণা, এটি শুধুই আর ক্রিকেট রাজনীতি নয়, এর সঙ্গে আরও বড় চক্রান্ত জড়িত।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি নাগরিক হত্যা করার বিষয়টি দেশের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এসব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে সরকারের সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল শনিবার ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তবে গণভবনে পৌঁছানোর পর বিশিষ্ট নাগরিক, দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কিছু কথা বলেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার নিশ্চয়তা দেন। এ বিষয়ে সৈয়দ শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ড কারা ঘটাচ্ছে, তা গোয়েন্দারা খুঁজে বের করবে এবং তাদের সেই দক্ষতা আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মন্ত্রী জানান, আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তিসহ সফর নিয়ে কথা বললেও দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির বিষয়টিও উঠে আসে। একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এ সময় বলেন, সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্য বিদেশিদের নিশানা করা হয়েছে। বিশেষ করে দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির ক্ষণ ঘনিয়ে আসায় ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেন, বিদেশিদের নিশানা করা হয়েছে দেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারের জন্য। কারণ বিদেশিদের হত্যা করা হলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তা বড় খবর।
আরেকজন মন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল বাংলাদেশে আসা নিয়ে কিছু বিদেশি দূতাবাস বক্তব্য দেওয়ার পর থেকেই দুটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। বিদেশি দূতাবাসগুলোর উদ্বেগ প্রকাশ করার পর ষড়যন্ত্রকারীরা আরও সক্রিয় হয়েছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকার সতর্ক রয়েছে বলে জানান। আলোচনার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশ সফরের অর্জন ও প্রাপ্তি ছাড়াও দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডসহ দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলবেন বলে ধারণা করা যায়। তিনি বলেন, সরকার মনে করছে, এটা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়, উদ্দেশ্যমূলক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
সরকারদলীয় নেতারা বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন উপলক্ষে এবং ওই নির্বাচনের এক বছর পূর্তিতে বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে যে অস্থিরতা ও সহিংসতা ঘটিয়েছিল, সেই শক্তি দল দুটির নেই। ফলে সরকার অনেকটা নির্বিঘ্নে দেশ চালাচ্ছিল। এরই মধ্যে বিদেশি নাগরিক হত্যার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি চক্র নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘৫ জানুয়ারির পর আমরা আশা করেছিলাম একটা সময়কাল আমরা অতিক্রম করেছি। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে প্রক্রিয়া সেটাও অনেকখানি সম্পন্ন হয়েছে নির্বিঘ্নভাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবার সেই অস্থিরতার অধ্যায় ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা লক্ষণীয়।’
এদিকে লন্ডন থেকে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরে নামার পর সেখানে স্থানীয় তিন সাংসদসহ জেলা ও মহানগরের আট নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া দুজন নেতা প্রথম আলোকে জানান, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য কুচক্রীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী নেতাদের সজাগ ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

বেনজিরকে পাকিস্তানে ফিরতে বারণ করেছিলেন মোশাররফ

পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে দেশে আসতে সতর্ক করেছিলেন দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। বেনজির ভুট্টো হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সাক্ষী মার্কিন সাংবাদিক মার্ক সিজেল এ তথ্য জানিয়েছেন। শনিবার এ খবর প্রকাশ করেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। সমাবেশের তিন সপ্তাহ আগেই মোশাররফ বেনজিরকে সতর্ক করেছিলেন। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির সন্ত্রাসবিরোধী আদালতে রেকর্ড করা ভিডিওতে এই তথ্য জানান। মার্ক সিজেল জানান, ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে মার্কিন সিনেটর টম ল্যানটোসের অফিসে একটি ফোন কল রিসিভ করেন বেনজির ভুট্টো। ১৫ মিনিটের ওই কলটি ছিল প্রেসিডেন্ট মোশাররফের। তাতে মোশাররফ বেনজিরকে পাকিস্তানে ফিরতে বারণ করেন। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের পাকিস্তান দূতাবাসে স্থানীয় সময় রাত ৮টায় তার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়। এ সময় তিনি বেনজিরের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। কারণ ১৯৮৪ সাল থেকে বেনজিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন মার্ক সিজেল। বেনজির ওই কলটিকে খুব খারাপ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
তিনি হতাশও হয়েছিলেন। মোবাইলের স্ক্রিনে মোশাররফের নামটিও তিনি দেখিয়েছিলেন। মোশাররফ বলেছিলেন, পাকিস্ত?ানে তার জীবন শংকার মধ্যে আছে। দেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালন করাটা তার নিজের দায়িত্বেই করতে হবে। মোশাররফ এও বলেছিলেন, আপনার নিরাপত্তা নির্ভর করে আমাদের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর। সিজেল বলেন, মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও (২৩ অক্টোবর, ২০০৭) আমার কাছে একটি ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন বেনজির। সেই ই-মেইলে তার নিরাপত্তা ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছিলেন বেনজির। ওই ই-মেইলেই বেনজির লিখেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য মোশাররফই দায়ী থাকবে। সাবেক আইএসআই প্রধান হামিদ গুল, ইন্টিলিজেন্স ব্যুরোর সাবেক প্রধান ইজাজ শাহ এবং পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পারভেজ ইলাহীর নামও উল্লেখ করেছিলেন বেনজির। সিজেল আরও বলেন, মোশাররফের আজ্ঞাবহ সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কয়েকজন অফিসার বেনজিরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে জানিয়ে একটা চিঠিও লিখেছিলেন মোশাররফকে। প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিতে এক নির্বাচনী প্রচারণায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন বেনজির। সেই থেকেই বেনজির হত্যাকাণ্ড মামলাটি বিচারাধীন। ৫ অক্টোবর মামলাটির আরেকটি শুনানি শুরু হবে।

লাশবাহী প্রথম বিমান ইরানে পৌঁছেছে

সৌদি আরবের মক্কার মিনায় শয়তানকে পাথর মারতে যাওয়ার পথে পদদলনে নিহত হওয়ার নয় দিন পর শনিবার লাশবাহী একটি বিমান ইরানের রাজধানী তেহরান পৌঁছেছে। দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনার মধ্যেই প্রথম দফায় ১০৪টি লাশ ইরানে এসে পৌঁছল। এদিন লাশ গ্রহণ করতে বিমানবন্দরে যান ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিসহ দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মৃতদেহ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হাসান রুহানি বলেন, মিনা ট্রাজেডি সবার জন্য একটি বড় পরীক্ষা ছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ খবর নিশ্চিত করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, মিনায় পদদলনে ৭৬৯ জন হাজীর মৃত্যু হয়েছে। তবে ইরানের দাবি এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। মক্কার একটি হাসপাতাল সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে,
মৃতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই হাজারের ওপরে ছাড়িয়ে যাবে। ইরানের দাবি, তাদের দেশের ৪৬৪ জন হাজী ওই ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তেহরান অভিযোগ করে আসছে, সৌদি সরকারের হজ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণেই ইতিহাসের অন্যতম এই বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছে। সৌদি রাজপরিবার এর দায় এড়াতে পারে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এ ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ ঘোষণা দিয়েছে মিনায় মৃতের সংখ্যা ৭৬৯ জন। তবে অধিকাংশ মুসলিম দেশ তাদের নিখোঁজ নাগরিকদের হিসাব করে জানিয়েছে নিহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ২৪ দেশ তাদের নিখোঁজ নাগরিকদের পরিসংখ্যান থেকে জানিয়েছে, সেখানে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ৩৬ জন। তবে ইরান বলেছে এ সংখ্যা দুই থেকে চার হাজারের মতো। আল জাজিরা।

দাঁত ভেঙে চোখ উপড়ে ফেলা হয়

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের কারাগারের নামে টর্চার সেলের বর্বর নির্যাতন নিয়ে নতুন একটি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। বইটিতে প্রকাশিত ৪৫ হাজার ছবিতে ফুটে উঠেছে কারাবন্দি আসাদবিরোধীদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র। শুক্রবার ব্রিটিশ দৈনিক ডেইলি মেইল এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে অমানবিক খুনি স্বৈরশাসক আসাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছে। একই সঙ্গে বর্বর আসাদকে সমর্থনের জন্য রাশিয়ার সমালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সিজার নামে সিরিয়ার একজন সামরিক ফটোগ্রাফার গোপনে ওই চিত্রগুলো ধারণ করেন। সেনাবাহিনীর ফরেনসিক বিভাগের সহকারী হিসেবে তিনি আসাদের পক্ষে কাজ করতেন।
ছবিগুলো নিয়ে একটি বই লিখেছেন ফরাসি লেখক গারান্স লি কাইসনি। অপারেশন সিজার নামের ওই বইয়ে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, কারাবন্দি আসাদবিরোধীদের নির্যাতন করে চোখ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। কারও দাঁত ভেঙে দেয়া হচ্ছে। চা গরম করার মতো স্টোভে বসিয়ে শরীর ঝলসে দেয়া হচ্ছে অনেক বন্দির। আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল, তারাই সবচেয়ে বেশি প্রতিহিংসার শিকার। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিনি ওই ফটোগুলো তুলেছিলেন। নির্মম নির্যাতনের এ সত্য খবর পৃথিবীকে জানাতে জীবনের ঝুঁকি নেন সিজার। গোপনে সেই ছবিগুলো সিরিয়ার বাইরে পাঠিয়ে দেন। সিজার বলেন, এমন কিছু (নির্যাতন) আমি কোনোদিন দেখিনি। এখন আমি আমার জীবন নিয়ে শংকিত।

সিরিয়ার চোরাবালিতে পড়েছে রাশিয়া

সিরিয়ায় বিমান হামলার মাধ্যমে রাশিয়া চোরাবালিতে পতিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদবিরোধীদের ওপর রুশ হামলার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন এই চোরাবালি থেকে বের হতে পারবে না। এর মাধ্যমে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) আরও শক্তিশালী হচ্ছে। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ওবামা। তবে সিরিয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ছায়াযুদ্ধ করবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। খবর এএফপি ও রয়টার্সের। প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনের সঙ্গে গত ক’দিন আগে বৈঠকের সময় তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইসলামিক স্টেট এবং ‘মডারেট অপজিশন’ বা যারা উগ্রপন্থী নয় এ রকম বিরোধীদের মধ্যে পার্থক্যটা পুতিন আলাদা করতে পারেন না। তিনি আরও দাবি করেছেন, তিনি মস্কোর সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু, রাশিয়া এখন যেসব লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা করছে তার যদি কোনো পরিবর্তন না করে তাহলে ব্যাপারটা রাশিয়ার জন্য খুব একটা ভালো হবে না বলেও সতর্কতা দিয়েছেন তিনি।
আমেরিকা চাইছে, রুশ বাহিনী যেন শুধু ইসলামিক স্টেট-এর উপরে আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাদের অভিযোগ এটি না করে রাশিয়া ইসলামিক স্টেটসহ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বিরোধী, অন্য আরও যত গোষ্ঠী আছে তাদের সবার ওপরই হামলা চালাচ্ছে। ওবামা আরও বলেন, পুতিনের সঙ্গে মতবিরোধ ও উত্তেজনা বাড়লেও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ছায়াযুদ্ধে জড়াবে না। রুশ হামলার মাত্র ৫ শতাংশ আইএসের বিরুদ্ধে- ব্রিটেন : সিরিয়ায় রাশিয়ার প্রতি ২০টি বিমান হামলার মাত্র একটি করা হচ্ছে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) লক্ষ্য করে, এমন অভিযোগ ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল ফ্যালনের। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বরাত দিয়ে ডেইলি সান জানায়, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণে জানা গেছে সিরিয়ায় রুশ হামলায় কেবল পাঁচ শতাংশ আইএসকে লক্ষ্য করে হচ্ছে। হামলায় বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ফ্রি সিরিয়ান বাহিনীর সদস্যরা নিহত হচ্ছে। তিনি বলেন, রাশিয়ার হস্তক্ষেপ সংকটকে আরও ‘জটিল’ করেছে। প্রত্যেক সকালে যেখানেই বোমা হামলা করা হচ্ছে তা আমরা খতিয়ে দেখছি। বেশিরভাগ হামলা আইএসকে লক্ষ্য করে হচ্ছে না। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তারা বেসামরিক এলাকায় বোমা ফেলছে এবং বেসামরিক নাগরিক হত্যা করছে। এছাড়া তারা আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ফ্রি সিরিয়ান বাহিনীর ওপর বোমা ফেলছে। তারা আসাদের হাতকে শক্তিশালী এবং দুর্দশাকে স্থায়ী করছে। শুক্রবার রাশিয়া তৃতীয় দিনের মতো সিরিয়ায় হামলা চালায়। রাশিয়া বলেছে, আইএসকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। তবে পুতিন তার সামরিক অভিযানের ব্যাপারে কড়া আন্তর্জাতিক সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন।
রুশ হামলা আরও জোরদার সিরিয়ায় বিমান হামলা শনিবার আরও জোরদার করেছে রাশিয়া। তবে বেসামরিক অবস্থানে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে বলে করা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি নাকচ করে দিয়েছে মস্কো। সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া আইএসবিরোধী বিমান হামলা সফল হবে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-মুয়ালেম। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মুখপাত্র ইগোর কোনাসেঙ্কোভ বলেন, আমি আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই- বেসামরিক স্থাপনা বা আবাসিক ভবনে কোনো ধরনের বিমান হামলা চালানো হয়নি। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার্থে অনেক যাচাই-বাছাই ও বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করার পর হামলায় যাচ্ছে রুশ বিমান। এমন বক্তব্যের পাশাপাশি শুক্রবার রাত থেকে তৃতীয় দিনের মতো সিরিয়ার মারাত আল-নুমান এবং রাক্কায় রুশ বিমান থেকে চালানো হামলার ছবি প্রকাশ করে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এদিকে, প্রথমবারের মতো সিরিয়ার লাতাকিয়া বিমান ঘাঁটির ছবি প্রকাশ করেছে একটি রুশ গণমাধ্যম। রুশ গণমাধ্যম আরটি প্রকাশিত ভিডিও সংবলিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আইএস দমনে সিরিয়ার লাতাকিয়া বিমান ঘাঁটি থেকে বিমান হামলা চালাচ্ছে বাহিনী। প্রতিবেদনে বলা হয়, লাতাকিয়ার বিমান ঘাঁটি থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে আইএস অবস্থান থাকায় উড্ডয়ন ও অবতরণে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে রাশিয়ার এসইউ-থার্টিফোর যুদ্ধবিমানগুলো। বিমান ঘাঁটি ঘিরেও নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা। ড্রোনের সাহায্যে আইএস অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরই হামলা চালানো হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তোলপাড়: জাপান ও কোরিয়ার সতর্ক বার্তা, দ্রুত বিচার চায় যুক্তরাষ্ট্র

এক সপ্তাহেরও কম সময়ে বাংলাদেশে দ্বিতীয় এক বিদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি (৬৫)। গতকাল সকালে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মাহিগঞ্জ গ্রামে তাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে গত সোমবার ঢাকায় কূটনৈতিক এলাকায় হত্যা করা হয় ইতালির এনজিওকর্মী সিজার তাভেলাকে। তাভেলা হত্যায় জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করলেও বাংলাদেশ সরকার মনে করছে এটা ‘একটি বিচ্ছিন্ন’  ঘটনা। এ হত্যার কোন কূল-কিনারা হওয়ার আগেই গতকাল খুন হলেন কুনিও হোশি। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া সরব হয়ে উঠেছে। সব মিডিয়াতেই এ খবরকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি সহিংসতা নিয়ে উচ্চ সতর্কতা বিরাজ করছে বাংলাদেশে। এ দেশটিতে রয়েছে স্পর্শকাতর আকাশপথ, স্থলপথ ও নৌপথ। এসব পথে সন্ত্রাসীরা এ দেশটিকে ট্রানজিট পয়েন্ট বানাতে পারে। এ দেশটি উদার ইসলামিক রীতি চর্চা করে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ কঠোরভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। এ বছরে টার্গেট করে হত্যার ঘটনা একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে হত্যা করা হয়েছে চার ব্লগারকে। ভারত উপমহাদেশে বেশকিছু হত্যার দায় স্বীকার করেছে আল কায়েদা নেতারা। বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। তারা বলেছে, বিদেশীদেরকে টার্গেট করা হতে পারে। এমনই আশঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ ঝুঁকিতে। গত সোমবার নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করেছে বৃটিশ সরকার। পশ্চিমারা সমবেত হন এমন অনুষ্ঠানে বৃটিশ কর্মকর্তাদের সীমিত উপস্থিতির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অনলাইন জাপান টাইমসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পুলিশ বলেছে- বাংলাদেশের উত্তরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে হোশিকে। স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ১০টার দিকে তিনি রিকশায় ছিলেন। তিনি ঘাসের চাষ করেন। সেখানে যাচ্ছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে চেপে তিন দুর্বৃত্ত তাকে ঘিরে ধরে খুব কাছ থেকে গুলি করে। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু তার আগেই তিনি মারা যান। স্থানীয় থানার ওসি রেজাউল করিম বলেছেন, হোশিকে বুকে, হাতে ও পায়ে গুলি করা হয়েছে। তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে রংপুুর মেডিক্যাল কলেজ মর্গে। তবে কি কারণে তাকে হত্যা করা হতে পারে এ বিষয়ে পুলিশ কোন মন্তব্য করে নি। তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে ঢাকায় জাপান দূতাবাসের এক কর্মকর্তার মন্তব্য চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, কুনিও হোশি জাপানি নাগরিক হলেও জন্মেছেন বাংলাদেশে। তিনি সহায়তাবিষয়ক ও কৃষি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর এক সপ্তাহেরও কম সময়ে গত সোমবার তিন দুর্বৃত্ত হত্যা করে ইতালির এনজিওকর্মী সিজার তাভেলাকে। এ হত্যার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। তবে সরকার বলছে এটা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এরপর থেকেই নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অস্থায়ীভিত্তিতে বন্ধ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের স্কুলগুলো। পশ্চিমা দূতাবাসগুলো তাদের কূটনীতিকদের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছে। বাংলাদেশ প্রধানত মুসলিম প্রধান দেশ। কিন্তু এ বছরে কয়েকজন ব্লগারকে হত্যায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে কট্টর ইসলামপন্থি গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন শুরু হয়েছে। ওদিকে অনলাইন আউটলুক ইন্ডিয়া লিখেছে, মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা গতকাল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে হত্যা করেছে জাপানের এক নাগরিককে। পুলিশ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেছেন, দুর্বৃত্তরা যখন হোশিকে গুলি করে তখন তারা ছিল মুখোশধারী। হত্যার পরেই তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এতে মনে হচ্ছে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। জাপানের এই নাগরিক গত ৬ মাস রংপুরে অবস্থান করছিলেন। ঘটনার সময় তিনি শহরের বাইরে একটি কৃষি খামারে যাচ্ছিলেন রিকশায় করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা এমনটাই বলেছেন। তাদের একজনের ভাষ্য- কুনিও হোশি একাই ছিলেন রিকশায়। আক্রমণকারীরা ছিল মুখোশ পরা। হোশি ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্র তারা তার বুকে, কাঁধে ও হাতে গুলি করে। এরপর একটি মোটরসাইকেলে চড়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। কুনিও হোশি স্থানীয় লোকজনের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কারণ তিনি সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে মিলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি ফার্ম। ওই ব্যবসায়ীকে, কুনিও হোসিকে বহনকারী রিকশার চালক, ভূমির মালিক ও স্থানীয় অন্য এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ঘাতকদের ধরতে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। এর আগে তাভেলা হত্যার দায় আইএস স্বীকার করলেও বাংলাদেশ সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ওই ঘটনা ঘটাতে আইএস স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সমমনাদের ব্যবহার করতে পারে- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেন নি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। ওদিকে নিক্কি এশিয়ান রিভিউও প্রায় একই রকম রিপোর্ট দিয়েছে। তারা জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যার রিপোর্ট দিতে গিয়ে টেনে এনেছে তাভেলা হত্যার প্রসঙ্গ। বলা হয়েছে, ইতালীয় নাগরিক তাভেলাকে হত্যার কয়েক দিনের মধ্যেই হত্যা করা হলো হোশিকে। পুলিশ বলছে, তারা বিশ্বাস করে যে, সিজার তাভেলাকে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস হত্যা করেছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন সহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশে চলাচলের ব্যাপারে সতর্কতা দিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে রংপুরের উপ-পুলিশ প্রধান সাইফুর রহমান বলেছেন, গতকাল কাউনিয়া শহরের বাইরে একজন জাপানিকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি রিকশায় করে তখন কোথাও যাচ্ছিলেন। তিন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে করে এসে তাকে থামিয়ে দেয় এবং গুলি করে। তারপর পালিয়ে যায়। তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। তাকে গুলি করা হয়েছে খুব কাছ থেকে।  তিনি বলেন, ঘাতকদের দুজন তার বুকে দুটি গুলি করে। অন্যজন মোটরসাইকেলেই অপেক্ষায় ছিল। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসের শিরোনাম- ‘ইতালিয়ান এনজিও কর্মীকে আইসিস হত্যার কয়েক দিন পরেই বাংলাদেশে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এক জাপানিকে’। এ ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকা থেকে ২১০ মাইল উত্তরের জেলা রংপুরে। তবে কি কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। বার্তা সংস্থা সিনহুয়া, অনলাইন এমিরেটস, জাপান টুডে একই রকম রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন আগেই
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্কতা দিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, সরকার যদি সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন নিশ্চিত করতে না পারে তাহলে জঙ্গি তৎপরতা বাড়তে পারে। নিরাপত্তার জন্য তা হুমকি হয়ে দেখা দেবে। এ খবর দিয়েছে বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক শাফকাত মুনির বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কোন পশ্চিমা নাগরিককে হত্যা বা টার্গেট করা হয়নি। সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটেছিল ২০০৪ সালে। তখন বাংলাদেশে বৃটিশ হাইকমিশনার ছিলেন আনোয়ার চৌধুরী। তার ওপর সিলেটে হামলা চালিয়েছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী। তারপর থেকেই জঙ্গি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে আইএস ও আল কায়েদাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে বেশ কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শাফকাত মুনির বলেন, বাংলাদেশে যেসব গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চালাচ্ছে তারা সব সময়ই সক্রিয় ছিল এবং এখনও আছে। এর কারণ, বিশ্বজুড়ে জঙ্গি সহিংতার উত্থান। তারাও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করেছে। আগস্টে দেশের আধা সামরিক বাহিনী আইএসের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে এক বৃটিশসহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করে। শাফকাত মুনির বলেন, উচ্চ নিরাপত্তামূলক সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও এসব গ্রুপ হামলা চালাতে সক্ষম। এটা চরম উদ্বেগের বিষয়। সিজার তাভেলাকে হত্যার পর সতর্কতা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমার মনে হয় সতর্কতা উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। আমার ভয় হলো- এই ধারা থামবে না। এটা চলতেই থাকবে এবং তা বৃদ্ধিও পেতে পারে।
জাপান ও কোরিয়ার সতর্ক বার্তা
ঢাকায় ইতালি নাগরিককে গুলি করে হত্যার ৫ দিনের মাথায় রংপুরে জাপানি নাগরিক খুনের ঘটনায় ফের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বিদেশীদের মধ্যে। নতুন করে সতর্ক বার্তা জারি করেছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। নিজ দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে জাপান। ঢাকাস্থ দেশটির দূতাবাসের ফেসবুক পেজে ‘সতর্ক বার্তা’ ইস্যু করা হয়। সেখানে নাগরিকদের ‘অপ্রয়োজনীয়’ সফর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। চলাচলের সময় গাড়ির দরজা বন্ধ রাখাসহ অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। একই  সঙ্গে যে কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখলে দূতাবাসে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। ঢাকাস্থ দক্ষিণ কোরিয়ান দূতাবাসও নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্কতা অবলম্বন করার বার্তা দিয়েছে। দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে বলা হয়, ‘স্থানীয় গণমাধ্যম রিপোর্ট অনুযায়ী ৩রা অক্টোবর (শনিবার) সকালে রংপুরের কাউনিয়া এলাকায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা একজন জাপানি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে।’ এমতাবস্থায় সতর্কতা অবলম্বন এবং সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা সব স্থানে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে ওই বার্তায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব ও পশ্চিমা যেসব দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছিল। এর মধ্যে ইতালি ছাড়া বাকিদের নোটিশ এখনও বলবৎ রেখেছে।
ওদিকে দেশীয় বার্তা সংস্থা ইউএনবিও ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাসের মুখপাত্র তাকেশি মাতসুনাগাকে উদ্ধৃত করে জানায়  তাদের একজন নাগরিক হত্যার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মাধ্যমে অবহিত হয়েছে দূতাবাস। ওই বার্তা সংস্থার জিজ্ঞাসার জবাবে মুখপাত্র বলেন, আমরা জানি হত্যাকাণ্ডটির বিষয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো বর্তমানে তদন্তে নিয়োজিত রয়েছে। দ্য জাপান টাইমস-এর অনলাইন সংস্করণে ‘জাপানিজ ম্যান শট ডেড ইন বাংলাদেশ; ইসলামিক স্টেট লিঙ্ক প্রোভড’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি কয়েকটি সংবাদ সংস্থার বরাতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকা থেকে ৩৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে রংপুরের কাউনিয়া ভ্রমণে গিয়ে কুনিও হোশি অজ্ঞাত খুনিদের হামলার শিকার হন। হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তার বুক, পা এবং হাতে গুলি করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম। হত্যার মোটিভ নিয়ে পুলিশ কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা বলছেন, তদন্ত চলছে।
সব দিক তদন্ত ও দ্রুত বিচার চায় যুক্তরাষ্ট্র
 রংপুরে জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে গুলি করে হত্যার সব দিক তদন্ত এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট এ আহ্বান জানান। মানবজমিনে পাঠানো ই-মেইল বার্তায় দূতাবাস এ তথ্য জানিয়েছে। বিবৃতিতে বার্নিকাট বলেন, রংপুরে জাপানের নাগরিক কুনিও হোসির মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। আমি তার পরিবার, বন্ধু ও জাপানের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমি এ অপরাধের প্রতিটি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের যত দ্রুত সম্ভব বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

বিধ্বংসী ইসরাইলি ড্রোন কিনতে তাড়াহুড়া করছে ভারত

ভারত যে নয়া দশটি সশস্ত্র ইসরাইলি হেরন টিপি ইউসিএভি কিনছে, সে খবর গত মাসেই প্রকাশিত হয়েছিল। ভারত সরকার প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কেনা এই ‘হেরন’ তুলে দেবে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে।
কিন্তু গতকাল ‘ডিপ্লোম্যাট’ জানিয়েছে, সেই চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চাইছে ভারত। দশটি ইসরাইলি হেরন বিমান বাহিনীতে দ্রুত অন্তর্ভূক্তি করতে চাইছে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু কেন ড্রোনগুলি কেনা তড়িঘড়ি সেরে ফেলতে চাইছে ভারত?
চীন ও পাকিস্তানকে মোকাবিলা করা। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, এ দিক থেকে চীন ও পাকিস্তান বেশ এগিয়ে গেছে। দেশে জঙ্গি-দমনে সেই ড্রোন ব্যবহারও করছে পাকিকস্তান সরকার। যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানি প্রযুক্তি ফাঁকা বুলি ব্যতীত কিছুই নয়। কার্যত ড্রোনগুলি তৈরি করে পাকিস্তানকে হস্তান্তরিত করছে চীন। আর ভারত অভিযোগ করে আসছে, চীন অরুণাচল সীমান্তে ক্রমশ অশান্তির বাতাবরণ তৈরি করছে। তাই চীন ও পাকিস্তানি সেনাকে একযোগে রুখে দিতে ইসরাইলি ড্রোনগুলিকে কাজে লাগাতে চাইছে ভারত সরকার।
ইসরাইলের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে দশটি সর্বাধুনিক ড্রোন-‘হেরন টিপি’। সবকটিতেই অস্ত্র ভরা যাবে। সবকটিই হবে দূর পাল্লার। সর্বাধুনিক ড্রোন বিমানবাহিনীর হাতে এলে অনেক সহজে অন্য দেশের ‘টার্গেট’গুলোর উপর আঘাত হানা যাবে। যুদ্ধাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বা কোনো সংঘর্ষে শুধু তিনটি দেশ- আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইসরাইল সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহার করেছে। এরপর ভারত সেই তালিকায় নবতম সংযোজন হতে চলেছে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাখছে আন্তর্জাতিক দুনিয়া।
অক্টোবর–নভেম্বর নাগাদ রাজস্থানে বড় মাপের সেনা সমাবেশ করবে নয়াদিল্লি। ৩০ হাজার সেনা, টি–৯০ এস এবং টি–৭২ ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র, কৃত্রিম উপগ্রহের সংযোগ সমন্বিত অস্ত্র, ড্রোন এই মহড়ায় অংশ নেবে।

যুদ্ধের জন্য নতুন টর্পেডো ওয়াটারক্র্যাফ্ট বানিয়েছে ইরান

সমুদ্রভিত্তিক লড়াইয়ের জন্য নতুন ধরনের ‌যুদ্ধযান তৈরি করেছে ইরান। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি টর্পেডো সজ্জিত এ ওয়াটারক্র্যাফ্ট সমুদ্রের পানির ওপর ও নিচেই একইভাবে চলতে পারবে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এ যুদ্ধযান তৈরি করেছে এবং আজ (শনিবার) এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। নতুন এ সামরিক যানের নাম দেয়া হয়েছে ‘জুলফিকার’ এবং আজ তা প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে দেখানো হয়।
১৭ মিটার লম্বা এ যুদ্ধযান ২২ টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সমুদ্রে ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে চলাফেরা করতে পারবে। এ যান চার মিটার লম্বা টর্পেডো বহন করতে সক্ষম যা শত্রুর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করতে সক্ষম। ইরানের তৈরি নতুন এ ওয়াটারক্র্যাফটের ওজন ২০০ টন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান সামরিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করেছে এবং এক ধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।

আল-আকসা রক্ষায় অস্ত্র হাতে তুলে নিন: হামাস

সশস্ত্র হামাস যোদ্ধা
ইহুদিবাদী ইসরাইলি সেনাদের হাত থেকে পবিত্র আল-আকসা মসজিদ রক্ষা করার জন্য ফিলিস্তিনি জনগণকে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। সম্প্রতি পবিত্র এই মসজিদকে কেন্দ্র করে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে এ আহ্বান জানালো হামাস।
হামাস নেতা মাহমুদ জাহার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আল-আকসা মসজিদে নিয়ে ইসরাইলের ভয়াবহ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন রুখে দেয়ার একমাত্র পথ হচ্ছে পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমের অধিবাসীদের অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া। মাহমুদ জাহারের ওই সাক্ষাৎকার হামাসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে আল-আকসা মসজিদ এলাকায় ইসরাইলি সেনা ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। সেখানে দফায় দফায় ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
এ সম্পর্কে মাহমুদ জাহার বলেন, পশ্চিম তীরে বিপুল জনশক্তি রয়েছে যাদেরকে যেকোনো সময় সংগঠিত করা যায়। তিনি বলেন, দখলদার ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরাও এখন পর্যন্ত অস্ত্রকেই প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করে।

ইসরাইল থেকে অস্ত্র ও চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে সন্ত্রাসীরা : সিরিয়া

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল মুআল্লিম বলেছেন, তার দেশে লড়াইরত সন্ত্রাসীদের অস্ত্র দিচ্ছে ইসরাইল এবং আহত সন্ত্রাসীদের চিকিৎসা করা হচ্ছে ইসরাইলি হাসপাতালে। তিনি দখলদার ইসরাইলের এইসব তৎপরতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমাজের নীরব দর্শকসুলভ ভূমিকার নিন্দা জানিয়েছেন। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ৭০ তম অধিবেশনে মুআল্লিম আরও বলেছেন, 'ইসরাইল সিরিয়ায় হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং আহত সন্ত্রাসীদের চিকিৎসা করছে ইসরাইলি হাসপাতালগুলোতে অথচ বিশ্ব তা দাঁড়িয়ে দেখছে। আর যখনই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে তখনই তেলআবিব সিরিয়ায় সরাসরি বিমান হামলা চালিয়ে অথবা গোলাবর্ষণ করে হস্তক্ষেপ করছে।' সিরিয়ার সরকার সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মুআল্লিম দায়েশ বা আইএসআইএল ও আননুসরার মত চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এইসব গোষ্ঠীর প্রতি ইসরাইলের পাশাপাশি তুর্কি, সৌদি ও কাতারি সরকারসহ বিদেশী সরকারগুলোর সহায়তার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, এইসব সরকার সিরিয়দের রক্ত ঝরানোর জন্য প্রতিযোগিতা করছে এবং এর ফলে মূল্য দিতে হচ্ছে নির্দোষ জনগণকে। দামেস্কের সঙ্গে সমন্বয় না করার কারণে আইএসআইএল-এর অবস্থানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কথিত বিমান হামলা ব্যর্থ ও অর্থহীন হচ্ছে বলে উল্লেখ করে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেবল বিমান হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কেবল সিরিয়ার সরকারি সেনারাই দেশটিতে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং রাশিয়া সিরিয়ার অনুরোধে ও সিরিয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে সন্ত্রাসীদের ওপর যে বিমান হামলা চালাচ্ছে তা সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে সুফল বয়ে আনছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। দামেস্ক সিরিয় সংকট সমাধানের জন্য সিরিয়দের নেতৃত্বাধীন আলোচনায় বসতে এবং এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আলোচনার আয়োজন করা হলে তাতেও যোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলে সিরিয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেছেন, সিরিয়ার সরকারি সেনারা সন্ত্রাসীদের পরাজিত করতে সক্ষম। আর তাই কোনো দুর্বলতা নিয়ে আলোচনায় বসবে না দামেস্ক। স্ববাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের স্বদেশে ফেরত আসার অধিকারের প্রতি দামেস্কের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে মুআল্লিম উল্লেখ করেছেন-আইআরআইবি

বাচ্চাদের টাকায় দুটি নতুন ব্যাংক দেয়া সম্ভব by হামিদ বিশ্বাস

স্কুল ব্যাংকিং। খুদে সঞ্চয়। শিশুদের টাকা জমাতে উদ্বুদ্ধ করা। উদ্যোগটি অভিনব। গভর্নর ড. আতিউর রহমানের আইডিয়া। ২০১০ সালের শেষের দিকে আলোর মুখ দেখে এটি। স্কুলের শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সালে। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ব্যাপক সাড়া পড়েছে স্কুল ব্যাংকিংয়ে। খোলা হয়েছে প্রচুর অ্যাকাউন্ট আর জমা হয়েছে অনেক অর্থ। জানা গেছে, একটি নতুন ব্যাংক খুলতে দরকার ৪০০ কোটি টাকা। বাচ্চাদের কাছে আছে ৮০০ কোটি টাকার বেশি। সে হিসাবে বাচ্চারা চাইলে আর অনুমোদন মিললে তাদের জমানো টাকায় দুটো নতুন ব্যাংক আসতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ে ৮ লাখ ৮৬ হাজার ২৭৭টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এতে শিশুদের ৮২৩ কোটি টাকা জমা রয়েছে।  জানা গেছে, দেশে কার্যরত ৫৬টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৯টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। চলতি বছরের শুরু থেকে আরও ৩টি নতুন ব্যাংক (ইউনিয়ন ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ও মধুমতি ব্যাংক) স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে ৫২টি ব্যাংক স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে আকর্ষণীয় মুনাফাসহ বিভিন্ন সঞ্চয়ী স্কিম রয়েছে স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য। প্রত্যেক ব্যাংকের ওয়েবসাইটে স্কুল ব্যাংকিং সংক্রান্ত স্কিমের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের জন্য স্কুলের পরিচয়পত্র ও অভিভাবকদের অনুমতি লাগে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিংয়ের জন্য তথ্য ও নিয়মাবলী জানিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে। উদ্দেশ্য ছিল সঞ্চয়ের মাধ্যমে স্কুলের শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া। যে হিসাবের মাধ্যমে এখন শিক্ষার্থীরা শুধু টাকাই জমাচ্ছে না, তাদের স্কুলের বেতন ভাতাও পরিশোধ করতে পারছে। নিজের একটি হিসাব থেকে স্কুলের বেতন পরিশোধ করা মানে পূর্ণভাবে একজন মানুষ ব্যাংকিংয়ের মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাওয়া।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে স্কুল ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে। প্রথম দিকে কিছুটা কম হলেও বর্তমানে শিক্ষার্থীরা বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। এখন তারা স্কুলের বেতন দিতে পারছে অ্যাকাউন্টটির মাধ্যমে। তিনি বলেন, শুরুতে ১০ টাকা দিয়ে হিসাব খোলা হলেও পরে হিসাবটি খুলতে ১০০ টাকা জমা রাখতে বলা হয়। এসব হিসাব চলতি হিসাবেও রূপান্তরের সুযোগ আছে। কোন কোন ব্যাংক আলাদা কাউন্টার বা ডেস্ক খুলে শিক্ষার্থীদের এ সেবা দিচ্ছে।
জানা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটা অংশ স্কুল শিক্ষার্থী। স্কুল ব্যাংকিং বা স্টুডেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় ‘ইয়ং স্টার’ ‘ফিউচার স্টার’ ইত্যাদি উদ্দীপনাসূচক নামে ব্যাংকগুলো চালু করে আকর্ষণীয় স্কিম। যেখানে অত্যন্ত সহজ শর্তে খোলা যায় শিক্ষার্থীদের নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। এ স্কিমের আওতায় শিক্ষার্থী এক কপি ছবি, স্কুলের আইডি কার্ড ও নামমাত্র টাকা দিয়ে ব্যাংকের যে কোন শাখায় খুলতে পারে সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা সঞ্চয়ী হিসাব। ৬ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে পারবে। শিক্ষার্থীদের পক্ষে পিতা-মাতা বা আইনগত অভিভাবক হিসাবটি পরিচালনা করবেন। সাধারণ হিসাব খুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ফরম রয়েছে, সঙ্গে আছে একটি গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) ফরম। সেগুলো পূরণ করতে হয় এতে। শিক্ষার্থীদের জন্ম নিবন্ধন সনদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। টাকা তুলতে পারবে নমিনি হিসাবে থাকা বাবা অথবা মা। তবে স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেট টেলার মেশিন) লেনদেনের জন্য এটিএম কার্ডও নিতে পারে শিক্ষার্থী। তার জন্য অবশ্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় রাখতে হবে শিক্ষার্থীকে। আর ১৮ বছর বয়স হলে সব শিক্ষার্থীই টাকা তুলতে পারবে। হিসাবগুলোয় সরকারি ফি ছাড়া অন্য কোন সেবা মাশুল ব্যাংকগুলো নেয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ে ৮ লাখ ৮৬ হাজার ২৭৭টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। যা আগের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৮ লাখ ৫০ হাজার ৩০৩টি।  সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩৫ হাজার ৯৭৪টি অ্যাকাউন্ট। খাতওয়ারি প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে শিশুরা ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৫৫টি অ্যাকাউন্ট খুলেছে। একইভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০টি, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬০৮টি ও বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১ হাজার ৪৫৪টি অ্যাকাউন্ট খুলে তারা।

এমপি লিটনের যত কাণ্ড

স্কুল ছাত্রকে নিজ পিস্তল দিয়ে গুলিবিদ্ধ করার পর থলের বিড়াল বেরিয়ে আসছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সরকার দলীয় এমপি মনজুুরুল ইসলাম লিটনের। তার সকল অন্যায় ও অপকর্মেও বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে স্থানীয় আওয়ামীলীগসহ সর্বস্তরের মানুষ। সুন্দরগঞ্জে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া গেছে তার যতসব কান্ডের তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০০ সালের ২৬ জুন সুন্দরগঞ্জ আঃ মজিদ সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয় মঠে জামায়াতে ইসলামীর জনসভা ছিল। তৎকালীন প্রসাশন আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখিয়ে ওই স্থানে ১৪৪ ধারা জারী করেন। পরে নির্বাচনী জনসভাপি ভুরারঘাট সিনিয়ার মাদ্রাসা মাঠে নেয়া হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতের সাবেক আমীর মরহুম প্রফেসর গোলাম আজম। অনুষ্ঠান শেষে দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ বাড়ী ফেরার পথে ছাইতানতলা এলাকায় রাস্তা বেরিকেড দিয়ে পথ রোধ করেন বর্তমান এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন। ছোড়ের গুরি। তার ছোড়া গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন পীরগাছার কাজী শহীদুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম ও রাজা মিয়াসহ ৬ জন। এরমধ্যে এখন অনেকেই অসহায় জবিন যাপন করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মনজুরুল ইসলাম লিটন উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আশরাফ আলী মাষ্টার। যুবক বয়স থেকেই বেশিভাগ সময় কেটেছে ঢাকায়। মেঘনা ঘাটে অবস্থিত শিপায়েড এন্ডার প্রাইজ জাহাজ নির্মাণের কারখানায়। ঢাকায় থাকাকালীন সময়ে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য হন লিটন। ২০০৩ সালে গুলি বর্ষন করে জিম্মি রেখে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি হন তিনি। একই সালের ১৪ নভেম্বর একতা এক্সপ্রেস এর যাত্রী ফলগাছা গ্রামের রওশনারা বেগম ভোরে ঢাকা থেকে বামনডাঙ্গা ফেরার পথে শ্লীললতাহানির শিকার হত মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের হাতে। ট্রেনে টানা হ্যাচড়া করে তাকে বিবস্ত্র করার চেষ্টা করা হয়। হাত ছিটকে পালিয়ে রওশনআরা আশ্রয় নেন বামনডাঙ্গা রেলওয়ে মসজিদে। এসময় তাকে উদ্দেশ্য করে মাতাল অবস্থায় মসজিদের ভিতর প্রবেশ করে গুলি বর্ষণ কওে লিটন। ২০০৫ সালে জড়িয়ে পড়েন বেসরকারী রেলওয়ে বাণিজ্য। ১ হাজার ৮৮৮ জন শ্রমিক কর্মচারীর ১৪ মাসের বেতন ভাতা প্রায় ৩০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে ভূক্তিভোগীরা। ২০০৮ সালে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে আশরাফ আলী হিমাগার নির্মাণ করেন মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। ব্যাংক ঋণের দায়ে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে বসে এ প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ৯ম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় বেরে যায় তার অপরাধ প্রবনতার মাত্রা। ২০১৩ সালে হিমাগারে অলু সংরক্ষণ করেন এলাকার অসহায়, গরীব চাষিরা। যথাসময়ে আলু ফেরত না দিয়ে বিক্রি করে গাঁ ঢাকা দেয় লিটন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বামনডাঙ্গার কালিতলা নামক স্থানে যাত্রামঞ্চে মদ পান অবস্থায় নর্তকীর সাথে নাচগান করতে দেখে বিষ্মিত হয় এলাকার মানুষ। ২০১১ সালের ২২ জুলাই সুন্দরগঞ্জ উপজেলার জাতীয় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রাপ্ত শিবরাম আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অনুমানিক রাত সাড়ে এগারটার দিকে স্কুল চত্বরে প্রবেশ করে ফাঁকা গুলি করে ভীতিকর পরিস্থিতির তৈরি করে। এঘটনার প্রতিবাদ করেন পুস্কার প্রাপ্ত জাতীয় শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষা মোঃ নুরুল ইসলাম। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাড়ীতেও আকষ্মিক গুলি বর্ষণ করেন এই লিটন। ২০১৪ সালের ভোটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে এমপি হন তিনি। তার নির্দেশে বামনডাঙ্গার পাশে মনমথ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গুলি করে হত্যা করা হয় স্থানীয় খামার ব্যবসায়ী এবং এলাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় যুুবক শাহাবুল ইসলামকে।
প্রতিবাদ বিক্ষোভ
এদিকে এমপি লিটনের পিস্তলে শাহাদত হোসেন সৌরভ (৯) গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রতিবাদে এমপি লিটনকে গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবিতে রোববার দিনভর মাননবন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে সুন্দরগঞ্জে। উপজেলার বঙ্গবন্ধু চত্বরে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন আওয়ামীলীগ নেতা ও পৌর মেয়র আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, উপজেলা আ’লীগের সাবেক সভাপতি টিআইএম মকবুল হোসেন প্রামানিক, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এমদাদুল হক বাবলু ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবিব মাসুদ। বক্তারা মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে দ্রুত আইনের আওতায় নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোরদাবী জানান। এদিকে ঘটনার পর থেকে এলাকায় চাপা উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সুুন্দরগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ ইসরাইল হোসেন জানান, শনিবার রাতে সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি বড় শ্যালক তরিকুল ইসলামের মাধ্যমে সংসদ সদস্যের ব্যবহৃত লাইসেন্সকৃত একটি পিস্তুল ও একটি শর্টগানসহ ৫৩ রাউন্ড গুলি থানায় জমা হয়েছে। অপর দিকে সৌরভের পিতা সাজু মিয়া বাদী হয়ে গত শনিবার রাতে সংসদ সদস্য লিটনকে একমাত্র আসামী করে মামলা করেছেন। মামলা তদন্ত কাজ বিভিন্নভাবে অব্যাহত আছে। আসামী গ্রেফতারের বিষয়টি থানা অফিসার ইনচার্জ কৌশলে এরিয়ে যান। তিনি জানান, গুলি করার সময় কোন অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে তা জমাকৃত অস্ত্র পরীক্ষা না করা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মামলার আইও এসআই কারিবেল হাসান জানায়, মামলার তদন্ত যথাযথ প্রক্রিয়া মোতাবেক চলছে। অগ্রগতির বিষয় তদন্ত নিরপেক্ষতার স্বার্থে বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল হাই মিলটন জানায়, এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরিস্থিতির উপর কড়া নজর দাড়ি রয়েছে। ঘটনার পর থেকে সংসদ সদস্যের মোবাইল ফোনটি বন্ধ রয়েছে।

ভারতে গরু নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শোভা দে
বিহারের নির্বাচনী উত্তাপকে পেছনে ফেলে ভারতে এই মুহূর্তে সরগরম গরু নিয়ে রাজনীতি। দিল্লি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে উত্তর প্রদেশের নয়ডায় বিসাদা গ্রামে এখন চলছে বিরামহীন ভিআইপি আনাগোনা। গো-হত্যার অভিযোগে হামলায় নিহত ইকলাখের বাড়িতে গতকাল শনিবার যান কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গান্ধী এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এলাকাটি এখনো উত্তপ্ত। বিরক্ত গ্রামবাসীর একাংশ এদিন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের গাড়ি ভাঙচুর করে। এরই মধ্যে পুলিশ দুই মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ সিং যাদব বলেছেন, অপরাধীদের কঠোর সাজা হবে।
নিছকই এক গুজবকে কেন্দ্র করে গত সোমবার রাতে বিসাদা গ্রামে শতাধিক লোকের আক্রমণে ইকলাখ নিহত হন।
গতকাল যে দুই মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়, তারা স্থানীয় এক মন্দিরের পুরোহিতকে বাধ্য করেছিল প্রতিশোধের ডাক দিতে। এর পরেই ইকলাখের বাড়ি আক্রমণ ও তাঁকে পিটিয়ে খুন করে উত্তেজিত জনতা।
গতকাল পাটনায় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ বলেছেন, বিজেপি গরুর রাজনীতি হাতিয়ার করে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের খেলায় নেমেছে। এটা ঠিক নয়। বহু হিন্দু আছে যারা গরু খায়। গরু খাওয়ার অপরাধে কাউকে পিটিয়ে মারা অন্যায়। পাটনাতেই লালুর কথার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, গরু নিয়ে কথা না বলে তিনি বরং বলুন, পনেরো বছরের শাসনে বিহারকে কেন জঙ্গলের রাজত্বে পরিণত করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে এখনো রা কাড়েননি। এ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও রাহুল গান্ধী। দুজনেই বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমালোচনা করেন। বিজেপি-বিরোধী দলগুলো প্রচার শুরু করে দিয়েছে, গরুর রাজনীতির মধ্য দিয়ে তারা দেশে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করছে, যাতে ভোটে জেতা সহজতর হয়।
ভারতের ১৮ কোটি মুসলমান ছাড়াও বহু অমুসলিম গরুর মাংস খায়। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাংস রপ্তানিকারক দেশ। তবে প্রধানত মহিষের মাংসই রপ্তানি হয় ।
এই বিতর্কের মাঝে বিশিষ্ট লেখিকা শোভা দে ট্যুইট করেন, ‘এখনই গরুর মাংস খেলাম। আসুন আমাকে খুন করুন।’ শোভা মুম্বাইয়ে থাকেন। বিজেপি এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করেছে।

ধর্ম জেনে গুলি চালাচ্ছিল ওরেগনের বন্দুকবাজ

হাত তুলে সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছিলেন পড়ুয়া, শিক্ষক-শিক্ষিকারা। বন্দুক উজিয়ে তাদের শাসাচ্ছিল ক্রিস হারপার মারসার। উঁচু গলায় বলছিল, ‘‘তোমরা খ্রিস্টান, তাই মুহূর্তের মধ্যেই ঈশ্বরের দর্শন পাবে!’’ বৃহস্পতিবার রাতে ওরেগন প্রদেশের রোজবার্গ শহরে উমকপুয়া কমিউনিটি কলেজের ক্যাম্পাসে বছর ছাব্বিশের ওই বন্দুকবাজের গুলিতেই মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। গুরুতর জখম ২০। গুলি করার আগে কলেজের পড়ুয়া, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ধর্ম জেনে নিচ্ছিল সে। খ্রিস্টান জানলেই গর্জে উঠছিল বন্দুক। দিনের শেষে মারা গিয়েছে হারপার নিজেও। একটি সূত্র বলছে, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে তার। তবে অধিকাংশ প্রত্যক্ষদর্শী জানাচ্ছেন, শেষমেশ আত্মহত্যা করেছে সে। আমেরিকার স্কুল-কলেজে বন্দুকবাজের হানা অবশ্য নতুন নয়। সে ১৯৯৯-এ কলোরাডোয় কলম্বিয়ান হাইস্কুলের হামলাই হোক, বা ২০০৭ সালে ভার্জিনিয়ার পলিটেকনিক কলেজ। অথবা সম্প্রতি কানেক্টিকাটে স্যান্ডিহুক এলিমেন্টারি স্কুল। গুলিতে বারবার রক্তাক্ত হয়েছে মার্কিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই তালিকায় নয়া সংযোজন উমপকুয়া। অন্য ক্ষেত্রে হামলার হিসেব ধরলে তালিকাটা আরও দীর্ঘ। তথ্য বলছে, চলতি বছরই আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় অন্তত ৩০০টি এ রকম হামলা হয়েছে। বন্দুক-হামলার প্রেক্ষিতে বরাবর দেশের বন্দুক-আইন কঠোর করার পক্ষেই সওয়াল করেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এ বারও ব্যতিক্রম হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউসে যখন সাংবাদিক বৈঠক করছিলেন, চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট। বন্দুক-আইন সংশোধনীতে বারবার বাধা দেওয়ায় ভর্ৎসনা করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান আর জাতীয় রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন লবিকে। বলেছেন, ‘‘ওরেগনে যা ঘটেছে, রাজনৈতিক ভাবে আমেরিকা নিজেই তা বেছে নিয়েছে।’’ বর্তমান আইনের দৌলতে, নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই নিজের কাছে বন্দুক রাখতে পারেন আমেরিকায়। রিপাবলিকানদের উদ্দেশে তাই ওবামার কটাক্ষ, ‘‘বন্দুক থাকলেই আমরা নিরাপদ, আর কত দিন এ কথা বলবেন?’’ রোজবার্গ শহরের যে কলেজটিতে বৃহস্পতিবার হামলা হয়েছে তাতে পড়ুয়ার সংখ্যাটা হাজার তিনেক। দুপুর নাগাদ হারপার যখন ঢুকল, তখন পুরোদমে ক্লাস চলছে ক্যাম্পাসে। প্রথমে কলাবিভাগ, তার পর বিজ্ঞান, লাইব্রেরি— দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হারপার। কলেজের এক রক্ষী জানান, তার গায়ে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হাতে, পিঠে তিন-তিনটে বন্দুক। সঙ্গে প্রচুর কার্তুজ। বড়সড় হামলার পরিকল্পনা নিয়েই সে এসেছিল বলে অনুমান পুলিশের। তবে হামলার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। কলাবিভাগের ১৬ নম্বর ঘরটিতে ছিলেন বছর কুড়ির ক্যাসেন্ড্রা ওয়েলডিং। ভাষাশিক্ষার ক্লাস চলছিল সেখানে। আতঙ্ক কাটিয়ে ক্যাসেন্ড্রা বললেন, ‘‘একসঙ্গে অনেকগুলো বেলুন ফাটলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক তেমন শব্দ পেলাম।’’ তার বর্ণনা, আওয়াজ শুনে এক অশিক্ষক মহিলাকর্মী ছুটে এসে দরজা বন্ধ করতে যান। আবার একটা শব্দ। লুটিয়ে পড়লেন ওই মহিলা। সরাসরি তার পেটে গুলি করে হারপার। পিঠের ব্যাগ জড়িয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন ক্যাসেন্ড্রা ও তার সহপাঠীরা। হারপারের শিকার হন কলাবিভাগের এক অধ্যাপকও। সামনে থেকে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে রোজবার্গের কলেজটিতে যোগ দিয়েছেন ব্যাডিন উইন্ডার (২৩)। গুলির আওয়াজে প্রথমে ভেবেছিলেন বড়সড় কিছু ভেঙে পড়েছে। পরে ভুল ভাঙে। ৯/১১-র সঙ্গে হামলার তুলনা করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘‘হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। বেঁচে ফিরব না ভেবে নিয়ে ফোন করছিলাম বাড়িতে।’’ শিরদাঁড়ায় গুলি লাগলেও বেঁচে গিয়েছেন বছর আঠারোর অ্যানাস্টেসিয়া বয়লান। শুক্রবারই তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। হাসপাতালের বিছানা থেকে তিনিই জানান, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাই হামলার লক্ষ্য ছিল। বয়লানের পিঠে গুলি চালায় হারপার। লুটিয়ে পড়লে পা দিয়ে ঠেলে যাচাই করে নেয় আদৌ বেঁচে আছেন কি না। যন্ত্রণা সহ্য করে চোখ বুজে পড়েছিলেন বয়লান। কলেজে হামলার খবর তত ক্ষণে রটে গিয়েছে। চত্বর ঘিরে ফেলেছে পুলিশ। কলেজ সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে একটি বিনোদনপার্ক। পুলিশের নির্দেশে খালি করে ফেলা হয় সেটি। এলাকাবাসীকে ঘরবন্দি থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। কলেজের উল্টো দিকেই থাকেন লরি অ্যান্ড্রু। বাজি ফাটার আওয়াজ পেয়ে বাইরে আসেন। বারান্দা থেকে দেখেন, কম্বলে জড়িয়ে রক্তাক্ত এক তরুণীকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে হামলাকারীর পরিচয় স্পষ্ট করেছে পুলিশ। জানানো হয়েছে, হারপার রোজবার্গেরই বাসিন্দা। জন্ম ইংল্যান্ডে। তবে ছোটবেলাতেই সপরিবার চলে আসে আমেরিকায়। বাবা ল্যান মারসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘আর পাঁচ জনের মতো ঘটনায় আমরাও সমান হতবাক। আমার পরিবারের জন্য বিধ্বংসী দিন ছিল এটা।’’ হারপারের প্রতিবেশী ব্রন্টে হার্ট জানান, ছোট থেকেই ঘরকুনো ছিল সে। বেশিরভাগ সময় অন্ধকার বারান্দায় একলা বসে থাকত। একটি অনলাইন ডেটিং সাইটেও হারপারের প্রোফাইলের সন্ধান মিলেছে। তাতে নিজেকে ‘অধার্মিক’ বলে দাবি করেছে সে। সেই সঙ্গে ‘ডাজ নট লাইক অর্গানাইজড রিলিজিয়ন’ বলে একটি গ্রুপেরও সে সক্রিয় সদস্য ছিল বলে জানা গিয়েছে। হারপারের প্রোফাইল ঘেঁটে পুলিশ জেনেছে, কলেজে হামলা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আগেই হুঁশিয়ারি জারি করেছিল সে।   - সংবাদসংস্থা

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন হোসি কোনিও

শনিবার রংপুর মহানগরীর উপকণ্ঠ কাচু আলুটারী এলাকায় দৃর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হোসি কোনিও (৬৬) এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত ২৭ রমজান তিনি স্থানীয় কাদেরীয়া মসজিদে ইসলাম ধর্ম গ্রহণও করেছিলেন। তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি এলাকার কেই মেনে নিতে পারছেন না। রংপুর পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে প্রকাশ, খুন হওয়া জাপানি নাগরিক হোসি কোনিও চলতি বছরের ১৪ মে এক বছরের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। এরপর তিনি রংপুর নগরীর মুন্সিপাড়ার জাকারিয়া বালার বাড়িতে উঠেন। ওই বাড়ির ওয়াল ঘেষেই আছে কাদেরীয়া জামে মসজিদ।
জাকারিয়া বালার স্ত্রী আয়শা জাকারিয়া জানান, জাকারিয়া পরিবারের চার ভাই সবাই থাকেন জাপানে। এর মধ্যে জাকারিয়ার ভাই বর্তমানে জাপান প্রবাসী মিশনের সাথে হোসি কোনিওর সুসম্পর্কের সুবাধে তিনি রংপুরে আসেন এবং জাকারিয়া বালার বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকেন। কয়েক বছর আগেও তিনি রংপুরে এসেছিলেন এবং ওই বাড়িতেই পেয়িং গেস্ট হিসেবে ছয় মাস অবস্থান করেন। এবার রংপুরে এসে আবারও ওই বাড়িতে উঠেন। তিনি থাকতেন ওই বাড়ির দোতালায়। বাসায় অবস্থানকালে শুধু খাওয়ার সময় নিচে নামতেন। তিনি জানান, হোসি কোনিও খুব ভালো লোক ছিলেন।
রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি সোহেল রানা ইমন জানান, হোসি কোনিও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শুক্রবারে মসজিদে এসে নামাজ পড়তেন। এবার কোরবানীর ঈদে কারামতিয়া কবরস্থান ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজও পড়েছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
অন্যদিকে স্থানীয় কামরুল ইসলাম অন্তু, মিজানুর রহমান রিপু, ইমন, নান্টুসহ এলাকার অনেকেই জানান, গত ২৭ রমজান কাদেরীয়া মসজিদে আসরের নামাজের সময় তিনি মসজিদের ইমাম সিদ্দিক হোসেনের কাছে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। এসময় ১৪/১৫ মুসল্লি মসজিদে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় কাদেরিয়া জামে মসজিদের ভারপ্রাপ্ত ঈমাম মাওলানা তাজুল ইসলাম জানান, আমি এই মসজিদে মাঝে মাঝে নামাজ পড়াই। কিছুদিন হোসি কোনিও আমার পেছনে বাম পাশে মাগরিবের নামাজ আদায় করেছেন। পুলিশের উদ্ধারকৃত পাসপোর্টে তার জন্ম তারিখ লেখা রয়েছে ৩১-০৫-১৯৪৯।
স্থানীয়রা জানান, রংপুরে এসে কাচু আলুটারি এলাকার শাহ আলম নামের এক কৃষকের দুই একর জমি রংপুর মহানগরীর রবার্টসন্সগঞ্জ পানির ট্যাংক এলাকার রজব আলীর পুত্র হীরার সাথে অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে লিজ নেন। সেখানে তিনি ও হীরা বিভিন্ন কোয়েল ঘাসের গাছ লাগিয়ে গড়ে তোলেন ফার্ম। নিজের হাতে সেগুলো পরিচর্যাও করতেন।
তবে পরিচর্যার জন্য মাস খানেক আগে হীরাসহ ফার্মে এলেও কিছুদিন থেকে তিনি একাই ফার্মে যাতায়াত করতেন বলে জানায় স্থানীয়রা। তবে ওই ঘাসের খামার পরিদর্শনে গিয়ে রংপুর প্রানী সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা জানান, ওই ঘাসের পরিচয় তিনি জানেন না।

এই যুগে রবিন হুডও অচল! by আশরাফুল ইসলাম

বিল গেটস, মুকেশ আম্বানি, জ্যাক মা
ব্রিটিশ লোকসাহিত্যের ঐতিহাসিক চরিত্র রবিন হুডের বীরত্বের কথা অনেকেরই জানা। ধনীদের সম্পদ লুট করে গরিবের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁকে বলা হয় ‘গরিবের রাজা’। আজকের দিনে বিশ্বের প্রতিটি দেশে যদি সেই রবিন হুডকে আবার ফিরে পাওয়া যেত, তাহলে গরিবদের কতটুকু উপকার হতো? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ ৪২টি দেশকে নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছে, প্রতিটি দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির সম্পদ যদি ওই একই দেশের সবচেয়ে দরিদ্র লোকদের ভাগ করে দেওয়া হয়, তাহলে তাঁদের অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হবে না। এ জন্য রবিন হুড সূচক নামের একটি আলাদা সূচকও তৈরি করা হয়েছে।
রবিন হুড সূচকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির মোট সম্পদ দেশটির দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ৩০ শতাংশ লোকের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হলে প্রত্যেকে পাবেন মাত্র ৫৯ ডলার বা ৪ হাজার ৭২০ টাকা। এ অর্থ দিয়ে একজন লোক ভারতে সর্বোচ্চ দেড় মাস তিন বেলা খেতে পারবেন। তবে খুব ভালো কিছু যে খেতে পারবেন, তা-ও না। প্রতি বেলার খাবারের জন্য ৩৫ রুপি হিসেবে একজনের পাতে জুটবে ভাত, ডাল, দুই প্রকার সবজি, আচার ও তিনটি চাপাতি রুটি। ১২৯ কোটি জনসংখ্যার ভারতে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন ৩২ কোটি মানুষ আর মুকেশ আম্বানির মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ১ হাজার ৯২০ কোটি ডলার। এ অর্থ গড়ে একজন ভারতীয় নাগরিক যে পরিমাণ আয় করেন, তার তুলনায় ১ কোটি ৩৬ লাখ গুণ বেশি!
প্রিন্স তালাল, ইংভার ক্যাম্পরাড, জন ফ্রেডরিকসেন
ভারতের চেয়ে চীনের দরিদ্র ব্যক্তিরা নিজেদের একটু ভাগ্যবান ভাবতে পারেন। কারণ, চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি জ্যাক মা যদি তাঁর ১৯ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ভাগ করে দেন, তাহলে একজন দরিদ্র চীনা নাগরিক পাবেন ২৩৪ ডলার বা ১৮ হাজার ৭২০ টাকা। বিশ্বের শীর্ষ ধনী মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তাঁর ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার যদি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র ১৫ শতাংশ নাগরিকদের দান করে দেন, তাহলে গড়ে একজন পাবেন ১ হাজার ৭৩৬ ডলার বা ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এ অর্থ দিয়ে মার্কিন মুলুকে একজন ব্যক্তির এক মাসের খরচ চলতে পারে।
সূচক অনুযায়ী সাইপ্রাস ও সুইডেনের দরিদ্ররা অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক বেশি অর্থ পাবেন। সুইডেনের শীর্ষ ধনী আসবাব ব্যবসায়ী আইকিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ইংভার ক্যাম্পরাড তাঁর ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ভাগ করে দিলে গড়ে একজন গরিব সুইডিশ পাবেন ৩৩ হাজার ১৪৯ ডলার। একইভাবে সাইপ্রাসের শীর্ষ ধনী জন ফ্রেডরিকসেন তাঁর ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ভাগ করে দিলে একজন গড়ে পাবেন ৪৫ হাজার ৯৮৭ ডলার। দেশ দুটির কম জনসংখ্যা অর্থের ভাগ বেশি হওয়ার মূল কারণ। সুইডেন ও সাইপ্রাসের জনসংখ্যা যথাক্রমে মাত্র ৯৫ লাখ ও ১২ লাখ।
সৌদি আরবের শীর্ষ ধনী যুবরাজ আলওয়ালিদ বিন তালাল আল সউদের সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার। তিনি যদি দেশটির দরিদ্রদের এ সম্পদ ভাগ করে দেন, তাহলে একজন গড়ে পাবেন ৮ হাজার ২৬১ ডলার বা সাড়ে ৬ লাখ টাকা।
মোদ্দা কথা হলো, আজকের যুগে রবিন হুডের মতো ধনীদের থেকে টাকা নিয়ে দরিদ্রদের যতই দেওয়া হোক না কেন, তা খুব একটা কাজে আসবে না। চীন, ভারত, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এ কথাটি আরও বেশি প্রযোজ্য।

পরীক্ষা মানেই প্রশ্ন ফাঁস! হতাশ শিক্ষার্থী চাকরিপ্রার্থী ও অভিভাবক by মেহেদী হাসান

পরীক্ষা মানেই প্রশ্নপত্র ফাঁস; এটিই যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনা। প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায়ও এখন এটি ঘটতে শুরু করেছে। পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের নিয়োগ পরীক্ষায় একের পর এক ঘটে চলেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। ২০০৯ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যে পরিমাণ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি অতীতে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত চার বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় মোট ৬৩টি বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অপর একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় একই সময়ে ৩০টিরও বেশি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছরে প্রায় সব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেকর্ড সম্পন্ন হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরি প্রার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যেও দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা। বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রমাণিত হলেও বাতিল করা হয়নি পরীক্ষা। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেলেও অনেক সময় কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। কখনো কখনো সাজেশন বলেও বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন কোনো নজিরও চোখে পড়ছে না। অনেকের মতে এসব কারণেই থামছে না প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি।
গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়। প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন কারণে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় একের পর এক কেলেঙ্কারি যেন লেগেই আছে। এ মুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাঠে রয়েছেন মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা।
চলমান শিক্ষক আন্দোলনের মধ্যেই ঘটে যায় দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলন তথা ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলন শেষ না হতেই আবার মাঠে নামলেন মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার আগের রাত থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে এবং এ অভিযোগে সরকারি চাকরিজীবী ও চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃতদের একজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বরের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা।
পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস উৎসব
২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ সাল ছিল পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের হিড়িকের বছর। ২০১৪ সালে বছরজুড়ে একের পর এক পাবলিক পরীক্ষায় ঘটতে থাকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। সমাপনী, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় প্রতিটি বিষয়ে মুড়ি মুড়কির মতো মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র। এ ছাড়া জেএসসি বা জেডিসি পরীক্ষায়ও তখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।
২০১৪ সালে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার শুরু থেকেই প্রতিটি বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং অভিযোগ আসতে থাকে। ফাঁস হওয়া অনেক প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার হলের প্রশ্নপত্র হুবহু মিলে যায়। তারপরও একটি পরীক্ষা স্থগিত ছাড়া অন্যসব পরীক্ষা চালিয়ে নেয়া হয়। ২০১৪ সালে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল এইচএসসির। পরিস্থিতি বেগতিক আকার ধারণ করায় স্থগিত করা হয় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। তবে বাংলা, ইংরেজি প্রথম পত্র, গণিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞানসহ বিষয়ের প্রশ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এ সত্ত্বেও এসব পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি।
২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রাথমিকের সমাপনী পরীক্ষায়ও একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘটতে থাকে। ২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে ধুমধামের সাথ।
২০১৩ সালে সমাপনী পরীক্ষায় ইংরেজি এবং বাংলা বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হয়। ইংরেজি ৮০ এবং বাংলা ৫৩ শতাংশ প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে। তবু এ পরীক্ষা বাতিল হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এস এম আশরাফুল ইসলাম তখন জানান তদন্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রমাণিত হয়েছে। তবে পরীা বাতিল করা হচ্ছে না।
২০১২ সালেও সমাপনী পরীক্ষায় বাংলা ও গণিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে।
২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন জেলায় দায়ীদের শাস্তি দিয়েছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার অনেকে অনলাইনে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রণালয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাদের কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তারপরও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার গত ৪ ডিসেম্বর নেত্রকোনা কেন্দুয়ায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেলেও এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের এসএসসি ও সমানের পরীায়ও সব প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। গণিত, ইংরেজি প্রথম পত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীায় ইংরেজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিা অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন মহামারী আকার ধারণ করেছে যে, সরকারি সর্বোচ্চ নিয়োগ পরীক্ষা তথা বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনা ঘটল। ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক নিয়োগ, বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, অডিট, এনবিআর, থানা ও উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও), মেডিক্যাল, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ উঠেছে। ইসলামী ব্যাংকেরও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থগিত করা হয় ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীা ও অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীা। একই কারণে প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক নিয়োগের পরীক্ষাও ১৭ জেলার বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের ৩১ মে ফাঁস হয়ে যায় অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগ পরীার প্রশ্ন। ওই দিন বিকেল ৪টায় পরীা থাকলেও সকাল ৯টা থেকেই হাতে লেখা প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সত্যতা পাওয়ার পর ১২ জুন ওই পরীা বাতিল করা হয়।
২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীা হলেও পরীা বাতিল হয়নি। একই বছর ২৮ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিাকর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। একই বছর ৮ জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীা স্থগিত করা হয়। একই বছর ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এতে ওই পরীা বাতিল করে কর্তৃপ।
২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীা নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই পরীা বাতিল করা হয়। ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০১২ বছরের ৩ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে পরীায় হলের প্রশ্নের হুবহু মিল থাকলেও পরীা বাতিল বা তদন্ত হয়নি। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই এটিইও পদে প্রিলিমিনারি পরীা হয়। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ৬ অক্টোবর পিএসসি পরীা স্থগিত করে। ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর প্রাইমারি স্কুলে প্রধান শিক নিয়োগ পরীার প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও অভিযোগ ওঠে।
ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে গড়ে উঠছে জালিয়াতচক্র। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ চক্র প্রশ্ন ফাঁসসহ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষার হলে বাইরে থেকে উত্তর বলে দেয়ার কৌশল রপ্ত করে ভর্তি ইচ্ছুকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ চক্রের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে ইতোমধ্যে। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এ চক্র প্রযুক্তির সাহায্যে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলন করছে মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুকরা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে তারা পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। এর আগেও ২০১০-১১ সালে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সিন্ডিকেট চক্রের ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়। ৫২টির মধ্যে ৪১টি প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে।
প্রশ্ন ফাঁসের রেকর্ড
ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে গত ছয় বছরে । ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরীায় সর্বপ্রথম প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ১৯৭৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ২৯ বছরে ৫৫টি পরীার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। আর গত ছয় বছরে ৩০টিরও বেশি পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।
প্রশ্ন ফাঁস, মামলা ও তদন্ত
বিভিন্ন পরীায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত ছয় বছরে রাজধানীতে ৭০টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলায় শাস্তি পাওয়ার তেমন নজির নেই। অনেকে প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়েছে। অনেক মামলা আর সচল নেই। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় অনেক তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তে অনেক ঘটনা প্রমাণ হয়েছে। তদন্তে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে অনেক সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু তারও তেমন কোনো বাস্তবায়ন নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকাশিত একটি তথ্যে দেখা যায়, গত ৩৫ বছরে অন্তত ৭৮টি পরীার প্রশ্ন ফাঁস হলেও তদন্ত কমিটি হয়েছে ২৩টিতে। আর বাতিল ও স্থগিতের ঘটনা ঘটেছে ১২টির মতো পরীক্ষায় ।
বার্ষিক পরীায়ও প্রশ্ন ফাঁস!
কুড়িগ্রামের চিলমারি উপজেলায় গত বছর ডিসেম্বর মাসে মাধ্যমিক স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ১ ডিসেম্বর উপজেলার সব উচ্চবিদ্যালয়ে চারটি সেটের মাধ্যমে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে বার্ষিক পরীা শুরু হওয়ার পর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে বিভিন্ন স্কুলে।
টিআইবির অনুসন্ধান
গত ৫ আগস্ট রাজধানীতে টিআইবির প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পাবলিক পরীায় ৪০টি ধাপে প্রশ্ন ফাঁস হয়। তার মধ্যে ২৩টি ধাপ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, বিজি প্রেসে কম্পোজ, প্রুফ দেখা, সিলগালা করা ও বিতরণ এবং পরীার দিন পরীা কেন্দ্রে শিকদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে শিাবোর্ড, মাধ্যমিক শিা অধিদফতর, প্রাথমিক শিা একাডেমি, কোচিং সেন্টার, গাইড বই ব্যবসায়ী ও সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন সরাসরি জড়িত। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে আকারভেদে ২০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের লেনদেন হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) এ চারটি পাবলিক পরীার প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন, ছাপানো, সংরণ ও বিতরণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এ গবেষণা কার্য পরিচালনা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৯ সালে প্রশ্ন ফাঁসের প্রবণতা শুরু হলেও ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ শিাবর্ষ সব বছরকে ছাড়িয়ে গেছে। গত চার বছরে গবেষণার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন পাবলিক পরীায় ৬৩টি প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল ও আত্মীয়স্বজন এ চারটি মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছায়।
গবেষণার সার্বিক পর্যবেণে দেখা যায়, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সরকারি ও বেসরকারি উভয় অংশীজন জড়িত। প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণে এবং তদারকির সাথে সম্পৃক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত। প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, প্রশ্ন প্রণয়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ম্যানুয়াল পদ্ধতির সাথে অনেকের সম্পৃক্ততাও প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথাকথিত সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখা ও প্রশ্নপত্র দিয়ে শিার্থীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টিকে অস্বীকার করার প্রবণতা, বিষয়টি ‘সাজেশন কমন পড়া’, ‘গুজব’ বলে অস্বীকার করা, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করা, প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি নীতি। এ ছাড়া পাবলিক পরীা অপরাধ আইনে শাস্তি কমানো, কোচিং বাণিজ্যে বন্ধে প্রণীত নীতিমালা অস্পষ্টতা, গাইড বই বন্ধে আইনের শিথিলতা, বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না করা, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া, একই শিক প্রতিবছরই প্রশ্ন প্রণেতা হিসেবে নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর তদারকি ও প্রয়োজনীয় পদেেপর ঘাটতি, পরিবর্তিত শিা ও পরীা কাঠামোর ওপর শিকদের যথাযথ ও পর্যাপ্ত প্রশিণের অভাব, বিজি প্রেসে পর্যাপ্ত তদারকি ও নিরাপত্তা না থাকা, শিাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বিকল্প প্রশ্ন না থাকা, প্রশ্ন গণনায় ম্যানুয়ালি করা, সচেতনতার ঘাটতি। এর ফলে সার্বিক শিা কাঠামোতে নৈতিকতার অবয়, শিার গুণগতমানের অবনতি পরিলতি হচ্ছে। একে শিার্থীদের মাঝে পড়াশোনার ঘাটতি, মেধাবীদের তুলনায় রেজাল্টে কম মেধাবীরা এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় ল্য করা গেছে।
নৈতিকতার বিপর্যয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর এমিরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রশ্ন ফাঁস ঘটনার সাথে আমাদের সমাজের অনৈতিকতার বিপর্যয়ের চিত্রও প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সমাজে অনৈতিকতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মা-বাবাও দৌড়াচ্ছেন সন্তানের জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করার জন্য। সন্তানও মা-বাবাকে দ্বিধাহীনভাবে বলছে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করে দেয়ার জন্য। মা-বাবা সে আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন। কারণ প্রশ্ন জোগাড় করতে না পারলে তার সন্তানতো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। একেবারে কোমল অবস্থায়ই একজন শিশুকে অনৈতিকতার দিকে ধাবিত করা হচ্ছে । মা-বাবা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী মিলে সবাই অনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই যে চিত্র এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক জাতির জন্য।
প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। গত ২৭ নভেম্বর অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম-এ তিনি লিখেছেন ‘ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। সারা পৃথিবীর কোথাও এই নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার কি এর চেয়ে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে? নেই। সারা পৃথিবীতে কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও কখনও থাকবে না। শুধু আমাদের দেশেই কিছু আমলা আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ একটা শিাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। যে জাতি শৈশবে অন্যায় করতে শিখে বড় হয়, সেই জাতি দিয়ে আমরা কী করব?’
জাফর ইকবাল লিখেছেন ‘এই দেশের শিাব্যবস্থার হর্তাকর্তা বিধাতারা, আপনাদের কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করি, আমাদের দেশের শিশুদের আপনারা মুক্তি দিন। এই শিশুগুলো যদি কোনো পরীা না দিয়ে শুধু বইগুলো নাড়াচাড়া করে সময় কাটিয়ে দিত তাহলে অন্তত তাদের একটা সুন্দর শৈশব থাকত, তারা অন্তত অন্যায় করা শিখত না। আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার দরকার নেই, দোহাই আপনাদের, তাদের ক্রিমিনাল করে বড় করবেন না! ’
হতাশায় মেধাবীরা
‘প্রশ্ন যদি হবে ফাঁস পড়ব কেন বার মাস’ স্লোগান ধারণ করে বর্তমানে আন্দোলন করছেন মেডিক্যাল ভর্তি ইচ্ছুকরা। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে অনেক অমেধাবী যেমন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করছে তেমনি অনেক অমেধাবীরা ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে। আবার অনেক অযোগ্যরা পাচ্ছে ভালো চাকরি। না পড়েই যদি প্রশ্ন ফাঁসের কারণে এসব পাওয়া যায় তাহলে মেধাবীরা ১২ মাস কষ্ট করে কেন পড়বে এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই জাতির কাছে। এ প্রশ্ন সত্যিই অনেক বেদনার অনেকের কাছে।
রাজধানীর হলিক্রস কলেজের অভিভাবক সালমা নাজু জানান, এইচএসসি পরীক্ষার সময় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় তার মেয়ে ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে। এ কলেজের মেয়েরা সবাই পড়াশুনায় ভালো। কিন্তু পরীক্ষার সময় ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিয়ে অন্যদের কাড়াকাড়ির দৃশ্য দেখে তার মেয়েসহ অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা কান্না ধরে রাখতে পারেনি। সারা বছর এত কষ্ট সাধনার পর এখন সবাই পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়ে যাচ্ছে এবং পরীক্ষার খাতায় তা গড় গড় করে লিখে দিয়ে আসছে। সালমা নাজু জানান, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষার সময় সে এবং তার মেয়ে যে মানসিক কষ্ট পেয়েছেন তা কোনো দিন ভুলতে পারবেন না।
প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং বেদনার চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন অসংখ্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী, চাকরিপ্রার্থী এবং তাদের মা-বাবা। রাজধানীর বিভিন্ন নামকরা কলেজের এইচএসসি পড়–য়া শিক্ষার্থীরা আগের বছরগুলোতে প্রশ্ন ফাঁসের স্মৃতিচারণ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা দেখেছে কিভাবে তাদের সামনে অমেধাবীরা, যারা হয়তো ঠিকমতো পাসই করতে পারত না তারাও জিপিএ ৫ পেয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছে ফল প্রকাশের পর। তাদের মতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা এবং উদারনীতিতে খাতা মূল্যায়নের কারণে ভালোমন্দ সব একাকার হয়ে গেছে। সারা বছর তাদের পরিশ্রম মূল্যহীন হয়ে গেছে।