Thursday, January 23, 2025

সরকার নিরপেক্ষ থাকতে না পারলে নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন হবে -বিবিসি বাংলাকে সাক্ষাৎকারে ফখরুল

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারলে নির্বাচন করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীরা নতুন রাজনৈতিক গঠন করে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চায় বলে জানা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারে নিজেদের প্রতিনিধি রেখে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব।

সাক্ষাৎকারে আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে ভাবনা, আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সংস্কার প্রস্তাবে প্রতিক্রিয়াসহ আরও অনেক বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দুই পর্বে বিএনপি মহাসচিবের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবিসি বাংলার সম্পাদক মীর সাব্বির।

পাঠকদের জন্য প্রথম পর্বটি এখানে তুলে ধরা হলো-

বিবিসি বাংলা: মি. আলমগীর আপনাকে অনেক ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার সাক্ষাৎকারে যোগ দেওয়ার জন্য। কেমন আছেন আপনি?

বিএনপি মহাসচিব: ভালো, ভালো। অনেক ভালো।

বিবিসি বাংলা: প্রথমে একটু নির্বাচন দিয়ে শুরু করতে চাই। সম্প্রতি আপনি একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে, এই বছরের (২০২৫) জুলাই-অগাস্টের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। এটা কি একটা সম্ভাবনার কথা বলছেন, নাকি আপনারা চান যে, জুলাই-অগাস্টে নির্বাচন হোক?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা তো চাই আর্লি ইলেকশন। আগেও বলেছি আমরা। যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সংস্কার, যেটা ন্যূনতম সংস্কার, সেগুলো করে যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা। এটা আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি এবং আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের যে অভিজ্ঞতা দেখেছি আমরা অতীতের কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টগুলোতে, তাতে করে এটা অসম্ভব কিছু না। এটা পসিবল যদি গভর্নমেন্ট চায় যে, ইলেকশন তারা করবে জুন-জুলাইয়ের মধ্যে বা অগাস্টের মধ্যে, তারা করতে পারে।

বিবিসি বাংলা: আপনারা কোনো সুনির্দিষ্ট কি বলবেন যে, আপনারা এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন চান?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা সুনির্দিষ্ট সময় ওইভাবে বলতে চাই না এজন্য যে, তাতে তো লাভ হবে না। কারণ গভর্নমেন্টকেও চাইতে হবে। আলাদা পলিটিক্যাল পার্টিদেরকেও চাইতে হবে, সবাই মিলে একসাথে চাইতে হবে। তবে আমাদের দিক থেকে আমরা মনে করি, এটা কোনো অসম্ভব কিছু না। এটা খুবই সম্ভব এবং যতদ্রুত হয় ততই দেশের জন্য মঙ্গল।

বিবিসি বাংলা: কিন্তু আপনাদের কোনো ডেডলাইন বা সময়সীমা নেই?

বিএনপি মহাসচিব: ডেডলাইন আমরা দেইনি এখনো।

বিবিসি বাংলা: যদি আপনারা দেখেন যে, নির্বাচনটা আপনারা যে সময়ের মধ্যে আশা করছেন, সেটা হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে আপনাদের পদক্ষেপটা কী হবে?

বিএনপি মহাসচিব: সেক্ষেত্রে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আমাদের পার্টিতে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো এবং আমাদের সঙ্গে যারা আন্দোলনে ছিলেন-আছেন, তাদের সঙ্গেও আমরা আলোচনা করবো। আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত নেব।

বিবিসি বাংলা: অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন যে, তারা কিছু সংস্কার কাজ করতে চান এবং সেই সংস্কার কাজগুলো শেষ হলে তখন তারা একটা নির্বাচনে যাবেন। তো আপনারা কি অপেক্ষা করতে রাজি আছেন সংস্কার কাজ শেষ করা পর্যন্ত?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা আমাদের কথাগুলো স্পষ্ট করে বলে আসছি। বলেছি যে, উনি যতগুলো সংস্কারের মধ্যে হাত দিয়েছেন, অতগুলো সংস্কার করতে গেলে আপনার দশ বছরের মধ্যেও শেষ হবে না। আর সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া। দু'বছর আগে রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা দিয়েছি আমরা। তার মধ্যে এই বিষয়গুলি তো রয়েছে।

সংবিধান সংস্কারের বিষয় রয়েছে, জুডিশিয়াল কমিশনের কথা আমরা বলেছি, আমরা ইলেকশন কমিশনের কথা বলেছি, আমরা ব্যুরোক্রেসি সংস্কারের কথা বলেছি ৩১ দফায়, আমরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের কথা বলেছি -এগুলো আমাদের সমস্ত বলা আছে। এখন সেক্ষেত্রে তারা যেটা করেছেন, সেটা কী রিপোর্ট নিয়ে আসছে আমরা জানি না।

যদি রিপোর্টগুলোয় দেখা যায় যে, আমাদের সঙ্গে মিলে গেছে, তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যেগুলো মিলবে না, সেগুলো তো একটা ন্যূনতম কনসেনসাস হতে হবে। তারপরে সেটা হতে হবে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আপনি সংস্কার দিলেন, কিন্তু সেটাকে আপনার অ্যাপ্রুভ করবে কে? তার জন্য তো আইনগত যাদের অধিকার আছে, তারাই করতে পারবে। দ্যাট ইজ পার্লামেন্ট।

পার্লামেন্ট ছাড়া কিন্তু কোনো সাংবিধানিক সংস্কার কঠিন হবে। এমনকি অন্যান্য বিষয় কতগুলা আছে, যেগুলা আপনার সংবিধানে কিছু কিছু পরিবর্তন আনার দরকার আছে। কিন্তু সেগুলা পার্লামেন্ট ছাড়া সম্ভব না। সেজন্যই আমরা মনে করি, দ্য সুনার দ্য ইলেকশন ইজ বেটার।

বিবিসি বাংলা: আপনি কি মনে করেন যে, নির্বাচিত সরকার আসার আগ পর্যন্ত এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের যাওয়া উচিৎ হবে না বা তারা যেতে পারে না?

বিএনপি মহাসচিব: যাওয়া উচিৎ হবে না আমরা বলছি না। কিন্তু যেতে তারা পারবেন না এজন্যে যে, সব দলের কনসেনসাস না হলে কোনোটাই যাওয়া তাদের ঠিক হবে না।

বিবিসি বাংলা: এই সরকারের মেয়াদ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে এবং নির্বাচন পর্যন্ত তো এই সরকারের মেয়াদ থাকবে, এটাই সবার ধারণা।

বিএনপি মহাসচিব: যদি সরকার পূর্ণ নিরপেক্ষতা পালন করে, তাহলেই তারা নির্বাচন কনডাক্ট করা পর্যন্ত থাকবেন। তা না হলে তো নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন হবে।

বিবিসি বাংলা: আপনার কি ধারণা যে, এই সরকারের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে?

বিএনপি মহাসচিব: নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আসতে পারে। কেননা, এখানে আমরা জিনিসটা লক্ষ্য করছি যে, আপনার ছাত্ররা তারা একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করার কথা চিন্তা করছেন। সেখানে যদি ছাত্রদের প্রতিনিধি এই সরকারে থাকে, তাহলে তো নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। ওইটা হচ্ছে, সম্ভাব্য কথা। কিন্তু যদি তারা মনে করে যে, (সরকারে) থেকেই তারা নির্বাচন করবেন, তাহলে তো রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেবে না।

বিবিসি বাংলা: আপনার কি মনে হয়, সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে এখন কোনো প্রশ্ন তৈরি হয়েছে?

বিএনপি মহাসচিব: এখন কোনো প্রশ্ন নেই। আমাদের কাছে কোনো প্রশ্ন নেই।

বিবিসি বাংলা: পাঁচই অগাস্টের পর যখন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা হচ্ছিল, সে আলোচনায় আপনারাও ছিলেন। সেই আলোচনার ভিত্তিতে পরে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। যথন এই অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকাল কী হবে, সেটা নিয়ে আপনাদের সাথে কোনো কথা হয়নি?

বিএনপি মহাসচিব: না। তখন তো ইলেকশন দ্রুত করার কথাই হয়েছে। দ্রুত ইলেকশন করার কথাই হয়েছে।

বিবিসি বাংলা: দ্রুত বলতে কত সময়? কোনো ধারণা, সময়সীমা- এ ধরনের কিছু নিয়ে কথা হয়নি?

বিএনপি মহাসচিব: না, সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তখন তো সেই সুযোগ ছিল না।

বিবিসি বাংলা: তো অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের পর আপনি নিজেই বলেছিলেন যে, এই সরকারকে আপনারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।

বিএনপি মহাসচিব: করছি।

বিবিসি বাংলা: এটা এখনও অব্যাহত আছে?

বিএনপি মহাসচিব: অব্যাহত আছে। উনারা যখনই ডাকেন, তখনই আমরা যাই, কথা বলি। না ডাকলে তো যাওয়া যায় না, তারপরও আগ বাড়িয়েও কথা বলি। আমরা যেগুলো মনে করি যে, এগুলো করা উচিৎ, সেগুলো তাদেরকে আমরা জানাই। অ্যান্ড উই আর কোঅপারেটিভ। এখন পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে কিন্তু কোনো আন্দোলনও করিনি, কথাও বলি না কোথাও। তবে দু-একটা ভুল-ত্রুটি তো দেখিয়ে দিতেই হয়।

বিবিসি বাংলা: শুরু থেকে আপনাদের সাথে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের যে সম্পর্কটা ছিল, এখনও কি তাই আছে? নাকি এখানে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়েছে?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা মনে করি যে, তাই আছে।

বিবিসি বাংলা: সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রায়ই সময় একটা বিষয় বলা হয় যে, তারা যে সংস্কার কাজগুলো করছেন বা করতে চাচ্ছেন, তার একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে-যে ধরনের একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী সরকার তৈরি হয়েছিল, সে ধরনের একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা যাতে বাংলাদেশে আর তৈরি না হয়। আপনার কি মনে হয়, এর দ্বারা আপনাদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়?

বিএনপি মহাসচিব: কোনোমতেই না। কারণ আমরা কখনই স্বৈরতান্ত্রিক ছিলাম না। আমরা সবসময় গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলাম। এখানে মাল্টিপার্টি ডেমোক্রেসি আমরাই নিয়ে আসছি। একদলীয় শাসনব্যবস্থা শেখ মুজিবের, সেখান থেকে ট্রানজিশন টু মাল্টিপার্টি সিস্টেম তো জিয়াউর রহমান সাহেব করেছেন। গণমাধ্যমকে মুক্ত করা, আমরাই করেছি। আপনার পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি তো আমরাই নিয়ে আসছি। কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট সিস্টেম আমরাই চালু করেছি। আপনি প্রত্যেকটাই দেখেন। সুতরাই প্রশ্নই উঠতে পারে না। আমাদেরকে কেউ স্বৈরাচারী আঙুল তুলবে এ কথা আমরা কখনই মেনে নিতে পারবো না।

বিবিসি বাংলা: বা ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের সুযোগ তৈরি না হয়।

বিএনপি মহাসচিব: প্রশ্নই আসে না। দলটিই তো আমাদের ওইরকম না। আমাদের দলটিই তো গণতান্ত্রিক দল। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। ইউ হ্যাভ অলওয়েজ ট্রাইড টু প্রাকটিস ডেমোক্রেসি। আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। ১৫ বছর আমরা লড়াই করলাম এই গণতন্ত্রের জন্য, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য। খালেদা জিয়া প্রায় ছয়টা বছর তিনি কারা অন্তরীণ ছিলেন এই মামলার জন্যে, এই গণতন্ত্রের জন্যে। এবং আমাদের তারেক রহমান সাহেব এখনও বিদেশে আছেন। আমাদের প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে। আমাদের প্রায় সাতশত মানুষ গুম হয়ে গেছে। আমাদের হাজার হাজার লোক খুন হয়েছে-গণতন্ত্রের জন্যে। এদেশের মানুষ স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছিল গণতন্ত্রের জন্যে। সুতরাই আমাদের দলে সেই প্রশ্নই উঠতে পারে না। ডেমোক্রেসির চ্যাম্পিয়ন বলতে পারেন আমাদেরকে আপনি।

বিবিসি বাংলা: আপনি সংস্কার কমিশনের কথা বলছিলেন। যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন হয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি এরই মধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সংবিধান সংস্কার কমিশন, আপনি এটার কথা বলছিলেন। সেই প্রস্তাবে কয়েকটি বিষয় এসেছে, তার মধ্যে একটি বড় বিষয় যদি বলি যে, মূলনীতি পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব আছে। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, বহুত্ববাদ আনার কথা বলা হয়েছে। এটা নিয়ে আপনার মতামত কী?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা এ বিষয়ে এখনই কথা বলবো না। আমাদের পার্টিতে একটা কমিটি তৈরি করা হয়েছে। সেই কমিটি অ্যানালিসিস করছে। এটা করার পরে আমাদের বক্তব্যটা আমরা পাবলিকলিই নিয়ে আসবো।

বিবিসি বাংলা: সেটা কবে?

বিএনপি মহাসচিব: দ্রুত, খুব দ্রুত। আর এটা তো খসড়া।

বিবিসি বাংলা: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের একটা প্রস্তাব এসেছে।

বিএনপি মহাসচিব: এই প্রস্তাব তো দিয়েছি আমরাও।

বিবিসি বাংলা: প্রস্তাবে যেভাবে দ্বিকক্ষের কথা হলা হয়েছে যে, নিম্নকক্ষ থাকবে নির্বাচনের ভিত্তিতে যেটি হয় এবং উচ্চকক্ষ আনুপাতিক ভোটের হিসেবে। আপনারা এটার সাথে একমত?

বিএনপি মহাসচিব: না, আমরা সেখানে একমত না। আমাদের ভিন্ন প্রস্তাব আছে, সেটা আমরা আলোচনার মাধ্যমে দেখবো।

বিবিসি বাংলা: আমরা এর মধ্যে দেখেছি যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের বেশকিছু দাবি বিভিন্ন সময় তুলেছিল, যেগুলো আপনারা বিরোধিতা করেছেন বা বাধার মুখে হয়নি। যদি কয়েকটি উদাহরণ দিই, যেমন-রাষ্ট্রপতি অপসারণের কথা, জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র দেওয়ার কথা এবং সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের একটা ইস্যু এসেছে, যেটা আপনারা বিরোধিতা করেছেন। এ বিষয়গুলোতে আপনাদের আপত্তির কারণ কী?

বিএনপি মহাসচিব: (হাসি) আপত্তির কারণ খুব সঙ্গত কারণ। আমরা তো একটা সংবিধানের অধীনে আছি। রাষ্ট্রের যে সংবিধান, সেই সংবিধানের অধীনে আমরা আছি। এই সরকারও শপথ নিয়েছে সেই সংবিধানের অধীনে। সেখানে রাষ্ট্রপতিকে যে অপসারণ করবে, সেটা কে করবে? এটা এক। দুই নম্বর হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি আনবেন কাকে? তিন নম্বর হচ্ছে, এটার লেজিটেমেসি কার হাতে থাকবে? পার্লামেন্ট নাই। সুতরাং ওই প্রশ্নটাকে আমরা মনে করি যে, অবাস্তব প্রশ্ন। আর যেখানে ওটা কোনো ক্রাইসিস ছিল না। ওই ধরনের কোনো ক্রাইসিস তৈরি হয়নি। সেটা আমরা মনে করেছি, এটা ক্রাইসিস তৈরি করা নতুন করে। আমাদের সামনে এখন একটাই মূল সমস্যা, সেটা হচ্ছে যে, আপনি নির্বাচন অতিদ্রুত করে ফেলা, একটা নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়া। এটা তো আপনার এসেন্স অব ডেমোক্রেসি।

এটা গেল এক। আপনার আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র। এটা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও করা হয়নি আগে, আমরা জানিও না এটা। আর (অভ্যুত্থানের) পাঁচমাস পরে এই ডিক্লারেশনের কোনো যুক্তি আছে কি-না? এটা কি আপনার সরকারি কর্মকর্তাদের চাকুরি ফিরিয়ে দেবার মত ব্যাপারটা? যেটা হয়েছে-হচ্ছে যে, যাদেরকে অপসারণ করা হয়েছিল ওই সরকারের আমলে, এখন আবার তারা ফেরত পাচ্ছে? এটা তা না। এটা একটা অভ্যুত্থান, একটা আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ডিক্লারেশন তখনই হওয়া উচিৎ ছিল। এটা ছাত্ররা তারা দিতেই পারে। কিন্তু আমরা ওটার পার্ট তখনই হবো, যখন গোটা জাতির প্রশ্নটা আসবে তার মধ্যে, টোটাল জিনিসটা। কোনো আলোচনা না করেই তো আমরা এটা করতে পারি না। প্রশ্নই উঠতে পারে না।

বিবিসি বাংলা: তো যে বিষয়টা তারা বলছেন যে, এটা একটা অভ্যুত্থান হয়েছে, একটা বিপ্লব হয়েছে এবং তারা সেখানে নেতৃত্বে ছিলেন। তারা এখন সেটি (ঘোষণা) দিতে চান।

বিএনপি মহাসচিব: দিতেই পারেন। ছাত্র হিসেবে তারা দিতেই পারেন। জাতি হিসেবে এবং পার্টি হিসেবে তো আমরা সেটার মধ্যে থাকতে পারি না। আমাদের ন্যারেটিভ আছে। ১৫ বছর আমরা লড়াই করেছি, সংগ্রাম করেছি। আমাদের এসব বিষয়গুলো এখানে থাকবে। এর আগে, সাতই নভেম্বরের বিষয়গুলো সেখানে আসতে হবে, নব্বইয়ের গণআন্দোলন সেখানে থাকতে হবে-এগুলো তো থাকতে হবে। আর একাত্তর হচ্ছে আমাদের অস্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ। সেই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে চব্বিশকে একমাত্র গুরুত্ব দেওয়ার কথা আসতে পারে না।

বিবিসি বাংলা: আপনি বলছিলেন যে, একাত্তরের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

বিএনপি মহাসচিব: আমি এর আগেও বলেছি। আমার কাছে কেন জানি মনে হয় যে, একটা পক্ষ একাত্তরকে একটু পেছনে রাখতে চায়।

বিবিসি বাংলা: কারা?

বিএনপি মহাসচিব: আছে কিছু হয়তো। তারা চেষ্টা করছেন। এটা আমার মনে হচ্ছে। আমি এক্সাক্টলি আপনাকে ঠিক বলবো না, বলতে পারবো না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, একাত্তরকে পেছনে ফেলার একটা চিন্তা-ভাবনা কারো কারো মধ্যে থাকতে পারে।

বিবিসি বাংলা: এতে কী সুবিধা হবে, একাত্তরকে যদি পেছনে ফেলা হয়?

বিএনপি মহাসচিব: যাদের সুবিধা হবে, সেটা আপনারা জানেন সবাই। আমি রিপিট করেতে চাই না।

বিবিসি বাংলা: জুলাই অভ্যুত্থানের বিষয়ে বলি। যখন নির্বাচনে কথা আসে, তখন ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে যে, নির্বাচনের জন্য জুলাই অভ্যুত্থান হয়নি। আপনাদের নির্বাচনের দাবির বিপরীতে জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটের কথাও প্রায়সময় বলা হয়। তো এই বিষয়টিকে আপনারা কীভাবে দেখেন?

বিএনপি মহাসচিব: আমাদের খুব পরিষ্কার করে বলা আছে, ভাই। আমরা আন্দোলন করছি, রাজনৈতিক দল করছি, দেশে একটা ডেমোক্রেটিক সেটআপের জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান জন্যে। আর গণতন্ত্রে ঢোকার প্রথম ধাপটিই হচ্ছে, নির্বাচন। যেহেতু তিন তিনটি নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকার নষ্ট করে দিয়েছে, জনগণ ভোট দিতে পারেনি। আমার ভোটের অধিকারটা তো প্রথম অধিকার নাগরিক হিসেবে। আমি এই দেশের মালিক। আমার একমাত্র হাতিয়ার হচ্ছে, আমার ভোটটা। সেটাই তো আমরা দিতে পারিনি। সুতরাং নির্বাচন চায় না বা নির্বাচন প্রধান নয়- এ কথা চিন্তা করাও তো ভুল। নির্বাচনটা আমরা মনে করি প্রধান। কারণ এই নির্বাচনের মাধ্যমেই আমি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারবো। আমি গণতান্ত্রিক সংবিধানের পরিবর্তনগুলো আনতে পারবো। গণতান্ত্রিক একটা রাষ্ট্র আবার পুনঃনির্মাণ করতে পারবো। এছাড়া আমার বিকল্প কিছু নেই।

বিবিসি বাংলা: আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে আপনাদের একটা দ্বিমত দেখা গেছে।

বিএনপি মহাসচিব: না, এটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। মিডিয়া এটাকে একুট ভুলভাবে প্রচার করছে।

বিবিসি বাংলা: কোন জায়গাটায় ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে?

বিএনপি মহাসচিব: আমরা কিন্তু পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটা পুরোপুরি জনগণের ব্যাপার। জনগণ যদি চায় যে, তারা কোনো দলকে নিষিদ্ধ করবে, তাহলে তারা করতেই পারে। সেটা কীভাবে হবে? সেটা পার্লামেন্টে হতে পারে বা অন্য কোনো মাধ্যমে হতে পারে।

বিবিসি বাংলা: কিন্তু কীভাবে আপনি জানবেন যে, জনগণ চাইছে কি চাইছে না?

বিএনপি মহাসচিব: ভোটের মাধ্যমে সেটা জানা যাবে। ইলেকশনের মাধ্যমেই সেটা জানা যাবে। আমি একটা পলিটিক্যাল পার্টি। আমি তো আরেকটা পলিটিক্যাল পার্টিকে নীতিগতভাবে, জামায়াতে ইসলামীকে যখন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, আমরা প্রতিবাদ করেছি। আমরা নীতিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে রাজনীতি করে, তাদেরকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটাতে আমরা কখনোই একমত হইনি। এটা আমরা বলেছি যে, জনগণ ডিসাইড করবে যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে-কি হবে না। এটা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে অনেক আমি জানি। কিন্তু এই বিতর্কের কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই না।

বিবিসি বাংলা: আপনি বলছিলেন ভোটের মাধ্যমে সেটা জানা যাবে। তো আগামী নির্বাচনে কি তাহলে আওয়ামী লীগ...

বিএনপি মহাসচিব: সেটা আওয়ামী লীগ আসতে পারলে আসবে, না আসতে পারলে আসবে না। দ্যাটস নট মাই পয়েন্ট। এক্ষেত্রে আমাদের কোনো কথা নেই। আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, কোন দল নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেটা তো দলগুলো নিজেরাই ঠিক করবে। তখনকার সেটআপ ঠিক করবে, ইলেকশন কমিশন ঠিক করবে। আমরা কথাটা খুব পরিষ্কার করেই বলছি যে, আমরা মনে করি কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার দায়িত্ব আমাদের না। আমরা চাই যে, জনগণের মাধ্যমে সবকিছু নির্ধারিত হবে।

mzamin

দ্রুত নির্বাচন না হলে অন্যান্য শক্তির উত্থান হতে পারে: আশঙ্কা মির্জা ফখরুলের

দ্রুত নির্বাচন না হলে অন্যান্য শক্তির উত্থান হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে শহীদ আসাদ পরিষদের উদ্যোগে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আসাদের ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকী’ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘একটা কথা আমি বলি, যে কথা বললে পরে আমার সমালোচনাও হয়। আমি বলি যে, নির্বাচনটা দ্রুত হওয়া দরকার। কেন বলি, এই কথাটা আমি বারবার বলার চেষ্টা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি যে, নির্বাচন থেকে আমরা ১৫ বছর বঞ্চিত, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার একটা সুযোগ পাবে।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখছেন যে, জোর করে সেই বিষয়টাকে যদি বিতর্কিত করে ফেলা হয় তাহলে তো জনগণ আবার সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। আমাদের যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, এই ধরনের নির্বাচন যদি দ্রুত না হয়, সময়ক্ষেপণ করা হয়, তাহলে অন্যান্য শক্তিগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। তখন জনগণের যে চাহিদা, সেই চাহিদা থেকে তারা পুরোপুরিভাবেই বঞ্চিত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এ কথাটা বার বার বলতে চাই, নির্বাচনে কে আসবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেটার জন্য আমরা লড়াই করেছি দীর্ঘ ১৫ বছর। আমি সেই কারণে বলেছি যে, আমাদের দরকার সত্যিকার অর্থেই বর্তমান যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে, সেই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। স্বাভাবিকভাবে একটা ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পরেই জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখন পর্যন্ত সমাজের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, সেই অবস্থায় কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না যে, সেখানে দেশের মানুষের প্রত্যাশাগুলো পূরণ হবে।’

নির্বাচনে জন্য কত অপেক্ষা এমন প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন রকম প্রোগ্রাম আছে, সেই কর্মসূচি নিয়ে তারা এগোতে চায়। তবে একটা বিষয় সবাই একমত- একটা নির্বাচন হওয়া দরকার। নির্বাচনটা শুধু একটা দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য একটা পথ সৃষ্টি করা, একটা দরজা খোলা। আজকে প্রশ্ন উঠছে যে, সংস্কার সবগুলো করে নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্ন। তাহলে কি আমরা ৪-৫ বছর ধরে অপেক্ষা করব বা যতদিন সংস্কার সম্পন্ন না হয় ততদিন ধরে অপেক্ষা করবে জনগণ?  তারা তাদের ভোটের অধিকার থেকে তো বঞ্চিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো দেখছি, আমাদের আমলাতন্ত্র আগের যে ব্যবস্থা ছিলো, সেই ব্যবস্থায় তারা এখনো সচিবালয় থেকে শুরু করে সমস্ত প্রশাসনে একইভাবে তাদের ভূমিকা পালন করছে, কোনো রদবদল হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজগুলোতে সেই ধরনের লেখাপড়া হয় না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। এটা অতীত থেকেই এসেছে এবং সেই পরিবর্তন এতো অল্প সময়ের সম্ভবও নয়। কিন্তু আমরা সেই পরিবর্তনগুলো চাই। সেই কারণে আমরা বলেছি যে, নির্বাচনটা দ্রুত হওয়া দরকার।’

ফখরুল বলেন, আমি এ কথা বুধবারও বলেছি, আমাকে একজন সাংবাদিক ভাই এ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি নিরপেক্ষ না থাকে তাহলে একটা নিরপেক্ষ সরকার দরকার হবে নির্বাচনের সময়ে। আমি কথাটা বলছি যে, এর কারণ আছে। কারণ হচ্ছে যে, আমরা দেখছি যে, বেশ কিছু বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরপেক্ষতা পালন করতে পারছেন না। আমি অনুরোধ করব, আমি প্রত্যাশা করব, আমি আশা করি যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সেই নিরপেক্ষতা পালন করবে এবং দেশে যে সংকট আছে সেই সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য তারা কাজ করবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের এই ন্যূনতম যে সংস্কার হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক, সেই সংস্কার শেষ করে আমাদের অতি দ্রুত নির্বাচনের পথে যাওয়া উচিত। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার বেরিয়ে আসবে তাদের দায়িত্ব হবে এখানে পুরোপুরিভাবে সেই সংস্কারের যে কমিটমেন্ট আছে, সেই কমিটমেন্টগুলো বাস্তবায়িত করা, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। আসাদের রক্ত, আবু সাইদের রক্তকে আমরা বৃথা যেতে দিতে পারি না। সেই জন্য আমাদের সকল ঐক্য গড়ে তুলে তাদের (শহীদদের) স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।’

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ‘র সভাপতিত্বে ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের সদস্য সচিব হাবিবুর রহমান রিজুর সঞ্চালনায় সভায় বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) একাংশের সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান, অপর অংশের সাধারণ সম্পাদক আসাদুর রহমান খান আসাদ, শহীদ আসাদের ছোট ভাই আজিজুল্লাহ এম নুরুজ্জামান নূর প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

mzamin


বিএনপি মহাসচিবের নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আরেকটা ১/১১ সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে -উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মূলত আরেকটা ১/১১ সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে তার ফেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে এ মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারলে নির্বাচন করতে পারবেন না।’ তার এই সাক্ষাৎকারের পরই তথ্য উপদেষ্টার কাছ থেকে এমন মন্তব্য এলো।

ওই ফেসবুক পোস্টে মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি মহাসচিবের নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মূলত আরেকটা ১/১১ সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। ১/১১ এর বন্দোবস্ত থেকেই আওয়ামী ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিলো। বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে সামনে আরেকটা ১/১১ সরকার, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা এবং গুম-খুন ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার আলামত রয়েছে। ছাত্র ও অভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে মাইনাস করার পরিকল্পনা ৫ই আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছে। ৫ই আগস্ট যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে লড়াই করছে, পুলিশের গুলি অব্যাহত রয়েছে, তখন আমাদের আপসকামী অনেক জাতীয় নেতৃবৃন্দ ক্যান্টনমেন্টে জনগণকে বাদ দিয়ে নতুন সরকার করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন (অনেকে ছাত্রদের কথাও বলেছেন সেখানে)। আমরা ৩ই অগাস্ট থেকে বলে আসছি আমরা কোনো প্রকারের সেনা শাসন বা জরুরি অবস্থা মেনে নেব না। আমাদেরকে বারবার ক্যান্টনমেন্টে যেতে বলা হলেও আমরা যেতে অস্বীকার করি। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে আলোচনা ও বার্গেনিং এর মাধ্যমে ড. ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।’

জাতীয় সরকার চেয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে একটা জাতীয় সরকার। জাতীয় সরকার হলে ছাত্রদের হয়তো সরকারে আসার প্রয়োজন হতো না। জাতীয় সরকার অনেকদিন স্থায়ী হবে এই বিবেচনায় বিএনপি জাতীয় সরকারে রাজি হয় নাই। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরেই দেশে জাতীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল। অথচ বিএনপি জাতীয় সরকারের কথা বলতেছে সামনের নির্বাচনের পরে। ছাত্ররাই এই সরকারের এবং বিদ্যমান বাস্তবতার একমাত্র ফ্যাক্টর যেটা ১/১১ এর সরকার থেকে বর্তমান সরকারকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে। বিএনপি কয়েকদিন আগে মাইনাস টু-এর আলোচনা করলেও এখন ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করার জন্য নিরপেক্ষ সরকারের নামে আরেকটি ১/১১ সরকারের প্রস্তাবনা করছে। এ ধরনের পরিকল্পনা গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে এবং ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না। এবং আমি মনে করি এটা বিএনপির বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র। আর এই সরকার জাতীয় সরকার না হলেও সরকারে আন্দোলনের সব পক্ষেরই অংশীদারত্ব রয়েছে এবং সব পক্ষই নানান সুবিধা ভোগ করছে।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘সরকার গঠনের আগেই ৬ই আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল এবং পুলিশের আগের আইজির নিয়োগ হয়েছিল যারা মূলত বিএনপির লোক। এরকমভাবে সরকারের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত নানান স্তরে বিএনপিপন্থী লোকজন রয়েছে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতার কথা বললে এই বাস্তবতায়ও মাথায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন, সংস্কার, নতুন সংবিধান, জুলাই ঘোষণা সব ইস্যুতেই বিএনপি বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অথচ এগুলা কোনোটাই ছাত্রদের দলীয় কোনো দাবি ছিল না। কিন্তু দেশের স্থিতিশীলতা, বৃহত্তর স্বার্থ এবং জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার জন্য ছাত্ররা বারবার তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। কিন্তু এর মানে এই না যে গণতন্ত্রবিরোধী ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বিরোধী কোনো পরিকল্পনা হলে সেখানে আমরা বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেবো।’

তথ্য উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ বিষয়ে ভারতের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ঐক্য সম্ভব হয়েছে অথচ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিষয়ে আমরা ঐক্য করতে পারি নাই এত হত্যা ও অপরাধের পরেও। হায় এই ‘জাতীয় ঐক্য’ লইয়া আমরা কি রাষ্ট্র বানাবো!’’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে দুর্বল করা সহজ। কারণ বাংলাদেশকে সহজেই বিভাজিত করা যায়। এ দেশের বড় বড় লোকেরা অল্পমূল্যে বিক্রি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। আমি মনে করি না সমগ্র বিএনপি এই অবস্থান গ্রহণ করে। বরং বিএনপির কর্মী সমর্থকদের বড় অংশই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন চায়।’

বিএনপির দেশপ্রেমিক ও ত্যাগী নেতৃত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘বিএনপির দেশপ্রেমিক ও ত্যাগী নেতৃত্বকে আহবান করব, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে না গিয়ে ছাত্র-জনতার সাথে বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতির পথ বেছে নিন।’

mzamin

পানামা খাল দখল করতে গেলে বিপদে পড়তে পারেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার তাঁর অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনে পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। পরের দিন মঙ্গলবার ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছে পানামা।

ট্রাম্প যদি শক্তি প্রয়োগ, বিশেষ করে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে পানামা খাল দখলের চেষ্টা করেন, তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের নীতিবিরুদ্ধ। তা ছাড়া যুদ্ধ করাটা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নীতিরও বিরোধী। কারণ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধ করার বিরোধিতা করে আসছেন। তাই হঠাৎ তিনি যদি পানামা খাল দখলের জন্য একটি বড় রকমের যুদ্ধ শুরু করেন, তা জনসমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হতে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার (১৯৭৭-৮১) পানামা খাল পানামা সরকারের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পানামা খাল চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাস হয় ১৯৭৮ সালে। জিমি কার্টার এই চুক্তির পক্ষে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্যের ভোট আদায় করতে পেরেছিলেন।

পানামা খাল পানামা সরকারের কাছে ফেরত দেওয়াটাকে ন্যায্য মনে করতেন জিমি কার্টার। ওয়াশিংটন যেহেতু তখন পর্যন্ত মধ্য আমেরিকায় আধা ঔপনিবেশিক নীতি অনুসরণ করত, তাই জিমি কার্টারের পানামা খাল ফেরত দেওয়ার মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।

জিমি কার্টার পানামা খাল চুক্তি সই করেছিলেন—এ কথা বলার পাশাপাশি এটাও বলা দরকার যে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের প্রেসিডেন্টরাই চুক্তিটির শর্ত মেনে চলেছেন। এসব প্রেসিডেন্টের মধ্যে রয়েছেন রোনাল্ড রিগ্যান, জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও বিল ক্লিনটন। বিল ক্লিনটনের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পানামা খাল পরিচালনার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পানামা সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এর পর থেকে পানামা খালের পরিচালনা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রশাসনের তথ্যমতে, আমেরিকার বন্দরগুলোয় যাতায়াত করা জাহাজগুলোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পানামা খাল ব্যবহার করে।

গত সোমবার ভাষণের আগেও গত ডিসেম্বরে পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের করা এক মন্তব্যের জবাবে পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, পানামা খাল ও এর আশপাশের অঞ্চলের প্রতি বর্গমিটার জায়গার বর্তমান মালিক পানামা এবং ভবিষ্যতেও তা পানামার থাকবে।’

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে লেখা চিঠিতে সংস্থাটির ঘোষণার একটি ধারার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘ট্রাম্পের হুমকিতে আমরা উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘের ঘোষণায় “অন্য দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা ভূখণ্ডের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহার বা হুমকি” দেওয়া যাবে না বলে বলা হয়েছে।’

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের অভিযোগ, চীন পানামা খাল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে, পানামা সরকার এ সুযোগ করে দিচ্ছে। কিন্তু পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো ট্রাম্পের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পাশাপাশি মঙ্গলবার এ খালে কার্যক্রম পরিচালনা করে—হংকংভিত্তিক এমন দুটি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত করারও নির্দেশ দিয়েছে পানামা সরকার।

হুমকি অনুযায়ী পানামা খাল দখলে ট্রাম্প যদি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে, তা গুরুতর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। পানামা খালের এলাকার আয়তন প্রায় ৫০০ বর্গমাইল। আর পানামার জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। পানামা খাল যুক্তরাষ্ট্রের দখলে থাকুক—এটি দেশটির জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কোনোভাবেই চাইবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, ‘কোনো সামরিক অভিযান সফল করার জন্য প্রতি এক হাজার বাসিন্দার বিরুদ্ধে ২০ জন যোদ্ধা দরকার হয়।’ সেই হিসাবে পানামার বর্তমান জনসংখ্যা অনুসারে পানামা খাল দখলে নেওয়ার জন্য যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় ৯০ হাজার সেনা মোতায়েন করতে হবে। ট্রাম্প এত বড় পরিসরে কোনো যুদ্ধ শুরু করলে তাঁকে চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে।

অন্যদিকে পানামায় সামরিক অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রস্তাব পাস করা লাগবে। দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এই ধরনের প্রস্তাব পাস করার জন্য পর্যাপ্ত সমর্থন পেতেও ট্রাম্পকে হিমশিম খেতে হবে। কারণ, উভয় দলের অনেক কংগ্রেস সদস্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পানামা খাল দখলের বিরোধিতা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পানামা খালের দখল নিয়ে যুদ্ধ শুরু হলে সেটির ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়বে। এই খাল দিয়ে প্রতিবছর বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৬ শতাংশ হয়ে থাকে। অথচ এরই মধ্যে লোহিত সাগরের সুয়েজ খালে দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অস্থির করে তুলেছে ইয়েমেনের হুতিরা। এ খাল দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য হয়ে থাকে।

প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ওপরই তাঁর রাজনৈতিক জীবন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তাই বলে পানামা খাল দখলের জন্য সামরিক শক্তির ব্যবহার হবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ—এ ধরনের অভিযান ব্যর্থ হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে নাৎসিদের প্রতীকসংবলিত পোস্টার পোড়াচ্ছেন পানামার শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা। পানামা সিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সামনে, ২০ জানুয়ারি ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে নাৎসিদের প্রতীকসংবলিত পোস্টার পোড়াচ্ছেন পানামার শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা। পানামা সিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সামনে, ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

H-1B ভিসা নিয়ে বড় বার্তা ট্রাম্পের: শুধু ইঞ্জিনিয়ার নয়, সবক্ষেত্রেই দক্ষ লোক আমেরিকায় আসুক

এইচ-১বি ভিসা নিয়ে কড়াকড়ির কথা আগেই বলেছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতায় আসতেই সেই নিয়ম কার্যকর করতে চলেছেন তিনি। হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন নয়া প্রেসিডেন্ট।

ওরাকল সংস্থার সিটিও ল্যারি এলিসন, সফটব্যাংক সিইও মাসায়োশি সন এবং ওপেন এআই সিইও স্যাম অল্টম্যানকে সঙ্গে নিয়ে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে এইচ-১বি ভিসা নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি দু’পক্ষের যুক্তিই গ্রহণ করেছি। তবে আমি চাই ভিন দেশে থেকে যারা আমেরিকায় আসছেন, তারা যেন যোগ্য এবং দক্ষ হন। এমনকি যারা অন্যদের সাহায্য করতে কিংবা প্রশিক্ষণ নিতে আসছেন, তারাও যেন যোগ্য হন। আমি কেবল ইঞ্জিনিয়ারদের কথা বলছি না। সব স্তরের মানুষের কথাই বলছি।’

গত কয়েকদিনে এইচ-১বি ভিসার নিয়মাবলী নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক চলছে। যেমন ইলন মাস্ক নিজে এই কড়াকড়ির পক্ষে নন। তিনি এই ভিসার মাধ্যমে সে দেশে দক্ষ কর্মীদের নিয়ে যাওয়ার পক্ষে। আবার অনেকের মতে, এইচ-১বি ভিসায় কড়াকড়ি না আনলে দিনে দিনে চাকরির বেশিরভাগটাই চলে যাবে অনাবাসীদের মধ্যে। আমেরিকানরাই আর নিজেদের দেশে চাকরি পাবেন না।

ট্রাম্প বলেন, তিনি দু'পক্ষের তর্ক বিতর্ক, যুক্তি  মন দিয়ে শুনেছেন। তারপরেই জানালেন তার বক্তব্য। হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্প জানান, ইঞ্জিনিয়ারের পাশাপাশি রেস্তরাঁ কর্মী থেকে সুরা বিশেষজ্ঞ, অর্থাৎ সর্বস্তরে তিনি চান দক্ষ ব্যক্তিদের।

একাধিক মহলের দাবি দক্ষ কর্মীর অভাবে ভুগছে মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি মহল। মার্কিন শ্রম বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যে আমেরিকার প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ১২ লাখ কর্মচারীর (১.২ মিলিয়ন) অভাব হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে চাহিদা পূরণের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৩.৫ লাখ প্রযুক্তিবিদ লাগবে বলে অনুমান করা হয়েছে

শুধু তাই নয় সংশ্লিষ্ট মহলের মতে আমেরিকায় দক্ষ ঘরোয়া কর্মচারীদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে ক্রমশ দক্ষ বিদেশি কর্মীদের উপরে আমেরিকার নির্ভরশীলতা বদ্ধি পাচ্ছে।

মার্কিন শ্রম বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩৩ সালের মধ্যে আমেরিকার প্রযুক্তি ক্ষেত্রে শূন্যপদের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০ লাখ হয়ে যাবে। সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ক্ষেত্রের উন্নতির গ্রাফ বজায় রাখতে এইচ-১বি ভিসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।

সূত্র : বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

mzamin

পারকিনসন্সের চিকিৎসায় 'ব্রেনসেন্স' প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুগান্তকারী সাড়া

পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় ব্রেন ইমপ্লান্টের পদ্ধতিকে ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (DBS) বলা হয়। এটি একটি নিউরোসার্জিক্যাল পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ইলেক্ট্রোড ইমপ্লান্ট করা হয়। এই ইলেক্ট্রোডের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো হয়, যা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিবর্তন করে।

পারকিনসন্সে আক্রান্ত যুক্তরাজ্যের উত্তর-পূর্বের  লোকেরা ব্রেন ইমপ্লান্টের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বের মধ্যে প্রথম। সান্ডারল্যান্ডের কেভিন হিলের মতো রোগী, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত এইচজিভি ড্রাইভার  ২০১৭ সাল থেকে পারকিনসন্সে আক্রান্ত।  ইতিমধ্যেই তার মস্তিষ্কে ইমপ্লান্ট এবং বুকে একটি ছোট কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিচালিত ‘গভীর মস্তিষ্কের উদ্দীপনা’ প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হয়েছেন। ব্রেনসেন্স নামে পরিচিত এই প্রযুক্তিটি রোগীর লক্ষণগুলো পরিচালনা করতে বৈদ্যুতিক বার্তা প্রেরণ করে।

ব্রেনসেন্স প্রযুক্তিটি কেভিনের ইমপ্লান্টের উপর ভিত্তি করে কাজ করবে ।  রোগীকে তাদের প্রয়োজনীয়  পরিবর্তনের সাথে সাথে  সামঞ্জস্য করার জন্য আর হাসপাতালে ফিরে যেতে হবে না।

ক্রনিকেল লাইভ-এর  প্রতিবেদনে বলা হয়,  কেভিন জানাচ্ছেন- ইমপ্লান্টের আগে আমি শরীরে কম্পন অনুভব করতাম।  যা আমার ঘুমকে প্রভাবিত করেছিল এবং আমার কাঁধ, হাত ও পায়ে ভয়ানক ব্যথা হতো। এটি আমাকে মানসিকভাবেও প্রভাবিত করেছিল। আমি সত্যিই আত্মসচেতন হয়ে উঠেছিলাম এবং অন্য লোকদের সঙ্গে দেখা করতে চাইতাম না।

কেভিনের কথায়, ‘ আমি যে ওষুধ খাচ্ছিলাম  তা  কাজ করছিল না এবং আমাকে আমার চাকরিও ছেড়ে দিতে হয়েছিল। যখন আমাকে ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন রেফার করা হয়েছিল, তখন আমাকে বলা হয় এটি প্রভাব ফেলতে কিছুটা সময় নিতে পারে। কিন্তু ব্রেনসেন্স প্রযুক্তিটি  আমার শরীরে  দুর্দান্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। এটি আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে এবং আমার কাঁপুনি, ব্যথা ও  বেদনাকে সম্পূর্ণরূপে সারিয়ে দিয়েছে। আমি আমার জয়েন্টগুলোতে আরও নমনীয়তা দেখতে পেয়েছি এবং আমার ঘুমের সমস্যা অনেকটা কমেছে । আমি আবার জীবনকে উপভোগ করছি, স্নুকার খেলছি এবং বাইকে উঠছি।‘

কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন আকবর হোসেনের প্রযুক্তির প্রতি অনুরাগ নিউক্যাসল হাসপাতালকে এই অসাধ্য সাধন করতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, ‘পারকিনসন্স রোগের প্রতিটি ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আলাদা এবং অনন্য। রোগের অগ্রগতির সাথে সাথে লক্ষণগুলো পরিবর্তিত হয়, তবে সেগুলো একদিনের মধ্যেও পরিবর্তিত হতে পারে। নিউক্যাসল ছিল যুক্তরাজ্যের প্রথম হাসপাতাল যেখানে ব্রেনসেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে । এই সিস্টেমটি ব্যবহার করে  আমরা রোগীদের উন্নত জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি ।‘

ডাক্তার আকবর হোসেন  জানাচ্ছেন যে,  ব্রেনসেন্স প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয়তা ‘আশ্চর্যজনক’ ছিল।  ডিভাইস দ্বারা মস্তিষ্কে প্রদত্ত বৈদ্যুতিক আবেগগুলো রোগীদের  বুকে থাকা ডিভাইস থেকে  স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং সমন্বয় করা যায়। ব্যক্তির মধ্যে উৎপন্ন জৈবিক সংকেত ইমপ্লান্ট দ্বারা প্রদত্ত চিকিত্সা পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা দেখিয়েছে । এই পরিবর্তনগুলো মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যে ঘটতে পারে। যার অর্থ নতুন এই চিকিত্সা পদ্ধতি প্রতিটি ব্যক্তির সঠিক প্রয়োজনের জন্য সত্যিই প্রতিক্রিয়াশীল। আমি সত্যিই উত্তেজিত এবং গর্বিত যে, আমরা আমাদের রোগীদের এই পরিষেবা অফার করতে পেরেছি।'

ব্রেনসেন্স প্রযুক্তিটি তৈরি করেছে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিক। সেখানকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট আমাজা রেইটমেয়ার বলেছেন যে, ‘নতুন প্রযুক্তির অর্থ পারকিনসন্সের রোগীদের তাদের শারীরিক সমস্যা নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।' যুক্তরাজ্যে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মানুষ মানুষ পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত।

উল্লেখ্য যে, নিউরোসার্জন আকবর হোসেনের বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে। তিনি বিলেত প্রবাসী মাহতাব মিয়ার জামাতা। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. নাজিবার স্বামী।

mzamin

ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি কি টিকবে by সাইমন টিসডাল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বা হামাসের নতুন নেতৃত্ব—কাউকেই গত সপ্তাহে হওয়া যুদ্ধবিরতিটি দীর্ঘস্থায়ী করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের চাপে নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে রাজি হতে কার্যত বাধ্য হয়েছেন।

গত মে মাসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও নিজের কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের চাপে নেতানিয়াহু সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন। কিন্তু এখন ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠান যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য নেতানিয়াহু নিতান্তই অনিচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন।

চুক্তি হওয়ার পরপরই নেতানিয়াহু তাঁর ক্ষুব্ধ মন্ত্রীদের আশ্বস্ত করেছেন, এটি সাময়িক এবং তিনি পুরোপুরি এই চুক্তির শর্ত মেনে চলবেন না। জানা যাচ্ছে, তিনি যুদ্ধবিরতির প্রতিবাদে পদত্যাগ করা কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং আরেক কট্টরপন্থী নেতা বেজালেল স্মোত্রিচকে আশ্বাস দিয়েছেন, খুব শিগগির যুদ্ধ আবার শুরু হবে। যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায় ছয় সপ্তাহ চলবে।

এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। সেখানে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ সামরিক প্রত্যাহার এবং জীবিত সব জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে আরও ফিলিস্তিনি বন্দীকে ছেড়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এই আলোচনা আদৌ শুরু হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ–এর বিশ্লেষক আমির টিবন লিখেছেন, ‘নেতানিয়াহুর সামনে যুদ্ধবিরতি বানচাল করার দুটি উপায় রয়েছে—এক. দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা (যা তিনি আগেও বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে করেছেন) এবং দুই. পশ্চিম তীরে সংঘর্ষ উসকে দেওয়া। সেখানে এখন আগুন জ্বলছে। তিন জিম্মির ফিরে আসাকে যখন লাখো ইসরায়েলি উদ্‌যাপন করছিলেন, সে মুহূর্তে পশ্চিম তীরের কট্টরপন্থী ইহুদি বসতির বাসিন্দারা কয়েকটি ফিলিস্তিনি গ্রামে বাড়িঘর ও গাড়িতে আগুন ধরিয়েছেন।’

এর বাইরে নেতানিয়াহু দাবি করে বসতে পারেন, হামাস চুক্তির শর্ত মানছে না। গাজা ও লেবাননের ছোটখাটো সংঘর্ষও যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার সম্ভাব্য অজুহাত হতে পারে। আসলে আগামী দুই সপ্তাহে নেতানিয়াহু কী করেন, তার ওপর এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

অনেকে বলছেন, নেতানিয়াহু শান্তির পথে হাঁটতেও পারেন এবং সরকার ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঝুঁকিও নিতে পারেন। সে পরিস্থিতিতে তিনি হামাসকে পরাজিত করার কৃতিত্ব নিয়ে নিজেকে একজন যুদ্ধনেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। এ মুহূর্তে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইসরায়েলি ভোটার যুদ্ধের অবসান চান। ফলে নেতানিয়াহু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তিনি হোয়াইট হাউসের সমর্থন পাবেন। ইসরায়েল হোয়াইট হাউসের সমর্থন পেলে তা ট্রাম্পের সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এবং ইরানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

সমস্যা হলো, হামাস ও তার মিত্র ইসলামিক জিহাদও যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করতে চায় না। রোববার বন্দী বিনিময়ের সময় অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় দেখা যায় হামাসকে। হামাসের এ শক্তি প্রদর্শন যদিও সীমিত ছিল, তবু এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে হামাস এখনো টিকে আছে, তারা এখনো অবশিষ্ট জিম্মিদের নিয়ন্ত্রণ করছে এবং গাজায় এখনো কোনো বিকল্প প্রশাসন নেই। সোমবার এক বিবৃতিতে হামাস ঘোষণা দিয়েছে, তাদের নেতৃত্বেই গাজা আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

এদিকে মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন টেকনোক্র্যাট সরকার গঠনের আলোচনা চলছে। পশ্চিম তীরে যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ রয়েছে, তার মাধ্যমে গাজা পরিচালনার কথাও উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো কেউ দায়িত্ব গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। ফলে হামাসই শূন্যস্থান পূরণ করছে। এর জন্য আংশিকভাবে দায়ী নেতানিয়াহু। কারণ, তিনি ১৫ মাস ধরে যুদ্ধপরবর্তী পরিকল্পনা করেননি বা এ বিষয়ে আলোচনা করতেই রাজি হননি।

আগামী সপ্তাহগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, হামাস সম্ভবত দ্রুত তার সামরিক শক্তি পুনর্গঠন শুরু করবে; কারণ, তারা এই যুদ্ধে যে ধ্বংসের শিকার হয়েছে, তার প্রতিশোধ নিতে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আগের মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সময় দেখা গেছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুই পক্ষকে চুক্তি মানতে বাধ্য করার জন্য সক্রিয় হতেন। কিন্তু ট্রাম্প সে ধরনের প্রেসিডেন্ট নন। এর ফলে যদি নেতানিয়াহু ও হামাসের নেতৃত্ব পুনরায় যুদ্ধের পথে হাঁটে, তাহলে হয়তো কেউই তাদের থামাতে পারবে না; যদিও অধিকাংশ ইসরায়েলি, ফিলিস্তিনি এবং সারা বিশ্বের মানুষ এখন শান্তির জন্য অপেক্ষা করছে।

সাইমন টিসডাল দ্য অবজারভার-এর বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত 

গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং বন্দিবিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পেয়েছেন ফিলিস্তিনি নারী নিদা জাগেবি। দীর্ঘদিন পর কাছে পেয়ে দুই মেয়েকে মায়ের আলিঙ্গন। গতকাল পশ্চিম তীরের জেনিনে
গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং বন্দিবিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পেয়েছেন ফিলিস্তিনি নারী নিদা জাগেবি। দীর্ঘদিন পর কাছে পেয়ে দুই মেয়েকে মায়ের আলিঙ্গন। গতকাল পশ্চিম তীরের জেনিনে। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে তোলপাড়, বিপাকে বাংলাদেশিরাও

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের কঠোর হস্তে দমনের নীতি ঘোষণা করেছেন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যেসব অভিবাসীর কাছে বৈধ কাগজপত্র বা ডকুমেন্ট নেই, তাদেরকেই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০শে জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন ট্রাম্প। পরদিন মঙ্গলবার শতাধিক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। ওদিকে এরই মধ্যে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় শুরু হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে যেসব বাংলাদেশি বৈধ কাগজপত্রবিহীন বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশিই নন, যুক্তরাষ্ট্রে যারাই অবৈধ অভিবাসী এই আতঙ্ক তাদের সবার। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ডেমোক্রেট নিয়ন্ত্রিত ২২টি অঙ্গরাজ্য ও ২টি শহর। অঙ্গরাজ্য ও শহর দু’টির পাশাপাশি ওই আইনি লড়াইয়ে শরিক হয়েছে বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠনও। মঙ্গলবার বোস্টনের একটি প্রাদেশিক আদালতে ওই মামলা করেছে ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া এবং সানফ্রান্সিসকো শহর সহ মোট ২২টি অঙ্গরাজ্যের একটি জোট। যার নেতৃত্বে রয়েছে ডেমোক্রেট দলের নেতারা। তাদের দাবি জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণীত অধিকার। এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফলে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ট্রাম্পকে।

এই মামলা একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে, তাও বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তিধর প্রেসিডেন্ট তিনি। ফলে মামলা টিকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু এর ফলে এটা ইঙ্গিত মিলছে যে, ট্রাম্প নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেলেও তাকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেবেন না ডেমোক্রেটরা। তারাও তাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্যে রাখবেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। মিডিয়ার খবর বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস ইনফোর্সমেন্ট নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন বরো’র ফুলটন থেকে গ্রেপ্তার করেছে চার বাংলাদেশিকে। সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা ঘরের বাইরে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। কিন্তু তাতেও কি রক্ষা আছে। অভিবাসন কর্মকর্তারা বাড়িঘরেও হানা দিতে পারেন। নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনকে অনেকেই বাঙালিপাড়া হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে যারা যুক্তরাষ্ট্রে যান, তাদের বেশির ভাগই প্রথমে ব্রুকলিনে আশ্রয় নেন। অনেকে সেখানেই অবস্থান করেন। বিভিন্ন রকম কাজ জুটিয়ে নিয়ে থেকে যান ব্রুকলিনে। খবরটি মার্কিন প্রশাসনও জানে। ফলে তাদের চোখ যে সেদিকে পড়বে তা হলফ করেই বলা যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই ঘোষণা দিয়েছেন অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে যার যার দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এমন হুঁশিয়ারির ভয়ে বহু বাংলাদেশি। তাদের সামনে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস ইনফোর্সমেন্টের কর্মকর্তারা সাদা পোশাকে হাজির হচ্ছেন। এ জন্য তাদের আগে থেকে কেউ চিনতে পারছেন না। নিজে আত্মগোপন করারও সুযোগ পাচ্ছেন না। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক বাংলাদেশি মিডিয়াকে বলেছেন- তারা ফুলটনের একটি এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলেন। অতর্কিতে সেখানে সাদা পোশাকে কয়েকজন কর্মকর্তা গিয়ে উপস্থিত হন। তারা তাদেরকে পরিচয়পত্র দেখাতে বলেন। কিন্তু তার প্রতিবাদ করেন এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম সংশোধনী অনুযায়ী তিনি পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য নন। তার এমন আচরণ দেখে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। ওই আড্ডায় থাকা অন্যদের ছেড়ে দেয় তারা। এর থেকে কিছুটা দূরে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস ইনফোর্সমেন্টের কর্মকর্তারা। তবে এসব বাংলাদেশির কারও নাম, পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

শপথ নিয়ে ৭৮ বছর বয়সী ট্রাম্প সোমবারই সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে সমালোচনা করেন এসব অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেয়ার জন্য। তিনি দাবি করেন লাখ লাখ অভিবাসী সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে। তারা নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। বাইডেনের প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র এসব অপরাধীর অভয়ারণ্য ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। কিন্তু ট্রাম্প তার আমেরিকা ফার্স্ট নীতির অধীনে শুধু বাংলাদেশি নন, সারা বিশ্বের যেসব অবৈধ অভিবাসী আছেন তাদের বের করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এ জন্য তিনি সীমান্তে প্রবেশকে প্রথমেই বন্ধ করে দেয়ার কথা বলেন। ইতিমধ্যে মেক্সিকো সীমান্তে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। রাখা হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এই আদেশের আওতায় অভিবাসীদের বৈধতা দেয়ার একটি প্রকল্পও বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত বিষয়ক কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অ্যাটর্নি রাজু মহাজন মিডিয়াকে বলেছেন, ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। যারা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা সহ দক্ষিণ আমেরিকার পথ ধরে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে ঢুকতেন, সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। আগে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব  দেয়া হতো। সে হিসেবে অভিবাসীরা বিভিন্ন জায়গায় চাকরির ব্যাপক সুযোগ পেয়েছেন। এখন থেকে মেধার ভিত্তিতে সেসব নিয়োগ নির্ধারিত হবে। ফলে ছাঁটাই হতে পারেন অসংখ্য বাংলাদেশি। সংবিধানের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশ জারি করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের একটি বিধানও বাতিল করেছেন ট্রাম্প। এতে এখন  থেকে ৩০ দিন পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানরা দেশটির নাগরিকত্ব পাবে না। তবে ইতিমধ্যে এই নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে ২৪টি রাজ্য ও শহরে মামলা হয়েছে। যেহেতু এটা মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনের বিরুদ্ধে যায়, সে কারণে হাইকোর্ট এটি বাতিল করে দিতে পারে। খাদিজা মুনতাহা বাংলাদেশিদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, আইনপ্রয়োগকারী কোনো সংস্থার সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাদের সহযোগিতা করতে হবে। অন্যের ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে কাজ করা বন্ধ করতে হবে। এই কঠিন সময়ে অহেতুক পুলিশি অথবা অন্যকোনো বিবাদ অথবা ঝামেলায় জড়ানো যাবে না। সরজমিন দেখা গেছে, বাঙালি-অধ্যুষিত এলাকার সড়ক ও রেস্তরাঁয় যেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড় দেখা যেত, এখন সেখানে  লোকজনের ভিড় নেই বললেই চলে। ইতিমধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

mzamin


ট্রাম্প যুগ: তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় এসেই তোলপাড় সৃষ্টি করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ২০শে জানুয়ারি শপথ নেয়ার পরই তিনি শতাধিক নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। তা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তৈরি হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির নতুন এক সমীকরণ। এর মধ্যে মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনেও তিনি তার গতি ধরে রেখেছেন। ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গাকারীদের ক্ষমা করে দেয়ার পক্ষে কথা বলেছেন এদিন। বলেছেন, ডাইভার্সিটি, ইকুইটি এবং ইনক্লুশন (ডিইআই) কর্মসূচি খর্ব করবেন। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক অবকাঠামো বিষয়ক বহু কোটি ডলারের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তার ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বিষয়ক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ৫০,০০০ কোটি ডলারের এআই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। চীনের ওপর শতকরা ১০ ভাগ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। এখানেই শেষ নয়, তিনি মঙ্গলবার রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথম কর্মদিবসে উপস্থিত হলে এ ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এর আগে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল মিটিং করেন। তারপর ওপেনএআই, ওরাকল এবং সফটব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাখাকে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা আসে। নতুন প্রশাসনের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গাকারীদের পক্ষে কথা বলেন। তিনি সোমবার কমপক্ষে এমন ১৫০০ ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। তারা কয়েক বছর জেল খেটেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, অথচ যুক্তরাষ্ট্রে খুনিদের জেলে যেতে হয়নি। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে চীনে তৈরি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করছেন। ট্রাম্প বলেন, মেক্সিকো ও কানাডার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল পাঠাচ্ছে চীন। এটি একটি নেশাদ্রব্য। এর আগে তিনি মেক্সিকো ও কানাডার বিরুদ্ধে শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এই দু’টি দেশের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযোগ হলো তারা ডকুমেন্টবিহীন অবৈধ অভিবাসী ও মাদক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দিচ্ছে। ডনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করবেন তিনি। ওদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চীনকে আরও বেশি হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন। পুতিনের প্রসঙ্গে জিনপিংকে তিনি বলেছেন- এ বিষয়ে (যুদ্ধবিরতি) তিনি (পুতিন) যথেষ্ট করছেন না। আপনাকে এর সমাধানে চেষ্টা করতে হবে। আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করেছি। ওদিকে শপথগ্রহণের প্রার্থনা অনুষ্ঠানের সময় ওয়াশিংটন ডিসির এপিস্কোপাল বিশপ তার ঐশীবাণী পাঠ করার সময় ট্রাম্পের দিকে তাকান এবং তার প্রতি আহ্বান জানান- তিনি যেন অভিবাসী, সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার যুবকদের বিষয়ে করুণা দেখান। পরে ওই প্রার্থনা নিয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন- এই প্রার্থনাটা ভালো হয়নি বলে তিনি মনে করেন। এটা আরও ভালো হতে পারতো বলে তিনি মনে করেন। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নেও শুল্ক প্রয়োগের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ‘চীন অপব্যবহারকারী। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন খুবই খারাপ আমাদের জন্য- এমনটা বলেছেন ট্রাম্প’। তিনি বলেন, তারা আমাদের সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করেন। সেজন্যই আমাদের শুল্কের দিকে যেতে হবে। নিজেদের ফিরে পাওয়ার এটাই একমাত্র পথ। ন্যায্যতা পাওয়ার জন্যও এটা একমাত্র উপায়। এর আগে  সোমবার শপথগ্রহণের পরপরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সহযোগীদের সঙ্গে থাকা চুক্তিগুলো পর্যালোচনা এবং তাতে অন্যায্য কিছু থাকলে তা চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে চীনা একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ‘সুরক্ষাবাদ’-এর সমালোচনা করেছেন। চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ডিং শেসিয়াং যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করেই বাণিজ্য বিরোধ মেটাতে ‘উইন উইন’ সমাধানের আহ্বান জানান। এর আগে নিজের নির্বাচনী প্রচারের সময়  ট্রাম্প চীনা পণ্যের উপর ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের অঙ্গীকার করেন। তবে শুল্ক বিষয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো লড়াইয়ের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের  প্রেসিডেন্ট শুল্ক আরোপের দিকে এগিয়ে যায় কানাডাও তার জবাব  দেবে এবং সবকিছুই আলোচনার  টেবিলে আছে। অটোয়াও এখন কয়েক বিলিয়ন ডলারের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তিন শীর্ষ বাণিজ্য সহযোগী দেশ হলো- কানাডা, চীন ও মেক্সিকো। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শুল্ক। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্ম সুরক্ষা ও রাজস্ব বাড়াতে পারবেন। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এর কারণে আমেরিকানদের বেশি মূল্য দিতে হতে পারে এবং কোম্পানিগুলো বিদেশিদের পাল্টা পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডনাল্ড ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি- স্টারগেট গঠনের ঘোষণা দেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন প্রযুক্তি জগতের বড় নাম স্যাম অল্টম্যান ও ল্যারি এলিসন। এ ছাড়াও ছিলেন জাপানের টেক টাইকুন মাসাইয়শি সন। ট্রাম্প জানান, এই  কোম্পানি ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোতে। এতে করে ১ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ওরাকলের ল্যারি এলিসন জানান  যে, টেক্সাসে ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ চলমান। এ জন্য  সেখানে দশটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যা পরে বিশটিতে উন্নীত হবে। ওপেনএআই-এর অল্টম্যান বলেন, এটাই এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। আর মাসাইয়শি সন বলেন, আমেরিকার সোনালী যুগের সূচনা হলো।
mzamin

জুলাই হত্যা: স্বজনের কবর শনাক্ত করতে পারছেন না তারা by শরিফ রুবেল

নির্মম জুলাই। স্বজন হারানোর কতো কাহিনী। কতো শত মানুষের লাশ। পঙ্গু আহতদের আর্তনাদ। বেওয়ারিশ লাশের লম্বা লাইন। এখনো পুলিশ স্টেশন, হাসপাতালের মর্গ ও কবরস্থানে স্বজনদের ছুটে  চলা। সবাই অন্তত নিখোঁজ প্রিয়জনের লাশটা ফেরত চান। তবে কেউ খোঁজ পাচ্ছেন। কেউ আবার খুঁজতে এসে না পেয়ে পাহাড়সম ব্যথা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। চব্বিশের জুলাই লাখো মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটে গেছে। এমনই ক্ষত নিয়ে প্রতিদিন রায়ের বাজার কবরস্থানে ছুটে আসেন এক মা। তিনি নিজে কাঁদেন, অন্যদেরও কাঁদান। বেওয়ারিশ কবরের সারিতে সকাল-সন্ধ্যা কাঁদেন। রাতে আবার বাড়ি ফিরে যান। প্রতিদিন এসেই একে ওকে প্রশ্ন করেন ছেলে সোহেলের কবর কোনটা? এখানেই শত কবরের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সোহেল রানা। তবে বেওয়ারিশদের কেউ কেউ ওয়ারিশ খুঁজে পেলেও কে কোন কবরে শুয়ে আছেন তা কেউ জানেন না। বেওয়ারিশ পরিচয় নিয়ে রায়ের বাজার কবরস্থানে দাফন হওয়া ১১৪ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জনের পরিচয় মিলেছে। বাকি ১১০টি মরদেহের কোনো ওয়ারিশই নেই। কেউ তাদের খোঁজও করতে আসেন না বলে জানিয়েছেন রায়ের বাজার কবরস্থান ও আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কর্মকর্তারা। এতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে বেওয়ারিশ এই শতাধিক লাশের স্বজনরা কোথায়। আদৌ কি তাদের পরিচয় শনাক্ত হবে? তারা কি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাবেন? নাকি বেওয়ারিশ হিসেবেই সমাহিত থাকবেন। এ নিয়ে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনও বিপাকে। তবে ইতিমধ্যে জুলাই আন্দোলনে নিখোঁজদের সন্ধান দিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি সেল। এদিকে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পরও সন্তানের কবর শনাক্ত করতে পারছেন না তারা। গেল ৫ মাস ধরে সরকারের বিভিন্ন মহলে ঘুরেও কবর শনাক্তের কোনো উপায় জানতে পায়নি ওই ৪ পরিবার। তাদের দাবি, জুলাই ফাউন্ডেশনে কয়েক দফা যোগোযোগ করেও কোনো সুরাহা মিলছে না।

জানা গেছে, গত ১৮ই জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সোহেল রানা। ১৯শে জুলাই সোহেলের লাশ ঢামেকের মর্গে আনে পুলিশ। ৫ দিন পর মর্গ থেকে লাশ নিয়ে বেওয়ারিশ হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। পরে আঞ্জুমানে এসে ছেলের ছবি দেখেই তাকে শনাক্ত করা হয়। একইভাবে উত্তরার ফয়সাল সরকার ও মো. আসাদুল ইসলাম, গোপিবাগের রফিকুল ইসলামের লাশ শনাক্ত করেন তাদের পরিবার। তবে কেউই এখনো কবরের সন্ধান পাননি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল ও শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা বেওয়ারিশ লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ডিএনএ নমুনা রেখে স্ব-স্ব থানার মাধ্যমে দাফনের জন্য আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে পাঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম ওই বেওয়ারিশ মরদেহের ছবি সংরক্ষণ করে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করে। ওই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ থেকে ১২টি পর্যন্ত লাশ দাফন করা হয়।

আঞ্জুমানের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া লাশের পরিচয় পাওয়া গেলেও লাশ শনাক্ত করা কঠিন। আসলে সন্ধান পেলেই এখন লাশ পাওয়া সম্ভব না। ওখানে গণহারে কবর দেয়া হয়েছে। কাকে কোন কবরে দাফন করা হয়েছে, এটা জানার কোনো সুযোগ নেই। এখন কার কবর কোনটা তা কীভাবে বুঝবেন? এটা খুবই জটিল কাজ। এখন পর্যন্ত ৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তবে কোনটি তাদের স্বজনের কবর তা জানতে পারেনি। ৪ জনের লাশ নিতে হলে ১১৪ জনের লাশই তুলতে হবে। তারপরে ওই ১১৪ জনের ডিএনএ স্যাম্পল নিতে হবে। তারপরে তাদের স্বজনের সঙ্গে মেলাতে হবে। তাছাড়া পরিচয় শনাক্ত করার অন্য কোনো উপায় নেই। আর ১১৪ জনের লাশ তোলা ওতো সহজ নয়। এখানে আইনি সমস্যা রয়েছে। চাইলেই লাশ তোলা যায় না। সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ নিতে হলে কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে সরকার চাইলে সহজেই সম্ভব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এখন বেওয়ারিশদের ওয়ারিশ শনাক্ত চ্যালেঞ্জিং। মেডিকেলে প্রতিটি বেওয়ারিশ লাশের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা আছে। তবে তা কোনো কাজে আসবে না। কারণ কোন কবরে কাকে দাফন করা হয়েছে, তা জানা মুশকিল। এখন সবগুলো বডি তুলে পুনরায় ডিএনএ করাতে হবে। তারপরে স্বজনের সঙ্গে ম্যাচ করাতে হবে। এটা পুলিশের কাজ।

ওই বিভাগের আরেক শিক্ষক মানবজমিনকে বলেন, দাফনের সময় কোনো সিরিয়াল মেইনটেন করা হয়নি। ওই পরিস্থিতিতে প্ল্যানিং মতো কাজ করাও সম্ভব ছিল না। দাফনের সময় হাসপাতাল থেকে দেয়া ডিএনএ নমুনার একটি সংকেতিক চিহ্ন যদি প্রতিটি কবরে একটি প্লেকার্ড টাঙিয়ে দেয়া হতো, তাহলে কেউ দাবি করলে তাদের ডিএনএ স্যাম্পল নিয়ে কবরে টাঙানো ওই প্লেকার্ডের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে ম্যাচ করলেই হয়ে যেতো। এটা সহজেই সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন একজনের লাশ নিতে হলে ১১৪ জনের লাশ তুলতে হবে। এটা প্রায় অসম্ভব।

রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ইনচার্জ মাওলানা ফেরদৌস মানবজমিনকে বলেন,  আমাদের কাছে লাশ এসেছে। আমরা দাফন করেছি। লাশের কাফন খুলে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আর কে কোনো কবরে তা আমাদের জানা নেই। যদি একটি সিরিয়াল মেনে এবং কোনো চিহ্ন দিয়ে দাফন করা যেতো, তাহলে এখন ডিএনএ করার জন্য আবার লাশ তুলতে হতো না। ওই সময়ে এমন পরিস্থিতি ছিল না।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা বিভাগের প্রধান কামরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, অনেকে ছবি দেখে শনাক্ত করছেন। যারা আসছেন আমরা সবাইকে ছবি দেখাচ্ছি। ৪ জন ছবি দেখে শনাক্ত করেছে। তবে এখন লাশের পরিচয় খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ নয়। বেওয়ারিশ লাশের ময়নাতদন্ত ও ডিএন নমুনা রেখেই দাফন করতে আঞ্জুমানে দেয়া হয়। আঞ্জুমান সেই লাশের একটি ছবি তুলে রাখেন। পরে সরকার নির্ধারিত কবরস্থানে দাফন করা হয়। দাফনের সময় কোনো ক্রমিক নম্বর ও শনাক্ত চিহ্ন রাখা হয় না। এতে করে লাশের সন্ধান পেলেও লাশ কোন কবরে আছে তা বলা মুশকিল। জুলাই আন্দোলনে নিহতদের খোঁজে গত ৩০শে জুলাই থেকে ২৭শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ ব্যক্তি আঞ্জুমান  মুফিদুল ইসলামে এসেছেন।  

জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মাহবুব উল্যাহ মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি। যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তাদের কাকে কোন কবরে দাফন করা হয়েছে এই তথ্য নেই। তাই পরিচয় পাওয়ার পরে বডি নিতে পারছে না। আমরা কাজ করছি। দেখি কি করা যায়। এতগুলো বেওয়ারিশ লাশ কিন্তু তাদের দাবিদার নেই। এটাও একটি জটিল বিষয়। দাবিদার না থাকলে তাদের লাশ তুলে কাকে দিবো? তবে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তাদের লাশ ফেরত দিতে কাজ করছি। দেখি কতোদূর করা যায়।

জানা গেছে, গত ২২শে জুলাই থেকে ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম রায়ের বাজার কবরস্থানে ১১৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এরমধ্যে ২২শে জুলাই একদিনেই ১১টি লাশ দাফন করা হয়। এরপর ২৩শে জুলাই ১টি, ২৪শে জুলাই ৯টি, ২৫শে জুলাই ৩টি, ২৭শে জুলাই ৭টি, ২৮শে জুলাই ১১টি। কবরস্থান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ২৮শে জুলাই থেকে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত ১৫ দিনে রায়েরবাজার কবরস্থানে আঞ্জুমান কোনো বেওয়ারিশ লাশ পাঠায়নি। পরে আঞ্জুমানে গেলে তারা বলেন, এই সময়ে তাদের কাছে কোনো বেওয়ারিশ লাশ আসেনি। কোনো হাসপাতাল থেকেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তবে ১২ই আগস্ট ২টি, ১৯শে আগস্ট ৮টি, ২১শে আগস্ট ৭টি, ২২শে আগস্ট ৩টি, ২৬শে আগস্ট ৩টি, ৩১শে আগস্ট ১০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়।

mzamin

ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জের আবেদন খারিজ বিচারকার্য চলবে

জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জের আবেদন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের করা এ সংক্রান্ত আবেদনটি খারিজ করে দেন বিচারপতি মো. গোলাম মোর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি মো. গোলাম মোর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, এখতিয়ার চ্যালেঞ্জের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে শুনানির সুযোগ নেই এবং এটি সাংবিধানিক আদালতের বিষয় উল্লেখ করে আবেদনটি খারিজ করেন। এ ছাড়া অব্যাহতি চেয়ে জিয়াউল আহসানের করা আবেদনকে (প্রি-ম্যাচিউর) “অপরিপক্ব”। কারণ মামলার তদন্ত এখনো চলমান বলে খারিজ করে দেয়া হয়।

আদালতে জিয়াউল আহসানের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আই ফারুকী ও এডভোকেট নাজনীন নাহার। আর প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

আদেশের পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে জারি করা অধ্যাদেশ চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার জন্য আইনটি করা হয়েছে। কিন্তু জুলাই-আগস্ট মাসে কোনো যুদ্ধ হয়নি এবং যেহেতু বর্তমানে কোনো সংসদ নেই সুতরাং আইনের এ সংশোধনীটি বৈধ নয়। সেইসঙ্গে তাদের দাবি ছিল- ২০২৪ সালে করা সংশোধনীতে গুমের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করার কারণে এক ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যৌক্তিক নয়।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে জারি করা অধ্যাদেশ চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। আমরা বলেছি, এর আবেদন করলে সাংবিধানিক আদালত তথা হাইকোর্টে করতে হবে। এটা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অর্থাৎ এই ফৌজদারি কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া আবেদনকারীরা বর্তমান সরকারের বৈধতাও চ্যালেঞ্জ করেছেন, সেক্ষেত্রেও আমরা বলেছি, এটি এখানে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ নেই।
তাজুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে থাকে, তার মৌলিক অধিকার স্থগিত থাকে এবং তার বিচারের জন্য করা কোনো আইন যদি সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণও হয় সেটা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। সাংবিধানিকভাবে এক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয়া আছে।

এ ছাড়াও আসামি পক্ষের আবেদনটি ছিল মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের একটি কৌশল। এটা আসলে তারাও জানেন যে, এ আবেদনের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। মিডিয়াতে একটি হাইপ তৈরি করার জন্য তারা এই আবেদনটি করেছেন। যেহেতু আবেদনটি আজ খারিজ হয়েছে, ফলে মামলার বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া বিভিন্ন ঘৃণা সূচক বক্তব্য, সাক্ষীদের ভয়তীতি দেখানোর যেসব বক্তব্য তা যেন কোনো মিডিয়ায় প্রকাশ না করা হয়, সে ব্যাপারে গণমাধ্যমকর্মীদের অনুরোধ করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাসিনার হুমকি-ধমকি ও সাক্ষীদের উস্কানিমূলক যে বক্তব্য রেখে চলেছেন তা এই মামলায় প্রভাব ফেলতে পারে। এর মাধ্যমে হাসিনা এই বিচার বানচালের অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন। আদালতের আদেশ অমান্য করে হাসিনার এসব কর্মকাণ্ড আমাদের নজরে আসে। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।

প্রসঙ্গত, গত জুলাই-আগস্টে গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে আওয়ামী লীগ সরকার, দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তোলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পুনর্গঠিত করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

mzamin