Saturday, September 13, 2014

খাদ্যের বিষ ও বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য by আনু মুহাম্মদ

গত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশে বিটি বেগুন নামের জিএম বীজে উৎপাদনের সাফল্য বর্ণনা করতে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছিল। সেখানে যে কৃষকদের জড়ো করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কথা বলেছেন খুবই কম৷ যতজন বলেছেন, তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জানিয়েছেন, এই বিটি বেগুন তাঁদের গছিয়ে দেওয়া হয়েছিল উচ্চ ফলনের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তাঁদের সর্বনাশ হয়েছে। তাঁরা এর জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে কৃষিমন্ত্রী কয়েকটি অঞ্চলে বিটি বেগুনের চারা বিতরণ করেন। বহু দেশে এ ধরনের বীজ নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশ সরকার কেন এত উৎসাহী, সেটা অবশ্যই এক বড় প্রশ্ন। বলা দরকার যে এই উৎসাহ আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।
১৯৯৯ সালে গৃহীত বাংলাদেশের কৃষিনীতিতে প্রধান উদ্দেশ্যাবলির মধ্যে ‘জৈবপ্রযুক্তির প্রবর্তন, ব্যবহার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ’কে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ায় বীজ নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেকগুলো বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার আংশিক মাত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধানবীজের ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফসল উৎপাদনের উচ্চ হারের লোভ দেখিয়ে বীজ বিক্রি করা হয়েছে, কিন্তু কৃষকদের পুরো মাঠের ফসল যখন এই বীজের কারণে মার খেয়েছে, তখন এর দায়দায়িত্ব কেউ নেয়নি—না সরকার না কোম্পানি। অথচ কোনো বিচার বা ফলাফল পর্যালোচনা না করে জিএম খাদ্য প্রচলন ও হাইব্রিড বীজের ওপর কৃষি ও কৃষককে নির্ভরশীল করে তোলার সর্বব্যাপী কার্যক্রমে ব্যাপক উৎসাহ ও সংঘবদ্ধ তৎপরতা চলছে।

জিএম খাদ্য ও হাইব্রিড বীজ বর্তমানে বহুজাতিক কৃষি ও খাদ্যবাণিজ্যের অন্যতম ক্ষেত্র। বিভিন্ন দেশে এর অনেকগুলোর ভয়াবহ ফলাফল প্রমাণিত, বিশ্বব্যাপী এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিস্তার লাভ করলেও মুনাফাকেন্দ্রিক তৎপরতায় নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে এটি চালু করার চেষ্টা বরং বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় এক দশক আগে সরকার এই বীজ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ভিটামিন ‘এ’যুক্ত, কীটপতঙ্গরোধক, গরিবদের পুষ্টিবর্ধক ইত্যাদি নানা প্রচারণার মাধ্যমে জিএম বীজের আধিপত্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলেছে। কোম্পানি কর্তৃক কৃষকদের বীজের বাজার দখলের আয়োজন এখন অনেকখানি সফল। বীজ, সার ও কীটনাশকে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছে হাতে গোনা কিছু বহুজাতিক কোম্পানির। নীতিনির্ধারকদের ওপর তাদের প্রভাবও তাই একচেটিয়া।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বীজবাণিজ্যের শতকরা ৬৭ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের ১০টি বড় কোম্পানি। এগুলোর শীর্ষে আছে মনসান্টো (যুক্তরাষ্ট্র), এরপর যথাক্রমে আছে ডুপন্ট (যুক্তরাষ্ট্র), সিনজেন্টা (সুইজারল্যান্ড), গ্রুপ লিমাগ্রেইন (ফ্রান্স), ল্যান্ড ও লেকস (যুক্তরাষ্ট্র), কেডব্লিউএজি (জার্মানি), বায়ের ক্রপ সায়েন্স (জার্মানি), সাকাতা (জাপান), ডিএলএফ (ডেনমার্ক), তাকি (জাপান)। প্রথম দুটি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিই নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব বীজবাণিজ্যের শতকরা ৩৮ ভাগ। সিনজেন্টাসহ এই তিনটি কোম্পানি প্রায় অর্ধেক বীজবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক। এসব সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু প্রায়ই তাদের নিজেদের কার্টেল তৈরি হয়। এ রকম ঘটলে বাজারের প্রতিযোগিতার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। বীজের সংকট, কৃষকনিয়ন্ত্রিত বীজের বিপর্যয়, খাদ্য-সংকট—সবই এসব সংস্থার জন্য সুখবর। কেননা, তাতে বাজারের বিস্তৃতি ও মুনাফার বৃদ্ধি সহজ হয়।
এই বাণিজ্যে নিয়োজিত বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থাগুলো ৯০ দশক থেকে একের পর এক একীভূত হয়ে আরও বড় আকার ধারণ করছে এবং এই বাণিজ্য ক্রমেই অধিকতর একক আধিপত্যের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যেমন সিবা ও স্যানডোজ মিলে নোভারটিস আবার জেনেসের সঙ্গে মিলে সিনজেন্টা। হোয়েকস্ট ও শিরিং মিলে অ্যাগ্রেভো এবং রোন পোলেনকের সঙ্গে মিলে গঠন করেছে অ্যাভেনটিস। কৃষিবাণিজ্যে সিনজেন্টা ও মনসান্টোই এখন শীর্ষে।
কয়েক দশক আগে কৃষি রাসায়নিক বাজারের সে রকম কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সেটি এখন কমপক্ষে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশ্ববাণিজ্য। কৃষি রাসায়নিক দ্রব্যাদি, বিশেষ করে কীটনাশক ওষুধের ক্ষেত্রে বিশ্ব উৎপাদন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বড় ১০টি কোম্পানি। এর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে আছে বেয়ার (জার্মানি): ১৯ ভাগ ও সিনজেন্টা (সুইজারল্যান্ড): ১৯ ভাগ। এরপর যথাক্রমে আছে বিএএসএফ (জার্মানি), ডো অ্যাগ্রো সায়েন্সেস (যুক্তরাষ্ট্র), মনসান্টো (যুক্তরাষ্ট্র), ডুপন্ট (যুক্তরাষ্ট্র), মাখতাশিম আগান (ইসরায়েল), নুফার্ম (অস্ট্রেলিয়া), সুমিতোমো কেমিক্যাল (জাপান), আরিস্টা লাইফ সায়েন্স (জাপান)। এদের বিশ্ববাণিজ্যের পরিমাণ এখন ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছেই। এর বড় অংশই গেছে ‘গরিব’ দেশগুলোয়। সারের দামও বেড়েছে। ২০০৭-৮ সময়ে সারের দাম আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল। সারবাণিজ্যে বড় কোম্পানিগুলো হলো পটাশকর্প (কানাডা), ইয়ারা (নরওয়ে), মোজাইক-কারগিল (যুক্তরাষ্ট্র), ইসরায়েল কেমিক্যালস (ইসরায়েল), অ্যাগ্রিয়াম (কানাডা), কে+এস গ্রুপ (জার্মানি)।
একচেটিয়া প্রভাবের কারণেই এসব ‘উন্নয়ন’সামগ্রী ব্যবহারে সামাজিক, পরিবেশগত ও উৎপাদনগত ক্ষতি নিয়ে বিস্তৃত কোনো সমীক্ষা হয় না। আংশিক সমীক্ষায় দেখা যায়, এসব সামগ্রীর প্রভাবে বিশ্বে ৪০০টি মৃত্যু অঞ্চল তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে গত ৫০ বছরে বাজারমুখী উৎপাদন বৃদ্ধির উন্মাদনায় রাসায়নিক সার, সেচ, কীটনাশক ব্যবহার বাড়ার ফলে বিশ্বের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ আবাদি জমির উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় খর্ব হয়েছে। স্বাদু পানির স্বাভাবিক মাছ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। জমির লবণাক্ততা বৃদ্ধিও এর একটি ফল। যান্ত্রিক সেচের আওতায় বিশ্বের যত জমি আছে, তার শতকরা প্রায় ২০ ভাগ এখন লবণাক্ততার শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি এবং এর বাইরেও কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষ কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ এর কারণে মৃত্যুবরণ করে।
সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোয় ভর্তুকি দিয়ে বাজার ঠিক রাখার জন্য জমি পতিত রাখা, দুধ সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার বহু ঘটনা আছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন দুর্বল দেশে খাদ্য-সংকটের সুযোগে, পিএল ৪৮০-এর অধীনে খাদ্য‘সাহায্য’ তাদের আধিপত্য বিস্তারের একটি অস্ত্র হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে। ষাটের দশক থেকে লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে উন্নয়নের নামে বহুজাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য আবাদের জমিতে রপ্তানিমুখী বৃক্ষরোপণ করেছে; রপ্তানিমুখী কোকো, কফি, কলার বাণিজ্যিক উৎপাদনেই তাদের প্রধান আগ্রহ। ফলে এসব অঞ্চলে খাদ্যঘাটতি ও খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। আফগানিস্তান থেকে বিশ্ব চাহিদার শতকরা ৭০ ভাগ হেরোইন সরবরাহ হয়, অথচ সেখানে শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। কলম্বিয়ায় কফি উৎপাদন হচ্ছে শতকরা প্রায় ২৬ ভাগ আবাদি জমিতে। সেখানে দারিদ্র্য, সামরিকীকরণ, সহিংসতা পাশাপাশি সহাবস্থান করছে। ভারতে জিএম বীজ ব্যবহার করতে গিয়ে কৃষকের আত্মহত্যার হার বেড়েছে।
রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক সেচের প্রসার প্রাথমিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও এর বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পেয়েছে; এখানকার প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে মানানসই অনেক খাদ্য ও মৎস্য উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটেছে। ভূগর্ভস্থ পানি নির্বিচারে ক্রমাগত টেনে তোলায় ভূগর্ভে ভারসাম্য অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর এক মহাবিপর্যয়কারী ফল হলো আর্সেনিক। বহু বছর যে টিউবওয়েলকে নিরাপদ পানির উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, এবং দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশের শতকরা ৯৮ জন মানুষ নিরাপদ পানি পান করছে, সেই টিউবওয়েলগুলোর একটি বড় অংশ এখন আর্সেনিকযুক্ত পানির প্রবাহের মাধ্যম। বাংলাদেশের সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখন আর্সেনিক বিষের হুমকির মুখে। বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনীতি এই সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়নি। কেননা, এসব নীতি প্রণয়নে বহুজাতিক পুঁজির যত প্রভাব, তার একাংশও কৃষক বা সর্বজনের নেই।
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন এখন প্রায় পুরোপুরি রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক সেচনির্ভর। ধান, ফল, সবজি, মাছ, ডিম, মুরগি—সবকিছুরই উৎপাদন বেড়েছে, আকর্ষণীয় চেহারায় সেগুলো বাজারে উপস্থিত হচ্ছে; কিন্তু এর প্রায় সবই নানা মাত্রায় বিষ বহনকারী। নকল, বিষাক্ত রং ও ভেজাল কারখানা এখন বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র। গ্রামের হাটবাজার এসব বিষের মোহনীয় বিজ্ঞাপনে ভরা। খাবারের জৌলুশ বাড়ছে, বিশ্বজোড়া মুনাফা ও বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। জিডিপি বাড়ছে। অন্যদিকে, খাদ্যনিরাপত্তার মৌলিক শর্ত নিরাপদ খাদ্য বিপন্ন, নতুন নতুন হুমকির মুখে অরক্ষিত মানুষ। এসবের মধ্য দিয়ে মানুষের বিশুদ্ধ পানির অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, সম্প্রসারিত হচ্ছে বোতল পানির বাণিজ্য। কোমল পানীয়সহ নানা ধরনের ক্ষতিকর ‘শক্তিবর্ধক’ পানীয়তে বাজার সয়লাব। ভারতে একদল বিজ্ঞানী কোমল পানীয়তে বিষাক্ত উপাদান আবিষ্কার করার পর কোথাও কোথাও তার বিক্রি কমলেও বিজ্ঞাপনের জোরে সেগুলোর প্রতাপ এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে এগুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের তথাকথিত ‘শক্তিবর্ধক’ পানীয়।
জনগণের খাদ্য, পুষ্টি ও বৈচিত্র্যময় চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা এবং তা সর্বজনের কাছে সুলভ করা। কিন্তু কৃষি ও খাদ্যের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ ও মুনাফামুখী তৎপরতা একদিকে উৎপাদনক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে, অন্যদিকে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে দীর্ঘ মেয়াদে তা সুষম খাদ্য উৎপাদন অনিশ্চিত ও নাজুক করে তুলেছে। পাশাপাশি বিনা বিচারে গোষ্ঠীস্বার্থে ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কৃষিজমি, মাটির ওপরের ও নিচের পানিসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে। বর্তমান ‘উন্নয়ন’নীতি এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে অক্ষম ও অনিচ্ছুক।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

হায় আশরাফুল মখলুকাত by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বাংলার মাটিতে মানুষ মরে পোকামাকড়ের মতো, মানুষের মতো নয়।
টিভির পর্দায় দেখেছি লঞ্চটি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে। এক নারীর কণ্ঠ, সম্ভবত তিনি তাঁর বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে উচ্চারণ করছেন—লা ইলাহা ইল্লালাহু...।
কলেমা শাহাদত আমি এ জীবনে লাখোবার শুনেছি। সেদিনের লঞ্চের তলা থেকে ধ্বনিত হওয়া অমনটি কখনো শুনিনি। মাস খানেক যাবৎ প্রতিদিন ওই কথাগুলোই আমার কানে বাজে। মানুষগুলো জানছে, তারা এখনই মরবে। কিন্তু এ কথা ভাবার সময় তারা পায়নি যে তাদের মরদেহ তাদের প্রিয়জনরা পাবে না দাফন করতে।
লঞ্চটির উদ্ধারকাজ সাঙ্গ করার পরদিন আমি মুন্সিগঞ্জে যাই। স্থানীয় লোকজন বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার হয়নি, কারণ ওর খোলের মধ্যে যে শতাধিক যাত্রীর লাশ ছিল, তা পদ্মাপাড়ে সারি সারি শুইয়ে রাখলে যে হৃদয়বিদারক দৃশ্য হতো, তা জনগণের সরকারবিরোধী আবেগ উসকে দিত। নদীর তলদেশে বিনা পয়সায় তাদের দাফন করে দিল কর্তৃপক্ষ। যেখানে জীবনের দাম নেই, সেখানে গলিত লাশের কী দাম?
লঞ্চটির ৮৫-৯০ যাত্রীর ধারণক্ষমতা ছিল। সেখানে আড়াই শ যাত্রী কীভাবে ওঠে, তা তদারকের কেউ নেই। থাকলেও তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। কর্তব্যে অবহেলার কারণে তাদের শাস্তি হয় না।
বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন চারজন, গুরুতর আহত হয়েছেন পাঁচজন। রেলের ডিজি হোসেন সাহেব বলেছেন, ‘লাইনের ওপর কেউ দাঁড়ানোর পর (মরলে) সেই দুর্ঘটনার দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষ নেবে না।’
তাঁর এই বক্তব্যে তথ্যগত ভুল নেই। যা আছে, তা হলো নির্মমতা ও নির্লজ্জতা। দুর্ঘটনার দুই ঘণ্টা পরে আমি ওই জায়গায় যাই। তখন রেললাইনের ওপর ছোপ ছোপ রক্ত, যেন বঁটি দিয়ে মাছ কেটেছে ওখানে কেউ। এবং সুনসান নীরবতা।
একটি লাইন দিয়ে চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে আসছিল। সেটা সবাই দেখেছিল। আর একটি ট্রেন যমুনা এক্সপ্রেস ছিল কমলাপুরগামী। ওই ট্রেনটি হুইসেল দিয়ে আসেনি। সবাই বলছিলেন, হুইসেল দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না। গেটম্যানও বলেছেন, ‘দুটি ট্রেন পাশাপাশি আসায় বিষয়টি অনেকে খেয়াল না করায় দুর্ঘটনা ঘটে।’
রেলপথে মুহূর্তের বিভীষিকারেলের ডিজি মহোদয়ের চেয়ে গেটম্যানের বক্তব্য অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। রেললাইনের ওপর বাজার বসায় সরকারি দলের মাস্তানেরা ‘মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে’। ওই টাকার ভাগ সবাই পায়। কে কে পায়, তাদের নাম বলতে পারব না।
দুর্ঘটনাটি ঘটে সকাল নয়টার আগে। তাই ধারণা করি, মন্ত্রী ও ডিজি তখনো প্রাতঃকৃত্য শেষ করে উঠতে পারেননি। ওই সময় এ-জাতীয় মরার খবর বিরক্তির উদ্রেক করতেই পারে। এখন মোবাইল ফোনের যুগ। পাঁচ সেকেন্ডে খবর পৌঁছে যায় সবার কাছে। ওখানে মন্ত্রীসহ সবার ছুটে যেতে আধা ঘণ্টাই খুব বেশি।
ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের কোনো গরু বা বাছুর অসুখে মারা গেলে বাঁশের সঙ্গে চার পা বেঁধে ঝুলিয়ে পদ্মার পাড়ে নিয়ে ফেলে আসা হতো। কারওয়ান বাজারে দুর্ঘটনার পর নিহত হতভাগ্যদের ঠিক ওইভাবে বাঁশে ঝুলিয়ে ওখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে গরু-বাছুরের মতো উলঙ্গ নয়, চটের বস্তায় জড়িয়ে। দৃশ্যটি আমার কাছে বর্বরোচিত ও বীভৎস মনে হয়েছে এই জন্য যে আমিও ওই লোকগুলোর মতোই একটি মানুষ, গরু-ছাগল বা কুকুর নই।
মাননীয় ডিজি মহোদয় ও মাননীয় রেলমন্ত্রী, যিনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সুখের নতুন জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, কী রকম দাপ্তরিক কর্তব্য বা নৈতিক দায়িত্ব পালন করছেন? তাঁদের বিবেক, যদি আদৌ থেকে থাকে, কী বলে সেই বিবেক? কোনো দুর্ঘটনায় তাঁদের নিকটজন বা শ্বশুরবাড়ির অথবা হবু শ্বশুরবাড়ির কেউ যদি মারা যেতেন এবং লাশ বস্তায় জড়িয়ে বাঁশে ঝুলিয়ে ডোমেরা বহন করতেন, তাহলে তাঁদের কেমন লাগত?
দুর্ঘটনাটি যেখানে ঘটে, সেটি কোনো নির্জন প্রান্তর নয়। জায়গাটি নগরের সবচেয়ে জনাকীর্ণ এলাকাগুলোর একটি। ওখান থেকে যেকোনো দিকে ৫০০ গজের মধ্যে পুলিশ গিজগিজ করে। সরকার কিছু করবে না জানি, প্রাইভেট ক্লিনিক চারদিকে বহু। একটি অ্যাম্বুলেন্স বা পিকআপ কোথাও পাওয়া গেল না!
যদি আমাদের রাষ্ট্র মানুষ হতো বা চেতনাসম্পন্ন কোনো বস্তু হতো, তাকে জিজ্ঞেস করতাম: হে রাষ্ট্র মহোদয়, আপনার কাজ কী?§ আপনি যাদের আপনার ম্যানেজার বানিয়েছেন, তাদের কাজই বা কী? §আপনি যত প্রকাণ্ড অবয়ববিশিষ্টই হোন, আপনি সৃষ্টির সেরা জীব নন। কিন্তু আমরা ছোট্ট শরীরবিশিষ্ট হলেও আমরা আশরাফুল মখলুকাত। আমাদের আত্মা ও শরীর দুটোই পবিত্র। তাকে অসম্মান করার অধিকার আপনার নেই।
এই রাষ্ট্রে নিজেকে মানব পরিচয় দিতে লজ্জা ও গ্লানি বোধ করি। নিহত ব্যক্তিদের বাবা-মা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কাছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে করজোড়ে ক্ষমা চাই।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আসুন, আমরা সবাই এরশাদ হই! by সোহরাব হাসান

লাগ ভেলকি লাগ। একদা জনগণ দ্বারা পরিত্যক্ত এবং হালে জননেত্রী শেখ হাসিনা দ্বারা অভিষিক্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন দলের নেতা-কর্মী দ্বারাই প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন। ক্ষমতায় থাকতে তাঁকে বলা হতো সিএমএলএ বা ক্যানসেল মাই লাস্ট অ্যানাউন্সমেন্ট। অর্থাৎ আমার আগের ঘোষণাটি বাতিল করা হলো। রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রে এখন অ্যানাউন্সমেন্ট দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই বলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে একেক দিন একেকজনকে বহিষ্কার করেন। জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতা ও তাঁর স্ত্রীকেও তিনি একাধিকবার দল থেকে বহিষ্কার করেছেন এবং নিজে ঘর থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।

কয়েক দিন আগে এই সাবেক সামরিক শাসক ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিএনপি জাতীয় পার্টিতে বিলীন হয়ে যাবে। তাঁর দলই হবে প্রধান বিরোধী দল। এরপর বললেন, আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নয়, আগামী নির্বাচনে তাঁর দলই ক্ষমতায় আসবে। এখন দেখা যাচ্ছে, তাঁর জাতীয় পার্টিতে গৃহদাহ শুরু হয়েছে। নেতায় নেতায় ঝগড়াঝাঁটি, গালমন্দ সমানতালে চলছে। এরশাদ সাহেবের দলে যতজন মহাসচিব ছিলেন, তাঁদের সবার ঠিকুজি খুঁজে বের করতে গবেষণার প্রয়োজন হবে। মহাসচিব আসে–যায়, চেয়ারম্যান তিনিই থাকেন।
একটি রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শগতভাবে কতটা দেউলিয়া হতে পারে, কতটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় চলতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এরশাদের জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টিতে বর্তমানে যে নেতৃত্বের সংকট, তার মূলে এরশাদের স্বৈরাচারী মনোভাব এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তাঁর দ্বৈত ভূমিকা। একটি দল বা একজন নেতা নির্বাচনের ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ভালো হোক মন্দ হোক, তাঁকে একটি সিদ্ধান্তই নিতে হয়। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল এরশাদ প্রথমে বললেন, ‘আমরা নির্বাচনে যাব। তারপর বললেন, বিএনপি না গেলে সেই নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। অতএব, আমরা নির্বাচনে যাব না। আমরা নির্বাচনে নেই।’ সেই না যাওয়া নির্বাচন থেকে কীভাবে তাঁর দল ৪০টি আসন পেল, আমজনতা বুঝতে অক্ষম। এত দিন জানতাম নির্বাচনে অংশ নিলে জয়-পরাজয় আছে। কিন্তু একজন সামরিক কাম রাজনৈতিক নেতা দেখিয়ে দিলেন, নির্বাচন না করেও নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায়। সব সম্ভবের বাংলাদেশে সবই সম্ভব।
নির্বাচনের আগে এরশাদ দলের একাংশকে বললেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করো। আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি না। আরেক পক্ষকে বলা হলো, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার কোরো না। এই দ্বৈত ভূমিকা নিয়ে তিনি যেমন শেখ হাসিনাকে বিপদে ফেলেছিলেন, তেমনি খালেদা জিয়াকেও এই বার্তা দিলেন যে নির্বাচন না হলে আমরা আপনার সঙ্গেই আছি। খালেদা জিয়া যদি সত্যি সত্যি নির্বাচনটি ঠেকাতে পারতেন, তাহলে এরশাদ হয়তো এখন তাঁরই বিশেষ দূত হতেন।
জাতীয় পার্টির এই দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মূলে হলো সুবিধাবাদ। ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাপ্ত মুফতে সুবিধা। দলের যাঁরা সুবিধা পেয়েছেন, তাঁদের ভূমিকা একরকম। আর যাঁরা সুবিধা পাননি, এরশাদের কথায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের ভূমিকা আরেক রকম হওয়াই স্বাভাবিক। এরশাদ জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বলেছেন। কিন্তু নিজে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত থাকবেন, এটি কেমন নৈতিকতা? এই প্রশ্নটি করেই মসিউর রহমান (রাঙ্গা) ও তাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর রোষের মুখে পড়েছেন।
এখন এরশাদকে ছাড়লেও তাঁরা পদ ছাড়বেন না। ফাউ খাওয়ার ও মুফতে পাওয়ার রাজনীতির পরিণাম এমনই হয়। জাতীয় পার্টিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কেবল তিনজন নন, আরও অনেক বেশি। সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপ হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পান। কাজী ফিরোজ রশীদ উপনেতা হলে তিনিও পাবেন। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে রওশনের অবস্থান কেবিনেট মন্ত্রীর সমান। আর এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।
২.
রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব তথা আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতার সংকট কেবল সাবেক স্বৈরাচারের দলে থাকলে আশ্বস্ত হওয়া যেত। জোর গলায় বলতে পারতাম, আসুন, আমরা স্বৈরাচার ও একাত্তরের রাজাকারকে বাদ দিয়েই একটি সাচ্চা ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলি। কেননা, আমাদের সঙ্গে গণতন্ত্রের সংগ্রামের দুই লড়াকু নেত্রী আছেন, যাঁরা এক হয়ে স্বৈরাচারকে হটিয়েছিলেন। কিন্তু বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির করুণ ও নাজুক সাংগঠনিক অবস্থা দেখে আপসোস হয়। এত বড় দল, এত বড় নেত্রী। কিন্তু দলের অবস্থা এত করুণ ও বেহাল কেন?
অনেকে যুক্তি দেখাতে পারেন যে বিএনপি সাড়ে সাত বছর ক্ষমতার বাইরে এবং নেতা-কর্মীরা জেল-জুলুমের শিকার। এ কারণে দলের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, সরকারের দমনপীড়নে কোনো দল দুর্বল হয় না। দুর্বল হয় ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁদের নানা অপকর্মের কারণে। ২০০১-০৬ সালে ক্ষমতাসীনেরা যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন, তা মানুষের স্মৃতি থেকে এখনো মুছে যায়নি। প্রতিবছর ২১ আগস্ট, ১৭ আগস্ট, ২৭ জানুয়ারি দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বিএনপি নেতা-নেত্রীরা সেসব থেকে শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে হয় না। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ভুল স্বীকার করলেও প্রকাশ্যে বলেন, তারা যা করেছেন, ঠিকই করেছেন।
গত পাঁচ বছরে বিএনপির নেতারা জনগণের সমস্যা-সংকট নিয়ে কোনো আন্দোলন করেননি। তাঁদের একমাত্র দাবি বা এজেন্ডা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়া। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে কী করবেন, তা বলেন না। ইদানীং লন্ডনপ্রবাসী নেতা তারেক রহমানের বাণী ও বাচনভঙ্গিতে বোঝা যায়, আরেকবার ক্ষমতায় আসতে পারলে আওয়ামী লীগকে দেখিয়ে দেবে। এখন যেমন আওয়ামী লীগ দেখাচ্ছে। আসলে এখন শিক্ষা নেওয়ার রাজনীতিকে দূরে ঠেলে শিক্ষা দেওয়ার রাজনীতিরই মহড়া চলছে। বিএনপির কার্যক্রম এখন প্রেসক্লাব ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই সীমিত হয়ে পড়েছে। আর দলের নীতি–কৌশল থেকে শুরু করে মহানগর কিংবা ছাত্রদলের কমিটিও ঠিক হয় লন্ডনে।
৩.
দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ কীভাবে চলছে, তা কেন্দ্রীয় নেতারাও জানেন না। জিজ্ঞেস করলে বলেন, সব জানেন সভানেত্রী। সব যদি সভানেত্রীই জানবেন, আপনারা কী করছেন? দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতে কিছুদিন পরপর গণভবনে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়, সাংগঠনিক শক্তি সুসংহত করার সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু কার্যকর হয় না। ঢাকা মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে। সেখানে যাঁরা নেতা, তাঁরাই মন্ত্রী। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের অবস্থা এতটাই নাজুক যে গত জুনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আহূত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়। প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল: কোনো কর্মী আসেননি, মলিন মুখে চলে গেলেন নেতারাও। এখানে রিপোর্টের কিছু অংশ তুলে ধরছি: ‘৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের তিন দিনব্যাপী কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানও ছিল কর্মীশূন্য৷ গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতেও ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান৷ এতে সাতজন নেতা উপস্থিত হলেও কোনো কর্মী না থাকায় বক্তৃতা না করেই তাঁরা চলে যান৷ আগের দিন একই স্থানে একই রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়৷ তাতে অল্প কজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন৷ গতকাল তাও ছিল না৷’
আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেন, বিএনপি জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জাতীয় পার্টি গৃহপালিত বিরোধী দল হিসেবে কাজ করছে। জামায়াতে ইসলামীর ভাগ্য আদালতে ঝুলছে। ১৪ দলীয় জোটের নেতারা সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন জুগিয়ে চলেছেন। বৃহস্পতিবার ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের সাংসদেরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সংবিধান সংশোধনে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা বিরোধী দলের বিগত আন্দোলনে বিদেশি জঙ্গিদের অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ রকম একটি লুফে নেওয়া তথ্য বাম নেতারা পেলেন, অথচ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের কেউ জানলেন না! একই সঙ্গে যদি তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের যুব ও ছাত্রসংগঠনটির নানা অপকর্মের চিত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতেন, দেশবাসী কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হতে পারত। যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতারা প্রকাশ্যে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেন, তখন দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নিরর্থক বৈকি।
আসলে রাজনীতির নামে এখন চলছে নীতি ও আদর্শ বিসর্জনের মহড়া। এরশাদ তার জ্বলন্ত প্রতীক হলেও ধীরে ধীরে সব দলেই মহামারির মতো সংক্রমিত হচ্ছে। নেতা-কর্মীদের কাছে সাংগঠনিক কর্মসূচির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত সুবিধা লাভ। আর এ জন্য সাংসদ সাংসদের বিরুদ্ধে, মন্ত্রী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে, নেতা দলের বিরুদ্ধে যেতেও দ্বিধা করছেন না।
রাজনীতির এই নষ্টামি, ভ্রষ্টামি দেখে দেখে দেশের মানুষ ত্যক্ত, বিরক্ত। অপরাজনীতির এই কালব্যাধি থেকে মুক্তি না পেলে হয়তো একদিন তারাও স্লোগান তুলবে ‘আসুন, আমরা সবাই এরশাদ হই!’
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

কাশ্মীরে বন্যার পর ভূমিধসে দুর্ভোগ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মিলেছে ত্রাণসামগ্রী। তাই নিয়ে বাড়ি
ফেরা। প্রায় কোমরসমান পানি ঠেলে চলতে হচ্ছে, তবু
চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ। বন্যাকবলিত কাশ্মীরের
শ্রীনগর থেকে গতকাল তোলা ছবি। এএফপি
ভারতশাসিত কাশ্মীরের বন্যাদুর্গত মানুষ গতকাল শুক্রবার একাধিক ভূমিধসের কারণে নতুন করে বিপর্যয়ের শিকার হয়। এতে সেখানকার বন্যাপীড়িত এলাকায় উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। খবর রয়টার্স, এএফপি ও এনডিটিভির। কাশ্মীর অঞ্চলের দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর প্রধান মেহরাজ-উদ-দিন শাহ গতকাল জানিয়েছেন, রাজ্যের প্রধান শহর গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর এখনো বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। তিনি বলেন, এখনো প্রায় এক লাখ মানুষ বিভিন্ন স্থানে সহায়তা কার্যক্রমের আওতার বাইরে রয়েছে। শ্রীনগর শহরে বিভিন্ন আশ্রয়ে থাকা হাজার হাজার অসহায় মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। কয়েকটি শহরের পথে লাশ ভাসতে দেখেছে স্থানীয় লোকজন। একটি গ্রামে ভূমিধসে অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছে। বন্যাবিধ্বস্ত কাশ্মীর উপত্যকা থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রত্যাশায় হাজারো মানুষ শ্রীনগরে বিমানবাহিনীর ঘাঁটির বাইরে জড়ো হয়। বিমানবাহিনী ভারী পরিবহন উড়োজাহাজ সি-১৭ ও সি-১৩০ দিয়ে পানিবন্দী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।
তবে উদ্ধারপ্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা উড়োজাহাজের তুলনায় অনেক বেশি। কাশ্মীরে ত্রাণ সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা শুরু হওয়ার ছয় দিন পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ গতকাল বলেন, তাঁর সরকার দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা কোনো সাড়া দিতে পারেনি। কারণ, তখন সরকার কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। রাজধানী শহর অচল হয়ে পড়ে। তিনি মাত্র ছয়জনকে নিয়ে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় তাঁর সরকারের সচিবালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ সব অবকাঠামো পানির নিচে চলে যায়। মুখ্যমন্ত্রী ওমর গতকাল এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমার কোনো মুঠোফোন ও টেলিফোন সংযোগ পর্যন্ত ছিল না। এখন মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে শুরু করেছি। আজ আমি মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাঁদের অনেকেই নিজেরাও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা করে কঠিন পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।’ অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণের প্রভাবে গত সপ্তাহে ঝিলম নদীর পানি অনেক বেড়ে যাওয়ায় কাশ্মীরের ভারত ও পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত দুই অংশেই গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা শুরু হয়। এতে পাকিস্তানে গতকাল পর্যন্ত ২৬৪ এবং ভারতে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। দুই দেশে বন্যাকবলিত মানুষের মোট সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।

সিরিয়ায় হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র

বারাক ওবামা
ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের ‘নির্মূল’ করতে ইরাকের মতো সিরিয়ায়ও বিমান হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা কোনো গোষ্ঠীই ‘নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবে না’। আইএসবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ইরাকে আরও ৪৭৫ জন সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন ওবামা। খবর নিউইয়র্ক টাইমস, এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির। এদিকে রাশিয়া বলেছে, ইরাক-সিরিয়ার জঙ্গিদের ওপর একতরফা মার্কিন হামলা হলে তা হবে ‘আইনের স্থূল লঙ্ঘন’। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, সিরিয়ায় আইএসবিরোধী মার্কিন বিমান হামলায় তারা অংশ নেবে না। তবে এর কিছুক্ষণ পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের মুখপাত্র বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেননি।’ জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বার্লিনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাঁদের এ অভিযানে অংশ নিতে বলাও হয়নি। আর তাঁরা এতে অংশ নেবেনও না। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। তবে একই সঙ্গে অবশ্যই দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।
উল্লেখ্য, সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা প্রসঙ্গে এত দিন রাশিয়ার সঙ্গে অভিন্ন অবস্থানে রয়েছে চীন। জাতির উদ্দেশে স্থানীয় সময় বুধবার রাতে (বাংলাদেশ সময় গতকাল সকাল) টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আগের ঘোষণামতো আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন উদ্যোগের কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরেন। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া ১৫ মিনিটের ওই ভাষণে ওবামা জানান, আইএসের জঙ্গিদের নির্মূল করতে ‘বিস্তৃত পরিসরের জোটের’ নেতৃত্বে থেকে মূল ভূমিকা পালন করবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা যেকোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের খুঁজে বের করব। ...এর মানে হলো, আইএস দমনে ইরাকের মতো সিরিয়ায়ও হামলা চালাতে পিছপা হবে না যুক্তরাষ্ট্র।’ ওবামা জানান, আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন চেয়েছেন তিনি। এ অনুমোদন পেলে তাকে স্বাগত জানাবেন। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিষয়ে ভোট: সিরিয়ার উদারপন্থী বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে শিগগিরই ভোটাভুটি হবে। আইএস দমনের অংশ হিসেবে বিদ্রোহীদের এ সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলার সঙ্গী ১০ আরব দেশ: আইএসবিরোধী অভিযানের জন্য জোট গঠনের উদ্দেশ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গতকাল সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। তিনি জেদ্দায় আরব দেশগুলোর অন্তত ১০ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ওই জোট গঠন নিয়ে আলোচনা করেন। এ ১০ দেশ আইএসবিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার সম্মতি দিয়েছে। এ দেশগুলো হলো সৌদি আরব, ইরাক, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান ও কাতার।

বিপুল সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক বিপুল সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেছেন, ‘দীর্ঘ ৫০ বছর পর এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি আমূল বদলে দেবে।’ মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা হয়ে শি জিনপিং ১৭ সেপ্টেম্বর বুধবার ভারতে আসছেন। উপমহাদেশে এই সফরের উল্লেখযোগ্য দিক, তিনি এবার পাকিস্তানে যাচ্ছেন না। এ সিদ্ধান্তের একটা কারণ যদি হয় ভারতকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া, অন্য কারণ অবশ্যই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ টালমাটাল অবস্থা। শি জিনপিং প্রথমেই দিল্লি আসছেন না। ভারতে তাঁর প্রথম গন্তব্য গুজরাটের আহমেদাবাদ। যেদিন তিনি এই শহরে আসছেন, ঘটনাচক্রে সেদিনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন। জন্মদিনের উপহারের মতোই শোনাতে পারে আহমেদাবাদ ও মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে দুটি শিল্প এলাকা স্থাপনে তাঁর ঘোষণার কথা। এই শিল্প এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। চীন এ দেশের অবকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী। বিশেষ করে বুলেট ট্রেন, রেলপথ, রাস্তা ও বন্দরে। ভারতের মূল আগ্রহ অবশ্য শুধু চীনা বিনিয়োগে নয়।
ভারত চায় চীন সারা বিশ্বে যা কিছু রপ্তানি করে থাকে, তার একটা বড় অংশ এ দেশে তৈরি করুক। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা। ভারত-চীন বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২০১৩-১৪ সালে প্রায় ছয় হাজার ৬০০ কোটি ডলার হলেও এর সিংহভাগই চীনের অনুকূলে। চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সে দেশের ২০টির বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরা আসছেন। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তাঁরা প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের কেনাবেচায় চুক্তিবদ্ধ হবেন। সব ধরনের সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তারে বন্ধুতা প্রথম অনুঘটক। সে জন্য চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বিরোধ মেটানো জরুরি। সে জন্য শি জিনপিংয়ের এ সফরের সময়ই সীমান্ত বিরোধ মেটাতে ভারত বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণের নাম ঘোষণা করতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সম্প্রতি তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তাইওয়ান ও তিব্বত নিয়ে চীন যেমন সংবেদনশীল এবং ভারত যেমন তার মর্যাদা দেয়, তেমনই অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারতের সংবেদনশীলতাকে মর্যাদা দিতে হবে চীনকে। প্রসঙ্গত, উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচলের একটি বড় অংশ তার নিজের বলে দাবি করে চীন।

খায়রুল হক আবারও দৃশ্যপটে by সাজেদুল হক

দৃশ্যপটে আবারও ফিরেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। বাংলাদেশের ইতিহাসের গতি নির্ধারণে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদে ফেরাতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল যখন পাসের অপেক্ষায় তখন আদালতপাড়ায় আবারও আলোচনার শীর্ষে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এখন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান। তার নেতৃত্বাধীন কমিশনই সরকারকে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শ দেয়। যদিও দল-মত-নির্বিশেষে দেশের শীর্ষ আইনজীবীরা এ সংশোধনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বুধবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় বারবারই উঠে আসে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নাম। দেশের কয়েকজন শীর্ষ আইনজীবী তার তীব্র সমালোচনা করেন। আলোচনায় এসেছে পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় ঘোষণার অবস্থান থেকে তার সরে যাওয়ার বিষয়েও। বিচারপতি খায়রুল হক পঞ্চম সংশোধনী মামলা অবৈধ ঘোষণার রায়ের লেখক। মোটা দাগে তিনি ওই সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করলেও কিছু কিছু বিষয় বহাল রাখেন। তার অন্যতম হচ্ছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ। এরপর তার নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বেঞ্চই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ওই রায় দেয়া হয়েছিল। চার বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করেন। বিপরীতে তিন বিচারপতি মত দেন এ ব্যবস্থা অসাংবিধানিক নয়। বাংলাদেশের আদি সংবিধানে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ছিল। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের কাছে অর্পণ করা হয়। পরে জিয়াউর রহমানের আমলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে দেয়া হয়। ষোড়শ সংশোধনী বিলের প্রস্তাবনায় এ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হলেও সংসদীয় কমিটি প্রস্তাবনা বাদ দেয়ার কথা জানিয়েছে। আইন মন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, তিন মাসের মধ্যেই এ ব্যাপারে আইন প্রণয়ন করা হবে। আইনে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্তে একটি কমিটি থাকবে। সে কমিটিতে কারা থাকবেন সে প্রশ্নটিই এখন সর্বাধিক আলোচিত। তবে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বিচারপতিরা এ কমিটিতে থাকছেন না। সাবেক বিচারপতিদের দিয়েই এ কমিটি গঠনের সম্ভাবনা বেশি। সংসদ সদস্যদেরও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের এ কমিটিতে থাকার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বুধবার বলেছেন, বিচারপতিদের অসদাচরণ বা অযোগ্যতার বিষয়টি তদন্ত করবেন কারা। আমি শুনেছি আইনমন্ত্রী নাকি বলেছেন, সেখানে প্রধান বিচারপতি থাকবেন না। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং সাবেক দুই বিচারপতির সমন্বয়ে এ কমিটি হবে। তাহলে সেখানে কি তিনটা দালালের জায়গা হবে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এবিএম খায়রুল কি ওই কমিটির চেয়ারম্যান হবেন? বিচারপতি খায়রুল হকের জ্ঞান-গরিমার প্রতি আমার সম্মান রয়েছে। কিন্তু তার জন্য আমরা কিছু অসুবিধাতেও রয়েছি। আমি শুনেছি বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের পরামর্শেই সংবিধানে এ সংশোধনী আনা হচ্ছে। তিনি সাত অনুচ্ছেদের জবাবদিহির কথা বলেছেন। তার কাছে আমার একটা প্রশ্ন। আপনি যখন পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় লিখেন তখন সাত অনুচ্ছেদ ছিল। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ধারণাও ছিল। কারণ অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়েই বাংলাদেশে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহলে আপনি কেন তখন ৯৬ অনুচ্ছেদ বহাল রাখলেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির আরেক সাবেক সভাপতি এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনও বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সিংগেল মেজরিটি ভোটে মৌলিক কাঠামোর দোহাই দিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হলো। অথচ কিছু দিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি সিংগেল মেজরিটি ভোটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সিদ্ধান্ত দেননি। বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ বহাল রেখেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলো। অথচ পৃথিবীর সব দেশেই নির্বাচনের সময় যে সরকার থাকে তারা তখন নির্বাচিত থাকেন না। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সময় পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব পালন করে যেতে বলা হয়।

কর্তৃত্ব ফেরাতে মরিয়া এরশাদ by নিয়াজ মাহমুদ

পার্টিতে নিজের কর্তৃত্ব ফেরাতে মরিয়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এজন্য তিনি শুরু করেছেন নানামুখী তৎপরতা। একই সঙ্গে দলে শুদ্ধি অভিযানেও নেমেছেন। দলের যারা তাকে বাদ দিয়ে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন করার প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন এবার  তাদেরকে মাইনাস করার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছেন জাপা চেযারম্যান। এরশাদ তার এ প্রচেষ্টায় খানিকটা সফল হয়েছেন বলে দলটির প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার বিরোধীদলীয় হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাকে প্রেসিডিয়াম পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার পর তারা এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের পর রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা করার পর থেকে এরশাদ ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আমরা তাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা না করায় তিনি ক্ষেপে গিয়ে আমাদেরকে অব্যাহতি দিয়েছেন পদ থেকে। এদিকে গতকাল বিকালে জাপার কাকরাইল অফিসের সামনে জাতীয় যুবসংহতি আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে  রাঙ্গা ও তাজুলকে পার্টি থেকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলটির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। ওদিকে, রওশন এরশাদের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছে, এরশাদ এখন যে কোন মূল্যে বিরোধীদলীয় নেতা হতে চান। ফিরে পেতে চান দলে কর্তৃত্ব। তাই এসব করছেন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকায় ছিলেন ব্যারিস্টার অনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। তাদের সহযোগী ছিলেন মসিউর রহমান রাঙ্গা ও তাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুজিবুল হক চুন্নু ও কাজী ফিরোজ রশীদ। এরশাদকে মাইনাস করে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে তারা দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনের পর এরশাদ সিএমএইচ থেকে ফিরে গুলশানের একটি হোটেলে (এরশাদের নির্দেশে যার নির্বাচনে যাননি) দলের কিছু নেতার সম্মানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে ব্যারিস্টার অনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, মশিউর রহমান রাঙ্গা ও তাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুজিবুল হক চুন্নু ও কাজী ফিরোজ রশীদ অনুপস্থিত ছিলেন। তখন এরশাদ তাদের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন তোমরা ফিরে এসো। না হয় আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। পরে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে দলের মহাসচিব করেন এরশাদ। সময়ে প্রয়োজনে ব্যারিস্টার অনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু রওশনের নেতৃত্ব মানলেও একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় রওশনের। এরশাদও সুযোগ বুঝে তাদেরকে প্রশ্রয় দেন দলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। এ অবস্থায় গত মাসে কাজী ফিরোজ রশীদকে বিরোধীদলীয় উপনেতা নিয়োগ দেয়াকে কেন্দ্র করে এরশাদ-রওশন আবার প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। শুধু স্পিকারকে পাল্টাপাল্টি চিঠি দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তারা। এর আগেও দু’জন পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও যান। একপর্যায়ে ৯ই আগস্ট এরশাদ কলকাতা যাওয়ার সময় জাপার ঢাকা দক্ষিণের সভাপতির পদ থেকে কাজী ফিরোজ রশীদকে অব্যাহতি দেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনের মাগরিবের নামাজের বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সংসদ ভবন কার্যালয়ে দেখা করেছেন এরশাদ। মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুও এসময় তার সঙ্গে ছিলেন। এর আগে ৩১শে আগস্ট অনুষ্ঠিত দলের সংসদীয় দলের বৈঠকে মন্ত্রিসভা থেকে বের হয়ে আসতে দলীয় নেতাদের নির্দেশ দেন এরশাদ। ওই সময় তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন রওশনও। জাপা সূত্র জানায়, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কেন্দ্র করে এরশাদের নেতৃত্ব নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে জাপায়। অনেকেই পার্টি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের কথা মুখে বললেও বাস্তবে অবহেলা করা শুরু করেন। এছাড়া মন্ত্রিসভায় অংশ নেয়া নেতারা নিজেদের মতো করে বলয় তৈরি করে তারা দলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করেন। বিষয়টি নিজের কাছে ধরা পড়লেও এতদিন কঠোর অবস্থানে যাননি এরশাদ। সুযোগ বুঝে এবার পার্টিতে শুদ্ধি অভিযানে নেমেছেন তিনি। গত ১৪ই আগস্ট ভারত সফর শেষে দেশে ফেরার পর জাতীয় পার্টিতে কর্তৃত্ব ফেরাতে মরিয়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাপার একটি সূত্র জানিয়েছে কোন বার্তা পেয়ে হয়তো তিনি এমনটি করছেন। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, সামনে এরশাদ আরও কয়েকজন নেতার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়েও নিজের অনুগত নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করেছেন। পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু গতকাল জানিয়েছেন, যারা পার্টি ভাঙার চেষ্টা করছে তারা জাতীয় পার্টির কেউ না। জাতীয় পার্টিকে কেউ ভাঙতে পারবে না। এদিকে সংসদ ভবনের লবিতে দলীয় এমপিদের হাতাহতির ঘটনায়ও ক্ষুব্ধ এরশাদ। এ ঘটনার পর ওই রাতেই সংসদ ভবনে সিনিয়র কয়েকজন নেতাকে নিয়ে বৈঠক করেন এরশাদ। দলীয় সূত্র জানায় জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের চিফ হুইপের পদ থেকে তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে অব্যাহতি দেয়া ও মশিউর রহমান রাঙ্গার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এ বৈঠকে। আজ-কালের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। অপর একটি সূত্র আভাস দিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পার্টিতে আরও রদবদল হতে পারে। এ লক্ষ্য নিয়েই সামনে এগুচ্ছেন তিনি।
ক্ষমা চাইলেন রাঙ্গা: এদিকে বৃহস্পতিবার সংসদ লবিতে অপ্রীতকর ঘটনার জন্য পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা। গতকাল টেলিফোনে ওই দিনের ঘটনার জন্য রাঙা দুঃখ প্রকাশ করেন বলেন জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানিয়েছেন।
জাভেদ ইকবাল, রংপুর থেকে জানান: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, রংপুর জেলা ও মহানগর শাখার সভাপতির পদে পুনঃবহালের দাবিতে শুক্রবার বিকালে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে রাঙ্গা সমর্থক জাপার অঙ্গসংগঠনের নেতারা। নতুন আহ্বায়ক কমিটির নেতারা বলেছেন এরশাদের ঘন ঘন এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রতি আমরা আস্থা রাখতে পারছি না। পার্টিও চেয়ারম্যান আমাদের দায়িত্ব দিয়ে সংঘর্ষ বাধাতে চান। আবার কালকে এ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিলে তখন রংপুরে বাস করা কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে দলীয় কার্যালয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাঙ্গার সমর্থকরা কার্যালয় দখলে রেখেছে। যে কোন মুহূর্তে সংঘর্ষের আশঙ্কায় সেখানে ব্যাপক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বিকালের সমাবেশে বক্তারা বলেন, জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ঢাকায় বসে অন্যের প্ররচনায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে মামা-ভাগ্নের সর্ম্পক নষ্ট করার অপচেষ্টা করছেন। সভা থেকে দাবি হয় তৃণমূল পর্যায়ে এসে রংপুরের নেতা-কর্মীদের উপস্থিততে যে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এরশাদের পাশে থেকে কাজ করে যাবে। কিন্তু ঢাকায় বসে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে রংপুরের নেতাকর্মীরা তা মেনে নেবে না। বক্তারা পর্াটির চেয়াম্যানের কাছে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গার প্রেসিডিয়াম পদ ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। তা না হলে কাফনের কাপড় পড়ে আগামী দিনে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে হমকি দেন। সমাবেশে জেলা জাপার সহসভাপতি সামসুল আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জেলা জাপার সাবেক সহসভাপতি আবদুল লতিফ খান, জাপা নেতা শামিম সিদ্দিকী, জেলা যুব সংহতির সভাপতি আলহাজ মো. আবদুল রাজ্জাক, সাধারণ সম্পাদক নাজিমুজ্জামান নাজিম, মহনগর যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউসুফ আহমেদ, জেলা ছাত্রসমাজের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম জবা, মহানগর ছাত্র সমাজের সভাপতি রিপন, রংপুর সরকারি কলেজ ছাত্রসমাজের সভাপতি সুমন, সাধারণ সম্পাদক পাপ্পু, রংপুর সদর উপজেলা জাতীয় পার্টি সভাপতি মো. আতোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মাসুদার রহমান মিলন জেলা মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদিকা কল্পনা প্রমুখ।

গভীর জলের ফিশ by শামীমুল হক

গভীর জলের ফিশ। মানে অতি চালাক। যাকে ধরা খুব কঠিন। ছোঁয়াও কঠিন। গভীর জলে থেকে তারা জেলেকে লেজ দেখায়। মিটিমিটি হাসে। মানুষের মধ্যেও এমন গভীর জলের ফিশ চরিত্র রয়েছে। যারা নিজেকে চতুর মনে করে। সব কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে। আর মনে মনে ভাবে আমি যে এত চতুর কেউ তা বুঝতেই পারে না। এটা ভেবে তিনি আত্মতৃপ্তি পান। গ্রামে গঞ্জে, শহরে-বন্দরে এমন গভীর জলের ফিশের সংখ্যা এখন হাজারে হাজার। যাদের দেখলে, যাদের কথা শুনলে লজ্জায় শ্রোতাদের মাথা নিচু হয়ে আসে। কিন্তু তাদের মাথা উঁচুই থাকে। কোন বিষয়ে নিজ স্বার্থে এমন কথা বলেন, যা কিনা একেবারেই অযৌক্তিক। অথচ এ অযৌক্তিক কথাকে সত্য প্রমাণ করতে নানা উদাহরণ হাজির করেন। মন দিয়ে শুনলে বোঝা যায়, তিনি যে সব উদাহরণ হাজির করলেন- তাতে তার কথা তারই বিপক্ষে যায়। তারপরও তিনি ঠেলে যাবেন নিজের কথার পক্ষে। ইদানীং দু’-একটি টিভি চ্যানেল দেখলে এমন গভীর জলের ফিশদের দেখা যায় সহাস্যে। হায় রে নিয়তি! চ্যানেলগুলোতে দু’পক্ষের লোকজনকে হাজির করে মুখোমুখি। একের পর এক বিষয় অবতরণ করেন উপস্থাপক। তারপর আর যায় কোথায়? দু’পক্ষই একসঙ্গে শুরু করেন লড়াই। কে কাকে দোষ দিতে পারবেন, কে কাকে কতটুকু ঘায়েল করতে পারবেন- চলে এর কসরত। এ অবস্থায়ই একপর্যায়ে উপস্থাপক তার অনুষ্ঠান শেষ করেন তড়িঘড়ি করে। এখানে গভীর জলের ফিসের ভূমিকায় থাকে দু’পক্ষই। শুধু টকশোতে কেন সব জায়গায়ই আজ গভীর জলের ফিশদের দাপট। মার্কেটে যাবেন? সেখানেও দেখবেন বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই গভীর জলের ফিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। শেষ পর্যন্ত ক্রেতা মনে করেন নিজে সফল মালামাল বিক্রি করতে পেরে। আর বিক্রেতা মনে করেন তিনি সফল মালামাল কিনতে পেরে। বিক্রেতা ভাবেন ভাল লাভ হয়েছে। ক্রেতাও ভাবেন অনেক কম দামে কিনেছি। তবে রাজনীতিতে গভীর জলের ফিশের অভাব নেই। কেউ কেউ একাধারে নিজ দলের পক্ষে অযৌক্তিকভাবে গলা ফাটিয়ে নিজেকে গভীর জলের ফিশ প্রমাণিত করেন। আবার কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে নিজেকে গভীর জলের ফিশ ভাবেন। আবার কেউ নিজ দলকে ভাঙিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হন। কেউ ভৃত্য থেকে হন জমিদার। কেউ নিঃস্ব থেকে হন কোটিপতি। কেউ কেউ হ্যাংলা থেকে হন মোটা-তাজা। কেউ বা নেতাকে পুঁজি করে হন সমাজের হর্তাকর্তা। তারা ধরাকে সরা জ্ঞান মনে করেন। তাদের আঙুলি হেলনে সমাজ চলে। তাদের হুঙ্কারে সমাজ থরথর করে কাঁপে। বেলা শেষে এর দায়ভার নিতে হয় দলকে। নেতাকে। আসলে রাজনীতিতে গভীর জলের ফিশরাই সবসময় বিপদ ডেকে আনেন। তারাই নেতাকে ভুল বুঝিয়ে কঠিন বিপদের দিকে ঠেলে দেন। শেষ মুহূর্তে যখন নেতা বিপদে পড়েন তখন আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। দেখা যায় ততক্ষণে তারা অনেক দূরে চলে গেছেন। হয়তো দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। নেতা তখন ভীষণ বিপদে। বিপদের দিনে এগিয়ে আসেন সুসময়ে যারা দূরে ছিলেন তারা। নেতাকে আগলে রাখেন। রোদ থেকে বাঁচাতে ছায়া দেন। বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে মাথায় ছাতা ধরেন। এ অবস্থায় দেখা যায় নেতা যখন দীর্ঘ সংগ্রাম করে বিপদ কাটিয়ে এগিয়ে গেছেন তখন কোথা থেকে যে সামনে এসে হাজির হন গভীর জলের ফিশরা তা টেরই পাওয়া যায় না। আবার তারা ঠিকই তাদের জায়গা করে নেন নেতার পাশে। দুঃসময়ে যারা কাছে ছিলেন সুসময়ে তারা কখনই কাছে আসতে পারেন না। তারা গুমরে মরেন। কিন্তু তাদের কিছুই করার থাকে না। নেতাও তাদের মনে রাখেন না। শুধু রাজনীতিতে কেন? সবক্ষেত্রেই চলছে আজ এ অবস্থা। গভীর জলের ফিশরা সব সময় তক্কে তক্কে থাকে। ঝোপ বুঝে কোপ মারে। সব নীতিকেই তারা দূরে ঠেলে সেখানে কায়েম করে দুর্নীতি। আফসোস হলো তাদের চিনেও কেউ কিছু করতে পারে না। তাদের কাছে কোথায় যেন জিম্মি। এ কারণেই দেখা যায় সারাজীবন মাঠের রাজনীতি করে কেউ সংসদে যেতে পারেন না। কিন্তু পয়সার জোরে রাজনীতি না করেও কেউ কেউ দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়ে যাচ্ছেন। দাবড়ে বেড়াচ্ছেন রাজনীতির ময়দান। রাজনীতিকদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছেন। গভীর জলের মাছ তাদের না বলে কাদের বললে ভাল হবে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, গোটা দেশটাই যেন গভীর জলের ফিশের কবলে পড়ে গেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন করতে পেরে কেউ কেউ নিজেদের গভীর জলের ফিশ ভাবছেন। অন্যদিকে নির্বাচনে অংশ না নিয়েও কেউ কেউ নিজেকে ভাবছেন গভীর জলের ফিশ।