Thursday, May 1, 2025

অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের প্রথম ইট স্থাপন করবে পাক সেনারা -পাকিস্তানি সিনেটর

বাবরি মসজিদ তৈরি হবে অযোধ্যায়। সেই মসজিদ স্থাপনের প্রথম ইট গাঁথবেন পাক সৈনিকরা। পাকিস্তানি সিনেটর পালওয়াশা মোহাম্মদ জাই খানের মন্তব্য রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে। পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের উচ্চকক্ষে পালওয়াশার বক্তৃতার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

সেখানে পালওয়াশা বলছেন, ‘অযোধ্যায় নতুন বাবরি মসজিদের প্রথম ইট পাকিস্তান সৈন্যরা স্থাপন করবে এবং প্রথম আজান দেবেন সেনাপ্রধান অসীম মুনির। আমরা মোটেও চুড়ি পরে বসে নেই।’ শুধু বাবরি মসজিদ নয়, ভারতীয় সেনা প্রসঙ্গেও বিভাজনমূলক মন্তব্য করেছেন পাক সিনেটর।

তার কথায়, ভারত যদি পাকিস্তানে আক্রমণ করে তাহলে নাকি শিখ ধর্মাবলম্বীরা তাতে অংশ নেবেন না। পালওয়াশার যুক্তি, ভারত যে পাকিস্তানকে এত হুমকি দিচ্ছে, ওদের জানিয়ে দিতে চাই-ভারতের শিখ সৈনিকরা মোটেও পাকিস্তানকে আক্রমণ করবে না। কারণ এটা তাদের কাছে গুরু নানকের দেশ।

পাকিস্তানি নেতারা ভারতের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মন্তব্য করার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। সম্প্রতি ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার পর পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি একটি উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখেন।

তিনি ভারতকে সতর্ক করে বলেন, ‘পাকিস্তানই সিন্ধু সভ্যতার প্রকৃত অভিভাবক। সিন্ধু নদ আমাদের। আর আমাদেরই থাকবে। হয় এখান দিয়ে পানি বইবে, নয়তো ওদের (ভারতীয়দের) রক্ত।’

গত বুধবার পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এক্স-এ বলেছেন, ‘পাকিস্তান শান্তি পছন্দ করে, কিন্তু তাদের এই আচরণকে দুর্বলতা হিসেবে ভুল করা উচিত নয়। পাকিস্তানের যেকোনো ভারতীয় আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে।’ সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, মিনট, নিউজ১৮

mzamin

গাজায় আরও ১৪ হত্যা, দুর্ভিক্ষাবস্থা

আজ বৃহস্পতিবার সকালের শুরুতেই গাজা উপত্যকায় আরও কমপক্ষে ১৪ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলিরা। ওদিকে ইসরাইলের দখল করে নয়া পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারী ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের সহায়সম্পদ ভাঙচুর করছে। গবাদিপশু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমতীরের জর্ডান উপত্যকায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর ওপর বুধবার দিবাগত রাতভর হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের একটি গ্রুপ। ইসরাইলের অবৈধ বসতি হামরা এলাকার কাছে এই ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা ফিলিস্তিনিদের তাঁবু, সৌর প্যানেল এবং অন্য সহায়সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করে। নিয়ে যায় কয়েক ডজন গবাদিপশু। ওদিকে গাজায় ত্রাণ সরবরাহ ইসরাইল বন্ধ করে দেয়ার ফলে সেখানে ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়া বলছে, দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অনাহারী শিশুদেরকে রাস্তায় রাস্তায় খাবার চেয়ে কাঁদতে দেখা যাচ্ছে। কাউকে দেখলেই তারা একবুক আশা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কারো কাছে খাবার নেই। ওদিকে খাদ্যপণ্যের দাম ৫০০ গুনের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলছেন, খাদ্যের গুদামঘরে যেটুকু খাবার জমা আছে তার সন্ধানে সেখানে যেতে পারছে না লোকজন। ইসরাইলি সেনারা তাদের ওপর আগ্রাসীভাবে অভিযান চালাচ্ছে। ফলে যেটুকু খাবার সেখানে অবশিষ্ট আছে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হানি মাহমুদ এর আগে জাতিসংঘের দেয়া বিবৃতির উল্লেখ করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, সীমান্তের অন্যপাড়ে অত্যাবশ্যকীয় সহায়তা ও জীবন রক্ষাকারী পণ্য নিয়ে অপেক্ষায় আছে তিন হাজার ট্রাক। কিন্তু তা গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরাইল। এসব ত্রাণের ওপর ভিত্তি করে বেঁচে থাকে গাজার প্রায় ১০ লাখ শিশু। এই খাবার গাজায় আসতে না দিলে সেখানে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। ওদিকে হামাস ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ১৫ই মে থেকে নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুইজারল্যান্ড। এই সিদ্ধান্ত থেকে তাদেরকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে হামাস। বলা হয়েছে, তাদের এ সিদ্ধান্ত দখলদারদের পক্ষে বিপজ্জনক অবস্থান। এর মধ্য দিয়ে তারা আইনগত ও মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাকে উপেক্ষা করছে। হামাস বলেছে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছেন। এ জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রতিশ্রæতি প্রয়োজন।
mzamin

ভারতের ১৭২টি, পাকিস্তানের ১৭০টি পারমাণবিক অস্ত্র: পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কতটুকু? by হান্না জোস এবং প্যাট্রিক মার্টিন

ভারতশাসিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সীমান্তে যুদ্ধের দামামা চরমে। ২২শে এপ্রিল পেহেলগামে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করছে ভারত। এর আগের মতোই পাকিস্তান সরকার জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করছে। উল্লেখ্য, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরকে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই নিজেদের বলে দাবি করে। উভয় দেশই এই অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা নিয়ন্ত্রণ রেখা দিয়ে আলাদা করা হয়েছে। কয়েক দশক ধরে এটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সন্ত্রাসী এবং তাদের মদতদাতাদের’ খুঁজে বের করার অঙ্গীকার করেছেন। উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞরা ঘটনাবলী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা কতটা প্রবল?

‘এখন আঘাত করার সময়’
এবিসি উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেছে। তাদের বেশিরভাগই বলেছেন, সামরিক জবাবের সম্ভাবনা খুব বেশি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার রাজ শুক্লা বলেন, পেহেলগাম আক্রমণ দুটি কারণে বিশেষভাবে জঘন্য ছিল। এটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। যা আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ। হামলা থেকে বেঁচে যাওয়াদের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা ধর্ম অনুযায়ী পর্যটকদের চিহ্নিত করে। পাকিস্তান কীভাবে এই হামলায় জড়িত সে সম্পর্কে ভারত এখনও কোনও প্রমাণ দেয়নি।

পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং ভাষ্যকার আম্বার শামসি বলেন, ভারতের অভিযোগ ‘স্পষ্টতই একটি প্যাটার্নকে অনুসরণ করে করা। এ বিষয়ে আমাদের আগের সাবেক প্রধানমন্ত্রীরা বলেছেন। সমস্যা হলো এবারের অভিযোগটি সেই একই প্যাটার্নের উপর ভিত্তি করে। এ বিষয়ে দৃঢ় প্রমাণ নেই। তবুও গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ইয়ান হল পাকিস্তানের অস্বীকার করার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে বেশ ভালো প্রমাণ আছে যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক বাহিনীর কিছু অংশ এই গোষ্ঠীগুলির সাথে ঘনিষ্ঠ। এ বিষয়ে পাকিস্তানের যুক্তি ক্ষীণ। কিন্তু ভারত বেশ আগে থেকেই আঙুল তোলার প্রবণতা দেখিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ‘ভারতের প্রতিক্রিয়ার ধরণ, লক্ষ্য এবং সময় নির্ধারণের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’ রয়েছে।

কিন্তু এটি এমন এক সংকট, যা রক্তাক্ত হতে পারে। এর ধারা দীর্ঘও হতে পারে। এ কথা বলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল শুক্লা। ভারতীয় অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক ভাষ্যকার অজয় শুক্লা বলেন, উভয় দেশই কঠিন অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, এই উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য কিছু না থাকলে, মুখ বাঁচানোর উপায় না থাকলে, অন্য কারো কিছু করার ক্ষমতা খুব কম।

এটা কি পারমাণবিক যুদ্ধে পরিণত হবে?
অধ্যাপক ইয়ান হল একমত যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক প্রতিশোধ নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি হবে অভূতপূর্ব। তিনি বলেন, আমি আশা করছি এবার আমরা আবার নতুন কিছু দেখতে পাব। তারা সমুদ্রভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার চেষ্টা করতে পারে। কারণ পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে (কাশ্মীরে) খুব সাবধানতার সাথে নজর রাখছে। আমরা যা কিছু দেখব তা মূলত একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচলিত সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা থাকলেও পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা নেই। ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ‘প্রথমে ব্যবহার নয়’ নীতি রয়েছে। সেখানে পাকিস্তান বলেছে- তারা ‘অস্তিত্বগত হুমকির’ সম্মুখীন হলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। দুই দেশের কাছেই তুলনামূলক পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে। ভারতের কাছে ১৭২টি এবং পাকিস্তানের কাছে ১৭০টি পারমাণবিক অস্ত্র আছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল শুক্লা বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা বুদ্ধিমান। বিকল্প পথ খোলা রেখেও তারা ‘পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে চাইবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটা ধরে নেবে যে, পারমাণবিক যুদ্ধ খুবই অসম্ভব।

চীন অবশ্যই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করবে। শেষ পর্যন্ত এসব বিষয় কোনও চূড়ান্ত পরিণতি ছাড়াই থেমে যাবে। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, সর্বাত্মক যুদ্ধের সম্ভাবনা কম। তবে তা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তিনি বলেন, উভয় দেশেরই পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি একটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সীমিত।

ভারত সরকার ‘কঠিন অবস্থানে’
তবুও, বিশ্লেষকরা বলছেন নরেন্দ্র মোদীর উপর কঠোর প্রতিশোধ নেয়ার চাপ বাড়ছেই। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের গবেষক সুবীর সিনহা বলেন, দেশের ভিতর যুদ্ধের জন্য মোদির প্রতি ব্যাপক সমর্থন আছে। কিন্তু তাতে ক্ষতির হবে ব্যাপক। তাই প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করা কঠিন হবে। পাকিস্তানি ভাষ্যকার শামসি বলেন, যদিও মোদি বড় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে আছেন, তবুও ২০১৯ সালে পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা ভারত কীভাবে প্রতিক্রিয়ায় কি ঘটেছিল তা থেকেই ইঙ্গিত মিলবে।

শামসি বলেন, আগেরবার ভারত যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা বেশিরভাগই প্রতীকী ছিল। খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। তাই হয়তো তারা আবারও একই রকম কিছু করবে। ভারতীয় কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, তারা পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন জৈশ-ই-মোহাম্মদের সাথে যুক্ত বিপুল সংখ্যক সন্ত্রাসী, প্রশিক্ষক এবং কমান্ডারকে হত্যা করেছে। পক্ষান্তরে পাকিস্তান দাবি করেছে  কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে অধ্যাপক ইয়ান হল বলেন, মোদি নিজেকে একজন শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে-  তিনি এই সমস্যাগুলি সমাধান করবেন। কিন্তু ভারতে এমন আক্রমণের ঘটনা ঘটতেই থাকে। সুতরাং এটি মোদী সরকারের উপর খুব সিদ্ধান্তমূলক কিছু করার জন্য আরও চাপ সৃষ্টি করে।
(অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এবিসি নিউজের অনুবাদ)  

mzamin

কাশ্মীর হামলার পর চাপে ভারতের মুসলিমরা, বেড়েছে দমনপীড়ন

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সাম্প্রতিক এক সন্ত্রাসী হামলার পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ধরপাকড়, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ নানা দমনমূলক কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীরা। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

গত সপ্তাহে কাশ্মীরের পেহেলগামে ভয়াবহ হামলায় নিহত হন ২৬ জন, যাদের অধিকাংশই হিন্দু ধর্মের অনুসারি ছিলেন। ভারতের দাবি, এই হামলায় পাকিস্তান মদদ দিয়েছে, যদিও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করেছে।

হামলার জবাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হামলার জবাবে ‘সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন’ করার ঘোষণা দেন এবং বক্তব্যে পাকিস্তানে সামরিক হামলার ইঙ্গিতও দেন। জবাবে পাকিস্তানের এক মন্ত্রী মঙ্গলবার বলেন, তারা যে কোনো সম্ভাব্য আগ্রাসনের মোকাবিলায় প্রস্তুত।

এদিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও চলছে দমনপীড়ন। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে ‘অবৈধ অভিবাসী’ অভিযানের নামে মুসলিমদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নানা স্থানে ‘বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়ে ভারতীয় মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে। অথচ এদের অনেকেই দেশটির নাগরিক।

অপরদিকে কাশ্মীরি মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও। হামলার পর জম্মু ও কাশ্মীরের প্রায় ২ হাজার স্থানীয়দের সন্দেহের জেরে আটক করা হয়েছে ‘সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট’ অভিযোগে। অনেকে অভিযোগ করছেন, তাদের বাড়িঘর বিনা নোটিশে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কাশ্মীরি ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা হুমকি ও হয়রানির মুখে রয়েছেন। উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো এমনকি কাশ্মীরি ফেরিওয়ালাদের মারধরের ভিডিও প্রকাশ করছে সামাজিক মাধ্যমে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, পেহেলগামে যা ঘটেছে, তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু তা কোনোভাবেই সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার অজুহাত হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, জাতীয়তাবাদী চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ার ঘৃণার ভাষা এই সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উত্তর প্রদেশ ও কর্ণাটকে মুসলিমদের লক্ষ্য করে হত্যার মতো ঘৃণামূলক অপরাধ ঘটেছে। উত্তর প্রদেশে সম্প্রতি এক মুসলিম রেস্তোরাঁকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়, আরেকজন আহত হন। হামলাকারীরা একটি ভিডিওতে ২৬ জনের মৃত্যুর বদলায় ২,৬০০ জনকে হত্যার শপথ নেয়। যদিও পুলিশ পরে জানায়, হত্যার পেছনে ছিল ‘খাবার সংক্রান্ত’ বিরোধ। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি হেট ক্রাইম হিসেবেই বিবেচ্য।

উত্তর প্রদেশ পুলিশের দাবি, তাদের অভিযানে ৬,৫০০ জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আটক ব্যক্তিদের দড়ির বেড়ায় ঘিরে রাস্তায় হাঁটানো হচ্ছে। অথচ পুলিশই পরে জানায়, এদের মধ্যে মাত্র ৪৫০ জনকে ‘অবৈধ’ হিসেবে শনাক্ত করা গেছে।

গুজরাটের আহমেদাবাদেও এমন একটি মুসলিম বসতিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২,০০০ বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে রাজ্য সরকার। ২,০০০ পুলিশ মোতায়েন করা হয় এই অভিযানে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ সাংভি দাবি করেন, এটি ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ উচ্ছেদ অভিযান। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা বহু বছর ধরে সেখানেই বসবাস করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি নোটিশ ছাড়াই ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক কর্মী হর্ষ মন্দার বলেন, ভারতের মুসলিমদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অধিকার হরণ করাটা বিজেপির বহু পুরনো কৌশল। তিনি আরও বলেন, এই অভিযান প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কিভাবে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বিভিন্ন রাজ্যে থাকা কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দলের প্রতিনিধিদের পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পেহেলগামের হামলাকে ব্যবহার করে বিজেপি একদিকে মুসলিমদের ‘অবৈধ’ হিসেবে উপস্থাপন করছে, অন্যদিকে নিজেদের কঠোর প্রতিরক্ষা নীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে।

ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে নির্বিচারে কয়েকটি রাজ্যে আটক করা হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে নির্বিচারে কয়েকটি রাজ্যে আটক করা হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত



অবৈধ নির্বাচনের ‘বৈধ’ মেয়রগণ by সোহরাব হাসান

২৬ এপ্রিল প্রথম আলোয় স্থানীয় সরকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। এটি ছিল মূলত তাঁর মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারি কাজে তাঁর বাবার লাইসেন্স পাওয়া নিয়ে।

ওই সাক্ষাৎকারে তাঁকে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার সংস্থায় আদালতের রায় নিয়ে মেয়র পদে বসা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল। এর জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, ওই নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে এবং অ্যাকনলেজ (স্বীকৃতি দেওয়া) করা হচ্ছে। আমার মনে হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর এই নির্বাচনগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করা এবং অবৈধ নির্বাচন থেকে কোনো প্রাপ্তিস্বীকার না করার সততাটা থাকা উচিত।’

এর আগে জাতীয় সংসদের একাধিক নির্বাচনেও পরাজিত প্রার্থী আদালতে মামলা করে পক্ষে রায় পেয়েছেন। অনেক বিলম্বে। কখনো সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, কখনো আবেদনকারী মারা যাওয়ার পর।

চট্টগ্রামের বিএনপির দলীয় প্রার্থী শাহাদাত হোসেন মেয়াদের আগে রায় পাওয়ায় শপথ নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ইশরাকের বেলায় দলের সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি। যদি দল শপথ নেওয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়, তিনি সময় পাবেন আগামী ১৫ মে পর্যন্ত।

এ ঘটনায় আরেকটি কঠিন সত্য বেরিয়ে এল। নির্বাচনী অনিয়ম ও কারচুপির বিরুদ্ধে আদালতে যেসব মামলা হয়, সেগুলো ১৮০ দিন বা ছয় মাসের মধ্যেই রায় হওয়া উচিত। বছরের পর বছর এসব মামলা ঝুলে থাকলে আদালতের ন্যায়বিচারও বিচারপ্রার্থীর কোনো কাজে লাগে না।

আদালতের এই রায় ক্ষমতাসীনদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে, আশা করি। আদালত যখন কোনো প্রার্থীর পক্ষে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের দেওয়া রায় অবৈধ ঘোষণা করলেন, তখন সেই পদের বিপরীতে তিনি যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, সেটাও ফেরত দেওয়া উচিত। তাহলে ভবিষ্যতে কেউ এই পথে যেতে সাহস পাবেন না।

নির্বাচন সংস্কার কমিশন নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে অনেকগুলো সুপারিশ করেছে। যেসব সুপারিশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকারও কার্যকর করতে পারে।

২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসকে বিজয়ী হিসেবে মেয়র ঘোষণা করা হয়। এ-সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের গেজেট চ্যালেঞ্জ করে ২০২০ সালের ৩ মার্চ তাপস, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আটজনকে বিবাদী করে নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন। ইশরাক প্রয়াত বিএনপি নেতা ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। ওই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করে গত ২৭ মার্চ রায় দেন ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল।

এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে নয়জনকে বিবাদী করে মামলা করেন মেয়রপ্রার্থী নগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে অপসারণ করে গত ১৯ আগস্ট চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. তোফায়েল ইসলামকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার।

গত ১ অক্টোবর শাহাদাত হোসেনের পক্ষে রায় দেন আদালত।

প্রকৃত ঘটনা হলো, তিনি প্রথমে প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিমের নানা অনিয়ম ও কারচুপির তথ্য–প্রমাণ দিয়ে প্রথমে নির্বাচনটি বাতিল করার আবেদন করেন। এরপর ২০২৪ সালের আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি সম্পূরক আরজিতে তাঁকে (শাহাদাত হোসেন) নির্বাচিত ঘোষণার আবেদন জানান।

আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, ইশরাক প্রথমে নির্বাচনী রায় বাতিলের আবেদন জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শাহাদাতকে চট্টগ্রামের মেয়র ঘোষণার পর তিনি আদালতে সংশোধনী আরজি জানান। সেখানে তাঁকে বিজয়ী ঘোষণার আবেদন করা হয়।

নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সেই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল মাত্র ২৯ শতাংশ, যা ছিল অবিশ্বাস্য।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২০২৩ সালের নির্বাচনের ফলাফল বাতিল চেয়ে ২৩ এপ্রিল আদালতে মামলার আবেদন করেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মেয়রপ্রার্থী ইকবাল হোসেন (তাপস)। সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি।

সম্প্রতি আদালতে মামলার পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন তাদের প্রার্থঅ মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করার দাবিতে আদালত প্রাঙ্গনে সমাবেশও করেছেন মামলার শুনানির দিন। দলের বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ফ্যাসিবাদী সরকার জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও বারবার জালিয়াতি করেছে। এখন আবার সেই জালিয়াতির নির্বাচনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের মেয়র ঘোষণার জন্য আদালতে মামলা ও মাঠে আন্দোলন করছেন। আগামী ৫ মে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনী মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কেন আদালতে যাচ্ছে না, জানতে চাইলে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘চট্টগ্রামের ঘটনার সময় এটা হয়েছে। তখন আমি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম না। এই যে রায়টা হলো, এ মামলায় কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কোনো পক্ষ ছিল না, আমরা পক্ষভুক্ত ছিলাম না। সুতরাং অফিশিয়ালি এটার অপোজ করার সুযোগ আমাদের নেই।’

মন্ত্রণালয় পক্ষভুক্ত থাকুক বা না থাকুক সরকার যে কোনো মামলার বিষয়ে আপিল করতে পারে। আপিল না করলে ধরে নেওয়া হবে সরকার রায়ে সন্তুষ্টু। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার বক্তব্যটি ব্যক্তিগত না সরকারের সেই প্রশ্নও উঠবে।

রায় ঘোষণার পর বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে শুক্রবার ইশরাক হোসেন বলেন, ভোটে তিনি হারেননি, তাঁকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর আইন মেনে তিনি মামলা করেছিলেন। সেই মামলা তখন ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর আইনি লড়াইয়ের পর তিনি এখন ন্যায়বিচার পেয়েছেন।

ন্যায়বিচার পেয়েছেন সন্দেহ নেই। কিন্তু যে নির্বাচনে আদালতের রায়ে ইশরাক মেয়র হলেন, সেটি কতটা ‘নির্বাচন’ হয়েছিল, সেই প্রশ্নও না উঠে পারে না। নির্বাচন কমিশন ২৯ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখালেও প্রকৃত ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক কম।

এর আগে এক কলামে লিখেছিলাম, ‘ইশরাক ‘মেয়র’ হলেন, বিএনপি এখন কী করবে।’ তখনো নির্বাচন কমিশন গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি। গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তিনি বা বিএনপি কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই দেখার বিষয়। প্রশ্ন হলো, যেই নির্বাচনকে বিএনপি এতদিন অবৈধ ও কারচুপির নির্বাচন বলে আসছে,আদালতের রায় নিয়ে মেয়রের পদে বসে নেই নির্বাচনকেই জায়েজ করবেন কিনা।

* সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক ও কবি

অবৈধ নির্বাচনের ‘বৈধ’ মেয়রগণ

ইথিওপিয়া হিজরতের গল্প by সাব্বির জাদিদ

ইথিওপিয়া হিজরত মক্কার নিপীড়িত জীবনে নবিজির (সা.) একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু হলে যখন নির্যাতনের মাত্রা তীব্র হলো, নবিজি তাঁর সাহাবিদেরকে ইথিওপিয়ায় (তখনকার আবিসিনিয়া) হিজরতের নির্দেশ দিলেন। প্রশ্ন হলো, ইথিওপিয়াই কেন, যার দূরত্ব আবার মক্কা থেকে চার হাজার চারশ ছিয়াশি কিলোমিটার? অন্য কোনো দেশ নয় কেন? মুহাম্মদ (সা.) জেনেছিলেন, ইথিওপিয়ার শাসক একজন খ্রিষ্টান। তিনি ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ, দূরদর্শী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি এমন মানুষ, যার ওপর মজলুমরা ভরসা রাখতে পারে। আর একারেই হিজরতের প্রথম ভূমি হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ইথিওপিয়াকে।

নবীজির (সা.)ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। সম্রাট নাজ্জাশির ইথিওপিয়া উদার বক্ষে গ্রহণ করেছিল মুহাজির মুসলিমদেরকে। যদিও মক্কার কাফেরদের ক্রোধের থাবা বিস্তৃত হয়েছিল সাগরের ওপারের নিরীহ দেশটি পর্যন্ত। কিন্তু আসহামা নাজ্জাশির বিচক্ষণতা এবং ন্যায়পরায়ণতার সামনে কাফেরদের কোনো চক্রান্ত টিকে থাকতে পারেনি।

ইথিওপিয়ায় হিজরতের ঘটনা ঘটেছিল দুইবার। প্রথমবারের সদস্য সংখ্যা ছিল ষোলজন। এঁদের মধ্যে বারোজন ছিল পুরুষ এবং চারজন নারী। দলপতি ছিলেন ওসমান ইবনে আফফান (রা.)। দ্বিতীয়বারের দলটি ছিল বড়। তিরাশি জন পুরুষ এবং আঠারো জন নারী ছিল সেই দলে। মক্কার কাফেররা যখন জানতে পারল, মুসলমানরা তাদের হাত ফস্কে বেরিয়ে ইথিওপিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে, ক্রোধে উন্মাদ হয়ে গেল তারা। মুসলমানদের ফিরিয়ে আনতে তারা আমর বিন আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়াকে পাঠাল ইথিওপিয়ায়। অজস্র উপঢৌকন নিয়ে তারা হাজির হলো লোহিত সাগরের ওপারের দেশে। প্রথমে চামড়ার উপহার সামগ্রী প্রদান করে তারা হাত করল নাজ্জাশির পারিষদবর্গকে। তারপর অবশিষ্ট উপঢৌকন নিয়ে প্রবেশ করল সম্রাটের দরবারে। বলল, আমাদের দেশের একদল ধর্মদ্রোহী আপনার দেশের আশ্রয় নিয়েছে, মহামান্য সম্রাট। এরা মক্কার পরিবেশ নষ্ট করে এখন এসেছে আপনার এখানে। এরা নতুন এক ধর্মমত প্রচার করছে। যার সাথে না আমাদের ধর্মের মিল আছে না আপনার ধর্মের। এরা খুব বিপজ্জনক। পূর্বপুরুষের ধর্ম এবং ঐতিহ্যের সাথে এরা গাদ্দারি করেছে। মক্কার নেতৃবর্গ এদের ফিরিয়ে নিতে আমাদেরকে পাঠিয়েছেন।

মহামান্য সম্রাট, ধর্মদ্রোহীদেরকে আমাদের হাতে ন্যস্ত করুন। আমরা ওদেরকে মক্কায় নিয়ে যেতে চাই। কথা শেষ করে তারা সম্রাটের সামনে উপঢৌকন পেশ করল। পারিষদবর্গ সায় দিল তাদের কথায়। কিন্তু প্রতিনিধিদ্বয়ের বিবরণে খটকা লাগল সম্রাটের মনে। ইনজিলে বর্ণিত প্রতিশ্রুত সেই মহামানব কি তবে এসে গেছেন বসুন্ধরায়! খানিক ভেবে তিনি বলেন, তোমাদের কথা শুনলাম, কিন্তু যাচাই-বাছাই না করে তো আমি আশ্রিতদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দিতে পারি না। তিনি আশ্রিত মুসলমানদেরকে দরবারে ডেকে পাঠালেন। মুহাজির মুসলমানদের দলটি যখন সম্রাটের কাছে এল, সম্রাট বললেন, যে ধর্মের কারণে তোমরা পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করেছ, সেই ধর্ম সম্পর্কে আমাকে জানাও।

মুসলমানদের মনোনীত মুখপাত্র জাফর বিন আবি তালিব খানিকটা এগিয়ে গেলেন। তারপর যা বললেন তার সারসংক্ষেপ এই: আমরা অজ্ঞতা, অশ্লীলতা, পাপাচারে লিপ্ত ছিলাম। আমরা ছিলাম নারী নিপীড়ক। মৃত প্রাণী ছিল আমাদের আহার। আমরা এক আল্লাহকে ভুলে বহু খোদার বন্দেগি করতাম। দুর্বলের সম্পদ গ্রাস করা ছিল আমাদের পেশা। হত্যা, লুণ্ঠন, মদ, জুয়ায় আমরা আকণ্ঠ ডুবে ছিলাম। এই যখন অবস্থা, তখন আমাদেরই ভেতর থেকে আল্লাহ একজন রসুল পাঠালেন। তিনি আমাদের আহ্বান করলেন একত্ববাদের দিকে। আমাদেরকে ডাকলেন অন্ধকার থেকে আলোর পথে। আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন নামাজ পড়তে, আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে। আমাদেরকে ত্যাগ করতে বললেন হত্যা, লুণ্ঠন, অশ্লীলতা, মিথ্যা।

তোমাদের রসুল আল্লাহর কাছ থেকে যা এনেছেন তার কোনো নিদর্শন দেখাতে পারবে?

জাফর (রা.) হৃদয়ে আবেগ আর কণ্ঠে মমতা ঢেলে পাঠ করলেন সুরা মরিয়ামের প্রথম কয়েকটি আয়াত। কোরআনের সুর লহরিতে দরবারে এমন এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হলো, সকলে কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে লাগলেন সম্রাট ও পাদ্রিগণ। চোখের জলে তাদের দাড়ি এবং সামনে রাখা সহিফাগুলো ভিজে গেল। নাজ্জাশি চোখ মুছে ভরাট কণ্ঠে বললেন, এই বাণী আর হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর অবতীর্ণ বাণী একই উৎস থেকে নাজিল হয়েছে। এবার তিনি শক্ত চেহারায় তাকালেন মক্কার প্রতিনিধিদ্বয়ের দিকে। বললেন, তোমরা যে উদ্দেশ্যে আমার কাছে এসেছ, সেই উদ্দেশ্য আমি সফল হতে দেব না। ফিরিয়ে নাও তোমাদের উৎকোচ। এঁরা আগে যেমন আমার আশ্রয়ে ছিল এখনো তেমনি থাকবে। এঁদেরকে কখনোই তোমাদের হাতে ন্যস্ত করব না। এরপর আশ্রিতদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যারা তোমাদেরকে অভিসম্পাত করবে, তাদেরকে আমি জরিমানা করব। এক পাহাড় স্বর্ণ দিলেও তোমাদের গায়ে আঘাত লাগতে দেব না। আল্লাহ যখন আমাকে এই রাজ্য দিয়েছেন, তখন আমার থেকে কোনো উৎকোচ নেননি। তাহলে আমি কেন উৎকোচ গ্রহণ করব!

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘাবড়ে গেল প্রতিনিধিদ্বয়। সম্রাটকে বিভ্রান্ত করতে শেষ প্রচেষ্টা চালাল আমর বিন আস। সে বলল, এরা আপনাদের নবি ঈসার ব্যাপারে মূর্খতাসুলভ কথা বলে, যা খুবই ভয়ঙ্কর।

জাফর বিন আবি তালিব বললেন, আমাদের নবী (সা.) থেকে জেনেছি, ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও রসুল। তার মা ছিলেন সতী-সাধ্বী-বিদুষী নারী। আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছায় স্বামী ছাড়াই তিনি ঈসা আলাইহিস সালামকে প্রসব করেছিলেন।

আমর বিন আস ভেবেছিলেন, এই কথা শোনার পর সম্রাট ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। শাস্তি দেবেন মুসলমানদের। কিন্তু আমরের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে সম্রাটের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এক টুকরো দণ্ড উঁচু করে ধরে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, জাফর যা বললেন ঈসা আলাইহিস সালাম তারচেয়ে এই দণ্ড পরিমাণও বেশি ছিলেন না। এরপর তিনি মুখ ফেরালেন জাফরের দিকে। বললেন, তোমরা নিরাপদে, শান্তিতে বসবাস করো আমার দেশে, যতদিন খুশি।

মুহাজির মুসলমানদের এই সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য নাজ্জাশিকে এতটাই প্রভাবিত করে, পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার মৃত্যুর সংবাদে নবীজি (সা.)গায়েবানা জানাজার নামাজ পড়েন মদিনায়। মক্কার দুর্বিষহ দিনে ইথিওপিয়ার হিজরত নবিজির এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে বিপুল সংখ্যক মুসলমান মুশরিকদের নিপীড়ন থেকে নিরাপদ শান্তিময় জীবনের স্বাদ পেয়েছিলেন। এবং যে সময়ে দুস্থ-অসহায়দের ঈমানের জোর ব্যতীত ইসলামের পার্থিব কোনো শক্তি ছিল না, সেই সময়ে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার দূরের এক খ্রিষ্টান শাসক মুসলমানদের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন।

সূত্র: প্রজ্ঞায় যার উজালা জগৎ

ইথিওপিয়া হিজরতের গল্প

পাকিস্তানকে যেভাবে জবাব দিতে হবে ভারতকে by শশী থারুর

কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যুর পর এই হামলার জবাবে কী করা উচিত, তা নিয়ে ভারতের মানুষের মধ্যে এখন আলোচনা চলছে। অনেকে এবং আমি নিজেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতোই মনে করি, অপরাধীদের এমন শাস্তি দেওয়া দরকার, যা তারা কোনো দিন ভুলবে না। তবে আবার কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধ এড়িয়ে চলা উচিত। প্রধানমন্ত্রী নিজেই একসময় বলেছিলেন, ‘এখন আর যুদ্ধের যুগ নয়।’ কিন্তু এটা তো সন্ত্রাসবাদের যুগও হওয়া উচিত নয়। তাহলে ভারতের কীভাবে জবাব দেওয়া উচিত?

প্রথমে ভাবতে হবে, যারা এই হামলা চালিয়েছে, আসলে তাদের চাওয়াটা কী। তাদের লক্ষ্য ছিল কাশ্মীরে শান্তির পরিবেশ নষ্ট করা। তারা চেয়েছে, যাতে সেখানে পর্যটন বন্ধ হয়ে যায়, স্থানীয় মানুষের জীবিকা নষ্ট হয়, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা চেয়েছে, ভারতের অন্য প্রান্তের মানুষ যেন কাশ্মীরিদের অবিশ্বাস করতে শুরু করে। এতে ভারতের ভেতরে বিভাজন বাড়বে, ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়বে। একই সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া যাবে এবং বিশ্ববাসীর কাছে কাশ্মীর ইস্যুকে আবার তুলে ধরা যাবে। তারা চায়, ভারত-পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবার একসঙ্গে বিবেচনা করা হোক।

এসব কিছুতে যাদের সবচেয়ে বেশি লাভ, তারা হলো পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তারা যেহেতু নিজের দেশে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, আর দেশের খারাপ অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে; সেহেতু এসব থেকে দৃষ্টি সরাতে তারা হয়তো এমন কিছু ঘটানোর চেষ্টা করছে। এই হামলার আগেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এক বক্তব্যে বলেছিলেন, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে কখনোই ভালো সম্পর্ক হতে পারে না।

তিনি আবার কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘জাগুলার ভেইন’ বা ‘জীবনের শিরা’ বলে দাবি করেন। যদিও বাস্তবে কারও শরীরের বাইরের কিছু কখনো তার শিরা হতে পারে না।
আমাদের এই খারাপ শক্তিগুলোর উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া যাবে না। এ জন্য প্রথমেই যে জিনিসটি আমাদের করা উচিত নয়, তা হলো আমরা যেন সাধারণ কাশ্মীরিদের দোষ না দিই। এই হামলার ঘটনায় কাশ্মীরিদের কোনো লাভ নেই, বরং এতে তাদের ক্ষতিই হয়েছে।

যদি আমরা শোক ও রাগের বশে কাশ্মীরিদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই বা যদি ভারতের বেশির ভাগ মানুষ কয়েকজন সন্ত্রাসীর কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো একটা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলে যায়, তাহলে সন্ত্রাসীরা তাদের উদ্দেশ্যে সফল হবে। আমাদের উচিত কাশ্মীরে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা, পর্যটনকে উৎসাহ দেওয়া এবং উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়া। ভারতের পক্ষ থেকে কাশ্মীরকে সুরক্ষিত রাখার অঙ্গীকার আরও জোরালোভাবে ঘোষণা করা উচিত। পর্যটকদের আবার উপত্যকায় যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।

একইভাবে আমাদের রাগ যেন নিজেদের দেশের মুসলিম নাগরিকদের দিকে না যায়। কিছু সন্ত্রাসী যদি দাবি করে, তারা সব মুসলমানের পক্ষ থেকে কথা বলছে, সেটার কোনো ভিত্তি নেই। ভারতের অধিকাংশ মুসলমানই শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চান, নিজেদের পূর্বপুরুষদের জন্মভূমিতে অন্য ধর্মের মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে, খেলতে, আনন্দ-দুঃখ ভাগ করে নিতে চান। যদি এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি মুসলমানকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বরং আমাদের উচিত এর উল্টো দিকটা তুলে ধরা। যেমন সেই কাশ্মীরিদের সাহসের কথা তুলে ধরা দরকার, যারা আক্রান্ত পর্যটকদের সাহায্য করতে ছুটে গিয়েছিলেন। সেই পানিওয়ালার কথা, যিনি হামলা থামাতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছেন, কিংবা অসংখ্য ভারতীয় মুসলমান যাঁরা ইন্টারনেটে বলেছেন, ‘এই হামলা আমাদের নামে হতে পারে না।’ এ ধরনের প্রতিবাদগুলো তুলে ধরলে এই ট্র্যাজেডিকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদের কট্টর ইসলামপন্থীরা চায় ভারত যেন তাদের ফাঁদে পা দেয়। তারা চায়, আমরা যেন ঠিক সেই আচরণ করি, যা তারা আশা করে। কিন্তু আমাদের উচিত আমাদের শোকের মধ্যেও নিজেদের ন্যায়পরায়ণ, সবার প্রতি সহনশীল এবং হিন্দু-মুসলমান, কাশ্মীরি-অকাশ্মীরি সবাইকে ভালো জীবনের নিশ্চয়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হিসেবে প্রমাণ করা।

আমরা যেন নিজেদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করাও শুরু না করি। যা ঘটেছে, তাতে স্পষ্ট যে এটি পরিকল্পিত হামলা ছিল। গোপন নজরদারি, নির্ভুল পরিকল্পনা আর সময় মেনে হামলা চালানো হয়েছিল। মূল দায় তাদের, যারা এই হামলা পরিকল্পনা ও কার্যকর করেছে।

অবশ্যই আমাদের পক্ষেও গোয়েন্দা তৎপরতা ও নিরাপত্তায় ভুল ছিল। সব জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনী থাকা সম্ভব না, আর কোনো দেশেই শতভাগ নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায় না। ইসরায়েলও এটি ৭ অক্টোবরের ঘটনা থেকে তা শিখেছে।

এই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং সরকারকে নিজের স্বার্থেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এই কাজগুলো করার সময় এখন নয়। এখন আমাদের একসঙ্গে থেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার সময়।

তাহলে এখন  কী করা উচিত

প্রথমত, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। আরেকটি হামলার ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। কাশ্মীর উপত্যকায় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান আরও কঠোর করেছে। জঙ্গিদের সঙ্গে জড়িত লোকদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হচ্ছে। বার্তা স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে।

তবে এখন আর বাড়িঘর ধ্বংস না করাই ভালো, কারণ এতে নিরীহ মানুষের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শাস্তি বা প্রতিরোধ নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে উপত্যকার মানুষ ও পর্যটক—সবাই বুঝতে পারে কাশ্মীর নিরাপদ ও স্থিতিশীল। পর্যটন উৎসাহিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে একদিকে যেমন অর্থনীতির উপকার হবে, অন্যদিকে মানুষের মনে এই সংকটের মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি ফিরে আসবে।

দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক দিক থেকে আরও তৎপর হতে হবে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এমনিতেই এতটাই খারাপ হয়ে গেছে যে নয়াদিল্লি ইতিমধ্যে প্রায় সব অসামরিক উপায়ে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ফেলেছে। তবুও কূটনৈতিক পর্যায়ে এখন দরকার আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করে পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়ানো। যদিও সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের (যেমন জেনারেল মুনির) বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আনা কঠিন হতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্ক ফাঁস করে দিলে পাকিস্তান আরও কোণঠাসা হবে।

ওসামা বিন লাদেন হত্যার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যে বদনাম হয়েছিল, সেটি এখন ভারতের কাজে লাগানো উচিত। বিশ্বসম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে ভারত যেন এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, যাতে পাকিস্তানের আগ্রাসী আচরণ রোধ করা যায়। যেমন পাকিস্তানের জন্য সামরিক সহায়তা বন্ধ করা, যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল করা, যন্ত্রাংশ সরবরাহে বিধিনিষেধ আনা, অমানবিক সাহায্য (নন-হিউম্যানিটারিয়ান এইড) কমানো এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে বহুপক্ষীয় অর্থায়ন বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা।

ভারতের উচিত যেসব পাকিস্তানি সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাদের প্রত্যর্পণের দাবি তোলা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় তাদের আবার যুক্ত করা এবং ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে এফএটিএর (আর্থিক কারচুপি ও সন্ত্রাসী অর্থায়নবিরোধী সংস্থা) চাপ বাড়ানোর দাবি তোলা।

তবে এসবই যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিতে হলে আরও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে আবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালানো হতে পারে। এ ছাড়া ২০১৯ সালের বালাকোট হামলার চেয়েও বড় আকারে বিমান হামলা চালানো যেতে পারে, যেখানে জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হবে। আবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমেও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ঘাঁটিতে আঘাত হানা যেতে পারে, যাতে ভারতের ক্ষোভ আরও স্পষ্টভাবে বোঝানো যায়।

ভারতের প্রতিক্রিয়া কেবল স্থল ও আকাশপথেই সীমাবদ্ধ না থেকে নৌবাহিনীও এতে যুক্ত হতে পারে। আরব সাগরের উত্তরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারতীয় নৌবাহিনী পাকিস্তানি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে চাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে বাণিজ্যে বিমা খরচ বাড়বে, পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং তাদের বিপজ্জনক আচরণের খেসারত আরও বাড়বে।

একদিকে দৃশ্যমান (ওভার্ট) পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যদিকে গোপন (কোভার্ট) অভিযানও জোরদার করতে হবে—যাতে পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসী নেতারা এবং তাদের নেটওয়ার্ক সব সময় হুমকির মুখে থাকে। পাশাপাশি ভারতকে সাইবার যুদ্ধের কৌশলও গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচালনা ক্ষমতা এবং পুরো অবকাঠামো ভেঙে দিতে হবে।

পাকিস্তান কী করবে

পাকিস্তান সম্ভবত পুরোপুরি যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। কারণ, তাদের সামরিক শক্তি এখন বেশ সীমিত। আর পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ভয় দেখানো হলেও বাস্তবে সেটা খুব একটা কাজে আসে না। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সাম্প্রতিক উদাহরণ থেকে আমরা দেখেছি, পারমাণবিক অস্ত্র সাধারণত হুমকি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, আসল যুদ্ধের জন্য নয়।

যদি পাকিস্তান এই অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়, তাহলে গোটা দুনিয়ার নজর সেদিকে যাবে। পাকিস্তান ভালো করেই জানে, এমন হুমকি দিলে তার ভয়াবহ ফল হতে পারে। তাই পাকিস্তান সম্ভবত সীমিত পরিসরের কোনো সামরিক সংঘর্ষে যেতে চাইবে, যাতে করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় এবং কাশ্মীর ইস্যু আবার আলোচনায় আসে। দেশের ভেতরে এই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের সেনাবাহিনীর মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে চাইবে, যেন মানুষ মনে করে, সেনাবাহিনীই দেশের নিরাপত্তার শেষ ভরসা।

ভারতের কাছে এটা নতুন কিছু নয়। ভারত আগেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। সব মিলিয়ে, ভারতের এমন কিছু করা দরকার, যাতে সবার কাছে স্পষ্ট হয় ভারত আর এই সন্ত্রাস সহ্য করবে না। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে, যেন ভারতের উন্নয়ন (যা আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার) থেমে না যায়।

আমরা কখনোই খুনিদের সামনে মাথা নোয়াব না।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
শশী থারুর ভারতের লোকসভার কংগ্রেস পার্টির এমপি

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে ভারতের মুম্বাইয়ে হিন্দু–মুসলমানদের প্রতিবাদ
কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে ভারতের মুম্বাইয়ে হিন্দু–মুসলমানদের প্রতিবাদ। ছবি : এএফপি

কোরআনের কাহিনি: বাঁধভাঙা বন্যার গল্প by রায়হান রাশেদ

ইয়েমেনের রাজধানী সানআ থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে মাআরিব শহর। মাআরিবে ছিল সাবা সম্প্রদায়ের বসতি। কোরআনে একটি সুরা আছে, সুরা সাবা। রানি বিলকিস ছিলেন সাবা সম্রাজ্যের সাম্রাজ্ঞী। তারা ছিল বণিক জাতি। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১১০০ সাল থেকে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এ-অঞ্চলে তাদের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের শহরের অবস্থান ছিল দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকায়। নদী-নালা, খাল-বিল কিছুই ছিল না। বাগান ও কৃষিজমিগুলো বড় আকালে পড়ে যেত সময়ে অসময়ে। বৃষ্টির পানি কিংবা পাহাড়ি ঝর্নার ওপর ভরসা করতে হতো। কিন্তু অনেক পানি মরুভূমিতে মিশে গিয়ে নষ্ট হয়ে যেত। কখনো উভয় পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি বন্যার মতো নেমে শহর ভাসিয়ে দিত। দেশের সম্রাটরা উত্তরণের পথ খুঁজতে লাগলেন। আল্লাহ তাদের সহায় হলেন। ইয়েমেনের আশপাশের শহর ও বসতিগুলোতে নির্মাণ তারা করলেন একশোটির বেশি বাঁধ। মাআরিব শহরের দক্ষিণ পাশে ডানে ও বাঁয়ের পাহাড়ের মাঝখানে উজাইনাহ উপত্যকায় প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্মাণ করলেন এই বাঁধের একটি; যাকে সাদ্দে মাআরিব বা মাআরিব বাঁধ বলা হতো। কেউ বলেছেন এ বাঁধটি ছিল দুই বর্গমাইল, আবার কেউ বলেছেন, বাঁধটি ছিল মূলত ১৫০ ফুট লম্বা ও ৫০ ফুট প্রশস্ত একটি প্রাচীর। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/১৫৯)

পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির পানি জমা হতো বাঁধে। বাঁধের ওপরে-নিচে ও মাঝখানে পানি বের করার তিনটি দরজা ছিল। দরজা দিয়ে সঞ্চিত পানি সুশৃঙ্খলভাবে শহরের লোকজন ও তাদের খেত-খামার এবং পৌঁছানো হতো। প্রথমে ওপরের দরজা, এরপরে মাঝখানের এবং সর্বশেষ নিচের তৃতীয় দরজা খুলে দিয়ে বছরব্যাপী পানির সঙ্কট কাটানো হতো। পরের বছর পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানিতে ভরে উঠত বাঁধ। বাঁধের নীচে পানির আধার নির্মাণ করে বিরাট বিরাট খালের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন দিকে পৌঁছানোর ব্যবস্থা ছিল। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ ১,১০৯)

এই বিশাল বাঁধ অন্যান্য বাঁধ থেকে পুরো দেশকে এমনভাবে জলতৃপ্ত করত, চতুর্দিকে শুধু বাগান আর বাগান দেখা যেত। মাইলের পর মাইল সবুজ শ্যামলিমায় ছেয়ে থাকত। চারপাশের খেজুরের বাগানগুলো খেজুরের কাঁদিতে নুইয়ে পড়ত। নানা ধরনের ফলফলাদিতে ভরে উঠত গাছগুলো। সুগন্ধ দ্রব্যসমূহের খেত, তৃণভূমি, দারুচিনি, আগর ও অন্যান্য সুগন্ধযুক্ত বৃক্ষের ঘন উদ্যান এত বেশি সৃষ্টি হয়েছিল যে গোটা এলাকাটি পুষ্পোদ্যান ও স্বর্গে পরিণত হয়েছিল। কাতাদাহ (রা.) বলেন, কেউ মাথায় খালি ঝুড়ি নিয়ে পথ ধরে গেলে গাছ থেকে পতিত ফলে ঝুড়ি ভরে যেত। (তাফসিরে ইবনে কাসির)। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সাবার অধিবাসীদের জন্য তো তাদের বাসভূমিতে ছিল নিদর্শন: দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে, অপরটি বামদিকে। (তাদের বলা হয়েছিল, হে সাবার অধিবাসীরা) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রদত্ত রিজিক ভোগ করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। উত্তম নগরী ও ক্ষমাশীল প্রতিপালক।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ১৫)

সাবা ছিল শান্তিকামী, নিরাপদ ও সুখী রাজ্য। তাদের বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় হতো প্রাসাদ ও অট্টালিকা নির্মাণে। পথঘাট সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল। আরাম-আয়েশ, উন্নতি ও সভ্যতার সব উপকরণ পূর্ণমাত্রাই বিদ্যমান ছিল। শহরে পোকামাকড়, মশা-মাছি ও সাপ-বিচ্ছুর মতো ইতর প্রাণীর নামগন্ধও ছিল না। বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তি শরীরে বা কাপড়ে উকুন ইত্যাদি নিয়ে এ শহরে এলেও সেগুলো আপনাই মারা যেত। সাবা থেকে শাম দেশ পর্যন্ত সাত শ গ্রাম আবাদ ছিল। সকাল বেলা এক জনপদ থেকে রওনা হলে দুপুরে আরেক জনপদে পৌঁছা যেত। সেখানে থেকে খেয়েধেয়ে অনায়াসেই অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল। কোরআনের ভাষায় ‘উত্তম নগরী’ হয়ে উঠেছিল সাবা।

এত নেয়ামত, সমৃদ্ধি এবং সুখী জীবনের পরও সাবা বাসী আল্লাহর নাফরমানি করল। আল্লাহ তাদের কাছে পথপ্রদর্শক পাঠালেন; যিনি তাদের আল্লাহর ইবাদত করার আদেশ দিলেন এবং কৃতজ্ঞতা আদায় করতে বললেন। তারা মুখ ফিরিয়ে নিল। বাঁধ ভাঙার ভয় দেখানো হলো তাদের। ইবনে কাসির ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহের সূত্রে বলেন, তাদের ধর্মগ্রন্থে লেখা ছিল, বাঁধটি ইঁদুরের মাধ্যমে ধ্বংস হবে। ফলে তারা ইঁদুর নিধনের জন্য বিড়াল পুষতে লাগল। তবে আল্লাহর ইচ্ছাকে রোখার সাধ্য কার? সেই বাঁধে এতই ইঁদুর এলো যে বিড়ালেরা হার মানল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইঁদুরগুলো বেশ বড় বড় ছিল এবং বাঁধের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত মাটি নষ্ট করে ফেলেছিল। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ ১,১০৯)

বিশাল বাঁধ একদিন ভেঙে পড়ল। সেই জলাধার থেকে বেরিয়ে আসা প্রচণ্ড স্রোত, পথিমধ্যে যতগুলো বাঁধ পেয়েছিল সবগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। মাআরিব ও আশপাশের ভূভাগকে প্লাবিত করলো। সুশোভিত ও মনোরম উদ্যানগুলোকে ডুবিয়ে দিয়ে নষ্ট করে ফেলল। ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হলো। মানুষ মারা পড়ল। যারা শহর ছেড়ে আগে চলে গিয়েছিল তারা বেঁচে রইল। বন্যার পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলো। তখন ওই স্বর্গসম উদ্যানগুলোর জায়গায় পাহাড়ের দুই পাশের উপত্যকার উভয় পাশে ঝাউ গাছের ঝাড়, জংলি বরইয়ের ঝোঁপ ও সারি সারি পিলু গাছ উৎপন্ন হলো। আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু তারা (আল্লাহ্‌র কাছ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিল। কাজেই আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠালাম বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যা, আর আমি তাদের বাগান দুটিকে পরিবর্তিত করে দিলাম এমন দুটি বাগানে যাতে জন্মিত বিস্বাদ ফল, ঝাউগাছ আর কিছু কুল গাছ। অকৃতজ্ঞতাভরে তাদের সত্য প্রত্যাখ্যান করার জন্য আমি তাদের এ শাস্তি দিয়েছিলাম। আমি অকৃতজ্ঞদের ছাড়া এমন শাস্তি কাউকে দিই না। তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ বর্ষণ করেছিলাম সেগুলোর মাঝে অনেক দৃশ্যমান জনপদ স্থাপন করে দিয়েছিলাম এবং ওগুলোর মাঝে সমান সমান দূরত্বে সফর মনজিল করে দিয়েছিলাম। (আর তাদের বলেছিলাম) তোমরা এ সব জনপদে রাতে আর দিনে নিরাপদে ভ্রমণ করো। কিন্তু তারা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের সফর-মঞ্জিলগুলোর মাঝে ব্যবধান বাড়িয়ে দাও। তারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছিল। কাজেই আমি তাদের কাহিনি বানিয়ে ছাড়লাম (যে কাহিনি শোনানো হয়) আর তাদের ছিন্ন ভিন্ন করে দিলাম। এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ১৬-১৯)

বাঁধটি বর্তমান সানআর মাআরিব প্রদেশের বালাখ হিলস এলাকার ওয়াদি আল-আজানায় অবস্থিত। বাঁধের কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো সেখানে আছে বলে ধারণা করা হয়। (দেশ-দেশান্তর, ৩/৩০৯)

রাজ্য হিসেবে সাবার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় দাউদ (আ.)-এর জাবুরে। এ থেকে প্রমাণিত হয় সাবার সমৃদ্ধির যুগের সূচনা হয়েছিল ১ হাজার খ্রিস্টাপূর্বাব্দ। (আজ-জাবুর, ৭২/১০)। সাইয়েদ সুলাইমান নদভির মতে, সাবার উন্নতি ও সমৃদ্ধির সূচনাকাল কিছুতেই ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে নয়। (আল-কুরআনের ভৌগোলিক ইতিহাস, সাইয়েদ সুলাইমান নদভি, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ১, পৃ ৩০৬)

রোমান ইতিহাসবিদদের মতে, সাবার শাসনকাল দুই স্তরে বিভক্ত। প্রত্যেক স্তরের শাসনকাল দুটি ভিন্ন ভিন্ন যুগে বিভক্ত। প্রথম স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১১০০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সালে এসে শেষ হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটা ছিল সাবার শাসনকালের উৎকর্ষের যুগ। সুলাইমান (আ.)-এর যুগের সাবার রানি বিলকিস এই যুগের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। প্রথম স্তরের দ্বিতীয় যুগ খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সাল থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে এসে শেষ হয়েছে। বাঁধ ভাঙা বন্যা এবং সাবা জাতির বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়া এই যুগের ঘটনা। দ্বিতীয় স্তরের প্রথম যুগ খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ সালে শুরু হয়ে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এসে সমাপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরের দ্বিতীয় যুগ ৩০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে শুরু হয়ে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে এসে শেষ হয়েছে। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৯, পৃ ৭২)

লেখক: আলেম

বাঁধভাঙা বন্যার গল্প

ফিলিস্তিনি মুসলিমরা কেন নির্যাতিত? by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

যুগের পর যুগ ফিলিস্তিনে রক্ত ঝরাচ্ছে ইসরাইল। অথচ, একদিন এই ইসরাইল নামের রাষ্ট্রই ছিল না। সেখানে ইউরোপের নির্যাতিত ইহুদিদের ঠাঁই দেয়াই কী আরবদের ভুল ছিল! যার ফলে ১৯৪৮ সালে সৃষ্টি হয় ইসরাইল নামের রাষ্ট্র! তারপর থেকে তারা মুসলিমদের ওপর অব্যাহতভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধ হয়েছে। অব্যাহতভাবে সেসব যুদ্ধে মুসলিমদের রক্ত ঝরিয়েছে তারা। অন্যদিকে মুসলিমদের, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রের অধিকারকে তারা অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। রাষ্ট্রের অধিকার চাওয়া মূল ভূখণ্ডের মালিক এসব মুসলিমকে তারা বানিয়ে দিয়েছে তাদের ভাষায় ‘সন্ত্রাসী’। নিজের জন্মভূমি, নিজের দেশের জন্য এত রক্তপাত, এত লড়াই পৃথিবীতে বিরল। কতো মা সন্তান, স্বামী, পরিজন হারিয়েছেন। কতো পিতা স্ত্রী, সন্তান হারিয়েছেন। কতো শিশু এতিম হয়েছে। কতো নিরপরাধ শিশুর রক্তে লাল হয়েছে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের হাত- এর কোনো হিসাব নেই। এ হিসাব ইতিহাস কোনোদিন নির্ধারণ করতে পারবে না। তবু আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধাপরাধী ইসরাইল ও এর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লেলিয়ে দেয়া সেনাদের সামনে প্রায় নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিরা, গাজার হামাস যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে। তাদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে বাংলাদেশ। এদেশের রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন সংহতি জানিয়ে র‌্যালি করেছে। সে খবর পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায়। আরব বিশ্বের নেতাদের নিষ্ক্রিয়তায় ধিক্কার জানানো হয়েছে। তাদেরকে উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমপ্রিয় মানুষ। ভিডিওতে গাজার শিশুর ঘাস খাওয়ার ছবি যদি আপনি দেখে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপনার চোখে অশ্রুক্ষরণ হয়েছে। অসহায় রক্তাক্ত শিশু ইসরাইলি সেনার পা জড়িয়ে ধরে ঠক ঠক করে কাঁপছে। এ দৃশ্য নিশ্চয় আপনার চোখ এড়িয়ে যায়নি। এই যে রক্তবাণ- কেন? বিশ্নের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান যুদ্ধ এবং সহিংস বিরোধের অন্যতম ফিলিস্তিনি জনগণ এবং ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ। এর শিকড় কমপক্ষে এক শতাব্দী পেছনে প্রোথিত। ইসরাইল এবং আরব দেশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক যুদ্ধ হয়েছে। ইসরাইলি অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন বা ইন্তিফাদা হয়েছে। প্রতিশোধ নিতে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে নৃশংস দমনপীড়ন চালিয়েছে ইসরাইল। ভূমি, সীমান্ত এবং অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ইস্যুতে এই যুদ্ধ। বর্তমানে এই যুদ্ধ প্রকট আকার ধারণ করেছে ইসরাইল এবং হামাসের মধ্যে। কেন হামাস, তথা ফিলিস্তিন এবং ইসরাইলের মধ্যে এই যুদ্ধ এতদিন ধরে চলছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে অনেকটা পেছনে যেতে হবে আমাদেরকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের অংশ ছিল ফিলিস্তিন। তা ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের শাসনের অধীনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোম্যানরা পরাজিত হয়। ফলে ফিলিস্তিন নামের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেয় বৃটেন। সেখানে তখন অন্য জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি বসবাস করতেন আরব সংখ্যাগরিষ্ঠরা ও ইহুদি সংখ্যালঘুরা। যুদ্ধে জয়ের পর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের একটি ‘নিজস্ব ভূখণ্ড’ প্রতিষ্ঠার নীতিগত সিদ্ধান্তে আসে বৃটেন। এই উদ্যোগ পরিচিত ‘বালফার ডিক্লারেশন’ নামে। বৃটেন এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিকভাবে এই ভূমির সঙ্গে যোগসূত্র ছিল ইহুদিদের। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি আরবরাও এই ভূখণ্ড তাদের বলে দাবি করে। তারা বলে, বহু শতাব্দী ধরে এই ভূমির মালিক তারা। ফলে তারা বৃটিশ উদ্যোগের বিরোধিতা করে। এ নিয়ে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে, তখন বৃটেন প্রতিশ্রুতি দেয় যে, ফিলিস্তিনি আরবদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা হবে। কিন্তু ১৯২০-এর দশক এবং ১৯৪০-এর দশকের মধ্যে ফিলিস্তিনের ওই ভূখণ্ডে ইহুদিদের সংখ্যা বেড়ে যায়। ইউরোপে নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক ইহুদি এ সময় উড়ে যায় ফিলিস্তিনের ওই ভূখণ্ডে। হলোকাস্টের সময় ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করা হয়। এর ফলে তাদেরকে একটি নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার দাবি জোরালো হতে থাকে। এভাবে ১৯৪৭ সাল নাগাদ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের যেখানে ইসরাইল, সেখানে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩০ ভাগের উপরে দাঁড়ায় ইহুদিদের সংখ্যা। তাদের এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৩০ হাজার। ১৯৪৭ সালে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন ইস্যু ভোটে দেয় জাতিসংঘ। তাতে বলা হয়, ফিলিস্তিনকে ভেঙে ইহুদিদের এবং আরব রাষ্ট্রকে আলাদা করা হবে। আর জেরুজালেম হবে একটি আন্তর্জাতিক শহর। কিন্তু এই প্রস্তাবে কোনো আরব দেশ সমর্থন দেয়নি। তারা যুক্তি দেন যে, এই পরিকল্পনায় ইহুদিদেরকে অধিক পরিমাণ ভূমি দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যদিও তাদের জনসংখ্যা অনেক কম। তাদের কথা কানে তোলেনি বৃটেন। তারা এই সমস্যা ১৯৪৮ সালে ১৪ই মে তুলে দেয় জাতিসংঘের হাতে। বৃটিশ শাসন শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ফিলিস্তিনে বসবাসরত ইহুদি নেতারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়, যার নাম হলো ইসরাইল। পরের বছরই জাতিসংঘ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। ফলে আরবদের বুকের উপর চেপে বসে ইহুদিরা।

কিন্তু ইসরাইল নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার একদিন পরেই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। ৫টি আরব দেশের সেনারা তাদেরকে ঘিরে ফেলে। এই যুদ্ধকে ইসরাইল দাবি করে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে। ১৯৪৯ সালের দিকে যুদ্ধ যখন বন্ধ হয়ে আসে, তখন ফিলিস্তিনের অনেক বেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ইসরাইল। চুক্তি হয় তাদের মধ্যে। সেই চুক্তি অনুযায়ী গাজা উপত্যকা দখলে নেয় মিশর। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলে নেয় জর্ডান। পশ্চিম জেরুজালেম দখলে নেয় ইসরাইল। ইসরাইল যে ভূখণ্ড দখল করে সেখান থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। অথবা তাদেরকে জোর করে গৃহহীন করা হয়। ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে ইসরাইল। এর ফলে ওই ফিলিস্তিনিরা পরিণত হন শরণার্থীতে। এই ঘটনাকে আরবিতে ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর পরের বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে হাজার হাজার ইহুদি ইসরাইলে চলে যায় অথবা তাদেরকে ওইসব দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের বেশির ভাগেরই ঠিকানা হয় ইসরাইল।

১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ এক যুদ্ধ হয়। এটা ‘সিক্স ডে ওয়ার’ বা ছয়দিনের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়। ফিলিস্তিনের জন্য বয়ে আনে বিরাট পরিণতি। এই যুদ্ধে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করে মিশর, সিরিয়া ও জর্ডান। ইসরাইল আগে থেকেই আতঙ্কে ছিল যে মিশর ও সিরিয়া তাদের ওপর হামলা করতে পারে। এ জন্য মিশরের বিমান বাহিনীর ওপর হামলা চালায় ইসরাইল। এ কারণে শুরু হয় ১৯৬৭ সালের ওই যুদ্ধ। যুদ্ধ যখন শেষ হয়ে আসে, ততক্ষণে সিনাই পেনিনসুলা এবং মিশরের কাছ থেকে গাজাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে ইসরাইল। সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান উপত্যকার বেশির ভাগ অংশ দখল করেছে। জর্ডানের কাছ থেকে দখল করেছে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিমতীর। এ কারণে পশ্চিমতীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেমের প্রায় দশ লাখ ফিলিস্তিনি চলে যায় ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে। এসব অঞ্চল সেই যে ইসরাইল দখল করেছে তা আর তাদের কাছ থেকে ফেরত পায়নি মুসলিমরা। তা এখনো ইসরাইলের দখলে আছে। এরই মধ্যে ফিলিস্তিনিরা স্বাধীনতা দাবি করেছে। তাদের পক্ষে জাতিসংঘ। কিন্তু পশ্চিমা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেনের ভেটোর কারণে ফিলিস্তিন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। এই দাবিতেই হামাস লড়াই করছে। স্বদেশের স্বাধীনতা, নিজেদের একটি রাষ্ট্রের পক্ষে লড়াই করার কারণে তাদেরকে পশ্চিমা বিশ্ব ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করছে।

১৯৭৯ সালে মিশরের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে ইসরাইল। তারা সিনাই পেনিনসুলাকে ফেরত দেয়। অন্যদিকে পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান উপত্যকায় তাদের থাবা বিস্তার করে। এ দুটি অংশকে নিজেদের বানিয়ে ফেলে ইসরাইল। তবে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এসব এলাকাকে ইসরাইলের বলে স্বীকৃতি দেয়নি।

পশ্চিমতীর: ইসরাইল এবং জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী অংশ পশ্চিমতীর নামে পরিচিত। সেখানে বসবাস করেন প্রায় ত্রিশ লাখ ফিলিস্তিনি। পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজার সঙ্গে এ অংশ ব্যাপকভাবে ‘দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড’ হিসেবে পরিচিত। এ অঞ্চলে ইসরাইলি উপস্থিতির বিরুদ্ধে সবসময়ই বিরোধিতা করে এসেছেন ফিলিস্তিনিরা। তাদের দাবি ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হতে হবে ওইসব ভূখণ্ড। তাদের এই ধারণাকে সমর্থন করেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ। কিন্তু পশ্চিমতীরের পুরো নিয়ন্ত্রণ ইসরাইল ধরে রেখেছে। তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে ফিলিস্তিন সরকার, যা প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটি নামে পরিচিত, তারা এর শহরগুলোর বেশির ভাগ অংশ পরিচালনা করছে। পশ্চিমতীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে আছে প্রায় ১৫০টি ইসরাইলি বসতি। তাতে বসবাস করে প্রায় সাত লাখ ইহুদি। দখল করা ভূখণ্ডে এসব বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নেয়ার দাবি জানায় ফিলিস্তিন। তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বসতি স্থাপনকারী হিসেবে দেখে তারা। তবে তাদের এই দাবির বিরোধিতা করে ইসরাইল সরকার। তারা বলে, বৃহৎ এই বসতি হলো স্থায়ী। সেখানে যেসব বসতি রয়েছে তাদের বসবাসের ঐতিহাসিক অধিকার আছে। পক্ষান্তরে তারা ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্রের অধিকারকে অস্বীকৃতি জানায়। যুক্তি দেখায়, পশ্চিমতীর হলো ইসরাইলিদের হোমল্যান্ড বা জন্মভূমি। ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর এসব স্থানে বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে ইসরাইলি সরকার। তারা বলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সৃষ্টি করা হলে তা হবে ইসরাইলের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি।
২০২৪ সালে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) তার রায়ে বলে, দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলিদের অব্যাহত উপস্থিতি অবৈধ। সব বসতি প্রত্যাহার করে নিতে হবে ইসরাইলকে। একই সঙ্গে তারা যেটা ঘটিয়েছে, তা বর্ণবাদ ও জাতিবিদ্বেষ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন।

জেরুজালেম নিয়ে বিরোধ: জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী বলে দাবি করে ফিলিস্তিন এবং ইসরাইল উভয়পক্ষই। এরই মধ্যে পশ্চিম জেরুজালেম নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। পরে তারা পুরো জেরুজালেমকে তাদের স্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করে। জানিয়ে দেয়, জেরুজালেমকে ভাগ করা যাবে না। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে দাবি করেছে ফিলিস্তিনিরা। পূর্ব জেরুজালেমে যারা বসবাস করেন তার বেশির ভাগই ফিলিস্তিনি। তার মধ্যে খুবই কম সংখ্যক সংখ্যালঘু ইসরাইলি নাগরিকত্ব নিয়েছে। পবিত্র জেরুজালেমই ফিলিস্তিন এবং ইসরাইলের সংঘাতের মূলে। পূর্ব জেরুজালেম মুসলিমদের কাছে তৃতীয় সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান। কারণ, এখানেই রয়েছে পবিত্র আল আকসা মসজিদ বা হারাম আল শরীফ। অন্যদিকে আছে ইহুদিদের টেম্পল মাউন্ট।  ইসরাইলিরা পূর্ব জেরুজালেমে যে জায়গা দখল করে নিয়েছে তা ফিলিস্তিনিদের বলে মত দিয়েছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বেশির ভাগ সংস্থা।

গাজায় কী ঘটেছে: ইসরাইল, মিশর ও ভূমধ্যসাগর দিয়ে বেষ্টিত একটি ছোট্ট ভূখণ্ডই গাজা উপত্যকা। এর দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার বা ২৫ মাইল। প্রস্থ ১০ কিলোমিটার। এখানে বসবাস করেন প্রায় ২৩ লাখ মানুষ। একে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার অন্যতম। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেকারত্বের হারের অন্যতম গাজা।   সেখানে বেশির ভাগ মানুষই বসবাস করেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। তারা বেঁচে থাকেন বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করে। ১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় যখন গাজা মিশরের অধীনে ছিল, তখনই গাজার সীমানা নির্ধারণ হয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে গাজা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয় মিশরকে। তখন তা দখল করে নেয় ইসরাইল। সেখানে তারা নির্মাণ করে বসতি। গাজায় বসবাসকারী জনগণকে সামরিক শাসনের অধীনে রাখে। ২০০৫ সালে গাজা থেকে নিজেদের সেনা এবং বসতি স্বীয় সিদ্ধান্তে প্রত্যাহার করে নেয় ইসরাইল। তবে অভিন্ন সীমান্ত, আকাশসীমা, সমুদ্র উপকূলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। একই সঙ্গে গাজায় জনগণ ও পণ্য চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল। এখনো গাজাকে ইসরাইলের দখল করা ভূখণ্ড বলে মনে করে জাতিসংঘ। ফিলিস্তিনে ২০০৬ সালের নির্বাচনে জয় পায় যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস। পরের বছরে তীব্র লড়াইয়ের পর গাজা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বের করে দেয় তারা। এর জবাবে অবরোধ আরোপ করে ইসরাইল ও মিশর। অন্যদিকে গাজায় কী প্রবেশ করবে, কী প্রবেশ করবে না তার বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল। পরের বছরগুলোতে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় যুদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে আছে ২০০৮-০৯ সময়ের যুদ্ধ, ২০১২ সালের যুদ্ধ এবং ২০১৪ সালের যুদ্ধ। দুই পক্ষের মধ্যে বড় একটি যুদ্ধ ১১ দিন পরে ২০২১ সালের মে মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যদিয়ে শেষ হয়। প্রতিটি যুদ্ধেই উভয় পক্ষে মানুষ নিহত হন। এর বেশির ভাগই ফিলিস্তিনের গাজায়। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর গাজায় ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১২০০ ইসরাইলি নিহত হয়। তারা জিম্মি করে কমপক্ষে ২৫০ জনকে। এর প্রতিশোধ নিতে গাজায় ভয়াবহ সামরিক হামলা চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তাতে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এর বেশির ভাগই নারী ও শিশু। ৭ই অক্টোবর হামলার এক বছর পূর্ণ হওয়ার কয়েকদিন আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক এজেন্সিগুলো গাজায় মানুষের দুর্ভোগ ও মানবিক বিপর্যয় বন্ধের দাবি জানিয়ে একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করে। ১৫ মাসের যুদ্ধের পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধ স্থগিতের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয় হামাস ও ইসরাইল। বিনিময়ে উভয় পক্ষ বন্দি ও জিম্মিদের মুক্তি দেয়। তারপর থেকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করা নিয়ে বিভিন্ন দেন-দরবার চলছে। সম্প্রতি একটি চুক্তির প্রথম মেয়াদ শেষে ১৮ই মার্চ থেকে গাজায় নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। প্রতিদিনই সেখানে লাশ পড়ছে।

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি:
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৪৩টি দেশ জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেয়ার পক্ষে ভোট দেয় ২০২৪ সালের মে মাসে। জাতিসংঘে তাদের পরিচয় হয় ‘স্টেট অব প্যালেস্টাইন’। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মর্যাদা হয় ‘পার্মানেন্ট অবজার্ভার স্টেট’ বা পর্যবেক্ষক দেশ। জাতিসংঘে তাদের আসন থাকবে। কিন্তু তারা ভোট দিতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র সহ কিছু ইউরোপিয়ান দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় না। তারা বলে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক সমাধান হলে তবেই এই স্বীকৃতি দেবে। ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে ভোট দেন বৃটিশ এমপিরা। কিন্তু সরকার সেটা করেনি। ২০২১ সালে তখনকার রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভ সরকার বলে- আমাদের পছন্দের সময়ে এবং শান্তির পক্ষে যখন উত্তম ব্যবস্থা হবে ফিলিস্তিনকে তখন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে বৃটেন। অন্যদিকে পশ্চিম তীরে নিজেদের ঐতিহাসিক অধিকার আছে বলে দাবি করে ইসরাইল। একই সঙ্গে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে তারা। তাদের যুক্তি, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে তা হবে অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ের এক হুমকি।

ফিলিস্তিনি শরণার্থী: জাতিসংঘের নিবন্ধন অনুযায়ী প্রায় ৫৯ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী রয়েছেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের পূর্ব পুরুষদের অনেকে দেশ ছেড়ে যান অথবা তাদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তাদের বেশির ভাগ বসবাস করেন জর্ডান, গাজা উপত্যকা, পশ্চিমতীর, সিরিয়া ও লেবাননে। এসব শরণার্থীকে দেশে ফেরার দাবি জানান ফিলিস্তিনিরা। কিন্তু এ অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করে ইসরাইল। ফিলিস্তিনে শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘের এজেন্সির সমালোচনা করে ইসরাইল। তারা বলেন, জাতিসংঘ এসব শরণার্থীকে পর্যায়ক্রমিক প্রজন্মের মধ্যে শরণার্থী মর্যাদা দিয়ে যাচ্ছে।

দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান চেষ্টা: ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি স্থাপনে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে সমর্থন করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এই প্রস্তাবে পশ্চিম তীর, গাজাকে নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে। যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। তারা অবস্থান করবে ইসরাইলের পাশাপাশি। তবে এই সমাধান প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে ইসরাইল। তারা বলে, বসতি স্থাপনের যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে হবে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সমঝোতায়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দাবি পূর্ব শর্ত হতে পারে না। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটি। কিন্তু হামাস তা সমর্থন করে না। কারণ, তারা ইসরাইলের অস্তিত্বের বিরোধিতা করে। হামাস বলে, ১৯৬৭ সালের মূল সীমান্তের ওপর ভিত্তি করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্র তারা মানতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে মানবে না, যদি তারা শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরার অধিকার প্রত্যাখ্যান করে। এর আগে এই দুই পক্ষের যুদ্ধের ইতি ঘটেছিল। এ লক্ষ্যে দুই দেশের নেতারা ১৯৯৩ সালে অসলো পিস অ্যাকর্ড স্বাক্ষর করেন। এটাকে শান্তি সংলাপের একটি মূল কাঠামো হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একে অন্যকে দোষারোপ করার কারণে সেই সংলাপ শুরুতেই ভেঙে যায়।

(সূত্র: বিবিসি ও ইন্টারনেট) জনতার চোখ থেকে নেওয়া

mzamin

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কী অত্যাসন্ন? জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা

সামরিক সংঘাতের পথেই কি চলছে ভারত? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানে হামলার স্বাধীনতা দেয়ার পর এমন প্রশ্ন উঠেছে সব মহলে। অবশ্য পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সমান হুঙ্কার ছাড়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতের যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জবাব দেবে পাকিস্তান। তার সেনাবাহিনী এ জন্য প্রস্তুত বলে শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কারাগারে রয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সেখান থেকেই তিনি মোদির যুদ্ধংদেহী মনোভাবের নিন্দা জানিয়েছেন। ফলে যেকোনো সময় পারমাণবিক শক্তিধর এ দু’টি দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর ভয়াবহ এক আশঙ্কা বিরাজ করছে। পাকিস্তানের বার্তা সংস্থা এপিপি জানিয়েছে, বিরাজমান উত্তেজনার মধ্যে ভারতীয় বিমান বাহিনীর চারটি রাফায়েল যুদ্ধবিমান ভারতশাসিত কাশ্মীরে টহল দিচ্ছিল মঙ্গলবার রাতে। কিন্তু দ্রুতই তাকে শনাক্ত করে পাকিস্তান বিমান বাহিনী।

নিরাপত্তা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর গৃহীত পদক্ষেপে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। উত্তেজনা তুঙ্গে থাকা অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দুই দেশের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। বুধবার পাকিস্তান ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে উত্তেজনা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও কথা বলার কথা। এমন অবস্থায় পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সামরিক অভিযানে নামবে বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়েছেন। বুধবার পর্যন্ত ছয় রাত ধরে দুই দেশের মধ্যে গুলিবিনিময় চলছে। ছোট অস্ত্রে চলছে এই গুলিবিনিময় সেকথা ভারতের সেনারাই জানিয়েছেন। তবে ভারতের উচ্চপর্যায়ে তৎপরতা তুঙ্গে। সাড়ে পাঁচ বছর পর সুপার কেবিনেটের বৈঠক হয়েছে বুধবার। রাজনীতিবিষয়ক কেবিনেট কমিটিকেই সুপার কেবিনেট হিসেবে ধরা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রীরাই এই কমিটির সদস্য। ২০১৯ সালে পুলওয়ামায় হামলার পরে সর্বশেষ বসেছিল সুপার কেবিনেটের বৈঠক। তারপরই পাকিস্তানের ভেতরে হয়েছিল ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক।

বুধবার সারা দিনই ভারতের শীর্ষ নেতারা ব্যস্ত ছিলেন একের পর এক বৈঠকে। মাত্র চারদিন আগে হওয়া নিরাপত্তা সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটির বৈঠক হয়েছে। বুধবার ফের বসেছিল সেই বৈঠক। এ ছাড়াও অর্থনীতি বিষয়ক কেবিনেট কমিটিরও বৈঠক হয়েছে বুধবার। সবক’টি বৈঠকেই সভাপতিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উপস্থিত ছিলেন রাজনাথ সিং, নির্মলা সীতারমন, অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, নীতিন গড়কড়ি সহ শীর্ষ মন্ত্রীরা। সংবাদ সংস্থা সূত্রের খবর, সব বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সামরিক প্রস্তুতি। সাত বছর পরে নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে মোদি সরকার। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ সুরক্ষা সংক্রান্ত মূল পদক্ষেপের দায়িত্বে রয়েছে। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’-এর সাবেক ডিরেক্টর অলোক যোশীকে উপদেষ্টা পর্ষদের প্রধান করা হয়েছে। ছয় সদস্যের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদে রয়েছেন সাবেক কূটনীতিক বি ভেঙ্কটেশ বর্মা, ভারতীয় বিমান বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল পিএম সিংহ, স্থলসেনার দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের সাবেক জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) একে সিংহ এবং নৌসেনার অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মন্টি খান্না। দুই অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার রাজীব রঞ্জন বর্মা এবং মনমোহন সিংহও রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্ষদে।

মঙ্গলবারই মোদি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে কীভাবে, কোন সময়, কোন লক্ষ্যে আঘাত হানতে হবে তা স্থির করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে। সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের উপর তার আস্থা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, তিন বাহিনীর প্রধান (সিডিএস) জেনারেল অনিল চৌহান, সেনাপ্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী, নৌসেনার প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ কে ত্রিপাঠী, এয়ার চিফ মার্শাল অমরপ্রীত সিংহ। পরে বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বৈঠকে নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে সংবাদ সংস্থা সূত্রে জানানো হয়েছে।  সোমবার রাজনাথ সিং সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে মোদিকে অবহিত করেন। সেখানেও  জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল উপস্থিত ছিলেন। রোববার তিন বাহিনীর প্রধান জেনারেল অনিল চৌহানের সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গত ৬ দিন ধরে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযোগ, পাকিস্তান রাতের অন্ধকারে গুলি চালাচ্ছে। ভারতও পাল্টা জবাব দিচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে উল্টো দাবি করছে পাকিস্তানও। তবে ভারতের তৎপরতা নিয়ে শঙ্কিত বিশ্বনেতারা সংযমের কথা বলছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী  শেহবাজ শরীফের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছেন। পেহেলগাম হামলার প্রেক্ষিতে  ভারত কী ধরনের সামরিক ব্যবস্থা নেবে তা নিয়ে নানা স্তরে আলোচনা চললেও নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে দ্বিধার মধ্যে রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। তবে  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাধিকবার তার কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে, পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় দেশটির জড়িত থাকার বিষয়ে ‘ভিত্তিহীন এবং সাজানো অভিযোগের’ ভিত্তিতে ভারতীয় বাহিনী আক্রমণ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, ভারত ‘বিচারক, জুরি এবং জল্লাদে’র ভূমিকা পালন করছে, যা তারা প্রত্যাখ্যান করে। তিনি বলেন, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে, পাকিস্তান খোলাখুলিভাবে সত্য নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞদের একটি নিরপেক্ষ কমিশন দ্বারা একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ এবং স্বাধীন তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছে। তথ্যমন্ত্রীর মতে, ইসলামাবাদ নিজেই সন্ত্রাসবাদের শিকার।

আগ্রাসনের জবাব দেবে পাকিস্তান: শেহবাজ
ভারতীয় আগ্রাসনের মোকাবিলায় পূর্ণ শক্তি দিয়ে জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেসের সঙ্গে ফোনালাপের সময় এ হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এ খবর দিয়েছে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম এআরওয়াই নিউজ। এতে বলা হয়, মঙ্গলবার দক্ষিণ এশিয়াতে চলমান সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন তারা। ফোনালাপে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, তার দেশ সকল ধরনের সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানায়। পাশাপাশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধে দেশটির উল্লেখযোগ্য ত্যাগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের একতরফা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে পেহেলগামের ঘটনা উন্মুক্ত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। ভারতের রাষ্ট্রীয় মদতে সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদের অজুহাতে কাশ্মীরের মুক্তি আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, ভারত অবৈধভাবে জম্মু ও কাশ্মীর দখল করে আছে। যা উদ্বেগের। শেহবাজ বলেছেন, ২৪ কোটি মানুষের জীবনধারণের উপায় হচ্ছে পানি। এক্ষেত্রে সিন্ধু অববাহিকার পানিতে ভারতের অপ্রতিরোধ্য অস্ত্র ব্যবহারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। ভারতের যেকোনো দুঃসাহসিক কাজের জবাবে পাকিস্তান তার পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করবে বলে জোর দেন শেহবাজ। জাতিসংঘের মহাসচিবকে তিনি ভারতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং সংযম প্রদর্শনের পরামর্শ দেয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। শেহবাজ উল্লেখ করেছেন, জম্মু ও কাশ্মীরের অমীমাংসিত সমস্যা দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিতিশীলতার মূল কারণ। এ বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন এবং এর ন্যায্য সমাধানে ভূমিকা পালনের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান শেহবাজ। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের একজন দায়িত্বশীল সদস্য এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রতি পাকিস্তানের অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন শেহবাজ শরীফ।

ইমরান খানের নিন্দা
কারাগারে থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুদ্ধপ্রবণ মনোভাবের নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ পার্টির (পিটিআই) নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। মোদির আগ্রাসন ও তাদের শত্রুতা পাকিস্তানের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ খবর দিয়েছে দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল। এতে বলা হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে আটক আছেন পাকিস্তানের আলোচিত এই রাজনীতিবিদ। সেখান থেকেই মোদি ও ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে। পিটিআই নেতা বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করলেও মোদির যুদ্ধপ্রবণ মনোভাব এবং তাদের আঞ্চলিক শান্তিতে হুমকির বিরুদ্ধে সকল পাকিস্তানি ঐক্যবদ্ধ আছি। আমরা মোদির বিপজ্জনক উচ্চাকাঙ্ক্ষার তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি আরও বলেন, দুঃখের বিষয় হচ্ছে একটি ভুয়া ফরম-৪৭ এর মাধ্যমে গঠিত অবৈধ সরকার দেশের জনগণকে বিভক্ত করেছে। কিন্তু মোদির সাম্প্রতিক আগ্রাসী আচরণ উল্টো দেশের জনগণকে জাতীয় স্বার্থে একত্রিত করেছে।  পেহেলগামের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় নিহত ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ইমরান খান। বলেছেন, আত্মসমালোচনা এবং তদন্তের পরিবর্তে, মোদি সরকার আবারো পাকিস্তানের উপর দোষ চাপাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা ঘটনার সময়ও আমরা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু ভারত কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। আমি তখনই বলেছিলাম, ভবিষ্যতে আবার এমনই ঘটবে। এখন পেহেলগাম ঘটনার পর সেটাই দেখা যাচ্ছে।

ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর হুঙ্কার
ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর হুঙ্কার দিয়েছেন পাকিস্তানের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ড. তারিক ফজল চৌধুরী। তার বক্তব্যে পাকিস্তানের সকল নাগরিকের বার্তা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এপিপি। এতে বলা হয়, সিনেটে বক্তব্য দেয়ার সময় ড. তারিক ফজল বলেছেন, পাকিস্তান একটি শান্তিকামী দেশ, আক্রমণকারী নয়। তিনি আরও বলেন, আমরা সন্ত্রাসবাদের উৎস নই, বরং আমরা এর শিকার। সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে মদত দেয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে ভারত। কুলভূষণ যাদবের ঘটনা এবং বেলুচিস্তানে অস্থিরতা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষও দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আছে বলে উল্লেখ করেন ফজল। বলেন, যুদ্ধে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয় আধ্যাত্মিক সংকল্প দিয়েও জয়লাভ করতে হয়। এ বিষয়ে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণের অতুলনীয় সাহস এবং বিশ্বাস রয়েছে। ভারতের সরকার তথা নরেন্দ্র মোদিকে অতীতের আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন ফজল। বলেছেন, এর আগে আপনারা কড়া প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন। পাকিস্তান এখন আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা অর্জন করেছে। 

mzamin

দুই সন্তান নিয়ে কঠিন যুদ্ধে লাকি by ফাহিমা আক্তার সুমি

মুলসুমা আক্তার লাকি। স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ছিল তার সংসার। ছয় বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ইমনকে। ছিল ভিটে-বাড়িহীন অভাবের সংসার। ভাগ্য পরিবর্তনে দু’জনে কিশোরগঞ্জ থেকে চলে আসেন ঢাকায়। পোশাক কারখানায় তারা চাকরি নেন। তাদের কোলজুড়ে আসে এক ছেলে সন্তান। ভাগ্যের চাকা কিছুটা পরিবর্তন হলেও হঠাৎ মুলসুমার সুখের সংসারে নেমে আসে বিষাদের কালো মেঘ। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে গুলিতে কেড়ে নেয় তার স্বামীর জীবন। স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েন তিনি। ইমন যখন মারা যান তখন মুলসুমা সন্তানসম্ভবা ছিলেন। গত মার্চ মাসে তার কোল জুড়ে আসে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। অভাব-অনটনের সংসারে দুই মাসের শিশু সন্তানকে রেখে তিনি আবার যোগ দেন কাজে। দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। গণ-অভ্যুত্থানের পরে পাননি সরকারি-বেসরকারিভাবে যথাযথ সহযোগিতা ও ক্ষতিপূরণ। স্বামীকে হারিয়ে জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত করছেন যুদ্ধ।

মুলসুমা মানবজমিনকে বলেন, অনেক কষ্টে জীবন চালাতে হচ্ছে। আমার দুই সন্তান নিয়ে কোথায় থাকবো? কীভাবে পড়াশোনা করাবো সন্তানদের। এসব চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়ছি। কী হবে আমার দুই সন্তানের ভবিষ্যত? আমার স্বামী ১৯শে জুলাই বিকালের দিকে গুলিতে মারা যান। ৮ই মার্চ আমার কন্যাসন্তান হয়। আমার পাঁচ বছরের আরেকটি ছেলে সন্তান রয়েছে। সংসার চালাতে না পেরে দুই সন্তানকে রেখে আবার পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়েছি। আমাদের কেউ কোনো খোঁজখবর রাখেনি। সরকারি-বেসরকারিভাবে অল্প কিছু সহযোগিতা পেয়েছি। কাগজপত্র অনেক জায়গায় জমা দিয়েছি। যে টাকা পেয়েছি সে টাকা দিয়ে এতদিন চলেছি। বর্তমানে অনেক ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। ওদের বাবা মারা যাওয়ার পর কিশোরগঞ্জে চলে গিয়েছিলাম কিন্তু সেখানেও ভিটেবাড়ি নেই। আমার শ্বশুর অনেক আগে মারা যান। শাশুড়ি মাটি কাটার কাজ করতেন এখন কিছু করতে পারেন না। ১৩ হাজার টাকা বেতন পাই এখানে। বাসা ভাড়া দিতে হয় ৫ হাজার টাকা। আমি না খেয়ে থাকতে পারি কিন্তু ছোট সন্তান ও বয়স্ক মানুষকে তো না খাইয়ে রাখতে পারি না। ভেবেছিলাম দু’জনে কাজ করে একটু ভিটেবাড়ি করবো কিন্তু স্বপ্ন দেখার আগেই আমার স্বপ্ন শেষ। মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়ে আমাকে ছাড়া তবুও চাকরি করতে হচ্ছে। ছেলেটাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলাম কিন্তু এখন আর পাঠাতে পারি না সেখানে। একদিকে আর্থিক সমস্যা অন্য দিকে আমি বাসায় না থাকলে তাকে কে দেখবে।

তিনি বলেন, বাড়িঘর না থাকায় গ্রামেও যেতে পারছি না। ঘরে ঠিকমতো খাবার কিনতে পারি না। ছেলেটাকে ওর বাবা অনেক ভালোবাসতো। ছেলেও বাবাকে ছাড়া থাকতে পারে না। ঈদের সময় ছেলেটা বাবার জন্য অনেক কান্নাকাটি করেছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট মেয়েটাকে দেখে যেতে পারলো না। তার মেয়ে সন্তানের অনেক শখ ছিল। ঘটনার দিন ঘরে বাজার না থাকায় কারখানায় গিয়েছিল টাকা আনতে। সেখান থেকে ফেরার পথে গুলি লাগে বুকের বাম দিকে। সেদিন সন্ধ্যার দিকে এক অপরিচিত লোকের মাধ্যমে খবর পাই আমি।

শুধু পোশাক শ্রমিক ইমন নয়, জুলাই আন্দোলনে অসংখ্য শ্রমিকদের ছিল সাহসী ভূমিকা। অনেকে দিয়েছেন জীবন। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এভাবে প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধ করে যাচ্ছেন অসংখ্য শহীদ পরিবার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ স্বামী, কেউ ভাই, কেউবা বাবা-মাকে। তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে প্রিয়জন হারানোর কষ্টে। অনেকে পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিতে নিহত পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী আবদুল গণি। তিনি গুলশান-২ এ একটি আবাসিক হোটেলের কর্মচারী ছিলেন। ১৯শে জুলাই কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। নিহতের স্ত্রী লাকি আক্তার মানবজমিনকে বলেন, আমার স্বামী ছিল সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে আমরা ভেঙে পড়েছি। সন্তানদের কোনো চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। সন্তানদের লেখাপড়া ঠিকমতো হচ্ছে না। এদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে কীভাবে আমি  তৈরি করে দিবো সেই চিন্তাই কাটছে না। আমরা এখন গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীতে থাকি। এরআগে ১৪ বছর ধরে ঢাকায় ছিলাম। খুব ভালো চলছিল সন্তানদের নিয়ে। এখন অবস্থা খুবই খারাপ। আমার  ছেলে গত বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তখন দুই সাবজেক্টে ফলাফল খারাপ এসেছিল। এইবার আবার পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল কিন্তু ওর বাবা মারা যাওয়ার পর আর পরীক্ষা দিতে পারেনি। ওর বাবা যে হোটেলে কাজ করতো সেই হোটেলে সে এখন কাজ করে। খুব অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরার জন্য পড়াশোনা বাদ দিয়ে ছেলেটি কাজ শুরু করেছে। আমি এসএসসি পাস করেছিলাম। অল্প কিছু সহযোগিতা পেয়েছিলাম সেইটা দিয়ে কোনোমতে চলছি। তিনি বলেন, স্বপ্ন ছিল সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করবো। একটা সুখের সংসার হবে আমাদের কিন্তু সেটি আর পূরণ হলো না।

রাসেল মিয়া (২২)। ভ্যানগাড়িতে মালামাল বিক্রি করতেন। রাজধানীর ধোলাইপাড়ে বোনের সঙ্গে বসবাস করতেন। রাসেলের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। গত ১৯শে জুলাই শুক্রবার  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চালাকালীন জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এলোপাতাড়ি গুলির মুখে পড়েন। এ সময় একটি গুলি রাসেলের গলার এক পাশে বিদ্ধ হয়ে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাসেলের মা মাকসুদা বেগম বলেন, আমার সন্তান তো নেই আর, তাকে তো গুলি করে মেরে ফেলেছে। আমি তো শেষ হয়ে গেছি। আমার দুই ছেলে ও এক  মেয়ে। রাসেল ছিল সবার ছোট। সে তার বোনের কাছে থাকতো। আমরা ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকি। গ্রামে কোনো সম্পদ নেই। আমার রাসেল মাসে কিছু  টাকা দিতো আমাদের ও নিজে চলতো। আমার সন্তানের মুখটা তো কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

mzamin

বৈধ গর্ভপাতের জন্য টার্গেট নারী চিকিৎসক

গর্ভপাতবিরোধী কর্মীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন পোল্যান্ডের একজন শীর্ষস্থানীয় নারী চিকিৎসক। এতে রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তিনি। এ ছাড়া হাজার হাজার হত্যার হুমকি পাচ্ছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। গিজেলা জাগিয়েলস্কা নামের ওই নারী চিকিৎসক দক্ষিণ-পশ্চিম পোল্যান্ডের ওলেস্নিকা শহরের একটি হাসপাতালে কাজ করেন। যেখানে বৈধ গর্ভপাতের নিয়ম আছে। গিজেলা বলেন, ১৭ই এপ্রিল ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য উগ্র ডানপন্থি  গ্রেগর্জ  ব্রাউনের নেতৃত্বে একদল উগ্রবাদী হাসপাতালে যায়। তারা তাকে অফিস থেকে বের হতে বাধা দেয়। তিনি আরও  বলেন, ব্রাউন বার বার নিজেকে খুনি দাবি করতে থাকেন এবং বলেন, আমি একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি। পুলিশের উচিত আমাকে গ্রেপ্তার করা। তিনি গিজেলাকে ধাক্কা দেন এবং তাকে অফিসে আটকে দেন। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ওই নারী চিকিৎসক বলেন, পুলিশ ডাকা হলেও তারা বিশৃঙ্খলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উল্লেখ্য, ব্রাউন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একজন সদস্য। এর কারণে তিনি দায়মুক্তি পান এবং তাকেও আটক করা যায়নি। পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র পুলিশকে জানান, পুলিশ ওই হাসপাতাল ও নারী চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। এদিকে ব্রাউনের এমন কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে পোল্যান্ডের সরকার। উক্ত ঘটনার পর থেকে অনেকে ওই চিকিৎসককে কটাক্ষ করছেন। এ ছাড়া হাসপাতালটি বোমা হামলার হুমকির শিকার হচ্ছে। ডা. গিজেলা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি অনেক মেসেজ পেয়েছি। আমাকে নিয়ে অনেক পোস্ট ও আমার রক্তমাখা ছবি দেখতে পাই। যার ক্যাপশনে লেখা ছিল- ‘খুনি’। আমার ব্যক্তিগত ঠিকানা অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়। কিছু মানুষ আমার বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে চান। তিনি আরও বলেন, পুলিশ তাকে কঠোর সুরক্ষার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ হাসপাতালে বেশির ভাগ মানুষ রোগীদের স্বজন। তারা রোগীদের কাছে আসে। এটি তাদের জন্যও একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি হতে পারে। পুলিশ অবশ্য ওই চিকিৎসককে বিশেষ নম্বর দিয়েছে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ওই নম্বরে কল করে পুলিশের সাহায্য নিতে বলা হয়েছে। মূলত এক নারীর করা মামলার ভিত্তিতে ওলেসনিকা হাসপাতালে ওই ঘটনার সূত্রপাত হয়। তার গর্ভে থাকা সন্তানের ভ্রুণে গুরুতর অস্বাভাবিকতা দেখা  দেয়ার পর ওই নারীর গর্ভপাত করা হয়। কাজটি করেন ডাক্তার গিজেলা। তিনি বলেন, অন্য একটি হাসপাতাল গর্ভে থাকা শিশুর অবস্থা নির্ণয় করতে ভুল করে। এ কারণে ওই নারীকে দেরিতে গর্ভপাত করতে হয়। ইউরোপের মধ্যে গর্ভপাতের ক্ষেত্রে পোল্যান্ড সবচেয়ে কঠোর কয়েকটি নীতি অনুসরণ করে। দেশটিতে ধর্ষণ ও মায়ের জীবন সংকটাপন্ন এমন পরিস্থিতিতেই শুধু গর্ভপাত করা যায়। প্রধানমন্ত্রী ডনাল্ড টাস্কের জোট অবশ্য ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর গর্ভপাতের আইন সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে তার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়।
mzamin

মানবিক করিডরে ঢাকার সায়, আপত্তি মিয়ানমার জান্তার: উভয়ের সম্মতি চায় জাতিসংঘ

জাতিসংঘের নেতৃত্বে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা চালু তথা (হিউম্যানিটারিয়ান করিডর) এর প্রস্তাবে সায় দিয়েছে ঢাকা। এটি চালু হলে তাতে লজিস্টিক (কারিগরি) সহায়তা দিতে আগ্রহী বাংলাদেশ। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির সঙ্গে আলাপে মঙ্গলবার এমনটা জানান। বলেন, রাখাইনে জাতিসংঘের নেতৃত্বে মানবিক সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হলে বাংলাদেশ তাতে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী আছে। আমরা বিশ্বাস করি, জাতিসংঘের সহায়তায় মানবিক সহায়তার মাধ্যমে রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা শরণার্থীদের ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।

এদিকে কেন্দ্র তথা জান্তা সরকারকে বাইপাস করে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত আরাকান বা রাখাইনে এমন করিডরে আপত্তি তুলেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। বিষয়টি স্বীকার করে সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা রাতে মানবজমিনকে বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বিষয়ে ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশকে কূটনৈতিক পত্র দিয়ে আপত্তি জানিয়েছে মিয়ানমারের কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত সামরিক জান্তা সরকার। আরাকান আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ অভিহিত করে বাংলাদেশ কেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নেপি'ড। শেষ পর্যন্ত দেশটির জান্তা সরকার করিডর প্রশ্নে বিরোধিতা থেকে সরাসরি বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে ন।

সরকারের বক্তব্য, অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে অস্পষ্টতা!
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘ এবং সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। তবে মানবিক সহায়তার রুটের বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে, যা নিয়ে নানা পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে সরকার তথাকথিত মানবিক করিডর নিয়ে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। সরকার মনে করে, যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে রাখাইনে মানবিক সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকবে।’

মিস্টার আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ সংকটকালে অন্যান্য দেশকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে বরাবরই উদাহরণযোগ্য ভূমিকা রেখেছে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো মিয়ানমারে ভূমিকম্পের পর আমাদের সহায়তা।’

প্রেস সচিব জানান, তারা আশঙ্কা করছেন যে এই ভোগান্তি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে আরও মানুষের বাংলাদেশে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থা বাংলাদেশ সামাল দিতে পারবে না। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাখাইনে সাহায্য পাঠানোর একমাত্র কার্যকর পথ হলো বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। এই পথ ব্যবহার করে সাহায্য পরিবহনে কারিগরি সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সম্মত।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, ‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি। যথাসময়ে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করব।’

প্রসঙ্গত, রাখাইনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মানবিক করিডর চালুর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের বিষয়টি গত রোববার জনসমক্ষে আনেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘এতটুকু আপনাদের বলতে পারি, নীতিগতভাবে আমরা এতে সম্মত। কারণ, এটি একটি হিউম্যানিটেরিয়ান প্যাসেজ (মানবিক সহায়তা সরবরাহের পথ) হবে; কিন্তু আমাদের কিছু শর্ত রয়েছে, সেই বিস্তারিত বিষয়ে যাচ্ছি না। সেই শর্তাবলি যদি পালিত হয়, আমরা অবশ্যই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সহযোগিতা করব।’

নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরাও চুলচেরা বিশ্লেষণ আর বাংলাদেশের সব অংশীজনকে যুক্ত করার আগে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, জাতিসংঘ, বাংলাদেশ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির এ বিষয়ে একমত হতে হবে। এই চার পক্ষের মধ্যে কোনো একটি পক্ষের ভিন্নমত থাকলে এটি আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।

মানবিক করিডোর: বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের সম্মতি চায় জাতিসংঘ

যুদ্ধ-কবলিত রাখাইনে খাদ্য সহায়তা পাঠাতে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ‘মানবিক করিডোর’ চালু করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের সম্মতি লাগবে বলে মনে করে জাতিসংঘ। ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইসের বরাতে  বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এমনটাই জানানো হয়। বলা হয়, রাখাইনে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন। সংস্থাটি বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সমর্থন জোরদার করতে কাজ করবে জাতিসংঘ। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে সীমান্ত পেরিয়ে যেকোনও মানবিক সহায়তা বা সরবরাহের জন্য প্রথমে দুই সরকারের সম্মতি প্রয়োজন। সীমান্ত অতিক্রম করে সহায়তা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারের অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া জাতিসংঘ সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এদিকে, রাখাইনের বেশিরভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আরাকান আমি। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সীমান্ত তাও নিয়ন্ত্রণ করছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির তীব্র সংঘাত চলছে। গত মার্চে বাংলাদেশ সফরে এসে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস রাখাইনে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা চান। এর অংশ হিসেবে একটি মানবিক করিডর তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি। রাখাইনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মানবিক করিডর চালুর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের বিষয়টি গত রোববার জনসমক্ষে আনেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘এতটুকু আপনাদের বলতে পারি, নীতিগতভাবে আমরা এতে সম্মত। কারণ, এটি একটি হিউম্যানিটেরিয়ান প্যাসেজ (মানবিক সহায়তা সরবরাহের পথ) হবে; কিন্তু আমাদের কিছু শর্ত রয়েছে, সেই বিস্তারিত বিষয়ে যাচ্ছি না। সেই শর্তাবলি যদি পালিত হয়, আমরা অবশ্যই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সহযোগিতা করব।’ গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকা মিয়ানমারের রাখাইনে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর জন্য শর্তসাপেক্ষে ‘মানবিক করিডর’ দেওয়ার বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে সম্মত মর্মে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। দেশে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যুতে অর্ন্তবর্তী সরকার কিসের ভিত্তিতে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ‘মানবিক করিডর’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলেন অনেকে। বলা হয়, সরকারের উচিত ছিল, দায়িত্ব ছিল এই বিষয়টা নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলা। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্তে দেশের ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির’ মুখে পড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে সরকারের ভেতরে বাইরে প্রতিক্রিয়া হলে নতুন ব্যাখ্যা হাজির করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম মঙ্গলবার বলেন, “আমরা এটা স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে সরকার তথাকথিত ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে জাতিসংঘ অথবা অন্য কোনও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেনি। রাখাইন রাজ্যে যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে মানবিক সাহায্য দেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে রাজি হবে, এটাই আমাদের অবস্থান।” এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি দাবি করে প্রেস সচিব বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোসহ সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমানও কথা বলেছেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘রাখাইনে জাতিসংঘের নেতৃত্বে মানবিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশ তাতে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী আছে। আমরা বিশ্বাস করি, জাতিসংঘের সহায়তায় মানবিক সহায়তার মাধ্যমে রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা শরণার্থীদের ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।’

রাখাইনে হিউম্যানিটারিয়ান করিডরের পক্ষে-বিপক্ষে ঢাকায় তোলপাড় চলা অবস্থায় আপত্তি জানিয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। বিষয়টি স্বীকার করে সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বুধবার মানবজমিনকে বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বিষয়ে ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশকে কূটনৈতিক পত্র দিয়ে আপত্তি জানিয়েছে মিয়ানমারের কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত সামরিক জান্তা সরকার। আরাকান আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ অভিহিত করে বাংলাদেশ কেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নেপি’ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত দেশটির জান্তা সরকার করিডর প্রশ্নে বিরোধিতা থেকে সরাসরি বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। 

mzamin

স্কুল থেকে ফেরার পথে রাহাতকে পিটিয়ে নদীতে ফেলে হত্যা

চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ে রাহাত ইসলাম (১২) নামে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এক বন্ধুকে মারধরের পর আহত অবস্থায় নদীতে ফেলে  হত্যা করেছে তার চার বন্ধু। পুলিশ ওই চার বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। বুধবার সকাল ৭টার দিকে নগরের হামিদচরের নদী থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত রাহাত নগরের চান্দগাঁওয়ের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ফরিদের পাড়ার মো. লিয়াকত আলীর ছেলে এবং সানোয়ারা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পাশাপাশি সে ব্রাদার্স ইউনিয়ন জুনিয়র ক্রিকেট দলের সদস্যও।

২৯শে এপ্রিল স্কুল ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে যায় রাহাত। এ সময় চার বন্ধু মিলে শত্রুতার জেরে পূর্বের একটি ঘটনা নিয়ে তাকে মারধর করে নদীতে ফেলে দেয়। সকালে স্থানীয়রা লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।

রাহাতের মা রোজি আক্তার বলেন, ছেলের ছয় বছর বয়স থেকে ক্রিকেট অনুশীলনের জন্য আউটার স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতাম। অনুশীলন শেষ হওয়ার পর আবার তাকে নিয়ে বাসায় ফিরতাম। আমার কষ্ট হতো, ছেলে তা বুঝতে পারত। এ জন্য প্রায়ই বলত, মা আমি যখন বড় ক্রিকেটার হব, তখন বিদেশে খেলতে গেলে তোমাকেও নিয়ে যাব সঙ্গে। এসব কথা বলতে না বলতেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন রোজি আক্তার। তখন তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন কোচ মাসুমউদ্দৌলা। পরে তিনি বলেন, ‘রাহাত অলরাউন্ডার ছিল। বোলিং, ব্যাটিং সবই করতো। ভালো কিপারও ছিল। গত বছর ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১১-১২ গ্রুপের অধিনায়ক করা হয় তাকে। সীমিত ওভারের বেশ কয়েকটি খেলায় পাশাপাশি দুটি ৫০ রান ছিল তার। একবার ৪৯ রানে অপরাজিত ছিল সে। একজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারকে হারিয়ে ফেললাম আমরা।’

মা-বাবার তৃতীয় সন্তান রাহাত। তার বড় দুই ভাই রয়েছে। তবে তারা অসুস্থ। রাহাতের চাচা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার ভাইয়ের যে ছেলেটা মেধাবী ছিল, খেলাধুলায় সেরা ছিল, সেই ছেলেটাই নেই।
সহপাঠীদের সঙ্গে রাহাতের কোনো ঝগড়া হয়েছে কি না, এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেননি সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল মনসুর চৌধুরী বলেন, স্কুলে রাহাতের সঙ্গে বন্ধুদের ঝগড়ার বিষয়ে কোনো তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। আমাদের কাছে কোনো অভিযোগও করা হয়নি। আমি শ্রেণিশিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছি, তিনিও কিছুই জানেন না। রাহাতের মা আমাদের বলেছেন, ১০-১২ দিন আগে রাহাত একদিন বাসায় ফিরে তাঁকে বলেছে, কয়েকটা ছেলের সঙ্গে তার গণ্ডগোল হয়েছে। তার মা এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে ঝগড়া না করার জন্য বলেছিলেন।’ ঘটনার পর সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চবিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে নিয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বলে প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন।

রাহাতের বাবার একটি গ্রিলের ওয়ার্কশপ রয়েছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই মাস আগে স্কুলে বসা নিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে তার ছেলের কথা-কাটাকাটি হয়। সেটি মীমাংসাও হয়ে যায়। কিন্তু এই ঘটনার জেরে তার ছেলেকে বুধবার টিফিন ছুটির পর নদীর তীরে নিয়ে যায় সহপাঠীরা। তারাই মেরে নদীতে ফেলে দেয় বলে তিনি দাবি করেন।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকালে রাহাত স্কুলে গিয়েছিল। কিন্তু ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে আর বাসায় ফেরেনি। চান্দগাঁও থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, চার বন্ধু মিলে এক বন্ধুকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চারজনকে থানা হেফাজতে নিয়ে আসা হয়েছে। তদন্তের পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

mzamin

প্রতিনিয়ত যুদ্ধের হুমকি আমাদের ঘিরে থাকে

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এমন বিশ্বে আমরা বাস করি, প্রতিনিয়ত যুদ্ধের হুমকি আমাদের ঘিরে থাকে। সেখানে প্রস্তুতি না নিয়ে থাকাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, আমাদেরই কাছে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সকালের খবরে দেখলাম, হয়তো গুজব, আজকেই শুরু হয়ে যাবে যুদ্ধ। কাজেই এই পরিস্থিতির মধ্যে প্রস্তুতি না নেয়াটা আত্মঘাতী এবং প্রস্তুতি নিতে হলে আধাআধি প্রস্তুতির কোনো জায়গা নেই। এটা এমন এক পরিস্থিতি, জয়ই একমাত্র অপশন। পরাজয় এখানে কোনো অপশন হতে পারে না। কাজেই আমাদের প্রস্তুতি কতো উচ্চপর্যায়ে নিতে পারি, তার চেষ্টা থাকতেই হবে। গতকাল বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বীরউত্তম এ কে খন্দকারে বিমান বাহিনীর ‘আকাশ বিজয়’ মহড়া পর্যবেক্ষণ শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অনেকের মতো আমিও যুদ্ধবিরোধী মানুষ। পৃথিবীতে যুদ্ধ হোক, এটা কামনা করি না। যুদ্ধ প্রস্তুতি অনেক সময় যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। কাজেই যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েও একটা ঘোরতর আপত্তি। যুদ্ধ একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় আছে। এমনিতেই বাংলাদেশ মজবুত অর্থনীতির দেশ হয়ে গড়ে উঠতে পারেনি। তার মধ্যে বিগত সরকারের যথেচ্ছাচারের কারণে যা ছিল তাও লুটপাট হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সামগ্রিক স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে হবে। শান্তির দিকে হাত বাড়িয়ে রাখতে হবে সবসময়। কিন্তু প্রস্তুতিও থাকতে হবে। বিমান বাহিনীর মহড়া দেখে খুবই ভালো লেগেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো আমরা সিনেমাতে দেখি। বাস্তবে দেখার খুব একটা সুযোগ হয় না। আজকে আপনাদের কারণে সেটা বাস্তবে দেখলাম। সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে মূল্যায়নে ড. ইউনূস বলেন, এতে আমাদের সাহস বাড়ে। শুধু যুদ্ধের সাহস না- আমাদেরই ছেলেমেয়েরা এমন দুর্দান্তভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে, কঠিন সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে, এটা দেখে বুক ভরে যায়। তিনি বলেন, শান্তির দিকে আমাদের হাত বাড়িয়ে রাখতে হবে সবসময়। কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতিতেও থাকতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদা প্রস্তুত আধুনিক বিমান বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্ব আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার মূল ভিত্তি উল্লেখ করে বিমান বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বিমান বাহিনীর সকল সদস্যের প্রতি যুগোপযোগী ক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন এবং পেশাগত ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি অব্যাহত মনোযোগ বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমরা একটা নিরাপদ, উন্নত ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, বিমান বাহিনীতে ভবিষ্যতে অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান, হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান, রাডার সংযোজনের জন্য সরকার বিমান বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে। প্রফেসর ইউনূস বলেন, বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্যগণ নিয়মিতভাবে বহুমাত্রিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও অনুশীলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে যুগোপযোগী করতে সদা সচেষ্ট রয়েছেন। অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা স্বাধীনতা যুদ্ধে বিমান বাহিনীর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের কথা স্মরণ করে বলেন, শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ জনগণ যারা দেশের অধিকারের প্রশ্নে জীবন ও রক্ত দিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তাদেরকে স্মরণ করছি। তিনি দেশের বিমান বন্দরসমূহের সুষ্ঠু পরিচালনা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত বিমান বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। মহড়া কেবল একটি সাময়িক অনুশীলনই নয় উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, এটি আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিমান বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার পরিচয় বহন করে। নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও পেশাগত উৎকর্ষের জন্য মহড়ায় অংশগ্রহণকারীদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আজকের এই অনুশীলন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আত্মবিশ্বাস, প্রস্তুতি এবং অর্পিত দায়িত্ববোধের বাস্তব রূপায়ণ। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বিস্তীর্ণ সমুদ্র এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিমান বাহিনীর সদস্যদের প্রতি জাতির আস্থা ও ভালোবাসা অটুট থাকুক- এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। এর আগে বিমান ঘাঁটিতে এসে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান। অনুষ্ঠানস্থলে বিমান বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল প্রধান উপদেষ্টাকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। এসময় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
mzamin

ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা রাশেদ খানের: ‘মুখে গামছা ঢুকিয়ে দেয় যাতে চিৎকার করতে না পারি’

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইশতিয়াক আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ জমা দিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান। ২০১৮ সালের ১লা জুলাই রাশেদ খানকে গ্রেপ্তার করে ইশতিয়াক আহমেদ ডিএমপি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কক্ষে হাত ও মুখ বেঁধে অমানবিক নির্যাতন চালান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ অভিযোগ জমা দেন রাশেদ খান।

অভিযোগ দাখিলের পর নিজের ওপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে রাশেদ খান বলেন, গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ড্রোন দিয়ে নজরদারি, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার সিটিটিসি’র সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইশতিয়াক আহমদ পুলিশ নামধারী একজন সন্ত্রাসী। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনাকে কটূক্তির, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় গ্রেপ্তারের পর তার দ্বারা আমি নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ২০১৮ সালের ১লা জুলাই আমাকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় আমি আক্রান্ত হই। এ সময় ডিএমপিতে নিয়ে যাওয়ার পর পা দিয়ে রক্ত ঝরার কারণে আমাকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ডিএমপি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিটে নিয়ে যাওয়ার পরপরই এডিসি ইশতিয়াক আহমদ আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। মা-বাপকে তুলে গালিগালাজ করে আর বলতে থাকে, আমার চোরের মতো চেহারা, আমি শেখ হাসিনাকে গালি দিয়েছি।

রাশেদ খান আরও বলেন, এরপর চেয়ার থেকে উঠে এসে বুঁট দিয়ে আমার অণ্ডকোষে লাথি মারে, আমি চিৎকার করে উঠলে, সে আমাকে চড়-থাপ্পড়, লাথি-ঘুষি মারতে থাকে। আমি দিশাহারা হয়ে বারবার তার পা জড়িয়ে ধরতে যাই। এরপর সে আমার হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দিতে বলে, মুখে গামছা ঢুকিয়ে মুখ বাঁধার নির্দেশনা দেয় একজন পুলিশকে। যাতে চিৎকার করতে না পারি। এরপর আমার হাত ও মুখ বেঁধে ফ্লোরে ফেলে পুলিশের মোটা লাঠি দিয়ে একটানা নির্যাতন করে। এ সময় আমার আঙ্গুল ফেটে ফ্লোরে রক্ত পড়ে এবং পুরো শরীর থেতলে যায়। আমি কয়েকবার সেন্সলেস হয়ে পড়ি। আমি তখন আর কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার স্বাভাবিক সেন্স ছিল না। মনে হচ্ছিলো, আমি মারা যাচ্ছি। দুনিয়ার কোনো চিন্তা আমার মধ্যে ছিল না। মনে হচ্ছিল আমি জাহান্নামে আছি। একটা পর্যায়ে এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী ক্লান্ত হওয়ার পরে আমাকে মারা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। যতবার দাঁড়াতে যাচ্ছি, আমি ততবার পড়ে যাচ্ছি। আর পড়ে গেলেই চেয়ার থেকে বারবার উঠে এসে এই ইশতিয়াক আমাকে লাথি-ঘুষি মারতে থাকে। পুরোদমে ক্লান্ত হওয়ার আগে সে কোনোভাবেই অত্যাচার বন্ধ করে না। আমার সামনেই, ফ্লোরে পড়ে থাকা রক্ত তারা টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলে। এত অত্যাচারের পরেও আমাকে কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আমি চিকিৎসার অনেক আকুতি করেও কোনো চিকিৎসা পাইনি। আমাকে মাত্র কয়েকটি ব্যথার ট্যাবলেট দেয় তারা। সে সময়কার অত্যাচারের কারণে রিমান্ডে ও কারাগারে থাকাকালীন ঘুমাতে পারিনি। আমার পুরো মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়। জেল থেকে বের হওয়ার পর চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পেয়েছি। তবে আমি আজও সুস্থ হতে পারিনি। ওই নির্যাতনের পর থেকে, প্রায়ই আমার পেশার লো হয়ে যায়, শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এখনো পা-হাত ও শরীরের ব্যথায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না, ঘুমের মধ্যে আঁৎকে উঠি। জেল থেকে বের হওয়ার পর দীর্ঘদিন আমি ঘুমের মধ্যেই চিৎকার করে উঠতাম। এই এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ আমার মতো অসংখ্য মানুষকে নির্যাতন করেছে। যেহেতু ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই পুনরায় ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান। সে ২০১৮ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্ত। আমি একজন ভুক্তভোগী হিসেবে মানুষরূপী এই হায়েনার উপযুক্ত শাস্তির দাবি করছি।

তিনি আরও বলেন, এছাড়া গণমাধ্যমের তথ্যমতে, এই অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি ও ভিডিও ধারণ করে। সুতরাং তার সর্বোচ্চ শাস্তি না হলে শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করা হবে। আমি তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

ইশতিয়াক আহমেদকে গ্রেপ্তারে দেরি করা হয়েছে উল্লেখ করে রাশেদ খান বলেন, বিচার যত ধীরে শুরু হবে, অপরাধীরা তত দেশ ছেড়ে পালাবে। প্রশাসনের গাফিলতির সুযোগে অনেক অপরাধী দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। অন্য অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক। ইশতিয়াক আহমেদের নির্যাতনের শিকার অন্য ভুক্তভোগীদেরও মামলা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমি জানতে পেরেছি, ইশতিয়াক আহমেদ জামিন পেয়ে যেতে পারেন। তাকে ছাড়া হলে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে অন্যায় করা হবে।’

এর আগে গত রোববার পুলিশ সিটিটিসি’র সাবেক এ অতিরিক্ত উপ-কমিশনারকে রাঙ্গামাটি থেকে গ্রেপ্তার করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন।

mzamin

দোহার নবাবগঞ্জের আতঙ্ক ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ by শামীম আরমান ও ইমরান হোসেন সুজন

২১শে এপ্রিল রাত তখন আনুমানিক পৌনে ৪টা। হঠাৎ ঘরের আলো জ্বলে উঠায় ঘুম ভেঙে যায় ঢাকার নবাবগঞ্জের চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের। চোখ খুলতেই দেখতে পান খাটের চারপাশে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৬-৭ জন অর্ধউলঙ্গ মানুষ। সবারই গামছা ও কাপড় দিয়ে মুখগুলো ঢাকা, পরনে শুধু হাফপ্যান্ট। তবে শরীরে নেই কোনো জামা, পায়ে নেই জুতা। আচমকা শয়নকক্ষে অপরিচিত লোকজন দেখে হতবাক হয়ে যান তিনি।

দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা ওই চিকিৎসককে অভয় দিয়ে স্বগর্বে বলেন, ডাক্তার সাহেব, আমরা ডাকাত, ডাকাতি করতে এসেছি, আপনাদের মারতে আসি নাই, তাই কোনো আওয়াজ করবেন না। ঘরে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণ আছে আমাদের দিয়ে দেন। এরপর নগদ দেড় লাখ টাকা ও ১০-১২ ভরি স্বর্ণ লুট করে নিয়ে যায়। তবে ডাকাতরা কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করেনি। এ ঘটনায় ওইদিনই নবাবগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ডাকাতরা তার বাড়ির জানালার গ্রিল কেটে ভিতরে প্রবেশ করে। ডাকাতদের একজন মধ্যবয়সী হলেও বাকিদের বয়স ১৫-২৫ এর মধ্যে। তারা সবাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেছিল। দেখে মনে হয়েছে সবাই শিক্ষিত এবং এখনো তুই তুরাকি শব্দ ব্যবহার করেনি। তবে সেই রাতেই স্মৃতি থেকে এখনো বের হতে পারছেন না তারা।

এর আগে ১৫ই এপ্রিল রাতে পার্শ্ববর্তী দোহার উপজেলার পশ্চিম সুতারপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. শাহজাহানের বাড়িতে সশস্ত্র হানা দেন ৬-৭ জনের একটি ডাকাতদল। একই কায়দায় রুমের গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ করে তারা। তখনো ডাকাতরাও মুখ ঢেকে শুধু হাফপ্যান্ট পরে এসেছিল বলে জানা যায়। ২৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ দেড় লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। এর একদিন পর একই কায়দায় উপজেলার নারিশা পশ্চিম চরের গাজী মাহফুজ কাকনের বাড়িতে হানা দিয়ে ৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ৫ লাখ টাকা লুট করে ডাকাতদল। ২ ঘটনার পর বাড়িতে থাকা সিসি ক্যামেরার ডিভিআর নিয়ে যায়। এরপর দোহার থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী পরিবার দু’টি।

জানা যায়, দোহারের দু’টি ও নবাবগঞ্জের একটি ডাকাতির ঘটনায় অনেক কিছুর মিল রয়েছে। সব ঘটনায় একই ধরনের আলামত রয়েছে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডাকাতির শিকার দোহারের ব্যবসায়ী শাহজাহান বলেন, হাফপ্যান্ট পরে মুখ ঢেকে ডাকাতরা বাসায় প্রবেশ করে সব লুট করে নিয়ে যায়। ওরা কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। আমরা ভয়ে তাদের সব দিয়ে দিয়েছি। যাওয়ার সময় তারা মামলা না করার হুমকিও দিয়ে যায়। আরেক ভুক্তভোগী একই উপজেলার নারিশা পশ্চিম চরের হাজী মাহফুজ কাকনও জানান একই কথা। তার বাড়িতেও গ্রিল কেটে হাফপ্যান্ট পরে ডাকাতরা প্রবেশ করে। তার গ্রিলের কাটা অংশে কাপড় পেঁচিয়ে রেখেছিল। তার সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি ডাকাতরা। শুধু ভয় দেখিয়ে হাত-পা-মুখ বেঁধে সব লুট করে নিয়ে যায়। এভাবে ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে দোহার-নবাবগঞ্জের মানুষের মাঝে। ২ উপজেলায় ডাকাতরা এখন ‘হাফপ্যান্ট বাহিনী’ হিসেবে পরিচিত। দোহার ও নবাবগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, রাত হলেই এখন আতঙ্কে থাকি। বাসায় ঘুমাবো সেখানেও ডাকাত আতঙ্ক, আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রেখে আসি সেখানে চুরির আতঙ্ক। এদিকে, দোহারে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত একই পরিবারের ৩ জনসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরিদপুরের নগরকান্দা গ্রামের ছাগলদীর খোরশেদ মাতুব্বরের ছেলে ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর ও ভাংগা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের সরোয়ার মাতুব্বরের ছেলে মো. আকরাম মাতুব্বর, লুণ্ঠিত স্বর্ণ বিক্রি ও ডাকাতির তথ্য সংগ্রহ কাজে সহায়তা করা, ওমর আলীর স্ত্রী রাবেয়া বেগম ও মা কমেলা বেগম এবং স্বর্ণ কেনার অপরাধে একই উপজেলার বিনোকদিয়া গ্রামের গোসাই দাস পালের ছেলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল পালকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় তাদের কাছ থেকে ডাকাতির সময় ব্যবহৃত ১টি দেশীয় অস্ত্র ও লুণ্ঠিত ১০ আনা ১ রতি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে দোহার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম জানান, ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর কিছুদিন পূর্বে জামিনে বের হয়ে বাসাভাড়া নিয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা করে এবং চাঞ্চল্যকর দুইটি ডাকাতি সংগঠিত করে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা প্রাথমিকভাবে অত্র ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান তিনি। দোহার থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, দোহারের দুই ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫ জনের মধ্যে ডাকাত সরদার ওমর আলী মাতুব্বর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেয়ায় তাদের আদালত রিমান্ড দেয়নি। নবাবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ডাকাতির ঘটনায় প্রশাসন কাজ করছে। সারারাত নবাবগঞ্জে পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে দোহার থানা পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে।

mzamin

‘২২৭ জনকে হত্যার লাইসেন্স পেয়ে গেছি’ অডিওটি শেখ হাসিনার

‘২২৭টি মামলা হয়েছে, তাই ২২৭ জনকে হত্যার লাইসেন্স পেয়ে গেছি।’ এই অডিওটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও গাইবান্ধার ছাত্রলীগ নেতা শাকিল আলম বুলবুলের বলে প্রমাণ মিলেছে ফরেনসিক রিপোর্টে। এ ঘটনায় হাসিনা এবং শাকিল আলমের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী ১৫ই মে’র মধ্যে এর জবাব দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। শুনানিতে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অংশ নেন। এসময় প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী ও অন্যান্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।

শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে প্রসিকিউশনের কাছে আবেদন করা হয়। আবেদনে ট্রাইব্যুনালের অভিযুক্ত ব্যক্তি হাসিনা এবং গাইবান্ধার ছাত্রলীগ নেতা শাকিল আলম বুলবুলের একটি অডিও ভাইরাল হয়। সেই অডিওতে আসামি হাসিনা ছাত্রলীগ নেতা শাকিলকে বলছেন, আমার বিরুদ্ধে ২২৭টি মামলা হয়েছে, তাই আমি ২২৭ জনকে হত্যার লাইসেন্স পেয়ে গেছি। এ ছাড়াও যারা হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করারও নির্দেশ দেন। এমনকি পুলিশ অফিসারদের হুমকি দিয়ে হাসিনা বলেন, তারা যেনো মনে রাখে, তাদেরকে ভবিষ্যতে চাকরি করতে হবে। এই বক্তব্য দিয়ে হাসিনা ও শাকিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করা, সাক্ষীদেরকে ভয়ভীতি দেখানো এবং হুমকি দেয়ার মাধ্যমে তারা আদালত অবমাননা করেছেন। এই অডিও সিআইডি’র ফরেনসিক রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট-১৯৭৩ এর ১১-এর ৪ উপধারা অনুযায়ী আদালত অবমাননার নোটিশ ইস্যু করেছেন। আগামী ১৫ই মে অথবা তারও আগে, নিজে অথবা কৌঁসুলির মাধ্যমে হাজির হয়ে জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে জুলাই-আগস্টে গণহত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্যারোলে মুক্তি চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন। স্বামীর অসুস্থতায় প্যারোলে মুক্তি চেয়ে গতকাল দীপু মনির আবেদনের শুনানি হয়। আবেদনে ট্রাইব্যুনাল যেনো তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ব্যবহার করে তার স্বামীর অপারেশনের  কারণে একদিনের জন্য দীপু মনিকে প্যারোলে মুক্তি দেয়। তার স্বামী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায়, স্বামীর সেবার জন্য তাকে পাশে থাকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।

তাজুল ইসলাম বলেন, প্যারোলে মুক্তি দেয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের নেই। এটা সরকারের ক্ষমতাধীন বিষয়। এই আদালত থেকে যদি তাকে জামিনও দেয়া হয়, দেশের অন্যান্য আদালতে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। সুতরাং তাকে মুক্তির আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে করা উচিত। শুনানি শেষে আবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেতে বলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

একইদিনে জুলাই-আগস্টে নারায়ণগঞ্জে গণহত্যার অভিযোগের ঘটনায় ৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম প্রকাশ করা হয় নাই। এ মামলায় নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে আগেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আছে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালে আশুলিয়ায় মরদেহ পোড়ানোর আগে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ২ পুলিশ কর্মকর্তাকে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট মূলে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেয়া হয়।

mzamin