Wednesday, December 31, 2025

নাইজেরীয় শিল্পী হলেন জাতিসংঘের প্রথম বৈশ্বিক শান্তির দূত

জাতিসংঘের প্রথম বৈশ্বিক শান্তির দূত হলেন নাইজেরিয়ার স্পোকেন-ওয়ার্ড শিল্পী ও কবি মরিয়ম বুকার হাসান। সম্প্রতি জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল অ্যাডভোকেট ফর পিস হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। জাতিসংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এ খবর দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয় মরিয়ম বুকার হাসান লিখেছেন ‘শান্তি এমন কোনো নীরবতা নয়, যা মানুষের মুখে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়’। তিনি ‘আলহান ইসলাম’ নামেও পরিচিত। তিনি আরও লিখেছেন, শান্তি ‘যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, বরং বোঝাপড়ার বিষয়।’ এই ভাবনাই ফুটে উঠেছে তার সাম্প্রতিক কবিতা ‘পিস ইজ এ ভার্ব’-এ। উত্তর নাইজেরিয়ায় জন্ম নেয়া বুকারের শৈশব ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহের করাল ছায়ায় গড়া।

বরনো ও কাদুনা অঙ্গরাজ্যের মধ্যে বারবার স্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন বোকো হারামের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর নৃশংস সহিংসতা। এই অঞ্চলেই এক দশকেরও বেশি আগে প্রায় ৩০০ স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করা হয়েছিল। এখনও তাদের  অনেকের কোনো খোঁজ নেই। মরিয়ম বুকার হাসান স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি প্রথম যে যুদ্ধ দেখেছি, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। তিনি জানান, সশস্ত্র লোকেরা তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তার ভাষায়, ‘তারা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাচ্ছিল। যদি দেখত কেউ মুসলিম, তাকে টেনে বের করে এনে হত্যা করত।’ বুকার ব্যথাভরা কণ্ঠে বলেন, ‘চার বছর বয়সে কোনো শিশুর এমন কিছু মনে থাকার কথা নয়। তাদের মনে থাকার কথা হাসিখুশিতে সময় কাটানোর স্মৃতি। তারা প্রায় মারা যাচ্ছিল শুধু মুসলিম বা খ্রিস্টান হওয়ার কারণে এমন স্মৃতি তাদের ধারণ করার কথা নয়।’

বুকারের কবিতা কেবল তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দলিল নয়; এটি একই সঙ্গে সংকট ও সংঘাতে টিকে থাকা মানুষের সংগ্রাম, টিকে থাকার শক্তি আর আশার কাহিনি। কবিতাটি মানুষকে শান্তির সুযোগ দিতে আহ্বান জানায়। তিনি বলেন, ‘আমি মানবমনের দৃঢ়তাকে ধরতে চেয়েছি। কেউ একদিন সকালে ঘুম ভেঙে হঠাৎ বোমা মারতে শুরু করে না। এর পেছনে থাকে ইতিহাস, বঞ্চনা, ক্ষোভ- থাকে হৃদয়ের ভেতরের যুদ্ধ।’

বুকারের কাছে শান্তিতে বিনিয়োগ মানে হলো সহিংসতা ও সংঘাতের মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত ও সমাধান করা। তিনি কল্পনা করেন এমন এক পৃথিবীর, ‘যেখানে বিশ্বনেতারা সত্যিই আলোচনা করবেন- কীভাবে নাগরিকরা নিজেদের দেশে উন্নত হবে, নিরাপদ বোধ করবে এবং শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারবে।’

mzamin

ভারতের ‘আন্তরাষ্ট্র দমন’ নিয়ে অভিযোগের শেষ কোথায় by হেলাল মহিউদ্দীন

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন’ (আন্তরাষ্ট্র দমন) বলে একটি ধারণা রয়েছে। ধারণাটি দিয়ে রাষ্ট্রগুলোর নিজ রাষ্ট্র ছাড়িয়ে অন্য রাষ্ট্রে অন্তর্ঘাত চালানো বোঝায়। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয়ের আগে এই ধারণাটি দিয়ে বোঝানো হতো সিআইএ, কেজিবি, এমআইসিক্স, মোসাদ ইত্যাদি আন্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে ভিনদেশে ভিন্নমতের সরকারকে চাপে রাখা। লক্ষ্য থাকত রাজনৈতিকভাবে কোনো দেশকে চাপে রাখা।

গোয়েন্দা সিনেমা, থ্রিলার, গেম, উপন্যাসে সেসব কার্যক্রমের কল্পগল্প উদাহরণ ভূরি ভূরি রয়েছে। সাধারণত আমনাগরিক পর্যায়ে ‘আন্তরাষ্ট্র দমন–এর ঘটনা মোটেই ঘটত না। অন্তর্ঘাতগুলো সাধারণ নাগরিক বা ছোটখাটো রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীর বিরুদ্ধে হতো না। ঘটত স্পাই-স্পাই, স্পাই-রুলিং এলিট, স্পাই-অস্ত্র উৎপাদক ও বিক্রেতা গোষ্ঠীর দালাল ও বাজার দখলদার পর্যায়ে। নিজ দেশের গোয়েন্দা তথ্য অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া ডাবল এজেন্ট বা স্বপক্ষত্যাগীরাও লক্ষ্যবস্তু হতো।

গত তিন দশকে অপঘাতগুলো কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামছিল। আলোচনায় ছিল মাত্র দুটি ঘটনা। এক. ২০০৬ সালে লন্ডনে রাশিয়ার নাগরিক আলেক্সান্দর লিটভেঙ্কো হত্যাকাণ্ড। দুজন রুশ নাগরিকের সঙ্গে মিটিং ও খাবার শেষের পর পোলোনিয়াম-২১০ এর মতো মারাত্মক রেডিওঅ্যাকটিভ বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। [২০১৮ সালে আরেক সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তাঁর কন্যা ইউলিয়া স্ক্রিপাল বিষাক্ত নোভিচক নার্ভ এজেন্ট-এর (এ-২৩৪) বিষক্রিয়ায় মরতে বসেছিলেন। তাঁরা অবশ্য শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছেন।] দুই. তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে স্বপক্ষত্যাগী অনুমিত জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ড।

লক্ষণীয়, উল্লিখিত দুটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। ভিনদেশের সাধারণ নাগরিককে বা রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে প্রবাসে কোনো দেশের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে কাউকে হত্যার ঘটনা কোনো গণতান্ত্রিক দেশ চালায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানো দেশ হিসেবে ভারত এবং তার গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর নাম বহুল আলোচিত হচ্ছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে।

কানাডা পৃথিবীর শান্তিবাদী দেশগুলোর অন্যতম। দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারতের, বিশেষত পাঞ্জাবি ও গুজরাটি অভিবাসীদের অসামান্য আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি কানাডার শান্তিবাদী মানুষদের বড় অংশই অশান্ত হয়ে উঠছেন ভারতবিরোধিতায়।

ঘটনার শুরু কানাডায় শিখদের মধ্যে জনপ্রিয় নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ড। কানাডা সরকারের দাবি ভারত সরকার এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত। হাতে আছে নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্যপ্রমাণ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডার তখনকার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নিজেই নিজ্জর হত্যায় ‘বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কুখ্যাত বিষ্ণোই গ্যাংকে (লরেন্স বিষ্ণোই নামের একজন গ্যাং লিডারের নামে এই গ্যাংয়ের নামকরণ হয়েছে) ব্যবহার করছে কানাডার জমিনে কানাডার নাগরিক শিখ নেতাদের নিধনের কাজে। নিজ্জর ছাড়া আরও অনেকেই নাকি আছে ‘র’–এর নিধন তালিকায়।

বিখ্যাত অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউট ও এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের যৌথ জরিপ প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে। জরিপে দেখা যায়, কানাডার নাগরিকদের ভারতের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। ২০২২ সালের জরিপে যেখানে ভারতের প্রতি সমর্থন ছিল ৫২ শতাংশ নাগরিকের, মাত্র এক বছর আট মাস পর ২০২৪-এ সেটি ২৪ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পতনের হার ২৬ শতাংশ।

ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কানাডায় বিপন্ন। ঘটনাটির দায়দায়িত্ব বিষয়ে আদালত এখনো চূড়ান্ত সুরাহা দেয়নি। ভারত যথারীতি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু আধুনিক কূটনীতিতে ‘চূড়ান্ত রায়’ আসার আগেই ‘আখ্যান’ তৈরি হয়ে যায়। আর আখ্যান তৈরি হয় রাষ্ট্রের বক্তব্য, গোয়েন্দা তথ্য, আদালতের নথি, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মিশেলে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। কূটনীতিক বহিষ্কার, ভিসা ও সেবা সীমিত করা, আস্থার সংকট এখনো কমেনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ পর্যায়েই থেমে থাকেনি। অভিযোগ ছাড়িয়ে অভিযোগপত্র তৈরির পর্যায়ে চলে গেছে। মামলা হয়েছে আদালতে। মার্কিন বিচার বিভাগ ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঘোষণা দেয়, একজন ভারতীয় সরকারি কর্মচারী বিকাশ যাদব যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি জোগাড়যন্ত্রসহ টাকাপয়সা লেনদেনের প্রায় সব প্রক্রিয়াই গুটিয়ে আনে। সব রকম যোগাযোগ হয়েছে গোপন ও কৌশলী এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে। কিন্তু দুর্ঘটনাটি ঘটার আগেই মধ্যস্থতাকারী সরকারি গোয়েন্দা দপ্তরে চর হিসাবে কাজ পেয়ে যান এবং ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষের জানা হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ভারতের অন্তর্ঘাত তৎপরতা।

এই ধরনের মামলা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কে আটকে থাকে না, ‘রুল অব ল’ পরিসরে ঢুকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তোলে—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও ভারত কীভাবে বিদেশের মাটিতে ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশনে সাহসী হয়ে উঠছে? ভারত যথারীতি এই অভিযোগগুলোও অস্বীকার করেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নজরদারি ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে চিহ্নিত আততায়ী ভারতে পালিয়ে গেছে—এই তথ্যেই বিশ্বাস রাখছে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। তাদের সন্দেহ ও বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডটির দায় ভারতের। যথারীতি ভারত হত্যা-সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে চলেছে। কিন্তু জনমনে ভারতের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাস আরও কয়েক ধাপ বেড়েছে এবং বাংলাদেশের মানুষের অন্তরাত্মা থেকে ক্ষতটি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

ভারতই হবে বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতা—একুশ শতকের শুরুতে এই প্রত্যাশা ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর। কিন্তু বর্তমান সময়ে নতুন বন্ধুত্বের আফগানিস্তান এবং ভুটান ছাড়া প্রায় সব প্রতিবেশীর চোখেই ভারত ‘বিতর্কিত বহিঃশত্রু’। দেশটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়বে ধারণা করা হয়েছিল তিনটি বাস্তবতায়। এক. দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও বাজার, দুই. প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ, তিন. বড় কূটনৈতিক ভূমিকা, বিশেষত বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধি হয়ে ওঠার চেষ্টা।

অথচ কানাডায় নিজ্জর হত্যা ও যুক্তরাষ্ট্রের মামলা চতুর্থ বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্কট্যাংক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্সের মতে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় প্রবাসী বিরোধীদের টার্গেটিং’ তবে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’, বিশেষত বহির্বিশ্বে ‘গণতান্ত্রিক উদাহরণ’কে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি শুধুই সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন নয়। বরং ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ও ‘স্বচ্ছতা’র প্রশ্ন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ উঠলে আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। এক. অভিযুক্ত রাষ্ট্র স্বচ্ছ তদন্তে সহযোগিতা করছে কি না। দুই. ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে অভিযুক্ত রাষ্ট্র সত্যিকার প্রাতিষ্ঠানিক সততা দেখায় কি না!

কানাডার নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলাপ-আলোচনার বড় অংশ জুড়েই থাকে বিদেশি হস্তক্ষেপ, অপতথ্য এবং প্রবাসী কমিউনিটির আচরণ। কানাডার সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ম্যারি-জোসি হোগ-এর নেতৃত্বে ২০২৩ সালে গঠিত ‘পাবলিক ইনকোয়ারি ইনটু ফরেন ইন্টারফিয়ারেন্স ইন ফেডারেল ইলেকটোরাল প্রসেসেস অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশনস’ এখন অবধি কাজ করে চলেছে।

আলোচনা ও প্রতিবেদনগুলোতে একাধিক দেশকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারত সেগুলোর অন্যতম। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কানাডীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মূল্যায়নমূলক পরামর্শ, ‘ভারতকে বিদেশি হস্তক্ষেপের অন্যতম ক্রীড়নক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হোক।

মূল্যায়নগুলো ভারতবিদ্বেষী যেমন নয়, ভারতকে সরাসরি দোষারোপও নয়। তবু ভারতের বিরুদ্ধে ‘কাঠামোগত সন্দেহ’ প্রবল হতে প্রবলতর হচ্ছে। কানাডার নীতিনির্ধারণেও তাই মূল্যায়নগুলোই বেশি ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের অন্যতম বড় খবর—ভারতীয় সংগঠিত অপরাধচক্রটিকে (লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং) ‘ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক’ ঘোষণা করা হয়েছে। কূটনৈতিক আস্থা প্রতিদিনই ভাঙছে। আস্থা ভাঙলে যা হয়—বাণিজ্য, ভিসা, শিক্ষা-অভিবাসন, এমনকি প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি সহযোগিতাতেও তার প্রভাব পড়ছে।

ভারত ‘বিশ্বাস হারানো’র মতো কৌশলগত সংকটে পড়েছে ভালোভাবেই। কারণ, দুটি দেশই ভারতের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী রাষ্ট্র। উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষণ—ভারত হয়তো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ও ‘চরমপন্থী’দের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে দেশ দুটিকে অভিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু উভয় দেশেই আইনি কাঠামো শক্ত ও স্বচ্ছ হওয়ায় এবং সংবাদমাধ্যম স্বাধীন ও অনুসন্ধানী থাকায় জনমত তৈরিতে সরকারের প্রয়োজন হয় না।

উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের ‘অবিশ্বস্ত’ পরিচিতি ঘোচানোর উপায় স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্য বিনিময় সহযোগিতা। প্রয়োজনে স্পষ্ট ভাষায় রাষ্ট্রীয় দায় স্বীকার করা বা নাকচ করা। ভারত অবশ্য কোনোটিই করছে না। ফলে আস্থার সংকট বাড়ছেই। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অপরাধী বিনিময় চুক্তি রয়েছে। কিন্তু যখন কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বিষয়েই ভারত নির্বিকার, বাংলাদেশের দাবিকে দেশটি কতটা আমলে নেবে অনুমান করা কঠিন।

শাস্তিপ্রাপ্ত দাগি আসামিদের আশ্রয়দান ইতিমধ্যে ভারতের নৈতিক ও কূটনৈতিক সম্মানকে দারুণভাবে খর্ব করেছে। শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যদি সত্যিই ভারত জেনেশুনে আশ্রয় দিয়ে থাকে, তবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। বল এখন ভারতের কোর্টে। কূটনৈতিক সমাধানে দেশটির আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসাই উভয় দেশের জন্য মঙ্গলকর।

* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সম্প্রতি উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন
সম্প্রতি উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন

নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে শপথ নিচ্ছেন মামদানি

২০২৬ সালকে বরণ করতে যখন হাজার হাজার নিউইয়র্কবাসী টাইমস স্কয়ারে ভিড় জমাবেন, ঠিক তার আগে নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ৩১ আগস্ট মধ্যরাতে পরিত্যক্ত এক সাবওয়ে স্টেশনে শপথ নেবেন। ওই স্টেশন আমেরিকার ‘গিল্ডেড এজ’ বা সমৃদ্ধির যুগে তৈরি করা হয়েছিল।

৩৪ বছর বয়সী জোহরান নববর্ষের আগের রাতে নিউইয়র্কের সিটি হলের নিচে অবস্থিত এ পরিত্যক্ত স্টেশনে শপথ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। বর্তমানে এ স্টেশন লোকাল ‘৫ নম্বর’ ট্রেনের ঘোরার পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ব্যতিক্রমী জায়গা বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে মামদানি বলেন, এটি প্রতীকীভাবে একটি ‘নতুন যুগের সূচনা’–কে জাগিয়ে তুলছে।

জোহরান মামদানি এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ স্থাপনা এমন এক শহরের স্মৃতিস্তম্ভ, যা একসময় সুন্দর হওয়ার সাহস দেখাত এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার মতো বড় কিছু গড়ে দিত। সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে বা সিটি হলের সুড়ঙ্গের নিচে আটকা পড়ে না থাকে, সে জন্য এ আয়োজন। ওপরের ভবন (সিটি হল) থেকে যাঁরা নিউইয়র্কবাসীদের সেবা করার সুযোগ পাবেন, তাঁদের লক্ষ্য হবে সে চেতনাকে ফিরিয়ে আনা।

জোহরান আরও যোগ করেন, নতুন সুযোগের এ যুগে লাখ লাখ নিউইয়র্কবাসীকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি ধন্য এবং শহরের এ মহান ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে পেরে নিজেকে সম্মানিত মনে করছেন।

১৯০৪ সালে নিউইয়র্কে প্রথম চালু ২৮টি স্টেশনের একটি হচ্ছে এ স্টেশন। পরে ১৯৪৫ সালে আধুনিকায়নের সময় এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে এটিকে নিউইয়র্কের ‘ল্যান্ডমার্ক’ এবং ২০০৪ সালে জাতীয় ঐতিহাসিক স্থানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

নতুন মেয়র জোহরান মামদানিকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস। এরপর আজ বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে সিটি হলের সিঁড়িতে আরেকটি অনুষ্ঠান হবে। সেখানে ভার্মন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তাঁকে শপথ পাঠ করাবেন। এরপর ব্রডওয়েতে একটি বড় উৎসবের (ব্লক পার্টি) আয়োজন করা হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস বলেন, সাবওয়ে স্টেশন বেছে নেওয়াটা যথার্থ হয়েছে। কারণ, ট্রেনব্যবস্থা নিউইয়র্কবাসীর জন্য এক ‘মহাসাম্য’ বা সবাইকে এক করার জায়গা।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘জোহরান আমাদের পরবর্তী মেয়র। কারণ, তিনি বোঝেন, আমরা যে সাবওয়ে লাইনই ব্যবহার করি না কেন, একে অপরের পাশে থাকা সব নিউইয়র্কবাসীর এমন একটি শহর পাওয়ার অধিকার আছে, যেখানে তারা ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবে।’

জোহরান মামদানির শপথ অনুষ্ঠানে সাবেক মেয়রদের মধ্যে কেবল প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট বিল ডি ব্লাসিও উপস্থিত থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন। মাইকেল ব্লুমবার্গ বা রুডি জুলিয়ানি এখনো কিছু জানাননি। বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামসও তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি অস্পষ্ট রেখেছেন।

গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডামস বলেন, তিনি মামদানির সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হতে চান, যেন তাঁর উপস্থিতি কোনো ‘বিঘ্ন’ না ঘটায়। অ্যাডামস পরোক্ষভাবে জোহরান মামদানির সমর্থকদের সমালোচনা করে বলেন, ‘দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। তবে দুর্ভাগ্যবশত তাঁর কিছু সমর্থক আছেন, যাঁরা সবকিছুতেই প্রতিবাদ করতে পছন্দ করেন। তিনি চাইলে আমি যাব।’

জবাবে জোহরান মামদানি বলেছেন, সাবেক মেয়রকে অবশ্যই স্বাগত।

জোহরান শপথ নেওয়ার আগেই তাঁর ফায়ার ডিপার্টমেন্ট প্রধানকে বাছাই নিয়ে সমালোচনা করেছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। তিনি যখন লিনিয়ান বনসিনোর (৫৬) নামের অভিজ্ঞ নারী ইএমএস (জরুরি চিকিৎসাসেবা) কর্মকর্তাকে ফায়ার ডিপার্টমেন্টের (এফডিএনওয়াই) প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন, তখন মাস্ক তাঁর অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

জবাবে মামদানি এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘অভিজ্ঞতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই আমি এমন একজনকে নিয়োগ দিয়েছি, যিনি ইএমএসে ৩০ বছরের বেশি সময় কাটিয়েছেন। মনে রাখবেন, ফায়ার ডিপার্টমেন্টে আসা ৭০ শতাংশ ফোনই ইএমএস কর্মীরা সামলান।’

গত সপ্তাহে মেয়র এরিক অ্যাডামস ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মার্ক গুয়েরাকে সাময়িক সময়ের জন্য ফায়ার চিফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে জোহরান বলেন, অন্য কোনো ঘটনা লিনিয়ানের দক্ষতাকে ম্লান করতে পারবে না। বর্তমান মেয়র এ বছরের শেষ দিন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন।

মীরা নায়ার ও জোহরান মামদানি
মীরা নায়ার ও জোহরান মামদানি। রয়টার্স

ভারতে গান্ধীর নাম ছেঁটে রাম নাম, মোদির নতুন চাল by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

এগারো বছর ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প থেকে বেছে বেছে জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর নাম বাদ দেওয়া হচ্ছিল। এবার নরেন্দ্র মোদির সরকারের কোপে কাটা গেল জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর নাম। টানা কুড়ি বছর ধরে যে প্রকল্প গ্রামীণ ভারতের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদের অন্নের সংস্থান করে এসেছে, সেই ‘মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিম’, আসমুদ্রহিমাচলে যা ‘মনরেগা’ নামে পরিচিত, তা বাতিল করে দেওয়া হলো। সংসদের উভয় কক্ষে রাতারাতি পাস করানো হলো এক নতুন বিল, যেখানে গান্ধীকে সরিয়ে কৌশলে ঢোকানো হয়েছে রামের নাম।

কৌশল, কেননা নতুন এই বিলের পোশাকি নাম ‘বিকশিত ভারত: গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) বিল ২০২৫’ এমনভাবে করা, যাতে ইংরেজি ও হিন্দি আদ্যক্ষরগুলো পাশাপাশি দাঁড় করালে হয় ‘ভিবি: জি রাম জি’। ‘অ্যাক্রোনিম’ এমনভাবে তৈরি, যাতে গান্ধীর পরিবর্তে ‘রাম বন্দনা’ প্রাধান্য পায়। রাম–বিরোধীদের ‘রাবণ’ আখ্যা দেওয়া সহজ। অনুমান করা যায়, হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের জেরে ‘জি রাম জি’ অচিরেই ‘জয় রামজি’ হয়ে যাবে।

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ আখ্যা দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর জন্যই গোটা বিশ্ব তাঁকে ‘মহাত্মা গান্ধী’ বলে চেনে। মহাত্মা গান্ধীকে এভাবে ছেঁটে ফেলার মধ্য দিয়ে মোদি সরকার রবীন্দ্রনাথকেও অসম্মানিত করলেন।

গান্ধীজি কোনোকালেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) চোখের মণি ছিলেন না। বরং তাঁর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে ছিলেন সংঘ–ঘনিষ্ঠ। গান্ধী হত্যায় সংঘের হাত ও অনুমোদন ছিল। এই অভিযোগে ১৯৪৮ সালে সংঘ নিষিদ্ধ হয়েছিল। জনসংঘ, পরবর্তী সময়ে বিজেপিও কখনো গান্ধীকে মাথায় তোলেনি। চিরকাল সমালোচনাই করেছে।

মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গান্ধীকে ব্যবহার করছেন কৌশল হিসেবে। পৃথিবীর শতাধিক দেশে যাঁর মূর্তি রয়েছে, শান্তির বাণী প্রচারের জন্য যাঁর কদর, তাঁকে অস্বীকার করা বোকামি হতো। এখন মোদি এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে গান্ধীজিকে ছেঁটে ফেলতে তিনি দুবার ভাবেননি। কোনো দল বা রাজ্যের সঙ্গে পরামর্শ না করে, কাকপক্ষীকে জানতে না দিয়েই সংসদে ‘জি রাম জি’ পাস করালেন। তিনি জানেন, বিরোধীরা দু–চার দিনের বেশি হইচই করতে পারবে না। তাঁরও লক্ষ্য পূর্ণ হবে।

মনরেগা কখনো মোদির পছন্দের প্রকল্প ছিল না। বরং ক্ষমতায় এসে ২০০৫ সালে মনমোহন সিংয়ের চালু করা ওই প্রকল্প বাতিল করবেন ভেবেছিলেন। তিনি মনে করতেন, ওতে গ্রামীণ সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে না। অর্থের অপচয় হচ্ছে। পরে মন বদলান। কেন বদলালেন, সে কথা ২০১৫ সালে সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় জানিয়েও ছিলেন। কংগ্রেসিদের কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘আমার রাজনৈতিক বোধবুদ্ধি বলছে মনরেগা বন্ধ করা উচিত হবে না। কেননা, এই প্রকল্প কংগ্রেসের ব্যর্থতার জীবন্ত স্মারক। স্বাধীনতার ৬০ বছর পরেও আপনারা মানুষকে দিয়ে গর্ত খোঁড়াচ্ছেন।’

কিন্তু মোদি যে ভুল করেছিলেন, তা বুঝতে দেরি হয়নি। পরের বছরেই, ২০১৬ সালে নোট বাতিলের মতো হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে কাজ হারানো গ্রামে ফেরা শ্রমিকদের একমুঠো খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ওই মনরেগা। ২০১৯ সালে নির্বাচনের সময় বিরোধীরা যখন মোদিকে প্রশ্ন করত, প্রতিশ্রুতিমতো বছরে ২ কোটি চাকরি কোথায়, তখন তাঁকে বাঁচিয়েছিল মনরেগাই। শ্রম মন্ত্রণালয় বছরে ২৩৫ কোটি শ্রম দিবস তৈরির হিসাব দাখিল করেছিল।

কোভিডের সময়েও মনরেগা হয়ে উঠেছিল মুশকিল আসান। তবু মোদি ওই প্রকল্প বাতিল করে ‘জি রাম জি’ আনলেন তিনটি কারণে। এক, কংগ্রেসের আইন বাতিল করে নিজের আইন প্রণয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা। দুই. কেন্দ্রের প্রতি রাজ্যগুলোর নির্ভরতা বাড়িয়ে তাদের কেন্দ্রমুখাপেক্ষী করে তোলা। তিন. কেন্দ্রের আর্থিক বোঝা কমানো।

এগারো বছর ধরে যে যে প্রকল্পের জন্য মোদি কৃতিত্ব দাবি করেন, সেগুলোর অধিকাংশই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে তৈরি। নতুন বোতলে পুরোনো মদ পরিবেশনের মতো তিনি শুধু মোড়ক ও নাম বদলেছেন। এবং প্রচারের জোরে বোঝাতে চেয়েছেন, ৬০ বছরে কংগ্রেস দেশটাকে রসাতলে পাঠিয়েছে। তিনি উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত। উদাহরণ অঢেল। যেমন ২০০৯ সালে মনমোহন সিং সরকারের প্রকল্প ‘নির্মল ভারত অভিযান’ হয়েছে মোদির ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’।

২০০৫ সালের ‘জিরো ব্যালান্স অ্যাকাউন্ট’–এর নাম পাল্টে করেছেন ‘জন ধন প্রকল্প’। মনমোহন সিং ২০০৬ সালে চালু করেছিলেন ‘ন্যাশনাল ই-গভর্ন্যান্স প্ল্যান’। মোদি তারই নাম বদলে করেছেন ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’। ‘স্বাবলম্বন যোজনা’র নাম দিয়েছেন ‘অটল পেনশন যোজনা’। ‘জওহরলাল নেহরু আরবান রিনিউয়াল মিশন’ নাম বদলে করেছেন ‘অটল মিশন ফর রেজল্যুশন অ্যান্ড আরবান ট্রান্সফরমেশন’, যার লক্ষ্য স্মার্ট সিটি তৈরি।

গ্রামের দরিদ্রদের জন্য পাকা বাড়ি তৈরির প্রকল্প ‘ইন্দিরা আবাস যোজনা’ চালু করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, ১৯৮৫ সালে। মনমোহন সিং শহুরে দরিদ্রদের জন্য ২০১১ সালে চালু করেন ‘রাজীব আবাস যোজনা’। মোদি দুটিরই নাম পাল্টে করেছেন ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’। ‘রাজীব গান্ধী গ্রামীণ বিদ্যুতিকরণ যোজনা’র নাম দিয়েছেন ‘দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রাম জ্যোতি যোজনা’।

২০১১ সালে মনমোহন সিং চালু করেছিলেন ‘ন্যাশনাল ম্যানুফ্যাকচারিং পলিসি’। মোদি তারই নাম দিয়েছেন ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। ওই বছরেই কংগ্রেস সরকার চালু করেছিল ‘ন্যাশনাল অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক’, যাতে গ্রামে গ্রামে ব্রডব্যান্ড সংযোগ পৌঁছে দেওয়া যায়। মোদি সেটারই নাম দিয়েছেন ‘ভারত নেট’। ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন মিশন’–এর নাম দিয়েছেন ‘স্কিল ইন্ডিয়া’। মনমোহনের ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ কর্মসূচিই মোদির ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্প। মনরেগা ছিল কংগ্রেসের জনপ্রিয়তম প্রকল্প। এবার সেটারও দখল নিলেন তিনি।

কুড়ি বছর ধরে মনরেগা গ্রামীণ দরিদ্রদের বছরে এক শ দিন কাজের নিশ্চয়তা দিয়েছে। নতুন আইন কাজ দেবে বলছে ১২৫ দিন। মনরেগার মজুরির টাকা ১০০ শতাংশ দিত কেন্দ্রীয় সরকার, ‘জি রাম জি’তে কেন্দ্র দেবে ৬০ শতাংশ, রাজ্যকে দিতে হবে ৪০ শতাংশ। ১০০ শতাংশ টাকা পাবে শুধু বিধানসভা না থাকা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলো। আর সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং হিমালয়সংলগ্ন জম্মু-কাশ্মীর, উত্তরাখন্ড ও হিমাচল প্রদেশকে দেওয়া হবে ৯০ শতাংশ।

এতকাল মনরেগার চরিত্র ছিল চাহিদানির্ভর। রাজ্যের চাহিদা অনুযায়ী কাজ হতো। কেন্দ্র টাকা দিত। নতুন আইনে কোন রাজ্যের কোন জেলায় কী ধরনের কাজ করানো হবে, তা ঠিক করে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্য নয়। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রের ওপর রাজ্যগুলোর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

রাজস্বের অভাবে দেশের অধিকাংশ রাজ্যই ধুঁকছে। ৪০ শতাংশ বাড়তি বোঝা চাপানোর অর্থ প্রকল্পটির আঁতুড়েই মৃত্যু। মোদি এটাই চাইছিলেন। ১০০ দিনের কাজের জন্য বরাদ্দ ২০২১ সালে ছিল ১ লাখ ১১ হাজার কোটি রুপি। তা কমিয়ে ৮৫ হাজার করেছেন। রাজ্যের বকেয়া ৯ হাজার কোটি রুপি। নতুন আইন কাজ দেবে ১২৫ দিন, বরাদ্দ ওই ৮৫ হাজার কোটি!

কুড়ি বছর ধরে গ্রামীণ দরিদ্রদের কাছে যা ছিল অক্সিজেনতুল্য, তার অপমৃত্যুর ধাক্কা সামলানো কঠিন। সম্মিলিত বিরোধিতা মোদিকে কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য করেছিল। গ্রামীণ দরিদ্রদের অভিসম্পাত সওয়া কিন্তু সহজ নয়।

* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ভারতের পার্লামেন্ট চত্বরে ভিবি জি র‍্যাম জি বিলের বিরুদ্ধে বিরোধী সংসদ সদস্যদের  প্রতিবাদ
ভারতের পার্লামেন্ট চত্বরে ভিবি জি র‍্যাম জি বিলের বিরুদ্ধে বিরোধী সংসদ সদস্যদের প্রতিবাদ। ছবি: এএনআই

ইসরায়েলের চোখে ‘নতুন সিরিয়া’ কেন বিপজ্জনক by আলী বাকির

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদের পতন শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না। আসাদের পতনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এসে দাঁড়ায় একটি বড় ধরনের মোড়ে।

গত এক বছরে সিরিয়া ধীরে ধীরে ধ্বংসের কিনারা থেকে সরে এলেও দেশটির অবস্থান এখনো নড়বড়ে। প্রেসিডেন্ট আহমদ আল শারার নেতৃত্বে সিরিয়া আর আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে থাকা রাষ্ট্র নেই। দেশটি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক পুনঃসংযোগ এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতির দিকে এগোচ্ছে। তবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। সিরিয়ার পক্ষে দাঁড়ানো আঞ্চলিক শক্তির সংখ্যা সীমিত এবং একাধিক শক্তি ওখানকার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এসবের মধ্যে ইসরায়েল একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

গত এক বছরে সিরিয়ায় বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। আসাদের শাসনের শেষ দিকের নিষ্ঠুর সময়ের তুলনায় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ সিরীয় নিজ দেশে ফিরে এসেছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী এবং ১৮ লাখ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে। এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের সতর্কতার সঙ্গে বাড়তে থাকা আস্থারই প্রতিফলন।

শারা সরকারের বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতিতে উত্তেজনা কমানো, স্থিতিশীলতা এবং পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। দেশের ভেতরে সরকার বিপ্লবী বৈধতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার দিকে অগ্রসর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আসাদের শাসনামলে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া সদস্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার চালু করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি সাংবিধানিক ঘোষণা এবং নতুন সংসদ গঠন।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার সবগুলো শক্তির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। কুখ্যাত মুখাবারাত গোয়েন্দা সংস্থাকে বিলুপ্ত করে তার জায়গায় জেনারেল সিকিউরিটি সার্ভিস গঠন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে একীভূত করে একটি জাতীয় সেনাবাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।

আঞ্চলিক পর্যায়ে সিরিয়া সফলভাবে আবার আরব বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাতার ও সৌদি আরব নতুন সরকারের মিত্র হিসেবে সামনে এসেছে। ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরেই প্রেসিডেন্ট শারা নজিরবিহীনভাবে কয়েকটি বিদেশ সফর করেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল ঐতিহাসিক। পাশাপাশি তিনি ফ্রান্স ও রাশিয়ার সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। এসব কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ সুগম হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার পুনঃঅন্তর্ভুক্তি আরও শক্তিশালী হয়।

নতুন ও স্থিতিশীল সিরিয়া গঠনে যেসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তাদের মধ্যে তুরস্ক অন্যতম। আসাদ সরকারের পতনের পর আঙ্কারার সঙ্গে দামেস্কের সম্পর্ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। এই সম্পর্কের ভিত্তি হলো সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং অভিন্ন হুমকির মোকাবিলা।

এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক নতুন সিরিয়াকে প্রভাবিতকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখে তুরস্ক সিরীয় রাষ্ট্রের বিপর্যয় ঠেকাতে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

এরপরেও সিরিয়ার নেতৃত্বকে কঠিন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দীর্ঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব অত্যন্ত বিশাল। পুনর্গঠনের ব্যয় এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং এখনো লাখ লাখ সিরীয় রয়েছে বাস্তুচ্যুত অবস্থায়। ফলে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ব্যাপকতা অত্যন্ত গভীর।

রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল। আসাদ সরকারের পতনের ফলে কিছু প্রভাবশালী সংখ্যালঘু গোষ্ঠী তাদের দীর্ঘদিনের বিশেষ সুবিধা হারিয়েছে। এর ফলে এমন একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা নানা অজুহাতে নতুন ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের মতো ধারণাকে সামনে রেখে তারা নিজেদের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

বাহ্যিক দিক থেকে ইসরায়েল এখনো সবচেয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও বিপজ্জনক শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। তেল আবিব নতুন সিরিয়াকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার কৌশল অনুসরণ করছে, যাতে তারা আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে পারে এবং গোলান মালভূমির দখল স্থায়ী করতে পারে।

গত এক বছরে ইসরায়েল একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল নতুন সরকারকে দুর্বল করা এবং সিরিয়াকে স্থায়ীভাবে অক্ষম অবস্থায় রেখে দেওয়া। আসাদ সরকারের পতনের পর ইরানের প্রভাব কমে গেছে, তবে তারা আবার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।

২০২৬ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর টানাপোড়েনে। সম্পূর্ণ স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির দিকে হঠাৎ কোনো বড় অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা যেমন কম, তেমনি আবার সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলকভাবে কম। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো, নানা বাধা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা।

দামেস্ক ও আঙ্কারার সম্পর্ক সিরিয়ার ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি হয়ে থাকবে। তবে সিরীয় জনগণ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সবাইকে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখতে হবে। সামনে পথ হবে দীর্ঘ, কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এই যাত্রায় ধৈর্য ও দৃঢ় অঙ্গীকার যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন ভেতরের ও বাইরের সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে সতর্কতা, যারা সিরিয়াকে একটি নতুন যুগের দিকে এগিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।

আলী বাকির, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

বাশার আল-আসাদের পতনের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বক্তব্য দেন। ৮ ডিসেম্বর, দামেস্ক
বাশার আল-আসাদের পতনের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বক্তব্য দেন। ৮ ডিসেম্বর, দামেস্ক। ছবি : রয়টার্স

আখতারুজ্জামান ও অলি আহমদকে ‘ধিক’ সোহেল রানার, জানালেন কারণ

বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান ও অলি আহমদকে ‘ধিক’ জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্রের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী ও রাজনীতিবিদ মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা। সোমবার ফেসবুক পোস্টে তিনি তাঁদের নিয়ে এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে এই অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। জানতে চাইলে ক্ষোভের কারণ প্রসঙ্গে জানালেন, মুক্তিযোদ্ধা হয়ে দীর্ঘদিন জামায়াতকে রাজাকার বলে স্লোগান দিয়ে আজ তারাই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছেন! এতে ধিক জানানো ছাড়া আর কীই–বা করতে পারি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের পাশে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। গতকাল রোববার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের পাশে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। গতকাল রোববার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে ছবি: প্রথম আলো

বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামানের বাড়ি জেলার কটিয়াদীতে। কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হন। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর জামায়াতে যোগদানের খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফুল হাতে জামায়াতের আমিরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতরুজ্জামান বিএনপি থেকে সর্বশেষ বহিষ্কার হন ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। দলে না থাকলেও রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বিশেষ করে নানা ইস্যুতে টক শো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলে আলোচনায় ছিলেন।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগ দিয়েছেন আখতারুজ্জামান
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগ দিয়েছেন আখতারুজ্জামান। ছবি: জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজ থেকে

এদিকে এলডিপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পান তিনি। মুক্তিযুদ্ধে সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে আসা অলি আহমদ ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। বিএনপির ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের সরকারে যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন তিনি। বিএনপি ছেড়ে ২০০৬ সালে এলডিপি প্রতিষ্ঠা করেন অলি আহমদ।

প্রথম আলোকে সোহেল রানা বললেন, ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ তো একাত্তর সালের কর্মকাণ্ডের জন্য এখনো ক্ষমা চায়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। যতক্ষণ তারা ক্ষমা চাইবে না ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে মনে করতে হবে, ৩০ লাখ শহীদের, ২ লাখ মা–বোনের ইজ্জত যারা নিয়েছে—তারা তাদেরই উত্তরসূরি। এখনকার জামায়াত এই দোষ না করলেও তো ওদের মধ্যে সেই গন্ধ আছে। আমার কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইবে। একজন ক্ষমা চাইল, দুজন ক্ষমা চাইল, তিনজন চাইল তাতে তো হবে না। এটার একটা প্রক্রিয়া আছে। রাষ্ট্রের ক্ষমা চাওয়ার একটা প্রক্রিয়া আছে। দেশের স্বার্থের জন্য কেউ আমার ভাই কেন আরও অনেক কিছুই হতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থটা যে জায়গা আছে, সেখানে আমার বন্ধু হবে। এখন আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, যাদের ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে ‘রাজাকার’ ‘রাজাকার’ বলা হচ্ছে, সেই রাজাকার ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধার দল গিয়ে জোট বেঁধেছে! এ কারণে আমি আখতারুজ্জামান ও অলি আহমদকে ধিক জানিয়েছি। আজ জামায়াত যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়, তাহলে তাদের যারাই জোটবদ্ধ হোক কিংবা দলে যোগ দিক আমি কিছুই বলব না।’

মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা
মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা। ছবি: প্রথম আলো

ইয়েমেনে জরুরি অবস্থা জারি: সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল

ইয়েমেনজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সোমবার জারি করা পৃথক দুটি ডিক্রিতে ৯০ দিনের জরুরি অবস্থা এবং ৭২ ঘণ্টার জন্য আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপের কথা জানানো হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

এই ঘোষণা এমন এক সময় আসলো, যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে ইউএই থেকে আসা অস্ত্রের একটি চালান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। জোটের দাবি, এসব অস্ত্র দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কাছে পাঠানো হচ্ছিল।

চলতি মাসে দক্ষিণ ইয়েমেনে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)-এর বাহিনী। তারা তেল ও সম্পদসমৃদ্ধ হাজরামাউত প্রদেশের অধিকাংশ এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী মাহরাহ প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলে নিয়েছে। টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে আল-আলিমি এই অগ্রযাত্রাকে ‘অগ্রহণযোগ্য বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়ে এসটিসিকে দখল করা এলাকা সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত ইয়েমেনের আগে থেকেই বিভক্ত সরকারব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে হুথিদের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে।

এদিকে, ইয়েমেনে হামলার পর সৌদি আরব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ‘লাল রেখায়’ অবস্থান করছে। মঙ্গলবার সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মুকাল্লা বন্দরে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি বিদেশি সামরিক সহায়তার বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের পর এই অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে। বিবৃতিতে সৌদি আরব ইউএইর ভূমিকা নিয়ে ‘হতাশা’ প্রকাশ করে জানায়, হাজরামাউত ও আল-মাহরাহ প্রদেশে এসটিসি বাহিনীকে সামরিক অভিযানে উৎসাহিত করা সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইয়েমেন ও পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

mzamin

ভারতনীতি: সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন খালেদা জিয়া

এনডিটিভির রিপোর্টঃ ভারত নীতি নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং  শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। হাসিনা ভারতকে বন্ধুসুলভ হিসেবে দেখেন। খালেদা জিয়া তার প্রাথমিক বছরগুলোতে মোটামুটি সতর্ক। কখনো কখনো বিরোধী অবস্থান বজায় রাখেন। সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় ভারতের সঙ্গে স্থলপথ সংযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি তার বিরোধিতা। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা হিসেবে ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দুইবার এই বিরোধিতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ভারতের জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশী ভূখণ্ড ব্যবহার করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। তিনি ভারতের ট্রাকগুলোর বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহারকে ‘দাসত্বের’ সমতুল্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি ১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চুক্তির নবায়নের বিরোধিতা করেন। অনেকেই এই চুক্তিকে সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তবে তিনি বলেন, তার দেশকে এই চুক্তি করতে ‘বাধ্য করা হয়েছে’। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ৮০ বছর বয়সে হৃদরোগ ও ফুসফুস সংক্রান্ত সংক্রমণ, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ছিলেন। তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয় দেশের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের জন্য। গত তিন দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, এই দুই নারী প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।

এনডিটিভি আরও লিখেছে, বিএনপিকে ‘বাংলাদেশের স্বার্থের রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খালেদা তার নীতিগুলোকে ‘ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা’ হিসেবে সাজিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ঢাকায় এক সভায়, যখন হাসিনা প্রধানমন্ত্রী এবং খালেদা বিরোধী দলনেতা ছিলেন, তখন তিনি ভারতের জন্য শুল্কমুক্ত সংযোগ প্রদানের কারণে হাসিনাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে ভারতের রাজ্য বানানোর চেষ্টা প্রতিরোধ করব।’ তবে খালেদার লক্ষ্য কেবল সংযোগের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা ছিল না, বরং তার দেশের জন্য বাস্তব লাভ নিশ্চিত করা ছিল। ২০১৪ সালে ঢাকার একটি পত্রিকা তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে যে, সংযোগ অনুমতি অবশ্যই তিস্তা জল চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন। ১৯৭৫ থেকে কার্যকর এই চুক্তি। গঙ্গা থেকে হুগলির দিকে পানি প্রবাহের জন্য ব্যবহৃত হয় এই চুক্তি। সমালোচনায় তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশকে গঙ্গার পানি থেকে বঞ্চিত করছে। ২০০৭ সালে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তারা বাঁধ খুলে দিয়ে দেশের বন্যা পরিস্থিতি খারাপ করেছে। সংযোগ ও অবকাঠামোর বাইরে প্রতিকূল অবস্থান ছিল তার কৌশলগত নীতির অংশ। ২০০২ সালে তিনি চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন করেন এবং ভারতের প্রতি উদাসীনতা দেখান। চীনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ঢাকার প্রধান সরবরাহকারী হয় ট্যাঙ্ক, ফ্রিগেট এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সরাসরি কৌশলগত। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি এবং দিল্লি কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করে, বিএনপি সরকারের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি সংগঠন আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ আনে ভারত। খালেদার ভারতবিরোধী অবস্থান ছিল বাস্তবমুখী। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯২ সালের তিন বিঘা করিডোর লিজের কথা বলা যায়।  এর ফলে ঢাকাকে দহগ্রাম-আঙরপোতা এলাকায় স্থায়ী অ্যাক্সেস দেয়, যা ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে ২০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি এবং নতুন মাদক তস্কর বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরও তার বাস্তবমুখী নীতি প্রমাণ করে। ২০১২ সালের দিল্লি সফরের পর ভারত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় সফরে এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
যাইহোক, চাপ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০১৬-২০২৪ সালের মধ্যে তার ভারতবিরোধী ভাষণ, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা, খালেদার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। আগস্ট ২০২৪-এর পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বিএনপি সমান ও সম্মানজনক সম্পর্কের জন্য ইঙ্গিত দেয়। যখন তার স্বাস্থ্য অবনতি হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদী টুইটে লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খবর জেনে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তার মৃত্যুর পর তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি ২০১৫ সালে ঢাকায় তার সঙ্গে আমার উষ্ণ সাক্ষাৎ স্মরণ করি।’

mzamin

লড়াকু এক যোদ্ধার বিদায়

না ফেরার দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের আশার বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়া। থেমে গেল দীর্ঘ ৪৩ বছরের আপসহীন, সংগ্রামী, লড়াকু এক রাজনৈতিক জীবন। জাতি হারালো রাজনীতির এক নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। মানুষ আর গণতন্ত্রের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের এক বিশ্বস্ত ঠিকানা। হয়ে উঠেছিলেন গণমুখী রাজনীতির উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, গণতন্ত্র ও অধিকার রক্ষায় এক লড়াকু সৈনিক। লাজুক গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখা বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রশ্নে জীবনে একদিনের জন্যও আপস করেননি। ফ্যাসিবাদ, স্বৈরশাসনের সামনে এক মুহূর্তের জন্য হার মানেননি। প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সামনের সারির লড়াকু এক যোদ্ধা। নির্বাচনী লড়াইয়ে যার কোনো পরাজয় নেই। প্রতিপক্ষের হিংসা, নির্যাতন, রাজনৈতিক আঘাতের জবাব তিনি দিয়েছেন শালীন ও রাজনীতির ভাষায়। হিংসার জবাব দিয়েছেন শান্তির বলিষ্ঠ বার্তায়।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন দেশের নারী সমাজের। নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের রোলমডেল এক সরকার প্রধান। ৩০শে ডিসেম্বর শীতের কনকনে ভোরে দেশবাসীকে কাঁদিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে। তার এই মহা প্রয়াণে দেশ হারিয়েছে এক মহীয়সী নক্ষত্র, যার আলোয় আলোকিত ছিল গণতন্ত্রকামী এক প্রজন্ম। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশি-বিদেশি চিকিৎসক-কর্মীদের ৩৭ দিনের টানা চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম মুহূর্তে তার বড় ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার আরেক পুত্রবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমানসহ স্বজনরা এভারকেয়ার হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতির এই অভিভাবককে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান দেশ। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। আজ বুধবার ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি।

মহিয়সী এই নারীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন। শোক প্রকাশ করে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

বেগম খালেদা জিয়ার দাফন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হবে রাষ্ট্রীয় সম্মানে। বেলা দুইটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউতে বিএনপি চেয়ারপারসনের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় সম্মানে সংসদ ভবনের উত্তর পাশের জিয়া উদ্যানে প্রয়াত স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত হবেন জাতীয় এই অভিভাবক। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই তার জানাজায় অংশ নিতে সাধারণ মানুষ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতে শুরু করেন। জানাজা ও শেষ বিদায়ে অংশ নিতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা আসছেন বলে গতকালই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। দলীয় চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলের গুলশানের কার্যালয়ে খোলা হয়েছে শোক বই। গতকালই শোক বইতে সই করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। শোক বইতে সই করেন ২৮টি দেশের কূটনীতিক। আজ এবং আগামীকালও এই শোক বইতে স্বাক্ষর করা যাবে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল। দরদি এই রাজনীতিকের প্রয়াণে শোকে মুহ্যমান দেশের সব শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণের মানুষ। শোকগ্রস্ত নেতাকর্মীরা প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ছুটে যান এভারকেয়ার হাসপাতালে, দলের গুলশান ও নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

দলের সমর্থক, সাধারণ মানুষের ভিড়ে এই তিনটি স্থান পরিণত হয় শোক, নীরবতা এবং আবেগের এক প্রাঙ্গণে। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছেন, কেউ আবার দুই হাত তুলে দোয়া, মোনাজাত করেছেন আপসহীন নেত্রীর মাগফেরাত কামনায়।

গতকাল সকালে এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সংবাদটি নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে হবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি। আমরা এবারো আশা করছিলাম, ঠিক আগের মতোই আবারো তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত, ইতিমধ্যে আপনারা শুনেছেন মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার ঘোষণা করেন মঙ্গলবার ভোর ৬টায় আমাদের গণতন্ত্রের মা, আমাদের জাতির অভিভাবক আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। এই শোক, এই ক্ষতি- এটা অস্বাভাবিক, অপূরণীয়। এই জাতি কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, যে নেত্রী তার সারাটা জীবন জনগণের অধিকারের জন্য, কল্যাণের জন্য, তার সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। এটা আমরা যারা তার সহকর্মী এবং রাজনৈতিক কর্মী, আমরা এটা ভাবতে পারি না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো। শুধু তাই নয়, গণতান্ত্রিক পৃথিবীর এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো।

এরআগে খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার আনুষ্ঠানিকভাবে খালেদা জিয়া ভোর ৬টায় আইসিইউতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে জানান। ব্রিফিংয়ের সময়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। বৈঠকে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও ১ দিনের সাধারণ ছুটির সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি এই সিদ্ধান্ত জানাতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা। পরে দুপুরে বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠকে বসে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে।

এভারকেয়ার থেকে ফিরোজায় যাবে খালেদা জিয়ার মরদেহ: গত রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালেই ছিল বিএনপি চেয়ারপারসনের মরদেহ। আজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ গুলশানের বাসা ফিরোজায় নেয়া হবে। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আজ বাদ জোহর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে লাশবাহী গাড়ি এভারকেয়ার হাসপাতাল-৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে-কুড়িল ফ্লাইওভার-নৌ সদর দপ্তর হয়ে বাসভবন ফিরোজা, গুলশান-২-কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ-এয়ারপোর্ট রোড-মহাখালী ফ্লাইওভার-জাহাঙ্গীর গেট-বিজয় সরণি-উড়োজাহাজ ক্রসিং হয়ে বামে মোড় নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ৬ নম্বর গেট দিয়ে দক্ষিণ প্লাজায় যাবে।

চোখে অশ্রু, হাসপাতালের ফটকে ভিড়: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চোখেমুখে ছিল গভীর শোকের ছায়া। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছিলেন, কেউ আবার দুই হাত তুলে করছিলেন দোয়া ও মোনাজাত। ভিড়ের মধ্যে কোথাও কান্নার শব্দ, কোথাও দীর্ঘশ্বাস-সব মিলিয়ে এক  শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল চত্বর ও সংলগ্ন সড়কে মানুষের চাপ বাড়তে থাকে। ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়। ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কর্মী স্মৃতি চারণা করছিলেন। কেউ আন্দোলনের দিনের কথা বলছিলেন, কেউ কারাবন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়ার দৃঢ় অবস্থানের কথা স্মরণ করছিলেন।

শোকে আচ্ছন্ন বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়: খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন গুলশানে তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তার মৃত্যুর সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পরপরই দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় কার্যালয়ে। সেখানে ভিড় করেন দলের নেতাকর্মীরা। চেয়ারপারসনের মৃত্যুর খবরে কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া বিএনপি’র নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কান্নার রোল নয়াপল্টনে, কোরআন খতম: খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হতে দেখা গেছে নেতাকর্মীদের। প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে কান্নার রোল পড়ে তাদের মধ্যে। অনেককে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে। কার্যালয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গেলে কোনো ব্যাগ বা ভারী সামগ্রী সঙ্গে নেয়া যাবে না বলে জানানো হয়েছে। জানাজা ও দাফনের সময়সূচি জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক বার্তায় এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আজ দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা হবে। এরপর আনুমানিক বেলা সাড়ে ৩টায় শেরেবাংলা নগরে  জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। জানাজার সময় কোনো ব্যাগ বা ভারী সামগ্রী বহন করা যাবে না। দাফনের কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে হবে বলে সেখানে সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার থাকবে না।

অন্যদিকে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় গুলশানের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এতে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অংশ নেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী কমিটির এ বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে কার্যালয়ে সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজা বুধবার বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে তার স্বামী সাবেক  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হবে। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার জানাজা পড়াবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব। পুরো জানাজা কার্যক্রমের সঞ্চালনা করবেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। সবাই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করবেন। তার দাফনে অংশ নেবেন।

গুলশান কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে:
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শোকবইতে স্বাক্ষর করা হয়।  এ ছাড়া আজ বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা এবং আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শোকবইতে স্বাক্ষর করা যাবে। শোকবইয়ে প্রথম স্বাক্ষর করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান, জার্মান, ইরান, ওমান, আলজেরিয়া, কাতার, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন, ব্রুনাই, প্যালেস্টাইন, স্পেন, মরক্কো, ভুটান, ব্রাজিলসহ ২৮টি দেশের কূটনৈতিক শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়াও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী, জামায়াতের নাযেবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলন প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, মেজর জেনারেল অব. মনিরুজ্জামান, মেজর জেনারেল অব. এ টি এম ওয়াহাব, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

শেষ কয়েকদিন খালেদা জিয়াকে যে চিকিৎসা করা হয়েছে: ছেলে তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরে অনেকটা স্বস্তিবোধ করেছিলেন অসুস্থ খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরটি বিএনপি চেয়ারপারসনকে জানান তার পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান ও ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) থেকেই ছেলের দেশের ফেরার খবর পান খালেদা জিয়া। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময়ে তার শরীরে গুরুতর ইনফেকশনের কারণে উন্নত অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

বিএনপি’র ৭ দিনের শোক কর্মসূচি: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ৭ দিনব্যাপী শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি দেয়া এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে আগামী ১লা জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোকের এই ৩ দিন দেশব্যাপী সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে ৭ দিনব্যাপী কালো পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ। দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা কালোব্যাজ ধারণ করবে। প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার জন্য ৭ দিনব্যাপী কোরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে গুলশানস্থ বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ও নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এবং জেলা পর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।

সোমবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সকাল, বিকাল এবং রাতে হাসপাতালে যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। এ ছাড়াও হাসপাতালে যান খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, আরাফাত রহমান কোকোর মেয়ে জাহিয়া রহমান এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাত ২টায় হাসপাতাল থেকে বের হন তারেক রহমান। কিছু সময়ের বিরতি দিয়ে তিনি আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাসপাতালে যান। বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম সময়ে তারা হাসপাতালেই ছিলেন। 

mzamin

বিশ্বজুড়ে জেন-জি আবার রাজনীতিতে আশার আলো জ্বালাচ্ছে by নাইরি উডস

২০২৫ সালের শেষ মাসটি ছিল বেশ হতাশাজনক। নির্বিচার গুলি, নানা সংকট আর তীব্র মেরুকরণের খবরের শিরোনামে সংবাদমাধ্যম ভরা ছিল। তবু এ অন্ধকার সময়ের মধ্যেও একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ভবিষ্যতের জন্য আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের নানা দেশে তরুণ প্রজন্ম এখন জোরালোভাবে চাকরি, সাশ্রয়ী খাদ্য ও জ্বালানি, অর্থনৈতিক সুযোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি তুলছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে পরিষ্কার একটি বার্তা দিচ্ছে, ‘শুনুন ও ব্যবস্থা নিন, নইলে সরে দাঁড়ান।’

নেপাল এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির সরকার ২৬টি বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে। এসব প্ল্যাটফর্মে রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে তথ্য প্রকাশ পাচ্ছিল। ফলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ৭৩ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পরিস্থিতি সামলানোর বদলে রাস্তায় নামা হাজারো কিশোর-তরুণকে নিয়ে বিদ্রূপ করেন। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১৯ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হলে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনে আগুন দেন এবং ওলির ব্যক্তিগত বাসভবনে হামলা চালান। পরদিনই তিনি পদত্যাগ করেন।

অনেকে মনে করেন, এ আন্দোলনের ঢেউ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায়। সে সময় দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে তরুণদের নেতৃত্বে বড় আন্দোলন গড়ে ওঠে। তাঁরা তৎকালীন ৭২ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের কার্যালয়ের সামনে ক্যাম্প স্থাপন করেন। অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা তাঁর পরিবার দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে জড়িত। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের বাসভবনে ঢুকে পড়লে গোতাবায়াকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়।

এর দুই বছর পর বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। সরকার তখন টেলিযোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং কঠোর পুলিশি দমন চালায়। এতে শত শত সাধারণ মানুষ নিহত হন। কিন্তু এ সহিংসতা আন্দোলন দমন করতে পারেনি; বরং আরও হাজার হাজার মানুষ এতে যুক্ত হন। ঢাকায় বিক্ষোভকারীরা দ্রুত তৎকালীন ৭৬ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় ও বাসভবনের দিকে মিছিল বের করেন। এর পরপরই তিনি ভারতে পালিয়ে যান।

প্রায় একই সময়ে কেনিয়ায় প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে জেন–জির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন, শতাধিক আহত হন এবং অনেককে বিনা কারণে আটক করা হয়। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনে ঢুকে আগুন দিলে রুটো কর বৃদ্ধি প্রত্যাহার করেন এবং তাঁর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যকে বরখাস্ত করেন। চলতি বছরের জুনে আবারও বিক্ষোভ শুরু হয়, যা জনরোষের গভীরতা স্পষ্ট করে।

এদিকে পেরুতে পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে ওঠে। মানুষ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ঘুষ কেলেঙ্কারিতে তদন্তাধীন প্রেসিডেন্ট দিনা বলুয়ার্তেকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

দেশে দেশে দেখা গেছে, জেন–জির নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনগুলো খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য ছড়িয়েছেন, সংগঠন গড়েছেন এবং নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। সরকার যখন এসব মাধ্যম বন্ধ করেছে, তখন তাঁরা এনক্রিপটেড সার্ভার, এমনকি অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মেও সংগঠিত হয়েছেন। আর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মুখে তাঁরা পিছু হটেননি; বরং আন্দোলন আরও জোরালো করেছেন।

এ আন্দোলন শুধু একটি প্রজন্ম বা একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। ধনী ও দরিদ্র—সব দেশের শ্রমজীবী মানুষের অভিন্ন উদ্বেগই এতে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট, কোভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ ও ক্রমবর্ধমান অভিবাসন চাপ—এসব মিলিয়ে মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো ক্রমেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। তবে জেন–জি আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চান না। তাঁরা চান এমন সরকার, যারা চাকরি দেবে, দুর্নীতি দমন করবে এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিনিয়োগ করবে। এসব দাবি বাস্তবসম্মত এবং এগুলো পূরণের পথও আছে।

যুব বেকারত্ব তার একটি উদাহরণ। এক দশক আগে পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, গ্রিস ও স্পেন—এই ‘পিআইআইজিএস’ দেশগুলো তীব্র ঋণসংকটে ভুগছিল। এখন তাদের চারটি দেশ যুব বেকারত্ব নাটকীয়ভাবে কমিয়েছে। পর্তুগালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্ব ২০১৪ সালের ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে নেমে এসেছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশে। আয়ারল্যান্ডে তা ২৪ দশমিক ২ থেকে কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রিসে ৫২ দশমিক ৮ থেকে ২০২৪ সালে নেমেছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে। স্পেনে একই সময়ে হার কমেছে ৫৩ দশমিক ২ থেকে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশে।

এ অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইয়ুথ গ্যারান্টি’ কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় সরকারগুলো প্রতিশ্রুতি দেয়—স্কুল শেষ করার বা বেকার হওয়ার চার মাসের মধ্যে তরুণদের চাকরি, প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ সুযোগ বা পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হবে। সব সমস্যা মেটেনি, কিন্তু এটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কী করা সম্ভব। দুর্নীতি দমন অবশ্য আরও কঠিন। আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, মলদোভা ও ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা তা প্রমাণ করে। তবু অগ্রগতি সম্ভব। এ জন্য দরকার দক্ষ ও ভালো বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী, শক্তিশালী নজরদারি ও অডিট ব্যবস্থা এবং প্রকৃত রাজনৈতিক জবাবদিহি। ই-গভর্ন্যান্সও সহায়ক হতে পারে। রুয়ান্ডার ডিজিটাল সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা দুর্নীতির সুযোগ কমিয়েছে। জর্জিয়ায় পুরোপুরি ইলেকট্রনিক টেন্ডার ব্যবস্থা চালুর ফলে প্রথম দিকে পরিমাপযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে।

স্বচ্ছতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি যখন সহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তা ছড়িয়ে পড়ে। আর যখন তা প্রকাশ পায়, তখন সামাজিক চাপ ও সুনামের ঝুঁকি দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করে। তাই হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, সহজলভ্য দুর্নীতিবিরোধী তথ্যভান্ডার ও ব্যবসায়িক খাতের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।

* নাইরি উডস, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের ডিন
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়
নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ছবি: এএফপি

তারেক রহমানের ফেরা মোড় বদলের সূচনা হতে পারে

স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়ঃ প্রায় দুই দশকের নির্বাসনজীবন শেষে তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়। এটি দেশে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পুনর্গঠনের এক সুনির্দিষ্ট মুহূর্তকে চিহ্নিত করে। এটি সেই মুহূর্ত যখন দেশে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা, বৈধতা ও ‘মেমোরি’ পুনর্বিন্যাস ঘটছে একসঙ্গে। শেখ হাসিনার পতনের পর যে রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, সেখানে তারেক রহমানের আবির্ভাব নতুন এক বিকল্প ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। বহু বাংলাদেশির কাছে তিনি ভাঙনের নয়, ধারাবাহিকতার প্রতীক। জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারী ও বিএনপি’র প্রধান মুখ হিসেবে দীর্ঘদিনের বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক পরিচিত ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করেন। তবুও সময়ের গুরুত্ব থেকেই যায়। বিএনপি’র  ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা লিখেছে ভারতের প্রভাবশালী দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা।

তার প্রত্যাবর্তন এমন এক মুহূর্তে ঘটেছে, যখন বছরের পর বছর দমনপীড়ন, সহিংস আন্দোলন ও বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিকীকরণের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ভিত ক্ষয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত মুখ আশ্বাস জাগাতে পারে- যদিও তার সঙ্গে থাকে অমীমাংসিত অনেক বিষয়। আগের সরকার পতনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো খারিজ হয়ে গেছে। সমর্থকদের কাছে এই অব্যাহতি পাওয়া সাবেক সরকারের নিপীড়নের প্রমাণ হলেও, সমালোচকদের দৃষ্টিতে জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এসেছে। বিপদটি এখানেই- আইনি সমাপ্তিকে যদি নৈতিক নিষ্পত্তি বলে ভুল ধরা হয়। স্বচ্ছ বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া স্থিতির বিনিময়ে রাজনৈতিকভাবে বিস্মৃতি যদি মূল্য হিসেবে গৃহীত হয়- তবে সেই হিসাবনিকাশ অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তবে জনতার উচ্ছ্বাসকে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। জনতার উচ্ছ্বাস ও সমর্থন ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নির্বাহী আধিপত্যের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প নয়।

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কাঠামো, স্বাধীন আদালত ও রাজনৈতিক সংযমের সংস্কৃতি না থাকলে তাতে ঝুঁকি থেকেই যায়। সেই অর্থে আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব কেবল আসনসংখ্যার অঙ্কে নয়- বরং এই প্রশ্নে যে, এখান থেকে কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পূর্বতন শাসকদল কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়ায় এই প্রতিযোগিতা প্রতিনিধিত্বের চেয়ে উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে রূপ নেয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তারেক রহমানের জনসমর্থননির্ভর জনপ্রিয়তা দলগত সাংগঠনিক শক্তি ও জমে থাকা বিরোধী শক্তির উন্মোচন ঘটালেও একই সঙ্গে তাতে রাজনৈতিক বিকল্পের পরিসর প্রসারিত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পাল্টা ভারসাম্য নিয়েও আলোকপাত করে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই রূপান্তরকে তাই আবেগহীন ও সতর্ক বিবেচনায় দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশীই নয়- আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত-পরিচালনা ও অর্থনৈতিক সংযোগের এক কৌশলগত অংশীদার। তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। পুনর্মিলনের বদলে বর্জনের মাধ্যমে জন্ম নেয়া কোনো সরকার দেশে প্রাথমিক বৈধতা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সংহতি ও বহির্বিশ্বের আস্থার পরীক্ষায় পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল নেতৃত্বের নয়- শেখারও পরীক্ষা। যদি বাংলাদেশের পরবর্তী অধ্যায় কেবল পুরনো রাজনৈতিক ভারসাম্যকেই নতুন প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে আনে, তবে অভিযোগ-প্রতিকারের এই চক্র ঘুরতে থাকবে। কিন্তু যদি এই মুহূর্তটি ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রিকীকরণ নয়, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে তারেক রহমানের এই ঘরে ফেরা পুনরাবৃত্তির পূর্বাভাস নয়, বরং এক সম্ভাব্য মোড় বদলের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

mzamin

খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার নিন্দায় ভারতের দুই প্রভাবশালী দৈনিক, মোদি–বিজেপি নীরব

বড়দিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে ভারতজুড়ে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আজ শনিবারেও নীরব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ নিয়ে এখনো মুখ খোলেননি। তবে প্রথম সারির সর্বভারতীয় দৈনিকগুলো মুখ খুলেছে। সম্পাদকীয় স্তম্ভে গুন্ডাদের শাস্তির দাবি জানানোর পাশাপাশি লেখা হয়েছে, স্বঘোষিত ধর্মপ্রহরীদের দাপাদাপি বন্ধ করা প্রয়োজন।

বড়দিন উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নয়াদিল্লির এক গির্জায় প্রার্থনা জানান। প্রার্থনা শেষে সামাজিক মাধ্যমে শান্তি, ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও শুভেচ্ছার বার্তা দেন। অথচ তার আগের দিন থেকে বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ও হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হানতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রীর বার্তা অগ্রাহ্য করে বড়দিনের দিনেও হামলা অব্যাহত থাকে।

বিস্ময় এই যে ভারতজুড়ে ওই তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত একটি কথাও বলেননি। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিজেপিও ঘটনাপ্রবাহের নিন্দা করে কোনো বিবৃতি প্রচার করেনি। শুধু মধ্যপ্রদেশ বিজেপির জব্বলপুর শাখা দলের অন্যতম নেত্রী অঞ্জু ভার্গবকে একটি চিঠি দিয়ে বলেছে, তাঁকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।

মধ্যপ্রদেশের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বড়দিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী খ্রিষ্টান নারীর সঙ্গে অঞ্জু দুর্বব্যহার করছেন।

চলতি বছর বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দেশজুড়ে যেভাবে বড়দিন উদ্‌যাপনের বিরোধিতা করেছে, অতীতে তা হয়নি। বিজেপিশাসিত রাজ্য আসাম, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, ওডিশা এবং দিল্লির পাশাপাশি বামশাসিত রাজ্য কেরালা ও আম আদমি পার্টি শাসিত (আপ) পাঞ্জাবে এই দুই সংগঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস) বড়দিন উদ্‌যাপনের বিরোধিতা করেছে। বড়দিনের উৎসবে মেতে ওঠা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকেও বাধা দেওয়া হয়।

বিপণিবিতান থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের দোকানে বিক্রির জন্য রাখা ক্রিসমাস ট্রি, সান্তার টুপিসহ অন্য সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদীরা। গির্জায় ঢুকে ক্যারল গাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য হিন্দুস্তান টাইমস উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আজ শনিবারের কাগজে সম্পাদকীয় লিখেছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ‘পানিশ দ্য গুনস্, হোয়াই বিজেপি শুড রেসপন্ড স্ট্রংলি টু ক্রিসমাস অ্যাটাক্‌স’ এবং হিন্দুস্তান টাইমসের শিরোনাম ‘নো প্লেস ফর ফেথ ভিজিল্যান্টেস: অ্যাটেম্পটস টু ডিসরাপ্ট ক্রিসমাস সেলিব্রেশনস গো অ্যাগেইনস্ট ইন্ডিয়াস সিভিলাইজেশনাল ইথস’।

দেশজোড়া তাণ্ডবের বর্ণনা দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আচরণ ঘৃণ্য বেদনাদায়ক ও লজ্জার। তারা ক্রিসমাসের জন্য জমায়েত মানুষদের হয়রান করেছে। ক্যারল গাইয়েদের ভয় দেখিয়ে গান থামিয়েছে। স্কুল ও গির্জায় জবরদস্তি ঢুকে পড়েছে। সান্টা ক্লজের টুপি বিক্রেতা গরিব মানুষদের মারধর করেছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, কেরালা ছাড়া আর কোথাও পুলিশ কি এই অপরাধ নজরে এনেছে? ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯৬(২) ও ২৯৯ ধারায় এফআইআর দাখিল করেছে, যে ধারায় মানুষে মানুষে শত্রুতা বাড়ানো বা ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে? ভিডিও দেখে যাদের সহজেই শনাক্ত করা যাচ্ছে, তাদের কাউকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে? এরা সবাই উৎসবের সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য দায়ী।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিজেপি ও আরএসএসকে এই জঙ্গিপনা বন্ধ করতে হবে। এরা শুধু দলের ক্ষতিই করছে না, এরা হিন্দু বিরোধীও। ধর্মের নামে কোনো হিন্দু এই বর্বরতা অনুমোদন করে না। ইউনাইটেড ক্রিশ্চান ফোরাম অভিযোগ জানিয়েছে, এই বছর বড়দিনের সময় সারা দেশে এমন ধরনের ৬০০–এর বেশি ঘটনা ঘটেছে। গুন্ডাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। একটি ছাড়া সব কটি রাজ্যই বিজেপিশাসিত। দলটি দেশেরও শাসক। এতে বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই কারণে আরও বেশি করে বিজেপি নেতৃত্বের সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার তুলনায় হিন্দুস্তান টাইমসের সম্পাকদীয় দীর্ঘ। প্রধানমন্ত্রীর গির্জায় যাওয়া, প্রার্থনা করা এবং সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার উল্লেখের পর তারা লিখেছে—আসাম ও ছত্তিশগড়ে সংঘ পরিবারের ধর্মপ্রহরীরা কীভাবে বড়দিনের আগে থেকেই খ্রিষ্টানদের হয়রান করেছে, উদ্‌যাপন বানচাল করেছে।

মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীকে বিজেপি নেত্রীর হেনস্তা করার ভিডিওটি বিরক্তিকর জানিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ছত্তিশগড়ে বড়দিনের দিন বন্‌ধ্‌ পালনের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী প্রহরীরা ভয়ের যে বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল, যা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল, সেটার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মত দেয়। শুধু আইনগতভাবে নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও কম। প্রধানত উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও কেরালায় তাদের অবস্থান জানিয়ে উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, সংবিধান সবাইকে বাধাহীন ধর্মাচরণের স্বাধীনতা দিয়েছে। সর্বভারতীয় স্তরে ধর্মান্তরণ বিরোধী কোনো আইন নেই। কোনো কোনো রাজ্য এই সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করেছে, জবরদস্তি অথবা লোভ দেখিয়ে ধর্মান্তরণ বন্ধ করতে। ধর্মপ্রহরীরা সেই আইনকেই হাতিয়ার করে অহিন্দুদের হেনস্তা করছে।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়, রাষ্ট্রের উচিত এই ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি রাজনৈতিক দিক থেকেও সক্রিয় হওয়া জরুরি, যাতে কেউ লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম না করে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতের প্রলেপ হবে।

সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, বিজেপির বোঝা উচিত, ধর্মপ্রহরীরা তাদের ক্ষতি করছে। বিজেপি নেতৃত্বের বোঝা উচিত এদের প্রশ্রয় দিলে সম্প্রীতির জন্য দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বার্তা বিফলে যাবে। ভারতীয় সভ্যতার মূল মন্ত্র ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, যার অর্থ—গোটা পৃথিবীই এক পরিবার।

ভারতের বিহারে ক্যাথলিক গির্জায় শিশু জেসাসকে চুমু দিচ্ছেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এক নারী। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাটনা
ভারতের বিহারে ক্যাথলিক গির্জায় শিশু জেসাসকে চুমু দিচ্ছেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এক নারী। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাটনা। ছবি: এএনআই

তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামরিক মহড়া, ফের উত্তেজনা

তাইওয়ান ঘিরে ব্যাপক সামরিক মহড়া শুরু করেছে চীন। দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল ও অবরোধের অনুশীলনসহ এই মহড়াকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির’ বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে বেইজিং। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।

এতে বলা হয়, এই মহড়ার নাম দেয়া হয়েছে ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’। এতে দেশটির সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সঙ্গে রকেট ফোর্সও অংশ নিয়েছে। মহড়ার অংশ হিসেবে সরাসরি গোলাবর্ষণসহ বিভিন্ন রণনীতি অনুশীলন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তরফে তাইওয়ানের কাছে ১১ বিলিয়ন ডলারের বৃহৎ অস্ত্র প্যাকেজ বিক্রির ঘোষণার পর এই মহড়া শুরু করলো চীন। ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বেইজিং এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কয়েকটি মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে। এদিকে তাইওয়ানের চলতি বছরে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের উদ্যোগও বেইজিংয়ের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় চীনের এই সামরিক মহড়ার সমালোচনা করে একে আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে মন্তব্য করেছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার সকালে তারা দ্বীপটির আশপাশে চীনা যুদ্ধবিমান ও জাহাজ শনাক্ত করেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিজেদের বাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বাহিনী।
চীনের ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে এই মহড়াকে ‘ন্যায়ের ঢাল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এক পোস্টে বলা হয়, যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তারা এই ঢালের মুখে ধ্বংস হয়ে যাবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মহড়াকে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির জন্য কঠোর শাস্তি বলে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহিরাগত শক্তিকে তাইওয়ান ইস্যুতে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেছেন, তাইওয়ান শান্তি বজায় রাখতে চায় এবং বর্তমান অবস্থান অক্ষণ্ন রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, শান্তি টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অপরিহার্য। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের পর থেকে তাইওয়ান প্রণালীতে নিয়মিত সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে চীন। চলমান এই মহড়াটি ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের নতুন প্রধান ইয়াং ঝিবিন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় মহড়া। একই সঙ্গে তাইওয়ানও নিজস্ব সামরিক মহড়ার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করে চলেছে, যা এ অঞ্চলের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

mzamin

এবার চীনের নাগরিক সন্দেহে উত্তরাখন্ডে ত্রিপুরার ছাত্রকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা আঞ্চলিক হিংসার পাশাপাশি ভারতের বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে জাতিগত হিংসাও কি যুক্ত হতে শুরু করেছে? প্রশ্নটি উঠেছে উত্তরাখন্ডের রাজধানী দেরাদুনে ‘চীনা’ সন্দেহে ত্রিপুরা রাজ্যের এক ছাত্রকে খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

এই ছাত্র খুনকে কেন্দ্র করে ভারতের ত্রিপুরায় সাধারণ মানুষ যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা গতকাল রোববার এই বিষয়ে কথা বলেন উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সঙ্গে। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ধামি দোষীদের গ্রেপ্তার করে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
ত্রিপুরা ও উত্তরাখন্ড দুই রাজ্যই বিজেপিশাসিত।
ত্রিপুরার নিহত তরুণের নাম অ্যাঞ্জেল চাকমা। ত্রিপুরার ঊনকোটির বাসিন্দা অ্যাঞ্জেল দেরাদুনের এক প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় বর্ষের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

অভিযোগ, গত ৯ ডিসেম্বর অ্যাঞ্জেল ও তাঁর ছোট ভাই মাইকেল দেরাদুনের এক বাজারে গিয়েছিলেন দৈনন্দিন জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে। সেখানে স্থানীয় ছয় তরুণ তাঁদের ‘চীনা’ ও ‘মোমো’ বলে টিটকিরি দেয়। উত্ত্যক্ত করতে থাকে।

এ অবস্থায় অ্যাঞ্জেল ও মাইকেল তাঁদের বলেন, তাঁরা আদৌ চীনের নাগরিক নন। পুরোপুরি ভারতীয়। ত্রিপুরার অধিবাসী। পড়াশোনার জন্য এসেছেন। ভারতীয় পরিচয় পর্যন্ত তাঁরা দিতে চান। বিষয়টি নিয়ে এক পর্বে তর্ক শুরু হলে অ্যাঞ্জেলকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তাঁকে মাথা ও পিঠে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শুক্রবার অ্যাঞ্জেলের মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ ত্রিপুরায় নিয়ে যাওয়ার পর আগরতলায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। সেই চাপের মুখেই মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা ফোন করেন উত্তরাখন্ডের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামিকে।

অ্যাঞ্জেলের বাবা তরুণ প্রসাদ চাকমা বিএসএফের হেড কনস্টেবল। মণিপুরে পোস্টিং। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অ্যাঞ্জেল দেরাদুনে গিয়েছিলেন এমবিএ পড়তে। তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় বসার আগেই তিনি এক সংস্থায় চাকরিও পেয়েছিলেন। পরীক্ষা শুরুর আগের দিনই তিনি আক্রান্ত হলেন।

মানিক সাহা জানান, মুখ্যমন্ত্রী ধামি তাঁকে বলেছেন, ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি একজন অভিযুক্ত নেপালে পালিয়ে গেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ধামি জানিয়েছেন, অভিযুক্তকে ধরতে পুলিশের একটি দল নেপালে গেছে।

এ খুনের ঘটনায় উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা। ত্রিপুরার তিপ্রা মথা পার্টির নেতা প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মার সঙ্গে কনরাড সাংমা সম্প্রতি ‘ওয়ান নর্থইস্ট পার্টি’ নামে একটি মঞ্চ গঠন করেছেন।

নিহত ব্যক্তির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই নেতা বলেন, উত্তর–পূর্বাঞ্চলের মানুষও আর পাঁচজনের মতো ভারতীয়। এই আঘাত কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নয়, গোটা অঞ্চলকে করা হয়েছে।

উত্তর–পূর্বাঞ্চলের যুব সম্প্রদায়কে দিল্লিসহ বিভিন্ন প্রদেশে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। ইদানীং সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছিল বলে মনে হচ্ছিল; কিন্তু অ্যাঞ্জেলের মৃত্যু সেই ধারণা ভুল প্রতিপন্ন করল।

সম্প্রতি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ঘৃণা অপরাধের ঘটনা বেড়ে গেছে। চলতি মাসেই দুজন পরিযায়ী শ্রমিক ঘৃণা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ওডিশার সম্বলপুরে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের জুয়েল রানাকে (১৯) বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর সঙ্গে যাওয়া দুই সহকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন।

ছত্তিশগড় থেকে কেরালার পালাক্কাড়ে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন ৩১ বছরের রামনারায়ণ বাঘেল। তাঁকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়। মারধরের সময় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল বাংলাদেশি কি না।

ওডিশাতেই ঝাড়সুগুদা জেলায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে যাওয়া চার শ্রমিক। গত বুধবার তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ দাগিয়ে মারধর করে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে। ওই ঘটনার পর তাঁরা সবাই পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসেছেন।

চলতি বছর বড়দিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও আরএসএসের কর্মীরা তাণ্ডব চালিয়েছে। গোরক্ষকদের হাতে দলিত ও মুসলিমদের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে চলেছে; কিন্তু এবারই প্রথম ‘চীনা’ সন্দেহে কাউকে আক্রান্ত হতে দেখা গেল।

ওডিশায় জুয়েল রানাকে পিটিয়ে মারার পর জম্মু–কাশ্মীরের পিডিপি নেত্রী ইলতিজা মুফতি ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লেখেন, ‘ইন্ডিয়া, ভারত বা হিন্দুস্তান নয়, তোমার নাম এখন লিঞ্চিস্তান (গণপিটুনির দেশ)।’

ত্রিপুরাসহ উত্তর–পূর্ব ভারতে অ্যাঞ্জেল চাকমা হত্যার বিচারের দাবি উঠেছে
ত্রিপুরাসহ উত্তর–পূর্ব ভারতে অ্যাঞ্জেল চাকমা হত্যার বিচারের দাবি উঠেছে। ছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স থেকে নেওয়া

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই। রবিবার তার প্রতিষ্ঠিত বার্দো ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। অভিনয়জীবনে বার্দো ৫০টিরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। এরপর তিনি নিজেকে প্রাণী অধিকার আন্দোলনে উৎসর্গ করেন। জীবনের পরবর্তী দশকগুলোতে তিনি চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী সম্প্রদায়, মুসলিম ও অভিবাসীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কারণে বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে পাঁচবার দোষী সাব্যস্ত হন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফ্রান্স ২৪।

এতে আরও বলা হয়, যৌবনে বার্দো ছিলেন নিরঙ্কুশ এক যৌন-প্রতীক। তার মোহময়ী শারীরিক আবেদন ও মুক্ত জীবনযাপন তৎকালীন ১৯৫০-এর দশকে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু খুব শিগগিরই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির সেই অবিরাম অনুসরণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং সবকিছু ছেড়ে দেন পশুদের জন্য কাজ করতে। শুরুর দিনে যখন তার বাঁকানো দেহরেখা, কাজল নয়ন আর অভিমানী ঠোঁট ফরাসি চলচ্চিত্রের পোস্টারজুড়ে ছড়িয়ে ছিল, তখন ‘বিবি’ নামে পরিচিত এই অভিনেত্রীকে প্রায়ই তুলনা করা হতো মেরিলিন মনরোর সঙ্গে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে, হঠাৎ একদিন তিনি খ্যাতির সেই নীল জগতকে বিদায় জানান। অবহেলিত প্রাণীদের দেখভাল করার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, তিনি ‘প্রতিদিন সুন্দর হতে হতে অসুস্থ’ হয়ে পড়েছিলেন। তার অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত অভিনয়জীবনে বার্দো একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করলেও সমালোচকদের কাছ থেকে খুব বেশি প্রশংসা পাননি। তার পঞ্চাশটির বেশি চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই ছিল মজাদার। তবে তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি, কেবল কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। ১৯৫৬ সালে ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’ ছবিতে তিনি ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। সেই তরুণীর প্রেম জড়িয়ে পড়ে এক ত্রিভুজ প্রেমে। ছবিটি পরিচালনা করেন তার তৎকালীন স্বামী রজার ভাদিম। ভাদিমের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, এই তরুণ নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠবেন ‘সমস্ত বিবাহিত পুরুষের নাগালের বাইরে থাকা কল্পনার নারী’ এবং তার সেই কথাই সত্যি হয়। ছবিটির এক বিখ্যাত দৃশ্যে, কোমর পর্যন্ত চেরা স্কার্ট পরে মাম্বো নাচতে থাকা বার্দোর মুক্ত যৌনশক্তির প্রকাশ তাকে দেবীর মর্যাদা দেয়। যদিও তা একই সঙ্গে তা চলচ্চিত্র সেন্সরদের বিরক্তির কারণ হয়। সাত বছর পর জ্যঁ-লুক গদারের ‘কনটেম্পট’-এ এক হতাশ, নির্জীব স্ত্রী চরিত্রে তার অভিনয়ও পরিণত হয় চলচ্চিত্রকিংবদন্তির অংশে। প্রযোজক ও দর্শকদের নগ্নদৃশ্যের প্রত্যাশার সঙ্গে গদার এমনভাবে দৃশ্য নির্মাণ করেন যেখানে বিছানায় শুয়ে থাকা বার্দোর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোলাজ তৈরি করা হয়। আর তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, তার শরীরের কোন অংশটি তার সবচেয়ে প্রিয়।

১৯৫৮ সালে ফরাসি লেখিকা মার্গারিত দ্যুরাস লিখেছিলেন- ‘রানী বার্দো দাঁড়ায় সেখানেই, যেখানে নীতিনৈতিকতার শেষ সীমানা।’ এক বছর পর দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার মন্তব্য করেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো চলেন। আর এটাই মানুষকে বিচলিত করে।
কিন্তু ‘স্বাধীনচেতা নারী’ রূপে নিজের এই জন-ইমেজে আনন্দ খুঁজে পাননি বার্দো; বরং তিনি সংগ্রাম করেছেন বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টির বিরুদ্ধে। ১৯৬০ সালে ২৬তম জন্মদিনে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আর ১৯৭৩ সালে চল্লিশে পা দেয়ার আগে তিনি পুরোপুরি সরে দাঁড়ান আলো-ঝলমলে জীবন থেকে। ১৯৭৮ সালে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম আমার ক্যারিয়ার সম্পূর্ণভাবে আমার শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে। তাই আমি সিনেমা ছেড়ে দিলাম। যেমন আমি সবসময় পুরুষদের ছেড়ে যাই, আগে।’

১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্ম নেয়া বার্দো বেড়ে উঠেছিলেন সচ্ছল, ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক পরিবারে। চারবার বিয়ে করা বার্দোর একমাত্র সন্তান নিকোলা। তার পিতা বার্দোর দ্বিতীয় স্বামী অভিনেতা জ্যাক শারিয়ের। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি সেন্ট-ট্রোপেজে প্রায় নির্জন জীবন বেছে নেন এবং এরপর থেকে প্রাণীঅধিকারই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান পরিচয়। ১৯৮০-এর দশকে কানাডায় বার্ষিক সীলশাবক হত্যাযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ২০১১ সালে ডব্লিউডব্লিউএফ’কে দেয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘ওই দৃশ্যগুলো আমি কখনো ভুলতে পারি না। যন্ত্রণাভরা সেই আর্তচিৎকার এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সেগুলোই আমাকে শক্তি দিয়েছে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করার, প্রাণীর জীবনের পক্ষে।’

প্রাণী সুরক্ষার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন। তিনি শিশু সীল, হাতি, পশুবলি প্রথা ও ঘোড়া জবাইখানা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করেন। পরবর্তী জীবনে বার্দো ক্রমশ চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী, মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের কারণে তাকে পাঁচবার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে। ২০০৩ সালের বই ‘এ ক্রাই ইন দ্য সাইলেন্স’-এ তিনি সতর্ক করেন ফ্রান্সের গোপন, বিপজ্জনক, নিয়ন্ত্রণহীন অনুপ্রবেশ সম্পর্কে। ২০১২ ও ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন দেন অতি ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেনকে । তিনি তাকে বলেন ‘২১শ শতকের জোয়ান অব আর্ক’।

ফ্যাশন ও চলচ্চিত্র জগত থেকে সরে যাওয়ার বহু বছর পরও বার্দো সেই জগতগুলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। পশমের পোশাক পরার বিরুদ্ধে ছিলেন সরব এবং গর্বের সঙ্গে এড়িয়ে গিয়েছেন প্লাস্টিক সার্জারি। ২০১৭ সালে হার্ভে  ওয়েনস্টিন কেলেঙ্কারির পর যখন মি-টু আন্দোলন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনও তিনি উল্টো স্রোতে হাঁটেন। ২০১৮ সালে প্যারিস ম্যাচ’কে তিনি বলেন, বেশিরভাগই ভণ্ডামি ও হাস্যকর আচরণ করছে। তার মতে, অনেক অভিনেত্রী প্রযোজকদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। আর পরে আলোচনায় আসার জন্য বলে বসে তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা যখন আমাকে সুন্দর বলত, বা বলত আমার নাকি সুন্দর পশ্চাৎদেশ- আমি সেটাকে আকর্ষণীয়ই মনে করতাম।’

mzamin

Tuesday, December 30, 2025

ইয়েমেনে আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ওপর সৌদি আরবের বোমা হামলা

ইয়েমেনের বন্দরনগরী মুকাল্লায় আজ মঙ্গলবার বোমা হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি আরবের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীর জন্য অস্ত্রের একটি চালান পাঠানো হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই হামলা চালানো হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এই হামলা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’–এর (এসটিসি) সৌদি আরবের উত্তেজনা নতুন করে বাড়িয়ে দিল। একই সঙ্গে এটি রিয়াদ ও আবুধাবির সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি করল।

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এক দশক ধরে চলা যুদ্ধে এই দুই দেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় (এসপিএ) প্রকাশিত এক সামরিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে আসা জাহাজগুলো মুকাল্লায় পৌঁছানোর পর এই বিমান হামলা চালানো হয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘জাহাজগুলোতে ট্র্যাকিং ডিভাইস (অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র) বন্ধ রাখা হয়েছিল। তারা এসটিসির বাহিনীর জন্য প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র ও সামরিক যান খালাস করছিল। এসব অস্ত্র স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেওয়ায় সৌদি জোটের বিমান বাহিনী আজ মঙ্গলবার সকালে অস্ত্র ও যানবাহনগুলো লক্ষ্য করে একটি সীমিত বিমান হামলা চালিয়েছে।’

হামলায় কেউ হতাহত হয়েছে কি না বা সৌদি আরব ছাড়া অন্য কোনো দেশ এতে অংশ নিয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে সৌদি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কোনো বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে তারা রাতের আঁধারে এই হামলা চালিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এই হামলার বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের টেলিভিশন চ্যানেল (এআইসি) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তারা বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘গ্রিনল্যান্ড’ নামের একটি জাহাজ লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ২২ ডিসেম্বর আমিরাতের ফুজাইরাহতে ছিল এবং গত রোববার মুকাল্লায় পৌঁছায়। দ্বিতীয় আরেকটি জাহাজের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইয়েমেনের বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল-বাশা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও উদ্ধৃত করে জানান, জাহাজ আসার পর মুকাল্লায় নতুন সাঁজোয়া যান চলাচলের দৃশ্য দেখা গেছে। এ ঘটনার পর দুপক্ষই সতর্কভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। আরব আমিরাত থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র সরবরাহ এখন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, সৌদি আরব ইয়েমেনের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করে।

সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ড্রোন ফুটেজে দেখা গেছে, মুকাল্লা শহরে বেশ কিছু সাঁজোয়া যান একটি নির্দিষ্ট এলাকার দিকে যাচ্ছে।

মুকাল্লা শহরটি ইয়েমেনের হাদরামাউত প্রদেশে অবস্থিত, যা সম্প্রতি বিচ্ছিন্নতাবাদী কাউন্সিল দখলে নিয়েছে। ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে এডেন শহরটি হুতিবিরোধী শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

এর আগে গত শুক্রবারও সৌদি আরব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সতর্ক করতে বিমান হামলা চালিয়েছিল। সৌদি আরব চায়, তারা যেন হাদরামাউত ও মাহরা প্রদেশ থেকে পিছু হটে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বর্তমানে দক্ষিণ ইয়েমেনের পতাকা ব্যবহার করছে এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেন যেমন আলাদা দুটি দেশ ছিল, তারা আবারও তেমন আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুলছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। দুই দেশ ওপেকের সদস্য এবং ব্যবসায়িক ও আঞ্চলিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-30%2F7ndtblj9%2Fyemen-attack.JPG?rect=0%2C0%2C2736%2C1824&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রান্সজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) সশস্ত্র গোষ্ঠী। ২০ ডিসেম্বর ২০২০, অ্যাডেন। ছবি: রয়টার্স

সাত দশক ধরে সামরিক শাসনের আবর্তে মিয়ানমার

স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে বেশির ভাগ সময় মিয়ানমার শাসন করেছে সামরিক বাহিনী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নানা আদর্শ ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত এই দেশকে পতনের হাত থেকে বাঁচাতে একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে বরাবরই নিজেদের তুলে ধরেছেন সামরিক শাসকেরা। সবশেষ এক যুগ আগে গণতন্ত্রের পথে আবার মিয়ানমার যাত্রা শুরু করলেও তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।

পাঁচ বছর ধরে সামরিক জান্তার শাসনের মুখে মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। এরই মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছে সরকার। এই নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ হবে বা তাতে জনগণের মতের কতটা প্রতিফলন হবে, তা নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বহু বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই একে দেখছেন জান্তার ক্ষমতা পোক্ত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে।

মিয়ানমারে সামরিক শাসন সম্পর্কে শুরু থেকে জানতে হলে ফিরতে হবে বেশ খানিকটা পেছনে। মিয়ানমার তখন পরিচিত বার্মা নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা পায় মিয়ানমার। মিয়ানমারের এই স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অং সান। তিনি দেশটির কারাবন্দী নেত্রী নোবেলজয়ী অং সান সু চির বাবা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের উৎখাত করতে জাপানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন অং সান। তবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে মিত্রপক্ষের দিকে গেলে তিনি আবার দল বদলান। স্বাধীনতার জন্য লন্ডনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর মিয়ানমারে বেশ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তবে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ের মুখে পড়ে বেসামরিক সরকার।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনীকে দুই বছরের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর নির্বাচন হয়েছিল। তবে ১৯৬২ সালে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয় সামরিক বাহিনী। অং সানের একসময়ের সহযোদ্ধা নে উইন দেশ রক্ষার কথা বলে এই পদক্ষেপ নেন। অং সান হত্যার পর এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়েছিলেন।

নে উইন বলেছিলেন, সময়মতো তিনি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন; তবে কথা রাখেননি। ২৬ বছর মিয়ানমার শাসন করেন তিনি। কায়েম করেন নামমাত্র সমাজতান্ত্রিক একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা। এতে বিশ্বে মিয়ানমার একঘরে হয়ে পড়ে। এর ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। অর্থনীতি ধসে পড়ে। ক্ষমতা ধরে রাখতে ভিন্নমত দমনের পথে হাঁটে জান্তা।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের মুখে ১৯৮৮ সালে পদত্যাগ করেন নে উইন। তখন সামরিক বাহিনীর নতুন নেতৃত্ব আবার অভ্যুত্থান করে। আন্দোলনকারীদের কঠোর হাতে দমন করা হয়। হত্যার শিকার হন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। কারাগারে স্থান হয় অনেকের। এরপর ১৯৯২ সালে সামরিক সরকারের দায়িত্ব নেন জেনারেল থান শোয়ে।

২০১১ সালে থান শোয়ে অবসর নেন। ক্ষমতা তুলে দেন বেসামরিক সরকারের হাতে। মিয়ানমারের নতুন নেতা হন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। তিনি সু চিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। ২০১৫ সালে নির্বাচনে বিশাল জয় পায় সু চির দল। ২০২০ সালেও জয় পান তিনি। তবে এই নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী।

জান্তা সরকারের প্রধান হন জেনারেল মিন অং হ্লাইং। আবার কারাবন্দী করা হয় সু চিকে। বিভক্ত হয়ে পড়ে দেশ। শুরু হয় জান্তাবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহীরা চান না ২৮ ডিসেম্বরের নির্বাচন হোক। কারণ, এর মাধ্যমে সামরিক শাসন আরও পোক্ত হওয়া ছাড়া অন্য কিছু দেখছেন না তাঁরা। এমনই পরিস্থিতিতে শুরু হতে যাচ্ছে ভোট গ্রহণ। তা শেষ হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হতে পারে ফল প্রকাশ।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ধর্ষিতার প্রতি বিজেপি কাউন্সিলরের স্বামীর হুমকি

ভারতের মধ্যপ্রদেশের সতনা জেলায় এক বিজেপি কাউন্সিলরের স্বামী ছুরি দেখিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, তিনি ধর্ষিতাকে হুমকি দিয়েছেন। দম্ভ করে বলেছেন, ‘আমার কিছুই হবে না’। শুধু ধর্ষণই নয় এর ভিডিও-ও ধারণ করেছেন তিনি। পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তাকে বারবার যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্য করেন। পরে যখন ওই নারী তাকে ক্যামেরার সামনে মুখোমুখি করে বলেন যে, তিনি তাদের কথোপকথনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করবেন, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্লজ্জভাবে বলেন, তার কিছুই হবে না। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম অশোক সিং। তিনি রামপুর বাঘেলান নগর পরিষদের এক বিজেপি কাউন্সিলরের স্বামী। সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে অশোক সিংকে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করতে ও ভুক্তভোগীকে হুমকি দিতে দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিও জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

ভাইরাল ভিডিওতে অভিযুক্তকে এমন বলতে শোনা যায়, ‘আমার কী হবে? কিছুই হবে না। যেখানে খুশি অভিযোগ কর- আমার কিছুই হবে না।’ এসময় পেছনে কাঁদতে থাকা নারীর কণ্ঠ শোনা যায়। তিনি অভিযোগ দায়েরের কথা বলছিলেন। ভুক্তভোগী সোমবার সতনার পুলিশ সুপার (এসপি) হাঁসরাজ সিং-এর কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। তিনি জানান, ঘটনাটি ঘটে প্রায় ছয় মাস আগে। কিন্তু নিজের ও পরিবারের প্রাণনাশের হুমকির কারণে তিনি এতদিন চুপ ছিলেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর এসপি তদন্তভার সহকারী পুলিশ সুপার (ডিএসপি) মনোজ ত্রিবেদীর কাছে হস্তান্তর করেন। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, কারহি এলাকার বাসিন্দা অশোক সিং তার বাড়িতে ঢুকে ছুরি ঠেকিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। পুরো ঘটনাটি মোবাইলে ধারণ করেন এবং কাউকে জানালে তাকে ও তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেন।

ওই নারীর অভিযোগ, ২০ ডিসেম্বর তিনি আবার তার কাছে গিয়ে তাকে যৌন হেনস্থা করেন ও পূর্বের ভিডিও প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে নিজের ইচ্ছামতো চলতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। তিনি আরও জানান, অশোক সিংয়ের অপরাধমূলক অতীত রয়েছে এবং তাকে পূর্বে জেলাসীমানা থেকে নির্বাসিতও করা হয়েছিল। এই প্রভাবেই তিনি দাপটের সঙ্গে তাকে হুমকি দিচ্ছেন।

ভুক্তভোগীর দাবি, অশোক সিং নিয়মিত তার দোকানে এসে তাকে গালিগালাজ করেন, ভয় দেখান এবং মানসিক আতঙ্ক তৈরি করেন। ওই নারীর অভিযোগ, তিনি পাঁচ দিন আগে পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি তার বা তার পরিবারের কোনো ক্ষতি হয় তাহলে তার দায় পুলিশেরই থাকবে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করছে এবং সব ধরনের প্রমাণ পরীক্ষা করছে। এ পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

mzamin

শেখ হাসিনার আক্রোশে খালেদা জিয়া: বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, বালুর ট্রাকের বেষ্টনী, কারাবন্দী

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনার আচরণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে অনেকটাই ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নিয়েছিল, যার জেরে সেনানিবাসের বাড়িছাড়া হতে হয় খালেদা জিয়াকে, বালুর ট্রাকে অবরুদ্ধ থাকতে হয় বাড়িতে, শেষে কারাগারেও যেতে হয়।
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানে নিজের বাসা ফিরোজায় অবরুদ্ধ করা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানে নিজের বাসা ফিরোজায় অবরুদ্ধ করা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

অক্টোবরের পর ৪১৪ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলেও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে বলে মনে করেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে ‘খুব দ্রুত’ পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

গতকাল সোমবার ফ্লোরিডায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প এ কথা বলেন। তবে অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল বারবার লঙ্ঘন করলেও তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন তিনি। তাঁর দাবি, ইসরায়েল ‘যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে’।

গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে।

গতকাল বৈঠকের পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল ‘পরিকল্পনাটি শতভাগ মেনে চলেছে’। যদিও গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে হামাস ও ইসরায়েলের কত দ্রুত অগ্রসর হওয়া উচিত—এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব। তবে নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই হতে হবে।’

হামাস সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (হামাস) যদি তাদের প্রতিশ্রুতিমতো অস্ত্র সমর্পণ না করে, তাহলে তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, গাজায় পুনর্গঠন কার্যক্রম ‘খুব শিগগির শুরু হতে পারে’।

গাজা শান্তি পরিকল্পনাটি গত অক্টোবরে কার্যকর হয়। পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে বিধ্বস্ত এ ভূখণ্ডে একটি টেকনোক্রেটিক সরকার গঠন করা, হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। এরপর গাজার পুনর্গঠন শুরু হবে।

তবে সমালোচকদের মতে, নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারেন এবং ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের আগে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য চাপ দিতে পারেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগও করা রয়েছে, তিনি ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে আগ্রহী নন।

হামাসের কর্মকর্তারা বলেছেন, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হওয়া উচিত।

পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে ইসরায়েল যথেষ্ট দ্রুতভাবে কাজ না করায় তিনি উদ্বিগ্ন কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল ‘পরিকল্পনার শর্ত মেনেই চলেছে’।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইসরায়েল যা করছে, তা নিয়ে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই। অন্যরা কী করছে বা কী করছে না—সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।’

ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত ৪১৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কেবল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব হিসেবেই গুলি চালিয়েছে। একই সময়ে তিনজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার জন্য তারা হামাসকে দায়ী করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ভিন্ন কোনো স্থাপনা ব্যবহার করছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আরও হামলা চালাবে।

গত জুন মাসে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করি তারা আবার তা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে না। কারণ, যদি তারা সেটা করে, তাহলে সেই কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায় থাকবে না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে) ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ফ্লোরিডায় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে) ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ফ্লোরিডায় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

সিডনির হত্যাযজ্ঞ গাজার কোনো গণহত্যাকে ঢাকতে পারবে না by গিডিয়ন লেভি

দুই খুনি যখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বন্ডি সমুদ্রসৈকতে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করছিল, তখন গাজার খান ইউনিস সৈকতে এক নারী একটা ঝাড়ু নিয়ে সয়লাব হয়ে যাওয়া তাঁর তাঁবু থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছিলেন। এই তাঁবুটাকেই তিনি তাঁর ঘর বলে মেনে নিয়েছেন। এ সময় তিনি চিৎকার করে তাঁর বাচ্চাদের করুণ দশা দেখাচ্ছিলেন। ছিন্ন ও ভেজা পোশাকে বাচ্চাগুলো ঠান্ডায় বারবার শিউরে উঠছিল। কিন্তু না। কেউই তাঁর কথা শোনেনি। সারা দুনিয়ার নজর তখন সিডনি হত্যাযজ্ঞের দিকে।

পরের দিনগুলোয় সারা দুনিয়া ১৫ জন ইহুদিকে নৃশংসভাবে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য শোক প্রকাশ করতে থাকল। যা ঘটেছে তা সবাইকেই ভয়ার্ত করে তোলে। বন্ডি হত্যাকাণ্ড অবশ্যই বৈশ্বিক শোক প্রাপ্য। কিন্তু এই যে শোক, তা তো একাধারে দ্বিচারিতা, প্রতারণামূলক ব্যবহার ও দ্বৈত নীতি দিয়ে ভরা। সবার প্রথমেই বলতে হয় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা, যিনি তড়িঘড়ি করে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করলেন।

নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে দায় নেওয়ার একটা বা দুটো বিষয় জানেন। আর তাই চট করে তিনি অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করলেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। তার মানে তিনি বোঝাতে চাইলেন যে এই হত্যাকাণ্ড ও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে!

আসলে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলা থেকেই রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ও প্রচারণা চালানোর কোনো সুযোগই ইসরায়েল কখনো হাতছাড়া করে না। এ রকম হামলা হতে পারে বলে মোসাদ যে একটা পূর্বাভাস দিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়া তা উপেক্ষা করেছে—তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্যটাও ছড়িয়ে দেওয়া হলো। ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এ রকম যে অস্ট্রেলীয়রা তো সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে জানে না, এমনকি তারা তা করতে চায়ও না! অথচ আমাদের [ইসরায়েলিদের] দিকে তাকালে তারা দেখত যে এখানে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি!

একজন ইসরায়েলি মন্ত্রী তো সিডনিতে উড়ে গেলেন নিহত ব্যক্তিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদান করতে। জেরুজালেম থেকে সিডনির দূরত্ব যত দ্রুত অতিক্রম করা গেল, তার চেয়ে শতগুণ কম দূর হওয়ার পরও জেরুজালেম থেকে নির ওজে কোনো সরকারি প্রতিনিধির দেখা মেলেনি গাজা যুদ্ধে নিহত নিজ দেশের নাগরিকদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে। [২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় গাজা–সংলগ্ন নির ওজে সবচেয়ে বেশি ইসরায়েলি নিহত হয়েছিল।] অথচ তাঁরাই আবার ‘কীভাবে অস্ট্রেলীয় সরকার ইহুদিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় একজন প্রতিনিধি না পাঠিয়ে থাকতে পারল?’ বলে উষ্মা প্রকাশ করছে। এহেন অতি স্পর্ধা তো সব সীমা অতিক্রম করে গেছে।

অবশ্য একটা কৌতুককর স্বস্তি নেমে আসে যখন জানা গেল যে একজন অস্ট্রেলীয়-সিরীয় কয়েকজন ইহুদির প্রাণ বাঁচিয়েছে। নেতানিয়াহু তো ইহুদিদের বীরগাথা বর্ণনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আহমদ আল আহমদ নামের ব্যক্তিটি সাহসিকতার সঙ্গে এক হত্যাকারীর বন্দুক কেড়ে নিয়ে তাকে নিরস্ত্র করে ফেলে—এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলিদের জন্য ‘বিব্রতকর’ হয়ে যায়। সব মুসলমান ও আরব সহজাতভাবেই খুনের জন্য অপরাধী—এহেন প্রচারণাও থেমে যায়।

এটা কি সম্ভব যে একজন আরব এ রকম সাহস ও মানবিকতা দেখিয়েছেন? কয়েক মুহূর্তের জন্য আরেকটা তাসের ঘর ধসে পড়ল। অবশ্য তার জায়গায় স্থান করে নিল ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম) নিয়ে বিতর্ক যদিও এটা খুব পরিষ্কার যে হত্যাকারীরা আইএসআইএসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর আইএসআইএসের লড়াই শুধু ইহুদিদের বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা পশ্চিমের বিরুদ্ধে।

এমনকি ইরানকে দায়ী করার চিরাচরিত প্রয়াসও তথ্যগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে উঠল। ইরান ও আইএসআইএস পরস্পরের শত্রু। সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় হলো হামলাকারীরা কেউই ফিলিস্তিনি নয়! সেটা হলেই তো কাজ সেরে যেত, জোর প্রচারণা ও ফায়দা লোটার মাত্রা অনেক বাড়ত।

তবে যাই হোক না কেন, এই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ইসরায়েলি প্রচারণাকে সহায়তা করে, ইসরায়েলি ও ইহুদিদের বিপর্যয়ের একই পাত্রে ধারণ করে। সারা দুনিয়া যখন আমাদের বিরুদ্ধে তখন এভাবে একত্র হওয়াটা তো খুব ভালো বিষয়, নয় কি?

সর্বোপরি রয়েছে দ্বৈত মানে কালো মেঘ: সিডনির এক সৈকতে ১৫ জন মানুষের হত্যাকাণ্ড গাজার ভয়াবহ সব বড় বড় গণহত্যাগুলোকে ঝাপসা করে দিল। অথচ বন্ডি সৈকতে ছিল মাত্র দুজন হত্যাকারী। আর গাজায়? গোটা একটি দেশ ও তার সশস্ত্র বাহিনী এসব গণহত্যা চালিয়েছে, চালাচ্ছে। এইতো সেদিন, ১৮ জন শিশুসহ ৩৬ জন মানুষ মারা গেল গাজার বেইত হানাউনের এক স্কুলে ইসরায়েলি হামলায়। এ রকম আরও অনেক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, এমনকি কথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও শত শত নিরীহ গাজাবাসী এখনো মারা পড়ছে।

না, বন্ডি সৈকতের হত্যাযজ্ঞ গাজা উপত্যকার সব গণহত্যাকে ঢেকে দিতে পারবে না। তবে ফিলিস্তিনিরা অশ্রুসজল চোখে কেবল দেখবে যে তাঁদের ধসে পড়া তাঁবুগুলো তাঁদের শীতার্ত বাতাসের চাবুক থেকে রক্ষা করতে পারেনি। বরং সারা দুনিয়া বন্ডি শোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁদের কত দ্রুত ভুলে গেছে!

* গিডিয়ন লেভি, ইসরায়েলের সাংবাদিক। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন।
- হারেৎজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ আসজাদুল কিবরিয়া

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-08%2Fjustnmop%2FCapture.PNG?rect=0%2C0%2C945%2C630&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে ফিলিস্তিনি কিশোরেরা। গাজা নগরীর আল-শাতি শরণার্থীশিবিরের পাশে। ছবি: এএফপি