Thursday, December 12, 2024

ইসরায়েলের হামলা ও সিরিয়ান বিদ্রোহী জোটের নীরবতা

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর, ইসরায়েলি বাহিনী সিরিয়ার সামরিক ক্ষমতার ৮০ শতাংশ ধ্বংস করার দাবি করেছে। খবর টাইমস অব ইসরায়েল।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় সিরিয়ায় ৩৫০টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে, পাশাপাশি সিরিয়ার নৌবাহিনীর স্থাপনাগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে।

এই হামলায় সিরিয়ার অস্ত্রাগার, বিমান ঘাঁটি এবং নৌবহরের বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়াও, ইসরায়েলি সেনারা গোলান মালভূমি দিয়ে ২৫ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছে।

হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘সিরিয়ায় সাবেক আসাদ সরকারের সামরিক ক্ষমতা ধ্বংস করা জরুরি ছিল, যাতে সেগুলো জঙ্গিদের হাতে না পড়ে। আমরা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাই না, তবে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা করব।’

এদিকে, ইসরায়েলের এই হামলা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ ইরান, ইরাক, সৌদি আরব এবং কাতার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

তবে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা কোনো কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বিদ্রোহী জোটের নেতা আবু মোহাম্মদ আল জোলানি মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সিরিয়া আরেকটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয় এবং সেটি শুরু হবে না।’ তার মতে, সিরিয়ার জনগণ দীর্ঘ বছরের সংঘর্ষে ক্লান্ত।

সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এই নেতার নীরবতার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামরিক এবং কৌশলগত কারণ বিদ্যমান।

১.বিদ্রোহীদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন

আসাদের পতনের পর, সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গুরুতর বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি এখন নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত। প্রতিটি গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব লক্ষ্য এবং কৌশল নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে, এবং এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিদ্রোহীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এ কারণে, তারা একত্রে ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

২. প্রধান লক্ষ্য : আসাদ শাসন উচ্ছেদ

বিদ্রোহীদের মূল লক্ষ্য ছিল আসাদ শাসন উৎখাত করা। তারা শুরু থেকেই একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে সংগ্রাম করছে – আসাদ সরকারকে উৎখাত করা এবং নিজেদের ক্ষমতায় আসা। ইসরায়েলের হামলা তাদের জন্য একটি পার্শ্বিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্রোহীরা জানে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আসাদ সরকারের পতন, এবং এ লক্ষ্যে তারা নিজেদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করছে। তাই ইসরায়েলের হামলা তাদের কাছে এখন কোনো বড় বিষয় নয়, বরং এটি তাদের মূল লক্ষ্য থেকে তাদের দৃষ্টি সরিয়ে ফেলতে পারে।

৩. আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কৌশল


বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কিছু অংশ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে সমর্থন পেয়ে থাকে। সিরিয়ার বিদ্রোহীরা জানে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তোলা তাদের আন্তর্জাতিক সমর্থন হারানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তারা বুঝে যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করলে তারা আন্তর্জাতিক স্তরে একচেটিয়া সমর্থন হারাতে পারে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই, বিদ্রোহীরা ইসরায়েলের হামলায় সরাসরি প্রতিরোধ গড়তে যেতে চায় না।

৪. সামরিক সক্ষমতার অভাব

ইসরায়েল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক শক্তি, যা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী হিসেবে পরিচিত। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে উন্নত। বিদ্রোহীদের মূল সামরিক শক্তি সীমিত এবং তারা গৃহযুদ্ধে অভ্যস্ত। তাদের কাছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক প্রযুক্তি এবং বাহিনী নেই। এতে করে, ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করতে বিদ্রোহীরা সক্ষম নয়।

৫. ইরান ও হিজবুল্লাহর সমর্থন

আসাদ সরকারের মিত্র হিসেবে ইরান এবং হিজবুল্লাহ রয়েছে, যারা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের জন্য অপ্রতিরোধ্য শত্রু। সিরিয়ার বিদ্রোহীরা জানে যে, ইসরায়েলের হামলা আসাদ সরকারের শত্রুদের ক্ষতি করতে পারে, যা পরোক্ষভাবে তাদের সুবিধা দেবে। তাই, তারা ইসরায়েলের হামলাকে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান হিসেবে দেখছে। বিদ্রোহীরা মনে করে, ইসরায়েল আসাদ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা তাদের জন্য পরোক্ষভাবে সহায়ক হতে পারে।

৬. জনমত ও সামরিক কৌশল

সিরিয়ার সাধারণ জনগণ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দেখতে চায়, কিন্তু বিদ্রোহীরা তাদের সীমিত শক্তির কারণে এই ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে না। তারা জানে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করা তাদের জন্য আত্মঘাতী হবে এবং তাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করবে। এ কারণে, বিদ্রোহীরা চুপ করে থাকে এবং তারা জানে যে, ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে কিছু না করলেই তাদের জন্য কম ঝুঁকি রয়েছে।

সিরিয়ার বিদ্রোহীদের ইসরায়েলের হামলায় নীরব থাকার পেছনে একাধিক কৌশলগত, সামরিক এবং রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। তারা এখনো আসাদ সরকারের পতন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ব্যস্ত এবং সে কারণেই ইসরায়েলের হামলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো সামর্থ্য বা ঐক্য তাদের নেই।

তবে, এই নীরবতা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করতে পারে এবং তাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

ইসরায়েলের হামলায় সিরিয়ার অস্ত্রাগার, বিমান ঘাঁটি এবং নৌবহরের বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের হামলায় সিরিয়ার অস্ত্রাগার, বিমান ঘাঁটি এবং নৌবহরের বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি : সংগৃহীত



সোনা আকড়ে টিকে আছে রাশিয়া

ইউক্রেনে হামলার পর থেকে সম্মিলিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে জর্জরিত রাশিয়ার অর্থনীতি। এর মধ্যেও নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করে যাচ্ছে পুতিন প্রশাসন।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে রাশিয়াকে টিকিয়ে রাখছে সোনার মতো মূল্যবান জিনিস। ইউরোনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার সোনার বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করলেও মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকার সোনা উৎপাদনে দেশটির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

গবেষণা সংস্থা ‘র‌্যান্ড ইউরোপ’-এর তথ্য মতে, যুদ্ধকালীন অর্থনীতিতে রাশিয়া হার্ড কারেন্সি, অস্ত্র এবং অন্যান্য পণ্য সংগ্রহের জন্য সোনা ব্যবহার করছে। বিশেষ করে চীন, তুরস্ক এবং ইরানের সঙ্গে এই ধরনের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে দেশটির।

২০২৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে রাশিয়া বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম সোনা রিজার্ভের মালিক ছিল। দেশটির মজুত সোনার পরিমাণ ছিল ২ হাজার টনেরও বেশি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পুরোদমে আক্রমণের আগে থেকেই রাশিয়া সোনা সংগ্রহের হার বাড়িয়ে দিয়েছিল। এক দশক ধরে তারা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সোনা রিজার্ভ তৈরি করেছে।

পাশাপাশি, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার সোনা উৎপাদনে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রয়েছে। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতু ও পাথরের বাণিজ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সোনা উৎপাদনের গতি কমিয়ে দিয়েছে। 

অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে সোনার ওপর নির্ভর করছেন পুতিন। প্রতীকী ছবি
অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে সোনার ওপর নির্ভর করছেন পুতিন। প্রতীকী ছবি

শিলং-কলকাতায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে সিলেট আওয়ামী লীগের নেতারা by ওয়েছ খছরু

ভারতের সীমান্তঘেঁষা রাজ্য মেঘালয়ের শিলং ও পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের হাজারো নেতাকর্মী অবস্থান করছেন।  প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরপরই তারা যে যেভাবে পেরেছেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এর মধ্যে রয়েছেন দলের সিনিয়র নেতারাও। মেঘালয়ের জোয়াই এলাকায় ট্রাকচালককে মারধর ও টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় চার আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভারতে অবস্থান করা নেতাদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিরাজ করছে। রোববার মধ্যরাত থেকে অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে নিরাপদে অবস্থান করছেন।

কলকাতা শহরের নিউ টাউন এলাকা থেকে মেঘালয় ও কলকাতা পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য ইলিয়াছ আহমদ জুয়েল, সিলেট মহানগর যুবলীগের সভাপতি আলম খান মুক্তি ও সিলেট মহানগর যুবলীগের সহ-সভাপতি আব্দুল লতিফ রিপন। তাদের গ্রেপ্তারের খবর ওই রাতেই সিলেটে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মারফতেই সিলেটে এ খবর রটে। এ নিয়ে সিলেটে তোলপাড় শুরু হয়। খবরটি নিয়ে ভারতে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্কও ছড়ায়। ভারতে অবস্থান করা সিলেট আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা জানান, চার নেতাকে গ্রেপ্তারের বিষয় সম্পর্কে বিষয়টি কিছুই অবগত হওয়া যায়নি। অনেকেই ধারণায় নিয়েছিলেন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের কারণেই তাদের আটক করা হয়েছে। এ কারণে যারা শিলং ও কলকাতায় অবস্থান করছিলেন তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।  কেউ কেউ ভয়ে গা ঢাকা দেন।

প্রাথমিকভাবে জানা যায়, শিলংয়ে এক মহিলাকে ধর্ষণের ঘটনায় তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু পুলিশ গ্রেপ্তারের পর মামলার আর্জিতে ধর্ষণের ঘটনার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ট্রাকচালককে মারধর ও টাকা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় ডাউকি সীমান্তঘেঁষা জোয়াই এলাকায় একটি মামলা হয়েছে। এ মামলা দায়ের করেন ওয়েস্ট জৈন্তা হিল ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি ইউ হেনরি মানার। তিনি ১৬ই অক্টোবর শিলং সড়কে ট্রাকচালককে মারধর করে টাকা ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেন। গ্রেপ্তার হওয়া চার নেতাকে টানা ২৪ ঘণ্টা কলকাতা থেকে মেঘালয় পর্যন্ত সড়ক পথে মঙ্গলবার আদালতে তোলার আগে মামলার বাদীর মুখোমুখি করা হয়। কিন্তু বাদী তাদের শনাক্ত করেননি বলে জানায় মেঘালয় রাজ্যের পুলিশ।

শিলংয়ে অবস্থান করা কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া চার নেতাকে মঙ্গলবার জামিন না দিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। গতকাল শুনানিকালে শর্তসাপেক্ষে তাদের জামিন হয়েছে। এখন তারা মেঘালয়েই অবস্থান করছেন। তাদের বিরুদ্ধে দু’টি ট্রাক ভাঙচুর, লুটপাট ও চালককে মারধরের অভিযোগ আনা হয়। এতে অজ্ঞাত বাংলাদেশি নাগরিকরা জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া মামলার এজাহারে ফরেনার অ্যাক্ট ধারাটিও সংযুক্ত রয়েছে। নেতাদের মতে, মামলায় কোনো আসামির নাম নেই। শিলং থেকে তথ্য নিয়েই তাদের কলকাতা থেকে আটক করে নিয়ে আসা হয়েছিল। এ মামলায় সন্দেহভাজন আরও দুই আসামি হলেন- স্বেচ্ছাসেবক লীগের  নেতা দেবাংশু দাশ মিঠু ও আফসার আজিজ। ঘটনার পর  গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় দেবাংশু দাশ মিঠু গা ঢাকা দেন। এখন তিনি ভারতের কোথায় অবস্থান করছেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে নেতারা জানান, মিঠু কাকরভিটা সীমান্ত পথ দিয়ে নেপাল পাড়ি দেয়ার চেষ্টায় ছিলেন। তিনি ভারতে রয়েছেন না নেপালে গেছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। চলতি মাসের প্রথম দিকে মিঠু মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে অবস্থান করছিলেন বলে জানান তারা। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় এখন বসবাস করছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। শিলং থেকে কলকাতা যাওয়ার পর বন্ধু সহকর্মী নাসির উদ্দিন খানের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। মঙ্গলবার নাদেল এ নিয়ে সিলেটের সাংবাদিকদের জানান, ভারতে নেতাকর্মীরা বৈধভাবে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, এর কোনো সত্যতা নেই। যে কারণে সে দেশের পুলিশও বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছে।
শিলং পুলিশের বরাত দিয়ে শিলং টাইমস সহ একাধিক মিডিয়া খবর দিয়েছে ১৬ই অক্টোবর সড়কে একটি ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর ট্রাক মালিক নেতা পুলিশে অভিযোগ করেন। আর এ অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তাদের আটক করে। খবরে বলা হয়েছে; বাংলাদেশি নাগরিকরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এদিকে, ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর প্রায় দেড় মাস সিলেটেই আত্মগোপনে ছিলেন নাসির উদ্দিন খান। এরপর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত শফিকুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে গোয়াইনঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের  মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে যান। চলতি মাসের শুরুর দিকে শিলং ছেড়ে কলকাতায় যান নাসির উদ্দিন খানসহ গ্রেপ্তার হওয়া নেতারা। শিলংয়ে বেশি ঠাণ্ডা হওয়ার কারণে তারা কলকাতা গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন ভারতে থাকা নেতারা। 

mzamin

বিপজ্জনক অবস্থায় ভারতের অর্থনীতি -বিবিসি’র রিপোর্ট

বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল ভারতের অর্থনীতি ভয়াবহ অবস্থায় আছে। সর্বশেষ সেখানে যে জিডিপি’র তথ্য পাওয়া গেছে তাতে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। ভারতীয় সাংবাদিক  সৌতিক বিশ্বাস ‘ইন দ্য ফাস্টেস্ট-গ্রোয়িং বিগ ইকোনমি লুজিং স্টেম?’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথাই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, সর্বশেষ জিডিপি’র যে সংখ্যা পাওয়া গেছে তাতে ভারতের এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি সেভেন-কোয়ার্টারে কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ৫.৪ ভাগ। অথচ রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) এই সংখ্যা শতকরা ৭ ভাগ বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। ফলে ওই সময়ে আরবিআইয়ের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক কম জিডিপি অর্জিত হয়েছে। যদিও এই চিত্র উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এখনো শক্তিশালী। তবুও এই জিডিপি অর্থনীতি ধীরগতির হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এর জন্য বিভিন্ন কারণকে শনাক্ত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে ভোক্তাদের চাহিদা দুর্বল হয়েছে বা কমে গেছে। কয়েক বছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। সরকারি খরচের খাত একটি অত্যাবশ্যকীয় চালিকাশক্তি। তবে তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিছিয়ে নেয়া হয়েছে। ভারতের পণ্য রপ্তানি দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করছে। তাদের বৈশ্বিক রপ্তানি ২০২৩ সালে এসে দাঁড়ায় শতকরা মাত্র ২ ভাগ। ফাস্ট-মুভিং কনজ্যুমার গুডস (এফএমসিজি) বিষয়ক কোম্পানিগুলো তাদের রিপোর্টে বলছে, তাদের বিক্রি কমেছে। প্রকাশ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য করে তাদের বেতন বিষয়ক বিল গত তিন মাসে সংকুচিত হয়েছে। এর আগে সমালোচিত আরবিআই ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধি শতকরা ৬.৬ ভাগ অর্জন হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ রাজেশ্বরী সেনগুপ্ত বলেছেন, এটা স্পষ্ট যে, অর্থনীতিতে পরিষ্কারভাবে স্লোডাউন বা ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

একই সঙ্গে (ভোক্তাদের) চাহিদা একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন অর্থনীতির একটি উজ্জ্বল চিত্র এঁকেছেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেছেন, অর্থনীতির এই পতন ধারাবাহিক নয়। কিন্তু নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি দেয়ার সময়ে সরকারি ব্যয় কমানোর ফলে এমনটা হয়েছে। তিনি আশা করেন, তৃতীয় চতুর্ভাগে প্রবৃদ্ধি এই পতনকে পুষিয়ে নেবে। সীতারমন বলেন, নির্দিষ্ট মজুরির ফলে অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদায় প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক চাহিদাও ধীরগতির হচ্ছে। তাছাড়া আছে কৃষিতে জলবায়ুজনিত বাধা। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভারত সম্ভবত সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে অবস্থান করবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সিনিয়র একজন মন্ত্রীসহ অর্থনীতিবিদ, আরবিআই-এর অর্থনৈতিক নীতি বিষয়ক গ্রুপের একজন সাবেক সদস্য যুক্তি দেখান যে, মুদ্রাস্ফীতি কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রবৃদ্ধির গলা টিপে ধরেছে। তবে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ক্ষেত্রে ঋণের ক্ষেত্রে অধিক হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ কমেছে। ভোক্তাদের চাহিদা কমেছে। এ দু’টি বিষয়ই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া প্রায় দুই বছর ধরে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। প্রাথমিকভাবে এটা করা হয়েছে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে। অক্টোবরে সেখানে মুদ্রাস্ফীতি শতকরা ৬.২ ভাগ ছাড়িয়ে যায়। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ সীমা শতকরা ৪ ভাগ অতিক্রম করেছে এবং তা ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। প্রধানত এ ঘটনায় ঘটেছে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি। এ খাতে ভোক্তাদের অর্ধেকই চলে যায় এ খাতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সবজির মূল্য অক্টোবরে বেড়ে যায় শতকরা কমপক্ষে ৪০ ভাগ। এই বৃদ্ধি আরও ইঙ্গিত দেয় যে, খাদ্যের মূল্য ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তা নিত্যদিনের অন্যান্য খরচকে, যাকে মূল্যস্ফীতি বলা হয়, তাকে প্রভাবিত করছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হওয়ার বিষয়টিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে শুধু উচ্চ সুদহারই যথেষ্ট নয়।

এ বিষয়ে দিল্লিতে অবস্থিত জওয়াহেরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির উন্নয়ন বিষয়ক অর্থনীতিবিদ হিমাংশু বলেন- ভোক্তা চাহিদা যদি শক্তিশালী না হয় তাহলে সুদের হার কমিয়েও আপনি প্রবৃদ্ধিকে বাড়াতে পারবেন না। যখন চাহিদা থাকে শুধু তখনই বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই।
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বিদায়ী গভর্নর শক্তিকান্ত দাস বিশ্বাস করেন, ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্প এখনো অক্ষত আছে। তিনি আরও যোগ করেন- মুদ্রাস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় আছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলেন, রেকর্ড পরিমাণ খুচরা ঋণ এবং অনিরাপদ ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ইঙ্গিত মেলে যে, উচ্চ হারের সুদের মধ্যেও জনগণ অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে ঋণ নিচ্ছেন। এতে ইঙ্গিত মেলে যে, শহরে চাহিদা দুর্বল হচ্ছে। মুম্বইভিত্তিক ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট রিসার্সের সহযোগী প্রফেসর মিস সেনগুপ্ত বলেন, ভারতের অর্থনীতির চলমান সংকটের সূচনা হয়েছে ‘দুই রকম গতিসম্পন্ন প্রক্ষেপণ থেকে, যা চালিত হয়েছে পুরনো এবং নতুন অর্থনীতি দিয়ে। কনসাল্টিং পার্ম ডেলোইটের মতে, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংগঠন জিসিসি বিশ্ব জুড়ে যে পরিমাণ কাজ করে তার শতকরা কমপক্ষে ৫০ ভাগ এখন ভারতে। এই প্রতিষ্ঠানটি দৃষ্টি দেয় আরঅ্যান্ডডি, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন এবং কনসাল্টিং সার্ভিসে। এ খাত থেকে রাজস্ব আসে ৪৬০০ কোটি ডলার। তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ২০ লাখ মানুষ। আরও সংশয়মূলক ইঙ্গিত আছে। ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালে ভারতের গড় শুল্কহার বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৫ ভাগ থেকে ১৭ ভাগে। ডলার কিনতে ক্রেতাদেরকে অবশ্যই অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে রুপিতে। এর ফলে বাজারে তারল্য কমেছে। 
mzamin

চার মাস ধরে নির্বাক আশরাফুল by নাইম হাসান

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ই আগস্ট পতন হয় হাসিনা সরকারের। ওইদিন সকালে আন্দোলন চলাকালে মিরপুর-১০ নম্বরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হন মো. আশরাফুল। ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় কুপিয়ে জখম করা হয় তাকে। এরপর চার মাস পেরিয়ে গেলেও আর কথা বলতে পারেনি আশরাফুল। বিদেশে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য আকুতি জানিয়েছে পরিবারটি।

সরজমিন রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালে গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তির খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির এইচডিইউ তথা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটের ৬ নাম্বার বেডে কম্বল গায়ে জড়িয়ে নির্বাক শুয়ে আছেন মো. আশরাফুল। গলার মধ্যে নল ঢুকিয়ে তাকে নিয়মিত দেয়া হচ্ছে তরল খাবার। ওই ইউনিটের দায়িত্বে থাকা নার্স বলেন, আশরাফুল নড়াচড়া করতে পারেন না। মাঝে মধ্যে শোয়া অবস্থায় হাত-পা নাড়ান তিনি। ডাকলেও কোনো সাড়া দেন না।

আশরাফুলের স্ত্রী জেসমিন আক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিরপুর-১৪ নাম্বারে একটি ভাড়া বাসায় মেসে থাকতেন আশরাফুল। পেশায় ছিলেন সিএনজি চালক। সেখান থেকে তিনি মিরপুর-১০ নাম্বারে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যুক্ত হন। ৫ই আগস্ট সকালে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের দ্বারা মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি। এরপর আশরাফুলকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দুইদিন পরে ৭ই আগস্ট তার উন্নত চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় সিরাজ-খালেদা মেমোরিয়াল ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড জেনারেল হাসপাতালে। আশরাফুলের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি না হলে ১২দিন পর তাকে নেয়া হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করাতে সম্মত হয়নি। উপায় না পেয়ে আশরাফুলকে ১৯শে আগস্ট ভর্তি করা হয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে। চার মাস পেরিয়ে গেলেও আশরাফুলের অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটেনি।

তার স্ত্রী জেসমিন আকুতি জানিয়ে বলেন, আমরা চাচ্ছি, উন্নত চিকিৎসা করার জন্য যেন তাকে বাহিরে নেয়া হয়। গত মাসে তাকে দেখতে উপদেষ্টা আসিফ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এসেছিলেন। এই হাসপাতালের দ্বীন মোহাম্মদ স্যার ও মাহফুজ স্যারকে বলেছি আগে তাদের একটা আগ্রহ ছিল, এখন তেমন কোনো আগ্রহ দেখছি না। উনারা বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাকে যদি বাহিরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো যেত, তাহলে আমার হাজবেন্ড স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতো। বাকিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমিই শুধু এখানে আছি। এই বিষয়ে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন বলে জানান।

আশরাফুল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি উল্লেখ করে তার স্ত্রী জেসমিন বলেন, আশরাফুল ভাড়া করে সিএনজিসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চালাতো। আমার ৫ বছরের মেয়ে আছে, ওর খালার বাসায় সাভারে রেখেছি। ছেলের বয়স ৩ বছর। ওকে কিশোরগঞ্জ গ্রামের বাড়িতে দাদীর কাছে রেখে আসছি। এখনো পর্যন্ত সংসারের দায়িত্ব কেউ নেয়নি। তবে কিছু ফাউন্ডেশন, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এবং ছাত্রদলের কাছ থেকে কিছু টাকা পেয়েছি। যখন আসছিলাম তখনই এটা দেয়া হয়েছে। পরে আর কিছু পাইনি। সেটা দিয়ে সংসার ও খাবারের খরচ চলছে। এখন পর্যন্ত  ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন জেসমিন।

আশরাফুলের ওষুধের বিল নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল বহন করছে উল্লেখ করে জেসমিন বলেন, কোনো ওষুধ লাগলে ওয়ার্ড থেকে সেটার একটা স্লিপ দিয়ে যায়। এরপর আমি বাইরে থেকে সেটা কিনে আনি। সেই ওষুধের রিসিপ্ট হাসপাতালে জমা দিলে টাকা দিয়ে দেয়। এ ছাড়া আমার খাবার হাসপাতালের ক্যান্টিন থেকেই দেয়া হয়। তবে সিরাজ-খালেদা হাসপাতালে সকল চিকিৎসার খরচ আমাকেই বহন করা লাগছে। বাচ্চাদের রেখে হাসপাতালেই দিন-রাত থাকতে হচ্ছে আমাকে। আর কতোদিন এভাবে থাকবো? আশরাফুলের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

mzamin

রাকিবের মৃত্যু এবং একটি অনুসন্ধান

১৯শে জুলাই সন্ধ্যা। ঢাকার  মোহাম্মদপুর। সেখানে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায় সরিয়ে নেয়া হচ্ছে গুলিবিদ্ধ এক কিশোরের রক্তমাখা মৃতদেহ। রক্তক্ষরণ কমাতে কেউ একজন আর্জেন্টিনার ফুটবল জার্সি দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলেন মৃতদেহের মাথা। হয়তো বা প্রাণ বাঁচাতেই মৃতদেহটিকে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল একদল মানুষ। এ দৃশ্য দেখে প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন আর্তনাদে চিৎকার করে উঠলো ‘একটি শিশু, আহ্‌ একটি শিশু। এভাবেই মাত্র ১২ বছর বয়সী রাকিব হাসানের উজ্জ্বল জীবনের আকস্মিক করুণ পরিণতি ঘটে। ‘স্কুলবয়েস’স ডেথ টাইড টু র‌্যাব হেলিকপ্টারস স্টান গ্রেনেড’ শিরোনামে নেত্র নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এভাবেই উঠে এসেছে ১২ বছর বয়সী রাকিবের করুণ মৃত্যুর খবর।

সংবাদমাধ্যমটির খবরে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুরে গত ১৯শে জুলাই সন্ধ্যায় বারো বছর বয়সী রাকিব হাসানের উজ্জ্বল তরুণ জীবনের আকস্মিক এবং করুণ পরিণতি ঘটে। আধা কিলোমিটার অনতিদূরের এক ছাদ থেকে এই দৃশ্যটি ভিডিও করেছিলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। সে সময় তাদের মাথার উপর দিয়ে একটি হেলিকপ্টার ক্রমাগত উড়াউড়ি করছিল। তা থেকে বর্ষিত হতে থাকে সাউন্ড গ্রেনেড। নেত্র নিউজ বলছে- হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে রাকিবের। হেলিকপ্টারটি পরিচালনা করছিল বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সদস্যরা। ১৯শে জুলাই মোহাম্মদপুরে বিক্ষোভ দমনে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও এতে হতাহতের খবর অস্বীকার করেছে র‌্যাব। তবে রাকিবের মৃত্যু এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, বিক্ষোভ দমনে ছাত্র-জনতার ওপর ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেড কম ভয়াবহ নয়। বিক্ষোভ দমনে সাউন্ড গ্রেনেডের কোনো প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে শান্তিতে নোবেল পাওয়া ফিজিশিয়ান ফর হিউম্যান রাইটসের বিজ্ঞানীরা। তারা জানিয়েছেন, হেলিকপ্টার বা ড্রোন থেকে জনসমাগমে গুলি চালানো বিপজ্জনক।

রাকিবের মৃত্যুতে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করতে ভিডিও, মেডিকেল ও ফরেনসিক রিপোর্ট, পুলিশের নথি বিশ্লেষণ করেছে নেত্র নিউজ। তারা এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, প্রতক্ষদর্শী এবং রাকিবের পরিবারের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছে।

সংবাদমাধ্যমটির তদন্তে আরও জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে রাকিবের পরিবার যেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না চান সে চেষ্টা করেছিল স্থানীয় পুলিশ। তবে দেশে অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর তারা এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলে পুলিশ তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। তারা পতিত সরকারের দল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর দোষ চাপায়। কিন্তু র‌্যাবের ওই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অনেক ব্যক্তিই জড়িত ছিলেন না।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এসব প্রাণঘাতী সাউন্ড গ্রেনেডের ব্যাপক ব্যবহার করেছে বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যরা। বিভিন্ন সরকারি নথিতে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

রাকিবের মৃত্যুর শেষ দৃশ্যপট: রাকিবের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো একত্রিত করেছে নেত্র নিউজ। তার পরিবারের দেয়া এক ভিডিওতে দেখা যায় ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিটে রাকিবের নিথর মৃতদেহটি রাস্তায় পড়ে আছে। ভিডিওতে যে স্থানটি দেখা যায় তা রাকিবের বাসা থেকে মাত্র এক মিনিট দূরে অবস্থিত বলে চিহ্নিত করেছে নেত্র নিউজ। ভিডিওর দ্বিতীয় মিনিটে দেখা যাচ্ছে লোকজন দ্রুততার সঙ্গে রাকিবের নিথর দেহটি প্রধান সড়কের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যাচাইকৃত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায় চিকিৎসার জন্য রাকিবকে রিকশায় তোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রায় ১১ মিনিট পর ৬টা ৫২ মিনিটে প্রত্যক্ষদর্শী সালমান নাঈমের ধারণ করা একটি ভিডিওতে আকাশে উড়তে থাকা হেলিকপ্টার থেকে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে দেখা যায়। রাকিব সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে যে স্থানে লুটিয়ে পড়ে সেখান থেকে নাঈমের বাসা মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে। নাঈম নেত্র নিউজকে জানিয়েছেন, ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়  হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া শুরু করে র‌্যাব। প্রায় আধা ঘণ্টা যাবৎ ক্রমাগত সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। নাঈম বলেন, রাকিব আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ার সময়ও হেলিকপ্টার থেকে ক্রমাগত সাউন্ড গ্রেনেডের বর্ষণ করেছে র‌্যাব।
রাকিব নিহত হওয়ার সাত দিন পর ২৫শে জুলাই মোহাম্মদপুরে হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার বিষয়টি স্বীকার করে র‌্যাব। তবে মৃত্যুর দায় অস্বীকার করেছে তারা। সংবাদমাধ্যমের জন্য সংরক্ষিত র‌্যাবের ফোন নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও এর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। মেডিকেল রিপোর্ট বলছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টা ৫২ মিনিটে রাকিবকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রিকশায় তোলার প্রায় এক ঘণ্টা পর হাসপাতালে পৌঁছায় রাকিবের নিথর দেহ। রাকিবের রোগী ভর্তির টিকিটে তার মাথায় সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইলেক্ট্রোকার্ডিগ্রাম পরীক্ষার পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাকিবকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। রাকিবের পিতা আবুল খায়ের তার ছেলের লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তবে রাকিবের মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য তার লাশ নিকটস্থ শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

রাকিবের পরিবারের কোনো আপত্তি না থাকলেও নেত্র নিউজকে ময়নাতদন্তের অনুলিপি দিতে অস্বীকৃতি জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা বিচার বিভাগীয় বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুমোদনের কথা জানায়। তবে নেত্র নিউজ ময়নাতদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক চিকিৎসকের হাতে লেখা নোট সংগ্রহ করেছে। রাকিবের মরদেহের ফরেনসিক প্যাথলজিতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন একজন চিকিৎসকের সঙ্গে নেত্র নিউজ যোগাযোগ করলে তিনি নোটগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমোদন না থাকায় নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

ওই নোটে গ্রেনেডের আঘাতেই রাকিবের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুর আগেই রাকিব আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং তার মৃত্যু একটি হত্যাকাণ্ড (হোমিসাইডাল) বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই নোটে। মেডিকেল নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গ্রেনেডের আঘাতে ‘পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন’ হয়ে যায় রাকিবের মস্তিষ্ক। ফলে তার মাথায় প্রকাণ্ড ক্ষত ছিল। এ ছাড়া মাথার খুলির হাড়ও ভেঙে যায় রাকিবের। সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতেই রাকিবের মাথায় এমন ক্ষত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ফিজিশিয়ান্স ফর হিউম্যান রাইটসের (পিএইচআর) একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, আঘাতের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় সাউন্ড গ্রেনেডেই ‘তার মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।’

নেত্র নিউজের পাওয়া ওই নোট এবং আনুষঙ্গিক নথিপত্র পর্যালোচনা করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন এক নারী ফরেনসিক বিজ্ঞানী। নোটে উল্লিখিত বর্ণনা দেখে তিনিও একই মত দেন। তিনি বলেন, রাকিবের মাথার অবস্থার সঙ্গে উপর থেকে  ভোঁতা বস্তুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।  

আলাদাভাবে পিএইচআরের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক রোহিনী আরও বলেছেন, সাউন্ড গ্রেনেডগুলো বিভিন্ন ধরনের আঘাতের কারণ হিসেবে পরিচিত। যেমন সরাসরি আঘাতের ফলে পুড়ে যাওয়া অথবা বিস্ফোরণে আহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া।

মাথা ব্যতীত রাকিবের শরীরে আর কোনো আঘাত ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্যাথলজিস্টের নোটে। হাসপাতাল থেকে রাকিবের মৃতদেহ পাঠানোর পর শেরেবাংলা নগর থানার তৈরি তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপিও হাতে পেয়েছে নেত্র নিউজ। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কপালসহ বাহ্যিক অঙ্গগুলো স্বাভাবিক ছিল। যা চিকিৎসকের দেয়া বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও প্রতিবেদনে মাথার আঘাতের বর্ণনা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু বলা হয়েছে, মাথাটি একটি সাদা ব্যান্ডেজে সম্পূর্ণভাবে ঢাকা ছিল।

অধরা ন্যায়বিচার
রাকিবের পিতা আবুল খায়ের নেত্র নিউজকে বলেছেন, তার ছেলের লাশ তাদের হাতে হস্তান্তরের সময় একটি বিবৃতিতে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছে পুলিশ। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আইনি লড়াইয়ের অধিকার  কেড়ে নেয়া হয়। আবুল খায়েরের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমি এই শর্তে লাশ সংগ্রহ করছি যে, ভবিষ্যতে এই লাশের বিষয়ে কোনো আইনি আশ্রয় নেবো না। বিবৃতিতে শফিক নামে পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শকের (এসআই) কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আবুল খায়ের জানান, এই শফিকই তাকে ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছিল। স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশে ব্যাপক রদবদল করে। ফলে শফিককে খুঁজে বের করতে পারেনি বা তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি নেত্র নিউজ।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার রাকিবের মতো হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচারের অঙ্গীকার করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাকিবের এক চাচা তার মৃত্যুর বিষয়ে থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। নেত্র নিউজ সেই অভিযোগের একটি অনুলিপি হাতে পেয়েছে। তবে সেখানে র‌্যাবের সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের কথা উল্লেখ নেই। এর পরিবর্তে, ওই অভিযোগটিতে রাকিবের মৃত্যুর দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার মতো শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে দলটির ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের।  সেখানে কোনো প্রমাণ ছাড়াই গুলিতে রাকিবের প্রাণহানি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন বিশ্লেষক বলেছেন, সাধারণত পক্ষপাতদুষ্ট আইনজীবীদের মাধ্যমে এই ধরনের অভিযোগগুলো তৈরি হয়, যারা ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের বিনামূল্যে আইনি পরিষেবা দিয়ে থাকেন। তিনি আরও বলেন, প্রকৃত জবাবদিহিতা চাওয়ার পরিবর্তে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য এমন মর্মান্তিক ঘটনার মামলাকে কাজে লাগানোর প্রবণতা থাকে এসব আইনজীবীর। এই ধরনের দাবির বৈধতার ব্যাপারে পুলিশের তদন্ত করার কথা এবং প্রকৃত অপরাধীকেই অভিযুক্ত করার কথা। যদিও গত ১৭ই অক্টোবর এই মামলায় সংশ্লিষ্ট হিসেবে ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আতিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও সেদিন র‌্যাবের কর্মকাণ্ডের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং সংস্থাটির ওপর সরকারি কর্তৃত্বেরও অভাব ছিল বলে উল্লেখ করেছে নেত্র নিউজ।

mzamin

মন্দির সংস্কারে বাধা দিতে বিজিবি ভারতে প্রবেশ করেনি: বিএসএফ

আসামের সীমান্তে একটি মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দিতে বিজিবির সদস্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল বলে ভারতীয় মিডিয়াতে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং স্থানীয় স্তরে যে রটনার জেরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল তাকে অস্বীকার করেছে বিএসএফ। গত সপ্তাহে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তে একটি মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিজিবির বিরুদ্ধে।

এই নিয়ে সমাজমাধ্যমেও রটনা হয়েছিল যে, বিজিবি ভারতের মধ্যে প্রবেশ করেছিল এবং মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু বিএসএফ-র এক ঊর্ধ্বতন কর্তা এই রটনাকে খারিজ করে দিয়ে জানিয়েছেন, বিজিবির কোনও সদস্যের ভারতে কোনও অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, বিজিবি আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রটোকল ভঙ্গ করার মত কাজ করে না বলেই তাদের বিশ্বাস।

বিএসএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমান্তের কাছে থাকা একটি মন্দির সংস্কারের জন্য পর্দা টাঙানো হয়েছিল। সেটি নিয়ে বিজিবি তাদের উদ্বেগ জানিয়েছিল। বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবি কর্মকর্তাদের জানানো হয় যে, এটি সাময়িক ভবে টাঙানো হয়েছে। মন্দির সংস্কারের কাজ হয়ে গেলেই খুলে ফেলা হবে। পরে সেটি খুলে ফেলা হলে বিজিবি কোনও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হচ্ছে না- বুঝতে পেরে আর কোনও আপত্তি জানায়নি।

mzamin

অশান্ত রাখাইন: এক টেবিলে বাংলাদেশ ভারত-চীন by মিজানুর রহমান

একে একে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে মিয়ানমার। কোণঠাসা কেন্দ্রীয় বাহিনী তথা জান্তা সরকার। তাদের হাত ছাড়া হচ্ছে এলাকার পর এলাকা। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলগুলো বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। দু’দিন আগে বাংলাদেশ ঘেঁষা রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে বিদ্রোহীরা। সীমান্ত ঘেঁষা মংডুর ২৭১ কিলোমিটার এলাকায় দখল প্রতিষ্ঠা করতে তারা সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। উত্তেজনা আছে দেশটির শান রাজ্যে। জানুয়ারিতে শান রাজ্যের হোপাং শহরে আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী দ্য ইউনাইটেড ওয়া স্টেট পার্টি (ইউডব্লিউএসপি)। ওই রাজ্যের দু’টি শহর তারা তখনই দখল করে নেয়। ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যে চীন সীমান্তবর্তী একটি সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেয় দেশটির জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহীরা। রাজ্যের মানশি শহরে অবস্থিত ওই ঘাঁটিতে কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি (কেআইএ) ও কাচিন পিপল্‌স ডিফেন্স ফোর্স (কেপিডিএফ) যৌথভাবে আক্রমণ চালায়। কয়েকদিনের তুমুল লড়াইয়ের পর জান্তা সেনারা পিছু হটলে ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। মার্চে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি মায়াবতী শহরে জান্তার একটি কার্যালয় ও থানা দখল করে নেয় ওই অঞ্চলে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (কেএনএলএ) ও তাদের সহযোগীরা। মায়াবতী শহরের থিঙ্গানিনাউঙ্গ অঞ্চলে জান্তার ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন ৩৫৫ এর পতন হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং বর্ডারিং কান্ট্রিগুলোর করণীয় ঠিক করতে মিয়ানমারের আশপাশের দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি ইনফরমাল বৈঠক বসছে ব্যাংককে। জরুরি ওই আলোচনায় এক টেবিলে বসছে বাংলাদেশ-ভারত ও চীন। সেখানে পূর্ব তিমুরও অংশ নিতে পারে বলে জানা গেছে। ওই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো হয়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্র মানবজমিনকে এটা নিশ্চিত করেছে যে, ব্যাংককের এক্সট্রাঅর্ডিনারি বৈঠকটি হবে ১৯শে ডিসেম্বর। হোস্ট থাইল্যান্ডের তরফে ইনফরমাল সেই বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর থাকবেন এ বিষয়েও নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। তবে চীনের প্রতিনিধিত্ব কে করবেন তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশায় রয়েছে ঢাকা। যেহেতু মিয়ানমার পরিস্থিতিই অত্যাসন্ন বৈঠকের মুখ্য আলোচ্য তাই এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে। মঙ্গলবার দুপুরে রোহিঙ্গা সংকট ও সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের মধ্যে এ নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বুধবার মানবজমিনকে বলেন, ‘আমি এটুকুই বলবো যে, গুরুত্বপূর্ণ ওই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, আমি যাচ্ছি। বৈঠক শেষে ফিরে এসে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানাবো।’ একদিন আগে সিএনএন জানিয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ২৭১ কিলোমিটার এলাকা দখল নিয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা আরাকান আর্মি। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মংডুর সেনা ঘাঁটি দখলে নিয়ে ১৬৮ মাইল এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তারা। এর মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে পুরোপুরি নিজেদের দখল বলবৎ করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। যার মাধ্যমে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় সফলতা অর্জন করলো তারা। রিপোর্টে বলা হয়, এই রাখাইন রাজ্যকে কেন্দ্র করেই গোটা মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২১ সালে অং সান সুচিকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশটিতে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এরপর থেকে রাখাইনে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। এর নেতৃত্বে রয়েছে আরাকান আর্মি নামের সশস্ত্র সংগঠন। সোমবার অজ্ঞাত এক স্থান থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির এক মুখপাত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রোববার মংডু শহরের শেষ সামরিক ঘাঁটিটি দখলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সীমান্ত এলাকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে গোষ্ঠীটি। মংডুর এই যুদ্ধের পরে প্রায় ৮০ জন রোহিঙ্গা বিদ্রোহীসহ সরকারি সৈন্যদের পাশাপাশি সামরিক অপারেশন কমান্ড ১৫-এর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থুরেইন তুনকে গ্রেপ্তার করেছে আরাকান আর্মি। মে মাসের শেষের দিকে মংডু আক্রমণ শুরু করে তারা। মাত্র ছয় মাসের মাথায় সীমান্তবর্তী এই শহরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিলো গোষ্ঠীটি। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর রিপোর্ট মতে, মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল তথা রাখাইনের এই জাতিগত সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর রোববার ভোরে মংডু শহরের বাইরে অবস্থিত মিয়ানমারের জান্তাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন সীমান্তরক্ষী পুলিশের ৫ নম্বর ব্যাটালিয়নের ঘাঁটি দখল করেছে বিদ্রোহীরা। এটি বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন সবশেষ ঘাঁটি ছিল। রিপোর্ট বলছে, জান্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের মিত্র হিসেবে রোহিঙ্গা মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ), আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই করছিল। বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর তারা হয় পালিয়েছে, না হয় আত্মসমর্পণ করেছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট বলছে, রাখাইনের লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে রয়েছে। জান্তা সরকার রাজ্যে খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধসহ আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য সরবরাহ বন্ধ করতে সড়ক ও জলপথ অবরোধ করেছে। রাখাইনে চলমান লড়াই পর্যবেক্ষণকারী সামরিক বিশ্লেষকদের বরাতে বিশ্ব সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পুনরুদ্ধার রাখাইন রাজ্যের মানুষের দুর্দশা লাঘবে সহায়ক হতে পারে। এক বিশ্লেষক বলেন, রাখাইন রাজ্যে জটিল রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের উচিত বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা করা। তবে এখন পর্যন্ত (গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) বাংলাদেশ ফরমাল কিংবা ব্যাকডোর চ্যানেলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেনি বলে দাবি করেছেন সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা।
mzamin

টাঙ্গাইলে বিক্ষোভের মুখে সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো যায়নি

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কলেজছাত্র ইমন হত্যা মামলায় সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মো. আব্দুর রাজ্জাকের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। এই মামলার জামিন আবেদনের শুনানির জন্য তাঁকে আজ বুধবার বিকেলে আদালত প্রাঙ্গণে আনা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে তাঁকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো যায়নি।

আদালত সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইমন হত্যা মামলার ধার্য তারিখে আব্দুর রাজ্জাককে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জেলা কারাগার থেকে বুধবার বিকেল সাড়ে চারটায় আদালত প্রাঙ্গণে আনা হয়। এর আগে দুপুরের পর থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা আদালত এলাকায় অবস্থান নিতে শুরু করেন। আব্দুর রাজ্জাককে বহনকারী প্রিজন ভ্যান আদালত চত্বরে প্রবেশ করার পর তাঁরা বিক্ষোভ করতে থাকেন। তাঁর বিচার দাবি করে প্রিজন ভ্যান ঘিরে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে আব্দুর রাজ্জাককে ভ্যান থেকে নামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

আইনজীবী এ কে এম শামীমুল আক্তার বলেন, মির্জাপুর আমলি আদালতে ইমন হত্যা মামলায় আব্দুর রাজ্জাকের জামিন আবেদন করা হয়। বিক্ষোভের কারণে তাঁকে শুনানির সময় আদালতে হাজির করা যায়নি। বাদীপক্ষের আইনজীবীরা জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন। শুনানি শেষে বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল ম্রং জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল পাঁচটার দিকে আদালত এলাকা থেকে বের হওয়ার সময় বিক্ষোভকারীরা আব্দুর রাজ্জাককে বহনকারী প্রিজন ভ্যান লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে মারেন। তাঁরা আদালতের ফটকের সামনে প্রিজন ভ্যান অবরোধ করেন। এ সময় আব্দুর রাজ্জাকের বিচার দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে যায়। এ সময় এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এক ছাত্রকে লাঠিপেটার অভিযোগ উঠলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আব্দুর রাজ্জাককে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা লাঠিপেটাকারী পুলিশ সদস্যের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

টাঙ্গাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আল আমিন বলেন, ‘আব্দুর রাজ্জাকের বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় এক পুলিশ সদস্য লাঠিচার্জ করেছেন। আমরা তাঁর শাস্তি চাই।’

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল আদালত পুলিশের পরিদর্শক মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে মির্জাপুরের গোড়াই এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে কলেজছাত্র ইমন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ আগস্ট ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইমন মারা যান। এ ঘটনায় নিহত ইমনের ভাই সুমন বাদী হয়ে মির্জাপুর থানায় গত ১৯ আগস্ট হত্যা মামলা করেন। এতে টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে প্রধান আসামি করা হয়। গত ১১ নভেম্বর টাঙ্গাইল আদালতে হাজির করে আব্দুর রাজ্জাককে ইমন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে বহনকারী প্রিজন ভ্যান ঘিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা–কর্মীদের বিক্ষোভ। বুধবার বিকেলে টাঙ্গাইল আদালত প্রাঙ্গণে
সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে বহনকারী প্রিজন ভ্যান ঘিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা–কর্মীদের বিক্ষোভ। বুধবার বিকেলে টাঙ্গাইল আদালত প্রাঙ্গণে ছবি: প্রথম আলো

তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ৮ বছর আগে, কী ঘটেছে ৩ তরুণের ভাগ্যে by আব্দুল কুদ্দুস ও গিয়াস উদ্দিন

আট বছরের বেশি সময় ধরে খোঁজ মিলছে না কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার তিন তরুণের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিখোঁজ তিন তরুণ হলেন মো. আবদুল্লাহ (২৬), মো. জয়নাল (২৫) ও জাহেদ হোসেন ওরফে জাকু (২৬)। আবদুল্লাহ ও জাহেদের বাড়ি টেকনাফ সদরের জাহালিয়া পাড়ায়, জয়নালের বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে দুই বন্ধু আবদুল্লাহ ও জয়নাল পোলট্রি খামারের জন্য মুরগির খাদ্য কিনতে ৯৪ কিলোমিটার দূরের কক্সবাজার শহরতলির লিংকরোড এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে একটি দোকানের সামনে পৌঁছামাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সাদাপোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি দুজনকে একটি গাড়িতে তুলে নেন। পরদিন ১৪ জানুয়ারি রাতে শহরের কলাতলী এলাকার একটি হোটেল থেকে একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের বন্ধু জাহেদ হোসেনকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তিনজনের আর খোঁজ মেলেনি।

টেকনাফ পৌরসভার বাসস্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে পাঁচ কিলোমিটার গেলে জাহালিয়া পাড়া। ওই গ্রামেই নিখোঁজ আবদুল্লাহর বাড়ি। সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে কথা হয় আবদুল্লাহর মা রহিমা খাতুনের (৫৮) সঙ্গে। ছেলের কথা বলতেই কান্না যেন থামে না রহিমার। হাতে ছেলের বাঁধাই করা ছবি নিয়ে বলেন, ‘তোমরা আমার ছেলে রে এনে দাও। আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। তবু তাকে গুম করেছে। ছেলেকে ছাড়া আমি বাঁচব না।’

কিছুক্ষণ পর ঘরে আসেন আবদুল্লাহর বাবা সামশু মিয়া (৭৮)। তিনি বলেন, ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ আবদুল্লাহ। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। থানাতেও মামলা নেই। গ্রামে পোলট্রি খামার ছিল আবদুল্লাহর।

ছেলেকে তুলে নেওয়ার পরদিন কক্সবাজার থানায় গিয়ে খোঁজ নিয়েছিলেন জানিয়ে সামশু মিয়া বলেন, থানা থেকে বলা হয় আবদুল্লাহকে তাঁরা আটক করেননি। অন্য কোথাও গিয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়। এরপর দেশের নানা জায়গায় গিয়ে আবদুল্লাহর খোঁজ নেওয়া হয়েছে, যদিও সন্ধান মেলেনি।

সামশু মিয়া বলেন, ‘গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টেকনাফে ক্রসফায়ারে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গুমের শিকারও অনেকে হয়েছেন। গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আশা করছি, কমিশনের তদন্তের তিন তরুণের খোঁজ মিলবে।’

আবদুল্লাহর বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে জাহেদ হোসেনের বাড়ি। ওই বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘরের বাইরে একটি দোকানের সামনে পাওয়া যায় জাহেদের বড় ভাই নজির আহমদকে। তিনি দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। দুই বছর আগে দেশে ফেরেন।

নজির আহমদ (৪৬) বলেন, বাবার অবর্তমানে সংসারের হাল ধরেন তাঁদের মা সখিনা খাতুন। জাহেদ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মা শুধু কান্নাকাটি করতেন। খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো করতেন না। জাহেদের জন্য কান্নাকাটি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁদের মা। ২০২০ সালের জুলাই মাসে মায়ের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগমুহূর্তেও জাহেদকে একনজর দেখার জন্য ছটফট করেছেন মা।

জাহেদ বিবাহিত, সংসারে দুই মেয়ে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠায় থাকেন তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগম। হাসিনা জানান, স্বামী ফিরে আসবেন, এমন আশায় দিন গুনছেন তিনি।

নিখোঁজ জয়নালের বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি পল্লিচিকিৎসকের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন কক্সবাজার শহরে।

জয়নালের বাড়িতে গিয়ে ফিরোজা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দ্বীপে মানুষ চিকিৎসা নিয়ে অনেক ভোগান্তিতে রয়েছেন। তাই মানুষের সেবায় পল্লিচিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন জয়নাল।

ফিরোজা বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো অপরাধ করলে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হতে পারত, কিন্তু গুম করা হলো কেন?’

জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ঘটনাটি পুরোনো হলেও এ পর্যন্ত অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় আসেনি। বাদীপক্ষ আদালত মামলা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের সহযোগিতা করবে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস ফোরামের কক্সবাজারের সভাপতি আইনজীবী আব্দুস শুক্কুর প্রথম আলোকে বলেন, এ পর্যন্ত তাঁরা কক্সবাজারে চারজন গুমের খবর পেয়েছেন। এর মধ্যে টেকনাফের তিন তরুণের নাম রয়েছে। সরকারের গুম অনুসন্ধান কমিটির কাছে এই চারজনের তালিকা পাঠানো হয়েছে।

নিখোঁজ মো. আবদুল্লাহর ছবি হাতে মা রহিমা খাতুন। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ সদরের জাহালিয়াপাড়ায়
নিখোঁজ মো. আবদুল্লাহর ছবি হাতে মা রহিমা খাতুন। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ সদরের জাহালিয়াপাড়ায়। ছবি: প্রথম আলো

নিখোঁজ মো. জয়নালের ছবি হাতে মা ফিরোজা খাতুন
নিখোঁজ মো. জয়নালের ছবি হাতে মা ফিরোজা খাতুন ছবি: প্রথম আলো

পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণা তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়কের

পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের এক বিধায়ক। মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় তৈরি করা হবে এই মসজিদ। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর বলেন, আগামী বছরে এই মসজিদ তৈরি হবে। রাজ্যের ৩৪ শতাংশ মুসলমানের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটবে এই মসজিদে।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় এক দল উগ্র হিন্দু করসেবকের দল বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল। বিশ্বজুড়ে এর প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক মসজিদের প্রতি সম্মান জানিয়েই এই মসজিদ তৈরি হবে পশ্চিমবঙ্গে বলে জানিয়েছেন বিধায়ক। তার মতে, একজন সংখ্যালঘু মানুষ হিসেবে তিনি এটা করতে চান। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। অবশ্য কবীর বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্কিত মন্তব্য করে প্রচারে থেকেছেন।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়কের এই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই মসজিদ তৈরির ঘোষণা থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। বিজেপি নেতা ও রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘এই ধরনের ঘোষণা আসলে রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিম সম্প্রদায়ের মেরুকরণের চেষ্টা’। তার মতে, ‘এই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস আগুন নিয়ে খেলছে’। তিনি এ ব্যাপারে  মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জবাব দাবি করেন।

কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বিধায়কের ঘোষণাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভেদমূলক বলে অভিহিত করেন।

এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়কের মসজিদ তৈরির ঘোষণার পাল্টা হিন্দুত্বাদীদের পক্ষ থেকে মুর্শিদাবাদে একাধিক রাম মন্দির তৈরির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বঙ্গীয় হিন্দু সেনার সভাপতি অম্বিকানন্দ মহারাজ বলেছেন, মুর্শিদাবাদেই আমরা অযোধ্যার রামন্দিরের অনুকরণে একাধিক রামমন্দিও তৈরি করব। ভরতপুর, রেজিনগর, সাগরদিঘীতে আমরা জমিও পেয়ে গিয়েছি। আগামী জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।

mzamin

ফ্রান্সে স্বামীর প্ররোচনায় স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছেন ৫০ পুরুষ, রায় আগামী সপ্তাহে

কেউ তরুণ, কেউ বৃদ্ধ, কেউ দশাসই, কেউ আবার শীর্ণকায়, কেউ সাদা, কেউ শ্বেতাঙ্গ, কেউ-বা কৃষ্ণাঙ্গ। তাঁদের মধ্যে কেউ গাড়িচালক, কেউ দমকল কর্মকর্তা, কেউ সেনাসদস্য, কেউ-বা নিরাপত্তারক্ষী। এমনকি একজন সাংবাদিক ও একজন ডিজেও রয়েছেন।

এসব পুরুষের সংখ্যা ৫০। তাঁরা ফ্রান্সের আলোচিত গিস লে পেলিকোতকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত। অভিযোগ, গিস লে-এর স্বামী ৭২ বছর বয়সী ডোমিনিক পেলিকোত তাঁকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করতেন। এরপর অন্য পুরুষ দিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করাতেন। এভাবে চলেছিল প্রায় এক দশক।

গত সেপ্টেম্বর থেকে এই মামলার বিচার চলছে। আগামী সপ্তাহে মামলার বিচার শেষে রায় হতে পারে। যদি তাঁরা দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে সম্মিলিতভাবে তাঁদের সাজার মেয়াদ হবে ৬০০ বছরের বেশি।

বিচার চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কয়েকজন বেশ প্রতিবাদ জানান। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই যখন বিচারকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন তাঁদের চোখ ছিল মাটির দিকে। মাঝেমধ্যে শুধু নিজের আইনজীবীর দিকে তাকিয়েছেন, তবে সে তাকানোয় ছিল একধরনের আশ্বাস পাওয়ার আকুতি।

অভিযুক্ত এই ৫০ ব্যক্তির বেশির ভাগই এসেছেন গিস লে–র গ্রাম মাজানের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যকার ছোট শহর ও গ্রাম থেকে।

৬৯ বছর বয়সী জোসেফ সি নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্রীড়া কোচ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন। তিনি যদি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তাঁর চার বছরের কারাদণ্ড হবে। আইনজীবীরা যে দণ্ড দাবি করেছেন, তার মধ্যে এটি সবচেয়ে কম। অন্যদিকে আরেকজন হলেন ৬৩ বছর বয়সী রোমেইন ভি। তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে ১৮ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

রোমেইন ভি নিজে এইচআইভি সংক্রমিত ছিলেন জানার পরও গিস লে-কে বিভিন্ন সময় ছয়বার ধর্ষণ করেছেন। এ সময় তিনি কোনো সুরক্ষা নেননি। যদিও তাঁর আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাই তাঁর মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমিত না–ও হতে পারে।

আইনজীবীরা এই মামলায় বিশদ তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন। কারণ, গিস লে-এর স্বামী ডোমিনিক পেলিকোত এক দশকের বেশি সময় ধরে স্ত্রীকে ধর্ষণ করানোর ঘটনাগুলো ভিডিও করে রেখেছেন। তিনি নিজেও আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ স্বীকার করেছেন। এবং আদালতকে বলেছেন, তাঁর সহ-অভিযুক্ত এই ৫০ জনই দোষী।

ফ্রান্সে ধর্ষণবিরোধী আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘সহিংসতা, জবরদস্তি, হুমকি বা আকস্মিকভাবে’ কোনো যৌন নির্যাতন করা হলে তাকে ধর্ষণ বলা যাবে। এতে ভুক্তভোগীর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনের কথা বলা হয়নি।

এই আইনের ভিত্তিতে বিবাদীদের আইনজীবীরা যুক্তি তুলে ধরে বলেন, গিস লে অনুমতি দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। এটা তাঁরা জানতেন না। তাই ওই ঘটনা ধর্ষণ হতে পারে না। এক বিবাদীর আইনজীবী বলেন, ইচ্ছে করে ধর্ষণ না করে থাকলে সেটা কোনো অপরাধ হতে পারে না।

স্বেচ্ছাসেবী একজন দমকলকর্মী ক্রিশ্চিয়ান এল বলেন, ‘আমার শরীর তাঁকে ধর্ষণ করেছে, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক এতে সায় দেয়নি।’

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন ৬৩ বছর বয়সী জেন-পিয়ারি। তাঁকে বলা হচ্ছে ডোমিনিকের শিষ্য। কীভাবে নিজের স্ত্রীকে ওষুধ দিয়ে অচেতন করে অপব্যবহার করবেন, সেই শিক্ষা তিনি ডোমিনিকের কাছ থেকে শিখেছেন। এটা তিনি পাঁচ বছর ধরে করেছেন বলেও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ডোমিনিকের সঙ্গে দেখা করাটাই তাঁর অপরাধ ছিল। ডোমিনিক তাঁকে নিজের ভাইয়ের (কাজিন) মতো কাছে টেনে নিয়েছিল। আইনজীবীরা তাঁর ১৭ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন।

ডোমিনিক প্রতারণা করেছেন

৫৪ বছরের আহমেদ টি পেশায় পানির পাইপের মিস্ত্রি। ছোটবেলার প্রেমিকাকে বিয়ে করে ৩০ বছরের সংসার তাঁদের। তিনি বলেন, তিনি যদি ধর্ষণ করতেই চাইতেন, তাহলে ষাটোর্ধ্ব কাউকে নয় নিশ্চয়ই।

রেদোয়ান এ একজন বেকার মানুষ। ৪০ বছরের এই ব্যক্তি বলেন, তিনি যদি ধর্ষণই করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই ডোমিনিককে সেই দৃশ্য ধারণ করার অনুমতি দিতেন না।

কেউ কেউ আবার বলেছেন, ডোমিনিক তাঁদের এমনটা করতে ভয় দেখিয়েছিলেন। আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, ডোমিনিক হলেন জঘন্য চরিত্রের মানুষ।

পুরুষ নার্স রেদোয়ান ই আদালতকক্ষে বলেন, শোবার ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি অনেক ভয় পেয়েছিলেন।

অন্যরা যুক্তি দেন, ডোমিনিক তাঁদের পানীয় পান করিয়েছিলেন। সেখানে মাদক বা অন্য কিছু মেশানো ছিল। তাই তাঁরা কী হয়েছিল, তা মনে করতে পারছেন না। যদিও ডোমিনিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বেশির ভাগই বলেন, ডোমিনিক তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা বা কৌশল খাটিয়েছেন। ডোমিনিক তাঁদের বুঝিয়েছিলেন, তাঁরা এই দম্পতির সঙ্গে একটি ‘যৌন খেলায়’ অংশ নিচ্ছেন।

অভিযুক্ত ক্রিস্টোফ ব্রুচি, জোসেফ সির আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তবে ডোমিনিক বরাবরই বলে আসছেন, তাঁর স্ত্রী যে বিষয়টি জানেন না, তিনি ওই ব্যক্তিদের কাছে সেই বিষয়টি অনেকবার স্পষ্ট করেছেন।

ডোমিনিক তাঁদের বলেছেন, তাঁর স্ত্রী যেন কোনোভাবেই জেগে না ওঠেন বা তাঁরা যেন এমন কিছু ফেলে না যান, যাতে তাঁদের শনাক্ত করা যায়। যেমন গিস লে-কে স্পর্শ করার আগে তাঁদের হাত গরম করে নিতে বলতেন। তাঁরা যেন কোনো ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার না করেন বা ধূমপান না করে আসেন। কারণ, এর ঘ্রাণ থেকে গেলে গিস লে-এর মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। তাঁরা সবাই এটা জানতেন।

গত সেপ্টেম্বর থেকে একের পর এক এই ৫০ জনকে অ্যাভিগনন শহরে আদালতে হাজির করা হচ্ছে। সাধারণত ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত করতে কয়েক দিন লাগে। কিন্তু এই মামলার বিচারে বিবাদীর সংখ্যাটি বেশি হওয়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের জড়ো করা হয়।

গিস লে পেলিকোত: তাঁরা সজ্ঞানে আমাকে ধর্ষণ করেছিলেন

অনেক বিবাদীর বর্তমান ও সাবেক নারী সঙ্গীর স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গেও গিস লে-এর মতো হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে এই পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন নারী বলেন, তাঁর মধ্যে এখন থেকে তীব্র সন্দেহ থাকবে, ‘শ্রদ্ধাশীল, চিন্তাশীল ও মিষ্টি এই মানুষটা’ তাঁকে কখনো তাঁর অজান্তে এমন খারাপ কিছু করেছেন কি না।

এই মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একই সুতায় গাঁথতে এমন একটি উপাদান খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হচ্ছিল।

গিস লে-এর আইনজীবীরা বলেন, সেখানে সবার ক্ষেত্রে যা পাওয়া গেছে, তা হলো প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছেতেই গিস লে–র বাড়িতে গেছেন, এমনটা এখনো দেখা যায়নি। তবে সবার মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, তা হলো তাঁরা সবাই সচেতনভাবে পুলিশের কাছে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিচার কার্যক্রম শুরুর হওয়ার প্রথম দিকে গিস লে-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি কি মনে করেন বিবাদীরা তাঁর স্বামীর কারসাজির শিকার। জবাবে গিস লে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, তাঁকে ধর্ষণের জন্য কেউ তাঁদের মাথায় বন্দুক ধরেননি। তাঁরা পূর্ণজ্ঞানে তাঁকে ধর্ষণ করেছেন। তিনি উল্টো জানতে চান, তাঁরা কেন পুলিশের কাছে গেলেন না? এমনকি একটি বেনামে কলও তাঁর জীবন রক্ষা করতে পারত। কিন্তু একজনও তা করেননি।

আদালতে আইনজীবীর সঙ্গে গিস লে পেলিকোত। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
আদালতে আইনজীবীর সঙ্গে গিস লে পেলিকোত। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

ক্ষমতায় টিকে থাকতে গণহত্যা, গুম, ক্রসফায়ারসহ সবকিছুই করেছে আওয়ামী লীগ

যে শিশুর বয়স দুই বছর ছিল, তখন তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন হয়তো তার মনেও নেই, তার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তার এখনো জানা নেই যে তার বাবা কোথায়, তার বাবা কি আদৌও বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেকের পেট কেটে ফেলা হয়েছে, নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়েছে, বস্তা দিয়ে বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারে জীবন গেছে কত মানুষের!

আজ বুধবার ‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের ঘটনা ও এর পরিণতি নিয়ে এ কথাগুলো উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে ‘সপ্রাণ’ আয়োজিত এই আলোচনা সভায় গণহত্যা ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুবিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান বক্তারা।

সভায় কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার নিজে গুম হওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এটা একটা অবিশ্বাস্য রকমের ট্রমা। গুম হওয়া ব্যক্তিদের এই ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। তাঁদের পরিবারগুলো সেই কষ্ট দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ায়। যাঁরা গুম হয়েছেন, তাঁরা যেন সুবিচার পান, সেই দাবি জানান তিনি।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান লিটন। আলোচনায় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক দল বলা যাবে না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এরা এমন কিছু নেই, যা করেনি। গণহত্যা, গুম, ক্রসফায়ারসহ ভিন্নমত দমনে সবকিছুই করেছে দলটি।

নূর খান লিটন বলেন, তাঁদের (গুমের শিকার ব্যক্তি) আয়নাঘরে এমন ভয়ংকর বন্দী হিসেবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাতে হয়েছে, যেখানে পাঁচ–ছয় ফুট একটা জায়গায় সাপের মতো প্যাঁচ দিয়ে একটা মানুষকে থাকতে হয়। তিনি বলেন, গুমের শিকার অনেক ব্যক্তির পেট কেটে ফেলা হয়েছে, নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়েছে, বস্তা দিয়ে বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারে তাঁদের জীবন দিতে হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম বলেন, ‘আমরা যখন গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলি, গুমের শিকার যাঁরা পরবর্তীকালে ফিরে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে যখন কথা বলি, তাঁরা যে কী ভয়ংকর ট্রমার মধ্য দিয়ে যান, তাঁদের কথাগুলো শুনে আমরা বুঝতে পারি।’ তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এই ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে গত ১৫ বছর পুরো দেশ চুপ ছিল। যে পরিবারের মানুষেরা এখনো গুমের শিকার ব্যক্তিদের পাননি, সেই সব পরিবারই বা ভবিষ্যতে কীভাবে জীবন পার করবে?

নৃবিজ্ঞান ও গুমবিষয়ক গবেষক ইয়াসমিন আরা বলেন, যে শিশুর বয়স দুই বছর ছিল, তখন তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন হয়তো তার মনেও নেই, তার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তার এখনো জানা নেই যে তার বাবা কোথায়, তার বাবা কি আদৌও বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন।

সভায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ফাইয়াজ হত্যার বিচার দাবি করেন।

‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে
‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

মালিককে মেঝেতে পুঁতে কর্মচারীদের নির্বিকার বসবাস

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ভাণ্ডারীর মোড়ে কাপড়ের স্কিন প্রিন্টের ব্যবসা করতেন নূর-এ-আলম। পরিবারের সদস্যরা ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে থাকলেও কাজের সুবাদে কর্মচারীদের সঙ্গে কারখানাতেই থাকতেন তিনি। কারখানার ভেতরে জুয়া খেলতে নিষেধ করায় তাকে হত্যার পর বাথরুমে নিয়ে লাশ দুইভাগ করে কারখানার মেঝেতে পুঁতে রাখে তারই কর্মচারীরা। লাশ ঘরের মধ্যে পুঁতে রেখে কিছু না জানার অভিনয় করে সেখানেই খাবার খাওয়া, ঘুমানোসহ নিত্যদিনের কাজ করে যাচ্ছিল কর্মচারী মিরাজ ও তার সঙ্গী রিফাত, সম্রাট, জিহাদরা। স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। নিহতের লাশও উদ্ধার করা হয়েছে মাটি খুঁড়ে।

নিহত নূর-এ-আলমের জামাতা আতাউল্লাহ খান সজীব বলেন, কামরাঙ্গীরচরের হাসান নগরে এক বছর আগে একটি কাপড়ের কারখানা স্থাপন করেন তার শ্বশুর নূর আলম। সেখানেই তিনি থাকতেন। গত শুক্রবার তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই বৃহস্পতিবার ভোররাত ৪টা ৩৫ মিনিটে আলমের ফোন থেকে তার স্ত্রীর ফোনে একটি কল আসে। কল রিসিভ করার পর আলম কোনো কথা না বললেও তার আশপাশে চিল্লাচিল্লির শব্দ শোনা যায়। এরপর থেকেই তার ব্যবহৃত ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরের দিন বাড়িতে না ফেরায় আমরা ঢাকা-ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু করি। কিন্তু কোনোভাবেই তার সন্ধান পাইনি। কারখানায় গিয়ে কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তারা কিছুই জানে না বলে জানায়। উপায় না পেয়ে আমি একপর্যায়ে কামরাঙ্গীরচর থানায় যোগাযোগ করি। পরে ফোনকল এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পুলিশ মঙ্গলবার ওই কারখানা থেকে প্রথমে নূর-এ-আলমের কর্মচারী মিরাজ মিয়াকে (২০) আটক করে। তার মাধ্যমে কামরাঙ্গীরচরের ঝাউরাহাটি থেকে মো. রিফাত (১৯) ও কোতোয়ালি থানার সদরঘাট থেকে মো. শিপন ওরফে সম্রাটকে (২৫) আটক করা হয়।

এদিকে গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যাকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরে ডিএমপি’র লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নূর-এ-আলমকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, বৃহস্পতিবার ভোররাতে শিপন, মিরাজ, রিফাত ও জিহাদসহ আরও ২ থেকে ৩ জন মিলে কারখানার মধ্যে জুয়া খেলছিল। তখন কারখানার মালিক নূর-এ-আলম টের পেয়ে তাদের বকাঝকা করেন ও কারখানার মধ্যে জুয়া খেলতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে নূর আলম ফোন দিয়ে তার পরিবারকে জানায় তিনি বাড়ি যাবেন। জুয়া খেলার কথা বাইরে বলে দেয়ার ভয়ে তারা নূর আলমের মাথায় পেছন থেকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। আরেকজন তার বুকে, গলায়সহ শরীরের বিভিন্নস্থানে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এতে ঘটনাস্থলেই নূর-এ-আলমের মৃত্যু হয়। তখন লাশ কারখানার ভিতরের বাথরুমে নিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে দু’টি পলিথিন ও কাপড় দিয়ে আলাদা আলাদা করে পেঁচিয়ে একটি বস্তায় ভরে কারখানার ভেতরে টেবিলের নিচের মেঝে ভেঙে মাটিতে দুই ফুট গর্ত করে চাপা দিয়ে দেয় তারা। কেউ যেন বুঝতে না পারে এজন্য খনন করা জায়গাটি বালু ও সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে বুধবার কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিরুল ইসলাম বলেন, নূর-এ-আলম কারখানার মালিক। ওই কারখানার এক কর্মচারী মিরাজ।  সে ওই কারখানায় থাকে। মিরাজ গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আরও তিনজন বহিরাগতকে নিয়ে কারখানায় জুয়া খেলছিল। পাশের কক্ষ থেকে মালিক নূর-এ-আলম টের পেয়ে তাদের বকাঝকা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে একজন আলমকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এবং আরেকজন তার বুকে ছুরিকাঘাত করে। ঘটনাস্থলেই নূর-এ-আলমের মৃত্যু হয়। এরপর হত্যাকারীরা মরদেহ টুকরো টুকরো করে ফ্যাক্টরির মাটির নিচে গভীর গর্ত খুঁড়ে তা পুঁতে রাখে এবং সিমেন্ট দিয়ে সেই স্থান ঢেকে দেয়। এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যার কাজে ব্যবহৃত একটি হাতুড়ি, একটি কাঁচি ও দু’টি চাকু উদ্ধারসহ অন্যান্য আলামত পুলিশ উদ্ধার করেছে। তদন্তের জন্য লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের জামাতা আতাউল্লাহ খান সজীবের দায়ের করা হত্যা মামলায় আসামিদের চালান করা হয়েছে। আমরা তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিলাম আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরকেও গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ভারত হাসিনাকে ফেরত না পাঠালে আইসিসি’র সহযোগিতা নিতে পারবে বাংলাদেশ: ক্যাডম্যান

ভারত বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান জানিয়ে জুলাই গণহত্যার প্রধান আসামি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বিশেষ পরামর্শক টবি ক্যাডম্যান। তবে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাঠালে বাংলাদেশ আইসিসি’র সহযোগিতা নিতে পারবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তারা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান জানিয়ে জুলাই গণহত্যার প্রধান আসামি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশে যে আইন আছে, সে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ গঠন করবে। এরপর ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে  রিকোয়েস্ট করবেন। এরপরও যদি তাকে ফেরত না পাঠায়, তাহলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার করতে পারবে ট্রাইব্যুনাল। তবে টবি ক্যাডম্যান শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ব্যাপারে আশাবাদী।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং তার বিশেষ পরামর্শক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ টবি ক্যাডম্যান। পরে জুলাই-আগস্ট গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে টবি ক্যাডম্যান আশা প্রকাশ করে বলেন, শেখ হাসিনাকে পাঠানোর ব্যাপারে ভারত কী করবে জানি না, তবে ভারত যদি ফেরত না দেয় তাহলে তার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলবে। ক্যাডম্যান আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালের যেসব আইন সংশোধিত হয়েছে, তা সঠিক হয়েছে। গণহত্যার বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে। জুলাই-আগস্ট গণহত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক ভাবে যেন কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে সে জন্যই টবি ক্যাডম্যানকে চিফ প্রসিকিউটরের এডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ক্যাডম্যানকে চিফ প্রসিকিউশন ও তার এজেন্সিকে সাপোর্ট এবং এডভাইজড করার জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবেন। তিনি বলেন, ডিফেন্সের পক্ষ থেকেও কেউ চাইলে কনসালট্যান্ট নিয়োগ করতে পারবেন। তবে আইনজীবী হিসেবে কাউকে নিয়োগ করতে হলে বার কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম, বিএম সুলতান মাহমুদ ও তদন্ত সংস্থার প্রধানরা।

এর আগে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিশেষ পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় লন্ডনভিত্তিক গার্নিকা ৩৭ ল’ ফার্মের যুগ্ম প্রধান টবি ক্যাডম্যানকে। জানা যায়, টবি ক্যাডম্যান বসনিয়ার যুদ্ধাপরাধে গঠিত ট্রাইব্যুনালের নির্বাহী আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। তিনি ২০০৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় যুদ্ধাপরাধ চেম্বার প্রজেক্ট প্রতিষ্ঠার জন্য আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়াও বসনিয়ার অপরাধ প্রতিরক্ষা অফিসের প্রথম প্রধান এবং ২০০৫ সালের শেষে দেশটির যুদ্ধাপরাধ নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবেও কাজ করেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এসেছিলেন টবি ক্যাডম্যান। গত ২রা সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।