Sunday, May 12, 2013

এবং সমাধান খুঁজতে হবে সংলাপের পথে

এখন প্রশ্ন হলো, এই সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে যে ন্যূনতম কর্মসম্পর্ক থাকা অপরিহার্য, তা গড়ে তোলা যাবে কীভাবে? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা: আলোচনায় বসতে হবে, কথা বলতে হবে। কিন্তু সরকারি দলকে এটা মনে রাখতে হবে, এবারের সংলাপে সরকারি দলের দায় স্মরণকালের অন্যান্য সংকটের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, তারা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা করে একতরফা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করে দিয়ে এক গভীর সংকট ও শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। একথা সত্য যে, অব্যাহত আলোচনা ও চর্চার মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক দর্শন থেকে গণতন্ত্রের ফারাক হলো, এই ব্যবস্থায় সংলাপের অগ্রাধিকার রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক কাঠামো বহাল থাকলেও সংলাপের অনুশীলন ও চর্চা তেমনটি হয়নি। বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তার মূলেও রয়েছে পারস্পরিক অনাস্থা ও সন্দেহ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দেয়ালটি রাজনীতির ক্ষেত্র ছাড়িয়ে বিভিন্ন সামাজিক স্তরেও প্রসারিত হচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তসংযোগের অভাবই এর কারণ। আজ যদি সংসদীয় গণতন্ত্র কার্যকর থাকত, তাহলে হেফাজতে ইসলামের এ ধরনের অবরোধ চাপিয়ে দিতে পারত কি না, তা নিয়ে বেশ জোরালো প্রশ্ন তোলা চলে। এই অবস্থায় সব রাজনৈতিক পক্ষের উচিত, তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিষয়টি নিয়ে অবিলম্বে আলোচনায় বসা। কোনো কিছু গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়ার ফল যে ভালো হয় না, নিকট-অতীতে তার বহু নজির আছে। সমাজে একজন লোকও যদি একটি মতের অনুসারী হন, তাঁর কথা শোনাই হলো গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, আলোচনার মাধ্যমেই তার সমাধান হতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতার ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম এবং তাকে দ্রুত নাকচ করার রাজনীতি দেশে শান্তি আনবে না। সরকারের উচিত এ মুহূর্তে আলোচনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া। যতটুকু নমনীয়তা তারা এখন দেখিয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা তাদের দিতে হবে। এই সরকারের প্রধান কে হবেন, সে বিষয়ে বিরোধী দলকেও সরকারি দলের মনোভাব মনে রেখেই সাড়া দিতে হবে। অপরাজনীতি সামলাতে হলে নির্বাচনকালীন সরকারের আশু ফয়সালা কাম্য।

তালিকায় সরকারি ও বিরোধী দলের শতাধিক নেতা by রোজিনা ইসলাম

৫ মের ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি পালনে হেফাজতে ইসলামকে অর্থসহায়তা দিয়েছেন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের শতাধিক নেতা। এ ছাড়া ৪০টির মতো আর্থিক ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান অর্থ, খাদ্য ও পরিবহনসুবিধা দিয়ে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটিকে সহায়তা করেছে।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল অবরোধ কর্মসূচির ঠিক আগে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের ঢাকার বাইরের পাঁচ নেতা, বিএনপির ৩৪, জামায়াতে ইসলামীর ৪১, জাতীয় পার্টির দুজন, চার পরিবহন ব্যবসায়ী ও একজন শিক্ষক এবং ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের ২৫ নেতা হেফাজতে ইসলামকে সহায়তা করেছেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের ওই পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে হেফাজতকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি প্রথম আলোর কাছে অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, ‘শুধু অর্থ দিয়ে নয়, হেফাজতে ইসলামকে সমর্থন দিয়ে নানাভাবে উসকে দেওয়ার প্রমাণও আমাদের হাতে এসেছে। যাঁরা এসব করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না।’
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা থেকে হেফাজতে ইসলামকে অর্থ ও খাদ্যসহায়তা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর বিএনপির একজন নেতা এবং জামায়াতের ঢাকা মহানগরের একজন নেতা। হেফাজতকে সহায়তা করার তালিকায় রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিনসহ চট্টগ্রামের বিএনপি ও জামায়াতের ১২ নেতা ও প্রতিষ্ঠান। আরও আছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদুল আলম, রাজা মিয়া, ইসলামী ঐক্যজোটের হাটহাজারী শাখার সভাপতি নাসির উদ্দিন মনিরী।
জানতে চাইলে মীর নাছিরউদ্দিন বলেন, ‘ওদের টাকা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। ডাহা মিথ্যা কথা। হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।’ কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আমাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। হেফাজতে ইসলামকে আমি পছন্দ করি না।’ যশোর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলীও হেফাজতকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
নড়াইল জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র জুলফিকার আলী মণ্ডল বলেন, ‘বিএনপি করি বলেই যে হেফাজতে ইসলামকে সহায়তা করব, তা ঠিক নয়।’ বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ ছালাম বলেন, বাগেরহাটে হেফাজতের সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল শেখ আ. ওয়াদুদ বলেন, ‘ওই সংগঠনকে সহায়তা করার কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত আমাদের নেই।’ জয়পুরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি মোজাহার আলী বলেন, ‘আমার কাছে কেউ টাকা চায়নি, দেইনি। আমার আর্থিক সামর্থ্যও নেই।’
দিনাজপুরের জিল্লুর রহমান পরিবহন দিয়ে সহায়তা করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমার চারটি রেইনবো গাড়ি আছে। কিন্তু আমি কাউকে গাড়ি দিইনি।’
এ ছাড়া রাজবাড়ী, মাদারীপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজশাহী. সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলার শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতার বিরুদ্ধে হেফাজতকে অর্থ দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সমর্থক ও নেতাদের নাম: ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ফেনী পৌরসভার মেয়র নিজাম উদ্দিন হাজারীর নামও আছে তালিকায়। জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থসহায়তা দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট।
ফেনী জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হেফাজতের স্থানীয় অনেক নেতার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। তবে সমাবেশের দিন হেফাজতের কর্মীরা গাড়ি না পেয়ে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সময় আমি বাধা দিয়েছি। কিন্তু অর্থসহায়তা করিনি।’
কক্সবাজারের রামুর সাংসদ আবদুর রহমানের ছোট ভাই ও টেকনাফ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং প্যানেল মেয়র মজিবর রহমানও হেফাজতকে টাকা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তিনি অবশ্য বলেন, কেউ প্রমাণ দিতে পারলে যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবেন।
আওয়ামী লীগের সমর্থক খুলনার জেড এম এ জব্বার হেফাজতে ইসলামকে অর্থসহায়তা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রথম আলোকে জব্বার বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে কীভাবে এ ধরনের অর্থসহায়তা দিতে পারি!’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা কুতুবউদ্দিনের নামও আছে প্রতিবেদনে। যোগাযোগ করা হলে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
অর্থসহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন: হেফাজতকে অর্থসহায়তা দেওয়া উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক, রাবেতা আল ইসলামী, ইবনে সিনা ট্রাস্ট, কেয়ারি গ্রুপ, মাকান গ্রুপ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চট্টগ্রামের আল আমিন ফাউন্ডেশন, কেয়ারি বাংলাদেশ, খুলনার হ্যামকো ব্যাটারি, আল আমিন জুয়েলার্স, তামান্না ট্রেডিং, মৌ-মার্কেট, রেটিনা, যশোরের এস এহসান মাল্টিপারপাস কোম্পানি সোসাইটি লিমিটেড, হাজী শরীয়তউল্লাহ ফাউন্ডেশন, আঁকাবা ফাউন্ডেশন এবং জেলা ইত্তেফাকুল উলামা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, এমদাদুল উলুম মাদ্রাসা।
বক্তব্য জানতে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের বাসায় ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর স্ত্রী জানান, তিনি দেশের বাইরে আছেন। এরপর ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবু নাসের মোহাম্মদ আবদুজ জাহেরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একরামুল আমিন বলেন, ‘সরকারের কোনো সংস্থা যদি মনে করে, আমরা হেফাজতকে অর্থ দিয়েছি তাহলে তারা প্রতিষ্ঠানে এসে তদন্ত করে দেখতে পারে।’
হেফাজত সম্পর্কে সতর্কতা: ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি ও জামায়াত-শিবির হেফাজতের সঙ্গে সংঘবদ্ধভাবে মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, প্রেসক্লাব, সচিবালয় ও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দাবি না মানা পর্যন্ত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করবে। এ ছাড়া বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের তিন থেকে চার হাজার সশস্ত্র কর্মী অবরোধের দিন পরিকল্পিতভাবে হেফাজতের নেতা-কর্মীদের লাশ ফেলে এর দায়ভার সরকারের ওপর চাপিয়ে ঢাকা মহানগরে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাতে পারে।
অবরোধ কর্মসূচিতে বাধা পেলে হেফাজতের ব্যানারে বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থকেরা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আক্রমণ, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কা করা হয় প্রতিবেদনে।
প্রসঙ্গত, ৫ মে রাজধানীতে হেফাজতে ইসলামের সন্ত্রাসী তাণ্ডব সেই আশঙ্কাকে বাস্তবে প্রমাণ করেছে। অন্যদিকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের রাতে অবস্থান ও এদের প্রতি বিএনপির প্রকাশ্য সমর্থনও সে তথ্য প্রমাণ করে। এ ছাড়া নানা সূত্রে এটিও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরাও ওই ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নিয়েছিলেন।

প্রাণের আশায় ছুটছে প্রাণ by আনোয়ার হোসেন ও অরূপ রায়

বিস্ময়কন্যা রেশমাকে জীবিত উদ্ধারের পর আশায় বুক বেঁধেছিলেন  স্বজনহারা অনেক ব্যক্তি। কিন্তু তাঁদের জন্য কোনো সুখবর ছিল না গতকাল শনিবার। আবার যেন থেমে গেছে প্রাণের স্পন্দন। গতকাল এই অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের চোখের সামনে দিয়ে একে একে বেরিয়ে এসেছে ৫০টি মৃতদেহ। তবু রানা প্লাজার আশপাশে স্বজনেরা ছুটে বেড়িয়েছেন প্রাণের আশায়। সাভারে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের যে স্থান থেকে ১৭ দিন পর রেশমা উদ্ধার হয়েছিলেন, সেই জায়গার স্ল্যাবগুলো গতকাল সরানো হয়েছে। এ নিয়ে ভবনটির মাঝখানের কিছু অংশ বাদ দিয়ে সামনে ও পেছনের ধ্বংসস্তূপ প্রায় সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ভবনের মাঝখানের জায়গা থেকে এখনো মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল বিকেল চারটার দিকেই মাঝখান থেকে একসঙ্গে আটটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও কিছু মৃতদেহ দেখা গেছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ধসে পড়া ভবনের সামনে ও পেছনে নিচতলার মেঝে পর্যন্ত সরানো হয়ে গেছে। মাঝখানে কিছু অংশে দু-তিনতলার কিছু স্ল্যাব রয়েছে। আজ রোববার সেগুলো সরানো সম্ভব হতে পারে। তবে ধসে পড়া ভবনের বেজমেন্টে (যেখানে গাড়ি রাখা হয়) পানি জমে আছে। রেশমাকে জীবিত উদ্ধারের পর যেসব স্বজন প্রিয়জনের জীবিত উদ্ধার হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে লাশের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন, তাঁদের অনেককেই গতকাল রানা প্লাজার আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। আরও কেউ বেঁচে থাকতে পারেন—এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন তাঁরা। সাভারের গেণ্ডা এলাকার বাসিন্দা নাসির আরাফাত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণকক্ষে এসে জানান, হানিফ খান নামে তাঁর এক চাচাতো ভাই ধ্বংসস্তূপের ভেতর বেঁচে আছেন। সেখান থেকে মুঠোফোনে বিদেশে অবস্থানরত বন্ধু মুরাদের নম্বরে ফোন করে বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন। মুরাদের মা রহিমা বেগম এ কথা জানান নাসির আরাফাতকে। এরপরই নাসির ছুটে আসেন নিয়ন্ত্রণকক্ষে।
সেনা কর্মকর্তারা নাসিরের দাবি করা ওই নম্বরের তথ্য সংগ্রহ করে জানান, এটি দুই মাস ধরে বন্ধ, ব্যবহার হচ্ছে না। তাই নাসিরের দেওয়া তথ্য সঠিক নয়। পরে নাসির চলে যান।
টানাপোড়েন: রানা প্লাজার পাঁচতলার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন মনোয়ারা বেগম। গত শুক্রবার সকালে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধারের পর দুপুরে শনাক্ত করেন স্বজনেরা। নিশ্চিত হয়ে জেলা প্রশাসন মনোয়ারার বাবার কাছে মৃতদেহ হস্তান্তরের উদ্যোগও নেয়। কিন্তু বাদ সাধেন স্বামী মুস্তাফিজুর রহমান। স্বামী হিসেবে স্ত্রীর মরদেহ দাবি করলে শুরু হয় বিবাদ। হস্তান্তর স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। মনোয়ারার বাবার বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার জয়মণ্ডপ গ্রামে। বছর দশেক আগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। তাঁদের পুষ্প নামের সাত বছরের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। মনোয়ারার বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, মনোয়ারার স্বামী তাঁদের লাশ নিতে বাধা দেন। পরে উভয় পক্ষের সম্মতিতে দুপুরে তাঁর কাছে মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের সময় শনাক্তকারী হিসেবে বাবা ও স্বামী দুজনের নামই উল্লেখ করা হয়। তবে জেলা প্রশাসন হস্তান্তর তালিকার মন্তব্যের ঘরে লিখে দিয়েছে, ‘মনোয়ারার মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেলে এর একমাত্র ভাগীদার হবে মেয়ে পুষ্প।’
ডিএনএ পরীক্ষার পরও লাশ মিলছে না: বগুড়ার সোনাতলার সুরুজ মিয়া কাজ করতেন সাততলার নিউ ওয়েভ স্টাইল পোশাক কারখানায়। ভবনের পেছনের অংশের একটি বড় বিমের আড়ালে আটকা পড়েন সুরুজসহ কয়েকজন। আলতাফ নামের আরেকজনের শরীরের নিম্নাংশ বিমের নিচে চাপা পড়ে আটকে ছিলেন। এই প্রতিবেদকসহ অনেকেই সুরুজ ও আলতাফের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তখন। ধসের প্রথম দুই দিন তাঁদের সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। এরপর আর সাড়া পাওয়া যায়নি। সুরুজের মা জ্যোৎস্না বেগম কয়েক দিন ধরে অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে অঝোরে কাঁদছেন। খাবার দেওয়া হলেও খাচ্ছেন না। গত শুক্রবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি শুধু বলছেন, ‘আমার সুরুজের সঙ্গে সবাই কথা বলেছে। ও জীবিত ছিল। এখন লাশও পাচ্ছি না।’ সুরুজের ভাই সুজন চার দিন আগে রক্ত দিয়ে এসেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাইয়ের লাশ পাননি। সুজন জানান, সুরুজ তাঁর ছোট ভাই। বাবা মারা গেছেন। দুই ভাই আর মা একসঙ্গে সাভার সিআরপির কাছে থাকতেন। সুজনও অন্য একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের আবুল কাশেমের মেয়ে কামনা আক্তার কাজ করতেন রানা প্লাজার পঞ্চম তলায়। গতকাল পর্যন্ত তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাননি স্বজনেরা। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ৬ মে কামনার ভাই মোস্তাক আহাম্মেদ নমুনা দিয়ে আসেন হাসপাতালে। টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ছিটকিবাড়ি গ্রামের আবুল কালাম ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সপ্তাহ খানেক আগে নমুনা দিয়ে এসেছেন। তিনিও মেয়ে নাছিমা আক্তারের লাশের কোনো হদিস পাচ্ছেন না। বরগুনার বেতাগীর আল-আমিনের লাশের খোঁজে তাঁর ভাই ইদ্রিসও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য রক্ত দিয়েছেন হাসপাতালে। এখনো মৃতদেহের সন্ধান পাননি। জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবরেটরি প্রধান শরিফ আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এটা নির্ভর করবে কত নমুনা পাওয়া যাচ্ছে তার পর। সাভারের ঘটনায় যত নমুনা পাওয়া গেছে, তাতে পরীক্ষা শেষ করতে ছয় মাসের বেশি সময় লাগবে।
এক বছরের ব্যবধানে দুই ছেলে আর মেয়ে নেই: জাহানারা, সেলিনা, তহুরা, মাহমুদা, আবদুল কাদের, আবদুল খালেক—তাঁরা সবাই ভাই-বোন।  এক বছরের ব্যবধানে কাদের ও খালেক চলে যান না-ফেরার দেশে। রানা প্লাজা ধসের পর ওই ভবনে কাজ করা মাহমুদাও বেঁচে নেই—এটা ধরেই নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। কারণ, গতকাল পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
তাঁদের বাবা শামসুল আলম বলেন, ‘বছর খানেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান কাদের। এর চার মাস পর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান খালেক। সর্বশেষ রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকা পড়েন মাহমুদা। এখন তাঁর জীবিত থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু লাশও খুঁজে পাচ্ছি না।’
শোকে পাথর শামসুল আলম ও স্ত্রী রাবেয়া বেগমের দিন কাটছে অধরচন্দ্র বিদ্যালয়ের মাঠে। শামসুল আলমের বড় মেয়ে জাহানারা বলেন, ছোট বোন মাহমুদা আর তিনি কাজ করতেন আটতলায়। ঘটনার দিন একসঙ্গেই তাঁরা কর্মস্থলে যান। ছিলেনও পাশাপাশি। কিন্তু ভবনধসের দেড় ঘণ্টা পর তিনি অক্ষত অবস্থায় বের হতে সক্ষম হলেও বোন বের হতে পারেননি। এই জাহানারার স্বামী মোসলেম উদ্দিন বছর চারেক আগে দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যান। বৃদ্ধ শামসুল আলম চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘উপার্জনক্ষম দুই ছেলে মারা যাওয়ার পর বিধবা মেয়ে জাহানারার আয়ে সংসার চলত। এরপর বোনের সঙ্গে কাজ নেয় মাহমুদা। সেও মনে হয় চলে গেল। এখন আমি বড় অসহায়।’
সর্বশেষ তথ্য: গতকাল রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এক হাজার ১১২টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই হাজার ৪৩৮ জনকে। তার মধ্যে ১২ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। এই ভবনধসে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল এক হাজার ১২৪-এ।
গতকাল রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ৮২২টি মৃতদেহ। হস্তান্তরের অপেক্ষায় অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠ ও বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে রয়েছে ৬৮টি মৃতদেহ। আর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে নাম-পরিচয়হীন ২৩৪টি মৃতদেহ। গতকালও ৭৮টি মৃতদেহ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

রেশমা সুস্থ, তবে মাঝেমধ্যে ভয়ে কেঁপে উঠছেন

অন্ধকার এক কুঠুরি। আশপাশে ছড়ানো-ছিটানো সহকর্মীদের লাশ। সেখান থেকে বের হওয়া যাবে কি না, কে জানে! এ রকম অবস্থায় ১৭ দিন আটকে থেকেও যিনি ভয় পাননি, মুক্ত হওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে এসে মাঝেমধ্যেই ভয়ে কেঁপে উঠছেন সেই রেশমা।
সাভার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন রেশমাকে অভয় দিতে একজন সেবিকা সারাক্ষণ তাঁর পাশে আছেন। তবে রেশমা ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছেন।
গতকাল শনিবার বিকেলে সিএমএইচের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রেশমার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানান ওই হাসপাতালের মেডিকেল বিভাগের প্রধান কর্নেল আজিজুর রহমান। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে গত শুক্রবার বিকেলে পোশাককর্মী রেশমাকে বের করে আনা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দ্দী বলেন, ‘রেশমাকে উদ্ধার করার সময় যতটা সুস্থ মনে হয়েছিল, হাসপাতালে আনার পর দেখা গেছে, তার অবস্থা ততটা ভালো নয়। শাহীনাও রেশমার মতো হতে পারত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি।’
কাল বিকেলে সিএমএইচের সামনে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক উপস্থিত হন। সেখানে জিওসির পক্ষে মেজর তৌহিদুজ্জামান জানান, রেশমার সঙ্গে কথা বলা যাবে না। তাকে কোনো প্রশ্ন না করে শুধু ছবি নিতে পারবেন। জিওসি রেশমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবেন।’ এরপর তিনি আলোকচিত্র সাংবাদিকদের তিনটি দলে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে রেশমার ছবি তোলার জন্য হাসপাতালে প্রবেশের ব্যবস্থা করেন।
জিওসি বলেন, ‘উদ্ধারের পর রেশমার সঙ্গে অল্পই কথা হয়েছে। তাকে বলেছিলাম, কেমন আছ? সে বলেছে, ভালো আছি। তার কী ইচ্ছা জানতে চাইলে সে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমি ফোন করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিই। সে প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে চায়। এরপর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চলে আসেন। তিনি রেশমাকে সান্ত্বনা দেন।’
মেজর জেনারেল সারওয়ার্দ্দী বলেন, ‘রেশমা তিনতলায় কাজ করত। তার সঙ্গে সেখানে আরও তিনজন ছিল। তারা মারা যায়। এরপর সে দোতলায় নেমে এসে ছোট্ট একটি জায়গায় আশ্রয় নেয়। তখন অন্যদের কাছে থাকা শুকনো খাবার সংগ্রহ করে এনেছিল সে। সেখানে সম্ভবত স্যুয়ারেজের একটি লাইনের পানি খেয়েছে। তবে শেষ দুই দিন তার খাবার ফুরিয়ে যায়।’
রেশমার পরনের কাপড় পরিচ্ছন্ন ছিল কেন, এ সম্পর্কে জিওসি বলেন, ‘তার পরনের পোশাক আমার কাছেও ফ্রেশ মনে হয়েছে। হয়তো সেখানে সে কোনো পোশাক পেতে পারে। হয়তো পোশাক বদলে থাকতে পারে। তবে এ মুহূর্তে তাকে এত কিছু বলার মতো পরিস্থিতি নেই। সুস্থ হয়ে উঠলে তাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হবে। তখন হয়তো সে আপনাদের সব কৌতূহলের জবাব দিতে পারবে।’
রেশমার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কর্নেল আজিজুর রহমান বলেন, ‘উদ্ধার করার সময় রেশমা অত্যন্ত ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত ছিল। তার শরীরে পানিশূন্যতা ও লবণের ঘাটতি ছিল। কিডনি কার্যক্ষমতা ৩৫ ভাগে নেমে এসেছিল। চিকিৎসা দেওয়ার পর কিডনির কার্যক্ষমতা ৫০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। অন্য ক্ষেত্রেও উন্নতি হয়েছে। তাকে তরল ও নরম খাবার দেওয়া হয়েছে। শরীরের কোথাও কোথাও সামান্য কিছু ছিঁড়ে যাওয়া ছাড়া গভীর কোনো ক্ষত বা আঘাত নেই।’
তবে শুক্রবার রাতে রেশমা ভালো করে ঘুমোতে পারেননি। এখন তাঁর প্রচুর ঘুম ও বিশ্রামের প্রয়োজন। কাল দুপুরে ঢাকা থেকে একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল সিএমএইচে গিয়ে রেশমার অবস্থা পরীক্ষা করেছেন। পুরোপুরি সেরে উঠতে হয়তো কিছু সময় লাগবে।
চিকিৎসকেরা ধারণা করছেন, ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার সময় হয়তো ‘কিছুটা ঘুম কিছুটা জাগ্রত’ এমন অবস্থায় ছিলেন রেশমা। এটা তাঁর স্মৃতিতে বিভ্রমের সৃষ্টি করতে পারে। তবে রেশমা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন বলে আশাবাদী চিকিৎসকেরা।
কাল সকালে মা জোবেদা ও ভাই জাহিদুল রেশমার সঙ্গে দেখা করেন। রেশমা তাঁদের চিনতে পেরেছেন এবং কথাও বলেছেন।

গোলাম আযমের মামলার রায়ের পর সহিংস প্রতিক্রিয়া!

আজ রোববার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে এ হরতাল দেওয়া হয়।
এর আগে জামায়াতের ডাকা অন্যান্য হরতালের আগের দিন থেকেই রাজধানীতে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু গতকাল শনিবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আগের মতো সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
দলের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কেন্দ্রিক মারমুখী প্রতিক্রিয়া দেখানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না জামায়াত। তবে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের আদেশের পর তেমন মারমুখী না হয়ে সাধারণ প্রতিক্রিয়া জানানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। দলটি মনে করে, চলতি মাসে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে। ওই রায়ের পর সারা দেশে একযোগে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কামারুজ্জামানের রায়ের পর গতকাল পর্যন্ত জামায়াত চুপচাপ থাকার কারণ হিসেবে দলটির আরেকটি সূত্র জানায়, ৫ মে রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে শক্তি প্রয়োগ করেছে, তাতে জামায়াতের তরুণ নেতা-কর্মীদের মনেও কিছুটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে। এ কারণে কামারুজ্জামনের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দুই দিন পর হরতাল দেওয়া হয়।
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর কমিটির সহকারী সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, জামায়াতের কর্মীরা হেফাজতের ওই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও উজ্জীবিত হবেন। কারণ হেফাজতে ইসলাম আর জামায়াত এক জিনিস না। হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন, তাঁরা সরকার পতনের জন্য আন্দোলন করেনি।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৫ ফেব্রুয়ারি দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২৮ ফেব্রুয়ারি নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এ দুই মামলার রায় ঘোষণার আগে ও পরে হরতাল ডেকে সারা দেশে সহিংসতা চালায় জামায়াত-শিবির।
তিন জেলা হরতালের আওতামুক্ত: প্রথম আলোর ফেনীর  নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, শ্রীশ্রী ঠাকুর রামচন্দ্র দেবের তিরোভাব (রামঠাকুর) উৎসব কমিটির অনুরোধে তিন জেলা ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরকে হরতালের আওতামুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত।
নোয়াখালীর চৌমুহনীতে অবস্থিত শ্রীশ্রী ঠাকুর রামচন্দ্র দেবের সমাধিক্ষেত্রে ৬৩ বছর ধরে তিরোভাব দিবসে উৎসব পালিত হয়ে আসছে। গতকাল বিকেল থেকে চার দিনের এ উৎসব শুরু হয়েছে। শেষ হবে  আগামী মঙ্গলবার।
উৎসব কমিটির সম্পাদক তপন রায় চৌধুরী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে চিঠি দিয়ে হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ করার কথা নিশ্চিত করেন।
ঠাকুর রামচন্দ্রদেব উৎসব কমিটির চিঠি পাওয়ার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটি ও তিন জেলার নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই তিন জেলাকে হরতালের আওতামুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ফেনী জেলা কমিটির সেক্রেটারি এ কে এম সামছুদ্দিন।

সংঘাত নয়, সংলাপে বসুন

দেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়টিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তাই সংঘাতের পথ ছেড়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
গতকাল শনিবার ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিনে বিভিন্ন আলোচনায় এ অভিমত দিয়েছেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গত শুক্রবার চার দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন তিনি।
গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। সন্ধ্যায় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সকালে বিএনপির এবং দুপুরে জাতীয় পার্টির দুটি প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে হোটেল সোনারগাঁওয়ে দেখা করে।
বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংলাপের প্রশ্নে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবকে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিরোধী দলের সময় বেঁধে দেওয়া ও সহিংস কার্যক্রম সত্ত্বেও তাঁর আলোচনার প্রস্তাব ‘এখনো অব্যাহত’ রয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য বিএনপি সব দরজা খোলা রাখছে।
গতকালের বিভিন্ন আলোচনায় জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের এ উদ্বেগ অতীতের চেয়ে বেশি। এমনকি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর মতে, অব্যাহতভাবে চলা এসব সহিংসতার অবসান হওয়া উচিত। সংঘাত বন্ধে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি।
জানা গেছে, গতকালের বিভিন্ন বৈঠকে নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন কী হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মত এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দলের মতের মধ্যে মিলও দেখা গেছে। এসব আলোচনা থেকে অস্কার ফার্নান্দেজ এ ধারণা পেয়েছেন যে, নেতাদের মতের মিল থাকলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভাগ্যটা ঝুলে থাকছে দুই নেত্রীর ওপর।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে সংবিধানের আওতায় কীভাবে এগোনো যায়, সে সম্পর্কেও অস্কার ফার্নান্দেজ জানতে চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সংবিধানে কী কী বিকল্প রয়েছে, সেগুলো তিনি বিভিন্ন জনের কাছে শুনেছেন। সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতাগুলোও তিনি জানতে চেয়েছেন। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সম্পন্ন নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা, ওই সব নির্বাচনের ত্রুটি-বিচ্যুতি এসব নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সন্দেহ আর বিভ্রান্তির উৎসটা কোথায়।
তবে বিভিন্ন বৈঠকে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ এ কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন যে, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে সংকট নিরসনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে জাতিসংঘ। 
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের প্রশংসা: বাসস জানায়, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশের চলমান ‘রাজনৈতিক অচলাবস্থা’ নিরসনের জন্য বিরোধী দলের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার প্রস্তাবের প্রশংসা করেছেন। পাশাপাশি এই উদ্যোগকে তিনি ‘সাহসী ও মহৎ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় জাতিসংঘের মহাসচিবের এ বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন।
বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন এবং দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বান কি মুন বলেন, এ ক্ষেত্রে সংলাপের জন্য কোনো পূর্বশর্ত থাকতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করেছে। জাতীয় সংসদের ১৬টি আসনে উপনির্বাচনসহ পাঁচ হাজার ৬৩৬টির বেশি নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এসব নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠক: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সন্ধ্যায় বৈঠক করেন ফার্নান্দেজ তারানকো। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
 খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাল সোমবার তারানকো আবার বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। গতকালের বৈঠকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার ও সংলাপ। বৈঠকে এ দুটি ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে তেমন আশাবাদী হতে পারেনি বিএনপি। তবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য বিএনপি সম্ভাব্য সব দরজা খোলা রাখছে বলে জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে জানিয়েছে।
বৈঠক শেষে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, জাতিসংঘ একটি সমঝোতার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা আশা করে, সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। বৈঠকে তারানকো বিএনপির চেয়ারপারসনের কাছে জাতিসংঘের মহাসচিবের একটি চিঠি পৌঁছে দেন।
খালেদা জিয়া দেশের বর্তমান অবস্থায় এবং এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বিএনপির নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, শমসের মবিন চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, ওসমান ফারুক ও জয়নুল আবদিন ফারুক উপস্থিত ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকার চায় জাপা: সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক সংঘাতের ঘটনার উল্লেখ করে এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোভাব জানতে চেয়েছে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল।
জানতে চাইলে জাপার মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংঘাতময় পরিস্থিতি অবসানের লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধী দলকে সমঝোতায় বসাতে আমরা জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চেয়েছি। নইলে সামনের দিনগুলোতে সংঘাত বাড়বে।’
জাপা নির্বাচনকালে ১০ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বলেছে। এর প্রধান হবেন একজন সর্বজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, যাকে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেতে পারে।
দুই সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক: দুপুরে সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের সঙ্গে মতবিনিময় করেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ফার্নান্দেজ তারানকো। তাঁরা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন।
ফার্নান্দেজ তারানকো এ সময় বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির অবসানে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে।

‘প্রাগৈতিহাসিক মাত্রায়’ কার্বন ডাই-অক্সাইড

বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের উপস্থিতি প্রথমবারের মতো বিপজ্জনক প্রতীকী মাত্রা ‘৪০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)’ ছাড়িয়ে গেছে। মার্কিন আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা এ তথ্য জানিয়ে বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাসের রেকর্ড ছোঁয়ারও আভাস দিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ঢালাও ব্যবহারে সৃষ্ট জলবায়ুর ক্ষতি ঠেকাতে অবিলম্বে বিশ্বনেতাদের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গ্রানথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ও এনভায়রনমেন্ট অ্যাট লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের নীতিমালা ও যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক বব ওয়ার্ড বলেন, লাখ লাখ বছরেও এ পৃথিবীতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা এমন পর্যায়ে আর পৌঁছায়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা প্রাগৈতিহাসিক যুগের জলবায়ুতে ফিরে যাচ্ছি। এতে মানবসমাজ ব্যাপক ও সম্ভাব্য বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ঝুঁকিতে পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমন কমাতে পারলে আমরা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা হ্রাসে সক্ষম হব।’ যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের মাউনা লোয়া এলাকায় স্থাপিত আবহাওয়া গবেষণাকেন্দ্র ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দেওয়া ৯ মের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগে কার্বন ডাই-অক্সাইডের দৈনিক গড় উপস্থিতির মাত্রা ৪০০ দশমিক ০৩ পিপিএম। ক্যালিফোর্নিয়ার সানদিয়াগোর স্ক্রিপস ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির এক পৃথক পর্যবেক্ষণে ওই দিন এ মাত্রাকে ৩৯৯ দশমিক ৭৩ পিপিএম জানানো হলেও পরে তা প্রত্যাহার করে ৪০০ দশমিক ০৮ পিপিএম সংশোধিত মাত্রার কথা বলা হয়। পেন স্টেটের আর্থ সিস্টেম সায়েন্স সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ম্যান বলেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড যে গতিতে বাড়ছে, তা উদ্বেগের বিষয়। এই অপ্রত্যাশিত গতিতে বৃদ্ধির নজির ইতিহাসে নেই।

মোবারকের পুনর্বিচার শুরু

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পুনর্বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ জন্য গতকাল শনিবার তিনি রাজধানী কায়রোর একটি আদালতে হাজিরা দেন। ২০১১ সালের গণবিক্ষোভ চলাকালে কয়েক শ বিক্ষোভকারীকে হত্যা এবং দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁর বিচার চলছে। ৮৫ বছর বয়সী মোবারক ও তাঁর দুই ছেলের (গামাল ও আলা) পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাবিব আল-আদলি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ছয় কর্মকর্তাকে এ-সংক্রান্ত মামলায় আসামি করা হয়েছে। হুইলচেয়ারে চড়ে আদালতে হাজির হন মোবারক। নিহত বিক্ষোভকারীদের স্বজনসহ লোকজন আদালতের বাইরে জড়ো হয়ে ‘খুনিদের’ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি জানান। ২০১২ সালের জুনে একটি মামলায় মোবারককে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পুনর্বিচারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এবার মনমোহন সিংয়ের বিদায় চায় বিরোধীরা

ভারতে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের পদত্যাগ দাবিতে এখনো অনড় রয়েছে সে দেশের বিরোধী দল। গত শুক্রবার দুর্নীতির কেলেঙ্কারি নিয়ে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী পবন কুমার বানসাল ও আইনমন্ত্রী অশ্বিনী কুমারের পদত্যাগের পর গতকাল শনিবার তারা এই দাবি জানিয়েছে। এদিকে গতকাল ভারতের টেলিকম মন্ত্রী কপিল সিবালকে আইন মন্ত্রণালয় এবং সড়ক ও পরিবহনমন্ত্রী সি পি যোশীকে রেল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তাঁদের এসব দায়িত্ব দেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি অশ্বিনী কুমার ও বানসালের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।  দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় মনমোহনের ওপর ক্রমাগত পদত্যাগের চাপ বাড়ছে। সম্প্রতি ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে গেছে। একের পর এক দুর্নীতি সামাল দিতে সরকারও হিমশিম খাচ্ছে। এ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কে রয়েছেন। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি রাজনাথ সিং বলেছেন, সরকার বেশ কিছু গুরুতর দুর্নীতির কেলেঙ্কারির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রতি মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে সততার সঙ্গে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। আর এটা করলে তিনি উপলব্ধি করবেন, পদত্যাগ ছাড়া তাঁর কোনো বিকল্প পথ নেই। ভারতের গণমাধ্যমে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দিনকে ‘কালো শুক্রবার’ বলে প্রচার করা হচ্ছে। কয়লাখনি কেলেঙ্কারির ঘটনায় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের তদন্তে হস্তক্ষেপের ঘটনায় চাপের মুখে আইনমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার পদত্যাগ করেন। আর রেলমন্ত্রী তাঁর ভাগনের ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় পদত্যাগ করেন। দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকার কীভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকবে—এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহের দানা বেঁধেছে। অথচ কংগ্রেস মাত্র দুটি আঞ্চলিক দলের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তাদের ক্ষমতার মেয়াদ আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হবে। তবে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনার উদাহরণ দিয়ে কংগ্রেস বলেছে, এ ঘটনা প্রমাণ করেছে দুর্নীতির ক্ষেত্রে তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি।

গুয়াতেমালার সাবেক সেনাশাসকের ৮০ বছরের কারাদণ্ড

মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়াতেমালার সাবেক সামরিক শাসক ইফরেইন রিয়োস মন্টকে ৮০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে গত শুক্রবার তাঁর বিরুদ্ধে এই রায় দেওয়া হয়। তিনজন বিচারককে নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার সময় জানান, ইফরেইন ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে তাঁর নির্দেশে জাতিগত মায়া জনগোষ্ঠীর এক হাজার ৭৭১ জনকে হত্যা করা হয়। ধারণা করা হয়, বামপন্থী বিদ্রোহীরা এই কাজে সেনাবাহিনীকে সহায়তা দেয়। ইফরেইন (৮৬) তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাবেক এই সামরিক শাসক তাঁর বয়সের বিষয়টি বিবেচনা করতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

নাজুক অর্থনীতি সামলানোই নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

পারমাণবিক শক্তিধর ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানে নতুন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। দেশটিতে প্রথমবারের মতো একটি বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে অপর একটি বেসামরিক সরকার ক্ষমতা নেবে। তালেবান জঙ্গিবাদ, ক্রমবর্ধমান চরমপন্থা এবং প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ১৮ কোটি মানুষের এই দেশ। নতুন সরকারকে এসব সমস্যার প্রতিটিই সুষ্ঠুভাবে সামাল দিতে হবে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নাজুক অর্থনীতির বিষয়টি সামলানোই হবে নতুন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তানে প্রবৃদ্ধির নিম্ন হার ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি লেগেই রয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিকে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে গত পাঁচ বছর ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। চাকরির বাজারে প্রতিবছর যুক্ত হচ্ছে ২০ লাখ বেকার। কিন্তু সরকার তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।   নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করা। প্রবৃদ্ধির পথে এটিকেই আপাতত সবচেয়ে বড় অন্তরায় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকারি দলের অনুগত লোকজনের পকেট ভারী হলেও লক্ষ্য অর্জন অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এ ছাড়া কয়লাখনিসমৃদ্ধ থর মরুভূমি অঞ্চলে উন্নয়নের উদ্যোগ কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে দেশটিতে বিদ্যুৎবিভ্রাট বেড়েছে। বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এ কারণে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ফেডারেশন অব পাকিস্তান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি আলি শেখ বলেন, জ্বালানিসংকটের সমাধান করাই হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশে আসতে চান না। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি। করাচি স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাদিম নাকভি বলেন, ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি পূরণের বিষয়টিকে নতুন সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কর আদায়ের প্রক্রিয়াটি সহজ ও উন্নত করতে হবে, তা যত অজনপ্রিয়ই হোক না কেন। সব সংকট সত্ত্বেও পাকিস্তানের বহু মানুষ মনে করে, পরিস্থিতি পরিবর্তন করা যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি নতুন সরকারের জন্য সুখকর না হলেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মোকাবিলায় তাদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে।

একনজরে

n  ১৭২ আসন প্রয়োজন হবে সরকার গঠনে। পার্লামেন্টে মোট   আসন ৩৪২
n   ১ ঘণ্টা ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানো হয়   সারা দেশে
n   ৪টি দল কয়েকটি এলাকায় নির্বাচন   বর্জন করে