Wednesday, September 18, 2024

আওয়ামী লীগের মতো করলে একই দশা আমাদেরও হবে: ফখরুল

টানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ যা করেছে এবং যেভাবে গণঅভ্যুত্থানে তাদের বিদায় হয়েছে, সেটা বিএনপি করলেও পরিণতি একই হবে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এজন্য দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন তিনি। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা বিএনপি আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে আমরা এই মুক্ত বাংলাদেশ বাস করছি, কিন্তু মনে রাখবেন- এই মুহূর্ত সেই পর্যন্তই মুক্ত ও স্বাধীন থাকবে, যতদিন আমরা মুক্ত ও স্বাধীন রাখতে পারব। আমরাও আওয়ামী লীগের মতো শুরু করলে তাদের মতো একই দশা আমাদেরও হবে। সেজন্য বিশেষ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হবে। কারো প্রতি অন্যায় অত্যাচার এবং অবিচার করা যাবে না।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকার আন্দোলনে দুই হাজার ছাত্র-জনতাকে খুন করেছে। অনেকের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে। কারও মাথার খুলি উড়ে গেছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নির্ভয় দিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা আমাদের আমানত। তাদের রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে আমানতের খেয়ানত করে সে মুমিন না। তাই এই আমানতকে রক্ষা করতে হবে। সামনে তাদের পূজা আসছে। সেখানে কোথাও যেন কোনো অঘটন না ঘটে, কারো কোথাও কোনো সম্পত্তিসহ আত্মীয়-স্বজনদের ওপর যেন অত্যাচার না হয় সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ‘অতীতে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তাই সবাই যেন ভোট দিতে পারে, যার ভোট সেই দেবে, যাকে খুশি তাকে দেবে। সেই ভোটের মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করব। আগের সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসার এবং ঠিক করার জন্য বর্তমান সরকারকে সময় দিতে হবে। তারা নিরপেক্ষ মানুষ, কোনো দল করেন না। কিন্তু দেশটাকে ভালোবেসে দেশের জন্য কিছু কাজ করতে চান। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে সবার সহযোগিতা করতে হবে।

ভারত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত অনেক খারাপ কাজ করে। সীমান্তে গুলি করে মানুষ মারে। আমরা ভালোভাবে থাকতে চাই তাদের সাথে। প্রতিবেশী হিসেবে থাকতে চাই তাদের সাথে। কিন্তু আমাদের সাথে কোনো অন্যায় করা হলে তার প্রতিবাদ আমরা জানাব।
জনসভায় হরিপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিন সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর করিম, সহসভাপতি ওবায়দুল্লা মাসুদ, জেলা মহিলাদের সভাপতি ফারাতুন নাহার পেরিস, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফয়সাল আমিন, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. কায়েসসহ উপজেলার বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং সমর্থকরা।

mzamin

'মনিপুরে শান্তি ফেরাতে মরিয়া মোদি সরকার, শুরু হয়েছে আলোচনা': অমিত শাহ by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

ভারতের উত্তরপূর্বের রাজ্য মনিপুরে শান্তি ফেরাতে মরিয়া সরকার। শুরু হয়েছে আলোচনা। মোদি সরকারের ১০০ দিন পূর্তিতে ঘোষণা করলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে সরকার। সেই সঙ্গেই তার দাবি, ভারত-মায়ানমার সীমান্তে অনুপ্রবেশ রুখতেও সতর্ক মোদি সরকার। গত বছরের মে মাসে মণিপুরে কুকি-মেইতেই সংঘর্ষ শুরুর পরে উত্তর-পূর্বের রাজ্যে ২০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। একটা সময় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর মণিপুরের পাঁচ জেলায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইন্টারনেট পরিষেবা। এই পাঁচ জেলা হল- পূর্ব ও পশ্চিম ইম্ফল, থৌবাল, বিষ্ণুপুর এবং কাকচিং। ১০ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টা থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টা পর্যন্ত পাঁচ দিন গোটা রাজ্যে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সমাজমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক গুজব ছড়ানো হচ্ছিল বলেই এই পদক্ষেপ, নির্দেশে এমনটাই জানিয়েছিল সরকার। এর পাশাপাশি তিন জেলায় কারফিউ জারি করে প্রশাসন। সোমবার রাজ্য সরকারের কমিশনার (হোম) এন অশোক কুমার জানিয়েছেন, লিজ় লাইন, ভিএসটি, ব্রডব্যান্ড এবং ভিপিএন পরিষেবা-সহ সমস্ত ইন্টারনেট পরিষেবা অবিলম্বে চালু করতে হবে। দ্রুত রাজ্যের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।  এর মধ্যেই অসম রাইফেলসের হাতে মায়ানমারের নাগরিক কুকি ন্যাশনাল আর্মি (বার্মা) (কেএনএ-বি) ক্যাডারকে গ্রেফতার করার ঘটনায় স্পষ্টভাবে মনিপুর সংকটে বিদেশী উপাদানগুলির জড়িত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং। ইম্ফলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বীরেন বলেন, সংঘর্ষে বিদেশিদের জড়িত থাকার সন্দেহটি জনসাধারণের কিছু অংশ প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করেনি এবং মনিপুরে সক্রিয় জঙ্গিদের অস্ত্র সরবরাহের প্রমাণ সহ বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করার জন্য অসম রাইফেলসের প্রশংসা করেছেন। গ্রেফতার হওয়া কেএনএ (বি) ক্যাডার নাগামপাওয়ের ছেলে থাংলিংকপ মায়ানমারের খামপাটের কোলাংয়ে জন্মগ্রহণকারী একজন মায়ানমারের নাগরিক। সম্প্রতি মণিপুরের চান্দেল জেলা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ভারত-মায়ানমার সীমান্তবর্তী শহর মোরেহ থেকে কুকি অধ্যুষিত জেলা চুরাচাঁদপুর পর্যন্ত জঙ্গলের ধারে অস্ত্র সরবরাহের জন্য নজরদারি মিশন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এই গত এক বছরে রাজনৈতিক সমাবেশ দেখেনি ইম্ফল বা মনিপুর। যদিও মনিপুর প্রসঙ্গে আশ্চর্যজনক নীরব থেকেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবার অমিত শাহ দাবি করলেন, কেন্দ্র মনিপুরে শান্তি ফেরাতে একটি রোডম্যাপ তৈরি করে ফেলেছে। এবং সেটাকে কাজে লাগিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই মনিপুরকে শান্ত করা যাবে।
mzamin

আমার বই পড়ে তরুণরা গণঅভ্যুত্থানের দিক-নির্দেশনা পেয়েছে: ফরহাদ মজহার

নিজের লেখা ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ বই পড়ে ৫ আগস্টের মতো ঘটনার জন্য তরুণরা দিক-নির্দেশনা পেয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার।

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘দ্য ভয়েস অব টাইমস’ আয়োজিত ‘গণঅভ্যুথ্যান-২৪: জনআকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন দাবি করেন।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) ছাত্র রেদোয়ানুর রহমানের একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ফরহাদ মজহার ওই দাবি করেন। রেদোয়ানুর রহমান কবি ও লেখক আহমেদ ছফার একটি লাইন উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছিল তখন বুদ্ধিজীবীরা তা জানতো না।

বুদ্ধিজীবীরা সমাজ বদলায়নি, বদলেছে তরুণরা—এমন একটি বক্তব্য টেনে এনে ফরহাদ মজহার বলেন, বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না—একজন তরুণ বলেছেন। একটা কথা মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিজীবিতা ছাড়া কোনো বড় ঘটনা বা বাংলাদেশকে গঠন করতে পারব না।

ওই তরুণকে উদ্দেশ্য করে ফরহাদ মজহার বলেন, তিনি আর একটা কথা বলেছেন, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে, এটা জানতো না। এটা ভুল কথা। ২০২৩ সালে আমাদের একটা বই বের হয়েছিল। আমাদের যৌথ প্রযোজনা। বইটির নাম ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’। ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট এটা প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের তরুণদের বড় একটা অংশ সেই বই দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। সেই বই তারা পড়েছে। সেই বই থেকে তারা দিক-নির্দেশনা পেয়েছে।

রাষ্ট্রচিন্তা প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন: বাংলাদেশের গণরাজনৈতিক ধারার বিকাশ প্রসঙ্গে’ বইটি নিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, এই গ্রন্থটির পেছনে আমার নিজের ক্ষতবিক্ষত হৃদপিণ্ডের অনেক টুকরা জড়িত। বইটি যখন স্নেহভাজন সারোয়ার তুষার হাতে তুলে দিলেন; ভেবেছি, একাত্তরের শহীদদের প্রতি কিছু দায় কি শোধ করা গেল? আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, বাহাত্তরে আমরা নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠন করতে পারিনি, সেই কাজ আমাদের অবশ্যই সম্পূর্ণ করতে হবে, সেটা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য এই গ্রন্থ।

ফরহাদ মজহার বলেন, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট বইটি বের হয়েছে। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। তাই তরুণরা যেভাবে বলছেন, সেটা ঠিক না। বারুদ জমা ছিল কিন্তু ম্যাচের কাঠি জ্বালানোর লোক ছিল না। তরুণরা ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়েছেন। ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে তরুণরা যেহেতু বুদ্ধিজীবিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন নাই, তাই তারা বিজয়ের ফসল তুলে দিয়েছেন ওই চুপ্পুর (রাষ্ট্রপতি) হাতে। এটা বুঝতে হবে। তরুণরা কাজটা শুরু করেছেন, জনগণ সাড়া দিয়েছে। আজ এই বিজয়টা চলে গেল তাদের হাতে, যারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নাই। গণতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের একটা ধরন। বাড়িটা হলো রাষ্ট্র আর বাড়িটা কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটা হচ্ছে নির্বাচন। বাড়ির ঠিক নাই, সেখানে কী নির্বাচন করবেন? এইজন্য বারবার বলা হচ্ছে গঠনের কথা।

ফরহাদ মজহার বলেন, এই সরকারকে এই বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে। না হলে মারাত্মক ভুল হবে। তরুণদের বুদ্ধিজীবীদের নেতিবাচক হিসেবে মনে করলে হবে না। এটার চর্চা না থাকলে সেই রাষ্ট্রে হাজার হাতুড়ি পিটিয়ে গণতন্ত্র আনতে পারবেন না।

উপদেষ্টাদের নিয়ে গঠিত সরকার প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, জনগণের অভিপ্রায় হচ্ছে গণতন্ত্র। জনগণের অভিপ্রায় বিসর্জন দিয়ে এখন একটা উপদেষ্টা সরকার বানানো হয়েছে। তার ভাষায় এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রশাসনের সকল স্তরে জনগণের অংশগ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এই সরকারের সেটা হচ্ছে না। তারা কিন্তু কাউকে বলে নাই। জনগণের পক্ষে কনক সারোয়ার, পিনাকী কথা বলেছে। কিন্তু এই সরকার কি তাদের কিছু বলেছে? যাদের আন্দোলন ও প্রোপাগান্ডার ফলে হয়েছে।

সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রসঙ্গে এই বুদ্ধিজীবী বলেন, এটা খুব ভালো লক্ষণ নয়। আমরা চেয়েছিলাম পুলিশ সংস্কার করা। তা হয়নি। পুলিশ না এলে তাদের পলাতক ঘোষণা করা হোক। আগে পুলিশ মাসে লাখ টাকা কামাতো। তারা তো এই দুই চার টাকার জন্য ফিরে আসবে না। আগে থেকেই এটা ভাবা উচিত না। তরুণরা ভেবেছিল বিল্পব ডিনার পার্টি, এটা ডিনার পার্টি না।

বিচার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, তারা (বিচার বিভাগ) ইকোনমিক ইস্যুতে, প্রসাশনিক এবং আইনের ক্ষেত্রে তারা স্বাধীন। এরশাদ সাহেব আদালতকে একবার ডিসেন্ট্রালাইজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটা আদতে হয়নি, যেটা নিয়ে আমরা আজ পর্যন্ত কাজ করতে পারিনি। আদালতকে জনগণের কাছে থামতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কথাটা বলা সহজ। এক-এগারোর সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার কথা বলে নির্বাহী শাসন ব্যবস্থা নিয়ে এসেছিল। মানবিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা আমরা মুখে বলি, কিন্তু কার্যত এর ব্যবস্থা আমরা করতে পারি না। আমরা কারো কথা শুনি না, অন্যের কথায় নাচানাচি করি। এটা কি আমাদের স্বভাব নাকি জ্ঞানের অভাব? এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অনেক সচেতন হতে হবে এবং সহনশীলভাবে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ছাত্ররা একটি নাগরিক কমিটি করেছে কিন্তু প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল সেটাকে সন্দেহের চোখে দেখছে উল্লেখ করে ফরহাদ মাজহার বলেন, কারণ তারা বলছে তোমরা নাগরিক কমিটি করো কিন্তু এই সরকারের ক্ষমতা নিয়ে আরেকটি কিংস পার্টি হয়ো না। এখন যেটা দরকার সেটি হলো বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন।  চিন্তার পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করা। যে ভিত্তিটা কারো পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব হবে না এবং সেই ভিত্তি তৈরি হলে কোনো দেশের পক্ষে নতুন বাংলাদেশ তৈরি হতে কোনো বাধা থাকবে না।

ভয়েস অব টাইমস-এর সম্পাদক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অংশ নেন সাংবাদিক ওলীউল্লাহ নোমান, জামায়াতে ইসলামীর পল্টন থানার আমির শাহীন আহমেদ খান, লেখক ও গবেষক সারোয়ার তুষার, সাংবাদিকনেতা শহীদুল ইসলাম। 

আমার বই পড়ে তরুণরা গণঅভ্যুত্থানের দিক-নির্দেশনা পেয়েছে: ফরহাদ মজহার

দেশ ছেড়েছেন আওয়ামী লীগের অনেকেই by মাহমুদুল হাসান

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের এক মাস পরও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অবৈধভাবে দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। পালাতে গিয়ে সীমান্তে ধরাও পড়েছেন কেউ কেউ। সীমান্ত পার হতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, গত সপ্তাহে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন। এঁদের আগে (৫ আগস্টের পর) দেশ ত্যাগ করেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী (নওফেল), সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ (নাসিম) ও আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ অনেকে।

যাঁরা পালিয়ে গেছেন বা পালানোর চেষ্টায় আছেন, তাঁদের প্রায় সবাই হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, সরকার পতনের এত দিন পরও কীভাবে এসব ব্যক্তি দেশ ছেড়ে পালাতে পারছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমসহ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের আরও বেশ কয়েকজন নেতার দেশ ছাড়ার গুঞ্জন রয়েছে। তবে তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকেরই ধারণা, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপর ওবায়দুল কাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নেন। পরে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত চলে যান। সাবেক একজন মন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি শুনেছেন ওবায়দুল কাদের এখন দুবাই আছেন।

শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দিন ও তাঁর ছেলে শেখ সারহান নাসের (তন্ময়), হেলালের ভাই সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল এবং আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে ও বরিশালের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ এখনো দেশ ছাড়ার সুযোগ পাননি। তাঁরা দেশের ভেতরে আছেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।

শেখ হাসিনার আরেক আত্মীয় আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের কিছুদিন আগেই ভারতে চলে যান। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ৩ আগস্ট রাতে পরিবারসহ দেশ ছাড়েন। তিনি ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর যান। তাঁর পরিবার পৃথক ফ্লাইটে যায় লন্ডনে। তাপসের ভাই যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস (পরশ) সরকার পতনের কয়েক দিন আগে, ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরেছিলেন। তিনিও দেশে আছেন বলে জানা গেছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও আন্দোলনের সময় সপরিবার সিঙ্গাপুরে চলে যান। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের (বিপু) অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান অবশ্য সরকার পতনের পর শুরুতেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিদেশ যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদও। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ৩০ জন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন।

৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়েছেন আওয়ামী লীগের এমন অন্তত ১৫ কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের নাম বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। অবৈধ পথে দেশ ছাড়ায় ইমিগ্রেশন বিভাগের নথিতে তাঁদের দেশত্যাগের তথ্য নেই। এর বাইরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের মধ্যে অন্তত ২৭ জনের দেশ ছাড়ার খবর জানা গেছে। তবে দেশ ছেড়ে পালানো ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা কয়েক শ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ৫ আগস্টের কিছুদিন আগে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে আর দেশে ফেরেননি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের এমন অন্তত ১৩ নেতার নাম জানা গেছে।

অবৈধ পথে এভাবে দেশ ছাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী তাঁর মুখপাত্রের মাধ্যমে প্রথম আলোকে বলেন, সীমান্তে নজরদারি রয়েছে। সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেই সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিসহ অনেকেই বিভিন্ন সীমান্তে ধরা পড়ছেন। এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।

আরও দেশ ছেড়েছেন যাঁরা

ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি মধ্যম ও নিম্ন সারির অনেক নেতাও দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এ ছাড়া অনেকে পালানোর সুযোগ খুঁজছেন বলে জানা গেছে। যাঁদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আরও যেসব নেতার দেশত্যাগের খবর পাওয়া গেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন (রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র), সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ (জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ) ও শফিউল আলম চৌধুরী (নাদেল), দলের দপ্তর সম্পাদক ও শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ও কার্যনির্বাহী সদস্য নির্মল কুমার চ্যাটার্জি। এ ছাড়া সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, কুমিল্লা সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও তাঁর মেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তাহসিন বাহার এবং ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীও দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।

এই তালিকায় আরও রয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবির (ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক), যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন (নিখিল), ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ (ইনান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির (শয়ন), ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, যুবলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জয়দেব নন্দী প্রমুখ।

এ ছাড়া বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিপ্লব কুমার সরকারও ১০ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রাম সীমান্ত দিয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন বলে খবর বের হয়েছে। এমন আরও অনেকে এভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টায় আছেন বলে জানা গেছে।

কোন পথে, কীভাবে দেশ ছাড়ছেন

ইতিমধ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন এমন বেশ কয়েকজনের পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট), যশোর অঞ্চল, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে দেশ ছাড়ার প্রবণতা বেশি। এ জন্য জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ২৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় সীমান্তের দুই পাশের দালালদের।

ভারতে পালানোর সময় গত ২৩ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তে স্থানীয় লোকজনের হাতে ধরা পড়েন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক)। স্থানীয় লোকজনের ধারণ করা একটি ভিডিওতে তখন তাঁকে বলতে শোনা যায়, তিনি ১৫ হাজার টাকা চুক্তিতে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। যাঁদের সহায়তায় তিনি পালাচ্ছিলেন, তাঁরা তাঁর কাছে থাকা ৬০-৭০ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন এবং সীমান্তের ওপারে নিয়ে মারধর করেছেন।

২৪ আগস্ট রাতে সিলেটের কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর সময় মারা যান ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান (পান্না)। লাশ উদ্ধারের পর মেঘালয় পুলিশ সূত্র গণমাধ্যমকে বলেছে, গলা টিপে শ্বাসরোধের কারণে ইসহাকের মৃত্যু হয়েছে।

১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তে আটক হন চট্টগ্রামের রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী।

পলাতক অন্য ব্যক্তিরা কোথায়

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীসহ ওই সরকারের সুবিধাভোগীরা আত্মগোপনে চলে যান। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে ৬২৬ জন আশ্রয় নেন বলে ১৮ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনীতিক, বিচারক, প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও বাকিরা সেনানিবাস থেকে বের হয়ে কোথায় অবস্থান করছেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন বলে প্রচার আছে।

এ ছাড়া আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, মোহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা আত্মগোপনে আছেন। আবার আত্মগোপনে থাকা কেউ কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ ছেড়েছেন বলে ঘনিষ্ঠদের দিয়ে প্রচার করাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

তাঁরা কীভাবে ভারতে আছেন

পাসপোর্ট, ভিসা ছাড়া কিংবা ইমিগ্রেশন সম্পন্ন না করে পলাতক ব্যক্তিদের বিষয়ে ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহনশীল আচরণ করছে বলে জানা গেছে। তাঁদের কারও কারও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসের অনুমতি (পিআর) বা গ্রিন কার্ড রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ ভারতের ইমিগ্রেশন বিভাগকে ‘ম্যানেজ’ করে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী এই প্রক্রিয়ায় ভারত থেকে লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেউ কেউ অবৈধ পথে ভারতে গিয়ে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্টে বাংলাদেশ থেকে বহির্গমন ও ভারতের প্রবেশের সিল লাগানোর ব্যবস্থা করছেন।

বিত্তশালীরা পালিয়েছেন, কর্মীরা কষ্টে

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিপুল অর্থের মালিক আওয়ামী লীগের এমন নেতাদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা বা চেষ্টা বেশি।

এ নিয়ে দেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ১১ জন নেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাঁরা বলেন, দেশ ছাড়ার পর নেতারা আর দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের খোঁজ নিচ্ছেন না। অনেকে আগের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরসহ ফেসবুক ও মেসেঞ্জার বন্ধ রেখেছেন। বিপদে আছেন তৃণমূলের অসচ্ছল নেতা-কর্মীরা।

হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিদেরও সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক নাইম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা ভারতে যাচ্ছেন, তাঁরা তো আগে দেশের ভেতর দিয়েই সীমান্তে যান। তাঁরা কীভাবে সীমান্তে যাচ্ছেন, সেটা জানা জরুরি। পাশাপাশি তল্লাশিচৌকি বসিয়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া সীমান্তে মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

দেশ ছেড়েছেন আওয়ামী লীগের অনেকেই

হিজবুল্লাহর কেনা ৫ হাজার পেজারে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে দিয়েছিল মোসাদ, কিন্তু কীভাবে

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কেনা পাঁচ হাজার পেজারের (যোগাযোগের যন্ত্র) ভেতরে বিস্ফোরক রেখে দিয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। গতকাল মঙ্গলবার লেবাননে পেজার বিস্ফোরণের ঘটনার মাস কয়েক আগেই এ কাজ করে তারা। লেবাননের একটি জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র এবং অন্য একটি সূত্র রয়টার্সকে এসব কথা বলেছে।

গতকাল লেবাননজুড়ে কয়েক হাজার পেজারে বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় ৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত প্রায় ৩ হাজার জন। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, পেজার বিস্ফোরণে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন।
লেবাননের নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, পেজারগুলো তাইওয়ানভিত্তিক গোল্ড অ্যাপোলো কোম্পানির। এই কোম্পানি থেকে পাঁচ হাজার পেজার কিনতে আদেশ (ক্রয়াদেশ) দিয়েছিল হিজবুল্লাহ।

কয়েকটি সূত্র বলেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে পেজারের চালানটি লেবাননে পৌঁছায়।

তবে গোল্ড অ্যাপোলো কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হসু চিং-কুয়াং বলেছেন, বিস্ফোরণ ঘটানোর কাজে ব্যবহৃত পেজারগুলো তাঁর কোম্পানি উৎপাদন করেনি। এগুলো তৈরি করেছে ইউরোপীয় একটি প্রতিষ্ঠান। এটির তাইপেভিত্তিক গোল্ড অ্যাপোলোর ব্র্যান্ড ব্যবহারের অনুমতি ছিল।

তবে ইউরোপীয় কোম্পানিটির নাম তাৎক্ষণিকভাবে উল্লেখ করেননি কুয়াং। আজ বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পণ্যটি (পেজার) আমাদের নয়। সেখানে (পণ্য) আমাদের ব্র্যান্ডের নামটি বসানো হয়েছে শুধু।’

ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ পেজার বিস্ফোরণের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তারা বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

তবে এই বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, পরিকল্পনাটি বেশ কয়েক মাস ধরে করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

লেবাননের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র পেজারের এপি ৯২৪ মডেলের একটি ছবি শনাক্ত করেছে। এটি দেখতে অন্য পেজারের মতোই। তারহীন এই যন্ত্রে বার্তা আসে, তা দেখা যায়; কিন্তু এই যন্ত্রের মাধ্যমে ফোন করা যায় না।

ইসরায়েল যেন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের অবস্থান শনাক্ত করতে না পারে, সে জন্য যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে গোষ্ঠীটি পেজার ব্যবহার করে আসছে। হিজবুল্লাহর কার্যক্রম সম্পর্কে জানা আছে—এমন দুটি সূত্র রয়টার্সকে চলতি বছর এ তথ্য জানিয়েছিল।

লেবাননের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র বলেছে, উৎপাদন পর্যায়েই পেজারগুলোয় পরিবর্তন (মডিফাই) এনেছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

একই সূত্র বলেছে, মোসাদ যন্ত্রের (পেজার) ভেতরে একটি বোর্ড ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এই বোর্ডে বিস্ফোরক উপাদান ছিল। এর একটি সাংকেতিক ভাষা গ্রহণের ক্ষমতা ছিল। যেকোনোভাবেই হোক, এটি শনাক্ত করা খুব কঠিন। এমনকি কোনো যন্ত্র বা স্ক্যানার দিয়েও শনাক্ত করা যায় না।

সূত্রটি বলেছে, যে তিন হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয়েছে, সেগুলো বিস্ফোরণের আগে সাংকেতিক বার্তা পাঠানো হয়েছিল। আর এ কারণে বিস্ফোরকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

আরেকটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, নতুন পেজারগুলোর মধ্যে তিন গ্রাম পর্যন্ত বিস্ফোরক লুকানো ছিল। কয়েক মাসেও হিজবুল্লাহ তা শনাক্ত করতে পারেনি।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।

তাইওয়ানে গোল্ড অ্যাপোলো কোম্পানির প্রদর্শনীতে রাখা পেজার
তাইওয়ানে গোল্ড অ্যাপোলো কোম্পানির প্রদর্শনীতে রাখা পেজারফাইল ছবি: রয়টার্স

মিশন শেষ করে হাসিনা ঠিকই পালালেন by ডাঃ ওয়াজেদ খান

শেখ হাসিনা পিতার দেখানো পথেই হাঁটলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মূহূর্তে পালালেন দেশ ছেড়ে। সাথে নিয়ে গেলেন বোন রেহানাকে। ভয়ংকর অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে গেলেন নিজ দলের নেতাকর্মী ও অনুগত প্রশাসনকে। পালানোর বিষয়টি তিনি আগে জানান দেননি কাউকে। হাসিনার পরিবারের সদস্যরা আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে বোন রেহানাকে নিয়ে যে মিশনে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন, সেই মিশন শেষে বোনকে নিয়ে পালালেন তিনি। দীর্ঘ ৪৩ বছরে শেখ পরিবারের হত্যাকারীদের বিচারসহ হাসিনা চরিতার্থ করেছেন তার সকল বিকৃত জিঘাংসা। স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় শাসন করেছেন বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করে বংশের সব সদস্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিভিন্ন দেশে। শেখ হাসিনা যে ভারত থেকে বোনকে নিয়ে ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন, বোনকে নিয়ে সেই ভারতেই পালালেন তিনি। তার পলায়নের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে অবসান ঘটলো শেখ পরিবারের নেতৃত্বের। পদত্যাগ করার শেষ মূহূর্তেও দম্ভ, অহমিকা ও ঔদ্ধত্য স্পষ্ট ছিলো তার আচরণে। “বঙ্গবন্ধু কন্যা কখনো পালায় না” এমন উক্তি তিনি করেছেন বহুবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পালিয়েছেন সবকিছু পেছনে ফেলে। এই পালানোর মধ্য দিয়ে হাসিনা তার প্রয়াত পিতার দেখানো পথেই হেঁটেছেন। শাসন কাজেও অনুসরণ করেছেন পিতাকে।

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালো রাতে শেখ মুজিব সাড়ে সাত কোটি মানুষকে পাকবাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে দাঁড় করিয়ে চলে যান পশ্চিম পাকিস্তানে। পঁচিশে মার্চের কালো রাতে পাকবাহিনী জঘন্যতম গণহত্যায় নামছে এমন আগাম বার্তা ছিলো শেখ মুজিবের কাছে। এজন্য দলের কিংকর্তব্যবিমুঢ় নেতারা ছুটে যান তার বাসায়, দিক নির্দেশনা চান নেতার নিকট। এমনকি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ টেপ রেকর্ডার নিয়ে ৩২ নম্বরের বাসায় যান স্বাধীনতার ঘোষণা রেকর্ড করতে।  কথিত আছে যুদ্ধের ময়দানে আত্মসমর্পণকারী সেনাপতির চেয়ে লড়াকু সৈনিকের মূল্য অনেক বেশি।” কিন্তু ইতিহাস থেকে সব সৈনিকের নাম মুছে ফেলেন শেখ মুজিব। এমনকি বাদ যায়নি মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী। তারপরের ঘটনা সবারই জানা। মুক্তিযুদ্ধের ৮ মাস ২১দিনে লাখো মানুষের প্রাণহানি, মা-বোনের ইজ্জত ও ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা পায় বাংলাদেশের মানুষ। শেখ মুজিবের নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে সত্য। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন না তিনি। মুজিব যুদ্ধের বিভৎসতা ও গণহত্যা দেখেননি, শোনেননি সন্তানহারা মায়ের আহাজারি । মুক্তিযুদ্ধে তিনি বা তার দলের চেয়ে বড় অবদান ছিলো দেশের আপামর জনতার। সাধারণ মানুষই নির্ভীক সৈনিক হিসেবে লড়েছে রণাঙ্গনে। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার পুরো ফসল গোলায় তোলে শেখ পরিবার ও তার দল। শেখ মুজিব বনে যান প্রেসিডেন্ট। একদলীয় শাসন, শোষণ ও ক্ষমতার শতভাগ ভোগদখল করেন তারা। খুন-হত্যা-রাহাজানি-ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, অপশাসনে অল্প দিনেই  মুজিব হয়ে উঠেন বিতর্কিত ও অজনপ্রিয়। ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছায় বাংলাদেশ।

ইতিহাসের বাক ঘুরে ২১ বছর পর পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুজিব কন্যা হাসিনা ফিরে আসেন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায়। দ্বিতীয় দফায় ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে কায়েম করেন স্বৈরশাসন। সংবিধান শিকেয় তুলে রেখে অনুসরণ করেন পিতার প্রদর্শিত বাকশালী কায়দা। বিগত দেড় দশকে পরপর তিনটি সংসদীয় নির্বাচনে বিনা ভোটে দখলে রাখেন রাষ্ট্র ক্ষমতা। বাংলাদেশকে পরিণত করেন এক বৃক্ষের বাগানে। গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে শুধু দল বা  পরিবারে সীমিত না রেখে নিয়ে নেন ব্যক্তি মালিকানায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ১৭ কোটি মানুষের অধিকার হরণ করে ধ্বংস করে দেন রাষ্ট্রের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্মম, নৃশংসভাবে মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করেন নিজ দেশের হাজারো মানুষকে। দেড় দশকে ২ হাজার ৭’শ মানুষকে হত্যা করেন বিচারবর্হিভূতভাবে। তার শাসনামলে গুমের শিকার হয়েছে প্রায় ৭’শ মানুষ। অভিযোগ আছে, হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার সরকারের অভিষেক হয় পিলখানায় সেনাবাহিনীর ৫৭জন চৌকষ অফিসারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এরপর মোটা দাগে গণহত্যা চালায় তার বাহিনী হেফাজতে ইসলামের সদস্যদের উপর। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দোহাই দিয়ে হত্যা করেন অনেককে। গোপন কারাগার আয়না ঘর তৈরি করে গুমকৃতদের নীপিড়ন-নির্যাতন এবং হত্যার শিকারে পরিণত করা হয়। বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে মামলা দিয়ে করা হয় কারারুদ্ধ। দেশকে ঠেলে দেন সাক্ষাত নরকে। মানুষের পিঠ ঠেকে যায় দেয়ালে। সাামাজিক বৈষম্য যখন চরমে এমন একটি ক্রান্তিকালে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আমাদের সন্তানেরা।

যে বৈষম্যের কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয় একাত্তরে, সেই বৈষম্যের অবসান ঘটাতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদেরকে “রাজাকারের বাচ্চা” বলে গালি দিয়ে তাদেরকে দমাতে লেলিয়ে দেন রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের। চালান নির্বিচার গণহত্যা।  নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে প্রায় একহাজার মানুষ। শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধে ফুঁসে উঠে সারাদেশ। একমাস ৬ দিনের আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। তারপরের ঘটনা সৃষ্টি করেছে নজিরবিহিন বিশ্ব ইতিহাস। নূতন করে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। যে নতুন প্রজন্ম এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে ছিলো হতাশা, তারাই আজ পরিণত হয়েছে জাতির ভরসাস্থলে। শেখ হাসিনা এখানো আওয়াজ দিচ্ছেন ভারতে বসে। কিন্তু ইতিহাস বলে বিশ্বের পলাতক স্বৈরশাসকদের কেউই পরবর্তীতে ফিরতে পারেনি রাজনীতিতে। উল্টো নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। এমনকি ক্ষমতাচ্যুতির দীর্ঘদিন পরও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি স্বৈরাচারদের সন্তানরা। দাঁড়াতে পারেনি তাদের রাজনৈতিক দলগুলোও। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, গুম ও গণহত্যা অন্যান্য দেশের স্বৈরাচারের তুলনায় নজিরবিহীন ও ভয়ঙ্কর। জুলাই-আগষ্টের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পালিয়ে গিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন হাসিনা। ভারত জরুরি ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক আশ্রয় দিয়েছে তাকে। তার পরবর্তী গন্তব্য জানা নেই কারো। হাসিনা বা তার পরিবারের কেউই আর কখনো যে দেশে ফিরতে পারবেন না সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত। দেশে শতাধিক হত্যা মামলা ও মানবতা বিরোধী অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা ‘চট’ করে দেশে ফিরবেন তার এমন উক্তি হাস্যকর। স্বৈরাচারী ও নৈরাশ্যবাদী হাসিনা নাকি মানসিকভাবে অসুস্থ এমনটি দাবি করেছেন তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। শুধু এখন নয় হাসিনার মানসিক অসুস্থতা আজন্ম। ‘প্যাথলজিক্যাল লায়ার’ হাসিনা চট করে দেশে ফিরে আসুক এমনটিই চাচ্ছে দেশের মানুষ।

(ডা: ওয়াজেদ খান
সম্পাদক
সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক।
Email:weeklybangladesh@yahoo.com)

mzamin

জঙ্গিবাদে অর্থদাতা নিষিদ্ধ এনজিও চালাতেন মনিরুল! by শরিফ রুবেল

মনিরুল ইসলাম। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ এসবি’র সাবেক প্রধান। এক সময়ের প্রবল প্রতাপশালী এই অতিরিক্ত আইজিপি’র অনিয়মের শেষ নেই। ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার থেকে এসবি প্রধান। গত ১০ বছরে নাটকীয় উত্থান। অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ক্রসফায়ারের হুমকি, তুলে নিয়ে ডিবি দিয়ে নির্যাতন, বিঘায় বিঘায় জমি দখল, বাড়ি দখল, ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে কোটি টাকা আদায়, মামলা বাণিজ্য, জঙ্গি নাটক সাজিয়ে মালিককে গ্রেপ্তার করে এনজিও ছিনতাই, শ্যালককে দিয়ে পিডব্লিউডির টেন্ডারবাজি এমন কোনো কাজ নেই, যা করেনি এই মনিরুল। জঙ্গি দমনে কাজ করা এই মনিরুল নিজেই জঙ্গিবাদে অর্থদাতা হিসেবে পৃথিবী জুড়ে নিষিদ্ধ দুটি এনজিও পরিচালনায় জড়িত ছিলেন। রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ও পুনর্বাসনের নামে ৭ বছরে এই এনজিও মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অনুদান এনেছে। নানা অনিয়ম, দুর্নীতিতে জড়ানো এই পুলিশ কর্মকর্তা শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরে গা ঢাকা দিয়েছেন।

যেভাবে নিষিদ্ধ এনজিওর দখল করেন মনিরুল: মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক দুটি এনজিওর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সূত্র বলছে, ১৯৯৪ সালে কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি নামে একটি এনজিও বাংলাদেশে তাদের প্রথম কার্যক্রম শুরু করেন। এটি পরিচালনা করতেন একটি প্রভাবশালী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয়সারির নেতা মো. জামাল আব্দুল খালেক আল নুরী। প্রথমদিকে এনজিওটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা নির্মাণ ও ছিন্নমূল বয়স্ক মানুষের পুনর্বাসনের কাজ করতো। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৬ সালে মনিরুল ইসলাম জঙ্গি দমনে গঠিত কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের প্রধান হয়েই কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি নামে এনজিওটির চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করেন। পরে এনজিওটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। নাম সংস্কার করে কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ নাম দেন। এরপর দখল করেন শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেকটি এনজিও। জাতীয় এনজিও ব্যুরোর নথি বলছে, ২০১৭ সালে নভেম্বর মাসের ২ তারিখে কুয়েত জয়েন্ট কমিটি এনজিওটির নাম পরিবর্তন করা হয়। যাতে মনিরুল ইসলাম সুপারিশ করেন। এরপর থেকেই এনজিও দুটি ভিন্ন নামে ভিন্ন রূপে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যার নেপথ্যে ছিলেন এসবি সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম। তার প্রভাবে এই এনজিও কার্যক্রম নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পাননি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জঙ্গিবাদে অর্থদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক এনজিও দুটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। বাংলাদেশেও এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি ২০১৭ সালে জঙ্গি সংগঠনগুলোর অর্থ জোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত ১৭টি এনজিওর তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই তালিকায় মনিরুল ইসলামের দখল করা এনজিও দুটির নামও ছিল। পরে নাম কিছুটা সংস্কার করে প্রভাব খাটিয়ে ওই তালিকা দেখে এনজিও দুটি দেন মনিরুল ইসলাম। গোপনে তিনি ওই এনজিওর মাধ্যমে কুয়েত থেকে অর্থ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যান। তবে ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি টের পেয়ে গেলে তিনি কৌশলে ওই এনজিওর মালিকানা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। পরে ২০১৮ সালে ২০শে জুন এনজিওটির চেয়ারম্যান বানানো হয় মনিরুল ইসলামের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনকে। অনুসন্ধান বলছে, দুটি এনজিও গত ৭ বছরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের নামে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা অনুদান সংগ্রহ করে। যার নেপথ্যে ছিলেন মনিরুল ইসলাম নিজেই। বর্তমানে এনজিওটির নামমাত্র প্রধান গাজী জহিরুল ইসলাম। কিন্তু নাম থাকলেও এটি পরিচালনা করেন রেজাউল আলম শাহীন নিজেই।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেএসআর কুয়েত ভিত্তিক একটি খাদ্য বিতরণ এনজিও। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া এনজিওটির পূর্ব নাম ছিল রিভাইভাল অব দ্য ইসলামিক হেরিটেজ। নাইন ইলেভেনে যুক্তরাষ্ট্রের টু-ইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে এনজিওটির বিরুদ্ধে। এজন্য ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বের অনেক দেশে এনজিওটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামে দুটি এনজিও যত নির্মাণ কাজ করেছে তার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছে রেজাউল হক শাহীনেরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএস এন্টারপ্রাইজ। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অবকাঠামো নির্মাণ কাজে সহায়তা প্রদান করেছে। এর মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুয়েতভিত্তিক নিষিদ্ধ কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ এবং শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনালের অনুদানের পুরোটাই মনিরুলের সহায়তায় লুটপাট করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এসবি প্রধান মনিরুলের দাপটে এই এনজিওর আয়-ব্যয় ও অফ চ্যানেলে অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেনের কোনো ফাইল আটকাতে পারেনি এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থা। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের উচ্চ মহলে এই এনজিও দুটির আর্থিক লেনদেনে অসামঞ্জস্যতা ও পুনর্বাসন প্রকল্পে দুর্নীতির প্রতিবেদন দিলেও মনিরুলের দাপটে তা আটকে যায়। ওই গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটির (কেজেআরসি)’র আর্থিক সন্দেহজনক লেনদেন ও প্রকল্পে অনিয়মের জন্য এনজিওটি বন্ধের সুপারিশ করলে তখন মনিরুলের প্রভাবে আটকে যায়। কুয়েত সোসাইটি ফর রিফিল (কেএসআর) যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৬৫১ এবং শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৮২৫। দুটি এনজিও-ই হাউস-০২, রোড ০৬/এ, সেক্টর-০৪, উত্তরা, ঢাকা: ১২৩০ ঠিকানা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা। এনজিও দুটির পরিচালনায় অন্য ব্যক্তিরা থাকলেও সরকারি নথি ও দাপ্তরিক কার্যাবলিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে মনিরুলের শ্যালক শাহীনের নামই ব্যবহার করা হয়েছে।

মনিরুলের যত হোটেল রিসোর্ট:
পুলিশের চাকরিতে থেকেই গত এক দশকে প্রভাব খাটিয়ে কয়েক একর জমি দখল করে হোটেল ও রিসোর্ট করেছেন মনিরুল ইসলাম। তবে সরাসরি নিজের নামে না করে তা শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনের নাম ব্যবহার করেছেন। ২০১৭ সালে কক্সবাজারের ডলফিন মোড়ে একটি ৫ তারকা হোটেল করেন মনিরুল। নাম ‘হোটেল দ্য আলম’। হোটেলটি ১২ তলা বিশিষ্ট। যা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন। বিলাসবহুল এই পাঁচ তারকা হোটেলের মালিক মনিরুলের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন। এ ছাড়া ফরিদপুর শহরের চরকমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মনিরুল ইসলামের নামে ১৫ কাঠার একটি প্লট আছে। সম্প্রতি ওই প্লটে একটি বাংলো বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাভারের ধউর ব্রিজ পার হয়ে (জিরাবোর দিকে যেতে) হাতের ডান দিকে রাস্তা ঘেঁষা কয়েক একর জমি আছে মনিরুল ইসলাম, শ্যালক রেজাউল ও স্ত্রী শায়লা ফারজানার নামে। যার অধিকাংশ দখল করা। মনিরুলের ভয়ে জমির মালিকরা প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারেনি। এ ছাড়া গাজীপুরে মনিরুলের শ্যালক শাহীন ও গাজী জহিরুল আলমের নামে এক দাগে ৪ একর জমি কিনেছেন মনিরুল ইসলাম। ওই জমির দখল নিয়ে বিরোধ চলছে। এদিকে ২০১৭ সালে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান বাহেরকুচিতে ঢালিস আম্বার রিসোর্টের পাশে প্রায় ১৫ একর জমি কেনেন মনিরুল ইসলামের স্ত্রী শায়লা ফারজানা। শায়লা ফারজানা তখন মুন্সীগঞ্জের ডিসি ছিলেন। তিনি থাকা অবস্থায় এই জমি ক্রয় করা হয়। বর্তমানে এই জমিতে একটি মিনি রিসোর্টের নির্মাণ কাজ চলমান আছে। একটি সূত্র বলছে, ডিসি থাকা অবস্থায় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প, রেললাইন, ফেরি ঘাট স্থানান্তরিত করতে শত শত একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। তখন ভূমি অধিগ্রহণে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়ম করে শত কোটি টাকা আয় করেন তৎকালীন মুন্সীগঞ্জের সাবেক ডিসি শায়লা ফারজানা। ওই টাকা দিয়েই বাহেরকুচি ইছাপুরা এলাকায় এই জমি ক্রয় করেন মনিরুল দম্পতি।

সাংবাদিক নির্যাতনে ভয়ঙ্কর মনিরুল:
২০২১ সালের ৩১শে মে রাতে মনিরুল ইসলামের নির্দেশে সাবেক ডিসি কাজী শফিকুল আলম সাংবাদিক নুজহাতুল হাচানকে চোখ বেঁধে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ডিবিতে ৫দিন আটকে রেখে ক্রসফয়ার দিতে উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে পলাতক দেখিয়ে ২টি মামলা দেয়া হয়। ৫ বছর মনিরুলের রোষানলে পড়ে পুলিশের হয়রানি, মামলা ও মারধরের শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়ান এই সাংবাদিক। নুজহাত ওই সময়ে একটি  বেসরকারি টেলিভিশনে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে মনিরুলের স্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা ওই টেলিভিশনে ফোন করে নুজহাতকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য করেন। জোরপূর্বক এই সাংবাদিকের সম্পাদনার একটি পত্রিকা অফিস ভেঙে দেয়া হয়। ডিবি পুলিশ দিয়ে অফিসে তালা মেরে দেয়া হয়। পুলিশ ওই পত্রিকা অফিসের কম্পিউটার ও গুরুত্ব্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায়। এ বিষয়ে সাংবাদিক নুজহাতুল হাচান মানবজমিনকে বলেন, ২০২১ সাল থেকে ২৩ সাল পর্যন্ত আমার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন করেন মনিরুল। আমাকে ডিবিতে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে পেটানো হয়। ৫দিন আমাকে পিটিয়ে প্রায় পঙ্গু করে দেয়া হয়। ২০২১ সালের ৪ঠা জুন মনিরুলের নির্দেশে আমার স্ত্রীকে ডিবিতে ডেকে নিয়ে তাদের কিছু শর্ত মেনে নিলে আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে বলা হয়। প্রথমত, আমি আর সাংবাদিকতা করতে পারবো না, আমি পত্রিকা চালাতে পারবো না, আমার নির্যাতন নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে পারবো না। ঢাকায় থাকতে পারবো না, গ্রামে চলে যেতে হবে। তখন আমার স্ত্রী আমাকে বাঁচাতে নিরুপায় হয়ে সকল শর্ত মেনে নেয়। পরে ডিবি অফিসে স্ট্যাম্পে লিখিত রেখে মুচলেকা দিয়ে আমাকে ছেড়ে দেয়। তাদের শর্তগুলো না মানলে ভবিষ্যতে আমার নামে মামলা হবে এবং ডিবিতে ধরে এনে শেষ করে দিবে হুমকি দেন। আমি ২০২১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত গ্রামে মনিরুলের বিশেষ নজরদারিতে গৃহবন্দি অবস্থায় থাকি। বাড়ি থেকে বের হতে পারতাম না। জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যেতে পারতাম না। প্রায়ই বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হতো। মনিরুল ইসলাম অতিরিক্ত আইজিপি হওয়ার পর আমাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পুরাতন দুটি মামলায় পলাতক দেখিয়ে, আদালতে চার্জশিট দিয়ে ওয়ারেন্ট জারি করে ডিবি উত্তর। আমি তখন জামিন চেয়ে কোর্টে সারেন্ডার করি। আদালত জামিন না দিয়ে আমাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়। প্রায় ২৫ দিন  জেল খেটে জামিনে মুক্তি পাই। অত্যাচার সইতে না পেরে জীবন বাঁচাতে ২০২৩ সালে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পরে রাশিয়ার ভিসা নিয়ে বিদেশে যেতে গেলে আমাকে এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনে আটকে দেয়া হয়। তখন আমার পাসপোর্ট জব্ধ করান মনিরুল। দেয়া হয় একাধিক মামলা।

শ্যালকের নামে কেনা মনিরুলের যত সম্পদ:
রেজাউল আলম শাহীন মনিরুল ইসলামের শ্যালক এবং সম্প্রতি ওএসডি হওয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা শিউলির ছোট ভাই। সদ্য সাবেক গাজীপুরের এসপি কাজী সফিকুল আলমের শ্যালক। মনিরুলের দেশে যে সকল অবৈধ সম্পদ রয়েছে তার অধিকাংশই তার বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে। তবে এদের মধ্যে তার বিশ্বস্ত শ্যালক শাহীন ও তার  স্ত্রী সানজিদা বেগম ওরফে তানজিন টুম্পার নামে অনেক সম্পদই কিনেছেন মনিরুল। এর ফলে রাতারাতি হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন শাহীন। অথচ ২০১৮ সালেও তিনি ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরে একটি ছোট বাসায় ভাড়া থাকতেন।

বেনামে মনিরুলের যত বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট:  ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন মনিরুল-সায়লা দম্পতি। ভাই, বোন, শ্যালকের নামে এসব সম্পদ করে নিজেদের আড়ালে রেখেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫৫/১ বেইলি রোডে রূপায়ন স্বপ্ন নিলয় টাওয়ারে  মনিরুলের ৪৮০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া মিরপুরের বিজয় রাকিন সিটিতে ৩৮০০ স্কয়ার ফিটের আরও একটি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। যেখানে মনিরুল ইসলামের শ্যালক রেজাউল শাহীন পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। মিরপুর পুলিশ কলেজের পাশে পুলিশ কনভেনশন সংলগ্ন ২.৫ কাঠার প্লটে ১০ তলা বাড়ি। মিরপুর ডিওএইচএস সংলগ্ন ৬ কাঠার প্লট। উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে ৬ কাঠার ৪টি প্লট রয়েছে মনিরুলের যার ২টি শাহিন ও তার স্ত্রীর। রাজধানীর মিরপুর, উত্তরাতে ৫৫টি ফ্ল্যাট কিনেছেন মনিরুল যা তার শ্যালক শাহীন ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, মিরপুর ১০ নম্বরে একাধিক বাড়ি রয়েছে মনিরুলের।

মনিরুলের যত দখল: গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে মনিরুলের বিশাল একটি বাগান বাড়ি রয়েছে। যার মূল্য ৫ কোটি টাকার বেশি হবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া মুকসুদপুর বাটিকামারী ডিগ্রি কলেজের পেছনে ৫৬ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখলে নেন মনিরুল ইসলাম। পুলিশি চাপে পড়ে নামমাত্র দামে ওই জমি কিনে নেন মনিরুল ইসলাম। এ ছাড়া নিজ গ্রাম বাহাড়া এলাকায়ও মনিরুলের বিরুদ্ধে বিঘায় বিঘায় জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। গোপালগঞ্জ ও গাজীপুরে মনিরুলের মাছের দুটি ঘের রয়েছে বলেও তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা গেছে।

বিদেশে ছেলের নামে ব্যবসা:  
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মনিরুলের লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। মনিরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সিলেটের সদ্য সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার লন্ডনে বড় ব্যবসায়ী। এই আনোয়ারের ব্যবসায় মনিরুলের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা গেছে। মনিরুলের একমাত্র ছেলে অনন্য ইসলামও লন্ডনে থাকেন। ছেলেই ওই ব্যবসা ও সম্পদের দেখভাল করেন। এ ছাড়া কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মিরপুর শাখায় মনিরুল ইসলাম, সায়লা ফারজানা ও শ্যালক শাহীনের গোপন বেশ কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যে অ্যাকাউন্টগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক অস্বাভাবিক লেনদেন  হয়েছে বলে ওই ব্যাংকের একটি সূত্র মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন।

প্রভাব খাটিয়ে দখল ও টেন্ডারবাজি:  পিডব্লিউডিতে টেন্ডার বাণিজ্যে বেপরোয়া ছিলেন মনিরুলের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন। পিডব্লিউডি’র টেন্ডারে ছিল তার একচ্ছত্র আধিপত্য। দুলাভাই মনিরুল, বোন সায়লা ফারজানা ও আরেক দুলাভাই এসপি কাজী সফিকের ক্ষমতার দাপটে পিডব্লিউডিতে টেন্ডার বাণিজ্যে বেপরোয়া হয়ে উঠেন শাহীন। ঠিকাদারদের একটা সিন্ডিকেটকে পুরো নিয়ন্ত্রণ করতেন শাহীন। এসএস এন্টারপ্রাইজের নামে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। এমনকি টেন্ডার পাইয়ে দিতে নিতেন মোটা অঙ্কের কমিশন। মনিরুলের আরেক শ্যালক বুলবুল আহমেদ মামুন ঢাকার গণপরিবহনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিলেন। তিনি ঠিকানা পরিবহন, বসন্ত পরিবহনসহ বেশ কয়েকটি পরিবহনের মালিক ছিলেন। পরিবহন ব্যবসা থেকে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করেছেন এই মামুন। যা থেকে একটি অংশ সরাসরি মনিরুলের পকেটে চলে যেত। মামুন ঢাকার রাকিন সিটিতে ১৮০০ স্কয়ার ফিটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন। মিরপুরে তিনিও কিনেছেন বাড়ি। কাজী সফিকুল আলম মনিরুলের ভায়রা। তিনি গাজীপুরে ডিবির পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। অর্থের বিনিময়ে জমি দখল করে দেয়া, বালু ব্যবসা, পোস্টিং বাণিজ্য, মাদক ব্যবসায়ীদের আশকরা দেয়া, ওসির কাছ থেকে ঘুষ নেয়া এবং ঝুট ব্যবসাসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গাজীপুরের এসপি হিসেবে যোগদানের মাস দেড়েকের মধ্যেই কালীগঞ্জের নাগরী ইউনিয়নের উলুখোলা এলাকায় সাড়ে তিন কোটি টাকা দিয়ে জমি কেনেন শফিকুল। ডিবিতে থাকাকালীন সময়ে উত্তরাতে ৬ কাঠার একটি প্লট কিনেন। উত্তরাতে ৪টি ফ্লাট রয়েছে কাজী সফিকের। এ ছাড়াও মিরপুর, বনশ্রীতে তার আরও ৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামের মুঠোফোনে কল দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে খুদে বার্তা দিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। 

mzamin

মালয়েশিয়ায় কলিং ভিসা পুনরায় চালু by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়ায় কলিং ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। দেশটিতে প্লান্টেশন সেক্টরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে 'চাহিদাপত্র' সত্যায়ন করার ঘোষণার মধ্যে দিয়ে বন্ধ থাকা কলিং ভিসা পুনরায় চালু করলো আবার।

মঙ্গলবার, (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ খ্রি.) এক বিজ্ঞপ্তিতে প্লান্টেশন সেক্টরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে 'চাহিদাপত্র' সত্যায়ন করার জন্য এমন তথ্য জানিয়েছে মালেশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন। যার স্মারক নং- ৪৯.০১.৬০০১.০০৬.২০.০৮৫.২০২২.৫৫৩

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, উপর্যুক্ত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, মালয়েশিয়া সরকার নতুন করে তাদের প্ল্যান্টেশন সেক্টরে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইতিমধ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের কোটা অনুমোদন করা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে প্ল্যান্টেশন সেক্টরের চাহিদাপত্র ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সত্যায়ন করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়নের জন্য উল্লেখিত বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া তথ্যাদি বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়নের জন্য নিম্নোক্ত প্রায় ১৫ রকমের তথ্যাদি বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে:

এর মধ্যে কোম্পানির অনুমোদনপত্র (কমপক্ষে কোম্পানির একজন কর্মচারী হতে হবে ম্যানেজার পর্যায়ে), সত্যায়ন ফি’র মূল ব্যাংক স্লিপ, শ্রমিকদের সবশেষ বেতন স্লিপ (৪/৫ জন শ্রমিকের নমুনা বেতন স্লিপ), কোম্পানির পটভূমি তথ্যের একটি প্রোফাইল যেখানে উল্লেখ থাকবে বিদ্যমান শ্রমিকের সংখ্যা (দেশি ও বিদেশি), শ্রমিকদের ২/৩ জনের ফোন নম্বর, কোম্পানির ব্যাংক স্টেটমেন্ট (বিগত ৩ মাসের) যেখানে ১০০ শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম ব্যালেন্স থাকতে হবে ২ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত।

এছাড়াও বিদেশি শ্রমিক ক্ষতিপূরণ প্রকল্পের সকসো নথি (বিদ্যমান কর্মীদের নমুনা নথি), বিদেশি কর্মীদের হাসপাতালে ভর্তি এবং সার্জিকা ১ স্কিম (এসপিআইকেপিএ) (এসকেএইচপিপিএ)-এর নথি (বিদ্যমান শ্রমিকদের নমুনা নথি), বিদ্যমান শ্রমিকদের আবাসন সম্পর্কে জেটিকে অনুমোদিত সার্টিফিকেট, জমির মালিকানার দলিল/জমি ইজারা দলিল, প্রতিশ্রুতি/গ্যারান্টি পত্র, পরিচালকের স্বাক্ষরিত ডিমান্ড লেটার, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, কর্মসংস্থান চুক্তি, রিক্রুটিং এজেন্ট (বিআরএ) এবং কোম্পানির মধ্যে চুক্তি, মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক কোটা অনুমোদন পত্রসহ সকল নথির ২ সেট তৈরি করে ১ সেট মূল এবং ১ সেট অনুলিপি হিসেবে দিতে হবে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী স্টিভেন সিমের সঙ্গে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল তাকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানালেও সম্প্রতি ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ার পর এমন সিদ্ধান্তে উৎফুল্ল মালয়েশিয়া প্রবাসীরা।

mzamin

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারত আগ্রহী

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা হারান এবং পালিয়ে ভারত চলে যান।  হাসিনার ক্ষমতা হারানোয় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে ভারত। কেননা, ভারত বাংলাদেশের জনগণকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র হাসিনা সরকারের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন করেছিল। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এখন দিল্লি এবং ঢাকার সম্পর্ক নতুন করে পুনঃনির্মাণ করতে হবে।  খোদ ভারতেই এ নিয়ে বিস্তর আলাপ উঠেছে। দিল্লি এখন নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে কীভাবে তারা ঢাকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন করবে। বাংলাদেশের জনমনে ভারত-বিরোধিতা তুঙ্গে থাকায় দিল্লিকে এ বিষয়ে খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। মঙ্গলবার ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে যা হবে তা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাই। প্রতিবেশী দেশগুলো একে অপরের নির্ভরশীলতার উপর জোর দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিস্তারিত এই সাক্ষাৎকারে জয়শঙ্কর আরও বলেন, বাংলাদেশে যা হবে তা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের পক্ষ থেকে সম্পর্কটাকে স্থিতিশীল রাখতে চাই। আমাদের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক ভালো। উভয় দেশের জনগণের মধ্যে ভালো সম্পর্ক আছে- যেটা আমি চাই সম্পর্কটা যেন এমনই থাকে।

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে জুলাই মাসে আন্দোলনে নামেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। পরে পুলিশি বাধার মুখে একসময় শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়। এতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই অভ্যুত্থানে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হন হাসিনা। তিনি বর্তমানে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। ভারত থেকে হাসিনা যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন কিন্তু তাকে ভিসা দেয়া হয়নি। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী হাসিনা এখন ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর নিরাপত্তায় রয়েছেন।
গত মাসে জয়শঙ্কর পার্লামেন্টে বলেছিলেন, হাসিনা খুব অল্প সময়ের নোটিশে দিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। তারপর একটি সর্বদলীয় ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, হাসিনাকে তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ভারত সরকার সময় দেবে। হাসিনা পালানোর পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার শপথের পরই তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফোনকলের মাধ্যমে ড. ইউনূসকে শুভেচ্ছা জানান। পরে ড. ইউনূস বলেছেন যে, ন্যায্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করতে আগ্রহী বাংলাদেশ।  ৮৪ বছর বয়সী ড. ইউনূস বলেন, আমরা চাই বিশ্ব বাংলাদেশকে একটি সম্মানিত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। ভারতকে উদ্দেশ্য করে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সামনের দিনে ভারতকে একটি ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেটি হলো বাংলাদেশের সবাই ইসলামপন্থি, বিএনপি ইসলামপন্থি। বাকি সবাইও ইসলামপন্থি এবং (তারা) এই দেশটিকে আফগানিস্তানে পরিণত করবে। আর বাংলাদেশ শেখ হাসিনার হাতেই নিরাপদ। এসব ধারণা থেকে ভারতকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশও অন্য প্রতিবেশীর মতো একটি প্রতিবেশী দেশ।

mzamin

৭৫ দিনের শিশুটি এখন অসহায়: ৬ তলার বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সুমাইয়া by ফাহিমা আক্তার সুমি

নিষ্পাপ শিশুটির চোখে-মুখে শূন্যতা। মায়ের আদরমাখা স্পর্শ তাকে আর ছুঁয়ে যায় না। ছোট কোমল হাতে মাকে স্পর্শ করতে না পারার যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছে। টলমলো চোখে খুঁজছে তার মায়ের মুখটি। জন্মের পঁচাত্তর দিন পর হারাতে হয় মাকে। ২০শে জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় গুলিতে মারা যান বিশ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার। তিনি তার একমাত্র শিশু সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পর ঘুম পাড়িয়ে বেলকনিতে দঁড়িয়েছিলেন। এ সময় ভবনটির ছয়তলার বারান্দার গ্রিল ছিদ্র হয়ে তার মাথায় এসে একটি বুলেট বিদ্ধ হয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢলে পড়েন মেঝেতে।

নিহত সুমাইয়ার মা আসমা বেগম মানবজমিনকে বলেন, আমার নাতনিটাকে কী জবাব দিবো। সে তো অবুঝ, মায়ের অভাব বুঝতে পারলেও মুখ ফুটে বলতে পারছে না কাউকে। ওইদিন নতুন মহল্লার আশেপাশের সবাই গুলি ও হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পায়। অনেকে তখন বারান্দা, ছাদ এবং জানালায় ছুটে যায় দেখার জন্য। আমার মেয়েও তার বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বাসার উত্তর দিকের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। এ সময় গ্রিল ভেদ করে বুলেটটি এসে সুমাইয়ার মাথায় লাগে। দুই বছর আগে বিয়ে হয় মেয়েটার। বাচ্চার বয়স এখন চারমাস চলে। সুমাইয়া যখন মারা যায় তখন ওর বয়স আড়াইমাস ছিল।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ নতুন মহল্লায় সুমাইয়াদের ভাড়া বাসায় গেলে তার মা বারান্দার গ্রিলে থাকা বুলেটের ক্ষত চিহ্নটি দেখিয়ে কাঁদছিলেন। ঘরে মধ্যে সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মেয়ের স্মৃতি। একমাত্র নাতনিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, মা আর সন্তান কী জিনিস সেটা ভাষায় বোঝানোর মতো না। আমি হারিয়েছি আমার বুকের সন্তানকে। আমার নাতনি হারিয়েছে তার মাকে। মায়ের কষ্টটা ওর কী কখনো পূরণ হবে। আমার মেয়েটা খুব শান্ত ছিল নিজের কষ্ট সবসময় লুকিয়ে রাখতো। সুমাইয়ার বাচ্চা হওয়ার পর এত খুশি ছিল যেটা বলার বহিরে। সব বসময় মেয়েকে নিয়ে হাসিখুশিতে কেটে যেতো। মেয়েটিও ওর মাকে মাত্র চিনতে শিখেছিল। মেয়ের জন্য বেশি লাল জামা পছন্দ করতো সুমাইয়া। আমাকে এমন কিছু বলে যেতেও পারেনি আমার মেয়েটা। আমার মেয়েটা বলে যেতে পারেনি যে মা আামি চলে যাচ্ছি আমার মেয়েটিকে দেখে রেখো। গুলি লাগার পরেই নিচের দিকে ঢলে পড়ে যায়।

আশপাশের বাসিন্দারা জানান, ঘটনার দিন বিকাল পাঁচটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি ভবনে আগুন দেয়ার পর থেকে হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি শুরু হয়। ওই ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় পুলিশ সদস্যরাও থাকতেন। আন্দোলনকারীদের ধাওয়ায় আওয়ামী লীগ কর্মীরাও সেখানে আশ্রয় নেয়। ভবনের ভেতরে আটকে থাকা পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গুলি চালায়। এতে অনেক লোক নিহত ও আহত হয়।

ওইদিনের ঘটনার বর্ননা দিয়ে তিনি বলেন, ২০শে জুলাই সন্ধ্যায় ঘটনাটি ঘটে। ওইদিন পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ ছিল। চারিদিকে গোলাগুলি হচ্ছে। একটার পর একটা র‌্যাব, পুলিশের হেলিকপ্টার ঘুরছিল। এটা দেখার জন্য সবাই উৎসুক ছিল। আমার মেয়ে তার বাচ্চাটিকে পাশের রুমে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আমাকে বলে সবাই দেখছে আমি একটু দেখি মা। গিয়ে পাশের রুমের বেলকনিতে দাঁড়ায়। তার কিছুক্ষণ পরে আমি একটা শব্দ শুনতে পাই। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি আমার মেয়ে বেলকনিতে ঢলে পড়ে আছে। চিৎকার দিয়ে উঠে ওর কাছে দৌড়ে যাই। তখন ওর মাথাটা বেলকনির দরজার কাছে এসে পড়ে। মাথায় হাত দিয়ে উঠিয়ে দেখি প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। চিৎকার দিয়ে সবাইকে ডাকি। আমার ছেলেরা এসে মেয়ের এই অবস্থা দেখে পাগলের মতো হয়ে যায়। তারা কী করবে, কোথায় নিবে কিছুই বুঝতে পারছে না। রক্ত বন্ধ করতে একটা কাপড় দিয়ে মাথায় বেঁধে দেই। যখন হাত দিয়ে গুলিবিদ্ধ জায়গা চেপে ধরি তখন ওর নাক দিয়ে রক্ত ছোটা শুরু করে। তখনই মনে হয়েছে আমার মেয়ে আর বাঁচবে না। এ সময় ঘরে থাকা সবাই দিকবিদিক হয়ে পড়েছিল। এত রক্তক্ষরণ হয়েছিল মেঝে পুরো লাল হয়ে যায়। এম্বুলেন্স আনার জন্য সবাইকে বলি, জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিলে সেখানেও কাউকে পাওয়া যায়নি। আশেপাশের মানুষ তখন অনেকে আসে। সবাইকে বলি আমার মেয়েটাকে একটু ধরেন। লোকজনকে বলি মেয়ের হাতটা একটু দেখেন ও বেঁচে আছে নাকি। সবার হাতে-পায়ে ধরেছি মেয়েটিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু বাইরে যে পরিস্থিতি ছিল তারাইবা কী করবে।

তিনি বলেন, এ সময় আমার বড় মেয়ে বাসার নিচে গিয়ে রিকশাচালকদের হাতে-পায়ে ধরেছে। পরে একজনের দয়া হলে সে রাজি হয় হাসপাতালে নিতে। আমার ছেলেরা ও একজন ভাড়াটিয়া ধরে ছয়তলা থেকে নামিয়েছে আমার মেয়েকে। যতদূর নেমেছে সিঁড়িতে ততদূর রক্ত পড়তে পড়তে গেছে। পরে আমার দুই ছেলে ও মেয়ে সাইনবোর্ড প্রো-অ্যাকটিভ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মেয়ের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিতে চেয়েও পারিনি। এরপর সবার পরামর্শে সিদ্ধিরগঞ্জ কবরস্থানে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেই। সেখানে দাফন করতে গেলেও ছিল আতঙ্ক। আমার মেয়েকে দাফন করতে গেলে ছাত্রলীগের লোকজন বাধা দেয়। তারা বলে আন্দোলনে গুলিবিদ্ধদের দাফন করতে দিবে না। অনেক হেনস্তা করেছে আমাদের।
আসমা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় থাকি। আমাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ। নদীতে আমাদের বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ওদের বাবা সেলিম মাতুব্বর করোনার সময় মারা যায়। তখন সন্তানেরা ছোট ছিল। কাঁচপুরে একটি টেক্সটাইল মিলের নিরাপত্তারক্ষী ছিল।

তিনি বলেন, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে ঝামেলার কারণে সুমাইয়া তাদের বাসায় থাকতেন। তার মৃত্যুর পর কয়েকদিন পর সুমাইয়ার স্বামী মেয়েকে এসে দেখে যান। নাতনীকে কৌটার দুধ খাওয়ানো হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ছেলেরা কিছু কাজ করে তা নিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। এখন এই দুধের শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা দুঃশ্চিন্তায় আছি। 

mzamin

শিক্ষা তথ্যই শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ভ্যানগার্ড by হাবিবুর রহমান

অশ্রুসিক্ত একজন শিক্ষক চোখের পানি মুছতে মুছতে প্রবেশ করলেন আমার অফিস কক্ষে। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় উদ্বিগ্ন এ শিক্ষক দেড়যুগ বিনা বেতনে পাঠদান করে আসছেন। পাঁচ কন্যার জনক এ শিক্ষক দেড়যুগ অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করে আজ যখন প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলো তখন তাকে বাদ দিয়ে প্রধান শিক্ষক সরকারি দলের একজন প্রভাবশালী নেতার স্ত্রীকে ২০১৮ সালে বসে ২০০১ সালে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়ে বৈধ কাগজপত্র তৈরি করে রাতারাতি তাকে গৃহিণী থেকে  ২০ বছরের অভিজ্ঞ শিক্ষক বানিয়েছেন। বিনিময়ে সরকারি দলের নেতাকে গুনতে হয়েছে মোটা অংকের টাকা। তবু ভালো মানুষ গড়ার কারিগর মহান পেশা শিক্ষকতায় পরিচয় হলো নেতার স্ত্রীর এটা কম কিসের। কিন্তু কপাল পোড়ালো কালাম সাহেবের। তিনি বিনা বেতনে মানবেতর জীবনযাপন করে শিক্ষকতা করেছেন দেড়যুগ আর এমপিওভুক্ত হওয়ার পর কালাম সাহেবের চাকরি নেই! কালাম সাহেব অঝোর ধারা অশ্রুসিক্ত হয়ে সব কষ্টের কথাগুলো আমাকে বলে কিছুটা হালকা হওয়ার সুযোগ নিলেন। নিথর ও নির্বাক হয়ে কালাম সাহেবের সব কথা শুনলাম। নেত্রকোনা জেলার নতুন এমপিওভুক্ত আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কালাম সাহেবের মতো চাকরি হারানো অসহায় শিক্ষকের কথা শুনালো কালাম সাহেব আমাকে। অতিরিক্ত টাকার চাপ দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে নয়তো রাজনৈতিক ট্যাগ লাগানো হচ্ছে। এতদিন যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ত্রিসীমায় আসতো না আজ তারাই সর্বেসর্বা। কালাম সাহেবের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেল নেত্রকোনা জেলার ভুক্তভোগী কিছু শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে।

বিষয়টি আমার ডেস্কের কাজ না হলেও আমি কালাম সাহেবের মতো বৈষ্যমের শিকার  অসহায় বঞ্চিত ও নিপীড়িত শিক্ষককে শিক্ষার বৃহত্তর এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সহযোগিতা করার জন্য   মনস্থির করলাম। ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে এমপিওভুক্তকরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কালাম সাহেবের এ গল্প মূলত ২০১৮ সালের ১২ই জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ)  জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ জারি করার পর থেকে সারা দেশের সকল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনবল কাঠামোতেই আবির্ভাব ঘটে। একই ধারা মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চলে। ২০১৮ সালের নীতিমালার আলোকে ২০১৯ সালে মোট ২৬৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ করা হয়। দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত বন্ধ থাকা এবং অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিএনপি সরকারের  শাসন আমলে স্থাপিত হওয়ায় জনবল কাঠামোও ওই ঘরানার বলেই কালামদের গল্প ট্রাজেডি ।  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সমস্যা শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষার গুণগত মান অনিশ্চিত হবে। এমপিওর সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্যারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলাম। সমাধানের পথও বলে দিলাম। তিনি মনে নিলেন কিন্তু মেনে নিলেন না। কোনো উদ্যোগ নেয়া হলো না। এটা বিশাল কর্মযজ্ঞ। আমার মতো ছোট মানুষের চিন্তা জাতীয় কোনো বিষয়ে একেবারেই অমূলক অবান্তর। থমকে দাঁড়ালাম কাউকে বুঝাতে না পেরে। কিন্তু কালামকে মডেল ধরে এগোতে চাই। সত্য প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। কালাম ওই স্কুলের বৈধ শিক্ষক। ২০০১ সাল থেকে শিক্ষকতা করছেন। হাজারটা প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একটা মিথ্যার কাছে সত্য হেরে যাবে তা হতে পারে না। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।
যুদ্ধ শুরু হলো একদিকে প্রধান শিক্ষক ও সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতার টাকা আরেক দিকে অসহায় শিক্ষক কালাম।
২০২১ সালে সরকার আবার এমপিওভুক্তকরণের উদ্যোগ নেয়। নীতিমালার আলোকে ২৭১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ করে ২০২২ সালে। কালামের গল্প এবার আরও ভয়ানক রূপ ধারণ করলো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষকরা প্রতিদিন আমাদের কাছে আসেন। সমাধান চান। করণীয় জানতে চান। মাননীয় সংসদ সদস্যরা সরাসরি জড়িত এ নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে বলে তারা অভিযোগ করেন। মোটা অংকের লেনদেন হয় বলে জানায় ভুক্তভোগী শিক্ষকগণ।

অনেক ভেবেচিন্তে আমি একটা কৌশল বের করলাম। যেহেতু সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ। সুতরাং সরাসরি  তাদের দায়ী না করে কৌশলে সরকারের স্বার্থকে সামনে এনে বড় করে দেখাতে হবে যা শিক্ষা প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ছোট মানুষ তাও আমার ভাবনাটাও ছোট। আমি তাদেরকে মহাপরিচালক, ব্যানবেইস বরাবর অভিযোগ দিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিলাম। কালামসহ ১০টি আবেদন যাচাই-বাছাই করে দেখলাম তারা সবাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধ শিক্ষক। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে তথ্যটি যাচাই-বাছাই করে পেলাম তা হচ্ছে ২০১৩ সালে   কালাম সাহেবের স্কুলে বৈধ ৫ জন শিক্ষকসহ স্টাফ  ছিল ৭ জন।  কিন্তু এমপিওভুক্তকরণের পর ২০২০ সালে হয়ে গেল ১৩ জন। অথচ ২০০৫ সালের পর নিবন্ধনবিহীন এবং ২০১৪ সালের পর নিবন্ধনসহ কোনো শিক্ষক ম্যানেজিং কমিটি নিয়োগ দিতে পারবে না। শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠান  প্রধান ও সহকারী প্রধান এবং স্টাফ নিয়োগ দিতে পারে। অথচ কালামের স্কুলে ২০১৮ সালে বসে ২০০১ সালে ৪জন শিক্ষককে  এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছে এবং তারা সরকারি বেতনও উত্তোলন করছেন। কীভাবে বেতন প্রদানকারী তিন স্তর বিশিষ্ট কর্তাব্যক্তিগণ বেতন দিলেন তা পরিষ্কার নয়। তবে তারা কোনোভাবেই বৈধ শিক্ষক নয়।
এরকম গরমিল ভুক্তভোগী শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে যেমন আছে তেমনি ২০১৯ ও ২০২২ সালে এমপিভুক্ত ৫৩৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আছে।

আমি কালাম সাহেবের এ সত্যটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য চ্যালেঞ্জ নিলাম।
মহাপরিচালক স্যারকে বিষয়টি বুঝালাম। স্যার বিষয়টি বুঝে আমাকে প্রস্তাব তৈরি করে সমস্যা সমাধানের লেআউট দিতে বললেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তাব দিয়ে সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ বরাবর মহাপরিচালক, ব্যানবেইস ১৬ই জানুয়ারি ২০২৩ তারিখ পত্র প্রেরণ করেন।

আমরা যুক্তি দেখালাম
এধরনের অবৈধ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা প্রশাসনের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে, সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অবৈধ অর্থের লেনদেন হচ্ছে, এনটিআরসিএ এর নিবন্ধনধারী শিক্ষকরা নিয়োগ পাচ্ছেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলাদলির কারণে কোর্টে এমপিও সংক্রান্ত মামলা বৃদ্ধি পাচ্ছে সর্বোপরি শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে এমপিও অনলাইনে দিয়েছে তাও ব্যর্থ হচ্ছে।

সমাধানের জন্য আমরা প্রস্তাব করলাম
২০১৩ সাল থেকে ব্যানবেইস সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের তথ্য অনলাইনে  সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করছে।
নতুন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন প্রদানের সময় যদি ব্যানবেইসে সংরক্ষিত ডাটাবেইজের সঙ্গে যাচাই করে বেতন প্রদান করা হয় তাহলে শিক্ষা প্রশাসনে সুশৃঙ্খলা ফিরে আসবে, সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হবে, এনটিআরসিএ নিবন্ধনধারী যোগ্য শিক্ষকগণ নিয়োগ পাবেন, অবৈধ অর্থের লেনদেন বন্ধ হবে, কোর্টে এমপিও সংক্রান্ত মামলা কমবে, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিদ্যমান থাকবে।

সচিব স্যার আমাদের প্রস্তাব সদয় বিবেচনা করে ৬ই এপ্রিল ২০২৩ সালে পরিপত্র জারি করেন এই মর্মে যে, এখন থেকে ব্যাকডেটের স্মারক ব্যবহার ও তারিখ ব্যবহার করে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে না। এমনকি  এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে উপজলা/জেলা/আঞ্চলিক/অধিদপ্তর পর্যায়ে ২০১৩ সাল থেকে অনলাইনে ব্যানবেইস কর্তৃক সংগৃহীত  শিক্ষক ও কর্মচারীদের তথ্যের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে বেতন প্রদান করতে হবে। পরিপত্র জারি করার পরপরই ব্যানবেইস সম্পূর্ণ বিনা খরচে  শিক্ষক ও কর্মচারীদের তথ্য অনলাইনে আপলোড করে দিলো। সরকারের একটি পয়সাও আমরা খরচ করিনি এ কাজে। সবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। একজন সংসদ সদস্য সরাসরি হুমকি দিলো। আমাকে দেখে নিবে এমন কি বিএনপি’র জামায়াতের শিক্ষকদের রক্ষা করার জন্য আমি ডিজি স্যারকে বুঝিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করেছি বলেও আমাকে অভিযুক্ত করেছে। আর এ পত্রের আলোকেই পরিপত্র জারি হলো। এখন আর তারা দলীয় লোক নিয়োগ দিতে পারবে না তাই আমার উপর ক্ষোভ ঝাড়লো।
এ পরিপত্র কালাম সাহেবদের জীবন রক্ষা করলো। কালাম সাহেবসহ সারা দেশের সকল নিপীড়িত শিক্ষকের ভ্যানগার্ড হলো এই পরিপত্র।

এর ফলাফল সারা দেশে শিক্ষা পরিবার আজ ভোগ করছে। দলমত নির্বিশেষে সকল বঞ্চিত শিক্ষকদের এই নিরাপত্তা আমাকে পুলকিত করবে আজীবন। রাষ্ট্রীয় সেবায় এইটুকু অবদান আমার ম্মৃতির পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে।
কালামে সাহেবের  নথি ৪৩ মাস পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর তদন্ত করে সমাধান করে বেতন প্রদানের নির্দেশনা দেয়। এ ৪৩ মাস কালাম সাহেবেকে নির্ঘুম যামিনী ডায়বেটিস প্রেসারসহ পিতৃবিয়োগ সবই উপহার দিয়েছে। একটা সত্যকে সত্য বলে মিথ্যার কাছে প্রতিষ্ঠা করতে হাজারটা জীবন্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও  ৪৩ মাস সময় লেগেছে আমাদের। এই ৪৩ মাসে সরকারের কতো কর্মঘণ্টা, অর্থ, ম্যানপাওয়ার, লজিস্টিক সাপোর্ট, সিস্টেম এমনকি শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে তার জবাব কে দিবে? কে দায়ী এ জন্য? যে অবৈধ অর্থের লেন দেন হয়েছে তার দায়ভার কার? তারা কি আদৌও শাস্তির আওতায় আসবে? এ লজ্জা শিক্ষা পরিবারের সকল সদস্যের। আমরা এ দায় এড়াতে পারি না।

আজ কালাম সাহেবে নতুন জীবন পেয়েছে একটা দানবকে পরাজিত করে। এ রকম কালাম তো সারা দেশে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সব কয়টিতেই কমবেশি আছে। যারা ঢাকা চিনেন না। টাকা নেই। নেই কালাম সাহেবের মতো সাপোর্ট। তারা অসহায় হয়ে সব নিয়মিত পাওনা বলে মেনে নিয়েছে। আল্লাহ কাছে দু’হাত তুলে গভীর রাতে কাঁদে আর বলে আল্লাহ তুমি এ জালিমের বিচার করো। তুমি ছাড়া আমার আর কেউ সাহায্যকারী নেই।
২০১৯ ও ২০২২ সালে আওয়ামী সরকার প্রায় ৫৩৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ করে। কালাম সাহেবের স্কুলের তথ্য অনুযায়ী গড়ে একটি প্রতিষ্ঠানে যদি ৪ জন শিক্ষক ও অবৈধ থাকে তাহলে ৫৩৫৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতোজন আছে এবং সরকারের কতো টাকা প্রতিমাসে ব্যয় হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। আর রাতারাতি শিক্ষক বনে যাওয়া এই শিক্ষকগণ একাডেমি কার্যক্রমে কতোটুকু ফিট তাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাপেক্ষ।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা সংস্কারে কালাম সাহেবদের বিষয়ে সঠিক ও আকার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নে মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টার সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।

লেখক: সহকারী পরিচালক (প্রশাসন), ব্যানবেইস

mzamin

অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের তাদের ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না -নয়াপল্টনের সমাবেশে তারেক রহমান

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফসল উল্লেখ করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এই সরকারকে ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। এই সরকারের ব্যর্থতা হবে আমাদের সকলের ব্যর্থতা। বাংলাদেশের পক্ষের গণতন্ত্রকামী জনগণের ব্যর্থতা।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে গতকাল নয়া পল্টনে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন। রাজধানী ও আশপাশের জেলা থেকে নেতাকর্মীরা এই সমাবেশে যোগ দেন। বিকালে সমাবেশ শুরু হলেও দুপুরেই নেতাকর্মীদের সমাগমে নয়া পল্টন জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন- তারেক রহমান। প্রায় ১৭ মিনিটের এই বক্তব্যে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলন, বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি, নতুন রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র সংস্কার, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে লাখো কোটি জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফসল। এই সরকারের কোনো কোনো কার্যক্রম সকলের কাছে হয়তো সাফল্য হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে। কিনু্ত এই সরকারের ব্যর্থতা হবে আমাদের সকলের ব্যর্থতা। বাংলাদেশের পক্ষের গণতন্ত্রকামী জনগণের ব্যর্থতা। এটি আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখতে হবে। সুতরাং এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। দেশ-বিদেশ থেকে নানা রকমের উস্কানিতেও জনগণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ হতে দেবে না। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যাতে নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় সে ব্যাপারে তাদেরকেও সতর্ক থাকতে হবে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, রাষ্ট্র-রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২৩ সালেই বাংলাদেশের পক্ষের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। তবে ঘোষিত ৩১ দফাই শেষ কথা নয়। বিএনপি মনে করে, রাষ্ট্র কিংবা রাজনীতি, সকল ক্ষেত্রেই সংস্কার কার্যক্রম একটি ধারাবাহিক এবং চলমান প্রক্রিয়া। সুতরাং রাষ্ট্র এবং রাজনীতি সংস্কারে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির আরও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং পরিমার্জনকেও বিএনপি স্বাগত জানায়।

তিনি বলেন, কেউ যদি মনে করেন, একটি উন্নত এবং নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য আরও নতুন রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন রয়েছে, তাতেও দোষের কিছু নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তারা কাকে সমর্থন জানাবে  কিংবা কাকে সমর্থন দেবে না। এ কারণেই বিএনপি বারবার জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার উপর জোর দিয়েছে। বিএনপি মনে করে একমাত্র অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই, রাষ্ট্র-রাজনীতি এবং রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশীদারিত্ব তৈরি হয়।  

তারেক রহমান বলেন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে রাজনীতির মাঠে নানারকম কথা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এটি একটি স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য রীতি। প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করবেন, এটিই স্বাভাবিক। এ নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, ফৌজদারি অপরাধের বিচার যেমন বিচারিক আদালতে হয় ঠিক তেমনি  রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা রাজনৈতিক আচরণের বিচার হয় জনগণের আদালতে। আমি আগেও বলেছি, ক্ষমতার পরিবর্তন মানে শুধুই রাষ্ট্র ক্ষমতার হাত বদল নয়। ক্ষমতার পরিবর্তন মানে রাষ্ট্র এবং রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। তাই প্রতিটি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মনে রাখা প্রয়োজন রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আচার-আচরণেও গুণগত পরিবর্তন জরুরি। সুতরাং আমার আহ্বান, কোনো প্রলোভন কিংবা উস্কানিতে বিভ্রান্ত না হয়ে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজের নেতৃত্ব দানের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখুন।

তিনি বলেন, হাজারো শহীদের রক্তস্নাত এই রাজপথে আজ আপনাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির অর্থ, ছাত্র-জনতার কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার এই যাত্রাপথে বাংলাদেশের পক্ষের শক্তিকে-হয়তো আরও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আরও কিছু পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে সেই পথ সন্ত্রাস-সংঘর্ষ-প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসার নয়। সেই পথ হবে ধৈর্য-সহনশীলতা এবং সমঝোতার। বলতে চাই, সংস্কার কার্যক্রমের পথ ধরে নির্বাচনী রোডম্যাপে উঠবে দেশ। সুতরাং আসুন- আমরা সবাই কাজের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস ভালোবাসা অর্জন করি। জনগণের সঙ্গে থাকি। জনগণকে সঙ্গে রাখি।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা শহীদি মৃত্যুবরণ করেছেন, যারা আহত হয়েছেন, হাত-পা, চোখ হারিয়েছেন কিংবা চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন- দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আজীবন তাদের এই আত্মত্যাগ এবং অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। হতাহতদের প্রতিটি পরিবারের প্রতি অবশ্যই রাষ্ট্র যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে।  আর লাখো শহীদের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাষ্ট্র-রাজনীতি শাসন প্রশাসন হওয়ার কথা ছিল গভর্নমেন্ট অফ দ্য পিপল বাই দ্যা পিপল ফর দ্য পিপল। অথচ গত ১৫ বছর বাংলাদেশে মাফিয়া শাসন চালু করা হয়েছিল। দেশে-বিদেশে পলাতক স্বৈরাচার ও বিনাভোটের সরকারের পরিচয় হয়ে উঠেছিল গভর্নমেন্ট অফ দ্য মাফিয়া বাই দ্যা মাফিয়া ফর দ্য মাফিয়া।
তিনি বলেন, এই মাফিয়া চক্র দেশকে সর্বক্ষেত্রে ভঙ্গুর করে দিয়েছিল। দেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর, ঋণনির্ভর এবং পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। মাফিয়া চক্র দেশের ব্যাংকগুলো দেউলিয়া করে দিয়েছে। গত দেড় দশকে দেশ থেকে ১৭ লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার করে দিয়েছে। ৫ই আগস্টের পতিত স্বৈরাচারের বেপরোয়া দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বর্তমানে ১০০ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে আজ যে শিশুটি জন্ম নিয়েছে কোনো কারণ ছাড়াই সেই শিশুটিরও মাথা পিছু ঋণ কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা।

তারেক রহমান বলেন, মাফিয়া চক্র দেশকে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই ভঙ্গুর করে দেয়নি। দেশের আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক রীতি-নীতিকেও ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রতি সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করে ফেলা হয়েছিল। খোদ ফ্যাসিবাদকেই বিচার বিভাগের সূতিকাগারে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য এবং গণতান্ত্রিক সেটি দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু মাফিয়া চক্র দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকেও সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।   

তিনি বলেন, অন্যায়-অনিয়ম আর অরাজকতার বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণে মাফিয়া চক্রের প্রধান দেশ ছেড়ে পালানোর পর, দেশে মাফিয়া শাসন-শোষণের অবসান ঘটেছে। পতিত স্বৈরাচারের পলায়নের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক-মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পথে প্রধান বাধা দূর হয়েছে। তবে বাধা দূর হলেও মাফিয়া চক্রের রেখে যাওয়া ১৫ বছরের জঞ্জাল দূর হয়নি। এই জঞ্জাল দূর করে জনগণের বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ করছে। তবে মাফিয়া চক্রের প্রধান হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালেও মাফিয়া চক্রের বেনিফিশিয়ারি অপশক্তি প্রশাসনের অভ্যন্তরে থেকে কিংবা রাজনীতির ছদ্মাবরণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।  

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ কিংবা যেকোনো দেশেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকার অবশ্যই জনগণের সরকার। তাই জনগণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে- রাখবে।  তবে কোনো একপর্যায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জবাবদিহিতাও কিন্তু নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হয়। সুতরাং জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সকল সংস্কার কার্যক্রমের প্রথম এবং প্রধান টার্গেটও হওয়া জরুরি। এজন্যই অগ্রাধিকারভিত্তিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত জবাবদিহিমূলক সরকার এবং সংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া দরকার। কারণ জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া সংস্কার কার্যক্রমের প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া উন্নয়ন-গণতন্ত্র কিংবা সংস্কার কোনোটিই টেকসই এবং কার্যকর হয় না। একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিটি ভোটারের ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করে ভোটারদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

তিনি বলেন, সেই লক্ষ্যে বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন জনপ্রশাসনের সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ‘সক্ষম এবং উপযুক্ত’ করে গড়ে তুলতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।  অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তবে বিএনপি মনে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এজেন্ডা সেটিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে না পারলে গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য ব্যাহত করতে ষড়যন্ত্রকারী চক্র নানা সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। এর কিছু আলামত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।  

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এবারের গণঅভ্যুত্থানের চরিত্র অতীতের যে কোনো গণঅভ্যুত্থানের চেয়ে ব্যতিক্রম। কেন ব্যতিক্রম? কারণ পলাতক স্বৈরাচারের অবৈধ শাসনকালে সকল গণতান্ত্রিক অধিকার মানবাধিকার হারিয়ে জনগণ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও হারাতে বসেছিল। তাই এবারের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কেবল মানুষের অধিকারই  প্রতিষ্ঠিত হয়নি, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়েছে। দেশ এবং জনগণ এখন গুম, খুন, অপহরণ আর বিভীষিকাময় আয়নাঘরের আতঙ্কমুক্ত ও স্বাধীন। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পর এবার দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা সুরক্ষায় প্রথম কাজ হতে হবে। রাষ্ট্র এবং সমাজে মানুষের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার এবং ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে বারো কোটি ভোটার। এরমধ্যে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় প্রায় আড়াই কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। ভোটার হওয়ার পর তরুণ প্রজন্মের এই আড়াই কোটি ভোটার একটি জাতীয় নির্বাচনেও ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি। ভোট দিয়ে তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেনি। কিংবা তাদের নিজেরাও কেউ ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়নি। বিএনপি মনে করে, দেশের জনশক্তির অর্ধেক নারী এবং তারুণ্যের এই বৃহৎ অংশকে, রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের বাইরে রেখে একটি বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। সংবিধান কিংবা প্রবিধানে যাই থাকুক জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা না গেলে সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা না গেলে শেষ পর্যন্ত কোনো সংস্কার কার্যক্রমেরই কার্যকরী ফল পাওয়া যাবে না।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণতন্ত্র আর বিএনপি দু’টি সমার্থক। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। গত ১৬ বছরে আমাদের অনেক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি’র বহু নেতা নির্বাসিত হয়েছেন। আজকে আমরা যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি সেটা যেন হেলায় না চলে যায়। আজকে সরকারে যারা আছেন, তাদের বলবো- এখনো ফ্যাসিস্ট সরকারের অনেকে তাদের চেয়ারে বসে আছে। এরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাধা হয়ে নানা ষড়যন্ত্র করতে চাচ্ছেন। তাদেরকে দ্রুত চেয়ার থেকে সরাতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জনগণের অধিকার এখনো ফয়সালা হয়নি। এই অন্তর্বর্তী সরকার নানা সংস্কারের কথা বলেন। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যে সংস্কার প্রয়োজন, সেটা সবেচেয়ে বড় প্রয়োজন। এই অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুরোধ করতে চাই, অনতিবিলম্বে এদেশে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। জনগণ সেখানে ভোট দেবে। জনগণের তাদের জনপ্রতিনিধিদের ভোট দিয়ে সংসদ গঠন করবে। আর বিজয় এখনো হয়নি। বিজয় আমাদেরকে ছিনিয়ে নিতে হবে। এ বিষয়ে সবাই সজাগ থাকবেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, সাজানো মামলায় জেল খেটেছি, এর বিচার আমরা করবো। গত কয়েকদিন ধরে আওয়ামী লীগের নেতারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। যেখানেই তাদের পেয়েছে গণপিটুনি দিয়েছে। এই ১৭ বছরে ৩৪ বার গ্রেপ্তার হয়েছি। কই আমাদের তো ফুল দিয়ে বরণ করেছে। আমরা জেলে গিয়েছি বীরের মতো, বেরও হয়েছি বীরের মতো। আর আমরা বলেছি, অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা সময় দেবো। কিন্তু আজীবন সময় দেবো না, মনে রাখবেন। একজন বলেছেন, তৃতীয় শক্তির প্রয়োজন আছে- এর ব্যাখ্যা জনগণকে দিতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা যে ইতিহাস তৈরি করেছে, তা পুরো পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ছাত্র-জনতার স্রোতে স্বৈরাচার হাসিনা ভেসে গেছে। ছাত্র-জনতাকে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে ও দেবে। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রথম ম্যান্ডেট নির্বাচন দিতে হবে। একই সঙ্গে গত ১৫ বছরে যে জুলুম ও নির্যাতন করা হয়েছে, তার বিচার করতে হবে।

সরজমিন দেখা গেছে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নয়াপল্টন ও এর আশপাশের এলাকায় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে ওঠে। রাজধানীর বিভিন্ন ইউনিটি থেকে ছোট ছোট মিছিলে আসেন। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে নয়াপল্টন। সমাবেশকে কেন্দ্র করে কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। তীব্র রৌদ উপেক্ষা করে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আসেন নেতাকর্মীরা। স্লোগানে স্লোগানে নয়াপল্টন প্রকম্পিত করে তোলেন তারা। নেতাকর্মীরা মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে উল্লাস করেন। নয়াপল্টনে আশপাশের এলাকা ও অলিগলিতে অবস্থান করেন ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীরা। ওদিকে বিএনপি’র সমাবেশকে কেন্দ্র করে নয়াপল্টন, কাকরাইল,  মালিবাগ, শান্তিনগর, বিজয়নগর, ফকিরাপুল এবং আরামবাগ এলাকায় তীব্র যানজট দেখা গেছে।

মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে এবং বিএনপি’র প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক ও দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনের সঞ্চালনায় সমাবেশে দলের নেতা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, জয়নুল আবেদীন, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, আবদুস সালাম আজাদ, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, কামরুজ্জামান রতন, গাজীপুর জেলা বিএনপি’র ফজলুল হক মিলন, ঢাকা জেলা বিএনপি’র নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র রফিকুল আলম মজনু, গাজীপুর জেলা মহানগরের শওকত হোসেন সরকার, যুবদলের আব্দুল মোনায়েম মুন্না, কৃষকদলের হাসান জাফির তুহিন, স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজীব আহসান, মহিলা দলের সুলতানা আহমেদ, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসাইন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক খান, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, জাসাসের হেলাল খান, মৎস্যজীবী দলের আব্দুর রহিম, ছাত্রদলের রাকিবুল ইসলাম রাকিব বক্তব্য রাখেন।

mzamin

মন্ত্রী নুরুজ্জামান ও পুত্রের লুটপাটের সাম্রাজ্য by মিলন পাটোয়ারী

সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মেদ। তামাক ব্যবসায়ী থেকে হয়েছিলেন অটো এমপি। তারপর মন্ত্রী। ক্ষমতা পেয়েই অপব্যবহার শুরু করেন। মন্ত্রণালয়কে বানান টাকা কামানোর মেশিন। দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড়। মন্ত্রী পিতার ক্ষমতাকে কাজে লাগান পুত্র রাকিবুজ্জামান আহম্মেদ। পিতার সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। চাকরি, তদবির, বদলি, দখলবাজি সব জায়গায় ছিল তার হাত। মন্ত্রীপুত্রের অনুমতি ছাড়া মামলাও নিতো না থানার পুলিশ। টাকা কামান দুই হাতে। টানা ৮ বছর মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনকালে নুরুজ্জামান কয়েকশ’ কোটি টাকার মালিক। নামে-বেনামে ঢাকায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। বিভিন্ন স্বজনের নামে ব্যাংকে রয়েছে কোটি কোটি টাকা। ৩ শতাধিক একর জমি। পট পরিবর্তনের পরপরই গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দু’জনই।

জানা গেছে, সংসদে কবিতা পাঠ করে শেখ হাসিনার মন জয় করেন নুরুজ্জামান। হয়ে যান শেখ হাসিনার আস্থাভাজন। সমাজকল্যাণের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান দু’বার। মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন পুত্র রাকিবু্‌জ্জামান ও এপিএস মিজান। মন্ত্রী কালীগঞ্জ রেলস্টেশনের পাশে  রেলওয়ে জমি দখল করে করেছেন পার্ক ও আয়েশখানা। রেল থেকে নোটিশ করলেও করেননি কর্ণপাত। দুদকে অভিযোগ করেও হয়নি লাভ। ক্ষমতার জোরে দুদকের অভিযোগ উধাও করে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হয় আভিযোগকারীকে। অভিযোগ রয়েছে- ক্যান্সার ও কিডনি নষ্টের ভুয়া রোগী দেখিয়ে মন্ত্রী নুরুজ্জামান কয়েকশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও ব্যবস্থা নেয়নি দুদক। ক্ষমতার অপব্যবহার করে মন্ত্রী তার মায়ের নামে তৈরি করেছেন মা ও শিশু হাসপাতাল। সেই শিশু হাসপাতালের জমি একোয়ার হলেও ন্যায্য মূল্য পায়নি জমির মালিকরা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি এলাকার গুণীজনের নাম না দিয়ে মন্ত্রী নিজের মায়ের নামে দেয়ায় সমালোচনা এলাকা জুড়ে। মন্ত্রী হলেও নিয়োগ ও তদবির নিয়ন্ত্রণ করতো তারই যুবরাজ পুত্র রাকিবুজ্জামান। লালমনিরহাটে সরকারি চাকরি ভাগ্য নির্ধারণ হতো  মন্ত্রীপুত্রের দরবার হলে। কাকিনার এন্তাজুল ইসলাম জানান, সমাজসেবা মাঠকর্মীর জন্য ১০ লাখ টাকা দাবি করলেও ৫ লাখ টাকা দিতে না পারায় চাকরিটা পায়নি। শুধু আমি না আমার মতো অনেক বেকার যুবকের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে মন্ত্রীপুত্র। রাকিবুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুদকে রয়েছে একাধিক অভিযোগ। কলেজে শিক্ষকতার চাকরি না করেই মন্ত্রীর পুত্রের ক্ষমতায় তুলতো বেতন। রাকিবুজ্জামান কালীগঞ্জে সরকারি কর্মকর্তাদের নির্যাতনে তৈরি করেছিলেন টর্চার সেল। কালীগঞ্জ রেল স্টেশনের পাশেই তার টর্চার সেল। ওই টর্চার সেলে যে সরকারি কর্মকর্তা কথা না শুনতো তাদের ডেকে এনে করতো মানসিক নির্যাতন। কালীগঞ্জ উপজেলা নেসকো’র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রবি চন্দ্র রায় জানান, তাকেও টর্চার সেলে মানসিক নির্যাতন করেন। তার কথা না শুনায় আমাকে টর্র্চার সেলে সবার সামনে মানসিকভাবে নির্যাতন করে। মন্ত্রীপুত্র রেলওয়ের জমি দখল করে মন্ত্রীর পুত্র তৈরি করেছেন সুইমিংপুল। লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ ও আদিতমারী)-এ রাকিব-এপিএস মিজানের হুকুম ছাড়া হতো না মামলা রেকর্ড। ওদিকে  মন্ত্রীর জামাতা জিল্লুর রহমান সরকারের যুগ্ম সচিব। শ্বশুর মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে হয়েছেন বাংলাদেশ স্থলবন্দর চেয়ারম্যান। শ্বশুরের ক্ষমতায় করেছেন নানা অনিয়ম। জিল্লুর রহমানের বাড়ি সুনামগঞ্জের গৌরাঙ্গতে। সেখানে তৈরি করেছেন সরকারি লুটের টাকায় এতিমখানা। কয়েকজন এতিম শিশুকে দেখিয়ে ওই এতিমখানার নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিতেন। সেই টাকা হতো লুটপাট। জিল্লুর গৌরাঙ্গে গড়ে তুলেছেন তার মায়ের নামে দিলশাদ হাজেরা অরফানেজ ওয়েলফেয়ার সেন্টার। ওই সেন্টারে জিল্লুরের বাবা আব্দুস সালাম নামে জামে মসজিদ। নুরুজ্জামান আহম্মেদ নামে গ্রন্থাগার। জিল্লুর নিজ নামে জেড রহমান অ্যান্ড ভাইবোন দাতব্য চিকিৎসালয়। জিল্লুরের স্ত্রীর নামে পরমিতা নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মন্ত্রীর নাতির নামে ঐশ্বর্য কম্পিউটার সেন্টার তৈরি করেন। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা ভুয়া বরাদ্দ নিয়ে লুটপাট করেছেন। জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকেও হয়েছে অভিযোগ। ওদিকে মন্ত্রী থাকাকালীন পুষ্প বাংলাদেশ এনজিও মাধ্যমে এলাকার দরিদ্র  বেকার যুবক-যুবতির ভাগ্য পরিবর্তনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের নামে কয়েক কোটি টাকা করেছেন লুটপাট।

লালমনিরহাট নবাগত পুলিশ সুপার  মো. তরিকুল ইসলাম জানালেন, আসামিদের বিরুদ্ধে যেহতু বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তবে অনেকগুলো বিষয়ে দুদক দেখছে। তারা সহয়তা চাইলে সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে। জেলা প্রশাসক মো. এইচএম রাকিব হায়দার জানালেন কোনো দুর্নীতিবাজ ছাড় পাবে না। আইন অনুযায়ী নেয়া হবে ব্যবস্থা। অপরদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন কুড়িগ্রাম সমন্বিত উপ-পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানালেন, আসামিদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। দুদকের হাত থেকে কোনো দুর্নীতিবাজ ছাড় পাবে না। সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মেদ ও তার পুত্র রাকিবুজ্জামান দুইটি হত্যা মামলায় পলাতক থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

mzamin

২০ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অনুসন্ধানে স্থবিরতা by মারুফ কিবরিয়া

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লোপাটের অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছিল। একাধিক মামলাও হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আত্মসাতের ঘটনায়। মামলার তদন্ত ও আরও অনুসন্ধানের কাজ চলমান। কিন্তু অনুসন্ধান ও তদন্ত দুটোই থমকে গেছে। দুদকের বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান শাখার আওতাধীন এমন আরও বেশ কিছু অনুসন্ধান-তদন্ত থমকে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন ওই শাখায় অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী পর্যাপ্ত লোকবল নেই। মূল অর্গানোগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক কর্মকর্তা দিয়ে চলছে বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির শাখা। এ নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন দুদকের একাধিক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, যে ক’জন দিয়ে শাখার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে তাদেরও অন্য শাখার অনুসন্ধান ও দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এদিক-ওদিক কোনোটিই সঠিক প্রক্রিয়ায় করা হচ্ছে না।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা দুদকের শাখাটি একজন পরিচালকের নেতৃত্বে ৩৭ জন কর্মকর্তা অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু কাগজে কলমে এই মুহূর্তে বিভিন্ন আর্থিক দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র আটজন।  এই আটজনের মধ্যে সবাইকেই দুদকের অন্য শাখার অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে।

সূত্র বলছে, অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী- একজন পরিচালক, দশ জন উপ-পরিচালক, ১৬ জন সহকারী পরিচালক, দশজন উপ-সহকারী পরিচালক মিলিয়ে বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান শাখা কার্যক্রম পরিচালনার কথা। কিন্তু দুদকের ওই শাখায় বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন একজন পরিচালক, তিনজন উপ-পরিচালক, দুজন সহকারী পরিচালক এবং দুজন উপ-সহকারী পরিচালক। এর মধ্যে তিন উপ-পরিচালকের মধ্যে দুজনকে সম্প্রতি অন্য শাখায় বদলি করা হয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচ জন মিলে এই বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শাখাটির কার্যক্রম চলছে।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, সংশ্লিষ্ট শাখাটিতে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বড় বড় অনিয়মের অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান। যেখানে বর্তমানে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অনুসন্ধান চলছে সেখানে এত কম সংখ্যক কর্মকর্তা থাকলে সঠিক সময়ে তদন্ত কাজ শেষ হবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, এটা বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানগুলো চলছে সেখানে এত কম কর্মকর্তা দিয়ে হয় না। অর্গানোগ্রামের অর্ধেক সংখ্যক কর্মকর্তাও এই শাখার দায়িত্বে নেই। সময়মতো অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ না করতে পারলে বীমা ও আর্থিক খাতে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত মাফিয়ারা যেকোনো সময় পালিয়ে যেতে পারেন। ফলে তাদের আইনের আওতায় আনাটাও কঠিন হয়ে পড়বে। সঙ্গে লোপাটকারীরা অর্থ পাচার করে থাকলে সেটিও ধরা পড়বে না।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুদকের অনেক মামলায় আসামিরা গাঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন বিদেশে। এদের আদালত সাজা দিলেও তা ভোগ করানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। আর এসব আসামিরা পালিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় দুদকেরই ধীরগতির কার্যক্রমের কারণে। দ্রুত অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ করতে পারলে কোনো আসামিই শাস্তির হাত থেকে রেহাই পায় না।

দুদক সূত্র ও বিভিন্ন সময়ের অনুসন্ধান সূত্র বলছে, বর্তমানে সংস্থাটির বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শাখায় অন্তত বিশ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা লোপাটের অনুসন্ধান চলছে  ২০২৩ সালের শুরু থেকে। এর মধ্যে জমি কেনার নামে ১১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির  সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে গত বছরের ৭ই সেপ্টেম্বর। একই বছরের ২৩শে মে ফারইস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হেমায়েত উল্যাহর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটির ৩৩টি ব্যাংক হিসাব থেকে ৩৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের  টাকা আত্মসাতের বিষয়ে আরও কয়েকটি অনুসন্ধান চলমান রয়েছে দুদকে। পাশাপাশি গত বছর দায়ের হওয়া মামলাগুলো তদন্তাধীন রয়েছে।

এদিকে ২০২০ সালে শুরু হয়েছিল পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে প্রশান্ত কুমার হালদারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান। এসব অনুসন্ধান করতে গিয়ে এফএএস ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্সসহ বেশ কয়েকটি  প্রতিষ্ঠান থেকে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায় দুদক। ইতিমধ্যে আত্মসাতের অভিযোগে দুই ডজনের মতো মামলা করেছে দুদক। মামলার পর তদন্ত চলাকালে এস আলম গ্রুপের সম্পৃক্ততার প্রমাণও পেয়েছে সংস্থাটি। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মকর্তার অভাবে মামলাগুলো ঝুলেই রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স করপোরেশন লিমিটেডের (বিআইএফসি) দশ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সাবেক মহাসচিব ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নানসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মামলা দায়ের করেছে দুদক। গত এক বছরে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়। এসব মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তবে শাখায় পর্যাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় এসব তদন্তেও অনেকটা স্থবিরতা নেমে এসেছে।

অন্যদিকে উত্তরা ফিন্যান্সের তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগেও একাধিক মামলা করেছে দুদক। এ বিষয়ে অনুসন্ধানও চলমান সংস্থাটিতে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন এসব অনুসন্ধান ও তদন্ত কোনোটাই ঠিকভাবে চলছে না এ মুহূর্তে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ই আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংস্থাটির কার্যক্রমের রূপরেখা বদলে যায়। তখন থেকেই কমিশন লোক দেখানো কাজের অংশ হিসেবে বিগত সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। ফলে চলমান অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানই থমকে গেছে। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটকারীদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মকর্তা সংকটের বিষয়ে জানতে দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) শাহরিয়াজের সঙ্গে কথা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। শাহরিয়াজ মানবজমিনকে বলেন, এ ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই। এ সময় জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এটা তো প্রশাসনিক ব্যাপার। আমার কিছু করণীয় নেই। আমি বিষয়টি সচিব মহোদয়কে অবহিত করবো।  

mzamin

৭ বছর ধরে বন্ধ সিলেটের পাথর কোয়ারি, কর্মহীন লাখো শ্রমিক by মিনহাজ উদ্দিন

দীর্ঘ ৭ বছর ধরে বন্ধ সিলেটের সবক’টি পাথর কোয়ারি। ভোলাগঞ্জ, জাফলং, বিছনাকান্দি, শ্রীপুর, লোভাছড়াসহ সবক’টি পাথর কোয়ারি বন্ধ রয়েছে। এতে স্থানীয় অর্থনৈতিক অবস্থার চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এ খাতে বিনিযোগকারী হাজার হাজার ব্যবসায়ী ও ৩ উপজেলার লাখো শ্রমিক কর্মহীন জীবনযাপন করছেন। পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত স্টোনক্রাশার মিল সমূহের আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, মালামাল বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে এসব যন্ত্রপাতি। এদিকে, পাথর কোয়ারি উৎসমুখের পাথর অপসারণ না করাতে প্রতিবছর জমছে পাথরের বিশাল স্তূপ। দিন দিন বেড়ে চলেছে উজান থেকে নেমে আসা এসব পাথরের স্তূপ। এতে করে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে নদ নদীর সাধারণ পানি প্রবাহে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। জাফলং জিরো পয়েন্টে পিয়াইন নদীর উৎসমুখে বিগত প্রলয়ংকারী বন্যায় উজান থেকে নেমে আসা পাথরের স্তূপে ৩০-৪০ ফুট উচ্চতায় ভরাট হয়েছে নদীর উৎসমুখ। এতে নদ-নদীর নাব্য হ্রাস পেয়েছে।

সবক’টি নদীতেই নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে মারাত্মকভাবে। নদী সমূহের উৎসমুখে পাথরজট তৈরি হওয়াতে বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে তীব্র স্রোত দেখা দেয় এবং পানির তোড়ে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। ফসলি জমি, পান সুপারির বাগান, বাড়িঘর, স্কুল, মাদ্রাসাসহ নানা স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। হুমকির মুখে রয়েছে আরও অগণিত মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, হাট-বাজার, চা বাগানসহ বিস্তৃত পতিত জমি। সিলেটের গোয়াইনঘাটের পাথর কোয়ারিগুলোও একই সময় থেকে বন্ধ রয়েছে। এমতাবস্থায় মাঝে মধ্যে লুকিয়ে কিংবা প্রশাসন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোয়ারিতে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনে গেলেও প্রশাসনের মোবাইলকোর্টের অভিযান আর পুলিশের ধর পাকড়ের শিকার হচ্ছে শ্রমিক ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে জাফলং বল্লাঘাট পাথর ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান আনু বলেন, দীর্ঘ ৭ বছর থেকে জাফলংসহ সিলেটের সকল পাথর কোয়ারী থেকে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এ কারণে পাথর ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা মানবেতর জীবনযাপন করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় সবক’টি কোয়ারিতে বহুগুণ বেড়েছে পাথরের পরিমাণ। তাছাড়া প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলেও উজান থেকে নেমে আসে পাথর। ফলে উৎসমুখে পাথরের স্তূপে নেমে আসা পানি প্রবাহের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব পাথর দ্রুত অপসারণ না করলে এলাকায় নদী ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করবে।

জাফলং স্টোনক্রাশার মিল মালিক সমিতির সভাপতি বাবলু বখ্‌ত বলেন, পাথর কোয়ারি সমূহের কার্যক্রম বন্ধ থাকাতে স্টোন ক্রাশারমিল সমূহ দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ রয়েছে। শত শত স্টোনক্রাশার মিল বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে ঝং ধরেছে। কোয়ারি বন্ধজনিত কারণে স্টোনক্রাশার মিল প্ল্যান্ট বন্ধ। লাখ লাখ টাকা বিনিযোগ করে গড়ে তোলা একেকটি প্রতিষ্ঠান পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। একদিকে পরিবার পরিজনের দৈনন্দিন খরচ, অপরদিকে ব্যাংকের দেনা টাকার কিস্তি নিয়ে মারাত্মক কষ্টে দিনযাপন করছেন। এমন অর্থনৈতিক সংকটের সময় আমাদের এসব ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। কোম্পানিগঞ্জ প্রেস ক্লাব সভাপতি ও পাথর ব্যবসায়ী শাব্বির আহমদ বলেন, আমরা সরকারের কাছে বার বার সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারি খুলে দিতে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সরকারের তরফে বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই। সিলেট চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ড্রাস্টির সাবেক সভাপতি তাহমিন আহমদ বলেন, সিলেটের পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকার কারণে বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন। কোয়ারির বিষয়ে আমরা একরকম ষড়যন্ত্রের শিকার। আশা করছি সরকার আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে আবারো সবক’টি পাথর কোয়ারী খুলে দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে জাফলং বিছনাকান্দিসহ বিভিন্ন পাথর কোয়ারি বন্ধ আছে। বর্তমানে কোয়ারি পাথর, বালি উত্তোলন অবৈধ। তাই অবৈধভাবে উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।

mzamin

শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য পটিয়ার নবাব ও মহব্বতের

চট্টগ্রামের পটিয়ায় দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া নবাব-মহব্বত ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। জানা গেছে, ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সামশুল হক চৌধুরী। তার দুই ভাই-মুজিবুল হক চৌধুরী নবাব ও ফজলুল হক চৌধুরী মহব্বত। নবাব পেশায় দর্জি ও মহব্বত কৃষক হলেও ভাই সংসদ সদস্য হওয়ার পর পাল্টে যায় তাদের ভাগ্য। দুই ভাই মিলে পটিয়ায় গড়ে তোলেন অপরাধের সাম্রাজ্য। ভাই তিনবার সংসদ সদস্য ও হুইপ থাকাকালীন তাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে। উপজেলার গরু চোর চক্রের সঙ্গে সখ্য করে জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের নাইখাইন এলাকায় অসহায় মানুষের জায়গা দখল করে একটি বিশাল ডেইরি ফার্ম গড়ে তোলেন। এই ডেইরি ফার্মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে গরু চোরেরা গরু চুরি করে এনে বিক্রি করা হতো বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, নবাব দর্জি থেকে বনে যান পটিয়া উপজেলা যুবলীগের সদস্য। গত ১৬ বছরে চট্টগ্রাম শহরে কিনে নেন কয়েকটি ফ্ল্যাটবাড়ি, অনেক জমি ও ব্যবসায়িক স্পেস। সরকারি সব টেন্ডার বাগিয়ে নিয়ে কমিশনে অন্যদের দিয়ে করিয়ে নেন কাজ। তদবির বাণিজ্য, থানা কন্ট্রোল, মাটি বহনকারী প্রতি গাড়ি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চাঁদা, বালু মহাল দখল, চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, মাদক, অস্ত্রের সিণ্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো তারা। তাদের কথার বাইরে গেলে মামলা থেকে রেহাই পেতো না কেউ।

এ ছাড়াও এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে শতাধিক জায়গা জোরপূর্বক নিজেদের নামে লিখে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ফজলুল হক চৌধুরী মহব্বত ১০০টি দলিল তৈরি করে বলেও সূত্রে জানা যায়। তা ছাড়াও আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতেন। সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন হামলার শিকার ভুক্তভোগীর ভাই সামশুল হক চৌধুরীকে ১নং আসামি করে আদালতে মামলা করায় ধলঘাট ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মো. মিজানুর রহমান চৌধুরীকে চুরি মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে পাঠানো হয়। এই ঘটনার নেপথ্যেও ছিল সাবেক হুইপের ভাই নবাব। শোভনদণ্ডী গ্রামের মাওলানা রফিক জানান, তাদের জায়গা দখলে নিতে মামলা দিয়ে ঘরছাড়া করেছিলেন তারা। আমরা হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ও তার ভাইদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। হিলচিয়া গ্রামের মোহাম্মদ ইদ্রিছ জানান, নবাব ও মহব্বত মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের ফাঁসিয়ে দেন। এই শোষকদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কোনো মামলাও তাদের বিরুদ্ধে হয়নি। উপজেলার সিনিয়র এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা দীর্ঘ ১৬ বছর মানুষের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন চালিয়ে শত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। বিএনপি নেতাদের হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে ঘরছাড়া করেছেন। ছাত্রদের আন্দোলনে হামলায় তাদের সম্পৃক্ততা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি। এদের আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।  

mzamin


কসবাতেও ছিলেন একজন বিদ্যুৎমন্ত্রী by জাবেদ রহিম বিজন

নিজেকে বিদ্যুৎমন্ত্রী হিসেবেই পরিচয় দিতেন কসবার পানিয়ারুপ গ্রামের মো. বাবুল মিয়া। দেশের মন্ত্রী আনিসুল হকও গ্রামের বাড়িতে এলে বিদ্যুৎমন্ত্রী কই বলেই শুধাতেন তাকে। আর পায় কে বাবুলকে। এখন অবশ্য আত্মগোপনে এই মন্ত্রী। উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পরিচালক  হওয়ার সুবাদে বাবুল তার রাজত্বে পরিণত করেন ওই বিদ্যুৎ সমিতিকে। তিনি যা বলেছেন বিদ্যুৎ অফিসে তাই করেছেন। তাকে ম্যানেজ না করে কেউ কোনো কাজ করতে পারেনি। টাকা  দিলেই হয়েছে কাজ। তা না হলে বসেনি খুঁটি, মিলেনি সংযোগ-মিটার কোনোকিছুই। বিদ্যুতের ঠিকাদারি কাজও ছিল তার কব্জায়। খুবলে খেয়েছেন বাবুল কসবার বিদ্যুৎ সেক্টরকে। চাহিদামতো টাকা না পাওয়ায় নিজের গ্রামের একটি মসজিদের খুঁটি পরিবর্তনের কাজ ফেলে রাখেন ১১ বছর। যা সরকার পরিবর্তনের পর এক সপ্তাহেই হয়েছে।

পানিয়ারুপ গ্রামের কাজী আমিন বলেন, তিনি ছিলেন বিদ্যুতের পরিচালক। সেখানে যত কাজ ছিল তার মাধ্যমেই করতে হতো। টাকা না দিলে কাজ হয়নি। তাকে টাকা না দেয়ার কারণে গ্রামের একটি মসজিদের খুঁটি ১১বছর পরিবর্তন হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর যা এক সপ্তাহে হয়েছে। নোয়াগাঁও পশ্চিমপাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদের ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তার টানা ছিল। সেজন্য মসজিদ দোতলা করা যাচ্ছিল না। আমরা আবেদন করে বাবুলের মাধ্যমে সেটি সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। বাবুল মসজিদ কমিটিকে বলেন- খুঁটি একটি নয়, ৩টি পরিবর্তন করতে হবে। এজন্যে আরও টাকা লাগবে। দেড়লাখ টাকা দাবি করেন। এখন ৪০ হাজার টাকা দিয়ে এক খুঁটি সরিয়েছি, সময়ও লেগেছে এক সপ্তাহ। একই গ্রামের মো. জুলহাস বলেন- গ্রামের মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছিল তাকে নিয়ে। সেখানে শুনেছি এক লোকের কাছ থেকে মিটার দেবে বলে ২ লাখ টাকা নিয়েছে।

নামপ্রকাশ না করার অনুরোধে কসবা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক এক পরিচালক বলেন-পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা ঠিকাদারিতে জড়িত বা কোনো সময় এখানে চাকরি করতেন এমন কেউ ডাইরেক্টর হতে পারবে না বলেই নিয়ম। কিন্তু বাবুল সে নিয়ম ভেঙেই পরিচালক হয়েছেন। মন্ত্রীর  দোহায় দিয়ে আইন মানেনি। নির্বাচন ছাড়া বিনা ভোটে পরিচালক হন একাধিকবার। আগে এখানে খুঁটির ব্যবসা, দালালি করতো সে। এরপর কর্মকর্তাদের বদলির ভয় দেখিয়ে ফায়দা নিয়েছে। কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আমি যখন ডাইরেক্টর তখন সে একদিন অফিসে বলেছে, ‘উনিতো ডাইরেক্টর, আমি উপমন্ত্রী’। এরপর আমি আর  সেখানে থাকিনি। সাবেক এক নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে বাবুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও জানান ওই পরিচালক। তার বদলি ঠেকিয়ে পদোন্নতির ব্যবস্থা করে ফায়দা নিয়েছেন তিনি।

কসবা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপ-মহাব্যবস্থাপক  মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বাবুল গত ৪ বছর ধরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন কাজে তার সুপারিশ থাকতো। আবাসিকের, শিল্প সংযোগের সুপারিশ করেছেন। কত কাজেই তো সুপারিশ করেছেন। এখানে কি কাজ হয়েছে বা কারা এই কাজ করেছেন, সেটি আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া হেড অফিস থেকেই বলতে পারবে। এখান থেকে কোনো টেন্ডার হয় না, ওয়ার্ক অর্ডারও হয় না। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১২৬ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন হয়েছে এই উপজেলায়। সংযোগ হয়েছে ৮২৯৭ টি।

তবে এই ক’বছরে ওই উপজেলায় কি কাজ হয়েছে সে তথ্য পেতে গিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. মকবুল হোসেন জানান, নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ লাইন নির্মাণ, অফিস ও সাবস্টেশন ভবন নির্মাণসহ সব সিভিল কাজ হয় সিলেট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে। সিলেট জোনে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ১২টি সমিতি রয়েছে। সিলেটে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ নিয়াজ মুহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, একবছর হয় তিনি এখানে এসেছেন। আগে সেখানে কি কাজ হয়েছে তার জানা নেই। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কাজের তথ্য তার কাছে নেই, জিএম অফিসে আছে বলে জানান। আবারো মহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তার কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপকের (টেকনিক্যাল) সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নিতে বলেন।  রোববার ঘাটুরায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিসে গিয়ে ডিজিএম টেকনিক্যাল আবু সায়ীমকে পাওয়া যায়নি। ফোন করলে তিনি আশুগঞ্জে রয়েছেন এবং তাকে এ ধরনের তথ্য দিতে বলা হয়নি বলেও জানান। গতকাল মঙ্গলবার আবারো তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তথ্য দেয়ার ব্যাপারে তাকে কিছু বলা হয়নি বলেই জানান। পরে আবার ফোন করে জানান, এক জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারকে তথ্য দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এর আগে মহাব্যবস্থাপক জানান-২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ হয়েছিল। তখন অনেক টাকার কাজ হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী, বর্তমানে ঢাকায় পরিচালক হিসেবে কর্মরত আলতাফ হোসেন বলেন, বাবুল মাঝে-মধ্যে সমিতির অফিসে আসতো সেই হিসেবে চিনতাম। সে গ্রামের একটা লোক তাকে দিয়ে আমার কী কাজ হবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে চিনতেন না বলেও জানান তিনি।  সম্প্রতি কসবা শহরের স্টেশন থেকে টি আলীর বাড়ির মোড় পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ করে ডিভাইডারের কাজ হয়। এ জন্যে বিদ্যুতের খুঁটি সড়কের ওপর থেকে সরিয়ে নিতে এক-দেড় কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু এই তথ্যও মিলেনি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।  বিদ্যুতের কাজের পাশাপাশি উপজেলায় বেশকয়েকটি সরকারি অফিস ভবন নির্মাণ কাজের ঠিকাদারিও করেছেন বাবুল। সরকার পতনের পরই পালিয়েছেন এলাকা ছেড়ে। পানিয়ারুপে তার বড়সড় একটি পাকা বাড়ি, অনেক সহায়-সম্পদ ছাড়াও ঢাকার টঙ্গীতে জায়গা রয়েছে। তার ২ সন্তান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করছে। এসব তথ্য জানিয়েছেন এলাকার মানুষ।

mzamin

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে ১০০ কোটি টাকা দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে একশ কোটি টাকা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধের হাতে এ অর্থ সহায়তা তুলে দেন তিনি। এ সময় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, যুব ও ক্রিড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা থেকে আর্থিক সহায়তার চেক গ্রহণ শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে জানানো হয়। এ সময় উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিবারকে সহায়তা ও আহতদের চিকিৎসার জন্য জরুরি একটি আর্থিক সহায়তা দেবে ফাউন্ডেশন। এছাড়াও এককালীন ক্যাশ দেয়া হবে এবং মাসিক একটি ভাতারও ব্যবস্থা করা হবে। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি আর্কাইবিং করে ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখা, তাদের আদর্শকে বাস্তাবায়ন করার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশন কাজ করবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদী তাদের (আহত-নিহতদের) পুনর্বাসন করা হবে। কাউন্সেলিং সার্ভিসের মাধ্যমে অভ্যুত্থানের যারা অংশ নিয়েছেন তাদের মেন্টাল হেলথ কাউন্সিলিং করা হবে। গ্লোবাল এডভোকেসি এন্ড অ্যাওয়ারনেন্স করা হবে। যার মাধ্যমে বৈশ্বিক একটি প্রচারণা এ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে করা হবে। অভ্যুত্থানের ডকুমেন্টেশনের প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে চলতি সপ্তাহ থেকে আমাদের জরুরি আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। সেটার উদ্যোগ হিসেবে অন্তর্বতী সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকার একটা ফান্ড জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে অনুদান হিসেবে দেয়া হয়েছে। এটি মূলত একটি আর্থিক ফাউন্ডেশন এখানে যে কেউ সহায়তা করতে পারবে। আমরা দেশের এবং দেশের বাইরের সবাইকে এ ফাউন্ডেশনে ডোনেট করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। যাতে আমাদের উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি। এবং শহীদ পরিবারদের পাশে আমরা দাঁড়াতে পারি। তবে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে বন্যার্তদের জন্য যে উদ্যোগগুলো নেয়া হয়েছিল সেটি এর থেকে আলাদা। এর বাইরে তিনি চাইলে যেকোনো খাতে ডোনেট করতে পারেন। সে জায়গা থেকে এ ফাউন্ডেশনের অনুদানটি আমরা সরকারের ত্রাণ তহবিল থেকে শুরু করলাম। এখন আমরা সবার কাছে ডোনেশনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। নাহিদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকেও যে উদ্যোগগুলো চলছে সেগুলো আলাদাভাবে চলতে থাকবে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও চলবে। এ সময় ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, আমরা আজ প্রধান উপদেষ্টার থেকে চেকটি গ্রহণ করেছি। আমরা দেশ ও দেশের বাইরে যারা আছেন তাদের অনুরোধ করবো যে আপনাদের সহায়তা আমাদের ফাউন্ডেশনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যারা আহত অবস্থায় রয়েছে তাদের চিকিৎসাটা এ মুহুর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা যত বিলম্ব হবে তাদের ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তালিকায় ২০ হাজারের অধিক আহত যেটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে করা। আর শহীদদের সংখ্যা প্রায় ৮০০। এখন পর্যন্ত ৭০০ এর মতো শহীদ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি আমরা। যোগাযোগ সম্পূর্ণ হলে আমাদের স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, ফাউন্ডেশনের যাত্রা আজ শুরু হলো। এখন সকলের কাছে ডোনেশনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। 
mzamin