Saturday, August 24, 2024

কেন পশ্চিমা নারীবাদীদের কাছে ফিলিস্তিনি নারীদের ধর্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

পার্সটুডে- নারীবাদী আন্দোলন তার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়নি। ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতাকে নারীবাদী আন্দোলনের নেতারা চরমভাবে উপেক্ষা করে চলেছেন।

গত দশ মাসে, সহমর্মিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক পশ্চিমা নারীবাদী বিশেষ করে ব্রিটেনের নারীবাদী সংগঠনগুলোর দ্বিমুখী আচরণ প্রত্যক্ষ করা গেছে।  পার্সটুডে'র মতে, ইসরাইলি নারীদের প্রতি সমর্থনে এই নারীবাদীদের কাছ থেকে অসংখ্য দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও,ফিলিস্তিনি নারীদের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে রহস্যজনকভাবে তারা নীরবতা রয়েছে।

ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনি নারীদের উপর ব্যাপক যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও এদিকে কারো কোনো নজর নেই। অথচ ফিলিস্তিনি নারীদের দুরবস্থার প্রতি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার উচিত ছিল।

৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত শত শত ফিলিস্তিনি নারীকে ইসরাইল আটক করেছে এবং তাদের ওপর যৌন নির্যাতন, নগ্ন করে শারিরিক নির্যাতন, ধর্ষণের হুমকিসহ বিভিন্নভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে। এর মধ্যে দুটি ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পশ্চিমা নারীবাদীরা চোখ বন্ধ করে রেখেছে

চলতি বছর ১৯ ফেব্রুয়ারী জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নথিভুক্ত যৌন নিপীড়নের দুটি ঘটনাকে উপেক্ষা করা হলেও প্রশ্ন হচ্ছে, গত ৭৬ বছরে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর যে সহিংসতা চালিয়েছে এবং এর যে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে সেটাকে কীভাবে উপেক্ষা করা যায়?

সাত অক্টোবরের আগে প্রকাশিত ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে এই সহিংসতার অসংখ্য রিপোর্ট, প্রতিবেদন সহজেই পাওয়া যায়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই সব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেমন ইসরাইলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেনারেল কমিটি, জেরুজালেম-ভিত্তিক মহিলা আইনি পরামর্শ এবং সহায়তা কেন্দ্র,এর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যায়।

এই প্রতিবেদনগুলো আইনি শুনানি, আইনি অভিযোগ, প্রতিরক্ষা অ্যাটর্নিদের নথি এবং বন্দীদের সাক্ষ্যগুলোর উপর ভিত্তি করে, ইসরাইলে আটকে থাকা ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন সহিংসতা, নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের চিত্রিত ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।  যদি নারীবাদীরা সত্যিই যুদ্ধে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, তাহলে ফিলিস্তিনি নারীদের বিরুদ্ধে চলমান অপরাধগুলো নিয়ে তাদের অবশ্যই কথা বলা উচিত।

গত দশ মাস ধরে ৪০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা যাদের অর্ধেকই নারী ও শিশু এবং ২১ হাজারটিরও বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটলেও নারীবাদীদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। বরং তারা ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ওপর  চলমান সহিংসতা চরমভাবে উপেক্ষা করে গেছে।

একইভাবে, গত ১২ জুন প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও  ফিলিস্তিনি নারীদের দুর্দশার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে এবং এসব ঘটনা তাদের বিবেককেও আলোড়িত করতে পারেনি।

যৌন সহিংসতার সংস্কৃতি

যৌন সহিংসতার ঘটনা পুরুষদের বিরুদ্ধেও হয়েছে। ইসরাইলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনি পুরুষদেরকে জোরপূর্বক নগ্ন করে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে সেদেহ তামান কারাগার থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা যায় ইসরাইলি সেনারা একজন ফিলিস্তিনিকে গণধর্ষণ করছে। বেজালেল স্মোট্রিচসহ ইসরাইলি মন্ত্রীরা ভিডিওটি প্রকাশের নিন্দা জানিয়েছিলেন, তবে যৌন নিপীড়নের কোনো নিন্দা তারা করেননি। লিকুদ পার্টির হ্যানোচ মিলভস্কির মতো কেউ কেউ এই নির্যাতনকে বৈধতা দিয়েছেন। যেমনটি পশ্চিমা নারীবাদীরা নীরব রয়েছে।

পাশ্চাত্যের নারীবাদীদের মতো বিশ্বের অন্য প্রান্তের নারীবাদীদের নীরবতাও নিন্দনীয়। ফিলিস্তিদের সীমাহীন দুর্দশার ব্যাপারে সবার নীরবতা থেকে মানবতার চরম অধ:পতনের প্রমাণ পাওয়া যায়।

যখন নিহতদের ৭০% নারী ও শিশু, ফিলিস্তিনি নারীরা যখন ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে তাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে বের করে, মায়েরা যখন তাদের প্রাণহীন শিশুদের আলিঙ্গন করে, যখন পরিবারগুলো শরণার্থী শিবিরে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে মারা যায়, ইসরাইলের অবরোধের কারণে মায়েরা যখন তাদের সন্তানদের অনাহারে মরতে দেখে এবং যখন শিশুরা চরম দুর্ভিক্ষে খাবারের জন্য এদিক ওদিক ছুটাছু করে এবং কান্নাকাটি করে তখন এ নিষ্ঠুর নীরবতা কোনো রাজনীতি নয় বরং তা  নারীদের প্রতি কথাকথিত নারীবাদীদের বিশ্বাসঘাতকতা।

ভারত পাল্টেছে এই বার্তা দিতে ঢাকায় দূত পাঠানো উচিত নয়া দিল্লির: আউটলুক ইন্ডিয়াকে শাফকাত মুনির

ভারতের সঙ্গে একটি পরিপক্ব, ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক সম্পর্ক চায় বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ। তাদের অনেকে মনে করেন, এতদিন এই সম্পর্ক ছিল একদল, এক ব্যক্তি ও এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। তা বিস্তৃত সম্পর্ক ছিল না। তাই নয়া দিল্লির একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়া জরুরি যে, যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন যা-ই হোক না কেন বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হবে। এ সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আউটলুক ইন্ডিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ঢাকাভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির। এতে বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে ভারত কীভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক মেরামত করতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে সেই সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: শহরগুলোর রাস্তায় আইন শৃংখলা কি ফিরেছে? পুলিশ সদস্যরা কি দায়িত্বে ফিরেছেন অথবা তাদেরকে কি এখনও টার্গেট করা হচ্ছে?
উত্তর: আস্তে আস্তে শৃংখলা ফিরছে। আইন শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা দ্রুত পুনঃস্থাপনে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন  পর্যন্ত ৫৩৯টি থানায় ফিরেছেন পুলিশ সদস্যরা। এখানে সবেমাত্র একটি বিপ্লব ঘটে গেছে। প্রকৃতিগতভাবে সব সময়ই বিপ্লব হয় বিশৃংখল। আমি আস্থাশীল যে, কয়েক দিনের মধ্যে সবকিছু পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় আসবে। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, পুলিশের ওপর আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয়ে গেছে। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, উল্লেখযোগ্য সংস্কার করা হবে পুলিশে। তাদের নির্ধারিত পোশাক ও লোগো পরিবর্তন করা হবে। নাগরিক এবং নাগরিক সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা মনে করি বড় রকমের সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পুলিশ। পুলিশে আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করতে হবে। আমাদেরকে এমন পদ্ধতিতে সংস্কার করতে হবে যে, পুলিশি সংস্কৃতি পরিবর্তন হয় এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের দৃশ্য আমাদেরকে রাজপথে যেন আর কখনো দেখতে না হয়।

প্রশ্ন: শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়েছে ভারত। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আছে। কীভাবে নয়া দিল্লি আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে? নয়া দিল্লির সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সম্পর্ক কি শেখ হাসিনা আরো কঠিন করে তুলেছেন ভারতে অবস্থান করে?
উত্তর: বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ ভারতের সঙ্গে একটি পরিপক্ব, ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক সম্পর্ক চায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এরই মধ্যে কথা বলেছেন এবং তাদের মধ্যে চমৎকার মতবিনিময় হয়েছে। এটা জেনে আমি আনন্দিত। আমি পুনর্বার বলতে চাই যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এমন একটি বার্তা দিতে ঢাকায় একজন বিশেষ দূত পাঠানো উচিত, যাতে বোঝা যায় যে তারা পাল্টাতে চায়। এমন একটি সফর ভবিষ্যত গঠনমূলক সম্পর্কের পথ তৈরি করতে পারে। আমাদেরকে এটা স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশে জনগণের বিপ্লব ঘটে গেছে এবং হাসিনা এখন একটি ইতিহাস! ভারতে হাসিনার অব্যাহত অবস্থানের বিষয়ে এরই মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এটা স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে, হাসিনার বিরুদ্ধে জনগণের ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ছাত্র ও বিভিন্ন গ্রুপের পক্ষ থেকে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। গত কয়েক দিনে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা হয়েছে। হাসিনার অব্যাহতভাবে ভারতে অবস্থান করে সেখান দেয়া তার বক্তব্য/বিবৃতি বিপ্লব ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে হেয় করছে। এতে অবশ্যই সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলবে, যা আমরা চাই না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা পাবেন বলে নিশ্চয়তা দিয়েছেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় তিনি কি তা দেয়ার মতো অবস্থায় থাকবেন?
উত্তর: সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। এমনকি একটি মৃত্যু অথবা সহায় সম্পত্তি ধ্বংসের একটি ঘটনাও অনেক বেশি। তাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনগণকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা জানতে পেরেছি যে, প্রচুর ভুয়া তথ্য আছে। তাই এসবের হোতাদেরকে ন্যায়বিচারের আওতায় আনাও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে ড. ইউনূস পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার সরকার বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বিপ্লব সব বাংলাদেশির ‘মনসুন রেভ্যুলুশন’। ছাত্র এবং এ দেশের নাগরিকরা এই ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লব এনেছেন। এটা এমন এক বিপ্লব যেখানে সব নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিকার থাকবে। নতুন বাংলাদেশে একগুঁয়েমি, বৈষম্য ও অবিচারের কোনো স্থান নেই। এই বিপ্লবের শহীদদের কাছে ঋণী আমরা।

প্রশ্ন: ভারত শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন দেয়ার অন্যতম কারণ হলো ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশের মাটি কখনো কখনো ব্যবহার করতো ভারতবিরোধী শক্তি। নতুন প্রশাসন অথবা পরে নির্বাচিত যেকোনো সরকার নয়া দিল্লির নিরাপত্তা সংশয়ের প্রতি কি সংবেদনশীলতা দেখাবে?
উত্তর: অন্তর্বর্তী সরকার বা ভবিষ্যতে নির্বাচিত যেকোনো সরকার কখনোই চাইবে না যে, ভারত সহ যেকোনো দেশের যেকোনো বিদ্রোহী গ্রুপ বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করুক। আমি আগেই যেমনটা বলেছি আমরা ফলপ্রসূ, গঠনমূলক এবং অর্থপূর্ণ সম্পর্ক চাই। একে অন্যের নিরাপত্তা উদ্বেগের ক্ষেত্রে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হবে সংবেদনশীল।

প্রশ্ন: ভারতের আরেকটি উদ্বেগ হলো চীনকে নিয়ে। হাসিনার শাসনকালে চীন এবং ভারত- উভয়েই সারাদেশে (বাংলাদেশ) তাদের উপস্থিতি বিস্তার করেছে।  এখন ভারত আউট, এ অবস্থায় চীন কি আধিপত্য বিস্তার করবে?
উত্তর: বাংলাদেশে কোনো দেশ আধিপত্য বিস্তার করবে এমন কোনো প্রশ্নই হতে পারে না। এরই মধ্যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন, সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম সত্তা। তাই আধিপত্যের প্রশ্নই উঠতে পারে না।

প্রশ্ন: শেখ হাসিনা বার বার অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশের অস্থিরতা উস্কে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর কারণ বাংলাদেশে একটি ঘাঁটি স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দেননি তিনি। এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
উত্তর: এসব অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও হাস্যকর। ‘মনসুন রেভ্যুলুশন’, ছাত্র ও নাগরিকদের আত্মত্যাগকে হেয় করার এটি একটি বেপরোয়া প্রয়াস। প্রকৃতপক্ষে এই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল যে জন্য, তাকে অস্বীকার করার এটা একটি চেষ্টা। এটা বাংলাদেশিদের, বাংলাদেশিদের জন্য এবং বাংলাদেশীদের দ্বারা সংঘটিত একটি বিপ্লব। এক্ষেত্রে বিদেশি হাত থাকার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। সময় এসেছে এ ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে জড়ানো থেকে বিরত থেকে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার।

দেশকে ইউরোপ বানাতে ৫ বছরের বেশি লাগবে না : ফরহাদ মজহার

বাংলাদেশকে ইউরোপের সমান বানাতে পাঁচ বছরের বেশি সময় লাগবে না বলে মন্তব্য করেছেন কবি, লেখক ও গবেষক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, অবশ্য তার জন্য প্রয়োজন আমাদের মানব সম্পদসহ সব সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।

শনিবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে প্রজন্ম একাডেমির উদ্যোগে ‘আওয়ামী দুর্বৃত্তায়ন ও লুটপাটে বিধ্বস্ত অর্থব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকারের করণীয়’- শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরহাদ মজহার এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের উচ্ছ্বাসকে কাজে লাগাতে হবে। আওয়ামী সরকার এতদিন আমাদের তরুণ প্রজন্মের উচ্ছ্বাসকে দাবিয়ে রেখেছিল। সেটা এতদিন পর মাটি ফুড়ে বেরিয়ে এসেছে। এই প্রজন্ম আজ দেশের যে কোনো স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলেই আমাদের দেশ একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। পার্শ্ববর্তী দেশের চাপ আছে। আমাদের মৌলিক প্রাপ্তিগুলো যদি তাদের কাছ থেকে সহজ প্রক্রিয়ায় না পাই সেক্ষেত্রে আমাদের দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশে অনেক রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে চক্রান্তকারীরা কিছুই করতে পারবে না। দেশে দীর্ঘসময় ধরে লুটপাট হয়েছে, দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকেও আমরা অল্পসময়ের মধ্যে মুক্তি পেতে পারি যদি আমাদের তরুণ ছাত্রসমাজ সোচ্চার থাকে। তিনি দুঃসময়ে প্রফেসর ইউনূসের পাশে থাকার জন্য প্রজন্ম একাডেমির সদস্যদের ধন্যবাদ জানান এবং তাদের বর্তমান সরকারে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।

প্রধান বক্তার বক্তব্যে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যে দুঃসাহসী ভূমিকা রেখে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। একে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক শক্তিকে ধরে রাখতে হবে এবং গণতান্ত্রিক শক্তির বিকশিত হওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। মনে রাখতে হবে ফ্যাসিস্ট শক্তি বনাম জনগণ। এখানে জনগণের জয় হয়েছে। আগামীদিনে দেশ পরিচালনায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৭ দফা বাস্তবায়ন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও দৈনিক খোলা বাজার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক জহিরুল ইসলাম কলিম বলেন, বানভাসী মানুষের পাশে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহীতা আইন পাস করে তাদের সব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। আওয়ামী লুটেরাদের সব অর্থ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা রাখতে হবে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার থাকতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের দমনপীড়নে তরুণ সমাজ পিষ্ট ছিল। এখন কাজ করার অবারিত সুযোগ এসেছে। প্রজন্ম একাডেমি থেকে দাবি তোলা হয় যাতে বর্তমান সরকারে তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়।

প্রজন্ম একাডেমির সভাপতি লেখক ও গবেষক কালাম ফয়েজীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন শাহীনের পরিচালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান, প্রজন্ম একাডেমির অর্থ সম্পাদক আবু হায়দার, জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম হোসেন, যুবনেতা হারুন অর রশীদ, প্রজন্ম একাডেমির সদস্য মো. নবী হোসেন, শারমিন রিনা, খলিল মৃধা প্রমুখ।

‘ভাত খাইতাম, না ঘর ঠিক করতাম, চিন্তা লাগের’

খেতের মধ্য দিয়ে প্রায় বুকসমান পানি ভেঙে মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কে উঠে আসছিলেন কয়েকজন। মনু নদ প্রকল্পের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বাঁধের ওপর দিয়ে সড়কে আসার সুযোগ নেই। পানি অনেকটা কমে আসছে, কিন্তু ভাঙা অংশ দিয়ে পার হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। মনু নদ প্রকল্পের বাঁধ ভেঙে ওই এলাকায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।

আজ শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের কদমহাটা এলাকাতে তাঁদের সঙ্গে দেখা। তাঁরা বন্যায় ডুবে যাওয়া নিজেদের ঘরদোর দেখে ফিরছিলেন।

এ দলেরই একজন কদমহাটা গ্রামের মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘ঘরর অবস্থা খুবই খারাপ। বেড়া ভাঙি গেছে। কিছু মাল বাইর অইয়া গেছেগি (জিনিস বের হয়ে গেছে)। ঘর ঠিক করা লাগব। কিন্তু কমলাখান (কেমন করে) যে ঠিক করতাম। বাঁশ-ঘাস কিচ্ছু নাই। ভাত খাইতাম, না ঘর ঠিক করতাম, চিন্তা লাগের।’

মনোয়ারা বেগম জানান, গত বুধবার দুপুরে ঘরে পানি ঢুকেছে। তাঁর কাঁচা ঘর। দেখতে দেখতে ঘরে কোমরসমান পানি হয়ে গেছে। তাঁরা কোনো রকম ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর কদমহাটা স্কুলে গিয়ে উঠেছেন। শুধু তিনি নয়, তাঁদের পাড়া-প্রতিবেশীর অনেকেই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। এর পর থেকে আশ্রয়কেন্দ্রেই আছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে যেমন-তেমন করে হোক, চলে যাচ্ছে। অনেকে শুকনা খাবারসহ কিছু না কিছু দিচ্ছেন। কিন্তু ঘরের অবস্থা দেখে মনটা ভেঙে গেছে। কী করে ঘরে ফিরবেন, এ নিয়ে চিন্তায় আছেন।

তাঁর প্রতিবেশী সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ফজলু মিয়ার চিন্তাও কম নয়। ফজলু মিয়া বলেন, ‘কাঁথা-বালিশ আর হুরুত্বা লইয়া (বাচ্চা নিয়ে) কোনো রকম বাইর অইছি (বের হয়েছি)। আইজ (শনিবার) গিয়া ঘর দেখছি। ঘরও অখনো (এখনো) ঠাঁই নাই (অনেক পানি)। ঘরর নিচ ফুক্কা (ছিদ্রময়)। ভিটারে একবারে সুড়ঙ্গ (নালার মতো) করি লাইছে (করে ফেলছে)। বেড়াও পানিয়ে নিয়া গেছে। ঘরও যাওয়ার কোনো রাস্তা নাই। চাইর দিন ধরি খিচুড়ি-টিচুড়ি খাইয়া স্কুলও আছি।’

ফজলু আরও বলেন, তাঁদের প্রায় ১২ সদস্যের পরিবার। ঘরের জায়গাটাও নিজের নয়। পরিচিত একজন ঘরটা বানিয়ে দিয়েছিলেন। কবে-কীভাবে ঘর ঠিক করবেন, চিন্তা করে কোনো কূল পাচ্ছেন না। দুই-চার দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলেও এই ঘরে ১৫-২০ দিনের আগে ফেরার সুযোগ দেখছেন না।

ফজলু আর মনোয়ারা বলেন, তাঁদের পাশের আরও চারটি ঘর কাত হয়ে আছে। পানি নামলে পড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি এ রকম ১০-১৫টি ঘর আছে। সব কটিরই একই অবস্থা। ভাঙনের মুখে থাকা রিপন মিয়া ও আছমা বেগমের ঘর পানির তোড়ে ভেসে গেছে। ভিটার মাটিটুকুও নেই। ভেসে যাওয়া একটি ঘরের টিনের চাল ভাঙনের ভাটিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে রাজনগর উপজেলার শ্বাসমহল এলাকায় মনু সেকেন্ডারি বাঁধ (নদ-সংলগ্ন বাঁধ) ভেঙে সেকেন্ডারি বাঁধ ও মনু নদ প্রকল্প বাঁধের মধ্যবর্তী গ্রামে পানি প্রবেশ করে। রাতের মধ্যে প্রায় সব ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়। মধ্যবর্তী গ্রামের লোকজনের অনেকে বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন কদমহাটা উচ্চবিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অনেকে বাঁধের ওপর কোনোমতে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার কদমহাটা এলাকায় পানি উপচে মনু নদ প্রকল্পের বাঁধের একাধিক স্থান ভেঙে যায়। কিন্তু এখন পানি ধীরে ধীরে নামছে। কয়েক দিনের মধ্যে ঘরবাড়ি থেকেও পানি নেমে যাবে। চিন্তা শুধু যাঁদের ঘর ভেঙেছে, তাঁদের নয়। যাঁদের ঘর ভাঙেনি, তাঁরাও ১০-১৫ দিনের আগে সেখানে উঠতে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। কারণ, পানি-কাদায় সেখানে আর থাকার অবস্থা নেই।

কদমহাটা উচ্চবিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া ছয়ফুল বেগম তাঁর মাদ্রাসাপড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে ঘরের অবস্থা দেখতে বেরিয়েছেন। মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কে তাঁর সঙ্গে দেখা। তিনি বলেন, ‘বুধবার রাইত (রাতে) পানি আইছে (এসেছে)। বৃহস্পতিবারে ঘরের অর্ধাঅর্ধি (আধাআধি) পানি। এরপর ঘরও থাকতাম পারছি না। পানির লাগি অখনো (এখনো) ঘরর অবস্থা গিয়া দেখতাম পারছি না। চালরসমান (ঘরের চাল) পানি। দুই দিন আধাপথও (অর্ধেক পথে) গিয়া ফিরত আইছি।’

ছয়ফুল এখন অনেকটা দূর ঘুরে ঘরে বাড়ির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। আশ্রয়কেন্দ্রে অনেকে চিড়া, আখনি দিচ্ছেন। তাতে দিন চলছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘরে তো ফিরতে হবে তাঁদের।

মনু নদ প্রকল্পের বাঁধে দেখা পেশায় রাজমিস্ত্রি মালিকোনা গ্রামের সাহেল মিয়ার সঙ্গে। তিনি একটি ঠেলা গাড়ি নিয়ে কিছু নিতে এসেছেন। সাহেল মিয়া বলেন, ‘বাড়িতে দুই মানুষসমান পানি উঠছিল। এখনো হাঁটুসমান পানি। সব ঘরেই পানি। প্রায় ঘর ভাঙি গেছে। মনু ডাইকে (সেকেন্ডারি বাঁধে) অনেক মানুষ আছে। সবার ঘরেই পানি। অনেকে এসে কিছু চাল, চিড়া, মুড়ি, ওষুধ দিছে, তা দিয়েই চলছে তাঁদের।’

প্রেমনগর গ্রামের খোদেজা বেগম বুধবার থেকে বাঁধে আছেন। আজ বেরিয়েছেন বাবার বাড়ি শ্রীমঙ্গল যাওয়ার জন্য। তিনি বলেন, ‘ঘর থাকি কোনো রকম জান লইয়া বাইর অইছি (প্রাণ নিয়ে বেরিয়েছি)। ঘরও এখনো পানি। ঘরে ঢুকতাম পাররাম (পারছি) না। হাঁটু পর্যন্ত কাদায় গাড়ে (কাদায় ডুবে যায়। এখন দেখি কিছু খানি-খোরাক (খাদ্যপণ্য) লইয়া আইতামনি পারি (আসতে পারি কি না)।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মৌলভীবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুর ১২টায় মনু নদের পানি রেলওয়ে ব্রিজের কাছে বিপৎসীমার ১১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং চাঁদনীঘাটে ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কুশিয়ারা নদী শেরপুরে ৯ সেন্টিমিটার এবং জুড়ী নদী ভবানীপুরে ১৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপর দিকে ধলাই নদের পানি রেলওয়ে ব্রিজের কাছে বিপৎসীমার ২১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।


আদালত প্রাঙ্গণে এবং আদালতে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলী উদ্বেগজনক by আলী রীয়াজ

আদালত প্রাঙ্গণে এবং আদালতে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে আমি উদ্বেগজনক বলে মনে করি। যে কোনও অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার প্রাপ্তি যেমন অধিকার তেমনি তার নিরাপত্তা বিধান সরকারের দায়িত্ব। আটক ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করার সময় এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার যাতে করে এই ধারণা তৈরি না হয় যে, তিনি ন্যায়বিচার বঞ্চিত হতে পারেন। তদুপরি অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ চাওয়া মাত্রই  অভিযুক্তদের রিমান্ডে দেবার ব্যবস্থাও বিচার বিভাগের জন্যে খুব ভালো কাজ নয়।

মনে রাখা দরকার যে, সারা বিশ্বের চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে আমার আলাপ-আলোচনায় যে প্রশ্নটি আমি শুনতে পাচ্ছি তা হচ্ছে, যে ব্যাপক আকারে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার ন্যায়বিচার হবে কীনা, যারা এই ধরণের অপরাধ করেছেন তাদের বিচার করা সম্ভব হবে কীনা। বিশ্বের কমবেশি সকল দেশেই এটা এখন আলোচিত যে, বাংলাদেশ গত ১৫ বছরে এক ভয়াবহ এক-ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচারী শাসনের মধ্য দিয়ে গেছে যখন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এখনকার কোনও আচরণ যেন এই জায়গা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে না নেয় সেটা মনে রাখা দরকার। তদুপরি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক সমাজের এবং মিডিয়ার সহযোগিতা দরকার হবে।  

প্রাসঙ্গিকভাবে গণমাধ্যমগুলো রিমান্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তি কী বলেছেন, কী করেছেন বলে যা প্রচার করছে সেগুলো যে পুলিশের সূত্রে পাওয়া ‘খবর’ সেটা সহজে বোঝা যায়। এগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের কোনও উপায় নেই, ফলে সাংবাদিকরা এই ধরণের সূত্রের দেয়া ‘তথ্য’কে যদি সংবাদ বলে প্রচার করেন তা জনপ্রিয়তা লাভে সাহায্য করতে পারে, কিন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়না। এই ধরণের সাংবাদিকতার কেবল সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুন্ন করেনা, গণমাধ্যমের ওপরে আস্থারও অবসান ঘটায়।

[লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট। লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া]

কঠোর অভিবাসন নীতির জেরে এবার ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে বৃটেনে

বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম এনেছে কিয়ের স্টারমারের সরকার। যে কারণে ভিসা পেতে সমস্যা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বৃটেনে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের স্পনসরড স্টাডি ভিসা ২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়া বছরে ১১০,০০৬টি ভিসা দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরে ছিল ১৪২,৬৯৩টি। অর্থাৎ ৩২,৬৮৭ টি কমেছে। এটি ২০১৯ এবং ২০২৩  এর মধ্যে উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের জন্য বেছে নেওয়া ভারতীয় ছাত্রদের ক্রমাগত বৃদ্ধির পরে এসেছে। ২০১৯ এবং ২০২৩ এর মধ্যে উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যকে বেছে নিয়েছেন ভারতীয় ছাত্ররা। পাশাপাশি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে অভিবাসীদের সংখ্যাও। ফলে কড়াকড়ি করা হয়েছে অভিবাসন নীতিতে। শিক্ষার্থীসহ বিদেশিদের বৃটিশ ভিসা পেতে পড়তে হচ্ছে কঠিন নিয়মের গেরোয়।

যার জেরে চলতি বছরে বহু ভারতীয় ছাত্রছাত্রীই আর বৃটেনে পা রাখেননি। তবে শুধু ভারতীয় নয়, বৃটেনে ভিসা প্রদান কমে গিয়েছে নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদেরও। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ৪৬% হারে হ্রাস ঘটেছে নাইজেরিয়ান ছাত্রছাত্রীদের ভিসায়।শিক্ষার্থীদের নিরিখে নাইজেরিয়াকে পিছনে ফেলে দিয়েছে পাকিস্তান। বিগত বছরে বৃটেনে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকায় প্রথমে ছিল ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান। কিন্তু এই রিপোর্টে দেখা গেছে, দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে ইসলামাবাদ। স্টুডেন্ট ভিসা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল যুক্তরাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক  কঠোর ভিসা নীতি  । জানুয়ারী ২০২৪ থেকে, শুধুমাত্র গবেষণা ভিত্তিক স্নাতকোত্তর ছাত্ররা তাদের পার্টনার  এবং শিশুদের যুক্তরাজ্যে আনতে পারবে। এই নীতি পরিবর্তনের ফলে ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে জারি করা নির্ভরশীল ভিসার সংখ্যা ৮১% হ্রাস পেয়েছে,  শুধুমাত্র ১১,৬৭৫টি ভিসা দেওয়া হয়েছে । পূর্বে, টোরি সরকার একজন আশ্রিত ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্যে আনার জন্য প্রয়োজনীয় বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা করেছিল, যা আইনি অভিবাসন হ্রাস করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ১১ এপ্রিল কার্যকর হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্বে বর্তমান যুক্তরাজ্য সরকার পারিবারিক ভিসায় পরিবারের সদস্যদের স্পনসর করার জন্য ন্যূনতম আয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা পরিকল্পনা স্থগিত করে ।

সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে

নেপালে নদীতে পড়লো ভারতীয় পর্যটকবোঝাই বাস, নিহত ২৭

নেপালে মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত ২৭ জন ভারতীয়ের ময়নাতদন্ত শনিবার বাগমতি প্রদেশের একটি হাসপাতালে করা হয়েছে।   মৃতদেহগুলো  মহারাষ্ট্রে  নিয়ে যাবার আগে একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এখবর জানিয়েছেন। নেপাল পুলিশ সূত্রে খবর, উত্তরপ্রদেশের ওই বাসে ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। শুক্রবার পোখরা থেকে কাঠমাণ্ডু যাচ্ছিল বাসটি। পথে তানাহুন জেলার মারসিংডি নদীতে পড়ে যায় যাত্রীবোঝাই বাসটি। তবে নদীর তীরেই বাসটির খোঁজ মিলেছে। স্থানীয় ডিএসপি দীপকুমার রায়া জানান, বাসটিতে উত্তরপ্রদেশের নম্বর প্লেট রয়েছে। জানা গেছে মৃত ২৭ জন ভারতীয় তীর্থযাত্রী প্রত্যেকেই মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা ছিলেন যারা ১০ দিনের সফরে নেপাল গিয়েছিলেন। ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

মাই-রিপাবলিকা নিউজ পোর্টাল ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ দীপক রাইয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মৃতদেহগুলিকে আনবু খাইরেনি হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্তের জন্য চিতওয়ানে পাঠানো হয়।  মুম্বাইতে মহারাষ্ট্র সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিমান আজ মৃতদেহগুলিকে নাসিকে নিয়ে যাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রক্ষা খড়সে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এবং বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের ফিরে আসার বিষয়টি তদারকি করতে। তিনি এক্স-এ একটি পোস্টে বলেছেন, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত  বীন শ্রীবাস্তব এবং নেপালের পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব ব্রিঘু ধুঙ্গানা একত্রে  উদ্ধার অভিযান এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা করছেন। তিনি আহত ১৬জনের একটি বিস্তারিত তালিকাও শেয়ার করেছেন, যাদের বেশিরভাগই ‘গুরুতর’ আঘাত পেয়েছেন। আহতদের মধ্যে দশজন নারী, বাকি ছয়জন পুরুষ। বাস দুর্ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করে, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এক্স-এ নিহতদের মৃত্যুতে  শোক প্রকাশ করেছেন। কাঠমান্ডু পোস্ট মোতাবেক, নেপাল পুলিশ এবং সেনার  দুর্ঘটনাস্থল থেকে মৃত এবং আহত যাত্রীদের তুলতে প্রায় সাত ঘন্টা সময় লেগেছিল। নেপালের আর্মড পুলিশ ফোর্সের (এপিএফ) ডেপুটি মুখপাত্র শৈলেন্দ্র থাপা পিটিআইকে জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলেই ১৬ জন ও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো ১১ জন মারা যান। আহত ১৬ জনকে বিমানে করে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে সংবাদপত্রটি জানিয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ এখনও জানা যায়নি। দুর্ঘটনাস্থল কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে জাতীয় সড়কের কাছে  অবস্থিত।

সূত্র : বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

বিশ্বে প্রথম ফুসফুস ক্যান্সারের ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালু হলো সাত দেশে

বিশ্বের প্রথম mRNA ফুসফুসের ক্যান্সারের ভ্যাকসিনের পরীক্ষা শুরু হলো। বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী এই ভ্যাকসিনের  হাজার হাজার জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি বছর বহু মানুষ ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণে মারা যান। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ১.৮ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয় ফুসফুসের ক্যান্সারে । যাদের দেহে  টিউমার ছড়িয়ে পড়ে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। এখন বিশেষজ্ঞরা একটি নতুন ভ্যাকসিন পরীক্ষা করছেন যা শরীরের ভেতরে ক্যান্সার কোষগুলিকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করে এবং সেগুলিকে ধ্বংস করে দেয়। এমনকি রোগীর দেহে নতুন করে ক্যান্সার হবার সম্ভাবনাও কমে যায়। BNT116 নামে পরিচিত এবং BioNTech দ্বারা তৈরি, এই ভ্যাকসিনটি নন-স্মল সেল ফুসফুস ক্যান্সার (NSCLC) নিরাময়ের জন্য তৈরী করা হয়েছে।

মানব দেহের ওপর BNT116  এর ফেজ ১ ক্লিনিকাল ট্রায়ালের গবেষণা সাতটি দেশে ৩৪ টি গবেষণা সাইটে চালু হয়েছে: যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্পেন এবং তুরস্ক।যুক্তরাজ্যের ছয়টি সাইট ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে অবস্থিত, যেখানে প্রথম যুক্তরাজ্যের ক্যান্সার রোগীরা  ভ্যাকসিনের  প্রাথমিক ডোজ  গ্রহণ করেছেন।

সামগ্রিকভাবে প্রায় ১৩০ জন রোগীকে - সার্জারি বা রেডিওথেরাপির আগে  ইমিউনোথেরাপির পাশাপাশি ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য নথিভুক্ত করা হবে। প্রায় ২০ জন রোগী যুক্তরাজ্য থেকে ভ্যাকসিন পাবেন। এই ভ্যাকসিন Covid-19 - এর মতো মেসেঞ্জার আরএনএ  (mRNA) কে ব্যবহার করে, নন-স্মল সেল ফুসফুস ক্যান্সারের কোষগুলিকে শনাক্ত করে তাদেরকে ধ্বংস করবে।

শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলবে। কেমোথেরাপির পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর কোষগুলিকে স্পর্শ না করে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে  একজন ব্যক্তির প্রতিরোধ ক্ষমতাকে  শক্তিশালী করাই এই গবেষণার লক্ষ্য। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতাল NHS ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের (UCLH) পরামর্শক মেডিকেল অনকোলজিস্ট অধ্যাপক সিও মিং লি বলেছেন- ‘আমরা এখন ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য এমআরএনএ-ভিত্তিক ইমিউনোথেরাপি ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করেছি এবং পরীক্ষার ফলাফলের আশায় আছি। এই প্রক্রিয়া  ক্যান্সার চিকিৎসার পরবর্তী বড় ধাপ।’ লন্ডনের ৬৭ বছর বয়সী জানুস রাক্স যুক্তরাজ্যতে ভ্যাকসিন পাওয়া প্রথম ব্যক্তি। মে মাসে তার রোগ ধরা পড়ে এবং তার পরেই কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি শুরু হয়। জানুস একজন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞ । ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ রিসার্চ ইউসিএলএইচ ক্লিনিকাল রিসার্চ ফ্যাসিলিটিতে ৩০ মিনিটের ব্যবধানে পাঁচ মিনিট পরপর ছয়টি ইনজেকশন দেয়া হয় জানুসকে। প্রতিটি জ্যাবে আলাদা আলাদা আরএনএ স্ট্র্যান্ড রয়েছে। তিনি প্রথমে  টানা ছয় সপ্তাহ, এবং তারপর প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর ভ্যাকসিন পাবেন। গবেষক লি বলেছেন: " ৪০ বছর ধরে আমি ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা করছি। আমরা আশা করি এই ভ্যাকসিন  ক্যান্সার ফিরে আসার পথ  বন্ধ করবে। সেইসাথে  ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগীরা আরো কিছুদিন পৃথিবীতে থাকার সুযোগ পাবেন।'  রাক্স দ্রুত ক্যান্সার থেকে সেরে উঠে এখন লন্ডন ম্যারাথনে যোগ দেবার স্বপ্ন দেখছেন।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

রাতের কলকাতায় নিরাপত্তা আরও জোরাল করছে লালবাজার by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে  ধর্ষণ ও খুনকাণ্ডের পর  কলকাতা শহরের নিরাপত্তা আরও জোরাল করছে লালবাজার।

১) রাতে নজরদারিতে ট্রাফিক পুলিশের জন্য  এসওপি (SOP) চালু করা হয়েছে
২) নয়া নিয়ম অনুযায়ী, হাসপাতাল, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বহুতল ও শপিং মলগুলিতে বাড়তি নজরদারি চালাতে হবে।
৩) ওইসব জায়গা কতটা সুরক্ষিত, অপরাধমূলক কার্জকম হয় কি না – সেসব খুঁটিনাটি বিষয়ে যথাযথ নজর দিতে হবে এবার থেকে।
৪) বিশেষ করে নারী  ও শিশুদের সুরক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে লালবাজার।
৫)   ট্রাফিক গার্ডগুলি রাতে নিজেদের কর্তব্য  পালন করছে কি না, তার নজরদারি করতে সুপারভাইজিং আধিকারিক থাকছেন।
৬) রাতে নজরদারিতে অ‌্যাডিশনাল কমিশনার (ACP) ও ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিকরাও থাকবেন।  কর্মরত নাইট অফিসার ও কর্মীদের তিনি ব্রিফ করবেন।

এদিকে আরজি কর-কাণ্ডে হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ-সহ সাত জনের পলিগ্রাফ পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে শিয়ালদহের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট (এসিজেএম) আদালত। এ বার আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ, অভিযুক্ত, অভিযুক্তের ‘বন্ধু’, হাসপাতালের চার চিকিৎসক শিক্ষার্থীর  পলিগ্রাফ পরীক্ষা করাতে পারবে সিবিআই। পলিগ্রাফ পরীক্ষাকে ‘লাই ডিটেক্টর’ পরীক্ষাও বলে থাকেন কেউ কেউ। অর্থাৎ, অভিযুক্ত মিথ্যা বলছেন কি না, তা যাচাইয়ের পরীক্ষা। প্রতিটি প্রশ্ন শোনার পর এবং উত্তর দেওয়ার সময় অভিযুক্তের শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়াগুলি একটি গ্রাফ বা লেখচিত্রের মধ্যে ধরা পড়ে। পরে এই লেখচিত্র বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা হয় যে, অভিযুক্ত মিথ্যা কথা বলছেন না সত্যি।

প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে 'মোদির রাজনীতি' -ফরেন পলিসির নিবন্ধ by সুশান্ত সিং

১০ বছর আগে নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের নেতারা আমন্ত্রিত  ছিলেন। এটি তার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ বৈদেশিক নীতির প্রতিফলন, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ছোট প্রতিবেশীদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সমন্বয় গড়ে তোলা। কিন্তু এই নীতি দ্রুত ব্যর্থ  হয় - সীমান্ত বিরোধ এবং দ্বিপাক্ষিক মতানৈক্য, উন্নয়ন প্রকল্পগুলি সম্পাদনের ক্ষেত্রে  ভারতের ঢিলেমি এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে।

তবে বাংলাদেশকে তার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। বাংলাদেশের সাবেক  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি চলতি  মাসে ছাত্র বিদ্রোহের চাপের মুখে পড়ে পদত্যাগ করার আগে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, মোদির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছেন।  বাংলাদেশে, হাসিনার যাত্রাপথের সূচনা গণতান্ত্রিক পথে হলেও পরে তিনি একজন কর্তৃত্ববাদী শাসকে রূপান্তরিত হন। তার বিরুদ্ধে দেশের মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়তে থাকে। সরকারী চাকরির কোটা সিস্টেমের  বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।  বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে  হাসিনা সরকারের  ব্যাপক দমন পীড়ন  দেশব্যাপী অস্থিরতার জন্ম দেয় । শেষমেশ  ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান হাসিনা এবং বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশে হাসিনার  জনপ্রিয়তা কম হওয়া সত্ত্বেও, তার পদত্যাগ ভারতীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংস্থার কাছে  একটি ধাক্কা হিসাবে প্রতিপন্ন হয়েছে। ভারত তার শাসনামলে হাসিনাকে সম্পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে এসেছে , এমনকি  অন্যান্য স্টেকহোল্ডার এবং বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগ উপেক্ষা করেও ।

মোদির অধীনে, নয়াদিল্লি তার বেশিরভাগ ছোট প্রতিবেশীদের সাথে এই নীতি গ্রহণ করেছে, কখনও কখনও তার পরিণতি হয়েছে দুর্ভাগ্যজনক। এটা স্পষ্ট যে, তার প্রতিবেশীদের সাথে  ভারতের নীতিগত ব্যর্থতা শুধুমাত্র বহিরাগত ঘটনার কারণে নয়। এগুলির সাথে  ভারতের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও সম্পৃক্ত। মোদির শক্তিশালী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে গিয়ে নয়াদিল্লি দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে ভারতের  উদারপন্থী মনোভাবকে ক্ষুণ্ন করেছে। কর্পোরেট স্বার্থের জন্য হাসিনার মতো সরকারগুলির সাথে মোদির ঘনিষ্ঠ আচরণ -  নয়াদিল্লির উদ্দেশ্য সম্পর্কে  সন্দেহের জন্ম দিয়েছে৷

মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থ, বিশেষ করে বাংলাদেশে ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৯  নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) যা মুসলমানদের বাদ দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলিতে নির্যাতিত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগ করে দিয়েছে , বাংলাদেশি জনসাধারণের মধ্যে  সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরে মুসলমানদের প্রতি বিজেপি সরকারের অশোভন আচরণের জন্যও   বিদেশে সমালোচিত হয়েছেন  মোদি। ২০২১ সালে  বাংলাদেশ সফরের সময়  সহিংস দাঙ্গার সম্মুখীন হয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী  । হাসিনার পদত্যাগ ভারত সরকারের জন্য  আত্মোপলব্ধির  সুযোগ করে দিয়েছে, কিন্তু এটি  নীতি সংশোধনে ভারত সরকারকে চালিত করবে কিনা তা বলা কঠিন। বাংলাদেশে ভারতের কলঙ্কিত ভাবমূর্তি দক্ষিণ এশিয়ায় মোদি সরকারের প্রথম বড় ব্যর্থতা নয়। একটি প্রকৃত হিন্দু রাষ্ট্র-এর অনুসরণ শুধুমাত্র ভারতের জন্যই ক্ষতিকর নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেও এর বিপর্যয়কর ফলাফল ডেকে আনতে পারে।

হাসিনার সঙ্গে ভারতের গভীর সম্পর্ক

শেখ হাসিনার পিতা তথা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর, হাসিনা এবং তার বোন ভারতে আশ্রয় নেন। তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে  বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০০৯ সালে পাকাপাকিভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ফিরে আসার আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার  দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের পর থেকে  তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসকে রূপান্তরিত হন- যার নিশানায় ছিল  রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক এবং অধিকার কর্মীরা। হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ  দল আওয়ামী লীগ, কট্টরপন্থী ইসলামী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ভারতবিরোধী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে ঘাঁটি স্থাপন করতে দেননি হাসিনা। ভারত অন্য সবাইকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র হাসিনাকে  সমর্থন করে গেছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে তিনি ক্ষমতা হারালে, ‘বাংলাদেশ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলির প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হবে।’ এমনকি এই বছর, হাসিনা একটি বির্তকিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসার  পর, ভারত গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ নিয়ে বাংলাদেশের উপর চাপ প্রয়োগ বন্ধ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের  প্রশাসনের কাছে তদবির করেছিল।

হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাক্ষী থেকেছে  এবং সামরিক বাহিনী সহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছেন। ফলস্বরূপ, ভারত ধরে নিয়েছিল যে  প্রতিবাদ সত্ত্বেও হাসিনা শাসন চালিয়ে যাবেন। কিন্তু এই মাসে নিরাপত্তাবাহিনী যখন  হাসিনাকে বাংলাদেশ  ছেড়ে চলে যেতে বলে তখন কূটনৈতিক ব্যর্থতা  নয়াদিল্লিকেও  হতবাক করে দেয়। কোনো পশ্চিমা সরকার তাকে আশ্রয় দেয়নি, নয়াদিল্লিতেই  আত্মগোপন করে আছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী । ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান। প্রতিবেশী কূটনীতির ক্ষেত্রে  ভারতের অতি-নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গি - হাসিনার প্রতি নয়াদিল্লির নিঃশর্ত সমর্থনে প্রতিফলিত। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায়  ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, জাতিগত, ভৌগলিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে গিয়ে  ভারত এটিকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। নয়াদিল্লি তার প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া করেছে, ফলে এই দেশগুলিতে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী দেশের বৃহত্তর জনসাধারণের অনুভূতির থেকে  বিচ্ছিন্ন হয়েছে ভারত , রাজনৈতিক বিরোধীদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে যার পরিণতি গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ ।

২০২১ সালে মিয়ানমারে, একটি অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার পক্ষে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের এড়িয়ে গেছে ভারত। আফগানিস্তানে আফগানদের সাথে দীর্ঘদিনের  সম্পর্ককে উপেক্ষা করে  তালেবান শাসকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ভারতের, নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তার আচরণে প্রকাশ পেয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর আচরণের ভুরি ভুরি অভিযোগ সামনে  এসেছে।  

মোদির শক্তিশালী রাজনীতি ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতিকেও প্রভাবিত করেছে । মোদি বিতর্কিত ভারত-চীন সীমান্তে চীনের অনুপ্রবেশের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখলেও, ভারতের ছোট প্রতিবেশীদের কাছে  তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ভারত ২০১৫ সালে মিয়ানমারে  বিদ্রোহীদের ট্রানজিট ক্যাম্পের বিরুদ্ধে একটি আন্তঃসীমান্ত অভিযান শুরু করে। একই বছর ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও  নেপালের উপর একটি বাণিজ্য অবরোধ জারি করে ভারত। গত বছর মোদির সমর্থকরা ভারতীয় পর্যটকদের মালদ্বীপ বয়কট করার জন্য একটি প্রচারণা শুরু করেছিল, কারণ মালদ্বীপের কয়েকজন মন্ত্রী মোদির সমালোচনা করেছিলেন ।

বাংলাদেশের জনগণের মনে  ভারতের সীমান্ত পুলিশের কঠোর আচরণের পাশাপাশি  পানি বন্টন , ট্রানজিট সুবিধা এবং অন্যান্য বাণিজ্য-সম্পর্কিত সমস্যাগুলির বিষয়ে নয়াদিল্লির পদক্ষেপ সম্পর্কে ক্ষোভ রয়েছে।  সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভ  হাসিনার  ওপর গিয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয় । ভারতের রাজনৈতিক বিরোধীরা  মোদি ঘনিষ্ঠ  ফার্মগুলিকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেবার জন্য  সমালোচনা করে এসেছেন , বিশেষ করে ধনকুবের গৌতম আদানির মালিকানাধীন ফার্মগুলিকে । এই ঘনিষ্ঠতা  ভারতের প্রতিবেশীদেরও নোযোগ আকর্ষণ করেছে। গত বছর, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে তার পাওয়ার প্লান্ট মারফত ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বলে ঘোষণা করার পর হাসিনার সাথে একটি ছবি পোস্ট করেছিল। ভীষণই  ব্যয়বহুল এই প্ল্যান্টের জন্য বাংলাদেশকে  সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন যে হাসিনার  'রাজনৈতিক বৈধতা সুরক্ষিত করতে মোদির রাজনৈতিক অনুগ্রহ প্রয়োজন। বহুত্ববাদ , কর্তৃত্ববাদ এবং ক্রোনিজম বাংলাদেশে ভারতের সমস্যায় অবদান রেখেছে , কিন্তু মোদি সরকারের হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসরণ আরও ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৯  সিএএ আইন  শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৃত হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করেছে। যে সকল নির্যাতিত সম্প্রদায়গুলি ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিল তাদের মধ্যে ছিল বাংলাদেশের হিন্দুরা। এর জেরে  বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নিয়েছে ভারত বিরোধী মনোভাব। বিজেপির শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য সামনে এসেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (মোদির কার্যত ডানহাত)  বাংলাদেশি  অভিবাসীদের উইপোকা, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে অভিহিত করেছেন ।

CAA-এর আগে, ভারতীয় বিচার বিভাগ আইনি নাগরিকদের নথিভুক্ত করার জন্য এবং আসামের সীমান্ত রাজ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি কঠোর জরিপের নির্দেশ দিয়েছিল- যাকে সমালোচকরা  অনথিভুক্ত ভারতীয় মুসলমানদের টার্গেট  করার একটি উপায় হিসাবে দেখেন। অমিত শাহ এই জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) দেশব্যাপী কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।যদিও নয়াদিল্লি এনআরসিকে  একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেছে।  কিন্তু বাংলাদেশ মনে করে ,ভারতের ‘অবৈধ বিদেশি নাগরিক’ সমস্যার মূলে তাকেই রাখা হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন যে CAA এবং NRC লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পারে।

এদিকে, হাসিনার সরকার দেশের মধ্যে এই ধারণাকে শক্তিশালী করতে থাকে যে তিনি নয়াদিল্লির অঙ্গুলি হেলনে  চলছেন। ২০২২ সালে যখন একজন বিজেপি মুখপাত্র মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)  উদ্দেশে  অপমানজনক  মন্তব্য করেছিলেন, তখন এটি অনেক মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ক্ষোভের  জন্ম দিয়েছিলো। কিন্তু  হাসিনা সরকার বিষয়টিকে ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ বলে উল্লেখ করে হালকা করার চেষ্টা করেন । বাংলাদেশে অভিযোগ বাড়তে শুরু করে  এবং ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি বিজেপি সরকারের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যমূলক আচরণ ক্ষোভের জন্ম দেয়।  এই বছর ভারতের নির্বাচনী প্রচারে মোদির  মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভাব কারোর নজর এড়ায়নি। এদিকে গত বছর, তিনিই  একটি নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধন করেছিলেন যেখানে ভারতের সমস্ত ছোট প্রতিবেশীদের নিয়ে বড় বড় করে চিত্রিত আছে  'অখন্ড ভারত' ("অবিচ্ছিন্ন ভারত")।

মোদির  জাতীয় ভাষণ

গত ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে, মোদি ভারতের ১.৪ বিলিয়ন নাগরিকদের বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা বলেছিলেন। এটি ছিল  ভারতকে বহুধর্মীয় এবং বহুভাষিক দেশ হিসেবে নয় বরং শুধুমাত্র একটি হিন্দু রাষ্ট্র  হিসাবে ফ্রেম করার কৌশলী উপায়। এটা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে বিজেপি সরকার তার ডানপন্থী সমর্থক এবং মিডিয়ার  নিন্দা করতে অস্বীকার করেছে  যারা সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যার বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে  ।

মোদির সরকারের এখন আত্ম-বিশ্লেষণের  ক্ষমতা কমে  আসছে বলে মনে করছেন অনেকে। বাংলাদেশে হাসিনার পদত্যাগের ঘটনাগুলির জন্য পাকিস্তান, চীন বা ইসলামপন্থীদের দোষারোপ করার পরিবর্তে, ভারতের  উচিত তার প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো। যারা দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে  কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন । যদিও ভারতকে অনেকে একটি ক্রমবর্ধমান শক্তি হিসাবে দেখে , তবে এর  প্রতিবেশীরা মনে করে ভারত তুলনামূলকভাবে দুর্বল।ভৌগোলিক কারণে  তার ছোট প্রতিবেশীদের অবশ্যই ভারতের সাথে কাজ করতে হবে, এই পরিস্থিতিতে  নতুন দিল্লির উচিত এখনই  নতুন  চুক্তির বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করা।

লেখক  ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক এবং ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনের একজন পরামর্শক সম্পাদক।

ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থন বন্ধের দাবিতে শিকাগোতে বিক্ষোভ

ডেমোক্র্যাটিক দলের জাতীয় কনভেনশনের শেষ দিনে শিকাগোতে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারী। ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা। এ খবর দিয়েছে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু। এতে বলা হয়, গাজায় ক্রমাগতভাবে গত দশ মাসের বেশি সময় ধরে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। ইসরাইলকে গোলা-বারুদ দিয়ে প্রকাশ্যে সমর্থন করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার শিকাগোর রাস্তায় জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারী। তারা ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমর্থন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

জাতীয় কনভেনশনের শেষ দিনে হাজার হাজার ডেমোক্র্যাট সমর্থকের উপস্থিতিতে আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন কমালা হ্যারিস। গত সোমবার শুরু হয় এই জাতীয় কনভেনশন। প্রথম দিন থেকেই কনভেনশন হলের বাইরে অবস্থান নিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার জনগণ। হাতেম আবুদায়েহ জোটের একজন মুখপাত্র এবং মার্কিন ফিলিস্তিনি গণমিছিলের অন্যতম সমন্বয়ক।

তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আমাদের প্রতিবাদের কেন্দ্রীয় ইস্যু হচ্ছে ফিলিস্তিনের মুক্তি। যা এখন গোটা বিশ্ববাসীর প্রধান ইস্যুও বটে। এক্ষেত্রে আমরা চাই মার্কিন সরকার ইসরাইলের প্রতি তাদের সহায়তা বন্ধ করবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থন বন্ধ করার দাবিতে এ সপ্তাহে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক শিকাগোর রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে। আবুদায়েহ আশাবাদী যে তাদের দাবির প্রেক্ষিতে হোয়াইট হাউস তাদের পলিসি পরিবর্তন করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং কমালা হ্যারিস ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন সহ কনভেনশনে থাকা শীর্ষস্থানীয় সকল ডেমোক্র্যাটদের কাছে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সহায়তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। তারা মনে করেন এখন ইসরাইলের প্রতি সমর্থন বন্ধ করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করার সময় এসেছে।

গাজায় এমন কোনো স্থান নেই যেখানে হামলা বাদ রেখেছে ইসরাইলি সেনারা। উপত্যকাটিতে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের জন্য কোনো নিরাপদ স্থান নেই। শিকাগোর একজন নারী চিকিৎসক ড. তাম্মি আবুঘানিয়াম বলেছেন, তিনি গত ছয় মাসে দুইবার গাজা ভ্রমণ করেছেন। সেখানে প্রায় ছয় মাস অবস্থান করে গত তিন দিন আগে শিকাগোতে ফিরে এসেছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘গাজায় থাকা অবস্থায় আমি প্রতিদিন প্রতিটা মুহূর্তে খেয়াল করেছি সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইসরাইল। সেখানে বেসামরিকদের জন্য কোনো নিরাপদ স্থান নেই। ইসরাইল গাজার কোনো স্থানে হামলা বাদ দেয়নি।’ এতে বুঝা যাচ্ছে গত দশ মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। যাতে প্রাণ হারিয়েছেন সেখানের হাজার হাজার বেসামরিক নিরস্ত্র মানুষ। তাম্মি আবুঘানিয়াম আরও বলেছেন, ‘আমি একজন মার্কিন নাগরিক। আমার মনে করি মার্কিন সরকারের উচিত ইসরাইলকে অস্ত্র সহায়তা বন্ধ করা। কেননা তেল আবিব এ অস্ত্র ব্যবহার করে গাজার হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে। এসব জানা সত্ত্বেও মার্কিন সরকার ইসরাইলকে সহায়তা দেয়া অব্যাহত রেখেছে, যা আমাকে হতাশ করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক এই হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দেয়ার পরেও তারা এ কাজটি করে যাচ্ছে।’

ইরানের নতুন মন্ত্রিসভার কঠিন যাত্রা শুরু

ইরানের সংসদ বুধবার প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভার সকল সদস্যকে অনুমোদন দিয়েছে। বেশ কয়েকদিন ধরে আলোচনার পর এই অনুমোদন দেয়া হয়। উল্লেখ্য, পেজেশকিয়ান গত মাসে ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যম পেজেশকিয়ানকে উদ্ধৃত করে জানায় যে তিনি বলেছেন, তার প্রশাসন প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা শেষ অবধি পালন করা হবে।

এনএইচকে ওয়ার্ল্ড এর এক প্রতিবেদনে এসব খবর দিয়ে বলা হয়ঃ আব্বাস আরাগচিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিনি জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একইসাথে ছয় বিশ্বশক্তির সাথে তেহরানের ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি আলোচনায় তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

পশ্চিমা দেশগুলো যাতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, সেই লক্ষ্যে পেজেশকিয়ান প্রশাসন পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা চালাতে প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছে।

তবে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই এর আগে জুলাই মাসে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়াহকে হত্যার জন্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা গাজা ভূখণ্ডে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আলোচনা কীভাবে অগ্রসর হয় তা দেখার পরে প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এবং পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে।

ইরান প্রতিশোধ নিলে, পশ্চিমা দেশগুলো যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাবে তা নিশ্চিত। এই অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজমান থাকায় নতুন মন্ত্রিসভাকে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে।

এশিয়ায় প্রথম এমপক্সে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত থাইল্যান্ডে

প্রাণঘাতী এমপক্সের নতুন একটি ধরণ শনাক্ত করেছে থাইল্যান্ড। এর মধ্য দিয়ে এশিয়ার প্রথম কোনো দেশে এম্পক্স শনাক্ত করা হল। ভয়ঙ্কর এই ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল আফ্রিকায়। আর আফ্রিকা মহাদেশের বাহিরে এমপক্স শনাক্ত হওয়ার দ্বিতীয় ঘটনা এটি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ জানিয়েছে সংক্রমিত ব্যক্তির বয়স ৬৬ বছর। ১৪ই আগস্ট অজ্ঞাতনামা একটি আফ্রিকান দেশ থেকে তিনি ব্যাংককে পৌঁছেছিলেন। দেশে পৌঁছানোর পরই তিনি তার শরীরে এমপক্সের লক্ষণ অনুভব করেন এবং হাসপাতালে যান। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই রোগীর শরীরে এমপক্সের ক্লেড ১-বি নামের একটি ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করার তথ্য জানিয়েছে।

গত এক বছরে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে ৪৫০ জনের বেশি মানুষ এই রোগে প্রাণ হারিয়েছেন। এরপর থেকে আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে।

কঙ্গোর আশপাশের দেশ বুরন্ডি, কেনিয়া রুয়ান্ডা এবং উগান্ডায় এর আগে এমপক্সের শিকার হয়নি। তবে বর্তমানে কঙ্গোর আশপাশের এলাকায় এই রোগটির ঝুঁকিতে রয়েছে। সেখানে এমপক্সের ক্লেড ১-বি আরও উদ্বেগজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। কঙ্গোর সীমান্তবর্তী এলাকা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আফ্রিকার বাইরে প্রথম এই রোগ শনাক্ত করা হয়েছে সুইডেনে। সপ্তাহখানেক আগে সেখানে এমপক্সের ক্লেড ১-বি ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। সুইডেনে আক্রান্ত ব্যক্তিও সম্প্রতি আফ্রিকা ভ্রমণ করেছিলেন।

এমপক্স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশের মানুষের মধ্যে রোগটির বিস্তার দ্রুত লাভ করে। বিশেষ করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আক্রান্ত রোগীর সাথে মেলামেশা, যৌনসম্পর্ক স্থাপন এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাস আদান প্রদানের মাধ্যমেও এই রোগের বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে এই রোগের এখনও কোভিডের মতো সংক্রমন হচ্ছে না। তবে এমপক্সের যে নতুন ভ্যারিন্ট শনাক্ত করা হয়েছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকরা। গত সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই রোগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিকভাবে সতর্কতা জারি করেছে।

শিক্ষার্থীদের নানা স্বপ্নে রঙিন দেয়াল by পিয়াস সরকার

দেয়ালটা পুরো কালো। এরমাঝে তুলির আঁচড়ে লাল রঙ দিয়ে দেয়াল সাজাচ্ছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসমা উল হুসনাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। আগারগাঁও এলাকায় তুলি হাতে মনোযোগ দিয়ে গ্রাফিতি আঁকছিলেন তারা। কিছু সময় বাদে লাল আলোর আভায় ভেসে উঠলো আরবি হরফে ‘আল্লাহ্‌’ লেখা। তিনি বলেন, এই দেশটা আমার, আমাদের। এই দেশটাকে সুন্দর করে সাজানোর দায়িত্ব আমাদের। সড়কগুলো আমরা দৃষ্টিনন্দন করতে চাই। ফুটিয়ে তুলতে চাই আমাদের কথা। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পোস্টারেরও প্রয়োজন আছে। এর জন্য নির্দিষ্ট একটি স্থান করে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু যত্রতত্র রাজনৈতিক পোস্টার আমরা চাই না।

আসমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তার মা। তিনি বলেন, আমার সন্তানদের হাত ধরেই নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। ভালো একটি কাজ করছে মেয়েরা। এ সময় তাদের পাশে থাকতে পেরে গর্ববোধ করছি। পাশেই দেখা যায় আসমার বান্ধবীরা দেয়ালে ফুটিয়ে তুলছেন। দেয়ালের এই অংশটিতে দেখা যায় তারা বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির স্থান আদালতকে ফুটিয়ে তুলছেন।
এ যেন নতুন ঢাকা। দেয়ালগুলোতে নেই ব্যানার পোস্টারের জঞ্জাল। দেয়ালগুলো সেজে উঠেছে রঙ তুলির আঁচড়ে। শুধু ঢাকা নয় গোটা দেশের শহুরে দেয়ালগুলোই এখন রঙিন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পোস্টারগুলোর জায়গায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের গল্প। যে গল্পের অধ্যায়গুলোতে রয়েছে বিদ্রোহ, বেদনা, হাসি-কান্না, প্রত্যয়, দুর্নীতি, স্বপ্নসহ নানা বিষয়। যেগুলোর সিংহভাগেই রয়েছে ক’দিন আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে হয়ে যাওয়া ছাত্র-জনতার লড়াইয়ের গল্প, গণহত্যার নৃশংসতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে এই চিত্রগুলোয় গুণমুগ্ধ প্রশংসা করছেন সকলেই।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা যায় দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে উঠেছে দেয়ালগুলো। মিরপুর ১০ নম্বর সড়কে দেখা যায় পুরো এলাকা জুড়েই রঙের ছোঁয়া। এরমধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে চোখে বাধে। যাতে লেখা- ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’, ‘মানব সভ্যতা গড়বো আমরাই’, ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই’, ‘বিকল্প আমরাই’। মিরপুরের মেট্রোরেলের পিলারগুলোতে বৈচিত্র্যপূর্ণ গ্রাফিতি। কয়েকটি গ্রাফিতিতে চোখ আটকে যায়, যাতে লেখা- ‘শোনো মহাজন, আমরা অনেকজন’, ‘ আমার বিচার তুমি করো, তোমার বিচার করবে কে’, ‘স্বাধীনতা ৩৬ জুলাই ২৪’ ইত্যাদি। এ ছাড়াও দুটি গ্রাফিতির সামনে অনেকেই ছবি তুলছিলেন। যাতে দেশের রঙিন বেলুনের পাশে লেখা ‘এঊঘ-ত্থ, আরেকটি গ্রাফিতিতে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার বুকে তিনটি গুলির চিহ্ন, দু’হাতে ভাঙা শিকল, পেছনে বাংলাদেশের মানচিত্র।
এ সময় দেখা যায় একটি ছোট পিকআপে করে খাবার সরবরাহ করছিলেন কয়েকজন যুবক। কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের মাঝামাঝি একটি পিলারে চিত্র আঁকার সময় তাদের প্যাকেট খাবার দিচ্ছিলেন। এ সময় আতিয়ার রহমান বলেন, আমরা বন্ধুরা মিলে টাকা তুলে তাদের জন্য খাবার এনেছি। তারা আমাদের দেশের জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। তাদের জন্য কিছু করতে পারাটা গর্বের বিষয়।
বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান একটি আঁকা গ্রাফিতির উপর রঙের ছোঁয়া দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, আমাদের গ্রাফিতিগুলো আঁকা প্রায় শেষ। কিছু অংশে কমতি ছিল। অনেক জায়গায় রঙ উঠে গেছে। এগুলো মূলত ঠিক করার জন্যই এসেছি।

তিনি বলেন, আমরা চাই না আমাদের গ্রাফিতিগুলো হারিয়ে যাক। মানুষ জানুক আমরা কতো বড় পাথর সরিয়েছি। যে পাথর সরাতে বয়ে গেছে রক্তের বন্যা। এরপর তিনি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই গ্রাফিতিতে লেখা ছিল, ‘করার আগে শেয়ার ভাবুন দশবার’, নিচে বড় করে লেখা- গুজবে ছারখার।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের আকর্ষণীয় কয়েকটি গ্রাফিতি হচ্ছে- ‘সি হ্যাস মেড আস ফ্লাই’, ‘খেটে বড় হও, চেটে নয়’, ‘গর্জে ওঠো আবারো’, ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ’ এ ছাড়াও রক্তাক্ত একটি দেয়াল পাশ থেকে ছুটে আসছে গুলি। সেখানে লাশ হাতে দাঁড়িয়ে এক শিক্ষার্থী পাশে লেখা- রক্তাক্ত জুলাই ২০২৪, ‘কিলার হাসিনা’ ইত্যাদি। দুটি দেয়ালের গ্রাফিতির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন সালমান ইসলাম নামে এক পথচারী। এ দুটোতে লেখা- ভালো হয়ে যাও মাসুদ, পালাবো না প্রয়োজনে... কী জায়গা দেবেন’ আরেকটিতে লেখা- আয়নাঘর; তুমি হাকিম হইয়া হুকুম করো, পুলিশ হইয়া ধরো’।

সালমান বলেন, এই যে মুক্তভাবে ছাত্ররা ছবি আঁকছে, এই যে আমি সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। এটা ফেসবুকেও দেবো। এটাই স্বাধীনতা। এই কাজটিই তো কতো বছর করতে পারিনি। মুক্তভাবে কথা বলতে যে কতোটা শান্তি লাগে তাতো সকলেই আমরা জানি এখন। এ ছাড়াও প্রেস ক্লাব এলাকায় গ্রাফিতিগুলোর মধ্যে অন্যতম- ‘কেউ চাঁদা চাইলে, কানের নিচে বসিয়ে দেবেন’, আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?’, ‘স্বাধীন বাংলায় দুর্নীতির কোনো ঠাঁই নাই’, ‘বিকল্প কে? আমি তুমি আমরা’, ‘দেশ সংস্কারের কাজ চলছে’, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশি’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট’, ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা’, ‘স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনবো’, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’, ওই মামা না প্লিজ’, ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি ইত্যাদি। আরেকটি ছবি ঘিরেও দেখা যায় এক পথচারীকে ছবি তুলতে। যাতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের ছবি ব্যঙ্গ করে আঁকা এবং লেখা- ‘স্যাটেলাইটে পানি ঢুকেছে’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়েও ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাফিতির ছোঁয়া। টিএসসি’র গেটে বিশাল করে লেখা- ‘এখন দরকার জনগণের সরকার’। ভিসি চত্বরে ছাত্রলীগের হাতে নির্মমভাবে নিপীড়নের শিকার হন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নির্মমতা থেকে ছাড় পাননি নারী শিক্ষার্থীরাও। এই ভয়াল আক্রমণের চিত্র ফুটে উঠেছে গ্রাফিতিতে। আরেকটিতে ফুটে উঠেছে সারি সারি লাশের সারি। এ ছাড়াও কয়েকটি গ্রাফিতি ভাইরাল হয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম- ‘গুলি করি মরে একটা, একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের একটি ভাইরাল টকশো নিয়ে গ্রাফিতি, যাতে উপস্থাপক আলোচককে বলছেন- ‘আপনি উত্তেজিত হবেন না প্লিজ’, ‘নিহত শিক্ষার্থী মুগ্ধর প্রতিচ্ছবি হাতে ‘পানি লাগবে পানি’ ‘ঘুষ চাইলেই ঘুষি’ ইত্যাদি। এ ছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে পুরো শহর জুড়েই আঁকা হয়েছে গ্রাফিতি। সকল স্থানে তাকে খুনি, দুর্নীতিবাজ, খুনের আদেশদাতা, রক্তখেকো ইত্যাদি রূপে দেখানো হয়েছে। একটি ছবি ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে তাতে শেখ হাসিনার ব্যঙ্গাত্মক ছবির পাশে লেখা- ‘হাসিনা পালায় না’। এ ছাড়াও শহর জুড়েই চোখে বাধে নানা ধরনের আরবি ক্যালিওগ্রাফি।

কোটা বিরোধী আন্দোলন: ব্যারিকেডে বিদ্যুৎ! পা হারিয়ে নির্বাক সাগর by ফাহিমা আক্তার সুমি

বাইশ বছর বয়সী সাগর ইসলাম। ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে। গত ৪ঠা আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ঠাকুরগাঁও  জজ কোর্টের মোড়ে সাগরের জীবনে নেমে আসে এক বিভীষিকা।

রাস্তায় থাকা পুলিশের ব্যারিকেডে দেয়া ছিল বিদ্যুৎ সংযোগ। আর সেই ব্যারিকেডে হাত লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে আহত হন। জীবন নিয়ে বেঁচে ফিরলেও পুড়ে যায় সাগরের হাত-পা। কেটে ফেলতে হয় তার পা। সাগরের বাবা খাদেমুল ইসলাম কৃষিকাজ করেন। মা শেফালী বেগম সংসার সামলানোর পাশাপাশি কৃষিকাজে সহযোগিতা করেন। সাগরের গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দ গ্রামে। ঘটনার দিন তাকে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়। পরে সেখান থেকে আনা হয় ঢাকায়। বর্তমানে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন তিনি। পা হারিয়ে সাগরের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার।

বার্ন ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, ৭০১ নম্বর রুমের ৫ নম্বর বেডে ভর্তি সাগর। চোখেমুখে হতাশার ছাপ। সাগর মানবজমিনকে বলেন, আমার তো সব শেষ। ছোটবেলা থেকেই আমি খেলাধূলা প্রিয় মানুষ। এখন দিন-রাত শুয়ে থাকতে হচ্ছে। ব্যথায় ঘুমাতে পারি না। বাবা-মা পরিবারকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। বাবা অনেক কষ্ট করে খেটে আমাকে পড়িয়েছেন। আমার ইয়ার লস হয়ে যাবে খুব চিন্তায় আছি। এই সেমিস্টার শেষ হলে ইন্টার্ন করতে পারবো। ২০২০ সালে এসএসসি পাস করি। বর্তমানে ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আরএসই সাবজেক্টে পড়াশোনা করি। পড়া শেষ দিকে চলে আসায় বাবা-মাকে সুখের দিন দেখানোর জন্য আমিও ব্যস্ত ছিলাম। বাবা-মা আমাকে যেমন করে মানুষ করেছে তেমন করে আমিও তাদের আগলে রাখতে চেয়েছিলাম, দূর করতে চেয়েছিলাম তাদের কষ্ট। তবে আমি ভেঙে পড়ছি না, হয়তো আমার চলতে কষ্ট হবে তারপরও বাবা-মায়ের জন্য আমি কিছু করতে চাই।

তিনি বলেন, গত ৪ঠা আগস্ট আন্দোলনে গিয়ে দুপুর ১২টার দিকে রাস্তায় থাকা পুলিশের ব্যারিকেডে হাত দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে একটা শব্দ হয়। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত ও দুই পা পুড়ে যায়। আমার ডান পায়ের পাতা অর্ধেক কাটা পড়ছে। আরেক পায়ের দুইটা আঙ্গুলসহ মাংস কেটেছে। বাম হাত পুড়ে গভীর ক্ষত হয়ে যায়। আমার সামনে এই ঘটনায় দুইজন স্পট ডেড হয়। এমন অবস্থা দেখে ঘটনাস্থল থেকে শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে নিয়ে যায়। যখন ব্যারিকেডে হাত দেই তখন আমি এমন বিকট শব্দ ও শরীরের অবস্থা দেখে অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে যাই। কিছুটা জ্ঞান ফিরে এলে ওই অবস্থায় রাস্তায় হামাগুড়ি দিচ্ছিলাম। পড়ে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা যখন আমাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যায় তখন পুরোপুরি জ্ঞান আসে। ঠাকুরগাঁও জেলা জজ কোর্টের সামনে ঘটনাটি ঘটে। তার পাশেই ছিল আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস।

সাগরের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে আমি বড়। অভাবের কারণে আমি মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে আর করতে পারিনি। চেয়েছিলাম ভাইকে পড়াশোনা করিয়ে অনেকদূর নিয়ে যাবো, ও অনেক ভালো চাকরি করবে। বাবাকে সহযোগিতা করতে আমি একটি ডিমের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করি। আন্দোলনের সময় সাগর সবসময় আমাকে দোকানে যেতে নিষেধ করতো। ও আমাকে বাধা দিয়ে নিজেই এখন সবকিছু হারিয়েছে। আমার ভাইয়ের এই অবস্থা হওয়ায় বাবা-মায়ের মন ভেঙে পড়েছে। সাগরকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। এখন জানি না জীবন কোনদিকে যাবে। বাবা কৃষিকাজ করে আবার মাঝে মাঝে মানুষের বাসায় কাজ করে। মা সংসার সামলানোর পাশাপাশি বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করেন। বাড়িতে একটা গরু ছিল সেটি ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করে ওর চিকিৎসা করানো হয়। প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। কোনো টাকা জমানো ছিল না যে সেটি দিয়ে ওর চিকিৎসা করাবো। বারো তারিখে ভাইকে নিয়ে এই হাসপাতালে নিয়ে আসি। আঠারো তারিখে ওর অপারেশন হয় এরপর থেকে এখানে চিকিৎসা খরচ ফ্রি করে দিয়েছে।

চাচাতো ভাই মোস্তফা কামাল বলেন, আমাদের আন্দোলনে সকাল এগারোটার দিকে যাওয়ার কথা ছিল। ঠাকুরগাঁও সদরে একটা বড় মাঠ আছে সেখানে সবাই একত্রিত হয়েছি। যত স্কুল-কলেজ ছিল সবাই এসেছিল। প্রায় ১৫-২০ হাজার শিক্ষার্থী ছিল বড় মাঠে। আমরা মাঠ থেকে বের হয়ে একটা পার্কের ভেতর থেকে জেলা শহরের দিকে যাই। রাস্তায় ফুটপাথে এসএসএফ পাইপ দিয়ে ঘেরাও দেয়া ছিল। সেই এসএসএফ পাইপের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল পুলিশের ব্যাড়িকেড। তাতে দেয়া ছিল বিদ্যুতের সংযোগ। বাইরে থেকে বোঝার এবং জানার কোনো উপায় ছিল না। সাগরসহ কয়েকজন পুলিশের ব্যারিকেডে হাত দিয়ে পার হতে যাচ্ছিল। হাত দেয়ার পরে একটা শব্দ হয়। আমরা কয়েকজন পিছনে ছিলাম মনে করেছি পুলিশ গুলি করেছে। পরে দেখি আমাদের থেকে বেশকিছু দূরে পুলিশের অবস্থান। প্রথমে যে হাত দিয়েছে সে ছিটকে নিচে পড়ে যায়, তার তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। তখনো আমরা কেউ কিছু বুঝতে পারিনি কেন সে নিচে পড়ে গিয়েছে। পরে সাগরসহ আরও ৪ জন ব্যারিকেড ও এসএসএফ পাইপে হাত দিয়ে সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে সঙ্গে সঙ্গে ব্লাস্ট হয়। পাইপের বা ব্যারিকেডের কোনো ক্ষতি হয়নি কিন্তু মানুষের শরীর পুড়েছে। স্পটেই দুজন মারা যায়। আরও দুইজনকে একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমার ভাইকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সাগরের পায়ে যে জুতা পরা ছিল সেই জুতা পুড়ে পায়ের সঙ্গে  লেগে যায়। ওর ডান পায়ের অর্ধেক পুড়ে শেষ, আঙ্গুলগুলো নেই। আরেক পা ও হাতের অবস্থা খারাপ। চার তারিখও আওয়ামী লীগের লোকজন খুব হামলা ও হুমকি দেয় আমাদের। সাগরকে প্রথম দুই-তিনদিন ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারিনি ওদের ভয়ের কারণে। সরকার পতনের দিন সন্ধ্যা থেকে তাকে হাসপাতালে ঠিকমতো দেখাশোনা করা হয়।

অবৈধ অস্ত্র নিয়ে সিলেটে যে আলোচনা by ওয়েছ খছরু

একটি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তুমুল আলোচনা সিলেটে। কেউ বলছেন একে ফোরটি সেভেন। কেউ আবার এমআর সিক্সটিন, কেউ বা এটিকে বলছেন স্নাইপার। ভয়ঙ্কর সেই অস্ত্র। যেটি অতীতে কখনো সিলেটের রাজপথে প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হয়নি। নানা সময় সিলেটের রাজপথে রাজনৈতিক ক্যাডাররা অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। শাবি’র নামকরণ বিরোধী আন্দোলন, ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপটের আগে নানা ধরনের অস্ত্র দেখা গেছে। কিন্তু এত ভয়ঙ্কর অস্ত্র নিয়ে অতীতে কখনোই কেউ প্রতিপক্ষ ঘায়েল করতে নামেন নি। কিন্তু এবার ২রা আগস্ট থেকে ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত সিলেটের রাজপথে ভয়ঙ্কর এসব অস্ত্র প্রদর্শিত হয়েছে। আর এ অস্ত্রের ব্যবহারে চলে গেছে তাজা প্রাণ। কেউ আবার আশঙ্কাজনক অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এই অস্ত্র বহন করেছিলেন শিপলু নামের একজন। পুরো নাম রুহুল আমীন। অনেকটা অপরিচিত এই শিপলু। আন্দোলনের সময় সিলেটের রাজপথে এই অস্ত্রের সঙ্গে শিপলুর নামটি আলোচিত হয়েছে। ইতিমধ্যে শিপলুকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। কে এই শিপলু- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে; শিপলু যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। ওখানে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। গত ২০ শে জুলাই শিপলু সিলেটে আসেন। এরপর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে রাজপথে নামেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে; সিলেটে এবার প্রথম অস্ত্রের মহড়া শুরু হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে।

প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক আন্দোলন হওয়ার কারণে শাবি শিক্ষার্থীদের ওপর চোখ রাঙানির পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন হয়। পরে আন্দোলনের মুখে ছাত্রলীগ কর্মীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরান হলের সি ব্লকের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অমিত শাহ’র ৪২৩ নম্বর রুম থেকে দুটি পিস্তল সাধারণ শিক্ষার্থীরাই খুঁজে বের করে। এরপর ২রা আগস্ট থেকে শাবি ফটক ও মদিনা মার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলে সিলেটের যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা অস্ত্র প্রদর্শন শুরু করে। ৩রা আগস্ট যেদিন পুলিশ ও ছাত্রলীগের ধাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারা যায়, সেদিন পুলিশকে পেছনে রেখে ফ্রন্টলাইনে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা অবৈধ অস্ত্র দিয়ে সুরমা আবাসিক এলাকায় অনবরত গুলি ছুড়ে। গুলির শব্দে ওইদিন সুরমা আবাসিক এলাকা প্রকম্পিত হয়। এর আগে ২রা আগস্ট ও ৪ঠা আগস্ট ওই এলাকায়ও  গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মদিনা মার্কেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পর্যন্ত নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর আফতাব হোসেন খান, তার সশস্ত্র ক্যাডার আজহার উদ্দিন সুমন, কুখ্যাত পাঙাস ও আরেক অস্ত্রবাজ তুহিনের নেতৃত্বে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওইদিন এসব এলাকায় সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান ওরফে মুরগি হান্নানের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র অস্ত্রবাজ মাঠে নেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গুলি ছুড়ে। পুলিশ যখন ছাত্র বিক্ষোভ দমাতে ক্লান্ত তখনই এই সব অস্ত্রবাজরা পুলিশের প্রক্সি হিসেবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে।

এতে ওই এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন কয়েকশ’ শিক্ষার্থী। ৪ঠা আগস্ট সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- আগের দিন ঘোষণা দিয়ে ৪ঠা আগস্ট নগরের কোর্ট পয়েন্টে বেলা ১১টার পর অবস্থান নিয়েছিলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। সঙ্গে ছিলেন সিলেট বিএনপিসহ বিরোধী বলয়ের কর্মীরাও। দুপুরের দিকে পুলিশ অ্যাকশনে গিয়ে ওই এলাকায় তাদের সরিয়ে দিলে রাজপথ দখলে নেয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এরপর থেকে সিলেট আওয়ামী লীগের উপ-গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডাররা অস্ত্র নিয়ে মহড়া শুরু করে। এ সময় দফায় দফায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। আর এ সময় ওই সব এলাকায় শত শত রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। আর এ সময় শিপলু ও তার অস্ত্রের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়। এ ছাড়া আফতাব ও আব্দুল হান্নান দলবল নিয়ে ওইদিন কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টাসহ নগরে অবস্থান নিয়েছিলো।

এর বাইরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি পীযূষ কান্তি দে তার দলবল দিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। পীযূষের সঙ্গে থাকা তার এক সহযোগীর হাতে ছিল তার সেই বহুল আলোচিত দু’নলা বন্দুক। এ ছাড়া শটগান হাতে যুবলীগ নেতা জাহেদ, মুনিম অখিলি, সজল দাশ অনিক, শান্ত, আলোচিত টিলাগড়ের ভয়ঙ্কর অস্ত্রবাজ আনসার, এমসি কলেজের দেলোয়ার হোসেন রাহী, সরকারি কলেজের রুহেল আহমদ, নাজন আহমদ, ছাত্রলীগের তানভীর, কাশ্মির গ্রুপের সৈকত চন্দ্র রিমী, গৌরাঙ্গ দাশ সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। তারা ওইদিন গুলিবর্ষণ করে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নগর ও জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন- অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও থানা, ফাঁড়ি থেকে খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে কাজ চলছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলে জনমনে আতঙ্ক কাজ করবে। ফলে বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে প্রশাসনের তরফ থেকে দেখা হচ্ছে বলে জানান তারা। 

স্বাভাবিক হয়নি সংসদ সচিবালয় by কাজী সোহাগ

এখনো স্বাভাবিক হয়নি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়। এখানে প্রায় ১২শ’ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছে। ৫ই আগস্টের পর কেউই আসছেন না সংসদ সচিবালয়ে। নেই হাজিরার সিস্টেমও। ভেতরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসার চেয়ার, টেবিলও নেই। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে সংসদ ভবন। ভেতরের ফ্লোরগুলোতে অসংখ্য ফাইল আর কাগজে ভরা। বেশিরভাগ দরজা ও জানালা ভাঙা। সংসদে থাকা কয়েকশ’ কম্পিউটার ও ল্যাপটপের কোনো হদিশ নেই। ইন্টারনেট লাইন সম্পূর্ণ অকেজো।

এ অবস্থায় মেরামতেরও কোনো উদ্যোগ নেই। সংসদ সচিবালয়ের বেশ কয়েক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সব ধরনের সিস্টেম একেবারে ভেঙে পড়েছে। তারা বলেন, সাংবিধানিকভাবে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু রুটিন ওয়ার্ক রয়েছে যা এখন করা সম্ভব হচ্ছে না। যারা কর্মকর্তা ও কর্মচারী আছেন তারা নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের জন্য কোনো ধরনের নির্দেশনা আসেনি। সরকারি চাকরি হওয়ায় তারা নিজ উদ্যোগে কোনোকিছু করতেও পারছেন না। সম্প্রতি সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তাই এ অবস্থায় সংসদ সচিবালয় চালানোর মতো কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত নেই। সবাই চেয়ে রয়েছেন সরকারের নির্দেশনার ওপর। যারা সংসদ এরিয়ায় বাসায় থাকতেন তাদের বেশিরভাগই বাসা ছেড়েছেন। কারণ সেখানে কোনো ধরনের আসবাবপত্র নেই। বেশিরভাগই বাসা ভাড়া করে আছেন অথবা নিকটাত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছেন। সংসদ ভবন বা জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্স ঢাকার শেরে বাংলা নগরে ২১৫ একর জায়গার ওপর অবস্থিত। ৯ তলা বিশিষ্ট ভবনটির মূল স্থপতি লুই কান। তিনি প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি। বাংলাদেশের সংসদ ভবন উপমহাদেশের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। এর স্থাপত্যশৈলী দ্বারা প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভবন চত্বর ও ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে হাজারো মানুষ। এ সময় তারা স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপদের কক্ষসহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষ তছনছ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৫ই আগস্ট সংসদ ভবনের গেটে প্রথমে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রবেশে বাধা দিলেও লোকসমাগম বাড়লে আর তাদের আটকানো যায়নি। সংসদ ভবন চত্বরের দক্ষিণ প্লাজা, খেজুরবাগান মাঠ, টানেলে ঢুকে পড়ে অসংখ্য মানুষ। সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ওইদিন বিকাল থেকে রাতভর একদল লুটেরা সংসদ ভবনের প্রায় সব কক্ষেই লুটপাট চালায়। তারা অনেকেই আবার সকালে তালা ভাঙার জিনিসপত্রসহ চলে আসে এবং কক্ষের তালা ভেঙে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজসহ মূল্যবান কাগজপত্র লুটপাট করে এবং কক্ষের সব জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। এ সময় তারা সংসদ ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বন্ধ করে দেয়। তিনি বলেন, বেলা ১১টার দিকে সংসদ ভবনে সেনাবাহিনী চলে আসে, সংসদ সচিবালয়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের সঙ্গে সংসদ ভবনের নিরাপত্তা বিধানে কাজ করে। তারা সচিবালয়ের কর্মচারী-কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেয়নি। তাদের সহয়োগিতায় এগিয়ে আসে একদল ছাত্র, যারা লুটের মালপত্র ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানায় এবং কিছু জিনিসপত্র লুটেরাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সংসদের একটি কক্ষে রেখে দেয়।


৪ঠা আগস্ট রাতেই হাসিনা বুঝতে পারেন সময় শেষ

শেখ হাসিনা কখন, কীভাবে পদত্যাগ করেন তা নিয়ে অন্তহীন জল্পনা-কল্পনা। সরকারের তরফে এখনো কিছু বলা হয়নি। শেখ হাসিনাও নিশ্চুপ। তবে নানা সূত্রে জানা যায়, ৪ঠা আগস্ট রাতেই শেখ হাসিনা জানতে পারেন- ছাত্র আন্দোলন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যা নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো অবস্থাতেই পদত্যাগে রাজি হচ্ছিলেন না। বরং তিনি আরও কড়া অ্যাকশনের পক্ষে অনড় ছিলেন। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছিল। কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকায় ফেরা ছোটবোন শেখ রেহানাও তাকে বোঝাতে ব্যর্থ তখন। একপর্যায়ে ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে। শুরুতে জয় ছিলেন ক্ষিপ্ত, উত্তেজিত। তার জবাব ছিল ‘আপনারা ব্যর্থ হয়েছেন। আপনাদেরকে কীভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তা ভুলে গেছেন।’ নিরাপত্তাবাহিনীর অনড় ভূমিকায় শেষ পর্যন্ত জয় তার মা শেখ হাসিনার পদত্যাগের পক্ষে সায় দেন। উপায়ান্তর না দেখে শেখ হাসিনা দ্বিতীয় চিন্তা বাদ দিয়ে অবশেষে পদত্যাগে রাজি হন।

সূত্র বলছে, ৪ঠা আগস্ট রাতেই শেখ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। কিন্তু তিনি তা মানতে রাজি ছিলেন না। দফায় দফায় বৈঠক, আলোচনা, পদত্যাগে সম্মতি আদায় এবং সর্বশেষ পদত্যাগপত্র প্রস্তুতিতে দ্রুত সময় ফুরিয়ে যায়। পরিস্থিতির বিষয়ে শেখ হাসিনাকে বাস্তব অবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল মর্মে অভিযোগ উঠেছে। এর জন্য বিভিন্ন মাধ্যম নানাজনের প্রতি অভিযোগের আঙ্গুল তুলছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের পেছনে ৪ জনের একটি চক্র বা ‘গ্যাং অব ফোর’- দায়ী বলে আওয়ামী লীগের এক নেতার বরাতে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম রিপোর্ট করেছে। যা নিয়ে ঢাকায় রীতিমতো তোলপাড় চলছে। তাছাড়া বার্তা সংস্থা এএফপি’র বরাতে তাৎক্ষণিক দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে খবর রটে ৫ই আগস্ট আড়াইটায় বঙ্গভবন থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ভারতের আগরতলা গেছেন, পরে দিল্লি। দেশ ছাড়ার আগে হাসিনা একটি ভাষণ রেকর্ড করে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ পাননি। ওইদিন সকালে ছোটবোনকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে বঙ্গভবনে গিয়ে পদত্যাগ করেন বলেও খবর রটে। এসব খবরের সত্যতা নিশ্চিতে অবিরাম চেষ্টা চলছে। যদিও এখনো ধোঁয়াশা কাটছে না। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার ৩ সপ্তাহ অতিবাহিত হতে চলেছে। মানবজমিনের অনুসন্ধান বলছে, শেখ হাসিনাকে ধারাবাহিকভাবে দেশের অবস্থা সম্পর্কে নানাভাবে জানানো হচ্ছিল। তিনি কারও কথাই কানে তুলছিলেন না।

একটি সূত্র বলছে, পদত্যাগ করতে শেখ হাসিনার সময়ক্ষেপণই জাতির জন্য কাল হয়। অন্যথায় গণভবনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে মানুষের ক্ষোভের থাবা কিছুটা কম হতো। ৫ই আগস্টের পরিস্থিতি শেখ হাসিনার বঙ্গভবনে যাওয়ার জন্য মোটেই অনুকূল ছিল না। সূত্র বলছে, জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিরাপত্তাবাহিনীর পরামর্শে সেদিন দুপুরে তিনি গণভবনে বসেই তার পদত্যাগপত্রে সই করেন। যা দায়িত্বশীল ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পৌঁছানো হয়। অন্য একটি সূূত্র বলছে, হেলিকপ্টারে চড়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়েননি। এমনকি আগরতলায়ও যাননি। সম্প্রতি বিমান বাহিনীর ফ্লিটে যুক্ত হওয়া সি-১৩০-জে সুপার হারকিউলেস এয়ারক্রাফ্‌ট-এ চড়ে শেখ হাসিনা সরাসরি দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তার আগে গণভবন থেকে কয়েক স্তরের নিরাপত্তায় তাকে তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরে নেয়া হয়। সেখানে প্রস্তুত ছিল বৃটিশ এয়ারফোর্সে ব্যবহৃত হওয়া আমেরিকান কোম্পানি ম্যাকডোনাল্ড ডগলাসের তৈরি সি-১৩০ জে উড়োজাহাজ।

 ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে বৃটিশ কোম্পানি মার্শাল এয়ারস্পেসের মাধ্যমে ৫টি সি-১৩০ জে এয়ারক্রাফ্‌ট কিনেছে বাংলাদেশ এয়ারফোর্স। দায়িত্বশীলরা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ যেকোনো অপারেশনে ওই এয়ারক্রাফটের উপর নির্ভর করা যায়। কারণ দীর্ঘপথে বিরতিহীন যাত্রায় সক্ষম বৃটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের অপারেশনে ব্যবহৃত ওই উড়োজাহাজ। সূত্র বলছে, আগে থেকে প্রস্তুত রাখা ওই উড়োজাহাজে ফ্লাই করেন শেখ হাসিনা। উড়োজাহাজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাইরে ফ্লাইটে শেখ হাসিনার একমাত্র সফরসঙ্গী ছিলেন তার ছোটবোন শেখ রেহানা। হাসিনা ও রেহানাকে বহনকারী বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের উড়োজাহাজটি ঢাকা থেকে ননস্টপ ফ্লাই করে ৫ই আগস্ট সন্ধ্যায় দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। সেখানে অপেক্ষমাণ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে রিসিভ করেন। দ্রুত ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্স পাওয়াসহ শেখ হাসিনাকে গ্রহণের অন্যান্য প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রশাসন প্রধানতঃ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দপ্তরের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছিল।

এবার হত্যা মামলার আসামি: ক্রিকেটে সাকিবের ভবিষ্যৎ কোথায়? by সৌরভ কুমার দাস

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোয় পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর গত এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে চলা গণ হত্যায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। আদাবর থানায় এমনই একটি মামলায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নাম এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই মামলার পর ক্রিকেটে সাকিবের ভবিষ্যৎ কী হবে।

গত কয়েক বছর ধরেই মাঠের বাইরে বেপরোয়া সাকিব বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলেন। যখন ইচ্ছা ছুটি নিয়েছেন, যখন ইচ্ছা খেলেছেন। নির্বাচকরাও জানতেন না সাকিব কোন সিরিজে খেলবেন আর কোন সিরিজে খেলবেন না। সাকিব নাকি সরাসরি ডিল করতেন তৎকালীন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হোসেন পাপনের সঙ্গে। সরকার পতনের পর লাপাত্তা পাপন পদত্যাগ করেছেন, বিসিবির নতুন সভাপতি হয়েছেন ফারুক আহমেদ। প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সাকিবের ব্যাপারে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন তিনি।

তবে এতদিন মাঠের বাইরে সবকিছুই সাকিব সামলে নিয়েছেন। মাঠে ভালো খেলেছেন, ভক্তরা ছিল পাশে। কিন্তু সর্বশেষ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাকিবের ভক্তরাই তাকে ধুয়ে দিয়েছেন। ছাত্রদের পক্ষে সাকিব কিছু বলেননি, সেটা শাসক দলের সংসদ সদস্য হিসেবে বলতে পারবেন না এই যুক্তি দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে কানাডার গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি লীগে এক দর্শককে প্রশ্ন করে বসেন ‘দেশের জন্য কী করেছেন?’ এতে যেন আরও ক্ষেপে ওঠে শিক্ষার্থীরা। এমনকি দেশে যখন প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে তখন সামাজিকমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চিড়িয়াখানায় বেড়ানোর ছবি ছবি আপলোড করেন সাকিব। সবমিলিয়ে সবদিক থেকেই সমর্থন আসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল সাকিবের। তবে এর মধ্যে সবাইকে কিছুটা অবাক করে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের প্রথম অনুশীলনেই যোগ দেন তিনি। যদিও সচরাচর দেখা যায় টেস্ট খেলতে চান না সাকিব। বোঝাই যাচ্ছে গত নির্বাচনে মাগুরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সাকিব এই পদ হারিয়ে এখন ইমেজ উদ্ধারে নেমেছেন।
তবে এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেলেন সাকিব আল হাসান। দেশজুড়ে আওয়ামীলীগের এমপিদের নামে মামলা হওয়ার তালিকায় তার নামও যোগ হলো। ৫ই আগস্ট সকালে রাজধানীর আদাবরে অবস্থিত রিংরোডে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান গার্মেন্টস কর্মী মো. রুবেল। হত্যার অভিযোগে নিহতের বাবা রফিকুল ইসলাম বাদি হয়ে আদাবর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় আসামির তালিকায় ২৮ নম্বরে আছেন আওয়ামী লীগের মাগুরা-১ আসনের সাবেক এমপি সাকিব আল হাসান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মামলার ১ নম্বর আসামি। এছাড়া সবমিলিয়ে আসামি করা হয়েছে ১৫৩ জনকে।  

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ওইদিন মিছিলে পুলিশের দু’টি বুলেটের মধ্যে একটি বুকে ও আরেকটি পেটের বাম পাশে এসে লাগে রুবেলের। এরপর গ্রিন রোডের সেন্ট্রাল  হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। সেখান থেকে পাঠানো হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। জরুরি অবস্থায় সোহরাওয়ার্দীতে রুবেলের সার্জারি হলেও আইসিইউ স্বল্পতায় তাকে ভর্তি করানো হয় কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে। এ হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রুবেল। দেশে যার নামে খুনে ইন্ধন দেওয়ার মামলা হলো তিনি পাকিস্তানে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন ক্রিকেটে। চলমান প্রথম টেস্টে বল হাতে একটি উইকেটও নিয়েছেন। বরাবরই বলা হয়, সাকিবকে মাঠের বাইরে কোনো কিছু স্পর্শ করতে পারে না। তবে সেই দিন বোধহয় আর নেই। আগে ধারাবাহিক পারফর্মেন্সই ছিল তার শক্তি, সেটাও অনেকদিন ধরেই সঙ্গ দিচ্ছে না। বিসিবি সভাপতি হিসেবে প্রথম দিন সংবাদ সম্মেলনে ফারুক আহমেদ বলেছিলেন, বাইরে থেকে সাকিব খেলতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা করবেন তারা। এই মামলা হওয়ার পর সাকিব দেশে আদৌ ফিরবেন কিনা সেটা নিয়েও এবার প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। আর যদি দেশে ফেরেন, এই মামলায় সাকিবকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে জাতীয় দলে সাকিবের ভবিষ্যৎ কী হবে! যদিও মামলা থাকলেই যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারবেন না এমন নয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটেই এর অনেক উদাহরণ আছে। ২০১৫ সালে ধর্ষণ মামলায় আদালত থেকে জামিন নিয়ে বিশ্বকাপ খেলেছিলেন রুবেল হোসেন।

তবে আইনি জটিলতা পাশে রেখে বিসিবি সাকিবের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নিবে। পারফর্মেন্সের অজুহাতে তারাও কি সাকিবের ব্যাপারে নরম থাকবে এটাই আলোচনার বিষয়। সাকিবের ব্যাপারে জানতে দৈনিক মানবজমিনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বিসিবি ক্রিকেট অপরারেশন্সের ম্যানেজার শাহরিয়ার নাফিসের সঙ্গে। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি বলে উত্তর দিতে চাইলেন না তিনি।
দৈনিক মানবজমিনকে নাফিস বলেন, ‘আমি আসলে বোর্ডে আসার পর এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। ফলে বোর্ড এই বিষয়গুলো কিভাবে ডিল করে সেটা জানতে হবে। আর এ ব্যাপারে বলতে পারবেন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী।’

এরপর প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। মোবাইল নম্বরে কল করা হলে সংযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে দুইবার কল দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি প্রধান নির্বাহী। আর নির্বাচক প্যানেলের চেয়ারম্যান গাজী আশরাফ হোসেন লিপু পাকিস্তান থাকায় তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সাকিবের ব্যাপারে এই মুহূর্তে বোর্ডের অবস্থান জানা যায়নি। তবে ফর্ম, সাম্প্রতিক সব অবস্থা মিলিয়ে মাঠের ক্রিকেটে সাকিবের ভবিষ্যৎ ভালো কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

নতুন বাংলাদেশ গঠনে সিরাজুলের ভীষণ প্রয়োজন ছিল -শোকসভায় বক্তারা

অধিকাংশ কূটনীতিক আত্মরক্ষায় নিয়োজিত থাকেন। কিন্তু সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম ছিলেন ভিন্ন। তিনি সাধারণের মধ্যে ছিলেন অসাধারণ। তিনি সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলার অপূর্ব ক্ষমতা রাখতেন। সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের শোকসভায় অংশ নিয়ে এমনটাই বলেন বক্তারা। এছাড়াও তারা বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুলের ভীষণ প্রয়োজন ছিল।

গত ১১ই আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তার স্মরণে গতকাল এম সিরাজুল ইসলামের পরিবার ও দ্য ঢাকা ফোরাম (টিডিএফ) শোকসভার আয়োজন করে। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন’-এ আয়োজিত সভায় তার বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে আলোচনা হয়। শুরুতে এম সিরাজুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন ও মোনাজাত করা হয়।
আলোচনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্যের শুরুতে আন্দোলনে শহীদ ছাত্র-জনতার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, সবুজ (এম সিরাজুল ইসলাম) বলেছিলেন এই সরকার (আওয়ামী লীগ) বেশিদিন থাকবে না। এখন সেই সরকার নেই। এই সময়টায় সবুজ থাকলে অনেক বেশি খুশি হতেন।

এ সময় তিনি এম সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে নানা সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করেন। এরপর তিনি বলেন, তিনি ছিলেন পজেটিভ। নট রি-অ্যাকটিভ। আর রি-অ্যাক্ট করতেন থিওরিটিক্যালি। সবুজ ছিলেন স্পষ্ট কথা বলার মানুষ। আমিও বলি বি-পজেটিভ। রি-অ্যাক্টিভ হবেন না। আমি যদি বলি আমরা সব করে ফেলবো। ১০টা কথা বললে দু’টা কথা তো সত্যি হবে। কিন্তু আমরা দেশের স্বার্থে মানুষের স্বার্থে কাজ করে যাবো।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সবুজ ছিলেন অসাধারণ দেশপ্রেমিক একজন মানুষ। শুধু তাই নয়, তিনি ভালো- পিতা, স্বামী, বন্ধু। সেইসঙ্গে তিনি ছিলেন মেধাবী, বুদ্ধিমান এবং স্পষ্টবাদী। এই ধরনের মানুষ সব সময় আসে না। আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছাত্রজীবন থেকে, ১৯৬৫ সাল থেকে। তার সঙ্গে মত সব সময় এক ছিল তা- না। তবে মানুষ ছিল একদম খাঁটি। আন্দোলনের সময় বহুবার তার বাসায় গিয়েছি। আলোচনা করেছি। আমীর খসরুসহ আমরা জেলে গিয়েছিলাম। তখন বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। সবুজ অনেক ঝুঁকি নিয়ে এই দায়িত্ব পালন করেছেন। আমাদের অনেক আশা ছিল যখন এই দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন হবে আমরা সবুজকে বিশেষ কাজে লাগাতে পারবো।
তিনি বলেন, এই দু’মাসেই যে মানুষ শহীদ হয়েছেন তা নয়। গত ১৫ বছর ধরেই অসংখ্য মানুষ শহীদ হয়েছেন। ভয়াবহ ফ্যাসিস্টের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য তারা প্রাণ দিয়েছেন। সবুজ লড়াই করেছেন তার লেখনীর মধ্য দিয়ে, কথার মধ্য দিয়ে। নামের মতোই সবুজ ছিল। ছিল প্রাণবন্ত। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। দেশ হারিয়েছে অত্যন্ত দেশপ্রেমিক একজন কূটনীতিককে।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাবেক এই কূটনীতিকের সঙ্গে নানা স্মৃতি রোমন্থন করেন। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বলেন, সবুজ ভাইয়ের বক্তব্য স্টেট ফরোয়ার্ড। যেকোনো অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য শ্রোতারা এত গুণমুগ্ধ হয়ে শুনতেন যে, তারপর আর বক্তব্য দিতে সমস্যা হতো। এই মানুষটা কোনোদিন রাজনীতি করেননি। তবুও ছিলেন সাবলীল। তিনি দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আর্টিকেল লিখতেন। তার বক্তব্য, লেখনী বিরোধী দলের রাজনীতিকে বস্তুনিষ্ঠ অবস্থায় নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বর্তমান এই প্রেক্ষাপটে উনাকে দরকার ছিল। উনাকে আমরা মিস করবো, সম্মান করবো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ বলেন, বেশির ভাগ কূটনীতিক আত্মরক্ষায় নিয়োজিত থাকেন। তিনি সাধারণের মধ্যে ছিলেন অসাধারণ। বাংলাদেশের বুকের ওপর যে জগদ্দল পাথর চেপে বসেছিল। তখনও তিনি আশার সঞ্চার দেখিয়েছেন। সঠিক সময় সঠিক কথা বলার অপূর্ব ক্ষমতা ছিল তার। তিনি ছিলেন কথার শিল্পী। কূটনীতিকরা অনেকেই টাইয়ের নট কিংবা কাটা চামচ কই রাখবেন তা নিয়ে চিন্তা করেন। মানুষের কথা চিন্তা করেন না। সবুজ ছিলেন তার ব্যতিক্রম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, সবুজ হয়ে উঠেছিলেন ন্যায় নিষ্ঠার প্রতীক। সবুজ একাকীও উজ্জ্বল ছিলেন। অবসরের পর তুলে নিলেন কলম। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অনবরত কাজ করে গেছেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবুজের যে কন্ট্রিবিউশন তা যেন আমরা ভুলে না যাই। অনেকে আমাকে বলেন- যুদ্ধ যে করলেন পেলেন কি? আমি বললাম কী আবার পাবো মুক্ত বাতাস পেয়েছি। সবুজের কিছু পাওয়ার আশা ছিল না।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, তার সঙ্গে আমার সবশেষ কথা হয়েছিল সেদিন আমরা ভবিষ্যৎ ফরেন পলিসি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, দেশে ফিরে আমরা সিরিয়াস ফরেন পলিসি নিয়ে কাজ করবো। কিন্তু আমরা একজন গুণী মানুষকে হারিয়েছি। আমরা দেশের জন্য তার অবদান আজীবন স্মরণে রাখবো।  
এছাড়াও অনুষ্ঠানে তার পরিচিতজনরা বক্তব্য রাখেন। তারা সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলামের গুণের প্রশংসাসহ দেশ গঠনে তার অবদানের কথা তুলে ধরেন। সভায় বিএনপি’র অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, মিজানুর রহমান মিনু, আবদুল হালিম, আবদুল কাইয়ূম, নজমুল হক নান্নু, সুজা উদ্দিন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নূর মোহাম্মদ খান, জহির উদ্দিন স্বপন, শামা ওবায়েদ, সাবেক কূটনীতিক ইফতেখার করীম, শাহেদ আখতারসহ অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মরহুমের সহধর্মিণী নাসরিন ফৌজিয়া, দুই কন্যা মৌসুমী ইসলাম সাবরিনা ও নওরিনসহ মরহুমের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম গত ১১ই আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। সিরাজুল ইসলামের কর্মজীবন শুরু হয় তৎকালীন পাকিস্তান ফরেন সার্ভিস থেকে। তিনি ক্যানবেরা, নয়া দিল্লি, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ে বাংলাদেশ মিশনে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি মিশর (১৯৯৯-২০০২) ও জাপানেও (২০০২-২০০৬) রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেয়ার আগে তিনি ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান ডিগ্রি নেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭৫-৭৬ সালে তিনি কানাডার ব্রক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ছাত্রজীবনে তিনি খেলাধুলার সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগের হয়ে ক্রিকেটও খেলেছেন। এছাড়া ১৯৬৮-৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেনিস দলের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে তাকে টেনিসে ব্লু পুরস্কার দেয়া হয়। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম হলিডে, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ডেইলি সান ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে কলাম লিখতেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর: বঙ্গবন্ধু পরিষদের পদধারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় by শুভ্র দেব

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) বঙ্গবন্ধু পরিষদের পদধারী কর্মকর্তারা আছেন বহাল তবিয়তে। শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের কাছে এখনো অসহায় ১৫ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত কর্মকর্তারা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এসব কর্মকর্তার ইশারায় চলছে ডিএনসি’র সমস্ত কার্যক্রম। নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে বদলি, নিয়োগ, টেন্ডার, মাদকের স্পট থেকে মাসোহারা তোলায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন তারা। অধিদপ্তরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন, পদোন্নতি, বদলিতে সংগঠনের নেতাদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। বেপরোয়া কর্মকর্তারা বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে দলীয় দাপট দেখিয়ে পুরো অধিদপ্তরকে কব্জা করে রেখেছেন। সাবেক সুরক্ষা সচিব, অধিদপ্তরের মহাপরিচালকদের ম্যানেজ করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। গড়েছেন অবৈধ সম্পদ। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে তাদের অনৈতিক অনেক কর্মকাণ্ডের সংবাদ প্রচার হয়েছে। কিন্তু লোক দেখানো বিভাগীয় মামলা করে সিন্ডিকেটের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারি সকল অফিসে সংস্কার হচ্ছে। দুর্নীতিবাজ, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের অপসারণ করা হয়েছে। তাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীও এখন সংস্কারের জন্য সোচ্চার। তারা চাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেসব কর্মকর্তারা প্রভাব বিস্তার করছিলেন তাদের সরিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিতদের সেসব পদে যাতে পদায়ন করা হয়। শিগগিরই সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। এ ছাড়া এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে।

ডিএনসি সূত্র বলছে, যেসব এলাকায় মাদকসেবী, মাদক কারবারি, মদের বার বেশি- সেসব এলাকায় মাদকের কর্মকর্তাদের অবৈধ আয় বেশি হয়। তাই ওই এলাকায় পোস্টিং পাওয়াকে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ ভাষায় ‘প্রাইস পোস্টিং’ বলা হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতারা দিনে দিনে হয়ে উঠছিলেন আরও বেপরোয়া। এ ছাড়াও অধিদপ্তরে নিয়োগ দেয়া হতো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী। এ ছাড়াও কর্মকর্তারা তাদের অবৈধ আয় থেকেও নিয়মিত মাসোহারা দিতেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। ভাগবাটোয়ারা এবং ফায়দা নিতে অধিদপ্তরের পাল্টাপাল্টি দুটি কমিটি গঠন করেছে চক্রটি।  

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটে যারা রয়েছেন  তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু পরিষদের একটি কমিটির সভাপতি প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি ও উপ-পরিচালক (ঢাকা উত্তর) আবুল হোসেন, সহ-সভাপতি ও উপ-পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক ও সহকারী পরিচালক রাহুল সেন, প্রচার সম্পাদক ও সহকারী পরিচালক শিরিন আক্তার রয়েছেন। এ ছাড়াও চক্রে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের অপর কমিটির সভাপতি ও উপ-পরিচালক (ঢাকা-গোয়েন্দা) রবিউল ইসলাম, একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও উপ-পরিচালক হামিমুর রশিদসহ আরও অনেকে।

ডিএনসি সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ও প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক বিভাগীয় মামলা। যার মধ্যে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পুলিশের অভিযানে ৫ কেজি হেরোইন জব্দ করা হয়। রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সেটি ডিএনসি ল্যাবে পাঠানো হয়। কিন্তু আসামি পক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে দুলাল ভুল প্রতিবেদন দেন। ধরা পড়ার পরে  দেশ জুড়ে আলোচিত এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এ ছাড়াও ৮ মাস আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যৌথ অভিযানে একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে দুই কোটি টাকার হেরোইন উদ্ধার করা হয়। এরপর সেই হেরোইন ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে সেখানে অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দিয়েছেন ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা। প্রতিবেদনে সরাসরি মাদক না লিখে তিনি লিখেছেন, ‘মাদকসদৃশ বস্তু পাওয়া গেছে।’ এভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাদকের বড় চালানে ভুল ও অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতানোর অভিযোগ রয়েছে দুলাল কৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ২টি বিভাগীয় মামলা চলছে। আরও দুটি মামলায় তাকে তিরস্কার দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভুয়া কোর্ট সার্টিফিকেট দিয়ে টিএডিএ বিল নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে রাসায়নিক পরীক্ষার টাকার বিনিময়ে ভুল রিপোর্ট ও নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য করে টাকা আয়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সব অভিযোগই মিথ্যা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে এসব করছে। বিভিন্ন সময়ের বিভাগীয় মামলার বিষয়ে বলেন, চাকরি করতে গেলে অনেক কিছুই থাকতে হবে।
বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি ও ঢাকা মেট্রো উত্তরের উপ-পরিচালক আবুল হোসেন ছাত্র জীবনে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা।

প্রভাবশালী এক আওয়ামী লীগ নেতার নিজ এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তার সঙ্গে রয়েছে গভীর সখ্যতা। মেধা ও তালিকায় পেছনে থেকেও সুপারিশে এই আবুল হোসেন উপ-পরিচালক থেকে খুলনা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালকের পদ বাগিয়ে নেন। এ নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে আদালতে রিট দায়ের হলে তাকে পুনরায় আদালতের নির্দেশে ডিডি পদে পদায়ন করা হয়। বর্তমানে তিনি আছেন অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদ ঢাকা মেট্রো উত্তরের উপ-পরিচালক পদে। ঢাকা উত্তরের অধীনে মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরে রয়েছে একাধিক বিহারি ক্যাম্প। এসব ক্যাম্প থেকে আবুল হোসেনকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে চলে মাদক কারবার। রাজধানীর এসব ক্যাম্পে দিনে কোটি কোটি টাকার মাদক বিক্রি হয়। রাজধানীর কয়েকটি ক্যাম্পে প্রকাশ্যে সিরিয়াল দিয়ে মাদক বিক্রির অন্তত ডজনখানেক ভিডিও রয়েছে। এই আবুল হোসেন অধিদপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করেন বলেও অভিযোগ আছে। তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামানোর অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরে আবুল হোসেন সাবেক ডিজি মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকীকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নেন। অধিদপ্তরের নথিপত্রে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ রেকর্ড আছে। অভিযোগের বিষয়ে আবুল হোসেন বলেন, সভাপতি-সেক্রেটারি সংগঠনে আমার নাম দিয়েছেন। খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালকের পদ নিয়ে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি ও উপ-পরিচালক (ঢাকা গোয়েন্দা) মো. রবিউল ইসলাম চাকরি জীবনের বেশির ভাগ সময়েই কাটিয়েছেন রাজধানীতে। এই কর্মকর্তা সবচেয়ে বেপরোয়া ছিলেন অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি মোহাম্মদ আতোয়ার রহমানের সময়। রবিউল তখন ঢাকা মেট্রো উত্তরে ডিডি ছিলেন। দু’জন একই এলাকার হওয়ার সুবাদে এই কর্মকর্তা তখন ডিজির প্রভাব খাটিয়ে পোস্টিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। এই কর্মকর্তা তখন প্রধান কার্যালয়ে গেলে সবাই আতঙ্কে থাকতেন। যেদিন তিনি সদরদপ্তরে যেতেন সেদিনই কোনো না কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করিয়ে দেয়া হতো। এখন তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের নাম ভাঙিয়ে একই কায়দায় বদলি বাণিজ্য করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আছে।
এ ছাড়াও অপর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও উপ-পরিচালক মো. হামিমুর রশীদ তার চাকরি জীবনের প্রায় ৯ বছর কাটিয়েছেন সদর দপ্তরে। এ ছাড়াও প্রাইস পোস্টিং পেয়ে মানিকগঞ্জে ১ বছর ও সম্প্রতি বদলি হয়ে পটুয়াখালীতে আছেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের দুই কমিটির একটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক ও অন্য কমিটিতে সদস্য হিসেবে সহকারী পরিচালক তুষার কুমার ব্যানার্জি। তিনি এখন ঢাকা বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চাকরি করছেন। চাকরি জীবনে তিনিও বেপরোয়া। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং নিয়ে পকেট ভারী করছেন। তার বিরুদ্ধে ২টা মামলা চলমান রয়েছে। এর আগে তিনি মামলার তদন্তে তিরস্কৃত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে এই সিন্ডিকেটে জড়িত বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও সহকারী পরিচালক (স্টাফ অফিসার টু ডিজি) শাহীন মাহমুদ। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। বর্তমানে ডিজিসহ আরও বেশ কয়েকজন ডিজির স্টাফ অফিসার হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। সাবেক ডিজি মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী তার মাধ্যমে সমস্ত কাজকর্ম করাতেন। ডিজিদের আস্থাভাজন হওয়াতে তিনি কাউকে তোয়াক্কা করেন না। বড় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গেও অনেক সময় খারাপ আচরণ করার অভিযোগ আছে। বঙ্গবন্ধু পরিষদের আরও অনেক নেতাই দাপট দেখিয়ে চলেন। অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অজানা কারণে তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়, ডিজিরা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আমি অধিদপ্তরে আসার এখনো তিন মাস হয়নি। এরমধ্যে আমি সংগঠনটির কোনো কর্মতৎপরতা দেখি নাই। এ ছাড়া প্রভাব বিস্তার করে বদলিরও কোনো কিছু দেখি নাই। আমার ওপর কেউ প্রভাব বিস্তার করে নাই। তিনি বলেন, আমি যোগদানের পর তিনজন ছাড়া তেমন কোনো বদলি হয়নি। তবে যাদের কথা বলেছেন তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো তথ্য পাই অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।

বাঁচার লড়াই: বন্যায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু

চারদিকে পানি আর পানি। অথৈ জলরাশিতে অসহায় মানুষের আর্তনাদ। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে সবাই সবাইকে মাফ করে দেয়ার আর্জি। পানিবন্দি মানুষের ঘরের চালা ও গাছ ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা। আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরে আসাদের হাহাকার। খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট। স্বজনকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। বিদ্যুৎ নেই। বন্ধ সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানিতে ভাসছে জনপদ। দিশাহারা মানুষ। নিহত অন্তত ১৫ জন। দুর্গত মানুষকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে ও ত্রাণ সরবরাহে কাজ করছে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা। এ ছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ শত শত স্বেচ্ছাসেবী স্পিডবোট ও নৌকা নিয়ে ছুটে চলছেন দুর্গত মানুষকে উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণে। ভারতের ত্রিপুরার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি ফেনীসহ ১১ জেলা। গতকাল বৃষ্টি বন্ধ থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে নামতে শুরু করেছে পানি। ডুবে গেছে ফেনীর সব কটি উপজেলা। পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়ার পর সদর, দাগনভূঞা ও সোনাগাজীর অবস্থাও ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। অন্যদিকে কুমিল্লায় গোমতি নদীর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে জেলার বুড়িচং উপজেলা। আগ থেকেই বন্যার পানিতে নিমজ্জিত ছিল কুমিল্লার কয়েকটি উপজেলা। এ ছাড়াও নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত। পানিবন্দি অন্তত অর্ধকোটিরও বেশি মানুষ। তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ফসলি ভূমি, মাছের ঘের। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার এসব মানুষ। গতকাল  সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুল হাসান জানান, বন্যাকবলিত জেলাগুলোয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। এ মুহূর্তে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬২৯টি পরিবার পানিবন্দি। আর এই বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে কুমিল্লায় চারজন, কক্সবাজারে তিন, চট্টগ্রামে দুই, ফেনীতে এক, নোয়াখালীতে এক, লক্ষ্মীপুরে এক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন মারা গেছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, বন্যা পরিস্থিতি ধীরগতিতে উন্নতি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩৯ মানুষ। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় এখন পর্যন্ত ৩ কোটি ৫২ লাখ নগদ টাকা, ২০ হাজার ১৫০ টন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে ফেনীতে অচল হয়ে পড়েছে ৯২ শতাংশ মোবাইল টাওয়ার। যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। এ ছাড়াও বন্যাকবলিত ১০ জেলার প্রায় ১১ শতাংশ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকা এবং টাওয়ার এলাকা ডুবে যাওয়ায় নেটওয়ার্ক সচল করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় টাওয়ার সচল করতে সমন্বয়ের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ফেনীতে এখনো পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ। তাদের উদ্ধারে কাজ করছে বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থা। ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ায় অসংখ্য মানুষ আটকা পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা তাদের নিরাপদে সরিয়ে আনতে কাজ করছেন। তবে গতকাল বৃষ্টি না হওয়ায় সেখানকার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। ভারতীয় পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে সোমবার ফেনীর মুহুরী-কহুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে নিম্ন্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। প্রবল স্রোতে বাঁধের অসংখ্য স্থান ভেঙে পানি প্রবেশ করতে থাকে লোকালয়ে। উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের অলকা, নোয়াপুর, ধনিকুন্ডা, মির্জানগর ইউনিয়নের শুভার বাজার ও বক্সমাহমদু ইউনিয়নের সাতকুচিয়া পয়েন্ট দিয়ে পানি প্রবেশ করে পাশের ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও সদরের সবকটি গ্রাম তলিয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষের আকুতিতে ভারী হয়ে উঠে সেখানকার বাতাস। এদিকে বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবীরা আটকেপড়া মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছেন ত্রাণ। তবে এসব এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট রয়েছে খাবারেরও। অন্যদিকে জেলার অন্য তিন উপজেলায় পানি বাড়ছে। সদর, সোনাগাজী, দাগনভূঞার অধিকাংশ এলাকায় গতকাল পানি বাড়তে থাকে। এ সব এলাকায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে এসব এলাকায় খাদ্য ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল ও কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লা গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গোটা বুড়িচং উপজেলা-ই তলিয়ে গেছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষ বিশুদ্ধ পানি আর খাবার সংকটের কারণে দিশাহারা। এ ছাড়াও চৌদ্দগ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি। সেখানেও খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা দুর্গত মানুষদের ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় তীব্র বেগে পানি ঢুকছে। এতে দ্রুতই পাশের ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবাও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জমান বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে বুড়বুড়িয়া এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধের নিচ দিয়ে পানি বের হচ্ছিল। স্থানীয় লোকজন বালুর বস্তা ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। রাত পৌনে ১২টার দিকে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে থাকে। বাঁধের অন্তত ৩০ ফুট ভেঙে গেছে। নদীর পানি না কমলে এই বাঁধ মেরামত করা সম্ভব না। নদীর পানি যতদিন না কমবে ততদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে থাকবে। বিকাল ৩টা পর্যন্ত গোমতীর পানি বিপদসীমার ১০৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, তারা গোমতীর এত পানি আগে কখনো দেখেননি। শিমাইলখাড়া গ্রামের অধ্যক্ষ সেলিম রেজা সৌরভ বলেন, পানি হু হু করে ঢুকছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান সোনার বাংলা কলেজে আশ্রয়কেন্দ্র আছে। মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে এসে নিরাপদে থাকতে বলা হচ্ছে। আতঙ্কে রয়েছেন কুমিল্লা নগরবাসীও। বাসিন্দাদের শঙ্কা, গোমতীর বাঁধ ভাঙলেই তলিয়ে যাবে গোটা শহর। জেলার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ, লাকসামসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার বেশির ভাগ গ্রাম এখনো বন্যার পানিতে ডুবে আছে। তবে বৃহস্পতিবারের তুলনায় শুক্রবার এসব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম জেলা। এরমধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বন্যার পানিতে ডুবে আছে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়ক। এ ছাড়া তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর রোপা আমন, পুকুর, মাছের প্রজেক্ট, পোল্ট্রি ফার্ম। যদিও শুক্রবার বৃষ্টি কম থাকায় পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি ঘটেছে। তবে শুক্রবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত জেলার ৯টি উপজেলায় অন্তত চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। সরকারি হিসেবে চট্টগ্রামে ৯টি উপজেলার মধ্যে ফটিকছড়িতে ২০টি ইউনিয়নে ১৯ হাজার ৫৮০ পরিবারের ১ লাখ ২ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বন্যাকবলিত খাগড়াছড়ির মানুষও আছেন কষ্টে। জেলার অনেক এলাকায় দুর্গত মানুষকে উদ্ধারে কাজ করছেন বিভিন্ন বাহিনীসহ স্বেচ্ছাসেবীরা। পৌঁছে দেয়া হচ্ছে ত্রাণসামগ্রী। সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ মো. আমান হাসান বলেন, যতদিন পর্যন্ত বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না, ততদিন পর্যন্ত খাগড়াছড়ি রিজিয়নের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার, ত্রাণ ও বিভিন্ন ধরনের মানবসেবা কার্যক্রম চলমান থাকবে। এ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে সেনাবাহিনী। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হালদা নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে ফরহাদাবাদ ও ধলই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। হালদা নদীর পানির গতির তীব্রতায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডস্থ নাজিরহাট নতুন ব্রিজের পশ্চিম পাশ ছালামত দফাদারের বাড়ি সংলগ্ন হালদার প্রতিরক্ষাকারী এ বাঁধটি ভেঙে যায়। ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই নদীর পানি হু হু করে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। দু’তিন ঘণ্টার মধ্যে ফরহাদাবাদ ও ধলই ইউনিয়নের অনেক ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, পুকুর তলিয়ে যায়।

এদিকে পানিবন্দি মানুষের জন্য দুঃসংবাদ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বন্যাকবলিত জেলায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আভাস দিয়েছে সংস্থাটি। আবহাওয়াবিদ মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, শনিবার থেকে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজারসহ সারা দেশে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় আবারও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। এতে তিন দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নয়ন না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মৌলভীবাজারের রাজনগরে মনু নদীর বাঁধ ভেঙে ও বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে রাজনগরের কামারচাক, মনসুরনগর, টেংরা, রাজনগর ও পাঁচগাঁও ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে হৃদয় (১৯) নামে এক যুবক নিখোঁজ রয়েছে। এদিকে দীর্ঘ ৪০ বছরের মধ্যে এই প্রথম রাজনগর বাজারে বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়াও বন্যা  দুর্গতদের জন্য গ্রাম পর্যায়ে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তাও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বন্যা আক্রান্তরা।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে মো. আদিব (১৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড পহরচাঁদা বিবিরখিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হাবিব ওই এলাকার মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে। স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুস শুক্কুর জানান, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিন শিশু একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে পহরচাঁদা বাজারের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় সড়কের উপর দিয়ে যাওয়া বন্যার পানির স্রোতে ভেসে যায় তিন শিশু। দুই শিশু সাঁতরিয়ে বেঁচে গেলেও হাবিব স্রোতে ভেসে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায়। অপরদিকে, বেশ কয়েকদিন ধরে অবিরাম বর্ষণে উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের গায়নাকাটা গ্রামে পাহাড় ধসে সুফি বেগম, রায়খান, সৈয়দ হোসন, নুরুল আলম, মো. রশিদ, ছৈয়দ বলীরসহ অন্তত ১৫টি বসতঘর ভেঙে গেছে। চকরিয়ায় টানা বৃষ্টিতে অন্তত ১০টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।  

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। বৃহস্পতিবার রাত থেকে বৃষ্টি বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার দুপুুরের পর সূর্যের আলো দেখা যায়।  নতুন করে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বানভাসি মানুষের স্বস্তি মিলেছে। তবে ভারতের ত্রিপুরা থেকে পানি নামা অব্যাহত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রের তথ্য, গতকাল ৬ সে. মি. পানি কমেছে। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এরআগে, গত মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে ভারী বৃষ্টি শুরু। পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল। পানির তোড়ে সীমান্ত এলাকায় হাওড়া নদীর কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। ধসে পড়ে দুইটি সেতু। আকস্মিক বন্যায় উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও ১টি  পৌরসভার ৪৭টি গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানি কমতে থাকায় কিছু পরিবার নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। পানিবন্দি গ্রামের মধ্যে রয়েছে বাউতলা, কালিকাপুর, ধলেশ্বর, বীরচন্দ্রপুর, বঙ্গেরচর, উমেদপুর, সেনারবাদি, সাহেবনগর, কুসুমবাড়ি, টানোয়াপাড়া, খলাপাড়া প্রভৃতি। আখাউড়া-আগরতলা সড়কের গাজীরবাজার এলাকায় অস্থায়ী সেতু ভেঙে স্থলবন্দরগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়েছে। স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতে পানির তোড়ে আখাউড়া-কসবা সড়কের নয়াদিল ব্রিজের আংশিক অংশ ধসে পড়ে। ওই পথে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মানুষ বিকল্প উপায়ে চলাচল করছে।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে টানা ভারী বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।  বৃহস্পতিবার দুপুর ৫টায় খোয়াই নদীর পয়েন্টে পানি ১১১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন মাস্টার গৌর প্রসাদ দাশ পলাশ বলেন, ভারী বর্ষণের প্রভাবে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির স্রোত খোয়াই সেতুতে আঘাত করছে। এতে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে রেল যোগাযোগ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত সিলেট বিভাগের রেলপথে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকবে।

কক্সবাজারের রামুতে ঢলে ভেসে গিয়ে ৩ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে আরও একজন শিশু। প্রবল বর্ষণে  বাঁকখালী নদী এবং খালের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্ধ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত  ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। পানির স্রোতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়ক। অধিকাংশ বাজারের দোকানপাট পানিতে তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে মাছের ঘের ও ফসলি জমি। ঢলের পানিতে ভেসে যাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন- রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের পূর্ব জুমছড়ি এলাকার ছৈয়দ হোসেনের ছেলে আমজাদ হোসেন (২২), ঈদগড় ইউনিয়নের বৈদ্যপাড়া এলাকার মৃত লইগ্যা রাখাইনের ছেলে চচিং রাখাইন (৫৫) এবং গর্জনিয়া ইউনিয়নের ছালেহ আহমদের ছেলে রবিউল আলম (৩৫)। নিখোঁজ শিশুটি হলো ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের লম্বরিপাড়া এলাকার নুরুল কবিরের ছেলে মো. জুনাইদ (১০)।