Thursday, May 29, 2025

পুতিন যে দুই জায়গায় ট্রাম্পকে পাত্তা দেন না by রজন মেনন

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর তিন বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো অনেক কিছুই অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এই রক্তের স্রোত কবে থামবে, কিংবা কী শর্তে সেটা বন্ধ হবে, তা কেউ বলতে পারেন না। তবে একটা বিষয়ে আমরা সবাই নিশ্চিত হতে পেরেছি। সেটা হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প, দায়িত্ব নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন বলে যে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, সেটিকে কেউই গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। এটা এখন প্রমাণিত যে রাজনৈতিকভাবে এই সংকট মীমাংসায় ট্রাম্পের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

গত সপ্তাহের শেষ দিনে রাশিয়া ইউক্রেনে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এটি ছিল পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্যতম বড় একটা আক্রমণ। সংঘাতটি যে হঠাৎ করেই থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, এই আক্রমণ তারই প্রতিফলন।

এর কারণ হলো, ভ্লাদিমির পুতিন এখনো লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন—এ চার প্রদেশ দখলে নেওয়ার লক্ষ্য অবিচল রয়েছেন। বর্তমানে লুহানস্কের প্রায় পুরোটা এবং বাকি তিনটির বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে রাশিয়া।

যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যেসব অস্ত্র দিয়েছে, তা অন্য সব মিত্রদেশ মিলিয়ে যতটুকু দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি। যদিও মানবিক ও অন্যান্য সহায়তা মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে অন্য দেশগুলো মোট সহায়তায় এগিয়ে।

ট্রাম্পের ভুল হলো, তিনি নিজেকে অসাধারণ একজন চুক্তি নির্মাতা হিসেবে মনে করেন। পুতিনের সঙ্গে কথিত সখ্য এবং ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব—সব মিলিয়ে তিনি ভেবে নিয়েছিলেন, কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করবেনই। সম্ভবত তিনি ভেবে নিয়েছিলেন, এই চুক্তির বদৌলতে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও পেয়ে যেতে পারেন।

কিন্তু গত কয়েক দিনে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে যেভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তাতে পরিষ্কার যে একবিন্দু ছাড়ও দিতে চান না পুতিন। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। এ ঘটনায় ট্রাম্পের অবস্থান দুর্বল হলো।

এখন ট্রাম্প পুতিনের ওপর ক্ষুব্ধ। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুতিনকে নিয়ে লিখেছেন, ‘পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন’ এবং ‘অপ্রযোজনীয়ভাবে অনেক মানুষ হত্যা করছে’। ট্রাম্পকে যখন জিজ্ঞাসা করা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়াতে চান কি না, তিনি উত্তর দিয়েছেন, ‘অবশ্যই’। কিন্তু এবারই প্রথম পুতিনকে সতর্ক করলেন না ট্রাম্প, কিংবা রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিলেন না। গত মাসের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘ভ্লাদিমির থামো!’

ট্রাম্প–পুতিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি অনিবার্য প্রবণতা। পুতিন এখনো তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ট্রাম্পের তোষামোদি ও ভয় দেখানো—দুটিকেই তিনি সমানভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এ কারণেই পুতিন ট্রাম্পের ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে কোনো আগ্রহ দেখাননি। অথচ জেলেনস্কি সঙ্গে সঙ্গে সেটি গ্রহণ করেছিলেন। এপ্রিলের শেষে ট্রাম্প রাশিয়াকে হুমকি দেন যে যদি তারা ‘বেসামরিক এলাকা, শহর ও জনপদে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া বন্ধ না করে’ তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। সেই হুমকিতেও পুতিন বিচলিত হননি। এই সতর্কবার্তা পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ট্রাম্প–জেলেনস্কির সাক্ষাতের পর আসে। এটি ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টকে কিছুটা আশাবাদী করলেও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এতে বিচলিত হননি।

যা–ই হোক, ট্রাম্প শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া এবং কথার বাইরে গিয়ে এবার যদি সত্যি সত্যিই রাশিয়ার ওপর আরও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপও করেন, তারপরও যুদ্ধ থামবে না। এর পেছনে কমপক্ষে দুটি কারণ আছে।

প্রথমত, এই যুদ্ধ পুতিন ডেকে এনেছেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে তিনি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে বাজি ধরেছেন। যত মূল্য চুকাতে হোক না কেন, তিনি সেটা করবেনই। এই সংঘাতে কতজন রাশিয়ান সৈনিক হতাহত হয়েছেন, সেই হিসাব নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এ সংখ্যা ৯ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা এক লাখের বেশি।

এই যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস না করলেও বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে দেখা যাচ্ছে, মোট সরকারি ব্যয়ের ৩৫ শতাংশই সামরিক ব্যয়। চলতি বছর তা আরও বেড়ে ৩৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ, যার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ২১ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে।

পুতিনের ক্ষমতা এখনই হুমকির মুখে নেই। তবে রাশিয়ার জনগণ এত বড় ত্যাগ স্বীকার করার পর তিনি যদি অর্ধেক সাফল্য নিয়েই থেমে যান, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তিনি দুর্বল হয়ে পড়বেন। ফলে এত রক্তপাত ও বিপুল ব্যয়ের পর পুতিন সহজে সমঝোতায় যাবেন—এমনটা আশা করা বৃথা।

দ্বিতীয়ত, পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের বলেছেন যে পুতিন মনে করেন যে রাশিয়ান বাহিনী জিততে চলেছে। পুতিন সম্ভবত জানেন না, রাশিয়ান সেনাদের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটা। এই যুদ্ধে আনুমানিক ১৪ হাজার ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও গোলাবারুদ নিক্ষেপের ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর কারণ হলো, জেনারেলরা হয়তো এই খারাপ সংবাদ তাঁদের নেতাকে দিতে ভয় পান।

আবার এটাও হতে পারে যে পুতিনকে সব তথ্যই ভালোভাবে জাননো হয়েছে। কিন্তু তিনি এটা বিশ্বাস করেন যে যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক শক্তির আধিপত্য শেষ পর্যন্ত বিজয় এনে দেবে। তিনি হয়তো ধরেই নিয়েছেন, পশ্চিমারা এ যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। ট্রাম্প চুক্তি করার প্রচেষ্টা থেকে সরে যাবেন, এমনকি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়াও বন্ধ করে দেবেন।

যা–ই হোক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। এ যুদ্ধ যদি আগামী ফেব্রুয়ারিত পঞ্চম বছরে পা দেয় এবং সেটা থামার কোনো লক্ষণ তখনও যদি দেখা না যায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

* রজন মেনন নিউইয়র্ক সিটি কলেজে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইমেরিটাস অধ্যাপক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

এখন ট্রাম্প পুতিনের ওপর ক্ষুব্ধ। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুতিনকে নিয়ে লিখেছেন, ‘পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন’ ।
এখন ট্রাম্প পুতিনের ওপর ক্ষুব্ধ। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুতিনকে নিয়ে লিখেছেন, ‘পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন’। ছবি : রয়টার্স

১০ দেশে শান্তির পতাকা হাতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা

‘নীল হেলমেট’ পরে বিশ্বশান্তির মঞ্চে বাংলাদেশের পথচলা শুরু ১৯৮৮ সালে। তখন জাতিসংঘের ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে ১৫ জন সদস্য পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ১০ দেশে শান্তির পতাকা হাতে নিয়োজিত আছেন ৪৪৪ নারীসহ ৫ হাজার ৮১৮ শান্তিরক্ষী।

বিশ্বশান্তি রক্ষার এ যাত্রায় ৩৫ বছরে জীবন দিয়েছেন ১৬৮ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫৭ জন। পেশাদারত্বের মাধ্যমে শান্তি রক্ষা মিশনে সৈন্য প্রেরণকারী শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ তৃতীয় শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ।

আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস। এদিন বিশ্বজুড়ে সম্মান জানানো হবে সেসব বীরকে, যাঁরা শান্তির পতাকা হাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করছে।

ঢাকায় আজ সকালে শান্তিরক্ষীদের স্মরণের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। পরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আহত শান্তিরক্ষীদের সংবর্ধনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ উপস্থাপনার আয়োজন করা হয়েছে। এ বছর দুজন আহত শান্তিরক্ষীকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।

সময়ের পরিক্রমায় শান্তি রক্ষার ইতিহাসে জাতিসংঘের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হয়ে উঠেছে দেশের সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্যরা। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্যানুযায়ী, তিন দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা ৪৩টি দেশ ও স্থানে ৬৩টি জাতিসংঘ মিশন সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। এ দীর্ঘযাত্রায় সশস্ত্র বাহিনীর অন্তত ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৪৩ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন বলে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

শান্তির বার্তা নিয়ে ১০ দেশে বাংলাদেশ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ বা গৃহযুদ্ধের শিকার, গণহত্যা বা গণনির্বাসনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ বা অঞ্চলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনা, পুনর্গঠন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রয়োজন, মানবিক সংকট মোকাবিলাসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে।

বর্তমানে ১০টি দেশ বা স্থানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করছেন। এগুলো হলো সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যবর্তী সীমান্ত অঞ্চল আবেই, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (সিএআর), সাইপ্রাস, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো), লেবানন, দক্ষিণ সুদান, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার বিরোধপূর্ণ অঞ্চল পশ্চিম সাহারা, ইয়েমেন, লিবিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর।

শান্তিরক্ষীরা মিশনগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের সহায়তায় কাজ করে। অবস্থানভেদে দুই পক্ষের মধ্যে অস্ত্রবিরতির শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা নজরে রাখা, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হলে রিপোর্ট করা, সাবেক যোদ্ধাদের অস্ত্র জমা নেওয়া, তাঁদের সমাজে পুনঃস্থাপন করা এবং সমাজে শান্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনায় কাজ করে। কখনো কখনো স্থানীয় পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তায় কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তা ইত্যাদি অবকাঠামো নির্মাণেও অংশগ্রহণ করেন শান্তিরক্ষীরা। এসব কাজ করতে গিয়ে তাঁদের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পড়তে হয়।

শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ

১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুলিশ। এ পর্যন্ত বিশ্বের ২৪টি দেশের ২৬টি মিশনে পুলিশের ২১ হাজার ৮১৫ জন শান্তিরক্ষী সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। বর্তমানে ৩টি দেশে ১৯৯ জন পুলিশ সদস্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত আছেন। সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালনকালে এ পর্যন্ত ২৪ জন পুলিশ সদস্য শান্তিরক্ষা মিশনে জীবন উৎসর্গ করেছেন।

শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কথা হয় মিশনে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তা পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশন্স) মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব দেশে আমরা কাজ করেছি, সেখাকার স্থানীয় জনসাধারণ এবং প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের দৃঢ় আস্থা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আমরা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, সুদান, আইভরিকোস্ট, পূর্ব তিমুর, বসনিয়া, কসোভো, লাইবেরিয়া, হাইতি, মালিসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করতে পেরেছি। এখনো কাজ করছি।’

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নারী

আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের (এএফডি) এক হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৭১৮ জন নারী শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ হাজার ৫১৩ জন, নৌবাহিনীর ৫৪ জন এবং বিমান বাহিনীর ১৫১ জন।

এএফডি বলছে, জাতিসংঘ ২০২৫ সালের মধ্যে শান্তি রক্ষা মিশনে ২২ শতাংশ নারী স্টাফ অফিসার ও মিলিটারি অবজারভার নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ১৮ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে এবং এই হার আরও বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের নারী পুলিশ সদস্যরা শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে পুলিশের ৭১ জন নারী সদস্য বিভিন্ন মিশনে নিয়োজিত আছেন। এই নারীরা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও সেন্ট্রাল আফ্রিকায় দায়িত্ব পালন করছেন।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতার ব্যাপক সুনাম রয়েছে। তবে মিশনের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে। সেটার সঙ্গে বাংলাদেশকে নতুনভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তিনি বলেন, যেসব অঞ্চলে শান্তিরক্ষী মিশন রয়েছে, সেখানকার ভাষা জানার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ জন্য প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে নজর দিতে হবে।

১০ দেশে শান্তির পতাকা হাতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা

‘এখনই গাজায় আগ্রাসন থামাও’- সরব হাজারো ইসরায়েলি সেনা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান সামরিক আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের প্রায় ১২০০ সাবেক ও বর্তমান রিজার্ভ সেনা কর্মকর্তা।

সম্প্রতি সরকার ও সেনাপ্রধান বরাবর পাঠানো এক খোলা চিঠিতে তারা এই আহ্বান জানান। মঙ্গলবার (২৭ মে) ইসরায়েলের প্রভাবশালী পত্রিকা হারেৎজ তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিঠির বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেছেন।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ইসরায়েলি সেনারা দাবি করেছেন, গাজায় এই দীর্ঘমেয়াদি অভিযান এখন আর ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়েছে- যা দেশের জনগণের বৃহৎ অংশের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, আমরা সাবেক ও বর্তমান রিজার্ভ অফিসার ও কমান্ডাররা এই রাজনৈতিক যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে, আমরা সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি যেন অবিলম্বে সব ইসরায়েলি জিম্মির নিরাপদে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা হয়। এই চিঠিতে সেনার সতর্ক করেছেন, চলমান অভিযান কেবল জিম্মি নয়, ইসরায়েলি সেনা ও নিরীহ বেসামরিক মানুষদের জীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ কেবল নৈতিকভাবেই অগ্রহণযোগ্য নয়, বরং এটি ইসরায়েলের সামরিক স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দিকে গড়াতে পারে, যা ইসরায়েলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে একই দাবি নিয়ে সরকার ও সামরিক বাহিনীর উদ্দেশে আরেকটি খোলা চিঠি দিয়েছিলেন সহস্রাধিক রিজার্ভ সেনা। একইসঙ্গে একটি স্বাক্ষর অভিযানে পাঁচ দিনের ব্যবধানে অংশ নিয়েছেন এক লাখেরও বেশি ইসরায়েলি নাগরিক।

এদিকে গাজায় চলমান মানবিক সংকটের দ্রুত সমাধানে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস ও ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেত্তেরি অর্পো। গত মঙ্গলবার (২৭ মে) হেলসিঙ্কিতে অনুষ্ঠিত এক যৌথ আলোচনায় তারা ইসরায়েলের প্রতি গাজায় জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রসঙ্গত, প্রায় ২০ মাস ধরে গাজায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। গত কয়েক সপ্তাহে তা আরও তীব্র হয়েছে। প্রায় ১১ সপ্তাহ ধরে অঞ্চলটিতে কার্যত ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ। সীমিত পরিসরে কিছু ত্রাণ ঢুকলেও তা অধিকাংশ ফিলিস্তিনির নাগালে পৌঁছাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা ইসরায়েলের এই বর্বর আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে আসছেন।

চলমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনাদের এই অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, দেশের ভেতর থেকেও গাজা যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে-কেবল নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, কৌশলগত দিক থেকেও।

ধ্বংসস্তূপ গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের আগ্রাসনের একটি মুহূর্ত। ছবি : সংগৃহীত
ধ্বংসস্তূপ গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের আগ্রাসনের একটি মুহূর্ত। ছবি : সংগৃহীত


ফিলিস্তিনে অবৈধ ইহুদি বসতির ‘গডমাদার’, গাজায় বসতি নিয়ে কী তাঁর ভাবনা by অস্কার রিকেট

ইসরায়েলি অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের অবৈধ বসতি স্থাপনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড্যানিয়েলা ওয়েইস। উগ্র জায়নবাদী এই নারীর কাছে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে ভূমি দখল ও বসতি স্থাপন অন্যায় কিছু নয়। মিডল ইস্ট আই ২৩ মে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অস্কার রিকেট...

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের নেত্রী ড্যানিয়েলা ওয়েইস সব সময়ই একজন জায়নবাদী। ৭৯ বছর বয়সী ড্যানিয়েলা নিজেই টেলিফোনে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘জায়নবাদ ছিল আমাদের পারিবারিক আলোচনার মূল বিষয়।’

ড্যানিয়েলা বসবাস করেন ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের উত্তরে অবস্থিত একটি অবৈধ ইহুদি বসতিতে।

ড্যানিয়েলা বলেন, ‘আমি গর্বিত যে ঈশ্বর আমাকে একজন ইহুদি হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমাদের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, বাইবেলের প্রতি ভালোবাসা, ঈশ্বর আমাকে এই অপার আশা ও আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন, যা অন্য কিছুর সঙ্গে বদলানো যায় না।’

এই উগ্র জায়নবাদী ড্যানিয়েলা ইহুদি বসতি আন্দোলনের এক পরিচিত মুখ। তিনি নিজেই বলেছেন, ৫০ বছর ধরে তিনি ‘ইসরায়েলের ভূমি গড়ে তোলার কাজে নিবেদিত’। তিনি দাবি করেন, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা ১৪১টি বসতি ও ২২৪টি অবৈধ চৌকি গঠনে তাঁর ভূমিকা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। আর ১৯৯০-এর দশক থেকে সরকারের অনুমোদন ছাড়াই তৈরি হওয়া চৌকিগুলো ইসরায়েলি আইনেও অবৈধ।

২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ—এই তিন মাসে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ১ হাজার ৮০৪টি হামলা নথিভুক্ত করেছে। ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা নিজেরা অথবা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে হামলা চালিয়ে ১১ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর আক্রান্ত হয়েছে, গাড়ি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, পানির লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে, ফলের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে এবং রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা গাজামুখী ত্রাণবাহী গাড়িতেও হামলা চালিয়েছে। ওসিএইচএ বলেছে, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও চলাচলে বাধার কারণে ৮৪৪ জন ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

গত মাসে ড্যানিয়েলা বিবিসির লুইস থেরাউক্সের তৈরি প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য সেটেলার’-এ এক আলোচনায় হাজির হন। প্রামাণ্যচিত্রে তাঁকে ‘উগ্রপন্থী বসতি নেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সরকার তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কারণ, তিনি ‘ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ও হামলায় উসকানি এবং তাতে অংশ নিয়েছেন’, যা যুক্তরাজ্যের গাজা যুদ্ধ নিয়ে কঠোর অবস্থানের অংশ।

তবে থেরাউক্স যখন তাঁকে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে বসতি স্থাপনকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন তিনি হেসে বলেন, ‘এটা হালকা ধরনের অপরাধ।’

একসময় ড্যানিয়েলাকে ‘নেসেট ক্যাফেটেরিয়ার রানি’ বলা হতো। কারণ, তিনি নিয়মিত ইসরায়েলি পার্লামেন্ট সদস্যদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ রাখতেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এবং বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে তিনি আবার আলোচনায় আসেন। এখন তিনি এমন একটি আন্দোলনের মূল নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যাঁদের বর্তমান নেতা ইতামার বেন–গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচ। দুজনই ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী।

থেরাউক্স ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতি ড্যানিয়েলার উগ্র আচরণকে ‘মনোবিকারগ্রস্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। ড্যানিয়েলা বলেছেন, বসতি স্থাপনকারীদের কাছে সহিংসতা বলে কিছু নেই।

বিশেষজ্ঞরা ড্যানিয়েলার প্রভাব নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও একটি বিষয়ে একমত যে তিনি এখনো শক্তি ও আকর্ষণশক্তি ধরে রেখেছেন, যা তাঁকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে সাহায্য করছে।

ড্যানিয়েলা বলেন, ‘আমি গান গাই না, অভিনয়ও করি না। তবে যখন আমি বক্তৃতা দিই, তখন সেটা অনেকটা স্ট্যান্ড-আপ কমেডির মতো হয়। এটাই আমার স্বভাব। আমি যখন কথা বলি, মানুষ শুনতে পছন্দ করে। কারণ, আমি তা জীবন্তভাবে উপস্থাপন করি।’

এই ইহুদি নেত্রী বলেন, ‘ঈশ্বর আমাকে যা দিয়েছেন, সবই আমি ব্যবহার করি জায়নবাদী স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে। আর আমি তা সম্পূর্ণ সচেতনভাবে করি।’

শান্তিকামী আন্দোলনের সংগঠন পিস নাউয়ের ‘সেটেলমেন্ট ওয়াচ’ প্রকল্পের পরিচালক হাগিত ওফরান মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ড্যানিয়েলা দখলদারত্বকে ভালো জিনিস মনে করেন এবং তিনি তা নিয়ে গর্ব করেন।

হাগিত বলেন, ড্যানিয়েলা যা বিশ্বাস করেন, তা খুব স্পষ্ট ও সরাসরি বলেন। এ কারণেই তিনি বিখ্যাত। কারণ, তিনি তাঁর উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে বলেন।

গাজা: এই জমির মালিক আমরা

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে—ড্যানিয়েলা ও ইসরায়েলের সরকারে তাঁর মিত্ররা এ অবস্থাকে ‘সুবর্ণ সময়’ বলে মনে করেন। পাঁচ দশক ধরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ইহুদিদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার পর এখন তাঁর চোখ গাজার দিকে।

ড্যানিয়েলা গর্ব করে বলেন, ‘এই পরিকল্পনা এত বিখ্যাত হয়ে গেছে যে মানুষ তেল আবিবে আমাকে থামিয়ে বলেন, “আমার জন্য গাজায় একটা জায়গা রাখবেন।” আমি বলি, “আমাদের ৯০০ পরিবারের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলুন, আমরা একটা ভালো প্লট খুঁজে দেব।’

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ড্যানিয়েলার সংগঠন ‘নাখালা সেটেলমেন্ট মুভমেন্ট’ একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে ১১ জন মন্ত্রীসহ হাজারো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অংশ নেন। সেই সম্মেলনের নাম ছিল—‘ইসরায়েলের বিজয়ের জন্য সম্মেলন, বসতি স্থাপন নিরাপত্তা নিয়ে আসে’। সেই সম্মেলনে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করার আহ্বান জানানো হয় এবং সম্ভাব্য বসতি এলাকার মানচিত্র দেখানো হয়।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ড্যানিয়েলাকে গাজার উত্তরাঞ্চলে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি সম্ভাব্য বসতি এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন, যার মধ্যে ছিল পুরোনো বসতি ‘নেতজারিম’। ১৯৭২ সালে সেখানে প্রথম ইহুদি বসতি স্থাপন করা হয়েছিল। পরে ২০০৫ সালে গাজা থেকে সর্বশেষ বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

ড্যানিয়েলা বলেন, পশ্চিম তীরের মতো গাজায়ও ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান দিয়ে বসতি স্থাপন শুরু হবে। তারপর সেনাবাহিনীর পাশে বসবাসকারী ‘ঘেরা কমিউনিটি’ হবে, তারপর গড়ে উঠবে শহর।

তবে ড্যানিয়েলার নিজের মিত্রদের মধ্যেও এই পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধিতা রয়েছে।

এই উগ্রবাদী ইহুদি নারী বলেন, ‘আমার ভালো প্রতিবেশী বেজালেল স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরের উন্নয়নের জন্য খুব ভালো কাজ করছেন। তবে গাজায় বসতি স্থাপন বিষয়ে আমি তাঁর ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট নই। আমি তাঁর কাছ থেকে আরও জোরালো ও স্পষ্ট অবস্থান আশা করি। আমি তাঁকে অনেকবার বলেছি, অন্তত গাজার উত্তরাংশে বসতি স্থাপনের বিষয়ে জোর দিন।’

নেতানিয়াহুর সমালোচনাও করেন ড্যানিয়েলা। অবশ্য তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর সহকারীদের সঙ্গে সব সময় তাঁর যোগাযোগ করা সম্ভব। নেতানিয়াহু এতে ‘একটু ধীর’। তবে এই ইহুদি নারী বলেন, ‘আমি বুঝি তাঁর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আছে, বামপন্থী চাপ আছে। কিন্তু এই ধারণা এখন বাতাসে উড়ছে মুক্তভাবে।’

গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস হামলায় ৫৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। কিন্তু ২৩ লাখ মানুষের মধ্যে যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁরা কি সেখানে আর থাকবেন না?

ড্যানিয়েলা ইসরায়েলে হামাসের হামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, তারা ৭ অক্টোবরের পর গাজার ওপর অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। তারা ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা, পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যাবে। এতে কিছুটা সময় লাগবে, তবে তারা তাদের অধিকার হারিয়েছে। সেই হত্যাকাণ্ড তাদের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।

এর আগেও উগ্রবাদী এই ইহুদি নারী বলেছিলেন, ‘গাজায় কোনো আরব থাকবে না। যদি আমরা তাদের খাবার না দিই, তাহলে তারা চলে যাবে।’

গত অক্টোবরে গাজার সীমানায় একটি উৎসবমুখর সম্মেলনে ড্যানিয়েলা বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিরা গাজা থেকে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যাবে। সেদিন বেন–গভিরও একই কথা বলেছিলেন, ‘এই জমির মালিক আমরা।’

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন অনেক পুরোনো ব্যাপার হলেও ওফরান বলেন, ‘৭ অক্টোবরের আগে গাজায় বসতি স্থাপনের চিন্তা অকল্পনীয় ছিল।

‘জায়নবাদের ইতিহাস আমার ব্যক্তিগত ডায়েরির মতো’

ড্যানিয়েলা ওয়েইসের জন্ম ১৯৪৫ সালে, তৎকালীন ব্রিটিশশাসিত ফিলিস্তিনের তেল আবিবের কাছে বনে ব্রাক শহরে। তিনি বড় হন একটি খামারে, একটি রক্ষণশীল ধর্মীয় ইহুদি পরিবেশে। পড়াশোনা করেন ধর্মীয় বিদ্যালয়ে। তখন তিনি ধর্মভিত্তিক জায়নবাদী আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এই আন্দোলনের নেতারা নিজেদের মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষ জায়নবাদ থেকে আলাদা মনে করতেন। কারণ, সে সময় ইসরায়েলের মূল সমাজ ও নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ জায়নবাদের প্রাধান্য ছিল।

ড্যানিয়েলা বলেন, তাঁর প্রথম স্মৃতি ১৯৪৮ সালের মে মাসে যখন মিসরীয় বাহিনী তেল আবিব এলাকায় গোলাবর্ষণ করেছিল। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কয়েক দিন পর ওই ঘটনা ঘটেছিল।

এই নারী বলেন, ‘আমার মা–বাবা বিছানার নিচে কার্পেট বিছিয়ে আমাকে আর আমার ছোট বোনকে সেখানে শুয়ে থাকতে বলেছিলেন। এটা ছিল রোমাঞ্চকর, একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো। আমি কখনো ভয় পাইনি।’

ড্যানিয়েলার বাবার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর মা এক বছর বয়সে পোল্যান্ড থেকে ফিলিস্তিনে এসেছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর মা-বাবা ছিলেন ‘খুবই বুদ্ধিমান মানুষ’। তাঁরা প্রথমে জায়নবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী লেহির (স্টার্ন গ্যাং) সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তাঁরা ডানপন্থী লিকুদ পার্টিতে যোগ দেন।

ড্যানিয়েলারা তিন বোন। তিনি বলেন, ‘আমরা যেন স্পার্টায় বড় হয়েছি।’

এখনো ড্যানিয়েলা ও তাঁর বোনেরা এই কথা বলে হাসেন। তিনি বলেন, ‘জীবন ছিল খুব কঠিন। আমরা এই বিশ্বাসে বড় হয়েছি যে আমাদের ঈশ্বরকে সব সময় ধন্যবাদ জানাতে হবে যে আমরা একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্রে বাস করছি। এটা ছিল আমাদের পরিবারের চিরাচরিত পরিবেশ।’

ড্যানিয়েলা বলেন, তাঁদের পরিবারে বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা এবং ইসরায়েল সম্পর্কে সচেতন থাকা ছিল বাধ্যতামূলক। সংবাদ শোনার সময় সেটাই ছিল পবিত্র সময়। তখন কেউ কথা বলতেন না।

বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ সময় এলে এই আবেগ আরও তীব্র হয়ে উঠত। যেমন ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকটের সময়, যখন ইসরায়েল, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য মিলে মিসরের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজা ও সিনাই উপদ্বীপে আক্রমণ করেছিল—তখনকার কথা তাঁর পরিষ্কার মনে আছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি মুহূর্তে আইডিএফের (ইসরায়েলি বাহিনী) অগ্রগতি অনুসরণ করতাম।’

ড্যানিয়েলা বলেন, ‘আমার জন্য জায়নবাদের ইতিহাস একটা ব্যক্তিগত ডায়েরির মতো। আমি এটি এত তীব্রভাবে স্মরণ করি, যেন আমার কাছে এটি সব সময় খোলা বই।’

এই ব্যক্তিগত ডায়েরির সঙ্গে ড্যানিয়েলার বাইবেলের প্রতি ভালোবাসাও আছে। তাঁর দাবি, ইহুদি জাতির মাতৃভূমির সীমানা বাইবেলে নির্ধারিত। এর সীমানা পূর্বে ফোরাত নদী থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে নীল নদ পর্যন্ত। অর্থাৎ তাঁর মতে, ফিলিস্তিনের বাইরেও সিরিয়া, ইরাক, জর্ডান, লেবানন ও মিসরের কিছু অংশ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

রবিন হত্যাকাণ্ড: ‘আমাদের জন্য নতুন যুগের সূচনা’

যেহেতু ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকট তরুণ ড্যানিয়েলার মনে দাগ কাটে, ফলে ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। ওই যুদ্ধে ইসরায়েল আরব দেশগুলোর যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করে গোলান মালভূমি, পশ্চিম তীর ও গাজা দখল করে।

এই যুদ্ধের পর জায়নবাদী ও রাবাই মোশে লেভিঙ্গার অধিকৃত এলাকায় ইহুদি বসতি গড়ে তোলেন। লেভিঙ্গার ১৯৮৮ সালে ছয় বছরের এক ফিলিস্তিনি শিশুকে মারধর করেন এবং একই বছর একজন ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেন। এই অপরাধে তিনি জেল খাটেন। তবে পরে এই অপরাধীই ড্যানিয়েলার উপদেষ্টা হন।

লেভিঙ্গার আর ড্যানিয়েলা মিলে গড়ে তোলেন উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ‘গুশ এমুনিম’। এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ড্যানিয়েলা। এ আন্দোলন মিশ্র ছিল—এক দিক ছিল ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিপূর্ণ (মেসিয়ানিক), অন্যদিকে ছিল রাজনৈতিক কৌশল ও বাস্তববাদ।

দুজনের এ সংগঠন বেশ সহিংসও ছিল।

১৯৮৭ সালের এপ্রিলে একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিহত হলে এবং পরে ফিলিস্তিনিদের প্রথম ইন্তিফাদার আগে লেভিঙ্গার ও ড্যানিয়েলার নেতৃত্বে পশ্চিম তীরের কালকিলিয়ায় বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি, গাড়ি ও বাগান ধ্বংস করেন।

কয়েক দিন ধরে চলা ওই সহিংসতার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঠানো হয়। এ ঘটনাকে হিব্রু ভাষায় ‘নাইট অব বোটলস’ বা ‘বোতলের রাত’ নামে ডাকা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিন জানায়, ড্যানিয়েলা ‘জরিমানা ও স্থগিত দণ্ডে রক্ষা পান’, যা প্রমাণ করে ‘ইসরায়েলি আদালত সব সময় এ ধরনের দাঙ্গাবাজ বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল’।

ইসরায়েলি সাংবাদিক ও লেখক গেরশম গোরেনবার্গ বলেন, অনেক দিক থেকে ইসরায়েলের কট্টর জাতীয়তাবাদীরা ধর্মীয় বসতি আন্দোলনকে মূল ইস্যু বানিয়েছে।

ড্যানিয়েলা নিজে বসতি আন্দোলনের চরমপন্থী অংশে রয়েছেন। তিনি মূলধারার আন্দোলনের নেতৃত্বকে ‘অতি নমনীয়’ বলে সমালোচনা করেন।

নিজেদের সংগঠন গুশ এমুনিমের মধ্যেও তাঁর কঠোর ভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা আছে। এরপরও তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কেদুমিম অবৈধ ইহুদি বসতি এলাকার মেয়র ছিলেন।

২০১০ সালে ড্যানিয়েলা গঠন করেন ‘নাখালা সেটেলমেন্ট মুভমেন্ট’। এ সংগঠনের মাধ্যমে তিনি আগের মতোই ইসরায়েলের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যান।

ড্যানিয়েলা আজও আগের মতোই এই লক্ষ্য নিয়ে উজ্জীবিত। তাঁর চার মেয়ে ও একাধিক নাতি-নাতনি আছে। ২০০৬ সালে তাঁর মেয়েজামাই আভ্রাহাম গাভিশ এক ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হাতে নিহত হন। ওই হামলায় তাঁর জামাতার মা–বাবাও নিহত হন। তাঁর মেয়ে ও নাতনি টেবিলের নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান।

মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলার দিন ড্যানিয়েলা গাজা নিয়ে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ’ লেখার জন্য ভোর ৫টা পর্যন্ত জেগে ছিলেন।

মিডল ইস্ট আইকে ড্যানিয়েলা বলেন, ‘আমি মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছি। এর পর থেকেই রাজনীতির কাজে লেগে পড়েছি, জুমে মিটিং, আলোচনা। সকালেই তিন ঘণ্টা কেটে গেছে।’ তাঁর স্বামী আমনোন ওয়েইস একজন সফল ব্যবসায়ী। তিনি পোলিওতে আক্রান্ত এবং প্যারালিম্পিকে অংশ নেওয়া অ্যাথলেট।

ড্যানিয়েলার বাড়ি ‘আশ্চর্যজনকভাবে অভিজাত’ এবং তাঁরা স্পষ্টতই ধনী। তাঁর সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অনুদান পেয়ে আসছে। ২০২৩ সালে প্রকাশ পায়, ৯৯ বছর বয়সী ধনী নারী লেয়া ড্যাঙ্কনার নাখালাকে প্রায় ২০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন।

আইজাক রবিনের সরকার ছাড়া ইসরায়েলের প্রায় প্রতিটি সরকারই ইহুদি বসতি আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। ১৯৯৫ সালে এক উগ্র ডানপন্থী ইসরায়েলির হাতে খুন হন রবিন। ওই ঘাতক একজন ইহুদি বসতি স্থাপনকারী ছিলেন।

আইজাক রবিন একবার পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি আন্দোলনকে ‘ক্যানসার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

ড্যানিয়েলা বলেন, রবিন খুন হওয়ার পর তিনি ভেবেছিলেন, ‘ইতিহাস বদলে গেছে, তাঁর (রবিন) ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা থেমে গেছে, আর আমাদের জন্য নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।’

বসতি আন্দোলন আন্তর্জাতিক পরিসরেও ইসরায়েলের জন্য ঝামেলা সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলি কূটনীতিক অ্যালন পিংকাস বলেন, ‘পশ্চিম তীর ছিল অধিকৃত। জেনেভা সনদ অনুযায়ী যুদ্ধ করে দখল করা জমিতে আপনি বসতি গড়তে পারেন না।’

এই কূটনীতিক বলেন, ‘বসতিগুলো ইসরায়েলি আইনে অবৈধ ছিল, সেগুলো আমি কীভাবে সমর্থন করব? সেগুলোকে আধুনিক রাজনীতির ভাষায় নয়, বাইবেলের ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু সেটা যুক্তিসংগত নয়।’

মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পরদিন ড্যানিয়েলা তাঁর পরিকল্পিত বসতি প্রকল্পের জন্য জায়গা দেখতে আবার গাজায় যান।

পিস নাউয়ের হাগিত ওফরান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ড্যানিয়েলা সত্যিই গাজায় ঢুকতে প্রস্তুত। এ সরকারের আমলে তাঁর যোগাযোগ ও সমর্থন অনেক বেশি। তাঁর মতো উগ্রবাদী ইহুদির চিন্তায় যুদ্ধ মানে সুযোগ। যুদ্ধের পরই মুক্তি আসে। এটাই তাঁর বিশ্বাস।’

গোরেনবার্গ বলেন, ড্যানিয়েলা মূলধারার মানুষের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করেন না। আর স্মোট্রিচ একটি ছোট, কিন্তু অতিমাত্রায় প্রভাবশালী বসতি সমর্থক গোষ্ঠীর নেতা।

তবে গোরেনবার্গ এটাও স্বীকার করেন, আজকের দিনে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় চরমপন্থী, বিশেষ করে ডানপন্থী আন্দোলনকে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

ড্যানিয়েলার কাছে গাজায় বসতি স্থাপন যেন পূর্বনির্ধারিত একটি বিষয়। এটি ‘জায়ন ফিরে আসার’ অংশ, যার মাধ্যমে ইহুদি জাতির সেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার অবসান ঘটবে, যা আজ থেকে ২ হাজার ৫০০ বছর আগে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ব্যাবিলনীয়দের হাতে নির্বাসনের পর শুরু হয়েছিল।

এই উগ্রবাদী ইহুদি নারী বলেন, ‘এটা ঘটবেই। হতে পারে এক বছরে, হতে পারে তিন বছরে, কিন্তু এটা ঘটবে। এটা শুরু হয়ে গেছে।’

ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের নেত্রী ড্যানিয়েলা ওয়েইস
ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের নেত্রী ড্যানিয়েলা ওয়েইস। ছবি: রয়টার্স

একজোট ইউরোপ কি নেতানিয়াহুকে থামাতে পারবে by ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান

গাজার জনগণের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। সেই নীতির বিরুদ্ধে এখন সারা বিশ্ব এক হয়ে সমালোচনা করছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনেরও কিছু মাত্রায় তাতে সায় দিচ্ছে।

নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের গাজায় চালানো নৃশংসতা, এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে অব্যাহত আগ্রাসন—এগুলো এখন আর পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ নয়। সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে যেসব পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, তাতে এই বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ ঘোষণা করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি পশ্চিম তীরে সহিংসতায় জড়িত কিছু বসতি স্থাপনকারী ও সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছেন।

যুক্তরাজ্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইসরায়েলের অংশীদারিত্ব চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। এই আহ্বান ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহু সদস্যরাষ্ট্র সমর্থন করে। তারা প্রকাশ্যে ইসরায়েলের আগ্রাসনের নিন্দা জানায়।

এই প্রক্রিয়ার পরিণতিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথও তৈরি হতে পারে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী তো আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ইসরায়েলকে সরাসরি ‘গণহত্যাকারী রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করেছেন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে সফরে গিয়েছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিসহ একদল কূটনীতিক। ইসরায়েলি বাহিনী তাদের প্রতি ‘সতর্কীকরণ গুলি’ ছোড়ে। এই প্রতিনিধিদলটি সেখানে গিয়েছিল পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ধ্বংসযজ্ঞ সরেজমিনে দেখতে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পরে বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে জানায় যে কূটনৈতিক বহরটি অনুমোদিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা—দুই পক্ষই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানায়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও পরবর্তীতে তাঁর নির্ধারিত ইসরায়েল সফর স্থগিত করেন।

সব মিলিয়ে এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত করে যে, ইসরায়েলের গণহত্যামূলক নীতির প্রতি পশ্চিমা জগতের দৃঢ় সমর্থনে এখন পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।

কূটনৈতিক চাপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরোধে ইসরায়েল সামান্য কিছু ত্রাণবাহী ট্রাক গাজার দিকে ঢুকতে দিয়েছে। তবে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা ও জরুরি ত্রাণবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল এই সরবরাহকে ‘সমুদ্রে একফোঁটা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

পশ্চিমা বিশ্বে সমর্থনের স্রোত ঘুরে যাওয়ার লক্ষণ এখন স্পষ্ট। তবু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর আগের রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধ থেকে একচুলও সরে আসেননি।

ওয়াশিংটন ডিসিতে গত ২১ মে ক্যাপিটল জিউইশ মিউজিয়ামের বাইরে গুলিতে ইসরায়েলি দূতাবাসের দুই কর্মী নিহত হন। এই ঘটনাটি চলমান পরিস্থিতিতে নতুন মোড় এনে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে সংহতি জানাতে বাধ্য হন। এই হামলার পরপরই নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকার ইউরোপের সমালোচনাকেই এ ধরনের ‘অ্যান্টি-সেমেটিক’ অপরাধের উসকানিদাতা হিসেবে দায়ী করে।

নেতানিয়াহু সরাসরি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাকে অভিযুক্ত করে বলেন, তারা সন্ত্রাসীদের সাহস জুগিয়ে চলেছে। তাঁর ভাষায়, ‘তারা চায় ইসরায়েল মাথা নিচু করে মেনে নিক যে হামাসের গণহত্যাকারী বাহিনী টিকে থাকবে, পুনর্গঠিত হবে এবং ৭ অক্টোবরের হত্যাযজ্ঞ আবার ঘটাবে।’

এই ধরনের বক্তব্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। নেতানিয়াহু বারবার ইহুদি জনগণের দুর্দশা এবং ‘ইহুদি-বিরোধী’ সংক্রান্ত ব্যাখ্যাকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে চলেছেন। উদ্দেশ্য একটাই—একটি কর্তৃত্ববাদী ও বর্ণবাদী রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে নিজের দুর্বল অবস্থানকে জোরদার করা।

তাহলে প্রশ্ন হলো—কী তাকে টিকিয়ে রেখেছে, এবং কী তাকে থামাতে পারে?

প্রথমত, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি। কারণ বিরোধীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা নেতানিয়াহুর জোট সরকারের ওপর তেমন কোনো বাস্তব চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক যুদ্ধ বন্ধ করে জিম্মিদের মুক্তি দেখতে চান। বিপরীতে, মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ চান যুদ্ধ আরও বাড়িয়ে গাজা দখল করা হোক।

এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত। তিনি ডানপন্থী মতাদর্শ ও যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ জনগণের হতাশার মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা তৈরি করতে চাইছেন।

অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়াইর গোলান সরাসরি ইসরায়েলের বর্ণবাদী ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এমন চলতে থাকলে ইসরায়েল এক সময়ের দক্ষিণ আফ্রিকার মতো একঘরে হয়ে পড়বে।’

ইসরায়েলের এক রাজনীতিকের মুখে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তুলনা আসাটা ঐতিহাসিক ও নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আজকের ইসরায়েলকে বহু গবেষক ও বিশ্বজুড়ে অধিকারকর্মীরা দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন। ১৯৯৪ সালে সেই ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গণআন্দোলনের সম্মিলিত চাপে ভেঙে পড়েছিল।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার আগেই দক্ষিণ আফ্রিকায় এই বর্ণবাদ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে তৎকালীন ট্রুম্যান প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকাকে সমর্থন দিয়েছিল। এই সমর্থন চলেছিল পরবর্তী বহু মার্কিন সরকারের আমলেও।

১৯৬০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা পুলিশের গুলিতে ৬৯ জন কৃষ্ণাঙ্গ বিক্ষোভকারী নিহত হন। তখন একটি বড় পরিবর্তন আসে। এই শার্পভিল হত্যাকাণ্ডের পরই জাতিসংঘ দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ডাক দেয়। তখন নিরাপত্তা পরিষদের যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও যুক্তরাস্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো অনুধাবন করতে থাকে যে আফ্রিকা মহাদেশে উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না।

তবে এই আন্তর্জাতিক অবস্থান বদলের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি ছিল বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে ওঠা তৃণমূল আন্দোলন। এসব আন্দোলনের চাপেই পশ্চিমা সরকারগুলো অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয়।

১৯৮৬ সালে মার্কিন কংগ্রেস পাশ করে ‘কমপ্রিহেনসিভ অ্যান্টি-আপারথেইড অ্যাক্ট’। এর ফলে বহু আন্তর্জাতিক কর্পোরেশন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহ ধাক্কা খায়।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের ইউরোপজুড়ে ফিলিস্তিন প্রশ্নে চলমান ঐতিহাসিক প্রতিবাদগুলোর কথা। বিশেষ করে গত ১৫ মে নাকবা দিবসে লন্ডনে যে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস থেকে শিখে আমরা আজকের ফিলিস্তিন আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কৌশল—বর্জন, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা। আন্দোলনের এই শক্তিকে এখন যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হবে।

ইসরায়েলের প্রভাবশালী পত্রিকা হা’আরেতজ নেতানিয়াহুকে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিটার বোথার সঙ্গে তুলনা করেছে। বোথার কঠোর দমননীতি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনকে টিকিয়ে রেখেছিল। ১৯৮৯ সালে বোথা পদত্যাগ করলে সেই শাসনব্যবস্থার ভাঙ্গন ত্বরান্বিত হয়।

আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সামনে এক বিশাল বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনটি স্তম্ভকে ভর করে তাঁর ক্ষমতা টিকে আছে। তাঁকে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের অবশ্যই সেগুলো চিনে নিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে সেই স্তম্ভগুলো ভেঙে ফেলার দীর্ঘ লড়াইকে পরিচালনা করতে হবে।

প্রথমত, ইসরায়েলের মধ্যে শক্তিশালী বিরোধিতা এবং নতুন নেতৃত্বের উদ্ভব খুবই জরুরি। এই নতুন নেতৃত্ব অন্তত ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়নকে রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করবে না। এমন একটি নেতৃত্বই কেবল ইসরায়েলের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে পারে।

দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বিরোধিতার শিথিলতা। এই শিথিলতাই নেতানিয়াহুর অপরাধমূলক পদক্ষেপগুলোকে টিকে থাকার প্রধান রসদ জোগায়। যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে নেতানিয়াহুর দমননীতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

তৃতীয়ত, ইউরোপীয় দেশগুলো, আঞ্চলিক শক্তিগুলো বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ। এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবও গত কয়েক দশকে নেতানিয়াহু বা তাঁর পূর্বসূরিদের যুদ্ধনীতি পরিবর্তনে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। কেবল গাজায় নয়, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা যত যুদ্ধ করেছে, তার প্রতিটির পেছনেই এই আন্তর্জাতিক চাপ ছিল প্রায় নিষ্ফলা।

এই তিনটি স্তম্ভ—ইসরায়েলের ভেতরের নেতৃত্ব সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক চাপের ব্যর্থতা—এই তিনের ওপর ভর করেই নেতানিয়াহু দাঁড়িয়ে আছেন। একের পর এক বিশ্বজনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজায় দখল ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নতুন যুদ্ধ পরিকল্পনা, ‘অপারেশন গিদেওন চারিয়টস,’ এই তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই অগ্রসর হচ্ছে।

সম্প্রতি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতি গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই বিবৃতিতে সই করেন। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়—যদি ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ না করে, তবে তারা ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করবে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ধরনের হুঁশিয়ারি কিংবা আগের সমর্থনের কোনো প্রত্যাহারই নেতানিয়াহুর নীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারেনি।

এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন ‘সৌদি-ফরাসি প্যালেস্টাইন সম্মেলন’ নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই সম্মেলন আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য—প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে বহুপক্ষীয় সংলাপ ও কূটনৈতিক চাপকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং গাজা সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে সমন্বিত করা।

ফ্রান্স ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোতে পারে। যুক্তরাজ্যও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছে, যদিও বেশ হালকাভাবে। এরই মধ্যে ইউরোপজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী তৃণমূল আন্দোলন এবং ইসরায়েলবিরোধী জনমত দিন দিন বাড়ছে। ফলে ভূ-রাজনীতির খাতিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষে নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন সরকারকে আর সমর্থন করা হয়তো আগের মতো সহজ নয়।

তবে এই পাশা খেলাতে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে তা এখনও বলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া, ইসরায়েলের অর্থনীতি বাণিজ্যিকভাবে বিপর্যস্ত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পরই সে সম্পর্কে মন্তব্য করা যাবে।

* ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান ঢাকায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত
- ইংরেজি থেকে অনুবাদ জাভেদ হুসেন

সম্প্রতি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতি গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
সম্প্রতি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতি গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ফাইল ছবি

চীনকে বাগে আনতে ট্রাম্পকে যে পথে হাঁটতে হবে by ই ফুসিয়ান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপের যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তা অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং সেই সমালোচনার পেছনে যুক্তিও আছে। কিন্তু ট্রাম্প যেটি বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কলকারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটি একেবারে ভুল কিছু নয়।

সমস্যা হলো ট্রাম্পের ‘চিকিৎসা পদ্ধতি’। তিনি যেন অস্ত্রোপচার করতে চাচ্ছেন করাত দিয়ে, যা কিনা রোগীকেই মেরে ফেলতে পারে। অথচ দরকার ছিল আরও সূক্ষ্ম স্ক্যালপেল (অপারেশনের জন্য ব্যবহার্য ধারালো ছুরি)। সরলভাবে বললে, ট্রাম্প সমস্যার ধরন বুঝলেও তাঁর সমাধানের পথটা খুব রুক্ষ আর বিপজ্জনকভাবে বেছে নিয়েছেন।

বর্তমানে যেটা আমরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের নিয়মকানুন দেখি (যেমন বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্যের লেনদেন ও ডলারের গুরুত্ব), তার সবকিছু তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উডস নামের একটি জায়গায় অনুষ্ঠিত এক বড় সম্মেলনে। তখন ইউরোপ ছিল যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি। ১৯৪৮ সালে ওই সম্মেলনের চার বছর পর দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি পণ্য একা যুক্তরাষ্ট্রই তৈরি করত।

তবে সেই সময় যে ‘নির্ধারিত বিনিময় হার’ (ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট) চালু করা হয়েছিল, মানে একেক দেশের মুদ্রার মান একভাবে বেঁধে দেওয়া হতো, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়নি। এর ফলে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্প দুর্বল হতে শুরু করে। ১৯৫৩ সালে বিশ্বে উৎপাদিত সব পণ্যের ৫৫ শতাংশ যেটি একা যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করত, সেটি ১৯৭০ সালে ২৪ শতাংশে নেমে আসে।

এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭১ সালে বড় একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মার্কিন ডলারকে সোনার মানের সঙ্গে যুক্ত থাকার নিয়ম থেকে আলাদা করে দেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের অবস্থা কিছুটা স্থির হয়। পরবর্তী ৩০ বছর ধরে অবস্থা মোটামুটি একই রকম থাকে।

সরল করে বললে, যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় কারখানা ছিল দুনিয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভুল নিয়মে তাদের উৎপাদন দুর্বল হয়। পরে কিছু বড় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা আবার নিজেদের অবস্থান কিছুটা ঠিক করে নেয়।

ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক বড় প্রভাব হলো যুক্তরাষ্ট্র আগে যে আয় করত (অর্থাৎ রপ্তানি করে যা পেত), তার চেয়ে বেশি খরচ করা শুরু করে (অর্থাৎ আমদানি বেশি করে)। ফলে ধীরে ধীরে তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ঘাটতির দেশ হয়ে ওঠে। আর এই সুযোগে জাপান তাদের উৎপাদন খাত অনেক বড় করে তোলে।

এরপর ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর (জাপান, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য) সঙ্গে এক চুক্তি করে, যার মাধ্যমে ডলারের মূল্য কমিয়ে দেয়। এতে কিছুদিনের জন্য আমদানি কমে যায় এবং বাণিজ্যঘাটতি কিছুটা কমে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে নাফটা নামে একটা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি চালু হয়, আর ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয়। তখন ব্যাপক হারে সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে।

২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দুটি বিষয় ঘটে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ও আমদানির অনুপাত ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ৪৫ শতাংশে চলে আসে। মানে আমদানি বাড়ে, রপ্তানি কমে। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, তাদের উৎপাদনের পরিমাণ, যা একসময় দুনিয়ার ২৫ শতাংশ ছিল, তা নেমে ১৬ শতাংশে নেমে যায়।

এই তথ্যগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে আর এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি অনেকটা দায়ী। ট্রাম্প এই দুর্বলতার দিকটা ঠিকই ধরেছেন। তবে তিনি যে কৌশল নিচ্ছেন, যেমন সবার ওপর একসঙ্গে শুল্ক বসিয়ে দেওয়া, সেটি সমস্যা কমানোর বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো চীন নিজেও তাদের অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন বা ওভারক্যাপাসিটি সমস্যার কারণে বেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। মানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীনও সমস্যায় আছে।

শিশুরা অনেক কিছু ব্যবহার করে, যেমন খেলনা, জামা–কাপড়, খাবার, শিক্ষা, ইত্যাদি। তাই কোনো পরিবারে যত বেশি শিশু থাকে, তত বেশি খরচ হয়। কিন্তু চীনে অনেক দিন ধরে এক সন্তান নীতি চলায় এখন তাদের শিশুদের সংখ্যা অনেক কম। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবার ছোট হয়েছে, অন্যদিকে তাদের খরচও কমে গেছে। এই কারণেই চীনে মানুষের আয় কম এবং তারা বাজারে খুব বেশি জিনিসপত্র কেনে না।

চীনের পরিবারগুলো যত কম খরচ করে, ততই চীনের ভেতরে (দেশের মধ্যে) জিনিসপত্র বিক্রি কম হয়। তাই তারা বাধ্য হয়ে অনেক পরিমাণে পণ্য তৈরি করে অন্য দেশে রপ্তানি করে। ২০২৩ সালে চীন প্রায় ১ দশমিক ৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা তাদের পুরো জিডিপির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, মার্কিনরা অনেক জিনিস কেনেন ও ব্যবহার করেন। আবার ডলার হলো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা, তাই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে অনেক পণ্য কিনতে পারে এবং সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করতে চায়। চীনের অতিরিক্ত পণ্যের জন্য তাই যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এই দুই দেশের এমন সম্পর্ককে ইতিহাসবিদেরা বলছেন ‘চিমেরিকা’ (চীন আর আমেরিকা মিলিয়ে এই নাম)।

এই সম্পর্ক শুরুতে দুই দেশের জন্যই উপকারী মনে হলেও পরে সমস্যা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের শিল্প ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়, কারণ, সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে। আর চীনের ভেতরে নিজের মানুষের চাহিদা এত কম যে তারা সব সময় বাইরে পণ্য বিক্রি না করলে চলতে পারে না।

চীন এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সেখানে এখন এক সন্তান নীতির পরিবর্তে এখন দুই সন্তান বা তিন সন্তান নিতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ পরিবার এত কম আয় করে যে তারা আর বেশি সন্তান নিতে চায় না।

চীন সরকার এখন ভাবছে, তাদের কাছে তো অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা তরুণ আছেন, তাই তাঁদের দিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই তরুণেরা চাকরি খোঁজেন যেসব জায়গায়, সেখানে খুব কম চাকরি আছে। তাই দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, নতুন বিয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যার মানে হচ্ছে জন্মহারও কমছে।

এসব সমস্যা সমাধানে যদি যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষ করে ট্রাম্প) সব দেশের ওপর বড় বড় শুল্ক বসিয়ে দেয়, তাহলে শুধু চীন নয়, পুরো বিশ্ববাণিজ্যই বড় বিপদে পড়বে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশাল বাণিজ্যঘাটতি, তার সঙ্গে চীনের অতিরিক্ত রপ্তানি ভারসাম্য তৈরি করে।

ট্রাম্প যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চান, তাহলে সেটা চীন থেকেই করতে হবে। অর্থাৎ চীনের জন্মহার বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ভেতরেই মূল সমস্যা নিহিত। কিন্তু এই কাজ শুল্ক বসিয়ে (ট্যারিফ দিয়ে) করা সম্ভব নয়। এটা করতে হলে চীনকে তার ভেতরের সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে বড় পরিকল্পনা করতে হবে।

* ই ফুসিয়ান উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তিনি চীনের এক সন্তান নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে চীন
এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে চীন রয়টার্স

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গড়ে ওঠা পিএলওর নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে by ফাহমিদা আক্তার

১৯৬৪ সালে মিসরের কায়রোতে আরব লিগের অধিবেশনে সূচনা হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর। ফিলিস্তিনিদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এ সংগঠন শুরুতে ছিল এক প্রতিশ্রুতির নাম। কথা ছিল, একীভূত আরব চেতনায় গড়ে তোলা হবে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন। কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষা আজও পূরণ হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পিএলও হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সংগ্রাম, সশস্ত্র প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক বিতর্কের এক জটিল মিশ্রণ। ২৮ মে পিএলওর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে সংগঠনটির যাত্রা ও ভূমিকা নিয়ে আজকের এই ফিরে দেখা।

গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে সবচেয়ে জটিল ও রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর একটি রচিত হয়েছে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ঘিরে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের বিভাজন প্রস্তাব থেকে শুরু করে লাখো ফিলিস্তিনির নির্বাসন, যুদ্ধ, সংঘাত ও প্রতিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে একটি চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা—নিজের ভূখণ্ডে মাথা তুলে স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার।

এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। অনেকেই মনে করেন, পিএলও ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে যথাযথভাবে এগিয়ে যেতে পারেনি, বরং নিজেদের স্বার্থে আন্তর্জাতিক সমঝোতার পথে এমন সব আপস করেছে, যা জনগণের চাওয়া থেকে অনেক দূরে। সময়ের বাস্তবতায় পিএলও অনেকটাই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, ক্ষমতাহীন ও প্রতীকী একটি কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

পিএলওর যাত্রা

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে এক ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনকে দুই টুকরা করে আলাদা ইহুদি ও আরব রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। আর জেরুজালেম হবে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক নগরী। ইহুদি নেতারা এ প্রস্তাব মেনে নেন, তবে ফিলিস্তিনি আরবরা তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফিলিস্তিনি আরবদের আশঙ্কা ছিল, এতে ইহুদিরাই সুবিধা পাবে এবং বিভাজনের কারণে আরবদের যাঁরা ইহুদি অঞ্চলের অধীন থেকে যাবেন, তাঁদের প্রতি অবিচার করা হবে।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদি নেতারা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এতে ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিজেদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ওই বছরই শুরু হয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। এ যুদ্ধ দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ও রক্তক্ষয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়। ওই সময় ফিলিস্তিনিরা নানা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তাদের কোনো সংগঠিত নেতৃত্ব ছিল না। রাজনৈতিকভাবে তারা ছিল দুর্বল ও প্রভাবহীন।

১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আরব রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে মিসর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। ফিলিস্তিনিরা নিজেদের একটি সংগঠিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকায় বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ফিলিস্তিনি ছোট ও বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ সংগঠন গড়ে তোলে। এগুলো প্রায়ই বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হতো। ফলে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল সীমিত।

১৯৬৪ সালে আরব লীগের শীর্ষ সম্মেলন চলার সময় ফিলিস্তিনিরা একত্র হয়ে একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন গঠন করে। এর নাম দেওয়া হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। জাতিসংঘে পর্যবেক্ষক মর্যাদা পাওয়া এ সংগঠনের ছায়াতলে একাধিক দল ও সংগঠন কাজ করে। বর্তমানে রাজনৈতিক দল ফাতাহ হলো পিএলওর মূল চালিকা শক্তি।

পিএলওর গঠনকাঠামো

পিএলওর সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয় প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কাউন্সিল বা পিএনসি। এ সংস্থার বিভিন্ন দায়িত্বের মধ্যে আছে নীতিনির্ধারণ করা, নির্বাহী কমিটি ও কাউন্সিল বোর্ড নির্বাচন করা এবং সদস্যপদ–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

আর পিএলওর নির্বাহী কমিটি দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড তদারকি করে। তারা বাজেটের বিষয়টি দেখভাল করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পিএলওকে প্রতিনিধিত্ব করে। পিএনসি ও কেন্দ্রীয় পরিষদের গৃহীত নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাদের ওপর বর্তায়।

পিএনসি ও নির্বাহী কমিটির মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে কেন্দ্রীয় পরিষদ। এই পরিষদে ১২৪ জন সদস্য আছেন। আর প্যালেস্টাইন লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) হলো পিএলও আনুষ্ঠানিক সামরিক শাখা।

পিএলওর নেতৃত্বে ইয়াসির আরাফাতের ফাতাহ

১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল বিজয়ী হওয়ার পর সামরিক নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন সংগঠন ফাতাহ পিএলওতে যুক্ত হয় এবং সংগঠনটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। ১৯৬৯ সালে আরাফাত পিএলওর নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হন। ২০০৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।

১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে পিএলও জর্ডানে তাদের ঘাঁটি থেকে ইসরায়েলে হামলা চালাতে শুরু করে। ১৯৭১ সালে পিএলও জর্ডান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং তাদের সদর দপ্তর লেবাননে স্থানান্তর করা হয়।

লেবাননে অবস্থানকালে পিএলওর বিভক্ত অংশ ইসরায়েলি সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা করা বাদ দিয়ে গুপ্ত হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। শক্তিশালী বোমা হামলা ও উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটায় তারা।

১৯৭৪ সালে ইসরায়েলের বাইরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বন্ধ করতে পিএলওর প্রতি আহ্বান জানান ইয়াসির আরাফাত। এটি ছিল আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা অর্জনের একটি পরিকল্পনার অংশ। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে আরব লিগ পিএলওকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি’ হিসেবে স্বীকৃতি এবং তাদের পূর্ণ সদস্য পদ দেয়।

এক মাস পর ইয়াসির আরাফাত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। তিনি হলেন প্রথম কোনো অরাষ্ট্রীয় নেতা, যিনি এ সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছেন।

১৯৮২ সালে পিএলওর নেতৃত্ব তাদের ঘাঁটি তিউনিসিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সেখানেই ঘাঁটি ছিল। পরে তারা আবারও গাজায় ফিরে আসে।

অসলো চুক্তি

১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা দখল করে নেয়। এরপর বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘাত থামাতে ১৯৯৩ সালে পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর জন্য দুই নেতা ১৯৯৪ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারও পান।

প্রথম অসলো চুক্তি স্বাক্ষর হয় ১৯৯৩ সালে এবং দ্বিতীয়টি ১৯৯৫ সালে। অসলো চুক্তির আগে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম ফিলিস্তিনি সংগ্রামের সময়কাল বা ‘প্রথম ইন্তিফাদা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (পিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়। চুক্তির আওতায় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার কিছু অংশের ওপর সীমিত কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। পিএ মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় ফাতাহ দলের মাধ্যমে। ফাতাহ হলো এমন একটি রাজনৈতিক দল, যা ১৯৪৮ সালের নাকবার পর নির্বাসিত ফিলিস্তিনিরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

অসলো চুক্তির কারণে পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত ও নির্বাসনে থাকা অন্য ফিলিস্তিনিরা দেশে ফেরার অনুমতি পান। অনেকেই এ চুক্তিকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি অর্জনের সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন। তবে প্রথম ইন্তিফাদার সময় গড়ে ওঠা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস এ চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। তারা মনে করে, এ চুক্তির মাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ফিলিস্তিনের জাতীয় স্বার্থকে বিক্রি’ করে দেওয়া হয়েছে।

অসলো চুক্তির পরও ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয়। এর সময়কাল ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল।

২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর ফাতাহ দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও পিএর প্রথম প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ আব্বাস পিএলওর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কয়েক মাস পর তাঁকেই পিএর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়।

হামাসের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

অসলো চুক্তির পর হামাস ও ফাতাহর মধ্যে আগে থেকে চলা দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে, যা আজও অব্যাহত আছে। ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস পিএর নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পায়। তখন ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড শাসনের জন্য হামাস ও বিরোধী দল ফাতাহর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে তা সফল হয়নি।

২০০৭ সালে পিএলও ও হামাসের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। একটি সশস্ত্র সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে হামাস গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর মাহমুদ আব্বাস হামাস-নিয়ন্ত্রিত আইনসভা ভেঙে দেন এবং তার পরিবর্তে একটি জরুরি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে কার্যত পশ্চিম তীরে পিএলওর কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে গাজা উপত্যকার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়।

ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধটা অনেকটাই গভীর। ফাতাহ ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয় এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ নম্বর প্রস্তাবের পক্ষে সম্মতি জানায়। অন্যদিকে হামাস ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় না। বরং এই সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের ১৯৮৮ সালের প্রতিষ্ঠা সনদে বর্তমান ইসরায়েলসহ ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

পশ্চিম তীরে ফাতাহ পরিচালিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহায়তা পেয়ে আসছে। অন্যদিকে গাজার শাসনক্ষমতায় থাকা হামাসকে পশ্চিমা বিশ্ব সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সংগঠনটি।

১৭ বছরের বেশি সময় ধরে গাজা একপ্রকার অবরুদ্ধ। স্থল, জল ও আকাশপথে ইসরায়েল ও মিসর কঠোরভাবে এ অঞ্চল অবরোধ করে।

২০১৪ সালে জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের একটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০১৭ সালে হামাস গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে সম্মত হলেও অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে বিরোধে সেই চুক্তিও ভেঙে যায়। এরপর ২০২২ সালে আলজিয়ার্সে ১৪টি ফিলিস্তিনি দলের প্রতিনিধিরা একটি নতুন সমঝোতা চুক্তি সই করেন। তাঁরা ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন। তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পিএ গঠনের উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করা। তবে বাস্তবে এটি প্রায় ক্ষমতাহীন একটি প্রশাসন হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে থাকে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের অবয়বে পরিচালিত হয়। এর মন্ত্রণালয়, সিভিল সার্ভিস, প্রশাসনিক কাঠামো—সবই আছে। তবে বাস্তবে ক্ষমতার রাশ রয়েছে ইসরায়েলের হাতে। কর আদায় থেকে শুরু করে পশ্চিম তীরে দিন দিন প্রবেশাধিকার সংকুচিত করা—সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে তেল আবিব।

ইসরায়েল প্রায়ই পিএর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে সরাসরি অভিযান চালায়। এখানেই শেষ নয়, ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিধিনিষেধের এক জটিল জাল বিছিয়ে রেখেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। তারা কোথায় থাকবে, কোথায় যাতায়াত করবে, এমনকি কোথায় ঘর বানাবে—সবকিছুই নির্ধারিত হয় ইসরায়েলি অনুমতির ঘূর্ণিতে।

নির্বাচন না দেওয়া নিয়ে জটিলতা

২০০৭ সালে ফিলিস্তিনের পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণা করার পর জনমত যাচাই ছাড়াই আব্বাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পিএ এবং পিএলও জোটে তাঁর ফাতাহ পার্টি সবচেয়ে প্রভাবশালী। দীর্ঘদিন ধরে বিলুপ্ত থাকায় পিএ পার্লামেন্ট এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

সমালোচকেরা ফিলিস্তিনের এমন পরিস্থিতির জন্য আব্বাসকে দায়ী করেন। তাঁরা মনে করেন, পার্লামেন্টকে পুনরুজ্জীবিত করতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, আব্বাস তা দুর্বল করে দিয়েছেন। মাহমুদ আব্বাসের বয়স এখন ৮৯ বছর। পিএর পাশাপাশি পিএলওরও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।

মাহমুদ আব্বাসের একজন উত্তরসূরি বেছে নিতে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের ওপর চাপ বাড়ছিল। এ অবস্থায় গত ২৪ এপ্রিল জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক শেষে পিএলও ভাইস প্রেসিডেন্ট নামে নতুন এক পদ সৃষ্টি করে।

মাহমুদ আব্বাস গত মার্চে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্বাচনের অংশ হিসেবে একটি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অবশেষে গত মাসে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হুসেন আল-শেখের নাম ঘোষণা করেন তিনি। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংশয় দূর করতে এ পদক্ষেপ জরুরি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।

গত বছর মাহমুদ আব্বাস একটি ডিক্রি জারি করে বলেছেন, কোনো কারণে যদি হঠাৎ প্রেসিডেন্টের পদ খালি হয়, তবে নির্বাচনের আগপর্যন্ত যেন একজন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রধান রাওহি ফাত্তৌহ।

আব্বাস উত্তরসূরি ঘোষণা করার পর কানাডীয় আইনজীবী ডায়ানা বুট্টু আল–জাজিরাকে বলেছিলেন, পিএতে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ তৈরি করলেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এড়ানো যাবে না। বরং এটি সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। পিএ যত বেশি খণ্ডিত হবে, তত বেশি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে। আর তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বাইরের শক্তি দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ হতে পারে।

ডায়ানা বুট্টু বিশ্বাস করেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন একটি রাজনৈতিক পদ তৈরি করার পরিবর্তে মাহমুদ আব্বাসের একটি নির্বাচন দেওয়া উচিত। এতে ফাতাহ, পিএলও এবং পিএ সবার জন্য ভালো হবে বলেও মনে করেন এই আইনজীবী।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, হিস্ট্রি.কম, ভক্স

রামাল্লায় পিএলওর সদর দপ্তর ছবি: রয়টার্স
রামাল্লায় পিএলওর সদর দপ্তর ছবি: রয়টার্স। ফাইল ছবি

ভারত–পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক বোমার চেয়েও ভয়ংকর অস্ত্র by সাইয়িদা সানা বাতুল

সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তানের সংঘাতটি আমাদের চোখে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র আসলে পারমাণবিক বোমা নয়, বরং বয়ান বা কাহিনি তৈরি করা।

ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করল এবং পাকিস্তান পাল্টা জবাব দিল ‘অপারেশন বুনিয়ান আল–মারসুস’-এর মাধ্যমে। কিন্তু আপনি যদি ভাবেন, এ ঘটনা কেবল পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার গল্প, তাহলে আসল কথাটা আপনার চোখ এড়িয়ে গেছে।
এই যুদ্ধ আসলে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের নয়। এটা ছিল ‘বয়ানের যুদ্ধ’।

পত্রিকার শিরোনামে, হ্যাশট্যাগে এবং টেলিভিশনের রাতের নিউজরুমে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত এক লড়াই। যুদ্ধের ময়দান ছিল গণমাধ্যম, গোলাবারুদ ছিল ভাষা, আর হতাহত হয়েছিল সত্য।

আমরা যা দেখলাম, তাকে আজকের দুনিয়ায় বলা হয় ‘বক্তৃতার যুদ্ধ’। অর্থাৎ ভাষার মাধ্যমে পরিচয়, বৈধতা ও ক্ষমতার পরিকল্পিত নির্মাণ। ভারত ও পাকিস্তানের গণমাধ্যমের হাতে প্রতিটি সহিংসতার ঘটনা যেন ছিল চিত্রনাট্য অনুযায়ী পরিচালিত। যুদ্ধের প্রতিটি ছবি ছিল কৌশলে নির্বাচিত। আর প্রতিটি প্রাণহানি ছিল নিছক রাজনৈতিক উপাদান। আর সংবাদগুলো ছিল অভিনয়।

দৃশ্য এক: ন্যায়সংগত আঘাত

৬ মে, প্রথম আঘাত হানে ভারত। তবে ভারতীয় গণমাধ্যম যেভাবে উপস্থাপন করল, তাতে মনে হলো—ভারত আসলে আত্মরক্ষার্থে প্রথম জবাব দিয়েছে।  
‘অপারেশন সিঁদুর’ ঘোষিত হলো নাটকীয় ভঙ্গিতে। ২৫ মিনিটে ২৪টি হামলা। ধ্বংস হলো ৯টি ‘সন্ত্রাসের ঘাঁটি’। কোনো বেসামরিক প্রাণহানি হয়নি—এমনটাই দাবি। দোষীদের নাম প্রকাশ করা হলো—জইশ-ই-মুহাম্মদ, লস্কর-ই-তইবা এবং বাহাওয়ালপুর ও মুজাফফরাবাদে ছড়িয়ে থাকা ‘সন্ত্রাসের কারখানা’। সবকিছুই নাকি মাটির সঙ্গে মিশে গেল।

শিরোনামগুলো ছিল জয়ের উল্লাসে ভরা—‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ২.০’, ‘ভারতীয় সেনার গর্জন পৌঁছাল রাওয়ালপিন্ডিতে’, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত’। সরকারিভাবে জানানো হলো এটি ছিল পেহেলগামে ২৬ জন ভারতীয় পর্যটকের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ‘উপযুক্ত জবাব’। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বললেন, ‘তারা ভারতের কপালে আঘাত করেছিল, আমরা তাদের বুকে আঘাত করেছি।‘ শব্দচয়নটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। আর তা খুব জেনেবুঝেই এমন করা হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম নিজের এমন এক পরিচয় দাঁড় করাল, যেখানে সে নৈতিক শক্তির অধিকারী এক রাষ্ট্র, যাকে বাধ্য না করলে সে আঘাত করে না। সে প্রতিশোধ নেয় না। সংযম রক্ষা করে। তার যে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তা–ই নয়, তার বড় অস্ত্র—ন্যায়ধর্ম ও নৈতিকতা অস্ত্র। তার শত্রু পাকিস্তান নয়, বরং সন্ত্রাস।

এভাবেই বয়ান তৈরি হয়। এখানে সে নিজেকে আক্রমণকারী নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে এক যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল। আর তা করল ভাষার মাধ্যমে। ভারতের জন্য এই পরিচয় গড়ে তুলল গণমাধ্যম। একটি কাহিনি গড়ে তুলে। সামরিক শক্তির সঙ্গে এখানে মিশে আছে নৈতিকতা। হামলাগুলো আগ্রাসন ছিল না। ছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠার কর্তব্য সম্পাদন।

দৃশ্য দুই: পবিত্র প্রতিরক্ষা

তিন দিন পর পাকিস্তান পাল্টা জবাব দেয়। চালু হয় ‘অপারেশন বুনিয়ান আল–মারসুস’—আরবিতে যার অর্থ ‘লোহার প্রাচীর’। এই নামই সব বলে দেয়। এটা কেবল প্রতিশোধ ছিল না, বরং এক ধর্মীয় ঘোষণা। একজাতীয় আহ্বান। শত্রু ঢুকে পড়ার দুঃসাহস করেছিল। এবার তার জবাব হবে মনে রাখার মতো।

পাকিস্তানি ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষিত হয় ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিতে—ব্রিগেড সদর দপ্তর, এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও পাঞ্জাব ও জম্মুর সামরিক স্থাপনায়। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘোষণা দেন, পাকিস্তান ‘১৯৭১-এর যুদ্ধের প্রতিশোধ নিয়েছে’। সেই যুদ্ধে পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করেছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। পাকিস্তানও তার কাহিনি তৈরি করা শুরু করল।

পাকিস্তানের গণমাধ্যম এই গল্প ছড়িয়ে দেয়। সারা দেশ দেশপ্রেমের উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে। ভারতের হামলাকে দেখানো হয় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে—মসজিদে হামলা, বেসামরিক মানুষ নিহত। ধ্বংসাবশেষ ও রক্তাক্ত ছবির সঙ্গে যুক্ত হয় ‘শহীদ’ শব্দটি।
পাকিস্তান নিজের জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলে—আমার শান্তিপ্রিয়, কিন্তু প্ররোচিত; সংযত, কিন্তু দৃঢ়। আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু ভয়ও পাই না।

ভারত–পাকিস্তান দুই দেশের হাজির করা গল্পের মধ্যে অবিশ্বাস্য মিল। উভয় রাষ্ট্রই নিজেকে ভাবছে আত্মরক্ষাকারী। তাদের কেউই আক্রমণকারী নয়। উভয়েরই দাবি—তারা নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ। উভয়েরই ভাষা—প্রথম গুলি চালিয়েছে শত্রু। জবাব দেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না।

কে জালিম আর কে মজলুম

দুই দেশই নিজেকে মজলুম হিসেবে জাহির করেছে। দুই দেশই বলছে, তাদের ওপর অন্যায় আক্রমণ হয়েছে। এই ক্ষেত্রেও দুই দেশের তৈরি করা গল্পে অদ্ভুত মিল।
ভারত উপস্থাপন করে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসের কারখানা’ হিসেবে, যে কিনা প্রতারক, নিয়ন্ত্রণহীন, জিহাদের নেশায় মত্ত এক পারমাণবিক দানব। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে শান্তি অসম্ভব। কারণ ‘ওরা’ কোনো যুক্তিবুদ্ধির ধার ধারে না।

অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতকে তুলে ধরে এক ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে, যার নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী সরকার, যার উদ্দেশ্য ইতিহাস থেকে মুসলমানদের মুছে ফেলা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই আক্রমণকারী। ভারতই দখলদার। তাদের হামলা সন্ত্রাসবিরোধী নয়, বরং ধর্মযুদ্ধ।

উভয় ক্ষেত্রেই শত্রু কেবল হুমকি নয়, সে এক মতাদর্শ। আর মতাদর্শের সঙ্গে যুক্তি চলে না।

এটাই গণমাধ্যম-নির্ভর পরিচয় নির্মাণের বিপদ। একবার যদি ‘অন্যজন’কে আপনি তামাশার পাত্র করে দেন, নিজেকে নায়ক বানিয়ে ফেলেন, তাহলে আর সংলাপ সম্ভব নয়। তখন কূটনীতি হয়ে ওঠে দুর্বলতা। আপস হয় বিশ্বাসঘাতকতা। আর যুদ্ধ হয়ে পড়ে কাঙ্ক্ষিত।

ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। মানুষ মরেছে। দুই কাশ্মীরেই বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। সীমান্ত গ্রামের ওপর গোলাবর্ষণ হয়েছে। নিরপরাধ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। কিন্তু এই মানবিক গল্পগুলো চাপা পড়ে গেছে কৃত্রিম গল্পের ধ্বংসস্তূপে। কোনো দেশের গণমাধ্যম অন্য দেশের নিরীহ নিহত মানুষের জন্য কোনো শোক প্রকাশ করেনি। যারা ‘আমাদের’, তারা শহীদ। যারা ‘ওদের’? তারা হয় নেহাত ক্ষয়ক্ষতি, নয়তো ভুয়া মিথ্যা গল্প। যখন আমরা কেবল নিজেদের মৃতদের জন্য কাঁদি, তখন ন্যায়বিচার মরে যায়। আর সেই অসাড়তার মধ্যেই পরবর্তী সহিংসতা হয়ে ওঠে আরও সহজ।

বৈধতার জন্য লড়াই

ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে কেবল ভূখণ্ড বা কৌশলগত সুবিধা নিয়ে ছিল না। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল বৈধতা। উভয় রাষ্ট্রই নিজেদের জনগণ ও গোটা বিশ্বের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছে ‘ইতিহাসের সঠিক পক্ষে’ অবস্থানকারী হিসেবে।

ভারতীয় গণমাধ্যম যে ভাষায় কথা বলেছে, তার নাম ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। পাকিস্তানে ঘাঁটি গাড়া জঙ্গিদের লক্ষ করে হামলা চালিয়ে ভারত নিজেকে তুলে ধরেছে বৈশ্বিক নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে। এই একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে, আর ইসরায়েল গাজায়।

অন্যদিকে পাকিস্তানি গণমাধ্যম নির্ভর করেছে সার্বভৌমত্বের বয়ানের ওপর। ভারতের হামলা তাদের কাছে কেবল পাকিস্তানের মাটিতে হয়নি। এই আঘাত তাদের ইজ্জতের ওপর আঘাত। পাকিস্তান ধর্মীয় স্থান ও বেসামরিক মৃত্যুর ছবি ছড়িয়ে দিয়ে ভারতকে তুলে ধরেছে ধর্মদ্রোহী হিসেবে।

এই কথার যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সত্যকে ঢেকে দিয়েছে। ভারত যখন দাবি করে ৮০ জঙ্গিকে হত্যা করেছে, পাকিস্তান বলে—সবই বানানো। পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, ভারত বলে—মিথ্যা প্রচার। উভয়ই একে অপরকে দোষ দেয় ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য। তাদের প্রত্যেকের সংবাদমাধ্যম হয়ে ওঠে ‘আরশিনগর’— ‘আয়নার ঘর’। এখানে শুধু নিজের মুখই দেখা যায়।

নতুন করে শোনার ডাক

১৩ মে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতি হয়। দুই দেশই বিজয় দাবি করে। কিন্তু থেকে যায় দুই পক্ষের তৈরি করা নিজেদের বয়ান—আমরা ঠিক ছিলাম। ওরা ভুল। আমরা শক্তি দেখিয়েছি। ওরা লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে।  

এই বয়ানই ভবিষ্যতের পাঠ্যপুস্তক, নির্বাচন, সেনাবাহিনীর বাজেট নির্ধারণ করবে। পরবর্তী সংঘাত, পরবর্তী গোলাগুলি, পরবর্তী যুদ্ধের ভিত্তি গড়ে দেবে।

এবং এই বয়ান বদল না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বদলাবে না। কিন্তু এই বয়ান বদলানো সম্ভব। বদলাতে হবে। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র পারমাণবিক বোমা নয়। সেই অস্ত্রের নাম কাহিনী বা বয়ান।

* সাইয়িদা সানা বাতুল  যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাংবাদিক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

১৩ মে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতি হয়। দুই দেশই বিজয় দাবি করে। কিন্তু থেকে যায় দুই পক্ষের তৈরি করা নিজেদের বয়ান—আমরা ঠিক ছিলাম।
১৩ মে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতি হয়। দুই দেশই বিজয় দাবি করে। কিন্তু থেকে যায় দুই পক্ষের তৈরি করা নিজেদের বয়ান—আমরা ঠিক ছিলাম। ছবি: এআই/প্রথম আলো

সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট: ইসরাইলে যুদ্ধাপরাধ করছে নেতানিয়াহুর ‘অপরাধী চক্র’

গাজায় ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করছে। সেখানে ইসরাইল বর্তমানে একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে যার কোনো লক্ষ্য নেই, পরিকল্পনা নেই, সাফল্যের কোনো সম্ভাবনাও নেই। প্রভাবশালী দ্য হারেৎজ পত্রিকায় এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট। তিনি আরও লিখেছেন, ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো এমন উদ্দেশ্যহীন যুদ্ধ চালানো হয়নি। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে থাকা ‘অপরাধী চক্র’ ইসরাইলের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ‘গিডিয়ন’ অভিযানের সুস্পষ্ট ফলাফল হলো গাজা ঘিরে ইসরাইলি সেনাদের বিশৃঙ্খল তৎপরতা। বিশেষ করে সেইসব এলাকায়, যেখানে আমাদের সেনারা আগেও যুদ্ধ করেছে, আহত হয়েছে, প্রাণ দিয়েছে-  অনেক হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে, যাদের মৃত্যু প্রাপ্য এবং বহু নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকেও হত্যা করেছে। এদের সবাই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বেড়ে চলা অকারণ মৃত্যুর পরিসংখ্যানের অংশ হয়ে উঠেছে।

তিনি আরও লিখেছেন, গাজায় সাম্প্রতিক অভিযানের সঙ্গে কোনো বৈধ লক্ষ্যের সম্পর্ক নেই। সরকার সেনাদের পাঠাচ্ছে, আর সেনাবাহিনী তা পালন করছে-  গাজা সিটি, জাবালিয়া এবং খান ইউনুসের আশেপাশে ঘোরাফেরার জন্য। এটা এখন একটা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যুদ্ধ। এর তাৎক্ষণিক ফল হলো গাজাকে এক মানবিক বিপর্যয় অঞ্চলে পরিণত করা। গত এক বছরে ইসরাইল সরকার এবং সেনাবাহিনীর গাজায় কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্বজুড়ে কঠিন অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও আছে। আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় স্তরে বহু বিতর্কে আমি এই অভিযোগগুলোর বিরোধিতা করেছি, যদিও সরকারের সমালোচনা করতেও পিছপা হইনি। আমি বলেছি- হ্যাঁ, অতিরিক্ত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কিন্তু কোনও সরকারি নির্দেশে নির্বিচারে বেসামরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। ফলে আমি বিশ্বাস করতাম, যুদ্ধাপরাধ ঘটেনি। আমি আইনত ‘গণহত্যা’ এবং ‘যুদ্ধাপরাধ’ শব্দদ্বয়ের তাৎপর্যকে গুরুত্ব দিতাম। প্রতিটি মঞ্চে বলেছি- হ্যাঁ, আমাদের উদাসীনতা এবং গাজাবাসীর প্রতি অবহেলা ছিল, কিন্তু তা যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ নয়। কিন্তু এখন আমি আর তা বলতে পারি না। এহুদ ওলমার্ট আরও লিখেছেন, আমরা এখন যে যুদ্ধ চালাচ্ছি তা ধ্বংসাত্মক, অগণতান্ত্রিক, নিষ্ঠুর এবং অপরাধমূলক। এটি কোনও নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে নয়, কোনও ইউনিটের বিচ্যুত আচরণের কারণে নয়। এটি এক সুপরিকল্পিত সরকারি নীতির ফলাফল- জেনে শুনে, মন্দভাবে, দায়িত্বহীনভাবে আরোপিত যুদ্ধ। হ্যাঁ, ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করছে।

তিনি লিখেছেন, প্রথমত, গাজাকে না খাইয়ে মারার নীতি নেয়া হয়েছে। সরকারি নেতারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, আমরা গাজার মানুষকে খাদ্য, ওষুধ, এবং ন্যূনতম মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করছি একটিমাত্র কারণেই: তারা গাজাবাসী, অর্থাৎ ‘সবাই হামাস’। তাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলাই আমাদের উদ্দেশ্য। নেতানিয়াহু এখন এ ধরনের আদেশের দায় এড়াতে তা ঘোলাটে করার চেষ্টা করছেন। তবে তার ঘনিষ্ঠ লোকেরা প্রকাশ্যে গর্বের সঙ্গে বলছেন- হ্যাঁ, আমরা গাজাকে অনাহারে মারবো।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এহুদ ওলমার্ট লিখেছেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার, ডাচ প্রধানমন্ত্রী, ইতালির জর্জিয়া মেলোনি- এরা কেউই ইসরাইলবিরোধী নন, বরং নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে। ম্যাক্রন বলেছেন: আমরা তোমার পাশে থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র রুখেছি, আর তুমি আমাদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বলছ? এখন কানাডা, বৃটেন, ফ্রান্সের মতো ইসরাইলঘনিষ্ঠ দেশগুলো ইসরাইল সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইসরাইলের চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব উঠেছে।
তিনি আরও লিখেছেন, নেতানিয়াহুর এই সরকার বলবে ‘সবাই আমাদের ঘৃণা করে, এরা সবাই ইহুদিবিদ্বেষী।’ কিন্তু না। এই দেশগুলো ইহুদিবিদ্বেষী নয়, তারা ইসরাইলি জনগণের ওপর নেতানিয়াহু সরকারের চাপ এবং নৃশংসতা দেখে আতঙ্কিত। আমি একমত যে, এই সরকার এখন দেশের ভেতরের শত্রু। ইসরাইলের ইতিহাসে এত বড় ক্ষতি আর কেউ করেনি-  না কোনো বাহ্যিক শত্রু, না কোনো যুদ্ধ। এই সরকার সমাজের ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতা-  সব কিছুই নষ্ট করছে। বন্দিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা তো করছে না-ই, বরং ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে, সেনাকে সেনার বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে।

তিনি লিখেছেন, ওদিকে পশ্চিম তীরেও চলছে বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের উপর নৃশংসতা। ‘হিলটপ ইয়ুথ’ নামের চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিদিন অপরাধ করছে-  পুলিশ এবং সেনাবাহিনী চুপচাপ চোখ বুজে থাকছে। যোসি দাগান বলছেন: প্যালেস্টাইনি গ্রামগুলো ধ্বংস করতে হবে। এটি সরাসরি গণহত্যার ঘোষণা। এমনকি সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিটগুলোতেও বহুবার দেখা গেছে-  বেসামরিক মানুষদের ওপর নির্মম গুলিবর্ষণ করতে,  ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে, লুটপাট করতে, সামাজিক মাধ্যমে সেনাদের উল্লাস করতে।
এটা যুদ্ধাপরাধ নয় তো কী?
আমি এখন বিশ্বাস করি- আমরা হয়তো সেদিকেই এগোচ্ছি, যেখানে জাতিগত নির্মূল কথাটাও আর অস্বীকার করার উপায় থাকবে না।
এই যুদ্ধ থামাতে হবে এখনই। না হলে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের কাঠগড়ায় আমাদের দাঁড়াতে হবে  এবং তখন আর কোনো ভালো ব্যাখ্যা থাকবে না। এবার যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। 

mzamin

ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবে ইন্দোনেশিয়া, তবে...

বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়া ইসরাইলকে কূটনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত। তবে শর্ত একটাই, ইসরাইলকে অবশ্যই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বুধবার জাকার্তায় এক সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবায়ো সুবিয়ান্তো। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের উপস্থিতিতে প্রবায়ো বলেন, দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধান এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাই প্রকৃত শান্তির একমাত্র পথ। আমাদের উচিত ইসরাইলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে একইসঙ্গে আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছি- যদি ইসরাইল ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, তখনই ইন্দোনেশিয়া ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত।

উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়া এখনো ইসরাইলকে কোনো ধরনের কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়নি। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান করে আসছে। প্রবায়োর এই বক্তব্য ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক অবস্থানে এক ধরনের সম্ভাব্য পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট প্রবায়োর এ ঘোষণায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।

বিশেষত, মুসলিম বিশ্বের অন্য দেশগুলো যারা এখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের জন্যও এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ফ্রান্সও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে। এ লক্ষ্যে সব ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপকে সমর্থন জানাবে। তিনি বলেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাও সমানভাবে অপরিহার্য। 

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট নিরসনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান চান ফরাসি প্রেসিডেন্ট

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট নিরসনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে মতামত পুনর্ব্যক্ত করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। বুধবার ইন্দোনেশিয়ায় বক্তৃতাকালে এ কথা বলেন তিনি। বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি ফরাসি নীতিতে কোনো দ্বিমুখী নীতি নেই। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, ম্যাক্রনের এই অভিমত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির দিকে ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ম্যাক্রনের বক্তব্য ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দিকেই ঝুঁকছে। যা ইসরাইলকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। এছাড়া পশ্চিমাদের মধ্যে বিভেদ আরও প্রবল হতে পারে। চলতি সপ্তাহে এশিয়ার কয়েকটি দেশ সফর করছেন ফরাসি এই প্রেসিডেন্ট। তার মাঝেই ইন্দোনেশিয়ায় ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধানে দ্বি-রাষ্ট্রের কথা বললেন ম্যাক্রন। কেবল রাজনৈতিক সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ম্যাক্রন বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে আমরা শিগগিরই নিউইয়র্কে গাজা নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করবো, যাতে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও এই অঞ্চলে তাদের শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বসবাসের অধিকারকে নতুনভাবে অগ্রাধিকার দেয়া যায়।

mzamin

ইসরাইলি হামলায় বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ যে দম্পতির

গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে দুর্ভোগের মাত্রা পৌঁছেছে অসহনীয় পর্যায়ে। নেই পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থা। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে গাজার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছেন নিরীহ ফিলিস্তিনিরা। এরই মাধ্যে বাবা-মা না হতে পারার ভয়াবহ বেদনায় ডুবলো ফিলিস্তিনি এক দম্পতি। মা হতে না পারার শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন নোরা। বলেছেন কষ্টের কথা। বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেন, আমার আর কিছুই থাকলো না। আমি নিঃস্ব। ২০২৩ সালে আইভিএফ চিকিৎসার মাধ্যমে গর্ভবর্তী হয়েছিলেন ওই নারী। আইভিএফ হলো কৃত্রিম উপায়ে গর্ভধারণের একধরণের উন্নত চিকিৎসা। গর্ভবতী হওয়ার পর নোরা ও তার স্বামী মোহাম্মদ সিদ্ধান্ত নেন, তারা আল-বাসমা ফার্টিলিটি সেন্টারে আরও দুটি ভ্রুণ সংরক্ষণ  করবেন। যাতে ভবিষ্যতে আরও সন্তান জন্ম দিতে পারেন। নোরা বলেন, আমার মনে হচ্ছিলো এবার আমার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। কিন্তু তা কেড়ে নিয়েছে ইসরাইল। যেদিন তেল আবিবের বাহিনী গাজায় প্রবেশ করলো আমার সেদিনই টের পেয়েছিলাম, খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে। ইসরাইলি বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডবের ফলে অন্য ফিলিস্তিনিদের মতো পালিয়ে বেরিয়েছেন নোরা ও মোহাম্মদ। এছাড়া গর্ভাবস্থায় যে খাদ্য, ভিটামিন ও ওষুধ প্রয়োজন সেগুলোও পাননি নোরা।

তার স্বামী বলেন, ক্রমাগত বোমাবর্ষণের কারণে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেছি। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালিয়েছি। তিনি বলেন, নোরা যখন সাত মাসের গর্ভবতী তখন তার তীব্র রক্তক্ষরণ হয়। তবে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা একটি গাড়িও খুঁজে পাইনি। অবশেষে আমরা নোরাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলেও ইতিমধ্যে তার গর্ভপাত হয়ে যায়। নোরা দুটি বাচ্চা জন্ম দেয়। এর মধ্যে একটি সন্তানের গর্ভাবস্থায় মৃত্যু হয়। জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর মৃত্যু হয় অন্য নবজাতকের। নোরা বলেন, মুহূর্তেই সবকিছু শেষ হয়ে গেলো। জমজ সন্তান হারানোর পাশাপাশি হিমায়িত ভ্রুণও হারান এই দম্পতি। হাসপাতালে থাকা কয়েক হাজার ভ্রুণ নষ্ট করে দেয় ইসরাইলি বাহিনী। আল-বাসমা ফার্টিলিটি সেন্টারের পরিচালক ড. বাহা ঘালাইনি দুঃখভারাক্রান্ত সুরে বলেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শুরুতেই হাসপাতালে থাকা ভ্রুণ নষ্ট করে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ওই হাসপাতালে ৪ হাজার হিমায়িত ভ্রুণ ও কমপক্ষে ১ হাজার শুক্রাণু ও ডিম্বানুর নমুনা রাখা হয়েছিলো। এছাড়া ইসরাইলি হামলায় হাসপাতালের দুটি ইনকিউবেটর নষ্ট হয়। যার মূল্য কমপক্ষে ১০ হাজার ডলার। ড. ঘালাইনি বলেন, ইসরাইলি হামলায় ৪ হাজার ভ্রুণ নষ্ট হয়েছে। এগুলো শুধু সংখ্যা নয়। এগুলো মানুষের স্বপ্ন। কয়েক বছর অপেক্ষা করে, বেদনাদায়ক চিকিৎসা নিয়ে বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন ওই সকল দম্পতি। এক মুহূর্তেই তাদের সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে। তিনি বলেন, এমন শতাধিক নারী আছেন যারা দ্বিতীয় বার আইভিএফ চিকিৎসার মাধ্যমে আর মা হতে পারবেন না। এটি তাদের শেষ সুযোগ ছিলো। এদের মধ্যে কেউ কেউ বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন, কেউ আবার ক্যান্সার আক্রান্ত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) তরফে বলা হয়, হামলার যথাযথ সময় জানানো হলে তারা বিস্তারিত তথ্য দিতে পারবে। আরও বলা হয়, তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কাজ করে এবং বেসামরিক মানুষদের ক্ষতি যাতে কম হয় সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে। এ বছরের মার্চে অধিকৃত ফিলিস্তিনের জন্য জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন অভিযোগ করে যে, ইসরাইল ইচ্ছাকৃত বাসমা আইভিএফ হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ওই ভ্রুণগুলো নষ্ট করে দেয়। যাতে  ফিলিস্তিনিরা সন্তান জন্ম দিতে না পারেন। সংস্থাটির তরফে আরও অভিযোগ করা হয়, ইসরাইল হাসপাতালটিতে নিরাপদে সন্তান প্রসব ও নবজাতকের যত্নে ব্যবহৃত সহায়তা উপকরণ প্রবেশেও বাধা দেয়।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এর জবাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি ওই সংস্থার বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম সমর্থনের অভিযোগ করেন। আইডিএফের এক মুখপাত্র বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ফার্টিলিটি ক্লিনিকে হামলা চালানো হয়নি। আরও বলেন, গাজাবাসীকে সন্তান জন্মে বাধা দেয়ার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। এদিকে ড. ঘালাইনি বলেন, গাজার নয়টি ফার্টিলিটি ক্লিনিকের সবগুলো হয় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে, নাহলে তা পরিচালনার অযোগ্য করে দেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এতে প্রাণ হারায় প্রায় ১২০০ ইসরাইলি। হামাস জিম্মি করে ২৫১ জনকে। প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলও গাজায় পাল্টা হামলা শুরু করে। যা এখনও অব্যাহত আছে। ওই হামলায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

mzamin

‘আবর্জনা থেকে হবে সোনা', জনতাকে বোকা বানালেন মন্ত্রী

এমন একটি মেশিন যা আবর্জনাকে সোনায় পরিণত করে। এটা কোনও গল্পকথা নয়। সেই মেশিন বসানো হবে মিরাটে। উত্তর প্রদেশের পশুপালন মন্ত্রী ধর্মপাল সিং -এর কথা শুনে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে রাজ্যে। যোগীর মন্ত্রীর এমন মন্তব্যে বিতর্ক চরম আকার নিয়েছে। বিরোধী শিবিরের কটাক্ষ, জনতাকে বোকা বোঝানোর সব সীমা পার করেছেন যোগীর মন্ত্রিসভার ওই মন্ত্রী।

ধর্মপাল সিংয়ের এহেন মন্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সাংবাদিক নরেন্দ্র প্রতাপের শেয়ার করা সেই  ভিডিওতে মন্ত্রী ধর্মপাল সিংকে বলতে শোনা যাচ্ছে, নর্দমা পরিষ্কার করার সময় ময়লা তুলে তা সেখানেই ফেলে রাখা হয়। ওই ময়লা পরে আবার নর্দমায় চলে যায়। এই বর্জ্যের উপযুক্ত ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা থাকা উচিত। আমাদের কাছে এমন একটি পরিকল্পনা রয়েছে যেখানে এইসব বর্জ্যকে সোনায় পরিণত করা যাবে। সোনা বানানোর সেই মেশিন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও সেই কাজে ছোট্ট একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তা ঠিক হয়ে গেলেই মিরাটে বসানো হবে মেশিনটি। যখন মেশিন তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে, তখন মিরাটে, আবর্জনা থেকে সোনা তৈরি হবে।'

যদি এটি সত্য হয়, তাহলে জেনেভার বিজ্ঞানীরা তাদের ব্যাগ গুছিয়ে মিরাটে যেতে চাইবেন বর্জ্য ব্যবহার করে কীভাবে সোনা তৈরি করা যায় তার একটি লাইভ ডেমো দেখার জন্য। এই মাসের শুরুতে, ইউরোপীয় নিউক্লিয়ার রিসার্চ অর্গানাইজেশন - যা CERN নামে বেশি পরিচিত রিপোর্ট করেছিল যে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে "উচ্চ-শক্তির সীসা নিউক্লিয়াসের মধ্যে সংঘর্ষে তীব্র তড়িৎ চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয় যা প্রোটনকে ছিটকে দিতে পারে এবং সীসাকে ক্ষণস্থায়ী পরিমাণে সোনার নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত করতে পারে।

তবে, সেটা ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত ছিল। যোগীর মন্ত্রীর বক্তব্য বিজ্ঞানের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব বলেন, ‘মন্ত্রী মশাইয়ের কাছে অনুরোধ তিনি প্রথমে কনৌজে গরুর দুধ বিক্রির ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে চাষিদের আয়বৃদ্ধির ব্যবস্থা করুন। তারপর না হয় আবর্জনা থেকে সোনা তৈরি করবেন।’

পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, ‘বিজেপির নেতারা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন কে কতবড় মিথ্যা বলতে পারেন।’

এর আগে ২০১৯ সালে একটি সভায় বঙ্গের বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, “ভারতীয় গরুর বৈশিষ্ট্য, তার দুধের মধ্যে সোনার ভাগ থাকে। তার জন্য দুধের রঙ একটু হলদেটে হয়।”

সূত্র : দ্য হিন্দু

mzamin

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ: ট্রাম্পের বক্তব্যে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ ঝুঁকি বাড়ছে

ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অংশ না নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘আগুন নিয়ে খেলছেন’। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের এমন মন্তব্য আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গত মঙ্গলবার রাতে তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে ‘সত্যিকার অর্থেই খারাপ’।

সম্প্রতি পুতিনকে উদ্দেশ করে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি হস্তক্ষেপ না করলে রাশিয়ায় ইতিমধ্যে সত্যিই ভয়াবহ কিছু ঘটে যেত।

ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের জবাবে এক্সে (সাবেক টুইটার) দিমিত্রি মেদভেদেভ লিখেছেন, ট্রাম্প পুতিনের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ এবং রাশিয়ায় ‘সত্যিই খারাপ ঘটনা’ ঘটা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। ‘আমি একটাই সত্যিকারের ভয়াবহ ঘটনা বুঝি। আর সেটা হলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আশা করি ট্রাম্প বিষয়টি বুঝতে পারবেন।’

ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আহ্বান জেলেনস্কির

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সংলাপে বসতে চান।

গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করার সময় জেলেনস্কি এসব কথা বলেন। জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিন যদি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, অথবা সবাই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক চান, তাহলে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি যেকোনো ধরনের বৈঠকের জন্য প্রস্তুত।’

জেলেনস্কি বলেন, ‘রাশিয়া না থামলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। আমরা তাঁর সঙ্গে দুটি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি—জ্বালানি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র এই দুই খাতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে কি না, আমি সেটা চাই।’

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি অঞ্চলে ৫০ হাজারেরও বেশি সেনা জড়ো করছে রাশিয়া। ওই এলাকায় মস্কোর সেনাবাহিনী বেশ কিছু বসতি দখল করেছে। ইউক্রেনের অভ্যন্তরে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরি করতে রাশিয়া এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

ক্রেমলিনের বক্তব্য

জেলেনস্কির ত্রিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করেছেন দিমিত্রি পেসকভ। গতকাল বুধবার তিনি বলেন, কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে ‘সুস্পষ্ট চুক্তি’ হলেই পুতিন, জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের মধ্যে একটি বৈঠক হওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, ‘(রুশ ও ইউক্রেনীয়) প্রতিনিধিদলের মধ্যে নির্দিষ্ট চুক্তি হলেই কেবল এ ধরনের বৈঠক হতে পারে।’

বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারে পেরুর মমি রহস্যে নয়া মোড়

পেরুর নাজকা মরুভূমিতে আবিষ্কৃত রহস্যময় ‘এলিয়েন’ মমিগুলোকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী তদন্তকারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, মমিকৃত শরীরগুলোকে খুন করা হয়েছিল। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন মোতাবেক, ২০১৭ সালে ওই ২১টি মমি আবিষ্কৃত হয়েছিল। যদিও অনেকেরই দাবি ছিল, এগুলো নকল। কেউ কেউ বলেন, সম্ভবত পশুদের অস্থি, কাগজ ও আঠার মণ্ড মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই ‘পুতুল’গুলো। আবার এদের হাতে তিনটি করে আঙুল ও লম্বা মাথার খুলি দেখে অনেকেই তাদের ভিনগ্রহী প্রাণীও বলেন। যদিও পরে বিজ্ঞানীরা খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে দাবি করেন, এগুলি মোটেই নকল নয়, ‘আসল’! এবং এগুলো ১২০০ বছর আগের মমি। কিন্তু এরা আদপে কোথাকার বাসিন্দা ছিল সেসব জানা যায়নি।

এগুলো কি মানুষ, নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী? ২০২৫ সালে এসেও যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। এর মধ্যেই মমি রহস্যে নয়া মোড়। বলা হচ্ছে, ওই মমিকৃত শরীরগুলোতে যে চিহ্ন মিলেছে তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, অত্যন্ত নৃশংসভাবে আঘাত করা হয়েছিল তাদের

উল্লেখ্য, সাংবাদিক এবং ইউফোলজিস্ট জেইম মাউসান নাজকা মরুভূমিতে এই রহস্যময়, মমিকৃত মৃতদেহগুলো আবিষ্কার করেছিলেন। প্রাথমিক ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এগুলি আংশিকভাবে মানুষ এবং আংশিকভাবে ‘অজানা প্রজাতি’, যা মেক্সিকোর ইউএফও সম্পর্কে প্রথম কংগ্রেসনাল শুনানির সূত্রপাত করে।

তবে, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা তাদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এখন, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে মমিগুলো আসল। যদিও তাদের উৎপত্তি অজানা তবুও মারিয়া, মন্টসেরাট এবং অ্যান্টোনিও নামে তিনটি মমির বিশদ গবেষণা থেকে জানা যায় যে, তারা হয়তো সহিংস মৃত্যুর শিকার হয়েছিলো।

মেক্সিকান নৌবাহিনীর চিকিৎসা বিভাগের প্রধান বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক  পরিচালক ড. জোসে জালস বলেছেন যে, তিনি ২১টি রহস্যময় মমিকৃত মৃতদেহের গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। ৩৫-৪৫ বছর বয়সী ৫'৬" উচ্চতার একজন নারী মারিয়াকে পরীক্ষা করে গুরুতর আঘাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মারিয়ার শরীরে তার নীচের পেলভিসে গভীর কাটা এবং কামড়ের চিহ্ন দেখা গেছে, পাশাপাশি তার নিতম্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হাড়ে একাধিক ছোট ছোট ক্ষতও দেখা গেছে। ওই স্থানের চামড়া এবং চর্বি অপসারণ করা হয়েছে এবং মেরুদণ্ডের হাড়ের দুটি কশেরুকা ভাঙা ছিল। ক্ষত থেকে বোঝা যায় যে, তিনি সম্ভবত একটি পাহাড় থেকে পাথরের উপর পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। এই অনুসন্ধানগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, মারিয়ার মৃত্যু সম্ভবত সহিংস এবং আঘাতমূলক ছিল।

ইতিমধ্যে, ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী মন্টসেরাটের সিটি স্ক্যানে পঞ্চম এবং ষষ্ঠ পাঁজরের মাঝখানে বুকে একটি ক্ষত দেখা গেছে। স্ক্যানে উল্লেখযোগ্য, দীর্ঘস্থায়ী আঘাতের প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো গভীর আঘাত থেকে স্ক্যাপুলা এবং পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়েছিলো। মারিয়ার মতো, মন্টসেরাটেরও স্বতন্ত্র শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছিল, যার মধ্যে ছিল একটি লম্বা মাথার খুলি, তিনটি করে হাতের আঙুল ও পায়ের আঙ্গুল এবং হৃদপিণ্ড, লিভার এবং অন্ত্রের মতো অক্ষত অভ্যন্তরীণ অঙ্গ। পেরুর মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ডা. ডেভিড রুইজ ভেলা অ্যান্টোনিওর পরীক্ষা করে বুকে মারাত্মক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পান। ছুরিকাঘাতটি বুক, পেট এবং লিভারে প্রবেশ করে।

ডা. ভেলার মতে, আঘাতটি গুরুতর ছিল, যার ফলে শরীরে অভ্যন্তরীণভাবে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছিল। এই অনুসন্ধান থেকে আরও বোঝা যায় যে অ্যান্টোনিওর মৃত্যু একটি হিংসাত্মক আক্রমণের ফলে হতে পারে। এসব দেখে ড. জালস বলেছেন, ‘এগুলো আরও স্পষ্ট এবং অকাট্য প্রমাণ দেয় যে এই দেহগুলো ১০০% খাঁটি, বাস্তব এবং একসময় জীবিত ছিল।’

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক ফরাসি চিকিৎসকের ২০ বছরের জেল

শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক এক ফরাসি চিকিৎসককে ২০ বছরের জেল দিয়েছে দেশটির আদালত। অভিযুক্ত ওই চিকিৎসকের নাম জো লে স্কুয়ার্নেক (৭৪)। তার বিরুদ্ধে ১৯৮৯-২০১৪ সালের মধ্যে কয়েকশ রোগীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। যার মধ্যে বেশিরভাগই শিশু। মার্চে নিজের বিরুদ্ধে আনা ওইসব অভিযোগ স্বীকার করেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ওই চিকিৎসক বর্তমানে কারাগারে আছেন। ২০২০ সালে চার শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে তার দুই ভাগ্নিও ছিলো। তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। শিশু বয়সে তারা যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তা তাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে সে বিষয়ে বলেছেন তারা। মার্চে ওই চিকিৎসক ২৯৯ রোগীকে যৌন নির্যাতন করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি তার ডায়েরিতে হেনস্থার বিষয়ে লিখে রাখেন। সেখান থেকে তথ্য নিয়ে পুলিশ ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করেছে। এদের অনেকের অবশ্য ধারণাই নেই তাদের সঙ্গে কী হয়েছে। কারণ রোগীদেরকে অ্যানেস্থেসিয়া দেয়ার সময় বা অস্ত্রপচারের পর তাদেরকে যৌন নির্যাতন করতেন ওই চিকিৎসক।

এদিকে গত সপ্তাহে আদালতে অনুতপ্ত হন লে স্কুয়ার্নেক । তিনি বলেছেন, আমি নিজের দিকে তাকাতে পারিনা। এটি ভেবেই লজ্জিত যে, আমি একজন শিশু নির্যাতনকারী। তিনি আরও বলেছেন, আমি কোনো সহানুভূতি চাইনা। এই মাসের শুরুতে ওই চিকিৎসক বলেছেন, দুই ভুক্তভোগীর মৃত্যুর জন্য তিনি দায়ী। শিশু বয়সে যৌন হেনস্তার শিকার হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি দুইজন ভুক্তভোগী। এর পরিপ্রেক্ষিতে আত্মহত্যা করেছেন তারা। চার বছর আগে মারা গেছেন এমন একজন হলেন ম্যাথিয়াস ভিনেট। চিকিৎসকের ডায়েরিতে তার নাম আছে এ তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর নাতির হেনস্তা হওয়ার বিষয়টি বিবিসিকে জানান তার দাদা। পনেরো বছর ধরে শিশু নির্যাতন করেও পার পেয়ে যাওয়ার কারণে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এছাড়া ২০০৫ সালে শিশু নির্যাতনের ছবি ডাউনলোড দেয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলেও তাকে কেন শিশুদের চিকিৎসা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়নি এ নিয়েও তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়। এদিকে এ বিষয়ে রাজনীতিবিদরা তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের একটি দল। তারা বলেন, এ থেকে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করা হয়নি।

mzamin

সমাবেশটি আগের মতো ছুটির দিনেও হতে পারতো by রাফসান গালিব

দুপুর থেকে গোটা কাওরানবাজার এলাকাটি  স্থবির হয়ে আছে। কোনো গাড়ি চলছে না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চললেও একটু এগোচ্ছে তো, আবার থেমে যাচ্ছে। প্রখর রোদ ও প্রচণ্ড গরমে গণপরিবহনের ভেতরে মানুষ ঘেমেনেয়ে একাকার। অনেকে যানবাহন থেকে নেমে হাঁটা ধরেছে।

কাওরানবাজারের পূর্ব দিকে হাতিরঝিলের মুখের সামান্য আগে নেমেছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। সেখান থেকে শুরু করে মগবাজার এলাকায়ও একই পরিস্থিতি; বরং আগে যে পরিস্থিতি কখনো দেখা যায়নি, তা হলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপরে পার্কিং করে রাখা বাস। মূলত যানজটের কারণে বাসগুলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপরেই আটকে পড়েছিল। যাই হোক, ফলে কয়েক ঘণ্টা ধরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটিও অনেকটা স্থবির হয়ে যায়।

রাজধানী ঢাকা শহর কখন কী কারণে এমন স্থবির হয়ে যায়, রাস্তায় নামা ছাড়া তা বোঝা মুশকিল। তবে যে কেউ ধারণা করে নেন যে হয়তো কোথাও আন্দোলন-মিছিল বা দাবি আদায়ের কর্মসূচিতে রাস্তা আটকে রাখা হয়েছে। এটিই যেন এ শহরের ‘স্বাভাবিক’ চিত্র। এ কারণে যে দিনের পর দিন দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় ঢাকাবাসীকে, তা–ও যেন গা–সওয়া হয়ে গেছে বলা যায়; কিন্তু কথা হচ্ছে, এভাবে একটি রাজধানী শহর কীভাবে চলতে পারে?

আজকের পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, সকালে জামায়াতে ইসলামী নেতা আজহারুল ইসলামের মুক্তির পর জামায়াতের সমাবেশ ছিল। সেখানে দলটির বিপুলসংখ্যক নেতা–কর্মী জড়ো হয়েছিলেন। ফলে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় যানজট তৈরি হয়। তবে বেলা গড়াতে না গড়াতে সেই যানজটের তীব্রতা মিরপুর ও উত্তরার কিছু এলাকা ছাড়া গোটা রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে মূলত বিএনপির তারুণ্যের সমাবেশের কারণে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী এই সমাবেশে ঢাকা, সিলেট, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ থেকে ১৫ লাখ তরুণের জমায়েত হওয়ার কথা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর আটকে থাকা গাড়িগুলো মূলত বিএনপির সমাবেশে কর্মীদের নিয়ে আসা বাস। সারি সারি বাসগুলো থেকে বিএনপি কর্মীরা নেমে পড়ছেন এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে হেঁটেই নেমে আসছেন মূল রাস্তায়।

এ লেখা যখন লিখছি, তখন কার্যদিবস শেষ। মানুষ অফিস থেকে বের হয়ে আসছেন। এর মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কাওরানবাজার এলাকা তখনো অনেকটা স্থবির। জামায়াতের সমাবেশ শেষ দুপুরের আগে, অর্থাৎ সকাল সাড়ে ১০টার আগেই; আর বিএনপির তারুণ্যের সমাবেশ শুরু হয়েছে বেলা দুইটার পর। বিকেল পাঁচটায় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ধারণা করি প্রায় সন্ধ্যাই হবে। এরই মধ্যে সমাবেশে আগত লাখ লাখ মানুষ ফিরতে শুরু করবেন। একই সময়ে রাজধানীর লাখ লাখ কর্মজীবীর ঘরে ফিরবেন। স্বাভাবিক কর্মদিবসেই যানজটের কারণে অনেক কর্মজীবীই ঠিক সময়ে ঘরে ফিরতে পারেন না। আর আজকের কথা ভাবুন তো!

রাজধানীতে বিএনপির আগের বড় সমাবেশগুলো নিয়ে যে প্রচার–প্রচারণা দেখা গিয়েছিল, আজকের কর্মসূচি নিয়ে সেটি তেমন ছিল না। ফলে অনেক মানুষ জানতেনই না যে আজকে বড় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ আছে। বিষয়টি জানা থাকলে সে মোতাবেক দিনের প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন অনেকে।

বিষয়টি এমন নয় যে বিএনপির কারণে রাজধানীবাসী আজ সারা দিন চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, সেই করুণ অবস্থা চিত্রায়িত করতেই এ লেখার উদ্দেশ্য। এটি শুধু বিএনপি বা জামায়াতের সমাবেশের বিষয় নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষয়।

গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াত বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা-সমাবেশে নানা বাধার মুখে পড়তে হতো। সে সময় সমাবেশের অনুমতি নিতে কী পরিমাণ টালবাহানার শিকার হতে হয়েছে আমরা দেখেছি!

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগের মাসে ডিসেম্বরে বিএনপি পল্টন ময়দানে মহাসমাবেশের কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। পল্টনে সেই সমাবেশ তো করতে দেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার, তার আগেই পুলিশের বাধা ও বিএনপি নেতা–কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন বিএনপির কর্মী নিহত হয়েছিলেন। এরপর গোলাপবাগে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ২৬টি শর্তে। চারদিক থেকে সরকারের তীব্র বাধা সত্ত্বেও সমাবেশের আগের দিন রাতেই গোলাপবাগ মাঠ ভরে গিয়েছিল বিএনপির নেতা–কর্মীতে। আর পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী মহাসমাবেশ তো হলোই। দিনটি ছিল শনিবার।

হ্যাঁ, সবার স্মরণে থাকার কথা। বিএনপি তখন ভোটের অধিকার রক্ষা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন শুরু করেছিল দেশজুড়ে। রাজধানীতে একের পর এক মহাসমাবেশের ডাক দিয়ে যাচ্ছিল। সেসব কর্মসূচি থাকত হয় শুক্রবার, নয়তো শনিবার।

২০২৩ সালের ১২ জুলাই, ২৭ জুলাই, ২৮ অক্টোবর এবং এরপর ১০ ডিসেম্বর—এসব তারিখে আয়োজিত প্রতিটি মহাসমাবেশে রাজনৈতিক জোয়ার ফিরে পেয়েছিল বিএনপি। এসব তারিখের প্রতিটি দিন ছিল শুক্রবার বা শনিবার। পাঠক, পুরোনো ক্যালেন্ডার ধরে তারিখ ঘেঁটে দেখতে পারেন।

ফ্যাসিবাদী সরকারের চাপ ছাড়াও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কর্মসূচি ফেলার বিএনপির একটি উদ্দেশ্য ছিল সমাবেশে দলীয় নেতা–কর্মী ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা, অফিস বা ব্যবসার ব্যস্ততা ছাড়াই ছুটির দিনে সবাই যেন সমাবেশে যোগ দিতে পারেন; সেই সঙ্গে কর্মদিবসে সমাবেশের আয়োজন করে মানুষকে দুর্ভোগের মুখে না ফেলা।

বিএনপি মনে করেছিল, কর্মদিবসে কর্মসূচি করলে তারা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি হারাতে পারে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের কাছেও সেটি হতো তখন রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার। সে সময় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যগুলো খেয়াল করলেও সেটি স্পষ্ট হয়।

এখন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ আয়োজনে কোনো বাধানিষেধ নেই; কিন্তু বিএনপি রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে সুন্দর চর্চা তৈরি করেছিল, সেটি থেকে কেন বিচ্যুত হলো? এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় দল হিসেবে বিএনপি যদি এই চর্চা অব্যাহত রাখত, বাকি দলগুলোর মধ্যেও বিষয়টি অনুসরণীয় হতো নিঃসন্দেহে। রাজনৈতিক দলগুলোরই তো সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করার কথা—মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে তো আসলে রাজনীতি হয় না। মানুষও সেই রাজনীতি কখনো পছন্দ করে না।

রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করা যেকোনো রাজনৈতিক দলের অধিকার। সংবিধানেও সেই অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সেখানে জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য কর্মসূচির আগে প্রশাসন বা পুলিশ থেকে অনুমতি নেওয়ারও একটি নিয়ম আছে। সরকার নিজ থেকে বাধা তৈরি না করলে সাধারণত সেই অনুমতি খুব একটা সমস্যা হয় না কারও।

আর আমরা এ–ও চাই না, সরকার বা পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির আয়োজনে বাধা দেবে বা অনুমতি দেবে না; কিন্তু জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে তারা চাইলে কর্মদিবসে বড় সভা-সমাবেশ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

আর রাজনৈতিক দলগুলো তো বলেই থাকে, তারা রাজনীতি করে মানুষের কল্যাণের স্বার্থে। তো, তারাও কেন কর্মদিবসের ক্ষেত্রে বড় কর্মসূচির ঘোষণা করতে সেই বিবেচনা করবে না?

* রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)