Thursday, December 31, 2009

সালমা সোবহান স্মরণে -শ্রদ্ধাঞ্জলি by ইলা চন্দ

সালমা সোবহানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। অনেক গুণের অধিকারিণী ছিলেন সালমা সোবহান। তিনি ছিলেন একজন গবেষক, একজন শিক্ষক, বাংলাদেশের প্রথম নারী ব্যারিস্টার, সমাজসেবী, জনদরদি অথচ ছিলেন ভীষণভাবে একজন নিভৃতচারী মানুষ। কোনো কাজ করে তার প্রচার একদম পছন্দ করতেন না। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ বছর কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এ সম্পর্কে দু-চারটা কথাই এখানে লিখছি।
১৯৯০ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) কাজে আমি যখন যোগ দিই, অফিসে তখন ফোন ছিল না। সালমা সোবহান চলে যেতেন অফিসের চারতলা থেকে নেমে রাস্তার পাশের একটি হোটেল থেকে ফোন করতে। নিজেই শুধু যেতেন না, আমাদেরও অনুরোধ করে পাঠাতেন। তখন খুবই বিরক্ত হতাম। সবে ছাত্রজীবন, ছাত্ররাজনীতি শেষ করে চাকরি করতে এসেছি, এ ধরনের কাজ ভালো লাগত না সব সময়। আজ মনে হয়, কত বিশাল একজন মানুষ ছিলেন তিনি, কত বড় নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন; তাই রাস্তার পাশের হোটেলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ফোন করতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। বিভিন্ন বস্তিতে গিয়ে সালমা সোবহান, হামিদা হোসেন (আসকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য) নারীদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন। সেখানে তখন আজকের মতো না বসার সুব্যবস্থা ছিল, না ছিল কথা বলার মতো কোনো পরিবেশ। পিঁড়িতে বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। যার ফসল আজকের আইন ও সালিশ কেন্দ্র—দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা কেন্দ্র, যার কিনা রয়েছে ১৭টি ইউনিট। আইনি সহায়তা, আইনগত সচেতনতা, গবেষণা, প্রকাশনা, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে গিয়ে আইনগত সহায়তা দেওয়া, পথশিশুদের নিয়ে কাজ করাসহ মানবাধিকার-সম্পর্কিত অনেক কাজ।
সবাইকে আইনগত সহযোগিতা দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু মানুষের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণার কথা শুনে, সান্ত্বনা দিয়ে পাশে বসিয়ে আপনজনের মতো করে কথা বলে ও শুনে কিছু সময়ের জন্য হলেও তাদের কষ্ট লাঘব করা যায়—এ কথা সালমা সোবহান সব সময় বলতেন। কোনো মক্কেলের সঙ্গে যেন কেউ খারাপ ব্যবহার না করে, উচ্চ স্বরে কথা না বলে, এদিকটায় তিনি খুবই খেয়াল রাখতেন। কোনো আইনজীবীর জোরে কথা শুনলে আস্তে গিয়ে পাশে বসতেন বা বলতেন, কোনো জটিল সমস্যা! অর্থাত্ তাঁর উপস্থিতিতে আইনজীবীরা বুঝে যেতেন, কেন তিনি এসেছেন। শুধু তা-ই নয়, আসকের প্রথম দিকে যখন তেমন কোনো ফান্ড ছিল না—আপাদের বাসার আসবাব, বই ও পেপার নিয়ে এসে কাজ শুরু হয়, তখন আপা তাঁর দুপুরের খাবারও অনেক সময় মক্কেলদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। কোনো গরিব মক্কেল দুপুরের খাবারের সময় থাকলে সালমা আপা বলতেন, তাঁর সঙ্গে আমাদের খাবার একটু শেয়ার করি। পরে যখন আসকের ক্যান্টিন হলো, তখন প্রতিদিন কয়েকজন মক্কেলের খাবারের ব্যবস্থা করেন, যা কিনা আজও চালু আছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার সালমা সোবহান ১৯৮৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। পুরো সময় ছো্ট্ট একটি কক্ষে বসে কাজ করে গেছেন নীরবে। মাত্র ৬৬ বছর বয়সে ২০০৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সালমা সোবহান শুধু আমাদেরই পথপ্রদর্শক ছিলেন না, ছিলেন এ দেশের মানবাধিকার আন্দোলনের পথিকৃত্ এবং বিরল মানবিক গুণসম্পন্ন, অনুসরণযোগ্য একজন মানুষ। বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা অটুট থাকুক—আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

রহস্যময় হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন জ্যাকব by আব্দুল কাইয়ুম

‘আমি জেনারেল নিয়াজিকে ৩০ মিনিট সময় দিয়ে বললাম, এই আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করতে রাজি কি না...।’ কথাগুলো কানে আসতেই আমি ত্বরিত বেগে ফিরে তাকাই। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবকে ঘিরে তন্ময় হয়ে সবাই শুনছেন তাঁর কথা। গত ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে রয়েল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবে সামরিক টাট্টু ও ব্যান্ড প্রদর্শনীতে আমরা গিয়েছি। সেখানে এসেছেন ৮৬ বছরের প্রাণোচ্ছল, চিরসবুজ জেনারেল জ্যাকব। একাত্তরের স্মৃতিতে হঠাত্ তিনি জ্বলে উঠলেন। মুখে এক দ্যুতিময় রহস্যের হাসি ছড়িয়ে রাখলেন।
প্রতিবছরের মতো এবারও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে কলকাতায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমাদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আইনুদ্দিন, বীর প্রতীক এবং সেনাবাহিনীতে বর্তমানে কর্মরত মেজর জেনারেল আবদুল মতিন। অপেক্ষাকৃত তরুণ ক্যাপ্টেন শাহ আসলাম পারভেজ ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এ কে এম সোলায়মানও ছিলেন। নেতৃস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এজাজ আহমেদ চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জালাল আহমেদ সিদ্দিকী, কর্নেল বজলুল গনি পাটোয়ারী, কর্নেল আমিনুল ইসলাম, মেজর ওয়াকার হাসান, মুক্তিযুদ্ধের সময় মেলাঘর বিশ্রামগঞ্জ ফিল্ড হাসপাতালের মেডিকেল কর্মী মিনু হক, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যসচিব এমদাদ হোসেনসহ আরও কয়েকজন। মূল অনুষ্ঠান ১৬ ডিসেম্বর। তার আগেই জেনারেল জ্যাকবের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, ভাবিনি।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি বাহিনী কীভাবে আত্মসমর্পণ করে, সে কথা বহুবার বহু কথায় উচ্চারিত হয়েছে। জেনারেল জ্যাকবও তাঁর লেখা সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব এ নেশন বইয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। জেনারেল নিয়াজিকে জেনারেল জ্যাকব ৩০ মিনিট সময় দিয়েছিলেন মন স্থির করার জন্য। ফিরে এসে তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, জেনারেল সাহেব, আপনি কি এই দলিল গ্রহণ করছেন? তিনবার জিজ্ঞেস করলেন। কোনো উত্তর নেই। জেনারেল জ্যাকব দলিলটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘আমি ধরে নিচ্ছি, আপনি এটি গ্রহণ করছেন।’ জেনারেল নিয়াজির শেষ ইচ্ছা ছিল ঢাকা অফিসে আত্মসমর্পণ করার। কিন্তু জেনারেল জ্যাকব রাজি হননি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উন্মুক্ত মাঠে সবার সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। জনসমক্ষে আত্মসমর্পণের উদাহরণ ইতিহাসে অদ্বিতীয়। পরে পাকিস্তানে হামুদুর রহমান কমিশনের কাছে জেনারেল নিয়াজি বলেন, জেনারেল জ্যাকব ধোঁকাবাজি (ব্ল্যাকমেইল) করে তাঁকে আত্মসমর্পণে রাজি করিয়েছিলেন!
সেদিন টার্ফ ক্লাবে জেনারেল জ্যাকবের কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ল তাঁর বইয়ের ঐতিহাসিক বিবরণীগুলো। আমি এগিয়ে যাই তাঁর দিকে। বাংলাদেশের সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় পেয়ে তিনি আনন্দে উদ্ভাসিত হলেন। জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৩৮ বছর পর আপনার অনুভূতি কী? তিনি বললেন, ‘আমি বাংলাদেশের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি। বাংলাদেশের উন্নয়ন দ্রুততর হোক। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করি।’
পরদিন ১৬ ডিসেম্বর সকালে ছিল ফোর্ট উইলিয়ামের বিজয় স্মারক প্রাঙ্গণে বিজয়োত্সবের মূল অনুষ্ঠান। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি-ইন-চিফ লে. জেনারেল ভি কে সিংয়ের আমন্ত্রণে আমরা সেখানে যাই। বাইবেল, পবিত্র কোরআন শরিফ, গীতা ও ত্রিপিটক ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্মারকস্তম্ভে প্রথমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে মাল্যদান করা হয়, এরপর অন্যরা। দুপুরে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে জেনারেল ভি কে সিং ও জেনারেল জ্যাকব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধিদলের সদস্যদের হাতে উপহারসামগ্রী তুলে দেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও তাঁদের হাত তুলে দেওয়া হয় বন্ধুত্বের আবেগসিক্ত উপহার।
আমরা যখন কলকাতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামছি, তখন থেকেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালালউদ্দিন বারবার আমাকে বলছিলেন, একটু ভালোভাবে লক্ষ করে দেখবেন একটি গণতান্ত্রিক দেশের সেনাবাহিনীর বৈশিষ্ট্যগুলো। বিমানবন্দরেই তার কিছুটা প্রমাণ পেলাম। আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার গৌতম দেবসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁরা কিন্তু খুব সাধারণ, সাদাসিধে ধরনের মানুষ। বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীরা যেমন, আমাদের প্রতিনিধিদলও প্রায় তেমনিভাবেই যাই। সেখানে অভ্যর্থনার বাড়তি লোক দেখানো আয়োজন যেমন নেই, তেমনি নেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।
গণতান্ত্রিক সেনাসংস্কৃতির আরও পরিচয় পেলাম ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আর্মি অফিসার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত মিলিটারি ব্যান্ড কনসার্ট ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে। একাত্তরে বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনী হিসেবে যুদ্ধে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর যে সদস্যরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই সেখানে ছিলেন। এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর গোপালকৃষ্ণ গান্ধী ও মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অবাক লাগল এ জন্য যে আর কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে সেখানে দেখিনি। এ ব্যাপারে আমি ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি-ইন-চিফ লে. জেনারেল ভি কে সিংকে জিজ্ঞেস করি, মন্ত্রীরা কেন নেই। আমাদের দেশে তো এ ধরনের অনুষ্ঠানে সবাই আসেন। তিনি বললেন, সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তবে সাধারণত গভর্নর ও মুখ্যমন্ত্রী ছাড়া অন্যরা আসেন না। তিনি জানান, এ ধরনের অনুষ্ঠানের পুরো কর্মসূচি প্রণয়ন ও অনুষ্ঠান পরিচালনার খুঁটিনাটি ইস্টার্ন কমান্ড নিজেরাই করে থাকে। সেখানে সরকার বা অন্য কোনো অংশের সংশ্লিষ্টতা থাকে না। তিনি অবশ্য বলেন, যদি মন্ত্রী ও অন্য সরকারি কর্মকর্তারা আসতেন, তাহলে ভালোই হতো। তাঁরাও বিজয় উত্সবের এই মহান আয়োজনের অংশীদার হতে পারতেন। কিন্তু প্রথাগতভাবেই তাঁরা সামরিক সংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে থাকেন।
রাজনৈতিক সরকার বা দলীয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাহীন সশস্ত্র বাহিনীই একটি গণতান্ত্রিক দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ভারতে এ প্রথাটি খুব যত্নের সঙ্গে অনুসরণ করা হয় বলেই দীর্ঘ ৬২ বছরের ইতিহাসে ভারতের রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপ ঘটেনি। অনেক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো ঘটনা। একের পর এক সেনা হস্তক্ষেপে পাকিস্তানে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। নানা রকম সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তত্পরতায় জর্জরিত দেশটির অস্তিত্বই আজ বিপন্ন। বাংলাদেশেও প্রথম দিকে রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে। দুবার সামরিক শাসন চেপে বসেছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে অবশ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারা ফিরে এসেছে। একে স্থায়ী রূপ দিতে পারলে আমাদের দেশে গণতন্ত্র পরিপুষ্ট হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
সন্ধ্যার সেই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে কথা হলো ব্রিগেডিয়ার এ এস ব্রার-এর সঙ্গে। তিনি একাত্তরের ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লার লালমাই ঘাঁটি দখলে নেতৃত্ব দেন। সেই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের স্মৃতিচারণা করছিলেন তিনি। ত্রিপুরা থেকে লালমাই পার হয়ে চিটাগাং-ঢাকা রোড ধরে দাউদকান্দি পর্যন্ত যান। পরে আবার ফিরে আসেন কুমিল্লায়। লালমাই দখলের যুদ্ধে অনেক ভারতীয় সেনাসদস্য প্রাণ দান করেন। তাঁদের স্মৃতিতে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। কর্নেল এস আর ভট্টাচার্যের সঙ্গেও কথা হলো। একাত্তরে ছিলেন ক্যাপ্টেন। মূলত গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতেন। তিনি ৯০০ মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের বালুরঘাট সীমান্ত পার হয়ে তিনি বাংলাদেশে ঢোকেন। দুবার বালুচ রেজিমেন্ট সদস্যদের হাতে ধরা পড়লেও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তিনি তাদের হাত গলে বেরিয়ে আসেন। ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনেকের সঙ্গে তিনিও উপস্থিত ছিলেন।
কর্নেল সন্তোষ সরকার এক চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার কথা বললেন। তিনি ও কর্নেল দাস ১৩ ডিসেম্বর একটি বাহিনী নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হন। আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে নরসিংদী। ১৮ ডিসেম্বর রাতে তাঁরা পৌঁছান ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমানে শেরাটন) হোটেলে। পেট চোঁ চোঁ করছে। দুই দিন প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি। খাবারের খোঁজে তাঁরা বেরোলেন। হোটেল সাকুরার পাশের গলিতে একটু এগিয়ে তাঁদের চোখে পড়ল একটি সাইনবোর্ড: ‘শনিবারের বিশেষ আকর্ষণ—ভুনা খিচুড়ি ও হাঁসের মাংস!’ সেদিনের সেই উপাদেয় খাবারের স্বাদ আজও তিনি ভোলেননি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর এক হাজার ৪২১ জন আত্মদান করেন। আহত হন চার হাজার ৫৮ জন। অবশ্য বিভিন্ন গবেষণায় ভারতীয় পক্ষের হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই বিজয়ের মাসে আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

জলবায়ু শরণার্থী ও বাংলাদেশ by আশরাফ মাহমুদ দেওয়ান

পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন সারা বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিনিয়ত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ফলে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রসহ বাংলাদেশের জন্য তাপমাত্রার বৃদ্ধি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণায় এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে জলবায়ুর পরিবর্তন বিভিন্ন সেক্টরকে প্রতিঘাত করবে, যার মধ্যে একটি হচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি। বাংলাদেশ একটি বিশাল জনসংখ্যার দেশ হওয়ায় জলবায়ুর নিয়ামকগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি চলকের পরিবর্তন অবশ্যই গত কয়েক শ বছরের প্রচলিত জীবিকার ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করবে। যেমন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় তিন কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব দ্রুততর হবে, অন্যদিকে জনসংখ্যার বাস্তুচ্যুতির বিষয়টিও তীব্রতর হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কাদের ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলব? এমনিতেই জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপের দরুন বাংলাদেশে গ্রামীণ মানুষের নগর-অভিগমনের হার অত্যন্ত বেশি। এর সঙ্গে আবার যোগ হয় বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগসৃষ্ট অভিগমন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বড় বড় শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যান্য কারণের মধ্যে অন্যতম হলো দুর্যোগসৃষ্ট মানুষের স্থানচ্যুতি।
১৯৫৮ সাল থেকে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ শব্দটি ব্যবহূত হয়ে আসছে। আবার কোনো কোনো গবেষক এবং বিজ্ঞানী ‘জলবায়ু শরণার্থী’ শব্দটির পরিবর্তে পরিবেশগত কারণে বাস্তুভিটা হারানো মানুষকে ‘পারিবেশিক উদ্বাস্তু’ ‘পারিবেশিক অভিবাসী’, ‘পারিবেশিক বাস্তুহারা’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলতে যেসব লোককে বোঝানো হচ্ছে, তারা হচ্ছে: যারা জলবায়ুর নিয়ামকের পরিবর্তনের কারণে বসতভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে, কিন্তু সেসব জনগোষ্ঠী বা ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত নিজ দেশেই অবস্থান করে। তবে এখন পর্যন্ত ‘জলবায়ু শরণার্থী’র কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। তথাপি ওই শব্দটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে মূলত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলন, সমুদ্র-সমতলের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, পৌনঃপুনিক বন্যা ইত্যাদি কারণে। তবে বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত জনবহুল দেশে সবাইকে ঢালাওভাবে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলাটা ঠিক নয়। কারণ, এখানে জনসংখ্যার একটি বৃহত্ অংশ উন্নত জীবন-জীবিকার সন্ধানে প্রায়ই নগর-অভিগমন করে থাকে। বহুকাল আগে থেকেই নদীভাঙনের শিকার মানুষজন যেমন বাস্তুভিটা হারিয়ে অভিগমন করছে, তেমনি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতির অভাবেও অভিগমন করছে শহরে অথবা অন্য কোনো দেশে। আর তাই ‘জলবায়ু শরণার্থী’ আমরা তাদেরই বলতে পারি, যারা জলবায়ুর যেকোনো চলকের (যেমন—তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের দরুন বাস্তুভিটা হারিয়ে অথবা পরিবর্তিত পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অভিগমন করতে বাধ্য হবে। যেমন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে মত্স্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল জেলে জনগোষ্ঠী যদি পেশা পরিবর্তন করে স্থানান্তরিত হয়, তবে তাদের ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলা ঠিক নয়। কিন্তু বারবার ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী যদি নিজস্ব বাস্তুভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তবে তাদের আমরা ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে অভিহিত করতে পারি। কারণ, মানুষ তাঁর বাস্তুভিটা তখনই ত্যাগ করতে বাধ্য হবে, যখন প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে প্রচলিত পরিবেশকাঠামোতে তাঁর বেঁচে থাকাটাই দুঃসাধ্য হয়ে যাবে।
জলবায়ুর এই পরিবর্তন পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে; বিশেষ করে, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে বসতভিটা ত্যাগে বাধ্য করবে। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান-এর মতে, আগামী ৫০ বছরে সারা পৃথিবীর প্রায় ১০০ কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটবে। সম্প্রতি কার্টিরেট দ্বীপের অধিবাসীদের বিশ্বের প্রথম ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কেননা এদের বেশির ভাগেরই বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে সমুদ্রসমতলের উচ্চতা বাড়ার কারণে। ২০০৫ সালে পাপুয়া নিউগিনির সরকার এদের স্থানান্তরপ্রক্রিয়া শুরু করে ২০০৭ সাল নাগাদ সম্পন্ন করে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যেই ওই দ্বীপপুঞ্জ নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যদি ২১০০ সাল নাগাদ এক মিটার সমুদ্রসমতলের পরিবর্তন ঘটে, তবে বাংলাদেশের তিন মিলিয়ন হেক্টর জমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটা ৪০-৫০ বছরের মধ্যে হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। ফলে বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ দ্রুততর ও তীব্রতর হবে। যদিও এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট উপসংহারে উপনীত হওয়া একটু দুঃসাধ্য ব্যাপার। মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে সম্প্রদায়ভুক্ত বা এলাকাভিত্তিক অভিযোজন-কৌশল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হওয়া জরুরি। কেননা বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অভিযোজন-কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকার দ্য পেন্টাগন-এর প্রতিবেদনে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির ব্যাপারে আরও ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে জনসংখ্যার ব্যাপক অভিগমন এবং বাস্তুচ্যুতির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের দরুন সৃষ্ট সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে পৃথিবীর অনেক দেশ মোটামুটি সচ্ছল প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পদের দিকে দৃষ্টিপাত করবে নিজস্ব জনসংখ্যার খাদ্য ও আবাসস্থলের নিরাপত্তার জন্য।
যেহেতু বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য আমেরিকা ও শিল্পোন্নত দেশগুলো বহুলাংশে দায়ী, তাই সারা পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলার জন্য তাদেরই গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। এর মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশের মতো অনেক দরিদ্র দেশের বহু নিষ্পাপ জীবন ও সম্পদ বাঁচানো সম্ভব হবে।
ড. আশরাফ মাহমুদ দেওয়ান: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিপন্ন নদী ও বন -কথা নয়, দরকার সর্বশক্তি নিয়োগে সরকারের সদিচ্ছা

কথায় কি কাজ হয়? গত সোমবারের প্রথম আলোই তার প্রমাণ। সেদিনের একটি সংবাদে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা সবুজ বাংলাদেশ চাই।’ একই দিনের আরেকটি সংবাদে জানা যাচ্ছে, বরিশালে বন কেটে ইটভাটা তৈরির ছাড়পত্র দিয়েছে সরকারেরই দুটি সংস্থা—বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রধানমন্ত্রী বলছেন সবুজ বাঁচানোর কথা, কিন্তু ওই সংবাদের সঙ্গে থাকা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সারি সারি সবুজ গাছ মাটিতে পড়ে আছে। ডাল কেটে সেগুলো কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর ‘সবুজ বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার; নদ-নদী, খাল-বিল-পুকুর ও জলাধার সংরক্ষণের নির্দেশ সত্য; নাকি বিরতিহীনভাবে বন-নদী-সমুদ্রতীরের সবুজ বেষ্টনী ধ্বংসের আয়োজন বেশি সত্য।
ওই একই দিনের আরেকটি সংবাদ জানাচ্ছে, জাহাজভাঙা-শিল্পের গ্রাসে সীতাকুণ্ড উপকূলের সবুজ বেষ্টনী উজাড় হচ্ছে। সংবাদগুলো নমুনা মাত্র। বাস্তবে বন, নদী দখল ও বিনষ্ট হওয়ার হার সরকারের প্রতিশ্রুতিকে ছাপিয়ে বিপুল বিক্রমে এগিয়ে চলছে। এ কাজে সরকারের বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য বিভাগ বিভিন্নভাবে জড়িত। বহু স্থানে সরকারদলীয় লোকেরা এসবের সুফলভোগী। সরকারি দল ও সরকারি সংস্থার মধ্যে যোগসাজশ ছাড়া এ রকম নির্বিচার দখল ও পরিবেশ ধ্বংস কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। সে কারণেই প্রশ্ন জাগে, যে শর্ষে দিয়ে ভূত তাড়ানো হবে, তার মধ্যেই যদি ভূত বসে থাকে? ঢাকার চারটি নদীকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার দূষণ ও দখল কি মোটেও কমেছে? জনদাবি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার চাপে সংকটের কথা স্বীকার করা হলেও সংকট কাটানোর জরুরি মহাপরিকল্পনা এল না। এটা কেমন দায়িত্বশীলতা?
যে কায়েমি মহল নদী ও বন ধ্বংসের জন্য দায়ী, তারা শক্তিমান। সমস্যার ভয়াবহতার মুখে শুধু কথায় চিঁড়ে ভিজবে না, প্রয়োজন বাস্তব ও আপসহীন উদ্যোগ। এর জন্য সবার আগে সরকারের নিজের হাতটি পরিষ্কার করতে হবে। সেই কাজের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে। সর্বনাশের ষোলকলা যখন পূর্ণ হচ্ছে, প্রতিকারে তখন সর্বশক্তি নিয়োগ করার কোনো বিকল্প নেই।

জাহাজভাঙা: আবার বিভীষিকা- দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিন

গত শনিবার সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে এক পুরোনো জাহাজ ভাঙার সময় প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চারজন শ্রমিকের তাত্ক্ষণিক মৃত্যু ও ২৬ জনের আহত হওয়ার যে বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তা এককথায় রোমহর্ষক। বিস্ফোরণের জায়গা থেকে ২৫-৩০ ফুট দূরে ছিটকে পড়েছে শ্রমিকদের দেহ; অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হয়েছে ছিন্নভিন্ন।
নতুন ঘটনা নয় এটি। গত তিন মাসে মারা গেছে ১৩ জন, এ নিয়ে চলতি বছরে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২২। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ, ভারত ও সুইজারল্যান্ড থেকে একযোগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ বছরে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা-শিল্পে দুর্ঘটনায় মারা গেছে এক হাজার শ্রমিক। হাইকোর্টের এক আদেশে অবশ্য এ সময়ে মৃতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৪০০। গ্রিনপিস ও ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস নামের দুটি সংস্থার জরিপ বলছে, সীতাকুণ্ডে গড়ে প্রতিদিন একজন করে শ্রমিক আহত হয়, মারা যায় সপ্তাহে একজন।
এ বছরের মার্চে বাংলাদেশের হাইকোর্ট পরিবেশ আইনবিদ সমিতির এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে আদেশ দেন দুই সপ্তাহের মধ্যে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ড বন্ধ করতে। কারণ, সেগুলোর কোনোটিই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তর আদালতকে জানিয়েছিল, জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোর একটিও কখনো পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেনি। অথচ আইনত এই ছাড়পত্র ছাড়া কোনো জাহাজভাঙা ইয়ার্ড স্থাপন করা যায় না। জাহাজভাঙা ইয়ার্ড-মালিকদের সমিতি আপিল করার পর থেকে বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। আর শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, পরিবেশ ছাড়পত্র না নিয়ে, গ্লাস-হেলমেট, গ্লাভস ইত্যাদি সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ছাড়াই ইয়ার্ড-মালিকেরা বিষাক্ত ও বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থসমেত পুরোনো জাহাজভাঙার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও প্রাণশক্তি দ্রুত হারাচ্ছে দরিদ্র শ্রমিকেরা, কখনো বা এ ধরনের ভয়াবহ বিস্ফোরণে হারাচ্ছে প্রাণ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এক ডলারেরও কম, তাদের মধ্যে শিশু-কিশোরও আছে।
হাইকোর্ট মার্চের আদেশে সরকারের প্রতি যে নয়টি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি আপিলের ফলে স্থগিতাবস্থার কারণে। কিন্তু এক মার্চ পেরিয়ে আরেক মার্চ এগিয়ে আসছে, সরকারপক্ষ সেই মামলার ব্যাপারে কেন নিষ্ক্রিয় রয়েছে, কেন এর নিষ্পত্তি করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোকে সংশ্লিষ্ট আইনকানুন, বিধি-বিধান মানতে বাধ্য করার উদ্যোগ নিচ্ছে না?
আদালতের অন্যতম নির্দেশনা ছিল বিষাক্ত ও বিপজ্জনক পদার্থসমেত কোনো জাহাজ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারবে না—এটা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। গত শনিবার তেলের যে ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে এতগুলো মানুষ হতাহত হলেন, সেই জাহাজটি কী করে বাংলাদেশে এল? বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যে কর্মকর্তা জাহাজটি কাটার আগে দেখতে গিয়েছিলেন বলে খবরে প্রকাশ, তিনি কী পরীক্ষা করে জাহাজটির একাংশ কাটার অনুমতি মৌখিকভাবে (সনদ দেননি) দিয়েছিলেন? পুরো বিষয়টি তদন্ত করে এসব প্রাণহানির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। দুর্ঘটনাকবলিত ইয়ার্ডটির মালিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করেছে, কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন? মালিকপক্ষ হতাহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও সুচিকিত্সার ব্যবস্থা করছে—এটাও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে, বিষাক্ত পদার্থসহ আরও অনেক পুরোনো জাহাজ আনার উদ্যোগ চলছে। সেগুলো বেআইনিভাবে বা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে যাতে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকতে না পারে, তা নিশ্চিত করা দরকার। সরকার তত্পর হলে সেটা অবশ্যই সম্ভব।

সাফ-ব্যর্থতা ভোলার মিশন

যেকোনো বড় টুর্নামেন্টের ড্র অনুষ্ঠানে তারকাদের দিয়ে দলগুলোর নাম ওঠানোটা এখন রীতিই হয়ে গেছে। রাজধানীর একটি হোটেলে কাল আসন্ন এসএ গেমসের ফুটবলের ড্র অনুষ্ঠানেও এর ব্যতিক্রম দেখা গেল না। টেবিলের ওপরে রাখা কাচের পাত্র থেকে মডেল ও অভিনেত্রী অপি করিম তুললেন নেপাল আর শ্রীলঙ্কার নাম। আর মডেল নোবেল তুললেন ভুটান ও আফগানিস্তান।
এর আগেই অবশ্য নিশ্চিত হয়ে গেছে কোন গ্রুপে খেলবে স্বাগতিক বাংলাদেশ। স্বাগতিক হিসেবে বাংলাদেশকে ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষ দল ধরা হয়েছে। আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে ধরা হয়েছে ‘বি’ গ্রুপের শীর্ষ দল। বাংলাদেশের গ্রুপ প্রতিপক্ষ মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটান। পাকিস্তানের গ্রুপে পড়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান।
২০০৪ ইসলামাবাদ এসএ গেমস থেকে জাতীয় দল খেলছে না। অনূর্ধ্ব-২৩ দল খেলায় গেমস ফুটবলের আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে। এবার সিনিয়র তিনজন খেলোয়াড় নিতে পারবে প্রতিটি দল।
সর্বশেষ জাতীয় দল খেলেছে যে গেমসে, কাঠমান্ডুতে সেই ১৯৯৯ এসএ গেমসে অপেক্ষার অবসান হয়েছিল বাংলাদেশের। সেবার স্বাগতিক নেপালকে হারিয়ে সোনা জেতে বাংলাদেশ। তার আগে ফাইনালে উঠে ব্যর্থতার ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৯ ও ১৯৯৫ সাফে রানার্সআপ হয়েই খুশি থাকতে হয়েছিল।
এবার বাংলাদেশ কী করবে, সময়ের হাতেই এর উত্তর তোলা থাক। তবে সাফ ফুটবলে ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে বাড়তি একটা চাপ আছে বাংলাদেশের ওপর। সাফের পর এসএ গেমসেও দল ব্যর্থ হলে গোটা ফুটবলেই এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করে ফুটবল অঙ্গন। কিন্তু এখনো গেমসে বাংলাদেশ দলের কোচ কে, কখন প্রস্তুতি শুরু হবে—এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি!
এসএ গেমসে মেয়েদের ফুটবলের ফরম্যাট চূড়ান্ত হয়েছে কাল। বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানকে নিয়ে রাউন্ড রবিন লিগে অনুষ্ঠিত হবে খেলাগুলো। আর্থিক সমস্যা দেখিয়ে এবারের গেমসে মেয়েদের ফুটবলে দল পাঠাচ্ছে না মালদ্বীপ, ভুটান ও আফগানিস্তান।
পুরুষ ফুটবলে বাংলাদেশের সোনা জয়ের মিশন শুরু হবে ৩০ জানুয়ারি থেকে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ওই দিনের প্রতিপক্ষ নেপাল। ভুটানের সঙ্গে ১ ফেব্রুয়ারি ও মালদ্বীপের বিপক্ষে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ ৩ ফেব্রুয়ারি। কমলাপুর স্টেডিয়ামে মহিলা দলের প্রথম ম্যাচ ২৯ জানুয়ারি। প্রতিপক্ষ নেপাল। পুরুষ বিভাগের ম্যাচগুলো হবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ও চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। চট্টগ্রামে শুধু গ্রুপ পর্বের খেলাগুলোই হবে। সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ঢাকায়। মেয়েদের প্রথম দুটি ম্যাচ কমলাপুরে হলেও বাকি ৯টি ম্যাচ বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। দুটি ফাইনালই ৮ ফেব্রুয়ারি।
বাংলাদেশ দলের শেফ দ্য মিশন মিজানুর রহমানসহ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কালকের এই অনুষ্ঠানটা ছিল সংক্ষিপ্ত। অনুষ্ঠানে এসে কর্মকর্তারা বললেন, ঘরের মাঠে বাংলাদেশ দলকে ভালো করতেই হবে। সাফ বিপর্যয়ের পর এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জও।

Wednesday, December 30, 2009

টয়োটা বিশ্বব্যাপী গাড়ি উত্পাদন বাড়াবে

জাপানের টয়োটা মোটর কোম্পানি ২০১০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী ১৭ শতাংশ গাড়ি উত্পাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তারা এ পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ৭৫ লাখ গাড়ি তৈরি করবে। গতকাল শনিবার ডেইলি নিক্কেই পত্রিকা জানায়, ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ছয় মাস পরিবেশবান্ধব গাড়ি কেনায় ভর্তুকি প্রদানের মেয়াদ বাড়ায় সরকার। সরকারের ওই সিদ্ধান্তের পর টয়োটা তাদের ২০১০ সালের গাড়ি উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়াতে পারে। আর্থিক মন্দার কারণে বিশ্বব্যাপী গাড়ি বিক্রি কমে যাওয়ার পর টয়োটা এ বছরের গোড়ার দিকে তাদের প্রধান বাজার জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে গাড়ি উত্পাদন কমিয়ে দেয়। তবে বর্তমানে টয়োটার প্রধান বাজার চীন ও অন্যান্য উঠতি বাজারগুলোতে তাদের গাড়ির চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

এক আফগান যুবকের সংস্কৃতিচর্চার যুদ্ধ

‘কাউকে যখন বলি, আমি আফগানিস্তান থেকে এসেছি, তখন প্রথমেই তাঁর মুখ থেকে যে শব্দগুলো বেরিয়ে আসে সেগুলো হলো—ওসামা, তালেবান ও যুদ্ধ।’ কথাগুলো আফগানিস্তানের পপসংগীতের প্রতিভা খোঁজার অনুষ্ঠান আফগান স্টার-এর সাবেক উপস্থাপক দাউদ সিদ্দিকির।
২০০৯ সালটি দাউদ সিদ্দিকির জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও পয়মন্ত একটি বছর। এই বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে দ্য সানডান্স চলচ্চিত্র উত্সবে যোগ দেন তিনি। উদ্দেশ্য আফগান স্টার-এর ওপর তৈরি করা একটি ব্রিটিশ তথ্যচিত্রের পক্ষে প্রচারণা চালানো। উত্সবে দুটো পুরস্কার অর্জন করে অনুষ্ঠানটি। আফগান স্টার তাঁর জীবনে এনে দিয়েছে তারকাখ্যাতি।
কিন্তু এত কিছুর পরও নিজের জীবনের ওপর তালেবান হুমকিতে বিচলিত দাউদ। আর কাবুলে ফিরে যেতে চান না তিনি। আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে।
আফগান স্টার শো এবং ব্রিটিশ তথ্যচিত্রের সুবাদে রাতারাতি সেলিব্রিটি বনে যান দাউদ। তবে নতুন পাওয়া এই খ্যাতি তাঁর জীবনের ওপর সৃষ্টি করেছে বেশুমার হুমকি।
ওয়াশিংটনে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে দাউদ বলেন, ‘আফগানিস্তানে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা চান না যে নারীরা নৃত্য করবে। তাঁরা দেশে গণতন্ত্র চান না। এমনকি বিশ্বায়নেরও বিপক্ষে তাঁরা। আধুনিক সংস্কৃতিও তাঁরা পছন্দ করেন না। আমাদের অনুষ্ঠান এ বিষয়গুলোকে উত্সাহ জুগিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আফগানিস্তানে নিরাপদ নই।’
কিন্তু এত ভীতিকর অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও দেশের প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি দাউদের। নিজের দেশ সম্পর্কে পশ্চিমা দেশগুলোর নেতিবাচক মনোভাব তাঁকে আহত করে।
তবে দাউদ বলেন, ‘আমি তাঁদের দোষ দিতে পারি না। টেলিভিশনে তাঁরা সব সময় যেটা দেখে থাকেন, সেটাই বলছেন। তবে বিশ্বাস করুন, আফগানিস্তানে ভালো ভালো গল্প রয়েছে। আছে অনেক ভালো মানুষ। আফগানিস্তান খুবই সুন্দর একটি দেশ।’
তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমার দিকে তাকান। আমি দেখতে তালেবানের মতো নই। আমি কাবুলে বড় হয়েছি। আমি একজন খাঁটি আফগান।’
বর্তমান ভয়েস অব আমেরিকায় (ভোয়া) কাজ করছেন দাউদ সিদ্দিকি। পশতু ভাষায় একটি কল-ইন রেডিও শো উপস্থাপনা করেন তিনি।
দাউদকে ভোয়ায় কাজ করার সুযোগ দিয়ে অনুতপ্ত নন রেডিওটির আফগান সার্ভিসের প্রধান বেথ মেনডেলসন। তিনি বলেন, দাউদ একজন মেধাবী তরুণ। তাঁর ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল।
বেথ মেনডেলসন বলেন, দেশের একজন বড় তারকার আবারও মিডিয়ায় ফিরে আসার বিষয়টি উপভোগ করছেন আফগানিস্তানে ভোয়ার শ্রোতারা।
আফগান স্টার-এর অর্জনে গর্বিত দাউদ। তিনি বলেন, এটা কোনো নিয়মিত রিয়ালিটি শো ছিল না। এটা ছিল গণতন্ত্র ও নারী অধিকারের একটি পরীক্ষা। সেখানে জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐক্য ছিল। অনুষ্ঠানটি দেশের মানুষের মধ্যে আশাবাদ ফিরিয়ে এনেছে।
অনুষ্ঠানের প্রথম দিকের পর্বগুলোতে নিজের জাতি-গোষ্ঠীর প্রতিযোগীদের সমর্থন দেওয়ার প্রবণতা ছিল দর্শকদের মধ্যে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসেন দর্শকেরা। প্রতিযোগীর সংখ্যা কমতে কমতে যখন তিনে এসে দাঁড়ায়, তখন জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে মেধার স্বীকৃতি দিতে শুরু করেন দর্শকেরা।
তরুণ দর্শকেরা অনুষ্ঠানটিকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করে। স্মিত হাসিতে দাউদ বলেন, তবে নারীদর্শকেরা এখনো সুদর্শন পুরুষ প্রতিযোগীদেরই ভোট দিচ্ছেন।
এত খ্যাতি, ভোয়ায় কাজ করার সুযোগ সত্ত্বেও দেশকে ভুলতে পারছেন না তিনি। ছয় বোন, এক ভাই ও বাবা-মাকে রেখে এসেছেন বাড়িতে। তাঁরা সবাই কাবুলে বসবাস করছেন। এ ছাড়া অভাববোধ করছেন নিজের দর্শকদের।
দাউদ বলেন, ‘আমি যখন এ দেশে আসি, তখন আমি সবকিছু ফেলে এসেছি। আমি সবকিছু হারিয়েছি। আমি মরে গেছি। আপনি এখন যাকে দেখছেন, সে আফগান স্টার-এর উপস্থাপক নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় আমার পুনর্জন্ম হয়েছে।’

ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না ভারতের লোকসভার সদস্যরা by দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী

সংসদীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার সদস্যরা সরকারি কোষাগারের জন্য বোঝা হয়ে উঠছেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গত ২৬ নভেম্বর লোকসভার অধিবেশনে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে আলোচনার সময় মাত্র ২৬ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। আর ৩০ নভেম্বর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত সাংসদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ জন।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, লোকসভার একটি অধিবেশনে প্রতি ঘণ্টার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হয় ১৫ লাখ রুপি। অথচ সদ্যসমাপ্ত শীতকালীন অধিবেশনে ৪৮ শতাংশ সাংসদই অনুপস্থিত ছিলেন। দিল্লিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের শাখা পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চ এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করে।
গবেষণায় জানানো হয়, লোকসভায় ২০৬ জন এমপি সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তেমন চিন্তিত নন। তাঁদের মধ্যে ১১৩ জন সদস্য বাজেট ও শীতকালীন অধিবেশনে কোনো প্রশ্ন করেননি। আর বাকি ৯৩ জন সদস্যের প্রত্যেকে গড়ে ১০টিরও কম প্রশ্ন করেছেন। এ ছাড়া রীতি অনুযায়ী মন্ত্রিসভার ৬৪ জন সদস্য এবং স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতা অধিবেশনে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন না। সুতরাং এই ৬৭ জনকে বাদ দিলে বলা যায়, ৫৪৪ জন সদস্যের লোকসভার প্রায় অর্ধেক সদস্যই বাজেট ও শীতকালীন অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেননি।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লোকসভার ৪৮ শতাংশ সদস্যই অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নেননি। যাঁরা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ২৫ শতাংশ আবার একটি বা দুটি বিষয়ে নিজেদের আটকে রেখেছেন। মাত্র তিন শতাংশ সদস্য ১০টির বেশি বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। আর এই চুপচাপ থাকার মাধ্যমে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্ত ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় সরকারকে ছাড় দিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।
এ ব্যাপারে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাংসদ রমেশ বাইস বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো এই সমস্যা সম্পর্কে জানে, কিন্তু দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বুঝতে পারছেন না কীভাবে এর সমাধান করবেন। আজকাল সংসদীয় কাজে আইনসভার সদস্যদের অংশগ্রহণ কমছে। এল কে আদভানির মতো শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বারংবার নির্দেশের পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
লোকসভার অধিবেশনে সাংসদদের উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। বাজেট ও শীতকালীন অধিবেশনে মাত্র ১৫ জন সাংসদ সব সময় উপস্থিত ছিলেন। কমপক্ষে ২৫ জন সাংসদ অর্ধেকের বেশি আলোচনায় অনুপস্থিত ছিলেন। ওই দুই অধিবেশনে সবচেয়ে কম উপস্থিত ছিলেন তেলেগু চলচ্চিত্রাভিনেত্রী ও সাংসদ বিজয়া শান্তি। তাঁর উপস্থিতির হার মাত্র ১৭ শতাংশ। আর শতভাগ উপস্থিত ছিলেন সিপিআইয়ের সাংসদ গুরুদাস দাসগুপ্ত, কংগ্রেসের সাংসদ একনাথ মহাদেব গায়কোয়াড়, জেডি-ইউর সাংসদ রাজীব রঞ্জন সিং ও সিপিআইএমের সাংসদ এম বি রাজেশ। আর আরেক তেলেগু চলচ্চিত্রাভিনেতা জে কে রিথিশ ও সাবেক ক্রিকেটার নভজিত্ সিংয়ের মতো সাংসদদের উপস্থিতি ৪০ শতাংশের কম।
এম বি রাজেশ বললেন, সাংসদ হিসেবে প্রথম লোকসভায় এসেছেন তিনি। অধিবেশনে যোগ দেওয়াকে দায়িত্ব বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি যৌক্তিক কারণ ছাড়া সাংসদদের অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকা ঠিক না।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সেনাদের গুলি, নিহত ৪

ইরানের রাজধানী তেহরানে গতকাল রোববার সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে চার ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আরও দুই ব্যক্তি আহত হয়েছে। একটি ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
রাহেসাবজ ডট নেট নামের ওই ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে তিন ব্যক্তি নিহত এবং দুজন আহত হয়েছে। তেহরানের ইঙ্ঘেলাব স্ট্রিটের কলেজ ব্রিজের কাছে এ ঘটনা ঘটে। এতে আরও বলা হয়, এ ঘটনার পর ভালি আসর মোড়ে আরও একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ গতকাল সকাল থেকে তেহরানের রাস্তায় সমবেত হতে থাকে। এ সময় তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
এর আগে সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়, আশুরার শোভাযাত্রাকে কেউ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ দিতে চাইলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রদেশের নাম পাল্টানো নিয়ে আলোচনার জন্য নওয়াজের কমিটি গঠন

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নাম পাল্টানোর প্রস্তাব নিয়ে ওই প্রদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির (এএনপি) সঙ্গে আলোচনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন পাকিস্তান মুসলিম লিগ- নওয়াজ (পিএমএল-এন)-এর প্রধান নওয়াজ শরিফ। গত শনিবার দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে নওয়াজ শরিফ সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
নওয়াজ বলেন, নাম পাল্টানোর বিষয়টি সমাধানের জন্য পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরতাজ আজিজের নেতৃত্বে ওই কমিটিতে রয়েছেন সরদার মেহতাব আব্বাসি, সরঞ্জাম খান, পীর সাবির শাহ ও সাবেক এমএনএ নাসির খান।
পাকিস্তানের সংবিধান সংস্কারের জন্য গঠিত কমিটির সুপারিশ তৈরি করার ক্ষেত্রে এই প্রদেশের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি একটি বাধা হয়ে আছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নাম পাল্টে পাখতুনখা রাখার প্রস্তাব করেছে এএনপি। পিএমএল-এন এখন এ প্রস্তাবে সম্মতি জানালেও তারা চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ ব্যাপারে একটি ভোট গ্রহণ করা হোক।
প্রদেশের হাজারা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পিএমএল-এনের শক্ত অবস্থান রয়েছে। সেখানকার প্রাদেশিক নেতাদের চাপে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এএনপির নাম পাল্টানোর ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে। গত শুক্রবার নওয়াজ শরিফ এএনপি নেতা ও পাকিস্তানের রেলমন্ত্রী গুলাম আহমেদ বাইলোরের সঙ্গে বৈঠক করেন। সংবিধানের ১৭তম সংশোধনী বাতিল না করা এবং অন্যান্য বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়ায় পিপিপি সরকারের সমালোচনা করেন নওয়াজ।

পারিবারিক ভিসার ক্ষেত্রে আইন শিথিল করছে সৌদি আরব

সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের জন্য পারিবারিক ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন শিথিল করছে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ। শনিবার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে স্থানীয় একটি পত্রিকা। এখন থেকে চাকরির বিচারে নয় বরং পারিশ্রমিকের বিবেচনায় প্রবাসী কর্মীদের জন্য পারিবারিক ভিসা দেওয়া হবে। এত দিন পর্যন্ত শুধু চিকিত্সক, প্রকৌশলী—এ ধরনের ‘হোয়াইট কালার’ পেশাজীবীদের পারিবারিক ভিসা দেওয়া হতো।
সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের একটি বড় অংশ শ্রমিক। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কয়েক লাখ নাগরিক সেখানে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। এসব পেশাজীবী ‘ব্লু কালার প্রফেশন’ শ্রেণীতে বিবেচিত হওয়ায় তাঁরা এত দিন পারিবারিক ভিসা পেতেন না। কিন্তু শিথিল নিয়মের আওতায় সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন কর্মীর আয়ের বিচারে পারিবারিক ভিসা দেবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পত্রিকা আল ইয়াউম।
এদিকে তিন সপ্তাহ ধরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিয়াদ অফিস সব পেশার প্রবাসী কর্মীর পরিবারের সদস্যদের জন্য ভিজিট (ভ্রমণ) ভিসা দিচ্ছে। তবে নির্দেশ না পাওয়ায় মন্ত্রণালয়ের জেদ্দা ও দাম্মাম অফিস নতুন এই নিয়ম এখনো চালু করেনি।
আইন শিথিল হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় জেদ্দার একজন প্রবাসী কর্মী শাবির আলী জানালেন, ‘দেশে স্ত্রী-সন্তান রেখে আসা আমার মতো হাজারও কর্মীর জন্য এটি একটি বড় সুখবর।’ শাবির জানালেন, কম্পিউটার প্রকৌশলী হলেও বিদ্যুিমস্ত্রি হিসেবে কাজ নিয়ে সৌদি আরবে গেছেন তিনি। আর পেশার কারণে তিনি পারিবারিক ভিসার জন্য আবেদন করতে পারছিলেন না। দ্য ডন।

ওমরের বাবা ছেলের চরম পন্থা সম্পর্কে আগেই কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন! -মার্কিন বিমান উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা

যাত্রীবাহী মার্কিন বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার নাইজেরীয় যুবক ওমর ফারুক আবদুল মোতালেবকে (২৩) যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিমান ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ওমর ফারুকের বাবা আলহাজি ওমারু মোতালেব দাবি করেছেন, তিনি আগেই তাঁর ছেলের এই পরিকল্পনা ও চরম পন্থার কথা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন।
ওমারু মোতালেব ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। দেশের রাজনীতিতেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি মার্কিন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দেন, তাঁর ছেলে ধর্মীয়ভাবে প্রচণ্ড গোঁড়া। ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমস-এর কাছে স্বীকার করেছেন, তাঁরা এ রকম তথ্য পেয়েছিলেন। তবে তথ্যের উত্স ছিল অজ্ঞাত এক ব্যক্তি।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও কেন ওমরের নাম ‘নো ফ্লাইং’ তালিকায় ওঠেনি, এ নিয়ে ব্যাপক তদন্ত শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এফবিআই প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে, ওমর যে তরল বিস্ফোরক ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন তা ছিল শক্তিশালী পিইটিএন। এটা পেন্টাইরিথ্রিটল নামেও পরিচিত। ওমর ওই দিন ৮০ গ্রাম পিইটিএন পলিথিনে মুড়িয়ে অন্তর্বাসে করে বিমানে ওঠেন। ইয়েমেনের আল-কায়েদার বোমা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তিনি ওই বিস্ফোরক সংগ্রহ করেন।
২০০১ সালের ডিসেম্বরে বড়দিনের প্রাক্কালে প্যারিস থেকে মিয়ামিগামী বিমানে জুতার মধ্যে বহন করা বোমা দিয়ে হামলার চেষ্টা হয়েছিল। ওই ঘটনায় জড়িত ব্রিটিশ নাগরিক রিচার্ড রেইড এখন কারাগারে।
যেভাবে নস্যাত্ হলো হামলা: ডেট্রয়েটের বিমানবন্দরে অবতরণের কয়েক মিনিট আগে ওমর তাঁর কাছে থাকা সিরিঞ্জ বোমা দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেন। যাত্রীদের মধ্যে এক ডাচ পর্যটক জেসপার শুরিঙ্গা (৩২) বিষয়টি টের পেয়েই ওমরকে প্রথমে জাপটে ধরেন। এরপর অন্যরা গিয়ে ওমরকে পাকড়াও করে।
জেসপার একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাও। ওই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, বিমানটিতে হঠাত্ প্রচণ্ড শব্দ পেয়ে তিনি ফিরে তাকান। এ সময় তিনি ধোঁয়ার কটু গন্ধ পান। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বুঝে যান এটা সন্ত্রাসী হামলা। তত্ক্ষণাত্ তিনি ওমরকে জাপটে ধরেন। বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ওমরকে অবশ্য আক্রমণাত্মক দেখা যায়নি। আটক করার সময়ও তিনি কাউকে বাধা দেননি।
নিরাপত্তা জোরদার: কথিত মার্কিন বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার ঘটনার খবরে বিশ্বব্যাপী বিমানবন্দরগুলোয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রগামী সব বিমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিমান ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা গত শনিবার বলেছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে যাত্রীদের জন্য কিছু নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। যাত্রীদের আপাদমস্তক তল্লাশির পর বিমানে উঠতে দেওয়া হচ্ছে। ভ্রমণের শেষ এক ঘণ্টা যাত্রীদের আসন থেকে না ওঠার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভিসা দেওয়া হয়নি ওমরকে: দ্য সানডে টাইমস-এর খবরে বলা হয়েছে, ওমর ২০০৫ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সম্প্রতি তিনি লন্ডনে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভিসা দেয়নি। ওমরের লন্ডনে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাও তদন্তে নেমেছে। প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছেন, কথিত ওমরের লন্ডনের অবস্থানকালীন বাসস্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রেখে কাজ করা হচ্ছে।
শুক্রবার নর্থওয়েস্ট এয়ারলাইনসের ওই বিমানটি ১১ জন ক্রু ও ২৭৮ জন যাত্রী নিয়ে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটে যাচ্ছিল। ডেট্রয়েটে অবতরণের কিছুক্ষণ আগে ওমর বিমানটি বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালান।

২৩ জেলায় ফাইবার অ্যাট হোমের লিংক স্থাপন

দেশব্যাপী অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক কমন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ চলছে। কাজটি সম্পন্ন হলে এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মোবাইল ফোন, কেব্ল টিভি অপারেটর ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা জনগণকে আরও কার্যকর সেবা দিতে পারবে। ‘ফাইবার অ্যাট হোম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এ কাজ করছে।
গত ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, কুমিল্লা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, নরসিংদী, বাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার জেলাসহ বেশ কিছু উপজেলায় প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার এইচডিপিই ডাকট স্থাপন সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে এসব জেলায় দ্রুততার সঙ্গে ফাইবার ব্লো করার কাজ চলছে। এসব স্থানে এসডিএইচ, এমপিএলএসের সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি স্থাপন করছে ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেড। ১০ জানুয়ারির মধ্যে এ জেলাগুলোয় সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহায়ণ তহবিল ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত

বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহায়ণ খাতে তাদের পুনঃ অর্থায়ন তহবিলে আরও ২০০ কোটি টাকা জোগান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে গতকাল রোববার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহায়ণ খাতে মোট পুনঃ অর্থায়ন তহবিল দাঁড়াল ৭০০ কোটি টাকায়।
সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, ইতিপূর্বে ৫০০ কোটি টাকার যে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছিল, তার প্রায় সবটাই বিতরণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, তাদের কাছে গত অক্টোবর পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া পুনঃ অর্থায়ন তহবিলে মাত্র ২২ কোটি টাকা ছিল। নভেম্বর মাসের আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার পর পুরো অর্থই বিতরণ হয়ে যাবে, এমনকি কিছু ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
২০০৭ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই তহবিল গঠন করে। কিন্তু প্রথম দিকে পুনঃ অর্থায়ন সুবিধার কিছু শর্তের কারণে গ্রাহক এই তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারেনি। পরে অবশ্য শর্ত শিথিল করায় ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয় এবং দ্রুত পুনঃ অর্থায়ন তহবিল ব্যবহার হতে থাকে।
উল্লেখ্য, আবাসন খাতে এই স্কিমের আওতায় সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে। দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশন, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার আওতাধীন এলাকায় শুধু আবাসিক ব্যবহারের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় অথবা তৈরির জন্য এই ঋণ দেওয়া হয়। অনধিক এক হাজার ২৫০ বর্গফুট অ্যাপার্টমেন্টের জন্য এই ঋণ প্রযোজ্য হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবাসন চাহিদা মেটাতে গৃহায়ণ খাতে পুনঃ অর্থায়ন স্কিম প্রণয়ন করে ২০০৭ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে। যাদের মোট মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে, তারা এই ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ।

অনশনের হুমকি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা আমরণ অনশন ধর্মঘটে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এসইসি এসব সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করলে তাঁদের অনশনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে গতকাল রোববার শেয়ারবাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ফোরাম বাংলাদেশ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের আহ্বায়ক এম এ বাশার। এ সময় জয়নুল আবেদিনসহ ফোরামের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এম এ বাশার বলেন, চলতি মাসের ২০ তারিখে এসইসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ফোরামের প্রতিনিধিদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে তাঁরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে মিউচুয়াল ফান্ডের বিষয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় মেনে নেওয়া এবং আগের মতো ঋণসুবিধা চালু করার যৌক্তিক দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেন। কিন্তু এসইসি এখন এ আশ্বাসের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে উল্টো ১০ বছর মেয়াদপূর্তি মিউচুয়াল ফান্ড অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে কারণে মিউচুয়াল ফান্ডের দাম আরও কমতে শুরু করেছে। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

ফরিদপুর চিনিকলে ১২ দফা দাবিতে সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান

‘কৃষক বাঁচাও, শিল্প বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে গতকাল রোববার ফরিদপুর চিনিকল আখচাষি কল্যাণ সংস্থা মধুখালী বৈশাখী মেলা মাঠে আখচাষিদের নিয়ে এক সমাবেশের আয়োজন করে। এ ছাড়া তারা প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছে।
আখচাষিদের ১২ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এই সমাবেশের আয়োজন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। সমাবেশে বলা হয়, আগামী ৯ জানুয়ারির মধ্যে এসব দাবি না মানা হলে আখচাষিরা চিনিকলে আখ সরবরাহ বন্ধ করে দেবেন এবং ওই দিন প্রতীকী অনশন পালন করা হবে।
সমাবেশে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী ও মাগুরা জেলার বিপুলসংখ্যক আখচাষি সমবেত হন। সমাবেশ শেষে ফরিদপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমল কান্তি সরকার ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর ১২ দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হচ্ছে, আখের মূল্য মণপ্রতি ১০০ টাকায় নির্ধারণ এবং চলতি মাড়াই মৌসুমে প্রতি মণ আখের দাম ৮০ টাকায় কার্যকর, বিগত ২০০৮-০৯ উত্পাদন মৌসুমে আখচাষে ব্যবহূত টিএসপি ও এমওপি সারের জন্য ১০০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া ইত্যাদি।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আখচাষি কল্যাণ সংস্থার সভাপতি আকরাম হোসেন মিয়া। এতে সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ আখচাষি ফেডারেশনের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম, সহসভাপতি শাজাহান খান, সহ-সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান দাউদ, সাংগঠনিক সম্পাদক বাচ্চু মিয়া, নির্বাহী সদস্য ওহিদুজ্জামান বাবলু, রাজবাড়ীর আখচাষি মো. ইয়াকুব আলী ও গোপালগঞ্জের আখচাষি নিলু সরদার বক্তব্য দেন।

বিশ্বকাপটা কাকার চাই

বিশ্বকাপের পোশাকি মহড়ার টুর্নামেন্টটা জিতেছে তারাই। আসল বিশ্বকাপও কি জিতবে ব্রাজিল?
পোশাকি মহড়ার ওই টুর্নামেন্ট—ফিফা কনফেডারেশনস কাপের সেরা খেলোয়াড় কাকা বলছেন, ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপা হাতে তোলার ‘দারুণ সুযোগ’ দেখছেন তিনি।
গত জুনে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসেছিল কনফেডারেশনস কাপের আসর। ফিফার ছয়টি কনফেডারেশনের ছয় দলের সঙ্গে স্বাগতিক আর বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন—এই আট দল মিলে খেলেছিল ওই টুর্নামেন্টে। এই টুর্নামেন্ট দিয়ে স্বাগতিকেরা নিজেদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি যাচাই করে নেয়। অংশগ্রহণকারী দলগুলো পায় বিশ্বকাপের কন্ডিশনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
রিয়াল মাদ্রিদের প্লে-মেকার কাকা বলছেন, আগামী বছর ১১ জুলাই জোহানেসবার্গের ফাইনালে আবারও শিরোপাটি উঁচিয়ে ধরতে তারা উন্মুখ, ‘বিশ্বকাপ অবশ্যই আমাদের মূল লক্ষ্য। ক্লাব পর্যায়ে আমরা যে এত পরিশ্রম করি সেটার ফলাফল আমরা বিশ্বকাপে পেতে চাই। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে চাই, যেন দক্ষিণ আফ্রিকায় আমি আমার সেরা ফর্ম নিয়ে যেতে পারি।’
বিশ্বকাপের সবগুলো আসরে খেলা একমাত্র দল ব্রাজিল এবারও অন্যতম ফেবারিট। কাকা নিজে অবশ্য ইংল্যান্ডের এবারের দলটিকে নিয়ে তাঁর মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন আগে। ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনও এবার শিরোপা-খরা ঘুচিয়ে দিতে পারে বলে অনেকের ভবিষ্যদ্বাণী। কাকা অবশ্য মনে করিয়ে দিলেন, শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলাটাই আসল; ফেবারিটের তকমা নয়। কাকা তাই জাতীয় দলের সতীর্থদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে রাখার আহ্বান জানালেন, ‘টুর্নামেন্টে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। আপনি জিততে পারেন, হারতেও পারেন। কিন্তু আমরা যদি ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে পারি তাহলে শিরোপা জেতার দারুণ সুযোগ থাকবে আমাদের।’
ইউরোপ-আমেরিকার বাইরে এর আগে যে একবার বিশ্বকাপ হয়েছে অন্য মহাদেশে, সেই এশিয়া থেকে পঞ্চম শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল। আর সেই দলের গর্বিত এক সদস্য কাকা। আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম বিশ্বকাপেও তাই কাকার কাছে শিরোপার গন্ধ ভেসে আসতেই পারে।

মাঠ ও পিচ কমিটি বিলুপ্ত

উইকেট-বিতর্কে যথেষ্টই বিব্রত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। কালই তাই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে মাঠ ও পিচ কমিটি। তবে বিসিসিআইয়ের গ্রাউন্ড ও পিচ কমিটি দাবি করতেই পারে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে তাদের। পিচ কমিটির প্রধান দলজিত্ সিং অনেক আগেই একাধিকবার সাবধান করে দিয়েছিলেন, এটা নতুন বানানো উইকেট, থিতু হতে একটু সময় নেবে। তারপরও এখানে চ্যাম্পিয়নস লিগ টি-টোয়েন্টি এবং অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে হয়েছে। এমন উইকেটে দুই মাসের মধ্যে দুটি ওয়ানডে আয়োজনের দায়টা তো বিসিসিআইয়েরই নেওয়া উচিত!

কোয়াবের দাবি শুনে অবাক গাজী আশরাফ

কোয়াবের প্রস্তাবে বিস্মিত বিসিবি টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান গাজী আশরাফ হোসেন। কোয়াব যতই বলুক বোর্ডের কাছে তারা তাদের দাবির কথা বারবার বলেও সাড়া পায়নি, টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান বলেছেন, ‘কোয়াব তাদের কিছু দাবির কথা জানিয়েছিল গত জাতীয় লিগের আগে। এবার তারা তাদের কোনো ভাবনা বা দাবির কথা আমাদের জানায়নি।’
‘এত বড় একটা আসরের জন্য বাজেটের ব্যাপার আছে, ব্যবস্থাপনার ব্যাপার আছে। লিগ শুরুর চার-পাঁচ দিন আগে হুট করে বললেই তো আর সব বদলে ফেলা যায় না। ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যালেন্ডার তৈরির আগে কেউ আবেদন নিয়ে এলে আমরা আলোচনায় বসতে পারতাম’—বলেছেন গাজী আশরাফ।
কোয়াবের দাবির ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য, ‘শুধু জাতীয় লিগের কথা ভাবলে হবে না, সার্বিক ক্রিকেটের কথা ভাবতে হবে। আমি তো মনে করি, বিভিন্ন পর্যায়ের ক্রিকেট মিলে এ মৌসুমে আমাদের ক্রিকেটাররা অনেক বেশি দীর্ঘ পরিসরের ম্যাচ খেলবে। সব মিলিয়ে খেলার সংখ্যা কমেনি। আর লিগ পেছালে সেটা পুরো ঘরোয়া ক্রিকেটের সূচিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পিসিএলেও অনেক ক্রিকেটারের খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’
কোয়াবের দাবি জানার পর পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলে কত টাকা পাচ্ছেন, সে খবরও নিয়েছেন টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান, ‘শ্রীলঙ্কায় চার দিনের ম্যাচ ফি বাংলাদেশি টাকায় ১৫ হাজার ৫০০ টাকা করে, তিন দিনের ম্যাচে ৯ হাজার টাকা। কায়েদ-ই আজম ট্রফিতে চার দিনের ম্যাচ খেলে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা পায় ৪ হাজার ১৫০ টাকা করে, সঙ্গে ডিএ আর খাবারের খরচ মিলিয়ে ৬৪৫ টাকা। তাহলে আমরা কম দিচ্ছি কই?’

নয়ন-চয়নের নাও by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

হাঁটুপানি। অনেকে হেঁটেই পার হচ্ছেন। মেয়েরা এবং যাঁরা পায়ের জুতা খুলে পানিতে নামতে চাইছেন না, তাঁদের জন্য আছে নৌকা। নৌকার ওপর উঠে দাঁড়ালেই হাফপ্যান্ট পরা নয়ন, আর ফুল প্যান্ট পরা চয়ন—দুই ভাই পানিতে নেমে নৌকা টেনে ওপারে ভেড়াচ্ছে। একজন গলুইয়ের আগা ধরে টানছে, আরেকজন পিছে ঠেলছে। বড়জনের বয়স বড়জোর ১০ আর ছোটজনের ছয়-সাত। কাজ নেই। স্কুলেও যায় না। শুধু খেলেই বেড়ায়। পাড়ার এক মাতব্বর তাঁর পড়ে থাকা নৌকাখানা দিয়েছেন। তাই নিয়ে দুই ভাই সারা দিন এপার-ওপার করে। মালিককে কিছুই দিতে হয় না। তাই দুই টাকা পারানির পুরোটাই দুই ভাইয়ের।
রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের বুলনপুর এলাকার নিচে পদ্মা নদীর খেয়াঘাটের এই হাঁটুপানিতে দুই ভাইয়ের নৌকা নিয়ে সারা দিনের লুটোপুটি। হাতে ক্যামেরা দেখে ছোট ভাই চয়ন ফোকলা দাঁতে ফিক করে হেসে বলে, ‘আমাদের একটা ছবি তোলেন না!’ জানতে চাই, সারা দিনে কত হয় ওদের। নয়ন নৌকা টানতে টানতে বলে, ‘ওই...হয়।’ বলতে চায় না, মোট কত ওঠে। চয়ন বলে, ‘১০০ টাকার মতো হয়।’ ‘কী করিস এত টাকা?’
নৌকায় ঠেলা দিয়ে দম ছাড়তে ছাড়তে চয়ন বলে, ‘মা কিস্তির লাইগ্যা দৌড়ে বেড়ায়।’ বুঝতে পারি, কিস্তি মানে এনজিও থেকে নেওয়া কিস্তিতে পরিশোধ্য ঋণ। এই টাকা নিয়ে ওরা কি বাড়িঘর বানিয়েছে? ঘাটে নেমে নয়নকে শুধাই, ‘বাবা কী করে রে?’ ‘রিস্কা চালায়।’ ‘নাম কী?’ ‘মাসুম।’ ‘মা কী করে?’ ‘কিছু না।’
এ সময় নৌকা থেকে নামছিলেন বুলনপুরের কৃষক দেলোয়ার হোসেন। আঙুল তুলে দেখালেন, ওই যে ওদের মা রিনা বেগম। দেখি, বাঁধের ওপর থেকে চোখেমুখে উত্কণ্ঠা নিয়ে একজন নারী নেমে আসছেন। বয়স ২৮-৩০ বছর হবে। কাছে এসে নিজের থেকেই জানতে চাইলেন, তাঁর ছেলেদের কিছু হয়েছে কি না। তাঁদের সংসারের খবর নিতে চাইলে ভয় পান। তারপর আস্তে আস্তে বলতে থাকলেন, ছেলের বাবার সঙ্গে মাসখানেক আগে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ‘সে মাতাল। সারা দিন রিকশা চালিয়ে যা হয়, নিজেই হেরোইন খেয়ে শেষ করে দেয়। বলতে গেলেই বিপত্তি। বাড়িঘর নাই। এখানে বস্তিতে একাই বড় হয়েছে। যাওয়ার জায়গাও নাই।’ রিনা বেগমের গলায় বেশ বড় একটা আঁচড়ের দাগ দেখে মনে হলো, তিনি আত্মহত্যার জন্য গলায় দড়ি দিয়েছিলেন। কোনোভাবে হয়তো বেঁচে গেছেন। কিন্তু না, প্রসঙ্গ তুলতেই রিনা বেগমের মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি করে হাত দিয়ে দাগটা আড়াল করার চেষ্টা করেন। বললেন, ‘ওই শুইনেন না। স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার। নয়নের বাপের ঠেকেই একটু লেগেছিল।’ ‘কেন, আপনাদের না ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?’
বেশ আহ্লাদ ভরা কণ্ঠে এবার রিনা বেগম বলেন, ‘তাও আসে। জোর করে ভাত খেয়ে যায়। না দিতে চাইলেই ঝামেলা করে। সংসারে কোনো খরচও দেয় না।’
কথা বলতে বলতে আমরা বাঁধের ওপরে উঠে আসি। বটগাছের পাশে খোলা জায়গায় একটা ভাতের হাঁড়ি থেকে মাড় গড়িয়ে পড়ছে। দৌড়ে গিয়ে রিনা বেগম হাঁড়ি সামলাতে লাগলেন। পাশেই তিন দিকে ইট দিয়ে ঘেরা ওপরে কয়খান টিনে ছাওয়া একটা ঘর। চৌকিতে একটা বিছানা। রিনা বেগম বললেন, ‘আমিনুল ব্যাপারির ঘর। পড়েই থাকে। আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নেয় না। এখানেই থাকি। বাসাবাড়িতে কাজ করি।’
সুযোগ বুঝে কথা তুললাম, ‘বিনা ভাড়ায় থাকেন, তো কিস্তির টাকা তুলে কী করেছেন?’ ‘মিথ্যা কথা বলব না,’ রিনা বেগম গরগর করে বলতে লাগলেন, ‘আমার একটা মেয়ে আছে। নাম টুকটুকি। ১৪ বছর বয়স। বিয়ে দিয়েছি।’
মনে হলো, এনজিও থেকে টাকা তুলে রিনা বেগম মেয়ের বিয়েতে খরচ করেছেন, কিন্তু বললেন অন্য কথা। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে তাঁর মেয়েটা ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজে গিয়েছিল। ওখান থেকে বান্ধবীদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে রাজবাড়ীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। এখন হাজতে আছে। ‘এখন আমি মা হয়ে জাবিন চাচ্ছি, ম্যাসটেট জাবিন দিচ্ছে না। মেয়েকে বের করার জন্য গ্রামীণ শক্তি এনজিও থেকে ছয় হাজার টাকা তুলেছিনু। সব খরচ হয়ে যাচ্ছে। মেয়েকে বের করতে পারছি না।’ বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে তাঁর। ‘মেয়ের ছবি আছে। দেখেন, আমার ছোট মেয়ে, কিচ্ছু বোঝে না।’ ঘরের ভেতর থেকে একটা ছবি বের করে আনলেন রিনা বেগম, কিন্তু ছবিটার অর্ধেক ছেঁড়া। জিজ্ঞেস করার আগেই রিনা বেগম বললেন, জামাই-মেয়ে একসঙ্গে ছবি তুলেছিল। সেদিন রাগ করে জামাই মাঝখান দিয়ে ছিঁড়ে আলাদা করে দিয়ে গেছে। রিনা বেগমকে হালকা করার জন্য বলি, ‘আপনার ভাত তো হয়ে গেছে, আজকেও নয়নের বাবা খেতে আসবে নাকি?’
এবার একগাল হেসে রিনা বেগম হাত তুলে বললেন, ‘ওই দেখেন, নয়নের বাপ নদীতে গোসল করছে। যাইয়ে শুধান খাবে নাকি।’ বলতে বলতে আবার রিনা বেগমের মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। আমাদের পাশেই নয়ন-চয়ন দাঁড়িয়ে ছিল। এই ফাঁকে দেখি, ওরা নৌকা টানতে টানতে আবার ওপারে চলে গেছে। মনে হলো, হায় রে পদ্মা নদী, নয়ন-চয়নের সংসারের মতোই তোমার অবস্থা!

বিএনপি সংসদে যাবে কি যাবে না by সোহরাব হাসান

সরকারি ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ কার্যকর হবে, সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও আইন পাস হবে—এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কথা। অথচ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো, ক্ষমতায় থাকতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু করা, আর বিরোধী দলে গিয়ে সংসদকে পরিত্যক্ত ভাবা। বিএনপির শাসনামলে আওয়ামী লীগ সংসদবিমুখ, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি সংসদবিমুখ।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ সব দলই সংসদকে রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র করা হবে বলে দেশবাসীর কাছে অঙ্গীকার করেছিল। কীভাবে সংসদ কার্যকর হতে পারে, কীভাবে সরকারি ও বিরোধী দল সংসদে কাজ করতে পারে, তার একটি রূপরেখাও তারা তুলে ধরেছিল। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিনই দেশবাসী হোঁচট খেল, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুজনকেই সরকারি দল থেকে নেওয়ায়। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পরে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়।
তার পরও উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাংসদদের উপস্থিতি জনমনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছিল। তারা ভেবেছিল, হয়তো রাজনৈতিক দলগুলো সংসদকে কার্যকর করতে সচেষ্ট হবে; অতীতের বর্জন-সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে।
গত এক বছরে তার কোনো লক্ষণ নেই। দেশবাসী গভীর উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করল, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার দুই সহযোগী জামায়াতে ইসলামী ও বিজেপির সাংসদেরা সামনের সারিতে আসন বাড়ানোর দাবিতে সেই যে অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ করলেন, আর ফিরে এলেন না। এরপর সময় যত গড়াতে থাকল, তাঁদের দাবির তালিকাও দীর্ঘ হতে লাগল। আর সে তালিকা বাড়াতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অবদানও কম নয়। যেমন, আইনের খুঁটিনাটি বিষয় যাচাই না করেই খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়তে নোটিশ জারি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারে বৈষম্যমূলক নীতি, বিরোধীদলীয় নেতার নিরাপত্তা বাহিনীর জনবল কমানো, তাঁর সেনানিবাসের বাড়িতে দর্শনার্থীদের যেতে বাধাদান। বিএনপির আমলে সরকারের যেসব গণবিরোধী ও হয়রানিমূলক পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে আওয়ামী লীগ, ক্ষমতায় গিয়ে তারাও যদি একই কাজ করে, সেগুলো জনগণ কীভাবে নেবে?
কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই বিএনপি সংসদ বর্জন করে চলেছে। এমনকি ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনেও তারা যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। জাতীয় সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন হলো বাজেট অধিবেশন। এতে বেশির ভাগ সাংসদ বাজেট নিয়ে যেমন আলোচনার সুযোগ পান, তেমনি নিজ এলাকার জনগণের অভাব-অভিযোগও তুলে ধরতে পারেন। যে এলাকাবাসী তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য জনপ্রতিনিধিদের সংসদে পাঠিয়েছে, তাদের বঞ্চিত করার অধিকার তাঁদের নেই।
সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি যেসব অভিযোগ এনেছে, সেগুলো সর্বাংশে সত্য হলেও লাগাতার সংসদ বর্জনের কোনো যুক্তি নেই। তাঁরা সংসদেও যাবেন না, আবার এলাকার জনপ্রতিনিধিও থাকবেন—এই স্ববিরোধী নীতি চলতে পারে না। বিএনপির অভিযোগ, সরকার বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। সংসদে বিরোধী দলকে অযথা গালাগাল করা হয়, সরকারি দল বিভিন্ন স্থানে তাদের সভা-সমাবেশ পণ্ড করে দিচ্ছে। এসব অন্যায়ের প্রতিকার চাইতেও বিএনপির সাংসদদের উচিত সংসদে গিয়ে কথা বলা, প্রতিবাদ করা। বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসন খুব কম হলেও বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ও বর্ষীয়ান সাংসদ আছেন। তত্কালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে বিরোধী দলের আসন ছিল আরও কম। তার পরও সরকারের কোনো আইন বা পদক্ষেপকে তারা বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশেও বাহাত্তরে গণপরিষদ মাতিয়ে রেখেছিলেন বিরোধী পক্ষের মাত্র দুজন সাংসদ, ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতা) ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ঊনআশিতে গঠিত জিয়াউর রহমানের সংসদেও আওয়ামী লীগের ৩৯ জন সাংসদ সরকারি দলকে স্বস্তিতে থাকতে দেননি। আসলে, বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা নয়, সংসদের প্রতি তাঁদের আস্থা আছে কি না, তার ওপরই সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করে। বিগত দুটি সংসদেই বিরোধীদলীয় নেতার (যথাক্রমে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) কাছে দলীয় সাংসদেরা পদত্যাগপত্র জমা রেখে দিয়েছিলেন, যাতে কেউ দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করতে না পারেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে, অনেকে একে সাংসদদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ বলেও মনে করেন। কিন্তু বিরোধী দলে থাকতে দলীয় নেতার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে রাখাকে কীভাবে দেখা যায়? প্রথমটি ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হলে, দ্বিতীয়টি দাস্য মনোবৃত্তির পরিচায়ক।
জাতীয় সংসদের অধিবেশন যত ঘনিয়ে আসছে, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বাগ্যুদ্ধও তত তীব্র হচ্ছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দেখে নেওয়ার এবং দেখিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না করলে তাঁরা আগামী অধিবেশনে যাবেন না। দলের নতুন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও ভবিষ্যত্ মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করার কথাও বলেছেন। সংসদে না গিয়ে কি সেটি সম্ভব?
প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি সংসদে যাবে কি যাবে না। বিএনপির নেতারা সংসদে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যেসব শর্ত পূরণের কথা বলেছেন, তা আসল দাবি নয় বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। নানা শর্তের আড়ালে বিএনপি দুটো দাবি নিয়েই এগোচ্ছে। এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার; দুই. দেশে ফেরার পর তারেক রহমানকে হয়রানি বা গ্রেপ্তার না করা।
তারেক রহমানের ব্যাপারে বিএনপিতে মতদ্বৈধ আগেও ছিল, এখনো আছে। দলের অপেক্ষাকৃত উদারপন্থীরা চেয়েছিলেন, আরও কিছু সময় পর তাঁকে সামনে নিয়ে আসতে। কিন্তু কট্টরপন্থীরা কাউন্সিলের মাধ্যমেই তারেককে বিকল্প নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। সাড়ম্বরে জন্মদিন পালন, পোস্টারে সবার আগে ছবি বসানো, ভিডিও কনফারেন্সে বক্তৃতার আয়োজন—সবই ছিল তাঁর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অংশ। দলের কট্টরপন্থী অংশ তারেককে কো-চেয়ারম্যান করার প্রস্তাবও দিয়েছিল, অবশ্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার মৃদু আপত্তিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেই সন্তুষ্ট থাকেন।
৮ ডিসেম্বরের কাউন্সিলের আগে তারেক রহমান ছিলেন দলের চেয়ারপারসনের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে নতুন পদে বরণ করায় তাঁর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সবাইকে মানতে হবে। এখন তারেকের বিরুদ্ধে মামলা হলে বা দেশে ফিরতে তাঁকে বাধা দেওয়া হলে বিএনপি অনায়াসে তাঁকে আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।
বিএনপির এই রাজনৈতিক চালকে সরকার কীভাবে নেয়, তার ওপরই রাজনীতির গতিবিধি নির্ধারিত হবে। সরকারি দলের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক জবাব না পাওয়া গেলেও প্রধানমন্ত্রীসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তা কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়। তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার এক দিন পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সমাবেশে কারও নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ‘কোনো দুর্নীতিবাজ ও অর্থ পাচারকারীকে রেহাই দেওয়া হবে না।’ দলের সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, দুর্নীতিবাজ ও গ্রেনেড-বোমা হামলার হোতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয়ের তুলনা করা চলে না। এই বাগ্যুদ্ধটা রাজপথে স্থানান্তরিত হলে আবার দেশবাসীকে হরতাল ও অবরোধের যুগে ফিরে যেতে হবে।
নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি সংসদের ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আসছিল। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচনী ফলাফলও মানতে চাননি। তবে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা যখন নির্বাচনকে আগের সব নির্বাচনের চেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে সার্টিফিকেট দিলেন, তখন তিনি অবস্থান বদলাতে বাধ্য হন। তা ছাড়া সে সময় দলের সাংগঠনিক অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে ‘ফলাফল মানি না’ বলে রাজপথ গরম করাও কঠিন ছিল। গত এক বছরে বিএনপি অনেকটাই গুছিয়ে নিতে পেরেছে; বিশেষ করে, ৮ ডিসেম্বরের কাউন্সিল সামনে রেখে তারা তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের কারণে কারাগারে আটক ছিলেন এমন নেতারা বাইরে এসে আন্দোলনের কর্মসূচি নিতে শীর্ষ নেতৃত্বকে চাপ দিচ্ছেন। কথিত সংস্কারপন্থীরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
এ অবস্থায় বিএনপি কী করবে? তারা কি সংসদে গিয়ে সরকারকে আরও কিছুটা সময় দেবে, না এখনই আন্দোলনের প্রস্তুতি নেবে? এ নিয়ে দলের মধ্যে মতভেদ আছে। দলের উদারপন্থী অংশ সরকারকে সময় দেওয়ার পক্ষপাতী। কট্টরপন্থী অংশ কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। তারা ধরেই নিয়েছে, সরকার তাদের দাবি মানবে না, অতএব সংসদেও যাওয়ার প্রশ্ন নেই। তবে এ মুহূর্তে বিএনপি স্থায়ী বর্জন বা পদত্যাগের চিন্তাও করছে না। সংবিধান অনুযায়ী, একজন সাংসদ একনাগাড়ে ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হবে। সেই ৯০ দিন পূরণ হওয়ার আগেই তাঁরা এক দিন সংসদে হাজিরা দিয়ে নিজেদের সদস্যপদ রক্ষা করবেন।
অর্থাত্ বিএনপি সংসদ কার্যকর করার বদলে নিয়ম রক্ষার নীতি নিয়ে এগোতে চাইছে। তাতে সদস্যপদও বাঁচবে, স্থায়ী বর্জনের অপবাদ থেকেও রেহাই পাওয়া যাবে।
সম্ভবত সেটাই হবে খ্রিষ্টীয় নতুন বছরে দেশবাসী ও গণতন্ত্রের সঙ্গে বিএনপির ‘শ্রেষ্ঠ তামাশা’।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

Tuesday, December 29, 2009

জনগণের নিরাপত্তা -নৈতিকতার কোনো জায়গা নেই, শুধুই রাজনীতি by কুলদীপ নায়ার

ভারত কোনো ব্যানানা রিপাবলিক নয়। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে ভারত দ্রুত সভ্য দেশ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার খোয়াচ্ছে। গোয়াতে রাশিয়ার এক নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনার কথাই ভাবুন। কোনো নারী অপরিচিতদের সঙ্গে মধ্যরাতের পর চলাফেরা করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হলে এটিকে অন্য সব ধর্ষণের ঘটনা থেকে আলাদাভাবে গণ্য করা হোক, এমনটা দাবি করেছেন রাজ্যসভার সদস্য শান্তারাম নায়েক। রাজ্যসভায় তাঁর বক্তব্য এ বিষয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। ধর্ষণের এ ঘটনা নিয়ে এই ব্যক্তির কোনো দুঃখবোধ নেই, কারণ সেই রুশ নারী রাত ১২টার পর তাঁর বাসস্থানের বাইরে ছিলেন।
আমি ভেবেছিলাম, গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী দিগম্বর কামাত এ জন্য নায়েককে তিরস্কার করবেন; কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। উল্টো মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, পুরুষের সঙ্গে রাতের বেলা বাইরে যাওয়া এক নারী ধর্ষণ-জাতীয় বিষয়ে বলছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত ও বহির্বিশ্বে কী ধরনের অভিব্যক্তি তৈরি হচ্ছিল, তার কোনো তোয়াক্কা করেননি তিনি। নায়েকের বিরুদ্ধে তাঁর সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে—এ প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রাশিয়ার সরকার আগে আমার কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে লিখুক, তারপর দেখা যাবে।’ তবু বারবার রাজ্যের পুলিশ ধর্ষণের শিকার নারীকে ঘুষ সেধেছে। শেষবার যে ঘুষ সাধা হয়, তার পরিমাণ ১৫ লাখ রুপি।
কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণাও নিন্দা জানিয়ে কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন, ‘বিদেশিদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত।’ জানি না, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ কথার সঙ্গে পর্যটনমন্ত্রী একমত হবেন কি না। কিন্তু এ রাজ্যের এক মন্ত্রী গোয়াকে ‘দুনিয়ার ধর্ষণ রাজধানী’ বললে কেমন করে গোয়া আশা করে, বিদেশিরা, এমনকি ভারতীয়রা এখানে ঘুরতে আসবে।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুম্বাইয়ে মস্কোর কনসুল জেনারেল আলেকসান্দর মানতিিস্ক একটি চিঠিতে তাঁর দেশের পক্ষ থেকে তাঁর উদ্বেগের কথা জানান। একটি হিসাব থেকে জানা যায়, প্রতিবছর গোয়াতে ঘুরতে আসা চার লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটকের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার রাশিয়া থেকে আসে। বেইলানচো সাদ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা চালান সাবিনা মার্টিন্স। থলের বেড়াল বেরিয়ে এসেছে তাঁর কথায়, ‘আজকের পর্যটন বিজ্ঞাপনে আর এ রাজ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা রাজ্যবাসীর অতিথিপরায়ণতার কথা বলা হয় না। প্রচারণায় “মদ, নারী ও গান” দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যা স্থানীয় সংস্কৃতি থেকে আলাদা।’
প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছি কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর নীরবতায়। অভিযুক্ত জন ফার্নান্দেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে গোয়ার কংগ্রেস সরকারের ওপর কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ঘটবে, তিনি হয়তো সে হিসাব কষতে ব্যস্ত। এ রাজ্যে জন ফার্নান্দেজ রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী। এ রাজ্যে কংগ্রেসের শাসন দোদুল্যমান, কয়েকজন সদস্য বিদ্রোহ করলে সরকারের পতন ঘটতে পারে বা বিরোধী দল ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, এ কথা সত্য। কিন্তু এটিই কি চূড়ান্ত বিবেচ্য? নৈতিকতার কোনো জায়গা নেই, শুধুই রাজনীতি!
একটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পর পর তিন দিন জানতে চেয়েছে, ধর্ষকের বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। কয়েকজন সাংসদও সরকারকে এ প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু সরকার এখনো নীরব। প্রশ্ন হলো, ধর্ষণের একটি ঘটনা ঘটার পর সে বিষয়টি অনুসরণ করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো দায় আছে কি না। অভিযুক্ত পার পেয়ে যেতে পারে বা তার বিরুদ্ধে কোনো কিছু প্রমাণ নাও হতে পারে। কিন্তু কেমন করে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ চুপ করে বসে থাকে? রাজনৈতিক চাপের কারণে ধর্ষক পার পেয়ে যেতে পারে, এ বিষয়টি এখন স্পষ্ট।
এ আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে হরিয়ানার এক ঘটনায়। ১৯ বছর পর সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) বিশেষ আদালত রাজ্য পুলিশের সাবেক মহাপরিচালক এস পি এস রাঠোরকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার রুপি জরিমানা করেন। ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। পুলিশের মহাপরিচালকের মাত্র ছয় মাসের সাজা হওয়া বিচারের নামে প্রহসন। লঘুদণ্ড দেওয়ার জন্য আদালতকে দায়ী করা ঠিক হবে না; কারণ, সিবিআই পুলিশের এক মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ দাখিল করতে চায়নি। যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটার নয় বছর পর এফআইআর করা হয়, কিন্তু সেটাকেও বদলে দেওয়া হয় একটি স্মারকে। কী পরিমাণ চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। তখন আইজি থাকা অবস্থায় রাঠোর রাজ্য সরকারের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন যে এই অপরাধ করার পরও তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বাসার বাইরে গুন্ডাদের লেলিয়ে দেওয়া হয় মেয়েটি বাইরে বেরোলে তাকে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি করার জন্য। রাঠোর যে কতটা ক্ষমতাবান ছিলেন, এ থেকেই বোঝা যায়। মেয়েটির বাড়িতে পাথর ছুড়ে মারা হতো। তিন বছর এভাবে চলার পর মেয়েটি কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করে। তার বাবা চণ্ডীগড়ের কাছের পাচখোলার বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে কলকাতায় চলে যান। মেয়েটির দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১১টি মিথ্যা মামলা করা হয়। বছরের পর বছর এসব মামলা চলার পর অবশেষে তাঁরা খালাস পান। মেয়েটির মা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘রাঠোরের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে স্মারক দায়ের করার পর আমাদের হুমকি দেওয়া হয়।’ কিন্তু লঘু কারাদণ্ডেও রাঠোরকে জামিন দেওয়া হয়। হরিয়ানার পুলিশব্যবস্থা ও তদন্তকাজে অংশ নেওয়া সিবিআইতে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার প্রধান বিচারপতি মুকুল মুগডাল এ মামলা পুনঃ তদন্তে একটি বিশেষ দল নিযুক্ত করতে পারেন। গুজরাটের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট এমনটি করেছিলেন; শেষে প্রমাণিত হয়, আগের বিচার ঠিক ছিল না।
ভারতের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পুলিশ সংস্কার ও বিচারব্যবস্থা সংস্কার করার সময় হয়েছে। পুলিশের সাবেক মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের এক মামলা কেমন করে ১৯ বছর ধরে চলতে পারে? যেসব মন্ত্রী, আমলা আর পুলিশ কর্মকর্তা একে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের সবার বিচার হওয়া উচিত। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসীন কাউকে বিচারের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়ার পরীক্ষার ক্ষেত্র হোক এটি। বিস্তারিত বিবরণ জানার পর দেশবাসী প্রচণ্ড ঘৃণা বোধ করছে। নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তাকে মনে হবে, চাপ ও ক্ষমতার কাছে নতি-স্বীকার।
ভারতের জন্য অসম্মানজনক আরও একটি ঘটনা ঘটিয়েছে আমেরিকার আইসক্রিম কোম্পানি হাগেন-ডেইজ। দিল্লিতে এটির শাখা উদ্বোধন করার সময় বাইরে একটি বোর্ডে লেখা হয়, শুধু বিদেশি পাসপোর্টধারীরা এখান থেকে আইসক্রিম কিনতে পারবে। যার অর্থ হলো, ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ। কোনো সার্বভৌম দেশের জন্য এটি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা। কোম্পানিটি সেই বোর্ড সরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু এর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেনি। শুধু বলেছে, এই বিজ্ঞাপনটি তারা যেভাবে ভেবেছিল, সেভাবে কাজ করেনি। একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর এ কোম্পানির দেওয়া উচিত, এটি কি নিজ দেশ আমেরিকায় এমন কোনো বোর্ড টাঙিয়ে দিতে সাহস দেখাত? উন্নত বিশ্ব নিজেদের উদ্ধত ও উদ্ভট ধারণাগুলো পরীক্ষার ক্রীড়াক্ষেত্র মনে করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে। কিন্তু এভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অবমাননাপ্রবণ হয়ে উঠেছে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কারবালার চেতনা -পবিত্র আশুরা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

প্রাচীনকাল থেকে যুগে যুগে ১০ মহররম বা আশুরা দিবসে ঐতিহাসিক বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবহ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির কাজ এদিনই সম্পন্ন করেন। হজরত আদম (আ.) খলিফা হিসেবে দুনিয়াতে আগমন করেন এবং এদিনেই তাঁর তওবা কবুল হয়। হজরত নূহ (আ.)-এর কিশিত মহাপ্লাবনের কবল থেকে রক্ষা পায়। হজরত দাউদ (আ.)-এর তওবা কবুল হয়। হজরত মূসা (আ.) ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি পান এবং তারা সদলবলে নীলনদে নিমজ্জিত হয়। হজরত ইবরাহিম (আ.) নমরুদের আগুন থেকে নাজাত লাভ করেন। হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান। হজরত আইয়ুব (আ.) দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে সেরে ওঠেন। হজরত ঈসা (আ.)-কে ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন করার ঘটনাও এদিনে ঘটেছিল। আশুরা দিবসে কিয়ামত সংঘটিত হবে বলেও বর্ণিত আছে। ইসলামের ইতিহাসে আশুরা দিবস বিভিন্ন ঘটনাপুঞ্জে সমৃদ্ধ থাকলেও সর্বশেষে সংঘটিত কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতই এ দিবসের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
পবিত্র আশুরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাত্পর্যময় একটি দিবস। পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামে সব সময় সত্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরেরা ৬১ হিজরিতে এদিন ইয়াজিদের সৈন্যবাহিনীর হাতে কারবালায় নির্মমভাবে শহীদ হন। ইসলামের সুমহান আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য তাঁর এ আত্মত্যাগ ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ত্যাগের মহিমা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জুলুম-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার এবং অসত্য ও অন্যায় প্রতিরোধে আশুরার মহান শিক্ষা জাতীয় জীবনে প্রতিফলন ঘটানো দরকার।
নবী-দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন সত্যের প্রতীক। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাতিলের রক্তচক্ষু তাঁকে এতটুকু বিচ্যুত করতে পারেনি। ক্ষমতালোভী ইয়াজিদকে সমর্থন না করায় পরিস্থিতি অনিবার্য সংঘর্ষের দিকে এগোতে থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামল পর্যন্ত ইসলামি আদর্শ তথা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাষ্ট্র পরিচালিত হতো; কিন্তু ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদ নিজেকে মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা দাবি করে দামেস্ককে রাজধানী ঘোষণা করেন। কিন্তু মদিনার লোকেরা তার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে খিলাফতের আসন গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানান। ইমাম হোসাইন (রা.) নিজেকে খলিফা দাবি না করলেও ইয়াজিদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। দুর্ভাগ্যবশত খুলাফায়ে রাশেদিনের প্রতিষ্ঠিত ন্যায়নীতি লঙ্ঘন ও পদদলিত করে ইয়াজিদ অন্যায় ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মুসলিম জাহানের শাসক হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং খিলাফতের পরিবর্তে প্রথম রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। এ পদে থেকে ইয়াজিদ ইসলামি আদর্শবিরোধী তত্পরতা শুরু করে এবং খলিফা হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য সাম্রাজ্যে ভীতিসঞ্চার করে সন্ত্রাসী তত্পরতা চালায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং বায়তুল মাল দখলকারী ইয়াজিদ অন্যায়ের কাছে মাথানত করে।
ইয়াজিদের সঙ্গে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিরোধ ছিল আদর্শিক, ইয়াজিদ ন্যায়নিষ্ঠ শাসক ছিল না। তার ছিল প্রচণ্ড ক্ষমতালোভ এবং শাসক হিসেবে ছিল হীন চরিত্রের স্বৈরতন্ত্রী। মুসলিম সমাজের যোগ্য প্রতিনিধিরা খলিফা বা আমিরুল মুমিনীন পদে তাকে মনোনয়নও দেয়নি, বরং ইয়াজিদ জবরদস্তিমূলকভাবে খলিফার পদ দখল করে বসেছিল। এ অবস্থায় ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এরই পরিণতিতে একপর্যায়ে মদিনা থেকে কুফা যাওয়ার পথে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা নামক স্থানে ইয়াজিদের তাঁবেদার বাহিনীর হাতে তিনি সপরিবারে জীবন বিলিয়ে দেন। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কোলে যিনি লালিত-পালিত হয়েছেন, যাঁর দেহে আখেরি নবীর রক্ত প্রবাহিত, তিনি কীভাবে তাঁরই আদর্শবিরোধী পন্থায় অধিষ্ঠিত শাসকের হাতে বায়আত বা আনুগত্য গ্রহণ করতে পারেন? এ ঘটনা মানবজাতির ইতিহাসে এক মর্মন্তুদ শোকাবহ ঘটনা হিসেবে স্থান পেয়েছে। এখন পর্যন্ত সারা দুনিয়ার মুসলিম সমাজ, এমনকি জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নিপীড়িত মানুষ এ শোকাবহ ঘটনাকে স্মরণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রেরণা লাভ করেন। কারবালার ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের সুমহান আত্মত্যাগের কাহিনী নয়, এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত প্রতিবাদের এক অনন্য সাধারণ বীরত্বগাথা। অপরদিকে এ ঘটনার ভেতর দিয়ে ক্ষমতালোভী মানুষের নৈতিক অধঃপতন, ক্ষমতার মোহ ও অর্থলিপ্সার হীন চরিত্র ফুটে উঠেছে।
কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা.)-সহ নবী বংশের আত্মত্যাগ ইসলামের কালজয়ী আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য; তাই আশুরার ঘটনাবহুল ঐতিহ্য শৌর্য-বীর্য ও ত্যাগের অপূর্ব মহিমায় সমুজ্জ্বল। কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.) সেদিন যে জান কোরবানির অনন্য নজির স্থাপন করেন, তা যুগে যুগে শান্তিকামী মানুষকে এক দুর্দমনীয় অনুপ্রেরণাসহ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর উত্সাহ দিয়ে আসছে। কারবালা ট্র্যাজেডির বদৌলতেই ইসলাম স্বমহিমায় পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সেদিন ইমাম হোসাইন (রা.) যদি দুরাত্মা ইয়াজিদের সঙ্গে আপস করতেন, তাহলে রাজ সিংহাসন তাঁর বশীভূত হতো। কিন্তু নিজের স্বার্থ ও ক্ষমতালিন্সা তাঁকে গ্রাস করেনি। লোভ-মোহের ঊর্ধ্বে উঠে ইমাম হোসাইন (রা.) বুকের তাজা রক্ত প্রবাহিত করে ইসলামের চিরশাশ্বত নীতি ও আদর্শকে সমুন্নত করলেন। কারবালার রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়েই ইসলামের পুনরুজ্জীবন ঘটে। তাই যথার্থই বলা হয়, ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায়/হর কারবালা কী বাদ’—ইসলাম জীবিত হয় প্রতি কারবালার পর।
হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সপরিবারে শাহাদাতবরণের ঘটনা ১০ মহররম আশুরাকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা ও ত্যাগের মহিমা। এদিন শুধু শোক আর বেদনা নয়, বরং কারবালা আমাদের অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, আত্মত্যাগে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। ইমাম হোসাইন (রা.) অসত্য ও অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। ফোরাত নদীর তীরে ইয়াজিদের অন্যায় দাবি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে তিনি এক অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনবাজি রেখে সপরিবারে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি, ইসলামের ইতিহাস তাঁদের অমর করেছে। কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মৃতিতে ভাস্বর পবিত্র আশুরায় শাশ্বত বাণী তাই আমাদেরকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা জোগায়।
বস্তুত, কারবালার ঘটনা কোনো আহাজারি কিংবা মাতমের বিষয় নয়, এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই। ইমাম হোসাইন (রা.) আজ অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে গণ্য। বিশ্বজুড়েই আজ সত্য-অসত্যের ও ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। অসত্য ও অন্যায়ই যেন প্রবলভাবে বিরাজমান। যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নবী-দৌহিত্র কারবালায় আত্মত্যাগ করেছিলেন, সেই চেতনার অভাবের কারণে আজ অসত্য ও অন্যায়ের প্রবল প্রতাপ। আশুরার শিক্ষা আমাদের অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাহস জোগায়, আত্মত্যাগের আহ্বান জানায়। কারবালার সেই চেতনাকে ধারণ করতে না পারলে, শুধু শোক আর মাতম করে কোনো লাভ নেই। যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অসত্য ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং কোনো দেশ-জাতি-রাষ্ট্র বা সমাজে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করাই কারবালার অতুলনীয় শিক্ষা। আসুন না, আমরা কারবালার মহান চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সব অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন, নিপীড়ন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। এ জন্য আশুরার শোকাবহ এদিনে অসত্য, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে আদর্শের লড়াইয়ের দৃপ্তকণ্ঠে বজ্রকঠিন শপথ গ্রহণ করা একান্ত বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

রাজনীতি -গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু ফায়দাতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র by বদিউল আলম মজুমদার

সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা খুললেই প্রতিদিন চোখে পড়ে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা বা তাঁদের অনুগত-সমর্থকেরা বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন বা পাচ্ছেন। এসব সুযোগ-সুবিধা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈধ, আবার ক্ষেত্রবিশেষে অবৈধ। এসব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতও সৃষ্টি হচ্ছে। প্রায় সারা দেশ থেকেই প্রতিনিয়ত এমন ধরনের অভিযোগ আসছে। এসব অভিযোগ গুরুতর এবং এগুলো আমাদের বিকাশমান গণতান্ত্রিক-ব্যবস্থার জন্য চরম ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে এ ব্যবস্থা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অন্যতম একটি বড় বাধা।
ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরাও এ দেশের নাগরিক, তাঁদেরও বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে সমস্যার সৃষ্টি হয় তাঁদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করলে। অর্থাত্ তাঁদের সরকারি চাকরি, আবাসিক এলাকায় প্লট কিংবা বিভিন্ন নির্মাণকাজের টেন্ডার দিতে গিয়ে যদি তাঁদের থেকে যোগ্য কাউকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে এটা হবে ফায়দা প্রদান। এ ধরনের বঞ্চনা চরম অন্যায় ও অবিচারের শামিল, যা নৈতিকতার দিক থেকে কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। একই সঙ্গে অন্যায়ভাবে ফায়দা দেওয়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও সহায়ক নয়। গণতন্ত্র নৈতিকতা ও আইনের শাসনের ওপর ভর করা একটি ব্যবস্থা। তাই গণতন্ত্র আর ফায়দাতন্ত্র কোনোভাবেই সহাবস্থান করতে পারে না।
এ ছাড়া দলবাজি ও ফায়দাবাজির মাধ্যমে সম্পদের অপব্যবহার ও অপচয় হয়। যেমন, দলীয় ব্যক্তিদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে নির্মাণকাজের ঠিকাদারি কোনো অযোগ্য-অদক্ষ লুটপাটের হোতাকে দিলে, বড়জোর অতি-নিম্নমানের কাজ হবে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজই হবে না, কিন্তু টাকা গচ্চা যাবে। সরকারি ক্রয়-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সম্প্রতি যে শিথিলতা আনা হয়েছে, তাতে সম্পদের এমন অপচয় হওয়াই স্বাভাবিক। দুর্বল অর্থনীতি ও সীমিত সম্পদের দেশ হিসেবে এ ধরনের অপচয় আমাদের সংগতির বাইরে এবং এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকেও ব্যাহত করছে।
পরিবারতন্ত্রও ক্রমাগতভাবে আমাদের ওপর জেঁকে বসছে। পরিবারতন্ত্রের নগ্নতম উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে বিএনপির সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দলের প্রধান এবং তাঁর ছেলে তারেক রহমানকে দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে নির্ধারণ করা শুধু দৃষ্টিকটুই ছিল না, এর মাধ্যমে দল পুরোপুরি পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটিও আমাদের বিকাশমান গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় হুমকি। প্রসঙ্গত, বেগম জিয়াকে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইন’কেও চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। আইনানুযায়ী, দলের সব স্তরের কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা। আইনি বিধানের প্রতি এমন অবজ্ঞাও কোনোভাবেই আইনের শাসনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
গণতন্ত্রের সংজ্ঞার দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। গণতন্ত্র হলো এমনই একটি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—অর্জিত হয়েছে তাদের কতগুলো অধিকার। বহুলাংশে নিশ্চিত হয়েছে নাগরিকদের মধ্যে সমতা ও তাদের জন্য সম-সুযোগ। এটি ‘লিবারেল’ বা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সংজ্ঞা।
উদারনৈতিক গণতন্ত্রের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য জনগণের ‘ফ্রি উইল’ বা স্বাধীন মতামত অর্থাত্ সম্মতি আবশ্যক। নির্বাচন—অর্থাত্ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে যা অর্জিত হয়, তা-ই গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়—অর্থাত্ জনগণই সব ক্ষমতার উত্স—রাজা-মহারাজা বা কুলীনেরা নন। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স শহরে লটারির মাধ্যমে সরাসরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও, বর্তমান বিশ্বে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের চর্চা হয়। নির্বাচিত পার্লামেন্ট ও নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যা রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বিস্তার লাভ করে।
দ্বিতীয়ত, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণ কতগুলো স্বাধীনতা বা অধিকার ভোগ করে। যেমন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে চলাফেরার স্বাধীনতা, যার যার ধর্মচর্চার স্বাধীনতা ইত্যাদি। এসব অধিকার সাধারণত লিখিত সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকে। আমাদের সংবিধানেও মৌলিক অধিকার হিসেবে এগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এগুলো মেনে চলা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক। কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ করা হলে, তা বলবত্ করার জন্য সে নাগরিক আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগও আজ রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত।
নাগরিকের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে অনেক বিপ্লব-সংগ্রামের প্রয়োজন হয়েছে। দিতে হয়েছে বহু প্রাণ। লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রাপ্তবয়স্কদের অবাধ নির্বাচনের সুযোগ অর্জনের জন্য প্রতিটি মানবসমাজের বহু শতাব্দী লেগেছে। যেমন, ১৮৩০ সালে মাত্র ২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্রিটিশ এবং অনেক গণতান্ত্রিক ইউরোপের অধিবাসীদের ভোটাধিকার ছিল। ১৮৬৭ সালে এই হার এসে দাঁড়িয়েছে ৭ এবং ১৮৮০ সালে প্রায় ৪০ শতাংশে। এ অগ্রগতির জন্য তাদের অবশ্য কম মূল্য দিতে হয়নি। বিংশ শতাব্দীর আগে পাশ্চাত্যের নারীরা ভোটাধিকারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে এখন প্রতিটি দেশেই—যেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরই ভোট দেওয়ার অধিকার অন্তত আইনগতভাবে স্বীকৃত হয়েছে।
তৃতীয়ত, উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক-ব্যবস্থায় মানুষে মানুষে সমতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সম-সুযোগের অধিকার নিশ্চিত থাকে। অন্যান্য অধিকার থেকে এ অধিকারের ভিন্নতা রয়েছে, যদিও এটিকে সাধারণত মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। ভিন্নতা ও গুরুত্বের কারণে এটি আংশিক অর্জন করতেও ঐতিহাসিকভাবে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এর জন্য লেগেছে বহু শতাব্দী ধরে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ও বহু আত্মত্যাগ। ইউরোপের ‘এইজ অব এনলাইটেনমেন্ট’ বা আলোর যুগ ও তার পরবর্তী সময় পর্যন্ত এর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর মাধ্যমেই ভোটাধিকার ও অন্য অনেক ক্ষেত্রে সাদা-কালো, নারী-পুরুষ প্রমুখের মধ্যে বৈষম্য বহুলাংশে দূর করা গেছে।
উল্লেখ্য, নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো কিছুটা এগিয়ে গেলেও সারা পৃথিবীতেই নারীরা এখনো অধস্তন অবস্থায় রয়েছে এবং তারা ব্যাপক বঞ্চনার শিকার। জাতিগত ও বর্ণবৈষম্যের সমস্যা থেকেও মানবজাতি এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য সারা পৃথিবীতেই দিন দিন প্রকট হচ্ছে। তবুও পাশ্চাত্যের দেশগুলোয়—যেখানে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই সমতা অর্জনের সুযোগ বহুলাংশে সৃষ্টি হয়েছে।
এসব মৌলিক বৈশিষ্ট্য—সম্মতি, স্বাধীনতা ও সমতা পূরণ না হলে সত্যিকারার্থে গণতন্ত্র কায়েম হয় না। অর্থাত্ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারদের সম্মতি অর্জন করা গেলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। অর্থাত্ নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। এমনকি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। বস্তুত নির্বাচনের পরই গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা হয়। দুই নির্বাচনের মাঝখানে কী হয় না হয়, তার ওপরই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত এবং এর কার্যকরতা অর্জিত হলো কি না, তা নির্ভর করে। তাই শুধু নির্বাচনকেই গণতন্ত্র বলার অবকাশ নেই, যদিও এ দুটির মধ্যে অনেকেই অহরহ তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তাই নির্বাচনকে গণতন্ত্র বলা আংশিক সত্য বলার শামিল। অন্যভাবে বলতে গেলে, ক্ষমতাসীন সরকার গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা না করলে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা না করলে গণতন্ত্র কায়েম হয় না।
নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা কিছুটা এগিয়ে গেলেও, সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে সম-সুযোগ থেকে আমাদের অধিকাংশ নাগরিক বঞ্চিত। আমাদের দেশে সমাজের ওপরের তলার একদল ব্যক্তি ভিআইপি নাগরিক হিসেবে আখ্যায়িত, যাঁরা সব ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত, যদিও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নাগরিকদের মধ্যে এ ধরনের বিভাজন করার কোনো অবকাশ নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় দলবাজির কারণে এ বঞ্চনা দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। যারা ক্ষমতাসীন দলের অনুগত নয়, তারা প্রতিনিয়ত নাগরিক হিসেবে তাদের নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, যা গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পুরোপুরি অসংগতিপূর্ণ। অর্থাত্ দলবাজি রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় অন্তরায়।
পরিবারতন্ত্র গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথে আরও বড় অন্তরায়। সত্যিকারার্থেই গণতন্ত্র কায়েম করতে হলে এবং গণতন্ত্রের সুফল সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হলে, সবচেয়ে সত্, যোগ্য ও নিবেদিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ থাকতে হবে। তাদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার পথ উন্মুক্ত থাকতে হবে। কিন্তু দলে পরিবারতন্ত্র সে পথ রুদ্ধ করে দেয়—এ ব্যবস্থায় দলীয় পদ একান্ত অনুগতদের মধ্যে ফায়দা হিসেবে বিতরণ করা হয়। পক্ষান্তরে, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা সে সুযোগ অবারিত করে। তাই পরিবারতন্ত্র গণতন্ত্রের সমতার বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে পরিবারতন্ত্র সৃষ্টি করে রাষ্ট্রে কোনোভাবেই গণতন্ত্র কায়েম করা যায় না।
এ ছাড়া পরিবারতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিদের দলীয় নেতৃত্বে আসার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। পরিবারের বাইরের ব্যক্তিদের মধ্যে করুণার ভিত্তিতে ফায়দা হিসেবে দলীয় পদ বিতরণ করা হয় বলে, সর্বাধিক অনুগত ব্যক্তিরা এবং বাগাড়ম্বর ও মোসাহেবিপনায় পটুরাই সাধারণত ক্ষমতার—বলতে গেলে, অনেকটা উচ্ছিষ্টাংশ পায়। ফলে জনগণ যোগ্য নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বস্তুত এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরই মানুষের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়।
প্রসঙ্গত, এ কারণেই প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের মতো মনীষীরা খ্রিষ্টপূর্ব চার-পাঁচ শতাব্দীর এথেন্সের সরাসরি গণতান্ত্রিক শাসনের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের মতে, তখনকার গ্রিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অদক্ষ, অযোগ্য ও বাগাড়ম্বরে পটু ব্যক্তিরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ফলে সমাজের অবক্ষয় ঘটে এবং চারদিকে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। দুর্ভাগ্যবশত ২৫০০ থেকে ২৬০০ বছর পরে প্লেটো-অ্যারিস্টটলের ধারণাই আমাদের দেশে সত্যে পরিণত হচ্ছে। এ-ই আমাদের নিয়তি!
প্রসঙ্গত, নাগরিক হিসেবে আমরা নিশ্চিত নই, বিএনপি কী করার চেষ্টা করছে? ইতিহাসে ছয় ধরনের সরকার দেখা যায়: রাজতন্ত্র (monarchy), অভিজাত (aristocracy), কতিপয়তন্ত্র (oligarchy), ধর্মতন্ত্র (theocracy), একনায়কতন্ত্র (dictatorship) ও গণতন্ত্র (democracy)। রাজতন্ত্রে রাজার ছেলে কিংবা রাজার মেয়ে যোগ্যতানির্বিশেষে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতো। অর্থ ও বংশানুক্রমিতায় সৃষ্ট কুলীনেরা অভিজাততন্ত্রের ধারক ছিল। ক্ষমতা অতি সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ওলিগার্সি বা কতিপয়তন্ত্র সৃষ্টি হতো। ধর্মের দোহাই দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করলে ধর্মতন্ত্র কায়েম হতো। এক ব্যক্তি শাসনক্ষমতা দখল করলে তাকে একনায়কতন্ত্র বলা হতো। বিএনপি কোনটি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে—রাজতন্ত্র, অভিজাত, কতিপয়তন্ত্র? না অন্য কিছু? গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েই বা তিনি কী করার চেষ্টা করছেন? আশা করি, বেগম জিয়া ও তাঁর আস্থাভাজনেরা ভাবনা-চিন্তা করেই এবং তাঁদের সিদ্ধান্তের পরিণতির কথা বিবেচনা করেই অগ্রসর হচ্ছেন। আমাদের আশঙ্কা, তাঁদের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ পরিণাম শুধু বিএনপিই নয়, পুরো জাতিকেই বহন করতে হবে।
পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে তেলে-জলে যেমন মেশে না, পরিবারতন্ত্র ও গণতন্ত্রও একত্রে যায় না। আমাদের আশঙ্কা, সরকারি ও প্রধান বিরোধী দলের দলবাজি, ফায়দাবাজি ও পরিবারতন্ত্রের চর্চা—আশা করি, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগও পরিবারতন্ত্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে না, যদিও আশাবাদী হওয়া দুরূহ—আত্মঘাতী এবং পুরো জাতিকেই ভবিষ্যতে এর চরম মূল্য দিতে হবে। ভাবতেও কষ্ট লাগে, আমাদের নেত্রীদ্বয়ের আশপাশের এত শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি এসব গর্হিত কাজে সায় দিয়ে যাচ্ছেন! আমাদের নাগরিক সমাজও কি চুপ করে বসে থাকবে? যদি আমরা সবাই দর্শকের ভূমিকা নিই, তাহলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগ এড়ানো সম্ভবপর হবে কী করে?
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, ‘সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক’।

পুলিশের ‘বেআইনি হাত’-পোশাকি নয়, দক্ষ ও সত্ পুলিশ প্রয়োজন -

পুলিশের হাতই কি আইনের হাত? পুলিশের সব কাজই কি আইনানুগ? নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মালীপাড়া গ্রামের পাঁচ গ্রামবাসীকে থানায় নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে জনতার ধরিয়ে দেওয়া চাঁদাবাজকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যে হাত নিরীহ ব্যক্তিদের নির্যাতন করেছে এবং চাঁদাবাজদের ছেড়ে দিয়েছে, সেই হাত কি আইনের হাত? পুলিশি ক্ষমতার এ অপব্যবহারকে কি আইনি কাজ বলা যায়? গত রোববারের প্রথম আলোয় প্রকাশিত এ দুটি সংবাদ নমুনা মাত্র। ছোট থেকে বড় পর্যায়ে এ রকম ঘটনা অহরহই ঘটছে এবং এতে কেবল মানবাধিকারই লঙ্ঘিত হচ্ছে না, অপরাধীরা অপরাধ করেও রেহাই পাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নির্যাতিত ব্যক্তিরা চুরি-ডাকাতির বিরুদ্ধে রাতে গ্রাম পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। থানায় ধরে নিয়ে পুলিশ তাঁদের নির্যাতন করে। এ ছাড়া ঘুষ চাওয়ারও অভিযোগ করেন নির্যাতিত ব্যক্তিরা। আড়াইহাজার থানার এসআই রফিক প্রথম আলোর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, ‘আমি নিজে নির্যাতন করিনি...অন্য পুলিশ সদস্যরা তাঁদের কিছুটা শাসন করেছেন।’ এই ভুল ও নির্যাতনের জন্য এখন দোষী পুলিশ সদস্যদের ‘শাসন’ করা প্রয়োজন। নতুবা এ রকম অপকর্ম চলতেই থাকবে।
পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যেরই পেশাগত সততা ও দক্ষতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু পুলিশের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ সদস্যরা নানা সময় অপরাধীদের সহযোগিতা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা যে জনগণের জানমালের রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, সেটাও সুবিদিত। তাঁদের একটা দিক উজ্জ্বল, আরেকটা দিক অন্ধকার। ইংরেজ ঔপন্যাসিক রবার্ট লুই স্টিভেনসনের জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড উপন্যাসে একই ব্যক্তির দিনে ও রাতে বিপরীত চরিত্রের দ্বন্দ্বের কথা রয়েছে। জেকিল দিনের বেলায় সজ্জন হিসেবে এবং রাতের বেলায় ঘৃণ্য অপরাধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আমাদের পুলিশ বাহিনীর ভেতরও আইনের রক্ষক ও আইন ভঙ্গকারী—এই দুই ভূমিকার দ্বন্দ্ব দেখতে পাওয়া যায়। এর অবসান ঘটাতে ভালো কাজের পুরস্কার ও মন্দ কাজের শাস্তিই একমাত্র পথ। এখন দেখা যাক, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উপরিউক্ত দুটি ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের কীভাবে ‘শাসন’ করে।

কারবালার ত্যাগের শিক্ষা আমাদের পাথেয় হোক -পবিত্র আশুরা

আজ হিজরি সালের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখ। পবিত্র আশুরা। এই দিনে অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইসলামের শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) চক্রান্তকারী ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে কারবালায় মর্মান্তিকভাবে শাহাদত বরণ করেন। বিশ্বের মুসলমানদের কাছে দিনটি একদিকে যেমন শোকের, তেমনি অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার চেতনায় উজ্জ্বল একটি দিন।
ইসলামের ইতিহাসে কারবালার এই শোকাবহ ঘটনার আগেও এই দিনে নানা তাত্পর্যময় ঘটনা ঘটেছে। বর্বর ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথিসহ হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদত বরণের এ মর্মান্তিক ঘটনা ছাড়া এই দিনে যুগে যুগে অনেক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে বলে হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে। আদি মানব হজরত আদম (আ.) এই দিনে পৃথিবীতে আগমন করেন এবং এদিনই তাঁর তওবা কবুল হয়। এই ১০ মহররম তারিখে হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পায়। এর বাইরেও এ মহিমাময় দিনে আরও অনেক তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে ইসলামের ইতিহাসে। হাদিস শরিফে আছে, মহররম মাসের ১০ তারিখ, অর্থাত্ শোকাবহ এই আশুরার দিনেই কিয়ামত ঘটবে।
ইসলামের ইতিহাসে ১০ মহররম তারিখটির নানা গুরুত্ব ও তাত্পর্য থাকলেও কারবালায় ঘটে যাওয়া সর্বশেষ মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণেই বর্তমান দুনিয়ার মুসলমানেরা দিনটি পালন করে থাকেন। মুসলমানেরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে এই দিনে রোজা পালন করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ইয়াজিদ অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং এ জন্য ষড়যন্ত্র ও শক্তি ব্যবহারের পথ বেছে নেন। চক্রান্তের অংশ হিসেবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আরেক দৌহিত্র হজরত ইমাম হাসান (রা.)-কে বিষ পান করিয়ে হত্যা করা হয়। একই চক্রান্ত ও নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতায় ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজন ও ৭২ জন সঙ্গীসহ শাহাদত বরণ করেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। তাঁদের হত্যার ক্ষেত্রে যে নিষ্ঠুর-নির্মম পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, ইতিহাসে এ ধরনের উদাহরণ বিরল। অসহায় নারী ও শিশুদের পানি পর্যন্ত পান করতে দেয়নি ইয়াজিদ বাহিনী। বিষাক্ত তীরের আঘাতে নিজ কোলে থাকা শিশুপুত্রের মৃত্যুর পর আহত অবস্থায় অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)।
আশুরার এই ঐতিহাসিক ঘটনার মূল চেতনা হচ্ছে ক্ষমতার লোভ, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য চক্রান্ত ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। বর্তমান দুনিয়ায় আশুরার এই শিক্ষা খুবই প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতার লোভ, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র ও নিষ্ঠুরতা আজও দুনিয়ায় টিকে রয়েছে। অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ও ত্যাগের যে শিক্ষা কারবালার ঘটনা মানবজাতিকে দিয়েছে, তা আজকের দুনিয়ার অন্যায় ও অবিচার দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

চেরি ফুল ফোটার আগাম বার্তা আর নয়!

জাপানে চেরি ফুল ফোটা নিয়ে রীতিমতো উত্সব চলে। তখন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও নানা আয়োজন করে। আর বহু প্রতীক্ষার সেই চেরি ফুল কবে, কখন ফুটবে, তার আগাম বার্তা জনসাধারণকে জানিয়ে দেয় দেশটির আবহাওয়া অফিস। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছিল। তবে অনেক সময় আবহাওয়া অফিসের সেই আগাম বার্তা অনুযায়ী চেরি ফুল ফোটে না। তাই এবার ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে আর কোনো আগাম বার্তা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা ইউসোতশি সাকাই জানান, প্রতি বছর মার্চের শুরুতে চেরি ফুল ফোটার বিষয়ে আগাম বার্তা দেওয়া হয়। তবে আগামী বছর থেকে সেটা আর দেওয়া হবে না।

মার্কিন মানবাধিকার কর্মীর উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ

যুক্তরাষ্ট্রের একজন খ্রিষ্টান মানবাধিকারকর্মী উত্তর কোরিয়ায় গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উত্তর কোরীয় নেতা কিং জং ইলের প্রতি অনুশোচনা প্রকাশের আহ্বান জানাতে তিনি দেশটিতে প্রবেশ করেন। তাঁর সহকর্মীরা শনিবার এ কথা জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দেশটিতে প্রবেশের পর উত্তর কোরিয়ার সীমান্তরক্ষীরা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।
সহকর্মীরা জানান, গ্রেপ্তারকৃত কোরীয় বংশোদ্ভূত ওই মার্কিন নাগরিকের নাম রবার্ট পার্ক। তিনি উত্তর কোরিয়া ও চীন সীমান্তের তুমেন নদী পার হয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁর এক সহকর্মী জানান, ‘বরফ আচ্ছাদিত নদীটি পার হওয়ার সময় পার্ক (২৯) চিত্কার করে বলছিলেন, ‘আমি মার্কিন নাগরিক। এখানে এসেছি ঈশ্বরের ভালোবাসা প্রচার করতে।’ ওই সহকর্মী আরও বলেন, ‘নদীর ওই পারে পৌঁছার পর আর আমরা পার্কের কোনো সাড়া-শব্দ পাইনি। আমরা আশঙ্কা করছি উত্তর কোরিয়ার সীমান্তরক্ষীরা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।’
রবার্ট পার্ক ‘ফ্রিডম অ্যান্ড লাইফ ফর অল নর্থ কোরিয়ান: ২০০৯’ নামের একটি গ্রুপের নেতা। গ্রুপটির দাবি, তারা উত্তর কোরিয়ায় মানবাধিকারের উন্নয়ন ও সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজ করছে। মার্কিন দূতাবাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পার্কের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর তাদের জানা নেই।

টাইমসের চোখে বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব নেদা আগা

যুক্তরাজ্যের টাইমস পত্রিকা ইরানের বিক্ষোভে নিহত নারী নেদা আগা সুলতানকে তাদের ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ বা বর্ষসেরা ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত করেছে। গত জুন মাসে ইরানে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকালে নেদা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এএফপি।
টাইমস গতকাল শনিবার এক খবরে জানিয়েছে, তেহরানে বিক্ষোভকালে রক্তক্ষরণে নেদা আগা সুলতানের মৃত্যুর দৃশ্য সারা বিশ্বে প্রদর্শিত হওয়ার পর তিনি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক বিশ্বপ্রতীক হয়ে ওঠেন।
তাঁর ছবি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের আলোকচিত্রসহ প্রথম পাতার খবরে পত্রিকাটি আরও বলেছে, নেদা বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। কারণ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শাসকগোষ্ঠী যেভাবে চুরি করেছে তাতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
নেদা বলেছিলেন, তিনি দেশে একটি ব্যতিক্রম ঘটাতে চান। তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না যে তিনি কী প্রভাব রাখতে যাচ্ছেন। রাজপথের ওপর রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা মোবাইলে ধারণ করা হয়। পরে ওই দৃশ্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
টাইমস-এর খবরে আরও বলা হয়, নেদা নিহত হওয়ার ঘটনায় ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বৈধতার সর্বশেষ সুতাটিও ছিন্ন হয়।
ওই ঘটনায় ইরানি কট্টরপন্থীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তারা বলেছিল যে নেদার প্রাণহানি শাসকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে একটি ‘সাজানো’ ঘটনা। তারা আরও দাবি করেছে যে ঘটনাটি সম্পর্কে বানোয়াট খবর দেওয়া হয়েছে এবং বিদেশি গণমাধ্যমে বাড়াবাড়ি রকমের অপপ্রচার চালানো হয়েছে।

রাজস্থানে সেতু ভেঙে ৪৫ জন নিহত

ভারতের রাজস্থানে নির্মাণাধীন একটি সেতু ভেঙে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ জনে। বৃহস্পতিবার রাজ্যের কোটা শহরের বাইরে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা রাজীব দাসোত জানান, সেতু ভেঙে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ৪৫ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা গেছে। ডুবুরিরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রেখেছেন।
কোটা শহরের বাইরে চম্বল নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। এ সময় সেতুটি ভেঙে পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাণ-প্রতিষ্ঠান হুন্দাই ও ভারতীয় নির্মাণ-প্রতিষ্ঠান গ্যামন যৌথভাবে সেতুটি নির্মাণ করছিল।

পোপের ওপর হামলাকারী ক্ষমা প্রত্যাশা করতে পারেন: ভ্যাটিকান

পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট আক্রমণের শিকার হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই শুক্রবার বড়দিনের বার্তায় তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ভ্যাটিকান এক বিবৃতিতে বলেছে, হামলাকারী ২৫ বছর বয়সী নারী সুসানা মায়েলো অপ্রকৃতিস্থ এবং এ জন্য তিনি ক্ষমা প্রত্যাশা করতে পারেন।
সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় বড়দিনের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে পোপের ওপর আকস্মিক ওই হামলার পরও তিনি অক্ষত ছিলেন।
ভ্যাটিকান বলছে, ওই নারী গত বছরও একই কায়দায় হামলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে বাধা দেয়।
লা রিপাবলিকা পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, সুইস-ইতালীয় নাগরিক মায়েলো ডাক্তারকে বলেছেন, তিনি ঠিক আঘাত করতে চাননি।

ইসরায়েলি হামলায় ছয় ফিলিস্তিনি নিহত

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গতকাল শনিবার পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ছয়জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানান, গাজায় বিমান হামলায় তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা ইসরায়েলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিল—এ সন্দেহে ওই হামলা চালানো হয়। এদিকে ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সকালে ইসরায়েলি সেনাদের এক অভিযানে পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরে তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। নিহতদের একজন আনান সুবুহ ফাতাহর সশস্ত্র শাখা আল-আকসা মারটায়ার্স ব্রিগেডের সদস্য। বাকি দুজন দলীয় কর্মী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মকর্তারা জানান, পশ্চিম তীরে নিহত ব্যক্তিদের কারও বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না এবং তারা ইসরায়েলি বাহিনীর প্রতি গুলিও ছোড়েনি। অভিযানে একজন নারী আহত হয়েছে। তবে এ ঘটনা স্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করতে রাজি হয়নি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নাবলুসে সকালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ডজন খানেক জিপ তিনটি বাড়ি ঘিরে ফেলে। গত বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনি এক বন্দুকধারীর গুলিতে একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর মৃত্যুর পর এ অভিযান চালাল ইসরায়েলি বাহিনী।

এ বছরটি ছিল বড়ই কঠিন -বড়দিনের বার্তায় রানি এলিজাবেথ

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ গত শুক্রবার বড়দিনের বার্তায় সশস্ত্র বাহিনীকে অভিনন্দন জানান। এ ছাড়া অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ইঙ্গিত করে ২০০৯ সালকে ‘কঠিন বছর’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বার্তার শুরুতে রানি বলেন, ‘প্রতিটি বছর আলাদাভাবে কাটে। কিছু বছর আমাদের জন্য খুবই স্বস্তিদায়ক, কিছু আমরা ভুলে যেতে পারলেই যেন বাঁচি। ঠিক তেমনি, যারা অর্থনৈতিক মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ২০০৯ সাল তাদের অনেকের জন্যই কঠিন বছর ছিল।’ ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর প্রতীকী প্রধান হলেন রানি এলিজাবেথ। তিনি জানান, আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সেনাদের হতাহতের বিষয়টি তাঁকে কষ্ট দিয়েছে।
রানি বলেন, ‘মিত্রদের সঙ্গে একত্র হয়ে আমাদের ছেলেরা যে কাজ করছে, তার জন্য আমরা গর্বিত।’
এ বছর আফগানিস্তানের সর্বোচ্চসংখ্যক ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়েছে। এ সংখ্যা ১০৬। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন আছে। এর মধ্যে ১০ হাজারই আফগানিস্তানে। রানির এ বার্তাটি আগেই বাকিংহাম প্যালেসে ধারণ করা হয়েছিল। ৫৭তম এই বার্তায় রানি কমনওয়েলথের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এর সব সদস্যরাষ্ট্রের উদ্দেশে কথা বলেন। রানি কমনওয়েলথকে ‘ভবিষ্যতের মুখচ্ছবি’ বলেও বক্তব্য করেন। ব্রিটেনে ক্রিসমাসের ঐতিহ্যগত অংশ হিসেবে রানির এ ভাষণ রেডিও, টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটে প্রচার করা হয়েছে।
রাজপরিবারের বড়দিন উদ্যাপন
ব্রিটেনের রাজপরিবারের সদস্যরা ঐতিহ্যগতভাবে তাঁদের শীতকালীন অবকাশ কাটান পূর্ব ইংল্যান্ডের নরফোকের স্যানড্রিংহ্যামে। আর ঐতিহ্যরক্ষার খাতিরে বড়দিনটিও তাঁরা সেখানেই উদ্যাপন করেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বড়দিন উদ্যাপনের জন্য গত শুক্রবার স্থানীয় সেন্ট মেরি ম্যাগডালেন গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেন রাজপরিবারের সদস্যরা।

আটক মার্কিন সেনার ভিডিও প্রকাশ করায় যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা

বড়দিনে আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে আটক এক মার্কিন সেনার ভিডিওচিত্র প্রকাশের নিন্দা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলেছে এটি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপমান’ করার চেষ্টা।
গত শুক্রবার প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখানো ওই সেনা নিজেকে বোয়ে রবার্ট বার্গডাল হিসেবে পরিচয় দেন। ভিডিওচিত্রে আফগান যুদ্ধ ও মুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছেন তিনি।
তালেবান ২৩ বছর বয়সী ওই সেনার মুক্তির বিনিময়ে আটক জঙ্গিদের মুক্তি দাবি করেছে। ভিডিওচিত্র প্রকাশের পর ছেলের মুক্তির আবেদন জানিয়েছেন বার্গডালের বাবা-মা।
৩০ জুন আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় পাকতিকা প্রদেশ থেকে ওই সেনাকে অপহরণ করা হয়। মার্কিন নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, এটা তালেবান বিদ্রোহীদের সহিংস ও কপটতাপূর্ণ কৌশল। বড়দিনে ওই ভিডিওচিত্র প্রকাশ করে বোয়ের উদ্বিগ্ন পরিবার, বন্ধুদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপমান করা হয়েছে।
আত্মঘাতী হামলা: কান্দাহারে গতকাল এক আত্মঘাতী হামলায় আটজন নিহত হয়েছে। একটি হোটেল ও স্থানীয় সরকার কার্যালয়ের কাছে ওই আত্মঘাতী হামলাকারীকে পুলিশ থামানোর চেষ্টা করলে হামলাকারী বিস্ফোরণ ঘটায়।

তেলেঙ্গানা ইস্যুতে অনির্দিষ্টকালের বনেধর হুমকি দিল জেএসি

আগামী সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে তেলেঙ্গানা রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেওয়ার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির (টিআরএস) সভাপতি কে চন্দ্রশেখর রাও। অন্যথায় ২৯ ডিসেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ডাকা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সম্প্রতি নবগঠিত তেলেঙ্গানা জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির (জেএসি) বৈঠকে চন্দ্রশেখর রাও ওই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জেএসির আহ্বায়ক সি কোনদারাম দ্য হিন্দু পত্রিকাকে বলেন, দু-এক দিনের মধ্যেই বনেধর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় টিআরএস সভাপতি চন্দ্রশেখর রাও মুখ্যমন্ত্রী কে রোসাইয়ার পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি বলেন, তেলেঙ্গানার মন্ত্রীদের পদত্যাগের পর পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন তিনি।
তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) সভাপতি এন চন্দ্রবাবু নাইডু তেলেঙ্গানা রাজ্য গড়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছেন বলেও অভিযোগ করেন চন্দ্রশেখর রাও। ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জ্যেষ্ঠ বিধায়ক নাগাম জনার্ধন রেড্ডির ওপর হামলার জন্য টিআরএসকে দায়ী করে তিনি নিজের দলের সমর্থকদের বিভ্রান্ত করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন চন্দ্রশেখর রাও।
এদিকে গত শুক্রবার দ্য হিন্দু পত্রিকায় ওয়ে আউট ইন অন্ধ্র প্রদেশ শিরোনামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়র বক্তব্য সম্পর্কে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে কথা বলার জন্য জেএসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কংগ্রেস এমপি মধুযক্ষী। তিনি বলেন, পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্যের জন্য আন্দোলন উন্নয়ন কিংবা পিছিয়ে পড়া ইস্যুতে নয়। এটা হচ্ছে আত্মসম্মানের জন্য। মধু আরও বলেন, ‘আমাদের এলাকা পিছিয়ে-পড়া হতে পারে, কিন্তু চিন্তায় আমরা পিছিয়ে নই।’ এ বিষয়ে সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য কাল সোমবারের মধ্যে বুদ্ধিজীবীদের একটি গ্রুপ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন চন্দ্রশেখর রাও।

আমদানি ও রপ্তানির বিষয়ে প্রথম আলো জবসের প্রশিক্ষণ

প্রথম আলো জবসের উদ্যোগে গত শুক্রবার ‘ঋণপত্রের মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানি’ শীর্ষক এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম আলোর সেমিনারকক্ষে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
প্রশিক্ষণ কর্মশালাটিতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো জবসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. রিয়াদ হোসেন। এতে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আজহার আলী মিঞা।
এ কর্মশালায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিভিন্ন প্রদান পদ্ধতি, ঋণপত্রের প্রকারভেদ, ঋণপত্র ও ঋণপত্রবিহীন আমদানি-রপ্তানি, ইউসিপিডিসি প্রভৃতি বিষয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক তুলে ধরা হয়।

সিটি ব্যাংক এনএর আইএসও সনদ লাভ

প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকগোষ্ঠীকে হোলসেল ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার জন্য সিটি ব্যাংক এনএকে সম্প্রতি আইএসও সনদ দিয়েছে মুডি ইন্টারন্যাশনাল।
সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কান্ট্রি অফিসার মামুন রশীদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই সনদ কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সিটির সেবা দেওয়ার একটি নিদর্শন। এটি সিটির সেবা সম্পর্কে বড় গ্রাহকদের আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।’
খাজা মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে আইএসও সনদ পাওয়া একটি বিরল ঘটনা এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেবার একটি মানদণ্ড স্থাপিত হলো।

আখের সংকট ও লোকসানের আশঙ্কা নিয়ে ঠাকুরগাঁও চিনিকলে মাড়াই শুরু by মজিবর রহমান খান

ব্যাপকভাবে আখের সংকট ও লোকসানের আশঙ্কার মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁও চিনিকলে ২০০৯-১০ মৌসুমের আখ মাড়াই শুরু হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, আলু চাষের জন্য জমি তৈরি করতে এবং বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে অনেক কৃষক এ চিনিকলে মাড়াই শুরুর আগেই আখ বিক্রি করে ফেলেছেন। কারণ চিনিকলটিতে এবার এক মাস দেরিতে ২৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি মৌসুমের আখ মাড়াই শুরু হবে—আগেভাগে এ খবর শুনে কৃষকেরা স্থানীয় গুড় তৈরির কারখানাগুলোর কাছে বেশি দামে আখ বিক্রি করে দেন। যে কারণে ঠাকুরগাঁও চিনিকলে এবার যেমন আখের মারাত্মক সংকট পড়বে, তেমনি বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষকেরা জানান, ঠাকুরগাঁও চিনিকলের কাছে যেখানে প্রতি মণ আখ বিক্রি করে পাওয়া যায় ৬৬ টাকা, সেখানে গুড় তৈরির কারখানাগুলো দেয় ৯০ থেকে ১০০ টাকা।
ঠাকুরগাঁও চিনিকলে গত শুক্রবার নতুন মৌসুমের আখ মাড়াই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প সংস্থার চেয়ারম্যান রণজিত্ কুমার বিশ্বাস, জেলা প্রশাসক মুনশী শাহাবুদ্দিন আহমদ, পুলিশ সুপার বি এম হারুন অর রশীদ, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মকবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক কোরাইশী এবং চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এবার এই চিনিকলে ৪৭ হাজার টন আখ মাড়াই করে তিন হাজার ৩৩৭ টন চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। সূত্র আরও জানায়, এবার ৬৬ টাকা মণ দরে আখ কেনা হলেও আগামী বছর থেকে ৮০ টাকা দরে কেনা হবে।
সদর উপজেলার নারগুনের সফিউল ইসলাম ও আবদুল মালেক এবং মোহাম্মদপুর গ্রামের পয়গাম আলী জানান, ঠাকুরগাঁও চিনিকলে দেরিতে আখ মাড়াই শুরু হবে জেনে তাঁরা জমির আখ কেটে ফেলেছেন।
এ ছাড়া সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামের মো. বাদল, মণ্ডলপাড়ার মনতাজ আলী, মনসুর আলী ও বেসারউদ্দিন জানান, তাঁরা চিনিকলের কাছে আখ বিক্রি করার চেয়ে নিজেরাই এখন গুড়ের কারখানা করে বেশি লাভ করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, গত বছর এই চিনিকলে আখ মাড়াই করে লোকসান হয়েছিল প্রায় ১৯ কোটি টাকা। এবার দেরিতে মাড়াই শুরু করায় আখের সংকটে পড়ে আরও বেশি পরিমাণে লোকসান দেবে।
কৃষকেরা জানান, সার ও বীজের দাম এবং শ্রমিকদের মজুরি মিলিয়ে এখন আর আগের মতো লাভ না হওয়ায় তাঁরা আখ চাষ কমিয়ে দিয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় আখচাষি সমিতির সাবেক সভাপতি ইউনুস আলী বলেন, চিনিকলের লোকসান কমাতে হলে চিনিকল এলাকায় আখের চাষ বাড়াতে ও সার কিনতে আখচাষিদের ভর্তুকি দিতে হবে। এ ছাড়া চিনিকলের জমি আলুর জন্য লিজ না দিয়ে আখ চাষের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে।
ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, চিনিকল এলাকায় আগামী মৌসুমে ১২ হাজার একর জমিতে আখ চাষ এবং এক লাখ ৩৫ হাজার টন আখ মাড়াই করে নয় হাজার ৫৮৫ টন চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ঠাকুরগাঁও চিনিকল ১৯৫৮ সালে স্থাপিত হয়। এর অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যে কারণে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে প্রতিবছর চিনিকলটির উত্পাদন ব্যাহত হয়।

সিলেটে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ দ্রুত শুরু হবে

শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেছেন, সিলেটে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন প্রক্রিয়ার দাপ্তরিক কাজ চলছে এখন। এ কাজ শেষ হলে খুব দ্রুত এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ শুরু করা হবে।
সিলেটের খাদিমনগর ও গোটাটিকর বিসিক এলাকা পরিদর্শনকালে গতকাল শনিবার তিনি কথাগুলো বলেন। এ উপলক্ষে খাদিমনগর বিসিকে এক সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিসিকের আঞ্চলিক পরিচালক আবদুল বাছিত। সভায় বক্তব্য দেন সাংসদ মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী কয়েস, সিলেটের জেলা প্রশাসক সাজ্জাদুল হাসান, খাদিমনগর বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম রব্বানী চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবীর সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী আবদুল মুকিত, বিসিকের ডিজিএম শফিউর রহমান, উপব্যবস্থাপক এ কে এম আবদুল হাই, জিয়াউল আলম চৌধুরী প্রমুখ।
দিলীপ বড়ুয়া বলেন, দেশের শিল্প খাতের উন্নয়নে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। শিল্পের জন্য সম্ভাবনাময় সিলেটের উন্নয়নকে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি বলেন, শিল্পক্ষেত্রে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সোনালী জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, পিছিয়ে পড়েছে রূপালী

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার খানিকটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পিছিয়ে পড়েছে রূপালী ব্যাংক।
বিগত বিএনপি ও জামায়াত জোট সরকারের আমলে রূপালী ব্যাংক বিক্রির প্রচেষ্টায় ব্যাংকটির সব ধরনের কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে না পারায় এ দফায় রূপালী ব্যাংকের পরিস্থিতি খারাপ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রস্তুত প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্য তিন ব্যাংক মোটামুটি ভালো পর্যায়ে এলেও রূপালী ব্যাংক প্রান্তিক পর্যায়েই পড়ে থাকার তথ্য মিলেছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৩ সালের মে মাসে তত্কালীন রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংককে নিবিড় তত্ত্বাবধানে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত অনুসারে রাষ্ট্র খাতের এসব ব্যাংককে সমস্যাকবলিত ব্যাংকের পর্যায়ে এনে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। এর পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি তিন মাস অন্তর ব্যাংকগুলোর অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছিল। দীর্ষ সাড়ে ছয় বছরে প্রথম তিনটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো মানে পৌঁছেছে। এর মধ্যে অবশ্য বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ২০০৭ সালের মে-জুন মাসে সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংককে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয় এবং একটি বাছাই কমিটির মাধ্যমে উচ্চ বেতনে চুক্তিভিত্তিক একজন শীর্ষ নির্বাহী নিয়োগ করা হয়। যদিও এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই ব্যাংকগুলো পরিচালিত হচ্ছে। নিয়োগ, পদোন্নতি, মহাব্যবস্থাপকদের (জিএম) প্যানেল তৈরি সবক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ই আগের মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই ব্যাংকগুলোকে পরিচালনা করছে। বিধি অনুসারে কোম্পানির ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদই এসব কাজে ক্ষমতাবান হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, রূপালী ব্যাংক অনেক আগে থেকে কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে এবং এটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় রূপালী বাদে অন্য ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। সর্বশেষ ক্যামেল রেটিংয়ে তিনটি ব্যাংকের সংযুক্ত মান হয়েছে ৩ বা মোটামুটি ভালো। কিন্তু সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক হিসাবে রূপালী ব্যাংকের সংযুক্ত মান হয়েছে ৪ বা প্রান্তিক।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত ‘ক্যামেল রেটিং’-এ মূলধন-পর্যাপ্ততা (সি), সম্পদের গুণগতমান (এ), ব্যবস্থাপনা (এম), উপার্জন ক্ষমতা (ই), তারল্য (এল) এবং বাজার ঝুঁকির প্রতি সংবেদনশীলতা (এস) পরিস্থিতি বিবেচনা করে।
সোনালী ব্যাংক: জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বর ’০৯ প্রান্তিকে সোনালী ব্যাংকের মূলধন-পর্যাপ্ততা, ব্যবস্থাপনা, উপার্জন ক্ষমতা ও তারল্যে ব্যাংকটির অবস্থা মোটামুটি ভালো উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাজার ঝুঁকির প্রতি সংবেদনশীলতায় সন্তোষজনক ও সম্পদের মানে অসন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে ব্যাংকটি।
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ৩১ দশমিক ৬২ শতাংশ, পরিমাণে যা প্রায় ছয় হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। এই খারাপ মানের সম্পদ ছাড়া ব্যাংকটির আর বাকি আর্থিক মানদণ্ডগুলো যেমন—কোনো ঝুঁকিনির্ভর সম্পদের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মূলধন রয়েছে, পুঞ্জীভূত ক্ষতি নেই, ঋণের নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে (প্রভিশন) ঘাটতি নেই, আমানত পরিস্থিতি ভালো এবং উপার্জন ক্ষমতাও ভালো। ব্যাংকটির ঋণ সর্বাধিক পরিমাণে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তবে পোশাকশিল্প খাতে তা সন্তোষজনক মাত্রার মধ্যেই আছে অর্থাত্ ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। সন্তোষজনক মাত্রা হলো ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত।
জনতা ব্যাংক: জনতা ব্যাংকের পরিস্থিতি চার ব্যাংকের মধ্যেই ভালো। মূলধন-পর্যাপ্ততা ও উপার্জন ক্ষমতার দিক থেকে ব্যাংকটির অবস্থান সন্তোষজনক। ব্যবস্থাপনা ও বাজার ঝুঁকির বিবেচনায় ব্যাংকটির পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো। তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী। তবে সম্পদের গুণগতমানে ব্যাংকটি এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে।
জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা পরিমাণে এক হাজার ৪১৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। প্রয়োজনীয় মূলধন ব্যাংকটিতে রয়েছে, পুঞ্জীভূত ক্ষতি নেই, ঋণের নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে (প্রভিশন) ঘাটতি নেই, আমানত পরিস্থিতি ভালো এবং উপার্জন ক্ষমতাও ভালো। ব্যাংকটির ঋণ সর্বাধিক পরিমাণে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তবে পোশাকশিল্প খাতে তা সন্তোষজনক মাত্রার মধ্যেই আছে অর্থাত্ ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
অগ্রণী ব্যাংক: জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বর ’০৯ প্রান্তিকে অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন-পর্যাপ্ততা, ব্যবস্থাপনা ও উপার্জন ক্ষমতা মোটামুটি ভালো উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাজার ঝুঁকির প্রতি সংবেদনশীলতা ও তারল্যে ব্যাংকটির পরিস্থিতি শক্তিশালী। আর সম্পদের মানে অসন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে ব্যাংকটি।
অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ২২ দশমিক ৯৫ শতাংশ, পরিমাণে যা দুই হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। এই খারাপ মানের সম্পদ ছাড়া ব্যাংকটির আর বাকি আর্থিক মানদণ্ডগুলো যেমন—কোনো ঝুঁকিনির্ভর সম্পদের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মূলধন রয়েছে, পুঞ্জীভূত ক্ষতি নেই, ঋণের নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে (প্রভিশন) ঘাটতি নেই, আমানত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উপার্জন ক্ষমতাও ভালো। ব্যাংকটির ঋণ সর্বাধিক পরিমাণে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, পোশাকশিল্প খাতে তবে তা সন্তোষজনক মাত্রার মধ্যেই আছে অর্থাত্ ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
রূপালী ব্যাংক: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে মূলধন-পর্যাপ্ততা ও সম্পদের গুণগতমানে রূপালী ব্যাংকের পরিস্থিতি অসন্তোষজনক। ব্যবস্থাপনা ও উপার্জন ক্ষমতায় প্রান্তিক। তারল্য পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো এবং বাজার ঝুঁকির প্রতি সংবেদনশীলতায় সন্তোষজনক।
রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ২৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, পরিমাণে যা এক হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। ঝুঁকিনির্ভর সম্পদের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মূলধন ৫৩১ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকটি সংরক্ষণ করতে পেরেছে ৪৪৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। পুঞ্জীভূত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৩৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে ঋণের নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে (প্রভিশন) ঘাটতি নেই, আমানত পরিস্থিতি ভালো। কিন্তু মুনাফা ও পুঞ্জীভূত ক্ষতি সমন্বয় করার পর উপার্জন ক্ষমতা শূন্যতে রয়েছে। ব্যাংকটির ঋণ সর্বাধিক পরিমাণে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, পোশাকশিল্প খাতে যা ঝুঁকিপূর্ণ, ৩০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। সন্তোষজনক মাত্রা হলো ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত।