Saturday, April 26, 2025

ভারতকে ছাড় দিতে নারাজ পাকিস্তান, চূড়ান্ত জবাবের প্রস্তুতি

কাশ্মীর হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তানও। এই অবস্থায় ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী আনোয়ারুল হক বলেছেন, সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত যদি পাকিস্তানে কোনো আগ্রাসন চালায়, তাহলে পাকিস্তান তার ‘চূড়ান্ত জবাব’ দেবে।

দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ভারতের সাহস নেই পাকিস্তানের সীমান্ত লঙ্ঘনের। কিন্তু যদি করে, তাহলে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়বে। তিনি ভারতের কূটনৈতিক আচরণকে চাণক্য নীতি বা ‘কূটনীতির আবরণে ছুরি মারা’ বলেও আখ্যা দেন।

আনোয়ারুল হক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারত কোনো তৃতীয় পক্ষকে ব্যবহার করে আজাদ কাশ্মীরকে অস্থির করতে পারে। যদি তারা এমন কোনো দুঃসাহস দেখায়, তাহলে উপযুক্ত জবাব দেবে পাকিস্তান।’ পাকিস্তান যে কোনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

ভারত-পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিন্ধু নদের পানি চুক্তি। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের মধ্যে বিরল এক সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে এতদিন ধরে টিকে ছিল। এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান সিন্ধু নদের জলাধার ব্যবস্থার ওপর অধিকতর নির্ভরশীল, কারণ দেশটির কৃষি ব্যবস্থার প্রায় ৯০ শতাংশ এই পানির ওপর নির্ভর করে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করবে না। ইতোমধ্যে ইসলামাবাদও স্পষ্ট করে বলেছে, চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের পানির প্রবাহ বন্ধ বা সরিয়ে দেওয়ার যে কোনো চেষ্টা ‘যুদ্ধ ঘোষণার’ শামিল হবে এবং তার জবাব দেওয়া হবে ‘সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত’ অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে।

পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বা এনএসসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পানি হচ্ছে পাকিস্তানের ‘জীবনরেখা’, যা ২৪ কোটিরও বেশি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। তাই পানির প্রবাহ বন্ধ করা হলে তা ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর জবাবে পাকিস্তান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করবে না।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত যদি পাকিস্তানের পানির প্রবাহ থামাতে কোনো জলাধার বা বাঁধ নির্মাণ করে, তাহলে পাকিস্তান সেই স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেবে। এতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করবে না ইসলামাবাদ। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের পপ্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের পপ্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি : সংগৃহীত

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিণতি কী হবে?

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী দুটি দেশ- ভারত ও পাকিস্তান। পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই দেশ দুটির মধ্যে বৈরিতা দৃশ্যমান। বহির্বিশ্বের কাছে ‘চিরশত্রু’র তকমাও পেয়েছে তারা। সীমান্তে নিয়মিত সংঘাত ও একাধিকবার বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়েছে দেশ দুটি। কাশ্মীর ইস্যু এই সংঘাতের প্রধান কারণ। সম্প্রতি জম্মু-কাশ্মীরের একটি পর্যটনস্থলে নিরপরাধ মানুষের ওপর ঘটা সন্ত্রাসী হামলাকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখী ভারত ও পাকিস্তান।

সন্ত্রাসী হামলার ওই ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ী করছে ভারত। নয়াদিল্লির অভিযোগ, ইসলামাবাদ ‘ক্রস-বর্ডার টেরোরিজমে’ মদদ দিচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এ অভিযোগ অস্বীকার করছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে দেশ দুটি পরষ্পরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। নয়াদিল্লি পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিসা বাতিল, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত ও সীমান্ত বন্ধের মত পদক্ষেপ নিয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামাবাদও।

ভারতের পানি চুক্তি স্থগিতের প্রতিক্রিয়ায় রিতিমতো যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, সিন্ধুর পানি বন্ধ বা অন্যদিকে প্রবাহিত করার যেকোনো উদ্যোগকে ‘যুদ্ধের উসকানি’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমন কিছু করা হলে ‘জাতীয় ক্ষমতার পূর্ণ শক্তি দিয়ে’ এর প্রতিক্রিয়া জানাবে পাকিস্তান।

এদিকে ভারতও সামরিক তৎপরতা জোরদার করেছে বলে জানাচ্ছে সেদেশের গণমাধ্যমগুলো। দেশটি তার সমুদ্র ও আকাশপথে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পালা শুরু করেছে। উত্তেজনার মধ্যেই বৃহষ্পতিবার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পরীক্ষা চালিয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনী। ভারতের রাজনৈতিক মহলের অনেকে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। কেউকেউ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বলছেন।

দুদেশের পাল্টাপাল্টি এমন অবস্থানে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। প্রতিবেশী বৈরী দুটি রাষ্ট্র আরও একবার বড় ধরণের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এমনকি লড়াইয়ে কে জয়ী হতে পারে, তা নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি নিয়ে। দু-দেশের সামরিক বাহিনীর আকার, কার হাতে কী ধরনের অস্ত্র রয়েছে তা নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা যুদ্ধের ফল যে কারো জন্যই সুখকর হবেনা তা উভয় দেশই ভালোভাবে অনুধাবন করে। দুটি দেশই পরমাণু শক্তিধর দেশ। উভয়ের কাছেই রয়েছে বিধ্বংসী সব বোমা ও উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র। পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত, যা উভয় দেশের যে কোনো সীমানা পর্যন্ত অতিক্রম করে।

উভয় দেশই জানে বড় আকারের যুদ্ধ হলে তা তাদের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে ফেলবে, ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাবি এবং রাষ্ট্রের অখন্ডতাকে নস্যাৎ করে দেবে। যুদ্ধ হলে কয়েক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে এবং সমগ্র অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। আর প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সংঘাত পরমাণু যুদ্ধে রুপ নিলে তা সমগ্র ভূখন্ডকে বিরাণ ভূমিতে পরিণত করবে। বড়বড় শহরগুলো পরমাণু হামলার টার্গেট হবে এবং মুহুর্তেই ধ্বংস হয়ে যাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই যুদ্ধে কেউই জিতবে না। যুদ্ধ দুটি দেশকেই পঙ্গু করে দেবে। আশপাশের অন্য দেশগুলোর ওপর এর মারাত্বক প্রভাব পড়বে। এমনকি সমগ্র বিশ্ব এই যুদ্ধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়, শান্তির পথই একমাত্র সমাধান। 

ভারত-পাকিস্তান সামরিক শক্তি। ছবি : সংগৃহীত
ভারত-পাকিস্তান সামরিক শক্তি। ছবি : সংগৃহীত

ভারত-পাকিস্তান: সীমান্তে গোলাগুলি, ফিরছেন ভিসা বাতিল হওয়া নাগরিকেরা -আল জাজিরা

কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলার জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) বরাবর এ গোলাগুলি হয়। এই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দুই দেশকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

এদিকে পাল্টাপাল্টি ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকেরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। দুই দেশই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।

কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ী করে আসছে ভারত। এ ঘটনায় পাকিস্তানকে জড়িয়ে ভারতের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে গতকাল শুক্রবার পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতকে সতর্কও করেছে পাকিস্তান। এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ সব সময়ই উদ্বেগের। যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়, তাহলে এই সংঘাত একটি করুণ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

পেহেলগামে হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি সরেজমিন খতিয়ে দেখতে গতকাল কাশ্মীর গেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি তিনি হামলার স্থলও পরিদর্শন করেন। আগের দিন সর্বদলীয় বৈঠকে কাশ্মীরে নিরাপত্তাব্যবস্থায় যথেষ্ট গাফিলতি ছিল বলে স্বীকার করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

গত মঙ্গলবার বিকেলে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বৈসারণ উপত্যকায় বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হন। এই হামলার দায় স্বীকার করেছে দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) নামে স্বল্প পরিচিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী।

এই হামলায় পাকিস্তানের মদদ আছে অভিযোগ তুলে গত বুধবার প্রতিবেশী দেশটির নাগরিকদের ভিসা বাতিল ও সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতসহ পাঁচটি পদক্ষেপ নেয় ভারত। জবাবে পরদিন ভারতের নাগরিকদের ভিসা বাতিল, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্থগিত, আকাশসীমা বন্ধসহ বেশ কয়েকটি পাল্টা পদক্ষেপ নেয় পাকিস্তান।

পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে অব্যাহত উত্তেজনার মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। ভারতের সেনাবাহিনীর সূত্রগুলো দাবি করেছে, পাকিস্তানের সেনারা প্রথম গুলি করেছেন। পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কর্মকর্তা সৈয়দ আশফাক গিলানি গোলাগুলির খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে কোন পক্ষ আগে গুলি চালিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

নিয়ন্ত্রণরেখার ঠিক কোন এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে পৃথক গোলাগুলির ঘটনায় বান্দিপোরায় দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পর্যটকদের ওপর হামলাকারী দুই সন্দেহভাজনের বাড়ি গতকাল সকালে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন ভারতীয় সেনারা।

এর আগে তিন সন্দেহভাজনের বিষয়ে তথ্য চেয়ে স্কেচসংবলিত পোস্টার ছাপিয়েছে ভারতের পুলিশ। তাঁরা হলেন ভারতের নাগরিক আদিল হোসেন, পাকিস্তানের নাগরিক আলী ভাই ও হাশিম মুসা। এ ছাড়া ভারতের আরেক নাগরিক আসিফ শেখকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ভারতের দুই নাগরিকের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে দুই দেশের নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরতে দেখা যায়। ওয়াঘা সীমান্তের ভারতের অংশ দেখা যায়, দেশটির নাগরিকেরা দেশে ফিরছেন। সীমান্তে স্বজনদের বিদায় দিতে এসেছেন কেউ কেউ। সীমান্তের পাকিস্তান অংশে দেখা যায়, এক নারীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন তাঁর স্বজনেরা। ভিসা বাতিল হওয়ায় ওই নারীর স্বামী ভারতের নাগরিক দেশে ফিরে যাচ্ছেন। এ সময় সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

কড়া জবাব দেওয়া হবে

বৃহস্পতিবার সর্বদলীয় বৈঠকে কাশ্মীরে নিরাপত্তাব্যবস্থায় যথেষ্ট গাফিলতি ছিল বলে স্বীকার করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এমন গাফিলতি ভবিষ্যতে যাতে না হয়, সে জন্য সতর্ক থাকবে ভারত। এই হামলার মদদদাতা দাবি করে পাকিস্তানকে কড়া জবাব দেওয়া হবে বলেও বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বৈঠকে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা ও গাফিলতির বিষয়ে কয়েকজন নেতা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এত বড় একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে, অথচ গোয়েন্দারা তা টের পেলেন না! ঘটনাস্থলে একজন নিরাপত্তারক্ষীও কেন ছিলেন না, সেই প্রশ্ন তোলা হয়। বলা হয়, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল এক গভীর চক্রান্ত। অথচ কেউ তা টের পেল না কেন? এই ব্যর্থতার দায় পুরোপুরি সরকারের।

সরকারের পক্ষে গাফিলতি ও ব্যর্থতা মেনে নিয়ে বলা হয়, প্রশাসনকে না জানিয়ে স্থানীয় ট্যুর অপারেটররা ওই পথ খুলে দিয়েছিল। সন্ত্রাসীরা সেই সুযোগ নিয়েছে। সরকার জানায়, প্রতিবছর জুন মাসে অমরনাথযাত্রার আগে পেহেলগামের পথ পর্যটকদের জন্য খোলা হয়। কিন্তু এবার স্থানীয় ট্যুর অপারেটররা ২০ এপ্রিল থেকেই সরকারের অজান্তে তা খুলে দেয়। ফলে প্রশাসন নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের সুযোগ পায়নি।

ওই বৈঠকে বিরোধী নেতারা শাসক দল বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের কড়া সমালোচনা করেন। কয়েকজন নেতা বলেন, হিন্দুত্ববাদীরা এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে ও দেখাতে চাইছে। বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ খোলাখুলিভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে চলেছেন।

হামলার পর পাকিস্তানের নাগরিকদের ভিসা বাতিল ও তাঁদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গতকাল মুখ্যমন্ত্রীদের ফোন করে তিনি বলেছেন, ভিসা বাতিলের পর পাকিস্তানিদের শনাক্ত করে যেন দ্রুত ফেরত পাঠানো হয়।

‘সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা’ পাকিস্তানের

যুক্তরাজ্যের স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাশ্মীরে হামলার ঘটনা দুই দেশের মধ্যে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। এ বিষয়ে বিশ্বকে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত’ বলে মন্তব্য করেন খাজা আসিফ। তিনি বলেন, ‘ভারত যে ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সেটা পর্যালোচনা করে আমরা পদক্ষেপ নেব। আমরা ভেবেচিন্তে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেব।’ খাজা আসিফ বলেন, যদি সর্বাত্মক হামলা চালানো হয় বা এ ধরনের কিছু হয়, তখন নিশ্চিতভাবে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হবে।

এমন পরিস্থিতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কি না—এমন প্রশ্নে হ্যাঁ-সূচক জবাব দেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

পেহেলগামের হামলার সঙ্গে পাকিস্তানকে জড়ানোর ভারতীয় চেষ্টার নিন্দা জানিয়ে দেশটির সিনেটে পাস করা প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মর্যাদাহানি করতে ভারত সরকার পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অপপ্রচারের এই ধরন পরিচিত। সংকীর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যই সন্ত্রাসবাদের ঘটনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রস্তাবে বেআইনি ও একতরফাভাবে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তেরও নিন্দা জানানো হয়। এতে বলা হয়, এমন পদক্ষেপ এই চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা যুদ্ধের উসকানির শামিল।

এর আগে পেহেলগামের হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ দিতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানান পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসহাক বলেন, ‘যদি পেহেলগামের ঘটনায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ থাকে, তবে দয়া করে তা আমাদের এবং পুরো বিশ্বকে দেখান।’

সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত নিয়ে ভারতের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। তিনি বলেন, সিন্ধু নদ পাকিস্তানের জনগণের এবং পাকিস্তানের পানির অধিকার হরণ করার যেকোনো চেষ্টার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

সিন্ধু প্রদেশের সুক্কুর শহরে গতকাল এক সমাবেশে পিপিপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘সিন্ধু নদ আমাদের এবং এটি আমাদেরই থাকবে।’

এর আগে ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী সি আর পাতিল বলেন, সিন্ধু পানিচুক্তির অধীনে যাতে এক ফোঁটা পানিও পাকিস্তানে না যায়, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে ভারত।

‘সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের’ আহ্বান জাতিসংঘের

কাশ্মীরে হামলার পর পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনার মধ্যে দেশ দুটিকে ‘সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের’ আহ্বান জানান জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আন্তোনিও গুতেরেসের এ বার্তা সাংবাদিকদের জানান।

স্টিফেন ডুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব ‘খুবই উদ্বিগ্ন’। সার্বিক পরিস্থিতিতে ‘খুব নিবিড়ভাবে নজর’ রাখছেন তিনি।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বেশ কিছু পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপের দিকে না যায়, সে জন্য দেশ দুটিকে তিনি সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরার অনুরোধ করেছেন বলে সাংবাদিকদের জানান ডুজারিক।

জাতিসংঘ মহাসচিব আরও বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যেকোনো সমস্যা অর্থবহ আলোচনা ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি এবং এটাই হওয়া উচিত।’

২০১৯ সালে কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলায় ভারতের ৪১ জন সেনা নিহত হন। ওই হামলার পর পাকিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছিল ভারত। এবারের হামলার পরও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির কয়েকজন নেতা।

নিজ দেশে ফেরার আগে ভারতীয় স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন পাকিস্তানের কয়েকজন নাগরিক। গতকাল ভারতের অমৃতসর শহরের ওয়াঘা সীমান্তে
নিজ দেশে ফেরার আগে ভারতীয় স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন পাকিস্তানের কয়েকজন নাগরিক। গতকাল ভারতের অমৃতসর শহরের ওয়াঘা সীমান্তে। ছবি: এএফপি

সিন্ধু পানি চুক্তি: ভারত কি পাকিস্তানে পানির প্রবাহ আটকে দিতে পারবে -বিবিসি

ভারত কি সত্যিই পাকিস্তানে প্রবাহিত সিন্ধু ও এর দুটি শাখা নদ–নদীর পানি আটকে দিতে পারবে? ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে গত মঙ্গলবার এক ভয়াবহ হামলার জেরে নয়াদিল্লি সিন্ধু অববাহিকার ছয় নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক একটি চুক্তি স্থগিত করায় অনেকের মনেই এ প্রশ্ন উঠছে।

১৯৬০ সালে এই চুক্তি করে ভারত-পাকিস্তান। এরপর পারমাণবিক শক্তিধর দেশ দুটি দুবার যুদ্ধে জড়ালেও চুক্তিটি স্থগিত হয়নি। তাই এতদিন আন্তসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে এই চুক্তি।

আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসী তৎপরতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে শুধু এই চুক্তিই স্থগিত নয়, আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত; যদিও এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে ভারতকে সতর্ক করে বলেছে, যদি ভারত পানি আটকে দেয়, তবে তা হবে ‘যুদ্ধের শামিল’।

চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি নদী ইরাবতী, বিপাশা ও শতদ্রুর পানি ব্যবহার করতে পারবে ভারত। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি নদ–নদী সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের ৮০ শতাংশ পানি পাকিস্তান ব্যবহার করতে পারবে।

তবে এই চুক্তি নিয়ে অতীতে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এসব নদ–নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারতের পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল পাকিস্তান। তাদের যুক্তি ছিল, এতে নদীর পানির প্রবাহ কমে যাবে এবং এটা চুক্তির লঙ্ঘন। (পাকিস্তানের ৮০ শতাংশের বেশি কৃষিকাজ ও এক-তৃতীয়াংশ পানিবিদ্যুৎ সিন্ধু অববাহিকার পানির ওপর নির্ভরশীল)।

এদিকে ভারত জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সেচ, সুপেয় পানি ও পানিবিদ্যুতের চাহিদার কথা বলে চুক্তিটি পর্যালোচনা এবং এতে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়ে আসছিল।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিল বিশ্বব্যাংক। দীর্ঘ এই সময়ে চুক্তিটি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান আইনি লড়াই চলেছে।

কিন্তু এবারই প্রথম কোনো একটি পক্ষ চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। কাজটি করেছে ভারত। কারণ, উজানের দেশ হিসেবে এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিকভাবে তারা আছে সুবিধাজনক অবস্থানে।

কিন্তু এই চুক্তি স্থগিত বলতে আসলে কী বোঝায়? ভারত কি সিন্ধু অববাহিকার পানি আটকে বা সরিয়ে পাকিস্তানের জনজীবনের জন্য অতি জরুরি এ পানি থেকে তাদের বঞ্চিত করতে পারবে? সেটা কি আদৌ ভারতের পক্ষে সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে পানি যখন বেশি থাকবে, ওই সময় পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো থেকে শত শত কোটি ঘনমিটার পানি আটকে দেওয়া ভারতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এ বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে কোথাও আটকে রাখার জন্য বিশাল কোনো জায়গা যেমন ভারতের নেই, তেমনি এত বড় কোনো খালও তাদের নেই।

সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক পানিসম্পদ–বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠাক্কার বলেন, ভারতের যে অবকাঠামো আছে, তার বেশির ভাগই বাঁধভিত্তিক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প, যেখানে বড় ধরনের জলাধারের প্রয়োজন হয় না।

এ ধরনের পানিবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবাহিত পানির শক্তিকে ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ জন্য বেশি পরিমাণে পানি আটকানোর প্রয়োজন হয় না।

ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকার কারণে চুক্তি অনুযায়ী ঝিলাম, চেনাব ও সিন্ধু নদ–নদীর ২০ শতাংশ পানিরও যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না ভারত। এই যুক্তি তুলে ধরেই ভারত পানি ধরে রাখার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে চেয়েছিল। তবে পাকিস্তান চুক্তির শর্ত উল্লেখ করে এর বিরোধিতা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখন বিদ্যমান অবকাঠামোর পরিবর্তন করে বা নতুন স্থাপনা নির্মাণ করে পাকিস্তানকে না জানিয়েই বেশি পানি আটকাতে বা সরিয়ে নিতে পারবে।

পানিসম্পদ–বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠাক্কার বলছেন, অতীতের মতো এখন আর ভারতকে কোনো প্রকল্পের নথি পাকিস্তানকে দেখাতে হবে না। কিন্তু জটিল ভূপ্রকৃতি ও ভারতের কিছু প্রকল্পের বিরুদ্ধে দেশটিতে প্রতিবাদের মতো কিছু চ্যালেঞ্জের কারণে এসব নদীর পানি ব্যবহারে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে তেমন গতি আসেনি।

২০১৬ সালে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক সন্ত্রাসী হামলার পর ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, সিন্ধু অববাহিকায় কয়েকটি বাঁধ ও জলাধার প্রকল্পের নির্মাণকাজে গতি আনা হবে। যদিও এ ধরনের প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তেমন কোনো সরকারি তথ্য নেই; তবে একাধিক সূত্রে জানা যায়, অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, ভারত যদি তার বিদ্যমান ও সম্ভাব্য অবকাঠামো দিয়ে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীতে পানি একেবারে কমে যায়, পাকিস্তান তখন এর প্রভাবটা বুঝতে পারবে।

টাফট্‌স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নীতি ও পরিবেশ গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাসান এফ খান পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডন–এ লিখেছেন, আরেকটি জরুরি উদ্বেগের বিষয় হলো, শুষ্ক মৌসুমে যখন অববাহিকাজুড়ে পানিপ্রবাহ কমে যায়, পানি ধরে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং সময়মতো প্রবাহ অধিকতর জরুরি হয়ে পড়ে, তখন কী ঘটবে? এ সময় চুক্তিতে থাকা বিধিনিষেধের অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে।

চুক্তি অনুসারে, ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে পানিপ্রবাহ–সংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি করতে হবে, যা বন্যা পূর্বাভাস, সেচ, পানিবিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ছয় বছরের বেশি সময় ধরে সিন্ধু পানি চুক্তি বিষয়ক কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন প্রদীপ কুমার স্যাক্সেনা। তিনি ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, ভারত এখন পাকিস্তানের সঙ্গে বন্যার তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দিতে পারে।

বর্ষাকালে (জুন থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) এ অঞ্চল বিধ্বংসী বন্যার কবলে পড়ে। তবে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি স্থগিতের আগেই ভারত হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা (জল সংস্থান বিষয়ক তথ্য) বিনিময় কমিয়ে দিয়েছিল।

সিন্ধু চুক্তি বিষয়ক পাকিস্তানের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার শিরাজ মেমন বিবিসি উর্দুকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘোষণার আগে থেকেই ভারত মাত্র ৪০ শতাংশ তথ্য পাকিস্তানকে জানাত।’

এ অঞ্চলে যখনই পানি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ে তখন প্রায়ই একটি প্রশ্ন ওঠে, উজানের দেশ কি ভাটির দেশের প্রতি পানিকে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে?

এ পরিস্থিতিকে অনেক সময় ‘জল বোমা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। যেখানে উজানে অবস্থিত দেশটি হঠাৎ পানি আটকে রেখে পরে একসঙ্গে ছেড়ে দেয়, যা ভাটির দেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ভারত কি এটা করতে পারে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত এমনটা করলে প্রথমে তার নিজের ভূখণ্ডই বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে। কেননা, বেশির ভাগ বাঁধ পাকিস্তান সীমান্ত থেকে অনেক দূরে। তবে পূর্ব সতর্কতা ছাড়া নিজের জলাধার থেকে কাদামাটি ছেড়ে দিতে পারবে, যা ভাটিতে থাকা পাকিস্তানের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

হিমালয় থেকে নেমে আসা সিন্ধুর মতো নদীগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কাদামাটি থাকে, যা দ্রুতই বাঁধে জমে যায়। এ কারণে হঠাৎ এ কাদামাটি ছেড়ে দিলে ভাটিতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

এখানে আরও একটি বড় বিষয় রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে রয়েছে চীন আর ভাটিতে ভারত এবং সিন্ধু নদের উৎপত্তি চীনের তিব্বতে।

২০১৬ সালে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলা হয়। সেই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছিল ভারত। সেবার ভারত সতর্ক করে বলেছিল, ‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না’। ভারতের এ সতর্কতার পর চীন ইয়ারলুং তাসাংপোর (যা ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদ নামে পরিচিত) শাখা নদীর পানি আটকে দেয়।

পাকিস্তানের মিত্র চীন তখন জানায়, তারা একটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনে এটা করেছে। তবে যে সময়ে চীন এ পদক্ষেপ নেয়, তাতে অনেকেই মনে করেন, চীন এর মাধ্যমে ইসলামাবাদকে সহায়তা করেছিল।

তিব্বতে একাধিক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পর ইয়ারলুং তাসাংপো নদীতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেয় চীন।

বেইজিংয়ের দাবি, এতে পরিবেশগত প্রভাব হবে খুবই কম। তবে ভারতের আশঙ্কা, এর ফলে নদীর ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়ে যাবে।

শুষ্ক সিন্ধু নদের তীরে হাঁটছে লোকজন, ১৫ মার্চ ২০২৫,  জামশোরো, পাকিস্তান
শুষ্ক সিন্ধু নদের তীরে হাঁটছে লোকজন, ১৫ মার্চ ২০২৫, জামশোরো, পাকিস্তান। ছবি রয়টার্স

কাশ্মীর: ভারত সরকার ও মিডিয়া দায় এড়াতে পারে কি by হামিদ মির

‘পেহেলগাম’ শব্দের অর্থ হলো পশুপালকদের জনপদ। কাশ্মীরি ভাষায় পশুপালকদের বলা হয় ‘পেহেল’ আর ‘গাম’ মানে গ্রাম বা বসতি। প্রাচীনকালে পেহেলগাম ছিল এক শান্ত, মনোরম চারণভূমি। সেখানে পশুপালক পরিবারের কয়েকটি ঘরবাড়ি ছিল। কিন্তু ২২ এপ্রিল ২০২৫ সালের পর থেকে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা স্থানটি হয়ে গেছে ‘বধ্যভূমি’। শুরু হয়েছে দোষারোপের খেলা।

২২ এপ্রিল দুপুরে পেহেলগামে ২৮ জন ভারতীয় পর্যটককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি একটি নৃশংস, নিন্দনীয় ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ হত্যাকাণ্ড ইসলামি শিক্ষার বিরুদ্ধেও যায়। কারণ, ইসলাম নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা সমর্থন করে না। সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই। আমরা যদি বেলুচিস্তানে জাফর এক্সপ্রেসে সাধারণ যাত্রীদের ওপর হামলার নিন্দা করি, তাহলে পেহেলগামে নিরস্ত্র পর্যটকদের ওপর হামলারও সমানভাবে নিন্দা করা উচিত।

এ ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই পাহাড়ি জনপদে তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য ভারতীয় রাজ্য থেকে আগত এত বিপুলসংখ্যক পর্যটকের জন্য কেন যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? যাঁরা জম্মু-কাশ্মীরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত, তাঁরা জানেন যে পেহেলগাম এলাকাটি বহু দশক ধরেই ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাহলে ভারত সরকার কেন তাদের নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করেনি?

হঠাৎ করেই জঙ্গলের ভেতর থেকে এম৪ মার্কিন রাইফেল ও একে-৪৭ হাতে সশস্ত্র জঙ্গিরা বেরিয়ে আসে। হাসিখুশি ভ্রমণরত পর্যটকদের ঘিরে শুধু পুরুষদের গুলি করে হত্যা করে। নিঃসন্দেহে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এর দায় এড়াতে পারে না। নারী ও শিশুদের তারা গুলি করেনি। এমনকি এক নারী যখন নিজের স্বামীকে হত্যা করতে দেখে জঙ্গিকে অনুরোধ করেন তাঁকেও গুলি করতে, তখনো জঙ্গি তাঁকে গুলি করে না।

অল্প কিছুদিন আগে জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভায় জানানো হয়েছিল যে ২০২৪ সালে কাশ্মীর রাজ্যজুড়ে ৩৫ লাখ পর্যটক ভ্রমণে এসেছিলেন। এর মধ্যে ৪৩ হাজার বিদেশি পর্যটকও ছিলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এ সংখ্যার ভিত্তিতে দাবি করেছিল যে কাশ্মীরে ‘আন্দোলনের যুগ শেষ’। কিন্তু আজ বলতেই হয় যে পেহেলগামে নিরস্ত্র পর্যটকদের হত্যার দায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এড়াতে পারে না। তেমনি এর দায়ভার বর্তায় ভারতীয় সেই নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার ওপরও। তারা জনগণকে জানায়নি যে এ অঞ্চল তাঁদের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

পেহেলগাম কিন্তু সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না। ১৯৯২ সালে যখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা বাবরি মসজিদে হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়, তার পরের বছর ১৯৯৩ সালে প্রথমবারের মতো পেহেলগামে অমরনাথ যাত্রায় অংশ নিতে আসা হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ওপর হামলা হয়। তার আগে পেহেলগাম ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এক দৃষ্টান্ত। মনোরম স্থানটি শ্রীনগর থেকে ৯৬ কিলোমিটার দূরে অনন্তনাগ জেলার অন্তর্গত। ১৬৬৪ সালে তৎকালীন গভর্নর ইসলাম খান একে ‘ইসলামাবাদ’ নাম দিয়েছিলেন।

‘অনন্তনাগ’ শব্দের অর্থ ‘অগণিত প্রস্রবণের শহর’। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, এ এলাকা ছিল বিষ্ণুর আবাসস্থল। হিন্দুদের অতি পরিচিত তীর্থ অমরনাথ মন্দির পেহেলগাম থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে হিমালয়ের উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত। প্রতিবছর শ্রাবণের পূর্ণিমায় হাজার হাজার হিন্দু ভক্ত অমরনাথ যাত্রায় অংশ নেন। তীর্থযাত্রীরা তাঁদের যাত্রা শুরু করেন পেহেলগাম থেকে। তারপর তাঁরা পৌঁছান লিদার উপত্যকার গণেশবল এলাকায়। সেখানে তাঁরা পুণ্যস্নান করেন।

এরপর তাঁরা পৌঁছান চন্দনওয়ারি, যেখান থেকে শুরু হয় এক বিপদসংকুল পাহাড়ি চড়াই। সেই চড়াই পার হয়ে তীর্থযাত্রীরা পৌঁছান শেশনাগ হ্রদের তীরে। যেখানে তাঁরা আবারও স্নান করেন। এরপর তাঁরা পৌঁছান ‘পাঞ্জতারনি’ নামের উপত্যকায়, যার মানে পাঁচটি নদীর উপত্যকা। এখানে ঠান্ডা পানিতে স্নান করে, ভক্তিগীতি গাইতে গাইতে যাত্রীরা এগিয়ে যান একটি বিশাল গুহার সামনে পর্যন্ত। যখন সেই গুহার ভেতর থেকে বুনো কবুতর বেরিয়ে আসে, তখন যাত্রীরা মনে করেন, তাঁদের অমরনাথ দর্শন সম্পন্ন হয়েছে, অর্থাৎ ঈশ্বরের দর্শন লাভ করেছেন। এরপর তাঁরা যাত্রা শেষ করে ফিরে যান।

অনন্তনাগে একটি প্রসিদ্ধ ঝরনা রয়েছে, যার নাম নাগহবেল। এ জায়গাই এক অসাধারণ উদাহরণ ধর্মীয় সহাবস্থানের—এখানে হিন্দুদের মন্দির, মুসলমানদের মসজিদ ও শিখদের গুরুদোয়ারা পাশাপাশি অবস্থিত। ধর্মীয় সহনশীলতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো ‘বাবা দাউদ খাকি’র মসজিদ, যার আঙিনায় হিন্দুদের একটি মন্দিরও রয়েছে। একই অঞ্চলে রয়েছেন আরেক জনশ্রুতিখ্যাত কাশ্মীরি সুফি সাধক রেশা মোল। এই সাধকের মাজারে মুসলমানদের পাশাপাশি বহু হিন্দু ভক্তও আসেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার পর এ অঞ্চলেও ধর্মীয় সহনশীলতার আবহে চিড় ধরে। ১৯৯৩ সালের ১৫ আগস্ট, এই এলাকাতেই অমরনাথ তীর্থযাত্রীদের ওপর এক হামলায় আটজন নিহত হন। এর পরের বছর ১৯৯৪-এ ৫ জন, ১৯৯৮ সালে ২০ জন, ২০০০ সালে ৩২ জন, ২০০১ সালে ১৩ জন, ২০০২ সালে ৯ জন, ২০০৬ সালে ৫ জন, ২০১২ সালে ৭ জন, ২০২২ সালে ৪ জন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে ১০ জন তীর্থযাত্রী নিহত হন।

এমনকি গত বছর, ১৯ মে ২০২৪-এ শোপিয়া ও অনন্তনাগে পর্যটকদের ওপর হামলা হয়েছিল। তাই এ বছর পর্যটকদের সতর্ক করাটা খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু সুরক্ষা সংস্থা কিংবা ভারতীয় মিডিয়া—কেউই জনগণকে যথাযথভাবে অবহিত করেনি।

পেহেলগামের জঙ্গলে নিয়মিতভাবে সুরক্ষা বাহিনী তল্লাশি অভিযান চালায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে অনন্তনাগের কুকারনাগ অঞ্চলে পাহাড়ি জঙ্গলে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও স্থানীয় পুলিশের যৌথ অভিযানে ড্রোন ব্যবহার করা হয়। সেখানে কয়েক দিন ধরে তীব্র সংঘর্ষ হয়। সংঘাতে ভারতীয় রাইফেলসের কর্নেল মনপ্রীত সিং, জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের এসপি হুমায়ুন ভাটসহ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। এ সংঘর্ষ সেই গোষ্ঠীর সঙ্গেই হয়েছিল, যারা পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে।

গোষ্ঠীটি ২০১৯ সালে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপের পর ‘মহাজে মুজাহমত’ (মোকাবিলার মোর্চা) নামে আত্মপ্রকাশ করে। এর নেতা শেখ সাজাদ গুল শ্রীনগরের বাসিন্দা। দিল্লির তিহার জেলে চার বছর কারাভোগ শেষে ২০০৬ সালে তিনি মুক্তি পান। ৫ আগস্ট ২০১৯-এর পর তিনি আবার সক্রিয় হন। এই গোষ্ঠী বহিরাগত হিন্দুদের জম্মু-কাশ্মীরে বসবাসের বৈধতা দেওয়া নীতির বিরোধিতা করে আন্দোলন করছে।

কিন্তু নিরস্ত্র পর্যটকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই স্বাধীনতার লড়াই হতে পারে না। এ ধরনের হামলা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে হামলাকারীদের জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী—সবকিছুকেই কলঙ্কিত করে।

উল্লেখ্য, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ের ওপর হামলার পর ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। এবার ২২ এপ্রিল পেহেলগাম হামলার পর আবারও দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধোন্মাদনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তবে এ কথা স্পষ্ট যে কাশ্মীর সমস্যা কোনো অভিযানের মাধ্যমে নয়, কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে।

* হামিদ মির পাকিস্তানি সাংবাদিক ও লেখক

- পাকিস্তানের দৈনিক পত্রিকাজঙ্গ থেকে নেওয়া। উর্দু থেকে অনুবাদ: জাভেদ হুসেন

কাশ্মীরে পর্যটকদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ভারতীয় সৈনিক
কাশ্মীরে পর্যটকদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ভারতীয় সৈনিক। ছবি: রয়টার্স

কাশ্মীর যেভাবে ভারত-পাকিস্তান সংকটের কেন্দ্রে

সাত দশকের বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কাশ্মীর অঞ্চল। গত মঙ্গলবার কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন নিহত হওয়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে এই অঞ্চলটি।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই ভূখণ্ড নিয়ে দুটি যুদ্ধ করেছে। দুই দেশই এই অঞ্চলের পুরোটা নিজেদের দাবি করে, তবে নিয়ন্ত্রণ করে আংশিকভাবে।

চীনও এই অঞ্চলের কিছু অংশে শাসন পরিচালনা করে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সামরিকায়িত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

২০১৯ সালে ভারতের পার্লামেন্ট এই অঞ্চলের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে, যা এই অঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসনের কিছুটা অধিকার দিয়েছিল।

তখন জম্মু-কাশ্মীর দুই অংশকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়।

এর পর থেকে ভারত সরকার বারবার দাবি করেছে যে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ থামানো গেছে। তবে মঙ্গলবারের মর্মান্তিক ঘটনার পর ভারত সরকারের সে দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা।

১৯৪৭ থেকে ইতিহাস

ব্রিটিশ শাসন থেকে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর সে সময়কার রাজকীয় শাসকদের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

তৎকালীন কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং ছিলেন একজন হিন্দু শাসক, কিন্তু এই অঞ্চলটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই দুই দেশের মাঝে অবস্থিত এই অঞ্চল নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে পরিবহন এবং অন্যান্য পরিষেবা বজায় রাখার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

১৯৪৭ সালের অক্টোবরে, মুসলিমদের ওপর আক্রমণের খবরে এবং হরি সিংয়ের বিলম্ব করতে থাকা কৌশলে হতাশ হয়ে পাকিস্তানের নৃগোষ্ঠী কাশ্মীরে আক্রমণ করে।

মহারাজা হরি সিং তখন ভারতের সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন।

ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন বিশ্বাস করতেন যে কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে সাময়িকভাবে যুক্ত হলে শান্তি বজায় থাকবে এবং পরে তার চূড়ান্ত অবস্থান নিয়ে গণভোট হবে।

সেই মাসেই হরি সিং ‘অধিগ্রহণ চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন, যার মধ্য দিয়ে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনী ভূখণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে নেয়, আর পাকিস্তান উত্তরের বাকি অংশ দখল করে। ১৯৫০-এর দশকে চীন এ রাজ্যের পূর্ব অংশ আকসাই চিন দখল করে।

এই ‘অধিগ্রহণ চুক্তি’ আগে স্বাক্ষরিত হয়েছিল নাকি ভারতীয় সেনা আগে প্রবেশ করেছিল, সেটি এখনো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় বিতর্কের বিষয়।

ভারত জোর দিয়ে বলে যে মহারাজা হরিং সিং প্রথমে স্বাক্ষর করেছিলেন, ফলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বৈধ। আর পাকিস্তান বলে, মহারাজা সৈন্য আগমনের আগে স্বাক্ষর করেননি, তাই ভারত ও মহারাজা পাকিস্তানের সঙ্গে হওয়া চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন।

পাকিস্তান কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গণভোট দাবি করে, আর ভারত বলে যে ধারাবাহিকভাবে রাজ্য ও জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাশ্মীরিরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

পাকিস্তান জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবের কথা বলে, যেখানে জাতিসংঘ পরিচালিত গণভোটের কথা বলা হয়েছে, তবে ভারত বলে ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি অনুযায়ী সমস্যার সমাধান রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই হতে হবে।

কয়েক দশক ধরে দুই পক্ষের এমন অবস্থানে খুব একটা নড়চড় হয়নি।

এ ছাড়া কিছু কাশ্মীরি রয়েছে যারা স্বাধীনতা চায়, যেটা ভারত বা পাকিস্তান কেউই মেনে নিতে রাজি না।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান ১৯৪৭-৪৮ এবং ১৯৬৫ সালে যুদ্ধ করেছে।

তারা সিমলা চুক্তিতে মূল যুদ্ধবিরতির যে রেখা ছিল সেটিকে নিয়ন্ত্রণ রেখা হিসেবে চূড়ান্ত করে, তবে এতে সংঘর্ষ বন্ধ হয়ে যায়নি। ১৯৯৯ সালে সিয়াচেন হিমবাহ অঞ্চলে আরও সংঘর্ষ হয়, যেটি ছিল নিয়ন্ত্রণরেখার বাইরে। ২০০২ সালেও দুই দেশ আবার যুদ্ধের কাছাকাছি চলে যায়।

১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে ইসলামপন্থীদের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বিতর্কিত ‘সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন’ (এএফএসপিএ) চালু করে ভারত সেনাবাহিনীকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়।

এ আইন নিয়ে মাঝেমধ্যে পর্যালোচনা হলেও এটি এখনো ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে কার্যকর।

কাশ্মীরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সময়

১৮৪৬ - কাশ্মীর রাজ্য গঠিত হয়।

১৯৪৭-৪৮ - পাকিস্তানি নৃগোষ্ঠী বাহিনীর হামলার পর কাশ্মীরের মহারাজা ভারতের সঙ্গে অধিগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।

১৯৪৯ - ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীর ভাগ হয়।

১৯৬২ - আকসাই চিন সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ হয়। এতে ভারত পরাজিত হয়।

১৯৬৫ - দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়, যেটি যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

কাশ্মীরি জাতীয়তাবাদের উত্থান: জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়, যার লক্ষ্য ভারত ও পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরকে পুনরায় একত্র করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন।

১৯৭২- শিমলা চুক্তি: যুদ্ধের পর ভারত ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণরেখা চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে একমত হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়।

১৯৮০-৯০ দশক: ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ, গণবিক্ষোভ ও পাকিস্তান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়।

১৯৯৯ - কারগিল যুদ্ধ: পাকিস্তান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ভারতের অধীন কারগিল অংশে অনুপ্রবেশ করলে ভারত ও পাকিস্তান আবার স্বল্পমেয়াদি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

২০০৮ – ভারত ও পাকিস্তান ছয় দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রণরেখা পারাপারের বাণিজ্য রুট চালু করে।

২০১০ - ভারতশাসিত কাশ্মীরে ভারতবিরোধী বিক্ষোভে শতাধিক যুবক নিহত হন।

২০১৫ – রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ: জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচনে ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি প্রথমবারের মতো এ অঞ্চলে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, যখন তারা আঞ্চলিক মুসলিম পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে আংশিকভাবে জোট সরকার গঠন করে।

২০১৯ – ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামাতে ভারতের সেনাবাহিনীর বহরে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ৪০ জন সেনা নিহত হন। অগাস্ট মাসে ভারত সরকার জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে, যা রাজ্যটিকে উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। এরপর রাজ্যটিকে ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করা হয়।

ভারত-পাকিস্তানকে বিভক্তকারী লাইন অব কন্ট্রোলের উরি সেকশনে সতর্ক অবস্থানে ভারতীয় সেনাবাহিনী
ভারত-পাকিস্তানকে বিভক্তকারী লাইন অব কন্ট্রোলের উরি সেকশনে সতর্ক অবস্থানে ভারতীয় সেনাবাহিনী। ছবি: এএনআই

ভারত-পাক সীমান্তে উত্তেজনার পারদ বাড়ছে, গুলিবিনিময়

পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলার অভিঘাতে ভারত-পাক সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই আবহে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির খবর আসছে। নতুন করে সেনা মোতায়েন শুরু করেছে পাকিস্তান। পাক সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির পাক সেনার নির্দিষ্ট কয়েকটি কোর এবং ইউনিটকে সক্রিয় হওয়ার বার্তা দিয়েছেন বলে সে দেশের সংবাদমাধ্যমের একাংশ জানাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত’ বলে দাবি করে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত যা কিছু শুরু করবে তার প্রতি আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করবো। এটি হবে একটি পরিমাপিত প্রতিক্রিয়া। যদি কোনো সর্বাত্মক আক্রমণ বা এরকম কিছু হয়, তাহলে অবশ্যই একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ হবে।

ভারতের পক্ষ থেকে এদিন কড়া ধরনের কোনো ঘোষণা না করা হলেও রাজস্থানে ভারতীয় সেনা যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে মিডিয়া সূত্রে বলা হয়েছে। ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় শ্রীনগরে পৌঁছেছেন। সেখানে তিনি স্থানীয় কমান্ডারদের কাছ থেকে নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে খোঁজখবর করেছেন। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ন্ত্রণরেখা  বরাবর পাক সেনারা গুলি চালিয়েছে বলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযোগ। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, শুক্রবারও জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর একাধিক স্থানে গুলি চালিয়েছে পাক সেনা। ‘ইন্ডিয়া টুডে’ ভারতীয় সেনার এক আধিকারিককে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, পাক সেনারা সীমান্তে গুলি চালিয়েছে। ভারতীয় সেনারাও পাল্টা গুলি চালিয়েছে। সীমান্তের এপারে ভারতীয়দের মধ্যে কেউ হতাহত হয়নি বলে জানানো হয়েছে।

পহেলগাঁও হামলার পর থেকেই জম্মু-কাশ্মীর জুড়ে সেনারা সন্ত্রাসী দমন অভিযান আরও জোরদার করেছে। কাশ্মীরের বান্দিপোরায় নিয়ন্ত্রণরেখার (এলওসি) অদূরে কুলনার বাজিপোরা জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী লস্কর-এ-তৈয়বার শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার আলতাফ লাল্লির মৃত্যু হয়েছে। ভারতীয় সেনার সূত্র উদ্ধৃত করে শুক্রবার প্রকাশিত খবরে এই দাবি করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই বান্দিপোরায় কুলনার বাজিপোরা এলাকায় তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছিল সেনাবাহিনী। লুকিয়ে থাকা জঙ্গিরা হঠাৎ নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকে বলে অভিযোগ। ভারতীয় সেনারাও পাল্টা আক্রমণ করে। সে সময়ই মৃত্যু হয় আলতাফের। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের এক আধিকারিক বলেছেন, এটি বাহিনীর বড় সাফল্য। দীর্ঘদিন ধরেই আলতাফের খোঁজ চালানো হচ্ছিলো।

এদিকে পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় সন্দেহভাজন দুই সন্ত্রাসবাদীর বাড়ি ভেঙে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী এবং জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন। একজনের নাম আসিফ শেখ এবং অপর জনের নাম আদিল হুসেন ঠোকর। দু’জনেই সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী লস্কর-এ-তৈয়বার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। সেনা সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আদিলের বাড়িটি আইইডি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়। আর শুক্রবার আসিফের বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়।
পাক সীমান্তে পাহারায় নিযুক্ত বিএসএফ জানিয়েছে, তারা সীমান্ত চেকপোস্টগুলোতে বিটিং রিট্রিট সেরিমনি ছোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেইসঙ্গে পাক কমান্ডারদের সঙ্গে করমর্দন বাতিল করা হয়েছে। বিএসএফের পাঞ্জাব ফ্রন্টিয়ারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপগুলো সীমান্তের আন্তঃসম্পর্কিত শত্রুতা নিয়ে ভারতের গুরুতর উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে এবং পুনরায় নিশ্চিত করে যে, শান্তি এবং উস্কানি একসঙ্গে চলতে পারে না।

শুক্রবার ভারতের সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেখানেই তিনি জানান যে, সংশ্লিষ্ট রাজ্যে কোনো পাকিস্তানের নাগরিক আছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে। যদি কেউ থেকে থাকেন, তবে তাকে শনাক্ত করতে হবে এবং পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে হবে। যদিও মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে শাহের এই কথোপকথনের বিষয়ে কেন্দ্র বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনের বিক্ষোভ: ভারতের বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনও ইতিমধ্যেই পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পথে নেমেছে। তাদের দাবি, এভাবে নিরীহ পর্যটকদের যারা হত্যা করেছে তারা মানবতার শত্রু। এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি শুক্রবার নিজের বাহুতে কালো ফিতে বেঁধে পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা করেন। এমন কী তিনি এদিন মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কালো আর্ম ব্যান্ড বিতরণ করেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কালো ফিতে পরার জন্য আহ্বান করেছিলেন। কলকাতার রাজাবাজারেও মুসলিমরা এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সমাবেশ করেন।
কাশ্মীর ইস্যুতে মোদির পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি কংগ্রেসের: ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে বন্দুকধারীদের হামলায় পাকিস্তানের সঙ্গে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তাতে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কংগ্রেস। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কার্যনির্বাহী কমিটির নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বৈঠকে কাশ্মীর ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারকে পূর্ণ সমর্থন করার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। পরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, তিনি বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাকে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় এই নেতা বলেছেন, এটা দলীয় রাজনীতি করার সময় নয়। এখন সম্মিলিত সংকল্পের সময়, যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সময়। তিনি যোগ করেন, এই মুহূর্তে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা সবাই সরকারের সঙ্গে একজোট। মল্লিকার্জুন বলেন, তার দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার যেন হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে সমস্ত শক্তি কাজে লাগায়। বৈঠক শেষে নিহতের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন কংগ্রেসের নেতারা।

জম্মু-কাশ্মীর ইস্যুতে পূর্ণ যুদ্ধের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর: ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র দু’টির মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের ‘চিন্তিত’ হওয়া উচিত। খাজা আসিফ সতর্ক করে বলেছেন যে, ভারতের দখলে থাকা জম্মু ও কাশ্মীরে (আইওজেকে) প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং তা ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে। বৃটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

মঙ্গলবার ভারত-অধিকৃত পহেলগাঁওয়ে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ পর্যটক নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনায় জড়িয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। একতরফাভাবে ওই হামলার পুরো দায় ইসলামাবাদের ওপর চাপিয়েছে দিল্লি। তবে ইসলামাবাদ ভারতের দাবি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে এবং একে ‘ভুয়া’ বলে অভিহিত করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন যে, তাদের সেনাবাহিনী যেকোনো পরিণতির জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে যা করা হবে আমরাও সে অনুযায়ী পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাবো। আমাদের প্রতিক্রিয়া হবে সমপরিমাণ। ভারত যদি পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু করে তাহলে পাকিস্তানও পাল্টা হামলা চালাবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আসিফ। তবে চলমান উত্তেজনা নিরসনে এখনো আলোচনার পথ বন্ধ হয়নি বলে মনে করেন তিনি। ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে বিশ্ব নেতাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কিনা জানতে চাইলে আসিফ বলেন, দু’টি পারমাণবিক শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ সবসময়ই চিন্তার বিষয়। যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যায়, তাহলে সংঘর্ষের বেশ দুঃখজনক পরিণতি হতে পারে। এই হামলার জন্য ভারতকে দায়ী করার বিষয়ে জানতে চাইলে- উত্তেজনা বৃদ্ধি সত্ত্বেও আসিফ বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই! এমন পরিস্থিতির জন্য তারাই দায়ী। এখন উচিত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা। এর আগে, আসিফ বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের পহেলগাঁওয়ের হামলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা, পাকিস্তান সর্বত্র সবধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতা করে। তিনি বলেন, ভারতকে পহেলগাঁওয়ের ঘটনার তদন্ত করা উচিত। কেননা, শুধু অভিযোগ করেই তারা এর দায় এড়াতে পারে না।

mzamin

জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ড: তদন্তে ধীরগতি, বাড়ছে ক্ষোভ by সাজ্জাদ হোসেন

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে চলা নৃশংসতায় গত ৪ঠা আগস্ট রাজধানীর মিরপুর ১০-এ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বিএএফ শাহীন কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী শহীদ আহনাফ। আন্দোলনে যেতে বাবা-মা নিষেধ করলেও তা শোনেননি আহনাফ। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ফোনে আহনাফ তার মাকে জানিয়েছিলেন তিনি মিরপুর ১০ নম্বরে আছেন। এটাই ছিল আহনাফের সঙ্গে তার মায়ের শেষ কথা। সেদিন সন্ধ্যায় একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন পেয়েই শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে আহনাফের লাশ খুঁজে পান পরিবারের সদস্যরা। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাদির কবরে পাশে দাফন করা হয় আহনাফকে।

এ ঘটনায় গত ৩রা অক্টোবর আহনাফের মা জারতাজ পারভীন সাফাত অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, পুলিশ বাহিনী সদস্যদের দ্বারা এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। যা তদন্ত সংস্থা খুঁজে বের করবে। এজন্যই নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তিনি। লক্ষ্য সন্তান হত্যার সুষ্ঠু বিচার। কিন্তু আভিযোগ দায়েরের প্রায় ৭ মাস অতিবাহিত হলেও মামলা হিসেবে অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালে না আসা। তদন্তের ধীরগতি। আসামিদের দ্বারা হুমকিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে আহনাফের মা-সহ জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহত পরিবারগুলোর মধ্যে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, মামলার তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের জন্য একের পর এক তারিখ দিলেও কোনো রিপোর্ট দাখিল না করতে পারা, তদন্ত সংস্থার প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব, বিপুলসংখ্যক অভিযোগের বিপরীতে ছোট তদন্ত সংস্থাসহ নানা কারণে মামলার তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। এসব কারণে অসন্তোষ ও ক্ষোভ রয়েছে আন্দোলনে নিহত পরিবার ও আহতদের মাঝে। এ ছাড়াও ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফর্মাল চার্জ দাখিলের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে, আস্থা হারাতে পারে সাধারণ মানুষের। মুখ থুবড়ে পড়তে পারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারব্যবস্থা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়ায় তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নৃশংসতায় অনেকের প্রাণ চলে গেছে, আবার কেউ হাত হারিয়েছে, কেউ পা, কেউ চোখ হারিয়েছেন। আহতদের অনেকে পঙ্গুত্ব আর অন্ধত্ব নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। হাজারেরও বেশি নিহত এবং ১০ হাজারের বেশি আহতদের আত্মত্যাগের কারণে এই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। ফলে নতুন একটা বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে। কিন্তু মামলা করার পরে এতদিন অতিবাহিত হলেও আমার মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। শহীদ আহনাফের মা মানবজমিনকে বলেন, আন্দোলনে যেসব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো কিংবা হামলা করেছে তাদের অনেকেই এলাকায় ফিরে আসছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ দাখিলের পরে আমার বাসায় আওয়ামী লীগের লোকজন এসে বিভিন্ন হুমকি দিয়ে গেছে। আমি কাদের নামে অভিযোগ দাখিল করেছি তার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে। পরে আমি যখন বলি এই অভিযোগের ব্যাপারে বিএএফ শাহীন কলেজে প্রশাসন এবং শহীদ আহনাফের বন্ধুরা তদারকি করছে। তখন তারা ফিরে গিয়েছে। এভাবে আর কয় দিন। আমরা দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর অগ্রগতি দেখতে চাই।

যাত্রাবাড়ীর আলোচিত হত্যাকাণ্ড শহীদ ইমাম হাসান তাইমের ভাই রবিউল আউয়াল মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাইকে পুলিশ খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেছে। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নিউজ চ্যানেলে ব্যাপক প্রচারও হয়েছে। আমি পুলিশের ৮ জন এবং আওয়ামী লীগের ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছি। এই ঘটনা সবার চোখের সামনে ঘটেছে। কিন্তু আমার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের এখন পর্যন্ত কয়েকটি তারিখ দিলেও এর অগ্রগতি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। এ ছাড়াও গত ৯ই এপ্রিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নেয়ার জন্য যে প্রজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। সে ব্যাপারেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রবিউল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৩০টি, কিন্তু এখন পর্যন্ত ৩৯টি অভিযোগ কমপ্লেইন রেজিস্ট্রারভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়াও মিসকেস হিসেবে ২২টি মামলার তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক অভিযোগের বিপরীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট-১৯৭৩ এর সেকশন (৮)১ এর অধীনে মাত্র ২৪ সদস্যর তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। এই তদন্ত সংস্থায় অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার ৭ জন, এসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার ৩ জন এবং ওসি পদমর্যাদার ১১ জন কর্মকর্তা কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের ক্যাডার র‌্যাংকের এসব কর্মকর্তা সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করে থাকে। কিন্তু মামলার তদন্ত রিপোর্ট তৈরিতে পুলিশের এসআই কিংবা ওসিদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলেও এর উপরের র‌্যাংকের কর্মকর্তাদের তেমন অভিজ্ঞতা থাকে না। সুতরাং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্ত করতে থানা এবং আদালতে তদন্ত কাজের ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এসআই এবং ওসি পদমর্যাদার আরও জনবল নিয়োগ দেয়া উচিত।

এ ছাড়া এত বিপুলসংখ্যক অভিযোগের বিচার শুধুমাত্র একটি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দ্রুত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ালে গতি ফিরবে বিচারকাজে। এতে সাধারণ মানুষের চাহিদার প্রতিফলন ঘটবে। এদিকে ট্রাইব্যুনালে আরও আইটি এক্সপার্ট নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। বিগত সরকারের আমলে প্রায় ২০ জনের মতো জনবল ছিল। মামলার অভিযোগপত্র এবং তদন্ত রিপোর্ট লিপিবদ্ধকরাসহ যাবতীয় কাজের জন্য। কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা ট্রাইব্যুনাল এবং তদন্ত সংস্থায় মিলিয়ে ৪ জনের মতো।  এত অভিযোগ এবং তদন্ত রিপোর্ট তৈরিতে আইটি সেক্টরে আরও দক্ষ জনবল নিয়োগ দিলে গতি ফিরতে পারে ট্রাইব্যুনালের কাজে।

এদিকে জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে চলমান সহিংসতায় থানায় করা মামলার আসামিদের সহজে ধরা গেলেও ট্রাইব্যুনালের মিস কেসগুলোর আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সঙ্গে সঙ্গেই খবর পেয়ে যাচ্ছে। ফলে আসামিরা পালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরপরই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে এসব তথ্য। যার কারণে প্রায় ২০ জনেরও অধিক পুলিশ কর্মকর্তা গাঢাকা দিয়েছেন। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে এখানে কোনো না কোনো জায়গা থেকে ফাঁস হচ্ছে। এটা আমরা খুব উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে সম্ভবত এই ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো একটা মহল এর সঙ্গে জড়িত বা প্রসিকিউশনের মধ্যে, অফিসেও থাকতে পারে। আমরা বিষয়টাকে গভীরভাবে উদ্বেগের সঙ্গে বিশ্লেষণ করছি এবং তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছি। আমরা এটার জন্য দায়ী যাকে পাবো, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) বিধিমালা-২০১০ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের মামলায় আসামি ধরতে ট্রাইব্যুনাল থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা লাগবে। রুল ৬ এবং রুল ৯ অনুযায়ী পরোয়ানা ছাড়া ধরা যাবে না আসামিদের। ফলে যখন ট্রাইব্যুনাল থেকে কোনো আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় তখন ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ এটা ফাঁস করছে। ফলে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আসামিদের গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া। কিন্তু থানার মামলাগুলোর ব্যাপারে এমন বিধি-নিষেধ না থাকার কারণে যখনই আসামিদের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায় তখনই তাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে। এজন্য ট্রাইব্যুনালের বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের মত বিশ্লেষকদের।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বক্তব্য: এসব অভিযোগের ব্যাপারে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করছি, জুলাই আন্দোলনে কিছু আহত এবং শহীদ পরিবার ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। এছাড়াও বিচার কাজের ধীরগতি সহ বিভিন্ন অভিযোগ তাদের। কিন্তু আমরা যথন ট্রাইব্যুনালের মামলার তদন্তে তাদের সাক্ষী হিসেবে ডাকি তখন তারা আসে না। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে মামলার তদন্ত হচ্ছে না, বিচারের কিছুই হচ্ছে না, কেন আমাদেরকে টাকা দেয়া হচ্ছে না, আমাদেরকে কেন বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না সহ নানা অভিযোগে বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু বিচারের কাজে সহায়তার জন্য ডাকলে তারা আসছে না। তারা সাক্ষী দেয়ার জন্য কিংবা তাদের কাছে রক্ষিত গণহত্যার অডিও-ভিডিও চাইলে তারা দেয় না। আমরা প্রায় ১০০০ জনেরও বেশি লোকের সাক্ষী নিয়েছি। আমরা এগুলো পর্যালোচনা করে দেখবো, কার সাক্ষী বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাদের সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে ডাকবো।

তাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা অন্য সব মামলার মতো নয়। এর প্রসেডিং থানায় করা মামলার মতো না। আমরা জুলাই-আগস্টে বিভিন্ন স্পটে যে গণহত্যা হয়েছে, ঐসব স্পটে তখন যারা কমান্ডের দায়িত্ব পালন করেছে। যার র্নিদেশ মতো গুলি চালিয়েছে, শেখ হাসিনাসহ সব আসামির বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির’ অভিযোগ আনা হয়েছে। আমরা ঐ দিন কারা স্পটে ছিল তদন্ত করে তাদের নাম বের করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার তদন্তে মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় সিনিয়র অফিসার দিয়ে মামলার তদন্ত করা হয়। সুতরাং ট্রাইব্যুনালের মামলায় ইন্স্পেক্টর পদমর্যাদার নিচের কোনো কর্মকর্তাকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেই। তবে তদন্ত সংস্থার জনবল বাড়ানোর জন্য আমরা সরকারকে কিছু রিকোয়ারমেন্টের কথা বলেছি, সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ ছাড়াও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসছে। দ্রুতই শুরু হবে ট্রাইব্যুনাল-২ এ বিচার কাজ।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) বিধিমালা-২০১০ এর প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রক্রিয়া চলছে বলে মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর। আর ট্রাইব্যুনালেন আইটি এক্সপার্ট এর সংকট নেই জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো লিপিবদ্ধের জন্য ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত জনবল থাকলেও তদন্ত সংস্থায় জনবল সংকট রয়েছে। আমরা এই জনবল বাড়ানোর ব্যাপারেও সরকারকে জানিয়েছি, দ্রুতই তা বাড়ানো হবে।

mzamin

‘দ্য উইক’-এ কাভার স্টোরি ‘ডেসটিনি’স চাইল্ড’ তারেকের ফেরার অপেক্ষায়

বৃটিশ সাপ্তাহিকী ‘দ্য উইক’ নিউজ ম্যাগাজিন চলতি সংখ্যায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে নিয়ে কাভার স্টোরি করেছে। যার শিরোনাম ‘ডেসটিনি’স চাইল্ড’ বা নিয়তির সন্তান। দ্য উইক ম্যাগাজিনের নয়াদিল্লি ব্যুরো চিফ নম্রতা বিজি আহুজা’র লেখা ওই শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারকর্তৃক বিএনপি ভাঙার চেষ্টার বিপরীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বেই দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং তারেক রহমান পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন। কারণ দিন দিন তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৭ বছর বয়সী তারেক রহমান এখন তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। কারণ বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে। সাপ্তাহিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘দ্য উইক’-এর চলতি সংখ্যার কাভার স্টোরি ‘ডেসটিনি’স চাইল্ড’-এর বাংলা অনুবাদ পাঠকের উদ্দেশ্যে নিচে তুলে ধরা হলো:

বাংলাদেশে পরিবর্তন তারেক রহমানকে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে তারেক রহমানের জন্য। যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন। সমর্থকদের কাছে ‘তারেক জিয়া’ নামে পরিচিত। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা জেনারেল জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের হাতে নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।

৫৭ বছর বয়সী তারেক রহমান এখন তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। কারণ বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ সরকারকে সরিয়ে দেয়ার পর বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঢাকায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। তিনি বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
তারেক রহমানের জন্য, যিনি ভার্চ্যুয়ালি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন, ঢাকায় নামার পর তার জীবনে পূর্ণ চক্র সম্পূর্ণ হবে। খালেদা জিয়া আশা করছেন, তারেকই আসন্ন নির্বাচনে দলের মুখ হিসেবে আবির্ভূত হবেন।

“তারেক রহমান ইতিমধ্যে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করেছেন,” বলেন তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন। “চাকরি, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষক, শ্রমিক বা শ্রমজীবী যেই হোক না কেন, আমরা তাদের সমান সুযোগ, ন্যায্য মজুরি এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিতে চাই,” বলেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা এবং তারেকের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি জানান, “আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নয়নকেন্দ্রিক রাজনীতি গড়ে তুলতে তারেকের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করতে চাই।”

সব নজর এখন থাকবে এদিকে যে, কতোটা দক্ষতার সঙ্গে তারেক বাংলাদেশের নেতৃত্ব নিতে সক্ষম হবেন যখন তিনি ঢাকায় নামবেন। “তিনি নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, এবং সামরিক-প্রশাসনিক কর্তৃত্ব তার কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকার নিয়েছিল যে, তিনি ভবিষ্যতে আর রাজনীতিতে জড়াবেন না। এটি ছিল তার রাজনৈতিক অধিকারের লঙ্ঘন,” বলেন জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী।

১৬ বছরের নির্বাসনকালে তারেক রহমান ব্যক্তিগত ক্ষতির সম্মুখীন হন (তিনি তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে হারান) এবং বহু আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। তবুও, তিনি বিএনপিতে প্রভাবশালী থেকে যান এবং দলকে একত্রিত রাখেন। “আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক দল ভাঙার চেষ্টার বিপরীতে তারেক এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন” বলেন আসিফ আলী।

২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সালে পুনঃনির্বাচিত হন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার মায়ের কারাবরণের পর থেকে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। “তারেক বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন, কারণ তার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে,” বলেন আলী।

তারেক ১৯৮৮ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেন, কিন্তু পরে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না, যদিও বিএনপি সরকার গঠন করে। তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারে পুনরায় সক্রিয় হন এবং বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। এই সময়ে তিনি দলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব অর্জন করেন। তবে, মায়ের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ এবং সরকারে কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও ক্ষমতা প্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়।

২০০৭ সালে, ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং তারেক তার মায়ের সঙ্গে বন্দি হন। দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকালে, অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়। তারেক ২০০৮ সালের নির্বাচন পূর্বে মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য প্যারোলে লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি পান।

বাংলাদেশে পরিবর্তন তারেকের জন্য একটি সুযোগ, যাতে তিনি তার পূর্বসূরিদের ধারা ভেঙে নিজস্ব একটি উত্তরাধিকার তৈরি করতে পারেন। প্রশ্ন হলো, তিনি কেমন নেতা হবেন?
 
(ভাষান্তর: কাউসার মুমিন, যুক্তরাষ্ট্র)

mzamin

অল্প টাকায় ইতালি নেয়ার প্রলোভন: মাফিয়াদের ভয়াবহ নির্যাতনের পর নিখোঁজ মাদারীপুরের ৩ যুবক

অল্প টাকায় লিবিয়া দিয়ে ইতালি নেয়ার প্রলোভন। এরপর লিবিয়ার বন্দি শিবিরে আটকে রেখে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে হাওয়া বেগম ও বাবুল মাতুব্বর নামে দুই দালালের বিরুদ্ধে। মাফিয়াদের ভয়াবহ নির্যাতনের পর নিখোঁজ মাদারীপুর সদর উপজেলার হাউসদী গ্রামের ৩ যুবক। এই ঘটনায় আদালতে মামলা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে দালালচক্র। উল্টো ভুক্তভোগীদের মিথ্যা মামলার হুমকি দিচ্ছে দালালরা। তবে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে। এই ঘটনায় লিবিয়ায় অবস্থানরত এক দালালের হুমকির অডিও রেকর্ডে এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। মাদারীপুর সদর উপজেলার মধ্য হাউসদী এলাকার বাবুল ফকিরের ছেলে মারুফ হোসেন এবং তার ভাগনে মহিউদ্দিন মোড়ল লিবিয়ায় অবস্থানরত দালালের কাছে বন্দি। লিবিয়ার অবস্থারত এক দালাল বাবুল ফকিরকে হুমকি দিচ্ছে। তার হুমকির অডিও রেকর্ড নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো বাবুল ফকির (লিবিয়ায় বন্দি মারুফের পিতা): ভাই ভাই আমি গরিব মানুষ। টাকা জোগার করার সময় দেন। অপর প্রান্ত থেকে দালালের হুমকি, তোরে তো এক ঘণ্টা সময় দিয়েছি। এরপর প্রকাশ গালাগালি করে দালাল। এরপর ভুক্তভোগী করুন কণ্ঠে বলেন, একটু দয়া করেন ভাই, একটু দয়া করেন। মোটরসাইকেল বেইচ্যা আপনারে এক লাখ টাকা দিতেছি। এতগুলো টাকা কোথা থেকে দিমু?

দালাল: এর আগে তিনদিন দিছি সময়। ওগো যে ছাড়াই আনছি ওগো তো কম টাকা লাগতেছে। তোরা কি এহন জানোস বর্তমানে মাফিয়াগো হাতে গেলে কতো টাকা লাগে? ওগো তো কম টাকা লাগতেছে। এক এক জনের ২০ লাখ টাকা লাগে। এরপর ভুক্তভোগী মারুফের বাবা বলেন, দিমু তো। আপনারা আনছেন ছাড়াই দিমু আপনাগো টাকা। এরপর দালাল বলেন: তোগো একটা সুযোগ দিছি। আজকে এক লাখ দিবি, পরশু পাঁচ লাখ করে দুইজনে দশ লাখ দিবি। পরের দিন ক্লিয়ার করে দিবি। ভুক্তভোগীর বাবা: ঠিক আছে ভাই একটু আমারে সময় দেন। এরপর দালালের হুঙ্কার, টাকা দিতে যতক্ষণ লেট হইবে ততক্ষণ ওদের ওপর লাঠি চলবে। পরে ভিডিও কইর‌্যা পাঠাই দেবোনে।

ভুক্তভোগী মারুফের বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন: ভাই এমন কইরেন না, ভাই দয়া করেন। এরপর দালাল আদেশ দেয়, টাকা দিয়া ফোন দিবি, একেবারে সন্ধ্যার আজানের পর। এরপর ফোন কেটে দেয়। এভাবেই লিবিয়ায় বন্দিদের আটকে রেখে স্বজনের কাছে হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে।

সরজমিন জানা গেছে, মাদারীপুরে সদর উপজেলার মধ্য হাউসদী গ্রামের মারুফ হোসেন, মহিউদ্দিন মোড়ল, সোলায়মান আকন। উভয়ের বয়স ২০। বাড়িতে থাকতে দালালচক্র ওদের প্রলোভন দেখায় ইতালির মোটা বেতনের। এরপর লিবিয়া নিয়ে আটকে রেখে চালায় নির্যাতন। নির্যাতনের সময় স্বজনদের মোবাইলে শোনানো হয় নির্যাতনের বর্ণনা। টাকার জন্য লিবিয়ায় অবস্থানরত দালালরা মোবাইল ফোনে দেয় হুমকি। এরপর আদায় করা হয় টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালরা কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে মানবপাচার করে থাকে। প্রথম ধাপের দালালরা গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষদের অল্প টাকা ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখায়। এরপর তাদের ফাঁদের পা দিলেই তারা ভুক্তভোগীদের লিবিয়াতে অবস্থানরত মাফিয়াদের হাতে তুলে দেয়। এরপর বন্দি শিবিরে আটকে রেখে নির্যাতন করে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এই নির্যাতনে অনেকেই প্রাণ হারায়। এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় মেম্বার, চেয়ারম্যান, পুলিশ প্রশাসন, ব্যাংক কর্মকর্তরাও জড়িত। স্বজনরা জানান, দালালে প্রলোভনে ছয় মাস আগে ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার মধ্য হাউসদী গ্রামের মারুফ হোসেন, মহিউদ্দিন মোড়ল ও সোলায়মান আকন। প্রথম কিছুদিন তাদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ থাকলেও এখন যোগাযোগ নেই। লিবিয়ায় নেয়ার পরে তাদের অমানুষিক নির্যাতন করে। ভিটেমাটি বিক্রি করার পাশাপাশি চড়াসুদে টাকা এনে দালালদের হাতে তুলে দেয় স্বজনরা। দালালরা লাখ লাখ টাকা আদায়ের পর দীর্ঘদিন ধরেই নেই যোগাযোগ। বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তাও জানে না স্বজনরা। এই ঘটনায় স্থানীয় দালাল হাওয়া বেগম ও বাবুল মাতুব্বরের নামে ভুক্তভোগী পরিবার একাধিক মামলা করেছে। এরপরও মিলেনি সন্ধান। গ্রেপ্তার হয়নি দালালচক্র। উল্টো আরও হুমকি দিচ্ছে।

নিখোঁজ সোলায়মান আকনের মা সালমা আক্তার বলেন, ছেলেকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন করে দফায় দফায় মুক্তিপণের জন্য টাকা আদায় করে। কয়েক দফায় বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৫ লাখ ৪০ হাজার দেয়া হয়েছে। এরপরও ছেলের সন্ধান পাইনি। উল্টো আমাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার হুমকি দিচ্ছে স্থানীয় দালাল হাওয়া বেগম এবং বাবুল মাতুব্বর। নিখোঁজ মারুফের বাবা এবং অপর নিখোঁজ মহিউদ্দিন মোড়লের মামা বাবুল ফকির বলেন, স্থানীয় দালাল হাওয়া বেগম এবং বাবুল মাতুব্বর আমাদের সহজে ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখায়। এরপর লিবিয়াতে নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে। আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে ওই দালালচক্র। এরপরও তাদের সন্ধান পাইনি। এ ঘটনায় অভিযুক্ত হাওয়া বেগম ও বাবুল মাতুব্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাড়িতে গেলে তাদের পাওয়া যায়নি। বাবুল মাদারীপুর শহরের চরমুগরিয়া বন্দর শাখা সোনালী ব্যাংকে দীর্ঘদিন থেকে কর্মরত। তবে মামলা পরে অনুপস্থিত রয়েছেন সেখানেও। এ ব্যাপারে মাদারীপুর সদর থানার ওসি আদিল হোসেন জানান, দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হুমকি দিয়ে থাকলে সেটাও গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে। মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান বলেন, মানবপাচারের বিষয় তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

mzamin

পর্যটকদের বাঁচাতে গিয়ে জীবন দিলেন কাশ্মীরি তরুণ

শান্ত ও স্নিগ্ধ মনোরম দৃশ্যে ঘেরা কাশ্মীরের পহেলগাঁও গত মঙ্গলবার লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে একদল বন্দুকধারী। তাদের অতর্কিত হামলায় সেখানে ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের একজন সৈয়দ আদিল হুসাইন শাহ। পেশায় একজন পনিওয়ালা বা ঘোড়াচালক। পহেলগাঁওয়ের মনোরম প্রকৃতির মধ্যে পর্যটকদের ঘোড়ায় করে ঘুরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন হুসেইন। পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র সন্তান ছিলেন তিনি। তার মৃত্যু ভয়ার্ত ছিল না। সাহসিকতার সঙ্গে এক বন্দুকধারীর বন্দুক কেড়ে নেয়ার সময় তাকে হত্যা করা হয়। নিজ পুত্রের এমন সাহসিকতার ঘটনায় শোক, মর্যাদা এবং অসীম গৌরবের প্রতীক হয়ে উঠেছেন পিতা সৈয়দ হায়দার শাহ। এ খবর দিয়েছে দ্য হিন্দুস্তান টাইমস। এতে বলা হয়,  ৩০ বছর বয়সী আদিলের পিতা হায়দার শাহ বলেন, আমি তার শাহাদাতের জন্য গর্ববোধ করছি। আমি শুধু তার এই গৌরবের জন্যই বেঁচে আছি। অন্যথায় হুসেইনের তরুণ মৃতদেহ দেখে আমি মারা যেতাম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন হুসেইন। তার বাবা বলেছেন, পর্যটকদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে গোটা পরিবার শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। তাদের তাড়া দিচ্ছে অসহনীয় যাতনা। তবে পুত্রের এমন নিঃস্বার্থ সাহসই হায়দারকে এখন বাঁচিয়ে রেখেছে।

অন্য সবার মতোই শেষ দিনটি শুরু করেছিলেন আদিল। পহেলগাঁওয়ের মনোরম প্রান্তরের পর্যটকদের ঘোড়ায় করে ঘুরানোর উদ্দেশ্যে সকাল সকালই বের হয়েছিলেন তিনি। ওই দিন দুপুর ৩টার দিকে তার পরিবারের লোকজন পহেলগাঁওয়ে একটি হামলার খবর পায়। তখন থেকেই তারা আদিলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। অবশ্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন তারা। যতক্ষণ না তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, আদিল আর দুনিয়াতে নেই। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন আদিলকে একাধিক গুলি করে তার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছে। বন্দুকধারীর হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে পর্যটকদের রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

আদিলের পিতা জানান, তারা ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টায় জানতে পারেন যে, তার পুত্র আর জীবিত নেই। সেখানে আদিলের সঙ্গে তার মামা ছিলেন। কিছু পর্যটক আদিলের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন বলে গর্ববোধ প্রকাশ করেছেন তার পিতা। আর আদিলের মায়ের কান্না তখনো থামেনি। হৃদয়ের ক্ষত নিয়ে তখনো তিনি বিলাপ করছিলেন।  শোকাহত এই নারী জানিয়েছেন, আদিলই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র খুঁটি। দিনে ৩০০ রুপি আয় করতেন আদিল। যা দিয়ে চাল কেনা হতো এবং পরিবারের সবাই তা একসঙ্গে খেতেন। এখন কে খাদ্যের যোগান দেবে বলে বিলাপ করছিলেন আদিলের মা। বলছিলেন, কে আমার জন্য ওষুধ নিয়ে আসবে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে বার বার আর্তচিৎকার করছিলেন ওই বৃদ্ধা।

আদিলের এই মৃত্যুর বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে আসে যখন তার জানাজায় জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ অংশ নেন। তাকে পহেলগাঁওয়ের হাপাতনার্ড গ্রামে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তার জানাজায় উপস্থিত হয়েছিলেন শত শত মানুষ। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী নিহত আদিল হুসেনের বাবা হায়দার শাহকে জড়িয়ে ধরে সমবেদনা জানান। এ সময় তিনি শোকাহত ও নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিহত আদিলের ভাই সৈয়দ নওশাদ বলেন, আদিল হুসেন কাজ করতে পহেলগাঁওয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে এক বন্দুকধারী তার বুকে তিনবার গুলি করে। তিনি পর্যটকদের ঘোড়ায় চড়িয়ে বৈসারণে নিয়ে যেতেন। মঙ্গলবার বন্দুকধারীরা যখন পর্যটকদের ওপর হামলা চালায়, তখন আমার ভাই ওদের থামানোর চেষ্টা করে। এক পর্যটক, যার বাবা ওই হামলায় নিহত হন, তিনি এসএমএইচএস হাসপাতালে আমাকে আদিলের বীরত্বের কথা জানান। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ আদিলের সাহসিকতার প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, তিনি যে পর্যটকদের ঘোড়ায় করে পার্কিং এলাকা থেকে বৈসারণ ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের রক্ষা করতে তিনি নিজের প্রাণ দিয়েছেন। তার শোকাহত পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি এবং তাদের পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছি।

mzamin

যখন হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তখন পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কোথায় ছিল? -সারজিস আলম

আমরা যখনই তাদের কাছে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের কথা বলি, তারা আমাদের পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গির দোহাই দেয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। তিনি বলেন, যখন শাপলা চত্বর, পিলখানা এবং জুলাইয়ে হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তখন পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কোথায় ছিল?

শুক্রবার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক সমাবেশে এ কথা বলেছেন তিনি। ‘জুলাই, পিলখানা ও শাপলা গণহত্যার বিচার এবং গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে’ এই সমাবেশের আয়োজন করে ইনকিলাব মঞ্চ। সারজিস আরও বলেন, আজ শাহবাগে এই উন্মুক্ত প্রান্তরে তারা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের যে দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, সেটা ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে পূরণ হওয়ার কথা ছিল। এই জেনারেশনকে ভয় করুন। যদি এই জেনারেশনের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আবেগ নিয়ে খেলা করেন, তাহলে এই জেনারেশন সকল ক্ষমতার বিপক্ষে গিয়ে যে কাউকে টেনেহিঁচড়ে ক্ষমতা থেকে নামাতে পারে।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধসহ ৪ দফা দাবিতে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের সমাবেশ
জুলাই অভ্যুত্থান, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার এবং আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবিতে ‘শহীদি সমাবেশ’ করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। গতকাল বিকালে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এ সমাবেশে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিরা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দলকে নির্বাহী আদেশে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পরবর্তীতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তারা।

চার দফা দাবিগুলো হলো- ১. আগামী ১০০ দিনের মধ্যে জুলাই গণহত্যার দৃশ্যমান বিচার শুরু করতে হবে এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাহী আদেশ, আদালতের রায় ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। ২. শাপলা চত্বরের ঘটনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের সহায়তায় একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে শহীদদের তালিকা প্রকাশ ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ৩. পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে গঠিত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। ৪. দেশের সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগের গণহত্যার বিচারের বিষয়ে স্পষ্ট ধারা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সমাবেশ থেকে জানানো হয়, এ দাবিতে আগামী ১০০ দিন দেশের ৬৪ জেলায় গণসংযোগ চালানো হবে। দাবি পূরণ না হলে আগামী ৩৬শে জুলাই (৫ই আগস্ট) ‘মার্চ ফর বাংলাদেশ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে শাহবাগ থেকে সচিবালয় ঘেরাও করা হবে। এ সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, কিছু মহল থেকে বলা হচ্ছে যদি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না আসে তাহলে ভারত কি মনে করবে? আমরা স্পষ্ট ভাষায় আধিপত্যবাদী ভারতের দিকে আর তাকাবো না। শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ মদদে ও ভারতের প্রেসক্রিপশনে পিলখানা ও শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ভারত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেয়া পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না।

ভারতের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে তাদের দেশে যে সকল খুনিকে জায়গা দিয়েছে তাদের বাংলাদেশে পাঠাতে হবে। যে ছাত্র-জনতা রাজপথে জীবন দিয়ে খুনি হাসিনাকে দেশ ছাড়া করেছে তাদের হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের নাম নেয়া এ অন্তর্বর্তী সরকারের মুখে মানায় না। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আগে সংস্কার নাকি নির্বাচন- এ প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রতিযোগিতায় নামুন। এবহ-ত কে ভয় করুন, যদি এ জেনারেশনের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের ইমোশন নিয়ে খেলার চেষ্টা করেন, তাহলে এ জেনারেশন সকল ক্ষমতা মোকাবিলা করে যে কাউকে ক্ষমতা থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামাতে পারে। সমাবেশে জুলাই অভ্যুত্থানে চোখ হারানো এক আহত ব্যক্তি বলেন, আমি চোখহারা জুলাই যোদ্ধা হয়ে বলতে চাই, আওয়ামী লীগের কোনো পুনর্বাসন হতে পারে না। যারা তাদের পুনর্বাসন করতে চায়, তারা যেন ভারত বা পাকিস্তানে চলে যায়। আমরা বাংলাদেশপন্থিরা নতুন দেশ গঠন করবো। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা এ বি জোবায়ের বলেন, আমাদের জুলাই এখনো শেষ হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। আমরা চাই, নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হোক এবং গণভোটের মাধ্যমে দলটিকে চিরতরে বিদায় করা হোক। তিনি শাপলা চত্বর ও বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ সব ঘটনার দ্রুত বিচার এবং জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশের দাবিও জানান।

তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ আজ টাকার পাহাড় গড়েছে, অথচ আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। কেউ আমাদের আশা বিক্রি করতে পারবে না। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সেক্রেটারি শেখ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা আশা করিনি ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করতে আমাদের সভা করতে হবে। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে, তাদের পুনর্বাসনের আগে আমাদের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলবে। শহীদ সাইমের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে কী অপরাধ করেছিল যে যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেল? ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেন আর কখনো এ দেশে রাজনীতি করতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন- পুসাবের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ জাকারিয়া, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আব্দুল ওয়াহেদ, শহীদ সজলের মা, শহীদ সাইমের পরিবারের সদস্যসহ আরও অনেকে। তারা সবাই একইসঙ্গে আহত ও শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।

mzamin

‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’-এর আত্মপ্রকাশ: ১৮ দফা ঘোষণা

ঢাকাই সিনেমার এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ আত্মপ্রকাশ করেছে। দলটির স্লোগান হলো ‘গড়বো মোরা ইনসাফের বাংলাদেশ’। দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ও মহাসচিব হিসেবে রয়েছেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ।

শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের নাম ও কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। অনুষ্ঠান শেষ হয় দুপুর ১২টায়।

এ সময় শওকত মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থান, বিপ্লব ও আন্দোলনের পর ওইসব সংগ্রামী চেতনায় নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের অভ্যুদয় ঘটে। যেহেতু রাষ্ট্র সাজবে একাত্তর ও চব্বিশের গণজাগরণের চেতনায়, সেই আঙ্গিকে নতুন দলের আবির্ভাব অনিবার্য। জাতির এই মাহেন্দ্রক্ষণে জাতীয় প্রত্যাশায় সকল প্রকার বৈষম্য, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে জনকল্যাণ, ইনসাফ ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এবং গর্বিত জাতীয়তাবোধ দূরীকরণ করতে। আজ নতুন এই দলের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করছি।

তিনি আরও বলেন, মোটা দাগে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনা, ৭ই নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান- সর্বোপরি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের চেতনায় আমরা জনতা পার্টি বাংলাদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের মূল স্লোগান হবে- গড়বো মোরা ইনসাফের দেশ। সাম্য, মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশকে বিনির্মাণের সফল অভিযাত্রায় আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

দলের ১৮ দফা তুলে ধরে মহাসচিব বলেন, অন্যান্য দলের তুলনায় আমাদের পার্থক্য হবে নিখাদ দেশপ্রেম, চিন্তা-চেতনায় স্বচ্ছতা ও সাহসিকতা, দলের ভেতরে-বাইরে গণতন্ত্রের অব্যাহত চর্চা, উচ্চারণে-কর্মে-জনসেবায় অভিন্ন লক্ষ্যাভিসারী হওয়া। জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ও নীতিনির্ধারণের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া। প্রবীণদের পরামর্শে, প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে তরুণদের সঙ্গে নিয়ে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও উন্নয়নের আমরা জাতিকে তুলে দিতে চাই প্রত্যাশার নব-সোপান।

তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য এই নতুন দল গঠন করিনি। ২০২৪ সালের যে নির্বাচনটি হয়েছে, সেখানে অনেকে বাধ্য হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আমার ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে বলতে পারি, আমাকে গোয়েন্দা সংস্থা তুলে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে যে ৭০টি মামলা, সেই মামলার একটির রায় ঘোষণা করা হবে। এটা ভয় দেখিয়ে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। ২০১৮ সালে যারা নির্বাচনে গেছে, ২০২৪ সালে নির্বাচনে যাওয়া আর ১৮ সালে নির্বাচনে যাওয়ার মধ্যে আমরা কোনো পার্থক্য দেখি না। ২৪ সালের নির্বাচনে যাওয়ার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করি। কিন্তু একইসঙ্গে যারা ১৮ সালে নির্বাচনে গেছেন এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন- তাদেরও তো দুঃখ প্রকাশ করা উচিত।

২০১৮ সালে একটি দল নির্বাচনে গেছে তাদের নিবন্ধন বাঁচাতে উল্লেখ করে শওকত মাহমুদ বলেন, আমি মনে করি, এখন যে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান এসেছে। যারা ফ্যাসিস্টদের দোসর, গণহত্যায় অংশ নিয়েছে, মানুষকে জুলুম করেছে তাদেরকে বাদ দিয়ে নতুন ঐক্য গড়তে আমাদের সবাইকে লাগবে। জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণেই বিএনপি থেকে আমার সরে আসা। তবে বিএনপি’র কাউকে দোষ দেয়ার নেই।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ৩২ বছর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন করেছি। যে কয়েকটি সরকারকে পেয়েছি তাদের কারও সহযোগিতা পাইনি। সরকারের সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ৩২ বছর যে সময় আমি দিয়েছি তা ব্যর্থ হয়েছে। এবার দেশের জন্য সততার সঙ্গে কাজ করতে চাই। দেশবাসীর সহযোগিতা চাই। আমি আশা করি, আমাকে সহযোগিতা করবেন, অনুপ্রাণিত করবেন, আমার ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
দলের নাম নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আগে-পরে এরকম হতে পারে। এটা তো একই টাইপের নয়। না, এটাতে (দলের নামকরণ) কোনো কনফ্লিক্ট হওয়ার কারণ নেই। তারপরে আরও একটা কথা হচ্ছে, উনি (উকিল নোটিশকারী) যে নামটির কথা বলেছেন, সেই নামটি কি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হয়েছে? নির্বাচন কমিশনের কাগজপত্র জমা দিয়েছেন? সেগুলো না জমা দিয়ে এগুলো করার কোনো মানে হতে পারে না।

জনতা পার্টি বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র গোলাম সারওয়ার মিলন বলেন, জাতীয় পার্টি নামে নিবন্ধন চারটা, জাসদের নামে চারটা নিবন্ধন। সুতরাং এখানে যারা জনতার নাম দিয়ে দল করেছেন, আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই। চেয়ারম্যান সাহেব, উনি যথার্থ জবাব দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে যখন নিবন্ধন হবে, যাকে দেবে, যে যোগ্যতা অর্জন করবে। সেই ফাইনালি থাকবে। পরিশেষে এটুকু বলতে চাই, জনতার নাম দিয়ে ভবিষ্যতে তো এমনও হতে পারে আমাদের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে এক হয়ে জাতীয় জনতার জোটও হতে পারে। এই নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নাই।

পরে দলের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন কমিটি ঘোষণা করেন। নির্বাহী চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র গোলাম সারোয়ার মিলন। ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল হক হাফিজ, ওয়ালিউর রহমান খান, রেহানা সালাম, মো. আবদুল্লাহ, এম এ ইউসুফ ও নির্মল চক্রবর্তী। মহাসচিব শওকত মাহমুদ। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এম আসাদুজ্জামান। যুগ্ম মহাসচিব এবিএম রফিকুল হক তালুকদার রাজা, আল আমিন রাজু ও নাজমুল আহসান। সমন্বয়কারী নুরুল কাদের সোহেল। সাংগঠনিক সম্পাদক মুরাদ আহমেদ। প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক গুলজার হোসেন। প্রচার সম্পাদক হাসিবুর রেজা কল্লোল। সম্মানিত সদস্য হিসেবে আছেন মেজর (অব.) ইমরান ও কর্নেল (অব.) সাব্বির। উপদেষ্টা হিসেবে আছেন শাহ মো. আবু জাফর, মেজর (অব.) মুজিব, ইকবাল হোসেন মাহমুদ, ডা. ফরহাদ হোসেন মাহবুব, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, আউয়াল ঠাকুর, তৌহিদা ফারুকী ও মামুনুর রশীদ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এম এ আবদুল করীম, মুসলিম লীগের চেয়ারম্যান মহসিন রশীদ, জামায়াতে ইসলামীর কর্ম পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান এবিএম খন্দকার গোলাম মূর্তজা, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাজিম উদ্দিন, নৈতিক সমাজের প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আমসা আমিন, বিকল্পধারা বাংলাদেশের একাংশের মহাসচিব শাহ আহমেদে বাদল, গণআজাদী লীগের একাংশের সভাপতি আতাউল্লাহ খান, গণফোরামের একাংশের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন, প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান, জাস্টিস পার্টির চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মজুমদার, খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক রোকনুজ্জামান রোকন, আমজনতা দলের দপ্তর সম্পাদক আরিফ বিল্লাহ, জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, শহীদ আসাদের ভাই আজিজুল্লাহ এম নুরুজ্জামান নূর, ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান কায়সার, লন্ডন প্রবাসী শেখ মহিউদ্দিন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

mzamin

৩ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে অভিযোগ by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের পাহাড় জমছে। প্রতিদিনই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করছেন নাগরিকরা। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে ৩০০০-এর বেশি অভিযোগের আবেদন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জামুকাতেও অভিযোগ দিচ্ছেন সচেতন নাগরিকরা। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরাই এখন মন্ত্রণালয়ে তাদের সনদ ফেরত দিচ্ছেন। কেউ কেউ লজ্জিতবোধও করছেন ভুয়া সনদের জন্য। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই করছে খবর পেয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে শুরু করে। এ সংক্রান্ত আইনের সংশোধনী আগামী একমাসের মধ্যে কেবিনেটে উঠবে বলে সূত্র বলছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা এক কর্মকর্তাকে বলছেন, আমরা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দেখতে চাই না। যারা দেশের জন্য নিবেদিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তার সঠিক সংখ্যা দেখতে চাই। মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চাই। দ্রুত আইন সংশোধন করে যাচাই-বাছাই করে তালিকা চান ওই মুক্তিযোদ্ধা।

এদিকে মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের স্তূপ বাড়ছে। প্রতিদিনই মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন নাগরিকরা। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে ৩০০০-এর বেশি অভিযোগ পড়েছে। এ ছাড়াও কেউ কেউ জামুকাতেও অভিযোগ করছেন। আবেদন পাওয়ার পর এগুলো যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রকাশ করা হবে। সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বসে তা ঠিক করবে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া ৯০ হাজারের উপরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা জমা পড়েছে। আছে নানা জাল-জালিয়াতির অভিযোগও। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সনদ ফেরত দিতে আবেদন করা ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু মন্ত্রণালয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা আবেদন করেছেন, নাম প্রকাশ করলে তারা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হবেন।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম গত ১১ই ডিসেম্বর নিজ দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও যারা সনদ নিয়েছেন, তাদের তা ফেরত দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিখিয়েছেন, গেজেটভুক্ত হয়েছেন এবং সুবিধা নিয়েছেন। এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এটি ছোটখাটো অপরাধ নয়, অনেক বড় অপরাধ। উপদেষ্টা আরও বলেন, আমরা একটি ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) দেবো, যারা অমুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে এসেছেন, তারা যাতে স্বেচ্ছায় এখান থেকে চলে যান। যদি যান, তারা তখন সাধারণ ক্ষমা পেতে পারেন। আর যদি সেটি না হয়, আমরা যেটি বলেছি, প্রতারণার দায়ে আমরা তাদের অভিযুক্ত করবো। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম গণমাধ্যমকে বলেন, যদি কেউ স্বেচ্ছায় সনদ ফেরত দিতে চান, সে জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে কেউ সনদ ফিরিয়ে দিলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। তিনি বলেন, যেহেতু তাদের পেছনে অর্থ খরচ হয়েছে, তাই আমার একার পক্ষে এ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। উপদেষ্টা পরিষদ থেকে এ প্রস্তাব পাস করাতে হবে। তারপর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, একজন তার আবেদনে নিজের নাম-পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও প্রলোভনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছি। এ অনৈতিক কাজের জন্য আমি লজ্জিত। আমি স্বেচ্ছায় এ সনদ ফেরত দেয়ার আবেদন করেছি।

অন্যদিকে, এর আগে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেয়ায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৫ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সনদ বাতিল করা হয়। তারা হলেন- সাবেক সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী, মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, এ কে এম আমির হোসেন ও যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম তালুকদার। এই সনদ ব্যবহার করে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত ১৫ই সেপ্টেম্বর উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম ঘোষণা দেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যারা সরকারি চাকরি পেয়েছেন, তাদের তালিকা করা হবে। যাচাই-বাছাই করা হবে। পরে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। চিঠিতে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছেন তাদের বিস্তারিত তথ্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর, করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ১৪ লাখের বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত আছেন। সে হিসাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৬ শতাংশ।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও এখনো পূর্ণতা পায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা। বিগত সব সরকারের আমলেই একের পর এক লম্বা হয়েছে এই তালিকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো অবদান না রেখেই অনেকে নানা কৌশলে হয়েছেন তালিকাভুক্ত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় শুদ্ধি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিপ্রাপ্তদের সত্যতা যাচাইসহ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই করার উদ্যোগ নেয়া হয়। একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন আনার কাজ করছে সরকার। এই সংজ্ঞা পরিবর্তন হলে, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা রণাঙ্গনে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন এবং যারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন শুধু তারাই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার’ স্বীকৃতি পাবেন। এর বাইরে যারা দেশে-বিদেশে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন, বিশ্বজনমত তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তারা হবেন ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ১০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ও ১০ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ড ও নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করে। এই কমিটি পুনর্গঠনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে কাজ শুরু করা হয়। এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, মূলত যারা রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, কেবল তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। বাকি যারা নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন তারা হবেন মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী।

জামুকা সূত্র বলছে, যেসব মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে অভিযোগ আসছে তাদের তথ্য যাচাই করতে প্রাথমিকভাবে সরজমিন শুনানি হবে। যাচাই-বাছাইয়ে ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই তালিকা যাচাই করতে গিয়ে অনেকের খোঁজ পাওয়া গেছে যারা ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। তালিকা যাচাই চূড়ান্ত হলে এসব ভুয়া সনদে বা সনদ জালিয়াতি করে চাকরি নেয়াদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। সেই তালিকার আলোকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ মাধ্যমে এই সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে এই অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

mzamin