Saturday, May 9, 2026

মানবাধিকার লঙ্ঘন আড়াল না করলে দপ্তরে আপত্তি কেন by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশের রাজনীতির এ এক অদ্ভুত প্রকৃতি। যাদের সহায়তা গতকাল অপরিহার্য বিবেচিত হয়েছে, আজ তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে অবিশ্বাস্য সব ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পেছনে ছোটা।

দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনায় যাদের সমর্থনের আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতে দেখা যেত কিংবা যাদের বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলা হতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এখন সেই জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের (ওএইচসিএইচআর) উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

বাম ও ডানপন্থী, ধর্মবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ—বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলগুলো যেন একই মোহনায় মিলিত হচ্ছে। আরও দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ছাত্র ও গণ-অভ্যুত্থানের নেতারাও এ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না।

হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার দপ্তর খোলার পেছনে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ খুঁজে পেয়েছেন।

ডয়চে ভেলে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘তারা এখানে অফিস করলে সমকামিতা উৎসাহিত হবে। তাহলে তো সভ্যতা থাকবে না। তারা কাদিয়ানি (আহমদিয়া), সংখ্যালঘু, পাহাড়ি, নানা ইস্যু তৈরি করবে। খ্রিষ্টানদের প্রভাব বেড়ে যাবে। আর নারী স্বাধীনতার নামে তারা নারীদের ইসলামের বিধিবিধানের বাইরে নিয়ে যেতে কাজ করবে।’

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স একই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তো এমন কোনো দীর্ঘ মেয়াদে সংকটে পড়ে নাই যে তাদের অফিস লাগবে।’ তিনি বরং অভিযোগ করেছেন, ‘জাতিসংঘ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তারা সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদীর স্বার্থ রক্ষা করছে।’

এনসিপি দলীয়ভাবে কিছু না বললেও দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সমঝোতা স্মারক নিয়ে ফেসবুকে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি ওএইচসিএইচআরের ভূমিকাকে পক্ষপাতমূলক ও সাম্রাজ্যবাদ-সমর্থক অভিহিত করে ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যক্রমের কিছু বাংলাদেশে হোক, এটা না চাওয়ার কারণ হিসেবে যা পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর সম–অধিকারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিরোধিতার কারণ বলে মনে হচ্ছে। বিরোধিতার আরেকটি বিষয় হচ্ছে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নটি, যা প্রধানত উঠেছে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে। বাম-ডান সবার ভাষ্যে কথিত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের কথাও আছে।

সব সরকারের আমলে সুবিধাভোগী একজন অধ্যাপক এক ধাপ বাড়িয়ে বলেছেন, বিশ্বের ১৮ দেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় রয়েছে, বাংলাদেশ যদি সেই তালিকায় চলে যায়, তাহলে এটা আমাদের জন্য বিরাট ইমেজ সংকট হবে। বিনিয়োগকারীরা তখন বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে অন্য দেশে চলে যাবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে তাদের কার্যালয় প্রতিষ্ঠায় কোনো বিনিয়োগকারী দেশ দুটি ছেড়ে গেছেন কি না, সে প্রশ্ন অবশ্য তাঁকে কেউ করেনি।

মানবাধিকারের প্রশ্নে বহির্বিশ্বের কারও নজরদারি ও জবাবদিহি যে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর কেউ সমর্থন করেন না, সেটা মোটেও অজানা কিছু নয়। তাঁদের উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, জনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁদের শক্তি প্রয়োগ সব সময় নিয়মনীতি মেনে চলে না এবং সে কারণে এ ধরনের নিবিড় নজরদারিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে জাতিসংঘে কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সবচেয়ে বড় শরিক হিসেবে এ আশঙ্কার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষায় আমাদের সৈনিক ও পুলিশ সদস্য যখন যান, তখন তাঁদের কর্মস্থল যত ঝঞ্ঝাপূর্ণ ও বিপজ্জনক হোক না কেন, তাঁরা তখন ঠিকই মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলেন। কোনো বিচ্যুতি ঘটলে দ্রুততার সঙ্গে তার তদন্ত এবং সামরিক আদালতে বিচারের কথাও আমরা জানি।

বিদেশের মাটিতে যে সৈনিক ও পুলিশ সদস্যরা মানবাধিকারের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে চলেন, তাঁরা স্বদেশে তা অনুসরণ করতে পারবেন না, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এখানে অবশ্য স্মরণ করা দরকার, স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর গণ-অভ্যুত্থানে এসব বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এমন সব প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, যা শান্তি মিশনে তাঁরা ব্যবহার করতে পারতেন না। স্বাভাবিকভাবেই জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার উপস্থিতিও নিরোধক হিসেবে কাজ করত।

সব জনগোষ্ঠীর সম–অধিকারের প্রশ্নে যে উদ্বেগ, তা আগেও ছিল এবং দেশের বাইরে থেকেই এর সমালোচনা হয়ে এসেছে। এই সমালোচনা তত দিন চলবে, যত দিন বাস্তবে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠা না পাবে। পশ্চিমা বিশ্বেও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ না থাকা এবং যৌন হয়রানির বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিতই হতাশাজনক প্রতিবেদন প্রকাশ পায় ও বিতর্ক হয়।

আমাদের দেশে সামাজিক রক্ষণশীলতা ও ধর্মীয় বিধিবিধানের কথা বলে সম্পদের অধিকারসহ নানাভাবে নারীকে পিছিয়ে রাখা হয়। নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ সত্ত্বেও উপার্জনের জন্য নারীকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর কোনো আপত্তির কথা কখনো শোনা যায় না, কিন্তু সম্পদের উত্তরাধিকারের দাবি উঠলেই ‘গেল, গেল’ রব তোলা হয়।

দেশে নারী-পুরুষ, ধর্ম-জাতি-গোত্রনির্বিশেষে কারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না—এমন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঘোষণা ও তা প্রতিপালন করা হলে জাতিসংঘ বা বিদেশি কোনো সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়। সমস্যা কেবল তখনই হতে পারে, যদি আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনকে প্রশ্রয় দিই এবং তা আড়াল করতে চাই।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে, জাতিসংঘ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা ও কাজ সম্পর্কে আমরা পর্যাপ্ত তথ্য না জেনেই বিতর্ক ও বিরোধিতায় নেমে পড়ি। গাজা ও পুরো ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের যে গণহত্যা ও দখলদারি, সেটা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের বিষয়, যার সমাধান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ শক্তিগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার কাজ শুধুই সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ এবং তা বৃহৎ পরিসরে তুলে ধরা, যেটা তারা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও জাতিসংঘ মহাসচিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের কাছে নিয়মিত পেশ করে।

বাংলাদেশে তাদের দপ্তর খোলার বিরোধিতায় বলা হচ্ছে, তারা ফিলিস্তিনে গণহত্যা রোধ করতে পারেনি। তাঁরা জানেনও না যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে জাতিসংঘের র‍্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ গণহত্যা নিয়ে অব্যাহত সমালোচনা করতে থাকায় ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকদের চক্ষুশূল হয়েছেন।

সম্প্রতি কোন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ইসরায়েলের জন্য সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করছে, তার তালিকা সমপ্রমাণে প্রকাশ করার পর যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার দপ্তর খোলা হলে তারা দেশে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবে বলেও মতপ্রকাশ করেছেন ডান ও বামপন্থী—উভয় ধারার রাজনীতিকেরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারিতে এক নির্বাহী আদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও এমন বক্তব্যের ভিত্তি কী? প্রথমবারও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন মানবাধিকার সংস্থার কথিত ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাতের অভিযোগে। এবার ক্ষমতা গ্রহণের দিনই তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছেন।

২২ জুলাই ট্রাম্প জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংস্থাটি বিভাজন সৃষ্টি করে, এমন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর প্রসার ঘটাচ্ছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে সংস্থার সদস্যপদ দেওয়াও আরেকটি কারণ। বলা দরকার যে যৌনশিক্ষার বিষয়টি ইউনেসকোর কার্যক্রমের অংশ। নারী অধিকারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রক্ষণশীল খ্রিষ্টান গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কি আমাদের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর খুব একটা পার্থক্য করা যায়?

ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বিপরীতে আমাদের বরং এই সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ জরুরি, কেননা গুমের মতো নিষ্ঠুর বর্বরতার বিরুদ্ধে এক দশক ধরে সবচেয়ে বেশি তৎপর ও সোচ্চার ছিল এই সংস্থা। হেফাজতের শাপলা চত্বরের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অধিকারের প্রতিবেদনের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অব্যাহত অপবাদ সত্ত্বেও সংস্থাটি অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল।

গত বছর ছাত্রহত্যার নিন্দা ও তদন্ত দাবি করে সবার আগে সবচেয়ে জোরালো বিবৃতিটি এসেছিল কোত্থেকে? ১৯ জুলাই মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক প্রথম বিবৃতি দিয়ে ছাত্র হত্যা বন্ধ ও সব ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার তদন্ত নিয়েও আপত্তি তোলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তাদের তদন্তের কারণেই ১ হাজার ৪০০ প্রাণহানি এবং শেখ হাসিনার সরকারের নিষ্ঠুরতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। না হলে আওয়ামী লীগের বিদেশি বন্ধুদের অপপ্রচার মোকাবিলা দুঃসাধ্য হতো। তিন বছরের জন্য সংস্থাটির দপ্তর খোলার পেছনে তাই ষড়যন্ত্র না খুঁজে তাদের সহায়তায় মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ও অতীত অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করায় মনোযোগী হওয়াই জরুরি। তাহলে তিন বছর পর আর তাদের প্রয়োজন হবে না।

কামাল আহমেদ, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মানবাধিকার লঙ্ঘন আড়াল না করলে দপ্তরে আপত্তি কেন

জীবনের একটা বড় শখ ছিল ভর্তি পরীক্ষা দেব: তাসনিয়া ফারিণ

৩১ অক্টোবর ২০২৫ অনুষ্ঠিত হলো রাইজ অ্যাবাভ অল। আয়োজক ডন সামদানি ফ্যাসিলিটেশন অ্যান্ড কনসালটেন্সি। অনুষ্ঠানে আরও কয়েকজন অতিথির পাশাপাশি অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্য দেন অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। তাঁর বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ।

আমার জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম ছোট জেলা—মেহেরপুরে। এরপর কক্সবাজার, পাবনা, অনেক জায়গায় থাকা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি তখন, একদিন বারান্দায় বসে বসে পত্রিকা ওলটাচ্ছি। শেয়ারবাজারের পাতায় একটা ছোট বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল—হলিক্রস স্কুলের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি। দেখে মায়ের কাছে গিয়ে বায়না ধরি, জীবনে প্রথমবারের মতো ভর্তি পরীক্ষা দিতে চাই।

মানুষের জীবনে কত অদ্ভুত শখই তো থাকে। আমারও সে রকমই একটা শখ ছিল—ভর্তি পরীক্ষা দেব। বায়না ধরার পর মা আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। আমি পরীক্ষা দিই। সৌভাগ্যবশত, সুযোগ হয় হলিক্রস স্কুলে।

সেটা ছিল আমার জীবনের প্রথম সফলতা। সফলতার স্বাদ পাওয়ার পর আমার জীবনের প্রথম ‘রিয়েলিটি চেক’টাও পাই। কারণ, (পরের পথটা) যতটা সহজ মনে হয়েছিল, ততটা নয়। ঢাকায় আসার পর নিজেকে মনে হচ্ছিল স্মল ফিশ ইন আ বিগ পন্ড (বড় পুকুরের ছোট মাছ)।

আমরা যাঁরা ছোট শহর থেকে ঢাকায় এসেছি, আমরা জানি ঢাকায় মানিয়ে নেওয়াটা কত কঠিন। অনেক ধরনের ঘটনাই ঘটেছে আমার সঙ্গে। যেমন একবার বাস থেকে নামতে গিয়ে ডান পা দিয়ে নামব নাকি বাম পা দিয়ে—এই দ্বিধায় পড়ে পা ভেঙে ফেলেছিলাম। সহপাঠীরাও আমার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেত। খুব সুন্দর মিষ্টি মিষ্টি প্রশংসা করত, ‘তোর হাতের লেখা খুব সুন্দর।’ পরক্ষণেই বলত, ‘আমার অ্যাসাইনমেন্টটা একটু করে দে না।’ এই মিষ্টি কথায় ভুলে সারা রাত জেগে অনেকের অ্যাসাইনমেন্ট করে দিয়েছি। এ রকম অনেকবার বোকা হয়েছি।

অবশেষে শেখা শুরু করলাম, ঢাকার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখলাম। আস্তে আস্তে আমার ফলও ভালো হতে শুরু করল। আমার মা সব সময় আমাকে সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত রাখতেন। ছোটবেলায় নাচ-গান শিখতাম। কিন্তু পেশা হিসেবে নেওয়ার কোনো চিন্তা ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকের পর, ২০১৭ সালে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পাই। আমার চেয়ে মা-ই বেশি খুশি ছিলেন—মেয়ে বড় পর্দার নায়িকা হবে। কিন্তু শুটিং অর্ধেক হওয়ার পর সিনেমাটাই ‘নাই’ হয়ে যায়। মাঝখানে আমি এক মাস সেমিস্টার ড্রপ দিই। পড়াশোনা, সিজিপিএ তলানিতে যেতে থাকে। তখন অনুধাবন করি, কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, অনুভূতি থাকার পরও ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন না হয়, আপনি যেকোনো জায়গায় আটকে যেতে পারেন।

নিজেকে আরেকটা সুযোগ দেব

অতঃপর আমি আমার প্ল্যান বি-তে (যেটা আপনাদের অধিকাংশেরই প্ল্যান এ) মনোনিবেশ করি, অর্থাৎ পড়ালেখা। বিইউপি (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস) থেকে স্নাতক করি ২০১৯ সালে। ওই সময়ে খুব ভালো একটা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টার্নশিপের প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি সেটা প্রত্যাখ্যান করি। চেয়েছিলাম নিজেকে আরেকটা সুযোগ দেব। ২০১৯ সালটা আমি দেখব। যদি হয় হলো, নাহলে অন্য কিছু করব।

সেই বছর, ফেব্রুয়ারির ভ্যালেন্টাইনস ডেতে আমার ক্যারিয়ার পরিবর্তন করে দেয় এক্স বয়ফ্রেন্ড। এই এক্স বয়ফ্রেন্ড কিন্তু সেই এক্স বয়ফ্রেন্ড না। এটা একটা নাটকের নাম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

এই পথে কি কোনো ঝুঁকি ছিল না? অবশ্যই ছিল। অনেকবারই মনে হয়েছিল, ছেড়ে দিই। অনেক হয়েছে, আর না। আমার সত্যিকার ‘এক্স বয়ফ্রেন্ড’, বর্তমানে যে আমার স্বামী, আমরা একসঙ্গে জার্মান ভাষা শিখেছিলাম। লেভেলে এ-ওয়ান, এ-টু ও করেছি। পরিকল্পনা ছিল জার্মানি চলে যাব।

নিশ্চয়ই অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। যেখানে ঝুঁকি আছে, সেখানে আছে পুরস্কারও। তাই বলে আবার জুয়া খেলতে যাবেন না। সেখানে শুধু ঝুঁকিই আছে, পুরস্কার নেই।

চলার পথে ভালো-মন্দ অনেক কিছুরই মুখোমুখি হতে হয়েছে। যেমন যে পত্রিকায় ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেখেছিলাম, সেই পত্রিকারই প্রথম পাতায় হয়তো সকালে আমার ছবি দেখেছি। বিকেলেই দেখি কোনো এক অচেনা নিউজ পোর্টাল লিখেছে, ‘এ কী করলেন তাসনিয়া ফারিণ, দেখুন ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ভিডিও!’ ভয়ে ভয়ে প্লে করতেই বাজতে শুরু করল, ‘আজ রঙে রঙে রঙিন হব।’ আমি অবাক! (হাসি)

জীবনে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছে। যখন নাটকে খুব ভালো সময় যাচ্ছিল, তখন ওটিটিতে কাজ শুরু করি। অনেকে বলছিল, ‘তুমি কি পাগল! নাটকের এত ভালো সময়, সামনে ঈদ। এসব ছেড়ে ওটিটির কাজে সময় দিচ্ছ!’ কিন্তু আমি চেষ্টা করতে চেয়েছিলাম।

আমি মনে করি, ঝুঁকি নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকির মূল্যায়নটাও গুরুত্বপূর্ণ। জানতে হবে কোথায় চলব, কোথায় থামব, কখন বিরতি নেব। এই সিদ্ধান্তগুলোই আদতে আপনাকে তৈরি করে। শাহরুখ খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যা আপনি অপছন্দ করেন, সেটা আগে করেন। যা পছন্দ করেন, সেটা পরে করার জন্য রাখেন। আমিও কিন্তু তা-ই করেছি। পড়ালেখাটা আগে শেষ করেছি, তারপর নিজের আগ্রহের পেছনে ছুটেছি। একই কথা মার্ক টোয়েনও বলেছেন, ‘যদি তোমাকে একটা ব্যাঙ খেতে হয়, সকালেই খেয়ে ফেলো। আর যদি তোমাকে দুটো ব্যাঙ খেতে বলা হয়, বড়টা আগে খাও।’ অর্থাৎ কঠিন কাজটা আগে করে ফেলো। সাফল্যের এই মন্ত্রগুলো মনে রাখলে আশা করি আপনিও সফল হবেন। তাই বলে আবার ব্যাঙ খেতে যাবেন না!

(ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)

অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ
অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: ফেসবুক থেকে