Sunday, August 31, 2014

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন অধ্যায় রচিত হবে

নরেন্দ্র মোদি
পাঁচ দিনের সফরে জাপান গেলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শনিবার জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে কিয়োটোয় পৌঁছালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রথা ভেঙে উপস্থিত হন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। সফর শুরুর আগে এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে ‘আমার ভালো বন্ধু’ এবং জাপানকে ‘ভারতের ঘনিষ্ঠতম সহযোগীদের অন্যতম’ সম্বোধন করে বলেছেন, এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবের মতোই নরেন্দ্র মোদি দক্ষিণপন্থী রাজনীতির হোতা। দুজনেরই প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ দেশের অবরুদ্ধ অর্থনীতিকে বেগবান করা। সেই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরসঙ্গী করেছেন মুকেশ আম্বানি, আজিম প্রেমজি, গৌতম আদানিদের মতো প্রথম সারির এক ঝাঁক শিল্পপতিকে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাপানের সঙ্গে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরে ভারত আগ্রহী। এই সফরে সেই বিষয়ে অগ্রগতি হবে।
এ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণে জাপানের সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তারে একাধিক চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় মোদি জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। তখন থেকেই জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সখ্য শুরু। আগের সফরে জাপানের দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। মুম্বাই ও আহমেদাবাদের মধ্যে সেই ট্রেন চালাতে এই সফরে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। জাপানের কাছ থেকে নৌবহরের জন্য ছয়টি ইউএস-২ যুদ্ধবিমান কিনতে ভারত খুবই আগ্রহী। এই উড়োজাহাজগুলোর বিশেষত্ব হলো, এগুলো জল থেকে আকাশে উড়তে যেমন পারে, তেমনই পারবে লাদাখের মতো পার্বত্য অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়তে। ভারত চায় এই যুদ্ধবিমানগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম করে তুলতে। বিষয়টি নিয়ে মোদির এই সফরে কথা অনেকটাই এগোনোর সম্ভাবনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের দিকে চীনও তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে জাপানের সঙ্গে চীনের তীব্র বিরোধ। এই সাগরে তেল উত্তোলনে ভিয়েতনাম-ভারত চুক্তিতেও চীন আপত্তি জানিয়েছে। জাপান ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বৃদ্ধি পেলে চীন নিজেকে কোণঠাসা মনে করতে পারে। অন্যদিকে জাপান ও ভারতের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়টিও চীন ভালো মনে নেয় না। মোদিকে পাশে পেতে চীন তাই ইতিমধ্যে ভারতকে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। জাপান যাওয়ার আগে মোদিও জানিয়েছেন, চীনের প্রস্তাব তাঁরা বিবেচনায় রেখেছেন। চীন-জাপানের লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটেও মোদির জাপান সফর গুরুত্বপূর্ণ।

‘আলঙ্কারিক প্রধানমন্ত্রী’ হওয়ার পথে নওয়াজ!

নওয়াজ শরিফ
পাকিস্তানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে এবার প্রকাশ্যেই চলে এসেছে সেনাবাহিনী। চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ। আন্দোলনকারী পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান ও পাকিস্তান আওয়ামি তেহরিকের (পিএটি) প্রধান তাহির উল-কাদরির সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার বৈঠকও হয়েছে সেনাপ্রধানের। এর পরই ইমরান তাঁর অবস্থানে অনড় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে নওয়াজ শরিফ না সরা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চলবে। নওয়াজের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে পিটিআই ও পিএটি। তাদের অভিযোগ, গত বছর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছে। তাই নওয়াজকে সরতে হবে। চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সামরিক বাহিনীর মধ্যস্থতার সমালোচনা করছেন কেউ কেউ। কেউ কেউ বলছেন, এটা ‘পরোক্ষ অভ্যুত্থান’।
পিটিআইয়ের প্রেসিডেন্ট জাভেদ হাশমি বলেন, সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতা ‘সব রাজনীতিকের জন্যই লজ্জাজনক’। পাকিস্তানের সামরিক বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, নওয়াজ এখন শুধু ‘আলঙ্কারিক প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে বাকি মেয়াদ টিকে থাকতে পারবেন। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে গত আট বছর যদি কিছু অর্জিত হয়েও থাকে, এখন তার সমাপ্তি ঘটল। নওয়াজের ঘনিষ্ঠ এক নেতা জানান, সেনাবাহিনী চলমান সংকট সমাধানে শর্তসাপেক্ষে প্রধানমন্ত্রীনকে সহায়তা দিতে রাজি হয়। অন্যতম শর্ত হলো: অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং ভারত-আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীই নেবে। সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে সেনাদের গোলাগুলির কোনো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন না। সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে নওয়াজ সবকিছু মেনেই নিয়েছেন। কয়েক দিন ধরে সেনাপ্রধান রাহিলের সঙ্গে তাঁর একাধিক বৈঠক সেটারই ইঙ্গিত দেয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, সরকারে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে সেনাবাহিনীই ইমরান ও কাদরিকে আন্দোলনে নামিয়েছে। তাঁদের দাবি, ইমরানের বিভিন্ন বক্তৃতা-বিৃবতিতে সে রকম ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এ সংকট ছোটখাটো ঝড়: নওয়াজ

পাকিস্তান সংকট: ঘটনাপঞ্জি
চলমান রাজনৈতিক সংকটকে ‘ছোটখাটো ঝড়’ আখ্যা দিয়ে নাকচ করে দিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। গতকাল শনিবার পূর্বাঞ্চলীয় নগর লাহোরে সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই এ ঝড় থেমে যাবে। এদিকে সংকট সমাধানে সরকারের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। এটা হবে দুই পক্ষের মধ্যে ষষ্ঠ দফার আলোচনা। খবর এএফপি, ডন, জিয়ো টিভি ও এনডিটিভির। নওয়াজ শরিফ তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ইমরান খান ও তাহির উল কাদরির চলমান আন্দোলনকে হাল্কা করে দেখাতে চাইলেও স্বীকার করেন এটি অর্থনীতির ক্ষতি করছে। তিনি বলেন, ‘অবস্থান ধর্মঘট অর্থনীতির বিশাল ক্ষতি করছে। আমরা এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠব। তবে তাদের বুঝতে হবে এটা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ নওয়াজ শরিফ দাবি করেন, নির্বাচনী সংস্কার ও কমিশন গঠনসহ আন্দোলনকারীদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। চলমান সংকট সমাধানে গত কয়েক দিনে সরকারের সঙ্গে পিটিআইয়ের পাঁচ দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এসব আলোচনায় কোনো ফল আসেনি। পিটিআই প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বাদ দিয়ে পিটিআইয়ের অন্য দাবিগুলোর সঙ্গে সরকার একমত। দুই পক্ষের মধ্যে ষষ্ঠ দফার আলোচনা গতকাল শনিবার শুরু হওয়ার কথা ছিল। আলোচনায় সরকারের পক্ষে ইসহাক দারের নেতৃত্বে পারভেজ রশিদ, আহসান ইকবাল, আবদুল কাদির বেলুচ ও জাহিদ হামিদ এবং পিটিআইয়ের পক্ষে শাহ মেহমুদ কোরেশির নেতৃত্বে আসাদ উমর, শাফকাত মাহমুদ,
জাহাঙ্গীর তারিনের অংশ নেওয়ার কথা। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার প্রেক্ষাপটে নুতন দফা আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেয় সরকার ও পিটিআই। এর আগে ইমরান খান সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করার পর ইসলামাবাদে অবস্থান নেওয়া তাঁর নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে নওয়াজ সরে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। ইমরান বলেন, তাঁর দল লাহোর, করাচি, ফয়সালাবাদ ও মুলতানেও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করতে পারে। আজ রোববার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। এদিকে নওয়াজকে পদত্যাগের জন্য শুক্রবার গভীর রাতে নতুন করে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন ইমরানের সঙ্গে আন্দোলনরত পিএটির নেতা কাদরি। ওই রাতেই পিটিআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মেহমুদ কোরেশির নেতৃত্বে একটি দল কাদরির সঙ্গে দেখা করে। গত ১৪ আগস্ট লাহোর থেকে পৃথকভাবে মার্চ করে পরদিন ইসলামাবাদে পৌঁছান ইমরান ও কাদরির নেতা-কর্মীরা। পৃথকভাবে অবস্থান নিয়ে সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। ইমরান ও কাদরির অভিযোগ, গত বছর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছে। তাই ওই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নওয়াজকে পদত্যাগ করতে হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী পদে নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণার জন্য গতকাল লাহোর হাইকোর্টে আবেদন জানানো হয়েছে। চলমান সংকট সমাধানে সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতার বিষয়ে নওয়াজ জনগণের সঙ্গে ‘মিথ্যা বলেছেন’ অভিযোগ তুলে ওই আবেদন জানান ইনসাফ ল ইয়ার্স ফোরাম নামের একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গওহর নওয়াজ।
পাকিস্তান সংকট: ঘটনাপঞ্জি
গত বছরের সাধারণ নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির প্রতিবাদে গত ২৭ জুন ইমরান খানের পিটিআই ঘোষণা করে,
১৪ আগস্ট ইসলামাবাদ অভিমুখে ‘আজাদি মার্চ’ হবে ১০ আগস্ট
পিএটি নেতা তাহির-উল-কাদরিও ১৪ আগস্ট ‘ইনকিলাব মার্চের’ ঘোষণা দেন ১৪ আগস্ট
লাহোর থেকে শুরু দুই নেতার মার্চ শুরু ১৬ আগস্ট ইসলামাবাদ পৌঁছায় মার্চ। পরদিন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দেন ইমরান
১৮ আগস্ট জাতীয় পরিষদ থেকে পিটিআই সদস্যদের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা
১৯ আগস্ট ইসলামাবাদের রেড জোনে ঢুকে পড়ে পিটিআই ও পিএটির কর্মীরা
২০ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে। আইএসপিআরের মহাপরিচালক সবাইকে ‘ধৈর্য ও প্রজ্ঞা’র আহ্বান জানান, ২৫ আগস্ট কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউ থেকে বিক্ষোভকারীদের সরাতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত

রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে এসো না: পুতিন

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়ার সামরিক বাহিনী যেকোনো ধরনের আগ্রাসন রুখতে প্রস্তুত। বিভিন্ন দেশকে এটা বুঝতে হবে যে, রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে যাওয়া ঠিক হবে না। ‘লৌহমানব’ হিসেবে পরিচিত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন করেছেন এ মন্তব্য। খবর রয়টার্সের। প্রেসিডেন্ট পুতিন গত শুক্রবার রাজধানী মস্কোর কাছের সেলিগার হ্রদের তীরে ক্রেমলিনপন্থী একটি যুব সম্মেলনে ভাষণ দেন। এ সময় তিনি বলেন, গত মার্চ মাসে ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ক্রিমিয়াকে নিজেদের অংশ করে নেওয়ার দরকার ছিল রাশিয়ার।
ইউক্রেন সরকারের সহিংসতার হাত থেকে সেখানকার রুশ ভাষাভাষী মানুষকে রক্ষার স্বার্থেই সেটার দরকার ছিল। পূর্ব ইউক্রেনে অব্যাহত সহিংসতার জন্য আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে কিয়েভের ‘আন্তরিকতার অভাবকে’ দায়ী করেন পুতিন। তিনি বলেন, ‘যেকোনো আগ্রাসন রুখতে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, সেটাই স্বাভাবিক। রাশিয়ার সহযোগীদের...বুঝতে হবে যে, আমাদের সঙ্গে লাগতে না যাওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।’ পুতিন বলেন, ‘আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে, রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।’

মার্কিন নেতৃত্ব এখনই বেশি দরকার: ওবামা

বারাক ওবামা
বিশ্ব পরিস্থিতি এখন ‘তালগোল পাকানো’ অবস্থায়। তাই বিশ্বের জন্য মার্কিন নেতৃত্ব এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ মন্তব্য করেছেন। খবর পিটিআইয়ের। নিউইয়র্কে নিজ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে ওবামা গত শুক্রবার বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বাস্তব সত্য হচ্ছে, বিশ্ব সব সময়ই তালগোল পাকানো অবস্থায় রয়েছে। আমরা সেটা কেবল এখন প্রত্যক্ষ করছি,
অংশত তার কারণ হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং মানুষের চলমান পরিস্থিতি বুঝতে পারার সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব অতীতে কখনোই এর চেয়ে বেশি দরকার ছিল না। আর চিন্তাধারা ও মূল্যবোধ যেগুলো এই বিশ্বে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার—প্রশ্নে প্রকৃতপক্ষে আমাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।’ চিন্তাধারা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছেও নেই বলে মন্তব্য করেন ওবামা। ওবামা আরও বলেন, কেউ কেউ বলে, রাশিয়া এই মুহূর্তে বেশ আগ্রাসী। তাদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখা যায়, ‘লোকে কি রাশিয়ায় অভিবাসী হওয়ার জন্য লম্বা লাইন দিচ্ছে? আমি তা দেখি না।’

নওয়াজকে আবার আলটিমেটাম

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে পদত্যাগে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলেন শীর্ষ আধ্যাত্মিক নেতা ও পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিকের (পিএটি) প্রধান তাহির-উল কাদরি। দেশটির সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতার চলমান সংকট নিরসনে চেষ্টার মধ্যেই নতুন করে এই সময়সীমা বেঁধে দিলেন কাদরি। এদিকে, একত্রে আন্দোলন ও দাবি-দাওয়ার বিষয় কাদরির সঙ্গে আলোচনায় পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান দলের একটি প্রতিনিধি দলকে পাঠিয়েছিলেন। ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মেহমুদ কুরেশি এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। কাদরিকে আন্দোলনের পরবর্তী ঠিক করার আগে সময় নেয়ার ব্যাপারে রাজি করান কুরেশি। এরপরই কাদরি এই ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, দুই সপ্তাহ আগে পার্লামেন্টের বাইরে বিক্ষোভে অংশ নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার নওয়াজকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দিয়েছেন কাদরি। দ্য ডন, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। এদিকে, নওয়াজ শরিফকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা চেয়ে দেশটির একটি আদালতে রিট দায়ের করা হয়েছে। শনিবার নওয়াজের বিরুদ্ধে ‘জাতির সঙ্গে মিথ্যাচারের’ অভিযোগে লাহোর হাইকোর্টে এই রিট করা হয়। ইনসাফ লইয়ার্স ফোরামের সিনিয়র সভাপতি অ্যাডভোকেট গওহর নওয়াজ এই রিট দায়ের করেন। এতে বলা হয়, ‘রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সেনাপ্রধানের আলোচনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতির সঙ্গে মিথ্যাচার করেছেন,
যা সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ ধারার লংঘন। এই মিথ্যাচারের কারণে নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।’ শুক্রবার নওয়াজ শরিফ পার্লামেন্টে বলেছিলেন, পিটিআই ও পিএটির অনুরোধে সেনাপ্রধান জেনারেল রাহেল শরীফকে রাজনৈতিক দলের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হতে অনুরোধ করেছেন। তার এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে উভয় দল ও সেনাবাহিনী। পাকিস্তানে ফের ‘সেনা সংকট’ পাকিস্তানের রাজনীতি যেন ঘুরে-ফিরে সেনাবাহিনীর হাতেই জিম্মি হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি পিটিআই (পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ) ও পিএটির (পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক) সরকারবিরোধী আন্দোলনে সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতার ঘোষণা এবং সরকারের পক্ষ থেকেও এর সমর্থন সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ ও পুনর্নির্বাচনের দাবিতে পিটিআই ও পিএটির যুগপৎ আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতার ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী। আইএসপিআরের (ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেশন্স) পক্ষ থেকে শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ ঘোষণার পরপরই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর এ বক্তব্য সরকারের মনোভাবেরই প্রতিধ্বনি। আইএসপিআরের ওই বিবৃতি প্রকাশের আগে তিনি নিজে সেটা পড়েছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফও তা পড়ে দেখেছেন। ডন নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে পিটিআই ও পিএটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল রাহেল শরীফ। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পিটিআই ও পিএটি নেতাদের দাবি অনুসারেই চলমান রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী। তবে দল দুটির পক্ষ থেকে সরকারের এ দাবিকে অস্বীকার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ‘অযোগ্য’ হাইকোর্টে রিট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সেনাপ্রধানের আলোচনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতির সঙ্গে মিথ্যাচার করেছেন, যা সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ ধারার লংঘন। এই মিথ্যাচারের কারণে নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন

ডি মারিয়ার অভিষেকেও বিবর্ণ ম্যানইউ

বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তাকে আর অঘটন বলা যায় না। গত মৌসুমের সেই দুঃস্বপ্ন এখনও তাড়া করছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে। দিনদিন যেন অবনতিই হচ্ছে রেডডেভিলদের। ছন্নছাড়া ম্যানইউকে উজ্জীবিত করতে পারলেন না অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়াও। কাল ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে আর্জেন্টাইন উইঙ্গারের অভিষেক ম্যাচে পুঁচকে বার্নলের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে ম্যানইউ। ডাচ কোচ লুই ভ্যান গলের অধীনে চার ম্যাচ শেষে জয়হীন ইউনাইটেড। প্রিমিয়ার লীগে সোয়ানসির কাছে হারের পর সান্ডারল্যান্ডের সঙ্গে ড্র। এরপর তৃতীয় বিভাগের দল এমকে ডন্সের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে ক্যাপিটাল ওয়ান কাপ থেকে বিদায়। তারই ধারাবাহিকতায় লীগের তৃতীয় ম্যাচেও হোঁচট খেল ম্যানইউ।
ম্যানইউ ব্যর্থ হলেও জার্মানির বুন্দেসলীগায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। বেয়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে হার দিয়ে মৌসুম শুরু করা ডর্টমুন্ড পরশু ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছে অ্যাসবুর্গকে। ১১ মিনিটে মার্কো রেউসের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ডর্টমুন্ডের মুঠোয় চলে আসে ম্যাচ। ৮১ মিনিট পর্যন্ত ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তারা। শেষ পর্যন্ত কোনো অঘটন না ঘটলেও শেষ আট মিনিটে দুই গোল হজম করে চাপে পড়ে গিয়েছিল ডর্টমুন্ড। এদিকে স্প্যানিশ লীগে মালাগাকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে ভ্যালেন্সিয়া। এএফপি।

আলাল দুলাল পঞ্চমপত্রে তারা তিনজন

গেল দুই বছর ধরে অভিনেতা মীর সাব্বির নিজের রচনা ও পরিচালনায় ‘আলাল দুলাল’ সিক্যুয়াল নাটক নির্মাণ করে আসছেন। ‘আলাল দুলাল প্রথমপত্র’ নামের প্রথম পর্বে আলাল চরিত্রে জাহিদ হাসান এবং দুলাল চরিত্রে সাব্বির নিজেই অভিনয় করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আসছে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মীর সাব্বির এবার নির্মাণ করেছেন ‘আলাল দুলাল পঞ্চমপত্র’। এবার আলাল দুলালের বিপরীতে অভিনয় করেছেন নাদিয়া।
এ প্রসঙ্গে মীর সাব্বির বলেন, ‘এটা ভীষণ আনন্দের ব্যাপার যে, দর্শকের কাছ থেকেই বিশেষ অনুরোধ আসে এই নাটকটির সিক্যুয়াল নির্মাণের জন্য। যে কারণে গত কয়েক বছর আমি এটি ধারাবাহিকভাবে নির্মাণ করে আসছি।’ জাহিদ হাসান বলেন, ‘অভিনয় এবং নির্দেশনায় দুটিতেই সাব্বির বেশ ভালো অবস্থানে আছে। এ নাটকটি নিয়ে তার পাশাপাশি আমিও খুব উচ্ছ্বসিত।’ আসছে ঈদে ‘আলাল দুলাল পঞ্চমপত্র’ যথারীতি এটিএন বাংলায় প্রচার হবে।

নওয়াজকে অযোগ্য ঘোষণার আবেদন হাইকোর্টে

রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলার জন্য সেনাবাহিনীকে অনুমতি দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। এ জন্য তাকে অযোগ্য ঘোষণার জন্য লাহোর হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছে গতকাল। রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে তিনি সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে কার্যত তিনি কর্তৃত্ব তুলে দিয়েছেন সেনাপ্রধানের হাতে। পাকিস্তানে দীর্ঘ দিনের সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস আছে। কর্তৃত্ব সেনাবাহিনী হাতে পেয়ে কার্যত তারা এখন প্রধানমন্ত্রীকে দেখাচ্ছে কে আসল বস! সমালোচকরা এমন পরিস্থিতিকে পাকিস্তানে ‘নীরব অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। ওয়াশিংটন পোস্টে গতকাল এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এর শিরোনাম- তবে কি এরই মধ্যে পাকিস্তানে নীরব সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে গেছে? এ প্রতিবেদনটির লেখক টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক সিনিয়র সম্পাদক ইশান ঠারুর। ওদিকে নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণার আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের মাঝে সেনাবাহিনীকে ডেকে তিনি অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাই তাকে অযোগ্য করা উচিত। ইনসাফ ল’য়ারস ফোরামের সিনিয়র সভাপতি এডভোকেট গওহর নওয়াজ আজ এ পিটিশন দাখিল করেছেন। উল্লেখ্য, শুক্রবার পার্লামেন্টে ভাষণ দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেন, তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফকে পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই)-এর ইমরান খান ও পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি)-এর প্রধান তাহিরুল কাদরির সঙ্গে যোগাযোগের অনুমতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকার ও এই দু’নেতার সঙ্গে মধ্যস্থতা করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছেন। নওয়াজ শরিফের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন ইমরান খান ও তাহিরুল কাদরি। তারা বলেছেন, এতে সেনাবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। আলাদা বক্তব্যে তারা বলেন, এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী জাতির সামনে মিথ্যা কথা বলেছেন। পরে অবশ্য মুখ খোলে সেনাবাহিনী। তারা সংক্ষিপ্ত একটি বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, তারা শুধু সরকারের পক্ষে দেশের চলমান সঙ্কট উত্তরণে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করছে। এ ঘটনার পরই আজ নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণার দাবিতে লাহোর হাইকোর্টে ওই আবেদন করলেন গওহর নওয়াজ। ইশান ঠারুর ওয়াশিংটন পোস্টে লিখেছেন, পাকিস্তানে যখন থেকেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তারপর থেকেই এর রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছে সেনাবাহিনী। বেসামরিক শাসনে হস্তক্ষেপ ও নাক গলানোর দীর্ঘ ইতিহাস আছে এদেশের জেনারেলদের। প্রায় ৭ দশকের মধ্যে গত বছর পাকিস্তানে যে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন নওয়াজ শরিফ তাতে প্রমাণ হয়েছে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে পাকিস্তান বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে সক্ষম। কিন্তু এখন আরও একবার সেনাবাহিনীর আবির্ভাব বড় করে দেখা হচ্ছে। রাজপথের উত্তেজনা থামাতে এ সপ্তাহে নওয়াজ শরিফ সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সম্মত হয়েছেন। এরই মধ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ বর্তমানে বিক্ষোভকারী বড় দু’টি দলের মূল নেতা- ইমরান খান ও তাহিরুল কাদরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই দু’নেতাই নওয়াজ শরিফের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছেন নওয়াজ শরিফ, যাতে তারা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। নওয়াজ শরিফের জন্য এটা একটি কঠিন পরিস্থিতি। ১৯৯৯ সালে তিনি যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এখন আবার সেনাবাহিনী নওয়াজকে দেখিয়ে দিচ্ছেন- আসল বস কে। এ বিষয়ে ইসলামাবাদ ভিত্তিক বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, এবার যদি নওয়াজ শরিফ টিকে যান তাহলে তার ক্ষমতার বাকি মেয়াদে তিনি হয়ে থাকবেন একজন আনুষ্ঠানিক প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ব তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবে না। এরই মধ্যে পাকিস্তানে নীরব অভ্যুত্থান ঘটে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো- এই অভ্যুত্থান কতটা কঠিন হবে।

নওয়াজ শরিফ গত বছর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হন। তখন থেকেই তিনি পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া কঠিন করেছেন, বেসামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছেন। এ দু’টি কারণে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, ভারতের সঙ্গে নওয়াজ শরিফ সম্পর্ক উন্নত করার কথা বলেছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রয়েছে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের এক ইতিহাস। তাদের নিজস্ব ব্যবসা আছে। এ বাহিনীতে রয়েছে ৫ লাখের মতো শক্তিশালী স্ট্যান্ডিং সেনা সদস্য। ১৯৪৭ সালে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর চারটি যুদ্ধ করেছে এই দেশ দু’টি। পাকিস্তানি বিশ্লেষক মোশাররফ জাইদি বলেন, পাকিস্তান ও ভারত যদি স্বাভাবিক প্রতিবেশী হতো তাহলে স্বাভাবিকভাবে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব কমে যেতো। কিন্তু তা সহজে হওয়ার নয়। নওয়াজ শরিফকে বেষ্টন করে আছে তার অনুগত ও চাটুকার উপদেষ্টা, আমলারা। এতেই তার ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। ইমরান খান ও তাহিরুল কাদরি তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শানিয়ে নিয়েছেন। ইমরান খানের অভিযোগ, ২০১৩ সালের নির্বাচন ছিল কারচুপির। ওই কারচুপির নির্বাচনের সুবিধা ভোগ করছেন নওয়াজ শরিফ। তিনি চান, এই সরকার ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন। নিরপেক্ষ বেশির ভাগ পর্যবেক্ষক মনে করেন, যে অনিয়মগুলো পাকিস্তানে আছে নতুন নির্বাচন দিয়ে তা পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে তাহিরুল কাদরি তার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন কানাডায়। তবে দেশে রয়েছে তার বিপুল সংখ্যক অনুসারী। তিনি পাকিস্তানের গণতন্ত্রে স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়েছেন। দু’সপ্তাহ ধরে ইমরান খান ও কাদরির কয়েক হাজার সমর্থক রাজধানী ইসলামাবাদের রাজপথে রয়েছেন। তুলনামূলক তাদের সংখ্যা কম হলেও তারা দেশকে দৃশ্যত অচল করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে পাকিস্তানের সাংবাদিক ও লেখক রাজা রুমি বলেন, এমন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানে নতুন নয়। দেশ কিভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে সেনা শাসন ও দুর্বল বেসামরিক সরকারের মধ্যে বোঝাপড়া আটকে আছে বহুদিন ধরে। ওদিকে পার্লামেন্টে নওয়াজ শরিফ এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ। তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। তা সত্ত্বেও ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে তিনি দুর্বল। এ বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের পাকিস্তান ব্যুরো প্রধান টিম ক্রেইগ বলেন, ১৯৯৯ সালে পারভেজ মোশাররফের অভ্যুত্থান যখন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে তার বাসভবন থেকে বের করে এনেছিল সেই অনুভূতির কথা মনে করে নওয়াজ শরিফ হয়তো বিকল হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অবমাননার ভয় করেছিলেন। এখন আবার তাকে দৃশ্যত অনেক বেশি নার্ভাস দেখা যাচ্ছে। যখন তিনি সঙ্কট মোকাবিলা করতে যাচ্ছেন তখন তাকে দেখা যাচ্ছে খুব বেশি সতর্ক। যদি তিনি ইমরান খান ও কাদরির সমর্থকদের বিক্ষোভের অনুমতি দিতেন পার্লামেন্টের সামনে তাহলে মিডিয়ায় তা নিয়ে রহস্য সৃষ্টি করা হতো না। কিন্তু নওয়াজ শরিফ তার পরিবর্তে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেলেন এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি ইমরান খান ও কাদরির বিরুদ্ধে কোন ফলপ্রসূ পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো নিজেকে নিজের ঘরের মধ্যে বন্দি করে ফেললেন। এর ফলে নওয়াজ এখন দৃশ্যত অনেকটা দুর্বল ও অকার্যকর। পাকিস্তানের মতো দেশে যে নেতা একবার দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি সেখানে বেশিদিন টিকে থাকতে পারেন না। তবে এখনও পুরোপুরি সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে- এমনটা বলা যাচ্ছে না। তবে জাইদি বলেন, প্রতিবেশী ভারত, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে চলমান লড়াই কেমন হবে সে বিষয়ে এখন সেনাবাহিনী তার অবস্থান জানাতে পারে।
ওদিকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তা গত কয়েকদিনেই স্পষ্ট হয়েছে। কারণ, তিন দিনের মধ্যে সেনাবাহিনী দু’বার সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। সেখানে তারা দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে কথা বলেন। এরপর শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ জাতীয় পরিষদে ভাষণে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য মধ্যস্থতা করার অনুমতি দেয়ার কথা স্বীকার করেন। এরপর সেনাপ্রধান ইমরান খান ও তাহিরুল কাদরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গতকাল দ্বিতীয় দফা ইমরান খানের সঙ্গে স্থানীয় সময় বিকাল ৪টায় আলোচনায় বসার কথা জেনারেল রাহিল শরিফের। ওদিকে, তাহিরুল কাদরির পিএটি বলেছে, সেনাবাহিনী যে হস্তক্ষেপ করেছে এ বিষয়ে তারা আশ্বস্ত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনাকে ধ্বংস করাই ছিল ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সকল চেতনা ধ্বংস করে দিয়ে এর বিরোধীতাকারীদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। গতকাল ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৫ই আগস্টের কর্মসূচি হিসেবে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত  সভাপতি এমএ আজিজের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক আবদুল হক সবুজের সঞ্চালনায় সমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে ’৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৫ই আগষ্ট হত্যাকাণ্ডের  পেছনে জিয়াউর রহমানের গ্রিন সিগন্যাল ছিল। আত্মস্বীকৃত খুনিরাই সাক্ষাৎকারে একথা বলেছে। তারা বলেছে হত্যাকাণ্ডের আগে তারা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছিল। জিয়াউর রহমান নিজে থাকবেন না জানিয়েছিলেন, তবে সিগন্যাল দিয়েছিলেন। তিনি বলেন খুনির সঙ্গে খুনির সম্পর্ক না থাকলে ঘটনার পরে মোশ্‌তাক জিয়াকে এতবড় পদে বসাতো না।  শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু এ দেশের জন্য সারাজীবন ত্যাগ করেছেন, কষ্ট করেছেন। তার জীবনে একটাই লক্ষ্য ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি সবসময় মানুষের স্বার্থ  দেখেছেন, তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন। তাই তাকে জীবন দিতে হয়েছে। আমি জাতির পিতার সন্তান। তাই আমিও তার আদর্শের সৈনিক। শোককে শক্তিতে পরিণত করে আমার জীবনকে দেশের মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছি। এ দেশের মানুষের মুক্তি ছিনিয়ে আনতে কাজ করে যাবো। এটা কেউ ব্যাহত করতে পারবে না। জিয়াউর রহমানের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে হানাদার বাহিনীর যে যোগসাজশ ছিল তা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আসলাম বেগের লেখা একটি চিঠি থেকে জানতে পারি। এছাড়া ১৫ই আগস্টের পর  মোশ্‌তাক জিয়াকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু কেন? বিএনপি এর  কোন জবাব দিতে পারবে? পরবর্তীতে জিয়া নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুরস্কৃত করেছে। জিয়াউর রহমান যেমন খুনিদের পুনর্বাসন করেছিল ঠিক তেমনি তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও একই কায়দায় তাদের হাতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়েছে। তারা আসলে এদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। তাই পরাজিত শক্তিকেই তারা বারবার সামনে নিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনা বলেন, ১৫ই আগস্টের কয়েকদিন আগে আমি আমার সন্তান ও বোন রেহানাকে নিয়ে দেশ ছেড়েছিলাম। দীর্ঘদিন দেশে আসতে পারিনি। দেশে ফিরে ৩২ নম্বরের বাসায় উঠতে পারিনি। জিয়া আমাকে বাসায় ঢুকতে দেয়নি। আমি সেখানে মিলাদ পড়তে চাইলাম কিন্তু জিয়া বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। তখন তার এত কিসের ভয় ছিল? বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, তারা বিগত নির্বাচন ঠেকানোর নামে শ’ শ’ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। তাদের হাত থেকে মানুষ, গরু, গাছপালা কিছুই বাদ যায়নি। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেভাবে মানুষ হত্যা করেছিল, অরাজকতা করেছিল তারাও ঠিক সেভাবেই আন্দোলনের নামে অরাজকতা করেছে। আসলে মানুষ খুন করাই তার কাজ। তিনি বলেন, বিকৃত চরিত্র ও মানসিকতার না হলে ১৫ই আগস্ট শোকের দিনে কেউ জন্মদিনের নামে কেক কেটে ফুর্তি করে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। তারা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মানুষ ভাল থাকলে তার ভাল লাগে না। দেশের উন্নয়ন তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু এই শিক্ষা আমার বাবা-মা আমাকে দেয়নি। আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য একটাই দেশকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। শেখ হাসিনা বলেন, আমার হারাবার কিছুই নেই। পাওয়ার কিছুই নেই। আমি একদিনে মা, বাবা, ভাই, বোন সকলকে হারিয়েছি। বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। আমি জাতির পিতার সন্তান। তার আদর্শে বড় হয়েছি। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য, শোষিত বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য আমি এখনও বেঁচে আছি।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিচারপতিদের অভিশংসনের বিষয়টি ’৭২-এর সংবিধানে ছিল। এখন সেটি আবার ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যারা বাহাত্তরের সংবিধানের প্রণেতা ছিলেন তারাই এখন এর বিরোধিতা করছেন। তিনি বলেন, যারা ষড়যন্ত্র  করে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে চায় তারা এখনও সরব। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা ছিল সংসদের হাতে। পরে সেনাসমর্থিত সরকার তা বাতিল করে। আগামী সংসদ অধিবেশনে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা হবে। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে সমাবেশে তিনি বলেন, তিনি ১৫ই আগস্ট জন্মদিন পালন করেন। আমি এটিকে বলি জারজ জন্মদিন। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, সংবিধান, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে আওয়ামী লীগের সকল নেতা-কর্মীদের বলবো, সকল ভেদাভেদ ভুলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হোন। জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, নগর আওয়ামী লীগের নেতা হাজী মো. সেলিম, মুকুল চৌধুরী, ফয়েজ আহমেদ, কামাল আহমেদ মজুমদার, শাহে আলম মুরাদ, সংসদ সদস্য একেএম রহমতউল্লাহ, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

কণ্ঠরোধের চেষ্টা

জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার কঠোর সমালোচনা করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। নীতিমালাকে একটি বিপদ হিসেবে অভিহিত করে তারা বলেছেন, এর মাধ্যমে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশে সামরিক শাসন অথবা জরুরি অবস্থা জারি করা না হলেও গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। সম্প্রচার নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করে তারা বলেছেন, এ নীতিমালা নিয়ন্ত্রণমূলক। তা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করবে, গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। সম্পাদক পরিষদের আয়োজনে গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণমাধ্যমের সামনে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তারা এ অভিমত দেন। তারা বলেন, সম্প্রচার নীতিমালার আলোকে সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে সম্পাদকদের আর কোন কাজ থাকবে না। এ নীতিমালা সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানকে নিরস্ত্র করার উদ্যোগ। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের সভাপতিত্বে আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় বেশির ভাগ আলোচকই গণমাধ্যমের জন্য কোন নীতিমালার প্রয়োজন নেই বলে মত দেন। তারা বলেন, নীতিমালা বা আচরণবিধি যদি করতেই হয় সাংবাদিকরা নিজেরাই তা প্রণয়ন করবে।
শুরুতে আলোচনা সভার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, সম্পাদক পরিষদ প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকদের সংগঠন হলেও গণমাধ্যম বলতে আমরা ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট, অনলাইন সব ধরনের মিডিয়াকেই বুঝে থাকি। সম্প্রচার নীতিমালাকে আমরা স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম প্রসারের পরিপন্থি মনে করি। তিনি বলেন, গণমাধ্যম স্বাধীন বাংলাদেশের একটি অন্যতম অর্জন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আমরা কিছু অশুভ উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি। জেলা প্রশাসকদের হাতে আগে পত্রিকা বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা ছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী সরকারের সময় আইন সংশোধন করে সে ক্ষমতা রহিত করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে সে ক্ষমতার পুনর্বহাল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের জন্যও আইন তৈরি হচ্ছে। আর পর্দার আড়াল থেকে সম্প্রচার নীতিমালা এরই মধ্যে সামনে এসে গেছে। মাহফুজ আনাম বলেন, কোন ধরনের নীতিমালা ছাড়াই আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়া ভাল কাজ করছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া আমাদের সংবাদ মাধ্যম জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তাহলে নীতিমালার কেন প্রয়োজন হবে? আর বিদ্যমান আইনেই মিডিয়ার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ এলে তার বিচার সম্ভব। তিনি বলেন, নীতিমালায় কোন ইতিবাচক কথা নেই। একটি কথাই কেবল বলা হয়েছে পারবেন না, পারবেন না। এ নীতিমালার মাধ্যমে মিডিয়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, উন্নয়ন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক। যে সব দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন সেসব দেশে দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কমে যায়।
বিএফইউজে’র একাংশের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, গণমাধ্যমের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নীতিমালাই নয়। গণমাধ্যমের সামনে আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ওয়েজ বোর্ড, সময়মতো বেতন পরিশোধ এসবও গণমাধ্যমের জন্য চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘদিন থেকেই এ নিয়ে আলোচনা চলে আসছে। তিনি বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নের ব্যাপারে আমরা চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলাম। টেলিভিশনের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চাকরির সুরক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, আমরা এরই মধ্যে জানিয়েছি সম্প্রচার কমিশন গঠন করতে হবে সংবাদ মাধ্যমের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে। কোন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা অথবা আমলাকে আমরা সম্প্রচার কমিশনে মেনে নেবো না। মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সম্পাদকীয় নীতিমালা চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। ডেইলি স্টার, প্রথম আলো এবং ভোরের কাগজের সম্পাদকীয় নীতিমালা এক হবে না। এটাই স্বাভাবিক।
বিএফইউজে’র অপরাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, মাহফুজ আনাম যে বক্তব্য রেখেছেন আমি তার সঙ্গে সহমত পোষণ করি। সম্প্রচার নীতিমালা স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি এক ধরনের বিদ্রূপ। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গণমাধ্যমের সংঘাত ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। আর গণমাধ্যম সবসময়ই জনগণের পক্ষে ছিল। তিনি বলেন, আমরা কখনও গণমাধ্যমের জন্য কোন নীতিমালা চাইনি। কারণ আমরা জানতাম কার হাতে নীতিমালা গেলে কি হবে। এ নীতিমালা বাতিল করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতের সংবিধানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা নেই। কিন্তু ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হিসেবেই স্বীকৃত।
টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন-এটকো’র সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল আই’র পরিচালক (বার্তা) শাইখ সিরাজ বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা মতামত দিয়েছিলাম। একটি বৈঠকে আমরা যোগ দিয়েছি। আমাদের কিছু মতামত গ্রহণ করা হয়েছে, কিছু মতামত গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু আমাদেরকে বাইপাস করেই মন্ত্রিসভায় নীতিমালা উত্থাপন করা হয়েছে। খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর আমাদেরকে তা দেখানো হয়নি। তিনি বলেন, মানুষকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে টেলিভিশন ঈর্ষণীয় সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, অংশীজনদের মতামত নেয়ার কৌশল কার্যকর না করেই এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। যারা সরকারকে এ কাজটি করতে উৎসাহিত করেছেন তারা সরকারের বন্ধু নন। এর মাধ্যমে তারা সরকারের যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন আপনারা সবাই মিলেও তা করতে পারবেন না। সরকারকে যারা এ বুদ্ধি দিয়েছে সে উপদেষ্টাদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তারা আসলেই উপদেষ্টা থাকার যোগ্য কিনা তা-ও দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, নীতিমালায় বলা হয়েছে সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করে সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ধরনের কথা পৃথিবীতে আর কোনদিন হয়তো শোনা যায়নি। তিনি নিজেদের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য সম্পাদক পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা ছাড়াও গণমাধ্যমের জন্য আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গণমাধ্যমের জন্য নীতিমালা প্রয়োজন কিনা এ নিয়েও বিতর্ক হচ্ছে। যেহেতু গণমাধ্যমগুলো নিজেদের জন্য কোন নীতিমালা প্রণয়ন করেনি তাই তথ্য মন্ত্রণালয় সুযোগ পেয়ে একটি নীতিমালা চাপিয়ে দিয়েছে। নীতিমালা চাপিয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা এমনিতেই অনেক বিপদের মধ্যে রয়েছি। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা একটি বিপদ এবং আপদ। আশার কথা হচ্ছে সম্পাদক পরিষদ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। গণমাধ্যমের ওপর যে আক্রমণ আসছে তার একটি কারণ সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য নেই। তাদের বিভাজন অত্যন্ত দুঃখজনক। পাকিস্তান আমলেও দেখা গেছে, করাচি থেকে কক্সবাজার-সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। সে সময় সাংবাদিকরা যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করেছেন তা তাদের ঐক্যের কারণেই পেরেছেন। তিনি বলেন, দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়নি, সামরিক শাসন জারি করা হয়নি। অথচ গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে, কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনিতেই আমাদের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত। মালিক, সরকার, বিজ্ঞাপনদাতাদের দ্বারা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত। এখন নতুন করে আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। আমাদের একমাত্র ভরসার জায়গা ছিল গণমাধ্যম। সে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ১১৫ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধ প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। ইংরেজ কবি জন মিল্টন তার সমর্থনপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধেই সোচ্চার হয়েছিলেন। কারণ সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হচ্ছে মানুষের চিন্তা করার স্বাধীনতা। তিনি বলেন, এখন জনগণকে ভয়ঙ্কর মনে করা হচ্ছে। এ কারণে ভয়ঙ্কর নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
গোলাম সারওয়ার বলেন, সম্প্রচার নীতিমালার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে তা নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। তথ্যমন্ত্রী নিজেই বলছেন, এটা ঠিক নীতিমালা নয়, একটা গাইডলাইন। উনি টিভি চ্যানেলগুলোকে স্পষ্ট করে বললেই হয় বিটিভি যেভাবে চলছে আপনারা সেভাবেই চলুন। স্বাধীন গণমাধ্যমের উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের গণমাধ্যমের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তানের বিরোধী দলের নেতারা সরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারেন। ১৯৯১ সালের পর আমরা যে শক্তিশালী গণতন্ত্র পেয়েছি তা গণমাধ্যমের কারণেই সম্ভবপর হয়েছে। যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে সম্প্রচার কমিশন গঠনের দাবি রেখে তিনি বলেন, আমাদের দেশে কমিশনের নামে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে থাকে। তাই একজন যোগ্য ব্যক্তির সমন্বয়ে কমিশন গঠন করে তার মাধ্যমে একটা নীতিমালা হতে পারে। গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়বদ্ধতাও আছে। পত্রিকা, টিভিতে অনেক সময় ভুল তথ্য পরিবেশন হওয়ার সুযোগ থাকে। এগুলো সংশোধন করা দরকার। গণমাধ্যমগুলোর নিজেদের উদ্যোগে একটি আচরণবিধি তৈরি করার আহ্বান জানান তিনি।
সম্প্রচার নীতির ত্রুটির কারণে সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে উল্লেখ করে এটিএন নিউজের হেড অব নিউজ মুন্নী সাহা বলেন, এতে নতুন প্রজন্ম উৎসাহিত হয়েছে। তিনি গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকলকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক নয় এটা স্পষ্ট। এই নীতিমালা বাতিল করা হোক। নীতিমালা যদি করতেই হয় তবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য কোন ব্যক্তির নেতৃত্বে সম্প্রচার কমিশন গঠন করে অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে একটা নীতিমালা করতে হবে।
এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ. ই. মামুন বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে গণমাধ্যমের জন্য একটা নীতিমালা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে যে সম্প্রচার নীতিমালা তা সংবিধানের ওই নীতিমালার বিস্তারিত রূপ। এক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনের জন্য তিনি সংবিধান বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, এই নীতিমালার উদ্দেশ্য গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ নয়। সরকার গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাইলে পুরাতন আইন দিয়েই করতে পারে। এরকম অনেক আইন আছে। নীতিমালার অনেকগুলো অংশের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। তবে স্বাধীনতার সীমাটাও বিতর্কের মাধ্যমে নির্ধারণ করা দরকার।
একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু সম্প্রচার নীতিমালার বিপক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, যার টাকা ও যোগ্যতা আছে সে টেলিভিশনের লাইসেন্স পাবে। ভাল-মন্দ জনগণ বিচার করবে। শুধু বিশেষ কোন বাহিনী নয়, যে কাউকেই কটাক্ষ করার অধিকার গণমাধ্যমের নেই। এই নীতিমালা শুধু গণমাধ্যম নয় পুরো বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যম জনগণের অধিকার নিশ্চিত করে। গণমাধ্যমের অধিকার খর্ব হলে নাগরিক অধিকার খর্ব হয়। সম্প্রচার নীতিমালাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে দেশের বিদ্যমান কিছু আইনের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হবে। নীতিমালার বাক্য গঠনে কিছু কপটতা ও ছলনার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এই নীতিমালার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নেই। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার লাইসেন্স প্রদানে কমিশনের ক্ষমতা প্রসঙ্গে বলেন, নীতিমালা অনুসারে কমিশন শুধু লাইসেন্স প্রদানের সুপারিশ করতে পারবে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিবে মন্ত্রণালয়।
মাছরাঙা টেলিভিশনের চিফ এডিটর সৈয়দ ফাহিম মুনএম বলেন, আমরা কিভাবে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করবো এটা অন্যরা বলে দেবে- আমরা বিষয়টি নিয়ে লজ্জিত। সরকার নীতিমালা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিটি হাউজে নীতিমালা রয়েছে বলে জানা নেই। এটার কোন প্রয়োজনও নেই। দেশের প্রচলিত আইনকেই নীতিমালা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
নিউজ টুডে পত্রিকার সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা দিয়ে গণমাধ্যমের সামনে চ্যালেঞ্জ শুরু হয়েছে। এর নিচে পর্বত অপেক্ষা করছে। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে আইন করে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে। এটাকে নীতিমালা বলা যায় না। এটা গণমাধ্যমের জন্য একটা ভীতিমালা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমরা যেন সেলফ সেন্সরশিপ গ্রহণ করি সে উদ্দেশ্যেই এটা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা কোনভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার তার অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার জন্য নীতিমালা করছে দাবি করে তিনি বলেন, এই নীতিমালা দেশকে গণতন্ত্রহীনতার দিকে নিয়ে যাবে। এটাকে প্রতিরোধ করতে হবে।

[গত ৪ঠা আগস্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রচার নীতিমালা অনুমোদন করে। পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।]

ক্যাইলা বাবুর নেতৃত্বে ১৫ সন্ত্রাসী কিলিং মিশনে অংশ নেয়

‘টিনশেডের বাড়িতে ঢুকতেই প্রথম কক্ষে সন্ত্রাসী ক্যাইলা বাবু এলোপাতাড়ি গুলি করে। এরপর তিনতলার রান্নাঘরে একই কায়দায় গুলি করে সে। ক্যাইলা বাবুর সঙ্গে ছিল সদস্যের সন্ত্রাসী বাহিনী। ওই বাহিনীর সদস্যরা আশেপাশের বাড়ির দরজা ও জানালা ভাঙচুর করে। পরে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মগবাজারের নয়াটোলার সোনালীবাগের ৭৮ নম্বর বাড়ির পাশের হোল্ডিং নম্বরবিহীন একটি টিনশেডের বাসায় এবং ৭৮/২/ক অপর তিনতলায় আরেকটি বাসায় স্থানীয় সন্ত্রাসী বলে পরিচিত ক্যাইলা বাবু ও তার লোকজন এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে। এতে রানু, মুন্না বিল্লাল ও হৃদয় নামে চারজন আহত হয়। পরে চারজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করে চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় নিহত রানুর ভাই শামীম ওরফে কালাচান বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে রমনা থানায় ৩০২ ধারায় পেনাল কোডে হত্যার অভিযোগে ক্যাইলা বাবুসহ ১৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি দুইজনকে শুক্রবার গভীর রাতে মগবাজারের নয়াটোলা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলো- সোহেল (২৮) ও ফারুক (৩২)।  পুলিশ তাদের দুইজনকে ঢাকা মহানগর আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। পরে আদালত তাদের উভয়কে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ গ্রেপ্তারকৃত দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

গতকাল সকালে ওই টিনশেডের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ওই বাড়ির সামনে দুইজন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ছয়রুমের টিনশেডের বাড়িটিতে তালা লাগানো। তবে মূল গেট খোলা ছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রমনা থানার ওসি (তদন্ত) সেলিম মিয়া জানান, ‘ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত রানুর ভাই থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ১৫ জন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা সবাই ক্যাইলা বাবুর সহযোগী। মামলার আসামিরা হলো: ক্যাইলা বাবু, শাহাদাৎ, রাজু, সিরাজ, ঠানডু, দিলীপ, অপু, ফারুক, সোহেল, মারুফ, আরিফ, বিল্লাল ও পিচ্চি রনি ও জনি। তিনি আরো বলেন, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ফারুক ও সোহেল হত্যাকাণ্ডের সময় ছিল। এছাড়াও তারা কিভাবে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ ও এজাহারভুক্ত ১৫ জন আসামি সেখানে উপস্থিত ছিল বলে গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশকে জানিয়েছে, ক্যাইলা বাবু নিহতদের গুলি করেছে। অন্যরা কেউ বাড়ির দরজা ও জানালা ভাঙচুর করেছে। কেউবা স্থানীয়রা যেন ভিকটিমদের বাঁচাতে না আসে এ জন্য পাহারারত ছিল। গুলি ও ভাঙচুরের শব্দ শুনে আশেপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই বাড়ির জানালা ও দরজা লাগিয়ে দেয়।
তিনি আরো বলেন, স্থানীয়রা অনেকেই কর্মজীবী। সন্ধ্যার পর সারাদিনের কাজ করে তারা বাড়ি ফিরছিল। বাড়িটি সরু গলির মুখে। বড় কোন গাড়ি ঢুকতে পারে না। স্থানীয় লোকজন কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে গুলি ও ভাঙচুরের শব্দ শুনে আর সরু গলি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে অনেকেই আহত হয়। ক্যাইলা বাবুর নেতৃত্বে ১৫ জন সন্ত্রাসী মাত্র ১০ মিনিটেই ঠাণ্ডা মাথায় ট্রিপল খুন করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। শুক্রবার ক্যাইলা বাবুর দুই চাচীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আটক করেছিল। পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
এ মামলার বিষয়ে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ (দক্ষিণ)’র উপ-পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘খুনের ঘটনার মূল মোটিভ পুলিশ জানতে পেরেছে। রেলের জমি ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। এর সঙ্গে আরো কোন বিষয় আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত আসামিকে  গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুনের ঘটনার পর মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা মগবাজার এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। খুনের প্রধান আসামিসহ অন্যদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। খুব দ্রুত মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে। এদিকে, গতকাল সকালে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহহার আকন্দের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা খুনের স্থান ঘুরে দেখেন। আশেপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের কাছে পাওয়া তথ্য নোট নেন। তবে ওই এলাকার লোকজন সিআইডির সদস্যদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে রাজি হয়নি।
মামলার বাদী শামীম ওরফে কালাচান জানান, ‘যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের আসামি করে থানায় একটি  মামলা  দায়ের করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মামলার মূল আসামি খুনি সন্ত্রাসী ক্যাইলা বাবুকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আমরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ক্যাইলা বাবুসহ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত আছে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশের প্রতি দাবি জানান। লাশের ময়নতদন্ত শেষে নিহতদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে বলে পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

লেসোথোয় সামরিক অভ্যুত্থান পালিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

আফ্রিকার দেশ লেসোথো’তে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে। সেনাবাহিনী হত্যা করতে পারে এমন আশঙ্কায় পালিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় আশ্রয় নিয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী টমাস থাবানে। সেনাবাহিনী রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে। ঘিরে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে তারা সামরিক অভ্যুত্থানের কথা অস্বীকার করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে আরও বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকা চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে লেসোথোকে। এর প্রধানমন্ত্রী সেখানে পালিয়ে গিয়ে বলেছেন, তিনি জীবন নিয়ে সন্দিহান। তাকে হত্যা করা হতে পারে। তাই তিনি পালিয়ে গিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১৯৬৬ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে এ দেশটি। তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে সেখানে দেখা দিয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান। এই দেশে জোট সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী থাবানে। কিন্তু জোটের ভিতরকার দ্বন্দ্বের জেরে গত জুনে তিনি পার্লামেন্ট অধিবেশন স্থগিত করেন। অভিযোগ আছে, এ জন্য তিনি তার সরকারকে খর্ব করেছেন। তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ থাবানে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, তার সরকার অকার্যকর। এ কারণে সেখানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে। তিনি বলেন, আমাকে জনগণ ক্ষমতাচ্যুত করেনি। আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে সেনাবাহিনী। সেনাদের এমন কর্মকাণ্ড অবৈধ। আমি শনিবার সকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে এসেছি। যদি লেসোথোতে আমার জীবন বিপদে না পড়ে এমন নিশ্চয়তা দেয়া হয় তাহলে আমি দেশে ফিরবো। কিন্তু আমাকে হত্যা করা হবে এমন আশঙ্কা থাকলে আমি দেশে ফিরবো না। ওদিকে লেসোথোর রাজধানী মাসিরু থেকে বিবিসির সাংবাদিক বাসিলডন পেটা বলেন, অভ্যুত্থান ঘটে স্থানীয় সময় রাত তিনটায়। ভোরে গুলির শব্দ শোনা যায়। তবে দিনশেষে রাজধানী দৃশ্যত শান্ত। লোকজন বাড়িতে অবস্থান করছে। তবে মিডিয়ায় খবর চেপে যাওয়া হয়েছে। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, এটা একটি সামরিক অভ্যুত্থান। প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই তা করা হয়েছে। সেনাদের ক্ষমতা দখল ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয় না। কোন হত্যাকাণ্ডের খবরও পাওয়া যায় নি। এ ঘটনাকে রক্তপাতহীন একটি সামরিক অভ্যুত্থান বলাই ঠিক হবে। তবে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। কি ঘটতে যাচ্ছে কেউ তা বলতে পারছে না। অন্য এক সূত্রে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কেনেডি তাইকামোলিকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে এ ঘটনা ঘটলো। সেনাবাহিনী বলেছে, সেনাপ্রধান এখনও দায়িত্বে বহাল আছেন। সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সমর্থন করে। তবে সেনা মুখপাত্র মেজর নাতেলি নতোই সামরিক অভ্যুত্থানের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, অভ্যুত্থানের মতো কিছু ঘটে নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সেনাবাহিনী তাদের ব্যারাকে ফিরে গেছে। গতকাল সকালের দিকে মাসিরুর রাস্তায় সেনাদের দেখা গেছে। এ সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। রেডিও স্টেশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। টেলিফোন লাইন কেটে দেয়া হয়। পরে তা সচল হয়। দেশটির ক্রীড়াবিষয়ক মন্ত্রী থেসেলি মাসেরিবানে বলেছেন, সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় বাসভবন ঘিরে রেখেছে।

আফিয়ার নামে সহিংসতা করবেন না -বোন ফওজিয়া সিদ্দিকীর আর্তি

পাকিস্তানের আলোচিত বন্দি আফিয়া সিদ্দিকীর নামে কোন সহিংসতা চায় না তার পরিবার। সিএনএন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন আফিয়া সিদ্দিকীর বোন ফওজিয়া সিদ্দিকী। তিনি একই সঙ্গে আইসিস জঙ্গিদের আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন আটক বন্দিদের ছেড়ে দেয়। ফওজিয়া সিদ্দিকী বলেন, আমি আফিয়ার বোন। আমরা আফিয়ার পরিবার। আমরা একই সঙ্গে তার মুখপাত্র হিসেবে কথা বলি। আমরা আফিয়ার নামে কোন সহিংসতা চাই না। আমাদের সব সংগ্রাম এক ধরনের, তা হচ্ছে মহৎ, শান্তিপূর্ণ ও বৈধ। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে নিউ ইয়র্কের একটি আদালত আফিয়া সিদ্দিকীকে ৭টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যাচেষ্টা ও মার্কিন কর্মকর্তাদের গুলি করার মতো অভিযোগ। বর্তমানে টেক্সাসের একটি আদালতে ৮৬ বছরের সাজা খাটছেন আফিয়া। ২০০৮ সালে তিনি আফগানিস্তানের গজনির গভর্নরের বাসভবনের বাইরে থেকে গ্রেপ্তার হন। তাকে তখন বোমা, রাসায়নিক অস্ত্র, জৈব অস্ত্র ও রেডিওলজিক্যাল অস্ত্র তৈরির ডকুমেন্ট বহন করার অভিযোগে আটক করা হয়। আফিয়ার বিরুদ্ধে কখনওই সন্ত্রাসে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল না। তবে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তারের বহু আগে একবার আল কায়েদার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তার নাম তালিকাভুক্ত করেছিল। ২০০৪ সালে এফবিআই-এর ‘সতর্ক-তালিকা’য় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে তার পরিবার সব সময় সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে তার কোন যোগসূত্রের ধারণা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে। ফওজিয়া বলেন, তার সঙ্গে আল কায়েদা বা অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের কোন সম্পর্ক ছিল না। তার বিরুদ্ধে এমনকি সন্ত্রাসবাদের অভিযোগও নেই। কিন্তু সমপ্রতি তথাকথিত আইএস ডকুমেন্টে তার নাম এসেছে। আইএস-এর হাতে শিরশ্ছেদ হওয়ার আগে মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফোলের পরিবারের নিকট একটি চিঠি পাঠায় আইএস। সেখানে বলা হয়েছে, জেমস ফোলের মুক্তির জন্য মার্কিন সরকারকে বহু প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সেখানে আফিয়া সিদ্দিকীর নামটা ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল, আমরা আমাদের বোন ড. আফিয়া সিদ্দিকীর মতো মুসলিম বন্দিদের মুক্তির পরিবর্তে জেমস ফোলের মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু খুব দ্রুতই তোমরা প্রমাণ করে দিলে যে, আসলে তোমরা এটা নিয়ে উৎসাহী নও। এর ফলে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, আফিয়া সিদ্দিকীর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক না থাকলে আইএস তার মুক্তি দাবি করলো কেন? এদিকে ফওজিয়া সিদ্দিকী বলেছেন, তার বোনের নাম সন্ত্রাসীরা নিজেদের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে নিজেদের বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। তিনি বলেন, আইসিস, আফিয়া ব্রিগেড, যে কোন ধরনের অপহরণকারী বা যে-ই আফিয়াকে দাবি করুক না কেন, তা সঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘লেডি আল কায়েদা’, ‘গ্রে লেডি অব বাগ্রাম’- তার বোনকে মিডিয়ার দেয়া এসব বিশেষণ তাকে অনেক কষ্ট দেয়। তার ভাষায়, যখন আমি এসব শুনি, যেমন- লেডি আল কায়েদা, আমি আসলে আর একবারও উচ্চারণ করতে চাই না এসব। আপনি জানেন, এসব কতটা কষ্ট দেয়। তিনি বলেন, আফিয়া একজন আইকন। তিনি কেবল এক নারীই নন, বরং চরম দুর্দশাগ্রস্ত মুসলিম নারীদের সংহতি প্রকাশক এক আইকন। উল্লেখ্য, ফওজিয়া নিজেও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল থেকে প্রশিক্ষিত একজন নিউরোলজিস্ট। ২০০৩ সালে আফিয়া তিন সন্তান নিয়ে নিখেঁাঁজ হয়ে গেলে কতটা কষ্টে ছিল তার পরিবার সেটিও উল্লেখ করেন ফওজিয়া। আফিয়ার নিউরোসায়েন্সে নিজের গবেষণা শেষ করে ইসলামাবাদ পৌঁছার কথা ছিল। কিন্তু তিনি কখনই পৌঁছাননি। তার সবচেয়ে ছোট সন্তানটির বয়স ছিল মাত্র ৬ মাস। ফওজিয়া বলেন, এটা অনেকটা এমন, কেউ দুনিয়া থেকে পড়ে গেল মহাশূন্যে। আমি আপনাকে বলতে পারবো না, বোন সম্পর্কে কিছু না জানতে পারাটা কতটা কষ্টের। কেউ মারা গেলে আপনি জানতে পারবেন। কিন্তু আফিয়ার সম্পর্কে কোন কিছুই জানা ছিল না তখন। আফিয়াকে ঘিরে পাঁচ বছর ধরে গুজব শোনার পর ২০০৮ সালে এসে তার পরিবার জানতে পারে আফিয়া মার্কিন কারাগারে বন্দি। আইনজীবীরা দাবি করলেন, আফিয়া এফবিআইয়ের দুই বিশেষ এজেন্ট, সেনাবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসার ও ক্যাপ্টেনকে গুলি করেছেন। এরপর তাকে পাল্টা গুলি চালায় ওয়ারেন্ট অফিসার। তার পরিবারের দাবি, ঘটনার এই অফিসিয়াল সংস্করণ মিথ্যায় পরিপূর্ণ। ফওজিয়া বলেন, তিনি ছিলেন কারাগারে। সেখান থেকে কি করে তিনি রাইফেল তুলে নিতে পারেন? ৬ জন সশস্ত্র প্রশিক্ষিত সৈন্যের মধ্য থেকে একজন মহিলা কি করে এই কাজ করতে পারে? এদের মধ্যে এফবিআই-এর উচ্চ প্রশিক্ষিত দুই বিশেষ এজেন্টও ছিল। এটার কোন ভিত্তিই নেই। ফওজিয়া বলেন, তার বোন আসলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র বলি। তার ভাষায়, এটা অনেকটা এরকম যে, মুসলিমদের বিচার ছাড়াই অপরাধী তকমা লাগিয়ে দেয়া হলো। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সুযোগটাও দেয়া হলো না। এই জিনিসটিই ঘটেছে আমার বোনের ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে নিজের লব্ধ জ্ঞান প্রয়োগ করতে চাওয়া আফিয়ার ব্যাপারে প্রচুর মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানো হয়েছে। তার পরিবার একই সঙ্গে দাবি করেছে, ৯/১১ হামলার পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মুহাম্মদের সঙ্গে কখনওই বিয়ে হয়নি আফিয়ার। এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রতি আফিয়ার মুক্তির দাবিতে একটি অনলাইন পিটিশনে কয়েক সপ্তাহেই এক লাখেরও বেশি মানুষ সমর্থন জানিয়ে স্বাক্ষর করেছেন। বর্তমানে তার পরিবার আফিয়ার মুক্তি দাবি করছে। ফওজিয়া বলেন, আফিয়াকে মুক্তি দেয়া উচিত। তবে কোন মুক্তিপণ বা কিছুর বিনিময়ে বা জঙ্গিদের দ্বারা অপহৃত কারও বিনিময়ে নয়। তাকে মুক্তি দেয়া উচিত, তার প্রতি এটিই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।

কৃচ্ছ্রসাধন এবং আমরা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

পৃথিবীর এক-সহস্রাংশেরও কম ভূমিতে আমাদের ২৪ সহস্রাংশ মানুষের বাস। অর্থাৎ পৃথিবীর একটি শিশু গড়ে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে বড় হয়, বাংলাদেশে একটি শিশু পায় তার ২৪ গুণ কম। স্বভাবতই সম্পদের ব্যবহারে আমাদের অবশ্যই মিতব্যয়ী হওয়া উচিত। একজন মানুষের জন্য সাকল্যে বরাদ্দ ৭৮৩ বর্গমিটার, যা শহর-দেশগুলো বাদ দিলে প্রায় সর্বোচ্চ শুধু মালদ্বীপের জন্য সংখ্যাটি ৭৫৭। যেসব দেশ আমাদের থেকে শ্রেয়তর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, যেসব দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রকৌশলের শক্তিতে আমাদের থেকে অনেক বেশি বলীয়ান, তাদের দিকে একবার তাকাই।
১. ২০১৪ সালের প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের আগে ও পরে রাশিয়ার ইকেটেরেনবুর্গ শহরের কোনো ছোট হোটেলে থাকতে হবে। খুঁজতে গিয়ে একটি বড় হোটেলের পাঁচ মিনিট দূরত্বে পেয়েও গেলাম। ভেতরে ঢুকতেই হতবাক। দেশের চতুর্থ বৃহত্তম শহরে ১০ X ২০ ফুট মাপের একটি বাসায় চারটি খাটের ওপর আরও চারটি খাট বসিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তাতে থাকে সেই দেশের নাগরিকেরা, যে দেশ আয়তনে পৃথিবীর বৃহত্তম, যে দেশের মাথাপিছু জায়গা বরাদ্দ ১ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার। পক্ষান্তরে আমাদের মাথাপিছু বরাদ্দ কেবল ১৫০ গুণ কম! আমাদের নিশ্চয়ই তাহলে এক খাটের ওপর চার-পাঁচটি খাট বসিয়ে বড় বড় হোটেলে থাকা উচিত!
২. ভারতে ট্রেনে শুধু সাধারণ কামরায়ই নয়, এমনকি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায় একটি বেঞ্চাকার সিটের ওপর আরও দুটি বসিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ভারতের থেকে আমাদের জনঘনত্ব কমপক্ষে তিন গুণ, তাহলে আমাদের কয়টি বসানো উচিত? এমনকি ভারতের মতো তিনখানাও তো দেখলাম না। ভারতে এমনকি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায় আরও সাশ্রয়ীভাবে যাওয়ার সুযোগ আছে, যাকে বলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (সাশ্রয়ী)। ভারতের মাথাপিছু আয় এখন আমাদের দুই গুণ, জনঘনত্ব তিন গুণ কম। একবার আমাদের একজন সম্পাদকের কাছে শুনেছিলাম যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ডাকসাইটে এক সচিব অবসরে যাওয়ার পর দুই কামরার বাসায় থাকছেন। আমরা নিশ্চয়ই তাঁকে কঞ্জুস বলে নিজেদের ভোগের মাহাত্ম্যে গর্বের ঢেকুর তুলব।
৩. চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনে কুনমিং থেকে তাইপেই প্রায় ১০ হাজার ডলার মাথাপিছু আয়ের দেশের থেকে ৪০ হাজার ডলার আয়ের দেশের ঘটনা। দ্বিতীয়বার ফলের রস খাওয়ার জন্য আগে দেওয়া ফেলনাযোগ্য গ্লাসটি চাইতে আমি তো রীতিমতো অবাক। যতক্ষণ পারো ব্যবহার করো, তারপর তার রিসাইক্লিং করো, তাও ফেলে দেবে না। তাইওয়ানে তারা আরেক কাঠি সরেস। পানি খেতে যেতে দেখি কোনাকৃতি হালকা কাগজের পাত্র। ফেলেই যখন দিতে হবে তা তৈরিতে এত কাঠখড়ি পোড়াব কেন? আকারেও যেন ছোট হয়, দামেও যাতে সস্তা হয়। কৃচ্ছ্রসাধন সর্বত্র, যদিও মাথাপিছু আয় আমাদের থেকে ২০ গুণ বেশি।
৪. এসিএম আইসিপিসির আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় কানপুর গিয়েছি। আগের বছর ঢাকা সাইটের পুরস্কার বিতরণী এবং সান্ধ্যভোজ আমরা হোটেল শেরাটনে করেছিলাম। গিয়ে দেখি হলগুলোর পাশে শামিয়ানা টানিয়ে সেখানেই সান্ধ্যভোজের ব্যবস্থা, যদিও মাথাপিছু আয় আমাদের দ্বিগুণ! কলকাতা শহরে একটি দোকান খুঁজছিলাম, যেখান থেকে দেশে একটি ই-মেইল করতে পারি। আলো-আঁধারিতে এক দোকান, ভেতরে কয়েকটি মান্ধাতার আমলের কম্পিউটার, কি–বোর্ডের বর্ণগুলো দেখা যায় না, মাউস নাড়ালে কোনো উত্তর নেই। সেই কম্পিউটার বাসায় নয়, ব্যবসার জন্য ব্যবহার করছে। প্রতি ১৫ মিনিট কিংবা তার অংশবিশেষের জন্য ১০ রুপি।
৫. পার্শ্ববর্তী দেশে তথ্যপ্রযুক্তির জয়জয়কার দেখে দেশে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কত উচ্চবাচ্য করছি কিন্তু কাজের কাজটি সম্ভবত এখনো হচ্ছে না। কোনোভাবেই সরকারি কোনো বাহিনীর সঙ্গে বিদেশে গিয়ে নিজের বিদ্যাবুদ্ধি সতেজ করার উপায় নেই। ঠিক করলাম নিজেই ভারতে গিয়ে দেখে আসব। গেলাম চেন্নাই শহরে। এক ভদ্রলোক খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে যাবেন বলে একটি পুরোনো যুগের খসে পড়া দেয়ালের ভবনের দোতলায় নিয়ে একটি তেল-চিটচিটে টেবিলের সামনে দাঁড় করালেন। টেবিলের ওপরে বসানো কম্পিউটারকে আরও মান্ধাতার আমলের মনে হলো। আইআইটি মাদ্রাজের টিনএজার ছাত্রজীবনের প্রথম কম্পিউটার দিয়ে এমন সব সফটওয়্যার তৈরি করছে যে মাইক্রোসফট তাকে ইন্ডাস্ট্রি প্রোডাক্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং মাত্র ২২ বছর বয়সে ৩৬ জন আইআইটি স্নাতক তার সঙ্গে কাজ করছে। কি–বোর্ডের বর্ণ না হয় দেখা না-ই গেল, মাথায় তো আর বুদ্ধি কম নয়, তাই পুরোনো কম্পিউটার দিয়ে যতক্ষণ কাজ করানো যায় করিয়ে নিচ্ছে। গিগাহার্টজ মেশিন নয়, আসল সম্পদ হলো মাথা। মেশিনে কাজ হলে কুয়েত, কাতার আর সৌদি আরব হতো সবচেয়ে উন্নত দেশ। তা কিন্তু নয়, তেল-গ্যাস সম্পদহীন জাপান হলো সবচেয়ে ঐশ্বর্যশালী আর তাদের সম্পদ হলো তাদের মাথা, জ্ঞান, প্রাযুক্তিক দক্ষতা। আমাদেরও যদি কোনো সম্পদ থেকে থাকে তা হলো মানুষ, যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। প্রাকৃতিক কিংবা ভৌত অবকাঠামোতে তো আমাদের এখনই সমৃদ্ধ হওয়ার কথা নয়।
৬. নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শুরুতে যিনি অবদান রেখেছিলেন, আইআইটি কানপুরের সেই অধ্যাপক ফাল্গুনী গুপ্ত ও তাঁর স্ত্রীকে বাসায় দাওয়াত করেছি। বড় বড় ফার্মের মুরগি কিনেছি। রোস্ট করার পর দেখতে খাসির পায়ের মতো লাগছে। ছয়-ফুটি ফাল্গুনী অতিকষ্টে নিজের প্লেটেরটা শেষ করে স্ত্রী এবং তনয়ার প্লেটের প্রায় অক্ষত ড্রামস্টিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, দুজন মিলে তো একটা খাওয়ার চেষ্টা করতে পারতে। এত মূল্যবান খাবার নষ্ট হয়ে যেতে তাঁর যে কষ্ট হচ্ছিল, তাতে আমারই খারাপ লাগছিল। অবশ্য দুর্বল অর্থনীতির দেশের নাগরিক হিসেবে বেহিসাবে খরচ করার জন্য নয়।
৭. আমার এক বন্ধু নামকরা বিদেশি দাতা সংস্থায় কর্মরত। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তারা কৃচ্ছ্রসাধনে মনোনিবেশ করেছে। নোটিশ দিয়ে সব কর্মকর্তাকে জানিয়ে দিয়েছে যে এই কৃচ্ছ্র সত্ত্বেও সভাগুলোতে গরম পানি সরবরাহে কার্পণ্য করা হবে না। আবার তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধানও নাকি ইকোনমি ক্লাসে বিমান ভ্রমণ করে থাকেন। দাতা সংস্থার কৃচ্ছ্রসাধন যদি এমন হয়, তাহলে যাদের দান করে, তাদের থেকে এই সংস্থার প্রত্যাশা কী হওয়া উচিত?
সীমিত সম্পদের দেশে আমরা যেন সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করে দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাই, এটাই প্রত্যাশা।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

এখন, না হয় কখনোই নয় by ইমতিয়াজ গুল

এখনই, না হয় কখনোই নয়, ইমরান খান ও ড. তাহিরুল কাদরির কর্মীরা এভাবেই তাঁদের নেতাদের দাবির পক্ষে আওয়াজ তুলছেন। তাঁদের নেতারা নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, এই ব্রিটিশ ঘরানার অভিজাতবান্ধব সরকারব্যবস্থার দিন ফুরিয়ে এসেছে। এটাকে তাঁরা গরিববিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সে কারণেই তাঁরা ছয় দফা দাবি পেশ করেছেন। নাটকীয়ভাবে ইমরান খান গত বুধবার গণমাধ্যম ও তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন,‘ নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো আপস হবে না। শরিফ যত দিন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, তত দিন আমরা ন্যায়বিচার পাব না।’
আর এই দাবি পূরণ হতে হলে মন্ত্রীদের লাশের ওপর দিয়ে তা হতে হবে, মুসলিম লীগের নেতারা বলেছেন। বুধবার বিকেলে দেখা যায়, শরিফ-সমর্থকেরা খুব ক্ষীণ গলায় বলছেন, না, সবকিছু ঠিক আছে। মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের চীন সফরের সময়ও এমনটা দেখা গেছে।
বড় শরিফ তাঁর মতো করে গণতন্ত্রের জন্য বুক চাপড়াচ্ছেন। বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদে তিনি মিত্রদের ধন্যবাদ দিয়ে বলেছেন, বর্তমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘একটি লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে...সেটা কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যাপার নয়...সরকার যায়, সরকার আসে, প্রধানমন্ত্রীরা আসে-যায়, কিন্তু নীতি, গণতন্ত্র ও সংবিধান টিকে থাকে।’
নওয়াজ শরিফ শুধু এটুকুই বলতে পারেন। এর জন্য তিনি শুধু তাঁর পার্টির হোমরাচোমরা ও পরামর্শকদের দোষারোপ করতে পারেন, কারণ:
১. ১৭ মার্চ পুলিশ লাহোরে ১৪ জন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করার পর দেখা গেল, পিএমএলের এই উপদেষ্টারা শুধু ঝামেলা লাগাতেই পারেন।
২. দলটির এই হইচই দেখে বোঝা যায়, সেখানে কোনো সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা নেই। দলটিতে কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাপার নেই, বড়জোর সেটা কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে। নওয়াজ শরিফ ও তাঁর কয়েকজন মন্ত্রীর আচরণে এমনটা মনে হয়েছে। গণতন্ত্র ও জনগণের কাছে জবাবদিহির কোনো বালাই এখানে নেই।
৩. দলটিতে না-বলার এক বৈপরীত্যমূলক সংস্কৃতি রয়েছে। এরা বিরোধী দলের ওপর ক্ষমতালোভী মাস্তানের মতো হামলে পড়ে আর অভিযোগ করে, এরা অসাংবিধানিক ও অবৈধ দাবি করে। আবার এরা একদল দুষ্কৃতকারীর সঙ্গে সংলাপে বসে এবং তাদের ‘পাঁচ থেকে ছয়টি দাবি মেনে নেয়’।
৪. দলটি দাবি করে, তারা কারও কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু বিরোধী পক্ষ থেকে সব সময় আওয়াজ তোলা হয়, নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে।
আমার এ লেখা যখন ছাপাখানায় যায়, তখন রাজধানীর দুটি প্রধান হোটেল এমকিউএম, পিপিপি ও অন্যান্য দলের নেতাদের কলকাকলিতে সরগরম হয়ে উঠেছে। কয়েক শ মিটার দূরে, পিটিআইয়ের নেতা জাহাঙ্গীর তারিনের বাড়িতে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি আলোচনায়ও বসেছেন। তাঁরা যত এককাট্টা হচ্ছেন, ততই একটা ব্যাপার মনে হচ্ছে: সব গুরুভার প্রধনমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত। ফলে, এই পদে যিনি থাকবেন, তাঁর বিচক্ষণতা, ঔদার্য ও আগে থেকে পদেক্ষপ নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।
এমকিউএমের একজন শীর্ষ নেতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কীভাবে এই ত্যাগ ও ঔদার্যকে ধারণ করবেন? এটা আমরা কথা বলে ঠিক করব, তিনি বলেন। এই নাকচ করার সংস্কৃতি হালে আর পানি পাবে না। বর্তমান অবস্থায় অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যা নিরাপত্তাসংকটেও মোড় নিতে পারে, যদি কাদরি তাঁর দাবি থেকে সরে আসতে অস্বীকার করেন: ১৭ জুনের হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের ও শরিফ ভাতৃদ্বয়ের পদত্যাগ। এর পাশাপাশি এফআইআর-বিষয়ক মতৈক্য, ভোট অডিট, নির্বাচনী সংস্কার প্রভৃতি বিষয়ে অধিকাংশ দলই ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তারা ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্যাগের বিষয়েও’ মতৈক্যে পৌঁছেছে।
এই সংকট নিরসনে ব্যাপক আলোচনা চলার সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি মন খুলে কথা বলেছেন। গিলানি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, ‘তারা আমার ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। সে সময় তারা সংসদের আধিপত্য স্বীকার করেনি, এর উল্লেখ পর্যন্ত করেনি। তার পরও আমরা এখন ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়েছি।’
সংসদে নওয়াজ শরিফের বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় গিলানি বলেছেন, এই সংকটের পেছনে কে, সেটা খুঁজে বের করার জন্য তদন্ত করা কোনো কাজের কথা নয়। এ সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাগলে তার ফল ভালো হবে না। গিলানি আরও বলেছেন, আরও আগেই স্থানীয় মডেল থানায় এফআইআর করা উচিত ছিল। আইনের শাসন বেছে বেছে প্রয়োগ করার ব্যাপার নয়।
পিপিপিও এই বিষয়ে কাজ করছে, একজন এমকিউএম নেতা টিএফটিকে বলেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি খুবই বিতর্কিত। ফলে, এর পরিণতি বিপর্যয়কর হলে তা হবে আরও খারাপ, এ বিষয়ে সরকারকে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
এতে ইমরান ও নওয়াজ উভয়েরই মুখরক্ষা হবে বলে মনে করেন সেই এমকিউএম নেতা। এমকিউএম ও পিপিপির নেতারা আরও বলেছেন, সব দলের নেতারা একটি লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলে সেটাও একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। তার মানে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভোটের অডিট, সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনী সংস্কার—এসবই এখন পথ দেখাতে পারে।
অধিকাংশ দলই মনে করে, চলমান সংকটের মোকাবিলা সহিংস পন্থায় হলে পরিস্থিতি শুধু জটিলই হবে না, পিএমএল-এনও ভেতর থেকে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ফলে, দলটির ভোটব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নওয়াজের হাতে আর কোনো সুযোগ থাকবে না।
ইমরানের ভরসা কোথায়? দ্রুত পরিবর্তনশীল জনসংখ্যাতত্ত্বেই তাঁর ভরসা নিহিত রয়েছে। পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৯ বছর, তারা ঔপনিবেশিক শাসন দেখেনি। আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে তারা পরিচিত। ফলে, পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারাই প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।
ইমরান খানের সমর্থকেরা মনে করে, দলটির তরুণ সমর্থকদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, যেটা গণতন্ত্রের আদর্শ বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। তাদের মধ্যে স্বপ্ন থাকতে হবে, পরিবারতন্ত্রের বাইরে গিয়ে পাকিস্তান আইন ও মেধার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
নওয়াজ শরিফ এই সংকট কাটিয়ে উঠলেও শরিফ ভাতৃদ্বয়ের আশা-ভরসা খুব একটা নেই বললেই চলে। ছোট ভাইয়ের পদত্যাগে দলটিতে ঐেক্যর ঘাটতি হবে, এই ব্যক্তি তাঁর একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে পুরো পাঞ্জাবকে ধরে রেখেছেন। সেখানে অন্য কাউকে বসালে আবার নওয়াজের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন² হবে।
সংকট একদিন না একদিন কেটে যাবে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থার একদম বারোটা বেজে যাবে, অর্থনীতি ধসে পড়বে আর পিএমএল-এনের মধ্যে ফাটল ধরবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; দ্য ফ্রাইডেটাইমস.কম থেকে নেওয়া
ইমতিয়াজ গুল: ইসলামাবাদভিত্তিক ইনডিপেনডেন্ট সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক।

দেশীয় কয়লা ও গ্যাস ব্যবহার নিশ্চিত করুন -বিশেষ সাক্ষাৎকারে ম. তামিম -সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া

সরকার সম্প্রতি ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ) আইন’–এর মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানের উদ্যোগ নিয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিপন্থী এই আইনের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে ও সামগ্রিকভাবে দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম
প্রথম আলো : দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার যে জরুরি আইন করেছে, চার বছর কার্যকর থাকার পর সম্প্রতি সরকার এর মেয়াদ আরও চার বছর বাড়িয়েছে। এটাকে কতটুকু যৌক্তিক বলে মনে করেন?
ম. তামিম : সরকার এক বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রথমে দুই বছরের জন্য এই আইন করেছিল, পরে আরও দুই বছর বাড়িয়েছে। এটুকু হয়তো ঠিকই ছিল, কিন্তু নতুন করে এই আইনের মেয়াদ বাড়ানোর কোনো যুক্তি আছে বলে মনে করি না। কারণ, যে বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য এই আইন করা হয়েছিল, তা এখন আর নেই। এই আইনের মূল ব্যাপারটি ছিল টেন্ডার এড়ানো, সময় বাঁচানো। এই বিষয়গুলো এখনো কার্যকর থাকার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। কারণ, এখন সরকারের সামনে একটি পরিকল্পনা আছে এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী টেন্ডার ডেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে কাজ দিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এই জরুরি আইনের মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে মনে করি না।
প্রথম আলো : চার বছর ধরে যে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ) আইন’ কার্যকর রয়েছে, এর প্রয়োজনীয়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বিদ্যুৎ খাতে এর কী সুফল পাওয়া গেছে?
ম. তামিম : ২০০৯-১০ সালে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি যখন চরমে পৌঁছায়, তখন দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই আইন করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল টেন্ডারে দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো। তখন বিদ্যুৎ খাতে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তা সামাল দিতে এই আইন কাজ দিয়েছে। সরকারের পক্ষে দ্রুত অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রথম আলো : কিন্তু এ ধরনের আইন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিপন্থী। কারণ, কাজ দিতে হয় টেন্ডার ছাড়া এবং এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না।
ম. তামিম : এ ধরনের আইনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে, তা সত্যি। এ ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার বিষয়টি শুরু থেকেই উপেক্ষিত ছিল। তবে আমি মনে করি, সরকার একটি ভালো কাজ করেছে এবং তা হচ্ছে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎ—এই দুই ক্ষেত্রেই ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের করা গাইডলাইন মেনে কাজ করেছে। ফলে, দামের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হওয়ার সুযোগ কম ছিল।
প্রথম আলো : তাহলে অনিয়ম হয়েছে কোথায়?
ম. তামিম :আসলে কাকে কাজ দেওয়া হবে, সে ক্ষেত্রে অনিয়ম ও রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে থাকতে পারে। কিন্তু দামের ক্ষেত্রে হয়নি। এমন অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে, যাদের হয়তো কাজ করার যোগ্যতা নেই। বর্তমান সরকারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে যেসব চুক্তি হয়েছে, এর অনেকগুলো সফল হয়নি। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদনে আসতে পারেনি বা ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার জন্য যদি যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেত, তবে শুধু প্রকৃত ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পাওয়ার জন্য এগিয়ে আসত।
প্রথম আলো : কিন্তু কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার শর্তটি তো আপনি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখনই বাদ দেওয়া হয়েছে।
ম. তামিম : আমরা তখন কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার শর্তটি বাদ দিয়েছিলাম। কারণ, আমরা চেয়েছিলাম এই খাতে দেশীয় নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসুক। এই বিবেচনা থেকেই তখন তা করা হয়েছিল। আমরা যখন এই শর্ত বাদ দিয়েছিলাম, তখন হয়তো এর যথার্থতা ছিল। কিন্তু আমি মনে করি, এরপর এখন ছয় বছর কেটে গেছে, ফলে এখন উচিত অভিজ্ঞতার শর্তটি জুড়ে দেওয়া। এই সময়ে যে কোম্পানিগুলো ভালো করেছে, যাদের ট্র্যাক রেকর্ড ভালো, নতুন কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরই বিবেচনায় রাখা উচিত। সেটা না পাওয়া গেলে অভিজ্ঞ বাইরের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া উচিত।
প্রথম আলো : এই আইনের অধীনে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে, কিন্তু বিদ্যুতের যে দাম পড়ছে, তেল আমদানিতে যে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেই চাপ বাংলাদেশ কত দিন নিতে পারবে?
ম. তামিম : দেখুন, কুইক রেন্টালের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বল্পমেয়াদি ও জরুরি ভিত্তিতে বিদ্ু্যৎ উৎপাদন। এটা কোনো দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার নয়। তিন-চার বছরের ব্যাপার। আর কোনো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এর ওপর ভিত্তি করে চলতে পারে না। সরকার জরুরি পরিস্থিতিতে এই উদ্যোগ নিয়েছিল এবং পরিকল্পনা ছিল যে এই সময়ের মধ্যে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। দেশীয় কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আদৌ কোনো অগ্রগতি নেই। আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু যে গতিতে হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। কুইক রেন্টাল ও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ—এ দুটি একই সঙ্গে শুরু হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ ছিল তিন থেকে পাঁচ বছর। এগুলোর মেয়াদ এখন বাড়াতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়তির দিকেই থাকবে সামনের দিনগুলোয় এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুতের দাম আরও বাড়বে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৮ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। সেটা হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিকে এই চাপ নিতে হবে।
প্রথম আলো : বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সরকার যে নীতি নিয়েছে, সেখানে কোনো ঘাটতি আছে বলে মনে করেন কি?
ম. তামিম : দেখুন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক জ্বালানিসংকট। তেলনির্ভর বিদু্যৎ উৎপাদন কোনোভাবেই টেকসই নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অব্যাহত তেলনির্ভরতা আমাদের অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করবে, অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যানবাহনের জন্য তেলনির্ভরতা ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশের অর্থনীতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়। আমাদের সামনে এ ক্ষেত্রে যে বিকল্প রয়েছে, তা হচ্ছে নিজস্ব গ্যাস, আমদানি করা গ্যাস, নিজস্ব কয়লা, আমদানি করা কয়লা। বর্তমানে আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু ঠিকমতো চললে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের পর এই কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ আসতে পারে। বড়পুকুরিয়ায় ওপেন পিট মাইনিংয়ের মাধ্যমে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা শোনা গিয়েছিল, কিন্তু এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি শূন্য।
প্রথম আলো : নিজেদের গ্যাস বা আমদানি করা গ্যাস?
ম. তামিম : গ্যাস বা এলএনজি আমদানির একটি উদ্যোগ রয়েছে, কিন্তু এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খুবই ব্যয়বহুল হবে। বাড়িঘরে, যানবাহনের সিএনজি হিসেবে ব্যবহার বা অন্যান্য কাজে এই গ্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম এই পর্যায়ে বাড়ানো উচিত, যাতে তা এলপিজি বা পেট্রলের দামের কাছাকাছি হয়। এ ক্ষেত্রে ভারত বা অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এই গ্যাস কীভাবে ব্যবহার করা আমাদের জন্য কার্যকর হবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত সমীক্ষা দরকার। আর নিজেদের গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর তো কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের উদ্যোগ জোরদার করার পাশাপাশি ভূখণ্ডে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্যও বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত। আমি মনে করি, বাপেক্স যদি সম্ভাবনাময় কোনো ব্লক বা অঞ্চল নিজেদের জন্য রাখতে চায়, তা রেখে বাকি সব বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত। দেশীয় কয়লা বা গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সমস্যা থেকেই যাবে।

এটি কার্যত দুর্নীতির দায়মুক্তি আইন -বিশেষ সাক্ষাৎকারে আনু মুহাম্মদ -সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ

সরকার সম্প্রতি ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ) আইন’–এর মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানের উদ্যোগ নিয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিপন্থী এই আইনের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে ও সামগ্রিকভাবে দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ
প্রথম আলো : জ্বালানি খাত নিয়ে এ রকম আইনের ঊর্ধ্বের ‘আইন’ প্রণয়নের প্রয়োজন হলো কেন?
আনু মুহাম্মদ : দুর্নীতি ও অনিয়ম করার জন্য বেপরোয়া না হলে এ রকম আইন করার দরকার ছিল না। এই আইন করার আগের, এমনকি এই সরকারের আগের সরকারগুলোর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির অনেক ঘটনা সবাই জানেন। কিন্তু এই আইন অনেক বেশি দুর্নীতির পথ তৈরি করেছে, যথেচ্ছাচারের সুযোগ দিয়েছে। ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি’ নয়, এটি কার্যত ‘দ্রুত লুণ্ঠন ও দুর্নীতি দায়মুক্তি আইন’। ২০১০ সালে বিদ্যুৎ–সংকট নিরসনের অজুহাতে আইন প্রণয়নের সময়ই আমরা আশঙ্কা জানিয়েছি যে, এই আইন বিদ্যুৎ সংকটের টেকসই সমাধান তো দেবেই না, উল্টো সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্ম দেবে। পরের বছরগুলোয় এই আশঙ্কা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই অনিয়মের ধারাবাহিকতা আরও চার বছর চালিয়ে যেতে চায় বলেই সরকার এর মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, গোপন চুক্তি ও সমঝোতার দুষ্টচক্রের গোড়া জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে সব আইনি বাধ্যবাধকতার ওপর স্থাপন করে দুর্নীতি আর জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতাকে অবাধ করতে চায় সরকার।
প্রথম আলো : জ্বালানি খাতে কী ধরনের দুর্নীতিকে রক্ষা করছে এই আইন?
আনু মুহাম্মদ : শতকরা ৮০ ভাগ গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রেখে সমুদ্রে গ্যাস ব্লক কনোকোফিলিপসকে প্রদান, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালমুখী তৎপরতা, কেয়ার্ন এনার্জি ও হেলিবার্টনের সঙ্গে আত্মঘাতী চুক্তি স্বাক্ষর, শেভরন ও নাইকোর কাছ থেকে গ্যাস ধ্বংসের জন্য প্রাপ্য ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের উদ্যোগ না নিয়ে শেভরনের জন্য সুবিধা বৃদ্ধি, সমুদ্রসম্পদ বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা, ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না করে এশিয়া এনার্জির বেআইনি শেয়ার ব্যবসা ও লবিস্টদের পৃষ্ঠপোষকতা, সুন্দরবন ধ্বংস করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি কমিশন ও দুর্নীতি ছাড়া হওয়া সম্ভব নয়। এসবকে বাধাহীন করতেই এই আইন।
প্রথম আলো :  সমস্যা নিরসনে অন্য বিকল্প কী ছিল?
আনু মুহাম্মদ : স্বল্প মেয়াদে পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় মেরামত ও নবায়ন করলে একই পরিমাণ গ্যাসে কমপক্ষে এক হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। এবং এর উৎপাদন খরচ হতো ইউনিটপ্রতি দুই টাকা। তা না করে আট গুণ বেশি দামে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ফাঁদে ফেলা হয়েছে দেশকে। অথচ বিদ্যুৎ পাচ্ছি তুলনায় কম। নাইকোর সঙ্গে বিরোধের জেরে ছাতক ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্রে উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এসব থেকেই প্রতিদিন ৩০ কোটি ঘনফুট বাড়তি গ্যাস মিলত। ব্যয়ও হতো তুলনায় অনেক কম। অথচ এই পথে দুর্নীতি ও কমিশনের সুযোগ কম বলে সরকারের উৎসাহও কম। অর্থের অভাবের কথাও ঠিক নয়। কারণ, এর চেয়ে ২০ গুণ বেশি অর্থ ব্যয়ের পথেই তো সরকার চলছে।
প্রথম আলো : বিদ্যুৎ খাত এ রকম দুস্থ দশায় পড়া কি অনিবার্য ছিল?
আনু মুহাম্মদ : না, ছিল না। যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হলে স্বল্পদামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ খুবই সম্ভব। আশির দশক থেকেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বহুজাতিক পুঁজির হাতে ছেড়ে দেওয়ার নীতি প্রণয়ন শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী বরাবরই জাতীয় মালিকানা ও জাতীয় সক্ষমতার বিরোধী। আর বিভিন্ন সরকার ও দেশি লুটেরা গোষ্ঠী লুণ্ঠন, দুর্নীতি ও কমিশনের লোভে এই নীতি অনুসরণ করেছে। এখান থেকেই দুস্থ দশার শুরু। দেড় দশক আগে ‘বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’, ‘গ্যাস রপ্তানি করলে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়ন করতে সক্ষম হবে, না করলে সর্বনাশ হবে’—এমন সব রব তুলে একসময় দেশের সীমিত গ্যাসসম্পদ বিদেশে পাচারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রচারকেরাই এখন বলছেন, দেশে গ্যাস মজুত খুবই কম, বিদ্যুৎ-সংকট কাটানোর জন্য অবিলম্বে বিদেশি কোম্পানির হাতে কয়লাখনি তুলে দিতে হবে, সমুদ্রবক্ষের গ্যাসসম্পদ নিয়ে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে আরও সুবিধা দিয়ে চুক্তি করতে হবে। তাদের মুখস্থ বুলি: আমাদের সক্ষমতা নেই, পুঁজি নেই। আসলে সংকট থাকলেই এদের জন্য সুযোগ আসে।
প্রথম আলো : অর্থনীতির চাপের তুলনায় কুইক রেন্টালের অবদান কতটা?
আনু মুহাম্মদ : পিডিবির ওয়েবসাইট অনুযায়ী ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ছয় হাজার ৬০১ মেগাওয়াট। কুইক রেন্টালের অবদান এর শতকরা ২০ ভাগেরও কম। অথচ বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়ের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই এর পেছনে যাচ্ছে। উপরন্তু, এগুলো নির্ভরযোগ্য নয়, অনেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বিল নিচ্ছে। (আরও বিস্তারিত দেখুন: (http://ncbd.org)
প্রথম আলো : জাতীয় কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, আপনাদের সমালোচনা যতটা আদর্শবাদী, ততটা বাস্তববাদী না।
আনু মুহাম্মদ : বাস্তবতা হচ্ছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত দেশি-বিদেশি লুটেরাদের রাহুগ্রাসে। সমুদ্র, সুন্দরবনসহ দেশ ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিসহ অর্থনীতির বোঝাও ক্রমবর্ধমান। বাস্তববাদী হওয়া বলতে যদি কেউ মনে করে সর্বনাশের মুখে চোখ-মুখ বন্ধ করে রাখা, তাহলে আমরা সে রকম বাস্তববাদী নই। আমরা এই বাস্তবতা পাল্টাতে চাই। জ্বালানি সম্পদের ওপর শতভাগ মালিকানা, রপ্তানি নিষিদ্ধ ও জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়নের পথেই স্বল্পদামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জোগানো ও জ্বালানিনিরাপত্তা সম্ভব। যেসব দেশ এগুলো করতে পারেনি, সম্পদ এবং দারিদ্র্য ও সহিংসতা সেখানে একসঙ্গেই আছে। সম্পদ সেসব দেশে অভিশাপ। ‘বাস্তববাদী’ লোকজন যেখানে চুপ করে থেকেছে বা তাল মিলিয়েছে; সম্পদশালী আফ্রিকা তার করুণ উদাহরণ। মিয়ানমারের অভিজ্ঞতাও একই রকম।
প্রথম আলো : আপনাদের আইনি প্রস্তাব কী?
আনু মুহাম্মদ : দুর্নীতি করার দায়মুক্তি আইন বাতিল করে খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে আইন করুন। বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার ও বিদ্যুৎ খাতকে কিছু গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি করার বিদ্যমান নীতি, চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করুন। রেন্টাল, কুইক রেন্টালের চুক্তি বাতিল করে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট চালু, মেরামত ও নবায়ন করুন। দীর্ঘ মেয়াদে বৃহৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করার কাজ শুরু করুন। বঙ্গোপসাগরের গ্যাস দেশের কাজে লাগানোর মহাপরিকল্পনা নিন। বিদেশি কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে কাজ করা বন্ধ করুন। আশু প্রয়োজন মেটানোর জন্য কয়লা আমদানিভিত্তিক না করে গ্যাস আমদানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করুন। জাতীয় সম্পদের ওপর জাতীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য বাপেক্স, পেট্রোবাংলা, জিওলজিক্যাল সার্ভে, ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্টসহ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটাতে উদ্যোগ নিন। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ও তার সর্বোত্তম ব্যবহারের জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আরও বিভাগ এবং জাতীয়ভাবে বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করুন। এ কাজে প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগান। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও বর্জ্যসম্পদের বিশাল ভান্ডার কাজে লাগাতে উদ্যোগ নিন। নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি জ্বালানিনীতি প্রণয়ন করে তার জন্য প্রয়োজনীর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ শুরু করুন।
পাঠকদের কাছে আমার প্রশ্ন, এগুলো কি অবাস্তব মনে হয়, না দেশের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য করণীয় মনে হয়?

স্বজনদের অপেক্ষা আর কান্নার কি শেষ নেই? -‘আমার আব্বুকে ফিরিয়ে দিন’

হলঘরের মাঝামাঝি সিঁড়িতে বসেছিল ছোট্ট রায়তা। হাতে পিতার ছবি। কিছুটা ভাবলেশহীন। কিছুক্ষণ আগেও যে সে কাঁদছিল, মুখ দেখে তা বোঝা যাচ্ছিল। চোখ দু’টো কিছুটা লাল। গালে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর চিহ্ন। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া এ মেয়েটির পিতা সাজেদুল ইসলাম সুমন নয় মাস আগে গুম হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে শাহীনবাগের বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর থেকে আর খোঁজ নেই তার। রায়তার এখন প্রতিটি দিন কাটে অপেক্ষা আর কান্নায়। তার বিশ্বাস, বাবা একদিন ফিরে আসবে। সে আল্লাহর কাছে প্রতিদিন প্রার্থনা করে। বলে, আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও। আমি যেন আমার বাবাকে নিজের চোখে দেখতে পাই। রায়তার মতো ছোট্ট আরিয়ানের হাতেও পিতার ছবি। যে সময়টিতে তার দুষ্টুমি আর দুরন্তপনায় মেতে ওঠার কথা, সে-ও বসে আছে নিশ্চুপ। চোখে-মুখে বিষণ্নতার ছাপ। বয়সে ছোট্টটি হলেও সে জানে তার পিতার কিছু একটা হয়েছে। মায়ের কান্না দেখে কাঁদছিল সে-ও। গত বছরের ২৮শে নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে থেকে তার পিতা খালেদ হাসান সোহেল নিখোঁজ হয়েছেন। ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয় দিয়ে পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে তাকেও একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারও ফেরা হয়নি আর। পিতার কথা জানতে চাইতেই ছোট্ট আরিয়ান বলে, ‘আমার বাবাকে পুলিশ আর র‌্যাব ধরে নিয়ে গেছে। তোমরা আমার বাবাকে এনে দাও।’ মা শাম্মি সুলতানা বলছিলেন, আমার ছেলে সব সময় তার বাবাকে কাছে পেতে চায়। ‘বাবা বাবা’ বলে বাসায় চিৎকার করে ডাকে। প্রশ্ন করে- বাবা আসবে কবে? আমি তার কোন উত্তর দিতে পারি না। আমরা প্রত্যেকটি সকালের জন্য অপেক্ষায় থাকি। আশায় থাকি এই বুঝি আমার ছেলের পিতা ফিরে এলো। সবাই বলে আমার স্বামী সোহেল ফিরে আসবে। দশ মাস ধরে আমরা প্রতীক্ষার প্রহর গুনেই যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের প্রতীক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। শাম্মি বলেন, তার স্বামী সোহেল সূত্রাপুরের ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। গত ২৮শে নভেম্বর তারা ছয় বন্ধু মিলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে গিয়েছিল। এলাকার অনেককেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, তাদের খোঁজ নিতে গিয়েছিল সে। কিন্তু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে থেকে ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে তাদের পাঁচজনকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। রুবেল নামে তার এক বন্ধু মসজিদে নামাজের জন্য গিয়েছিল। এ কারণে সে-ই একমাত্র বেঁচে গেছে। আমার স্বামীসহ অন্যদের ভাগ্যে কি হয়েছে আমরা জানি না। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আমরা একাত্তর দেখিনি। কিন্তু একাত্তরের মতোই কেন আমাকে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে? কেন আমার সন্তানকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে? আমার স্বামীকে আপনারা ফিরিয়ে দিন।
>>গত বছরের ২৮শে নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে থেকে নিখোঁজ হন খালেদ হাসান সোহেল। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে পিতাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়ে প্রেস ক্লাবে হাজির হয়েছিল শিশু আরিয়ান
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে গুম আর ক্রসফায়ারে মারা যাওয়া এমন ৯৭টি পরিবার গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের অডিটরিয়ামে একত্র হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০১৪ উপলক্ষে ‘স্বজনদের ব্যথা- গুম, খুন ও নির্যাতন আর না’ শিরোনামে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি। সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম-খুনের শিকার হওয়া ৯৭টি পরিবারের মধ্যে ২২টি পরিবারের সদস্যরা নিজেদের করুণ কাহিনী তুলে ধরেন। প্রতিটি ঘটনাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ করা হয়। যদিও গুম-খুনের অভিযোগগুলো বরাবরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অস্বীকার করে আসছিলেন।
গত বছরের ২৭শে নভেম্বর রাতে কুমিল্লা থেকে গুম হওয়া সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হীরুর মেয়ে মাশরুফা ইসলাম বলেন, ‘আমার আব্বু ফ্রিডম ফাইটার ছিল। উনি কি দেশ স্বাধীন করেছে এই জন্য যে, এই দেশে তাকে গুম করা হবে। নয় মাস ধরে আমরা বাবাহারা হয়ে আছি। আমার বাবা হার্ট ও ডায়াবেটিসের রোগী। জানি না তার এখন কি অবস্থা। আমার আব্বুকে মেরে ফেলছে কিনা তাও জানি না। কেস করেছি তারও কোন আপডেট নাই।’ মাশরুফা বলেন, ‘বাবা যেখানেই থাকতো প্রতিদিন হয় আমাকে ফোন দিতো অথবা আমি বাবাকে ফোন দিতাম। নয় মাস ৪ দিন হলো আমাকে কেউ ফোন দেয় না। বলে না, মা তুমি কি করছো?’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো তার পিতাকে হারিয়েছেন, স্বজন হারিয়েছেন। তিনি স্বজন হারানোর বেদনা বোঝেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানাই আমার বাবাকে যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়।’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মাশরুফার পিতা সাইফুল ইসলাম হীরুর সঙ্গে গুম হয়েছেন হুমায়ূন কবীর পারভেজ। তার স্ত্রী শাহনাজ আক্তার বলেন, আমি আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছি। ঈদের সময় আমার মেয়ে বলেছে, আমার তো বাবা নেই, আমি একটার বেশি জামা নেবো না। এ কথা শুনে আমি হু হু করে কেঁদেছি। আমার বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ি আমার কাছে তাদের ছেলের খবর জানতে চান। আমি কোন উত্তর দিতে পারি না।’ শাহনাজ বলেন, আমার স্বামীর কিছু লোন ছিল আমরা তা শোধ করতে পারছি না। স্বামীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা ছিল তা-ও তুলতে পারছি না। তার স্বাক্ষর ছাড়া ব্যাংক টাকা দেয় না। এখন তাহলে আমরা কোথায় যাবো? কিভাবে বাঁচবো? তিনি বলেন, ‘নয় মাস ধরে কাঁদছি। এখন আমাদের কান্নাও হারিয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে গেছে। এখন আর কাঁদতেও পারি না।’ শাহনাজ বলেন, ‘তবু আমি বিশ্বাস করি, আমার স্বামী বেঁচে আছে। সে র‌্যাবের কাছেই আছে। আমার তিন ছেলেমেয়ে এতিম করবেন না।’ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘উনিও (প্রধানমন্ত্রী) তো আমাদের মতো স্বজনহারা। উনি কি আমাদের মতো স্বজনহারাদের কান্না শুনতে পান না?’
প্রায় সাড়ে চার বছর আগে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের মেয়ে মাসুদা আক্তার বলেন, একটা মানুষ মরে যাওয়া স্বাভাবিক। খুন হলেও তার লাশ পাওয়া যায়। কিন্তু বাবাকে সাড়ে চার বছর ধরে গুম করে রাখা হয়েছে। আমার বাবাকে আমি ফেরত চাই।’ তিনি বলেন, বাবা ছাড়া আমরা কেমন আছি, কেউ খোঁজ নেয় না আমাদের। প্রতিবছর ২৫শে জুন আসলে বিএনপির পক্ষ থেকে ফোন করে যেতে বলে। আর কিছু না। এই দেশ কি এভাবেই চলতে থাকবে? প্রশ্ন করেন তিনি। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া ফেরার সময় গুম হওয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আল মুকাদ্দেসের পিতা মাওলানা আবদুল হামিদ বলেন, ৩০ মাস ধরে ছেলের জন্য অপেক্ষা করে আছি। কিন্তু ছেলে ফিরে আসে না। আমার স্ত্রী মাঝে মধ্যে স্বপ্ন দেখে- মুকাদ্দেস বাড়িতে এসেছে। সে কান্নাকাটি করে। ছেলের বন্ধুরা আসে। আড়াই বছরের প্রতিটা দিন আমাদের চোখের জল ফেলে কাটাতে হয়েছে।’ গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম বলেন, আমার ভাইয়ের একটাই দোষ ছিল সে বিএনপি করতো। সে ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক ছিল। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে র‌্যাবের লোক র‌্যাব-১ লেখা গাড়িতে তাকেসহ ৬ জনকে সবার সামনে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু পরদিনই র‌্যাব তা অস্বীকার করে। সানজিদা বলেন, ‘র‌্যাব যদি তাদের না-ই তুলে নিয়ে যায় তাহলে তারা খুঁজে বের করে দেয় না কেন? র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমাদের ট্যাক্সের টাকায় চলে। তাহলে আমাদের ভাইকে খুঁজে বের করবে না কেন?’ তিনি বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি গুম হওয়া সবাইকে তাদের স্বজনদের কাছে জীবিত ফেরত দিতে হবে।’ সুমনের সঙ্গে গুম হওয়া কাউসারের স্ত্রী মিনু বলেন, ‘আমার স্বামী ড্রাইভারি করতো। সুমন ভাইয়ের কর্মী ছিল। তাকেও ধরে নিয়ে গেছে র‌্যাব। একটা সন্তান নিয়ে আমি কষ্টে বেঁচে আছি। আমার দেখার কেউ নেই। বাবা-মায়ের সঙ্গে কখনও গ্রামের বাড়ি বরিশালে থাকি। কখনও ঢাকায় ভাইয়ের বাসায় থাকি। আমার মেয়ে মীমের এখন কি হবে?’ কোলের মেয়েকে দেখিয়ে মিনু বলেন, ‘ছোট্ট মেয়েটা শুধু বাবার কাছে যেতে চায়। বাবার কথা মনে করে নিজে নিজেই নামাজের পাটি বিছিয়ে হাত তুলে আল্লাহর কাছে বাবাকে ফেরত চায়।’ মিনুর কোলে থাকা শিশু মীমকে বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলে বলে, ‘আমার বাবাকে র‌্যাব ধরে নিয়ে গেছে। আমার আব্বু আসবে।’ একই সময়ে নাখালপাড়া থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া আদনানের বাবা রুহুল আমীন মাস্টার বলেন, ‘রাতে যখন র‌্যাব পরিচয়ে লোকজন আমার বাসায় ঢুকে আমি তখন নিজের হাতে ছেলেকে র‌্যাবের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। কারণ র‌্যাবের প্রতি আমার আস্থা ছিল। কিন্তু পরদিন র‌্যাব, থানা, ডিবি যেখানেই গিয়েছি সবাই তাকে গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করেছে। এমনকি থানা পুলিশ আমাদের জিডি পর্যন্ত নিতে চায়নি। ‘তিনি বলেন, ‘দেশটা কি মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। আমরা কি মগের মুল্লুকে বাস করি?’ তিনি বলেন, ‘পত্রিকায় একটি শিশুর নিখোঁজ সংবাদ দেখে সেই শিশুকে যদি উদ্ধার করতে পারে তাহলে র‌্যাব যাদের নিয়ে গেছে তাদের উদ্ধার করতে পারে না কেন?’ তিনি ছেলেকে দ্রুত ফেরত দেয়ার দাবি জানান। কুমিল্লার বাসা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়া ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী রকিবুল হাসান শাওনের পিতা মুক্তিযোদ্ধা কাজী আবদুল মতিন বলেন, ‘প্রতিপক্ষের কাছ থেকে টাকা খেয়ে র‌্যাব আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গুম করেছে। ছেলে অন্যায় করলে তার ১০০ বছর জেল দেন আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু এমনভাবে গুম করে ফেললেন যে লাশটাও দেখার সৌভাগ্য আমাদের হলো না।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো স্বজন হারানোর কষ্ট বোঝেন। তাহলে এভাবে যারা গুম-হত্যা করছে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না?’ খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘জয় ও সায়মা হোসেনকে যদি এভাবেই গুম করা হতো তবে প্রধানমন্ত্রী মা হিসেবে কি বলতেন?’ ২০১১ সালে নয়া পল্টন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাবে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শামীমের স্ত্রী ঝর্ণা খানম বলেন, রাজনীতি করার জন্যই তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তার থানায় জিডি করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছি। আমার সন্তানের বয়স এখন দশ বছর। ছেলে জানতে চায় তার বাবাকে মেরে ফেলেছে কিনা? আমি কিছু জবাব দিতে পারি না। তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়। রাষ্ট্র কর্তৃক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। প্রতিটি পরিবারের একই দৃশ্য। মা সন্তানের জন্য, স্ত্রী স্বামীর জন্য, বোন ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা জানতে পারছে না তাদের স্বজনদের ভাগ্যে আসলে কি হয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের অন্যতম আইনজীবী চন্দন সরকারের ভাইয়ের ছেলে অমিতাভ সরকার বলেন, আমার কাকা চন্দন সরকারের কোন শত্রু ছিল না। তিনি ফৌজদারি মামলাও পরিচালনা করতেন না। তিনি বাসায় কবিতা লিখতেন, বাঁশি বাজাতেন। তিনি ছিলেন অন্য জগতের মানুষ। অথচ তাকেই মরতে হলো র‌্যাবের হাতে। তিনি বলেন, র‌্যাব ১১-এর সিও তারেক সাঈদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ছিল। কিন্তু মন্ত্রীর জামাই বলে তাকে কিছু বলা হতো না। ঘটনার পর আমরা যখন র‌্যাব অফিসে গিয়েছিলাম তিনি আমাদের সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করেন। এ বিচার চাইতে গিয়ে আমরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছি। যে র‌্যাব আমাদের ট্যাক্সের টাকায় চলে সেই র‌্যাব যদি এরকম করে তাহলে আমরা কোথায় যাবো? তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, আর যেন কোন লোকের এমন পরিণতি না হয়।’ কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের দিন সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুকে পল্লবীর এক বাসা থেকে ধরে নিয়ে প্রশাসনের লোক। তার ভাই ইসলাম রেজা ফেকু বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের ধরে তাকে ধরে নিয়ে গেছে। এটা কোন আইন হলো? বিরোধী রাজনীতি করলেই তাকে ধরে গুম করতে হবে?’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পারছি না আমাদের ভাই বেঁচে আছে না তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। বছর দুয়েক আগে পিন্টু বিয়ে করেছিল। তার স্ত্রী নুহাশ এখনও প্রতীক্ষায় আছে তার স্বামী ফিরে আসবে। তিনি গুমের শিকার হওয়া সবাইকে ফেরত দেয়ার আহ্বান জানান।

একটি পশ্চাৎপদ নীতি by মাহফুজ আনাম

স্বাধীন গণমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে যে কোন দ্বন্দ্বে প্রাথমিকভাবে সরকার জিতলেও শেষ পর্যন্ত স্বাধীন গণমাধ্যমেরই জয় হয়। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের কারণে জাতির গঠনমূলক মূল্যবান সময়ের বিপুল অপচয় হয়। সরকার প্রাথমিকভাবে জয় লাভ করে সরকারি প্রশাসন যন্ত্র, পুলিশ, গোয়েন্দা বাহিনী প্রভৃতির ব্যবহার, পেশীশক্তির প্রয়োগ ও অর্থের জোরে। প্রাথমিকভাবে এই বিজয় সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত বাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমের জয় হয় জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে। তবে এই প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ। আমাদের সরকার মনে হয় ইতিহাসের এই ধারা থেকে কিছুই শিখছে না। কেন এই নতুন সম্প্রচার নীতিমালা? স্বাধীন বাংলাদেশের একটি অন্যতম অর্জন হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এ দেশে বড় আকারে স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকাশ ও বিস্তৃতি ঘটে। বর্তমানে গণমাধ্যমে একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিদ্যমান। বাংলাদেশের গণমাধ্যমখাতের সামগ্রিক পরিসরে সম্প্রচার মাধ্যমগুলো সাম্প্রতিক সময়ে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে তা চমকপ্রদ। যদিও তাদের আরও বাধা-বিপত্তি পেরোতে হবে তারপরও এই অগ্রগতি এক কথায় বিস্ময়কর। টেলিভিশন খবর জানার প্রচলিত ধারাকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে এর জনপ্রিয়তা বিপুল বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একই সঙ্গে সরকারকেও আরও বেশি জবাবদিহিতার সম্মুখীন করেছে। আমি গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতে চাই রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সময় আমাদের টেলিভিশন সাংবাদিকরা দিন- রাত বিরতিহীনভাবে ঘটনাটি সরাসরি প্রচার করেছে এবং বিশ্বব্যাপী আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। টেলিভিশনে ঘটনার সরাসরি সম্প্রচারের ফলে খবর প্রচারে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে যা দর্শকদের কাছে গণমাধ্যমকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে। এফ.এম রেডিওর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। অনলাইন এবং ডিজিটাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোও কমবেশি সফল। এই প্রবন্ধে আমি এই মাধ্যমগুলোর আলোচনায় যাবো না। বর্তমানে প্রস্তাবিত সম্প্রচার নীতিমালা ছাড়াই এসব সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। টিভি স্টেশন এবং এফএম রেডিওগুলো বিদ্যমান আইন, নীতিমালা বিশেষ করে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে প্রদত্ত নীতিমালা মেনেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। যদি বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা দিয়েই টেলিভিশন ও এফএম রেডিও মাধ্যমে যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয় তবে কেন একটি নতুন নীতিমালার প্রয়োজন, বিশেষ করে এমন একটি নীতিমালা যা এই অগ্রগতির প্রতিবন্ধক হবে বলে মনে হয়। একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়নের একটিই গ্রহণযোগ্য যুক্তি থাকতে পারে আর তা হল নীতিমালার মাধ্যমে সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর বিকাশ ত্বরান্বিত করা। কিন্তু প্রস্তাবিত নীতিমালায় তা ঘটবে না, কেননা, এই নীতিমালা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী, বিকশিত করতে নয়। সরকার বলছে নীতিমালার বিষয়টি সাংবাদিকদের প্রস্তাব থেকেই আনা হয়েছিল। এটা সত্য। কিন্তু সাংবাদিকদের দাবি ছিল একটি স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন সেই নীতিমালা তৈরি করবে এবং নীতিমালা তৈরির সময় সকল অংশীজনদের বিশেষ করে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর মালিকদের মতামত গ্রহণ করবে। কিন্তু তারা কখনোই আমলাদের দ্বারা নীতিমালা তৈরির পক্ষপাতী ছিলেন না যেখানে অন্যান্য অংশীদারদের নামমাত্র অংশগ্রহণ থাকবে এবং তাদের অধিকাংশ মতামত গ্রহণই করা হবে না। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ গেজেট অনুযায়ী, সম্প্রচার নীতিমালাটিতে ৭টি অধ্যায় আছে। প্রথম অধ্যায়ের ‘উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য’ অংশে যে সব মৌলিক মূল্যবোধের কথা বলা হয়েছে আমরা তার সাথে একমত। ১.২.১ থেকে ১.২.৫ ধারা পর্যন্ত যেসব কথা বলা হয়েছে আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। তারপরও মূল্যবোধবিষয়ক এসব ধারা অপ্রয়োজনীয় ভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে যার কোন কোনটি বাদ দিয়ে অথবা অন্যধারার সাথে যুক্ত করে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অংশটিকে আরও সংক্ষিপ্ত ও সুপাঠ্য করে তোলা যেত। দ্বিতীয় অধ্যায়টি সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদান নিয়ে এবং এখানে বলা হয়েছে সম্প্রচার কমিশন গঠনের পর সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদানবিষয়ক বিস্তারিত নীতিমালা তৈরি করা হবে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে সম্প্রচারের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই তিন অধ্যায়ে প্রায় ৭০টি ধারা ও উপধারা আছে। প্রত্যেকটি ধারা-উপধারা গণমাধ্যমে সম্প্রচারের বিষয়বস্তু (Content) কেন্দ্রিক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক। সম্প্রচার নীতিমালায় সম্প্রচারের বিষয়বস্তুর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলো নিয়েও কথা বলেছে যা নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং এইসব সূক্ষ্ম বিষয়ে নীতিমালা আরোপ করে সহজেই তথ্যের অবাধ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ ৩.২.১ ধারায় বলা হয়েছে ‘অনুষ্ঠানে সরাসরি বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনভাবেই দেশবিরোধী ও জনস্বার্থবিরোধী বক্তব্য প্রচার করা যাবে না।’ এ বিষয়ে দ্বিমতের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কোন তথ্য ‘দেশবিরোধী’ বা ‘জনস্বার্থবিরোধী’ এটা ঠিক করবে কে? স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় সরকার একাই এসব বিষয়ে বিধি নিষেধ আরোপ করে কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমগুলোই দেশের সংবিধানের আলোকে বিষয়গুলো বিবেচনা করে। কিন্তু আলোচিত নীতিমালা এ দায়িত্ব গণমাধ্যমের কাছ থেকে নিয়ে নিয়েছে। পরের ধারাটিতে (৩.২.২) বলা হয়েছে ‘আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে কোন প্রকার বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য বা উপাত্ত দেয়া পরিহার করতে হবে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে সব পক্ষের যুক্তিসমূহ যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে হবে।’ সম্প্রচার মাধ্যমগুলো নিজ দায়িত্বেই এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং বর্তমানেও তারা এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। এসব বিষয়ে তাদের লাইসেন্স নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। গণমাধ্যমকে অবশ্যই ‘অসত্য’ তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি কখনও অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোন ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয় তবে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করা হয় এবং ক্ষমা চাওয়া হয়। ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্যের ক্ষেত্রে আমাদের সংসদে বিতর্কের নামে যা চলে তার সঙ্গে কি তুলনা করা যায়? প্রায়ই সরকার নিজেই অর্ধসত্য এবং মাঝে মাঝে ডাহা মিথ্যা তথ্য প্রচার করে। ৩.২.৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান যেমন: রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের ভাষণ, জরুরি আবহাওয়া বার্তা, স্বাস্থ্য বার্তা, গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা, প্রেস নোট ও অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান জনস্বার্থে যথাযথভাবে সম্প্রচার/প্রচার করতে হবে।’ আমরা সব সময়ই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সম্প্রচার করি। কিন্তু জরুরি আবহাওয়া বার্তা, স্বাস্থ্য বার্তা, প্রেস নোট এবং অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের বিষয়গুলো আরোপ করার কোন প্রয়োজনীয়তা দেখি না। সম্প্রচার মাধ্যমগুলো দর্শক আকৃষ্ট করার তাগিদেই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্প্রচার করে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এ জন্য এ ধরনের নীতিমালার প্রয়োজন নেই। ৩.৫.১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘স্বেচ্ছাভিত্তিক কাজ ও উন্নয়ন কার্যক্রম প্রচার করতে হবে।’ কিন্তু কেন? প্রতিটি চ্যানেল তাদের দর্শকদের কথা মাথায় রেখে সম্প্রচারের বিষয়বস্তু ঠিক করবে। সব চ্যানেলে কেন একই ধরনের বিষয়বস্তু চাপিয়ে দেয়া হবে। এ নীতিমালা উন্নয়ন কর্মকা-, বিনোদনমূলক প্রোগ্রাম, খেলাধুলা এবং শিক্ষামূলক প্রোগ্রামের মতো বিষয়গুলো নিয়েও কথা বলেছে। এ নীতিমালার আরেকটি বিপজ্জনক দিকটি হলো এখানে বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তুর (Content) ওপর নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কি ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে আর কি যাবে না সে বিষয়ে একটা গাইডলাইন বর্তমানে আছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তুর সুক্ষাতিসুক্ষ দিকগুলো নিয়ে নীতিমালা আরোপ করা হলে তা বিজ্ঞাপনের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। এর ফলে সম্প্রচার মাধ্যমগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক ও দুর্বল হয়ে পড়বে। আর বর্তমানে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এমন কোন বিজ্ঞাপন দেখানো হয় না, যা প্রতিরোধে কোন নীতিমালা প্রয়োজন। ষষ্ঠ অধ্যায়ে সম্প্রচারের অন্য দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ অধ্যায়ে এমন কিছু ধারা আছে যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণœ করতে পারে। ধারা ৫.১.৪: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে এমন ধরনের সামরিক, বেসামরিক বা সরকারি তথ্য প্রচার করা যাবে না। আমরা সেনাবাহিনী সম্পর্কিত তথ্যের স্পর্শকাতরতার বিষয়ে ভালভাবেই অবগত। কিন্তু বেসামরিক এবং সরকারি তথ্য গণমাধ্যমে প্রচার করা যাবে না কেন? ধারা ৫.১.৫: কোন অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপনে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কোন সংস্থা এবং অপরাধ রোধ, অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং অপরাধীকে দ- প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রতি কটাক্ষ বা বিদ্রƒপ কিংবা তাদের পেশাগত ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে পারেÑ এমন কোন দৃশ্য প্রদর্শন কিংবা বক্তব্য প্রচার করা যাবে না। এ নীতিমালার অন্তঃসারশূন্যতা কি ভয়াবহ! আজ যদি এই নীতিমালা বলবৎ থাকতো তাহলে আমরা দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় এনএসআই এবং ডিজিএফআই’র সংশ্লিষ্টতা (যা অভিযুক্তরা নিজেরাই স্বীকার করেছে) নিয়ে মুখ খুলতে পারতাম না। এ নীতিমালা অনুযায়ী, আমরা ২১শে আগস্টের ঘটনা নিয়ে কিছু লিখতে পারতাম না, যেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় পুলিশের তিন সাবেক মহাপরিদর্শক, দুইজন সাবেক এনএসআই প্রধান, তিনজন সাবেক সিআইডি কর্মকর্তা এবং সেনাবাহিনীর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনও করা হয়েছে। নতুন এই নীতিমালা অনুসারে আমরা পুলিশ কাস্টডিতে অথবা পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যু, সামরিক বাহিনী, র‌্যাব, ডিজিএফআই, গোয়েন্দা সংস্থা ও দ- দানে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবো না। এই নীতিমালা কার্যকর হলে আমরা নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় জড়িত র‌্যাব কিংবা মিরপুরে ঝুট ব্যবসায়ীকে নির্যাতন করে হত্যাকারী মিরপুর থানা সাব-ইন্সপেকটরের বিরুদ্ধে কিছুই লিখতে পারবো না। আমরা ক্রসফায়ার কিংবা রিমান্ডে নির্যাতন নিয়ে কিছু প্রকাশ করতে পারবো না। লিমনের মতো নিরীহ নিরপরাধ ছেলে কখনই ন্যায় বিচার পেত না যদি না গণমাধ্যম র‌্যাবের মুখোশ উন্মোচ করত। র‌্যাব নিরপরাধ লিমনকে গুলি করে পঙ্গ করে দেয় উপরন্তু তাকে সন্ত্রাসী সাজানোর নাটকও করে। গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-, পুলিশি নির্যাতনের সকল খবর আমরা এখনও সম্প্রচার করতে পারি না কারণ তা এসব বাহিনীর পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করবে। প্রকৃতপক্ষে, এ প্রস্তাবের উদ্দেশ্য গণমাধ্যমকে নিজ দায়িত্ব পালন করা থেকে ব্যাহত করা ছাড়া আর কিছুই নয়। ধারা ৫.১.৯: জনস্বার্থ বিঘিœত হতে পারে এমন কোন বিদ্রোহ, নৈরাজ্য এবং হিংসাত্মক ঘটনা প্রদর্শন পরিহার করতে হবে ‘বিদ্রোহ’ বিষয়টি আমরা বুঝি এবং কিভাবে তার সম্প্রচার করা হবে তা নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। কিন্তু ‘নৈরাজ্য’ এবং ‘হিংসাত্বক’ বলতে কি বোঝানো হচ্ছে? এই নীতিমালা অনুযায়ী আমরা সহিংসতা এবং গোলযোগের ঘটনা প্রচার করতে পারবো না। মনে হচ্ছে যখন দুষ্কৃতকারীরা রেললাইন উপড়ে ফেলবে অথবা আমাদের কারখানা জ্বালিয়ে দেবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তখন নাচ গান দেখানোতেই ব্যস্ত থাকবে। ২০১৪ সালের নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত যখন চলন্ত বাসে বোমা নিক্ষেপ করছিল অথবা ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ তথাকঠিত ‘লগি-বৈঠা’র আন্দোলনের নামে যে সহিংসতা ঘটিয়েছিল তা যথাযথভাবে তুলে ধরা কি ভুল ছিল? ভবিষ্যতে কি এসব ঘটনা আর প্রচার করা যাবে না? আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো সর্বদাই আন্দোলনের কর্মসূচি দেয় এবং প্রায়শই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সরকার নীতিমালায় নৈরাজ্য ও সহিংসতার ঘটনা প্রদর্শন করা যাবে না বলে প্রকৃতপক্ষে বিরোধী দলের কর্মসূচির খবর প্রচার বন্ধ করতে চায়। কয়েকদিন আগে বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর যে পুলিশি নির্যাতন করা হলো এই নীতিমালা অনুযায়ী কি তা প্রচার করা যাবে না? ধারা ৫.১.৭: কোন বিদেশী রাষ্ট্রের অনুকূলে এমন ধরনের প্রচারণা যা বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে বিরোধের কোন একটি বিষয়কে প্রভাবিত করতে পারে অথবা একটি বন্ধু ভাবাপন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন ধরনের প্রচারণা যার ফলে সে রাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে এমন দৃশ্য বা বক্তব্য প্রচার করা যাবে না। এই ধারা অনুযায়ী মিয়ানমার কর্তৃক ২০০৭/৮ সালে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় যুদ্ধজাহাজ প্রেরণের ঘটনার অনুরুপ কোন ঘটনা অথবা সীমান্তে ফেলানির হত্যাকা-ের মতো ঘটনা বা নিয়মিতভাবে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যার ঘটনা ভবিষ্যতে আর প্রচার করা যাবে না। তিস্তায় আমাদের ন্যায্য হিস্যার ব্যাপারে ভারতের উদাসীনতা নিয়ে কি লেখা যাবে? এই নীতিমালা অনুযায়ী, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় সৌদি আরব, কুয়েত, মালয়েশিয়া অথবা অন্য কোন দেশে যেখানে আমাদের শ্রমিকরা খুন, নির্যাতন, ধর্ষণ অথবা অবৈধ আটকাদেশের শিকার হচ্ছে তা নিয়ে খবর প্রচার করতে পারবো না? তাহলে আমাদের শ্রমিকেরা যাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করে আমরা রেকর্ড রিজার্ভের গর্ব করছি তারা কি বিদেশী রাষ্ট্রের কৃপা অথবা আমাদের দেশের ভীতু এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ কমার্শিয়াল এটাশিদের কৃপার ওপর নির্ভর করবে? ধারা ৪.২.৮: বিজ্ঞাপনে পরিবেশবান্ধব নয় এমন কোন দৃশ্য প্রচার পরিহার করতে হবে। দূষিত নদী, যত্রতত্র ফেলে রাখা আবর্জনা অথবা নির্বিচারে গাছ কাটা প্রভৃতি দৃশ্য তুলে ধরে জনগণকে এসব কাজ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সচেতন থাকতে বলায় দোষের কি আছে? সর্বোপরি এই নীতিমালায় স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি যে ধরনের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে তা ইতিহাস বিরুদ্ধ ও স্বাধীনতার পথে মানুষের অগ্রযাত্রার প্রতিবন্ধক। গণতন্ত্রের অধীনে গত তিন দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকাকে সরকার ভুলভাবে এবং অবহেলার সঙ্গে বিবেচনা করছেন। এখানে আমি অমর্ত্য সেনের লেখার দিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন কিভাবে বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা উন্নয়নে অবদান রাখে। তাঁর যুগান্তকারী বই ‘উন্নয়ন ও স্বাধীনতা’ আমাদের নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি উন্মোচনে সহায়ক হবে। ধারা ৭.১: এ সম্প্রচার নীতিমালার আলোকে প্রতিটি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট Charter of duties ও সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা কোনমতেই সম্প্রচার নীতিমালার পরিপন্থি হতে পারবে না ও কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত হবে। এই প্রস্তাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি স্বরূপ। এটা প্রকৃতপক্ষে গণমাধ্যমের ‘সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও অন্যান্য কার্যক্রমের স্বাধীনতাকে খর্ব করে। এর ফলে সম্পাদকগণ ও গণমাধ্যমকর্মীরা স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে চ্যানেলগুলো পরিচালনা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। এটা মন্ত্রণালয়কে (পড়–ন আমলা ও তাদের রাজনৈতিক প্রভু) গণমাধ্যমের কার্যক্রমে সরাসরি নাক গলানোর সুযোগ করে দেবে। ধারা ৭.৩: কোন অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন শোভনীয়, সুন্দর, সুরুচিপূর্ণ ও পরিমার্জিত কিনা এ বিষয়ে কোনরূপ দ্বিধা/সন্দেহ দেখা দিলে সম্প্রচার মাধ্যমকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ প্রস্তাবটি যারা তৈরি করেছেন তাদের কোন ধারণাই নেই সম্প্রচার মাধ্যম কিভাবে কাজ করে। ধরেন, প্রতিটি গণমাধ্যম কি ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করবে তার জন্য প্রত্যেকবার ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের’ কাছে নিয়ে যাবে। এটা দেখে মনে হয় টেলিভিশনে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের বিজ্ঞাপনের যথার্থতা নিয়ে কোন ধারণা নেই আর আমলারা যাদের সম্প্রচার মাধ্যমের কর্মকা- বিষয়ক কোন জ্ঞান নেই তারাই বিজ্ঞাপন বিষয়ে সর্বজ্ঞ। ধারা ৭.৪: এ নীতিমালায় উল্লেখ নেই অথবা অন্য কোন নীতিমালা বা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত প্রদান করবে। এটি একটি অন্তঃসারশূন্য (vague) প্রস্তাব যা বিস্তৃত বিষয় নিয়ে কথা বলছে। ‘অন্য কোন নীতিমালার আওতায় কি কি নীতিমালা বিবেচিত হচ্ছে আমরা তা জানি না। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব নীতিমালা থাকতে পারে। গণমাধ্যম কতগুলো নীতিমালা অনুসরণ করবে। তথ্য মন্ত্রণালয় আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট অনুযায়ী এসব নীতিমালার এমন ব্যাখ্যা দেবে যা জনগণের জানার অধিকারকে ক্ষুণœ করবে। এই প্রস্তাবটি স্বাধীন গণমাধ্যমের কর্মকা-কে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ধারা ৭.৫: সম্প্রচার ও সম্প্রচার কমিশন সম্পর্কিত আইন, বিধিমালা এবং নীতিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত তথ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রচার সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এটা কোনভাবেই স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক নয়। আধুনিক দর্শকদের রুচি ও চাহিদা এই নীতিমালায় আরেকটি গুরুতর বিষয় রয়েছে যা নিয়ে এখনও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয় না। এই নীতিমালা বা এর সঙ্গে দূরবর্তীভাবে সম্পর্কিত কোন নীতিমালাও যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে আমাদের সম্প্রচার মাধ্যমগুলো একঘেয়ে ও বিরক্তিকর (dull and gloomy) হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার অভাবে আমাদের চ্যানেলগুলো যে সব প্রোগ্রাম তৈরি করবে তা বর্তমান কালের দর্শকদের মন যোগাতে ব্যর্থ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ দর্শকরা এখন অনেক গতিশীল ও চাহিদা সম্পন্ন। এই ডিজিটাল যুগের তরুণদের ক্ষেত্রে একথা আরও বেশি প্রযোজ্য। তারা একঘেয়ে ও বিরক্তিকর চ্যানেল ছেড়ে আনন্দদায়ক ও বিনোদনমূলক চ্যানেলে যেতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। এর ফলে আমাদের দেশের দর্শকরা দেশী চ্যানেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং বিদেশী চ্যানেলগুলোর প্রতি আর ঝুঁকে পড়বে। আমাদের দেশে এসব বিদেশী চ্যানেল ইতিমধ্যেই খুবই জনপ্রিয়। আমাদের দেশী চ্যানেলগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই প্রবণতা অনেকটা রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই নীতিমালার ফলে দর্শকদের মত বিজ্ঞাপনদাতারও দেশী চ্যানেলগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এভাবেই প্রস্তাবিত নীতিমালার দেশীয় সম্প্রচার মাধ্যমগুলোকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিবে। পরিশেষে বলতে চাই আমরা সম্প্রচার নীতিমালার বিরুদ্ধে নই। আমরা এমন আইন চাই যা স্বাধীনতাকে লালন করবে এবং গণমাধ্যমেকে একটি শক্তিশালী শিল্পখাত হিসেবে গড়ে তুলবে যেখানে একটি নৈতিক এবং স্বাধীন গণমাধ্যম সর্বোচ্চ নৈতিকতা বজায় রেখে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করতে সক্ষম হবে। আমরা মনে করি এরকম একটি আইন তৈরি করতে প্রথমেই একটি স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠন করা উচিত। সাংবাদিক সমিতিগুলো এবং সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর সমিতি এ্যাকটোও এ বিষয়ে একমত। যারা সকল অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে এই আইনটি তৈরি করবে। এখানে অংশীজনরা অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হবেন। অবিলম্বে স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠন করুন এবং তাদেরকেই নীতিমালাটি তৈরি করতে দিন। আমরা শুরুর ন্যায় শেষেও একই কথা বলতে চাই। সরকার সাময়িকভাবে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত স্বাধীন গণমাধ্যমেরই জয় হবে।
মাহফুজ আনাম: সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদক পরিষদ এবং সম্পাদক ও প্রকাশক, দি ডেইলি স্টার