Tuesday, April 8, 2025

প্রতিদিন রাতে আমি ওকে চুমু দিতাম, যেন এটাই শেষবার by শামীমা আল দুররা

এই গল্প আজকের নয়। গল্পটি শুরু হয়েছিল ঠিক এক বছর আগে—১৯ মার্চ ২০২৪ সালে। এটি ছিল যুদ্ধ, ভয়, ক্ষুধা, মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি আর ধ্বংসের এক বছর। এটি ছিল এমন একটি বছর, যেখানে প্রতিটি কোণে মৃত্যু ওত পেতে ছিল।  আমি নিজ চোখে মৃত্যু দেখেছি। আমি যে বেঁচে আছি, তা তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, যখন চরম আতঙ্কের মধ্যে আমার প্রসববেদনা শুরু হলো। একটি ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের বাড়ির একদম পাশেই আঘাত হেনেছিল। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল, আর ধাতব টুকরাগুলো উড়ে আসতে লাগল। বাতাস ধোঁয়া আর রক্তের গন্ধে ভরে গিয়েছিল।

আমি নিশ্চিত ছিলাম, সব শেষ। কিন্তু নিজের জন্য ভয় পাইনি। ভয় পেয়েছিলাম আমার সেই অনাগত শিশুর জন্য, যে এখনো সূর্যের আলোও দেখেনি। আমরা কি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাব—আমি, আমার অনাগত সন্তান আর আমার স্বামী?

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি, চিৎকার করে উঠেছিলাম, ‘আমরা পুড়ে যাচ্ছি! আমরা পুড়ে যাচ্ছি!’ আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম আনন্দ, উষ্ণতা আর উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে আমার সন্তানকে পৃথিবীতে স্বাগত জানাব। কিন্তু তার বদলে সে জন্ম নিল গুলি আর আগুনে ঝলসানো আকাশের নিচে। যতই প্রসবের দিন ঘনিয়ে আসছিল, আমি প্রার্থনা করছিলাম যেন সে শান্তিতে জন্ম নেয়। আমি মরিয়া হয়ে একটা যুদ্ধবিরতির আশায় ছিলাম। কিন্তু ভাগ্য ছিল নিষ্ঠুর।

আমার সন্তান হয়ে গেল আরেকটি যুদ্ধশিশু—যে শিশু জন্মের পরপরই বিস্ফোরণের শব্দে ঢাকা পড়ে গেল, যার ঘর আর দোলনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, আর যার জীবন শুরু হওয়ার আগেই কেড়ে নেওয়া হলো। আমরা ছিলাম একা—এক জ্বলন্ত পৃথিবীর মাঝে নিঃসঙ্গ।

ইসরায়েলের যুদ্ধ যখন ফিলিস্তিনের এই ছোট্ট ভূখণ্ডকে তছনছ করে চলেছিল, তখন আমার ছিল না কোনো আশ্রয়, ছিল না কোনো স্বস্তি, ছিল না কোনো সহায়তার হাত। আমার একমাত্র শক্তি ছিল আমার গর্ভের সন্তানের ছোট ছোট নড়াচড়া। আমার ভেতরে তার প্রতিটি স্পন্দন যেন একটা ফিসফিসানি ছিল। ছিল একটা প্রতিশ্রুতি—আমরা টিকে থাকব। মৃত্যু আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছিল। কিন্তু কোনোভাবে আমরা টিকে গিয়েছিলাম। আমরা বেঁচে ছিলাম ঘর ছাড়ার পর। ফাঁকা রাস্তাগুলো পেরিয়ে যেখানে বাতাসও যেন শোক বয়ে আনছিল, সে পথে আমরা গুটি গুটি পায়ে হাঁটছিলাম।

আমরা বেঁচে ছিলাম যুদ্ধের নিষ্ঠুর হাত যখন আমাকে আমার পরিবার থেকে ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা বেঁচে ছিলাম প্রিয়জনদের হারানোর পরও বুকের ভেতর সেই ভারী শোক বয়ে নিয়ে। যখন শত্রুরা আমার ঘরটাকে উড়িয়ে দিল, তখন আমি সাত মাসের গর্ভবতী। আমি তখন নিজেকে সেই কথাগুলোই বললাম, যা আল্লাহ মরিয়ম (আ.)–কে বলেছিলেন: তুমি খাও, পান করো আর শান্ত হও। সেই মুহূর্তে, চারপাশের ভয়াবহতার মধ্যে সামান্য শান্তি পেয়েছিলাম। আমি শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম এই বিশ্বাস যে আমার সন্তান আমার জন্য এক আশীর্বাদ, যে আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেবে।

তারপর, প্রসবব্যথা শুরু হলো।

প্রতি তরঙ্গে যখন ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছিল, আমি কেবল দয়া আর শক্তির জন্য দোয়া করছিলাম। মুহূর্তটি আনন্দ আর ভালোবাসার হওয়ার কথা ছিল। সে মুহূর্তে কোনো একজনের আমার হাত ধরে সাহস দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমি ছিলাম ঘোর অন্ধকারের মধ্যে, মৃত্যুর ছায়ায় ঘেরা এক ভয়াবহ পথে। বিস্ফোরণের শব্দ যেন আমার প্রতিটি প্রসববেদনার সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। আমি আল্লাহর কাছে কাতর হয়ে দোয়া করছিলাম, যেন আমি নিরাপদে আমার সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে পারি, আর তাকে নিজের হাতে একবার হলেও ধরতে পারি। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই আমার সন্তানের প্রথম কান্না আমাদের অবিনশ্বর শক্তির প্রমাণ হয়ে উঠল।

সেই রাত ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা। বৃষ্টিতে ভিজে থাকা এক রাত। কিন্তু আকাশ ছিল আগুনের মতো জ্বলন্ত। যুদ্ধবিমানগুলো গর্জন করছিল। আর মিসাইলের আলো অন্ধকার চিরে শহরটাকে এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের রূপ দিচ্ছিল। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিথর সন্তানের দেহ আঁকড়ে ধরে রাখা মায়েদের পাশে আমার মতো নারীরা সন্তান জন্ম দিচ্ছিল। আমি তখনো আমার বাচ্চাটির মুখে চুমু খেতে পারিনি।

অবশেষে সকাল এল। আমার পরিবারও এসে পৌঁছাল। এত দিন পর প্রথমবার মনে হলো, আমার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। কিন্তু শান্তি ছিল তেমনই এক স্বপ্ন, যা আমরা বাস্তবে আর দেখিনি। বোমার শব্দ আমার আনন্দের চেয়ে বেশি জোরে বাজছিল। তবু সেদিন আমি এক সিদ্ধান্ত নিলাম: আমার সন্তান ও আমি বেঁচে থাকব। যা কিছু আসবে, তার সঙ্গে লড়াই করব।

কিন্তু লড়াই তো সবে শুরু হয়েছিল। আমি ওকে কী খাওয়াব? একসময় ফাঁকা হয়ে যাওয়া বাজার আবার হঠাৎ করেই ভরে উঠল। কিন্তু সবকিছুর দাম এমন ছিল যে তা কেনা অসম্ভব হয়ে উঠল। মাংস, মাছ, ফল—সবই এক অজানা বিলাসিতা হয়ে গেল। আর কাপড়? বাচ্চাটির কোনো নতুন পোশাক ছিল না। কেবল যুদ্ধের মধ্যে জন্ম নেওয়া অন্য শিশুদের পুরোনো কাপড়েই তাকে ঢেকে রাখছিলাম।

আমার সন্তান জন্ম নিয়েছে এক শরণার্থী হয়ে, এক গৃহহীন শিশু হিসেবে—আমাদের মতোই। আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছিলাম আর আমাদের পেছনে ছিল কেবল মৃত্যু।

যুদ্ধ লম্বা হতে থাকল। সে তখনো এতটাই ছোট যে গ্রীষ্ম আর শীতের পার্থক্য বোঝার বয়সও তার হয়নি। কিন্তু কষ্ট? সেটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে শিখেছিল। গরম এমন ছিল যে সহ্য করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। সে সব সময় ঘেমে থাকত আর কাঁদতে কাঁদতে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।

সূর্যাস্ত হয়ে উঠত নতুন এক যন্ত্রণা। সূর্যের শেষ রশ্মি আমাদের আশ্রয়স্থলকে একধরনের ভেতর থেকে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা চুল্লিতে পরিণত করত। তার ছোট্ট কান্না রাতভর প্রতিধ্বনিত হতো। পোকারা তার কচি দেহে কামড়াত। আর দূরে কুকুরগুলো ডাকছিল। সেসব কুকুর একসময় ছিল গৃহপালিত। এখন যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বেড়ানো ক্ষুধার্ত শিকারিতে তারা পরিণত হয়েছে। তাদের কেউ কেউ তো উত্তর গাজার মৃত মানুষের শরীর খেয়েও টিকে ছিল।

তারপর এল হাড় কাঁপানো শীত। আমার সন্তান কাঁদত। আর আমি তার সঙ্গে কাঁদতাম। দুঃখ যেন আমাকে চেপে বসেছিল। চারপাশের অন্ধকার আমাকে গ্রাস করতে চাইছিল। কিন্তু আমার ইমানই ছিল আমার একমাত্র আশ্রয়।

আমাদের কিছুই ছিল না। শীত থেকে বাঁচতে একই কাপড় ভাগ করে নিতে হতো। আমি এখনো মনে করি, আমাদের বাস্তুচ্যুতির প্রথম সপ্তাহে কয়েকটা প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিয়ে ভেবেছিলাম, আমরা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে যাব। তখনো জানতাম না, আমাদের জীবন চিরতরে বদলে গেছে।

আমরা যেন এক শীতল কবরের ভেতরে ছায়ার মতো বসবাস করছিলাম। সব সময় ভয় লাগত, যদি শীত আমার সন্তানকে নিয়ে যায়—যেমনটি ক্যাম্পের আরও অনেক শিশুর ক্ষেত্রে হয়েছে।

প্রতিদিন রাতে আমি ওকে চুমু দিতাম, যেন এটাই শেষবার। আমার নিজের প্রাণের চেয়ে ওর প্রাণের ভয় আমাকে বেশি তাড়া করত।

ওর জন্ম আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়ে উঠল এক বোঝা; যা প্রতিনিয়ত আমার হৃদয়কে ভারী করে তুলল।

যখন ও এক বছর পূর্ণ করল, আমি চেয়েছিলাম ওকে শান্তি উপহার দিতে। কিন্তু যুদ্ধের সময় শান্তি কীভাবে দেব?

শামীমা আল দুররা গাজার একজন সাংবাদিক

মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

আমরা বেঁচে ছিলাম প্রিয়জনদের হারানোর পরও বুকের ভেতর সেই ভারী শোক বয়ে নিয়ে
আমরা বেঁচে ছিলাম প্রিয়জনদের হারানোর পরও বুকের ভেতর সেই ভারী শোক বয়ে নিয়ে। ছবি : রয়টার্স

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি দার আল-আরকাম স্কুল পরিদর্শন করেন ফিলিস্তিনিরা। গাজা উপত্যকার গাজা শহরে, ৪ এপ্রিল ২০২৫
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি দার আল-আরকাম স্কুল পরিদর্শন করেন ফিলিস্তিনিরা। গাজা উপত্যকার গাজা শহরে, ৪ এপ্রিল ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েল গজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে
ইসরায়েল গজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। ছবি : রয়টার্স

‘আমি নিতান্তই কোনো সংখ্যা হতে চাই না, আমি গাজার এক বাস্তব গল্প’

গাজায় কাটানো দুর্বিষহ জীবন নিয়ে লিখেছেন সেখানকার বাসিন্দা রুওয়াইদা আমির। ক্রমাগত ইসরায়েলি বোমা হামলার আতঙ্ক আর ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটানো জীবনের কথা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। আল–জাজিরায় প্রকাশিত তাঁর লেখাটি ভাষান্তর করে প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখতে পাব, তা আমার ধারণায় ছিল না। আমি ভাবতাম, মৃত্যু হুট করেই আসে, আমরা এটা অনুভব করতে পারি না। তবে এ যুদ্ধ চলাকালে তারা ধীরে ধীরে আমাদের সব পরিস্থিতিরই মুখোমুখি করেছে।

ঘটনা ঘটার আগেই আমরা ভুগছি। যেমন বাড়িতে বোমা হামলার আশঙ্কা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে রেখেছে।

শুরু হওয়া সে যুদ্ধ এখনো আছে, কিন্তু ভয়ের সেই অনুভূতি ভেতরে চাপা থেকে গেছে। এই ভয় আমার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এমনকি আমার মনে হচ্ছে, এটা আর কোনো ধকল নিতে পারবে না।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমাদের অনেক কাছাকাছি চলে আসা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে সামলাতে আমি হিমশিম খাচ্ছি। আমার মনে আছে, যখন নেতজারিম এলাকা থেকে ট্যাংকগুলো ঢুকছিল, তখন আমি স্তম্ভিত হয়ে আমার সব বন্ধুর কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলাম: ‘তারা গাজায় কীভাবে ঢুকল? আমি কি স্বপ্ন দেখছি?!’

তারা কবে গাজা থেকে সরবে, এটি আবার কবে মুক্ত হবে, সে অপেক্ষায় আছি আমি।

এখন আমি যেখানে থাকি, সেই আল–ফুখারি এলাকার খুব কাছে চলে এসেছে ইসরায়েলি সেনারা। খান ইউনিসের পূর্বে এবং রাফার উত্তরে এর অবস্থান। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে খান ইউনিস এলাকার শেষ এবং রাফার শুরু।

তারা এতটাই কাছে চলে এসেছে যে আমরা প্রতিনিয়ত ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের অবিরাম সেসব শব্দ শুনতে হচ্ছে।

এ যুদ্ধ ভিন্ন ধরনের। আমার আগের অভিজ্ঞতার চেয়ে এটা অনেকটাই আলাদা।

আমি নিতান্তই একটা সংখ্যা হতে চাই না।

মৃতদের ‘অজ্ঞাত ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা বা গণকবরে শুইয়ে দিতে দেখার পর থেকে আমার মাথায় বিষয়টা গেঁথে আছে। এর মধ্যে কিছু কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গও আছে, যা শনাক্তই করা যায়নি।

এটা কি সম্ভব যে আমার কাফনের ওপর শুধু ‘কালো/নীল ব্লাউজ পরা তরুণী’ লেখা থাকবে?

আমি কি ‘অজ্ঞাত ব্যক্তি’ হিসেবে মারা যাব, শুধুই একটি সংখ্যা হিসেবে?

আমি চাই, আমার আশপাশে থাকা প্রত্যেকে আমার গল্প মনে রাখুক। আমি কোনো সংখ্যা নই।

আমি সেই মেয়ে যে কিনা গাজায় কঠোর অবরোধ চলাকালে অন্য রকম পরিস্থিতিতে হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য সব জায়গায় কাজ খুঁজছিলাম। কারণ, অবরোধের কবলে পড়ে আমার বাবা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার চাকরি হারিয়েছেন।

আমি আমার পরিবারের বড় মেয়ে এবং আমি আমার বাবাকে সহযোগিতা করতে চাই। আমি চাই আমাদের থাকার জন্য একটি ভালো বাড়ি থাকুক।

অপেক্ষা করুন...আমি কিছুই ভুলতে চাই না।

আমি একজন শরণার্থী। আমার দাদা-দাদি শরণার্থী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলি দখলদারির কারণে তাঁদের নিজের জমি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।

আমার দাদা-দাদি গাজা উপত্যকায় যান এবং শহরের পশ্চিমে খান ইউনিসে শরণার্থীশিবিরে থাকতেন।

ওই শিবিরে আমার জন্ম, তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমাকে সেখানে জীবন কাটাতে দেয়নি।

২০০০ সালে ইসরায়েলি বাহিনী আমাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। দুই বছর আমাদের আশ্রয়হীন থাকতে হয়েছে। আমরা বসবাসের অযোগ্য একটি বাড়ি থেকে আরেকটিতে স্থানান্তরিত হতে থাকলাম। ২০০৩ সালে আইএনআরডব্লিউএ আল–ফুখারিতে আমাদের আরেকটি বাড়ি না দেওয়া পর্যন্ত এমন অবস্থাই চলতে থাকল।

কৃষিজমিতে ভরা এই এলাকা দারুণ। আমরা সেখানে জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। যেখানটায় আমরা থাকতাম, তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ইউরোপিয়ান হাউজিং’। সেখানে অবস্থিত ইউরোপিয়ান হাসপাতালের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়।

বাড়িটি ছোট ছিল। মা-বাবাসহ পাঁচজনের পরিবারের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। বাড়িতে বাড়তি রুমের প্রয়োজন ছিল, একটি লিভিং রুমের প্রয়োজন ছিল। রান্নাঘরে সংস্কার করানোর দরকার ছিল।

যা–ই হোক, প্রায় ১২ বছর আমরা সেখানে ছিলাম। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব, ২০১৫ সালের দিকে আমি বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য কাজ শুরু করলাম। আরাম করে থাকার মতো একটি বাড়ি বানাতে আমি তাঁকে সাহায্য করলাম। হ্যাঁ, আমরা সেটা করতে পেরেছিলাম। তবে তা খুব কষ্টসাধ্য ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর মাত্র তিন মাস আগে আমাদের বাড়ি তৈরির কাজ শেষ হয়।

হ্যাঁ, আমাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় ১০ বছর ধরে তিলে তিলে আমরা বাড়িটি পুনর্নির্মাণ করেছি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে আমরা বাড়ির কাজ শেষ করি।

যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজায় অবরুদ্ধ অবস্থা ও দুর্বিষহ জীবন নিয়ে আমি হিমশিম খাচ্ছিলাম। এরপর যুদ্ধ আমাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিল, আমার হৃদয়কে দুমড়ে–মুচড়ে দিল এবং আমি আমার মনোযোগের কেন্দ্র হারিয়ে ফেললাম।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমরা কিছুর জন্য লড়াই চালাচ্ছি। টিকে থাকার জন্য লড়ছি, ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় যেন মারা না যাই, তার জন্য লড়ছি। যেসব ভয়াবহতা আমরা দেখছি, তার জন্য যেন মনোবল না হারিয়ে ফেলি, সেটা নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করছি।

আমরা যেকোনো উপায়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। আমরা বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি। আমার জীবনে আমি চারটি বাড়িতে থেকেছি এবং কাছাকাছি জায়গায় ইসরায়েলি বোমা হামলার ঘটনায় প্রতিটি বাড়িই ধ্বংস হয়েছে।

আমাদের থাকার কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। যুদ্ধবিরতির আগে আমরা ৫০০ দিন আতঙ্কে কাটিয়েছি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুদ্ধের সময় আমি যা করিনি, তা হলো কান্না। আমি শক্ত থাকার চেষ্টা করেছি এবং আমার দুঃখ ও রাগ ভেতরে চেপে রেখেছি। এতে আমার হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ পড়েছে, এটি আরও দুর্বল হয়ে গেছে।

আমি আমার চারপাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সবার প্রতি ইতিবাচক ছিলাম এবং সমর্থন দিয়েছিলাম। হ্যাঁ, উত্তরের মানুষেরা ফিরে আসবে। হ্যাঁ, সেনাবাহিনী নেতজারিম থেকে সরে যাবে। আমি সবাইকে সাহস জোগাতে চেয়েছিলাম, যদিও আমার ভেতরে একটা বিরাট দুর্বলতা ছিল, যা আমি দেখাতে চাইনি।

আমার মনে হয়েছিল, যদি এটি দেখিয়ে ফেলি, তাহলে আমি এই ভয়াবহ যুদ্ধে শেষ হয়ে যাব।

যুদ্ধবিরতি ছিল আমার বেঁচে থাকার বড় আশা। আমার মনে হয়েছিল, আমি টিকে গেছি। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।

যখন লোকেরা ভাবছিল, যুদ্ধ কি আবার ফিরে আসবে? আমি তখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘না, আমার মনে হয় না, এটি আবার ফিরবে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।’

যুদ্ধ ফিরে এসেছে এবং আগের চেয়ে বেশি আমার কাছাকাছি চলে এসেছে। অবিরাম গোলাবর্ষণের কারণে ক্রমাগত ভয় নিয়ে বেঁচে আছি। তারা আমাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে—রকেট, বিমান ও ট্যাংকের গোলা। ট্যাংক থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণ হয়, নজরদারি ড্রোন উড়তে থাকে, সবকিছুই ভয়ংকর।

আমি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সত্যিই ঘুমাইনি। তন্দ্রার ভাব হলেই বিস্ফোরণের শব্দে জেগে উঠি এবং দৌড়াতে থাকি। কোথায় যেতে চাইছি তা জানা থাকে না, কিন্তু আমি ঘরের ভেতর দৌড়াতে থাকি।

একনাগাড়ে আতঙ্কিত হতে হতে আমি আমার বুকের ওপর হাত দিয়ে ভাবি, এই হৃৎপিণ্ড আর বেশি সইতে পারবে কি না।

এ জন্য আমি আমার সব বন্ধুকে একটি বার্তা পাঠিয়েছি। আমি তাদের বলেছি, আমার গল্পটি নিয়ে কথা বলতে যেন আমি নেহাতই একটি সংখ্যা না হয়ে যাই।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমার আশপাশের এলাকা ধ্বংস করে দেওয়ায় আমরা অসহনীয় দিন কাটাচ্ছি। এখানে এখনো অনেক পরিবার বাস করছে। তারা চলে যেতে চায় না, কারণ বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টি মানুষকে শারীরিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়।

আমার মনে আছে, প্রথম বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাটি ছিল ২০০০ সালে। তখন আমার বয়স ছিল প্রায় আট বছর।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বুলডোজার খান ইউনিস আশ্রয়শিবিরে এসে আমার চাচার ও দাদার বাড়ি ধ্বংস করে দেয়। তারপর কোনো কারণে এগুলো আমাদের বাড়িতে এসে থেমে যায়। আমরা চলে গেলাম। ওই সময় পবিত্র রমজান মাস ছিল এবং আমার মা–বাবা ভেবেছিলেন যে আমরা পরে ফিরে আসতে পারব। আমাদের সাময়িকভাবে আশ্রয়ের জন্য তাঁরা একটি জরাজীর্ণ ঘরের সন্ধান পান।

আমরা যে আমাদের বাড়ি হারিয়েছি, এটা আমি মেনে নিতে পারিনি। তাই আমি সেই বাড়িতে ফিরে যেতাম যেখানে আমার দাদা-দাদির সঙ্গে কাটানো সুন্দর স্মৃতিগুলো ছিল। আমি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে মাকে দিয়েছিলাম।

ঈদের আগের রাতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল। ঈদুল ফিতরের প্রথম দিনে আমি ও আমার পরিবার সেখানে গেলাম। নতুন জামাকাপড় পরে ধ্বংসস্তূপে ঈদ উদ্‌যাপনের কথা আমার মনে পড়ে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমাদের কিছুই রাখতে দিচ্ছে না। তারা সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের মনে যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই তারা অবশিষ্ট রাখছে না। ভয়াবহ এই সেনাবাহিনীর হাত থেকে বিশ্ব যদি আমাদের না বাঁচায়, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে, আমার জানা নেই। জানি না, আমার হৃৎপিণ্ড অবিরত চলা এসব শব্দ আর বেশি নিতে পারবে কি না।

আমাকে কখনো ভুলে যাবেন না। আমি আমার জীবনের জন্য কঠিন লড়াই লড়েছি। সাংবাদিক ও শিক্ষক হিসেবে ১০ বছর আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, নিজেকে নিবেদিত করেছি।

আমার শিক্ষার্থীদের আমি ভালোবাসি। সহকর্মীদের সঙ্গে আমার সুন্দর স্মৃতি আছে।

গাজায় জীবনযাপন কখনোই সহজ নয়। তবে আমরা এটাকে ভালোবাসি। অন্য কোনো বাসভূমিকে আমরা ভালোবাসতে পারি না।

রুওয়াইদা আমির গাজায় ১০ বছর শিক্ষকতা করেছেন।
রুওয়াইদা আমির গাজায় ১০ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ছবি: আল–জাজিরার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

২০২২ সালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রুওয়াইদা আমির
২০২২ সালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রুওয়াইদা আমির। ছবি: আল–জাজিরার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

উত্তাল ইসরায়েল, নেতানিয়াহুর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। এরই মধ্যে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেছেন নাগরিকরা।

সোমবার ( ০৭ এপ্রিল) ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর জেরুজালেমের বাসভবনের বাইরে জিম্মি পরিবার ও তাদের সমর্থকরা বিক্ষোভ করছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা সীমান্তে হামলার দেড় বছর পূর্তিতে এই প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা গাজায় আটক থাকা ৫৯ জিম্মির ছবি প্রদর্শন করেন।

৭ অক্টোবর নিহত তামির আদারের ভাতিজা এরেজ আদার প্রধানমন্ত্রীকে একসঙ্গে সব জিম্মি মুক্তির চুক্তি করতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেঁচে থাকাদের পুনর্বাসন ও মৃতদের সমাহিত করার জন্য সবার ফিরে আসা প্রয়োজন, যাতে আমরা এখানে একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে পারি।

জিম্মি এদান আলেকজান্ডারের দাদি ভার্দা বেন বারুক নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে রয়েছেন। সেখানে বসেই সবার মুক্তির চুক্তি শেষ করুন। আমরা এটাই আশা করছি।

জিম্মি অবস্থায় নিহত কারমেল গ্যাটের চাচাতো ভাই গিল ডিকম্যান সতর্ক করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প- দয়া করুন। দেড় বছর পার হয়েছে। এখন কেবল একটি শব্দই বলার আছে- যথেষ্ট হয়েছে, এই দুঃস্বপ্নের অবসান হোক। তিনি বলেন, অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে বেঁচে থাকা জিম্মিদের জীবন ঝুঁকিতে থাকবে।

নেতানিয়াহুর পাশাপাশি মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের বাসার বাইরেও একই ধরনের বিক্ষোভ চলছে। গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। জিম্মি মুক্তির আলোচনা চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। নেতানিয়াহু ও তার সরকারের সমালোচকরা অভিযোগ করছেন, রাজনৈতিক অনীহার কারণে জিম্মি মুক্তির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ইসরায়েলে জিম্মিদের পরিবারের বিক্ষোভ। ছবি : সংগৃহীত

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে যেভাবে গড়ে উঠল ইসরায়েল রাষ্ট্র by আসজাদুল কিবরিয়া

ফিলিস্তিনের গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে নির্বিচার ও নৃশংস হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এতে এ পর্যন্ত প্রায় ৫১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন যাঁদের বেশির ভাগ শিশু ও নারী। ১৯৪৮ সালে যেভাবে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, এবারও ঠিক সেভাবে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চলছে। সেই সময়কার পরিস্থিতি পাঠকের কাছে তুলে ধরতে প্রথম আলোতে ২০২৩ সালের ১৫ মে প্রকাশিত লেখাটি আবার প্রকাশ করা হল।

‘প্রতিশ্রুত ভূমি।’ ‘মনোনীত সম্প্রদায়।’ ‘ভূমিহীন মানুষের জন্য মনুষ্যহীন ভূমি।’ পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত শক্তিশালী তিনটি বয়ান, যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে ইহুদিদের জন্য ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জোরপূর্বক আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র স্থাপনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ হিব্রু বাইবেল বা তানাখ অনুসারে নবী আব্রাহামকে ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশধরদের জন্য একটি ভূখণ্ড নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যা বংশপরম্পরায় তাদের পুণ্যভূমি হিসেবেই থাকবে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে আজ যেখানে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল, সেটি হলো সেই ভূমি, যদিও বাইবেলের আরেক বিবরণ অনুসারে এটি মিসর থেকে ইউফ্রেতিস নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত। আবার যাদের জন্য ঈশ্বর এই ভূমির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারা হলো ইহুদি সম্প্রদায়, যারা এই বাইবেল অনুসারেই, মহাপ্রভুর মনোনীত সম্প্রদায় বা জাতি (চুজেন পিপল)। ঈশ্বরের সঙ্গে ইহুদিদের রয়েছে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক, একমাত্র তাদের সৌভাগ্য হয়েছে ঈশ্বরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার। সে কারণেই তারা জগতের শ্রেষ্ঠতম জাতি, যারা সব অ-ইহুদিকে নিম্ন জাতের বলে মনে করে।

যেহেতু ইহুদি শুধু একটি ধর্মাদর্শই নয়, একই সঙ্গে একটি সম্প্রদায় বা জাতি, তাই অন্য ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে ব্যতিক্রম। ইহুদিরা একই সঙ্গে ধর্ম, নৃতত্ত্ব ও সংস্কৃতি দ্বারা একসূত্রে গাঁথা। যদিও ইহুদিদের মতো খ্রিষ্টান ও মুসলমানরাও একেশ্বরবাদী ইব্রাহিমীয় ধর্মাদর্শের অনুসারী। অর্থাৎ বিশ্বের এই তিনটি প্রধান ধর্মের আদি পিতা একজনই—আব্রাহাম {বা পবিত্র কোরআন মতে হজরত ইব্রাহিম (আ.)}।

ইহুদিরা হিব্রু সম্প্রদায় হিসেবেও পরিচিত, যেহেতু তাদের ভাষাও হিব্রু। ঈশ্বরের পছন্দের জাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষেরা ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমিতেই বসবাস করবে। তারা সেটা করেও আসছিল মুসা (আ.) তাদের মিসর থেকে সিনাই উপত্যকা হয়ে কেনানে ফিরিয়ে আনার পর থেকে (খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১৪০০ সাল)। তবে দুই হাজার বছরের বেশি আগে (৭০ খ্রিষ্টাব্দে) রোমানরা জেরুজালেমে ইহুদিদের দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস করে তাদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেয়।

হিব্রুরা স্বভূমি থেকে উৎখাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে। নির্বাসিত হয়েও তাদের মন পড়ে থাকে সেই প্রাচীন ভূমিতে, যেখানে রয়েছে জেরুজালেম ও ইহুদিদের দ্বিতীয় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, আছে প্রাচীন জুদিয়া ও সামারিয়া, আছে জায়ন পাহাড়। তারা অবশ্য এটাও বিশ্বাস করত যে একসময় এই প্রতিশ্রুত ভূমিতে তারা বা তাদের উত্তরসূরিরা ফিরে আসবে। সুতরাং আজকে যে ইহুদিরা ইসরায়েলে বসবাস করছে, তারা দুই হাজার বছর আগে এই ভূমি থেকে বিতাড়িত হিব্রু সম্প্রদায়েরই বংশধর।

স্বভূমি থেকে উৎখাত ও দুই হাজার বছর পর স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে এই ভূমিতে ফিরে আসার মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ে তাহলে কারা ছিল এই ভূমিতে? নাকি এই ভূমি ছিল মানববসতিহীন? এর উত্তর দেওয়া হয়েছে এভাবে: যারা পরবর্তী সময়ে থেকেছে, তারা আসলে সেই ভূমির মানুষ নয়, এমনকি কোনো মানবসম্প্রদায়ও নয়! আর তাই সেই ভূমি হলো মনুষ্যহীন ভূমি। এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করতেই বলা হলো, ফিলিস্তিনি বলে কিছু নেই, ফিলিস্তিনি জনগণ বা সম্প্রদায় বলে কিছু নেই। বরং সেই মনুষ্যহীন ভূমির প্রকৃত দাবিদার হলো হিব্রু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। সুতরাং তারা যখন আবার এসে এখানে বসবাস শুরু করেছে, তখনই এই ভূমি সঠিক মালিকের কাছে ফিরে গেছে। তার আগপর্যন্ত যারা থেকেছে এবং তা হাজার বছরের বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় তারা, মানে ফিলিস্তিনিরা, বিশেষত মুসলমানরা উৎখাতযোগ্য এবং যথাযথভাবেই তা করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে।

ইহুদিদের চূড়ান্ত দখলদারত্ব সূচনার মাধ্যমে আজ থেকে ৭৫ বছর (এখন ৭৭ বছর প্রায়) আগে ফিলিস্তিনিদের ওপর অনিঃশেষ এক বিপর্যয় নেমে আসে। সেটা ১৯৪৮ সালের ১৪ মে। ফিলিস্তিনের ভূমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরপরই সাত লাখের বেশি ফিলিস্তিনিকে নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত ও রাষ্ট্রহীন হওয়ার বিপর্যয় শুরু হয়। আরবিতে বিপর্যয়কে বলা হয় ‘নাকবা’। ফিলিস্তিনিরা প্রতিবছর তাই ১৫ মে তারিখটিকে ‘আল-নাকবা’ দিবস হিসেবে পালন করে। আর এ বছরই প্রথম জাতিসংঘে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি জনগণের অবিসংবাদিত অধিকার আদায়বিষয়ক জাতিসংঘ কমিটি (ইউএনসিআইআরপিপি) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে দিনব্যাপী নানা আয়োজনে নাকবা দিবস পালনের জন্য ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ পরিষদ অনুমোদন দেয়।

অবশ্য ফিলিস্তিনিরা ৭৫ বছর ধরে এই নাকবা দিবস পালন করছে না। বরং ১৯৯৮ সালে ইসরায়েল যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘটা করে উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নেয়, তখন ফিলিস্তিনিদের কিংবদন্তি নেতা ও ফিলিস্তিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরাও তাঁদের নাকবার ৫০ বছর পূর্তি পালন করবেন। তিনি ইসরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের পরের দিনটিকে নাকবা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন।

প্রথমবার নাকবা দিবস পালনের আগের দিন সন্ধ্যায় ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন যে ফিলিস্তিনিদের ট্র্যাজেডির জন্য ইসরায়েল দায়ী নয়; বরং দায়ী তাদের নেতৃত্ব। তবে ফিলিস্তিনিদের জন্য কী পরিহাস যে সিকি শতাব্দী পরে নাকবা দিবস পালনের সময় সেই নেতানিয়াহুই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী, যাকে ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎস বিভিন্ন সময় বর্ণবাদী ও জাতিবিদ্বেষী হিসেবে অভিহিত করেছে।

ফিলিস্তিনের নাকবা মানে ইসরায়েলের স্বাধীনতা। আর ইসরায়েলিরা প্রতিবছর হিব্রু অষ্টম মাস আইয়ারের পাঁচ তারিখে দিবসটি উদ্‌যাপন করে, যাকে হিব্রুতে বলে ইয়োম হা-য়াতযামুত। হিজরির মতো অনেকটা চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় প্রতিবছর গ্রেগরীয় বা আন্তর্জাতিক বর্ষপঞ্জির ১৪ মে তারিখের সঙ্গে কখনো মিল আর কখনো আগে-পরে গিয়ে অমিল হয়।

জায়নবাদ থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্র

অস্ট্রিয়ার ইহুদি সাংবাদিক, নাট্যকার ও রাজনীতিক থিওডর হারজেলের উদ্যোগে ১৮৯৭ সালের আগস্ট মাসে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেল নগরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব জায়নবাদী সম্মেলন (ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট কংগ্রেস)। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে শুধু ইহুদিদের জন্য একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা গৃহীত হয়। প্রসঙ্গত, ১৮৯৫ সালে অস্ট্রীয় লেখক নাথান বারনবুম ‘জায়নইজম’ বা জায়নবাদ শব্দটি প্রবর্তন করেন।
মোটাদাগে এই মতবাদ হলো ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার এবং সেই ভূমির ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার জাতীয় আন্দোলন। যেহেতু ইহুদি হওয়ার কারণেই বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে অন্য জাতিগোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও ধর্মের মানুষ দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা, সেহেতু একটি পর্যায়ে তারা উপলব্ধি করে যে একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি তথা দেশ না হলে তাদের ওপর এই নির্যাতন বন্ধ হবে না। জায়নবাদী আন্দোলন এ থেকেই উৎসারিত। আর জায়নবাদীরা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ভূমিতেই ইহুদিদের নিজস্ব দেশ গঠনের কোনো বিকল্প নেই বলে দাবি তোলে। শুরু হয় নানামুখী তৎপরতা।
-----১৯৪৮
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে তেল আবিবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে একে স্বীকৃতি দেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর অনিঃশেষ এক বিপর্যয় নেমে আসে।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিপর্যস্ত-বিধ্বস্ত ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে বাঁটোয়ারা করে নিতে ১৯২০ সালে ইতালির সান রেমো শহরে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী এবং জাপান, বেলজিয়াম ও গ্রিস সরকারের প্রতিনিধিরা একত্র হন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে সিরিয়া ফরাসি ম্যান্ডেটে আর ফিলিস্তিন ও মেসোপটেমিয়া বা ইরাক ব্রিটেনের ম্যান্ডেটে শাসিত হবে। ১৯২২ সালে লিগ অব নেশনসের মাধ্যমে এই ম্যান্ডেট অনুমোদন করা হয়। এদিকে ১৯২৩ সালে তুরস্কে আনুষ্ঠানিকভাবে ওসমানীয় খেলাফত বা সালতানাত অবলুপ্ত হয়ে যায় কামাল আতার্তুকের হাত দিয়ে।

ফিলিস্তিনকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে নেওয়ার পেছনে ছিল এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার বেলফোর জায়নবাদী নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে ৬৭ শব্দের এক পত্রে জানান, ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি গড়ে তোলার জন্য যা করা প্রয়োজন, তার সবই করবে। এটি ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসেবে পরিচিত, যাকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম বড় নিয়ামক হিসেবে দেখা হয়।

সান রেমো সম্মেলনে বেলফোর ঘোষণা কার্যকর করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হলো ব্রিটিশ সরকারকে। সেটাকে অন্য মিত্রশক্তিগুলো সমর্থন দিল। এর পর থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইউরোপ থেকে ইহুদিরা দলে দলে পাড়ি জমাতে থাকে। তারা সেখানে জমিজমাও কিনতে থাকে। প্রথম দিকে ফিলিস্তিনিরা এটায় গুরুত্ব দেয়নি। তা ছাড়া তখনো সেখানে মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরও বসবাস ছিল।

এই তিন ধর্মের মানুষ হাজার বছরের বেশি সময় ধরেই এই ভূমিতে বসবাস করে আসছিল। এই ইহুদিরা ছিল বেশির ভাগই প্রাচ্যের ইহুদি, যারা মিজরাহি হিসেবে পরিচিত। আর ইউরোপ থেকে আসতে থাকে আশকেনাজি ইহুদিরা, যারা আবার ইহুদিদের মধ্যে নিজেদের সবচেয়ে উচ্চবর্ণের বলে দাবি করে থাকে। ১৮৮২ ও ১৯০৪ সালে রাশিয়া ও ইউরোপ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইহুদির অভিবাসন ঘটে ওসমানীয় ফিলিস্তিনে। অভিবাসী ইহুদিরা স্থানীয় আরবদের জমিজমা কিনতে থাকে। আরবরা বেশির ভাগই ছিল মুসলমান।

ইউরোপীয় ইহুদিদের স্রোত বাড়তে থাকায় একপর্যায়ে স্থানীয় ফিলিস্তিনি-আরবদের সঙ্গে তাদের বৈরিতা-সংঘাত দেখা দেয়। ১৯৩৩ সালে ফিলিস্তিনিরা বড় আকারে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু করলে ব্রিটিশ সরকার কঠোরভাবে তা দমন করে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের নানামুখী পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড চলতেই থাকে।

তারই অংশ হিসেবে ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার নিযুক্ত পিল কমিশন ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করে ৭৫ শতাংশ আরব ও বাকিটা ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের সুপারিশ করে। তবে তিন ধর্মের পবিত্র স্থান জেরুজালেমকে জাফাসহ ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ও আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাখার কথাও বলা হয়। আরব ও ইহুদি—দুই পক্ষই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ছয় বছরব্যাপী এই যুদ্ধ চলাকালে জার্মান নেতা হিটলারের নেতৃত্বে ইউরোপে ইহুদি নিধনযজ্ঞ (হলোকাস্ট) সারা দুনিয়ায় বিভীষিকা তৈরি করে। কমবেশি ৬০ লাখ ইহুদি নাৎসি বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। প্রাণ বাঁচাতে সে সময় অনেক ইহুদি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে থাকে, অনেকে আসে ফিলিস্তিনে, যদিও ব্রিটিশ সরকার ইহুদি অভিবাসন সীমিত করে দিয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে জায়নবাদী সম্মেলনে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা গৃহীত হয়।

১৯৪৫ সালে জার্মানি-জাপান অক্ষশক্তির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। ইউরোপ ইহুদি নিধনের বিভীষিকার তরতাজা স্মৃতি সারা বিশ্বের সমবেদনা কেড়ে নেয়। ফলে ইহুদিদের রাষ্ট্র স্থাপনের কাজ অনেকটা সহজ হয়ে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে শাসিত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৫৬ শতাংশ ইহুদি ও ৪৩ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় ৩৩-১৩ ভোটে (চীনসহ ১০ দেশ ভোটদানে বিরত ও থাইল্যান্ড অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিল)। এতে জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নগরের মর্যাদা দেওয়া হয়। ইহুদিরা এটা মেনে নিলেও আরবরা এতে আপত্তি জানায়। আরব লিগ নেতৃত্ব প্রশ্ন তোলেন, হলোকাস্টের অপরাধের শাস্তি কেন আরবদের পেতে হবে?

এদিকে জায়নবাদীরা ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার ছক কেটে ফেলে। প্ল্যান দালেত বা প্ল্যান ডি নামে এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিলেন ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ন। প্ল্যান ডি ছিল হত্যা-ধর্ষণ-লুটতরাজ-সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি আরবদের নিজ ভূমি থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মহাপরিকল্পনা। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে হাগানাহ, স্টার্ন গ্যাংসহ ইসরায়েলি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো তা বাস্তবায়নে পুরোদমে নেমে যায়। স্থানীয় আরবরা ইহুদিদের হামলা ও হত্যার শিকার হতে থাকে। ফলে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিঃস্ব অবস্থায় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি প্রাণ রক্ষায় ছুটে পালাতে থাকে। মূলত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত সাত লাখ ফিলিস্তিনি আশপাশের আরব দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। কিছু কিছু স্থানে ইহুদিরাও আক্রান্ত হয় ও মারা পড়ে।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট বা শাসন শেষ হলে বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে একে স্বীকৃতি দেন। আনুষ্ঠানিকভাবে আল-নাকবা বা মহাবিপর্যয় নেমে আসে ফিলিস্তিনিদের ওপর।

আরব দেশগুলোর ব্যর্থতা

ফিলিস্তিনিদের এই মহাবিপর্যয় সৃষ্টির জন্য আরব দেশগুলোর দুর্বলতা ও ব্যর্থতাও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। অথচ আরব ও মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত ফিলিস্তিনের ইতিহাসে আরব দেশগুলোর অবস্থান নির্মোহভাবে তুলে ধরা হয়নি। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে আরব লিগের সদস্য মিসর, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ইরাকের সেনাবাহিনী ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং সদ্য ঘোষিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। প্রথম দিকে আরবরা কিছুটা সুবিধা করতে পারলেও দ্রুতই তারা পিছু হটতে থাকে। সামরিক শক্তির দিক থেকে আরব দেশগুলো ছিল দুর্বল, যদিও সংখ্যায় প্রথম দিকে তারা ছিল বেশি। তবে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া ও রক্ষার প্রত্যয়ে প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত ইহুদি যোদ্ধাদের সামনে তারা ছিল দিগ্‌ভ্রান্ত ও লক্ষ্যহীন। তদুপরি নিজেদের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। ফলে ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে আরব দেশগুলো যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
------১৯৪৭
১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে শাসিত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৫৬ শতাংশ ইহুদি ও ৪৩ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।


জর্ডানের বাদশাহ প্রথম আবদুল্লাহ আগ্রহী ছিলেন ফিলিস্তিনের ভূমিকে সংযুক্ত করে নিয়ে বৃহত্তর হাশেমীয় সিরিয়া গঠনের। সিরিয়াবাসী ইসরায়েলের চেয়ে জর্ডান নিয়ে বেশি ভীত থাকায় তাদের সেনারা ফিলিস্তিনে হাজির হয়েছিল মূলত পশ্চিম তীর জর্ডানের দখলে যাওয়া থেকে রুখতে। মিসরও হাশেমীয় জর্ডানের পরিকল্পনা ঠেকাতে চেয়েছিল। ফলে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন হয়ে ওঠে এসব আরব দেশের উচ্চাভিলাষ ও ভীতির এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা ও ভবিষ্যতের চিন্তা আসলে পেছনে পড়ে যায়।

১৯৪৭ সালেই জায়নবাদী নেতা গোল্ডা মেয়ার (ইসরায়েলের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী ও এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী) গোপনে ট্রান্সজর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এতে বাদশাহ পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীর পাওয়ার বিনিময়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকতে সম্মত হন। প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে জর্ডান তাই পশ্চিম তীর দখলে নিতে সক্ষম হয়। ওদিকে মিসর দখল করে নেয় গাজা উপত্যকা। তবে দুই দশকের মধ্যেই ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে গাজা ও পশ্চিম তীর যথাক্রমে মিসর ও জর্ডানের হাতছাড়া হয়ে যায়।

ইসরায়েলের এগিয়ে যাওয়া

গত ৭৫ বছরে চারটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিটিতে আরবরা পরাজিত হয়েছে আর ফিলিস্তিনিরা নিজ ভূমে ক্রমে কোণঠাসা হয়েছে। তবে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল সাড়ে সাত দশক ধরে বিকশিত হয়ে চলেছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি, যার আছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার, আছে বিশ্বের দুর্ধর্ষতম গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ।

উচ্চ প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে নেতৃস্থানীয় দেশটির প্রতি ১০ হাজারে ১৩৫ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। এটি পরিণত হয়েছে ‘স্টার্টআপ নেশনে’। নিপুণভাবে পানি ছিটানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে সেই ’৫০-এর দশকে। ঊষর মরুর বুকে ব্যাপক সবুজায়ন ঘটিয়েছে। অধিবাসীদের গড় আয়ু বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। ইসরায়েলের অর্জন আধুনিক বিশ্বের এক বিরাট বিস্ময় বললেও অত্যুক্তি হয় না, যার পেছনে পশ্চিমা বিশ্বের অকুণ্ঠ সমর্থনও ভূমিকা রেখেছে।

একই সঙ্গে এই সমর্থনের জোরে, বিশেষত যুগের পর যুগ যুক্তরাষ্ট্রের একচোখা মদদে ফিলিস্তিনিদের ভূমি-পানি-গাছপালা-ঘরবাড়ি—সবই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ফিলিস্তিনিদের একাংশ জর্ডান সীমান্তঘেঁষা পশ্চিম তীরে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত, আরেকাংশ মিসরের সিনাই সীমান্তঘেঁষা গাজায় ইসরায়েল আরোপিত অবরোধের মধ্যে জীবন যাপন করছে। ফিলিস্তিনিরা নিয়মিতই ইসরায়েলি হামলা-নির্যাতন-হত্যা-দখলদারির শিকার হচ্ছে। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বও একাধারে দ্বিধাবিভক্ত, দিশাহীন ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়েছেন। আরব দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থবহ ও কার্যকর সহযোগিতা অতীতেও মেলেনি, আজও মিলছে না। ফিলিস্তিনিরা টিকে আছে নিজস্ব প্রতিরোধ-সংগ্রাম আর কিছু সীমিত বৈশ্বিক সহায়তায়। শেষ হচ্ছে না তাদের নাকবার।

[তথ্যসূত্র: ১. ইসরায়েল অ্যান্ড প্যালেস্টাইন: দ্য কমপ্লিট স্টোরি—ইয়ান ক্যারল (২০১৮ কিন্ডল ই-বুক সংস্করণ ২. দৈনিক হারেৎসের বিভিন্ন সংখ্যা।]

* আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক
    asjadulk@gmail.com

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা জেরুজালেম কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটা নির্ধারণ
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা জেরুজালেম কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটা নির্ধারণ। ছবি: এএফপি

‘সীমাহীন যুদ্ধ’ ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় জর্জরিত অবরুদ্ধ গাজাবাসী

গাজার মানবিক সহায়তা বন্ধ রয়েছে প্রায় দুই মাস। যার ফলে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে উপত্যকাটির লাখ লাখ মানুষ। মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়ে নিরীহ গাজাবাসীর ওপর নির্মম হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। এতে ২০ লাখের বেশি গাজাবাসী চরম দুর্দশার মধ্যে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। দিন দিন খাদ্য সংকট আরও তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘসহ গাজায় কাজ করা বিভিন্ন এনজিও সংস্থা। খাবারের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানিরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে অমানবিক জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁবুতে আশ্রয় নেয়া গাজার নারী ও শিশুরা। এ খবর দিয়ে অনলাইন সিএনএন বলছে, গত ১৮ মাস ধরে গাজাবাসীর ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে মার্চে তা আরও তীব্র হয়েছে। এক মাস ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর পুনরায় বর্বরতা শুরু করার ফলে গাজাবাসীর ওপর ইসরাইলের বর্বরতা বেড়েছে কয়েক গুণ। গত মাসে হামলার আগে গাজায় খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার আদেশ দেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চুক্তি ভঙ্গ করে নতুন নতুন শর্ত আরোপ করেন তিনি। এর দায় দিয়েছে হামাসের ওপর। তেল আবিব বলেছে, হামাস মানবিক সহায়তার চালান আটকে দিয়ে তা অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। তবে হামাসের তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহে গাজার দুই লাখ ৮০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যাদের গাজা ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। গাজা সিটির মুখপাত্র আসেম আল নাবীহ সিএনএনকে বলেন, সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি উচ্ছেদ আদেশের পর গাজাবাসীকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে। তাদেরকে প্রধান সড়ক, পাবলিক পার্কেও থাকতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি ময়লার স্তূপের কাছেও ঘেঁষতে দেয়া হচ্ছে না। সর্বশেষ উচ্ছেদ আদেশের আগে গাজায় মাত্র ৪০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ছিল। যার পরিমাণ এখন আরও কমেছে। বর্তমানে পুরো গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে

গত কয়েক সপ্তাহে গাজায় এক লাখ ৭৫ হাজার টন বর্জ্য জমেছে বলে অনুমান করেছেন আল নাবীহ। ইসরাইলের দ্বিতীয় ধাপের হামলা সীমাহীন যুদ্ধে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের ফিলিস্তিন অংশের সমন্বয়ক জনাথন হোয়াইটঅল। বলেছেন, ক্ষুধা ও অপুষ্টির নতুন ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে গাজার মানুষ। কেননা পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আর এটা গত দুই মাস যাবৎ চলছে। আটা বিতরণও এখন বন্ধ করে  দেয়া হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, রান্নার গ্যাস ও আটার অভাবে গাজা জুড়ে ২৫টির মতো ভর্তুকি বেকারি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে খাদ্য সংকট তীব্র হয়েছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, গাজায় প্রবেশের জন্য প্রায় ৮৯ হাজার টন খাবার অপেক্ষা করছে। এদিকে গাজার অভ্যন্তরে তীব্র সংকটের ফলে খাদ্য মূল্য নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহের তুলনায় এক ব্যাগ গমের আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৪৫০ শতাংশ। জাতিসংঘের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পানির ক্ষেত্রে এখনো গুরুতর সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে গাজার মানুষ। উপত্যকাটির দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার প্রতিদিন ছয় লিটার পানিও পাচ্ছে না। সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির পর পানি সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হলেও বর্তমানে তা পুনরায় ধসে পড়েছে। একদিকে  বোমার শেল আরেকদিকে সীমান্তে খাদ্য সহায়তা আটকে দিয়ে গাজাবাসীকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে ইসরাইল। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বহু মানবাধিকার সংস্থা।

mzamin

গাজায় চলছে লোমহর্ষক গণহত্যা

গাজায় গণহত্যা বন্ধে বিশ্বের সরকারগুলো কিছুই করছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাইজেরিয়ার লেখিকা চিমামান্দা নগোজি আদিচি। বিশ্ববাসীর এমন অসাড়তায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তিনি। বলেছেন, গাজায় সামষ্টিক শাস্তি দেয়া হচ্ছে। এটা অমানবিক। একটি দেশের একটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের কারণে কেউ পুরো একটি  জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। গাজায় হত্যাযজ্ঞ কি মাত্রায় পৌঁছেছে তা তার কথায় স্পষ্ট। প্রতিদিন সেখানে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে ‘যুদ্ধাপরাধী’ ইসরাইল ও এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২৪ ঘণ্টায় তারা গাজায় আরও কমপক্ষে ৪৬ জনকে হত্যা করেছে। শনিবার দিবাগত রাতভর গাজা শহরে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ২১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে এক ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন এক পিতা ও তার কন্যা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ব জুড়ে আজ সোমবার সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করেছে প্যালেস্টাইনিয়ান ন্যাশনাল ও ইসলামিক ফোর্সেস। এক বিবৃতিতে গাজার ভয়াবহতাকে বিশ্ববাসীর কাছে জোর দিয়ে তুলে ধরার জন্য এই ধর্মঘট আহ্বানের কথা জানানো হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। দাবি জানানো হয়েছে গাজায় অপরাধের জন্য, ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘন করায় ইসরাইলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে।

পুরোপুরি একটি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করা হয়েছে রাফাকে। ইসরাইলি বাহিনী গাজার বাকি অংশকে এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, গাজার নিরীহ জনসাধারণের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে লোমহর্ষক গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরাইল। অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আবাসিক ভবনকে পর্যায়ক্রমিকভাবে এবং ব্যাপকভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে ইসরাইল। তারা এই শহরটিকে জনমানবহীন করে দিতে চায়। কয়েকদিনে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করেছেন ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রাফায় শতকরা কমপক্ষে ৯০ ভাগ বাড়িঘর ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইল। এর পরিমাণ কমপক্ষে ২০ হাজার ভবন। তাতে আছে কমপক্ষে ৫০ হাজার হাউজিং ইউনিট। ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে পানির ২৪টি কূপের মধ্যে ২২টি, শতকরা ৮৫ ভাগ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, আটটি স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১২টি মেডিকেল সেন্টার পুরোপুরি সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে গাজায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার একটি নতুন ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ। ওদিকে ইসরাইলি বাহিনীর সুরক্ষায় রোববার সকালে আল আকসা মসজিদে প্রবেশ করেছে কয়েক ডজন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী।

সামনের দিনগুলোতে এটা নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ, সামনেই ইহুদিদের ‘পাসওভার’ অনুষ্ঠান। তবে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের এই মসজিদে প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরাইল। ওদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, পোলিও টিকা প্রবেশ করতেও দিচ্ছে না ইসরাইল। এর ফলে গাজার ৬ লাখ দুই হাজার শিশু স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। জটিলভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়তে পারে। তাদেরকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন টিকা। ওদিকে বৃটিশ পার্লামেন্টের দু’জন এমপিকে ইসরাইলে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এটাকে বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছেন তারা। ওই দুই বৃটিশ এমপি লেবার পার্টির আবতিসাম মোহামেদ এবং ইয়াং ইয়াং এক্সে যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, বৃটিশ এমপিদেরকে দখলীকৃত পশ্চিমতীরে প্রবেশে বাধা দিয়েছে ইসরাইল। অপ্রত্যাশিত এমন আচরণে আমরা বিস্মিত। দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সরাসরি পরিস্থিতি দেখা পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক এমপি’র মধ্যে আমরা দু’জন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ নিয়ে পার্লামেন্টে কথা বলেছেন তারা। তারা বলেছেন, টার্গেটে পড়বো এই ভয়কে অতিক্রম করে হাউস অব কমন্সে আমাদেরকে অবাধে সত্য বলা উচিত। ওদিকে আজ সোমবার মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের সঙ্গে কায়রোতে মিটিং করার কথা জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর। গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির আমন্ত্রণে হতে যাচ্ছে এই বৈঠক।

‘গাজা গণহত্যা বন্ধে সরকারগুলো কিছুই করছে না’

গাজায় গণহত্যা বন্ধে বিশ্বের সরকারগুলো কিছুই করছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাইজেরিয়ার লেখিকা চিমামান্দা নগোজি আদিচি। বিশ্ববাসীর এমন অসাড়তায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তিনি। বলেছেন, গাজায় সামষ্টিক শাস্তি দেয়া হচ্ছে। এটা অমানবিক। একটি দেশের একটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের কারণে কেউ পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। গাজায় হত্যাযজ্ঞ কি মাত্রায় পৌঁছেছে তা তার কথায় স্পষ্ট। প্রতিদিন সেখানে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে ‘যুদ্ধাপরাধী’ ইসরাইল ও এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২৪ ঘন্টায় তারা গাজায় আরও কমপক্ষে ৪৬ জনকে হত্যা করেছে। শনিবার দিবাগত রাতভর গাজা শহরে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ২১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে এক ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন এক পিতা ও তার কন্যা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে আজ সোমবার সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করেছে প্যালেস্টাইনিয়ান ন্যাশনাল ও ইসলামিক ফোর্সেস। এক বিবৃতিতে গাজার ভয়াবহতাকে বিশ্ববাসীর কাছে জোর দিয়ে তুলে ধরার জন্য এই ধর্মঘট আহ্বানের কথা জানানো হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। দাবি জানানো হয়েছে গাজায় অপরাধের জন্য, ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘন করায় ইসরাইলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে। পুরোপুরি একটি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করা হয়েছে রাফাকে। ইসরাইলি বাহিনী গাজার বাকি অংশকে এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, গাজার নিরীহ জনসাধারণের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে লোমহর্ষক গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরাইল। অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আবাসিক ভবনকে পর্যায়ক্রমিকভাবে এবং ব্যাপকভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে ইসরাইল। তারা এই শহরটিকে জনমানবহীন করে দিতে চায়। কয়েক দিনে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করেছেন ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রাফায় শতকরা কমপক্ষে ৯০ ভাগ বাড়িঘর ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইল। এর পরিমাণ কমপক্ষে ২০ হাজার ভবন। তাতে আছে কমপক্ষে ৫০ হাজার হাউজিং ইউনিট। ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে পনির ২৪টি কূপের মধ্যে ২২টি, শতকরা ৮৫ ভাগ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, আটটি স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১২টি মেডিকেল সেন্টার পুরোপুরি সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে গাজায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার একটি নতুন ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ। ওদিকে ইসরাইলি বাহিনীর সুরক্ষায় রোববার সকালে আল আকসা মসজিদে প্রবেশ করেছে কয়েক ডজন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী। সামনের দিনগুলোতে এটা নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ, সামনেই ইহুদিদের ‘পাসওভার’ অনুষ্ঠান। তবে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের এই মসজিদে প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরাইল। ওদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, পোলিও টীকা প্রবেশ করতেও দিচ্ছে না ইসরাইল। এর ফলে গাজার ৬ লাখ দুই হাজার শিশু স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। জটিলভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়তে পারে। তাদেরকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন টীকা। ওদিকে বৃটিশ পার্লামেন্টের দু’জন এমপিকে ইসরাইলে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এটাকে বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছেন তারা। ওই দুই বৃটিশ এমপি লেবার পার্টির আবতিসাম মোহামেদ এবং ইয়াং ইয়াং এক্সে যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, বৃটিশ এমপিদেরকে দখলীকৃত পশ্চিমতীরে প্রবেশে বাধা দিয়েছে ইসরাইল। অপ্রত্যাশিত এমন আচরণে আমরা বিস্মিত। দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সরাসরি পরিস্থিতি দেখা পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক এমপির মধ্যে আমরা দু’জন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ নিয়ে পার্লামেন্টে কথা বলেছেন তারা। তারা বলেছেন, টার্গেটে পড়বো এই ভয়কে অতিক্রম করে হাউস অব কমন্সে আমাদেরকে অবাধে সত্য বলা উচিত। ওদিকে আজ সোমবার মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের সঙ্গে কায়রোতে মিটিং করার কথা জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহর। গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির আমন্ত্রণে হতে যাচ্ছে এই বৈঠক। 

mzamin

গাজায় ইসরাইলি বর্বর আগ্রাসন: বিক্ষোভে উত্তাল দেশ

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি বর্বর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভে উত্তাল ছিল দেশ। বিশ্বব্যাপী ‘নো ওয়ার্ক নো স্কুল’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে গতকাল সকাল থেকেই রাস্তায় নেমে আসেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। মিছিল-স্লোগানে প্রতিবাদ জানান জায়নবাদী ইসরাইলের গণহত্যা ও বর্বর আগ্রাসনের। কাজ বন্ধ রেখে সড়কে নেমে প্রতিবাদী মিছিলে শামিল হন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিবাদ বিক্ষোভে রাজধানী কার্যত মিছিলের নগরী হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয় ঢাকাসহ সারা দেশে।

রাজধানীতে বায়তুল মোকাররম, পল্টন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, মহাখালী, মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডা, গুলশান, বারিধারাসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিক্ষোভকারীর উপস্থিতি দেখা গেছে। যেখান থেকে দাবি উঠেছে অবিলম্বে আগ্রাসন বন্ধের। যে দাবিতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাজপথে স্লোগান দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন। মিছিল-সমাবেশ থেকে নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানোর পাশাপাশি ইসরাইলি পণ্য বয়কটেরও ডাক দেয়া হয়েছে। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়েছে- ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন। ফরম দ্য রিভার টু দ্য সী, প্যালেস্টাইন উইল বি ফ্রি। এদিন বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। ইসরাইলি পণ্য রাখা বা দেশটিকে সমর্থন দেয়ার অভিযোগে ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। এ ছাড়াও ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কাছাকাছি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে, আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের প্রস্তাব এবং শান্তি, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের জন্য ফিলিস্তিনিদের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানে পৌঁছাতে কাজ করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।

ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘নো ওয়ার্ক, নো স্কুল’ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের পাশাপাশি রাজপথে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তারা। বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় প্রতিবাদ সমাবেশ। এ ছাড়াও ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, কানাডিয়ান, নর্থ সাউথসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও ছিলেন রাজপথে। যোগ দিয়েছিলেন মেডিকেল, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরাও। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন স্লোগানে মুখরিত ছিল চারদিক। এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অংশগ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন ঢাকার বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও। বিক্ষোভ থেকে শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। একইসঙ্গে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর নীরব ভূমিকারও সমালোচনা করা হয় বিক্ষোভ থেকে। বক্তারা বলেন, ইসরাইলি সহিংসতা বন্ধ করে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানে পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলে, গাজায় চলমান ইসরাইলি আগ্রাসন, দখলদারিত্ব এবং নির্মম গণহত্যা যেন গোটা বিশ্বের সচেতন মানুষকে বাকরুদ্ধ করে তুলেছে। ইসরাইলের খুনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রক্তপিপাসু নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি মুসলমান এবং মানুষ হিসেবে সকলের কর্তব্য। এদিন দুপুরে মানববন্ধন করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে যোগ দেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরাও। জেরুজালেম ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বৈধ ও ন্যায্য বলে জানান তারা।

এদিকে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কাছাকাছি কয়েকটি স্থানে একাধিক বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। বেলা পৌনে ২টায় মার্কিন দূতাবাসের উল্টো দিকের পদচারী সেতুর সামনে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একদল শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গুলশানে মার্কিন দূতাবাস এলাকায় মিছিল বের করেন একদল তরুণ। মার্কিন দূতাবাসের সামনের সড়কে অবস্থান নেন তারা। এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিছিলটির সামনে ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। সকাল থেকে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ, ঢাকার শিক্ষার্থীরা মার্কিন দূতাবাসের সামনের সড়কে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভকে ঘিরে দূতাবাস এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিতে এলাকাটিতে কঠোর অবস্থানে ছিলেন সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, এসবি, সিআইডি, পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয় গুলশান এলাকায় থাকা অন্য দূতাবাসগুলোতেও।

ইসরাইলি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিন্দা-বিবৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের হাইকমিশনারকে তলব করে জবাবদিহি চাওয়ার দাবিতে আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ঢাবি শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফরম ‘আজাদ ফিলিস্তিন’। একইসঙ্গে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা দাহ করাসহ মার্কিন দূতাবাস অভিমুখে মার্চ করবে বলে জানান প্ল্যাটফরমের সংগঠক ঢাবি’র বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচি অনুযায়ী মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে পদযাত্রা শুরু হবে। ইসরাইলের বর্বরোচিত গণহত্যার প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) বিক্ষোভ মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে শুরু হয়ে এ মিছিল বাহাদুর শাহ পার্ক ঘুরে রফিক ভবনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। রাজধানী জুড়ে সরব ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সোমবার রাজপথে নেমে আসেন। সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা মধ্যবাড্ডা ও উত্তর বাড্ডা এলাকায় সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন। আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা রামপুরা ব্রিজসহ আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। একই এলাকায় প্রতিবাদ জানান কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও। বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ), ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (আইইউবি), আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এআইইউবি) ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও কর্মকর্তারা।

বিক্ষোভে উত্তাল বায়তুল মোকাররম:
মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়েছিলেন বায়তুল মোকাররম এলাকায়। ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের নির্মম হামলার প্রতিবাদ ও গাজাবাসীর ডাকা বিশ্বব্যাপী ধর্মঘটের সমর্থনে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে সমবেত হন মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এদিন বাদ জোহর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের ডাকে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। বিকালে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামী। মিছিলটি পল্টন হয়ে শান্তিনগরে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। মিছিলপূর্ব সমাবেশে দক্ষিণ জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল বক্তব্য রাখেন।

বিকালে রাজধানীর মহাখালী চৌরাস্তায় কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে ইসরাইলি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা ও উপর্যুপরি বিমান হামলার প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে বর্বরোচিত হামলা বন্ধের দাবিতে’ ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিছিলটি মহাখালী ওভারব্রিজ থেকে শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মগবাজার হাতিরঝিল মোড়ে গিয়ে সংক্ষিপ্ত পথ সভার মধ্যদিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, জায়ানবাদী ইসরাইলিরা সকল প্রকার আইন-কানুন, নীতি- নৈতিকতা ও যুদ্ধ বিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে উপর্যুপরি বিমান হামলার মাধ্যমে পুরো গাজা নগরীতে ধ্বংসের শহর ও মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। তারা প্রতিনিয়ত মানবতাবিরোধী অপরাধ করে প্রমাণ করেছে। ইসরাইল কোনো রাষ্ট্র নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের অবৈধ ও সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। তাদের এ বর্বরতা ও নির্মমতা ইতিহাসের সকল নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে। বাদ আসর হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তরের উদ্যোগে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিছিলটি সাভার মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে সাভার বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। বেলা সাড়ে ৩টায় রাজধানীর মিরপুর-১০ গোল চত্বরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর উত্তরের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন নেতাকর্মীরা। মিছিল-১০ নম্বর গোল চত্বর থেকে শুরু হয়ে ছয় নম্বর হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিরপুর-১ নম্বরে গিয়ে শেষ হয়।

গাজার প্রতি বৈশ্বিক সংহতির অংশ হিসেবে রাজধানীতে খেলাফত মজলিস ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিন খেলাফত মজলিস ঢাকা মহানগর উত্তর, নারায়ণগঞ্জ মহানগর, সিলেট মহানগরসহ সারা দেশের বিভিন্ন শাখায় সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে সংহতি সমাবেশ করে বাংলাদেশ লেবার পার্টি। বিকাল ৫টায় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহেল মিঞার নেতৃত্বে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল বের করা হয়। গাজায় গণহত্যা বন্ধ করার দাবিতে’ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মিছিলটি হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনে থেকে শুরু করে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা জাহিদ হাসান, ভেরিফিকেশন সেলের মাহফুজ, আরিফ, সাবরিনা আফরোজ, শাহমিন আহম্মেদসহ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। রামপুরায় ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন বলে স্লোগান তুলে বিক্ষোভ করেছে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে রামপুরায় অবস্থিত ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে এ বিক্ষোভ শুরু হয়। এ সময় তারা আমেরিকাসহ ইসরাইলের বিপক্ষে নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন।

শাহবাগে এনসিপি’র সমাবেশ: গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন ও ভারতের বিতর্কিত ওয়াক্‌ফ বিলের বিরুদ্ধে এনসিপি’র ঢাকা মহানগর কমিটি শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। বাংলাদেশে যেমন ‘জুলাই বিপ্লব’ ঘটে গেছে, তেমনি ফিলিস্তিনের মাটিতেও একদিন ‘জুলাই’ আসবে বলে আশা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন।

গোয়েন্দা তৎপরতার জন্য ইসরাইল থেকে আওয়ামী লীগের আমলে যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ বলে সমাবেশে উল্লেখ করেন আখতার হোসেন। এ ধরনের প্রতিটি চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানান তিনি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশকে উচ্চকণ্ঠ হতে সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। সমাবেশে এনসিপি নেতারা বক্তব্য রাখেন।

mzamin
গাজায় হামলা এবং গণহত্যার প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররমে মুসল্লিদের বিক্ষোভ- ছবি: জীবন আহমেদ

ইসরাইলি গণহত্যার প্রতিবাদে দেশে দেশে বিক্ষোভ

গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভে উত্তাল সারা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরাইলি বর্বরতার বিরুদ্ধে গতকাল রাস্তায় নামে লাখ লাখ মানুষ। তারা একই সুরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এই বর্বরতায় ক্ষোভ, ঘৃণা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা জানিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বাংলাদেশের বিক্ষোভকারীরা সহ বিভিন্ন দেশ ইসরাইলি পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন। বিক্ষোভ হয়েছে অনেক মুসলিম দেশে। আল জাজিরা ও বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে প্রতিবাদের খবর। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে অংশ নেয় হাজার হাজার মানুষ। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শহরেও প্রতিবাদ জানিয়েছে তারা। বিক্ষোভে তিন শতাধিক অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ অংশ নিয়ে তাদের সমর্থন জানিয়েছে। এ সপ্তাহের শুরু থেকেই দেশটিতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা ৩ নম্বর স্ট্রিট এনডব্লিউ ও পেনসিলভেনিয়া এভিনিউ এনডব্লিউয়ের চৌরাস্তায় সমবেত হয়। পরে তারা ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) সদর দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মিছিল করে। এ সময় ফিলিস্তিনি কর্মী মাহমুদ খলিল ও তুর্কি শিক্ষার্থী রুমেইসা ওজতুর্কসহ আটক ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদদের মুক্তির আহ্বান জানায়। মরক্কোতেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। হাজারো বিক্ষোভকারী মরক্কোর রাস্তায় নেমে আসেন। গাজায় ইসরাইলি যুদ্ধের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কয়েক মাসের মধ্যে মরক্কোয় সবচেয়ে বড় বিক্ষোভগুলোর একটি ছিল এটি। দেশটির রাজধানী রাবাত-এর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ঢল নামে। ইসরাইলি পতাকা পদদলিত করেন তারা। গাজা পুনর্গঠনের জন্য উপত্যকাটি থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যার তীব্র বিরোধিতা করেছে আরব দেশগুলো। তারা এই পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছে। আরব বিশ্ব ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিকল্পনাকে জাতিগত নির্মূল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

গাজায় চলমান গণহত্যার প্রতিবাদে সোমবার ফিলিস্তিন জুড়ে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট আহ্বানকারীদের আশা- আন্তর্জাতিক সমর্থক এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে  সোচ্চার প্ল্যাটফরমগুলোও সোমবার এই কর্মসূচি পালন করবে। ফিলিস্তিনের জাতীয় ও ইসলামী শক্তিগুলো রোববার এক বিবৃতিতে বৈশ্বিক এই ধর্মঘটের ডাক দেয়। বিবৃতিতে বৈশ্বিক ধর্মঘট সফল করার আহ্বান জানানো হয়। এতে প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর, ইসরাইলি বাহিনীর ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ ও অপরাধ তুলে ধরার ওপর জোর দেয়া হয়। ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনের নিরীহ সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের হত্যা করছে। ইসরাইলি হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি নিজেদের ঘর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়, ইসরাইলের আগ্রাসন বন্ধে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ঐক্যবদ্ধ করা জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলকে বিচারের মুখোমুখি করতে এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলের হামলায় কমপক্ষে ৫০ হাজার ৫২৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর বেশির ভাগই নিষ্পাপ শিশু ও নারী। আহত হয়েছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩৮ জন। বিশ্বের সব মুসলিম ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আহ্বান জানিয়ে একটি বিরল ধর্মীয় ফরমান বা ফতোয়া জারি করেছেন বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম। অবরুদ্ধ গাজার বাসিন্দাদের ওপর ১৭ মাস ধরে চলা নৃশংস ও নির্বিচার ইসরাইলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা এ ফতোয়া জারি করেন। ইউসুফ আল-কারযাভীর নেতৃত্বে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলারসের (আইইউএমএস) মহাসচিব আলী আল-কারদাঘি সব মুসলিম দেশকে এই গণহত্যা এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে অবিলম্বে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৫ দফা-সংবলিত ওই ফরমানে আলী আর কারদাঘি বলেন, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে আরব ও ইসলামিক সরকারগুলো ব্যর্থ হলে তা ইসলামিক আইন অনুযায়ী আমাদের নিপীড়িত ফিলিস্তিনি ভাইদের বিরুদ্ধে বড় অপরাধ বলে গণ্য হবে।

কারদাঘি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সম্মানিত ধর্মীয় নেতাদের একজন। তার ফরমান বা ফতোয়াগুলো বিশ্বের ১৭০ কোটি সুন্নি মুসলমানের কাছে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব বহন করে। ফতোয়া হলো ইসলামিক আইনি আদেশ। সাধারণত কোরআন ও হাদিসের আলোকে একজন ধর্মীয়  নেতা এ আদেশ জারি করেন। কারদাঘি বলেন, গাজার মুসলমানদের নির্মূলে কাজ করা কাফের শত্রুকে (ইসরাইল) সমর্থন করা নিষিদ্ধ, তা সে যে ধরনের সমর্থনই হোক না  কেন। তিনি আরও বলেন, এদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা অথবা স্থল, জল বা আকাশপথে সুয়েজ খাল, বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালির মতো আন্তর্জাতিক জলসীমা বা বন্দরের মাধ্যমে তাদের পরিবহনকে সহায়তা করা নিষিদ্ধ। এই ধর্মীয়  নেতা বলেন, গাজায় আমাদের ভাইদের সহায়তার লক্ষ্যে দখলদার শত্রুদের স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে অবরুদ্ধ করার দাবি জানিয়ে কমিটি (আইইউএমএস) একটি ফতোয়া জারি করেছে।

কারদাঘির বিবৃতির প্রতি অন্য আরও ১৪ জন মুসলিম পণ্ডিত সমর্থন জানিয়েছেন। ওই বিবৃতিতে বিশ্বের সব মুসলিম দেশের প্রতি তাদের সঙ্গে ইসরাইলের শান্তিচুক্তিগুলো পর্যালোচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তিনি আগ্রাসন বন্ধে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে দেয়া সব সামরিক সরবরাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে যেসব পণ্য ‘দ্বৈত ব্যবহার’ হয় তারও ইসরাইলে যাওয়ার ওপর কঠোরতা আরোপ করেছে দেশটি। এসব পণ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রেজ্যুলুশন মেনে চলছে কিনা তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। পার্লামেন্টে এক চিঠিতে সরকার বলেছে, সাধারণ রপ্তানি লাইসেন্স ব্যবহার করে এসব আর রপ্তানি করা যাবে না। ১৩ই মার্চ গাজায় ১৫ জন ত্রাণকর্মীকে হত্যা করে ইসরাইল। তাদেরকে বহনকারী এম্বুলেন্স বহরে হামলা চালিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ চালায় ইসরাইল। এই অভিযোগকে হতাশাজনক অভিহিত করেছে জার্মানি। তারা এ জন্য জরুরি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ক্রিস্টিয়ান ওয়াগনার বলেন, ইসরাইলি সেনারা যেসব কাজ করছে তা নিয়ে বড় রকমের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে তদন্ত এবং জড়িতদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। ওদিকে সোমবার সকাল থেকে কমপক্ষে ৩৭ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। 

mzamin

ওয়াকফ বিল পাসের বিরুদ্ধে উত্তাল মণিপুর, বিজেপি নেতার বাড়িতে আগুন

ওয়াকফ সংশোধনী আইনকে সমর্থন করার অভিযোগে ভারতের মণিপুরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক নেতার বাড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষুদ্ধ জনতা। সূত্র জানিয়েছে রোববার সন্ধ্যায় বিজেপি সংখ্যালঘু মোর্চার মণিপুর সভাপতি আসকার আলীর বাড়িতে আগুন দিয়েছে তারা। ওই দিন থৌবাল জেলার লিলং এলকার ১০২ নং হাইওয়েতে আয়োজিত এক সমাবেশে কয়েক হাজার মানুষ জমায়েত হন এবং ওয়াকফ বিল পাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। এ খবর দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়লে পরে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হন এবং পরিবেশ শান্ত করেন। এছাড়া সেখানে এখনও আধাসামরিক ও অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারায় ওই সমাবেশটি আলিয়া মাদ্রাসা এলাকার লিলং হাওরেইবি পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিল। এখানে বলে রাখা ভালো লিলং একটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা।

আসরের নামাজের পর ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন স্থানীয় মুসলমানরা। তারা বিলটির বিরোধীতা করে সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এসময় তারা বিভিন্ন ফেস্টুন প্রদর্শন করেন। এই ঘটনার পর সোমবার ভোর পর্যন্ত অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতেও কড়া নিরাপত্তায় ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। স্থানীয় মুসলিম নেতারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লড়াইকে খর্ব করার অভিযোগ করেছেন। বলেছেন, ভারতে মুসলমানদের মনোবল ভেঙে দিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লেলিয়ে দিয়েছে বিজেপি সরকার।
কিছু কিছু যায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। থৌবালের ইরোং চেসাবাতে, সকালে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারী একটি সমাবেশে বাধা দিলে ওই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে এখনও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

সমাজকর্মী এবং মুসলিম নেতা সাকির আহমেদ সমাবেশে অংশগ্রহণ করে বলেন, ওয়াকফ সংশোধনী বিল ভারতীয় সংবিধানের নীতিমালার পরিপন্থী, কারণ এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও ওয়াকফ বিল পাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

mzamin