Monday, October 14, 2019

ক্যানসারে এক বছরে দেড় লাখের বেশি আক্রান্ত মৃত্যু এক লাখ ৮ হাজার

গত বছর বাংলাদেশে দেড় লাখের বেশি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন এক লাখ ৮ হাজার মানুষ। খাদ্যনালী, ফুসফুস ও মুখমন্ডলের ক্যানসারে পুরুষরা আর স্তন ও জরায়ু মুখের ক্যানসারে নারীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। জীবনযাত্রা, পরিবেশ দূষণ, নিরাপদ ও সুষম খাদ্যের অভাব, অনৈতিক জীবনযাপনের কারণে দেশে ক্যানসার ঝুঁকি বাড়ছে। গতকাল আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেলের অনকোলজি বিভাগের উদ্যোগে জিনজিয়ান রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব ক্যানসার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের প্রতিবেদন তুলে ধরে একথা বলেন। আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেলের অনকোলজি বিভাগ প্রতিবারের মতো এবারও অক্টোবর মাসব্যাপী ক্যানসার সচেতনতা মাস উদযাপন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে হাসপাতালটির ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. এহ্‌তেশামুল হক লিখিত বক্তব্যে বলেন, ক্যানসার শুধু একটি মরণ ও ঘাতক ব্যাধিই নয়; এটি মানবজাতির জন্য এক ভয়ংকর অভিশাপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বে ক্যানসারে নতুন আক্রান্তদের সংখ্যা এক কোটি ৮১ লাখ।
মারা গেছেন আনুমানিক ৯৬ লাখ মানুষ। যা ২০১৭ সালের তুলনায় বেশি। প্রতি ৫ জনের একজন পুরুষ এবং প্রতি ৬ জনের একজন নারী তাদের জীবনে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্তদের মধ্যে মারা যাচ্ছেন পুরুষদের ৮ জনে একজন এবং নারীদের ১১ জনে একজন। তিনি আরো বলেন, দেশে ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হলেও বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি ও আক্রান্ত বাড়ছে। রোগীরা শেষ পর্যায়ে ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের কাছে আসেন, যে অবস্থায় আসেন তখন চিকিৎসা দিয়েও ক্যানসার সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। এর প্রধান কারণ অজ্ঞতা, অসাবধানতা ও কুসংস্কার। ক্যানসার প্রতিরোধে রোগীকে শুরুতে চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে। যথা সময়ে ক্যানসার নির্ণয় করতে হবে। নিয়মিত ক্যানসার স্ক্রিনিং-এর বিকল্প নেই। হতে হবে সচেতন। ক্যানসারের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জীবনযাত্রা, পরিবেশ দূষণ, নিরাপদ ও সুষম খাদ্যের অভাব, অনৈতিক জীবনযাপনের কারণে ক্যানসার ঝুঁকি বাড়ছে। ডা. মো. এহ্‌তেশামুল হক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক দুর্বল। রোগী বাড়ছে। সংকট তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসার কেন্দ্র থাকা দরকার ১৭০টি। কিন্তু আছে মাত্র ১৭টি। এক প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোস্তাক হোসেন তুহিন বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় বাংলাদেশে জাতীয় নীতিমালা না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। বিভ্রান্তির কারণে রোগীরাও ভুগছেন। আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনকলোজি বিভাগ ২০১৮ সালে ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালান এক হাজার ৮২ জনের উপর। এর মধ্যে পুরুষ ৩৫৬ জন এবং নারী ৭২৬ জন। তাদের মধ্যে ৮৫ জন পজেটিভ ধরা পড়ে। অর্থাৎ ৮ শতাংশ ক্যানসার হিসেবে শনাক্ত হন। ক্যানসার হিসেবে ৫৫ জন নারী ও ৩০ জন পুরুষ শনাক্ত হন। গবেষণায় দেখতে পান ৪৩ শতাংশ স্তন ক্যানসার, ১১ শতাংশ জরায়ু, ১৬ শতাংশ লাং, ১৬ শতাংশ মুখমন্ডল, পাকস্থলীতে ৬ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ কলোরেক্টল ক্যানসারে ভুগছেন। ২৬ থেকে ৩৫ এবং ৩৬ থেকে ৪৫ বয়সের নারী বেশি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনকলোজি বিভাগ ২০১৫ সাল থেকে এই বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ক্যানসার নির্ণয় করে আসছে। হাসপাতালটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা সপ্তাহব্যাপী ফ্রি স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে থাকে। ৩ বছরে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে স্ক্রিনিং করে দেখতে পান গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষরা বেশি ক্যানসারে আক্রান্ত। হাসপাতালটি এ বছর আজ থেকে ৩০শে অক্টোবর পর্যন্ত নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে সপ্তাহব্যাপী স্ক্রিনিং ও সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চলবে। ২০শে অক্টোবর পর্যন্ত বর্হিবিভাগে ফ্রি ক্যানসার স্ক্রিনিং ও স্বল্পমূল্যে ক্যানসার চিকিৎসা দেয়া হবে। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ডা. ফরিদ আহমেদ, ডা. মোস্তাফিজ, ডা. জাকিয়া সুলতানা, ডা. আলী নাফিজা, ডা. নূর-ই-আম্বিয়া প্রমুখ।

ইরান ও সৌদি আরবকে জোড়া লাগাতে পারবেন ইমরান!

তীব্র বৈরি দুই দেশ সৌদি আরব ও ইরান। তাদের মধ্যে বার বার সৃষ্টি হচ্ছে যুদ্ধাবস্থা। এমন দুটি দেশকে আলোচনার এক টেবিলে বসানো এবং তাদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে ভাই-ভাই সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এরই মধ্যে তিনি ১৩ই অক্টোবর ইরান সফর করেছেন। সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। মঙ্গলবার এই ইতিবাচক সাড়া নিয়ে তার যাওয়ার কথা সৌদি আরবে। যদি তিনি এই দুই দেশের বরফ শীতল সম্পর্ককে গলাতে পারেন তাহলে ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিকে পরিণত হওয়া ইমরান খান কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় একটি সফলতা লাভ করবেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।
এই প্রচেষ্টাকে মধ্যস্থতা বলতে চান না ইমরান খান। তিনি একে ইংরেজিতে বলছেন ‘ফ্যাসিলেটেটর’। যার অর্থ কঠিন কিছুকে সহজকারী। দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে তিনি এই কাজ করতে চান। রোববার ইরান সফরে সে দেশের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন ইমরান খান। এ সময় তিনি বলেন, অতীতে সৌদি আরব ও ইরানকে আপ্যায়িত করেছে পাকিস্তান। আবারও তারা ভ্রাতৃত্বসুলভ এই দুটি দেশকে তাদের কঠোর মতপার্থক্য দূর করে সম্পর্ক সহজ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে তার দেশ। তিনি আরো বলেন, ইস্যুটি জটিল। তবে আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই জটিলতা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। তবে এই উদ্যোগ একান্তই পাকিস্তানের নিজস্ব।
ইমরান খান আরো পরিষ্কার করে বলেন, পাকিস্তানের ভূমিকা মেডিয়েটর বা মধ্যস্থতাকারী নয়। পাকিস্তানের ভূমিকা হবে ফ্যাসিলেটেটর বা সম্পর্ক সহজকারীর। কারণ, প্রত্যেকেরই উচিত তার অঞ্চলে সংঘাত চলতে না দেয়া। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনাকে অত্যন্ত উৎসাহপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন। এই উৎসাহ নিয়ে মঙ্গলবার যাচ্ছেন সৌদি আরবে। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভ্রাতৃত্বসুলভ গভীর সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের। এ দুটি দেশ পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাদেরকে প্রয়োজনের সময় সহায়তা করেছে পাকিস্তান। ইমরান খান বলেন, এ জন্য কারো উচিত হবে না ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত প্রত্যাশা করা। এই দুটি দেশের মধ্যকার সংঘাত শুধু পুরো অঞ্চলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে এমন নয়। একই সঙ্গে তা ক্ষতিগ্রস্ত করবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও। এতে বিশ্বে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়বে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে। তেল কিনতে অধিক অর্থ ব্যয়ের কারণে খরচ বাড়বে।
ইমরান খান আরো বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবার দৃষ্টিভঙ্গি একই। শুধু স্বার্থান্বেষী মহল যুদ্ধ বা সংঘাত চাইতে পারে। নিউ ইয়র্ক সফরকালে ইমরান খানের সঙ্গে আলোচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। তখনই তিনি তাকে ইরান বিষয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানান। এই মিশন নিয়ে তিনি ইরান সফর করেছেন। জবাবে ইরান কি বলেছে, তাও ব্যাখ্যা করেছেন ইমরান খান। তিনি বলেছেন, ইরানের নেতা তাকে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপের জন্য যতটা সহজ হওয়া প্রয়োজন ইরান তা হবে। যাতে ইরানের ওপর অবরোধ প্রত্যাহার হয় এবং পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইমরান খান বলেছেন, তার ইরান সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো এই অঞ্চলে যেকোনো যুদ্ধ এড়ানো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানে ৭০ হাজার মানুষ হতাহত হয়েছেন।

চীনকে বিভক্ত করার চেষ্টা করলে হাড় গুঁড়ো করে দেবো: -শি জিনপিংয়ের হুঁশিয়ারি

ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি বলেছেন, চীনকে বিভক্ত করার কোনো রকম চেষ্টা করা হলে তাদের শরীর আর হাড় ভেঙে গুঁড়ো করে দেয়া হবে। রোববার নেপালে রাষ্ট্রীয় সফরকালে তিনি এমন মন্তব্য করেছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি খবর দিয়েছে। কোন অঞ্চলকে চীন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা তিনি উল্লেখ করেন নি। তবে এটা ধরে নেয়া যায় যে, তিনি হংকংয়ের দিকে ইঙ্গিত করে ওই সতর্কতা দিয়েছেন। হংকংয়ে কয়েক মাস ধরে চলছে বেইজিংবিরোধী বিক্ষোভ। রোববার সেখানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় গণপরিবহন বিষয়ক স্টেশন ও বেইজিংপন্থি দোকানপাটে ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে।
এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
রোববার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে শি জিনপিংয়ের ওই হুঁশিয়ারির কথা বলা হয়। এতে আরো বলা হয়, চীনকে বিভক্ত করার বিষয়ে যদি বাইরের কোনো শক্তি সমর্থন দেয় তাহলে তাদেরকে চীনের মানুষ শুধুই বিভ্রান্তকারী হিসেবে দেখবে। উল্লেখ্য, চার মাস ধরে চলছে হংকংয়ের বিক্ষোভ। শুরু থেকেই এই অস্থিরতা উস্কে দেয়ার জন্য বিদেশী শক্তিকে দায়ী করছে চীন। অভিযোগ করছে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন।
হংকং বিক্ষোভ নিয়ে শি জিনপিং এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো মন্তব্য করেন নি। ফলে তার এই সর্বশেষ মন্তব্যকে বিরল এবং খুবই কঠোর সতর্কতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বেইজিং বলে এসেছে, তারা বিশ্বাস করে হংকংয়ে যে সমস্যা তা মোকাবিলায় সক্ষম সেখানকার পুলিশ। তবে বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা অন্যখানে। তারা মনে করে, সহিংস এই বিক্ষোভ দমনে সেনা পাঠাতে পারে বেইজিং। এমনটা হবে বলে মনে হয় না। কারণ, এমনটা হলে গুরুতর পরিণতি ঘটতে পারে। খুব কম সংখ্যক মানুষই মনে করেন চীন ১৯৮৯ সালের গণতন্ত্রপন্থিদের ওপর দমনপীড়নের পুনরাবৃত্তি করতে পারে। ওই সময় বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারে গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকারীদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন চালায় চীন। এতে কয়েক শত মানুষ নিহত হয়েছেন।
হংকং চীনের অংশ হলেও সেখানে রয়েছে উচ্চ মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন। এর আছে নিজস্ব আইন ও বিচার ব্যবস্থা। মূল চীনে মানুষের যেটুকু স্বাধীনতা আছে তার চেয়ে হংকংয়ে বসবাসকারীদের স্বাধীনতা বেশি। কিন্তু এখানে বেইজিংবিরোধিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল কিছু সময় ধরে। জুনে শুরু হয় সর্বশেষ দফার বিক্ষোভ। প্রস্তাবিত একটি নতুন আইনকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভের সূচনা। ওই আইন অনুযায়ী, যেকোনো সন্দেহভাজনকে চীনের কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল, যাতে চীনে তার বিচার হয়। তবে বহু মানুষ এই আইন নিয়ে আতঙ্কিত। তারা মনে করেন, এই আইন দিয়ে হংকংয়ে চীনের সমালোচকদের ওপর নিপীড়ন চালাবে চীন সরকার। তা ছাড়া সমালোচকরা বলেন, এমন আইনের ফলে হংকংয়ের বিচার বিভাগের যে স্বাধীনতা আছে তা খর্ব হবে। বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত হংকং কর্তৃপক্ষ ওই আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। তারপরও বিক্ষোভ চলছে। তারা এখন ৫ দফা দাবি দিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র, পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে তদন্ত করা।

ইমাম রেজার (আ) মাজারে এসে মুসলমান হলেন রুশ যুবক

রাশিয়ার এক যুবক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র পবিত্র বংশধারার সদস্য ইমাম রেজা (আ)'র মাজারে এসে মুসলমান হয়েছেন।

জেইসন নামের এই যুবক এই প্রথমবার ইমাম রেজার (আ) পবিত্র মাজার জিয়ারত করেছেন। তিনি গত বৃহস্পতিবার ওই পবিত্র মাজারে এসে বিদেশি পর্যটক সংক্রান্ত দপ্তরে হাজির হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা ও পড়াশোনা এবং এ বিষয়ে মুসলমানদের সঙ্গে সংলাপের প্রেক্ষাপটে তিনি ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন বলে জানান।

দেশ-বিদেশ থেকে প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন জিয়ারতকারী ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাশহাদ শহরে অবস্থিত এই মাজার জিয়ারত করতে আসেন।

রুশ যুবক জেইসন জানান, কয়েক মাস ধরে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে পড়াশুনা করে বুঝতে পেরেছি যে ইসলাম ধর্মে উত্থাপিত বিষয়গুলো মানুষের মানবীয় প্রকৃতির কাছাকাছি এবং ইসলাম ধর্মের মধ্যে আমার বেশিরভাগ প্রশ্নের জবাব পেয়েছি।

মাজার প্রশাসনের বিদেশী পর্যটক সংক্রান্ত বিভাগ এই নও-মুসলিমকে রুশ ভাষায় অনূদিত পবিত্র কুরআনের একটি কপি ও কয়েকটি সাংস্কৃতিক সামগ্রী উপহার দিয়েছে।

এ নিয়ে গত ছয় মাসে ইমাম রেজা (আ)'র পবিত্র মাজারে এসে ইরানের ভেতর ও বিদেশ থেকে আসা দশ জন অমুসলমান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে রুশ নাগরিক ছাড়াও ছিলেন থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইডেন, ভারত, কানাডা, আফগানিস্তান, জাপান ও পর্তুগালের নাগরিক।

কি বার্তা দিলেন শি-মোদি!

ভিতরে ভিতরে তাদের তীব্র প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। তা সত্ত্বেও চীন ও ভারত উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক একটি ‘মেকানিজম’ গড়ে তুলতে একমত হয়েছে। এর উদ্দেশ হবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবাখাত দেখাশোনা। দোকলাম নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পর ইয়াংজি নদীর তীরে উহান শহরে যে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে সেই উদ্দীপনা নিয়ে চেন্নাইয়ে আবার বৈঠক হয়েছে তাদের। এর নাম দেয়া হয়েছে চেন্নাই কানেক্ট। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শেষ করেছেন তারা। এ সময়ে উভয় পক্ষ নিশ্চিত করেছে তারা একে অন্যের অগ্রাধিকারগুলো আরো গভীরভাবে দেখবেন, যেসব বোটলনেক বা সরু সীমান্ত আছে এবং তা নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনাকর সম্পর্ক বিদ্যামান তা সমাধানের চেষ্টা করবেন তারা।
এই দুই নেতার মধ্যে দুই দফায় প্রায় ৬ ঘন্টা সরাসরি আলোচনা হয়। এ সময় ছিল বাড়তি প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনাও। এ আলোচনা ফলপ্রসূ ইঙ্গিত দিয়ে টুইট করেছেন ভারতে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত সান ওয়েইডং। 
চেন্নাইয়ের মামাল্লাপুরাম জেলেদের এলাকা বলে পরিচিত। সেই এলাকায় শনিবার সকালে উপস্থিত হন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি এদিন সকালে মোদির সঙ্গে ৫০ মিনিট একান্তে কথা বলেন। শনিবার রাতেও অব্যাহত ছিল আলোচনা। সমুদ্রপাড়ে তারা দু’জনে একান্তে পায়চারী করেন।  ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে পরে বলা হয়, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক দীর্ঘমেয়াদী ও কৌশলগত বিভিন্ন ইস্যুতে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে গভীর মত বিনিময় করেছেন দুই নেতা।
অভিন্ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে সন্ত্রাস। বিবৃতিতে বলা হয়, যেহেতু এ দুটি দেশ অনেক বিশাল এবং বৈচিত্রে ভরা, তাই সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও সমর্থন দেয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো শক্তিশালী ভূমিকা নিশ্চিত করতে অব্যাহতভাবে কাজ করবে দুই দেশ। এটা করা হবে সারা বিশ্বে। এক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকবে না।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ও চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হু চুনহুয়ার নেতৃত্বে ভারত ও চীন গড়ে তুলবে একটি উচ্চ পর্যায়ের মেকানিজম। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে বলেছেন, এই মেকানিজম দেখাশোনা করবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবাখাত। দোকলাম পরবর্তী উহান সামিটের ফলে মোদি ও শি জিনপিং নিজ নিজ দেশের সেনাবাহিনীকে শান্তি বজায় রাখার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। আর এবার তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করতে এবং বাণিজ্যে ফারাক মোকাবিলায় সম্মত হয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অধীনে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে সামনে এগিয়ে নিতে অধিক থেকে অধিক হারে গুরুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতা কাঁধে কাঁধ রেখে পালন করছে চীন ও ভারত। জাতীয় পুনরুজ্জীবন অর্জনে পরবর্তী কয়েকটি বছর ভারত ও চীনের কাছে হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। একই সঙ্গে তা গুরুত্বপূর্ণ হবে চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ককে উন্নত করার ক্ষেত্রেও।
চীনের বিবৃতি অনুযায়ী, শি জিনপিং পরামর্শ দিয়েছেন যে, একে অন্যের উন্নয়ন এবং পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা বৃদ্ধির জন্য চীন ও ভারতকে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে হবে।  উভয় দেশের মধ্যে ফারাকের বিষয়টি যথার্থভাবে লক্ষ্য করতে হবে। এর ফলে যাতে দুই দেশের সার্বিক সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, যথাযথ সময়ে এবং উপযোগী আচরণের মাধ্যমে কৌশলগত যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে দুই দেশকে। সীমান্ত ইস্যুতে সুষ্ঠু ও যৌক্তিক সমাধান হতে হবে, যা উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। বিবৃতি অনুযায়ী, উভয় পক্ষের মূল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যু, সামরিক নিরাপত্তা বিনিময় ও সহযোগিতা সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক ও বাণিজিক সংলাপ বিষয়ক মেকানিজম প্রতিষ্ঠার ফলে অর্থনৈতিক উন্নতি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন শি জিনপিং। তিনি মনে করেন এতে চীনে ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক ও প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে পারে। তাদেরকে চীন স্বাগত জানায়। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক বিনিময়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকতার বিষয়ে সহযোগিতা শক্তিশালী করার কথাও বলা হয়েছে।

ছাত্রলীগের দৈন্যদশা দেখার আগে আমার মৃত্যু হলো না কেন : -সাক্ষাৎকারে নূরে আলম সিদ্দিকীby কাজল ঘোষ

ক্ষোভ, হতাশা আর আক্ষেপ নূরে আলম সিদ্দিকীর মুখে। আবরার ফাহাদ হত্যা তাকে পীড়া দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাইতো তিনি আফসোস করে বলেন, ছাত্রলীগের এ দৈন্যদশা দেখার আগে আমার মৃত্যু হলো না কেন? কোন পাপে এ দৃশ্য দেখার জন্য এখনো বেঁচে আছি জানি না। মানবজমিন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, খুন, রাহাজানির মহামারিতে দেশ আজ ছেয়ে গেছে। যদি আবরার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হয় তবে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। তিনি আবরার হত্যাকারীদের শুধু গ্রেপ্তার নয়, দোষীদের দ্রুত বিচার ও ফায়ারিং স্কোয়াডে দেয়ার দাবিও জানান। সাক্ষাৎকারে বর্তমান পরিস্থিতি, সরকারের দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযান নিয়েও কথা বলেন তিনি।
বর্তমান ছাত্রলীগ কেমন দেখছেন?
ছাত্রলীগের বেহাল অবস্থা, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা অবলোকন করে হৃদয়ের যে দগ্ধীভূত চিত্র তা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই।
তবে এটুকু বলতে পারি, আজকের ছাত্রলীগের দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্ক আমাদের সময়ে নিকৃষ্টতম কর্মীটির ক্ষেত্রেও তা কল্পনার আবর্তের মধ্যেই ছিল না। আজকের ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের দিকে যখন তাকাই তখন দীপ্তিহীন আগুনের নির্দয় দহনে সমস্ত অনুভূতি দগ্ধিভূত হতে থাকে। সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই যেন আজকের ছাত্রলীগের মৌলিক আদর্শে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এর জন্য দায়ী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি। তারা ছাত্রলীগকে আদর্শের একটি প্রতীক হিসেবে দেখতে চান না বরং তাদের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে লেজুড়বৃত্তিতে লিপ্ত রাখতে চান। ওই রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানে স্বাধীনতা পূর্বকালের মতো ছাত্রলীগ আদর্শের সূর্যস্নাত মূল্যবোধে উদ্ভাসিত শিক্ষাদীক্ষায় নিমগ্ন এবং জাতির প্রয়োজনে যথাসময়ে নিজেদের সবটুকু নিয়ে রুখে দাঁড়ানোর গতি থাকলে তাদের দিয়ে লাঠিয়াল বাহিনীর কর্মকাণ্ড করা যাবে না। শুধু দলের নয়, নিজের আঁচলে বাঁধা আদর্শবিবর্জিত একটি নিছক তোষামোদির সংগঠন করা যাবে না। আমরা যখন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম তখন বঙ্গবন্ধুকে আমাদের আদর্শের প্রতীক হিসেবে মনে করতাম কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ছাত্রলীগকে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ভাবতাম না। বরং সাংগঠনিক রাজনীতি করার কারণে বঙ্গবন্ধু যে কথাটি সরাসরি বলতে পারতেন না সেই কথাটি বর্জনিনাদে নিঘোষিত হতো ছাত্রলীগের উদাত্ত কণ্ঠে। আজকে ছাত্রলীগ দলীয় প্রধানের এতটাই আজ্ঞাবহ যে, তার সমালোচনা ছাত্রলীগ নেতৃত্বের একটি বিরাট অংশের এতটাই জ্বালা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে যে, আবরারের মতো মেধাবী ছাত্রকে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সমালোচনার অপরাধে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হাতে জীবন দিতে হয়। কাকে বুঝাবো? কি করে বুঝাবো? ছাত্রলীগ একটি আদর্শের প্রতিষ্ঠান; সন্ত্রাসী সংগঠন নয়।
নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, আজকের ছাত্রলীগের নেতৃত্ব এবং কর্মীবৃন্দকে অতীত ইতিহাসকে জানতে তো হবেই বরং তা বিশ্লেষণ করে আপন চরিত্রকে আত্মিকভাবে বিনির্মাণ করতে হবে। আজকের ছাত্রলীগের মধ্যে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, খুন, মারামারি, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সন্ত্রাসের যে স্বকরুণ দৃপ্ত প্রতিভাত হচ্ছে এটা ক্ষমতাসীন চক্র খুবই সুপরিকল্পিতভাবে সূক্ষ্ণ কৌশলে তৈরি করেছে।
সংবাদ সম্মেলন হতে শুরু করে সর্বত্র প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতিতে কিছু কিছু আশাপ্রদ কথা ওঠে এসেছে। সেখানেও প্রান্তিক জনতার কথা হলো খালেদ, জি কে শামীম, সম্রাটের মতো চুনোপুঁটি বা মধ্যম ধাঁচের নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অতি দ্রুত দৃশ্যমান কঠিন শাস্তি দিতে হবে।
প্রশ্ন ওঠেছে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির যৌক্তিকতা নিয়ে?
আবরার হত্যার পর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সর্বজনীনভাবে একটা কথা উঠে এসেছে আজকের ছাত্র রাজনীতি যখন টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে তখন ছাত্রসংগঠনের প্রয়োজন আছে কিনা? আমি বলবো, একদিন আমারও মনে হতো, ডাকসু নির্বাচন হলে ছাত্রলীগসহ ছাত্র নেতৃত্বের সাধারণ ছাত্রদের কাছে একটি দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। যার প্রেক্ষিতে ছাত্র রাজনীতি দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা পাবে। ডাকসু নির্বাচন হলো বটে। নির্বাচিত নেতৃত্বটি কিছুদিন নর্তন কর্দন করলেন পরে ধূমকেতুর মতো মিইয়ে গেলেন। ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদকই ডাকসুর জিএস। কোন নৈতিকতায় এটি সম্ভব তা বোধগম্য নয়। শেখ হাসিনা তাকে ছাত্রলীগের পদ থেকে বহিষ্কার করেছেন কিন্তু ডাকসুর জিএস পদ থেকে বহিষ্কার করেননি কেন- সেটি সবার জিজ্ঞাসা। যদি প্রশ্ন ওঠে, ছাত্র রাজনীতি অব্যাহত থাকবে না নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে। সহজভাবে উত্তরটা দিতে চাই- ছাত্র রাজনীতি থাকবে ছাত্রদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য; তাদের মেধা বিকাশের জন্য; তাদের চরিত্রে দায়িত্ববোধ এবং সৎ নেতৃত্বের উপাদান সৃষ্টির জন্য। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হলের আবাসন দখলের জন্য না না না, কখনই না। আমি ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। তবে ছাত্র রাজনীতির নামে আবরার হত্যা হলে আমি এমন ছাত্র রাজনীতির পক্ষে নই।
এ পরিস্থিতির উত্তরণে করণীয় কি?
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। শুধু আবরার হত্যা নয় বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে মূল্যবোধের তলানিতে আমরা দাঁড়িয়েছি। যদি এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া হয় তবে এই আবরারের হত্যার কারণে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। ভাবা যায়, কতটা নিষ্ঠুর, পৈশাচিক হলে হত্যাকারীরা আবরারের লাশ ফেলে রেখে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখতে পারে। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে দেশের অবস্থা হবে ভয়াবহ। আবরারের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারই সব নয়, দোষীদের দ্রুত বিচার করলে, ফায়ারিং স্কোয়াডে দিলে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।
শেষ কথা কি বলবেন?
আজকে মানুষ সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে আতঙ্কিত এই আশঙ্কায় তাদের যেন আবরার হয়ে যেতে না হয় বা তাদের যেন আবরারের ভাগ্য বরণ করতে না হয়। ভয় হয়, সত্য কথা বলার জন্য আমাকেও না আবরার হয়ে যেতে হয়।

বিশ্বের দীর্ঘতম লবণের গুহা

ফ্যাকাশে ও লম্বা লবণের দণ্ডগুলো ঝুলছে গুহার ছাদ থেকে। কোথাও কোথাও কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ লবণের স্ফটিকের দ্যুতিতে ঝলমল করছে গুহার দেয়াল। কোথাও আবার দণ্ডের গা বেয়ে চুইয়ে পড়ছে লবণপানি। ডেড সির কাছেই বিশ্বের দীর্ঘতম এ সল্ট কেভ বা লবণগুহা আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন ইসরায়েলের গুহাসন্ধানীরা। এত দিন ইরানের দখলে ছিল এ রেকর্ড। আকর্ষণীয় লবণের দণ্ডে ভরা গুহাটির নাম মালহাম।
১০ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত মালহাম ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় পাহাড় সোদমের বুক চিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিকটবর্তী মৃত সাগরে গিয়ে শেষ হয়েছে। মালহাম প্রথম গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমোস ফ্রামকিনের কাজের মাধ্যমে। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের গুহা গবেষণাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ফ্রামকিন আশির দশকে গুহাটির প্রায় পাঁচ কিলোমিটার মানচিত্র তৈরি করেন। কিন্তু ২০০৬ সালে গবেষকেরা ইরানের কেশম দ্বীপে ছয় কিলোমিটারব্যাপী এন৩ গুহা আবিষ্কার করলে সারা বিশ্বে তা দীর্ঘতম লবণগুহার স্বীকৃতি পায়।
বছর দুয়েক আগে গুহাপ্রেমী ইসরায়েলি জোভ নেগেভ ফ্রামকিনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেন। বুলগেরিয়ার গুহা সন্ধানীদের শীতের দিনে উষ্ণ অ্যাডভেঞ্চারের লোভ দেখিয়ে দলে-বলে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে রাজি করিয়ে ফেলেন তিনি। ইসরায়েলের গুহাসন্ধানী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা নেগেভ ইউরোপিয়ান ৮টি এবং স্থানীয় ২০টি গুহাপ্রেমী দল নিয়ে একটি টিম গঠন করেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বোয়াজ ল্যান্ডফোর্ড ও তাঁর দল। ২০১৮ সালে প্রায় ১০ দিন ধরে গুহার মানচিত্র তৈরি করেন তাঁরা।
এ বছর দ্বিতীয় দফা ১০ দিনের অভিযান চালিয়ে গুহাটির ১০ কিলোমিটারের বেশি এলাকা চিহ্নিত করেন তাঁরা। ৮০টি স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক গুহাপ্রেমী দল মিলে লেজারের সাহায্যে মাপ নেওয়া এবং মানচিত্র তৈরির কাজটি করে। তাদের চোখে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। সোদম পাহাড় নিজেই একটি বিশাল লবণের ব্লক, যার ওপরে রয়েছে পাথরের স্থিতিস্থাপক আস্তরণ। মরুভূমির দুর্লভ বৃষ্টি পাথরের ওই আস্তরণে আটকে থাকে। পানিতে লবণ গলে দীর্ঘদিন ধরে জমে জমে ডেড সি বা মৃত সাগরের দিকে গুহার রূপ নিয়েছে।
ফ্রামকিনের আঁকা মানচিত্রের পর গুহার পুরো কাঠামো বদলে যেতে খুব বেশি দিন সময় লাগেনি। লবণগুহার বৈশিষ্ট্য মেনে বর্তমান রূপও বেশি দিন স্থায়ী হবে না। মরুভূমি থেকে উড়ে আসা ধুলোর কারণে গুহার অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছে বিচিত্র নকশা। বিশালাকার লবণ ফলক, আম্বার বর্ণের ধুলো আর খনিজ মিলে নাটকীয় সৌন্দর্য ধারণ করেছে। লবণ ব্লক থেকে ভেঙে পড়া পাতলা একটি ফলকের নাম রাখা হয়েছে ‘দ্য গিলোটিন’। অন্য একটি হলে যমজ ফলকের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’।
গুহার সরু প্যাসেজের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে কষ্ট করে ওয়েডিং হল বা ‘বিয়েবাড়ি’তে পৌঁছান সাংবাদিকেরা। ভিন্ন আকৃতির, ভিন্ন দৈর্ঘ্যের শত শত সাদা লবণের দণ্ড গুহাজুড়ে যেন বিয়ের উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে। নেগেভের মতে, মালহামের রয়েছে নিজস্ব জাত। পুরো ইসরায়েলে এমনটি আর কোথাও নেই, ইসরায়েলে ১০ কিলোমিটারের ধারেকাছেও আর কোনো গুহা নেই দাবি করেন তিনি। গুহার ভেতরে সুড়ঙ্গ, প্যাসেজ, জেটি, মালভূমি মিলে বিশাল এক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি হয়েছে। নেগেভের মতে, এটি ইসরায়েলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং জটিল একটি কাঠামো। তাঁর দেখা অন্যতম মন্ত্রমুগ্ধকর সৌন্দর্যের অধিকারী মালহাম।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল: দায়িত্বে প্রভোস্ট তদারকিতে ছাত্রলীগ by মুনির হোসেন

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রভোস্টসহ একাধিক শিক্ষক দায়িত্বে থাকলেও স্ব স্ব হলের বিভিন্ন নথিপত্রে সই করা ছাড়া
কার্যত তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। সিট দেয়া থেকে শুরু করে কাউকে হলে ওঠানো কিংবা নামানোর সব কাজই করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। গত এক দশক ধরে এ ভূমিকায় রয়েছে শাসকদল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। সংগঠনটির নেতাকর্মীরা নিজেদের খেয়াল খুশিমতো হল চালাচ্ছেন। এর আগে একই ভূমিকায় দেখা গেছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলকেও। ১৯৯০-এর পর গণতান্ত্রিক সরকার আমল থেকে এ ধারা শুরু হয়। হলগুলোতে কমতে থাকে প্রভোস্টসহ অন্যান্য শিক্ষকদের প্রভাব। পদ টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকরাও ছাত্র সংগঠনগুলোর অনৈতিক সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা দিয়ে যাচ্ছেন।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে তাদের পাওয়া যায় না। অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার মেলেনি। হলে ছাত্রলীগ ও প্রশাসন মিলেমিশে একাকার। বিভিন্ন দিবসে হল প্রশাসনের উদ্যোগে খাবার দেয়ার জন্য টোকেন বিতরণের সময় আবাসিক শিক্ষকদের দেখা মেলে।

এ ছাড়া আবাসিক হলে শিক্ষার্থীরা কেমন আছেন, কোনো সমস্যা আছে কিনা, পড়ালেখা চলছে কিনা- কোনো ধরনের খোঁজ নেন না দায়িত্বে থাকা আবাসিক শিক্ষকরা। গত এক দশকে দেখা গেছে, মতের অমিল হলেই বিভিন্ন সময় আবাসিক শিক্ষার্থীদের মেরে হল ছাড়া করেছে ছাত্রলীগ। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় পুলিশেও সোপর্দ করেছে সংগঠনটি। ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরেও অনেককে মিথ্যা ব্লেম পেয়ে হলছাড়া হতে হয়েছিল। হলে হলে গড়ে তোলা হয়েছিল টর্চার সেল। যেখানে শ’ শ’ শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু কখনো হল প্রশাসন এসব ঘটনার তদন্ত করেনি। নেয়নি কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটে) শেরে বাংলা হলের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলের দায়িত্বে থাকা প্রভোস্টদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি ছেলেকে হলের অভ্যন্তরে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। অথচ কিছুই জানতেন না প্রভোস্ট। এমনকি অন্য কোনো শিক্ষার্থী এ ব্যাপারে প্রভোস্ট কিংবা অন্যান্য আবাসিক শিক্ষকদের অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেননি।

শেরে বাংলা হলের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ইতোপূর্বে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা অনেকবার ছাত্রলীগের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন। কিন্তু কখনো এর কোনো বিচার হয়নি। অবহিত করার পরও প্রভোস্ট ছিলেন নির্বিকার। আবার যারা একটু প্রতিবাদ করতো তাদেরও পরবর্তী সময়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তাই কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র এটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য হল রয়েছে মাত্র ১৯টি। এর মধ্যে পাঁচটি ছাত্রীদের জন্য, ১৩টি ছাত্রদের জন্য আর একটি হল বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য। একমাত্র বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত স্যার পিজে হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হলই প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। অন্যসব হল রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত। ছেলেদের হলগুলোর সর্বময় ক্ষমতা ছাত্রলীগের হাতে। প্রশাসন এখানে কেবল নথিপত্রে সই করার জন্যই রয়েছে। অন্য কোনো ভূমিকায় তারা নেই। কোনো শিক্ষার্থীকে সিট দেয়া থেকে কাউকে সিট থেকে নামিয়ে দেয়া সব কিছুই করে ছাত্রলীগ। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছেলেদের বিজয় একাত্তর হল ও মেয়েদের পাঁচটি হল। বিজয় একাত্তর হলে রাজনৈতিক প্রভাব ছেলেদের অন্য হলগুলোর তুলনায় কিছুটা কম। এখানে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। ছাত্রলীগও সিট দেয় তবে সেটি অনেক কম। আর মেয়েদের পাঁচটি হলের বেশিরভাগ সিটই প্রশাসন বরাদ্দ দিয়ে থাকে। তবে এ পাঁচটি হলে ছাত্রলীগ নেত্রীদের হাতেও বেশ কিছু কক্ষ রয়েছে। তারাও সিট দেয়া নেয়ার কাজ করে। মেয়েদের পাঁচটি হল হলো- বেগম রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল, কবি সুফিয়া কামাল হল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল। ছেলেদের ১৩টি হলের মধ্যে তীব্র সিট সংকট রয়েছে- সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, কবি জসীমউদ্‌্‌দীন হল, অমর একুশে হল, স্যার এ এফ রহমান হলে।

সিট সংকট কিছুটা কম হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মাস্টার’দা সূর্যসেন হল, ড. মু. শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক মুসলিম হলে। আর শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীরা মোটামুটি প্রথম বর্ষ থেকেই সিট পেয়ে থাকে। ছেলেদের হলগুলোতে ছাত্রলীগ নেতারা দিনের পর দিন সিট দখল করে থাকেন। স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার পর তারা সিট ছাড়েন না। এমনকি বেশিরভাগ ছাত্রনেতা হলের সিঙ্গেল কক্ষগুলো ধরে রেখেছেন। দুইজন কিংবা চারজনের কক্ষও একজন দখল করে রেখেছেন। কিন্তু প্রশাসন এদের হল ছাড়া করার কোনো উদ্যোগ নেন না। কখনো কখনো মেয়াদোত্তীর্ণদের হল ছাড়া করার অভিযান শুরু করলেও সেটি কেবল সাধারণদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। প্রভোস্টের নেতৃত্বে আবাসিক শিক্ষকরা কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীদের হল ছাড়া করতে চান। কিন্তু তারা কখনো বছরের পর বছর কক্ষ দখল করে থাকা ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষের দিকে যান না। ছেলেদের হলগুলোতে ছাত্রলীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় অনেক বহিরাগত অবস্থান করলেও তাদের ব্যাপারেও কোনো উদ্যোগী হতে দেখা যায় না হল প্রশাসনকে।

বৈধ শিক্ষার্থীরা কষ্ট করে গণরুমে থাকলেও বহিরাগতরা বিভিন্ন কক্ষে আরামে থাকছেন। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে গেস্টরুমের (যে কক্ষে ম্যানর শেখানোর নামে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়) নামে নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। বিভিন্ন সময় এসব ঘটনা সামনে এলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি হল প্রশাসন। কোনোভাবে বড় ভাই অসন্তুষ্ট হলেই নবীন শিক্ষার্থীদের চরম পরিণতি ভোগ করতে হয়। বিভিন্ন সময় অনেক শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ ভিন্নমত লালনের কারণে হল ছাড়া করেছে। অমানবিক নির্যাতনের পর তাদের হল ছাড়া করা হয়। কিন্তু প্রশাসন সেসব বিষয়ের কোনো তদন্ত করেনি। দেখেও না দেখার ভান করেন দায়িত্বে থাকা আবাসিক শিক্ষকরা। উল্টো প্রশাসনের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের ইচ্ছায় তাদের পুলিশে দেয়া হয়েছিল। অনেক সময় থানা থেকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে ছাড়া পেয়েছেন অনেকে। ছাত্রলীগের গ্রুপ উপ-গ্রুপেরও বলি হতে হয়েছিল অনেক নিরপরাধ শিক্ষার্থীকে। কিন্তু প্রশাসন কোনো ঘটনারই তদন্ত করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। কিছু কিছু ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) হলগুলোও অলিখিতভাবে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করে। গত রোববার এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলে আবরার ফাহাদ নামে এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয় তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ঘটনায় তোলপাড় পুরো দেশ। বিক্ষোভে বিক্ষোভে উত্তাল ছিল দেশের শিক্ষাঙ্গন। শুক্রবার আবরার ফাহাদ হত্যার জেরে বুয়েটে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। দেশের প্রাচীন এ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলেই ছিল ছাত্রলীগের টর্চার সেল। বিষয়টি জেনেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ২০০২ সালে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গুলি বিনিময়কালে সাবিকুন্নাহার সনি নামে এক ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ফের বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি শুরু করে ছাত্রলীগ। এরপর হলগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য বিরাজ করতে থাকে। নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে হলের প্রাধ্যক্ষরা। সিট দেয়া থেকে শুরু করে সব কিছুই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

চবির হলেও হর্তাকর্তা ছাত্রলীগ: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রত্যেকটি হলের দায়িত্বে প্রভোস্টরা থাকলেও হলগুলোর দেখভাল করছে ছাত্রলীগ। সবগুলো হল দখল করে আছে শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে হলে বৈধ শিক্ষার্থীদের মারধর করে হল থেকে বের করে দেয়ার নজির রয়েছে। ২৪ ঘণ্টা হলের সার্বিক বিষয় দেখাশোনার দায়িত্বে প্রভোস্টদের থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রভোস্ট ক্যাম্পাসে থেকে দায়িত্ব পালন করেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট এবং আবাসিক শিক্ষকরা বছরে একবার শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফরমে সই করে দায় সারেন। হলের কোন ব্লকে কে থাকবে তা তদারকি করে ছাত্রলীগ। জানা যায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত বৈধ শিক্ষার্থীরা থাকতে না পারলেও ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন হলে বহিরাগতরা অবস্থান করে। এই বছরের ২৫শে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে সোহরাওয়ার্দী হলের গেস্ট রুম থেকে এক বহিরাগত নারীসহ ১৮ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মাদক সেবনরত অবস্থায় একাধিক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করার নজির রয়েছে। এ ছাড়াও সমপ্রতি সোহরাওয়ার্দী হলের ১৫১ নম্বার কক্ষে শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি নাজিমের নেতৃত্বে কয়েকজন বহিরাগতকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কোনো টর্চার সেল নেই।

কোনো কর্মী কাউকে নির্যাতন করলে সেটার দায়ভার তার নিজের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করবো অভিযোগ পাওয়া গেলে সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এবং এ বিষয়ে আমারও পুরোপুরি সহযোগিতা থাকবে। হলে বহিরাগতদের অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি জানি না যদি তা থাকে সেটা দেখার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। শাখা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, হলগুলো দেখার দায়িত্ব প্রভোস্টদের হলেও তারা যেন হলের মেহমান। তাদেরকে হলে দেখাই যায় না। তারা শুধুমাত্র ছাত্রদের পরীক্ষার ফরমে স্বাক্ষরের দায়িত্বই পালন করেন। হল তদারকির বিষয়ে প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান বলেন, ২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পাসে থেকে হল পরিচালনার জন্য আবাসিক ও পরিবহন সুবিধা প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে আমরা এর কিছুই পাই না।

রাবির হলও চলে ছাত্রলীগের ইচ্ছায়: কর্তৃপক্ষকে তোয়াক্কা না করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র হলে সিট দখলে একচ্ছত্র আধিপত্য চালাচ্ছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও নিজের গ্রুপে ভিড়ানোর শর্তে দলীয় কর্মী কিংবা পছন্দের ছোট ভাইকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই হলে সিট করে দিচ্ছে তারা। এদের মধ্যে অনেকের আবার সংশ্লিষ্ট হলে সংযুক্তিও থাকে না। এ ছাড়াও বিভিন্ন হলে বহিরাগতদের অবস্থানের প্রমাণও মিলেছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের পরিচিতদের হলে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের এমন বেপরোয়ায় কোণঠাসা প্রশাসন। তাদের নীরব ভূমিকায় ভুগতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হলেই অবৈধভাবে সিট দখল করে রেখেছে ছাত্রলীগ। হলগুলোতে পলিটিক্যাল নামে ব্লক দখল করে সেখানে অবৈধভাবে দলীয় কর্মীদের সিট দিচ্ছে নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা রুমে রুমে গিয়ে মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের লিস্ট করে। তাদের পরীক্ষা কবে শেষ এবং কবে তারা হল ছাড়বে এ সময়গুলো লিখে নেয় তারা। এসব শিক্ষার্থী চলে গেলে ওই সিটগুলো দখলে নেয় ছাত্রলীগ।

নাম গোপন রাখার শর্তে রাবি ছাত্রলীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতা বলেন, হলগুলোতে জুনিয়র নেতাকর্মীরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে কাউকে তোয়াক্কা করছে না তারা। শিক্ষার্থীরা জানান, সিটের জন্য হলের নেতাদের কাছে জিম্মি তারা। অনেকেই আবার সিটের জন্য টাকাও দেয় এই নেতাদের। গত ১লা ফেব্রুয়ারি মতিহার হল থেকে এক অবৈধ শিক্ষার্থীকে বের করে দেন প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আলী আসগর। পরে ওই শিক্ষার্থীকে আবার অবৈধভাবে সেই রুমেই তুলে দেয়া হয়। নাম প্রকাশ না করে এক হল প্রাধ্যক্ষ বলেন, গায়ের জোরে কিংবা দল ভারি করা যাই হোক না কেন নেতাকর্মীরা হলগুলোতে এসব করে যাচ্ছে। যারা অবৈধ তাদের হল থেকে বের করে দিতে গেলে বিভিন্নভাবে বাধা আসে। জানতে চাইলে রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন, আমরা দুয়েকদিনের মধ্যেই হলের দায়িত্বে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে বসবো। হলগুলোতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি যেন বজায় থাকে আমরা সেই চেষ্টাই করবো। হল প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক রেজাউল করিম বকসী বলেন, আমি এ বিষয়ে শুনেছি। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যেই ভিসির সঙ্গে হল প্রাধ্যক্ষরা বসে এগুলো কীভাবে বন্ধ করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।

‘ভাই’দের হাতে ইবির হল: কখনো দলীয় পরিচয় কখনোওবা ‘বড় ভাই’য়ের গ্রুপ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে সিট পাওয়ার মাধ্যম এটা। মেধা তালিকায় হলে সিট পাওয়া যেন অমাবশ্যার চাঁদ। কালেভদ্রে গুটিকতেক শিক্ষার্থী মেধা তালিকায় সিট পায়। তবে ক্ষমতাসীন ‘বড় ভাই’দের তদবির ছাড়া উঠা যায় না নিজ রুমে। হল প্রশাসন নিজেদের মত চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে বরাবরই তারা জিম্মি। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবসময়ই বঞ্চিত হয়ে আসছে। প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ইবিতে হল রয়েছে ৮টি। যার ধারণ ক্ষমতা মোট শিক্ষার্থীর ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে মেয়েদের তিনটি হল প্রশাসনের কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ছেলেদের হলে পুরোই ভিন্ন চিত্র। হল প্রশাসনকে নামে মাত্র দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় ছাত্র হলগুলোতে। সিটে উঠতে শিক্ষার্থীদের যোগ দিতে হয় ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে। তদবির করতে হয় নির্দিষ্ট ‘বড় ভাই’দের সঙ্গে। ভাই বললে সিট জুটবে। ভাই না বললে মিলবে না। তার কথাতেই ছাড়তে হয় অনেকের স্বপ্নের হলের সিট। সম্প্রতি ইবির প্রতিটি হলে এক যোগে তল্লাশি করেছে হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে দেখা যায় ৮০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী অনাবাসিক। প্রত্যেকেই শাখা ছাত্রলীগের কোনো না কোনো গ্রুপ বা উপ-গ্রুপের বড় ভাইদের মাধ্যমে হলে উঠেছে। এদিকে কয়েকটি হলে গত কয়েক বছর আবাসিকতা দেবার নামে আবেদন নেয়া হয়েছে। তবে অদৃশ্য কারণে অ্যালোটমেন্ট দিতে পারেনি হল প্রশাসন।

শত শত শিক্ষার্থী টাকা দিয়ে ২-৩ বার আবদেন করেও সুযোগ পায়নি হলে উঠার। আবার হলের আবাসিকতা দিলেও সিটে উঠতে পারে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হলে অবস্থানরত অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ১ম বা ২য় বর্ষের ছাত্র। অথচ মাস্টার্সসহ সিনিয়র ছাত্ররা আবেদন করেও সিট পাচ্ছে না। প্রতিবারই আবাসিকতা দেয়ার ঘোষণা আসলে একই ঘটনা ঘটে বলে হল সূত্রে জানা গেছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তার ছাত্র সংগঠনের হতেই কার্যত হলের নিয়ন্ত্রণ থাকে। বর্তমান শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিব নেতা হয়ে বঙ্গবন্ধু হলে উঠার ব্যবস্থা করতে হল প্রশাসনকে জানায়। তার ক্ষমতার প্রভাবে রুম নির্ধারণ করা, মেরামত, রং করা এবং আন্তর্জাতিক ব্লকের পুরো একটি ফ্লোর ফাঁকা করার নির্দেশ দেয় প্রভোস্ট। একইভাবে ইচ্ছেমতো নিজের কর্মীদের হলে তুলতে অন্য শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দেয় নেতারা। তবে আবাসিকতা না পেলেও দিব্যি হলে অবস্থান করছে অনাবাসিক দলীয় শত শত কর্মী। এতে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বরাবরই বঞ্চিত হয়ে আসছে। পুরো শিক্ষা জীবন শেষ করেও কোনো দিন হলে থাকতে পারেন নি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বিরাট। এদিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হলে নিজ কর্মীসহ অবস্থানরত সকল শিক্ষার্থীর ওপর সবসময়ই চলে বড় ভাইদের খবরদারি। নিয়মিত মিছিলে যাওয়া, হলের মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করা সকলের ওপর বাধ্যতামূলক।

কোনো কর্মসূচিতে না গেলে হল থেকে নামিয়ে দেয়ার হুমকি আসে। গ্রুপিং রাজনীতির কারণে প্রতিপক্ষ গ্রুপের কর্মীদের হেনস্তার শিকার হতে হয় প্রায়ই। এ ছাড়া ছাত্রলীগের কয়েকটি কক্ষে নিয়মিত চলে মদ, গাঁজা আর জুয়ার আসর। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এসব দেখেও তাদের ভয়ে কোনো কিছু বলার সাহস দেখাতে পারে না। এসব রুমে মাদকের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরে এনে চাঁদা দাবি করা হয়। নিয়মিত চাঁদা না দিলে শিবির বলে মারধর ও পুলিশে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। শিক্ষা জীবন ও প্রাণ ভয়ে বরাবরই মুখ বন্ধ রাখে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। চাঁদা দিতে না পেরে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার ঘটনাও রয়েছে কয়েকটি। এসবের পেছনে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণহীনতা একমাত্র কারণ বলে অভিযোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। বঙ্গবন্ধু হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. তপন কুমার জোদ্দার জানান, হলগুলো তো ঠিকমতো চলছে না। গত ৯ মাস ধরে আমি দায়িত্বে আছি। আমি যেভাবে চাচ্ছি সেভাবে পারছি না। প্রভোস্ট কাউন্সিলে আমি বলেছি, বাড়ির মালিক যদি না জানে তার বাড়িতে কে থাকে, তবে তো সে মালিকই হতে পারে না। আগামী ১ মাসে যদি হলের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি তবে আমি আর থাকবো না। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. রাশিদ আসকারী বলেন, কোনো হলই নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে না। হলে উঠতে কারো সমস্যা হলে আমি নিজে তাকে তুলে দিয়ে আসবো। ঢাবির মতো অনুরূপ সিদ্ধান্ত আমরও নেব। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মতো ইবির সকল হলে সার্চ হবে।টর্চার সেল বা এ ধরনের নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা ব্যবস্থা নেব। সকল প্রভোস্টকে নিয়ে সভা ডেকেছি। আশা করি হলগুলোতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত হবে।

বেরোবিতে ছাত্রলীগের কাছে জিম্মি হল প্রশাসন: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ছাত্রদের আবাসিক হলের অধিকাংশ ছাত্রই থাকছেন অবৈধভাবে। ছাত্রলীগ পরিচয়ে হলে অবস্থান করায় হল প্রশাসনও জিম্মি। তবে ছাত্রলীগের দাবি, হল চালাতে ব্যর্থ হয়ে নিজেদের দায় ছাত্রলীগের উপর চাপাচ্ছে হল প্রশাসন। হল প্রশাসন বলছে, ছাত্রদের দুইটি হলই এখন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। হলে ভর্তি না হয়েও ছাত্রলীগের নেতাদের মাধ্যমে ছাত্ররা অবৈধভাবে হলে উঠছেন। তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি আবু মোন্নাফ আল তুষার কিবরিয়া। হল সূত্র জানায়, হলে আসন শূন্য থাকা সাপেক্ষে গত বছর সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু হল ও ইলাহী হল ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেয়। শিক্ষার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু হলে ৬৭ জনকে এবং ইলাহী হলে ৩৬ জনকে আসন বরাদ্দ দেয় হল কর্তৃপক্ষ। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু হলে ১৩ জন এবং ইলাহী হলে ২৬ জন ভর্তি ফি দিয়ে বৈধভাবে হলে উঠেন। বাকিদের হলে না উঠার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, কাগজে-কলমে আসন ফাঁকা থাকলেও সবই অবৈধদের দখলে। যার মধ্যে অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের ছত্রছায়ায় রয়েছেন।

(মানবজমিন এর এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রাহাত খান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুর রহমান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইমরান শুভ্র, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ইভান চৌধুরী )

হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে বিজ্ঞানসম্মত নতুন চিকিৎসা by ডা: গোবিন্দ চন্দ্র দাস

বিশ্বের এক নম্বর মারণব্যাধি হৃদরোগ। কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই যেকোনো সময় এটি কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন। বিশ্বের মোট মৃত্যুর অর্ধেকই হয় হার্টের রোগ ও স্ট্রোকে। প্রতিবছর লাখ লাখ লোকের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। এদের মধ্যে ২৫ ভাগের মৃত্যু হয় হাসপাতালে পৌঁছার আগেই। হার্ট অ্যাটাক হলেও অনেক সময় বেঁচে থাকতে হয় নানা
অক্ষমতা আর হঠাৎ মৃত্যুর ভয় নিয়ে। লিখেছেন ডা: গোবিন্দ চন্দ্র দাস
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমেরিকায় গড়ে প্রতিদিন দুই হাজার ৬০০ লোক মারা যাচ্ছে হৃদরোগের শিকার হয়ে। সেখানে হৃদরোগীর সংখ্যা ষাট মিলিয়ন। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের পর বহুসংখ্যক মানুষ প্রতিনিয়ত এই ব্যাধির সঙ্গে সংগ্রাম করে চলেছে। স্ট্রোকের ঝুঁকির ভেতর বসবাস করছে অগণিত মানুষ। পাশাপাশি জীবনযাপনে সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে বহু লোক মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে এনেছে।
হার্ট অ্যাটাককে ভূমিকম্প হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। মানবদেহে এই ‘ভূমিকম্প’ আসতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে। কিন্তু এই ভূমিকম্প হয় কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই। পৃথিবীর ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না, কিন্তু মানবদেহের ‘হৃদকম্প’ বা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশে ৩০ বছর বয়সের পর হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। ৪০-৪৫ ঊর্ধ্ব ব্যক্তিদের হৃদরোগ তো অজানা নয়।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট সম্প্রতি জানিয়েছে- বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে একজনের হার্টের সমস্যা আছে। এদের সমস্যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরো জটিল হয়। তারা আরো জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে ১৫-২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হচ্ছে। এ দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব যতই থাকুক না কেন, রোগভীতিও এ থেকে মৃত্যুভয় কিন্তু কম নয়।
বাংলাদেশে হৃদরোগ বাড়ার কারণ : বর্তমানে আমাদের জীবন ধারার পশ্চিমা ধাঁচে পরিবর্তন হচ্ছে। ফাস্টফুডের সাথে দ্রুততালে বাড়ছে ফ্যাট খাওয়ার প্রবণতা। কমেছে শাকসবজি, ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস ও টাটকা খাবার খাওয়ার ঝোঁক।
জীবনের গতি বাড়তে বাড়তে জেটগতির জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এক শ্রেণীর মানুষ। ফলে ইঁদুর দৌড়ের জীবনে বাড়ছে টেনশন, মানসিক চাপ- মন হয়ে পড়ছে ক্ষতবিক্ষত, হৃদরোগ বেড়ে চলেছে এভাবে। অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে চলেছে ধূমপান। এর বিপক্ষে সচেতনতা সৃষ্টি ও মোটিভেশনও যেন রুখতে পারছে না এর অগ্রযাত্রাকে। ধূমপান এখন আর শুধু বড়দের সঙ্গী নয়, ছোটদেরও বন্ধু। অতীতে বাঙালি ছিল কর্মমুখর, পরিশ্রম নির্ভরতায় চলছিল জীবন। জীবনযাপনের এ পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে মানুষ। গ্রামের এক শ্রেণীর মানুষ এখন মোটরসাইকেলে চড়েন বেশি, সাইকেলে চড়েন কম, হাঁটেন আরো কম। শহরাঞ্চলে লাফ দিয়ে বাড়ছে গাড়িচড়া, বসে বসে কাজ করা ও আয়েশী জীবনযাপনের মানসিকতা। কমছে শরীরের ব্যায়াম, বাড়ছে স্থূলতা। ব্যায়াম মানে তো হার্টরেট উঠছে ১৪০-এ আর ঘাম ঝরবে টপটপ করে।
প্রচলিত চিকিৎসা : রক্তনালীতে ব্লক ধরা পড়লে অ্যানজিওপ্লাস্টি বা করোনারি বাইপাস সার্জারি করা হয়। উভয় পদ্ধতি বেশ খরচসাপেক্ষ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত। দেখা যায় কয়েক বছর পর জীবনীশক্তি অর্ধেকে নেমে আসে। যে হারে হৃদরোগের সংখ্যা বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না নির্ভরযোগ্য অ্যানজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারির সেন্টারের সংখ্যা। এভাবে বাড়তে থাকলে আগামীতে হৃদরোগ চিকিৎসার হাসপাতাল ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কয়েকগুণ বেশি প্রয়োজন হবে। যা রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেয়া, তবে এ রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ও নিয়মিত ওষুধ খেলে এর জটিলতা বহুলাংশে এড়ানো সম্ভব।
খাদ্যের মাধ্যমে কোলেস্টেরল ও চর্বি গ্রহণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলে এটা একদিকে যেমন নতুন ব্লকেজ সৃষ্টি রোধ করবে, অন্যদিকে তেমনি ধমনিতে জমে থাকা মেদকেও অপসারণ করবে। চিন্তার বিষয় হলো হৃদরোগ চিকিৎসায় আধুনিক নিরাময় প্রযুক্তি, যেমন বাইপাস সার্জারি বা এনজিওপ্লাস্টি বিফলে যায় শুধু নতুন নতুন ব্লকেজ সৃষ্টি এবং অপারেশনের পর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণেই।
বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। হৃদযন্ত্রের ধমনিতে ব্লকেজ সৃষ্টির কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। দেখা গেছে, ব্লকেজ সৃষ্টি যে কারণে হয় সেই সমস্যার সমাধান না করেই অস্ত্রোপচারের চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল। এই সূত্র ধরেই নতুন ধরনের চিকিৎসার পথ খোঁজা হতে থাকে। গবেষণা করেই হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই সর্বসাম্প্রতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুক্তির পথ মিলেছে।
কী সেই মুক্তির পথ?
শুধু নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন আর কিছু নিয়ম অনুসরণ করলেই কঠিনতর হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এটাকেই বলা হচ্ছে করোনারি আর্টারি ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড রিগ্রেশন প্রোগ্রাম বা সংক্ষেপে ‘সিএডিপিআর’। কোনো ওষুধ গ্রহণ ছাড়াই কেবল খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ এনে হৃদরোগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ এবং নিরাময় করা সম্ভব।
চিকিৎসা যখন ওষুধ ও অস্ত্রোপচার ছাড়া :
১৯৮৮ সালে ডা: অরনিসের অবদানের কথা বিশ্ববাসী জানতে পারেন, তিনি করোনারি আর্টারি রোগে আক্রান্ত কিন্তু বাইপাস সার্জারি করতে রাজি হচ্ছেন না এমন রোগীদের দু’টি গ্রুপে ভাগ করেন। প্রথম গ্রুপের রোগীদের চিকিৎসা শুরু করেন কম ফ্যাট ও বেশি আঁশযুক্ত খাবার দিয়ে। এ ছাড়া স্ট্রেসমুক্ত থাকার পদ্ধতি, প্রাণায়াম-যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন করার উপদেশ ও দীক্ষা দেন। অপর গ্রুপকে দেয়া হলো হৃদরোগে সচরাচর ব্যবহৃত ওষুধ।
এ দুই গ্রুপের রোগীদেরই বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হলো। কিছুদিন পর পর রোগীর অগ্রগতি পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হলো। পাওয়া গেল অদ্ভুত ফল। ডা: অরনিসের আবিষ্কৃৃত পদ্ধতি যারা অনুসরণ করেছেন, তাদের ধমনিতে জমে থাকা চর্বি বা কোলেস্টেরল পরিষ্কার হয়ে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তারা ভীতিকর বুকব্যথা থেকে মুক্তি পান এবং হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমে আসে।
অপর দিকে, দ্বিতীয় দলের রোগীদের অবস্থা আগের অবস্থায় থেকে গেল। অর্থাৎ অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না। কারো কারো ক্ষেত্রে অবস্থার অবনতি হলো।
ভারতের গবেষণা : ভারতের খ্যাতনামা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরাও এই পদ্ধতি অনুসরণ করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা : ৩৮ বছরের এক বাংলাদেশী। গত ৩ মাস আগে করা অ্যানজিওগ্রামে তার লেফট ইন্টেরিয়র ডিসেন্ডিং আর্টারিতে ৮৫-৯০ শতাংশ ব্লক ধরা পড়ে। ডাক্তাররা তাকে তাৎক্ষণিক অ্যানজিওপ্লাস্টি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু টাকার অভাবে তিনি তা করতে পারেননি। তাকে প্রাণায়াম ও মেডিটেশন পদ্ধতি চালিয়ে যেতে বলা হলে বিগত আড়াই-তিন মাস থেকে এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন। যেখানে তার আগে আধা মাইল হাঁটতে কষ্ট হতো, এখন তিনি কষ্ট ছাড়াই দুই-তিন মাইল পর্যন্ত হাঁটতে পারেন। তিনি এরই মধ্যে ভারতের এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে এসেছেন। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার বর্তমান অবস্থা দেখে তাকে আগের পদ্ধতিগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন এবং আপাতত অ্যানজিওপ্লাস্টি করার প্রয়োজন নেই বলে মত দেন।
এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিতে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধকে একেবারে বাদ দেয়া হয় না। পাশাপাশি ওষুধ সেবন চলতে থাকে। তবে ধীরে ধীরে রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে তখন এ ওষুধ আর চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এই নবধারার চিকিৎসা পদ্ধতিতে খাদ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা কি খুব জরুরি। সেই শিক্ষাই দেয়া হয় এই প্রোগ্রামে; আরো শেখানো হয় যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন। সামগ্রিক চাপ মোকাবেলা করার বিশেষ ট্রেনিংও এর অন্তর্ভুক্ত। এর জন্য পাঁচ দিনের একটি কোর্সের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এটা বিস্ময় জাগায় যে মাত্র কয়েক সপ্তাহ খাদ্যগ্রহণে পরিবর্তন এনে, নিয়মতান্ত্রিক ব্যায়াম করে, চাপমুক্তির কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এবং মেডিটেশন চর্চা করে বুকের ব্যথা সম্পূর্ণভাবে দূরীভূত করা সম্ভব। এক-দু’বছরের চেষ্টায় ধমনির ব্লকেজও অপসৃত হয়ে থাকে।
‘সিএডি পিআর’ থেকে কারা হবেন উপকৃত
০১. যার একবার বা একাধিকবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে।
০২. নিকট ভবিষ্যতে যিনি এনজিওপ্লাস্টির পরিকল্পনা করেছেন।
০৩. নিকট ভবিষ্যতে যিনি বাইপাস সার্জারির পরিকল্পনা করেছেন।
০৪. যিনি ইতোমধ্যে এনজিওপ্লাস্টি বাইপাস সার্জারি করেছেন।
০৫. এনজিওপ্লাস্টি বাইপাস সার্জারির পর যার পুনরায় ব্লকেজ ধরা পড়েছে।
০৬. যিনি এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছেন।
০৭. যিনি উচ্চ রক্তচাপে (হাইপারটেনশন) ভুগছেন।
০৮. যিনি অসম্ভব মুটিয়ে গেছেন।
০৯. যার হৃদরোগের দীর্ঘ পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে।
১০. যার অস্বাভাবিক মাত্রায় রক্তে কোলেস্টেরল বিদ্যমান।
১১. যিনি ডায়াবেটিসে ভুগছেন, রক্তে শর্করার মাত্রা উঁচু।
১২. সেইসব কর্মজীবী যাদের অত্যন্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়।
বেশির ভাগ ডাক্তার মনে করেন, করোনারি আর্টারি একবার ব্লক হতে শুরু করলে এর গতি আর পাল্টানো যায় না। এর একমাত্র চিকিৎসা অ্যানজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি। কিন্তু উপরোক্ত গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনধারা পরিবর্তন করে বিশেষ করে খাওয়ার পরিবর্তন, সুচিন্তা, প্রাণায়াম ও মেডিটেশনের মাধ্যমে ব্লক সারানো সম্ভব। আমাদের দেশের লাখ লাখ হৃদরোগী যারা এ রোগের নিরাময়ের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় করে এমনকি অনেকে বাড়িঘর, জমিজমা বিক্রি করে অ্যানজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস অপারেশন করেছেন বা অনেকে বিদেশে যাচ্ছেন, আবার অনেকের হৃদরোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তারা উপরিউক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবন পেতে পারেন। এখনই সময় নিজের জীবনধারায় কিছু নিয়ন্ত্রণ এনে ভবিষ্যৎকে হাতের মুঠোয় পোরার। একবার কষ্ট করে পরিবর্তনের ধারায় এলে পরে আর সেটা কষ্টসাধ্য মনে হবে না।
লেখক : অধ্যাপক, ইমুনোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা।
চেম্বার : হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার, ৫৭/১৫ পান্থপথ, ঢাকা।
ফোন : ০১৭১১৫৯৪২২৮

আবরার হত্যাকাণ্ড এবং ছাত্র রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন :-বিবিসি বাংলা'র মেইলবক্স

বুয়েট ছাত্রাবাসে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক কথাবার্তা, বাক-বিতণ্ডা হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। এসবের মধ্যে যোগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের লাভ-লোকসানের খতিয়ান নিয়ে আলাপ আলোচনা।
আবার কিছু কিছু লোক দু'টোর মধ্যে যোগসাজশও খুঁজে পাচ্ছেন, বিশেষ করে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন নিয়ে। যেমন লিখেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মিনহাজুল ইসলাম তারেক:
''সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের যে সংবাদ বিবিসি বাংলা প্রথম প্রকাশ করে তাতে বলা হয় - জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যে বাংলাদেশ এই প্রথমবারের মতো তাদের প্রাকৃতিক গ্যাস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রফতানি করবে। বিষয়টি ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে পরে আপনারা সংশোধনীও দেন। তবে এর আগেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়!
''অনেকেই বলছেন, বুয়েটের নিহত ছাত্র আবরারও এই খবরটির ওপর ভিত্তি করে নিজের ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন, যেখানে গ্যাস রফতানির বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। এখানে বিবিসি বাংলা'র কাছে আমার প্রশ্ন, আপনাদের ভুল সংবাদ পরিবেশনের উপরই যদি আবরার স্ট্যাটাস দিয়ে থাকে আর এই স্ট্যাটাসই যদি তার জীবনের কাল হয়ে থাকে, তবে বিবিসি বাংলা কি এক্ষেত্রে তাদের দায় এড়াতে পারে?''
দায় থাকলে না এড়ানো বা না এড়ানোর প্রশ্ন আসবে মি. ইসলাম। কিন্তু এখানে বিবিসি বাংলার দায় কেন থাকবে? আপনি যদি এই চিঠি লেখার আগে একটু রিসার্চ করতেন, তাহলেই দেখতে পেতেন আবরার ফাহাদ কোন ভাবেই বিবিসি বাংলার খবর দেখে কিছু লিখতে পারে না। কারণ, তার সেই স্টেটাস পোস্ট করা হয়েছিল ৫ই অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টা ৩২ মিনিটে। আর বিবিসি বাংলার রিপোর্টের প্রথম সংস্করণ, যেটায় ভুল তথ্য ছিল, সেটা প্রকাশ করা হয়েছিল ৫ই অক্টোবর রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে। অর্থাৎ আবরার তার স্টেটাস বিবিসি বাংলার রিপোর্টের চার ঘণ্টা আগে পোস্ট করেছিল। তাহলে কীভাবে বলবেন আবরারের স্টেটাসের সাথে বিবিসি বাংলার রিপোর্টের কোন সম্পর্ক ছিল? এটা উদ্ভট একটা প্রশ্ন।
এখানে আরেকটি কথা সোজা-সাপটা বলে রাখা ভাল। যেসব ছাত্র বা নেতারা আবরারকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারাই এই খুনের জন্য দায়ী। অন্য কারো দায় এখানে নেই। আপনাকে ধন্যবাদ।
দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর কৌশল নিয়ে লিখেছেন খুলনা থেকে মুনির আহম্মদ:
''একজন মন্ত্রীর কথা উদ্ধৃত করে যখন 'জনকণ্ঠ' পত্রিকায় শিরোনাম হয়, 'বিবিসির প্রচারিত সংবাদের কারণে আবরার ফাহাদের এই নির্মম মৃত্যু' তখন আমরা ব্যথিত হই। এদেশে হলুদ সাংবাদিকতার এ রকম উদাহরণের অভাব নেই। মন্ত্রী মহোদয় হয়তো অনেক কথা বলতে পারেন, তবে বিবিসির ভুল সংবাদের কারণে আবরার ফাহাদ পোস্ট দিয়েছে আর সেই কারণে ছাত্রলীগ দ্বারা নির্মমভাবে হত্যাকে জায়েজ করার এক কূটকৌশল কি কোন সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করতে পারে?
''সত্যিই আমি অবাক হই এদেশ আজ কোথায় চলেছে। শামসুর রাহমানের একটা কবিতার বইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো, "উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।''
আমি একটু আগে এই কথাই বলছিলাম, মি. আহম্মদ। কে কখন পোস্ট দিল সেটা ঠিকমত না দেখেই আবোল-তাবোল বক্তব্য অনেকেই দেন। তবে সাংবাদিক বা রাজনীতিকদের কাছ থেকে আরো দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায়। আর একটা হত্যাকাণ্ড নিয়ে এরকম কূটকৌশল মোটেই কাম্য নয়। আপনাকে ধন্যবাদ।
বাংলাদেশে ছাত্র সংগঠনগুলোর বর্তমান ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন টাঙ্গাইলের সরকারি ম্যাটস থেকে বিলকিস আক্তার:
''বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেশের মানুষের জন্য কী কী কল্যাণ অর্জন করেছে? আর ছাত্র সংগঠনগুলো দ্বারা সংগঠিত অকল্যাণগুলোই বা কী? কল্যাণ আর অকল্যাণ দুটির মধ্যে কোনটির পাল্লা ভারী? এসব ভেবে দেখার সময় এখনই। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরিও বটে।! কারণ অনেকেই মনে করে, বর্তমান ছাত্র রাজনীতি হচ্ছে আদর্শ-বহির্ভূত রাজনীতি । এ ধরণের রাজনীতির সংস্কার হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।''
একই বিষয়ে লিখেছেন ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে জহিন মুমতাহিনাহ:
''আমি মনে করি বাংলাদেশে দ্রুত ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা উচিত, কারণ ছাত্র রাজনীতি এতটাই ভয়ঙ্কর ও বেপরোয়া হয়ে গেছে যে, প্রায়শই কোন না কোন মায়ের বুক খালি হচ্ছে। কলুষিত হচ্ছে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে অনেক অন্যায়, অপরাধ আর সন্ত্রাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যেত।''
আপনাদের দু'জনকেই ধন্যবাদ বিলকিস আক্তার এবং জহিন মুমতাহিনাহ। অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং তার জন্য যে ছাত্র সংগঠনগুলোই দায়ী, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে অপরাধ রোধ করার জন্য দরকার আইনের প্রয়োগ এবং যথাযথ বিচার। ছাত্র রাজনীতিকে অপরাধ মুক্ত করতে পারলেই ক্যাম্পাসে সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে বলে আমার মনে হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি একদম নিষিদ্ধ করার আগে দু'বার ভাবতে হবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরণের প্রতিক্রিয়া হয়েছে। যেমন লিখেছেন রাজশাহীর রানীবাজার থেকে হাসান মীর:  
''ভারত আমাদের বন্ধু প্রতিম রাষ্ট্র। 'বন্ধু প্রতিম' অর্থ বন্ধুর মতো, সম্পূর্ণ বন্ধু নয়। বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে, ছোট আর বড়র অসম বন্ধুত্ব প্রকৃত বন্ধুত্ব হয় না। ভারত আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই।
''প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর থেকে জানা গেল, বাংলাদেশ ভারতকে ফেনী নদীর পানি দেবে, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা দেবে, ভারত যাতে বঙ্গোপসাগরে চীনা নৌবাহিনীর আনাগোনার ওপর নজরদারি করতে পারে সেজন্যে বাংলাদেশের উপকূলে রাডার স্থাপন করতে দেবে ইত্যাদি। বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি, যেখানে তিস্তার পানির কথা নেই, গঙ্গার পানি পাওয়া যাবে তবে কেবল বর্ষাকালে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে না।
''তারপরেও বলবো , বাংলাদেশ -- ভারত মৈত্রী দীর্ঘজীবী হোক, কারণ ভারতকে বৈরী ভেবে নয়, বন্ধু ভেবেই বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হবে।''
বিষয়টি যে জটিল তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই মি. মীর। ভারতের সাথে কূটনৈতিক দর কষাকষিতে বাংলাদেশের হাত তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং বৈরিতা সৃষ্টি করে সে হাতকে শক্তিশালী করা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা চেষ্টা করছেন ভারত এবং চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে। কাজটা সহজ না। আপনাকে ধন্যবাদ।
একই বিষয়ে লিখেছেন ঢাকার উত্তরা থেকে শফিকুল, যিনি শুধু একটি নামই ব্যবহার করেছেন:
''এবারের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ছিল সব দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। আট বছর ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির একটি সুরাহা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানবিক দিক বিবেচনা করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম শহরের মানুষের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি ভারতকে উত্তোলনের সুযোগ দিবে বাংলাদেশ। শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে খরা আর বর্ষা মৌসুমে বন্যা। এই উভয় সংকট নিরসনের জন্য তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি অতীব জরুরি। বাংলাদেশ, ভারতের প্রতি মানবিক আচরণ করলেও ভারত আমাদের প্রতি মানবিক আচরণ করছে না।''
অনেকেই তাই মনে করছেন মি. শফিকুল, এমনকি ভারতের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকাগুলোও ভারতের রাজনীতিকদের প্রতি বাংলাদেশের স্বার্থর কথা ভাবার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে আসামের নাগরিক পঞ্জি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ দূর করা এবং তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির কাজ তরান্বিত করার কথা বলা হয়েছে। আপনাকে ধন্যবাদ।
আবার যাচ্ছি বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে। শুক্রবার আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে লিখেছেন চুয়াডাঙার আলমডাঙ্গা থেকে কাজী সাইদ:
''বিবিসি বাংলার সায়েদুল ইসলামের ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত প্রতিবেদনটি খুবই ভাল লেগেছে। সত্যি কথা বলতে, ছাত্র রাজনীতির আসলেই দরকার আছে কিনা, বা থাকলে সেটা ঢেলে সাজানোর দরকার কিনা, তা ভেবে দেখার সময় এখন এসেছে। ভাল রাজনীতিবিদ হতে ছাত্র রাজনীতি করতে হবে, এই যুক্তি আর খাটছেনা। আরেকটি ব্যাপার হল, ছাত্র রাজনীতি শুধু ছাত্রদের উপর প্রভাব ফেলে, তাতো না। এর প্রভাব পরিবারগুলোতে পড়ে মারাত্মক ভাবে। উদাহরণস্বরূপ, আবরার-এর মৃত্যু শুধু আবরার-এর পরিবার নয়, শেষ করবে খুনিদের পরিবার গুলোকেও।''
ছাত্র রাজনীতি এক সময় বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয় ছিল, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর থেকে ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড যেভাবে চলেছে, তাতে কেউ আর গর্ব করছে বলে মনে হয় না। আজ ছাত্রদের দাবির মুখে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। ঘটনার এখানেই শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না, কারণ সারা দেশে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ না হলেও, ব্যাপক সংস্কারের দাবি যে জোরদার হবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আপনাকে ধন্যবাদ।
আবরার ফাহাদের পোস্ট, বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে।

অবশেষে বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র-চীন

অবশেষে বাণিজ্য যুদ্ধে ‘অস্ত্রবিরতি’তে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। শুক্রবার ওয়াশিংটন একটি সীমিত চুক্তিতে রাজি হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে যে শুল্ক বৃদ্ধি করার কথা ছিল তা স্থগিত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। বিনিময়ে চীন কিছু বিষয়, বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য ক্রয়ে ছাড় দেবে। অর্থাৎ একে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বলা যাচ্ছে না। সাময়িক এই চুক্তিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘প্রথম পর্যায়ের চুক্তি’। এ খবর দিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
খবরে বলা হয়, এ চুক্তির ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি কিছুটা হলেও হাফ ছেড়ে বাঁচবে। এছাড়া বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উত্তাল থাকা বৈশ্বিক পুঁজিবাজারও কিছুটা শান্ত হবে।
তবে এ-ও সত্য, হোয়াইট হাউজে আসীন হওয়ার প্রথম দিন থেকেই ট্রাম্প আমেরিকা-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেভাবে করতে চেয়েছিলেন, তেমনটা এই চুক্তির মধ্য দিয়ে হয়নি। আগামী ৫ সপ্তাহের মধ্যেই সীমিত এই চুক্তির লিখিত দলিল চূড়ান্ত করবেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। মূলত আগামী মাসে চীনে আপেক নেতাদের সম্মেলনে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সম্ভাব্য বৈঠকের পূর্বেই লিখিত দলিলাদি চূড়ান্ত করার কথা।
যদি চুক্তি সম্পন্ন হয়, তাহলে ট্রাম্প দাবি করতে পারবেন যে, তিনি বাণিজ্য ইস্যুতে অগ্রগতি আনতে পেরেছেন। কেননা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে চাপে ছিলেন। এমনিতেও ঘরোয়া রাজনীতিতে তার অবস্থা টালমাটাল। বিরোধী ডেমোক্রেটরা তার বিরুদ্ধে অভিশংসন তদন্ত শুরু করেছে। চুক্তি হলে ট্রাম্প নিশ্চিতভাবেই কিছুটা সাফল্য দাবি করতে পারবেন।
চীনের সঙ্গে দরকষাকষিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সীমিত আকারে ছাড় দিয়েছেন। চীন থেকে আমদানি করা ২৫০০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। মঙ্গলবারই এই বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এই সীমিত চুক্তির আওতায় তা আপাতত স্থগিত থাকছে।
তবে ২০১৮ সালের শুরু থেকে আজ অবদি চীনা পণ্যের ওপর আরোপকৃত শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করেনি যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে সেপ্টেম্বরে কার্যকর হওয়া ১১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর আরোপ করা ১৫ শতাংশ শুল্কও বহাল। এছাড়া ১৫ই ডিসেম্বর নতুন চীনা পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি থেকেও সরে আসেনি যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া চীনের টেলিযোগাযোগ যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে চলমান অবরোধ থেকেও সরে আসার কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
চীনের ছাড়ও ছিল তুলনামূলক অল্প। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিজাত পণ্য, বিশেষ করে সয়াবিন ও শূকরের মাংস ক্রয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। সেই হিসাবে বার্ষিক ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য আমদানি করবে বেইজিং। এছাড়া মেধা সম্পত্তি (ইন্টিলেকচুয়াল প্রোপার্টি), মুদ্রা ও আর্থিক সেবার ক্ষেত্রেও চীন কিছু ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে শিল্পক্ষেত্রে ভর্তুকি সহ অন্যান্য ইস্যুতে বড় ধরণের ছাড় দিতে রাজি হয়নি চীন।
তবে দুই পক্ষের সম্মত হওয়া সীমিত চুক্তি কীভাবে কার্যকর করা হবে, সেই ধরণের কাঠামো এখনও দাঁড় করানো হয়নি। হোয়াইট হাউজ ডনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে লেখা শি জিনপিং-এর একটি বার্তা প্রকাশ করেছে। এতে শি জিনপিং লিখেছেন, ‘চুক্তির কিছু অংশ নিয়ে আমাদের দুই দল অগ্রগতি করতে পেরেছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা একে-অপরের উদ্বেগ নিরসন করবো ও অন্যান্য দিকেও ইতিবাচকভাবে অগ্রসর হবো। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সম্পর্ক দুই দেশ ও সামগ্রিক বিশ্বের স্বার্থের পক্ষে।’ অপরদিকে ট্রাম্প বলেছেন, তার প্রত্যাশা এই চুক্তি সামনের দিনগুলোতে আরও বৃহৎ হবে। তার ভাষ্য, ‘ভাগেভাগে চুক্তি করাই আমি মনে করি ভালো। আমরা এখন দ্বিতীয় ধাপের দিকে নজর দিতে পারবো।’
চুক্তির খবরে মার্কিন পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইতিবাচকভাবে। প্রসঙ্গত, দরকষাকষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন মার্কিন রাজস্ব বিষয়ক মন্ত্রী স্টিভেন মনুচিন ও মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট লাইথিজার। চীনের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী লিউ হে। মার্কিন মন্ত্রী মনুচিন বলেছেন, এই চুক্তির পর চীনকে ‘কারেন্সি ম্যানিপুলেটর’ আখ্যা দেওয়া থেকে বিরত থাকার বিষয়টি বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

আসামে এনআরসি: আত্মীয় স্বজনদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিলেটজুড়ে উদ্বেগ by মিলাদ জয়নুল

অন্তত ৬০ বছর আগের কথা। বিয়ের পর স্বামী তাকে নিয়ে চলে যান করিমগঞ্জে। সেখানে তার ৫ ছেলে, ৩ মেয়ে। সন্তানদের সবাই প্রতিষ্ঠিত, মেয়েরা ভালো চাকরি করছে। প্রতি ২ বছর পর পর একবার বাংলাদেশে আসতেন। এখানে তার বাপের বাড়ি-নাড়ির টান। ভাইবোনদের সবাই বাংলাদেশে বসবাস করছেন। এদেশে এলে কমপক্ষে তিন মাস তাকে থাকতে হতো।
এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে সময় কাটাতেন সুফিয়া বেগম। এখন তার বয়স ৮০-এর কাছাকাছি। বয়স আর অসুখে কণ্ঠস্বর ক্ষিণ হয়ে এসেছে। মোবাইল ফোন ধরতে গেলে হাত কাঁপে। এরপরও প্রতিদিন ২-৩ বার ফোন করে ভাইবোনদের কাছে জানতে চান- ‘এখন আমার কিতা অইবো। ছেলেদের এত বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্যের কী হবে? সত্যিই যদি তাদের বন্দিশালায় নিয়ে যায়, তবে ব্যবসা-সম্পত্তির দেখাশোনা করবে কে?’-এসব নানা প্রশ্ন করে কাঁদতে শুরু করেন সুফিয়া বেগম। তার বাপের বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার মুল্লাগ্রামে।
সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে করিমগঞ্জের দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটারের কম। বিয়ানীবাজার উপজেলা থেকে শেওলা-সূতারকান্দি চেকপোস্ট দিয়ে পার হলেই আসামের গ্রামগঞ্জ। আবার জকিগঞ্জ পৌরশহরের কাছাকাছি কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিলেই করিমগঞ্জ জেলা শহর। নদীর ওপার থেকে ডাক দিলে এপারের লোক শুনতে পায়। শীতকালে পানি কমে গেলে নদীতে জেগে ওঠা দু’পারের বালুচরে আত্মীয়-স্বজনরা দেখা করতেন। গল্প করতেন সুখ-দুঃখের। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাধার দেয়াল তাদের ছুঁতে না দিলেও কাছ থেকে দেখা হতো-কথা হতো।
সিলেটের ১৩টি উপজেলার মধ্যে সীমান্তবর্তী থানাগুলো হচ্ছে, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট। এই উপজেলারগুলোর সীমান্তঘেঁষা এলাকা করিমগঞ্জ ও আসাম।
সম্প্রতি আসামের ১৯ লাখেরও বেশি মানুষের নাম জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি থেকে বাদ দেয়ার ঘটনায় সিলেটে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আসামের করিমগঞ্জ কিংবা বাংলাদেশের সিলেট, এই দুই এলাকায় খুব কম লোক পাওয়া যাবে- যাদের নিকটাত্মীয় এপারে-ওপারে নেই। সিলেট জেলা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আমান উদ্দিন বলেন, বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, জকিগঞ্জ উপজেলার প্রায় সব ক’টি পরিবারের আত্মীয়-স্বজনরা করিমগঞ্জে বসবাস করেন। বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কসবা গ্রামের প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল আজিজের নিজস্ব নামে করিমগঞ্জে এখনো বিপণিবিতান রয়েছে। জকিগঞ্জ পৌরশহরের ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নূর উদ্দিন বলেন, তার নানাবাড়ি, ভগ্নিপতিসহ অনেক আত্মীয়ের বাড়ি করিমগঞ্জে। এনআরসির পর থেকে নিকটাত্মীয়দের জন্য তিনিও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
বিবিসি বাংলার তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় প্রশ্ন ওঠে আসামের অংশ সিলেটের ভাগ্যে কী হবে। সিদ্ধান্ত হলো গণভোট অনুষ্ঠানের। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ই জুলাই সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ জন। ভোট দিয়েছিল ৭৭ শতাংশ মানুষ। ২৩৯টি ভোট কেন্দ্রে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা ছাড়া শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছিল জানা যায়। ওই ভোটে কংগ্রেসের মার্কা ছিল ঘর আর মুসলিম লীগের মার্কা ছিল কুড়াল। হিন্দুদের মধ্যে নমশূদ্ররা ছিল মুসলিম লীগের পক্ষে। আলেমদের একদল ছিল কংগ্রেসের সমর্থনে। ওই ভোটে ৭৮ ভোট বেশি পেয়ে মুসলিম লীগ জয়লাভ করে। তবে গণভোটের রায় না মেনে মানচিত্রে দাগ কেটে করিমগঞ্জের কিছু অংশ ভারতকে দিয়ে দেয়ায় সিলেটের মানুষের কাছে চির বিতর্কিত হয়ে যায় রেডক্লিফ লাইন। ভোটে করিমগঞ্জের মানুষও আসাম ছাড়ার পক্ষে রায় দিলে করিমগঞ্জের কিছু অংশ রেডক্লিফ লাইনে ভারতের আসামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দুবাগ এলাকার আব্দুল লতিফ জানান, তার আপন ভাই করিমগঞ্জে বসবাস করেন বহু বছর থেকে। সেখানে আসামের এক নারীকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছেন। কিন্তু এনআরসিতে তার সঙ্গে স্ত্রীও বাদ পড়েছেন। এখন করিমগঞ্জে ফোন করে ভাইকে তার ভাগের জমিজমা আলাদা করে রাখতে বলেছেন। এ নিয়ে টেলিফোনে দুই ভাইয়ের মধ্যে অনেকবার ঝগড়া হয়েছে। আব্দুল লতিফ বলেন, ভাই একা আসলে হয়তো তাকে গ্রহণ করবো। কিন্তু বউ-বাচ্ছাদের নিয়ে এলে জায়গা দিবো না।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. তপোধীর ভট্টাচার্যের পৈতৃক বাড়ি অধুনালুপ্ত পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজার পৌরশহরের নয়াগ্রামে। প্রায় ৫ বছর আগে তিনি নিজ বাড়ি ঘুরে গেছেন। তিনি জানান, এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষকে অদূর ভবিষ্যতে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হবে, সেই সম্ভাবনা খুব কম। তাই বলে বাংলাদেশ এই ইস্যুতে নিশ্চিন্ত হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতেও পারবে না। মুখে তারা যতই এটাকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করুক, পর্দার আড়ালে তাদের এই চেষ্টাও প্রতিনিয়ত চালিয়ে যেতে হবে যে, এই মানুষগুলোকে কিছুতেই যেন জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়ার চেষ্টা না হয়!
নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ পড়েছেন এমন একজন তৈয়বুর রহমান। করিমগঞ্জের বঙ্গারইরগাঁও গ্রামে তার বসবাস। তিনি তার এক নিকটাত্মীয়কে জানান, আমি ভারতীয় নাগরিক, এ নিয়ে আমার সব ডকুমেন্টস আছে, এখন এনআরসিতে আমার নাম ওঠানো হয়নি। তিনি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন। কবি ও গবেষক ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আসামের রাষ্ট্রহীন মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবছে। বিশেষ করে সিলেটবাসী বরাক উপত্যকার লোকজনকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। খাসা গ্রামের জমিদার বংশের মেয়ে মহিরূহ পাল চৌধুরী টেলিফোনে বলেন, তার বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার নাম উঠলেও তার নাম ওঠেনি এনআরসিতে, ছেলেমেয়ে কারও নাম নেই। বাবার ভোটার তালিকা দেখাতে না পারলে তো সবাইকে জেলে ধরে নিয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমার ঠাকুরদা, বা সব পূর্ব পুরুষরাই এখানকার বাসিন্দা। ইংরেজ আমলে সরকারি কর্মীও ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ। কিন্তু এত পুরনো কাগজপত্র খুঁজে পাচ্ছে না বলে জানান মহিরূহ চৌধুরী।
এদিকে, আসামে এনআরসি তালিকা ঘোষণার পরই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কড়া নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বিজিবি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৫২ ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান বলেন, ‘আসামের বিষয় মাথায় রেখেই বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার জন্য ইতিমধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমনকি আসামের পরিস্থিতি যদি কোনো সময় অবনতি হয় তাহলে সেদিকেও আমাদের নজরদারি আছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশের নাগরিকদের বলা আছে তারা যাতে সতর্ক থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ এবং ভারতীয় নাগরিকদের কোনো তৎপরতা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজিবি ক্যাম্পকে অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে।’

কে শুনছে অসহায় অভিবাসী বা শরণার্থীর আর্তনাদ? by মালবী গুপ্ত

''মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও/ মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও।''
মনে হচ্ছে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ওই অমোঘ নির্দেশকে মান্যতা দিয়ে যদি সত্যি ক্রন্দনরত মানুষের পাশে আমরা দাঁড়াতে পারতাম।
মনে হচ্ছে, যুদ্ধদীর্ণ, জাতি দাঙ্গা বা গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে বা রাজনৈতিক সন্ত্রাসে মৃতপ্রায়, কখনো দারিদ্র কিম্বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ভিটে হারানো যারা হন্যে হয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে একটু নিরাপত্তা খুঁজে চলেছে, যদি তাদের পাশে দাঁড়াতে পারতাম।
কিন্তু পারছি কই? আর এই না পারার বিষাদ অনুভূতিই যেন বেশি করে সংবাদ মাধ্যমে বারবার উঠে আসা সেইসব আতঙ্কিত মুখগুলিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। যারা নিজভূমেই নিয়ত ছিন্নমূল হয়ে গ্রাম ছেড়ে, শহর ছেড়ে, কখনো বা দেশ ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে পালাচ্ছে।
চোখের সামনে আজ ভেসে উঠছে, তুরস্কের সাগর তীরে বালির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা সেই হৃদয়বিদারক বছর তিনেকের সিরিয়ান শিশু আলান কুর্দির নিথর দেহও। ভূমধ্যসাগরের নৌকাডুবি আরও অনেকের সঙ্গে যে শিশু প্রাণটিও কেড়ে নিয়েছিল।
ইউরোপে আশ্রয়: ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া এক আফ্রিকান শিশু।
ইউরোপে আশ্রয়ের খোঁজে বছর চারেক আগে সিরিয়া থেকে জলপথে পালানো পরিবারের সঙ্গে থাকা আলানের সেই প্রাণহীন দেহ যেন সেদিন কাঁপিয়ে দিয়েছিল সারা পৃথিবীকে।
তবে প্রতিদিনই এখন এমন অসংখ্য আলান, অসংখ্য পরিবারের সলিল-সমাধি ঘটছে। প্রতি মুহূর্তের বিপদসংকুল বাঁচা থেকে পরিত্রাণ পেতে, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপের পথে পা বাড়াচ্ছে যে হাজার হাজার অভিবাসী ও শরণার্থী, তাদের অনেকেরই মাঝপথে মৃত্যু ঘটে যাচ্ছে।
জানতে পারছি ওই সাগর পেরোতে গিয়ে কেবল ২০১৮ তেই প্রতিদিন ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন।
মনে পড়ে যাচ্ছে ক্রন্দনরত শিশুদের সেইসব অসহনীয় মুখও। বিগত কয়েক মাস ধরে আমেরিকায় পৌঁছনো শরণার্থী মা-বাবার কাছ থেকে যাদের জোর করে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই যে শিশুর কপালে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশহীন রাষ্ট্রহীন নাগরিকত্বহীনের টিকা।
কে জানে হয়তো তাদের উত্তরসূরিদের পিঠেও পুরুষানুক্রমে লেগে থাকবে সেই অপরিচয়ের গ্লানি, যে গ্লানির মধ্যে এক অনিঃশেষ অসহায়তা থেকে যাবে। হয়তো প্রাণের আশঙ্কাকেও তাদের আমৃত্যু লালন করে যেতে হবে ।
এবং এই অভিবাসী ও শরণার্থীর প্রতি আমেরিকায় 'জিরো টলারেন্স' নীতি প্রয়োগ করতে গিয়ে নিতান্ত শিশুদেরও যেভাবে বাবা মা'র থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তাকে মনে হয় যেন মানবসভ্যতার চরমতম অমানবিকতার নিদর্শন বললেও বুঝি কম বলা হয়।
আজ জীবন-মৃত্যুর এই দোলাচলে থাকা, সন্তান - স্বজন হারানো দেশান্তরী সেইসব লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্না কে মোছাবে? চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই কোটি কোটি আশ্রয়হীনের পাশে একাকী মানুষ কীভাবেই বা দাঁড়াবে?
আসলে মনে হচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়েই যেন ঘোর এক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আমরা কেবলই ঘুরে মরছি।
জাতিসঙ্ঘের রিফিউজি এজেন্সির ২০১৮ এর রিপোর্ট বলছে, সারা বিশ্বে ৬ কোটি ৮৫ লক্ষ মানুষ বাধ্য হয়েছে, ওই যুদ্ধ-জাতি-গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ঘর ছেড়ে পালাতে। আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন ।
আশঙ্কা হচ্ছে ২০১৯-এ ওই সংখ্যা যে কত গিয়ে দাঁড়াবে তাই ভেবে । কারণ একদিকে খরা, বন্যা, ভূমিকম্প, সুনামি তথা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত দরিদ্র মানুষ। অপরদিকে হিংসা, সংঘাতে জর্জরিত মানুষ।
সাগর পেরিয়ে গ্রীসের এক দ্বীপে পৌঁছেছেন এক কুর্দি পরিবার।
সে সিরিয়া সুদান সোমালিয়া ইয়েমেনই হোক, বা ভারত বাংলাদেশ মায়ানমার আফগানিস্তান কিম্বা মেক্সিকোই হোক - সর্বত্রই হাজারে হাজারে যারা ক্রমাগত নিরাশ্রয় হয়ে পড়ছে। ছিন্নমূল শরণার্থী হয়ে দেশান্তরে ছুটে যাচ্ছে। আশ্রয় খুঁজছে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার নানা দেশে।
কোথাও কোথাও অস্থায়ী ঠাঁইও জুটেছে, জুটছে। আবার কেউ কেউ দেখছি তাদের ওই অসহায়তার সামনেই আকাশ উঁচু পাঁচিল তুলে দিতে চাইছে এবং দিচ্ছে।
অথচ প্রতি ২ সেকেন্ডে একজন করে, আর প্রতি মিনিটে ৩০ জন মানুষ নতুন করে আশ্রয়চ্যুত হচ্ছে।এবং সারা পৃথিবীতে প্রতি ১১০ জন মানুষে একজনকেই হয় আশ্রয় খুঁজতে হচ্ছে, নয় দেশের মধ্যেই তাকে স্থানান্তরিত কিম্বা উদ্বাস্তু হতে হচ্ছে। আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন।
কে বলতে পারে আজ বা কাল আমরাও ওই ১১০ জনের একজন হব না। কে বলতে পারে কোনো যুদ্ধ বা কোনো ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদেরও ছিন্নমূল করবে না।
কারণ বিশ্ব জুড়েই এক গভীর অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা যেন কেবলই আমাদের গ্রাস করছে। মনে হচ্ছে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ যে সভ্যতা গড়ে তুলেছে, এক অদ্ভুত আক্রোশে যেন মানুষই সেই সভ্যতা দু'হাতে নিরন্তর গুঁড়িয়ে চলেছে।
মনে হচ্ছে মানুষই যেন মানুষের জন্য নিরবধি এক অনন্ত ফাঁদ পেতে চলেছে। এবং সেই অদৃশ্য মৃত্যু ফাঁদ যাকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলছে, তার সমস্ত মানবাধিকারও সে কেড়ে নিচ্ছে চরম নিষ্ঠুরতায়।
তাই ভাবছি কে কার পাশে দাঁড়াবে? কারণ যে প্রতিবেশী, সে ব্যক্তি হোক বা রাষ্ট্র, 'পাশে আছি' বলে কখনো কখনো যে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেই হাতের রঙও যে প্রায়শই বদলে বদলে যাচ্ছে!
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু : স্বজন হারানো দেশান্তরী সেইসব লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্না কে মোছাবে?
যে হাতের বরাভয়ে একদিন ক্রন্দনরত অসহায় মানুষ আশ্রয়ের নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছে, সেই হাতের মুদ্রাও হঠাৎই বদলে যাচ্ছে যেন। সেই মুদ্রায় উঠে আসছে হুঁশিয়ারি। কখনো গ্রামে ফিরতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি, দেশে ঢুকতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি, কখনো বা দেশ থেকে বিতাড়নেরও হুঁশিয়ারি।
তাই ভাবছি, রাষ্ট্রহীন নাগরিকত্বহীন, সমস্ত মৌলিক অধিকার বঞ্চিত, অহরহ মৃত্যুভয়তাড়িত যাদের জীবন যাপন, যাদের অপরিচয়ের অসহায়তা নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে দেশ থেকে দেশান্তরে এক অনিঃশেষ যাত্রা, তাদের প্রতি আমরা কি একটুও সহমর্মী, একটুও সহানুভূতিশীল হতে পারছি?
নাকি নিজেদের জীবন-যাপন নিয়ে আমরা এতটাই এখন মশগুল, যেখানে ওই লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্নার কোনো অভিঘাতই পৌঁছচ্ছে না?
মালবী গুপ্ত

পৃথিবীর কয়েকটি ব্যয়বহুল হোটেল-রিসোর্ট

হোটেল বা রিসোর্টের প্রতি রাতের ভাড়া কত হতে পারে? আর যাই হোক, ১ লাখ মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৮৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা হতে পারে তা ক’জনই বা ভাববেন! ফিলিপাইনে নতুন চালু হওয়া বানওয়া প্রাইভেট আইল্যান্ডে এই আকাশচুম্বি ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রিসোর্ট এটাই। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এমন অনেক হোটেল-রিসোর্ট আছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। কোনোটি আস্ত দ্বীপে একমাত্র ভিলা, আবার কোনোটি শুধুই তারকামানের একটি হোটেলের স্যুট। একঝলকে জেনে নিন সেগুলোর টুকরো তথ্য।
নেকার আইল্যান্ডের গ্রেট হাউস রুম
১. নেকার আইল্যান্ড: ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে রিচার্ড ব্র্যানসনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি এটি। প্রতি রাতের ভাড়া ৭৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার।
প্রেসিডেন্ট উইলসন হোটেলের দ্য রয়েল পেন্টহাউস স্যুট
প্রেসিডেন্ট উইলসন হোটেলের দ্য রয়েল পেন্টহাউস স্যুট
২. দ্য রয়েল পেন্টহাউস স্যুট: সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত প্রেসিডেন্ট উইলসন হোটেলের কক্ষ এটি। প্রতি রাতের ভাড়া ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার।
দ্য মার্কের ফাইভ বেডরুম টেরেস স্যুট
দ্য মার্কের ফাইভ বেডরুম টেরেস স্যুট
৩. ফাইভ বেডরুম টেরেস স্যুট: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে দ্য মার্ক হোটেলের কক্ষটির প্রতি রাতের ভাড়া ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার।
মার্টিনেজ গ্র্যান্ড হায়েট হোটেলের পেন্টহাউস স্যুট
মার্টিনেজ গ্র্যান্ড হায়েট হোটেলের পেন্টহাউস স্যুট
৪. পেন্টহাউস স্যুট: ফ্রান্সের কান শহরে অবস্থিত মার্টিনেজ গ্র্যান্ড হায়েট হোটেলের এই কক্ষের প্রতি রাতের ভাড়া ৫৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার।
ফায়েনা হোটেলের পেন্টহাউস
ফায়েনা হোটেলের পেন্টহাউস
৫. পেন্টহাউস: যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মিয়ামি শহরের ফায়েনা হোটেলের এই কক্ষের প্রতি রাতের ভাড়া ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
বাহামাসের মুশা কে আইল্যান্ড
বাহামাসের মুশা কে আইল্যান্ড
৬. মুশা কে: ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ বাহামাসে জাদুশিল্পী ডেভিড কপারফিল্ডের মালিকানাধীন ১৫০ একরের দ্বীপটিতে প্রতি রাতের ভাড়া ৪২ হাজার মার্কিন ডলার।
ফিজির লকালা আইল্যান্ডে হিলটপ ভিলা
ফিজির লকালা আইল্যান্ডে হিলটপ ভিলা
৭. হিলটপ ভিলা: ফিজিতে লকালা আইল্যান্ডে অবস্থিত এই থাকার জায়গায় প্রতি রাতের ভাড়া ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার।
সূত্র: ডেইলি মেইল

কলকাতার দ্বিতীয় মেট্রোরেল আংশিকভাবে চালু হচ্ছে এ মাসেই by পরিতোষ পাল

ভারতের প্রথম মেট্রোরেল (পাতাল রেল হিসেবে বেশি পরিচিত) যাত্রা শুরু করেছিল কলকাতাতেই। উত্তর ও দক্ষিণের সংযোগকারী এই মেট্রোরেলের প্রথম পর্যায়ের যাত্রার উদ্বোধন হয়েছিল ১৯৮৪ সালের ২৪শে অক্টোবর। এবার সেই দিনটিকেই সামনে রেখে কলকাতার দ্বিতীয় মেট্রোরেল ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর প্রথম পর্যায়ে যাত্রী পরিবহনের উদ্বোধন করার সব ব্যবস্থা পাকা করা হয়েছে। কলকাতার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের সঙ্গে গঙ্গার ওপারে হাওড়া ময়দানের সঙ্গে সংযোগকারী নতুন এই মেট্রোরেলের নাম ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো। এর দৈর্ঘ্য ১৬.৫৫ কিলোমিটার। মোট স্টেশন থাকবে ১২টি। এর মধ্যে ৬টি স্টেশন থাকবে উপরে আর বাকি ৬টি স্টেশন থাকবে মাটির নিচে। দীর্ঘ এই মেট্রোরেলের কাজ ধর্মতলা-শিয়ালদহ অংশের মাত্র কয়েক শ’ মিটার টানেল তৈরির কাজ মাটি ও বাড়ি ধসে যাওয়ার বিপর্যয়ের জন্য বন্ধ রয়েছে।
বাকি অংশের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে  গেছে। ভারতে প্রথম পানির নিচ দিয়ে টানেলের মধ্যদিয়ে যাবে এই ট্রেন।  এজন্য গঙ্গার নিচে ৫২০ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল তৈরি হয়েছে। মাত্র দেড় মাসের মধ্যে এই টানেল তৈরি করা হয়েছে আধুনিকতম প্রযুক্তির সহায়তায়। সাম্প্রতিক ধস বিপর্যয়ের ফলে গোটা পথে মেট্রোরেল কবে চালু করা যাবে তা বলতে পারেন নি কলকাতা মেট্রোর রেল করপোরেশনের কর্তারা। আসলে জমি অধিগ্রহণ, পথের পুনর্বিন্যাস এবং লোকালয় সরানোর কাজে নানা বাধার জন্য এই দ্বিতীয় মেট্রো তৈরির কাজ বারে বারে পিছিয়েছে। তবে বার বার তারিখ পরিবর্তনের পর এবার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভ থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার পথে প্রথম পর্যায়ে মেট্রোর দ্বিতীয় পথে যাত্রা শুরু হবে বলে ঠিক হয়েছে।  এই পথে থাকছে ৬টি স্টেশন। এজন্য একাধিকবার ট্রায়াল রান হয়ে  গেছে। আরেক দফা ট্রায়াল রান হবে আগামী সপ্তাহেই। এসে গেছে আধুনিক রেক। স্টেশনে স্টেশনে আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় গেট, যেগুলো গাড়ি এসে স্টেশনে দাঁড়ানোর পর খুলবে। আগামী ২৪শে অক্টোবর কলকাতার দ্বিতীয় এই মেট্রোরেলের প্রথম পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী চলাচলের সূচনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতেই হবে বলে জানা গেছে। প্রথম পর্যায়ের পর স্টেডিয়াম থেকে ফুলবাগান পর্যন্ত ট্রেন চলাচল চালু হবে আরো কিছুদিনের মধ্যে। এই পর্যায়ের কাজও শেষ হয়ে  গেছে। এর পরের পর্যায়ের ট্রেন চলবে শিয়ালদহ পর্যন্ত। বাকি অংশে ট্রেন চলবে শেষ পর্যায়ে। মেট্রোরেল সূত্রে জানা গেছে, দুই প্রান্তেই পরবর্তী সময়ে আরো কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত হবে এই ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো। পূর্বদিকে বিমানবন্দরের কাছে তেঘরিয়া পর্যন্ত এবং পশ্চিম প্রান্তে সাতরাগাছি পর্যন্ত এই রেলপথের বিস্তার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুর্গাপূজা বাণিজ্যে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান: বিশ্বের বৃহত্তম পথ উৎসব বলে পরিচিতি পেয়েছে বাঙালির দুর্গোৎসব। আসলে বারোয়ারি দুর্গাপূজা মানেই রাস্তায় বা রাস্তার ধারে প্যান্ডেল। আর তাই এর পরিচিতি স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল হিসেবে। তবে এই উৎসবকে ঘিরে যে খরচের মাতামাতি তা নিয়ে অনেকের আপত্তি রয়েছে। কলকাতার পুজোতে কত খরচ হয় তা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো পূজা কমিটিই মুখ খুলতে চান না। তবে কলকাতার শতাধিক মেগা পূজার বাজেট যে কয়েক কোটির কাছাকাছি তা এই সব পূজার জাঁকজমক দেখলেই বোঝা যায়। তবে পূজা কমিটির কর্তারা এই উৎসব উপলক্ষে আড়ম্বরের জন্য অর্থ ব্যয়কে অপচয় বলতে রাজি নন। বরং তারা মনে করেন, এই অর্থ প্যান্ডেল তৈরির কারিগর, শিল্পী, পুরোহিত, ঢাকি, বিদ্যুৎ সজ্জার কারিগর, মৃৎশিল্পী সহ নানা ক্ষেত্রের এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বছরের ছয় মাস ধরে। পশ্চিমবঙ্গে এ বছর ৩১ হাজারের বেশি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর অধিকাংশই বারোয়ারি পূজা। তবে বৃহত্তর কলকাতাতে এ বছর প্রায় ৪৫০০ বারোয়ারি পূজা হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক পূজা মেগা পূজা হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় ৪০০ পূজা কমিটিকে নিয়ে তৈরি ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের প্রেসিডেন্ট কাজল সরকারের মতে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে কলকাতাকেন্দ্রিক পূজাগুলোতে প্রায় ৪৫০০ কোটি রুপির লেনদেন হয়। আর গোটা রাজ্যে এর পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি রুপি। এই অর্থের অনেকটাই আসে করপোরেট সংস্থাগুলো থেকে। কলকাতার প্রায় ১০০০ পূজা কমিটি বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে করপোরেট সংস্থার বিশাল পরিমাণ অর্থ  পেয়ে থাকে। তিনি বলেছেন, কলকাতার ৪৫০০ পূজার মধ্যে প্রায় ২০০ পূজার প্রত্যেকটিতে ৫০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়। বাকিগুলোতে ২০ জন করে। ফলে আর্থিকভাবে প্রকৃত উপকৃত হন এমন মানুষের পরিবারের সদস্যদের ধরে সংখ্যাটি কয়েক লাখ। এদিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে তৈরি হচ্ছে গত ছয় দশকে দুর্গাপূজার বাণিজ্যিক বিবর্তনের ধারা নিয়ে একটি আর্কাইভস। যার নেতৃত্বে এই আর্কাইভস তৈরির কাজ চলছে সেই অধ্যাপিকা সুদেষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ১৯৬০-এর দশক থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিজ্ঞাপনী উপস্থাপনার বিবর্তন এবং ব্যান্ডিংকেই সংগ্রহ করার কাজ চলছে। বাংলার সেরা উৎসবের পরিবর্তনগুলোকে এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা হচ্ছে। এর ফলে গবেষকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও পূজার বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন।
বীরাষ্টমী উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমানঃ
পরাধীন ভারতে যুবকদের দেশসেবায় আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সরলা দেবী চৌধুরাণীর ঐতিহাসিক প্রচেষ্টায় শুরু হয়েছিল বীরাষ্টমী উৎসবের। পরবর্তী সময়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্যোগে তা নতুন মাত্রা পেয়েছিল। কলকাতার পরে ঢাকাতেও জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে আয়োজিত দুর্গাপূজায় ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাস  বীরাষ্টমী উৎসব করেছিলেন। তিনি নিজেই তার আত্মকথায় বলেছেন, ‘অষ্টমীর দিন বীরাষ্টমী উৎসব হইলো। কতিপয় স্বদেশি সংগীত হইলো,  হেমচন্দ্রের ভারত সংগীত কবিতাটি আবৃত্তি হইলো। লাঠিখেলা ও ছুরি খেলা হইলো। ঢাকায় সেটিই ছিল প্রথম বীরাষ্টমী উৎসব। ওপার বাংলা থেকে কলকাতায় চলে আসার পর তিনি বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবে নিয়মিত উপস্থিত থেকে বীরাষ্টমী উৎসবে যুবকদের আত্মরক্ষার প্রয়োজনে নানা ধরনের অস্ত্র শিক্ষার কথা বলতেন। শতবর্ষ পার করে আসা বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবে অষ্টমীর সকালে এই বীরাষ্টমী উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমান। বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবের অন্যতম কর্ত্রী শিক্ষিকা দেবযানী মুন্সী কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, বর্তমান সময়ে এই উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু আজও আমরা স্বাধীনতা আন্দোলনের বীরদের স্মরণে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে চলেছি। এখনো অষ্টমীর সকালে পুরনো দিনের মতোই পূজা প্রাঙ্গণে লাঠিখেলা, তরোয়াল খেলাসহ নানা আত্মরক্ষামূলক খেলার প্রদর্শনী হচ্ছে। শুধুই কি ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই বীরাষ্টমী উৎসবের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাসের পৌত্র বিশ্বরঞ্জন দাস জানিয়েছেন, বর্তমান সময়েও নানা অনাচার ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বীরের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু আমরা কি প্রকৃত বীরের সন্ধান  পেয়েছি? বা প্রকৃত বীরকে চিনতে  পেরেছি? এটা ঠিক যে, স্বদেশি আমলে আমাদের সামনে বীরের যে ধারণা ছিল তা আজ প্রযোজ্য হতে পারে না। তখন  দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার লক্ষ্যই ছিল প্রধান। এখন প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। তবে এখনো যুবকদের সামনে বীরের কর্তব্য রয়ে গেছে। তাই তিনি মনে করেন, বীরাষ্টমী উৎসবের মঞ্চ থেকেই বিপথগামী, আত্মকেন্দ্রিক ও অসহিষ্ণু যুব সমাজকে উদ্ধারের ব্রত নিতে হবে আমাদেরই।
নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা ভাসান নিয়ে বিতর্কঃ
গত কয়েক বছর ধরেই পরিবেশবিদরা নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। আদালতে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। তবে এবার ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা’র নির্দেশ ঘিরে প্রতিমার বিসর্জন বা ভাসান নিয়ে তৈরি হয়েছে ফের বিতর্ক। গঙ্গা যে ১১টি রাজ্যের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত সেই রাজ্যগুলোকে এক নির্দেশে গঙ্গা ও তার শাখা-প্রশাখায় প্রতিমা বিসর্জন নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছিল, নদী বা জলাশয়ের কাছে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে তার মধ্যে প্লাস্টিকের আস্তরণ দিয়ে প্রতিমা ভাসান দেয়া হোক। পরে প্লাস্টিকের মধ্যে জমা বর্জ্য তুলে নিয়ে নষ্ট করে দেয়া হোক। এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে দিল্লিতে যমুনায় এ বছর কোনো প্রতিমা বিসর্জন হয়নি। কিন্তু কলকাতায় গঙ্গায় বিসর্জন এবারও হয়েছে। সরকারি মদতেই হয়েছে এই বিসর্জন। এবারও প্রায় ৫ হাজার দুর্গা প্রতিমা (দুর্গার সন্তানদের ধরে ২০ হাজার) গঙ্গায় বিসর্জন দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন বন্ধে যিনি জাতীয় পরিবেশ আদালতে মামলা করেছিলেন, সেই সাবেক বিজ্ঞানী অম্বরনাথ সেনগুপ্ত বলেছেন, প্রতিমায় যে রঙ করা হয় তাতে ক্রোমিয়াম, সিসাসহ ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। এগুলো পানিতে মিশে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি করে। ফলে ক্ষতি হয় জীব বৈচিত্র্যের। অবশ্য নদী বা জলাশয়ে বিসর্জনের বিকল্প নিয়ে পরিবেশবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কলকাতার এক সরকারি স্কুলের সাবেক শিক্ষিকা তনুশ্রী সেনগুপ্ত বলেছেন, হিন্দু প্রথা অনুযায়ী, আমরা পুজোর প্রতিমা থেকে উপকরণ সবকিছুই পানিতে ফেলি। তবে নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা ভাসান কোনো শাস্ত্রের বিষয় নয়। কেননা, দশমীর দিন পুরোহিত মন্ত্র পাঠের মধ্যদিয়ে নিরঞ্জন করার পর সেই প্রতিমা আর চিন্মমী থাকে না। আর প্রকৃত বিসর্জন তো প্রতিমার সামনে থাকা ঘটের পানিতে দর্পণের মাধ্যমে  মুখ ও পায়ের প্রতিফলনের মধ্যদিয়েই সমাপ্ত হয়ে যায়। তাই মৃন্ময়ী প্রতিমার নদী বা জলাশয়ে বিসর্জনে বিতর্কের অবকাশ  নেই। বিষয়টি আসলে বিবেচনার পরিসরে নির্ধারিত হতে পারে প্রতিমা কীভাবে বিলীন করে দেয়া যায়।