Monday, September 22, 2025

ফিলিস্তিনকে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার স্বীকৃতির গুরুত্ব কতটা

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো শিল্পোন্নত দুই দেশ যুক্তরাজ্য ও কানাডা। শিগগিরই এ তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেক প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশ ফ্রান্স। এটা হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যদেশের মধ্যে চারটি দেশেরই স্বীকৃতি পাবে ফিলিস্তিন। এর আগে ১৯৮৮ সালে অন্য দুই স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

আজ যুক্তরাজ্য ও কানাডার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যদেশের প্রায় ৭৫ শতাংশের স্বীকৃতি পেল ফিলিস্তিন। এখন প্রশ্ন হলো, এ স্বীকৃতির অর্থ কী বা এটি কি বাস্তবে ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য কোনো পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে?

আসলে ফিলিস্তিন এমন একটি রাষ্ট্র, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক মিশন রয়েছে। অলিম্পিকের মতো ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেয় ফিলিস্তিন। জাতিসংঘের স্থায়ী পর্যবেক্ষক সদস্যও তারা। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ফিলিস্তিনের কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা, রাজধানী বা সেনাবাহিনী নেই।

ইসরায়েলি দখলদারির মুখে নব্বইয়ের দশকে পশ্চিম তীর শাসনের জন্য ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (পিএ) গঠন করা হয়েছিল। তবে তাদের পুরো ভূখণ্ডটির ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফিলিস্তিনের গাজা অংশেও প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি প্রতীকী ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে শক্তিশালী নৈতিক বার্তা দেওয়া গেলেও বাস্তবে খুব একটা পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার এই স্বীকৃতি প্রদান ফিলিস্তিনিদের প্রতি ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই তিন দেশই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশাকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেছে।

তা ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা ছিল যুক্তরাজ্যের। এরপর দীর্ঘকাল ইসরায়েলের মিত্রদেশ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে লন্ডন। সে কারণে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্যের এই স্বীকৃতির বড় ধরনের প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে।

গত জুলাইয়ে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছিলেন, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রতি সমর্থন জানানোর এক বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে যুক্তরাজ্যের। তিনি ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার কথা উল্লেখ করেন। এ ঘোষণায় সই করেছিলেন তাঁরই পূর্বসূরি আর্থার বেলফোর।

বেলফোর ঘোষণায় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য একটি আবাস গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। ডেভিড ল্যামি বলেন, ঘোষণায় এই প্রতিশ্রুতিও ছিল যে ইহুদি বাদে এই ভূখণ্ডে অন্য সম্প্রদায়ের যেসব লোকজন বসবাস করেন, তাঁদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কিছু করা হবে না। যদিও ইসরায়েলের সমর্থকেরা বলে থাকেন, ঘোষণায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কিছু বলা হয়নি।

এমন সব জটিলতার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সমস্যার সমাধান সামনে এগোয়নি। দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৬৭ সালে আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের আগে পশ্চিম তীর ও গাজার যে সীমানা ছিল, তা নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। রাজধানী হওয়ার কথা ছিল পূর্ব জেরুজালেম। তবে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়নি।

এখন যদি যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ফ্রান্সও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়, তাহলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের অবস্থান আরও শক্ত হবে। স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থাকবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না দেওয়া দেশ। যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যতিক্রম। তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতি এককাট্টা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলোর একটি জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদ
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলোর একটি জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদ। ছবি: এএফপি

‘সেবার রাজনীতি’ যেভাবে ‘খয়রাতি মন’ তৈরি করে by আলতাফ পারভেজ

উচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে ছাত্র সংসদ (ডাকসু ও জাকসু) নির্বাচনের পর দেশজুড়ে নাগরিক সমাজে অনেক ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। যে বিতর্কগুলো জাতীয় নির্বাচনের বেলায়ও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। সে জন্য সমাজে এসব আলোচনা হওয়া দরকার আছে।

সব বিতর্ক একসঙ্গে আলোচনায় না এনে আলাদাভাবে বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে পারি আমরা। যেমন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দান-অনুদানের কদর ও নির্বাচনে তার প্রভাব নিয়ে কথা হচ্ছে। আপাতত এ বিষয় এবং এর রাজনৈতিক–অর্থনীতি নিয়ে ভাবতে পারি আমরা।

ডাকসু, জাকসু ও রাকসু হলো শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন। পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দর–কষাকষি করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস জীবন স্বস্তিকর করাই এসব ইউনিয়নের প্রকৃত লক্ষ্য। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাত্রদের দাবিদাওয়া আদায় করে দেওয়াই ছাত্র সংসদের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থায় সংসদের বিধান সে জন্যই রাখা হয়েছে। এটা অনেকটা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ‘সিবিএ’র মতো।

কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একাধিক শ্রমিকসংগঠন থাকতে পারে; কিন্তু শ্রমিকেরা তাদের মধ্য থেকে কালেকটিভ বার্গেনিং এজেন্ট বা সিবিএ হিসেবে বেছে নেয় কয়েকজন কর্মীকে। ডাকসু, জাকসু ও রাকসুতেও শিক্ষার্থীদের তা–ই করার কথা।

ডাকসু, জাকসু ও রাকসুর কাজ হলো ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দেওয়া। এখন প্রশ্ন হলো ইউনিয়ন নেতৃত্ব যদি সরকার, রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দাবিদাওয়া আদায়ের বদলে নিজেরাই ভিন্ন কোনো উৎস থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের জন্য সেবা ও সুবিধা বাড়াতে চেষ্টা করে, তাহলে সমস্যা কী? এর কি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনী অধ্যায়ের পূর্বাপর অনুসন্ধান করে অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলছেন, বিদ্যাপীঠগুলোতে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বাছাইয়ের নির্বাচনে দান-অনুদানে যুক্ত সংগঠন ও প্রার্থীরা ভোটে এগিয়ে ছিলেন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দর–কষাকষির চেয়ে নিজেরাই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সেবাধর্মী সংগঠনগুলো বাড়তি ভোট পেয়েছে। ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প থেকে শুরু করে হলে পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র বসানো পর্যন্ত অনেক কাজ করছে কোনো কোনো সংগঠন। তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীরা এসব কাজ পছন্দ করছেন। তাঁরা এরকম দান-অনুদানে যুক্তদের ভোটে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে হয়েছে।

এ রকম যুক্তি ও অনুমান যেহেতু অনেকের কাছে বেশ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে, সেই কারণে এই  সিদ্ধান্তে আসাও সহজ হয় যে অতীতে শিক্ষার্থীরা যেসব বিষয় দেখে নেতৃত্ব পছন্দ করতেন, এখনকার পছন্দের মানদণ্ড তার চেয়ে ভিন্ন।

এর ফল হিসেবে পরের অধ্যায় অনুমান করা কঠিন নয়। জাতীয়ভাবেও হয়তো অনেক সংগঠন এখন দান-খয়রাতধর্মী সেবামূলক কাজের দিকে বেশি ঝুঁকবে। সে ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন তো উঠতে পারে, ক্যাম্পাসে হোক বা অন্যত্র হোক, এসব সেবাধর্মী কাজের খরচ কারা জোগান দেবে বা দিচ্ছে?

শিক্ষার্থীদের পক্ষে ওয়াশিং মেশিন কিনে হলগুলোর তলায় বসানো সম্ভব নয়। হঠাৎ হঠাৎ গরু কিনে জিয়াফত আয়োজনও সহজ নয়। তাহলে নিশ্চয়ই বাইরের কোনো উৎস থেকে তারা এই অর্থ পাচ্ছে বা নিচ্ছে।

শত শত শিক্ষার্থীকে ইফতার করানো বা উপঢৌকন দেওয়াও বাইরের আর্থিক–সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। তার মানে এ ধরনের সেবাধর্মী তৎপরতা শুধুই ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক বিশুদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এর ক্যাম্পাস–বহির্ভূত একটি অন্তর্জাল অবশ্যই আছে; কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের এত অন্তর্জাল খোঁজার ‘টাইম নেই’। সুবিধাটা নগদ নগদ তাঁরা পছন্দ করছেন।

যেমন এখন ঢাকা শহরে গণপরিবহনের স্বল্পতা একটি বিশাল সমস্যা। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও খোদ রাজধানীতে সে রকম কোনো স্বস্তিকর ব্যবস্থা কোনো সরকার করতে পারেনি বা করেনি। এসব নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-দুঃখ আছে। এখন কোনো রাজনৈতিক দল বা তার ছায়ায় পুষ্ট কোনো ‘সামাজিক সংগঠক’ যদি ঢাকায় বিনা মূল্যে ১০০ বাস নামায়, তাতে সাধারণ মানুষ খুব খুশি হবেন।

এ রকম খরচ ও সেবার একটি রাজনৈতিক-অর্থনীতি থাকতে পারে। নিদেনপক্ষে এর মাধ্যমে সমাজে মতাদর্শিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা তো থাকবেই; কিন্তু বিপন্ন মানুষ, নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের অত কিছু খেয়াল করলে চলে না। যে দল বা সংগঠন এ রকম সেবা দেবে, তারা ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান বা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না বিপক্ষে, সেটি ভাবার চেয়ে মানুষ দ্রুততার সঙ্গে ওই সেবা নেবেন এবং সেবাদানকারীও তাঁদের পছন্দনীয় হয়ে উঠবে।

এ রকম আরও সেবাদানকারী তখন এগিয়ে আসতে পারে এ রকম কাজে। কারণ ‘পছন্দ’ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে অনেক লোভনীয় জিনিস; কিন্তু তাতে গণপরিবহন–ব্যবস্থার দাবি খুব একটা এগোবে না। একাধিক দল একই সেবা দিতে নামলে ওই দাবি বরং হারিয়ে যাবে।

কিন্তু এ রকম মডেল রাষ্ট্রের খুব পছন্দ; অন্যান্য ‘কর্তৃপক্ষের’ও পছন্দ। সমাজে দারিদ্র্য কমানো, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা, বৈষম্য হ্রাস করা, শিক্ষার অধিকার কিংবা স্বাস্থ্যসুবিধা বাড়ানোর দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে এসব বিষয়ে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেই। আর সরকার গঠিত হয় রাষ্ট্রের সেসব দায় বাস্তবায়নের জন্য।

কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র বা বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র সেসব দায়িত্ব মেটাতে পারছে না। তাতে জন–অসন্তোষ আছে। এ ধরনের রাষ্ট্রে নাগরিকেরা বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চাইতে পারেন। সে অবস্থায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ‘বিকল্প’ হিসেবে সেবাধর্মী কাজ, দান, অনুদান ও খয়রাত রাষ্ট্রের জন্য একটি ভালো ডিফেন্সলাইন। এতে রাষ্ট্রের গায়ে ক্ষোভের আঁচড় কম লাগে। প্রশাসন তার ব্যর্থতা আড়াল করতে পারে।

যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাবারের মান ও পরিমাণ বাড়ানো দেশের সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এটা রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন এমন হতে পারে ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে শক্তিশালী কোনো সংগঠন তাদের মূল দল বা দেশ-বিদেশের সহযোগী বন্ধুদের মাধ্যমে বিপুল অর্থ এনে নিজেরাই হলে হলে বাড়তি খাবার সরবরাহ করল। এটা শিক্ষার্থীরা খুব পছন্দ করবে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রও খুব পছন্দ করবে।

কেবল ক্যাম্পাসে নয়, কয়েক বছর ধরে গ্রামাঞ্চলেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মধে৵ কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন এভাবে ‘দরিদ্রবান্ধব সেবাধর্মী কাজ’ করছে। জাতীয় নির্বাচন হলে তারও চমকপ্রদ কিছু ফল দেখব আমরা। এ রকম সবকিছুর প্রাপ্তি হিসেবে সেবাধর্মী দান-অনুদানের একটি প্রতিযোগিতাও হয়তো দেখব আমরা চারদিকে। এতে জনসমাজে পদ্ধতিগত বঞ্চনার রাষ্ট্রীয় সমাধানের দাবি ক্রমে অবলুপ্ত হতে বাধ্য। এ রকম সমাধানচিন্তার প্রস্তাবকারীদেরও স্বভাবত সামনে দুর্দিন।

এ রকম আর্থসামাজিক অবস্থা রাষ্ট্রের জন্য একটি সুযোগের মতো। ক্ষমতার রাজনীতিতে উচ্চ আকাঙ্ক্ষী ধনাঢ্য সমাজের জন্যও অনুরূপ। জনসমাজ সেবা পেয়ে খুশি থাকলে শিক্ষা খাত বা স্বাস্থ্য খাতে ব্যায় না বাড়িয়ে বাড়তি টাকা রাষ্ট্র সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র শক্তিশালী করায় বিনিয়োগ করতে পারে। এতে ‘রাষ্ট্র’ ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং সমাজের পুরোনো অধিকারবাদী, পরিবর্তনবাদী রাজনীতিকেও কোনঠাসা করতে পারে।

সেবাধর্মী রাজনীতিতে রাষ্ট্রের লাভ তাই দ্বিবিধ। ফলে আন্তরিকভাবেই এ রকম ‘কাজ’ রাষ্ট্রের সব ‘কর্তৃপক্ষের’ সমর্থন, সহায়তা ও সহযোগিতা পায় ও পাবে। সব দেশে সেটিই হয়। কারণ, একদিকে এতে সব ‘কর্তৃপক্ষের’ সুরক্ষা বাড়ে। অন্যদিকে এতে তাদের শক্তিও বাড়ে। কুলীন সমাজ এ রকম রাষ্ট্রকে দিয়ে খুব সহজে কর্তৃত্ববাদী একটি শাসনও কায়েম করতে পারে।

কুলীন সমাজ ও করপোরেটদের জন্য দান-অনুদান কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক সুবিধা রাষ্ট্রের মতোই ব্যাপক ও সম্পূরক। সে বিষয়েও দু–চার কথা বলা দরকার।

সেবাধর্মী রাজনীতির একটি অনিবার্য পার্শ্বফল হলো সামাজিক বৈষম্য আড়াল হওয়া। সমাজে সম্পদের যে অসম বণ্টন এবং পুঁজির শোষণ রয়েছে, দানের রাজনীতি তাকে ন্যায্যতা ও স্বাভাবিক চেহারা দেয়। দারিদ্র্য ও যাবতীয় সামাজিক দুর্দশা যে একটি কাঠামোগত সমস্যা, সেটি আড়াল করে তথাকথিত এই ‘সেবা’।

‘সেবার রাজনীতি’ জনসমাজকে এই বার্তাই দেয়—‘ধনাঢ্যরা কীভাবে আয় করছেন, রাষ্ট্র সম্পদের সুষম বণ্টনে ব্যর্থ কি না, সেসব দেখার দরকার নেই তোমার। বৃহত্তর সমাজের কথা বাদ দাও। ধনাঢ্যরা তোমাকে যা দিচ্ছেন, তাতে তোমার ভালোই চলে যাবে। তুমি এতে সন্তুষ্ট থাকো। শোকর করো এবং দাতাদের তোমার অভিভাবক হতে দাও।’

এভাবে সেবার পথে, অধিকারবাদী প্রতিদ্বন্দ্বীকে বিনা যুদ্ধে ধরাশায়ী করে কুলীন সমাজ রাষ্ট্র ও রাজনীতির অভিভাবকত্ব পায়। তবে এ রকম ‘সেবাবাদ’ দুইভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষতি করে। রাষ্ট্রকে জনস্বার্থে সম্পদ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় আরও ন্যায্য ও দক্ষ হতে বাধাগ্রস্ত করে এটা। জনগণের তরফ থেকে এ লক্ষ্যে চাপ কমতে থাকায় রাষ্ট্র ক্রমে একটি ক্ষুদ্র সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর নিজস্ব হাতিয়ারে পরিণত হয়। গুটিকয়েকের হাতে সম্পদের পুঞ্জীভবনকে তখন সমস্যা মনে করা হয় না। এতে রাষ্ট্রের ভেতর সমান্তরাল অর্থনৈতিক বিকাশ সীমিত থেকে যায়।

দ্বিতীয়ত সমাজ ও রাষ্ট্রকে অধিকতর সুষম ও ন্যায়ানুগ করার ক্ষেত্রে জনসমাজের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও আইনি অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত করে দান-অনুদান মডেল। সুবিধাবঞ্চিত সমাজ যেহেতু বাস্তব কারণে সেবা-দান-অনুদান অগ্রাহ্য করতে পারে না; বরং এটা পাওয়ার জন্য ন্যায্য ভিন্নমতও চেপে যায়, সে কারণে এই মডেল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশও রুদ্ধ করে।

এটা জনসমাজে সৃষ্টিশীল উদ্যমের বদলে ‘খয়রাতি মন’ তৈরি করে চলে, বিশেষ করে সুবিধাগ্রহীতাদের মধ্যে। এ অবস্থায় মানুষ ভাবতে শুরু করে—তার বা তাদের অবস্থার পরিবর্তন বাইরের কোনো শক্তির দয়াদাক্ষিণ্যনির্ভর। নিজেরা বা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যমান অবস্থার বদলে সক্ষম নয়। তাদের সে রকম লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ হওয়ারও দরকার নেই। এ রকম মনোভাব সহজে সুবিধাপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাবানদের পুরোনো কর্তৃত্ব ও শক্তিকে উৎপাদন-পুনরুৎপাদন হতে সহায়তা করে চলে।

‘সেবা-মডেল’ সমাজের ক্ষমতা-সম্পর্ক অপরিবর্তনশীল করে রাখতে চায় এবং সেবার আদলে নতুন ধরনের একটি উপনিবেশ-সংস্কৃতি জারি করে ও তাকে প্রতিমুহূর্তে প্রয়োজনীয় মনে করায়। ‘সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিরা’ এতে চিরকাল নির্ভরশীল ও অপরের মুখাপেক্ষী থেকে যায় এবং তাঁদের দেশের ‘প্রতিষ্ঠানগুলো’র প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নও আর হয় না। এতে সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণের বদলে ‘সুবিধা’ পাওয়ার সর্বব্যাপক আকুতি দেখা দেয়। এসব বিবেচনায় সমাজে ‘সেবা’ বিশেষ ধরনের একটি রাজনৈতিক বিনিয়োগ এবং নিশ্চিতভাবে কৌশলগত ও হেজিমনিক বিনিয়োগও বটে।

* আলতাফ পারভেজ, গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

‘সেবার রাজনীতি’ যেভাবে ‘খয়রাতি মন’ তৈরি করে

এবার দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ফিলিপাইন

এবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ফিলিপাইনের জনগণ। রোববার দেশটির রাজধানী ম্যানিলায় বিক্ষোভ করেছেন দেশটির হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। বলা হচ্ছে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি বরাদ্দে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের দুর্নীতি হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে এখনও কঠোর না হলেও সতর্ক অবস্থানে আছে সরকার। পুলিশের পাশপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারের তরফে বলা হয়েছে, ‘লাল সতর্কতা’ হিসেবে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।  এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় মারাত্মক সহিংসতা হয়েছে। সেখানে পুলিশি সহিংসতা, সংসদ সদস্যদের বেতন বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন হয়েছে। ম্যানিলায় বিক্ষোভকারীরা ফিলিপাইনের পতাকা উড়িয়ে দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘আর না, অনেক হয়েছে, ওদের জেলে ঢোকাও’- লেখা ব্যানার ছিল। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বরাদ্দে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকলের বিচার দাবি করেছেন তারা।

আন্দোলনে তরুণদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। ছাত্র নেতা আলথিয়া ত্রিনিদাদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, আমরা দারিদ্র্যে ডুবে আছি এবং আমাদের বাড়িঘর, জীবন ও ভবিষ্যৎ হারাচ্ছি, অথচ তারা আমাদের করের টাকায় বিলাসবহুল গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ এবং বড় বড় কর্পোরেট লেনদেন থেকে বিশাল অর্থ উপার্জন করছে। এটা আমার কাছে খারাপ লাগে। তিনি আরও বলেন, আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে মানুষ আর শোষিত হবে না।

এএফপি তরফে বলা হয়েছে, রোববার সকালে ম্যানিলার লুনেটা পার্কে প্রায় ১৩ হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছে। জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট ফার্ডিনান্ড মার্কোস জুনিয়র তার বার্ষিক ‘স্টেট অফ দ্য নেশন’ ভাষণে ওই কেলেঙ্কারির কথা তুলে ধরার পর তথাকথিত ‘ভুতুড়ে অবকাঠামো প্রকল্প’ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। মার্কোস পরে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করেন, যা ৯ হাজার ৮৫৫টি বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের বেশিরভাগ প্রকল্প তদন্ত করবে। এই প্রকল্পগুলোর মোট বরাদ্দ ছিল ৫৪৫ বিলিয়ন (৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) পেসো। জনগণের ক্ষোভ আরেকটি কারণ হচ্ছে- বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের চুক্তি সারাহ ও প্যাসিফিকো ডিসকায়া নামের এক দম্পতিকে দেয়া হয়েছে। যারা অতি বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্থ। বন্যা নিয়ন্ত্রণের মতো এমন একটি গণপ্রকল্প এই ধনী দম্পতিকে দেয়া জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে।

আন্দোলনের ওপর গভীর নজর রাখছে সরকার। সতর্কতা স্বরূপ আগে থেকেই সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কোস গত সোমবার বলেন, এই কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য তিনি জনগণের উপর মোটেও অসন্তুষ্ট নন। বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এদিকে ম্যানিলা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক বার্নাবি লো জানান, এই প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিভিন্ন খ্রিস্টান চার্চ। ক্যাথলিক চার্চগুলোর নেতৃত্বে একত্রিত হয়েছে ফিলিপাইনের জনগণ।

mzamin

মাও সে–তুং: বিপ্লবের সূর্য নাকি বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ক by কাজী আলিম-উজ-জামান

‘তুষারে শুভ্র সারা পৃথিবী;

অবস্থার গুরুভারে আমরা বরফের ওপর দিয়ে চলেছি,

দৃষ্টিতে কোথাও নেই সবুজ পাইন,

লালঝান্ডা হাওয়ায় উড়িয়ে আমরা অতিক্রম করি গিরিপথ

আমাদের মাথার ওপর খাড়া পাহাড়’

—মাও সে–তুং, ফেব্রুয়ারি ১৯৩০

আজকের আধুনিক চীন—যে রাষ্ট্র আজ বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে সর্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করছে—তার ভিত্তি নির্মাণের পেছনে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় অবদান মাও সে–তুংয়ের। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে, ১৯৭৬ সালে তিনি দেহ রেখেছেন বটে; কিন্তু তাঁর চিন্তা, দর্শন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনো প্রতিদিন নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁকে। কেবল তাঁর জন্মভূমি চীনেই নয়, এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশেই মাও আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

১৯১৭ সালে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় জার শাসনের পতন ঘটে; ক্ষমতায় আসে বলশেভিকরা, যাদের আদর্শ ছিল সমাজতন্ত্র। তখন মাও সে–তুং মাত্র ২৪ বছরের তরুণ। এরই মধ্যে তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শ নিয়ে লেখা বহু গ্রন্থ পড়ে ফেলেছেন। রুশ বিপ্লব তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। পরবর্তী সময়ে মাও লিখেছেন—

‘১৯২০ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে, তত্ত্বগত হোক বা কর্মক্ষেত্রে, আমি মার্ক্সবাদী হয়ে উঠি। এই প্রথম আমি নিজেকে প্রকৃত অর্থেই মার্ক্সবাদী হিসেবে ভাবতে পারলাম।’

মাও সে–তুংয়ের রাজনৈতিক দর্শন পরিচিত ‘মাওবাদ’ নামে। মূলত এটি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদেরই এক নতুন রূপ, তবে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও কৃষিভিত্তিক চীনা সমাজের বাস্তবতা এর ভিত গড়ে তোলে। মাওবাদের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষকশ্রেণিকে সংগঠিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, গণসংহতির ভিত্তিতে আন্দোলন পরিচালনা এবং কৌশলগত জোট গঠনের ধারণা।

শুধু চীনেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা প্রান্তে মাওবাদের ছাপ আজও স্পষ্ট। ভারত, নেপাল, ফিলিপাইনসহ একাধিক দেশে মাওবাদী সংগঠন সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

বলা হয়ে থাকে, বিপ্লবী নেতৃত্বে যেমন মাও ছিলেন নিঃসন্দেহে সফল, রাষ্ট্র পরিচালনায় ততটা সাফল্য তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকেনি। জনগণকে সংগঠিত করে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতায় পৌঁছেছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর সেই জনগণকেই তাঁর নীতির কারণে বহুবার দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’ কিংবা ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর মতো উদ্যোগ প্রমাণ করে, একজন দূরদর্শী বিপ্লবী নেতা হয়তো তিনি ছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় দেশকে অনিশ্চয়তা, দুর্ভিক্ষ ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় মাও সে–তুংয়ের বিখ্যাত উদ্ধৃতিসংকলন ‘লিটল রেড বুক’। ছোট আকারের, উজ্জ্বল লাল মলাটের এই বইয়ের ভেতরে ছিল মাও সে–তুংয়ের রাজনীতি, বিপ্লব, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামরিক কৌশল, যুবসমাজ, নারী, কৃষি ও শিল্প–সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত উক্তি। সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক কমিশনার লিন বিয়াও বইটি সংকলন করেন। মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা।

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় (১৯৬৬–১৯৭৬) বইটি হয়ে ওঠে একধরনের ‘অবশ্যপাঠ্য’। স্কুল, কারখানা, সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও লাল বই হাতে দেখা যেত ছাত্র-যুবক, শ্রমিক ও কৃষকদের। মাও সে–তুংয়ের চিন্তা মুখস্থ করা, উদ্ধৃতি দিয়ে বক্তৃতা রাখা, এমনকি বিতর্কে অংশ নেওয়া ছিল রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ। একসময় এটি বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক মুদ্রিত বইয়ে পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ‘লিটল রেড বুক’–এর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। আফ্রিকা ও এশিয়ার মুক্তিকামী আন্দোলন থেকে শুরু করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদী তরুণদের হাতেও এই বই দেখা গেছে। মাও সে–তুংয়ের বিপ্লবী ভাষ্য তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছিল একধরনের সংগ্রামী অনুপ্রেরণা।

তবে গবেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে এক নয়। অনেকেই মনে করেন, এটি কেবল বিপ্লবী চেতনা জাগানোর বই ছিল না, বরং মাও সে–তুংয়ের ব্যক্তিপূজা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক কার্যকর হাতিয়ারও বটে।

আজ ৯ সেপ্টেম্বর এই মহান নেতার প্রয়াণবার্ষিকী। অতীতের আয়নায় ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, মাও সে–তুংয়ের জীবনের চালচিত্র—এক কৃষিপ্রধান দেশে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখানো তরুণ থেকে শুরু করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, দীর্ঘ গেরিলা সংগ্রামের সফল সেনাপতি, আবার একই সঙ্গে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ক।

মহাজীবনের সূচনা

১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর। চীনে তখন চলছে কিং রাজবংশের শাসন, বলা ভালো দুঃশাসন। একদিকে বিদেশি শক্তির আগ্রাসন, অন্যদিকে দুর্বল প্রশাসন—দেশজুড়েই বিরাজ করছিল অস্থিরতা আর দুরবস্থা। সে সময়েই হুনান প্রদেশের শাওশান গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নিলেন মাও সে–তুং।

মাওদের পরিবার তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ছিল। নিজস্ব কৃষিজমি থাকায় অনাহার-অভাব তেমন ভোগ করতে হয়নি। তবে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, চাষাবাদ আর কৃষকের সংগ্রাম খুব ছোটবেলা থেকেই মাওকে প্রত্যক্ষভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী জীবনে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও বিপ্লবী চিন্তায় এই গ্রামীণ অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

আট বছর বয়সে গ্রামের স্থানীয় স্কুলেই মাও সে–তুংয়ের পড়ালেখা শুরু হয়। তবে শিক্ষাজীবনের শুরুটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র পাঁচ বছর পর, ১৩ বছর বয়সে তাঁকে পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে নেমে পড়তে হয়। জমিজিরাত সামলানো, মাঠে শ্রম দেওয়া—এসবের মধ্য দিয়েই কৈশোরের একটি বড় অংশ কাটে তাঁর।

কৈশোরেই মাওকে জীবনের আরেকটি ধাক্কা সামলাতে হয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবা তাঁর বিয়ে ঠিক করে দেন। কিন্তু এই বিয়ে তিনি কখনোই মেনে নেননি।

১৭ বছর বয়সে ঘর ছেড়ে হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় গিয়ে ভর্তি হন একটি স্কুলে। পড়াশোনার পাশাপাশি তখন মাও ডুবে যান রাজনৈতিক ঘটনাবলির ভেতরে। ১৯১১ সালে রাজার শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হলো সিনহাই বিপ্লব। তরুণ মাও তাতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং যোগ দেন চীনের জাতীয়তাবাদী দল কুয়োমিনটাংয়ে। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন সান ইয়াত-সেন, যিনি আধুনিক চীনের প্রথম বিপ্লবী নেতা হিসেবে খ্যাত।

বিপ্লবের মুখে ১৯১২ সালে পতন ঘটে দীর্ঘকালীন রাজতন্ত্রের। প্রতিষ্ঠিত হয় চীন প্রজাতন্ত্র। আর এ ঘটনাই মাও সে–তুংয়ের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রথম বড় ধাক্কা আনে—তাঁকে ভাবতে শেখায় গণতন্ত্র, বিপ্লব ও জনগণের শক্তি নিয়ে।

১৯১৩-১৮ সালে হুনান প্রদেশের টিচার্স ট্রেনিং স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং রুশ বিপ্লব তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।

১৯১৮ সালে মাও সে–তুং স্নাতক শেষ করেন। কিন্তু একই বছরে বড় ধাক্কা আসে ব্যক্তিগত জীবনে—মায়ের মৃত্যু। এ ঘটনায় তিনি স্থির সিদ্ধান্ত নেন, আর বাড়ি ফিরবেন না। পাড়ি জমান চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে।

প্রথমে চাকরি জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। বহু চেষ্টা ও তদবিরের পর অবশেষে তিনি বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক লি দাজাওয়ের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। লির বিপ্লবী চিন্তাভাবনা মাওকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সে সময়ই হাতে পান মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার বইপত্র। এ পরিচয় মাওকে ধীরে ধীরে মার্ক্সবাদী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে পরিচালিত করে।

১৯২১ সালে মাও সক্রিয় ভূমিকা নেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে। এভাবেই তিনি চীনের রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রবেশ করেন, যেখানে কৃষক ও শ্রমিকের শক্তিকে কেন্দ্র করে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টায় লিপ্ত হন।

ক্রমে ক্রমে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং একটি বড় সমর্থক শ্রেণি গড়ে তোলে। এ সময় ১৯২৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সান ইয়াত-সেন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হাতে নেন। নীতিতে বলা হয়, দেশ পরিচালনায় তাঁর দল কুয়োমিনটাং কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতা নেবে।

মাও সে–তুং তখন উভয় দলেই সমর্থন প্রকাশ করেন। তবে পরবর্তীকালে তিনি লেনিনবাদের দিকে ঝুঁকে যান। বিশ্বাস করতেন, এশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি হলো কৃষকশ্রেণির সমর্থন। এ ধারণা মাওকে চীনের বিপ্লবী আন্দোলনের নতুন কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে প্রণোদিত করে—যেখানে শহুরে শ্রমিক নন, গ্রামীণ কৃষকই বিপ্লবের মূল শক্তি হবেন।

১৯২৫ সালের মার্চে সান ইয়াত-সেনের মৃত্যু হয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন চিয়াং কাইশেক, যিনি পূর্বসূরির তুলনায় অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিলেন। ১৯২৭ সালে চিয়াং কাইশেক কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে কুয়োমিনটাংয়ের জোট ভেঙে দেন। সমাজতন্ত্রের অনুসারীদের ওপর শুরু হয় দমন–পীড়ন; বহু কমিউনিস্ট সমর্থক হত্যার শিকার বা বন্দী হন।

রেড আর্মি গঠন ও ঐতিহাসিক লংমার্চ

এ বিপর্যয়ের সময়ে মাও সে–তুং কৃষকদের নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী বাহিনী গঠন করেন, যা পরে ‘রেড আর্মি’ নামে পরিচিতি পায়। এ বাহিনীকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মাও ১৯৩০ সালে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম জিয়াংজি অঞ্চলে ‘সোভিয়েত রিপাবলিক অব চায়না সরকার’ গঠন করেন। এটি ছিল চীনা কমিউনিস্টদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র, যেখান থেকে তাঁরা পরবর্তী বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সক্ষম হন।

১৯৩৪ সালে মাও সে–তুংয়ের অধীন জিয়াংজি প্রদেশের কিছু অঞ্চল আসে। উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে চিয়াং কাইশেক প্রায় ১০ লাখ (কিছু সূত্রে পাঁচ লাখ) সেনা পাঠান রেড আর্মিকে দমন করার জন্য। জিয়াংজি প্রদেশের পার্বত্য অঞ্চলে রেড আর্মিকে ঘিরে ফেললেও মাও কৌশলে পালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

পরবর্তী ১২ মাসে এক লাখের বেশি কমিউনিস্ট এবং তাঁদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা চীনের উত্তরে ইয়ানান অঞ্চলের দিকে পাড়ি জমান। পথটি ছিল প্রায় আট হাজার মাইল দীর্ঘ এবং এই দুঃসাধ্য যাত্রার পর টিকে ছিলেন মাত্র ৩০ হাজার কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মী।

ইতিহাসচিহ্নিত এ পদযাত্রা পরবর্তী সময়ে পরিচিত হয় ‘লংমার্চ’ নামে। ৩৮১ দিনের এই যাত্রা ১২টি প্রদেশ অতিক্রম করে এবং প্রায় ২০ কোটি মানুষকে বিপ্লবের মন্ত্রে অনুপ্রাণিত করে। লংমার্চ শুধু সামরিক কৌশলের শিক্ষা নয়, এটি ছিল এক আত্মবিশ্বাস ও সংগ্রামী চেতনার প্রতীক, যা মাওকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অটুট নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

এ বিষয়ে মাও সে–তুং বলেছেন, ‘লংমার্চ নিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে, এর গুরুত্ব কী? আমরা উত্তরে বলি যে, ইতিহাসে এ ধরনের জিনিস এই প্রথম। লংমার্চ একটা ইশতেহার। লংমার্চ একটা বিপ্লবী প্রচার বাহিনী, বীজ বোনার মন্ত্র।’

মাও সে–তুংয়ের নিজের লেখা কবিতায় ধরা পড়েছে ওই সময়ের (১৯৩৫) কথা,

‘পুবের হাওয়া হয়েছে ভীষণ!

তুষার প্রভাতে বনহংসীরা চাঁদের জন্য কাঁদে

তুষার প্রভাতে অশ্বক্ষুরের ধাতব শব্দ,

ক্লান্ত বিউগল ধীরে ফুঁপিয়ে ওঠে,

পর্বতশীর্ষ থেকে দেখা যায়—

স্তরে স্তরে পাহাড়গুলো ঢেউয়ের মতো নাচছে

অস্তগামী সূর্য যেন একদলা রক্ত।’

যেভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে মাও

কমিউনিস্টদের ছত্রভঙ্গ করার পরও চিয়াং কাইশেক বেশি দিন শান্তিতে থাকতে পারেননি। ১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে জাপানের রাজকীয় সেনাবাহিনী চীন আক্রমণ করে। বেইজিংসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হাতছাড়া হয় এবং চিয়াং কাইশেক বেইজিং ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

জাপানি বাহিনীকে আটকাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত চিয়াং কাইশেক কমিউনিস্টদের সঙ্গে সন্ধি করেন। এরপর কমিউনিস্ট ও কুয়োমিনটাং বাহিনী একত্র হয়ে জাপানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ চালায়। এই সময়ে মাও সে–তুং নিজেকে চীনের সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বাহিনী সামরিক কৌশল, প্রশিক্ষণ ও জনপ্রিয়তা—দুটিই লাভ করে।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় হয়। এর ফলে জাপানের দখল করা অঞ্চলগুলো ফিরে পায় চীন। তখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে চীনে একটি জোট সরকার গঠনের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু মাও সে–তুং একক নিয়ন্ত্রণের পথে এগিয়ে যান।

এরপর শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। মাও তাঁর কৌশলী নেতৃত্ব, জনসমর্থন ও কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে কুয়োমিনটাং বাহিনীকে পরাজিত করেন। ১৯৪৯ সালের দিকে কমিউনিস্টরা পুরো চীন দখল করে নেন। চিয়াং কাইশেক দলবল নিয়ে পালিয়ে যান তাইওয়ানে।

তৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত আসে ১ অক্টোবর ১৯৪৯, যখন বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন চত্বরে মাও সে–তুং পিপলস রিপাবলিক অব চায়না প্রতিষ্ঠা ও কমিউনিস্ট শাসনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এই দিনটি চীনের আধুনিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।

মাওয়ের শাসন ও নানা বিতর্ক

পরবর্তী কয়েক বছরে মাও সে–তুং চীনে বড় ধরনের সংস্কার শুরু করেন। কৃষিজমি পুনর্বণ্টন করে ভূস্বামীদের জমি জব্দ করে সাধারণ জনগণের হাতে তুলে দেওয়া হয়। একই সময়ে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, শিক্ষার হার বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যসেবা মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়। তবে শহরাঞ্চলে এসব সংস্কার ততটা কার্যকর হয়নি।

প্রাথমিকভাবে মাও গণতান্ত্রিক ভাবনায় ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা অনুমোদন দেন। তিনি মনে করেছিলেন, এ ধরনের সমালোচনা তাঁকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে মাও দমন ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি গ্রহণ করেন। এ সময় হাজার হাজার মানুষ, যারা তাঁর নীতির সমালোচনা করেছিল, তাদের বন্দী করা হয়।

ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ

১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে মাও সে–তুং ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নামের একটি বিশাল উদ্যোগ হাতে নেন। এর লক্ষ্য ছিল চীনের কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করা। মাও আশা করেছিলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক দশকের মধ্যে চীনকে শত বছর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা সফলতা দেখা দিলেও তিন বছর ধরে চলা বন্যা ও খারাপ ফসলের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বিপর্যয়ের দিকে এগোতে থাকে। এক বছরের মধ্যে চীনে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যার কারণে ধারণা করা হয় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে প্রায় চার কোটি মানুষ মারা গেছেন।

গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের ব্যর্থতা মাওকে নীরব ও কোণঠাসা করে তোলে। এটি তাঁকে বাস্তবতার সঙ্গে আপস করতে শেখায়। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর নীতি ও সিদ্ধান্তগুলোয় আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রণমূলক দিকও যুক্ত হয়।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব (১৯৬৬-৭৬)

১৯৬৬ সালে আবার মাও সে–তুং সামনে আসেন। তখন তাঁর বয়স ৭৩ বছর। তিনি শুরু করেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব। মাও তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, চীনে আবার পুঁজিবাদ ফিরিয়ে আনতে সমাজে বুর্জোয়া উপাদান ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই উপাদানগুলোর মূলোৎপাটন করা অত্যাবশ্যক।

মাওর তরুণ সমর্থকেরা গঠন করেন রেড গার্ডস নামের বাহিনী। এই বাহিনী নেতৃত্ব দেয় সাংস্কৃতিক বিপ্লবে। তারা বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকদের ওপর দমন চালায়, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকাশনাকেন্দ্রগুলোয় হানা দেয় এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ধ্বংস করে। সাংস্কৃতিক বিপ্লব চীনের সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে, যা দেশের রাজনৈতিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে।

মাও সে–তুং বিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যকর্ম রচনার বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে, সাহিত্যকর্ম হতে হবে শ্রমিক, কৃষক, সেনাবাহিনী, বিপ্লবী যোদ্ধা ও ছাত্রসমাজের জন্যই। মাও সে–তুং লিখেছেন, ‘শিল্পী ও লেখকদের সামাজিক শ্রেনিবিন্যাস ও তাঁর পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে পরিষ্কার জ্ঞান থাকা দরকার। সমাজের নানা শ্রেণির দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিকে একটি গতিশীল ভূমিকার মধ্যে দাঁড় করিয়ে দেওয়াই শিল্পী ও সাহিত্যিকের কর্তব্য।’

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মাও আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসেন। এর পর থেকে তিনি আমৃত্যু চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ধরে রাখেন। মাও সে-তুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি নীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তাঁর চিহ্ন রেখে যায়।

মাও সে-তুংয়ের প্রয়াণের পর মধ্যপন্থী কমিউনিস্ট নেতারা ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁরা দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনে ধীরে ধীরে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ শুরু করেন, যা চীনের আধুনিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিশ্বমঞ্চে প্রবেশের পথ তৈরি করে।

মাও কি আছেন

আজ চীনে দেখা যায় ‘রেড ট্যুরিজম’ বা ‘লাল পর্যটন’–এর জোয়ার। মাও সে–তুংয়ের জন্মস্থান শাওশান এখন হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম গন্তব্য। তাঁর প্রতিকৃতি আজও শোভা পায় চীনের মুদ্রা, সরকারি ভবন, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীরচিত্রেও।

মাও সে–তুং নিয়ে গবেষণা সব সময়ই সহজ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনে ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর সেন্সরশিপ বেড়ে গেছে, ফলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব বা গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের দুর্ভিক্ষের মতো বিষয়গুলোয় নিরপেক্ষ গবেষণা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবু ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, মাও সে–তুংয়ের যুগ আজও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের দেখায় রাজনৈতিক ব্যক্তিপূজা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও গণ–আন্দোলনের সীমা কেমন হতে পারে। মাও সে-তুংয়ের জীবন ও নীতি শুধু চীনের ইতিহাসের অংশ নয়, বরং রাজনীতি, সমাজ ও মানুষের ক্ষমতার দিক নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

মাও সে–তুং যেমন আধুনিক চীনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, তেমনই তাঁর কিছু ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য বহন করেছে কোটি মানুষ। আজকের প্রজন্ম তাঁকে দেখে এক বহুমাত্রিক দৃষ্টিতে, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি ও আধুনিকতার গল্প মিলেমিশে আছে।

মাও সে-তুং বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর ছায়া এখনো বর্তমানের ওপর দীর্ঘ হয়ে আছে। রাজনৈতিক চেতনা, বিপ্লবী দর্শন ও সাংস্কৃতিক প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবনের শিক্ষা আজও চীনের ইতিহাস, সমাজ ও বিশ্বরাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক।

১৯৩৫ সালে চীন বিপ্লবের মহাবিস্ময় অধ্যায় লংমার্চকালে লাল ফৌজ বাহিনী একটি দুর্গম পর্বত অতিক্রম করেছিল। তারই স্মরণে মাও সে–তুং লিখেছিলেন একটি কবিতা। একটি কবিতা দিয়ে শেষ হোক মাওকে স্মরণের এই নাতিদীর্ঘ যাত্রা।

‘উত্তর দেশের দৃশ্য

বরফ মোড়কে ঢাকা সহস্র যোজন,

অজুত যোজন ব্যেপে তুষারের ঝড়।

স্বচ্ছ দিন আহা!

টুকটুকে মোড়কে দেখ ধবধবে সাজের বাহারে

আশ্চর্য নয়ন মনোহর

আমাদের এই নদীগিরি দেশ বড়ই সুন্দর

তাই অগণন বীর মাথা নোয় সমুখে তৎপর।

অনুবাদ: বিষ্ণু দে, (সংক্ষেপিত)

(সূত্র: ‘মাও সে-তুঙ এর দেশে’। মওলানা ভাসানী।

‘মাকর্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন, হো চি মিন ও মাও সেতুঙের কবিতা’। সম্পাদনা ও ভূমিকা: সন্দ্বীপ সেনগুপ্ত।

বিবিসি, আল–জাজিরা, প্রথম আলো)

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-08%2F0t2kjvr0%2Fmao-0.jpg?rect=0%2C0%2C900%2C600&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মাও সে–তুং। ফাইল ছবি: এএফপি

৪৬ জিম্মির ছবি প্রকাশ হামাসের, সবগুলোয় লেখা ‘রন আরাদ’

ফিলিস্তিনের গাজায় এখনো বন্দী থাকা জিম্মিদের ছবি প্রকাশ করেছে হামাস। এগুলোকে ‘বিদায়কালীন’ ছবি বলে উল্লেখ করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটির সামরিক শাখা। হামাসের ভাষ্যমতে, ইসরায়েল যদি গাজা নগরীতে স্থল অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে এই জিম্মিরা বিপদের মধ্যে পড়বেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। ইসরায়েল থেকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় ২৫১ জনকে। ইসরায়েলি বাহিনীর তথ্যমতে, তাঁদের মধ্যে ৪৭ জন এখনো গাজায় রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জন মারা গেছেন। ৭ অক্টোবর থেকেই গাজায় নৃশংস হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গতকাল শনিবার বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে ৪৬ জিম্মির ছবি প্রকাশ করে হামাস। প্রতিটি ছবিতে রন আরাদের নাম লেখা ছিল। রন ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর একজন পাইলট। ১৯৮৬ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধের সময় তাঁর যুদ্ধবিমান দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ভূপাতিত হয়। তাঁকে লেবাননের শিয়া গোষ্ঠীগুলো আটক করেছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে তাঁর আর কোনো খোঁজ মেলেনি। মরদেহও পায়নি ইসরায়েল।

টেলিগ্রামে ওই পোস্টে ছবিগুলোর পাশে হামাসের সামরিক শাখা আল–কাসেম ব্রিগেড লিখেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একগুঁয়েমি এবং সেনাপ্রধান ইয়াল জমিরের নতি স্বীকার করার কারণে গাজা নগরীতে অভিযান শুরুর সময় এই বিদায়ী ছবিগুলো তোলা হয়েছিল। তবে এই জিম্মিদের কতজন মারা গেছেন বা জীবিত আছেন, তা পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।

গাজায় চলমান নৃশংসতার মধ্যেই গত মঙ্গলবার থেকে গাজা নগরীতে স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এর পর থেকে সেখানে তীব্র হামলা চালানো হচ্ছে। শহর এলাকাটি থেকে পালিয়েছেন সাড়ে ৪ লাখ ফিলিস্তিনি। এই স্থল অভিযানের বিরোধিতা করে আসছেন জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের মতে, এতে জিম্মিদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই কথা সেনাপ্রধান ইয়াল জমিরেরও।

এদিকে আজ রোববারও গাজা নগরীর বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এদিন সেখানে অন্তত ৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অন্তঃসত্ত্বা এক নারী ও তাঁর দুই শিশুসন্তান। ওই নারীর শ্বশুর মোসাল্লাম আল–হাদাদ রয়টার্সকে বলেন, ‘আমার পুত্রবধূ, তার ছেলে, মেয়ে ও গর্ভে থাকা সন্তান, সবাইকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি। আর আমার ছেলের অবস্থা গুরুতর।’

ফিলিস্তিনের গাজায় অস্ত্র হাতে হামাসের যোদ্ধারা
ফিলিস্তিনের গাজায় অস্ত্র হাতে হামাসের যোদ্ধারা। ফাইল ছবি: এএফপি

গাজা নগরীর ধ্বংসযজ্ঞ ফিলিস্তিনিদের স্থায়ী উচ্ছেদের শঙ্কা বাড়াচ্ছে

ফিলিস্তিনের ব্যাংক কর্মী শাদি সালামা আল-রাইয়েস টানা এক দশক ধরে ৯৩ হাজার ডলারের (প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ৬৭ হাজার টাকা) একটি ফ্ল্যাট কেনার ঋণ পরিশোধ করে আসছিলেন। গাজা উপত্যকার গাজা নগরীর অভিজাত এক এলাকায় সুউচ্চ আধুনিক ভবনের ওই ফ্ল্যাটেই ছিল তাঁর পরিবারের স্বপ্নের বসতি। কিন্তু এখন তিনি নিঃস্ব। কারণ, ইসরায়েলের এক ভয়াবহ হামলার পর তাঁকে পরিবারসহ পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে। ইসরায়েলের হামলায় তাঁদের আবাসিক ভবনটি মুহূর্তেই ধসে পড়ে।

৫ সেপ্টেম্বর ১৫ তলা মুশতাহা টাওয়ারে ওই হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে গাজায় নতুন ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে ইসরায়েলের সেনারা। গাজার বৃহত্তম ও প্রাচীনতম শহরটিতে পূর্ণমাত্রায় স্থল অভিযান শুরুর আগমুহূর্তে সেখানকার উচ্চ ভবনগুলো একের পর এক ধ্বংস করা হয়েছে। এখন ইসরায়েলি বাহিনী গাজা নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ কেন্দ্রীয় শহরের দিকে এগোচ্ছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, গত দুই সপ্তাহে তারা গাজা নগরীর অন্তত ২০টি সুউচ্চ ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, এসব ভবন হামাস ব্যবহার করত। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এখন পর্যন্ত ৫০টি ‘সন্ত্রাসী টাওয়ার’ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

গাজা নগরীতে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সর্বাত্মক অভিযানে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী নগরীর জায়তুন, তুফফাহ, শুজাইয়া এবং শেখ আল-রিদওয়ানসহ একাধিক এলাকায় পুরো মহল্লা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এসব এলাকার অন্তত ১০ জন বাসিন্দা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শেখ আল-রিদওয়ান এলাকায় আগস্ট থেকে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা স্যাটেলাইটে ধারণা করা ছবিতেও স্পষ্ট ধরা পড়েছে।

আল-রাইয়েসের আশঙ্কা, গাজা নগরীর বাসিন্দাদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতেই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ও (ওএইচসিএইচআর) একই মত দিয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র থামিম আল-খিতান এক বিবৃতিতে বলেছেন, স্থায়ী বাসিন্দাদের এভাবে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আসলে জাতিগত নিধনের (এথনিক ক্লিনজিং) শামিল।

গত বুধবার আল-রাইয়েস বলেন, ‘গাজা নগরী ছেড়ে চলে যেতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। কিন্তু বিস্ফোরণ থামছেই না। আমি সন্তানদের নিরাপত্তাঝুঁকিতে ফেলতে পারি না। তাই যা পারি তা নিয়ে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছি।’ তবে স্বগতোক্তির সুরে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো পুরোপুরি গাজা উপত্যকা ছেড়ে যাব না।’

ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ গত মে মাসে বলেছিলেন, গাজার বেশির ভাগ এলাকা অচিরেই ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হবে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের সীমান্তঘেঁষা মিসরের কাছে একটি সরু ভূখণ্ডে ঠেসে রাখা হবে।

চলমান অভিযানে গাজা নগরীর সব বেসামরিক বাসিন্দাকে শহর ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসরায়েল। গত সপ্তাহে তারা উত্তর গাজার একটি ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে। এতে করে গাজা নগরীতে খাদ্যের অপ্রতুল সরবরাহ আরও কমে এসেছে।

ইসরায়েল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি এক প্রশ্নের জবাবে রয়টার্সকে বলেছেন, ‘গাজা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার কোনো কৌশল তাদের নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘হামাসকে ধ্বংস করা এবং বন্দীদের উদ্ধার করাই তাদের লক্ষ্য।’

নাদাভ শোশানি দাবি করেন, (গাজা নগরীর) সুউচ্চ ভবনগুলো থেকে হামাস নজরদারি করত এবং ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হামলা চালাত। এসব ভবনের বেসামরিক বাসিন্দাদের তারা মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। পাশাপাশি তারা ভবনগুলোতে ফাঁদসহ অন্যান্য বিস্ফোরক পুঁতে রাখত। ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বিস্ফোরণে গাজায় নিয়মিতভাবে ইসরায়েলি সেনা মারা যাচ্ছে।

আবাসিক ভবন ব্যবহার করে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে হামাস।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের লক্ষ্য সব সময় এক নয় বলে, রয়টার্সকে এমনটাই জানিয়েছেন দেশটির দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাঁদের একজনের মতে, গাজার কিছু এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতে তা পুনর্গঠন করা হবে, এটা ইসরায়েলের মূল সামরিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে মেলে না। এ বিষয়ে জানতে নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দেয়নি।

প্রায় দুই বছর আগে গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপত্যকাটিতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। গাজা নগরীতে চলমান ধ্বংসযজ্ঞ সেই রকম একটি অভিযান।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫১ জন জিম্মি হয়। ওই দিনই গাজায় জল, স্থল ও আকাশপথে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। ইসরায়েলের হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রায় অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছে।

গত সপ্তাহে জাতিসংঘের এক তদন্তে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। ইসরায়েল এই সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতদুষ্ট ও ‘কেলেঙ্কারিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসামরিক ভবন ও অবকাঠামো ধ্বংস যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

ইসরায়েলের বিমান হামলার পর গাজা নগরীর ১৫ তলা মুশতাহা টাওয়ার ধসে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যাচ্ছে। ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ইসরায়েলের বিমান হামলার পর গাজা নগরীর ১৫ তলা মুশতাহা টাওয়ার ধসে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যাচ্ছে। ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

মুখে হ্যান্ডেল কামড়ে ধরে চালালেন মোটরসাইকেল

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসঃ মোটরসাইকেল বা বাইকে স্টান্ট মানেই ভয় ও বিস্ময়ের মিশ্রণ। কিন্তু সৌদি আরবের জেদ্দায় যা ঘটেছে, তা বিশ্বকে হতবাক করেছে। আহমেদ ওসমান নামের এক যুবক মুখে হ্যান্ডেল ধরে শুধু পেছনের চাকায় ভর করে ৩০০ মিটার বাইক চালিয়েছেন। এভাবে পেছনের চাকায় ভর করে বাইক চালানোকে হুইলি বলা হয়।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ৯ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি ঘটেছে ১৫ জুলাই। বিপজ্জনক এই হুইলি করার জন্য আহমেদ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী পরিধান করেছিলেন।

শুরুতে বাইকটি প্রায় খাঁড়া করে দাঁড় করান আহমেদ। এরপর একটি হাতল দাঁতে শক্ত করে ধরেন। দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করেন। তাঁর ডান পা ছিল ফুটরেস্ট বা পাদানিতে, আরেক পা ছিল বাইকের পেছনের ধাতব রডে। প্রায় এক মিনিট ধরে তিনি এই ভঙ্গিতে বাইক চালিয়ে যান। ৩০০ মিটার শেষে সামনের চাকা নামিয়ে নিরাপদে থামান। সফলভাবে লক্ষ্য পূরণ করতে পারায় তিনি ও তাঁর দল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

আহমেদ বলেন, ‘আমি আমার প্রতিভা বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিলাম। এই রেকর্ডের মধ্য দিয়ে আমার প্রতিভা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে গেল।’ হুইলি করার পুরোটা সময় অসম্ভব রকমের মনোযোগী ছিলেন তিনি।

মোটরসাইকেল–দুনিয়ায় এর আগেও অনেক বিস্ময়কর রেকর্ড হয়েছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের জনি ডেভিস দ্রুতগতির একটি বাইক পেছনে ধরে ২৫৬ কিলোমিটার গতিতে দৌড়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। এই স্টান্টে বাইক স্টার্ট দেওয়ার পর কৌশলে উল্টো লাফ দিয়ে বাইক থেকে নেমে মোটরসাইকেলের পেছনের অংশ হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরতে হয়। এরপর তা ধরে থেকে বাইকের গতিতে ছুটতে হয়।

জনি ডেভিস নিজ দেশের পল সুইফটের সঙ্গে মিলে এক মিনিটে সর্বাধিক ‘হুইলি ডোনাটের’ রেকর্ডও করেছিলেন। হুইলি ডোনাট বলতে বোঝায়, মোটরসাইকেলের সামনের চাকা মাটি থেকে তুলে রেখে (হুইলি অবস্থায়) বাইককে বৃত্তাকারে ঘোরানো বা চক্কর দেওয়া। একে ‘ডোনাট’ বলা হয়। কারণ, বাইকের চাকার ঘর্ষণে মাটিতে গোলাকার দাগ পড়ে, যেটা দেখতে ডোনাটের মতো লাগে। ডোনাট একধরনের গোল পিঠাজাতীয় মিষ্টি খাবার।

মুখ দিয়ে হ্যান্ডেল কামড়ে ধরে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন সৌদি তরুণ
মুখ দিয়ে হ্যান্ডেল কামড়ে ধরে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন সৌদি তরুণ। ছবি: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের সৌজন্যে

বলসোনারো ও ট্রাম্প গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় হুমকি by পেদ্রো আবরামোভাই

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিচার নিয়ে যখনই সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়, তখনই তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিস্ময়কর মিলগুলোর প্রসঙ্গ উঠে আসে। দুজনই অতি ডানপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধি, দুজনই হঠাৎ করে রাজনীতিতে আসেন, দুজনই করোনা মহামারির সময় ক্ষমতায় ছিলেন এবং দুজনই প্রকাশ্যে মহামারি মোকাবিলা ও জলবায়ুবিজ্ঞানের গুরুত্ব অস্বীকার করেছিলেন। তাঁরা দুজনেই আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিলেন—কোনোভাবেই নির্বাচনে হার মানবেন না। আর যখন ভোটে হেরে গেলেন, তখন উভয়েই সমর্থকদের জাতীয় আইনসভা দখলে উসকে দেন, যাতে ফল উল্টে দেওয়া যায়।

কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। বলসোনারো এখন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। তিনি এখন সুপ্রিম কোর্টে দণ্ডিত হওয়ার মুখে। অন্যদিকে ট্রাম্প আবার যুক্তরাষ্ট্র শাসন করছেন। প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন হলো? এ উত্তর খুঁজলেই বোঝা যাবে, আজকের গণতন্ত্রের মূল সংকট কোথায়?

বলসোনারো রাজনীতিতে আসেন ১৯৮৮ সালের সেই সংবিধান চূড়ান্ত হওয়ার পর, যা ব্রাজিলে দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এসে শুরু থেকেই তাঁর ভাবনা ছিল কর্তৃত্ববাদী। তিনি বলেছিলেন, সামরিক একনায়কতন্ত্র যথেষ্টসংখ্যক বামপন্থীকে হত্যা করতে পারেনি। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো হেনরিক কার্দোসোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি পর্যন্ত করেছিলেন। এমনকি তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এলে পার্লামেন্ট বন্ধ করে দেবেন।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফকে অভিশংসনের সময় বলসোনারো তাঁর ভোটটি উৎসর্গ করেছিলেন সেই সেনা কর্মকর্তাকে, যিনি রুসেফকে নির্যাতন করেছিলেন। এমন অসংখ্য ঘটনায় প্রমাণ মেলে, বলসোনারো গণতন্ত্রের ভেতর দিয়েই উঠে এলেও সারা জীবন গণতন্ত্রকেই আক্রমণ করেছেন।

ট্রাম্পের উত্থান ভিন্নভাবে। ১৯৮০-এর দশকে নিউইয়র্কে পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো কিশোরের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণ মামলা হলে তিনি প্রকাশ্যে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আলোচনায় আসেন। পরে ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন তারকার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করেন।

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা দাঁড়িয়েছিল সেসব মানুষের ক্ষোভের ওপর, যাঁরা মনে করতেন, তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছেন কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে অবহেলিত। তিনি কখনোই উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং আদালতের প্রতি তাঁর প্রবল অবিশ্বাস ছিল। ব্যবসায় যেমন তিনি আইনকে অবজ্ঞা করেছেন, রাজনীতিতেও তা–ই করেছেন। এখন তিনি আবার প্রেসিডেন্ট হয়ে সংবিধান দুর্বল করা, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, ভোটের নিয়ম নিজের মতো করে পাল্টানো এবং নাগরিকত্বের সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

ট্রাম্প ও বলসোনারো—দুজনই প্রথমবার পুনর্নির্বাচনে ব্যর্থ হন। তবে এখানেই তাঁদের পথ আলাদা হয়ে যায়।

ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয়। ফেডারেল বিচার বিভাগের অধীন সারা দেশে একই দিনে ভোট হয়। আমাজনের আদিবাসী গ্রাম থেকে শুরু করে দক্ষিণের কৃষক পর্যন্ত সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফল ঘোষণা হয়। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার বলসোনারো এ ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি জাতির আস্থার জায়গাটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের খণ্ডিত নির্বাচনী ব্যবস্থা ট্রাম্প নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন। তিনি গণতন্ত্রের প্রতি সন্দেহ ঢুকিয়ে দেন, অঙ্গরাজ্যগুলোর কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির দাঙ্গার পথ তৈরি করেন।

বলসোনারো কিন্তু আরও এক ধাপ এগিয়ে ছিলেন। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা একটি খসড়া আদেশ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, যাতে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার শপথ আটকে দেওয়া যায়। সেনাবাহিনীর ভেতর দ্বিধার কারণে সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এমনকি লুলা, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরালদো আল্কমিন ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েসকে হত্যার পরিকল্পনাও হয়েছিল। তবে সেনাবাহিনীর অস্বস্তির কারণে সেটিও শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যায়।

নির্বাচনের পর বলসোনারোর সমর্থকেরা সেনাশিবিরের বাইরে অবস্থান নিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ দাবি করেন। সরকারি কর্মকর্তারাও পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেন। লুলার শপথ গ্রহণের এক সপ্তাহ পর তাঁরা সহিংসভাবে সরকারের তিন শাখার কার্যালয় আক্রমণ করেন।

২০২১ সালের ক্যাপিটল হিলে হামলার পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টদের প্রায় পূর্ণ দায়মুক্তি দিয়ে দেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁর বিজয় সব ধরনের জবাবদিহির পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

ব্রাজিলে চিত্র আলাদা। বলসোনারো ক্ষমতায় থাকতেই সুপ্রিম কোর্টকে প্রধান শত্রু বানিয়েছিলেন। অথচ অ্যাটর্নি জেনারেল (যিনি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন) যখন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আনেন, সেটা ছিল ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের শাস্তিহীনতার ধারা ভাঙার ঘটনা।

বলসোনারো এখন গণতান্ত্রিক আইনের শাসন উচ্ছেদের চেষ্টা করার অভিযোগে আদালতে। ব্রাজিলের আইনে এটি স্পষ্ট অপরাধ। কারণ, অভ্যুত্থান সফল হলে জবাবদিহি ভেঙে পড়বে। বলসোনারো বলছেন, তিনি অভ্যুত্থানের কথা শুধু ভাবছিলেন, কাজ করেননি। আদালত এখন তাঁর কথার সত্যতা যাচাই করছেন।

ট্রাম্প ও বলসোনারো দুজনেই আজকের নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদের প্রতীক। তাঁরা ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছেন, বিজ্ঞানের বিরোধিতা করেছেন, মানবাধিকারকে অগ্রাহ্য করেছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অবজ্ঞা করেছেন। তবে বলসোনারোকে আলাদা করে চেনা যায় তাঁর বিংশ শতাব্দীর সামরিক একনায়কতান্ত্রিক আদর্শের কারণে।

যদিও কোনো দেশই গণতন্ত্র ধ্বংসের হুমকি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়, তবে ব্রাজিলের স্বৈরাচারী শাসনপরবর্তী সংবিধান গণতন্ত্রের শক্ত সুরক্ষা তৈরি করেছে। বলসোনারো আজ শাস্তির মুখে, কারণ তিনি ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ভাঙেননি, বরং সরাসরি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন।

আমি একজন ব্রাজিলীয়। আমার পরিবারের অনেকে সামরিক শাসনামলে গ্রেপ্তার বা নির্বাসিত হয়েছিলেন। তাই বলসোনারোকে বিচারের মুখে দেখা আমার কাছে স্বস্তির বিষয়। কারণ, কোনো সামরিক শাসকই কখনো তাঁদের অপরাধের শাস্তি পাননি।

কিন্তু আজকের সবচেয়ে বড় হুমকি সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থান নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদ—যেখানে ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ হয়ে যায়। ব্রাজিলে, যুক্তরাষ্ট্রে এবং অন্যত্র—আমাদের এখনই প্রতিরোধ গড়তে হবে। কারণ, গণতন্ত্রের এই ক্ষয়ই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ও বলসোনারোর মতো নেতাদের ক্ষমতায় বসার পথ তৈরি করে।

* পেদ্রো আবরামোভাই, ব্রাজিলের সাবেক বিচারমন্ত্রী
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জইর বলসোনারো।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জইর বলসোনারো। ফাইল ছবি রয়টার্স

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলো বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। রোববার পর্যায়ক্রমে এ ঘোষণা দিয়েছে ওই তিন দেশ। এরমধ্যে প্রথম ঘোষণা আসে কানাডার পক্ষ থেকে। এরপর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ও সর্বশেষ বৃটেন ফিলিস্তিনিকে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে যোগ হলো নতুন এক অধ্যায়। পশ্চিমা শক্তি তথা যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা জি৭ ভুক্ত এই তিন দেশের স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুন পথে পরিচালিত করবে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউরোপীয় এই দেশগুলোর স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিন। এদিকে এই পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। পাশাপাশি এই স্বীকৃতিকে ‘সরাসরি সন্ত্রাসবাদকে পুরষ্কৃত’ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। 

স্কাই নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, রোববার ফিলিস্তিনকে প্রথমে স্বীকৃতি দেয় কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং আমরা ফিলিস্তিন ও ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যত গঠনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কানাডার দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে দৃঢ় অবস্থান ছিল, কিন্তু এই সম্ভাবনা এখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বীকৃতি প্রদানে দ্বিতীয় দেশ হলো অস্ট্রেলিয়া। কানাডা এবং বৃটেনের সঙ্গে সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবেনিজি। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তটি একটি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাবে। একই দিন পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে বৃটেন। প্রধানমন্ত্রীর স্যার কিয়ের স্টারমার এই পদক্ষেপের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মুখে আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে জীবিত রাখতে এবং দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এই সিদ্ধান্তকে হামাসের প্রতি কোনো পুরস্কার হিসেবে দেখা যাবে না বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। স্টারমার বলেন, হামাসের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এবং তাদের কোনো সরকারি বা নিরাপত্তা ভূমিকা থাকবে না। হামাসের বিরুদ্ধে আগের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সামনে নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে এই প্রক্রিয়ায় আরও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়াকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন নেতানিয়াহু। বলেছেন, রাজনৈতিক প্রয়োজনে দেয়া ইউরোপের এই স্বীকৃতিতে আত্মহত্যা করবে না ইসরাইল। দেশটির মুখপাত্র শোশ বদরোসিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহুর মন্তব্য পড়ে শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিডিয়ায় কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যেখানে বলা হচ্ছে, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার আজ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই পদক্ষেপকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘সরাসরি সন্ত্রাসবাদের পুরস্কার’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে আমাকে জানিয়েছেন যে, তার বার্তা হচ্ছে- গাজায় হামাসের হাতে আটক ইসরাইলি নাগরিকদের দুঃখ-দুর্দশা উপেক্ষা করে যেসব দেশ এই পথ বেছে নিচ্ছে তাদের চাপে আত্মহত্যা করবে না ইসরাইল।

এই বিরোধিতা নতুন নয় এবং ইসরাইল আগেও বৃটেন এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর এই ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মতামত জানিয়েছে। বদরোসিয়ান আরও নিশ্চিত করেছেন যে, নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে যাবেন, সেখানে কিছু দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।

mzamin