Tuesday, October 29, 2019

আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সেই ডন by রুদ্র মিজান

আজিজ মোহাম্মদ ভাই। অপরাধ জগতের পুরনো রাজা। একটা সময় ছিল বাংলাদেশে মাফিয়া ডন বলতে তাকেই বুঝানো হতো। হত্যা, মাদক পাচার, শেয়ার কেলেঙ্কারি-পাপের খতিয়ান দীর্ঘ। ছিলেন পর্দার আড়ালে। অনেকদিন ধরেই দেশছাড়া। থাইল্যান্ডে গড়ে তুলেছেন বসত। সেই আজিজ মোহাম্মদ ভাই নতুন করে আলোচনায় এসেছেন।
তার গুলশানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছেন মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সেখানে খোঁজ মিলেছে বিপুল পরিমাণ মাদকের। ছিল আধুনিক সব ক্যাসিনো সামগ্রী। এ বাড়িতে অবশ্য অনেকদিন পা পড়ে না আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। থাকেন তার স্বজনরা। মাঝে মাঝে আসতেন আজিজের স্ত্রী।
অপরাধ জগতে আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে নিয়ে নানা কাহিনী। ডিসকো, মদ, নারী তার খুব পছন্দের। নাচ আর গানেও পারদর্শী তিনি। ঢাকায় থাকার সময় নাচ-গান জানা বান্ধবীদের নিয়ে প্রায়ই পার্টিতে যেতেন। তার গান শুনে মুগ্ধ হতেন অনেকে। ২৭শে জুলাই ১৯৯৮- প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, এমনি এক পার্টিতে তার বান্ধবী বিয়ার চেয়ে না পাওয়ায় ঘটে যায় তুলকালাম কাণ্ড। চলচ্চিত্র প্রযোজনায় এসে ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ জড়িয়ে পড়েন নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয় নানা স্ক্যান্ডাল। এমনকি ভারতীয় কোনো কোনো অভিনেত্রীও তার ডাকে ছুটে আসতেন ঢাকায়। এরশাদের শাসনামলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। প্রিন্স আগা খানের সুপারিশে সেসময় তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন এমন আলোচনা আছে। ১৯৯৬ সালে কিংবদন্তির নায়ক সালমান শাহ’র রহস্যময় মৃত্যুর পর তুমুল আলোচনায় আসেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ ওঠে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিরুদ্ধে। সালমান শাহর মৃত্যুর দুই বছর পর ১৯৯৯ সালে ঢাকা ক্লাবে খুন হন আরেক চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী। এ হত্যাকাণ্ডেও আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও তার পরিবারের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। ১৯৯৬ সালে প্রতারণার মাধ্যমে শেয়ারবাজার  থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই মামলায় গত বছরের ২৯শে আগস্ট তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। তার ভাতিজা আমিন হুদাকে ২০০৭ সালে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
আজিজ মোহাম্মদ ভাই অপরাধ জগতের এক রহস্যময় চরিত্র। ভাই তার পারিবারিক উপাধি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ভারতের কানপুর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন আজিজের বাবা মোহাম্মদ ভাই। পরের বছর থেকে ব্যবসায় নামেন। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্টিল মিল। আজিজের জন্ম আরমানিটোলায়। অল্প বয়সেই পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি নিজেও আলাদা ব্যবসা শুরু করেন। তাদের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ওয়ান ইলেভেনের একদিন আগেই আজিজ মোহাম্মদ ভাই দেশ ত্যাগ করেন। দুই পুত্র ও তিন কন্যার জনক আজিজ দীর্ঘদিন ধরেই স্ত্রী নওরিনকে নিয়ে থাইল্যান্ডে বসবাস করছেন।
আজিজের গুলশানের বাড়িতে যা হতো
ঢাকায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের হয়ে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য তদারকি করেন তাদের মধ্যে একজন ওমর মোহাম্মদ ভাই। তিনি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাতিজা। নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈধ-অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করছিলেন দীর্ঘদিন থেকে। শুদ্ধি অভিযানে ক্যাসিনো হোতাদের অনেকে গ্রেপ্তার, অনেকে আত্মগোপনে গেলেও ওমর মোহাম্মদ ভাই ছিলেন বহাল তবিয়তে। গুলশান-২ এলাকায় নিজেদের বাড়িতেই মিনি বার ও ক্যাসিনো পরিচালনা করছিলেন দীর্ঘদিন থেকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে এই বাড়িটি যেন পরিণত হতো ভিন্ন এক জগতে।
রোববার বিকালে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের দুটি বাড়িতে অভিযানের পর গতকাল গুলশান থানায় এ বিষয়ে দুটি মামলা দায়ের করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের টিমের উপস্থিতি টের পেয়ে বাসা থেকে দ্রুত পালিয়ে যান ওমর মোহাম্মদ ভাই। তবে আটক করা হয় তার সহযোগী নবীন মণ্ডল ও মোহাম্মদ পারভেজকে। তারা দুজনেই গুলশানের ওই দুটি বাড়িতে পরিচালিত মাদক, বার ও ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের দেশি-বিদেশি অতিথি, বন্ধু, ঘনিষ্ঠদের জন্যই এই বারটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। পরবর্তীতে বারটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন ওমর মোহাম্মদ। বিদেশ থেকে মদ আমদানি করে মজুত রাখা হতো দুটি বাড়ির দুই ফ্ল্যাটে। পার্টি হতো ৫৭ নম্বর সড়কের ১১/এ নম্বর বাড়ির ছাদে। ওই ছাদেই গড়ে তোলা হয়েছে সুসজ্জিত বার।
সূত্র মতে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই বাড়ির পার্কিংয়ে একের পর এক জড়ো হতো কালো গ্লাসঘেরা বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়ির দরজা টেনে বের হতেন সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সঙ্গে থাকতেন সুদর্শনা নারী। বাড়ির ষষ্ঠ তলার ছাদের সুসজ্জিত বিশাল কক্ষে তখন ইংরেজি, হিন্দি গানের মিউজিক। পার্টিতে অংশ নিতেন বিভিন্ন বয়সের নারী, পুরুষ। ডেকে আনা হতো শিল্পীদেরও। লাইভ কনসার্ট হতো মাঝে-মধ্যে। এমনকি চলচ্চিত্রের নায়িকা, নৃত্যশিল্পী ও মডেলরা অংশ নিতেন পার্টিতে। মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বুঁদ হয়ে উপভোগ করতেন স্বল্প বসনা তরুণীদের নাচ, গান। পার্টিতে অংশ গ্রহণকারীদের পছন্দ অনুসারে আমদানি করা হতো বিলাতি মদ। প্রয়োজন অনুসারে মজুত থেকেই বারে মদ আনা হতো।
মদের সঙ্গে টাকা উড়তো ৬তলা এই ভবনের ছাদে। রাত ভর চলতো ক্যাসিনো। এই ক্যাসিনোতে ঢাকার প্রথম শ্রেণির কিছু ব্যবসায়ী এবং বিদেশিরাও অংশ নিতেন। প্রতিরাতেই বিপুল টাকার খেলা হতো এখানে। খেলা হতো ডলারে। বনানী এলাকার প্রভাবশালী এক বাসিন্দা সঙ্গী-সাথী নিয়ে এই আয়োজনে অংশ নিতেন। তবে তিনি ক্যাসিনো খেলতেন না। মূলত মদ ও নারীর আড্ডায় অংশ নিতেন তিনি। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর ক্যাসিনো বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছে।
ওমর মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হতো আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। রাশিয়া, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে প্রায়ই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের রেফারেন্সে বিদেশিরা ওই পার্টিতে যেতেন। আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাসায় অবৈধভাবে মদ মজুত রেখে বিক্রির বিষয়ে তথ্য পেয়ে রেকি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি টিম। পরে রোববার বিকালে গুলশানের ৫৭ নম্বর সড়কে একই দেয়াল ঘেরা দুটি বাসায় একসঙ্গে পৃথক দুটি টিমের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। ১১/এ বাসায় থাকেন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ে ভাই মরহুম রাজা মোহাম্মদ ভাইয়ের পরিবার। তার পুত্র ওমর মোহাম্মদ ভাই ওই বাসার তৃতীয় তলায় মদ মজুত রাখতেন এবং ছাদে পরিচালনা করতেন বার। পাশাপাশি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ১১/বি নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় বিপুল মদ পাওয়া যায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম জানান, এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গুলশান থানায় দুটি মামলা করেছে। মামলা দুটিতে ওমর মোহাম্মদ ভাইসহ তিন জনকে আসামি করা হয়েছে। বাদী হয়েছেন অধিদপ্তরের পরিদর্শক এসএম শামসুল কবির ও উপ-পরিদর্শক আতাউর রহমান। এ ছাড়াও অভিযানে ক্যাসিনো সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় একটি জিডি করা হয়েছে। এই অবৈধ কার্যক্রমে আর কারা জড়িত ছিলেন এ বিষয়ে তথ্য উদ্ধারের জন্য গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ জন্য তাদের রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।

আবু বকর আল-বাগদাদি বৃত্তান্ত by রুকমিনি ক্যালিমাচি ও ফালিহ হাসান

অবশেষে নিহত হলেন আবু বকর আল-বাগদাদি। তারই প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক স্টেট বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে সদস্য সংগ্রহ করে হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক এক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। পাগড়ি পরিহিত এই জঙ্গি নেতার বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর। এর আগে অনেকবারই তার মৃত্যুর খবর সংবাদ মাধ্যমে এলেও, সেই সংবাদ পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। তবে কোনোবারই কোনো দেশের সরকার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নিহত হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়নি। এবার খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযান চলাকালে আত্মঘাতি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিহত হন তিনি। অবশ্য এখন অবদি ইসলামিক স্টেটের সংবাদ মাধ্যম শাখা এ সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। তবে এ-ও সত্য, বিভিন্ন হামলার দায় খুব দ্রুতই স্বীকার করলেও, নিজেদের নেতাদের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করতে বা অস্বীকার করতে সময় নেয় সংগঠনটি।

ইরাকের সামারা শহরের ধর্মপ্রাণ সুন্নি পরিবারে জন্ম বাগদাদির।
তার মধ্যে ধর্মীয় আবেগ যেমন ছিল, তেমনি ছিল অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য বিদ্বেষ। তিনি ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে। তার নেতৃত্বে ছিল এমন এক সংগঠন, যেটি নিজেদের সবচেয়ে সাফল্যময় সময়ে বৃটেনের সমান ভূখণ্ডনিয়ন্ত্রণ করেছে। এই সংগঠন থেকে অনুপ্রাণিত বা নির্দেশিত হয়ে প্রায় ৩ ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তার অনুসারীরা।

বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী প্রধান ছিলেন তিনি। আমেরিকার সরকার তার সম্পর্কে তথ্যের জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল। কয়েক বছর ধরে তাকে ধরার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল বেশ কয়েকটি দেশ। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা তার সন্ধানে লেগে ছিল। প্রায় ১ দশক ধরে লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হন আল-বাগদাদি। তার নিরাপত্তার জন্য নানা স্তরের কঠোর ব্যবস্থা কার্যকর করা ছিল। নিজের সবচেয়ে আস্থাভাজন সহযোগীর সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি। গত বছর গ্রেপ্তার হওয়া বাগদাদির অন্যতম সহযোগী ইসমাইল আল-ইথাওয়ি বলেন, ‘আমার হাতের ঘড়ি পর্যন্ত খুলে রাখতে হয়েছিল।’ সকল ধরণের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস সরিয়ে রাখার পরও সাক্ষাতপ্রার্থীদের চোখ বেঁধে ফেলা হতো। এরপর বাসে ঢুকিয়ে কয়েক ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। যখন তাদের চোখের বাঁধন খুলে ফেলা হতো, তখন তারা দেখতে পেতেন আল-বাগদাদি তাদের সামনে বসে আছেন। বৈঠক সাধারণত ১৫-৩০ মিনিটের মধ্যে শেষ হতো। বৈঠক শেষে আল-বাগদাদিই আগে বের হতেন ভবন থেকে। তিনি চলে যাওয়ার পরও অতিথিরা সশস্ত্র পাহারায় থাকতেন কয়েক ঘণ্টা। এরপরই আবারও তাদের চোখ বেঁধে ফেলা হতো। এবং গাড়িতে করে আগের স্থানে রেখে আসা হতো। ইরাকি জয়েন্ট অপারেশন কমান্ডের মুখপাত্র জেনারেল ইয়াহিয়া রাসুল বলেন, ‘বাগদাদির মাথায় সবসময় একটা চিন্তাই ঘুরতো: আমার সঙ্গে কে বিশ্বাসঘাতকতা করবে? তিনি আসলে কাউকেই বিশ্বাস করতেন না।’

দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ আল-বাগদাদির নাম প্রথম শোনেন ২০১৪ সালে। ওই সময় তার অনুসারীরা ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ ও প্রতিবেশী সিরিয়ার অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করতো। তখনই নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে খিলাফত ঘোষণা করেন তিনি। এর মাধ্যমেই আরেক বৃহৎ ও পুরোনো জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার সঙ্গে নিজেদের স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে আইএস। আল বাগদাদির অনুসারীরা একসময় আল কায়দার পৃষ্ঠপোষকতায় চলেছেন প্রায় এক দশক। পরে বেশ সহিংসভাবেই সেখান থেকে বের হয়ে আসেন তিনি।

আল কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনও খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল এমনটা করলে তার জবাবে ব্যাপক সামরিক প্রতিক্রিয়া আসবে। তার সেই আশঙ্কা সত্যি ছিল। বাগদাদির ক্ষেত্রে ঠিক তা-ই হয়েছিল। এবং শেষ অবদি নিয়ন্ত্রিত এলাকা তাকে ছাড়তে হয়।
কিন্তু বাগদাদির শাসনাধীন অঞ্চলের শেষ অংশটুকু নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীর ৫ বছর লেগে যায়। নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্তে আইএস-এর কালো পতাকা উড়েছে সবচেয়ে জনবহুল কিছু এলাকায়। পূর্বে প্রাচীন নিনেভেহ শহর থেকে উত্তরে সিনজার পর্বতমালা। পালমিরা থেকে সিরিয়ার তেলক্ষেত্র দেইর আজোর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল আইএস’র রাজত্ব। বাইবেলে উল্লেখিত শহর নিনেভেহর প্রাচীন গির্জাগুলোকে বোমা বানানোর কারখানায় রূপান্তর করে আইএস। সিনজার পর্বতমালায় বহু নারীকে যৌনদাসীতে পরিণত করা হয়।

আইএস পরিচিত ছিল আরও বিভিন্ন নামে। আইসিস, আইসিল ও দায়েশ। এটি পরিচালিত হতো বাগদাদির নেতৃত্বাধীন ‘ডেলিগেট কমিটি’র মাধ্যমে। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ইসলামের বেশ সহিংস এক সংস্করণ চাপিয়ে দিয়েছিল আইএস। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগে অভিযুক্ত নারীদের পাথর ছুড়ে হত্যা করা হতো। অভিযুক্ত চোরদের হাত কেটে ফেলা হতো। জঙ্গিদের নির্দেশ অমান্য করলে শিরশ্ছেদ করা হতো।

এ ধরণের শাস্তির কিছু কিছু সৌদি আরবেও দেয়া হয়। কিন্তু ইসলামিক স্টেটের বিশেষত্ব ছিলো, তারা তাদের নৃশংস শিরশ্ছেদের ভিডিও বিশ্বব্যাপী প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সম্প্রচার করতো। কিছু কিছু শাস্তি তারা নিজেরাই আবিষ্কার করে নিয়েছিল, যার কথা ইসলামি বইপুস্তকে কখনই ছিল না। যেমন, জর্দানের একজন পাইলটকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই দৃশ্য মাথার ওপর থেকে ধারণ করা হয় ড্রোনের মাধ্যমে। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের খাঁচার ভেতর ঢুকিয়ে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। পানিরোধী ক্যামেরার মাধ্যমে ওই ব্যক্তির শেষ নিশ্বাসের ভিডিও ধারণ করা হয়। অনেককে টি-৫৫ ট্যাংক দিয়ে পিষে ফেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। কাউকে আবার কসাইখানায় নিয়ে প্রাণীদের মতো জবাই ও টুকরো টুকরো করা হয়েছে।

এমন নিষ্ঠুর শাস্তি সত্ত্বেও, কিছুক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সেবা দিতে পেরেছিল আইএস। তারা এমন এক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যার স্বীকৃতি দেয়নি কোনো দেশই। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে পূর্বোক্ত রাষ্ট্রের চেয়েও তাদের শাসন কার্যকর ছিল। যেমন, আইএস আয়কর সংগ্রহ করতো। পাশাপাশি, এ-ও নিশ্চিত করেছিল যে, ময়লা-আবর্জনা যেন প্রকৃত অর্থেই পরিষ্কার করা হয়। বিবাহিতরা বৈবাহিক লাইসেন্স পেতো আইএস-এর স্টেশনারি থেকে। তাদের সন্তান হলে তার ওজন সহকারে জন্মসনদ পেতো। এছাড়া পরিবহণ নিবন্ধন সংস্থাও ছিল তাদের।

আইএস যদিও মধ্যযুগের ধর্মীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলছিল, তারা ছিল কার্যত এই সময়ের সৃষ্টি। এই আমলের প্রযুক্তি ইন্টারনেট ব্যবহার করেই বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার অনুসারীকে আকৃষ্ট করেছে তারা। এই অনুসারীরা নিজেদেরকে আইএস-এর খিলাফতের ভার্চুয়াল নাগরিক মনে করতেন।

এই সংগঠনের অনুসারী হতে কোনো অনুমতি প্রয়োজন হতো না। বিশ্বের যে কেউ যেকোনো স্থানে আইএস’র পক্ষে হামলা চালাতে পারতো। এ কারণে আইএস ছিল বহুগুণ ভয়ানক। জীবনে যে কখনও প্রত্যক্ষভাবে আইএস’র সংস্পর্শে আসেনি বা সরাসরি আইএস’র কোনো প্রশিক্ষণও পায়নি, সে-ও আইএস’র পক্ষে হামলা চালাতে পারতো। সেই হিসাবে আইএস বিশ্বের হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। যুক্তরাষ্ট্রের সান বার্নারডিনোর অফিস পার্টিতে হামলা, জার্মানির বড়দিনের বাজারে হামলা, ফ্রান্সের নিস-এ ট্রাক দিয়ে হামলা, শ্রীলংকার চার্চে ইস্টার সানডের দিনে আত্মঘাতী বোমা হামলা- সবই হয়েছে আইএস’র নামে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা পেছনে রেখে গেছে রেকর্ডিং বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করা পোস্ট বা ভিডিও, যেখানে সে/তারা বাগদাদির প্রতি আনুগত্যের কথা বলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী শাখার সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক জোশুয়া গেল্টজার বলেন, ‘আইএস-এর উত্থান ও বিবর্তনের নেপথ্যে এককভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হলেন বাগদাদি।’
(রুকমিনি ক্যালিমাচি ও ফালিহ হাসান যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক। আল-বাগদাদিকে নিয়ে তাদের এই অবিচুয়ারি পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছে)

নরীর পাশবিক নির্যাতনের প্রতিকার কি? by নাজমুন নাহার রহমান

সখি ভালবাসা কারে কয়-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ গানটির আমরা প্রায় সবাই শুনেছি। আমার ধারণা রবি ঠাকুর যদি নারী হতেন আর তাঁর জন্ম যদি আজকের বাংলাদেশে হতো তবে, তিনি নিশ্চিত লিখতেন, সখি নারী নির্যাতন কারে কয়?
কারণ গত কয়েক বছর নারী নির্যাতনের রেকর্ডই এদেশে ভাঙেনি, বর্বরতার এক নতুন মাত্র যোগ করেছে। নির্যাতন করেই কেবল নারীকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে না। তাকে নির্যাতনের পর দল বেঁধে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। চলন্ত বাসে নারীকে ধর্ষণের পর বাস্তায় ফেলে ইট দিয়ে মাথা থেতলে হত্যা করা হচ্ছে। প্রযুক্তি অপব্যবহার করে নারীকে আত্মহত্যার পথে নিয়ে যাওয়া এখন ডাল ভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারী নির্যাতন বলতে আমরা কী বুঝি? কোনো এক বা একাধিক পুরুষ বা নারী দ্বারা কোনো শিশু থেকে বৃদ্ধাকে মুখের ভাষায় বা শারিরীকভাবে নির্যাতন করাকে নারী নির্যাতন বুঝায়।
এ তো গেল কিতাবি ভাষা। আমি বা আমার মতো নারীরা বর্তমানে এই নারী নির্যাতন শব্দের অর্থ বলতে বুঝি, নুসরাত বা শাহিনুরের কথা। তাঁরা তাদের জীবনের বিনিময়ে এই ব্যাখ্যা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে।
আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ বহুভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেছে। এ দাবি বিভিন্ন সংস্থার। তারা এ দাবির পক্ষে বিভিন্ন পরিসংখ্যানও দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নারী নির্যাতন বা এর প্রকাশভঙ্গিতে আমাদের দেশের পুরুষরা বর্বরতার শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার পাওয়ার দাবিদার হয়ে উঠছে।
এই পরিসংখ্যান কেনো করা হচ্ছে না তা নিয়ে ভাবতেই না ভাবতেই প্রকাশ পেল বাংলাদেশ নারী নির্যাতনের শীর্ষ স্থানে অবস্থান করছে। গত ৯ মে ২০১৮ তে প্রকাশিত ‘গুটম্যাচার ল্যান্সেট’ কমিশন এ রিপোর্ট প্রকাশ করে। যা বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ২৯ মে ২০১৯ এ ছাপা হয়। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী পাকিস্তান নারী নির্যাতনে আমাদের থেকেও পিছিয়ে আছে। এশিয়াতে কেবল মাত্র সিঙ্গাপুরে নারী নির্যাতনের হার এক শতাংশ। আর বাংলাদেশে তা ৫২ গুণ বেড়ে ৫৩ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান দেখে আমি অবাক ও বাকরুদ্ধ। এমন একটি বিষয়ে আমাদের দেশ শীর্ষ স্থান অর্জন করলো যার অপর নাম- বর্বরতা!
গত মে মাসের প্রথম নয় দিনের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে ৪১টি শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। যা দেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
পড়াশুনা শেষ করে একটি চাকরি যে কী অভাবনীয় সাফল্য তা, যে অর্জন করতে পারে সেই জানে। যদিও দেশের শ্রম শ্রমিকদের কাজের কোনো অভাব নেই। কিন্ত একজন শিক্ষিত মানুষের তার উপযোগি কাজের বহুলাংশের অভাব রয়েছে। পরিসংখান বলে আমাদের দেশে শিক্ষিত চাকারি প্রার্থীদের তিন জনের দুইজনই বেকার। অথচ একটি সাধারণ গ্রামের মেয়ে একটি চাকরি পেয়ে এই দু:সাধ্য কাজটি সাধন করেছেন। কিন্ত মেয়েটি তিনজন নরপশুর কাছ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পাারেনি। হ্যাঁ, আমি বলছিলাম ইবনে সিনা হাসপাতালের সেবিকা অভাগী শাহিনুরের কথা।
নতুন চাকরির টাকা জমিয়ে সে তার মধ্যবিত্ত বাবা-মার জন্য একটি এলইডি টিভি কিনে অফিস থেকে দু’দিনের ছুটি নিয়ে ছয় মে সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি থানার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের যাচ্ছিলেন। তিনি ওই গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। তাঁর অনেক দিনের শখ বাবা মা কে টিভি কিনে দেবে। আহা কী আনন্দ! বাসে বসে একা একাই  হয়তো এই শখ পূরণের আনন্দ উপভোগ করছিলেন শাহিনুর। কিন্ত তিন জন মানুষ রূপি পশুর ক্ষণিকের জৈবিক চাহিদার কাছে শাহিনুর ও তাঁর পরিবারের সকল আনন্দ নস্যাত হয়ে গেল। বাস শ্রমিকরা এই অবিবাহিত সেবিকাকে একা বাসের মধ্যে পেয়ে পৈশাচিক নির্যাতনে মেতে উঠলো। অত:পর হত্যা করলো নির্মমভাবে।
একবার আপনারা ভাবুন তো চোখ বন্ধ করে, কেউ আপনাকে যৌন নির্যাতন করার পর ইট দিয়ে মাথা থেতলে দিচ্ছে। শুধু একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। তাহলেই অনুভব করবেন কী নির্মমতা!
এই নরপশুদের তিন জনের দুইজন ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। তারা অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দিতেই উঠে এসেছে শাহীনুরকে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যার চিত্র। পুলিশ এখনো এ হত্যাক-ের চার্জশিট দেয়নি। হয়তো এ মামলাটিও আমরা দিনের পর দিন চলতে দেখবো। হয়তো এক সময় আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে আসামীরা বের হয়ে যাবে বা স্বল্প মেয়াদে সাজা ভোগ করবে। কারন মামলা দীর্ঘ হলে শাহীনুরের পিতা কী পারবে অর্থ ও শারিরীক সামর্থ্য দিয়ে তা মোকাবেলা করতে? তাঁর দ্বারা কি সম্ভব হবে আত্মজার খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা?
শাহিনুরে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে গেলে বা স্বল্প মেয়াদে শাস্তি পেলে শাহীনুরের বিদেহী আত্মার কাছে আমাদের জবাব-ই বা কী হবে। আমরা কি রাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের নির্যাতনের শাস্তি চীনের আদলে চাইতে পারি না। চীনে এ ধারনের অপরাধকে ‘ক্রাইম এ্যাগেইনিস্ট পিপলস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ ধরণের অপরাধে  মেডিক্যাল রিপোর্টে আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের সাথে সাথে চীন  অপরাধীর মৃতুদন্ড কার্যকর করে।
নাজমুন নাহার রহমান, চিত্রশিল্পী ও লেখিকা।
নাজমুন নাহার রহমান

আবারও মোদিকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিল না পাকিস্তান, আইসিএও’তে নালিশ

পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বহনকারী বিমানকে আবারও অনুমতি দেয়নি পাকিস্তান। এতে ক্ষিপ্ত হয়েছে ভারত। ফলে তারা বিষয়টি নিয়ে নালিশ জানিয়েছে বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান চলাচল বিষয়ক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইসিএও) কাছে। এ খবর দিয়েছে ভারতের অনলাইন জি নিউজ। এতে বলা হয়, আজ সোমবার থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। এ জন্য তাকে বহনকারী বিমানকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চায় ভারত। কিন্তু পাকিস্তান সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে রোববার। এর ফলে ক্ষিপ্ত ভারত আইসিএও’তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ভারত সরকারের একটি সূত্র বলেছেন, আবারও ভিভিআইপি স্পেশাল ফ্লাইটকে আকাশসীমা ব্যবহারে ক্লিয়ারেন্স দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পাকিস্তান সরকার। তাদের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমরা নিন্দা জানাচ্ছি। ভিভিআইপি বহনকারী স্পেশাল ফ্লাইটের জন্য আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়া একটি নিয়মিত রুটিন বিষয়। এক্ষেত্রে আইসিএওর গাইডলাইন রয়েছে। তাই ভারত এমন ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে আমরা এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল বিষয়ক ওই সংস্থায় নিয়ে গিয়েছি। আইসিএও’র সনদ অনুযায়ী, শুধু যুদ্ধ বাদে যেকোনো পরিস্থিতিতে এমন ফ্লাইটের জন্য যেকোনো দেশ তার আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য। ফলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বড় অংকের জরিমানা করা হতে পারে।
আগস্টের পর এটাই দ্বিতীয়বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলো পাকিস্তান। প্রথমবার সেপ্টেম্বরে নরেন্দ্র মোদি জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যান। তখন একবার পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল ভারত। কিন্তু পাকিস্তান সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তাই ভারত সরকারের সূত্রগুলো বলছেন, পাকিস্তানের উচিত আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলা। তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। একতরফা তারা যে ভুল ধারণা পোষণ করতে তা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
এর আগে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ইউরোপিয় ইউনিয়নের তিনটি দেশ সফরে যান ভারতের প্রেসিডেন্ট রাম নাথ কোবিন্দ। তখনও পাকিস্তান তাকে বহনকারী বিমানকে আকাশসীমা ব্যবহারে অনুমতি দেয় নি। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি বালাকোটে ভারতের সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানের পর ২৭ শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান তার আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থা চার মাস ধরে চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আগস্টে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ার ঘটনা। নরেন্দ্র মোদি সরকারের এমন সিদ্ধান্তে পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

যেসব খাবার ফ্রিজে রাখবেন না

কিছু খাবার ফ্রিজে না রাখলেই ভালো থাকবে দীর্ঘদিন। জেনে নিন কোন কোন খাবার রাখবেন না ফ্রিজে।
মধু
মধু সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজের প্রয়োজন নেই। বাইরেই এটি ভালো থাকে। মুখবন্ধ বয়ামে রেখে সারা বছরই খেতে পারবেন মধু।
পাউরুটি
পাউরুটি ফ্রিজে রাখলে শক্ত ও খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই ফ্রিজে না রেখে শুকনা ও ঠাণ্ডা স্থানে সংরক্ষণ করুন এটি।
টমেটো
ফ্রিজে রাখলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় টমেটোর। অনেকদিন পর্যন্ত ভালো রাখতে ফ্রিজের বাইরে খোলামেলা জায়গায় রাখুন টমেটো।
রসুন
ফ্রিজে না রেখে বাইরে রাখলেই রসুন বেশি দিন ভালো থাকে। তবে সংরক্ষণ করার জায়গাটিতে যেন পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে সেদিকে নজর রাখবেন।
পেঁয়াজ
ফ্রিজে পেঁয়াজ রাখলে কটু গন্ধ ছড়িয়ে যায় অন্যান্য খাবারে। শুকনা স্থানে সংরক্ষণ করুন পেঁয়াজ। বাতাসের উপস্থিতি থাকার পাশাপাশি স্থানটি খানিকটা অন্ধকার হলে পেঁয়াজের অঙ্কুরোদগম হবে না।

গ্যাস্ট্রিক দূর করার ৩ ঘরোয়া উপায়

অ্যালোভেরা
অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া, ফাস্টফুড খাওয়া, ঘুমের অভাবসহ নানা কারণে আজকাল গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভোগেন অনেকে। এছাড়া বেশি কফি ও চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া ও কম পানি খাওয়ার কারণেও অ্যাসিডিটি হতে পারে। গ্যাস্ট্রিক ঝটপট দূর করতে কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন। তবে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
অ্যালোভেরা
শরীর থেকে দূষিত উপাদান বের করতে সাহায্য করে এই ভেষজ। এতে থাকা অ্যান্টি-ফ্ল্যামাটরি উপাদান, ভিটামিন ও অ্যামিনো অ্যাসিড অ্যাসিডিটি দূর করতে সাহায্য করে। অ্যালোভেরার পাতা থেকে জেল সংগ্রহ করে পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করুন দিনে কয়েকবার। মুক্তি মিলবে বুক জ্বালা ও অ্যাসিডিটি থেকে। 
মসলার মিশ্রণ
একটি সসপ্যানে ১ গ্লাস পানি নিন। জিরা, এলাচ, আদা গুঁড়া ও লবঙ্গ দিন প্যানে। মৃদু আঁচে জ্বাল দিন। নামিয়ে ঠাণ্ডা করে পান করুন মিশ্রণটি। চাইলে গুড় মিশিয়ে নিতে পারেন খাওয়ার আগে।
আনারস
তাজা আনারসের রস খেতে পারেন। গ্যাস্ট্রিক কমে যাবে। 
তথ্য: টাইমস অব ইন্ডিয়া

ইউটেরাস সমস্যার লক্ষণ কী?

নারীস্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ওভারি এবং ইউটেরাসের ব্যাপারে অনেকেই উদাসীন। অথচ যারাই যন্ত্রণাদায়ক পিরিয়ড, পিঠের নিচের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটভার ইত্যাদিতে ভুগছেন তারা জানেন এগুলো ইউটেরাসের সমস্যার লক্ষণ। তবে সচেতন হলে এবং খেয়াল রাখলে এর কষ্ট থেকে বাঁচার রাস্তা খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিনও নয়।
গাইনিকলজিস্টদের মতে, স্ক্রিনিং পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা মেয়েদের জন্য ভীষণ জরুরি। এতে করে অসুখ হওয়ার আগেই ধরে ফেলা যে, কোথায় কোথায় সমস্যার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু সবার জন্য এই পদ্ধতি এক নয়। বয়স অনুযায়ী তার বেশ কিছু ভাগ রয়েছে। যাদের কম বয়স তাদের হরমোন ইমব্যালান্স খুব বেশি হয়। যার ফলে ব্রণ, অনিয়মিত পিরিয়ড, ওজন বেড়ে যাওয়া, চুল পড়া বা অতিরিক্ত হেয়ার গ্রোথ এই সব দেখা যায়। আবার ওজন বেড়ে যাওয়ার ফলেও হরমোনাল ইমব্যালান্স হতে পারে। সে সব ক্ষেত্রে অল্প ওষুধেও কাজ হয়। তবে কাউন্সেলিং এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকরি।
হরমোনাল ইমব্যালান্সের কারণে অনিয়মিত পিরিয়ডস হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ব্লিডিং কম হলে ততটাও ভয়ের নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ব্লিডিং হলে অ্যানিমিয়া হয়ে যেতে পারে।
তখন অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া জরুরি। তবে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে অনেক সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলেই মনে করেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা।
এখনকার বাচ্চারা জাঙ্কফুড অনেক বেশি খেয়ে থাকে। তাই আগে থেকেই সতর্ক হয়ে খাদ্যতালিকা থেকে জাঙ্ক ফুডের পরিমান কমিয়ে ফেলুন।
এছাড়া ইউটেরাসে কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, সেটা জানার জন্য প্যাপ স্মিয়ার অব সার্ভিক্স বা প্যাপ স্মিয়ার টেস্টের উপরে গুরুত্ব দেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞেরা।
বয়স কিছুটা বেড়ে গেলে বছরে অন্তত এক বার এই টেস্ট করানো উচিত। প্রি-ক্যান্সার সেলগুলোকে খুঁজে বের করার জন্যই এই টেস্ট। প্রি-ক্যান্সার সেল বা কোষ দশ বছর ধরা না পড়লে তবেই ক্যান্সার হয়। ফলে যতটা সম্ভব গুরুত্ব দিয়েই এটা করা ভাল।
তবে ইউটেরাসে ক্যান্সার এবং ওভারিতে ক্যান্সারের মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে বলে জানান চিকিৎসকরা। ইউটেরাসের ক্যান্সারে ব্লিডিং নিয়ে সমস্যা হয়। কিন্তু প্রাথমিক স্তরে ওভারিয়ান ক্যান্সারের কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। তাই ৪৫-৫০ বছরের নারীদের আলট্রা সাউন্ড করে দেখা উচিত ওভারি এবং ইউটেরাস ঠিক আছে কি না।

চার্লি চ্যাপলিনের হাসির আড়ালে এক বিশাল দুঃখগাথা by মোস্তফা হোসেন আবীর

তাকে দেখলেই হাসি পায়। আর তার অভিনয় দেখে তো দর্শক হাসতে হাসতে খুন। ঢিলেঢালা প্যান্ট, আঁটসাঁট কোট, ঢাউস আকারের জুতো, নাকের নিচে মধ্য বরাবর সামান্য কাটছাঁট নকল গোঁফ, মাথায় টুপি, হাতে ছড়ি বা লাঠি- রূপটা তার এমনই। আর এই রূপ নিয়ে তার নির্বাক দাপুটে অভিনয় তাকে জগৎজুড়ে এনে দিয়েছে আকাশছোঁয়া খ্যাতি। তিনি চার্লি চ্যাপলিন। অভিনয় জগতের হাসির রাজা। নির্মাতা হিসেবেও তুলনাহীন। তার অভিনীত এবং নির্মিত সিনেমাগুলো দেখতে বসলেই চোখ-কান খাড়া হয়ে যায় যে কারো।
কখন কী ঘটাবেন তিনি, হাসির নাকি কান্নার- তা বোঝা খুব কঠিন। তার প্রায় সব সিনেমাই নির্বাক। অথচ অনেক বক্তব্য, অনেক কাহিনি তিনি প্রতিটি মুহূর্তে নির্মাণ করেছেন হরেকরকম তামাশায়। সেসব দুর্দান্ত তামাশার আড়ালে লুকিয়ে আছে মানুষের যাপিত জীবনের দুঃখবোধ, হতাশা, হাহাকার, আশা ও আনন্দের মিশ্রণ। আর যিনি চলনে-বলনে নানান তামাশায় মানুষকে হাসাতেন, কাঁদাতেন, মানুষের মনে আনন্দের খোরাক জোগাতেন অনবদ্য অভিনয় শৈলীতে; সেই মানুষটির জীবন আসলে কতটা সুখের ছিল-  এমন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক।  উত্তরটিও তিনিই দিয়েছেন। চার্লি চ্যাপলিন বলেছেন, আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে ভালোবাসি, কারণ তখন কেউ আমার কান্না দেখতে পায় না। যে মানুষটি নিজের চোখের পানি আড়াল করে শুধু মূকাভিনয়ের মাধ্যমে অগণিত মানুষের হাসির খোরাক হয়েছেন তার জীবনটা ছিল এক বিশাল দুঃখগাথা। সত্যিকার আনন্দের হাসি জীবনে তিনি ক’বার হেসেছেন তা বোধহয় গুণে গুণে বলে দেওয়া যায়। বেচারা জীবনে এক মা ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারেননি, আর ছোট বেলাকার সেই দুঃখের ছাপ এতদিন ধরে কোটি কোটি লোককে হাসিয়েও তিনি মুছে ফেলতে পারেননি। বাইরে কোথাও দাওয়াতে গেলে অবশ্য তিনি লোকজনকে খুব হাসাতে পারতেন, কিন্তু ঘরে বসে তাকে তার বেহালার করুণ সুর ছাড়া আর কোনো সুর সাধতে কেউ দেখেনি। চার্লি চ্যাপলিন তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, আমার কাছে সৌন্দর্য হচ্ছে নর্দমায় ভেসে যাওয়া একটা গোলাপ ফুল। তিনি আরো লিখেছেন- শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি তার শৈশবকে বয়ে বেরিয়েছেন। সেই শৈশব কেটেছে চরম অভাব-অনটন ও নিদারুণ কষ্টের মাঝে। খুব ছোট বয়স থেকেই তিনি নানারকম তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। চ্যাপলিনের বয়স তিন বছর হওয়ার আগেই তার বাবা-মা আলাদা বসবাস করা শুরু করেন। বাবা তার মাকে ত্যাগ করার পর মা কখনো সস্তা নাটকের দলে গান গেয়ে, কখনো সেলাই করে চালিয়েছেন সংসার। তারা না খেয়ে থেকেছেন বহুদিন। কখনো ভিক্ষা করে, কখনো চুরি করে জোগাড় করতে হয়েছে খাবার। শৈশবের সেই বঞ্চনা আর অপমানকেই যেন চার্লি মোকাবেলা করেছেন তার চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে। তিনি লিখেছেন, প্রবল বঞ্চনার ভেতর দাঁড়িয়েও কী করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয়, সে শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন তার মায়ের কাছ থেকে। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চার্লি চ্যাপলিন নিজের সিনেমাতে নিজেই অভিনয় করতেন এবং চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা, পরিচালনা, প্রযোজনা এমনকি সংগীত পরিচালনাও করতেন। তিনি তার প্রতিটি সিনেমায় এক একটি থিম পরিবেশন করে পেয়েছেন বিশ্বখ্যাতি। চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন একজন যথার্থ সিনেমার কবি। যিনি তার কবিত্ব সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন কৌতুকের মধ্য দিয়ে। সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার জন্য তার এই কৌতুককে মাধ্যম হিসেবে নেয়ার অন্যতম একটি কারণ হয়তো এটিও হতে পারে যে, কৌতুুকের রয়েছে একটি নিজস্ব আড়াল ক্ষমতা। কৌতুকের প্রচুর অর্থ করা যায়। আইনে সহজে আটকে না। আর যে যার মতো করে অর্থ করে নিতে পারে, করতে পারে রসাস্বাদন। এই কৌতুকপ্রিয়তার ভেতর দিয়ে তিনি বরাবরই তুলে এনেছেন গভীরতম বাস্তবতার বোধ। আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মানুষের অমানবিকতা, অভাব, বিচ্ছিন্নতা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিষ্ঠুরতা। সেটা জুতা চিবানো, মেশিনের ভেতর চলে যাওয়া কিংবা খাদ্যযন্ত্রের যন্ত্রণায় পরা- যাই হোক না কেন! নিজেকে এবং পারিপার্শ্বিককে ঘিরে সব কিছুকেই চার্লি চ্যাপলিন দেখেছেন ব্যক্তির সীমানা ডিঙিয়ে এক গভীরতর অনুভূতি দিয়ে। তার বসতি, পথঘাট, মানুষ, সবই সেই অনুভূতির প্রতীক। তাই তার বেদনাবোধটি নিতান্ত ব্যক্তিগত হয়েও যেন ব্যক্তির উর্ধ্বে এক বৃহত্তর অনুভূতির রাজ্যে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। আর এই অনুভূতিই চ্যাপলিনের শিল্প সৃষ্টির উৎস। সৃষ্টির এই মূল উপাদানটি চার্লি চ্যাপলিন কুড়িয়ে পেয়েছেন তার ছেলেবেলাকার দুঃসহ জীবনযাত্রার মধ্যে। এখানেই তিনি চিনেছেন দুঃখকে, দারিদ্র্যকে; রূঢ় বাস্তবের সঙ্গে তার নিবিড় পরিচয় ঘটেছে। আবার এই কঠিন জীবনযাত্রার মধ্যে খাঁটি সোনার মতো খাঁটি প্রাণেরও সন্ধান তিনি পেয়েছেন লাঞ্চিত মানুষের ভিতরেই। চার্লি চ্যাপলিন তার সিনেমায় এমন একজন মানুষকে দেখিয়েছেন যার নিতান্ত ছোটখাট সাধারণ কাজগুলোর মধ্যেও বেশ একটু বোকামির আভাস পাওয়া যায়। যেমন হঠাৎ চার্লির মাথা থেকে টুপি উড়ে গিয়ে যত না হাসির বিষয় হয়, তার চেয়ে বেশি হাসির বিষয় হয় উস্কোখুস্কো চুলে, কোটের মস্ত বড় কোণ উড়িয়ে সেই টুপির পেছন পেছন হন্তদন্ত হয়ে তার ছুটতে শুরু করে দেয়া। চার্লি চ্যাপলিনের অনেক ছবিতেই দেখা যায়, একটি ঘটনাতেই দর্শককে দু’বার হাসাতে চেষ্টা করেছেন তিনি। এই যেমন ‘দি এডভেঞ্চার’ ছবিতে তিনি বারান্দায় বসে চামচ দিয়ে বরফ খেতে লাগলেন আর তার নীচে হলে বসালেন একজন উচ্চবংশীয় মহিলাকে। তারপর খানিকটা বরফ চামচে থেকে পড়ে গেল তার প্যান্টে, এবং শেষে বেয়ে বেয়ে গিয়ে সেটা পড়ল সেই মহিলাটির ঘাড়ে। মহিলা তো লম্ফ-ঝম্ফ দিয়ে সারা। দর্শকেরা একবার হাসেন চার্লির আনাড়ীপনায়, আর একবার তার চেয়ে বেশি হাসেন মহিলাটির লম্ফ-ঝম্ফে। চার্লি চ্যাপলিনের সব ছবিতেই এমন নানা মজার ঘটনা দেখে দর্শক দারুণভাবে আনন্দিত হন। প্রতিভাধর এই মানুষটির পুরো নাম স্যার চার্লস স্পেনসার জুনিয়র। ১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিল ইংল্যান্ডের দক্ষিণ লন্ডনের ওয়েলওর্থের বার্লো স্ট্রিটে জন্ম নেন বিংবদন্তি এই মূকাভিনেতা। তবে তার জন্মস্থান নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। বলা হয়, চার্লি চ্যাপলিন ব্রিটেনেই জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার মৃত্যর পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। তার জন্মস্থান ফ্রান্সও হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। ২০১১ সালে উদ্ধারকৃত একটি পুরোনো চিঠিতে পাওয়া তথ্যমতে, ইংল্যান্ডের স্ট্যাফোর্ডশায়ারের একটি ক্যারাভ্যানে তার জন্ম হয়। চার্লি চ্যাপলিনের বাবার নাম চার্লস চ্যাপলিন। আর মা হানা চ্যাপলিন। তারা দুজনই একাধারে মঞ্চে অভিনয় করতেন এবং পাশাপাশি গানও গাইতেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই চার্লিও শিল্পমনা ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার কয়েক বছর যেতে না যেতেই চার্লির মা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মানসিকভাবে অসুস্থই ছিলেন। অভাবের তাড়নায় ও মঞ্চে অভিনয় করার আগ্রহ থেকে মাত্র আট বছর বয়সেই চার্লি চ্যাপলিন যুক্ত হন ‘দ্য এইট ল্যাঙ্কাশায়ার ল্যাডস’ নামক একটি যাত্রাদলের সঙ্গে, যার সদস্যরা সবাই ছিল অল্পবয়সী। মূলত এখান থেকেই তার কর্মজীবন শুরু হয় এবং প্রথম থেকেই বালক চার্লি চ্যাপলিনের মঞ্চাভিনয় দর্শক ও আয়োজকদের নজর কাড়তে শুরু করে। এরপর ১৪ বছর বয়সে তিনি উইলিয়াম জিলেট অভিনীত ‘শার্লক হোমস’ নাটকে কাগজওয়ালা বিলির চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সুবাদে তিনি ব্রিটেনের নানা প্রদেশে ভ্রমণ করেন ও অভিনেতা হিসাবে তিনি যে খুবই সম্ভাবনাময় তা সবাইকে জানিয়ে দেন। শুরু হয় তার জীবনের নতুন ও কর্মব্যস্ত এক অধ্যায়। এরপর চার্লি চ্যাপলিন নামের এই দুঃখী বালকটিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তার বয়স যখন সতেরো, তখন আমেরিকার ‘কি স্টোন মুভিজ’-এর পরিচালক ম্যাক সেনেট চ্যাপলিনকে আমেরিকায় নিয়ে আসেন। সেনেটের পরিচালনায় কৌতুক চরিত্র ‘দ্য লিটল ট্র্যাম্প’ হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন চ্যাপলিন। সেনেট চ্যাপলিনের কাজে এতই সন্তুষ্টি আর নির্ভরতা খুঁজে পান যে, তার পরবর্তী সিনেমাগুলোর প্রযোজনা ও পরিচালনার ভার নিশ্চিন্তে চ্যাপলিনের ওপর ছেড়ে দেন। হাসির গল্পের মধ্যেও কিছু একটা অর্থ ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হন স্বাধীন চ্যাপলিন, যেন বলতে চান পেছনে ফেলে আসা জীবনের কষ্টের কথা। সমগ্র জীবনে তিনি আশিটিরও বেশি ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সিটি লাইটস’, ‘মডার্ন টাইমস’, ‘দ্য ব্যাংক’, ‘পুলিশ’, ‘উওম্যান’, ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’. ‘দ্য ভ্যাগাবন্ড’, ‘দ্য গোল্ড রাশ’ ইত্যাদি। একাধারে কাহিনি রচনা, পরিচালনা, অভিনয়- চলচ্চিত্র জগতে এই ত্রয়ী রূপ চ্যাপলিনের মধ্যেই প্রথম দেখা যায়। চার্লি চ্যাপলিনের ৭৫ বছরের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনটি বাদে বাকি সব চলচ্চিত্রই ছিল নির্বাক। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম কথা বলেন ১৯৪০ সালে ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ সিনেমায়। এটি একটি রাজনৈতিক ব্যাঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র। রিল লাইফের মতো চার্লি চ্যাপলিনের রিয়েল লাইফও অনেক ঘটনাবহুল। এ অভিনেতা তখন পৃথিবী বিখ্যাত। একবার তার অনুকরণে অভিনয়ের একটি প্রতিযোগিতার অয়োজন করা হয়। গোপনে চার্লিও নাম দেন সেই প্রতিযোগিতায়। মজার বিষয় হলো প্রতিযোগিতার শেষে দেখা গেল প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে অন্য দু’জন প্রতিযোগী আর চার্লি চ্যাপলিন হন তৃতীয়। আর একবার দুই দিনের জন্য জন্মভূমি ইংল্যান্ডে যান চার্লি চ্যাপলিন। আর এই সময়ের মধ্যে ঘটে যায় বিশাল ঘটনা। মাত্র দু’দিনে তার কাছে প্রায় ৭৩ হাজার চিঠি আসে। ১৯২৫ সালের ৬ই জুলাই প্রথমবারের মতো অভিনেতা হিসেবে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে আসেন চার্লি চ্যাপলিন। চার্লির ট্রেডমার্ক চরিত্র ভবঘুরে ২৬ বছরে আবির্ভূত হয় ৭০টি পূর্ণ ও স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমায়। ১৯৮৭ সালে দেড় লাখ ডলারে বিত্রিু হয় চার্লির টুপি ও ছড়ি। ব্যক্তিজীবনে চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আর এ কারণে ১৯৫২ সালে তার্কে আমেরিকা ছাড়তে হয়েছিল। এরপর সুইজারল্যান্ডে তিনি স্থায়ী হন। অবশ্য ১৯৭২ সালে আরেকবার তিনি আমেরিকায় এসেছিলেন বিশেষ একাডেমি অ্যাওয়ার্ড গ্রহণের জন্য। ব্রিটেনে তাকে ‘নাইট’ উপাধি দেওয়া হয়। এছাড়া ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সংবর্ধনা এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট উপাধি তার কর্মকৃতীর স্বীকৃতি। ১৯৭৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর ৮৮ বছর বয়সে চার্লি চ্যাপলিন সুইজারল্যান্ডে প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান। ১৯৭৮ সালের ৩রা মার্চ সুইজারল্যান্ডের করসিয়ার-সার- ভেভে গোরস্তান থেকে চুরি হয়ে যায় তার মৃতদেহ। অবশেষে ১৮ই মার্চ পুলিশ মৃতদেহটি উদ্ধার করে এবং পুনরায় সমাহিত করা হয় চার্লি চ্যাপলিনকে।

নিজের শরীর নিয়ে হীনমন্যতাবোধ যেভাবে ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে : -মিচ উইটহ্যাম

আমার বান্ধবী লিয়ানেকে আমি সত্যিই ভালোবাসি। আমি চাই সেও তার নিজের সম্পর্কে একই ভাবে অনুভব করুক। সে খুব মজার একজন মানুষ।
একই সাথে তাঁর নীল চোখ এবং লম্বা চুল তাকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সে তাঁর চুল নানা ধরনের রং করে। বর্তমানে কার চুলে লাল রং করা। তাঁর হাসিও বেশ সুন্দর।
কিন্তু নিজের সম্পর্কে লিয়ানের ধারণা ভিন্ন রকম। সে নিজেকে ঘৃণা করে।
প্রতিদিন সে নিজেকে কয়েকবার কুৎসিত এবং বিরক্তিকর বলে বর্ণনা করে। সে নিজেকে স্থূলকায় মনে করে। আসলে বিষয়টা সে রকম নয়।
২১০৫ সালে টিন্ডারে আমাদের দেখা হয়। আমার বান্ধবী টিন্ডার পছন্দ করে, কারণ টিন্ডারে ছবি নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্রথমে যে কয়েকবার আমাদের দেখা হয়েছে তখন তাকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। আমি কারো সাথে কখনো এতো দ্রুত সহজ হতে পারিনি।
আমাদের মধ্যে ভালো যোগাযোগ ছিল এবং কয়েকমাসের মধ্যে আমি তার প্রেমে পড়ে গেলাম।
আমাদের সম্পর্কের ছয় মাসের মধ্যে এটা পরিষ্কার হয়ে গেলো যে লিয়ানে তার শারীরিক গঠন নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে।
আমরা যখন বাইরে যাবার জন্য তৈরি হয়েছি তখন সে হঠাৎ বুঝতে পারলো যে তাঁর চুলের স্প্রে শেষ হয়ে গেছে।
লিয়ানে এবং মিচ গত দেড় বছর যাবত ডেটিং করছে।
তাঁর চুল দেখতে কেমন লাগবে? এ বিষয়টি ভেবে সে কিছুটা মন খারাপ করলো। তখন আমি তার জন্য চুলের স্প্রে কিনতে গেলাম।
বিষয়টিতে সে বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। একপর্যায়ে সে জিনিসপত্র লাথি মেরে ফেলে দিতে লাগলো।
আমাদের মধ্যে সাংঘাতিক ঝগড়া হয়ে গেলো। যখন আমরা শান্ত হলাম, তখন আমি বুঝতে পারলাম যে তার ব্যবহার - নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলা - বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়।
আমার 'অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার' রয়েছে। এটা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, কিন্তু এটি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
আমি বুঝতে পারলাম যে আমার বান্ধবীর কিছু ব্যবহারেও একই রকম লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
আমি তাকে চিকিৎসকের কাছে যাবার পরামর্শ দিলাম।
যদিও সে প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত ছিলনা, কিন্তু পরবর্তীতে বিষয়টা নিয়ে সে কিছুটা স্বস্তি পেল এই ভেবে যে আমরা এনিয়ে আলাপ করেছি।

বডি ডিসমোরফিক ডিসঅর্ডার

চিকিৎসকের কাছে যাবার পর তার বডি ডিসমোরফিক অর্ডার ধরা পড়লো। এর অর্থ হচ্ছে, একজন ব্যক্তি নিজের চেহারা সম্পর্কে নানা খুঁত কল্পনা করে সেগুলো নিয়ে ভাবতে থাকে।
মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশের মধ্যে এ ধরণের আচরণ আছে বলে মনে করা হয়। তারা মনে করে সে অন্যদের তুলনায় দেখতে কুৎসিত।
লিয়ানে সম্প্রতি চিকিৎসার অংশ হিসেবে থেরাপি নিতে শুরু করেছে। যদিও তার সমস্যাটি চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু এ ধরণের অবস্থায় বসবাস করা খুব কঠিন।
আমার যদিও এ ধরণের সমস্যা নেই, কিন্তু লিয়ানের সাথে থাকতে গিয়ে এটি আমার জীবনেরও অংশ হয়ে গেছে।
নিজের চেহারা নিয়ে অতি উদ্বেগ লিয়ানের জীবনযাত্রা ব্যহত করছে।
দিনে-দিনে এই সমস্যাটি এমন আকার ধারণ করলো যে অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হলাম।
উদাহরণস্বরূপ- আমরা হয়তো হয়তো জুস বারে ঢুকছি এমন সময় আমার বান্ধবী বেঁকে বসলো, সে যাবেনা। কারণ সে মনে করছে যে ভেতরে তার চেয়ে বেশি সুন্দরী একটি মেয়ে বসে আছে।
মাঝেমধ্যে এটি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। লিয়ানে প্রায়ই বলে সে তার মুখমণ্ডল আঁচড়ে ফেলতে চায় এবং তার চুল পুড়িয়ে দিতে চায়। কারণ তার দৃষ্টিতে তার নিজের চেহারা এবং চুল সুন্দর নয়।
একবার সে যখন চুলে আগুন ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করলো। তখন আমি সেখানে ছিলাম। আমি ওর হাত থেকে লাইটার ছিনিয়ে নিলাম।
সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল, আমরা কখনো অন্তরঙ্গ ছিলাম না। আমার বান্ধবীর পক্ষে আমার সামনে নগ্ন হওয়াটা ছিল ভীষণ কঠিন।
কয়েকমাস আগে আমরা যখন শেষবারের মতো অন্তরঙ্গ হয়েছিলাম, তখন সেটা পুরোপুরি যৌন মিলন ছিল না।
সাধারণত আমি অপেক্ষা করতাম সে যাতে এগিয়ে আসে। সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে কিনা সেটি বুঝতে সুবিধে হতো। কিন্তু সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল, সে চাইতো আমি যাতে এগিয়ে যাই।

অন্তরঙ্গ অবস্থা

আমরা অন্তরঙ্গ হতে শুরু করতাম। কিন্তু একপর্যায়ে সে আত্মবিশ্বাস বোধ করতো না এবং আমরা সেটা থামিয়ে দিতাম।
মাঝে মধ্যে আমার মনে হতো আমি ছুরির ওপরে বসে আছি। যৌন মিলন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় বিষয়।
নিজের চিকিৎসার অংশ হিসেবে আমি পর্ন ব্যবহার করি। একবার লিয়ানে যখন আমার মোবাইল ফোনে পর্ন দেখতে পেল, সে খুব রেগে গেল। সে চাইতো না যে আমি পর্ন দেখি।
আমরা অন্তরঙ্গ হওয়ার বেশ কিছু উপায় চেষ্টা করেছি। আমি তাকে বলতাম যে, সে কতো সুন্দরী এবং তাকে তৈরি হওয়ার জন্য অনেক সময় দিতাম।
কিন্তু সে যদি নিজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করে তাহলে বিষয়টি বেশ কঠিন। সেজন্য আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন পরিকল্পনা করতে পারিনা।
আমাদের দু'জনের বয়স এখন ২৯ বছর। এই বয়সে তার সব বন্ধুরা বিয়ে করছে। আমরাও বিয়ে এবং সন্তান নিয়ে আলাপ করেছি, যেটা আমি খুব পছন্দ করি।
লিয়ানে বলত সে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু তার মন সেটিতে সায় দিতো না। সে মনে করতো সন্তান জন্ম দিলে তার শরীরের ক্ষতি হবে।
মিচ হুইটহ্যাম
আমার বান্ধবী এখন থেরাপি নিচ্ছে এবং তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
একবার আমরা একটি বারে বসেছিলাম। তখন কিছু জুটি আসলো যাদের সাথে মেয়েরা ছিল। বিষয়টিতে লিয়োনে বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো।
আমি বুঝতে পারলাম যে, লিয়ানে ভেবেছে মেয়েগুলো তার চেয়ে বেশি সুন্দরী।
আমার উপর রাগান্বিত হয়ে সে ওখান থেকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। আমরা গত ১৮ মাস যাবত প্রেম করছি এবং এসব ক্ষুদ্র বিষয় বেড়েই চলেছে।

সাহায্য নেয়া

সে ঘটনার পরে আমি তাকে বললাম যে, বিষয়গুলো বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আমি আর এগুলো মানিয়ে নিতে পারছিনা। আমি লিয়ানেকে পরামর্শ দিলাম সে যাতে সাহায্য নেয়।
প্রায়ই মনে হতো লিয়ানের মধ্যে দুটো মানুষ, এর একটি হচ্ছে বডি ডিসমোরফিক ডিসঅর্ডার। এটি তার গভীরে লুকায়িত।
যে যখন বলতো, "আমি সুন্দর না।" তখন আমি সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে ওর হাত ধরতাম কিংবা তাকে জড়িয়ে ধরতাম।
অনেকদিন ধরে আমি আমার পরিবার বা বন্ধুদের বিষয়টি জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি।
কারণ, আমি ভেবেছি এটা লিয়ানের ব্যক্তিগত বিষয়। গত বছর আমি বিষয়টি আমার বাবা-মাকে জানালাম। কারণ, আমার মধ্যে জমে থাকা হতাশা লাঘব করার উপায় খুঁজছিলাম।
আমার বাবা-মা বেশ সহনশীল ছিলেন। আমার মা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতেন। লিয়ানের সমস্যাটি তিনি অনুধাবন করতে পারলেন।
বন্ধুদের বিষয়টি ভিন্ন রকমের। তারা সম্প্রতি বডি ডিসমোরফিক ডিসঅর্ডার সম্পর্কে জানলো।
আমার এবং লিয়ানের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার যে অভাব ছিল, সে বিষয়টি বুঝতে বন্ধুদের খুব বেগ পেতে হচ্ছিল।
আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়েছে, "তুমি এর সাথে মানিয়ে নিতে পারবে না।"
কিন্তু আমাদের মধ্যে যে ভালোবাসা আছে, সে বিষয়ে আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।
আমরা ভালো মুহূর্তগুলো একত্রে উদযাপন করতাম। আমরা এখনো প্রতিদিন হাসি এবং পরস্পরের কাছে সবকিছু প্রকাশ করি। সে এখনো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আমি জানি লিয়ানের বডি ডিসমোরফিক ডিসঅর্ডার কখনো দূর হবে না। কিন্তু আমি এমন একটি অবস্থায় পৌঁছতে চাই যেখানে সে তাঁর নিজেরে মধ্যে আত্মবিশ্বাস পায়।
(এই সাক্ষাৎকারটি বিবিসি থ্রি-তে প্রকাশিত হয়েছে।)